জোঁক

ঋজু গাঙ্গুলী

Jonk

ধরুন আপনি পশ্চিম কর্নওয়ালে বেড়াতে গেছেন। সে-ক্ষেত্রে, পেনজ্যান্স আর ল্যান্ডস এন্ডের মাঝের ন্যাড়া আর উঁচু জায়গাটা পেরোনোর সময় রোদে পুড়ে, জলে ভিজে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটা নোটিসবোর্ড আপনার নজরে পড়তেও পারে। তাতে লেখা আছে, ‘পোলার্ন ২ মাইল।’ তখন আপনি গাইড বুক খুলবেন। সেখান থেকে জানবেন যে ওটা একটা মাছ-ধরা গ্রাম। দ্রষ্টব্য বলতে গির্জার রেলিঙ হিসেবে ব্যবহৃত কিছু কাঠখোদাই আর নকশা— যারা আদতে আরও পুরোনো একটা গির্জার অংশ ছিল। সেখানেই আপনি পড়বেন যে সেন্ট ক্রিডের গির্জাতেও সেই সময়ের নকশা আর স্থাপত্য দেখা যায়— বরং আরও ভালোভাবে সংরক্ষিত আকারে। এরপর আর কে ওখানে যাবে?

তা-ও ধরুন আপনি যেতে চাইলেন। একটু এগিয়েই বুঝবেন যে খানাখন্দে ভরা ওই সরু রাস্তায় যাতায়াত করে হাঁটু বা সাইকেলের, বা দুটোরই বারোটা বাজবে। তারপর আপনার বাকি ছুটিটার কী হবে?

তাই, একেবারে উত্তুঙ্গ টুরিস্ট সিজনেও পোলার্নে কেউ যায়-টায় না। বাকি সময়ের কথা তো বলাই বাহুল্য। এমনকি পোস্টম্যান অবধি রেজিস্টার্ড চিঠি বা বড়ো পার্সেল গোছের কিছু না এলে ওই গ্রামে যায় না, বরং রাস্তার কাছেই রাখা একটা বড়ো বাক্সে সব চিঠিচাপাটি ফেলে দেয়।

জেলেরা মাছ ধরে সমুদ্রপথেই জেটিতে যায়। সেখানে মাছ বেচার পর ফিরে আসে তাদের ফাঁকা ট্রলারগুলো।

কেউ আসে না পোলার্নে। সেখান থেকেও কেউ কোত্থাও যায় না। এতটা বিচ্ছিন্ন থাকলে যে-কোনও জায়গার বাসিন্দাদের মধ্যেই একটা তীব্র স্বাধীনচেতা, বা আরও সহজ ভাষায় বললে একলাষেঁড়ে মনোভাব তৈরি হতে বাধ্য। কিন্তু পোলার্নের বাসিন্দারা নিজেদের মধ্যে বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে-গুছিয়ে নিত। মনে হত, ঝড় আর বৃষ্টি, রোদ আর হাওয়া যেন এক আলাদা মন্ত্রগান শুনিয়ে তাদের একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। মানুষের ক্ষুদ্র-তুচ্ছ ওঠাপড়ার চেয়েও অনেক বড়ো, অনেক দুর্জ্ঞেয় কোনও শক্তির অস্তিত্ব যেন তারা সবাই জানে।

দশ বছর বয়সে আমার ফুসফুসের সমস্যা ধরা পড়েছিল। এমনিতেই রোগে ভুগে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিলাম। তার ওপর এই অবস্থা হওয়ায় বড়োরা ঠিক করেছিলেন, আমাকে লন্ডন থেকে দূরে এমন কোথাও পাঠিয়ে দেবেন যেখানে বিশুদ্ধ হাওয়া আর যত্ন— দুটোই জুটবে। আমার পিসেমশাই রিচার্ড বোলিথো ছিলেন পোলার্নের ভাইকার। তিনি ওখানে একটা ছোট্ট বাড়ি কিনে সেখানেই থাকতেন। ভিকারেজটা তিনি জন ইভান্স নামের এক শিল্পীকে ভাড়া দিয়েছিলেন।

রিচার্ডের বাড়ির একপাশে পাথরের দেওয়াল আর ছাদ দিয়ে বানানো একটা ঘর ছিল। ওটাই আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল। আমি ওতে দিনের ক’ঘণ্টা কাটাতাম বলা মুশকিল। আসলে লন্ডনের ওই ধূসর বাদামি আকাশ, ধোঁয়া আর বদ্ধ পরিবেশের পর এমন একটা জায়গায় এসে আর ঘরবন্দি থাকতে ইচ্ছে হত না। সারাদিন আমি ঘুরে বেড়াতাম পাহাড়ের ঢালে, সমুদ্রের ধারে, ঘাসফুলের ভিড়ে আর জেটিতে। কোনওরকম নিষেধাজ্ঞাই ছিল না আমার ওপর। শুধু দুটো জিনিস একটু অন্যরকম ছিল।

আমার রোজকার পড়াশোনা নিয়ে খুব একটা চাপ ছিল না। বাগানে হাঁটতে-হাঁটতে রিচার্ড আমাকে ল্যাটিন ব্যাকরণ আর সাহিত্য বোঝাতেন। তাঁর পড়ানোর ভঙ্গিটাই এমন ছিল যে আমার বুঝতে আর মনে রাখতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হত না। তারই সঙ্গে তিনি আমাকে ফুল, পাখি, গাছ— এগুলো চেনাতেন, তারপর সেগুলোর বর্ণনা দিতে বলতেন। জটিলতম বিষয়কেও সহজে আর যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার শিক্ষাটা আমি রিচার্ডের কাছেই পেয়েছিলাম।

তবে রোববার, চার্চের বেদিতে দাঁড়ানো অবস্থায় এই মানুষটির এক অন্য রূপ দেখতাম।

ক্যালভিনিজম আর মিস্টিসিজমের কোন গোপন আগুন এই মানুষটির ভেতরে ছিল, জানি না। তবে অনুশোচনাহীন পাপীদের পরিণতি নিয়ে তাঁর সেই ভয়াবহ বক্তৃতামালা আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিত। এমনকি সন্ধেবেলায়, যখন ছোটোরা আসত তাঁর কথা শুনতে, তখনও রিচার্ডের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসত সেই কালো আগুনের এক-আধটা ফুলকি। সেখানেই তিনি বলেছিলেন, “দেবদূতেরা শিশুদের রক্ষা করেন ঠিকই। কিন্তু সেই শিশু যদি এমন কিছু করে যাতে দেবদূত বিরূপ হন, তাহলে ভয়ংকর বিপদ হবে। দেখা আর অদেখা এমন সব বিপদ আমাদের ঘিরে থাকে, যাদের হাতে পড়লে শিশু থেকে বৃদ্ধ— সবারই পরিণতি হয় অবর্ণননীয়!”

এই কথাগুলো বলার সময় রিচার্ড সেই পুরোনো কাঠখোদাই আর নকশাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করতেন, যাদের কথা আমি প্রথমেই বলেছিলাম। সেগুলো খুঁটিয়ে দেখে বুঝেছিলাম, মোট চারটে প্যানেল আছে তাতে। প্রথমটা নিরীহগোছের— দেবদূত গ্যাব্রিয়েল কুমারী মেরি-কে জানাচ্ছেন যে তাঁর গর্ভে জন্ম নিতে চলেছেন ঈশ্বরের সন্তান, অর্থাৎ যিশু। দ্বিতীয়টাও বেশ সম্ভ্রান্ত— আর্কেঞ্জেল মাইকেল যিশু-র দেহ কাঁধে বহন করছেন পুনরুজ্জীবনের ঠিক আগে। তৃতীয়টা দেখিয়েছে এন্ডরের উইচ-কে— মানে যে মহিলার পরামর্শ অনুযায়ী সল স্যামুয়েলের কাছ থেকে ফিলিস্তিনদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য পরামর্শ নিয়েছিলেন।

চতুর্থ প্যানেলটাই ছিল গোলমেলে। ওটা ব্যাখ্যা করার সময় রিচার্ড বেদি থেকে নেমে আসতেন আর আঙুল তুলে-তুলে জিনিসটা দেখাতেন।

ওতে দেখানো জায়গাটা হুবহু পোলার্নের চার্চের সামনের চাতালের মতো। চার্চের গেটে আলখাল্লা-পরা এক পুরোহিত দাঁড়িয়ে আছেন। হাতের ক্রস তুলে ধরে একটা বিশাল জোঁকের মতো জিনিসকে ঠেকাতে চাইছেন তিনি!

একটা জোঁক যে কতটা ভয়াল হতে পারে, তা ওই প্যানেলটা না দেখলে কখনওই বুঝতে পারতাম না। তারই সঙ্গে চলতে থাকত রিচার্ডের ধারাবিবরণী। জিনিসটার নীচে লেখা ‘নেগোশিয়াম পেরামবুলান্স ইন টেনেব্রিস’ কথাটা ব্যাখ্যা করে দিতেন তিনি— সেই ব্যাধি, যা অন্ধকারে থাকে।

“এ ব্যাধি শরীরের কম, কিন্তু মনের বেশি!” গর্জন করতেন রিচার্ড, “যা কিছু অশুভ, যা কিছু কদর্য— তার সঙ্গে লেনদেন করে এই প্রাণী। ঈশ্বর যাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাদের শেষ করে দেয় এ।”

আমার সমবয়সী ছেলেরা এগুলো শুনে চোখ চাওয়াচাওয়ি আর ফিসফিস করছে দেখেই মনে হয়েছিল, তারা এই ভাবনা আর তর্জনগর্জনের পেছনের ঘটনা বা কিংবদন্তিটা জানে। তাদের থেকে যে গল্পটা উদ্ধার করলাম, সেটা এইরকম—

যে চার্চে দাঁড়িয়ে রিচার্ড আমাদের ভয় দেখাতেন, সেখান থেকে বড়োজোর তিনশো গজ দূরেই একটা বহু প্রাচীন ও পরিত্যক্ত চার্চ ছিল। পরে জমির সঙ্গে সেই পরিত্যক্ত বাড়িটাও কিনেছিলেন লন্ডন থেকে আসা এক ভদ্রলোক। চার্চ ভেঙে তার পাথরগুলো দিয়ে তিনি নিজের বাড়ি বানিয়েছিলেন। শুধু ওই প্যানেলটা তিনি রেখে দিয়েছিলেন নিজের ঘরে। তার ওপরেই তিনি মদের বোতল রাখতেন, জুয়া খেলতেন, আরও নানাবিধ অপকম্মো করতেন। তবে যত দিন গেল, ভদ্রলোকের সাহসের ভাঁড়ারে ঘাটতি দেখা দিল। সবসময় বাড়ির সবক’টা আলো জ্বালিয়ে রাখতেন তিনি। কেন? উত্তরটা তিনি কাউকে বলেননি। তবু সবাই জানতে পারল একদিন।

সেদিন ভয়ংকর ঝড় উঠেছিল। সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা হাওয়া আর জলের ঝাপটায় নিভে গেল বাড়ির আলোগুলো। তৎক্ষণাৎ সেই ভদ্রলোকের মর্মভেদী আর্তনাদে মুখরিত হল পোলার্ন! আলো জ্বালিয়ে চাকর-বাকরদের ছুটে আসতে কিছুটা সময় লাগল। তারা এসে দেখল…

বিপুলদেহী ভদ্রলোকের শরীরটা একটা নেতানো বস্তার মতো ফাঁপা হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। তাঁর গলার কাছটা ফাঁক হয়ে মাটিতে গড়াচ্ছে রক্ত।

আর মানুষটির শরীর থেকে দূরে অন্ধকারে মিলে যাচ্ছে একটা প্রকাণ্ড জোঁকের মতো কিছু!

“ভদ্রলোক মারা যাওয়ার আগে ল্যাটিনে কিছু একটা বলেছিলেন।” বক্তাদের একজন নাক চুলকে বলল, “সেটা ঠিক…”

“নেগোশিয়াম পেরামবুলান্স ইন টেনেব্রিস?” আমি মনে করানোর চেষ্টা করলাম।

“হতে পারে।”

“তারপর কী হল?”

“কেউ আর ওদিকে যেতই না। ভদ্রলোকের বাড়িটা রোদে-জলে পড়ে-থেকে-থেকে নষ্ট হচ্ছিল। তিন বছর আগে পেঞ্জ্যান্স থেকে মিস্টার ডুলিস এসে বাড়িটা কিনে নিয়েছেন। তারপর সেটাকে মেরামতও করেছেন। তবে উনি বোধহয় জোঁক বা অন্য কিছুতে ভয় পান না। রোজ সন্ধেবেলা পুরো এক বোতল হুইস্কি ফাঁকা করার পর তিনি ঠিক কী বোঝেন বা ভাবেন— তা তিনিই জানেন।”

এরপর থেকে মিস্টার ডুলিস আমার পোলার্ন-বাসের ফোকাস হয়ে গেলেন। ভদ্রলোকের ওপর যথাসাধ্য নজরদারি করতাম। অপেক্ষা করতাম, কখন তিনি আর্তনাদ করে উঠবেন, আর আমিও দেখতে পাব সেই ভয়াল ভয়ংকর জোঁককে— যে অন্ধকারে থাকে! কিন্তু তেমন কিছুই হল না। মিস্টার ডুলিস নিজের মতো থাকতেন। গেঁটে বাত না লিভার— কোনটা তাঁকে আগে কাত করবে, সেটা নিয়েই ভাবনা হত। ডুলিস চার্চে যেতেন না, রিচার্ড বা আমাদের মতো কাউকে আপ্যায়নও করতেন না। ফলে একটু-একটু-করে পুরো ব্যাপারটাই আমি ভুলে যেতে শুরু করলাম।

তিন বছর রোদ, জল আর হাওয়ার মধ্যে থেকে আমার চেহারা আর মন-মেজাজে আমূল পরিবর্তন এসেছিল। পোলার্নের পাট চুকিয়ে আমি লন্ডনে ফিরে এলাম। তারপর এল ইটন আর কেমব্রিজ-এর পালা। সে-সবের পর ব্যারিস্টার হিসেবে আমি যা রোজগার করতে শুরু করলাম তা প্রায় ঈর্ষণীয়। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও আমার একটাই কথা মনে হত।

আমাকে পোলার্নে ফিরে যেতে হবে।

দু’দশক পর বুঝতে পারলাম, আর আমার রোজগার করার দরকার নেই। সঞ্চয় আর নানা ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে আমি যে ব্যবস্থা করেছি তাতে প্রতি মাসে আমার হাতে বেশ ভালো টাকাই আসবে। আমি বিয়ে করিনি, কারণ তেমন ইচ্ছেই হয়নি। ব্যারিস্টার হিসেবে বিশাল কিছু একটা হওয়ার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষাও আমার ছিল না। তাই লন্ডনের ওই ব্যস্ততা আর মালিন্যে ভরা জীবনের বদলে খোলা আকাশ, সমুদ্রের নোনা লে রোদের ঝিকমিক আর হু-হু হাওয়া আমাকে টানছিল। পাথর দিয়ে বাঁধানো রাস্তার বদলে ঘাসফুলে ছাওয়া পাহাড়ি পথে ছুটতে ইচ্ছে হচ্ছিল।

রিচার্ডের সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ বজার রেখেছিলাম পোলার্ন থেকে চলে আসার পরেও। তাঁর মৃত্যুর পর ওখানে গিয়ে পিসি হেস্টারের সঙ্গে দেখা করতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু আমি যাইনি। আসলে ওখানে গেলে যে আর ফিরতে পারব না— এমন একটা দৃঢ় বিশ্বাস আমার ছিল। তাই শেষ অবধি লন্ডনের পাট চোকানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই আমি পিসিকে সেই বিষয়ে জানালাম।

পিসি-র সোৎসাহ উত্তর এসে পৌঁছোল ক’দিন পরেই। তিনি লিখেছেন, “নিজের জন্য একটা পছন্দসই বাড়ি না-কেনা অবধি আমার সঙ্গেই থেকো। বোলিথো হাউজ এমনিতেও আমার একার পক্ষে বড্ড বড়ো, বড্ড ফাঁকা।”

রাজি হয়ে গেলাম। জুন মাসের এক সন্ধ্যায় পোলার্ন যাওয়ার হাঁটাপথ ধরে গ্রামে ঢোকার সময় বুঝতে পারলাম, জায়গাটা এই তিন দশকেও তেমন বদলায়নি। ছোটোবেলার চেনাজানা জায়গাগুলো বড়ো হওয়ার পর ছোটো লাগে, কিন্তু তেমন কিছুও মনে হচ্ছিল না। সবচেয়ে বড়ো কথা, ‘সবার থেকে আলাদা’ ভাবটা অটুট ছিল পোলার্নের আকাশে-বাতাসে। হাঁটতে-হাঁটতে মনে হচ্ছিল, লন্ডনের সেই আইন-আদালত আর অন্য সব মারপ্যাঁচ মুছে যাচ্ছে স্মৃতি থেকে। সবটা ভরাট করে দিচ্ছে হাওয়া আর সমুদ্রের গর্জন।

পোলার্ন বদলায়নি। হেস্টার, মানে আমার পিসিও দেখলাম তেমন বদলাননি। তিন দশক লন্ডনে থাকলে লোকজন একেবারে বেঁকে যায়। এই মহিলা কিন্তু বুড়িয়ে যাননি। বরং একটা অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব আর লাবণ্য ফুটে উঠেছে ওঁর চেহারায় আর আচরণে। খাওয়া-দাওয়া সেরে গল্প করছিলাম আমরা। হেস্টারের ঝলমলে আকাশের মতো মুখটায় একফালি মেঘ জমল, যখন আমি মিস্টার ডুলিসের ব্যাপারে জানতে চাইলাম।

“ডুলিসের মারা যাওয়ার পর দশ বছরেরও বেশি হয়ে গেছে।” কফির কাপটা সরিয়ে রেখে বলেছিলেন হেস্টার, “মানুষটি নিউলিন থেকে এখানে আসার আগেও অনেক অপকর্ম করেছিল। এমনকি এখানেও তুমি তো দেখেইছিলে। মদ খাওয়া আর সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার— এই দুটো দিয়েই ডুলিসকে চিনে নেওয়া যেত। তোমার পিসে বলতেন, ওর কপালে দুঃখ আছে। কথাটা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছিল আর কী।”

“কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল?”

“চার্চে নানা কথা বলতে-বলতে তোমার পিসে বেদি থেকে নেমে আসতেন। তারপর রেলিঙে লাগানো কাঠখোদাই আর নকশাগুলো, বিশেষ করে চার নম্বর ফ্রেমটা দেখাতেন। মনে আছে তোমার?”

“বিলক্ষণ।”

“ওই বিশাল জোঁকের মতো জিনিসটা যে দেখেছে, সে-ই ভোলেনি। যাইহোক, ওটার কথা তুলে তোমার পিসে যে ভাষণগুলো দিতেন, ডুলিস সেগুলো শুনেছিল। তারপর থেকেই দেখতাম, সন্ধে হলেই ওর বাড়ির সবক’টা আলো জ্বলে। এই করতে-করতে ওর ভয় কমার বদলে বেড়েই যাচ্ছিল। তারপরেই কেলেংকারি হল।”

“কেলেংকারি!”

“হ্যাঁ। একদিন মদ খেয়ে একেবারে চুর অবস্থায় ডুলিস চার্চের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ওই প্যানেলটা ভেঙে তছনছ করল।”

“সে কী! অত পুরোনো প্যানেলটা এইভাবে…?”

“পরদিন সকালবেলা চার্চে ঢোকার পর ওই অবস্থা দেখে তোমার পিসে তো রেগে আগুন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটা কার কাজ। ডুলিসের বাড়িতে গিয়ে লোকটাকে চেপে ধরতে লোকটা স্বীকার করেছিল, ‘হ্যাঁ, আমিই ভেঙেছি ওই জিনিসটাকে। বেশ করেছি। ওটাই ছিল যত কুসংস্কারের ডিপো। জানি, ওটা দেখিয়েই তুমি যতরাজ্যের হাবিজাবি বকতে। সেটাও গেল তো। বেশ হয়েছে!’

তোমার পিসে ঠিক করলেন, সোজা পেনজ্যান্সে গিয়ে পুলিশে অভিযোগ জানাবেন এই ব্যাপারে। কিন্তু চার্চে ঢুকে তিনি দারুণ চমকে গেলেন।”

“কেন?”

“প্যানেলটা একেবারে অক্ষত অবস্থায় জায়গামতো রাখা ছিল। এটা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, পুলিশ, এমনকি চার্চের থেকেও বড়ো আর ক্ষমতাধর কেউ বা কিছু এই ব্যাপারটায় হস্তক্ষেপ করেছে।”

“উনি ভুল দেখেননি তো?” আমি জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলাম, “মানে ব্যাপারটা এতই অবিশ্বাস্য…!”

“লন্ডনের মানুষের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া একটু শক্তই।” হেস্টার হাসলেন, “তবে সেই রাতেই ঘটনাটা ঘটল। শুতে যাওয়ার সময়েও দেখেছিলাম, ডুলিসের বাড়ির সবক’টা আলো জ্বলছে। রাতে একটা চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভাঙল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, ওর বাড়িটা একদম অন্ধকার। তারপরেই দেখতে পেলাম, রাস্তা দিয়ে টলতে-টলতে কেউ ছুটছে আর প্রাণভয়ে আর্তনাদ করছে, ‘আলো! আমাকে কেউ একটু আলো দাও!’

আমি তোমার পিসেকে তুললাম। তিনি আলো জ্বালিয়ে যতক্ষণে রাস্তায় নামলেন ততক্ষণে আরও বেশ ক’জন উঠে পড়েছিলেন। সবাই মিলে রাস্তা ধরে নেমে একেবারে জেটি অবধি চলে গেলেন। ওখানেই পাথরের ওপর পড়ে ছিল ডুলিস। ওর গলার নলিটা ফাঁক হয়ে রয়েছে। শরীরটাও একেবারে শুকিয়ে গেছে। অথচ আশেপাশে কোথাও রক্তের চিহ্নমাত্রও ছিল না।”

হেস্টার আমার দিকে ঝুঁকে বললেন, “সরকারি রিপোর্টে পুরো ব্যাপারটা মাতলামি আর তার ফলে হওয়া দুর্ঘটনা বলেই দেখানো হয়েছিল। তবে আসল কারণটা বুঝতেই পারছ।”

মাথা নাড়লেও এই নিয়ে কিছু বললাম না। জানতাম, যা-ই বলব তাকেই ‘লন্ডনের মানুষের’ ভাবনা বলে সাব্যস্ত করা হবে। তাই জিজ্ঞেস করলাম, “ওই বাড়িতে কি এখন কেউ থাকে?”

“থাকে।” হেস্টারের মুখটা অন্ধকার হয়ে এল, “একসময় আমাদেরই ভাড়াটে ছিল সে।”

“জন ইভান্স?”

“সে-ই। কী ভালোই না ছিল মানুষটা। আর সে এখন…” হেস্টার উঠে দাঁড়ালেন।

“সে এখন? কথাটা এইরকম মাঝপথে ছাড়ছেন কেন?”

“ওর কথা ও নিজেই শেষ করবে।” আলোটা জ্বালিয়ে হেস্টার বললেন, “রাত কিন্তু অনেক হল। এরপরেও আমরা জেগে থাকলে লোকে ভাববে, আমাদেরও বোধহয় সারারাত আলো জ্বালিয়ে রাখার অবস্থা হয়েছে।”

রাতে শোয়ার সময় ঘরের পর্দাগুলো সরিয়ে দিলাম। কুয়াশামাখা চালগুলো চাঁদের আলোয় চকচক করছে। সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসছে হাওয়া আর মৃদু গর্জন। বাগান থেকে আসা হালকা সুগন্ধ মিশে যাচ্ছে সেই হাওয়ায়। মনে হল, পোলার্ন ফিরে আসার সিদ্ধান্তটা আরও আগেও নিতে পারতাম আমি।

আপনা থেকেই চোখ গেল ঢালের ওপরদিকে। গোটা গ্রাম অন্ধকার হয়ে থাকলেও একটা বাড়ির সবক’টা আলো তখনও জ্বলছে!

ঘুম ভাঙার পর চোখ মেলতে ভয় করছিল। আশঙ্কা হচ্ছিল, দিনের আলোয় যদি পোলার্ন দেখে হতাশ হই? কিন্তু চোখ খুলে বুঝলাম, আমার ধারণাটা একেবারে অমূলক। শুধু তা-ই নয়, একেবারে আক্ষরিক অর্থে আমি ছোটোবেলার সেই তিনটে বছরে ফিরে যেতে শুরু করলাম। পোলার্নের আকাশে-বাতাসে-মাটিতে একটা অন্যরকম শক্তির উপস্থিতি সেই সময় আবছাভাবে টের পেতাম। সেটা এখন একেবারে স্পষ্টভাবে ধরা দিল আমার কাছে। তাকে প্রাকৃতিক বা ঐশ্বরিক বলব না। বরং মনে হল, এখানে মানুষের মধ্যে থেকে দূষিত রক্তের মতো করে অসংযত জীবনযাপন বা অসদাচরণের প্রবণতা যেন শুষে নিচ্ছে কোনও অদৃশ্য জোঁক!

ক’দিনের মধ্যেই জন ইভান্সের সঙ্গে আমার মোলাকাত হল।

একদিন সকালে আমি সমুদ্রের তীরে বালির ওপর শুয়ে ছিলাম। তখনই দেখলাম, একজন স্থূলদেহী মাঝবয়সী মানুষ— মদ আর অসংযত জীবনযাপন শরীরের মতো যার মুখটাকেও একেবারে থলথলে করে দিয়েছে— টলতে-টলতে এগিয়ে আসছে। কাছে এসে চোখগুলো ছোটো করে আমাকে দেখল লোকটা। তারপর বলে উঠল, “আরে! তুমি তো ভিকারের সেই ভাইপো না বোনপো— কী যেন একটা, তাই না? বাগানের ঘরটায় থাকতে তুমি। আমাকে চিনতে পারছ না?”

গলা থেকে কিছুটা চিনলাম। তার চেয়েও বেশি চিনলাম, যেহেতু আগের সেই ছিপছিপে বলিষ্ঠ চেহারার একটা ফসিল ওই থলথলে চেহারার মধ্যে কিছুটা হলেও ছিল।

“চিনতে পেরেছি।” আমি বললাম, “আপনি আমার জন্য ভারি সুন্দর কয়েকটা ছবি এঁকে দিয়েছিলেন সেইসময়।”

“তা দিয়েছিলাম।” আমি চিনতে পারায় মানুষটি যে খুশি হয়েছেন সেটা বোঝা গেল, “আবার দেব। কিন্তু তুমি এখানে কী করছ? সমুদ্রে স্নান করতে গেছিলে নাকি? ঝুঁকির ব্যাপার। জলের নীচে ঠিক কী-কী আছে— কে জানে! ডাঙার ক্ষেত্রেও অবশ্য একই কথা প্রযোজ্য। তবে আমি ও-সব কথায় বিশ্বাস করি না। কাজ আর হুইস্কি— এই নিয়েই আমার সময় কেটে যায়। এই ক’টা বছরে আমি আঁকতে শিখেছি। মদটাও ইদানীং একটু বেশিই খাই। আসলে ওই বাড়িটায় থাকলেই কেন যেন সবসময় খুব তেষ্টা পায়!”

চুপ করে রইলাম। ইভান্স বলে চললেন, “তুমি মিসেস বোলিথো’র সঙ্গেই থাকছ কি? ওঁর একটা পোর্ট্রেইট আঁকতে পারলে কিন্তু বেশ হত। সৌন্দর্য আর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আরও একটা জিনিস ধরা পড়ে ওঁর মধ্যে। উনি অনেক কিছু জানেন। পোলার্নের অনেকেই অনেক কিছু জানে। তবে আমার ও-সব না জানলেও চলবে!”

আমি একইসঙ্গে ভদ্রলোকের প্রতি আকর্ষণ আর বিকর্ষণ অনুভব করলাম। বিকর্ষণের ব্যাপারটা বোঝা সহজ। কিন্তু আকর্ষণ?

আসলে ওঁর চেহারা, আর তার চেয়েও বেশি করে ওঁর কথা বলার ভঙ্গিতে আমার মনে হচ্ছিল, জীবনের একটা অন্যরকম চেহারা দেখেছেন ইভান্স। সেটা ওঁর ছবির ওপর কেমন প্রভাব ফেলেছে— সেটাই দেখার জন্য একটা প্রবল কৌতূহল মাথাচাড়া দিচ্ছিল আমার ভেতরে। সে-জন্যই বললাম, “আপনি কি বাড়ি ফিরছিলেন? আমিও তাহলে আপনার সঙ্গেই ফিরতাম।”

ইভান্সের সঙ্গেই বাড়িটায় গেলাম। বেড়ার ওপার থেকে দেখা অযত্নলালিত বাগানটা দেখলাম এত বছরে একেবারে জঙ্গলই হয়ে গেছে। একটা মোটাসোটা বেড়াল জানালায় বসে রোদ পোহাচ্ছিল। বাগান, শ্যাওলা-ধরা পাথরের বেঞ্চ, বাঁকানো পাঁচিল— সব পেরিয়ে আমরা বাড়িতে ঢুকলাম।

ভেতরের ঠান্ডা ঘরটার একপাশে এক বৃদ্ধা মহিলা খাবার-দাবার গুছিয়ে রাখছিলেন। পাথরের দেওয়ালের গায়ে আর নানা জায়গায়, এমনকি ছাদেও নানা ধরনের মুখ আর কিংবদন্তির জীবজন্তুর দেহাবশেষ দেখতে পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারলাম, পুরোনো চার্চের ধ্বংসস্তূপের অনেক কিছু দিয়েই এই বাড়িটা বানানো হয়েছে। একটা ডিম্বাকৃতি টেবিলের সামনের দিকে একটা পাথরের আংটায় চিত্রকরের ক্যানভাস আর তুলি রাখার ব্যবস্থা করা ছিল। সেটারও ওপরে একটি দেবদূতের মূর্তি বসানো রয়েছে।

“বেশ ভক্তিমূলক পরিবেশ— কী বল!” সেদিকে বুড়ো আঙুল নাচিয়ে ইভান্স বললেন, “এদিকে আমি আঁকি একেবারেই সাদামাটা জিনিস বা মানুষের ছবি। তাই সেই ছবিতেই এমন একটা ভাব আনতে হয়, যাতে ওই ‘ভক্তিভাব’-টা ফুটে না ওঠে। যাইহোক, আমি একটু ঘরোয়া জামাকাপড় পরে আসি। তুমি ততক্ষণ ছবিগুলো দেখতে থাক।”

ছবিগুলো দেখতে-দেখতে দুটো জিনিস মেনে নিলাম।

প্রথমত, জন ইভান্স সত্যিই শিল্পী হিসেবে অনেক-অনেক উঁচু দরের একজন হয়ে গেছেন।

দ্বিতীয়ত, তাঁর ছবিতে বিষ ঢুকেছে। এটা ছাড়া আর কোনওভাবেই প্রত্যেকটা ছবির মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা পাপ আর অশুভের অনুভূতিটাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। জানালায় বসা বেড়ালের একটা ছবি ছিল, কিন্তু ওই বেড়াল সাক্ষাৎ নরকের বাসিন্দা। রোদে গরম বালিতে শুয়ে থাকা এক নগ্ন কিশোরের ছবি আঁকা হয়েছে— কিন্তু ওই কিশোরের জন্ম দিয়েছে সমুদ্রের নীচের অন্ধকার। সবচেয়ে মারাত্মক ছিল ইভান্সের আঁকা বাগানের ছবিগুলো— যাদের দেখে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ঝোপ, প্রতিটি পাতার পেছনেই ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করছে মূর্তিমান বিপদ!

“কেমন লাগছে?” ইভান্সের হাতের গ্লাসে পানীয়ের রঙ দেখে বুঝলাম, জল-টল মেশানো হয়নি। তাতে একটা চুমুক দিয়ে ইভান্স বললেন, “আমি যা দেখি তার সারটুকু ধরতে চেষ্টা করি। শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটা বেড়াল আর একটা ঝোপের মধ্যে খুব একটা তফাত থাকে না। বরং আকার-অবয়বহীন যে অন্ধকার আর আগুন থেকে আমাদের সবার জন্ম— আমি সেটাকেই ফুটিয়ে তুলি। সুযোগ পেলে তোমারও একটা ছবি আঁকব। দেখবে, আমার আয়নায় নিজেকে দেখতে কেমন লাগে!”

গ্রীষ্ম কেটে গেল। ইভান্সের সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যেই দেখা হত। তবে এমনও হত যে গোটা সপ্তাহ ধরেই মানুষটি নিজের বাড়ি আর আঁকা ছেড়ে বেরোতেন না। কখনও-সখনও জেটির ধারে মানুষটিকে বসে থাকতে দেখতাম— একা। তখন ওঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সেই যুগপৎ আকর্ষণ-বিকর্ষণ অনুভব করতাম। মনে হত, ইভান্স একটা অন্ধকার পথ ধরে হেঁটে চলছেন যার শেষে তিনি এমন কিছু জানতে পারবেন, যা কেউ জানে না।

বাস্তবে শেষটা অন্যরকম হল।

অক্টোবরের শেষ দিন ছিল সেটা। পাহাড়ের ওপর ইভান্সের পাশে বসে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমি। রোদের অন্তিম আলোয় ঝলমল করছিল সমুদ্র। আচমকা পশ্চিম আকাশে একটা ঘন কালো মেঘ কোথা থেকে জানি উদয় হয়ে সেই আলোটুকু শুষে নিল হু-হু করে। তাতেই ইভান্সের চটকা ভাঙল।

“আমাকে এখনই ফিরতে হবে।” অস্থিরভাবে বললেন ইভান্স, “আজ আমার বাড়ির ওই কাজের মহিলা ছুটি নিয়েছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অন্ধকার হয়ে যাবে। তার মধ্যে আলো জ্বালানো না হলে…!”

ওই খাড়া পথ ধরে ইভান্স যে-ভাবে ছুটলেন সেটা তাঁর চেহারা আর চলনের সঙ্গে একেবারেই মেলানো যায় না। ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যেও মানুষটিকে প্রায় ছুটতে দেখে মনে হল, উনি সত্যিই চিন্তিত… বা ভীত! আমার দিকে ঘুরে উনি চিৎকার করলেন, “আমার সঙ্গে এসো। দু’জনে হাত লাগালে তাড়াতাড়ি আলোগুলো জ্বালানো যাবে। আলো না থাকলে বড়ো বিপদ!”

ইভান্সের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম হলেও ওঁর সঙ্গে তাল মেলাতে হিমসিম খেলাম সেই সন্ধ্যায়। বাগানের গেটের সামনে পৌঁছে দেখি, ইভান্স তার মধ্যেই বাড়ির কাছে চলে গেছেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই একটা লণ্ঠন তুলে নিলেন ইভান্স। কিন্তু সেটা জ্বলল না। আসলে দেশলাই ধরে থাকা ওঁর হাতটা এত কাঁপছে যে শিখাতে আগুনই ধরছে না।

আমি ঘরে ঢুকে ওঁকে সাহায্য করার জন্য এগোলাম। হঠাৎ, আমার পেছনে খোলা দরজার দিকে আঙুল তুলে ইভান্স আর্তনাদ করে উঠলেন, “না-না! ওটাকে আটকাও।”

পেছন ফিরে দেখলাম, খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ইভান্সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একটা প্রকাণ্ড জোঁক!

মলিন একটা আভা বেরিয়ে আসছিল জোঁকটার শরীর থেকে। সে-জন্যই ওই অন্ধকারের মধ্যেও প্রাণীটাকে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আর পেলাম একটা গন্ধ— কাদা আর নোংরার মধ্যে অনেকক্ষণ কিছু ডুবে থাকলে তাতে যেমন গন্ধ হয়! নির্লোম শরীরে কোনও মাথা দেখিনি, তবে সামনের দিকে কুঁচকে থাকা অংশটা যেভাবে খুলছিল আর বন্ধ হচ্ছিল তাতে মুখটা চিনে নিতে অসুবিধে হয়নি। ইভান্সের কাছে এসে ওটা অদ্ভুতভাবে পেছনে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মনে হল, যেন একটা বিষধর সাপ ছোবল মারার জন্য তৈরি হচ্ছে!

ইভান্সের বুকফাটা আর্তনাদ আমার অচল হয়ে থাকা শরীরটাকে ছুটে যেতে বাধ্য করল। আমি দু’হাত বাড়িয়ে জোঁকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম— ওটাকে সরিয়ে আনব ভেবে। কিন্তু পারলাম না! মনে হল, আমি যেন একটা কাদার তালকে ধরার চেষ্টা করছি। জিনিসটা আমার আঙুলের ফাঁক দিয়ে, তেলোর পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। এ-ভাবেই কেটে গেল কয়েক সেকেন্ড। ওটুকুই যথেষ্ট ছিল।

চিৎকার ক্রমেই অসহায় কান্না আর বিড়বিড় হয়ে নৈঃশব্দ্যে মিলিয়ে গেল। জীবটা ইভান্সের ওপর ঝুঁকে থাকতে-থাকতেই তার হাত-পা ছোড়া স্তিমিত হয়ে এল। কিছু একটা শুষে নেওয়ার আর টেনে নেওয়ার মাঝামাঝি শব্দ পেলাম। তারপর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল জোঁকটা।

টলতে-টলতে একটা লণ্ঠন জ্বালালাম। সেই আলোয় দেখলাম, মেঝেতে যা পড়ে আছে তাকে শরীর না বলে চামড়া দিয়ে মোড়া একবস্তা হাড় বলাই সঙ্গত।

পোলার্নের বুক থেকে আরও কিছুটা দূষিত রক্ত শুষে বিদায় নিয়েছে তার রক্ষক!

_

মূল কাহিনি: নেগোশিয়াম পেরামবুলান্স

লেখক: ই.এফ.বেনসন

প্রথম প্রকাশ: হাচিনসনস্‌ ম্যাগাজিন, নভেম্বর ১৯২২

লাল

Laal

ছিমছাম, পুরোনো হলেও বেশ যত্নে রাখা একটা মাঝারি মাপের বাড়ি— এই হল আমার গল্পের পটভূমি। সেটাকে ওই বদমায়েশ বাড়িওয়ালা ‘লাল’ বলে ডাকলেও গেজেটিয়ারে বাড়িটা ‘দ্য রেড লজ’ নামে চিহ্নিত করা ছিল। বাড়ি আর তার লাগোয়া বাগান— দুটোকেই বেশ পছন্দ করে ফেলল মেরি, মানে আমার স্ত্রী। ডানপিটে টিম আবার বেশি পছন্দ করল বাড়ির পেছনেই বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটাকে। দামও ঠিকঠাক লাগল। আমি চুপচাপ টাকা-পয়সা মিটিয়ে বাড়িটা ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা করলাম।

হাতের কাজ মিটিয়ে ওখানে যেতে আমার অন্তত সাতদিন লাগত। ততদিন মেরি আর টিম-কে লন্ডনের ধোঁয়া আর ধুলোর মধ্যে রাখার ইচ্ছে ছিল না। আমি লন্ডন ছাড়ার হপ্তাখানেক আগেই মেরি আর টিম ‘লাল’-কে দখল করল। টিমের নার্স-ও ওদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। অবশেষে আমি যখন ‘লাল’-এর সামনে পৌঁছোলাম, তখন সূর্য একেবারে মধ্যগগনে। তবু, চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢোকামাত্র আমার ভেতরে অস্বস্তিটা শুরু হল।

আমি একজন চিত্রশিল্পী। আলো-ছায়ার খেলা আমার মনে যে একটু বেশিই প্রভাব ফেলে— এ-কথা অস্বীকার করব না। হয়তো সে-জন্যই আলোয় ভেসে যাওয়া বড়ো ঘরটাতে দাঁড়িয়েও আমার ঠিক… ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, যেন বাড়িটার ভেতর সর্বত্র একপোঁচ কালো রঙের স্তর লাগিয়ে রেখেছে কেউ। বা আমি যেন একটা কালচে কাচের মধ্য দিয়ে সবকিছু দেখছি। মেরি-কে দেখেও মনে হল, ও ভালো নেই। বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “সব ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ।” মেরি বেশ কষ্ট করেই মুখে হাসি ফোটাল। আমি ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। তখনই আমার নজর গেল কার্পেটের ওপর একটুকরো সবুজ শ্যাওলার দিকে।

“ওগুলো বোধহয় টিম-ই সারা বাড়িতে ছড়ায়।” হাসার চেষ্টা করল মেরি, “নদীর ধারে বেশিক্ষণ কাটালে যা হয় আর কী।”

কথা না বাড়িয়ে বাইরে এলাম। বাগানে একটা মালবেরি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, মেরি-কে এখানে প্রায় একা-একা পাঠানোটা বোধহয় ঠিক হয়নি। নতুন জায়গায় কতরকম ব্যাপার হয়। বেচারির স্নায়ুতে যথেষ্ট চাপ পড়েছে মনে হচ্ছে। এর বেশি ভাবার সুযোগ পেলাম না। টিম-কে আসতে দেখলাম। মেরি-ও খেতে ডাকল।

খাওয়ার টেবিলে টিম-কে দেখে মনে হল, ও-ও কিছুটা ঝিমিয়ে আছে। তবে চল্লিশ বছরের এক পুরুষ, তেত্রিশের এক মহিলা, আর সাড়ে ছ’বছর বয়সী একটি ছেলের মধ্যে একবার কথা শুরু হলে থামানো মুশকিল। সেদিনও তা-ই হল। সুখাদ্য ও পানীয় সহযোগে খাওয়া শেষ হতে-হতে আমি মাথা থেকে যাবতীয় দুর্ভাবনা দূর করে দিয়েছিলাম। অবশেষে, ‘এমনি করেই যায় যদি দিন’ ইত্যাদি ভেবে সেই মালবেরি গাছের নীচে একটা আরামকেদারা পেতে আমি আধশোয়া হলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালও নেই।

তবে ঘুমটা ভালো হয়নি। মনে হচ্ছিল, কে বা কারা যেন আমাকে লক্ষ করছে। বারবার চটকা ভেঙে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম, কিন্তু কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি ‘লাল’-এর দিকে মুখ করেই বসা আর শোয়ার মাঝামাঝি অবস্থায় রয়েছি। একবার ঘুম ভেঙে সোজা তাকিয়ে মনে হল, দোতলার একটা ঘরের জানালার পর্দার পাশ দিয়ে একজন আমাকে দেখছে। সে নারী না পুরুষ— তা বুঝতে পারলাম না। তবে মুখটা ভারি অদ্ভুতভাবে কাচের গায়ে একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে লেগে ছিল। ভালো করে চোখ কচলে আবার তাকাতেই আর কিছু দেখতে পেলাম না। আমি বোধহয় স্বপ্ন দেখছিলাম। তারই রেশ হয়তো জেগে ওঠার পরেও থেকে গেছে। এরপর আর শুতে ইচ্ছে করল না। আমি উঠে বাগানে পায়চারি করা শুরু করলাম।

বাগানটা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। শুধু একেবারে শেষ মাথায় একটা ছোট্ট দরজা খুললে একটা পায়ে-চলা পথ পাওয়া যায়। ডানদিকের দেওয়ালের সমান্তরালে কিছুদূর চলার পর পথটা সেই ছোট্ট নদীর ধারে গিয়ে শেষ হয়। ওই দরজাটার গায়ে আমি সবুজ শ্যাওলার মতো বেশ কয়েকটা ছোপ দেখলাম। এগুলোও কি টিম লাগিয়েছে? জায়গাটা অবশ্য দুটো ঝুপসি রোয়ান গাছের ছায়ায় এমনিতেই অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে হয়ে রয়েছে। ওখানে বেশিক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করল না। ফিরে এসে টিমের সঙ্গে খেলায় মেতে গেলাম। খেলাটা খুব বেশিক্ষণ চালানো গেল না অবশ্য। কিছুটা দূরের ম্যানর হাউজের বাসিন্দা স্যার উইলিয়াম প্রাউস, লেডি প্রাউস, আর তাঁদের মেয়ে— তিনজনেই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চলে এলেন।

ওঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমার বেশ ভালো লাগল। চায়ের পাট চুকলে স্যার উইলিয়ামের সঙ্গে একটু হাঁটতে বেরোলাম।

“আমাদের আগে এখানে কারা থাকত?” জিজ্ঞেস করলাম।

“হকার পরিবার।” উইলিয়াম বললেন, “সে-ও দু’বছর আগের কথা।”

“মালিক এখানে থাকে না কেন?” পড়ন্ত আলোয় বাড়িটাকে ভারি সুন্দর লাগছিল বলেই প্রশ্নটা মাথায় এল, “বাড়িটা তো এমনিতে বেশ যত্নেই রাখা আছে।”

“কে জানে!” উইলিয়াম ঠোঁট বাঁকালেন, “হয়তো বাড়িটা নদীর এত কাছে বলে থাকতে চায় না। লোকটাকে আমার অসহ্য লাগে। ভালো কথা, আপনারা কদ্দিনের জন্য বাড়িটা ভাড়া নিয়েছেন?”

“তিন মাস।”

“বেশ-বেশ। কোনওরকম ঝামেলা হলে নির্দ্বিধায় বলবেন কিন্তু।”

মাথা নেড়ে সায় দিতে-দিতেও মনে হল, উইলিয়াম ‘ঝামেলা’ কথাটাকে একেবারে আন্ডারলাইন করে দিলেন কেন? এই পরিবেশে এমন একটা বাড়িতে কী ঝামেলা হতে পারে? তবে অধিকাংশ মানুষই শিল্পীদের নিয়ে অনেককিছু ভাবেন। নিজেকে বোঝালাম, উনিও হয়তো তেমনই কিছু ভেবে কথাটা বললেন।

প্রাউস পরিবার বিদায় নিলে টিমের সঙ্গে গল্প আর খেলা শুরু করলাম। বুঝলাম, নদীটাকে ও কোনও কারণে ভয় পাচ্ছে। ঠিক করলাম, এই অমূলক ভয়টা ভেঙে না দিলে পরে বেচারিকেই এ-জন্য ভুগতে হবে। তবে একটা কথা মনের মধ্যে কাঁটার মতো খচখচ করছিল।

গতবছর ফেন্টনে গিয়ে ছুটি কাটানোর সময় টিম সমুদ্রকে আদৌ ভয় পায়নি!

বাকি দিনটাতে উল্লেখযোগ্য কিছু হল না। শুধু রাতের খাওয়ার পর হাঁটতে গিয়ে আমি একবার ভাবলাম, ছোটো দরজাটা খুলে বাইরে নদীর দিকে যাব। কিন্তু দরজার ছিটকিনিতে হাত দিতেই একটা তীব্র শিসের শব্দ পেলাম। চমকে এদিক-ওদিক তাকিয়েও শব্দটার উৎস আবিষ্কার করতে পারলাম না। কাউকে দেখতেও পেলাম না। তবে এই শিসের ধাক্কায় বাইরে যাওয়ার উৎসাহটাই চলে গেল। আমি বাড়ি ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলাম, মাথাটা ভার হয়ে রয়েছে। কাজের ঘরের বাতাসটাও কেমন যেন ভ্যাপসা ঠেকছে। জানালাগুলো খুলতে গিয়ে কীসে যেন আমার পা পিছলে গেল। চমকে উঠে দেখলাম, নীচে আর দরজায় দেখা সেই সবুজ শ্যাওলার একটা ছোপ ওখানে পড়ে আছে। এবার আমি সত্যিই অবাক হলাম, কারণ টিম আমার কাজের জায়গায় একদম আসে না। জিনিসটা তাহলে কোত্থেকে এল? ওটাকে ঘষে সাফ করে ফেললাম ঠিকই, তবে প্রাতরাশের সময়টা আমি ওই শ্যাওলা কোত্থেকে এসে থাকতে পারে— সেই ভেবেই কাটালাম।

খাওয়ার পর টিমকে বললাম, “চলো, আমরা দু’জন নৌকো চেপে নদীতে একটু বেড়িয়ে আসি।”

“আমাকে কি যেতেই হবে, বাবা?” একটু শঙ্কিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল টিম।

“জোরজারির ব্যাপার নেই।” আমি একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, “তবে না-গেলে তোমারই হয়তো পরে খারাপ লাগবে।”

“না গেলে তুমি রাগ করবে?”

“না, টিম।” আমি হেসে ফেললাম, “তবে একবার গিয়ে দেখলে হয় না?”

“আ…চ্ছা।”

একরকম বাধ্য হয়েই আমি নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম, “টিম তো জল-কে ভয় পেত না। কী হল হঠাৎ?”

“জানি না, স্যার।” নার্স ঈষৎ বিব্রতমুখে বললেন, “প্রথমদিন এখানে আসার পর আমরা ঠিকমতও গুছিয়ে বসার আগেই ও একদম হই-হই করে নদীর দিকে ছুটেছিল। কিন্তু তারপরেই ও কাঁদতে-কাঁদতে আবার বাড়িতে ফিরে এল। আমাদের মনে হয়েছিল, ও বোধহয় জলে কিছু দেখে ভয় পেয়েছে।”

নৌকাবিহারের পরিকল্পনা মাথায় তুলে আমরা সবাই মিলে বাড়ির আশপাশটাই ভালো করে দেখতে বেরোলাম। ঘোরাঘুরি করতে বেশ ভালো লাগছিল। কিন্তু এ-ও বুঝতে পারছিলাম, বাড়িটাতে ফিরে আসার কথা ভাবলেই আমার মনটা ভার হয়ে যাচ্ছে। কেন জানি না, মনে হচ্ছিল যেন ‘লাল’-এর মধ্যে কিছু একটা ঘটছে আমাদের অবর্তমানে। হয়তো মেরিও এমন কিছু ভাবছিল।

ফেরার পর ঝটপট খাওয়া সেরে নিলাম আমরা। মাথা ধরেছে বলে মেরি তখনই শুতে চলে গেল। আমি নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে বই নিয়ে বসলাম। দরজাটা বন্ধ করতে বাধ্যই হলাম। নইলে ‘আমাকে কেউ লক্ষ করছে’ এমন একটা অনুভূতি এতই জোরালো হয়ে উঠছিল যে বইয়ের পাতায় মনঃসংযোগ করতেই পারছিলাম না। বার-কয়েক চমকে উঠলাম খুট-খাট শব্দ শুনে। নিজেকে বোঝালাম, ওককাঠের প্যানেলগুলো নিশ্চয় সারাদিনের রোদ পাওয়ার পর, এখন রাত নামতে এমন আওয়াজ তুলছে। তবুও বারবার চোখ যাচ্ছে ঘরের অন্ধকার কোণগুলোর দিকে। অবশেষে, যখন সক্রেটিসের বলা একটা জটিল বক্তব্যে প্রায় ঢুকেই পড়েছি, দেখলাম আমার চেয়ারের পাশেই সবুজ শ্যাওলার একটা টুকরো পড়ে আছে। আমাকে প্রায় স্তম্ভিত করে দিয়ে চোখের সামনেই মেঝেতে আরেকটা টুকরো গজাল, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা! প্রায় লাফিয়ে উঠে জিনিসটা হাতে নিলাম। জলে ভেজা একটুকরো শ্যাওলা ছাড়া আর সেটা আর কিছুই না। আমার চেয়ার আর ঘরের দরজার মাঝের দূরত্বটা পায়ে হেঁটে পেরোতে গেলে যে-দূরত্বে কারও পা পড়বে, মোটামুটি সেই দূরত্বেই পড়ে আছে শ্যাওলার টুকরোগুলো।

মনের সবটুকু জোর আর সাহসে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ঘরের মাঝের বড়ো আলোটা জ্বালালাম। টেবিল-ল্যাম্প নেভালাম। তারপর নিজের কাজের ঘরে গিয়ে পুরো জিনিসটা ভাবতে শুরু করলাম। ‘লাল’-এ যে একটা বড়োসড়ো গোলমাল আছে— এটা আর উপেক্ষা করার উপায় নেই। মন বলছে, এই মুহূর্তেই সবাইকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু তিন মাসের ভাড়ার আগাম হিসেবে দেওয়া একশো আটষট্টি পাউন্ডের কথাটা ভাবতেই বড়ো কষ্ট হল। তা-ছাড়া দুম্‌ করে যাবই বা কোথায়? নিজেকে শেষ অবধি বোঝালাম যে আমি বোধহয় সত্যিই বেশি কল্পনাপ্রবণ তাই এ-সব দেখছি। চিন্তা হল, আমার এমন ভাবনার ছোঁয়া লাগলে মেরি আর টিমও অনেককিছু ‘দেখতে’ শুরু করবে। তাই ঠিক করলাম কাউকে কিছু না বলে আপাতত নিজেই ব্যাপারগুলো বোঝার চেষ্টা করব।

পোশাক বদলে, আলো নিভিয়ে মেরির পাশে শুয়ে পড়লাম।

কোনও কারণে মন বেশিরকম বিক্ষিপ্ত থাকলে ঘুম আসতে চায় না। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর মনে হল, এই বাড়ি বা নিজের কাজ থেকে একেবারেই ‘অন্যরকম’ কিছু নিয়ে ভাবা যাক। তা-ই করলাম। ভিড়, শহরের গমগমে আলো আর আওয়াজ, একটা পার্টিতে পানীয় হাতে গল্প আর তর্ক, পিয়ানোর টুংটাং— এ-সব ভাবতে-ভাবতে চোখ প্রায় লেগে এসেছে, ঠিক তখনই খেয়াল হল…

আমি আর বিছানায় নেই! রোয়ান গাছদুটোর নীচে দাঁড়িয়ে আমি আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপছি!

কেন?

কারণ আমার সামনের ওই ছোট্ট দরজাটা একটু-একটু করে খুলে যাচ্ছে! আমি জানি না, ও-পাশে কে বা কী আছে। কিন্তু যে-ই থাকুক না কেন, আমি জানি, তার মুখোমুখি হওয়ার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু!

দরজাটা খুলে গেল। আমি… ঠিক কী যে দেখলাম, তা বুঝতে পারলাম না। তবে মনে হল, মানুষ আর অমানুষের মাঝামাঝি একটা ভয়ংকর অস্তিত্ব আমার দিকে এগিয়ে আসছে।

আমি কি স্বপ্ন দেখছি? ঘুমের মধ্যেই আমার মাথার মধ্যে চাপ বাড়তে শুরু করল। মনে হচ্ছে, যেন আগুনের মতো গরম একটা বীজ আমার মাথার মধ্যে বড়ো হচ্ছে। কী অসহ্য সে উত্তাপ! আপনা থেকেই আমার দু’চোখ খুলে গেল।

ঘন অন্ধকারের মধ্যে আমার মনে হল, আমার মুখের ঠিক বড়োজোর ফুটখানেকের দূরত্বে কেউ রয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে আছে সে। আর তারপর…

আমার মুখের ওপর ফোঁটা-ফোঁটা করে কিছু একটা পড়তে শুরু করল।

ওই অবস্থাতেও মনে হল, মেরি আমার পাশে শুয়ে আছে। আমি আর্তনাদ করতে শুরু করলে ও আরও ভয় পেয়ে যাবে। কী কষ্ট করে যে কাপড়-চোপড় আর চাদর নিয়ে নিজের মাথা ঢাকলাম, তারপর ভয়ে প্রায় ফুঁপিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে রাত কাটালাম— সে আমি লিখে বোঝাতে পারব না।

অবশেষে, নীচের বড়ো ঘড়িতে পাঁচটা বাজার শব্দ হল। পাখির ডাক আর আলোর আভাস বুঝিয়ে দিল, আমার নৈশ নরকবাস শেষ হয়েছে। তখন আমি ঘুমোলাম।

বেলা করে উঠলাম বটে, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঠিক করলাম, বাগানে বসে ছবি আঁকব। নিজের মতো কিছুটা সময় কাটালে হয়তো একটু সুস্থ লাগবে। সেই মতো কাগজ আর চারকোল নিয়ে মালবেরি গাছের ছায়ায় বসলাম বটে, কিন্তু রাতের অভিজ্ঞতাটা কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছিলাম না। তারপর হঠাৎ নজর গেল হাতের কাগজটার দিকে।

এ কী! এটা আমি কী এঁকেছি?

এ তো… কাল রাতে দরজার ওপাশ থেকে আসা সেই জিনিসটা! আর এ-ই তো আমার মুখের ঠিক ওপরে ভেসেছিল কাল রাতে!

লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কাগজটা ছিঁড়ে কুচিকুচি করলাম। মন চাইছিল তখনই রেল স্টেশনের দিকে ছুটে সামনে যে ট্রেন পাই সেটাতে চেপে এখান থেকে পালাতে। নিজেকে অনেক কষ্টে সামলালাম। তারপর মেরি-কে নিয়ে রওনা দিলাম ম্যানর হাউসের দিকে। একবার ভেবেছিলাম, টিম-কেও সঙ্গে নেব কি না। কিন্তু বাড়িতে নার্স আর এলাকা থেকে আসা অন্যান্য কাজের লোকেদের ভিড়ে টিম হাসিখুশি থাকবে ভেবে ওকে আর অতদূর হাঁটালাম না।

রাস্তায় মেরি একটাও কথা বলল না। আমিও খুব বেশি কথা বলার অবস্থায় নেই। আমাদের দু’পাশের ঘাসজমি কিন্তু হাওয়ায় দুলতে-দুলতে ফিসফিস করে অনেক কিছু বলছিল। তাদের মধ্যে আমি একটাই কথা শুনলাম— ‘পালাও!’ কিন্তু একগুঁয়ে হয়ে ঠিক করে ফেলেছিলাম, স্যার উইলিয়ামের সঙ্গে কথা না বলে এখান থেকে যাব না। ‘ঝামেলা’-য় যখন পড়েইছি তখন ওঁর সঙ্গে কথা বলাটা জরুরি।

কপাল খারাপ আর কাকে বলে! গিয়ে শুনলাম, স্যার উইলিয়াম সেদিনের জন্য লন্ডনে গেছেন। তবে সন্ধে নাগাদ ফিরবেন। বলে এলাম, উনি ফিরলে যেন আমাদের আসার কথা ওঁকে জানানো হয় আর উনি কখন আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন সেটাও যেন আমাকে কেউ ফোন করে জানিয়ে দেয়। তারপর নিজেদের একরকম টানতে-টানতে আবার ‘লাল’-মুখো হলাম।

বাড়ি পৌঁছোতে ছ’টা বাজল। ক্লান্ত, অনিচ্ছুক শরীরগুলো টেনে গেটের কাছে আসতেই ভেতরে, বাগানের দিক থেকে একটা আর্তনাদ শুনলাম।

টিমের গলা!

পেছন ফিরে দেখলাম, টিম বাগানের মধ্য দিয়ে, দু’হাতে নিজের চোখ ঢেকে টলতে-টলতে ছুটে আসছে। নার্স ওর পেছনেই দৌড়ে আসছেন। মেরি ছুটে গিয়ে টিমকে কোলে নিতে-নিতেই ও আরও একবার আর্তনাদ করল। তারপর মেরি-র কাঁধে মুখ গুঁজল। কথা না বাড়িয়ে মেরি ওকে কোলে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে সোজা শোয়ার ঘরের দিকে এগোল।

আমি নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে? টিম কি ব্যথা পেয়েছে?”

“জানি না, স্যার।” নার্স ফ্যাকাশে মুখে বললেন, “আমরা দু’জন সরু রাস্তাটা ধরে হাঁটছিলাম। দরজাটা খোলাই ছিল। টিম আমার চেয়ে একটু এগিয়ে ছিল। ও গেট পেরিয়ে ওপাশে গেল। আমি গেট পেরোবার আগেই শুনলাম, ও ওইভাবে আর্তনাদ করে উঠল। তারপর বাগানের মধ্য দিয়ে ওর ছুটে যাওয়া, চোখ ঢেকে রাখা— এগুলো তো আপনারাও দেখেছেন।”

“এমন কিছু আপনার চোখে পড়েছিল, বা শুনেছিলেন, যার থেকে টিম এইরকম ভয় পেতে পারে?”

“না, স্যার।”

টিমের কাছে গেলাম। জানতাম, ওকে এই নিয়ে জিজ্ঞেস করে কোনও লাভ নেই। মেরি’র আদরে ও একটু-একটু করে শান্ত হল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা মা, ওই সবুজ বাঁদরটা আমাকে ধরবে না তো?”

“না-না।” মেরি টিমের কপালে চুমু খেয়ে বলল, “ও তোমার কাছেই আসতে পারবে না। আমরা রইলাম পাহারায়। এবার ঘুমোও তো একটু।”

টিম ঘুমোলে মেরি শুকনো মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই বাড়িটাতে কী সমস্যা আছে, বল তো? আমি এখানে আসার পর থেকে… অনেককিছু দেখেছি। তুমি কি কিছু দেখেছ?”

আমি সংক্ষেপে বললাম, “দেখেছি।”

“আমি তোমাকে কিছু বলতে চাইনি।” মেরি যে খুব কষ্ট করে নিজেকে সংযত রাখছে সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। নিজেকে সামলে নিয়ে ও বলে চলল, “যেদিন এখানে এলাম, সেইদিনই দেখলাম, আমার আগে-আগে একজন পুরুষ আমাদের শোয়ার ঘরে ঢুকল। আমি অবাক হয়ে ঘরে এসে কাউকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম, ভুল দেখেছি। কিন্তু তারপরেও আমি ফাঁকা ঘরে ফিসফিস শুনেছি। কোনও কোণার পাশ দিয়ে বাঁক ঘুরতে গিয়ে স্পষ্ট মনে হয়েছে, সামনে থেকে কেউ সরে গেল। আর যেদিন তুমি এলে…”

“সেদিন কী দেখেছিলে?”

“আমি শুয়ে ছিলাম।” মেরি ঢোঁক গিলে বলল, “হঠাৎ জানালা থেকে শব্দ পেলাম। অবাক হয়ে উঠতে গিয়ে মনে হল, কী যেন একটা ভার আমার ওপর চেপে রয়েছে। তবু আমি হামাগুড়ি দিয়ে জানালা অবধি গেলাম। পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। দেখলাম, একজন মহিলা বাগান দিয়ে দৌড়োচ্ছেন!”

“মহিলা!”

“হ্যাঁ। তিনি দু’হাত সামনে বাড়িয়ে ছুটছিলেন। আর তাঁর পাশে একটা বীভৎস কিছু ছিল।”

মেরি হু-হু করে কেঁদে ফেলল। আমি অতি কষ্টে ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করলাম। তারপর জানতে চাইলাম, “আর কেউ কিছু দেখেছে?”

“নার্স কিছু দেখেননি। তবে গ্রাম থেকে যারা কাজ করতে আসে, তারা কিছু দেখেছে। কিছু জানেও, তবে বলে না। কিন্তু আমি খেয়াল করেছি, ওরা কেউ একা থাকতে চায় না। সবচেয়ে খারাপ জিনিস হল এই শ্যাওলার টুকরোগুলো! ওগুলোর মতো কুৎসিত আর কদর্য জিনিস আমি জীবনে দেখিনি।”

মেরি-র ভয়টা রাগের চেহারা নিয়েছে দেখে একটু আশ্বস্ত হলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “টিম কি এর আগে কিছু দেখেছিল?”

“দেখেছিল।” টিমের মাথায় হাত বুলিয়ে মেরি বলল, “কিন্তু কী দেখেছিল, সেটা ও বুঝিয়ে বলতে পারেনি।”

তখনই ফোন বাজল। ম্যানর হাউজ থেকে আমাকে জানানো হল, পরদিন সকাল সাড়ে দশটার সময় স্যার উইলিয়াম আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।

“ব্যস।” আমি ফোনটা রেখেই মেরিকে বললাম, “কাল আমি এই ব্যাপারটা ভালোভাবে একবার বুঝে নিই শুধু। তিন মাস তো দূরের কথা, একটা গোটা সপ্তাহও এখানে কাটালে আমি পাগল হয়ে যাব। টাকা যায় যাক। কিন্তু ‘লাল’-এর পাল্লায় আমি বেশিদিন পড়ে থাকতে চাই না।”

‘লাল’-এর স্থায়ী বাসিন্দারা আমি আলো নেভানো অবধি অপেক্ষা করেছিল। তারপর তারা দলবেঁধে আমাদের শোয়ার ঘরে ঢুকল। আমার থেকে হাতখানেকের ব্যবধানে মেরি আর টিম ঘুমোচ্ছে। বিছানার একটা ধার শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আমি ঠিক করলাম, পৃথিবী রসাতলে গেলেও আমি ভয় পাব না।

মনের ওপর অমানুষিক চাপ পড়ছিল। তবু আমি হাল ছাড়লাম না। নিজের সবটুকু জেদ, সবটুকু রাগ একটা বিন্দুতে সংহত করে আমি লড়ছিলাম চারদিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরা ছায়াগুলোর সঙ্গে। বাতাসে মিশে যাচ্ছিল একটা গা-ঘিনঘিনে ভাব আর জোলো গন্ধ। কারা যেন কথা বলছিল আমার সামনে-পেছনে। ভয়ের একটা কুয়োতে তলিয়ে যাওয়ার অবস্থা হলেও আমি কিছুতেই নিজেকে ভাসিয়ে দিইনি অন্ধকারে।

ভোর হল। আলোর আভাস আর পাখির ডাক জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে বুঝিয়ে দিল, ‘লাল’-এ আমাদের আরও একটা রাত কেটেছে। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে উঠে আবিষ্কার করলাম, রাতভোর লড়াইয়ের পর আমি যথারীতি ধ্বংসস্তূপ হয়ে থাকলেও মেরি আর টিম শান্তিতে ঘুমিয়েছে। যথাসাধ্য পরিপাটি হয়ে, ঠিক সকাল সাড়ে দশটার সময় ম্যানর হাউসে হাজিরা দিলাম। এই বাড়িটায় ঢুকতেই আমার বেশ ভালো লাগল। বাড়িটার কোথাও আড়ম্বর ছিল না, কিন্তু একটা সহজ উষ্ণতা ছিল।

“আমি জানতাম, এমন কিছু হবে।” লাইব্রেরিতে আমাকে বসিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন স্যার উইলিয়াম, “প্রথম থেকে বলুন, ঠিক কী-কী হয়েছে।”

যথাসম্ভব সংক্ষেপে সবটাই বললাম। মেরির, টিমের, আমার অভিজ্ঞতা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উইলিয়াম বললেন, “সব্বার সঙ্গে এমনটাই হয়। ভুতুড়ে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়তো আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ নয়। কিন্তু ওই বদমায়েশ উইল্কস্‌ যে-ভাবে এই কথাগুলো চেপে গিয়ে আপনাদের মতো লন্ডনের বাসিন্দাদের ওই ‘লাল’-এ টেনে আনে, সেটাকে শয়তানি ছাড়া কিছু বলা যায় না। চল্লিশ বছর ধরে আমি ওই বাড়িটাকে দেখে আসছি। বিশ্বাস করুন, আমি যা বলছি, জেনে-বুঝেই বলছি।”

“কিন্তু ওখানে কী হয়েছিল?” আমি প্রশ্নটা না করে পারলাম না, “মানে এমনি-এমনি একটা বাড়িতে তো এই…সব হয় না।”

“অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাড়িটার মালিক ছিলেন উইল্কস্‌-এর এক পূর্বপুরুষ। তিনি তাঁর স্ত্রীকে পছন্দ করতেন না। নিজের অনুগত চাকর-বাকরদের তিনি বলেছিলেন, তারা যেন তাঁর স্ত্রীকে যখন সম্ভব, যেখানে সম্ভব, যতভাবে সম্ভব ভয় দেখায়! সেই চাকরেরা কী করেছিল, তার কোনও খতিয়ান নেই। তবে একদিন ভোরের আগে সেই মহিলা নদীর জলে ডুবে নিজের জ্বালা-যন্ত্রণা জুড়িয়েছিলেন।”

“তারপর?”

“বাড়ির মালিক একটা ছোটোখাটো হারেম বানিয়েছিলেন ওই ‘লাল’-এ। তবে সেই সুন্দরীদের কারও পরিণতি সুখের হয়নি। একে-একে তারাও আশ্রয় নিয়েছিল ওই নদীর জলেই। তারপর ঠিক কতজন ‘লাল’-এর শিকার হয়েছে, আমি জানি না। গত চল্লিশ বছরে আমি ওখানে একটার-পর-একটা ‘দুর্ঘটনা’ বা আত্মহত্যা ঘটতে দেখেছি। আমার খুব কাছের দু’জন মানুষ— দুই ভাই ওই বাড়িতে থাকত। তাদের একজন আপনাদের শোয়ার ঘরটায় আত্মহত্যা করেছিল, অন্যজন নদীতে ডুবে মারা গেছিল। তবে সবচেয়ে ভয়ানক ছিল সেই প্রথম হতভাগিনী মহিলার শোয়ার ঘরটা। ওটা উইল্কস্‌ এখন বন্ধ করেই রাখে।”

“হ্যাঁ।” প্রথমদিন যে ঘরের জানালায় মুখটা দেখেছিলাম তার কথাটা মনে পড়ে শিউরে উঠলাম, “উইল্কস্‌ বলেছিলেন, ওই ঘরে নাকি ওঁর কী-সব জরুরি কাগজপত্র আছে।”

“কাগজ নয়, অন্য কিছু আছে!” শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন উইলিয়াম, “ওকে বাধ্য করা হয়েছিল ওই ঘরটা বন্ধ রাখতে। সে-জন্যই ওই বাড়িতে মৃত্যুর সংখ্যা ইদানীং অনেকটাই কমে গেছে। তবু, এই চল্লিশ বছরে ‘লাল’-এর বাসিন্দাদের মধ্যে অন্তত বারোজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ এবং ছ’জন শিশুর মৃত্যুর কথা আমিই জানি। ভয় পেয়ে বা অন্যভাবে মৃত্যুর সব কথা তো আমি জানতেও পারিনি।”

আমি কিছু না বললেও উইলিয়ামা আমার অবস্থাটা বুঝতে পারলেন। একটু নরম গলায় ভদ্রলোক বললেন, “দু’বছর আগের ভাড়াটেরাও এক সপ্তাহ ওখানে থেকেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই ভদ্রলোক উইল্কস্‌-এর বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আইনত কিছু করার উপায় ছিল না। আমি আপনাকেও বলব, টাকার মায়া না করে ওখান থেকে চলে যান।”

“আচ্ছা...” হঠাৎ টিমের বলা কথাটা মনে পড়ল, “ওই বাড়িতে সবুজ বাঁদর টাইপের কিছুর কথা কেউ কখনও বলেছে? আসলে টিম কাল সন্ধেবেলা ওইরকম কিছু দেখেছিল।”

“কী সর্বনাশ!” উইলিয়াম উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন, “আপনি আর দেরি করবেন না। যে ছ’টি বাচ্চার মৃত্যুর কথা আমি বললাম, তারা প্রত্যেকেই জলে ডুবে যাওয়ার আগে বাগানের একপ্রান্তে ওই ছোট্ট গেটের কাছে সবুজ রঙের একটা জন্তু বা ওইরকম কিছু দেখেছিল। টিম যখন ওটাকে দেখেছে তখন ওরও ঘোর বিপদ!”

“আপনি নিজে কিছু দেখেছেন কখনও?”

“আমি ওই জঘন্য জায়গাটাকে যতটা পারা যায় এড়িয়েই চলি।” আমার চোখে চোখ রেখে বললেন উইলিয়াম, “যখনই ওখানে যাই, আমি কিছু-না-কিছু দেখি। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হল, নিজের ঘরে এসেও রেহাই পাই না। স্বপ্নে দেখি, আমি ওই সরু লেনের একমাথায় নদীর পারে দাঁড়িয়ে আছি। জলের মধ্যে কিছু একটা জিনিস ভেসে আছে। প্রথমে মনে হয়, কাঠের টুকরো-টাকরা হবে। কিন্তু তারপর, যখন ওটা জলে ভেসে আমার কাছে আসে, তখন দেখি ওটা... অন্যকিছু! তারপর ওটা আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আর তখনই আমার ঘুম ভেঙে যায়। তবে প্রত্যেকবারই ভাবি, যদি ঘুম ভাঙার আগেই ওটা আমার নাগাল পেয়ে যায়?”

চুপ করে গেলেন উইলিয়াম। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “উইল্কস্‌-এর বিষদাঁত কীভাবে ভাঙা যায়, তাই নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব। আপাতত আপনি ওখানে ফিরে যান, প্যাকিং করুন, তারপর ওখান থেকে পাততাড়ি গোটান।”

উইলিয়ামের সঙ্গে করমর্দন করে উঠে পড়লাম।

Laal 2

‘লাল’-এ ফিরে দেখলাম, টিম খুব ভালো মনমেজাজে আছে। তা-ও ভাবলাম, ওকে বাড়িটার থেকে দূরে রাখাই ভালো। মেরি আর নার্সকে প্যাকিং সারতে বলে আমি টিম-কে নিয়ে হাঁটতে বেরোলাম। কতক্ষণ যে আমরা নিজেদের আনন্দে এদিক-সেদিক ঘুরেছি, খেয়ালও ছিল না। তবে আলো কমে আসছিল। তারপর পশ্চিম আকাশ থেকে মেঘের গুমগুম আর একপশলা ঠান্ডা হাওয়া জানিয়ে দিল, বৃষ্টি আসছে। পেছনদিকে হাঁটা লাগালাম আমরা।

একটা বড়ো মাঠ পেরোনোর ঠিক আগেই চোখ-ধাঁধানো বিদ্যুতের ঝলক তুলে ঝড়টা এসে পড়ল। এবার দৌড় লাগালাম আমরা। আমরা যখন বাড়ির পাশের ওই সরু রাস্তাটায় এসে পড়েছি, তখনই আলগা হয়ে থাকা জুতোর ফিতেয় পা আটকে আমি আছাড় খেলাম। টিম আমার চেয়ে আগে ছিল। ও দৌড়ে ছোটো গেটের কাছে এসে পড়ল।

জুতোর ফিতেটা বেঁধে সোজা হতে-হতে আমার মনে হল, কে যেন গেট দিয়ে সাঁৎ করে বাইরে এল। টিম আর আমার মাঝে দাঁড়িয়ে এক-মুহূর্তের জন্য সে আমার দিকে ঘুরল, তখনই আমি তাকে ভালোভাবে দেখলাম।

লম্বা, সরু, সবুজ রঙের একটা… কিছু, যার মুখের জায়গায় রয়েছে বড়ো একখণ্ড শ্যাওলা!

পরক্ষণেই সে টিমের দিকে ঘুরল। একটা আর্তনাদ করে টিম নদীর দিকে ছুটতে শুরু করল। আমি প্রাণপণে ওর পেছনে দৌড়োলাম। তবে আমার আগেই ওই জিনিসটা টিমের কাছে পৌঁছে ওর ওপর ঝুঁকে পড়ল।

নদীতে ঝাঁপ দিল টিম!

এক মুহূর্ত কিছু না ভেবে আমিও ওর পিছু-পিছু ঝাঁপালাম। মনে হল, যেন একটা সবুজ আর দুর্গন্ধযুক্ত আবরণের মধ্য দিয়ে আমি জলে এসে পড়লাম। টিম তখন পারের কাছের ঝাঁঝি আর দামের মধ্যে হাত-পা ছুড়ছে। ওকে কোনওক্রমে বুকে টেনে, শান্ত করে পারে উঠলাম। টিম আমার কোলে চেপেই ফিরল।

জানালা দিয়ে আমাদের দেখে মেরি’র মুখের যে কী অবস্থা হয়েছিল, তা আর বোঝানোর চেষ্টা করছি না।

গাড়ি ডেকে লটবহর আর নিজেদের বসিয়ে আমি সদর দরজাটা বন্ধ করতে গেলাম। মনে হল, যেন দরজাটাকে ওপাশ থেকেই কেউ বা কারা ঠেলে দিল ভীষণ জোরে।

‘লাল’ রয়ে গেল তার আদি ও অকৃত্রিম বাসিন্দাদের হাতেই।

_

মূল কাহিনি: দ্য রেড লজ

লেখক: হার্বার্ট রাসেল ওয়েকফিল্ড

প্রথম প্রকাশ: ‘দে রিটার্ন অ্যাট ইভিনিং’ বইয়ের অংশ হিসেবে ১৯২৮ সালে

অধ্যায় ১ / ৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%