পল্লব সরকার

অনুচ্চ শব্দে মাইকে একটানা বেজে চলেছে শিল্পীর সৃষ্টিগুলি৷ পরিবেশ ভাবগম্ভীর৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে বিশ্ববন্দিত সেতার-বাদক পদ্মবিভূষণ পণ্ডিত অমিয়প্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মরণসভা৷
মঞ্চের উপর ডানদিকে বাদনরত শিল্পীর একটি ছবি ফুল দিয়ে সাজানো৷ ধূপের ধোঁয়া সূক্ষ্ম পর্দার মতো ছেয়ে রয়েছে ছবিটির উপর৷ আরেক পাশে নীচু একটি বেদির উপর রাখা একটি সেতার, শিল্পীর শেষ ব্যবহৃত যন্ত্র৷
অমিয়প্রসাদকে শ্রদ্ধা জানাতে আজ এই স্মরণসভায় হাজির হয়েছেন বাংলার সংগীত জগতের প্রায় সমস্ত নক্ষত্র৷ মন্ত্রী এবং আমলারাও রয়েছেন অনেকে৷ বিশিষ্ট মানুষ, শিষ্য-শিষ্যা, অনুরাগীতে হল একেবারে কাণায় কাণায় পূর্ণ৷ বহু মানুষ ভিতরে ঢুকতে না পেরে বাইরে জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে৷
দেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁদের শোকবার্তায় অমিয়প্রসাদের এই অকালপ্রয়াণকে জাতীয় ক্ষতি হিসাবে বর্ণনা করেছেন৷ এমন মৃত্যুকেই মনে হয় বলে ইন্দ্রপতন৷
অরণ্যদা এবং আমি বসেছি হলের মাঝামাঝি জায়গায়৷ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার মিনিটপাঁচেক আগে হঠাৎ মাইকে বিশ্রী শব্দ— কোঁ কোঁ চোঁ চোঁ...
সেসব ঠিক করে অনুষ্ঠান শুরু হতে সামান্য কিছুটা দেরি হয়ে গেল৷
মঞ্চে বিশিষ্ট মানুষদের পাশাপাশি উপস্থিত রয়েছেন শিল্পীর স্ত্রী লাবণ্যদেবী এবং ছোটো মেয়ে সীমা৷
স্মরণসভা পরিচালনার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মুখ্যসচিব এবং অমিয়প্রসাদের স্নেহভাজন ড. জয়ন্ত সরকার স্বয়ং৷ ওনার নির্বন্ধেই আজ আমাদের এই স্মরণসভায় যোগদান৷
ড. সরকারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় মাত্র গতকালের৷ ভদ্রলোক অত্যন্ত পণ্ডিত, ভারতীয় সংস্কৃতিতে একজন অথরিটি বলা চলে৷ ওনার লেখা বেশকিছু বইপত্র রয়েছে৷ খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিনে নিয়মিত কলম লেখেন৷ পরিচয়ের সূত্রে বুঝলাম মানুষটি অত্যন্ত অমায়িকও বটে৷ তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের শীর্ষ আমলা হিসাবে ওঁর থেকে উপযুক্ত লোক পাওয়া মনে হয় সম্ভব না৷
গত বুধবার তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তর থেকে দিল্লিতে ইন্ডিয়া ফোর্টনাইটলির হেড অফিসে ফোন যায়৷ জানানো হয় যে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি মি. অরণ্য সেনশর্মার সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইছেন৷ অরণ্যদা যেহেতু উইকএন্ডে কলকাতায় ফেরে সেহেতু অ্যাপয়েন্টমেন্টটা কলকাতাতেই রাখা হল৷ গতকাল, অর্থাৎ শনিবার সেই সূত্রেই আমরা গিয়েছিলাম গলফ-ক্লাব রোডে ড. সরকারের বাড়িতে, সন্ধ্যেবেলা৷ ভদ্রলোকের বইয়ের সংগ্রহ রীতিমত ঈর্ষা জাগানো৷
মুখোমুখি পরিচয়ের পালা শেষ হওয়ার পর ড. সরকার অরণ্যদার উদ্দেশে বললেন, বলতে পারেন আমি আপনার একজন গুণমুগ্ধ৷ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমকে আপনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, এ-দেশে তা একেবারেই নজিরবিহীন৷
প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি অরণ্যদা দিল্লি থেকে প্রকাশিত জাতীয়স্তরের বিখ্যাত পাক্ষিক ইন্ডিয়া ফোর্টনাইটলির সহকারী সম্পাদক৷ দক্ষিণভারতের থিরুপুরের পদ্মনাভ মন্দিরের রহস্য এবং মধ্যভারতের জঙ্গলে ‘জীবন্ত’ ছিন্নমস্তা মূর্তির রহস্য উদঘাটনের পর তদন্তমূলক সাংবাদিকতায় অরণ্যদার এখন বেশ নামডাক৷ ওর ছায়াসঙ্গী হিসাবে সেই খ্যাতির আলো যে আমার উপরেও কিছুটা এসে পড়ে তা বলাই বাহুল্য৷ ইন্ডিয়া ফোর্টনাইটলির কলকাতা করেসপন্ডেন্ট হিসাবে কাজ করার পাশাপাশি অরণ্যদার সমস্ত ‘ক্রুশিয়াল অ্যাসাইনমেন্ট’-এ আমি তার সঙ্গী৷
অরণ্যদা বিনয়ের একটা হাসি দিয়ে বলল, আপনার মতো পণ্ডিত মানুষের সংস্পর্শে আসাটা আমাদের কাছেও অত্যন্ত সম্মানের৷ কোথাও আপনার লেখা দেখলেই আমি সঙ্গে সঙ্গে পড়ে ফেলি৷ আপনার ‘হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান আর্ট’ তো আমার অত্যন্ত প্রিয় বই৷
মৃদু হাসলেন ড. সরকার৷ তারপর কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বললেন, যে ব্যাপারটা আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই সেটাকে হয়তো আপনার একটু অদ্ভুতই মনে হবে৷ তবে পুরো ব্যাপারটাই আনঅফিসিয়াল৷ কেন, তা আমার কথাগুলো শুনলেই বুঝতে পারবেন৷
ওকে৷ বলুন৷
ব্যাপারটা সেতারী অমিয়প্রসাদের মৃত্যুকে ঘিরে৷ উনি ছিলেন আমাদের পারিবারিক বন্ধু৷ অভিভাবকও বলা চলে৷ ওনার পরিবার আর আমাদের পরিবার ফরিদপুরের একই গ্রামের৷ আমার বাবা এবং উনি সেখানে একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন৷ সেই থেকেই দু-জনে হরিহর আত্মা৷
ড. সরকার পারিবারিক অ্যালবাম বার করলেন৷ তাতে দুই পরিবারের সদস্যদের অনেক ছবি৷ একটি ছবিতে যুবক অমিয়প্রসাদ ছোট্ট জয়ন্তবাবুকে কোলে করে রয়েছেন৷ একটা গ্রুপ ফটো দেখিয়ে ড. সরকার বললেন, এটা ফরিদপুরের স্কুলে তোলা৷ এই যে, বাবা আর অমিয়কাকু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে৷ ছবিতে আঙুল দিয়ে দেখালেন ড. সরকার৷
কাকু আমাকে নিজের ছেলের মতো দেখতেন৷ এবারেও দেশে ফেরার আগে ফোন করেছিলেন৷ বললেন, কনসার্টে আমি যেন অবশ্যই উপস্থিত থাকি৷ প্রায় পাঁচ বছর পর কাকু কলকাতায় পা রাখেছেন৷ সেই আনন্দ যেন আর চেপে রাখতে পারছিলেন না৷ বললেন, নতুন একটা কম্পোজিশন করেছি বুঝলি, কলকাতায় বাজাবো৷ দেখবি কেমন সাড়া পড়ে যায়৷ ওনাকে জানালাম যে সম্ভবত এ বছরই তুমি ভারতরত্ন পাচ্ছ৷ সে কথা শুনে তো দারুণ খুশি হলেন৷ ফোনের মধ্যেই হা হা করে হাসছিলেন৷ বললেন, তিনবার গ্র্যামির পর তোদের টনক নড়ল!
ওনার কী ইউ এস সিটিজেনশিপ?
হ্যাঁ৷ উইথ ও সি আই স্টেটাস৷ নিউইয়র্কই ওনার বেস৷ ওখানেই তো ওনার মিউজিক স্কুল৷
ড. সরকার হাতদুটো জড়ো করে দুই বুড়ো আঙুল ঠোঁটে ছোঁয়ালেন৷ ভাবলেন কিছুক্ষণ৷ তারপর বললেন, আমার একটা ফিলিং হচ্ছে জানেন৷
অরণ্যদা বলল, কী ফিলিং?
কেবলই মনে হচ্ছে কাকুর মৃত্যুটা ঠিক স্বাভাবিক নয়!
হঠাৎ এরকম মনে হওয়ার কারণ?
সেটা আপনার খুবই ভেগ মনে হবে৷ ...কোনো শিল্পী বাজাতে বাজাতে বা গাইতে গাইতে মারা গেছেন এ উদাহরণ মনে হয় পৃথিবীতে খুব কমই রয়েছে৷ কাকু বলতেন, যখন বাজাই তখন স্বয়ং দেবী সরস্বতী আমার সামনে এসে দাঁড়ান৷ সে সময় মৃত্যুও আমাকে ছুঁতে পারবে না৷
অরণ্যদা মানুষ হিসাবে যুক্তিবাদী হলেও মানুষের এ ধরনের অনুভূতি বা আবেগের মূল্য দিতে জানে৷ ড. সরকারের কথায় ও বলল, আমিও ব্যাপারটা ফিল করছি৷ কিন্তু কেবলমাত্র এই যুক্তিতে মৃত্যুটাকে অস্বাভাবিক ধরে নেওয়াটা কি উচিত হবে?
বললাম না, ব্যাপারটা আপনার ভেগ মনে হবে৷
আপনি তো কনসার্টে ছিলেন?
হ্যাঁ৷
অস্বাভাবিক কিছু কি আপনার চোখে পড়েছিল সেদিন?
ড. সরকার কয়েক সেকেণ্ড ভেবে একটু জড়ানো গলায় বললেন, ...না...হঠাৎই দেখলাম কাকুর শরীর ডানদিকে হেলে পড়েছে! আমি সামনেই ছিলাম৷ সঙ্গে সঙ্গে স্টেজে উঠে যাই৷ কাকুকে তবলায় সঙ্গত করছিলেন পণ্ডিত বিক্রমজিৎ সেন৷ দু-জনে ধরাধরি করে কাকুকে স্টেজের উপর শুইয়ে দিই৷ যন্ত্রণার চোটে কাকুর মুখ ভীষণরকম বিকৃত হয়ে গিয়েছিল৷
ঘটনার ক্লিপিংটা নিউজে দেখেছিলাম৷ ইউটিউবে নিশ্চই আছে?
আছে অবশ্যই৷ ওটা তো সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল৷ অদ্ভুত মানুষের রুচি!
ড. সরকার টেবিলে রাখা পিসি-তে ক্লিপিংটা চালালেন৷ অমিয়প্রসাদ নিবিষ্ট মনে বাজাচ্ছেন৷ পরনে সবুজ পাঞ্জাবি৷ মুখের প্রতিটা ভাঁজে গভীর মগ্নতা৷
ড. সরকার বললেন, এই যে রাগটা বাজাচ্ছেন, এটা কাকুর অত্যন্ত প্রিয় রাগ, সুরদাসী মল্লার৷ বর্ষার দিনে, বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলা হলে তো উনি এটা বাজাবেনই৷ খেয়াল করুন, দ্রুত তিনতালে সুরের কী অসাধারণ বিস্তার! সাপাট, কুট, গমকের তালের অনুষঙ্গ তুলনাহীন৷ ...আর এই যে, অতি দ্রুত ঝালা, কাকু এটা বাজাতেন একেবারে নিজের সিগনেচার স্টাইলে৷
হঠাৎ স্পিকারে কোঁ কোঁ শব্দ!
ড. সরকার বললেন, ওই সময় হঠাৎ মাইক গণ্ডগোল করছিল৷
অমিয়প্রসাদ হতবাক চোখে মুখ তুলে তাকালেন৷ তারপরেই সারা মুখ জুড়ে ফুটে উঠল তীব্র যন্ত্রণার চিহ্ন! বাঁ-হাতটা এলিয়ে পড়তেই সেতারটা একটু হেলে গেল৷ তিনি মুখটা হাঁ করলেন৷ মনে হল দম নেওয়ার চেষ্টা করলেন৷ কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শরীরটা ডানদিকে হেলে গেল৷
ড. সরকারকে দৌড়ে স্টেজে উঠতে দেখা গেল৷ তিনি আর পণ্ডিত বিক্রমজিৎ সেন মিলে অমিয়প্রসাদকে ধরাধরি করে স্টেজের উপরে শুইয়ে দিলেন৷ এরপর স্টেজে বহু মানুষের ছোটাছুটি৷ অমিয়প্রসাদের শরীরটা পায়ের জঙ্গলের আড়ালে চলে গেল৷
ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে কতক্ষণ লেগেছিল? জিজ্ঞেস করল অরণ্যদা৷
ড. সরকার বললেন, মিনিট পনেরো হবে বড়োজোড়৷ কিন্তু নিয়ে যেতে যেতেই সব শেষ৷ ডাক্তাররা চিকিৎসা করার কোনো সুযোগই পাননি৷
খবরে তো দেখলাম হাসপাতালের মেডিক্যাল বুলেটিনে বলেছে কার্ডিয়াক ফেইলিওর৷ পোস্টমর্টেম নিশ্চই করা হয়নি?
না৷ এটা তো আর আনন্যাচারাল ডেথ নয়৷
এমনিতে ওনার শরীর-স্বাস্থ্য কেমন ছিল?
আটষট্টি বছর বয়সের তুলনায় ভালোই৷ তবে হৃৎপিণ্ডে সমস্যা থাকায় বছর দুই আগে পেসমেকার বসাতে হয়েছিল৷
হুম৷ অন্য কোনো টেনশন ছিল কি?
দেখুন, একেবারে ব্যক্তিগত কিছু থাকলে আমি জানি না৷ আমার যতদূর জানা আছে, সেরকম কিছু ছিল না৷ তবে হ্যাঁ, একটা ব্যাপার, কলকাতায় আসার পথে ওনার সেতারটা ড্যামেজ হয়৷ কলকাতা এয়ারপোর্টে কার্গো হ্যান্ডলিং-এর সময় ব্যাপারটা ঘটে৷
আমি বললাম, সে খবর তো মিডিয়াতেও এসেছিল৷
রাইট৷ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে খবরটা পেয়ে কাকু আমাকে ফোন করেছিলেন৷ গলা শুনে মনে হল বেশ টেনশনে পড়ে গেছেন৷ রবিবার অনুষ্ঠান, আর এ ঘটনাটা তার দিন পাঁচেক আগের৷ কাকু সে সময় কোনো একটা কাজের সূত্রে জুরিখে ছিলেন৷ ওই ক-দিনের মধ্যে নিউইয়র্ক থেকে আরেকটা সেতার আনানো প্রায় অসম্ভব ব্যাপার৷ কাকুর কথা মতো আমিই তখন যন্ত্রটা সারানোর বন্দোবস্ত করি৷
ঠিকঠাক সারানো সম্ভব হয়েছিল?
হ্যাঁ৷ ওসব নিয়ে অনুষ্ঠানের দিন আর কোনো টেনশন ছিল না৷ আগের দিনই ওটা রিপেয়ার হয়ে চলে এসেছিল৷ সেদিন সন্ধ্যেয় হোটেল থেকে কাকুকে আমিই সঙ্গে করে হলে নিয়ে যাই৷ কাকুর আগের দিন কলকাতায় পৌঁছোনোর কথা থাকলেও ফ্লাইটের সমস্যায় পৌঁছোন রোববার সকালে৷ অতটা ট্র্যাভেল করে এলেও কাকুকে খুব ফ্রেশ লাগছিল৷ শরীরে জেটল্যাগের কোনো চিহ্নই ছিল না৷ গাড়িতে যেতে যেতে অত্যন্ত উৎসুকভাবে চারিদিক দেখছিলেন আর মাঝে মাঝে শিশুর মতো উচ্ছ্বাসিত হয়ে উঠছিলেন৷ পুরোনো দিনের অনেক কথা বলছিলেন সেদিন৷ পার্কসার্কাসে কোন চায়ের দোকানে আড্ডা দিতেন, লাবণ্যকাকিমার জন্য লেডি ব্রেবোর্নের সামনে কীরকম ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন; এইসব কথা আর কী৷ কাকুকে বললাম, দিন দিন তুমি আরও ইয়ং হয়ে যাচ্ছ৷ সে কথা শুনে কাকু বললেন, বুঝলি জয়ন্ত, মানুষ হল গাছের মতো৷ গাছ যতদিন নতুন পাতার জন্ম দিতে পারে জানবি তার মধ্যে ভাইটালিটি রয়েছে৷ মানুষেরও তাই৷ যেদিন থেকে সে নতুন কিছু করার ক্ষমতা হারায় জানবি সেদিন থেকে সে মৃত্যুর দিকে হাঁটা লাগাল৷ কাকু এই বয়সেও প্রচণ্ড ক্রিয়েটিভ ছিলেন৷ ওনার মধ্যে মৃত্যুর কোনো লক্ষণই আমার চোখে পড়েনি৷
আপনার কাকিমা ব্যাপারটাকে কীরকম ভাবে নিয়েছেন?
স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন৷ ফোন করে ওনাকে খবরটা আমিই দিই৷ উনি নিউইয়র্কে ছিলেন৷ এবারে কাকুর সঙ্গে আসেননি৷ কাকিমা কলকাতায় পৌঁছোলেন বুধবার৷
ওনাদের তো দুই মেয়ে?
হ্যাঁ৷ সীমা পৌঁছোল বৃহস্পতিবার ভোরে৷ সিডনিতে ওর একটা কনসার্ট ছিল৷ ওই দিনই তো দাহকার্য হল৷ নীতা আসতে পারেনি৷ ও রয়েছে আলাস্কায়৷ ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের টিভি হোস্ট৷ সেতারের সঙ্গে কোনো সংশ্রব নেই৷
ইতিমধ্যে চা এসে গিয়েছিল৷ অরণ্যদা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, আমাকে আপনি কী করতে বলছেন?
ড. সরকার একটু অসহায়ভাবে বললেন, কী করতে বলা উচিত সেটাই তো মাথায় আসছে না৷ তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, জাস্ট রিকোয়েস্ট করব ঘটনাটা আপনি একটু স্টাডি করুন৷ পুলিশ বা কোনো গভর্নমেন্ট এজেন্সিকে দিয়ে তো আর এ কাজ সম্ভব নয়৷ আপনাকে আমার বলার একটাই উদ্দেশ্য, ক্রাইম ডিটেকশনে আপনার যে ন্যাচারাল ইনসটিংক্ট সেটা ব্যবহার করে যদি আপনার পক্ষে কিছু বোঝা সম্ভব হয়৷
বুনো হাঁসের পিছনে দৌড়নো৷ মৃদু হাসল অরণ্যদা৷
ড. সরকারও মৃদু হাসলেন৷ ব্যাপারটা অনেকটা সেরকমই দাঁড়াচ্ছে৷ তারপর বললেন, আগামীকাল সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসদনে কাকুর স্মরণসভা৷ আমার দপ্তরই আয়োজন করছে৷ আমি আপনাদের আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি৷
অবশ্যই যাব৷ ক-টায়?
ছ-টায়৷
একটা প্রশ্ন, অমিয়বাবুর কোনো শত্রু ছিল কী?
কাকু অজাতশত্রু মানুষ৷ কোনোদিন মনে হয় কাউকে একটা কটু বাক্যও বলেননি৷
ড. সরকারের বাড়ি থেকে ফিরতে ফিরতে একটা কথা আমার মাথায় ঘুরছিল৷ অরণ্যদাকে সেটা বলেই ফেললাম৷ তোমার কী মনে হয় না যে ড. সরকার অকারণেই ব্যাপারটার মধ্যে জটিলতা দেখছেন?
অরণ্যদা গাড়ি চালাতে চালাতে কিছু ভাবছিল৷ আমার কথায় কেবল হুমম করে একটা গম্ভীর শব্দ করল৷
তাহলে?
ও গম্ভীরভাবে বলল, মানুষটা পণ্ডিত৷
আমি আর কথা বাড়ালাম না৷
স্মরণসভা শুরু হল অমিয়প্রসাদেরই সৃষ্টি বনমালিকা নামের একটা কম্পোজিশন বাজিয়ে৷ বাজালেন ওঁরই এক শিষ্যা৷ তারপর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ৷
রবীন্দ্র সরণির এক বাদ্যযন্ত্রের দোকানের বৃদ্ধ মালিকও শোনালেন অনেক অন্তরঙ্গ স্মৃতিকথা৷ ভদ্রলোকের নাম হরিপদ দাস৷ অমিয়প্রসাদের সেতার ভাঙার সূত্রে টিভি চ্যানেলগুলোতে এনার মুখও বেশ কয়েকবার দেখা গেছে৷
অমিয়প্রসাদের সমস্ত সেতার এনার হাতেই তৈরি৷ এমনকী সেগুলো সারাতেনও ইনি৷ আর কারোর কাজেই নাকি অমিয়প্রসাদের মন উঠত না৷ কোনো যন্ত্রে সমস্যা হলে অমিয়প্রসাদ আমেরিকা থেকে সেটা সরাসরি এনার কাছে পাঠিয়ে দিতেন৷ এবারেও ইনিই ছিলেন মুশকিল আসান৷
হরিপদবাবুর বয়স পঁচাত্তরের আশেপাশে হবে৷ শীর্ণ ভঙ্গুর চেহারা৷ বয়সের ভারে কিছুটা কুঁজো হয়ে গেছেন৷ চোখে মোটা কাচের চশমা৷ পরনে মলিন ধুতি আর ফতুয়া৷
স্মরণসভার শেষ অনুষ্ঠান ছিল সেতারী পণ্ডিত সত্যরঞ্জন মজুমদারের বাদন৷ তিনি প্রয়াত শিল্পীকে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন শিল্পীরই প্রিয় রাগ সুরদাসী মল্লার বাজিয়ে৷
অরণ্যদা মোবাইলে কিছুক্ষণ ধরেই কী যেন করছিল৷ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই ও হঠাৎ সিট থেকে উঠে পড়ল৷ আমাকে বলল, বিনায়ক, আয়৷
মঞ্চের পিছনে অতিথি-অভ্যাগতদের যেখানে বসানো হয়েছে আমরা সেখানে গেলাম৷ ড. সরকার আমাদের দেখে বললেন, কী ব্যাপার মি. জার্নালিস্টস?
অরণ্যদা তাঁকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলল, হরিবাবু কী বললেন আপনি খেয়াল করেছেন?
ড. সরকার একটু অবাক হয়ে বললেন, কে, দাসমশাই?
হ্যাঁ৷
হ্যাঁ, মানে কোন কথাটা বলুন তো?
‘অমিয়বাবু এই সেদিনও আমার দোকানে এসেছিলেন’!
কথাটা আমিও শুনেছিলাম৷ কিন্তু বুড়ো মানুষের প্রলাপ ভেবে পাত্তা দিইনি৷ এখানে উপস্থিত সকলেই হয়তো তাই করেছেন৷ একজন সামান্য ‘মিস্ত্রী’-র কথায় সুধীজনেরা কবেই বা গুরুত্ব দিয়েছেন৷
ড. সরকার অপ্রতিভভাবে বললেন, না, মানে শুনেছি...
অরণ্যদা বলল, হরিবাবুর সঙ্গে একবার কথা বলার দরকার৷ আর একটা ছোট্ট এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে৷
কী এক্সপেরিমেন্ট? জিজ্ঞেস করলেন ড. সরকার৷
বলছি৷ তার আগে হরিবাবুর সঙ্গে আলাপটা সেরে নিই৷
আপনি কি অন্যরকম কিছু আঁচ করছেন? উৎসুক চোখে প্রশ্ন করলেন ড. সরকার৷
অরণ্যদা কেবল একটু হাসল৷ যার মানে অনেক কিছু হতে পারে৷
হরিপদ দাস হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে এক কোণে একটা চেয়ারে বসেছিলেন৷ অরণ্যদা এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল হরিবাবু৷
বৃদ্ধ মানুষটি ভারী চশমার ভিতর দিয়ে তাকিয়ে বললেন, কী কথা? অমিয়বাবুকে নিয়ে? সেদিন থেকে তো কতজনই কথা বলতে এল৷ বলো, কী জানতে চাও৷
আপনি যে মঞ্চে বললেন, ‘অমিয়বাবু এই সেদিনও আপনার দোকানে এসেছিলেন’ —সেটা কবে?
হরিবাবু কয়েক সেকেন্ড ভেবে বললেন, সেতারটা যেদিন আমার কাছে এল তার দু-একদিন পর৷ বেস্পতি-শুক্কুরবার হবে৷
বৃহস্পতি না শুক্র?
হরিবাবু আবার খানিক চিন্তা করে বললেন, মনে পড়ছে না৷ বেস্পতিই হবে বোধ হয়৷ এখন আর কিছুই মনে থাকে না৷
আপনি নিশ্চিত তো অমিয়বাবুই এসেছিলেন?
অবাক দৃষ্টিতে অরণ্যদার দিকে তাকিয়ে হরিবাবু বললেন, এসব কী বলছ বাবা? উনি ছাড়া আর কে হবেন?
না না, ঠিক আছে৷ যেন এরকম অদ্ভুত প্রশ্ন করা তার উচিত হয়নি এমন ভাব দেখিয়ে অরণ্যদা প্রসঙ্গ পালটে বলল, অমিয়বাবুর সঙ্গে তার আগে শেষ কবে আপনার দেখা হয়েছিল?
বৃদ্ধ একটু ভেবে বললেন, তা বছর পাঁচ-সাত আগে হবে৷ আগে তো কলকাতায় এলেই একবার অন্তত দোকানে আসতেন৷
এবার যখন এলেন তখন দোকানে কে কে ছিল?
কে আর থাকবে বাবা, সবাই তো চলে গেল! হঠাৎই হাহাকার করে ওঠেন বৃদ্ধ৷ সবই আমার ঔদ্ধত্যের ফল!
অরণ্যদা মুহূর্তের জন্য থেমে প্রশ্ন করল, কারা চলে গেল?
আমার তিন ছেলে৷ সা জোয়ান তিন ছেলে৷ বাপ, পিতামহের আদেশ অগ্রাহ্য করেছি, তার শাস্তি তো পেতে হবেই৷ হরিবাবুর ঘোলাটে চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে৷
কী আদেশ?
বৃদ্ধ খানিক দম নিয়ে বললেন, আদেশ ছিল কোনোদিন যেন বীণা না বানাই৷ এমনকী সারাই পর্যন্ত না করি৷ আমাদের বংশে যে-ই ও কাজ করেছে তারই চরম সর্বনাশ ঘটেছে৷
মনে মনে ভাবলাম, স্বয়ং দেবী সরস্বতীর বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এমন সংস্কার! সত্যিই পৃথিবীতে বিচিত্র কত কিছুই না আছে৷
গুরুজনের আদেশ অমান্য করে আমি সেই কাজটাই করি৷ লোভ লোভ! লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু!
কীসের লোভ?
টাকার৷ আর কীসের! অনেকেই ও জিনিসের খোঁজ করত৷ ফরেনেও খুব চাহিদা৷ কিন্তু বীণা বানানোর সেরকম কারিগর আর কোথায়৷ সাপ্লাই কম বলে দামও চড়া, লাভও বেশি৷ লোভে পড়ে তাই শুরু করলাম৷ প্রথম অর্ডারটাই ছিল জাপান থেকে৷ মালটা যেদিন ডেলিভারি হল তার এক সপ্তাহের মধ্যে মেজো ছেলেটা গলায় দড়ি দিল৷ চশমাটা খুলে ধুতির খুঁটে চোখ মুছলেন হরিবাবু৷ ...মেজোজনকে পুড়িয়ে ফেরার পথে গাড়ি চাপা পড়ল ছোটোজন৷ দশদিন হাসপাতালে অনেক লড়াই করে সেও ক্ষান্ত দিল৷ শোকের বাষ্পে গলা বুজে আসে বৃদ্ধের৷ চোখের দৃষ্টিতে অসীম শূন্যতা৷ ...এর মধ্যে মেজো বৌমার গায়ে আগুন লাগল৷ তিনদিনের দিন সেও গেল৷ তার বাপের বাড়ির লোকজন আমাদেরই দোষী করল৷ আমরাই নাকি তার গায়ে আগুন দিয়েছি৷ বড়োছেলে আর আমাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেল৷ ...দু-মাসের মাথায় জামিন হল৷ জেল থেকে বেরিয়ে ধরা পড়ল বড়োছেলের গলায় ক্যানসার৷ মাথায় বাজ পড়ল৷ যেটুকু যা ছিল উজাড় করে চিকিৎসা করিয়েও তাকে বাঁচাতে পারলাম না৷ ...এখন আমি মরলেই সব শেষ৷ কে সারাতো অমিয়বাবুর সেতার! তাই মনে হয় তিনি আগেই চলে গেলেন৷
বোবা দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন বৃদ্ধ৷ তারপর একসময় মুখটা তুলে ধরা গলায় বললেন, বাদ দাও সেসব কথা৷ আর কী জানতে চাও বলো?
অরণ্যদা বলল, অমিয়বাবু ক-টা নাগাদ আপনার দোকানে এসেছিলেন?
সন্ধ্যের পরে৷ সাতটা-টাতটা হবে৷
এসে কী করলেন?
সেতারটা দেখতে চাইলেন৷ তারপর বললেন, এটাকে নিয়ে আমি একা একটু বসব৷ তখন আমি ওনাকে দোকানের মালপত্র রাখার ঘরটায় নিয়ে গেলাম৷ বললেন, দরজাটা দিয়ে দিন৷ আর আপনি বাইরে থাকুন৷
ড. সরকার পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলেন৷ হরিবাবুর কথায় তাঁর কপালের ভাঁজগুলো ক্রমশ গভীর হতে লাগল৷
অরণ্যদা বলল, সেতারটা কি সারানো হয়ে গিয়েছিল?
না, মাঝপথে৷ ওটার ‘নেক’ আর ‘কদুর’ জোড়ের কাছটা ভেঙে গিয়েছিল৷ তুম্বাটাও ড্যামেজ ছিল৷
তারপর?
আধঘণ্টা মত অমিয়বাবু ওঘরে ছিলেন৷ বেরিয়ে এসে বললেন, কাজটা কমপ্লিট করে ফেলুন দাসমশাই৷ রবিবারে অনুষ্ঠানের আগে যেন হাতে পাই৷ তারপর গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, আমি যে এসেছিলাম এ কথা কাউকে বলার দরকার নেই৷ নইলে মিডিয়ার জ্বালায় অস্থির হয়ে যাব৷
উনি ওই ঘরে বসে সেতারটা নিয়ে কী করলেন?
সে কথা কী অত বড়ো একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করা যায়?
ঠিক আছে৷ এবার অন্য একটি কথা, ...সেতারটি আপনাকে আবার খুলতে হবে৷
খুলতে হবে? কেন? এই তো সেদিন...
বিশেষ একটা দরকার আছে৷
হরিবাবু আমতা আমতা করে বললেন, ...ঠিক আছে ...কিন্তু তার জন্য তো ওনার পরিবারের অনুমতির প্রয়োজন৷
অরণ্যদা ড. সরকারের দিকে তাকাল৷ তিনি বললেন, আমি কাকিমার সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি৷
লাবণ্যদেবী এবং তাঁর মেয়ে ততক্ষণে হল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন৷ ড. সরকার মোবাইলে কথা বলে সম্মতি আদায় করে নিলেন৷
সম্মতি পাওয়া গেছে শুনে হরিবাবু বললেন, ঠিক আছে, ওটা দোকানে পাঠিয়ে দেবেন৷
অরণ্যদা বলল, কাল সকালে আমরাই ওটা নিয়ে যাব৷ দোকানের ঠিকানাটা যদি দয়া করে বলেন৷
আঠাশের বি বাই ওয়ান, রবীন্দ্র সরণি৷ লালবাজারের পিছন দিকে৷
ধন্যবাদ হরিবাবু৷ কাল সকালে দেখা হচ্ছে৷
বৃদ্ধ লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে বেরিয়ে গেলেন৷
এরপর অরণ্যদা ড. সরকারের উদ্দেশে বলল, অনুষ্ঠান শুরুর আগে অমিয়প্রসাদের যে সিডিগুলো বাজানো হচ্ছিল সেগুলো একবার চাই৷
ড. সরকার দপ্তরের একজন কর্মীকে ডেকে সেগুলো আনতে বললেন৷
কর্মীটি দুটি সিডি নিয়ে এলেন৷
অরণ্যদা সেগুলোর কভারের উপর চোখ বুলিয়ে একটা সিডি লোকটির হাতে দিয়ে বলল, তিন নম্বর ট্র্যাকটা বাজান৷
ফাঁকা হলে বেজে উঠল সুরদাসী মল্লার৷
অরণ্যদা সিডি প্লেয়ারে ট্র্যাকটা খানিক এগিয়ে দিল৷
রাগটি বাজতে বাজতে ঝালা অংশে পৌঁছোতেই মাইকে কোঁ কোঁ করে সেই শব্দ শুরু হল! সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মোবাইলগুলোও গোঁ গোঁ করে উঠেছে৷
ব্যাপারটা এতটাই ‘ট্যান’ হয়ে গেল যে আমি আর ড. সরকার দু-জনেই ফ্যালফ্যাল করে অরণ্যদার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম৷
আধমিনিট মতো এরকম চলার পর মাইকের শব্দ আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে গেল৷ মোবাইলগুলোও সঙ্গে সঙ্গে চুপ করল৷
অরণ্যদা মুচকি হেসে বলল, আগুনের প্রতিশোধ!
এমন হেঁয়ালিতে রহস্য বাড়ল বই কমল না৷
আশাকরি আগামীকালই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে৷ কাল সকাল এগারোটায় হরিবাবুর দোকানে দেখা হচ্ছে৷ সেতারটা হাতে তুলে নিন অরণ্যদা৷
হল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে হাতঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে অরণ্যদা বলল, সাড়ে আটটা... রবীন্দ্র সরণি চল৷
আমি বিনা বাক্যব্যয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিলাম৷
রোববার রাতের ফাঁকা রাস্তা ধরে দশমিনিটে পৌঁছে গেলাম রবীন্দ্র সরণি৷
সারসার ঝাঁপবন্ধ দোকান৷ রাস্তায় জায়গায় জায়গায় বৃষ্টির জল জমে রয়েছে৷ ঘরঘর শব্দে চলে গেল একটা ফাঁকা ট্রাম৷
লালবাজার ছেড়ে কিছুটা এগোতেই রাস্তার ডানহাতে আঠাশের বি বাই ওয়ান৷ ধুলিমলিন বিবর্ণ সাইন বোর্ডে লেখা
এইচ ডাস অ্যান্ড কোং
ম্যানুফ্যাকচারার অফ অল কাইন্ডস অফ মিউজিক ইনসট্রুমেন্ট
দোকানটি থেকে একটু এগিয়ে রাস্তার একপাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমরা নামলাম৷
অরণ্যদা একটা সিগারেট ধরাল৷ তারপর পায়চারি করার ঢঙে আঠাশের বি বাই ওয়ান-এর সামনে দিয়ে ঘুরে এল একবার৷
এই লাইনে পর পর কয়েকটা বাদ্যযন্ত্রের দোকান রয়েছে৷
অরণ্যদা রাস্তার ওপারে একটা চায়ের দোকান দেখিয়ে বলল, চল চা খাই৷
উলটোদিকে ট্রাফিকগুমটির গায়ে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান৷ আমরা গিয়ে দাঁড়াতে দোকানদার মাটির ভাঁড়ে এগিয়ে দিল ঘন দুধের গরমা-গরম চা৷
চায়ের ভাঁড় হাতে আমরা নানা কথা বলছি, হঠাৎ উপর থেকে ঠং করে একটা স্টিলের চামচ আমাদের সামনে এসে পড়ল৷ ট্রাফিকগুমটির মাথার উপর গাছের ডালপালা আর তারের জঙ্গলের মধ্যে পরিপাটি বাসা বেঁধেছেন সনাতনবংশীয় এক কাক্কেশ্বর৷ দেহাতি দোকানদারের ‘চম্মচ’-এর গুনতিতে মনে হয় কিছু গরমিল হয়েছিল৷ হঠাৎ-ই হিসাব মিলে যাওয়ার পুলকে সে ঠেট ভোজপুরিতে ‘কউয়া’-র বাপ-বাপান্ত শুরু করল৷ কউয়াও কম যান না৷ ক-ক্ক-কা-ক্কা শব্দে তিনিও আসর জমিয়ে দিলেন৷ কেতাবি ভাষায় যাকে বলে একেবারে হিউম্যান অ্যানিম্যাল কনফ্লিক্ট৷
চা শেষ করে অরণ্যদা বলল, আমাকে ড্রপ করে দিয়ে তুই বাড়ি চলে যা৷
পরদিন সকাল এগারোটায় আবার হাজির হলাম হরিবাবুর দোকানে৷ কিছুক্ষণের মধ্যে ড. সরকারও এসে পড়লেন৷
আমাদের দেখে কুণ্ঠিত স্বরে হরিবাবু বললেন, কোথায় যে আপনাদের বসাই৷
দোকানটি খুবই ছোটো৷ সাত-বাই-পাঁচ ফুটের হতশ্রী একটি কুঠুরি৷
পাশের দোকানটি দেখিয়ে হরিবাবু বললেন, ওই অংশটাও আমার ছিল৷ বড়োছেলের অসুখের সময় বিক্রি করে দিতে হয়েছে৷
পাশের দোকানটিও বাদ্যযন্ত্রের৷ তবে একেবারে ঝাঁ চকচকে৷ হালফ্যাশনের কাচের শো-কেসে নামী-দামী ব্র্যান্ডের নানান বাদ্যযন্ত্র৷ অরণ্যদা সেতারটি হরিবাবুর হাতে দিয়ে বলল, আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না৷ অমিয়বাবু যেখানে বসেছিলেন সে জায়গাটা আমাদের একবার দেখান৷
আসুন৷
হরিবাবুর পিছু পিছু আমরা দোকানের পিছনদিকে গেলাম৷ সেখানে একটি ঘর রয়েছে৷ এটাও বেশি বড়ো নয়৷ উঁচু ছাদ থেকে টিমটিমে একটা বাল্ব ঝুলছে৷ ঝুলকালি মাখা ধূসর দেওয়াল৷ ঘরে আসবাব বলতে পাল্লা ভাঙা একটা কাঠের আলমারি আর দুটো স্টুল৷ কিছু কাঠকুটো এবং বাদ্যযন্ত্রের ভাঙা অংশ এককোণে জড়ো করা রয়েছে৷
অরণ্যদা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল৷ তারপর এটা ওটা সরিয়ে সরিয়ে দেখতে লাগল৷ কী দেখেছে ওই জানে৷
হরিবাবু আধঘণ্টার মধ্যে জোড়ের আঠা ছাড়িয়ে সেতারটির ‘কদু’ থেকে লম্বা ‘নেক’ অংশটি আলাদা করে ফেললেন৷
অরণ্যদা কদুর খোলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কিছু একটা পরীক্ষা করে হরিবাবুর উদ্দেশে বলল, একটা বাটালি হবে?
হরিবাবু একটা বাটালি এনে দিলেন৷
অরণ্যদা সেটা দিয়ে খুঁচিয়ে ভিতর থেকে বার করে আনল যে জিনিসটা সেটাকে অনেকটা মোবাইলের পাওয়ার ব্যাঙ্কের মত দেখতে৷ জিনিসটা দেখে হরিবাবুর মুখ হাঁ হয়ে গেছে৷
ড. সরকার প্রচণ্ড বিস্মিত স্বরে বললেন, ওটা কী?
অরণ্যদা রহস্যময় একটা হাসি হেসে বলল, শব্দভেদী বাণ৷ চলুন এবার আসল কাজ৷
হরিবাবুর দোকান থেকে বেরিয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম৷ ড. সরকারও আমাদের গাড়িতে উঠলেন৷ চালকের আসনে অরণ্যদা৷ গাড়ি ছুটলো দক্ষিণমুখো৷
বালিগঞ্জ ফাঁড়ি টপকানোর পর খেয়াল করলাম কলকাতা পুলিশের একটা গাড়ি আমাদের পিছু নিয়েছে৷ তার মানে অরণ্যদা এর মধ্যেই সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছে৷
সাদার্ন অ্যাভিনিউ থেকে ডানদিকে নিয়ে আমাদের গাড়ি লেক টেরেস রোডে ঢুকলো৷ খানিকটা এগোনোর পর একটা পার্কের সামনে অরণ্যদা গাড়ি দাঁড় করালো৷ আগে থেকেই সেখানে একটা পুলিশের গাড়ি অপেক্ষা করছিল৷
পিছনের গাড়িটা থেকে নামলেন কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার মি. সব্যসাচী বাগচী৷ ভদ্রলোক অরণ্যদার সহপাঠী এবং অভিন্নহৃদয় বন্ধু৷
স্থানীয় থানার ওসি এসে মি. বাগচীকে স্যালুট ঠুকে বললেন, ফোর্স রেডি স্যার৷
অরণ্যদা জিজ্ঞেস করল, বাড়িটা আইডেন্টিফাই করা গেছে তো?
ওসি বললেন, হ্যাঁ স্যর৷ অলরেডি দু-জন পিসি পার্টিকে বাড়ির সামনে ডিপ্লয় করে দিয়েছি৷
গুড, গাড়িটা?
বাড়ির গ্যারাজেই আছে, স্যর৷
তাহলে এগোনো যাক৷
ওকে, স্যর৷
পার্ক থেকে দুশো-গজ দূরে একটা লাল রঙের দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা৷ ভরদুপুরে পাড়ার মধ্যে পুলিশ দেখে অনেকেই আড়চোখে তাকাচ্ছে৷
বাড়ির সামনে ছোটো একটা বাগান রয়েছে৷ বেশ সুন্দর, সাজানো-গোছানো৷ বাড়ির মালিকের যে রুচি এবং ট্যাঁকের জোর দুটোই রয়েছে, বাড়ির চেহারা দেখলেই তা বোঝা যায়৷
সদর দরজায় পিতলের নাম ফলকে লেখা ‘এ পি মুখার্জি’৷
মি. বাগচী কলিংবেলে চাপ দিলেন৷ একবার, দু-বার৷
দরজা খুলল যে সে সম্ভবত বাড়ির কাজের লোক৷
লোকটাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মি. বাগচী হুড়মুড়িয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লেন৷ পিছন পিছন আমরা৷ তারপর কড়া গলায় বললেন, মি. মুখার্জি কোথায়?
হঠাৎ পুলিশ দেখে লোকটা ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিল৷ সে কাঁপা কাঁপা হাতে উপরের দিকে দেখিয়ে বলল, ড্রইংরুমে৷
চলো৷
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে কানে এল দোতলায় বাজছে বিদেশী যন্ত্রসঙ্গীত৷
ড্রইংরুমে ঢুকে সোফায় বসা মানুষটাকে দেখে তো আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড়৷ ড. সরকারও মনে হয় চমকের শেষ সীমায়৷
স্বয়ং অমিয়প্রসাদ!
শরীরটা সোফায় এলানো৷ পা-দুটো সামনের টেবিলে তোলা৷ হাতে মদের গ্লাস৷
কে আপনারা? ইংরাজিতে কুৎসিত একটা গালাগালি দিয়ে গর্জে উঠলেন ভদ্রলোক৷ আমার বাড়িতে পুলিশ কেন?
গলার আওয়াজে বুঝলাম ইতিমধ্যেই বেশ কয়েক পেগ চেপে গেছে৷ টেবিলের উপর একটা স্কচের বোতল আর আইস বক্স৷
অরণ্যদা টেবিলের উপর থেকে রিমোটটা নিয়ে মিউজিক সিস্টেমটা অফ করে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, সেতারী অমিয়প্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে খুনের অভিযোগে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে৷
লোকটা চোখের নিমেষে হাতের গ্লাসটা অরণ্যদার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে৷ বাস্টার্ড! কে সে? আমি ও নামে কাউকে চিনি না!
অরণ্যদা মুহূর্তের মধ্যে শরীর একদিকে বাঁকিয়ে গ্লাসটা এড়ালো৷ দেওয়ালে আছড়ে পড়ে ঝনাৎ শব্দে ভাঙল সেটা! টুকরো টুকরো কাচ ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে৷
একজন ষণ্ডামার্কা কনস্টেবল সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে লোকটার হাত দুটো চেপে ধরেছে৷
নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে লোকটা পৃথিবীর তাবৎ গালিগালাজ ওগড়াতে লাগল৷
এদিকে ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে উৎকৃষ্ট স্কচের মন মাতানো সুবাস৷
অরণ্যদা বলল, আপনার ছক যে কেউ ধরে ফেলতে পারে এ মনে হয় আপনি স্বপ্নেও ভাবেননি, তাই না মি. মুখার্জি? তাই এত আস্ফালন৷
অরণ্যদার ইঙ্গিতে মি. বাগচী পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে অরণ্যদার হাতে দিলেন৷
অরণ্যদা সেটা মি. মুখার্জির নাকের ডগায় নাচিয়ে বলল, সার্চ ওয়ারেন্ট৷ আপনার বাড়ি সার্চ করা হবে৷ দয়া করে সহযোগিতা করুন৷
পুলিশের নাগপাশের মধ্যে লোকটা ফুঁসেই চলেছে৷ যেন চোখের দৃষ্টিতেই আমাদের ভস্ম করে দেবে৷
সার্চ শুরু হল৷ অরণ্যদার নির্দেশমতো প্রতিটা আনাচ-কানাচ, আলমারি, ক্যাবিনেট, ড্রয়ার তন্ন তন্ন করে দেখা হচ্ছে৷
দোতলার মাস্টার বেডরুমের একটি ক্যাবিনেট থেকে বেরল মি. মুখার্জির শিক্ষা এবং চাকরিজীবনের নথিপত্র৷ দেশের এক বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রাক্তনী মি. মুখার্জির চাকরিজীবন কেটেছে স্বনামধন্য সব বহুজাতিকে৷ কোথাও ইলেকট্রনিক্স ডিভিশনের আর অ্যান্ড ডি চিফ, কোথাও ইনোভেশন ইনকিউবেশন সেন্টরের ডাইরেক্টর; বহু গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছে লোকটা৷ একেবারে চোখ ধাঁধানো ক্যারিয়ার৷ বর্তমানে সুইডিশ টেলিকম জায়ান্ট সান টেকনোলোজিস-এর ডাইরেক্টর বোর্ডের টেকনিক্যাল মেম্বার৷
বাড়ির লাইব্রেরিটিও ইলেকট্রনিক্স এবং টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অজস্র বই এবং জার্নালে ঠাসা৷
বাড়ির নীচতলায় সার্চ করতে করতে পিছনের দিকের একটা ঘরের দরজা খুলেই আমরা থমকে গেলাম৷ একটা ছোটোখাটো ওয়ার্কশপ৷ দেওয়ালের তাকে সাজানো রয়েছে নানান ইলেকট্রনিক সামগ্রী, নাম না জানা অজস্র গ্যাজেট৷
অরণ্যদা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরটা দেখতে শুরু করল৷ এদিক-ওদিক হাতড়াতে হাতড়াতে হঠাৎ একটা ড্রয়ারের ভিতর থেকে বার করে আনল সম্পূর্ণ অযাচিত একটি বস্তু; অমিয়প্রসাদের বাজনার একটা সিডি!
অরণ্যদার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি৷ এটা এখানে কীসের প্রয়োজনে মি. মুখার্জি?
দ্যাট ইজ নান অব ইওর বিজনেস৷ সন অব আ বিচ৷
মুখ সামলে মি. মুখার্জি! গর্জে উঠল অরণ্যদা৷ নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবেন তাই না? জানবেন বাবারও বাবা আছে৷ এমন ঘৃণ্য কাজটা করলেন কেন?
আমি কিছু করিনি! চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল লোকটা৷
আপনি এখনো অমিয়প্রসাদ মুখার্জিকে খুনের কথা অস্বীকার করছেন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, করছি!
তাহলে এই সিডিটা?
মি. মুখার্জি মুখ বাঁকিয়ে বিকৃত স্বরে বললেন, ওটা থেকে কিছুই প্রমাণ হয় না মি. সুপারকপ!
অরণ্যদা ঠাণ্ডা গলায় বলল, আপনার অবগতির জন্য জানাই, আমি ‘কপ’ নই৷ সাংবাদিক৷ তারপর জিন্সের পকেট থেকে সেই গ্যাজেটটা বার করে মি. মুখার্জির সামনে ধরে বলল, এটা চিনতে পারছেন মি. মুখার্জি?
পুলিশ-সাংবাদিক ধন্দে মি. মুখার্জি মনে হয় একটু ঘেঁটে গিয়েছিলেন৷ গ্যাজেটটা দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে সেই বিকৃত সুরে বললেন, ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, চিনতে পারছি না! জাস্ট গেট লস্ট!
চিনতে অসুবিধে হচ্ছে, তাই তো! তাহলে এটা নিশ্চই চিনতে পারবেন৷ অরণ্যদা মোবাইলে একটা ভিডিও চালিয়ে মি. মুখার্জির সামনে ধরল৷
ভিডিওটা কোনো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ৷ রাতের দৃশ্য৷ সময় দেখাচ্ছে সাতটা বেজে তিন মিনিট৷ তারিখ, এ মাসের পনেরো, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার৷ একটা সেডান এসে ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়াল৷ ড্রাইভারের সিট থেকে যিনি নেমে এলেন তিন হয় ইনি নয় অমিয়প্রসাদ৷ লোকটা গাড়িটা ছেড়ে এগোতেই ক্যামেরার বাইরে চলে গেল৷ গাড়ির পিছন দিকে স্ট্রিট লাইট এসে পড়ায় নাম্বার প্লেটটা স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে৷
গাড়িটা নিশ্চই চিনতে পারছেন মি. মুখার্জি? শ্লেষ মেশানো গলায় প্রশ্ন করল অরণ্যদা৷
মি. মুখার্জি উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, এই ছবি থেকে কিছুই প্রমাণ হয় না৷ মি. মুখার্জির গলায় ঝাঁঝটা হঠাৎ করে খানিকটা কমে গেল যেন৷
হয়, হয়৷ মুচকি হেসে বলল অরণ্যদা৷ পরের ভিডিওটা দেখলেই বুঝবেন৷
অরণ্যদা আরেকটা ভিডিও চালাল৷ গাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে হরিবাবু এবং লোকটা কথা বলছে৷ মিনিট খানেক কথা বলার পর হরিবাবুর সঙ্গে করমর্দন করে লোকটা গাড়িতে উঠে চলে গেল৷
অরণ্যদা বলল, নিজেকে যদি চিনতে অসুবিধা হয় তাহলে অন্তত গাড়িটা চেনার চেষ্টা করুন মি. মুখার্জি৷ কারণ ওটা এখন দাঁড়িয়ে রয়েছে আপনারই বাড়ির গ্যারাজে৷
মি. মুখার্জি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন৷ চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে৷ এ সি-র মধ্যেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম৷
অরণ্যদা বলল, আপনার উদ্ভাবনী ক্ষমতার কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয় মি. মুখার্জি৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় সেটা প্রয়োগ করলেন নিজেরই দাদাকে খুন করতে৷
অনলপ্রসাদ! চরম বিস্মিত কণ্ঠস্বরে বললেন ড. সরকার৷
ইয়েস ড. সরকার, ইনি অনলপ্রসাদ মুখার্জি৷ অমিয়প্রসাদ মুখার্জির ছোটো ভাই৷
ড. সরকার একটি চেয়ারে বসে পড়েছেন৷
অরণ্যদা তাঁর উদ্দেশে বলল, অমিয়প্রসাদের যে একজন যমজ ভাই রয়েছেন সে কথা আপনার জানা ছিল?
হ্যাঁ৷ চোখ বন্ধ করে মাথাটা উপর-নীচ করলেন ড. সরকার৷ মানে, বাবার মুখে দু-একবার শুনেছিলাম৷ কিন্তু তাঁকে তো কোনোদিনই চোখে দেখিনি৷
আপনার কাকুর মুখে তাঁর কথা কখনও শোনেননি?
না, কোনোদিনই শুনিনি৷
এর কারণ?
বলতে পারব না৷ কিন্তু ছোটোজন যে কোথায় আছেন, কী করছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কিনা সেটাই আমাদের জানা ছিল না৷ কিশোর বয়েসেই উনি বাড়ি ছাড়া হন৷ ওনাদের বাবা ওনাকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন৷
কেন?
দুই ভাইই বাবার কাছে সেতারের তালিম নিতেন৷ অমিয়প্রসাদ ছিলেন ধীরস্থির, বাবার বাধ্য৷ ছোটোজন ঠিক তার বিপরীত, উদ্ধত এবং কটূভাষী৷
মি. বাগচী বললেন, তার নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি!
একদিন রেওয়াজের সময় বাবার সঙ্গে কিছু একটা নিয়ে মতান্তর হওয়ায় অনলপ্রসাদ মাথা গরম করে সেতারে লাথি মারেন৷ সেই দেখে রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে অজিতপ্রসাদ পিটিয়ে ছেলেকে বাড়ি ছাড়া করেন৷ সেই থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি৷
মি. মুখার্জির তীব্র দৃষ্টি যেন ড. সরকারকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে! তিনি বিশ্রী একটা অঙ্গভঙ্গি করে বিকৃত গলায় বললেন, আপনি কে মশাই এসব ঢপের গপ্প শোনাচ্ছেন?
অরণ্যদা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়ে বলল, তাহলে ‘আসল’ গল্পটা আপনার মুখ থেকেই শুনি না!
শুনবেন? চিৎকার করে ওঠেন মি. মুখার্জি৷ তাহলে শুনুন৷ বড়ো ছেলের প্রতি বাপের একচোখোমিই ছিল সব সমস্যার মূলে৷ কিন্তু সেসব প্যাচাল পেড়ে এখন আর কী লাভ! কথাগুলো বলে জোরে জোরে শ্বাস নেন মি. মুখার্জি৷
অরণ্যদা এবার সহানুভূতির সুরে বলল, বলুন না আমরা শুনতে চাই৷
মি. মুখার্জি সে কথায় পাত্তা না দিয়ে মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে রইলেন৷
অরণ্যদা আবার বলল, আমরা শুনতে চাইছি মি. মুখার্জি৷
শুনে কী করবেন? খেঁকিয়ে উঠলেন মি. মুখার্জি৷ সেই অন্যায়ের বিহিত করবেন?
সে ক্ষমতা আমাদের নেই মি. মুখার্জি৷ কিন্তু আপনি যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগটি আনছেন তিনি একজন ঋষিপ্রতিম মানুষ৷ শিল্পী হিসাবে সারা পৃথিবীর সঙ্গীতপ্রেমীরা তাঁকে শ্রদ্ধা করে৷
অরণ্যদার কৌশল কাজ করল৷
মি. মুখার্জি চিড়বিড়িয়ে উঠে বললেন, ঋষিপ্রতিম তো ধুয়ে জল খান না! ...ঋষি ...ঋষি... হুঁঃ! লোকটা একটা বাচ্চাছেলের জীবন কীভাবে বিষিয়ে দিয়েছিল সেটা জানেন? কথায় কথায় অপমান, আমার দ্বারা নাকি সেতার হবে না! যা হবে ওনার বড়োছেলের হবে৷ আবার বড়ো মানে কী, কয়েকমিনিটের বড়ো! তাতেই তার জন্য দুধভাত আর অন্যজনের জন্য লাথি-ঝ্যাঁটা!
আপনার মধ্যে হয়তো তিনি সে প্রতিভা দেখেননি, বলল অরণ্যদা৷
একচোখো হলে দেখবেন কী করে! হোমোজাইগাস টুইনের একজন হবেন প্রতিভাধর আর আরেকজন হবেন অসার মাল, এ কখনও হয়?
আপনার প্রশ্নের উত্তর একমাত্র কোনো বায়োলজিস্টই দিতে পারবেন৷ কিন্তু আপনার বাবা যে আপনাকে সেতার শেখাতেন না এ কথা তো বলতে পারবেন না৷ আপনিও তো বাবার কাছে তালিম নিতেন শুনলাম৷
হ্যাঁ, তালিম! আমার কোনোকিছুই ওনার পছন্দ হত না৷ যা বাজাতাম তাতেই দু-চ্ছাই! আর বড়োছেলের বাজনা শুনে, ওহ সে কী আহ্লাদ! বড়োছেলেই নাকি ওনার মান রাখবেন!
সে তো রেখেইছেন৷
রেখেইছেন! কিন্তু কীসের বিনিময়ে? ফুঁসে উঠলেন মি. মুখার্জি৷ এই আমার, আমার ক্যারিয়ারের বিনিময়ে!
সেটা কীভাবে মি. মুখার্জি?
ওর স্ট্র্যাটেজিই ছিল আমাকে উঠতে না দেওয়া৷ বাপের ঘরানায় একমাত্র উত্তরসুরি হিসেবে একবার নিজেকে তুলে ধরতে পারলে প্রতিষ্ঠা পাওয়া তো সময়ের অপেক্ষা মাত্র৷ সে কারণে আমার প্রতি চরম অবিচার হচ্ছে দেখেও স্বার্থপরের মতো উদাসীন থেকেছে৷
আপনি সেতারে লাথি মেরেছিলেন এ কথা কি সত্যি?
একদম বাজে কথা! মিথ্যে রটনা! একটা বাচ্চাছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়ানোটা জাস্টিফাই করতে ওই গল্পটা বাজারে ছাড়া হয়েছিল৷
কে ছেড়েছিল?
আপনাদের সেই ‘ঋষিপ্রতিম’-ই হবেন!
আসল ঘটনাটা কী ঘটেছিল?
উত্তেজনার কারণে মি. মুখার্জির গলা শুকিয়ে গিয়েছিল মনে হয়৷ তিনি জল চাইতে একজন কনস্টেবল টেবিলের উপরে রাখা জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিল৷
জলপান করে হাতের তালুতে মুখ মুছে মি. মুখার্জি বললেন, একদিন ঘরে বসে আপন মনে বাজাচ্ছি৷ হঠাৎ রাগে গনগন করতে করতে দরাম করে দরজা ঠেলে উনি ঢুকলেন! প্রায় দৌড়ে এসে সজোরে আমার গালে এক থাপ্পড় মেরে বললেন, এটা রেওয়াজ হচ্ছে, বেসুরো বলদ কোথাকার! ওই হাতে হালই মানাবে, সেতার নয়৷ এ ধরনের ঘটনায় আমি অভ্যস্তই ছিলাম৷ কিন্তু সেদিন দেখলাম ত্যানার পিছু পিছু ত্যানার বড়োপুত্তুরও এসে হাজির হয়েছেন৷ পেছনে দাঁড়িয়ে তিনি মিটিমিটি হাসছেন৷ আমি রাগের চোটে সেতারটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম৷ কিন্তু তার আগেই আবার পিটুনি শুরু৷ ঘাড় ঠেসে ধরে পিঠের উপর দুমদাম কিল৷ আমাকে পেটাতে পেটাতেই বড়োপুত্তুরকে একটা খেজুরের ডাল নিয়ে আসার অর্ডার দিলেন৷ বড়োপুত্তুরও একমুহূর্ত বিলম্ব না করে লাফাতে লাফাতে গিয়ে সেটা জোগাড় করে নিয়ে এলেন৷ তারপর সেটা দিয়ে শুরু হল মার! কোনোদিনও খেয়েছেন খেজুর ছড়ির মার? তাহলে বুঝতেন কী যন্ত্রণা৷ সারা গা হাত পা কেটে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছিল!
অরণ্যদা বলল, আপনাদের মা কী করছিলেন? তিনি বাধা দেননি?
হুঁঃ! তিনি তো আঁতুড়ঘরেই ফৌত হয়েছিলেন৷ সেটাও নাকি আমার দোষ! আমার জন্মের পরেই নাকি ব্লিডিং শুরু হয়৷ তাই সব দোষের ভাগী আমাকেই হতে হয়েছে৷
ওহ, আ অ্যাম সরি৷ ...এই কারণেই কী আপনার বাবা আপনার প্রতি বিমুখ ছিলেন?
তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে মি. মুখার্জি বললেন, জানি না৷ ভিকটিমের কাছে সেটা ইররেলিভ্যান্ট৷
কিন্তু আজ এত বছর পরে আপনি এমন একটা কাণ্ড ঘটালেন কেন?
মি. মুখার্জি ভাঙবেন তবু মচকাবেন না৷ চিৎকার করে বললেন, বললাম তো আমি কিছু জানি না৷ জাস্ট গেট লস্ট৷
সিসি ক্যামেরার ফুটেজও কি মিথ্যে বলছে মি. মুখার্জি?
ওটা জাল! আমি বলছি ওটা জাল!
সেটা কোর্টেই প্রমাণ হবে৷ কিন্তু অমিয়প্রসাদের মতো একজন শিল্পীকে খুন করার আগে দু-বার ভাবলেন না? আপনার নিজেরই তো দাদা৷
আমি কোনো সম্পর্ক স্বীকার করি না৷ আই অ্যাম আ সেলফ-মেড ম্যান৷
সেটা তো দেখলামই৷ আপনার সমস্ত সার্টিফিকেটে বাবার নামের জায়গায় লেখা ‘লেট প্রসাদ মুখার্জি’৷
হ্যাঁ৷ আমি নিজের বাবাকে নিজেই মৃত ঘোষণা করেছি৷ পিতৃপরিচয় মুছে দেওয়ার জন্য নামটাও ছেঁটে দিয়েছি৷ আর ওই মিটমিটে ছকবাজ শয়তানটাকে তো আমি মানুষ বলেই গণ্য করি না৷ ও আরও দগ্ধে দগ্ধে মরলে আমার প্রাণের জ্বালা জুড়তো৷
কম যন্ত্রণা তো ওঁকে দেননি মি. মুখার্জি৷
আবার এক কথা? গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন মি. মুখার্জি৷ বললাম তো আমি কিছু জানি না৷
সেটা আমি এক্ষুনি প্রমাণ করে দিচ্ছি৷
অরণ্যদা নিজের মোবাইলে অমিয়প্রসাদের সুরদাসী মল্লার চালিয়ে সেটাকে ঝালা অংশে টেনে দিল৷ সঙ্গে সঙ্গে সবার মোবাইল গোঁ গোঁ শব্দ করে উঠল৷
অরণ্যদা বাজনাটা বন্ধ করে দিল৷ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গোঁ গোঁ শব্দও বন্ধ হল৷
অরণ্যদা গ্যাজটটা তুলে ধরে বলল, আমার হাতে আপনারা যে যন্ত্রটি দেখছেন, এটার নাম দেওয়া যেতে পারে ম্যাগনেটিক ফিল্ড জেনারেটর! এটা এমনভাবে প্রোগ্রামিং করা যে একটি বিশেষ সুরের ধাক্কায় এটি সক্রিয় হয়ে ওঠে৷ সেটা কোন সুর, এতক্ষণে নিশ্চই তা আপনাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে৷ এরকম একখানা যন্ত্র বানানো যে যার তার কম্ম নয় সেটাও নিশ্চই বুঝতে পারছেন৷
অরণ্যদা দু-কদম এগিয়ে মি. মুখার্জির সোজাসুজি দাঁড়াল৷ তারপর ডানহাতের তর্জনী তাঁর বুকের উপর ঠেকিয়ে বলল, এইখানে যে প্রতিশোধের আগুন আপনি জ্বালিয়ে রেখেছিলেন তারই তাড়নায় আপনি নিজের দাদার প্রতিটা গতিবিধির উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন৷ ঠিক ধূর্ত শ্বাপদের মতো৷ ওনার বুকে যে পেসমেকার বসানো হয়েছে এই সামান্য তথ্যও আপনার নজর এড়ায়নি৷ কিন্তু আপনার দাদার সৌভাগ্যই বলতে হবে যে তিনি এতদিন আপনার ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন৷ কিন্তু ওনার কলকাতায় পদার্পণ এবং সেতার ভাঙার ঘটনা অযাচিতভাবে আপনার সামনে একটা সুযোগ এনে দেয়৷
অরণ্যদা আমাদের দিকে ফিরে বলল, সেতার ভাঙার ব্যাপারটা ঘটনার দিনই মিডিয়ায় আসে এবং আমার অনুমান তার আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে মি. মুখার্জি এই গ্যাজেটটা ডেভলপ করে ফেলেন৷ অমিয়প্রসাদ সম্বন্ধে এনার হোমওয়ার্ক এতটাই ডিটেল ছিল যে ওনার পছন্দ অপছন্দের সমস্ত খুঁটিনাটি এনার নখদর্পণে ছিল৷ শ্রাবণমাসের সন্ধ্যায়, পাঁচ বছর পরে, নিজের মাটিতে বাজাতে বসে অমিয়প্রসাদ যে সুরদাসী মল্লারের টান এড়াতে পারবেন না এ বিষয়ে ইনি দুশোভাগ নিশ্চিত ছিলেন৷ ...ড. সরকার, আপনিই বলেছিলেন অমিয়প্রসাদ সুরদাসী মল্লারের ঝালা অংশ বাজাতেন নিজের সিগনেচার স্টাইলে৷ ধুরন্ধর মস্তিষ্ক মি. মুখার্জিও ঠিক ওই পয়েন্টটিকেই হাতিয়ার করেন৷ এই গ্যাজেটটা উনি এমনভাবে প্রোগ্রামিং করেন যে এটা কেবলমাত্র অমিয়প্রসাদের বাজানো ঝালা অংশের ফ্রিকোয়েন্সি কম্বিনেশনেই সক্রিয় হয়ে ওঠে৷ এক কথায় বলা যায় এটি একটি শব্দভেদী বাণ! এটা সক্রিয় হয়ে উঠলে যে ম্যাগনেটিক ফিল্ড সৃষ্টি হয় সেটা কালও দেখেছেন, এখনো দেখলেন৷ ম্যাগনেটিক ফিল্ডের ধাক্কায় মোবাইলগুলো গোঁ গোঁ শুরু করল৷ এর আগে অন্ততপক্ষে তিনবার গ্যাজেটটা সক্রিয় হয়েছে৷ প্রথমবার অমিয়প্রসাদ যখন মঞ্চে সুরদাসী মল্লার বাজাচ্ছেন তখন৷ তার ফলে যে ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হয় তাতে অমিয়প্রসাদের বুকে বসানো পেসমেকার অকেজো হয়ে যায়! মেডিক্যাল লিটারেচার অনুযায়ী এ ধরনের রোগীর বুকের কাছে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের বেশি মেটাল ডিটেকটর ধরা মানা৷ কারণ, হ্যান্ড হেল্ড মেটাল ডিটেকটর যে ম্যাগনেটিক ফিল্ড সৃষ্টি করে তাতেই পেসমেকার অকেজো হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা৷ এই কারণেই এই রোগীদের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চৌম্বকক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে এমন যন্ত্রপাতি, যেমন ধরুন এমআরআই মেশিন, এগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়৷ মি. মুখার্জি খুব স্ট্র্যাটেজিক্যালি এটি সেতারের খোলের মধ্যে বসিয়ে দিয়ে আসেন৷ বাজানোর সময় খোলটি ঠিক শিল্পীর বুকের কাছে থাকে৷ অর্থাৎ, পেসমেকারের উপর যন্ত্রের এফেক্ট ম্যাক্সিমাম! সে সময় মাইকে যে নয়েজ হয়েছিল তার কারণও ছিল এই ম্যাগনেটিক ফিল্ড৷
ড. সরকার প্রশ্ন করলেন, হরিবাবু কী ব্যাপারটা খেয়াল করেননি?
না, করেননি৷ করলে অবশ্যই আমাদের বলতেন৷ খোলের ভিতরের দিকে উপরের অংশে আঠা দিয়ে এমনভাবে এটা লাগানো ছিল যে কারোরই চোখে পড়ার কথা নয়৷ এটা লাগানোর পর আঠা শুকোনোর জন্য আপনাকে আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল, তাই না মি. মুখার্জি? মি. মুখার্জির উদ্দেশে প্রশ্ন করল অরণ্যদার৷
মি. মুখার্জি থম মেরেই রইলেন৷ জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন বলে মনে হল না৷
অরণ্যদা গ্যাজেটটা ড. সরকারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, দেখুন, এটার গায়ে এখনো আঠার দাগ রয়েছে৷
ড. সরকার জিনিসটা হাতে নিয়ে দেখে আবার অরণ্যদার হাতে ফেরত দিলেন৷
অরণ্যদা বলল, দ্বিতীয়বার এটা সক্রিয় হয় গতকাল সন্ধ্যায়৷ নিশ্চই মনে আছে, স্মরণসভা শুরুর আগে হঠাৎ করেই মাইকে নয়েজ শুরু হয়? সে সময় অডিটোরিয়ামের মিউজিক সিস্টেমে অমিয়প্রসাদের সুরদাসী মল্লারই বাজছিল৷ কিন্তু এর পরেও ব্যাপারটা আমাকে স্ট্রাইক করেনি৷ সামান্য এরকম একটা ঘটনাকে ক্লু করে খুনের এমন অভিনব ছক আবিষ্কার, অন্তত আমার ক্ষমতার বাইরে৷
মি. বাগচী হেসে বললেন, ক্রিমিনোলজিতে আমার যতটুকু জ্ঞান তাতে মনে হয় দিস কেশ ইজ ইউনিক৷ ফার্স্ট অফ ইটস কাইন্ড ইন দ্য হিউম্যান হিস্ট্রি!
অরণ্যদা মি. বাগচীর কথায় সায় দিয়ে বলল, স্মরণসভায় হরিবাবুর কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমি উইকিপিডিয়ায় ‘অজিতপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়’ সার্চ করি৷ সেখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে যে অজিতপ্রসাদের দুই সন্তান, অমিয়প্রসাদ ও অনলপ্রসাদ৷ টেক্সটে ‘অমিয়প্রসাদ’ লিঙ্কটা অ্যাক্টিভ হলেও ‘অনলপ্রসাদ’ ইনঅ্যাক্টিভ৷
এরপর অরণ্যদা ড. সরকারের উদ্দেশে বলল, আপনাদের পারিবারিক অ্যালবামে যে গ্রুপ ছবিটা রয়েছে তাতে মাঝামাঝি জায়গায় আপনার বাবা এবং অমিয়প্রসাদ দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ লক্ষ্য করে দেখবেন, একেবারে ডানপাশে যে কিশোরটি দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে অমিয়প্রসাদের চেহারার হুবহু মিল রয়েছে৷ ছবিতে দুই ভাইয়ের যা দূরত্ব তা থেকেই অনুমান করা যায় যে সেই বয়সেই দু-জনের মধ্যে সম্পর্ক যথেষ্ট তিক্ত ছিল৷ মনে রাখতে হবে সেটা মোবাইল ক্যামেরার যুগ নয়৷ তখন ফটো তোলা ছিল একটা ইভেন্ট৷
অরণ্যদার কথায় ড. সরকার যেন গাছ থেকে পড়লেন৷ এর আগে আমি অন্তত দুশোবার ছবিটা দেখেছি কিন্তু কখনোই এ ব্যাপারটা আমার চোখে পড়েনি!
সেটা হতে পারে৷ এর জন্য দায়ী অটোসাজেশন৷ অনলপ্রসাদের অস্তিত্বই যেহেতু পৃথিবী থেকে মুছে গিয়েছিল সেহেতু গ্রুপ ছবিতে তার উপস্থিতি চোখে না পড়ারই কথা৷ বিশেষ করে তাদের, যারা তাকে কোনোদিনই চোখে দেখেনি! ... অনলপ্রসাদ নামটা ভেসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁকে খুঁজে বার করার জন্য সহজতম পদ্ধতিটা ব্যবহার করি, সেটা হল সোশ্যাল মিডিয়া৷ কিন্তু ‘আমাদের বন্ধু’ ওনার পারিবারিক প্রথাকে অমান্য করে ‘অনলপ্রসাদ’ না লিখে লেখেন ‘অনল প্রসাদ’৷ সমাসবদ্ধ পদকে ভেঙে লেখার এই ভুল অথচ ফ্যাশনেবল কায়দা শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে প্রায় সমস্ত বাঙালিই করেন৷ এই কারণে ওনাকে খুঁজে পেতে আমার অতিরিক্ত কয়েক মিনিট সময় ব্যয় হয়৷ সুবিধের মধ্যে এই ছিল যে ‘অনল প্রসাদ মুখার্জি’ নামে আর কোনো প্রোফাইল নেই৷ প্রোফাইলটা দেখার পরই এরকম একটা গ্যাজেটের অস্তিত্বের কথা আমার মাথায় হঠাৎ করে এসে যায়৷ সান টেকনোলজিস-এর মতো কোম্পানির ডাইরেক্টর বোর্ডের টেকনিক্যাল মেম্বার৷ আবার ‘ইলেকট্রনিক এনথুসিয়াস্ট’ নামে একটা কমিউনিটির সদস্য৷ এই কমিউনিটির সদস্যদের উৎসাহ হল নতুন নতুন নানা অদ্ভূত ইলেকট্রনিক গ্যাজেট তৈরি করা৷ অমিয়প্রসাদের সুরদাসী মল্লার বাজলেই কেন মাইক ডিসটার্ব করে সে প্রশ্নও আমাকে বেশ খোঁচা মারছিল৷ স্মরণসভায় পণ্ডিত সত্যরঞ্জন মজুমদার যখন সুরদাসী মল্লার বাজালেন তখন মাইকে কোনো গণ্ডগোল হল না৷ দুটো ব্যাপার পাশাপাশি রাখলে একটা সিদ্ধান্তেই পৌঁছোনো যায়— গ্যাজেট সক্রিয় হওয়ার জন্য দায়ী অমিয়প্রসাদের ‘সিগনেচার স্টাইল’! এটা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি গতকাল অমিয়প্রসাদের সেতারটি নিয়ে এক্সপেরিমেন্টটা করি৷
ড. সরকারের মুখে প্রশংসার হাসি৷ বললেন, একটা প্রশ্ন, গ্যাজেটটা যে সেতারের মধ্যে ইমপ্লান্ট করা হয়েছে সেটা কীভাবে বুঝলেন?
অরণ্যদা বলল, কনসার্ট এবং স্মরণসভার মধ্যে একটি বস্তুই কমন ছিল, সেটা হল ওই সেতারটি৷ তার সঙ্গে হরিবাবুর স্মৃতিচারণ৷ মি. মুখার্জি হরিবাবুর সম্বন্ধেও যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়েছিলেন৷ দোকানে যে উনি ছাড়া আর কেউ থাকে না এ কথা মি. মুখার্জি জানতেন এবং সন্ধ্যের সময় ক্ষীণদৃষ্টি হরিবাবুর পক্ষে যে অনলপ্রসাদ এবং অমিয়প্রসাদকে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব, এ কথা অনুমান করেই উনি ওই সময়টা বেছে নেন৷ আবার কায়দা করে হরিবাবুকে বলে আসেন যে তাঁর দোকানে আসার কথা যেন কেউ না জানে৷ অমিয়প্রসাদ যেহেতু তখনো বিদেশে তাই মিডিয়ার কল্যাণে এমন কথা চাউর হলে লোকের মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে পারে৷
এরপর অরণ্যদা একটু যেন ব্যঙ্গ করেই মি. মুখার্জির উদ্দেশে বলল, আপনার দুর্ভাগ্য মি. মুখার্জি যে পাশের দোকানটির দরজায় লাগানো তুচ্ছ একটা সিসি ক্যামেরার কারণে আপনার দুর্ধর্ষ ছকটি একেবারে ভেস্তে গেল৷ আর কোর্টে পেশ করার জন্য আমরাও পেয়ে গেলাম একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ৷
মি. বাগচী বললেন, অরণ্যের কথামত পুলিশ আজ সকালে ওই ফুটেজ সংগ্রহ করে৷
অরণ্যদা আমার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হেসে বলল, কাল রাতে কাল রাতে আমরা ও পাড়ায় একটু হাওয়া খেতে গিয়েছিলাম৷
হঠাৎ দেখলাম অনলপ্রসাদ জোরে জোরে শ্বাস টানছেন৷ চোখের দৃষ্টিও কেমন যেন ঘোলাটে৷ কনস্টেবলটি ওনাকে সোফায় বসিয়ে দিল৷
অরণ্যদা জিজ্ঞেস করল, আপনার কী শরীর খারাপ লাগছে?
কিছু একটা বলতে গিয়েও অনলপ্রসাদ বলতে পারলেন না৷ মুখ হাঁ করে বাতাস টানার চেষ্টা করলেন৷ শরীরটা ব্যাকরেস্টের উপর এলিয়ে পড়ল৷ মনে হয় জ্ঞান হারালেন৷
অরণ্যদা মি. বাগচীর উদ্দেশে বলল, কুইক, হসপিটলে শিফট করতে হবে৷
দক্ষিণ কলকাতার এক অভিজাত হাসপাতালের ছ-তলা৷ আমরা আইসিসিইউ-এর সামনে অপেক্ষারত৷ মি. মুখার্জি অসুস্থবোধ করার বিশ মিনিটের মধ্যে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে৷ পুলিশের গাড়িতেই আনতে হল কারণ অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করার মতো অবস্থা ছিল না৷
পরিবার বলতে অনলপ্রসাদের কিছুই নেই৷ বিয়ে করেননি৷ বছরের বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে বাইরেই কাটে৷ ওনার কাজের লোকটিকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা হয়েছে৷ গত সাত বছর সে মি. মুখার্জির বাড়িতে কাজ করছে৷ বাড়ির দেখভাল, রান্নাবান্না সবই তার দায়িত্বে৷ লোকটির বয়ান অনুযায়ী মি. মুখার্জি নাকি কারোর সঙ্গেই তেমন মিশতেন না৷ কোনোদিনও কোনো বন্ধুবান্ধবকে সে বাড়িতে আসতে দেখেনি৷
মি. মুখার্জিকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আধঘণ্টার উপর৷ অবস্থা কেমন সে বিষয়ে এখনো কোনো ফিডব্যাক আসেনি৷ সেই যে জ্ঞান হারিয়েছেন হাসপাতালে আনা পর্যন্ত আর জ্ঞান ফেরেনি৷
আমি সময় কাটানোর জন্য ওয়েটিং লবিতে লাগানো রোগ-ভোগের পোস্টারগুলো পড়তে শুরু করলাম৷
অরণ্যদা এবং মি. বাগচী একপাশে দাঁড়িয়ে নীচুস্বরে কিছু আলোচনা করছে৷
ড. সরকার ফোনে ফোনে অফিস সারছেন৷
প্রায় একঘণ্টার মাথায় আইসিসিইউ-এর দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন কলকাতার প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. সৌমেন চন্দ৷ আমাদের দেখে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন ড. চন্দ৷ সরি৷
অনিবার্য নিস্তব্ধতার কয়েক মুহূর্ত অতিক্রম করে অরণ্যদা প্রশ্ন করল, কী হয়েছিল?
এটাকে বলে সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট৷ ইরাটিক অ্যান্ড ডিসঅর্গানাইজড ফায়ারিং অফ ইমপালস ফ্রম লোয়ার চেম্বার অফ দ্য হার্ট৷ অ্যারিদমিয়ার কারণে ব্রেনে ব্লাড ফ্লো ভীষণ কমে গিয়েছিল৷ যার ফলে পেশেন্ট আনকনসাস হয়ে যায়৷
হঠাৎ করে এটা কী করে...
হঠাৎ করেই ব্যাপারটা শুরু হতে পারে৷ ফিফটি পার্সেন্ট কেসে প্রায়র কোনো সিম্পটম থাকে না৷
ড. সরকার বিস্মিত গলায় বললেন, ওনার দাদারও ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিল!
ড. চন্দ বললেন, কার?
ওনার দাদার৷ সেতারী অমিয়প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যিনি কয়েকদিন আগে মারা গেলেন৷
এ কথায় অবাক হয়ে আমরা ড. সরকারের দিকে তাকালাম৷
ড. চন্দ বললেন, ও হ্যাঁ৷ আ ভেরি ড্রামাটিক ডিমাইস অফ আ সিতার মায়স্ত্রো৷ কিন্তু মিডিয়াতে তো অন্যরকম রিপোর্টিং হয়েছে৷
ড. সরকার বললেন, না না, সেটা দু-বছর আগের ঘটনা৷ আমেরিকায় ওনার বাড়িতে৷ তারপরেই ওনার বুকে পেসমেকার বসানো হয়৷
ও৷ কিন্তু ভাইয়ের ক্ষেত্রে তো আমরা সে সুযোগই পেলাম না৷
অরণ্যদা ড. চন্দের উদ্দেশে বলল, অমিয়প্রসাদ ও অনলপ্রসাদ হোমোজাইগাস টুইন ছিলেন৷ এমন অদ্ভূত সমাপতনের কারণ কী সেটা হতে পারে?
ড. চন্দ ক্ষীণভাবে হেসে বললেন, নো ওয়ান ক্যান রুল আউট দ্য জিন৷ ওকে? ড. চন্দ চলে গেলেন৷
আইসিসিইউ-এর শীতল নিঃস্তব্ধ অন্দরমহল৷ শুভ্র শয্যায় চিরনিদ্রায় শায়িত অনলপ্রসাদ৷ অসহায়৷ নিঃসঙ্গ৷ জানলার বাইরে দিকচক্রবাল ছুঁয়ে সন্ধ্যা নামছে৷ কলকাতার আকাশে শ্রাবণের মেঘমল্লার৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন