অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সত্যযুগের মানুষ যজ্ঞডুমুরের গাছের সমান লম্বা ছিল, ত্রেতাযুগের লঙ্কা গাছ, দ্বাপরে ভাণ্ডীর, আর কলিতে লজ্জাবতী। এরপর মানুষ ক্রমে এত ছোট হয়ে যাবে যে শেষে আঁকশি দিয়ে তবে তাদের বিলিতি-বেগুনের গাছ থেকে বেগুন পাড়তে হবে।
সেই ত্রেতাযুগের রামচন্দ্র অবতীর্ণ হলেন—রাক্ষস-বংশ ধ্বংস করতে অর্থাৎ যেখানে বাঁশবন ছিল সেখানে লঙ্কাচারা আর বোম্বাই-আম বসাতে; যাতে মানুষ বোশেখ-জোষ্টি মাসে আমকাসুন্দি, ঝালকাসুন্দি খেয়ে বাঁচতে পারে। বিশ্বাস না হয়, কাসুন্দে আর ঝালুন্দেকে প্রশ্ন কর।
এখন রামচন্দ্র জন্মালেন, কিন্তু লঙ্কার ধোঁয়া দিয়ে রাক্ষস তাড়ানো তো তাঁর কম্ম নয়। এক-লাফে সমুদ্রই পার হয় কে? আজেই হনুমান এই কিষ্কিন্ধ্যায়,—ওই যে মনসাতলার ঘাটে কাঁটাবন ওইখানে—জন্ম নিলেন। এদিকে হনুমানও জন্মেচেন আর ওদিকে রথে চড়ে সূর্যিমামা দেখা দিয়েছেন। মামার মুখটি যেন পাকা আমের মতো। দেখেই হনুমানের লোভ হয়েছে, এক লাফে মামার কোলে ঝাঁপিয়ে উঠেছেন। মামা—‘হনু! হনু!’ —বলে আদর করে যেমন ভাগ্নেকে চুমু খেতে গেছেন আর হনু দিয়েছেন মামার গালে এক কামড়! —‘ওরে গেলুম, গেলুম! ছাড়, ছাড়!’ —আর ছাড়!
এমন সময় ইন্দ্রদ্যুম্ন যাচ্ছিলেন আকাশ দিয়ে। মামা-ভাগ্নের ঝগড়া দেখে তিনি ছেড়ে দিয়েছেন বজ্জর। যেমন বাজ পড়া আর হনু ‘রাম! রাম!’ করতে-করতে ঠিকরে গিয়ে পড়েছেন ওই রামচণ্ডীতলায়; আর সূয্যিমামা রথশুদ্ধ পড়েছেন ওই চন্দ্রভাগার কাছে কালিদয়ে বালির পাঁকে। মামার রথের চুড়োটা মচাৎ করে ভেঙে পড়ল ঘোড়া কটা কন্দকাটা হয়ে বালির পাঁকে আটকা পড়ে গেল—মায় সহিস কোচম্যান লোকলস্কর দাসী চাকর! যে যেখানে ছিল সবাই আড়ষ্ট যেন পাথর!
সূয্যিমামা কালিদয়ে দইকাদা মেখে গড়াতে-গড়াতে ডাঙায় গিয়ে উঠলেন। ইন্দ্রদ্যুম্ন তাড়াতাড়ি ঐরাবত-হাতি নিয়ে মামাকে তুলতে যেমন এসেছেন অমনি গেল ঐরাবতও দয়ে পড়ে। কি করেন? তখন হনুমানকে ডাকাডাকি। হনুমান এসে দু-বগলে দুজনকে নিয়ে তবে স্বগ্গে পৌঁছে দেন। সেইদিন থেকে সূয্যিমামা আর রথে চড়ে বেড়াতে গেলেন না, পায়ে হেঁটেই আনাগোনা করেন। সিন্ধুঘোটকটা ভাগ্যি ছিল, তাই চড়ে ইন্দ্রদ্যুম্ন হাওয়া খেয়ে বেড়ান।
একদিন ইন্দ্রদ্যুম্ন ঘোড়ায় চড়ে এই সমুদ্দুরের ধারে হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছেন, এমন সময় সিন্ধুঘোটকের একটা পা গেছে বালিতে বসে। আর ঘোড়া নড়ে না। ইন্দ্রদ্যুম্ন ঘোড়ার পা ধরে টানাটানি করতে ঘোড়ার পা-টা গেল ছিঁড়ে। তিনি আর কি করেন, সেই খোঁড়া ঘোড়ায় ন্যাংচাতে-ন্যাংচাতে ছিষ্টিকত্তা ব্রহ্মার কাছে গিয়ে হাজির। গিয়েই ব্রহ্মাকে বলছেন, ‘আমার আর-একটা ঐরাবত-হাতি আর উঁচু ঘোড়া না হলে চলছে না। দেবতাদের রাজা হয়ে শেষে কি পায়ে হেঁটে বেড়াবো? আমার মান থাকে কেমন করে?’
ব্রহ্মা বললেন, ‘আমি বারে-বারে তোমাদের জন্যে ছিষ্টি করতে পারিনে, যাও নারদের ঢেঁকিটা চেয়ে নিয়ে চড়ে বেড়াও। হাতিঘোড়া পেয়ে যে যত্ন করে রাখতে পারে না তার ঢেঁকি চড়ে বেড়ানোই ঠিক।
ছিষ্টিকত্তার কাছে তাড়া খেয়ে ইন্দ্রদ্যুম্ন নারদের কাছে হাজির। নারদ বুদ্ধি দিলেন : ‘দেখ ইন্দ্রদ্যুম্ন, তুমি হলে রাজা, ঢেঁকি চড়া তোমার শোভা পাবে না, লোকে হাততালি দেবে, তার চেয়ে যাও তপস্যা করগে, ছিষ্টিকত্তা খুশি হয়ে তোমাকে দুটো কেন দশটা হাতিঘোড়া ছিষ্টি করে দেবেন।
ইন্দ্রদ্যুম্ন রাজার ছেলে, তপস্যার নাম শুনেই ভয়ে তাঁর মুখ শুকিয়ে গেল। তখন নারদ বুদ্ধি দিলেন, ‘যাও ইন্দ্রদ্যুম্ন! রামচন্দ্রের কাছ থেকে রাবণের পুষ্পক-রথটা চেয়ে নাও।’
ইন্দ্রদ্যুম্ন এসে রামচন্দ্রকে ধরে বসলেন। রাম বললেন, ‘রাবণের রথ কেড়ে নেওয়া তো সহজ নয়, তোমরা যদি আমার সঙ্গে যাও তো হতে পারে। কিন্তু রাবণ যদি চিনতে পারে যে দেবতা, তা হলে তোমার বিপদ।’

ইন্দ্রদ্যুম্ন বললেন, ‘আজ্ঞে, আমরা বাঁদর সেজে রাবণের সঙ্গে লড়ব।’
রামচন্দ্র বললেন, ‘তথাস্তু।’
তারপর রাম-রাবণের যুদ্ধ। হনুমান হলেন যত বাঁদরমুখো দেবতাদের সেনাপতি; আর আমি কিচ্কিন্দে হলুম—কিচ্কিন্দের দলে যত উড়ে, তাদের সেনাপতি। এই দুই দল নর-বানর—এদেরই কিত্তি কিত্তিবাসি রামায়ণে লেখা আছে। সে তো তুমিও জানো?
তারপর বলি শোন—রাবণের কাছ থেকে পুষ্পক-রথ তো কেড়ে নিয়ে রামচন্দ্র অযোধ্যায় এসেছেন, ইন্দ্রদ্যুম্ন রথটি নিয়ে যান আর কি, এমন সময় সূয্যিমামা এসে বলছেন, ‘বাপু রাম, ইন্দ্র বজ্জর ফেলে আমার রথটি গুঁড়ো করেছেন, এখন পুষ্পক-রথটি উনি নিলে আমি দু-বেলা আপিস করি কেমন করে! উনি রাজার ছেলে ঘরে বসে থাকলে চলে, কিন্তু সকাল-সন্ধে আমাকে যে এই সারা পৃথিবী ঘুরে আলো দিয়ে বেড়াতে হয়, আফিস-গাড়ি নইলে আমার চলবে কেন?’
হনুমান ছিলেন বসে রামের কাছে, তিনি অমনি বলছেন, ‘ইন্দ্র আমাকেও বজ্জর মেরে দফারফা করেছিল আরকি! কেবল রামনামের জোরে বেঁচে আছি!’
‘কী, রামদাসকে মারা! ইন্দ্রদ্যুম্ন, যাও রথ তোমায় দেব না!’ বলেই রাম সূয্যিমামাকে রথটা দিয়ে দিলেন।
ইন্দ্ৰ মুখ-চুন-করে ফিরে যান দেখে রামচন্দ্রের দয়া হল, তিনি হনুমানকে ডেকে বললেন, ‘হনু, তুমি ইন্দ্রদ্যুম্নকে নিয়ে সমুদ্রের ধারে যাও, যেখানে ইন্দ্রের সিন্ধুঘোটকের ছেঁড়া পা-খানি উদ্ধার করে গন্ধমাদন থেকে বিশল্যকরণীর পাতার আঠা দিয়ে ইন্দ্রদ্যুম্নের খোঁড়া ঘোড়া জোড়া দিয়ে দাওগে।’
তখন হনুমানকে নিয়ে সমুদ্দুরের ধারে ইন্দ্রদ্যুম্ন হাজির। সেখানে তখনো সিন্ধু-ঘোটকের ছেঁড়া পা-খানা বালির ওপরে লটপট করছিল—হনুমান সেই পা ধরে দিয়েছেন এক টান, আর অমনি বালির নিচ থেকে হড়হড় করে একটা মন্দির বেরিয়ে এল।
হনুমান তো ঘোড়ার পা-খানা ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে রেখে বিশল্যকরণীর পাতা আনতে যান, এদিকে ইন্দ্রদ্যুম্ন মাসির বাড়ি থেকে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে এনে সেই মন্দিরে পুজো লাগিয়ে দিয়েছেন। হনুমান এসে দেখেন মন্দির দখল। তখন হনু রেগেই লাল! বলে, ‘আমি বিশল্যকরণীর পাতা দেব না। আমার মন্দির, আমি রামচন্দ্রকে এখানে বসাব মনে ছিল। তুমি কেন জগন্নাথকে বসালে?’
বড় গোলযোগ দেখে ইন্দ্রদ্যুম্ন ব্রহ্মকে আনতে ছুটলেন। ব্রহ্মা এসে বললেন, ‘হনুমান, যিনি জগন্নাথ, তিনি রঘুনাথ। তুমি গোল কোরো না আমি সব ব্যবস্থা করছি।’
সেই দিন থেকে প্রতি বছর রামনবমীর দিন জগন্নাথের রঘুনাথ-বেশ করে পুজোর ব্যবস্থা হল।
ইন্দ্রদ্যুম্ন বললেন, ‘ছিষ্টিকত্তা, আমার ঠাকুরের কি বেশ হবে তার ব্যবস্থা করুন।’
ব্রহ্ম ব্যবস্থা করলেন—পাবন্ধি-বেশ।
ইন্দ্রদ্যুম্ন তো ঘোড়ায় চড়ে স্বগ্গে যান আর হনুমান রাবণের মধুবন থেকে যে আমের আঁঠিটি সীতাদেবীর হাত থেকে পেয়েছিলেন, সেটিকে একটা বাগানে বসিয়ে দিলেন। দেখতে-দেখতে সেই বাগান এক আমবন হয়ে উঠল আর হনুমান সেই বনের ভেতরে দলবল নিয়ে মধুরেণ সমাপয়েৎ করে আরামে রইলেন।
এই তো গেল ত্রেতাযুগে—মানুষ যখন লঙ্কাগাছের মতো, তখনকার কথা। এখন সত্যিযুগের কথা বলতে বল তো বলি—কিন্তু সেটা ভয়ানক সত্যি, গল্পের মজা তাতে নেই, যেন বাঙলার ইতিহাস পড়ার মতো সব ঠিক-ঠিক একেবারে ঠিক।
বলেই কিচ্কিন্দে সত্যিযুগের কথা আরম্ভ করেছে—
‘সত্যে ব্ৰহ্মঙ্ক কর যাত-অ-অ,
সত্য স্ব-রূ-প তু অনন্ত।
সত্যে তোহার আত্ম যাত-অ-অ
আম্ভে জ-নি-লু তোর সত্য,
তোর সঞ্চিলা সেয়ল-অ-অ-অ
অসুর মারি সাধু পাল-অ-অ-অঃ
জগত তোর দেহুঁ যাত-অ-অ,
থিতি পালন করুঁ অন্ত।
তোহ মায়ারে মূরু-খ জন-অ-অ,
আত্মাকু দেখন্তি সে ভিন্ন।
পণ্ডিতে জানন্তি সে-এক-অ-অ,
মায়ারে দিশই অনেক
তু এ সংসারে দুঃখ সুখে-এ-এ
শরীর বহু নানা রূপে
সাধুকু দিশই নি-র-ম-ল-অ-অ
খল-লোচনে যম কাল-অ-অ-অঃ।’
‘ও কিচ্কিন্দে, থাক! তোমার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলুম না। আর কোনো কথা থাকে তো বল।’
‘সত্যিযুগের সব কথাগুলোই ওই রকম দাড়িওয়ালা মুনি-গোঁসাইগুলোর মতো গোম্সা-মুখো। আচ্ছা শোনো। দ্বাপরযুগে রাখাল-ছেলে ভাণ্ডারীগাছের তলায় দাঁড়িয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে আর গরু-বাচুর তার চারদিকে নেচে-নেচে গান গাইছে :
‘কি সুন্দর মুরলী পা-নী রে সজনী।
তাঙ্কু কে দিব অন্তা আ-নি-রে-এ সজনী।
দিনে যমুনাকু মু যেবে গলি গাধোই
বাটরে দেখিলি মু প্রাণ মাধো-ই রে সজনী।
বাঙ্ক-বাঙ্ক করি মো তে দেলে অনাই
তরকী-তরকী মু অইলি প-লা-ই রে সজনী।
ধাঁই-ধাঁই সে যে মো ধইল লাঙ্গলে-এ
মু ভেঁই পড়িলি যাই যমুনা জলে-এ রে সজনী।’
বলেই কিচ্কিন্দে ফুঁ-ফুঁ করে একটা বাঁশি বাজাতে আরম্ভ করে দিলে।
‘বলি ও কিচ্কিন্দে, গানের চেয়ে তোমার বাঁশিটি কিন্তু মিষ্টি।’
যেমন এই কথা বলা অমনি কিচ্কিন্দে বাঁশি রেখে বলে উঠেছে : ‘Thank you Baboo, I earnestly hope and trust that the noble example of this most enlightened and public spirited Kumar Krishna Kich Kinda of Orissa will be followed by all Maharajas, Rajas, Jamindars and other wealthy people—not only in India but throughout the length and breadth of Bengal, Behar & Orrissa—for the amelioration of self and friends and all the poor gentlemen at large like হারুন্দে, কাসুন্দে, বাসুন্দে, ঝালুন্দে অ্যাণ্ড মালুন্দে।’
‘ও কি বলচ কিচ্কিন্দে?’
‘কলির কথা। —ধন্যবাদ তোমাকে বাবু, আমি ব্যগ্রভাবে ভরসা ও প্রত্যয় করিতেছি যে ঐ কুলীন উদাহরণ এই আলোকসম্পন্ন সাধারণ ভূতবান উড়িষ্যার কুমার কৃষ্ণ কিচ্কিন্দার হইবে অনুগমিত সকল রাজা মহারাজা জমিদার ও যোত্রসম্পন্ন ব্যক্তিগণের দ্বারাই নিজের বন্ধুর এবং হারুন্দে ইত্যাদির মতো বেচারা গরিব এবং ছাড়া-পাওয়া ভদ্রগণের অপেক্ষাকৃত ভালো করিবার নিমিত্তে।’
‘এ কথার তো কিছু মানে-মাথা নেই কিচ্কিন্দে।’
‘আচ্ছা কথার তো কিছু মানে-মাথা নেই কিচ্কিন্দে।’
‘আচ্ছা শোনো দেখি, এটার কিছু মানে পাও কিনা—বঙ্গ-বিদর্ভনগর লৌবর্ত্ম সমিতি। এটা আরো শক্ত? আচ্ছা দেখ দেখি এটা সহজ কিনা—পূর্ণপরব্রহ্মজ্যোতিস্বরূপ গুরু মাতা পিতা আত্মাতে পূর্ণরূপে নিষ্ঠাবিহীন জীব বাহিরে ভিন্ন-ভিন্ন নামরূপ দেখিয়া বহির্মুখী মনোবৃত্তির দ্বারা বাসনায় আবদ্ধ হইয়া সত্য হইতে বিমুখ হয় ও মিথ্যার আসক্তি করতঃ কলির ব্রাহ্মণ নামে আখ্যাত হইয়া থাকে—’
‘এটা তো একেবারে সমস্কৃত, একটুও বোঝবার জো নেই।’
‘তবেই তো বাবু, কলিকালের কথার নমুনা দেখেই ভড়কে গেলে। গল্পটা আগাগোড়া শোনা তোমার কম্ম নয়। ভাণ্ডীরবনে রাখাল-ছেলের বাঁশির গানটুকুই তোমার অদেষ্টে লেখা ছিল।’
বলেই আবার কিচ্কিন্দে বাঁশি বাজাতে লাগল:
মু ভেঁই পড়িলি যাই যমুনা জলে-এ রে সজনী।
বাঁশি শুনতে-শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছি। ইতিমধ্যে কখন যে পালকি সুদ্ধ কিচ্কিন্দে আমাকে সমুদ্দুরের জলে নামিয়ে নিয়ে গেছে তা জানিনে। ঝপাং করে যেমন এক ঢেউ এসে পালকিতে লেগেছে আর ঘুম ভেঙে গেছে।
‘ও কিচ্কিন্দে, কোথায় নিয়ে চললে? পিসির বাড়িতে চল না—এদিকে কেন?’
‘বাবু, পিসির বাড়ি কি এখানে? সাত সমুদ্দুর পেরিয়ে যেতে হবে।’
‘জাহাজ কই কিচ্কিন্দে? পার হব কেমন করে?’
‘জাহাজ কি করবে বাবু? জন্ম-জন্ম ধরে জাহাজ চালিয়ে গেলেও পিসির বাড়িতে যেতে পারবে না। জলের ওপর দিয়ে পিসির বাড়ি যাবার রাস্তা নেই, যেতে হবে জলের নিচে দিয়ে—ডুব-সাঁতার মেরে, সাত ঘাটের জল খেতে-খেতে। পিসির বাড়ি যাওয়া কি সহজ বাবু!
‘তাই তো কিচ্কিন্দে, ডুব-সাঁতার তো আমি জানিনে, কেমন করে তবে পিসির বাড়ি যাই!’
‘পিসি তো তাই আমাদের পাঠিয়েছেন। ভয় কি? গট্ হয়ে পালকিতে বসে থাকো, এইখান থেকে এক ডুব মারব আর ঠেলে তুলব পালকি এক্কেবারে পিসির বাড়ি। কিন্তু দেখ বাবু, রাস্তার মধ্যে অনেক আশ্চয্যি দেখতে পাবে দেখে যেন ভয় খেও না। প্রথমে আসবেন কালা-কানা-আংলা-টানা, তারপর আছেন গামলা-চালা ফোঁপরা-জালা, তার পরে ঘণ্টাকর্ণ রক্তশোষা মাথায়-ছাতা, তার পরে শাঁখচূর্ণি মুক্তোকলাই, তারপর আছেন শুঁড়-দুল্ দুল্ কাঁচুমাচু কল-কব্জা দাড়া-বাঁধা, আর রাঘববোয়াল পায়রা-চাঁদা।’
‘কিচ্কিন্দে, এরা যদি আমায় ধরে?’
‘কিছু ভয় নেই। আমরা আছি। ভয় পেলে আমায় ডেকো।’ বলেই—’হ্যে রে রে দাদা রে’ বলে পালকি-সুদ্ধু আমাকে নিয়ে তারা ডুব মেরেছে জলের ভেতর।
প্রথমটা অন্ধকারে কিছুই দেখতে পাইনে। খানিক পরে দেখি ফুঁকো শিশির মতো ছোট-ছোট আলো জলের ভেতর দুধারে সারি-সারি ঝুলছে। এক-একবার জলের তোড়ে আলোগুলো হুড়হুড় করে গড়িয়ে ডাঙার দিকে যাচ্ছে আবার গড়গড় করে গড়িয়ে যেখানে ছিল সেখানে ফিরে আসছে। এমন সময় দেখি, এক কড়া তেল জলের ওপর যেমন ভাসতে-ভাসতে চলে তেমনি কি-একটা আমাদের দিকে পিছলে-পিছলে আসছে! অমনি কিচ্কিন্দে ডেকেছে, ‘সামাল! সামাল! বাঁয়ে ধর ভাই!’
সাঁ করে আমরা বাঁ-দিকে একটা ডোবার ভিতর নেমে গেছি। সেখান থেকে দেখি— তেলটা ভাসতে-ভাসতে আমাদের ঠিক মাথার ওপরে এসে চারদিকে চারটে লম্বা-লম্বা আঙুল বার করে জল খুঁটতে লাগল। তারপর আবার আস্তে-আস্তে আঙুল-কটা গুটিয়ে নিয়ে একদিকে ভেসে চলে গেল।
কিচ্কিন্দে বললে, ‘দেখলে বাবু, উনিই হচ্ছেন কালা-কানা-আংলা-টানা। ওঁর না আছে মাথা মুখ, না আছে কান, না আছে চোখ; থাকবার মধ্যে আছে কেবল এক আঙুল আর একরাশ তেল-চুকচুকে পেট। আঙুলটি গিয়ে কারো গায়ে ঠেকেছে কি আর অমনি সমস্ত পেটটি তেলের মতো গড়িয়ে গিয়ে তার ওপর পড়েছে—যেমন পড়া আর অমনি হজম করে ফেলা! জানোয়ার যদি ওঁর চেয়ে তিন-চার ডবল বড় হয় তবে ঐ পেটটিও সঙ্গে-সঙ্গে বেড়ে তেলের মতো ছড়িয়ে গিয়ে জানোয়ারটিকে বেশ করে ঘিরে নেয়!’
‘ছুটি দিয়ে পিটটা চিরে দেওয়া যায় না কিচ্কিন্দে?’
‘হবার জো নেই। ওঁকে দু-টুকরো কর, দশ-টুকরো কর, একশো-হাজার-টুকরো কর, দেখবে সব টুকরোগুলো একটা-একটা নতুন কালা-কানা-আংলা-টানা ভুল বার করে ভেসে বেড়াচ্ছে। সমুদ্দুরের ভেতর এঁর মতো জবরদস্ত আর কেউ নেই বাবু। চল এই আংলা-টানার হাতে পড়লে আর রক্ষে নেই।’ —বলেই আমরা চুপি-চুপি পালিয়ে চলেছি। এমন সময় দেখি একরাশ চিনেমাটির মার্বেল জলের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে। কাছে আসতে দেখি—সেগুলি এক-একটি গোল খাঁচা আর ভেতরে একটি করে খুদে আংলা বসে আছে।
‘ও কিচ্কিন্দে, আমাকে চাট্টিখানি ওই মার্বেল ধরে দাও না।’
‘দেখ না একবার ধরে!’ —বলেই খপ করে দুটো মার্বেল ধরেই কিচ্কিন্দে আমার দু-হাতে দিয়েছে। তেমন মুঠো করে ধরা আর শুঁয়োপোকার কাঁটার মতো হাতময় ছুঁচ বিধে গেছে!
মার্বেল দুটো ফেলে দিয়ে দুহাত চুলকোতে-চুলকোতে চলেছি, এমন সময় কিচ্কিন্দে বলছে, ‘গামলা-চালা ফোঁপরা-জালার দেশে এলুম বাবু!’
চেয়ে দেখি চারদিকে কেবল গামলা আর জালা! কোনোটা বড়, কোনোটা ছোট, কোনোটা লম্বা, কোনোটা বেঁটে, কেউ ধানের মরাইটার মতে, কেউ ঢাকাই জালাটার মতো, কেউ চুমকি ঘটিটির মতো। কোনো গামলা ফুলের টবের মতো দাঁড়িয়ে আছে, কোনোটা বা গরুর জাব দেবার ফুটো গামলাটার মতো উল্টোনো রয়েছে!

‘এ-সব গামলা আর কুপো কেন কিচ্কিন্দে?’
‘জানো না? এখানে তোমার পিসির ঘি-তেল মজুদ থাকে। দেখ না’ —বলেই ছোট একটি ঘিয়ের মট্কি কিচ্কিন্দে আমার হাতে তুলে দিয়েছে।
‘ও কিচ্কিন্দে, এ ভাঁড়টার মুখ কোন দিকে? ঘি বার করি কেমন করে?’
‘দাও, দেখিয়ে দিই। বলে মট্কিটা আমার হাত থেকে নিয়ে কিচ্কিন্দে দুহাতে নিংড়োতেই দেখি গল্-গল্ করে এক সের ঘি বেরিয়ে পড়ল!
‘এ তো বেশ মজা!’ বলেই আমি পালকি থেকে নেমে সেই জালা আর গামলাগুলো টিপতে লাগলুম আর অমনি পিচকিরি দিয়ে ফোয়ারার মতো কোনোটা থেকে তেল কোনোটা থেকে ঘি বেরোতে লাগল। দেখতে-দেখতে চারদিক তেল আর ঘিয়ে ভেসে গেল! তখন কিচ্কিন্দে বলছে, ‘বাবু, আর খেলা নয়। এত তেল-ঘি ঢেলে ফেলেছ দেখলে পিসি রাগ করবেন। চল, চুপি-চুপি পালাই।’
পালকি করে আবার চলেছি। কিন্তু মনে ভয় হচ্ছে—পিসির এত তেল-ঘি ঢেলে নষ্ট করলুম, পিসি যদি টের পান তো রক্ষে রাখবেন না।
‘ও কিচ্কিন্দে, পিসিকে বোলো না যেন যে অত তেল-ঘি নষ্ট করেছি!’
‘একটুও নষ্ট হবে না বাবু, পিসির তোমার তেমন জালা, তেমন গামলা নয়! কুপোগুলো সব তেল-ঘি আবার শুষে নিয়ে যেমন ছিল তেমনি ফুলে উঠছে! চল এখন পিসির বাড়ির তেতলায় আমরা নেমে যাই। সেখানে ঘণ্টাকর্ণ রক্তশোষা মাথায় ছাতা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!’ বলেই কিচ্কিন্দে পালকি নিয়ে ধাপে-ধাপে সমুদ্দুরের নিচে নেমে চলল। সেখানটা এমন অন্ধকার যে কিছু দেখা যায় না।
‘ও কিচ্কিন্দে, তেতলায় তো সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে হয়, এ যে তুমি আমাকে নিয়ে নেমে চললে।’
‘ঠিক যাচ্ছি বাবু! জলের ওপরে যে তেতলা বাড়ি তাতে উঠতে হলে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যেতে হয়, আর জলের নিচে যে বাড়ি তার তেতলায় যেতে হলে নিচেবাগে নেমে যেতে হবে। জলের ভেতরে যে বাড়ি কি বাগানের গাছ দেখ, সেগুলোর মাথা ওপরে থাকে না নিচেতে থাকে?’
‘নিচেবাগে।’
‘জলের ওপরে যে বাড়ি থাকে তার মাথা কোন দিকে থাকে?’
‘ওপর দিকে।’
‘তবে? জলের ওপরে তোমার মাসির বাড়িতে যা করতে নিচে পিসির বাড়িতে এসে ঠিক তার উল্টোটা না করলে মুশকিলে পড়বে, এইটে মনে রেখ।’ বলেই কিচ্কিন্দে ক্রমে আরো নিচে নেমে চলল।
‘ও কিচ্কিন্দে, চোখে যে কিছুই দেখতে পাইনে, বড় অন্ধকার!’
‘আলো বেশ আছে, কেবল তুমি চোখটি খুলে রেখেছ বলে কিছুই দেখতে পাচ্ছ না। চোখ বন্ধ কর, সব স্পষ্ট দেখতে পাবে।’
কিচ্কিন্দের কথায় চোখ বন্ধ করেছি। সবাই চোখ-চেয়ে দেখে, আমি দেখছি চোখ বুজে—নীল জল! এত নীল যেন নীল কালি! তারই মাঝে গোনা যায় না—এত ঘণ্টা দলছে! ঘণ্টার গায়ে ছোট-ছোট গোল-গোল কত যে চোখ জ্বলছে তার ঠিক নেই—কোনোটা লাল, কোনোটা হলদে! গোলাপি সবুজ শাদা বেগুনি—কত রঙেরই চোখ! ঘন্টাগুলোর দুদিক দিয়ে দুটো করে লম্বা শুঁড়ের মতো কান ঝুলছে! যেমন এক-একবার সেই কানগুলোতে ঢেউ লাগছে আর অমনি সব ঘণ্টাগুলো হেলে-দুলে টুং-টাং ক্লিং-ক্লাং টুং-টাং করে বাজছে—ঠিক যেন গোঁসাই এসে কানের কাছে মন্তর দিচ্ছে
পালকির কাছ দিয়ে যখন এক-একবার ঘণ্টাকর্ণ এক-একটা হেলতে-দুলতে চলে যাচ্ছে তখন ইচ্ছে হচ্ছে—দিই একবার দুই কান ধরে টেনে। কিন্তু তখনি আবার মনে পড়ে যাচ্ছে এখন সব উল্টো কাজ করতে হবে; যখন ইচ্ছে হবে চোখ বুজে ঘুমোই তখন থাকতে হবে চোখ চেয়ে; যখন ইচ্ছে হবে শুই তখন হবে দাঁড়াতে; যখন কান মলতে হাত এগিয়ে যাচ্ছে তখন হাতকে জোর করে পিছিয়ে আনতে হবে। কাজেই আমি ভালো-মানুষটি হয়ে চুপ করে হাত-পা-গুটিয়ে চোখ বুজে বসে রয়েছি। এমন সময় দেখি আমাদের মেজ পুঁটির মতো একটি মাঝারি গোছের পুঁটিমাছ ঝাঁ করে গিয়ে ঘণ্টাকর্ণের কানে দিয়েছে ঠোকর। যেমন কান ছোঁয়া আর কান অমনি জড়িয়ে ধরেছেন হাতির শুঁড়ের মতো পুঁটিমাছটিকে! যেমন ধরা অমনি ঘণ্টার ভেতর পোরা! কাঁচের হাঁড়িতে পোষা মাছ যেমন ঘুরে-ঘুরে বেড়ায়, তেমনি দেখছি ঘণ্টার ভেতর পুঁটিমাছটি ঘুরে বেড়াচ্ছে—পালাবার পথ নেই! আমি মাছটার কি হয় দেখবার জন্যে চেয়ে আছি।
‘আর দেখছ কি বাবু! হজম হয়ে গেল বলে। যাও না ঘণ্টার কানটা ধরে টেনে দেখ না মজাটা।’
‘কিচ্কিন্দে, তুমি কেমন করে জানলে যে কান মলবার জন্যে আমার হাত নিশপিশ করছিলে, আমি তো তোমাকে কিছু বলিনি।’
‘বলনি বলেই জানতে পারলুম। বললে কিছু শুনতেও পেতুম না, জানতেও পারতুম না। এখানে সব উল্টো নিয়ম তা তো তোমাকে বলেই দিয়েছি।’
এই কথা হচ্ছে এমন সময় দেখি পাঁচ দিক থেকে পাঁচটা শুঁড় নাড়তে নাড়তে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে—রক্তশোষা। তার সবটাই অগুনতি ঠোঁট আর গাল আর জিভ—লাল টকটকে, শাদা ফ্যাঁফ্যাঁকে। এক ক্রোশ থেকে তার ঠোঁট নাড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে—পট্-পট্-পট্, চক্-চক্-চক্!
কিচ্কিন্দে ডাকছে, ‘ডাইনে ধর ভাই, ডাইনে!’
বলতে-বলতে দেখি পালকি ডাইনে ঘুরেছে, আর দেখি রক্তশোষা বাঁদিকে সরে গেছে।
‘বাঁয়ে ধর ভাই, বাঁয়ে ধর!’
পালকি যেমন বাঁদিকে ঘুরেছে আর দেখি রক্তশোষা ডাইনে চলে গেছে। এমনি ডাইনে বাঁয়ে করতে-করতে আমরা রক্তশোষার ঠোঁট এড়িয়ে ছাতা-মাথার ঘরে এসে পড়েছি। সেখানে দেখি কেবল ছাতা আর তার নিচে এক-একটা মুণ্ড—গুটিসুতোর মতো সোঁটা-সোঁটা চুল আর মুলোর পাতার মতো গোছা-গোছা দাড়ি। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন বিটপালং, গাজর, ওলকপি আর বিলিতি-মুলোর ঝাঁকা সব উল্টে পড়ে ভেসে যাচ্ছে।
‘ও কিচ্কিন্দে! এরা কারা?’
‘এরা মালী। তোমার পিসির সবজি-বাগানে কাজ করছে।’
‘এত তরকারি কি পিসি একাই খান?’
‘তিনি ছাড়া আর কে খাবে? এ তরকারি কারো ছোঁবার জো আছে! ছুঁলেই হাত চুলকে অস্থির হবে। যতক্ষণ না পিসি এগুলিকে নিজের হাতে বেঁধে-বেড়ে দেবেন ততক্ষণ কারো মুখে দেবার জো নেই। মুখে দিয়েছে কি আর গাল ফুলে গোবিন্দর মা হয়েছে!’
গালফুলো গোবিন্দর মা কে কিচ্কিন্দে?
‘তিনি আগে গোবিন্দর মা ছিলেন, পিসির এই সবজি খেতে ওলকপি তুলতে এসে একটি বিলিতি মুলো চুরি করে খেয়েছিলেন, সেই থেকে তাঁর গাল ফুলে গেছে। গোবিন্দ আর তাঁর মায়ের মুখ দেখেন না।’
‘আচ্ছা কিচ্কিন্দে, ওই যে টোকা মাথায় দিয়ে মালীরা সব এই সবজি-খেতে কাজ করছে ওদের গা কই চুলকোয় না কেন?’
‘ওদের গা থাকলে তো! চুলকে-চুলকে সব ক্ষয়ে গেছে। এদিকে দেখ বাবু, তোমার পিসির ধানের খেত। এখানে কেবল মুক্তোকলাই, দশবছরে একবার ফলে, আর তোমার পিসি সেই কলাইয়ের ডাল দিয়ে পান্তাভাত দশবছর অন্তর একদিন খান।’
‘পান্তাভাত কি কিচ্কিন্দে?’
‘ভিজে ভাত বাবু। তোমায় তো বলেছি এখানে সব উল্টো, ডাঙার ওপর মাসির বাড়িতে খাও তোমরা শুকনো ভাত আর জলের নিচে পিসির বাড়িতে সবাই খায় ভিজে ভাত। তোমাদের কলাইয়ের ডাল পাতলা—যেন জল, আর এখানকার কলাইয়ের ডাল যেন মুক্তোর মতো ঝুরঝুরে।’
এই কথা হচ্ছে এমন সময় শুনি খেতের ভেতর থেকে ভোঁ-ভোঁ করে শাঁখ বেজে উঠল।
‘এত শাঁখ বাজে কেন কিচ্কিন্দে?’
‘শাঁখচূর্ণিরা সব শাঁখ বাজিয়ে কলাই-খেত থেকে পাখি তাড়াচ্ছে বাবু।’
দেখি, শাঁখচূর্ণিরা সব শাঁখ বাজিয়ে খেতময় ঘুরে-ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের আর কিছু নেই—কেবল পাটি করে দাঁত আর একটা মস্ত কান, তাতে একটি ফুটো। জাঁতিকলের মতো দুপাটি দাঁত তারা খুলছে আর বন্ধ করছে, আর তাদের সেই কানের ফুটোগুলো দিয়ে ভোঁ-ভোঁ করে শাঁখের শব্দ বার হচ্ছে। কতদূর থেকে যে সে শব্দ শোনা যাচ্ছে তার ঠিক নেই!
শুঁড়-দুল-দুল কাঁচুমাচুর দেশ পেরিয়ে চলেছি, তখনো শুনছি সেই শাঁখের আওয়াজ! যেমন এক-একবার শাঁখের শব্দ আসছে আর অমনি দেখছি শুঁড়-দুল-দুলের যত শুঁড় সব ভয়ে কেঁচো হয়ে ল্যাজ গুটিয়ে মুখ কাঁচুমাচু করে গর্তে লুকোচ্ছে।
‘ও কিচ্কিন্দে, পিসি এত কেঁচো নিয়ে করেন কি?’
‘তিনি ওই কেঁচোর টোপ দিয়ে ছিপ ফেলে কাঁকড়া ধরেন।’
‘একটা ছিপ পাই তো গোটাকতক কাঁকড়া ধরি।’
অমনি দেখি মস্ত-মস্ত কাঁকড়া দাড়া নেড়ে-নেড়ে বলছে, ‘ধরো না দেখি! আঙুলটি কাটব নাকি? —কট্-কট্-কট্!
যাঃ-যাঃ ‘দূর হ!’
যত বলি ‘দূর হ’ ততই দেখি কাঁকড়াগুলো এগিয়ে আসে।
‘ও কিচ্কিন্দে এরা এগিয়ে আসে যে!’
‘আসতে বলছ তো আসবে না! যাঃ-যাঃ বললে এগিয়ে আসবে না তো কি পিছিয়ে যাবে? এখানে সব উল্টো, মনে নেই? বল—আয়-আয়।’
যেমন ‘আয়-আয়’ করে ডাকা আর অমনি সব কাঁকড়া দেখি পালিয়েছে। আমি যত ডাকি ‘আয়’ তত তারা দূরে পালায়। আবার যেমন একবার বলেছি ‘যাঃ-যাঃ’ অমনি সব কাঁকড়া কট্কট্ করে আমার দিকে ছুটে এসেছে!
‘আচ্ছা কিচ্কিন্দে, পিসি অত কষ্ট করে কেঁচোর টোপ ফেলে কাঁকড়া ধরেন কেন? জলের ধারে বসে যাঃ-যাঃ বললেই তো তারা আপনি পিসির হাতে উঠে আসত?
‘আহা, পিসির তোমার মায়ার শরীর, কাউকে কি তিনি যাঃ বলতে পারেন! পিসির মুখে যাঃ কথাটি কখনো শুনিনি। যদি বললুম—পিসি বাড়ি যাই, অমনি পিসি বলবেন—আয় বাছা! কোনোদিন বলবেন না—যা বাছা! তোমাদের মুখে যেমন যা-যাঃ দূর-দূর লেগেই আছে, পিসি তো আর তেমন নয়, পিসি সবাইকে বলেন—এসো বাছা, বসো বাছা! সাধে কি আমরা পিসির চাকর হয়ে আছি? ওই দেখ তোমার পিসির ছিপে একটা কল-কব্জা-দাড়া-বাঁধা ধরা পড়েছে। ওই আর একটা! উঃ, তোমার জন্যে পিসি খুব কাঁকড়া আর গলদা চিংড়ি-ধরছেন দেখছি, কাল খাওয়া খুব হবে বাবু!’

দেখি পিসির ছিপে দুটো প্রকাণ্ড কাঁকড়া আর গলদা-চিংড়ি ধরা পড়েছে। কাঁকড়ার এক-একটা দাড়া আমার হাতের মতো লম্বা; আর চিংড়ি দুটো যেন এক-একটা তেলেঙ্গি সেপাই—ঢাল খাঁড়া নিয়ে তিড়িং-তিড়িং লাফাচ্ছে। আমাদের চোখ, মুখের সঙ্গে চ্যাপ্টানো, এদের চোখগুলো যেন দূরবীনের চোঙার মতো মুখ থেকে ঠেলে বেরিয়েছে আর কট্মট্ করে তাকিয়ে আছে! দেখলে ভয়ে গা শিউরে ওঠে। কাঁকড়া আর গলদা-চিংড়ি দেখে, পিসির রাঁধা কচি কুমড়ো দিয়ে কাঁকড়ার ঝোল, লাউ-চিংড়ি আর গুড়-অম্বল খেতে নোলা সকসক করে উঠল।
‘ও কিচ্কিন্দে পিসির বাড়ি আর কতদূর?’
‘এই তো এসেছি বাবু তোমার পিসির খিড়কি-পুকুরে। ওই দেখ কত রাঘব-বোয়াল আর পায়রা-চাঁদা মাছ পুকুরে ঠাসা রয়েছে।’
বাপরে! এমন সব মাছ তো কখনো দেখিনি! যেন এক-একটা জাহাজ ভেসে বেড়াচ্ছে। কারো ভাঁটার মতো চোখ, কারো গাময় চাকা-চাকা আঁশ, কারো মাথার শিং, কারো গালে গোঁফ, কারো থোঁতা মুখ, কারু মুখ বা ছুঁচলো, কেউ লম্বা কাঠি, কেউ গোল একটি বেলুনের মতো! লাল নীল সবুজ কত রঙের কত রকমের যে মাছ পিসির পুকুরে ছাড়া রয়েছে—তা আর কি বলব! গল্প শুনতে-শুনতে যেমন ঘুম পায় তেমনি পিসির বাড়ির সাতঘাটের কাণ্ডকারখানা দেখতে-দেখতে আমার ঘুম পেয়ে এল।
‘ও কিচ্কিন্দে, বড় ঘুম আসছে, আর যে চোখ বুজে থাকতে পাচ্ছিনে।’
‘বেশ তো বাবু, ঘুমোও চোখ খুলে, আর তো দেখবার কিছু নেই, রাত পোহালেই এই পুকুরের ওপারে তোমার পিসির বাড়ি পৌঁছে দেব।’
আমি অকাতরে ঘুম দিচ্ছি এমন সময় শুনছি পিসি ডাকছেন, ‘অবু, ও অবু, ওঠ্ রাত হয়েছে, আর কত ঘুমোবি? সূয্যি যে অনেকক্ষণ নেমেছেন।’
কিচ্কিন্দে বলছে, ‘পিসিমা, দাদাবাবু সারাদিন পালকিতে ঘুমোননি, একটু ঘুমোতে দাও, এই তো সবে সূর্যি নেমেছেন, এখনো তো রাত বেশি হয়নি।’
কিচ্কিন্দের গলা পেয়েই আমার ঘুম ভেঙে গেছে। তাড়াতাড়ি উঠে বসে দেখি— পিসির বাড়ির ছাদে শুয়ে আছি আর আকাশে একটা কালো সূর্যি উঠেছে। আমাকে উঠে বসতে দেখে কিচ্কিন্দে তাড়াতাড়ি বলছে, ‘বাবা ঘুমোও, এখনো রাত হবার দেরি আছে, আর একটু রাত হোক তো জেগো।’
‘রাত হলে তো ঘুমোব, তখন আবার জাগব কি?’
পিসি বলছেন, ‘ও কপাল! রাতে বুঝি ঘুমোতে হয় আর দিনে জাগতে হয়? খবরদার রাতে ঘুমোসনে—অম্বল হবে, বাত হবে! যাই, রান্নাবান্না হল কিনা দেখে আসি’— বলে পিসি তো গেলেন। কিচ্কিন্দে তখন আমায় বলছে, ‘বাবু ভুলে গেলে? তোমাকে তো বলেছি। পিসির দেশে রাতে সূর্যি ওঠেন, দিনে চাঁদ। যা মাসির বাড়ি করতে এখানে ঠিক তার উল্টোটি করা চাই, মাসির বাড়ি যদি ঘুমোই রাতে তো এখানে ঘুমোব দিনে, সেখানে যদি চান করি জলে, এখানে করতে হবে বালিতে। খাবার সময় সেখানে যদি বলতে মাসি খিদে পিয়েছে ভাত দাও, এখানে বলতে হবে পিসি খিদে নেই, পেট আইঢাই করছে, ভাত আজ দিও না, খাব না। সেখানে বই পড়তে চোখ খুলে বইখানা সামনে রেখে, এখানে পড়তে হবে চোখ বন্ধ করে বইখানা পিছনে লুকিয়ে রেখে।’
‘কিচ্কিন্দে এ-সব শিখতে তো আমার অনেকদিন লাগবে।’
‘তা লাগবে বই কি বাবু! আজ দিনটা একটু পিসির বাড়ি আরাম কর, কাল রাতেই তোমাকে পাঠশালায় ভর্তি করে দেব; সেখানে লেখাপড়া খুব ভুলতে পারবে।’
এমন সময় পিসি এসে ডাকছেন, ‘ভাত আজ আর খেও না।’
কিচ্কিন্দে তাড়াতাড়ি এক ঘটি বালি এনে দিলে, আমি তাই একটু মুখে দিয়ে পিসির রান্নাতলায় হাজির। এদেশে রান্নাঘর নেই, খোলামাঠে উনুন পাতা আছে, তারই কাছে দেখি খাবার জায়গা। সেখানে একখানা মস্ত কলাপাতা পাতা রয়েছে, আসন-টাসন কিছুই নেই! আমি যেমন কলাপাতার সামনে মাটিতে বসতে গেছি আর পিসি বলছেন, ‘ওরে ওখানে না, ওই পাতাখানায় বোস্।’
‘পিসি, পাতায় আমি বসব তো ভাত দেবে কিসে?’
‘এই যে পিঁড়িতে ভাত বেড়ে রেখেছি’—বলে একটা পিঁড়ের ওপরে ডাল ভাত তরকারি সাজিয়ে পিসি আমাকে এনে দিলেন। আমি তখন বুঝলুম, এখানে লোকে পাতায় বসে আর পিঁড়েয় ভাত খায়! পিসির হাতের কলাইয়ের ডাল আর কাঁকড়ার ঝোল দিয়ে একপেট ভাত খেয়ে জলের ঘটিতে চুমুক দিয়ে দেখি এক ঘটি বালি—বেশ পরিষ্কার, তাতে আবার গোলাপের গন্ধ ছাড়ছে, আর বেশ মিষ্টি। ঢক্ঢক্ করে এক ঘটি বালি খেয়ে ধুলোয় হাত-মুখ ধুয়ে উঠলুম। পিসি একটি পান দিলেন—শুকনো যেন তালপাতা। আমরা খাই কাঁচা পানের পাতা, এরা খায় শুকনো তালের পাতা! একপেট খেয়ে ঘুম পাচ্ছিল। কিচ্কিন্দেকে বললুম, ‘কিচ্কিন্দে শোবার ঘরটা কোথায়? একটু দুপুরবেলা ঘুমোতে হবে। বিকেলে তোমার সঙ্গে বেড়াতে যাব।’
‘আচ্ছা বাবু’—বলেই কিচ্কিন্দে একটা ছাদে খাটিয়া পাতা রয়েছে সেইখানে আমাকে এনে বললে, ‘এই খাটিয়াতে একটু গড়াগড়ি দাও, আমি ঠিক সকাল পাঁচটার সময় তোমায় নিয়ে বেড়াতে যাব।’ বলেই কিচ্কিন্দে চলে গেল। বিছানায় শুতে গিয়ে দেখি, খানকতক ইট পাতা রয়েছে! তখন বুঝলুম এদের বালিস তোষক নরম নয়; শক্ত ইট; আর ছাদ হচ্ছে এদের ঘর, ঘর হচ্ছে ছাদ! ইটের বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে কিছুতে ঘুম আসে না, তখন মনে দেখি উপুড় হয়ে শুয়ে। যেমন উপুড় হওয়া আর অমনি ঘুম—টিকটিকির মতো ইটের দেয়ালে হাত-পা ছড়িয়ে আরামে ঘুম! এমন ঘুম কখনো হয়নি। যখন বেলা পড়ে এসেছে তখন কিচ্কিন্দে এসে বললে, ‘বাবু চল একটু রথতলায় বেড়িয়ে আসি।’
‘চল’—বলে কিচ্কিন্দের সঙ্গে এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে রথতলায় চলেছি, এমন সময় দেখি গোবিন্দর মা একটি ভোঁদড়-ছানা নিয়ে তাকে ঘুম পাড়াচ্ছে আর সুর করে ছড়া কাটছে—
‘ধেই-ধেই চাঁদের নাচন।
বেলা গেল চাঁদ নাচবি কখন।’
তখন পিসির দেশের কালাচাঁদ নাচতে-নাচতে পুবদিকে অস্ত যাচ্ছেন আর সোনারচাঁদ নাচতে-নাচতে পশ্চিম দিকে উদয় হচ্ছেন। এই দুই চাঁদের আলোয় সমস্ত পৃথিবীটা গোবিন্দর মায়ের ফুলো গালের মতো খানিক আলো খানিক কালো দেখা যাচ্ছে। আকাশ দেখতে হয়েছে যেন হলদে-আর-কালো ডুরেশাড়িখানি। হাওয়া বইছে আধেক গরম আধেক ঠাণ্ডা। আমাকে দেখে গোবিন্দর মা বলছে, ‘ও কিচ্কিন্দে, এ কাদের ছেলে গো?’
‘আমাদের দাদাবাবু গো। মামার বাড়ির লোক। এনাকে একবার রথতলাটা দেখিয়ে আনি।’
‘চল, আমিও যাই একবার রথতলায়’—বলেই গোবিন্দর মা ভোঁদড়-ছানাটি কোলে আমাদের সঙ্গে চলল।
সমুদ্দুরের ধারেই রথতলা। বেশ জায়গাটি। চারদিকে ঝাউবন, মাঝে অনেকখানি বালি—পরিষ্কার তকতক করছে। তারই মাঝে মুড়ো রথখানা—তার চাল নেই, চুড়ো নেই। সেইখানে দেখি হারুন্দে হয়েছে সদ্দার আর কাসুন্দে বাসুন্দে ঝালুন্দে মালুন্দে হয়েছে চিতাবাড়ি আর ধাঁইকিড়ি। চিতাবাড়ির দল ধরেছে দুই লাঠি, ধাঁইকিড়ির দল ধরেছে দুই লাঠি। হারুন্দে এক-একবার হাঁক দিচ্ছে—
‘ইকড়ি-মিকড়ি চামচিকড়ি
চাম্ কৌটো মজুন্দার
ধেয়ে এসো দামুদার—’
আর অমনি দুই দলে ঠকাঠক লাঠি ঠুকছে। দেখতে-দেখতে দেখি আর মানুষ চেনা যায় না! কোথায় কাসুন্দে কোথায় বাসুন্দে কোথা বা ঝালুন্দে কোথা বা মালুন্দে। কেবল একরাশ কাঁকড়া আর মাকড়সা বালির ওপর ইকড়ি-মিকড়ি কচ্ছে। আর তাদের মাথার ওপরে একরাশ কালো-কালো চামকিচে চামচিকড়ি ডানাগুলো ঝেড়ে-ঝেড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে! লড়াই হতে-হতে যেমন একটা চামচিকে চিক্ করে মাটিতে পড়েছে আর অমনি সব ইকড়ি-মিকড়ি গিয়ে তাকে ধরে ফেলেছে! অমনি হারুন্দে ডাকছে—
‘দামুদার ছুতারের পো
হিঙুল গাছে বেঁধে থো।’
যেমন এই কথা বলা অমনি সবাই মিলে চামচিকের মতো রোগা-পটকা ছুতোরের পো-কে হিংচে গাছে চুলের দড়ি দিয়ে বেঁধেছে! তখন হিংচে গাছ কচ্ছে কড়মড়! তখন ইকড়ি-মিকড়ি দল হিংচে গাছের চারদিকে হাততালি দিয়ে গান গেয়ে-গেয়ে ঘুরতে লেগেছে—
‘চাঁদ-চাঁদ-চাঁদ গগনচাঁদ
হিংচে বনে শশী!
ওই এক চাঁদ এই এক চাঁদ—
চাঁদে মেশামেশি।’
‘ও কিচ্কিন্দে এ-সব হচ্ছে কি?’
‘একে বলে চিকড়ি-মিকড়ি খেলা’—বলেই কিচ্কিন্দে একটা বাঁশি বাজাতে লেগেছে। আর অমনি দেখি ইকড়ি-মিকড়ি হয়ে গেছে চিতাবাড়ির দল আর চামচিকড়ি হয়ে গেছে ধাঁইকিড়ির দল! যেমন কাসুন্দে বাসুন্দে ঝালুন্দে মালুন্দে ছিল সবাই তেমনি হয়ে গেছে! আর নাচতে-নাচতে তারা এসে আমাদের বলছে—
‘ধিনতা নাচন মধুর বচন তোমরা কর কি?’
অমনি গোবিন্দর মা গাল ফুলিয়ে বলছেন—

‘মনের আনন্দে মোরা খোকন নাচাচ্ছি।’
‘গোবিন্দর মা, দেখি তোমার খোকা’—বলেই হারুন্দে ভোঁদড়-ছানাকে নিয়ে যেমন তার পেটে ফুঁ দিয়েছে আর অমনি সে একটা লক্ষ্মীপ্যাঁচা হয়ে উড়ে পালিয়েছে—একেবারে মুড়ো রথের চুড়োয়। সেখান থেকে প্যাঁচাটা আমায় ডাকছে, ‘ঘু-ঘু-ঘু মেতি—সু পেটে—ফুঁ।’
‘ও কিচ্কিন্দে প্যাঁচাটা বলে কি?’
‘যাও না, তোমায় খেলতে ডাকছে।’
‘ও কিচ্কিন্দে, আমি তো উড়তে পারিনে, তবে ওর কাছে যাই কেমন করে?’
‘উড়বে নাকি?’ বলেই হারুন্দে যেমন আমার পেটে এক ফুঁ দিয়েছে আর আমি হয়ে গেছি একটা হুমো পাখি হুতুম থুমো। গোবিন্দর মা যেমন আমাকে ধরতে এসেছে আর আমি উড়ে গিয়ে একেবারে মুড়ো রথের চালে গিয়ে বসেছি। প্যাঁচাটা আমাকে হঠাৎ দেখেই একটু ভয় খেয়ে গেছে, তারপর যখন দেখছে আমি তারই বড়দাদা হুতুম প্যাঁচা তখন সে আস্তে-আস্তে কানের কাছে এসে বলছে—
একটি কথা।—কি কথা?
ব্যাঙের মাথা।—কি ব্যাঙ?
সরু ব্যাঙ।—কি সরু?
বামুন গরু।—কি বামুন?
ভাট বামুন।—কি ভাট?
গো ভাট।—কি গো?
চিতি গো।—কি চিতি?
সোনা চিতি।—কি সোনা?
গিনি সোনা।—কি গিনি?
মানুষের গিনি।—কি মানুষ?
বনমানুষ।—কি বন?
খেজুরবন।—কি খেজুর?
ঠিক মজুর।—কি ঠিক?
বেঠিক।
‘ঠিক-ঠিক।’ বলে উড়তে-উড়তে আমরা গিয়ে খেজুর গাছে বসেছি। সেই খেজুর গাছের তলায় কতকালের পোড় একটা আখবাড়ি রয়েছে, তাতে একখানা মরচে-ধরা আখমাড়ার কল, একটা ভুঁড়োশেয়ালি সেই আখমাড়া কলটা ধরে ঘোরাচ্ছে—ক্যাঁচকোঁচ। প্যাঁচা দেখেই বলছে—
আখবাড়ি পাশে
ভুঁড়োশেয়ালি নাচে।
আমি বলছি, ‘তারপর?’
‘তারপর শুনবে গল্পটা? তবে শোনো’—বলেই প্যাঁচা বলছে—
‘এক যে ছিল শেয়াল
তার বাপ দিচ্ছে দেয়াল।’
‘বুঝেছ ভাই—সে ভারি কাণ্ড! বুঝেছ কিনা—“শেয়াল তার বাপ দিচ্ছে দেয়াল!” শেয়াল দেয়াল দিচ্ছে না, দিচ্ছে তার বাপ—বুঝেছ? সে ভারি কাণ্ড। শেয়ালের বাপের নাম কি জানো?—
‘তার বাপের নাম রতা।’
‘সে রতা শেয়াল, বুঝেছ কিনা—দেয়াল যে দিচ্ছে সে রতা শেয়াল; —শেয়ালের বাপ শেয়াল, বুঝেছ?’
‘এক যে শেয়াল
তার বাপ দিচ্ছে দেয়াল ॥
তার বাপের নাম রতা
ফুরোল আমার কথা ॥’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কি?’
‘এই বুঝি তোমার গল্প হল? দেখ ভাই প্যাঁচ, একটা যদি বড় গল্প না বল, তবে তোমার সঙ্গে এই আড়ি দিলুম বলে!’
‘রোসো-রোসো আড়ি দিও না। মনে পড়েছে একটা মস্ত ব্যাঙের গল্প; বলি শোনো’ —বলেই প্যাঁচা আরম্ভ করেছে—‘তাঁতি ঘরে ব্যাঙের বাসা! তাঁতঘর দেখেছ তো? সেই যেখানে খট্-খট্ করে তাঁতি-বুড়ো মাকু চালায় আর সর্-সর্ করে কাপড় বার হয়—দশ হাতি, বারো হাতি, চোদ্দ হাতি, খ্যাপা হাতি, পোষা হাতি!’
‘না ভাই, তাঁতশালা কখনো দেখিনি, কিন্তু কাপড়ের হাতি আমি অনেক দেখেছি, আসল হাতির মতোই সেগুলো মোটাসোটা!’
‘আচ্ছা গোল কোরো না, শোনো ফের বলছি—
‘তাঁতি ঘরে ব্যাঙের বাসা, তিনটে পেড়েছে ছানা।
খায় দায় নিদ্রা যায়, তাঁতঘরে তার থানা ॥’
‘বুঝেছ?’
‘বুঝেছি, তাঁতির ঘরে তিনটে ব্যাঙের ছানা হল। কিন্তু তারপর কি হল তো বুঝতে পাচ্ছিনে!’
‘এঃ, তুমি ভারি বোকা! তাঁতির ঘরে ব্যাঙের তিনটে ছানা হল, বাড়ির সবাই যখন খেয়ে-দেয়ে ঘুমোতে গেল, তখন তাঁতি-বুড়ো গিয়ে থানায় খবর দিচ্ছে—দারোগা সাহেব, তিনটে ব্যাঙের ছানা আমার সব সুতো খেলে—সর্বনাশ করলে।
‘কি, আমি থাকতে ডাকাতি? রামসিং আমায় এক ছিলিম তামাক দাও আর তাঁতির সঙ্গে গিয়ে বেঁধে আনো সেই ব্যাঙ তিনটেকে!—বলেই দারোগা-সাহেব গুড়গুড়ি টানতে-টানতে খাটিয়াতে শুলেন। যেমন শোয়া আর অমনি ঘুম! এখন তো—“খায় দায় ঘুম যায়, তাঁতঘরে তার থানা”—এটার মানে বুঝলে? তারপর শোনো—
‘সুবুদ্ধি তাঁতির ব্যাটা কুবুদ্ধি ধরিল।
তার একটি ছানারে পায়ে চেপে মেল ॥
‘সুবুদ্ধি তাঁতি ঠিক কাজ রেছিল—রামসিং এসে তিনটি ছানাকেই পুলিশে নিয়ে জরিমানা করে দিত—কিন্তু সুবুদ্ধির ছেলে কুবুদ্ধি করেছে কি, আস্তে আস্তে একটি ব্যাঙকে ধরেছে, ধরেই পা দিয়ে এক টিপ্নি! আর অমনি ফটাস করে ভুঁইপটকার মতো ফেটে গেছে ব্যাঙের পেট, যেমন ফটাস করে শব্দ হওয়া অমনি দুটো ব্যাঙ পগার পার—একটা গিয়ে মাঠের ধারে গাছে চড়েছে, আর একটা করেছে কি, বলি তবে শোনো—
‘আর একটি ব্যাঙ ছিল বড়ই সিয়ানা।
লিখন পাঠায়ে দিল পরগনা-পরগনা ॥
আজিপুর গাজিপুর মধুপুর ডাঙা।
লক্ষ ব্যাঙ এল তথা চক্ষু করে রাঙা ॥
‘এসেই কুবুদ্ধির মুখে লাথি! লক্ষ ব্যাঙের রাঙা চোখ দেখেই তাঁতির পোর প্রাণ উড়ে গিয়েছিল, তার ওপর ব্যাঙের লাথি খেয়ে সে তত আধ-মরা হয়ে থাক। এদিকে সুবদ্ধি আর রামসিং দোবে আসছেন রাজহাটের মাঠ দিয়ে—এমন সময় হল কি? না—
‘সুতোনাতা নিয়ে তাঁতি যাচ্ছে রাজার হাট।
লক্ষ ব্যাঙের তাড়াতাড়ি আগুলিল ঘাট ॥
‘যেমন ব্যাঙগুলোকে দেখা অমনি রামসিং তালপাতার-সেপাই—বাপরে! বলে, মেরেছে এক দৌড়। তাঁতি তখন আর করেন কি, না—
‘তরাসে মরাসে তাঁতি গাছেতে উঠিল।
‘একটা ছিল মুড়ো খেজুর গাছ, যেমন তাড়তাড়ি ওঠা আর অমনি—
‘কোথা ছিল কোলাব্যাঙ মুখে লাথি মেল ॥
‘লাথির ওপর লাথি! কোলাব্যাঙের লাথি খেয়ে তাঁতি তো মরো-মরো; ধপাস করে পড়েছে খেজুরতলায় আর অমনি সব ব্যাঙ তাকে এসে ধরেছে! তখন সেই সিয়ানা ব্যাঙ বলছে—ছেড়ে দাও—ছেড়ে দাও—
‘মেরো না ধর নাল ভাই তাঁতিরে গোঁসাই।
‘এখনি দারোগা এসে হাতে হাতকড়ি দেবে। পায়ে বেড়ি পড়লে তখন পালানো দায়। সরে পড় এইবেলা!—বলতেই যত ব্যাঙ আজিপুরে গাজিপুরে চম্পট! এদিকে তো—
‘মেরো না ধর না, ভাই তাঁতিরে গোঁসাই।
‘ওদিকে রামসিং এসে তার হাতে দিয়েছে হাতকড়ি।’
‘কেন, তাঁতির হাতে দড়ি পড়ল কেন?’
‘তার ছেলে কুবদ্ধি ব্যাঙ মেরেছে বলে।’
‘কুবুদ্ধির কি হল?’
‘কুবুদ্ধির পায়ে বেড়ি পড়ল। আর কি হবে?’
‘পরে সেই রামসিং দোবের কিছু হল না?’
‘হল বৈকি। ব্যাঙের দিষ্টিতে তার মুখ পুড়ে গেল, মুখে আর তার কিছু রোচে না—
‘নিম লাগে মিষ্টি!
সন্দেশ লাগে তেতো!
মুড়কি বলে ঝাল!
‘সে কেবল ঘুষ খেয়ে-খেয়ে ছিষ্টি ব্যাঙেরা গালাগালি খেয়ে-খেয়ে বেড়াতে লাগল।’
‘আর সেই দারোগা কি করলে?’
‘সে আর করবে কি? ব্যাঙের তার গায়ে যত ধুলো দিলে সে তা ফুঁয়ে উড়িয়ে মনের আনন্দে গায়ে ফুঁ দিয়ে বেড়াতে লাগল।’
বলেই যেমন প্যাঁচা ফুঁ দিয়েছে আর অমনি সেই ফুঁ এসে আমার গায়ে লেগেছে। যেমন গায়ে লাগা আর আমি মানুষ হয়ে যাওয়া, যেমন মানুষ হওয়া আর ধুপুস করে ভাদ্দর মাসের তালের মতো মাটিতে পড়া আর ভুঁড়োশেয়ালি খপ্ করে আমাকে তুলে দে-ছুট! এক ছুটে শেয়ালটা আমাকে তালতলাতে এনে হাজির করেছে। সেখানে একজোড়া ছেঁড়া তালতলার চটি পড়েছিল, সেইটে মুখে করে এনে শেয়াল আমাকে বলছে, ‘খাবে?’
আমি বলছি, ‘দূর! আমি কেন জুতো খেতে গেলুম! তুই খা!’
অমনি শেয়ালটা কসকস করে চটি জুতোটা গিলে ফেলেছে, তারপর আমার দিকে চেয়ে বলছে—
‘বাপ ভনরি!
কি খাইতে সাধ করেছ? —চালদা মসুরি?’
আমি শেয়ালকে বলছি, ‘দেখ শেয়াল, আমার নাম ভনরি নয় আর আমি তোমার বাপও নয়। আমাকে ভুল করে এখানে এনেছ। আমি চালদা পেলে খাই কিন্তু মসুরি খাটিয়ে তার ভেতর আমরা ঘুমোই, মসুরি আমি কিছুতে খাব না!’
শেয়ালটা বোধহয় আমার কথা বুঝলে না, সে আবার বললে—
‘বাপ নন্দলাল!
কি খাইতে সাধ করেছ? —পাকা তাল?’
‘ওরে বাপু, আমি নন্দলালও নই, ভনরিও নই, তোর বাপও নই! তোর বাপের নাম হল রতা আর আমার নাম হল আবু। দুটো তাল পেড়ে দাও তো খাই, নয়তো বল ঘরে যাই। তালের বড়া কিম্বা তালফুলুরি, না হয় গাছপাকা তাল, এই তিনটের একটা যদি দিতে পার তো থাকি, নয়তো আমাকে বাপু পিসির বাড়ি রেখে এসো।’
‘এই তো তুমি অন্যায় কইলে। তাল তোমাকে দিই কেমন করে? তালগাছে কে থাকে জানো? বলেই শেয়ালটা বলছে—
‘এক যে আছে একা-নোড়ে,
সে থাকে তালগাছে চড়ে।
দাঁত দুটো তার মুলোর মতো,
পিঠখানা তার কুলোর মতো!
কান দুটো তার নোটা-নোটা,
চোখ দুটো আগুনের ভাঁটা!
কোমরে বিচুলি দড়ি
বেড়ায় লোকের বাড়ি-বাড়ি।
তাল খেতে যে কাঁদে—
তাকে ঝুলির ভেতর বাঁধে।
গাছের ওপর চড়ে
আর তুলে আছাড় মারে।’
‘ওইরে একা-নোড়ে!’ —বলে শেয়ালটা যেমন আমায় ভয় দেখিয়েছে অমনি আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলেছি, আর অমনি কি একটা তালগাছে উড়ে এসে বসেছে আর মাথা নেড়ে-নেড়ে বলছে—
‘কান-কাটা বলে আমি
এই গাছেতে আছি।
যে ছেলেটা কাঁদে তার
কানে ধরে নাচি ॥’
আমার তখন আরো ভয় হয়েছে, আমি দুই হাতে কান চেপে ধরে ফোঁস-ফোঁস করে ফুঁপিয়ে একেবারে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছি। অমনি শেয়াল বলে উঠেছে, ‘কেয়া হুয়া কেয়া হুয়া!’ আর সেখানে যত শেয়াল ছিল সব ছুটে এসে ডাকতে লেগেছে, ‘ক্যাহুয়া-ক্যাহুয়া-ক্যাহুয়ারে-ক্যাহুয়া?’
বুড়ি খ্যাঁকশেয়ালি ছিল গর্তের ভেতর, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে বলছে, ‘তোরা কি গোল লাগিয়েচিস! ভালো করে দেখ দিকিন কে?’
যত ভুঁড়োশেয়াল আমার মুখের কাছে এসে আলোয়া ধরে-ধরে দেখছে আর খ্যাঁ-খ্যাঁ করে হেসে পালাচ্ছে। এমন সময় অন্ধকার থেকে হাতি আমার পিঠে শুঁড় বুলিয়ে বলছে—
‘ওরে-বাপ নয় রে মানুষ
উড়ে পড়ল ফাঁনুশ!’
মানুষের নাম শুনেই শেয়ালদের ভয় হয়েছে। তখন তারা সব ল্যাজ গুটিয়ে হাতজোড় করে বলছে—
‘বাপধন রাজার নাতি
চড়ে কে গো মস্ত হাতি!’
যেমন শেয়ালরা এই কথা বলা আর অমনি হাতি শুঁড়ে করে তুলে নিয়ে আমাকে পিঠে উঠিয়েছে! হাতিতে চড়ে আমার ভারি আহ্লাদ হয়েছে, আমি হাততালি দিয়ে বলছি—
‘তাই-তাই-তাই মামার বাড়ি যাই।’
অমনি হাতি বলছে, ‘তোমার মামার বাড়ি কোথায় বল তো?’
‘আমার মামাবাড়ি যশোর দক্ষিণডিহি চেঙুঠে পরগনা।’
‘আচ্ছা চল সেখানেই যাচ্ছি’—বলেই হাতি চলতে আরম্ভ করলে—হুস-হাস থপাস-থপাস! দেখতে-দেখতে মামাদের কলাবাগানে এসে পড়েছি। সেখানে দেখি হনুমান হুপ-হাপ করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। যেমন আমি বলেছি—
‘ও হনুমান, কলা খাবি?
জয়জগন্নাথ দেখতে যাবি?’
অমনি হনুমান দাঁত-খামাটি দিয়ে মুখ ভেংচে বলছে, ‘রাম রাম! রোস তো আদুরে ছেলে! তোর মামার বাড়ি যাওয়া বার করছি!’ বলেই হনুমান একটি কলা নিয়ে যেমন ডেকেছে—
‘আদুরের কলাগুলি বাদুড়ে খায়,
ধর-ধর খোকামণি মামার বাড়ি যায়।’

আর অমনি দুটো বাদুড় এসে ছোঁ মেরে হাতির পিঠ থেকে আমাকে তুলে নিয়ে দৌড়—একেবারে পিসির তেঁতুলতলায়! সেখানে আমাকে এনে ফেলেই বাদুড় দুটো হয়ে গেছে হারুন্দে আর কিচ্কিন্দে! তাদের দেখে আমার ভারি রাগ হয়েছে, কেমন মামার বাড়ি যাচ্ছিলুম, কেবল যেতে দিলে না আমাকে এই দুটো বাদুড়! যেমন এই কথা মনে করেছি আর অমনি কিচ্কিন্দে বলছে, ‘মামার বাড়ি যাচ্ছিলে তো যাচ্ছিলে, কলাবাগানে হনুমানজিকে বলতে গিয়েছিলে কেন—
‘ও হনুমান, কলা খাবি?
জয়জগন্নাথ দেখতে যাবি?
‘জয় সীতারাম দেখতে যাবি—বলতে পারনি? হনুমান রেগে তোমার ইস্কুলের ছুটি কেটে দিয়েছে, এখন আর তুমি পিসির বাড়ি থাকতে পারবে না, এখন তোমায় গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় পড়তে হবে আর জোড়া-বেত খেতে হবে। চল’-বলেই আমাকে পালকিতে ভরে হারুন্দে আর কিচ্কিন্দে পাঠশালায় নিয়ে চলল।
‘ওরে আমাকে তোরা ছেড়ে দে, আমি এমন কাজ আর কখনো করব না। ও কিচ্কিন্দে, তোর পায়ে পড়ি, আমাকে গুরুমশায়ের কাছে দিস্নে, আমি পড়ব না, আমি ছবি লিখব, আমি যাব না পাঠশাললে যাব না—আ—আ’ বলে পালকির ভেতর আমি হাত-পা আছড়ে কাঁদতে লেগেছি। জোড়া-বেতের নাম শুনে ভারি ভয় হয়েছে। হারুন্দে কিচ্কিন্দে পালকির দুই দরজা চেপে ধরে আমাকে গুরুর পাঠশালে হাজির করে বলছে—
‘গুরু-মশাই গুরু-মশাই
তোমার পোড়ো হাজির।
চড়চড়িয়ে পড়ুক বেত
হোক বিচার কাজির ॥’
শুনছি গুরুমশায় ঘরের ভেতর থেকে মন্তর পড়ছেন—
‘আয় ধুগ্ড়ি
ধুগ্ড়ি মন্তর গায়।
চড়চড়িয়ে পড়ু ক বেত
পড়পড়িয়ে যায়।।’
যেমন এই মন্তর পড়া আর দেখি জোড়া-বেত নাচতে নাচতে গুরুমশায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সঙ্গে-সঙ্গে মাছরাঙা গুরু নাকের ওপরে চশমা লাগিয়ে এসে বলছেন, ‘পড়—

‘লিখিবে পড়িবে মরিবে দুখে।
মৎস ধরিবে খাইবে সুখে।।’
আমার তখন ভয়ে কি পড়া আসে! আমি বলে ফেলেছি—
‘লিখিবে পড়িবে থাকিবে সুখে।
মৎস্য ধরিবে মরিবে দুখে ॥’
অমনি গুরু এক বেতের খোঁচা দিয়ে বলছেন, ‘ভুল হল! লেখাপড়া করলে কি হয়? সুখে থাকে? না দুঃখে থাকে?’
আমার তখন মনে পড়েছে পিসির বাড়িতে সব উল্টো। আমি অমনি ফস করে বলেছি, ‘দুঃখে থাকে মশাই, দুঃখে থাকে।’
‘ভালো রে ভালো! আচ্ছা তোর নাম তো অবু? লেখ দেখি—
‘অবু তবু গিরি সুতা।
মায়ে বলে পড় পুতা ॥
পড়লে শুনলে দুধি ভাতি।
না পড়লে ঠ্যাঙার গুঁতি ॥’
আমি জানি সব উল্টো লিখতে হবে, না হলে বেত, কাজেই আমি মাটিতে খড়ি দিয়ে একটা চৌকো ঘর কেটে লিখছি—প্যাঁচা-পেঁচি দুই ভূতা। কিন্তু যেমন লিখছি—মায়ে বলে পড় পুতা—অমনি আমার মাকে মনে পড়ে গেছে, আমি খড়ি ফেলে দিয়ে একেবারে পাঠশালা থেকে দৌড়! এক-দৌড়ে ষষ্ঠীতলায় হাজির। সেখান থেকে দেখছি—গঙ্গার ওপারে তুলসীগাছের পাতা ঝুর-ঝুর করছে, তারই তলায় মা-আমার দুগ্গো-পিদিম জ্বালছেন! ওদিকে দেখছি গুরুমশায় ঠ্যাঙার গুঁতি হাতে, সঙ্গে হারুন্দে, কিচ্কিন্দে আর সেই মনসা-বুড়ো আর আংলা-বাংলা যত ভূত-পেরেত! যেমন গুরুকে দেখা আর ‘মা!’ বলে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়েছি, আর আমবাগানে আমার ছোট-ছোট দাদা-দিদিরা আম-কুড়োতে লেগেছে। আমিও মায়ের বাড়িতে আঁচল ভরে শিল আর আম কুড়োতে লেগে গেছি। ভূত-পেরেত কেউ সেখানে আসবার জো নেই। এসেছে কেবল আমার সঙ্গে উড়তে-উড়তে গোবিন্দর মায়ের ভোঁদড়-ছেলে, আর আমার বন্ধু সেই লক্ষ্মীপ্যাঁচাটি। তাকে একটা আমগাছের কোটরে বাসা বেঁধে দিয়েছি, রোজ রাত্তিরে সে আমার গায়ে ফুঁ দেয় আর আমি মাসির বাড়ি, পিসির বাড়ি উড়ে বেড়াই। আমার ভূতপত্রী লাঠিটি কিন্তু গোবিন্দর মা চুরি করে রেখে দিয়েছে। লাঠি নইলে তো চলতে পারি না। তোমরা সবাই চাঁদা করে যদি আমাকে একটা আঁকাবাঁকা লাঠি কেনবার পয়সা দাও তবে সেইটে নিয়ে আমি একবার মামার বাড়ি যাই, আর তোমাদের জন্যে বাঁকানদীর ধার থেকে অনেক আঁকাবাঁকা ছবি যোগাড় করে আনতে পারি।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন