অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
‘আমার নাম হারুন্দে নয়—হারুন-অল-রসিদ, বোগদাদের নবাব খাঞ্জা খাঁ জাহান্দর শা বাদশা। এখন হয়েছি হারুন্দা।’
বোগদাদের হারুন-অল-রসিদের কথা আরব্য উপন্যাসে পড়েছি, আবু হোসেনের থিয়েটারেও তাকে দেখেছি—কখনো সদাগর সেজে বেড়াচ্ছে, কখনো ফকির, কখনো বা কাফ্রি চাকর। এখন আবার তিনি উড়ে-বেহারা সেজে এলেন দেখছি!
অবাক হয়ে হারুন্দের মুখের দিকে চেয়ে আছি—কখন আবার সে ফকির হয়, কি বাদশা হয়! আমাকে হাঁ করে থাকতে দেখে বলছে, ‘আমার কথায় বিশ্বাস হল না বুঝি? আচ্ছা দেখ!’ বলেই একবার হারুন্দে দাড়িতে গোঁফে মোচড় দিয়েছে। আর অমনি দেখি, সে হারুন্দে আর নেই! ইয়া দাড়ি, ইয়া গোঁফ, মাথায় বকের পালক-গোঁজা পাগড়ি, গায়ে চিনেপোতের জোব্বা-কাব্বা পায়ে ঢিলে ইজের আর দিল্লির লপেটা পরে হাতে বাঁকা এক তলোয়ার নিয়ে দেখা দিয়েছে—হারুন বাদশা! ফিক করে হেসে আমাকে সে যেমন সেলাম করেছে আর অমনি আমি ফস করে দেশলাই জ্বেলে ফেলেছি। বাদশার হাতে গলায় মাথায় হীরে-মানিকের গহনাগুলো এমন ঝকঝক করে উঠেছে যে চোখে ধাঁধা লেগে গেছে। কিচকিন্দে ছিল পাশে; সে অমনি ফুঃ করে আলোটা নিভিয়ে দিয়েছে। আর কোথায় বাদশা? —যে হারুন্দে সেই হারুন্দে!
আলো জ্বালতে হারুন্দে ভারি রেগে গেছে, কিছুতে আর গল্প বলতে চায় না। অনেক হাতে-পায়ে ধরে তাকে ঠাণ্ডা করেছি তবে সে আবার গল্প বলছে, ‘দেখলে তো আমিই ছিলুম বোগদাদের নবাব খাঞ্জা খাঁ জাহান্দর শা বাদশা হারুন-অল-রসিদ! আর ওই যে কালো কিচকিন্দে উড়েটা তোমার ওপাশে চলেছে, ও ছিল মসুর—আমার কাফ্রি চাকর। তুমি ফস করে যেমন আলো জ্বেলেছিলে ও তেমনি খপ করে তোমার মাথা কেটে ফেলতে পারে যদি আমি হুকুম দিই। দেখবে? মসুর—’
‘না! না!’ বলেই আমি হারুন্দের মুখ চেপে ধরেছি, পাছে হুকুম বেরিয়ে পড়ে। কিচকিন্দে আমার গা টিপে বলছে, ‘শোনো কেন? ওটা একটা পাগল, আমি কোনো-পুরুষে ওর চাকর নই।’
একটা ভারি মজা দেখছি—কিচকিন্দে আমার গা-টি ছুঁয়েছে আর তার মনের কথা পষ্ট-পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, কিচকিন্দেকে মুখ দিয়ে একটি কথাও বলতে হচ্ছে না।
কিচকিন্দের কথায় সাহস পেয়ে হারুন্দের মুখ ছেড়ে দিলুম। ছাড়তেই শুনলুম, হারুন্দের মুখের হুকুমটা গোঁ করে তার বুকের ভেতর নেমে গেল; হারুন্দেও আর রাগ-টাগ করলে না।
‘দেখলে তো!’ বলেই সে আবার গল্প শুরু করল: ‘একদিন আমি আমার বসরাই-গোলাপবাগ বলে যে বাগান সেখানে বসে গুড়গুড়িতে তামাক খাচ্ছি, আর গোলাপ-জলের ফোয়ারার ধারে বসে ওই মসুর আমার পোষা বুলবুল বোস্তাঁর সোনার খাঁচাটা ধুয়ে-মেজে সাফ করছে, এমন সময় সিন্ধবাদ নাকি সাত সমুদ্দুরের জলে সাতখানা জাহাজ-ডুবি করে এসে হাজির—ভিজে কাপড়ে দু-হাতে আমাকে সেলাম ঠুকতে-ঠুকতে। মসুরকে বলেছি আনতে একখানা চৌকি, না, মসুরটা এমন গাধা যে এনেছে একটা টুল। আমি রেগে মসুরের মাথা কাটতে যাব আর অমনি সিন্ধবাদ আমার দু-পা জড়িয়ে ধরে বলছে, হুজুর মসুরকে মাপ করুন—অনেকদিনের পুরোনো চাকর। শুনুন, এবার কি আশ্চর্য কাণ্ড দেখে এসেছি। এবারে আমি জাহাজ নিয়ে হিন্দুস্থানের দিকে বাণিজ্য করতে গিয়েছিলুম, কাঁচের বাসনের বদলে অনেক হীরে-জহরত হিন্দুস্থানের বোকা লোকগুলোর কাছ থেকে ঠকিয়ে নিয়ে দেশে ফিরে আসছি, এমন সময় জাহাজ আমাদের ঝড়ে পড়ল। এমন ঝড়ও কখনো দেখিনি, সমুদ্দুরে এমন ঢেউও কখনো পাইনি! পাল, দড়ি, হাল, দাঁড় ভেঙেচুরে ছিঁড়ে-খুঁড়ে কোথায় উড়ে গেল তার ঠিক নেই! সাতদিন সাতরাত আমাদের জাহাজ মোচার খোলার মতো জলে ভাসতে-ভাসতে শেষে এসে কালাপানিতে পড়ল; সেখানে সমুদ্দুরের জল, হুজুর, ওই মসুরের মতো কালো, আর যেন রেগে টগবগ করে ফুটছে! যেমন কালাপানিতে জাহাজ পড়েছে আর মাঝিমাল্লা সবাই আল্লা-আল্লা করে কেঁদে উঠেছে। যত বলি—কাঁদিস কেন? কি হয়েছে। বল? —কেউ আর কথার উত্তরেই দেয় না, কেবল ডাঙার দিকে একটা কাফেরদের মন্দির দেখায় আর ভেউ-ভেউ করে কাঁদে। এমন সময় জাহাজের কাপ্তেন আমার কাছে এসে বললে—কর্তা আর দ্যাহেন্ কি? আল্লার নাম ল্যান! ওই যে কাফেরদের মন্দির, ওর মাথায় একটা জাঁতার মতো চুম্বক-পাথর আছে, তারি টানে জাহাজের যত লোহার পেরেক সব একটি-একটি করে খুলে ওই মন্দিরের গায়ে যেয়ে লাগবে আর জাহাজের কাঠগুলি ভুস করে আলগা হয়ে মাঝিমাল্লা মালমাত্তা সব জলে যাবে! কত্তা সব জলে যাবে! বলতে-বলতে দেখি, জাহাজ থেকে পেরেকগুলো খুলে-খুলে বিষ্টির মতো গিয়ে সেই মন্দিরের চুড়োয় চুম্বক পাথরটায় লাগছে। দেখতে-দেখতে আমাদের মুরগি রাঁধবার লোহার হাঁড়ি আর রুটি সেঁকবার তাওয়াখানা গেল উড়ে। আমার হাতে আমার হীরে-জহরতের লোহার সিন্দুকের চাবিটা ছিল, সেটাও দেখি পালাই-পালাই কচ্ছে। আমি—না আল্লা, না খোদা—চাবিটাকে মুখে পুরে আমার লোহার সিন্দুকটা জাপটে ধরেছি। এদিকে ভুস করে জাহাজটি ডুবে গেছে। আমি কিন্তু ঠিক ভেসে আছি; চুম্বকের টানে লোহার সিন্দুক আমার ঠিক ভাসতে-ভাসতে গিয়ে ডাঙায় ঠেকেছে। আমি টপাস করে বালিতে লাফিয়ে পড়েছি আর অমনি হুজুর—আমার সেই লোহার সিন্দুক, আমার অনেক টাকার সিন্দুক হুজুর, অনেক-কষ্টে-ঠকিয়ে-নেওয়া হীরে-জহরতে-ভরা সিন্দুক হুজুর, বোঁ করে উড়ে পালিয়েছে—উড়ে-মেড়োদের সেই মন্দিরের চুড়োয়!’ —বলেই সিন্ধবাদ মাটিতে লুটোপুটি খেয়ে কাঁদতে লাগল।

আমি সিন্ধবাদের হাত ধরে উঠিয়ে তাকে ঠাণ্ডা করে টুলে বসিয়ে বললেম, ‘সিন্ধবাদ, শোনো। জানো আমি হারুন-অল-রসিদ, আমার সামনে মিথ্যা কথা বললে তোমার মাথা কাটা যাবো জানো!’
সিন্ধবাদ বললে, ‘জানি হুজুর, সেইজন্যেই তো আমার দুঃখু! সব সত্যি বলতে হল হুজুর, একটি মিথ্যা কথা দিয়ে এবারকার গল্পটা সাজাতে পারলুম না। ওরে আমার লোহার সিন্দুক!’ —বলেই সিন্ধবাদ টুল থেকে ঘুরে পড়েছে। একেবারে অজ্ঞান অচৈতন্য। মসুর অমনি তাড়াতাড়ি তার মুখে জল দিতে এসেছে। আমার ভারি রাগ হল, মসুরকে এক লাথি মেরে বললুম, গাধা! আগে ওর মুখ থেকে সিন্দুকের চাবিটা এইবেলা বার করে নে। জেগে উঠলে কি আর দেবে?
মসুর অমনি সিন্ধবাদের মুখে আঙুল দিয়ে বলছে, ‘কই কত্তা চাবি তো পাইনে!’
‘পাসনে কি রে, দেখ জিবের নিচে!’
‘পাইনে তো কত্তা!’
‘দেখ্, দেখ্, গলায় আটকেছে!’

‘চাবি তো নেই কত্তা।’
‘খেয়ে ফেলেছে রে গাধা, খেয়ে ফেলেছে, পেট চিরে দেখ পাজি!’
মসুর অমনি ঝট করে তার পেট চিরে ফেলেছে আর দেখি পেটের ভেতর বজ্জাত সওদাগর তার লোহার সিন্দুকের চাবিটা লুকিয়ে রেখেছে! নিশ্চয় আমার কাছে মিথ্যা কথা বলত—‘যেমন আল্লা বলে কেঁদেছি হুজুর, অমনি চাবিটাও উড়ে পালিয়েছে।’
মসুর চাবিটা গোলাপ জলে ধুয়ে আমার হাতে এনে দিলে। আমি মসুরকে হুকুম করলুম, আমার সেই উড়ো-সতরঞ্চি আর মুড়ো-দূরবীনটা আনতে—যাতে পাখির মতো উড়ে-উড়ে হাওয়া খেয়ে বেড়াই আর সগ্গ-মত্ত-পাতালের জিনিস ঘরে বসে দেখি।
সতরঞ্চি আসতেই আমি তার ওপরে তাকিয়া ঠেস দিয়ে দূরবীন হাতে উঠে বসেছি, মসুরও আমার পায়ের কাছে বসেছে—পা টেপবার জন্যে। যেমন হুকুম দেওয়া—চলো কালাপানি! অমনি সতরঞ্চি আকাশ দিয়ে উড়ে চলেছে। তামাক খেতে গিয়ে হাতের কাছে নল পাইনে! মসুরটা এমনি গাধা যে গুড়গুড়িটা তুলে নিতে ভুলে গেছে। ভাগ্যি পকেটে কটা সিগারেট ছিল, তাই রক্ষে! মসুরও বেঁচে গেল, আমিও তামাক খেয়ে আরাম পেলুম।
বোগদাদ থেকে বেরিয়ে ঘণ্টাখানেক এসেছি কি না, এমন সময় মসুর বলছে, ‘হুজুর, একটা কালো মন্দিরের চুড়ো দেখা যাচ্ছে, ঠিক ওই ডানদিকে।’
তাড়াতাড়ি দূরবীন কষে দেখি সেটা মক্কার মসজিদ। মসুর এত বড় মসজিদ কখনো চক্ষেও দেখেনি। সে তো অবাক।
আবার খানিক পরে কাফ্রিস্থানের ওপর দিয়ে আমরা উড়ে চলেছি। তখন মসুরের হাসি দেখে কে। সে বলছে, ‘ওই দেখা যাচ্ছে সাহারা, হুজুর! ওটা একটা সমুদ্দুর শুকিয়ে গিয়ে চড়া পড়ে গেছে। ওরই ওদিকে দেখুন একটুখানি নোনা জল, তারই ওপারে ফিরিঙ্গি মুলুক আর আমাদের রূপের বাদশার কস্তুন্তুনিয়ার কেল্লা দেখা যাচ্ছে। ওই দেখুন হুজুর, বালির ওপর দিয়ে সার-বেঁধে উটের কাফিলা চলেছে; ওই খেজুরতলায় ফালহানি জল তুলছে, ওই মিসির শহর আর ওই দেখুন সেকেন্দ্রিয়ার কুতুবখানা, হুজুর! ওখানে দুনিয়ার কেতাব জমা আছে। হুজুর ওই যে দেখেন দুটো পব্বতের মতো, ও দুটো হচ্ছে কাফ্রিস্থানের বাদশার কবর। এত বড় কবর আর জগতে নেই। কেবল সোনা-রুপো-হীরে-জহরতে ঠাসা আর তারই মাঝে সব মরা মানুষ শুয়ে আছে—হাজার বরষ ধরে, তবু তাদের দেখে মনে হয় যেন এই মরেছে, নয়তো ঘুমিয়ে আছে। কিমিয়াবিদ্যার জোরে এখনো হাজার-হাজার বরষের মরা মানুষগুলো। টাটকা রয়েছে হুজুর! যদি দেখতে চান তো নেমে চলুন।’

আমি মসুরকে ধমকে বললুম, ‘ওসব জীনের কারখানা আমি দেখতে চাইনে। ওদিকে ওটা কি দেখা যাচ্ছে?’
‘হুজুর ওটা নীল নদী, ওখানে নীলপদ্ম পাওয়া যায়। হিন্দুদের যমুনা—আর কাফ্রিদের ওই নীল নদী! হুজুর, ওর ওপর একবার নৌকোয় করে হাওয়া খেয়ে দেখুন, দিল্ খুশ হয়ে যাবে। ওই নদীর ধারে আমার বাড়ি দেখা যায়, ওই আকের খেতের ধারে হুজুর, ওই আমাদের বুড়ো গাধাটি আমার দিকে মুখ তুলে চেয়ে আছে হুজুর! আমি হিন্দুস্থানে হীরে-জহরতের খোঁজে যেতে চাইনে, আমাকে আমার দেশের এই আকের খেতে ছেড়ে দিয়ে যান হুজুর!’
আমি দেখলেম বিপদ। মসুরকে ছাড়লে আমার তো একদণ্ড চলবে না। তামাক দেয় কে? পা টেপে কে? হিন্দুস্থানে একলাই বা যাই কি করে—সিন্ধবাদের জহরত লুঠ করতে?
আমি মসুরকে কিছু না বলে সতরঞ্চির ওপরে পুব-মুখো হয়ে ঘুরে বসেছি—হিন্দু রাজাদের মতো। এতক্ষণ আমি মোছলমানি কেতা-মতো পশ্চিম-মুখো বসেছিলুম, সতরঞ্চিও তাই পশ্চিম-মুখো চলছিল; পুব-মুখো বসতেই সতরঞ্চি পুবে ঘুরেছে আর হু-হু করে নীল-নদী পেরিয়ে একেবারে সিস্তান ঘুরে ইস্পাহানে হাজির। সেখানে বুলবুল-বোস্তাঁর ঝাঁক, হাফেজের গান গাইতে-গাইতে আমাদের সঙ্গে সব উড়ে চলেছে; মাটি থেকে সিরাজি সরবত আর ইস্তাম্বুল আতরের খোসবো আসছে। আমারও তেষ্টা পেয়েছে—মসুরেরও খিদে লেগেছে; দুজনে একটা মেওয়ার বাগানের ধারে আকাশ থেকে নেমে এসেছি। মসুরকে দুটো মোহর ফেলে দিয়েছি—দু-বোতল সিরাজি সরবত আনতে। মসুরটা এমনি গাধা! দেখি, খানিক পরে দু-মোহর দিয়ে এক ঝাঁক বেদানা আর আঙর এনে হাজির!
‘সিরাজি কই রে? কতকগুলো শুকনো বেদানা নিয়ে এলি যে!’
‘হুজুর, খোদাবন্দ, জাঁহাপনা! সিরাজি আর পাওয়া যাবে না। দোকানে যে কটা ছিল, একা মসুর—হুজুরের পেয়ারের গোলাম এই মসুর—তা শেষ করেছে!’
ভারি রাগ হল, ধাঁ করে মসুরের নাকে এক ঘুঁষি বসিয়ে দিলুম। মসুরটা সিরাজি খেয়ে একেই টলছিল, ঘুঁষি খেতে চিৎপাত হয়ে পড়ে গেল। মেওয়ার ঝাঁকাটা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে, আর দেখি তার ভেতর একটা সিরাজির বোতল। আমি সেটা কুড়িয়ে মসুরকে বললুম, ‘মসুর, যেমন আমার সঙ্গে চালাকি তেমনি থাক তুমি এইখানে পড়ে, আমি চললুম!’ বলেই যেমন আকাশে উড়তে যাব আর মসুর ধরেছে আমার গুড়-গুড়িটা চেপে, আর বলছে, ‘হুজুর, আমি মসুর হুজুর, কসুর মাপ করুন হুজুর, আমি আপনার পুরোনো চাকর হুজুর, গুড়গুড়ি হুজুর, পায়ের জুতো হুজুর, গোলামের গোস্তাখি মাপ হোক হুজুর।’
গুড়গুড়ি যায় দেখে মসুরকে সেবারের মতো সঙ্গে তুলে নিলুম। তখন আকাশের ওপর দিয়ে সতরঞ্চি হু-হু করে উড়ে চলেছে। দেখতে-দেখতে কাবুল ছাড়িয়ে কান্দাহারে পৌঁচেছে। মসুর বলছে, ‘হুজুর মেওয়াগুলো ফেলে আসা হল—অমন বেদানা।’
আমি অমনি কান্দাহারের একটা মেওয়ার বাগানে সতরঞ্চি নামিয়েছি; সেখানে মানুষের মাথার মতো এক-একটা বেদানা ফলে আছে। মসুর তো দেখেই অবাক।
‘কেমন মসুর, এমন বেদানা কখনো দেখেচিস?’
‘হুজুর, না!’—বলেই মসুর একটা বেদনা ভেঙেছে আর অমনি চারদিক থেকে কাবুলিওয়ালা মোটা লাঠি-হাতে তেড়ে এসেছে। আমি অমনি মসুরকে টেনে নিয়ে সোঁ করে আকাশে উঠেছি; মসুর তো রেগেই লাল। বলে, ‘হুজুর, কেন পালিয়ে এলেন? কাবুলিদের আচ্ছা করে ঘা-কতক দিয়ে আসতুম!’
আমি মসুরকে সাবধান করে দিয়ে বললুম, ‘মসুরকে সাবধান করে দিয়ে বললুম, ‘মসুর, খবরদার আর এমন কাজ কোরো না। মসুর, ওরা যদি আজ তোমাকে ধরতে পারত তবে মমিয়াই করে ছেড়ে দিত, জানো। মমিয়াই দেখেছ মসুর?’
‘হ্যাঁ হুজুর, হাকিমসাহেবের কাছে যে কালো মলম তাকেই তো বলে মমিয়াই!’
‘হ্যাঁ, ঠিক তোমার মতনই কালো। মমিয়াই হয় কিসে জানো?—কালো মানুষের চর্বিতে।’
‘সে কি হুজুর!’
‘হ্যাঁ, শোন তবে—কাফ্রিদের ছেলে কিম্বা যে-কোনো কালো ছেলে কিম্বা দুষ্টু যদি সুন্দর ছেলে হয় তাদের ওই কাবুলিওয়ালারা ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঝুলির ভেতর পুরে এনে একটা মেওয়ার বাগানে ছেড়ে দেয়। সেখানে মনের আনন্দে ছেলেগুলো বেদানা কিসমিস খোবানি আঙুর খেয়ে বেড়ায় আর মোটা হতে থাকে; শেষে মোটা হতে-হতে তাদের গা থেকে চর্বি গড়াতে থাকে, তখন সেই কাবুলিওয়ালাদের হাকিম একটা আগুনের কুণ্ডুর ওপর গরম-জল চাপিয়ে সেই মোটা ছেলেগুলোর পায়ে দড়ি বেঁধে মুরগির মতো নিচে মুখ ওপরে পা করে ঝুলিয়ে রাখে; আগুনের তাতে তাদের সেই চর্বি গলে টপটপ করে সেই কড়ায় পড়তে থাকে। যতক্ষণ একফোঁটা চর্বি থাকবে ততক্ষণ কিছুতে তাদের ছেড়ে দেবে না—তাতে তারা মরুক আর বাঁচুক। এমনি করে মমিয়াই তৈরি হয় মসুর। তোমার মতো মিশকালো ওরা কটা পায়? ধরতে পারলে আজ আর তোমার রক্ষা ছিল না; নিশ্চয়ই মমিয়াই করে ছেড়ে দিত।’ ভয়ে দেখলুম মসুরের ঠোঁট শাদা হয়ে গেছে, ঘুরে পড়ে আরকি! আমি তাকে একটু সিরাজি খাইয়ে ঠান্ডা করলুম।
বলতে বলতে পেশোয়ারে এসে পড়েছি। সেখানে সন্ধে হয়েছে কিন্তু কাবুলিওয়ালার ভিড় দেখে মসুর কিছুতে সেখানে রাত কাটাতে চাইলে না। আমি কত বোঝালুম যে এখানে ইংরেজের রাজ্য—কাবুলিদের কিছু উৎপাত করার জো নেই, কিন্তু মসুর কিছুতে বুঝল না। কাজেই আরো এগিয়ে উড়ে চলতে হল; একেবারে দিল্লির কুতুবমিনারে এসে সতরঞ্চি নামালুম। মসুরটা এমনি ভয় পেয়েছে যে দিল্লির চাঁদনিচকে গিয়ে দুটো দিল্লির লাড্ডু কিনে আনতেও তার সাহস হল না। কি করি, আমরা কুতুবমিনারের চুড়োয় সতরঞ্চি বিছিয়ে শুয়ে পড়লুম। চাঁদ না উঠলে অন্ধকারে আর ওড়া যাবে না।
রাত নটার সময় চাঁদ উঠল। অত বড় চাঁদ—এমন পরিষ্কার চাঁদ হিন্দুস্থান ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। এই চাঁদনিতে দিল্লির চাঁদনিচক আলো হয়ে গেছে; রাস্তায় সব লোক বেরিয়ে হাওয়া খাচ্ছে, গান-বাজনা করছে। মসুর দেখি দিল্লির জুম্মা-মসজিদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
‘দেখছ কি মসুর?’
‘হুজুর, এমন মসজিদ কোথাও দেখিনি।’
‘তবু মসুর, ওর আধখানা রেল-কোম্পানি ভেঙে উড়িয়ে দিয়েছে!’
‘ওটা কি হুজুর?’
‘ওটা শাজাহান বাদশার কেল্লা। ওখানে একটা দরবার-ঘর আছে, সে দেখলে চোখ ঠিকরে যেত—এত হীরে-মানিক দিয়ে সেটা সাজানো ছিল। সেইখানে ময়ূর-সিংহাসনে বাদশারা বসে দরবার করতেন।
‘ছিল বলছেন কেন হুজুর? এখন কি সে-সব নেই?’
‘না মসুর, শুনেছি ময়ূর-সিংহাসন নাদির শা কেড়ে নিয়ে কাবুলে চলে গেছে, আর দেয়ালে যে-সব হীরে-পান্না ছিল তা মোগল-বাদশারা বাড়ি ছাড়বার পর কাঁচ হয়ে গেছে। আসল কথাটা কি জানো মসুর, ও দেয়ালে কাঁচই লাগানো ছিল কিন্তু মোগল বাদশার ভয়ে লোকে বলত সেগুলো হীরে-মানিক! নইলে অত টাকা গরিব হিন্দুস্থানের বাদশা শাজাহান কি করে পাবে? এ কি বোগদাদের বাদশা হারুন-অল-রসিদ যে ঘরখানা হীরে দিয়ে মুড়ে ফেললে? আমি বেশ জানি মসুর, বুড়ো শাজাহান এক তাজমহল আর ময়ূর-সিংহাসন তৈরি করতে সব টাকা, যা-কিছু তার বাপ-দাদা জমিয়ে গিয়েছিল, ফুঁকে দেয়। সেই রাগে তার ছেলে ঔরঙ্গজেব তাকে কয়েদ করে সিংহাসন কেড়ে নেয়—এ আমার উজির জামায়ের নিজের মুখ শোনা, নিজের কানে শোনা, জানো মসুর—’
মসুর দেখি ঘুমিয়ে পড়েছে; আমার কিন্তু ঘুম আসছে না, দিল্লির হাওয়া বড় গরম লাগছে। আমি আস্তে-আস্তে কুতুবমিনারের ওপর থেকে নেমে বাদশাদের একটা তহ্খানার ভেতরে গিয়ে ঢুকেছি। মাটির নিচে তহ্খানা, তার চারদিকে জলের ফোয়ারা। এখন আর ফোয়ারার জল উঠছে না, কিন্তু তবু ঘরখানি বেশ ঠাণ্ডা।

খানিক বসে থাকতে-থাকতে শুনেছি ঢং-ঢং করে রাত বারোটা বাজল। অমনি দেখি সব ফোয়ারাগুলো খুলে গেছে—আর ফরফর করে গোলাপজলের ছিটে আমার গায়ে পড়ছে। তহ্খানার মাঝখানে একটা মখমলের বিছানা ছিল, আমি তারি ওপর শুয়ে একটু চোখ বুজেছি আর দেখি বুড়ো ঔরঙ্গজেব একটা লাঠি ধরে ঠকঠক করে এসে হাজির! এসেই আমাকে লাঠির খোঁচা দিয়ে বলছে, ‘কৌন্ হায় রে?’ আমিও অমনি তার মুখের ওপর শুনিয়ে দিয়েছি, ‘তুম্ কৌন্ হায় রে?’
‘হাম্ হিন্দুস্তানকি মালিক ঔরঙ্গজেব বাদশা হ্যায়!’
‘ম্যায়নে তুর্কিস্তানকে পাশা হারুন-অল-রসিদ নবাব খাঞ্জা খাঁ খাঁজাহান-ই-জাহান্দার শা বাদশা বেগদাদি হুঁ!’
‘আও লড়েঙ্গে!’
‘আও লাড়ো!’
বলেই আমরা দুজনে তাল ঠুকতে-ঠুকতে পাঞ্জা কষতে-কষতে একেবারে কুতুবমিনারের ওপরে এসে হাজির। সেখানে এসে বুড়ো ঔরঙ্গজেবটা আমাকে এমনি জাপটে ধরেছে যে ফেলে আরকি ঠেলে ওপর থেকে নিচে! এমন সময় মসুর ছুটে এসে মেরেছে তার মাথায় এক কিল। যেমন কিল মারা অমনি তার পাগড়িটা পড়েছে ঠিকরে লাহোরের কেল্লায়। সেখানে রণজিৎ সিং খাটিয়া পেতে ছাতে ঘুমুচ্ছিল; পাগড়িটা পড়বি তো পড় একেবারে তার মুখের ওপরে, আর পাগড়ির কোহিনুর হীরেটা গেছে তার একটা চোখে বিঁধে!
এদিকে ঔরঙ্গজেবটা তার খালি মাথায় হাত বুলুচ্ছে, ওদিকে রণজিৎ সিং একগাল হাসতে-হাসতে কোহিনুর হীরেটার দিকে একচোখে চেয়ে আছে, আর আমরা সতরঞ্চি চালিয়ে একেবারে আগ্রায় এসে হাজির হয়েছি। দেখি অজবিবির কবরটার চারদিকে বুড়ো শাজাহানটা কেঁদে-কেঁদে ঘুরে বেড়াচ্ছে! সেখান থেকে সোজা ফতেপুর শিক্রির দিকে সতরঞ্চি চালিয়ে দিলুম। আমার ছেলেবেলার বন্ধু আকবর সেখানে পঞ্চমহলের ওপরে বসে চতুরং খেলায় মত্ত ছিল। আমাকে দেখে ভারি খুশি। ‘এস ভাই বোগদাদি!’ বলে আমায় পাশে বসালে। তার সঙ্গে এক পাঠশালায় পড়া, তাই সে আমাকে বলে বোগদাদি, আমি বলি তাকে আগারওয়ালা। অনেকদিনের পর দুজনের দেখা। দেখি আকবর কেমন বুড়িয়ে গেছে। চুল সব শাদা হয়ে গেছে। গোঁফ-দাড়ি সব ফেলে দিয়ে লোকটা কেমন যেন কাটখোট্টা-রকমের দেখতে হয়ে গেছে। তার আর সে চেহারা নেই।
দুজনে অনেকক্ষণ ছেলেবেলায় গল্প করে আমি বললুম, ‘তবে এখন আসি ভাই, অনেক দূর যেতে হবে।’
‘আঃ বোলো না। মসুর কিছু খেয়ে নিক। ওরে, মসুরকে ভালো করে খাইয়ে-দাইয়ে নিয়ে আয়। আর ভাই, বুড়ো-বয়েসে মনের সুখ নেই। বড় ছেলে জাহাঙ্গিরটা হয়েছে বেজায় মাতাল, কাজকর্ম কিছুই দেখে না, সেই এলাহাবাদের কেল্লায় বসে কেবল টাকা ওড়াচ্ছে। ভেবেছিলুম নাতি শাজাহানটা একটা মানুষের মতো মানুষ হয়ে বংশের নাম রাখবে, কিন্তু ভাই আমার কপালের দোষে নাতবৌ ম’রে ইস্তক স্ত্রীর শোকে সেও গেল পাগল হয়ে।ঔরঙ্গজেবটা এদিকে চালাকচতুর, কিন্তু হিঁদুদের ওপর তার বিষদৃষ্টি। হিঁদু প্রজা নিয়েই আমার কারবার, অথচ তাদেরই সে চটাতে চায়। এমন কল্লে কি রাজত্ব থাকে দাদা? আমি সেই ষোলো বছর থেকে আজ পর্যন্ত যা-কিছু জমিজমা টাকাকড়ি করেছি সব আমার কটা নাতি-পুতি মিলে বরবাদ কল্লে দেখছি। কি যে করব ভেবে পাইনে। এখন ভালোয়-ভালোয় মানে-মানে মরতে পারলে বাঁচি ভাই বোগদাদি।’
আমি বললেম, ‘দেখ জাহাঙ্গির যতই মাতাল হোক, ও তোমার রাজ্য একরকম চালিয়ে নেবে; শাজাহানও যতই পাগলামি করুক কিন্তু দেখ একদিন তোমার নাম রাখবে; ছেলেটি বেশ ধীর, শান্ত, বুদ্ধিমান। কিন্তু ওই যে তোমার শাজাহানের ছেলে ঔরঙ্গজেবটি, ওটি ভাই, তোমার গোলাপবাগে কাঁটাগাছ। ও তোমার ভিটেয় ঘুঘু চরিয়ে ছাড়বে। আমার সঙ্গে পথে আসতে তার দেখা হয়েছিল, একেবারে গোঁয়ার! আমি বেশ করে তাকে শিক্ষা দিয়ে এসেছি।’

‘বেশ করেছ ভাই বোগদাদি! তুমি শিক্ষা না দিলে আর দেবে কে! দেখ, তুমি তো এলাহাবাদ হয়ে যাবে, পার তো জাহাঙ্গিরকে একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মদ খাওয়াটা ছেড়ে যাতে সে এখানে এসে একটু কাজকর্ম দ্যাখে সেইটে কর ভাই।’
‘আচ্ছা তাই হবে।’ বলে মসুরকে নিয়ে আবার সতরঞ্চি উড়িয়ে চললুম, যমুনার কিনারা দিয়ে। যাবার আগে আগারওয়ালা ছেলেদের জন্যে একরাশ পাথরের খেলনা সতরঞ্চিতে তুলে দিলে।
তখন রাত প্রায় দুটো। এলাহাবাদে পৌঁচেছি। ভেবেছিলুম জাহাঙ্গির ওরা সব ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু গঙ্গা-যমুনার ওপরে নৌকোর পুলের কাছে এসে দেখি কেল্লাটা একেবারে আলোয় আলোময়; এক ক্রোশ থেকে মদের গন্ধ, গানবাজনার আওয়াজ, আর আতর-গোলাপের খোসবো পাওয়া যাচ্ছে। কেল্লায় একটা জলসা দেখে আমাকেও একটু সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে নিতে হল। তারপর একেবারে গিয়ে জাহাঙ্গিরের খাস মজলিসে হাজির।
জাহাঙ্গির আমাকে দেখেই থতমত খেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি আমার হাত ধরে একেবারে নূরজাহানের কাছে নিয়ে বললে, ‘অনেক পথ এসেছেন, এইখানে বিশ্রাম করুন; আমার বন্ধুবান্ধবদের বিদায় করে আমি এলেম বলে!’ বলেই জাহাঙ্গির সরে পড়ল।
আমি নুরজাহানকে বললেম, ‘দেখ, আমায় এখুনি আবার রওনা হতে হবে, জাহাঙ্গিরের সঙ্গে আজ রাতে আর দেখা হবার সম্ভাবনা নেই, কালও হয় কিনা সন্দেহ। তোমায় একটি কথা বলে যাই—জাহাঙ্গিরকে একটু সাবধান হয়ে সম্ঝে চলতে বল, নইলে তোমার শ্বশুর তাকে ত্যাজ্যপুত্তুর করবেন বলেছেন। তোমার শ্বশুর আমাকে এই পাথরের খেলনাগুলো দিয়েছেন; এগুলো তুমি নিয়ে খেলা কর। আমি এসব নিয়ে কি করব? এখন তবে আসি।’ —বলে আমি আবার সতরঞ্চি চালিয়ে দিলুম।
মসুরটাকে আমি গাধা বলি কিন্তু সে একেবারে নির্বুদ্ধি নয়। এরই মধ্যে সে জাহাঙ্গিরের ভিন্ডিখানা থেকে পোয়াটাক খাস অম্বুরী তামাক যোগাড় করেছে। মসুরটাকে বাহাদুরি দিতে হবে। কিসে আমার কষ্ট না হয় সেদিকে তার খুব নজর আছে।
ভোর নাগাদ একটু চোখ বুজেছি কি না অমনি মসুর ‘হুজুর, দেখুন! দেখুন!’ বলে ঠেলে তুলেছে। দেখছি ডানা উঠলে পিঁপড়েগুলো যেমন মাটি ছেড়ে ঘুরে-ঘুরে আকাশের দিকে ওঠে, তেমনি দলে-দলে ষাঁড় হু-হু করে উত্তর দিকে উড়ে চলেছে, আর দক্ষিণ দিকে কেবল গাধা টঙ্গস-টঙ্গস করে লাফাতে-লাফাতে চলেছে।

এ কি আশ্চর্য ব্যাপার! এত গরু, এত গাধা আসে কোথা থেকে? দূরবীনটা চোখে লাগিয়ে দেখছি একটা নদী আধখানা চাঁদের মতো বেঁকে চলেছে তারই দুই পারে দুই শহর; একটা শহরে কেবল হিঁদুদের মঠ আর মন্দির, পূজারি পাণ্ডা গুণ্ডা আর সন্ন্যাসীর আড্ডা, আর একদিকে কেবল যত মোটা-মোটা লক্ষপতি ক্রোরপতি—তাদের বড়-বড় মোটা-মোটা থাম-দেওয়া বাড়ি আর যত টিকিধারী সভাপণ্ডিতদের বাসা! এই দুই শহরের মাঝে দুটো বড়-বড় চিতা জ্বালানো রয়েছে, আর শহরের যত লোক দিন-রাত কাঠের বোঝা, তেলের কুপো এনে সেই চিতায় ঢালছে। যেমন এক-একবার আগুন দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠছে আর অমনি লোকগুলো তাতে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আর অমনি একদল গরু হয়ে বেরোচ্ছে, আর অন্য দল গাধা হয়ে দৌড় দিচ্ছে! এমন সময় দেখি দুপার থেকে দুটো হিঁদুদের বুজরুগ আমাদের হাত নেড়ে ডাকাডাকি করছে—‘গোলোকে যাবে গো? গন্ধর্বলোকে যাবে গো?’
জাফরের মুখে শুনেছিলুম এরা নতুন মানুষ পেলেই ভেড়া বানিয়ে দেয়। আমি আর তাদের দিকে না দেখে বোঁ-করে সতরঞ্চি চালিয়ে দিয়েছি! একেবারে গঙ্গা-পার হাবড়ার পুল কলকেত্তা হাজির! মসুরটা তো আজব শহর কলকেত্তা দেখবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু আমি মসুরকে বললুম, ‘এখানে বুজরুগি বড় কম চলে না—মানুষ ধরে এরা পাঁঠা করে রাখে, আর সময়মতো সেগুলোকে বলি দিয়ে বাজারে তাদের মাংস বিক্রি করে, নিজেরাও পাঁঠার ঝোল বেঁধে খায়।’ বলতে-বলতে দেখি দলে-দলে ছেলে-বুড়ো যত বাঙালি—কেউ কানে কলম গুঁজে, কেউ কেতাব বগলে—‘ওই দেখা যায় বরানগর, সামনে কাশীপুর, কলকাতা কদ্দুর।’ বলতে-বলতে ছুটে এসে এক-একটা বড়-বড় কেতাবখানা দপ্তরখানায় গিয়ে ঢুকছে। বেশ মনের ফুর্তিতে, কিন্তু বেরিয়ে আসছে দেখি এক-একটা বোকা ছাগল!
‘মসুর, জানো একে বলে কামরূপ কামিথ্যে ভেল্কিবাজি। আর এই শহরে বাঙলার যত বড়-বড় বুজরুগের আসল আড্ডা। ওই দেখ গড়ের মাঠে একটা যাদুঘর, আর ওই আলিপুরে একটা চিড়িয়াখানা, আর ওই পুবদিকে দিঘির ধারে একটা গোলামখানা। আলিপুরে মানুষ-পাঁঠা জিয়োনো থাকে, ওই গোলামখানায় তাদের পোষ মানায়, আর মরবার পরে ওই যাদুঘরে তাদের হাড়গুলো আর ছালগুলো জমা রাখে। এখানে পা দিয়েছ কি বোকা বনেছ!’ —বলেই আমি একদণ্ড আর সেখানে না থেকে একেবারে কালাপানির দিকে সতরঞ্চি চালিয়ে দিলুম।
আকাশের ওপর দিয়ে পাখির মতো শোঁ-শোঁ উড়ে চলেছি, দেখি বাঙলাদেশের বুজরুগ তাদের দূরবীনগুলো উঠিয়ে আমাদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে।
‘কাজটা ভালো হল না, মসুর! সবাই আমাদের দেখে ফেললে, এতক্ষণে কালাপানিতে টেলিগ্রাম গেছে যে আমরা ওই মুখেই চলেছি। সেখানে গেলেই পুলিশ লাগবে পিছনে, তখন সিন্ধবাদি হীরেটাই দখল করা শক্ত হবে। মসুর এস, এইখানেই নেমে পড়া যাক। এইখান থেকে বেশ বদলে, রেলে করে উড়েদের সেই মন্দির পর্যন্ত যাওয়াই ভালো।’
বলে আমরা রূপনারায়ণ নদীর ধারে নেমে তল্পিতল্পা বেঁধে হেঁটে গিয়ে রেলে চড়লুম। আমি হলুম হীরানন্দ বাবাজি আর মসুর হল কিচকিন্দা—আমার উড়ে চেলা। গাড়িতে দেখি কেবল মাড়োয়ারি, মাদ্রাজি আর বাঙালি। বাবাজি দেখে তারা আমাকে আদর করে বসালে, কত কথা পুছতে লাগল। জবাব দিতে পারিনে; কাজেই আমি সাজলুম বোবা আর মসুর হল কালা। আর কোনো গোল রইল না।
ছ-মাস পুরীতে আছি, রোজ মন্দিরের চারদিকে ঘুরে বেড়াই, কিন্তু চুড়োর ওপর কোথায় যে সিন্দবাদের সিন্দুকটা গিয়ে আটকে আছে তার আর সন্ধান পাইনে। শেষে একদিন একটা ফন্দি মাথায় এল। মসুরকে বললুম, ‘দেখ্ মসুর, প্রায়ই দেখি এক-একটা লোক ওই মন্দিরের চুড়োয় নিশেন বাঁধতে ওঠে, তুই ওদের দলে ভিড়ে যদি একদিন মন্দিরের চুড়োয় গিয়ে বেশ করে সিন্দুকটা কোথায় আছে দেখতে পারিস তবে তোকে একখানা হীরে বকশিশ দেব।’
মসুর প্রথমে কিছুতেই রাজি হয় না, বলে, ‘পড়ে মরব কত্তা!’ কিন্তু শেষে দেখি একদিন গেছে! বেশ করে চুড়োটা দেখে মসুর এসে বলছে, ‘কত্তা! সিন্দুক এখেনে নেই। ওই চুড়োর ওপর থেকে বিশ-ক্রোশ তফাতে আর-একটা মন্দির দেখা যায়, সেইখানে আমি পষ্ট দেখলুম সিন্দুকটা যেন পাথরের গায়ে ঝুলচে। কিন্তু অনেক দূরে কত্তা! এইখানে থেকে বালির ওপর দিয়ে ঠিক সোজা একেবারে পুব-মুখো যেতে হবে কত্তা।’
মসুরের কথাই ঠিক। আজ ছ-মাস দেখছি এই কালাপানি দিয়ে কত জাহাজ এল, গেল; কিন্তু একটি পেরেকও দেখলুম না যে এই মন্দিরে এসে লাগল। সেইদিনই রাত্তিরে সতরঞ্চি উড়িয়ে একেবারে মসুরের সেই মন্দিরে হাজির। গিয়ে দেখি মন্দিরের সব আছে কেবল চুড়োটি নেই।
‘যাঃ! সর্বনাশ হয়েছে মসুর! সিন্দুক সরিয়ে ফেলেছে মসুর! এত কষ্ট করে আসা বৃথা হল মসুর!’ বলেই মসুরও অচৈতন্য।
যখন আবার চোখ খুলেছি দেখি একটা ছোট ঘরে কে আমাদের বন্ধ করে গেছে—একটি পিদিম আর এক ঘড়া জল দিয়ে। দেখি পিদিমের কাছে একটা বাক্স রয়েছে। বাক্সটা লোহার, আর তার ওপরে পেতল দিয়ে লেখা রয়েছে—‘সিন্ধবাদ’। তাড়াতাড়ি বাক্সটা টেনে নিয়ে খুলতে যাব, দেখি পকেটে চাবিটা ছিল সেটা কে চুরি করেছে!
‘মসুর, চাবি নিলে কে? নিশ্চয় তোর কাজ!’
‘না কত্তা, চাবি তো আমি নিইনি।’

‘মিথ্যেবাদী, পাজি!’—বলেই সেই লোহার বাক্সটা ছুঁড়ে মেরেছি। যেমন মারা আর অমনি মসুর—‘বাপরে!’ বলে ঘুরে পড়া; আর বাক্সটা খটাং করে খুলে একটা একবেগ্দা মানুষ বেরিয়ে এসে আমার সুমুখে দাঁড়াল।
এ কি, সিন্ধবাদ যে! হাতে তার সেই চাবিকাঠিটি। সিন্ধবাদ সামনে এসেই বলছে, ‘কি হারুন-অল্-রসিদ!—হীরানন্দ বাবাজি! সিন্ধবাদের হীরে পেলে কি? চাবিটা তো তার পেট থেকে খুঁজে বার করলে! এখন হীরেগুলোও বার কর।’
‘আমার সঙ্গে তামাশা!’ —বলেই যেমন সিন্ধবাদকে ধরতে গেছি আর সে একেবারে চম্পট! যেন নিভে গেল!
আমার বড় ভয় হল; এত বুজরুগি কাটিয়ে এসে শেষে কি উড়ে বুজরুগের পাল্লায় পড়লুম!’
‘মসুর! কথা কোসনে যে মো-সু-উ-র?’
মাথার ওপরে চামচিকে কিচ্কিচ্ করে বলছে, ‘মঁসুর কি আর আঁছে সেঁ কালো কিঁচকিন্দে মঁরে ভূঁত হয়ে গেঁছে, এই অন্ধকারে তোঁমাকেও ভূত হয়ে থাকতে হঁবে। হিঁঃ-হিঁঃ-হিঁঃ।’ —বলেই চিকচিক করে আমার চারদিকে অন্ধকারে উড়ে বেড়াতে লাগল।
মসুরটা হঠাৎ মরে গিয়ে আমায় ভারি বিপদে ফেলে গেল! তার মতন এমন নেমকহারাম চাকর আমি দেখিনি!
রাগে দুঃখে আমি গোঁ হয়ে বসে আছি; চামচিকেটা ঘুরতে-ঘুরতে যেমন আমার হাতের কাছে এসেছে আর অমনি আমি খপ করে তাকে ধরে ফেলেছি। ধরেই দেখি সেটা সেই এক-বেগদা সিন্ধবাদ!
‘তবে রে পাজি! এখন তোকে কে রাখে! বল্ কোথায় হীরেগুলো রেখেছিস? নইলে তোকে ওই সিন্ধুকে বন্ধ করে কালাপানির জলে ফেলে দেব!’ বলেই আমি তার হাত থেকে বাক্সের চাবিটা কেড়ে নিলুম।
তখন সিন্ধবাদ আর কি করেন? চুপি-চুপি আমাকে যেখানে তার হীরে-জহরতগুলো পোঁতা আছে সেই জায়গাটার নাম বলে দিল।
‘জায়গাটা কোথায় জানো?’
‘চামচিকেটা যদি আমায় আগে সেটা বলত তবে আমাকে এত কষ্ট পেতে হত না। জায়গাটা হচ্ছে ওই—সে কি-বলে-কি—সেই যেখানে জগন্নাথের যত যাত্রী ঘুরপাক দেয়!’
‘অক্ষয় বট?’
‘আরে না বাবু, গাছটাছ সেখানে কোথা!’
‘তবে দোলমঞ্চ হবে।’
‘সেখানে তো দুলতে হয়। ঘুরতে হয় কোথায়?’
‘তবে “চানবেদী!”
‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, ওরই কাছাকাছি, ঠিক মনে হচ্ছে না এখন, খানিক বাদে মনে হবে।’ —বলেই হারুন্দে চুরুট ফুঁকতে লাগল!’
খানিক পরে জিজ্ঞাসা করি, ‘হারুন্দে, নামটা মনে পড়ল কি? আমায় যে ভারি শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে কোথায় হীরেগুলো লুকোনো আছে।’
কথা নেই!
‘বলি ও হারুন্দে, মনে পড়ল কি?’
‘একটু-একটু পড়ছে।’
‘বলে ফেল।’
‘রোসো বলছি—“ল” না-না, “র” আর “ন”; “র” হল না তো! “র” আর “ন”র মাঝে কি হয় বাবু?’
‘কি হয় হারুন্দে?’
মনে পড়ছে না। মসুর, “র” আর “ন”র মাঝে কি হয়? ওহো তুই কেমন করে জানবি? তোকে তো আমি সেই লোহার বাক্সতে পুরে জলে ভসিয়ে দিলুম। “র” আর “ন” তার মাঝে হল—’
‘তোমার মাথা আর মুণ্ডু! শোনো কেন বাবু, ও পাগলের কথা। ও চিরকালই হারুন্দে, কোনো কালে হারুন-অল্-রসিদ নয়। ওর বাপ ওকে লেখাপড়া শেখাতে কলকাতায় পাঠিয়েছিল। সেখানে পৃথিবীর ইতিহাস, পারস্য উপন্যাস আর ডিটেকটিভ গল্প পড়ে-পড়ে ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কখনো এক টুকরো ইতিহাস, কখনো উপন্যাস, দু ছত্তর বা কবিতা, দুটো বা সত্যি কথা, দশটা বা মিছে কথা। কখনো হাততালি দিচ্ছে, কখনো গালাগালি। মাথাটা যেন বাংলা খবরের কাগজ—মূল্য দুই পয়সা মাত্র! আমি কিচকিন্দে এই কিচকিন্দায় থেকে বুড়ো হয়ে গেলুম, সিন্ধবাদকে তো কখনো এ তল্লাটে দেখিনি। একটা কথা বললেই হল—সিন্ধবাদ এল, চুম্বকে তার সিন্দুক টেনে নিলে! জাহাজ টেনে নেয় এত বড় চুম্বক-পাথর—সে পাথর গেল কোথায়?’
হারুন্দের কথা নেই।
‘দেখলে বাবু, গল্পের খেই ধরতে জানে না, গল্প বলতে আসে। ও তো সেদিনের ছেলে। গল্পের ও জানে কি? বোগদান-ফোগদাদ তো সেদিনের কথা; সত্য ত্রেতা দ্বাপর, কলি—এই চার যুগের গল্প আমি জানি। গল্প শুনতে চাও তো শোনো—’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন