মিহির সেনগুপ্ত
গোঁসাই সম্পর্কীয় রঙ্গরস শেষ করে ঘরের দিকে যাচ্ছি। এমন সময় নসু বললে, দুলাভাই, রসু, অর্থাৎ রস্ইয়া এবার পূজায় আইছে, বোজজেন নি? দ্যাহেন যাইয়া, সামনের হাইত্নায়, গোস্তোভাত হান্দাইতে আছে পছোন্দো মতন।
রসিককে আমি চিনি, তার তিন চার বছর বয়সকাল থেকেই। সে এ বাড়িতেই মানুষ। রায়গিন্নিই তাকে আসলে মানুষ করেছিলেন। রসিক বা রসুও বরাবর কাকিমার বড় ন্যাওটা। কিন্তু গত বছর বা তার আগের বছর, তাকে পুজোয় এখানে দেখিনি। কীসব যেন গণ্ডগোলের কথা শুনেছিলাম। তার বাবা মারা গিয়েছিল অকালে, যখন রসিক নিতান্তই শিশু। সে বড় দুঃখের কাহিনী। রসিকের প্রসঙ্গে তা এখন মনে পড়ে।
গঞ্জে আলকাতরার গুদামে কাজ করত কুদরৎ, রসিকের বাবা। রোজ ভোরে গ্রাম থেকে হেঁটে সে যেত গঞ্জে। আর, ফিরত রাতদুপুরে। আলকাতরায় তীব্র ঝাঁঝেই হোক, কিংবা অপুষ্টিই কারণ হোক, কুদরৎ শারীরিক দিক দিয়ে রুগ্নই ছিল বরাবর। বেশ কমজোরি মানুষই ছিল সে। জমি জিরেত, বিষয় আশয় বলতে একখানা টিনের দোচালা ঘর আর সংলগ্ন খানিকটা জমি। চাষের কোনো ব্যাপার নেই। সে তা জানতও না, করতও না। ওই, গুদামে আলকাতরা কেনেস্তারায় ভর্তি করা, সিল করা এইসব কাজ করে যা পেত তাতেই তার দিন গুজরান। তার বিবি করিমন, এই রোজগারের সাথে ধানকোটা, চিঁড়ে কোটা, ধানকুড়োনো এইসব করে চালিয়ে নিত দুটো পেট। এরই মধ্যে রসিক– “আল্লার চিরাগের মতো” “ফড়কান দিল” একদিন, এই অভাবী সংসারে। সেই রসিককে নিয়ে কুদরতের তখন ‘ফাউকান’ দেখে কে? তাকে নিয়ে কুদরতের ‘হাউস’ ছিল, সে নাকি ‘রসুরে’ “ল্যাহাপড়া শিহাইয়া” মানুষ করবে। কিন্তু ল্যাহাপড়া শেখাবার সময় পাওয়া কুদরতের পক্ষে অসম্ভব ছিল। ‘ওস্তাদ’ রাখার প্রশ্ন নেই, পয়সা কোথায়? সে নিতান্ত নিরক্ষর ছিল না। প্রাথমিক শিক্ষা দেবার মতো বিদ্যে বা এলেম তার ছিল। কিন্তু সময়াভাব। কুদরৎ গঞ্জে যেত ভোর সবেরে। তখন রসুকে নিয়ে বসার ফুরসুৎ আদৌ হতো না। সময় পাওয়া যেত সেই সপ্তাহান্তে জুম্মাবারে। সেদিন কুদরতের ছুটি। সেদিন সকাল থেকে সে ছেলেকে পড়াতে বসত। ছেলেকে অধ্যয়ন করানোর তার সেই অনবদ্য ভঙ্গি এবং প্রক্রিয়ার কথা আজও মনে হলে পেটফাটা হাসি পায়। কিন্তু দুঃখ হয় বেশি।
রসিকের বয়স তখন বছর তিন কী চার। সে-বয়সে, ও যুগে, ওই অজ গ্রামগাঁয়ে কোনো সুশিক্ষিত ভদ্র বাড়িতেও শিক্ষারম্ভ করার কথা কেউ ভাবত না। এখনকার দিনকাল অন্য, এখনকার কথা আলাদা। কিন্তু কুদরতের ‘হাউস’ বড় শক্তিশালী ছিল। কী? না, ছেলেকে ‘পড়উয়া’ করবেই। এ নিয়ে, বাল্যে, আমরা, ভদ্দরলোকদের অনেক হাসিঠাট্টা, টিটকিরি শুনেছি। কুদরৎ কিন্তু সেসবে নির্বিকার থেকে, তার অনবদ্য কৌশলে রসিককে বর্ণমালা শেখাত। শুক্রবার ভোর থেকে আমরা কান পেতে থাকতাম, কখন কুদরতের গলা শোনা যাবে, “ও বাজান, ও রসু ওড্বানা? সূরয উড্ইয়া গেল, কোন্হানের মানুষ কোন্হানে গেল, তুমি এহনও ওডলানা। ওডো বাজান, উডইয়া চৌহে মুহে পানি দেও। আল্লার ধারে দোয়া মাঙ্গো, আল্লা, মোরে এট্টু এলেম দেও। তার খানিকক্ষণের মধ্যেই পাঠভ্যাস শুরু হতো। আমরা একটি বয়স্ক এবং একটি কচি কণ্ঠের ঐকতান শুনতাম। প্রথমে কুদরৎ এবং অনুসরণকারী রসু–
আইক্সা ‘ক’, কুলাকাণা ‘খ’, বগা ‘গ’, আঘারউয়া ‘ঘ’, মাথায় পাগড়ি ঙ (উচ্চারণে আঙ্গ)। ক্রমশ পর্দা উঁচু হতো! বাইগুন্ইয়া ‘চ’, গাম্ছামুড়ি ‘ছ’, বর্গীয় ‘জ’, উফ্রাউফ্রি ‘ঝ’, কান্ধে বোচ্কা নিও (ঞ)। এরকম অদ্ভুত বাক্যবিন্যাসে বর্ণমালা শেখার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। অতএব অসম্ভব আকর্ষণ বোধ করতাম আমরা। কখন কখনও গিয়ে হয়তো কুদরৎকে আব্দার জানাতাম– ও চাচা, বাকিগুলান এট্টু কয়েন না। আমরা এট্টু শুনি। আমাদের আবদারে কুদরৎ খুব খুশি হতো। বলত, আহা তোমরা আইছো, আয়ো। তোমরা কত ল্যাহাপড়া কর, তোমাগো কি এয়া ভালো লাগবে? এয়া অইলে, হাইল্যা চাষার গুড়াগাড়ারে শেহানের লইগ্যা সরল পইধ্যতি। তয়, হোনো, যহন হোনতে চাইতে আছ। তয়, হাসপা না, কইলম হ। কুকুর লেজি ‘ট’, নাই মাত্রা মূধ্যন ণ–। গলা ভরা ‘ত’, কান মুচরী ‘থ’, আড়ুভাঙ্গা ‘দ’, কান্ধে ভারী ‘ধ’, দইন্ত্য ‘ন’, এইরকম আর কি। আমরা এসব শুনে খুব অবাক হয়ে ভাবতাম, কুদরৎ চাচা কত জানেন। কিন্তু আমাদের কর্তারা এ নিয়ে হাসাহাসি ঠাট্টা মশকরা করতেন।
কিন্তু কুদরৎ এভাবেই রসুকে শিক্ষা দিত। আবার কখনও সেই ভোর ফজরে আমরা শোনতাম –উডা, উডা, উডা। লামা, লামা, লামা। বেহা, বেহা, বেহা। ব্যাহাইছো? মোর রসু বেয়াক পারে। এইবারর বাজান, এইবার এট্টু কাইত্যার করো।–এ এ এ্যাই যে– এইতো অইয়া গেল। যাও। এহন যাইয়া মায়ের ধারে দুগ্গা হুড়ুম খাও। আমরা করিমন চাচিকে জিজ্ঞেস করতাম, ও চাচি, চাচায় ওয়া, বেনইয়াকালে কি উডায় লামায়? চাচি একগাল হেসে বলতেন, ও হেয়া বুজি তোমরা জান না। ওয়া রসুরে ‘ক’ ল্যাহায়। তো এইভাবে কুদরত চাচা রসুকে ‘ক’ শেখালে।
কিন্তু রসুকে যখন ধীরেন মাস্টারের পাঠশালায় দেওয়া হলো, তখন রসুর কী যে দুর্গতি, তাও তো আমরা দেখেছি। সে আর কহতব্য নয়। ধীরেন মাস্টার বলতেন রসু, ক এ আকারে কা, ক এ আকারে কা– কী অয়?
রসুর সরল জবাব। ক এ আকারে কা, ক এ আকারে কা– চাচা। ‘চাচা? হারামজাদা, ম্লেচ্ছ, ক এ আকারে কা, ক এ আকারে কা, চাচা?’ রসুর পুনরায় সরল উত্তর, মোয়া তো চাচাই কই– আফনে রাগেন ক্যান? মোর ভয় করে।
ক্যান তোরা ওরহম কও ক্যান?
মোগো পাশের বাড়িত্ মৌলবী হুজুর তো হেরহমই কয়েন।
কী রহম কয়েন?
তেনায় কয়েন কী, তেনায় কয়েন বোলে যে ক এ আকারে কা, ক এ আকারে কা– চাচা। আর ব এ আকারে বা, বয়ে আকারে বা– আব্বা। ধীরেন মাস্টার হাসতে হাসতে লুটোপুটি। রসু পুনরায় বলে, হাসেন ক্য? মোরা তো এ রহমই কই। ধীরেন মাস্টার বলতেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে, তোর ওইতেই অইবে।
সেই কুদরৎ একদিন আর গঞ্জ থেকে ফেরে না। রসিকের তখন বয়স চার কী পাঁচ। তখনকার দিনের বাচ্চারা ওই বয়সেও খেলা ছেড়ে ছুটে এসে মায়ের দুধ খায়। করিমন সারারাত ভাত নিয়ে বসেছিল। তারপর একসময় একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
পরদিন সকালে ছেলেকে নিয়ে করিমন বেরিয়ে পড়েছিল গঞ্জের উদ্দেশ্যে। কেন লোকটা ফিরল না তাই জানতে। এ-রকম তো আগে কোনোদিন হয়নি। গঞ্জ, এই গাঁ থেকে কম করে তিন মাইল দূর। সারাটা রাস্তা কখনও সে ছেলেকে কোলে নিয়ে, কখনও বা হাঁটিয়ে রাস্তা চলেছে। মাঠের এবড়ো খেবড়ো পথ। তখন শীতকাল। কাঁচা রাস্তা, বর্ষায় কাদা হয়েছিল, এখন তা শুকিয়ে ঝামা হয়ে আছে। খালি পায়ে চলতে বড় লাগে। করিমন রসিককে নিয়ে হেঁটেছিল সেই পথ। সারারাস্তা সে ভেবে পায়নি, কী হতে পরে সেই মানুষটার। সে তো কোনোদিন এ-রকম করেনি।
করিমনের গঞ্জে পৌঁছোতে বেলা হয়েছিল দেড় প্রহর। রাস্তা যেখানে, শেষ, সেখানে খেয়াঘাট। গুদামটা ছিল খেয়াঘাটের কাছেই। খেয়া পেরোতে, কুদরতের এক সহকর্মী করিমনকে দেখে ছুটে এসেছিল। নসুকে কোলে তুলে সে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। করিমন কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। সে যত জিজ্ঞেস করে, ও ভাই কী অইছে, আপনের ভাইজানে কই? কাইল ফেরে নায় ক্যান? সে ততই কাঁদে। কারখানার সামনে সাদাকাপড়ে ঢাকা কুদরতের দেহ ঘরে সব কর্মচারীরা। করিমনেরা সেখানে পৌঁছোতেই সবাই একসাথে কী সব যেন বলছিল। করিমন কিছুই বুঝতে পারছিল না। শীতের ভোরের কুয়াশায় তার দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে একসময় সব অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
পরে সে শুনেছিল, কুদরতের নাকি সেদিন কাজে যাওয়ার পর জ্বর হয়। গুদাম ঘরে সারি সারি আলকাতরার ড্রাম। জ্বর বাড়তে, তারই একটা ড্রামের গায়ে হেলান দিয়ে সে বেতাবুদ ঘুমিয়ে পড়েছিল। দারোয়ানের ডাক সে শুনতে পায়নি। গেট বন্ধ হলে গুদাম প্রায় নিশ্ছিদ্র। আলকাতরার ঝাঁঝ আর বাতাসের অভাবে কখন যেন সবার অগোচরেই সে মারা যায়। তার অর্থ, গাঁয়ে ফিরে এসে করিমন বুঝল, সে একজন বেওয়া এবং আছৈয়া বেওয়া, যার মাথার ওপর কোনো কিছুই নেই, এমনকী আল্লার তৈরি আাকাশখানাও না। হ্যাঁ, একটা জিনিস তার ছিল, সে এই রসু।
কুদরতের বাড়ি, এখন আমি যেখানে এসেছি, সেই রায়বাড়ি থেকে বেশি দূর নয়। সেদিন, কুদরতের বাড়ির কান্নাকাটি, আর্তনাদ শুনে, এ বাড়ির রায়কত্তার খুড়ামশাই, বুড়ো রায় গিয়েছিলেন ব্যাপারটি জানতে। ফিরলেন যখন, তাঁর কোলে এই রসিক। বাড়ির উঠোনে কোল থেকে তাকে নামিয়ে বুড়ো রায় তাঁর বউমাকে ডেকে বলেন, বউমা, পোলাডারে তো এট্টু দুধ খাওয়ান লাগে। অর বাপটা, কুদরতইয়া, মরইয়া গেছে, মাডা পাগলের ল্যাহান করতাছে। আমি অরে লইয়া আইলাম।
বুড়ো রায় মানুষটা একটু পাগলাটেই ছিলেন। নতুবা যখনকার কথা বলছি, তখন কোনো অপবর্গী মুসলমান শিশুকে এভাবে কোলে করে বাড়িতে নিয়ে আসা কোনো হিন্দুর পক্ষেই সম্ভব ছিল না। রায়বাড়ির অনেক অনাচারী পুরুষেরাও তা ভাবতে পারতেন না সে যুগে, এঁরা আঞ্চলিক অন্যান্য সামন্তবর্গী হিন্দুদের চাইতে বেশ কিছুটাই ভিন্ন ধরনের ছিলেন। অসম্ভব ধরনের আদিম স্বভাবসম্পন্ন ছিলেন তাঁরা। ফলে কাহার, নগ্দি ইত্যাদি পেশার বা জাতের মানুষদের সাথে তাঁদের এক ধরনের আত্মিক যোগ ছিল, যা অন্যান্য আঞ্চলিক হিন্দু সামন্তবর্গীয় লোকেদের দৃষ্টিতে ছিল অনাচার। কিন্তু তবুও তাঁরা এতটা করার কথা ভাবেননি।
বুড়ো রায় মানুষটি ঢিলেঢালা। বেঁটেখাটো, গোলগাল চেহারা। আবক্ষ শ্বেতশ্মশ্রু ভ্রূ-র লোম পর্যন্ত সাদা। পালপার্বণে দরাজদিল, ব্যবহারিক সংসারে উদাসীন, উদার মুক্তমনা মানুষ ছিলেন তিনি।
বউমা দুধ নিয়ে এলে, তাঁর পিছনে এসে হাজির হয়েছিলেন বুড়ো রায় গিন্নিও। তাঁর বড় ক্রোধ। কারণ, এ বড় অনাচার। দুধ এনে দিতে রায় বললেন, দ্যাও, আমার হাতে দ্যাও। আমিই খাওয়াইয়া দি। তুমি আবার ছেঁওয়া ছানা করবা। তোমার হাউরী হ্যানে আবার রাগ করবে। আহা! কুদরতইয়া এ্যারগো ভাসাইয়া দিয়া গেলে। এ্যাহন এ্যারগো উপায় কী? নে খা, দিক করিস না। খা-আ। ও বউমা, দ্যাহনা, মাগো, আমি তো টিক জুইত পাইতে আছি না। এ ছাতার পোলায় তো দেহি বেয়াক ফ্যালাইয়া দে। বউমা তখন ভয়ে ভয়ে খুড়শাশুড়ির দিকে তাকায়। ও কাকিমা, কী করুম? কাকিমা তখন রোষে চণ্ডিকা। কী আর করবা? হৌরের লগে বইয়া এমন মেলেচ্ছ পোলা মানুষ করো। হারা জীবনডা মোরে জ্বালাইয়া খাইলে। অ্যাঁ! মোছলমানের পোলা, তোমার এট্টু ঘেন্না পিত্তও নাই? তয়, যা করো না করো ঘরডার মইদ্যে যেন উডাইও না, বলে বুড়ি সরোষে প্রস্থান করে। রায় বলেন, পাগল, তোমার কাকিমায় পাগল তো, হ্যার লইগ্যা বোঝে না। তুমি খাওয়াও, অরে খাওয়াও দেহি। আহারে! এবং বউমাও আসনপিঁড়ি হয়ে বসে তাকে কোলের কাছে বসিয়ে দুধ খাওয়ায়। আর দেখ, সেই মনুষ্যপুত্র প্রায় স্বাধিকারে, যেন-বা, চুক চুক করে দুধ খায়। বুড়া রায় অবাক হয়ে এই অসম্ভব কাণ্ড দ্যাখেন, আর ভাবেন, আরে এত সহজ আর তিনি কিনা এতক্ষণ চেষ্টা করেও–।
রসিক দুধ খাচ্ছে, বুড়া রায় বকে যাচ্ছেন, বোজজোনি বউমা, তোমারে কমু কী? হে এক বড় দুঃকের কাণ্ড। আমি তো চেঁচামেচি, কুওইল শুন্ইয়া গেলাম, কী অইছে হেয়া দ্যাখথে। যাইয়া দেহি, কুদরতইয়ার কব্বর টব্বর দ্যাওন শ্যাষ। হেই কব্বরের উপার করিমন মাথা কোডে পাগলের ল্যাহান। আর এই গ্যাদাডা হ্যার মায়রে খালি হাবডায় আর ডাহে, ও মো, মো, ও মো, আব্বুরে মাডি চাপা দেল যে? মুই পড়মু না তয়? বলতে বলতে, বুড়া রায় হেঁচকি তুলে কাঁদেন। কাঁদেন আর বলেন, ও মাথারি তো দুইদিন যাইতে না যাইতে আরেকজনেরে নিহা করইয়া চলইয়া যাইবে। আর হেয়া ছাড়া গতিই বা কী? কিন্তু, এই গ্যাদাডার কী অইবে কও? তুমি মাগো, পারবা না, এডারে এট্টু বড় করইয়া দেতে? আহা, মোগো বাড়িতে কত বিড়াইল কুহুরও তো খাইয়া পড়াইয়া থাহে, আর এ তো মাইনসের বাচ্চা।
তো, তদবধি, রসিক রায়বাড়ির হাতায় মানুষ। না, বুড়ো রায় পারেননি তাকে অন্দরে ঢোকাতে। সমাজ সে যুগে বড় প্রচণ্ড। কিন্তু রসিক আর তার মায়ের দায়-দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। সারাদিন রসিক এখানেই থাকে। এতএব তার মাকেও থাকতে হয়। বুড়া রায়ই ব্যবস্থা পাকা করে দেন। থাহ, সারাদিন এহানেই থাহ। ছুডাছাডা কামকাজ কর, বাইরের কাজকাম। ধানপান হুগাও, বাইল পাতা, কাডকুডা টৌহাও, এডাওডা দ্যাহ। সয়ন্ধ্যায় বাড়ি যাও পোলারে লইয়া– যাইয়া হুইয়া থাহ। খাওয়াদাওয়া, কাপড়-চোপর বেয়াক পাবা, পাবা সাদাপাতা, পান তামাকের পয়সা। অসুখবিসুখে, হীরালাল ডাক্তারের মিকচার, যেমন বেয়াকে খায়, তুমিও খাবা। কোনো অসবিদা নাই। তখনকার দিনে, এ দিগরে, নগ্দা মাইনেকড়ির রেওয়াজ ছিল না। তাছাড়া, প্রয়োজনের সবটাই যখন হয়ে যাচ্ছে এবং তা যখন পরম্পরায় চলে, তখন নগ্দার দরকারই বা কী? তখনকার দিনে এইসব আশ্রিতরা ঠিক কাজের লোক বাইরের লোক তো ছিল না, ছিল পরিবারের একজন। তা পরিবারের লোককে কি কেউ মাইনে দেয়? আর সর্বোপরি যে কথা, তা হলো, করিমনের তো তখন পেট-গোখরো বড় শত্তুর।
কিন্তু না। পেট-গোখরো অন্নৌষধে বশ হয়। কিন্তু কাঁচা বেওয়ার পুরুষ্টু যৌবন? সে তো হালহামেশা কালকেউটের ছোবলে জরজর। শরীর বড় শত্তুর। আর করিমনের বয়সটাই বা কি তখন? সবেমাত্র একবার ছাঁচে কড়া পড়েছে, তাতে কি আল্লার মাশুল দেওয়া বন্ধ হয়? কুদরতের এক চালার নৈশ বিশ্রামে যে কদিন শোককাল কাটল তো কাটল। কিন্তু শোক তো কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। দিন যায়, শোক হয় পাতলা। তারপর কবরের মাটিতে দুর্বা ঘাস গজায়। যত গজায় ততই শোক হয় স্বচ্ছ। এক সময় সেই শোক হয় স্মৃতি। শরীর কিন্তু তার দাবি ছাড়ে না। করিমন যখন রসিককে বুকে নিয়ে তার স্বল্পদৈর্ঘ্যের জীবনের সুখদুঃখ হাতড়ায় তখন, এক সময় তার বেড়ার উপরে, চালে আলকেউটের হিসহিস। কিন্তু হায়রে গতর। এই নেমকহারাম গতরই যেন এক সময় ওৎ পেতে থাকে কতক্ষণে শুরু হবে হিসহিসানি। সে ছোবল খাওয়ার বাসনা করে। শুধুমাত্র আহার, শ্রম, শ্রম আর আহারের পৌনঃপুনিকতা, এই এতিম শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা– এরকম একটা ত্রয়ী ক্রমের চক্রে আবর্তিত তার যৌবনিক প্রদাহ, এক সময় তাকে ক্লান্ত করে। আর তার সামাজিক অবস্থানের পরম্পরাগত অভিজ্ঞতায় সে জানে আল্লার মাশুল দিতেই হয়। মানুষের তার থেকে নিস্তার নেই। আলিজান নামে ডাকাবুকো যে লোকটা রোজ তাকে খালপাড়ে ইশারা করে, তার নজরে যেন একটা ফয়সালা করার ভাব থাকে। আওয়াজ ইশারায় অনেক মিঞাই তাকে টালায়। কিন্তু আলিজান? হায় আল্লাহ। হে আদমিডা যেন পাথুরইয়া। কী বুক! কী সিনা! কিন্তু হ্যার চক্কে য্যানো, কী এক সব্বোনাশ আছে। য্যানো হে যা চায়, হেয়া পাওয়ার হক আছে হ্যার। আর সব আকাঙক্ষীদের চোখে কাতরতা, কিন্তু আলিজান? তার চাউনিই বলে, মাগি আবি তো আয়, না আবি তো আড়উয়া কোলে লইয়া জোঙ্গোলে লইয়া যামু। বাপরে বাপ, কী ডাহাইত!
ফলকথা এক পৌষী জুম্মায় করিমনের নিকাহ্-এর ব্যবস্থা করেন বুড়া রায়, আলিজানের সাথে। বুড়ার পুরোপুরি মত ছিল না এ-নিকায়। বলেছিলেন, বউ, তুই একবার ভাবইয়া দ্যাখ। ওই আজরাইলরে কইলম মুই ভাল ঠেহি না। ও যদি রসইয়ারে না নে? করিমনের তখন সে ভাবনা ভাবার উপায় ছিল না। আলকেউটে তখন তাকে পুরো বিষয়টা ঢেলে দিয়েছে। নাকি এরই নাম আল্লার মাশুল।
বুড়া করিমনের নিকা দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারেননি তাই। রসিককে নিয়েই তাঁর যত ভাবনা। পরগাছার ছাল পরগাছায় লাগে না। আলিজান ছিল অত্যন্ত আত্মস্বার্থী, হুজুগবাজ মানুষ। জোর জুলুম, হাট-বাজার-মেলায় লুটপাট– এ ছিল তার সুখের উপকরণ জোটাবার উপায়। তাই বুড়া রায় মাঝে মাঝে রসিকের হালহকিকৎ দেখতে যেতেন করিমনের নয়া গেরস্থালিতে। একবার এইরকমই এক পুজোর দিনে গিয়েছিলেন তিনি রসিককে আনতে। বাড়িতে পুজো, খাওয়া-দাওয়া, উৎসব, অঢেল ব্যবস্থা। আহা! পোলাডায় এট্টু ফুর্তি করইয়া যাউক। ভালোমন্দ খাইয়া যাউক– এরকম ইচ্ছে হয়েছিল বুড়া রায়ের। কিন্তু সেখানে তখন নেমেছিল জাহান্নামের আগুন। আলিজান নাকি বাড়ির কোনো এক বেওয়া বাঁদিকে নিয়ে তখন শয্যায়। এ কিছু তার পক্ষে নতুন ঘটনা নয়। সেখানে রসিক নাকি অবাঞ্ছিত ঢুকে পড়েছিল। অতৃপ্ত আলিজান এই বেত্তমিজি সহ্য করতে না পেরে পাঁচ বছরের সেই এতিমকে ঘরের দাওয়া থেকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেছিল। সেই সময়ই বুড়া রায় সেখানে গিয়ে উপস্থিত। সময় তখন মধ্যাহ্ন। উঠোনে নরম কাদামাটি না থাকলে রসিক হয়তো চুরচুর হয়ে যেত। সে কাদামাটির মধে পড়ে ওমো ওমো, মোরে মারে, ওই হালারপো হালায় মোরে মারে– বলে চিৎকার করছিল। বুড়া রায় সদাশিব মানুষ। কাদার মধ্য থেকে রসুকে তুলে নিয়ে করিমনকে ডেকে বলেছিলেন, বউ, মুই কইলম কদাপি রাগি। কিন্তু যদি রাগি, হেয়া কইলম ভয়ঙ্কর। আলিজানইয়ারে কইস, হে যেন এট্টু সামালইয়া থাহে। তয় রসউয়ার যেডুক ব্যাতা লাগছে, হেয়ার দুগুনা হ্যারে পাইতেই অইবে। এ্যার থিহা রেহাই নাই।
তারপর সেই বৃদ্ধ ডেকে পাঠিয়েছিলেন তাঁর কাহার আর নগ্দিদের। তারা নামে মাত্র মুসলমান। তারা আল্লাকে যেমন মানে, রায়বাড়ির বুড়া শিবকেও সে মতো মানে। বুড়া রায়, বাড়ির অন্যান্য কর্তাদের মতো, এদের কোনোদিন হল্লা হুজ্জোৎ করার জন্য আদেশ করেননি। স্বভাব শান্ত মানুষ। এ-সব তাঁর ধাতে ছিল না। কিন্তুরসিকের এই হেনস্থা তাঁকে পীড়া দিয়েছিল মর্মের গভীরে। তাই, ক্রুদ্ধ কিন্তু সংহত বৃদ্ধ কাহার আর নগ্দিদের আদেশ করেছিলেন সেদিন যে, ওই আজরাইলের বাচ্চারে বান্ধইয়া আনতে হইবে। আদেশ অচিরে পালিত হয়েছিল। বৃদ্ধের পরবর্তী আদেশ ছিল, লাংচুনির পোয়রে এবার চালের উপার উডাইয়া হেহান দিয়া পাক্কা মারইয়া উডানে ফ্যালা। সে আদেশও, বলাবাহুল্য, অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়েছিল। চালের সাথে মই লাগিয়ে, কাহার নগ্দিরা নাকি, রায় মশায়দের দোতলা টিনের বাড়ির একচালার উপর থেকে আলিজানকে হস্তপদ বদ্ধাবস্থায়, চ্যাংদোলা দুলিয়ে মাঝ উঠোনে ছুঁড়ে ফেলে ছিল। পাঠক-পাঠিকা, মূর্ছা যাবেন না। তখন কিন্তু এইস্থানে পাকশাহীর মহ্যাহ্ন। সে যা হোক, এ-কারণে আলিজানকে আজীবনের মতো কোমর ভাঙা ‘দ’ হয়ে কাটাতে হয়।
তারপর থেকে রসিক এ বাড়িতেই এক সময়ে ঘর ব্যাভারী, আধাজলচল হয়ে গেছে। তখন তার কী জাত, সে কার ছেলে কী বেতান্ত– এ নিয়ে কোনো বিতণ্ডা তুলত না। কেউ কিছু বললে, বুড়া রায় খুব ক্ষিপ্ত হতেন। বলতেন, ও মোগো রসউয়া। ব্যাস, এ্যার উফরে আর কোনো কতা নাই।– বুড়িও শেষতক, তাকে মেনেই নিয়েছিলেন। না নিয়ে তাঁর উপায়ও ছিল না। শুধু বলতেন, যা খুশি কর, যেহানে খুশি যাও, খালি গোঁসাইঘরে ঢোহো বোজোন? কিন্তু হায় আল্লাহ্, এই মনুষ্যপুত্রের সর্বাধিক আনন্দ ছিল গোঁসাইঘরে ঢোকাতেই। সে যখন তখন সেখানে ঢুকে পড়ে বলত– ও মাগো দ্যাহ, মুই ঠাহুরঘরে। এ অবস্থায় মাগো কীইবা করতে পারতেন।
সেই রসিককে সাদি বিয়ে করিয়ে যথাসময়ে গেরস্থ করা হলো। বুড়া রায় তখন গত। রায়কত্তা খুড়ার আরব্ধ কর্ম শেষ করেছিলেন। খালপাড়ের একটা ছাড়া ভিটেয় তার ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। আর দিয়েছিলেন এককানি নাবাল। থেকে রসিক ধান, খেসারি এবং মরিচ অর্থাৎ লঙ্কা যা পেত, তাতে তার সম্বৎসরের খোরাকি হয়েও যা বাড়তি থাকত, তাতে অন্য খরচ কুলিয়ে যেত। এ ছাড়া রায়বাড়িতে ভাগচাষের কাজও করত সে।
করিমন রসিকের মা আসত মাঝে মাঝে। তার আরও দুটি সন্তান হয়েছিল– আল্লাহর মাশুল গুনতে। আলিজানের কোমর ভাঙলেও তেজ পড়েনি। জমিজিরেত ভালোই ছিল। করিমনের নেশা ঘুচে গিয়েছিল তার ততদিনে। কিন্তু লোভ বেড়েই গিয়েছিল। কামলা মেয়েদের প্রতি লোভের শেষ ছিল না তার। এ নিয়ে করিমনের অশান্তির শেষ ছিল না। রসিক তাকে নিজের কাছে এনে রাখতে অরাজি ছিল না। কিন্তু তার বউ ছিল দজ্জাল। তার সাথে মানিয়ে চলা করিমনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আলিজানও তাকে ছাড়তে না। কারণ, সংসারে কামকাজ প্রায় সবটাই তাকে করতে হতো। মাঝে মাঝে এসে সে রসিককে বলত, ও রসু, কাকিমার (অর্থাৎ রায়গিন্নির) ছামু ছাড়ো বোচোন? হেলেকইলম মরবি। মুই কইলম তোরে হ্যার ধারে দিয়া দিছি। তুই কইলম এহন হ্যার পোলা। রসিক সংক্ষিপ্ত অভিমানে বলত, জানি, তুই যা। মনে মনে মরা বাপকে ‘খামার’ দিত। কেন, তা সে নিজেই জানে না। মাকে দিত না। মা যাকে নিকা করেছে, অর্থাৎ রসিকের বাপের যে পিঠ ভায়রা, তাকে বলত, চুদির পো। সে লোকটা একদিনের জন্যেও রসিককে কাছে ডাকেনি বা কোনো কথা বলেনি। ও লোকটার উপর তার রাগ অনেক। রসিক এক সময়ে আমাদের বলত, বোজজেন নি, মুই বরাবইর হেই হালারপো হালারে মনে মনে খামার দেতাম। মনে মনে কইথাম, চুৎমারানির পো, তোর মায়ের গায়ে মুই মুতি। হ্যার ফলনাতা হরি। ফলনাতা হরি– অর্থে অমুক করি। বলত– বোজজেন নি হে ভাড়উয়ার পোয় মোরে খালি ছ্যাচতে। এ্যামন ছেচা ছ্যাচতে যে মোর হাড়-গোস জুদা। শুধু শুধুই মারত সে তাকে। সে যাকগে, এখন রসিক আর সে রসিক নেই। সে এখন একটা ব্যাডা হইছে। তার এখন রীতিমত এটা কলমা পড়া বিবি আছে, জমি আছে এক কানি। নিজের ঘর আছে একটা, যার চালে লাউ কুমড়ার ডগা লফ্লফায়। সে এখন একজন দস্তুরমতো হাইল্য়্যা গিরস্ত।
সে মেলা কথা। মাঝে নাকি রসিককে নিয়ে বিস্তর ঝঞ্ঝাট গেছে। সে নাকি এ বাড়ি ত্যাগ করেছিল– বউয়ের দৌরাত্ম্যে। সে তখন মহা মুছল্লি। হিন্দুবাড়ি খায় না। কেননা, তার বউ নাকি তাকে বলেছিল, আফনে যে হিন্দুবাড়ি খাবেন, হেথে কইলম মোর এট্টা আফত্য আছে। রসিক প্রথমে কিছুদিন সে নিয়ে ঝগড়াফ্যাসাদ করেছিল। তা বউ তাকে একদা নাকি ভীষণ ‘কিরউয়া’ কাডইয়া মানা করলে। কী? না, আফনে যদি আর হিন্দুবাড়ি খায়েন, হেলে আফনে হুকরের মাংস খায়েন। এখন, এরপর, মুসলমান সন্তান হয়ে সে কী করে রায়বাড়িতে খাওয়ালওয়া করে। হুকরের মাংস, অর্থাৎ শূকরের মাংস, মুসলমানের পক্ষে একান্ত হারাম। কারণ আল্লাহ্তায়ালা, কোরান শরীফে ফরমাইয়াছেন– যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ ভোজন করে, সে তো সীমানালঙঘনকারী। অতএব তার স্থান কেয়ামতে নরকের আগুনে। নরকের আগুন এক ভয়াবহ স্থান। রসিকের বিবি তার বাপের বাড়ি থাকতে, সে গ্রামের মোল্লাছায়েবের কাছে শুনেছে সেই আগুনের বিবরণ। সে বড় সাংঘাতিক।
এইসব শুনেই হোক, আর বউয়ের মন খুশি করার জন্যেই হোক, সবাই একদিন দেখে যে রসু আর রসু নাই, সে দাড়ি রেখেছে, গোঁফ ছেঁটে ফেলেছে, লুঙ্গি বা পাজামা পরে সে “ঘুরমুরইয়ার উফার” অর্থাৎ গোড়ালির চার আঙুল উপরে। তার নাম তখন আর রসিক নয়, মোহাম্মদ আবদুল রছিদ। রসিক বলে ডাকলে সে এখন আর রা’ও কাড়ে না।
এ-সব কথা আমার আগে কানে গিয়েছিল। এখন দেখি রসিক রায়বাড়ির হাতায় একথালা ভাত আর হিন্দুগো পূজার না-পাক একবাটি বলির মাংস নিয়ে পরমানন্দে হাড় চিবোচ্ছে, আর বলছে, প্যাজের থিহা হিং বালো। পাডার ভোভরা গোন্দো একছের শ্যাষ। বলির পাঁঠার মাংসে পিঁয়াজ চলে না, হিং দিয়ে গন্ধ নাশ করতে হয়। হিং দিয়ে পাঁঠার ঝোল যে স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়, সে-কথা ভোক্তারা সবাই জানেন।
রসিককে শুধোই, ও রসু বউ কী বলে? সে হাড় চিবোতে চিবোতে জবাব দেয়, আরে ধ্যাত্তামাড়ি, থোয়েন ফ্যালাইয়া হে মাগীর ক্যাচাল। মুইও কইয়া দিছি– তোর হুকরের মাংসের গুষ্টির মুই ফলনাতা হরি। ফলনাতা কথাটির তর্জমা করলে প্রুফরিডার, প্রিন্টার পাণ্ডুলিপিটি নর্দমায় ফেলে দিতে পারেন বলে, ও পথে গেলাম না।
কিন্তু তার বউয়ের দিব্যিটিও একটু ভেবে দেখা দরকার। সে জ্ঞান হওয়া অবধি দেখেছে, তারা হিন্দুবাড়ি খায়, কিন্তু হিন্দুরা তাদের বাড়িতে খায় না। শুধু খায় না নয়, তাদের ঘরেও ঢুকতে দেয় না এবং নানাবিধ ক্যাচাল করে। রাগ হওয়া তাই তার অন্যায় নয়। কিন্তু এতসব ভাবতে গেলে, বা এটাই সব ধরে নিলে, রসিকের মতো মানুষদের বেঁচে থাকা, বড় হওয়া, বিয়েসাদি করা বা গেরস্ত হওয়া– কিছুই হয় না।
রসিকের বউয়ে ‘কিরউয়া’ আজ থেকে বিশ পঁচিশ বছর আগে হলে দিব্য মানিয়ে যেত। তখনও এইসব ছোঁয়াছানার ব্যাপার ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্যরকম। রসিকেরা এখন যে শুধু ঘরেই ঢুকতে পারে তাই নয়, তারা এখন পাকের ঘরে, ঠাকুর ঘরেও ঢোকে। রসিকের চাচাতো ভাই খলিল এখন রায়বাড়িতে পুজোর কদিন রান্না করে বলে, তাদের দোস্তোরা হ্যারে বোলায় খলিল ঠাহুর বলইয়া। মুজিবর, যে কিনা গেরাম সুবাদে রসিকের জামাই, হে পূজার বেয়াক কিছু জোগাল দেয়। তাই সে মণ্ডবী। এ কারণে রসিক এখন তপ্ত। সে নাকি কিছুদিন বিবিকে বোঝাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু হে মাগি বোজলে তো। হে নাকি মুছল্লি বাড়ির মাইয়া। হ্যার বাপভাইয়া বেয়াকে কওমের ভাইগো ছাড়া ক্যারো লগে মেশে না। পেত্যেকে রোজা নামাজ রাহে, না-পাক খায় না, বুরপরস্তি নাই। হিন্দুয়ানি হ্যারা সইজ্য করে না। হ্যারগো লোংগি ঘুড়মুড়ইয়ার উফার আর পিরানের লোম্ফা আডুর নীচে। তো সেই সুবাদে রসিকও কিছুকাল সেমত চলছিল। কিন্তু সে অভ্যাস টেকেনি। সে এখন খেতে খেতে আমাকে বলে– বোজজেন নি দুলাভাই, যে কাকিমায় মোরে ল্যাংডা বয়স থিহা মানুষ করছে, নিজের হাতে ভাত মাইখ্যা খাওয়াইছে, গুয়াক্যাতা মুতাক্যাতা ধুইছে, হ্যার ধারে মোরে আইথে দেবে না। মোর হৌর চুৎমারানির পোয় অইলে আস্থা আজরাইল। হে ভাড়উয়ার পয়সা কড়ি, জমিজিরাত মেলা। খালি জাইতে খাডো, হ্যার লইগ্যা বড় মেঞাগো টাউটগিরি হরে। ভাবে হ্যারা হেরে জাইতে লইবে। আসলে তো কাহারের পো কাহার। কাকায় না কইলে, মুই ও মাগিরে বিয়াই করতাম না।
রসিক তার শ্বশুরের উপর বিলক্ষণ চটা। জিজ্ঞেস করার আগেই তার বিষ সে ঢেলে যায় নাগারে। আফনে মনলয়, দুলাভাই, ভাবতে আছেন, মুরুব্বি মানুডারে রসিক খামরায় ক্যা? খামরামু না হরমু কি কয়েন। মুরুব্বি না বাল। মোর সাফ কতা। তোমরা মোর আইজগার পরিজন। তোমার মাইডিরে পার করছ ছল্লিবল্লি করইয়া, হেই সবাদে না তুমি মোর মুরুব্বি। নাইলে, তোমার যা চরিত্তির, রসইয়া হ্যার বাও কেনু দিয়া তোমার হোগাও মারতে না। কমু কি কাকায় কইলে, নাইলে মুই বিয়া করি ওই আজরাইলের আওলাদরে।
রসিক বোধহয় এতদিনে একজন মনমতন শ্রোতা পেয়েছে। তাই সমানে বকে যাচ্ছে। বলে, বোজজেন নি দুলাভাই, কইলে হ্যানে কইবেন যে, কয়। চুৎমারানির পোয়ের এ্যমন খাসইয়তের দোষ যে কোনো কামলা মাতারি হ্যার হাত থিহা রেহাই পায় না। বিয়া করছে দুইডা, হ্যার পরেও নি হ্যার খাউজ মেডে। ওরে খাউজ রে খাউজ। এহন বয়স অইবে আফনের কোম করইয়া পয়ষট্টি বছর। তমো দ্যাহেন রোজ সয়েন্দা কালে বাজারের হেকিম সায়েবেরে যাইয়া ধরে, কয়, মোরে এট্টু বলকারক অষইদ দেও। হালায় এমন মালউয়ার মালউয়া।
এসব দেখে রসিকের পিত্তি জ্বলে। তা শ্বশুর যা করে করুক, তাতে তার কী? কিন্তু তুই মাগি চ্যাতো ক্যা, এ্যাঁ? তোর এত চ্যাতার কী অইছে? তোর বাফে চায় না মুই কাকিমার ধারে আই। তুইও যে হেইতালে তাল দেও, তুই ভাবছডা কী?
তাই রসিক সর্বশেষ সিদ্ধান্ত করেছে, যে যা বলে বলুক, করে করুক, কাকিমা যদ্দিন আছে সে এ বাড়িতে আসবে, খাবে, ফাইফরমাস খাড়বে, আনন্দ ফুর্তি সব করবে। এ সব শুনে বউ গোঁসা করে বাপের বাড়ি। তাই রসিক বলছে, বোজজেন, হে মাগি গ্যাছে হেই আজরাইল বাপের বাড়ি, তো, মুই পোলামাইয়াগো যাইতে দি নাই। জিজ্ঞেস করি, কই, তারা কোথায়? সে বলে, ক্যান, হ্যারা হ্যারগো ঠাহুমার লগে এহন মোণ্ডোপে। মুই বউরে কইছি, তুই যা তোর বাফের বাড়ি, মুইও যাই মোর বাফের বাড়ি। কয়েন, এডা তো মোর বাফের বাড়িই। নাকি? কয়েন। ঠাহুমা, অর্থাৎ, রায়গিন্নি, অর্থাৎ কাকিমা, তিনি তখন তার মেলেচ্ছ নাতি-নাতনিদের নিয়ে ‘হিন্দুগো বুত্পরস্তি’ অর্থাৎ ‘পিরতিমা’ দেখাতে নিয়ে গেছেন। কোরান শরীফে, আল্লাহ্তায়ালা ফরমাইয়াছেন, লা হুক্মা হল্লা লিল্লাহ্। আলীফ, লাম্ মীম্ স্বাদ। যাহারা বুত্পরস্তি করে তাহারা সীমালঙঘন করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন