তেইশ

মিহির সেনগুপ্ত

ছোমেদ এবার তাদের সাগরযাত্রার কথা শোনায়। সাগরযাত্রার দিনক্ষণ ঠিক হলে পর দৌলত একদিন ভালবউদিকে বলে, ভালবউদি, তুমি আছ, ছোমেদ ভাই আছে, আরও এহানে য্যারা য্যারা আছে, বেয়াকের ধারেই কই। মোগো এই বিয়া তোমরা সগলায় মানইয়া লইছ। ন্যায় অন্যায় যা করছি তোমাগো ধারেই করছি। তোমরা জান, সরেস্বতীরে মুই পেরানতুল্য বালবাসি। মুই যদি ফিরইয়া না আই, হ্যারে তোমরাই দেইখ্য। হ্যার প্যাডে যে আইতে আছে হ্যারে তোমরা ফ্যালাইয়া দিও না। আরেট্টা কতা, সরেস্বতী যদি মুই না ফেরলে একলা না থাকতে পারে, হে য্যান ইচ্ছামতন ক্যাওরে বিয়া করে। মোর কোনো আপত্য থাকল না।

সরস্বতী তখন পোয়াতী। দৌলতের কথা শুনে সে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল। অলক্ষুণে কথার জন্য দৌলতকে শাপশাপান্ত করেছিল। ভালবউদি তাকে বুকে জড়িয়ে শান্ত করেছিল। জেলে রমণীরা সবই বুঝত, কিন্তু তবু মন তো মানত না, তাই তাদের কান্নার আর বিরাম ছিল না। তারপর নির্দিষ্ট দিনে কলমীকান্দর গ্রাম পেছনে ফেলে তাদের যাত্রা শুরু হলো।

ছোমেদ এবার সেই যাত্রার কথা ছন্দোবদ্ধ করে–

ভাইগণ বন্দুগণ শোনেন সকলে।

ক্যামনে সাগরে যায় হ্যারা দঙ্গলে।।

টলারে চড়িল তারা মানুষ দশজনা।

কোন দ্যাশে যাইবে হ্যার কীবা ঠিকানা।।

কীবা খাইবে কীবা পরবে কীবা বিশ্রাম।

আপদে বিপদে তাদের কীবা পরিণাম।।

টলারে চড়িল তারা সুগন্ধায় পড়িল।

সুন্দার সে নদী হ্যারগো গোনেতে বহিল।।

সামনে ডাইনে ছাড়ে গাবখানের নদী।

আর দিগে কাউয়ার চর, বামে যাও যদি।।

কেরমশো ধরিল নদী বিষখালি নাম।

সেই নদী পাড়ি দিতে জপ ইষ্টনাম।।

উথাল পাথাল নদী সব্বক্ষণ ঢেউ।

হে নদীতে নাও বায় এমোন আছে কেউ।।

এই বিষখালি নদীর তুফান অইন্য নদীতে নাই। এই নদীই অইলে সাগরে যাওনের পথ। সাগরের পানি যহন হুড়মুড় করইয়া ঢোহে, তহন ঢেউ ওডে দোতালা তিনতালা বাড়ির সোমান উচা। এ য্যান চান্দো সদাগরের বাণিজ্যযাত্রা।

কিন্তু সে ঢেউ পা তুফান এদের গা সহা। ভয় তখনই, যখন এর উপর ঝড় শুরু হয়। তখনকার ভয়াবহতা বর্ণনা করা যায় না। ট্রলার যখন কুয়াঘাটার কাছাকাছি পৌঁছেছে, তখন সেই ভয়াবহতা শুরু হলো। বিষখালির মাঝনদীতে ট্রলার তখন খোলাম কুচি। ঝড়ের প্রকোপে কাৎ হয়ে পড়ে তো ঢেউ তাকে সোজা রাখে। একবার ঢেউয়ের মাথায় তো পরক্ষণেই তলায়। এ যেন সত্যই চাঁদ সদাগরের সেই কালীদহের দুর্যোগ। যেন ক্রুদ্ধা পদ্মা সেই বণিকের যথাসর্বস্ব ডুবিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নদ-নদীদের আদেশ করছেন–

পদ্মা বলে নদ নদী কীবা চাও আর।

ডুবাও চান্দোর ডিঙ্গা সমুদ্র মাঝার।।

তখন দৌলত ফণীকে বলেছিল, ফণীদা, এ ছাতার টলার ডোববে। লও ঝাপ দি। সাতরাইয়া কূলে ওডার চেষ্টা দেহি। ফণী বলেছিল, খ্যাপছ? এই তুফানে? একলহমায় খ্যাড়ের ল্যাহান ভাসাইয়া লইয়া ফ্যালাইবে অকূল সাগরে, ট্যারও পাবি না।

ছোমেদ বলে, টলার তহন হরিণঘাডার কাছাকাছি। দুই আড়াই দণ্ড চললে পৌঁছাইতে পারে। কিন্তু তুফান আর দেউই থামার কোনো নাম নাই। তহন য্যান আসমান, জমিন, নদী, বন– বেয়াকখানে এক পেলয় কাণ্ড।

চাইর ম্যাগের লগে দৌড়ায় চৌষট্টি ম্যাগিণী।

আহা, ঊনপোঞ্চাশ পবন কোদে পেলয় মনে গুণি।।

আহা সাগর থিহা আসে ঢেউ পাহাড় সোমান উচা।

তাহার উপার ভাসে ডিঙা য্যানো কলার মোচা।।

আহা সে সাদেরও ডিঙা উথালও পাথাল।

তাহার উপার জালইয়ার পোয়রা করে আলফাল।।

দৌলত ফণীকে বলেছিল, ফণীদা এই বিদ্যাশ বিপাকে মরতে বইলাম মোরা। কেউ জানলেও না, শোনলেও না। দ্যাহ কী এক জেবন মোগো। হায় রে দুঃক। পানির লগে মোগো খাইদ্য-খাদক সম্পক্ক। নিকিরির ছাওয়াল মোরা, পানি ছাড়া গতি নাই। শ্যাষ গতিও কি পানিতেই অইবে। মোগোরে দয়া করণের লইগ্যা কি কেউ কোতায়ও নাই।–ছোমেদ আবার গান ধরে–

ঘরে রইল পেরানের ধন যোবতী সুন্দরী।

ক্যার মুখও দেখিয়া বাচপে যদি মুই মরি।।

আহা নিদয়া রাইক্কসী নদী ফণা ধরইয়া ফোসে।

গিলিয়া খাইবারে চায় পরমও আক্কোসে।

খলও খলও কলও কলও আছাড়ি বিছাড়ি।

মোগো সগলারে বুজি পাডায় যোমের বাড়ি।।

আহা, কোতায় রইলা পানোপিয়া কোতায় রইলা মা।

মরণকালে ক্যারেও তো চৌক্কে দ্যাকলাম না।।

ফণী বলেছিল, দৌলত, আয় বেয়াকে। এ রহম খাড়ইয়া মরমু না। শ্যাষ চেষ্টা দেহন লাগে। না আল্লা, না মানু, না তুফান তাণ্ডব কেউই মোগো ছাড়ে না। আয় মটোর বন্দ করইয়া, গেরাফি ফ্যালাইয়া, টলারডা আটকাইয়া রাহি। গেরাফি আছে তিনডা। তিন দিগে ফ্যালা– তখন নোঙ্গরগুলো ফেলে ট্রলার বেঁধেছিল তারা। এতে একটা সুবিধে হলো এই যে, বাতাসের ধাক্কায় এদিক যদি কাৎ হয় ওদিক টান পড়ে, ওদিকে কাৎ হলে টান পড়ে এদিকে। ট্রলার এখন আর ওলটাতে পারবে না। কিন্তু ঢেউয়ের হাত থেকে বাঁচায় কে?

এইভাবে সেই তাণ্ডব চলেছিল ‘দোয়াদশ’ দণ্ডকাল। ট্রলারে যারা ছিল সবাই ইষ্টনাম জপ করেছে। পরিজনেদের জন্য বিলাপ করেছে। এ অবস্থায় মানুষের আর কীই বা করার থাকে। শুধু ফণী আর দৌলত তাদের দুই বিশাল পেশিবহুল দেহকাণ্ড নিয়ে লড়াই করে গেছে চাঁদ সদাগরের মতো অসীম সাহসে। এ তো তাদেরও বাণিজ্যযাত্রা। ছোমেদ এখন কথকতায় এই প্রাণান্ত সংগ্রামের বিষয় বলে যায়। বলে, মাইন্যমানেরা, আপনেরা, শোনতে আছেন, মুই কইতে আছি। কিন্তু মোর এ কওনে কিছুই কি বুজাইত পারতে আছি? এই কওনে কতডুক বুঝান যায়, কিছুই যায় না। খালি এই জিন্দিগী য্যারগো ঘাড় ধরইয় বুজায়, হ্যারা বোজে। মানুষ যে কত দুব্বল, কত যে কাঙ্গাল, হেয়া এই রহম সোমায়ই মাইনসের মনে আয়।–ছোমেদ আবার চাঁদ সদাগরের ডিঙা ডুবির প্রসঙ্গে চলে যায়। যদিও এখানে ডিঙি মাত্র একখানা ট্রলার। সে বলে, এ য্যান মোগো কালু গাইনের ব্যাখ্যাতা–

পদ্মারে দেখিয়া চান্দো চাহে চারিপাশে।

হেনকালে দ্যাখে যত নদনদী আইসে।।

পবনের গতি মেঘ ভ্রমে চারি ভিত।

দেখিয়া ডিঙ্গার লোক হইল কম্পিত।।

মোগো কালু গাইনের রয়ানি, মাইন্যমানেরা, আপনেরা য্যারা য্যারা হোনছেন, এট্টু চিন্তা করইয়া দ্যাহেন। ক্যামন আঙ্গুল নাচাইয়া নাচাইয়া হেনায় গাইতেন, আহা!

কাণ্ডারি বলে সাধু ভাল না অইল কাজ।

প্রমাদ পড়িল আজি সমুদ্রের মাঝ।।

বায়ু কোণে ডাকে মেঘ যেন দেখি নীল।

ঝড় বরিষণ হইল আর পড়ে শিল।।

মেঘের দারুণ চিৎকারে কাঁপে সর্ব গা।।

বড় ভাগ্যে আজু রক্ষা করিবে দুর্গা মা।।

কোনো মা-ই রক্ষা করার লইগ্যা আয় না। হ্যাষে রাইত কাবার করইয়া থামলে হেই তাণ্ডব। না, চান্দোর মতো হ্যারগো ডিঙা ডোবে নায়। ব্যানইয়া কালে, দ্যাহা গেল টলার হান ছোডো ছোডো ঢেউ-এর উপার নাচতে আছে।

ট্রলার আবার চলতে থাকে। দুপাশে সুন্দরী, গোলপাতা, গেউয়ার বন। মাঝে নদী। নদী থেকে দেখা যায়, দুপাশের হোগল ঝোপের ভেতর থেকে ট্রলারের শব্দে ভীত মেছো কুমিরের কীরকম তরতর করে জলে নেমে যায়। গোলপাতার আড়াল থেকে শজারুরা তাদের গায়ের কাঁটা উচিয়ে কুঁতকুঁতে চোখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে, আর ট্রলারের ড্‌ড্‌ড্‌ড্‌ আওয়াজ শোনে। শেয়ালগুলো জল সাঁতরে, নদীর মাঝে মাঝে যে চরা পড়েছে সেখানে কাঁকড়া খেতে যায়। বুনো হাঁসের ঝাঁক হঠাৎ আলোড়নে এলোমেলো ওড়ে, আবার জলের উপর ভাসতে থাকে। জানা অজানা নানান পাখিরা ওড়াউড়ি করছে নদী আর বনের মাথার উপরে। এইসব দেখেশুনে দৌলত, ফণী আর তার সঙ্গীদের মনে প্রত্যয় হয় যে, কাল রাত্তিরের দুর্যোগ পেরিয়ে সত্যিই তারা বেঁচে আছে।

হরিণঘাটা নদীটা যে খুব বিশাল কিছু তা নয়। এই ঘাটে আগে হরিণেরা জল খেতে আসত। এখন হরিণ আর তত নেই। নদীর আশেপাশে জনবসতি হওয়ায় তারাও আর এখানে জল খেতে আসে না। নদীর স্বভাব খুব ভাল। ছোমেদ বলে, এহানের বেয়াক নদী গো একোই চেহারা। মোডাসোডা বছর বিয়ানইয়া মাইয়্যা মাইনসের ল্যাহানথলথলইয়া। য্যান যদ্দিন র‍্যাত আছেলে বিয়াইছে, এহন, এহানে মাংসের দলা, ওহানে দম্বল, বুক ঢাহে তো হোগা খোলা এইরহম ভাব। সত্যিই তাই। এখানে চরা, ওখানে বাঁক, কিনারায় স্তরে স্তরে পলি। আর হবেই না কেন, এই তো তার অন্তিম গতি। এ সময়ে স্বভাব খারাপ করেই বা আর লাভ কী? তবে বেনোজল বলে কথা। তারা যখন হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে, তখন এই প্রৌঢ়াদেরও কূল রক্ষা সমূহ সংকট। এ যেন ছাড়ন্ত যৌবন। শেষ ভাসানে তোলপাড় করে দেয় সব।

ছোমেদ বলে, নদীর স্বভাব তমোও ভালই কম, ম্যালা নাচোন কোদন নাই। ধীরে সুস্থে গদাই লস্করি চালে হ্যার যাওন। তো, হিদিন দুফইরে হ্যারা পোছলে হরিণঘাডার বাজারে। হেইহানেই টলার বান্ধলে। ঠিক অইলে, হিদিন হেহানেই বেয়াকে থাকপে। ফণী দলের সর্দার, হে কয়, আইজ এহানেই থাহন। মরণের হাত থিকা বাচ্ছে বেয়াকে, মনে সাইদ্যের ফুর্তি।

বিকেলে দৌলত এসে বলে, ফণীদা, দ্যাখছ, কাখরা উজাইছে। যেসব ঝোরা খাল হরিণঘাটায় পড়েছে সেই সব খালে হাজার হাজার কাঁকড়া এসে নামছে নদীতে। জলের রঙ ক্রমশই কালো হয়ে যাচ্ছে। এরা বা নিম্নবঙ্গের সবাই জানে এই ‘উজানিয়া’ কাঁকড়ার স্বাদ। আবার এই কাঁকড়ার যথেচ্ছ ব্যবহারও যে কী বিপর্যয় আনতে পারে, তাও ভুক্তভোগীদের জানা। এই কাঁকড়া যেন প্রায় নিয়তিনির্দিষ্ট মরণও নিয়ে আসে প্রত্যন্তবঙ্গের এইসব মানুষদের জীবনে। অসাধারণ স্বাদ। যখন তারা উজানপথে নেমে আসে, তাদের কোনো সীমা সংখ্যা থাকে না। বিলের বদ্ধ জলে জন্ম নেয় এরা। শরতের শেষে, সোঁতার টানে নেমে আসে তারা। অদ্ভুত তাদের চরিত্র। তারা স্রোতের বেগে নামে, কিন্তু গতি রাখে তার বিরুদ্ধে। যেন মাতৃজঠর তারা ছাড়বে না কোনোমতেই। এ কারণে নাম উজানিয়া, যেন বাঙালি।

ছোমেদ বলে, খালি সোয়াদের কতা না। সস্তা সুবিদায় এমন অমের্ত মোরা আর কোতায় পাই, কয়েন। তো দৌলতইয়া যহন কইলে কাখড়া উজাইতে আছে, তহন বেয়াকে ওডলে উফাল দিয়া। কাখড়া ধরলে বেয়াকে রাইজ্যের। মনে ম্যালা ফুর্তি। রাইতের খাওনডা জোমবে। ফণী কইলে, কাইল মোরা সাগরে পৌঁছাইয়া যামু, আর হ্যার পরথিয়া খালি খাডন তারা খাডন। ভাইরা, আইজ বেয়াকে এট্টু আমোদ ফুর্তি করইয়া লও। ছোমেদ ভাই এট্টু গান গপ্প হউক। কাখড়ার ঝাল ছালুন আর ভাত, যে যত পার খাও।

ট্রলারে যারা ছিল, তাদের তো এমনি কোনো আমোদ আহ্লাদের ব্যবস্থা ছিল না। এরকম আমোদ আহ্লাদের ফুরসুতও তাদের জীবনে কদাপিই আসে। সেজন্যে ওইদিন তারা একটু ফুর্তিতে মাতল। অষ্ট বলল, ছোমেদ ভাই এহানে তো তোমার দোহার দাহার নাই। তয় মুই কিনা, বহুত দিন, তোমাগো কায়দা কানুন দেখছি, আইজ, মুই তোমার দোহার হমু। চিন্তা নাই, ডুবাইয়া দিমু না।

ছোমেদ অষ্টর দোহারে সেদিন মাথুর পালা গেয়েছিল। মাথুর। মথুরা থেকে মাথুর। মাধব মথুরাপুরীতে যাচ্ছে। রাধিকা সেই বিরহ বর্ণনা করছে।

অব মাধব মথুরাপুর গেল।

গোকুল মানিক হরিলেল।।

গোকুলে উছলল করুণাক লোল।

নয়নকে জলে দেখ বহত হিল্লোল।।

শূন ভেল মন্দির শূন ভেল নগরী।

শূন ভেল দশদিক শূন ভেল সগরী।।

চারদিকে যেন নিঃসীম শূন্যতা থমথম করছে, আছড়ে পড়ছে। এই হচ্ছে মাথুর। ধীবরপল্লীর রমণীরা তো সেই মাথুরে বিরহী এখন। ছোমেদ সেই মাথুর কীর্তন না করে কীই বা গাইতে পারে?

এ কথা শুনল শ্রবণ ভরিয়া

কৃষ্ণ না আইল আর।

মধুপুরে রহে সবজন কহে

রহিল যমুনা পার।।

এইসব পদাবলী ছোমেদ শিখেছিল সূর্যদাসের কীর্তন শুনে। তার মনের মধ্যে কলমীকান্দরের মেয়েদের মাথুর ভর করেছিল সেদিন। বহু রাত অবধি চলেছিল সেই পালাগান। তারপর কাঁকড়ার ছালুন আর ভাত খেয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়েছিল সবাই। শেষ রাতে দৌলত এবং অপর দুজনের আরম্ভ হলো ভেদ বমি।

প্রথমে সবাই ভেবেছিল বদহজম। কিন্তু ক্রমশ যখন জলের মতো পাতলা পায়খানা শুরু হলো, আর সেই সাথে হাত পায়ে খিচুনি, তখন কারোর আর বুঝতে কিছু বাকি থাকল না। ছোমেদ বলে, মোরা কই ঝোলা। পাতলা জলের ল্যাহান দাস্ত আর হ্যার লগে বইমি।

সকাল হলে ফণী গিয়েছিল ডাক্তারের খোঁজে। কিন্তু ওই জঙ্গলের দেশে ডাক্তার কবিরাজ কোথায়। একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার এসে ফোটা কেটে ওষুধ দিয়েছিল, আর লবণ, গুড়, জল মিলিয়ে খাওয়াবার ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু লাভ হলো না। বেলা যখন মাথার উপর, তখন দুজন শেষ। দৌলত আরও ঘন্টা দুয়েকের মতো লড়েছিল, তারপর সেও শেষ।

পরদিন শ্রান্ত, ক্লান্ত বিধ্বস্ত ফণী, ছোমেদ, আর অষ্ট লঞ্চে বাড়ির পথে রওনা হয়েছিল। অষ্ট সারা রাস্তা অঝোরে কেঁদেছিল। ফণী তার পাথরের চাঁইয়ের মতো শরীরকে আরও শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে সংহত থেকেছিল। ছোমেদ জ্বীনে পাওয়া মানুষের মতো অষ্ট আর ফণীর হাত ধরে থম মেরে বসেছিল। তার মনের মইধ্যে তখন মাথুরের প্রবল হাহাকার দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। ছোমেদ বলে, মোর মনে অইলে আগের রাত্তিরের গাওয়া কেত্তনের হেই পদ–

এ কথা শুনল শ্রবণ ভরিয়া

কৃষ্ণ না আইল আর।

মধুপুরে রহে সবজন কহে

রহিল যমুনা পার।।

ফণী নাকি একটা কাটা কলাগাছের মতো দৌলতের উঠানে আছাড় খেয়ে পড়েছিল। তার মুখ থেকে একটাই বাক্য বেরিয়েছিল– সরেস্বতী, বুইনডি, তুই মোরে শাপ দে, মুই তোর দৌলতরে হরিণঘাডার কূলে কব্বর দিয়া আইছি। এর পরেই সে জ্ঞান হারিয়েছিল।

ছোমেদ বলে যায়– উপস্থিত পঞ্চজন, মরণ মোগো মইদ্যে যহন তহনের কারবার। কেউ মরলে শোকতাপ অয়ই। কিন্তু মোরগো মরণ এ্যমন যে হেয়া লইয়া মোরা বেশিক্ষুণ শোকতাপ করণের সোমায় পাই না। তয় মোগো দৌলতের মরণডা হেরহম না। হে আছিল মোগো বেয়াকের চৌক্কের মণি। হে মরইয়া, মোরগো বেয়াকের ড্যানা ভাইঙ্গা দিয়া গেলে। আহা! ওইরহম এট্টা পোলা।

সরস্বতী এই সংবাদ পাওয়ার পর যে চুপ করে গেল, আর রাও কাড়ল না। সে শুধু বিড়বিড় করে নাকি বার দুয়েক বলেছিল, মুই জানতাম, মুই জানতাম। ফণীর স্ত্রী, কার্তিকের স্ত্রী বা ছোমেদের বিবি, তারা সবাই সবসময় তাকে আগলে রাখত। সে তখন আসন্ন প্রসবা। কিন্তু মুখে তার একটিও শব্দ নেই। এইভাবে যখন দিনের পর দিন একটা দমবন্ধ অবস্থার মধ্যে সবাই কাটাচ্ছে, তখন একদিন ফণী এসে ছোমেদকে বলেছিল, ছোমেদ ভাই, এট্টা বড় খুশির সম্বাদ আছে।

ছোমেদ বলে, মুই ভাবি মোগো আবার খুশির খবর কী? জিগাইতে, ফণী কয়–কাইল রাইতে সরেস্বতীর এউক্কা পুত্র সন্তান হইছে। দ্যাখফা চল, একছের য্যান এউক্কা ছোডো দৌলত হুইয়া আছেন। কিন্তু সরেস্বতী না হ্যারে দুধ দে, না হ্যার মুখ দ্যাহে। তো, ফণীর লগে লাফাইতে লাফাইতে গেলাম পোলা দ্যাখতে। যাইয়া দেহি, কাত্তিকার বউওর কোলে হইয়া হাত পাও লড়তে আছেন গুণধর। সরেস্বতী হেই রহম উদাস। কইলাম, বুইনডি, পোলারে এট্টু কোলে লও। ও তো তোমার আর দৌলতের কইলজা।

দৌলতের নাম নিতেই সরস্বতী আচমকা তীক্ষ্ন চিৎকারে খান খান হয়ে পড়েছিল। বলেছিল, ও পোলা মুই ছুমু না, ও ওর বাপেরে খাইয়া জন্মাইছে। এ কতার কাত্তিকের ঘরের মাইনসে কয়, হাউয়া হাউয়া ছিয়া ছিয়া। মুহের কোনো আগোইল নাই। এ্যামন সুন্দার পোলাডা, হ্যারে নি এই রহম কতা কয়। সরেস্বতী কয়, চাইনা মোর পোলা, কিচ্ছু লাগবে না মোর। ও পোলা তোমরা দ্যাহ, তোমরা পোষো।

ছোমেদ আবার দু চোখের ধারায় দাড়ি ভেজায়। বলে, সরেস্বতীর তহনকার মনের কতা মোরে গানে কইতে দেন। হাদা কতায় হেয়া কওন যায় না। গানেই কইতে অয়। বাশিডা এট্টু মোলায়েম করইয়া বাজাও কাত্তিক ভাই–

মুই অতি অবাগিনী অকালেমরল পতি।

হুগাইয়া মরণ ছাড়া কীবা মোর গতি।।

জমি নাই, জিরাত নাই, নাই চালে ছাওয়া।

কেবা দেবে গৃহবস্ত্র, কেবা প্যাডের খাওয়া।।

কেবা খাওইবেমোরে দুয্যোগেরও দিনে।

ক্যামনে কাডামু যৈবন পতিরও বিহনে।।

দুধেরও ছাওয়াল মোর ক্যারে ডাকপে বাপ।

ক্যার কোলে মাথা রাইখ্যা ঘচামু সন্তাপ।।

একে তো অবলা জাতি, বান্দা হাত পাও।

ক্যামনে বাইব মুই আইছয়া এ নাও।।

উপস্থিত মাইন্যমানগণ, আমার দেলের পেয়ারের ভাই বন্ধুরা, আর য্যারা মোরগো ল্যাহান, হুগানইয়া মুগানইয়া, উপাসইয়া কাপাসইয়া মানু এহানে আছেন, তেনাগো ছোমেদ রয়াতি আবার, আদাব আরজ জানায়। হে আবারও বিনতি করে, হ্যারা য্যান ছোমেদের অফরাদ না লয়। সরেস্বতীর যে কতাগুলান এহন পয়ারে বান্দইয়া আপনেগো হুনাইলাম, হে কতাগুলান কৈলাম এট্টু ভাবোন লাগে। এহানে যেনরা উচা জাতের মনুষ্য আছেন, তেনরা মোন লয় ভাবতে আছেন, হাউয়া ছিয়া। এই কয়দিন আগেই না তোর সোয়ামিডা মরলে। হ্যার লইগ্যা এট্টু শোক তাপ নাই, তুই মাগি এয়া কও কী? তুই এহনই ভাবোন ধরছ, ক্যার কোলে মাতা রাইখ্যা ঘুচাবি সন্তাপ? তোর যে এট্টা পোলাও অইছে, তুই হ্যারেও আমোল দিতে আছো না। হ্যারেও তুই বিলাইয়া দিতে চাও। তয় তো তুই বেবুইশ্যারও অধম, খারাপ মাইয়া মানু তুই। ভাইয়েরা মোর, এইসব কতাগুলান ভাবার আগে, আপনেরা যদি এই ছোমেদ আলির লগে এট্টু চিন্তা করেন, যে কী পরিবস্থায় সরেস্বতীগো এরহম ভাবনা মাতায় আয়, তয় বোধকরি হ্যারে খুব এট্টা খারাপ ভাববেন না। মুই পুনরায় পয়ারে কই, হোনেন–

আহা, হায় হায়, হায় হায়, হায়। (ধ্রুঃ)

যতও দিনও আছে পতি ততও দিনও ভাব।

হ্যার পরে তো প্যাডের চিন্তার পেরকাণ্ড পেরতাপ।।

কেবা আনে দানাপানি, কেবা খ্যাদায় জার।

মাতার উফার নাই ছই অকূলও পাথার।।

প্যাডে দেওয়ার কেউ নাই, পিরিত করার নাগর।

প্যাড বাজাইয়া হরইয়া পড়ে, কোথায় পাই তার লাগর।।

কত দিনবা এই মতন সুস্থ থাহন যায়।

হে, কারণে এ্যারা নয়া পুরুষও বিচরায়।।

হেই পুরুষটা যদি অয় মানুষের ল্যাহান।

তয় জানিবা হে রমণীর মুসকিল আছান।।

যে গ্যাছে, হে গেছে, হ্যারে ফিরাইবে কেডা।

হে কি পারবে মোকাবেলা করতে নিত্য ল্যাডা।।

বেয়াকেরই মরতে অইবে, আগে কিবা পরে।

তমোও তো জীয়ন্তের সোমস্যা সংসারে।।

যতদিন বাচো তুমি ততদিন খাওয়া।

হে খাওয়া জোডায় কেডা যদি তুমি বেওয়া।।

যোবতী বেওয়ার দুঃক আরও চোমোৎকার।

প্যাডের অন্ন যেই দেয় সে হয় ভাতার।।

এ পর্যন্ত সুরে বিন্যাস করে, ছোমেদ গদ্যের মতো করে পদ্য বলে। এও তাদের এক কায়দা বলে, প্যাডের অন্নের কতা শোনেন দিয়া মন। উপস্থিত আছেন যারা ভদ্র পঞ্চজন। য্যার নাই জমি জিরাত য্যার নাই পতি। য্যার কোনো আশ্চয় নাই অকূলে বসতি। তার দুঃক দূর করে এ্যামন মানুষ কেডা। বিনা সাত্থে অন্ন জোগায় আছে কোন ব্যাডা। বিনা সাত্থে অন্নজল কেউই জোডায় না। য্যার ক্ষ্যামতা নাই, হ্যার কতা স্বতন্তর। য্যার আছে, হে যদি আত্মীয় বান্দবও অয় তমো বিনা সাত্থে হে কিছু করে না।

বিনা সাত্থে দেবে না কেউ অন্নদানাপানি।

কারণ বেকারণে করবে অযথা হয়রানি।।

ভাত দেবার কেই না তো, পিরিত করার গোসাই।

এত কাল তো ছোমেদ আলি দেইখ্যা আইল তাই।।

এই বিচারে আপনেরা এট্টু মোগো সরেস্বতীর বিষয়ডা ভাবেন। সরেস্বতী কইলম গুণের মাইয়া আছেলে, গুণবতী য্যারে কই মোরা। দৌলতের লগে হ্যার পিরিত যে কত ঘোনো আছেলে, হেয়াও কইলম মোরগো অজানা না। তয় এহন করণ কী? দৌলত মরছে, চাইর পাচ মাস অইছে তহন। হে যদ্দিন আছেলে, সরেস্বতীর কোনো চিন্তা আছেলে না খাওয়া লওয়া, না অইন্য কিছুর। এহন মোরা য্যারা, মরাধরা, মোগো খাওয়ায় কেডা, তো সরেস্বতী আর হের পোলারে মোরা দেখমু। এক দিন, দুই দিনের তো কতা না। হারা জেবনডা হ্যারগো পড়ইয়া রইছে। হেই চিন্তাই সরেস্বতীর আসল চিন্তা। আর এ কারণেই, সাগরে যাওয়ার সোমায় দৌলত কইয়া গেছেলে, সরেস্বতী যদি, হ্যার অবত্তমানে অইন্য কাউরে বিয়া করে, হেতে হ্যার আফত্য নাই।

ছেলেকে যে সরস্বতী মানুষ করবে, সে সামর্থ্য তার কোথায়। তাই শেষতক কার্তিকের বউই সেই দায়িত্ব নেয়। তার নিজের কোলে কাঁখে তো কেউ নেই। এ কারণেই ছোমেদ গানে বলেছে, বাজা মাগির কোলে দ্যাহ চান্দের রোশনাই। ছোমেদই তার নাম রেখেছিল কানাই। এভাবে ছেলে মানুষ করার সমস্যা মেটে। কিন্তু তাতেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়? সরস্বতীর তো নিজস্ব সমস্যাও আছে। সে যে এখন পুনরায় আছইয়া নাও।

এভাবেই দিন মাস বছর যায়। মানুষের অতি তীব্র সন্তাপও শীতল হয় ক্রমশ সময়ের প্রলেপে। সরস্বতীর চালে তখন ঢিল পড়ে রাত বেরাতে, দিনে দুপুরে। সে ঢিল বড় অর্থবহ। খালের ঘাটে জল আনতে যাওয়া সরস্বতী, আশপাশ ইতর পুরুষের কুৎসিত ইশারায় নিজেকে বড় অশুচি বোধ করে। ছোমেদ বলে, রসের নাগরেরা, হুনাইয়া হুনাইয়া কয়, এ্যামন যৈবন কি হুগাইয়া মরণের লইগ্যা? কিন্তু ভাইগণ বন্ধুগণ, এ ব্যাপারে মোরা কী করতে পারি? মোগো তো খাডউয়া খাইতে অয়, মোরা কি পারি হ্যারে সব্বোক্ষণ পাহারা দেতে?

অষ্ট একদিন এসে বলে, ছোমেদ ভাই, এট্টা গুরুতর কতা আছে। তার মাথার চুল ‘উড়াখুড়া’, চোখের কোলে ‘পানা পুহইরের আন্দার’, গালে সাতদিনের না-কামানো দাড়ি। জিজ্ঞেস করলে কথার উত্তর দেয় না, শুধু নখ খোঁটে, আর মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর একসময় সে কেঁদে ফেলে। ছোমেদ বলে, মুই জিগাই, তোর অইছে কী? কান্দ কিয়া? হে কয়, ছোমেদ ভাই, দৌলতইয়া যে মোরে কী ফ্যাসাদে ফেলাইছে–। দৌলত ফ্যাসাদে ফ্যালাইছে অষ্টরে? হ্যারা তো দুই জোনে ঘোনো দোস্ত আছেলে। জিগাইলাম, খুলইয়া ক’। হে কয়, সরেস্বতীর কী অইবে?

ক্যান, হ্যার অইছে কী?

না, কাইল গেছিলাম হ্যার ওহানে। পেরায়ই তো যাই দ্যাখতে, কেমন আছে। এডা ওডা দিয়া থুইয়া আই। দুই দণ্ড দুঃকের কতা কই। কাইল যহন গেছি হে কান্দয়া পড়লে। কয় বোলে যে, এ রহম আর কয় দিন চলবে? রাত্তিরে তো টেকতে পারি না। বেড়ার পাশে শিস দে, ডাহে, দরজায় টোক্কা মারে। মুহ মড়ার ল্যাহান পড়ইয়া থাহি।

এসব শুনে ছোমেদ অষ্টকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে কী করতে চায় ছোমেদ বলে, মোর য্যান এট্টু ক্যামন ঠ্যাকলে। অষ্ট কান্দলে কিয়া? অষ্ট তাকে তখন তার সমস্যার কথা বলে। বলে, তুমি, তোমরা বেয়াকেই জান দৌলত আমার পেরানের পেরান আছেলে। কিন্তু ছোমেদ ভাই, এয়া কী অইলে? মুই তো কোনো দিন একতা চিন্তাও করি নাই। এহন যে সোমস্যায় পড়ছি, হে সোমস্যায় কতা মুহে কইতেও লজ্জায় মাতা কাডা যায়। তুমি মোরে এট্টা নিদান দেও, কী করি। সরেস্বতীরে রক্ষা করা মোর কত্তব্য।

ছোমেদ তাকে আরও বাজিয়ে নিতে চেয়েছিল, সে বলে, মুই সোজা মানুষ, সোজা হ্যারে জিগাইলাম, তোর কি খালি কর্তব্য করতে ইচ্ছা করতে আছে, না এ্যার মধ্যে অন্য কিছুও আছে, এট্টু ভাঙ্গাইয়া ক দেহি। মুই কইলম তোর ভাব ভাল ঠেহি না। অষ্ট বলে, ছোমেদ ভাই, মুই জানি তুমি মোরে ভুল বোজবা না। মিত্যা কমু না তোমারে। শয়নে স্বপনে মোর এহন এট্টাই চিন্তা, হেডা সরেস্বতীর, তয়, বিশ্বাস কর দৌলতেরে মুই ভুলি নাই। দৌলতের কতা যতই মনে হয়, ততই সরেস্বতীর কতা ভাবি।

ছোমেদ সমাজের কথা তুলেছিল। সমাজ অষ্ট এবং সরস্বতীর সম্পর্ক মেনে নেবে না। তারা কয়জন বন্ধু-বান্ধব ছাড়া দৌলত-সরস্বতীর ব্যাপারটাই বা কয়জনে মেনেছে? এ তো আবার অন্য সমস্যা। কার্যগতিকে সরস্বতীতে নিয়ে আবার একটা জলঘোলা হবার রাস্তা তৈরি হতে চলেছে। অষ্ট এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেনি। বলেছিল, মুই সোমাজের হোগা মারি। আড়াই জোন মানুষ গেরামে, এহানে সোমাজের আছেডা কী? আর সোমাজ কি হ্যারে বাচাইবে? কিন্তু সরেস্বতী? হ্যার কি মত আছে? ছোমেদ জানতে চেয়েছিল। অষ্ট বলেছিল, হ্যার মন লয় আফইত্য অইবে না।

ভাইগণ, বন্ধুগণ, রাইত পেরায় শ্যাষ মোর এই পরণকতার শ্যাষ নাই। ক্যান? না একতার শ্যাষ অয় না। মোগো দুদ্দশার য্যামন শ্যাষ অয় না, হ্যার কতারও হেইরম শ্যাষ অইতে পারে না। তমো এক জাগায় তো থামতে অইবে। দ্যাহেন আপনেরা, যে যাই ভাবেন, যে যাই কয়েন মোগো সমস্যার নিদান মোগোই খুজইয়া বাইর করতে অইবে। হেয়া অইন্য কেউ করতে পারবে না। করলেও হেথে কাম অইবে না।–তো, অষ্ট একদিন সরস্বতীকে বলে, সই, আয়ো, মোরা আবার নতুন করইয়া ঘর বান্দি। সরস্বতী জানতে চেয়েছিল– আর কানাই? ছোমেদ বলে, কানাইর সমস্যাডা কইলম, ভাইগণ বন্দুগণ, সামাইন্য না, কাত্তিক আর হ্যার স্তিরি হ্যারে পালতে পোষতে আছেলে। এ কতা ঠিক। তয় সরেস্বতী যে হ্যার মা আর দৌলত যে হ্যার মরইয়া যাওয়া বাপ, একতা তহন হ্যার অজানা আছেলে না। তয় পোলাপান মানু, খুব এট্টা কিছু বোজতে না। কিন্তু ভবিষ্যৎ বলইয়া এট্টা কতা আছে।

অষ্ট বলেছিল, সই, কানাই তো মোগো দৌলতের চিন্ন। তুমি য্যামন দৌলতের মহব্বত করতা, মুইও তো করতাম। কানাই তো মোগো কলিজা। তখন সরস্বতী আবার তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কানাইর বাবারে কোনোদিন অসোম্মান করবা না তো?–অষ্ট তাকে ছুঁয়ে শপথ করেছিল। বলেছিল, সই এ ছাড়া তোমারে বাচানের আর কোনো রাস্তা নাই। তুমি যদি ছন্নছাড়া অইয়া যাও, তয় দৌলতের রুহু মোরে ক্ষ্যামা করবে?– তহন বোজজেন নি, ভাইগণ, বন্দুগণ, সরেস্বতী অষ্টর হাত ধরইয়া কইলে, চল তোমারে ঘরে যাই। মোগো য্যারা নিজেগো মানুষজোন আছে, হ্যাগো এ্যাকদিন ডাইক্যা খাইয়াইয়া দেও, যা জোডে। আর কিছু করণের দরকার নাই। যে যা কয় কউক।

জেলে নিক্কিরি সমাজে এ সমাধান কিছু নতুন নয়। তাছাড়া, এ নিয়ে কানাইয়ের ভবিষ্যতে যে খুব একটা মানসিক সমস্যা হবে, যেমন উঁচু জাতের অনুরূপ সন্তানদের ঘটে, তাও বলা যায় না। সমস্যা ঘটতেই পারে, তবে তার কারণ অন্য ধরনের। সেখানে অষ্টর এক প্রগাঢ় ভূমিকা যদি সক্রিয় না হয়, তবেই তার সম্ভাবনা এবং তা সাধারণত ঘটেও থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে তা আদৌ বিচার্য নয়। ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা ভেবে বর্তমানের সমাধানকে এরা কখনই তুচ্ছ করতে পারে না। তাছাড়া অজানা পথে চরণদারিই তো এদের পরম্পরা। এরা কীভাবেই বা অত হিসেবি হওয়ার কথা ভাববে?

রাত প্রায় শেষ হতে চলল। ছোমেদের সুদীর্ঘ পরণকথারও আপাত ইতি। সত্যিই এ কথার শেষ হয় না।

ভাইগণ, বন্দুগণ, এতক্ষুণে মোর বচনবিলাপ শ্যাষ করলাম। আপনেগো মেহেরবানি আর দোয়া কামনা করি। মোরগো কানাই য্যানো জিন্দিগীতে আর দুঃক না পায়। ও যেন সুহে থাহে। অষ্ট আর সরেস্বতীরেও আপনেরা দোয়া করবেন। নানান জোনে নানান কতা কয়। কিন্তু মুই ছোমেদ বয়াতি কই, অরা ভাল, ভাল। আল্লায় হ্যারগো ভাল রাহুক। হ্যারগো পিরিত মোহব্বত যেন আজীবন থাহে। হ্যারা য্যানো শান্তিতে থাহে।

দৌলত সরেস্বতীর কতা হৈল সমাপন।

এইখানে শ্যাষ করি আমারও বচন।।

সুহে দুঃকে থাহি মোরা আমাগো মতন।

ধন চাই না, দৌলত চাই না, রাজ্য সিংহাসন।।

তমো কেন নানা মত করিয়া অছিলা।

অকালে মৌয়াত আনে নিদয়া রঙ্গিলা।।

ঝড় বইন্যা পানি হে তো আল্লার কুদরত।

হ্যার থিহা বাচনের কিবা আছে পথ।।

তমো মোরা যুজি নিত্য তাহাদের সাথে।

তবুপরি ক্যান মরি নিত্য লোহু পাতে।।

এই দ্যাশে যত আছ গরিবও সন্তান।

মাইনসের খুনে আর না করিও সান্‌।

য্যার খুশি রাজা হউক য্যার খুশি গজা।

যেবা চায় টোঙ্গে বইয়া লুড়ুক যত মজা।।

মোগো হাল জমিডুক মোগো হাতে থাউক।

মোগো পুত্র পরিজোনে দুডি অন্ন পাউক।।

মোগো দৌলতেরা য্যানো না মরে ঝোলায়।

পতির কাছে থাহুক স্তিরি মায়ের কোলে পোলায়।।

এ্যার অধিক আমাগোর নাই পেরোজন।

এইডুক লইয়া বাচি মাইনসের মতোন।।

ভাইগণ, বন্ধুগণ, মোরা কাজইয়া, ঝঞ্ঝাট, গুল্লিবারুদ, ও সব কিচ্ছু চাই না। মোরা খানসেনা, মুক্তিফৌজ, রাজাকার চাই না। মোগো এহেক বার এহেক দল এহেক রহম বুজায়, যা কয় হুনি, হ্যাষে দেহি, মোরা মোরাই থাহি, হ্যারা হ্যারা। মোরা আর হ্যারা কহনই এক অই না। খালি যহন মরার দরকার অয়, তহন হুনি মোরা বেয়াকে এ্যাক। আর য্যাই হ্যারা সিংগাসনে বইয়া পরে, তহন আবার মারতে আরাম্ব করে মোগোই। এয়ার শ্যাষ নাই।

হে কতা যাউক, খালি নিয়মমতো মোর আরজিডা জানাইয়া জবান বন্দ করি। আপনেরা জানে, মোর নাম ছোমেদ আলি। আল্লাদ করইয়া বেয়াকে ডাহে ছোমেদ বয়াতি কইয়া। বাড়ির গোনে আওনের সোমায় বিবি কইয়া দোছেলে, কোনোহানে তাতইই মাতইও না। যেকামে যাইতে আছ, হেইকাম সারইয়া ঘরের মানুষ ঘরে আইয়া উডইও। কামডা অইলে ভাইগো ধারে এট্টু সাহায্য পাথথনা। বাবায়, এই বাড়ির রায়কত্তায়, দেছেলেন জমি। তো হে জমি শাসনে রাখথে পারি, হে ক্ষমতা নাই। হেয়া উঠছে নীলামে। এহন হেয়া উদ্দার করণ লাগে। কিন্তু দ্যাহেন, মাতারির কতাই ঠিক অইলে, আইয়া তাতলাম আর মাতলাম। আসলে ছোমেদ আলি যদি জারি পরণকতার গোন্দো পায় হ্যার হোগার মইদ্যে ক্যামন য্যান গুবগুবাইয়া ওডে। টেকথে দেনা একছের। তহন হ্যার বেয়াক কিছু আউল ঝাউল অইয়া যায়। একারণে ঘরের জোনে নিত্য খামরায়, কিন্তু হেথে লাভ অয় না কিছু। এই কাত্তিকার আর মোর দশাডা একোই রহম। তো হে যাউক, এহন আখরি গানডা গাইয়া ছ্যাক দি এ পরণকতার–

এবার ছ্যাক দ্যাও ছোমেদ আলি

সোমায় অইছে যাবার।

এবার ছ্যাক দ্যাও (ধ্রু)।

বেয়াক টুহুন কইয়া দিছ

যা আছিল কবার।।

অনেক অইলে দুঃকের কতা

এবার এট্টু হাসি

সেই তালে বাজাও ভাইরা

ঢোল সানাই কাসি।।

এই যে দ্যাহ গুড়াগাড়ার

জারিতে নাই মোন।

হ্যারা সবাই দ্যাখথে চায়।

নাচোনও কোদন।।

আগুন লইয়া নাচপে হ্যারা

পাজাল লইয়া হাতে।

সোনার চান্দেরা মোর

থাহুক দুধে ভাতে।।

মোরা য্যাত দুঃক পাইলাম

মোগো বয়সের কালে।

হে দুঃক না থাহে য্যান

সোনাগো কপালে।।

পাল পরবের দিনে গাইলাম

শোক দুঃকের কতা।

সোনাগো কলিজায় তাই

লাগছে বড় ব্যাতা।।

শোক আছে দুঃক আছে

মোগো চিরকাল।

উপাসও কাপাসও আচে

প্যাডে হরতাল।।

তমো মোরা উচ্ছবের করি আয়োজন।

বাচনের জইন্য তাহা অতি পেরোজন।

সে কারণে কিছু কতা হাসকাব্যে কই।

হার পর সোনারা সব কর হৈ চৈ।।

তয় কই গপ্প কতা হোনো দিয়া মন।

আলতির পরণকতা করি বিবরণ।

মোগো গ্যাদা কালে আলহে রাজা জমিদার।

ভগবতীর পূজা করতেন কাণ্ড অসুমার।।

হে পূজাতে নাচত যত নেমো ভুইমালী।

হেই নাচেতে দ্যাখতাম মোরা হ্যারগো চতুরালি।।

বাবুরা সব থাকতেন বইয়া গদিমোড়া খাডে।

ফাক্কুৎ ফুক্কুৎ দ্যাখথেন কেডা চিত্তার অইয়া হাডে।।

যদি দ্যাখথেন কোনো ব্যাডা খাইছে মদ মাদী।

ডাইক্যা আনতেন এ্যারে অরে বাদী পিরতিবাদী।।

এ হালায় যে মদ খাইছে হেয়া কয় নায় ক্যান।

কবে থিহা এ হালায় অইছে জেন্টেলম্যান।।

দেইখ্যা শুনইয়া বোজলাম হালায় বড় বদ।

এ হালারে ল্যাংডা করইয়া হোগায় ঢালো মদ।।

মদই যদি খাবি তুই আগে কও নায় ক্যান।

ভাবছ নাকি এই বাবুরা অডিনারী ম্যান।।

চুৎমারানইরা নোমোরইয়া তুই জান মোগো আইন।

মোরা মুজারে কই এষ্টাকিন সোমায়রে কই টাইন।।

হি অত্থ হে, আর হার অত্থ হ্যার।

সায়েবরা কয় বাবু জানে ইংরাজি আচার।।

হেই বাড়িতে মদ খাইয়া চিত্তার অইয়া হাডো।

দশ জোনের সামনে তুই বাবুরে করলি খাডো।।

না জানাইয়া না শোনাইয়া মদ খাইলি ক্যান।

এ ভাড়উয়ারে ল্যাংডা করইয়া সোগায় ঢালো ফ্যান।।

এই রহম রগড় অইত মোগো ছোডো কালে।

বাবুরা সব কাণ্ড করত আচালইয়া কুচালে।।

কাম নাই কায্য নাই খালি ফুর্তি করে।

কারণ অকারণে গরিব গুরবা ধরইয়া মারে।।

হাউস করইয়া বানাইছেন সোয়া হাত জুতা।

খাজনা বাকি পড়লে মারে গোন্ডা আষ্টেক গুতা।।

হেইকাল গেছে মোগো জ্বলিয়া পুড়িয়া।

হে কতা শুনিলে বিক্ষের পাতা যায় ঝরিয়া।

হে আপোদ গ্যাছে তমো মোরা বাচি কই।

একের জাগায় পাচ শত্তুরে করে হই-চই।।

এ কয় আমারে দ্যাও, ও কয় আমারে।

মোগো ধান পান কিছু ওডে না খামারে।।

যতদিন যায় তত শত্তুর বাড়ইয়া যায়।

হাসকাইব্যের কতা কইতে মনও নাহি চায়।।

যতবার করি চেষ্টা ততবার হারি।

হাজারো বচ্ছরের কষ্ট ক্যামনে ভোলতে পারি।।

মাফ করো সোনার চান্দ যত পোলাপান।

গাইতে না পারলাম মুই আল্লাদেরও গান।।

শেষ হয়েও শেষ হয় না। ছোমেদ এরপর তার শিল্পীজীবনের সমস্যার কথা বলে। এই যে সে নাচ গান পরণকতা করে, এর জন্যও তার দুঃখ পেতে হয় অনেক। সে নিকিরি হোক আর যাই হোক, ধর্মে তো মুসলমান। একদিকে ব্রাহ্মণেরা অন্যদিকে মোল্লা মৌলারা কেউই ছোমেদের মতো শিল্পীদের এইসব অনুষ্ঠান ভালো চোখে দ্যাখে না। ফলে সামাজিক নির্যাতন তাদেরকে ভোগ করতে হয়। তাছাড়া বড় লোকদের সম্পর্কে তারা গানের মাধ্যমে, কথার মাধ্যমে যা যা বলে, তার ফলও সবসময় ভালো হয় না। ছোমেদ বলে, তমোও কি মোর এসব ছাড়তে পারি। মোরা এছলামেও কিছু দোষ দেহি না, আবার বয়ানিও মোগো পছন্দ। কেত্তন হোনলেও মোরা কান্দি, আবার বিষাদসিন্দুর কারবালার কেসসা শোনলেও মোগো বুক ফাডইয়া যায়।

গেল সন মোর পরিবারে একদিন কয়েন, বয়াতি আফনে এবার এসব ছাড়েন। মুই কই, ক্যান? তো হেনায় কয়েন, না হুনছি আটরশির পীর ছায়েব নাকি ফতওয়া দেছেন, যে, য্যারা বেইসলামি কাম করবে, হ্যারা য্যান নিজেগো হাতায় নিজেগো কব্বর খুড়ইয়া রাহে, হ্যারগো মোরা আর অধিক দিন রাহুম না। বয়াতি, মোর বড় ডর লাগে। তো হেসব কতা বিস্তারিত কওয়ার জাগা এডা না। সে কারণ চুপ থাকলাম। তয়, জানাইয়া রাহেন, বাল করি মন্দ করি এ্যার ঝঞ্ঝাট ম্যালা। এহন কিবা হিন্দু, কিবা মুসলমান, তেনাগো মইদ্যে য্যারা একালের বা হেকালের বড় মানুষরা ধম্মে পোক্ত, য্যামন চায়েন হে রহম গানই বেশি করি। ওই যেডুক ছাড় পাওন যায়।

কিন্তু হে গান পেরায় ভিক্ষা চাওয়ার গান। হেয়ার নমুনা এট্টু হোনেন–

তয় শোনেন শোনেন বন্ধুগণ

কহি আমি বিবরণ

কী কারণে ছোমেদ মেঞা দুঃক কষ্ট পায়।

ছোমেদ মিঞার বড় দুক

নিত্য হ্যার প্যাগে ভুক

হে ভুক মিডাইতে তার নাই কোনও উপায়।

ভুকের কতা কইতে আইয়া

জারি গান গাইতে বইয়া

ছোমেদ মেঞার বেয়াক কিছু

আউল ঝাউল অইয়া যায়।

আইবার কালে বাড়ির গোনে–

কইয়া দেছে ঘরের জোনে

ভাইগো ধারে কই য্যানো মুই দুস্ক সমুদায়।

তয় ভাইদাদারা আছেন হেতায়

দুলাভাইও হাচা কতায়

ছোমেদ মেঞার কিছু উপায় করবেন সুনিশ্চয়।

মোর দিদি আইছে বাপের বাড়ি

দয়াবতী নাইওর মাতারি

হ্যারগো কাছে য্যাদা কতা কওয়া বিষম দায়।

তমো কইলাম মনের কতা

ছোমেদ মেঞার বোজবেন ব্যাতা

ছোমেদ মেঞা আপনেগোডে এইডুক খালি চায়।

যদি জোডে জমিডুক

ছোমেদ মেঞার মেডে ভুক

খুশি অইয়া ছোমেদ মেঞা

জারি গাইতে পায়।

ছোমেদের আসর শেষ। কথকতা শেষ হয় না। এ কথকতা আর গান হাজার বছরের জীবন-পরিক্রমায় ধূসর কিন্তু মৃত নয়। এক কথকতা থেকে আরেক কথকতায়, এক কিংবদন্তি থেকে আরেক কিংবদন্তিতে তার উত্তরণ। অনন্ত সুখের এক চলমান আসর, মাছধরা নৌকোর সারি, বিষখালি, হরিণঘাটার উদ্দাম ঢেউ ; ঝড়, সাগর, সুগন্ধার প্রগাঢ় স্নেহচ্ছায়া– এইসব অনুষঙ্গ নিয়ে যে জীবন, ছোমেদ তার কথকতা করে। অভাগিনী সরস্বতীরা তাদের সাগর থেকে না-ফেরা পুরুষদের উদ্দেশ্যে বোনা দুঃখের নকশিকাঁথা গায়ে জড়িয়েও জীবনের তাগিদে পুরুষান্তরে যায়, কিন্তু প্রেম থাকে। থাকে নদী আর সাগরের হাতছানির অনিবার্যতাও, তাই পুরুষ আবার যায়, কেননা সেটাই তাদের জীবন। ছোমেদরা সেই জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে তার রস নিঙড়োয় এবং এইরকম সব উৎসবে নিজেদেরকেই তা পরিবেশন করে।

রাত উজাগরী মানুষেরা এই কথকতা শোনে, কাঁদে, হাসে এবং আসরশেষে এই একই প্রবাহে ফিরে যায়। এই জগৎ বড় রহস্যময়। যেন প্রাকৃত প্রদোষের ধূসরতা আর বর্তমানের অর্থহীন সব তুচ্ছতার এক মাখামাখি। ছোমেদদের কথনে তার ছবি ফুটে ওঠে একটি বিশেষ রঙে। সে রঙ হয়তো বা প্রাকৃত বর্ণই, কিন্তু তা অবশ্যই মাতৃবর্ণ।

এ আসর এখানে শেষ তো আবার নতুন কথকতায় কোথাও বসে হয়তো। এই প্রাকৃত জীবনের বহতার মতোই তার বহতা। অনেক দূরের শরীর মানসপথ পাড়ি দিয়ে আমি এক নীল কুয়াশার প্রান্তরে এসে পড়েছি। এই আমার সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম। এ প্রান্তর আমার চেনা, অথচ চেনা নয় যেন। মনে হচ্ছে–

অনন্ত জীবন যদি পাই আমি

পৃথিবীর পথে যদি ফিরি আমি

দেখিব সবুজ ঘাস

ফুটে ওঠে– দেখিব হলুদ ঘাস ঝরে যায়

–দেখিব আকাশ

শাদা হয়ে ওঠে ভোরে।

যেমন এখন, এই মুহূর্তে দেখছি। রাতভর এই পরণকতায় যেমন দেখেছি।

এই স্থির নীরবতা এই করুণতা

বহুক্ষণ আমারে থাকিতে বলে এইখানে।

এ কারণেই কি আমার বারবার এই উৎসে ফেরার চেষ্টা? আমার এই জীবনও এই কথকতার অংশীদার হবে, এই সাদা ভোরের নীল কুয়াশায় বিগত অনন্ত উজাগর রাত্রির পরণকথা সুর আর রঙে আমাকে ঘিরে থাকবে, এই জীবন তার প্রাকৃত চর্যাপদের ছন্দে আমাকে শিকড়ে পৌঁছে দেবে–

এর চেয়ে বেশি রূপ বেশি রেখা বেশি করুণতা

আর কে দেখাতে পারে

আকাশের নীল বুকে অথবা এ ধুলার আঁধারে...

অধ্যায় ২৩ / ২৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%