অভীক সরকার
আড্ডাটা সেদিন জমেছিল ভালোই।
পৌষের রাত। কদিন বাদে আমাদের পৌষকালী পুজো। তাই বিশু, বংশী, শিবু, গদাই সবাই এই নিয়ে খুব ব্যস্ত। ক্লাবের এক কোনায় বিড়ি আর চা সহযোগে গভীর আড্ডা চলছে, সবাই খুব উত্তেজিত।
ক্লাবের বাইরে জবুথবু মফসসলি রাত। রাস্তায় লোক চলাচল নেই বললেই চলে। এই এলাকায় কুয়াশা নেমে আসে খুব তাড়াতাড়ি। সেই কুয়াশার মধ্যে বাইরের ল্যাম্পপোস্ট মরা মাছের ভ্যাটকানো চোখের মতো আলো ছড়াচ্ছে।
বিশ্বনাথ ওরফে বিশু একা একা তাস পিটছিল। তার তাস খেলার সঙ্গীসাথিরা সবাই পুজো সংক্রান্ত গভীর আলোচনায় মগ্ন। ফাঁকা আছেন কেবল একজন, কিন্তু তিনিও ক্লাবের একমাত্র সম্পত্তি নড়বড়ে তক্তাটির ওপর বসে সেই যে ঝিমোচ্ছেন, তাঁর আর অন্য কোনো সাড়াশব্দ নেই।
তাস পিটতে পিটতে বিশু ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছিল। একা একা কাঁহাতক পেশেন্স খেলা যায়? শেষমেশ সে তাস ফেলে হুঁকো হাতে ঝিমোতে থাকা লোকটির উদ্দেশে বলল, 'ও চাটুজ্জেমশাই, বলি ঝিমোচ্ছেন কেন? আপনি যাকে বলে ক্লাবের সিনিয়র মেম্বর, কিছু একটা বলুন!'
চাটুজ্জেমশাই ঝিম ভেঙে উঠে বললেন, 'হয়েছেটা কী? এত গোল কীসের?'
কোনা থেকে শিবু বলল, 'কিছুই হয়নি। পুজোর প্ল্যান হচ্ছিল। তা আপনি হলেন গিয়ে একজন বয়স্ক লোক। আপনাদের থেকে গুরুমন্তর পেলে একটু সুবিধা হয়।'
চাটুজ্জেমশাই সামান্য বাঁকা হেসে বললেন, 'ও বাবা, শিবুভায়া যে একেবারে বিনয়ে বিগলিত হয়ে পড়লে দেখি!'
বংশী বলল, 'তা নয়, আসলে মায়ের পুজো তো, তাই একটু ভয়ে ভয়ে থাকি, কোথায় কী ত্রুটি হয়!'
চাটুজ্জেমশাই হেসে বললেন, 'মায়ের ভালোবাসা কি ছোটোখাটো ত্রুটিতে ক্ষুণ্ণ হয় হে! তিনি জগন্মাতা, তাঁর ভালোবাসা সর্বজীবে পরিব্যাপ্ত। তিনি ত্রিগুণাতীতা, ষড়ৈশ্বর্যময়ী। এই বিশ্বপ্রপঞ্চ তাঁর ইশারায় জন্মায়, তাঁর ভ্রূকুটিমাত্রে মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়। তাঁর পুজোয় একটিই উপচার, শুদ্ধাভক্তি।'
গদাই আমাদের ট্রেজারার। চাঁদার অবস্থা দেখে সে একটু তিরিক্ষি মেজাজে ছিল। তিতকুটে গলায় বলল, 'চাটুজ্জেমশাই যে দেখছি একেবারে রামপ্রসাদী ভক্তিরসে চুবুচুবু হয়ে আছেন! বলি মায়ের পুজোয় অনর্থ হলে সেটা কি আমাদের পক্ষে ভালো হবে খুব? বাপ-ঠাকুরদাদের বলতে শুনেছি মা কালীর পুজো করা আর হাড়িকাঠে গলা দিয়ে থাকা একই ব্যাপার। বিন্দুমাত্র ত্রুটিতে মহা অনর্থ ঘটে যেতে পারে।
কথাটা শুনে চাটুজ্জেমশাই গম্ভীর হয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে বললেন, 'হাড়িকাঠ! বলিদানের অন্যতম উপকরণ। এককালে শাক্তপুজোয় বলিদান ছিল আবশ্যকীয় বিধি। শাস্ত্রে বিবিধ প্রকার বলির উল্লেখ আছে, তার মধ্যে মহাবলি, মানে মানুষ বলিরও বিধান আছে বই কি। হাড়িকাঠ অতি সাংঘাতিক জিনিস। সেবার তো...' বলেই চুপ করে গেলেন সেই ভূয়োদর্শী প্রৌঢ়।
গল্পের গন্ধে বাকিরা ঘনিয়ে এলাম, 'হাড়িকাঠ নিয়ে ঝুলিতে কোনো গল্প আছে নাকি চাটুজ্জেমশাই?'
'আছে বই কি! সেই থেকে হাড়িকাঠ শব্দটা শুনলেই মনের মধ্যে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।'
ইতিমধ্যেই সবাই এসে চাটুজ্জেমশাইকে ঘিরে বসেছে। বিশু ঝট করে ক্লাবের বাইরে হরির চায়ের দোকানে এক কেটলি চায়ের অর্ডার দিয়ে এল।
চাটুজ্জেমশাই শুরু করার আগে একবার গলা খাঁকারি দিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, 'তিরানব্বই সাল, বুঝলে। আমি তখন অ্যাডিশনাল ডি এফ ও হিসেবে জয়েন করেছি বাঁকুড়ায়...'
ঢিবিটা দেখে আমি আর মাধুরী দুজনেই একটু ধন্ধে পড়ে গেলাম। আগের দিনও তো এখানে বেড়াতে এসেছিলাম দু-জনে, তখন তো এই ঢিবিটা চোখে পড়েনি!
জায়গাটা বীরভূমের ছাতনার কাছেই, নাম শুনুকপাহাড়ি। একটু দূরে তিরতির করে বয়ে চলেছে কর্ণাবতী নদী। এখন সবে এপ্রিলের শেষ, তাই নদীতে জল মোটামুটি। নইলে ভরা বর্ষায় কর্ণাবতী জলে টইটুম্বুর থাকে।
এই নিয়ে পরপর দুটো শনিবারে আমরা এখানে এলাম। এর খোঁজ পেয়েছিল অবশ্য মাধুরীই। তখন আমি নর্থ বেঙ্গল থেকে অ্যাডিশনাল ডি এফ ও পোস্টে প্রমোশন পেয়ে এসেছি এই তল্লাটে। বিয়ে হয়েছে এক বছরও হয়নি। তোমরা তো জানই, তোমাদের কাকিমা ছিলেন আসামের মেয়ে। তিনসুকিয়া থেকে গুয়াহাটি আর ওদিকে কাছার, এর বাইরে জীবনে পা রাখেননি। পশ্চিমবঙ্গে এসে তার কৌতূহল যেন ফেটে পড়ছে।
মাধুরীর একটা অদ্ভুত নেশা ছিল, নাম না-জানা বিচিত্র সব জায়গা আবিষ্কার করার নেশা। পুরোনো ভাঙা নীলকুঠি, ব্রিটিশ আমলের পরিত্যক্ত গোরস্থান, কেউ খোঁজ পায়নি এমন পিকনিক স্পট, মোটমাট একটু অচেনা-অজানা জায়গা ওর আগ্রহের বিষয়। এমনকি বিয়ে করে নর্থ বেঙ্গলে চলে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই জলপাইগুড়িতে একটা পুরোনো ধর্মরাজের মন্দির আবিষ্কারে বেশ একটু নামডাকও হয়েছিল ওর।
এই জায়গাটাও ওরই আবিষ্কার। আর বলতেই হবে যে আবিষ্কারটা জব্বর করেছে ও। চারদিকে শাল-পিয়ালের বন, একদিকে দলমা রেঞ্জ। সেখান থেকে নেমে এসেছে এই কর্ণাবতী। একটু দূরে গিয়ে সে মিশেছে দ্বারকেশ্বরের সঙ্গে। চারিদিক ছাওয়া মিঠে সবুজ ঘাসে। প্রান্তরের মাঝখানে একটি মস্ত বড়ো বটগাছ ছাড়া এই চত্বরে আর কোনো গাছ-টাছ নেই। সবমিলিয়ে সমস্ত জায়গাটির মধ্যে একটা স্নিগ্ধ শান্ত ভাব ছড়িয়ে আছে, দেখলেই মনের আরাম হয়। কোনো অজ্ঞাত কারণে কলকাতার হুজুগে বনভোজন পার্টি এখনও জায়গাটার খোঁজ পায়নি, তাই জায়গাটার সুগম্ভীর পবিত্রতাটুকু অবশিষ্ট আছে। নইলে জায়গাটা তো কলকাতা থেকে খুব বেশি দূর নয়, গাড়ি নিয়ে বেরোলে ঘণ্টা চারেক।
চারিদিকে আরও একবার তাকিয়ে নিলাম দু-জনে। এখন বিকেল। সুয্যিমামা পাটে বসবেন বসবেন করছেন। চারিদিক একেবারে ফাঁকা। আমরা দুজন ছাড়া একটিও লোক নেই। দূরে একটা গোরু চরছে। তার ওপাশে মেঠো রাস্তা। তার ধার ঘেঁষে আমার সদ্য কেনা মারুতি জেন দাঁড়িয়ে।
এখানে এসেছি মাস তিনেক হল। প্রথম মাসটা গেছে সংসার গুছোতে গুছোতে। তারপর একটু ফাঁক পেতেই মাধুরীর পুরোনো নেশাটা চাগাড় দিয়ে ওঠে আর বাঁকুড়া সদর থেকে সামান্য দূরে এই জায়গাটার খোঁজ যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতোই তার কোলে এসে পড়ে।
একদিন লাঞ্চের পর অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি, হঠাৎ করে একটি লোক এসে তাকে বলে, 'আপনি ফরেস্ট অফিসের নতুন ছোটোবাবু না?'
লোকটাকে আগে কখনও দেখিনি। তবে জঙ্গলের ব্যাপার, এই এলাকার অর্থনীতি অনেকটাই জঙ্গলের ওপর নির্ভর করে। তাই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে ছোটোবাবু জয়েন করার সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে খবর চাউর হয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। বললাম, 'হ্যাঁ, বলুন।'
সচরাচর এসব ক্ষেত্রে লোকজন কিছু ছোটোখাটো সাহায্য-টাহায্য চায়। এ লোকটি কিন্তু তার ধার কাছ দিয়ে গেল না, বলল, 'আপনার গিন্নির শুনলাম নতুন নতুন ইন্টারেস্টিং জায়গা খুঁজে বেড়াবার শখ?'
'ইন্টারেস্টিং' শব্দটা কট করে কানে বাজল। লোকটির পোশাক-আশাক তেমন শহুরে না হলে কী হবে, চোখেমুখে একটা বুদ্ধির ছাপ আছে। চোখ সরু করে বললাম, 'আমার বউয়ের শখের খবর আপনার কানে গেল কী করে?'
অল্প হাসল লোকটি, 'আমাদের মতো মানুষদের ফরেস্ট অফিসের বাবুদের আর তাঁদের গিন্নিমা'দের শখ-আহ্লাদের কিছু খোঁজ রাখতে হয় বই কি!'
'আমাদের মতো মানুষদের বলতে?'
কথা না বলে অল্প হাসে লোকটি। তাতেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলাম।
সব ফরেস্ট অফিসেই নিয়মিত মাসোহারা'র বিনিময়ে একজন করে স্থানীয় লোক নিয়োগ করা থাকে। এদের কাজ হচ্ছে জঙ্গলের খবর-টবর সাপ্লাই করা। চলতি কথায় খোঁচড় বলে, ভদ্রভাষায় ইনফর্মার। এইরকম ইনফর্মার আমাদের উত্তরবঙ্গের অফিসেও ছিল। তা এই ফরেস্ট অফিসের খবরি হচ্ছে এই বাবুলাল, বাবুলাল মান্ডি। পড়াশোনা ক্লাস থ্রি অবধি, এককালে সার্কাসে কাজ করত। সার্কাস উঠে যাওয়াতে বাজারে একটা চায়ের দোকান দিয়েছে, গুচ্ছের লোক সেখানে জমায়েত হয়।
মাধুরীকে এই জায়গাটার খোঁজ বাবুলালই দিয়েছিল।
গত সপ্তাহে এখানে এসেই লাফিয়ে উঠেছিলাম আমি, 'আরিব্বাস, বাবুলাল তো একখান জম্পেশ জায়গার খোঁজ দিয়েছে দেখছি?' মাধুরী উত্তর দেয়নি, মিটি মিটি হেসেছে শুধু। ভাবখানা হচ্ছে, কী, কেমন দিলাম?
নদীতে অনেকক্ষণ পা ডুবিয়ে বসে ছিলাম। উঠে এসে দেখি মাধুরী একদৃষ্টে একটা ঢিবির দিকে তাকিয়ে আছে।
'কী দেখছ ওখানে?'
প্রথমে একটু চমকে ওঠে মাধুরী। তারপর বলে, 'গত সপ্তাহে যখন আমরা এখানে এসেছিলাম, এই ঢিবিটা কি দেখেছিলাম?'
ঢিবিটার দিকে তাকালাম। সাধারণ একটা মাটির স্তুপ, বাংলার গ্রামে-গঞ্জে এরকম হাজার হাজার ঢিবি দেখা যায়। সারা গায়ে লম্বা লম্বা ঘাস গজিয়ে আছে, তাদের কয়েকটার মাথায় বেগুনি রঙের ফুল দুলছে। উচ্চতায় ফুট আটেক হবে।
'দেখে থাকতে পারি। মনে পড়ছে না। কেন?'
'আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে এটা এখানে ছিল না।'
'সে আবার কী? ঢিবি কি পাখি নাকি যে উড়ে উড়ে বেড়াবে?'
'ইয়ার্কি রাখো,' মৃদু ধমক দিল মাধুরী 'আগের দিন আমরা কতক্ষণ ঘুরে বেড়ালাম এখানে মনে নেই? কই, এটা চোখে পড়েনি তো!'
'ধুস, এটা এখানেই ছিল, আমরা খেয়াল করিনি হয়তো। এখন চলো দেখি, সন্ধে নেমে আসছে। এবার বাড়ি ফিরতে হবে।'
'এত বড়ো ঢিবিটা খেয়াল করিনি?' বড়ো বড়ো চোখ করে আমার দিকে তাকাল মাধুরী, 'কী বলছ কী তুমি?'
'আরে ধুর, এখন চলো না, পরে আর একদিন এসে না হয় এই নিয়ে তদন্ত করা যাবে।'
আমি ক্রমাগত তাড়া দিচ্ছিলাম। তার অবশ্য একটা কারণ ছিল। এ এক বছরেই আমি হাড়ে হাড়ে চিনে গেছি ভদ্রমহিলাকে। একটা জিনিস যদি ওর মাথায় ঢোকে তাহলে সেটার পুরোপুরি হেস্তনেস্ত না করে ওর শান্তি নেই।
মাধুরী ফিরে আসছিল। হঠাৎ করে কীসে যেন চোখ আটকে গেল ওর। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে চোখ আটকাল আমারও। ঢিবির ওদিকে কিছু আছে নাকি? কীসের একটা মাথা দেখা যাচ্ছে না?
দুজনে ঢিবিটা পেরিয়ে ওদিকে গেলাম। বিশেষ কিছু নেই। একটা জিনিস ছাড়া।
একটা হাড়িকাঠ। মন্দিরের সামনে বলি দেওয়ার জন্য একটা হাড়িকাঠ পুঁতে রাখা হয়, একেবারে সেই জিনিস।
একটু কাছে এগিয়ে গেলাম, হাড়িকাঠটাকে ভালো করে দেখবে হবে। আর তখনই একটা জিনিস নজরে এল।
কাঠটা উলটো করে পোঁতা আর সারা গায়ে একটা জং ধরা কাঁটাতার জড়ানো আর খুব পুরোনো, তার সারা গায়ে কালচে শ্যাওলা লেগে একটা অদ্ভুত রং তৈরি হয়েছে,
আমি ঢিবিটার ওপরে উঠে হাত দিয়ে ধরতে যাচ্ছিলাম কাঠটা, মাধুরী হাতটা ধরে আমাকে আটকাল, 'কী করছ কী? ওইসব হাড়িকাঠে হাত দিতে আছে? কোথা থেকে কী হয়ে যাবে?'
আমার অট্টহাসিতে যে গোরুটা ঘাস খাচ্ছিল সে বিরক্ত হয়ে ঘাস খাওয়া থামিয়ে উলটো পথে হাঁটা দিল। মানছি যে আসামের জঙ্গলে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল বটে। কিন্তু সেসব আমার কাছে এখন অতীত। হাসি থামলে বললাম 'কতবার না বলেছি, এসব কুসংস্কারে একদম বিশ্বাস করবে না। এটা একটা কাঠের টুকরো ছাড়া আর কিছুই না। দেখবে?'
আমার জামার হাতাটা সজোরে খামচে ধরল মাধুরী, 'না দেখব না। আর তুমিও দেখবে না। এবার বাড়ি চলো, অনেক হয়েছে।'
'বাড়ি তো যাবই, কিন্তু তার আগে...' বলতে বলতে একটানে হাড়িকাঠটা উপড়ে আনলাম, তারপর ছুড়ে ফেলে দিলাম দূরে, 'দেখলে তো, এসব ফালতু জিনিস নিয়ে বেকার টেনশন নিচ্ছিলে। এখন চলো তো।'
মাধুরী চুপ করে গেল, কিছু বলল না। ওর মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল যে ব্যাপারটা ওর ভালো লাগেনি। একটা অজানা ভয় আর অস্থিরতার ছায়া ওর মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। গায়ের চাদরটা শক্ত করে টেনে মাধুরী একটু ভয় পাওয়া মুখে বলল, 'বাড়ি চলো, আমার শীত করছে, খুব শীত করছে।'
এই কর্ণাবতীর তীর ছেড়ে, এই শান্ত মায়াবী তৃণাচ্ছাদিত ভূমি ছেড়ে চলে যাওয়ার ঠিক আগে, গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে একবার ঢিবিটার দিকে চোখ গেল। আর তখনই কেমন যেন আমার মনে হল সেই অন্ধকার ঢিবিটার গায়ে নীচের মাটির আচ্ছাদন সরিয়ে, অন্ধকারের পর্দা ছিঁড়ে, হঠাৎ করে জ্বলে উঠলো দুটো আলোর বিন্দু।
দুটো চোখ।
প্রথম খুনের খবরটা পেলাম পরদিন সকালে। কাজের লোক মতিয়ার মায়ের মারফত।
খুন হয়েছেন এক স্কুল টিচার। নাম নকুলেশ মাহাত, বাঁকুড়া জেলা স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক। নির্বিরোধী সদাশয় অকৃতদার মানুষ। শহরের একপ্রান্তে ভাড়া থাকতেন। রাত্রে কে যেন এসে ভদ্রলোকের গলাটা ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে গেছে। খুনের মোটিভ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ খুনিরা ঘরের কিচ্ছু ছোঁয়নি, চুরি করা তো দূরস্থান।
খবরটা শুনলাম বারান্দায় প্রাণায়াম করতে করতেই। কাল আবার মাধুরী তার কোনো এক সদ্য আলাপ হওয়া বান্ধবীর বাড়িতে রাত কাটাতে গেছে। ফিরবে আজ বিকেলে। সঙ্গে নাকি নতুন কী একটা গাছের চারা আনবে। আমাকেই ঝটপট ম্যাগি বানিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে হল।
মোতিয়ার মায়ের রেডিয়ো সংবাদ শেষ হতে না হতেই দেখি জগুবাবু হন্তদন্ত হয়ে বেরোচ্ছেন। জগুবাবু, অর্থাৎ এখানকার থানার ভারপ্রাপ্ত দারোগাবাবু জগত্তারণ মল্লিক এবং আমাদের প্রতিবেশী। দাপুটে লোক, তবে বয়সের কারণে চালচলন একটু ধীর। তবে ওটা তিনি পুষিয়ে নেন মগজাস্ত্র আর অভিজ্ঞতা দিয়ে। কর্তা-গিন্নি আমাদের খুবই স্নেহ করেন। একটি মেয়ে আছে, বিবাহিত, পুনেতে থাকে। তারও বয়েস মাধুরীর মতোই। তাই হয়তো এত স্নেহ।
হাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী জগুবাবু, মাস্টার খুনের কেস?' উনি বললেন, 'আর বোল না ভায়া। ভোর রাতে খবর পেয়েই দৌড়েছি। সে এক ক্যাডাভ্যারাস কাণ্ড! গলাটা একেবারে ভারত-পাকিস্তান বর্ডার করে দিয়ে গেছে। অথচ ঘরের একটি জিনিসও খোয়া যায়নি। না কোনো জুতোর ছাপ, দরজা ভেতর বন্ধ।'
বললাম, 'বডি কি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন?'
জগুবাবু হাত উলটে বললেন, 'না না, তাহলে তো হয়েই যেত। সদর থেকে অ্যাডিশনাল এস পি আসছেন দেখতে। তিনি তদন্ত করার পরেই নাকি বডি সরাতে হবে। আমি তো পাহারায় দুটো হাবিলদার বসিয়ে চান-খাওয়া সারতে এলুম।'
জীবনে গোয়েন্দা গল্প পড়েছি অনেক, কিন্তু কোনো খুনের ঘটনা দেখিনি। কেমন যেন কৌতূহল হল। বললাম, 'আপনার সঙ্গে যেতে পারি একবার?'
জগুবাবু ইতস্তত করে বললেন, 'পুলিশি তদন্তে তো এইভাবে আর নিজের লোক বলে কাউকে নিয়ে যাওয়া যায় না ভায়া। তবে তুমি বলছ যখন চলো। আমি বরং একটু আগে তোমাকে নামিয়ে দেব। হাবিলদারকে বলা থাকবে, বড়োসাহেব চলে গেলে একবার উঁকি মেরে দেখে নিয়ো। খবরদার, ঘরের ভেতরে ঢুকো না, কোথায় কী এভিডেন্স নষ্ট করে ফেলবে। চিন্তা নেই, আমি তো থাকব। আর হ্যাঁ বাপু, আগে থেকেই বলে রাখি, খুনখারাপি দেখে আবার বমি-টমি করে এক কাণ্ড কোরো না।
নকুলেশ মাহাত থাকতেন একটা একতলা বাড়িতে। একটি কাজের মেয়ে রান্না করা, ঘর মোছা, বাসন ধোয়া ইত্যাদি করে দিয়ে যেত। বাড়ির মালিক ভৈরব গাঙ্গুলি থাকেন বাঁকুড়া শহরেই, অন্য প্রান্তে। তিনি খবর পেয়েই এসে উপস্থিত। হাত জোড় করে কাঁদো কাঁদো মুখে জগুবাবুকে বললেন, 'নকুলেশদা কিন্তু খুব ভালো লোক ছিলেন স্যার। কারও সাতে-পাঁচে থাকতেন না। নিজের লেখাপড়া, বই পত্তর নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও কোনোদিন কোনো কমপ্লেন পাইনি। কোত্থেকে যে কী হয়ে গেল বুঝতেই পারছি না।'
ততক্ষণে বড়োসাহেব জগুবাবুর সঙ্গে শলাপরামর্শ করে চলে গেছেন। ভৈরব গাঙ্গুলি আর জগুবাবুর সওয়াল জবাবের মাঝখানে সন্তর্পণে ঘরের মধ্যে উঁকি দিলাম।
প্রথম দর্শনেই গা'টা বীভৎসভাবে গুলিয়ে উঠল।
ঘরের মেঝেতে একটা শীর্ণ শরীর বিসদৃশভাবে শুয়ে। খালি গা, পরনে লুঙ্গি। ডান পা'টা দ'য়ের মতো করে ছড়ানো। বাঁ পা'টা খাটের ওপর উঠে আছে। মেঝেতে চাপ-চাপ রক্ত। মাথাটা ধড় থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। ঘরের একটাই জানলা, তার একটা পাল্লা অল্প খোলা। সিলিং থেকে একটা রিকেটি পাখা ঝুলছে।
আমি একবার উঁকি দিয়েই চলে আসছিলাম। থমকে গেলাম দুটো জিনিস দেখে। এক, মেঝেতে রক্তের মধ্যে কয়েকটা বাংলা অক্ষর লেখা, প্রতিটা অক্ষরের মধ্যে একটা করে দাঁড়ি আছে। অক্ষরগুলো হচ্ছে, অ। ক। খ। ঙ।
আর দ্বিতীয়টা আরও অদ্ভুত। মেঝেতে ছড়ানো কতগুলো ময়ূরের পালক।
বাইরে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরালাম। গা গোলাচ্ছিল তো বটেই, তার সঙ্গে মাথাটাও ভোম মেরে ছিল। অক্ষরগুলোর মানে কী? আর ময়ূরের পালকই বা এল কোথা থেকে?
জগুবাবু চলে গেলেন। আমিও একটা রিকশা নিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিলাম।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধে ছ'টা বাজল। রিকশা থেকে নেমে দেখি সারা বাড়ি অন্ধকার, কোথাও কোনো আলো নেই। দেখে চিন্তায় পড়ে গেলাম। সচরাচর এরকম হয় না, পাঁচটা বাজলেই মাধুরী সারা বাড়ির আলো জ্বালিয়ে, তুলসীতলায় প্রদীপ দেয়। এসব ওদের পারিবারিক সংস্কার। মাধুরীর ফেরার কথা দুপুর নাগাদ। এখনও ফেরেনি? কোনো অনর্থ ঘটল না তো?
ঘরে এসে দেখি মাধুরী ফিরেছে বটে, কিন্তু ধুম জ্বরে তার সারা গা পুড়ে যাচ্ছে। মোতিয়ার মা বারান্দায় বসে ছিল। মাধুরীর নাকি ফিরে এসেই ধুম জ্বর, তাই দেখে সে আর বাড়ি যায়নি, আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।
হুটোপাটি করে ডাক্তারবাবুকে কল দেওয়া হল। তিনি এসে দুটো ওষুধ লিখে আশ্বস্ত করলেন, তেমন চিন্তার কিছু নয়, বর্ষার শেষে সিজন চেঞ্জের সময় এরকম হয়েই থাকে। আমার প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করে মোতিয়ার মা ভাতে ভাতে দুটো ফুটিয়ে দিল। আমিও দু-একটা ভাজাভুজি করে নিলাম। জীবনের অনেকটা সময় একা কাটিয়েছি, দু-একটা রান্না তো জানিই। মাধুরীর কপালে ওডিকোলন দিতে জ্বরটা কিছুটা নামল। তারপর জোর করে কয়েক দলা ভাত খাইয়ে দিলাম। ওষুধ খাওয়ানোর সময় মাধুরী হঠাৎ করেই বলল, 'ও ছাড়া পেয়ে গেছে, তাই না গো?'
কথাটা শুনে চিন্তায় পড়ে গেলাম। জ্বরের সময় ডিলিরিয়াম বা ভুল বকা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। কাল সকালে ডাক্তারবাবুকে আর একটা কল না দিলেই নয়।
পরের দিন অবশ্য তার দরকার হল না। পরদিন সকাল থেকে মাধুরী একদম ফিট। ঘুম থেকে উঠে দেখি স্নান সেরে বাড়ির পেছনে ওরই হাতে বানানো ছোট্ট বাগানটায় গাছে জল দিচ্ছে। আমি পেছন থেকে ডাকতে বাচ্চা মেয়ের মতো বলল, 'জুঁই গাছটায় কত ফুল ফুটেছে দেখেছ?'
কাছে গিয়ে কপালে হাত দিয়ে দেখি তাপমাত্রা একদম স্বাভাবিক। চোখমুখ একেবারে ঝকমক করছে। আমি কিছু বলার আগেই মাধুরী বলল, 'আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরো তো, রাত্তিরে ভাবছি মাটনের একটা স্পেশ্যাল ডিশ করব।'
নিশ্চিন্ত হয়ে অফিসে গেলাম। যদিও তাড়াতাড়ি বাড়ি আসা কপালে নেই। আজ থেকে ডিপার্টমেন্টের হাফ ইয়ার্লি অডিট শুরু, চলবে দিন দুয়েক। কলকাতা থেকে বড়োসাহেবরা আসবেন, তাঁদের জন্য এন্তার খাবার-দাবার আর আনুষঙ্গিক মোচ্ছবের ইন্তেজাম করতেব হবে।
বিকেলে এসে দেখি মাধুরী দিব্যি একদম চাঙ্গা। জিজ্ঞেস করতে বলল বাবুলাল নাকি ওকে কী একটা আয়ুর্বেদিক গাছ-গাছড়ার শিকড় দিয়ে গেছে। শিলে বেটে ছাগলের দুধ আর দু-ফোঁটা মধু দিয়ে খেতে হয়। এতে নাকি নার্ভ স্ট্রং থাকে। আমিও কিছু বলিনি। মাধুরীর নার্ভ সেই কাউরীবুড়ির কাণ্ডের পর থেকে এমনিতেই একটু উইক।
খুব হুটোপুটির মধ্যে দুটো দিন গেল। বছরে দু-একটা দিন এরকম যায়। সারা রাত অফিসে থেকে ফাইলপত্তর রেডি করতে হয়। পরদিন ফাইনাল অডিট রিপোর্ট সাবমিট করতে হবে বলে।
আমি আর বিট অফিসার মানব মণ্ডল জান লড়িয়ে দিলাম। মানব মেদিনীপুরের ছেলে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে সদ্য চাকরি পেয়েছে স্পোর্টস কোটায়। এই অফিসে জয়েন করেছে মাসখানেক হল। তার এসব বিষয়ে উৎসাহ খুব।
অডিটের হিসেব মিটল প্রায় সকাল আটটা নাগাদ, বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে আটটার কাছাকাছি। খুনের কথাটা মাথা থেকে মিলিয়েই গেছে। ঘরে ফিরে স্নান-টান সেরে বারান্দায় বসে রেডিয়োটা খুলেছি কী খুলিনি, মাধুরী দু'কাপ চা হাতে নিয়ে এসে বলল, 'খবর শুনেছ?'
আমি শ্বশুরমশাইয়ের পাঠানো আসাম লিকারে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, 'কাল সারাদিন সারারাত অডিট কমিটির সঙ্গে উস্তুম-কুস্তুম লড়াই করে সবে ফিরলাম ডার্লিং। গুচ্ছের এক্সেপশন আর কোয়েশ্চেনেয়ারের ঠেলায় চোখে এখনও অন্ধকার দেখছি। এই অবস্থায় এসব জাগতিক সংবাদের খোঁজ কী করে রাখি বলো দেখি?'
মাধুরী যেন ডার্লিং সম্বোধনটা কানেই নিল না। অন্যমনস্ক ভাবে বলল, 'কাল বিষু�পুরে একজন বইয়ের দোকানদার খুন হয়েছে, শুনেছ?'
আমি বললাম, 'কই না তো? আসলে সারা দিনরাত এত ব্যস্ত ছিলাম... কিন্তু তুমি জানলে কী করে?'
'বাবুলাল কাল সন্ধেবেলা একটা গাছের চারা দিতে এসেছিল। ও-ই বলে গেল।'
মাধুরীর গাছের শখ জেনে বাবুলাল নিয়মিত গাছের চারা সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে আজকাল সে জানি। সেদিনও একটা ক্রোটন আর একটা রঙ্গন দিয়ে গেছে। কথা সেটা নয়, কথা হচ্ছে যে খুনোখুনি তো এখন নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা। এই বিশেষ খুনের কথাটা বাবুলাল মাধুরীকে বিশেষ ভাবে জানাল কেন?
প্রশ্নটার উত্তর মাধুরী নিজেই দিয়ে দিল। 'বাবুলাল বলছিল এর বুকে নাকি কীসব নকশা কাটা ছিল। আগের খুনটার ওখানেও মেঝেতে রক্ত দিয়ে কীসব লেখা ছিল না?'
সোজা হয়ে উঠে বসলাম। নকুলেশ মাহাত'র মৃতদেহের পাশে যে রক্ত দিয়ে কিছু লেখা ছিল সেটা ও জানল কী করে?
মাধুরীকে কথাটা বলতেই ও উলটে ঝাঁঝিয়ে উঠল আমার ওপরে, 'তুমি তো আজকাল কোনো কথাই খুলে বল না। মোতিয়ার মা আর বাবুলাল না বললে আমি জানতে পারতাম না এত কথা? এই নিয়ে সারা শহরে যা গুজগুজ-ফিশফিশ হচ্ছে তার কোনো খবর রাখো কিছু?'
স্বীকার করতে বাধ্য হলাম যে কোনো খবরই রাখি না। প্রথম খুনের কেসটা যে নিজের চোখে দেখে এসেছি সেটা স্রেফ চেপে গেলুম। জগুবাবুকেও বারণ করে দিয়েছিলাম যে উনি বা ওঁর গিন্নি যেন আমার ওখানে যাওয়া নিয়ে মাধুরীকে কিছু না বলেন।
চায়ে সন্তর্পণে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, 'কে খুন হল আবার?'
'রামশঙ্কর সামন্ত। এককালে পাটের আড়তদারি করতেন। একটি মাত্র মেয়ে, বিয়ে করে কলকাতায় থাকে। স্ত্রী গত হওয়ার পর ব্যাবসাপত্তর গুটিয়ে একটা বইয়ের দোকান খুলেছিলেন। ইদানীং ধর্মেকর্মে মতি হয়েছিল, কোনো এক সাধুবাবার কাছে নাকি দীক্ষাও নিয়েছিলেন। একলা মানুষ, চাকর-বাকর নিয়ে থাকতেন। আজ ভোরে কাজের মেয়ে চা দিতে গিয়ে দেখে দরজা ভেজানো। ধাক্কা দিতে দরজা খুলে গিয়ে দেখে বীভৎস কাণ্ড। সামন্তবাবু'র বডির নাকি মাথাটা মুচড়ে উলটো করে ঘোরানো ছিল। কাজের মেয়ে সেসব দেখে বমি-টমি করে একশা।'
মাধুরীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছে ম্যাডামের বলার মতো আরও কিছু কথা আছে। মাধুরী ধীরে ধীরে বলল, 'বাবুলাল বলছিল লোকটার বুকে নাকি জ্বলন্ত শিক দিয়ে একটা স্টার আঁকা ছিল।'
শোনামাত্র বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
মাধুরী পাশে বসে নিজের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আনমনে বলতে থাকল, 'বাবুলাল নিজের কানে শুনেছে বিষু�পুর থানার ওসি বলছিলেন যে লোকটাকে মারার পরেই ওর বুকে ওই স্টারটা এঁকে দেওয়া হয়েছে। বাপ রে! কী নৃশংস, বলো?'
শুনে গা'টা শিউরে উঠল। কত আক্রোশ থাকলে খুন করার পরেও তার মৃতদেহের ওপর এতটা অত্যাচার করা যায়?
চা'য়ে চুমুক দিতে দিতে বললাম, 'আজ ভোরের খুন, এখন বাজে ন'টা। এর মধ্যেই খবর পেয়ে গেলে?'
'খারাপ খবর দাবানলের বেগে ছড়ায়, জান না? বাবুলাল সকালে ওর দোকানে যাওয়ার পথে ওই আয়ুর্বেদিক টনিকটা দিতে এসেছিল। ও-ই বলে গেল।'
'আর কী কী বলল বাবুলাল?'
মাধুরী কিছু বলল না। অন্যমনস্কভাবে বলল, 'ও নাকি খবর পেয়েছে দুটো খুন নিয়েই পুলিশের ওপরমহলে বেশ আলোড়ন পড়ে গেছে।'
'কেন?'
'প্রথমত, দুটো খুনেরই কোনো কারণ বা মোটিভ নেই। যাঁরা খুন হয়েছেন তাঁদের কারও সঙ্গে কারও কোনো চেনাজানা নেই। দুজনের অতীতও একদম পরিষ্কার। পুলিশ নাকি বুঝতেই পারছে না ওঁদের কেই-বা মেরেছে আর কেনই-বা মেরেছে!'
কথাটা শুনে বেশ ঘেঁটে গেলাম। খুনোখুনির ব্যাপার, মনে হচ্ছে জগুবাবুর হেল্প লাগবে।
ব্রেকফাস্ট সেরে জগুবাবুর কোয়ার্টারে একবার ঢুঁ মারতে গেলাম। দেখলাম উনি নেই। বউদি এককাপ চা অফার করে বললেন, 'তোমার দাদার ওপর খুব চাপ যাচ্ছে, বুঝলে। আজকাল এমন খ্যাঁকখ্যাঁকে হয়ে আছে যে কিছু জিজ্ঞাসা করতেই ভয় করে।'
বাড়ি এসে স্নান করে একটা টানা লম্বা ঘুম দিলাম। জেগে ওঠার পর দেখি শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে। এখানে এসে একটা স্কুটার কিনেছিলাম। মোতিয়ার মা'কে ছুটি দিয়ে তাতে চড়ে শহরটায় এক চক্কর দিয়ে এলাম। তখন এসব খুনোখুনির ব্যাপারটা মাথায় নেই।
ফেরত আসতে আসতে সন্ধে। হুইস্কির বোতলটা নামাতে বাধ্য হলাম বললেই চলে। গত কয়েকদিনে শরীরের ওপর দিয়ে কম ধকল যায়নি। চিকেনভাজা আর বাদামমাখা দিয়ে হুইস্কি খেতে খেতে বিভূতিভূষণের 'দেবযান' পড়া শুরু করলাম। পরলোকচর্চা নিয়ে আমার একটা অনেকদিনের কৌতূহল তো ছিলই। রিসেন্ট কিছু বইপত্তর পড়ে সে-বিষয়ে উৎসাহ বেড়েছে বই কমেনি।
পড়তে পড়তে বেশ তন্ময় হয়ে গেছি, রাত তখন প্রায় সাড়ে ন'টা, এমন সময় মাধুরী একটা গ্লাস এনে বলল, 'খেয়ে নাও।'
বললাম, 'এটা কী?'
'নার্ভ স্ট্রং করার আয়ুর্বেদিক ওষুধ। বাবুলালের আনা।'
'দেবযান'-এর মধ্যে একেবারে ডুবে গেছিলাম। ফলে দ্বিরুক্তি না করে গ্লাসের মধ্যেকার গাঢ় সবজেটে তরলটা গলায় ঢেলে নিলাম। একটু কষাটে লাগল বটে, তবে উপকারের কথা ভেবে সেটাকে আর গা করিনি।
রাতের ঘুমটা হল জব্বর। শেষ কবে এত গাঢ় ঘুম ঘুমিয়েছি মনে নেই। শুধু মনে থেকে গেল একটা স্বপ্নের আবছায়া রেশ। যেন এক সালংকারা নারীমূর্তি আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক অন্ধকার বনের গভীরে। আমার ভয় লাগছিল, ভীষণ ভয়। কিন্তু তার সঙ্গে অদেখাকে দেখার, অজানাকে জানার এক দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষাও যেন আমার সারা শরীর জাপটে ধরছিল। অরণ্যের অন্ধকারের মধ্যে আমি যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম, হারিয়ে যাচ্ছিলাম এক বোধহীন, উন্মত্ত এবং বোবা বস্তুপিণ্ডের মতো। সেই হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে আশঙ্কা আছে, আতঙ্ক আছে। কিন্তু তারও বেশি যেটা আছে সেটা হচ্ছে একটা গা-শিরশিরানি অদ্ভুত ভালোলাগা।
ঘুম ভাঙতে বেলা হল। ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলেই প্রথম যে কথাটা মনে পড়ল সেটা হচ্ছে যে, আজ জঙ্গলের সল্টপিটে একটা ভিজিট আছে। আর নতুন ডি এফ ও ব্যানার্জিবাবু বহুত খতরনাক লোক। আমার জন্য যদি ওঁকে অপেক্ষা করতে হয় তাহলে যে অনর্থ হবে তার তুলনা নেই।
কথাটা মনে হতেই লাফিয়ে উঠে প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। মোতিয়ার মা বলল মাধুরী ভোরে উঠে কোথায় যেন গেছে, ফিরবে একটু পরেই। আমি কি ওর জন্য অপেক্ষা করব? আমি স্নান সেরে দ্রুতবেগে গামছায় গা মুছতে মুছতে বললাম, 'তার দরকার নেই, তুমি আমাকে ঝটপট ভাত বেড়ে দাও।'
ভাত খাওয়ার সময় দেখি মোতিয়ার মা আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে চেয়ে আছে। আমি মুসুর ডাল সেদ্ধ, আলুসেদ্ধ আর খাঁটি গাওয়া ঘি মাখা গোবিন্দভোগ চালের ভাত একসঙ্গে মেখে গোগ্রাসে গিলতে গিলতে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে, কিছু বলবে?'
মোতিয়ার মা ফিশফিশ করে বলল, 'দিদিকে একটু সাবধানে রাখো গো দাদা। দিদির বোধহয় হাওয়া লেগেছে।'
দ্রুত অন্নপিণ্ড গলাধঃকরণ করতে করতে বললাম, 'তাই নাকি? এরকম মনে হল কেন?'
মোতিয়ার মা গলাটা আরও নামিয়ে দিয়ে বলল, 'মাঝে মাঝে দিদিমণি কেমন করে গো দাদা! সাঁঝবেলায় লাল-লাল চোখ করে এলোচুলে দরজার কাছে বসে থাকে। আমি ডাকলেও সাড়া দেয় না। দুপুরে হঠাৎ হঠাৎ করে কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। আমার ঠিক চুপচাপ ফিরে আসে। আবার কীরকম বিড়ালে পা হয়েছে গো দিদির, কোথা থেকে হঠাৎ হঠাৎ আচমকা উদয় হয় বোঝাই যায় না।'
এসব কথাকে আমল দেওয়ার মানেই হয় না। নতুন বিয়ের পর সব মেয়েরই বাড়ির জন্য মন কেমন করে। মাধুরীরও হয়তো তাই হয়েছে, সেইজন্যই উদাস এলোচুলে বসে থাকে। আর দুপুরে এদিক-ওদিক যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, আশেপাশের অনেক বউদি বা মাসিমারাই ওকে খুব স্নেহ করেন দেখেছি। আর বিড়াল পা'য়ের ব্যাপারটা আর কিছুই না, মোতিয়ার মা যে কানে কম শোনে একথা আমরা সব্বাই জানি।
জঙ্গলে ঢুকতে ঢুকতে প্রায় এগারোটা বাজল। সল্টপিটের কাছে যখন পৌঁছোলাম তখন বেলা প্রায় একটা। কিছু আর্জেন্ট কাজ ছিল, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কাজের বিবরণ দিয়ে আর তোমাদের বোর করব না। কিন্তু তার পরে যেটা ঘটল সেটাই খুব আশ্চর্যের।
আমাদের টিমে বাবুলালও ছিল। কাজকর্ম শেষ করে আমরা একটা পাথরের আড়াল বেছে টিফিন বের করেছি, এমন সময় বাবুলাল আমার ওপরওয়ালা বামনবাবুকে বলল, 'সল্টপিটের ওপর যে নালাটা দেখছেন স্যার, তার ওপারে একটা চমৎকার জায়গা আছে, যাবেন নাকি? একদম নতুন জায়গা, আমি ছাড়া এর খোঁজ আর কেউ জানে না।'
বামনদেববাবু, অর্থাৎ বামনদেব ব্যানার্জিমশাই এই অফিসের ডি ওফ ও'র দায়িত্ব নিয়েছেন হপ্তাদুয়েক হল। হাইটে প্রকৃত অর্থেই বামন হলে কী হবে, দাপটে ইতিমধ্যেই চারিদিকে ত্রাহিমাম রব তুলে দিয়েছেন। বয়স পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি। ছোটো ছোটো করে ছাঁটা চুল, গুল্লি-গুল্লি মাসল আর রাগি-রাগি চোখের ভদ্রলোককে আমরা ইতিমধ্যেই ভয় পেতে শুরু করেছি। আগের বড়োসাহেব রমেন মিত্তির ছিলেন মাইডিয়ার লোক। তাঁর সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা, মশকরা সবই চলত। ইনি সাক্ষাৎ টেরর, হাতে মাথা কাটেন। সারা অফিস তটস্থ হয়ে আছে।
এহেন বামনদেববাবু দেখলাম বাবুলালের প্রতি খুবই সদয়। প্রস্তাব শুনেই খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হেসে বললেন, 'বাবুলাল যখন বলছে তখন নিশ্চয়ই ভালো জায়গাই হবে। কী বলো হে চাটুজ্জে?'
আমি শুকনো উৎসাহের সঙ্গে 'হ্যাঁ হ্যাঁ সে তো বটেই, সে তো বটেই' এসব বলে প্রভূত উৎসাহ দিলাম। সঙ্গে ডিপার্টমেন্টের আর এক সঙ্গী, বিট অফিসার মানব মণ্ডলও অতিরিক্ত উৎসাহের সঙ্গে লাফিয়ে উঠে, 'হ্যাঁ হ্যাঁ সে তো বটেই, সে তো বটেই,' বলে ধুয়ো তুলে ফেলল।
ব্যাপারটা বুঝতে আর বাকি রইল না। বস আর বসের প্রিয়পাত্রকে খুশি করতে কে না চায়? তবে আমার মতো চৌকশ লোক থাকতে শেষমেশ বাবুলালের মতো একটা খোঁচড় যে বামনদেববাবুর ছাতা হয়ে দাঁড়াবে কেই-বা ভেবেছিল?
খাওয়া শেষ হতে জনা সাতেকের টিমটা রওনা দিলাম। বামনদেববাবু, আমি, মানব মণ্ডল আর তিনজন ফরেস্ট গার্ড, এই হচ্ছে টিম। সঙ্গে বাবুলাল জুটেছে ফাউ হিসেবে। যদিও দেখা যাচ্ছে যে সেই ফাউয়ের দামই আপাতত আসলের থেকে বেশি।
একটা শুকনো নালা পার করে, ছোটো শুঁড়িপথ পেরিয়ে, জঙ্গলের একটা ছোটো বাঁক অতিক্রম করে বাবুলাল আমাদের যেখানে এনে ফেলল সেটা একটা ভারি মনোহর আর দর্শনধারী প্রান্তর। একদিকে দলমা রেঞ্জ, আর একদিকে সবুজে ছাওয়া মাটির বুক চিরে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে কর্ণাবতী নদী। সবমিলিয়ে এমন চমৎকার দৃশ্য আর হয় না। বামনদেববাবু আর বাকিরা যথারীতি আহা-উহু শুরু করে দিলেন। কিন্তু আমার মুখ যদি তখন কেউ দেখত তাহলে বুঝতে পারত আমার মনের মধ্যে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
এই তো সেই প্রান্তর, যেটা আমি আর মাধুরী কয়েকদিন আগে দেখে গেছি! এটা নাকি একদম অনাবিষ্কৃত একটা জায়গা? মাধুরীকে তো সেইরকমই বুঝিয়েছিল বাবুলাল। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে জায়গাটা যতটা অনাবিষ্কৃত বলে ও দাবি করেছিল ততটা অনাবিষ্কৃত নয়! এই তো ব্যানার্জিবাবুর জন্য সেই একই জায়গা হাট করে খুলে দিল ও! তার মানে কি এটা ওর একটা চাল? লোক বুঝে অনেককেই এই বিশেষ প্রান্তরটার সৌন্দর্য বিলিয়ে থাকে ও?
একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে বাবুলালের চোখমুখের ভাব লক্ষ করছিলাম। তার মুখে সেই সরল হাসি, সেই অনাবিল উৎসাহ। দেখে মনেই হবে না যে আমার সামনেই আমাকে ঠকানোর মতো একটা জঘন্য কাজ সে এই মুহূর্তে করছে!
লোক ঠকানোর কথাটা মাথায় আসতেই নিজেকে সামলে নিলাম। আমি বোধহয় একটু বেশিই ভেবে ফেলছি। এখানে ঠকানোর প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে? ও তো আর আমার বা মাধুরীর কাছ থেকে টাকা নেয়নি এখানে নিয়ে আসার জন্য। বামনদেববাবুও যে ওকে কোনো টাকাপয়সা দেননি তার প্রমাণ আমি নিজেই।
কিন্তু আমিই বা এত ক্ষুব্ধ হচ্ছি কেন?
একটু ভাবতেই বুঝলাম কেসটা কী! আমি মনে মনে প্রতারিত বোধ করছি। যে সৌন্দর্যে আমার অধিকার নিঃসপত্ন বলে ধরে নিয়েছিলাম, সেখানে অন্যকে প্রবেশ করতে দেখে ঈর্ষান্বিত হচ্ছি। নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে অন্যের সঙ্গে অনুরক্ত হতে দেখলে পুরুষ যেমন যৌনঈর্ষায় জর্জরিত হয় তেমনই। অথচ তার কোনো মানেই হয় না। জায়গাটা তো আর আমার বাপের সম্পত্তি নয় রে ভাই!
তাহলে বাবুলালের কেসটা কী? বিভিন্ন লোককে 'আপনাকে একদম নতুন জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি' বলে তাদের এখানে নিয়ে আসার পেছনে উদ্দেশ্যটা কী?
সবাই এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল। বামনদেববাবু দেখলাম বেশ ইমপ্রেসড। হেঁড়ে গলায় বাবুলালের তারিফ করতে লাগলেন। মানবও দেখলাম খুব উচ্ছ্বসিত। ফরেস্ট গার্ড তিনজনের মুখেও বেশ একটা সপ্রশংস ভাব। তাদেরই একজন, নাম তুফান মারান্ডি, তার কাছে ঘেঁষে এসে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হে তুফান, এখানে আগে এসেছ কখনও?'
তুফান বেশ একটা বিহ্বল গলায় বলল, 'না স্যার। এখানে প্রথমবার এলাম।'
কথাটা শুনে একটা খটকা লাগল। তুফান এখানকারই বাসিন্দা, যোগ দিয়েছিল বন সহায়ক হিসেবে। প্রমোশন পেয়ে ফরেস্ট গার্ডের কাজ করছে কম দিন না। তার চোখে কখনও পড়েনি এই জায়গাটা? এটা বিশ্বাস করতে হবে?
অন্য দুজনের সঙ্গেও কথা বলে দেখলাম, তাদেরও একই বক্তব্য। এতদিন জঙ্গলে কাজ করেও এই জায়গাটা নাকি তাদের কাছে অচেনাই ছিল এতদিন।
মনের মধ্যে কোথাও একটা কাঁটা খচখচ করতে লাগল। কে যেন বলতে লাগল, 'যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে না ভবতারণ, কোথাও একটা বড়ো গোলমাল আছে।'
একটু হাঁটতে হাঁটতে বড়ো বটগাছটার কাছে পৌঁছোলাম। তার পাশেই সেই ঢিবিটা। সেখানে বাকি সব ঠিক আছে, শুধু দেখলাম বাবুলাল ঢিবিটার সর্বত্র আঁতিপাঁতি করে কী যেন একটা খুঁজছে। তার কপালে ঘাম, দুচোখে উদবেগ, অন্য কোনোদিকে তার মন নেই।
আমি কিছুক্ষণ দেখলাম ওর কার্যকলাপ। তারপর একবার গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকলাম, 'বাবুলাল, কিছু খুঁজছ?'
বাবুলাল শোনামাত্র তিড়িং করে দাঁড়িয়ে উঠল। পর্যায়ক্রমে তার মুখের মধ্যে অনেকগুলো ভাব খেলে গেল। তার মধ্যে হঠাৎ চমকে ওঠা থেকে শুরু করে অপ্রস্তুত হওয়া সবই মিশে আছে। তবে ছোকরা চালিয়াত বটে। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'আরে চ্যাটার্জিদা যে! কিছু বলছিলেন নাকি?'
প্রশ্ন করলাম, 'কী একটা হাঁচড়পাঁচড় করে খুঁজছ মনে হচ্ছে!'
বাবুলাল একটু অপ্রস্তুত হেসে বলল, 'ওই আর কী! একটা জিনিস...'
'কী জিনিস বাবুলাল?'
'কাঠের তৈরি একটা জিনিস বাবু। ক্রিশ্চানদের ওই ক্রুশের মতো হয় না..'
'তুমি কি একটা হাড়িকাঠ খুঁজছ বাবুলাল?'
আমি তোমাদের বলে বোঝাতে পারব না বাবুলালের ওপর আমার এই কথাটার কী অভিঘাত হল। ছেলেটার শরীরটা মুহূর্তের মধ্যে ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো সটান হয়ে দাঁড়াল। চোখের মধ্যে ভয় আর অবিশ্বাস। আমার দিকে কিছুক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইল বাবুলাল। তারপর ফিশফিশ করে বলল, 'আপনি কি ওই হাড়িকাঠে হাত দিয়েছেন বাবু?'
আমি বাবুলালের চোখে চোখ রেখে বললাম, 'কেন, তাতে অসুবিধা আছে কিছু?'
বাবুলালের চোখদুটোয় ভয় ছড়িয়ে পড়ল। চাপা গলায় বলল 'সর্বনাশ করেছেন বাবু। কাজটা ভালো করেননি।'
আমি আশ্চর্য হলাম। বললাম 'কেন, কী হয়েছে তাতে?'
'এই যে ঢিবিটা দেখছেন, এখানে আগে রঙ্কিনীদেবীর মন্দির ছিল। রঙ্কিণীদেবীর নাম শুনেছেন তো?'
শুনেছি তো বটেই। বিভূতিভূষণের লেখাতেই পড়েছি।
'মহা জাগ্রত দেবী বাবু, আর সেইরকমই রাগি। এককালে এখানে নিয়মিত বলি হত। বলির রক্ত ছাড়া মায়ের পুজো হত না। নরবলিও হত গোপনে গোপনে।'
'তারপর?'
'তারপর একদিন ইংরেজ সরকার বলে দিল যে নরবলি হবে না। শুধু পশুবলি হবে। কিন্তু এই শুনুকপাহাড়ির জমিদারমশাই শুনলেন না। তিনি গোপনে গোপনে একটা নরবলির আয়োজন করলেন।'
'কেন?'
'জমিদারমশাইয়ের ছেলের একটা অদ্ভুত অসুখ ছিল। কারণে-অকারণে মাঝে মাঝেই খেপে উঠতেন, পাগলের মতো আচরণ করতেন, হাতের সামনে যাকে পেতেন তাকেই মারধর করতেন। তখন তাঁকে সামলানো যেত না। এমনকি বাড়াবাড়ি চরমে উঠলে খুনজখমও করেছেন কিছু। অনেক ওষুধপত্তর খাইয়েও সারেনি।
শেষে জমিদারমশাইয়ের গুরুদেব এক মহাসিদ্ধ তান্ত্রিককে ধরে আনলেন কোথা থেকে। তিনি এসে নিদান দিলেন কোনো এক যজ্ঞ করে নরবলি দিলে নাকি রোগ সেরে যাবে।'
'হুম। তারপর?'
'জমিদারের আদেশে নায়েবমশাই চুপিসারে সব আয়োজন করলেন। লক্ষণ দেখে একটি বামুনের ছেলেও ধরে আনা হল। মন্দির বন্ধ করে তান্ত্রিক, গুরুদেব, জমিদারমশাই আর তার ছেলে যজ্ঞে বসলেন।
কিন্তু শেষরক্ষা হল না। যে বামুনঠাকুরের ছেলেকে তুলে আনা হয়েছিল তিনি সদরে গিয়ে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নালিশ করলেন। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সেপাই এসে বলি আটকাল, পুজো বন্ধ করাল আর জমিদার মশাইকে তাঁর ছেলে আর গুরুদেব শুদ্ধু উঠিয়ে নিয়ে গেল। সেই সিদ্ধ তান্ত্রিক গোলেমালে কোথায় সরে পড়লেন কেউ জানে না।'
শুনে বেশ চমৎকৃত হলাম। এরকম কত গল্প যে হাটে-মাঠে ছড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম 'তারপর কী হল?'
বাবুলাল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 'তারপর আর কী! আদালতের বিচারে জমিদারের ফাঁসির আদেশ হল, জমিদারের ছেলে আর গুরুদেবের হাজতবাস। হাজতে একদিন জমিদারের ছেলে খেপে উঠে গুরুদেবের গলা টিপে খুন করে ফেলল। ইংরেজ সরকার তৎক্ষণাৎ বিচার-টিচার সেরে তাকেও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিল। শুনুকপাহাড়ির জমিদারি নষ্ট হয়ে গেল। এই মন্দিরও ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে গেল। তার জায়গায় জেগে রইল ঢিবিটা। আর ঢিবির মাথায় জেগে রইল শুধু হাড়িকাঠটা, রঙ্কিণীদেবীর চিহ্ন হিসেবে।'
'তা সেই হাড়িকাঠে হাত দিয়ে কী সর্বনাশের কথা বলছিলে যেন?'
আরও কাছে ঘনিয়ে এল বাবুলাল। বলল, 'আমি মাঝে মাঝেই এখানে আসি বাবু। একবার করে দেখে যাই হাড়িকাঠটা ঠিকঠাক আছে কি না।'
কথাটা শুনে আশ্চর্য লাগল, 'কেন? তুমি আস কেন?'
একটু বোকার মতো হাসল বাবুলাল। তারপর বলল, 'কারণ সেই পালিয়ে যাওয়া তান্ত্রিক আমারই পূর্বপুরুষ ছিলেন বাবু। আমাদের পরিবারে একটা কথা প্রচলিত, এই হাড়িকাঠ নাকি দেবীর মতোই ভারি জাগ্রত। তাকে জাগাতে নেই, তাতে হাত দিলেই অনর্থ। তখন সে নাকি রক্তের খোঁজে শিকার খুঁজে বেড়ায়। রঙ্কিণীদেবীর কোপ নেমে আসে এই এলাকা জুড়ে।'
আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই দূর থেকে বামনদেববাবুর তৃপ্ত এবং প্রসন্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এল, 'কী হল ভবতারণ, বলি গেলে কোথায়? বাবুলালই বা কোথায় হারিয়ে গেল! এবার তো ফেরার রাস্তা দেখতে হয়!'
ফেরার রাস্তাটা চুপচাপ কাটল। সবাই একটু চুপচাপ। কয়েকবার ইচ্ছে করে ঘাড় ঘুরিয়ে বাবুলালের মুখটা দেখলাম। ভাবলেশহীন মুখচোখ, যেন একটু আগে ওর আর আমার মধ্যে কিছুই ঘটেনি।
বাড়ি এসে হাত-পা ধুয়ে শুয়ে পড়লাম। শরীরটা ক্লান্ত ছিল। শুধু মনে আছে যে মাঝরাতে আধোঘুমে একবার পাশ ফিরতে গিয়ে দেখি বিছানা ফাঁকা। ভাবলাম মাধুরী বাথরুম গেছে হয়তো, এক্ষুনি ফিরে আসবে।
বোমটা ফাটল পরদিন সকালে। ঘুম থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে তুলল মাধুরীই। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, 'ওগো শুনছ, শিগগিরিই ওঠো। তোমাদের বামনদেববাবু খুন হয়েছেন!'
বামনদেববাবুর কোয়ার্টার আমার বাসার কাছেই। কাজের সূত্রে এক-দুবার যেতে হয়েছে। একাই থাকতেন ভদ্রলোক। স্ত্রী থাকেন কলকাতায়, সেখানে কোনো এক কলেজে পড়ান।
সেখানে গিয়ে দেখি লোকজনের ভিড়। পুলিশের গাড়ি আছে দুটো। দরজায় তিনজন হাবিলদার তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে। বুঝলাম বড়োসাহেব কেউ এসেছেন।
একটু পরে পুলিশের টিম বেরিয়ে এল। জগুবাবু আছেন, তাঁর সামনে সামনে একজন ইয়াং ছোকরা গোছের অফিসার। তাঁকে সবাই স্যার, স্যার করছে। বুঝলাম ইনিই বড়োবাবু। কানের পাশে কে যেন ফিশফিশ করে বলল, 'এস পি সাহেব।'
খবর তাহলে ওপরমহলে পৌঁছে গেছে। অবশ্য পৌঁছোনটাই স্বাভাবিক। এই ক'দিনের ব্যবধানে তিন-তিনটে অস্বাভাবিক খুন তো কম বড়ো কথা নয়। তার ওপর তার মধ্যে একজন যদি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হন।
হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে এলাম। বুঝলাম যে খবরটা এর মধ্যেই শহরময় ছড়িয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় জটলা। মাথা নীচু করে গুজগুজ- ফিশফাশ। অচেনা মুখ দেখলে চুপ করে যাওয়া।
বাবুলালের দোকান বাজারের মধ্যেই। সেখানে চাপা গলায় উত্তেজিত তর্ক-বিতর্ক চলছে। আমাকে দেখেই সবাই চুপ করে গেল। বাবুলাল এক কাপ চা হাতে ধরিয়ে দিয়ে উপস্থিত জনতাকে বলল, 'ফরেস্ট অফিসের ছোটোবাবু।'
চা হাতে নিয়ে দেখি জটলার মধ্যে.মানবও উপস্থিত। আমাকে দেখে ধরা গলায় বলল, 'কোথা থেকে কী হয়ে গেল চ্যাটার্জিদা। কালও আমরা এই সময়...'
আমি চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, 'কেসটা কী হয়েছে খুলে বলো তো মানব।'
মানব বলল, 'কী আর বলব দাদা। স্যার যে একলাই থাকতেন সে তো জানেনই। ভোরে খবরের কাগজওয়ালা এসেছিল কাগজ দিতে। তার কাগজ ছুড়ে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু সদর দরজা খোলা দেখে তার সন্দেহ হয়। সে সাইকেল থেকে নেমে অনেকক্ষণ বেল বাজিয়ে যখন দেখে কেউ বেরিয়ে আসছে না তখন সে পাশের বাড়ি খবর দেয়। তারা এসে দেখে স্যার খাটে শুয়ে, বুকে একটা গভীর ক্ষত। সেখান থেকে রক্ত বেরিয়ে বিছানা-টিছানা ভিজে একাকার।'
চায়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আর কিছু ছিল না?'
'আর কিছু বলতে?'
'বডিতে কিছু আঁকাটাকা ছিল না? বা অন্য কিছু রাখা ছিল না আশেপাশে?'
মানব আমার দিকে একটু চেয়ে রইল। তারপর বলল, 'বডির বুকের ওপর একটা মেয়ে-পুতুল বসানো ছিল। বাচ্চা পুতুল নয়, বার্বি'র মতো কিশোরী মেয়েদের পুতুল।'
আমার মন বলছিল আগের খুনগুলোর মতোই এখানেও কিছু একটা নিশ্চয়ই অদ্ভুত কিছু থাকবে। সেটা মিলে যেতে একটা সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল মনের মধ্যে।
যবে আমি আর মাধুরী ওই মাঠটায় গেছি, তবে থেকেই এই খুনোখুনির পালা শুরু। প্রতিটা খুনই হয়েছে রাতের দিকে। আর সেই তিন রাত্রিতেই মাধুরী আমার চোখের সামনে ছিল না। প্রথমবার ও কোনো এক বান্ধবীর বাড়িতে রাত কাটাতে গেছিল, দ্বিতীয়বার আমি বাড়ি ছিলাম না আর কাল একবার যেন ঘুমের ঘোরে মনে হল...
মাথাটা একবার জোর করে ঝাঁকিয়ে নিলাম। এসব কী উলটোপালটা ভাবছি আমি? পাগল হয়ে গেলাম নাকি!
চায়ের দাম মিটিয়ে দিলাম বাবুলালকে। ফেরার পথে জগুবাবুর সঙ্গে দেখা। বাড়ির সামনে জিপ থেকে নামছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, 'শুনেছ তো সব?'
স্যাঁৎ করে জগুবাবুর বাড়ির মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম। বললাম, 'এসব কী হচ্ছে দাদা, কিছুই তো বুঝতে পারছি না! একটু আলো ফেলুন না!'
ইশারায় আমাকে বসতে বলে জগুবাবু ফ্রেশ হতে অন্দরে চলে গেলেন।
যখন ফিরে এসে সামনে বসলেন দেখলাম মুখে গভীর চিন্তার ছাপ। সামনে রাখা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, 'কী জানতে চাও বলো? আগেই বলে রাখি, ডিপার্টমেন্টাল ইনভেস্টিগেশনের কথা তোমাকে বলেছি, এসব কথা বাইরে প্রকাশ পেলে আমার কিন্তু চাকরি চলে যাবে ভায়া। অতএব এখানে যা শুনবে, ঘরের বাইরে পা রাখা মাত্র ভুলে যাবে, বুঝেছ?'
বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নাড়লাম। জিজ্ঞেস করলাম, 'আমার মনে হচ্ছে এই তিনটে খুনই কোনো-না-কোনোভাবে কানেক্টেড। খুব ভুল বললাম দাদা?'
জগুবাবু নির্লিপ্ত গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন, 'একদমই ভুল বলনি। কেসটা যে সিরিয়ালের কিলিং-এর সেটা এখন আমাদের কাছে স্পষ্ট।'
হাতে ধরা কাপটা কেঁপে গেল। চুমুক দিয়ে সপ্রশ্ন চোখে জগুবাবুর দিকে চেয়ে রইলাম।
'ফরেনসিক বলছে আগের দুটো খুন হয়েছে একই হাতে। প্রায় নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট চান্স যে এই খুনের পেছনেও একই হাত আছে। খুন হওয়ার সময়টাও প্রায় সেম, রাত দেড়টা থেকে সাড়ে তিনটের মধ্যে। ভিকটিমদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ বা জানাশোনা ছিল না। ঘরের মধ্যে কিছুই খোয়া যায়নি। মানে খুন করা ছাড়া খুনির আর অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই।'
'আর ওই বুকে লেখা অং বং চং লেখা, অক্ষর, স্টার আঁকা, ময়ূরের পালক, বার্বি পুতুল, ওগুলো কী?'
'ওগুলো একজন টিপিক্যাল সাইকোপ্যাথ সিরিয়াল কিলারের লক্ষণ। হত্যা করে মৃতদেহ বিকৃত করা। পুলিশকে ল্যাজে খেলিয়ে নিজের ইগো তৃপ্ত করা। ইচ্ছে করেই এমন সূত্র রেখে যাওয়া, যেটা দেখে পুলিশ ধোঁয়াশায় পড়বে। আর তার ফাঁকে নতুন শিকার খোঁজা।'
শুনে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল। তার মানে আমাদের মধ্যে এই মুহূর্তে একটি সাইকোপ্যাথ সিরিয়াল কিলার ঘুরে বেড়াচ্ছে?
'আর আরও একটা জিনিস আমরা লক্ষ করেছি। এখনও সেসব কেউ জানে না বটে, তোমাকেই বলছি। প্রতিটা কেসে দেখা গেছে বাড়ির বাইরে কী যেন একটা পুঁতে ফের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খুব বড়ো কিছু নয়, যেমন ধরো একটা উইকেট, বা একটা ছাগল বাঁধার খুঁটি, বা একটা মোটা গাছের ডাল, বা একটা...'
'হাড়িকাঠ।' আমার অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে গেল কথাটা।
ধীরে ধীরে মাথাটা ওপর নীচে করলেন জগুবাবু, 'হতেই পারে। ইন ফ্যাক্ট আমরা সেই জায়গায় জবাফুল আর আলোচালের ট্রেসও পেয়েছি বটে।'
'পুলিশ কী বলছে দাদা?'
'কথাটা লালবাজার আর ভবানী ভবন অবধি পৌঁছে গেছে ভায়া। কাল সি আই ডি'র টপ অফিসার আসছেন তদন্তে। নিউজ পেপারে বা টিভি চ্যানেলে খবরটা চেপে দেওয়া হয়েছে বটে, পাবলিকের মধ্যে প্যানিক ছড়াবে বলে, কিন্তু ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস। তুমি আবার এ নিয়ে কাউকে কিছু বোলো না কিন্তু!'
চা খেয়ে বাড়ি এলাম। শিরদাঁড়ার কাছটা শিরশির করছিল। ক'টা দিন সাবধানে থাকতে হবে মনে হচ্ছে।
জগুবাবুদের এত সাবধানতা সত্ত্বেও খবরটা চাপা রাখা গেল না। 'বাঁকুড়া বার্তা' বলে একটি স্থানীয় সংবাদপত্রের ফার্স্ট পেজে পরদিনই ফলাও করে ছেপে বের হল খবরটা, 'বাঁকুড়া, বিষু�পুর জুড়ে সিরিয়াল কিলারের তাণ্ডব' এই শিরোনামে। সঙ্গে নীচের কলামে একটা ছোট্ট খবর, 'খোয়া গেছে শুনুকপাহাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন রঙ্কিণী মন্দিরের হাড়িকাঠ। ঘুরে বেড়াচ্ছে অশরীরী আততায়ী।'
সারা শহর জুড়ে যেন অলিখিত কারফিউ লেগে গেল। চারিদিকে একটা থমথমে ভাব। কেউ অকারণে ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। সন্ধের আগেই সব বাড়ির দরজা-জানলা বন্ধ। পাড়ায় পাড়ায় নাইট ওয়াচ চালু হল। পলিটিক্যাল পার্টির কর্তারা দিনের বেলা ছোটো ছোটো জনসভা করে অভয় দিতে লাগলেন। কিন্তু ওই দিনের বেলায়ই, রাতের বেলা সব শুনশান।
বাড়িতেও একই অবস্থা। মাধুরী এমনিতেই ভয়ে সিঁটিয়ে আছে, তার ওপর মোতিয়ার মা এসে নানারকম গুজবের কথা মাধুরীর কানে তুলে ব্যাপারটা আরও সঙিন করে তুলল। সন্ধের পর বাড়ি ফিরলে সে তুমুল চ্যাঁচামেচি করে। মোতিয়ার মা'কে তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে সারা বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখে। তখন বেসরকারি অফিস আর গুটিকয় পয়সাওয়ালা বাড়ি ছাড়া এসি লাগানোর চল ছিল না। ফলে দমবন্ধ হাঁসফাঁস অবস্থা।
আস্তে আস্তে লক্ষ করতে লাগলাম মাধুরীর চরিত্রে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন এসেছে। হঠাৎ করে রেগে যাওয়া, হঠাৎ করে কেঁদে ফেলা, হঠাৎ করে চুপ করে যাওয়া এইসব। কথায় কথায় ভুল বুঝছে। একদিন অকারণে মোতিয়ার মায়ের ওপর চোটপাট করল, যেখানে বুড়ির কোনো দোষই ছিল না। ভর সন্ধেবেলায় মোতিয়ার মা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। আমার মনটা কেমন যেন কুডাক ডেকে উঠল।
বামনদেববাবুর খুনের কয়েকদিন পরের কথা। তখনও নতুন ডি ওফ ও আসেননি। অ্যাডিশনাল ডি এফ ও হিসেবে আমাকেই সব কাজ সামলাতে হচ্ছে। ফিরতে প্রায়ই রাত হয়। মাধুরীর চিৎকার-চ্যাঁচামেচির ভয়ে দুজন সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ফিরি।
তেমনই একদিন বাড়ি দেখি মাধুরী এলোচুলে সদর দরজার ওপর বসে আছে। 'ওপর' কথাটা এই জন্য ব্যবহার করলাম এটা বোঝাতে যে ওর শরীর চৌকাঠের ওপারে থাকলেও পা দুটো ছিল চৌকাঠের এপারে।
আমি খুব একটা কুসংস্কার মানি না। বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সেইদিন এলোচুলে বসে থাকা মাধুরীকে দেখে বুকটা ধক করে উঠল। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে এসে বললাম, 'এ কী মাধুরী, এখানে এইভাবে বসে আছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে?'
মাধুরী ধীরে ধীরে মুখ তুলল। চোখের কোনা লাল। ঠোটের কোনায় কষ লেগে আছে। সিঁথিতে সিঁদুর নেই, কোনো প্রসাধন নেই, একটা উগ্র রুক্ষ রূপ। আমার দিকে তাকিয়ে ঘড়ঘড়ে স্বরে বলল, 'ও ছাড়া পেয়েছে, তাই না গো?'
একটু নীচু হয়ে প্রশ্ন করলাম, 'কে ছাড়া পেয়েছে মাধুরী, কার কথা বলছ?'
চোখদুটো বড়ো বড়ো হয়ে উঠল মাধুরীর। ফিশফিশ করে বলল, 'আমি জানি ও ছাড়া পেয়েছে, বুঝেছ। ওর ডাক শুনেছি আমি। ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে ও, ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে। কেন জান?'
'কেন?'
গলাটা আরও খাদে নামিয়ে আনল মাধুরী, 'রক্ত চাই ওর, অনেক রক্ত।'
মাধুরীকে প্রায় কোলপাঁজা করে তুলে নিয়ে যেতে হল। বুকটা ধকধক করছিল। মনে হচ্ছিল কী যেন একটা সর্বনাশ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে অপেক্ষা করছে।
কয়েকটা দিন এভাবেই কাটল। প্রতিবেশিনীদের মধ্যে অনেকেই মাধুরীকে স্নেহ করতেন। তাঁরা পালা করে দেখে যেতে লাগলেন। মোতিয়ার মা নিজের মেয়ের মতো আগলে রইল মাধুরীকে। ডাক্তারবাবুর পরামর্শে একজন সাইকিয়াট্রিস্টকে দেখান হল। তিনি কিছু নার্ভের ওষুধ দিলেন, বললেন কোনো কারণে স্নায়ুর ওপর হঠাৎ করে চাপ বেড়েছে বলে এই অবস্থা।
কাজকর্ম ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে এল। উত্তেজনা থিতিয়ে এল ক্রমশ। মাঝেমধ্যে জগুবাবুর বাসায় যাই। চা-জলখাবার খাই। জগুবাবুর কথামতো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট মনে করছে শিকারি এখন সতর্ক, পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই ফের আঘাত হানবে।
সেই দিন যে এত তাড়াতাড়ি আসবে কে জানত?
সেদিন অফিসের কাজ শেষ হয়ে গেছিল বেলাবেলি। বিট অফিসার ভুবন গড়াই বলল ওর জামাইবাবু নাকি গত হপ্তায় সিঙ্গাপুর থেকে ফেরার সময় ডিউটি ফ্রি শপ থেকে একটা শিভাস রিগ্যাল উঠিয়ে এনে শালাবাবুকে গিফট করেছে। বোতলটার ঘোমটা ও নাকি আমাদের সামনেই খুলতে চায়। বলা বাহুল্য এসব প্রস্তাবে না বলার মানেই হয় না।
ভুবনের বাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতে রাত প্রায় এগারোটা। মানব আগেই বেরিয়ে গেছিল, পরদিন সকাল সকাল ওর ট্রেন ধরে দেশের বাড়ি যাওয়ার কথা। আমার অবশ্য তাড়া নেই, অফিস থেকে বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন করে মাধুরীকে বলে দিয়েছিলাম যে ফিরতে একটু রাত হবে, ও যেন চিন্তা না করে।
রিকশাটা যেখানে নামিয়ে দিল সেখান থেকে আমার বাড়ি প্রায় দু'কিলোমিটার। হতচ্ছাড়া রিকশাওয়ালা উপরি পাঁচ টাকার লোভেও বাড়ি অবধি আসতে রাজি হল না। অগত্যা আমি ওকে ওর ভাড়া মিটিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
চেনা রাস্তা, কলোনির মধ্য দিয়ে চলে গেছে এদিক থেকে ওদিক। ছিমছাম পরিচ্ছন্ন এলাকা। দিনের বেলায় জায়গাটা লোকজনের আনাগোনায় মশগুল হয়ে থাকে। এখন অবশ্য রাস্তাঘাট শুনশান।
আসতে আসতে শিস দিয়ে 'তেরে দর পর সনম চলে আয়ে' গাইতে গাইতে আসছিলাম। সদ্য 'ফির তেরি কাহানি' রিলিজ করেছে। সিনেমার সবকটা গানই হিট, লোকের মুখে মুখে ফিরছে।
খানিকটা এসে ডানদিকে বেঁকে একটা শর্টকাট নিলাম। মাঝে একটা এল শেপের বাঁক ছিল। বাঁক ঘুরতেই ডাক্তার নৃসিংহপ্রসাদ দাশগুপ্তর বাড়ি। মাধুরীর চিকিৎসা ইনিই করেন। জটিল অসুখবিসুখ বা অপারেশন বাদ দিলে বাকি রোজকার সাধারণ চিকিৎসায় ডাক্তারবাবু সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি। ভদ্রলোক মানুষ হিসেবেও অতি মাইডিয়ার গোছের লোক।
বাড়ির সামনে আসতেই কী যেন একটা দেখে থমকে গেলাম। ডাক্তারবাবুর সদর দরজার এক কোণে হাঁটু সমান উচ্চতার কী ওটা?
দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। নেশার মধ্যেও কী যেন একটা বুকের মধ্যে টিকটিক করছিল।
দরজার কাছটা একটু অন্ধকার। ল্যাম্পপোস্টটাও অনেক দূরে, এদিকে আলো আসে না। প্রথমে বুঝলাম না জিনিসটা কী? পকেট থেকে লাইটার বার করে জিনিসটার সামনে উবু হয়ে বসলাম। সিগারেটটা নিভে গেছিল। লাইটার জ্বালিয়ে আগে সিগারেট ধরিয়ে লাইটারটা জিনিসটার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলাম।
আর মনে হল আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে!
রঙ্কিণীদেবীর হাড়িকাঠ!
লাইটারের আলোটা স্থির হয়ে জ্বলে রইল। সিগারেটটা ঠোঁট থেকে পড়ে গেল। আমি যেন নিশ্বাস নিতেও ভুলে গেছিলাম।
এ কী করে সম্ভব? সেই হাড়িকাঠ এখানে এল কী করে? সেই সবজেটে কালচে শ্যাওলা ধরা কাঠের টুকরো। তার গায়ে জড়ানো জংধরা কাঁটাতার। একটা ভ্যাপসা সোঁদা গন্ধ উঠে আসছে কাঠের টুকরোটা থেকে। তার সঙ্গে মিশে আছে আর একটা গন্ধ।
কাঁচা রক্তের!
লাইটার বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালাম। হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল আমার। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই।
নিজের অজান্তেই চোখ গেল ডাক্তারবাবুর দোতলায় বারান্দার দিকে।
একটা ছায়া। একটা অন্ধকার অবয়ব। কার্নিশ বেয়ে টিকটিকির মতো উঠে যাচ্ছে বারান্দার দিকে। কোনো মানুষ যে এইভাবে দেয়াল বাইতে পারে আমার জানা ছিল না আগে। পা দুটো যেন কে গেঁথে দিয়েছিল আমার।
শরীরটা বারান্দায় নামল। বারান্দার পাশেই ডাক্তারবাবুর শোয়ার ঘর। ধীরে ধীরে একটা সরু কী যেন জানলার পাল্লার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। কন্ট করে একটা ক্ষীণ আওয়াজ এত দূর থেকেও শুনতে পেলাম।
পাল্লাটা দু-হাট করে খুলে গেল।
শরীরটা নেমে গেল ঘরের মধ্যে।
আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। সারা গা ঘামে ভিজে যাচ্ছে।। পা দুটো কে যেন গেঁথে দিয়েছে মাটিতে। এখান থেকে দেখতে পাচ্ছি যে ঘরের মধ্যে নড়াচড়ার আভাস। বুঝতে পারছি সাংঘাতিক একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু শরীরে শক্তি নেই যে কিছু করব। বুকের ভেতরটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে।
এমন সময় নজরে পড়ল হাড়িকাঠের ঠিক ওপরে। সদর দরজার গায়ে একটা কলিং বেল লাগানো আছে না?
আর কিছু না ভেবে কলিং বেলটা সজোরে টিপে ধরলাম। একটা তীক্ষ্ন রিরিরিরিং শব্দ ছড়িয়ে পড়ল বাড়ির মধ্যে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই ছায়াশরীর দ্রুত বেরিয়ে এল ঘরের বাইরে। ততক্ষণে দু-একটা ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। সেই ছায়াশরীর একটি অতিকায় টিকটিকির মতো নেমে আসতে লাগল দেয়াল বেয়ে। বাড়ির পেছনে দারোয়ান থাকার আস্তানা। সেখানে টর্চ জ্বলে উঠল। দারোয়ান দেখতে আসছে এই মধ্যরাত্রে কোনো মরণাপন্ন রোগী এসেছে ডাক্তারবাবুর কাছে আর্জেন্ট কলে।
সর্বনাশের সামনে দাঁড়িয়ে আমার স্নায়ু ম্যাজিকের মতো কাজ করে, আগেও দেখেছি। এখনও তাই হল। সেই ছায়াশরীর কার্নিশ থেকে লাফ দিয়ে মাটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতে-পায়ে সাড় ফিরে এল। আমি অন্ধের মতো সোজা দৌড়োলাম আমার বাড়ির দিকে।
ডাক্তারবাবুর বাড়িতে সিরিয়াল কিলারের হানার খবরে শহরে যেন বিদ্যুৎ বয়ে গেল। চারিদিকে চাঞ্চল্য। পুলিশ এসে ডাক্তারবাবু আর দারোয়ানকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে গেল। 'বাঁকুড়া বার্তা' তো বটেই, আরও দু-চারটে নিউজপেপার থেকে ডাক্তারবাবুর সাক্ষাৎকার আর ফোটো নিয়ে গেল। সেসব ফলাও করে ছাপাও হল। সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরে ডাক্তারবাবু যেন হিরো হয়ে গেলেন।
শুধু সেই রাতে কলিং বেল কে বাজিয়েছিল সে রহস্য খোলসা হল না।
এই প্রথম প্রমাণ পেলাম যে মানুষের কল্পনাশক্তির তুলনা নেই। সম্ভব- অসম্ভব নানা মনগড়া কাহিনিতে শহর ছেয়ে গেল। কেউ বলছে কোনো মরণাপন্ন রোগীর আত্মীয়, কেউ বলছে পাড়ার রাতের পাহারাদার, কেউ বলছে ডাক্তারবাবু অনেক লোকের প্রাণ বাঁচিয়ে পুণ্য করেছেন, তাই স্বয়ং ভগবানই নাকি সে রাতে তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেলেন!
আমি ঘটনাটা স্রেফ চেপে গেলাম, নইলে পুলিশের কাছে জবাবদিহি করতে গেলে প্রাণান্ত হত। ঘটনার পর দুদিন ছুটি নিয়ে ঘরে বসে ছিলাম। প্রায় নার্ভাস ব্রেকডাউন মতো হয়ে গেছিল। মাধুরী হয়তো কিছুটা আন্দাজ করেছিল, কিন্তু কিছু বলেনি।
শুধু জগুবাবুর কাছ থেকে পরে একটা খবরই উদ্ধার করতে পেরেছিলাম। সিরিয়াল কিলার নাকি একটা কনিষ্কের মূর্তি ফেলে গেছে। তার গায়ে লেগে থাকা হাতের ছাপ অন্যান্য খুনের জায়গা থেকে পাওয়া হাতের ছাপের সঙ্গে এক্কেবারে মিলে গেছে।
আমার কেন জানি না মনে হচ্ছিল যে এই ফেলে যাওয়া সব সিম্বল, এদের মধ্যে একটা গূঢ় যোগাযোগ আছে। কোনো একটা সংকেত আছে যেটা আমরা ধরতে পারছি না। খুনি যেন এক-একটা সূত্র ফেলে রেখে চ্যালেঞ্জ করে বলছে, এই দেখ বাপু, বলে দিচ্ছি কে আমি। এবার আমাকে ধরে দেখাও দেখি!
অফিসে জয়েন করে দেখি চারিদিকে একটা গুজগুজ-ফিশফাশ। বাবুলালকে নাকি দুদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। অফিসেও আসে না, দোকানও বন্ধ। সময়টা এমন যে যে-কোনো ছোটোখাটো অসংগতিও মানুষের চোখে বিরাট হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আমি অবশ্য সে নিয়ে মাথা ঘামালাম না। নতুন ডি এফ ও জয়েন করবেন, তাঁর জন্য চার্জ টেকওভারের ফাইল তৈরি করতে হবে। এদিকে মানব গেছে ওর দেশের বাড়ি, ওর ঠাকুরদার প্রতিষ্ঠিত স্কুলে নাকি বড়ো করে রবীন্দ্র জয়ন্তী হয়, সেইসব সামলাতে। ফলে সব ঝক্কি আমার ঘাড়েই। কাজেকর্মে বুঁদ হয়ে গেলাম।
কাজ শেষ হতে হতে বিকেল চারটে। বেরোতে যাব, এমন সময় মানবের ডেস্কের সামনে আটকা পড়ে গেলাম। ডেস্কের ওপর একটা পাঁজি পড়ে আছে। তার একটা পাতায় একটা পেজ মার্ক।
পাঁজিটা তুলে নিলাম। পেজ মার্ক খুলে দেখি পঁচিশে বৈশাখের ডেটে পেজ মার্ক গোঁজা। অন্যমনস্ক ছিলাম, তাই পেজ মার্কটা যথাস্থানে না গুঁজে পকেটে নিয়ে নিলাম।
বাড়ি যাওয়ার পথে বাজারে গেছি সাংসারিক কেনাকাটা করতে, দেখি বাবুলাল দোকান খুলছে। বললাম, 'কী হে, দুদিন ছিলে কোথায়? এদিকে শহরে যে ধুন্ধুমার কাণ্ড, খবর রাখো কিছু?'
বাবুলাল ম্লান হেসে বলল, 'আর বলবেন না বাবু, বাড়ির ডাবগাছ থেকে ডাব পাড়তে গিয়ে পা'টা মচকেছিল। চুন-হলুদ লাগিয়ে শুয়ে ছিলাম দুদিন। এখন একটু ঠিক হয়েছে বলে দোকান খুলতে এসেছি। খবর পেয়েছি সবই। কী আর বলব বলুন, সাবধানে থাকতে হবে, এই যা।'
বাবুলালের পায়ের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করে মাথায় যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল।
বাড়ি এসে মারুতিটা বার করলাম। মাথার মধ্য একটা অস্বস্তি টিকটিক করছে।
গৌতম মণ্ডল বাঁকুড়া জেলা স্কুলে ইতিহাস পড়ান। অতি অমায়িক লোক। স্থানীয় ইতিহাস, বিশেষ করে বাঁকুড়ার পুরাকীর্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। একটা সরকারি অনুষ্ঠানে আলাপ হয়েছিল। হঠাৎ করে তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হওয়াতে অবাক হলেন বটে, তবে আপ্যায়নে ত্রুটি রইল না।
আমি সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলাম। 'এই অঞ্চলে কখনও কোনো রঙ্কিণীদেবীর মন্দির ছিল?'
অল্প হাসলেন গৌতমবাবু, 'দেখুন, রঙ্কিণীদেবীর মিথ তো ঝাড়খণ্ড থেকে মেদিনীপুর এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। বাঁকুড়ায় একটা থাকলে অবাক হতাম না। তবে বাঁকুড়া শহর বা তার আশেপাশে রঙ্কিণীদেবীর কোনো পুরোনো মূর্তি বা দেউলের খোঁজ অন্তত আমার জানা নেই।'
'এখানে নয়, ধরুন আর একটু দূরে। শুনুকপাহাড়ির দিকে। ওখানকার জমিদারবাড়ির প্রতিষ্ঠিত মূর্তি।'
ভুরু কুঁচকোলেন, 'শুনুকপাহাড়িতে জমিদারি? সেখানে তো ঘন জঙ্গল ছিল এই সেদিনও। ওখান থেকে কতবার হাতির দল নেমে এসেছে বাঁকুড়া টাউনে। কবেকার কথা বলছেন বলুন তো?'
উত্তেজনা চেপে রেখে বললাম, 'ধরুন ব্রিটিশ পিরিয়ডে?'
'ব্রিটিশ পিরিয়ডে শুনুকপাহাড়িতে জমিদারি? এসব গালগল্প কে শোনাল আপনাকে?'
বাবুলালের গল্পটা পুরো শোনালাম ওঁকে। অবশ্যই নামটা উহ্য রেখে।
মাথা নাড়লেন গৌতমবাবু, 'অসম্ভব। সেই সময় ওখানে মানুষের বসতি, তার ওপর জমিদারি... নাহ, আপনার বন্ধু আপনার সঙ্গে একটা প্র্যাঙ্কই করেছে। এ-বিষয়ে আমি নিশ্চিত।'
ফেরার পথে একবার পার্কে গিয়ে বসলাম। মাথাটা একেবারে ভোম মেরে ছিল। সব কিছু জট পাকিয়ে তালগোল হয়ে যাচ্ছিল মাথার মধ্যে।
আমাকে এত বড়ো মিথ্যেটা বলার কারণ কী? রামশঙ্করবাবুর খুনের দিন অত সকালে বাবুলাল জানল কী করে খুনের ব্যাপারে? তাও যখন খুনটা হয়েছে বিষু�পুরে আর ও আছে বাঁকুড়ায়? ডাক্তারবাবুর বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটার পরদিন থেকেই ও গায়েব? পায়ের মচকানিটা কীসের? ডাব গাছ থেকে পড়ে, না উঁচু কার্নিশ থেকে লাফিয়ে নামতে গিয়ে? কিন্তু অত দ্রুত-দেয়াল কার্নিশ বেয়ে ওঠা...
কথাটা মাথায় আসতেই বিদ্যুতচমকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গেল। চায়ের দোকান খোলার আগে বাবুলাল কীসে চাকরি করত? সার্কাসে না?
ঝট করে উঠে পড়লাম। সন্দেহের কথাগুলো জগুবাবুকে না জানালেই নয়।
একটা হাত যেন অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে আমার জামার হাতাটা টেনে ধরল। তার সঙ্গে একটা শান্ত ধীর স্বর বলে উঠল, 'এত তাড়া কীসের ভবতারণ?'
আমি প্রথমে চমকে উঠেছিলাম। তারপর রুদ্ধস্বরে বলে উঠলাম, 'কাকা, আপনি?'
সেই চেনা হাসির শব্দটা ভেসে এল, 'চমকালে কেন ভবতারণ?'
'চমকাব না? সেই যে কাউরীবুড়ির জঙ্গল থেকে উধাও হয়ে গেলেন তারপর থেকে তো আপনার কোনো খোঁজই নেই। ছিলেন কোথায় অ্যাদ্দিন?'
'ছিলাম অনেক জায়গায় ভায়া। মা কী আমার জন্য শান্তির জীবন বেছে রেখেছেন হে? এই দেখ না, তোমার বিপদের কথা জেনে আবার আমাকে আবার আসতে হল।'
'বিপদ? কীসের বিপদ কাকা?'
প্রসন্ন লঘুস্বরটা এবার গম্ভীর হয়ে উঠল, 'যে বিপদ এতদিন তোমার চারিপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সে যে এখন তোমার ঘরের ভেতরে ঢুকবে বলে ওঁত পেতে আছে ভবতারণ।'
গা'টা শিউরে উঠল। কাঁপা-কাঁপা স্বরে বললাম,' কিন্তু আমি কেন কাকা? আমার পরিবারই বা কেন?'
'নৃশংস, উন্মত্ত, অন্ধ রক্তপিপাসার কোনো কারণ থাকে না ভবতারণ। নকুলেশ মাহাত, রামশঙ্কর সামন্ত, বামনদেব ব্যানার্জি এদের খুন হওয়ার কোনো কারণ ছিল?'
চুপ করে রইলাম। তারপর প্রশ্ন করলাম 'এই উন্মাদ খুনিকে আটকাবার উপায় কী কাকা?'
'পরের খুন হওয়ার আগে খুনের সম্ভাব্য জায়গায় ফাঁদ পেতে রাখা।'
শুনে মনে হল কাকার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। যে খুনের কোনো প্যাটার্ন নেই, কার ওপর কবে আক্রমণ নেমে আসবে বোঝা যাচ্ছে না, সেখানে পরের খুন কবে কোথায় হবে সেটা আন্দাজ করে সেখানে ফাঁদ পেতে বসে থাকতে হবে?'
কাকা যেন আমার মনের কথাটা বুঝতে পারলেন। অন্ধকার থেকে একটা হালকা ব্যঙ্গমিশ্রিত তির্যক হাসির শব্দ ভেসে এল। 'তুমি না সায়েন্সের স্টুডেন্ট ছিলে ভবতারণ? প্যাটার্ন বা মডেল দেখে ভবিষ্যৎ বলতে পারবে না? তাহলে তো বলতে হয় তোমার বিজ্ঞানশিক্ষা বৃথা।'
'কীসের কী প্যাটার্নের কথা বলছেন কাকা?'
'মৃতদেহের পাশে তার রক্ত দিয়ে লেখা সাংকেতিক অক্ষর, মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ময়ূরের পালক, বুকে এঁকে দেওয়া সাংকেতিক মুদ্রা, উদ্ভিন্নযৌবনা কিশোরীর পুতুল, কনিষ্কের মূর্তি, এসব কীসের ইঙ্গিত ভবতারণ? একটা এত বড়ো জ্বলজ্যান্ত প্যাটার্ন খুনি প্রত্যেকবারেই সূত্রের আকারে ফেলে যাচ্ছে, আর তুমি সেটা ধরতে পারছ না?'
মাথাটা পুরো গোলমাল হয়ে গেল। যে জিনিস সিআইডি বাঘা বাঘা অফিসাররা ধরতে পারছেন না, সে জিনিস ধরব আমি?
অন্ধকার থেকে ফের কাকার স্বর ভেসে এল, এবার একটু কঠিন, 'জ্যোতিষবিদ্যা শেখানোর সময় তোমাকে তন্ত্র-মন্ত্র ইত্যাদি নিয়েও অনেক কিছু শিখিয়েছিলাম। তার কিছু মনে আছে?'
আবছা মনে আছে। তাই হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়াটা তেমন জোরদার হল না।
'প্রথম কে খুন হন ভবতারণ?'
'নকুলেশ মাহাত।'
'নকুলেশ বা নকুলেশ্বর শব্দটা আগে কখনও শুনেছ?'
উত্তরটা মাথায় আসতে একটু সময় লাগল, 'শুনেছি কাকা। কালীঘাটের মায়ের ভৈরব হলেন নকুলেশ্বর শিব। মূল মন্দিরের উত্তর-পূর্ব কোণে তাঁর মন্দির আছে।'
'বাহ, এই তো মনে আছে দেখছি। এবার বলো তো, রামশঙ্কর সামন্ত'র বুকে কী আঁকা ছিল?'
'একটা স্টার।'
'স্টার। অর্থাৎ?'
'স্টার, মানে স্টার, তার আবার মানে আছে নাকি? স্টার মানে তারা।' কথাটা বলতেই বুঝতে পারলাম মাথার মধ্যে জট কাটিয়ে খুব ধীর লয়ে কী যেন একটা চলতে শুরু করেছে।
'বাহ বাহ, এই তো চিন্তাভাবনা সঠিক খাতে বইছে। এবার তৃতীয় খুন, বামনদেব ব্যানার্জি। এঁর মৃতদেহের ওপর কী বসানো ছিল? একটি কিশোরী বা তরুণীর পুতুল, তাই তো?'
গলাটা শুকনো হয়ে এসেছিল। তার মধ্যেই বললাম, 'ষোড়শী?'
কাকার গলাটা অন্ধকারের মধ্যেই ঘন হয়ে এল, 'হ্যাঁ ভবতারণ, ঠিকই ধরেছ। কালী, তারা, ষোড়শী। এবার প্যাটার্নটা বুঝতে পারছ তো?'
আমার মুখে কথা জোগাল না। অন্ধকারের মধ্যে ফের কাকার কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
'ডাক্তারবাবুর ঘরে আততায়ী কীসের মূর্তি ফেলে গেছিল?'
'কুষাণরাজ কনিষ্কের মূর্তি।'
'কনিষ্কের মূর্তির বৈশিষ্ট্য কী?'
'কনিষ্কের সব মূর্তিই মুণ্ডহীন,' বলতে বলতেই চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে গেল। রূদ্ধশ্বাসে বলে উঠলাম, 'দেবী ছিন্নমস্তা?'
এইবার একটা প্রসন্ন হাসির শব্দ ভেসে এল কাকার দিক থেকে, 'ব্যস ব্যস, আমার যেটুকু ধরিয়ে দেওয়ার ছিল সেটুকু ধরিয়ে দিয়েছি। এবার বাকিটা তুমি নিজেই করে নিতে পারবে ভাই।'
'কিন্তু, কিন্তু...' অন্ধকারের মধ্যেই হাঁসফাঁস করে উঠলাম, 'দশমহাবিদ্যার দেবীদের ক্রম তো রক্ষিত হচ্ছে না। দেবী ষোড়শীর পর তো দেবী ভৈরবীর আসার কথা। তারপর দেবী ভুবনেশ্বরী, তারপর দেবী ছিন্নমস্তা।'
'তার কারণ এই অঞ্চলে বরাহ আর কল্কি দিয়ে শুরু করা কোনো নামের মানুষ নেই, তাই। যদি থাকতেন তাহলে তাঁরাই আগে খুন হতেন। তাঁদের পাওয়া যায়নি বলেই দু-দু জন দেবীর ক্রম টপকে নৃসিংহপ্রসাদবাবুর ওপর আক্রমণ।'
'বরাহ? কল্কি? এসব কী বলছেন কাকা? এই তো দশমহাবিদ্যা নিয়ে কথা হচ্ছিল, এখানে দশাবতার এলেন কোথা থেকে?'
'সে অনেক জটিল তত্ত্ব ভবতারণ, এখন সে বোঝাবার সময় নয়। শুধু জেনে রাখো, ভারতীয় অধ্যাত্মকল্পনায় দশমহাবিদ্যার প্রতিটি দেবীর সঙ্গে দশাবতারের এক-একটি অবতার সম্পৃক্ত। যেমন ধরো দেবী কালীর সঙ্গে কৃষ্ণ...'
'তাই নকুলেশ মাহাত'র মৃতদেহের পাশে অত ময়ূরের পালক?'
'হুঁ।'
'আর ওই অক্ষরগুলো?'
'সে আরও গূঢ় অর্থ। তন্ত্রের অভিধান মতে বাহান্নটি বর্ণের প্রতিটির এক-একটি অর্থ আছে। প্রতিটি বর্ণের বিস্তর ব্যাখ্যা আছে। নকুলেশ মাহাতর রক্তে লেখা প্রতিটি বর্ণ দেবী কালীর দ্যোতক।
দেবী তারার সঙ্গে যে দশাবতার যুক্ত আছেন তিনি শ্রীরাম। তাই রামশঙ্করবাবুর বুকে তারাচিহ্ন আঁকা। দেবী ষোড়শীর দশাবতার হলেন বামনাবতার, যিনি মহাপ্রাণ দৈত্য বলিকে পাতালে রুদ্ধ করেছিলেন। তাই বামনদেব ব্যানার্জির বুকের ওপর কিশোরীর পুতুল।
আর দেবী ছিন্নমস্তার দশাবতার হলেন...'
'নৃসিংহদেব।' আমার গলা থেকে ছিটকে বেরোল শব্দটা।
'হুঁ। তাই তো বলছি, সাবধানে থেক। খুনির পরবর্তী নিশানা কিন্তু তুমি।'
সারা শরীর যেন ভয়ে ঠান্ডা হয়ে এল। 'কিন্তু আমি কেন কাকা?'
সেই অশরীরী অন্ধকার যেন আমাকে একপাক ঘুরে গেল, 'সেদিন তুমি যখন ডাক্তারবাবুর বাড়ির কলিং বেল টিপে দিয়ে পালাচ্ছিলে, আততায়ী তোমাকে দেখে নেয়। বুদ্ধিতে সে অতি ধূর্ত, তার শারীরিক ক্ষিপ্রতার তুলনা নেই। পারলে সে সেইদিনই তোমাকে তাড়া করে মেরে ফেলতে পারত। কিন্তু তাড়াহুড়োয় তার পায়ের গোছ মচকে যাওয়াতে সে তোমাকে ধাওয়া করতে পারেনি।
কিন্তু তাই বলে সেই উন্মাদ খুনি তার রাগ ভুলে যায়নি। তার মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার মতো অপরাধ সে কিছুতেই ক্ষমা করবে না। সেই অন্ধ ক্রোধ এবার তার শিকারের নামের ক্রম অনুসরণ করেনি, তোমাকেই তার পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেছে। আর এবারে সে তার শিকারকে সহজে মারবে না। তাকে ধাঁধায় ফেলে, উদবেগে রেখে, তিলে তিলে মারবে। নইলে তার বিকৃত হত্যাকাম তৃপ্ত হবে না।'
'কিন্তু সে কে কাকা? আমি যাকে সন্দেহ করছি সে-ই?'
অন্ধকারটা ফিকে হয়ে আসছিল। সেই সঙ্গে ক্রমে ক্ষীণ হয়ে উঠছিল কাকার স্বরটাও।
'নিজের ওপর আস্থা রাখো ভবতারণ। আমার যেটুকু বলার সেটুকু বলে গেলাম। বাকিটা তুমি নিজেই সমাধান করতে পারবে। তবে চিন্তা কোরো না, মা সর্বমঙ্গলা নিজে তোমার ঘর আলো করতে এসেছেন। উনি ঈশ্বরকোটির মানুষ, ভৈরবীচিহ্ন নিয়ে জন্মেছেন। এই অপশক্তির প্রভাব তাঁকে সাময়িকভাবে অসুস্থ করে তুলেছে ঠিকই। কিন্তু উনিই তোমার এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। মনে রেখো ভবতারণ, স্বয়ং মহামায়া যখন তাঁর ভৈরবের রক্ষার্থে শূল তুলে নেন, সেই মহাক্রোধ থেকে রক্ষা পায় এমন নারকী শক্তি আজও জন্মায়নি। তাঁর ওপর ভরসা রেখো ভবতারণ...'
ঘুম ভেঙে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে বসলাম। বাপ রে, কী ভয়ানক স্বপ্ন! নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি গেঞ্জি ভিজে গেছে জবজবে ঘামে। বুকটা ধড়ফড় করছে।
উঠে ঘাড়ে, মাথায় একটু জল দিয়ে এসে বারান্দায় আরামকেদারাটা নিয়ে বসলাম। সবে ভোর হচ্ছে। শীতল হাওয়ায় শরীরটা যেন জুড়িয়ে এল। মাধুরী এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। মোতিয়ার মায়ের আসতে দেরি আছে এখনও। আমি চোখ বুজে ধ্যানস্থ হলাম।
সাধারণত স্বপ্নের দৃশ্য ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন থেকে উবে যায়। কিন্তু এই স্বপ্নটা বেশ জলজ্যান্ত হয়ে জেগে ছিল। মনে হচ্ছিল পুরো স্বপ্নটাই যেন মনের মধ্যে সিনেমার রিলের মতো অনবরত ঘুরে চলেছে।
কাকা'র খোঁজ নেই বহুদিন, কাউরীবুড়ির মন্দিরের সেই ভয়ানক রাতটার পর থেকেই। এতদিন পর তাঁকে কেন স্বপ্নে দেখলাম সেটা আমার নিজের কাছেই ধোঁয়াশার মতো লাগছিল। আর ওঁর স্বপ্নে বলা সূত্রগুলো? প্রতিটি তথ্য সঠিক। এসব কাকাই পড়িয়েছিলেন এককালে। এতদিন কাজের চাপে ভুলেই গেছিলাম। আজ মনের কোন অতল থেকে উঠে এল কে জানে!
স্বপ্ন আর মনস্তত্ত্ব নিয়ে এককালে বেশ কিছু পড়াশোনা করেছিলাম। ফ্রয়েড থেকে কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং, বাদ রাখিনি কিছুই। অবদমিত অবচেতনের জটিল চিন্তাই নাকি স্বপ্নের সায়রে ভেসে ওঠে। মানুষের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, চেষ্টা, কৃতকর্ম, পাপবোধ, সব কিছুর আয়নাই নাকি ওই স্বপ্ন।
তার মানে কি কাকার মুখ দিয়ে আমার অবচেতনই ওই কথাগুলো আমাকে বলে গেল? মাথা ঠান্ডা করে পুরো ব্যাপারটা প্রথম থেকে ভেবে দেখার চেষ্টা করলাম। চোখ বুজে আছি, এমন সময় কী যেন একটা উড়ে আমার কোলে এসে পড়ল।
তাকিয়ে দেখি কাল মানবের ডেস্কের পাঁজি থেকে বের করে নেওয়া পেজ মার্কটা। ওটা রেখেছিলাম জামার পকেটে। জামাটা বারান্দায় টাঙানো ছিল। তার পকেট থেকে এই পেজ মার্কটা ভোরের বাতাসে উড়ে এসে আমার কোলে পড়েছে।
পেজ মার্কটা খুলে দেখলাম। আমার ভুরু কুঁচকে গেল।
আরামকেদারায় লম্বা হয়ে শুলাম। ধীরে ধীরে আমার মগজের খাঁজে ঘটনাটার প্রত্যেকটা দিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
চিন্তাটা ভেঙে গেল মোতিয়ার মায়ের উল্লাসে। 'দেখ দেখ দাদাবাবু, কী সুন্দর একটা কচ্ছপ! এখানে এল কী করে?'
চটকা ভেঙে দেখি গেটের কাছে একটা ছোটো কচ্ছপ ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাধুরীর কল্যাণে বাড়ির আশেপাশে গাছপালার অভাব নেই। আপাতত কচ্ছপকুমার মন দিয়ে একটি গাছের পাতা চিবোচ্ছেন।
পেছন থেকে মাধুরীর উচ্ছ্বসিত স্বর ভেসে এল, 'ও মা কী সুন্দর গো! আমি পুষবোওও!'
আমি উঠে বাথরুমে চলে গেলাম। ফিরে এসে দেখি কচ্ছপবাবাজীবন একটি গামলায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। অল্প জল আর গাদাগুচ্ছের শাকপাতা পেয়ে মহা আনন্দে আছে ব্যাটা।
কাজে যেতে একটু দেরিই হল আজ। গিয়ে দেখি হুলুস্থুল কাণ্ড। নতুন ডি এফ ও সাহেবের আসতে কিছু দেরি ছিল, কিন্তু তাঁকে নাকি আজই উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। ভদ্রলোক জাতে বিহারি, নাম পরশুরাম চৌবে।
নামটা শোনা অবধি মনের মধ্যে একটা কাঁটা খচখচ করছিল। যদ্দূর জানি দেবী মাতঙ্গীর সঙ্গে সম্পৃক্ত দশাবতারটি হচ্ছেন পরশুরাম। এঁকেই আসতে হল?
মাথা গুঁজে কাজ করছি, নতুন বড়োসাহেবের জন্য ফাইল রেডি করব বলে, এমন সময় আমার নামে একটা পার্সেল এসে উপস্থিত। ডাকঘরের সিল দেখে কে কোথা থেকে পাঠিয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। তবে কার্ডবোর্ডের বাক্সে বেশ আষ্ঠেপৃষ্ঠে প্যাক করা পার্সেল।
পার্সেল খুলে একটা চিনেমাটির কচ্ছপ বেরোল। ঘাড়টা কী একটা কায়দায় লুজ ফিটিং করা আছে, হাওয়া লাগলেই নড়ে। পাশের টেবিল থেকে রজতদা বললেন, 'এ তো চাইনিজ লাকি চার্ম হে! বাজারে এখন ফেং শুই না কী এক চিনা বাস্তুশাস্ত্র এসেছে, তাতে বলছে এই মাথা নাড়া কচ্ছপ, দু-হাত তোলা পেটমোটা বুদ্ধ এসব নাকি সৌভাগ্যের চিহ্ন। কলকাতার পাবলিক খাচ্ছে খুব। রেখে দাও ভবতারণ, কে বলতে পারে, হয়তো এর জন্যই তোমার ভাগ্য খুলে গেল, হে হে হে!'
নতুন বড়োসাহেব এলেন বিকেল নাগাদ। দেখে অতি অমায়িক সদাশয় লোক বলেই মনে হল। সবার সঙ্গে হাসিমুখে আলাপ করলেন। আমাকে ডেকে হ্যান্ডওভার নিলেন। তারপর অফিস ক্লোজ করে বেরোতে বেরোতে ছ'টা। আসার পথে একবার জগুবাবুর সঙ্গে দেখা করে এলাম। কিছু কথা ছিল।
বাড়ি এসে হাত-পা ধুয়ে বসতে মাধুরী চা এনে নিল। সঙ্গে মোতিয়ার মা একটা মশা তাড়ানোর ধূপ জ্বালিয়ে রেখে গেল। এটার গন্ধ আগেরটার থেকে আলাদা। জিজ্ঞেস করতে জানতে পারলাম এই কছুয়া ছাপ মশা তাড়ানোর ধূপটা নাকি মার্কেটে নতুন এসেছে, খুব কাজের। বাবুলাল দিয়ে গেছে। শুনে হাসলাম, কিছু বললাম না।
রাতের খাবার সারতে দেরি হল একটু। খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়েছি, এমন সময় মাধুরী ঘরের কাজ সেরে এসে বিছানায় বসে বলল, 'আজ দুপুরে একটা কাণ্ড হয়েছে জানো! হঠাৎ করে এক অল্পবয়সি সাধু এসে উপস্থিত। মোতিয়ার মা তো ভক্তিভরে চাল-ডাল-আলু এসব নিয়ে সিধে দিলই। তারপর আমার কাছ থেকে চেয়ে একটা পঞ্চাশ টাকার নোটও দিল। সাধুবাবা বেশ খুশি-টুশি হয়ে আশীর্বাদ করে যাওয়ার আগে একটা মন্ত্রপূত কাছিমের খোলা দিয়ে গেল। বলল ঘরের কোণে রাখলে নাকি...'
আমি শুধু বললাম, 'সাধুবাবা কি একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন?'
মাধুরী অবাক হয়ে বলল, 'সে তুমি জানলে কী করে? ম্যাজিক জানো নাকি?'
অল্প হাসলাম। কিছু বললাম না। মাধুরী বিরক্ত হয়ে আলো নিভিয়ে ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।
আমি চোখ খুলে জেগে রইলাম। আমার ধারণা যদি ঠিক হয় তাহলে আজ রাতেই...
ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। হঠাৎ যখন ঘুমটা ভাঙল, মনে হল দূরে কোথায় যেন একটা ঠক ঠক আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। কাঠের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে মারলে যেমন আওয়াজ হয় তেমন।
পাশ ফিরে দেখলাম মাধুরী অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
একটা লাঠি এনে রেখেছিলাম খাটের তলায়। সেইটে হাতে নিয়ে চুপিসারে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
বিকেল অবধি আকাশ পরিষ্কার ছিল। এখন দেখছি একটু মেঘ করেছে। বাইরে একটুও আলো নেই। ল্যাম্পপোস্টগুলোও অন্ধকার।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম থামের আড়ালে। এখান থেকে চারিদিকে নজর রাখা যায়। অথচ চট করে কারও চোখে পড়ার চান্স কম।
কিন্তু চারিদিকে চোখ বুলিয়ে প্রথমে কিছু ঠাহর হল না। চারিদিকে একটা থমথমে ভাব। ঠকঠক শব্দটা থেমে গেছে আমি বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই। এখন চারিদিক একদম নিশ্চুপ, নিঝুম। তার মধ্যে মেঘের আড়ালে চাঁদের আলো যেন লুকোচুরি খেলছে, তাতে বেশ একটা অস্বস্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
এবার একটা শব্দ পেলাম। খুব ক্ষীণ। শব্দটা আসছে বাড়ির পেছন দিক থেকে।
টানা বারান্দা বাড়ির পেছনদিকে ঘুরে গেছে। পা টিপে টিপে পেছন দিকে গিয়ে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম।
চোখটা অন্ধকারে সইয়ে আসতে মনে হল খিড়কি দরজার ঠিক বাঁদিকে যেন কী একটা পোঁতা আছে, হাঁটু সমান উচ্চতার। আমি জানি ওটা কী। কিন্তু তাও কীসের যেন একটা অদম্য কৌতূহল আমাকে ওদিকে টানতে লাগল।
আস্তে আস্তে বারান্দা থেকে রাস্তায় নামলাম। এখন আমি অরক্ষিত। শুধু মনে হচ্ছিল এই বুঝি পেছন থেকে কেউ লাফিয়ে পড়ল ঘাড়ে! শিরদাঁড়ার কাছটা শিরশির করছিল। রাস্তার দুপাশে মাধুরীর নিজের হাতে লাগানো গাছের চারা। শুধু মনে হচ্ছিল যেন এক-পা এক-পা করে এগোচ্ছি আর গাছের চারাগুলোও আমার দিকে একটু একটু করে ঘুরে যাচ্ছে।
খিড়কি দরজার কাছে গিয়ে উবু হলাম। যা ভেবেছিলাম তাই। সেই কালচে শ্যাওলাধরা হাড়িকাঠ, জংধরা কাঁটাতার জড়ানো। ভ্যাপসা সোঁদা গন্ধটা যেন আরও একটু উগ্র। তবে যেটা দেখে সত্যিই ভয় পেয়ে গেলাম সেটা হচ্ছে যে হাড়িকাঠে ঠিক সামনে একটা কচ্ছপ উলটে আছে। তার বুকে একটা মাংস কাটার ছুরি গাঁথা।
সকালের সেই কচ্ছপটা।
উঠে দাঁড়ালাম। হাত-পা কাঁপছিল থরথর করে। গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। শুনতে পাচ্ছিলাম যে বুকের কাছ থেকে একটা শব্দ উঠে আসছে, ধক, ধক, ধক...
খিড়কি দরজা ধরে উঠে দাঁড়ালাম কোনোমতে। হাঁটুদুটোয় জোর কমে এসেছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে এক্ষুনি পড়ে যাব।
চারিদিকটা একবার ধীরে ধীরে দেখে নিতে থাকলাম। এই সময়টা যে আসবে জানতাম, তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতও ছিলাম, কিন্তু তার ভয়াবহতা সম্বন্ধে যদি বিন্দুমাত্র ধারণা থাকত তাহলে...
দৃষ্টিটা বাড়ির দিকে ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে আটকে গেল।
আমার ঠিক সামনে একটা মুখ। আমার খুব চেনা একটা হাসিমুখ। আমার দিকে চেয়ে আছে।
আমি পড়েই যাচ্ছিলাম। কোনোমতে নিজেকে সামলে বললাম, 'কী চাও তুমি? কেন করছ এসব?'
লোকটা আমার হাতের লাঠিটা টেনে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল। আমি হাতটা ধরতে গিয়ে বুঝলাম ওর গায়ে অসম্ভব জোর। এক ঝটকায় আমাকে মাটিতে শুইয়ে দিল। আমার ভয়ার্ত পা দুটো কাটা মুরগির মতো থরথর করে কাঁপছিল। মৃত্যুকে দ্বিতীয়বারের জন্য খুব কাছ থেকে দেখতে পেলাম।
ঘড়ঘড়ে স্বরে প্রশ্ন করলাম, 'কেন, কেন করছ এসব?'
আপাদমস্তক কালো বর্ষাতি পরা লোকটা ধীরেসুস্থে আমার বুকের ওপর বসল। তারপর ডানহাত বাড়িয়ে কচ্ছপের বুক থেকে ছুরিটা একঝটকায় তুলে এনে ছুরির ফলাটা নিজের বর্ষাতিতে মুছে খিক খিক করে হেসে বলল, 'কারণ খুন করতে আমার ভালো লাগে।'
ভয়ে, আতঙ্কে বিবশ হয়ে গেলাম। কোনোমতে প্রশ্ন করলাম, 'তার মানে আগের খুনগুলো...'
অন্ধকারের মধ্যে লোকটার চোখদুটো ধক করে জ্বলে উঠল হিংস্র শ্বাপদের মতো। বলল, 'হ্যাঁ, আমিই করেছি।'
লোকটার দিকে তাকিয়ে আমার চোখে কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেল। যে লোকটাকে এতদিন ধরে চিনি, এতবার দেখেছি, এত কথা বলেছি, এ তো সে লোক নয়! শরীরে-রক্ত-মাংসে সে একই মানুষ হতে পারে বটে, কিন্তু এই মুহূর্তে তার পেশির উগ্রতায়, তার চোখের বন্যতায়, তার চিবুকের কাঠিন্যে যে রিরংসা ফুটে উঠেছে তার তুলনা নেই।
লোকটা একটু ঝুঁকে বলল, 'ভয় পেলেন নাকি? খি খি খি... ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি ছাড়ব না...' বলতে বলতে ছুরিটা দুই হাতে উঁচু করে তুলে ধরল।
আমার গলা থেকে একটা বোবা আর্ত চিৎকার বেরিয়ে এল। চোখের সামনে উঁচিয়ে আছে সাক্ষাৎ মৃত্যুর ফণা। আর কয়েক সেকেন্ড। তার মধ্যেই ওই মাংস কাটা ছুরিটা আমূল গেঁথে যাবে আমার বুকে। আমার ঘর, সংসার, পরিবার, স্বপ্ন, বেঁচে থাকার ছটফটানি সব নিমেষে বুদবুদের মতো মিশে যাবে। আমি ভয়ার্ত আতঙ্কের চোখে চেয়ে রইলাম সেই সিরিয়াল কিলারের দিকে।
ছুরিটা সবেগে নেমে আসছে। নেমে আসছে ঘাতক নিয়তির মতো। আর হয়তো দু-সেকেন্ড।
চোখ বুজে ফেললাম।
কিন্তু পরক্ষণেই চোখটা খুলতে হল একটা আর্তনাদের শব্দে। সঙ্গে আমার মুখে ছিটকে এল গরম তরলের ছিটেফোঁটা। চোখ খুলে দেখি আততায়ী তার বাঁ হাত দিয়ে ডানহাতটা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠেছে। ছুরিটা পড়ে আছে একপাশে। আর তার মাথার ঠিক পেছনে আরও একটা ছায়ামূর্তি। আর সেই ছায়ামূর্তির হাতে একটা কাটারি। সেই কাটারির আঘাত নেমে এসেছে আততায়ীর উদ্যত হাতের ওপর। তার কাটা আঙুল তখনও পড়ে আছে আমার মাথার কাছে।
অন্ধকারের মধ্যে মাধুরীর উন্মত্ত হিসহিসে স্বর ভেসে এল, 'শয়তান, তোর এত বড়ো সাহস যে ওর ওপর হাত তুলেছিস? দেখ আজ তোর কী করি!'
কাটারি ধরা হাতটা আততায়ীর গলার ওপর নেমে আসার আগেই আরও একটা বলিষ্ঠ হাত মাধুরীর হাত ধরে ফেলল। জগুবাবুর শান্ত অথচ দৃঢ় স্বর ভেসে এল, 'ছেড়ে দাও বউমা, ভবতারণের কিছু হত না। আমরা জানতাম যে আজ ও আসবে, তাই আমরাও তৈরিই ছিলাম। তবে হঠাৎ করে যে তুমি স্বয়ং চণ্ডীরূপ ধারণ করবে সে আমরাও ভাবতে পারিনি। এবার বাকিটা আমাদের সামলাতে দাও।'
চারিদিকে গাছের মাথা থেকে ফ্লাড লাইট জ্বলে উঠল। সেই আলোতে দেখলাম মাধুরীর বড়ো বড়ো চোখে উন্মত্ত ক্রোধের ছায়া। তার মাথার সিঁদুর ঘেঁটে গেছে সারা কপাল জুড়ে, চুল এলোমেলো, শাড়ির আঁচল কোমরে গোঁজা। বাঁহাতে সে আততায়ীর চুলের মুঠি ধরেছে, ডান হাতে কাটারি। অসহ্য আবেগে, অন্ধ ক্রোধে তার সারা শরীর কাঁপছে। আমি লাফিয়ে উঠে মাধুরীকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার দিকে একবার পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মূর্ছা গেল ও।
আততায়ী তখনও ডানহাত চেপে ধরে কাতরাচ্ছিল। জগুবাবু তার পাশে বসে চুক চুক করে বললেন, 'বিশ্বাস করুন মণ্ডলসাহেব, আমরা আপনাকে সম্পূর্ণ অক্ষত শরীরে ধরার প্ল্যানই করেছিলাম। কিন্তু স্বয়ং মহামায়া যে খড়গহস্তে অসুর নিধনে নেমে আসবেন সেইটে আমাদের হিসেবের বাইরে ছিল। কী আর করা যাবে বলুন, ভাগ্যের লিখন বলেই না হয় মেনে নিন আপাতত।'
আমার চোখের সামনে তখন মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছিল বিট অফিসার মানব মণ্ডল। ও তখন আর আমার সহকর্মী নয়, একজন নৃশংস সিরিয়াল কিলার মাত্র!
গল্পটা শেষ হতেই সবাই হই হই করে উঠল, 'এ কীরকম হল? এভাবে গোয়েন্দা গল্প শেষ হয় নাকি? অপরাধী কী করে ধরা পড়ল সেইটে বলুন!'
চাটুজ্জেমশাই ফিক করে হেসে বললেন, 'কেন? অপরাধী কে সে তো বলেই দিলুম। আর গোয়েন্দা গল্প কীভাবে শেষ হয় শুনি?'
বিশু গোঁজ হয়ে বলল , 'ওভাবে হয় না স্যার। সব রহস্য গল্পের শেষে ডিটেকটিভ একটা গোলটেবিল বৈঠক ডাকেন, সেখানে কালপ্রিট শুদ্ধু সব্বাইকে ডাকা হয়। তারপর এক-এক করে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াবার মতো রহস্যের এক-একটা উন্মোচন করে দোষীকে পাকড়াও করা হয়। এখানে তা হল কই?'
'কেন? দোষীকে পাকড়াও করা হল তো!'
'কিন্তু সে-ই যে দোষী সেটা তো গল্পের মধ্যে সূত্র দিয়ে বোঝানো থাকবে।' ব্যাখ্যা করে বোঝায় বংশী। তারপর সেগুলো যখন যুক্তি দিয়ে কানেক্ট করা বোঝানো হবে তখনই তো আসল মজা।'
চাটুজ্জেমশাই গম্ভীর হয়ে গেলেন। 'এটা কোনো গল্পলিখিয়ের মনগড়া আজগুবি কাহিনি নয় বংশী, সত্যি ঘটনা। এখানে ওসব ঘটবে ভাবলে কী করে?'
'আহা, তা নয়,' এবার আসরে নামে গদাই, 'কিন্তু কী করে লোকটা ধরা পড়ল, মানে তার যদি কিছু সূত্র..'
'সূত্র তো গল্পের মধ্যেই বলে দিলাম,' বিরক্ত হলেন চাটুজ্জেমশাই, 'তোমরা সেটা এখনও ধরতে পারনি?'
সবার মুখের দিকে তাকিয়ে সমবেত উত্তরটা আন্দাজ করে নিলেন চাটুজ্জেমশাই। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। 'কচ্ছপের ব্যাপারটা বুঝেছ আশা করি। কচ্ছপটাকে বাগানে মানব-ই ছেড়ে গেছিল। শুধু তাই নয়, অফিসে চাইনিজ কচ্ছপের প্যাকেটটা পাঠানো ওরই কীর্তি। মাধুরীকে আশীর্বাদ করে যাওয়া সাধুবাবাও ওইই ছিল।
কচ্ছপ মানে কূর্ম। কূর্ম অবতারের সঙ্গে সম্পৃক্ত দশমহাবিদ্যা হচ্ছেন দেবী বগলামুখী। সেই বছর ওই দিন, মানে আটই মে শুধু রবীন্দ্রজয়ন্তী ছিল না, দেবী বগলামুখী পুজোর দিনও ছিল বটে। সেই জন্যই মানব দেশের বাড়ি যাওয়ার ছুটি নিয়েছিল। বলা বাহুল্য, মেদিনীপুর যাওয়ার কথাটা ভাঁওতা, আসলে ও অ্যালিবাই বানাচ্ছিল। এর আগে দরকার হয়নি, কিন্তু এবারে ও সতর্ক হয়ে যায়। প্ল্যান ছিল খুনটা সেরে ভোরের ট্রেন ধরবে।
কিন্তু মানব একটাই ভুল করেছিল। পাঁজির মধ্যে ওর টিকিটটা ফেলে যায়। ভাগ্যক্রমে সেইটে আমার হাতে এসে যায়। যেদিনকার টিকিট, ও নাকি তার আগের দিন মেদিনীপুর চলে গেছে। ব্যাপারটা নিয়ে খটকা লাগতে একটু ভেবে দেখতেই পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
'কিন্তু বাবুলালের ওই রঙ্কিণীদেবীর হাড়িকাঠ?'
'পুরোটাই গালগল্প, মানবের মাস্টারপ্ল্যান। মানব-ই টাকা খাইয়ে বাবুলালকে এই কাজে লাগায়। প্ল্যান ছিল লোকজনকে ডেকে ওই হাড়িকাঠটা দেখিয়ে লোকমুখে ওটার প্রচার করা, যাতে সিরিয়াল কিলিং ব্যাপারটার মধ্যে একটা অলৌকিক ব্যাপার ঢুকে যায়। তাতে লোকে আরও ভয় পাবে। আমাদের বা বামনদেববাবু আর বাকিদের ডেকে দেখানটাও ওই প্ল্যানেরই অন্তর্গত।
পরে বাবুলালকেও ধরা হয়। বাবুলাল স্বীকার করে যে মানব-ই ওকে একটা বেয়াড়া মজা করার লোভ দেখিয়ে, টাকা দিয়ে ওই ঢিপিতে একটা পুরোনো হাড়িকাঠ পুঁতে রাখতে বলে। বাবুলাল প্রথমে টাকার লোভে আর মজা পেয়ে এতে যোগ দিয়েছিল। পরে খুনের জায়গায় হাড়িকাঠ পুঁতে রাখার গর্তের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে শুনে ভয় পেয়ে যায়। তাই দুদিন লুকিয়ে ছিল।
'আর অমন টিকটিকির মতো দেয়াল বেয়ে ওঠা?'
'মানব যে চাকরি পেয়েছিল স্পোর্টস কোটায় সেটা জানতাম। শুধু যেটা জানতাম না মানব কোন স্পোর্টসের কোটায় চাকরি পেয়েছিল! পরে জেনেছি, জিমনাস্টিকস।'
'বিচারে শেষমেশ কী হল?'
'মানব মণ্ডলের ফাঁসি হয়। বাবুলাল প্রমাণাভাবে ছাড়া পেয়ে যায়। আমরাও বাঁকুড়া ছেড়ে চলে আসি তার পর পরই। তারপর আর ও তল্লাটের খবর রাখিনি। তবে শেষ খবর যেটা পেয়েছিলাম সেটা কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো।'
'সেটা কী চাটুজ্জেমশাই?' আমরা সবাই আরও ঘন হয়ে আসি।
'আমরা চলে আসার মাসখানেকের মধ্যে পরশুরাম চৌবে তাঁর ঘরের মধ্যে খুন হন। তাঁর মৃতদেহের ওপর নাকি আড়াআড়ি করে একটা পুরোনো বীণা রাখা ছিল। দেবী মাতঙ্গীর আধান।
আর তাঁর ঘরের বাইরে, দরজার ঠিক কাছে একটা ছোটো গর্ত মতো ছিল। কী যেন একটা পুঁতে ফের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খুব বড়ো কিছু নয়, হতে পারে একটা উইকেট, বা একটা ছাগল বাঁধার খুঁটি, বা একটা মোটা গাছের ডাল, বা একটা হাড়িকাঠ...'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন