প্রেতযক্ষ

অভীক সরকার

চাটুজ্জেমশাই ক্লাবঘরে ঢুকেই দেখলেন ক্লাবে বেশ একটা উৎসবের পরিবেশ৷ বিশু একটা নতুন মোটরসাইকেল কিনেছে৷ তাই ক্লাবের ছেলেরা ধরে বসেছে খাওয়ানোর জন্য৷ বিশুও আজ দিলদরাজ৷ গদাধর ঘোষের দোকান থেকে এককাঁড়ি মিষ্টি এনেছে আর অনাদি রেস্তোঁরা থেকে চিকেন কাটলেট৷

চাটুজ্জেমশাইকে দেখেই সবাই হইহই করে উঠল৷ কাগজের প্লেটে করে মিষ্টি আর কাটলেট এনে দিল রঘু৷ বংশী একটা প্লাস্টিকের গ্লাসে কোকা কোলা ঢেলে নিয়ে এল৷ চাটুজ্জেমশাই খাইয়ে মানুষ, ভারি খুশি হলেন৷ তারপর হাতমুখ ধুয়ে বিশুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কী ভায়া, কত পড়ল? কোন শোরুম থেকে কিনলে?’’

বিশু বলল, ‘‘শোরুম থেকে নয় চাটুজ্জেমশাই, ব্যাংক থেকে কিনলাম৷’’

‘‘ব্যাংক থেকে?’’ আশ্চর্য হলেন চাটুজ্জেমশাই, ‘‘কীরকম?’’

‘‘টানা মাল বোঝেন?’’ বোঝাতে প্রবৃত্ত হয় বিশু, ‘‘কেউ একটা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বাইকটা কিনেছিল৷ কিন্তু ইএমআই দিতে পারেনি৷ ব্যস, ব্যাংকের রিকভারি এজেন্ট গিয়ে তুলে এনেছে৷ তারপর নিয়ম অনুযায়ী নিলামে চড়ানো হয়েছে৷ আমিও তক্কে তক্কে ছিলাম৷ চান্স পাওয়া মাত্র তুলে এনেছি৷ বলতে গেলে সস্তাতেই পেলাম৷ একদম নতুন গাড়ি, ছ’মাসও হয়নি৷ আড়াই না তিন হাজার কিলোমিটার চলেছে মাত্র৷’’

চাটুজ্জেমশাইয়ের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল৷ একটু পর বললেন, ‘‘কাজটা ভালো করোনি বিশ্বনাথ৷’’

বিশু তো অবাক৷ আমরাও তাই৷ গদাই বলল ‘‘সে কী চাটুজ্জেমশাই? অমন ঝকঝকে বাইক, দারুণ পারফরম্যান্স, খারাপ বলছেন কেন?’’

‘‘বাইক তো খারাপ বলিনি৷ বলেছি ওই অন্যের অনেক শখের জিনিস এইভাবে কেনা৷ এমন জিনিস ব্যবহার করতে নেই, এতে লোকের দীর্ঘশ্বাস লাগে৷’’

মাথা চুলকোল বিশু, ‘‘কিন্তু আমি তো তুলে আনিনি চাটুজ্জেমশাই৷ তুলে এনেছে ব্যাঙ্ক৷ আমি ব্যাঙ্কের কাছ থেকে বৈধভাবে টাকা পয়সা দিয়ে বাইকটা কিনেছি৷ কাগজপত্তরও আমার নামে৷ এই দেখুন৷’’

‘‘বৈধ-অবৈধ’র কথা হচ্ছে না বিশু৷ একটা লোক অনেক শখ করে একটা গাড়ি কিনল, কী বাড়ি বানাল৷ তারপর হয়তো ভাগ্যের পরিহাসে সেই শখের, ভালোবাসার জিনিস তার হাতছাড়া হয়ে গেল৷ জেনে রাখবে সে জিনিস কখনও কিনতে নেই৷ ভালোবাসার টান বড়ো সাংঘাতিক টান হে৷ বিষিয়ে গেলে ও জিনিস জীবন ছারখার করে দিতে পারে৷’’

গদাই বলল, ‘‘এ নিয়ে ভালো কোনো গল্প আছে নাকি স্টকে? থাকলে ঝটপট বার করুন না৷’’

‘‘আছে তো বটেই৷ শুনতে হলে চুপটি করে বোসো, আর একটু নুন-চিনির শরবত দিতে বলো তো হে৷ এই গরমে আর চা পোষাচ্ছে না৷’’

মুহূর্তের মধ্যে ক্লাবের ছেলেপিলেরা চাটুজ্জেমশাইকে ঘিরে বসে পড়লাম৷ চাটুজ্জেমশাইও গলা খাঁকারি দিয়ে তাঁর গল্প শুরু করলেন৷

‘‘আমি তখন পড়াশোনা শেষ করে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি আর চাকরির চেষ্টা করছি৷ কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না৷ হওয়ার অবশ্য কথাও ছিল না৷ আমার তখন মঙ্গলের মহাদশায় কেতুর অন্তর্দশা চলছে, সব কাজেই বাধা-বিপত্তি অশান্তি এসব লেগে থাকারই কথা৷

এমন সময় আমার আমার বাবার খুড়োমশাইয়ের ছেলে, শ্রীচণ্ডীচরণ মুখোপাধ্যায় আমাকে তাঁদের বাড়ি বর্ধমানে ডেকে পাঠালেন৷ অবশ্য বর্ধমান টাউন ঠিক না, মেমারির কাছে এক গ্রাম৷ কাজ সামান্যই, কাকা উইল করে তিন ছেলের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে যেতে চান৷ সেই সংক্রান্ত কিছু লেখাপড়ার কাজ, উকিলের সঙ্গে কথা বলা, এই সবই করে দিতে হবে আর কী৷ পরিবারের মধ্যে আমিই প্রথম গ্র্যাজুয়েট, তাই ডেকে পাঠানো৷ ওখানে কয়েকদিন থেকে ঢালাও আদর-যত্ন পাওয়ার লোভ তো ছিলই৷ তার ওপর চণ্ডীকাকা ইঙ্গিত দিলেন কিছু অর্থপ্রাপ্তিও ঘটার সম্ভাবনাও আছে৷ আমি যেন অতি সত্বর রওনা হয়ে যাই৷

সেবার ছিল এমনই এক গ্রীষ্মকাল৷ কয়েকদিন ধরে সুয্যিদেব যেন আগুন ঢালছিলেন ধরিত্রীর ওপরে৷ দুপুরে রাস্তায় বেরোলে মনে হত কলকাতা যেন এক মৃত নগরী৷ রাস্তাঘাট পুরো ফাঁকা, কুকুর অবধি দেখা যেত না আর রোদের ঔজ্জ্বল্যে চোখ ধাঁধিয়ে যেত৷ কবিগুরুর ওই রৌদ্রময়ী রাত্রির উপমাটা যে কত সুপ্রযুক্ত সেটা হাড়েমজ্জায় টের পেতুম৷ তখনও এত এসি, এয়ার কুলার এসবের বিলাসিতা ঢোকেনি শহরে৷ সেদিক দিয়ে গরমে গ্রামে যাওয়াটা অনেক আরামের ছিল৷ গাছপালার প্রাচুর্যের কারণে গরমটাও কম লাগত৷ আর বিকেল হলেই পুকুরে বা নদীতে অবগাহন৷ আহা, সে শান্তির স্নান তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না৷

সে যাই হোক৷ একদিন বহু ট্রেন বাস রিকশা পেরিয়ে চণ্ডীকাকার বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হওয়া গেল৷ কাকিমা তো খুশি হলেনই, বউদিদিরাও কলেজপাশ দেওর পেয়ে ভারি যত্নআত্তি করতে লাগলেন৷ চণ্ডীকাকা বেশ সম্পন্ন গৃহস্থ, দাপটও কম না৷ জানি না সেই জন্য কি না, দেখলাম যে তিন ভাই আর বউদিদিদের মধ্যে ভারি ভাব৷

গ্রামের নাম ছিল দক্ষিণ গোপালপুর৷ মেমারি থেকে বড়শুল হয়ে যেতে হয়৷ দামোদরের কোলঘেঁষা গ্রাম৷ ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় বলতে যা বোঝায় একদম তাই৷ শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবন৷ সবাই সবার খোঁজ রাখে, বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ আবার গ্রাম্য কূটকচাল, চণ্ডীমণ্ডপের পরনিন্দা-পরচর্চা এসবও কম নয়৷ সবমিলিয়ে দিন তিনেক কোথায় কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না৷

চতুর্থ দিনে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল৷ সেইখান থেকেই আমাদের কাহিনির সূত্রপাত৷

বিকেলবেলা দামোদরে খুব খানিকটা হুটোপুটি সেরে ফিরছি, বিকেল হব-হব করছে, এমন সময় রাস্তায় একটা বিপত্তি ঘটল৷

দামোদরের ধার ঘেঁষে একটা মোটরগাড়ি যাচ্ছিল৷ ঝকঝকে সাদা অ্যাম্বাসাডর, খুব সম্ভবত সরকারি গাড়ি, এদিকে কোনো কাজে এসেছিল৷ মাটির রাস্তা, রাস্তার ওপর একটা হাম্প, মাটিরই৷ বোঝা যায় যে গ্রামের লোকজনই বানিয়েছে৷ একটু দূরে একটা বছর তেরো-চোদ্দোর ছেলে রাস্তা পার হচ্ছিল৷ ছেলেটার মাথা ন্যাড়া, গা খালি, পরনে সাদা কোরা ধুতি পরা৷ কোমরে কুশের আসন৷ ছেলেটা ধীরেসুস্থে রাস্তা পার হচ্ছে, গাড়িটাও ধীরে সুস্থে হাম্পের ওপর উঠল, আর নামার পর হঠাৎ করেই স্পিড বাড়িয়ে তেড়ে গেল ছেলেটার দিকে!

আমরা তো আতঙ্কে ‘রোককে রোককে’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছি৷ ছেলেটা প্রথমে হকচকিয়ে গেছিল৷ তারপর ঝাঁপ দিল রাস্তার সাইডে৷ গাড়িটাও অন্য সাইডে গিয়ে বিকট আওয়াজ করে থেমে গেল৷

আমি দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে তুলে ধরলাম৷ কনুইয়ের কাছে ছড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো আঘাত নেই, তবে ছেলেটা ভয় পেয়েছে প্রচুর৷ হাত-পা থরথর করে কাঁপছে৷ চোখে একটা ভয়তাড়িত ভ্যাবলামার্কা দৃষ্টি৷ যেন এইমাত্র কী ঘটে গেল সেটা বুঝতে পারছে না৷

এদিকে ড্রাইভারও নেমে এসেছে গাড়ি থেকে৷ দেখি সে কোমরে হাত দিয়ে ভুরু কুঁচকে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে৷ গ্রামের লোকজনও এসে পড়েছে হই হই করে৷ একটা মহা হট্টগোলের সৃষ্টি হল৷ বেশ কয়েকজন ড্রাইভারকে ঘিরে ধরে জবাবদিহি চাইতে লাগল৷ কয়েকজন দৌড়োল বাচ্চাটার বাড়িতে খবর দিতে৷

আমি বাচ্চাটাকে ছেড়ে গাড়ির কাছে গিয়ে দেখি লোকজন তো ড্রাইভারকে এই মারে কী সেই মারে৷ আর বৃদ্ধ ড্রাইভার হাত জোড় করে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, ‘‘এগারো বচ্ছর এই গাড়ি চালাচ্ছি৷ গাড়ির গায়ে কেউ একটা স্ক্র্যাচ দেখাতে পারবে? মোস্তাফা মিয়ার ডেরাইভারির হাত অত পলকা নয় গো৷’’

ভিড়ের মধ্যে একজন চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘‘পলকা নয় তো বাচ্চাটারে চাপা দিতে গেছিলে ক্যান?’’

ড্রাইভারের চোখেমুখে একটা অসহায় বিপদগ্রস্ত মানুষের ভঙ্গি৷ সে বিব্রতস্বরে বলল, ‘‘সেইটা তো আমিও বুঝতে পারছি না, কী থেকে কী হয়ে গেল৷’’

আবার একটা ‘মার মার’ শব্দ উঠতে যাচ্ছিল, আমি হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘‘কী হয়েছিল ড্রাইভারসাহেব?’’

মোস্তাফা জিভ দিয়ে একবার শুকনো ঠোঁটটা চেটে নিয়ে বলল, ‘‘ঠিক ওই বাম্পারটা পার হইছি, অমনি মনে হল স্টিয়ারিং আর আমার বশে নাই৷ গাড়িটা যেন খ্যাপা ষাঁড়ের মতো নিজে নিজে আগিয়ে গেল ছেলেটারে চাপা দিবে বলে৷ জোরে ব্রেক চিপলুম, কিন্তু তাতেও কাজ হলনি৷ আবার হঠাৎ করে মনে হল কে যেন স্টিয়ারিং ডানদিকে ঘুরিয়ে দিল৷ কী যে হয়ে গেল কিছু বুঝলুমনি বাবু৷ এগারো বচ্ছর এই গাড়ি চালাচ্ছি, কই, এমন তো কোনোদিন হয়নি!’’

লোকজন এর-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল৷ কয়েকজনের চোখে স্পষ্টই অবিশ্বাস৷ স্বাভাবিক, আমারও গল্পটা খুব একটা বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ তবে ঘোঁটটা আবার পাকিয়ে ওঠার আগেই দেখি কে যেন ভিড়ের পেছনদিকে থেকে বললেন, ‘‘উনি যা বলছেন, ঠিক বলছেন৷ ওঁদের ছেড়ে দাও৷ ওঁদের কোনো দোষ নেই৷’’

ভিড় একটু সরে গিয়ে আসার পথ করে দিল৷ একজন অত্যন্ত শান্তশিষ্ট দেখতে ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন৷ হাইট পাঁচ ফুটের একটু বেশি, ন্যাড়া মাথা৷ পরনে ধুতি আর গায়ে একটা উড়নি৷ ইনি এই গ্রামের ঠাকুরমশাই, বনবিহারী চক্রবর্তী৷

ঠাকুরমশাই বললেন, ‘‘লখাইকে ওর মায়ের কাছে দিয়ে এসো কেউ৷ আর বোলো ঠাকুরমশাই বলেছেন ও যেন পরের অমাবস্যা অবধি বাইরে না বেরোয়৷ আমি একটু পর ওর বাড়ি যাচ্ছি৷’’

বোঝা গেল ঠাকুরমশাইয়ের কথা এ গাঁয়ের লোক খুবই মান্য করে৷ একটু একটু করে ভিড় ফাঁকা হয়ে গেল৷ মোস্তাফা ড্রাইভার ঠাকুরমশাইকে ধন্যবাদ দিয়ে গাড়িতে উঠে যে স্পিডে চম্পট দিল সেটা দেখার মতো৷ আমিও উঠতে যাচ্ছি, ভদ্রলোক বললেন, ‘‘একটু দাঁড়িয়ে যাও, এখন উঠো না৷’’

আমি আশ্চর্য হলাম, ‘‘কেন?’’

ঠাকুরমশাই বললেন, ‘‘বাতাস ভালো না৷ হাওয়াটা কেটে যাক, তারপর উঠো৷’’

তখন সন্ধে নেমে আসছে৷ পাখিরা ফিরে আসছে বাসায়৷ তাদের কলকাকলির মধ্যে, ওই আধো-অন্ধকারের মধ্যে, দামোদরের বাতাসের মধ্যে কথাটা যেন মূর্তিমান অমঙ্গলচিহ্ন হয়ে ভেসে এল৷ আমি অবাক হয়ে ঠাকুরমশাইকে বললাম, ‘‘বাতাস ভালো না? এসব কী বলছেন কিছুই তো বুঝতে পারছি না!’’

ঠাকুরমশাই গম্ভীরমুখে বললেন, ‘‘কিছু যে একটা আছেই সে তো আর না-বোঝার কথা নয়৷ এক কাজ করো, এসো আমার সঙ্গে৷ তাহলেই সব বুঝতে পারবে৷ অবশ্য আমি সঙ্গে থাকলে বিপদের ভয় নেই৷’’

আধঘণ্টা কেন, আমার হাতে তখন অখণ্ড সময়৷ আমি ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গ নিলাম৷

* * *

লখাইদের বাড়ি গ্রামের একদম একপ্রান্তে৷ একতলা বাড়ি, ন্যাড়া ছাদ৷ চার কোণে বিমের মাথা থেকে বেরিয়ে আছে ভূতুড়ে কনস্ট্রিকশন রড৷ ইটের গায়ে কোনোমতে বালি-সিমেন্টের একটা প্রলেপ দেওয়া৷ চৌহদ্দির বাইরে ছিটে বাঁশের বেড়া৷ তখন দেশগাঁয়ে অত ইলেক্ট্রিসিটি আসেনি৷ দূর থেকে দেখলাম হ্যারিকেন আর হ্যাজাক জ্বলছে কয়েকটা৷ আমি আর ঠাকুরমশাই বাঁশ কেটে বানানো নীচু গেটখুলে দাওয়ায় এসে দাঁড়ালাম৷

একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করলাম৷ বাড়িটা ঘিরে একটা বিষণ্ণ ভাব জমাট বেঁধে আছে৷ একটা অদ্ভুত জোলো ভ্যাপসা গন্ধ, একটা মন খারাপ করা অনুভূতি৷ ঠাকুরমশাইকে কথাটা বলতে উনি মৃদু হাসলেন৷ কিছু বললেন না৷

এক সদ্য বিধবা মহিলা দাওয়ায় এসে দাঁড়ালেন৷ পেছনে পেছনে লখাই আর আরও দুটি বাচ্চা মেয়ে৷ ঠাকুরমশাই বললেন, ‘‘বউমা, লখাই আজ বড়ো বিপদের হাত থেকে বেঁচে গেছে৷ ছেলেমেয়েদের বলো ক’দিন যেন বাইরে বেশি না যায়৷’’

মহিলা ম্লানমুখে ঘাড় নাড়ালেন৷ তারপর সপ্রশ্নচোখে আমার দিকে চাইতেই ঠাকুরমশাই আমার পরিচয় দিলেন৷ এও জানালেন যে লখাইকে আমিই প্রথম তুলে ধরেছিলাম৷

ভদ্রমহিলা শুনেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন৷ আমি বিব্রতভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম৷

একটু পর কান্নার প্রাথমিক বেগ থামলে মহিলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে এসব কী হচ্ছে ঠাকুরমশাই? আমরা তো কারও কোনো ক্ষতি করিনি! কোনো দোষ করিনি! তাহলে আমাদের সঙ্গেই এমন কেন হচ্ছে?’’

বলা বাহুল্য, আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না৷ ঠাকুরমশাই আমাকে নিয়ে দাওয়ায় বসে বললেন, ‘‘দু’কাপ চা খাওয়াবে মা?’’

চা খেতে খেতে পুরো ব্যাপারটা খোলসা করলেন ঠাকুরমশাই৷

এই বাড়ি বানিয়েছিলেন সদ্যপ্রয়াত বিমলকৃষ্ণ সাঁতরা৷ সাঁতরামশাইয়ের আদি নিবাস ছিল বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটির তালড্যাংড়া গ্রামে৷ বাপ-পিতেমোর চাষের জমি ছিল বেশ কিছু৷ ভাগচাষ করেও যা পাওয়া যেত পরিবারের দিব্যি চলে যেত৷

বিমলকৃষ্ণ লেখাপড়া শেখেননি বেশি৷ কোনোরকমে ম্যাট্রিক পাশ করে বাবাকে গিয়ে বললেন তিনি আর পড়বেন না৷ বাবাও চাপাচাপি করলেন না৷ সংসারের জোয়ালে একটি নবীন বলীবর্দ জুতে গেল৷

কালক্রমে বিমলকৃষ্ণের বিয়ের বয়েস হল৷ অনেক খোঁজপত্তর করে বর্ধমানের এই গ্রামেরই রতন হাজরার মেয়ে লক্ষ্মীমণির সঙ্গে বিয়ে ঠিক হল৷ বিয়ে হয়েও গেল ধুমধামের সঙ্গে৷ কালক্রমে বয়সের ধর্ম মেনে তিনটি সন্তান হল তাদের, বড়োটি ছেলে, তারপর দুটি ছোটো মেয়ে৷

এদিকে বিমলকৃষ্ণের বাড়িতে ক্রমেই স্থান অকুলান হয়ে পড়ছিল৷ হাজার হোক একান্নবর্তী পরিবার, সংসার বড়ো হতে থাকলে জায়গা কম পড়ে৷ এদিকে বিয়ের পর পরেই লক্ষ্মীমণির মা তিনদিনের সান্নিপাতিকে মারা গেছিলেন৷ সেই শোকে হাজরামশাই শয্যা নিলেন৷ তাঁর একটি ছেলে ছিল৷ কিন্তু ছেলে-বউয়ের সঙ্গে তাঁর মোটে সদ্ভাব ছিল না৷ তিনি ভারি মেয়ে-ন্যাওটা ছিলেন৷ তিনি মেয়ে-জামাইকে এখানে এসে থাকতে বললেন৷

কিন্তু থাকতে বললেই আর থাকা যায় না৷ লক্ষ্মীমণির ভাই আর ভাইবউ এই নিয়ে অশান্তির চূড়ান্ত করে ছাড়ল৷ তাদের আশঙ্কা ছিল যে হাজরামশাই তাঁর পুরো সম্পত্তি মেয়ে-জামাইকে লিখে দেবেন৷ তাদের আশঙ্কা অমূলক ছিল না৷ তবে রতন হাজরা অতটা করলেন না৷ একটা চালু মুদির দোকান আর অনেকদিন আগে কেনা একটুকরো জমি ছেড়ে দিলেন মেয়েজামাইকে৷ শুধু তাই নয়, অসুস্থ শরীরে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে একতলা বাড়ি তুলে দিলেন৷ আর সেই পরিশ্রমেই কি না জানা যায় না, গৃহপ্রবেশের অল্পদিনের মধ্যেই হাজরামশাই চিরতরে চোখ বুজলেন৷ বিমলকৃষ্ণও সন্তান আর পরিবার নিয়ে নতুন বাড়িতে উঠে এলেন৷ এ বেশি নয়, মাস পাঁচেক আগের কথা৷ আর তার পর থেকেই শুরু হল গণ্ডগোল৷

বাস শুরু করার কয়েকদিনের মধ্যেই লক্ষ্মীমণির বেশ কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হতে লাগল৷ একদিন উনুনে হাঁড়ি চড়িয়ে দেখলেন চাল আর সেদ্ধ হচ্ছে না৷ সারাদিন উনুনে চড়িয়েও লক্ষ্মীমণি ভাত রান্না করতে পারলেন না৷

আর একদিন সদ্য উনুন থেকে রান্না নামিয়ে একটু বাইরে গেছেন কী একটা আনতে৷ এসে দেখেন রান্না পচে বিশ্রী গন্ধ ছাড়ছে৷ অথচ একটু আগেই রান্না হওয়া তরকারি, গরম ধোঁয়া উঠছিল৷ সেদিন সমস্ত রান্না ফেলে দিতে হল৷

এর পর শুরু হল সন্ধে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের আবহাওয়ার পরিবর্তন৷ বাইরে জমাটি শীত৷ অথচ ঘরের ভেতর গুমোট গরম৷ ঘরের জানলা-দরজা হাট করে খুলেও তার হাত থেকে রেহাই নেই৷ সমস্ত ঘরে একটা দমবন্ধ পরিস্থিতি৷

সাঁতরাদের ইষ্টদেব ছিলেন বালগোপাল, দেশভাগের সময় নিয়ে আসা৷ জন্মাষ্টমীর লক্ষ্মীমণি ঠাকুরকে ভোগ দিয়ে দেখলেন গোপালের ভোগের খাবার নষ্ট হয়ে গেছে৷ অথচ অতি যত্নে রান্না করা ভোগ৷ ভয়ে-দুর্ভাবনায় লক্ষ্মীমণি কেঁদে ফেললেন৷

আর একদিন লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তে যাবেন, দেখলেন প্রদীপ জ্বালাতে পারছেন না৷ কোথাও কোনো হাওয়া বইছে এমন নয়৷ একটা আস্ত দেশলাই বাক্স শেষ হয়ে গেল, অথচ একটা প্রদীপ জ্বালানো গেল না৷

তবে আসল ভয়ের কাণ্ড তখনও শুরু হয়নি৷

লক্ষ্মীমণির মেয়ে দুটির নাম ললিতা আর বিনতা, লালি আর বিনু৷ একদিন তিন ভাইবোন দাওয়াতে বসে বসে সুর করে নামতা পড়ছে৷ এমন সময় লখাই বলল বাথরুম যাবে৷ তোমরা বোধহয় দেখনি, গ্রামের দিকে বাথরুম উঠোন পেরিয়ে অন্য প্রান্তে বানানো হয়৷ লখাই বাথরুম গেল৷ অনেকক্ষণ কেটে গেল, কিন্তু লখাইয়ের সাড়াশব্দ নেই৷ দুই বোন একটু ভীতু টাইপের৷ তারা মা’কে ডেকে আনল৷ লক্ষ্মীমণি কুপি নিয়ে বাথরুমের কাছে গিয়ে ডাকলেন, ‘‘লখাই!’’

কোনো সাড়া নেই৷

লক্ষ্মীমণি দরজায় টোকা দিলেন৷ কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ দরজা ঠেলে দেখলেন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ৷ লক্ষ্মীমণি এবার উঁচু গলায় ডাকলেন ‘‘লখাই, কী হল তোর? সাড়াশব্দ দিচ্ছিস না কেন?’’

ঠিক সেই সময়ে লালি আর বিনু চিৎকার করে উঠল৷

লক্ষ্মীমণি ত্বরিতে ঘুরে দেখলেন কোন অলৌকিক উপায়ে লখাই সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে, কিন্তু উলটো দিকে হেঁটে! আর হাঁটাটা কেমন যেন প্রাণহীন জড়বস্তুর মতো, যেন একটা পুতুল হেঁটে আসছে!

দেখে ভয়ে আর আতঙ্কে লক্ষ্মীমণির প্রাণ উড়ে গেল৷ তিনি দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন৷ লখাই যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল৷ একবার চটকা ভেঙে মায়ের দিকে চাইল৷ তারপর কাপড়ের পুতুলের মতো এলিয়ে পড়ল মায়ের কোলে৷

এর পর লখাইয়ের এল ধুম জ্বর৷ টানা প্রায় পাঁচদিন ছেলে অচৈতন্য হয়ে পড়ে রইল৷ লক্ষ্মীমণি ক্রমাগত কাঁদতে থাকলেন আর ঠাকুরকে ডেকে গেলেন৷ সেই ডাকের জোরেই কি না জানা যায় না, পাঁচদিনের দিন সকালে আপনা থেকেই লখাইয়ের জ্বর ছেড়ে গেল৷

সেদিন ছিল অমাবস্যা, আর সেই রাতে লক্ষ্মীমণির সংসার শূন্য হয়ে গেল৷

এখানে বাড়িটার একটা বর্ণনা দেওয়া প্রয়োজন৷ একতলা বাড়িটা ছিল গ্রামের একপ্রান্তে৷ বাড়ির পেছন দিকে বাঁশবন৷ বাঁশবন পেরিয়ে একটা মজা ডোবা৷ ডোবার ওপারে বেশ খানিকটা খোলা জমি, লোকে বলে ভুলোর মাঠ৷ মাঠ পেরিয়ে গাঁয়ের একমাত্র শ্মশান, দামোদরের পাড় ঘেঁষে৷ লোকজন পারতপক্ষে সন্ধের পর ভুলোর মাঠের দিকে হাঁটে না৷

বিমলকৃষ্ণ পরিশ্রমী লোক ছিলেন৷ শ্বশুরের কাছ থেকে প্রাপ্ত মুদির দোকানটি নিয়ে তাঁর সারাদিন কেটে যেত৷ তার ওপর নতুন জায়গা, নতুন খরিদ্দার৷ সব কিছু বুঝে নিতেও একটু সময় লাগে৷ দোকান বন্ধ করে বিমলকৃষ্ণ যখন ফিরতেন তখন রাত হয়ে যেত৷ পাড়াগাঁয়ে রাত আটটা মানে গভীর রাত৷ সন্ধের একটু পরেই চারিদিক নিঃঝুম হয়ে যেত৷ রাস্তাঘাটে ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাড়া কিছু শোনা যেত না৷ সাঁতরামশাই একটা সাইকেলে করে ফিরতেন, সামনে একটা কার্বাইডের ল্যাম্প জ্বলত৷ দূর থেকে বাড়ির দাওয়ায় হ্যাজাক জ্বলছে দেখতে পেতেন৷

সেদিন সাঁতরামশাই এসে হাত-পা ধুয়ে দাওয়ায় বসেছেন, লালি আর বিনু ভেতর ঘরে অসুস্থ দাদার দেখাশোনা করছে, লক্ষ্মীমণি এসে হাওয়া করতে করতে সব কথা স্বামীর কানে তুললেন৷

বিমলকৃষ্ণ গম্ভীর মানুষ ছিলেন, কিছু বললেন না৷ চুপচাপ রাতের খাবার খেয়ে কলতলায় হাত-মুখ ধুতে গেলেন৷ লক্ষ্মীমণি এঁটো বাসন সরিয়ে রাখলেন, দাওয়া মুছে রাখলেন৷ ছেলেমেয়েদের খাওয়া আগেই হয়ে গেছিল, মশারি টাঙিয়ে তাদের শোয়ার ব্যবস্থা করতে গেলেন৷ স্বামী ফিরে এলে তিনি নিজে খেতে বসবেন, যেমন রোজ হয়৷

কিন্তু বিমলকৃষ্ণ ফিরলেন না৷

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে লক্ষ্মীমণি হ্যাজাক হাতে কলতলায় গিয়ে দেখলেন বিমলকৃষ্ণ কলতলায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন৷ ঘাড়টা সামান্য উলটে আছে, চোখের মণি দেখা যাচ্ছে না আর অকুতোভয় সাঁতরামশাইয়ের সারা মুখে একটা সাংঘাতিক ভয় পাওয়ার ছাপ!

* * *

পরদিন সকালে খুড়োমশাইয়ের সঙ্গে সম্পত্তি সংক্রান্ত কিছু কাজ করছি, কথায় কথায় আগের দিনের ঘটনাটা উঠল৷ খুড়োমশাই ওই প্রায় অ্যাক্সিডেন্টের কথাটা জানতেন, কিন্তু তারপর যে ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে যে সাঁতরামশাইয়ের ভদ্রোসনে গিয়েছিলাম সেটা জানতেন না৷ কথাটা শুনে খুড়ো একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘কাজটা ভালো করোনি ভবতারণ৷’’

একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কেন খুড়োমশাই?’’

‘‘যে বাড়িতে অপঘাতে মৃত্যু হয় সেখানে অসময়ে হুট করে যেতে নেই৷ তা ছাড়া...’’

‘‘তা ছাড়া কী?’’

‘‘বাড়িটা নিয়ে অনেক কথা কানে এসেছে ভব৷ অনেক অশৈলী অশরীরী ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি৷ তোমরা শহরের ছেলেপিলে এসব মানো না জানি, কিন্ত আমরা বুড়ো লোকজন এসব লক্ষণ-অলক্ষণ খুব মানি৷ ও-বাড়িতে কারও একটা অভিশাপ আছে হে৷ লক্ষ্মী আমাদের গাঁয়ের মেয়ে, ছোটোবেলা থেকে দেখছি৷ অতি চমৎকার মেয়ে৷ তার কপালে যে এতবড়ো একটা দুর্ভোগ নেমে আসবে সে ভাবতেই পারিনি৷’’

‘‘অভিশাপ? ওই বাড়িতে? কার অভিশাপ খুড়োমশাই?’’

চণ্ডীখুড়ো হুঁকোটা নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন৷

কোথাও কিছু নেই, একটা হাওয়া আমাদের পাক খেয়ে গেল৷ খুড়োমশাই একটু শিউরে উঠে বললেন, ‘‘আমিও ঠিক জানি না৷ তবে ছোটোবেলায় শুনেছি জমিটা ভালো না৷ কিছু একটা দুর্লক্ষণ আছে৷ তবে সেটা কী বলা মুশকিল৷ বাপ-দাদারা ভেঙে কিছু বলেননি৷’’

বললাম, ‘‘যদি কথাটা মেনেও নিই, তাহলেও বলতে হয় এ-কথাটা তো লক্ষ্মীমণির বাবা রতন হাজরাও জানতেন নিশ্চয়ই৷ তা সত্ত্বেও তিনি জমিটা কিনলেন কেন?’’

‘‘জমিটা রতন কেনেনি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি৷ তবে রতন নিজেও কিনতে পারত৷ ভারি ডাকাবুকো মানুষ ছিল সে, তা ছাড়া ঘোর বৈষয়িক লোক৷ এসব অভিশাপ-টভিশাপে বিশেষ বিশ্বাস করত না৷ আর তাতেই তার কাল হল৷

এই এলাকার জমিদার ছিলেন দিগম্বর মিত্র৷ এককালে মিত্রদের দাপটে বাঘে-গোরুতে একঘাটে জল খেত৷ আজ থেকে প্রায় ষাট বছর আগে দিগম্বর মিত্র’র কাছ থেকে জমিটা কেনেন রতনের বাবা, রাম হাজরা৷ ইচ্ছে ছিল ওখানে একটা বাড়ি বানাবেন৷ কিন্তু জমিটা কেনার পর থেকেই নাকি হাজরা পরিবারে একের পর এক অশান্তি নেমে আসে৷ রতনের মা ছিলেন ভারি লক্ষ্মীমন্ত মানুষ৷ তিনি এসব আচার-বিচার খুব মানতেন৷ তিনি বলেন জমিটা বেচে দিতে৷ কিন্তু জমি-জিরেত ভারি জটিল জিনিস, ওভাবে আলুপটলের মত ঝট করে কেনাবেচা যায় না৷ এদিকে বদনামও রটে গেছে৷ তাই জমিটা পড়েই রইল৷ শেষে একদিন দেখি রতন দাঁড়িয়ে থেকে ওই জমিতে বাড়ি তুলছে৷ বলল মেয়ে-জামাই এসে থাকবে৷ আমি আর কিছু বলিনি৷ তবে আশঙ্কা করেছিলাম যে এই নিয়ে কিছু একটা অনর্থ হবেই৷’’

আরও কিছু জিজ্ঞেস করতাম, কিন্তু তার আগেই দেখি ঠাকুরমশাই বনবিহারীবাবু উঠোনে এসে দাঁড়ালেন৷ সঙ্গে আরও একজন লোক৷ হাসিমুখে বললেন, ‘‘এই যে চণ্ডীবাবু, একজন পুরোনো আলাপীকে সঙ্গে নিয়ে এলাম৷ আমাদের গ্রাম দেখতে এসেছেন৷ ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই৷’’

খুড়োমশাই শশব্যস্ত হয়ে ‘‘আরে কী সৌভাগ্য, আসুন আসুন, বসুন’’ বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন৷ ছোটোবউমণি দুটো মোড়া দিয়ে গেলেন বসার জন্য৷ খুড়োমশাই চা আর মুড়ি দিয়ে যেতে বললেন৷

ঠাকুরমশাই সঙ্গে আসা লোকটির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন, ‘‘ইনি মৈত্রমশাই৷ গেলবার গয়া গেছিলাম? তখনই ট্রেনে আলাপ৷ সেই থেকে চিঠিচাপাটিতে যোগাযোগ ছিলই৷ শুনলাম এই বারের গরমটা নাকি গ্রামে কাটাতে চান৷ সঙ্গে সঙ্গে চিঠি লিখে আনিয়ে নিলুম৷ কী মৈত্রমশাই, ঠিক বলছি তো?’’

সঙ্গের লোকটি মৃদু হেসে বললেন, ‘‘বনবিহারীবাবুর মতো সৎ এবং পরোপকারী বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার৷ তিনি যে আমাকে ডেকেছেন সে আমার পরম সৌভাগ্য৷’’

লোকটিকে ভালো করে লক্ষ করলাম৷ সাধারণ গড়পড়তা বাঙালির মতো দেখতে, চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর বয়েস হবে৷ পরনে সুতির শার্ট আর টেরিকটের প্যান্ট, পায়ে একটা স্যান্ডেল৷ কানের কাছে চুলে পাক ধরলে কী হবে, ত্বক এখনও সতেজ, টানটান৷ তবে দেখবার মতো হচ্ছে চোখ দুটো৷ একই সঙ্গে বুদ্ধি আর করুণার এমন মিশ্রণ খুব কম চোখেই দেখা যায়৷

খুড়োমশাই বললেন, ‘‘মৈত্রমশাইয়ের বাড়ি কোথায়?’’

‘‘আদি বাড়ি নবদ্বীপে৷ তবে কাজেকর্মে সারা ভারতবর্ষই ঘুরে বেড়াতে হয়৷ অবরে-সবরে দেশে আসি৷ এবার মনে হল অনেকদিন গ্রামবাংলা দেখা হয়নি৷ তা বনবিহারীবাবুকে সে-কথা জানাতে উনি প্রায় জোর করেই টেনে আনলেন৷’’

খুড়োমশাই শুনে খুশি হয়ে বললেন, ‘‘খুব ভালো করেছেন৷ এখানে তো খুব বেশি বাইরের লোক আসে না৷ এই আপনাদের মতো কেউ এলে বেশ দেশ-বিদেশের খবর পাওয়া যায়৷ তা তামাক চলে তো?’’

ভদ্রলোককে আমার বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিল৷ তোমরা তো জানোই, আমার দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াবার শখ ছিল এককালে৷ কার্যগতিকে সেটা হয়ে ওঠেনি৷ সেই থেকেই পর্যটক গোত্রের লোকজনের প্রতি আমার একটা টান আছে৷ তা ছাড়াও লোকটার মধ্যে কী যেন একটা অদ্ভুত আকর্ষণী ক্ষমতা ছিল৷ একবার দেখলে নির্নিমেষে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে৷

আরও এ কথা সে-কথার পর চা, তামাক খেয়ে দুজনে উঠে পড়লেন৷ খুড়োমশাই নিমন্ত্রণ করে রাখলেন৷ মৈত্রমশাই থাকবেন চারদিন৷ ঠিক হল আগামীকাল দু-জনে এই বাড়িতে দুপুরে খেতে আসবেন৷

দু-জনের সঙ্গে আমিও উঠে পড়লাম৷ লোকটার সঙ্গ ছাড়তে ইচ্ছে করছিল না৷ বনবিহারীবাবু খুশিই হলেন, ‘‘চলো হে৷ তোমরা তো শহরের লোক৷ আসল গ্রাম কাকে বলে ঘুরিয়ে দেখাই৷’’

সে গ্রাম আমি গত তিনদিন ধরেই দেখছি৷ তবে সে-কথা আর বললাম না৷

* * *

তিনজনে মিলে হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের অনেকটা ঘুরে ফেললাম৷ ততক্ষণে মৈত্রমশাই আমার কাকা হয়ে উঠেছেন৷ আমি খুড়ো বলতে গেছিলাম৷ উনি হেসে বললেন, ‘‘খুড়োমশাই শুনলেই কেমন যেন অশীতিপর বয়োবৃদ্ধ মনে হয় ভব৷ তুমি বরং আমাকে কাকা বলেই ডেকো৷’’

হাঁটতে হাঁটতে শ্মশানের দিকটায় এলাম৷ কাকা দেখলাম কীসব বিড়বিড় করছেন৷ ঠাট্টা করে বললাম, ‘‘ভূতের মন্তর আওড়াচ্ছেন নাকি? ভয় করছে?’’

কাকা হেসে ফেললেন, ‘‘শ্মশানে ভয় কীসের ভবতারণ? রাজা থেকে ভিক্ষুক, মহাত্মা থেকে পাপী, সাধু থেকে ভোগী সবারই শেষ আশ্রয়স্থল এই শ্মশান৷ এখানে পাপপুণ্য, সমস্ত কৃতকর্মের বোঝা নামিয়ে জীবাত্মা মিলিত হন পরমাত্মার সঙ্গে৷ শ্মশান অতি পুণ্যস্থান৷ শ্মশানে এলে চিত্তশুদ্ধি হয়৷’’

কথাগুলো শুনে বড় ভালো লাগল৷ তা ছাড়া কাকার কথা বলার মধ্যেও এমন একটা ধীরস্থির শান্ত ভঙ্গি থাকে যে শুনলেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে৷

শ্মশান ঘুরে ভুলোর মাঠ ধরলাম৷ বৈশাখের খর দুপুর৷ মাথার ওপর সূর্যদেব যেন আগুন ঝরাচ্ছেন৷ চারিদিক তেতেপুড়ে একশা৷ প্রচণ্ড রোদে আলজিভ অবধি শুকিয়ে উঠেছে৷ এমন সময়ে একটা জিনিস দেখে থমকে গেলাম৷

আমাদের একটু আগেই একমুঠো ধুলো যেন হঠাৎ করেই হাওয়াতে পাক খেয়ে নেচে উঠল বাতাসে৷ তার সঙ্গে আর একটা হাওয়ার স্রোত এসে মিলল কোথা থেকে৷ কিছু শুকনো পাতা আর কাঠকুটো জড়িয়ে গেল তাদের সঙ্গে৷ তারপর সেই ধুলো আর হাওয়ার স্রোত একে অন্যকে জড়িয়ে পাক খেতে খেতে এদিক-ওদিক মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে নাচতে লাগল৷ মনে হল যেন দুটি বিশাল অজগর সাপে শঙ্খ লেগেছে৷

আমরা তিনজনে স্তব্ধ হয়ে সেই ভয়ংকর সুন্দর দৃশ্য দেখতে লাগলাম৷ আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে সারা মাঠে আর কোথাও হাওয়া নেই৷ শুধু আমাদের চোখের সামনে যেন ঘূর্ণিঝড়ের এক আশ্চর্য নাটক অভিনীত হচ্ছে৷

কিছুক্ষণ পরে ঘূর্ণিঝড়টা দ্রুত ধেয়ে গেল মাঠের ওপারে একটা বাঁশবাগানের দিকে৷ বাঁশবাগানের সামনে একটা পচা ডোবা৷ দেখলাম শুকনো বাঁশপাতা আর একগাদা কাঠকুটো নিয়ে আরও বড়ো হয়ে উঠেছে সেই ধুলোর ঝড়৷ তারপর বাঁশবাগানের মাথার একটু ওপরে উঠেই ভেঙে গেল সে৷

এতক্ষণ তিনজনেই চুপ ছিলাম৷ প্রথম কথা বললেন কাকা, ‘‘বাঁশবাগানের ওপারে কী আছে?’’

ঠাকুরমশাই শুকনো গলায় বললেন, ‘‘গ্রামেরই এক বাসিন্দার বসতবাড়ি৷’’

‘‘আমাকে ওখানে নিয়ে যেতে পারবেন?’’

‘‘কেন?’’

‘‘আমাকে কেউ ডাকছে৷’’

* * *

বসে ছিলাম লক্ষ্মীমণির বাড়ির দাওয়াতে৷ কাল যে ঘটনা ঠাকুরমশাই আমাকে বিশদে বলেছেন, সেটাই এবার কাকাকে বলা হল৷ সকালে চণ্ডীখুড়ো আমাকে যেটা বললেন সেটাও জানালাম৷ লক্ষ্মীমণি একটু কেঁদেও নিয়েছেন এর মাঝখানে৷ পরিস্থিতি গম্ভীর হয়ে আছে৷

কাকা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বললেন, ‘‘এই জমিতে এমন কিছু একটা রয়ে গেছে যেটা ভালো নয় মা৷ তোমাদের কপালে অনেক দুর্ভোগ আছে দেখতে পাচ্ছি৷’’

‘‘সেটা কী মৈত্রমশাই?’’ লক্ষ্মীমণির স্বরে ভয় স্পষ্ট৷

মাথা নাড়লেন কাকা, ‘‘ঠিক বুঝতে পারছি না৷ তবে কোনো সাধারণ বাস্তুদোষ নয়৷ খুব জটিল কোনো ভূমিবন্ধন৷ এর কারণ বা উৎস খুঁজে না পেলে একে প্রতিহত করা মুশকিল৷’’

‘‘আর যদি প্রতিহত করা না যায়?’’ কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন ঠাকুরমশাই৷

‘‘তাহলে আরও রক্ত ঝরবে,’’ ভদ্রলোক স্থির এবং অনুত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘‘যে নেমে এসেছে তার রক্তের পিপাসা এখনও মেটেনি চক্রবর্তীমশাই৷ আরও শিকার ধরার জন্য সে ওঁত পেতে আছে৷ তৃপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সে একের পর এক বলি নিয়েই যাবে৷’’

আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে আছি, এমন সময় লক্ষ্মীমণির আট বছর বয়সি মেয়ে বিনু একগ্লাস জল আর একটা বাতাসা এনে মৈত্রমশাইয়ের হাতে দিয়ে পাকা গিন্নির মতো বলল, ‘‘আহা রে, রোদে তেতেপুড়ে মুখটা শুকিয়ে গেছে একেবারে৷ এই বাতাসাটা দিয়ে জলটা খেয়ে নাও দিকি৷ একটু বাতাস করব?’’

আমরা সবাই হেসে উঠলাম৷ মৈত্রমশাই কিন্তু হাসলেন না৷ বাতাসাটা হাতে করে অদ্ভুত চোখে কিছুক্ষণ বিনুর দিকে চেয়ে রইলেন৷ তারপর বাতাসাটা গুঁড়ো গুঁড়ো করে গ্লাসের জলে মিশিয়ে খানিকটা খেয়ে বাকি জলটা দিয়ে বিড়বিড় করতে করতে বাড়ির চারিদিকে ছিটিয়ে দিলেন৷

ঠাকুরমশাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘এটা কী করলেন মৈত্রমশাই৷’’

কাকা বললেন, ‘‘মেয়েরা মায়ের জাত চক্রবর্তীমশাই৷ মা যখন স্নেহভরে সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেন তখন তার থেকে মহত্তর মঙ্গল-উপচার আর কিছুই হতে পারে না৷ শুনুন ঠাকুরমশাই, আমি আজ কিছু স্থানবন্ধন করে দিয়ে গেলাম৷ তবে এ ক্ষণস্থায়ী৷ আপনি যে করে হোক কালকের মধ্যে এই জমির ইতিহাস জানার ব্যবস্থা করুন৷ রোগ না জানলে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারব না৷ পরশু রাতে আমার ট্রেন, তার আগেই আমি এর একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে যেতে চাই৷’’

তিনজনে উঠে পড়লাম৷ অনেক কাজ বাকি৷ আসার পথে কাকাকে শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘ধুলোর ঝড় তুলে কে আপনাকে ডাকছিল কাকা?’’

কাকা মৃদু হাসলেন, কিছু বললেন না৷

* * *

চণ্ডীখুড়ো চিন্তিত মুখে বললেন, ‘‘ইতিহাস তো বলতে পারব না বাবা৷ জমিটা রতন হাজরার বাপ কিনেছিল জমিদার দিগম্বর মিত্র’র কাছ থেকে, এইটুকু জানি৷ তার আগে জমিটা কার ছিল সে-কথা তো জানি না৷ তবে মিত্তির বংশের উত্তরাধিকারীরা এখনও আছেন৷ তাঁদের দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে দেখলে কিছু জানা গেলেও যেতে পারে৷’’

আমার সঙ্গে ঠাকুরমশাই ছিলেন৷ কাকা ঠাকুরমশাইয়ের বাড়িতে নিজের ঘরে ঢুকে সেই যে দোর দিয়েছেন আর খোলার নাম নেই৷ তাঁকে নাকি কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে৷ তবে আমাকে আর ঠাকুরমশাইকে পইপই করে বলে দিয়েছেন যে করে হোক আজ বা কালকের মধ্যে ওই বাস্তুর ইতিহাস যেন খুঁজে বার করি৷ নইলে লক্ষ্মীমণি আর তার তিনটি সন্তান, কেউ বাঁচবে না৷ ওই বাস্তু ছেড়ে গেলেও বাঁচবে না৷ বরং যেখানে যাবে সেখানেই এই অভিশাপ নিজের থাবা বসাবে৷

ঠাকুরমশাই হতাশ হয়ে বললেন, ‘‘সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই৷ সেই দিগম্বর মিত্তিরও নেই, জমিদারবাড়ির সেই দাপটও নেই৷ দিগম্বর মিত্তিরের নাতি সুবল এখন স্কুল টিচার৷ সে আর তার পরিবার পোড়ো জমিদারবাড়ির একটা অংশে বাস করে৷ তাদের জমিদারি দস্তাবেজ খুঁজে দেখাবার মতো কেউ অবশিষ্ট আছে বলে জানি না৷’’

চণ্ডীখুড়ো ভুরু কুঁচকে খানিক চিন্তা করে বললেন, ‘‘দিগম্বর মিত্র’র নায়েব ছিলেন হাজারি সরকার৷ এই গ্রামেই থাকেন৷ তাঁকে বললেন তিনি হয়তো ঠিক দলিল খুঁজে দিতে পারবেন৷ তবে সরকারমশাইয়ের অনেক বয়েস হয়েছে৷ পারবেন কি না জানা নেই৷’’

আমি বললাম, ‘‘একবার গিয়ে কথা বলতে দোষ কী?’’

খুড়োমশাই মাথা নাড়লেন, ‘‘তা অবশ্য নেই৷ চলো, আমিও যাই, নইলে তোমাদের চিনতে না-ও পারেন৷’’

সরকারমশাইয়ের ভদ্রোসন বরশুল যাওয়ার পথে পড়ে৷ হাতাওয়ালা দোতলা বাড়ি, সামনে ছোটো বাগান৷ লাল সিমেন্টে শান বাঁধানো দাওয়ায় বসে সরকারমশাই মুড়ি খাচ্ছিলেন৷ বয়েস প্রায় আশি ছুঁই-ছুঁই হলে কী হবে, মেরুদণ্ড একেবারে টানটান৷ উজ্জ্বল গৌরবর্ণ দেহ, খাড়া নাক আর খরধূর্ত চোখ দেখে প্রাক্তন নায়েবমশাইকে চিনে নিতে অসুবিধা হয় না৷

চণ্ডীখুড়ো নিজের পরিচয় দিতে চোখ কুঁচকে বললেন, ‘‘কোন চণ্ডী? নিতাই মুখুজ্জের ছেলে? রামেশ্বর মুখুজ্জের নাতি?’’

বাপ রে! বুড়োর স্মৃতিশক্তি দেখে চমকে গেলাম!

তবে এত স্মৃতিশক্তিতেও খুব একটা লাভ হল না৷ বুড়ো জমিটার কথা মনে করতে পারলেন বটে, সে নিয়ে কিছু একটা অশান্তি হয়েছিল সেটাও মনে করতে পারলেন, কিন্তু কী হয়েছিল সেটা আর বলতে পারলেন না৷

ঠাকুরমশাই একবার দলিল-দস্তাবেজ দেখার কথাটা তুললেন৷ তাতে বুড়ো হেসে বললেন, ‘‘সে কি আর আছে হে? অনেক দলিল তো সেরদরে বিক্রিই করে দেওয়া হয়েছে৷ আর বাকি যা ছিল সব উইয়ে খেয়ে শেষ করে দিয়েছে৷ না হে বাপু, ওই পথে হেঁটে লাভ হবে না৷’’

হতাশ হয়ে উঠে আসছি, এমন সময় একটা কথা মাথায় এল৷ জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘দাদামশাই, আপনাদের সময়কালের আর কেউ আছেন, যিনি এখনও বেঁচে আছেন? তাঁকে জিজ্ঞেস করলে হয় না?’’

দাদামশাই ডাক শুকে বুড়ো সরকারমশাই বেশ প্রসন্ন হলেন৷ তারপর অনেক ভেবেচিন্তে বললেন, ‘‘মিত্তিরমশাইয়ের খাস ঠেলে ছিল আবদুল৷ জমিদারবাড়ির মৃধার কাজ করত আর মিত্তিরমশাই কোথাও গেলে পাহারা নিয়ে নিয়ে যেত৷ সে আমার থেকেও কয়েক বছরের বড়ো৷ শুনেছি এখনও বেঁচে আছে৷ তাকে জিজ্ঞেস করতে পারো৷’’

আবদুলের বাসস্থান যে গ্রামে তার নাম বাজেসালেপুর৷ যখন পৌঁছোলাম তখন বিকেল৷

আব্দুল শেখ উঠোনে চাটাই বিছিয়ে বসে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কাঁচা আম মাখা খাচ্ছিলেন৷ এই বয়সেও বেশ শক্তসমর্থ শরীর৷ আবলুস কাঠের মতো গায়ের রং, ন্যাড়া মাথা আর সাদা দাড়িতে ভদ্রলোককে বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা চরিত্র বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক৷

কার্যগতিকে দেখা গেল আবদুল মিয়ার মনে আছে সবই৷ কিন্তু সব কথাই ঐতিহাসিক রেফারেন্স টেনে শুরু করেন৷ যেমন বয়েস কত জিজ্ঞেস করতে বললেন ‘‘সেই যেবার প্রথম বড়ো যুদ্ধ লাগল, সেইবার,’’ অথবা ছোটো ছেলে জন্মাল কবে জিজ্ঞেস করতেই শুরু করলেন, ‘‘সেই যেবার সুভাষবাবু রেঙ্গুন অবধি চলে এলেন...’’ এইরকম আর কী৷

অনেক কষ্টে ইতিহাসের অনেক মাইলফলক পেরিয়ে আসল প্রসঙ্গে এলাম৷ বুড়ো শোনামাত্র বলল, ‘‘ভুলোর মাঠের সামনের জমিটা? পেছনে বাঁশবাগান আর মস্ত ডোবা আছে?’’

সেই জমিটার কথাই যে বলা হচ্ছে সেটা জানানো হল৷ তবে ডোবা যে আর মস্ত নেই সে কথাটা শুনে বুড়ো দুঃখ করলেন খুব, ‘‘ওই ডোবা থেকে কই মাছ ধরেছিলুম সেই যেবার লালবাহাদুর শাস্ত্রী যুদ্ধে জিতলেন...’’

আমরা চেপে ধরে বললাম, ‘‘দাদাজান, ওসব পড়ে শুনব৷ আগে বলুন জমিটা কার ছিল, আর দিগম্বর মিত্র’র হাতে এল কী করে?’’

আরও বেশ কিছু আগড়ম-বাগড়ম শোনার পর আসল কথা জানা গেল৷ কথাটা আবদুল মিয়ার জবানিতেই বলছি৷

তখন ওই শ্মশান আর ভুলোর মাঠ সংলগ্ন এলাকা ঘিরে ছিল একটা বাঁশবন৷ জায়গাটার কুখ্যাতি ছিল খুব৷ এমনকি দিনের বেলাতেও পারতপক্ষে ওই রাস্তা মারাত না কেউ৷ রাত-বিরেতে কেউ মরলে অন্তত দশ-বারোজন মিলে দল বেঁধে পোড়াতে যেত শ্মশানে৷

একদিন ভিন গাঁ থেকে একটা ডাকাবুকো লোক এসে জমিদারবাবুকে পেন্নাম ঠুকে দাঁড়াল৷ ছোটোখাটো চেহারা, একমাথা ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, গালভরা দাড়ি আর পরনে লাল রঙের কাপড়৷ এসে বলল তার নাম নাকি কালীকিঙ্কর ভট্টাচার্য, বাঁকড়োয় বাড়ি৷ সংসারে অশান্তি বলে সব ছেড়েছুড়ে এখানে চলে এসেছে৷ বাবুর কাছে বসবাস করার জন্য কিছু জমি চাইল৷

বাবু খুব হুঁশিয়ার আর হিসেবি লোক ছিলেন৷ তিনি কোনো বাস্তুজমি দিলেন না৷ ওই বাঁশবন দেখিয়ে লোকটাকে বললেন পারলে সে যেন ওই বন কেটে বসত বানিয়ে নেয়৷ কিছু টাকাও দিলেন ঋণ হিসেবে আর দু-জন কামলা দিতে চাইলেন, বাঁশবন কাটতে সাহায্য করার জন্য৷ কিন্তু লোকটা বলল আর কাউকে চাই না, ও একাই যথেষ্ট৷ শুনে আমরা মুখ টিপে হাসলাম৷

তবে লোকটা কিন্তু তার কথা রেখেছিল৷ হপ্তাদুয়েকের মধ্যেই দেখি বাঁশবন, ঝোপজঙ্গল কেটে সাফ দিব্যি একটা একচালা ঘর বানিয়ে নিয়েছে৷ একদিন জমিদারবাবুকে পেন্নাম ঠুকে গেল৷ আমরা তো অবাক! লোকটা দানো-টানো পোষে নাকি?

একদিন জমিদারবাবু বিকেলে হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন, সঙ্গে আমিও আছি, বাবু বললেন, ‘‘চল তো আবদুল, দেখে আসি লোকটা কীরকম বাড়ি বানিয়েছে!’’ আমি রাস্তাটা চিনতাম৷ পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলাম৷ বাবু তো বাড়ি দেখে তাজ্জব! কোথায় সেই বাঁশবন? লোকটা সব কেটেকুটে দিব্যি একটা ঝকঝকে তকতকে বাড়ি বানিয়েছে৷ সামনে পরিষ্কার উঠোন, নিকোনো দাওয়া৷ শুধু বাড়ির পেছনে একটুখানি বাঁশবন রেখে দিয়েছে আর ওই ডোবাটা৷

বাবুর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল৷ তিনি বাড়ি ফিরে বললেন পরদিন সকালে কালীকিঙ্করকে যেন ডেকে আনি৷

কালীকিঙ্কর এলে বাবু তাকে যে টাকাটা ধার হিসেবে দিয়েছিলেন সেটা ফেরত চাইলেন৷ নায়েবমশাইয়ের খাতা-কলমের জোরে ততদিনে ওটা চার ডবল হয়ে গেছে৷ কালীকিঙ্করের মুখ দেখে মনে হল তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে৷ সে ভারি কাকুতি-মিনতি করতে লাগল, যাতে তাকে একটু সময় দেওয়া হয়৷ কিন্তু বাবুর গোঁ ছিল বড়ো সাংঘাতিক৷ তিনি বললেন পরের দিন যদি সেই টাকা না শোধ দেওয়া হয়, তাহলে তিনি বাড়িঘরের দখল নেবেন৷

বলা বাহুল্য একদিনের মধ্যে কালীকিঙ্করের পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না৷ ফলে আমরা পরের দিনই গিয়ে ঘরের দখল নিলাম৷ লোকটার যা যা ছিল সব বাইরে ছুড়ে ফেলা হল৷ কালীকিঙ্কর কিচ্ছুটি বলল না, চুপচাপ দেখল শুধু৷ তারপর চোখের জলটুকু মুছে কাপড়ের পুঁটলি বগলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল৷

আমরা গিয়ে বাবুকে খবর দিলাম৷ বাবু খুশি হয়ে আমাকে বললেন, ‘‘আবদুল, আজ রাতটা তুই ওই ঘরটায় থাক৷ কাল থেকে লোকলশকর লাগিয়ে দে, আমার ইচ্ছে ওখানে একটা বাগানবাড়ি করব৷’’

আমিও সেই কথামতো সেদিন রাত্রে খাবার-দাবার খেয়ে আশ্রয় নিই কালীকিঙ্করের বাড়িতে৷ আর সেই রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে৷

ঘরের মধ্যে মাদুর পেতে শুয়েছি, চোখটা লেগে আসব-আসব করছে, এমন সময় মনে হল ঘরের চালে কীসের যেন খড়খড় আওয়াজ হচ্ছে৷ ঘরের মধ্যে একটা দমবন্ধ করা ভ্যাপসা ভাব৷ কুপি জ্বালাতে গিয়ে দেখি কিছুতেই দেশলাই জ্বলছে না৷ হাতড়ে হাতড়ে দেওয়াল খুঁজে পেলাম৷ কিন্তু ওই দেওয়াল ধরে ধরে সারা ঘর ঘুরেও না দরজা খুঁজে পেলাম, না জানলা! আমার তো ভয়ে প্রাণ উড়ে গেছে৷ গলায় গ্রামের মৌলবিসাহেবের দেওয়া তাবিজটা ছিল, সেইটে হাতে কিছুক্ষণ আল্লার নাম নেওয়ার পর দেখলাম হাওয়া কিছুটা ঠান্ডা হল৷

আমি আবার কুপি ধরাবার চেষ্টা করলাম, এবার দেখি জ্বলল৷ দেখলাম জানলা-দরজাও যেখানে থাকার কথা সেখানে আছে৷ এসব দেখে আমি আর থাকিনি, জিনিসপত্র গুছিয়ে সোজা চম্পট দিইছি৷

পরেরদিন সকালে কাছারিবাড়ি গিয়ে কথাটা বাবুর কানে তুললাম৷ নায়েবমশাই সামনেই ছিলেন৷ দু-জনেই শুনে খানিক ভাবলেন৷ তারপর বললেন এখন ওখানে কিচ্ছু করার দরকার নেই৷ না বাগানবাড়ি, না অন্য কিচ্ছু৷ আরও বললেন এই কথা কাউকে জানাবার দরকার নেই৷

তারপর শুনি জমিটা বাবু রাম হাজরাকে বেচে দিয়েছেন৷ তার পর আমিও ভুলে গেছি, আর সবাইও ভুলে গেছে৷ এই আজ আপনারা এলেন বলে এতদিন বাদে সব মনে পড়ল৷ কেন বাবু, ওখানে কিছু হয়েছে?

* * *

কাকা সামনে চুপ করে বসে ছিলেন৷ এখন তাঁর সম্পূর্ণ অন্য রূপ৷ পরনে উড়নি ও রক্তাম্বর৷ মুখখানি একইসঙ্গে উত্তেজিত অথচ গম্ভীর৷ চোখদুটো যেন আরও ধারালো, আরও সতর্ক৷

বসে ছিলাম ঠাকুরমশাইয়ের বাড়িতে, মৈত্রমশাইয়ের ঘরে৷ আমি আছি, ঠাকুরমশাই আছেন আর আছেন লক্ষ্মীমণিও৷

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন কাকা? মানে কী হচ্ছে কিছুই তো বুঝতে পারছি না!’’

কাকা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘‘কী আর বলব ভব৷ মায়ার অভিশাপ হে, ভালোবাসার অভিশাপ৷ কী জানো তো ভব, অসহায় মানুষের হা-হুতাশ, হাহাকার বড়ো ভয়ংকর জিনিস৷ সে না চাইলেও তার কান্না আর দীর্ঘশ্বাস বাতাসে গুমরে গুমরে কাঁদতে কাঁদতে একদিন বিষধর সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়ায়৷ কালীকিঙ্কর খুব সম্ভবত বড় সাধক ছিলেন৷ তিনি কোনো অভিশাপ দেননি বটে, কিন্তু তাঁর ফেলে যাওয়া চোখের জলটুকুই আজ সর্বগ্রাসী সর্বনাশী অভিশাপের রূপ নিয়েছে৷’’

ঠাকুরমশাই অবাক হয়ে বললেন, ‘‘একটা ছোট্ট কাঁচামাটির ঘরের জন্য এত বড়ো অভিসম্পাত?’’

‘‘ভুল করছেন ঠাকুরমশাই৷ ঘর মানে তো শুধু একটা কাঁচামাটির আস্তানা নয়, ঘর মানে ভালোবাসা৷ মানুষ তো শুধু চারটে দেওয়াল আর একটা ছাদ ভালোবাসে না, নিজের একটুকরো সংসার, নিজের শখের বাগান, বারান্দার কোণের রোদ, পোষা কুকুর-বিড়াল, নিজের মতো করে একটুখানি বাঁচা, এই সবটুকু ভালোবাসে৷ আর সেই ভালোবাসা যদি কোনো কারণে উৎখাত হয়ে যায়, তাহলে তার ওই কান্নাজড়ানো মায়াটুকু লেগে থেকে যায় তার সঙ্গে৷ সে জিনিস বড়ো ভয়ংকর জিনিস৷ অন্ধকারের প্রতিষেধক আলো, ঘৃণার প্রতিষেধক ভালোবাসা৷ কিন্তু আলোর প্রতিষেধক কী ঠাকুরমশাই? ভালোবাসার অভিশাপ আটকায় কীসে?’’

আমরা চুপ করে রইলাম৷ এ বড়ো কঠিন সত্য কথা৷

‘‘জেনে রাখো ভব, কাউকে তার ভালোবাসার বাস্তু থেকে গায়ের জোরে, অন্যায়ভাবে উৎখাত করলে ভয়ানক দোষ ঘটে৷ বাস্তুহারা মানুষের চোখের জলের অভিশাপ বড়ো সাংঘাতিক৷ প্রাণদায়ী মধু যেমন কোনোগতিকে পচে গেলে মারাত্মক বিষ হয়ে ওঠে, এও তেমনি৷ সেই বাস্তু আর ভোগ করা যায় না৷’’

‘‘কী হয় কাকা?’’

‘‘তাতে প্রেতযক্ষের নজর লাগে৷ যে বা যারা সেই বাস্তু ভোগ করার চেষ্টা করে, প্রেতযক্ষ তাদের তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারে, যতক্ষণ না সেই বাস্তু আবার মানুষশূন্য হয়৷’’

লক্ষ্মীমণি আবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন, ‘‘এবার আমার কী হবে ঠাকুর? ছেলেমেয়ের হাত ধরে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? আমার তো বাপের বাড়িতেও ঠাঁই হবে না, আর ওনার দেশের বাড়িতেও আমাদের আর মুখ দেখাবার উপায় নেই৷’’

কাকা স্নেহের সুরে বললেন, ‘‘চিন্তা করবেন না মা৷ আমরা যখন আছি, তখন কিছু একটা ব্যবস্থা তো হবেই৷ তা ছাড়া আপনি একা নন, আপনার স্বামী কিন্তু এখনও আপনাদের ছেড়ে যাননি৷ আপনাদের একটা গতি না করে তিনি এই পৃথিবীর মায়া কাটাতে পারছেন না৷’’

সামান্য ইতস্তত করে বললাম, ‘‘বুঝলাম না কাকা৷ আপনি বলছেন যে বিমলকৃষ্ণ’র ইয়ে, মানে প্রেতাত্মা এখনও এখানে আছেন?’’

অল্প হাসলেন কাকা, ‘‘প্রেত কাকে বলে ভবতারণ? সংস্কৃতে ই-ধাতু বা ক্রিয়াপদের অর্থ হল যাওয়া, চলে যাওয়া৷ সেই ধাতুর নিষ্পন্ন পদ হল ইতঃ, অর্থাৎ গত৷ তার সঙ্গে প্র, মানে প্রকৃষ্ট উপসর্গ যোগ করলে হয় প্রেত৷ যিনি প্রকৃষ্টভাবে চলে গেছেন, যাঁর আর কোনো পিছুটান নেই, তিনিই প্রেত৷ অথচ আমরা এর অর্থই জানি না৷ শব্দটা শুনলেই ভাবি অনিষ্টকারী অশুভ শক্তি বুঝি৷ বিমলকৃষ্ণ শুধু যে এখনও জাগতিক বন্ধন কাটিয়ে উঠতে পারেননি তা নয়, তাঁকে পিতৃলোক থেকে বার বার নেমে আসতে হচ্ছে প্রেতযক্ষ’র ছোবল থেকে নিজের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য৷’’

ঝট করে যেন চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে গেল৷ রূদ্ধশ্বাসে বলে উঠলাম, ‘‘ও, তাহলে সেদিন মুস্তাফা ড্রাইভারের স্টিয়ারিং... ’’

ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন কাকা, ‘‘হ্যাঁ ভব৷ সেদিন তিনিই গাড়িচাপা পড়ার হাত থেকে নিজের ছেলেকে রক্ষা করেছেন৷ শুধু তাই নয়, যতবার প্রেতযক্ষ’র অভিশাপের থাবা নেমে আসতে চেয়েছে তাঁর পরিবারের ওপর, ততবার তিনি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন৷ কিন্তু তিনি জানেন এই পৈশাচী শক্তির সঙ্গে তিনি আর বেশিদিন পেরে উঠবেন না৷ হাজার হোক, তাঁর শক্তি মানুষী, অপ্রাকৃত অপশক্তির সঙ্গে যুঝবার শক্তি তাঁর বেশি নেই৷ এই মরপৃথিবীর সঙ্গে তাঁর মায়ার বাঁধন আলগা হয়ে আসছে প্রতি মুহূর্তে৷ তাই সেদিন তিনি আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ধুলোর ঝড়ের সংকেত দিয়ে ডেকে এনেছিলেন তাঁর ভিটেয়৷’’

শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল৷ জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কী সেই শক্তি কাকা, যার জোরে সাধারণ মানুষী আত্মাও অমন মহাক্রুর মহাভৈরব মহাপৈশাচী পাপযোনির সঙ্গে সমান স্পর্ধায় রুখে দাঁড়াতে পারে?’’

‘‘ভালোবাসা ভব,’’ মোমবাতির আলোটা কাকার মুখে নরম হয়ে এল, ‘‘ভালোবাসা৷ নিজের স্ত্রী-পরিবারের প্রতি ভালোবাসা৷ যত্ন দিয়ে, স্নেহ দিয়ে, সর্বস্ব দিয়ে বড়ো করা সংসারের প্রতি ভালোবাসা৷ নিজের কাছের মানুষগুলোকে সুখী চাওয়ার প্রতি ভালোবাসা৷ জেনে রেখো ভব, ভালোবাসাই হল সবচেয়ে বড় তন্ত্র, সবচেয়ে বড় জাদু৷’’

কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে রইলাম৷ দেখলাম কাকার চোখের কোনায় জল চিকচিক করছে৷

লক্ষ্মীমণি কান্নাজড়ানো স্বরে বললেন, ‘‘কিন্তু বাবা, এই প্রেতযক্ষর হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় কী?’’

কাকা লক্ষ্মীমণিকে বললেন, ‘‘মা, আমি এই বিপদ আপনাদের থেকে উদ্ধার করতে পারি৷ কিন্তু সে বড়ো জটিল পথ, অতি সাংঘাতিক পুজো৷ তার উপচারও বিচিত্র এবং আয়োজনও বিপুল৷ পূজার আচার-আয়োজনে সামান্যতম ত্রুটিতে সংকল্পকারী সবংশে নির্বংশ হবে, পূজারিও বাঁচবে না৷ আমি পারি এই পূজা করতে, কিন্তু আপনি কি রাজি হবেন?’’

আগেরদিন সন্ধ্যায় কাকা জল ছিটিয়ে আসার পর বাড়ির গুমোট ভাব কেটেছে, কোনো ভয়ের ব্যাপারও ঘটেনি৷ লক্ষ্মীমণি কাকার পায়ে পড়ে গেলেন, ‘‘ছেলেমেয়েদের মুখ চেয়ে সব করতে পারি ঠাকুর৷ কিন্তু আমাদের যে বেশি টাকাপয়সা নেই!’’

কাকা আশ্বস্ত করলেন, ‘‘ভয় পাবেন না মা৷ আপনি তো অপরাধী নন, কেবল ভয়ানক বাস্তুদোষে এত কষ্ট পাচ্ছেন৷ দেখবেন, আপনার উপায়- উপচার ভগবান নিজে জুটিয়ে দেবেন৷’’

‘‘কী সেই উপায় ঠাকুর?’’ আকুলস্বরে প্রশ্ন করলেন লক্ষ্মীমণি৷

‘‘উপায় একটিই আছে মা, মাত্র একটিই উপায় আছে৷ সে হচ্ছে মা চণ্ডালকালীর পুজো৷ একমাত্র তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই প্রেতযক্ষ’র অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব৷

কিন্তু এই পুজো গৃহস্থের পক্ষে নিষিদ্ধ৷ একমাত্র পূর্ণাভিষিক্ত কৌল সাধক ছাড়া চণ্ডালকালীর পুজো আর কারও করার অধিকার নেই৷

আমি একজন কৌলসাধক মা, আমি করব এই পূজা৷ কিন্তু এর উপচার আপনাকে এনে দিতে হবে এবং সবকটি উপচার সম্পূর্ণ নিখুঁত হওয়া চাই৷ বিন্দুমাত্র বিচ্যুতিতে মহা অনর্থ হয়ে যাবে৷’’

ঠাকুরমশাই ইতস্তত করে বললেন, ‘‘কী কী লাগবে ঠাকুরমশাই৷ আমাকে বলুন, আমি দেখছি৷’’

কাকা একটা হাতে লেখা ফর্দ এগিয়ে দিলেন৷

সেই পুজোপচারের ফর্দ দেখে তিনজনেই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম৷ অর্ধেক গাছপালা আর লতার নামই শুনিনি! বিড়ঙ্গ, চাকুন্দেবীজ, কুড়, পুনর্নবা, খেতপাপড়া, গুঞ্জামূল আরও কত কী! শুধু কী তাই, তার প্রকারভেদ কত! ডালিমগাছে বেড়ে উঠেছে এমন গুলঞ্চলতা, মঘানক্ষত্রে তোলা হয়েছে এমন শ্বেতকুঁচের মূল, চিতিকাঁকড়ার ঘি, একাঙ্গুল পরিমাণ সর্পাস্থিকীলক, কালো মোষের পায়ের লোম এবং আরও অনেক কিছু৷ তার সঙ্গে অসময়ের ফলমূলাদি তো আছেই৷

আমাদের মুখ দেখে স্মিত হাসলেন মৈত্রমশাই, ‘‘আপনারা বৃথা চিন্তা করবেন না৷ যাঁর পূজা তিনিই করিয়ে নেবেন, আপনারা শুধু বিশ্বাসটুকু রাখবেন৷ আর কালকে অমাবস্যা, আমি কালই পূজায় বসব৷ ঠাকুরমশাই, তন্ত্রধারক কিন্তু আপনিই হবেন৷’’

আমরা চিন্তান্বিত ভাবে ঘরে ফিরলাম৷

* * *

তোমরা বললে বিশ্বাস করবে কি না জানি না, কাকাবাবুর কথা আশ্চর্যজনক ভাবে ফলে গেল৷

পরের দিন সকাল সকাল প্রাতঃকৃত্যস্নানাদি করে ঘরের বাইরে বেরিয়েছি, দেখি এক বৃদ্ধ ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে৷ দেখেই বোঝা যায় সমাজের দরিদ্রস্তরের মানুষ৷ আমাকে দেখেই প্রণাম ঠুকে ভারি কুণ্ঠাভরে বললেন, ‘‘আমি জেলেপাড়ার জগন্নাথ, তো বাবু, শুনলাম আপনাদের নাকি চিতিকাঁকড়ার ঘি চাই, কী যেন পুজোয় লাগবে? সে আমার কাছে ছিল গো বাবু, একটু খান নিয়ে এসেছি৷ হাজার হোক বাবার পুজো, সবার ভালো হবেক বটে৷ তবে পুজোটা যেন দেখতি পাই বাবু৷’’

ভগবানের পূজাদর্শনে সবার অধিকার, ভক্তের তো সর্বাগ্রে৷ কিন্তু সে-কথা বলার আগেই দেখি এক প্রৌঢ় দম্পতি ঢুকছেন৷ এসে আভূমিপ্রণত হয়ে বললেন, ‘‘আমরা বাইদ্যা-বাইদ্যানি গো বাবু৷ হুইনলাম তুমরা নাকি সাপের হাড় খুঁজতাসো? হেইডা দ্যাহো দেহি, চইলবাগ নাকি?’’ বলতে বলতেই সঙ্গে রাখা ঝুলি থেকে বার করে আনলেন বিশাল বড়ো এক সর্পাস্থিকীলকের মালা!

আমি অবাক হওয়ার আগেই দেখলাম ঠাকুরমশাই বেড়া ঠেলে ঢুকছেন৷ তাঁর মুখে বিহ্বলভাব, পেছনে লম্বা লাইন৷ আর সেই লাইনে দাঁড়ানো লোকেদের হাতে ছোটোবড়ো বিভিন্ন ঝুড়ি! ঠাকুরমশাই বিহ্বল স্বরে বললেন, ‘‘এসব কী হচ্ছে ভবতারণ?’’

তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই সেইসব ঝুড়ির দিকে চোখ গেল আর আমি আশ্চর্য হওয়ার শেষপ্রান্তে পৌঁছে গেলাম৷

তোমরা তো জানো, অলৌকিক জিনিসে এমনিতেই মানুষের আগ্রহ বেশি৷ তার ওপর সেকালে গ্রামেগঞ্জের নিস্তরঙ্গ জীবনে এসব ঘটনা ঘটা মানে চারিদিকে হইহই পড়ে যাওয়া৷ কিন্তু কী করে যে এক রাতের মধ্যে লোকমুখে খবর ছড়িয়ে পড়ল সে আমার কাছে আজও এক রহস্য৷ স্তম্ভিত হয়ে দেখলাম ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে যাঁরা এসেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই কিছু-না-কিছু পূজোপচার হাতে করে নিয়ে এসেছেন, কেউ খালি হাতে আসেননি আর আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এক জিনিস দুজনে আনেনি৷ এমন অলৌকিক ঘটনা জীবনে দুটি দেখিনি ভাই৷ সবাই বলছে তারা নাকি লোকমুখে কালী পুজোর কথা শুনে এসেছে, সবাই সে পুণ্যফলের এক কণা অংশ চায়৷

দেখে নিজে থেকেই হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো হয়ে এল৷ মায়ের কৃপা ছাড়া এ কী সম্ভব?

কিন্তু গোল বাধল দুপুরের পর থেকে৷

দুপুরে খাবার খেয়ে একটু গড়িয়ে নিচ্ছিলাম৷ ঘুমের চটকা ভাঙল মেঘের গুরুগম্ভীর ডাকে৷ তাকিয়ে দেখি বিকেল হয়ে এসেছে আর তার সঙ্গেই শুরু হয়েছে আকাশে মেঘেদের আনাগোনা৷ দেখতে দেখতে ঘন কালো মেঘের দল আকাশের বুক ছেয়ে ফেলল৷ আর তার দিকে তাকালে বুক কেঁপে ওঠে, এতই সর্বনাশী রুদ্রমূর্তি সেই মেঘের৷

সন্ধে নাগাদ নামল তুমুল বৃষ্টি৷ আর সেই বৃষ্টির সে কী দাপট! এক হাত দূরে কী আছে দেখা যায় না৷ মনে হল প্রকৃতি যেন তার রুদ্র আক্রোশের সবটুকু ঢেলে দিচ্ছে এই ক্ষুদ্র জনপদটির ওপর৷ মাঝে মাঝেই বজ্রপাতের হুংকারে কেঁপে উঠছে চারিদিক, আর মুহূর্তের আলোয় চোখের সামনে দেখছি বৃষ্টির দাপটে ক্রমশ কুঁকড়ে যাচ্ছে আমার চেনা এই গ্রামটি৷

রাত আটটা নাগাদ বৃষ্টির দাপট একটু কমে এলে একপ্রকার মরিয়া হয়েই ছাতা মাথায় বেরিয়ে পড়লাম ঠাকুরমশাইয়ের বাড়ির দিকে৷ আজ যদি পুজো না হয়, তাহলে তো মহা অনর্থ হয়ে যাবে!

ঠাকুরমশাইয়ের বাড়ি গিয়ে দেখি আর এক আশ্চর্য দৃশ্য৷ যারা যারা বিভিন্ন উপচার হাতে পুজো দিতে এসেছিল,তারা কেউ এত ঝড়জলেও ফিরে যায়নি৷ শান্ত মনে অপেক্ষা করছে ঠাকুরমশাইয়ের বাড়িতে৷ অকৃতদার ঠাকুরমশাই তাঁর ঘরদোর খুলে দিয়েছেন এই রবাহূত অতিথি-অভ্যাগতদের জন্য৷ মহিলারা ঘরের দখল নিয়েছেন, বিশেষ করে রান্নাঘরের৷ ইতিমধ্যেই আশেপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে রান্নার বাসনকোসন এসে গেছে আর এসে গেছে চাল, ডাল, আলু, পটল ইত্যাদি৷ সমবেত মহিলারা তাই দিয়েই চালে-ডালে খিচুড়ি রাঁধছেন৷ তাঁদের মধ্যে যেমন সেই সকালে দেখা বেদেনি আছেন, তেমনই আছেন ব্রাহ্মণবাড়ির সধবা মহিলারা৷

একটু পরেই দেখলাম মায়েদের দল হাতে হাতে সেই খিচুড়ি শালপাতার ডোঙায় তুলে দিচ্ছেন উপস্থিত অভ্যাগতদের হাতে৷ দৃশ্যটা দেখে চোখে জল চলে এল৷ ক্ষুধার্ত মানুষকে তৃপ্তিসহকারে খেতে দেখার মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ আছে৷ শাস্ত্রে বলে জ্ঞানদান নাকি সর্বোত্তম দান৷ আমি বলি ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার থেকে মহত্তম দান আর কিছুতে নেই৷

একটু পরেই কাকার ঘরের দরজা খুলে গেল৷ মৈত্রমশাই একটা লালরঙের ধুতি পরে বাইরে এসে দাঁড়ালেন৷ আমি দৌড়ে গেলাম ওঁর কাছে৷ বললাম, ‘‘কাকা, এত বৃষ্টিতে পুজো হবে তো?’’

কাকা একবার সমবেত জনতার দিকে তাকালেন৷ তারপর আমাকে বললেন, ‘‘ভগবানের চাইতে ভক্তের ভালোবাসার জোর বেশি ভবতারণ৷ আজ এত লোক এসেছে মায়ের পুজো দেখবে বলে৷ বেটির সাধ্য কী পুজো না নিয়ে যায়?’’

বলতে বলতেই দেখি সেই বেদেনি এক ডোঙা খিচুড়ি নিয়ে দৌড়ে এল কাকার কাছে৷ একগাল হেসে বলল, ‘‘অ ঠাউর, খিচড়িডা খাইয়্যা লও দেহি৷ না খায়্যা-দায়্যা পূজা করবা কেমুন কইর‌্যা?’’

চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কাকার চোখে দ্বিতীয়বার জল দেখলাম৷ তিনি ডোঙাটা হাতে তুলে মাথায় ঠেকিয়ে বললেন, ‘‘জয় মা, জয় মা! মা ভালোবেসে সন্তানের মুখে যা তুলে দেন, তাই প্রসাদ৷’’

সেই পাঁচমেশালি খিচুড়ি আমিও খেয়েছিলাম ভায়া৷ আহা, সে স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে, যেন অমৃত! পরে ঠাকুরমশাইকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এর কারণ৷ ঠাকুরমশাই হেসে বলেছিলেন, ‘‘ভক্তি ভব, ভক্তি৷ ভোগের খিচুড়ি আর সাধারণ খিচুড়ির ওই একটিই তফাত৷ ও স্বাদ দেবতার প্রতি নিজের ভক্তি উৎসর্গ করার স্বাদ, ও স্বাদ ভালোবাসার৷ ভালোবাসা আর পূজার মধ্যে কোনো তফাত নেই ভব, কোনো তফাত নেই৷’’

* * *

শেষমেশ কাকার কথাই ফলে গেল৷ কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল কাকার সেই ‘বেটি’র পুজো নেওয়ার ইচ্ছেটা আমাদের পুজো দেওয়ার ইচ্ছের থেকে বেশি বই কম না৷ রাত দশটা নাগাদ বৃষ্টি ধরে আসতে আমরা সদলবলে রওনা দিলাম লক্ষ্মীমণির বাড়ির দিকে৷

ঠিক মাঝরাতে লক্ষ্মীমণির বাড়ির পেছনে, ডোবাটার সামনে পুজো শুরু হল৷ কোনো মূর্তি নেই, কেবল মাটিতে একটি অষ্টদলপদ্মমণ্ডল যন্ত্র আঁকলেন কাকাবাবু৷ নিমকাঠ আর শ্মশান সংলগ্ন নদীর চরের বালি দিয়ে দিয়ে যজ্ঞের বেদি করা হল৷ ঠাকুরমশাই তন্ত্রধারক হলেন৷ আমি ব্রাহ্মণসন্তান বলে সঙ্গে রয়ে গেলাম এটা-ওটা এগিয়ে দেওয়ার জন্য৷ বাকি লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল৷ কাকা শুধু আর দুজনকে ডেকে নিলেন, চিতিকাঁকড়ার ঘি আনা সেই বৃদ্ধ জেলে আর সর্পাস্থিকীলক আনা বেদেকে৷ তাঁরা দুজনে জবুথবু হয়ে দাঁড়ালেন৷

কাকা প্রথমে ঋষিন্যাস তারপর করাঙ্গন্যাস, এসব শেষ করে পুজোয় বসলেন৷ উদাত্ত কণ্ঠে মন্ত্র আবৃত্তি করতে লাগলেন, অঞ্জনাদ্রেনিভাং দেবী শ্মশানালয়বাসদিনীম, রক্তনেত্রাং মুক্তকেশীং শুষ্কমাংসাতিভৈরবাম৷ পিঙ্গাক্ষীং বামহস্তেন মদ্যপূর্ণং সমাংসকং, সদ্যকৃত্তোশিরো দক্ষহস্তেন দধতীং শিবাম...

ভোর অবধি পুজো চলল৷ কাকা একবারও মন্ত্রোচ্চারণ থামাননি৷ যজ্ঞ চালিয়ে গেছেন আর একের পর সংগ্রহ করা পুজোপকরণ আহুতি দিয়ে গেছেন৷ আর সেসব এগিয়ে দিয়েছেন সেই অন্ত্যজশ্রেণির মানুষ দুজন৷

পুজো শেষে একটি মস্ত মাটির হাঁড়ি থেকে দামোদরের জল ঢেলে সেই যজ্ঞের আগুন নিভিয়ে দিলেন, যন্ত্রটি মুছিয়ে দিলেন৷ সেই জল, যজ্ঞের পোড়া কাঠ, ছাই, অজস্র বেলপাতায় সাজানো প্রসাদের কণা, অসংখ্য প্রসাদী ফুলের এক-একখানি পাপড়ি দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকে আঁচলে কোঁচড়ে করে নিয়ে গিয়েছিল৷ পূজাস্থলে যাতে ভবিষ্যতে কারও পা পড়ে অশুদ্ধ না হয়ে যায়, তাই কাকা পূজা বেদিতে একখানি বেলগাছ পুঁতে দিলেন৷

তবে আমার আশ্চর্য হওয়ার আরও বাকি ছিল৷ পুজো শেষ হওয়ার পর প্রসাদ দিতে গিয়ে সেই বেদে দম্পতি, সেই জেলে, পুজোপচার নিয়ে আসা আরও অনেক লোকজন, তাদের কোনো খোঁজই পেলাম না৷ যেন হঠাৎ করেই হাওয়ায় উবে গেছে লোকগুলো৷

কাকাকে কথাটা বললাম৷ তিনি তাঁর সেই ট্রেডমার্ক স্নিগ্ধ হাসিটা হেসে বললেন, ‘‘মা যে কখন তাঁর পুজোর আয়োজন নিজেই করে নেন সে কেই-বা জানে ভব৷ বাদ দাও বাবা, অত তর্কে কূটবিচারে কাজ নেই৷ শুধু জেনে রাখো যে স্বয়ং মহামায়া আজ আমাদের মুখে অন্ন তুলে দিয়ে গেছেন৷ এ সৌভাগ্য কোটিতে গুটিকের মেলে বাবা৷ আমরা ভাগ্যক্রমে সেই গুটিকয়েক৷’’

* * *

এর পরদিনই সেই গ্রাম ছেড়ে চলে আসি৷ কয়েকমাস পর একটি চাকরি পেয়ে উত্তরবঙ্গে চলে যাই৷ সেখানেই একদিন অফিসে চণ্ডীখুড়োর বড়োছেলে ফোন করলেন, খুড়োর মৃত্যুসংবাদ দিয়ে৷ এ-কথা সে-কথায় লক্ষ্মীমণিদের কথা জিজ্ঞেস করলাম৷ দাদা হেসে বললেন তারা ওই ভিটেতে বহাল তবিয়তে আছে৷ ওইদিনের পর আর কেউ কখনও ভয় পায়নি৷’’

গল্প শেষ হওয়ার পর বংশী জিজ্ঞেস করল, ‘‘ইনিই সেই কাকাবাবু না, যিনি আপনাকে সেই আসামের জঙ্গলে রক্ষা করেছিলেন?’’

চাটুজ্জেমশাই সামান্য হাসলেন, ‘‘হ্যাঁ, তিনিই বটে৷ সেবারেই কাকার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা৷ তার পরে অবশ্য আরও বেশ কয়েকবার হয়েছে, আর প্রত্যেকবারই খুব অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে৷ পরের গল্পটা শুনবে নাকি, অ্যাঁ?’’

* * *

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%