দেশনায়ক – ২

র‍্যাভেন শ’ কলেজিয়েট স্কুলে সুভাষচন্দ্র ১১০৯ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত পড়েছিলেন। ওই বছর তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে পাস করেন। এই ক’বছর তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কৈশোরের প্রথম অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও ঘটনাগুলি তাঁর প্রকৃতি ও চরিত্রকে গড়ে তুলেছিল। এই সময়ের তাঁর স্মৃতিচারণ, মা প্রভাবতী, মেজদাদা শরৎচন্দ্র ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু হেমন্তকুমার সরকারকে লেখা চিঠিগুলি পড়লে মনে হবে যে কিছুটা অস্বাভাবিক দ্রুতভাবে বয়ঃসন্ধিক্ষণ পেরিয়ে তিনি যৌবনে প্রবেশ করছিলেন। এমনকি মনে হতে পারে যে অপ্রাপ্তবয়সের এক কিশোর প্রবীণের মতো চিন্তাভাবনা ও আচরণ করছিল। সাধারণভাবে এরকম মনে হলেও সুভাষচন্দ্রের ক্ষেত্রে কিন্তু তা প্রযোজ্য ছিল না। কেননা, যেসব চিন্তা, প্রশ্ন ও বিশ্বাস মনে আসতে শুরু করেছিল তা তাঁর পরবর্তী জীবনেও দূর হয়নি। ওই প্রসঙ্গে আসার পূর্বে র‍্যাভেন শ’ কলেজিয়েট স্কুলে তাঁর ছাত্র জীবনের গোড়ার দু’-একটি ঘটনা ও অভিজ্ঞতার কথা জানা প্রাসঙ্গিক হবে।

পি.ই. স্কুলে সুভাষচন্দ্রের বংশমর্যাদার কোনও মূল্য ছিল না। পড়াশোনায় ভাল করার চেয়েও খেলাধুলায় ভাল হাওয়ার কদর ছিল বেশি। কিন্তু নতুন স্কুলে তাঁর বংশপরিচয়, ইংরাজি স্কুলে পড়াশোনার জন্যে তাঁর ইংরাজির জ্ঞান, খুব ভাল ছাত্র বলে সুনাম সুভাষচন্দ্রকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল। এর ফলে তাঁর আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বেড়েছিল। এরই সঙ্গে তিনি এক বড় সমস্যা ও অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিলেন। ইংরাজি স্কুলে পড়ায় বাংলাভাষা, ব্যাকরণ বা বানানে তিনি ছিলেন খুবই কাঁচা। এই নিয়ে ক্লাসের ছেলেরা হাসাহাসি ও বিদ্রুপ করত। কিন্তু এইসব বিদ্রুপ ও অপমানের জবাব দিতে তিনি লুকিয়ে লুকিয়ে বাংলা শেখায় মন দেন। তারপর বার্ষিক পরীক্ষায় সবাইকে অবাক করে তিনি বাংলা পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পান। এই জিদ ও আত্মবিশ্বাস ছিল সুভাষচন্দ্রের চরিত্রের এক বৈশিষ্ট্য।

র‍্যাভেন শ’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বেণীমাধব দাস। প্রথম দেখার দিন থেকেই বেণীমাধববাবু সুভাষচন্দ্রকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব, আদর্শ-নিষ্ঠ চরিত্র, নৈতিক মূল্যবোধ কিশোর সুভাষচন্দ্রের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তখন তাঁর বয়স মাত্র বারো। হেডমাস্টার মশাই নিচু ক্লাসে পড়াতেন না বলে তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র হবার সুযোগ সুভাষচন্দ্র বেশিদিন পাননি। বেণীমাধববাবু বদলি হয়ে যান। কিন্তু প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব দাসকে সুভাষচন্দ্র কোনওদিন ভুলতে পারেননি। সুভাষচন্দ্রের মনে তিনি এক স্থায়ী দাগ রেখে গিয়েছিলেন। বেশ কিছুকাল তাঁর সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের পত্রালাপ ছিল। বেণীমাধববাবুর কাছে তিনি আরও এক শিক্ষা পেয়েছিলেন। সেটি হল, প্রকৃতি প্রেম ও সৌন্দর্য বিচার। রামায়ণ, মহাভারত, মহাকবি কালিদাসের সাহিত্য, ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা পড়ে ও তার মর্ম উপলব্ধি করে তিনি গভীর আনন্দ পেতেন। আর, আশ্চর্যের কথা হল যে সংস্কৃত কাব্য-সাহিত্য কিশোর সুভাষ পড়তেন মূল সংস্কৃতে। সংস্কৃত ভাষা, সাহিত্য, হিন্দু ধর্মশাস্ত্র বিষয়ক গ্রন্থ মাত্র পনেরো-ষোল বছর বয়সের মধ্যে তিনি কত গভীরভাবে পড়েছিলেন ও তার ফলে তাঁর মনে কী রকম চিন্তা-ভাবনার আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল তার পরিচয় পাই তাঁর মাকে লেখা ওই সময়ের কয়েকটি চিঠিতে।

সুভাষচন্দ্র বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ও অন্যান্য লেখা নিশ্চয় পড়েছিলেন খুব ভাল করে। কিন্তু কখন তিনি প্রথম বঙ্কিম সাহিত্য পড়েন তা জানতে কৌতূহল হয়। কেননা, মাত্র পনেরো বছর বয়সে দুর্গাপূজার সময় মাকে চিঠিতে পুজোর জাঁকজমক সম্বন্ধে লিখছেন, “জাঁকজমকে প্রয়োজন কি? যাঁহাকে আমরা ডাকি—তাঁহাকে যদি প্রাণ খুলিয়া গদগদ কণ্ঠে ডাকিতে পারি তাহা হইলে যথেষ্ট হইল; আর অধিক কি প্রয়োজন? যে পূজায় আমরা ভক্তি-চন্দন ও প্রেম-পুষ্প ব্যবহার করিতে পারি তাহাই জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পূজা। জাঁকজমকের সম্মুখে ভক্তি পলায়ন করে। এবার একটা দুঃখ রহিয়া গেল। সেটা বড় বেশি দুঃখ—সাধারণ দুঃখ নহে। এবার দেশে যাইয়া সেই ত্রৈলোক্যপূজ্যা সর্বদুঃখহারিণী, মহিষাসুরমর্দিনী জগন্মাতা দুর্গাদেবীর সর্বাভরণভূষিতা, নানা সাজসজ্জিতা, দেদীপ্যমানা জ্যোর্তিময় মূর্তি দর্শন করিয়া নয়ন সার্থক করিতে পারিলাম না।” অবিশ্বাস্য যে মাত্র তিন বছর আগে এই কিশোরই বাংলা প্রায় লিখতেই জানত না। তার বাংলা রচনা পড়ে ক্লাসের সহপাঠীরা হাসিঠাট্টা বিদ্রূপ করত। অল্পদিনের মধ্যেই বাংলা ও সংস্কৃত ভাষা সে এমন রপ্ত করেছিল যে মূল সংস্কৃত মহাকাব্য দু’টি ও কালিদাসের রচনা পড়তে পারত। মাকে পরম বিজ্ঞের মতো পরামর্শ দিত, “বসুমতীর আপিসে শঙ্করাচার্যের সমুদয় স্তোত্র খুব সস্তায় বিক্রয় হইতেছে। একটি পুস্তকে তাঁহার সব স্তোত্রই আছে এবং মূল্য কেবল বারো আনা কিংবা ১ টাকা। এ সুযোগ ছাড়িবেন না। কঞ্চিমামাকে বলিবেন একটি ক্রয় করিয়া আনিতে।” একই চিঠিতে সুভাষচন্দ্র মাকে জানিয়েছেন তিনি নিরামিষাশী হতে চান কারণ, শাস্ত্রকাররা ‘অহিংসা পরমো ধর্মঃ’ বলেছেন। স্বয়ং ঈশ্বরও এই কথাই বলেছেন। “আমাদের কি অধিকার আছে যে আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টি নষ্ট করিব? তাহাতে কি ঘোর পাপ হয় না?” ঈশ্বর চিন্তা ও ঈশ্বর নির্ভরতা কিশোর সুভাষের জীবনে তখন প্রবল হয়ে উঠেছে। মাকে অন্য এক চিঠিতে লিখছেন, “জন্মমৃত্যু লইয়া এ জীবন—তাহাতে একমাত্র সার জিনিস—হরিনাম। তাহা না করিতে পারিলে জীবন নিরর্থক।” “দয়াময়” ঈশ্বরের করুণায় তাঁর অটুট বিশ্বাস। “ভীষণ পাপের তাণ্ডব নৃত্যের ভিতরেও তাঁর দয়ার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁহার দয়ার আদিও নাই অন্তও নাই।”

স্কুলের ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর মনে গভীর অধ্যাত্মচেতনা দেখা দিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতবর্ষ “ভগবানের বড় আদরের স্থান”। এই মহাদেশে লোকশিক্ষা দানের জন্যে যুগে যুগে ভগবানের আবির্ভাব হয়েছে। এই বিশ্বাসের উৎসে ছিল গীতার দর্শন ও শিক্ষা। তাঁর তৎকালীন চিঠিপত্রে তা সুস্পষ্ট। গীতার প্রখ্যাত শ্লোক উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছিলেন, “কার্যে আমাদের অধিকার আছে—কার্য আমাদের কর্তব্য—কিন্তু ফল তাঁহার—আমার নয়।” অন্য কেউ এত অল্প বয়সে এই ধরনের কথাবার্তা বললে বা চিন্তা করলে স্বভাবতই সন্দেহ হত যে অপরিণত মন ও বুদ্ধির ফলে গুরুপাক শাস্ত্রগ্রন্থ তাঁর হজম হয়নি। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের প্রতিভা ও মৌলিক চিন্তার স্ফুরণ হয়েছিল বাল্যবয়স থেকেই। কালক্রমে ওই প্রতিভা ও ধীশক্তি পূর্ণতা লাভ করেছিল। তাঁর সমগ্র জীবন, মনন ও কর্মকে আবৃত ও নিয়ন্ত্রণ করেছিল।

সুভাষচন্দ্রের জীবন ও চিন্তায় স্বদেশ ও অধ্যাত্মচেতনা, দেশপ্রেম ও ঈশ্বর প্রেমের এক অপূর্ব বিচিত্র সমম্বয় ঘটেছিল। ছাত্র জীবনেই ঈশ্বর বিশ্বাস ও অন্বেষণ, মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালবাসা, মাতৃভূমিকে জানা ও আবিষ্কারের ইচ্ছা তাঁর মধ্যে প্রবলভাবে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু কলকাতার বসু পরিবারে বাড়িতে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন ও বিপ্লবী কার্যকলাপ তেমন কোনও আগ্রহ-উৎসাহ সৃষ্টি করেনি। বরং বাড়িতে রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ছেলেদের মনে বাইরের রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনার তাপ যে একেবারেই লাগেনি তা নয়। তারা কাগজে বিপ্লবীদের যেসব ছবি বেরত তা কেটে পড়ার ঘরের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখত। কিন্তু একবার এক আত্মীয় পুলিশ অফিসার ওইসব ছবি দেখে জানকীনাথকে বলায় তিনি সব ছবি সরিয়ে দেন। এতে ছেলেরা খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিল। ১৯১১ সালের ১১ আগস্ট শহীদ ক্ষুদিরামের আত্মদানের দিন ছাত্রদের গণ-অনশনের নেতৃত্ব তিনি দিয়েছিলেন, এই ঘটনার কোনও উল্লেখ সুভাষচন্দ্রের আত্মজীবনীতে কিন্তু নেই। সহপাঠীদের দেশের বন্ধন-মুক্তির সংগ্রামকে শ্রদ্ধার চোখে দেখাতে শিখিয়েছিলেন তারও উল্লেখ নেই। ‘রায়বাহাদুর’ জানকীনাথ বসুর ছেলেদের মধ্যে একটা রাজভক্তির ভাব ছিল। সুভাষচন্দ্র নিজেই ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক নিয়ে একটি রচনা প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিলেন। পঞ্চম জর্জ কলকাতায় এলে বসু পরিবারের সবাই বেশ উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন।

সুভাষচন্দ্রের এই মানসিকতা বেশি দিন থাকেনি। তাঁর প্রথম রাজনৈতিক হাতেখড়ি হয় তাঁর সমবয়সী এক ছাত্রের কাছে। সে নিজে একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে কলকাতায় যুক্ত হয়েছিল যাদের উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক উন্নতি ও গঠনমূলক সমাজসেবা। এঁদের নেতা ছিলেন সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাত্রটির নাম হেমন্তকুমার সরকার, যার সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সুভাষের মনে নতুন বন্ধুর কথাবার্তা আলোড়ন সৃষ্টি করে। ধর্মীয় আবেগ ও স্বদেশপ্রেম দু’টিই তাঁর মধ্যে বাড়তে থাকে। দেশের ইতিহাস, পরিবেশ, সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি, সমস্যা ও দুরবস্থার কথা তিনি গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। নানা প্রশ্ন, সংশয় ও চিন্তাভাবনার ভিড় হতে থাকে তাঁর মনে। আর এসবের প্রকাশ ঘটে তাঁর মা ও মেজদাকে লেখা বিভিন্ন চিঠিতে।

রাঁচি থেকে সুভাষচন্দ্র মাকে লেখেন, “মা, আমার মনে হয় এ যুগে দুঃখিনী ভারতমাতার কি একজন স্বার্থত্যাগী সন্তান নাই—মা কি প্রকৃতই এত হতভাগ্যা!” লক্ষণীয় হল যে এই চিঠিতে সুভাষের গর্ভধারিণী ‘মা’ ও জন্মভূমি ‘মা’ একই ভাবে সম্বোধিত হয়েছেন। সুভাষের আশঙ্কা ছিল যে তাঁর এই স্বদেশপ্রেমের আবেগময় প্রকাশ মাকে উদ্বিগ্ন করে তুলবে। তিনি তাঁকে রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে নিষেধ করবেন। তাই মা’র কাছে সন্তান আবেদন করেছে যেন মা তাকে দেশের সেবায় ঝাঁপ দিতে নিবৃত্ত না করেন। তিনি লিখছেন, “মা যদি সন্তানকে বলেন—‘তুই স্বার্থ লইয়া বসিয়া থাক’—তবে আর কি! বুঝিব সন্তানই হতভাগ্য! তাহা হইলে বুঝিতে হইবে এই কলি যুগে ভাল লোকের আর আবিভাব নাই।” মাকে তিনি স্মরণ করিয়েছেন অহল্যাবাঈ, মীরাবাঈ, দুর্গাবতীর কথা। বলেছেন যে, মাতৃ-উপদেশ ও মাতৃশিক্ষা সন্তানের যত উপকার ও উন্নতি করতে পারে তা আর কিছুতেই সম্ভব নয়। চিঠির শেষে লিখেছেন, “আমি যেন চিরকালই সকলের সেবক হয়ে থাকতে পারি।” শুধুমাত্র ভাবাবেগ ও অপরিণত মনের উচ্ছ্বাসে সুভাষচন্দ্র ওই রকমের চিঠি লিখছিলেন না। এর পিছনে ছিল তাঁর গভীর আত্মপ্রত্যয় ও আদর্শ কার্যকর করার দৃঢ় সংকল্প। তিনি তাঁর পরীক্ষায় সাফল্যের জন্যে যে বৃত্তি প্রাপ্য ছিল তার সবটাই পরার্থে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত করেন। তিনি তাঁর সঙ্কল্পের কথা জানিয়ে মাকে লেখেন, “আমি টাকাকে বড় ভয় করি, কারণ টাকাই যত অনর্থের মূল।”

র‍্যাভেন শ’ স্কুলে পড়ার সময়ই সুভাষচন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে গভীর আগ্রহী ও শ্রদ্ধাশীল হতে শুরু করেন। তাঁর সমগ্র জীবনে এঁদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। কলকাতায় কলেজ জীবন শুরু হলে এই প্রভাব ও অনুপ্রেরণা আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। স্কুলে ছাত্রাবস্থায় হেমন্তকুমার সরকারের মাধ্যমে তিনি কলকাতার যে আদর্শবাদী গোষ্ঠীর সংস্পর্শে এসেছিলেন তাঁদের কেউ কেউ শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯১৪ সালে। সুভাষ ও তাঁর কয়েকজন সহপাঠী শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন কবিকে দর্শন করতে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁদের শুধু দেখাই হয়নি, রবীন্দ্রনাথ গ্রামের পুনর্গঠন সম্বন্ধে তাঁদের কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। ওই প্রসঙ্গে সুভাষ বলেছেন যে, তাঁর কথা তখন তিনি বুঝতে পারেননি। পরে যত দিন গেছে ততই বুঝেছিলেন ওই উপদেশের মূল্য কতটা। সুভাষচন্দ্র নিজে বললেও কথাটা বোধহয় সম্পূর্ণ ঠিক নয়। সুভাষ এই প্রথম দর্শনের পূর্বেই কবিগুরুর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ‘ঋষি কবি’র কবিতা ও অন্যান্য লেখা তিনি পড়তে শুরু করেছিলেন। অত অল্পবয়সে রবীন্দ্রনাথের কবিতার অর্থ তাঁর সম্পূর্ণ বোধগম্য না হলেও তিনি কটক থেকে শরৎচন্দ্র বসুকে লেখেন, “আমার বিশ্বাস একদিন রবি ঠাকুরের কবিতাগুলির মর্ম আমি উপলব্ধি করিতে পারিব।” বালক সুভাষ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার লাভের সংবাদে আনন্দে ও গর্বে আত্মহারা হয়েছিলেন। কবির স্বদেশে উপযুক্ত সম্মান স্বীকৃতির কার্পণ্য ও বিদেশে অত বড় সম্মান প্রাপ্তি প্রসঙ্গে তাঁর অন্তর্বেদনার কথা জানিয়ে সুভাষচন্দ্র তাঁর মেজদাদাকে লেখেন, “আমি আত্ম-অনুশোচনায় পীড়িত বোধ করি যখন ভাবি, বাংলা দেশ তাঁহার প্রতিভার প্রতি কত উদাসীন ছিল। যখন ভাবি তাঁর অমানুষিক প্রতিভাকে অস্বীকারের অন্ধকারে কতদিন আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল; অথচ বিদেশীরা, যাহারা বিজাতীয় ভাষাভাষী, যাহাদের চিন্তা ও অনুভূতি কোনও কোনও ক্ষেত্রে আমাদের সম্পূর্ণ বিরোধী, তাহারাই তাঁহার প্রতিভাকে রাহুমুক্ত করিয়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবির আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে।”

শান্তিনিকেতনের পরিবেশ, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শও সুভাষচন্দ্রের শিক্ষার উদ্দেশ্য ও সার্থকতা সম্পর্কে মনোভাবকে প্রভাবিত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্রের মধ্যে পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্ক উত্তরোত্তর গভীর হয়েছিল। একেবারে কৈশোর কাল থেকেই সুভাষের জীবন ও মননে রবীন্দ্র প্রভাব ও প্রেরণা কতখানি প্রবল হয়ে উঠছিল তা শিক্ষার আদর্শ সম্পর্কে স্কুলছাত্র সুভাষচন্দ্রের একটি চিঠি থেকে বোঝা যায়। এই চিঠিতেই তিনি তাঁর মাকে তাঁর বৃত্তির টাকা পরার্থে ব্যয় করার সঙ্কল্পের কথা জানিয়েছিলেন। তার আগে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ প্রসঙ্গে একটি কথা বলা প্রয়োজন।

‘ভাল ছেলে’ কাকে তিনি মনে করেন এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মরা মন নিয়ে পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীর ঊর্ধশিখরে’ যারা ওঠে তাদের তিনি ভাল ছেলে বলে স্বীকৃতি দেন না। কারণ, এই ছেলেরা ‘পদবি অধিকার করে, জগৎ অধিকার করে না।’ রবীন্দ্রনাথ চাইতেন শান্তিনিকেতনে ছাত্ররা ‘পরিপূর্ণভাবে’ বাঁচার শিক্ষা পাবে। জগৎ সম্পর্কে তারা উৎসুক হয়ে থাকবে—‘সন্ধান করবে, পরীক্ষা করবে, সংগ্রহ করবে।’ তাদের শিক্ষাদান করবে এমন সব শিক্ষক, “যাঁদের দৃষ্টি বইয়ের সীমানা পেরিয়ে গেছে, যাঁরা চক্ষুষ্মান, যাঁরা সন্ধানী, যাঁরা বিশ্বকুতূহলী, যাঁদের আনন্দ প্রত্যক্ষজ্ঞানে এবং সেই জ্ঞানের বিষয় বিস্তারে, যাঁদের প্রেরণাশক্তি সহযোগী মণ্ডল সৃষ্টি করে তুলতে পারে।” সুভাষচন্দ্র একটি চিঠিতে প্রকৃত শিক্ষা সম্বন্ধে তাঁর ধারণা সম্পর্কে লেখেন, “প্রথম হই আর লাস্ট হই, আমি স্থির রূপে বুঝিয়াছি লেখাপড়া ছাত্রের প্রধান উদ্দেশ্য নহে—বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চাপ্রাস’ পাইলে ছাত্রেরা আপনাকে কৃতার্থ মনে করে—কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চাপ্ৰাস’ পাইলেও যদি কেহ প্রকৃত জ্ঞান লাভ না করিতে পারে—তবে সে শিক্ষাকে আমি ঘৃণা করি। তাহা অপেক্ষা মূর্খ থাকা কি ভাল নয়? চরিত্র গঠনই ছাত্রের প্রধান কর্তব্য…কার্যই জ্ঞানের পরিচায়ক। বই পড়া বিদ্যাকে আমি সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা করি। আমি চাই চরিত্র-জ্ঞান-কার্য। এই চরিত্রের ভিতরে সব ভগদ্ভক্তি, স্বদেশপ্রেম,—ভগবানের জন্য তীব্র ব্যাকুলতা—সবই যায়। বই পড়া বিদ্যা তো অতি সামান্য তুচ্ছ জিনিস—কিন্তু হায়! কত লোকে তাহা লইয়া কত অহঙ্কার করিয়া থাকে।”

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তার মূল সুর কিশোর সুভাষের শিক্ষা সম্বন্ধে মনোভাবে সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের সংবেদনশীল মনে রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও আরও দু’জনের প্রভাব পড়েছিল। এই দু’জন হলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দ। ‘চাপ্রাস’ কথাটির ব্যবহার ও ভগবানের প্রতি ‘তীব্র ব্যাকুলতা’ যেমন শ্রীরামকৃষ্ণের বাণীর ইঙ্গিত দেয়, তেমনি স্বদেশপ্রেম ও চরিত্রের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দান স্বামী বিবেকানন্দের বাণীর সুনিশ্চিত অনুরণন। শ্রীরামকৃষ্ণ-স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারা ইতিমধ্যেই সুভাষচন্দ্রের মনকে উদ্বেল করে তুলেছিল। তিনি তাঁর “জীবন জিজ্ঞাসার” উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও বাণীতে।

সকল অধ্যায়
১.
দেশনায়ক – ১
২.
দেশনায়ক – ২
৩.
দেশনায়ক – ৩
৪.
দেশনায়ক – ৪
৫.
দেশনায়ক – ৫
৬.
দেশনায়ক – ৬
৭.
দেশনায়ক – ৭
৮.
দেশনায়ক – ৮
৯.
দেশনায়ক – ৯
১০.
দেশনায়ক – ১০
১১.
দেশনায়ক – ১১
১২.
দেশনায়ক – ১২
১৩.
দেশনায়ক – ১৩
১৪.
দেশনায়ক – ১৪
১৫.
দেশনায়ক – ১৫
১৬.
দেশনায়ক – ১৬
১৭.
দেশনায়ক – ১৭
১৮.
দেশনায়ক – ১৮
১৯.
দেশনায়ক – ১৯
২০.
দেশনায়ক – ২০
২১.
দেশনায়ক – ২১
২২.
দেশনায়ক – ২২
২৩.
দেশনায়ক – ২৩
২৪.
দেশনায়ক – ২৪
২৫.
দেশনায়ক – ২৫
২৬.
দেশনায়ক – ২৬
২৭.
দেশনায়ক – ২৭
২৮.
দেশনায়ক – ২৮
২৯.
দেশনায়ক – ২৯
৩০.
দেশনায়ক – ৩০
৩১.
দেশনায়ক – ৩১
৩২.
দেশনায়ক – ৩২
৩৩.
দেশনায়ক – ৩৩
৩৪.
দেশনায়ক – ৩৪
৩৫.
দেশনায়ক – ৩৫
৩৬.
দেশনায়ক – ৩৬
৩৭.
দেশনায়ক – ৩৭
৩৮.
দেশনায়ক – ৩৮
৩৯.
দেশনায়ক – ৩৯
৪০.
দেশনায়ক – ৪০
৪১.
দেশনায়ক – ৪১
৪২.
দেশনায়ক – ৪২
৪৩.
দেশনায়ক – ৪৩
৪৪.
দেশনায়ক – ৪৪
৪৫.
দেশনায়ক – ৪৫
৪৬.
দেশনায়ক – ৪৬
৪৭.
দেশনায়ক – ৪৭
৪৮.
দেশনায়ক – ৪৮
৪৯.
দেশনায়ক – ৪৯
৫০.
দেশনায়ক – ৫০

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%