ব্ল্যাক লিস্ট – ১০

কাজী আনোয়ার হোসেন

দশ

সিয়েরা নেভাডার দক্ষিণের ঢালু জমি বেয়ে উঠে গেলে পৌঁছে যাওয়া যায় সোল ই নিয়েরেতে। প্রাডো লানোর নিচের অংশে হোটেল সিয়েরা নেভাডায় স্বামী ও স্ত্রী হিসেবে দামি এক সুইট ভাড়া নিয়েছে রানা ও মারিয়া। ওদের ঘরের চওড়া জানালা দিয়ে পরিষ্কার দেয়া যাচ্ছে তুষারে ছাওয়া স্কি রান।

বোরেগুইলাসের ঢালু বরফে ঢাকা স্কি রান নিচে নেমে মাঝখানে দু’ভাগ হয়ে গেছে পিকাচো দে ভেলেটা ও প্রাডো লানোতে। প্রাডো লানোর কাছে এসে শেষ হয়েছে নিচের অংশের কেবল-কারের স্টেশন। ওপরে উঠে আসার কেবল- কারের স্টেশন নতুন করে শুরু হয়েছে বোরেগুইলাস থেকে। ওখানেই আছে কেবল-কারের ইঞ্জিন-রুম।

বোরেগুইলাস থেকে প্রাডো লানো পর্যন্ত সমান্তরাল দুই গিরিখাতে স্কি করার জন্যে চমৎকার তুষারে ভরা ঢালু জমি। তার মাঝে আছে গ্র্যানিট ও মিকা পাথরের শৈলশিরা। প্রচুর তুষারপাত হলেও ওখানে নাক তুলেছে ছোরার মত কালো সব ধারাল পাথর।

প্রধান গিরিখাদের ওপরে ঝুলতে ঝুলতে প্রাডো লানো থেকে বোরেগুইলাস পর্যন্ত উঠে এসেছে কেবল-কার। ওদিকের তুষারের স্কি রান নতুন সব স্কিয়ারের জন্যে উপযোগী। পুবের গিরিখাতে স্কি করে নেমে যাওয়া অনেক বেশি কঠিন।

হোটেলের ব্যালকনির চেয়ারে বসে পুরো স্কি রান দেখতে পাচ্ছে রানা। সাঁই-সাঁই করে নিচে নেমে যাচ্ছে একদল স্কিয়ার। আপাতত স্কি করার ইচ্ছে নেই রানার। নিজের কাভার পোক্ত করার জন্যে স্কিয়ারদের দেখিয়ে হাতের ক্যানন এইট-ফিফটি এমএম এসটিএম লেন্সের ওইএস নাইণ্টিডি থার্টি-টু এমপি ডিএসএলআর দিয়ে ব্যালকনি থেকে তুলছে কিছু ছবি। এ-ক্যামেরায় কিছু কারিগরি ফলিয়ে তারপর ওর হাতে তুলে দিয়েছেন বিসিআই-এর টেকনিকাল ডিপার্টমেন্টের বর্তমান হেড পাগলাটে বিজ্ঞানী শামশের আলী।

ম্যালাগা থেকে সোল ই নিয়েরে পৌছুবার দীর্ঘ যাত্রা ছিল বিরক্তিময় ও ক্লান্তিকর। হোটেলে নিজের ঘরে ঢুকে জুতো খুলে আরামদায়ক বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছে রানা। কিন্তু নানান দুশ্চিন্তায় এল না একফোঁটা ঘুম। জেগে থেকে চোখ বুজে ভাবতে লাগল গত ক’দিনের ঘটনাগুলো।

দু’দিন আগে ইয়টে খুন হয়ে গেছে রোমিয়ো মোরেলির ডাবল। লোকটা মারা গেছে কিউলেক্সের হাতে। তারপর জন কার্সন আর ক্যাথির সঙ্গে দেখা হলেও কোন কিছুই ঘটেনি। এরই ভেতরে কয়েকবার বন্ধু বার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে রানা। তবে বার্টির হাত ঘুরে কোন মেসেজ আসেনি।

এদিকে জরুরি কাজে বাংলাদেশে ফিরে গেছেন বিসিআই চিফ। অবশ্য চোখ রেখেছেন এই মিশনের ওপরে। গতকাল সকালে ম্যালাগায় রানার স্মার্টফোনে এনক্রিপটেড মেসেজ পাঠিয়েছেন: বিএসএস চিফ লংফেলোর কাছ থেকে সিআইএ-র চিফ জানতে পেরেছে, আমেরিকান ও ইতালিয়ান মাফিয়ার বিরুদ্ধে লড়ছ তুমি। তাই তাদের এজেন্ট জন মিউলারকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিলেও তোমার ওপরে জারি করা মৃত্যু-পরোয়ানা আপাতত প্রত্যাহার করেছে তারা।

এবার তুমি চেষ্টা করবে. সরাসরি মোরেলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তার দেয়া দরকারি তথ্য আমাদের জন্যে খুব জরুরি। মনে করি না হঠাৎ করে পিছিয়ে য স। এলিনা পার্কারসনের মাধ্যমে লোকটা যোগাযোগ করবে, সেজন্যে অপেক্ষা করো।

আমরা জেনেছি কিউলেক্স এখন আর ম্যালাগায় নেই। ভুলেও তার পিছু নেবে না। চোখ খোলা রাখো তার জন্যে।

পরের মেসেজে তিনি লিখেছেন:

আগের মতই বহাল আছে পারস্পরিক চুক্তি। সোল ই নিয়েরেতে তুমি দেখা করবে মোরেলির সঙ্গে।

এদিকে আমরা খোঁজ নিয়েছি এমআই-ফাইভে। তারা জানিয়ে দিয়েছে, জন কার্সন নামে কোন এজেন্ট নেই তাদের। ছদ্মনাম ও নকল পরিচয় ব্যবহার করছে সে। ওদিকে লংফেলো বলেনি কার্সন ওর এজেন্ট নয়। বিএসএস চাইছে না মিশন শেষ হওয়ার আগে তার ব্যাপারে কিছু করো তুমি। লোকটার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।

জানা গেছে কিউলেক্স বেশ কয়েক বছর ধরেই মাফিয়ার হয়ে খুন করছে। এ ছাড়া নানান দেশের অপরাধীদের জন্যে লাখ লাখ ডলারের বিনিময়ে মানুষ খুন করে সে।

আমরা ক্যাথি মোনালিসার বিষয়ে কোন ধরনের তথ্য পাইনি। আগে কখনও এসপিয়োনাজ, কাউন্টার- এসপিয়োনাজ বা আণ্ডার-কাভার এজেন্ট হিসেবে কোথাও তার কোন রেকর্ড নেই। স্প্যানিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মেয়েটা বোধহয় তাদের দেশের কেউ নয়। তার ফ্রেঞ্চ বা ইতালিয়ান হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

আরও জেনেছি, মেক্সিকোর এনসেনাডায় তোমাদের ওপরে যে স্পাইপিং করা হয়েছে, সেই একই সময়ে ওখানে ছিল কিউলেক্স। পরে তোমাদের পিছু নিয়ে আলাদা এক বিমানে চেপে ইউরোপে ফিরে এসেছে সে।

এরপর আর কোন মেসেজ দেননি বিসিআই চিফ।

গতকাল দুপুরে ম্যালাগায় মারিয়াকে নিয়ে হোটেলের লবিতে নেমেছে রানা, এমন সময় এল বার্টির ফোন। রানা হ্যালো বলার আগেই বলল সে, ‘বিসিআই-এ তোর বসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে নোবলম্যান। কথা অনুযায়ী তোদের যেতে হবে সোল ই নিয়েরেতে।’

‘ঠিক আছে,’ বলেছে রানা।

‘তাকে যেন না খুঁজিস, সেজন্যে অনুরোধ করেছে। মাঝরাতে ট্রাট্টু নামের একজন যাবে কেবল-কার ইঞ্জিন- রুমে। নোবলম্যানের সঙ্গে তোর সাক্ষাৎকারের সময় আর জায়গা জানিয়ে দেবে সে। প্রথম আর দ্বিতীয় মিটিঙে মারিয়াকে সঙ্গে না নিতে অনুরোধ করেছে নোবলম্যান।’

‘বুঝলাম।’

‘গুড লাক, কিং।’

‘এক মিনিট,’ বন্ধু ফোন রেখে দেয়ার আগেই বলেছে রানা। ‘এলিনা এখন কেমন আছে?’

‘সুস্থ হয়ে উঠছে।’

‘তা হলে সে-ও নিশ্চয়ই রিসোর্টে যাবে?’

‘সেটা এখনও আমরা জানি না। ডাক্তার গঞ্জালেস এখনও তাকে ক্লিনিক থেকে ছেড়ে দেয়নি। কবে ছাড়বে, সেটাও বলেনি।’

‘জন কার্সনের ব্যাপারে নতুন কিছু জানা গেল?’

‘এখনও না।’

‘আর ক্যাথি মোনালিসা?’

‘তার ব্যাপারেও কোন ইনফরমেশন নেই।’

‘তুই দেখি সারাদিন মাছি মেরে মেরে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিস!’

‘কী যে বলিস!’ হাসল বার্টি। ‘আরও জরুরি কাজ আছে। ওটা হচ্ছে: মনে মনে এলিনা পার্কারসনের সঙ্গে প্রেম করা!’

‘রাখ্ তো তোর ফোন!’ কল কেটে পকেটে স্মার্টফোন রেখে দিয়েছে রানা।

.

বিকেলে স্কি প্যান্ট, শার্ট ও সোয়েটর পরে নিল রানা। এখনও তুষারে ভরা ঢালু পথে স্কি করছে অনেকে। পুরুষদের পরনে লাল জ্যাকেট, মেয়েদের সবুজ জ্যাকেট। একেবারে নিচের ঢালে নেমে যাচ্ছে তারা। বোরেগুইলাস পার করে দ্বিতীয় ‘গিরিখাদ ধরে নামছে ওয়েদারকক লক্ষ্য করে। চলাচল করছে কেবল-কার। পাশ কাটাচ্ছে পরস্পরকে। আরোহী নিয়ে ওপরে যাচ্ছে, নেমে আসছে খালি পেটে। চোখ তুলে ইঞ্জিনরুমের দিকে চেয়ে রোমিয়ো মোরেলির কথা ভাবল রানা। লোকটার চেহারা চেনা থাকলে আশপাশের হোটেলে খোঁজ নেয়া যেত। ওদের এই হোটেল খুব বড় নয়। একবার লবিতে বসে চোখ রাখবে নাকি লোকটার জন্যে?

না, থাক।

এরই ভেতরে খুন হয়ে গেছে একজন লোক। এমনিতেই জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে মোরেলি। সিকিউরিটির বিষয়টা তার জন্যে খুব জরুরি।

সুইটে পাশের ঘরের দরজায় টোকা দিল রানা।

ওদিক থেকে বলল মারিয়া, ‘কিছু বলবে?’

‘এসো, নিচে যাব।’

মিনিট পাঁচেক পর হোটেলের লবিতে নেমে এল ওরা। স্ত্রীর ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করছে মারিয়া। চেহারায় রানার জন্যে গভীর ভালবাসা আর শ্রদ্ধা।

হোটেল থেকে বেরিয়ে এল ওরা। ঝিরঝির করে বইছে বরফের মত শীতল হাওয়া। কিছুক্ষণ আগে ঝরে গেছে পেঁজা তুলার মত হালকা তুষার। আকাশ দেখে রানার মনে হলো না রাতের আগে আর তুষারপাত হবে।

হোটেলের তুষারে ভরা মাঠের শেষ প্রান্তে একটা টেবিলে বসে চকোলেট দেয়া কনিয়্যাকের জন্যে অর্ডার দিল রানা। একটু পর ট্রে হাতে এক বয় এসে ওদের টেবিলে নামিয়ে দিয়ে গেল দুই গ্লাস সুস্বাদু পানীয়। ঠোঁটে গ্লাস তুলে চুপচাপ চুমুক দিচ্ছে ওরা, এমন সময় দেখল ওপরের ঢাল বেয়ে নেমে এল চারজন লোক। স্ন্যাকবারের দেয়ালে স্কি ও পোল রেখে এদিক-ওদিক তাকাল তারা। আশপাশে কোন টেবিল খালি নেই।

জার্মান ভাষায় কথা বলছে তারা, খেয়াল করেছে রানা। নিজেদের টেবিলের অর্ধেক তাদেরকে ছেড়ে দিতে চাইল ও। তাতে খুশি হয়ে ওকে ধন্যবাদ জানাল তারা। চেয়ারে বসার আগে মারিয়ার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকাল তাদের দলনেতা। রানা আন্দাজ করল, তার বয়স হবে চল্লিশ। দলের অন্য তিনজনের বয়স বড়জোর পঁচিশ। এদের দলনেতা জার্মানভাষী হলেও তার জাতীয়তা, সুইট্যারল্যাণ্ডের। অন্য দু’জন জার্মান, আর তৃতীয়জন ড্যানিশ। বাষ্প-ওঠা চকোলেটের মগ চলে এলেও বারবার মারিয়ার কমনীয় চেহারা দেখছে যুবকেরা।

‘আমি হের আর্নেস্ট মুলার,’ রানার সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিল দলনেতা।

‘স্যামি কিং, এসেছি ইংল্যাণ্ড থেকে,’ তার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে দিল রানা।

‘তা-ই? বাহ! এত ভাল জার্মান শিখলেন কোথা থেকে?’

‘এক বান্ধবীর সাহায্যে,’ বলল রানা। ‘দুঃখিত, আমার আগেই উচিত ছিল আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া।’

‘আপনি পৃথিবীতে এসেছেন সৌভাগ্য নিয়ে, স্যর!’ ভারী গলায় বলল স্কি টিমের দলনেতা আর্নেস্ট মুলার। ‘সত্যিই অপূর্ব সুন্দরী আপনার স্ত্রী।’ দলের অন্যদের দিকে তাকাল সে। ‘তোমরা কী বলো?’

‘ইয়া, ইয়া,’ ঘন ঘন মাথা দোলাল অন্য দুই জার্মান। জবাব না দিয়ে চকোলেটের গ্লাসে চুমুক দিল ড্যানিশ যুবক।

‘আপনারা কি আজ স্কি করবেন?’ রানার কাছে জানতে চাইল হের মুলার।

‘তাই তো চাইছি,’ নিজে থেকে বলল মারিয়া।

‘তা-ই? আগামীকাল স্কি রানে যাব না, তবে পরশু দিন বা তরশু দিন তা হলে আপনার সঙ্গে দেখা হবে।’ উত্তেজিত হয়ে নিজের উরুতে চাপড় দিল হের মুলার। ‘দারুণ হবে একসঙ্গে আমরা স্কি…’ মারিয়ার সঙ্গে যে তার স্বামী আছে, সেটা মনে পড়তেই চট করে যোগ করল, ‘তিনজন মিলে করলে।’

‘আমারও খুব ভাল লাগবে,’ চোখের তারা চকচক করে : উঠল মারিয়ার।

‘হের কিং?’

‘আমার কোন আপত্তি নেই, বলল রানা। তবে বলার সুরে সবাই বুঝল স্বামী হিসেবে খুশি নয় ও।

হেসে ফেলল হের মুলার এবং দলের অন্যরা।

এরপর নানান আলাপ হলো ওদের ভেতরে। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই মারিয়ার বাহু ধরে ওকে টেনে তুলল হের মুলার। টেবিল থেকে সরে স্যাকবারের দেয়ালে ঠেক দিয়ে রাখা স্কি আর পোলের কাছে নিয়ে গেল। স্কির লক ডিভাইসের বিষয়ে টেকনিকাল কী যেন বোঝাতে লাগল। তাতে উচ্ছ্বসিত হয়ে মুলারের প্রশংসা করল মারিয়া।

‘হের মুলার তা হলে একজন বিযিনেস ম্যান?’ পাশে বসে থাকা জার্মান যুবকের কাছে জানতে চাইল রানা।

যুবকের চোখ নীল, মাথার চুল সোনালি। ঘন ঘন মাথা দোলাল সে। ‘ইয়া! হের মুলার মস্তবড় ব্যবসায়ী! তাঁর কাজের শেষ নেই!’

‘এবার কীভাবে সময় বের করলেন?’ নিরীহ সুরে বলল . রানা।

‘এক সপ্তাহ পর প্যারিসে বিশাল মিটিং,’ বলল যুবক, ‘তার আগে ভাবলেন একটু বিশ্রাম নেবেন। তুষারে স্কি করতে খুব ভালবাসেন। আর তার ওপরে…’

হঠাৎ করেই চুপ হয়ে গেল যুবক।

পরস্পরের দিকে তাকাল দুই জার্মান। জোরে নিজের ঊরুতে চাপড় দিল ড্যানিশ যুবক।

শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগল তারা।

‘সুন্দরীদের বিছানায় নিতে খুব ভালবাসেন আমাদের হের মুলার,’ কথা শেষ করল প্রথম জার্মান যুবক।

.

বেশিরভাগ স্কি রিসোর্টের বিশাল ডাইনিংরুমের মতই মস্ত ‘রানাদের হোটেলের রেস্টুরেন্ট। বড় এক ঘরের মাঝে অসংখ্য পায়ের ওপরে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘ টেবিল। ছোটগুলো আছে ঘরের চার কোনায়।

রাত সাড়ে দশটায় ডিনার সেরে নেয়ার জন্যে নিচতলার রেস্টুরেন্টে ভিড় জমিয়েছে হোটেলের অতিথিরা। মাঝের বিশাল টেবিলে হের মুলার ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে বসেছে রানা ও মারিয়া। বহু মানুষের আলাপচারিতায় গমগম করছে ঘর। ভারী গলা উঁচিয়ে আশপাশের সবার কান ধরিয়ে দিচ্ছে হের মুলার। সবাই বুঝে গেছে, নানান বিষয়ে বিশদ জ্ঞান আছে লোকটার। কখনও বলছে জার্মান ভাষায়, কখনও ইংরেজিতে। কথা বলার ভঙ্গি এমনই যে মন না দিয়ে পারা যায় না।

ডিনার সেরে নেয়ার পুরো সময়ে গভীর মনোযোগে হোটেলের অতিথিদেরকে খেয়াল করছে রানা। বারবার ওর চোখ খুঁজছে ড্রাগ লর্ড নোবলম্যানকে। ওদের হোটেলে উঠে থাকলে এসব মানুষের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সে।

ডিনার শেষ হওয়ার পর একবার হাতঘড়ি দেখল রানা। এখন রাত সাড়ে এগারোটা। রেস্টুরেন্টের এক বয় দিয়ে গেল গ্লাস ভরা ব্র্যাণ্ডি। সোনালি তরলে চুমুক দিয়ে চারপাশে চোখ বোলাল রানা। শীতের ভেতরে গলা ভিজিয়ে নেমে গিয়ে পাকস্থলি উষ্ণ করে দিচ্ছে দামি ব্র্যাণ্ডি। গ্লাস খালি করে মারিয়াকে বলল রানা, ‘শুয়ে পড়ার আগে একটু তাজা বাতাসে ঘুরে আসতে চাই। তুমি কি আসবে আমার সঙ্গে, ডিয়ার?’

রানাকে দেখে নিয়ে বলল মারিয়া, ‘না, ডার্লিং। সরি। বাইরে বেশি ঠাণ্ডা। এই পরিবেশে বেশিক্ষণ বাইরে থেকো না, সর্দি ধরে যেতে পারে।’

মাথা দুলিয়ে চেয়ার ছাড়ল রানা। হের মুলারকে বলল, ‘হের মুলার, আপনার সঙ্গে সময়টা খুব সুন্দর কাটল। আশা, করি আগামীকাল আবার দেখা হবে।’

প্রচুর পরিমাণে ওয়াইন ও ব্র্যাণ্ডি গিলে লাল হয়ে গেছে হের মুলারের দুই গাল। ‘ইয়া,’ খুশিমনে বলল সে। ‘শুভরাত্রি, হের কিং।’

অন্য দুই জার্মান আর ড্যানিশ যুবকের দিকে একবার মাথা দুলিয়ে ভিড়ের ভেতর দিয়ে রেস্টুরেন্টের দরজার দিকে চলল রানা। সিঁড়ি বেয়ে নিজেদের সুইটের সামনের করিডরে চলে এল। সুইটে ঢুকে ইয়ার মাফলার দিয়ে কান ঢেকে নিয়ে মাথায় পরল ক্যাপ। শোল্ডার হোলস্টারে পিস্তল একবার চেক করে নিয়ে গায়ে চাপিয়ে দিল উইণ্ডচিটার। গোড়ালিতে হাত দিয়ে দেখল, জায়গামত আছে স্টিলেটো। তারপর সুইট ত্যাগ করে নেমে এল নিচতলায়। একবার লবিতে চোখ বুলিয়ে বেরিয়ে এল হোটেল থেকে।

বাইরে কালো রাত। উত্তর থেকে হু-হু করে আসছে হিম শীতল হাওয়া। পেছনের দালানের আড়াল ছেড়ে ট্রেইল ধরে এগোতেই হাড়ে হাড়ে টের পেল কাকে বলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। গরম পোশাক ভেদ করে শরীরে যেন কামড় বসাচ্ছে কনকনে হাওয়া। নিজেকে উলঙ্গ বলে মনে হলো রানার।

কেবল-কারের ইঞ্জিন-রুমে কোন বাতি জ্বলছে না। থমথম করছে পাহাড়ি এলাকা। উত্তরা হাওয়ার শোঁও-শোও ছাড়া কোথাও কোন আওয়াজ নেই। একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাল রানা। হোটেলের রুমগুলোর জানালা দিয়ে বাইরে এসে তুষারের বুকে পড়েছে সোনালি আলো। তাতে প্রাডোর সাদা বরফে তৈরি হয়েছে ছোপ-ছোপ নকশা।

চারপাশের তুষারের মাঝে থম মেরে বসে আছে চেয়ার- লিফট মেশিনারির রুম। ওটার দরজা উপত্যকার দিকে। ভিড়ানো থাকলেও তালাবদ্ধ নয়। রানা নব ঘুরিয়ে ঠেলা দিতেই খুলে গেল কবাট। নির্মেঘ আকাশের কোটি নক্ষত্রের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে ভেতরের কিছু অংশ। সাধারণত এত গভীর রাতে এতটা রূপালি আলো বিলায় না আকাশে। ঘরের ভেতরে আঁধারে চোখ সয়ে যেতেই কেবল-কারের স্টিলের তার টেনে নেয়ার বিশাল চাকা আর একটা কেবল- কার দেখতে পেল রানা। ভোর হলেই ব্যস্ত হয়ে উঠবে ঘরের নানান ধরনের মেশিনারি।

ঘরে পা রাখবে রানা, তার আগে কেবল-কারের কাছ থেকে ঝট করে সরে গেল কালো এক ছায়া। বুঝতে দেরি হলো না ওর, আগে থেকে অপেক্ষা করছে কেউ। বোধহয় মোরেলির বার্তাবাহক ট্রাট্টু। অথবা কোন আততায়ী।

হোলস্টার থেকে পিস্তল নিয়ে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকে একদিকে সরে গেল রানা। ফিসফিস করে ডাকবে, ‘ট্রাটু?’ কিন্তু তার আগেই কেবল-কারের কাছে নড়ল অন্য কেউ।

নিজেও ডাকল লোকটা, ‘ট্রাটু!’

এই লোক যেহেতু ট্রাট্টুকে ডাকছে, কাজেই সে নিজে ট্রাটু হতে পারে না! অন্ধকারে তার দিকে পিস্তল তাক করল রানা। ‘জী?’ ইঞ্জিন-রুমের অন্যদিক থেকে এল চিকন কণ্ঠ।

আর তখনই বিকট শব্দে গর্জে উঠল ভারী ক্যালিবারের পিস্তল। বদ্ধ ঘরে হাজার ঢাকের প্রতিধ্বনি তুলেছে। গুলির কমলা ফুলকি জ্বলে উঠেই নিভে গেছে। বামদিকে চিকন গলায় কাতরে উঠেছে কেউ।

কেবল-কারের কাছে ছায়ামূর্তির দিকে গুলি পাঠাল রানা। স্প্যানিশ ভাষায় গালি দিল কে যেন। রানার বামে ধুপ করে মেঝেতে পড়ে গোঙাচ্ছে কেউ। এদিকে কেবল-কারের পেছনে সরে গেছে ছায়ামূর্তি। তাকে লক্ষ্য করে আবারও গুলি করল রানা। তিন সেকেণ্ড পর ঘরের পেছনে ঠাস্ করে খুলে আবারও বন্ধ হলো দরজা। রানা বুঝে গেল, পালিয়ে যাচ্ছে আততায়ী। অন্ধকারে তার পেছনে ছুটল ও।

এখন আর কেউ নেই কেবল-কারের কাছে। ঘরের দ্বিতীয় দরজা খুঁজে নিয়ে খুলল রানা। ইঞ্জিন-রুম থেকে বেরিয়ে তুষারে ভরা ঢালু জমিতে চোখ বোলাল।

তবে ওদিকে এখন কেউ নেই।

আবার ইঞ্জিন-রুমে ঢুকল রানা। ঘড়ঘড় করে শ্বাস নিচ্ছে কে যেন। গোঙানির আওয়াজ অনুসরণ করে তার পাশে পৌঁছে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল রানা। কিছুই দেখা যাচ্ছে না ঘুটঘুটে আঁধারে।

‘ট্রাট্টু?’ নিচু গলায় ডাকল রানা।

‘জী,’ কাঁপা গলায় বলল কেউ।

‘বলো তো, যার জন্যে এসেছি, কোথায় তার সঙ্গে দেখা হবে?’

‘ভেলেটার ওপরে… পিকাচো দে ভেলেটা। আগামীকাল মনুমেন্টের কাছে। রাত বারোটায়।’

‘ঠিক আছে,’ সামনে ঝুঁকে ছেলেটাকে দেখতে চাইল রানা। বেচারার গলার ভেতরে বেড়ে গেছে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ। গুলি লেগেছে ফুসফুসে। মারা যাচ্ছে বেচারা। একবার জোরে গুঙিয়ে উঠে স্থির হলো কিশোর ছেলেটা। ওর হাত খুঁজে নিয়ে পাল্স্ দেখল রানা।

নেই।

দেরি না করে ইঞ্জিন-রুম থেকে বেরিয়ে এল রানা। তুষারে ঢাকা পাথুরের এলাকা পেরিয়ে পৌঁছে গেল প্রাডো লানোর কাছে। আশপাশে কেউ নেই দেখে হোলস্টারে রাখল পিস্তল। হোটেলের আঙিনায় পৌঁছে একবার ঘুরে তাকাল কেবল-কারের ইঞ্জিন-রুমের দিকে। ওখানে এখন জ্বলছে বাতি। ভেতরে ঘোরাঘুরি করছে বেশ কয়েকটা ছায়ামূর্তি।

গুলির শব্দে পৌঁছে গেছে গার্ডিয়া সিভিলের অফিসারেরা।

চট্ করে গিয়ে হোটেলের লবিতে ঢুকল রানা।

তিক্ত হয়ে গেছে ওর মন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%