কাজী আনোয়ার হোসেন
রেঁনো গাড়িটা বাইরের পার্কিংলটে রেখে আলহাব্রা গার্ডেনে ঢুকেছে রানা ও মারিয়া। এরপর এক মিনিট পেরোবার আগেই ওদের সঙ্গে এসে দেখা করেছে কালচে রঙের এক যুবক। দেখলে মনে হয় জাতে সে জিপসি। মাথার কোঁকড়া চুল খয়েরি। ভাসা-ভাসা চোখ দুটো কুচকুচে কালো, রানার মতই। এখন তারই পিছু নিয়ে হাঁটছে রানা ও মারিয়া।
‘আন্দালিউসিয়ার তুলনায় পরিবেশ এখন বহুৎ গরম,’ নিখুঁত বাংলায় বলল শায়েদ আনন্দ।
‘মরোক্কোর জন্যে তো আর নয়,’ মন্তব্য করল রানা।
মাথা দুলিয়ে, সায় দিল যুবক। একটা পেপার গাছের নিচে পৌঁছে বেঞ্চ দেখাল সে।
বেঞ্চে পাশাপাশি বসে পড়ল ওরা।
একটু দূরে মুরদের তৈরি বিশাল খিলানের উল্টোদিকে রোদ পড়ে ঝলমল করছে পুকুরের টলটলে জল।
‘আপনার জন্যে নতুন খবর আছে,’ নিচু গলায় বলল আনন্দ। ‘ট্যুর শেষ হয়ে গেলে সবই বলব।’
‘কী ধরনের খবর?’ জানতে চাইল রানা।
ঠোঁটের ওপরে ডান তর্জনী রাখল যুবক। ‘টিলার ওদিকে যাওয়ার পর বলব।’ হাতের ইশারায় আলহামব্রা গার্ডেনের উত্তর দিকের টিলা দেখাল সে। ওদিকে আছে একের পর এক গভীর গুহা। ওখানে বাস করে জিপসিদের অনেকে। নিজেই এসব তথ্য দিয়েছে শায়েদ আনন্দ।
‘ঠিক আছে, ট্যুর শেষ হলে আমরা থামব আলহামব্রার প্রবেশ-পথের কাছে,’ বলল রানা।
এমনিতেই হালকা হয়ে গেছে আলহামব্রা দেখতে আসা ট্যুরিস্টদের ভিড়। প্রবেশ-পথ পার করে পার্কিংলটের দিকে চলেছে অনেকে।
মিনিট পাঁচেক পর রানা ও মারিয়াকে নিয়ে পার্কিংলটে এসে থামল আনন্দ।
‘তোমার সঙ্গে গাড়ি আছে?’ জানতে চাইল রানা।
‘আহা, সে-কথা বলে বুকে আর কষ্ট দেবেন না, ‘ একগাল হাসল নকল জিপসি। করুণ চোখে দেখল মারিয়াকে। ‘সত্যি বলতে আমার আছে মাত্র একটা পুরনো ল্যামব্রেটা।’
‘তা-ই বলে তোমার এত কষ্ট পাওয়ার তো কিছু নেই,’ কাঠখোট্টা সুরে বলল রানা। বুঝে গেছে, মারিয়ার সহানুভূতি আদায় করতে চাইছে যুবক। ‘আমাদের সঙ্গে চলো। কাজ শেষ হলে আবারও তোমাকে পৌঁছে দেব ‘ল্যামব্রেটার কাছে।’
‘আপনি, ভাই, বড় পাষণ্ড,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল আনন্দ। ‘আমি তো বুকের কষ্ট বলছি ম্যাডামকে।’
‘অত কথা বলতে নেই,’ বলল রানা।’তোমার বউ জেনে গেলে রাতে আর পেটে খাবার জুটবে না।’
‘নীলা?’ বড় করে ঢোক গিলল যুবক।
‘হ্যাঁ, নীলা,’ কড়া চোখে ওকে দেখল রানা। বিসিআই থেকে ওকে বলা হয়েছে, দু’বছর হলো স্পেনের নামকরা এক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসে ভবঘুরে স্বভাবের বাঙালি যুবক শায়েদ আনন্দের প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করেছে ঢাকার মেয়ে নীলা কুণ্ডু। তারপর থেকে বিসিআই-এর হয়ে কাজ করছে ওরা স্বামী-স্ত্রী।
আধহাত জিভ বের করল আনন্দ। ‘রাম, রাম! আমি আবার কী বললাম!’
‘টিলা বেয়ে উঠতে গিয়ে সময় নেবে, তাই গাড়ি করে আমাদের সঙ্গে চলো। তোমার বাড়ি কোথায়?’
‘নীলা আর আমি থাকি দুঃখজনক এক গুহার ভেতরে,’ করুণ চোখে মারিয়ার দিকে তাকাল যুবক।
জবাবে কড়া চোখে তাকে দেখল মারিয়া।
‘মিথ্যা বলছ না তো,’ বলল রানা। ‘গুহার ভেতরে হয়তো লুকিয়ে রেখেছ সাত ঘড়া সোনার মোহর!’
‘না, না, ব্রাদার, ওসব কোথায় পাব!’
রেঁনোর পেছনের সিটে উঠল আনন্দ ও মারিয়া। ড্রাইভিং সিটে উঠে দরজা আটকে নিল রানা। ‘পথ দেখাও।’
‘সোজা যান, তারপর ডানে বাঁক নেবেন,’ বলল যুবক। ‘তারপর পৌঁছে যাব আমাদের বাড়িতে।’
কিছুক্ষণ পর রেঁনো থামল উঁচু এক টিলার সামনে। ওটার গায়ে রয়েছে অসংখ্য গুহা। এখানে-ওখানে একটা-দুটো করে পেরোজেও গাড়ি ও কমদামি মোটর সাইকেল।
‘আমরা গুহায় গিয়ে বসব,’ বলল যুবক।
রিয়ার ভিউ মিররে তাকে দেখল রানা। ‘এবার বলো তোমার সেই খবরটা কী?’
‘আপনাকে ম্যালাগায় সেনোর স্মিথের সঙ্গে কথা বলতে বলা হয়েছে।’
‘কী কারণে, সেটা কি জানো?’
‘তা জানি না।’
‘তোমার এনক্রিপ করা ফোন আছে?’ জানতে চাইল রানা।
‘গুহায় পাবেন, বড় এক গুহামুখ দেখাল আনন্দ। ‘চলুন, ভেতরে যাওয়া যাক।
গাড়ি থেকে নেমে শায়েদ আনন্দের পিছু নিল ওরা। গুহার ভেতরে স্বাভাবিক যে-কোন বাড়ির মত আসবাবপত্র। মেঝের ওপরে সস্তা কার্পেট। দেয়ালের নানান জায়গায় ইলেকট্রিক সকেটে জ্বলছে ন্যাংটো বাল্ব ও মাঝারি মানের ল্যাম্প। প্রধান গুহার ভেতরের বাতাসে ভাসছে বাঙালিদের প্রিয় সব খাবারের সুবাস। পেছনের এক ছোট গুহা থেকে এল খুন্তির টুং-টাং শব্দ। রিনরিনে একটা কণ্ঠ এল ওদিক থেকে, ‘বাড়ি ফিরলে?’
‘না ফিরে কি আমার উপায় আছে?’ জবাবে বলল শায়েদ। ‘আমাকেও তো বাঁচতে হবে!’
‘বেশি কথা বলে!’ চাপা এক গর্জন এল রান্নাঘর থেকে।
বড় গুহার একদিকে চওড়া বুকশেলফ্। ওটার তিন নম্বর তাক থেকে মোটা এক বই সরাল নীলার স্বামী। গর্তের ভেতরে হাত ভরে বের করল ছোট এক টেলিফোন সেট ওটার একটা বাটন টিপে দিতেই জ্বলতে লাগল লাল বাতি। ডায়াল করে কয়েক সেকেণ্ড পর সেটের একটা বাটন টিপে দিল সে।
‘বার্টি?’ স্পিকারে বলল রানা। ‘জরুরি কিছু বলবি?’
‘ম্যালাগার মেয়েটা… সে যাচ্ছে সোল ই নিয়েরেতে।’
‘তো?’
‘তুই কি কোন বিপদে পড়েছিস? আমাদের তো বললি না যে নোবলম্যানের সঙ্গে তোর দেখা হয়েছে কি না।’
মন দিয়ে কথা শুনছে মারিয়া।
‘দেখা হয়েছে, তবে সে নোবলম্যান কি না, সেটা আমি এখনও জানি না,’ বলল রানা।
কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবার পর বলল বার্টি, ‘শোন, নোবলম্যানের কাছ থেকে ফোন পেয়েছে মেয়েটা। লোকটা বলেছে; রিসোর্টে গত দুই রাত আগে তার ইনফর্মার ছেলেটাকে খুন করা হয়েছে। আর আজ সকালে খুন হয়েছে আরেকজন!’
‘জানি।’
‘নোবলম্যান এখন তোর সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না। বলেছে, পরে যোগাযোগ করবে।’
‘এর কারণটা কী?’ জানতে চাইল রানা।
‘বুঝতেই তো পারছিস, ভয় পেয়ে গেছে সে। ভাবছে, তাকে খুন করার জন্যে নতুন আরও কোন ফাঁদ পেতেছে মাফিয়া।’
‘তাকে দোষ দেয়া যায় না,’ বলল রানা।
‘তার প্রেমিকা এখন লাল এক জাগুয়ারে চেপে সোল ই নিয়েরের দিকে যাচ্ছে,’ বলল বার্টি।
‘কিন্তু’ আসছে কেন?’
‘বলেছে, জরুরি ভিত্তিতে নোবলম্যানের সঙ্গে তোদের মিটিঙের ব্যবস্থা করবে।’
‘এক মিনিট, বার্টি,’ বলল রানা, ‘এলিনা বা আমি দু’জনই চিনি নোবলম্যানকে। এর মানে বুঝতে পারছিস?’
‘বুঝেছি।’
‘কাজেই মনে হচ্ছে না যে নোবলম্যানের সঙ্গে দেখা করতে আসছে মেয়েটা।’
‘তুই বোধহয় সত্যিকারের নোবলম্যানের হদিস পাসনি।’
‘হয়তো তা-ই। আমাদের পক্ষের কেউ কখনও তাকে দেখেনি। যদিও আমাদের হাতে মাইক্রোফিল্ম দিয়েছে একজন। এ থেকে কী বুঝলি?’
‘এলিনা জোর দিয়ে বলেছে, আসল নোবলম্যানের সঙ্গে তোর দেখা হয়নি। সত্যিকারের নোবলম্যান চাইছে আবারও কর্সিয়ায় গিয়ে লুকিয়ে পড়তে। সেক্ষেত্রে কোনভাবেই আমরা তার কাছ থেকে ব্ল্যাক লিস্ট পাব না।’
‘অর্থাৎ আমার বস্ আর মিস্টার লংফেলো ভাবছেন আসল লোকের সঙ্গে দেখা হয়নি আমার,’ বলল রানা।
‘বোধহয় তা-ই।’
‘বুঝলাম,’ বলল রানা। ‘সেক্ষেত্রে দুটো সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এক, নোবলম্যান সঠিক লোক। দুই, আমার সঙ্গে যে দেখা করেছে, সে এক ঠগ। বার্টি, তুই দেরি না করে চলে আয় সোল ই নিয়েরেতে।’
‘কী কারণে?’ জানতে চাইল বিএসএস এজেন্ট।
‘তোকে চাইছি কারণ তোর সাহায্য আমার লাগবে। আমাদের জানতে হবে কে আসলে নোবলম্যান।’
‘কী করতে হবে আমাকে?’
‘পরে বলব। চলে আয় আগামীকাল।’
‘কোথায় আসব?’
‘আসবি সোল ই নিয়েরের সিয়েরা নেভাডা হোটেলে।’
‘ঠিক আছে।’
লাইন কেটে দিল রানা। ওর থমথমে চেহারার দিকে চেয়ে আছে মারিয়া। নিচু গলায় জানতে চাইল, ‘এবার কী করবে?’
বিস্ফারিত চোখে ওকে দেখছে আনন্দ। তাকে পাত্তা না দিয়ে মারিয়াকে বলল রানা, ‘আনন্দের কাছে মাইক্রোফিল্ম দাও।’ .
হাতব্যাগ খুলে জিনিসটা নিয়ে যুবকের হাতে দিল মারিয়া। চোখ তুলে তাকাল রানার চোখে।
‘গোটা রোল ব্লো করে তারপর বিসিআই-এর কাছে পাঠিয়ে দেবে,’ আনন্দের উদ্দেশে বলল রানা।
‘ওটা করবে নীলা,’ বলল যুবক।
‘রেঁনো নিয়ে সোল ই নিয়েরেতে ফিরে যাবে, মারিয়া,’ বলল রানা।
‘আর তুমি?’ চোখ সরু করে ওকে দেখল মেয়েটা।
‘আমি যাব এলিনার সঙ্গে মাঝপথে দেখা করতে।’
‘কিন্তু সেটা করতে হবে কেন?’
‘কারণ, মেয়েটা একবার রিসোর্টে গেলে হয়তো অন্যদের চোখে ধরা পড়বে সত্যিকারের মোরেলি।’
‘কিন্তু…’
‘মাফিয়ার লোক খুন করতে চাইছে তাকে,’ মারিয়াকে মনে করিয়ে দিল রানা।
‘সে কে হতে পারে?’
‘ধরে নাও সে জন কার্সন ওরফে মোরেলি।’
অবাক চোখে ওকে দেখল মারিয়া। ‘কিন্তু কেন ধরে নিচ্ছ যে কার্সন আসলে মোরেলিকে খুন করতে চাইছে?’
‘কারণ, সে আর কিউলেক্স ছাড়া অন্য কারও এত গরজ নেই।’
সেক্ষেত্রে মোরেলিকে খুন করতে চেয়েছে আলাদা দু’জন খুনি?’ ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল মারিয়া।
‘বোধহয় মাফিয়া নিয়োগ দিয়েছে দু’জন খুনিকে। একজন ব্যর্থ হলেও যেন আরেকজন সফল হয়।’
‘তা হলে তো ঘটনা আরও জটিল হয়ে গেছে!
‘জীবন সবসময় বড় জটিল, মারিয়া,’ বলল রানা, ‘একটু ভেবে দেখো, কার্সন চাইছে মোরেলিকে খুন করতে। কিন্তু নিজের চোখে তাকে কখনও দেখেনি। তবে এটা জেনেছে, মোরেলির সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছি তুমি আর আমি। কাজেই প্রথম সুযোগে আমাদের সঙ্গে ভিড়ে গেছে সে।’
রানার কথা শুনে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে মারিয়ার মুখ।
‘এবার ভেবে দেখো, রিসোর্টে ট্রাট্টু যখন খুন হয়ে গেল, তার আগেই কিউলেক্স আর কার্সনকে ভাড়া করেছে মাফিয়া কমিশন। আর আমি ইঞ্জিন-রুমে মৃতপ্রায় ছেলেটার কাছ থেকে কথা শোনার সময়ে ওখানে লুকিয়ে ছিল কার্সন। আমার কথা এ-পর্যন্ত বুঝতে পেরেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তারপর’ মনুমেন্টে’ গিয়ে মোরেলিকে খুন করতে চাইল কার্সন। কিন্তু মোরেলি ওখানে গেলই না। তার বদলে হাজির হলাম আমি। তাতে মাথায় বাজ পড়ল কার্সনের।’
‘কিন্তু সত্যিকারের মোরেলি ওখানে গেল না কেন?
‘বার্টির কথা তো আগেই শুনেছ। ট্রাট্টু মারা যাওয়ায় গা ঢাকা দিয়েছে আসল মোরেলি।’
‘কিন্তু ওখানে গিয়ে মোরেলিকে কেন খুন করতে চাইল কার্সন?’
‘সেটা আমি এখনও জানি না,’ বলল রানা, ‘তবে মনে হচ্ছে ইঞ্জিন-রুমে মৃতপ্রায় ছেলেটার শেষ কথাগুলো শুনেছে। আর সেজন্যেই মোরেলিকে খুন করতে ভেলেটায় গেছে।’
ভুরু কুঁচকে রানাকে দেখল মারিয়া।
ওখানে ছিলাম কার্সন আর আমি,’ বলল রানা। ‘আমি যে মোরেলি নই সেটা জেনে গেল সে। এ-ও বুঝল, কোথায় গিয়ে দেখা করব মোরেলির সঙ্গে। তাই মনুমেন্টে যখন মোরেলি এল না, দেখা করে আমাকে বলল কার্সন, সে-ই আসলে মোরেলি। এরপর বাকি সময়ে অভিনয় করে গেছে সে।’
‘কিন্তু আমার হাতে যে দিল মাইক্রোফিল্ম?’
ওটা সত্যিকারের কি না, আমরা চেক করে দেখব। তখন বাদ পড়বে না মাফিয়া ডনদের নাম, ছবি, ঠিকানা, সঠিক জায়গা আর তারিখ এসব জানতে।’
‘তা হলে…..’
‘আমার ধারণা: আমাদেরকে নকল মাইক্রোফিল্ম দিয়েছে কার্সন। কেবল-কারে এমন ভান করেছে, যেন সে-ই মোরেলি। আর ওদিকে সত্যিকারের মোরেলিকে পেয়ে গেছে ভেবে ওকে খুন করতে গিয়ে আমার হাতে খুন হয়েছে কিউলেক্স।’
‘কিন্তু আমরা কোথায় দেখা করব, সেটা কীভাবে জানল সে?’
‘গুবরে পোকা রেখেছে কিউলেক্স রেঁনোর নিচে,’ বলল রানা।
‘কার্সন তা হলে এখন কী করতে চায়?’ জানতে চাইল মারিয়া।
‘এলিনার জন্যে অপেক্ষা করছে সে। ক্যাথিকে বোকা মনে করে আগেও ফোন করেছে মোরেলির প্রেমিকার কাছে। কার্সন ভাল করেই জানে, আগে হোক আর পরে, ‘সোল ই নিয়েরেতে যাবে এলিনা। আর তখন প্রথম সুযোগে সত্যিকারের মোরেলিকে খুন করবে সে। আমার কথা বুঝতে পেরেছ?’
‘কিন্তু এলিনাকে তুমি মাঝপথে থামিয়ে দিলে আমাদের আসলে কী লাভ?’
‘মেয়েটাকে জানিয়ে দেব, সে সোল ই নিয়েরেতে এলে তার কারণে খুন হবে সত্যিকারের মোরেলি।
মাথা দোলাল মারিয়া। ‘বুঝেছি। না হয় কথা বললে মেয়েটার সঙ্গে, কিন্তু তারপর কী করবে?’
‘পরে কী করব সেটা এখনও ভাবিনি,’ বলল রানা।
.
শায়েদ আনন্দ আর রানাকে নিয়ে গ্রানাডায় পৌঁছে এক কার রেন্টাল অফিসের সামনে রেঁনো রাখল মারিয়া। গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া করার জন্যে কার রেন্টাল দোকানে ঢুকল রানা। ওদিকে আনন্দকে আলহাব্রা পার্কের সামনে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দিল মারিয়া। তারপর ফিরে চলল সোল ই নিয়েরের হোটেলে।
এদিকে পরের দশ মিনিটে টাকা পরিশোধ করে তেইশ সালের নীল রঙের এক সিট অ্যাটেকা গাড়ি ভাড়া করল রানা। প্রায় নতুন গাড়িটা চালিয়ে উঠে এল ম্যালাগা-গ্রানাডা হাইওয়েতে। ঝোড়ো বেগে চলেছে ম্যালাগার দিকে। শেষ বিকেলে জ্বলজ্বল করছে স্পেনের সোনালি রোদ। সোল ই নিয়েরের দিকে লাল কোন জাগুয়ার যেতে দেখলে ওটাকে থামাবে রানা।
টানা পঁচিশ মিনিট ম্যালাগার দিকে এগোবার পর ঢালু উপত্যকার দূরে লাল জাগুয়ার দেখতে পেল ও। কড়া ব্রেক কষে ঘুরিয়ে নিল অ্যাটেকা। থেমে গেল গমের এক বিশাল খেতের পাশে। রিয়ার ভিউ মিররে দেখতে পেল ক্রমেই এগিয়ে আসছে লাল গাড়িটা।
এক শ’ ফুটের ভেতরে জাগুয়ার পৌঁছে যেতেই হাত বের করে ওটার ড্রাইভারকে থামাবার ইশারা করল রানা।
অ্যাটেকা গাড়ি থেকে হাত বের করেছে কেউ, সেটা দেখতে পেয়েছে মেয়েটা। অবাক হলেও রানার গাড়ির পেছনে এসে থামল সে। গাড়ি থেকে নেমে জাগুয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল রানা। কয়েক দিন ক্লিনিকে বিশ্রাম নিয়ে যেন আগের চেয়েও সুন্দরী হয়ে গেছে এলিনা পার্কারসন। একবার মুখের দিকে তাকালে বারবার ফিরে দেখতে ইচ্ছে হয়। মেয়েটার পরনে এখন সবুজ সোয়েটার ও ধূসর স্কার্ট।
‘সেনোর স্মিথের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে,’ নরম সুরে বলল রানা।
‘তা-ই? তা হলে তো তুমি জানো কেন এখানে এসেছি।’
‘হ্যাঁ, জানি। কিন্তু বদলে নেয়া হয়েছে আমাদের প্ল্যান।’ অবাক চোখে ওকে দেখল এলিনা। ‘তা হলে কি এরই ভেতরে বাড়ি ফিরে গেছে মোরেলি?’
‘হয়তো তা-ই। আমরা সেটা এখনও জানি না। তবে অন্য ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।’
‘তুমি এসব কোথা থেকে জানলে?’ চোখ পিটপিট করে রানার দিকে তাকাল এলিনা।
‘আমি জেনেছি, কারণ নিজের পরিচয় ফাঁস করে দিয়েছে মোরেলি।’
‘না, সেটা কখনও করবে না ও।’ রানার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে গমের খেতের দিকে তাকাল এলিনা। ‘তুমি কি আমার কথা বিশ্বাস করছ না, কিং? আমি শপথ করে বলতে পারি, একটা কথাও মিথ্যা কখনও বলিনি।’
‘আমি তোমাকে অন্তর থেকে বিশ্বাস করি, এলিনা,’ বলল রানা। ‘তবে সমস্যা হচ্ছে, অন্য একজন দাবি করছে যে সে-ই আসলে মোরেলি।’
‘তা হলে তো মোরেলিকে সতর্ক করতে হবে…’
মাথা নাড়ল রানা। ‘কেউ না কেউ চাইছে তাকে খুন করতে। তুমি মোরেলির সঙ্গে দেখা করলেই খুনিও জানবে সে আসলে কে। কথাটা বুঝতে পেরেছ?’
ফ্যাকাসে হলো অপরূপা মেয়েটার মুখ। ‘বুঝতে পেরেছি,’ প্রায় ফিসফিস করে বলল। রানার চোখে তাকাল। ‘তুমি তা হলে আমাকে কী করতে বলো?’
‘আমি চাই তুমি যেন গ্রানাডায় রয়ে যাও।’
দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল এলিনা। ‘ওখানে খুব একা লাগবে আমার।’
‘ক্লিনিকে তো একাই ছিলে। পারবে না আর দু’এক দিন
একা থাকতে?’
‘খুব বিরক্তি লেগেছে ওখানে।
তোমার কাঁধের ক্ষতের কী অবস্থা?’
‘প্রায় সেরে গেছে।’ মিষ্টি করে হাসল এলিনা। ‘তুমি দেখতে চাও? দু’আঙুলে সোয়েটারের গলা টান দিয়ে ক্ষতটার ওপরে ছোট্ট ব্যাণ্ডেজ দেখাল মেয়েটা।
‘এলিনা, ভেবে দেখো গ্রানাডায় রয়ে যাবে কি না।’
‘ওখানে বসে কী করব?’
‘রাতে তোমাকে ডিনারে নিয়ে যাব,’ ষড়যন্ত্রের সুরে বলল রানা। ‘আর তারপর ঘুরে বেড়াব যেখানে তুমি যেতে চাইবে।’
জ্বলজ্বল করে উঠল এলিনার দুই চোখ। ‘সত্যি, কিং?’
হাসল রানা। ‘তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে খুব ভাল লাগবে আমার।’
‘ঠিক আছে। তা হলে গ্রানাডাতেই থেকে যাচ্ছি।’
‘আমার গাড়ির পিছু নাও,’ বলল রানা। ‘ভাল কোন হোটেলে তোমাকে তুলে দেব।’
উত্তেজনায় চকচক করছে এলিনার চোখ।
‘আমরা একসঙ্গে ঘুরছি সেটা জানলে ভীষণ খেপে যাবে . মোরেলি। এটা একবার ভেবে দেখেছ?’
‘যা খুশি ভাবুক। আমি তো আর ওকে ভয় পাই না।’
‘আমিও না,’ মুচকি হাসল এলিনা।
বিপজ্জনক এক জীবন বেছে নিয়েছে মেয়েটা, মনে করেছে সর্বক্ষণ ফূর্তি করে কাটাবে, তবে জীবন কখনও এত সহজ হয়ে ওঠে না, আনমনে ভারল রানা।
.
গ্রানাডার শপিং এলাকার কাছে দুর্দান্ত দামি এক রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে নিল রানা ও এলিনা। এককোণে স্প্যানিশ মিউযিক বাজাল পাঁচ. মিউযিশিয়ান। একটু পর পর ওয়েটার এসে জানতে চাইল.আরও কিছু ওদের লাগবে কি না।
রাতের শহর গ্রানাডার চারপাশে দোকানগুলোয় ঝলমল করে অসংখ্য বাতি। পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত ট্যুরিস্ট। রাত দশটা বাজলেও বাইরে রয়ে গেছে শহরের নাগরিকেরা। সবার জন্যে অপরাধ-মুক্ত সুন্দর এক পরিবেশ উপহার দিয়েছে গার্ডিয়া সিভিলের অফিসারেরা।
রাত সাড়ে দশটার দিকে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে হোটেলে পৌঁছে গেল রানা ও এলিনা। হোটেলের ডেস্ক থেকে চাবি সংগ্রহ করল রানা। এলিনাকে নিয়ে এগোতেই খেয়াল করল, ম্যালাগার মতই এলিনার সঙ্গে ওকে দেখে চরম বিদ্বেষ নিয়ে চেয়ে আছে হোটেলের বেশ ক’জন অতিথি।
লিফটে করে উঠে লাল গালিচার করিডরে পা রাখল ওরা। প্যাসেজের শেষমাথায় বিশাল এক বিলাসবহুল সেটি। পেছনের দেয়ালে ঝুলছে ফুলদানিতে তাজা সাদা ও লাল ফুল। সুইটের দরজার সামনে থেমে রানার চোখে চেয়ে চোখ টিপল এলিনা। ‘তুমি কি তালার ভেতরে ভাল করে চাবি ঢোকাতে পারো?’
‘খুবই ভালভাবে,’ মৃদু হাসল রানা। .
‘তা-ই? তো তুমিই বরং তালায় আজ চারি দাও,’ চকচক করছে এলিনার নীল দুই চোখ।
চাবি দিয়ে সুইটের দরজার তালা খুলল রানা। ঘুরে দেখল এলিনার চোখ। কেন যেন খিলখিল করে হাসল মেয়েটা। হাতে হাত রেখে সুইটের ভেতরে ঢুকে পড়ল ওরা।
বেডরুমের বাতি জ্বেলে প্রকাণ্ড বেডের পাশে গিয়ে থামল এলিনা, চোখে কীসের এক ঘোর নিয়ে দেখছে রানাকে। কখন যেন ফেলে দিয়েছে কাঁধের ছোট্ট ব্যাণ্ডেজ। সোয়েটার খুলে আঙুল তাক করল ক্ষতের ওপরে। ‘ভেবো না এটার জন্যে কোন ধরনের ব্যথা পাব।’
‘বাতি?’ ভুরু নাচিয়ে জানতে চাইল রানা।
‘থাকুক না! আজকের রাত হোক আলোকিত।’ ঝুপ করে কার্পেটে পড়ল এলিনার ধূসর স্কার্ট।
মেয়েটার সামনে গিয়ে থামল রানা। দু’গোড়ালি উঁচু করে ওকে দেখছে এলিনা। ওর কমলার কোয়ার মত ঠোঁটে নেমে এল রানার নিষ্ঠুর ঠোঁট। পরক্ষণে ব্যস্ত হয়ে গেল ওরা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন