আশাপূর্ণা দেবী
আবার উটোউটি? আবার বেড়াল নাড়ানাড়ি কুকুর নাড়ানাড়ি? তোমার কতা আর সহ্যি হতেচে না বাপু। আবার ক্যানে? সাগরের চেরে ফাঁটা ভাঙ্গা গলার এই উত্তেজিত প্রশ্নটা যেন আর্তনাদের মত শোনায়, 'না। কোথাও যাবনি। মরতি হয় এই চুলোতিই মরব।'
কাঠি চাঁছা নারকেল পাতার সরু ফালিগুলো দিয়ে জ্বাল ঠেলে ঠেলে ভাত সেদ্ধ করছিল সাগর। পাতা পোড়ার কটু গন্ধ ধোঁয়া। আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে উনোনের ধারটা, তবু তার অন্তরালস্থিত ভাত ফোটার গন্ধটা অটল দাসের সমস্ত চৈতন্যটাকে যেন একটা মোহময় সুখের স্বাদে আচ্ছন্ন করে তুলল।
অটল দাস তার অবুঝ পরিবারকে খিঁচোতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, 'অদেষ্ট। গাঁ ভুঁই ছাড়া অবদিই তো বেদের টোল ফেলে ফেলে দিন গোঞাচচি।'
কোথা থেকে যেন ঘুরে এসেছে অটলদাস, হয়তো এই সুসংবাদটি আহরণ করতেই তার যাওয়া। গরমের দুপুর, পরণের ঘাড়গাটা হাতা ছেঁড়া হাফ হাতা হাওয়াই শার্টটা ঘামে ভিজে সপসপিয়ে উঠেছে, পরণের খাটো খেঁটে তালি সেলাই মারা ধুতিটাও তথৈবচ। তবু অটল দাস শুধু জামাটারই তত্ত্বাবধান করতে উঠোনে নামল। উঠোন মানে তিন কোণা এক চিলতে মেটে জায়গা যার বুকে একটি পেয়ারাগাছ যেন সবুজ স্নেহে এই অনেক আশার স্বপ্নে ঘেরা ছোট্ট সংসারটুকুর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে শাখা দুলিয়ে দুলিয়ে ভালবাসা জানায়।
এইখানে এসেই ওই পেয়ারার চারাটা পুঁতেছিল সাগর কোথা থেকে যেন সংগ্রহ করে। আর যত্ন নিয়েছিল প্রয়োজনের অতিরিক্ত।
তা গাছটা বেইমান নয়, ফল দিয়েছে। গত বছর দিয়েছে এ বছরও দেবার আশ্বাস। যেন আরো বেশীরই আশ্বাস। ছোট ছোট কষাকষা শিশু ফলের সম্ভারে ভরা শাখাগুলি তার ইসারা বহন করছে।
পেয়ারা গাছটার কোলের গোড়ায় সাগরের তুলসীমঞ্চ। সেও অনেক যত্নে গড়া। গাছটা হয়েছিল নিজের খেয়ালে, সাগর আহ্লাদে অভিভূত হয়ে এখান ওখান থেকে দু—চারখানা ভাঙ্গা ইঁট জোগাড় করে তার ঘের দিয়ে আর মাটি লেপে মঞ্চটি খাড়া করেছিল। সাঁঝের পিদ্দিমটা নিত্য দিতে অবিশ্যি তেলে কুলোয় না তবে সকালে জলটুকু দেয় নিয়ম করে। মনে মনে বাল্যের লেখা মন্তরটি উচ্চারণ করে, তুলসী, তুলসী নারায়োণ, তুমি তুলসী বৃন্দাবন...
অটল দাসের এক ভাজ এসেছিল একবার কোথায় যেন যাবার পথে। ধরে করে তাকে দুদিন রেখেছিল সাগর। অতিথ আত্মীয় এলে তাকে ধরাকরা করে থাকতে বলাই তো সংসারের রীতি। সেটাই সংসারের স্বাদ। সাগর যে আবার সংসার করতে পেয়েছে, এইটুকুই জানাতে ইচ্ছে হয়েছিল সাগরের দেশের দূর সম্পর্কের ওই জাটিকে। জানানো হয়েছিল ধরে রেখে আর যত্ন করে। চেনা মানুষই যদি সুখের দৃশ্য না দেখল তো সুখের অর্থ কী?
সাগর তখন তার সংসারটিকে 'সুখের' বলেই ভাবতে শুরু করেছিল। কারণ তখন অটল এই পড়ে পাওয়া ভাঙ্গা ঘরটুকুকে নিজের হাতে ছ্যাচাবেড়া, আর দর্মা তালি মেরে একখানা বাসস্থানের রূপ দিয়ে ফেলেছিল আর তিনকোণা ওই মাটিটুকু যাকে সাগর উটোন বলে সেইটুকুকে তখন কুড়িয়ে আনা বাঁশবাখারি কচাব ডাল বিছুটির ডাল দিয়ে ঘেরার কাজটা সদ্য শেষ করেছিল। আর সেই তখনই সাগরের পেয়ারা গাছটা সুগোল মসৃণ হালকা সবুজ রঙা ফলগুলি প্রসব করতে শুরু করেছিল।
আর তুলসী ঝাড়টা? যেন ভগবানের অকৃপণ আশীর্বাদের মত।
তা ওই গাছে জল ঢালার মন্ত্রটি কানে যেতেই বড়জা বলে উঠেছিল 'আমরণ! তুলসী তো হচছেন গে মেয়েছেলে আদাআনীর সতীন, তাঁকে আবার 'নারায়ণ' বলা ক্যানো?'
সাগর এতো জানে না। সাগর তো শৈশবকালে গুরুজনদের মুখেই এই মন্ত্র শুনেছে আর শুনে শুনে শিখেছে। তাই সাগর তার এই শাস্ত্রজ্ঞ বড় জায়ের মুখের দিকে না তাকিয়েই প্রণামান্তে বলেছিল ভগোমানের আবার ব্যাটাছেলে মেয়ে ছেলে কী?
'মরণ! ভগোমানের মেয়েছেলে ব্যাটাছেলে নেই? বলি মা কালীকে তুই বাবা কালি বলবি? না শিবঠাকুরকে মা গো শিবঠাকুর বলবি?
সাগর বুঝেছিল সুবাসিনীর এটা মনান্তর বাধাবার ছল। ভেতরের হিংসের প্রকাশ। সর্বস্বান্ত সাগর যে বেদের টোল ফেলে ফেলে অবশেষে একটা আশ্রয় পেয়েছে আর দৈত্যের মত পরিশ্রমী অটলের চেষ্টায় যত্নে সে আস্তানায় এমন লক্ষ্মীশ্রী ফুটেছে, তাই দেখে সুবাসিনীর ভেতরে ভেতরে হিংসের জ্বালা ধরেছে। উদাস গলায় সাগর বলেছিল তোমার মতন শাস্তোর পালা তো জানিতে সুবাসদি, ছোটকালে মা—পিসির মুকে যা শুনিচি, তাই শিকিচি।
'ভুল শিক্ষে।'
সুবাসিনী আত্মস্থ গলায় রায় দিয়েছিল আদাআনীর পূজোয় তুলসী দেবার জো নাই। সতীন বলেই না?
তবু সুবাসিনীর যাবার বেলায় সাগর খইয়ের মোয়া করে দিয়েছিল চারটি, আর গাছের পেয়ারা দিয়েছিল পেড়ে পেড়ে।
চলে যাবার পর শংকু আর তুষু রাগ রাগ গলায় মাকে বলেছিল, ওই বুড়িটাকে সব মোয়াগুলান দিয়ে দিলি? গাচটা নিসুট্যি করে প্যায়ারা দিলি? ক্যানো? বুড়িটাতো পাজী।'
সাগর তাড়াতাড়ি বলেছিল, 'ছিঃ। গুরুজন না?'
কিন্তু সেই সাগরই আবার বরের কাছে গুরুজনের নিন্দে করতে ছাড়েনি! গলা নামিয়ে বলেছিল, 'যাই বলিস তোর ভাজ বড্ড খালি হিঁসকুটে।'
তা তুই—ই তো রাকলি পায়ে ধরে? অটলের সাফ জবাব দুদিন ওনার নৈবিদ্যি জোগান দিতে নিজেদের পেটে টান।
'তা হোক', সাগর জবাব দিয়েছিল, মানুষ মনিষ্যিতি বলে একটা কতা আচে তো? না কি নাই?
তার মানে সাগর ধরে নিয়েছিল এখন তার মানুষ মনিষ্যত্ব দেখাবার অধিকার জন্মেছে। তার মানে তখন সাগর ধরে নিয়েছিল; অনেক দুঃখু ধান্ধার শেষে আদার কেটে ভোর হয়েছে তার।
তকতকে করে লেপা পোঁছা তুলসীমঞ্চ চকচকে করে নিকোনো উনোন যুগল, ছ্যাঁচাবেড়া আর দর্মা ঘেরা এই ঘরখানির মধ্যেই সাজানো সংসার। এ সবের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অনেক দূর অবধি স্বপ্ন দেখতো সাগর কল্পনার রাশ ছেড়ে দিয়ে।
দেখবে না কেন? ভগবান যে তার সহায়। নচেৎ যখন এই অজানা গেরামের একটেরে এই ছোট্ট পোড়ো জমিটুকুনের উপর একখানা ভাঙ্গা কুঁড়ে দেখে তার মধ্যে স্বামী ছেলেমেয়ে নিয়ে ঢুকে পড়েছিল, তখন অটল কি তার দুঃসাহসে কম ভয় পেয়েছিল? বলেছিল নাকি মালিক এসে দূর দূর করে বের করে দেবে কুকুর ছাগলের মতন পুলিশেও ধইরে দেতে পারে।
কিন্তু হয়েছে সে সব?
বানভাসি হয়ে ঘুরে ঘুরে সাত ঘাটের জল খেয়ে আর বাচ্চা দুটোকে নিয়ে সত্যি বেড়াল নাড়ানাড়ি কুকুর নাড়ানাড়ি করে মরে, এই মাথা গোঁজার আচ্ছাদনটুকু পেয়েছে ওরা। গ্রামের লোকেরা বলে 'এটা নাকি' একটা সাধুর কুঁড়ে। একা এখানে বাস করতো সাধু। রাঁধতো কিনা রাঁধতো কে জানে দেখেনি কেউ, ভকত টকতও দেখেনি!
হঠাৎ আর কবে থেকে যেন দেখা গেল না তাকে।
শেকল তুলে দেওয়া দরজাটার ওপারে কি আছে দেখবার জন্যে কৌতূহলী ছেলেপুলে দরজাটা খুলে দেখেই পালিয়েছে। বলেছে, 'ওরে সন্নিসীটা আবার আসচে রে। ঘরের মধ্যে দড়িতে কাপড় চাদর ঝুলতেছে।
কিন্তু কালক্রমে ঝড়—বৃষ্টি সেই শেকল বন্ধ দরজাখানাকেই কোথায় আছড়ে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে। সেই চাদর কাপড় কোথায় লোপাট হয়ে গেছে। কিন্তু ঘরটা বেদখল হয়নি। দখল নিলে এসে সাগররা।
অটল ভর দেখালেই সাগর মুখ ঝামটা দিয়েছে, 'কতো লোক কতো জামজিরেৎ জবর দখল করে ঘর বাড়ি বানিয়ে রাজা হয়ে বসতেছে, শুনতে পাসনে? কি হয় তাদের? গরমেণ্ট হার মেনে ছেড়ে দেয়। আর এতো বেঅয়ারিশ! কার জায়গা গেরামের লোকও জানে না। বলে পুকুরটা আগে মস্ত ছেলো শুকোতে শুকোতে এই জমি উটেচে।
অতসব সাগর স্বপ্ন দেখেছে।
কিন্তু সাগরের স্বপ্ন আর তার কল্পনার পাখায় ভর করে বেশী দূর এগোতে পায়নি। দিনকাল খারাপ হয়ে যাচছে দিনের দিন। ছেলেমেয়ে দুটো ক্রমশ ডাগর হয়ে উঠছে। শুধু ভাত জোটাতেই জান ছুটে যাচ্ছে অটলের। জাত ব্যবসা ঘরামির কাজ করে নগদা মজুর খেটে যখন যেভাবে পারে উঞ্ছবৃত্তি করে, যা পাচছে শুধু জঠরাগ্নিতে আহুতি দিতেই ফুরিয়ে যাচছে।
সাগর যে ভেবেছিল হাঁস পুষে আর ছাগল পুষে সে নিজে কিচু ওজগার করবে তা আর হবার আশা কই? প্রথমটায় তো পয়সা কড়ি খরচা করে তারপর শুরু করতে হবে?
তবু সাগর এই হাভাতের সংসারেও—তুলসীতলা নিকোয় দাওয়ায় কোলে পাতা উনুন দুটোকে পরিপাটি করে মাটি লাগায় ভাত কটা সেদ্ধ হয়ে গেলেই...কাজে তো লাগে একটা উনুন পাতা লতা জ্বেলে ভাতকটা সেদ্ধ করতে তবু দুটো উনুনকে সমান যত্ন করে সাগর।...
পাতবার সময় অটল হেসেছিল। 'প্রাণপাত করে পুকুর পাড় থেকে মাটি নে এসে দু দুটো চুলো গড়বার কি দরকার পড়ল রে সাগর? কত যজ্ঞি রাদবি?
এখন সাগরের সামান্য যা পুঁজি ছিল তাও একটা করে বিক্রমপুরে যাচছে। কিছুদিন অটল দাস হঠাৎ বেশ কিছু রোজগার করে ফেলেছিল। কেমন যেন কাজ পেয়ে যাচছিল ঝপাঝপ গ্রামের আর একজন আধবুড়ো ঘরামি তার সাকরেদের সঙ্গে ঝগড়া করে আলাদা হয়ে গিয়ে হঠাৎ অটলদাসকে দেখে লুফে নিয়েছিল।
কাল হলো ডালভাঙ্গা গ্রামে এক যাত্রা পার্টি আসায়। যাত্রাদলের প্যাণ্ডেল বাঁধার কাজে কাজ পেল অটল দাসের সেই মুরুব্বি ফকির মোড়ল, অতএব অটলও। অসুরের মত খাটল অটল, ফকির গা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে তদারকী করল আর মজুরি ভাগের সময় ফকির একেবারে চোখের চামড়াহীনের মত কাজ করল। করল তার কারণও ছিল, ফকির টের পেয়ে গেল তার পুরনো সাকরেদ তলে তলে তার জামাই হবার পথ পাকা করে বসছে। অতএব তার সঙ্গে মিটমাট করা ছাড়া গতি কী।
কিন্তু অটল দাস এতো কারণের ধার ধারবে কেন? ছেড়ে দিল ফকিরের সাকরেদি।
একাই কাজ চালাতে লাগল বটে অটল, কিন্তু তেমন সুযোগ সুবিধে জোটে না। ফকিরকে সবাই চেনে, তার সঙ্গে আর কে আসে কে দেখে?
তারপর তো ক্রমশই আকাল লাগছে দেশে। রুজি—রোজগার শূন্যের অঙ্কে ঠেকতে বসছে।
ফকিরের কাছে থাকতে থাকতে তার সঙ্গেই মাঝে মাঝে হাটে গিয়েছে অটল, সাগরের বায়না মিটোতে এটা—ওটা কিনে কিনে এনেছে।
না, সাগর কোনদিন গন্ধতেল কাচের চুড়ি সাবান আলতা চায়নি, ডুরে শাড়িও না, সাগরের বায়না শুধু সংসারী জিনিসে। 'নোয়ার একটা কড়াই' যেই হলো, অমনি সাগরের মাথায় 'দুখান এনেমেলের শানকির ভূত চাপলো। সেটা যদি হলো তো একটা সিলবারের ভাত আঁদবার হাঁড়ি।
মাটির হাঁড়ি মালসা নিত্যি ভাঙ্গে 'ছুঁতো' হয়।
একে একে সাগরের অনেক কিছু হয়েছিল। বঁটি, কাটারি, শিলনোড়া, ডালের কাঠি, এনেমেলের থালা চারজন—এর চারখানা ইত্যাদি।
পিঁড়ি অবশ্য অটল বানিয়ে দিয়েছিল।
দাওয়ার ধারে সেই পিঁড়িতে বসে সাগর যখন উনুনে কাঠ ঠেলতে ঠেলতে ঘটঘটিয়ে ডালে কাঠি দিত, রাণী মনে হতো সাগরের।
ক'দিনেরই বা খেলা? কালের কবলে সবই যাচ্ছে একে একে।
এই সেদিন প্রাণের অধিক প্রিয় 'সিলবারের' হাঁড়িটা বেচে দিতে হয়েছে গোষ্ঠ মুদির কাছে দেনার দায়ে।
তাছাড়া খুচখাচ সবই গেছে, ননী ধোপানীর কাছে, দীনু কামানীর কাছে, সত্য গয়লার মেয়ের কাছে।
তাছাড়া দরকারও তো ফুরিয়ে আসছে ক্রমশঃ। ডালই যদি রান্না না হয় তো ডালের কাঠি কোন কর্মে লাগবে? ব্যঞ্জন না রাঁধলে বাটনা বাটবার শিলনোড়া? কুটনো কোটার বঁটি?
ভাতই কি সবদিন জুটছে আর? হয়তো দুদিন হাহাকারের পর একদিন নারকেল পাতা পোড়া গন্ধের সঙ্গে ভাত ফোটার গন্ধ।
মাঝে মাঝে নারকেল কাঠি চাঁছার কাজ জোটায় সাগর, তার দরুন ওই সরু সরু কাঠিগুলো পায়।
ঘামে ভেজা জামাটা ঝেড়ে পেয়ারা গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিয়ে অটল একটা কাঁচা ডালের আগা ভেঙ্গে নিয়ে সেইটা দুলিয়ে দুলিয়ে বাতাস খেতে বলল, 'রান্না হয়ে গেচে?'
এখন 'সিলবারের' হাঁড়ি নেই। আবার মাটির মালসা। ফেন গালারও প্রশ্ন নেই। ভাত সেদ্ধ হয়ে আসার মুখে জ্বাল টেনে নিলেই ফেন বসে ভাত ঠিক হয়ে যাবে।
সাগর সেই জ্বাল টেনে নিতে নিতে ভারী গলায় বলল, 'আন্না একেবারে ধনে ধান কাবাসে বান' কতো। শউর—শাউরির মরার হবিষ্যির পিণ্ডি আঁদচি।
অটল জো পায়। বলে ওঠে, তবু তো ঘোট করে বসে থাকতি চাইছিস। মরি তো এইখেনে মরবো। বলি নিজেরা নয় না খেয়ে মরলাম, শংকু? তুষু?
সাগরের দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে অসহায়তা। তবু তার গলার স্বর কঠিন, 'বাস উটিয়ে যেখেনে যেতি বলচো সেখেনে দুবেলা খেতে দিতি পারবি ওদের, এ গেরাণ্টি আচে?'
অটল উৎসাহের গলায় বলে, না থাকলি কি বলতেচি? পেট পুরে খেতি দেবে, থাকবার জায়গা দেবে—'
সাগর আরো কঠিন মুখে বলে, 'তুই যেমন গাড়োল তাই এইসব কতায় বিশ্বেস করতেচিস। কার বাপ—মা মরা দায় পড়েচে যে তোকে আমাকে বুকে ধরে নে গিয়ে খেতি পরতি দেবে? গরমেণ্ট? সেবারে যেমন দেছলো?
অটল একটু নিস্প্রভ গলায় বলে, 'সে আর এ এক হল?'
'ও সবই এক।'
'ও সবই এক।' সাগর দৃঢ় গলায় বলে, 'য্যাখন বেদের টোল ফেইলে ফেইলে ঘুইরে মরিচি, ত্যাখন পিত্যেক বার বলিস নাই, সাগর বাঁচতে চাস তো চল এখেন থেকে—। দুটো কাঁচা খোকা খুকি কোলে নে, কী নাটাপাকড়ি খেইচি তা আমিই জানি আর ভগোমান জানে।'
অটল এখন খেঁকিয়ে ওঠে বলে, ভগোমান দেলো তো, রুজি—রোজগার কেড়ে নেলো না? পেটে কীল মেরে আর কদিন চলবে? নেকচার বাবুরা তো বলতেচে এ কতা? না খেয়ে কদিন থাকবে তোমরা? চলো—ভাতের দেশে, মাচের দেশে—'
সাগর দপ করে জ্বলে ওঠে, 'বুড়ো হয়ে মরতি চললি, ঘটে একটুকু বুদ্ধি এলো না? নিযাস এই ঘরখানা আর জমিটুকুন নে নেবার মতলোব, তাই ভুজুং দিয়ে ঘরছাড়া করতি চাইচে।'
এবার অটলের অটহাস্যের পালা আমায় তো বোকা বুদ্ধু নিব্বুদ্দি অনেক বলিস, নিজে কী? নেকচার বাবুরা আমাদের এই ছ্যাঁচা বেড়ার ঘরখানা নিতি আসবে? যেনারা জিপ গাড়ি চড়ি রাস্তা মাতিয়ে আসচে যাচচে। শুদু তোকে আমায় বলতেচে না কি? রসুলপুর জবর দখল কলোনির সব্বাইকে বলতেচে। গরমেণ্ট তো না, ওনারা হল গে, দেশসেবা মানুষ।
অটল মহোৎসাহে বোঝাতে থাকে শুনে এসেছে এইসব দুঃখী মানুষদের জন্যে ব্যবস্থা হয়ে গেছে, নিশ্চিত অন্নের নিশ্চিত আশ্রয়ের।
যত কথা শুনে এসেছে অটল, তবে সবটা বলে তার অবুঝ পরিবারের কাছে। হয়তো বা বেশী করেও বলে। তার মনটা এখন দড়ি—ছেঁড়া হয়ে গেছে। দেখতে পাচছে ওই যাত্রায় সে আর এতোদিনের মত একা নয়। সঙ্গী আছে। সঙ্গী পাবে। দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে।
এযাবৎ নিজেরাই ভেসে ভেসে বেড়িয়ে বেড়িয়ে আশ্রয় খুঁজছে দুটো কচি ছেলেমেয়ে নিয়ে।
শহরবাসী বড়মানুষদের গাঁয়ের পোড়ো দালান বাড়ী ভেঙ্গে হুমড়ে পড়া ঠাকুরবাড়ীর দালানের আস্ত একটু কোণ, ছেলেদের কেলাব ঘরের পিছনের এক টুকরো চাতাল। কত জায়গায় হাঁপিয়ে বসে পড়েছে পুঁটলি পাটলা আর বাচ্চা দুটোকে নিয়ে, জায়গাগুলোকে আপাত বেওয়ারিশ ভেবে। ওমা কোথা থেকে না কোথা থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে ওয়ারিশ এসে হাজির হয়েছে, দূরদূর করে তাড়িয়ে দিতে।
আবার বুকে বল করে লোকেরা দোরে দোরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে এই আবেদন নিয়ে,মাইনে দিতি নাগবেনি বাবু। শুদু দুটো ভাত, আর একটু আশ্রয়। দুই মানুষে গতরে খেটে শোধ দেব—ঘরামির কাজ জানি। কোলে দু—দুটো ছেলে নিয়ে এই আবেদন।
কেউ মুখ বাঁকিয়েছে, কেউ উপহাসের হাসি হেসেছে।
সাগর বুঝে ফেলে কাতর অনুনয় করেছে 'এদিগে কিচু দিতি হবেনি মা, আমাদের পেট মেরেই এদিগের পেট চাইল্যে দেবো—' কিন্তু সাগর পাগল বলে, তারা তো আর পাগল নয়?
সেবার অনেক দুঃখের শেষে একবার হঠাৎ কপাল খুলে গেল। একটা খামার বাড়ীতে কাজ পেয়ে গেল তারা। মালিক কাজ চায়, পাহারাদার চায়। স্ত্রী পুত্র কন্যা সমেত একটা লোকের মত নির্ভরযোগ্য পাহারাদার আর কোথায় মিলবে? চুরিচামারি করে চট করে পালাতে পারবে না।....
চার—চারটে পেট বলে চমকালো না খামারের মালিক। দুটো ভাতে তার কিছু যায় আসে না। কাজ দরকার। তা কাজ সে ভদ্রলোক পেয়েছিল বৈকি।
মরা হাতী লাখ টাকা রোদে জলে ঘুরে বেড়ানো অটল দাসও দুটো দিন মাথায় তেল আর পেটে ভাত পেয়ে অসুর অবতার... সাগরও কম নয়।...বস্তা বস্তা মুগ কলাই অড়র খেসারি তোলাপাড়া ঝাড়াবাছা, কুলো পাছড়ানো, এসব কাজ অবলীলায় করেছে সাগর, আর অটল থেকেছে শস্যের ভার ক্ষেত থেকে এনে খামারজাত করা আর আবার তাদের লরীতে বোঝাই করার কাজে।
খাটুনি থাকুক বড় আনন্দে কেটে ছিল সেই দিন ক'টা।
কিন্তু অভাগার ভাগ্য। সেই ভর—ভরন্ত খামার বাড়িতে একদিন লাগলো আগুন।
তার মানে আগুনই অটল দাসদের কপালেই লাগলো।
হতাশ অটল ছুটে মনিবকে খবর দিতে গেছে। সেও তো অনেকটা দূরে।
ওই ভস্মাবশেষের কাছে লুটিয়ে পড়ে অটল দাস বুক চাপড়ে মাথা চাপড়ে বলেছে, বাবু আমায় জেলে দেন, ফাঁসি দেন, গলায় পা দে মেইরো ফেলান। হতভাগা আমি আমার কোত্তব্য কোরতে পারি নাই। আমি থাকতি, এই সব্বোনাশ হয়ে গেলো। তবে ভগোমান সাক্ষী বাবু অটল বেইমান নয়।
কর্তা ওর হাত ধরে তুলে বলে ছিলেন, আচছা আচছা থাম। তোরা চারটে যে বেগুনপোড়া হয়ে মরিসনি এই আমার ওপর ভগবানের দয়া।...এ কাজ যে কে করেছে তা বুঝেছি আমি। জ্ঞাতি শত্রুর কাজ। তোরা আর কি করবি বাবা! এখন, অন্য কাজ দেখগে।
অতএব আবার নিরাশ্রয়। মাইনের দাবি ছিল না, তবু অতোখানি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষটা জোর করে অটল দাসের হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন না করিছস কেন? কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে রাত পোহালে মুখে দিবি কী?
'মানুষ না, দ্যাবতা। বলেছিল সাগর।
আর সেই দেবতার আশীর্বাদীটুকুর শেষাংশ হাতে থাকতে থাকতেই ভগবানের দেওয়া আস্তানা পেয়ে গিয়েছিল ওরা।...তখন অটল দাস আর সাগরবালা ভেবেছিল এবার রাত কাটলো, সকাল হলো, এখন শুধু আলোর দিকে এগোনো।
কিন্তু নিভে গেছে সেই আলোর আশ্বাস। আর কি দিন ফিরবে? তবু সাগর তার বড় যত্নে গড়া এই সংসারটার দিকে তাকিয়ে দেখে। ঘরের মধ্যে সারা দেওয়াল জুড়ে পেরেক গুঁজে গুঁজে জিনিস রাখা।...ঠাকুরের পট, মাটির টিয়াপাখী, সাধুর ঘুড়ি ইত্যাদি।
ঘরের একধারে দেওয়াল ঘেঁষে অটল দাসের নিজের হাতের শিল্প কলার নমুনা—বাঁশ বাখারি দিয়ে গড়া আধখানা ঘর জোড়া নীচু মাচান।
এইসব বাঁশ বাখারি সবই সংগ্রহের জিনিস। পরের ঝাড়ের বাঁশ কেটে নেওয়াকে খুব দোষের মনে করে না অটল।...
কেউ বাঁশ কাটতে দেখে জিগ্যেস করলে অটল সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলে, 'বাবুদের নেগে কাটতেচি।'
একজন ঘরামির পক্ষে এটা খুবই স্বাভাবিক, তাই দ্বিতীয় কথা ওঠে না।
ওই মাচাটা বানাবার সময় সাগর বকবক করেছিল, জানিনে বাবা, এ আবার কী মোতি বুদ্ধি। ওইটুকুখানি ঘরের মদ্যে একখান বীরভদ্দর মাচান কিসের নেগে।'
কিন্তু পরে যখন অটল দাস তার উপর চ্যাটাই চট বিছিয়ে মাদুর কাঁথা সাজিয়ে বিছানা পেতে ফেলল, আর হাঁড়ি কলসী বাসনপত্রগুলো তার তলায় ঢুকিয়ে লুকিয়ে রাখল, তখন সাগর হঠাৎ ঢিপ করে তাকে একটা পেন্নাম করে বলেছিল 'ধন্যি বটে। করেচো একখান কাজের মতন কাজ।'
এইসব ফেলে রেখে অনিশ্চিত এক অজানার উদ্দেশে পা বাড়াতে হবে? সাগর বলে উঠে, 'কাদায় গুণ ফেলে বসি থাক। আবার দিন আসবে।'
আসবে! বলেচে তোকে। দেকচিস মানুষ দলে দলে গেরাম ছেড়ে চলে যেতেচে।'
এটা অস্বীকার করতে পারি না সাগর। একটু গুম হয়ে থেকে বলে ওঠে, তার মানে আবার সেই হাঁটা। সেই পা ছিঁড়ে পড়া, মাজা খসি পড়া!...আর শংকু, তুষু? ওরা পারবে হাঁটতি?'
'এই দ্যাকো! তবে এতোক্ষণ শুনলি কী?' অটল দাস একটু চতুর হাসি হেসে বলে, 'হাঁটনের দিক দেও যেতি হবে না! ওদের 'টেরাকে' চড়িয়ে নে যাবে সব্বাইকে।'
সাগর ভ্রুকুটি করে, 'ওদের গরজ?
অটল অকারণেই গলা নামিয়ে বলে, 'অটল দাস যে নিজেকে কলোনির লোক বলে নাম নিকিয়ে এলো রে।'
'তুই নিকিয়ে এলি, আর ওরা নিকালো?'
'আরে বাবা, অনেক প্যাঁচ কষে কায়দা কোশুল করে তবেই হয়েছে। এখোন ওদের সবার যা বেবস্থা, আমাদেরও তাই বেবস্থা?'
'আর ধরা পড়লে?'
'দূর ক্ষেপী! এর আবার ধরা পড়াপড়ি কী? বসন্ত সাক্ষী দেচে অটল দাস তার বোনাই!'
সাগরের মন অটলের মত খোলামেলা নয়, খুঁৎখুঁতে। তাই সেই একইভাবে বলে, 'ক্যানো? বসন্ত মিচে কতা বলতে গ্যালো ক্যানো?
'আহা দোস্তি হয়েচে না ওর সঙ্গে? দোস্তোর জন্যি একটু মিচে কতা কইলে পুণ্যি বৈ পাপ নাগে না।...ঘর এমন নিঃঝুম যে? ব্যাটা বেটি দুটো গ্যালো কোতা? খাবেনি?
'ঘাটে গামচা ছাঁকা দে পুঁটি ধরতে গ্যাচে। বলেছে মাচ এনে তবে মাচ পোড়া দে ভাত খাবে।'
অটল হেসে বলে, 'লবাবের ব্যাটাবেটি। নে বাবা চল এবার মাচের রাজ্যিতে। কত খাবি খা।'
সাগর সন্দেহের গলায় বলে, 'কোনখেনে নে যাবে?'
অটল আত্মস্থ। বলে 'গোসাবা, বাসন্তী, মোরেলগঞ্জ। সোঁদরবন, বুইলে সোঁদরবন।'
সাগর চমকে ওঠে, 'সোঁদরবন! মোরেলগঞ্জ! সেখেনে নে যাবে? সত্যি ঠিক বলতেচো?'
অটলও চমকায়। বলে, 'তা শুনে এমন বেভুল মারলি ক্যানো? আচে না কি কেউ সেখানে?
এখন নাই—' সাগর যেন আচ্ছন্নের মতো বলে, 'ছেলো। বাবা ছেলো। আর আমি ছিনু।'
'তুই ছিলি? সোঁদর বনে গেচিস তুই?'
অনেক দিন পরে সাগরের গলায় অভিমানী তরুণীর কণ্ঠ শোনা যায়, 'জানিস নাই না কি? ছোটকালে গপপো করি নাই? আমার কতা তো কখনো কান দে শুনিস না। মা মরে যেতে আতদিন কাঁদি কাটি, পিসি বাবাকে বললো, মেয়েটারে তোর সঙ্গে নে যা। বোটে বোটে ননচে ননচে ঘুরবে, দশটা দিশ্য দেকবে, মনডা বুঝ হবে।
...তা নে গেল বাবা। ...বাবা তো একজনা ফলেস্টাবাবুর চাপরাশি ছেলো? বাবু আমাদের 'পাঁজিয়া' গেরামেরই। বাবাকে চাকরি দে নে গেছল চেনা জানা বিশ্বাসী নোক বলে। ধলাইতলা ঘাট থে নৌকোয়, তারপর ননচা। কাঁহা কাঁহা মুলুকে যে গেচে বাবা আমায় নে।'
সাগর আনমনা ভাবে বলে, 'ফলেস্টা আপিসের বাড়িগুলান কী সোন্দর। ইয়া ইয়া খুঁটি গেড়ে তার উপরি কাটের পাটাতন দে উঁচু বাড়ি বানিয়েচে যেন সায়েব বাড়ি। সিঁড়ি দে উটে গেলে দেকবি তার মদ্যি চ্যায়ার টেবিল খাট বেছনা। বারেণ্ডা দে ঝুকে ঝুকে দ্যাকো ওই জলির মদ্যি ক্যাঁকড়া শিঙ্গি জলঢোঁড়া সাপ কিলবিলোচচে, তার সঙ্গে আবার কুচো চিংড়ি ছটকাচছে।
'কুচো চিংড়ি ছটকাচছে।'
অটল জিভের জলটা একটু শুকিয়ে নিল। বলল, 'তোর ভয় নাগতো নি?'
'ভয়? ত্যাখোন কি আর ভয়ের বয়েস গো? বরং সোঁদরবনে এসে বাঘ দেখনু না ক্যানো এই আক্ষেপ করে করে বাবাকে জ্বালিয়ে খেতুম।...বাবা বলতো 'খবরদার নাম করবিনে। বল মা বনবিবি রক্ষে করো।'...বাবার মনিব বাবু, নাম মনে নাই, আমি সদ্য মা মরা গেচি বলে কতো ভালো কতা বলতো।...আর কী খাওয়া। বললে হাঁ হবি। যতো বেপারিদের নৌকো পাশ করবে, সব থেকে ফলেস্ট্রো বাবুকে ভেট দে যাবে।....একা বাবু কত খাবে। বস্তাবন্দী নারকেল, কলসী কলসী মদু, কাঁটাল, হাঁসের ডিম, হরিণের মাংস আর মাছ। নেকাজোকা নেই এতো মাচ। ঝোড়া ঝোড়া মাচ ঢেলে দে যায় আপিস বাড়ির বারেণ্ডায়। মাচ খেয়ে খেয়ে অরুচি জম্যে গেচলো। ভাত মানেই মাচের ছেরাদ্দ।
অটল দাস তাড়াতাড়ি বলে 'আহাহা এই ভালো ভালো গপ্পো সব ফুইরে ফেলাস না...ওদের আসতে দে—'
সাগর মুচকি হেসে বলে 'ওর অনেক শুনেচে।'
তা শুনেছে বৈকি। ছেলে মেয়ের কাচে গল্প মানেই তো ছেলেবেলার গল্প।
অবিশ্যি বেশীদিন বাপের সঙ্গে ঘুরতে পায়নি সাগর। একটু ডাগর হতেই গাঁয়ে রেখে গেলো বাপ পিসির কাছে!
শংকু আর তুষু এলো ঘেমে লাল হয়ে।
তবু বিজয় গৌরব। চার—পাঁচটা পুঁটি পেয়েছে! আবার ক'টা 'ঘেনি কাঁকড়া!'
'ওমা, পোড়া নয় পোড়া নয় ঝাল রেঁদে দে—
'এখোন অ্যাতো বেলায় আবার ঝাল। আকার গরমের মদ্যি গুঁজে দে, দিব্যি দলকে যাবে, নুন দে মেকে খাবি।'
'না মা না।' শংকু বলে 'অ্যাতো কষ্ট করে ধরলাম—'
অগত্যাই উঠতে হয় সাগরকে।
অটল মেয়েটাকে কাছে টেনে পেয়ারা ডালটা দিয়ে বাতাস করতে করতে বলে, 'এই মাচটুকু নিয়েই অ্যাতো আহ্লাদ? এইবার চল মাচ—ভাতের দেশে!
'মাচ ভাতের দেশে!'
অটল বোঝাতে বসে ছেলেমেয়েদের। হ্যাঁ, স্বর্গরাজ্যই। প্রাচুর্যের দেশে। ফেলা ছড়ার দেশ। মাছ খেয়ে খেয়ে অরুচি জন্মে যায় সে দেশে।
'অ্যাঁ।'
'সোঁদরবন?'
'মায়ের বাপের সেই সোঁদরবন? শংকুর মুখ উত্তেজনায় আরক্ত।'
অটল হেসে বলে, 'হ্যাঁ, বাপ! তোদের মায়ের বাপের সেই সোঁদরবন! এ্যাখোন তোদের বাপের হবে।'
'বাপ, শব্দটার উপর একটু কৌতুক হাস্যের মিশেল দেয় অটল দাস। তুষু আর শংকু বাপের এই হাস্যরঞ্জিত মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বর্তে যায়। কত কত দিন যেন বাপের এমন হাসি হাসি মুখ দেখে নি তারা। সর্বদাই তো একটা রুক্ষ—শুষ্ক উদভ্রান্ত চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াচছে অটল।
তবে যতো দুর্দশাই হোক, ছেলেমেয়েকে কখনো গালমন্দ করে না অটল। শুধু কথাবার্তাগুলো ছাড়া—ছাড়া নীরস বিরস। আর তুষুর বন্ধু পুঁটির বাপ? রাত—দিন ছেলেমেয়েদের গাল দেয়, দূর হয়ে যা না, দূর হয়ে যা। আমার হাড়ে বাতাস নাগুক।
পুঁটির মা নেই। পাঁছ—ছটা ছেলে মেয়েকে ফেলে রেখে কোথায় যেন পালিয়ে গেছে।...দেখে অবাক লাগে তুষুর। মা—বাপ আবার অমন রাক্ষোস—এর মতন, ডাইনের মতন হয়?
তবু উদভ্রান্ত অন্যমনস্ক বাপের দিকে আজকাল আর তেমন ঘেঁষছিল না তুষু। নইলে মেয়ে তো ছিল অটলের গলার হার। কাজে যাচছে মেয়ে সঙ্গে করে, হাটে যাচছে মেয়ে কাঁধে করে, খেতে বসতে তো মেয়েকে সঙ্গে চাই—ই চাই।
সাগর যদি রাগ করেছে, 'ওকে তো পেট চিরে গিলিয়েচি, আবার নিজের থে ভাগ দেওয়া ক্যানো?
অটল হেসে হেসে বলেছে, 'তুষু যেন তোমার সতীন ঝি! বুইলি তুষু? ওইটা তোর মা না, সৎমা।'
শংকু সাহস করে বলে, সোঁদরবনে অনেক মদু আচে না বাবা?
'আচেই তো—মদু তো আচেই।'
অটল উৎসাহে ওঠে দাঁড়ায়, 'আসল কতা বল মাচ আচে, ভাত আচে। দুবেলা পেট পুরে শুদু ভাত আর মাচ! তার সঙ্গে ওসব তো আচেই। মদু কাঁটাল নারকেল পানিকল—পাঁটা হাসের ডিম—'
ছেলে মেয়ে দুটো বাপের গা ঘেঁষে বসে। জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে শুনে যায়।
কী সূত্রে কোন পথ দিয়ে আসবে এসব কথা ভাবে না অটল দাস। ওর স্বপ্নাতুর চোখের সামনে ওই মায়াময় আকর্ষণীয় জিনিসগুলো যেন ভেসে ভেসে উঠতে থাকে নাম—না—জানা নোনা নদীর জল থেকে।
অটল নদীর নাম জানে না। সাগরেরও যে খুব মনে আছে তা নয়, তবু স্মৃতির অনুশীলন করতে করতে হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যাচছে—'ভোলা' 'বলেশ্বর' 'রূপসী' 'মৌলা'।
মনে পড়াতক শৈশব বাল্যের সেই ধূসর স্মৃতি, যা নাকি বানের জলে ধুয়ে যাবার কথা, আর এত দিনের ঝড়—ঝঞ্ঝার উড়ে যাবার কথা, তা যেন আবার নতুন রঙের ছোপ খেয়ে খেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ছেলেমেয়ে দুটোও মায়ের চোখ দিয়েই যেন সেই সমারোহময় জীবনের ছবি দেখতে পায়।
'মা, কবে যাওয়া হবে?'
'তোর বাপকে শুদো। ওজই তো বলবে দু দিন বাদ।'
'দু দিন দু দিন করে দশ দিন হয়ে গ্যালো।'
'মা, আমার গিন্নী পুঁতুলটা নে যাবো?
'শুদেগে তো বাপকে। বলচে তো কিচ্চু নে যেতে হবে নি, মোট পুঁটুলিতে ভার করতি হবে নি, ওরা সব দেবে। তুই ওটাকে নুকিয়ে সঙ্গে নে।'
'মা প্যায়রাগুলান সব গাঁয়ে পড়ে থাকবে?'
সাগরও সেই সবুজ পাতার নাচনের আড়ালে লুকিয়ে বসে—থাকা ছোট ছোট পেয়ারাগুলোর দিকে তাকিয়েছিল।
সামনের আকর্ষণ তীব্র, তবু ফেলে যাওয়া মাটির মমতাও তো কম নয়। এক এক সময় মনে হয়, চিরদিন কি আকাল যাবে? কষ্ট করে আর কিছু দিন এখানে চেপে বসে থাকতে পারলে আবার সুদিনের মুখ দেখা যেতো।
'মা, সেই দেশটা খুব সোন্দর বলে সোঁদরবন নাম, তাই না?
'তাই তো। আবার কী? শংকুর খুব বুদ্ধি আচে।'
তলে তলে দেয়ালে গোঁজা পেরেকগুলো উপড়ে উপড়ে জড়ো করে সাগর। আঁচলের কোণে বেঁধে নিয়ে যাবে। যাওয়া মাত্তর কে সাগরকে পেরেক দড়ি এসব জোগান দেবে?
'থাকতে তো দেবে, কিন্তু ঘরটা কেমন দেবে? মনের মধ্যে প্রশ্নের তোলাপাড়া।
নিজেই চাপান নিজেই কাটান। নিঘঘাত ছোট মোটই হবে। বলেছে বটে, জবর দখলের মানুষগুলোকে মনিষ্যি হয়ে তারা ছাগল ভেড়ার মতন খোয়াড়ে পড়ে আচিস, দেখে প্রাণ কাঁদে—'
তবু এতো হুদো হুদো নোককে কি আর পেল্লাই পেল্লাই ঘর দিতি পারবি? ধরে নেয় সাগর ছোটই ঘর, কিন্তু কেমন হবে তার চেহারাটা?....সেই অদেখা ঘরটাকে কিছুতেই স্পষ্ট করে তুলতে পারে না সাগর।
'খণ্ডখোলা' গ্রামের তার সেই শ্বশুর বাড়ির মাটির ঘরটা, সেই কিছু দিনের বাসা খামার বাড়ির খড়ের চালাটা মামুদপুরের এই ছ্যাঁচা বেড়ার ঘরটা, সব যেন একাকার হয়ে যায়। আর তার উপর মোহময় একখানা ঘরের ছবি মাঝে মাঝে আবছা হয়ে ভেসে ভেসে ওঠে।
মোটা মোটা উঁচু উঁচু গরাণের খুঁটি শালের খুঁটির উপর কাঠের পাটাতন পাতা, তার উপরে বারান্দা—ঘেরা ছবির মতন সুন্দর বাড়ি! ভিতরে খাট বিছানা আয়না আলনা।
'কবে তোমার টেরাক আসবি শুনি? সাগর যেন আর এই ভাঙ্গা সংসারটা টানতে পারছে না। বর্ষা পড়ে গেছে, জলের ঝাপটায় দাওয়ায় বসে ভাত রাঁধা যায় না, ঘরের মধ্যে নারকেল পাতার জ্বালের ধোঁয়ায় অন্ধকার।
সাগরের মনে হয় ছুটে বেরিয়ে গিয়ে সেই রথে চড়ে বসে, যে রথ তাদের নিয়ে যাবে সেই সবুজ দিগন্তের দেশে।
'তোকে ভাঁত্ততা দিয়ে বাড়তি একটা নাম নিকিয়ে নেচে মুকপোড়া বসন্ত। দেকিস, ওই টিকিটে ওর সত্যি কার বোনাই বেয়াই কেউ টেরাকে চড়ি পড়বে। য্যাখন বাবুরা খাতা ধরি বলবি—অটল দাস? অন্য আর একটা মিনসেকে ধরে দেকিয়ে বলবি এই যে হুজুর।'
অটল অটল বিশ্বাসে বলে, কী যে বলিস! তুই যে যাত্তারা পালা নিকলি না ক্যানো, তাই ভাবতেচি। দেকিস পরে।
তবু ভিতরে ভিতরে ভয় নেই তা নয়, তাই এবেলা ওবেলা তিন চার মাইল রাস্তা হেঁটে রসুলপুর ঘুরে আসে অটল।
তারপর সত্যিই একদিন আসে।
'কাল ভোর রাত্তিরে টেরাক আসবি—হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসে অটল, বেলা বারোটায় ছাড়বি। বসন্ত বলে দেচে শেষ রাত্তিরে গে পৌচে বসন্তর গুষ্টির সামিল হয়ে বসি থাকতি! আর আলসেমি না।—শংকু, তুষু, তোদের ঘুম ভাঙ্গবে তো ত্যাখন?'
ছটফট করে বেড়ায় অটল দাস।
একবার তার নিজে হাতে বাঁধা বেড়ার ডালগুলো টানে, একবার দর্মার দেওয়ালগুলোয় হাত চাপড়ায়, একবার বসে, একবার হাঁটে।...সাগর কিন্তু সুস্থির। ও যতটা সম্ভব পুটলী বাঁধছে।
ওদিকে দশ বছরের শংকু গাছে উঠে, কষা কষা পেয়ারার গাদা পেড়ে পেড়ে জড়ো করছে। কিন্তু ট্রাক কই?
ভোর থেকে বইতে শুরু করেছে ঝোড়ো হাওয়া, বসে থাকতে থাকতে কাঁপুনি ধরে যাচছে।...অটল দাস ঘোরাঘুরি করছে, আসছে—যাচছে, সাগর তার পুঁটলি পোঁটলা আর ছেলেমেয়ে দুটোকে আগলে নিয়ে বসে আছে শুকনো মুখে। আর থেকে থেকে ভগবানকে শাপ—শাপান্ত করছে এই দুর্যোগের জন্যে।
হঠাৎ অটলদাস ঘুরে এসে একটা সুখবর দিল।
ট্রাক আসছে। তার সঙ্গে আরো একটা ট্রাক আসছে তার মধ্যে হাণ্ডা হাণ্ডা খিচুড়ি। কলোনির লোকেরা আজ সংসার উঠিয়ে চলে যাচছে, রান্না খাওয়ার সুবিধে হবে না, তাই এই ব্যবস্থা?
'ভগোমান। তুমি তবে আচো।' সাগর দুহাতে নিজের নাক কান মলে, 'হেই ঠাকুর, হেই ভগোমান, অপরাদ নিওনি।'
ঝড়ে শালপাতা উড়ে যাচছে, বা হাতে চেপে ধরে তবে খাওয়া। স্বাদও যদি না থাকে তবু ও অমৃত!
ওই শক্ত কাঠ কাঠ বিবর্ণ বিস্বাদ খিচুরি ডেলার মধ্যে যেন 'জীবনের' স্বাদ, বর্ণাঢ্য ভবিষ্যৎ।
ঝোড়ো হাওয়া বয়েই চলেছে। মানুষগুলো যেন পাতার মত উড়ে যাবে। অথচ গত রাত পর্যন্ত আকাশ শান্ত ছিল! ছিল জ্যোৎস্না।
সাগর বলল, 'অদেষ্টটা দ্যাকো।'
অটল বলল, 'একা তোর আমার নয়, এই এতোগুলো মানুষের।'
সেই ঝোড়ো বাতাসের মধ্যেই ট্রাক বোঝাই হতে থাকে। মানুষগুলোকে আর ছাগল ভেড়া বলেও মনে হয় না। যেন মাল মাত্র। যেভাবে মালের লরী বোঝাই হয়, সেইভাবেই হতে থাকে।
একসময় ট্রাক ছেড়ে দেয়।
শোরগোল চেঁচামেচি থামতেই চায় না। বেদম ঝোড়ো হাওয়ার শব্দকে পাল্লা দিয়ে মানুষের কলকল্লোল এগিয়ে চলে জানা অজানা পথ পার হয়ে।
মা—বাপের সঙ্গে আর কথা চলছে না। দুই ভাইবোনে গায়ে গা পিষে চুপি চুপি কথা!
'দাদা দ্যাক আমরা চলে যেতেচি বলে, এখেনের গাচপালাগুলো যেন মাতা ঝুঁইকে ঝুঁইকে কানতেচে—
'ঠিক বলিচিস! নুটিয়ে নুটিয়ে কানচে।'
'আত্তিরে আবার খেতি দেবে দাদা?'
'দেবেই তো। বসন্ত কাকা বলেচে—ননচে আঁদাবাড়া হবে, রাজাই খাওয়া—দাওয়া।'
'আর কক্ষনো এখেনে আসা হবেনি দাদা?'
দাদা নিজ মহিমা দেখাতে জোর গলায় বলে,—ক্যানো হবেনি? আমরা কি কইদী নাকি? জেলখানায় নে যাচচে?
কত পথ পার হয়ে, কত মাঠঘাট—ক্ষেতখামার ছাড়িয়ে ট্রাক চলেছে মানুষ বোঝাই দিয়ে।
যাত্রা শুরুর সেই কলকোলাহল আশ্চর্যরকম থেমে গেছে। এখন সকলেরই মুখ মলিন বিষণ্ণ। এ যেন অনন্ত যাত্রার পথে চলেছে তারা।
হঠাৎ তীব্র একটা আঁশটে গন্ধ এই বাতাসকেও ছাপিয়ে উঠে ছড়িয়ে পড়ল।
'দাদা।' ঠেলা মারল তুষু ঘুমন্ত দাদাকে, 'এসে গেচি বোদায়। মাচ মাচ গন্ধ আসতেচে—'
হঠাৎ রব উঠল, 'ক্যানিং ক্যানিং।'
আর ঠিক সেই সময় বৃষ্টি নামল মুষলধারে। সারাদিনের আফসানির শেষ পরিণতি।
তারপর এক অবর্ণনীয় হুলস্থূল কাণ্ড। ঠেলাঠেলি, চেঁচামেচি, আর্তনাদ, হাহাকার। কার হাতের পুঁটুলি পড়ে গেছে, কে ছেলেপুলেকে দেখতে পাচছে না, তবু লাঠির গুতো খেতে খেতে কাদার চড়া ভেঙে লঞ্চে উঠতে হচছে।
লঞ্চের মধ্যে আলোর রেখা, কাদার চড়া, ঘুটঘুটে অন্ধকার।
...যারা সব নিজের নিজের হারিকেন লণ্ঠন সঙ্গে এনেছিল, তারা খুঁজে পাচছে না। জ্বালবার চেষ্টাও অবশ্য বাতুলতা।...মাঝি মাল্লাদের হুঙ্কার, সারেঙের হুইশিল, বৃষ্টির শব্দ ক্রমশঃ চৈতন্যকে অসাড় করে দিচছে।
তবু দু'হাতে দুই ছেলেমেয়ের হাত শকত করে চেপে ধরে কাদার চড়া ভেঙে ভেঙে লঞ্চের সিঁড়িতে উঠছে সাগর, অটলের কাঁধে মালপত্র। মাথার উপর বৃষ্টির মুষলধারা। চেঁচিয়ে উঠল সাগর, 'আজকেই কি ভগোমানের পেলয়ের দিন গো? পিথীমীর শেষ আজ?'
কে একটা বলে উঠল—'মর মাগী। কথার কী ছিরি।'
তারপরই একটা কাতর শিশুকণ্ঠ, 'দাদা প্যায়েরা পড়ে যাচছে।'
কিন্তু পড়ে গেল কি শুধুই। দুটো অবোধ শিশু বাহিত ক'টা কষা পেয়ারা?...সৃষ্টি কর্তার হাত থেকে পড়ে গেল না কি তার আপন সৃষ্টির কিছু সঞ্চয়?
ঘাট জুড়ে লঞ্চ। আগে পিছে, দূরে! একটাতে চড়ে পড়তে পারলে, তার থেকে সিঁড়ি নামিয়ে পিছনেরটায় চড়ে পড়া যাবে। কে কোনটায় চড়বে, কেউ জানে না। কোথায় নির্দশনামা, কোথায় কে?
থেকে থেকে শুধু রণ হুঙ্কারের মত হুঙ্কার ছাড়ছে মাঝি মাল্লারা।...বিশেষ একটা সাংকেতিক শব্দ। এই পটভূমিকায় ভয়াবহ মনে হচছে।
এই ভয়ঙ্করকে চিরে ফেলে সহসা একটা নারীকণ্ঠ উদ্দাম হয়ে উঠল, 'শংকু! তুষু। ওগো ওরা যে ওঠে নাই।'
'উটেচে, উটেচে!'
'কই কোতায় উটেচে? শংকু, শংকুরে! তুষু! তুষুরে!'
'আমি উটবনি! আমি যাবনি! আমার নাইমে দ্যাও।'
উন্মাদিনীর এই প্রলাপ বাক্যে কে কর্ণপাত করবে? লঞ্চ তো ছেড়ে দিয়েছে।
'খপরদার আমায় ধরোনি, আমি যাবনি। আমি জলে ঝাঁপ দে চলে যাব।'
কিন্তু কে তাকে ছাড়বে?
হঠাৎ বসন্তর অভয়কণ্ঠ শোনা যায়, 'তারা তো উই আগের ননচে উঠলো দেখলাম।'
'আগের ননচে!'
'কোন আগের?'
'উই যে যেটার গায়ে হলদে হলদে করে কী সব লেখা ছিলো।'
'সেটা কোন খেনে যাবে?'
'সবই এক জায়গা যাবে বাবা। অটলদাস তোমার পরিবারকে বুঝ দাও। চড়ে যখন পড়েছে, ঠিকই পৌঁছাবে।'
'পৌঁচাবে। কখন পৌঁচাবে?'
'তা জানি নে। বাতাসের মুখ বুঝে।'
এখন আর এলোমেলো চীৎকার নয়, শুধু একটানা একটা কাতর কান্না,—'ওরে শংকু বাপ আমার, ওরে মা তুষু, তোরা ক্যানো আমার হাত ছাইড়ে এগুয়ে গেলি? এই রাস্কোস ঠাঁইতে তোদের আমি কোতায় খুঁজবো?'
অনেকেই এ কান্নায় বিরক্ত হয়। যাত্রাকালে এ কী মড়া কান্না! কেউ কেউ আবার সান্ত্বনাও দিতে আসে, তোমাদের চেনা লোক যখন বলছে অন্য লঞ্চে উঠতে দেখেছে তখন যাবে কোথায়? ড্যাঙায় নাবলে ঠিক পেয়ে যাবে। ভাত রান্না হচছে, খাও দাও।
অটলদাস কিছুই বলছে না। সাগরকে তার বড় ভয়। সান্ত্বনা দিতে এসে হয়তো হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। এখন শুধু ড্যাঙার অপেক্ষা।
কিন্তু কোথায় সেই ডাঙা? যেখানে সাগর আর অটলদাস পায়ের তলায় মাটি পাবে?
সকালে প্রকৃতি মনোহারিণী রূপসী। কে বলবে কাল ওই কাণ্ড গেছে।
ভিজে মাটির চড়ার ওপর ঝকঝকে রোদ। বাসন্তীতে নোঙর করেছে এই লঞ্চ। ক্যাম্প পড়েছে চড়ার ওপর দিকে উঁচুতে। আরো কিছু কিছু ক্যাম্প পড়েছে গোসাবায়। সেখানে আগে নেমে গেছে আগের লঞ্চের লোক।
'তোমার ছেলেমেয়ে বোধহয় ওই ওই আগের লঞ্চেই চেপে বসেছিল বাছা! মাঝি মাল্লাদের বলে কয়ে দ্যাখো। যদি ফিরতি পথে তোমাদের নিয়ে যায়।'
'নে যাবি?'
'যাবে না কেন? সংসারে ভাল নোকও আছে বৈকি।'
বৌয়ের কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচছিল অটলদাস, সাহস করে একবার এগিয়ে আসে। বলে, 'মাজিদের বলেচি, নে যাবে। কাল তো এতোটুকুন কিছু দাঁতে কাটিস নাই, ওখেনে পাউরুটি আর চা দেচছে।'
এতোক্ষণ গুণগুনুনি চলছিল, আর চলছিল বৃথা খোঁজা। হঠাৎ বাঘিনীর মত ঝাঁপিয়ে পড়ে সাগর নামের মেয়েছেলেটা। আর শত চক্ষুর সামনে দু হাতে কীল মারতে থাকে একটা শক্তসমর্থ পুরুষকে। ক্যানো আনলি তুই। ক্যানো আনলি? বল ক্যানো আনলি? এনে দে আমার শংকু তুষুকে। দে এনে!
কিন্তু কী সাধ্য অটল দাস নামের তুচ্ছ মানুষটার যে ওই লোনা জলের গভীর তলা থেকে সাগরের হারানে মানিক দুখানা খুঁজে এনে দেবে? দিন রাত পার হয়ে গেছে।...গোসাবা তো খুঁজে এল, খুঁজে এল মোরেলগঞ্জ খুঁজতে ফিরে এল ক্যানিং পর্যন্ত।...আবার গেল সেই গোসাবায়!
পথ চিনতে না পেরে মা—বাপকে খুঁজে খুঁজে কোথায় কোথায় হয়তো ঘুরে বেড়াচছে দুটো ছোট্ট মানুষ।
একশোবার জিগ্যেস করা হয়েছে বসন্তকে, 'বসন্ত তুমি কি সত্যি দেখেছিলে?'
বিপদকালে একটা স্তোক বাক্য উচ্চারণ করে ফেলে যে এমন বিপদে পড়তে হবে তা কি ভেবেছিল বসন্ত? বলে, 'দেখলাম তো দাদা। নিজের চক্ষেই তো দেখলাম।'
বলে ফেলেছে তার জের তো টেনে চলতে হবে।
নিজের চক্ষে দেখেছে বসন্ত। তবে?
তবে এই জায়গাটা ছেড়ে রেখে কোথায় যাবে সাগর আর অটল? কিন্তু দুজনে কী একসঙ্গে? নাঃ সাগর একলা ফেরে। হঠাৎ হঠাৎ প্রবল শব্দে ডাক দেয়, শংকুরে—তুষুরে—! আর অটলকে ধারে কাছে আসতে দেখলেই ধাঁই ধাঁই করে মারতে থাকে।
নিশ্চিত খাওয়া নেই, নিশ্চিত নাওয়া নেই, নিশ্চিত আশ্রয় নেই, শেয়াল কুকুরের মতো ঘুরে ঘুরে, এখানে সেখানে দিন রাত্রি কাটানো।
হঠাৎ একদিন অটল দাস ওই পাগলীর মায়ের হাতটা চেপে ধরল, বলল, 'সাগর আমার দিকে তাকা। পষ্ট করি তাকা। দ্যাক আমার কি কিছুই নাগে নাই? তুষু আমার গলার হার ছেলো না? শংকু আমার পাজরার হাড়? জানিস নাই তুই?'
পাগলীর রুদ্র মূর্তি সহসা স্থির হয়ে যায়। তাকিয়ে থাকে ওই বেদনার্ত মুখটার দিকে। বারো বছর বয়েস থেকে এই বত্রিশ বছর বয়েস পর্যন্ত যে মুখটার দিকেই তাকিয়ে কাটিয়ে এসেছে সে। সুখে দুঃখে জলে আগুনে অভাবে অনটনে। আগুন জ্বলা ধক ধকে চোখ দুটোর গভীর গহ্বর থেকে হঠাৎ বাষ্পোচ্ছ্বাস ওঠে, তারপর প্রবল জলোচ্ছ্বাস।
ডুকরে কেঁদে উঠে সাগর নামের সেই মেয়েটা, যে মেয়েটা একদিন জ্যালজেলে চেলির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে এক জেলা থেকে আর এক জেলায় চলে এসেছিল অটলদাসের পিছু পিছু সবিস্ময়ে তার চওড়া কাঁধ আর চ্যাটানো পিঠখানার দিকে তাকাতে তাকাতে।
শ্বাস নেই তবু হাড় ক'খানা আছে, মাস নাই তবু কাঠামোখানা আছে। সেই কাঠামোখানার ওপরই আছড়ে পড়ে মুখ চেপে ধরে হু হু করে কেঁদে চলে সাগর। লোনা জলে ভাসিয়ে দেয় অটলদাসের চওড়া বুকের খাঁচাখানা।
কাঁদতে দেয় ওকে অটল। মনে মনে বলে কাঁদ, কান্নাই ওষুধ।
অনেকক্ষণ পরে আস্তে বলে, যদি পাবার হয় তো একদিন খুঁজি পাবো সাগর। আর যদি ভগমানের কড়িনুকোনো খেলা হয়তো কিচু করার নাই।...কিন্তুক আমরা দু মানুষতো আচি? একদা ওরা ছেলো না, আসে নাই। শুদু তুই আর আমি থেকেচি। মনে ভাব সেই দিনে ফিরে গেচি আবার। তুই আর আমি নোতুন করে জেবন আরম্ভ করতেচি।...
শরীরে আর সেই অসুরের বল নেই।
নেই সেই পেশী কঠিন চওড়া বুক পিঠ। নেই টগবগে মুখ, রগরগে চুল। তবু লোকটা অটল দাস।
এধার ওধার যেতে আসতে লোকে দেখে আলতু ফালতু কুড়োনো মাল হোগলা গোল পাতা, নারকেল পাতা খেজুরছড়া দিয়ে দিব্যি একখানা ঝুপড়ি বানিয়ে ফেলেছে একটা চরে ঘুরে বেড়ানো আধবুড়ো লোক বানিয়ে ফেলার পর কোথা থেকে যেন বয়ে বয়ে আনছে, মাটির মালসা জ্বালানিপাতা।
কেন যে?
ওই লোকটির মধ্যে যে কোনখানে কোথাও মান—অভিমানের বালাই বলে কিছু ছিল, থাকা সম্ভব, তা কে কবে ভেবেছে? ঘরে পরে?
নীহারের মুখের বুলিই তো ছিল, মানুষ না জানোয়ার, কী তুমি? লজ্জা নেই, ঘেন্না নেই, মান নেই, অপমান নেই, ইতর ছোটলোক!
পাড়াপড়শী আত্মীয়জনেরা বলত, আশ্চর্য বেহায়া লোক বাবা! গণ্ডারের চামড়া দিয়ে তৈরি নাকি কে জানে। বলতে তো কিছু কসুর রাখি না। তবু—
আর লতু? সরকার বাড়ির লতু? যার কথাটা সব থেকে বুকে বাজত অধীরের। রক্তে সব থেকে দাহ ধরাত। লতু তার লাবণ্যময় মুখটাকে করুণ করুণ করে অনায়াসে বলত, মেসোমশাইয়ের কাণ্ড দেখে আমারই গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করে অধীরদা। বাবা কী বলে জানো? বলে, রাস্তার বেড়াল কুকুরটারও যেটুকু ময্যেদা জ্ঞান আছে, এ লোকের তাও নেই। তাদের দূর দূর হেয় হেয় করলে দুটো দিনও সে বাড়ি ঢোকে না। আর এই সুধীর ভট্চায—ছিঃ। শুনে যেন মাথা কাটা যায় অধীরদা! ভগবান যে ওঁকে কেন অমন করে গড়েছেন! কিন্তু ক্রমশ দেখা যাচ্ছে, ভগবানের সৃষ্টিতে পুরো ফাঁকি ছিল না। ওই সুধীর ভট্টচায লোকটার মধ্যে মান—অভিমান বলে বস্তু কিছুটা দিয়ে রেখেছিলেন কোন খাঁজে খোপে। অবশ্য একদিন দু'দিনে তা ধরা পড়েনি।
প্রথম ক'দিন নীহারই বলেছে, যাবে আবার কোন চুলোয়! কে কোথায় ওঁর জন্যে ভাত বেড়ে নিয়ে বসে আছে? পকেটের পয়সা ক'টা ফুরোলেই সুড়সুড় করে চলে আসবে। খবরদার বিজ্ঞাপন—টিজ্ঞাপন দিতে যাবি না অধীর।
রণধীর আর বাণ্টি চুপি চুপি বলাবলি করেছে যতদিন না আসে বাবাটা ততদিনই ভালো। বাড়িটা কেমন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা রয়েছে দেখছিস!
কিন্তু ওই আলোচনাগুলো ক্রমেই ধূসর হয়ে আসছে। ওই ঠাণ্ডা ঠাণ্ডাটা যেন সংসারটাকে ঠাণ্ডা সারিয়ে দিচ্ছে। আর এমনি ভাগ্যের ফের, বাপকে গলা ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বিদেয় করার পর থেকেই অধীরের অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজটা যেন ফুলে ফেঁপে উঠছে।
যখন আশাতীত সব অর্ডার আসে, নোটের গোছাগুলো হাতে নিয়ে মাঝে মাঝে যখন অবিশ্বাস্য লাগে, তখন গোপনে একটা নিশ্বাস ফেলে ভাবে অধীর, এর অর্থ কী? বাপকে গলাধাক্কা দিয়ে (মানে সত্যি সত্যি আক্ষরিক অর্থেই) বাড়ির বার করে দেওয়া তো পাপই। মহাপাপ! তা সে যেমন চরিত্রের বাপই হোক। অথচ সেই তখন থেকেই কেন এমন বাড়বাড়ন্ত। এখন টাকা হাতে নিয়ে এক এক সময় ভারী বিষণ্ণ হয়ে যায় অধীর। তখন যদি এ অবস্থা আসত! এর অর্ধেক আয় হলেও বাপের হাতে নিশ্চয় কিছু কিছু তুলে দিতে পারত সে। তাহলে ওই নোংরামিটা করে বেড়াত না বাবা।
কী না করেছে সুধীর ভটচায, কত না উঞ্ছবৃত্তি তার নেশার খরচ জোটাতে। লোকের দোরে দোরে হ্যাংলার মতো বারবার গিয়েছে, হাতে পায়ে ধরেছে, পৈতে ছুঁয়ে দিব্যি গেলেছে, এই শেষ আর চাইবে না, আর ছেলেকে শাপমন্যি দিয়েছে বাপের নেশার খরচ বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে।
ভালো হবে না! এই বলে দিচ্ছি অধীর, তোর ভালো হবে না। তোর দুঃখে শ্যাল কুকুর কাঁদবে। বাপের শাপ, ব্রহ্মশাপ, তা মনে রাখিস। ছেলেকেও একদিন পৈতে ছিঁড়ে অভিশাপ দিয়েছিল সুধীর ভট্চায। শেষ অবধি আবার ছেঁড়া পৈতেটা কুড়িয়ে নিয়ে গিঁট দিয়ে পরেছিল, আর আজও শেষ অবধি সেই গিঁট দেওয়া তেলচিটা পৈতেটাই গলায় ছিল তার।
বাপের সেই ময়লা পৈতে পরা খালি গা চেহারাটা যখনই চোখে ভেসে ওঠে। কিন্তু কই, বাপের শাপ যদি ব্রহ্মশাপ হতো অধীরের ভাগ্যে উল্টোটাই হচ্ছে কেন? বাপ গিয়ে পর্যন্ত অবিরত ভালোই তো হচ্ছে তার। প্রথম যেদিন একসঙ্গে অনেকগুলো টাকা পেয়েছিল অধীর, সেদিন তার থেকে দুখানা বড় নোট হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল, মনে মনে একখানা শীর্ণ শিরাবহুল হাতের দিকে বাড়িয়ে ধরে। তারপর আস্তে উঠে তুলে রেখেছিল দেরাজের একেবারে নীচে কাপড়—চোপড়ের তলায়। এখনও সে দুটো সেই ভাবেই তোলা আছে! অভাবের থাবা তাকে মুঠোয় চেপে উঠিয়ে নিয়ে যায়নি। কারণ অভাব বলতে অধীরের এখন শুধু সময়ের অভাব। আর কিছু না। হয়তো ভুলেই গেছে অধীর ও দুটোর কথা। অথবা মানতি পূজোর মতো তুলে রেখে দিয়েছে! কে জানে সেই শীর্ণ শিরাবহুল হাতখানা সত্যি প্রত্যক্ষ মূর্তিতে সামনে বাড়ানো থাকলে কী হত! এই মন কেমন, এই বিষণ্ণতা, এই অপরাধ—বোধ, মরুভূমিতে জলের ফোঁটার মতো শুকিয়ে যেত কিনা। দায়হীন ভারহীন তীব্রতার স্পর্শহীন ছায়াটুকুর সঙ্গে দুর্দান্ত দুরন্ত দাপুটে কায়ামূর্তির তফাৎ অনেক। ইচ্ছে করে অনেক সময় অধীর তার এই সাজানো সংসারে সেই দুরন্ত উপস্থিতিটা অনুভব করতে চেষ্টা করে, কিন্তু চেষ্টাটা দানা বাঁধে না। কিছুতেই সেই অসহনীয়তাটা অনুভবে আনতে পারে না। কেবলই কিছু কিছু নোটের গোছা সব আবছা করে দেয়?
টাকা হাতে পেলে কি অমন হ্যাংলা আর হিংস্র থাকত সুধীর ভটচায নামের মানুষটা? লোকের কাছে হ্যাংলা, বাড়িতে হিংস্র। কিন্তু শুধুই কি হিংস্র, একটা সাধারণ গেরস্থ ঘরের মানুষের পক্ষে যত রকম নিঘিন্নেপনা, মিথ্যে কথা, জোচ্চুরী, হাত সাফাই, আর সর্বোপরি নির্লজ্জ মনোবিকার। বাড়িতে একটা কমবয়সী ঝি রাখবার পর্যন্ত জা ছিল না নীহারের! দৈবাৎ অসুবিধেয় পড়ে রাখতে হলে পাহারা দিয়ে দিয়ে বেড়াতে হত নীহারকে।
এদিকটা অবশ্য জানা ছিল না অধীরের। বিবাহিত পুরুষ তো নয় যে, সংসারের সর্ববিধ ঘটনার রিপোর্ট পাবে। মনের ঘেন্নায় চক্ষুলজ্জার দায়ে অথবা কী জানি আর কিসের জন্যে বড় ছেলের কাছে অনেক কিছুই লুকাতো নীহার। কিন্তু বাকিগুলো তো হাড়ে হাড়ে টের পেত অধীর।
টাকা এনে কোথায় লুকিয়ে রাখবে ভেবে পেত না, মায়ের কাছে রেখে দিয়েও তো স্বস্তি নেই। সংসার খরচের জন্যে গুণে গুণে যেটুকু তুলে দেয় মায়ের হাতে, তার থেকেও তো কেড়ে নেয় মায়ের পতি পরম গুরু, খোসামোদ করে পায়ে পড়ে, অথবা খিঁচিয়ে, অকথ্য গালমন্দ করে হাত মুচড়ে।
দুটো একটা টাকাও প্যাণ্টের পকেটে রাখবার জো নেই, কোন ফাঁকে আলনায় ঝোলানো প্যাণ্টটার পকেটে হাত চালিয়ে সাফাই করেই উধাও হয়ে যাবে অধীরের পিতা স্বর্গঃ পিতা ধর্মঃ...।
অসময়ে চাকরি খুইয়ে বসে থাকাও তো সুধীরের ওই গুণটির কল্যাণে। একদা তো একটা মাড়োয়ারী কর্ম প্রতিষ্ঠানে হিসাব রক্ষকের কাজ করত সুধীর ভট্টচায, বাড়ির লোকে অবশ্য কোন দিন তার পুরো মাইনের হিসেব জানত না, পেতও না, তবু নেহাৎ খারাপ ছিল না কাজটা। তা ছাড়াও অন্য নানাবিধ সুবিধা ছিল।
কিন্তু তলায় তলায় তিল তিল করে লোভের গর্ত খুঁড়ে চলেছিল সুধীর, এক সহকর্মী এক গুরুর প্ররোচনায় আর দুঃসাহসে।
লোভই ছিল সুধীরের, বুদ্ধি ছিল না। অতএব হঠাৎ একদিন সেই তিলের গহ্বরটি তাল প্রমাণ হয়ে মনিবের গোচরে এসে গেল। সুধীরের গুরু সেই পরামর্শদাতাটি দিব্যি গা বাঁচিয়ে রয়ে গেল, সুধীরের চাকরিটি খতম হল। জেল হল না এই ঢের।
মনিব বলেছিল, নিজের ঝঞ্ঝাট বাঁচাতে থানা পুলিশ করতে গেলাম না, তবে ভবিষ্যতে এইটা যেন তোমার জীবনের শিক্ষা হয়...আর শিক্ষা! কর্মজীবনে সেইখানেই সমাপ্তি—রেখা সুধীর ভট্টচার্যের। তদবধিই উঞ্ছবৃত্তির ওপর থেকেছে। নেহাৎ তখন থেকেই অধীর কিছুটা আনতে শিখেছে, তাই সংসারটা বালির চড়ায় মুখ থুসড়ে পড়েনি। কিন্তু সুধীরের চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল না, ইচ্ছেও ছিল না। বাপের ওপর রাগে ঘৃণায় সর্বদা শরীর রী রী করত অধীরের।
বাপের সঙ্গে কথা কইতেও প্রবৃত্তি হত না। হবেই বা কী করে? যে লোক কেবল মাত্র উঞ্ছবৃত্তি আর ভিক্ষুক বৃত্তির ওপর চলতে চলতে নেশার মাত্রা বাড়িয়েছে বলে, তার ওপরে কার শ্রদ্ধা ভালোবাসা আসবে?
লোকটারও হয়তো কর্মহীন দায়হীন শ্রদ্ধা ভালোবাসার সম্বন্ধহীন নিরলম্ব জীবনটার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছিল গাঁজা কোকেন ধেনো মদ।
ক্রমশ ঘৃণ্য এবং ভীতিকর হয়ে উঠছিল লোকটা ঘরে বাইরে। যতক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকে শান্তি, বাড়ি ঢুকতে দেখলেই স্ত্রী পুত্র কন্যা সকলের আতঙ্ক। ওই এলো ধূমকেতুর মূর্তিতে।
আর বাইরের লোক? চেনা লোক রাস্তায় দেখা হলে না দেখার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায় পাছে টাকা চেয়ে বসে। বাড়িতে আসছে দেখলে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিয়ে ছেলেমেয়েকে শিখিয়ে দেয়, বলিস আমি বাড়ি নেই। তবু তার মধ্যে থেকেও নাছোড়বান্দা ভিখিরির মতো—
সবথেকে বেশী ঘেন্না করেছে বিজন সরকার। লতুর বাবা। বলেছে, আপনার না হয় গায়ে গণ্ডারের চামড়া, কিন্তু আমার পকেটটা তো রবারের নয়! দয়া করে আর আসবেন না। আর এলে কিন্তু অপমানী হতে হবে।
যেন হচ্ছে না সেটা। যেন এটা অপমান নয়। কিন্তু তবু কি ঠেকাতে পেরেছে? সুধীর ভটচায যে একদা বিজন সরকারের দাদা বিনয় সরকারের ক্লাশফ্রেণ্ড ছিল, সেই কথা তুলে কাকুতি মিনতি করেছে সুধীর।...মরে যাওয়া দাদার ক্লাশফ্রেণ্ড সম্পর্কে কোন রকম দুর্বলতার ভাবই দেখায়নি বিজন সরকার, কিন্তু তার টাকা আছে অনেক, তাই তার কাছেই ধর্ণা দিতে গেছে সুধীর। তাছাড়া আরো একটা কারণ, তার ব্যাটা অধীরের টিকিটা এখানে বাঁধা পড়ে রয়ে আছে, অতএব চক্ষুলজ্জার দায়ে এবং মেয়ের মুখ চেয়ে না দিয়ে পারবে না বিজন।
কিন্তু আশ্চর্য, এই লোকটা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে কেউই গলা খুলে বলছে না, বাঁচা গেছে, আপদ গেছে, হাড়ে বাতাস লেগেছে আমাদের—
বরং সকলেরই কোথায় যেন একটা অপরাধ—বোধ আলপিনের খোঁচার মতো চিনচিন ধরাচ্ছে। ভাবটা—আহা, লোকটাকে অত দূরছাই না করলেই হত! নশো পঞ্চাশ কিছু তো চাইত না, বড় জোর টাকাটা সিকেটা, তার জন্যে বড় বেশী অপমান করা হয়েছে। কেউ কেউ আরো মমতায় গলে বলেছে, কী করবে, নেশার দাস হয়ে মরেছিল, অথচ ছেলে এক পয়সা হাত খরচ দিত না—তাই অমন করে বেড়িয়েছে। ...নেশা যে মানুষকে অমানুষ করে ছাড়ে।
হঠাৎ অবস্থা ফিরে যাওয়ায় এখন আর মুখোমুখি কেউ কিছু বলছে না অধীরকে। গোড়ার দিকে বলেছে বৈকি। দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা এসে এসে বলে গেছে, যতই হোক জন্মদাতা পিতা তো বটে। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দেওয়াটা উচিত হয়নি তোমার অধীর! শুনতে পেলাম নাকি যেতে চাইছিল না, দরজা আঁকড়ে বসে পড়েছিল, তুমি ঠেলতে ঠেলতে বার করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলে!
কথাটা মিথ্যা নয়, তাই দিয়েছিল বটে, অধীর নামের সেদিনের সেই তীব্র গোঁটা।
তোমায় আজ আমি বিদেয় করে তবে ছাড়ব—
কথাটা যেন যখন তখনই হঠাৎ হঠাৎ কানে বেজে ওঠে অধীরের। কথা নয়, গর্জন। কার গলা? অধীরের? এত কটু কঠোর রুক্ষ কর্কশ গর্জন অধীরের গলা থেকে বেরোতে পারে? তা পেরেছিল তো।
কিন্তু ওরা কি করে জানল? ওদের তো জানবার কথা নয়!
সংবাদদাতা পরিবেশিতই অবশ্য। কিন্তু কে সেই সংবাদদাতা? রণধীর? বাণ্টি? মা?...কোনটাই সম্ভব নয়। বাণ্টি রণধীরের তো কথাই ওঠে না, মার পক্ষেও অসম্ভব! সত্যি বলতে কি মার জন্যেই তো আরো—
সেই সন্ধ্যাটাকে মাঝে মাঝেই উঁচু তাক থেকে পেড়ে নামায় অধীর। এদিক থেকে ওদিক থেকে এগিয়ে পিছিয়ে সামনে থেকে অনেক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে, আর গভীর পরিতাপের সঙ্গে অস্থির উত্তেজনা নিয়ে ভাবে—ভেস্তে যাওয়া ফেলার তাসগুলোকে কুড়িয়ে নিয়ে আবার যদি নতুন দান সাজিয়ে বসা যেত! যদি ফিরিয়ে নেওয়া যেত সেই সন্ধ্যাটাকে!
খুব যথাযথ মনে করতে পারে অধীর সেই সন্ধ্যাটাকে। কারণ সেই কেবলই মনের মধ্যে মেলে ধরে দেখে অধীর।
বাপের কেলেঙ্কারীতে ধিক্কারে অপমানে লতুদের বাড়িতে আর যাচ্ছিল না ক'দিন অধীর, হঠাৎ রাস্তায় দেখা হল লতুর সঙ্গে। মান—অভিমান দেখাল খানিকটা, তারপরই বলল, তোমার বাবাকে তুমি কিছু কিছু টাকা দিও অধীরদা ওই সব নেশা—ফেশা করার জন্যে। নইলে আমার বাবার কাছে তো আর আমার মুখ থাকছে না। আজ কী হয়েছে জানো? সত্যি করে বাবার পায়ে ধরেছে মেসোমশাই। বলেছে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্রাহ্মণ হয়ে তোমার পায়ে ধরছি বিজন, পাঁচটা টাকা আজ আমায় দিতেই হবে।...তা মা বলল...লতু মুখটাকে আদুরী আদুরী করে বলে উঠল, মা বলল, বামুন মানুষ পায়ে ধরছে, দিয়ে দাও টাকা ক'টা। পাঁচটা টাকা তো তোমার হাতের ময়লা! কিন্তু এ কথাও বলে বসেছে, অমন হাঘরের ছেলের সঙ্গে তোর বে দিচ্ছিনে আমি।... মাথায় আমার আকাশ ভেঙে পড়েছে অধীরদা।...
আকাশ—ভাঙাভাঙি আবার কী? বিয়ে—ফিয়ে তো করছি না—বলে অধীর রাগে জ্বলতে জ্বলতে বাড়ি ফিরেছিল।
শরীরের সব রক্ত যেন আগুন হয়ে উঠেছে, জিভেয় স্বাদ তেতো। মনের অনুভূতি যেন জিভে এসে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ঢোক গিলতেও যেন তেতো লাগছিল। এই শরীর মন নিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢোকার পথেই শুনতে পেলো—মরো মরো, এক্ষুনি মরো তুমি! তোমার যমের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে শাঁখা নোয়া ভেঙে গঙ্গা নেয়ে উঠি আমি।
কী কুৎসিত! কী অশ্লীল! ছুটে বাড়ির মধ্যে ঢুকে এলো অধীর। দেখতে পেলো মায়ের আঁচলটা টেনে ধরে তাতে দাঁত বসাচ্ছে বাবা। গিঁট বাঁধা আছে মোক্ষম করে, নখের চেষ্টায় খোলবার ধৈর্য নেই, তাই দাঁতে ছিঁড়ে নিচ্ছে গিঁটটা সমেতই। গিঁট মানেই তো টাকা!
অধীর যে মুহূর্তে ঢুকেছে, সেই মুহূর্তেই খানিকটা শাড়ি ফ্যাঁস করে ছিঁড়ে এসেছে সুধীরের দাঁতে।...বিপর্যস্ত নীহার গা কাপড় সামলাচ্ছে আর চেঁচাচ্ছে।
কী হচ্ছে কী? গর্জন করে ওঠে অধীর।
ছেলের সামনে কেঁচো। আর কথা নেই দুর্দান্ত সুধীর ভটচাযের।
চেঁচিয়ে ওঠে নীহার, তুই এসেছিস! দ্যাখ, দ্যাখ তোর বাপের কীর্তি। বোঝ না কেন গালমন্দ করি। তুই সেই দশটা টাকা দিয়ে গেলি রেশনের জন্যে, আজ আর আনা হয়নি লক্ষ্মীছাড়া ছোটলোক টের পেয়ে আঁচল ছিঁড়ে কেড়ে নিচ্ছে—
অধীর তাকিয়ে দেখে দেয়ালের ধারে বাণ্টি আর রণধীর ভয়তরাসে চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে এই নাটকীয় দৃশ্য অবলোকন করেছে। আর বাবা গোঁজ হয়ে খুলে পড়ো পড়ো লুঙ্গিটা সামলে বাঁধছে, বোধ করি সটকান দেবার তালে।
তেড়ে গিয়ে বাপের ঘাড়টা চেপে ধরে অধীর। আর ওই কটু কর্কশ রুক্ষ কঠোর দাঁত পেষা শব্দটা কোথা থেকে যেন উচ্চারিত হয়—তোমায় আজ আমি বিদেয় করে তবে ছাড়ব।
তখন তো নীহারও আরও কটু আরও কর্কশ।—দে দে, তাই দে! ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দে।...এই ইতর ছোটলোক চামারকে নিয়ে আর পারছি না আমি...দে বার করে দে—হাড় জুড়ুক আমার।
সত্যিই তাই দিল অধীর।—যাও বেরিয়ে যাও। আর এ বাড়ীতে মাথা গলাতে চেষ্টা কোরো না।
ঠেলতে ঠেলতে পার করে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল অধীর তার হতভম্ব বাপের মুখের ওপর। হতভম্বই। সত্যি এমনটা হতে পারে তা বোধহয় ভাবতেই পারেনি সুধীর ভট্চায। শেষ চেষ্টা করতে দরজাটা আঁকড়ে ধরল, কিন্তু দুরন্ত রাগে জ্ঞান—শূন্য জোয়ান ছেলের জোরের সঙ্গে পারবে কেন?
এক ঝটকায় হাতটা খসে পড়তেই লোকটা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। তারপর চেঁচিয়ে বলে উঠল, আচ্ছা, ঠিক আছে। আর এ ভিটেয় পা দিচ্ছি না আমি। এই শেষ!
দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে অধীর হাঁপাতে থাকে, আর কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে। কিন্তু নীহার তখনও চেঁচিয়ে চলে, মানুষের রক্ত যদি গায়ে থাকে তো ট্রামলাইনে মাথা পাতগে। লরীর তলায় ঝাঁপ দাওগে—কিছু না পারো, মা গঙ্গা আছেন।
মা থামো। ক্লান্ত বিধ্বস্ত অধীর ভটচায গম্ভীর খাদে নামা গলায় বলে ওঠে, মা থামো।
এই নিষেধবাণী কাজে লাগে। হঠাৎ একেবারে চুপ হয়ে যায় গলার শির ওঠা ইস্পাত শক্ত চোয়াল পেশী কঠিন মুখ, একটা ক্ষ্যাপা গোঁ।
কিন্তু এই দৃশ্যর আর কোন দর্শক ছিল না, বাদে, বাণ্টি রেণু আর মা ছাড়া।...অথচ অধীরের যে যেখানে আছে সবাই জেনে ফেলল, কী কী ঘটনা ঘটেছিল, কোন পরিস্থিতিতে মূল ঘটনাটা ঘটল।...আশ্চর্য হয়ে যায় অধীর।
নাটকের ক্লাইম্যাক্সের পর যেন কিছুক্ষণের জন্যে মঞ্চে যবনিকা পড়ল। সাড়াহীন শব্দহীন একটা ভয়ঙ্কর স্তব্ধতা। অধীর নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়েছে, জানে না কে কোথায় কি করছে।
অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ ওই স্তব্ধতা বিদীর্ণ করে নীহারের ভাঙা ফাটা গলাটা কথা কয়ে উঠল—এই লক্ষ্মীছাড়ি বাণ্টি মজা করে ঘুম মারতে গেলি যে? জল দেওয়া পিঁড়ি পাতা সেও কি আমায় করতে হবে?
অধীরের ঘুম এসেছিল, ধড়মড় করে উঠে বসল। সংসারটা তাহলে থেমে যায়নি। নিত্য নিয়মে পিঁড়ি পড়বে, তার পাশে পাশে জলের গ্লাস বসবে, আহার্যপূর্ণ থালাও বসবে সামনে। মায়ের তীব্র অভিযোগের কণ্ঠ সেই পরম আশ্বাসবাহী।
দাদাকে ডাক। শুনতে পেল অধীর। ডাকের অপেক্ষায় পড়ে রইল।
বাণ্টি এসে ডাকল, দাদা এসো, মা খেতে দিয়েছে।
অধীর চৌকী থেকে নেমে দাঁড়িয়ে হাই তুলে সহজ হবার ভঙ্গীতে বলে, বাবা ফিরেছে?
বাবা! বাণ্টি প্রায় অবাক গলায় বলে, বাবা আবার ফিরবে?
অধীর আরও সহজ হতে চেষ্টা করে, ফিরবে না তো কি সত্যি সত্যি চলে যাবে নাকি? কোথায় থাকবে রাত্তিরে?—প্রবোধটা বাণ্টিকেই দিল অধীর, না নিজেকে, তা কে জানে।
অধীর ভেবেছিল ছেলেমেয়েদের খাইয়ে মা নিজের খাবার ঢেকে রেখে বসে থাকবে। এবং অধীরকে বলতে হবে, কেন মিথ্যে বসে থাকবে? আজকে আর আসবে না বাবা—রাতটা রাগ করে কোথাও পড়ে থাকবে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল মা তাদের খেতে দিয়ে দেয়ালের ধারে নিজের জায়গাটায় ঠিকই বসে পড়ল রুটি তরকারি গুছিয়ে নিয়ে। ...শুধু একটু তফাতে একটা জায়গা ফাঁকা পড়ে রইল আরো অস্বস্তিকর ফাঁকা—পিঁড়ি নিয়ে।
তদবধি চলছে সেই ফাঁকার কারবার। তবু প্রথমটা কেউ গায়ে মাখল না। ওই লোকের মধ্যে যে মান অভিমানের বালাই বলে কিছু আছে সে বিশ্বাস তো ছিল না কারুর।...তাই অধীর মাঝরাত্রে দু—একবার উঠে উঠে দেখেছে বাইরের দরজা খুলে—যদি নেশার ঘোরে এসে বসে থাকে।
সকালবেলা উঠে অধীর দেখল নীহার যথারীতি রান্নাঘরে খটখট করছে, ঘরের বাইরে বালতির উনুনটা যথারীতি গনগনে হয়ে জ্বলে উঠেছে। আগুনটাকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল অধীর—আস্তে আস্তে বেশী লাল হয়ে উঠছে, অল্প অল্প নীলচে শিখা উঠছে বাতাসে কাঁপছে।
একটু পরে নীহার বেরিয়ে এলো ঘর থেকে—একটা ভিজে গামছা নিয়ে বালতির হ্যান্ডেলটা চেপে ধরে রান্নাঘরের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল উনুটা। ...অধীর রান্নাঘরের দরজায় এলো, একটু ইতস্তত ঘরে বলল, রাত্তির দরজা—টরজা ঠেলেনি তো?
নীহার নীরস গলায় বলল, ঠেললে তুমি শুনতে পেতে না?
আমি? আমার তো টিন পেটালেও ঘুম ভাঙে না। মানে—
অধীর আর একটু ইতস্তত করে বলে, ভাবলাম, কি জানি, দরজা ঠেলে খোলা না পেয়ে যদি আবার চলে—টলে গিয়ে থাকে।
নীহার বলল, কোন চুলোয় যাবে? কে ভাত বেড়ে নিয়ে বসে আছে?
অধীর আরও একটু দাঁড়িয়ে থেকে বলে, ফিরে এলে তুমি যেন আবার বকাবকি কোরো না।
বকাবকি করা আমার সাধ তো—তাই করি। বলে নীহার শিল নোড়াটা নামিয়ে মশলা পিষতে বসল।
আমার জন্যে বেশী তাড়া কোরো না, আমি আজ একটু বেলায় বেরোব। মাকে নির্দেশটা দিয়ে দাড়িটা কামিয়ে নিল অধীর। তারপর বাজারের থলিটা নিয়ে মার কাছে এসে দাঁড়াল, বিশেষ কিছু আসবে।
নীহার তেমনি নীরস গলায় বলল, বিশেষের আবার কি আসবার আছে।
না, মানে লেবু কাঁচালঙ্কা কি উচ্ছে—টুচ্ছে?
যা আসবে, তাই বাঁধা হবে। বলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল নীহার।
অধীর বাজারে বেরিয়ে কেবলই আশেপাশে তাকাচ্ছিল—হয়তো দেখবে কোনখানে বসে আছে বাবা, খালি গায়ে গিঁট বাঁধা পৈতে গলায় ঝুলিয়ে লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপর তুলে। কোন পানের দোকানের ধারে কি চায়ের দোকানে সামনের বেঞ্চে, কিংবা কোন বাড়ির রোয়াকে।
কিন্তু না, কোথাও দেখতে পেল না। অন্যমনস্ক ভাবে বাজার করল অধীর। ভগবান জানেন কেন অন্য দিনের থেকে মাছ খানিকটা বেশীই নিয়ে ফেলল।
বাড়ি ঢুকেই বুঝল নতুন কোন ঘটনা ঘটেনি। একটা আশা—হয়তো অধীরের কাজে বেরিয়ে যাবার সময়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তারপরে আস্তে আস্তে ঢুকবে। বড় ছেলেকে বড় ভয় সুধীর ভটচাযের, সেটা বড় ছেলের জানা আছে।
বাবা যতদিন না আসে ততদিনই ভালো, তাই না দিদি?
রণুর কথায় বাণ্টি চোখ মুখ নাচিয়ে সায় দেয়, যা বলেছিস! আজ দেখ বাড়িটা কী ঠাণ্ডা! যেন ভগবানের হাওয়া বইছে।
কী জানি, এক্ষুনিই হয়তো এসে যাবে। রণুর গলায় আশঙ্কার সুর।
এলে মা ঢুকতে দেবে ভেবেছিস?...বাণ্টি গিন্নীর ভঙ্গীতে হাত তুলে একটু বিশেষ ভঙ্গী করে বলে, ঝ্যাঁটা পিটিয়ে বার করে দেবে।
দেবেই তো—রণুর গলায় উত্তেজনা, মাকে যা করে! কালকে তো মেরেই দিয়েছিল।
দাদা আজ বেশী করে মাছ এনেছে কেন রে দিদি?
কেন আবার? বুঝতে পারছিস না। একটু বেশী করে খেতে পাবে বলে। দেখিসনি, কতদিন দাদা সকালে মাছ না খেয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেলে মা দাদার রাত্তিরের জন্যে একটু তুলে রাখলে, বাবা ঢাকা খুলে খুঁজে বার করে লুকিয়ে খেয়ে রাখে।...রোজ রান্নাঘরে ঢুকে দেখে কী আছে।
বাবাটা যেন একটা রাক্ষোস, না রে দিদি?
ঠিক বলেছিস। আমারও তাই মনে হয়। বাবা হয় তাই বলতে নেই।
বাবা যদি আর কক্ষনো ফিরে না আসে মা বাঁচে, না রে দিদি?
তাই তো। যত কষ্ট তো মারই।
আমরা খুব দুঃখী, না রে? ডাবু, বিশু, লক্ষ্মণ, অপূর্ব কারুর বাবা এ রকম বিচ্ছিরি নয়।
এই, চেঁচিয়ে বলিসনি, হঠাৎ কখন এসে পড়ে শুনে ফেলবে, আর মেরে শেষ করে দেবে।
হ্যাঁ, প্রথম দিকে অহরহ এই আশঙ্কা। ওই বুঝি কখন রে রে ঢুকে পড়ে, যাচ্ছেতাই গালমন্দ করে, গাঁউ গাঁউ করে খায়, টাকা কেড়ে নেয় মায়ের কাছ থেকে, আর কারণে অকারণে ছেলে—মেয়ে দুটোকে মারে।...
বড়ছেলেকে ভয়, এই দুটো ছেলেমেয়ে যেন কবলের মধ্যে, তাই যত আক্রোশ ঝাড়ে তাদের ওপর। অধীরের পর দু—দুটো নষ্ট হয়ে গিয়ে এরা। নীহার বলে, মহারাজ। ছেলে দুটোকে মারতে তোমার লজ্জা করে না।
সুধীর ভটচায খিঁচিয়ে বলে, লজ্জা তোমারই হওয়া উচিত ছিল। বুড়ো বয়সে দুটো হাঁস মুরগী পুষতে বসা। আগের দুটো যে পথে গেছল, সেই পথেই গেল না কেন?
মা—বাপ একখানা নাম দিয়েছিল বটে, নীহারও খিঁচোয়, নামে কলঙ্ক! বেহায়া ইল্লুতে! হাঁস মুরগী আমি খানা—ডোবা থেকে কুড়িয়ে এনেছি, না?
বাপ—মার ঝগড়ার অনেক কথাই বুঝতে পারে না এরা, রণধীর দিদি বিনতাকে নিজের থেকে অনেক বেশী বুদ্ধিসম্পন্ন ভাবে, তাই অনেক সময় চুপি চুপি দিদিকে জিগ্যেস করে, বাবা যা বলল তার মানে কী রে দিদি? মা কী বলল বুঝতে পারলি দিদি?
দু'বছরের দিদি খেলা হয়ে যাবার ভয়ে বলে, বুঝব না কেন? ছোটদের ওসব শুনতে নেই।
তুই বুঝি ছোট নোস?
তোর থেকে তো বড়।
একটা কদর্য আর নিষ্ঠুর পৃথিবীর অসহায় দর্শক এই ছোট ছেলেমেয়ে দুটো যেন ওই পৃথিবীর কাছ থেকে নিজেদেরকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিয়ে পরস্পরকে অবলম্বন করে টিঁকে আছে।
দাদাকেও এরা খুব দূরের মানুষ বলে ভাবে। রুক্ষ তিক্ত, সর্বদা টাকার চিন্তায় ব্যস্ত ওই দাদার কাছে ঘেঁসতে সাহস হয় না। দাদাও কাছে ডাকে না।
কিন্তু বাবা চলে যাবার পর থেকে দাদার মধ্যে কেমন যেন একটা মমতার আভাস দেখতে পাচ্ছে। দাদা কাছে ডেকে পড়া জিগ্যেস করে, দাদা হঠাৎ হঠাৎ টফি লজেস নিমকি বিস্কুট এনে উপহার দেয়, এবং কেমন যেন অন্য রকম করে তাকায় ওদের দিকে। দেখে ভালো লাগে আবার কান্না কান্না পায়।
দাদা কেন আজকাল আমাদের এত দয়া মায়া করে জানিস? ...একজন বলে অন্যজনকে, দাদা ভাবে বাবার জন্যে আমাদের মন কেমন করছে, তাই। আমাদের তো আর মন কেমন করছে না,—অ্যাঁ? কেন করতে যাবে? বাবা কি আমাদের ভালোবাসত তো?
অন্যজন বলে, বাসত না। তবে দাদা এখন এত বেশী বেশী করে খাবার আনে, অনেক অনেক দিন মাংস আনে, এই দেখে মনটা কেমন করে ওঠে। বাবা খেতে ভীষণ ভালোবাসত তো।...
তোর মনে আছে রণু, একদিন সেই মাংস রান্না হয়েছিল, খুব কম কম, বাবা দেখে দাদাকে কিপটে বলে ঘেন্না দিল, দাদা রাগ করে খেল না, তখন মাও খেল না, সবটা বাবাকে দিয়ে দিল? বাবা কেমন চোর চোর মুখে খেল সবটা?
মনে আছে। মাংস খেতে গেলেই সেদিনের কথাটা আমার মনে পড়ে যায়।...অথচ দ্যাখ, এখন দাদা কত বেশী বেশী সব আনে।
এখন যে দাদার অনেক বেশী টাকা হচ্ছে। দেখিস না, কেবলই সন্দেশ নিয়ে এসে এসে মায়ের ঠাকুরের কাছে দেয়, আর বলে, তোমার ঠাকুরের দয়ায় আজ কিছু পাওয়া গেল মা। কিছু মানেই টাকা।
হ্যাঁ টাকা। অনেক টাকা এসে যাচ্ছে আজকাল সংসারের—অপ্রত্যাশিত, আশাতীত। আর মানসিক অবস্থা যেমনই থাক, লক্ষ্মী ঘরে ঢুকলে সংসারের চেহারা লক্ষ্মীমন্ত হয়ে উঠবেই। অবশ্য যদি লক্ষ্মীর বাহক কৃপণ না হয়।
অধীর কৃপণ নয়। অধীর এ যাবৎ কাল ওই বদনামটা বহন করে এসেছে প্রত্যক্ষ বাপের কাছে, পরোক্ষে মায়ের কাছে। মা বলেছে কী করে সংসার চালাই তা আমিই জানি। কতটুকু কী দাও আমায় হিসেব করে দ্যাখ।
আর বাপের কথা তো ধরে কাজ নেই। খাওয়া পছন্দ না হলে কী বলেছে আর কী না বলেছে।
দিন পেয়ে অধীর সেই বদনামটা ঘোচাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু যখন তখনই সুর কেটে যাচ্ছে। মায়ের কাছে টাকা রাখতে এলে, মা বলে, আমি আর নিয়ে কী করব, কোথায় রাখব, তুমিই রেখে দাও। আমাকে সংসার খরচের মতো হাত তুলে যা দেবে দিয়ে রাখ।
মার গলায় স্বরটা আগেও নীরস ছিল, কিন্তু এমন ধাতব ছিল কী? মা কতদিন 'তুই' বলে কথা বলেনি অধীরের সঙ্গে?
হঠাৎ হঠাৎ আজকাল মনে হয় অধীরের, মা যেন বিশ্বাস করে না এখন অধীরের অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসাটা হঠাৎ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। মনে হয় মা যেন তাকে সন্দেহ করছে, বাপের ভয়ে সে টাকা চেপে রেখে এসেছে এতদিন, এখন নিশ্চিন্ত হয়ে বার করছে।
মায়ের চোখের শাণিত দৃষ্টিতে, কণ্ঠের ধাতব শব্দে ছুঁড়ে মারা টুকটাক মন্তব্যে সেই সন্দেহ গর্ত থেকে মুখ বাড়ানো জানোয়ারের মতো মুখ বাড়ায়।
অধীর যেদিন একটা গডরেজের আলমারী এনে হাজির করে বলল, এবার তো টাকা পয়সার ভার নিতে পারবে? এই আলমারী হল তোমার।
সেদিন নীহার ছেলের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত মাত্র না করে বলল, আমি আর কিছুর ভার নিতে চাই না বাছা, রেখে দাও তোমার বৌয়ের জন্যে। তবে মানুষটা যদি ওপরে উঠে গিয়ে থাকে তো সংসারের ভোল বদল দেখে হাঁ হয়ে যাবে।
সেদিন বলল, আগে রুটির ওপর সামান্য একটু গুড় জুটত না আর এখন ঘিয়ে ভাজা পরোটার ওপর সন্দেশ! বলতেই হবে সংসারের কুগ্রহ সরে গেছে তাই ভাগের এত বোলবেলাও।
আর একদিন বলল, হয় এবার বৌ এনে সংসার পাতো, নয় একটা রান্নার লোক রাখো অধীর, এত এত রান্না আমার দ্বারা হয়ে উঠছে না। মাছের ওপর মাংস, মাংসের ওপর ডিম, তার সঙ্গে গুচ্ছের কপি বেগুন মূলো মটরশুঁটি! কে যে খাবার লোক তার ঠিক নেই।
অধীর অপরাধী ভাবে বলে, বাণ্টি রণু ভালোবাসে—
ভালো চিরকালই বাসতো—
অধীর আরও মলিন হয়, তখন তো পেরে ওঠা যায়নি মা।
মা আনাজপাতিগুলো ধামায় ঢেলে ঘরে তুলতে তুলতে বলে যায়, একেবারে যেতো না সেটাই আশ্চর্য!
তবু অধীর মায়ের করুণা প্রার্থী হয়ে দাঁড়ায়। এখনকার এই পেরে ওঠার ভারটাও তো তার পক্ষে কম দুর্বহ নয়। মা যদি একটু অন্তরঙ্গ হত।
জগতে কম সমারোহ, বাজারে কত আয়োজন, অধীর তো তার হতাশ দর্শকের ভূমিকা নিয়েই কাটিয়ে এসেছে এতদিন, এখনও কি তাই থাকবে?...এখনও বাণ্টির ফ্রকের ছেঁড়াটার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নেবে? রণুর জুতো থেকে আঙুল বেরিয়ে পড়া দেখে মুচি খুঁজে বেড়াবে?
মায়া কি ছিল না অধীর নামের ছেলেটার? ছোট ভাইবোন দুটোর ওপর? মায়ের ওপর? সে মায়া প্রকাশের পথ ছিল কোথায়? এখন পথ পেয়েও সে পথে পা বাড়াবার দরজা বন্ধ করে রাখবে মায়ের বাঁকা মন্তব্য, কুটিল নিশ্বাস আর শান্তি চাহনির ভয়ে? কিনে আনবে না ভাইবোনের জন্যে বেশী বেশী জামা জুতো সোয়েটার মাফলার, মায়ের জন্য গরম চাদর।
কিন্তু মা সে চাদর গায়েই দিল না। বলল, জীবন গেল শুধু আঁচল জড়িয়ে, এখন আবার শীতে গরম চাদর! মরণকালে হরিনাম।
অথচ হিসেব মতে মায়ের বয়েস মাত্র পঁয়তাল্লিশ। অধীর চেষ্টা করে আসে, পঞ্চাশের পাঁচ বাকি থাকতেই তোমার মরণকাল এসে গেল মা? তা তাই যদিই হয়, বুড়ো হাড়েই শীত লাগে বেশী, সেটা তো মানো?
রেখে দাও, লাগলে নেব। বলেছিল নীহার, কিন্তু নেয়নি। সারা শীত সে চাদর খাপে মোড়া পড়েই থাকল।
মাকে বুঝে উঠতে পারে না অধীর। বাবার চিহ্ন বলতে যা কিছু ছিল সব তো ধুয়ে মুছে ফর্সা করে ফেলেছে। অবিশ্যি ছিলই বা কী?...তবু বালিশটা বিছানাটা, থালাটা, গেলাসটা, লুঙ্গিটা, গেঞ্জিটা!...সুধীরের চৌকিটার ওপর এখন রাজ্যের বালিশ—বিছানা—লেপ—কাঁথা ডাঁই করে রেখে দিয়েছে নীহার। রান্নাঘরের ঘটিটা ফুটো হয়ে যাওয়ায় নাকি সুধীরের স্পেশাল লম্বা গেলাসটা নিয়ে রান্না করছে মা, আর সেদিন দেখল বাবার লুঙ্গিটা ছিঁড়ে ঝিকে ঘর মুছতে দিচ্ছে।
অধীরের মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল, বাবার লুঙ্গিটা ন্যাতা করতে দিলে?
নীহার এমন একটা পাথুরে দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিল যে মাথাটা নীচু করা ছাড়া উপায় ছিল না। ঝি সরে গেলে খুব শান্ত গলায় বলেছিল নীহার, কপালে থাকলে ফিরে এসে জরিপেড়ে শান্তিপুরী ধুতি পরবে।
কথা তো নয় তীক্ষ্ন তীর। এ তীর সবটাই কি অধীরের প্রাপ্য? অধীরের মুখে কি যখন তখন এসে পড়তে চায় না—তুমিও তো কম বলনি মা। তুমিই তো বলেছিলে ঘাড় ধরে বার করে দে—
কিন্তু বল ত পারে না। জীবনে একবারই সহিষ্ণুতার মাত্রা ছাড়িয়ে ফেলেছিল সে, আর সেই অসহিষ্ণুতার খেসারৎ দিয়ে চলেছে বেচারী অবিরত।
ছোট ভাইবোন দুটোর মধ্যেও কি সন্দেহের বীজ দানা বাঁধছে? তারাও কি ভাবতে শুরু করছে বাবাকে খেতে দেবার ভয়ে দাদা তখন টাকা লুকিয়ে রাখত, খরচ করত না! ভাবছে—খোঁজাখুঁজি করলে বাবাকে নিশ্চয় পাওয়া যেত, দাদা ইচ্ছে করে খুঁজছে না!
একদিন তো আরো ভয়ানক একটা কথা বলে বলল রণু, আচ্ছা দাদা, তুমি কি সত্যিই বাবাকে আর কোন দিন দেখতে পাও না?
অধীরের সারা শরীরে চড়াৎ করে বিদ্যুৎ চমকে উঠেছিল, দেখতে পেলে নিয়ে আসব না?
রণু এদিক ওদিক তাকিয়ে দিদির কান বাঁচিয়ে বলেছিল, মা বলছিল, বাবাকে তুমি দেখতে পেয়ে শাসিয়ে রেখেছ খবরদার না আসতে।
এই কথা বলেছে মা! রণু দাদার ইস্পাত কণ্ঠে ভয় পেয়ে গিয়ে প্রায় কেঁদে ফেলেছিল—ও দাদা তোমার পায়ে পড়ি, মাকে বোলো না, মা তাহলে আমায় মেরে ফেলবে।
অথচ নীহার খেতে বসে মাছের ল্যাজা চিবোতে চিবোতে অদ্ভুত একটা বিকৃত হাসি হেসে বলে উঠল সেদিন, মড়মড়িয়ে মাছ মাংসগুলো তো গিলছি, কী হয়ে বসে আছে ভগবান জানে।
অধীরের খাওয়ার হাত থেমে গিয়েছিল মায়ের কথা শুনে। অধীর পাতে আঙুলের আগায় হিজিবিজি কাটতে কাটতে বলেছিল, দুর্ঘটনার খবর খবরের কাগজে ওঠে মা।
সেটা তোমরাই জানো। আমি তো আর খবরের কাগজ পড়তে যাই না।
হঠাৎ বড় রাগ ধরে গিয়েছিল অধীরের। মা যেন বাবার ব্যাপারে সমস্ত দোষটা অধীরের ওপরই চাপাচ্ছে। বলে ফেলেছিল, তুমি না পড়, তোমার আপনজনেরা পড়ে।
আমার আপনজন? নীহার ভুরু কোঁচকানোর সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল, আমার আপনজন যম ছাড়া আর কেউ নেই।
অধীরের জেদ চেপে গিয়েছিল। অবিরত মেনে নিতে নিতে হঠাৎ যেমন এক ধরনের বিদ্রোহের সাহস এসে যায় সেই সাহসে উঠেছিল, কেন? তোমার সুপরামর্শদাতারা? মেজমামা, ছোটমামা, মেসোমশাই, মাখনদা—
নীহার হঠাৎ জলের ঘটিটা বাঁ হাতে তুলে নিয়ে ঘাড় উঁচু করে আলগোছে খানিকটা জল খেয়ে নিয়ে বলেছিল, তা তোমার কাছে এ রকম কথা ছাড়া আর কি আশা করব! গুরুজনকে যে মান্য সমীহ করে কথা বলতে হয়, সেটা আর শিখলে কবে? তবে জেনে রাখ, কেউ আমায় কু—পরামর্শ দিতে আসে না, মায়া করে একটু দেখতে আসে কী ভাবে মানুষটার দিন কাটছে। বাড়িতে যে আছে তার তো একবার 'মা' বলে ডাকবারও সময় নাই।
অধীরের ডাক ছেড়ে বলে উঠতে ইচ্ছে করে—মা, একবারও কি তুমি আমায় 'তুই' করে কথা বল আজকাল? তোমার এই নিষ্ঠুরতা আমায় তোমার কাছ থেকে ঠেলতে ঠেলতে দূরে অনেক দূরে তাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি বলা যায়? কিম্বা সবাই পারে না ইচ্ছে মতো কথা বলতে।
আবার কেউ কেউ ভীষণ ভাবে পারে। নীহার তাদের মধ্যে একজন। নীহার অনায়াসেই হঠাৎ আবার বলে উঠতে পারে অপঘাতের কথা যদি কাগজে ওঠাই নিয়ম, তো বলতে হয় লোকটা তবে বৈরাগী হয়ে গেছে। অখদ্যে অবদ্যেরও পুনর্জন্ম হতে পারে। জগাই মাধাইও উদ্ধার হয়েছিল। দস্যু রত্নাকর বাল্মীকি হয়ে রামায়ণ লিখেছিল, লালবাবু 'বেলা গেল' শুনে সংসার ছেড়েছিল। ছেলের হাতের কোঁৎকা খেয়ে মানুষটার বৈরাগী হয়ে যাওয়া আশ্চয্যি নয়। নচেৎ জলজ্যান্ত মানুষটা তো সত্যি কপ্পুর হয়ে উড়ে যেতে পারে না।
ছেলের হাতের কোঁৎকা! কী কুৎসিত! কী কদর্য! জগতে এই সব কুৎসিত কদর্য ভাষা চালু আছে এখনও? অধীরের আর একবার বলে উঠতে ইচ্ছে করল—না, তোমার নিষ্ঠুরতাও একটা মানুষকে ঘর ছাড়া বৈরাগী করে ফেলবার পক্ষে যথেষ্ট। আমারই তো মাঝে মাঝে—
কিন্তু বলে উঠল না কারণটা সেই একই—সবাই পারে না যথেষ্ট কথা বলতে।
আশ্চর্য! কী উল্টো ধারণাই ছিল অধীরের! নিরুপায় দর্শকের চোখে কেবলই দেখে এসেছে মা এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের মধ্যে পড়ে ছটফটাচ্ছে, অধীরের কিছু করার নেই।
সীমিত আয়, সীমিত সাহস। কী করবে যে? করবার মধ্যে শুধু কল্পনার স্রোতে ইচ্ছের নৌকোখানা ছেড়ে দেওয়া। মসৃণ একখানি সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখত অধীর। যে রকম সচ্ছলতার সুধীর ভটচায নামের ওই বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নটাকে অন্যত্র কোথাও সরিয়ে রাখা যায়। আর সেই সরিয়ে রাখার ফলে বাড়ির চেহারাটি কেমন হয়।
তিল তিল করে সেই সুস্থ শান্ত নিরুদ্বেগ আর কুশ্রীতামুক্ত সংসারটাকে গড়ত অধীর মনে মনে। সেই সংসারের মধ্যমণি মায়ের মূর্তিটি কী উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় আনন্দময়ী!
অধীরের ছেলেবেলার মায়ের সঙ্গে তার কিছুটা আদল আছে। যে ছেলেবেলায় অধীরই ছিল মায়ের একমাত্র। আর যে ছেলেবেলায় বাবা ফর্সা জামা কাপড় পরে নিয়মিত অফিস যেত। মাতে আর অধীরেতে তখন তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের ছবি আঁকা চলত। দুজনেরই হাতে রং তুলি ক্যানভাস একটাই। সেই ছবিটা হচ্ছে অধীর যখন 'বড় হবে'।
বড় হয়ে অধীর মাকে লাল টুকটুকে জরির শাড়ি কিনে দেবে। কিনে দেবে ঝিকঝিকে ঝিকঝিক সোনার মালা। আর গাদা গাদা জিনিস কিনে দেবে মাকে যত ইচ্ছে করতে। তখন তো আর বাবা বকতে পারবে না—এত খরচ কেন বলে।
রোজ কত করে আলু কিনবি অধীর?—একমণ, দু'মণ।
পটল?—ইয়া বড় তিন ঝুড়ি পাঁচ ঝুড়ি।
মাছ?—বিয়েবাড়ির মতন।
তেল?—কুড়ি সের।
ঘী?—কুড়ি সের।
চিনি?—কুড়ি সের।
আরও অনেক প্রশ্নমালা!...উত্তর সবই মুখস্থ। রোজই তো প্রশ্নোত্তর। নিত্য এই এক বেলা ছিল মা ছেলের।
বাবা বাড়ি এলেই চুপ। বাবা তখন এত হিংস্র ছিল না। ফর্সা জামা কাপড় পরে অফিস থেকে ফিরত...বলত, মা ছেলে তো খুব কলকলাচ্ছিলে, হঠাৎ চুপ মেরে গেলে যে? কী গল্প হচ্ছিল?
ও রূপকথার গল্প...মায়ের মুখটা তখন রূপকথার রাজকন্যার মতোই লাগত অধীরের। চাপা হাসিতে উজ্জ্বল, গোপন কৌতুকে ঝকঝকে চোখ।
সেই অলৌকিক রূপকথার ওজনে না হোক, দিন পেয়েই তো অধীর মাকে সচ্ছলতার স্বাদ দিতে চাইছে। কিন্তু মা যেন সে স্বাদ পা দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে। যেটুকু নিচ্ছে যেন বাঁ হাতে নিচ্ছে।
অধীর কি অভিমান করে আবার 'পুনর্মূষিকোভব' মন্ত্র পড়বে? তাই বা পড়া যায় কী করে? দরকার তো তার নিজের জীবনেও আসছে।
কাজ বেড়েছে, বেড়েই চলেছে। বাড়িতে লোক আসছে হরদম। পদস্থ, অ—পদস্থ। বিশিষ্ট অ—বিশিষ্ট। কেউ বা দালাল, কেউ বা মালিক স্বয়ং। তাদের তো ভদ্রভাবে বসতে দেবার জায়গা দরকার?
সুতরাং নিজের নামের শোবার ঘরখানাকেই বসবার ঘরে পরিণত করতে বা করবার করতে হয়।...শোবার সরু চৌকীখানাই দিনের বেলা ভালো সুজনী গায়ে চাপিয়ে ডিভান। সময়ে কেনা রেডিমেড সোফাসেটি ক'টার সঙ্গে বিশেষ বেমানান লাগে না।
জানালা দরজায় জীবনে এই প্রথম পর্দা ঝুলেছে। প্রথম পর্দা, প্রথম আব্রু। অধীর বলে, খোলা দরজাটার সামনে দিয়ে তুমি যেন যা তা পরে যাওয়া আসা কোরো না মা। বাড়িতে যে অবস্থা করে থাকো। গামছা পরার কথাটা আর তোলে না, নিজের মুখে আনতেই লজ্জা করেছে, তাই তোলেনি।
নীহার কথা রেখেছে। রাখেও। কিন্তু সব সময় বলে, বাড়িতে আপিস বসালে বাড়ির লোকের দম আটকে আসে।
মার দম আটকানো নিবারণ করতে অধীর মা ভাইদের ঘরে একটা সীলিং ফ্যান করে দিয়েছে। নীহার সে বিষয়ে উদাসীন। পাখার হাওয়া খায় না তা নয়, কিন্তু খেয়ে কী ভাবের উদয় হচ্ছে মনে সেটা বলে না। যা কিছুই করে অধীর মায়ের সুবিধার জন্য, সবই যেন ভস্মে ঘী!
এদিকে লতু তাড়া লাগাচ্ছে। বলছে, আর দেরী করলে কিন্তু বাবা আর কারুর হাতে কন্যে সম্প্রদান করে বসবে তা বলে দিচ্ছি।
শূন্য পকেট অধীরের মুখে যে জৌলুস ছিল, এখন যেন আর তা নেই। পকেট ভারী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন তার বয়েসটাও বড় তাড়াতাড়ি ভারী হয়ে যাচ্ছে। বুড়িয়ে যাচ্ছে অধীর। লতুর প্রাণে তাই ভয় ঢুকছে। লতু একবার ও বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারলে বাঁচে।
এ যাবৎকাল বাবা হায়রে বলে নাক সিটকাত, এখন আর তা করে না। বরং মাঝে মাঝে উল্টো সন্দেহ প্রকাশ করে। ও বাড়ির গিন্নী সুদ্দুরের বেটি বলে নাক কোঁচকাবেন নাতো? হাস্যবদনে বৌ বরণ করে ঘরে তুলবেন তো?
বুড়োটাই একটা কাদাখোঁচা হয়ে রইল। বলে লতুর মা। বাহান্ন বছর বয়সের সুধীর ভটচাযকে বুড়োই বলে। আগে থেকেই বলত। সুধীরের ওপর অনাচারে অত্যাচারে হাড় বুড়োই তো দেখাত তাকে।
আবার এও বলে লতুর নিজেকে সান্ত্বনা দিত। তবু তো শাশুড়ী শাড়ি পরে বেড়াচ্ছে। বৌ বরণ করে ঘরে তুলতে পারবে। হঠাৎ কোনখান থেকে একটা বিচ্ছিরি খবর এসে পড়ে সব কিছু না ভণ্ডুল করে দেয়।
তা সে রকম কোন খবর এসে পড়ে না। সুধীর ভটচায যে হঠাৎ একদিন এসে হাজির হবে এ আশঙ্কা, বা এ আশা আর থাকছে না কারো। প্রথম দিকে আশঙ্কাই ছিল, ক্রমশ আশার সময়ের র্যাঁদার ঘষা খেয়ে খেয়ে লোকটা সম্পর্কে আর সবাইয়ের এবড়ো—খেবড়ো কর্কশ অনুভূতিগুলো আস্তে আস্তে পালিশ হয়ে যাচ্ছে। মনের ঘেন্নায় লোকটা যদি গঙ্গায় ঝাঁপ না দিয়ে থাকে তো সন্নিসী হয়ে গেছে এই ধারণাই ক্রমে বদ্ধমূল হয়ে আসছে লোকের।
মা বারণ করলেও বিজ্ঞাপন কিছুদিন দিয়েছিল বৈকি অধীর।...মামার নাম দিয়ে নীহার মৃত্যুশয্যায় শেষ দেখা দেখে যাবার অনুরোধ জানিয়ে।...তারপর মনে হয়েছে যখন দেখা যাচ্ছে সুধীর ভটচাযের মধ্যেও মান অভিমান বস্তুটা ছিল, তখন তার সম্মান রাখাই দরকার। সঙ্কেতে নিজের গর্হিত আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বাপকে অনুরোধ জানিয়েছিল ফিরে আসবার জন্যে।
কিন্তু অনুতপ্ত পুত্রের সে আবেদনও তো কর্ণপাত করেনি সেই বিতাড়িত ব্যক্তি। যখন বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, তখন মার নিষেধ অগ্রাহ্য করার অপরাধে মা পাছে রাগ করে, এই ভয়ে মাকে জানায়নি। (বেচারী অধীর! কী বোকাই ছিল!) তবু মা কি আর সত্যি জানেনি? কাগজে ছাপা অক্ষর, কেউ কি আর মাকে বলে যায়নি? মা যে পড়তে না জানে তা নয়, গল্পের বই তো পেলেই গেলে। সিনেমা পত্রিকাগুলো সংগ্রহ করে আনে এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে, কিন্তু খবরের কাগজের দিক দিয়ে যায় না। তাহলেও জেনেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু ভাঙে না সে—কথা। অনায়াসে বাতাসকে শুনিয়ে বলে, কুকুর বেড়ালটাকেও দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলে লোকে ফিরে উল্টে দেখে—তাইতো, গেল কোথায়! এ সংসারে সেটুকু মনুষ্যত্বও নেই।
আবার বলে, ওই হতভাগা পায়ের বেড়ি দুটোর জন্যেই তো হয়েছে যত জ্বালা। বেঁধে মার খাওয়া আর সহ্য হয় না। কে যে মারছে সেটা অবশ্য বলে না। ভগবান না মানুষ।
লতুর বাবা এসে প্রস্তাব করে যাওয়ার পর থেকেই এই উচ্চস্বর স্বগতোক্তি বেড়েছে। ডাঁটুস বিজন সরকার অনেকটাই নম্র হয়ে এসে বলেছিল—অধীর তো অনেকদিন থেকেই—মানে দুজনেই তো এক রকম মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, এখন আপনি অনুমতি করলেই—
নীহার রস নিংড়ে নেওয়া আখের গলায় বলল, সবই যখন ঠিক হয়ে আছে, তখন আর আমার অনুমতির কথা কেন? বলতে যাচ্ছিল ধাষ্টামো কেন? সেটা সামলে নিল।
ঘুঘু বিজন সরকার বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, সে ঠিক তো খেলাঘরের পুতুলের বিয়ের ঠিক, আপনি দিনস্থির করে না দিলে তো হতেই পারে না।
নীহার দেখল ধারে কাছে ছেলে নেই। বাইরের পুরুষের সঙ্গে বেরিয়েছে বলে একটা চাদর গায়ে দিয়েছে সেটাকে সাপটে টান টান করে জড়িয়ে নিয়ে উত্তর দেয় নীহার, মনস্থির না করতেই দিনস্থির?
সে কি! সে কি! সেটা কী একটা কথা নাকি? বিজন যেন আকাশ থেকে পড়েছে—মনস্থির করতে না পারলে তো—তবে কথা হচ্ছে—
বিজন দুঃখে অভিভূত হয়ে যায়, করুণায় বিগলিত। কথা হচ্ছে আপনার মনের মধ্যে সর্বক্ষণ যে ঝড় বইছে তাতে কি আর মনস্থির হওয়া সম্ভব? মানুষের বাইরে থেকে তো ভেতর বোঝা যায় না, কিন্তু চোখ থাকলে বোঝা যায়। বুঝছি সবই। বাজ পড়া তাল গাছের মতো দাঁড়িয়ে আছেন বৈ তো নয়। তবু মায়ের কর্তব্য করে যেতেও হবে। ছেলে যাতে সুখী হবে, মায়ের তাতেই সুখ। কী বলেন? তাই কিনা?
বিজন একটু থামে, দেখে ওষুধ ধরছে কিনা। মনে হচ্ছে যেন ধরছে।
সত্যি, নীহারকে কে কবে এত ভালো ভালো কথা শুনিয়েছে? বাইরের একজন পুরুষ! তবে নীহার সহজে ভাঙে না, আস্তে বলে, সে তো ঠিক!
সে তো ঠিক। আশাপ্রদ। কিন্তু এটা বিয়ের অনুভূতি নয়। দিনস্থিরও নয়। আরো খেলাতে হবে। লতুর মা অবশ্য বলেছিল বামনী বলে তো অহঙ্কার! সেই সুধীর বামনার বামনী তো? তার পায়ে নাক ঘসটাতে যাবার দরকার কী? ছেলে যখন তোমার হাতের মুঠোয়, তখন সেই বামনীর নাকে ঝামা ঘসে কাজ চালিয়ে যাও।
কিন্তু বিচক্ষণ বিজন সরকার তাতে রাজী হয়নি। ছেলে যে সত্যিই তার হাতের মুঠোয় এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে বিজনের। আজকাল যেন কেমন একবগগা লাগে ছেলেটাকে। আগে মনমরা মনমরা লাগত, এখন ভাব বদলে গেছে। হতেই পারে, বাপটার জন্যে শান্তি নেই।... একদিন তো বলেই ফেলেছিল, আর কিছুদিন যাক না।
তার মানে এখনো আশা করছে বাপ ফিরে আসতে পারে।...ফিরে আর এসেছে! হুঃ। মাতাল গেঁজেল লোক মনের দুঃখে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়েছে, কি কোথায় গিয়ে রেললাইনে মাথা দিয়েছে, কে জানে। বেঁচে থাকলে এত দিনে আর ফিরত না? পেটের জ্বালাতেই ফিরত। রোজগারের তো মুরোদ নেই।
কিন্তু এ সব সন্দেহ প্রকাশ করা চলে না। বলতেই হয়েছে, দেখা তো উচিত।
নিশ্চয় উচিত। তবে কি জানো বাপু, আমার হল গিয়ে কন্যাদায়। কবে আছি কবে নেই কে বলতে পারে? চার হাত এক হয়ে গেলে নিশ্বাসটা নিয়ে বাঁচি। ভটচায মশাই বৈরাগ্যের পথে চলে গেছেন, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বরং তীর্থ—স্থানে—টানে খোঁজ করলে হয়। তবে বিয়েটা টাঙিয়ে রেখে নয়।
নীহারের মুখের কাঠিন্য যেন একটু কমে আসছে। এই বিজন সরকার। পাড়ায় যার অবস্থাপন্ন বলে নামডাক। কন্ট্র্যাক্টরীর ব্যবসা। মাঝে মাঝে লাল হয়ে যায়। তবে বড়লোকী কায়দায় থাকে না—এই যা। কিন্তু সেই লোক তো? সে নীহারের বাড়ি বয়ে এসে খোসামোদ করছে! মেয়ে এ বাড়ি পড়লে, বরাবরই করবে।
বিজন এবার আলগা ঝোপে কোপ মারে। এই সময় বলে ওঠে, তবে এইটি আপনি জেনে রাখুন, আপনি যদি একবার 'না' করেন, তবে আমার সাধ্য হবে না আপনার ছেলেকে রাজী করাতে। অধীর যে কী মাতৃভক্ত সন্তান জানেন না আপনি।
নীহার মনে মনে বলে, মরণদশা! আমি জানি না তুই জানিস। মেয়ে পার করার তালে কত কারসাজি। হয়কে নয়, নয়কে হয়। যা দেখছি বিয়েটা ঘটবেই মাঝখান থেকে আমি কেন আপত্তি করে খেলো হই? বৌ এসে সর্বেসর্বা হবে, এ তো দিব্যচক্ষেই দেখছি। তবু মেনেই নিতে হবে। জোয়ান ছেলে বিয়ে না দিলে আর কী করবে বলা শক্ত। ওই বাপের তো ছেলে।
নীহার অতএব উদারতা দেখায়, ঠিক আছে। আপনি যা বলছেন তাই হবে।
চতুর বিজন সরকার মাথা নাড়ে, উঁহু, এতে চলবে না। আপনি যা বলবেন তাই হবে।
নীহার লোকটার ঘুঘুমি দেখে মনে মনে বিরক্ত হলেও একটু হাসির ভাব দেখিয়ে বলে, বেশ আমিই বলছি পাঁজি দেখান।
ব্যস ব্যস। বিজন সরকার নীহারের পায়ের কাছের একটু ধুলোয় হাত ঠেকিয়ে মাথায় ঠেকায়।
নীহার আর একটু রাশ চাপে, আসলে কী জানেন সরকার মশাই, এ বংশে তো আজ পর্যন্ত বামুনের ঘরে ছাড়া কোন কাজ হয়নি, তাই মনটা একটু খুঁৎ খুঁৎ করছিল।
বিজন সরকারের মুখে আসছিল—আহা ইস! তবু যদি না সেই বামুন—ঠাকুরকে বস্তির ঝিয়ের ঘরে বসে মুড়ি বেগুনী খেতে দেখতাম!...সেই পরম কুলিনটি বিদেয় হয়েছেন, লোকে ভুলে—টুলে গেছে বলেই এ ঘরে মেয়ে দিতে সাধছি। কিন্তু মুখে আসা কথা যারা সামলাতে জানে বিজন তাদের একজন।...
এত ঝুট ঝামেলার মধ্যে কে আসতে চাইত, যদি মেয়ে অধীরদা বলে আঁধার না হত! একটা মাত্তর মেয়ে, তাকে জবরদস্তি করে দুঃখী বানিয়ে লাভ নেই। বিজন সরকারে এই সাধ্য সাধনা তো থিয়েটার। সেই থিয়েটারই চালিয়ে যায়, সে তো নিশ্চয়। একশোবার। খুঁৎ খুঁৎ তো করবেই। আমারই কি করছে না? তবে কি জানেন, আজকাল তো ঘরে ঘরেই এই। তাই মনকে মানিয়ে নেওয়া। আচ্ছা, তাহলে দিন দেখাইগে।
চলেই যাচ্ছিল। এই সময় নীহার একটা বোকার মতো কথা বলে বসল। বলল, তা মেয়ে জামাইকে কী দিচ্ছেন—টিচ্ছেন?
এই সময় ছেলে বাড়ি নেই বলে নিতে পারা গেল।
কথাটা শুনে কিন্তু চমকাল না সরকার, নীহারের মুখের রেখায় এ প্রশ্ন ছায়া ফেলে ফেলে যাচ্ছিল, তা সে দেখে বুঝছিল। বরং প্রশ্নটা অনুক্ত থেকে গেল দেখে আশ্চর্য হচ্ছিল। এখন বলল, আপনি বলুন?
আমি আর কী বলব? আপনার মেয়ে—জামাই। আপনি মানী লোক—
না না, মানী—টানী কিছু না, তবে জানেনই তো আমার সবেধন ওই একটা মাত্তরই মেয়ে, আমার সাধ্যমত গহনা কাপড় খাট—বিছানা আলমারি বাসন—পত্র ঢেলে মেপেই দেব।...তাছাড়া আমার ঘরবাড়ি লতুর মায়ের সাজানো সংসার সবই তো আপনার ছেলে— বৌয়েরই থাকবে। আমরা দুটো বুড়োবুড়ি আর ক'দিন? তবে আপনি যদি আরও কিছু বলেন আদেশ করুন।
না না, আর কিছু না। এমনি কথার কথা বলেছি। নীহার একটু উদাস গলায় বলে, আমার আর কিসের কী? ওরা সুখী হলেই হল।
বিজন সরকার বলে, বাঃ, তা বললে হবে কেন? আপনার আর একটি ছেলে নেই? কালে ভবিষ্যতে বিয়ে দিতে মেয়ে নেই?... আপনার যা দরকার জানাবেন।
বিজন সরকার চলে যায়। লঙ্কাবিজয়ী বিজয় সিংহের মতো বীরদর্পে।
সেই অবধি বুকের মধ্যে জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে নীহারের। ভাবী—বৌটা যে বড়লোক বাপের একমাত্র মেয়ে, তা জানা ছিল না। তার যথাসর্বস্ব ভবিষ্যতে নীহারের ছেলে—বৌয়ের হবে, এতে কোন সান্ত্বনা নেই নীহারের।...কার যে হবে তা আর জানতে বাকি নেই নীহারের। দেখছে না পৃথিবীকে?
আর সব তো ছার, ছেলেটাও যে আর নীহারের থাকবে না, বৌমার বর হয়ে যাবে, তা জানে নীহার। তাই ভেবেই প্রাণের মধ্যে হু হু করে উঠেছে।
এই তো এখন যতই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য দেখাক নীহার ছেলেকে, ছেলে তো চোদ্দবার মায়ের কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে—চূণ চূণ মুখ দিয়ে। মায়ের একটু মন রাখবার জন্যে আকুলি বিকুলি করছে, এরপর আর করবে তা? আর এসে দাঁড়াবে কাছে?
দোরের কাছে বড়লোক শ্বশুরের বাড়ি, সেইখানেই গিয়ে বসে থাকবে শ্বশুরের মেয়েটিকে নিয়ে। মনোরঞ্জন যা করবার তারাই করবে। একেই তো যুগের ধর্ম, তায় আবার ভাবের বিয়ে। তার মানে মুগুর খাওয়া কপালে নীহারের নতুন মুগুর পড়তে চলেছে।
ভয়ানক আক্রোশ আসে। ভয়ানক রাগ। ছেলের উদ্দেশ্যে যা মুখে আসে তাই গাল দিতে ইচ্ছে করে। বেহায়া স্বার্থপর ধর্মখেগো ছেলে! ধাপকে গলা ধরে বিদেয় করে দিয়ে এখন সুখের সংসার পাততে বসছ নিজে? বাপ দুটো পয়সার জন্যে ভিখিরির মতন দোরে দোরে ঘুরছে, আর তুমি চোখের চামড়াখোর ছেলে, লুকিয়ে লুকিয়ে টাকা জমিয়েছ পরে লপচপানি করবে বলে। ধর্মে সইবে?
বুকের মধ্যে রাবণের চিতা। বাতাসে তার দাহ ছড়ায়। বাতাসকে উদ্দেশ্য করে কথা।
কিন্তু নীহারেরই বা দোষ কী? মাতাল হোক গেঁজেল হোক নীচ নোংরা যা—ই হোক সেই লোকটাই তো নীহারের পায়ের তলার মাটি। নীহারের সামাজিক পরিচয়ের মলাট। নীহারের জীবন আস্বাদনের স্বাদের স্নায়ু।...সেই দুঃস্বপ্নের মতো লোকটা বিহনে নীহারের দিনরাত্রির সব কিছুই অর্থহীন। রান্না খাওয়া ছেলে মেয়ের পাতে ভাত বেড়ে ধরে দেওয়া সবই অর্থহীন।
অধীর যদি আগের মতো গরীব থাকত, তাহলে হয়তো এতটা জ্বালার সৃষ্টি হত না। এই প্রাচুর্যের জ্বালা অভাবের থেকেও মর্মান্তিক। সামান্যর জন্য কত দুর্বাক্য বলেছে তাকে ভেবে নিদারুণ জ্বালা। সামান্য একখানা দশ টাকার নোটের জন্যে মানুষটাকে জন্মের শোধ হারাতে হল, সে কী দুরন্ত জ্বালা। এখন তো সামান্যই মনে হয় দশ টাকাকে।
অহরহ ওই জ্বালার ওপর এলো ছেলের ভালোবাসার বিয়ের জ্বালা। যে বিয়েয় নিজের মাতৃমহিমা প্রকাশের কোন পথ নেই, সে বিয়ে জ্বালা ছাড়া আর কী? তাও যদি গরীব গেরস্ত ঘরের পাঁচটা মেয়ের একটা হত। এ একেবারে নৈবিদ্যির মাথার মণ্ডা। বড়লোকের একমাত্র মেয়ে। ওদের সমারোহময় দাম্পত্য জীবনের অভাগিনী দর্শক—এই পরিচয় নীহারের। নীহারের যদি অহরহ মাথা খুঁড়তে ইচ্ছে হয়, দোষ দেওয়া যায় না।
লতুর মুখে আহ্লাদ উদ্ভাসিত—তুমি এমন ভাব করছিলে যেন তোমার মার মত পাওয়া খুব শক্ত হবে। বাবা গেল আর মত আদায় করে ফিরে এলো।
আদায়! এইটুকু বলে অধীর।
আহা ওই হল, না হয় পাওয়া। তোমার সঙ্গে কথা কওয়া শক্ত। পান থেকে চূণ খসবার জো নেই। যাক—এখন লেগে পড়। তোমার তো আর করবার কেউ নেই। মামা মেসো তো কেবল সমালোচনা করতেই ওস্তাদ। নিজের ঘাড়েই সব। নিজেই বর নিজেই বরকর্তা।
নিজেই বরকর্তা! বুকটা ছাঁৎ করে ওঠে অধীরের। সারা শরীরের মধ্যে একটা তোলপাড় ওঠে।...আর সেই তোলপাড়ের মধ্যে নিত্য দেখা একটা ছেঁড়া লুঙ্গি পরা, গিঁট—বাঁধা ময়লা পৈতে গলায় লোককে হঠাৎ যেন ফর্সা ধবধবে ধুতি পাঞ্জাবী পরে পাট করা চাদর কাঁধে ফেলে গর্বিত ভঙ্গীতে কোন টোপর পরা বরের আগে আগে একটা ফুল সাজানো মটর গাড়ির খোলা দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে।...ওই লোকের মুখের চেহারাটিও তার চলার ভঙ্গীর সঙ্গে দিব্যি মানানসই।
তোলপাড়টা থামতে চায় না যেন। ওই মুখটা কি সত্যিই পৃথিবী থেকে চিরতরে লুপ্ত হয়ে গেছে?...গেছেই এইটা ভেবে নিশ্চিন্ত হতে পারার মতো করে কে খুঁজে দেখেছে পৃথিবীটাকে?
কী হল? অমন চুপ মেরে গেলে যে? লতু ঠোঁট ফোলায়।
তার ওই কৌতুক উচ্ছ্বসিত কথাটায় যে কারুর মনের মধ্যে আলোড়ন উঠতে পারে, এমন অবিশ্বাস্য কথা ভাবে না লতু।...শয়নে স্বপনে ধ্যানে জ্ঞানে একখানা ফুল সাজানো গাড়ি থেকে লতু একটা মানুষকেই নামতে দেখে তাদের আলোয় মোড়া বাড়ির দরজার সামনে। মাথায় টোপর কপালে চন্দনলেখা গলায় ফুলের মালা। চির পরিচিতকে সেই আকাঙিক্ষত অপরিচিতের মূর্তিতে দেখবার উদ্বেল আবেগের মধ্যে সেই গাড়ি থেকে ফালতু আর কেউ নামল কি না নামল ভাবতে খেয়ালও আসে না লতুর। বলে, কী এমন বললাম যে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলে?
অধীর বলে, না কিছু না। মাথাটা কেমন ধরে রয়েছে। কিন্তু সত্যি তো—বর নিজেই বরকর্তা হবে? তাই পারে না কি? ধ্যেৎ!...প্রতিকারের চেষ্টার দরকার।
কিন্তু সেই প্রতিকারের চেষ্টাটা করা যাবে কোন পথ দিয়ে? খবরের কাগজের নিরুদ্দেশ কলমের রাজরাস্তা যখন কাজে দেয়নি তখন নোংরা পচা সরু গলির পথ ধরেই আর কোথায়? যেখানে মুখে মুখে খবরের লেনদেন।...সেই ছেঁড়া ময়লা লুঙ্গি পরা লোকটা যেখানে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে বসে থাকত।...
মুড়িওয়ালী কেষ্টুর মা বলে, সে তো আজ দু—তিন বছরের কথা দাদাবাবু। আর তো দেখি না তেনাকে।...তবে হ্যাঁ, নিত্যি নে যেতো বটে ত্যাখন মুড়ি ফুলুরি ছোলা সেদ্ধ! নে যেতো আর হেসে হেসে বলত, এ জন্মে আর তোর সব ধার শোধ হবেনি কেষ্টুর মা, আসচে জন্মে হবে।
অনুসন্ধানকারী চমকে ওঠে। মুখটা লাল হয়ে ওঠে তার। গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলে, কত ধার আছে তোমার কাছে?
কেষ্টর মা জিভ কাটে, ও মা, অমন কতা বলুনি। বামুন মানুষ খেয়েছেলো খেয়েছেলো, তার জন্যে আমি দোষ ধরি নাই।
দোষ ধরার কথা নয়, ধারটা শোধ করা দরকার।
কেষ্টর মা শঙ্কিত গলায় বলে, মারা গ্যাচে বুঝি? তা সে কি আর আমার হিসেব আছে? হবে দশ—বারো টাকা।...কে হও? ছেলে নাকি?
উত্তর দেবার দায়িত্ব নেয় না লোকটা, প্যাণ্টের পকেট থেকে দু'খানা দশটাকার নোট বের করে কেষ্টর মার মুড়ি ঢালা চটের ওপর ফেলে দিয়ে চলে যায়।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখে নোট দুখানা আঁচলে বাঁধতে বাঁধতে মুড়িওলি কেষ্টর মা আপন মনে বলে, ব্যাটা ছাড়া আর কে হবে? পিত্রিঋণ শুদবার দায়ে ঘুরতেচে। মুকের আদলে বামুনদাদার আদল আছে।
পানের দোকানের শশী বলল, কথা তো অনেক দিনের বাবু। অনেকজনকে জিগেস করেছি, কেউ বলতে পারে না। বলে, নেশা খোরের খেয়াল। কে জানে কিসের খেয়ালে নিরুদ্দিশ হয়ে গ্যালো। ওই খাল পাড়ে যে একটা রাং ঝালাইয়ের দোকান আছে, ফুটো ঘটি বাটি বদনা গাডু সারাই করে, সেখানে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। ওইখানে খুব দহরম—মহরম ছিল।
তোমার কাছে কোন ধার—টার ছিল সেই লোকের?
ধার? শশী চকিত হয়। ব্যাপার কী? পুলিশ এনকোয়ারি নয় তো? ধারে পানটা বিড়িটা খেয়েছে অবিশ্যি, সে কথা কবুল না করাই ভালো। কে জানে বাবা কী থেকে কী হয়? বলে, না বাবু, আমার সঙ্গে তেমন কিছু ছিল না। মাঝে মধ্যে বিড়িটা পানটা নিত এই পর্যন্ত।
রাং ঝালাইয়ের দোকানের ছেলেটা বলল, দু—তিন বছর আগে? ত্যাখন আমার কাকা বসত দোকানে?
কাকা নেই?
আছে। তবে না থাকাই। হাঁপানি, ঘরে বসে থাকে।
ঘরটা কোথায়?
এই তো দোকানের পেচনে।
আমায় নিয়ে যেতে পারবে?
দোকান ছেড়ে যাব কেমন করে? সাফ জবাব।
অনেক তুতিয়ে—বাতিয়ে একবার ওঠাতে রাজী করানো গেল ছেলেটিকে। একটু এগিয়ে আঙুল বাড়িয়ে বলল, ওই যে, সামনের চালাটা। কেশব বলে ডাক দিলেই হবে।
ডেকে পাওয়া গেল কেশবকে। কিন্তু কেশবের দৃষ্টি সন্দিগ্ধ।—এতদিন পরে, কী ব্যাপার বলেন তো?
ব্যাপার কিছু না। সেই অবধিই খোঁজ চলছে। একজন বলল, এইখানে খবর পাওয়া যেতে পারে।
কেশব চোখ তুলে বলল, পুলিশের লোক?
না না, কী মুশকিল, সে সব কিছু না। আসলে সেই লোকের বাজারে কিছু ধার—টার ছিল, তাই খোঁজ নিচ্ছি।
ধার ছিল তাই এতকাল পরে খোঁজ নিতে এসেছেন!...তাজ্জব তো! বাড়ির লোক? তা তিনি মারা গেছেন বুঝি?
অনুসন্ধানকারী মৃদু উত্তর দেয়, তাও জানি না।
তা হক কথা বলব বাবু ধার আমার কাছে নেই কিছু। বরং এখেনে বসে নেশাটা আসটা করত বলে আমাকেই খাওয়াত।...ধার আছে বাবুলের দোকানে—গলা নামায়, বলে, আপনি সেখেনে যেতে পারবেন না বরং লোকটাকে ডাকিয়ে আনাই। কিছু যদি মনে না করেন, একটা পাঁইট—এর দাম দিলে লোক পাঠানোর ছুতো হয়।
খালপাড়ের এই জায়গাটা যেমন কাদা তেমনি এবড়ো—খেবড়ো। রাং ঝালাই কেশবের বাসাটা পর্যন্ত যদি বা একটু রাস্তা টমতো আছে, তারপর শুধু খানিক জল থই থই আর পাঁকের 'হদ'! এক কথায় নরককুণ্ড।
এখন পড়ন্ত বেলা, একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। বেলাবেলি এখান থেকে ফিরতে পারলে হয়।
টাকা বার করে দিয়ে দেশী মদওয়ালা বাবুলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা চারিদিকে তাকিয়ে একটু দার্শনিক হাসি হাসে। আমি অধীর ভটচায, ভদ্রলোকের খাতাতেই নাম আছে, দু'দিন বাদে আমার বিয়ে, আর আমি এই নরককুণ্ডের মধ্যে দাঁড়িয়ে এক বোতল ধেনোমদের প্রতীক্ষা করছি।
কিন্তু প্রতীক্ষার শেষে বড় আশার বাণী শোনা গেল। বাবুলের কাছে ধার ছিল ভালোই। বাবুল ভেবেছিল চারিদিকে দেনা করে মরে লোকটা গা ঢাকা দিয়েছে, ও আর উদ্ধার হবে না।...কিন্তু হঠাৎ একদিন জগদ্দল না কোথা থেকে দশটাকা মনিঅর্ডার এলো বাবুলের নামে, প্রেরক সুধীর ভটচায! সেই থেকে আরো দু'বার দিয়েছে পাঁচ টাকা, পাঁচ টাকা করে। কুপনে লিখেছে আরো পাঠাচ্ছি। ঋণী হয়ে মরতে ইচ্ছে নেই।...
সেই কুপন আছে?
শেষ টাকা পাঠানোর রসিদটা এনে দেখায় বাবুল। বাকি সব ধার শোধের বিনিময়ে। ঠিকানাও সাপ্লাই করল বাবুল।
সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। আকাশে অনেক নক্ষত্র। লোকালয়ে বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি নেয় অধীর। বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির গদিতে পিঠ ঠেসিয়ে বসে ভাবতে থাকে, ঠিক জায়গায় খুঁজতে জানি না বলেই আমরা অনেক কিছুই সময়ে খুঁজে পাই না।
আবার ভাবল, অথবা সময়টাই আসল। সে না এলে কিছুই হয় না। তিন বছর আগে আমি কি কখনও ভাবতে পেরেছিলাম এই নরককুণ্ডে আমাকে আসতে হবে আমার জীবনের পরম দুর্গ্রহকে খুঁজতে! সময় আমাদের পিটিয়ে পিটিয়ে ভিন্ন গড়ন দেয়।
তা হয়তো সময় সবাইকেই দেয় ভিন্ন গড়ন। নইলে সুখস্বর্গের দরজা অবধি খোলা পেয়েও সুধীর ভটচাযের মতো চিরদিনের লোভী হ্যাংলা লোকটা তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ত্যাগের মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারে? বলতে পারে—তুই যে আমায় নিয়ে যেতে চাইলি এই আমার যাওয়া হল খোকা।...এই আমার স্বর্গ হাতে পাওয়া। কিন্তু ভেবে দেখছি ভবানীপুরের নীহারকণা দেবীর সংসারে চটকলের কুলি এই পৈতে ফেলা ঘনশ্যাম দাসকে কিছুতেই খাপ খাওয়ানো যাবে না।...এ এক রকম বেশ আছি। যেমন আমার চরিত্তির তেমনিই জীবন। কলের ভোঁ বাজলেই কারখানায় ছুটি, আবার ভোঁ বাজলে ফিরি।...একটা কামিনমাগী ভাত জল করে ঘর সংসার দেখে, চলে যাচ্ছে এক রকম। আমি গেলেই তোদের সাজানো সংসার আবার তচনচ বৈতো নয়।
বাবা, এখন আর সংসারে তেমন অভাব নেই।
জানি, খবর পাই, কিন্তু সুধীর ভটচায যা কেলেঙ্কারি করত তার সবটাই তো অভাবে নয় বাবা, করত স্বভাবে। তা স্বভাবের স্বভাব তো জানিস? কথায় বলে স্বভাব যায় না মলে। তুই এলি আমায় আবার বাবা বলে ডাকলি, এতেই আমি বর্তে গেলাম।
আবার ফিরছে অধীর। রেলগাড়ির কামরায়। বাবা বলেছিল, তোকে কিছু খাওয়াতে পারলাম না এ দুঃখু মলেও যাবে না। কিন্তু এই নরকে তোকে খাওয়াবার চেষ্টা করব না। জীবনটা তো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয় বাবা, নিজেকে সর্বদাই অশুদ্ধ মনে হয়।
অধীরের বুক—পকেটে দুখানা একশো টাকার নোট। সুধীর ভটচায তার শীর্ণ আঙুল ক'টা দিয়ে সেটা অনেকক্ষণ ধরে থেকে আবার ছেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। চোখের জলটা সামলাতে সময় লেগেছিল বলেই একটু পরে বলেছিল, এ আমার টাকা নয় রে খোকা, ভগবানের আশীর্বাদ। মাথায় করে নিলাম। এখন এটা আমার ছেলের বৌয়ের জন্যে নিয়ে যা, শ্বশুরের আশীর্বাদ বলে।
আমার টাকা তাহলে তুমি নেবে না বাবা?
ও কথা বলিস না খোকা, কখন কী হয় কে বলতে পারে? তবে এখন আর লোভের ফাঁদে পা দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আর তুই দিলেই কি আমার ভোগে লাগবে? ওই হারামজাদি মাগী হাত মুচড়ে কেড়ে নেবে।...দেখ না, ওখানে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে।
অধীর চকিত হয়ে তাকিয়ে দেখেছিল, অদূরে একটি মাঝবয়সী মেয়েছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছে। মুখে বসন্তের দাগ, কপালে চকচকে টিপ। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল অধীর।
তবু অধীর মনে মনে খসড়া করছে, গিয়ে মাকে কী বলবে। হ্যাঁ, ঠিক করে নিয়েছে, বলবে, মা, তোমার ধারণাই ঠিক জানতে পারলাম, বৈরাগ্যের পথেই চলে গেছে বাবা। বিয়েটা এখন স্থগিত থাক, চল, তোমায় নিয়ে তীর্থে তীর্থে ঘুরে দেখি একটু, এখন চলে যাওয়াই ভালো।
মা যেন খবর না পেয়ে কোথা থেকে জানতে পারল অধীর।... শুধু একটা কথা মনে যন্ত্রণার পিন ফোটাচ্ছে। আসবার ঠিক আগেই মিথ্যা কথা বলে এসেছে বাপের কাছে। একেবারে চলে আসবার সময় বাবা কেমন একটা ছেলেমানুষী হাসি হেসে বলে উঠেছিল, হ্যাঁ রে, তোমার মার রাগটা পড়েছে?
অধীর বলে উঠতে পারেনি, মা তোমার জন্যে মরে যাচ্ছে বাবা। অধীর বলেছিল, মার কথা বোঝা যায় না।
বাবার আশা আশা মুখটা নিভে গিয়েছিল। বলেছিল, ওই তো, ওই তো দুঃখু! কোন দিন বুঝতে পারলাম না মানুষটাকে।
কিন্তু কেন যে অধীর আসল কথাটা না বলে অন্য একটা কথা বলে এলো, তা নিজেই জানে না।
একই ছাদের নীচে
ঢং!
দেওয়াল ঘড়িটা মৃদুগম্ভীর আওয়াজে একটি ঘণ্টাধ্বনি দিলো!...শব্দের এই মৃদু গাম্ভীর্য ঘড়িটার প্রবীণত্বের পরিচায়ক। সেকেলে পুরনো দেওয়াল ঘড়িগুলোই এ রকম আত্মস্থ গৃহকর্তার ভঙ্গীতে ঘণ্টা ধ্বনি দেয় যেন সংসার সদস্যদের সময় সম্পর্কে সচেতন করে দিতে।
আগে সাধারণ একখানা দেওয়াল ঘড়ি প্রায় সব বাড়িতে থাকতো, সাধারণ গেরস্থ বাড়িতেও। আজকাল সাধারণ গেরস্থ বাড়ির দেওয়ালে, একখানা বড়সড় ঘড়ি ঝুলছে এমন দৃশ্য প্রায় দুর্লভ। যাদের আছে তাদের আছে। অর্থাৎ যারা সাবেক কালের এই প্রাণীটাকে চেষ্টা যত্ন করে এখনো টিকিয়ে রেখেছে। যেমন—সুধামাধবের বাড়িতে।...ঘড়ির সাদা জমিটা পুরনো খবরের কাগজের মত ঘোলাটে ময়লা ঝাপসা হয়ে গেছে, পিতলের কাঁটা দুটো স্রেফ লোহার মত, তবু কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আজকাল আর এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার চালটাকে কেউ তেমন শ্রদ্ধাসমীহ করে না, নাই বাতিলরা অপসারিত হয়ে হয়তো জঞ্জালের স্তূপে ঠাঁই নেয়, নয় তো শিশি বোতলগুলোর ঝুলিতে চড়ে বিদায় নেয়। নতুন করে ধ্বনিময় একটা দেওয়াল ঘড়ি বড় একটা কেউ কেনে না। অন্ততঃ সাধারণ গেরস্থরা। কারণটা হয়তো তার আকাশছোঁয়া দাম। ঘড়ির দাম তো ঘোড়ার মত ছুটে ছুটে সেকাল থেকে একালে এসে পৌঁচেছে। তাছাড়া সত্যি, জিনিসটা তেমন কাজেও লাগে না আর আজকাল। মেয়েমানুষ নির্বিশেষে প্রায় সকলেরই হাতে হাতে নিজস্ব একটা করে বাঁধা থাকে। বাড়ির সিঁড়ির সামনে দালানের উঁচু দেওয়ালে টাঙানো একটা মাত্র ঘড়ি দেখে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত করবার দুঃখজনক অবস্থায় কেউ আর আজ থাকতে চায় না।
সুধামাধবের বাড়িতেও তাই।
তবু সুধামাধবের বাবা ব্রজমাধবের কেনা এই বড় ঘড়িটা এখনো বাজে। নির্ভুল নিয়মে আত্মস্থ গৃহকর্তার ভঙ্গীতে মৃদু গাম্ভীর্যে। তার সেই ঘণ্টা ধ্বনিতে বাড়ির আর কেউ কান না দিক, সুধামাধব দেন। আর যখনি ওর আওয়াজটা কানে আসে, বাবার সেই কথাটা মনে পড়ে যায়। ব্রজমাধব এই ঘড়িটাকে বলতেন 'সময়ের প্রহরী'।
সুধামাধব ভাবতেন বাবা বেশ শব্দগুলো কথার মধ্যে বসান। সময়ের সেই প্রহরীর ওই একটি মাত্র ধ্বনি শুনেই বিছানায় উঠে বসলেন সুধামাধব।
এই একটা শব্দ 'বারোটা বেজে যাওয়া' দিন রাত্রির আবার নবোদ্যমের সূচনা নয়। এটা অর্দ্ধমাত্রিক স্মারক। আধ ঘণ্টা সময় আগে ঘড়িটা যে চারবার ঘণ্টা বাজিয়েছিল ঘুমন্ত সংসারটার চেতনায় ঘা দেবার বৃথা চেষ্টায়, সেটা 'অজানা ঘুম' সুধামাধবও শুনতে পান নি, এটা পেলেন, এবং অনুভব করলেন, এটা ভোর সাড়ে চারটে।
আষাঢ় মাসের আকাশ এখনি দিনের ধান্ধায় গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়েছে।
সুধামাধবও উঠে পড়লেন।
নীলিমার মত ঘুম ভেঙে উঠে বহুক্ষণ বিছানায় বসে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীকে স্মরণ করবার অভ্যাস সুধামাধবের নেই, তিনি বিছানা থেকে উঠে পড়েই খাটের তলায় রাখা রবারের চটিটা পায়ে গলিয়ে আস্তে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন।
দালানের সামনের দেওয়ালে পাশাপাশি যে দু'খানি ছবি ঝোলানো আছে, একবার তাদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে প্রণাম করে নিয়ে দালানের অন্য একটা দেওয়ালের গায়ে পেরেকে ঝোলানো সিঁড়ির চাবিটা পেড়ে নিয়ে এগিয়ে গেলেন।
ছবি দু'খানা সুধামাধবের মা মনোরমা দেবীকে আর বাবা ব্রজমাধবের। দুজনে একত্রে ছবি তোলার সুযোগ আর ঘটে ওঠেনি ওদের জীবনে, তাই পরে সুধামাধব দু'খানা ছবিকে নিবিড় সান্নিধ্যে পাশাপাশি টাঙিয়ে রেখে হয়তো মৃত আহ্লাদের সান্ত্বনা, এবং আপন আত্মার শান্তিবিধান করেছেন।
সুধামাধবের শোবার ঘর থেকে বেরোতেই সামনেই পড়েন ওঁরা। দেবদ্বিজে ভক্তিমতী নীলিমা একবার ওই দেওয়ালেই ফটো দুখানার মাথার উপর একটা ছোট ব্র্যাকেট বসিয়ে তার উপর একখানি মাটির কালীমূর্তি স্থাপন করেছিলেন, যাতে ঘুম ভেঙে উঠেই দেবী দর্শন হয়, দিন ভাল যায়। কিন্তু স্বল্পভাষী সুধামাধব বলেছিলেন, বাড়িতে তো আরো অনেক দেওয়াল আছে। নীলিমার মুখের দিকে আর তাকাননি।
বাড়ির সেই অনেক দেওয়ালের একটা দেওয়ালের পেরেক থেকে চাবিটা নিয়ে—সিঁড়ির মুখের কোলাপসিবলের গেটটা খুলে, দুদিকে একটা ঠেলে একটা মানুষ যাতায়াতের মত ফাঁক বার করে আস্তে আস্তে নেমে গেলেন।
রবারের চটি, তাই বাবার সুঁড়তোলা বিদ্যেসাগরী চটির মত অথবা ঠাকুর্দার খড়মের মত সিঁড়ি নামা ওঠার চটাস চটাস খটাস খটাস আওয়াজ হয় না। ওঁরা হয়তো ভাবতেন গৃহকর্তার পদধ্বনির একটু জানান থাকা ভালো, সংসারের অধস্তন সদস্যরা অবহিত হতে সময় পায়। সুধামাধবের সে ভাবনা নেই, কারণ ওই অবহিত হয়ে ওঠার প্রশ্নটাই নেই। অতএব রবারের চটিটাকেও আস্তে আস্তে চেপে চেপে নিঃশব্দে নেমে আসেন।
সিঁড়ির তলার পাশেই ক্ষুদে একটা 'ঘরের মতন'এ লালটু শুয়ে থাকে, ওর ওই ঘটা একেবারে সদর দরজার গায়েই। ভোরবেলা বাসনমাজা মহিলাটিকে দরজা খুলে দেবার দায়িত্ব তার। কিন্তু দায়িত্ব থাকলেই যে সে দায়িত্ব পালন করতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই?
অতএব আগে প্রায়ই মহিলা কড়া নেড়ে ফিরে যেতেন, এবং পরে ডাকতে গেলে মুখ নাড়া দিয়ে বলতেন, কার এতো সময় সস্তা, যে চৌপর দিন আপনাদের দরজায় পড়ে থাকব? ...ফাষ্ট পালায় দোর খুলে না দিলে লাষ্ট পালাতেই পড়তে হবে।
চার বাড়ির কাজ, সময়ের দাম সোনার দামে, এ অহঙ্কার তার আছে।
কিন্তু লালটুও ঝাড়গ্রামের ছেলে, ঘুমেও যেমন পটু কথাতেও তেমন পটু। সে সতেজে বলে, কুসুমদির ফাষ্ট পালা মানেই তো অর্দ্ধেক রাত্তির কে দরজা খুলবে তখন? দরজার ফুটোর কাঁচ দেখে আমার ভয় লাগে। পেতণী শাঁকচুন্নি মনে হয়।...বলাই বাহুল্য এনিয়ে খণ্ড প্রলয় বেধে গিয়েছিল, এবং 'কে থাকবে, কে যাবে' এই নিয়ে টাগ অফ ওয়ার চলেছিল, শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তি হলো সুধামাধবের মধ্যস্থতায়। তিনি বললেন, ঠিক আছে দরজা খুলে দেওয়ার ভারটা আমিই নিচ্ছি। আমি তো ভোরেই উঠি।
এতে নীলিমা ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, ভোরে ওঠো বলে মাঝ রাত্তিরে? কুসুমের 'ফাষ্ট পালা' কখন জানো? রাত সাড়ে চারটেয়।
সুধামাধব মৃদু হেসেছিলেন, ওটা রাত নয়। শাস্ত্রমতে ব্রাহ্মমুহূর্ত। আমার বরং ভালই হবে। তাছাড়া—ফাষ্ট ট্রেনটা ধরতে না পারলে তো তোমাদের অসুবিধে। সেই লাষ্ট ট্রেনে গিয়ে ঠেকবে! নানান বিশৃঙ্খলা।
তদবধি কাজটা নিঃশব্দে হচ্ছে এবং সংসার রথখানি বেশ কুসুমাস্তীর্ণ পথেই চলছে। বাড়ির সবাই যদি ঘুম থেকে উঠে দেখে, চারিদিক সব ধোওয়ামোছা—চকচকে, রান্নাঘর শুকনো খটখটে, বাসনের গোছা ধোওয়ামাজা, খাবার টেবিলটা নির্মল বক্ষপেতে বসে আছে চায়ের সরঞ্জাম নামার অপেক্ষায়, তাহলে কুসুমাস্তীর্ণ ছাড়া আর কি বলা যায়? উল্টোটা হলে তো রথের চাকা কাদায় বসে যাওয়া।
প্রত্যেকে প্রত্যেককে দোষারোপ করবে সামান্যতম অসুবিধে ঘটলেও, যে চায়ের টেবিলে মলয় বাতাস বয়, সেখানে তুফান উঠবে, চেঁচামেচি গোলমালে সকালের রমণীয় স্নিগ্ধতা ছিন্নভিন্ন হবে।
'অসুবিধে' বড় ভয়ানক জিনিস।
ওতে মুহূর্তে মানুষকে অভদ্র করে তুলতে পারে, স্বার্থপর করে তুলতে পারে, রুক্ষ করে ফেলতে পারে।...অথচ সে 'অসুবিধের' কারণ হয়তো সামান্যই।
সুধামাধব এইটি অনুধাবন করেই ওই কাজের ভারটি নিয়েছিলেন। কিন্তু শৃঙ্খলা সুবিধে সত্ত্বেও—কথা শোনাতে ছাড়ে না কেউ।
'বাবাই প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে ওই লালটুবাবুর মাথাটি খেলেন। লালটুকে পাছে কাঁচা ঘুমে উঠতে হয়, তাই বাবা নিজে—ভাবা যায় না।...' 'বাড়ির কর্তার পোষ্টটা আমার হলে দেখিয়ে দিতাম ঝিকে জাষ্ট ছটার সময় আসতে বাধ্য করা যায় কিনা।... ওর অসুবিধে হবে বলে উনি রাত থাকতে এসে ইলেকট্রিসিটি খরচা করে কাজ করবেন! ভাবা যায় না।'....
...'সাত জন্মে কেউ' কখনো শুনেছে চাকর নাক ডাকিয়ে ঘুমোয়, আর বাড়ির কর্তা যান দরজা খুলতে।...'এরপর হয়তো দেখা যাবে বাবা বেডটি বানিয়ে লালটুকে ডেকে খাওয়াচ্ছেন।' ...গোবর গণেশ কর্তা হলেই সবাই পেয়ে বসে, দেখে আসছি তো চিরকাল।'
ইত্যাকার নানা মন্তব্যই শোনা যায়, সামনে আড়ালে। তবে সুধামাধবের কানে ঢোকে কিনা বোঝা যায় না।...
সুধামাধব যথারীতি নিজের কাজগুলো করে যান পর পর।
নীচে নেমেই সিঁড়ির পাশের বসবার ঘরের জানলাগুলো সব খুলে দেন, যদিও এটা লালটুরই করণীয়।...কিন্তু করণীয় কাজ কে কত করে? প্রায়ই দেখা যায় বেলা দশটা পর্যন্ত ঘরটা জানলা দরজা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।
তাই নিয়ে বাড়িসুদ্ধ সবাই ওই বালক, বা নাবালকটাকে একহাত নেবে। অথচ কাজটা একমিনিটের।
বাইরের দরজায় ভিতর থেকে ভারী একটা লোহার তালা ঝোলানো থাকে সুধামাধবের বাতিকের চিহ্ন বহন করে। সবাই হাসাহাসি করে, বলে 'বাড়ির মধ্যে থেকে তালা ভেঙে বেরিয়ে যাবার তাল করবার মত কে আছে?'
তবু তালাটা ঝোলে, যেমন ঝুলতো ব্রজমাধবের আমলে। তখন 'নবতাল' ওঠেনি—গডরেজও না, কে জানে কোন কোম্পানীর, তবু অটুট আছে এখনো।
তালাটা খুলে দরজার একটা পাল্লা খুলে ধরে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন সুধামাধব।...মিনিট খানেকও নয়, নির্দিষ্ট মোড়ের মাথায় কুসুমবালার লম্বা রোগা কালো কাঠ ঠকঠকে মূর্তিখানি ফুটে উঠলো, প্রাক উষার আর রাস্তার বিজলি বালবের মিশ্রিত আলোয়।
ওসময় ও এসে না ঢোকা পর্যন্ত দোরটা খুলে রেখে চলে যাওয়া যায় না। কিন্তু দৈবাৎ একমিনিটের বেশী সময় দাঁড়াতে হয় সুধামাধবকে। এইজন্যে কেবলমাত্র এই জন্যেই ওই কাংসকন্ঠী এবং সত্যিই প্রায় শাঁকচুন্নি সদৃশ কুসুমবালাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন সুধামাধব।
কুসুমবালা সম্পর্কে শ্রদ্ধা শব্দটা হয়তো হাস্যকর, তত্রাচ ওই শব্দটাই সুধামাধবের মধ্যে কাজ করে। কখনো কখনো ইচ্ছে হয় বাড়ির লোককে বলেন, 'কুসুমের কাছেও তোমাদের শিক্ষা করবার আছে'—কিন্তু ইচ্ছেটা কাজে পরিণত করতে ইচ্ছে হয়না। কথাটা তো কারুর উপকার বহন করে আনবে না। বরং সুধামাধবেরই অপকার বহন করে আনবে। অবমানিকেরা—অবশ্যই কথার বিষটা ফেরৎ দিতে চেষ্টা করবে।
কুসুম ঢুকতেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সুধামাধব। বেশ লাগে এ সময় ঠাণ্ডা রাস্তায় একটু পায়চারি করতে।...এক একদিন প্রায় লেকের কাছ পর্যন্ত চলে যান, আর ভাবেন, কে যে কার কিসের নিমিত্ত হয়! ওই বাসনমাজা ঝিটা আমার এই অনির্বচনীয় মাধুর্য স্বাদের নিমিত্ত।...সত্যি, কবে আর এমন উষা ভোরে অকারণ রাস্তা বেড়িয়েছি?
বাড়ির অন্য সকলের থেকে ভোরে অবশ্য উঠি চিরকালই, কিন্তু এমন সময়? কই আর? ...উঠেছি কলঘরে গিয়েছি, দাড়ি কামিয়েছি, নিজস্ব টুকিটাকি কাজ করেছি, তারপর বাজারে বেরিয়েছি।...এমন করে তো কোনোদিন অনুভব করিনি ভোরের বাতাস কত স্নিগ্ধ। ভোরের আকাশ কত সুন্দর। কলকাতার রাস্তাও ভোরে কেমন মোলায়েম।...আগে আগে না হয় চাকরীর দোহাই ছিল, কিন্তু রিটায়ার ও তো করেছেন কম দিন নয়। কই মনে তো পড়েনি, যাই ভোরবেলা উঠে রাস্তায় বেড়াইগে।
আষাঢ়ের ভোর বড় তাড়াতাড়ি বিলীন হয়, খুব বেশীদূর গেলেন না সুধামাধব...আস্তে ফিরে এলেন।...
ঘুরে এসে দেখলেন কুসুম সিঁড়ি মুছছে। এটাই কর্ম সমাপনের শেষ সঙ্কেত।...কুসুম ওঁকে দেখেই বলে উঠল, লক্ষ্মীছাড়াটাকে একটু ডাকুন না বাবা! আমি সেই ইস্তক ডেকে ডেকে মরছি। তা নবাবের জামাইয়ের ঘুম আর ভাঙছে না। আপনার সাড়া পেলে তবে যদি...
সুধামাধব বললেন, উঠবে। আপনিই উঠবে।...বাড়ির আর কেউতো ওঠেও নি। ওকী কাজ করবে?
কুসুম ধড়াং করে বালতিটা অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে খ্যানখেনে গলায় বলে ওঠে, ওইতো! ওই তো আপনার দোষ বাবু। এতো মায়ার শরীর করলে চলে না। পয়সার বিনিময়ে খাটতে এসেছে বৈ তো আয়েস করতে আসেনি।
সুধামাধব মনে মনে একটু হাসেন।
সবাইয়ের যদি এ 'সেনস'টা থাকতো।
যদিও এই শান্ত ভোরের পরিবেশে কুসুমের চড়া গলার ক্যানক্যানানি রীতিমত আশ্রমপীড়া ঘটায়, তবে সে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। দেখা যায়, কথা শেষ না করেই ঝনাৎ করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে কুসুম।
তবু ওর সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল সুধামাধব।
অনেক সময় ভাবেন সবাই যদি ওর মতো সময়নিষ্ট হতো!
দোতলায় উঠে যাবার আগে একবার ডাক দিলেন, লালটু। এই লালটু! উঠে পড়। আর শুয়ে থাকলে বকা খাবি তো।
তারপর উঠে এসে দাঁড়ান।
বাড়ি এখনো নিথর, কেউ ওঠেনি ঘুম থেকে। শুধু দালানের ধারে মাজা বাসনের গোছাগুলো একটা জাগ্রত ভূমির আভাস জানাচ্ছে।
সুধামাধব নিঃশব্দে স্নানের ঘরে ঢুকে গেলেও যথানিয়মে একেবারে দাড়ি কামিয়ে স্নান সেরে নিজের গেঞ্জি পায়জামা সাবান দিয়ে কেচে নিয়ে যখন পায়জামা গেঞ্জি পরে বেরিয়ে এসে ভিজে দুটো সামনের তারে শুকোতে দিয়ে ক্লিপ আটকে একটু আগে ভেজিয়ে রেখে যাওয়া দরজাটা আস্তে ঠেলে খুলে ঘরে ঢুকলেন, দেখলেন সেখানেও যথানিয়মে নিজের খাটের উপর ধ্যানাসন হয়ে বসে নীলিমা বিজবিজ করে স্তব পাঠ করছেন।
এ সময় সাড়া শব্দ করা বিধি নয়, তাই বাজারে কী দরকার না দরকার আগের রাত্রে জেনে নিয়ে লিখে রাখেন সুধামাধব। নিঃশব্দে ড্রয়ার খুলে সেই ফর্দটা আর টাকাটা বার করে নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
কারো সম্পর্কে কিছু ভাববোনা সংকল্প থাকলেও না ভেবে পারলেন না, নীলিমা দেবী স্বর্গের রাস্তায় কতদূর এগোতে পারলে?...তোমার এই স্তব স্তোত্র ধ্যান জপ সমাপ্ত করে উঠে এসেই তো তুমি সংসারের সবাইয়ের উপর এক হাত নিতে শুরু করবে।...তখনতো তোমায় দেখে মনে হবে না তুমি এতোক্ষণ ঈশ্বর সান্নিধ্য করে এলে।
আবার ভাবলেন চিরকাল দেখেছি স্নান শুদ্ধ হয়ে পূজোপাঠ করতে হয়, বিছানায় বসে পূজোটা অভিনব।...অথচ শুনতে পাওয়া যায় নীলিমার গুরু এই সময়টির উপরই বিশেষ জোর দেন।...সারারাত্রিব্যাপী সুখসুপ্তির পর শরীর মন নাকি হালকা আর পবিত্র থাকে।
হবেও বা। সুধামাধবতো কখনো ও ধার ধারেননি।
ধারকাছ দিয়ে হাঁটেনও নি।
নীলিমার আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে অনায়াসে পিছলে বেরিয়ে এসেছেন তিনি।
নীচের তলায় নেমে এসে দেখলেন, ঝোলা হাফপ্যাণ্ট আর ছেঁড়া গেঞ্জি পরা লালটু বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে পরপর হাই তুলে যাচ্ছে।
সুধামাধব হাসি চেপে বললেন, কী? এখনো ঘুমের নেশা কাটেনি? যা হাতেমুখে জল দিয়ে আস্ত জামা প্যাণ্ট পরে আয়।
লালটু মলিন মুখে বলে, 'ঠাকমা বলে রাতের শোওয়া ওই ছেঁড়া গেঞ্জি পেণ্টুল পরেই বাজার যাবি।'
তার মানে? এ হুকুম কেন?
ঠাকমা বলে, বাজারে ধাঙড় মেথর ছোঁওয়া যায়, এসে একেবারে সাফ সুৎরো হয়ে 'কাচা জামা' পরবি।
সুধামাধব এখন একটু হেসে বলেন, তা' সেসব তো আমারও ছোঁওয়া যায়। ওরা কি বেছে বেছে ছোঁয়?
আপনার কথা বাদ দাও দাদু। আপনাকে বলতে আসবে এমন সাধ্য থাকলে তো?
থাক। খুব কথা শিখেছিস! তোর ঠাকুরমাকে বলিস এরকম ময়লা নোংরা জামাপরা দেখলে আমি তোকে নিয়ে যাব না।...এতো ছেঁড়া পরিসইবা কেন? আর নেই?
লালটু অপ্রতিভ মুখে বলে, আছে। তা' ঠাকমা বলে, ছেঁড়া বলে ফেলে দিবি না কি? রাতে শুবি।
তা' বেশ ভালই বলেন। তা' এখন তো আর রাতে শুচ্ছিস না। যা চটপট বদলে আয়, আমি এগোচ্ছি, তুই থলি দুটো নিয়ে চলে আসবি।...
লালটু বিজ্ঞের ভূমিকা নেয়।
বলে, এতো সকালে বাজার খোলেনি।
না খুলে থাকে, খানিক ছাওয়া খাবি।
বৌদি রাগ করে। বলে চা পর্যন্ত না খেয়ে বাজার যাবার কোনো মানে হয় না। অফিস তো যেতে হবেনা, এতো তাড়া কিসের?
সুধামাধব এখনো হাসেন। বলেন, বলে বুঝি? আমার আবার এই ভোরবেলাতেই বাজারে আসতে ভালো লাগে, ভীড় থাকে না। যাকগে তুই চটপট চলে আয়। আমি কালোর দোকানের কাছে আছি।
নীলিমা যে বলেন, বাড়ির লোকের সঙ্গে একটা বৈ দুটো কথা খরচ করতে নারাজ, মিথ্যে বলেন না বোধহয়। ...
সত্যি এই ছেলেটার সঙ্গে অনেক সময়ই একাধিক কথা বলেন সুধামাধব। হয়তো বা অকারণেও। তাছাড়া—একথাও মিথ্যেও নয়, ছেলেটা সম্পর্কে তাঁর একটা দুর্বলতা আছে। যখনই দেখেন—ও একা একা কোথাও উদাস মুখে দাঁড়িয়ে আছে, অথবা মলিন মুখে ন্যাতাবালতি নিয়ে ঘর মুছছে, কি বয়েসের অনুপাতে কঠিন কঠিন কাজ করছে, মনটা কেমন করে ওঠে সুধামাধবের।...শুধু অভাবের তাড়নাতে এই ছোট্ট ছেলেটাকে মা বাপ ভাইবোন ছেড়ে দূর দূরান্তরে এসে একটা নিষ্পরের বাড়িতে প্রাণপাত করে খেটে মরতে হচ্ছে।...অনেক ভালো ছিলো চাষী বাপের ছেলেরূপে মাঠে খাটা। তবু তো মায়ের হাতে খেতে পেতো।
এই দুর্বলতার বশেই সুধামাধব নিত্য বাজার যাবার পথে ওই কালোর দোকানে এসে দাঁড়ান একবার। খান চারেক জিলিপি কি দুখানা গজা কিনে লালুটকে খেয়ে নিতে বলেন, তারপর বাজারে ঢোকেন।
লালুট অবশ্য এতে খুবই লজ্জা পায় 'না না' করে। বলে আপনি কিছু খাননা, আমি গপ গপ করে খাব আমার বুঝি লজ্জা লাগেনা?
সুধামাধব হেসে ফেলেন।
তোর মতন দোকানে দাঁড়িয়ে জিলিপি খাবো আমি?
তারপর আবার হয়তো কৌতুকের গলায় বলে ওঠেন, আমি বাড়ি ফিরলেই আমার জন্যে এই চা আসবে, এই মাখন মাথা টোষ্ট আসবে, ডিম সেদ্ধ আসবে, সন্দেশ আসবে, তোর জন্যে আসবে তা?...তোর ভাগ্যে তো সেই সকলের শেষে—
আশ্চর্য! ছোট্ট ছেলেটাকে কেউ ছোট ভাবে না। ভাবলে না কি ও সাপের পাঁচ পা দেখবে, মাথায় চড়ে বসবে, বেয়াড়া হয়ে উঠবে।
অতএব বাবুদের খাওয়ার আগে খেতে দেওয়া চলে না ওকে।...কাজেই কালো দোকানের ওই গজা জিলিপির বরাদ্দ। যদিও জানেন সুধামাধব নামক ব্যক্তিটির প্রতি গঞ্জনার ও লালটু নামক ছেলেটার প্রতি লাঞ্ছনার শেষ থাকবে না, তথাপি বাড়িতে—বলিসনে—এমন ছোট কথাটাও এই ছোট ছেলেটার কাছে বলতে পারেন না।
তথাপি সহজাত বুদ্ধির বশেই ছেলেটা এই সত্যটি গোপন করে চলে।
ছুটতে ছুটতেই চলে এলো লালটু, একটা কাচা জামা মাথায় গলাতে গলাতে। হাতের মধ্যে বাজারের থলি গলিয়ে।...জিলিপির ঠোঙাটা হাতে নিয়ে লালটুর চোখে মুখে যে অনির্বচনীয় ভাবটি ফুটে ওঠে, তার দাম কী, আর ওই কটা পয়সা তার কাছে কতটুকু সেটাই ভাবতে চেষ্টা করেন সুধামাধব...
সামান্যর বিনিময়ে অসামান্য!
কানাকড়ির বিনিময়ে রাজত্ব।
ভাল করে হাত ধুয়ে নে—
বলে বাজারের দিকে এগোন সুধামাধব। পিছনে পিছনে হৃষ্ট মুখ লালটু শূন্য থলি দুটোকে বেদম দোলাতে দোলাতে।
সুধামাধবের ঘরে ঢোকা, টাকা পয়সা নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যাওয়া, গভীর ধ্যানস্থ অবস্থাতেও নীলিমার চোখে এড়ায়নি। নীলিমার চেতনায় এটাও ধরা পড়ে আছে—মাত্র দু'এক মিনিট আগেই অনলস প্রহরী ঘড়িটা পর পর ছটা ঘণ্টা বাজিয়েছে। এই সাত সকালেই বাজারে ছোটা হল বাবুর!
আসবেন সেই বেলা আটটায়। লক্ষ্মীছাড়া ছোঁড়াটার সঙ্গে গাল গল্প করতে করতে। ছোঁড়া বাজার থেকে ফেরে যেন আহ্লাদে ভাসতে ভাসতে। দাদুর আদরে ধরাখানিকে সরাখানা দেখে পাজীটা।
সেদিন মৌরলা মাছ কুটতে বলায় বলে কিনা, এসব কি আর আমার দ্বারা হয় ঠাকমা এ হচ্ছে মেয়েছেলের কাজ!
নীলিমা অবিশ্যি ওর ঘাড় ধরে চড়িয়ে ছাড়লেন, 'ঠাকমা' ডেকে আহ্লাদ বাড়ালেই কি তিনি সুধামাধবের মত নাতির আদর করতে বসবেন ওকে?
আজ পূর্ণিমা। নীলিমা ঠাকুরের জন্যে একটু ফল আনতে বলবেন ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু ধ্যানের মাঝখানে তো আর কথা বলতে পারেন না।
কথা তুললে বলবেন, রাতে কেন বলে রাখোনি?
মানুষ যেন যন্ত্র। তার যেন আর ভুল হয়ে যেতে পারে না, অথবা হঠাৎ নতুন একটা ইচ্ছে হতে পারে না। কেন, নীলিমা ধ্যানপূজো সেরে উঠে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারা যায় না? রোজই তো শুনতে পাওয়া যায় বৌমা আক্ষেপ করছে, বাবা কেন যে খালিপেটে বেরোন। চা টা খেয়ে তো বাজার যাবেন!...শুনতে লজ্জা করে না নীলিমার?...কেন? কী এমন রাজকার্য তোমার? রিটায়ার বুড়ো তো বেকারের সামিল। ...দেব নেই দ্বিজ নেই, ঠাকুর দেবতার নাম মুখে আনা নেই। এখনো যেন উঠতি বয়সের ছোকরা। এখনো মাংস মুর্গী ডিম পিঁয়াজ খাচ্ছেন, সর্বদা ফর্সা জামা কাপড় পরছেন, ঘড়ির কাঁটায় চলছেন। ছিঃ!
মনে মনে অভিযোগের পসরা সাজাতে সাজাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নীলিমা। ফুলো ফুলো মুখ, এলোমেলো চুল, মুখের রেখায় বিশ্বের বিরক্তি। সংসারের কিছু তাঁর মনের মত নয়।
এইতো তাঁর গুরুভগ্নী বাসনাদির বাড়িটি।
কতবার গেছেন নীলিমা, দেখে যেন চোখ জুড়িয়ে যায়। বাড়িতে ঠাকুর ঘরে বাসনাদি যে গোপাল প্রতিষ্ঠা করেছেন, নিত্য তাঁর ভোগরাগ। বাড়ির সকলেই সেই ঠাকুর অভিমুখী চিত্ত। মেয়েটি সকালবেলা উঠে শুদ্ধবস্ত্রে মায়ের পূজোর গোছ করে দিচ্ছে, ছেলের বৌটি তারপরে আলাদা উনুন জ্বেলে ঠাকুরের নাড়ু ক্ষীর ছানা সুজির পায়েস এইসব বানাচ্ছে, কর্তা পর্যন্ত একখানা স্কেটের ধুতি পরে ঠাকুরের সন্ধেআরতি করে দিচ্ছেন...বাসনাদির ওপর আদেশ আছে নিত্য হাজার জপ করতে, সেই করতেই তাঁর দিন যায়। সবাই মিলে সাহায্য না করলে ঠাকুর সেবাটি ঠিকমত হবে কী করে? সেটি সংসারের সবাই বোঝে। সবাই শুদ্ধাচারী, সবাই সংযমী! বাড়িতে মাছটুকু ছাড়া কোনো অমেধ্য ঢোকে না।
আর নীলিমার সংসার?
বাড়ির মাথা থেকে পা অবধি মাছ মাংস মুরগী পিঁয়াজ আর বিস্কুট পাউরুটিতে মাখা। সধবা হয়েও নীলিমাকে বিধবার মত আলাদা রান্না করে খেতে হয়। রাঁধুনী ঠাকুর গোটা কতক আস্ত আলু পটল কপি কুমড়ো আর খান চারেক কাঁচা মাছ একদিকে সরিয়ে রেখে দেয়, নীলিমা সেই কোন বেলায় পূজো করে নেমে এসে একেবারে দুবেলার মত একটা তরকারি রেধে নেন, আর দুটি ভাত ফুটিয়ে নেন। ব্যস। কেন, নীলিমার কি দৈবাৎও ইচ্ছে করতে পারে না পাঁচ রকম খাই দাই। মাছও তো খান না সবদিন, অমাবস্যা, পূর্ণিমা সংক্রান্তি গুরুদেবের জন্মতিথি, আরো কত বার ব্রত থাকে, সে সব দিনে তো নিরামিষ তার মানেই ভাতে ভাত। তাছাড়া আর কি করবেন? অথচ ডাল তরকারি সুক্ত চচ্চড়ি এসব খেতে তো বাধা নেই? কিন্তু জুটবে কোথা থেকে? কর্তা এতোরকম তরিতরকারি আনেন, সব শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখো তুমি নীলিমা দেবী।
কিন্তু ও বেলায় শুধু বৌয়েরই গৌরব, নীলিমার কচু। নীলিমা কি ওঁদের ওই মাংস মুরগী খাওয়া শরীরের রান্না খেতে যাবেন? চান করে কাচা কাপড় পরে দিতে পারবে? হুঁঃ। কাকে যে 'শুদ্ধাচার' বলে তাই জানে না। এই তো সেদিন সদ্য নেয়ে এসেছে দেখে বলেছিলাম, বৌমা একখানা সিল্কের মিল্কের কাপড় জড়িয়ে এসে আমার এই ফুলের মালা কটা গেঁথে দিতে পারবে?
তা এক গাল হেসে বলা তো হলো, ওমা, কেন পারবোনা? মালা গাঁথতে আমি খুব ভালবাসি।
কিন্তু করলেন কী? সিল্কের কাপড়ের সঙ্গে বাছা সুতির জামা সায়া পরে এসে দাঁড়ালেন। একে আর কী চৈতন্য করাবো? বললাম, ওই ওখানে বসে আলগোছে গেঁথে দাও। গঙ্গাজল দিয়ে নেব। দিল তাই, তবে সে মালা কি আমি ঠাকুরের গলায় দিতে পারলাম? কাঠটার গায়ে ঝুলিয়ে রাখলাম।
...এই তো ব্যবস্থা আমার সংসারের। ইচ্ছে হয় একবার বাসনাদির ঘর সংসারটা দেখিয়ে আনি এদের।...তা দেখালেই কি মন মতি ফেরে? আমার যে আসল ঘরেই মুসল নেই। কর্তাদি যদি এমন ম্লেচ্ছ না হতেন, বাসনাদির স্বামীর মত হতেন, তা'হলে সংসারের ছাঁচ বদলাতো। ...বলবো কি আমার নিজের পেটের ছেলে মেয়েরাই আমার প্রতিপক্ষ। বৌটির তবু যাহোক সৌজন্য সভ্যতা আছে, কিন্তু আমার ওই হারামজাদা মেয়েটি? কথা শুনলে হাড়পিত্তি জ্বলে যায়।
বলে কিনা, আহাহা মায়ের খাওয়া নিয়ে বৃথা দুঃখ কোরোনা বৌদি, মা জননী আমাদের কৃচ্ছ্ব সাধনের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে সশরীরে স্বর্গে যাবার তাল করছেন।....আবার শয়তানী হেসে হেসে বলে, আচ্ছা, মা তোমার এই শরীরেই একদা তুমিও আমাদের মত যত সব অমেধ্য বস্তু খেয়েছ, ওই দাঁতেই মাংসের হাড় চিবিয়েছ। ওদের বিশুদ্ধ করে নিতে পারলে কী ক'রে? আমাদের কাপে চা পর্যন্ত যখন চলে না তোমার। আর ছেলেদের তো কথাই নেই। বড়টাতো উঠতে বসতে ঠাট্টা বিদ্রুপ করে আমার গুরু গোবিন্দ নিয়ে, আর ছোটটা বলে কিনা, মালা জপা বুড়িগুলোই হয় পৃথিবীর সবথেকে কুচুটে। মা সেই দলে গিয়ে ভিড়ছে। অতএব মারও বারোটা বেজে গেছে।
এই কণ্টকাকীর্ণ সংসারে বাস নীলিমার।
তবে কিসের সুখে মুখে হাসি আহ্লাদ প্রসন্নতা আসবে?
কর্তাও কি মাঝে মাঝে চিপটেন কাটতে ছাড়েন? আমাকে শুনিয়ে ছেলে মেয়েদের বলবেন কিনা, দ্যাখ চিরকাল শুনে এসেছি—'প্রসন্ন মন নারায়ণের আসন', তা তোর মা তার ঠাকুরকে কোথায় বসায় বল দেখি? আসন তো নেই। এই সব সহ্য করে অধ্যাত্ম পথে এগিয়ে যেতে হচ্ছে নীলিমাকে।...গুরুদেব বলেন 'প্রাক্তন ক্ষয় হচ্ছে—' ওই চিরকেলে ছেদো কথাটা কি আর মেজাজ ঠিক রাখবে?
মেজাজ বেঠিক হবার ঘটনা তো অহরহ।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই দেখতে পেলেন নীলিমা দুই ননদ ভাজে চায়ের টেবিলে মুখোমুখি বসে একেবারে আহ্লাদে গড়িয়ে পড়ে কী যেন বলাবলি করছে।
নিশ্চয় নীলিমার প্রসঙ্গ।
তা' নইলে এতো ইয়ে কিসের?
বিরক্ত নীলিমা বলে না উঠে পারলেন না, সকাল বেলা এতো হাসির কী হল শুনি?
মেয়ে মুখে হাত চাপা দিয়ে আরো হাসতে লাগল আর বৌ তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ও শুভ্রার কলেজের একটা মেয়ের ব্যাপার মা।
নীলিমা ঘাসের বীচি খান? নীলিমা বুঝতে পারলেন না ওরা নীলিমার কাছে চাপছে? নীলিমা রাগে গরগরিয়ে বলে উঠলেন, এইত একটু আগে সব ঘুমোচ্ছিলে। এখুনি চায়ের বাটি নিয়ে বসা হল? অ্যাড়া বাসি কাপড়গুলো তো ছাড়াই নেই, মুখটাও কি ধুতে ইচ্ছে করেনা?
শুভ্রা বলে ওঠে, এ মা! আমরা মুখ না ধুয়ে খাই? তোমার থেকে ডবল ভাল করে ধুই।...তোমার মতন অমন বিনা ব্রাশে দাঁত মাজি না আমরা।
নীলিমা কি তবুও সেখানে দাঁড়াবেন?
সরে যান। রাঁধুনী ঠাকুরের পিছনে লাগতে যান। না লাগলে হবে কেন? সে শকড়ি হাত ধুলো কিনা, রান্না করে সব আগে নিজের জন্যে তুলে রাখলো কিনা। চাল ডাল তেল মশলা সরাবে? কি না, বড় বড় মাছের চাকাগুলো কাকে দিতে কাকে দিচ্ছে? এসব তদারকি আর কেউ করতে আসবে নীলিমা ছাড়া?
অথচ বাড়িসুদ্ধু সবাই বলতে আসবেন এতো দেরি করে স্নানে যাও কেন তুমি? এতো দেরী করে পূজোয়?
সুধামাধব আবার বলেন, সকালে তো একবার পূজো টুজো হয় দেখি, ক'বার করতে লাগে?
প্রশ্নটি শুনতে নিরীহ, কিন্তু তাৎপর্যটি কি তা বুঝতে বাকী থাকে নীলিমার? কাকে বলে ধ্যান ধারণা, কাকে বলে জপতপ পূজো পাঠ, এ সব জ্ঞান আছে তোমার? নাস্তিকের অগ্রগণ্য। বোঝাতে চেষ্টা করতেও রুচি হয় না। প্রথম দিকে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ওই পাথরের মন গলাবে কে? একদিন হাতজোড় করে বলে বসলেন কিনা, দেখো ওসব যদি বুঝতেই হয়, তো হিমালয়ে চলে গিয়ে গুহায় বসে বুঝতে চেষ্টা করবো, তোমার কাছে কেন?
অথচ মঠের উৎসবে টুৎসবে কী মধুর দৃশ্যই চোখে পড়ে। সকলেরই কিছুই স্বামী পুত্র সবাই দীক্ষিত নয়, কিন্তু উৎসবে সবাই আসে।...গুরু—ভগ্নীরা মেয়ে জামাই নাতি নাতনী ছেলে বৌ কর্তা সবাইকে 'বাবা'র কাছে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ নিচ্ছে, আর নীলিমা এক পাশে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন যেন তাঁর কেউ কোথাও নেই।
ভাগ্য। সবই ভাগ্য।
গুরু গোবিন্দ গোপাল নারায়ণ জপ তপ, কেউই ভাগ্যকে বদলে দিতে পারে না।...
অথচ কতটুকুই বা চাহিদা ছিল নীলিমার?
সংসারে সবাই সদাচার সম্পন্ন হবে,—ঈশ্বরমুখী মন হবে সকলের, নীলিমার জীবনের যা সম্বল, তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, ব্যস। এইটুকুতো চাওয়া। তার এক চিলতেও জুটলনা নীলিমার ভাগ্যে।
কিন্তু লোকচক্ষে?
এমন ভাগ্যবতী না কি হয় না।
সবাইতো তাই বলে। নীলিমার নিজের লোকেরা পর্যন্ত। নীলিমার নাকি সুখে থাকতে ভূতের কীল খাওয়া, সেধে দুঃখু গলায় নেওয়া আর জীবনের মধ্যে বিদঘুটে এক ঝঞ্ঝাট ডেকে এনে সংসারকে অশান্তি দেওয়া।
নীলিমার নিজের বোন পর্যন্ত বলে কিনা, জামাইবাবুকে তুই যতই 'নাস্তিক' বলে ঘেন্না দিস মেজদি, উনি তোর থেকে অনেক জ্ঞানী।
স্বল্পভাষী সুধামাধবের যেমন ভিতরে বাইরে কোনোখানেই 'কথা' নামক বস্তুটার কোনো চাষ নেই, সুধামাধবের চিরসঙ্গিনী নীলিমার তেমনি ভিতরে বাইরে শুধু ওই কথারই চাষ। জপের মন্ত্রের মধ্যে কথারা ঢুকে পড়ে হানা দেয়, ধ্যানের মধ্যে কথারা তৈরী হতে থাকে। অতএব নীলিমা তাঁর অফুরন্ত অনন্ত কথার ভার বাড়িতে যতগুলো কান আছে তাদের বর্ষণ করে চলেন। তা বাইরে না হলেও ভিতরে কথার চাষ চলে এ বাড়ির আর একটি মহিলারও।
শ্বশুরের মত অত স্বল্প ভাষী না হলেও কথা কমই বলে, অমৃত মাধবের বৌ অসীমা। কিন্তু মনে মনে কথা কয়ে চলে যায়। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই। প্রথম কথা শুরু ওই 'অমৃত' মাধব নামক ঘুমন্ত লোকটাকে উদ্দেশ্য করেই।
আহা কী সুন্দর জীবনটিই বেছে নিয়েছ।
সকালবেলা যত ইচ্ছে বেলা অবধি ঘুমোবো, তারপর শুধু এক কাপ চা গলায় ঢেলে চাল যাব 'অঙ্গরাগ' করতে, 'অঙ্গরাগই' বলব, নইলে শুধু দাড়ি 'কামাতে', চান করতে, আর সাজসজ্জা করতে সারা সকালটা খরচা হয় একটা ইয়াং লোকের! তোমার থেকে অনেক স্মার্ট তোমার প্রৌঢ় বাবা! তোমরা দু ভাই বিছানায় গড়াগড়ি দাও আর তোমাদের বাবা ছোটেন বাজারে। কারণ ঠাকুর চাকরের কেনা মাছ তরকারি তোমাদের পছন্দ হয় না। হবার কথাও নয় অবিশ্যি। সে যাক।
ঘণ্টা দেড়েক ধরে দেহ পরিচর্যা করে তুমি একেবারে যুটেড, বুটেড, হয়ে টেবিলে এসে বসলে ব্রেকফাষ্ট করতে। যে ব্রেকফাষ্টটির অনেকখানি অংশই প্রোটিন সম্বলিত। কারণ এটাই তোমার বাড়ির আসল খাওয়া। লাঞ্চটা জোটে অফিসের ক্যাণ্টিনে। অফিসারের পোষ্টে উঠেই তুমি বাড়ির ভাত ছাড়লে। কারণ সাত সকালে ভাত পেটে দিয়ে হাঁসফাঁস করতে করতে অফিসে যাওয়া অফিসারের মানায় না। যদিও ওই পোস্টটায় বসার আগের দিন পর্যন্তও তুমি সকালে ভাতের থালা নিয়ে বসতে। তবু তো এ গ্রেড হতে পারছ না এখনো পর্যন্ত। আর পার টেবিলে বসে তুমি অম্লান মুখে অকুণ্ঠিত চিত্তে, রেলিশ করে বাবার নিয়ে আসা মাছ মাংস ডিম টিমের সিংহভাগটি ভোগে লাগিয়ে কেটে পড়তে। ব্যস। অফিসার হয়ে পর্যন্ত তুমি 'মিনি বাস' ছাড়া চড়ছনা, দেরী হয়ে গেলেই ট্যাক্সী। দেখে শুনে মনে হয় যেন অফিসার হয়েই জন্মেছ তুমি। অথচ তোমার বাবার কোনদিনই এরকম ভঙ্গী দেখিনি। তিনিও তো কিছু কম ছিলেন না। তোমার ভঙ্গী দেখে মনে হয় মনুষ্য জীবনের চরম লক্ষ্য সরকারি অফিসের অফিসার হওয়া, এবং তাঁর থেকেও উচ্চতর লক্ষ্য এ গ্রেড হওয়া।
অথচ আর এক বোকামিতে তুমি তোমার এই পরমতম শ্রেয়কেও এতাবৎ কাল ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে এসেছো, এবং এখনো তাই করে আসছো।
প্রমোশন দিলেই কলকাতা থেকে বদলি করে দেবে, এই আতঙ্কে তুমি প্রমোশন পর্যন্ত নিতে চাওনি, বারবার বহু কৌশলের পর হঠাৎ তুমি বিনা বদলিতে প্রমোশনটা বাগাতে সক্ষম হয়েছ।
কিন্তু পরবর্তী পথটি?
সেও হয়তো ওই একই কৌশলে বাগিয়ে ফেলবে। না পারলে, বরং প্রমোশন ছাড়বে, তবু কলকাতা ছাড়বে না। আশ্চর্য! কী মোহ কলকাতায়।...যেন কলকাতা ছাড়তে হলেই তোমার সর্বস্ব ভেসে যাবে।
অথচ আমি?
জন্মেছি এক পাহাড়ের কাছাকাছি দেশে, মানুষ হয়েছি তেমনি সব দেশে, বাবার বদলীর চাকরীর সুযোগে বরাবর খোলামেলা জায়গায় মানুষ হয়েছি। আমার মনের জগতে তেমনি একটা কোনো দেশের ছবি আঁকা ছিল, সেই ছবিটার গায়ে রঙিন তুলি বুলিয়ে বুলিয়ে একখানি ছিমছাম 'ফিটফাট সংসার' পেতেছিলাম।
সেই ছবি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ সেই সংসারটা আর কোনো দিনই পাতা হবে না। কারণ তুমি তোমার পরম স্বর্গ প্রমোশন ত্যাগ করেও কলকাতার মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে।
আমার সেই সোনালী স্বপ্নটা ভেঙেই গেল। আবার তোমার আর এক ফ্যাসানের শিকার হয়ে পড়ে আছি আমি। এতোগুলো বছর বিয়ে হয়েছে আমার, তবু না কি এখনো 'মা' হওয়ার অধিকার অর্জন করিনি আমি। আমাদের নাকি আরো অপেক্ষা করতে হবে—প্রতিষ্ঠিত হতে। ভাবছোনা যে আমার দিনগুলো কাটে কী করে!...সকাল থেকে রাত অবধি তোমাদের এই সংসারের তদারকি করা, আর সকলের সঙ্গে অ্যাডজাষ্ট করে চলবার চেষ্টা করা, আর সারাক্ষণ তোমার ওই 'হরিচরণে লীন' জননীর অনর্থক বকবকানি শোনা। ...তোমার বাবা অবশ্য দেবতুল্য মানুষ। কিন্তু বড় দূরের মানুষ আমার বাবার সঙ্গে অনেক বিষয়েই কোথায় যেন সাদৃশ্য আছে, অথচ আবার কোথায় যেন দারুণ তফাৎ। আমার বাবা যেন বড় কাছের মানুষ, শুধু আমাদের বলেই নয়, সকলের কাছেই।...তোমার বোনটির কথা বাদ দাও, তিনি তো এখন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন, কথা বলতে হয় নিক্তির ওজনে। কখন কি হয়ে যায় কে জানে। অতএব তার সঙ্গে শুধু শাড়ি গহনা, সিনেমা গল্পের বইয়ের গল্প করে চালাতে হয়।
এদিক ওদিক করতে ভয় হয়।
আর তোমার ভাইটি?
সে তো পৃথিবীকে তৃণমূল্য আর আত্মীয়জনকে নস্যসম জ্ঞান করে। ব্যঙ্গের ছুরি বিঁধিয়ে ছাড়া কথাই বলতে জানে না সে।
কিন্তু আমি বেচারা মফস্বলের মেয়ে, অত ব্যঙ্গ বিদ্রূপের ধার ধারি না। আমি তাই সাধ্যপক্ষে ওর সঙ্গে বেশী কথা কই না। আর কথা কইলেই তো তাকে ঠেলে নিয়ে যাবে পলিটিকসের দিকে।
তোমাদের এই এতো বড় বাড়ি, এতো পুরনো পুরনো আসবাব পত্রে ঠাসা অকারণ ভারী সংসার, এতো কথা, এতো বিশৃঙ্খলা, আর তোমার এই নির্লিপ্ত নিশ্চিন্ততা আমার যেন দম বন্ধ করে আনে।
ভাগ্যের কাছে অধিক কিছু প্রত্যাশা তো ছিল না আমার। প্রত্যাশা ছিল শুধু হালকা ছিমছাম সুন্দর একটি জীবন। সেখানে আমার পদ্ধতিতে আমি সকলকে যত্ন করবো, সেবা করবো, ভালবাসবো।
সেটা কি খুব বেশী চাওয়া?
ধরো আমরা যদি কোনো একটি মফস্বল শহরে সুন্দর একটি সংসার পেতে বসতাম ছোট্ট দু' একটি বাচ্চা নিয়ে, আমাদের সংসারে ডাকতাম তোমার আপন জনেদের, তাঁরা গেলে আমরা যত্নে আদরে ডুবিয়ে দিতাম তাঁদের, কী মনোরম সেই জীবনখানি। এই জীবন দেখেছি আমার মার। কী প্রসন্ন মুখ ছিল মার, কী নির্মল উজ্জ্বল হাসি! অথচ তোমার মা?...
থাক, গুরুজন সম্পর্কে সমালোচনা করতে চাই না, শুধু ভাবি 'ভগবান পেতে হলে কি মানুষকে ত্যাগ করতে হয়, আর অফিসার হতে গেলে?'
এ বাড়ির সবাই যে বেলা অবধি ঘুমোয় এটা কিন্তু সত্য নয়। হয়তো কেউই তেমন ঘুমোয় না গৃহকর্তার বড় ছেলে অমৃতমাধব বাদে।...ডাকনামে যে 'অমি' বলে পরিচিত।
অমৃতমাধবের ঘুমটা সত্যিই দারুণ ব্যাপার।
রাত্রে বৌয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অথবা আক্ষরিক অর্থে বৌয়ের কথা শুনতে শুনতে সেই যে হঠাৎ পাশ ফিরে নাক ডাকাতে শুরু করে, সে ডাক থামে সকালের ডাকাডাকিতে।
বৌ বলে, 'ক্লাস ওয়ান' অফিসাররা নাক ডাকায় বলে শুনিনি।
'অমি' হাই তুলে বলে, তখনো শুনবে না। ইত্যবসরে ডাকিয়ে নিই।
কথা বলতে বলতে যে কী করে ঘুমিয়ে ষ্টীল হয়ে যাও। আশ্চর্য!
অমৃতমাধব আলস্য ভাঙতে ভাঙতে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, বলতে বলতে নয়, শুনতে শুনতে।
তা' বটে! বর্ষার রাতে ব্যাঙের ডাক শুনতে শুনতেও ঘুম আসে।
কী মুস্কিল! তোমার সব সময় কেবল একহাত নেবার তাল। বলে স্নানের ঘরে ঢুকে যায় অমৃতমাধব নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে।
বৌয়ের মনের মধ্যেটা যে সর্বদাই একটা বোকাটে অভিমানে বাষ্পে ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে তা' অমৃতমাধবের অজানা নয়। তবে নিজে সে বোকার মত বৌয়ের কাছে সেই জানার খবরটা ব্যক্ত করে ফেলে তার ভারাক্রান্ত চিত্তের ভার লাঘবের চেষ্টা করে না। জিনিসটাকে তো সে গুরুত্ব দেয় না।
অমৃতমাধবের ধারণায় 'অসন্তোষ' মেয়েমানুষের স্বধর্ম; ওর সন্তুষ্ট বিধানের চেষ্টাটি হচ্ছে খাল কেটে কুমীর আনা। অতএব ও ফাঁদে পা দিতে যায় না অমৃতমাধব নামক বুদ্ধিমান ব্যক্তিটি। যতই বিদুষী বিদ্যেবতী হোক, 'মেয়ে' সেই আদি অকৃত্রিম মেয়েই। যাদের প্রকৃতিই হচ্ছে সেধে দুঃখু ডেকে আনা, সব থাকলেও সর্বহারা ভাব। তাই তাদের কাজ হচ্ছে অকারণ মনভার, কারণে অকারণে কান্না যে কোনো প্রসঙ্গেই নিজের প্রসঙ্গ এনে ফেলে আক্ষেপোক্তি, ব্যঙ্গোক্তি, ভাগ্যকে আসামী বানিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। আমি শালা কোথায় কত কাঠ খড় পুড়িয়ে, কত কায়দা কৌশল খেলে ট্র্যান্সফারটা ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে আসছি। আর তুমি শ্রীমতী দুঃখে ভেঙে পড়ছো তোমার বর কলকাতা ত্যাগ করে একটা হাড়—হাভাতে মফস্বল জায়গায় বদলী হচ্ছে না কেন বলে? এখানের সুখটা তোমার নজরেই পড়ছে না।....
এখানে শালা বাপের হোটেলে আছি, কি তোফা আছি দেখতে পাও না? চক্ষুলজ্জার দায়ে গোটাকতক টাকা ধরে দিই মাত্তর, তাতে যে এ বাজারে কত হয় তা তো আর জানতে বাকি নেই। অফিসের হতভাগ্যদের হাহাকার, শুনতে শুনতে তো কান পচে গেল। 'বাজার দর' আর তাই নিয়ে কার কত কষ্ট এটাই তো প্রধান প্রসঙ্গ।
এ হোটেলে চাঁদু তোমার ঘরভাড়াটি ফ্রী, ইচ্ছেমত আহার, আঙুলটি নাড়তে হয় না, আগুন তাতটি লাগে না, বাড়াভাত খাচ্ছ, ফ্যানের তলায় পড়ে দিবানিদ্রাটি দিচ্ছ, সাজছো গুজছো, দ্যাওর ননদকে জুটিয়ে নিয়ে মার্কেটিং করছো, সিনেমা যাচ্ছো। বাড়ি থেকে বেরোতে দরজায় তালা লাগাবার চিন্তা নেই, ইনসিকিউরিটির প্রশ্ন নেই, খাও দাও কাঁসি বাজাও। এতো স্বস্তি ছেড়ে কোথায় গিয়ে তোমার সোনার সংসারটি পাততে যেতে চাও মানিক? কত মাইনে পাব আমি? যতই ক্লাশ ওয়ান হই, এই আরামটি আর পেতে হয় না!...অন্যত্র গেলে খাটতে খাটতে জান নিকলোবে তোমার। একটু বেড়াতে বেরোলেই ফেরার সময় গায়ে কাঁটা দেবে, গিয়ে কী দৃশ্য দেখবো ভেবে। আরো কত ঝামেলা তার হিসেব আছে? 'মুক্ত প্রকৃতি'র দৃশ্য দেখে দেখে পেট ভরাবে?...
কলকাতায় ওনার প্রাণ হাঁপায়।
দম আটকায়!
শুনলে মাথা জ্বালা করে।
বলে হোল ইন্ডিয়ার তাবৎলোক এই কলকাতায় এসে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্যে মরছে! দেখছো না? জায়গাটা যদি এতো বিচ্ছিরিই হবে, ভারতসুদ্ধু লোক কেন এখানেই মরতে আসে তাই বল?
যাকগে, মরুকগে, ও নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। আমাকে এখন অনেক অঙ্ক কষে কষে চলতে হবে, যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙে।...প্রমোশনটাও হয়, ট্র্যান্সফারটাও রদ হয়।
এতো অঙ্ক কষে চলে অমৃতমাধব, তবু তার ঘুমের ঘরে ঘাটতি নেই।...দেওয়াল ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি তার ঘুমের দেওয়ালে ফাটল ধরাতে পারে না।
কিন্তু ওদের ঘুমের দেওয়ালে ফাটল ধরায়। অমৃতমাধবের ছোট ভাই মধুমাধবের আর ছোটবোন খুকুর। ভাল নাম তার একটা আছেই অবশ্য, কিন্তু ওতেই সে পরিচিত।
ওরা ঘড়ি ঘণ্টা সবাই শুনতে পায়, সেই ভোর থেকেই। ইচ্ছে করে ওঠে না। জেগে জেগে শুয়ে থাকে।...সাবেক চালের বাড়ি, আগে লোক ধরতো না, এক একটা ঘরে গড়াগড় বালিশ পড়তো এক গাদা করে। কমবয়সী ছেলে মেয়েরা স্বপ্নেও ভাবতে পারতো না প্রত্যেকের নিজস্ব এক একখানা ঘর থাকবে। কিন্তু এদের ভাগ্যে সেটা জুটে গেছে। বাড়ির সদস্য হিসেবে ঘরের স্বচ্ছলতা বেশী, তাই সকলের ভাগ্যে আস্ত এক একখানা ঘর বাদেও, মধুমাধবের ছোট একটা পড়বার ঘর আছে, অমৃতমাধবের ভাগ্যেও তেমনি খুদে বাক্স প্যাঁটরা আলমারি দেরাজ রাখবার জন্যে বাড়তি একটা।...
অতএব আপন আপন ঘরে সবাই রাজা।
জেগে জেগে শুয়ে পা নাচালে, সাতবার এপাশ ওপাশ করলে, অথবা জাঙিয়া পরে ডনবৈঠক করলেও কেউ চোখ ফেলতে আসছে না।
খুকু শুয়ে শুয়েই টের পায় বাবা সিঁড়ির কোলাপসিবলটা ঠেললেন, নীচে নামলেন, যতই চটির শব্দ না করুন তবু টের পায়। মৃদু হলেও সদর দরজা খোলার আওয়াজ পায়, তারপর আওয়াজ পায় কুসুমবালার। কুসুমবালা সুধামাধব নয়, যে ভোরের শান্তি ব্যাহত হবার ভয়ে পা টিপে টিপে হাঁটবে, অথবা বাসনপত্রের 'ঝনন রনন' শব্দ তুলবে না।
খুকুর যে কোনোদিনই উঠে পড়তে ইচ্ছে হয় না তা' নয়, বিশেষ করে বেশী গরমের দিনের ভোরে। তবু ওঠে না। শুয়ে শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে ভাবে এখন উঠে কী করব?...ওঠবার কি উদ্দেশ্য আছে আমার? যতদিন কলেজ ছিল, ততদিন তবু দিনরাত্রির একটা মানে ছিল, এখন তো স্রেফ জাবরকাটা।
এই জাবরকাটা জীবন থেকে কবে যে উদ্ধার পাবো!...সেই হতভাগাটারও কি তেমনি গোঁ, ভাল চাকরী না পেলে না কি বিয়ের পীড়িতে বসার চিন্তা অচল। আরে বাবা ভাল মন্দ যাই হোক, করছিস তো একটা। তাতে হবে না? তবে পী�ড়িতে বসবার ভাগ্য ঘটবে কি না, জানেন ভগবান, আর শ্রীমতী নীলিমা দেবী, এবং শ্রীযুক্ত বাবু সুধামাধব গুপ্ত।...কারণ ওঁদের মতে তো 'সে' সিডিউল কাষ্টের দলে পড়বে।...
বিপদ তো সেইখানেই।
ওঁরা যদি ওঁদের সুউচ্চ কুল আর পবিত্র বংশগৌরবের ধ্বজা তুলে এ বিয়ে আটকাতে চেষ্টা করেন, তাহলে ফাইট করে একবস্ত্রে শূন্যহাতে বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। কিন্তু সেটা কি একটা কথার মতো কথা হল?...আমি বলে কতকাল থেকে বিয়ের ঘটা আর বিয়ের সাজ সজ্জার স্বপ্ন দেখছি।...তাছাড়া—ওপক্ষেও তো শুনছি 'অর্দ্ধচন্দ্রের' ব্যবস্থা। তাহ'লে?
সংসারটা পাতিয়ে দেবে কে শুনি?
আর শাড়ি গহনা জাঁকজমক নেমন্তন্ন আমন্তন্ন এসব ছাড়া বিয়ের সুখ কী? অর্থ কী? গৌরব কী?...বরের কাছেইবা মুখ কোথায়? ...বাপের দেওয়া পালিশ চকচকে জোলা খাটে 'ফুলশয্যার' শয্যা বিছোতে না পেলে জীবনটাই তো মরুভূমি। বৌদিটা অবশ্য আশ্বাস দেয়; বলে যত ভাবছ, তত নয়। আজকাল তো সব বাড়িতেই এরকম হচ্ছে। সেটা আর ওঁরা বুঝবেন না? বাবা মোটেই সেরকম গোঁড়া নন।
আমার কিন্তু ভয় ভাঙে না। বাবার বিষয় যদিবা নিশ্চিন্ত হবার চেষ্টাটুকুও করা যায়, কিন্তু মা জননীর বিষয়ে? নৈব, নৈব।...তিনি তাঁর গুরু ভ্রাতা ভগ্নীদিগের কাছে মুখ দেখাবেন কি করে? যদি তাঁর বাড়িতে এমন একটা ভয়াবহ নারকীয় ঘটনা ঘটে? অসম্ভব।
বরং তিনি তাঁর কন্যাকে চাবি বন্ধ করে আটকে রাখবেন, অথবা গুম খুম করে ফেলবেন। তত্রাচ বলতে পারবেন না, 'বেরো লক্ষ্মীছাড়ি মুখপুড়ি আমার বাড়ি থেকে, যা প্রাণ চায় তোর করগে যা।'
উঃ! কবে যে সমাজ থেকে এই সব মাথা মুণ্ডহীন কুসংস্কারগুলো দূর হবে।....কুল শীল গাঁই গোত্র, ঠিকুজি কুষ্ঠি, আর সর্বোপরি—অহমিকাস্ফীত অভিভাবকদের আকাশছোঁওয়া বংশমর্যাদা। এতগুলো বেড়া ডিঙিয়ে, এতগুলো খানাখন্দ পার করে, তবে একখানা বিয়ে? ধ্যেৎতারি নিকুচি করেছে।
এক এক সময় ভাবি হতভাগাকে বলে দিই, তুমি তোমার ভাল চাকরীর মগডালের দিকে তাকিয়ে থাকো, তোমার হাতের খাবারের পুঁটুলিটা ততক্ষণে চিলে ছোঁ মেরে নিয়ে যাক।
আশ্চর্য বাবা? আমাদের ক্লাশের কতগুলো মেয়ের কি পটাপটই বিয়ে হয়ে গেল! প্রেমে পড়া বিয়ে, ছাঁদনা তলায় প্রথম দেখা বিয়ে, অনেক দিন ধরে লুকিয়ে লটকে থেকে, শেষ পর্যন্ত মা বাপকে ভিজিয়ে ভজিয়ে দান সামগ্রী গহনা শাড়ি আদায় করে ড্যাংডেঙিয়ে বিয়ে। কত রকমই দেখলাম। আমার ভাগ্যেই নৌকো বালির চড়ায় আটকে বসে আছে।
ভাগ্যটাই মন্দ।
তার সাক্ষী আমার পরিবেশের চেহারা, স্থিতপ্রজ্ঞ নিরুদ্যম পিতা, 'ভগবৎ চরণে বিলীন' ঘোরতর সংসারী জননী, পরম স্বার্থপর দাদা, বিশ্বনস্যাৎ কারী ছোট ভাই আর করুণাময়ী, অথচ নিতান্তই ক্ষমতা হীনা এক বৌদি, এই সম্বল।
যেদিকে তাকাই, অন্ধকার।
কলেজ যাওয়া আসা বন্ধ হয়ে পর্যন্ত সেটার দেখা হওয়ার স্কোপ কম। কোন উৎসাহে আর ভোরবেলা বিছানা ছেড়ে উঠে ঘুরে ফিরে বেড়াব? একঘেয়ে দৃশ্য একঘেয়ে কথা। ভাল লাগে না। কপাল আমার! মরতে প্রেমে পড়তে গেলাম একটা 'পকেট ফর্সা' ছোঁড়ার সঙ্গে। ওর যদি পায়ের তলায় মাটি থাকতো। আমি নিশ্চয় আমার পায়ের তলার মাটি ত্যাগ করে ওর কাছে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তাম।
হবে না, কিছু হবে না আমার।
যতক্ষণ বিছানায় পড়ে পড়ে ভবিষ্যতের সোনার স্বপ্ন দেখি, ততক্ষণই সুখ।
সেকেলে ধাঁচের বাড়ি, চওড়া দালানের একধারে সারি সারি ঘর, তাই ঘরের বাসিন্দারা প্রকৃত পক্ষে নিতান্তই পাশাপাশি ঘেঁসাঘেসি বসে শুয়ে পরস্পর বিরোধী কথা ভাবে। শুধু ওদের মাঝখানের ওই পনেরো ইঞ্চি দেওয়ালগুলোই প্রত্যেককে এতো নিশ্চিন্ত স্বাধীনতা দান করেছে।
খুকুর ঘরের একপাশে দাদা বৌদির জিনিসের ঘর, অপর পাশে ছোট ভাই মধুমাধবের।
এই অদ্ভুত নামের ছেলেটাও ঘুমোয় না বেলা অবধি। তবে সেও অন্য সকলের মতই ঘরের দরজা খোলেনা, তাই এই ভুলধারণা!
ওর ভাষায় 'প্রপিতামহের ঘড়িতে, যখন ছটা ঘণ্টা বেজেছে। তখনই ওই বিছানায় উঠে বসে আছে স্রেফ একটা জাঙ্গিয়া পরে। ভোরে উঠে 'যোগ ব্যায়াম' করার অভ্যাস তার, এটা তারই প্রস্তুতি।
মধুমাধবের ভাগ্যে ওর ঘরে মস্ত একখানা 'দাঁড়া' আর্শি, দাঁড় করানো আছে দেয়ালের একধারে। দুপাশে 'গামছা—মোড়া' গড়নের পাক দেওয়া কালো পালিশের স্ট্যাণ্ড। কাঁচটা ভরে এখানে সেখানে ছোট বড় 'মেচেতা পড়া'র মত দাগ।...নীলিমা যাকে বলে 'চিতিধরা'। মধুমাধবের ভাষায় এও 'প্রপিতামহীর আয়না'।
তা হোক প্রপিতামহীর, হোক মেচেতাধরা, তবু বিরাট একখানা মালতো বটে। মধুমাধব নামক তরুণ যুবার পুরো অবয়বখানির ছায়াতো পড়ে। সেটাই কি কম লাভ? যোগব্যায়ামের পক্ষে যেটা পরম দরকারী।
বিছানায় বসে বসেই আর্শির মধ্যে নিজেকে অবলোকন করতে করতে মুখভঙ্গী করছিল মধুমাধব। এটা ওর একটা বিশেষ 'হবি', নিজেকে ভ্যাংচানো। এখনও ভেঙচে ভেঙচে বলে, এই যে শ্রীমান মধুমাধব, ইহ পৃথিবীতে একমাত্র যে প্রপার্টিটি আছে তোমার, সেইটিকে সুরক্ষিত রাখতে যত্নবান হও এবার। অনেকক্ষণ তো শুয়ে কাটালে।
এই! শুধুমাত্র এই দেহখানিইতো তোমার সম্বল, যাকে বলা চলে পিতৃদত্ত ধন। তা প্রপার্টিটা খুব একটা মন্দ নয়।....
খাট থেকে নেমে এসে আর্শির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাসল ফুলিয়ে দেখতে দেখতে একটু প্রসন্ন হাসি হেসে বলে, বরং অনেকের থেকেই ভাল। এটিযে পরম পূজনীয় অগ্রজ, শ্রীঅমৃত মাধবের মত ঘাড়ে গর্দানে পেটমোটা হয়নি এ একটা লাক!...কিন্তু ব্যস ওই পর্যন্তই।...ওইটুকু সাপ্লাই দিয়েই, 'বেশী দেওয়া হয়ে গেল' ভেবে হাত গুটিয়ে নিলেন গার্জেনরা।...নইলে—কেউ কখনো শুনেছে একটা রেসপেকটেবল ভদ্দরলোকের বাড়িতে বড় সাধের কনিষ্ঠপুত্রের এরকম একখানা নাম রাখে?...এমন দুখানি ওয়ার্ড, যে তার কোনো একটা টুকরো বেছে নিয়েও লোক সমাজে কিছু কিঞ্চিৎ মুখ রক্ষা সম্ভব হবে।...এই যে আমাদের ক্লাশের একটা ছেলে ছিল, নাম গজেশ কুমার, ও শুধু শেষের অংশটুকুই বেছে নিয়েই কাজ চালিয়ে চলতো।
কুমার! কুমার! এই নামে কেল্লা মারতো সে। শুধু ও কেন, কলেজের রণদাচরণ? সে ও তো ওই 'চরণটা' ছেড়ে খানিকটা স্মার্টনেস বজায় রেখেছিল! সবচেয়ে বড় কথা ছোট পিসেমশাইয়ের ভাই? কী একখানা নাম পেয়েছিল সে তার ছমাস বয়েসে! না—নাম হল পাতকী নিধন!...সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুটার বুকের ওপর এই গন্ধমাধন খানি চাপিয়ে দিতে এক ফোঁটা মায়াও হয়নি তার বাপ ঠাকুর্দার!
উঃ! ভাবা যায় না।
তবে অ—বাক তো চির অ—বাক থাকে না?...নির্যাতিত ও চিরদিন পড়ে মার খায় না। কে. জি. ছেড়ে বড় স্কুলে যাবার প্রাক্কালেই 'পাতকীনিধন' বেঁকে বসে বলল, আমার নামটা বিচ্ছিরি। ও নাম বদলে দাও।
শুনে বাড়ির লোক 'থ'। নামকরণের নাম, রাশিলগ্নে ওটা পুরোহিত নির্দেশিত ব্যাপার, বদলাবো কী?
তা হলে আমি ইস্কুলে ভর্তিই হব না।
অতএব আট বছরের সেই ছেলেটা, নামের শেষাংশ 'নিধন' শব্দটাকে নিধন করে, আর প্রথম অংশটাকে একটু তেড়িয়ে নিয়ে স্রেফ 'পতাকী' হয়ে বুক ফুলিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু হে হতভাগ্য মধুমাধব! তোমার কোনো দিক থেকেই মুক্তির কোনো রাস্তা নেই। তোমার হাত পা বাঁধা।...জগৎ সংসারে 'মধু' শব্দটা যতই মধুময় হোক, ওই নামের ফ্রেমে নিজেকে আটকে নিয়ে বেড়ালে, তোমাকে বাড়ির ঘরঝাড়া চাকর ছাড়া আর কিছু মনে হবে না।...আর মাধব? আহা! যেন বৈষ্ণব পদাবলী থেকে হঠাৎ ঝরে পড়েছ।...দূর দূর!
ছেলে মেয়েদের সম্পর্কে মূল্যবোধ কত কম থাকলে এরকম নাম রাখা সম্ভব? তাও ডাকা হয় 'মেধো' বলে।
একমাত্র বাবা মেধো না বলে মাধব হলেন।
অবিশ্যি তাতেও আহ্লাদের কিছু নেই।
তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞার পরস পরিচয় ওই 'মেধো'র সঙ্গে মাধবের খুব বেশী পার্থক্য নেই আমার কাছে।
এই বাড়ি তোমার হে মধুমাধব। এই পরিস্থিতি।
বাবা গৃহে থেকেও বৈরাগী, মা ঘোরতর বিষয়ী হয়েও সন্ন্যাসিনী। তোমার দাদার মোক্ষের জগৎ তোমার কাছে হাস্যকর। তোমার সদা অভিমানিনী বৌদি মাঝে মধ্যে কিছু টাকাকড়ি দিয়ে তোমার উপকার করে বটে, কিন্তু 'কিপটে সোয়ামীর' পকেট থেকে কতটুকুইবা খসাতে পারে?
খালি পকেট নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে জীবনে ঘেন্না ধরে গেছে। হায় মেধো, তোমার দিদিটি তো একটা ভ্যাগাবণ্ডের সঙ্গে লটকে পড়ে হাত, কামড়াচ্ছে তার কাছেও নো হোপ! ...কিন্তু এই কি একটা ভদ্র কালচার্ড পরিবার?...যাদের মধ্যে একজনও পলিটিকস কাকে বলে জানে না, দেশের অবস্থা নিয়ে মাথা ঘামায় না, কালচারাল কোনো ব্যাপারের সঙ্গে যোগ রাখে না।...
এবাড়িতে নিত্য নির্ভুল নিয়মে ঘড়ি বাজবে, নির্ভুল নিয়মে বাজার হবে, রান্না হবে, খাওয়া হবে, চায়ের কোয়ালিটি অথবা সিনেমা সংক্রান্ত একটু আলোচনা হবে, বাড়িতে কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটলে পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করা হবে এবং আবার পরদিন রান্নাখাওয়ার ব্যবস্থায় তৎপর হবে।
আবার বলি, হায় মধুমাধব! এই তোমার জন্মাগার! এই তোমার পরিবেশ।...ছ্যাঃ।
ব্যায়াম সেরে মধুমাধব যখন চায়ের টেবিলে এসে বসে, তখন দেখতে পায় বৌদি তার পূজনীয় শ্বশুর ঠাকুরের জন্যে চা ছাঁকছে। আহা দুর্গাঠাকুরের মুখের ঘামতেলের মত, মুখে কেমন একখানা ভক্তির প্রলেপ! ধন্য মহিলা তুমিই ধন্য। পুরু করে মাখন মাখাও শ্বশুরের টোষ্টে।
মধু প্রতীক্ষা করে সুধামাধব তাকে কিছু বলবেন, সমালোচনা সূচক, অথবা উপদেশসূচক, কিন্তু বললেন না। কিছুদিন থেকেই যেন লক্ষ্য করছে মধুমাধব, বাবা এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। তার মানে এখন মধুমাধবকে দুটো পালটা জবাব শুনিয়ে দেবার স্কোপটুকুও দিতে নারাজ।
কাজেই মধুকে বাবার সামনে বসে বসে নীরবে চা খেতে হয় নিমপাতা চিবোনো মুখ নিয়ে।....শুধু বৌদির দু'একটি সমীহপূর্ণ উক্তি আর দিদির বেজার বেজার কথা কানে এসে পড়ে মনের সঙ্গে কিছুটা কৌতুক রসের সৃজন করে। বৌদি বলে, বাড়িখানকে কিন্তু এবার একবার ভাল করে মেরামত করা দরকার বাবা, অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে।
আহা শ্বশুরের এই পচা পুরানো ভিটে খানার মুমূর্ষু অবস্থায় মহিলা যেন কতইনা বিচলিত! মনে মনে তো শিকলিকাটা পাখি হয়ে আকাশে উড়ছো।...স্রেফ বাকতাল্লা! শ্বশুরের মনোরঞ্জনের প্রয়াস।...তা শ্বশুর ঠাকুরটি তো আর তোমার মত বোকা নয় যে, এই ছলনাটুকু ধরতে পারবেন না?...তবে হ্যাঁ, ডায়লগের পিঠে একখানা ডায়ালগ তিনি বসান। বলেন, এ বাড়ি মেরামত করা আমার দ্বারা আর হবে না বৌমা!...বাপ পিতামহের কাটা ফসল খেয়ে শেষ করে বিদায় নেব। দিদি অমনি সঙ্গে সঙ্গে বেজার মুখে মামাবাবু হরদম যেকথা বলে বলে যায়, সেই কথাটাই বলে বসে, 'তোমার দ্বারা হবে না' এটা তোমার স্বেচ্ছাকৃত নিরুপায়তা বাবা। এই কটা মানুষে এতোবড় বাড়িখানা দখল করে বসে না থেকে খানিকটায় ভাড়াটে বসালে, অনায়াসেই সেই টাকায় বাড়ি সারানো যেতো। আত্মস্থ পিতা অবশ্য এনিয়ে বাদ প্রতিবাদ করতে আসেন না, মৃদু হেসে বলেন, বড় ভুল হয়ে গেছে বটে। এই এক এক বগগা ঝানু আদর্শবাদী পণ্ডিতমূর্খ ব্যক্তি। সেণ্টিমেণ্টের খাতিরে আখের দেখল না। দিদির কথাগুলো চ্যাটাং চ্যাটাং হলেও উড়িয়ে দেবার নয়।
'ভিটেয় ভাড়াটে বসাবো না।'
অদ্ভুত একখানা গোঁ বটে।
যাকগে চুলোয় যাক।
এ বাড়ি কর্পোরেশনে ভেঙে দিয়ে গেলেও আমার কিছু এসে যাবে না। আমি তালে আছি তোমাদের এই সোনার ভারত ছেড়ে কেটে পড়তে পারা যায় কি করে। এই হতভাগা দেশে আবার মানুষে থাকে?
সুধামাধবের সংসারের দিনের প্রারম্ভের চেহারাটা মোটামুটি এই।...এরপর যে যার তালে সারাদিন ঘুরবে। ঘুরবে রাত পর্যন্ত। ফিরবে খুশীমত। খাবে যার যখন সুবিধে। পরিবারের সবাই দিনান্তে অন্ততঃ একবারও একত্রে বসে খাবে, এ বিধি এখন আর পালিত হয় না। খাবার জন্যে কোনো নিয়মবাঁধা সময় নেই।
নিয়মী সুধামাধবই শুধু যথানিয়মে রাত্তির সাড়ে নটার ঘণ্টা পড়লেই টেবিলে এসে বসে বলেন, ঠাকুর আমায় দিয়ে দাও।
প্রকাণ্ড একখানা শূন্য টেবিলের একধারে কোণ ঘেঁসে বসেন, যাতে থালাটা অন্যের না অসুবিধে ঘটায়।
ব্রজমাধবের সংসারে টেবিল ছিল না, পীড়িই সার।...সুধামাধবই এই প্রকাণ্ড টেবিলখানা বানিয়েছিলেন সবাই মিলে একসঙ্গে গল্প করতে করতে খাওয়া দাওয়া হবে বলে। তখন তো তাঁর ছোট দুইভাইও ছিল, ললিতমাধব আর অমিয়মাধব। তাদের একজন স্ত্রী—পুত্র নিয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে বসবাস করছে। আর একজন সোজাসুজি পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছে।
তবু এরা তখন ছোট ছিল, 'বাবার সঙ্গে যাব' বলে বসে থাকতো।... আর নীলিমা? নীলিমাও অবশ্যই। তাঁর তো তখন গুরুমন্ত্র হয়নি।
খেতে বসে যা কথা ঠাকুরের সঙ্গে।
লালটুর এ সময় নীচে বসে থাকার ডিউটি। কে কখন ফিরবে, দরজাখোলা পেতে দেরী হলে রেগে যাবে। কে কোথায় গেছে জিগ্যেস করেননা সুধামাধব, তবু ঠাকুর স্বতঃ—প্রবৃত্ত হয়ে যা জানায়, তা সুধামাধবের অজানা নয়। বড়দাদাবাবু যে অফিস ফেরৎ ক্লাবে যায়, ছোড়দাদাবাবু কোথায় না কোথায়, মা গুরুআশ্রমে কীর্তনগান শুনতে, এবং বৌদিদি আর দিদিমনি পাশের বাড়িতে টি.ভি. দেখতে ও তথ্য সুধামাধবকে পরিবেশন না করলেও চলতো।...তবু লোকটা আহার্য পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গে কৌশলে ওই তথ্যগুলোও পরিবেশন করে ফেলে।
হয়তো অন্য কোনো কারণে নয় স্রেফ মমতার বসেই। ভালমানুষটা একা বসে খাচ্ছে, দেখে দুঃখ হয় ওর। যেন কেউ নেই ওনার।
তাই এটা ওটা কথা বলে পরিস্থিতিটা সহনীয় করে তুলতে চায়। ঠিকে ঠাকুর বটে, তবে অনেক দিনের পুরনো।
খাওয়ার পর সুধামাধব বেশ কিছুক্ষণ বইটই পড়েন।
সেটা শোবার ঘর সংলগ্ন ছোট্ট একটু ঘেরা বারান্দায়। কাচের জানালা বসানো এই ঘরবারান্দাটিতে সুধামাধবের একটা ছোট টেবিল আছে, আছে চেয়ার আর একটা টেবিল ল্যাম্প। এখানেই তাঁর পঠন পাঠন।
বারান্দাটা এমন জায়গায় যে এখানে বসে বসেই তিনি টের পাচ্ছেন, একে একে সবাই আসছে। সকলের আগে 'অমি'। শুনতে পেলেন এসেই প্রশ্ন করছে বৌদিরা ফেরেনি এখনো?
বলাবাহুল্য, এই প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ শ্রীমান লালটুর প্রতি। তবে তার ক্ষীণ কণ্ঠের উত্তর শোনা যায় না। কিন্তু উত্তর তো নেতি বাচকই হবে।
সুধামাধব শুনতে পান ক্রুদ্ধ অমৃতমাধবের মন্তব্য, রাবিশ জিনিস এসেছে দেশে। টিভি।
সুধামাধবের মনের মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে।
এরপর ভারী ভারী জুতোর শব্দ পান। দোতলায় উঠে এসেছে 'অমি'। ঘাড় ছোট লোকেদের কি জুতোর শব্দ একটু ভারী হয়?
নিজের ঘরে ঢুকে গেল। বলে গেল, ঠাকুর এক কাপ গরম জল দাও।
কী করবে গরম জল? ওষুধ খাবে বোধ হয়। ওই এক বাতিক আছে ওর, ওষুধ খাওয়া। কখনো ডাক্তারী, কখনো হোমিওপ্যাথি, কখনো বা কবিরাজীও। কোনো একটা চিকিৎসার অধীনে ব্যতীত যে থাকতে পারেনা।
এরপর বাড়ি ঢোকেন বাড়ির গৃহিণী।
বোধকরি একদল গুরু ভগ্নীর সঙ্গে, কলোচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বাস শোনা গেল দরজায়।...
'তোমার এই কাজ হয়েছে ভাই, গাড়ির মধ্যে একটি বাহিনীকে ভরে নিয়ে বাড়ি বাড়ি নামাতে নামাতে ফেরা। গাড়ি থাকার ঝকমারি।'
হয়েছে, হয়েছে, তোমাকে আর সৌজন্য করতে হবেনা বাবা! কেমন গল্প করতে করতে আসা হল। আহা, কী কের্তনই গাইলেন! কান প্রাণ দুই জুড়িয়ে গেল। একেই বলে সাধনা। ভক্ত কণ্ঠ ভিন্ন এ সুর খেলেনা।
ধমাস করে গাড়ির শব্দ হল।
গাড়িবতী চলে গেলেন।
নীলিমা উঠে এলেন হাঁসফাঁস করতে করতে। আর এসেই উঁকি দিলেন সুধামাধবের পড়ার জায়গায়।
বসা হয়েছে তো বই মুখে দিয়ে? ওঃ। জগতের আর কিছুই জানলেনা।...একদিন যদি যেতে ওখানে, বুঝতে জীবনটা কী বৃথা অপচয় করেছো।
সুধামাধব মৃদু হেসে বললেন, সতীর পুণ্যে পতির পুণ্য।
হুঁ। জানোতো খালি সকল কথা উড়িয়ে দিতে।
নীলিমা হাতের ঝকমকে তোলা চুড়ির গোছাটা খুলতে খুলতে বলেন, রাখো ততক্ষণ এগুলো, হাত মুখ ধুয়ে আসি। টেবিলে রাখলেন।
সুধামাধব এক পলক তাকিয়ে বললেন, এই সব পরে রাত্তিরে রাস্তায় বেরোনো ভাল? আজকালতো শুনি—
নীলিমা ঝঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, তবে কি পাঁচজনের আমলে দীন দুঃখীর মতন শুধু এই ক্ষয়া চুড়ি কটা হাতে দিয়ে যেতে হবে? একে তো—নিত্যদিন হ্যাংলার মত পরের গাড়ি চড়ে যাচ্ছি আসছি।...কতজনের যে গাড়ি আছে—
সুধামাধব একটু হাসলেন, কতজনের আবার নেইও। একজনের নৌকোয় দশজন পার হয়।
হুঁঃ। এই কথাই বলবে জানি।
চলে গেলেন পরণের চওড়া জরিপাড় শাড়ি খানি কাঁধ থেকে নামিয়ে পাট করতে করতে। বোঝা যাচ্ছে আজ বিশেষ উৎসবের দিন ছিল।
এতক্ষণে বোধহয় বাড়ির তরুণী মেয়ে দুটি ফিরল। পাতলা গলার টুকরো টুকরো কথা শোনা গেল।
ওমা! দাদা! তুমি খেতে বসে গেছ?
তা' কী করতে হবে?...অমৃতমাধবের অমৃত কণ্ঠ নিনাদ, তোমরা কখন আড্ডা দিয়ে ফিরবে সেই আশায় পেট জ্বলিয়ে বসে থাকবো?
আহা! নিজে যখন তাস খেলে দেরী করে ফেরো। দেখছিস বৌদি, দাদার ব্যাভার?
বৌদির দেখা টেখা হয়ে গেছে। তুমি দেখো।
তাই দেখছি, ঠাকুর আমাদেরও দিয়ে দাও। বৌদিকে আমাকে।...ছোট বাবু ফেরেননি তো? জানি।...ঠিক আছে। কী আর করবে? ওর খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে তুমি খেয়ে নিয়ে চলে যাও। লালটুকেও দিয়ে দিও।
ঘরের ভিতর থেকে নীলিমার গলা ভেসে এলো, এই খুকু। তোর যে খুব সর্দারি দেখছি। এক্ষুনি আর ওদের খেয়ে না নিলে চলবে না? আর একটু দেখুক না!
দেখে কী হবে মা? বাবুতো এসে একঘণ্টা চান করবেন। ওরা কতক্ষণ হাঁ করে বসে থাকবে?
নীলিমার বেজার গলা শোনা যায়। মেধোর কপালে রোজ এই। বাড়িসুদ্ধ সকলের এঁটো পাতের ধারে—
তা' যেমন কর্ম তেমনি ফল।
খুকু ঘরঘরিয়ে ঘরে ঢুকে যায়, বোধ হয় বাইরের সাজ ছাড়তে।
নীলিমা এখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।
রাগী গলায় বলেন, লালটু সুদ্ধু খেতে বসলে, মেধোকে দোর খুলে দেবে কে?
এখন সুধামাধবও উঠে আসেন।
বলেন, আমি দেব।
ওরা খেতে খেতেই কড়ানাড়ার শব্দ ওঠে।
খুট করে একটু। এই স্টাইল মধুমাধবের, দাদার মত ভীম বেগে নাড়ে না। সুধামাধবকে দরজা খুলতে দেখে ঈষৎ অপ্রতিভ গলায় বলে, তুমি এলে? আর কেউ নেই?
সুধামাধব পাশ কাটিয়ে উত্তর দিলেন, আরে, আমাকে তো নামতেই হতো তালা লাগাতে।
চাবিটা লালটুর কাছে রেখে দিলেও তো হয়।
পাগল!
অযৌত্তিক কথা উড়িয়ে দেবার এই পদ্ধতি সুধামাধবের।
সকলের খাওয়া হয়ে যায়, সব ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। নীলিমা দরজা বন্ধ করেননি বটে, চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন। গুরু আশ্রমে আজ উৎসবের ভোগে প্রসাদ, রীতিমত গুরুভোজন হয়ে গেছে।
সুধামাধব সিঁড়ির কোলাপসিবলটা টেনে বন্ধ করে তালা লাগান, তালাটা টেনে দেখেন। তারপর ওদের পরিত্যক্ত একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে, তার উপর দাঁড়িয়ে ঘড়িটায় দম দেন, আস্তে আস্তে চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।
আজ বুধবার।
দম দেবার দিন।
নতুন দম খাওয়া যন্ত্র আবার যখন 'ঢং' করে একটা ঘণ্টা মারে 'বারোটা বেজে যাওয়া' রাত্তিরের পর নতুন তারিখের ঘোষণা জানিয়ে, সেটা সত্যিই আর কারো কানে পৌঁছয় না।
ততক্ষণে বিক্ষুব্ধ অভিযোগ—ক্লান্ত কয়েকটা ভিন্ন ভিন্ন গ্রহের জীব গভীর অন্ধকারের তলায় তলিয়ে গেছে একই ছাদের তলায় শুয়ে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন