উনিশশো ঊনআশিতেও

আশাপূর্ণা দেবী

দেশ রাজ্য জুড়ে দেওয়ালে দেওয়ালে এখন উনিশশো ঊনআশীর ক্যালেণ্ডার ঝুলছে, আর শুধু শহর বাজারে নয়, গ্রামে গঞ্জেও মায়ের কোলের শিশুটাও জানে মানুষ চাঁদে ঘুরে পুরনো হয়ে এসেছে সেই কবে, এখন মঙ্গল গ্রহে ঢুঁ মারতে যাচ্ছে। এবং তাবৎ জনেই জানে মানুষ ক্রমশঃ বুধ, বেস্পতি, শুক্কুর, শনি হয়তো শেষতক রবির বাড়িও সঙ্কেত পাঠাবার তাল করতে, শূন্যে 'স্টেশন' বসাচ্ছে।

এই সাগরপুকুর গ্রামেও কারো জানতে বাকি নেই বিজ্ঞানের বলে এখন মানুষের শরীর যন্ত্রগুলোর কোনটা অকেজো—টকেজো হয়ে গেলে তাদের বাদ বাতিল করে কৃত্রিম অকৃত্রিম নতুন সব যন্ত্র বসিয়ে নিয়ে দিব্যি কাজ চালানো যায়। চোখের সামনেই ক'জনা তাদের হাওয়া ফুরিয়ে আসা হার্টের গায়ে 'হার্ট—মেসিন' বসিয়ে পুরোদমেই বেঁচেবর্তে রয়েছে। মেসিনের আয়ু ফুরিয়ে এলে, কলকাতায় গিয়ে আবার নতুন 'আয়ু' ভরে নিয়ে আসছে। তবু—তবু এখনো বিন্দে বুড়িকে হঠাৎ ঘাটে পথে দেখতে পেলেই, ছেলে বুড়ো সবাই উল্টোপাক খেয়ে চোঁ চাঁ সটকান দেবে। তার কারণ? কারণ 'দৃষ্টি'।

বুড়ির 'দৃষ্টি'কে সকলের দারুণ ভয়।

ওই দিষ্টিতেই তো বুড়ি কী না কি অনিষ্ট ঘটাতে পারে কে জানে! মানুষ গ্রহান্তরে ঘুরে আসতে শিখেছে বলেই তো আর 'নজর লাগা' 'বান মারা' 'তুকতাক' 'জুড়ি—বুটি' এগুলো মিথ্যে হয়ে যায়নি? আর শক্তিও ফুরিয়ে যায়নি জল—পড়া, তেল—পড়া, ফুল—পাতা, শেকড়—বাকড়, হোমের ছাই, হাড়িকাঠের মাটির।

বিপদে পড়লে, এরাই বিপদতারণ।

এদের নিয়ে যাদের কারবার, তারা 'ভরে'র ঘোরে স্বর্গ মর্ত পাতাল ঘুরে এসে তোমার ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান সব কিছুর ফটো তুলে তোমার সামনে ধরে দেবে। বিজ্ঞান পারবে এ সব? সে বড় জোর তোমার রক্ত মাংস চামড়া শিরা ভেদ করে হাড়ের ফটোটা তুলে ধরতে পারে। কাজেই বিজ্ঞান হার মানলেই অ—জ্ঞানের কাছে আশ্রয়। আশ্রয় তো নিতেই হবে কোথাও।

একদা বৃন্দেও এ তল্লাটের পরম 'আশ্রয়' ছিল। বৃন্দের নাম তখন একডাকের মাথায়। বৃন্দে তখন 'গুনীন মা'। বিপদে পড়লেই ডাক ডাক বিপদতারিণী গুনীন মা—কে। কিন্তু এখন পালা বদলে গেছে। এখন বিন্দেবুড়িই যেন গ্রামের একটা বিপদ—কেন্দ্র।

ওর দৃষ্টি পড়ার ভয়ে ওর বাড়ির সামনে দিয়ে সাধ্যপক্ষে কেউ হাঁটে না।.... অথচ ঝোপ জঙ্গল আর ফণীমনসার বেড়ায় ঘেরা বুড়ির ওই বাড়িটার সামনে দিয়েই স্টেশনে যাবার শর্টকাট রাস্তা। গ্রাম সুদ্ধ লোকেরই তো ডেলি প্যাসেঞ্জারীর ব্যাপার। পুরুষ ছেলেরা তো নিশ্চয়ই যাবে, গ্রাম ঝেঁটিয়েই যাবে। কলকাতা না ছুটে গতি কি? এখানে 'পাত' সেখানে 'ভাত'।

গ্রামের বৌ—ঝিও তো কম যায় না পড়তে, পড়াতে, চাকরি করতে, গান শিখতে, এমন কি সেলাই—বোনা শিখতেও।

সুবোধ কুমোরের মেয়েটা নাকি মাটির মূর্তি গড়া শিখতে নিত্যদিন রেলগাড়ি চড়ে কলকাতায় যাচ্ছে আসছে।

এত প্রগতির হাওয়া সাগরপুকুর গ্রামে, তথাপি সব স্টেশন যাত্রীরাই বিন্দের দিষ্টির ভয়ে দুশো পাঁচশো গজ বেশী হাঁটা স্বীকার করে নিয়েও ভাঙা শিবমন্দিরের পিছন দিয়ে ইস্কুলবাড়ির পাশ দিয়ে ঘুরে স্টেশনে যায়। শুধু সাইকেল আরোহীরাই যা চোঁ চাঁ মারে সামনে দিয়ে।

মুশকিল এই, বুড়ির বর্তমানের বাসস্থান ওই খড়ের চালার ঘরটা, আর ফাটা বাঁশের খুঁটির ঠেকনোয় ঠেকানো থুত্থুড়ে দাওয়াটা, একটা ঢিপি জমির ওপর। সেই দাওয়ায় বসে থাকা বুড়িটাকে দেখলে ঠিক অশোকবনের চেড়ির মতো দেখতে লাগে! আর মরা আগুনের ঢেলার মতো চোখটাও চোখে পড়ে।

অথচ জমজমাট জ্বলজ্বলট যে ঘরবাড়ি আর সাজানো সংসারখানা ছিল বৃন্দের, সেখানে এখন আর তার পা ফেলবার হুকুম নেই! ও মুখো হতে গেলেই টগর ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেবে। বলবে—এখেনে ক্যানো? এখেনে উঁকিঝুঁকি ক্যানো? আমার বাচ্চাকাচ্চাকে নজর দিতি এইচিস বুড়ি?

'নজর'। হায় সে ক্ষমতা যদি এখন থাকত বৃন্দের।

তাহলে এতদিনে কবে টগরের 'সপুরী একগাড়ে' হয়ে যেত। কিন্তু বৃন্দে এখন বিষ হারানো ঢোঁড়া। বৃন্দের এখন মন্তর—টন্তর বিস্মরণ হয়ে গেছে, শেকড়—বাকড় চিনতে পারে না। বাণ মেরে অন্যকে শুকিয়ে দেবে কি, নিজেই তো শুকিয়ে শুকিয়ে আখের ছিবড়ে হয়ে গেছে। শুকিয়েছে বয়েসে, শুকিয়েছে মনের জ্বালায়, আর শুকিয়েছে পেটের আগুনে।

সর্বনাশিনী সর্বগ্রাসিনী টগর বৃন্দেকে শুধু দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তার রুজি রোজগারের পথটুকুও বন্ধ করে দিয়েছে শয়তানীর জাল ফেলে ফেলে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শক্তি যাচ্ছিল, রোজগারও কমে এসেছিল, বৃন্দের 'দুলোর বাপ' মরতে সাহায্যকারী হারিয়ে, আরোই ক্ষীণধারা হয়ে এসেছিল, তবু কিছু তো ছিল?

এখনকার বাচ্চাদের পেঁচোয় না পাক, হঠাৎ জ্বরের তাড়সে 'তড়কা'—টা তো হয়? আমাশা, ঘুংড়ি কাসি এ সবও হয়ে পড়ে রাংতামোড়া বড়ি—ফড়ি ছাপিয়েও। আর বুড়োদের ঘাড়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা এগুলোও হয়। বৃন্দের জল—পড়া তেল—পড়াগুলো তো এ সবে ম্যাজিকের মত কাজ করত। এইটুকুর পেন্নামী থেকেই পেটটা চলে যেত একা বৃন্দের। টগর সে গুড়েও বালি দিয়েছে।

টগরের বিষ মন্তরে চাকা ঘুরে গেছে। এখন বৃন্দে সাগরপুকুরের বিভীষিকা স্থল। বিপদতারিণী থেকে বিপদকারিণীর ভূমিকায় দাঁড় করিয়েছে এখন তাকে দেশের লোক।

ইচ্ছে করে তো কেউ ওর ছায়া মাড়াতে যায়ই না, দৈবাৎ পথে ঘাটে দেখতে পেলেও ছুট মারে।

তা পথে দেখাটাও ক্রমশঃই বিলোপ পাচ্ছে। শুধু ঘাটেই বলা যায়। লাঠি ঠুকে ঠুকে খুট খুট করে যায় বৃন্দে শুধু ঘাটে। পেট বড় কড়া মনিব। মায়া মমতার বালাই নেই, উঠতে না পারলেও ঠেলে তুলে খাটতে পাঠায়।

পুকুরে তো যেতেই হবে।

বৌ হারামজাদি তো 'টিপকল' সমেত উঠোনটাই দখল করে নিয়েছে।

এতটুকুন একটা মেটে কলসীর গলায় গামছা বেঁধে দুলিয়ে দুলিয়ে একটু রান্না খাওয়ার জল নিয়ে আসে বিন্দে পুকুর থেকে। আর পুকুর পাড় থেকে খুঁটে খুঁটে নিয়ে আসে কিছু শুষনি কলমি শাক, দুটো শামুক গুগলি। কি দুটো 'ঘেনি কাঁকড়া'।

ধনুকের মত গোল হয়ে যাওয়া শরীরটাকে আরো গোল করে হেঁট হয়ে বৃন্দে যখন ওই সব সংগ্রহ করে, তখন ওর ঘাড়টা অসম্ভব নড়ে। আর ঘাড় নড়ে বলে মাথার ওপরকার ঘোলাটে সাদা ঝাঁকড়া চুলগুলো মুখের দু'ধারে সাপের ফণার মত দুলতে থাকে। দৃশ্যটা দূরে থেকে ছোট ছেলেমেয়েদের পিলে চমকে দেবারই মত। বড়দেরও ভীতিকর।

ঘাড় আরো বেশী নড়ে, বিন্দের বিড়বিড়িনি বকুনির ঠ্যালায়।

বকুনি আর কি!

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে গাল পাড়া। স্বর্গের ভগবানকেও ছেড়ে কথা কয় না। তবে প্রধান টার্গেট হচ্ছে দুলোর বৌ টগর। যে বৌটার স্বামী হঠাৎ হাট থেকে ফিরে 'বুক কেমন করতেছে' বলে ধড়ফড়িয়ে মরে যাওয়ায় রটিয়ে বেড়িয়েছিল, বেটার বৌয়ের প্রতি আক্রোশে তাকে জব্দ করতে নিজের বেটাকেই বাণ মেরে খতম করেছে বুড়ি। ..... তদবধিই বিন্দে গ্রামের বিভীষিকা।

বিন্দের তাই এখন গালমন্দই একমাত্র অস্ত্র।

ইহ পৃথিবীতে যত গাল থাকতে পারে তার সবগুলো বৃন্দে ছেলের বৌয়ের প্রতি প্রয়োগ করে। আর ইহ সংসারে মেয়েমানুষের জীবনে যত রকম দুর্দশা ঘটা সম্ভব, সেই 'দশা'গুলো বৌয়ের ভাগ্যে ঘটাবার জন্যে তার জানা জগতের যাবতীয় দেবদেবীর কাছে প্রার্থনা করে।

কিন্তু সবই ওই বিড়বিড়িয়ে। গলা তুলে গাল পাড়বার সাহস ঘুচে গেছে। গেছে বৌয়ের বন মেয়েটা লায়েক হয়ে ওঠা পর্যন্ত। বছর দশেকের মেয়েটা একদিন একখানা খেঁটে বাঁশ উঁচিয়ে তেড়ে এসে বলেছিল, 'ফের যদি মায়ের নামে গাল পাড়বি, তো এই বাঁশ মেরে মাথা ফাইটে দেবো, তা বুলে আকচি অ্যাঁ।'

তদবধি 'গলা' বন্ধ বৃন্দের ওই বিড়বিড়। ওটাই এখন রোগে দাঁড়িয়েছে। ঘাড় নড়ে, আর গলার নলি নড়ে।

ফণীমনসার বেড়ায় ঘেরা থুত্থুড়ে চালাঘরটার দাওয়ায় বসে মাৎগুড়মাখা চালভাজার গুঁড়োর দলা গিলতে গিলতে বিড়বিড় করে, আচ্চয্যি! এখনকার কাঁচা কচিগুলান কি সব্বাই আকুলি—সুকুলির বর পাওয়া? মা চণ্ডির বরপুত্তুর? তাই সাজজন্মে অ্যাকটাকে ডাইনেও চোষে না?

টগর যে গাঁয়ে তার দফারফা করে রেখেছে, সেটা বুড়ির জ্ঞান গোচরে ধরা পড়েনি, অগোচরেই রয়ে গেছে। কেউ তো আর কাছে এসে বলে যায় না। তাই ভাবে রোগ—বালাই উপে গেছে গ্রাম থেকে। তাই বলে, মা ওলাইচণ্ডীও কি গাঁ থেকে বিদেয় নেচে গা? মা শেতলা তার বেটাদের আঁচলে গিঁট বেঁদে থুয়ে একেচে?......আর ভূতপেরেৎও ভেবোন ছাড়া হয়ে গ্যাচে? তাই ঝি বৌর গায়ে এট্টু হাওয়া বাতাসও নাগে না?.... তবে আর গিরোস্তো বাড়ি থেকে বিন্দে কাওরাণীর ডাক পড়বে কোন কাজে?

কত ঝি বৌর দাঁত কবাটি ছাইড়েচে এই বিন্দে। কত বেয়াড়া মেয়ের ভূত ছাইড়েছে। চোক উল্টে যাওয়া ছেলেপুলেরে সোজা করে দাঁড় কইরে দেচে। .... ডাগদার বোদ্যি কি আর ছেল না গাঁয়ে? ছেল, তবু বিন্দেকে নৈলে চলতনি কাউর।...

এখন যেন সব সায়েব ম্যাম হয়ে গ্যাচে। আহা,মা ওলাইচণ্ডি, মা শেতলা, ভূত পেরেৎ হাওয়া বাতাস, সবাই মিলে একবার ঝাঁইপে পড় না এই সাগোরপুকুর গাঁয়ে।

আর বিন্দেকে শোক্তি দাও। নোতুন যৈবনের মতন শক্তি।

মনের প্রাণের কথা শোনবার লোক চলে গ্যাছে। অন্য আর কে এমন ভয়াবহ কথা কান পেতে শুনবে? তাই এই আক্ষেপের বাণী, প্রার্থনার বাণী ওই চালভাজার গুঁড়োর মধ্যেই গুঁড়ো হয়ে যায়।

কিন্তু শুধু বৃন্দে বুড়ি কেন? আধবুড়ো অনঙ্গ ডাক্তারই যখন তার ফাঁকা ডিসপেনসারি ঘরের মধ্যে হাতল ভাঙা চেয়ারটায় বসে কাঁচা পাকা গোঁফের ঝুড়িতে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বলে, দেশটা কি বিলেত হয়ে গেল, অ্যাঁ! চিরপরিচিত রোগগুলো সব উবে গেল তল্লাট থেকে? এখন রোগের মধ্যে রোগ, যত সব দুরারোগ্য ব্যাধি? নে, রুগী নিয়ে কলকেতায় ছোট। কলকেতায় যেন ধন্বন্তরী বসে আছে! কলকেতায় লোক মরে না!

বলি অনঙ্গ ডাক্তারের হাতে এ—যাবৎ ক'টা রুগী ফেঁসেছে? গুণে বলতে পারি।..... খাতায় লেখাও আছে। ডাক্তার মরলে দেখিস খাতা খুলে। ... আর তোদের ওই কলকেতার পেশালিস্টদের হাতে? হুঁ! ... বলি নাড়িজ্ঞান আছে কারুর? রুগী নিয়ে গিয়ে সামনে ধরে দিলেও তো টাচটি করে না। হুকুম হবে রুগীর রক্ত আন—ইউরিন আন—হ্যান আন—ত্যান আন—মাথা থেকে পা অবধি এক্সরে ফটো আন, তবে রুগী ছোঁব। ... তখন বাবুদের হাজারে হাজারে টাকা ঢালতে পেছপা নেই। মাসের পর মাস ঘোরাচ্ছে। রুগী বয়ে বয়ে কলকেতায় যাও আর আসো, তারপর আর বোয়ো না। তাকে হাসপাতালে রেখে এসো, আর শেষ অবধি কলকেতার শ্মশানে পুড়িয়ে খালাশ হও।... অথচ অনঙ্গ ডাক্তারকে দুটোর ওপর তিনটে ভিজিট দিতে হলেই বুক ফেটে যায়। তখন শাসানি—কই ডাক্তার? কিছু তো উন্নতি দেখছি না। .... তা দেশটা বিলেত হয়ে গেল বৈ আর কী বলব? দুরারোগ্য ব্যাধি ভিন্ন কলেরা নেই, বসন্ত নেই, ম্যালেরিয়া নেই, পেটের অসুখ রক্ত আমাশা পর্যন্ত নেই। ছিঃ? থাকবে কোত্থেকে? এখন যে সব স্বয়ং কর্তা বাবুদের পকেটে পকেটে ওষুধের মোড়ক। বিশ্বসুদ্ধ সবাই ডাক্তার হয়ে বসে আছে। রোগকে কি আর মাথা তুলতে দেয়?

তখন কি আর দেয়াল ছাড়া অন্য কাউকে বলে অনঙ্গ দাস? এ—সব কথা মনেরও অগোচরে থাকে।

শুধু মড়িপোড়া ঘাটের 'গুনো ডোম'? সে রাতের বেলা হাই তুলতে তুলতে তার সাকরেদকে ডেকে ডেকে হেঁকেই বলে, হ্যাঁ রে বেচু, সাগরপুকুরের লোকগুলো কি অমর হবার পিতিজ্ঞে নিয়েচে? রাতভোর বাসর জাইগে বোস করে রইচি, একখান মড়া নাই?

গুনো ডোমের ঘাটটাকে এখন 'সাগরপুকুরের' লোকেরা সভ্য করে বলে 'বার্ণিংঘাট' তা 'বার্ণিং' হতেই বা আসচে কে? আসবে না। বড়জোর দিনান্তে দুটো কি একটা। অথচ আগে?

গুনো উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে বসে বলে, ত্যাখনকার কতা মনে কর বেচা! গাঁয়ে এ্যাক অ্যাকটা মড়োক নাগচে, আর তোতে আমাতে চিলু সাজাতে দিশে—পিশে পাচ্চিনে। ... এই আসচে, এই আসচে তার ওপোর তার ওপোর। দিন রাতের ভেদ নাই।

বেচু হয়তো বলে, আজকাল আর লোক রাত—ভিতে বেরোয়—না মামা, মড়া কোলে নে বোস করে থাকে ফর্সা হবার ওপিক্ষেয়। অথচ অ্যাখোন মা মনসার বংশোধরেরাও তো নোপাট্টি। আর জনে জনে হাতে টচবাতি। ভয়ের কী আচে?

গুনো নিঃশ্বাস ফেলে বলে, রাতে বেরোয় না—তো দিনোমানেই বা বাসিমড়ার ভিড় কই? সাদে বলচি এ তল্লাটের লোকেরা অমর হবার পিতিজ্ঞে নেচে।

তা গুনোর এ আক্ষেপও তার প্রাণের প্রাণ পাতানো ভাগনা বেচু ভিন্ন কি আর কারো কানে ঢোকে? কাজেই গ্রামবাসীর টের পাবার উপায় নেই তাদের সেই অতি অকিঞ্চিৎকর বেঁচে থাকাটার উপর কোথায় কি বিষদৃষ্টি পড়ছে।

তবে এমনিতেই বৃন্দের 'দৃষ্টি' সম্পর্কে সবাই অবহিত।

বৃন্দের ওপর দিকের তিন পুরুষ, না, ঠিক পুরুষ বলা চলে না, তিন নারী'ই বরং বলতে হয়, মা দিদিমা আর তস্য মা সবাই ছিল নাড়িকাটা দাই। গেরস্ত বাড়ির আঁতুড় ঘরই তাদের কর্মক্ষেত্র। বৃন্দে যে কেমন করে 'গুনীন মা' হয়ে উঠেছিল সেটাই রহস্য।

অবশ্য রহস্য আবিষ্কার করতে গেলে, উৎস—মুখের সন্ধান যে না মেলে তা নয়। বৃন্দের যখন প্রথম বয়সে মানে বাল্যবয়েসেই, সত্যকার বিয়ে হয়েছিল, এবং বেশ ক'বছর শ্বশুরবাড়িতে কাটিয়েও ছিল, তখনই এই বিদ্যাটি শিক্ষার সূত্রপাত।

বৃন্দের দিদিশাশুড়ি ছিল ওদের হলুদ গাঁয়ের নাম—করা মেয়ে। যত রকম জড়ি—বুটি শেকড়—বাকড়ের সঞ্চয় থাকা সম্ভব, তা তার ছিল। দিদিশাশড়ির এই সব জড়ি—বুটির সাপ্লায়ার ছিল একটা যোয়ান বয়সের বেদেনী। তার সঙ্গে ভাব—ভালবাসার সূত্রেই বিন্দের এই বিদ্যে শেখার সূত্রপাত। উৎসাহ দেখে দিদিশাশুড়িও শিখিয়েছিল অনেক। নিজের সব বিদ্যেই মরণকালে নাতবৌকে দিয়ে যাবে এ অঙ্গীকারও করে রেখেছিল, কিন্তু তার মরণকালের আগেই বিন্দের মরণ হল।

'অমনিষ্যি' যে বরটা ছিল বিন্দের সেটা একদিন বলা কওয়া নেই দুম করে মরে গেল, আর বিন্দেও পত্রপাঠ তার পিসতুতো দ্যাওরের সঙ্গে পলায়ন দিল।

ওদের সমাজেও দ্যাওরের সঙ্গে বিয়ে হয় না। কিছুদিন ঘুরল একসঙ্গে, কারণ লোকটার ছিল ওই ঘুরুনীর নেশা। আর যুবতী বিন্দের কাছে তখন পৃথিবীটা দারুণ আকর্ষণের। বলতে কি—ওই দেশ বিদেশ ঘোরার প্রলোভনেই দেশ ছেড়েছিল বিন্দে। কিন্তু লোকটার নেশা লোকটাকে আরও দূরে নিয়ে গেল।

একদিন মুঙ্গেরের গঙ্গার ঘাটে 'তুই এট্টু বোস, আমি আসতেছি—' বলে বিন্দেকে বসিয়ে রেখে সেই যে হাওয়া হয়ে গেল, তো গেলই।

বিন্দে কি তা বলে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে এই বিশ্বাসঘাতকতার জ্বালা জুড়োবে? না, তেমন পলকা ধাতুর মেয়ে বিন্দে নয়। বিন্দে সেই মুঙ্গেরের ঘাট থেকে অনেক ঘাটের জল খেয়ে অবশেষে আর একটা পুরুষের ঘাড় জোগাড় করে, তার সঙ্গে তারই গাঁ এই সাগরপুকুর এসে ঘর বাঁধল। দুলো তার এই তৃতীয় সংসার জীবনের ছেলে।

এই সাগরপুকুরেই বিন্দের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা কেটেছে, বিন্দে সংসার করেছে, জমি—জিরেত করেছে আবার দোহাতা কর্মজীবনের পশার জমিয়েছে। এত ঘোরা ঘুরতির মধ্যেও বিন্দের অতীত বিদ্যাটি নষ্ট হয়ে তো যাইইনি, বরং বেড়েছে। নানা সংস্পর্শে এসে নানা সাহায্যে বেড়েছেই সত্যি।

বিন্দে মানুষের ভাল করতেও শিখেছে, মন্দ করতেও শিখেছে।

তবে গেরস্ত ঘরের ঘর সংসারী মানুষরা তো মন্দ করতে বলতে তেমন সাহসী নয়, ভাল চাইতেই আসত ছুটে ছুটে, আর সে ভালটাই করত বিন্দে। জল পড়া তেল পড়া মাদুলী শেকড় বাকড় ঝাড় ফুঁক, যা চাও, বিন্দের কাছে আছে।

কোলের ছেলেকে মায়ের কোল থেকে 'ডান চুষলো'—ছেলে বমি করে করে নেতিয়ে পড়ে যায় যায়—তখনই ডাক ডাক গুনীনমাকে ডাক।

তখনকার বিন্দের চেহারা, যদ ক্যামেরায় ধরা থাকত, এখন দেখলে কি কেউ বিশ্বাস করত, সেই মানুষটা এই মানুষ?

মাজামাজা গড়ন, পিঠ ছড়ানো কালো চুলের 'ঢাল'। মুখ চোখ কুঁদে কাটা। সুন্দরী ছিল বৃন্দে কালো রঙেও।

কিন্তু রূপ—যৌবন জিনিসটার তো চিরস্থায়িত্বের গ্যারান্টি নেই। তুকতাকেও থাকে না। রূপ তো গিয়েইছিল—

বিন্দে ক্রমশ গেঁয়ো যোগীও হয়ে পড়েছিল। লোকের হঠাৎ ঘাড়ে কোমরে ব্যথা আটকে ধরলে অভ্যেসের বশে বিন্দের কাছে 'ঝাড়াতে' যাচ্ছিল বটে, কিন্তু হাতে হাতে ফল পেলেও, বলছিল—'দূর! ওই অ্যানাসিনের বড়ি দুটোই কাজ করল।'

বিন্দের কালো চুল শাদা হচ্ছে, ভরাট গালে ভাঙন ধরছে। খাড়া ধনুক শরীরটাকে অলক্ষ্যে কে কোথায় বসে যেন ছিলে পরাবার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর ওদিকে সাগরপুকুরের মাটি থেকে ম্যালেরিয়া কমছে, ওলাবিবি বিদায় নিচ্ছে, মা শীতলা, যদিবা তাঁর তিন ছেলের মধ্যে দুটোকে মাঝে মাঝে ছাড়ছে, কিন্তু আসল জোরাল ছেলেটাকে সহজে আঁচল ছাড়া করছে না।

অনঙ্গ ডাক্তারের মতন তো বিন্দের হাতে পর‍্যাপ্ত ওষুধ নেই। তাই রাতের অন্ধকারে পুকুরের জলে ছড়িয়ে রেখে এসে মড়কের পদধ্বনির আশায় ঘণ্টা গুনবে।

দুলোর বাপ থাকলেও হয়তো বা করত একটা ব্যবস্থা।

সাপও মরে লাঠিও ভাঙে না এমন সব ওষুধ তারও জানা হয়ে গিয়েছিল। সংগ্রহ করে আনতে পিছপা হত না। আর এমন অলক্ষ্যে কাজ সারত যে শিবের বাবাও টের পেত না। মন্দটি করে রাখত সে আর বিন্দে ভাল করত। ধরা পড়ত না।

অনঙ্গ ডাক্তার ধরা পড়েছিল।

আর পড়েছিল বিন্দের হাতেই।

রাতের অন্ধকারে দু'জনে মুখোমুখি। পুকুরের জলে 'ওষুধ' ঢালবার মুখে।

বিন্দে শেকড়ের চেষ্টায় গিয়েছিল।

গেরস্থদের বৌ ঝি বিশেষ একটা 'ওষুধের' জন্যে তখনো বিন্দের দ্বারস্থ হত। দশটা কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে ল্যানজারি হওয়ায় যে সুখ নেই, সেটা বুঝেছিল তারা গরমেণ্টের প্ররোচনার অনেক আগে থেকেই। তাদের সেই বোধ বুদ্ধির সহায়ক ছিল বিন্দে। তাই অমাবস্যার রাত্তিরে পুকুর ধারে শেকড় তুলতে এসেছিল সে।

ডাক্তারের ক্রিয়াকলাপটা দেখে ফেলে বিন্দে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় প্রশ্ন করল, ডাক্তার মশাই এটা কি হল?

অ্যাঁ! কে? কে তুই? কোনটা কি?

শুদোচ্ছো ক্যানো? নিজেই জানো নাই?

অনঙ্গ দাবাড়ি দিয়ে অস্বীকার করতে পারত কিন্তু সেইমাত্র অকর্মটা করে ফেলে বুকটা ধড়ফড় করছিল—তাই বলে উঠল, চুপ বাবা চুপ! তোর মা চণ্ডীর দোহাই! কাজটার ফল ফললে তো তোরও লাভ, আমারও লাভ!

বিন্দে তীব্র গলায় বলল, আর গুনো ডোমেরও লাভ।

আহা না না, অত কিছু না। তেমন জোরালো কিছু না। শুধু একটু রোগ—বালাই হতে পারে।

আচ্চা দেকব। ত্যামন হলে তোমায় ধরে নে গে মা চণ্ডীর তলায় বলিদান দেওয়া করাবো, তা কয়ে রাকচি।

অনঙ্গ মুসড়ে গিয়ে খানিকটা তুতিয়ে পাতিয়ে শেষে রেগে গিয়ে বলেছিল, আচ্ছা, তোরও হাটে ভাঙবার হাঁড়ি আছে।

কী আচে আমার, অ্যাঁ? কী আচে শুনি?

আছে। তোর বেটার বৌই বলেছে। বলে হন হন করে চলে গিয়েছিল অনঙ্গ ডাক্তার।

কিন্তু দুজনারই কপাল। তেমন কিছু ছেড়ে কিছুই হল না। নির্ঘাৎ ভেজাল ওষুধ।

আর সাগরপুকুরের লোক তো সহজে পুকুরের জল ব্যাভার করছে না অনেক দিন থেকেই। রাস্তায় রাস্তায় টিপকল বসিয়ে দিচ্ছে গরমেণ্ট। পয়সাওলারা নিজেরাই নিজ নিজ উঠোনে বসিয়ে নিচ্ছে।

বিন্দের উঠোনেই তো টিপকল বসেছে তখন।

প্রথম যখন জিনিসটা গাঁয়ে চালু হয়েছে। দুলোর বাক উয্যুগ আয়োজন করে নিজের উঠোনে ওই 'পাতালগঙ্গা' বসিয়েছিল।

সেই জিনিস এখন দুলোর বৌয়ের অধিকারে।

সর্বস্বই তার অধিকারে। পেটের বেটাই বিন্দেকে দূর দূর করে খেদিয়েছে।

বুড়ি আমার মেয়ে ক'ডাকে নজর দে নজর দে ওগা করে দেচে—।

এই ঢেউ তুলে টগর দুলোকে লেলিয়ে দিয়ে বিন্দেকে ভিটে ছাড়া করে রান্নাঘরের ধারে ওই চালাখানা তুলিয়ে বসতি করিয়ে দিয়েছে। তার মানে দূর করেই দিয়েছে।

তাড়িখোর দুলো, বোঝ না সোঝা। ঠ্যাঙা নিয়ে বোঝ। বৌয়ের কথা শুনে বলেছে, তাই তো, মেয়েগুলানতো রোগা হয়ে গেছে।

দুলো মাকে চোখছাড়া করে এসে মায়ের ঘরের বড় চৌকিখানায় হাত পা বিছিয়ে শুয়ে বলেছে, ভালই হল। আমার একখানা নেজস্বো ঘর হল। তোর ওই নরিষ্টি, গরিষ্টি মেয়ে তিনডেরে নে। তুই ও ঘরে রাজত্বি করগে যা টগরি।

কিন্তু সে আর ক'দিন? দুলোকেও তো সে চৌকি ছাড়তে হল। কে জানে এখন কোথায় কোন চৌকি জুটেছে তার। এখন তো সবটাতেই টগরের রাজত্বি। বিন্দে বুড়ি ও অঞ্চলে পা দিতেই পায় না।

মাঝে মাঝে গলা তুলে চেঁচায় বটে, টিপকলের জলডা আমারে নিতে দিবেনি ক্যানরে লক্ষ্মীছাড়ি? নান্নাখাওয়ার জলডা নিতে দিবিনে ক্যান? ওডা তোর শোউরের তৌউরি না। সে মালিক না?

টগর বিদ্রূপের হাসি হেসে বলে, তো যমের বাড়ি থে ডেকে নে আয় মালিককে। তা—পর দখল নিতে আসিস।

নিরুপায়ের শেষ অস্ত্র শাপ—শাপান্ত।

টগর যে তার ওই সোয়াগের মেয়ে তিনটেকে নিয়ে রাতারাতি বিছানায় মরে থাকবে, এমন ভবিষ্যৎ বাণীও করে বিন্দে।

টগরও চেঁচাতে ছাড়ে না, আর দু'পক্ষ যখন সপ্তমে ওঠে, তখন ঘরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে সেই দস্যি লোকটা, দুলোর জায়গায় যে ওই সংসারটাকে বাগিয়ে নিয়েছে। ওখানেই খায় শোয় বসে দাঁড়ায়, আর সংসারটার শ্রীবৃদ্ধিকল্পে দৈত্যের মত খাটে।

তাড়িখোর দুলো উঠোনের একমুঠো ঘাস কখনো ছেঁড়েনি। আর এ লোক ওইটুকুতেই সোনা ফলাচ্ছে।

সে এসে টিপকলটার ধারে দাঁড়ায়, আর হুঙ্কার দিয়ে বলে, হয়েচেটা কী? অ্যাতো চেল্লাচিল্লি কিসের?

ব্যস। সব চুপ হয়ে যায়।

দুলোর মেয়েগুলো হি হি করে হাসে, আর বলে বাপটারে, বুড়ি য্যানো ঢিল খাওয়া নেড়ি কুত্তার মতন পাইলে গ্যাল। তাই লয়?

আশ্চর্য!

লক্ষ্মীছাড়ি ছুঁড়িগুলো কিনা আপন ঠাকুমাকে বাঁশ নিয়ে মারতে আসে, আর নিজের বাপের থেকে সৎবাপকে ভালবাসে। 'বাপটা' বলতে গড়িয়ে পড়ে একেবারে।

দেখে আর রাগে ব্রহ্মাণ্ড জ্বলে যায় বিন্দের। মাথার চুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে শাপ দেয়, মরবি মরবি। মা ওলাবিবি তিনডেরে অ্যাক সাতে ধরবে। আত পোয়াতে না পোয়াতে, দোকখিন দোরে যাবি।

ওরা আর ভয় পায় না।

একই কথা শুনে শুনে কানে ঘাঁটা পড়ে গেছে।

নতুন কথা আর পাবে কোথায় বিন্দে? শুনতে পেলে মেয়েগুলো জিভ ভ্যাংচায়, পা দেখায়, আর হি হি করে হাসে। বুড়ি তখন যদি বলে, পা দ্যাকাচ্চিস? বাপের মায়েরে পা দ্যাকাচ্চিস? ওই পায়ে কুট হবে, জিব খোসে যাবে—। সেটাই কি নতুন বলে?

কিন্তু আর কোন সম্বল আছে এখন বিন্দের?

সন্ধেবেলা ভাতের পাট নেই। কোথায় ভাত যে পাট থাকবে? ক্ষমতাই বা কোথায় ভাত সেদ্ধ করতে? সন্ধ্যেবেলা চালের খড় খসে পড়া থুত্থুড়ে দাওয়ার নীচে বসে তেল নুন আর জল মাখা ছাতুর গুলি চিবোতে চিবোতে বৃন্দে উদাস দৃষ্টিতে আকাশ পানে তাকিয়ে তাকিয়ে তার সেই উজ্জ্বল সমারোহময় দিনগুলোর কথা ভাবে।

উকিলবাবুর মেয়ের ঘরের পেরথম নাতি, চাঁদপারা রূপ ঝিয়ের কোলে চেপে পাড়ায় বেড়াতে গিয়েছিল। হঠাৎ ছেলে চিৎকার করে কেঁদে উঠেই ভয়ে নীল হয়ে সেই যে ঘাড় নটকে ঝিয়ের কাঁদে মুখ গুঁজল, সে মুখ আর তুলছে না। শুধু বু বু করতে করতে মুখে ফেনা কাটছে!

নজর লাগাই। কিন্তু মোক্ষম কিছু।

কিন্তু ও রোগের ওষুধ কি আর ডাক্তার বদ্যির কাছে মেলে। এর চিকিৎসা গুণীনমা। ডাক তাকে, এখুনি ছুটে যা।

রান্না চড়াচ্ছিল বৃন্দে, জ্বলন্ত কাঠে জল ঢেলে দিয়ে ছুটে এলো। দেখে কপাল টিপে বসে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ছেলের মাকে জিগ্যেস করল। ঝির সাতে ছাড়া করার বেলা ছেলের কপালে কাজলের টিপ দ্যাও নাই?

হ্যাঁ। দিয়েছি গো।

হাতের ত্যালোয় গোবরের ফোঁটা?

তাও দিয়েছি।

কোড়ে আঙ্গুল কামড়ে নেচলে?

হ্যাঁ মা, সব করেছি।

মুখে 'থুক' দেচলে?

ছেলের মা মাথা নাড়ল।

দাও নাই। উইতো, উইটিই তোমাদের দোষ। শুদোই মা তোমার সাত দুয়োরি ঘরের ছটা দুয়োরে খিল হুড়কো নাগিয়ে তালাচাবি দে বন্দ করে, যদি অ্যাকটা দুয়োর হাট রেকে থোও, সেই ফাঁক দে দিয়ে চোর মাতা গলাতি পারে, কি নারে'? বল আমারে?

মা নীরব।

দিদিমাকে বলে, আপনি তো মান্যিমান গিন্নী মনিষ্যি। তো আপুনিও তো দ্যাবে? আপুনি জানো না কি থেকে কী হয়?

দিদিমা ইতস্তত করে জানালেন তিনি তো বলেছিলেন, কিন্তু মেয়ে বলে ঘেন্না লাগে।

ঘিন্না নাগে? তো অ্যাকোন বোজো? বলে মায়ের থু অমতো। ওই ফাঁকা দুয়োরটি দিয়েই চোর সেঁদিয়েচে।

মা দিদিমা দুজনেই হাপাসায়।

ডাক্তার গিন্নী আর উকিল গিন্নী।

আর কখনো এমন ভুল হবে না মা। এখন তুমি বাঁচাও।

তা বাঁচাল বৈকি বৃন্দে, মায়ের খোঁপার লোহার কাঁটা পুড়িয়ে এক ঝিনুক দুধে তিনবার ছ্যাঁক ছাঁক করে ডুবিয়ে, সেই দুধ জোর করে গিলিয়ে দিল মুখ গোজা নেতিয়ে পড়া ছেলেকে। দণ্ড দুই পরেই হেঁটে বেড়ালো।

তা তো বেড়ালো। কিন্তু এমন কাজটা করলে কে?

আর কেউ নয়। সেই দাসী।

কেন এত দিনের বিশ্বাসী লোক। লোভ! লোভে পড়ে মানুষ কি না করে।

তার পেট কেঁচড়ের আঁচল থেকে বেরোল ছেলের গলার সোনার হার।

এতক্ষণ ছেলে নিয়েই ব্যস্ত ছিল সবাই, দেখেনি গলার হার গলায় আছে কি নেই। বিন্দের জেরায় স্বীকার করতে বাধ্য হল যে নিয়েছে লোভে পড়ে। এখন ধরা পড়ল। দেখা গেল ছেলের ঘাড়ে গলায় হার হিঁচড়ে টানার দাগ.....।

কলকাতার স্যাকরার গড়া, আধুনিক 'টিপকল' খুলতে পারেনি, ছিঁড়ে নিয়েছে। তদবধিই ছেলে মুখ গুঁজেছে। ঘাড় তোলেনি।

স্বীকার না করে উপায় ছিল?

বৃন্দে একগোছ পান মন্তর—পড়া জলে ডুবিয়ে ধরে শাসাচ্ছিল, বল মাগী, বল কেমন করে নেছিলি? ... মিচে কতা বলবি তো এই পানজলের আচড়া মারব। জন্মের শোদ বাক্যি বন্ধ হয়ে যাবে। তোর ঝাড়ে বংশে শ্যাষ হবে।

উকিল গিন্নী হাতের আংটি খুলে দিয়ে দিয়েছিলেন বৃন্দেকে। আর তাঁর মেয়ে দিয়েছিল চওড়া লাল পাড় পাটের শাড়ি। সেই শাড়ি—পরা রূপ দেখে দুলোর বাপ বলেছিল, পতে ঘাটে এই রূপ নে ঘুরিসনে দুলোর মা। গোরায় ধরে নে যাবে।

বৃন্দে বলেছিল, মরণ! বুড়ো—কালে অ্যাকনো কতায় কত অস।

কথা। একদা ওই কথাতেই মজে বৃন্দে ওর সঙ্গে জাকিয়ে বসে ওর দেশ গাঁ এই সাগরপুকুরে এসে বসবাস করতে লেগেছিল। চওড়া বুক, চওড়া পিঠ, বাবরি চুল, হাত পা যেন লোহায় গড়া। অথচ প্রাণটা মায়ার সমুদ্দুর। আর মুখের কথা? যেন মিছরির পানা।

কতকাল হয়ে গেছে, তবু এখনো মনে করলে, মনটা হুহু করে ওঠে।

ভাল করতেও পারত বৃন্দে, মন্দ করতেও পারত। দত্তবাড়ি, জ্ঞাতির লড়াই। গলাবাজি থেকে হাতাহাতি।

দুই জ্ঞাতি ভাই, জ্যাঠতুতো খুড়তুতো, লেখাপড়া জানা। তথাপি পরস্পরে বাপ তুলে গালিগালাজ। অতঃপর কোর্টে ছোটে আর কি!

কিন্তু ঝগড়ার কারণ? কারণ হাস্যকর।

বড় দত্তর হাজারে নারকেল গাছের আগাটা ঝুঁকে এসে পড়েছে, ছোট দত্তর ভাগের পাঁচিলের এধারে।

ছোট দত্ত শাসায়, উঠোনে ঘুঁটে শুকোয়, কাঠ শুকোয়—ছায়া পড়ে। গাছের মাথা সরিয়ে নেবে তো নাও, নচেৎ বাগদী লাগিয়ে গাছ ঝাড়ে মূলে শেষ করে দেব।

আর বড় দত্ত শাসায়, ডেকে আন উকিল ব্যারিস্টার। বলুক কে বলবে, গাছের ছায়া অন্যের জমিতে পড়তে পারে না। পড়াটা বে—আইন। দেখি কেমন বাগদী লাগাস। গাছ দু'ফাঁক হবে তো তোর মাথাও দু'ফাঁক হবে।

ছোট দত্ত রাতের অন্ধকারে এসে ধরল বৃন্দেকে।

দুলোর বাপ হেসে বলল, তা আপনারই তো ছোটকত্তা গাজুরি লড়াই? গাছের ছাওয়া নে নড়াই চলে?

ছোটকত্তা একগোছা দশটাকার নোট 'মায়ে'র পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে বলল, তা জানিনে। বিহিত একটা করতেই হবে। এ হচ্ছে ইজ্জতের লড়াই। বলে কিনা কোর্টে যাবে। মাকে দেখতেই হবে। মুখ রাখলে শাড়িজোড়া। নতুন গামছা, আরো টাকা।

অগত্যই দেখতে হল মাকে।

ব্যস! রাতারাতিই বড় দত্তর হাজারে নারকেল গাছ, কাঁদি কাঁদি ডাব সুদ্ধু বাণ খেয়ে কাঠ। একটা ডাবের মধ্যেও ছিটে বিন্দু জল নেই।

পরদিন বড় দত্ত আপসে এসে পড়ল, তুই আমার এই করলি বাছা? বলি ছোট হারামজাদা কত টাকা দিয়ে গেছল তোকে? আমায় একবার তুই জানালি না কেন? আমি তার ডবল দিতাম। অন্যায় তো ওরই।

বৃন্দে অকুতোভয়ে বলল, ন্যায় অন্যায়ের বিচার করার মালিক বিন্দে না। ট্যাকা তার ছপ্পর ফুঁড়ে পড়ে। উনি অগরে শরোণ নেচে, উনির সাতে বেইমানী করব?

বড় দত্ত আগুন হয়ে বলে গেল এক মাঘে শীত পালায় না বিন্দে! দেখব। তা সেই তেনাকেই আবার দাঁতে কুটো নে আসতে হল বৃন্দের দোরে।

ছেলের বৌয়ের গহণার বাক্স চুরি হয়ে গেছে। ছিল কোথায়? ঘরের মধ্যে লেপের চালির ওপর তোলা ছিল। বিছানা বালিশের মধ্যে তাকিয়ার তুলো বার করে তার ভিতর পুরে রাখা থাকত। সে জিনিস চোরে নেয় কেমন করে? মই ভিন্ন তো নাগাল পাবে না।

থানা পুলিশ করতে গেলে জিনিস মিলবে না, হয়রাণি সার হবে। এ কথা গ্রামের বাসিন্দাদের জানতে বাকি নেই। অতএব? অতএব 'গুণীনমা'।

কড়ি চেলে বল মা, কে এমন কাজ করেছে। কোন ঘরশত্তুর বিভীষণ? গিন্নীর একটা অগাবগা ভাইপো থাকত সংসারে, দু'বেলা দুটি খাওয়ার বিনিময়ে মজুরে খাটুনী খাটত, তবু কর্তার দু'চোখের বিষ সে। 'সন্দ' তার ওপর।

কড়িটি চাললেই খ্যাঁক করে তার কণ্ঠনালিতে চেপে বসবে। কাঁকড়া বিছের কামড়ের মত। হাতে ধরে ছাড়ানো যাবে না। স্বীকার করলে আপনি ছেড়ে খসে পড়বে।

আর অস্বীকার করলে? সে কথা বৃন্দেই জানান দিল। নিয়ে অস্বীকার কল্লে মুখে অক্ত উটবে।

কত্তা বললেন, যা হয় হোক।

গিন্নী বললেন, ওই মুখে রক্ত ওঠাউঠি বাদ দিয়ে হয় না?

বৃন্দে মাথা নাড়ে।

মন্তরের কাজ মন্তর করবে। কড়ির কাজ কড়ি। চলার পর আর বৃন্দের হাতে নেই। সে নিজের পথে ছুটবে। তবে হ্যাঁ, চোরের চেহারা চরিত্তির বলে দিতে পারে বৃন্দে চোখ বুজে। তারপর তোমরা থানা পুলিশ কর, আর মারধোর কর। তবে কড়ি হচ্ছে মোক্ষম। নির্ভুল।

চোখ বুজে বিড়বিড় করে বৃন্দে, লম্বাপারা গড়োন, গোরাপারা অং।

গিন্নী নিশ্বাস ফেলে। স্বস্তির নিশ্বাস। আর যাই হোক তাঁর ভাইপোকে কেউ 'গোরাপারা রং' বলে অপবাদ দেবে না। আর লম্বাপারাও নয়। দেখা যাক কে?

বৃন্দে বলে চলে, মাতার সুমুকের চুল পাতলা, বাঁ পায়ে একটা জড়ুল। আর ডান কানের পিঠে তিল। ... ঘরেই বসবাস, ঘরেই শোওয়া বসা—

ছেলের বৌ ডুকরে ওঠে।

কত্তা গিন্নী বৃন্দের পায়ের সামনে উপুড় হয়ে বলেন, মা, কড়িচালায় ক্ষ্যামা দাও। এই তোমার পেননামী, এ—কথা যেন আর কারো কাছে প্রকাশ না হয়।

কিন্তু করেছে কি সে গহণা? বেচেছে? গালিয়েছে? না কি—

হ্যাঁ তাই। বেচেওনি গালায়ওনি। ভাবের মেয়েছেলেকে দেচে। কলকেতায় থাকে সে মাগী, এ অঞ্চলেই নয়।

তবে আর কী করা যায়!

করার কিছু নাই।

বৌ বাপের কাছে গিয়ে আবদার করে আবার গহণা বাগাক। বলুক, চোরে নেচে বলে তোমার বেটি ন্যাড়া গায়ে লোক—সমাজে বেরোবে?

তা বিশ্বাসের মূল্য রাখে বৃন্দে। আজ পর্যন্ত বলেনি কাউকে।

চোখের ওপর ভাসে সামন্তগিন্নীর চেহারাটা।

মোটাসোটা দলদলে গয়লার গাইয়ের মত আকার। গলায় ইয়া মোটা কড়ি হার, হাতে মোটা গোলাপপাতা বালা, ওপর হাতে পালংপাতা অনন্ত। কোমরে রুপোর গোট—দেড়সেরের কম ওজন নয়। নাকে ফাঁদি নথ, কানে সার মাকড়ি।

ভর দুপুরে পাঁচটা পান, পাঁচটা সুপুরি নিয়ে এসে চুপি চুপি গছিয়ে আর্জি জানিয়ে রেখে গেল, বৃন্দের ঘরের 'উদ্দানী চণ্ডির' ঘটের ঠাঁই।

'রুদ্রাণী চণ্ডী যে কোন দেবী, কোন মূর্তি তা জানে না বৃন্দে। সেই কোন অতীতে প্রথম পক্ষের দিদিশাশুড়ির কাছে শুনেছিল। এই তাদের ইষ্টদেবী। এনার নামে ঘট পিতিষ্টে করে রাখতে হবে, যে যা বাসনা জানাতে আসবে, পাঁচটা পান সুপুরি ঘটের সামনে 'গছিয়ে' রেখে চুপিচুপি মনের কথা ব্যক্ত করে যাবে।

'এমারজেন্সির' ক্ষেত্রে অবশ্য আলাদা পদ্ধতি।

তখন তো ডাক পেয়ে ছুটতে হয়। জ্বলন্ত উনুনে জল ঢেলেও।

তখন ওই ঘট পেন্নাম করেই ছুট। পরে সফল হলে মায়ের পূজো দেবে খদ্দের।

তা অসফল আর ক'বার হয়েছে বৃন্দে তার জীবনে?

এখনি চাকা ঘুরে গেছে।

ডাকই নেই, তা সফল আর অসফল।

সামন্ত গিন্নীর আর্জি, বেটার বৌকে জব্দ করতে হবে। বৌ নাকি জাহাবাজ চোপাবাজ। শাশুড়িকে মনিষ্যি জ্ঞান করে না, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। পাড়ার লোকের কাছে বলে বেড়ায় শাশুড়ি গিল্টির গহণা পরে বাহার দিয়ে বেড়ায়। কলকেতায় বোনের বাড়ি, সেখান থেকে কিনে আনায়।

.....'সোয়ামীর সোয়াগে' দিন দিন আস্পদ্দা আরো বাড়ছে।

এই বৌকে যদি জব্দ করতে না পারত সামন্ত গিন্নী তো তার জীবনে ধিক।

কী ভাবে জব্দ করতে হবে।

তা জানে না সামন্ত গিন্নী। শুধু তার স্বামীপুত্তরের গায়ে আঁচড়টি না লাগে। আকাশে ধুলো ছুঁড়লে আপন গায়ে এসে লাগে। তাই ওইটি বাদে। অনিষ্ট যদি করতেই হয়, তা তার বাপ ভাইয়ের হোক গে।

বৃন্দে জিভ কেটেছিল।

না গো না। বিন্দে ও কম্মে নাই। মানষের পেরাণ হানির মধ্যে নাই। কেন? বিন্দের ভাঁড়ারে কি ওষুধের অভাব? এই শেকড়টুকু নে যাও, যেমন করে পারো বৌয়ের মাতার বালিশের তলায় একে দ্যাওগে, আতটুকু। অ্যাকটা আত।

সামন্তগিন্নী মুখ শুকিয়ে বলে, রেতে তো ছেলের সঙ্গে এক বালিশে মাথা মা! সোহাগের ছড়াতেই তো আছে—

'এক বালিশ দুই মাথা, আস্তে আস্তে কয় কথা।' তা ছেলের কিছু অনিষ্ট হবে না তো?

হলি আমি দিই?

বৃন্দে বলেছিল, শেকড়ে নাম বেঁধে থোবনি? বৌর নামডা বোলে যাও।

নাম মালতি।

মালুতি! ওঃ ফুলের নামে নাম? তাই বলি! হবেই তো। এই মেয়েছেলেরাই জাঁহাবাজ হয় মা। তুমি হিসেব নে দেকো।

তা যে যত জাঁহাবাজই হোক না কেন, বৃন্দের শেকড়ের কাছে সব ঠাণ্ডা।

শেকড়ের পরদিন থেকে বৌ আর মুখে 'রা' পাড়ে না। ঘাড় গুঁড়ে সংসারের কাজ করে, আর বাকি সময় আকাশ পানে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকে।

ওদিক সামন্ত গিন্নীর ছেলের যেন মেজাজ গমগম। বৌয়ের দিকে সে আদরের চাউনি নেই, ছুতোয় নাতায় বৌয়ের ধারে কাছে ঘুরঘুর করা নেই। বুকটা ঠাণ্ডা সামন্ত গিন্নীর।

একজোড়া কানফুল হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, বিশ্বেস কর মা, গিল্টি না, খাঁটি গিনি ভেঙে গড়ানো। দিলাম তোমায়। তবে ছেলের এই ভাবটি যদি বরাবরের মতন বজায় রাখতে পারো, তা তোমায় রূপোর চুড়ি সেট গতিয়ে দেব।

বিন্দে তাতে রাজী হয়নি।

বলেছিল, বৌ তোমায় অমান্যি করেছেল, চোপা করেছেল মুখ ভোঁতা করে দিচি, ব্যস। দেকো আর কখনো গলা তুলি রা কাড়াবেনি। তবে চেরদিনের মতন সোয়ামী স্তীরির বেরহো বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিতে পারবনি। পাপ নাগবে। পাপ পুণ্য ধর্ম অধর্ম মেনে চলতে হয় বইকি।

তা নইলে মা উদ্দাণীর গোঁসা হবেনি?

তবে ক্ষেত্তোর বুঝে কম্মো।

মন্দ কাজেও মায়ের আদেশ নিতে হয়। পাওয়া যায় না তা নয়।

জমি নিয়ে মামলা মায়ে বৌয়ে। ত্রিভুবনে শুনেছে কেউ এমন কথা?

একমাত্র ছেলে, মা মরলে তো ছেলেরাই সব, তবু মামলাবাজি।

দু'পক্ষই চুপি চুপি এসেছে পান সুপুরি হাতে।

মা বলে, মামলার দিন ছেলে যেন পড়ে পা মচকায়, কোর্টে যেতে না পারে। এক তরফা ডিগ্রী হয়ে যাক।

ছেলে বলে, মামলার দিন মার যেন পক্ষাঘাত হয় কোর্টে যেতে না পারে। এক তরফা ডিগ্রী হয়ে যাক।

বিন্দে বলল, না, চেরকাল জানি, কুপুত্তুর যোদ্যাপি, হয়। কুমাতা কখনো নয়। তো মায়ের শরীরেই পক্ষাঘাত দ্যাও।

দিলো তো মা তাই।

অবিশ্যি খাটতে হয়েছে বৃন্দেকে। হোম যজ্ঞ, উপোস কবাস।

তবে মজা এই সেই মা মাগী কিন্তু পরে দূষলো না বৃন্দেকে। বলল, আমার কর্মফল। ভগবান হাতে হাতে দেখিয়ে দিল।.... আর আরো মজা, সেই ছেলেই মাকে এমন সেবাটা করলো, যে পাড়ার লোক ধন্যি ধন্যি করলো। মাকে তুলে ধরে নাওয়ালো খাওয়ালো সব। সেও আবার বলল, 'পাপের প্রাচিত্তির করছি'। কত মানুষ, কত মুখ। কত চুপিচুপি সলা পরামর্শ। কত জনের কেঁদে পড়া। মেয়ে মানুষের জীবন যে বড় ছলনা বঞ্চনার। এই সব তুকতাক মারণ উচাটন বশীকরণ বিষকরণ না হলে তাদের চলবে কি করে?

স্বামী যদি অন্য মেয়েছেলেকে মন দেয়, বৌ বাঁজা বলে আবার বিয়ে করতে যায়, বছরে বছরে আঁতুড় ঘরে ঘুরে আসতে আসতে যদি দেহ ভেঙে যায়, বাচ্চা হয়ে হয়ে যদি না বাঁচে, তাদের গতি কি এই সব ছাড়া?

ডাক্তারকে বলতে যাবে?

ডাক্তারকে বলবার কথা?

তাছাড়া ডাক্তার ডাকতে হলে পুরুষের কানে তুলতে হবে না?

সকল কথা পুরুষের কানে তোলা যায়?

বৃন্দে যেন ভাবনার সূতোর গুলিটা হাত থেকে ফেলে দিয়েছে, যত ইচ্ছে গড়িয়ে যাচ্ছে সূতো খুলতে খুলতে। বড় বড় ঘরানাদের ঘরে গতায়াত ছিল বৃন্দের, কতোই দেখেছে। কত লোভ, কত পাপ, কত নিষ্ঠুরতা, কত ভণ্ডামী, কত নির্লজ্জতা। বৃন্দের কাছে অনেক ইতিহাস।

বাঁড়ুয্যে কর্তার দ্বিতীয় পক্ষের গিন্নী বৃন্দেকে এসে ধরে পড়ল, সতীনপো বৌটার যাতে জন্মের শোধ ছেলেপুলে না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে।

ওমা। সি কি, জোয়ান মেয়ে, নতুন বে হয়েচে।

তা' হোক। ওর ছেলেপুলে হলেই তো আমার ছেলের ভাগীদার হবে? তোমায় আমি অনেক টাকা দেব।

বৃন্দে বলেছিল, টাকাতো আপনি আমায় দেবে মা, বলি পরকালে জবাব দেবার ভারটি নেবে কি? এত বড় অধম্মো ধম্মে সইবে?

ছোট গিন্নী মুখনাড়া দিয়ে বলল, তুমি আর ধম্মকথা কইতে এসো না বাছা। কতলোকের কত করছো। হওয়া ছেলে মেরে ফেলতে তো বলছিনে? যাতে না হয় তারই প্রতিকার চাইছি।

মনের অগোচরে পাপ নেই, লোভে পড়ে এ যুক্তিটা নিয়েছিল বৃন্দে। সত্যি এ তো আর মানুষ খুন নয়?

তা এ ওষুধ তো বৃন্দের হাতের মুঠোয়।

কতজনকেই সাপ্লাই করছে হরদম।

'কপাটবন্দী' গাছের বাকল, আর 'বিনষ্টি' লতার মূল, ওতো ঘরে মজুতই থাকে বৃন্দের।

অদৃষ্টের ফের।

আবার একদা সেই বৌ—ই এসেছে চুপিচুপি।

স্বামী না কি কলকেতায় নিয়ে গিয়ে অনেক ডাক্তার বদ্যি করেছে, কাজ হয়নি। তো সে মানুষ নাকি মাদুলি কবচে বিশ্বাসী নয়, তাই বৌ তাকে না জানিয়ে চুপি চুপি এসেছে।

দেখে মায়া হয়েছিল বৃন্দের।

পয়সার লালসে কাজটা করেছিল খুব খারাপ। কিন্তু আর তার হাত নেই। খোদার ওপর খোদকারি বারবার হয় না।... কে জানে, কোন পাপে বৃন্দের আজ এমন দুর্দশা।

আহা 'ভাল' 'মন্দ' দুই—ই তো করেছে বৃন্দে। তবে? পাপ পুণ্যিতে কাটাকুটি হয়ে যায় না? পয়সার লোভে অনেক অকর্ম করেছে বটে, অনেক পাপ। কিন্তু যারা করিয়েছে? তারা পাপী নয়? পাপের ফল তাদের ছোঁয় না?

ওইতো বাঁড়ুয্যে গিন্নী রামরাজত্ব করে সংসার করে ড্যাংডেঙিয়ে মরে গেল। বরং সতীনপো বৌটাই দুঃখে কষ্টে থেকেছে। সন্তান নেই, স্বামীও রইল না। তারপর চলেই গেল দেশ ছেড়ে বোনের বাড়ি, না ভাইয়ের বাড়ি।

কি দিয়ে তবে বিচার? বারুইদের মেজ বৌটা?

আপনার ছেলের মাথার দোষ কাটাতে, ননদের ছেলেটাকে পাগল করে দেয় নি?

বৃন্দে তো নিমিত্ত। প্ররোচনাটা কার?

সেই মেজ বৌয়ের কত বোলবোলাও। ইস্টিশানের ধারে তার সেই ছেলের কতবড় সিনেমা হল আরো এক ছেলে কলকাতায় বড়বাজারে দোকান দিয়ে 'লাল' হয়েছে, মেজকর্তা এখনো জ্যান্ত। বৃন্দের তবে কিসের পাপে এতো খোয়ার?

স্বেচ্ছায় ভালকাজই কি করেনি বৃন্দে?

দুলোর বাপ তখনো বেঁচে, একদিন হাসতে হাসতে এসে বলল, জগা বাউরি তো তোর অন্নো মারবে রে।

বৃত্তান্ত কি?

না, জগা কোথা থেকে অনেক কিছু শিখে এসেছে।

জগার কী মদগর্ব। বললো, তুই তো 'নিশিরডাক' ডাকতে শিকিস নাই, জগা সেডা শিকেচে।

বৃন্দে বলল, শিকুক। ওতো মানুষ মারা কল।

মানুষ বাঁচানোরও।

তা হোক। ওটা মহাপাপের কাজ।

তা একদিন সেই মহাপাপের কাজ চোখে পড়ে গেল বৃন্দেরই। বৃন্দের তো রাতে ভিতেই চরা। গেছিল মাঝরাত্তিরে কলাগাছের গায়ে গুনছুচ বিঁধতে। কারু মন্দ করতে নয়, হিত করতেই। মুখুয্যে বাড়ির মেয়ের বিয়ে, মহা ঘটাপটার ব্যবস্থা। কিন্তু মেয়ে নাকি 'বাদুল'। যদি বিয়ের রাত্তিরে বৃষ্টিতে ভাসায়, এত আয়োজন পণ্ড হবে। তখনো তো জমিদার বলে কথা আছে, ওনারাই ছিল জমিদার। রসুনচৌকি বসিয়েছে সাতদিন আগে থাকতে। বরযাত্রীরা আসবে বলে, ইস্টিশান থেকে আলোবাতির মালা। ইংরিজি বাজনা মজুত। আর খাওয়ান দাওয়ানের কথা তো বাদই দাও।

বৃষ্টি হলেই তো সব লণ্ডভণ্ড।

তাই ওই কলাগাছের গায়ে গুণছুঁচ পুঁতে 'বিষ্টিবন্ধন'।

মাঝরাত্তিরে এলোচুলে ছুঁচ পুঁতে দিয়ে যাবে, যতক্ষণ না বৃন্দে নিজে এসে সে ছুঁচ টেনে তুলে ফেলে দেবে ততক্ষণ বৃষ্টির সাধ্যি নেই যে নাবে।

তবে গাছের এমন ঠাঁই পুঁততে হবে, যাতে কারো চোখে না পড়ে। মুখুয্যেদেরই কলাবাগান। সেখান থেকে চলে আসছে কাজ সেরে, দেখে জগা চলেছে হনহনিয়ে।

বৃন্দেকে দেখে বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁসে ঘেঁসে হাঁটছে।

কিন্তু সেই এক লহমাতেই তো বৃন্দে যা দেখবার দেখে ফেলেছে। বৃন্দের শ্যেন দৃষ্টি। জগার হাতে একটা মুখকাটা ডাব। বাঁ হাতের তেলোয় বসিয়েছে, ডানহাতে কাটা মুখটা চেপে ধরেছে।

এলো চুল জড়াতে ত্বর সয়না, বৃন্দে ছুটে আসে। 'কার সববোনাশ কত্তে যাচ্ছিস রে লক্ষীছাড়া?'

জগা শিউরে উঠে বলল, সববোনাশই বা কেন? সুবকাজেও। ছাড় বিন্দেদি, দাঁড়ানো চলবেনি!

বলি রক্কেটা হচ্চে কার?

নবীনবাবুর শালার মেয়ে। কলকেতা থেকে এয়েচে। ডাক্তার বদ্যি হার মেনেচে, নবীনবাবুর পরিবার তাই ভাই—ভাজকে আনিয়েচে রুগী মেয়েরে নে। সেই ছুঁলি বিন্দে দি? দোহাই তোর ছেড়ে দে। ছুঁড়িটা খাবি খেতেচে—

হুঁ। বড় দরোদ। অনেক ট্যাকা কবলেচে বোধ হয়?

তা ওগডা কী?

ওগ অক্তচোষা। শরীলের সব অক্ত ভস্মোকীটে শুয়ে নেচ্চে—

ও বাঁচবেনি।

বৃন্দের অমোঘ স্বর।

সেকতা তুই আমি বললি তো হবে না। বাঁচিয়েই ছাড়বে।

এক সন্তান?

বেটাছেলে আচে তিনটে চাট্টে, বেটিছেলে ওই এ্যাকটাই বটে। পয়সার অদিবদি নাই, বলে আজার আজত্বি দেবে, যদি মেয়ে বাঁচে। হাতডা ছাড় বিন্দে দি—

'মেয়ে' শুনে বৃন্দের মন থেকে অনেকখানি মূল্যবোধ ঝরে পড়েছিল, তায় আবার শুনল বেটা আছে তিন চাট্টে, বৃন্দে আরো শক্ত করল হাতের মুঠোটা।

বলল, পয়সার গরম। তাই মহাপাপেও ভয় নাই। বলি ডাবের খোলের মদ্যি করে পেরাণ পাকিটা পুরে নে যাচ্ছিস?

জগা বলতে রাজী নয়, বৃন্দেও ছাড়বে না।

শেষতক জগা বাউরি শাসাল, দণ্ডো পার হলি, কাজ হবেনি, একুল ওকুল দুকুল যাবে। বেশী 'এ' কল্লে ভাল হবে নি বলচি।

বৃন্দের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।

কী বললি জগা? বিন্দেকাওরাণীকে তুই ভাল হবেনি দেকাতে এইনিচস? এক ফোঁট্টা ছেলে, এই সেদিন ও কাঁকালে ঘুনশি বেঁদে উদোম হয়ে আস্তায় ঘুত্তে দেকেচি। বিন্দেকে শাসানি? বল বলচি, কার সববোনাশ কল্লি? নইলি হাত মুচড়ি পটকে দিবো।

জগার অবস্থা বেপোট।

দুটো হাতই বন্দী। আবার সেই হাতেরই কব্জি বৃন্দের কবজায়। অগত্যা বলে ফেলতে বাধ্য হয়।

শুনে শিউরে ওঠে বৃন্দে।

অ্যাঁ কী বললি? হরিকুমোরের ওই হারামরা একমাত্তোর ছেলেডা?

জগা কাতর বচনে বলে, ওস্তাদ বলে থুয়েচে একমাত্তোর না হলি, এ কাজ হবেনি।

হবেনি। তাই তুই বড় মানসের ঘরের একটা পোকায়কাটা বাদুড়চোষা ছুঁড়ির জন্যি, ওর জলজীয়ন্তো ব্যাটাটাকে হত্যে করচিস? ভাল চাসতো, অ্যাকনো ভাবের মুক ছেড়ে দে জগা।

ছেড়ে দেব?

জগা হাপসে পড়ে।

কতো চেষ্টায় কতো সাদোনায় ঘটানু। অ্যাখোন তুই বলছিস—

বলচি।

বৃন্দে আবার অমোঘ স্বরে বলে, আমি বলচি ও মেয়ে বাঁচবেনি। আজ তুই বাঁচাবি, কাল আবার মত্তে পড়বে। অ্যাখনো সেময় আচে জগা, হরির ছেলেডার পেরাণডা ফিরিয়ে দে।

জগা তখন স্বীকার করতে বাধ্য হয়, ফিরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি সে জানে না।

জানে না অবশ্য বৃন্দেও।

একাজের শিক্ষাটা নেই তার। তবু শুনেছে ঢের।

তাই কড়া গলায় বলে। পেরাণডা শুধু নিতি জানলিই হয়নারে জগা, দিতি জানতিও হয়। ওই ডাবের জলটুকুন অ্যাখোন ওই কুমোরের বেটার মুকেই ঢালগে যা।

ওবাবা। আমায় পুলিশে দেবেনি?

দেবে, জেল খাটবি। না দিলি, তোরে আমি ফাঁসি দেওয়া করাবো, তা' কয়ে আকচি।

শুনেছিল জগা তার কথা।

তবে বৃন্দে সঙ্গে গিয়েছিল।

ম্যানেজ করেছিল, মায়ের 'স্বপ্নাদেশের' গল্প বানিয়ে। তারা হকচকিয়ে গিয়েছিল। কারণ তারা তখনও বিপদ টের পায়নি। ছেলে ঘুমোচ্ছে না ঘুমোচ্ছে। আট দশ বছরের ছেলে, কাঁথায় শোওয়া তো নয় যে, মা রাতে উঠে দেখবে।

ছেলের চেহারা দেখে মনে মনে হেসে ফেলেছিল বৃন্দে। অঘোর ঘুম ঘুমোচ্ছে ছেলে, যেমন কে তেমন। তার মানে কিছুই শেখেনি জগা।

বৃন্দে দরজার শেকল নেড়ে দোর খুলিয়েছিল, জগা বাইরে দাঁড়িয়েছিল ডাব হাতে। বৃন্দে বেরিয়ে এসে চুপিচুপি বলল, ডাবে দরকার নাই, তুই পালা, আমি পরে যাচ্চি।

হরিকুমোর দেবতুল্য ভক্তি করে বৃন্দেকে, কাতর হয়ে বলল, স্বপন দেকে ছুটে এয়েচে মা। তোমার দয়ার শেষ নাই। তো কী স্বপন দেকলে মা?

কিচু না বাবা। যেন কানে শুননু 'হরির ঘরে যা দিকিন অ্যাকবার। মন নিচ্চে কেউ অনেষ্টর তালে আচে। তাই ছুটে এনু।'

এই মাজ রাত্তিরে। মাগো তোমার গরীব ছেলে, কী শোদ দেবে?

শোদ?

বৃন্দে হেসেছিল, তোদের ভক্তি ভালবাসাই আমার শোদ বাবা। বসে থেকেছিল আরো খানিকক্ষণ। হরির বৌকে বলেছিল পান খাবো বৌমা।

বাইরে আসার পর জগা ধরল, এডা কী হল বিন্দেদি?

হলো?

গল্পবানাতে ওস্তাদ বৃন্দে বলল, দেকনু ছেলের গতিক তো সুবিদের না। অ্যাখোন যদি টেঁশে যায়। তো তোর আমার দুজনার হাতে হাতকড়া পড়বে। বলবে মাজ আত্তিরে দুয়োর ঠেঙিয়ে ছেলেকে তুক করে মেরে ফেললো। তো মায়ের শরোন নিনু। হাতচালা, ঝাড় ফুঁক, মন্তোর তন্তোর—ছেলে চোখ মেলল দেকে, তবে এনু।.....

জগা মলিনমুখে বলল, ওদের কী জবাব দিবো?

কেট্টে পড় গা। দু'চাদ্দিন গা ঢাকা দে থাকগে যা। নবীনবাবুর শালা তো আর চেরকাল বোনাই বাড়ি থাকবেনি?

ট্যাকা খেয়েচি—

খেয়েচিস, ফেরত দেগা যা। বলবি—ওষুদ খুঁজতে ওস্তাদের কাচে গেচনু—

ট্যাকা ফেরৎ দিবো?

দিবি!

নিবে না।

বৃন্দে চোখ টিপে বলে, বড় মানুষ তো। অ্যাকোন শুনবে তুই ওষুদ খুঁজতে গেচলি, আর মেয়ে নিকেশ হয়ে গ্যাচে শুনি ট্যাকা ফেরৎ দিতি এইচিস, ত্যাখন বলবে ওতে দরকার নাই।

তাই বলতেচো।

বলতেচি। তোর আসার অনেক আগে পিথিবিতে এইচি—

তদবধি জগা বাউরি বিন্দের প্রতিপক্ষ না হয়ে মান্যভক্তিই করতো। আসল কথা তো ফাঁস করেনি বৃন্দে। 'নিশিরডাকে' মরা ছেলেকে বাঁচিয়ে এলো, এই কথাই জেনেছে জগা।

কিন্তু সে বৃন্দে কোন বৃন্দে?

সে কি এই নখদন্তহীন বিন্দে বুড়ি?

বিধবা ব্যাটার বৌয়ের সংসারে পরের দাবড়ানি খেয়ে যে বুড়ি নিজের উঠোন থেকে পালিয়ে আসতে পথ পায় না? আর লোকে যাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়।

সকল শক্তি হারিয়ে ফেলল বৃন্দে কোন ফাঁকে?

সকল শিক্ষেদীক্ষে ভুলে গেল কী করে?

আঃ, ওই বজ্জাতটাকে যদি বিন্দি একখান বাণ ঝেড়ে বোবা কানা করে দিতে পারতো। দূরে থেকে বাণ মারার ইতিহাসও তো আছে।

বড় দত্তর হাজারে নারকেল গাছ, বুদো গয়লার ক্ষেপে যাওয়া মোষটা, লরিগাড়ি, কামারনীর লকলকে বেগুন ক্ষেতটা, হাড়পাজী দুগগা তেলিনীর দুধেলা ছাগলটা, এরা সব বৃন্দের বয়েসকালের শক্তির সাক্ষী।

'মা উদ্দানী চোনডি, তোর নামডা পর্য্যন্ত বিস্মরোণ হয়ে যাই মাজে মাজে। কিন্তুক লোকে আমারে ছাড়ালো ক্যানে মা? কী অপোরাদ কন্নু তোর কাচে। লোকে যে কেন ছেড়েছে, সেই তথ্যটিই জানে না বৃন্দে। বৃন্দেকে তো কেউ বলতে আসেনি—তোরই বৌ টগর বলে গেছে বিন্দে আগে নিজে 'মন্দটি করে, তবে তারিনীমূর্তিটি ধরে ভাল করতে বসে। নিজে 'নজর' দিয়ে পরে নজর ছাড়ায়। নিজে ভূতে ধরিয়ে পরে ভূত তাড়ায়। নিজে ডান চুষে' পরে ঝাড়ান কাটান করে। এতদিনে তোর স্বরূপ জানা গেছে।'

না, বলে কেউ যায়নি।

অনঙ্গ ডাক্তার একদিন বলেছিল রাগ করে সব ফাঁস করে দেব। কোথায় ফাঁস করেছে কে জানে। বৃন্দের কাছে নয়।

ভিতরে ভিতরে ভাঁওতা আছে।

এখনো আছে। জানে, ভাল করতে না পারুক, মন্দ করতে পারে এখনো।

বসে থাকতে থাকতে বৃন্দের পেটের ভিতরটা জ্বালা করে উঠে। খিদের চোঁয়ান নাড়িতে ছাতু আর কাঁচালঙ্কা বিষ হয়ে ওঠে। বৃন্দে এই সময় ভাত ফোটার গন্ধ পায়।

টগরের রান্না ঘর থেকে বাতাসে ভেসে আসে।

ভাত ফোটার, খেঁসারি ডাল ফোটার আর কাছিমের মাংস সেদ্দর।

কিন্তু ওই রান্নাঘরটা কি টগরের?

বড় সাধ করে হাঁড়ি মাচান বসিয়ে বসিয়ে ধাপি গেঁথে গেঁথে বানিয়ে দেয়নি দুলোর বাপ বৃন্দের জন্যে?

বলেছিল—অ্যামন রান্নাশাল বানিয়ে দিনু তোকে, যে রানতে রানতে আর উটতে হবেনি। হাতের মাতায় সব পাবি। চুলোর গোড়ায় কাট খসি রাকতে এই এট্টু মাচান পয্যোন্তো বানিয়ে দিচি। নে কতো রাঁদবি রাঁদ।

খেতে ভালবাসতো, এনেও দিত তেমনি।

তখন তো ওই পাপিস্টি এসে ঘরে ঢোকেনি, দুলো মায়ের পায়ে পায়ে ঘুরত। দুলো জল এনে দিত, মশালা পিষে দিত মাছ কুটে দিত। আর আহ্লাদে ডগমগ বাপবেটায় ভাত বেড়ে ডাক দিত আয়। খাবি আয়। পেট জ্বলে না?

পেট 'জ্বলা' কি জানিস, তা' কী জানতো বৃন্দে? জানত না তবু বলতো। আর এখন?

জ্বলা পেটটা গামছার বিঁড়েয় চেপে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে বৃন্দে। নাকে আঁচল চাপা দিয়ে। ওই ভাত ফোটার ডাল ফোটার মাংস সেদ্ধর গন্ধ সহ্য করতে পারে না।

কবে একদিন, ওই শয়তানের বেটাটা কোথায় গিয়েছিল, বৃন্দে তাই সাহসে ভর করে এই দাওয়া থেকে নেমে, ফণীমনসার বেড়া ডিঙিয়ে ওই টিপকল বসান উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলেছিল, অ জবা! জবা! শোন একবার।

সেজ নাতনীটার নাম জবা।

বড়টার মতন অত হারামজাদা নয়। সেটির নাম পদ্ম। বৃন্দে বলে, 'শুদু পদ্যো না। পদ্যো কাঁটা।' তা জবা এসে দাঁড়িয়েছিল, কী?

বলতেচি, তোর মা কী আঁদবে র‍্যা বড় খাশা খোশবো বেইরেচে। কাচিমের মাংসো বুজি?

জবা বলেছিল, হুঁ।

তো আমায় এট্টুখানি দিতে বল না। এট্টু মালাখোলা যাতি হোক।

বেরিয়ে এসেছিল পদ্ম।

হেঁকে বলেছিল, বুড়ি কি বলতেছে র‍্যা জবা?

জবা ঢোক গেলে বলেছিল, মা মানসো রাঁদতেছে তাই এট্ট চাইতেচে।

অ্যাঁ কী বললি? মানসো চাইতে এসেচে। বুড়ির যে দেকি বড়ো নোলা। বলে দে মানসো অ্যাতো সসতা না।

তবু মান খুইয়ে বলেছিল বৃন্দে, এট্টু দিলি কী তোদের অ্যাতো কমতি হবে। এ্যাতো খাবনা ভাতের উপুর অ্যাক হাতা ঢেলে দে' দে নক্ষীসোনা।

নক্ষীসোনা। জবা হেসে পালিয়ে গিয়েছিল।

আর ঘরের মধ্যে থেকে সমবেত হাসির আওয়াজ ভেসে এসেছিল, নোলাদাগীবুড়ি। অ্যাখোন নক্ষীসোনা বলতে এয়েচে। পাঁশ কেটে কেটে থুচ্চে আতদিন। যা বেরো। খৈরান নিয়ে নিয়ে নজোর দিতি আসবেনি বলছি। পদ্ম, জবা, ঘেঁটু, তিন ফুলের মুখেই তখন হাসির ধূম।

টগরের গলা শোনা গেছল, নজোর নাগা দব্যি পেটে সইবেনি পদ্যো, নোক চিমটে এট্টু তুলে নে পাঁদাড়ে ফেলে দে আয়। ফের এখোন মাতা গলাতে এইচিস বুড়ি? হায়া নাই? নাজ নাই? যাঃ। যাঃ।

যেন বেড়াল কুকুর তাড়াচ্ছে।

তা মরে মরে পুরানো চেনা পরিচিত বাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেও তো এমনি। যাঃ যাঃ করে অবিশ্যি বাড়িগুলোই পরিচিত, মানুষগুলো সবই অচেনা অপরিচিত হয়ে গেছে। একদিন সামন্তবাড়ির দরজায় লাঠি ঠুকে ঠুকে গিয়ে জিগ্যেস করেছিল একটা ছোটমেয়েকে, তুমার নাম কী গো? তুমার বাপের নাম কী গো?

তো মেয়েটা চেঁচাতে চেঁচাতে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল, মা, মা, একটা ডাইনী বুড়ি আমায় নজর দিতে এসে কী বলচে সব।

টগরের রান্নাঘর থেকে—

ভাত মাংস চাইতে যাওয়ার দিনকে ঘরে ফিরে এসে বৃন্দে তার 'চণ্ডীর কুলুঙ্গীর' নীচে ঠাঁই ঠাঁই করে মাথা ঠুকে বলেছিল, মা তুই যোদি সতোর হোস আর বিন্দে যোদি তোর কন্যে হয়, তো এই আতের মদ্যেই ওই হারামজাদির য—পূরী একগাড়ে হয়ে মরে কাট হয়ে থাক। না যোদি হয় তো তোকে টান মেরে ওই পানা পুকুরে বেসজ্জন দে দেব।

মাথা ঠুকে ঠুকে কপাল ফুলিয়ে ফেলেছিল।

কিন্তু দুঃসময়ে ইষ্টও বিমুখ হয়।

একদা যে দেবী বৃন্দের একডাকে সাড়া দেচে 'থানে' থেকে কত কানে নেচে, সেই দেবী বৃন্দের কালশিটে পড়ে যাওয়া ঢিপি কপালের দিকেও নীরবে তাকিয়ে বসে থাকে। ঘটের গায়ে সিঁদুর দিয়ে আঁকা চোখ দুটো তো আবছা অন্ধকারে বিভীষিকার মত জ্বলে। চোখ তো জ্যান্ত।....

তবু—

পরদিন সক্কালেই টগরের ঘর থেকে হাঁসের ডিম ভাজার সুগন্ধ ভেসে আসে। তার মানে এখন সব কটায় মিলে চা খেতে বসবে। লক্ষ্মীছাড়াটা রাতে ফিরেছে মনে হচ্ছে। লোকটা হাঁস চাষ করে, ঝুড়িঝুড়ি ডিম বাজারে বেচে আসে। আবার বাড়িতেও ঝুড়ি ভর্তি। যার যখন ইচ্ছে হচ্ছে ভেজে খাচ্ছে, সেদ্ধ করে খাচ্ছে।

পদ্মতো কাঁচাই মেরে দেয় কত সময়। পদ্মর প্রাণের পুতুল বেড়ালছাড়া 'মিশকালী'ই বোধহয় দিন দুটো চারটে খেয়ে পার।

এতবড় নিষ্ঠুর বেইমান হতে পারে মানুষ?

মাঝে মাঝে যে অবাক হতে হতে পাথর হয়ে যায় বৃন্দে।

বৃন্দেরই সর্বস্ব গ্রাস করে বসে আছে, অথচ বৃন্দেকে কুকুর বেড়ালের মত দূর দূর করা। কুকুর বেড়ালকেও মাছ ভাত মেখে মেখে, 'আয় আয়' তুতু করে ডেকে খাওয়ায়। হাঁস মুরগীকেও খেতে দেয় আর বৃন্দেকে খিদের জ্বালায় পেটে গামছা বেঁধে ঘুমোতে হয়।

দিনে দুটো ভাত ফুটিয়ে খায় বটে,—দুটো পান্তা রেখে দিলে চলে। কিন্তু বুড়ো হয়ে এক মরণ হয়েছে, পান্তা খেলেই পেট ভাঙবে, বমির উপর বমি।

কিন্তু সন্ধ্যেবেলা কি আবার কাঠ কুটো জ্বেলে ভাত ফোটাতে বসতে পারে? জল আনতে হবে সেই পুকুর থেকে। ছোট্ট কলসীটাকে গামছায় বেঁধে ঝুলিয়ে বড় জোর দু'বার আনতে পারে, সে আর কতটুকু? ভাত রাঁধতে জল লাগে। ছাতু খেতে লাগে না।

দুলো মাকে 'ডাইনী' আখ্যা দিয়ে আলাদা করে দিয়েছিল বটে, তবু যতদিন বেঁচেছিল, বড় মেটে কলসী করে দু'এক কলসী জল এনে দিতো। তা' বৃন্দের কপালে তাও ঘুচল।

জগতে একটা ভাল লোক আছে এখনো, তাই ওই একবেলার ভাতটুকুও জোটে, সন্ধ্যেয় মাৎগুড় চালভাজার গুঁড়ো, ছাতু তেল নুন। লোকটা হচ্ছে সত্য মুদি।

মুদিখানাটা তার বড় নয়, তবে মনটা বড়।

আর ওই একটাই লোক যে বৃন্দেকে ভয় পায় না, ডেকে কথা কয়। অবিশ্যি ভয় পাবেই বা কেন? তিনকুলে আছেটা কে তার? যার জন্যে ভয় তরাশ? একদা সত্যর একটু উপকার করেছিল বৃন্দে।

সত্যর বাপের দোকানটা উঠে যাব যাব হয়েছিল, সেই সময় দোকানটাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল বৃন্দে।

তখন দুলোর বাপ মারা গেছে সবে, মন প্রাণ উদাস, সেই সময় বৃন্দে মুখুয্যে বাড়ি থেকে পাওয়া সেই দশ ভরির সোনার হার ছড়াটা দিয়ে দিয়েছিল সত্যকে। বলেছিল, এটা থেকে তুমি দোকানটা ফের তোলো।

সত্য ভয়ে ভয়ে বলেছিল, তোমার ছেলে জানতে পারলে, আমায় পুলিশে দেবে যে গো—

ক্যান? মাগনা?

বৃন্দের যুক্তি এ তার নিজের পাওনা জিনিস। দুলোর বাপের দেওয়া তো নয়।

তা ছাড়া—জিনিষটা যে আছে, সেটা টের পেলেই তো হতভাগা মুখপোড়া ছলে বলে কৌশলে যে করেই হোক ওটা বাগিয়ে নিয়ে ওই সোহাগের বৌকে পরাবে। নচেৎ বৌ সর্বনাশীই কোন ফাঁকে চুরি করে নেবে। তার থেকে সত্যের দোকানটা জাঁকুক।

সত্য না হয় অসময়ে বুড়িকে দুটো ভাতের ব্যবস্থা করবে। মনে জানবে দোকানের আয়ে বিন্দেরও কিছু ভাগ আছে।

কিন্তু বলেছিল বলেই কি, সে কথা রাখবে সত্য, এমন ভরসা থাকার কথা নয়। দুনিয়াটাকে তো দেখছে বৃন্দে। না দিলেই পারতো। খেদিয়ে দিলেই পারত। বলতে পারত তুই যে সাহায্য করেছিলি, কে তার সাক্ষী আছে?

কিন্তু তা করে না সত্য।

দৈনিকের খাদ্যটা জোগান দিয়ে যায়।

একসঙ্গে দেবে কি? কে সামলাবে ইঁদুর আরশোলা? কখন হাত পা লেগে পড়ে যাবে। রোজের রোজ চারটি চাল একটু নুন, নারকেল মালায় একটু সরষের তেল, আর কাগজের ঠোঙায় একটু ছাতু আর মাটির ভাঁড়ে একটু মাৎ গুড়।

ওই সত্যর সঙ্গেই যা দুটো কথা।

বৃন্দে বলে, আরজন্মে তুমি আমার বেটা ছিলে বাপ।

সত্য বলে, ও কিছু না। ও কিছু না।

লাজুক আছে লোকটা।

আসলে লোকটা ভালই।

প্রশংসায় লজ্জা পায় এমন লোক তো এযুগে বিরল। আত্মপ্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে, নিজেই নিজের ঢাক পেটাবে এযুগে এটাই তো স্বাভাবিক। সত্যচরণ তা হলে এ যুগের মত নয়। সত্যচরণের আত্মপ্রশংসায় লজ্জা, সত্যচরণের একদা উপকার পাওয়ার বদলে চিরকালের কৃতজ্ঞতা। এটি না থাকলে বৃন্দেকে তো নির্ঘাৎ এতদিনের দুর্ভিক্ষের মড়ার মত চিমড়ে চিমসে মরতে হতনা!

তা'ছাড়া ওই দশভরি সোনার হারটার জন্যে কৃতজ্ঞতার সমীহ সম্ভ্রম যা ছিল তা তো ছিলই আর ছিল বিস্ময়ের সম্ভ্রম।

বৃন্দের হারান প্রাপ্তির মূল উৎসের ইতিহাসই সত্যকে বিস্ময়ে সম্ভ্রমে নম্র করে রেখেছিল। সত্যচরণ যে পেয়েছিল, তার মূলে বৃন্দের শুধু যে বদান্যতাই ছিল তা' তো নয়, স্বার্থও ছিল। পষ্টাপষ্টিই তো বলেছিল বুড়ি, ঘরে থাকলি তো ওই বৌ হারামজাদি চুরি বাটপাড়ি যে করে হোক হাতিয়ে নেবে। এ তবু জ্ঞেয়ান হবে সত্যর দুকানে বিন্দের কেচু অংশো রইলো বিন্দের অসময়ের জন্যি। অতএব এটা এমন কিছু মহত্বের নয়। আশ্চর্যেরও নয়।

আশ্চর্যের হচ্ছে বিন্দের হারটা পাওয়ার কারণ।

দেখে রোমাঞ্চ হয়েছিল সত্যর বিন্দেমাসি মুখুয্যেকর্তার মরে যাওয়া নাতিটাকে মন্তরের জোরে বাঁচিয়ে তুলল।

সত্য তো দেখেছিল নিজের চোখে।

দুর্গাপূজোর ষষ্ঠির সকালে মা দশভুজা যখন দালান আলো করে বিরাজমান, তখন কিনা রোল উঠল, রাতের মধ্যে কখন কর্তার তিন বছরের নাতিটা মরে তক্তা হয়ে আছে। মা ওঠাতে এসেছে নতুন জামা পরিয়ে কলা—বৌ নাওয়ানের সঙ্গে পাঠাবে বলে। বার উঠোনে ঢাকী—ঢুলিরা সেইমত ড্যাডাং ড্যাং করে ঢাকে কাঠি দিয়েছে, ঠাকুর দালানে নবপত্রিকার তোড়জোড়, হঠাৎ এই নিদারুণ সংবাদ।

থেমে গেল বাজনা বাদ্যি, উঠলো কান্নার রোল।

কর্তা উন্মাদের মত ছুটে গিয়ে দালানে উঠে প্রতিমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার চেষ্টা করতে করতে চীৎকার শুরু করে দিলেন, বল সর্বনাশী। বল কেন এমন কাজ করলি?

ইতিমধ্যে অন্যান্য জ্ঞাতির পাঁচ বছরের ছেলের মৃত্যু অশৌচ, ক'পুরুষ পর্যন্ত লাগে। পূজোর দিনগুলো তো তা হলে গেল। আর বলাবলি করছিল, ভয়ঙ্কর একটা কোনো অপরাধ ঘটেছে।

কিন্তু মা কি এমনই প্রতিহিংসা পরায়ণ হবেন?

শাস্ত্রে পুরাণে অবশ্য দেখা যায়, দেবদেবীরা মানুষের থেকে অনেক বেশী প্রতিহিংসা পরায়ণ, তাই বলে মা দুর্গা?

এই মুখুয্যে বাড়ির ঠাকুর দালানে যিনি তিনপুরুষ ধরে পূজিত হয়ে আসছেন ত্রুটিহীন আয়োজনে, চ্যুতিহীন নিষ্ঠায়।

ডাক্তার এসে তো রায় দিয়ে গেল।

কিন্তু ইত্যবসরে যে কে বা কারা, হয়তো বাড়ির ভৃত্যকুল, ডেকে নিয়ে এসেছে 'গুনীনমাকে।

গুনীনমার তখন ভাগ্যরবি মধ্যগগনে। এই মানুষই তো এই ক'বছর আগে বাদুলে মেয়ে দিদিমনির বিয়েতে শ্রাবণ মাসে বৃষ্টি বন্ধন করেছিল। এ বাড়িতে বৃন্দের বরাবরই আসা যাওয়া।

বাসিমুখে ছুটে এসেছিল বৃন্দে।

কিন্তু নিজেই জানে না বৃন্দে কী হয়েছিল।

আজ পর্যন্তই জানে না।

সেদিনের ঘটনা তার কাছে চির রহস্যাবৃত।

বৃন্দে জানে না সে কী করেছিল, তবে কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা দেখেছিল, ঠাকুরদালানের নীচের বিরাট উঠোনের মাঝখানে খড়ির গণ্ডিকাটা খানিকটা জায়গায় মাঝখানে বড় বড় ক'খানা আঙ্গুট কলাপাতার উপর শোওয়ানো সেই মৃতদেহটার ধারে মাথা খুঁড়ে রক্ত গঙ্গা হয়েছিল বৃন্দে, আর সেই খড়ির গণ্ডি ঘুরে ঘুরে একটা মেটে কলসী ভরা মন্তরপড়া জল থেকে আঁজলা ভরে ভরে ছেলের মুখে গায়ে আছড়ে আছড়ে মারছিল।

গুনীনমা যে তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে একাজ করছে, দর্শকরা অনুভব করছিল। সেই অনেক দর্শকের মধ্যে সত্যচরণও একজন ছিল। যুবক সত্যচরণ।

অবিশ্বাস আর উত্তেজনা, এই ছিল দর্শকদের মধ্যে।

ছেলের তরুণী মা কোথায় কোনখানে জ্ঞান হারিয়ে পড়েছিল কে জানে, যুবক বাবা ঠাকুর দালানের নীচের সিঁড়িটায় দু'হাতের মধ্যে মাথাটা চেপে বসেছিল, আর ঠাকুরদা প্রতিমাকে ঠেলে নড়াতে না পেরে ক্লান্ত হয়ে এসে উঠোনে এই দৃশ্যের ধারে এসে বসে পড়েছিলেন। শুধু ঠাকুরদা, মুখুয্যে গিন্নী স্থির হয়ে চোখবুজে বসে জপ করে যাচ্ছিলেন। এতোলোক জমা হয়েছিল, এবং বিশেষ কারো মধ্যেই বিশ্বাসের ভাব ছিল না তবু জায়গাটা নিঃশব্দ নীরব ছিল। কেউ একটি শব্দ উচ্চারণ করছিল না।

শুধু মাঝে মাঝে গুনীনমার তীব্র তীক্ষ্ন চীৎকার মা! মা!.... ক্রমশঃ গলাটা ভেঙ্গে আসছিল।

বাড়ির বাইরে অনঙ্গ ডাক্তার কিছু লোকের কাছে বলছিল আর কতক্ষণ এ ফার্স চলবে? এবং যে বড় ডাক্তার 'মৃত' বলে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি বৈঠকখানায় বসে 'ডেথ সার্টিফিকেট' লিখে বিরক্ত চিত্তে বসেছিলেন কর্তাদের কাউকে দেখতে না পাওয়ায়।

হঠাৎ কী একটা ঘটল কে জানে।

তুমুল একটা কলরোল যেন আকাশ ছাপিয়ে অসীম শূন্যলোককে বিদ্ধ করল। ওটা সমবেত কণ্ঠের একটা জয়ধ্বনি।

হয়ত তার ভাষাটা ছিল, 'জয় মা'।

তবে সেটা বোঝা গেল না, শুধু ধ্বনিটাই পরিব্যাপ্ত হল।

কী হল?

চমকে উঠল ডাক্তার, আর অনঙ্গ ডাক্তার।

চমকে উঠল জনতা।

কী ঘটলো? আরো কোন অভাবনীয় মর্মান্তিক?

যিনি দশভুজা প্রতিমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার চেষ্টা করছিলেন আর দেবীর উদ্দেশ্যে কটূক্তি করছিলেন, তিনি কি তাঁর সেই মহাপাপের শাস্তি স্বরূপ প্রাণ হারালেন?

অথবা—তরুণী মা ভাগ্যের এই অন্যায় আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে—এগিয়ে এলেন তাঁরা। এগিয়ে এসেছে তারাও, যারা এতক্ষণ যাকে বলে চিত্রার্পিত পুত্তলিকাবৎ দাঁড়িয়েছিল, আর এখন 'জয় মা' বলে চেঁচিয়ে উঠেছে।

এখন চীৎকার ধ্বনিটা হচ্ছে—চোখ চেয়েছে। চোখ চেয়েছে।

এই অবিশ্বাস্য শব্দে চকিত হয়ে সিঁড়ি থেকে নেমে এল ছেলের দিশেহারা বাপ। আর ঘর থেকে উন্মাদিনীর মত এলোকেশ হয়ে বেরিয়ে এল মা।

কিন্তু এখন বিপদ।

ছেলেটাকে চোখ চাইয়ে, 'গুনীনমা' কি নিজে চিরদিনের মত চোখ বুজল? খড়ির গণ্ডির ধারে ঠিক মৃতের মতই তো পড়ে আছে নিস্পন্দ হয়ে।

ততক্ষণে ছেলে শুধু চোখই চায়নি, উঠে বসতেও চেষ্টা করেছে।

কোন অপদেবতাকে মড়ার দেহের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল না তো? বলেছিল কেউ কেউ, যার মধ্যে অনঙ্গ ডাক্তার প্রধান। মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চারের ঘটনা যারা কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজী নয়, তারা কিন্তু এ কথাটা বিশ্বাস করছে। মৃতদেহে বিদেহী আত্মার আবির্ভাব।

এমন কি এও মনে মনে ভেবে নিল কেউ, 'আচ্ছা পরে ছেলের ভাবভঙ্গী দেখেই বোঝা যাবে।'

আর বড় ডাক্তার এখন বললেন, চিকিৎসা শাস্ত্রে এরকম রোগের আছে, যাতে রোগীর দেহে কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ মৃত্যুর লক্ষণ ফুটে ওঠে।

ডাক্তার সেটা চিন্তা করছিলেন এতক্ষণ।

যাক এখন ছেলেকে ভাল করে ঢাকাঢুকি দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেওয়া হক। যে ভাবে ঠাণ্ডা জল আছড়া দেওয়া হয়েছে, নিউমোনিয়া হতে কতক্ষণ?

অনেকক্ষণ পরে বৃন্দেও উঠে বসেছিল।

ছেলেটাকেও বসিয়ে রাখা হয়েছে ঠাকুরমার কোলে। ভিতরে নিয়ে চলে যাওয়া হয়নি বৃন্দের মূর্চ্ছাভঙ্গের আগে।

মূর্চ্ছাভঙ্গের পর বৃন্দে না কি ছেলেটাকে বসে থাকতে দেখে, হাউ হাউ করে কেঁদেছিল।

কে জানে কিসের এই কান্না।

বৃন্দেকে পাটের শাড়ি পরিয়ে গালচের আসনে বসিয়ে গলায় জবার মালা দিয়ে, কর্তা—গিন্নী দুজনে রীতিমত পূজোই করেছিলেন বলা যায়। অথবা এ যুগের ভাষায় সম্বর্ধনাজ্ঞাপন করেছিলেন। অতঃপর মুখুয্যে গিন্নী তাঁর নিজের গলার দশভরির গোট হারখানা খুলে বৃন্দের গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন। কর্তা একখানা ফুলগিনি দিয়ে প্রণাম করেছিলেন। আর বৌ বাক্স খুলে পুজোর কেনা নতুন বেনারসী একখানা নামিয়ে দিয়েছিল বৃন্দের পায়ের কাছে, ছেলে দিয়েছিল একগোছা নোটের তাড়া।

যে যেখানে ছিল নাটকের শেষ অবধি দেখেছিল।

যারা 'অপদেবতা' চালানের সন্দেহ পোষণ করছিল, তারাও ছেলেকে স্বাভাবিক কথা কইতে দেখে হতাশ হয়ে ফিরে গিয়েছিল।

সত্যচরণ ছিল সেখানে, কিন্তু সেই দলে নয়।

অভিভূতর দলে।

তা' তাও ছিল বৈকি কিছু। এমন দৃশ্যে অভিভূত হবে না। আর ব্যাপারটা তো প্রায় পঁচিশ বছর আগের ঘটনা। সাগর পুকুরের লোক তখন একেবারে অবিশ্বাসী হয়ে যায়নি।

তখন এই—

ঘটনার পর থেকে বৃন্দের বোলবোলাও যাকে বলে টপে উঠেছিল।

দুলোর বাপ দূর থেকে দৃশ্যটা দেখেছিল।

সে তো অচ্ছ্যুৎ। সে তো আর পাঁচটা ভদ্রলোকের গায়ে গা দিয়ে দাঁড়াবে না। দূর থেকে দেখছে বৃন্দেকে মালা গলায় দিয়ে পাটের শাড়ি পরিয়ে কর্তা গিন্নী ছেলে বৌ সবাই প্রণাম করছে।

কী রোমাঞ্চ!

কী অদ্ভুত আবেগ উল্লাস!

বৃন্দে ঘরে ফেরার পর বোকাবোকা গলায় বলেছিল লোকটা, এখন তোর গায়ে হাত দিতি আমার ভয় নাগচে। মন নিচ্চে তোতে বুজি মা 'রুদ্দানী চোণ্ডীর' ভর হইচে। তো কেমন করি কী কল্লি বল দিকি?

বৃন্দে বলেছিল, আমার বোদ নাই।

আজ পর্যন্তও বোদ নাই।

তা' বোধ নেই বোধহয় সত্যচরণেরও।

নইলে বৃন্দের ছেলের বৌ যখন বৃন্দের নামে যথেচ্ছ অপবাদ দিয়ে দিয়ে তার 'গুণ ফাঁস' করে দিয়ে দিয়ে গ্রামের লোকের মন ঘুরিয়ে উল্টোমুখো বহাতে সক্ষম হয়েছে, তখনও সত্য নিজ বিশ্বাসের মত অবিচল আছে।

সে বোঝে বয়েস হয়েছে, এখন ক্ষমতা গেছে তা'বলে চিরদিনই বৃন্দে লোক ঠকিয়ে রেখেছে, একথা বিশ্বাস করতে নারাজ সে।

মুখুয্যে বাড়ির এই ঘটনার সময় হারু বাগদির মেয়ে টগর বালিকা মাত্র, দুলোর সঙ্গে মোলাকাতও ছিল না, তবু পরে দুলোর বৌ হয়ে এসে বলে বেড়ালো, উতো ওর নিজের কুকীর্তি! নিজে 'বাণ' মেরে বাচ্চাডারে খতম করে একে তৎপরে নোক সমাজে ঘটাপটা দেইকে বাঁচা করাল।

বাবুদের বাড়ি থে নিজেরা কেউ উকে ডাকতে এয়েছেলো? কোন্নোটা না। উয়ারই যড়করা লোক লোক গে খবোর দেচনো। বাণডা মোকখোম ছেলো, তাই সিটারে তোলা করাতে অত ঝালপিটাপিটি।

বালিকা ছিল টগর তখন।

তা' পদ্মও তো এখন বালিকা! সাপের চেয়ে সলুইয়ের বিষ বেশী।

বাপের সঙ্গে এসেছিল টগর।

হারু ফিরে যেতে যেতে বলেছিল, তাজ্জবডা দ্যাকালো বটে গুনীনমা।

মেয়ে ঠোঁট উল্টে বলেছিল, ছেলেডা মরে নাই। শুধু ভিমরি গেছল। মলে আর বাঁচাতি হতনি।

ডাগদারে তো ঝেড়ে জবাব দে গেচলোরে।

দেককা যাক না ক্যানে। ঠিক দ্যাকে নাই। মানুষ জেয়ন্তোরে মাত্তি পারে, মড়ারে জেয়ন্তো কত্তি পারে।

বালিকা টগরের মুখে কথাটা হয়তো বেশী দার্শনিক শুনিয়েছিল। কিন্তু পদ্মও তো বালিকা। সাপের চেয়ে সলুইয়ের বিষ বেশী।

সত্যভাষিনী টগর পরবর্তী জীবনে, তার কথার সত্যতা প্রমাণ করেছে। জেয়ন্তোরে মারতে সক্ষম হয়েছে সে নিজেই। বৃন্দের জ্বলজ্বলাট গৌরিবমূর্তিটিকে সে ক্রমেই মৃদু বিষ প্রয়োগে জীর্ণ করে ধ্বংস করে ছেড়েছে।

কিন্তু তখন গ্রামে গ্রামে সেই বার্ত্তা রটি গেল ক্রমে।

সেই ঘটনার পর থেকে একেবারে টপে উঠে গিয়েছিল বৃন্দে। শুধু এ গ্রামই নয়, নানাদিক থেকে লোক ছুটে আসতে শুরু করেছিল, দিকে দিকে সাগরপুকুরের 'গুণীনমার' নাম ডাক। ''সাগরপুকুর'' বিখ্যাত হয়ে গেল বৃন্দের মহিমায়। ... ষ্টেশনে ভিড় বাড়ে। আর রিকশাগুলোকে বললেই, সে বলে, 'ঠিক আছে বুঝেছি।'

সেই সময় দুলোর বাপ ঘরবাড়ি বাগান পুকুর করল, উঠোনে টিউবওয়েল বসাল, মনের মত করে রান্নাঘর বানিয়ে দিল বৃন্দেকে।

পেশার জন্যে বার ব্রত উপোস তিরেস অনেক করত বৃন্দে কৃচ্ছ্বসাধনের অনেক নিয়ম নীতিও মানত কিন্তু সংসারটি পুরো বজায় রেখেছিল।

ভরের সময় ছাড়া সে ঠিকই আছে।

'ভর' হওয়ার বাড়বৃদ্ধির পর থেকে, বৃন্দেকে আর লোকের বাড়ি ছুটতে হত না, লোকই ছুটে আসত।.... এমন কি স্কুলের ছেলেমেয়েগুলো পরীক্ষার আগে! চণ্ডীর ফুল নিয়ে যেত, নিয়ে যেত চণ্ডীর সেবিকার 'আশীর্বাদ।'

তা' এ একটা খুব বিরল দৃশ্য নয়।

আমাদের এই পুণ্যভূমি ভারতবর্ষে প্রদেশে প্রদেশে, গ্রামে গ্রামে, যেখানে সেখানে, গাছ তলায়, বাঁশবনে এই সমারোহময় ভক্তির দৃশ্য দেখা যায়। একটা কিছু অলৌকিক শক্তির বার্তা পেলে হয়।.... আর আমাদের এই বঙ্গভূমিতে? সে তো বলে কাজ নেই। ... আজ দেখলে কেউ কোথাও পেতলের থালায় দুটো চারটে পয়সা রেখে চোখ বুজে বসে আছে, কাল দেখলে তার সেই বোজা চোখের ক্যাপাসিটিতেই থালায় পয়সা ধরছে না। ...অতঃপর মন্দির উঠল, দিনে দিনে সে মন্দিরের শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকল, তারপর লোকের ভিড়ে অন্যলোকের রাস্তা চলা দায় হল।.... হয়ত ফলাও করে খবরের কাগজেও বেরোলো সেই বার্তা।

অহরহই এ দৃশ্য দেখা যায়।

মানুষ বিজ্ঞানের উন্নতি চরম সীমায় লক্ষ্যমাত্রা রেখে ছুটছে বলেই কি অলৌকিকের পিছনে ছুটবে না?

বৃন্দের ভাগ্যে তখন সেই মহালগ্ন এসেছিল।

দুলোর বাপ বলত দিনে দিনে তোর যা বোল বোলাও হতেচে বিন্দে, মন নিচ্চে তোকে নে কলকেতায় গিয়ে অ্যাকটা ঠাট বাট পেতে বসিগে।...তা'লে দালানকোটা বানিয়ে ফেলতি পারব।....

বৃন্দে উড়িয়ে দিত। বলতো শহরে বাজারের লোক এসবে বিশ্বে করে না কি? করেনি? বলতেতিস কি তুই? হুদো হুদো লোক আসতেচে না কলকেতা থেকে? 'ডেলি প্যাসেঞ্জার' বাবুদের আপিসের লোকই কত আসতেচে। তুই তো ভরে' থাকিস কে আসতেচে যেতেচে খ্যাল করিস নাই।... তাই বলতেচি অ্যাকবার কলকেতায় নে গেলে—

বৃন্দের এতে তেমন সায় নেই। বৃন্দের বক্তব্য, এখেনডা হলো গে মায়ের থান। ঘটের পিতিষ্টে, এখেনছেড়ে ওন্যেত্তর গেলে কি আর মা উদ্দানী কেরপা করবে?

লোকটা বলত, আহা তোরে কি আর চাটি বাটি উঠিয়ে নে যেতে বলতেচি? কালীঘাটে মায়ের মন্দিরের চাতালে কি কোনো মোহাশ্মশানের ধারে কাচে, হপ্তায় দু'দিন গে বসলি। তাতেই দেকচি—

হপ্তায় দু'দিন কোরে আমি কলকেতায় ছুটবো? এডা—অ্যাকটা কতা হোলো। আর এই বাবুরা যে রোজ দিন ছুটতেচে। মেয়ে লোকও ছুটতেচে আজকাল। শয়োরের লোক বিশ্বাস নে আসে না। মজা দেখতে আসে পরীক্ষা করতে আসে।

তো পরীক্ষেয় তো পাশ হবি তুই। ফাষ্টো হয়েই পাশ দিবি।

বৃন্দে কেমন বিমনা হয়ে যেত।

বৃন্দের মনে হত এই তার বাঁশবন আর ফণী মনসার ঝাড়ের আড়ালে মনের মত ভিটেটুকু এই জোড়া নিমগাছ তলার কুঁড়েয় মায়ের ঘট পিতিষ্টে, এই শত শত ভক্তের পায়ের ধুলোয় পবিত্র হয়ে ওঠা উঠোন বাগান, এ সবের নড়চড় করলেই বুঝি বৃন্দে শক্তি হারিয়ে ফেলবে।.... আসলে যা কিছু করে বৃন্দে, আমি করছি, ঠিক এ বোধে করে না। যা করবে মা করবে মায়ের কি ইচ্ছে মা জানে এই সব বলে বলে অভ্যাস হয়ে গিয়ে মজ্জাগত হয়ে গেছে। তা ভয় হয় বুঝি ঠাঁই নাড়া হলেই বুঝি সব অন্যরকম হয়ে যাবে।

হায় তখন যদি বৃন্দে সেই মানুষটার হিত কথা শুনতো! তা হলে হয়ত আজ এমন দুর্দশায় পড়তে হত না তাকে। .... সেই 'অন্যরকমই' তো হয়ে গেল।

কে জানে কোন মহাভাগ্যের বলে বৃন্দের হাত দিয়ে মরা পর্যন্ত বাঁচালো মা, বৃন্দের অবস্থা ফিরিয়ে দিল, আবার কোন কুটিল ভাগ্যের ফেরে বৃন্দে সর্বস্ব হারিয়ে কাঙালিনী হয়ে গেল।....

ওই মানুষডাই ছেলো আমার সৌবাগ্যো।

মনে মনে ভাবে বৃন্দে।

ও হতেই আমার অ্যাতো বাড়বাড়ন্তি, অ্যাতো বোলবোলা।... ওরপরেই মা উদ্দানী এতো সদয় ছেলো ও মরার পর অবদি আমি সরবোস্বান্তো হলাম গো। হয়তো বৃন্দের কথাই ঠিক।

'ভুজুদা' নামের লোকটা বৃন্দের জীবনে খুব পয়া ছিল। তাই বৃন্দে ধূলো মুঠি ধরেছে সোনা মুঠি হয়েছে।

তবে—

ভুজঙ্গই ওই কালসাপিনীকে ঘরে আনার গোড়া।

বৃন্দে বলেছিল মেয়ে সোদ্দল বলে কি দুলো তোরে ধুয়ে জল খাবা?.... হেরোর আবস্তার ওই ছিরি। কিচু দেবেক থোবেক নাই।

ভুজঙ্গ হেসে বলেছিল, বেটার বোয়ের বাপের দ্যায়ায় থোওয়ায় পিত্যিসী তুই? তোর মা তোরে চেনে মেপে দেচ্চে না?

অস্বীকার করা যায় না কথাটা। অতএব—

অতএব যৌবন না আসতেই যুবতীর ধাক্কা ধরা রূপসী টগর, বৃন্দের বুকে জাঁতা বসাতে, এ সংসারে এসে প্রবেশ করলো।

ছেলের বৌকে প্রথম প্রথম ভুজঙ্গ খুব আদর যত্ন করেছিল, 'ছেলেমানুষ' ভেবে মায়াও করেছিল, এবং তাকে তার 'শাশুড়ীর মহিমা' সম্পর্কে অবহিত করতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কিছুদিন পরেই বুঝলো, এটি কি বস্তু।

শ্বশুরকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, পরিবারের লোকঠকালে ব্যবসা হতে সৌউর আমার বড়লোক বোলে প্যায়ে তো, তাই অ্যাতে ভোক্তি।....

তা কী আর করা?

একদিনে তো আর টগর বিষবড়ি খাইয়ে মারেনি শাশুড়ীকে? বড় হয়েছে, তিন তিনটে মেয়ের মা হয়েছে, এবং কেমন করে যেন বৃন্দের পাতানো সংসারখানাকে নিজের মুঠোয় ভরে ফেলতে শুরু করেছে। সেই সময় ভুজঙ্গ মারা গেল। দুম করেই গেল। চোখেকানে দেখতে দিল না বৃন্দেকে।

আর সেই শুরু হল টগরের পাড়া বেড়ানো।

অর্থাৎ বিষ ছড়ানো।

'নিজের সোয়ামীকেই যে আকতে পাল্লোনি, সে জেবন বাঁচাবে ওন্যের? ক্যানো তোর জড়িবুটি গ্যালো কোতা? তোর উদ্দানী মা? হুঁঃ। সব ভুজুং।

তখনি রাষ্ট্র হলো বৃন্দে লোক ঠকাতে নিজে 'মন্দ' করে তবে 'ভালো' করাতি দেখায়। রাষ্ট্র হলো—মুখুয্যেদের সেই বাচ্চা খোকাটাকে ঘরে বসে 'বিষবাণ' মেরে তারপর তাকে বাঁচাবার ভান করতে গেছিল বৃন্দে। ... অতোদিন আগের কথা, তবু লোকে টগরের কথাই বিশ্বাস করে ফেলল। ... তারা অবশ্য আর গ্রামে নেই। সেই বছরই পূজোটি সমাধা করে মুখুয্যেরা গ্রামের বাস তুলে দিয়ে কলকাতায় পাকাপাকি বাস করতে চলে গিয়েছিল। এমনিতে তো বেশীরভাগই থাকত, তবে পালে পার্বিনে, ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে আর ওই দুর্গোৎসবে আসতো।... দুর্গোৎসব উঠিয়ে দিল, নিজেদের আসা বন্ধ করে দিল। কেন কে জানে। ছেলে বেঁচে ওঠা সত্ত্বেও এই ডিসিশনে, কি জানি হৃদয় রহস্যের এ কোন রহস্য।

কিন্তু মুখুয্যেরা না থাকলেও গ্রামে ছিল তো অনেকেই। আর দীর্ঘকাল যাবৎ বৃন্দের প্রতি সমীহ আর কৃতজ্ঞতা নিয়েই ছিল। চিড় খেল সেই মনোভাবে। তারপর ভাঙন।....

তোমার আগুনলাগা ঘরে জল ঢেলে আগুন নিভিয়ে তোমায় বাঁচিয়েছে বলে, যে পড়শীর প্রতি তুমি কৃতজ্ঞতায় বিগলিত ছিলে, হঠাৎ যদি টের পেয়ে যাও আগুনলাগানোটা সেই পড়শীরই অবদান, মন যেভাবে ওলট পালট হয়ে যায়, সেইভাবেই ওলট পালট খেলো সাগরপুকুর গ্রামের মন।

ক্রমশঃই সবাই অতীতের খাতা উল্টে উল্টে টগরের কথার 'সমর্থন' আবিষ্কার করতে লাগলো, আর ওই একটা মুখ্যু অছ্যুৎ জাতের মেয়ে এতাবৎ এইসব বুদ্ধি রাগমান লোককে ঠেকিয়ে খেয়ে এসেছে বলে, আক্রোশে আর অপমানে বিকৃত হয়ে উঠল।.....

বৃন্দের কপাল তখন তার নিজের দেহতেও ভাঙ্গন ধরেছে।... বুকের বল চলে গিয়ে বুক গেছে ধ্বসে, যত্নের অভাবে শরীর যেতে বসেছে গুঁড়ো হয়ে। গ্রাম গ্রামান্তরের লোকেরও উৎসাহে ভাঁটা পড়ে এসেছে।...

চারিদিকেই তো নতুন উৎসাহের আবির্ভাব।

তখন 'রামদেবপুরের ফকিরের' বাড়বাড়ন্ত জাহির হচ্ছে।

অতএব বৃন্দে তলিয়ে যাবে, স্বাভাবিক।

দুলোর বাপ যে সাহায্য সহায়তা করতো—

তাড়িখোর দুলো তার সিকির সিকিতো করলই না। বরং একদিন টগরের প্ররোচনায় মত্ত অবস্থায় মাকে ভিটে ছাড়া করে ঢিবি জমির ওপর বানানো সেই 'চণ্ডীর কুটিরে' বসিয়ে রেখে এলো। শাসিয়ে এল খবরদার যদি আমার বেটিগুলানের ওপর নজর দেতে ও ভিটেয় উঁকি দিবি তো, তোকে ওই শ্যাওলা পুকুরে ডুইবে রেকে আসবো।

বৃন্দে রেগে কী বলল, আমায় এই শূন্যিঘরে একেথুলি, আমার জিনিষ পত্তর?

দুলো বলল, উসব তো আমার বাপের। তোর বাপের?

তোর বাপেরটা হোলো কমনে? আমার ওজগার না?

দুলো বলল, মানে দুলোর মাথায় ওটা নেশার রং বলল, তবে থানা পুলিশ করগা যা।...

কে করবে থানা পুলিশ?

কে লড়বে বৃন্দের হয়ে? কে বলতে আসবে ন্যায় কথা? কার দায় পড়েছে তাড়িখোর গোয়ারের সঙ্গে কথা কইতে আসতে?

বৃন্দে তো গ্রামের সকলের কাছে কেঁদে গিয়ে পড়েছিল।

কিন্তু একটা 'শক্তির পতন' মানুষকে বড় বেশী সহানুভূতিহীন করে ফেলে। ... যেন সেই শক্তিকে বিশ্বাস করে এসে যে বোকামী করে এসেছে, তার প্রায়শ্চিত্ত করে।

মাটির খোলটায় পরিণত হয়ে আঁস্তাকুঁড়ে পড়ে রইল।

শুধু সত্য চরণ।

একটা ব্যতিক্রমের মত, নীরবে এসে বৃন্দের ভাঙা চালার নীচে মেটে দাওয়ার ওপর নামিয়ে দেয়। নিত্যদিনের সিধে।... একটু চাল, এতটুকু ডাল, একফোঁটা নুন, একছিটে তেল, দুটো ছাতু, দুটো চাল ভাজা, দু'তিনটে গুলি গুলি আলু। একদা বৃন্দেকে যা খাওয়া অভ্যাস করিয়েছিল ভুজঙ্গ সেই অভ্যাসটার জন্যে অনেকদিন কষ্ট পেয়েছে বৃন্দে। এমন কি মান খুইয়ে ওদের গিয়ে বলেছে, ভাত দিস না দিস, অ্যাকটুক চা তো আমারে দিতি পারিস? নিজেদের অ্যাতো চায়ের র‍্যালা।

তখন টগর হেসে হেসে বলেছে, বসতি পেলেই মানষে শুতি চায়। আজ তোরে অ্যাকটুক চা দিই, কাল তুই 'ভাত দে' বলে জুলুম কর। হুঁঃ। ক্যাঙালকে শাগের ক্ষেত দ্যাকাতে অ্যাচে।

টগর কেন এতো এমন করে ভেবে পায় না।

মনুষ্য চরিত্রে চির অভিজ্ঞ বৃন্দেও যে দিশেহারা হয়ে যায়। বুঝতে পারে না। বৃন্দের শক্তিকে ভয় করে বলেই টগর এমনভাবে তাকে দাবিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। বিয়ে হয়ে এসে পর্যন্ত ওই শক্তিকে ভয় করে এসেছে, আর তাকে দাবাতে চেষ্টা করে এসেছে, এতোটুকু শিথিলতা দেখালেই যদি আপদ শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে টগরকে বিপদজনক অবস্থায় ফেলে।

কৈ—মাগুর মাছ কুটতে বৃন্দে নিজেই যেমন, তার চোখে মুখে নুন লাগিয়ে, মাথাটা ছেঁচে ছেঁচে নিস্তেজ করে ফেলে, তবে বঁটিতে দু টুকরো করে।

জিনিস কটা নামিয়ে রেখে সত্যচরণ বললো, মাসি, অসময়ে শুয়ে যে?

বৃন্দে উঠে বসে বলল, শরীলডে ভাল নাই। তা' তোমার আজ বিলম্বো?

আসলে বৃন্দে খিদেয় শুয়ে পড়েছিল। চালকটা না এলে তো ভাত রাঁধার উপায় নেই।

সত্য এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, শাক—টাক কিছু তোলোনি?

নাঃ। আজ আর মন নাই।

সত্য দাওয়া থেকে নেমে এদিক ওদিক ঘুরে একগাছা কাঁকুড় শাক, আর অ্যাতোটুকু একটু জালি কাঁকুড় তুলে এনে বলল, ন্যাও, উঠে রাঁধো। না খেলে শরীর ধুঁকবে।... আমার বাড়ি কাছে হলে, তোমার দুটো ভাতের ব্যবস্থা আমিই করতাম। সেই তো—নিজের জন্যে হয়। তো তুমিতো আর অতটা হেঁটে যেতে আসতে পারবে না।

বৃন্দে উঠে বসলো।

আহা! ভগমান আচে তালে অ্যাখনো।

তারপর বললো, না বাবা চলতে নারি।

ওই তো। নচেৎ দেখতে যেতে পারতে মুখুয্যে বাড়িটার এবার আবার কত জৌলুস ফিরেছে। ওদের বাড়ির পাশেই তো আমার ঘর।

বৃন্দে আবেগের গলায় বলল, কোন মুকুয্যে বাড়ি?

আহা মুখুয্যে বাড়ি আর কটা গো মাসি? ওই বাবুদের বাড়িই। তেনারা যে এবার আবার পূজো করছেন।

পূজো করচে!

বৃন্দের চোখের সামনে যেন একটা রং—মশাল জ্বলে ওঠে। অ্যাতোকাল বন্দো দে' আবার পূজো করতেচে?

সত্যচরণের আজ রান্না করতে হবে না।

মুখুয্যে বাড়ির যে কেয়ারটেকার এযাৎকাল বাড়ি দেখাশুনো করে আসছে, সত্যচরণের সে বন্ধুলোক। সেও নিঃসঙ্গ। সত্যও তাই। তা আজ সে অফার দিয়েছে—আজ থেকে রান্নার লোক লেগেছে, রাঁধবে বাড়বে, বাবুরা এসে পড়বার আগে একটু পুরনো হতে, কেয়ারটেকার নিজে, আর কিছু 'লোকজন' খাবে। অতএব সত্যও যেন এসে বসে যায়।

সত্যর তাই আজ অনেক সময়।

দোকান বন্ধ করে এসে গল্প করতে বসেছে।

হয়তো বা বৃন্দের এই নিস্তেজ শিথিল ভঙ্গী, এই বলীরেখাঙ্কিত মুখ, নিভে যাওয়া কয়লার আঙারের মত চোখ আর হেরে যাওয়া চেহারাটা দেখে মুদির দোকানওয়ালা সত্যচরণের মায়া হল।

তাই বললো, বুঝলে মাসি, আজ আর আমায় হাত পুড়িয়ে খেতে হবে না। আজ নেমন্তন্ন।

'নেমন্তন্ন' শব্দটা শুনেই বুড়ি বিন্দের বুকটা যেন উথাল পাথাল করে উঠল। কত বাড়িতে কত নেমন্তন্ন খেয়েছে বৃন্দে। যত জানা ঘর, তাদের ইষ্টপূরণ বাবদ খাইয়েছে, আবার কাজ—কর্মেও নেমন্তন্ন করেছে। তখন আবার বলেছে—ছেলেকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে এসো মা।

এসব ক্ষেত্রে বড় একটা তা আনতো না বৃন্দে।

তার স্পেশাল খাতির থাকলেও, জাতের বিচারটাতো সমাজ সামাজিকতায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না? খেতে বসাবে নিশ্চয় অচ্ছ্যুৎদের সঙ্গে। বৃন্দে বলতো, অ্যাকটা লোক দিও মা, খাবার সঙ্গে নে যাব। ওরা আসতে চাইবেনি।

বাড়িতে এনে তিনজনে একসঙ্গে খেতো। আর বাবুদের বাড়ির রান্নার তারিফ করতো। বিশেষ করে দুলো। বলতো, মাচ—মানসো তো তুইও আঁছিস মা অ্যামন খোসবো হয় না ক্যান বলতো?

ওনারা কতো তরিবৎ করে। আঁদুনী ঠাকুরে আঁদে।

বলে বৃন্দে নিজের ভাগের সবটা ছেলের পাতে তুলে দিতো।

যতক্ষণ সে ওই ক্রিয়াকলাপে আছে, ততক্ষণ যেন অন্য আর এক বৃন্দে। কিন্তু সংসার জীবনে বৃন্দে নামের মেয়েমানুষটা তো একেবারেই সাধারণ ছিল। স্বামী পুত্তরের প্রতি স্নেহশীল, সংসারে টান।

আর গাল মন্দ?

কেউ কোনোদিন শোনেনি তার মুখে। এক ভূতছাড়ানো মন্তরের মধ্যে ছাড়া।

জীবন্তেই কি প্রেতাত্মা হয়ে যেতে পারে মানুষ?

কিন্তু একটা সহজ মানুষ বৃন্দের সঙ্গে সহজভাবে গল্প করতে বসেছে দেখে বৃন্দে যেন অনেকগুলো বছর পিছিয়ে যায়। উৎসাহের গলায় বলে ওঠে, বসলে গো?

ওই তো মুখুয্যে বাড়ি। পর্শু আসবেন তেনারা আজ থেকেই রাঁধুনী ঠাকুর।

আসবেন তাঁরা।

এ দীর্ঘ পাঁচিশটা বছর পরে তারা আসবে। কিন্তু কারা কারা?

সত্যচরণ হাসে, সেই বুড়ো কর্তা—গিন্নী কখনো এখনো বেঁচে থাকে? এখন ছেলে বৌ। যেনাদের ছেলেকে তুমি জীবন দিয়েছিলে।

হঠাৎ বৃন্দের চোখে একঝলক জল এসে পড়ে। চোখ মুছে কষ্টে বলে, আমি কে? যা করেচে মা। তো তুই অ্যাখনো সে কথা স্মরোণে রেখেচিস বাবা? আর কোন্নো মানুষডা আকেনি। তো সেই ছেলেডা? আসে নাই।

আরে এসেচে বৈ কি।

সত্যচরণ জানায়, তার জন্যই না কি আসা।

এ বছরের এই দুর্গোৎসব তো তার নামেরই মানতি।

বুড়ো কর্তা—গিন্নী যে কী ভেবে এখানের পূজো তুলে দিয়েছিলেন তাঁরাই জানেন।

....কলকাতার বাড়িতে না কি ঘটে পটে পূজো করতেন, কর্তা মারা যাওয়ার পর তাও উঠে যায়।

অথচ পয়সার অবধি নেই।

বিরাট ব্যবসা তো।

দালানের প্রতিমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার চেষ্টায় মায়ের নাকি দশহাতের একখানা হাত খুঁতো হয়ে গিয়েছিল, কে জানে সেই অপরাধ বোধই কর্তাকে ওইভাবে চালিত করেছিল কিনা।

যাক সে তো অনেক দিনের কথা।

বর্তমানের ঘটনা—সেই মরেবাঁচা ছেলে বিলেতে পড়াশুনো করে ফিরেছে, এবং বিশেষ ঘটা সহকারে বিয়েও হয়ে গেছে। দেশে এই যে হবার প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু সেই বাবদ ছেলের মার এই মানত।

দেশে এসে একটা ঘটা করবেন, নতুন বৌকে দেশের পূজো দেখাবেন।

নিজের সেই বধূজীবনের আনন্দের স্মৃতির গল্প করেছেন, দেখাতে সাধ।

বলেছেন নাকি। গ্রামের লোক ত কেউ কোনো দোষ করেনি ছেলের নেমন্তন্ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পূজোয় তার শোধ হোক। আমার নিজের বিয়ের সময় দেখেছি গ্রামসুদ্ধু লোক পাঁচদিন ধরে নেমন্তন্ন খাচ্ছে।

এখন অবশ্য খরচের হার অনেক বেড়ে গেছে কিন্তু ব্যবসার আয়ও ত অনেক বেড়েছে। তাছাড়া বাপবেটা দুজনেই কৃতী।

এ সমস্ত গল্প শুনে এসেছে সত্যচরণ তার সেই বন্ধুজনের কাছে। কাজকর্মের অবসরে সে লোকটা গল্প করতে সত্যচরণকে ডাকে। জমিদার বাড়ির নীচের তলায় কত ঘর কত দালান। এতোদিন পোড়া হয়ে পড়েছিল, এখন নতুন রং মেরামত হয়ে আবার পুরনো বাহার খুলেছে।

আমারে কেউ কয়না। আজ এই তুমি কইলে, তাই টের পেলাম।

বৃন্দে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, কেমন দেখতে হয়েছে সেই খোকাডা, কত বড় হয়েছে দেখতে মন যাচ্ছে।

সত্যচরণ দুঃখের গলায় বলে, তুমি তো হাঁটতে পারোনা। তা একটা রিক্সা গাড়ি চেপে যাবে ক্ষ্যাপা?

বৃন্দে বলে, আমারে চেনবে? এডা আবার কেডা এলো, বলে দৌরানে গলাধাক্কিয়ে তাইড়ে দিবে।

সত্য জিভ কাটে।

ছি ছি। এ কী বলছো মাসি। তাঁরা সভ্য ভদ্দর শহরের মানুষ। এই সাগরপুকুরের লোকের মতন বেইমান নয়। পরিচয় দিলে, দেখো কত মান্য সম্মান করবে। কী বল? আজ এই এতো আহ্লাদ কোথায় থাকতো, যদি সেদিন—মরা ছেলে না ফিরে পেতো।

বৃন্দের বুকটা দুলে ওঠে।

বৃন্দে তবু নিজেকে সামলে বলে, আর বাচ্চা—কাচ্চা নাই?

নাঃ। ওই একটাই। সাধে বলছি—কী থাকতো তাহলে? কখন বিলেত ফেরৎ ছেলে, পরীর মতন বৌ, গ্রামের লোকেদের দেখিয়ে মুখটা বড় হবে কতো! তা তুমি বেঁচে আছো জানলে, নিশ্চয় তোমাকেও পূজোয় নেমন্তন্ন করবে।

বৃন্দে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, অ্যাকডা পেরানী ত এই বৃন্দেবুড়ির ছায়া মাড়ায় না। যাই তুমি ছেলে—তাই এখনো পেরানটা আছে।

সত্যচরণ ভাবে, ওনাদের কানে তুলতে হবে—সেই গুণীন মা এখনো বেঁচে আছে। তবে স্বামীপুত্তুর হারিয়ে আর ছেলের বৌয়ের দুর্ব্যবহার বড় দুঃখে কষ্টে আছে। তাঁদের তো হাত ঝাড়লে পর্বত, যদি বুড়ির 'শেষ কালে' একটু সুব্যবস্থা করে দিয়ে যান।

সত্যচরণ এর মধ্যে কোনো অযৌক্তিক দেখতে পায় না। ভদ্র মানুষের মধ্যে তো কৃতজ্ঞতা থাকবেই।

এই যাঃ। তোমার দেরী করে দিলাম মাসি। নাও নাও রাঁধো।

বলে সত্যচরণ চলে যায়।

কিন্তু বৃন্দের আর উনুন জ্বালতে গা ওঠে না। বৃন্দে ভাবে, সেজের কালে ভাত এঁদে খাবো অখন।

অতএব বৃন্দে সেই ছাতু কটাই জলে গুলে গুড় দিয়ে খেয়ে নিয়ে ঢকঢক করে এক ঘটি জল খেয়ে ছেঁড়া মাদুরটা বিছিয়ে শুয়ে পড়ে।

কিন্তু রাতে ঘুম আসে না বৃন্দের তা দুপুরে।

অন্যদিন যদিবা একছিটে 'ভাত ঘুম' হয়, আজ তো তাও নয়। বৃন্দে সেই বাবুদের বাড়ির উঠোনে গিয়ে বসে।

১০

বৃন্দে পঁচিশবছর আগে ফিরে যায়।

মুখুয্যেদের নব আবির্ভাবের উদ্যোগে গ্রামে রীতিমত সাড়া পড়ে গেছে। যদিও আজকালকার ছেলে মেয়েরা কোনো ফালতু ব্যাপারে উৎসাহ প্রকাশ করাকে খেলোমি মনে করে, এবং এতোদিনের অবহেলিত জীর্ণ দশাগ্রস্ত প্রাসাদটায় মিস্ত্রীর হাত পড়েছে দেখেও, তাকিয়ে দেখে না। তবু এই মেরামতীতে আর রং করণে কত খরচা হতে পারে, তার একটা সম্ভাব্য হিসেব মনে মনে কষতে থাকে অনেকেই।

খরচা যে রীতিমতই হবে তাতে সন্দেহ কি?

এখন বয়স্ক মহলে জল্পনা—কল্পনা—এতো খরচের কারণটা কি? তবে কি ছেলে বৌকে কলকাতার বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে কর্তা গিন্নী নিজেরা এখানে এসে বসবাস করতে চান?

বিলেত আমেরিকা ফেরৎ ছেলে আর আধুনিক বৌ—এর সঙ্গে হয়তো বনছে না। আরে রেখে দাও তোমার বিলেত আমেরিকা ফেরৎ। কলকাতার রাস্তায় মুঠো মুঠো গড়াগড়ি যাচ্ছে।' না বনলে এমনিই বনছে না।

কিন্তু এখানে এসে বাস করবে কি করে, প্রসূন মুখুজ্যে তো এখনও সার্ভিসে। তা'ছাড়া অতো সব ব্যবসা।

তাতে কি? পয়সার তো অভাব নেই। ওদের জন্যেই তো পেট্রল। রোজ গাড়িতে যাওয়া আসা করবে। ক'মাইলই বা রাস্তা। বড়লোকেরা এমন করে আজকাল।

নাকের সামনে হঠাৎ এক বড়লোক এসে বাস করতে বসলে, ব্যাপারটা খুব সুবিধের হবে না।

তাতে তোর আমার কি?

তা অবিশ্যি। আমরা তো আর 'বাবু' এসেছেন বলে প্রজার মত জোড়হাতে গিয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছি না।

কেউ কেউ যাবে দেখিস। বুড়োরা তো নির্ঘাৎ। সেই পুরোনো প্রেম ঝালাতে যাবে।

কে যেন বলছিল, শুধু ধূমধাম সহকারে পূজো করে চলে যাবে।

গেলেই ভালো।

আচ্ছা শুধু চারিদিনের জন্যে এতো খরচা?

বড়লোকি দেখানো। আর কিছু নয়।

মুখে ঔদাসীন্য দেখালেও, তলে তলে উত্তেজনা আছে।

কথাটা সত্যিও।

যদি বাসই না করে, চারদিনের জন্যে এতো খরচা? বাড়াবাড়ির একটা সীমা থাকে তো।

হয়তো বাড়াবাড়িটা বেশিই হয়ে গেছে।

কণ্টাক্টর লাগিলে কাজ তো।

তবু—

বাড়ি সম্পর্কে একটা অপরাধবোধ পীড়িত করছিল বোধ হয় বর্তমান মালিককে। টাকার অভাব তো নেই সত্যি, অবহেলায় পিতৃপুরুষের ভিটেটা পড়ে যাবে? তাছাড়া নতুন বৌকে দেখাবার বাসনাটাও পেয়ে বসেছিল নতুন বৌয়ের শাশুড়ীর। এ পুরনো গড়নের বাড়িরও কত বাহার বুঝুক। পুরনো নামেই তো নাক তোলে সব।

বাড়ি সারানো নিয়ে জল্পনা—কল্পনা চলছিল—আসল ঘটায়, মুহূর্তে মুহূর্তে চমকাচ্ছে সবাই।.... লরী চেপে কুমোরটুলীর ঠাকুর এলেন, সেটা এমনত কিছু না। 'সাগরপুকুর বান্ধব লাইব্রেরীর' সর্বজনীন দুর্গোৎসবেও কলকাতা থেকে ঠাকুর আসেন। কিন্তু প্যাণ্ডেল? ডেকরেটিং? আলোকসজ্জা? কেটারিঙের ব্যবস্থা?

পূজোর ভোজে চেয়ার টেবিলের ব্যবস্থা। এটা এখনো হয়নি এখানে।

গ্রামসুদ্ধ নিমন্ত্রণ হয়ে গেছে।

মাঝখানে একদিন গাড়ি করে এসে প্রসূন মুখুয্যে বাড়ি বাড়ি নেমন্তন্ন করে গেছেন। এ সেকাল নয় যে, নায়েব গোমস্তা দিয়ে নেমন্তন্ন হবে।

মা দুর্গার ছবি আঁকা নিমন্ত্রণ কার্ডটা বাঁধিয়ে রাখার মত।

পঞ্চমীর দিন সাত আটখানা গাড়ি করে কলকাতা থেকে এসে গেল, নতুন বৌ ও আত্মীয় স্বজন। সেই সব গাড়ির সারি আসতে লাগল বৃন্দের বাড়ির সামনে দিয়েই।

শুধু আজ নয়, ক'দিন ধরেই আসছে গাড়ি, ট্রাক। যেন রাজসূয় যজ্ঞ। আসল কথা সকল জিনিস কলকাতা থেকে আনানোর ব্যবস্থায় সমারোহের ব্যবস্থাটা এত প্রকট দেখাচ্ছে।

টগরের বাড়ির লোকটার প্রকৃতপক্ষে ঘরামির কাজ।... পুজোটুজো বা বিয়ে থাওয়ায় সে রীতিমত 'ব্যস্তমানুষ।' আর এই উপলক্ষে তো বিরাট বায়না পেয়েছে সে। সবকিছু কলকাতা থেকে এলেও, বাঁশ দড়িগুলো এখানেরই। এবং দুচারটে ঘরামিও নেওয়া হয়েছে ডেকরেটারের নির্দেশে।

জবা, পদ্ম, ঘেঁটু ওদের মধ্যেও তাই উৎসাহ উত্তেজনা।

ওদের নাকি নবমীর দিনে খেতে যাবার কথাও আছে।

বৃন্দের কানে মাঝে মাঝেই ওদের কথার টুকরো ভেসে আসে ... কী খাওয়াবে রে বাপটা?

আমারে বুজি বলে থুয়েরে?

বেস্তর ঘটা? তাই না রে। তুই কটা মাচ খাবি জবা?

অ্যাক কুড়ি, দুকুড়ি। তুই?

দশকুড়ি।

দূর, পেট ফাট্যা অক্কা পাবি।

মা, তুই যাবিনে?

যাবো না ক্যানে?

শুদু বুড়ি পড়ে থাকবা। হি হি।

তো তুই কোলে ধরে নে যাস।

হি হি হি।

ওদের ওই হাসির আওয়াজটা বড় অসহ্য লাগে বৃন্দের। কান চেপে শুয়ে থাকে। পঞ্চমীর দিন একেবারে সিধে দিতে এসে উৎফুল্ল সত্যচরণ বললো, আজ সবাই এসে গেছে মাসি, আমার বন্ধুকে বলে রেখেছি ওনাদের জানাতে।

বৃন্দে আজ ক'দিন ধরে আয়োজনের বহর দেখছে। আর কখনো কম্পিত, কখনো স্তিমিত, কখনো উত্তাল, কখনো স্মৃতি মর্মরিত।

মনে পড়ছে—মুখুয্যে কর্তার মেয়ের বিয়ের সেই 'বিষ্টিবন্ধন।'

চওড়া লালপাড় তাঁতের শাড়ি প্রণামী দিল গিন্নীমা, কত মান্য, কত আদর। ছেলের বিয়েতেও সাতদিন ধরে চলেছে খাওয়া মাখা।

আর সেই ভয়ানক দিনে?

সেই ছবিটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে বারবার। গাড়ি করে কারা যেন সব এলো। ওর মধ্যে কি সেই ছেলেটা ছিল?

এখন বৃন্দে কিঞ্চিৎ স্তিমিত।

কারণ দুলোর মেয়েদের হি হি টা যেন এখনো বাতাসে ভাসছে।

বলল, কী জানান করবো?

এই—সত্য, একটু ঢোক গেলে বলে, তুমি এখনো বেঁচে বর্তে আছো, সেইটাই আর কি। বন্ধুকে বলে এসেছি—সে যা বলবার বলবে। চারটে রিকশাগাড়িকে ওরা রাতদিনের ভাড়া করে রেখেছে দরকার লাগতে—এক সময় তোমায় তারই একটায় চড়িয়ে—

বৃন্দে মলিন হাসি হেসে বলে, 'তোর যে বাবা গাচে কাঁটাল গোঁপে ত্যাল।'

আহা কাঁঠাল পাতে নাবছে দ্যাখোনা। জানতো না গিন্নীমা—যখন জানবে তুমি এখনো আছো, দেকো কী আহ্লাদ করবে।

তেনার কি অ্যাখনো সে কথা স্মরোণে আচে?

স্মরণে নেই? কী বল মাসি?

বলে যায়। তার কেয়ারটেকার বন্ধু তাকে অনুরোধ জানিয়েছে তিন চার দিনের মত দোকান বন্ধ করে ওখানে থাকতে। কাজের লোক, অনেষ্ট লোক। সত্য ভেবেছে, ভালই হয়েছে।

সত্য সেখানে থাকলে মাসির স্থায়ী একটু ভালমত ব্যবস্থা করে ফেলতে পারবে বলে বলে।

দিন কেটে যায় পাথরের ভার নিয়ে।

কোথায় কে?

'কী আহ্লাদের পসরা নিয়ে কি তবে, সেই ছেলের মা নিজেই আসবে? আজ যিনি গিন্নীমা! হয়তো তাই। তা সময় তো নেই, তাই এতো দেরী। রাত হয়ে যায় দাওয়া থেকে নড়ে না বৃন্দে।

ভাবে কতবড় বিরোদ কাজ মাতায়, তিনির কি সয়োজে অবকাশ হবে? আত করেই আসা করবে।

রাত করে?

কিন্তু কত রাত?

সন্ধেবেলা ভাত রেঁধে খাবার কথা।

দুপুরে তো ছাতুগোলায় কেটেছে। কিন্তু কাঠকুটো ধরাতে সাহস হয় না। যদি তখনি এসে পড়ে? ধুঁয়ো লাগবে।

আর—আরও একটি ক্ষীণ আসা।

ঘটার বাড়ি থেকে আসবে, শুদু হাতে কি আর আসবে? 'ভালমন্দ' কিছু আনবে হয়তো। মিচিমিচি ভাত ক'টা খেয়ে খিদে নষ্ট করে বসে থাকবে?

১১

শুক্লাপঞ্চমীর রাত। মৃদু জ্যোৎস্না ঠাহর হয় না কত রাত। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবে বৃন্দে?

মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়লে কথাটা তুলল টগর।

বলল, পদ্মোটা কেঁদে মরবে।

লোকটা বসে বসে একটা জবা ফুলের মালা গাঁথছিল।

বলল, চুপ! একদম চুপ! টু শব্দোটি না।

পেরাণ তুল্যি তো? তাই বলতেছি, আর কোতাও পেলি নাই?

পেলে তোরে বলিনা?

আকাশে তো চাঁদের আলো ফুটফুটি। ভয় লাগছে।

—তুই থামবি?

ওর দাবড়ানিতে টগরও থেমে যায়।

দুলোকে সত্যকার বিয়ে করা স্বামীকে ফুঁ দিয়ে ওড়াতো টগর। কিন্তু একে ভয় করে। একে বোঝা ভার। কখনো মাথায় তোলে, কখনো পায়ে ছ্যাঁচে। মেয়েগুলোও তাই ওকে কখনো বাপটা বলে আদর কাড়ায় কখনো যমের মত ভয় করে।

মালাটা সরিয়ে রেখে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে লোকটা বলল, শয়তান বুড়ি রাত দুপুর অবদি দাওয়ায় বোস করে ছেলো ক্যানো বল দিকি?

টগর জানবে কেমনে? বাজনা বাদ্যির আওয়াজ আসতেছে তো, তাই শুনতে যে হবে।

বাজনা বাদ্যি। হুঁ কানের কত জোর!

শোয়াপল্লি যে? ঘুইমে পড়বি না তো?

লোকটা উঠে বসে বলল, ফের কথা? বলছি না চুপ!

টগর ভয়ে ভয়ে চোখ বুজে। ভান দেখায় ঘুমিয়ে পড়ছে।

কিন্তু ঘুম কি আসবে? আসতে চায় না।

আচ্ছা টগরের তো ভরপেট তবে ঘুম না আসার কারণ কি?

ঘুম না আসতে পারে বৃন্দের। পেট খালি।

দাওয়া থেকে উঠে এসে বৃন্দে সত্যর দেওয়া সেই জালি কাঁকুড়টা বঁটিতে ফেঁড়ে নুন ঠেকিয়ে খেতে গিয়েছিল। খেতে পারা গেল না। তেতো হাকুত।

কাঁচা চালই দুটো নিয়ে চিবিয়ে খেতে গেল, তাও হল না। শুধু মাড়ির জোরে জব্দ করতে পারল না তাদের। নিজের বুদ্ধিকে ধিক্কার দিতে দিতে, তলানি গুড়টুকু মুখে দিয়ে ঢকঢকিয়ে খানিকটা জল খেয়ে শুয়ে পড়েছে।

ভাবনা, রাতে তেষ্টা পেলে খাবে কি।

আর তো জল নেই।

মরুকগে। রাততো পোহাবে এক সময়?

মনে হচ্ছে সত্যর বন্ধু কথাটা তেনাদের বলতেই ভুলে গেছে। সত্য ঠিকই বলেছে, গিন্নীমার কানে উঠলে নির্ঘাত লোক পাঠাতো..... হ্যাঁ লোকই পাঠাবে। বৃন্দের যেমন মরণ, তাই ভেবে মরেছে তিনি নিজে আসবে। তাই কখনো হয়। একি যে সে লোক।

মরতে ভাত কটা রাঁধল না বৃন্দে। ন্যাও অ্যাখোন মরো পেটে কিল মেরে জ্বলে মরো।

আচ্ছা বুড়ো হলে এতো ক্ষিদে পায় কেন?

বয়সকালে মায়ের নামে কত উপোস করেছে বৃন্দে, কই এমন তো হয়নি, টেরও পায়নি। সারাদিন উপোস করে মাঝরাত্তিরে উঠে শেকড় তুলতে গেছে। হঠাৎ বিড়বিড় করে নিজে নিজেই বলতে থাকে বিন্দে...

'বশ করার' ওষুধের কত খিরকেল!

আমাবস্যের দিনে নেজ্জলা উপোসে থেকে মাজ আত্তিরে গে পুকুরে ডুব দে, ভিজে কাপড়ে এলো চুলে শেকড় তুলে নে এসে। আতের মদ্যেই তারে বেটে পানের পাতে মাইকে থোও.... সেই পানটি চুন সুপূরি কপ্পুর দে সাজ করে নোকটারে খাওয়াও। ব্যস। সে তোমার পায়ে পায়ে ঘুরবে। করিচি তো এসব। কতো করিচি।

আচ্ছা।

নির্বুদ্ধির ঢেকি বিন্দে ছেলের বিয়ে হতে হতেই বৌটাকে কেন বশ করার পান খাওয়ায়নি? পেরথম পেরথম তো বৃন্দের পানের বাটা থেকে পান খেতে খুব তৎপর ছেলো বৌ।

দ্যাক তোর, না দ্যাক মোর।

বাটা খুলে পান নে দৌড়। আহা সেই মহালগ্ন হারিয়েছে বৃন্দে। আর উপায় নেই। আর শক্তিও নেই। একদিন তো বৃন্দে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ওই লোকটাকে 'বাণ' মারতে পারলো না, ঘাম ছুটে গেল, হাত পা কাঁপতে লাগল। বুক 'উৎলোতে' লাগল।

জেগে থাকতে থাকতেই কখন যেন স্বপ্নের শিকার হয়ে গেল বৃন্দে।

এই স্বপ্নের মধ্যে কত লোক, কত মুখ। চেনা অচেনা।

যেন—সেই উঠোনটায় আবার গিয়ে বসেছে বৃন্দে। পরনে পাটের শাড়ি। গলায় জবার মালা। ঝলমলে ঝকমকে গিন্নীমা বলছে আপনার হতেই তো সব মা। আপনি যদি সেদিনকে ওর জীবেনটা ফেরৎ না দিতেন কিছু হতো? ওরা সভ্য। ওরা 'আপনি' করেই কথা বলে।

কর্তা বলবে, জানতুম না আপনি বেঁচে আছো। জানলে আপনারে সকলের আগে নে আসতুম।

আর সেই খোকাডা? সেও এসে—

কিন্তু কোথায় সে? এরা কারা? এরা তো সেই বুড়ো কর্তা গিন্নী?

আর ওই বৃন্দে?

কালো চুলের ঢাল। মাজা মাজা রং। মাজা গড়ন। চকচকে তেলতেল মুখ। খাড়া হয়ে বসে আছে। ও কোন বৃন্দে?

সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে বৃন্দের। স্বপ্নের মধ্যে বর্তমান তাকে কিছুতেই বাগিয়ে ধরতে পারছে না। অতীতের মধ্যে গলে গলে মিলে যাচ্ছে সেটা।

সারারাত বাজনার আওয়াজ আসছে।

কিন্তু এ বাজনা কি পূজোর বাজনা? ফিনফিনে গান, ঝিনঝিনে সুর।...

একে তো বলে মাইকের গান।...

হঠাৎ একসময় বেজে উঠল পূজোর বাজনা।

ঢাকে কাঠি পড়ল।....

ভোর হলো নাকি? তাইতো। কলাবৌ নাওয়াতে যাবে তবে এখন। টাকীঢুলি ঘুম ভেঙে উঠেই দিয়েছে দুটো ঘা। যাতে সবাই জেগে ওঠে।

বৃন্দেও উঠে পড়বে নাকি?

এই পথ দিয়েই তো বড় দীঘিতে যাবে ঢাক ঢোল বাজিয়ে সমারোহ করে, কলাবৌ নিয়ে।

আর বৃন্দেকে দেখতে পেয়ে বলে উঠবে। ইস তাইতো—বড্ড ভুল হয়ে গেছে মা, আপনাকে বলতে আসি নাই।

কিন্তু উঠবে কি হাত পা উঠছে না।

মাথাটা লটকে পড়ছে। কালকের উপোসটা বড্ড লেগেছে।

আচ্ছা! বাজনাটা বেজেই থেমে গেল কেন? গোলমাল কিসের?

কোথা থেকে এমন রে রে, শব্দ আসছে?

শব্দটা বৃন্দের কুঁড়ের দিকেই আসছে যে। কাছে, আরো কাছে। আরো।—একেবারে দরজায়—

কী বলছে ওরা?

অতোগুলো লোক।

কোথায় সেই হারামজাদি বুড়ি।

টেনে বার কর। পিটিয়ে লাশ করে ছাড়।

মেরে তক্তা বানিয়ে দে!

এই শয়তানী বুড়ি, বেরিয়ে আয় বলছি। তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, এখনো বজ্জাতি! এই বিন্দে! বিন্দে! বেরিয়ে আয় শীগগির!

তারমানে বিন্দেকেই খুঁজতে এসেছে।

কিন্তু এই কি নেমন্তন্ন করতে আসার ভাষা।

বৃন্দের দরজায় এতো গোলমাল, কিন্তু যাদের বাড়ি সমারোহ হবার কথা, সেখানে এক নিথর স্তব্ধতা। যেন এই আড়ম্বর আয়োজনে উদ্দাম উত্তাল হয়ে ওঠা প্রাসাদটায় হঠাৎ কোন দৈত্য এসে মরণ কাঠি ছুঁইয়ে দিয়ে গেছে।

এই ভয়াবহতায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন বর্তমানের গৃহকর্তা প্রসূন মুখার্জি, সেই পঁচিশ বছর আগের এক দুর্গাষষ্ঠির ভোরের মত, ঠাকুর দালানে ওঠবার সিঁড়ির শেষ ধাপটায়। আজ আর দুহাতে মুখ ঢাকা নয় বটে, কিন্তু মুখের উপর যেন অদৃশ্য এক কঠিন আবরণ। বোঝা যাচ্ছে না মনোভাবটা কি।

দালানের উপর ধারের দিকে বসে আছেন বর্তমান গৃহিণী মীরা মুখার্জি। পাঁচিশ বছর আগের সেই দুর্গাষষ্ঠির দিনটায় যে মেয়ে কোথায় যেন পড়েছিল অচৈতন্য হয়ে। এখন তার মুখে একটা স্থির সংকল্পের আভাষ।

বাড়িতে একটি নবদম্পতি আছে, তারা কোথায় আছে দেখা যাচ্ছে না।

তবে সাহস করে এগিয়ে এসে স্তব্ধতা ভাঙছে না। মরণকাঠির প্রভাবটা অবহেলায় মুছে দিয়ে 'জীয়নকাঠির' সন্ধান এনে দিচ্ছে না।

উঠোন ভর্তি ডেকরেটারদের চেয়ার পাতা আছে, উঠোনের চারদিক বিচিত্র আর বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত। চেয়ারগুলির মধ্যে অনেকগুলি দখল করে আছেন কিছু বয়স্ক ভদ্রলোক। পাড়ার এবং জ্ঞাতিবাড়ির। তার সঙ্গে পুরোহিতও।

কিছুক্ষণ পরে স্তব্ধতা ভঙ্গ করে এগিয়ে এলেন প্রসূনের খুড়তুতো কাকা প্রভাস মুখুয্যে। গলা ঝাড়া দিয়ে বললেন, বৌমাকে বল বাপু মনটা স্থির করতে। ঠাকুর মশাই বলছেন, দেউড়ি যখন আটক রয়েছে, খিড়কি দিয়েই নবপত্রিকা স্নান করিয়ে আনা হোক। উনি যখন বলছেন—

প্রসূন মুখার্জি একবার চোখ তুলে উঁচু দিকে তাকালেন।

চওড়া লালপাড় গরদ পরিহিতা নীটোল যৌবনা মীরা মুখার্জি স্থির স্বরে ঘোষণা করলেন, আমি তো বলে দিয়েছি ঠাকুর মশাই, পূজো হবে না। পূজোর ইচ্ছে আমারে চলে গেছে।

মীরা মুখার্জিকে দেখে কেউ বলবে না ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে ওর। যেন পঁচিশ বছর আগে যে বাইশ বছরের বৌটি এখানে ঘুরে গেছে, সেই বৌ—ই সাজবদলে গিন্নী সেজে মঞ্চে উঠে এসেছে। .... যেমন স্থির যৌবনা, তেমনি স্থির ঘোষণা।

ঠাকুর মশাই কুণ্ঠিত গলায় বললেন, বুঝছি মা। আপনার মনের অবস্থা বুঝছি। মহাষষ্ঠির দিন এই অশুভ ঘটনা। স্বয়ং ষষ্ঠিরবাহন। কিন্তু এই বিপুল আয়োজনের দিকে তাকিয়ে, আর জনসাধারণের মুখ চেয়েই এ বিধান দিচ্ছি। পূজো তো আগামীকাল। আজ কলাবৌ স্নানটা করিয়ে আনা হোক তারপর দেউড়ি সাফ করিয়ে, এখানে একটা শান্তি স্বস্তয়ণের ব্যবস্থা করে—

গৃহিণীর আগেই কর্তা বলে ওঠেন, দেউড়িই বা সাফ হচ্ছে কি করে? পঞ্চাশ টাকা থেকে একশো টাকায় উঠেছি, কেউতো ছুঁতেই রাজি হচ্ছে না। দুলে পাড়া, বাগদি পাড়া সর্বত্রই নাকি লোক ঘুরে এসেছে।

এখন আবার প্রসূনের কাকা এগিয়ে আসেন।

বলেন, কি জানো বাবা, তুকতাকের ব্যাপারতো কেউ সাহস করছে না। দুলে বাগদি হোক আর যাই হোক, সবাই ছেলে পুলে নিয়ে ঘর করে। তায় আবার দিনটা মোক্ষমতো মহাষষ্ঠির দিন, মাষষ্ঠির বাহন।

তারপর আবার গলাঝেড়ে বলেন, সেদিনই তোমায় আমি বলিনি বাবা? তুমি আবার বলছিলে ওকে নেমন্তন্ন করে পাঠাবে। এখন বুঝছো, আমাদের কথা সত্যি কিনা। মহা সাংঘাতিক মেয়েমানুষ!

প্রসূন মলিন গলায় বলেন, কিন্তু গুণীনমাতো চলতে ফিরতে পারে না।

সাধারণ কার্যক্ষেত্রে পারে না—

কাকা উদ্দীপ্ত হন, কিন্তু এসব কর্মে ঘাড়ে পিশাচের ভর হয় তো। তার জোরেই।

প্রসূন আলগা গলায় বলেন, অথচ সেদিন এই এখানেই—

তার রহস্যতো তোমার কাকিমা বলে গেলেন কাল। নিজে মেরে নিজে বাঁচালো। এই যে বিতিকিচ্ছি কাণ্ডটি করে রেখে গেছে এর পেছনে কী মতলব আছে কে জানে।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

কর্তা স্খলিত স্বরে বলেন, আগে তো দেখেছি, আপনারা সকলেই খুব ভক্তিটক্তি—

ঠাকুরমশাই এবং তস্য বয়স্য কাকা মশাই দুজনেই সমস্বরে বলে ওঠেন, ওই তো! ওইখানেই তো বাহাদুরী। ভাবতে পারো বাবা একটা মুখ্যু নিরক্ষর ছোটজাতের মেয়েছেলে কতকাল ধরে এই অ্যাতো রাশি রাশি লোককে ঠকিয়ে খেয়ে এসেছে। শুধু এ গাঁ কেন দেশ দেশান্তর থেকে লোক এসেছে। এখন? এখন ধরা পড়ে গেছে স্বরূপটি। ... স্রেফ একটা ডাইনী। নইলে এই অ্যাতো বড় পূজোর দিন কিনা এই কর্ম করে।

কর্তা কি বলতেন কে জানে, গিন্নীর ক্লান্ত অথচ দৃঢ় স্বর ভেসে আসে, ওসব কথা থাক। এখনই একটা গাড়ির ব্যবস্থা হোক আমি খোকাকে বৌমাকে নিয়ে চলে যাবো।

চলে যাবেন? এখনই চলে যাবেন?

দু'দুটো আর্তস্বর যেন আছড়ে পড়ে আপনি এখনই চলে যাবেন? দালালে প্রতিমা বসে—

বসেই থাকুন। নয়তো বিসর্জন দিয়ে দিন—

এখন চেয়ার—আসীন জনগণ বলে ওঠেন, বিসর্জন। সে কী? সেটা যে মহা অশাস্ত্রীয় হবে। দিকে দিকে সর্বত্র মা দালানে উপবিষ্টা—এখন বিসর্জন! ইস! তাহলে এই দালানেই পড়ে থাকুক মা!

মীরার স্বর উত্তপ্ত, এই যখন তাঁর ইচ্ছে—

দুর্গাষষ্ঠির দিন সকালবেলা দেউড়ির সামনে মা ষষ্ঠির আসল বাহন মিশকালো এক কালো বেড়ালের ছানাকে মরে পড়ে থাকতে দেখে এঁরাই শিউরে উঠেছিলেন বেশী, এঁরাই বিভীষিকা দেখিয়ে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন সবাইকে। ঢাকী—ঢুলীরা এঁদের নির্দেশেই বাজনা থামিয়ে ফেলেছিল, আর এঁরাই বলেছিলেন, যা সবাই, সেই শয়তানী ডাইনী বুড়িকে মারতে মারতে ধরে আন, তুলে নিয়ে যাক, ওই ভয়ঙ্কর বিভীষিকাকে। এখন তাঁরাই আবার পুজো হবে না শুনে বিচলিত হচ্ছেন।

অশাস্ত্রীয় কাজ তো করা চলে না।

সেই যে কবে একদিন বাজারের পথে তিনমাথার মোড়ে, কে একটুকরো কলাপাতার ওপর পাঁচটা জবাফুল বসিয়ে রেখে গিয়েছিল, ছুঁয়েছিল কেউ? টান মেরে ফেলে দিয়েছিল? আর ভুলে ভুলে কি ডিঙিয়েই ছিল? ঘুরে অন্যপথে বাজার গেছে।

কে না জানে, ডিঙোলেই অন্য কারও দুরোরোগ্য ব্যাধি তার শরীর থেকে তোমার শরীরে এসে ঢুকে পড়বে।

কে জানে সে কাজই বা কার?

ওই ডাইনী লোক দেখিয়ে চলৎশক্তিহীনের ভান দেখায় কিনা কে বলতে পারে? পিশাচে ভর করে হয়তো রাতচরা হয়ে বেড়ায়।

তা কতক্ষণ পরে যেন দুটো ছাগলে সেই জবা কলাপাতা সব সাফ করে ফেলেছিল তাই রক্ষে। তবু দু'পাঁচদিন লোকে সেই জায়গাটা এড়িয়ে পা ফেলেছে।

ভগবান জানেন ছাগল দুটো কোন দুরারোগ্য ব্যাধির শিকার হয়ে গেল কিনা। 'অ্যাজমা' কি 'ব্লাড ডিসেন্ট্রি', 'টি.বি.' কি 'ক্যানসার।'.....

কিন্তু ফুল পাতা নির্মূলের তো তবু দৈব প্রেরিত প্রাণীর ভরসা। কালো বেড়ালের উপায় কি?

ওকে তো আর ছাগলে খেয়ে যাবে না।

প্রথম দর্শক কেয়ারটেকার বৈকুণ্ঠ ঘোষ।

ভোরে গেটের চাবি খুলতে এসে আঁৎকে উঠে এমন ডাক হাঁক শুরু করেছিল যে সেই ভোর রাত্রির শান্ত শান্তি যেন ক্লেদাক্ত হয়ে উঠেছিল। তবে তখন গোলমাল শুনে নবদম্পতি সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে এসে বলে উঠেছিল, কী আ—শ্চর্য! এই নিয়ে এতো হৈ চৈ? রাস্তায় মরা কুকুর বেড়ালের ছানা পড়ে থাকতে দেখেনি কেউ?

বিজ্ঞরা সে কথা শুনে তাদের ব্যাপারটা সম্পর্কে অবহিত করিয়ে দিয়েছিলেন।

দেখবে না কেন! দেখেছে। গাড়ি চাপা পড়ে মরে থাকে, দু'দলে ঝগড়া খেয়োখেয়ি করে মরে পড়ে থাকে। কিন্তু দুর্গাষষ্ঠির ভোরে পূজোবাড়ির ঠিক গেট—এর সামনে মিশকালো এক বেড়ালছানাকে গলায় জবার মালা, আর কপালে সিঁদুরে ফোঁটা পরে মরতে আসতে দেখেছে কেউ কখনো?

নাঃ। একথা স্বীকার করতেই হলো, এমন দৃশ্য কেউ কখনো দেখেনি। সুইসাইড করবার জায়গাটা আবিষ্কার করেছে বটে ছানাটা।

আমেরিকা ফেরৎ ছেলে বলল, দূর! 'তুকতাক' আবার একটা কথা নাকি? আমি ও সব বিশ্বাস করি না। কেউ না ছোঁয়, আমি টান মেরে ফেলে দিয়ে আসছি। বল তো চানও করে ফেলতে পারি।

লরেটো পড়া বৌ তার হাত চেপে ধরে বললো, কী দরকার তোমার এতো বাহাদুরীতে? কিসে কি হয় কে জানে। মরা বেড়াল ফেড়ালে জার্ম থাকতে পরে। মানলাম। কিন্তু এই সব তুকতাক তুমি বিশ্বাস করো?

মোটেই না। তবে চিরকাল এসব চলেও তো আসছে। ও নিয়ে তাল ঠোকার দরকার কি? কখনো ওদিকে যাবে না তুমি।

দৃশ্যটার বীভৎসতায় তার গা গোলাচ্ছিল।

দু'জনেই তাই আবার শয়নকক্ষেই ফিরে গেছে। সেখানে হয়তো দেশের এই সব কুসংস্কার নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে।

১২

গুঞ্জন ধ্বনি উঠল চারিদিক থেকে।

বোধন বসে গেছে, মহাপূজার সব আয়োজন সম্পূর্ণ, আর এই রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন। অপূজিতা মাকে ঠাকুর দালানে বসিয়ে রেখে চলে যাওয়া! এ কী একটা কথা হল?

মীরা মুখার্জি সংকল্পে অটুট। বলছেন—

আমারই অন্যায় হয়েছিল, পুজোর সাধ করা। শ্বশুর শাশুড়ী যখন তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। বোঝাই যাচ্ছে ঠাকুর আর এ বাড়িতে পুজো নেবেন না। খরচ অপচয় হলো অনেক। তা সেটা ভুলের খেসারৎ বলে ধরতে হবে।.... গাড়ির ব্যবস্থা করা হোক, আমি এখুনি খোকাকে বৌমাকে নিয়ে চলে যাব। .... আপনাদের ছেলের ইচ্ছে হয়, শান্তি—স্বস্তেন করে নিয়ে করুন পুজো।

ছেলে দাঁড়িয়ে উঠলেন একটা অ্যাবসার্ড কথা, বলার কোনো মানে হয় না।

আমার থাকাটাও অর্থহীন।

তা'হলে প্রতিমা?

ঠাকুর মশাই তো রইলেন। যা করবার করবেন। খরচার টাকা রেখে যাচ্ছি। এই সব সাজ গোজ?

ডেকরেটাররা খুলে নিয়ে যাবে। তাদের পাওনা তো পেয়েই গেছে।

আর কেটারাররা?

যা এনেছে উঠিয়ে নিয়ে যাক। লোকসান পুষিয়ে দেওয়া হবে।

সকলেরই সব লোকসান পুষিয়ে দেওয়া হবে।

কিন্তু আশাহত নিমন্ত্রিত গ্রামবাসীদের?

তাদের কথা কেউ ভাবছে না।

'লৌকিকতার' ভারবিহীন তিনদিন ব্যাপী একটা নিষ্কণ্টক নিমন্ত্রণের আশায় যারা দিন গুনছিল।

কি আর করা। তাদের কপাল।

তারা অতঃপর কিছুদিন ধরে এঁদের এই আচরণের পক্ষে এবং বিপক্ষে ডিবেট চালাবেন। আর নতুন রং করা বুড়ি বাড়িটা আবার ধীরে ধীরে রং হারিয়ে বার্দ্ধক্যের চেহারায় ফিরে যাবে। আর যে কখনো আসবে এরা এমন মনে হয় না। তবে বাড়িটাকে একটা শান্তি স্বস্তয়ন করে শোধন করে যাওয়া দরকার।

কে বলতে পারে, ওই মৃত কালো বেড়ালের আত্মা ওঁদের পিছু পিছু ধাওয়া করবে কিনা।... অলক্ষ্যে ওঁদের মোটরেও উঠে বসতে পারে।

'কালো বেড়ালের আত্মা' একটা পৃথিবী জানিত ভীতির বস্তু।

তা' করতেই যদি হয় তার ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি হোক।

এ বাড়িতে যখন রান্নাবান্না হবে না। বেলা হলে অসুবিধে।

কিন্তু সেই বুড়িকে এখনো এনে ফেলছে না কেন?

ধরে হোক বেঁধে হোক।

মারতে মারতে, তাকে তার 'তুকতাক' তুলিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য করতে হবে। অতঃপর জায়টাকে গোবর গঙ্গাজল এবং অগ্নিশুদ্ধ করে নিয়ে শান্তি স্বস্তয়ন যাহোক একটা কিছু করে ছেড়ে দেওয়া মুখুয্যে পরিবারকে।

কিন্তু কোথায় সে ভয়ঙ্কর অপরাধের নায়িকা?

তাকে নিয়ে এসে হাজির করছে কই?

না তাকে আর হাজির করে উঠতে পারেনি ওরা। যাদের ধরে আনতে পাঠানো হয়েছিল। মহেআহে গিয়েছিল যারা, স্বভাবতঃই তারা ধরে আনতে বললে বেঁধে আনার দল।... বেঁধে আনার হুকুম পেলে আর একটা বাড়াবে—

এটাই স্বাভাবিক।

তারা অতএব 'পিটিয়ে লাশ', করে 'মেরে তক্তা বানিয়ে' নিয়ে এসেছে।

অবশ্য ঠিক 'নিয়ে' আসা বলা চলে না।

পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে রেখে এসেছে। চিরকালের শয়তান একটা সর্বনাশিনী ডাইনিকে যখন হাতে পাওয়া গেছে, হাতের সুখ করে নেবে না?

অতঃপর রেখে এসেছে সেই ভাঙা ঝরঝরে দাওয়াটায়। যেখানে একটা চটা ওঠা কলাই করা বাটি ছাতু না কি যেন গায়ে মেখে গড়াগড়ি যাচ্ছিল।

রেখে এসে হাতের ধুলো ঝেড়ে বলল, চোখরাঙিয়ে—ডাকাডাকি করতে ভয়েই মরে গেল বুড়ি। ঘরে ঢুকে দেখি মরে রয়েছে।

কিন্তু তা বললে তো হবে না। পড়ে থাকলে তো চলবে না।

দেশে আইন নেই? পুলিশ নেই? তারা এলো, এবং 'নিয়ে' তারাই গেল বেঁধে ছেঁধে।

মর্গের রিপোর্ট অবশ্য 'ভয়ে'র কথা তোলেনি।

বলেছে। 'অপুষ্টি জনিত মৃত্যু।'

একদা এদেশে দোহাত্তা লোকে পীলে ফেটে মরতো এখন দোহাত্তা 'অপুষ্টি জনিত'য় মরে। অতএব এটাকে স্বাভাবিক মৃত্যুই বলতে হয়। দোহাত্তাই যখন ঘটছে। আর বুড়ির চেহারাও তো রিপোর্টের পক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে। দেখে কি কেউ বলতে যাবে, ঘুষ খেয়ে রিপোর্ট দিয়েছে।

তবু জগতে মন্দ লোকের তো অভাব নেই?

তাদের কাজই অকারণ বিষোদগার।

দু'একটা দুষ্টমতি খবরের কাগজ, এমনি বিষোদগার করে বসলো। অক্টোবরের কোন একটা তারিখে ফলাও করে বেরোলো।

'এমনও হয়। এই ঊনিশশো ঊনআশীতে'ও হয়। কলিকাতার অতি নিকটবর্তী একটি গ্রামে, 'ডাইনি' সন্দেহে এক বুড়িকে পিটাইয়া মারা হইয়াছে। ..... বুড়ির আত্মীয় স্বজন কেহ নাই, অতএব পুলিশী তদন্তেরও প্রয়োজন হয় নাই। পোষ্ট মর্টেমের রিপোর্ট 'স্বাভাবিক মৃত্যু' বলিয়া ঘোষিত হইয়াছিল।

এই আমাদেশ দেশ।

অগ্রসর দেশের মানুষরা যখন গ্রহে গ্রহান্তরে পাড়ি দিবার সাধনা করিতেছে, তখন আমাদের দেশে এক গরীব অসহায় বুড়িকে 'ডাইনি' বলিয়া পিটাইয়া মারিয়া কেহ লজ্জিত হইতেছে না। ..... অথচ এই গ্রামে শিক্ষিত এবং উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির অভাব নাই।....

অপর একটা কাগজ আবার আরো সরস করে বলেছে, যদিও এই গ্রাম বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তাল রাখিয়া বিজ্ঞানের সুখ সুবিধাগুলি দ্রুত করায়ত্ত করিতেছে, এবং ক্লাবে লাইব্রেরীতে জনসভায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বন্যা বহাইয়া, নিজেদেরকে রুচিবান ও সংস্কৃতিবান বলিয়া স্বীকৃত হইতেছে, তথাপি—যাক খবরের কাগজের কথা কে ধরে।

ওদের কাজই তো তিলকে তাল করা।

হ্যাঁ তিল থেকে তাল করা, ভদ্র ব্যক্তিদের বৃথা অপদস্থ করা, পুলিশকে হ্যানস্থা করা, এবং কথায় কথায়! 'হায়! এই আমাদের দেশ' বলে আক্ষেপ করা। এই তো পেশা ওদের?

খবরের কাগজের কথায় কান দিলে চলে না।

তবে হ্যাঁ তিল থেকে যে তাল হয় না তা নয়। এই সাগরপুকুর গ্রামেই তো দেখা গেল তার দৃষ্টান্ত।

একটা নিহত বিড়াল শিশুর মৃতদেহ সারা গ্রামখানাকে তোলপাড় করে তুলতে সক্ষম হলো, কলকাতা থেকে আনা বহুমূল্য দেবী প্রতিমার মানতি পূজোর বহুমূল্য আয়োজন খতম করে দিলো, এবং একটি রাজসূয় যজ্ঞ পণ্ড করে ছাড়ল। এই শেষেরটায় গ্রামসুদ্ধ লোক তো কম আহত আশাহত হয় নি।..... এমন কি, যে লোকেরা ষাঁড়ের শত্রু বাঘে মারলো ভেবে উৎফুল্ল হচ্ছিল, তারাও ক্ষুণ্ণ হয়ে ভাবল, এতোটা হবে কে জানতো।

তবে হলোতো? ঐ তিল থেকেই হলো।

এই উনিশশো ঊনআশীতেও হলো।

আর ভয়ের কারণ নির্মূল হলেও এখনো লোকে স্টেশন যাবার ওই সহজ পথটা পরিত্যাগ করেই রেখেছে, সাইকেল আরোহী আরোহিনীরাও পর্যন্ত। .... ঘুরপথেই যাতায়াত করছে তারা।

কে না জানে, ওই ঢিবি জমিটার ওপর ফণী মনসার বেড়া ঘেরা চালা খসে পড়া ভাঙা দাওয়াটায় নিরবয়ব একখানা ছায়ার গায়ে আগুনের ঢেলার মত দুটো চোখ পথ চলতিদের রক্ত চুষতে রাতদিন জেগে বসে থাকে। ... 'গ্রাম' তো নামেই, প্রগতির কমতি নেই। তবু—

মার্কসবাদ কোনো কাজে লাগেনা, কাজে লাগে না ইংলিশ মিডিয়াম।

জোচ্চোর

ট্রেন থামার আগেই নিজের সাইট ব্যাগটা কাঁধে জম্পেস করে তুলে নিয়ে, আর সুদত্তার স্যুটকেসটাকে বাগিয়ে ধরে দরজার কাছে চলে এসেছিল প্রবাল সুদত্তাকে হাতের ইঙ্গিতে অনুগামিনী করে নিয়ে। থামা মাত্রই খালি হাতটা বাড়িয়ে সুদত্তাকে প্রায় হিঁচড়ে টেনে লাফিয়ে নেমে পড়ল।

টেনে নামানো ছাড়া উপায় কি? ট্রেন তো এখানে মাত্র এক মিনিট থামে। আর লাফানো ছাড়াই বা উপায় কি? প্ল্যাটফর্ম বলতে তো ট্রেনের দরজা থেকে অনেকটা নীচে এবড়ো—খেবড়ো খানিকটা জমি।

নামার সঙ্গে সঙ্গেই গাড়িটা ঘসঘস করে বেরিয়ে গেল। সুদত্তা সেই দিকে একটু তাকিয়ে থেকে হাঁফ—ছাড়ার মতো একটা নিশ্বাস ফেলে বলে উঠল, বাবাঃ, এমন ভাবে টেনে নামালে যেন নারীহরণের নায়ক! এদিক ওদিক থেকে হৈ—চৈ করে লোক ছুটে এলে আশ্চর্য হতাম না।

আমি হতাম। প্রবাল কাঁধের ঝোলাটা আবার টেনে কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে পা চালানো শুরু করে বলল, নারীহরণ হচ্ছে দেখে ছুটে আসবার মতো লোক ধারে—কাছে আছে বলে মনে হচ্ছে?

সত্যি, স্টেশন এত চুপচাপ কেন!

এক মিনিট স্টপেজের স্টেশনে কত জনসমাগম আশা কর?

আশা—টাসা কিছু করছি না। সুদত্তা বলল, ভাবনা করছি কতখানি হাঁটাবে। গাড়ি—টাড়ি পাওয়া যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না।

প্রবাল হাসল, এখনি ভয় ধরছে? একপা—ও তো হাঁটনি এখনো।

সুদত্তা রেগে উঠে বলল, হাঁটতে ভয় পাচ্ছি না কি আমি?

তবে?

তবে আবার কি? এখন এই দুপুর রোদে, সূর্যের দিকে মুখ করে হাঁটাটা খুব আরামদায়ক হবে কিনা সেটাই ভাবা হচ্ছে। কতটা রাস্তা কে জানে!

আমি তো জানি।

আহা, কতই জানো। নিজেই বলেছ দশ বছর পরে এই আসছ। সব কিছু মনে আছে যেন।

দশ বছরের বিরতিতে মামার বাড়ির রাস্তা ভুলে যাব?

ছেলেরা এ সব খুব তাড়াতাড়িই ভোলে।

ছেলেদের সম্পর্কে এমন জোরালো অভিজ্ঞতাটি কবে হল?

হিসেব দিতে হবে না কি?

নাঃ। প্রবাল কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তেমন সৌভাগ্য করে কি আর পৃথিবীতে এসেছি?

সুদত্তা ঘাড় বাঁকিয়ে ওকে দেখে নিল। রোদ পড়ে প্রবালের ফর্সা মুখটা আরো ফর্সা লাগছে, কপালে ঘাম জমেছে ছোট ছোট ফোঁটায়।

সুদত্তা শাড়ির আঁচলটা টান—টান করে কোমরে এঁটে নিয়ে বলল, স্যুটকেসটা এবার আমায় দাও তো।

প্রবাল গম্ভীর ভাবে বলল, কেন? টাকা—কড়ি গহনা—পত্র অনেক আছে বুঝি?

তার মানে?

মানে তো সোজা। অন্যের হাতে রেখে স্বস্তি পাচ্ছ না।

পাচ্ছি না—ই তো। সুদত্তা রেগে রেগে বলল, ঝোঁক করে চলে তো এলাম, এখন এই ক'টা দিনই তোমার সঙ্গে আমার বনলে হয়। যা না তুমি।

চমৎকার! দোষটা আমারই হল তাহলে?

ওঃ বলতে চাও আমিই ঝগড়াটি?

আমি তো কিছুই বলতে চাইনি। নিঃশব্দেই যাচ্ছলাম। তুমিই—

বেশ নিজে খুব ভালো। সুদত্তা বলল, বীরপুরুষ তো এইটুকু রাস্তা এতটুকু একটা স্যুটকেস বয়েই ঘামতে শুরু করেছেন।

প্রবাল সুদত্তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে।

সুদত্তারও কপালে ঘাম জমে উঠেছে।

চুলের গোড়ায় গোড়ায় ভুরুর খাঁজে, চোখের কোলে।

সুদত্তার রং শ্যামলা, তবু রোদের আঁচে লালচে হয়ে উঠেছে।

প্রবালের ইচ্ছে হল পকেট থেকে রুমাল বার করে ঘামটা মুছিয়ে দেয়। কিন্তু পাগল তো নয় প্রবাল, তাই এই দৌলতপুর হেন গণ্ডগ্রামের রাস্তার মাঝখানে এমন একটা অনাসৃষ্টি কাণ্ড করে বসে। ত্রিসীমানায় লোক দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না বটে, কিন্তু ভয়ঙ্কর কোন মুহূর্তে মাটি ফুঁড়েও মানুষ উঠে পড়ে এটা তো ঠিক। মমতাটুকু এখন তোলা থাক।

অতএব দুষ্ট বুদ্ধিকেই প্রশ্রয় দেওয়া যাক। স্যুটকেসটাকে একটু তুলে ধরে দুলিয়ে বলল, খুব এতটুকু অবশ্য নয়। ভেতরে ক'ডজন শাড়ি ভরা হয়েছে? ডজন তিন চার? না আরো বেশি?

ডজন তিন চার? আরো বেশি? কেন, আমি কি তোমার মামার বাড়ির দেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাস করতে এসেছি? ক'টা শাড়ির ভার এত ভার? সুদত্তা আচমকা প্রবালের হাত থেকে স্যুটকেসটায় হ্যাঁচকা টান মেরে মাটিতে নামিয়ে ফেলেই হি হি করে হেসে বলে ওঠে, এমা! কী বোকা! বয়ে নিয়ে যাবার দরকার কি ছিল? এটার তো চাকা রয়েছে। টেনে নিয়ে গেলেই তো হল।

প্রবাল ওর হেসে গড়ানো মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল। সুদত্তার হাসিটা একেবারে মার—কাটারি। হাসিটা দেখলে মনে থাকে না সুদত্তা ফর্সা কি কালো, সুদত্তার চোখ দুটো বড় বড় ভাসা ভাসা না ছোট ছোট নাচুনে মার্কা।

কিন্তু সুদত্তার হাসিটি কি সুলভ? সুদত্তা এ যুগের তরুণীদের মতো ভুরু প্লাক করে না, তার নিজস্ব ধনুকাকৃতি ভুরুজোড়া প্রায় সর্বদাই উঁচিয়ে রেখে কথা বলে। তবু সুদত্তা কী অদ্ভুত আকর্ষণীয়া।

প্রবাল অবশ্য এই পরম সত্যটি প্রকাশ করে না, বরং সুদত্তাকে ক্ষেপিয়ে তার ভ্রুধনুটি আরো উৎক্ষিপ্ত করিয়ে মজা দেখে। এখন বেশ গম্ভীর গলায় বলল, চাকাটার সাহায্যে কি টেনে নিয়ে যাবার ভূমিকাটা পোষা কুকুরের ম্যাডাম!

পোষা কুকুরের!

হ্যাঁ। তা জানো না তুমি? স্যুটকেসের তলায় চাকা লাগানোর ফন্দীটা মাথায় আনা হয়েছিল কুকুরের কথা ভেবেই।

কে বলেছে তোমায় এমন অদ্ভুত কথা! ওটা বানানোর উদ্দেশ্য কুলির কথা না ভেবে নিজের ভার নিজে বইবার জন্যে। বুঝলেন মশাই।

ওটা তোমার ভুল ধারণা। প্রথম যখন ওটা হাটে—বাজারে ছড়াল, আডভার্টিজমেন্টের ছবি দেখেছিলে? নব—দম্পতি হনিমুন—এ যাচ্ছে প্রেমে ভাসতে ভাসতে, পিছনে পোষা কুকুর। আর তার পিছনে ঢাউশ এক স্যুটকেস চলেছে কুকুরের মুখে চেপে ধরা দড়ির টানে। তা নইলে হয়তো আর কারো টানে অন্য দিকে চলে যেতো।

কই, এমন ছবি আবার কবে দেখলে তুমি? আমি তো দেখিনি।

আহা সবই কি আর সবাই দেখতে পায়? চোখ সজাগ থাকা চাই।

সুদত্তা হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলে ওঠে, যা ইচ্ছে বলে যাচ্ছ মানে? এটা হনিমুন অভিযান?

প্রবাল বলতে যাচ্ছিল, আহা সেই মনোরম অবস্থাটা ভাবলেই বা ক্ষতি কি। বলল না। বরং বলে উঠল, কী সর্বনাশ! এ কথা আবার কখন বললাম? বলেছি, যারা যায়, তাদের পক্ষে মালপত্র সামলাতে একটা পোষা কুকুর এসেনসিয়াল। আর তার কথা ভেবেই এই স্যুটকেসে চাকার আবিষ্কার। তবে যদি বল, যে কোন পোষ্যপ্রাণী হলেও কাজ চলে যায়, তাহলে অবশ্য—

এবড়ো খেবড়ো রাস্তা, চাকা যে খুব মসৃণ ভাবে এগোতে পারছিল তা নয়। সুদত্তা থেমে পড়ে বলে, এই ভাবে ইয়ার্কি মারতে মারতে হাঁটলে পৌঁছতে ক'ঘণ্টা লাগবে খেয়াল আছে?

যতক্ষণ লাগে ততক্ষণটাই লাভ। গিয়ে পড়লেই তো সেই সমাজ সংসার সভ্যতা ভদ্রতা।

আহা, কী একেবারে সুখকর অবস্থা।.... সুদত্তা বলে ওঠে, তাই ভাবতে হবে 'সমাজ সংসার মিছে সব' এর নাম তোমার নব ফাল্গুন! মলয় বাতাসের বহর বটে! আর রোদের তাত জুন মাসকেও হার মানাচ্ছে।

প্রবাল ঘড়ি দেখল। বেলা দেড়টা। প্রখর রোদেরই সময়। আর পাড়াগাঁয়ের রোদের তাত বেশী। রাস্তা আর বেশী নেই, কিন্তু এটুকুও সত্যিই কষ্টকর।

হঠাৎ যেন ভুঁইফোঁড়ের মতো একটা সাইকেল বোঁ করে পাশ দিয়ে চলে গেল। আরোহীর জামার লাল রংটা বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো চোখ ঝলসে দিয়ে।

সুদত্তা বলে উঠল, আরে সাইকেল—ফাইকেল আছে তাহলে তোমার মামার বাড়ির দেশে?

দেশটাকে ভাবছ কি? নেহাৎ একটা অসময়ে এসে পড়েছ তাই। ছেলেবেলায় যখন আসতাম, যথেষ্ট সমারোহময় অবস্থা দেখেছি। বড়মামার আবার একটা টমটম জাতীয় ঘোড়ার গাড়ি ছিল। তিনি তাতে চেপে রোগী দেখতে বেরোতেন।

আছেন এখনো তিনি?

কে বড়মামা? নাঃ। বড়মামা বিগত, মেজমামা সপরিবারে কানপুর—বাসী। ছোটমামা জাপানে গিয়ে সেখানেই সেটল করেছেন। বড়মামার ছেলেরা কলকাতায় থাকে।

ও মা, তবে তোমার মামার বাড়িতে আছে কে?

কেন, আমাদের সেই বিখ্যাত নেবুমাসী আছেন। যাঁর কথা শুনে আকৃষ্ট হয়ে তুমি দেখতে আসতে চাইলে।

সুদত্তার হঠাৎ মনে হল কাজটা বোকার মতো হয়ে গেছে। অথচ তখন ভীষণ আগ্রহ অনুভব করেছিল যখন প্রবালের কাছে শুনেছিল তার ছেলেবেলায় মামার বাড়ি মানেই ছিল নেবুমাসী। আর তাঁর নিতান্ত নির্বেদেই নাকি ক'দিনের জন্যে মামা বাড়ির দেশে যাচ্ছে প্রবাল।

নেবুমাসী নাকি বাল্যকালে এমন সুন্দরী ছিলেন যে হেতমপুরের না কোথাকার যেন রাজা সন্ধান পেয়ে ছেলের বৌ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নেবুমাসীর বাবা সে অফার নেননি। অবহেলায় ত্যাগ করেছিলেন। বলেছিলেন না কি রাজবাড়িতে মেয়ের বিয়ে দেওয়া আর মেয়েকে বেচে দেওয়া সমান। মেয়ে জামাই নিয়ে আমোদ আহ্লাদ হবে না, সাতজন্মে বাপের বাড়ি আসতে পাবে না। আমার একটা সন্তান, লোভে পড়ে বিসর্জন দেব?

তা এমন অহঙ্কারের কথা মানাতোও তাঁর মুখে। এই সারা দৌলতপুরটাই ছিল তাঁর অধিকারভুক্ত। বনেদী জমিদার। তৎপরে তিনি তখনকার কালে মেয়েকে প্রায় অরক্ষণীয়া করে তুলে বিয়ে দিয়েছিলেন এমন ঘটা করে যে নেবুমাসীর বিয়ের ঘটার গল্প দৌলতপুরের প্রায় একটা ঐতিহাসিক গল্প হয়ে থেকেছে অনেক কাল। প্রবালদের তো শুনে শুনেই মুখস্থ ছিল।

বলে বসেছিল সুদত্তা, আমি যাব তোমার সঙ্গে—।

কিন্তু সে উৎসাহ কি শুধুই ওই ঐতিহাসিক গল্পের আর সে গল্পের নায়িকাকে চাক্ষুষ দেখার আগ্রহে? তাহলে এখন হঠাৎ মনে হচ্ছে কেন কাজটা বোকার মতো হয়ে গেছে?... আর নিজেকে তলিয়ে দেখে মনে হচ্ছে কেন এই একটা ছুতোয় ছুটির ক'টা দিন প্রবালের সান্নিধ্যের আশাতেই তার এই ঝাঁপিয়ে পড়া। অবশ্য জেদটা আরো বেড়ে উঠেছিল প্রবালের প্রতিকূল বাণীতে।

সে যাবে শুনে প্রবাল তো প্রথমটা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল, তুমি যাবে? তাহলেই হয়েছে!

হয়েছে মানে? কি হয়েছে?

ব্যাপারটা অসম্ভব তাই বলছি।

অসম্ভবটা কিসে?

আরে বাবা সে একটা অজ পাড়া গাঁ। বেণুদা সেদিন বলেছে চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না কলকাতার প্রায় নিকটবর্তী এখনও এমন জায়গা আছে, যেখানে সভ্যতার আলোক স্পর্শ করেনি।

সভ্যতার আলোকের দাহ তো জন্ম থেকেই অনুভব করছি, একটু অন্ধকারের শীতলতাই দেখা যাক না। আর তোমাদের সভ্যতা তো ক্রমশই পিছু হেঁটে হেঁটে আলোক থেকে অন্ধকারের দেওয়ালে গিয়ে ঠেকছে।

আহা এ সব তো পুঁথির বুলি, প্র্যাকটিক্যাল কথা হচ্ছে জায়গাটায় এখনো ইলেকট্রিসিটি যায়নি।

খুব বেশী তফাৎ মনে হচ্ছে কি? তোমার এই সাধের শহরে সেই ইলেকট্রিসিটির দাক্ষিণ্য কতক্ষণ?

তবু প্রবাল আরো কত কি বলেছিল, বাড়িটা ভীষণ পুরনো, কাজ করার লোকজন আছে কি নেই কে জানে ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটের মাথায় সুদত্তার এই প্রস্তাবটা তার কাছে পরম লোভনীয় মনে হলেও নিবৃত্ত করার বেশ খানিকটা চেষ্টা করেছিল প্রবাল। কারণ জানে তো এখনও পল্লী—সমাজ বস্তুটা একেবারে তিরোহিত হয়নি। ওর সঙ্গে সুদত্তাকে দেখলে—

কিন্তু প্রবাল যত নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছে সুদত্তার জেদ ততই প্রবল হয়ে উঠেছে। এটাই তার প্রকৃতি। ও বলেছে, তুমি ভাবছ অসুবিধেকে আমি ভয় খাই? যে কোন অবস্থার সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নেবার ক্ষমতা আমার আছে! শুধু নাম—করা শহর খুঁজে বেড়াতে যাব, নামী—দামী হোটেলে গিয়ে উঠব, গাড়ি চড়ে দ্রষ্টব্য দেখে বেড়াব, একে আমি বেড়ানোই বলি না। ছেলেবেলা থেকে এই নিয়ে মা বাবার সঙ্গে ঝগড়া হয় আমার। আমার ইচ্ছে হয় সেকালের মতো পায়ে হেঁটে পাহাড় ডিঙোই, গ্রামে গ্রামে যা—হোক তা—হোক করে ঘুরে বেড়াই। তবে তোমার যদি আমায় তোমার মামাবাড়িতে নিয়ে যাবার কোন বাধা থাকে তো আলাদা কথা।

এরপর আর ঠেকাবার চেষ্টা করা চলে না।

এবং সত্যিই যখন মা বাপের অনুমতি আদায় করে সুদত্তা প্রবালের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল, তখন অপূর্ব এক পুলক রসে মন কাণায় কাণায় ভরে উঠল।

সেই ভরা মনটাকে কি এখন ব্যাহত করবে প্রবাল সুদত্তাকে মনে করিয়ে দিয়ে যে, গ্রামে গ্রামে যেমন তেমন করে বেড়ানো রোদের আঁচ বাঁচিয়ে সম্ভব নয়।

বরং বলল, আশ্চর্য, দূরে দূরে অত ঝোপ—জঙ্গল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে; অথচ রাস্তায় একটাও ছায়াশীতল বৃক্ষতল নেই যে তার তলায় তলায় হাঁটা যাবে। তোমার সত্যিই কষ্ট হচ্ছে।

সুদত্তা ভুরু তুলে বলল, শুধু আমার? কেন, আমিই বুঝি মোমের পুতুল? নিজেরও যে এদিকে শার্টের পিঠ ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। ফ্লাস্কের জলটা ট্রেনেই ফুরনো হল।

আমি ভেবেছিলাম স্টেশনে অরেঞ্জ স্কোয়াশ জাতীয় কিছু একটা খেয়ে নেওয়া যাবে। এতদিনে কি আর এটুকু উন্নতি হয়নি? তা দেখছি—

ওদের কথার মাঝখানে আবারও হঠাৎ সেই লাল শার্ট—বাহী সাইকেলটা বোঁ করে ঘুরে এসে এদের কাছে দাঁড়াল।

সুদত্তা নীচু গলায় বলল, দুর্বৃত্ত বলে মনে হচ্ছে।

প্রবাল হাসল। তাকাল লাল শার্টের দিকে।

লাল শার্ট বলে উঠল, পলুদাদাবাবু তো?

হুঁ! তুমি কে?

আমি বাচ্চু! মণিরাম পালের নাতি।

আরে তাই নাকি? তা তুমি আমায় চিনলে কি করে?

বাচ্চু একটু আত্মতৃপ্তির মধুর হাসি হেসে বলল, অনুমানে।.....

ইস্টিশান মাস্টারের লোক গিয়ে বুড়ো দাদুকে খবর দিল, সে যাক! কথা পরে হবে। এখন রেকশোটায় চড়ে পড়ুন।

রেকশো! এই অভাবিত শব্দটি শুনে সচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখল এরা, সত্যিই একটা সাইকেল রিকশা চলে আসছে স্টেশনের দিক থেকে।

প্রবাল বলল, এটিকে কোথায় পেলে হে?

আজ্ঞে দাদাবাবু ইস্টিশানের ওধার থেকে।

কই, আমি তো একখানার ছায়াও দেখতে পেলাম না।

ইদিকে আর কোথায় পাবেন দাদাবাবু? ইদিকটা তো ওঁচা দিক। ওই দোকখিন দৌলতপুরের দিকে যা কিছু বোলবোলা। উদিকে সিনেমা হল রয়েছে তো। ইলেকটিক এয়েচে।

সুদত্তা মুচকি হেসে নীচু গলায় বলল, শুনে প্রাণে ভরসা পাচ্ছ। দেখ তোমার আর আক্ষেপের কিছু নেই, সভ্যতার আলোক যথেষ্ট পরিমাণেই এসে পৌঁচেছে। সাইকেল রিকশায় উঠে পড়ল ওরা।

বাচ্চু রিকশাওলাটাকে বলল, নন্দদা, তুমি এগিয়ে যাও। আমি আসছি।

আর রিকশাওলাটা নিজের আসনে উঠে বসতে বসতে বলল, কাপড়ের আঁচলটা সাবটে নিল বৌদি, পুরাতন গাড়ি, পেরেক ফেরেক আচে।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

সুদত্তা বিরস গলায় বলল, বৌদি মানে?

বাঃ, আমি কি করে জানব? তুমিও যেখানে আমিও সেখানে।

ওর ভুল ভাঙাতে হবে কিনা?

প্রবাল নড়ে চড়ে বসল। সুদত্তার রাগ রাগ মুখের দিকে তাকাল। তারপর উদাস অবহেলার গলায় বলল, পৃথিবীতে কত লোক তো কত ভুল ধারণা নিয়ে জীবন কাটিয়ে ফেলছে, তখন তুচ্ছ এই নন্দদার এই ক্ষণিকের ভুলটুকু ভাঙল আর না ভাঙল তাতে ক্ষতি কী?

ক্ষণিকের মানে?

মানে আর কি! ও তো আমাদের লাহিড়ীবাড়ির দেউড়িতে পৌঁছে দিয়েই, আবার সেই ওর দোকখিন দৌলতপুরে ফিরে যাবে।

তাই বলে ও এই সব যাতা বলবে?

ওঃ যাতা! প্রবাল একটা কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমার অবশ্য তা মনে হয়নি। আচ্ছা দিচ্ছি ভুল ভাঙিয়ে। বলে গলাটা একটু বাড়িয়ে ডাক দিল, ওহে শুনছ, ও নন্দদা—

সুদত্তার এখন অস্বস্তি হল। কি না কি বলে বসবে কে জানে। বিশ্বাস নেই ওকে। তাড়াতাড়ি ওর পিঠে আঙুলের একটা খোঁচা দিয়ে গলা নামিয়ে বলল, আচ্ছা থাক, আর হৈচৈতে দরকার নেই।

প্রবাল কান দিল না ওর কথায়, আবার ডাক দিল, ও নন্দদা!

সুদত্তা রীতিমত নার্ভাস হয়ে পড়ে। যা ছেলে, সুদত্তাকে জব্দ করতে হয়তো বলে বসবে, শোন, একে বৌদি বলায় ভীষণ চটে গেছেন। আসলে তো বৌদি নয়।

নাঃ ওই বিরক্তি দেখানোটা ঠিক হয়নি। ভাবল সুদত্তা, যাচ্ছি তো এক রিকশায় দিব্যি পাশাপাশি। পাড়াগাঁয়ের লোক, প্রকৃত সত্য উদঘাটনে আবার কি ভেবে বসবে কে জানে! ইস!

নন্দ ঘাড় ফিরিয়ে বলল, দাদাবাবু কিছু বলছেন?

হ্যাঁ বলছিই তো, না হলে ডাকব কেন? বলছি—

সুদত্তার বুক ঢিপ ঢিপ করে ওঠে। সুদত্তা জোর করে হালকা হবার চেষ্টা করে। আর তখনই শুনতে পায় প্রবালের গলা, বলছি দেশলাই আছে তোমার কাছে? আমারটা হঠাৎ ফুরিয়ে গেল।

দেশলাইটা বাড়িয়ে ধরে নন্দ বলল, থাকছেন তো ক'দিন?

ক'দিন আর কি? দিন চার পাঁচ।

নন্দ আস্তে আস্তে প্যাডেল করতে করতে পরিচিতের ভঙ্গীতে গ্রাম্য অন্তরঙ্গ সুরে বলল, থাকলে পাত্তেন দু—দশ দিন। জন মনিষ্যি তো আসে না। ওই ভগ্নো অট্টালিকেয় শুদু দুটো বুড়ো মনিষ্যি। আপনাকে পেয়ে বত্তে যাবে। ... ক'দিন আগে শুনেচি আসতেচেন। বৌদির কতা শুনি নাই, তো ভালই হল। শহরের মেয়ে, গাঁ ঘর দেকুন একবার। তা এসে য্যাখোন পড়েচেন, বুড়ি সহজে ছাড়লে হয়।

বোঝা যাচ্ছে নন্দ একটু বাক্যবিলাসী। কিন্তু ব্যাপার তো বেশ ঘোরালো হয়ে উঠছে। প্রবাল ভয়ে আর সুদত্তার মুখের দিকে তাকাতে সাহস করে না। নন্দকে থামানোর জন্যেই আলগা গলায় বলে, উপায় নেই। ছুটি নেই বেশী।

ওই তো—নন্দ দার্শনিক গলায় বলে, এই দুরন্তো যুগে এক তিল ছুটি তো নাই কারো। রাতদিন শুদু ছুটোছুটিই আচে। কে কার মুক চাইতে আসচে। দুদ্দশা শুদু জেবন ফুরিয়ে যাওয়া বুড়ো বুড়ি গুলানের। জেবনও নাই, মরণও নাই এই সসেমিরে আবস্থা।

তা ঠিক! প্রবাল নন্দর উৎস—মুখে পাথর চাপা দেয়, তা পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে?

কতক্ষণ আবার? নন্দর রেকশো রকেট গাড়ি!

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট মারে নন্দ এখন।

সুদত্তা তীক্ষ্ন গলায় বলল, ব্যাপারটা কী হচ্ছে?

'মানময়ী গার্লস স্কুল' নয়। স্রেফ ভাগ্যচক্র।

কলকাতায় ফেরার ট্রেন কখন?.... সুদত্তার কণ্ঠে ছুরির ধার।

প্রবালের অমোঘ গলা, রাত তিনটেয়।

রিকশা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বল। ওয়েটিং রুমে বসে তাকব।

ওয়েটিং রুম! প্রবাল নিরীহ গলায় বলল, সেটা কি রকম দেখতে?

ওঃ! কেন মরতে আমি—

প্রবাল আসতে ওর হাতটা একটু ছুঁয়ে বলল, ওই একটা বোকা বুড়োর ভুল ধারণা নিয়ে এত উত্তেজিত হবার কি আছে?

আমার খুব খারাপ লাগছে।

মন থেকে ঝেড়ে ফেল। ওই নন্দ রিকশাওলা তো ক্ষণিকের ব্যাপার।

নিশ্চয় ও সক্কলকে গৌরব করে বলে বেড়াবে—

কী বলে বেড়াবে?

রাগ বাড়িও না। বুঝতে পারছ না যেন। বলে বেড়াবে শহর থেকে বৌদি এসেছে। আমি তাকে পৌঁছে দিয়ে এলাম—এই সব।

প্রবাল হঠাৎ হেসে ওঠে, কার কাছে বলে বেড়াবে? ওর সার্কেলে তো? তাতে তোমার কি এসে যাচ্ছে?

থাম! বেশ মজা দেখা হচ্ছে, না?

ঠিক ধরেছ তো! প্রবাল আবার হেসে ওঠে।

কাঁচা পাকা চুল নন্দ এই হাসির শব্দে একটু পাকা হাসি হাসে।... ভাবে নতুন বে, নতুন ভালোবাসা, এখন ফী কথায় হাসি।

সুদত্তা একটুক্ষণ গুম হয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠল, তুমি যে বলেছিলে তোমার ওই নেবুমাসি বালবিধবা?

বলেছিলাম তো, কিন্তু সেটা নাকচ করলাম কখন?

ওই নন্দ না কে যে বলল, দুই বুড়ো বুড়ি—

প্রবাল ঠাট্টার গলায় বলল, তাহলে দেখছ, হাঁদা নন্দ রিকশাওলা আর রিসার্চ স্টুডেন্ট সুদত্তা মুখার্জি একই ভুল করতে পারে। বুড়ো বুড়ি হলেই যে তাদের কর্তাগিন্নীই হতে হবে তার কী মানে? ঢ্যাঙাদাদু তো আসলে এই লাহিড়ী বংশেরই কেউ নয়।

সুদত্তার ভুরু উঁচিয়ে ওঠে, কী দাদু?

ওহো হো। ওটা একটা মজা।

নন্দকে আরও একবার নাড়া দিয়ে হেসে উঠল প্রবাল, বেচারী ভদ্রলোক একটু বেশী লম্বা বলে নেবুমাসি ওকে ঢ্যাঙা বলে ডাকতেন। আমরা ছোটরাও শুনে শুনে বলতাম ঢ্যাঙাদাদু। এখনও সেই অভ্যেসে—

একটা ঝাঁকুনি খেয়ে রিকশাটা থেমে যায়।

রাশিকৃত ভাঙা ইট—পাটকেলের বোঝা রাস্তা আটকে রেখেছে। আসলে একটা জঙ্গল—সদৃশ ব্যাপার।

বোঝা যাচ্ছে নন্দ বর্ণিত 'ভগ্নো অট্টালিকা'র সামনের অংশটার স্মৃতিচিহ্ন ওই ইঁট—পাটকেলের স্তূপ। তারই খাঁজে খাঁজে গাছ গজিয়ে জঙ্গলের সৃষ্টি করেছে।

গাড়ি থেকে নেমে পড়ে নন্দ সবিনয়ে বলল, এখেনেই নামতে হবে দাদাবাবু। চাকা আর চলবে না।

প্রবাল বিপন্ন গলায় বলল, এটা কী ব্যাপার বল তো? এমন অবস্থা তো ছিল না।

কত দিন আসেন নাই?

প্রবাল সাল তারিখটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, তা অনেক দিন। তখনো তো এই ঠাকুর দালানে—

অল্পে অল্পে ধসছিল। গেলবারের বন্যে বর্ষায় ভূমিস্যাং হয়েচে। এই দু'বছর ভেতর বাড়ির ঠাকুরঘরে নমো নমো করে পূজো হয়েছে।

প্রবাল আস্তে আস্তে ওই স্তূপ বাঁচিয়ে নেমে পড়ে সুদত্তাকে নামার সাহায্যকল্পে হাত বাড়াতে যাচ্ছিল সুদত্তা অপর দিক দিয়ে প্রায় লাফিয়ে নেমে পড়ে শাড়ির ধূলো ঝেড়ে নিল। এবং বেশ সতেজ ভাবে এবড়ো খেবড়ো ডিঙিয়ে এদিকে চলে এলো।

প্রবাল মনে মনে হেসে নন্দকেই উদ্দেশ্য করে বলল, পূজো এখনো হয়?

তা হয় দাদাবাবু। বুড়ির গোঁ। বলে বাপের বিষয়টি খাব বসে বসে আর বাপের কুলকম্মোটি পালব না?

হুঁ, তা করে কে?

নন্দর গলায় আবার দার্শনিকতার সুর, ও যাঁর কাজ তিনিই করিয়ে ন্যান। চেরকালের নোকেরা ঠিক ঠাক সময়ে আপন আপন কাজ করতে এসে যায়! তো আসেন, কলকেতা থেকে কেউ কেউ আসেন নেমন্তন্ন খেতে আসার মতন। এই যে ইদিক দিয়ে চলে আসুন। অ্যাখোন পাশদোরই সদর হয়েছে। আসুন, আমি এগুয়ে গিয়ে খপরটা দিইগে—

তুমি আগে প্রথম সম্ভাষণ করোগে যাও—সুদত্তা তার টান টান করে গোঁজা সিল্কের শাড়ির আঁচলটা আলগা করে ছেড়ে দিয়ে রুমালে ঘাড় গলা মুছে নিয়ে বলল, আমি এই বাইরের রকে আছি। তুমি আগে আমার সঠিক পরিচয়টা দিয়ে ডাকবে, তবে যাব।

কিন্তু অতখানি অবকাশ হতভাগ্য প্রবালকে দিচ্ছে কে?

সুদত্তার কথা শেষ হবার আগেই তো চাঁচাছোলা গলায় সোল্লাস বাণী উচ্চারণ করতে করতে বেরিয়ে এসেছেন বিখ্যাত নেবুমাসি।

কইরে পলা কোতায়? দেকি মুখখানা। বলি বে করেচিস তা এই বুড়িকে অ্যাকবার খপরও দিতে নেই?.... তা তোরই বা দোষ কী? টুনু চলে গ্যাচে, তা যাক সতীনক্ষ্মী হাতের নো সিঁতের সিঁদুর নে। অ্যাগে গ্যাচে, ভালই গ্যাছে। কিন্তু জামাই? তোর বাপ? তার কতা একটু মনে পড়ল না? ... না কি অ্যাকোনকার মতন 'লবম্যারেজ' করেচিস? তাই—

পুরুষালী ধরণে হা হা করে হেসে ওঠেন নেবুমাসি। পোশাকী নাম যার শরদিন্দুনিভাননী। এ নামটা আবিষ্কার করেছিল প্রবাল কত যেন বয়েসে। দোতলার বড় ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো ফ্রেমে বাঁধানো একখানা জীর্ণপ্রায় কার্পেটের ছবিতে লতাপাতা মণ্ডিত বর্ডারের মধ্যে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা 'পতি পরম গুরু'। আর তার নীচে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা 'শ্রীমতী শরদিন্দু—নিভাননীদেবী।'

বাবা রে, কত বড় একখানা নাম! প্রবাল লাফাতে লাফাতে নেমে এসে ওই নেবুমাসিকেই জিজ্ঞেস করেছিল, ওপরে ওই কার্পেটের ছবিটা কে করেছে গো নেবুমাসি? শ্রীমতী শরদিন্দুনিভাননী দেবী কে!

নেবুমাসি হেসে উঠেছিলেন হাহা করে। পুরুষালী ভঙ্গীতে। চিরকাল এক ধরণ। তারপর ডাক দিয়ে বলেছিলেন, অ টুনু, তোর ব্যাটার কথা শোন। আমায় শুদোচ্ছে কার্পেটের ছবিতে কার নাম! হ্যাঁ লা, এত কালেও ছেলেকে বলিসনি মাসির নামটা কি।

হ্যাঁ মাসিই বলেছিলেন কারণ শরদিন্দুনিভাননী প্রবালের নিজের মাসি নয়, মায়ের মাসি। তাও নিজের মাসি নয়, বোধ হয় জ্ঞাতি গোছের।

নেবু তো তাঁর মা বাপের সবেধন নীলমণি।

কিন্তু টুনুর জীবনে বাপের বাড়ি বলতে তো এই দৌলতপুরই। প্রবালদেরও তাই মামার বাড়ি বলতে এটাই। ছেলেবেলায় যখন আসত প্রবালরা, আরো অনেক সমবয়সী ছেলেমেয়ে দেখতে পেত, তাদের সঙ্গে কার কি সম্পর্ক সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবার প্রশ্ন ছিল না, খেলাটা উদ্দাম হত, সেটাই মজা।

তা ওই শরদিন্দুনিভাননী অপভ্রংশে 'নেবু' তিনিই ছিলেন সেই অপোগণ্ড বাহিনীর আশ্রয়স্থল। সম্পর্ক যার যা থাকুক, সবক'টাই ওই একই নামে ডাকত। তাদের মায়েরাও।

প্রবাল এই কথার তোড়ের মুখেই প্রণাম করে ফেলে বলে উঠল, তুমি তো দেখছি একটুও বদলাওনি নেবুমাসি। ঠিক যেমন ছিলে তেমনি আছো।

নেবুমাসি তেমনি হাহা করে হেসে উঠে সতেজ গলায় বললেন, বদলাবো কেন? ভদ্দরনোকের অ্যাক কতা। বুজলি? তা তুই মস্তান আসল কতাটি চেপে রেকে চিটি দিছলি কেন? নিকবি তো একা যাচ্চিনে, জোড়ে যাচ্ছি। মহারাণীর উপযুক্তো ব্যবস্তা করতাম। যাক যা করেচিস বেশ করেচিস, দেকাতে যে নিয়ে এলি এই ঢের। এসো ভাই, রাজরাণী হও।

সুদত্তা রুষ্ট মুখে একটা প্রণামের মতো করে কিছু একটা বলতে চেষ্টা করছে দেখে প্রবাল মরীয়া হয়ে বলে উঠল, যা প্রাণ চায় বলে তো চলেছ, যা ভাবছ তা নয় বাবা! নাতবৌ দেখবার কপাল তোমার হয়নি এখনো। এ আমার সঙ্গে পড়ে, পাড়াগাঁ দেখাতে নিয়ে এসেছি।

অ! নেবুমাসি একটু দুষ্টু হাসি হেসে বলেন, বান্দবী? তা ওকেই আমরা হবু বৌ বলি। যাক এনে দেকিয়ে যাবার বুদ্দি হয়েছে তাও ভাল। সত্যি তো আর নেবুমাসি অমর বর নিয়ে পৃথিবীতে আসেনি। যখন বে করবি, তখন হয়তো থাকব না। এসো ভাই। পাড়াগেঁয়ে বুড়ির কতায় কিছু মনে কোরো না। অনেক দিন পরে ছেলেটাকে দেকে প্রাণে বড় আহ্লাদ হল তাই।....

হঠাৎ পাশের দিকে তাকিয়ে ধিক্কারের গলায় বলে উঠলেন নেবুমাসি, কী রে ঢ্যাঙা, তুই যে অমন সঙের মতন দাঁড়িয়ে রইলি? আয় ইদিকে? মুকচোরা লজ্জাবতী! চিরটাকাল অ্যাক রকমে গেল। তোদের ঢ্যাঙা দাদুকে কেমন দেকচিস রে পলা? হাড়বুড়ো হয়ে গেচে না?

ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন এখন। তাকিয়ে দেখল প্রবাল।

হাড়বুড়োর কোন লক্ষণ দেখল না। দিব্যি সোজা সতেজ ঋজুভঙ্গী। গড়নটা একহারা বলেই লম্বাত্বটা চোখে পড়ে। বিশেষের মধ্যে দেখল মাথা ভর্তি চুলগুলোর খাঁজে খাঁজে যে কালোর ছিটে ছিল, সেগুলো সব নির্মল শুভ্র হয়ে উঠে, মাথার ওপর একটা সাদা পশমের টুপির মতো বিরাজ করছে।

প্রবাল এখন সপ্রতিভ হবার চেষ্টা করছে, কারণ খুব গুরুতর একটা কাজ সে করে ফেলেছে, আর সুদত্তার কিছু বলার নেই। যদিও নেবুমাসির পরবর্তী কথাগুলো খুব স্বস্তিদায়ক নয়। তবু প্রবালকে তো আর দোষ দিতে পারবে না সুদত্তা।

তথাপি সুদত্তার দিকে না তাকিয়েই, সরোজমোহনকে, যিনি ঢ্যাঙা নামে অভিহিত, প্রণাম করে বলল, কই, আমি তো তা দেখছি না। দাদুও তো একই রকম রয়েছেন।

সরোজমোহন মৃদু হাস্যে বললেন, ওনার মতন লম্ফঝম্ফ করতে না পারলেই সে হাড়বুড়ো। তো বুড়ো হব নাই বা কেন? আশী বছর বয়েস তো হল।

সরোজমোহনের দাঁত বোধ হয় নতুন বাঁধানো, অতএব প্রকৃতির নিজস্ব মাধুর্যের সঙ্গে বাড়তি ও শুভ্রতার যোগ হয়ে হাসিটি শুভ্রমধুর।

কিন্তু নেবুমাসির তো বাঁধানো দাঁত নয়। নীচের দিকের একটা দাঁতের অনুপস্থিতির শূন্যতা তার প্রমাণ দিচ্ছে। সারি দিয়ে সাজানো এই মুক্তোর মতো দাঁতের পাটিকে এখনো অটুট রেখেছেন নেবুমাসি!

সুদত্তা দেখছিল। নাঃ, বয়েসকালে ছিলেন বটে একখানি।

আচ্ছা, চুলও তো এখনো বারো আনা অংশ কালো। রেশম মসৃণ ঈষৎ কোঁকড়ানো ওই চুলের গোছাও অবাক করে সুদত্তাকে। এই পরিবেশে, এই বয়েসে মহিলা নিশ্চয় চুলে কলপ দেননি। কে জানে বয়েস কত। ওই বুড়ো ভদ্রলোককে তো তুই তুই করছেন। কোন সম্পর্কে?

এতক্ষণের বিরক্ত বেজার মনটা হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে উঠল। তাছাড়া আর প্রবালের ওপর রাগ রাখা উচিত নয়। ওর পক্ষে যথেষ্ট করেছে। আমাকেই ফ্রী হতে হবে। সুদত্তা এগিয়ে এসে সরোজমোহনকে প্রণাম করে উঠল, গাড়া—গাঁ আমার দেখা হয়নি কখনো, তাই চলে এলাম।

বেশ করেছ দিদি! নাম কি?

সুদত্তা। সুদত্তা মুখার্জি। বলেই দুষ্টু হাসি হেসে বলল, আপনার নাম তো জেনেই ফেললাম। ঢ্যাঙা। তাই না?

সরোজমোহন হেসে উঠলেন হো হো করে।

হাসল সকলেই। সুদত্তা আরো একবার ওই মুক্তোর সারি দেখে নিঃসংশয় হল। নাঃ, বাঁধানো নয়। বাস্তবিকই কালে রীতিমত রূপসী ছিলেন। কিন্তু জীবনের কী অপচয়! কী অপচয়!

হাসি থামিয়ে নেবুমাসি ঠোঁটে একটি অপরূপ ভঙ্গী করে বলে উঠলেন, হ্যাঁ, এখন তো শুদু নাম জেনে ফেলেচ। রূপও দেখলে। এরপর গুণ বুঝবে।

ঢ্যাঙা অবলীলায় বললেন, তোর গুণ ছাপিয়ে চোখ অন্যত্র যাবার অবকাশ পেলে তো বুঝবে! বলি এদের এখানে দাঁড় করিয়ে রেখে শুধু বাকতাল্লা মারবি? এসো তো ভাই তোমরা। সুখীর মা, ভেতর বাড়ির নাইবার ঘরের চৌবাচ্চাটা চটপট ভরে দাও তো। আর তোমার সুখীকে ডেকে দিয়ে যাও, এই দিদিমণিকে কোথায় কি রাখবে দেখিয়ে দিতে।

ওঃ খুব হে কত্তব্যগ্যান! নোক দেকিয়ে আর বাহাদুরী দেকাতে আসিসনে ঢ্যাঙা। তোকে আর ও সব ব্যবস্তায় নাক গলাতে হবে না। ... এসো ভাই আমার সঙ্গে .... ইয়ে, কি যেন নাম বললে?

সুদত্তা।

কী বললে? সু—

দত্তা। সুদত্তা।

সু—দ—ত্তা। তা এ নামের মানে কী রে পলা?

প্রবাল গম্ভীর গলা করে বলল, এ নিয়ে কোন দিন মাথা ঘামিয়ে দেখিনি।

শোনো কতা! যা বলে ডাকচি, তার মানেটা কি সেটা ভাবতে হবে না?

আবার কথা? ঢ্যাঙা তেড়ে ওঠেন, ছেলে মেয়ে দুটোকে হাত—মুখ ধুতে দিতে হবে না? চা—টা খাবে না? এখন পুঁথি খুলে বসল, নামের মানে কী? বলি তোর নামটারই বা মানে কি? বোঝা ওদের।

নেবু মাসি ঝঙ্কার দিয়ে হেসে উঠলেন, ওর আবার বোজবার কী আছে? নেবু মানে জানে না? তবে হ্যাঁ, কি নেবু, সেটা অ্যাকটা কতা! তা বাপু কাগজি নয়, গন্ধরাজ নয়, পাতিও নয়, একেবারে মোক্ষম মান—গোঁড়া নেবুই। টকের জ্বালায় ভূত পালায়।

নেবুই বুঝি তোর নাম? ঢ্যাঙা প্রায় খেঁকিয়েই উঠলেন, আসল নাম নেই?

আসল নাম!.... শোনো কতা! জম্মো গেল নেবু নামে, এখন আসল নামের খোঁজ। সে নাম তাঁবাদি হয়ে গ্যাচে।

সুদত্তা ঈষৎ হেসে বলল, তা কেন? আপনার আসল নাম আমি জানি। তার মানেও জানি। এখন প্রমাণও পেলাম যাঁরা নাম রেখেছিলেন, তাঁরা বাজে কথার মানুষ ছিলেন না।

ও বাবা, মেয়ের তো খুব কতার বাঁদুনি। চল বাছা, চল।

নেবু মাসি ওকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, থমকাতে হল। বাইরে সাইকেলের কিড়িং কিড়িং শব্দ জানান দিল সেই লাল শার্টের আবির্ভাব ঘটল।

নেবুমাসি গলা তুলে বললেন, কে বাচ্চু? তা পেলি কিচু? না বিরিঞ্চি মুখপোড়া এখনো ঝাঁপ বন্দ করে ঘুম মারচিলো?

বাচ্চু ইঁট—পাটকেল বাঁচিয়ে সাইকেলটাকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে এগিয়ে নিয়ে বাড়ির ভেতর উঠোনে ঢুকল। তার সাইকেলের দু'হ্যাণ্ডেলে দুটো বড় সড় মাটির হাঁড়ি ঝোলানো। আর পিছনে ক্যারিয়ারে একটা পদ্মপাতা ঢাকা চ্যাঙারি।

নামাবো কোথায় এগুলো?

নেবুমাসি চড়া গলায় বললেন, নতুন হসনে বাচ্চু! জুতো খোল,, দালানে ঢুকে যা। বেঞ্চের ওপর বসিয়ে রাক। রেকেই যেন বাইসাইকেল উড়িয়ে হাওয়া হয়ে যাসনে। চা হলে গিলে তবে যাবি।

বাচ্চু বলল, সে আপনি না বললেও থাকতাম। মিষ্টি—মাষ্টি এনে রাখলাম, কচুরি এখনো ভাজেনি। কড়া চাপা করিয়ে তবে এলাম। যাব আবার একটু বাদে।

প্রবাল এতক্ষণ উঠোনের চারধার ঘুরে ফিরে গাছপালা বেড়া ইঁদারাটা, বাড়ির ভগ্নদশা দেখছিল, এখন বলল, এত সবের কি দরকার? বাড়িতে কি রাক্ষস এসেছে? যা মাল তোমার ওই হ্যাণ্ডেলে ঝুলিয়ে নিয়ে এলে তা তো দশ কুড়ি জনের মতো।

পোড়া কতা কসনে পলা। কলকেতয় থেকে থেকে খুব কলকেত্তাই হয়েচিস। কলকেতার নোক তো নিখাগী! ছাড় ও সব কায়দা। এই দৌলতপুরের ছানার জিলিপি কী ভালোই বাসতিস! মনে আচে—যকন তকন বলতিস, এত সব কুটনো তরকারি ভাত—ডাল করে কি হয় নেবুমাসি? শুদু ছানার জিলিপি খেয়ে থাকলেই তো হয়।

বলতাম বুঝি? প্রবাল হেসে ওঠে। এখন তো আমার ওই মিষ্টি—ফিষ্টি বেশী দেখলে ভয় লাগে।

তা নাগবে বৈ কি। শহুরে হয়েছিস তো! আচ্চা, আমার হাতে পড় না, দেখব অখন। সুখীর মা চায়ের জল চাপা। সু—সুদত্তা এসো ভাই। পলা, তোকেও কি দেকিয়ে দিতে হবে?

ঢ্যাঙা বললেন, তা হবে না? আগের মতো সব আছে? বারবাড়ি তো জবাব দিয়েছে। বাচ্চু দাদাবাবুকে নতুন দিকে টিউবওয়েলের ধারে নিয়ে যা।

বাড়ির বাইরের চেহারা দেখে ধারণা করা সম্ভব হয়নি ভিতরে এমন একখানি মনোরম দৃশ্য দেখতে পাওয়া যাবে।

দোতলায় বারান্দায় চায়ের আসরে এসে অবাক হয়ে গেল সুদত্তা। ইতিপূর্বে অবাক হয়েছে দোতলার চওড়া দালানের ধারের সারি সারি ঘর দেখে। বৃহৎ বৃহৎ শার্সি খড়খড়ি সম্বলিত জানালা দরজা বহুল প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সব ঘর, তালা চাবি খুলে দেখিয়েছেন নেবুমাসি। চাবির গোছা অবশ্য সুখীর মা'র হাতে।

দরজায় দরজায় লাগানো ভারী তালাগুলো খুলে খুলে দেখাবার কাজটা তার। নেবুমাসি আছেন সঙ্গে সঙ্গে। ঘরে ঘরে পুরনো আমলের আসবাবপত্রও আছে অনেক।

এই সব ঘর দোরে আগে লোক ধরত না। একন মানুষ বিহনে পড়ে আচে। নেবুমাসি আক্ষেপের গলায় বলেন, কাকাদের ছেলেপুলে নাকি কলকেতায় অ্যাতোটুকুন ফেলাটে অ্যাতো অ্যাতো টাকা ভাড়া দে বাস করচে।

সুদত্তা ইতিমধ্যেই বেশ সহজ হয়ে উঠেছে। সে হেসে বলে, এই বাড়িটা যদি উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে কলকাতায় বসিয়ে ফেলতে পারতেন, কত লাখ টাকা যে দাম হত কে জানে। উঃ, ভাবা যায় না যে এক সময় এখানে লোক ধরত না।

সেই তো। নেবুমাসি বললেন, এ সব দেকে দেকে ভাবতে বসলে মনে হয় কত কাল পৃথিবীতে এয়েচি। নচেৎ—মনেও পড়ে না এতখানি বয়েস হল। ছোটকালে যখন শুনতুম কারুর আশী বছর বয়েস মনে হত ও বাবা! একনো বেঁচে আচে কী করে। হাটচে চলচে খাচ্চে দাচ্চে কেমন করে? এখন তাই ভেবে হাসি পায়। অনুমানে দেকি, সেই তো সক্কাল হলেই ওই বাঁশজাড়ের ওধার থেকে সূয্যি উঁকি মারে, সন্দেয় ওই দত্তবাড়ির চিলেকোটার পিছনে ডুব মারে, সেই তো বোশেকে বোশেকী ফুলে বাগান ভরে যায়, বর্ষায় কদম গাচে ফুল ধরে। শীতে গ্যাঁদা গাচ সোনা ঢালে। শীতের পর বসন্ত আর বসন্তর পর গ্রীষ্মি বর্ষা আসে।.... কোতা দিয়ে যে অ্যাতোগুলো দিন কেটে গেল ভগবান জানে।

সুদত্তা অবাক হয়ে তাকায়।

নেবুমাসির পরণে ধবধবে ফর্সা মিহি থান আর ধবধবে ফর্সা মিহি সেমিজ। নেবুমাসির ঈষৎ কোঁকড়া কাঁচা পাকা খাটো চুলের গোছা রেশমের মসৃণতা নিয়ে ছড়িয়ে আছে মুখের পাশে কাঁধে ঘাড়ে। আর নেবুমাসির চোখে অধুনা দুর্লভ সোনার ফ্রেমে বাঁধানো চশমা। নেবুমাসির কাঁচা হলুদ রঙা মুখে পাতলা টিকটিকে নাকের ওপর এই পুরনো স্টাইলের চশমাখানাই যেন ঠিক। এ ছাড়া আর কিছু মানাতো বলে মনে হচ্ছে না।

সুদত্তার হঠাৎ মনে হল, অভিজাত চেহারা বলে যে একটা শব্দ আছে, সেটার মানে পাচ্ছি। অথচ—

হ্যাঁ, অথচ একটা আছে। কথাবার্তায় তো স্রেফ গ্রাম্যভঙ্গী।

নইলে বাচ্চু নামের ছেলেটাকে খেতে দিয়ে—তুই শুদ্দু যদি আর দিও না আর দিও না করিস বাচ্চু তো তোর হাড় একঠাঁই মাস একঠাঁই করব।

বাচ্চু তার সামনে পদ্মপাতায় রক্ষিত একরাশ মুড়ির সঙ্গে বেশ কিছু কচুরি মিহিদানা ছানার জিলিপি আর গজার মুখোমুখি বসে করুণ স্বরে বলেছে, আমাদের বাপ ঠাকুদ্দার মতন খাবার ক্ষ্যামতা কি আর আছে ঠাকুমা? ঠাকুদ্দা তো শুনি আপনাদের পুরনো বাগানের ঢাকাই কাঁঠালের গাছের একটা আস্ত কাঁঠাল একাই খেত! সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই। আপনি একদিন দিচ্ছেন তাই, নইলে আমাদের এ যুগে না খেয়ে খেয়ে পেটের খোলা শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে।

নেবুমাসি আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, সরোজমোহন বলে ওঠেন, সেই রাম অযোধ্যা যে আর নেই, এ কথা তোদের ঠাকুমা মানতে রাজী নয় রে বাচ্চু।

তবে আর কি, তুইও ওদের দেকাদেকি বলতে বোস আর দিও না অত দিও না। আজ আমার পলা এয়েচে, কত আল্লাদের দিন। আয় রে, তোরা বোস।

খালি খালি ঘরগুলো দেখে মনটা কেমন এক রকম বিষণ্ণ বিষণ্ণ লাগছিল সুদত্তার, এই চা খাবার বারান্দায় এসে যেন মনটা একটা আনন্দের স্বাদে ভরে গেল।

জীর্ণদশাগ্রস্ত হলেও জোড়া জোড়া থামের মধ্যে মধ্যে রেলিঙে লাইন ঘেরা মার্বেল মোড়া বারান্দাটা যেন একটা অপ্রত্যাশিত দৃশ্য।

চায়ের টেবিলও অভিনব। মাটিতে শতরঞ্জ পাতা, আর তার ওপরে কারুকার্য করা কাঠের পায়াদার পাথরের টপ বসানো নীচু নীচু চারটে চৌকী ঈষৎ দূরে দূরে। তার ওপরেই চা খাবার রক্ষিত।

সুদত্তা মোহিত কণ্ঠে বলে ওঠে, কী চমৎকার! চা খাবার জন্যে এমন সুন্দর জিনিস! দেখিনি কখনো।

নেবুমাসি হেসে ওঠেন, চা খাবার জন্যেই বটে! যে কালে এ সব বানানো হয়েচিল, তখন চায়ের পাট ছিল না কি? ছেলেদের পড়তে বসার জন্যে দশখানা করিয়ে রেকেছিলেন, বাবা বলতেন মাদুরে বই শেলেট রেকে ঘাড় গুঁজে বসে নেকাপড়া করলে পিটের শিরদাঁড়া বেঁকে যায়। এতে খাড়া থাকবে।

প্রবাল ঢ্যাঙা দাদুর সঙ্গে বারান্দার রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে মৃদু গলায় কী আলোচনা করছে, তাকিয়ে দেখল সুদত্তা। পড়ন্ত বেলায় আলো পড়ে ঝকঝক করছে ওর মুখটা। হওয়াই স্বাভাবিক। রূপ আছে যৌবন আছে।

কিন্তু ওই বৃদ্ধের মুখটাও সে আলোয় এমন ঝকঝক করছে কী করে? যেন একটা অলৌকিক মাধুর্যের আভা এসে পড়েছে দুজনারই মুখে। কিসের আলোচনা হচ্ছে?

সুদত্তা বলল, আচ্ছা, এরা তো শুনছি মাঝে মাঝে মামার বাড়ি আসত, আর আপনি আপনার মা বাবার একমাত্র মেয়ে, তাহলে এত সব ছেলেমেয়ে কারা?

এই দ্যাকো, 'মেয়ে' আবার কখন বললাম গো। মেয়েরা বসবে শিরদাঁড়া খাড়া করে টুল নিয়ে পড়তে? ছেলে। সবই ছেলে। যত জ্ঞাতিগুষ্টির ছেলের পাল। বাবার আমার যে সদাব্রতর ব্রত। নিজের একটা মাত্তর সন্তান তাও মেয়ে সন্তান। কপাল—ক্রমে বাপের ঘর আগলে বসে আছি। নচেৎ তো পরঘরী হয়ে যাবার কতা। লাহিড়ী বংশের কুলপিদ্দিমদের মানুষ করতে হবে না? তাছাড়া আমার নিজের কাকা ছিল দুজন, তাদের ছেলেরা।... সবক'টাকে পড়িয়েছেন বাবা, সব মেয়েগুলোর বে দিয়েছেল। যেমন তেমন করেও দেননি, ঘটাপটাই করেচেন মোটামুটি। তবে কি আর আমার বে—র মতন?

পুরুষ দুজন রেলিঙের ধার ছেড়ে চায়ের সেই অভিনব টেবিলের ধারে বসেছে আসন পিঁড়ি হয়ে, শেষ সূর্যের আলো এসে পড়েছে একটা খিলেনের মধ্যে দিয়ে। সকলের মুখেই কনে দেখা আলো।

নেবুমাসির সেই শানানো গলা খানিকটা খাদে নামা। মুখে স্মৃতি রোমন্থনের পরিতৃপ্তির ছাপ।

বয়েস তখন দশ, জগৎপুরের রাজবাড়ি থেকে সম্বন্ধ এল। কোতা থেকে কার মুখে নাকি শুনেচে দৌলতপুরের লাহিড়ীবাড়িতে এক রূপের ধ্বজা মেয়ে আচে বে'র যুগ্যি—পাটিয়ে বসল ঘটকী। বাবা তাকে কুটুমের মতন আদর যত্ন করলেন, একজোড়া কাপড় আর সিদে দিয়ে বিদেয় দিলেন, কিন্তু বিয়ের মত দিলেন না। রাজবাড়িতে মেয়ে দেওয়া মানে মেয়েকে জন্মের শোদ বিলিয়ে দেওয়া। জামাই—মেয়ে নিয়ে আদর আহ্লাদ করতে পারব না, মেয়েকে ইচ্ছে মতন আনা নেওয়া করতে পারব না, একটা সন্তান, মায়ের প্রাণ বোধ মানচে না। মায়ের দোহাই—ই দিলেন ভদ্দরতার দায়ে।... ঘটকী না কি হেসে বলেছিল, তার মানে ঘরজামাই রাকতে মন? বাবা বলেছিলেন, তা ককখোনো না। ঘরজামাইয়ে আমার ছেদ্দা নেই। কথায় বলে, কালো বামুন কটা শুদ্দর বেঁটে মোছলমান, ঘরজামাই আর পুষ্যিপুত্তুর সবকটা সমান।

হঠাৎ ঢ্যাঙা বলে ওঠেন, তা আমিও তো কালো বামুন—আমাকেও ওই দলে ফেলছিস তো?

নেবুমাসি ঝঙ্কার দিয়ে ওঠেন, তোর আবার বেশি বেশি বিনয় ঢ্যাঙা। তুই আবার কালো কোতা? এখনই দিন দিন পোড়াকাটের মতন হয়ে যাচ্ছিস। ছোটকাল দিব্যি ঘিওলো ঘিওলো রং ছিল। বাতিকে বাতিকেই গেলি তুই। দুধ খাব না, ঘি খাব না, অধিক মিষ্টি খাব না—এতে কি আর চেহারায় শরীরে লাবণ্য থাকে?

ঢ্যাঙা চড়া গলায় বলেন, খাব না বললেই রেহাই দিস যে? জোর করে খাইয়ে খাইয়ে আমাশার ধাত জম্মিয়ে দিলি। আশী বছরের বুড়োর চেহারায় আবার লাবণ্য।

নেবুমাসি তেড়ে উঠলেন, সেই ইস্তক আশী বচর আশী বচর করচিস ক্যানরে ঢ্যাঙা? বলি, আমি বড় না তুই বড়?

ওঃ, ভারী তো বড়! তিন মাসের বড়, তার আবার বড়াই!

তিন মাস নয়, সাড়ে তিন মাস। নেবুমাসি দৃঢ় গলায় বলেন, আমি আশ্বিনের পয়লা, আর তুই পৌষের মাঝামাঝি। তা যে যাই হোক, বড় বৈ তো ছোট নয়? তবে আমার আশী না হতেই তোর আশী হয় কী করে?

তোরই বা হতে কতক্ষণ?

নেবুমাসী আরো দৃঢ় গলায় বললেন, যতোক্ষণ না সামনের আশ্বিন আসবে, ততক্ষণ?... হচ্ছিল লাহিড়ীবাড়ির সবধেন নীলমণি মেয়ের বিয়ের ঘটার গপপো, দিলি তো ভণ্ডুল করে? দিবি বৈকি! হিংসের জ্বালা! নিজের তো ও গুড়ে বালি! তা বুঝলে বাছা—আঃ তোমার নামটি বাপু কেমন যেন পেটে আসে মুখে আসে না। বলি ডাক—নাম নেই?

সুদত্তা কিছু বলার আগে প্রবাল বলে ওঠে, আছে। জানি।

সুদত্তা রেগে বলল, আছে! জানো? কোথা থেকে জেনেছ শুনি?

কোথা থেকে? নাঃ সোর্সটা বলব না, তবে জেনেছি—বলি?

না বলে ছাড়বে ভেবে কি আর প্রসঙ্গটা তুলেছ?

রেগে যাচ্ছ মনে হচ্ছে। তবে থাক।

সুদত্তা বলল, থাক—এর কিছু নেই। মা বাবা খুকু বলে ডাকে। একেই যদি ডাক নাম বলতে চাও বল।

খুকু! নেবুমাসি এক গাল হেসে বললেন, আহা, এমন মিষ্টি নামটি থাকতে আমি হোঁচট খেয়ে মরচি! তা বুজলে বাছা খুকু! আমার বাবা ওর বে দেবার জন্যে কম ব্যস্ত হননি, কিন্তু বাবুর এক গোঁ, ঘর নেই বাড়ি নেই বৌ এনে রাকবো কোতায়।.... বাবা শেষ অবদি রেগেই গেলেন, বললেন, অ্যাতো বড় বাড়িখানায় তোর একটা বৌয়ের জায়গা হবে না? তবু গোঁ ছাড়ল না। নিজের পায়ে দাঁড়াব বলে কোতায় যেন চলে গিয়ে কত দিন কাটিয়ে এলো। .... তারপর বাবার মৃত্যুকালে বাবা—

সরোজমোহন রেগে বললেন, হচ্ছিল জমিদার কন্যে শরদিন্দু—নিভাননীর বিয়ের ঘটার গল্প, তার মধ্যিখানে এ হতভাগার জীবন কাহিনী ফাঁদতে বসছিস কেন? হ্যাঁ, ঘটা একখানা হয়েছিল বটে। ...... পলা তোরা ছোটবেলায় সে কাহিনী শুনেও থাকবি।

অসতর্কে নিজেই তিনি গল্পের খেই হাতে তুলে নিয়ে বসলেন। এবং চালিয়েও গেলেন। অবশ্য নির্বিঘ্নে নয়। প্রতি ধাপে প্রতিবাদের ধাক্কা খেতে খেতে।

তবু প্রবালের শোনা গল্প আবার ঝালানো হল আর খুকুরও শোনা হল—

নেবুমাসির বিয়েতে নাকি সেই পাকা দেখার দিন থেকে বিয়ের অষ্টমঙ্গলা পর্যন্ত রোজ দুবেলা যজ্ঞি চলেছিল। পাকা দেখা উপলক্ষে দিক দিগন্তর থেকে যত আত্মীয় কুটম্ব এসেছিল, শশাঙ্ক লাহিড়ী তাদের আর ফিরে যেতে দেননি, আটকে ফেলেছিলেন। এক মাসের আগে আগে ছাড়েননি।

শ্রোতারা বলে ওঠে, চমৎকার। তিনি না হয় আটকে ফেললেন, লোকেরাও আটকে গেল? কাজ ছিল না কারুর?

তা একেবারেই ছিল না কি? ছিল। তবে তখনকার মানুষের এই এ যুগের নূতন এমন কাজ কাজ বাতিক ছিল না। থাকুক কাজ, তা বলে মান্যিমান একটা লোকের অনুরোধ অগ্রাহ্য করবে? শশাঙ্ক লাহিড়ী সবাইকে হাত জোড় করে বলেছিলেন না—আমার জীবনে এই একটাই কাজ! এই প্রথম, এই শেষ! হবে না হবে না করে সাত ঠাকুরের দ্বোর ধরে বুড়ো বয়সে এই মেয়ে। প্রাণ ভরে সাধ আহ্লাদ করব এই বাসনা।

তবে? এমন একটা আবেগময় অনুরোধের সামনেও লোকে নিজের কাজ দেখাবে? যাদের আপিস ইস্কুল, তারা কামাই করবে। চুকে গেল সমস্যা। তাছাড়া আসল কাজটি তো সমাধা হবে।

শ'দুই লোক বাড়িতেই ছিল, এ বাড়ি, কাছারী বাড়ি, জ্ঞাতিদের বাড়ি সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তবে খাবার ব্যবস্থা এইখানে। বিরাট বিরাট দুটো চালা বানানো হয়েছিল, একটা মেয়েদের একটা পুরুষের। তাতে সকাল থেকে রাত অবধি পাত পড়ার বিরাম নেই। জনা দশ কাজের লোক মোতায়েন ছিল সারাক্ষণ পাতা ফেলতে আর পাতা পাততে।

এখানে ঠিকরে উঠেছিলেন নেবুমাসি, হাঁদার মতন কতা বলিসনে ঢ্যাঙা। যারা পাত ফেলছিল, তারাই পাত পাতছিল? বলি এ বাড়িতে এমন মেলেচ্ছ কাণ্ড কবে দেকেচিস? পাত পেতেচে স্বজাতির মেয়ে পুরুষে।

তোর তো বিয়ে, তুই সব দেকতে গিয়েছিলি?

না যাই। জ্ঞানগম্যি তো আচে একটা! গোয়াড়ি না হাঁসখালি কোতা থেকে যেন এক কুড়ি হালুইকরকে এনে স্থাপনা করিয়ে রাকা হয়েচিল, তারা কি ঘোড়ার ঘাস কাটচিল?

তবে তুইই বল।

কেন, এটুকু বলতেই তোর মুক ব্যথা হয়ে গেল? তো আমিই বলচি। বুঝলে খুকু, ওই ওদিককার মাঠে চালা তুলে জোল কেটে উনুনই বানানো হয়েছিল আটটা দশটা।

আটটা দশটা? তবে তো খুব বললি। এদিকে জলপানির দিকে আরো চারটে উনুন কাটা হয়নি? ফি দিন সক্কাল না হতেই ঝোড়া ঝোড়া কলাই ডালের বোঁদে ভাজা হচ্ছিল না? তার সঙ্গে ঝুড়ি ঝুড়ি খাস্তা নিমকি?

হ্যাঁ সে খবর তো তোরই বেশী জানবার কতা—নেবুমাসি হি হি করে হেসে উঠলেন, সেইখানেই তো পড়ে থাকতিস সকাল থেকে!

অকৃতজ্ঞতা করিসনে নেবু, শালপাতার ঠোঙা বানিয়ে বানিয়ে চুপি চুপি সাপ্লাই করা হত না তোর কাছে? বুঝলি পলা, বিয়ের দিন সকালে নিমকি খাব বলে কি ঝুলোঝুলি! বলে কিনা শেষ রাত্তিরে খানিকটা দই চিঁড়ে গিলিয়ে গেল, আমার গা কেমন করছে?।... দোহাই ঢ্যাঙা, দু'চারখানা নিমকি এনে দে চুপি চুপি। যা সুবাস ছাড়ছে। ওই মাঠে কড়া চাপিয়েছে, এখানে ঘিয়ের গন্ধ ভেসে আসছে। কোথা থেকে যেন ঘি আনিয়েছে।

ওঁদের কথার ভঙ্গী শুনলে মনে হতে পারে, ঘটনাটা বুঝি এখনই ঘটছে। সত্যিই বুঝি সেই কোথা থেকে আনানো ভালো গিয়ের গন্ধ ভেসে আসছে।

থাক, ওই নিয়ে আবার অত বিশদ কিসের রে ঢ্যাঙা? দিয়েছিলি?

বাঃ! সেদিন না তোর উপোস করার কথা! দিয়ে অমঙ্গল করি আর কি!

আহা, না দিয়েও কি মঙ্গলের বাহার! হেসে গড়িয়ে পড়লেন নেবুমাসি, বচর না ঘুরতেই তো ঘরের মাল ঘরে ফিরে এলো।

এলো, সে বিধাতার লিখন। কিন্তু তখন তো আর সে বুদ্ধি হয়নি। নির্ঘাৎ মনে হত বিয়ের দিন খেয়েই এই কাণ্ডটি হল। আর নিজেকে মহাপাপী ভেবে—ঢ্যাঙা হাসলেন। চিরদিনের মজ্জাগত কুসংস্কার। ছেলে বুদ্ধি! কেবল মনে হয়েছে নিশ্চয় কোথাও কোন দোষত্রুটি ঘটেছে।

নেবু ঝঙ্কার দিলেন, ছেলেবুদ্ধি আবার কী? বুড়ো বুদ্ধিতেও তো ওই কথা বলছে। কেউ বলল, রাজার মুখের ওপর না করায় অপমানে শাপ দিয়েছে রাজা তাই এই দশা। দ্বিরাগমন না হতেই কপাল পুড়ল মেয়ের। হি হি হি, আমার কিন্তু তখন কি মনে হয়েছিল জানিস রে পলা, বাঁচলাম বাবা। আর শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে না।

চমৎকার! এদিকে তো কার্পেটে 'পতি পরম গুরু' ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।

ও মা! শোন কতা? সে তো একটা শিল্পকাজ শিকচি বলে। ঘরে গুণে গুণে বুনলেই তো কতাটা নেকা হয়ে যায়। 'বন্দেমাতরম' ছিল 'জননী জন্মভূমিশ্চ' ছিল। যে যেমন প্যাটার্ণ ধরেছিল। আমি ওটা নিয়েছিলাম সোজা বলে। তা হটাৎ যকন খবরটা এলো, পিসি চেঁচিয়ে উঠে ছুটে এসে বলল, 'ওরে নেবু, তুই এখানে প্যায়রা গাছে চড়ে বসে আছিস। তোর যে কপাল পুড়ল।' শুনে চমকে গিয়ে তাড়াতাড়ি কপালে হাত দিয়ে দেকচি আগুনের ধারে কাচে আসিনি, পুড়ল কি করে! অবিশ্যি সেকালের তুলনায় আমি কিছু খুকী ছিলাম না, কিন্তু ববরাবরই ডাকাবুকো ছিলাম, আর যত বেটাছেলের মতন খেলায় হুড়িয়ে বেড়াতাম, তাই মেয়েলি কথা বেশী শিখিনি তখনো। তা আমার সকল ডানপিটেমির আজ্ঞাবাহী ছিল ঢ্যাঙা।

আকাশের আলো কখন বিদায় নিয়েছে, কখন কোন ফাঁকে কে যেন একটা হ্যারিকেন জ্বেলে বসিয়ে রেখে গেছে—খেয়াল নেই কারো। চলছে এই ভাবেই। দীর্ঘ দিন পরে দুটো সহিষ্ণু শ্রোতা পেয়ে যেন স্থানকালপাত্র হারিয়ে ফেলেছে মানুষ দুটো। হারিয়ে ফেলেছে বয়েসের ভার।

সুদত্তা অবাক হয়ে দেখছে, একশোবার বাদ প্রতিবাদ চালালেও, গল্পও এরা এমন ভাবে চালাচ্ছে, যেন এই ক'দিন আগের ঘটনা।

প্রবাল অবশ্য হেসে হেসে বলেছে, কি সুদত্তা, কেমন গল্প শুনছ? এক যে রাজা, 'থামনা দাদা! রাজা নয় সে রাজপেয়াদা' মনে পড়ে যাচ্ছে না?

সুদত্তা হাসল, কিন্তু সে হাসি কৌতুকের মাটিতে দাঁড়িয়ে নয়, কেমন যেন অন্যমনস্ক ভাবে।

প্রবাল বলল, কি যেন ভাবছ মনে হচ্ছে?

হুঁ ভাবছি।

কী?

নিজেও এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না।

আমি বুঝতে পারছি।

তাই বুঝি?

হুঁ। ভাবছ তো, এই ভাবে এরা জীবনটা কাটাচ্ছে কী করে? আর কেনই বা কাটাচ্ছে।

সুদত্তা একটু হাসল। বালকের কথায় বিজ্ঞরা যেমন হাসে।

এভাবে হাসলে যে?

এমনি।

আমার ব্যাখ্যাটা অর্বাচীনের মতো লাগল মনে হচ্ছে?

আচ্ছা থাক।

খেতে বসে তিনজনেই রেকাবির মিষ্টি আলাদা থালায় তুলে রেখেছিল, বাদে নেবুমাসি। এখনকার ছেলেমেয়েদের খাওয়া নিয়ে ধিক্কার দিয়েছেন নেবুমাসি, এবং অধিকতর ধিক্কার দিয়েছেন তৃতীয় ব্যক্তিটিকে। আধুনিকদের দেখাদেখিই যে ঢ্যাঙার এমন অধঃপতন, সেটি সরবে ঘোষণা করে। নিজে নিষ্ঠার সঙ্গে চারখানা ছানার জিলিপি, দুটো কাঁচাগোল্লা, দুটো খাস্তা গজা ও খানকয়েক হিংয়ের কচুরি সহযোগে চা খেয়ে বাড়তিগুলো ঘরে তুলতে গেছেন। ঢ্যাঙা গেছেন তাঁকে আলো ধরতে। আলো অবশ্য আধুনিকতার পাপে কলঙ্কিত টর্চ।

এই অবকাশে এরা কথা বলে নিচ্ছে।

প্রবাল সুদত্তার হাতটা একটু ছুঁয়ে বলল, ভাবছি এঁদের ভ্রান্তি নিরসন না করলেই বা কি ক্ষতি ছিল?

তার মানে?

মানে হচ্ছে, ইয়ে আর কি, নন্দর ধারণা মতো থাকলে মন্দ কি হত? আমাদের একটু নিজস্ব গল্প—টল্প করার সুযোগ সুবিধে জুটত। নেবুমাসির বিচক্ষণতা আমাদের সাহায্য করত। তা তুমি যা না খেপচুরিয়াস হয়ে উঠলে।

ওঃ। তুমি বলছ, সেই অসভ্যতাটা চালিয়ে যাওয়াই ঠিক ছিল?

ওই আর কি! মানে ক্ষতিটা আর এমন কি হত!

থামো! শেষ পর্যন্ত জল কোথায় পৌঁছত তা খেয়াল আছে?

প্রবাল মাথা চুলকে বলল, সেটা কোন ভাবে ম্যানেজ করা যেত না? ধর আমি আবদার করে বললাম, ঢ্যাঙাদাদু, আজ তোমার সঙ্গে আমি একঘরে শোব, গল্প—টল্প করব।

আজ! তা বেশ! কাল? পর্শু? তর্সু?

আচ্ছা আচ্ছা, ভুল হয়েছে। তুমি অমন অগ্নিমূর্তি হয়ো না। বসে বসে সত্তর বছর আগের এক বিয়ের ঘটা—পটার গল্প শোন। যা দেখছি, সেই রাজসূয় যজ্ঞে কোন দিন কী রান্না হয়েছিল তাও শুনতে হবে আমাদের।

সুদত্তা বলল, হোক না। সেটাই বা মন্দ কী? এও তো এক ধরণের ইতিহাস। শতবর্ষ পূর্বের বাঙালীর সমাজজীবনের ইতিহাস।

তুমি যে এমন হার্টলেস, আগে অনুভব করিনি।

অথচ তুমিই আমার কাছে তোমার নেবুমাসির গল্প করেছ।

সে আলাদা! এখন ওই দুই বুড়ো—বুড়ির বোকার মতো ঝগড়া দেখে—

থামতে হল। কারণ অভিযুক্ত আসামী যুগল সেই একই অপরাধ করতে করতে এসে পড়ল।

তোর ক্ষুরে আমি নমস্কার করি ঢ্যাঙা। বাচ্চুকে মাংস আনার কতা বলে রাকতে ভুলে গেলি? ও কি আর ভোর সকালে আসবে? হয়তো বেলায় অ্যাকেবারে মাচ নিয়েই চলে আসবে। এরা এয়েচে—শুধু মাচ দিয়েই চালাবার মতলব, কেমন?

প্রবাল তাড়াতাড়ি বলল, ওই মাছই তো ভালো নেবুমাসি। আবার মাংস—ফাংস কেন? ওখানে তো কেবলই ওই খাওয়া হয়। বরং তোমার ঘরের সেই সব ঘণ্ট নাকি, আর পোস্তর বড়া, ছেলেবেলায় যেগুলোয় দারুণ আকর্ষণ ছিল—সেই কর না।

নেবুমাসি হেসে উঠে বললেন, সে সব থেকেই কি আর বঞ্চিত হবি? শহুরে নাতনীকে কি আমি মোচার ঘণ্ট, গুঁড়ো মশলার সুক্তো, বড়িপোস্ত না খাইয়ে ছাড়ব? তবে শুধু তাই দিয়েই কাজ সারব নাকি? সকালে মাচ ভাত, পাঁচটা বেঞ্জন হোক, রাত্তিরে নুচি মাংস, পায়েস, মিষ্টি—

নেবুমাসি, তোমার রান্নাঘরের বারোমাসের অতিথি হয়ে থেকে যাব না কি? যা লোভ দেখাচ্ছ।

আহা রে। সবাই অমন বলে। বেণুও সেবার এসে বলেছিল, দৌলতপুরে এখনো যা দৌলতের নমুনো দেকচি, থেকে যেতে ইচ্ছে করচে। ওই দু—চার দিনই ভালো লাগে রে। কাজের তাড়ায় ছুট ছুট।

ওইতো! 'কাজ' বলে একটা কড়া মনিব আছে। সে যাক, তুমি আর ওই মাংস—টাংসর জন্যে লোক ছুটিও না।

নেবুমাসি আত্মস্থ গলায় বললেন, ছোটাতে বাকি আচে নাকি? ঢ্যাঙা চলে গেল দেকলি না? গিয়ে নন্দর বৌকে বলে রাকবে, সে নন্দকে দিয়ে বাচ্চুকে খবর দেবে। ও হয়ে যাবে।

কী আশ্চর্য? এত ঝঞ্ঝাটের কী দরকার ছিল মাসিমা? সুদত্তা বলল, ভীষণ লজ্জা করছে আমার। আমি এলাম বলেই তো এত ব্যস্ত করা।

নেবুমাসি হঠাৎ গলা খাটো করেন। বলেন, এই ছুতোয় ওরও একটু খাওয়া হবে, তাতেই আরো ব্যস্ত করা, বুজলে না? এদিকে ওই জিনিসটিতে খুব মন। কিন্তু আমার অসুবিধে হবে বলে কিচুতে আনতে দেবে না। বলে, একটা মানুষের জন্যে এত হ্যাঙ্গামা। আমি যদি বাচ্চুকে বলে রাকি, তলে তলে বারণ করে রাকে। তা এই কেউ এলে গেলে তার সুবাদে হুকুম করি। নচেৎ মিচে করে বানিয়ে বলি, বাচ্চু খেতে চেয়েচে, নন্দ মুক ফুটে বলেচে একদিন একেনে পাতা পাড়বে। ওই করে ওই একটু হয়। পেটে খিদে মুকে লজ্জা, এই মানুষকে ভাল মন্দ একটু খাওয়ানো দুষ্কর। আগে কেবলই বলত বসে বসে অন্ন ধ্বংসাচ্চি কোতাও চলে যাই। একদিন আচ্ছা করে তুলো ধোনা করে গাল দিতে তবে সে বাতিক ছেড়েচে। জম্মোকাল এ বাড়িতে রইল, তবু পর পর ভাব গেল না। ওই যে আসচেন বাবু!

হুকুম তামিল করে আসা হয়েছে—বেশ প্রাবল্যের সঙ্গে কতাটা বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলেন সরোজমোহন।

সঙ্গে সঙ্গেই নেবুমাসি বলে উঠলেন, কেতাত্ত হলাম। একটু বেশী করে আনতে বলা হয়েচে কি? বাচ্চু ছোঁড়াটাও খাবে তো। সুখী সুখীর মা রয়েচে।

ও সব জানি না। আনতে হবে সেটাই বাচ্চুকে বলে এলাম। ওর সঙ্গেই দেখা হল।

ঠিক আচে। বললেন নেবুমাসি, বাচ্চুর আন্দাজ বুদ্ধি তোর থেকে বেশী আয় খুকু, তখনকার গপ্পোর বাকিটা শেষ করি আয়।

সরোজমোহন ব্যঙ্গের গলায় বললেন, বাঃ, চমৎকার! এখুনি ভদ্রলোকের মেয়েটাকে তুই—তোকারি আরম্ভ করা হয়ে গেছে?

গেচে! আমি গাঁইয়া ভূত, ওই রকমই ব্যাভার। তোর সাধ হয়, আপনি আজ্ঞে কর। নয়তো বৈঠকখানা ঘরে গিয়ে বসে থাকগে। একেনে থাকলেই তো কতায় কতায় ফোড়ন কেটে গপ্পো এগোতে দিবি না।

ঢ্যাঙা জেদের গলায় বলে উঠলেন, ঠিক আছে। আয় পলা, আমরা বেটাছেলেরা বৈঠকখানা ঘরে গিয়েই বসিগে।

নেবুমাসি কথার ডানা মেলে এক ঝাপট মারেন, কেন? পলা যাবে কেন? ও বলে পুরনো গপপো শুনতে কত ভালোবাসে।

ও ভালোবাসে কিনা জানি না, আমি কিন্তু ভীষণ ভালোবাসি মাসিমা। বলল সুদত্তা।

ও পাগল মেয়ে! মাসি কেন? বল দিদিমা। পলা ছোঁড়া মায়ের দেকাদিকি নেবুমাসি বলে তাই। নচেৎ দিদিমা হই তো।

বলায় কি আসে যায়? সুদত্তা বলল, একটা কিচু বললেই হল।

শোন কতা! একটা কিচু বললেই হল? নেবুমাসি নিজস্ব ভঙ্গীতে হি হি করে হেসে ওঠেন, যাকে তাকে তুই প্রাণেশ্বর বলতে পারিস? যাকগে তামাশার কতা, পুরনো অট্টালিকায় বসে পুরনো কালের কাহিনী শোন। একেনে বাতাস বইচে দেক কী প্রাণ জুড়ানো। একেই কবিরা বলে মলয় বাতাস, তাই না রে পলা?

অতঃপর সেই মনোরম মলয় বাতাসের স্পর্শে উদ্বেলিত হৃদয়টি নিয়ে পলাকে শোনা গল্পই বসে বসে শুনতে হয়, গাঁ—সুদ্ধু লোকের কারো ঘরে ওই একটি মাস উনুন জ্বলেনি। বাবার হুকুম। জ্বলতে দেওয়া হয়নি। সব এই যুজ্ঞিবাড়ি থেকে হবে। মায় কচি ছেলের দুধটা বার্লিটা পর্যন্ত।....

দেখা যায় ঢ্যাঙা তাঁর লম্বা ছায়া নিয়ে এই আসরেই বসে আছেন একটি গোলালো তাকিয়া কোলে নিয়ে, এবং যথারীতিই কথার মাঝে মধ্যে ফোড়ন কেটে চলেছেন।

যে সব জ্ঞাতি গোত্র ওই এক মাস ধরে ভোজ খেলো, তারাই শেষে বলে বেড়াতে লাগল—মেয়ে বছরের মধ্যে বিধবা হবে এ আর আশ্চর্য্যি কী, এত বাড়াবাড়ি ভাগ্যে সয়? ভাগ্যেরও একটা সহ্যশক্তির সীমা থাকে।

নেবুমাসি বললেন, তা কেন? সেই সোনার কড়ি নিয়ে কড়ি খেলার—

সোনার কড়ি! সুদত্তা অবাক হল।

ওই তো। আমার মায়ের উদ্ভুট্টি শক। তাঁর এত আদরের মেয়ের এত সাধের বিয়ে, মেয়ে বরের সঙ্গে কড়ি খেলবে সোনার কড়ি নিয়ে। তাই নিজের আঠারো ভরির গোট ভেঙে সওয়া পাঁচগণ্ডা কড়ি গড়িয়ে রেখেছিলেন। তাই দেখে সব গিন্নীরা রাগারাগি করতে লাগল—পয়সার গুমোরে শাস্তর নিয়ম উল্টানো...বাপের কালে কেউ শুনেচে সোনার কড়ি দিয়ে শুভকাজ হয়!...শেষ পর্যন্ত রাগারাগি করে সবাই আবার সমুদ্দুরের কড়ি এনে খেলাল, আর কোন ফাঁকে কে যে সেগুলো সরিয়ে ফেলল!

আবার হঠাৎ হেসে ওঠেন নেবুমাসি, সত্যি কথা বলি ভাই, সেই কড়ি ক'টা হারানোয় যত দুঃখু হয়েছিল, কপাল পোড়ায় তত নয়। এমন খাশা গড়েছিল যেন সদ্য কড়ি। আমাদের সেই শশীস্যাকরার যা হাত ছিল—

এলোমেলো কথা বলছিস কেন নেবু? তোর বিয়ের সময় আবার শশীস্যাকরা কোথা? তখন তো শশীর বাবা তারাপদ—

তুই বড়ো জানিস, না? বলি তুই বড়ো না আমি বড়ো?

তোর তিন মাসের বড়ো—গিরি তুলে রাখ নেবু। তুই বিয়ের কনে, তুই এত সব খবর জানতিস?

আর তুই যেন মস্ত গার্জেন ছিলি। তাই সব খবর রেখে বেড়াতিস।

তা বেড়াতামই তো। ফাঁকে ফাঁকে এসে লুকিয়ে লুকিয়ে তোর কাছে সব খবর সাপ্লাই করতে হত না?...ঢ্যাঙা জোর গলায় বলেন, তখন কী খোসামোদ! বুজলি পলা? হেই ঢ্যাঙা লক্ষ্মীছেলে, কোতায় কী হচ্চে আমায় বলে যা। জিগ্যেস করলে লোকে বেহায়া বলবে। এদিকে আমার প্রাণ ছটফট করচে। বাবা যদি আর কারুর বিয়েতে এমন ঘটা করত, আমি প্রাণ ভরে আমোদ করতে পেতাম।

প্রতি পদে এহেন বাদ প্রতিবাদ সত্ত্বেও, সুদত্তার সেকালের ঐশ্বর্যশালী বাঙালীর সমাজ জীবনের ইতিহাস একটু একটু করে জানা হয়ে যায়।...সুদত্তা বলে, ঐশ্বর্যটা তারা কেবল মাত্র স্ত্রী—পুত্রের উপভোগের গণ্ডির মধ্যেই নিবন্ধ রাখতেন না। ভাগ করে ভোগ করতে জানত।...

সবাই তাই করত না হাতী—নেবুমাসি ঝঙ্কার দিয়েছেন, বাবার আমার জমিদারীর আর কোলিয়ারির পয়সা সব বারো ভূতে খেয়েচে।

কিন্তু সেই ঝঙ্কারের মধ্যে শুধু শব্দ ঝঙ্কারই দেখা গেছে, আক্ষেপ নয়।

আমি কিন্তু খুব অবাক হয়ে যাচ্ছি নেবুমাসি। রাত্রে খাটে পা ঝুলিয়ে বসে সুদত্তা বলল।

না, আর মাসিমা নয় যথাযথ নিয়মে দিদিমাও নয়, সেই নেবুমাসিতেই এসে পৌঁছে গেল এই ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে। হয়তো সেটাই আশ্চর্যের কারণ।

এই পুরনো বাড়ির ঘরে ঘরেই কালো কালো পালিশ উঠে যাওয়া বড়ো বড়ো জোড়া খাট পাতা, তবে নেবুমাসির ঘরে স্বতন্ত্র ব্যবস্থা। একখানা সোরু চৌকিতে নেবুমাসির স্বল্প উপকরণ যুক্ত বিশুদ্ধ শয্যা।

সেই ঘরেরই ফাঁকা দেওয়ালের ধারে অন্য কোনো ঘর থেকে একটা সোরু খাট আনিয়ে পাতা হয়েছে, এবং ফর্সা চাদর বালিশ সম্বলিত বিছানা পাতা হয়েছে।

ঘরে ঢুকে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল সুদত্তা—শূন্য শূন্য ঘরগুলোর দেয়ালেও বড়ো বড়ো এক একখানা আর্শি বসানো আছে, এ ঘরে তার কিছুই না। এ ঘরের আসবাবের মধ্যে একটা মাত্র আলনা, তাতে নেবুমাসির দু—একটা থান ও ধুতি ও সেমিজ লম্বমান।

নেবুমাসি বলেছিলেন, পাশেই আয়না—টেবিলওয়ালা সাজানো ঘর রয়েছে ভাই, কিন্তু এই বুড়ো বুড়ো জানলা দরজাওলা বৃহৎ পুরনো ঘরে একা তোর ভালো লাগবে না, ভয় লাগবে। তাই এই বুড়ির ঘরেই স্থাপনা করলাম তোকে।

তারপর দুষ্টু হাসি হেসে বলেছিলেন, তোরা যে আমার আশায় ছাই দিলি। নাতবৌ এলো বলে আহ্লাদে ভাসছি, তা নয় এখনো হবু। এখনকার যে সব কায়দা হয়েচে নেকাপড়া না শেষ করে বে করব না। ইদিকে নেকাপড়ারও শেষ হবার নাম নেই। মেয়ে পুরুষ সবাই বিদ্যের জাহাজ হবে এই পণ! তা যাক, এই বুড়ি বেঁচে থাকতে থাকতে শুভ কাজটা সেরে ফেলে একবার আসিস ভাই। সাধ মিটিয়ে—চুপ করে গেলেন।

সুদত্তা এই নিশ্চিত বিশ্বাসের দিকে তাকিয়ে বলতে পারেনি, তুমি যত সিওর নেবুমাসি আমরা নিজেরা এখনো ততো নই। এখনো আমরা নিজেদের মন বুঝতে পারছি না।

সুদত্তা তাই ও পথ এড়িয়ে গিয়ে বলেছিল, বেঁচে থাকতে থাকতে মানে? একশো বচ্ছরের আগে আপনাকে পৃথিবী থেকে নড়তে দিচ্ছে কে?

নেবুমাসি হাসলেন, তা অসম্ভবও নয়। বাল্যবিধবার পরমায়ু পাথর দিয়ে বাঁধানো থাকে টসকাতে জানে না। নইলে দ্যাক এই আশী বচর বয়সেও তোদের মতন যুবিদের থেকে তিন গুণো খাচ্ছি, তিন টপকায় সিঁড়ি ভাঙছি। তবে মরতেও তো পারি।

ঘর বিছানা দেখিয়ে দেবার সময় এ সব আলোচনা। এখন শুতে এসে সুদত্তা খাটে পা ঝুলিয়ে বসে বলল, আমার কিন্তু খুব অবাক লাগছে নেবুমাসি।

নেবুমাসি বললেন, কেন বল তো?

ভাবছি আপনারা তো পুরনো কালের লোক, পুরনো সংস্কার, এ ভাবে একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে একসঙ্গে ঘুরতে দেখে রাগ করলেন না, বিরক্ত হলেন না, নিন্দে করলেন না বরং এত ভালোবাসছেন—

নেবুমাসি হেসে উঠে বললেন, যে কালে যে ধর্ম, আমরা পুরনোরা রাগ করলে আর নিন্দে করতে বসলেই কি কাল তার স্বধর্ম হারাবে? আমাদের আমলে সাহেব মেমরা কোটশিপ করত, এ আমলে তোরা করচিস। জিনিসটা আমাদের অজানা নাকি?

আমরা কিন্তু মোটেই এটা ভাবিনি নেবুমাসি। একসঙ্গে পড়ি, বেড়াই—টেড়াই এই পর্যন্ত।

নেবুমাসি ঈষৎ গভীর গলায় বলেন, ও কথা বলিসনে ভাই, ছেলেটার মুখ চোখ দেখতে পাসনে? তোর পানে তাকালেই বিভোর—

সর্বনাশ! নেবুমাসি এই সব দেখছেন আপনি? ধ্যেৎ! কক্ষনো না।

দেখব বলে কি আর দেখচি রে বাপু। চোকে পড়ে গেলে করব কি? যাকগে। একটা কতা ভাবছি সারাদিন—

কি ভাবচেন? কাল সকাল থেকে রাত অবদি কি কি খাওয়াবেন আপনার আদরের অতিথিদের?

নেবুমাসি হেসে ফেলে বললেন, তাও ভাবছি, তবে আরো একটা কতা ভাবছি, থাক কাল বলব।

প্রবালের আশ্রয় জুটেছিল সরোজমোহনের ঘরে। অনেক রাত পর্যন্ত তার উচ্চ হাসি আর উচ্চরবের সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল, সুদত্তা ভাবছিল এই ভেঙে পড়া প্রাসাদের মধ্যে এই জীর্ণ বিবর্ণ সব আসবাব পত্রের আবেষ্টনে, দিনরাত্রির খাজনা জুগিয়ে চলা ছাড়া আর তো কোনো কাজ নেই বুড়ো ভদ্রলোকের—তবু এত প্রাণশক্তি আসে কোথা থেকে?

মহিলাটির কথা তবু আলাদা। তিনি তাঁর পিতৃকুলের কুলমর্যাদা, বংশমর্যাদা, আচার—আচরণ সবকিছুর দায়িত্ব বহন করে চলে আসছেন, তার মধ্যে কর্তৃত্ব গৌরব রয়েছে। রয়েছে সংসার করার সুখও।

হলেও সে সংসারের সদস্য সুখী, সুখীর মা, চিরকালের প্রজা ঘর, বিনা ভাড়ায় বাসিন্দা রিকশাওলা নন্দ, আর পুরনো সরকার মণি পালের নাতি বাচ্চু। সংসারের ঠাট তো আছে। বাড়িটাই সংসার।

তবে প্রকাণ্ড এক প্রশ্নচিহ্নের মতো বিরাজ করছেন ওই বৃদ্ধ।

অনেক রাত্রে শুনতে পেল সুদত্তা, নেবুমাসি গলা তুলে কাকে যেন বলছেন, আজ রাতে কী আর ঘুমুতে—টুমুতে হবে না? বলি ঘুমের কমতিতে ছেলেটার শরীর বিগড়ালে?

কত রাত এখন? প্রবাল এখনো জেগে ছিল?

হঠাৎ খুব একটা ব্যাকুল আবেগ অনুভব করল সুদত্তা। ইচ্ছে করলেই সুদত্তা স্বর্গলোকের একখানি টিকিট কিনে ফেলতে পারে।

ঘুম ভাঙল সুদত্তার রিকশাওলা নন্দর ডাক—হাঁকে।

দাদাবাবু গাঁ দেখতে বেরোবেন নাকি? গাড়ি মজুত আচে।

নেবুমাসি কখন উঠে গেছেন কে জানে। দেখল ওঁর বিছানাটি পরিপাটি করে ঝাড়া ঠিক করা। আস্তে বেরিয়ে এসে ভিতর দালানের জানালার ধারে দাঁড়াল সুদত্তা। দেখতে পেল উঠোনের ওপারে বারান্দায় প্রবালও সদ্য নিদ্রোত্থিত ভাবে দাঁড়িয়ে।

অপূর্ব একটা আনন্দরসে ভরে উঠল মন। নিজেকে হঠাৎ নববিবাহিতা বধূর মতোই মনে হল সুদত্তার। প্রবালের মুখে চোখেও বুঝি সেই একই অভিব্যক্তি। ইশারায় বলল, যাচ্ছি ওদিকে।

আর এই সময় নেবুমাসির চড়া গলার প্রশ্ন শোনা গেল—এই অতি সকালে গাঁ দেকাতে নিয়ে যেতে এসেছিস মুকপোড়া? একটু বোধ—গ্যান নেই? বলি বিচানা থেকে তুলে নিয়ে যাবি নাকি? অ্যা!...কাগে এখনো বাসা ছাড়েনি। এখনো এসেচ গাড়ি নিয়ে!

নন্দ সতেজে বলল, আমার কি দোষ? দাদু কাল বলে থুয়েছে ভোরে আসবি নন্দ। বেলা করে বেরোলে ফিরতে রোদ চড়া হয়ে যাবে।

অ তাই বল। আমিও তাই ভাবচি, নন্দ এমন সাতসকালে কাঁথা মাদুর ছেড়ে এয়েচে! যা, এখন যা, এক ঘণ্টা বাদ আসবি।

খোয়া খাপরা রাস্তা দিয়ে রিকশা চলার শব্দ শোনা গেল। এবং নন্দ বিদায় পর্ব সমাধা হতে না হতেই সরোজমোহনের বিরক্ত গলা শোনা গেল, দেওয়া হল তো বিদেয় করে? নাও দেখ এখন কোন বেলায় আসে। ওদের এক ঘণ্টা মানেই তিন ঘণ্টা।

সুদত্তা আর প্রবাল দুজনে দু'দিক থেকে ঝুঁকে একই দৃশ্য দেখতে পায়।

লাল টুকটুকে সিমেন্টের দাওয়া বোধ হয় সদ্য ধোওয়া হয়েছে, ঈষৎ দূরত্ব রেখে মুখোমুখি দুখানি আসন পেতে চা খেতে বসেছেন। সদ্যস্নাতা নেবুমাসির পরণে কেটে থান, গায়ে একটা মটকা চাদর।

নেবুমাসির সামনে একটি উঁচু পাথরের গেলাসে চা। ঢ্যাঙার সামনে অবশ্য কাঁচের গ্লাস। চায়ের আসল সরঞ্জাম নামেনি। তার মানে এটি ওদের বলতে গেলে বেড—টী।

আচ্ছা, মুখের ভাবে তো পরিতৃপ্তির কোনো অভাব নেই। তবে গলার স্বর এই সক্কালবেলাতেই এমন কড়া কেন? নেবুমাসিরই অধিক।

তবে আর কি, হাত মুখ ধোবে না, চা জল খাবার খাবে না, বিচানা থেকে উঠেই গাঁ দেখতে বেরোবে। কী একেবারে তাজমহল দেকবার দেশ!

তাহলে আর ঘটা করে দেখতে যাওয়াই বা কেন? সরোজমোহন প্রায় খিঁচিয়ে ওঠেন, ফেরার সময় রোদ চড়বে সেটাই বলা হয়েছে। গোঁসাইবাগানে যাবে, সিদ্ধেশ্বরীর মন্দিরে যাবে—

যাবে তাতে আর কী? তোর সব তাতেই উটোন সমুদ্দুর ঢ্যাঙা। আমি এই নিত্য দিন সিদ্ধেশ্বরীর মন্দিরে যাই, তোর বচরে এ্যাকদিন হয়ে ওঠে না। রিশকোয় যাবে আসবে—বলি ওটা হচ্চে যে?... গেলাশটা পাত। বাটিতে চা আচে আরো।

বাঁ হাতের কাছে একটা ঢাকা দেওয়া বাটিতে বোধ হয় বাড়তি চা মজুৎ। ঢ্যাঙা সেইদিকে দৃষ্টিপাত করে বলেন, ওই তো ওইটুকু, থাক ও থেকে আর তোর দাতব্য করতে হবে না, নিজের গলায় ঢাল।

রাগ বাড়াসনে ঢ্যাঙা। কেন? সবটুকু আমার গলায় ঢালতে হবে কেন? মরুভূমি হয়ে আচে বলেচি?

তবে দে বাবা দে! গেলাসটা পাতলেন সরোজমোহন।

নেবুমাসি আঁচলের কোণ দিয়ে বাঁ হাতে বাটিটা ধরে দুটো গেলাশেই একটু একটু ঢেলে নিলেন।

সরোজমোহন একটু কোমল হাসি হেসে বললেন, এই সকালের চাটুকুই চা! এ চায়ের সঙ্গে সুখীর মা'র হাতের চা। হুঁঃ!

চা সাঙ্গ করেই উঠে গলা তুললেন সরোজমোহন, ওহে প্রবালবাবু, উঠেছেন নাকি?

উঠে পড়ে নেবুমাসিও গলা তুললেন, হল ডাক—হাঁক শুরু? কাল তো মাজ রাত্তির অবদি বকবক করে ছেলেটাকে ঘুমুতে দাওনি—

তবে ঘুমোক। যা বরং নাতির গায়ে আঁচল চাপা দিয়ে বসগে যা। এই মেয়েছেলেগুলোই হচ্ছে দেশের সর্বনাশের মূল। মায়ায় মরে গিয়ে বেটাছেলেদের আর বেটাছেলে হতে দেয় না।

নেবুমাসির হি হি হাসি ধ্বনিত হলয়, ওঃ, কী আমার পণ্ডিতমশাই বুদ্দি চূড়োমণি এলেন গো! তো বলি, তোর জন্যে তো জম্মোজীবনে কেউ মায়ায় মরেনি ঢ্যাঙা, তুই কেন ইয়া বীরপুরুষ হয়ে যুদ্দে গেলি না। ঘরকুনো কুড়ের সর্দার।...নে, ওষুদটুকু খেয়ে নিয়ে যা ইচ্ছে করগে যা।

রোজ রোজ কিসের ওষুধ? খাব না, যাঃ।

মদু দিয়ে মেড়ে ফেলেচি ঢ্যাঙা, আজ খেয়ে নে। কাল থেকে খাসনে।

এ কথা তো রোজ বলিস।

কি করব? হাঁপানির টান উটলে আমারই তো দুদ্দশা! এই ব্যাধিটি যদি না থাকত, নেবু এই দৌলতপুরের মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকত? চাটি—বাটি উঠিয়ে কাশীবাস করতাম গিয়ে।

সরোজমোহনের বিদ্রূপের গলা আকাশে ওঠে, থাম নেবু, আর বাকতাল্লা মারিস না। তুই নইলে আর কাশীবাসী হবে কে? বলে একটা তেল মাখার বাটি হারালে বাড়ি মাথায় করিস, এই বৃহৎ পুরী দু'বেলা ঝাড়ু না পড়লে রাজ্য রসাতলে যায় তোর, আবার বৈরিগী বুলি!...আমার ব্যাধি আমার আছে, তোর কি?

তা তো নিশ্চয়। নেবুমাসি গম্ভীরভাবে বলেন, কতাতেই আছে মামার শালা পিসের ভাই তার সঙ্গে সম্বন্ধ নাই। তা এ তো আবার পিসের ভাইপো। ওদের ছোটো কাল থেকে দেখচি বলেই এ্যাকটা বিবেক—বোদ।

ওরে বাপ! শুধু বৈরাগ্য নয়, আবার বিবেক। যাত্রা পালা একেবারে। আর এক গেলাশ চা গলায় ঢাল নেবু। নইলে মাথা পরিষ্কার হবে না। বলে হা হা করে হেসে ওঠেন সরোজমোহন।

গোঁসাইবাগানের পথে যেতে যেতে নন্দ বলে, আজন্মো এক ঠাঁই রইল তবু দুটো মনিষ্যি যেন সাপে নেউলে। দেখতেচেন দাদাবাবু?

দেখতেচি।

ব্রেদ্ধ হয়েচে, এখনো সেই ছোটোকালের ঝুটোপুটি ঝগড়ার অব্যেস গেল না। আমরা দেখি আর হাসি। অথচ এমনিতে দুটো মানুষই খুব ভালো। বাচ্চু বলে দুজনারই বোধ হয় কোঁদল লগ্নে জম্মো!

হাত চালাও নন্দদা। মানে পা চালাও। প্রবাল বলল, আগে যখন বাড়িতে আরো লোকজন ছিল। তখন এমন ছিল না বাবা। কে কোথায় থাকত। এখন ফাঁকা বাড়িতে চেঁচামেচির খুব সুবিধে হয়েছে।

সুদত্তা অদ্ভুত হেসে বলল, চেঁচামেচির সুবিধে নয়, চেঁচামেচিটাই সুবিধে।

তা চেঁচামেচিও থাকল, হাসি গল্পও থাকল পুরো দমে। খাওয়া দাওয়ারও মহোৎসব চলল। যাওয়ার আগের দুপুরে নেবুমাসি সেই কাল বলব বলে তুলে রাখা কথাটি ব্যক্ত করেন।

কবে আছেন কবে নেই তিনি বলা তো যায় না। তাই প্রবালের ভাবী বৌয়ের আশীর্বাদ পর্বটা সেরে রাখবেন তিনি। অতএব—

হ্যাঁ সেই অতএবটাই আসল। শরদিন্দুনিভাননীর বাবার দেওয়ালে পোঁতা চোরাসিন্ধুক থেকে তাঁর গহনার বাক্সটি বার করে দিতে হবে।

আমার সেই গিণির মালাটা আমি মনে মনে পলার বো'র জন্যে তুলে রেকেচি। নেবুমাসী বললেন।

গিণির মালা, প্রবাল লাফিয়ে ওঠে। ক্ষেপেছ না পাগল হয়ে গেছ? নাকি আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে চাইছ নেবুমাসি? আজকালকার দিনে গিণির মালা! ঢ্যাঙা দাদু, তুমি আমায় এ বিপদ থেকে উদ্ধার করো।

নেবুমাসি সতেজে বলেন, আমার জিনিস, আমি যদি স্বেচ্ছায় কাউকে উপকার দিই, তাতে থানা পুলিশের কথা আসে কেন রে?

কেউ বিশ্বাস করবে না নেবুমাসি! গিণির মালা! এক একখানা গিণির এখন কত দাম জানো?

জানিনে। জানতে চাইওনে। আমি তো কিনতে যাচ্চিনে। বাবা দিয়েছিল, ও তো আমার স্ত্রীধন। যাকে ইচ্ছে দেব। দিইনি কী? কতজনাকে কত দিয়েচি আগে আগে। গহনা তো কম ছিল না। বুঝলি খুকু, ওজন করে দু'সের সোনা দিয়েছিল বাবা—

দু'সের! সুদত্তা হেসে উঠে বলল, সোনার সের!

তোদের একালে ভাতের চাল ভরি দরে বিকোয় আমাদের সেকালে অবস্তাপন্নের ঘরে সোনার হিসেব ওই রকমেই হতো বাছা। মাতা থেকে পা অবদি সোনায় মোড়া বৌ গিয়ে দুধে আলতার পাতরে গিয়ে দাঁড়াল। ... আর তো যাইনি, সকল সোনা বাবার ওই চোরা সিন্দুকের মধ্যে। তো একে একে বিলিয়েচি অনেক। যতজনের বে হয়েচে, একেকখানা করে গহনা দিয়েচি। চর বাজুবন্দ, চিক সিঁতিপার্টি, সীতাহার, পুষ্পহার, গোট, বিছে, অনন্ত, তাগা, ইয়া মকরমুকো বালা, ফাঁস হার রতনচুর—

নেবুমাসি! প্রবাল বলে ওঠে, এই সব তুমি দাতব্য করেছ? শুনে আমার মাথা ঘুরছে। দিলে কোন প্রাণে?

হেসে ওঠেন নেবুমাসি, কি ছেলেবয়েসের বুদ্ধি। বিধবা মানুষ গহনা নিয়ে কী করব? তা যাক, একনো যা আচে অনেক। পালিশপাতের চুড়ি, বারোমেসে গোখরিচুড়ি, মানতাশা, ও গিণির মালাটা—তো বাক্সটা তুই আমায় বের করে দে দিকিনি ঢ্যাঙা।

ঢ্যাঙা অম্লান মুখে বলেন, কত কাল থেকে বলছি না, চাবিটা হারিয়ে গেছে। লোকজন ডেকে চাবি বানাও।

নেবুমাসি ক্রুদ্ধ গলায় বললেন, শুনছিস পলা বেআক্কেলের কতা! লোকজন ডেকে আমি চোরাসিন্দুক দেকাই। পর দিন বাড়িতে ডাকাত পড়বে না?

ঢ্যাঙা অবিচল, তবে আমি নাচার!

নাচার বললেই নাচার? আমি বড় মুক করে বললাম গিণির মালা দিয়ে আশীর্বাদ করব পলার হবু বৌকে—

তুমি দিলেই কি আমি নিতাম নেবুমাসি? প্রবাল বলে।

নিতিস না?

পাগল তো নই! তাছাড়া তুমি তো স্বপ্নে বাগান বানাচ্ছ। তোমার ওই খুকু আমার বৌ হতে রাজী হবে কিনা সে—গ্যারান্টি আছে?

বটে? নেই গ্যারান্টি? ডাকত দেকি তাকে—খুকু!

থাক থাক—ঢ্যাঙা বলে ওঠেন, জিনিসটা যখন দিতেই পারছ না—

দিতেই পাচ্ছি না? সাফ জবাব? তুই বুড়ো ধাড়ি ছেলে, সিন্দুকের চাবিটা হারিয়ে বসে আচিস। তা, একটু হায়া লজ্জা নেই? চাবি না থাকে পলাতে তোতে চাড় দিয়ে খোল।

প্রবাল আর সরোজমোহনের চোখে চোখে একটা ইশারা খেলে যায়। এবং প্রবাল প্রবল স্বরে বলে, চাড় দিয়ে? সেকালের বিলিতি কোম্পানির দেয়ালে গাঁথা আয়রণ সেফ চাড় দিয়ে খুলবে তুমি নেবুমাসি? বরং তোমার বাবার এই বাড়িখানা চাড় দিয়ে খুলতে পারতে পারো—ওটিকে পারবে না।

তবে কি তোরা বলতে চাস, আমার সেই গহনার কাঁড়ি, সেই গিণির মালা দেয়ালের মধ্যে গুমখুন হয়ে মরে পচবে? ও সব শুনতে চাই না ঢ্যাঙা, গিণির মালা আমার চাই—ই চাই।

চাই বললেই চাই? আজ দশ বছর ধরে তো সেই চাবি খুঁজছি রে বাপু। না পেলে?

পাশের ঘরে সুদত্তা। শুনতে পেয়েছে সবই।

স্তব্ধ হয়ে বসে ভাবে, তাকে কেন্দ্র করে এ কী ভয়ানক একটা কলঙ্কিত ইতিহাসের পৃষ্ঠা খুলে পড়ল? সুদত্তা কি ছুটে গিয়ে বলবে, আমি এক্ষুনি চলে যাব। ফুল ভেবে যা ধরতে যাচ্ছিলাম, সেটা এমন ভয়ঙ্কর একটা সাপ?

ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোক! কিন্তু তাই কি সম্ভব? এত বড় ভয়ানক অপরাধ করে এমন নিশ্চিন্ত ভাবে বসে থাকতে পারে কেউ?

চাবি তুই হারালি কেন?

ইচ্ছে করে কেউ হারায়? তুই আমায় দিতেই বা গিয়েছিলি কেন? নিজে রাখলেই পারতিস।

আমি ও সব কলকব্জা জানি? ইংরিজি ইংরিজি অক্ষর সব ঘোরাতে হয়, কতা তৈরি করতে হয়, সে কি আমার কম্মো?

তবে যেমন কম্ম তেমনি ফল ভোগ কর। বাপ ভাইকেই লোকে বিশ্বাস করে চাবি দেয় না, আর আমি একটা পরস্য পর, আমার হাতে চাবি দিতে এলি। বেশ হয়েছে, ঠিক হয়েছে। এখন কী করবি কর। পুলিশ ডেকে হাতকড়া দিতে ইচ্ছে হয়েছে!

বলেছি আমি সে—কতা?

পাকে প্রকারে বলছিস। চাবি হারিয়ে গেচে। গিণির মালা পাওয়া যাবে না, ব্যস—বলে সরোজমোহন নামের ব্যক্তিটি ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

নেবুমাসি চেঁচাতে থাকেন, এত অহঙ্কার ভালো নয় ঢ্যাঙা। আমায় মনিষ্যি বলেই মনে করচিস না। লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেলি—

প্রবাল এ ঘরে এসে বলে, সত্যি কথাটা বলে ফেলুন না দাদু! দারুণ চটেছেন নেবুমাসি।

সরোজমোহন একটু রহস্যের হাসি হেসে বলেন, সত্যি কথাটা শুনলে আরও চটবে রে পলা। যখন শুনবে ওর জন্যেই আমার এই অকম্মো তখন—

কিন্তু আপনার এই ডিসিশান নেওয়াটা কিন্তু সত্যিই অদ্ভুত ঢ্যাঙা দাদু।

সরোজমোহন গম্ভীর ভাবে সিগারেটে টান দিতে দিতে বলেন, উপায় কী বল? রাজকন্যের যে অনুষ্ঠানের ত্রুটি হবার জো নেই। বাড়ি ভেঙে ওয়ার হচ্ছে, তবু ঠাট—বাটটি বজায় থাকা চাই। দোল—দুর্গোৎসব চাই, গোটা চারেক দাসদাসী চাই—এখনো লোকলৌকিকতার বাহারটি সমান রাখা চাই। পাড়ায় কারো বাড়িতে ভাত পৈতে বিয়ে হোক না, এ বাড়ি থেকে সেরা মাল যাবে। আকাশ থেকে পড়বে টাকা? কিন্তু এতদিন বেচারা জানতেন তার বাক্সভর্তি গহনা আছে, হঠাৎ যদি টের পান সব হাওয়া, হার্টফেল করে বসবেন না? সেই ভয়েই তো চাবিটাকে হারাতে হয়েছে রে ভাই।

কিন্তু ভয়টার কি সত্যিই কোন মূল্য ছিল? না অমূলক?

নইলে এরা যখন চলে আসছে, তখন কি না বলে ওঠেন নেবুমাসি, থাক হয়েছে। আর চাবি খোঁজা চাবি খোঁজা চাবি খোঁজা খেলা খেলতে হবে না ঢ্যাঙা। এরা এগোচ্চে, বেরিয়ে আয় ঘর থেকে। চাবি বেরোলেই কি আর আমার সেই গিণির মালা বেরোবে? ও নির্ঘাৎ তুই তলে তলে বেচে খেয়েচিস! নচেৎ দশ বচর ধরে নাকি লোকে চাবি খুঁজে মরে পায় না। ..... সন্দ আমার হয়েচে কবে থেকেই, লপচপানি চলচে কোথা থেকে? নেবু যখন গা হুকুম করচে তামিল হচ্চে। নেবুর বাপের জমিদারী তো ওদিকে ঢুঁ ঢুঁ হয়ে এয়েচে।..... অমনি হচ্চে? কত ধানে কত চাল বোজে না নেবু? কিন্তু তোর দুঃসাহসকে বলিহারী দিই ঢ্যাঙা। এ বার্তা পাঁচ কান হলে লোকে তোকে কি বলবে ভেবে দেকেচিস?

ঢ্যাঙা বিশ্ব নস্যাতের ভঙ্গীতে বলেন, দেখব না আবার কেন? তুই যা বলছিস, তাই বলবে। বলবে চোর।

কি? কি বললি? আমি তোকে চোর বলেচি?

চোর না হয় জোচ্চোর বলেছিস।

নেবুমাসি চড়া গলায় বলেন, তা বলবই তো, জোচ্চোরকে জোচ্চোর বলব না তো কি মহাপুরুষ বলব? বল তো পলা—বল তো বাছা খুকু?

সুদত্তা প্রণাম করছিল। প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে একটু হেসে বলে, হ্যাঁ, এ বিষয়ে আমি আপনার সঙ্গে একমত নেবুমাসি!

রিকশায় চলতে চলতে প্রবাল বলল, আসার সময় ওই কথাটা বলা তোমার ঠিক হয়নি সুদত্তা। শুনতে খারাপ লাগল।

কোন কথাটা? সুদত্তা সচকিত হয়।

ওই নেবুমাসির সঙ্গে একমত হওয়া।

সুদত্তা হেসে উঠে বলে, সত্যি কথাগুলোই সব সময় শুনতে খারাপ লাগে প্রবাল। চিরদিনই তো লোকটা জোচ্চুরী করে এসেছে। নিজের সঙ্গে, ভালোবাসার লোকের সঙ্গে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%