মহাসিন্ধুর ও’পার থেকে

সৌভিক চক্রবর্তী

আদি পর্বঃ লোকনাথের প্রত্যাবর্তন

গাড়ির জানলায় মাথা হেলিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তিতাস কী একটা গান গুনগুন করছে। পল্লব কান খাড়া করে শুনল, তিতাস গাইছে, ‘ইন দ্য জাঙ্গল, দ্য মাইটি জাঙ্গল, দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট/ ইন দ্য জাঙ্গল, দ্য কোয়াইট জাঙ্গল, দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট...’

মনটা বড় ভালো হয়ে গেল পল্লবের। অনেকদিন পর তিতাস আবার গান গাইছে।

শেষ ছ’মাস খুব খারাপ কেটেছে। গান গাওয়া তো দূরের কথা, তিতাস কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল প্রায়। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও করত না। দরজা বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকত ঘরে। অনেক সাধ্যসাধনা করে যদি বা ঘরের বাইরে বার করা যেত তাও ছেঁড়া ছেঁড়া দু’-চারটে কথা বলেই সে চুপ করে যেত। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত দেওয়াল বা সিলিং-এর দিকে আর চোখ দু’টো ভরে উঠত জলে। গাল বেয়ে সে জল টপ টপ করে ঝরে পড়ত হাতের পাতায়। সেদিকে খেয়াল থাকত না তার। পাশে এসে বসত পল্লব। চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলত, কেন এমন করছিস তিতাস? ওগুলো অ্যাক্সিডেন্ট। অ্যাক্সিডেন্ট কি মানুষের জীবনে হয় না? তা বলে সেটা নিয়ে এভাবে দিনের পর দিন কষ্ট পেতে হবে? তুই আস্তে আস্তে আবার কাজ শুরু কর।

জলে ভরা চোখ নিয়ে পল্লবের দিকে তাকাত তিতাস। বলত, অ্যাক্সিডেন্ট একবার হতে পারে। পর™র দু’বার নয়। আমি ডাক্তারিটা জানি না পল্লব। প্লিজ আমাকে কনভিন্স করতে আসিস না।

চুপ করে যেত পল্লব। তিতাসের অবস্থা দেখে তারও খুব কান্না পেত। সে তো তিতাসকে এই ভাবে দেখে অভ্যস্ত নয়। তিতাস মানেই প্রাণ, তিতাস মানেই গান। যে বন্যার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায় সব জড়তা। যে মিতুলকে উদ্ধার করার জন্য প্রাণ অবধি বাজি রাখতে পারে! সেই তিতাস কি না এই ভাবে গুটিয়ে যাচ্ছে নিজের ভেতরে! নিয়ত আত্মধিক্কারে যন্ত্রণা দিচ্ছে নিজেকে! এ কি সহ্য করা যায়? অসহায় হয়ে সঞ্জয়কে ফোন করত পল্লব কিন্তু সঞ্জয়ও কোনও আশার কথা শোনাতে পারত না। সেও তো তিতাসকে বোঝানোর কম চেষ্টা করেনি। আর শুধু সঞ্জয়ই বা কেন, অমিয়, দীপক পাল, তিতাসের বাবা-মা, শিক্ষকেরা এমনকী ভাদুড়ি মশায় অবধি তিতাসকে বহুবার বুঝিয়েছেন। তাতেও কাজ হয়নি। তিতাস নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। সে আর ডাক্তারি করবে না। চাকরি থেকে রিজাইন করেছে এমনকী নিজের ডাক্তারি লাইসেন্সটা অবধি ছিঁড়ে ফেলতে যাচ্ছিল একদিন। অনেক কষ্টে পল্লব তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সেটা লুকিয়ে রেখেছে।

ঘটনার সূত্রপাত মাস আটেক আগে। তিতাস ততদিনে বারাসাত জেলা হাসপাতাল থেকে ট্রান্সফার নিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জয়েন করেছে। সেখানেই অদ্ভুত এক রোগ নিয়ে ভর্তি হল মোহর নামে একটি বাচ্চা মেয়ে। গার্ডেন হাই-তে ক্লাস টু-তে পড়ে। ডাকনাম বুবু।

বুবুর দাঁত পড়ে যাচ্ছিল। তা এই বয়েসের বাচ্চাদের দুধে দাঁত পড়ে নতুন দাঁত উঠবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক ব্যাপারটা হল, বুবুর পড়ে যাওয়া দাঁতগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। খুব অবাক হয়েছিল বুবু। এক-একদিন ঘুম থেকে উঠে সে দেখত, তার একটা দাঁত নেই। কিন্তু সেটা কোথায় যে গেল, কিছুতেই খুঁজে পেত না। বুবুর বাড়ির লোকেরা হাসাহাসি করত, সত্যি বোধ হয় ইঁদুরে দাঁত নিয়ে চলে গেছে। কিন্তু কিছুদিন পর ব্যাপারটা আর মজার জায়গায় রইল না। মেয়ের দাঁত পড়ছে নিয়মিত, নতুন দাঁতও গজাচ্ছে কিন্তু পড়ে যাওয়া দাঁতগুলো যাচ্ছে কোথায়? বুবুর একটাই উত্তর, সে কিছু জানে না। ঘুম থেকে উঠে দেখেছে, দাঁত ভ্যানিশ। বুবুর মা-বাবা চিন্তায় পড়ে গেলেন। এর মধ্যেই শুরু হল বুবুর পেটে ব্যথা। সে এমন ব্যথা ছোট্ট মেয়েটার দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। তাকে তড়িঘড়ি হাসপাতালে নিয়ে আসা হল। পরীক্ষা করে দেখা গেল অদ্ভুত কাণ্ড! বুবুর পাকস্থলী এবং অন্ত্র জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট ছোট দাঁত! তাদের আঘাতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে ক্রমাগত।

মেডিক্যাল বোর্ড বসল রাতারাতি। ডাক্তাররা সিদ্ধান্তে এলেন, ঘুমের মধ্যেই বুবুর দাঁত পড়ে যায় এবং সেগুলো ঘুমের ঘোরেই গিলে ফেলে সে। তাই দাঁতগুলো জমা হয়েছে পাকস্থলীতে আর অন্ত্রে। তবে অন্য একটা ব্যাপারে আশঙ্কিত হলেন তাঁরা। পাক প্রক্রিয়ায় দাঁতের ক্যালসিয়াম ক্ষয়ে গিয়ে দাঁতের আকার ছোট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে দাঁতগুলির আকার বেড়েছে। বহু জার্নাল ঘাঁটাঘাঁটি করেও এমন অদ্ভুত রোগের দ্বিতীয় কোনও নজির পেলেন না ডাক্তারেরা। চিকিৎসা পদ্ধতি কী হবে তাই নিয়েও ধন্দে পড়লেন তাঁরা। তখনই মেডিক্যাল বোর্ডের কনিষ্ঠতম সদস্যা তিতাস বলে উঠেছিল, আমি কিছু বলতে চাই স্যার। আমার মনে হয়, কীভাবে মেয়েটির এই দাঁত পড়া ও গিলে ফেলা আটকানো যায় সেসব নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। এই মুহূর্তে মেয়েটির যা কন্ডিশন তাতে অপারেট করে আগে ওর পেট থেকে দাঁতগুলো বার করে ফেলা দরকার।

প্রবীণ চিকিৎসকেরা সায় দিলেন তিতাসের কথায়। কিন্তু বড়ই জটিল এই অস্ত্রোপচার। অন্ত্র এবং পাকস্থলীর দুরূহ কোণে গেঁথে আছে দাঁতগুলি। সেখান থেকে তাদের তুলে আনা বড় সহজ কথা নয়। তিনজন শল্যচিকিৎসকের টিম তৈরি হল। যে টিমে সেকেন্ড ইন কম্যান্ড তিতাস।

অপারেশনের কথা শুনে ভয়ে এতটুকু হয়ে গেছিল ছোট্ট মেয়েটা। তার নরম হাত দু’টো নিজের হাতে নিয়ে তিতাস বলেছিল, কোনও ভয় নেই বুবু। তোমার এত্তটুকু ব্যথা লাগবে না।

ডাগর চোখ দু’টি তুলে বুবু বলেছিল, প্রমিস?

তার চুল ঘেঁটে দিয়েছিল তিতাস, প্রমিস।

না। সে প্রমিস রাখতে পারেনি তিতাস। প্রায় আট ঘণ্টার দীর্ঘ অপারেশনের পর বুবুর পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে দাঁতগুলি বার করতে সক্ষম হয়েছিল তিন চিকিৎসকের দলটি কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটে গেছিল সেই রাতেই। ঘুমের ঘোরে আবার একটি দাঁত গিলে ফেলেছিল বুবু এবং সেই দাঁতটি ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল তার পাকস্থলীর অন্তর্গাত্রের কাঁচা সেলাইগুলি। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে চলে যেতে হয়েছিল বুবুকে।

মনমরা হয়ে পড়েছিল তিতাস। একা থাকলেই বুবুর মুখটা ভেসে উঠত চোখের সামনে। ছোট্ট মেয়েটিকে দেওয়া কথা রাখতে না পারার যন্ত্রণায় বিদ্ধ হত সে। যদিও বা কিছুদিন পর তিতাস সামলে উঠেছিল খানিকটা কিন্তু তার পরেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। একই রোগ নিয়ে ভর্তি হল ময়ূখ নামে একটি বাচ্চা ছেলে। এবারে তিতাস যেটা করেছিল, প্রথমেই অ্যালুমিনিয়াম পাত দিয়ে সিল করে দিয়েছিল ছেলেটির দুটো মাড়ি। অপারেশন সাকসেসফুলও হয়েছিল। চিকিৎসকেরা ভেবে চলেছিলেন, কীভাবে দাঁত পড়া নিশ্চিত ভাবে আটকানো যায়। ছেলেটি দ্রুত সুস্থও হয়ে উঠছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। লোহার বাসরের ছিদ্র দিয়ে ঢুকে পড়ল কালনাগিনী। ছেলেটিকে খাওয়ানোর সময় অ্যালুমিনিয়াম পাত খুলে নিতে বলেছিল তিতাস আর সেখানেই ভুলটা হয়ে গেল। খাবারের সাথেই একটা দাঁত গিলে ফেলল ছেলেটি এবং একই ভাবে পুরনো ক্ষতগুলিকে খুঁচিয়ে তুলল সেই ঘাতক দাঁতটি।

কিন্তু এখানেই শেষ হল না ব্যাপারটা। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ এনে হাসপাতালের ডাক্তারদের ওপর চড়াও হল ছেলেটির পরিবারের লোকজন। তারা যথেচ্ছ ভাবে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করল এবং তাদের মারে তিনজন জুনিয়র ডাক্তার জখম হলেন। একজনের অবস্থা তো রীতিমতো আশঙ্কাজনক। রাজ্য জুড়ে ধর্মঘট ঘোষণা করলেন জুনিয়র ডাক্তারেরা। বিরাট এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ল চিকিৎসা পরিষেবা। শেষমেশ মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ধর্মঘট উঠল বটে কিন্তু এই গোটা ঘটনার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে রিজাইন করল তিতাস। হাজার অনুরোধ-উপরোধেও তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে নড়ানো গেল না। আর এই ঘটনার পর থেকেই শুরু হল তিতাসের একলা যাপন। নিজেকে শিশু দু’টির হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলল সে। ভয়ানক এক ডিপ্রেশন গ্রাস করল তাকে।

একটা সময় পল্লব বেশ বুঝতে পারছিল, আর কিছুদিন এভাবে চললে তিতাসকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে উঠবে কিন্তু এই সমস্যার কোনও সমাধানও পাচ্ছিল না। তখনই তাকে বুদ্ধিটা দিয়েছিল অপালা। ভাদুড়ি মশায়ের নাতনি। মিতুল উদ্ধারের পর থেকেই অপালার সঙ্গে ভারী বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল ওদের। আমেরিকায় ফিরে গেলেও অপালা নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে ওদের সঙ্গে এবং গত পুজোয় সে দেশে এসেছিল। পুরো পুজোটাই প্রায় ওদের সঙ্গে কাটিয়েছে।

একদিন কনফারেন্স কলে অমিয় আর সঞ্জয়ের সঙ্গে তিতাসকে নিয়ে কথা বলছিল পল্লব। সে কলে অপালাও ছিল। হঠাতই সম্পূর্ণ এক অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেছিল অপালা। বলেছিল, আচ্ছা পল্লব, তোমার কী মনে হয়, তিতাস কী দেখে তোমার প্রেমে পড়েছিল?

ভারী হকচকিয়ে গেছিল পল্লব। বলেছিল, হঠাৎ এ প্রশ্ন? আমাদের তো কথা হচ্ছিল, তিতাস কাউন্সেলিং করাতে চাইছে না, সেই নিয়ে। তার সাথে এর কী সম্পর্ক?

অপালা বলেছিল, দেখো, সরাসরি হয়তো সম্পর্ক নেই কিন্তু আমি অন্য একটা দিক থেকে বিষয়টা ভাবতে চাইছি। আমি তোমাদের দু’জনের কেমিস্ট্রি দেখেছি। ইটস বিউটিফুল। তিতাস যে তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে তা নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু যেকোনও ভালোবাসার পেছনেই একটা প্রাইম ফ্যাক্টর থাকে। সেটা খুব পাওয়ারফুল হয়। ইট ক্যান বি এনিথিং। যেমন লুকস, পারসোনালিটি, উইট, ক্রিয়েটিভিটি, ইভন হাউ সামওয়ান পারফর্মস ইন বেড... সেটাও একটা ক্রাইটেরিয়া হতে পারে। তোমাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কী? তুমি কেন তিতাসের প্রেমে পড়েছিলে সেটা এই মুহূর্তে ইমমেটিরিয়াল। তিতাসের তোমার প্রতি ভালোবাসার কারণটা বলো। আই ওয়ান্ট টু নো।

একটু থমকে গিয়েছিল পল্লব। সে জানে, প্রেমে পড়ার ক্ষেত্রে ছেলেদের আর মেয়েদের দৃষ্টিভঙ্গিগত একটা বিরাট পার্থক্য আছে। আর তার জন্য দায়ী হরমোন। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রেমে পড়াটা অনেক বেশি চাক্ষুষ। ছেলেরা মেয়েদের বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে উত্তেজিত হয়। মেয়েটিকে কামনা করে কিন্তু উল্টোদিকে মেয়েদের প্রেমে পড়া অনেক বেশি বৌদ্ধিক। সম্পর্কের শুরুতেই একটি ছেলে একটি মেয়েকে শারীরিক ভাবে চাইলেও মেয়েটির এই চাহিদা তৈরি হতে সময় লাগে। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয় কিন্তু সূর্যাস্তের সময় আকাশ লাল হয়ে যায় বলে কেউ তো আর আকাশের রং লাল বলে না। পল্লবও তিতাসের প্রেমে পড়েছিল তিতাসকে দেখেই। গানটা ছিল ‘এক্সট্রা চিজ’। অ্যাডেড ফ্যাক্টর। আজও চোখ বুজলে পল্লব দেখতে পায় মিলিউয়ের স্টেজে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত মাইক হাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একটা লম্বা ছিপছিপে শ্যামলা মেয়ে। কোঁকড়ানো চুলগুলোকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তার হলুদ ব্যান্ডানা। যদিও সানগ্লাসে ঢাকা চোখ তবু সে চোখের দিকে যে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যাবে না তখনই বুঝেছিল পল্লব। সেই মুহূর্ত থেকেই সে তিতাসের প্রেমে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছিল কিন্তু পল্লবের প্রেমে পড়তে সময় লেগেছিল তিতাসের। পল্লবের সাথে সে কথাও বলত খুব কম। তখনও স্মার্টফোনের যুগ আসেনি। দিনে একশোটা করে মেসেজ ফ্রি থাকত। সেই একশোটা মেসেজের সবক’টাই পল্লব তিতাসের পেছনে খরচ করত। উত্তর পেত সাকুল্যে দশটা। পল্লবের একটা সমস্যা আছে। সে বেশিক্ষণ সাধারণ কথা বলতে পারে না। কয়েকটা সাধারণ কথার পর থেকেই তার কথায় কেমন একটা ‘শরীর শরীর’ গন্ধ বেরোয়। পল্লব খেয়াল করে দেখেছিল, এই সুগন্ধী কথাগুলো তিতাস এড়িয়ে যায়। কোনও উত্তর দেয় না। একদিন খুব রাগ ধরে গেছিল পল্লবের। সোজা মেসেজ করেছিল, তুই রেসিপ্রোকেট করিস না কেন বল তো?

তিতাস উত্তর দিয়েছিল, কেন করব বল তো? তুই আমার কে হোস?

পল্লবের আহত পৌরুষ তার শিল্পীসত্তার ঘেটি ধরে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো গলগল করে বেরিয়ে এসেছিল চার লাইন একটা কবিতা। সেটাই সে পাঠিয়ে দিয়েছিল তিতাসকে। যথারীতি সে কবিতারও কোনও উত্তর দেয়নি তিতাস কিন্তু পরের দিন বিকেলে হুট করে হাজির হয়েছিল প্রেসিডেন্সিতে।

তখন সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে। উজ্জ্বল হয়ে উঠছে তারাগুলি। পাখিদের ঘরে ফেরা শেষ। একটা-দু’টো করে জ্বলে উঠছে প্রেসিডেন্সি কলেজের সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পগুলো। সোডিয়ামের হলুদ আলো বড় খারাপ জিনিস। যখন তখন মায়াকাজল পরিয়ে দেয় চোখে। বিভ্রম সৃষ্টি হয়। এ আলো পৃথিবীর আলো নয়। সেই অপার্থিব আলোতে বসে কথা বলতে বলতেই আচমকা পল্লবকে চুমু খেয়েছিল তিতাস। কেমন যেন স্থবির হয়ে গেছিল পল্লব। তার মনে হচ্ছিল সে অনেক উঁচু একটা নাগরদোলায় বসে আছে আর সেটা হু হু করে নেমে আসছে নীচের দিকে। ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে তলপেটের ভেতরটা। পল্লবের নীচের ঠোঁটটা জ্বালা করছিল। উঠে দাঁড়িয়েছিল তিতাস। চলে যাওয়ার আগে বলেছিল, এমনিতে আমি মোটা ছেলে বিশেষ পছন্দ করি না কিন্তু বড্ড ভালো লিখিস তুই। অগত্যা।

পল্লব বলল, তিতাস আমার লেখা দেখে প্রেমে পড়েছিল। আর তিতাস ছিল বলেই আমি লেখালিখিটাকে জীবিকা করতে পেরেছি। না হলে হয়তো অ্যাদ্দিনে কোনও কলেজে চর্যাপদ পড়াতে পড়াতে নিজেই শিলালিপি হয়ে যেতাম।

লাফিয়ে উঠেছিল অপালা, ওয়ান্ডারফুল। প্লিজ ইউজ দিস টুল।

পল্লব কিছু বলার আগেই সঞ্জয় অবাক হয়ে বলেছিল, কিন্তু কীভাবে?

অপালা বলেছিল, দেখো, তিতাসের মন ভালো করার জন্য ওর যা যা ভালো লাগে সেসবই তো আমরা এর মধ্যেই ট্রাই করে ফেলেছি। কাজ হয়নি। তিতাস ডাক্তারও দেখাতে চাইছে না। তাই এখন এই একটা রাস্তা খোলা আছে। কনসাশে বা সাবকনসাশে পল্লবের লেখালিখির প্রতি তিতাসের একটা দুর্বলতা থাকবেই। সো পল্লব, ইউ ক্যান রাইট সামথিং যাতে তিতাসকে ইনভলভ করা যায়। আমার মনে হয় ইট উইল ওয়ার্ক।

কথাটা মনে ধরেছিল পল্লবের এবং বছর দুয়েক আগে দীপক পালের মেয়ে মিতুলকে উদ্ধার করা নিয়ে যে নানা কাণ্ডকারখানা হয়েছিল তাই উপন্যাস আকারে লিখতে শুরু করেছিল। একটা করে পর্ব লিখত আর তিতাসকে পড়ে শোনাত। ঘটনার পাত্রপাত্রীদের অনুমতি নিয়ে সবার আসল নামই ব্যবহার করছিল লেখায়। প্রথম প্রথম তিতাস উৎসাহ দেখাত না কিন্তু ধীরে ধীরে সেও উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে গা ভাসাতে শুরু করল। স্থান কাল লজিকের ত্রুটি শুধরে দিতে শুরু করল। লেখা শেষ হওয়ার পরে নিজেই প্রুফ দেখে দিল, প্রচ্ছদ নিয়ে প্রচ্ছদ শিল্পীর সঙ্গে ঝামেলা করল এবং বই প্রকাশের দিন নিজেই সেজেগুজে পল্লবকে ঠেলে তুলল ঘুম থেকে, ওঠ। আর কত ঘুমোবি? দেরি হয়ে যাবে তো এবার।

কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তিতাসের দিকে তাকিয়েছিল পল্লব তার পর তাকে জড়িয়ে ধরে এই প্রথম প্রকাশ্যে কেঁদে ফেলেছিল। কেঁদে ফেলেছিল তিতাসও। পল্লবের চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলেছিল, আই অ্যাম সরি। তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি এই ক’দিনে।

সেদিনের পর থেকেই তিতাস স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল, আর আজ এত দিনে এই প্রথমবার গান গেয়ে উঠল। পল্লব যে আনন্দিত হবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

পল্লব আর তিতাস আজ বারাসাত যাচ্ছে। মিতুলের আজ জন্মদিন। আজ আর ফিরবে না ওরা, অমিয়র ফ্ল্যাটেই থেকে যাবে। বেশ একটা ছুটি কাটানো হবে। তাই সকাল সকাল দু’জনে বেরিয়ে পড়েছে বারাসাতের উদ্দেশে। গাড়ি এখন বাইপাসের ওপর। পল্লব শুনল, তিতাস গাইছে, ‘নিয়ার দ্য ভিলেজ, দ্য পিসফুল ভিলেজ/ দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট/ নিয়ার দ্য ভিলেজ, দ্য কোয়াইট ভিলেজ/ দ্য লায়ন স্লিপস টুনাইট...’

পল্লব হেসে বলল, হাকুনা মাতাতা।

তিতাসও ঘাড় ঘুরিয়ে হাসল, হাকুনা মাতাতা।

কী ব্যাপার? হঠাৎ লায়ন কিং?

কাল একটা সিংহের স্বপ্ন দেখেছি বুঝলি?

পল্লব গম্ভীর হয়ে বলল, স্বপ্নে আমার বদলে অন্য পুরুষ আসছে। ভালো লক্ষণ নয়।

তিতাস হেসে ফেলল, হ্যাট গাধা।

পল্লব বলল, সিংহ থেকে গাধা?

আরে শোন না, স্বপ্নটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল।

কীরকম?

তিতাস বলতে শুরু করল, আমি প্রথমে একটা মরুভূমি মতো জায়গা দেখলাম জানিস? না, ঠিক মরুভূমি না, বালিয়াড়ি বলা ভালো। সেখানে একটা মন্দির। অদ্ভুত স্ট্রাকচার মন্দিরটার। এমন আমি আগে দেখিনি।

তার পর?

মন্দিরটা একদম ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই। শুধু শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে। এমন সময় মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা বিশাল চেহারার সিংহ। বাদামি কেশর কাঁধ ছাপিয়ে পিঠ ছুঁয়েছে। বিশাল বলিষ্ঠ থাবা। কী মাসল! সাচ আ ম্যানলি বিস্ট।

পল্লব মুখ বাঁকাল, কী নির্লজ্জের মতো ঝাড়ি মারছিস সিংহটাকে!

বেশ করছি, তারপর শোন না কী হল...

কথাটা শেষ করতে পারল না তিতাস তার আগেই প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি খেল সে। সিট বেল্ট বাঁধা না থাকলে মাথাটা এতক্ষণে উইন্ডশিল্ডে ঠুকে যেত। রিফ্লেক্সে একটা চিৎকার করে উঠল সে। তার পরেই পল্লবের দিকে ঘুরে দেখল, বিস্ফারিত চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে পল্লব থরথর করে কাঁপছে। ঘটনার আকস্মিকতায় সে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেছে। রাস্তার আশপাশ থেকে হইহই করে ছুটে এল লোকজন। একটু ধাতস্থ হয়ে পল্লব আর তিতাসও নেমে পড়ল গাড়ি থেকে।

রাস্তার পাশে একটা কম বয়সি ছেলে কাত হয়ে পড়ে আছে। ছাব্বিশ- সাতাশ বছর বয়েস হবে। লম্বা, ফর্সা, ছিপছিপে চেহারা। কপাল ফেটে রক্ত বেরচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে জ্ঞান নেই। তার সাইকেলটা পড়ে আছে উল্টোদিকে। গাড়ির ধাক্কায় পেছনের চাকাটা একেবারে তুবড়ে গেছে। লোকজন রে রে করে উঠল। এই ধরনের দুর্ঘটনায় সব দোষ গিয়ে পড়ে তুলনায় বড় আকারের গাড়ির চালকের ওপর। লোকে এমন একটা হাবভাব করে যেন, আহা! ও তো ছোট গাড়ি! সাইকেল কিংবা বাইক! ও কি অতশত বোঝে? তুমি বড় গাড়ি, তোমার একটা দায়িত্ব নেই?

এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হল। পল্লব কাউকে বোঝাতেই পারল না, সে ইচ্ছে করে ধাক্কা মারেনি। সে খুব ধীরে সুস্থেই চালাচ্ছিল। এই ছেলেটি যেন নিজে থেকেই গাড়ির সামনে চলে এল সাইকেল নিয়ে! যেন অপেক্ষা করছিল, কখন গাড়ি আসবে আর সে ঝাঁপ দেবে!

হাওয়া গরম হয়ে উঠল। পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে তিতাস এগিয়ে এল। সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বলল, আপনারা উত্তেজিত হবেন না। আমরা ছেলেটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। ওর চিকিৎসার খরচ আমাদের। ওকে একটু গাড়িতে তুলে দিতে হেল্প করুন।

লোকজন ছেলেটিকে গাড়িতে তুলে দিল। ছেলেটির মাথা কোলে নিয়ে পেছনের সিটে বসল তিতাস। একজন সহৃদয় ভদ্রলোকও এগিয়ে এলেন। বললেন, চলুন, আমিও যাচ্ছি আপনাদের সঙ্গে।

এই ডামাডোলে স্বপ্নের শেষটুকু আর বলা হল না তিতাসের। এদিকে পল্লব সবে গাড়িটা স্টার্ট দিয়েছে ভিড়ের মধ্যে থেকে একটা লোফার টাইপের ছেলে বলে উঠল, ট্রিটমেন্টের খরচ তো দেবেন ম্যাডাম, কিন্তু সাইকেলের দামটা?

চড়াং করে মাথাটা গরম হয়ে গেল পল্লবের। স্পিড তুলতে তুলতে সে বলল, তুই সাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করিস। ফেরার পথে তোকে ইচ্ছে করে ধাক্কা মারব। তখন দু’টোর দাম একসাথে দিয়ে দেব।

এই কঠিন পরিস্থিতিতেও পল্লবের উত্তরে ফিক করে হেসে ফেলল তিতাস আর হাসতে গিয়ে খেয়াল করল না, কোলে শুয়ে থাকা আহত ছেলেটি স্থির চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুহূর্তের মধ্যে আঙুলের ফাঁক থেকে একটা ব্লেড বার করে আনল সে এবং সবার অলক্ষ্যে অভ্যস্ত হাতে চোখের পলকে কেটে নিল তিতাসের কয়েকটি চুল।

গাছের তলাটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। ফুঁ দিয়ে ধুলো ঝেড়ে সেখানেই বসে পড়ল রোশনি। ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বার করে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে ফেলল। ঘুরে ঘুরে পা ব্যথা হয়ে গেল তবু এখনও কাজের কাজ হল না। এই মুহূর্তে রোশনি বসে আছে বর্ধমানের হাসপাতালে। বদ্রিনাথ সাহা নামে হাসপাতালের একজন ফোর্থক্লাস স্টাফের সঙ্গে দেখা করতে সে কলকাতা থেকে বর্ধমান এসেছে সকালের বাসে। বদ্রিনাথ নিজেই আসতে বলেছিল কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা হয়ে গেল রোশনি অপেক্ষা করছে, বদ্রিনাথ আসেনি। এমনকী তার ফোনও বন্ধ। হতাশ হয়ে রোশনি ভাবছিল, নির্ঘাত লোকটা তার সাথে প্র্যাকটিক্যাল জোক করেছে। শুধুমাত্র ফোনে কথা হওয়ার ওপর ভরসা করে সকাল সকাল এতটা উজিয়ে আসা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। কিন্তু রোশনিরও দোষ নেই। বদ্রিনাথ যা ইঙ্গিত দিয়েছিল, তা শুনলে যে কোনও সাংবাদিকই উত্তেজিত হত। সেখানে তো রোশনির মাথার ওপর খাঁড়া ঝুলছে। বস আকারে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিয়েছেন, খুব তাড়াতাড়ি এক্সক্লুসিভ কোনও স্টোরি না করতে পারলে চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে। তাই বদ্রিনাথের কথা শুনে নড়চড়ে বসেছিল রোশনি।

গতকাল রোশনির মর্নিং ডিউটি ছিল। হঠাৎ বড় কোনও দুর্ঘটনা না ঘটলে মর্নিং ডিউটিতে সাধারণত খুব একটা চাপ থাকে না। কাজ বলতে, ঘণ্টাখানেক অন্তর অন্তর পুলিশের কন্ট্রোলরুমে ফোন করে খোঁজ নেওয়া। অফিস জমজমাট হতে শুরু করে বারোটার পর থেকে। ফলে আটটা থেকে বারোটা এই চার ঘণ্টা বেশ একটা নিরিবিলি সময় পাওয়া যায়। ওই সময়টায় রোশনি বইপত্র পড়ে বা ইন্টারনেট ঘাঁটে। গতকালও তাই করছিল। এমন সময় বেজে উঠেছিল অফিসের ল্যান্ড ফোন।

খুব বেশিদিন হয়নি রোশনি রিপোর্টিংয়ে ট্রান্সফার হয়েছে। প্রথমদিকে মর্নিং ডিউটিতে ফোন বাজলেই তার বুক ধড়ফড় করত। মনে হত, এই বুঝি কোথাও আগুন লেগেছে বা বাড়ি ভেঙে পড়েছে বা অন্য কোনও দুর্ঘটনা। কিন্তু দিনকয়েক যেতে রোশনি খেয়াল করেছিল, দুর্ঘটনা ঘটারও মোটামুটি কয়েকটা নির্দিষ্ট সময় আছে। যেমন, আগুন লাগে সাধারণত ভোরের দিকে বা দুপুরের পর। বাইকওয়ালারা ফ্লাইওভারের ডিভাইডারে ধাক্কা মারে রাত গহীন হলে আর লোকে বাসে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যায় অফিস থেকে ফেরার সময়। একমাত্র মেট্রোয় সুইসাইড করার নির্দিষ্ট কোনও সময় নেই। ওটা মেট্রো খোলার পর যে কোনও সময় হতে পারে। তবে এটা সম্পূর্ণই রোশনির ব্যক্তিগত অভিমত। এতে কোম্পানির কোনও দায় নেই।

সাধারণত সকালের দিকে যে ফোনগুলো আসে সেগুলো খুবই আটপৌরে। কেউ ফোন করে পাড়ার ক্লাবের বার্ষিক বিচিত্রানুষ্ঠান কভার করাতে চান। কেউ আবার ম্যাগাজিনে কেন লেখা ছাপা হচ্ছে না তাই নিয়ে খুব অভিমান করেন। রোশনির বেশ মজা লাগে অচেনা মানুষগুলোর চেনা অভিযোগ, চেনা আবদার শুনতে। অফিসের অনেকেই আছে যারা এই সব ফোন ধরে হ্যাঁ-হুঁ করে কেটে দেয়। রোশনি সে দলে পড়ে না। সে মন দিয়ে সবটা শোনে তার পর তার সাধ্যমতো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। কালও যথারীতি রোশনি ফোন ধরেছিল, হ্যালো।

উল্টোদিক থেকে একটা ভাঙা ভাঙা গলা বলে উঠেছিল, এটা দৈনিক নবজাগরণের অফিস তো?

হ্যাঁ। কে বলছেন?

আপনি কি সাংবাদিক?

প্রশ্নটা শুনে রোশনি এক মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেছিল। ঠোঁটের গোড়ায় এসে গেছিল, না আমি চিয়ারলিডার। খবরের কাগজের অফিসে সকাল সকাল সাংবাদিক ছাড়া আর কে থাকবে? কিন্তু বলতে গিয়েও সামলে নিয়েছিল নিজেকে। রোশনি খেয়াল করে দেখেছে, সারকাসটিক্যালি কথা বলা ইদানীং একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে। ট্যারা ট্যারা উত্তর দিয়ে মানুষ অদ্ভুত আত্মরতি অনুভব করে। ধরা যাক, ফেসবুকে কারও সাথে নতুন আলাপ। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি কোথায় থাকেন? সে উত্তর দিল, বাড়িতে। আরে কী জিতে নিলি তুই এটা বলে? তুই কি কুকুরের বাচ্চা যে পথেঘাটে থাকবি! বা কাউকে জিজ্ঞেস করা হল, কেমন আছেন? সে উত্তর দিল, জেনে আপনার লাভ? কথাটা ঠিকই, তুই কেমন আছিস তা দিয়ে বিপুলা এ পৃথিবীর কিচ্ছুটি ছেঁড়া যায় না কিন্তু তবু তো মানুষ কুশল বিনিময় করে। সেটাই সভ্যতা। মানুষের মধ্যে এই সভ্যতার পরিমাণটা কমে যাচ্ছে। মানুষ সোজা কথা বলতে ভুলে যাচ্ছে। রোশনি কোনও একটা লেখায় পড়েছিল, লোকসংখ্যা বাড়ছে এটা ভয়ের কথা নয়। ভয়ের কথা হল ছোটলোকের সংখ্যা বাড়ছে। একদম ঠিক। যে মানুষ অন্যকে নীচু করে আনন্দ পায় তার থেকে গরিব এ দুনিয়াতে আর কে আছে? প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় রোশনিও রক্তের গরমে মানুষকে বাঁকা কথা বলেছে। সার্কাজমে বিদ্ধ করেছে। কিন্তু বয়েস বাড়তে সামলে নিয়েছে নিজেকে। বুঝেছে, সার্কাজম চন্দ্রবিন্দুর গানেই ভালো লাগে। পারস্পরিক আলাপচারিতায় নয়। তাই নরম গলায় রোশনি বলেছিল, হ্যাঁ আমি একজন সাংবাদিক। বলুন কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

লোকটা সময় নিয়ে বলেছিল, ম্যাডাম, আমার কাছে এমন একটা খবর আছে সেটা কাগজে বেরোলে হুলস্থুল পড়ে যাবে।

যাঁরা খবর দিতে ফোন করেন তাঁরা সকলেই মনে করেন, তাঁদের কাছে যে খবর আছে সেটা দিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে গদিচ্যুত করে দেওয়া যায়। ফলে বিশেষ মাথা ঘামায়নি রোশনি। নিরাসক্ত গলায় বলেছিল, আচ্ছা।

উল্টোদিকের লোকটা বোধ হয় রোশনির বলার ভঙ্গিটা পড়তে পেরেছিল। একটু চুপ থেকে বলেছিল, আমার কথাটা সিরিয়াসলি নিলেন না তাই না ম্যাডাম? আমি কিন্তু কোনও ফালতু খবর দিতে ফোন করিনি। অন্য কাগজেও ফোন করতে পারতাম কিন্তু আপনারা বাংলার সবচেয়ে বড় মিডিয়া। তা যাক গে, আপনার ইন্টারেস্ট না থাকলে অন্য কথা। রাখি।

লোকটার বলার মধ্যে একটা প্রত্যয় ছিল। রোশনি সচকিত হয়ে উঠেছিল। সে দ্রুত বলে উঠেছিল, দাঁড়ান। কী খবর আছে আপনার কাছে? তার আগে বলুন, আপনি কে? কোথা থেকে বলছেন?

নামটা গোপন থাকবে তো?

থাকবে। সাংবাদিকরা সোর্সের নাম ডিসক্লোজ করে না। প্রফেশনাল এথিক্স। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

আমার নাম বদ্রিনাথ সাহা। বর্ধমান থেকে কথা বলছি। বর্ধমান হাসপাতালের শিশুরোগ ডিপার্টমেন্টের ফোর্থক্লাস স্টাফ। ম্যাডাম, একটা নতুন ভাইরাস এসেছে আর তাতে অদ্ভুত ভাবে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য দফতর খবরগুলো চেপে দিয়েছে কিন্তু এটা মানুষের জানা উচিত।

কী বলতে চাইছেন একটু খুলে বলুন।

ম্যাডাম, আমি তিন মাস হল হল বদলি হয়ে এই হাসপাতালে এসেছি। এর আগে ছিলাম হুগলিতে। আমার বদলি হবার মাসখানেক আগে হুগলিতে দু’টো বাচ্চা পরপর মারা যায়। একদম আনন্যাচারাল ডেথ। কিন্তু ডাক্তারেরা পুরো চেপে গেছিল। হাসপাতালের সুপার নিজে বাচ্চা দু’টোর ফ্যামিলির সাথে অনেক কথাবার্তা বলেছিল ঘর বন্ধ করে। শুধু কানাঘুষোয় যেটুকু জানতে পেরেছিলাম, তা হল বাচ্চা দু’টোর না কি দাঁত পড়ে যাচ্ছিল। তা যাই হোক, ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল। কিন্তু মাসখানেক আগে বর্ধমান হাসপাতালেও এমন একটা কেস হয়। এখানেও বাচ্চাটা মারা যায়। এবার আমি তক্কে তক্কে ছিলাম। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, সেম কেস। এই বাচ্চাটারও দাঁত নিয়ে কিছু একটা প্রবলেম ছিল। আমার এক মামাতো বোন নার্স। সে অবশ্য প্রাইভেট নার্সিংহোমে আছে। সেখানেও একটা বাচ্চার এমন হয়। বাচ্চাটাকে রাতারাতি কলকাতার পিজি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমার মন কু ডাকছিল। আমি কলকাতায় চলে যাই। পিজি হাসপাতালে ঘোরাঘুরি করতে থাকি। জানতে পারি ওই বাচ্চাটাও মারা গেছে। আমি খাতা দেখে চারটে বাচ্চার ঠিকানা জোগাড় করেছি। ওদের ফ্যামিলির লোকজনের সাথে কথাও বলেছি। কেউই মুখ খুলতে চাইছিল না বুঝলেন? আসলে ডিরেক্ট সরকারি চাপ আছে। কিন্তু অনেক কায়দা করে কিছু কিছু জিনিস জানতে পেরেছি যেগুলো খুব অদ্ভুত। আমার মন বলছে, এই চারটে বাচ্চাই শুধু নয়। এর পর আরও অনেক বাচ্চার সাথে এই একই জিনিস হতে চলেছে। বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে হবে ম্যাডাম।

কথাগুলো শুনে থ হয়ে দাঁড়িয়েছিল রোশনি। তার মাথার মধ্যে তখন ঘুর্ণি তুলেছে নানা সম্ভাবনা, নানা আশঙ্কা। নিজেকে একটু সামলে সে বলেছিল, কী কী জানতে পেরেছেন বলুন।

বদ্রিনাথ বলেছিল, এত কথা ফোনে বলা যাবে না। রিস্ক আছে। আপনি একবার দেখা করতে পারবেন? আমি এই কেসটাতেই খোঁজাখুঁজি করতে গিয়ে একটু আটকে পড়েছি। নয়তো নিজেই কলকাতা চলে যেতাম। বর্ধমানে আসতে অসুবিধে হবে?

একটু ভেবে রোশনি বলেছিল, না। কবে আসব বলুন?

কালকেই আসুন না। সকাল সকাল চলে আসবেন। এসে আমায় একটা ফোন করবেন। আমার মোবাইল নম্বরটা লিখে নিন।

রোশনি লিখে নিয়েছিল মোবাইল নম্বর। ফোন রাখার আগে বদ্রিনাথ বলে উঠেছিল, ও হো! আপনার নামটাই তো জানা হল না। আপনি?

আমি রোশনি।

রোশনি কী?

শুধু রোশনি।

তা সকাল সকালই এসেছিল রোশনি। কলকাতা থেকে সাতটার বাস ধরেছিল। দশটার মধ্যে পৌঁছেও গেছিল দিব্যি। কিন্তু বাস স্ট্যান্ডে নেমেই তার মাথায় হাত পড়ে গেল। বদ্রিনাথের ফোন সুইচড অফ। এ কী ইরেসপনসিবল লোক রে বাবা! নিজেই আসতে বলে ফোন বন্ধ করে রেখেছে! বাস স্ট্যান্ডেই ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেছিল রোশনি আর বারবার ফোন করছিল বদ্রিনাথকে। কিন্তু সেই একই কথা শুনিয়েছিল যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর। জেদ চেপে গেছিল রোশনির। এত দূর যখন এসেছে তখন দেখা না করে সে ফিরবে না। একটা টোটো ধরে চলে এসেছিল হাসপাতালে। শিশুরোগ বিভাগে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিল, বদ্রিনাথ এখনও আসেনি। সেই থেকে বদ্রিনাথের জন্য হা পিত্যেশ করে বসে আছে সে। বেলা ভালোই হয়েছে। প্রায় একটা বাজে। সকাল থেকে দু’ কাপ চা আর দু’টো বিস্কুট ছাড়া কিছু খাওয়া হয়নি। বেশ খিদে পেয়েছে। হাসপাতালের বাইরে একটা ভাতের হোটেল দেখেছিল রোশনি। ঠিক করল, ওখানেই দুপুরের খাওয়াটা সেরে কলকাতার বাস ধরবে। বদ্রিনাথের জন্য জীবনের আর একটা মিনিটও নষ্ট করবে না সে।

দোকানে ঢুকে সবে চেয়ার টেনে বসেছে, একটা ছেলে এসে বলল, দিদি ভাত শেষ। একটু বসতে হবে।

রোশনি বলল, কতক্ষণ?

ছেলেটা বলল, চল্লিশ মিনিট।

বিরক্ত হতে গিয়েও হেসে ফেলল রোশনি। ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি ঝুলিয়ে বেরিয়ে এল হোটেল থেকে। ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এতকাল সে দেখেছে, ভাত শেষ হয়ে গেছে বললেই কাস্টমার খেঁকিয়ে ওঠে। এই প্রথম কাউকে হাসতে দেখল। মানুষ তো মানুষের মন পড়তে পারে না। যদি পারত তা হলে ছেলেটা বুঝতে পারত, এই মুহূর্তে রোশনি নিজের ভাগ্যকেই পরিহাস করছে। সে ভাবছিল, কোথায় এখন তার সম্পাদকীয় পাতায় নতুন বেরনো কোনও বইয়ের রিভিউ লেখার কথা, তা না খবরের সন্ধানে সে খিদে পেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে বর্ধমানের রাস্তায়! রোশনি জানে, সে সাপের ল্যাজে পা দিয়ে ফেলেছে। খুব বেশি দিন আর এই চাকরিটা তার কপালে নেই। যে ঘটনা ঘটেছিল তাতে চাকরিটা রোশনি নিজেই ছেড়ে দিতে পারত। কিন্তু ছাড়েনি দু’টো কারণে। এক, সে যদি নিজে ছেড়ে দিত তা হলে এটা প্রমাণ হত যে সে ভুল করেছে। আর দুই, এই মুহূর্তে চাকরি ছাড়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই তার।

ঝামেলাটা চলছে প্রায় দু’ মাসের ওপর। পূর্বতন সম্পাদক অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর ম্যাগাজিনের এক উচ্চপদস্থ কর্তাকে সম্পাদক হিসেবে বসানো হয়, আর ঝামেলাটা শুরু হয় তার পরেই। ভূতপূর্ব সম্পাদক ঠিক যতটা বিনয়ী, ভদ্র ও শিক্ষিত ছিলেন এই লোকটা ঠিক ততটাই দুর্বিনীত, অভদ্র ও অশিক্ষিত। ইনি একটাই জিনিস দারুণ পারেন আর তা হল আদিরসাত্মক রসিকতা। মহিলা সহকর্মী দেখলে ওনার এই পানু জোক বলার ইচ্ছে বৃদ্ধি পায়। এ অবধি তাও মেনে নেওয়া যাচ্ছিল কারণ বহু পুরুষেরই অবদমিত কাম এই পথে প্রকাশিত হয়। কিন্তু ক্রমে প্রকাশ পেল, শুধু রসিকতাই নয়, ওনার ভর্ৎসনাও আদিরসময়। খুব রেগে গিয়ে তিনি একদিন এক অধস্তন মহিলা সহকর্মীকে বলে উঠলেন, শুধু বুকের খাঁজ দেখানোর জন্য তোকে মাইনে দেওয়া হচ্ছে না।

তার পর আর একদিন অন্য একজনকে ধমকে উঠলেন, পোয়াতি গোরুর মতো পাছা না দুলিয়ে তাড়াতাড়ি যাও।

ওই দু’জনের একজন খুব কাঁদল আর একজন এইচ আরে কমপ্লেন করল। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হল না। রোশনি খেয়াল করেছিল, প্রথম থেকেই লোকটা তার দিকে কেমন অশ্লীল ভাবে তাকায়। একদিন পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, তোর চোখ নাক মুখ হেবি সুন্দর কিন্তু তোর মধ্যে একটা মদ্দা মদ্দা ভাব আছে। অবশ্য সেটা খারাপ না।

আর একদিন ভরা মিটিংয়ে বললেন, রোশনির আবার চাপ কী? ওর তো বাসে অটোয় কনুই খাওয়ার ভয় নেই।

বলে হো হো করে হাসতে লাগলেন। যেন কী দারুণ একটা মজার কথা বলে ফেলেছেন। চাটুকারেরা হাসিতে যোগ দিল আর বাকিরা রোশনির অপমানে মিশে গেল মাটিতে। ছোট বুক নিয়ে রোশনিকে যে কোনওদিন কটাক্ষ হজম করতে হয়নি এমন নয় কিন্তু অফিসেও যে এটা শুনতে হবে রোশনি কল্পনা করেনি। সে স্তব্ধ হয়ে গেছিল। উঠে চলে গেছিল মিটিং ছেড়ে। সন্ধেবেলায় সম্পাদক নিজে এসে হাজির হলেন রোশনির ডেস্কে। দুপুরের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইলেন এবং যাওয়ার সময় আদর করে রোশনির পাছায় হাত বুলিয়ে দিলেন!

সহকর্মীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ দু’জনকে ঘটনাটা জানিয়েছিল রোশনি। তারা বলেছিল, এইচ আরে কমপ্লেন করতে। রোশনি করেনি। সে জানত কমপ্লেন করে লাভ হবে না। অসহায় রাগ এবং ঘৃণা ক্রমশ পরিণত হয়েছিল প্রত্যয়ে। নিজের কর্মপদ্ধতি ঠিক করে ফেলেছিল রোশনি।

সে দিনটা ছিল শুক্রবার। সন্ধেবেলায় রোশনি কয়েকটা প্রিন্ট আউট বার করছিল। সম্পাদক মহাশয় পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তোর মধ্যে একটু মদ্দা মদ্দা ভাব থাকলে কী হবে আসল জিনিসগুলো নরম। এই বলে আবার রোশনির পেছনে হাত রেখেছিলেন সম্পাদক আর এবার কালবিলম্ব না করে তাঁর গালে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিয়েছিল রোশনি। বলে উঠেছিল, রোজ দাড়ি কামালে কী হবে, আপনার গালটাও ভারী নরম।

সবাইকে স্তম্ভিত করে ব্যাগটা কাঁধে তুলে অফিস থেকে বেরিয়ে গেছিল সে। পরে খবর পেয়েছিল, সম্পাদক আহত ব্যাঘ্রের মতো কিছুক্ষণ দাপাদাপি করেছিলেন নিজের কেবিনে। তার পর প্রেস ক্লাবে গিয়ে চার পেগ মদ খেয়ে রোশনির মতো মদ্দা টাইপ মাগিকে কুকুরেও নেবে না বলে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন এবং রোশনির মতো মেয়েদের ঠান্ডা করার জন্য গ্যাং রেপের দাওয়াই দিয়েছিলেন।

রোশনি জানত ঝড় আসবে কিন্তু সেটা যে এভাবে আসবে বুঝতে পারেনি। এক সপ্তাহের মাথায় তাকে জানানো হল, রিপোর্টিংয়ে দক্ষ লোক দরকার তাই তাকে সেখানে ট্রান্সফার করা হচ্ছে। আর ট্রান্সফারের দু’ সপ্তাহের মাথায় জানানো হল, রোশনি পারফর্ম করতে পারছে না। অনতিবিলম্বে এক্সক্লুসিভ স্টোরি আনতে না পারলে চাকরি যাবে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলল রোশনি। এখুনি চাকরিটা গেলে তার চলবে না। সিদ্ধান্ত বদল করল। বদ্রিনাথের জন্য আরও কিছুটা সময় ব্যয় করতেই হবে। ডিপার্টমেন্ট থেকে বদ্রিনাথের বাড়ির ঠিকানা নিতে হবে এবং তার বাড়ি যেতে হবে। কিন্তু শিশুরোগ বিভাগে ঢুকতেই থমকে গেল রোশনি। রিসেপশনে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে। বিভাগেরই কয়েকজনের সঙ্গে তারা কথা বলছে। কথোপকথন শুনে চমকে উঠল সে। গতকাল রাত থেকে বদ্রিনাথ মিসিং। সন্ধেবেলায় বেরিয়েছিল, আর ফেরেনি। বাড়ির লোক থানায় ডায়েরি করাতে পুলিশ খোঁজ করতে শুরু করেছে।

অদ্ভুত একটা অস্বস্তি দানা বাঁধছিল রোশনির মাথার মধ্যে। অজানা একটা আশঙ্কায় শিহরিত হচ্ছিল সে। গতকাল সকালে যে লোকটা একটা গোপন খবর দেবে বলল, সন্ধে হতে না হতে সে নিখোঁজ! রোশনি কিছুতেই এ দুটোকে সমাপতন বলে মানতে চাইছিল না তবু তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে সাবধান করছিল বারবার, চলে যাও। এ খবরের পেছনে না ছুটে ফিরে যাও। বিপদ হবে। খুব বিপদ।

মনটা ভারী খুশি ছিল বদ্রিনাথের। যে খবরটার জন্য গত কিছুদিন ধরে লড়ে যাচ্ছে তার একটা বড় সূত্র আজ হাতে এসেছে। বাচ্চা মৃত্যুর ব্যাপারটা হুগলিতে না, শুরু হয়েছিল কলকাতায়। সাত-আট মাস আগে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পরপর এরকম দুটো কেস এসেছিল। তার একটা নিয়ে তো বিরাট হুলস্থুল হয়েছিল। সরকার তখনও রোগটার গুরুত্ব ধরতে পারেনি তাই কাগজে লেখালিখিও হয়েছিল অল্প করে। আসলে সেই সময় জুনিয়র ডাক্তারেরা ধর্মঘট করে দেওয়ায় খবরটা অন্যদিকে ঘুরে যায়। পুরনো কাগজ ঘেঁটে বদ্রিনাথ এও জানতে পেরেছে, সে সময় এই ডামাডোলে তিতাস সেন নামে একজন ডাক্তার রিজাইনও করেছিল। কাল রোশনি ম্যাডাম আসছে। তাঁকে সবটা খুলে বলতে হবে। হ্যাঁ, নতুন একটা রোগের আমদানি হলে সেটা নিয়ে ঢাকঢোল না পেটানোরই কথা। তাতে লোকে বেশি ঘাবড়ে যায় কিন্তু তা বলে খবরগুলো চেপে দেওয়াও তো কাজের কথা না। এভাবে একের পর এক ফুটফুটে বাচ্চাগুলো মরে যাবে, এ মেনে নেওয়া যায় না কি! এসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ি ফিরছিল বদ্রিনাথ। ভালোই রাত হয়েছে। রাস্তাঘাটে লোকজন নেই। দু’একটা কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে এদিক ওদিক। হঠাৎই উল্টোদিক থেকে একটা সাইকেল এগিয়ে এসেছিল। এসে থেমেছিল একেবারে গা ঘেঁষে। চমকে উঠেছিল বদ্রিনাথ। সাইকেল আরোহী তার মুখ চেনা। কয়েকদিন আগেও মোড়ের চায়ের দোকানে দেখেছে। দোকানটা চালায় মন্টু। বদ্রিনাথ মন্টুকে জিজ্ঞেস করেছিল, কে রে ছেলেটা? নতুন না কি?

মন্টু বলেছিল, হ্যাঁ। মনে হচ্ছে ভাড়া এসেছে।

ভারী অদ্ভুত দেখতে ছেলেটাকে। ছিপছিপে, লম্বা, ফর্সা, কাটাকাটা চোখমুখ। সুন্দরের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লোকে এগুলোই বোঝায় কিন্তু সব ক’টা দিক মিলে যাওয়ার পরেও ছেলেটাকে সুন্দর দেখতে বলা যাবে না। তার কারণ ছেলেটার মুখের মধ্যে অদ্ভুত একটা নিরাসক্তি আছে। চোখ দু’টো যেন পাথরের। কোনও অভিব্যক্তিই ফোটে না তাতে। যাদের চোখ কথা বলে না তাদের মোটে ভালো লাগে না বদ্রিনাথের। সে বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, এ কী! একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়লে যে!

ছেলেটা হড়বড় করে বলে উঠল, সরি দাদা। আসলে মায়ের খুব শরীর খারাপ। হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পাশের বাড়ি থেকে বলল, হাসপাতালে আপনার অনেক চেনাশোনা। তাই আপনার বাড়ি গেছিলাম। গিয়ে শুনলাম আপনি নেই। ভাবলাম, হয়তো চায়ের দোকানে আছেন। তাই ছুটে যাচ্ছিলাম। সরি দাদা, একটিবার আমাদের বাড়ি যাবেন প্লিজ? মায়ের এখন তখন অবস্থা!

এসব ব্যাপারে বদ্রিনাথ না করতে পারে না। বিপদে-আপদে এলাকার লোকজন তার কাছে আসে। মনে মনে বিরক্তি চেপে সে বলল, চলো। কোথায় বাড়ি তোমাদের?

দাদা, পশ্চিমপাড়ায়।

ও। ক্যারিয়ারে বসব?

হ্যাঁ দাদা। বসুন।

বদ্রিনাথকে ক্যারিয়ারে বসিয়ে হু হু করে সাইকেল ছুটিয়ে দিল ছেলেটা। চালাতে চালাতে বলল, কবরখানার মধ্যে দিয়ে গেলে শর্টকাট হয়। যাব দাদা? আপনার ভূতের ভয় নেই তো?

হাসল বদ্রিনাথ, না হে। ওসব ছেলেবেলায় থাকে। যেখান দিয়ে তাড়াতাড়ি হয় চলো। একটা কিছু ব্যবস্থা করে দিয়ে আমায় আবার ফিরতে হবে। অনেক রাত হল।

বলতে বলতেই রাস্তা থেকে সাইকেল নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল ছেলেটা। এ রাস্তা বদ্রিনাথ চেনে। সামনে বড় দরগার কবর পেরোলেই ওপারে বড় রাস্তা। বড় রাস্তায় উঠে কিছুটা গিয়ে ডানদিকে নিলেই পশ্চিমপাড়া। বদ্রিনাথ বলল, তোমায় সেদিন দেখলাম চায়ের দোকানে। ক’দিন এসেছ এদিকে?

ছেলেটা বলল, বেশি না। এই মাস দুয়েক হবে।

ততক্ষণে কবরখানার মধ্যে ঢুকে পড়েছে সাইকেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ছেলেটা এক হাতে মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে ধরে রেখেছে আর এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল। এবড়োখেবড়ো মাটিতে বেশ লাফাচ্ছে সাইকেলটা। তার ওপর ছেলেটা জোরে চালাচ্ছে বলে বসতে আরও অসুবিধে হচ্ছে। বদ্রিনাথ মনে মনে ভাবল, রোগাপাতলা হলে কী হবে? ছেলেটার গায়ে তো বেশ কষ আছে। এক হাতে হ্যান্ডেল ধরে এই পথে ডবল ক্যারি করা মুখের কথা না। সে বলে উঠল, একটু আস্তে চালাও ভাই।

বলতে না বলতেই আচমকা ব্রেক মেরে দিল ছেলেটা। মাটিতে চাকা ঘষটে বিশ্রী আওয়াজ করে দাঁড়িয়ে গেল সাইকেলটা আর টাল সামলাতে না পেরে বদ্রিনাথ উল্টে পড়ল একটা কবরের ওপর। কবরের ধারগুলো ইট দিয়ে বাঁধানো। তাতে ঘষা খেয়ে কনুইয়ের নুনছাল উঠে গেল। প্রচণ্ড মাথা গরম হয়ে গেল বদ্রিনাথের। ততক্ষণে ছেলেটাও নেমে পড়েছে। সাইকেল স্ট্যান্ড করে এগিয়ে এসেছে বদ্রিনাথের দিকে। বদ্রিনাথ রেগে বলল, ইয়ার্কি না কি! এই ভাবে কেউ সাইকেল চালায়! মানছি মা অসুস্থ তাই বলে বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে?

করুণ গলায় ছেলেটা বলল, সরি দাদা। আপনি যে পড়ে যাবেন আমি বুঝতে পারিনি। মনে হল সামনে দিয়ে একটা সাপ যাচ্ছিল তাই ব্রেক মেরে দিয়েছিলাম। উঠে আসুন।

ডান হাত বাড়িয়ে দিল ছেলেটা। তার হাত ধরে বদ্রিনাথ উঠে দাঁড়াল আর উঠে দাঁড়ানো মাত্রই ছেলেটার বাঁ হাতটা বদ্রিনাথের গলা বরাবর বিদ্যুতের মতো একবার এদিক থেকে আড়াআড়ি ওদিকে চলে গেল। বিস্মিত হয়ে বদ্রিনাথ দেখল, কেউ যেন ছেলেটার মুখে, জামায় পিচকিরি দিয়ে কোনও তরল ছিটিয়ে দিল নিমেষে। কয়েক মুহূর্ত পর বদ্রিনাথ অনুভব করল সে আর শ্বাস নিতে পারছে না। সে প্রাণপণে নাক মুখ দিয়ে বাতাস টানছে কিন্তু সে বাতাস পৌঁছচ্ছে না বুক অবধি। বুকের ভেতরটা এক বিন্দু বাতাসের জন্য আকুলিবিকুলি করছে। বড় কষ্ট হচ্ছে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে ক্রমশ। সেই ঝাপসা চোখেই সে দেখতে পেল, ছেলেটার বাঁ হাতে কী যেন চকচক করছে। অন্ধকারেরও একটা নিজস্ব প্রভা আছে। সেই সামান্য স্পষ্টতাতেও বদ্রিনাথ বুঝতে পারল, ওটা একটা ব্লেড আর নাক মুখ দিয়ে প্রাণপণে টানা সমস্ত বাতাস তার গলার ক্ষত দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটার মুখে জামায় যা ছিটকে লাগছে তা তারই রক্ত। ছেলেটা ডান হাতে এখনও শক্ত করে তার হাত ধরে রেখেছে। মরে যেতে যেতে বদ্রিনাথ অবাক হয়ে দেখল, ছেলেটার চোখ দুটো হাসছে!

খুব রোদ উঠেছে আজ। কুলকুল করে ঘাম হচ্ছে। বগলের কাছটায় একটা ফোঁড়া হয়েছে। ঘামে ঘামে আরও চেটকে যাচ্ছে সেটা। ভেপসে উঠছে। খুব টাটাচ্ছে জায়গাটা। একটা হাত তাই মাথার ওপর তুলে রেখে এক হাতে ছাতু মাখছিল লোকনাথ। সানকিটার তলায় টেপ্পোল খেয়ে গেছে। ঠিকমতো বসছে না মাটির ওপর। নড়বড় নড়বড় করছে। ছাতু মাখতে গেলেই পিছলে সরে যাচ্ছে। রাগ ধরে গেল লোকনাথের। ধুত্তেরি, এভাবে খাওয়া যায়? ছেলেটা এখনও আসছে না কেন কে জানে! এতক্ষণে তো কাজ হয়ে যাওয়ার কথা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোকনাথ। তার পর আধমাখা ছাতুর সানকিটাকে একপাশে সরিয়ে হাত ধুয়ে ফেলল। চিত হয়ে শুয়ে পড়ল চৌকিতে। ফাটিয়ে দিতে চাইলে ফোঁড়াটা ফাটিয়েই দেওয়া যায় কিন্তু ইচ্ছে করেই সেটা করেনি লোকনাথ। এসব ধরনের বিপজ্জনক কাজের আগে ঘা, ফোঁড়া এগুলো হওয়া ভালো লক্ষণ। ব্যথা যত টাটিয়ে উঠবে তত বেশি করে মনে পড়ে যাবে, বাকি আছে। এখনও কাজ বাকি আছে।

ঘরের এক কোণে যেন ছোটদের ঝুলন সাজানো হয়েছে। ইটের টুকরোয় লাল সুতো বেঁধে ঘের দেওয়া হয়েছে কিছুটা জায়গা। তার ভেতর ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বালি। যেন একটা ছোট্ট বালিয়াড়ি। মাঝখানটায় বালি দিয়েই একটা ঢিপি মতো করা হয়েছে। তার ওপর পুঁতে দেওয়া হয়েছে একটা তিরকাঠি। কাঠিটার সারা গায়ে লাল সুতো জড়ানো। বালির ঢিপিটার ঠিক সামনে খেজুর পাতায় বোনা একটা ছোট্ট চাটাই। তার ওপর রাখা একটা আটার মণ্ড আর সেই মণ্ডটার গায়ে চিপকানো খবরের কাগজ থেকে কেটে নেওয়া একটা ছবি। ছবিটা তিতাসের। চোখের পলক না ফেলে সেদিকে তাকিয়ে রইল লোকনাথ। তার এত বছরের সাধনা এক মুহূর্তে নষ্ট করে দিয়েছে এই মেয়েটা। সিদ্ধির দোরগোড়া থেকে ফিরে আসতে বাধ্য করেছে তাকে। কিন্তু ও জানে না, লোকনাথ চক্কোত্তির জন্মই হয়েছে সাধনা করার জন্য। লোকনাথ জন্ম সাধক। এত বছর ধরে যার জন্য অপেক্ষা করে আছে তা তো সে শেষ করবেই কিন্তু তার আগে পুড়িয়ে মারবে এই মেয়েটাকে। মেয়েটা কল্পনাও করতে পারবে না লোকনাথের প্রতিহিংসা কী সাংঘাতিক!

এখনও চোখ বুজলেই লোকনাথকে তাড়া করে বেড়ায় সেই দৃশ্যটা। মিতুলকে স্পর্শ করতে গিয়ে অসহায় গেনু ছিটকে পড়েছে দূরে। বুক মুচড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে লোকনাথের। গেনুকে ওরা শেষ করে ফেলেছে। গেনু নেই। গেনু আর আসবে না। কতগুলো বছর গেনু তার সঙ্গে ছিল। কত স্মৃতি গেনুর সঙ্গে। গেনুকে পোষ মানানো সহজ কাজ ছিল না। পোষ মানার আগে গেনু তার দুটো আঙুল খেয়ে ফেলেছিল। কিন্তু পোষ মানার পর গেনু হয়ে উঠেছিল তার অনুগত সহচর। এক মুহূর্তের জন্য গেনু তার বিশ্বাসের অমর্যাদা করেনি কোনও দিন। সেই গেনুকে ওরা...

প্রথম প্রথম ক্রোধে অসহায় হয়ে যেত লোকনাথ। সে শক্তিহীন, সে পঙ্গু। পরাজিত সৈনিকের মতো নিষ্ফল আক্রোশে নিজেকেই ক্ষতবিক্ষত করত প্রতিনিয়ত। বিছানায় শুয়ে কাঁদত দিনরাত। সে সময় খুব সেবাযত্ন করেছিল সুদেব আর তার বউ। ওরাই তো ভাঙা কোমর জোড়াতালি দিয়ে খাড়া করে দাঁড় করাল লোকনাথকে। লোকনাথের শুধু মনে পড়ে আচমকা একটা গাড়ি এসে তাকে ধাক্কা মেরেছিল খুব জোরে। বাকিটা অন্ধকার। জ্ঞান ফিরেছিল একটা ঝুপড়ির মধ্যে। পরে সুদেবের কাছে শুনেছিল সবটা।

সুদেব ভেড়িতে যেত মাছ চুরি করতে। সেই প্রথম লোকনাথকে পড়ে থাকতে দেখেছিল। নাড়ি ধরে চমকে উঠেছিল, প্রাণটা এখনও ধুকধুক করছে। লোকনাথ অবশ্য জানত, সে এত সহজে মরবে না। লোকনাথের অসামান্য মেধা দেখে ভাদুড়ি মশায় একবার তার কুষ্ঠি বিচার করতে চেয়েছিলেন। লোকনাথেরও জানার ইচ্ছে ছিল তার কুষ্ঠিতে কী আছে, কেন সে এমন সৃষ্টিছাড়া? তদ্দিনে অবশ্য ভাদুড়ি বুড়োর থেকে তার যা নেওয়ার ছিল নেওয়া হয়ে গেছে। তাই কুষ্ঠি বিচারে যদি এদিক-ওদিক কিছু বেরোত, লোকনাথ ভেবেই রেখেছিল, সে পালাবে। কিন্তু কুষ্ঠি বিচার করে অদ্ভুত একটা কথা বলেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। বলেছিলেন, লোকনাথ তুই ক্ষণজন্মা। তুই প্রায় অমর।

চমকে উঠেছিল লোকনাথ, অমর? সে কীরকম গুরুদেব? অমর তো দেবতারা হয় শুনেছি। আমি তো দেবতা নই। সামান্য মনিষ্যি।

একটু চুপ করে থেকে ভাদুড়ি মশায় বলেছিলেন, তুই বোধ হয় ‘প্রায়’ শব্দটা খেয়াল করিসনি। আমি বলেছি, প্রায় অমর।

দয়া করে বুঝিয়ে বলুন গুরুদেব।

কপালে ভাঁজ পড়েছিল ভাদুড়ি মশায়ের। বলেছিলেন, দেবতারা ছাড়াও আরও কেউ কেউ অমরত্ব প্রাপ্ত হত। সে তাদের সাধনালব্ধ ফল। তারা অসুর। পুরাণ ঘাঁটলে এমন ভূরি ভূরি উদাহরণ পাবি যেখানে তপস্যা করে অসুরেরা দেবতাদের সন্তুষ্ট করে অমরত্বের বর লাভ করেছে। কিন্তু দেবতারা চাইতেন না তাঁরা ছাড়া আর কেউ অমর হোক। তা হলে সৃষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হবে। তাই তাঁরা সেই বরে ছোট্ট একটা ফাঁক রেখে দিতেন।

যেমন মহিষাসুর অমরত্ব চাওয়াতে বর পেয়েছিল যে কোনও ব্যাটাছেলে তাকে মারতে পারবে না তাই তো?

ঠিক। মহিষাসুর ভাবতেই পারেনি যে কোনও নারী তার প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠতে পারে। ওইটুকু ফাঁক ছিল বরের মধ্যে। তোর পূর্বজন্ম রহস্যাবৃত। আমি তা ভেদ করতে পারিনি। তবে এটুকু বুঝেছি, পূর্বজন্মের কৃতকর্মের ফলে তুই এ জন্মে বরপ্রাপ্ত হয়েই জন্মেছিস। তোর মৃত্যু বিস্ময়কর এবং অভূতপূর্ব। মানে এমন মৃত্যু যা আগে কখনও ঘটেনি। কেউ দেখেনি। কালে কালে তুই অমিত শক্তিধর হবি লোকনাথ কিন্তু...

কিন্তু?

দুটো সম্ভাবনাই আছে। তুই দেবতাও হতে পারিস। অসুরও হতে পারিস। অসুর হওয়া সোজা। দেবতা হতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। তুই আমার উজ্জ্বলতম ছাত্র, আমি আশা করব তুই পরিশ্রমের পথটাই বেছে নিবি।

মনে মনে খিক খিক করে হেসেছিল লোকনাথ। হায় রে ভাদুড়ি বুড়ো! বুড়ো জানত না, লোকনাথ তদ্দিনে অসুর হয়ে উঠেছে। দেবতা হওয়া খুব পানসে। পানসে জিনিস লোকনাথের ভালো লাগে না। তাই গাড়িটা যখন লোকনাথের ওপর আছড়ে পড়েছিল তখন জ্ঞান হারাতে হারাতে লোকনাথ একটাই কথা ভেবেছিল, এত সহজে সে মরবে না। গাড়ির ধাক্কায় তো আকছার লোক মরে। আর যাই হোক একে অভূতপূর্ব মৃত্যু বলা যায় না।

অন্য কাউকে পড়ে থাকতে দেখলে সুদেব তুলে আনত কি না বলা মুশকিল কিন্তু সেদিন লোকনাথের রক্তাম্বর তার সহায় হয়েছিল। সাধু সন্নিসিতে খুব ভক্তি সুদেব আর সুদেবের বউ পম্পির। ভ্যানে করে তারা তাকে নিয়ে গিয়েছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার বলেছিলেন, ওরে হাসপাতালে নিয়ে যা। পেশেন্টের অবস্থা ভালো না।

হাত জোড় করে সুদেব বলেছিল, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার মতো পয়সা বা সময় কোনওটাই নেই ডাক্তারবাবু। এখানেই যা পারুন করুন। যা হওয়ার হবে।

ডাক্তার বলেছিলেন, পেশেন্ট কে হয় তোর?

সুদেব কিছু বলার আগেই পম্পি বলে উঠেছিল, আমার বাবা।

একটা অচেনা অজানা লোকের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তাকে নিজের বাবার জায়গা দিয়ে দেবে অতটাও পরোপকারী পম্পি নয়। লোকনাথকে বাঁচিয়ে তোলার পেছনে তার স্বার্থ ছিল। খুবই বড় স্বার্থ। আসলে সুদেব আর পম্পির দুই ছেলেমেয়ে। ছেলেটার বয়স দশ। মেয়েটা পাঁচ বছরের ছোট। প্রথম যখন পেটে বাচ্চা এল পম্পি আর সুদেব ঠাকুরের কাছে খুব করে প্রার্থনা করেছিল যাতে সুস্থ সবল ছেলে হয়। হেন মন্দির নেই যাতে হত্যে দেয়নি। ঠাকুর ওদের কথা শুনেছিলেন ঠিকই কিন্তু অতিরিক্ত হত্যে দেওয়ার পরিশ্রমে কিছু একটা গড়বড় হয়ে গিয়েছিল। তাই ছেলেটা হল হাবাগোবা। গন্নাকাটা। ঠাকুর দেবতা ছেড়ে পম্পি এবার পাকড়াও করল সাধু আর জ্যোতিষীদের। তাগা তাবিজ মাদুলি আর আংটিতে প্রায় ঢেকে ফেলল ছেলেটাকে। তা এই করে দশ বছর কেটে গেল, ছেলের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হল না। পম্পি আর সুদেব প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল এমন সময় টিভিতে এক জ্যোতিষীর দেখা পেল তারা যিনি না কি চুটকিতে ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। যাকে টিভিতে দেখায় সে তো আর এলিতেলি কেউ না অতএব ছেলেকে নিয়ে সেই জ্যোতি¡ীর কাছে ছুটল পম্পি আর সুদেব। ছেলের হাত দেখে জ্যোতিষীর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি বললেন, খুব শিগগিরই এক দিব্যপুরুষের সংস্পর্শে আসবে এই ছেলে এবং সেই দিব্যপুরুষের আশীর্বাদেই সে সেরে উঠবে। ভক্তিবিহ্বল হয়ে জ্যোতিষীকে হাজার টাকা দক্ষিণা দিল সুদেব আর তাঁর পরামর্শেই জমানো টাকা প্রায় চেঁছেপুঁছে ছেলেকে একটা গোমেদ আর একটা পান্না কিনে দিল। তা এই ঘটনার মাসখানেকের মধ্যেই যদি সুদেব একটা রক্তাম্বর পরা সাধুটাইপ লোককে উদ্ধার করে তা হলে পম্পি কেন ভাববে না, ইনিই তিনি? সেই দিব্যপুরুষ!

সুদেব আর পম্পির সেবায় লোকনাথ বেঁচে ফিরল ঠিকই কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার ভাঙা কোমরটা পুরোপুরি জোড়া লাগাতে পারল না। লাঠি ধরতে হল লোকনাথকে। তবে বছর খানেক পর শরীরটা সারলেও মাথাটা পরিষ্কার হতে আরও সাত-আট মাস সময় লেগে গিয়েছিল লোকনাথের। শুরুর দিকে সবই কেমন ঝাপসা ঝাপসা ছিল। সে কে, কোথা থেকে এসেছে, এই ঝুপড়িতে কী করছে, কিছুই স্পষ্ট ভাবে মনে করতে পারত না লোকনাথ। রোজ তাকে ব্রাহ্মী শাকের রস খাওয়াত পম্পি। সাধুবাবা সেরে না উঠলে ছেলেকে আশীর্বাদ করবে কী করে? তা ধীরে ধীরে আবার সব মনে পড়তে লাগল লোকনাথের আর পড়ামাত্রই ক্রোধ, হতাশা মিলেমিশে উন্মাদপ্রায় করে তুলল তাকে। সবটা রাগ গিয়ে পড়ল ভাদুড়ি মশায়ের ওপর। পারলে তখনই সে বুড়োর বুক চিরে মেরে ফেলে কিন্তু সে যে শক্তিহীন। সিদ্ধিলাভের আশায় সব শক্তি সমর্পিত করে দিয়েছিল গেনুর মধ্যে। সিদ্ধি হয়নি। তা ছাড়াও এত বছর ধরে সাধনার যা যা উপকরণ সে সংগ্রহ করেছিল সে সবও হারিয়ে গেছে সেই দিনের পর।

লোকনাথের মনের মধ্যে তখন দিনরাত প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। শয়নে স্বপনে তার একটাই চিন্তা, কীভাবে মারবে ভাদুড়ি বুড়োকে? কিন্তু মারতে গেলে তো সবার আগে তাকে শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। কোন পথে সে অর্জন করবে সেই শক্তি? সাধারণ পদ্ধতিতে সাধনা করাই যায় কিন্তু তাতে লেগে যাবে দীর্ঘ সময়। অত ধৈর্য নেই লোকনাথের। তার চাই এমন কোনও এক পন্থা যা একাধারে সহজ, দ্রুত এবং অমোঘ। এ সবই ভাবতে ভাবতে একদিন সুদেবের ঝুপড়ির দাওয়ায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল লোকনাথ। ঘুম ভেঙেছিল সুদেবের মেয়েটার ডাকে, দাদু, দাদু। ও দাদু।

আরক্ত চোখ চোখ মেলে তাকিয়েছিল লোকনাথ, কী রে?

হাতের মুঠো খুলে লোকনাথের সামনে ধরেছিল বাচ্চা মেয়েটা, এই দেখো দাদু, আমার দাঁত পড়েছে। মা বলেছে দাঁত পড়তে শুরু করলেই আমি বড় হয়ে যাব...

মেয়েটা কলকল করে আধো আধো গলায় আরও কী সব বলে যাচ্ছিল কিন্তু সে সব কিচ্ছু কানে ঢুকছিল না লোকনাথের। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছিল দুধে দাঁতটার দিকে। মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। এক এক করে সব কটা পাতা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। যে পাতাগুলো সে এক কালে কেটে নিয়েছিল ভাদুড়ি মশায়ের গোপন খাতা থেকে। পাতাগুলো হারিয়ে গেছে কিন্তু তারা রয়ে গেছে লোকনাথের স্মৃতিতে। ভাদুড়ি মশায় মজা করে বলতেন, লোকনাথের হাতির মতো স্মৃতিশক্তি। যা একবার দেখে আর ভোলে না। দুর্ঘটনার ধাক্কায় সে ক্ষমতায় পলি পড়েছিল কিন্তু আজ হড়পা বান এসে ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে সমস্ত আস্তরণ। ঝিকিয়ে উঠছে পুরনো বিদ্যা। মেয়েটির ছেলেমানুষি লোকনাথের সামনে নতুন করে খুলে দিয়েছে অনন্ত সম্ভাবনার গুপ্তদ্বার। এক গাল হেসে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়েছিল লোকনাথ তার পর বলেছিল, দাঁতটা আমারে দেবা দিদিভাই?

খুব অবাক হয়েছিল মেয়েটা, দাঁত নিয়ে তুমি কী করবে দাদু?

কেন? সবাইরে দেখাব, এই দেখো, আমার দিদিভাইয়ের দাঁত।

সরল বিশ্বাসে লোকনাথের হাতে নিজের দাঁতটা তুলে দিয়েছিল মেয়েটা আর পরদিন সকাল হতেই সুদেবরা অবাক হয়ে দেখেছিল, দিব্যপুরুষ তাদের অনাথ করে দিয়ে চলে গেছেন।

জ্যোতিষীর কথা ফলেনি। ছেলে তো সুস্থ হয়ইনি উল্টে দিব্যপুরুষ চলে যাওয়ার এক মাসের মাথায় অসহ্য পেটে ব্যথায় ছটফট করতে করতে মারা গিয়েছিল ছোট্ট মেয়েটা।

সেই শুরু হল লোকনাথের শক্তি অর্জনের সাধনা। সর্বোচ্চ শক্তি আহরণ করতে মারতে হবে নয় বছরের কম বয়সি তেরোটি শিশুকে। একটি করে শিশুর গা ছমছমে মৃত্যু হবে আর একটু একটু করে শক্তিমান হয়ে উঠবে লোকনাথ। ইতিমধ্যে সাতটি শিশুকে জীবন দিতে হয়েছে লোকনাথের শক্তি ফিরিয়ে দিতে। সাত নম্বর শিশুটিকে মারার পরেই লোকনাথ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। আর তখনই জানতে পেরেছিল, তার বিফলতার প্রধান কারিগর তিতাস নামের মেয়েটা। জানতে পেরেওছিল ভারী অদ্ভুত ভাবে। একসাথে হাজারটা বিছে যেন হুল ফুটিয়েছিল লোকনাথের শরীরে। মাত্র একটি নারী ছাড়া সমগ্র নারীজাতিকে লোকনাথ ঘেন্না করে এসেছে জন্মাবধি। সেখানে একটা মেয়ে ছল করে তার এত বছরের সাধনা এক মুহূর্তে নষ্ট করে দিল! নিজেকে বড় বেশি হীন মনে হয়েছিল লোকনাথের। সেই ঘৃণামিশ্রিত হীনবোধ লোকনাথের অন্তরের সমস্ত অন্ধকার সেঁচে তুলে এনেছিল ভয়াবহ এক সিদ্ধান্ত। দাঁতে দাঁত চেপে লোকনাথ বলেছিল, তিন টাকার বেশ্যা, ত্রাতা হওয়ার শখ জেগেছে? মহান সেজেছ সবার চোখে? তোরে যদি আমি ভরা বাজারে ন্যাংটো না করেছি তো আমার নাম লোকনাথ চক্কোতি না। এমন বাণ মারব, নিজে হাতে নিজের চিতা সাজাবি তুই। নিজেই আগুন ধরাবি তাতে। নিজে তো মরবিই আর সেই আগুনে পুড়ে মরবে তোর আশপাশে যারা আছে তারাও। আমি তারিয়ে তারিয়ে সেই ন্যাড়াপোড়া দেখব।

মহাসিন্ধুর ওপারের সুদূর প্রদেশে হাজার হাজার বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা এক ঘাতক অভিশাপকে জাগাবার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল লোকনাথ। তার জন্যেই ঘরের কোণে তৈরি করতে হয়েছে নকল বালিয়াড়ি। লোকনাথ জানে, ইতিমধ্যেই অল্প অল্প করে তার ছায়া বিস্তার করতে শুরু করেছে এই তন্ত্র। এবার শুধু অপেক্ষা তিতাসের কোনও দেহাংশ হাতে পাওয়ার। সে চুল, নখ, দাঁত, চামড়া যা কিছু হলেই হবে। তা হলেই পূর্ণ হবে ষোলোকলা। গত তিনদিন ধরে তিতাসের সমস্ত গতিবিধির ওপর নজর রাখছে তড়িৎ। আজ তার জিনিসটা নিয়ে আসার কথা। যদিও সরিত গেলেই সে বেশি নিশ্চিন্ত হত কিন্তু সরিত আটকে পড়েছে বর্ধমানে। একটা খোঁচর বাচ্চাগুলোর মৃত্যু নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে শুরু করেছে। তাকে সরিয়ে দেওয়া দরকার। লোকনাথ চায় না, এই নিয়ে বেশি হুজ্জুতি হোক। তাই সে এক জায়গায় সব ক’টা বাচ্চাকে না মেরে বিভিন্ন জায়গা বেছে নিয়েছে এবং ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছেও কিছুদিন পরপর। এটুকু ধৈর্য সে ধরতে বাধ্য হয়েছে। প্রথমদিকে সবটা লোকনাথ নিজেই করত কিন্তু সরিত আর আর তড়িৎকে পেয়ে তার খাটনি কমেছে। বড় বিশ্বাসী এই দুই ভাই। তড়িৎটা একটু নড়বড়ে কিন্তু সরিতের তুলনা নেই। সরিতের মধ্যে লোকনাথ নিজের ছায়া দেখতে পায়। মাঝে মাঝে সে আদর করে সরিতকে গেনু বলে ডাকে। সরিতও বোঝে, লোকনাথের কাছে এ ডাকের গুরুত্ব কতখানি। মাথা নিচু করে লোকনাথের পা ছোঁয় সে। বলে, তোমার জন্য জান দিতে পারি কত্তা। শুধু হাতটা রেখো মাথার ওপর।

গলা ঝাড়ার শব্দে ঘোর কাটল লোকনাথের। তাকিয়ে দেখল, দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে তড়িৎ। ধড়মড় করে উঠে বসল লোকনাথ। উঠতে গিয়ে আবার টাটিয়ে উঠল ব্যথার জায়গাটা। সেটাকে পাত্তা না দিয়ে উদগ্রীব গলায় লোকনাথ বলল, এনেছিস?

উত্তর দিল না তড়িৎ। পকেট থেকে একটা মোড়ানো কাগজের টুকরো বার করে এগিয়ে দিল লোকনাথের দিকে। কাগজের ভাঁজ খুলতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল লোকনাথের চোখ। এক গুছি চুল। যা একটু পরেই হয়ে উঠবে তিতাসের অলঙ্ঘ্যনীয় নিয়তি। খুশিয়াল গলায় লোকনাথ বলল, কেমন করে আনলি?

তড়িৎ বলল, রাস্তার ধারে ওত পেতে ছিলাম। গাড়িটা আসতে দেখেই সাইকেলটা ভিড়িয়ে দিলাম গাড়ির সামনে। ওতেই তো কপালটা ফাটল। আমাকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল সেই সময় কেটে নিয়েছি।

হাসি ফুটে উঠল লোকনাথের মুখে, বাহ বাহ বাহ! তুইও তো দেখি দিনে দিনে সরিতের মতো লায়েক হয়ে উঠছিস। ভালো ভালো খুব ভালো। ধর তো একটু, চৌকি থেকে নামি। চান করতে হবে।

স্নান সেরে রক্তাম্বর পরল লোকনাথ। তারপর বজ্রাসনে বসল খেলনার বালিয়াড়ির সামনে। কোমরের দোষে আজকাল এভাবে বসতে কষ্ট হয় কিন্তু উপায় কী? তন্ত্র সহজ জিনিস নয়। সে সাধকের কৃচ্ছ্রসাধন দাবি করে। প্রথমে বালির ঢিবিটার ওপর তিনবার জল ছিটিয়ে দিল লোকনাথ। তারপর খেজুর পাতার চাটাইয়ের ওপর রাখা আটার মণ্ডটার মধ্যে খুব সাবধানে বসিয়ে দিল তিতাসের চুলের গুছিটা। কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে। চোখ বুজে বিড়বিড় করে কী যেন বলতে লাগল। কান খাড়া করে তড়িৎ যেটুকু বুঝতে পারল একঘেয়ে সুরে লোকনাথ বলে চলেছে, ইযুজ্জু ইনান্নাখ ইযুজ্জু ইনান্নাখ ইযুজ্জু ইনান্নাখ

মোটরসাইকেল দু’জাতের। এক, বুলেট। দুই, বাকি যা কিছু। সবাই বুলেট চালাতে পারে না। সবার বুলেট চালানোর যোগ্যতা থাকে না। অনধিকারীর হাতে বুলেটও আর পাঁচটা মোটরসাইকেল। যার পয়সা আছে, সে একটা কেন, দশটা বুলেট কিনতে পারে কিন্তু তার মানেই সে বুলেট চালানোর অধিকারী হয়ে উঠবে এমন কোনও কথা নেই। সত্ত্বঃ, তমঃ আর রজোঃ গুণের সুষম বণ্টনে তৈরি হয়েছে বুলেট নামে বস্তুটি। বুলেট আসলে মানুষের তৈরি কোনও যন্ত্র নয়, ঈশ্বরদত্ত মন্ত্রগুপ্তি। সমুদ্রমন্থনে উঠে এসেছিল ইন্দ্রের ঘোড়া উচ্চৈশ্রবাঃ, বুলেট হল তার আধুনিক রূপ। তাই বুলেট চালাতে গেলে যেমন প্রয়োজন ঋষিসুলভ ঔদার্য, তেমনই প্রয়োজন রাজকীয় উন্নাসিকতা। বুলেট কখনওই খুব জোরে বা খুব আস্তে চালানো উচিত না। বুলেটের আচরণ হওয়া উচিত যূথশ্রেষ্ঠ গজপতির ন্যায়, অভিজাত। আপাত মন্থর অথচ প্রতিটি পদক্ষেপেই অমিত গতিশক্তির ইঙ্গিতবহ।

অন্য মোটরসাইকেলগুলোকে তাচ্ছিল্য করে মসৃণ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল অমিয়র জলপাই রঙের বুলেট, আর চালাতে চালাতে এই সবই ভাবছিল অমিয়। অমিয় খেয়াল করে দেখেছে, দুটো সময়ে তার স্বাভাবিক সত্তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। বুলেট হাতে নিলে সে হয়ে ওঠে দার্শনিক আর মিতুলের সামনে অর্গলহীন হয়ে ওঠে তার লাজুক কবিমন। এই মুহূর্তে অমিয় বুলেট চালিয়ে মিতুলের সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি যে বেশ ঘোরালো সহজেই অনুমেয়।

আজ মিতুলের জন্মদিন। সেই উপলক্ষে অমিয় ছুটি নিয়েছে। পল্লব আর তিতাসও আসছে। এতক্ষণে ওদের পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু পল্লব ফোন করে জানিয়েছে, আসতে গিয়ে একটা ছেলের সাথে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হচ্ছে, তাই দেরি হবে। তবে বাড়াবাড়ি কিছু না।

পল্লব আর তিতাসের আসতে খানিক দেরি হবে শুনেই চট করে প্ল্যানটা করে ফেলেছিল অমিয়। ঠিক করে ফেলেছিল, মিতুলকে নিয়ে লাঞ্চে যাবে। তবে অমিয় যে আসবে মিতুল জানে না। এটা সারপ্রাইজ। মিতুলদের কলেজে এখন গরমের ছুটি। ফলে মিতুল বাড়িতেই আছে। মিতুলদের বাড়ির সামনে গিয়ে বুলেটটা থামাল অমিয়। তারপর হর্ন দিল পরপর তিনবার। আজকাল আর বাঁশির যুগ নেই। হর্ন শুনেই রাধিকা আকুলা হন। বোঝেন, অভিসারের সঙ্কেত এসেছে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। হুড়মুড় করে বারান্দায় বেরিয়ে এল মিতুল আর অমিয়কে দেখেই তার চোখ দুটো গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল। প্রথমত, সারপ্রাইজটা একদম ঠিকঠাক হয়েছে। অমিয় যে এই সময় আসতে পারে সেটা মিতুলের কাছে অপ্রত্যাশিত আর দ্বিতীয়ত, অমিয়কে আজ দারুণ সুন্দর দেখাচ্ছে। সাদা ধবধবে একটা জামা পরেছে। জামার হাতা দুটো কনুই অবধি গোটানো। নিম্নাঙ্গে ঘন কৃষ্ণনীল ডেনিম। পায়ে বাদামি স্নিকার্স। চোখে এভিয়েটর। দাড়িটা ট্রিম করেছে। জামার ওপরের দুটো বোতাম খোলা। তার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে অমিয়র সুঠাম বুক। মিতুলের শরীরটা যেন কেমন কেমন করতে লাগল আচমকা। গলা শুকিয়ে গেল। খুব গরম লাগতে শুরু করল। মিতুল জানে, এরপর এই লোকটা চোখ থেকে চশমাটা খুলে ফেলবে আর মিষ্টি করে হেসে উঠবে। ব্যস মিতুল শেষ। কিছুতেই ওই হাসিটা দেখবে না মিতুল। ভর দুপুরে সে মোটেই বেহায়া হতে পারবে না। অমিয় চশমাটায় হাত দিতেই মিতুল ঝপ করে চোখ বুজে ফেলল। শক্ত করে চেপে ধরল রেলিংটা।

মিতুলের মাও ভেতর থেকে হর্নের শব্দ শুনেছিলেন। তিনি বাইরে এসে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। দেখলেন, তাঁর মেয়ে রেলিংয়ে হাত দিয়ে প্রাণপণে চোখ বন্ধ করে আছে আর তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অমিয়। তিনি জানেন, অমিয় আর তাঁর মেয়ের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে কিন্তু প্রেমাস্পদকে দেখে চোখ বুজে ফেলার মতো ঘটনা তাঁর অভিজ্ঞতায় নেই। খুবই আশ্চর্য হলেন তিনি এবং একই সাথে ভয় পেলেন। মিতুল হারিয়ে যাওয়ার পর তাঁর মধ্যে সামান্য পাগলামির লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। মিতুল ফিরে আসায় তিনি অনেকটা সুস্থ হয়েছেন বটে কিন্তু মিতুলকে অসংলগ্ন কিছু করতে দেখলেই আজও তিনি ঘাবড়ে যান। ভাবেন, মিতুলকে আবার কোনও তান্ত্রিক বশ করেছে। তখন তাঁর প্যানিক অ্যাটাক মতো হয়। এখনও তাই হল। তিনি মিতুল বলে একটা চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান মতো হয়ে গেলেন। দৌড়ে আসতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল অমিয় আর তার নতুন সানগ্লাসটা মট করে ভেঙে গেল।

মাথা নিচু করে খাবারগুলো নাড়াচাড়া করছিল মিতুল। মিতুলকে নিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ করতে এসেছে অমিয়। যদিও অমিয় আজ সবই তার পছন্দের খাবার অর্ডার করেছে তবু কোনওটারই তেমন স্বাদ পাচ্ছে না মিতুল। সে যদি তখন চোখ বুজে না ফেলত তা হলে তো এত কিছুই হত না। মিতুল জানে, এভিয়েটরটা অমিয়র খুব প্রিয়। প্রচণ্ড অপরাধবোধ হচ্ছে তার। ইশ! সব কিছুর জন্য সে দায়ী। তার জন্মদিন বলে এই লোকটা এত সুন্দর করে সারপ্রাইজ দিতে এল আর সবটা ঘেঁটে দিল সে! কান্না পেয়ে গেল মিতুলের। কিন্তু এখন তো কাঁদতেও পারবে না। লোকটা যদি জিজ্ঞেস করে কাঁদছ কেন, কী উত্তর দেবে সে? বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি করা খুবই প্রেস্টিজের ব্যাপার। কান্নাটাকে গিলতে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে ফেলল সে আর গ্লাসটা নামিয়েই দেখল অমিয় তার দিকে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মিতুল। গম্ভীর গলায় অমিয় বলল, খাবার ভালো হয়নি?

মিতুল ঘাড় নাড়ল। অমিয় বলল, তা হলে খাচ্ছ না কেন?

কই? খাচ্ছি তো।

আমার সানগ্লাসটা ভেঙেছে। চোখ খারাপ হয়ে যায়নি।

মিতুল আর থাকতে পারল না। বলে ফেলল, সরি। মা যে অমন করবে আমি বুঝতে পারিনি।

এতক্ষণ ধরে খুব গম্ভীর দিচ্ছিল অমিয়। এবার ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, সেটা তোমার জানার কথাও নয় কিন্তু তুমি কেন অমন চোখ বন্ধ করে ফেললে বলো তো?

অমিয়কে হাসতে দেখে মিতুলের মনের মেঘটা সবে কাটতে শুরু করেছিল কিন্তু এই প্রশ্নে ফের ঘেঁটে গেল ব্যাপারটা। এই প্রশ্নের কী উত্তর দেবে মিতুল? বলবে, তোমাকে দেখলেই আমার বুকের ভেতরটা গুরগুর করে! তুমি কাছে এসে দাঁড়ালেই কোথা থেকে যেন একটা ভাপ উঠে আসে! আমার খুব গরম লাগতে শুরু করে! মনে হয় শরীরটা গলে গলে পড়ছে মোমের মতো! গলা শুকিয়ে আসে আর তুমি চশমা খুলে মিষ্টি করে হাসলেই আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে! ইচ্ছে করে মরে গিয়ে পেত্নি হয়ে তোমার ঘাড়ে চাপি আর তোমায় খেয়ে ফেলি! বাচ্চা ভেবে আজ অবধি তো ঠিকমতো ছুঁয়েও দেখলে না! তোমাকে আমার আদর করতে ইচ্ছে করে গো। ইচ্ছে করে, আদর খেয়ে একটা অজগরের মতো নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকি! কিন্তু এসব তো আর বলা যায় না। এগুলো বলার মতো কথা নয়। ওই যে, কথা কিছু কিছু বুঝে নিতে হয়... যে বোঝে সে বোঝে। যে বোঝে না সে পাথর। যেমন এই লোকটা। অগত্যা চুপ করে থাকে মিতুল।

মিতুলকে চুপ থাকতে দেখে অমিয় কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই বেজে উঠল তার ফোন।

ডাকবাংলো মোড় পার করেই অমিয়কে ফোন করে দিয়েছিল পল্লব। স্পিকার অন করে দিয়েছিল। বার কয়েক রিং হতেই অমিয় ফোন ধরল, হ্যালো। কোথায় তোরা?

পল্লব বলল, এই তো ডাকবাংলো ক্রস করলাম। তোরা কোথায়?

আমি মিতুলকে নিয়ে খেতে বেরিয়েছিলাম। খাওয়া হয়েই গেছে প্রায়। ছায়াবাণীর সামনে আছি।

ওহ লাভলি। পাঁচ মিনিটে পৌঁছচ্ছি।

আচ্ছা, ওই যে ছেলেটার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল তার কী অবস্থা?

আরে আর বলিস না। কিছুতেই তাকে হসপিটালে ভর্তি করতে পারলাম না। ফার্স্ট এইড-এর পর জোর করে বাড়ি ফিরে গেল। তিতাস কিছু টাকাও দিতে চেয়েছিল। নিল না। বলল, আপনাদের দোষ নেই। আমিই না দেখে গাড়ির সামনে চলে এসেছিলাম।

হুম। তার মানে দুনিয়াতে কিছু ভালো লোক আছে এখনও। আমি তো ভেবেছিলাম ভালোই টাকাপয়সা খিঁচে নেবে। যাক গে, চলে আয় চটপট।

আসছি, ফোন কেটে দিল পল্লব। তিতাস হেসে বলল, প্রেমিকার জন্মদিনে লাঞ্চ ডেট? অমিয় তো দুর্দান্ত রোম্যান্টিক হয়ে উঠেছে দেখতে পাচ্ছি।

পল্লব বলল, অমিয় চিরকালই রোম্যান্টিক ছিল। তোর দুর্ভাগ্য তুই বুঝতে পারিসনি।

মুহূর্তে পল্লবকে কটাক্ষে বিদ্ধ করল তিতাস। বঙ্কিম স্বরে বলল, বুঝতে পারলে বুঝি ভালো হত?

অফকোর্স নট। তুই যে বুঝিসনি সেটা আমার সৌভাগ্য।

চুপ করে গেল তিতাস। তারপর একটু সময় নিয়ে গিয়ারের ওপরে থাকা পল্লবের হাতের ওপর হাতটা রাখল। নরম গলায় বলল, কার সৌভাগ্য, কার দুর্ভাগ্য সে জানি না পল্লব, শুধু এটুকু জানি ভাগ্যিস তুই ছিলি। না হলে আমি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম না।

তিতাসের হাতটা মুঠো করে ধরে চুপ করে রইল পল্লব। সব কথার উত্তর হয় না।

দক্ষিণপাড়া থেকে বাঁদিকে ঘুরল পল্লবের গাড়িটা। তিতাস জানে, এই রাস্তাটা পল্লবের বড় প্রিয়। এই রাস্তাতেই পল্লবের স্কুল। যতবার পল্লবের সাথে বারাসাতে এসেছে তিতাস ততবার অবধারিত ভাবে পল্লব দুটো জিনিস দেখিয়েছে। তার প্রথম প্রেমিকার বাড়ি আর তার স্কুল। প্রেমিকার বাড়িটা আজ আউট অব রুট কিন্তু স্কুলের কাছে এসেই পল্লব শিশুর উচ্ছলতায় বলে উঠল, তিতাস, এই দেখ আমার স্কুল। বারাসাত প্যারীচরণ সরকার রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয়।

কবে স্থাপিত সেটা বললি না? এই বলে হাসতে হাসতে তিতাস ডানদিকে তাকাল আর তখনই কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল মাথাটা। এক মুহূর্তের জন্য সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল আর সেই অন্ধকার কাটতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল তিতাস। কোথায় পল্লবের স্কুলবাড়ি? এ যে আদিগন্ত বিস্তৃত একটা বালিয়াড়ি। মাঝে মাঝে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা খেজুর গাছ। বালিয়াড়ির মাঝখানে একটা উঁচু ঢিপি আর তার ওপর সেই স্বপ্নে দেখা অদ্ভুত স্ট্রাকচারের মন্দিরটা। চারদিক শুনশান। কেউ কোথাও নেই। শুধু শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে। এমন সময় আবার মন্দিরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সেই বিশাল চেহারার সিংহটা। বাদামি কেশর কাঁধ ছাপিয়ে পিঠ ছুঁয়েছে। প্রকাণ্ড বলিষ্ঠ থাবা। এদিক ওদিক তাকিয়ে অলস ভাবে একটা গর্জন করল সে আর তখনই কে যেন মৃদু শিস দিল মন্দিরের ভেতর থেকে। সেই শিস শুনে পোষা কুকুরের মতো সিংহটা পেছন ফিরে এগিয়ে গেল মন্দিরের দরজার কাছে। ভেতরটা অন্ধকার। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবু বোঝা গেল, একটা মানুষের অবয়ব এসে দাঁড়িয়েছে সেখানে। সিংহটা সেই ছায়ামূর্তিকে দেখে যেন ভারী আনন্দিত হল। মাথা ঘষতে শুরু করল তার পায়ে। অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল এক রমণীর সুডৌল হাত। বহুমূল্য রত্নরাজিতে খচিত অলঙ্কারে ভূষিত সেই হাত পরম স্নেহে স্পর্শ করল সিংহের কেশরদাম। যেন বিলি কেটে দিল তাতে। তার পর সিংহের গলায় পরিয়ে দিল রত্নখচিত এক কণ্ঠবন্ধনী।

এই তিতাস, এসে গেছি তো। হাঁ করে কী ভাবছিস? নাম।, পল্লবের কথায় ঘোর কাটল তিতাসের। দেখল, তাদের গাড়িটা ছায়াবাণী সিনেমাহলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এক মূহূর্তের জন্য এই আধুনিক সভ্যতাকেই স্বপ্ন বলে মনে হল তিতাসের। মনে হল, এতক্ষণ ধরে সে যা দেখছিল তাই আসলে বাস্তব। মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল তার। একবার মনে হল, পল্লবকে এই দিবাস্বপ্নের ব্যাপারে বলে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, কী লাভ বলে? সে যা করবে, যা দেখবে সব পল্লবকে বলতে হবে না কি? ব্যক্তিগত বলেও তো একটা বিষয় আছে। এ সব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ তিতাসের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। সে দেখল, রেস্তোরাঁর কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে অমিয় আর মিতুল। ওহ মাই গুডনেস! অমিয়কে কী দুর্দান্ত হ্যান্ডসাম লাগছে আজ! পৌরুষ যেন ঠিকরে বেরচ্ছে তার সর্বাঙ্গ থেকে। তিতাস অনুভব করল ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে তার রক্তস্রোত। অমিয়কে ভোগ করার এক প্রবল বাসনা জন্ম নিচ্ছে তার মধ্যে। গাড়ি থেকে নেমে সে ঘোর লাগা চোখে এগিয়ে যেতে থাকল অমিয়র দিকে। এই মুহূর্তে স্থান, কাল, পাত্র কিছুই বিবেচনা করছে না সে। তার সমগ্র চেতনা জুড়ে ঘনিয়ে উঠছে এক উদগ্র অন্ধ যৌনেচ্ছা, বিশাল মহাকায় শকুনের মতো পঙ্খ বিস্তার করছে সহস্রাধিক বছর ধরে অন্ধকারের গর্ভে নিহিত থাকা এক জান্তব খিদে, মাটি ফুঁড়ে নরকের প্রেতদলের মতো উঠে আসছে ঘাতক অতৃপ্তি যার উপশম না হলে প্রলয় অনিবার্য। কী হত বলা যায় না কিন্তু অমিয়র কাছে পৌঁছনোর আগেই রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরোয় হোঁচট খেল তিতাস আর তার বুড়ো আঙুলের নখটা ভেঙে গেল নিমেষে। তীক্ষ্ণ বেদনাবোধ তিতাসকে আছড়ে ফেলল বাস্তবের মাটিতে। আহ করে উঠে উবু হয়ে বসে পড়ল সে কিন্তু এই কল্প-বাস্তবের মানসিক টানাপোড়েন সইতে পারল না। অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়ল রাস্তার ধুলোর ওপরেই। ছুটে এসে তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল অমিয় আর পল্লব। মিতুলও ছুটে এল কিন্তু তার মনটা কেমন খচখচ করতে লাগল। তিতাস দিদি তার আইডল। তিতাস দিদি যা-ই করে মিতুলের তাই ভালো লাগে। কিন্তু আজ ভালো লাগল না। মেয়েরা খুব ভালো চোখের ভাষা পড়তে পারে। মিতুল স্পষ্ট দেখেছে, তিতাস দিদি যেভাবে তার মানুষটার দিকে তাকিয়েছিল সে দৃষ্টিতে লোভ ছাড়া আর কিচ্ছু ছিল না। সে যেই হোক না কেন, কেউ তার মানুষটার দিকে লোভ দিলে মিতুলের খুব খুব খুব রাগ হয়।

* * *

সন্ধেটা আজ ভালোই কেটেছে ওদের। দুপুরে ওষুধ খাইয়ে তিতাসকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল পল্লব। শেষ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে তিতাস চাঙ্গা হয়ে গেল। নিজেই অমিয় আর পল্লবকে তাড়া দিতে লাগল মিতুলদের বাড়ি যাওয়ার জন্য। পল্লব বলেছিল, তুই আর একটু রেস্ট নে না।

তিতাস উড়িয়ে দিয়েছিল কথাটা, চিন্তা করিস না। আমি একদম ঠিক আছি। কোনও কারণে প্রেশারটা ফল করেছিল।

আরে তোর নখেও তো ব্যথা।

তো? থোড়াই কোনও পদযাত্রায় যাচ্ছি! গাড়িতে যাব। গাড়িতে আসব। চল চল। মিতুলের জন্য এত্ত গিফট এনেছি। কখন দেব সেগুলো?

বেশ চল তবে।

তিতাসের পায়ে নতুন করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিল পল্লব তার পর বেরিয়ে পড়েছিল মিতুলদের বাড়ির উদ্দেশে। আগের দিন রাতে নিজে হাতে মিতুলের জন্য কেক বানিয়েছে তিতাস। ম্যাঙ্গো ফ্রেশ ক্রিম। এই কেকটা তিতাস দুর্দান্ত বানায়। কলকাতা থেকে আসার সময় সেটা ভরে নিয়েছিল আইস বাস্কেটে। সেই বাস্কেটটাও রওনা দিল ওদের সঙ্গে। তবে আজকের সেলিব্রেশন মিতুলদের বাড়িতে নয়, ভাদুড়ি মশায়ের বাড়িতে। মিতুলের জন্মদিন উপলক্ষে তিনি সবাইকে আজ নেমতন্ন করেছিলেন। মিতুলকে গিফট দেওয়ার পালা শেষ হতে দীপক পাল আর তাঁর স্ত্রীকে গাড়িতে তুলে নিয়েছিল পল্লব। ওদিকে মিতুল চেপে বসেছিল অমিয়র বুলেটে। তার পর সবাই মিলে ভাদুড়ি মশায়ের বাড়ি। হইহই করে কেক কাটা হল। ভিডিও কলে ধরা হল অপালা আর সঞ্জয়কে। ভাদুড়ি মশায়ের জন্য একটা নতুন চশমার ফ্রেম নিয়ে গিয়েছিল তিতাস। সেটা পেয়ে শিশুর মতো খুশি হলেন বৃদ্ধ। গান, গল্প, আড্ডায় কখন যে রাত বেড়েছে বোঝাই যায়নি। শেষকালে দীপক পাল তাড়া দিলেন। কাল তাঁর মর্নিং ডিউটি। আসর ভাঙল। উৎসবের রেশ লেগে রইল ফিরতি পথে। কিন্তু পল্লব, তিতাস, অমিয় বা মিতুল কেউই আন্দাজ করতে পারল না, আর কিছুক্ষণ পরেই এই রাতটাই এমন বিভীষিকাময় হয়ে উঠবে যা পাল্টে দেবে ওদের সব্বার জীবন।

অমিয়র বসার ঘরের সোফায় কাত হয়ে শুয়েছিল পল্লব। পল্লবের অনেক সমস্যার মধ্যে একটা সমস্যা হল, সে বেশিক্ষণ সোজা হয়ে বসে থাকতে পারে না। ঢিস ঢিস করে বাঁ হাতের ওপর ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। একটা ঠ্যাং তুলে দেয় আর একটা ঠ্যাঙের ওপর। তিতাস অনেকবার বলেছে, একটু সোজা হয়ে বোস না পল্লব। সারাক্ষণ শুয়ে পড়িস কেন? কিসের এত ল্যাদ তোর?

পল্লবের উত্তর তৈরিই থাকে, একে শোয়া বলে না তিতাস। এ হল অনন্ত শয্যা। ভগবান শ্রীবিষ্ণু এভাবে শুতেন আর আমি শুই।

তিতাস বলে, মরণ।

আজও অনন্ত শয্যায় শুয়ে পেটে হাত বোলাতে বোলাতে পল্লব বলল, খাওয়াটা কিন্তু আজ জমজমাট হয়েছে।

তিতাস হাসল, তা কোন দিন তোর খাওয়া জমজমাট হয় না? জানিস অমিয়, রান্নার মাসির হাড় ভাজাভাজা করে দেয়। মাসি এখন তাই আর নিজে থেকে কিছু করার রিস্ক নেয় না। ওর লেখার টেবিলের পাশে এসে কাঁচুমাচু মুখে বলে, আজ কী কী রান্না হবে বউদি?

ঘর ফাটিয়ে হেসে উঠল অমিয়, বউদি?

তিতাস বলল, তা নয় তো কী? ও তো ওই রকমই। অবিকল বাড়ির গিন্নিদের মতো করে বলবে, ‘আজ একটু লাউ দিয়ে ডাল করো, ঝিরিঝিরি করে আলু ভাজো, পটল পোস্ত করো আর মাছের টক। আর হ্যাঁ শোনো, মুগডালটা কিন্তু আগে খোলায় ভেজে নিও। আর পোস্তটা যে বাটবে পুরো মিহি করে ফেলবে না। সামান্য দাঁতে লাগে যেন। বুঝেছ?’ তরিবতের শেষ নেই। এ তো গেল রান্না তারপর লেখা শেষ হতেই আমার আর মাসির পেছনে টিকটিক শুরু। ‘তিতাস, চাদর ভাঁজ কর। মাসি, টেবিলের পেছনে ঝুল লেগে আছে। ঝেড়ে দাও। তিতাস, জানলা খোল। সকালবেলা জানলা বন্ধ কেন? আলো আসতে দে।’ জ্বালিয়েপুড়িয়ে শেষ করে দিল রে আমাদের।

পল্লব কিছু বলছে না। শুধু মিটিমিটি হাসছে। অমিয় বলল, পল্লব ছোটবেলা থেকেই একটু গোছানো টাইপ। হস্টেলে একমাত্র ওর ঘরটাই রোজ ঝাঁট দেওয়া হত। একমাত্র ওর বিছানাটাই বিছানার মতো দেখতে লাগত। আমাদেরগুলো তো আর বিছানা ছিল না। ছিল, গুদামঘর।

চুপ কর। পুরুষ মানুষ অত গোছানো হলে ভালো লাগে না।

অমিয় হাসল, এই ভালো না লাগতে লাগতেই তো এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলি একসাথে।

তা বটে, কম দিন তো হল না। মাঝের তিনটে বছর শুধু একসাথে থাকাটা হয়নি কিন্তু মনে মনে কি জুড়ে ছিল না পল্লব আর তিতাস? তিতাস ভাবে, সেই কবেকার প্রেম ওদের। দশ বছর নেহাত কম সময় নয়। যখন ওদের ভালোবাসার শুরু তখনও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি। তখনও প্রেসিডেন্সিকে পাঁচতারা হোটেল বানিয়ে দেয়নি বেনিয়ার বিকৃত রুচি। তখনও প্রেসিডেন্সির আনাচে কানাচে কান পাতলেই শোনা যেত ইতিহাসের ফিসফিসানি। তখনও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর ঋতুপর্ণ ঘোষ বেঁচে ছিলেন। তখন সবে ষাট বছরের যুবক কবীর সুমন। পল্লব তখন সারা দিন ধরে দেওয়াল আর পোস্টার লিখত। প্যান্টের পকেটেই থাকত একগোছা তুলি। নিশানের রং লেগে থাকত হাতে আর জামাকাপড়ে। সেই উলোঝুলো হয়েই পল্লব দেখা করতে আসত তিতাসের সঙ্গে। তিতাসের এক সিনিয়র খুব দুঃখ করে বলেছিল, কত সম্ভাবনা ছিল তিতাস কিন্তু শেষকালে তুই এই লরির খালাসিটার প্রেমে পড়লি? কী দেখলি ওর মধ্যে?

কথাটা মিথ্যে নয়। সুন্দর সুপুরুষ ঝকঝকে যুবকেরা চিরকালই তিতাসের চারপাশে ভিড় করে থেকেছে। তবু তাদের মধ্যে থেকে ওই অত্যন্ত সাধারণ দেখতে, মোটা, মধ্যম উচ্চতার ছেলেটিকেই কেন সবটা উজাড় করে দিয়েছিল তিতাস? কারণ সে বুঝেছিল, বাইরে থেকে যতই সব কিছু গুছিয়ে রাখতে চাক এই ছেলেটা আসলে ভেতরে ভেতরে পৃথিবীর সবচেয়ে অগোছালো মানুষ। যতই কথায় কথায় হাসুক বা হাসাক, বিশাল এক মৌচাকের মতো বেদনা জমাট বেঁধে আছে এই ছেলেটার মনগোপনে। অচেনা এক অস্থিরতায় এই ছেলেটা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পল্লবের অন্তরতম প্রদেশের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সেই অন্তরীপের সন্ধান পেয়েছিল একমাত্র তিতাস। ঝড় যে বড় ভালো লাগে তার। তাই সে হয়ে উঠেছিল পল্লবের ব্যথার মলম, শীতের উত্তাপ, রোদ্দুরে জলগামছা।

অমিয় আবার বলে উঠল, তোরা দু’জন আমার ইন্সপিরেশন। তোদের দেখি আর ভাবি, সংসার করতে গেলে এভাবেই করতে হয়। তা বিয়েটা এবার করে নে না।

পল্লব বলল, করব করব। তিতাস প্র্যাকটিস শুরু করলেই করে নেব। বিয়ের পর আমি বাবা আর কাজকর্ম করব না। আমার বরাবরের স্বপ্ন একটা বড়লোক বউ হবে। সে বেশ আমায় হাতখরচা দেবে আর আমি গুছিয়ে সংসার করব। আমার ভাতকাপড়ের দায়িত্ব কবে নিবি তিতাস?

তিতাস বলল, বাজে কথা বলা বন্ধ কর তো। এই অমিয়, বাই এনি চান্স মিতুলের কি মন খারাপ? ওকে আজ একটু ডাউন লাগছিল না?

পল্লব বলল, ঠিক বলেছিস। আমিও খেয়াল করেছি। অন্যদিনের মতো হাসিখুশি না, আজ একটু আড়ষ্ট লাগছিল ওকে। কী হয়েছে রে? ঝগড়া করেছিস?

অমিয় বলল, না রে! ও একটা পাগলি।

পল্লব বলল, আরে হয়েছেটা কী বলবি তো?

দুপুরে মিতুলের চোখ বুজে ফেলা থেকে মিতুলের মায়ের সেন্সলেস হয়ে যাওয়া এবং সানগ্লাস ভাঙার ঘটনাটা ওদের খুলে বলল অমিয়। তারপর বলল, সেই থেকে ব্যাটা গিল্ট ফিলিংয়ে ভুগছে। দুপুরেও ঠিকমতো খায়নি।

পল্লব হেসে উঠতে ধমক দিল তিতাস, বোকার মতো হাসিস না। আহা রে! মিতুলটা বড্ড ইনোসেন্ট। ওকে যত্ন করে রাখিস অমিয়।

একটু যেন লাল হয়ে উঠল অমিয়র গাল দু’টো। চোখ নীচু করে বলল, চেষ্টা করি। কিন্তু বড্ড ছোট তো। ইমম্যাচিওর।

প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারিটা তো যেচেপড়ে নিয়েছিলি ভাই। এখন কাঁদলে চলবে কেন? হাসতে হাসতে বলে উঠল পল্লব, তবে একদিকে ভালো হচ্ছে। বাচ্চা মানুষ করার অভিজ্ঞতাটাও হয়ে যাচ্ছে। পরে আর অসুবিধে হবে না।

পল্লবের বলার ধরনে তিতাস আর অমিয় দু’জনেই হেসে ফেলল। এই সময় বেজে উঠল অমিয়র ফোন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অমিয় বলল, মিতুল। দাঁড়া একটু কথা বলে আসি।

ফোন নিয়ে ব্যালকনিতে চলে এল অমিয়, বলো।

কী করছ?

এই তো তিতাস আর পল্লবের সাথে আড্ডা দিচ্ছি। তুমি কী করছ?

শুয়ে আছি।

কী ব্যাপার বলো তো? সারাটা দিন এমন মনমরা হয়ে রইলে কেন? কতবার বলব যে আমি রাগ করিনি? তিতাস আর পল্লবও বুঝেছে তোমার মন ভালো নেই। আরে বাবা, তুমি তো ইচ্ছে করে জেনেবুঝে আমার চশমাটা ভেঙে ফেলোনি।

সে জন্য মন খারাপ না।

যাহ বাবা! আবার কী মন খারাপের কারণ ঘটল?

আমার মন খারাপই না।

তা হলে অমন চুপ ছিলে কেন?

আমার ভালো লাগছিল না।

আরে কী হয়েছে স্পষ্ট করে বলবে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। অমিয়র স্বরে অধৈর্যের আভাস।

বুঝতে হবে না তোমায়। পল্লবদা’রা কি আজ থাকবে?

হ্যাঁ, তোমায় তো আগেই বলেছিলাম।

থাকার কী আছে? গাড়ি আছে তো। ফিরে গেলেই পারে।

ভারী অবাক হল অমিয়। মিতুলের এই ব্যবহার তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। এতদিন সে দেখেছে, পল্লব, তিতাস, সঞ্জয়, অপালাদের দেখলে মিতুল অত্যন্ত আনন্দিত হয়। বিশেষ করে তিতাস এলে তো কথাই নেই। সারাক্ষণ তিতাসের সাথে লেপটে থাকে। আসলে তিতাসের প্রতি তীব্র এক কৃতজ্ঞতাবোধ কাজ করে মিতুলের মধ্যে। মিতুল জানে, তিতাস না থাকলে তার পরিণতি অন্যরকম হত। কিন্তু আজ সেই তিতাসরা থাকাতেই আপত্তি জানাচ্ছে সে! বিস্ময় ধরা পড়ল অমিয়র কণ্ঠে, এই মিতুল, তোমার কী হয়েছে ঠিক করে বলো তো?

মিতুলের গলা নিরাসক্ত, কী আবার হবে? কিছুই হয়নি।

তা হলে বললে কেন ফিরে গেলেই পারে?

ভুল কী বললাম? এমন কিছু রাত হয়নি। রাতের বেলা লোকে দিঘা, মন্দারমণি থেকে গাড়ি চালিয়ে ফিরে আসছে আর ওরা বারাসাত থেকে সাউথ কলকাতা যেতে পারল না?

অমিয়র প্রাথমিক বিস্ময় এবার বিরক্তিতে রূপান্তরিত হল। রুক্ষ গলায় সে বলল, শোনো মিতুল, ওরা আমার বন্ধু। ওরা চাইলেও আমি ওদের ফিরে যেতে দিতাম না। তা ছাড়া, আমার বাড়িতে কে থাকবে না থাকবে তা নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর তো দরকার দেখছি না। আর তুমি কি না তিতাস, পল্লবকে নিয়ে এসব বলছ! ছিঃ! তুমি এতটা স্বার্থপর আমি তো আগে বুঝতে পারিনি।

ফোনের ওপারে অখণ্ড নীরবতা। অমিয়ও চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, আমি রাখছি।

অমিয়র থমথমে মুখ দেখে গন্ডগোলের আভাস পেল তিতাস। পল্লব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তাকে চিমটি কেটে চুপ করিয়ে দিয়ে বলল, অমিয়, খুব টায়ার্ড লাগছে। শুয়ে পড়লাম বুঝলি? সকালে কথা হচ্ছে।

অমিয় বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ। শুয়ে পড় তোরা। আমিও শোবো।

কথা না বাড়িয়ে অমিয় নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। চোখে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে তিতাসের দিকে তাকাল পল্লব, কেসটা কী বল তো?

তুই কি কিছুই বুঝিস না? মিতুলের সাথে অমিয়র ঝগড়া হয়েছে।

সে কী! কেন?

হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তিতাস, ওহ পল্লব! হাউ অ্যাম আই সাপোজড টু নো? চল তো শুতে চল। পাগল করে দিবি তুই আমায়।

অনেকক্ষণ হল পল্লব ঘুমিয়ে পড়েছে। ফুরফুর করে নাক ডাকছে তার। কিন্তু তিতাসের কিছুতেই ঘুম আসছে না। সে খালি এপাশ, ওপাশ করছে। একসময় উঠে পড়ল তিতাস, নাহ এভাবে জোর করে ঘুম আসবে না। অমিয়র ফ্ল্যাটের ব্যালকনিটা ভারী সুন্দর। একটা বাইলেনের শেষপ্রান্তে অমিয়র ফ্ল্যাটটা। ফলে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে দেখা যায় ছোট রাস্তাটা সোজা গিয়ে মিশেছে বড় রাস্তায়। ছোট রাস্তাটার দু’পাশে অনেক গাছ আর কিছু দূর অন্তর অন্তর হলুদ আলো। কয়েকটা গাড়ি পার্ক করা রাস্তার ওপরে। যদিও গরমকাল তবু আজ অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছে। সিগারেট ধরিয়ে ব্যালকনির রেলিংয়ে কনুইয়ের ভর দিয়ে দাঁড়াল তিতাস। আজ চাঁদ উঠেছে ভারী সুন্দর। চারপাশটা শুনশান। মাঝেমাঝে বড় রাস্তা দিয়ে হুশ হুশ করে এক-আধটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। আশপাশের কোনও ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে মৃদু একটা সুর। একটু কান পেতে তিতাস বুঝল, মধ্যরাতে গান ধরেছেন এলভিস প্রেসলি, ‘ওয়াইজ মেন সে, ওনলি ফুলস রাশ ইন/ বাট আই কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ’ আলতো একটা হাসি ফুটে উঠল তিতাসের ঠোঁটের কোণে। সে গলা মেলাল প্রেসলি সাহেবের সাথে, আই কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ। হঠাৎই পল্লবের ঘুমন্ত মুখখানা দেখতে ইচ্ছে করল তার। ইচ্ছে করল, পল্লবের চোখের পাতায় একটা চুমু এঁকে দিতে। সবে ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাবে একটা বিজাতীয় শব্দে থমকে গেল তিতাস। কোত্থেকে যেন একটা চাপা গরগর আওয়াজ আসছে। ঘুরে তাকাতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে। রাস্তায় পার্ক করানো একটা গাড়ির চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে গাড়িটাকে শুঁকছে বিশাল এক সিংহ আর যেন চাপা আক্রোশে গরগর করে চলেছে অনবরত! কয়েক মুহূর্তের জন্য কেমন যেন সাড়হীন হয়ে গেল তিতাস, তার পরেই সে চমকে উঠল। চাঁদের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে সিংহের গলায় পরানো রত্নখচিত কণ্ঠবন্ধনী! এ তো সেই স্বপ্নে দেখা সিংহটা, যাকে আজ দুপুরেও সে দেখেছে। কিন্তু সেই সিংহটা এখানে কী করছে? আচমকাই গা-টা ছমছম করে উঠল তিতাসের। কেন সে ওই এক স্বপ্ন বারবার দেখছে? আর এখন যেটা দেখছে সেটা কী? স্বপ্ন না বাস্তব? নিজের কপালেই একটা টোকা দিল তিতাস। না, সে তো নিজের অঙ্গসঞ্চালন অনুভব করতে পারছে। তা হলে সত্যি সত্যিই সিংহটা! ভাবনাটা পুরোপুরি শেষ করতে পারল না তার আগেই সে ঘাড়ের কাছে অনুভব করল একটা তীব্র তীক্ষ্ণ শীতল স্পর্শ। ছিটকে ঘুরে দাঁড়িয়েই বিস্ফারিত হয়ে গেল তিতাসের দুই চোখ। তার থেকে মাত্র এক ফুটের দূরত্বে যে দাঁড়িয়ে আছে সে যে মানুষ না তা নিয়ে তিতাসের কোনও সন্দেহ নেই। এমন রূপ, এমন প্রভা, এমন দীপ্তি মানুষের কল্পনাতীত। এমন উচ্চকিত অথচ নীরব, স্থির অথচ চঞ্চল, শান্ত অথচ উদ্দাম, স্থানিক অথচ চরাচরব্যাপী, প্রেমপূর্ণ অথচ ভীতিপ্রদ উপস্থিতি মানুষের সাধ্যাতীত। তা হলে কে সে? কে এই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময়? ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসতে লাগল তিতাসের চোখের পাতা।

* * *

অনেকক্ষণ ধরেই একটা অস্বস্তি হচ্ছিল অমিয়র। সে ঘুমোচ্ছে কিন্তু কিছুতেই যেন দানা বাঁধছে না ঘুমটা। দুধের ওপর লেবুর রস ফেললে যেমন ছানা কেটে যায় ঠিক সেভাবেই বারবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে ঘুমের রেশ। নাহ, মিতুলকে ওভাবে বকাবকি করাটা ঠিক হয়নি। সেই অস্থিরতা থেকেই এই অবস্থা। একটা সময় সে উঠে বসল খাটের ওপর আর নাইট ল্যাম্পের আবছা নীলাভ আলোয় অবাক হয়ে দেখল, তার পায়ের কাছে বসে তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে তিতাস। বিস্ময়ে অবরুদ্ধ কণ্ঠে অমিয় বলে উঠল, তিতাস তুই? এখানে?

অমিয়র চোখে চোখ রেখে তিতাস বলল, ঘুম আসছিল না। মনটা ভালো নেই। পল্লব তো ঘুমিয়ে কাদা। তাই ভাবলাম, দেখি তুই জেগে আছিস কি না? তা হলে একটু গল্প করতাম। এসে দেখলাম তুই ঘুমোচ্ছিস। তাই আর ডাকিনি।

ভারী অবাক হল অমিয়। মনখারাপ হচ্ছে বলে গভীর রাতে তার সাথে গল্প করতে আসবে এমন মেয়ে তো তিতাস নয়। তবে মানসিক ট্রমাটা থেকে ওঠার পর তিতাস আগের চেয়ে একটু দুর্বল হয়ে গেছে। তিতাসের জন্য খারাপ লাগল অমিয়র আবার একই সাথে মনের গোপনে অদ্ভুত এক পুলকে শিহরিত হল সে। তিতাস তার স্বপ্নের নারী। চিরকাল তিতাস অধরা ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তিতাস বন্ধুর প্রেমিকা। কিন্তু সেই তিতাস যখন নিজে থেকে কথা বলতে এসেছে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না অমিয়। এত বড় কসাই সে নয়। তবে তিতাসের সামনে আদুর গায়ে বড়ই লজ্জা পেল সে। হাত বাড়িয়ে খাটের বাজুতে রাখা টি-শার্টটা নিয়ে পরতে যেতেই তিতাস বলে উঠল, থাক না অমিয়। তোকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে।

এবার আর বিস্মিত নয়, রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়ে গেল অমিয়। এসব কী বলছে তিতাস? হতে পারে এ শুধুই মুগ্ধতা প্রকাশ কিন্তু সময়টা যে গভীর রাত। এ মোটেই মুগ্ধতা প্রকাশের জন্য ভালো সময় নয়। অমিয় আচমকা অনুভব করল সে একটা সরু সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সে সুতোর একদিকে রয়েছে মনের গহীনে প্রায় এক যুগ ধরে পুষে রাখা এক বিস্ফোরক ইচ্ছে আর অন্যদিকে বন্ধুত্ব, দায়িত্ব, প্রেম, কর্তব্য এবং আরও যা যা কিছু মানুষকে মানুষ করে তোলে। পায়ের কাছ থেকে উঠে এবার অমিয়র পাশে এসে বসল তিতাস। অমিয় অনুভব করল তার খুব গরম লাগছে। এসির টেম্পারেচার খানিকটা কমিয়ে দিল। গলাটা যেন শুকনো শুকনো লাগছে। বেশ খানিকটা জল খেয়ে ফেলল। অমিয়র মন বলছে, তার এখন উঠে যাওয়া উচিত কিংবা তিতাসকে ঘরে ফিরে যেতে বলা উচিত, কিন্তু সে পেরে উঠছে না। কেমন যেন একটা ঘোর লাগছে। যুক্তিবোধ গুলিয়ে যাচ্ছে। আচমকা অমিয়র সুঠাম বুকে একটা হাত রাখল তিতাস। অমিয়র সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল নিমেষে। থরথর করে কেঁপে উঠল সে। অস্ফুটে বলে উঠল, তিতাস!

অমিয়র বুকের ওপর সাবলীল ভাবে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল তিতাসের লম্বা লম্বা সুছাঁদ আঙুলগুলো। ফিসফিস করে তিতাস বলল, আমার আর ভালো লাগে না জানিস অমিয়? পল্লবটা দিন দিন মোটা হচ্ছে। ভুঁড়ি হচ্ছে। আমার ঘেন্না করে। ও যখন আমার গায়ে হাত দেয় আমার বমি পায়। শেষ কবে আমার অর্গ্যাজম হয়েছে আমার মনে নেই। আয় না অমিয়। একবার। একটিবার আমাকে আদর কর।

ভয়ঙ্কর এই কথাগুলো বলতে বলতে তিতাস ততক্ষণে অমিয়কে জড়িয়ে নিয়েছে সরীসৃপের মতো। অস্বাভাবিক এক অস্থিরতায় ছটফট করছে অমিয়। তার চৈতন্য পরিষ্কার ভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে এই মুহূর্তে। একটা অমিয় চাইছে এই গা শিরশির করা নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে। আর একটা অমিয় চাইছে সেই আদিম বিস্ফোরণ। এই দুই অমিয়র টানাপড়েন চলছে ক্রমাগত। কিন্তু এই লড়াইটা থামিয়ে দিল তিতাসই। তীব্র আশ্লেষে শুষে নিতে শুরু করল অমিয়র অধরোষ্ঠ। অমিয়র একটি পুরুষ পাঞ্জা নিজেই তুলে নিল তার নাতিবৃহৎ সুডৌল বাম স্তনে,মন যেন একটা ঘোর লাগছে। যুক্তিবোধ গুলিয়ে যাচ্ছে। আচমকা অমিয়র সুঠাম বুকে একটা হাত রাখল তিতাস। অমিয়র সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হল নিমেষে। থরথর করে কেঁপে উঠল সে। অস্ফুটে বলে উঠল, তিতাস!

অমিয়র বুকের ওপর সাবলীল ভাবে ঘুরে বেড়াতে শুরু করল তিতাসের লম্বা লম্বা সুছাঁদ আঙুলগুলো। ফিসফিস করে তিতাস বলল, আমার আর ভালো লাগে না জানিস অমিয়? পল্লবটা দিন দিন মোটা হচ্ছে। ভুঁড়ি হচ্ছে। আমার ঘেন্না করে। ও যখন আমার গায়ে হাত দেয় আমার বমি পায়। শেষ কবে আমার অর্গ্যাজম হয়েছে আমার মনে নেই। আয় না অমিয়। একবার। একটিবার আমাকে আদর কর।

ভয়ঙ্কর এই কথাগুলো বলতে বলতে তিতাস ততক্ষণে অমিয়কে জড়িয়ে নিয়েছে সরীসৃপের মতো। অস্বাভাবিক এক অস্থিরতায় ছটফট করছে অমিয়। তার চৈতন্য পরিষ্কার ভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে এই মুহূর্তে। একটা অমিয় চাইছে এই গা শিরশির করা নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে। আর একটা অমিয় চাইছে সেই আদিম বিস্ফোরণ। এই দুই অমিয়র টানাপড়েন চলছে ক্রমাগত। কিন্তু এই লড়াইটা থামিয়ে দিল তিতাসই। তীব্র আশ্লেষে শুষে নিতে শুরু করল অমিয়র অধরোষ্ঠ। অমিয়র একটি পুরুষ পাঞ্জা নিজেই তুলে নিল তার নাতিবৃহৎ সুডৌল বাম স্তনে, অন্য হাতে আঁকড়ে ধরল অমিয়র স্থূল ও দীর্ঘ পৌরুষ। কয়েক মুহূর্ত পর চুলের মুঠি ধরে সে অমিয়কে নামিয়ে আনল তার নির্লোম, মসৃণ, পিচ্ছিল উরুসন্ধিতে। তার পর শুরু হল এক অবিশ্বাস্য রমণ। কিন্তু কিছুটা সময় যেতেই অমিয়র শীৎকার রূপান্তরিত হল চাপা আকুতিতে। তার স্খলন হয়ে গেছে অনেকক্ষণ কিন্তু তিতাসের পাশবিক রমণের কোনও বিরাম নেই। স্খলনমাত্র ফিরে এসেছে অমিয়র স্বাভাবিক চৈতন্য। নিজের কৃতকর্মের জন্য প্রতিটি পল অনুপলে সে ধিক্কার দিচ্ছে নিজেকে। তার জলে ভরা দুই চোখে বারবার ভেসে উঠছে মিতুলের নিষ্পাপ মুখখানি। কাঁদতে কাঁদতে সে বলছে, ছাড় তিতাস। এবার ছাড় আমায়। প্লিজ। দয়া কর।

কিন্তু তিতাস যেন ঘাতকের মতো নির্দয়, সন্ন্যাসীর মতো নির্বিকার। যন্ত্রের মতো সে রমণ করে চলেছে। আর থাকতে পারল না অমিয়। এক ধাক্কায় তিতাসকে ফেলে দিল খাট থেকে। তারপর চাদর জড়িয়ে ছুটে ঢুকে গেল বাথরুমে। ছিটকিনি এঁটে দিল দরজায়। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দরজায় পিঠ দিয়েই বসে পড়ল মাটিতে।

কতক্ষণ ধরে যে কেঁদেছে সে হিসেব অমিয়র নেই। যখন ফিরে এল ঘরে তিতাস চলে গেছে। বিস্রস্ত হয়ে পড়ে আছে বিছানা। হতাশায়, ক্লান্তিতে বিছানার ওপরেই ধপ করে বসে পড়ল অমিয়। খাটের সোজাসুজি আয়না। এক পলকের জন্য আয়নায় চোখ পড়তেই চমকে উঠল সে। আবছা নীল আলোয় কী যেন দেখা যাচ্ছে তার গায়ে। অমিয় পায়ে পায়ে উঠে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জ্বালিয়ে দিল ঘরের উজ্জ্বল আলো আর সেই আলোয় দেখল, তার সারা ঘাড় গলা জুড়ে দগদগ করছে তিতাসের কামড়ের দাগ। এ দাগে কোনও ভালোবাসা নেই। রয়েছে পাশব প্রবৃত্তির পরিচয়। এ দাগ কিছুতেই লাভ বাইট হতে পারে না। কিছুতেই না। ভয়ে শিউরে উঠল অমিয়। এই ঘৃণার সাক্ষ্য বহন করে সে কেমন করে দাঁড়াবে মিতুল আর পল্লবের সামনে?

চলেছে। আর থাকতে পারল না অমিয়। এক ধাক্কায় তিতাসকে ফেলে দিল খাট থেকে। তারপর চাদর জড়িয়ে ছুটে ঢুকে গেল বাথরুমে। ছিটকিনি এঁটে দিল দরজায়। হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে দরজায় পিঠ দিয়েই বসে পড়ল মাটিতে।

কতক্ষণ ধরে যে কেঁদেছে সে হিসেব অমিয়র নেই। যখন ফিরে এল ঘরে তিতাস চলে গেছে। বিস্রস্ত হয়ে পড়ে আছে বিছানা। হতাশায়, ক্লান্তিতে বিছানার ওপরেই ধপ করে বসে পড়ল অমিয়। খাটের সোজাসুজি আয়না। এক পলকের জন্য আয়নায় চোখ পড়তেই চমকে উঠল সে। আবছা নীল আলোয় কী যেন দেখা যাচ্ছে তার গায়ে। অমিয় পায়ে পায়ে উঠে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। জ্বালিয়ে দিল ঘরের উজ্জ্বল আলো আর সেই আলোয় দেখল, তার সারা ঘাড় গলা জুড়ে দগদগ করছে তিতাসের কামড়ের দাগ। এ দাগে কোনও ভালোবাসা নেই। রয়েছে পাশব প্রবৃত্তির পরিচয়। এ দাগ কিছুতেই লাভ বাইট হতে পারে না। কিছুতেই না। ভয়ে শিউরে উঠল অমিয়। এই ঘৃণার সাক্ষ্য বহন করে সে কেমন করে দাঁড়াবে মিতুল আর পল্লবের সামনে?

থানার বাইরে মেলা ভিড় হয়েছে। লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন তো গাছের ছায়া দেখে বসেও পড়েছে। সবাই বুঝে গেছে, এত সহজে এ ঘটনার ফয়সালা হবে না। সবাই তাই হাতে সময় নিয়েই জড়ো হয়েছে থানার সামনে। বদ্রিনাথ নিখোঁজ হওয়ার প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পর গতকাল রাতে পুলিশ বড় দরগার কবরখানার মধ্যে থেকে বদ্রিনাথের গলার নলি কাটা দেহ উদ্ধার করেছে। খুনের মামলা রুজু করেছে পুলিশ। তবে খুনি শুধু বদ্রিনাথের গলার নলি কেটেই ক্ষান্ত দেয়নি, যাওয়ার আগে নিপুণ হাতে বদ্রিনাথের নাকটা কেটে নিয়ে গেছে। আজ সারা সকাল গোটা কবরখানা তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেই কাটা নাকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বদ্রিনাথ পরোপকারী মানুষ ছিল। লোকের বিপদে আপদে বুক দিয়ে দাঁড়াত। এলাকার লোকজন তাকে ভালোবাসে। তাই তার খুনের খবর চাউর হতেই সবাই খেপে উঠেছে। তারা ঠিক করেছে, যতক্ষণ না বদ্রিনাথের খুনিকে গ্রেফতার করা হবে ততক্ষণ থানার বাইরে অবস্থান করবে। পার্টির লোকেরা সব জায়গায় মুখ মারতে চলে আসে। এখানেও এসে পড়েছে। চারদিকে পার্টির ঝান্ডা লাগিয়ে দিয়েছে। একটা ভোবদা মতো আধবুড়ো নেতা গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে, বদ্রিনাথ সাহার খুনিকে গ্রেফতার করতে হবে, করতে হবে। বদ্রিনাথ সাহার মৃত্যু মানছি না, মানব না।

পিচ করে খানিকটা থুতু ফেলল সরিত। মনে মনে বলল, তুই মানবি কি মানবি না তাতে আমার বাল ছেঁড়া যায়।

আসলে কারও মানামানিতেই আর কিছু এসে যায় না। বদ্রিনাথ মরেছে এটা দিনের আলোর মতো সত্যি। প্যান্টের ডান পকেটটা আলতো করে একবার ছুঁয়ে নিল সরিত। পলিথিনের প্যাকেটে মোড়ানো কাটা নাকটা ওখানেই আছে। নাকটা বেশি লম্বা হয়ে গেছিল বদ্রিনাথের। সেটা তো কাটতেই হত।

বদ্রিনাথকে খুন করার পরেই ঠাটিয়ে নেশা করেছিল সরিত। একদিনেরও বেশি সময় ঘুমিয়েছিল। খোঁয়াড়ি কাটতে বেরিয়েছিল চা খেতে। সেখানেই জানতে পারে থানার বাইরে লোক জমায়েত হচ্ছে। জামাকাপড় বদলানোর আর সময় পায়নি। চা খেয়েই সোজা থানায় চলে এসেছে। তাই নাকটা রয়ে গেছে পকেটেই। লোকজনের ভিড়ে মিশে সেও এখন বসে আছে থানার বাইরে একটা গাছের তলায়। পার্টির একটা ছেলে এসে তার হাতেও কালো ফিতে বেঁধে দিয়ে গেছে। হাতে একটা প্ল্যাকার্ড ধরিয়ে দিয়ে গেছে। তাতে লেখা, ‘বদ্রিনাথ সাহার খুনির চরম শাস্তি চাই।’ সেইটা বুকের কাছে যত্ন করে ধরে রেখেছে সরিত।

খুন করার পর খুনি সাধারণত ঘটনাস্থল থেকে অনেকটা দূরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে। নিজের অ্যালিবাই খাড়া করার চেষ্টা করে। কিন্তু সরিত উল্টো। খুন করার পর সে কিছুদিন স্পটের আশপাশেই পড়ে থাকে। একেবারে পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ায়। এতেই সবচেয়ে বড় অ্যালিবাই তৈরি হয়ে যায়। তবে সরিত যে সাবধানতার সাথে এবং সন্তর্পণে কাজ সারে তাতে কাকপক্ষীও টের পায় না। তবু সাবধানের মার নেই। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে সরিত তার এই সাতাশ বছরের জীবনে পাঁচটা মানুষ খুন করেছে কিন্তু কোনওবারই পুলিশ খুনির টিকির নাগাল পায়নি।

এ বুদ্ধিটা সরিতের মাথায় এসেছিল বই পড়ে। সে পড়েছিল, সম্রাট আকবর না কি কোহিনুর হীরেকে পেপারওয়েট হিসেবে ব্যবহার করতেন। এটার কারণ হল, কোনও জিনিসকে একেবারে চোখের সামনে অবহেলায় ফেলে রাখলে মানুষ ভেবেই উঠতে পারে না যে জিনিসটা দুর্মূল্যও হতে পারে।

বই পড়তে ভারী ভালোবাসে সরিত। তাকে বইপোকা বললেও অত্যুক্তি হয় না। তার ব্যাগের মধ্যে আর কিছু থাক না থাক গোটা দুয়েক বই সব সময় থাকবেই। বাজারে নতুন কোনও বই এলেই সরিত সে বই কিনে ফেলে আর একটু ফাঁক পেলেই বসে পড়ে বই খুলে। তবে এই বই পড়া বিফলে যায়নি। নিকষছায়া নামে একটা বই পড়তে গিয়েই তো সে কত্তাকে আসল খবরটা দিতে পেরেছিল। সে না বলা অবধি তো মানুষটা পালের গোদাকে ছেড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল অন্যের পেছনে। কথাটা শুনে কত্তা কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে বসেছিল। তারপর ঘড়ঘড়ে গলায় বলেছিল, তুই ঠিক বলছিস?

সরিত বলেছিল, আমি ঠিক ভুল বলার কে? এ গল্প তো আগেই আপনার মুখে শুনেছি। এই দেখুন না, বইয়ের পাতা উল্টে আসল জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছিল।

অনেকক্ষণ ধরে পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখেছিল কত্তা। দেখতে দেখতে থরথর করে কেঁপে উঠছিল কত্তার রোগা শরীরটা। চোখ দুটো দিয়ে আগুন বেরোচ্ছিল যেন আর একসময় সেই জ্বলন্ত দুই চোখ ভরে উঠেছিল জলে। হাতের চেটোয় চোখের জল মুছে বইটা ফেরত দিয়ে সরিতের মাথায় হাত বুলিয়ে কত্তা বলেছিল, যার জন্য আমার সর্বস্ব গেছে তাকে চিনিয়ে দিলি তুই। তুই জানিস না আমার কত বড় উপকার করলি।

মনটা ভরে গেছিল সরিতের। বলেছিল, উপকার তো আপনিও আমার কম করেননি কত্তা। আপনার চরণে আমায় জায়গা দিয়েছেন। আমাকে শিষ্য বলে মেনেছেন। এবার বলুন কত্তা, কী করতে হবে? কীভাবে মারব মাগিটাকে? শুয়োরকে যেভাবে মারে? পোঁদে গরম রড ঢুকিয়ে দেব?

চমকে উঠেছিল কত্তা। বলে উঠেছিল, না না। তুই কিছু করবি না। ও মাগির ব্যবস্থা তো আমি করব। আমাকে ওর একটা ছবি জোগাড় করে দিতে পারবি?

তা ছবিও জোগাড় করে দিয়েছিল সরিত। একটু ভাবতেই মনে পড়েছিল, বেশ কয়েক মাস আগে কাগজে এই মাগিটার ব্যাপারে বেরিয়েছিল। মাগিটা ডাক্তার। কত্তা কলকাতায় যে বাচ্চা দুটোকে মেরেছিল তাদের নিয়ে হুজ্জুতি হওয়ার ফলে মাগিটা রিজাইন দেয়। পুরনো খবরের কাগজ থেকে মাগিটার একটা ছবি কেটে এনে দিয়েছিল। ইন্টারনেট থেকেও দেখিয়েছিল, তিতাস সেনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল। তার পরেই কত্তা বলেছিল, মাগিটার দেহের কোনও অংশ লাগবে।

কলকাতায় থাকলে সরিত নিজেই যেত কিন্তু এদিকে কাজ পড়ে গেল। তবে তড়িত তৈরি হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে হয়তো জিনিসটা এনেও দিয়েছে কত্তাকে। ফোন থাকলে ফোন করে জেনে নেওয়া যেত। এই সব সময়ে একটা ফোনের দরকার অনুভব করে সরিত কিন্তু তারপরেই সাবধান হয়ে যায়। মোবাইল ফোন খারাপ জিনিস। মোবাইল থাকা মানেই পুলিশের হাতে ধরা পড়ার জন্য একটা পা বাড়িয়ে থাকা। তাই সরিত ওসব ঝামেলায় যায়নি। আর দিনতিনেক এখানে থাকলেই হবে। তার পর সে কলকাতা যাবে। কত্তার সঙ্গে দেখা করবে। কত্তাকে সে রেখেছে খিদিরপুরের একটা বস্তিতে। সবে সাতটা বাচ্চা মারা হয়েছে। কত্তার পুরো শক্তি ফিরে আসার জন্য এখনও ছ’টা বাচ্চাকে মারতে হবে। কত্তার সাথে দেখা করে সেসব নিয়ে বসতে হবে। কলকাতা, হুগলি, বর্ধমান এই তিন জায়গায় কাজ হয়েছে। এবার নতুন জায়গার সন্ধান করতে হবে। নয় বছরের কম বয়সি বাচ্চা খুঁজতে হবে। তাদের সাথে ভাব জমাতে হবে। কাজ অনেক। আগে কত্তা একাই করত। কিন্তু এখন এগুলো সে-ই করে। তড়িৎ কত্তার দেখাশোনা করে আর দরকারে টুকটাক সাহায্য করে। বাচ্চা মারার ব্যাপারটা ও জানে না। কত্তাই জানাতে বারণ করেছে। মাঝখান থেকে এই বদ্রিনাথ নাক না গলালে অ্যাদ্দিনে পরের প্ল্যান ছকা হয়ে যেত। সরিত চায়, খুব তাড়াতাড়ি কত্তার সবটা শক্তি ফিরে আসুক। তবেই না কত্তা তাকে মন্ত্রদীক্ষা দিতে পারবে।

দুনিয়াতে এই একটা মানুষ, সরিত যাকে তোয়াক্কা করে। অবশ্য কত্তা বলে, রতনে রতন চেনে। তাই আমাদের এত ভাব।

তবে সরিত যদি একটা রত্ন হয় কত্তা যে খাঁটি হীরে তা নিয়ে সন্দেহ নেই সরিতের। একটা সময় অবধি সরিত ভাবত, সে এই দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ানক মানুষ। কিন্তু কত্তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সরিতের ধারণা পাল্টে গেছে। সে বুঝেছে, সে যদি সবচেয়ে খারাপ মানুষ হয়, কত্তা তবে রাক্ষস বা অসুর। কত্তা যে অবলীলায় ভয়ঙ্কর কথাগুলো ভাবতে পারে তা কোনও মানুষের কম্ম না। এমন একটা মানুষের খোঁজেই তো সরিত এতদিন ছিল। এমন একটা মানুষ যার সামনে নির্দ্বিধায় মাথা নোয়ানো যায়, যাকে ভয় পাওয়া যায়। কতকাল ধরে একটুখানি ভয় পাওয়ার জন্য সরিতের প্রাণটা আকুলিবিকুলি করেছে কিন্তু তেমন দাপের মানুষ কোথায় যে সরিতকে ভয় পাওয়াতে পারে? সরিত তো নিজেই একটা মূর্তিমান ভয়। কত কত মানুষ শুধু তার চাহনি দেখেই ভয়ে গুটিয়ে গেছে আর সে নিজের রূপ দেখালে তো কথাই নেই। মানুষ যখন তাকে দেখে ভয়ে পেচ্ছাপ করে ফেলে তখন ভারী ভালো লাগে সরিতের। মনের মধ্যে কেমন একটা তৃপ্তি ভুসভুসিয়ে ওঠে। মনে হয়, সার্থক এই জন্ম।

আসলে ছেলেবেলা থেকেই সরিত সৃষ্টিছাড়া। জন্মের পর থেকে আজ অবধি সে একবারের জন্যেও কাঁদেনি। জ্ঞান হওয়ার আগের কথা তো তার মনে নেই, মায়ের মুখে শুনেছিল, সে কাঁদে না দেখে মা তার কুষ্ঠি বিচার করতে দিয়েছিল। কুষ্ঠি বানাতে গিয়ে ভয় পেয়ে গেছিল জ্যোতি¡ী। মাঝপথে কাজ বন্ধ করে ছুটে এসেছিল মায়ের কাছে। বলেছিল, ভালো চাস তো এই ছেলেকে মেরে ফেল সবিতা। এ বেঁচে থাকলে সব্বোনাশ হবে।

মা বলেছিল, কার সব্বোনাশ?

জ্যোতিষী বলেছিল, তোর, আমার, সব্বার। এ ছেলে মানুষ নয়। অন্য কিছু।

জ্যোতিষীকে সে দিন ঝেঁটিয়ে তাড়িয়েছিল মা। সরিতের না কি তখন চার বছর বয়েস। কিন্তু ১২ বছর পর সরিত যেদিন মায়ের বুকের ওপর দম দম করে কয়লা ভাঙা হাতুড়ি পিটছিল সেদিন মরে মরে যেতে মা আফশোস করেছিল জ্যোতিষীর কথা না শোনার জন্য। মাকে মারতে চায়নি সরিত কিন্তু সে একটা খুন করছিল আর মা সেটা দেখে ফেলেছিল। বলেছিল, সবাইকে বলে দেবে। বাধ্য হয়েই মাকে সরিয়ে দিতে হয়েছিল সেদিন। অবশ্য আরও একটা কারণ ছিল। মাকে মেরে সরিত তড়িৎকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল, তার বিরুদ্ধে গেলে তড়িতেরও এই একই অবস্থা হবে।

তড়িৎ তার যমজ ভাই। সে দু’মিনিটের বড়। দু’জনকে হুবহু একই রকম দেখতে না হলেও চেহারায় এতটাই মিল যে যারা চেনে না তাদের গুলিয়ে যেতে বাধ্য। সরিত জানে, তড়িৎ তাকে পছন্দ করে না। সে না করুক, ভয় পেলেই হবে। হ্যাঁ, তড়িৎ ভয় পায় সরিতকে। একটু আধটু না, যমের মতো ভয় পায়। তড়িৎ অবাধ্য হলেই সরিত তাকে একটা বিশেষ শাস্তি দেয়। সেই শাস্তির ভয়েই কি না কে জানে তড়িৎ তার সব কথা শুনে চলে। নিজের সুবিধের জন্যই সরিত তড়িৎকে কিছু কিছু কাজ শিখিয়েছে। তবে কত্তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরে তড়িতেরও কাজেকম্মে মন বসেছে। আর হবে নাই বা কেন? কত্তা কি আর যে সে লোক? সরিত স্বপ্ন দেখে সেও একদিন কত্তার মতো রাক্ষস হয়ে উঠবে। আর আজ বলে না, এ স্বপ্ন সরিত জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে।

সরিতের জন্ম কালীঘাটের বেশ্যাপট্টিতে। তার মাকে সুন্দর দেখতে ছিল। আর মায়ের চেয়েও সুন্দর দেখতে কোনও এক হারামি মায়ের পেট বাঁধিয়ে কেটে পড়েছিল। তাই তো সরিত আর তড়িৎকে এত সুন্দর দেখতে। অবশ্য সে হারামখোরের নাম মা মরার সময়েও বলে যায়নি। তবে বেজন্মা হলে কী হবে ছোট থেকেই সরিতের মাথাটা ভীষণ পরিষ্কার। মা তাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। সেখান থেকেই তো বই পড়ার নেশা ধরল। কিন্তু রক্তের দোষ কোথায় যাবে? তখন সরিতের ক্লাস সিক্স। তদ্দিনে লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াল, কুকুর খুন করে সরিত হাত পাকিয়ে ফেলেছে। আলাদা করে রাগ বা কোনও কারণ ছিল না। খুন করতে ভালো লাগত তাই সে খুন করত। খাবারের লোভ দেখিয়ে কুকুর বা বেড়ালকে একটেরে নির্জন জায়গায় নিয়ে যেত। আগে থেকেই বিষ মিশিয়ে রাখত খাবারে। সেই বিষ মেশানো খাবার খেয়ে কুকুর বা বেড়ালটা যখন ছটফট করত তখন লাঠি দিয়ে সেটাকে পিটিয়ে পিটিয়ে মারত সরিত। এবার সে কুকুর, বেড়াল ছেড়ে নজর দিল মানুষের দিকে। সরিতের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল মৃণ্ময়। রোজ সে সরিতকে নিজের টিফিনের ভাগ দিত। কী খেয়াল হল, একদিন বাড়ি ফেরার পথে সরিত তাকে একটা ইঁদুর মারা বিষ মেশানো লাড্ডু খাইয়ে দিল। বিষ মেশানো লাড্ডু খেয়ে মৃণ্ময় যখন ছটফট করছে, ড্রেনের ধারে উবু হয়ে বসে বমি করছে, পেছন থেকে তার মাথায় দমাস করে একটা থান ইট বসিয়ে দিল সরিত। ঝুপ করে মৃণ্ময়ের দেহটা উল্টে পড়ল ড্রেনের কালো থকথকে জলে। থিকথিক করছিল মশার ডিম। সেগুলো সব এলোমেলো হয়ে গেল।

সেই শুরু হল মানুষ মারা। জহুরিরাও খাঁটি রত্নের খোঁজে থাকে। কয়েক বছরের মধ্যেই খুন করার বিনিময়ে সরিত টাকা পেতে শুরু করল। প্রথাগত লেখাপড়ার পাট পুরোপুরি চুকিয়ে দিয়ে এই লাইনে নেমে পড়ল সে। খুন করতে সরিতের ভালো লাগে। তা ভালো লাগার কাজ করে যদি উপার্জন করা যায় মন্দ কী? এ দুনিয়ায় সেই তো ভাগ্যবান যার প্যাশন আর প্রফেশন এক হয়ে যায়। সরিত লক্ষ্য করে দেখেছে, মানুষ মারা একটা নেশা। খুব বেশিদিন মানুষ মারতে না পারলে তার ভারী অস্বস্তি হয়। কিন্তু মানুষ মারায় অনেক ঝক্কি আছে। সবচেয়ে বেশি ঝামেলা পুলিশকে নিয়ে। পুলিশকে সরিত ভয় পায় না কিন্তু দিনের পর দিন জেলে বন্দি হয়ে থাকাটায় তার আপত্তি। তাই অনেকদিন থেকেই সরিত এমন একটা উপায় খুঁজছিল যাতে চাইলে দূর থেকেই মানুষকে মেরে ফেলা যায়। পড়াশোনা করতে গিয়েই সরিত জেনেছিল, তন্ত্রসিদ্ধ হতে পারলে মারণ, উচাটনের মতো এমন অনেক ক্ষমতা করায়ত্ত হয় যা যে কোনও অস্ত্রের চাইতে অনেক বেশি ঘাতক। কিন্তু মন্ত্রদীক্ষা না হলে যে সিদ্ধি হয় না। আর এ বিদ্যা প্রত্যক্ষভাবে গুরুবাদী। বই পড়ে আর যাই হোক তান্ত্রিক হওয়া যায় না। সে জন্যই গুরুর সন্ধানে শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছিল সরিত। কিন্তু লাভ হচ্ছিল না। বেশিরভাগই ভণ্ড। শুধু মদ, গাঁজা খাওয়া আর টুপি দিয়ে লোকের থেকে পয়সা লোটার ফিকির। ঘেন্না ধরে যাচ্ছিল সরিতের। এর মধ্যেই এক ভৈরবীর সন্ধান পেল সে। হুগলি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এক পরিত্যক্ত শ্মশানে তার বাস। দেখে মনে হয়েছিল, বিদ্যাটা জানে। কিন্তু শবসাধনা শেখাবে বলে নির্জনে টেনে নিয়ে গিয়ে খপ করে সরিতের প্যান্টের মধ্যে হাত ভরে দিয়েছিল মাগিটা। ছেলেবেলা থেকে মাকে এসব ছেনালি করতে দেখেছে সরিত। চড়াত করে গরম হয়ে গেছিল মাথাটা, সাধনার নামে ঢলানি? সেই মুহূর্তে ঠিক করে নিয়েছিল মাগিটাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু মাগিটা বেশ গায়ে-গতরে। সঙ্গে কোনও অস্ত্র নেই। খালি হাতে মারতে গেলে ধস্তাধস্তি হবেই। চেঁচালে লোক জড়ো হয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। তাই সে বলেছিল, আজ ছেড়ে দাও আমায়। কাল আসব।

ঘন গলায় ভৈরবী বলেছিল, সত্যি আসবি তো? আমি কালী, তুই আমার শিব। দু’জনের মিলন না হলে সৃষ্টি থেমে যাবে যে পাগল।

ভৈরবীর থুতনিটা ধরে সরিত হেসে বলেছিল, আসব গো। আসব।

মাথার মধ্যে তখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। লম্বা লম্বা পা ফেলে সরিত বেরিয়ে আসছিল শ্মশান থেকে। আচমকা একটা গলা ভেসে এসেছিল, আগুন হবে?

থমকে ঘুরে তাকিয়ে সরিত দেখেছিল, অন্ধকারে গাছের নীচে উবু হয়ে একটা লোক বসে আছে। পকেট থেকে দেশলাইটা বার করে সরিত এগিয়ে গেছিল সেদিকে। দেশলাইটা বাড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু দেশলাইটা না নিয়ে লোকটা বলেছিল, মাগিটারে কীভাবে মারবা কিছু ভাবলে?

চমকে উঠেছিল সরিত, কী করে জানল লোকটা? তার ওপর নজর রাখছিল না কি? পুলিশের খোঁচর? কিন্তু তাও যদি হয় সরিতের মনের কথা জানা তো সম্ভব নয়। সাবধানী গলায় সরিত বলে উঠেছিল, কে তুমি?

লোকটা বলেছিল, আমি নগণ্য মনিষ্যি।

বলতে বলতে লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল কোনওমতে। সরিত দেখেছিল, লোকটার কোমরের কাছ থেকে বেঁকে আছে সামনের দিকে। চলাফেরা করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল লোকটাকে। তবু লাঠি ঠুকে ঠুকে এগিয়ে যেতে যেতে লোকটা বলেছিল, মারবাই যখন নতুনত্ব করে মারো। একঘেয়ে খুনে মজা নাই।

বিপদের ইঙ্গিত পেয়েছিল সরিত। চকিতে মাটিতে পড়ে থাকা একটা ভাঙা বোতল তুলে নিয়েছিল। লোকটা তখন তার দিকে পেছন ফিরে এগিয়ে যাচ্ছে। ভাঙা কাচের বোতল অস্ত্র হিসেবে মারাত্মক। শরীরের সবটা শক্তি একত্র করে বোতলটা সে গেঁথে দিতে চেয়েছিল লোকটার ঘাড়ে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখেছিল, সে এক বিন্দু নড়াচড়া করতে পারছে না। অদৃশ্য এক শেকল যেন পাকে পাকে বেঁধে ফেলেছে তাকে। নিজের শরীরটাই আর তার বশে নেই। জীবনে এই প্রথমবার ভয় পেয়েছিল সরিত। সে অনুভব করছিল, তার গলার কাছটা শুকিয়ে আসছে। কেমন যেন ভার ভার ঠেকছে তলপেট। বিচ্ছিরি একটা শীত ভাব কিলবিল করে বেড়াচ্ছে রোমকূপের গোড়ায় গোড়ায়। চিৎকার করে উঠতে চেয়েছিল সরিত। কিন্তু তাও পারেনি। কে যেন লোহার সাঁড়াশি দিয়ে টিপে ধরে রেখেছিল তার কণ্ঠা। তখনই যেতে যেতে ফিরে তাকিয়েছিল লোকটা। খিক খিক করে হেসে বলেছিল, এরে বলে হস্তপদ বন্ধন। এলেবেলে কাজ। মন দিয়ে শিখতে পারলে আরও কত কী যে করা যায়! আমার গুরু বলতেন, ওরে লোকনাথ, তন্ত্রই পালক। তন্ত্রই সংহারক। তোমার মধ্যে বস্তু আছে বাপ। কিন্তু বড্ড ছাড়াকাটা হয়ে আছে। পাকড়ে ধরে বিন্দুতে স্থিতি করাতে লাগবে। চাও তো দিশা দেখাতে পারি। এবার তোমার ব্যাপার। বড় হয়েছ, যা ভালো বোঝো।

ফের খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে গেছিল লোকটা আর সরিতের গায়ে জড়িয়ে থাকা অদৃশ্য শেকলের বাঁধনেও ঢিল পড়েছিল। গুড়ুল খাওয়া পাখির মতো ঝপ করে মাটির ওপর খসে পড়েছিল সরিত। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়েছিল ধাতস্থ হতে তার পর ছুটে গিয়ে সোজা আছড়ে পড়েছিল লোকটার পায়ে।

চুঁচড়ো স্টেশনের একটা অন্ধকার কোণে উবু হয়ে বসে ফুঁ দিয়ে চা খেতে খেতে লোকটা ফিসফিস করে বলেছিল, শোনো বাপ, পাপ করার নেশা হল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নেশা। একটা সময় পাপ করতে করতে মানুষ আর পাপী থাকে না। সে নিজেই আস্ত একটা পাপ হয়ে ওঠে। ভালোর যেমন একটা শক্তি আছে, খারাপেরও আছে। বরং খারাপের শক্তিতে কাজ হয় অনেক চটজলদি। ভালো ব্যাপারটাই হল ভদ্রঘরের সতী মাগির মতো। কোমরের কাছে কাপড় গুটোতে এত সাধ্যসাধনা করতে হয় যে ঝক্কি পোষায় না। আর খারাপ হল বাজারি মেয়েছেলে। পা ফাঁক করেই আছে। তোমার তো বাপ সুখ পাওয়া নিয়ে কথা। তা হলে খামোখা অত খাটতে যাবা কেন? তবে হ্যাঁ, খারাপেরও তরতম আছে। খারাপকে খারাপতর, তার পর খারাপতম করে তুলতে হয় ধীরে ধীরে। তবেই বিপরীত শক্তি আত্মস্থ হয়। বুঝলা? তা এই মাগিরে যখন মারবা ভেবেছ, খুব খারাপ করে মারো। দেখি তুমি কতটা খারাপ করে ভাবতে পারো। তোমার ভাবনার দৌড় দেখি।

মানুষ খুন করার কয়েকটা অভিনব পন্থা পরপর বলে গেছিল সরিত কিন্তু প্রত্যেকবারই মাথা নেড়ে নাকচ করে দিয়েছিল লোকটা। বলেছিল, তুমি যেগুলো বলছ বাপ সেগুলো এমন কিছু নতুনত্ব না। আর সবচে বড় কথা এগুলোর মধ্যে নিষ্ঠুরতার বড় অভাব।

থমকে গেছিল সরিত। তার বুদ্ধিতে বলে, খুন ব্যাপারটাই ভয়ানক নিষ্ঠুর একটা কাজ। সেখানে আবার নিষ্ঠুরতার অভাব খুঁজে পাচ্ছে লোকটা! বলেছিল, আমার মাথায় তো এগুলোই আসছে। আপনিই বলুন প্রভু।

কাঁধে হাত রেখে লোকটা বলেছিল, প্রভু না। তুমি আমারে কত্তা বলে ডাকবা। আমার বড় কাছের একজন আমায় কত্তা বলে ডাকত। তোমার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। ভালো করে কাজ করো, তোমায় একটা নাম দেব। তোমায় গেনু বলে ডাকব।

তখনও নিকষছায়া বইটা ঘুমিয়ে আছে পল্লবের অন্তরেই। ফলে অবাক হয়ে সরিত বলেছিল, গেনু কে?

লোকটা বলেছিল, সে পরে একদিন বলব তোমায়। যাক গে, খুনের কায়দাটা বলি। দেখো তো পছন্দ হয় কি না?

বলেছিল লোকটা আর সবটা শুনে ফের ভয়ে হিম হয়ে গেছিল সরিত। তার মাথা ঝিমঝিম করছিল। হাত কাঁপছিল তিরতির করে। মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল একটাই প্রশ্ন, এত ভয়ঙ্কর ভাবে কেউ ভাবতে পারে? তখনই সরিত বুঝেছিল, তার উল্টো দিকে যে বসে আছে, মানুষের মতো দেখতে হলেও আসলে সে রাক্ষস কিংবা অসুর। মানুষের মন এখনও এতটা হিংসা ধারণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। প্রথমে ভয় পেলেও সারা রাত ধরে নিজেকে বুঝিয়েছিল সরিত। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাকেও কত্তার মতো হয়ে উঠতে হবে। মানুষ থাকার মধ্যে মজা নেই। রাক্ষস হতে হবে, রাক্ষস। খারাপকে করে তুলতে হবে কুৎসিত। নৃশংসকে করে তুলতে হবে নারকীয়।

পরের দিন রাত বাড়তেই সে হাজির হয়েছিল পরিত্যক্ত শ্মশানটায়। তাকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল ভৈরবী। একটা বড় ঝোপের আড়ালে তাকে উদোম করে ফেলে ধামসাতে ধামসাতে প্রথমেই সায়া দিয়ে তার হাত বেঁধে ফেলেছিল সরিত। তার পর নিজে উদোম হয়ে জাঙিয়াটা ঠেসে গুঁজে দিয়েছিল তার মুখের মধ্যে। বহুদিনের বুভুক্ষু মাগিটা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল সরিতের এই দস্যুতায়। তখনই নিপুণ হাতে প্যান্টের পকেট থেকে জিনিসটা বার করে এনেছিল সরিত। আদর করার অছিলায় সরসরিয়ে নীচের দিকে নেমে গেছিল মাগির পেট বেয়ে আর চোখের পলকে তার দু’পায়ের মাঝখানে উজাড় করে দিয়েছিল অ্যাসিডের বোতলটা। অবরুদ্ধ যন্ত্রণায় কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছিল মাগিটা। হাত বাঁধা থাকায় মুখ থেকে বার করতে পারছিল না জাঙিয়াটা আর পারছিল না ভারসাম্য রাখতে। উঠে ছুটতে গিয়েই উল্টে পড়েছিল। আর দেরি করেনি সরিত। দ্রুত হাতে কেটে দিয়েছিল মাগিটার গোড়ালির শিরা দুটো। ভালো ভাষায় যাকে বলে অ্যাকিলিস টেন্ডন।

সেই প্রথমবার খুন করার পরে সরিতের জ্বর এসেছিল। সারারাত মাথার কাছে বসে জলপট্টি দিয়েছিল কত্তা। ভোরের দিকে করমচার মতো লাল চোখে তাকিয়েছিল সরিত। তার বুকে হাত বোলাতে বোলাতে কত্তা বলেছিল, ভয় পায় না বাপ। ভয় পায় না। তোমার হবে। তুমি পারবা গেনু হয়ে উঠতে। প্রথম প্রথম তো, তাই এমন আনচান করছে। আসলে অনেকখানি বিপরীত শক্তি শরীরে প্রবেশ করেছে। এ তারই প্রভাব। ধীরে ধীরে অভ্যেস হয়ে যাবে।

তা ভুল বলেনি কত্তা। সত্যি অভ্যেস হয়ে গেছিল সরিতের। এখন আর স্বাভাবিক ভাবে খুন করতে তার ভালো লাগে না। বদ্রিনাথের কাটা নাকটায় হাত বোলাতে বোলাতে এসবই ভাবছিল সরিত। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল। থানার গেট থেকে কিছু দূরে একটা টোটো এসে থেমেছে। টোটো থেকে নেমে এল একটা হলুদ জামা পরা দোহারা চেহারার মেয়ে। চুলগুলো পেছনে টান করে বাঁধা। চোখে সানগ্লাস। ব্যাগটা বুকের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি হয়ে ঝুলছে কোমরের কাছে। একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে মেয়েটা ঢুকে গেল থানার ভেতর। সরিত লক্ষ্য করল, বুক না থাক মাগিটার পাছাটা মাখন। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল সরিত। তার ইন্দ্রিয়গুলো বড়ই সংবেদনশীল। নতুন কিছু ঘটতে চললে সে তার আঁচ পায়। এবারও তার মন বলে উঠল, এই মাগিটার মধ্যে কোনও একটা ঘাপলা আছে। এ এই এলাকার মাল নয়।

একটা কথা বাদে পুলিশকে সবটাই খুলে বলেছে রোশনি। বদ্রিনাথের কল রেকর্ড ট্রেস করে বর্ধমান থানার পুলিশ রোশনির সাথে যোগাযোগ করেছিল। সে খবরের কাগজে চাকরি করে জেনে অত্যন্ত বিনীত ভাবেই অনুরোধ করেছিল, যদি একবার সে থানায় হাজিরা দেয় বড় ভালো হয়। না করেনি রোশনি। পুলিশের সঙ্গে সাংবাদিকের অসদ্ভাব নেই। একটা বড় জবানবন্দি দিয়েছে সে। সেখানে বদ্রিনাথের ফোন আসা থেকে শুরু করে করে তার বর্ধমানে আসা এবং দেখা না পেয়ে ফিরে যাওয়া সবটাই সে বলেছে। বলেনি যেটা সেটা হল বদ্রিনাথের দেওয়া খবরের সূত্রটা। কাল যখন বদ্রিনাথকে পাওয়া যাচ্ছিল না তখন থেকেই রোশনির মনে কু ডেকেছিল কিন্তু সেটা যে এমন মর্মান্তিক ভাবে সত্যি হয়ে যাবে তা রোশনি ভাবতেও পারেনি। বদ্রিনাথের খুন তাকে বিহ্বল করে দিয়েছিল। একটাই কথা ভাবছিল সে, বদ্রিনাথের খুনের পেছনে কি এই গোপন খবরটার ভূমিকা আছে? বদ্রিনাথ এই খবরের সন্ধানে অনেকটা দূর চলে গিয়েছিল বলেই কি তাকে অকালে সরে যেতে হল? সে যদি এই খবরের গভীরে প্রবেশ করতে যায় তাকেও কি তবে সরে যেতে হবে? এই সব ভাবতে ভাবতেই থানা থেকে বেরিয়ে এসেছিল রোশনি। অন্যমনস্কের মতো হেঁটে যাচ্ছিল। এমন সময় কে যেন ডাকল, ম্যাডাম।

ঘাড় ঘুরিয়ে রোশনি দেখল, একটা সুন্দর মতো ছেলে। লম্বা, ফর্সা, ছিপছিপে চেহারা। রোশনি বলল, আমাকে ডাকছেন?

ছেলেটা এগিয়ে এল, হ্যাঁ। কলকাতা থেকে আসছেন?

একটু থমকাল রোশনি। অপরিচিত মানুষ বেশি কৌতূহল দেখালে তার ভালো লাগে না। গম্ভীর গলায় সে বলল, তাতে আপনার কী দরকার?

দু’পা এগিয়ে এল ছেলেটা, বদ্রিদার সঙ্গে আপনারই তো কথা হয়েছিল। তারপর আরও দু’পা এগিয়ে এসে চাপা গলায় বলল, ওই শিশুমৃত্যুর ব্যাপারে, তাই তো?

প্রবল চমকে উঠল রোশনি। সেটা দেখে মনে মনে হেসে ফেলল সরিত, ঢিলটা একদম ঠিক জায়গায় লেগেছে। থানার এক কনস্টেবলকে খৈনি বেটে দিতে দিতেই জেনে নিয়েছিল, মেয়েটা খবরের কাগজে চাকরি করে। বদ্রিনাথের কল রেকর্ডে মেয়েটার নম্বর আছে। তখনই দু’য়ে দু’য়ে চার করে নিয়েছিল সরিত। সে আবার বলল, বদ্রিদা আমাকে সব বলেছিল। বদ্রিদা ভয় পাচ্ছিল, ওর কিছু হয়ে যেতে পারে। ঠিক তাই হল। বদ্রিদা ভালো লোক ছিল। ওর খুনিকে না ধরা অবধি আমরা থানার সামনে অবস্থান করব। তা ছাড়া আমিও চাই এই শিশুমৃত্যুর কেসটা সবার সামনে আসুক। আমি যতটা জানি আপনাকে বলতে পারি ম্যাডাম। কিন্তু এখানে সবার সামনে কথা বলা ঠিক হবে না। এখান থেকে আমি মিনিট দশেকের ডিসট্যান্সে থাকি। যদি চান আপনি আমার সঙ্গে আসতে পারেন।

রোশনির দিকে তাকিয়ে রইল ছেলেটা। দ্বিধায় পড়ে গেল রোশনি। সে বুঝতে পারছে না, এই ছেলেটাকে বিশ্বাস করা কতটা উচিত হবে? তার একটু ভয় ভয় করতে লাগল কিন্তু একই সাথে এই খবরের ওজন তার সাংবাদিক সত্তাকে উত্তেজিত করে তুলল। একটা সময় সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে বলে উঠল, চলুন।বড় খুশি হল সরিত। পকেটে হাত ঢুকিয়ে বদ্রিনাথের কাটা নাকটাকে একটু আদর করে দিল সে।

রাতের ঘুম ভালো হলে মনমেজাজ শরিফ থাকে। সকালে চোখ খুলে জানলা দিয়ে আসা এক ফালি নরম রোদের দিকে তাকিয়েই তিতাসের মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল। বহুদিন পর এত গাঢ় ঘুম হল তার। মাঝের একটা সময় তো মুঠো মুঠো স্লিপিং পিল খেয়েও ঘুম আসত না। শেষ কিছুদিন ধরে যদিও এ সমস্যাটা অনেক কমে এসেছিল তবে খুব গভীর ঘুম হত না। অল্প কোনও শব্দেই ঘুম ভেঙে যেত। সেখানে এমন নিরবচ্ছিন্ন শান্তির ঘুম ভাবাই যায় না। বিছানায় উঠে বসে আড়মোড়া ভাঙল তিতাস। শরীরটাও একেবারে ঝরঝরে হয়ে গেছে। পল্লব এখনও ঘুমোচ্ছে। খাট থেকে নেমে পড়ল তিতাস। সাড়ে সাতটা বাজে। ঠিক করল, একেবারে চা বানিয়ে পল্লব আর অমিয়কে ডাকবে।

অমিয়র ফ্রিজটা বসার ঘরে। ফ্রিজ থেকে দুধ বার করতে গিয়ে থমকে গেল তিতাস। ফ্রিজের গায়ে ম্যাগনেট দিয়ে একটা কাগজের টুকরো আটকানো। তার ওপরে অমিয়র হাতের লেখা। লেখাটা পড়তে পড়তে ভুরু কুঁচকে গেল তিতাসের। অমিয় লিখেছে, পল্লব, জরুরি কাজে আমাকে বেরোতে হল। তোরা বেরনোর সময় চাবিটা সিকিউরিটির হাতে দিয়ে যাস।

মানুষের কথা বলার ধরন তার লেখায় প্রতিফলিত হয়। এ লেখা বড্ড দায়সারা। এমন ভাবে তো অমিয় কথা বলে না! তা হলে? ওর কি কিছু হয়েছে? মিতুলের সঙ্গে মনোমালিন্য মেটেনি বলে কি মুড অফ? কেমন যেন একটা খটকা লাগল তিতাসের। ফোন করল অমিয়র নম্বরে। কিন্তু পরপর দু’বার ফোন বেজে বেজে কেটে গেল। অমিয় ফোন ধরল না। পল্লবকে ধাক্কা দিয়ে তুলল তিতাস। কোনওমতে উঠে বসল পল্লব। ঘুম জড়ানো গলায় বলল, কী হয়েছে?

তিতাস বলল, অমিয় সাতসকালে বেরিয়ে গেছে। একটা নোট লিখে রেখে গেছে, জরুরি কাজ ছিল বেরিয়ে যাচ্ছি।

তো? কাজ থাকলে বেরোবে না?

ফোন ধরছে না তো। আমার কেমন একটা আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে।

কথাটায় পাত্তা না দিয়ে তিতাসের কোমর জড়িয়ে শুয়ে পড়ল পল্লব। আদুরে বেড়ালের মতো পেটে মুখ ঘষতে ঘষতে বলল, আমার পাঁচ নম্বর ভার্টিব্রার ওপর একটা চুমু খা না তিতাস।

এটা পল্লবের বরাবরের স্বভাব। তিতাস যেহেতু ডাক্তার তাই চুমু খেতে বলার মাধ্যমে তার অঙ্গসংস্থান জ্ঞানের পরিচয় নেয় সে। মাঝে মাঝেই বলে ওঠে, তিতাস, আমার কিডনির ওপর একটা চুমু খা। আমার বাম নিলয়ের ওপর একটা চুমু খা। আর শুধু চুমুই বা কেন? মাথা চুলকে দিতে হলে বলবে, অক্সিপিটাল লোবের ওপরটা একটু চুলকে দে। মাথা টেপাতে হলে বলবে, ফ্রন্টাল লোবের ওপরটা খুব দপদপ করছে। এসব বাঁদরামো পল্লবের পক্ষেই সম্ভব। অন্য সময় তিতাস হাসে কিন্তু আজ এক ধাক্কা দিল পল্লবকে। বলল, সকাল সকাল দেয়ালা করিস না। ওঠ তো।

এইবার ঠিকমতো উঠে বসল পল্লব। বলল, কী ব্যাপার বল তো? তুই এমন করছিস কেন?

কারণ, গত দু’ বছরে অমিয় কখনও এমন করেনি। যতই জরুরি কাজ থাক আমাদের সি-অফ না করে ও অফিস যায়নি। একবার তো আমাদের জন্য এসপি-র সঙ্গে জরুরি মিটিং-ও ঢপ দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিল। মনে আছে?

হ্যাঁ, সে মনে আছে কিন্তু এবার হয়তো তার চেয়েও জরুরি কোনও কাজ পড়েছে। যাকগে, ওর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। তুই স্নানে যা। সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ি চল। রাস্তায় ব্রেকফাস্ট করে নেব।

মনের মধ্যে একটা খচখচানি নিয়েই স্নান করতে ঢুকে গেল তিতাস। খুব রাগ ধরে গেল অমিয়র ওপর। না বলে যাওয়া অবধি মানা যায়, তা বলে ফোনও ধরবি না? তিতাস ঠিক করে ফেলল, ফেরার পথে একবার মিতুলের সঙ্গে দেখা করে যাবে। কী নিয়ে ওদের ঝগড়া হয়েছে সেটা জেনে ঝগড়াটা মিটিয়ে দিতে হবে। খুব ঝাড়বে অমিয়কে। মিতুলের মতো মিষ্টি ফুটফুটে একটা মেয়ের সাথে ঝগড়া করার কোনও অধিকার নেই ওর।

সবে শাওয়ারটা খুলেছে তিতাস, বাইরে থেকে দরজায় টোকা দিল পল্লব। গলা উঁচু করে বলল, অমিয় ফোন ধরেছে। বলল, ভোর রাতে ব্যারাকপুর রোডের ওপর কোথায় একটা খুব বড় মারপিট হয়েছে। তাই ফোর্স নিয়ে যেতে হয়েছে। আমরা ঘুমোচ্ছিলাম বলে ডাকেনি। ফিরে ফোন করবে।

আচ্ছা। একটু নিশ্চিন্ত হল তিতাস। শাওয়ারের জোর বাড়িয়ে দিয়ে মাথায় শ্যাম্পু ঘষতে শুরু করল। এই কোঁকড়ানো চুলে শ্যাম্পু করা একটা যুদ্ধ। একদিন ঠিকমতো শ্যাম্পু না করলে, সিরাম না লাগালে জট লেগে এমন অবস্থা হয় যে চিরুনির দাঁড়া ভেঙে যাওয়ার জোগাড়। মাঝে মাঝে তিতাস ভাবে একেবারে ন্যাড়া হয়ে যাবে কিন্তু এই চুলের ওপর আবার মায়াও আছে। এই চুলে নাক ডুবিয়েই না পল্লব বলেছিল, ‘তোমার জন্য লিখতে পারি এক পৃথিবী।’ নিজের মনেই হাসে তিতাস, বয়স যত বাড়ছে তত পাক ধরছে প্রেমে। বয়স হলে কেন যে প্রেমে এত পাক ধরে, কেন যে হৃদয় রাত জেগে পায়চারি করে তা তিতাস জানে না। জানবেই বা কী করে? সুমনসাঁই তো নিজেই জানেন না এর উত্তর। তবে তিতাস এটা জানে, প্রেমে পাক ধরার সঙ্গে শারীরিক চাহিদার সম্পর্কটা ব্যস্তানুপাতিক। সম্পর্কের শুরুতে প্রায় সবটাই আচ্ছন্ন করে রাখে শরীর। দু’টো নতুন শরীর প্রচণ্ড তীব্রতায় একে অপরকে কাছে টানে। তাদের নিষ্পেষণে যে প্রবল ঘূর্ণি ওঠে কালক্রমে তাই পর্যবসিত হয় শান্ত, শীতল, গভীর নির্ভরতায়। প্রেমের গভীরতা যত বাড়ে উপরিতলের ওই উদ্দামতা ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসে। তখন আঙুলে আঙুল ছুঁলে শরীর জাগে কম, মন জাগে বেশি। এসব ভাবতেই ভাবতেই মাথায় জল দিল তিতাস আর চুল ধুতে গিয়েই চমকে উঠল! মাথা কিচকিচ করছে বালিতে! চুল বেয়ে বালিধোয়া জল পড়ছে বাথরুমের মেঝেতে! এক মুহূর্ত আগেই যখন মাথায় শাম্পু ঘষছিল বালি তো ছিল না! তবে কি শাওয়ার থেকেই বালিটা আসছে? চকিতে শাওয়ারের দিকে তাকাল তিতাস। কিন্তু না! শাওয়ারের ঝাঁঝরি দিয়ে যে জল পড়ছে তাতে তো বালির চিহ্নমাত্র নেই! অথচ বাথরুমের মেঝে থিকথিক করছে বালিতে। এমনকী বালির পরিমাণ এতটাই বেশি যে বাথরুমের জল বেরনোর নালাটা অবধি আটকে গেছে বালি জমে। বাথরুমে এখন পায়ের পাতা ডোবা জল। আচমকা খুব ভয় পেয়ে গেল তিতাস। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে বলল, যা হচ্ছে বা হবে তা ভালো জিনিস নয়। দ্রুত বাথরুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল সে। এক ঝটকায় খুলে ফেলল বাথরুমের দরজা আর খুলতেই ভয়ে, বিস্ময়ে, অপ্রত্যাশিত অভিঘাতে বিমূঢ় হয়ে গেল তিতাস। বাথরুমের দরজা খুলে সে যেন এসে পড়েছে সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে! কোথায় অমিয়র সেই চেনা ফ্ল্যাট? চেনা বাথরুম? তার বদলে সে এখন দাঁড়িয়ে আছে আধো অন্ধকার একটি বিপুলায়তন কক্ষে। অদ্ভুত নকশাকাটা বিশাল বিশাল চৌখুপি পাথরের মেঝে। পাথরের চাঁই জুড়ে জুড়ে বানানো দেওয়াল। দীর্ঘকায় সব পাথুরে গম্বুজ উঠে গেছে ছাদ পর্যন্ত। দেওয়ালের গায়ে জ্বলছে মশাল। তারই আবছা আলোতে দেখা যাচ্ছে, দেওয়ালের ওপর পাথরে খোদাই করে আঁকা বিবিধ বিচিত্র সব ছবি। কিছুটা দূরে একটা বৃহদাকার পাথরের বেদি। বেদির ঠিক পেছনে একটি নাতিউচ্চ কপাটবিহীন দরজা। মশালের আলো সেই দরজার ওপারের কালিগোলা অন্ধকারকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারছে না। বেদির সামনে নানা ধরনের উপাচার দেখে বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই পুজো হয়েছে। সার দিয়ে রাখা কয়েকটি পাথরের মালসার মধ্যে কী যেন পুড়ছে। ধোঁয়া উঠছে। অদ্ভুত এক ঝিমধরানো গন্ধ তাতে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, বেদির ওপর কোনও বিগ্রহ নেই! ধীরে ধীরে বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিচ্ছিল তিতাস। সে আন্দাজ করল, এই কক্ষটি কোনও এক বহু প্রাচীন মন্দিরের গর্ভগৃহ। এ কি তবে সেই মন্দির যা সে স্বপ্নে দেখেছিল? কিন্তু মন্দিরই যদি হবে বিগ্রহ নেই কেন? আর সে এখানে এলই বা কী করে! তবে কি সে এখন স্বপ্ন দেখছে? সব গুলিয়ে যাচ্ছিল তিতাসের, তখনই কানে এল চাপা গরগর আওয়াজ। চমকে তাকাল সে। আওয়াজটা আসছে বেদির পেছনের সেই দরজার ওপারের অন্ধকার থেকে। আর এ আওয়াজটা চিনতে ভুল হল না তিতাসের। তিতাস জানে এবার ওই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসবে একটি বিশালাকার সিংহ। যার প্রতিটি পেশিতে স্তম্ভিত বিদ্যুৎ। কিন্তু সিংহটাকে দেখতে পাওয়া মানে তো তাকেও দেখতে পাওয়া। সিংহ আছে মানে সেও আছে। শিউরে উঠল তিতাস। না না, তাকে আর দেখতে চায় না তিতাস। একবার মাত্র তাকে দেখেছে তিতাস কিন্তু তাতেই বুঝেছে, পৃথিবীর সমস্ত বিপরীতার্থক অবস্থা একসঙ্গে স্থিত হয়েছে ওই আধারে। একই মুহূর্তে আলো আর অন্ধকারকে সহ্য করার মতো ক্ষমতা মানুষের নেই। চোখ বুজে ফেলল তিতাস। চোখ বুজে থেকেই অনুভব করল, লঘু পায়ে সিংহটা এগিয়ে আসছে তার দিকে আর আদিম এক ভয় আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে তার সমস্ত চেতনা। পা দুটো যেন জমে গেছে পাথরের মেঝের সাথে। চাইলেও আর কোনওদিন যেন সে ফিরে যেতে পারবে না এই গর্ভগৃহ থেকে। খুব কান্না পাচ্ছিল তিতাসের। তার বন্ধ করে থাকা চোখ উপচেই জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে আর পড়া মাত্রই তীব্র শীতল এক নিঃশ্বাসে জমে বরফ হয়ে গেল সেই অশ্রুবিন্দু।

এসেছে। সে এসেছে।

সেই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময় এখন প্রদক্ষিণ করছে তিতাসের চারপাশে, অসম্ভব গরম লাগতে শুরু করেছে তিতাসের। সে দরদর করে ঘামছে কিন্তু মৃত্যুহিম এক শৈত্যে সে স্বেদবিন্দুও স্ফটিকদানায় পরিণত হচ্ছে নিমেষে। আর পারছে না তিতাস। তার মনে হল সে এবার অজ্ঞান হয়ে যাবে আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার মাথার ভেতর গমগম করে উঠল এক আশ্চর্য কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর একাধারে সুরহীন কর্কশ ও অনির্বচনীয় সুরেলা। সেই কণ্ঠস্বরে যেন যুদ্ধজয়ের উল্লাস আবার একই সাথে তাতে সঞ্চিত হয়ে আছে প্রিয়জন বিয়োগের বেদনা। সেই কণ্ঠ যে ভাষায় কথা বলছে তা তিতাসের অজানা তবু তার অর্থ অনুধাবন করতে একটুও অসুবিধে হল না। আশ্চর্যতম সেই কণ্ঠ বলছে, অমিয় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে ধরিয়ে দাও। ধরিয়ে দাও। এক এক করে শেষ করে দাও প্রত্যেককে। কঠোর হও। নির্মম হও। নীতিজ্ঞান লোপ পাক। চৈতন্য উদ্ভাসিত হোক অন্ধকারে। আমায় ধারণ করো অন্তরে। বলো, ইযুজ্জু ইনান্না... ইযুজ্জু ইনান্না... ইযুজ্জু ইনান্না...

চোখের পাতা ক্রমশ ভারী হয়ে এল তিতাসের। ঘোর লাগা গলায় সে বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল, ইযুজ্জু ইনান্না... ইযুজ্জু ইনান্না... ইযুজ্জু ইনান্না...

* * *

প্রায় সওয়া এক ঘণ্টা হয়ে গেল তিতাস স্নানে ঢুকেছে। স্নান করতে তো তিতাসের এত সময় লাগে না! একটু অস্থির হয়েই দরজায় টোকা দিল পল্লব, তিতাস। এই তিতাস। আর কতক্ষণ..., কথা শেষ করার আগেই ঝপ করে বাথরুমের দরজাটা খুলে গেল। সামান্য চমকে উঠল পল্লব। ও কী! তিতাসের চোখ দুটো অমন লাল কেন? কিন্তু সে কিছু বলার আগেই তিতাস বলে উঠল, চোখ দুটো খুব লাল হয়েছে না রে?

চিন্তিত গলায় পল্লব বলল, হ্যাঁ। ব্যথা-ট্যথা করছে না তো?

তিতাস বলল, না না। আসলে শ্যাম্পু ঢুকে গেছিল। অনেকটা জলের ঝাপটা দিয়েছি। ও ঠিক হয়ে যাবে।

আচ্ছা। অমিয় আবার ফোন করেছিল।

কী বলল?

বলল, মারামারিটা না কি একটু রায়টের দিকে চলে গেছে। পুলিশ ক্যাম্প বসেছে। ওখানেই থাকতে হবে। ফিরতে ফিরতে দু’-তিনদিন লেগে যাবে।

সে কী! ও সেফ আছে তো?

বলল তো সিচুয়েশন আন্ডার কন্ট্রোল। চিন্তার কিছু নেই।

বেশ। ঠিক আছে। তুই রেডি তো? আমি পাঁচ মিনিটে রেডি হয়ে আসছি।

আসছি মানে? এখানেই তো রেডি হবি।

না। অমিয়র ঘরের আয়নাটা বড়।

জামাকাপড় আর ব্যাগ নিয়ে অমিয়র ঘরে ঢুকে গেল তিতাস। দরজাটা বন্ধ করে দিল। বেশ খানিকটা অবাক হল পল্লব। প্রথম কথা, বরাবর তিতাস তার সামনেই চেঞ্জ করে আর দ্বিতীয় কথা, তারা যে ঘরে আছে সে ঘরের আয়নাটা কোনও অংশেই অমিয়র ঘরের আয়নাটার থেকে ছোট না। তা হলে চেঞ্জ করার জন্য হঠাৎ আয়নার দোহাই কেন দিল তিতাস? মাথা নেড়ে ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলল পল্লব। মেয়েমানুষের কার্যকলাপ নিয়ে ভাবতে গেলে পেট গরম অবশ্যম্ভাবী। দেবতারাই যেখানে নারীর মনগহনের তল পায় না সেখানে কুতো মনুষ্যাঃ, মানুষ তো কোন ছার। জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতে গুনগুন করে গান ধরল পল্লব, ‘মন দিল না বঁধু/ মন নিল যে শুধু/ আমি কি নিয়ে থাকি...’ সে জানতেও পারল না, বন্ধ দরজার ওপারে তখন ঘৃণ্য এক চক্রান্তের জাল বুনে চলেছে তারই প্রিয়তমা তিতাস। না, এ তিতাস পল্লবের প্রিয়তমা নয়। এ তিতাস নির্মম চেতনাহীন এক পাষাণমাত্র। শাপগ্রস্ত। যে অভিশাপ সহস্রাধিক বছর ধরে গুমরে মরছে মহাসিন্ধুর ওপারে দুই নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এক প্রাচীন সভ্যতার উপকথায়।

মেয়েটা রিক্সায় যাচ্ছে আর সরিত সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে তার সামনে সামনে। মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে আড় চোখে মেয়েটাকে দেখছে। কী যেন চিন্তা করছে মেয়েটা। সরিত জানে, বদ্রিনাথের মৃত্যুর খবরে মেয়েটা ভয় পেয়েছে। ভয় পাওয়ারই কথা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে যা হবে তখন এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভয় পাবে মেয়েটা। কারও মৃত্যুসংবাদ শোনা আর চোখের সামনে খাঁড়ার মতো মৃত্যুকে ঝুলতে দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। সাইকেল চালাতে চালাতে সরিত ভাবছিল, ভয় পেলে মেয়েটার মুখটা কেমন দেখতে হবে।

যে মুহূর্তে মেয়েটা ‘চলুন’ বলেছিল, সেই মুহূর্তেই পরবর্তী কর্মপদ্ধতি ঠিক করে নিয়েছিল সরিত। প্রথমে মেয়েটাকে নিয়ে নিজের ঘরে যাবে। মেয়েটার সাথে কথা বলে জানবে বাচ্চা মৃত্যুর ব্যাপারে বদ্রিনাথ ওকে কতটা বলেছে। তবে বেশি জানুক আর কম জানুক, পরিণতি একই হবে। কথা হয়ে গেলে ঘুমের ওষুধ মেশানো চা খাইয়ে মেয়েটাকে বেহুঁশ করে ফেলবে। হাত, পা, মুখ বেঁধে ফেলে রাখবে রান্নাঘরে। রাত গভীর হলে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে মেয়েটার জ্ঞান ফেরাবে কিন্তু তখনই মারবে না মেয়েটাকে। মেয়েটার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। এরকম টানটান চাবুক চেহারার মেয়েই সরিতের পছন্দ। তার ওপর পাছাখানা মাখনের মতো। কথায় বলে, ‘শ বুর গলাকে বনতা হ্যায় এক গাঁড়।’ খাঁটি কথা। গাঁড় মেরে যে সুখ সে সুখ অন্য কিচ্ছু দিতে পারে না। আর গাঁড় মারার সময় বেশি ব্যথা লাগে বলে সবাই চেঁচায় বেশি, তার ওপর মুখ বাধা থাকলে তো কথাই নেই। সেই চিৎকারটা যেন সারা শরীরের কাঁপুনি দিয়ে বেরিয়ে আসে। ওতেই তো আরও বেশি উত্তেজিত হয় সরিত।

আসলে কিছু স্মৃতি মানুষের অবচেতনে থেকে যায় এবং মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায় আজীবন। নয়তো সে কেন এমন তীব্র পায়ুকামী হয়ে উঠবে? কেন আজও প্রতিটি রমণের সময় এক ঝলকের জন্য হলেও তার মনে পড়ে যাবে সেদিনের কথা?

সরিতের মা মাঝে মাঝেই বাবু বদলাত। প্রতিটি মানুষই উন্নত থেকে উন্নততর জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখে। সরিতের মা বেশ্যা বলে সে যে এমন স্বপ্ন দেখতে পারবে না, তার তো কোনও কথা নেই। সেই উন্নততর জীবনযাপনের লক্ষ্যেই এই বাবু বদল। বছর খানেক, বছর দেড়েক পরপর মা একটা করে নতুন বাবু ধরত আর তাদের ঘরে নতুন ফ্রিজ, নতুন টিভি আসত। তাদের দুই ভাইয়ের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা হত। বেড়ে যেত হাতখরচের টাকার পরিমাণ। পুরনো বাবুরা যে ঝামেলা করত না তা নয় কিন্তু মা ওসব সামলে নিত। বেশ্যাপট্টির দালালদের টাকা খাইয়ে আগে থেকেই হাতে রেখে দিত মা, ফলে কেউ বেশি ঝামেলা করলে তার বিচি গেলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করাই থাকত। তবে সবার ক্ষেত্রে যে একই নিয়ম খাটে না, মা এটা বুঝতে পারেনি। তাই সুখেন্দু জানা বলে একটা লোকের কাছে কেস খেয়ে গেল।

বেশ্যাপট্টিতে যে ধরনের চুতখোরেরা আসে সুখেন্দু জানা একেবারেই তাদের মতো ছিল না। হাবেভাবে সে ছিল একেবারে নিপাট ভদ্রলোক। খুব সাধারণ ছিটের কাপড়ের জামা টেরিলিনের প্যান্টের মধ্যে বেল্ট দিয়ে গুঁজে পরত। পায়ে বাটার চটি। সব সময় পায়ে হেঁটে আসত। মায়ের কাছে সরিত শুনেছিল, এই সুখেন্দু জানার না কি আটটা কোল্ড স্টোরেজ, তিনটে পেট্রল পাম্প আর বত্রিশটা ট্রাক, যেগুলো অন্ধ্র থেকে মাছ নিয়ে আসে নিয়মিত। শুনে কিছুক্ষণ হাঁ হয়ে থেকেছিল সরিত। তার মন বলে উঠেছিল, বাইরের এই ভদ্রলোকের মতো চেহারাটা আসলে সুখেন্দু জানার ক্যামোফ্লাজ। সে কথা অবশ্য সরিত মাকে বলেনি।

প্রথম প্রথম সুখেন্দু জানাকে নিয়ে মা খুব খুশি ছিল। বাড়ি বদলে তারা একটা নতুন বাড়িতে উঠেছিল। এসি বসানো হয়েছিল তিনটে ঘরেই। সুখেন্দু জানা মাসের মধ্যে দু’বার কি তিনবার আসত, রাতটুকু থেকে পরদিন সকালে কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিয়ে ফিরে যেত। দিব্যি চলছিল, কিন্তু ওই যে মায়ের ছেনাল স্বভাব। এই শান্তির জীবনে শরীরে ঠিক হিট আসছিল না। বাবু আর বাবুর বন্ধুরা আসবে, মদের ফোয়ারা ছুটবে, খিস্তাখিস্তি হবে, ল্যাংটো নাচ হবে, নাচের সময় বাবুরা ঠাটিয়ে ঠাটিয়ে পোঁদে চড় মারবে, পোঁদ যত লাল হবে তত টাকা ফেলবে আর পরদিন সকাল হতেই নেশায় চুর হয়ে লং ড্রাইভে চলে যাবে মন্দারমণি। তবে না একটা কালারফুল লাইফ! যে ভাতার না চাইতেই টাকা দেয়, যার সাথে নখরা করে সুখ নেই, তার সাথে বেশি দিন থাকা যায় না। তাই বছর না ঘুরতেই সুখেন্দু জানাকে লুকিয়ে মা আশনাই শুরু করল অন্য একটা বেওরা মালের সাথে। সে মাল আবার বেআইনি অস্ত্র বেচত, ফলে মা ভেবেছিল, সুখেন্দু জানা জানতে পেরে ঝাম দিলে মেশিন দেখিয়ে চমকে দেবে।

কিন্তু সুখেন্দু জানা যেদিন এল সেদিন মাকে বাঁচাতে না এল দালালরা, না এল মায়ের বেওরা বয়ফ্রেন্ড। সরিতের স্পষ্ট মনে আছে, সে দিনটা ছিল শনিবার। সরিত তদ্দিনে ইশকুলের পাট চুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তদ্দিনে আবার বই পড়ার নেশাটা ধরে গেছে। তাই ঘুম থেকে উঠে পাড়ার দোকানে কচুরি খেয়ে সরিত শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়ছিল। তড়িৎ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিল আর মা যথারীতি ঘুমোচ্ছিল পাশের ঘরে। সাড়ে আটটা কি ন’টা হবে বেজে উঠেছিল কলিং বেল। তড়িতকে এক লাথি মেরে সরিত বলেছিল, খোল।

একটা দোতলা বাড়ির ওপরের তলায় থাকত তারা। তড়িৎ নীচে নেমে গেছিল দরজা খুলতে কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তির বেগে ওপরে উঠে এসেছিল। দৌড়ে ঢুকে পড়েছিল মায়ের ঘরে। ব্যাপারটা কী হল বুঝতে না বুঝতেই সরিত দেখল, দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে সুখেন্দু জানা। হাসিমুখে সে বলল, কেমন আছ সরিত?

সরিত বুঝতে পারছিল না, সুখেন্দু জানাকে দেখে তড়িৎ এত ভয় পেয়ে গেল কেন? বুঝল একটু পর, যখন চারটে দানবের মতো লোক মায়ের বেওরা বয়ফ্রেন্ডটাকে নেংটি ইঁদুরের মতো আছড়ে ফেলল ঘরের মেঝেতে। ততক্ষণে মা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে আর অবস্থা আন্দাজ করতে পেরে ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকে খাটের ওপর বসেছিল সুখেন্দু জানা। মা যেসব দালালদের পয়সা খাওয়াত তাদেরই দু’জন চা এনে দিয়েছিল তাকে। সবটাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল মা কিন্তু তার আর কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। মা ততক্ষণে বুঝতে পেরে গেছিল, সুখেন্দু জানাকে সে হালকা ভাবে নিয়েছিল। তার কপালে দুঃখ আছে। কিন্তু দুঃখটা যে অমন অভিনব ভাবে আসবে তা মা কেন, সরিতও আঁচ করতে পারেনি।

চা খেয়ে গলা ঝেড়ে সুখেন্দু বলেছিল, সবিতা, তুই আমাকে ঠকিয়েছিস। তোকে আমি সব দিয়েছিলাম কিন্তু তুই জাত খানকি। নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছিস। এই ঘর থেকে তোকে তো আবার পথে নামিয়ে দেবই কিন্তু তার আগে অন্য একটা শাস্তি দেব।

এতক্ষণে মা ছুটে এসে সুখেন্দু জানার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেছিল। মায়ের কান্নায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে সুখেন্দু জানা মায়ের বেওরা বয়ফ্রেন্ডটাকে বলেছিল, এই ওঠ। উঠে ওকে ধর।

কাঁদতে কাঁদতেই ছিটকে উঠে দাঁড়িয়েছিল মা, ধর মানে? কী করবে তুমি?

মাকে বেশি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মায়ের হাত দুটো পেছন দিকে পেঁচিয়ে ধরেছিল মায়ের সেই বেওরা বয়ফ্রেন্ড। ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠেছিল মা। সুখেন্দু জানার ইশারায় মায়ের মুখে রুমাল ভরে মুখটা বেঁধে দিয়েছিল একটা দানবাকৃতি লোক। মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে সুখেন্দু জানা বলেছিল, মানুষের সবচেয়ে বড় শাস্তি কী জানিস? অপমান। তোকে আজ আমি তোর দুই ছেলের সামনে অপমান করব। আর মানুষকে সবচেয়ে বেশি অপমান করা যায় কীভাবে জানিস? জোর করে পোঁদ মেরে।

এই বলে সরিত আর তড়িতের সামনেই মাকে ধর্ষণ করেছিল সুখেন্দু জানা। তড়িৎ ভয়ে গুটিয়ে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল ঘরের এক কোণে বসে কিন্তু সরিত পুরোটা দেখেছিল। এক মুহূর্তের জন্যেও সে চোখ সরায়নি। সে দেখছিল, মায়ের চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। চিৎকার করতে পারছে না বলে শরীরটা, বিশেষ করে পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। মিথ্যে কথা বলবে না, সরিতের ভালো লেগেছিল শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতিটা। সুখেন্দু জানার কথাটা তার মাথার মধ্যে গেঁথে গেছিল, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় শাস্তি কি জানিস? অপমান। আর মানুষকে সবচেয়ে বেশি অপমান করা যায় কীভাবে জানিস? জোর করে পোঁদ মেরে।’

পৃথিবীটা গোল। সেই ঘটনার আট বছর পরে সুখেন্দু জানাকে খুনের সুপারি পেয়েছিল সরিত। খুন করার আগে আচ্ছা করে সুখেন্দু জানার পোঁদটা মেরে দিয়েছিল সে। সরিত মাকে ঘেন্না করত ঠিকই কিন্তু ভালোও তো বাসত।

তা আজ এই মেয়েটাকেও অপমান করবে সরিত। তার পর বডিটা টুকরো টুকরো করে কেটে চুনের বস্তায় ভরে পেছনের পানা পুকুরে ফেলে দেবে। কত্তার সাধনার পথে যেই বাধা হতে আসবে তাকে এই দুনিয়ার মায়া কাটাতে হবে। এখনও ছ’টা বাচ্চা মারা বাকি। কত্তা একবার সম্পূর্ণ শক্তি পেয়ে গেলে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না সরিতকে।

রিক্সাওয়ালা হাঁক দিল, দাদা কোনদিকে?

সম্বিত ফিরল সরিতের। রিক্সাওয়ালাকে বাড়িটা না চেনানোই ভালো। সে বলল, এখানেই রেখে দাও। ম্যাডাম, অল্প একটু রাস্তা। হাঁটতে অসুবিধে নেই তো?

না। সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে রিক্সা থেকে নেমে এল রোশনি। ভাড়া মিটিয়ে পা বাড়াল ছেলেটার সাথে। দুটো ছোট গলি পেরিয়েই একটা বাঁশবাগানের সামনে এসে পড়ল তারা। জায়গাটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। লোকালয়ের এত কাছে যে এমন ঘন একটা বাঁশঝাড় থাকতে পারে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ছেলেটা বলল, এদিকটা বেশ গাছপালা আছে। ওপাশে একটা আমবাগানও আছে। ওই বাগানের মধ্যেই আমাদের ঘর। এবার তো আমের ফলন ভালো হয়েছে। ঘরের চালে আম পড়ছে। চলুন আপনাকে খাওয়াব।

রোশনি বলল, আম খাওয়ার সময় নেই। আমায় ফিরতে হবে। বাই দ্য ওয়ে, আপনার নামটাই তো জানা হয়নি।

ছেলেটা হাসল, আমার নাম গেনু।

একটু অবাক হল রোশনি। নামটা ভারী অদ্ভুত! সে জিগ্যেস করল, এটাই আপনার নাম?

ছেলেটা বলল, হ্যাঁ। এই নামেই সবাই চেনে। আপনার কী নাম ম্যাডাম?

রোশনি।

বাহ! সুন্দর নাম। আসুন, এই দিকে।

ছেলেটার পিছুপিছু একটা ছায়াঘন আমবাগানের মধ্যে ঢুকে পড়ল রোশনি। দিনের বেলাতেও জায়গাটা বেশ অন্ধকার হয়ে আছে। শুকনো পাতায় পায়ের চাপে খড়মড় শব্দ উঠছে। কাছেই কোথাও একটা তক্ষক ডেকে উঠল। টরেটক্কার মতো শব্দ কিন্তু রোশনির মনে হল, তক্ষকটা যেন বলছে, ‘যা রে, যা রে, যা রে, যা রে। পালা, পালা, পালা, পালা।’ অবশ্যই মনের ভুল তবু যেন একটু শিউরে উঠল রোশনি। সে বলে উঠল, এখানে তো কোনও লোকজন নেই। যা বলার বলে নিন না।

ছেলেটা যেন রোশনির মনের কথা বুঝতে পারল। বলল, লোকজন নেই দেখে কি ঘাবড়াচ্ছেন ম্যাডাম? কোনও ভয় নেই। এদিকটায় জঙ্গল কিন্তু বাড়ির উল্টোপাশ আবার খোলামেলা। রাস্তা দিয়ে সব সময় ভ্যান, রিক্সা সব যায়। এদিক দিয়ে এলে শর্টকাট হয় তাই এলাম। গিয়ে একটু জিরিয়ে নিন। সব বলছি। বলব বলেই তো নিয়ে এলাম আপনাকে।

একটা মজা পানাপুকুর পেরিয়ে বাড়িটার কাছে গিয়ে তবে রোশনির অস্বস্তিটা কমল। সামনের দিকটায় সত্যি মানুষ চলাচলের রাস্তা আছে। মোটর ভ্যান, রিক্সা চলছে। ঘরে ঢুকে বিছানাটা ঝেড়ে দিয়ে ছেলেটা বলল, মায়ের শরীরটা ভালো না। মামার কাছে আছে। আমি এখন একাই আছি। ম্যাডাম বসুন। চা বানিয়ে আনি।

রোশনির আপত্তিতে কর্ণপাত করল না ছেলেটা। ঢুকে গেল লাগোয়া রান্নাঘরে।

রান্নাঘরে ঢুকে নিঃশব্দে প্রাণ খুলে হাসল সরিত। নামেই সাংবাদিক কিন্তু আসলে ভ্যাবলা। এত সহজে যে শিকার ফাঁদে পা দেবে সেটা সরিত আশা করেনি। চায়ের জল ফুটতেই তাক থেকে ঘুমের ওষুধের শিশিটা নামিয়ে জলে ছ’টা ট্যাবলেট ফেলে দিল সে। বেশি করে চিনি দিয়ে দিল। ওষুধের তিতকুটে ভাবটা চাপা পড়বে। চা খাওয়ার পর আধ ঘণ্টা কথায় কথায় ব্যস্ত রাখতে হবে মেয়েটাকে। তা হলেই যথেষ্ট। প্লেটের ওপর চায়ের কাপ বসিয়ে ঘরে এল সরিত। মেয়েটা মোবাইলে কী যেন দেখছিল। সরিত ডাকল, ম্যাডাম চা।

ধন্যবাদ। হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিল মেয়েটা। তার পর সেটা টেবিলে রেখে বলল, এবার বলুন। কী বলবেন বলছিলেন।

একটা মোড়া টেনে সামনে বসল সরিত, চা-টা খেয়ে নিন না। ঠান্ডা হয়ে যাবে তো।

আমার খুব গরম কিছু খেতে অসুবিধে হয়। আপনি বলুন।

চা খাওয়ার জন্য বেশি তাড়া দেওয়া কাজের কথা হবে না। মেয়েটা সন্দেহ করতে পারে। সরিত বলল, বলছি। তার আগে বলুন, বদ্রিদা আপনাকে কতটা বলেছে?

রোশনি বলল, উনি আমায় তেমন কিছুই বলেননি। শুধু বলেছিলেন, নতুন একটা ভাইরাসের আক্রমণে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে আর গভর্নমেন্ট সেই খবর বাইরে আসতে দিচ্ছে না। বাকি কথা দেখা হলে বলবেন বলেছিলেন।

মনে মনে হাসল সরিত, বলে না কি ভাইরাস! তার পর বলল, হুম। তার মানে আপনি তেমন কিছুই জানেন না। ম্যাডাম, এ ঘটনার শেকড় অনেক দূর অবধি ছড়িয়ে আছে। বদ্রিদা যখন হুগলিতে ছিল তখন দুটো বাচ্চা মারা যায়। কিন্তু বদ্রিদা তখনও ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারেনি। তবে ম্যাডাম, শহরের বুকে এ ঘটনা কিন্তু শুরু হয়েছিল কলকাতায়।

চমকে উঠল রোশনি, কলকাতায়?

ফের মনে মনে হাসল সরিত। একে সবটা খুলে বলে দিলেও কিছু এসে যায় না। কারণ একটু পরেই মেয়েটা আর গোটা থাকবে না। ছোট ছোট টুকরো হয়ে ঢুকে পড়বে চুনের বস্তায়। সে বলল, হ্যাঁ। কলকাতায় বাচ্চা মৃত্যু নিয়ে হেবি ঝামেলা হয়েছিল। তিতাস সেন বলে একটা ডাক্তার রিজাইনও করেছিল। বদ্রিদা বলেছিল আমায়।

মাই গড! তার পর? উত্তেজনায় চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে তুলে নিল রোশনি। চুমুক দিতে যাবে তখনই জানলা টপকে লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল একটা সাদা রঙের বেড়াল। ডেকে উঠল, ম্যাও। কিন্তু তারপর যেটা হল সেটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না রোশনি। সে দেখল, বেড়ালটার আওয়াজ শুনেই বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে তাকাল ছেলেটা আর কিছু বোঝার আগেই প্রচণ্ড এক ক্ষিপ্র লাথিতে বেড়ালটাকে ছিটকে ফেলে দিল। বেড়ালটা গিয়ে আছড়ে পড়ল ঘরের নিরেট দেওয়ালে। উঠেই প্রাণভয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। ঠিক দু’ পা ছুটেই কাতর একটা আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে পড়ল মেঝের ওপর। আর নড়ল না। একগাল হেসে খুব পরিতৃপ্ত গলায় ছেলেটা বলল, সেদিন আমাকে আঁচড়ে দিয়েছিল।

রোশনির মাথা কাজ করছিল না। হাত-পা কাঁপছিল থরথর করে। তার নিজের একটা পোষা বেড়াল ছিল। এরকমই সাদা গায়ের রং। কান দুটো পাটকিলে। রোশনি তাকে মজন্তালি বলে ডাকত। মজন্তালি আর রোশনি রোজ এক টেবিলে ডিনার করত, এক বিছানায় শুত। মজন্তালির শরীর খারাপ হলে রোশনি অফিস ছুটি নিত। গত বছর মজন্তালি চলে গিয়েছে না ফেরার দেশে। আজও তাকে বড্ড মিস করে রোশনি। রোশনির মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তার মজন্তালিকেই লাথি মেরেছে। চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে রোশনি দ্রুত ছুটে গেল নেতিয়ে পড়ে থাকা বেড়ালটার কাছে। মাটিতে বসে পড়েই হাতে তুলে নিল মাথাটা এবং বুঝতে পারল, বেড়ালটার দেহে আর প্রাণ নেই। জিভটা অর্ধেক বাইরে বেরিয়ে আছে। কান আর মুখের কাছে জমে আছে রক্ত। অজান্তেই চোখ দুটো ভিজে উঠল রোশনির। তারপর সেই জল ভরা চোখে সে যখন ফিরে তাকাল সরিতও যেন এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠল। ত্রু«দ্ধ বাঘিনীর মতো দেখাচ্ছে রোশনিকে। উঠে এসে সরিতের মুখোমুখি দাঁড়াল সে। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল, আপনি কি জানোয়ার? একটা অবলা প্রাণীকে এভাবে মেরে ফেললেন? আপনি জানেন এটা ক্রিমিনাল অফেন্স? আই ডোন্ট নিড ইয়োর হেল্প।

দ্রুত হাতে নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল রোশনি। খুশি হল সরিত, বেশ তেজ আছে তো মেয়েটার। তার চোখে চোখ রেখে কথা বলা সহজ নয়। ভালোই হবে, যত ছটফটাবে, গাঁড় মেরে তত সুখ। কিন্তু মেয়েটা তো চলে যাওয়ার উপক্রম করছে।

সবে দরজার চৌকাঠে পা রেখেছে রোশনি, সরিত বলে উঠল, আরে! রাগ করছেন কেন ম্যাডাম? ঠিক আছে আমার হেল্প না নিলেন, চা-টুকু খেয়ে যান।

ঘুরে তাকাল রোশনি। মধ্যমাটা সরিতের নাকের সামনে তুলে বলল, ফাক ইউ।

মাথায় আগুন জ্বলে উঠল সরিতের। খানকি মাগির এত তেজ! খপ করে সে হাত চেপে ধরল রোশনির আর তার পরেই অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা ঘটল। এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রোশনি অন্য হাতে সপাটে চড়িয়ে দিল সরিতের গালে। সরিতের ফর্সা গালে রোশনির পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেল।

বিস্ময়ের অভিঘাত কাটিয়ে দু’ আঙুলের ফাঁকে ব্লেড ধরে সরিত যতক্ষণে বাইরে এল ততক্ষণে সামনের দিক দিয়ে বেরিয়ে রোশনি একটা চলতি ভটভটি ভ্যানে উঠে বসেছে। বিচ্ছিরি কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভ্যানটা এগিয়ে চলেছে। সেই ধোঁয়া ঢুকে যাচ্ছে সরিতের নাকে, মুখে। অনেকটা ডিজেলপোড়া ধোঁয়া গিলে নিয়ে সরিত একটা ভয়ঙ্কর প্রতিজ্ঞা করে বসল।

ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিল অমিয়। তার মনে হচ্ছিল হাঁটু দুটো খুলে পড়ে যাবে। শারীরিক ক্লান্তির চেয়ে মানসিক ক্লান্তি অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। গতকাল রাত থেকে তার সবটা এলোমেলো হয়ে গেছে। যেন একটা ঘূর্ণিঝড় এসে তছনছ করে দিয়েছে সাজানো বাগান। গতকাল যা হয়েছে অমিয় মনেপ্রাণে সেটাকে অস্বীকার করতে চাইছে কিন্তু অস্বীকার করতে চাইলেই কি আর তা হয়? অমিয়র সারা শরীরে জোঁকের মতো লেপটে থাকা দাঁতের দাগ প্রতি মুহূর্তে তাকে জানান দিচ্ছে, সে অন্যায় করেছে। ভয়ানক এক অন্যায়। একই সঙ্গে সে মিতুল এবং পল্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যে বিশ্বাসঘাতকতার কোনও ক্ষমা হয় না। পল্লবের সামনে মুখ দেখাতে পারবে না বলেই আজ সে ভোর থাকতে থাকতে বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। পল্লবকে ফোনে জানিয়েছিল, ব্যারাকপুর রোডে ঝামেলা হচ্ছে। পুলিশ ক্যাম্প বসেছে। সেখানেই দু’তিনদিন থাকতে হবে। মিতুলকে যদিও সে অন্য কথা বলেছে। বলেছে, এক মাসি অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সেখানেই যাচ্ছে। মিতুলকে অন্য কথা বলতে হয়েছে কারণ মিতুলের বাবা দীপক পাল অমিয়র অধস্তন। মিতুল চাইলে সহজেই তার বাবার থেকে পুলিশি ঝামেলার সত্যতা যাচাই করতে পারবে। সে রিস্ক অমিয় নেয়নি। মিতুল বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল। ফোন ধরেনি অমিয়। বারবার সে মিতুলকে মিথ্যে বলতে পারবে না। মেসেজ করে দিয়েছিল, ফ্রি হলে ফোন করব। চিন্তা কোরো না। ফিরে দেখা করব।

অমিয় আজ অফিসেও যায়নি। দীপক পালকে জানিয়ে দিয়েছে, মাসি অসুস্থ। আসলে এই দু’-তিনদিন সময়টা নেওয়া খুব দরকার ছিল। যত দিন না তার সারা গা থেকে তিতাসের দাঁতের দাগ মুছে যাচ্ছে ততদিন সে কোন মুখে লোকজনের, বিশেষ করে মিতুলের সামনে যাবে? মিতুল যদি জিগ্যেস করে, এগুলো কিসের দাগ? কী উত্তর দেবে সে?

কমবয়সে কলেজে পড়তে এই লাভবাইট বা হিকি নিয়ে একটা রসিকতা প্রচলিত ছিল। একটি মেয়ে একদিন ঘাড়-গলা ভর্তি হিকি নিয়ে বাড়ি ফিরল। মা চমকে উঠলেন মেয়ের গলার কালশিটে দেখে। চিন্তিত হয়ে বললেন, এগুলো কিসের দাগ? মেয়ে কী বলবে আগেই বন্ধুদের থেকে জেনে নিয়েছিল। স্মার্টলি বলল, পোকায় চেটে দিয়েছে। শুনে মা একটু গম্ভীর থেকে বললেন, তাই হবে। আমাকেও বিয়ের পর খুব পোকায় চাটত। পোকাটাকে অবিকল তোর বাবার মতো দেখতে ছিল। তা তোর এই পোকাটিকে কেমন দেখতে?

মিতুল এই গল্পের মায়ের মতো স্মার্ট নয়। আর হলেও অমিয় যদি বলে পোকায় চেটে দিয়েছে, সে হয়তো অবিশ্বাস করবে না। কিন্তু এত বড় মিথ্যেটা সে মিতুলকে কীভাবে বলবে? সে তো কিছুতেই বলতে পারবে না, এই পোকার বাস তার মনের গোপনে। বহু বছর ধরে সে এই পোকাটাকে লালন করছিল। গতকাল ছিদ্র পাওয়া মাত্র এই কীট বাইরে বেরিয়ে এসেছে এবং তাকে দংশন করেছে। দাগ হয়তো মিলিয়ে যাবে সময়ের নিয়মে কিন্তু এই কদর্য ঘুণপোকাটি অমিয়র অন্তরে যে গরল ঢেলে দিল তার জ্বালা কি কোনওদিন জুড়োবে? মনে হয় না।

এসব ভাবতে ভাবতেই নিজের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল অমিয়। চাবি ঘুরিয়ে খুলে ফেলল দরজা। এ বাড়ির দুটো চাবি। একটা অমিয় সবসময় নিজের কাছে রাখে। আর একটা থাকে ঘরে। পল্লবদের সেই চাবিটা লাগিয়েই সিকিউরিটির কাছে দিয়ে যাওয়ার কথা। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সিকিউরিটি কিছু বলবে বলে ছুটে এসেছিল। সম্ভবত চাবিটাই ফেরত দিতে এসেছিল। কিন্তু অমিয়র আজ কথা বলার মুড নেই। তাই সে হাত নেড়ে সিকিউরিটিকে নিবৃত্ত করেছে। চাবিটা পরে ফেরত নিলেও চলবে। শরীর যেন আর চলছে না। একেবারে স্নান করে শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকবে। আসার পথে দুটো ঘুমের ওষুধ কিনে এনেছে। সে দুটো খেয়ে শুয়ে পড়বে। এখন তার পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। একমাত্র নিবিড় ঘুমই পারে দুঃস্বপ্নকে ভুলিয়ে দিতে। লিভিং রুমে দাঁড়িয়েই জামাকাপড় খুলে ফেলল অমিয়। তার পর ঢুকে গেল বাথরুমে। স্নায়ুগুলি দুর্বল থাকায় সে খেয়াল করল না, ঘরের বাতাসে একটা মৃদু সুগন্ধ ভাসছে।

স্নান সেরে তোয়ালেটা কোমরে জড়িয়ে শোবার ঘরে ঢুকে পড়ল অমিয়। ঘর অন্ধকার। অভ্যস্ত আঙুল লাইটের সুইচে চাপ দিল। আলো জ্বলে উঠল আর সেই আলোতে অমিয় যা দেখল তাতে তার অন্তরাত্মা অবধি শিউরে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য অমিয়র মনে হল সে যা দেখছে চোখের ভুল। হ্যালুসিনেশন। কিন্তু সে ভুল ভাঙতেই অমিয় ভয় পেল। অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে তার মাথা ঘুরতে লাগল। গা গুলিয়ে উঠল। এমন শরীর অসাড় করে দেওয়া ভয় জীবনে সে কোনওদিন পায়নি। সে দেখল, খাটে বসে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে মিতুল।

১০

জীবন বড় সহজ ব্যাপার নয়। তার অনেকরকম বাধ্যবাধকতা থাকে। প্রতিদিন অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙার পরে অফিস যেতে হবে ভাবলেই মানুষের মনে হয়, আহা রে! যদি সিকিমে পাহাড়ের কোলে আমার একটা হোমস্টে থাকত! হিম হিম ভোরবেলা উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখতে দেখতে গরম চায়ে চুমুক দেওয়া যেত! প্রতিদিনের এই অসহ্য অফিস, অফিস পলিটিক্স, বসের চোখরাঙানিকে তুড়ি মেরে পাহাড়ি ঝরনার জলে স্নান করা যেত অবিরাম... কিন্তু মনে হওয়া দিয়ে জীবন চলে না। মাঝখানে ঈশ্বরের অবতারের মতো নানা রূপে এসে হাজির হয় বাধ্যবাধকতা। মনে পড়ে যায়, দু’দিন পরে ইএমআই দিতে হবে। বসার ঘরের সোফাটা ভেঙে গেছে। কাঠের মিস্ত্রি বলেছে, ও সারানো যাবে না। নতুন নিয়ে নিন। মায়ের অ্যাজমাটা আবার বেড়েছে। বউ বলছে, শীতের ছুটিতে কেরালা যাবে। কিংবা গত তিন মাস প্রেমিকের চাকরি নেই। প্রতি মাসে তাকে হাতখরচ দিতে হচ্ছে। আগে যখন চাকরি ছিল তখন ছ’ টাকার ফ্লেক খেত। আজকাল সতেরো টাকার গোল্ডফ্লেক কিং সাইজ খাচ্ছে। অগত্যা স্নান সেরে অফিস যেতে হয়।

রোশনিও ঠিক এরকমই একটা বাধ্যবাধকতার জালে জড়িয়ে পড়েছে। গেনু বলে ছেলেটার কাছ থেকে শিশুমৃত্যু সম্পর্কে যা তথ্য পেয়েছে সেগুলোর কোনওটাই তার কাজে লাগানোর ইচ্ছে নেই। কারণ ওই ছেলেটার প্রতি এক তীব্র ঘৃণা বোধ করছে সে। এমন ইতর প্রকৃতির মানুষ অদ্যাবধি দেখেনি রোশনি। তার অফিসের বসও বুঝি ইতরতায় এর কাছে হেরে যাবে। এ কথাটা মাথায় আসতেই নিজেকে সংশোধন করল রোশনি। তুলনাটা ঠিক হল না। তার অফিসের বস একটা আধবুড়ো, অপদার্থ, অবদমিত কামসর্বস্ব মানুষ। কিন্তু আর যাই হোক লোকটা খুনি নয়। খুন করার জন্য এক অদ্ভুত উন্নাসিকতার অধিকারী হতে হয়। এই ‘মাদার নেচার’ তার স্তন্য দিয়ে তিলে তিলে একটা প্রাণ গড়ে তোলে। যেহেতু সেই অমৃতসুধাবিন্দু এই দুনিয়ার প্রতিটি প্রাণের আকর তাই প্রাণে প্রাণে এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগ থাকে। সেই অদৃশ্য সংযোগের টানেই দলের একটি বাইসন চিতার কবলে পড়লে বাকিরা তাকে বাঁচাতে ছুটে যায়। প্রবল বর্ষণে ভিজতে থাকা পথকুকুরকে পরম মমতায় ঘরে তুলে আনে মানুষ। বিপদের দিনে অচেনা মানুষও অন্যের পাশে দাঁড়ায় নির্দ্বিধায়। এই পৃথিবীতে পারস্পরিক সহাবস্থানই স্বাভাবিক। সেখানে ওই অমোঘ সংযোগ ছিন্ন করে প্রাণের বিনাশ করার জন্য অন্য কোনও এক শক্তির প্রয়োজন। সে শক্তি সকলের থাকে না।

শুরু থেকেই ছেলেটার চাহনির মধ্যে একটা অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ্য করেছিল রোশনি। কেমন যেন একটা নিরুত্তাপ চাহনি। সে চাহনির দিকে তাকিয়ে বেশিক্ষণ কথা বলা যায় না। মনে হয় যেন একটা মৃতদেহ কথা বলছে। সে চাহনিতে লাশকাটা ঘরের ফরমালিনের গন্ধ। কিন্তু খবরটা পাওয়ার উত্তেজনায় রোশনি বিষয়টাকে পাত্তা দেয়নি। এখন তার মনে হচ্ছে ছেলেটার সাথে না গেলেই ভালো হত। তা হলে চোখের সামনে বেড়ালটাকে ওভাবে মরতে দেখতে হত না। ছেলেটার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো ব্যবহার করতে বারবার অনীহা হচ্ছিল রোশনির। মৃত বেড়ালটার মুখ মনে পড়লেই রাগে উষ্ণ হয়ে উঠছিল তার রক্তস্রোত। মনে হচ্ছিল, ছেলেটাকে আরও কয়েকটা থাপ্পড় মারলে বুঝি বা মনের একটু শান্তি হত। কিন্তু ওই যে বাধ্যবাধকতা। এই মুহূর্তে রোশনি চাকরিটা ছাড়তে পারবে না। তাছাড়া নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদও তো রয়েছে। তাই কলকাতায় ফিরেই সে ছুটে গেছিল অফিসের লাইব্রেরিতে।

অত্যন্ত গোছানো রোশনিদের অফিসের এই লাইব্রেরিটা। লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোকের কোনও তুলনা হয় না। যেদিন থেকে এই সংবাদপত্র প্রকাশিত শুরু করেছে সেদিন থেকে আজ অবধি রোজকার কাগজ জমানো আছে কম্পিউটারের মেমোরিতে। কয়েকটা ক্লিকেই অভীষ্ট সংবাদটি পড়ে ফেলা যায়। আট মাস আগে যখন জুনিয়র ডাক্তাররা ধর্মঘট ডেকেছিল সেই সময়টার কথা রোশনির মনে আছে। এ বিষয়ে কয়েকটা সম্পাদকীয় এডিট করতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু সেসময় তিতাস সেন নামটা তার নজরে আসেনি। আজ পুরনো খবরগুলো খুঁটিয়ে পড়তে গিয়ে অবাক হল সে। তাদের কাগজেই তিতাস সেনের ছবি দিয়ে একটা খবর ছাপা হয়েছিল। খবরের হেডিং ‘শিশুমৃত্যুর দায় কাঁধে নিয়ে পদত্যাগ ডাক্তারের।’

এত জরুরি খবরটা সে খেয়ালই করেনি! অবশ্য খুব ছোট করে ছাপা হয়েছিল। খুব বেশি তথ্যও দেওয়া নেই। তবু সম্পাদকীয় যখন এডিট করতে হয়েছিল তখন এ-খবরটা মিস করা উচিত হয়নি।

লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে নিজের ডেস্কে এসে কম্পিউটার অন করেছিল রোশনি। দ্রুত হাতে খুলে ফেলেছিল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন ডাক্তারদের লিস্ট। সেখান থেকে তিতাস সেনের ব্যাপারে ডিটেইলস বার করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।

তিতাস সেন। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন ছাত্রী। এমবিবিএস-এর পরে এসএসকেএম থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। অত্যন্ত মেধাবী। কোনও বিদেশি ডিগ্রি নেই অথচ বিদেশি সব তাবড় তাবড় জার্নালে একের পর এক লেখা ছাপা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে কমবয়সি সফল শল্যচিকিৎসক হিসেবে বিপুল পরিচিতি রয়েছে। বিদেশ এবং দেশের প্রথম সারির প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে ডাক এলেও সে ডাকে সাড়া দেয়নি তিতাস। সরকারি হাসপাতালেই থাকতে চেয়েছে বরাবর। কিছুদিন বারাসাত জেলা হাসপাতালে ছিল। সেখান থেকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ট্রান্সফার হয়। সেখানেই এই পদত্যাগ।

একটু খটকা লেগেছিল রোশনির। মেয়েটা বিদেশি প্রাইভেট হাসপাতালের লুক্রেটিভ অফার ফিরিয়ে দিয়েছে। সাধারণ জনতার সেবা করতে চায় বলে সরকারি হাসপাতালে থেকে গেছে। সেখানে রোগীর আত্মীয়রা হাসপাতাল ভাঙচুর করেছে, জুনিয়র ডাক্তাররা আহত হয়েছে বলে সে চাকরি ছেড়ে দেবে? হ্যাঁ, ঘটনার সূত্রপাত একটি বাচ্চাছেলের মৃত্যু থেকেই কিন্তু এমন ঘটনা তো আমাদের রাজ্যে হামেশাই হয়। আজকাল শপথ নেওয়ার সময় ডাক্তারদের হাতে তুলো আর ডেটলের বোতল ধরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের বলে দেওয়া হয়, যে কোনও মুহূর্তে তারা প্যাঁদানি খেতে পারে। রোগীর আত্মীয়দের সম্পূর্ণ অধিকার আছে তাদের ওপর হাতের সুখ করার। এটাও চাকরির অঙ্গ।

রোশনি ঠিক করে ফেলেছিল, তিতাস সেনের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলবে। শিশুমৃত্যুর এই রহস্য উদ্ঘাটন করতে গেলে তাকে তিতাসের সাহায্য নিতেই হবে। তিতাসের মতো ডাক্তারের ফোন নম্বর বা ঠিকানা জোগাড় করা কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু ইচ্ছে করেই ফোন করেনি রোশনি। ফোন করলে অনেকেই ধানাইপানাই করে। তার চেয়ে ফিজিক্যালি চলে যাওয়া অনেক ভালো। অতএব মাস্টারদা সূর্য সেন মেট্রো স্টেশনে নেমে রোশনি রিক্সাওয়ালাকে জিগ্যেস করেছিল, দাদা সুবোধ পার্ক চেনেন?

বিরস মুখে রিক্সাওয়ালা বলেছিল, সুবোধ পার্ক কেন? সবই চিনি। যাবেন কোথায়?

ডাক্তার তিতাস সেন।

কথা শেষ করতে দেয়নি রিক্সাওয়ালা। এক গাল হেসে বলেছিল, তিতাস দিদির বাড়ি যাবেন? আসুন আসুন।

তিতাসদের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়াতেই মনটা ভালো হয়ে গেল রোশনির। যে বাড়ির দরজাটাই এমন সুন্দর সে বাড়ির ভেতরটা না জানি আরও কত সুন্দর হবে! অন্য ফ্ল্যাটের মতো এখানে দরজার পাশের দেওয়ালে কোনও প্রথাগত কলিং বেল নেই। তার বদলে ঝোলানো রয়েছে ভারী সুন্দর দেখতে একটা লোহার ঘণ্টা। দরজাটায় গ্রাফিটি করা। তার মাঝখানে কাঠের নেমপ্লেটে লেখা ‘পাগলাঝোরার বাসা’। থমকে গেল রোশনি। কে এই পাগলাঝোরা? তিতাসের ডাকনাম? কিন্তু কেউ কি নিজের ডাকনাম তাও আবার এমন কাব্যি করে নেমপ্লেট বানায়? উঁহু। বানায় না। ওই যে গান আছে না, ‘যার নাম তার মুখে ভালো লাগে না।’ তা হলে কে বানিয়েছে এই নেমপ্লেট? যে তিতাসকে অমন সুন্দর ডাকনাম দিয়েছে, সে? কে সে? এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ঘণ্টাটা নাড়াল রোশনি। ঢং ঢং করে একটা গম্ভীর শব্দ হল। কয়েক মুহূর্ত পরেই দরজাটা খুলে মুখ বাড়াল বছর তিরিশ-বত্রিশের একটা ছেলে। মাথায় এলোমেলো চুল, গালে দাড়ি, চোখে ভারী পাওয়ারের চশমা। এরকম চুল দাড়ি রোগা, লম্বা ছেলেদের মুখে ভালো মানায়। কিন্তু এ ছেলেটা লম্বা নয়। উচ্চতায় রোশনির মতোই হবে। সাড়ে পাঁচ ফুটের কিছু বেশি। আর রোগা তো কোনওমতেই নয়। রোশনি এবার একটা ‘কাকে চাই’ গোছের প্রশ্নের জন্য তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু তাকে অবাক করে মিষ্টি হেসে ছেলেটা বলল, গুড ইভনিং।

একটু হকচকিয়ে গেল রোশনি। তারপর সামলে নিয়ে বলল, গুড ইভনিং। এটা ডাক্তার তিতাস সেনের বাড়ি তো? আমি দৈনিক নবজাগরণের রিপোর্টার রোশনি। ওনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।

দরজা থেকে সরে দাঁড়াল ছেলেটা, আসুন। ভেতরে আসুন। আপনি বসুন। আমি তিতাসকে ডেকে দিচ্ছি।

বসার ঘরে দেওয়াল ঘেঁষে একটা বড় সোফা। সেটায় বসে চারদিকটা দেখছিল রোশনি। তার ধারণা মিথ্যে নয়। সত্যি খুব সুন্দর করে সাজানো বাড়িটা। বিত্তের অহংকার নেই কিন্তু ঘরের প্রতিটা কোণে রুচিবোধের ছাপ স্পষ্ট। সোফার পেছনের দেওয়ালে দুটো বড় ছবি। তিতাস এবং যে ছেলেটি দরজা খুলে দিল তার। তা হলে এই ছেলেটিই তিতাসের বয়ফ্রেন্ড?

তিতাস আধশোয়া হয়ে গান শুনছিল। পল্লব ঘরে ঢুকতেই কান থেকে ইয়ারফোনটা খুলে বলল, কে রে?

একজন রিপোর্টার এসেছে। তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়।

অবাক হল তিতাস, রিপোর্টার? আমার সঙ্গে?

হুঁ। দেখিস না আজকাল ডাক্তাররা বেশির ভাগ সময় টিভিতেই বকবক করে।

বাজে বকিস না।

আচ্ছা ঠিক আছে। আগে গিয়ে তো দেখ। মেয়েটাকে বসিয়ে রেখেছি। বাচ্চা মেয়ে।

তুই কোনটায় বেশি আপ্লুত হলি? বাচ্চা দেখে না মেয়ে দেখে?

হেসে ফেলল পল্লব। ল্যাপটপের সামনে বসতে বসতে বলল, মেয়ে মাত্রই সুন্দর। এ ব্যাপারে ঈশ্বর একচোখো। উনি কোনও মেয়েকেই অসুন্দর করে বানাননি। কেউ কেউ একটু বেশি সুন্দর এই যা। এই মেয়েটা অবশ্য বেশি সুন্দরের দলে পড়বে।

ইঙ্গিতবহ গলা খাঁকরানি দিয়ে তিতাস এগিয়ে গেল বসার ঘরের দিকে। কিন্তু শোবার ঘর পেরিয়ে বসার ঘরে আসতেই এক মুহূর্তের জন্য যেন তিতাসের মাথাটা ঘুরে উঠল আর ঠিক তখনই তার মাথার ভেতর গমগম করে উঠল সেই কণ্ঠস্বর, যা একাধারে অনির্বচনীয় সুরেলা ও সুরহীন কর্কশ। সেই কণ্ঠস্বর মিশে যেতে লাগল তিতাসের সমস্ত চৈতন্য জুড়ে। তিতাস বুঝতে পারল সে বলছে, কঠোর হও। নির্মম হও। নীতিজ্ঞান লোপ পাক। চৈতন্য উদ্ভাসিত হোক অন্ধকারে। আমায় ধারণ করো অন্তরে। বলো, ইযুজ্জু ইনান্না... ইযুজ্জু ইনান্না... ইযুজ্জু ইনান্না...

পায়ের আওয়াজে ঘুরে তাকাল রোশনি কিন্তু তাকিয়েই একটু ধাক্কা খেল। তিতাস এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের মুখ দেখে তার মনের অবস্থা কিছুটা হলেও বুঝতে পারা যায়। রোশনি বুঝতে পারল তিতাস অসম্ভব বিরক্ত। এই বিরক্তির কারণ কী? সে খবর না দিয়ে এসেছে বলে না কি অন্য কিছু?

রোশনি উঠে দাঁড়িয়ে তিতাসের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, হ্যালো ম্যাম। আমি....

কথা শেষ করতে না দিয়ে তিতাস খর গলায় বলল, শুনেছি। কী দরকার আপনার?

বেশ জোরালো একটা ধাক্কা খেল রোশনি। এই ডাক্তারটির ব্যবহার অত্যন্ত খারাপ। ছোটবেলা থেকে খারাপ ব্যবহার পেয়ে পেয়ে খারাপ ব্যবহারের প্রতি রোশনির একটা তীব্র বীতরাগ তৈরি হয়েছে। কেউ খারাপ ব্যবহার করলেই তার চুলের মুঠি ধরে দুটো থাপ্পড় দিতে ইচ্ছে করে। এখনও ইচ্ছে করছিল কিন্তু ওই যে বাধ্যবাধকতা। গলাটা যথাসম্ভব নরম করে রোশনি বলল, আসলে ম্যাম আপনার সঙ্গে একটা বিষয়ে কথা বলতে চাই।

কথা বলতে চান তো অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেননি কেন? এভাবে উইদাউট অ্যাপয়েন্টমেন্ট কারও বাড়িতে যে আসা উচিত নয় আপনি জানেন না?

অত্যন্ত অপমানিত বোধ করল রোশনি। কিন্তু এখন অপমান গিলে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। অপমান খুবই তেতো খেতে। রোশনির গলার কাছটা তিতকুটে হয়ে গেল। সে বলল, জানি ম্যাম। আসলে ব্যাপারটা খুব আর্জেন্ট তাই।

বলুন কী ব্যাপার? সংক্ষেপে বলবেন।

রোশনি ব্যাগ থেকে ছোট একটা নোটবই আর কলম বার করল। বলল, ম্যাম আজ থেকে আট মাস আগে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়র ডাক্তাররা রোগীর পরিবারের হাতে নিগৃহীত হয়। সে সময় আপনি পদত্যাগ করেন। আমি পুরনো খবর ঘেঁটে জানতে পেরেছি, এই গন্ডগোল শুরু হয়েছিল একটি শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। আপনি কি আমাকে বলবেন সেসময় আসলে কী হয়েছিল?

কথাগুলো বলতে বলতেই রোশনি খেয়াল করছিল, তিতাসের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু তিতাস যে এই ব্যবহারটা করবে সেটা রোশনি একেবারেই আশা করেনি। রোশনির কথা শেষ হওয়া মাত্রই তিতাস প্রায় চিৎকার করে বলল, না। বলব না। আর ফারদার যদি আপনি আমাকে বিরক্ত করেন তা হলে আপনাকে পুলিশে দেব। বেশ তো নায়ক-নায়িকাদের জামা-প্যান্ট অন্তর্বাস নিয়ে খবর করছিলেন। সেগুলোই করুন না। এসব সিরিয়াস ব্যাপারে কে ঢুকতে বলেছে আপনাকে? দু’ পয়সার সাংবাদিক সে এসেছে মেডিক্যাল কলেজের খবর করতে। গেট আউট।

এবার নিজেকে শান্ত রাখতে পারল না রোশনি। বাঁকা হেসে বলল, যাচ্ছি ম্যাডাম। আমি দু’ পয়সার সাংবাদিক। আপনি দু’ কোটি টাকার ডাক্তার। তবে আপনি চাইলে আমার থেকে ভদ্রতা শিখতে পারেন। আমি ফিজ নেব না।

মুহূর্তে রোশনির গলার কাছটা খামচে ধরল তিতাস, কী বললি তুই? কী বললি?

আচমকা এই আক্রমণের জন্য রোশনি একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। টাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল সোফার ওপরে। তার পায়ের ধাক্কায় সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা একটা ফ্লাওয়ার ভাস মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। তিতাস তখনও তার কলার ধরে ঝাঁকাচ্ছে, তোর এত বড় সাহস আমায় ভদ্রতা শেখাতে চাস?

বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে নিতেই রোশনির মাথাটা আগুন হয়ে উঠল। এই অসভ্যতা বরদাস্ত করার কোনও মানে হয় না। হাঁটু দিয়ে তিতাসের পেটে একটা ধাক্কা মারতে যাবে তার আগেই ছুটে এল ছেলেটা। একটানে তিতাসকে সরিয়ে নিল রোশনির গায়ের ওপর থেকে, কী করছিস তিতাস? তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

পল্লবের থেকে বাধা পেয়ে তিতাসের যেন আরও বেশি করে চেতনা লোপ পেল। পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল, ছাড় আমাকে। ছাড় বলছি। ওকে আজ আমি শেষ করে দেব।

পল্লব কোনওদিনই তিতাসকে এতটা হিংস্র হতে দেখেনি। কোনওমতে তিতাসকে টানতে টানতে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল বাইরে থেকে। দরজার ওপারে তিতাস তখন অবরুদ্ধ ক্রোধে চিৎকার করছে। দড়াম দড়াম করে লাথি মারছে দরজায়। পল্লব বুঝতেই পারল না, মেয়েটা কী এমন বলল যাতে তিতাস এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করছে। সে এগিয়ে এসে হাতজোড় করে বলল, তিতাসের ব্যবহারের জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু আপনি এখন যান প্লিজ।

কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এল রোশনি। মুডটা অত্যন্ত বিগড়ে আছে। আজ দিনটাই খারাপ। সকাল থেকে একটার পর একটা অসভ্য ইতর মানুষের সাথে কথা বলতে হচ্ছে। তিতাসের বয়ফ্রেন্ড ছেলেটির ব্যবহার তো বেশ ভালো। তিতাসের মতো মেয়ের সঙ্গে থাকে কী করে?

একটা উবার ডেকে ফেলল রোশনি। এখন আর অটো বা রিক্সা ধরার এনার্জি নেই। এখান থেকে তার ভাড়ার ফ্ল্যাটটা কাছেই।

একশো তিরিশ টাকা ভাড়া নিল উবার। রোশনির ফ্ল্যাটটা একটা গলির মধ্যে। সেখানে গাড়ি ঢোকে না। বড় রাস্তায় নেমে মিনিট তিনেক হাঁটতে হয়। গলফ ক্লাব রোডের এই দিকটা একেবারেই রেসিডেন্সিয়াল এলাকা। সন্ধের পর রাস্তাঘাটে লোকজন বিশেষ থাকে না। নাইট ডিউটির দিনগুলোতে তো বাড়ি ফিরতে বেশ গা ছমছম করে। এখন যদিও ন’টা বাজে তবু রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এক-আধটা বাইক আর গাড়ি হুস করে চলে যাচ্ছে। লম্বা পিচের রাস্তাটা চলে গেছে অনেক দূরে। রাতের আলোয় রাস্তাটাকেও কেমন যেন ক্লান্ত দেখাচ্ছে। ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির গলির দিকে পা বাড়াল রোশনি।

রোশনি গলিতে ঢুকতেই রাস্তার উল্টোদিকের গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা হুড পরা অবয়ব। কিছুটা দূরত্ব রেখে সে রোশনির পিছু নিল। একটা ল্যাম্প পোস্টের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে চিনে নিল রোশনির ফ্ল্যাটটা। রোশনি ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর সে দু’ পা এগিয়ে এল সামনের দিকে। মাথার ওপর থেকে সরিয়ে দিল হুড। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ঝিকিয়ে উঠল সরিতের ঠান্ডা চোখ দুটো।

১১

বড় অসহায় গলায় অমিয় বলল, মিতুল তুমি?

অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে মিতুল। চোখের সে ভাষা পড়তে পারল না অমিয়। হয়তো বা পড়ার চেষ্টাই করল না। বেদনার এই ভার বহন করা সাধারণ মানুষের সাধ্যাতীত। অমিয় বুঝতে পারছে সে ধরা পড়ে গিয়েছে। এবার বিচার হবে। অমিয়র মনে হল এই মুহূর্তে যদি আত্মহত্যা করতে পারত সবচেয়ে ভালো হত। যুদ্ধে যাওয়ার সময় সৈনিকরা গলায় ঝুলিয়ে নেয় পটাসিয়াম সায়ানাইডের অ্যাম্পুল। যখন দেখে বেঁচে ফেরার আর উপায় নেই তখন তারা মুখে পুরে দেয় ওই বিষ। মুহূর্তে বেছে নেয় মৃত্যুর নিশ্চিন্ত আশ্রয়। জীবনের যুদ্ধে পটাসিয়াম সায়ানাইড বহন করার নিয়ম নেই। সেখানে বেঁচে থেকে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য যন্ত্রণাকে স্বীকার করাই ভবিতব্য। অস্ফুটে অমিয় আবার বলল, তুমি এখানে কী করে এলে মিতুল?

মিতুলের খুব কান্না পাচ্ছে। এত কষ্ট হচ্ছে মনে হচ্ছে যেন এখনই দম বন্ধ হয়ে যাবে। তার তো এভাবে চুপি চুপি অমিয়র বাড়ি আসার কথা ছিল না। তবু সে এসেছে। আজ বিকেলে সে এমন একটা ফোন পেয়েছে যে না এসে থাকতে পারেনি।

রোজকার মতো আজও সকালে ঘুম থেকে উঠে সে অমিয়কে ফোন করেছিল। গত রাতে অমিয়র সঙ্গে যে তার একটু মনকষাকষি হয়েছিল সেটা একেবারেই মনে রাখেনি। মাঝে মাঝে এই লোকটার ওপর মিতুলের রাগ হয়। কিন্তু মিতুল একটা জিনিস খেয়াল করেছে, সে বেশিক্ষণ রাগ পুষে রাখতে পারে না। তার রাগের মেয়াদ বড়জোড় ঘণ্টা দুয়েক। সেখানে একটা গোটা রাতের পরে রাগ যে কমে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ফোন করেই অমিয়র গলাটা শুনে ভারী অবাক হয়েছিল সে। অমিয় কেমন যেন কাঠ কাঠ হয়ে কথা বলছে। অমিয় তো এমন করে না। বরং সকালের প্রথম ফোনটায় মিতুলের সঙ্গে বেশ কিছুটা দেয়ালা করে। বেলা যত বাড়ে অমিয় তত গম্ভীর হয়। সন্ধের পর থেকে তার এই গম্ভীর ভাবটা কমতে থাকে এবং রাতের দিকে একেবারেই চলে যায়। তখন অমিয় ফোনে মিতুলকে কিছু কিছু ভালোবাসার কথা বলে। মাঝে মাঝে মিতুলের খুব দুষ্টুমি পায়। তখন সে একটা দুটো অসভ্য কথা বলে ফেলে। ফোনের ও প্রান্ত থেকেই মিতুল বুঝতে পারে সে সব শুনে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়ে যায় অমিয়। মিতুলেরও যে একটু একটু লজ্জা করে না তা নয় কিন্তু কী করবে সে! মাঝে মাঝে তার যে খুব আদর খেতে ইচ্ছে করে। সে তার বান্ধবীদের কাছে শুনেছে, তাদের বয়ফ্রেন্ডরা না কি সারাক্ষণ ওসব করার জন্য ছুঁকছুঁক করে। কিন্তু এই লোকটাই কেমন অন্য ধারার। আজ অবধি ভালো করে একটা চুমু খায়নি। চুমু খেলে সেই চোখে, গালে কিংবা কপালে। কতবার লজ্জার মাথা খেয়ে মিতুল ঠোঁট বাড়িয়ে দিয়েছে। লোকটা যেন দেখেও দেখেনি। মিতুল তো একটা মেয়ে। এর থেকে বেশি বেহায়া সে হতে পারবে না।

একবার মিতুল খুব অভিমান করেছিল। অমিয় বলেছিল, তুমি তো এখনও ছোট মিতুল। আর একটু বড় হও। আমরা তো কেউ পালিয়ে যাচ্ছি না। আগে মনে মনে মিলমিশটা হয়ে যাক। তারপর ওসব তো আছেই।

এরপরে আর কথা বলা চলে না। চুপ করে গেছিল মিতুল। তবে লোকটার এই ব্যাপারটা তার ভালোও লাগে। লোকটার চওড়া বুকে মাথা রেখে একটা আশ্রয় পাওয়া যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই লোকটাকে সে বেশ খানিকটা বোঝে। সে বুঝতে পারে লোকটা তাকে বড্ড ভালোবাসে। তাই সকালের কাঠ কাঠ গলাটা পেয়ে মিতুল বলেছিল, কী হয়েছে গো?

একটু চুপ থেকে আমতা আমতা করে অমিয় বলেছিল, তার কে এক মাসি অসুস্থ। সেখানে যেতে হবে। তখনই সামান্য খটকা লেগেছিল মিতুলের। প্রায় দু’ বছর হয়ে গেল অমিয়র সঙ্গে তার সম্পর্ক। কই কোনও মাসির কথা তো শোনেনি! কিন্তু এ নিয়ে তখন কথা বাড়ায়নি মিতুল। সে শোনেনি মানেই অমিয়র মাসি নেই এটা কোনও যুক্তি হতে পারে না। খটকাটা বাড়ল অমিয় পরপর তিনবার ফোন না ধরায়। লোকটা তো কখনও এমন করে না। যখনই মিতুল ফোন করে অমিয় ফোন ধরে। খুব ব্যস্ত থাকলেও ফোন ধরে চাপা গলায় বলে দেয়, পরে করছি। সেখানে পরপর তিনবার! এর কিছুক্ষণ পরে অমিয়র একটা মেসেজ এসেছিল। মেসেজটা দেখেও অস্বস্তি হয়েছিল মিতুলের। এমন কাঠ কাঠ করে তো লোকটা মেসেজ লেখে না। কী হয়েছে লোকটার? কোনও সমস্যায় পড়েছে? এসব ভাবতে ভাবতেই বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল মিতুল।

তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। চারদিকে কেমন একটা ঝিম ধরা ভাব। দুপুরের শেষ আর বিকেলের শুরু, এই সন্ধিক্ষণটা ভারী অদ্ভুত। মিতুল চিরকাল দেখেছে এই সময়টায় কোনও এক অজানা কারণে তার মন খারাপ হয়ে যায়। আজও খুব মন খারাপ করছিল তার। কেন কে জানে অদ্ভুত একটা সন্দেহ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তার মন বলছিল, অমিয় তাকে কিছু একটা গোপন করে যাচ্ছে। কিন্তু কী গোপন করছে? কেনই বা করছে! গত রাতে তিতাস দিদি আর পল্লব দাদাকে সে চলে যেতে বলেছিল বলে কি লোকটা এখনও তার ওপর রাগ করে আছে? তখনই তিতাসের ফোনটা এসেছিল। চমকে উঠেছিল মিতুল। একটা কুণ্ঠাবোধ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। গত রাতের ব্যবহারের জন্য সে খুবই লজ্জিত হয়ে আছে। সারা রাত তার ঘুম হয়নি। বারে বারেই মনে হয়েছে তিতাস দিদিকে সে ভুল বুঝেছে। যে তিতাস দিদি তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছে তাকে ভুল বোঝার কোনও অধিকার নেই তার। আর তিতাস দিদি তো পল্লব দাদাকে কত্ত ভালোবাসে। পল্লব দাদাকে ছেড়ে সে কেন তাকাতে যাবে এই মানুষটার দিকে? ছি ছি! সবটাই তার পাপ মনের কল্পনা। নিজেকে খুব ধিক্কার দিয়েছিল মিতুল।

প্রথমবার বেজে বেজে কেটে গেছিল ফোনটা। মিনিট পাঁচেক পরেই আবার ফোন করেছিল তিতাস। এবার আর দেরি করেনি মিতুল। নিজেকে সামলে ফোনটা ধরেছিল, হ্যাঁ তিতাস দিদি বলো।

কোনও ভনিতা না করে তিতাস বলেছিল, হ্যাঁ রে, অমিয়র সাথে তোর কথা হয়েছে?

একটু অবাক হয়েই মিতুল বলেছিল, না গো। সকালের পর আর হয়নি। কেন?

না, আসলে অমিয় আমার বা পল্লব কারও ফোনই ধরছে না। সকালে আমরা বেরনোর আগেই ও বেরিয়ে গেছিল। পরে পল্লবকে ফোন করে জানিয়েছিল, ব্যারাকপুরে রোডে না কি খুব ঝামেলা হচ্ছে। সেখানেই পুলিশ ক্যাম্পে আছে। তাই চিন্তা হচ্ছে আর কী!

থমকে গেছিল মিতুল। ব্যারাকপুর রোডে ঝামেলা? কই দুপুরে খেতে এসে বাবা তো তেমন কিছু বলল না! বরং বাবাও বলল যে মাসি অসুস্থ বলে লোকটা আজ অফিসে আসেনি। সবটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল মিতুলের। লোকটা তাকে একরকম বলেছে, তিতাস দিদিদের আর একরকম বলেছে! কেন? আবার সেই সন্দেহের পোকাটা কুট করে কামড়ে দিয়েছিল মিতুলকে। ফোনের ওপার থেকে তিতাস বলেছিল, যাই হোক। তোর সাথে যদি কথা হয় আমাদের একবার ফোন করতে বলিস। আমরা খুব চিন্তায় আছি।

ঠিক আছে গো। বলে ফোন রেখেছিল মিতুল আর তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল লোকটার বাড়ি যাবে। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে বলেছিল, কিছু একটা গোলমাল আছে। সে নিশ্চিত হয়ে গেছিল, লোকটা তাকে মিথ্যে কথা বলেছে। বেচারা মিতুল! সে জানতেও পারেনি কলকাতায় নিজের ঘরে তখন ঝুম হয়ে বসে আছে তিতাস। তার মাথার ভেতর অনুরণন তুলেছে এক অপার্থিব কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠ বলছে, অমিয় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ধরিয়ে দাও ওকে। ধরিয়ে দাও।

সন্ধের মুখেই অমিয়র ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছেছিল মিতুল। সিকিউরিটির থেকে জানতে পেরেছিল অনেক ভোরে অমিয় বেরিয়ে গেছে। এখনও ফেরেনি। অমিয়র বাড়িতে যে দুই বন্ধু মাঝে মাঝেই আসে তারা ঘরের চাবি তার হাতে দিয়ে ন’টা নাগাদ চলে গেছে। মিতুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আজ লোকটার সাথে কথা না বলে সে ফিরবে না। তাকে জানতে হবে, কেন লোকটা তাকে মিথ্যে বলেছে? সিকিউরিটির থেকে চাবি চেয়ে নিয়েছিল সে। সিকিউরিটিকে বলেছিল, তোমার স্যারকে বোলো না আমি এসেছি। সারপ্রাইজ দেব।

সিকিউরিটি মিতুলকে খুব ভালো করেই চেনে। তাই দ্বিরুক্তি করেনি। তবে মিতুলের কথা সে পুরোপুরি শুনেছে এমনটাও নয়। প্রভুভক্তির নমুনা দিতে সে অমিয়কে বলতেই গেছিল যে ঘরের ভেতরে একজন আছে। কিন্তু অমিয় তার কথা শোনেনি। কী আর করা যাবে! নিয়তি কেন বধ্যতে।

অমিয় ফ্ল্যাটে ঢুকতেই মিতুল টের পেয়েছিল কিন্তু তখন সাড়া দেওয়ার মতো অবস্থায় সে ছিল না। কারণ ততক্ষণে তার বিশ্বাসের পৃথিবীটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। স্থবিরের মতো সে বসেছিল খাটের ওপর। ঘরে ঢুকতেই সে দেখেছিল অমিয়র বিছানাটা একেবারে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। যেন খাটের ওপর যুদ্ধ হয়েছে। বিছানা কখন এমন এলোমেলো হয় সে সম্পর্কে মিতুলের একটা অস্পষ্ট ধারণা আছে। সে ধারণায় সিলমোহর পড়েছিল আরও দুটো জিনিস দেখার পর। মেঝেতে পড়ে আছে একটা কালো রঙের বাহারি ব্রা। আর খাটের এক কোণে পড়ে থেকে মিতুলকে বিদ্রূপ করছে একটা কালো প্যান্টি।

তারপর অমিয় ঘরে ঢুকে এল এবং আলো জ্বালাল আর আলো জ্বলতেই মিতুল দেখল, অমিয়র সারা গায়ে অজস্র দাঁতের দাগ। এক মুহূর্তের জন্য অভিমানে ভারী হয়ে এল মিতুলের চোখের পাতা। দুনিয়ার যত অভিমান যেন এক নিমেষে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। কিন্তু পরমুহূর্তেই সে বোধকে আচ্ছন্ন করল ক্রোধ। একটা বোবা রাগে মিতুলের ইচ্ছে করল অমিয়কে খুন করে ফেলতে। কিন্তু সে রাগও বেশিক্ষণ থাকল না। অদ্ভুত এক অসহায়তা গ্রাস করল তাকে। এখন মিতুলের খুব কান্না পাচ্ছে। এত কষ্ট হচ্ছে মনে হচ্ছে যেন দম বন্ধ হয়ে যাবে। ওদিকে কেমন বিবশের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছে অমিয়। বেশ খানিকটা সময় নিল মিতুল। তবু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াল সে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দরজার দিকে। তারপর বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে অমিয়র দিকে তাকিয়ে বলল, আজ বুঝলাম কেন তুমি আমাকে আদর করতে চাও না। আমায় আদর করলে সে খুব কষ্ট পাবে বলো?

এতক্ষণে মিতুলের চোখের ভাষা পড়তে পারল অমিয়। গলায় কান্না থাকলেও সেখানে ঘেন্না ছাড়া আর কিচ্ছু লেখা নেই।

১২

ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে রইল রোশনি। তারপর ধপ করে শুয়ে পড়ল খাটের ওপর।

ছোট্ট দু’ কামরার ফ্ল্যাট রোশনির। কিন্তু খুব সুন্দর করে গোছানো। সব একেবারে পরিপাটি। যখনই এ বাড়িতে কেউ এসেছে অন্দরসজ্জা দেখে রোশনির প্রশংসা করেছে। ঘরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রোশনি। ঘর গুছোতে বড় ভালোবাসে সে। শুধু ঘর কেন, এ জীবনে আনন্দ থেকে বেদনা, প্রেম থেকে বিচ্ছেদ সবই গুছিয়ে রাখতে হয়। সেসবও যত্ন করে তুলে রেখেছে রোশনি। খাট থেকে সোজা তাকালে দেওয়ালে একটা বড় ছবি টাঙানো। মায়ের। সেদিকে তাকিয়ে অজান্তেই চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল রোশনির। মা বেঁচে থাকলে আজ তার জীবনটা হয়তো অন্যরকম হত। তার এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে মা ছিল একমাত্র মানুষ যে তাকে বুঝত। একমাত্র মাকেই সবটা খুলে বলতে পেরেছিল সে। শুনে মা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়েছিল তার দিকে। তার পর মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বলেছিল, এমন তো হয় বাবান। তোর যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই করবি। তোর ওপর আমার ভরসা আছে।

বাবা কিন্তু ভরসা করত না এতটুকু। মায়ের কাছে সব শুনে প্রবল অশান্তি করেছিল বাবা। প্রথমদিকে ভয় পেলেও ধীরে ধীরে নিজের মনকে শক্ত করেছিল রোশনি। মায়ের কথাটা সাহস দিত তাকে। কিন্তু রোশনির ষোলো বছর বয়সে এই সাহস দেওয়ার মানুষটা তার জীবন থেকে বরাবরের মতো হারিয়ে গেল। ডেঙ্গু হয়ে চারদিনের জ্বরে চলে গেল মা। মা মারা যাওয়ার পর কোনওমতে আরও দুটো বছর রোশনি বাড়িতে ছিল। কিন্তু দিন দিন বেড়ে চলছিল বাবার অত্যাচার। বাবা যেন সহ্যই করতে পারত না তাকে। প্রেসিডেন্সিতে চান্স পাওয়াটা রোশনির কাছে তাই মুক্তির ইশতেহার হয়ে এসেছিল। কিছু জমানো টাকা সম্বল করে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে। তার পরের লড়াইটুকু শুধু রোশনিই জানে। এখনও মাঝে মাঝে সে নিজের হাত পায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবে, কী এক আশ্চর্য জাদুবলে সে সারভাইব করে গেল!

চোখের জল মুছে উঠে বসল রোশনি। এমনিতে সে খুবই শক্ত ধাতের মানুষ। কান্নাটান্না চট করে তার আসে না। কিন্তু ক’দিন যা চলছে তাতে মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ারই কথা। সেই বদ্রিনাথের ফোন আসা দিয়ে শুরু হয়েছিল। তারপর তিতাসের এই অপমান। জল খেয়ে নিজেকে খানিকটা সামলে নিল রোশনি। তারপর মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে বসল। খবরটা দেওয়ার পরেই বদ্রিনাথের খুন হয়ে যাওয়া এবং শিশুমৃত্যুর ব্যাপারে তিতাসের কিছু বলতে না চাওয়া এই দুটো ঘটনার মধ্যে যেন এক অদ্ভুত সমাপতন রয়েছে। রোশনির মনে হল, বদ্রিনাথের কথাই ঠিক। কোনও এক মারণ ভাইরাসের আগমন ঘটেছে এবং সরকার থেকে সবটা গোপন করে যাওয়া হচ্ছে। চোয়াল শক্ত হল রোশনির। তার মনে পড়ল, বদ্রিনাথ বলেছিল, শুধু কলকাতা নয়, হুগলি এবং বর্ধমানেও একই ঘটনা ঘটেছে। রোশনি সিদ্ধান্ত নিল, কালকেই এ নিয়ে একটা স্টোরি করবে। হ্যাঁ, এই মুহূর্তে স্টোরিটা হয়তো ভাসা ভাসা হবে কিন্তু এটা নিয়ে একটা হইচই হওয়া দরকার।

রোশনির চিফ রিপোর্টার দেবকুমার ঘোষ মানুষটা ভালো। এইচ আর থেকে যখন রোশনির কাছে মেইল এসেছিল যে ঠিকমতো পারফর্ম না করতে পারলে চাকরি যাবে সে ছুটে গেছিল এই ভদ্রলোকের কাছে। বলেছিল, এর মানে কী দেবকুমারদা? আমি সদ্য জয়েন করেছি রিপোর্টিংয়ে। এতদিন সম্পাদকীয় আর রবিবারের পাতা বানিয়েছি। আমি তো রিপোর্টিংয়ের কিছুই জানি না। কোনও কন্ট্যাক্টই তৈরি হয়নি এখনও। সেখানে আমি নতুন স্টোরি কোথা থেকে আনব?

চেয়ার দেখিয়ে দিয়েছিলেন দেবকুমার ঘোষ, বোস ওখানে। অত ঘাবড়ানোর কী আছে? দেখ রোশনি, এই অফিসের বাইরে যে কুকুরটা শুয়ে থাকে সেও জানে তোর এই ট্রান্সফার নরমাল নয়। নেহাত কাউকে বিনা কারণে চাকরি থেকে ঘাড়ধাক্কা দেওয়া যায় না তাই এই নাটকটা করা হল। তুই সাপের ল্যাজে পা দিয়েছিস ভাই। আর সাপটা খুব ভালো করে জানে যে তুই রিপোর্টিংয়ে এসে থই পাবি না। কিন্তু এখানে আমার একটা কথা আছে। তোকে যখন আমার ডিপার্টমেন্টে দিয়েছে তখন তোর দায়িত্ব আমার। হ্যাঁ, ওই সাপটার যা ক্ষমতা সে তুলনায় আমি চুনোপুঁটি। আমি সরাসরি তোর চাকরি হয়তো বাঁচাতে পারব না তবে তোকে হেল্প করব।

সত্যিই সাহায্য করেছিলেন দেবকুমার ঘোষ। নিজের বেশ কিছু ভালো কনট্যাক্টের সঙ্গে রোশনির যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু খবর তো আর গাছে ফলে না। তেমন খবর তৈরি হতে সময় লাগে। ফলে সময় চলে যাচ্ছিল কিন্তু রোশনির কপালে আর ব্রেকিং নিউজ জুটছিল না। যাই হোক, রোশনি সিদ্ধান্ত নিল এখনই একবার ব্যাপারটা দেবকুমারদাকে জানিয়ে রাখবে। আশা করা যায় ভদ্রলোককে কনভিন্স করানো খুব একটা কঠিন কাজ হবে না। ফোনটা হাতে তুলে সবে বসের নম্বর ডায়াল করতে যাবে তখনই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে একটা অচেনা নম্বর ফুটে উঠেছে। একটু ভুরু কুঁচকেই ফোনটা ধরল রোশনি, হ্যালো।

ওপার থেকে একটা মেয়েলি গলা বলে উঠল, হ্যালো, রোশনি বলছেন?

হ্যাঁ বলছি। আপনি?

আমার নাম পল্লব।

একটা অদৃশ্য বিষম খেল রোশনি। তার জানা মতে পল্লব ছেলেদের নাম। কী হল ব্যাপারটা? রোশনিকে চুপ থাকতে দেখে ফোনের ও প্রান্ত থেকে সেই গলাটা বলে উঠল, আমার নাম আর গলা শুনে একটু ধন্দে পড়ে গেছেন তাই না? আসলে আমার গলাটা ফোনে মেয়েদের মতো শুনতে লাগে। আগে সামনে থেকেও লাগত কিন্তু এইচ এস দেওয়ার পর থেকে সেই ব্যাপারটা অনেক কমে এসেছে। এখন শুধু ব্যাঙ্ক থেকে যারা লোন দিতে ফোন করেন, তাঁরা, উবারওয়ালা আর অচেনা কেউ আমায় মেয়ে ভেবে ভুল করেন। আগে রাগ হত। ইদানীং অসুবিধে হয় না।

কিছু কিছু মানুষের কথা বলার ধরন হয় ভারী আন্তরিক। কথার মধ্যে যেন এক কাপ গরম কফির উষ্ণতা মিশে থাকে। রোশনির মনে হল এই লোকটিও তেমন। একটু হেসে বলল, আপনি ঠিক ধরেছেন। নাম আর গলা এ দুটো আমাকে একটু কনফিউজ করেছিল। বাই দ্য ওয়ে আমি কিন্তু আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না।

চেনার কথাও নয়। আমি কেউকেটা নই। তবে কিছুক্ষণ আগেই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আপনি আমাদের বাড়ি এসেছিলেন।

থমকে গেল রোশনি। একটু সময় নিয়ে বলল, আপনি কি তিতাস সেনের...

কথা শেষ করতে না দিয়ে ফোনের ওপারের মানুষটা বলল, হ্যাঁ। আসলে দুটো কথা বলব বলে ফোন করলাম।

একটু গম্ভীর হল রোশনি। তিতাসের ঘটনাটা ফের মনে পড়ে গেছে। তিতাসের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন যে কোনও কিছুকেই রোশনির এই মুহূর্তে অসহ্য লাগছে তবু নিজের সহজাত ভদ্রতাবোধকে সে একেবারে উড়িয়ে দিতে পারল না। বলল, বলুন কী কথা। তার আগে বলুন আপনি আমার নম্বর পেলেন কী করে?

আমি এককালে আপনার কাগজেই চাকরি করতাম। কিছু বন্ধুবান্ধব আছেন ওখানে। তাঁদের থেকেই পেয়েছি।

জোর চমকে গেল রোশনি। দ্রুত বলে উঠল, এক মিনিট। এক মিনিট। আপনি নবজাগরণে চাকরি করতেন? আপনার নাম কী বললেন? পল্লব?

হ্যাঁ। ওটাই মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডে লেখা আছে।

আচ্ছা আপনার পদবী কি চক্রবর্তী?

হ্যাঁ। কিন্তু কেন বলুন তো? অন্য কোনও পদবি কি আপনি অ্যালাও করবেন না?

কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল রোশনি। তারপর একসাথে বেশ কয়েকরকম অনুভূতি ঘিরে ধরল তাকে। প্রথমেই তার খুব আনন্দ হল। তার পরে নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে হল। তার পরে তিতাসের ওপর সব রাগ জল হয়ে গেল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলাল রোশনি কিন্তু গলার উচ্ছ্বাসটা আর চেপে রাখতে পারল না। লাফিয়ে উঠে বলল, আপনি... আপনি সেই পল্লব চক্রবর্তী? আপনিই তো নবজাগরণে ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ বলে একটা কলাম লিখতেন? বলুন না, আপনিই লিখতেন তো?

একটু লজ্জা পেল পল্লব। সে যখন নবজাগরণে চাকরি করত তখন এই কলামটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রথমে সপ্তাহে একদিন করে বেরনোর কথা হয়েছিল পরে জনগণের দাবিতে সপ্তাহে ওটা তিনদিন হয়ে যায়। ওই কলামে পল্লব এই বাংলার সাধারণ মানুষদের নানা অসাধারণ কাহিনিকে গল্পের মতো করে সাজিয়ে দিত। তার জন্য তাকে ঘুরতেও হত প্রচুর। সে নিচু গলায় বলল, হ্যাঁ। আমিই ওটা লিখতাম।

আবেগ ভরভর গলায় রোশনি বলল, আমি আপনার ফ্যান পল্লবদা। জানেন আপনার ওই কলামটা পড়েই আমার সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল। তারপর আমি আপনার উপন্যাসও পড়েছি। আপনার ‘আলাপ করে ভালো লাগল’ তো আমার অল টাইম ফেভারিট।

একটু ইতস্তত করে পল্লব বলল, অনেক ধন্যবাদ। কেউ প্রশংসা করলে তার ভারী অস্বস্তি হয়।

রোশনি পল্লবের সে অস্বস্তি ধরতে পারল না। ধরতে পারার কথাও নয়। সে উত্তেজিত হয়ে বলল, ইশ! আজ আপনার এত কাছে গেলাম অথচ চিনতে পারলাম না! আমার যে এখন কী আফশোস হচ্ছে আপনাকে কী বলব? তবে বইয়ের ব্লার্বে আপনার যে ছবিটা আছে তার সাথে আপনার কোনও মিল নেই।

পল্লব হাসল, থাকবে কী করে? ওটা তো আজ থেকে বারো বছর আগে তোলা ছবি।

মানে? আপনার বইটা তো বেরিয়েছে বছর দুয়েক। সেখানে বারো বছরের পুরনো ছবি দিয়েছেন কেন?

সে এক অদ্ভুত করুণ কাহিনি। আপনাকে আর একদিন বলব। যাই হোক, যে দুটো কথা বলব বলে ফোন করা সে দুটো আগে বলি?

হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন।

দেখুন, প্রথমত আমি তিতাসের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইছি। আপনি কি ওর পদত্যাগের ব্যাপারে কিছু জানতে চেয়েছিলেন?

হ্যাঁ।

আমি আন্দাজ করেছিলাম। আসলে বিষয়টা একটু সেনসিটিভ। ওই নিয়ে তিতাস অনেকদিন অসুস্থও ছিল। সব মিলিয়ে হয়তো নার্ভ ফেল করেছে। তাই আপনার সাথে অমন ব্যবহার করে ফেলেছে। দয়া করে ওকে ক্ষমা করে দিন।

পল্লবের বলার মধ্যে যে আকুতি ছিল তা স্পর্শ করল রোশনিকে। সে লজ্জিত স্বরে বলল, ছি ছি। আপনি এভাবে ক্ষমা চাইছেন কেন? বাদ দিন ওসব। যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। একটা অনুরোধ করব?

বলুন।

আমাকে প্লিজ আপনি করে বলবেন না। আমি আপনার থেকে বয়সে ছোট। তার ওপর আপনার ফ্যান। আপনি আমায় তুমি করে বললে খুশি হব।

বেশ তাই হবে। তুমি কেমন আছ রোশনি?

হঠাৎ এই প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে গেল রোশনি। অনিচ্ছাতেও তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল যে শব্দটা তাকে হ্যাঁ আর অ্যাঁ-এর মাঝামাঝি রাখা যায়।

পল্লব বলল, ও কিছু না। তুমিটা ঠিক লাগসই হচ্ছে কি না দেখে নিলাম। এবার দ্বিতীয় কথাটা বলি? সেটা হল, তুমি তোমার অফিসের পাঞ্চিং কার্ডটা আমাদের বাড়িতেই ফেলে গেছ।

সে কী! চমকে উঠল রোশনি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল তার। যেখানে সেখানে কার্ড ফেলে আসা তার বরাবরের বাজে স্বভাব। আর একবার এই কার্ড হারালে যন্ত্রণার শেষ থাকে না। অফিস থেকে একটা সাদা কাগজ মতো গলায় ঝুলিয়ে দেয় আর যতবার ঢুকতে বা বেরতে হয় ততবার জাবদা খাতায় নাম এন্ট্রি করতে হয়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পোজ দিতে হয়। অফিসের সিকিউরিটিগুলো এমন কর্তব্যপরায়ণ যে বিরাট খাতির থাকলেও এই কার্ডের ব্যাপারে কোনও রেয়াত করে না। আর একবার কার্ড হারালে পার্সোনেল ডিপার্টমেন্ট থেকে নতুন কার্ড দিতে প্রায় মাসখানেক লাগিয়ে দেয়। এবার অবশ্য কার্ডটা পাওয়া গেছে কিন্তু কাল সকালে অফিস যাওয়ার আগে আবার সেই বাঁশদ্রোণী অবধি উজিয়ে যেতে হবে ভেবেই রোশনির শরীরটা কেমন খারাপ করতে লাগল। রোশনিকে চুপ থাকতে দেখে পল্লব বলল, বিপদে পড়ে গেলে তাই না? এই কার্ড হারালে যে কী জ্বালা আমি জানি। তোমার কাছে এখন দুটো অপশন আছে। কাল সকালে অফিস যাওয়ার আগে তুমি কার্ডটা আমাদের বাড়ি থেকে কালেক্ট করতে পারো। আর সেকেন্ড অপশন হল, আমি তোমাকে কার্ডটা দিয়ে আসতে পারি।

ভদ্রতাও এক ধরনের প্রতিবর্ত ক্রিয়া। রোশনি দ্রুত বলে উঠল, না না। আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমি কাল অফিস যাওয়ার পথেই নিয়ে নেব।

সে তোমার ইচ্ছে তবে কষ্টের কিছু নেই। অফিসের এক বন্ধু জানালেন তোমার বাড়ি তো গলফ ক্লাব রোডে। আমার এখন গলফ গ্রিনে একটা মিটিং আছে। মিটিংটা শেষ হতে রাত হবে। যদি তুমি জেগে থাকো আমি ফেরার পথে তোমায় কার্ডটা দিয়ে আসব।

আমি অনেক রাত অবধি জেগেই থাকি। কিন্তু আপনার এত রাতে মিটিং?

প্রোডিউসার কর্তা। তাঁর ইচ্ছেতেই কর্ম। হাসল পল্লব।

মনে মনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেও একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে রোশনি বলল, আপনার অসুবিধে হবে না তো?

না না। অসুবিধের কী? আমি তো ড্রাইভ করে যাব। তুমি একজ্যাক্ট লোকেশনটা পাঠিয়ে রাখো এই নম্বরে। আমি মিটিং শেষে তোমায় ফোন করে নেব। তা হলে এখন রাখি কেমন? দেখা হচ্ছে।

ফোন কেটে দিল পল্লব। ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল রোশনি। তারপর এক পাক নেচে নিল। প্রিয় লেখক বাড়ি বয়ে কার্ড ফেরত দিতে আসছে! ব্যাপারটা যেন এখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না রোশনির। ভাগ্যিস আজ তিতাসের সাথে তার ঝামেলা হল। আর তাই তো সে রাগের মাথায় কার্ড ফেলে চলে এল। রোশনির মনে হল, তিতাসের মতো ভালো মেয়ে আর দুটো হয় না। সামনে পেলে সে এখনই তিতাসকে চুমু খেত। মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টটা খুলে ফেলল রোশনি। পল্লবের অ্যাকাউন্ট খুঁজে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল আর পল্লবের একটা ছবি ডাউনলোড করে পোস্ট দিল, ‘আজ প্রিয় লেখকের সাথে দেখা হওয়ার দিন।’

* * *

এখন পৌনে একটা বাজে। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল রোশনি। রাস্তাঘাট একেবারে শুনশান। কেউ কোত্থাও নেই। শুধু সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পগুলো একচোখো পাহারাওলার মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই এলাকায় অনেক গাছ। অনেকগুলো আলো গাছের পাতায় ঢেকে আছে। ফলে একটা বিষণ্ণ আবছায়া তৈরি হয়েছে। কালো রাস্তার ওপর গাছের কালো ছায়া পড়ে রহস্য যেন আরও ঘন করে তুলেছে। একটা বাচ্চা কুকুর মৃদু ভুকভুক করতে করতে ছুটে চলে গেল। রেলিংয়ে ভর দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল রোশনি। মিনিট পাঁচেক আগে পল্লব ফোন করেছিল। জানিয়েছিল, মিটিং হয়ে গেছে। বেরোচ্ছে।

রোশনি জিগ্যেস করেছিল, নীচে গিয়ে দাঁড়াবে কি না?

পল্লব বলেছিল, এত রাতে নীচে নামার দরকার নেই। তুমি সিকিউরিটিকে বলে রাখো। আমি তোমার ফ্ল্যাটে গিয়ে দিয়ে আসব।

কথাটা ভালো লেগেছিল রোশনির। পল্লবদা যে তার সুরক্ষার কথা ভাবছে সে জন্য নয়। মানুষটা কেমন নির্দ্বিধায় বলল, আমি তোমার ফ্ল্যাটে গিয়ে দিয়ে আসব। মানুষের থেকে এই অসঙ্কোচ ব্যবহারই তো আশা করে মানুষ। কিন্তু মানুষের মনে পাপ। মনের পাপ মানুষের ব্যবহারকে আড়ষ্ট করে তোলে। রোশনি ঠিক করে রেখেছে, পল্লবদা এলে তাকে সমাদর করে ঘরে ডাকবে। এক কাপ চা না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়বে না।

পল্লবের ফোন পেয়েই নীচের সিকিউরিটিকে বলে দিয়েছিল রোশনি। পল্লবদা এলেই সে গেট খুলে দেবে। হিসেবমতো এবার পল্লবদার চলে আসার কথা। ভাবতে ভাবতেই বেজে উঠল কলিং বেল। এক মুহূর্তের জন্য যেন কিশোরী মেয়েটি হয়ে গেলে রোশনি। ছুটে গিয়ে খুলে ফেলল দরজার লক। কিন্তু ছিটকিনিটা খুলতে খুলতে রোশনির মাথার মধ্যে টুং করে একটা বিপদঘণ্টি বেজে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য রোশনির মনে পড়ল সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে দু’দিকের রাস্তাই পরিষ্কার দেখা যায়। পল্লবদা বলেছিল, ড্রাইভ করে আসবে। ফলে যেদিক দিয়েই আসুক না কেন গাড়ি এলে সে তো দেখতে পেত। কিন্তু কোনও গাড়ি তো আসেনি। কাউকে সে ফ্ল্যাটে ঢুকতেও দেখেনি। তা হলে কলিং বেল দিল কে? যেই হোক সে পল্লবদা কিছুতেই নয়। ছিটকিনিটা ততক্ষণে খুলে ফেলেছে রোশনি। তাও রিফ্লেক্সে সেই জায়গাটা হাত দিয়ে চেপে ধরে সে চোখ রাখল আই হোলে আর চমকে উঠল। তার ঘরের সামনেটা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। অন্যদিন বিকেলের পর থেকে সকাল অবধি এখানে একটা আলো জ্বলে। রোশনি যখন ফিরেছিল তখনও জ্বলছিল কিন্তু এখন আর জ্বলছে না। গা শিরশিরে একটা ভয়ে রোশনির পেটের ভেতর পাক দিয়ে উঠল। সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাতে সে ছিটকিনিটা ফের লাগাতে গেল কিন্তু তার আগেই প্রচণ্ড একটা ধাক্কায় খুলে গেল দরজাটা। সেই ধাক্কায় রোশনি ছিটকে পড়ল মেঝেতে। মাথাটা ঠুকে গেল একটা চেয়ারের কোণে। এক মুহূর্তের জন্য যেন চোখে অন্ধকার দেখল রোশনি। কানের মধ্যে যেন হাজার ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে উঠল একসঙ্গে। কিন্তু একটু আগে পাওয়া অস্বস্তিকর ভয়টাই রোশনির চেতনা ফিরিয়ে দিল। অজানা বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই যেন মস্তিষ্ক ফের সচল হল নতুন করে। দৃষ্টি ফিরে আসতে লাগল ক্রমশ আর ঝাপসা চোখে রোশনি দেখল, ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লম্বামতো কেউ একটা বন্ধ করছে দরজাটা। আরও একটু স্পষ্ট হল রোশনির দৃষ্টি আর তখনই রোশনির দিকে ফিরে তাকাল সে। মুখটা ঢাকা একটা কালো মাঙ্কিক্যাপে। চোখ ছাড়া আর কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। তবু চিনতে ভুল হল না রোশনির। এ চাহনিতে লাশকাটা ঘরের ফরমালিনের গন্ধ। ধীরে ধীরে মাঙ্কিক্যাপটা খুলে ফেলল সে। আতঙ্কে স্থবির হয়ে রোশনি দেখল, তার দাঁতের ফাঁকে ঝকঝক করছে নিঃশব্দ ঘাতকের মতো একটা ব্লেড।

১৩

বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল তিতাস। বড় অস্থির করছে শরীরটা। মাথার ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে আছে। সঙ্গে সূক্ষ্ম একটা যন্ত্রণা। আজকাল মাঝে মাঝেই মনে হয় তার সঙ্গে কিছু একটা যেন ঘটছে। কিন্তু কী ঘটছে সেটা ধরা যায় না কিছুতেই। পল্লবের কথা যদি সত্যি হয় এ তা হলে শর্ট টার্ম মেমোরি লসের লক্ষণ। একটা রিপোর্টার মেয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল মনে আছে তিতাসের। তাকে নিয়ে পল্লব একটু মশকরা করেছিল। তারপর সে বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংয়ের দিকে যাচ্ছিল... ব্যস এটুকুই। এরপরে আর কিচ্ছু মনে নেই। কিন্তু পল্লব বলছে, সে না কি মেয়েটার সাথে অসম্ভব দুর্ব্যবহার করেছে! মেয়েটাকে মারতে উঠেছিল পর্যন্ত! অথচ ওই সময়ের স্মৃতিটুকু যেন পুরোপুরি মুছে গেছে। তিতাস কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, সে একজন সাংবাদিককে মারতে গেছিল। কিন্তু পল্লব তো আর মিথ্যে কথা বলবে না। বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তিতাস। দু’হাতে চেপে ধরল মাথাটা। সে কি তবে পাগল হয়ে যাচ্ছে? আজকাল মাঝে মাঝেই সে ওই স্বপ্নটা দেখে। সেই আদিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াড়ি। সেই প্রাচীন মন্দির। সেই বিশালাকার বলিষ্ঠ সিংহ আর সেই...। থমকে যায় তিতাস। মাত্র দু’বার তাকে অনুভব করেছে তিতাস কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা যেন আজন্মকালের। তার উপস্থিতি অতিমাত্রায় বাস্তব অথচ তার অবস্থিতি যেন স্থান, কাল, সময়ের বোধ এলোমেলো করে দেয়। মাথার ভেতরে বেজে ওঠে সেই কণ্ঠস্বর। যা একাধারে শান্ত নদীটির বহতার মতো কোমল আবার বন্যার মতো সর্বগ্রাসী। তিতাস বেশ কয়েকবার ভেবেছে পল্লবকে এই স্বপ্নের ব্যাপারে বলবে কিন্তু যখনই বলতে গেছে অদ্ভুত একটা অবসাদ ঘিরে ধরেছে তাকে। একই সঙ্গে মনে হয়েছে এই স্বপ্ন তার একান্ত ব্যক্তিগত। এ পৃথিবীর কারও অধিকার নেই তাকে জানার। এই ভাবনা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আবার যেন সেই অবসাদ অনুভব করল তিতাস কিন্তু আজ আর সেটাকে প্রশ্রয় দিল না। নিজেকে শক্ত করে উঠে দাঁড়াল বিছানা থেকে। জরুরি মিটিংয়ে পল্লব বেরিয়েছে। তার ফিরতে ফিরতে রাত হবে। মুখে যখন বলতে পারছে না, তিতাস ঠিক করে ফেলল, এই অদ্ভুত স্বপ্ন এবং তার মানসিক অবস্থার কথা সে লিখে ফেলবে। দৃঢ় পায়ে সে এগিয়ে গেল পল্লবের টেবিলটার দিকে। টেবিলের ওপর পল্লবের ল্যাপটপটা রাখা স্লিপ মোডে। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল তিতাস। ডেস্কটপে একটা ফোল্ডার বানাল। নাম দিল ‘ড্রিম’। স্বপ্ন। ফোল্ডারটা খুলে সবে লিখতে শুরু করবে তখনই বেজে উঠল ফোন। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হল সে। মিতুল ফোন করছে। এখন সাড়ে বারোটা বাজে। মিতুল অমিয়র সাথে বকবক না করে তাকে কেন ফোন করেছে? না কি ওরা কনফারেন্সে নিতে চাইছে? যদি কনফারেন্স হয় অমিয়কে খুব ঝাড়বে। সেই যে ভোরে বেরিয়ে গেছে তারপর থেকে ফোন তো ধরেইনি। একবার রিং ব্যাকও করেনি। মাঝে মাঝে খালি পল্লবকে মেসেজ পাঠাচ্ছে, আমি ঠিক আছি। এমন ভাব করছে যেন তিতাসের সাথে ওর শত্রুতা। ফোনটা রিসিভ করল তিতাস। কিন্তু হ্যালো বলেই সে থমকে গেল। মিতুল কাঁদছে। মুহূর্তে নানারকম সম্ভাবনা ভিড় করল তিতাসের মাথার মধ্যে। তবে কি অমিয়র সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে না কি অন্য কোনও বিপদ? সে দ্রুত বলে উঠল, কী হয়েছে মিতুল? কাঁদছিস কেন?

অমিয়র বাড়ি থেকে বেরনোর পর মিতুল যে কীভাবে বাড়ি অবধি পৌঁছেছে সে শুধু মিতুলই জানে। ভাগ্যিস একটা চেনা রিক্সাওয়ালা পেয়ে গেছিল।

কান্না কঠিন ব্যাপার। তার থেকেও কঠিন ব্যাপার কান্না চেপে রাখা। কষ্ট তো চোখের জল হয়ে গলে পড়ে। কিন্তু সে যন্ত্রণা নির্গমনের পথ না পেলে সারা শরীর বইতে থাকে বেদনার ভার। মিতুলের মুখ দেখেই চমকে উঠেছিলেন তার মা। মাথা ধরেছে বলে মাকে কোনওমতে মাকে কাটিয়ে ঘরে এসে দরজা দিয়েছিল মিতুল। ভালোই হয়েছে বাবার আজ নাইটে স্পেশাল ডিউটি পড়েছে। এত সহজে সে বাবার চোখকে ফাঁকি দিতে পারত না।

ঘরে এসে বিছানার ওপর আছড়ে পড়েছিল মিতুল। অমিয়র সামনে সে এতটুকু কাঁদেনি। বিশ্বাসঘাতকের সামনে চোখের জল ফেলতে তার ডিগনিটিতে বাধছিল। কিন্তু ভালোবাসা বড় বেহায়া। পোষা কুকুরের মতো। জুতোর বাড়ি খাওয়ার পরেও পায়ের কাছে এসে কুঁইকুঁই করে। সে অকাতরে ক্ষমা করে দিতে চায় বিশ্বাসঘাতককে। কিন্তু তাকে প্রাণপণে পিছু টানে ইগো, সেলফ রেসপেক্ট। আর এই দুইয়ের টানাটানিতে ক্ষতবিক্ষত হয় মানুষ। কাঁদে। পাগলের মতো বিলাপ করে। কিন্তু চোখের জলও ফুরিয়ে আসে কিছুক্ষণ পর। তখন বোমার মতো আছড়ে পড়ে চরাচরব্যাপী শূন্যতা। ফোঁড়ার মতো বিষিয়ে ওঠে পুঁজরক্তকষ্টবমি।

কী করবে কিছু বুঝতে না পেরেই তিতাসকে ফোন করে ফেলেছিল মিতুল। তিতাসের গলা পেয়ে তার কান্নার বেগটা আরও বেড়ে গেল। ওদিকে তিতাস বারবার জিগ্যেস করে চলেছে, কী হয়েছে বল আমাকে। এমন করছিস কেন? আমার তো ভয় লাগছে।

একসময় নিজেকে একটু সামলে উঠল মিতুল। এই অপমানের কথা কাউকে না কাউকে তো বলতেই হবে। কষ্ট না কি ভাগ করলে কমে। কষ্টটা কমা দরকার। এতটা যন্ত্রণা মিতুল সহ্য করতে পারছে না। সে বলল, তোমাদের বন্ধু আমাকে ঠকিয়েছে তিতাস দিদি।

চমকে উঠল তিতাস, মানে? কী করেছে অমিয়?

ও তোমাদেরও মিথ্যে বলেছিল তিতাস দিদি। ব্যারাকপুর রোডে আজ কোনও ঝামেলাই হয়নি। ও যায়নি পুলিশ ক্যাম্পে।

অবাক হল তিতাস, অমিয় কেন মিথ্যে বলল তাদের? সেই জন্যই কি অমিয় তার ফোন ধরছিল না? পল্লবকে মেসেজ করে মুখের ওপর মিথ্যে বলার ঝামেলা এড়াচ্ছিল?

তা হলে কোথায় গেছিল ও? প্রশ্ন করল তিতাস।

সে আমি জানি না। কিন্তু ও আমাকে বলেছিল ওর কোন মাসি না কি অসুস্থ। তোমার ফোন পাওয়ার পরেই আমার সন্দেহ হয় আর আমি ওর বাড়ি যাই। ও তখন বাড়িতে ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসে।

তারপর?

অনেকটা সময় নিয়ে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে ভাঙতে ভাঙতে আর জুড়তে জুড়তে তিতাসকে সবটা বলে গেল মিতুল। সে যতই আপন হোক, প্রেমিকের দ্বিচারিতা, বিশ্বাসঘাতকতার কথা অন্য কাউকে বলা খুব সহজ কাজ নয়।

সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল তিতাস। এ কী শুনল সে? এ যে অবিশ্বাস্য। যতবার অমিয়র সঙ্গে মিতুলকে নিয়ে কথা হয়েছে ততবারই অমিয়র চোখে মিতুলের প্রতি একনিষ্ঠ প্রেম দেখেছে সে। সেই অমিয় কীভাবে অন্য নারীর সঙ্গে? ভাবতেই কেমন যেন মাথা ঘুরে উঠল তিতাসের। মিতুলকে কী বলবে বুঝেই উঠতে পারল না কিছুক্ষণ। এই মুহূর্তে মিতুলের মনের যা অবস্থা তাতে সান্ত্বনাবাক্য কুরুচিকর। আপাতত মনের জোর দিতে হবে মিতুলকে। মিতুল বাচ্চা মেয়ে। নয়তো সে কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারে। তার পর সবটা খতিয়ে দেখতে হবে। অমিয়র সঙ্গে কথা বলতে হবে। অমিয়কে হীন ভাবতেও তার বন্ধুত্বে বাধছে।

ফোনের ওপাশে তখনও ফুঁপিয়ে চলেছে মিতুল। মিতুলকে কী বলবে মনে মনে সবটা সাজিয়ে নিল তিতাস কিন্তু কিছু বলার আগেই স্তব্ধ হয়ে গেল সে। তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে তীব্র তীক্ষ্ণ শীতল নিঃশ্বাস। মুহূর্তে এক ভয়াল শৈত্যপ্রবাহ নেমে গেল তার শিরদাঁড়া বরাবর। তিতাস বুঝতে পারল, সে এসেছে। আর সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার চেয়ারের পেছনে। চেয়ারের সঙ্গেই যেন আটকে গেল তিতাস। একই সঙ্গে অসম্ভব গরম আর শীত লাগছে তার। ধীরে ধীরে বহুমূল্য রত্নরাজিতে খচিত অলঙ্কারে ভূষিত দুটি সুডৌল হাত এসে পড়ল তিতাসের কাঁধে। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে লাগল তিতাসের। অস্ফুটে সে বলল, ইযুজ্জু ইনান্নাখ ইযুজ্জু ইনান্নাখ ইযুজ্জু ইনান্না।

কাতর কণ্ঠে মিতুল বলল, চুপ করে আছ কেন তিতাস দিদি? কিছু বলো।

চোখ খুলল তিতাস। তার কাঁধে হাত রেখে এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময়। তিতাসের কাঁধে মৃদু চাপ দিল সে। যেমন করে মানুষ পোষ্যকে অনুমতি দেয় ঠিক তেমন। তিতাস কান্নাভেজা গলায় বলে উঠল, ভালোবাসার মানুষ যখন এভাবে ধোঁকা দেয় তখন কী লাভ বল তো বেঁচে থেকে? এই যন্ত্রণা সহ্য করার থেকে মরে যাওয়া ভালো। তুই অনেক শক্ত মিতুল। অনেক শক্ত। পল্লব যদি আমার সঙ্গে এমন করত আমি হয়তো আত্মহত্যা করতাম। হয়তো কেন? আমি ঠিক আত্মহত্যা করতাম মিতুল। শেষ করে দিতাম নিজেকে। আমি সবসময় ব্যাগে ঘুমের ওষুধ রাখি। যদি কখনও পল্লব আমার সঙ্গে এমন করে আমি একসাথে সবক’টা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নেব। আমি আর কথা বলতে পারছি না মিতুল। আমি রাখছি।

ফোন রেখে শূন্য চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল মিতুল। তার মাথায় একটাই শব্দ বেজে চলেছে জাহাজের একঘেয়ে সাইরেনের মতো। আত্মহত্যা।

১৪

মাটি থেকে ওঠার চেষ্টা করল রোশনি কিন্তু তার আগেই সরিতের লাথিটা জমে গেল তার বুকের ঠিক মাঝখানে। রোশনির মনে হল কেউ যেন তার বুক থেকে সবটুকু হাওয়া নিংড়ে নিল। সে নেতিয়ে পড়ল ঘরের মেঝেতেই। অক্লেশে রোশনির দেহটা পাঁজাকোলা করে তুলে নিল সরিত তার পর আছড়ে ফেলল বসার ঘরের ডিভানটার ওপরে। সরিত জানে এখন কিছুক্ষণ অচেতন হয়েই থাকবে মাগিটা। টেবিলের ওপরে রাখা জলের বোতল থেকে খানিকটা জল খেল সে। হাত-পা একটু ছাড়িয়ে নিল স্ট্রেচ করে। অনেকক্ষণ সিঁড়ির নীচে মিটার ঘরের আড়ালে উবু হয়ে বসেছিল সে। কোমরটা ধরে গেছে।

রোশনি ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পরেই ফ্ল্যাটটাকে ভালো করে জরিপ করে নিয়েছিল সরিত। বাইরে একটা বড় গেট। সেখানে সিকিউরিটি আছে। ফ্ল্যাটে ঢোকার মুখে আবার একটা কোল্যাপসিবল গেট। সরিত আন্দাজ করেছিল রাত এগারোটার মধ্যে গেটগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। তাই সিকিওরিটি একটু আনমনা হতেই বেড়ালের মতো লঘু পায়ে সে ঢুকে পড়েছিল ভেতরে আর শরীরটা মিশিয়ে দিয়েছিল সিঁড়ির নীচের অন্ধকারে। চারপাশ শুনশান হতে বেরিয়ে এসেছে।

ঘরে একটা কম পাওয়ারের আলো জ্বলছে। ভালো করে দেখা যাচ্ছে না মাগিটার মুখ। সুইচ খুঁজে বড় আলো জ্বালিয়ে দিল সরিত। হ্যাঁ, এইবার দেখা যাচ্ছে। নাহ! মাগিটার মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। কোমর থেকে একটা বড় মাংসকাটা ছুরি বার করে টেবিলে রাখল সে। তারপর মাগিটার মুখের মধ্যে রুমাল ভরে দিয়ে মুখটা ভালো করে বেঁধে দিল। নাইলনের দড়ি বার করে বেঁধে ফেলল হাত আর পা। এবার সে যা যা করবে, মরার আগে পর্যন্ত মাগিটার প্রবল চিৎকার করার কথা। চিৎকারটা শুনতে পেলেই বেশি ভালো হত কিন্তু কিছু করার নেই। আশপাশে লোকজন আছে। যতটা সম্ভব নিঃশব্দে কাজটা সারতে হবে। নিজের গালে একবার হাত বোলাল সরিত। এখানেই চড় মেরেছিল মাগিটা। ছোট ভুল কিন্তু তার জন্য বড় খেসারত দিতে হবে মাগিটাকে। এমনিতেই মাগিটা অনেক কথা জেনে ফেলেছে। মরতে তো ওকে হতই। শুধু এখন মরাটা একটু বেশি যন্ত্রণার হবে। আগের বার মাগিটাকে অজ্ঞান করে কাটবে ভেবেছিল, এবার অজ্ঞান করার কোনও গল্প নেই। মাগিটার নরম গালে একবার হাত বোলাল সরিত। তারপর গাল বরাবর ব্লেডটা টেনে দিল। চড়াৎ করে ফাঁক হয়ে গেল গালের চামড়া আর ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল।

অসহ্য একটা যন্ত্রণায় চেতনা ফিরে এল রোশনির আর সে বুঝতে পারল সে বন্দি। গালটা অসম্ভব জ্বালা করছে। অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে ছাড়াতে পারল না সে। তার গলা ফাটানো চিৎকার মুখের ওই বাঁধন পেরিয়ে কিছুতেই বাইরে আসতে পারল না। বিস্ফারিত চোখে ছেলেটার দিকে তাকাল রোশনি। ব্লেডটা দেখিয়ে ঠান্ডা গলায় ছেলেটা বলল, এটা দিয়ে গালটা চিরে দিয়েছি। তাই জ্বলছে।

ভয়ে কুঁকড়ে গেল রোশনি। তার মনে পড়ে গেল বদ্রিনাথকে গলার নলি কেটে খুন করা হয়েছিল। এবার কি তবে ছেলেটা তার...? বাঁচার উদগ্র বাসনায় পাগলের মতো আছাড়িপাছাড়ি খেতে শুরু করল সে আর পাশ ফিরতেই তার চোখ আটকে গেল টেবিলের ওপর। টেবিলের ওপর একটা বিশাল চপার। ওটা কেন এনেছে ছেলেটা? কী করতে চায় ও? রোশনি বুঝতে পারল সে বমি করে ফেলেছে। মুখ দিয়ে বাইরে আসতে না পেরে বমিটা আতকে আছে গলায়। গলার তেতো ভাবটা যেন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে একটু একটু করে। একেই বুঝি মৃত্যুভয় বলে? এর চেয়ে বড় ভয়ের জন্ম হয়নি এ পৃথিবীতে। বুদ্ধিটা একটু একটু করে শিথিল হয়ে আসতে লাগল তার।

রোশনিকে ফের ঝিমিয়ে পড়তে দেখে ছেলেটা একটু হাসল। বলল, মানুষ যখন বুঝে যায় সে নিশ্চিত মরবে তখন ঠিক এই ভাবে হাল ছেড়ে দেয়। আর একটু পরেই তুই মুতে দিবি। কিন্তু তার আগে আমি তোর পোঁদটা মেরে নেব। তারপর ওই মাংসকাটা ছুরিটা দিয়ে তোর পোঁদের খাঁজ বরাবর সামনের দিকে তলপেট অবধি চিরে ফেলব আর তোর সুপুরির মতো ছোট ছোট মাইয়ের বোঁটা দুটো কেটে নেব। সে দুটো তোরই নাকের ফুটোয় গুঁজে দেব। ব্যস এটুকুই। তারপর আমি চলে যাব। তোর মুখ বন্ধ। তার ওপর বমি করে ফেলেছিস। নাকও বন্ধ হয়ে যাবে। দম নিতে পারবি না, ওদিকে গলগল করে রক্ত বেরোবে। সকালে এসে যখন দরজা ভেঙে লোকে তোকে বার করবে ততক্ষণে তুই মরে যাবি। খুব কষ্ট পেয়ে মরবি যদিও। কিন্তু কী করা যাবে বল? মানুষ নিজেই তার ভাগ্য লেখে। যদি আমায় চড়টা না মারতিস এত কষ্ট পেয়ে মরতে হত না। এবার তুই আমায় বলতেই পারিস, মারছিস মার। পোঁদ মারবি কেন? কারণ মারার আগে আমি তোকে অপমান করতে চাই। মানুষকে সবথেকে বেশি অপমান করা যায় তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে পোঁদ মেরে।

বলতে বলতেই রোশনির প্যান্টে হাত দিল ছেলেটা। প্যান্টটা টেনে নামানোর চেষ্টা করতে লাগল। আর নরকের নর্দমা থেকে উঠে আসা পূতিগন্ধময় কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রোশনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল এত সহজে সে মরবে না। অন্তত এই মূর্তিমান ঘেন্নাটার হাতে তো কিছুতেই না। মৃত বেড়ালটির মুখ বারবার ভেসে উঠতে লাগল রোশনির চোখের সামনে। নিজের জন্য না হলেও ওই বেড়ালটার মৃত্যুর তো প্রতিশোধ নিতেই হবে।

ছেলেটা প্যান্টের দড়ি খুঁজে পাচ্ছে না। রোশনি দেখল তার ঠিক সামনে একটা তেপায়া টুলের ওপর তার সাধের টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। অনেক দিন আগেই তারটা আলগা হয়ে গেছে। জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাচ্ছিল সে। ওভার কনফিডেন্সে ছেলেটা একটা ভুল করেছে। পুরো শরীরটা বাঁধেনি। মুহূর্তের ভগ্নাংশ সময় আছে তার হাতে। জোড়া হাত বাড়িয়ে ল্যাম্পের তারটা খুলে ফেলল রোশনি। অন্য প্রান্ত তখন প্লাগে গোঁজা। তারের খোলা মুখ এখন বিদ্যুৎবীর্যে পোয়াতি। এই সময় ঠিক দুটো ঘটনা ঘটল। রোশনির প্যান্ট আর প্যান্টি হাঁটু অবধি একটানে নামিয়ে ফেলে একবার থমকাল ছেলেটা। অদ্ভুত এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল তার মুখে আর তখনই বেজে উঠল রোশনির ঘরের কলিং বেল। চমকে দরজার দিকে তাকাল ছেলেটা। সেই অবকাশে রোশনি এক ঝটকায় উঠে বসল। তারের বিদ্যুৎবাহী প্রান্তটা দু’হাতে গুঁজে দিল ছেলেটার কানের মধ্যে। টাল সামলাতে না পেরে কাচের সেন্টার টেবিল ভেঙে উল্টে পড়ল ছেলেটা আর রোশনি জোড়া পায়ে লাফিয়ে গিয়ে খুলে দিল দরজার ছিটকিনি। পুরো ঘটনাটা ঘটতে সব মিলিয়ে পাঁচ সেকেন্ড সময় লাগল।

মিটিংটা ভালো হয়েছে। মহামান্য প্রোডিউসার গল্প শুনে খুশি হয়েছেন। যদিও একটা আইটেম সং ঢুকিয়ে দিতে বলেছেন কিন্তু তাতে আপত্তি করেনি পল্লব। পল্লব জানে সে নেহাতই মধ্যমেধার মানুষ। গোদার, তারকোভস্কি বা বার্গম্যান হতে সে আসেনি। সে যোগ্যতাও নেই তার। খুশি মনেই রোশনির দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল সে। আলোটা বন্ধ দেখে একটু খটকা লেগেছিল কিন্তু পাত্তা দেয়নি। আলো জ্বালিয়ে বেল দিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই ভেতরে একটা জোর শব্দ হল আর তারপর মুহূর্তেই দরজা খুলে তার গায়ের ওপর এসে পড়ল রোশনি। রোশনিকে দেখে হতবাক হয়ে গেল সে। রোশনির গালে একটা টাটকা ক্ষত। সেখান দিয়ে রক্ত পড়ছে। মুখ রুমাল দিয়ে আর হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা এবং রোশনির পরনের প্যান্ট ও অন্তর্বাস হাঁটু অবধি নামানো। পল্লবকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ধাক্কা মেরে একটু সরিয়ে দিল রোশনি তারপর নিজেও বাইরে বেরিয়ে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বাইরে থেকে টেনে দিল হ্যাজবোল্ড। মুখের রুমালটা সরিয়ে হড়হড় করে বমি করে দিল। বমি করতে করতেই অস্ফুটে বলল, দরজা খুলবেন না পল্লবদা। ভেতরে ও আছে।

তারপরই অচেতন হয়ে পড়ে গেল পল্লবের গায়ের ওপর। রোশনিকে ধরেই কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পল্লব। কী হচ্ছে সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই তার তবে এটুকু বুঝতে পারছে, এই বন্ধ দরজার ওপারে রয়েছে কোনও মূর্তিমান বিভীষিকা। বড় করে কয়েকটা শ্বাস নিল সে। চঞ্চল স্নায়ুগুলোকে বাগে আনার চেষ্টা করল। ধীরে ধীরে রোশনিকে শুইয়ে দিল দরজার সামনে। তার প্যান্ট আর অন্তর্বাস তুলে দিল কোমর পর্যন্ত। তারপর বেল দিল উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের দরজায়। গলায় যত জোর আছে সবটা এক জায়গায় করে চেঁচিয়ে উঠল, সিকিউরিটি। হেল্প।

১৫

ভোর হচ্ছে। আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হতে শুরু করেছে। গঙ্গার ওপরের আকাশে ইতস্তত উড়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটা পাখি। তারা ডাকছে। বোধ হয় বাকিদের ঘুম থেকে ডেকে তুলছে। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে জেটিটা। ডকের একটা কোণের দিকে বসে আছে দু’জন মানুষ। একজন বুড়ো মতো। আর একজন জোয়ান। ওরা গুরু-শিষ্য। লোকনাথ আর সরিত।

মাথা নীচু করে পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে সরিত আর তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে লোকনাথ। আচমকা বাঁ হাত দিয়ে সরিতের কানের কাছে কষিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল সে। চড়টা খেয়েও মুখ তুলে তাকাল না সরিত। নীচু গলায় বলল, মাফ করে দাও কত্তা। ভুল হয়ে গেছে।

কোনও উত্তর না দিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকনাথ। সরিতের সঙ্গে তার কথা বলার প্রবৃত্তি হচ্ছে না। কোন একটা মেয়েছেলেকে মারতে না পেরে সরিত ফিরে এসেছে বলে লোকনাথের কোনও আক্ষেপ নেই। তার আক্ষেপ এখানেই যে সরিত ওই মেয়েছেলেটাকে অনেকগুলো কথা বলে ফেলেছে। মেয়েটা সরিতকে চিনে ফেলেছে। এবার মেয়েটা পুলিশের কাছে যাবে। সেখানে সরিতকে কেমন দেখতে ছিল সে সব বলবে আর একই সঙ্গে এটাও বলে দেবে যে পেটে দাঁত ঢুকে এখনও অবধি ছ’টা বাচ্চা মারা গেছে। যদিও আসলে সাতটা বাচ্চা। কিন্তু সুদেব আর পম্পির মেয়ের ব্যাপারটা কেউ জানে না বলেই লোকনাথের বিশ্বাস। যেই নাড়াঘাঁটা হবে ওমনি এই বাচ্চাদের মৃত্যু নিয়ে হইহল্লা শুরু হবে। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারবে ওই ছ’টা বাচ্চার মধ্যে অন্তত তিনটে বাচ্চার বাড়িতে একটা বুড়ো মতো খোঁড়া জমাদার আসত। যে শেষ কিছুদিন ধরে আসছে না। বাকি তিনটে বাচ্চার বাড়ির লোক আর ইশকুলে খবর নিয়ে পুলিশ এটাও জানতে পারবে যে একটা ফর্সা মতো সুন্দর দেখতে বেলুনওয়ালা ইশকুলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত। সেও অনেকদিন বেপাত্তা। তারপর যদি পুলিশ সন্দেহভাজনদের ছবি আঁকায় তা হলে তো আর কথাই নেই। ভাসা ভাসা হলেও তার এবং সরিতের একটা চেহারা পুলিশের কাছে চলে আসবে। তাতে অবশ্য পুলিশ তার বালটাও ছিঁড়তে পারবে না কিন্তু মাঝখান থেকে আসল কাজটা পিছিয়ে যাবে। এখনও ছ’টা বাচ্চা মারতে হবে। লোকনাথ চেয়েছিল, সরিত বর্ধমান থেকে ফিরে এলেই কাজ শুরু করে দেবে। এবার আর একটা একটা করে না। একসাথে ছ’টা বাচ্চার চুল জোগাড় করে ফেলবে। কিন্তু সরিত এমন প্যাঁচাল পাকিয়ে রেখেছে যে ক’দিনের জন্য চুপচাপ থাকতেই হবে। যতবার সে সিদ্ধির কাছাকাছি যায় কোনও না কোনওভাবে তাকে পিছিয়ে আসতে হয়। হতাশায় চোখে জল এল লোকনাথের। অথচ জীবনের কাছে এর বেশি কিছু তো চায়নি সে। মানুষ কত কিছু চায়। গাড়ি, বাড়ি, ধন, দৌলত, ক্ষমতা, খ্যাতি কত কিছু। কিচ্ছু চায়নি সে। শুধু সাধনা করতে চেয়েছে। সিদ্ধিলাভ করতে চেয়েছে। আর সিদ্ধি না হওয়া অবধি যে তার মুক্তি নেই। সে যে সত্যবদ্ধ। সে যে কথা দিয়েছিল চিন্ময়ীকে। এ পৃথিবীর একমাত্র নারী যাকে লোকনাথ ভালোবেসেছিল।

চিন্ময়ী চলে গেছে আজ কত বছর হবে? হিসেব গুলিয়ে যায় লোকনাথের। পঁয়ত্রিশ বছর না চল্লিশ? কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য লোকনাথ ভুলতে পারেনি সেই দিনটার কথা। সেদিনের সেই ক্ষত আজও লোকনাথের মনে সদ্য কাটা ঘায়ের মতো দগদগে হয়ে আছে। সেই দিনের পরেই তো লোকনাথ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, মানুষ হয়ে থেকে কোনও লাভ নেই। মানুষ বড় দুর্বল প্রাণী। প্রিয়জনকে রক্ষা করার ক্ষমতা মানুষের নেই। তাই ঈশ্বর কিংবা রাক্ষস হতে হবে। ঈশ্বর হওয়া কঠিন। মানুষ ঈশ্বর হতে পারে না। কিন্তু চাইলেই রাক্ষস হওয়া যায়। লোকনাথ রাক্ষস হয়েছে।

লোকনাথ বোঝে তার বয়স হচ্ছে। শরীরের জোর তো কমে আসছেই। মনটাও আজকাল মাঝে মাঝে বশে থাকে না। কেমন যেন হতাশ লাগে। মনে হয়, সে বুঝি শেষ অবধি পেরে উঠবে না। এই এখন যেমন লাগছে। ভোরের গঙ্গার শীতল হাওয়াও তার ক্লান্তি দূর করতে পারছে না। একটা সিঁড়ির ওপর বসে পড়ল লোকনাথ। একটু যেন ঝিমুনি এসেছে। আচমকা সোজা হয়ে বসল সে। চোখ দুটো জ্বলে উঠল ধক করে। নাহ, হার মানলে হবে না। সে লোকনাথ চক্কোত্তি। তার জন্মই হয়েছে সাধনা করার জন্য। যখনই এই ক্লান্তি আসে লোকনাথ মনে করে তার অতীতকে। অতীতের সব বঞ্চনা, অপমান, যন্ত্রণার স্মৃতি নতুন শক্তি দেয় তাকে। মানুষকে ঘেন্না করার শক্তি। চোখ বোজে লোকনাথ। হু হু করে পিছিয়ে যায় অনেক অনেক বছর আগে।

তখন তার বয়স কত? বছর কুড়ি হবে। সেই প্রথমবার টের পেয়েছিল মানুষ আসলেই বেজন্মা। জন্ম প্রক্রিয়াটাই অমন নোংরা বলে মানুষ জন্মায় পাঁকগন্ধ বুকে নিয়ে। মানুষের মনের ভেতরটা তাই যৌনাঙ্গের মতোই পিচ্ছিল, দুর্গন্ধ, স্যাঁতস্যাঁতে।

ছোট থেকেই লোকনাথের ঝোঁক ছিল পুজোআচ্চার ওপর। লোকনাথের বাবা-মা আবার দু’জনেই পুরনো কমিউনিস্ট। তাদের বাড়িতে ঠাকুরের আসন ছিল না। তার বদলে ছিল কাঠের আলমারি বোঝাই বই। এমন বাড়ির ছেলের নাম লোকনাথ হয়েছিল কারণ ঠাকুমা। তিনি আবার ছিলেন লোকনাথ বাবার অন্ধ ভক্ত। ছোট থেকেই লোকনাথ অদ্ভুত প্রকৃতির। বেশির ভাগ সময়টাই সে চুপ করে বসে থাকত। মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেছিল তাকে বই পড়ানোর, গান শেখানোর, আঁকা শেখানোর। কিন্তু কিছুই লোকনাথের ভালো লাগত না। অথচ তার স্মৃতিশক্তি ছিল মারাত্মক। একবার কিছু দেখলে সে ভুলত না। যত ঠাকুর দেবতা আছে সবার পুজোর মন্ত্র ছিল তার কণ্ঠস্থ। লুকিয়ে লুকিয়ে এসব বই কিনত সে। একটা সময়ের পর বাবা-মা হাল ছেড়ে দিয়েছিল। লোকনাথ বুঝত মা কিংবা বাবা কেউই তাকে পছন্দ করে না। তাদের সবটুকু ভালোবাসা ছিল বোনকে ঘিরে। বোনও বেড়ে উঠছিল মা-বাবার মনের মতো করেই। সে যে অবহেলিত তা নিয়ে লোকনাথের কোনও কষ্ট ছিল না। ঘরের এক কোণে বসে মনে মনে মা কালীর ধ্যান করতে পারলেই সে আর কিছু চাইত না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঘরে থাকতে আর ভালো লাগত না লোকনাথের। স্কুলের পাট চুকেছিল অনেক আগেই। কলেজে ভর্তি হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। পাতাভর্তি গাঁজাখুরি লেখা পড়তে বয়েই গেছে লোকনাথের। সে তখন ঘুরে বেড়ায় শ্মশানে শ্মশানে। শ্মশানের মধ্যে একটা অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য আছে। যা একটু একটু করে ঢুকে যেত লোকনাথের মাথার মধ্যে। আগুন জ্বালিয়ে মা কালীর স্তব করত লোকনাথ। মধ্যবিত্ত পাড়ায় এসব খবর চাপা থাকে না। রটে গেল লোকনাথ তন্ত্রসাধনা করে। লোকজন লোকনাথকে এড়িয়ে চলতে শুরু করল। বাবা-মা আগে থেকেই মাঝে মাঝে একটা কথা বলত। তারা বলত, লোকনাথ আমাদের ছেলে নয়। মনে হয় বদলাবদলি হয়ে গেছে। এবার পাড়াসুদ্ধু লোকের সামনে সে কথা বলতে শুরু করল। লোকনাথেরও মনে হতে লাগল সে এ বাড়ির আশ্রিত। মূল বাড়ি থেকে বেরিয়ে পেছনের দিকে যেখানে ভাড়াটেরা থাকত সেখানেই একটা ছোট ঘরে নিজের সংসার গুছিয়ে নিল সে। আসলে তখনই বাড়ি ছাড়ার মতো মনের জোর ছিল না তার।

এভাবেই দিন কাটছিল। মা, বাবা, বোন কেউ লোকনাথের সঙ্গে কথা বলত না। সেও ঘাঁটাত না ওদের। ততদিনে লোকনাথ স্বপাক খেতে শুরু করেছে। তবে হ্যাঁ, চাল, ডাল, আলু বাড়ি থেকেই আসত। দাওয়ায় নামিয়ে রেখে চলে যেত কাজের লোক। সবাই যেন লোকনাথকে ভয় করতে শুরু করেছিল। শুধু ভয় করত না একজন। উল্টোদিকের ঘরে ভাড়া থাকত কমল হালদার বলে একটা লোক। সে তার বউ রেখা আর তিন বছরের ছেলে সুমনকে নিয়ে থাকত। কমল কী কাজ করত লোকনাথ জানে না। সকাল হলেই সে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যেত। ফিরত অনেক রাত করে। রেখা ভারী ভালো ব্যবহার করত লোকনাথের সঙ্গে। লোকনাথের থেকে সে বড়জোড় বছর পাঁচেকের বড় হবে। লোকনাথকে সে ঠাকুরমশাই বলে ডাকত। মাঝে মাঝেই দুপুরবেলা ছেলের হাত ধরে লোকনাথের দাওয়ায় এসে দাঁড়াত। বলত, কী রান্না হচ্ছে ঠাকুরমশাই?

লোকনাথ হাঁড়ির সরা তুলে দেখাত, এই তো সেদ্ধভাত।

রেখা বলত, কী করে রোজ সেদ্ধভাত খাও ঠাকুরমশাই? আমি আজ কাঁঠালের বিচি দিয়ে ডিমের ডালনা রেঁধেছি। খাও না একটু।

লোকনাথ হেসে মাথা নাড়ত।

অনুযোগের সুরে রেখা বলত, কেন? আমার হাতে খেলে তোমার জাত যাবে?

বেশ সহজ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল রেখা আর লোকনাথের মধ্যে। রেখা রোজ সকালে লোকনাথের দাওয়ায় ফুল তুলে রেখে দিত। বিকেলের রোদ মরে এলে লোকনাথের ঘরের বাইরেটায় এসে বসত। চুল বাঁধতে বাঁধতে সংসারের নানা গল্প করত। বলত, স্বামীর সঙ্গে তেমন সদ্ভাব নেই। কমল তাকে বাপের বাড়ি যেতে দেয় না।

চুপচাপ শুনত লোকনাথ। জাগতিক ব্যাপারে তার আগ্রহ বরাবর কম। নয়তো সে বুঝতে পারত কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে রেখা চকিতে যেভাবে তার দিকে তাকায় তাকে আর যাই হোক স্বাভাবিক দৃষ্টি বলা চলে না। লোকনাথ বুঝতে পারেনি রেখা আসলে জমি তৈরি করছিল। কিন্তু সংসার জীবনে অভিজ্ঞ রেখা বুঝেছিল এই খামখেয়ালি ঠাকুরমশাইকে দুঃখের গল্প শুনিয়ে লাভ হবে না। তাই সে ঠিক করে ফেলেছিল বড় ঘা দেবে।

সেটা ছিল একটা গরমকালের বিকেল। লোকনাথ চৌকিতে শুয়ে ঝিমোচ্ছিল। হঠাৎ কানে এসেছিল চাপা গলায় রেখা ডাকছে, ঠাকুরমশাই। ও ঠাকুরমশাই।

ধড়মড় করে উঠে বাইরে এসেছিল লোকনাথ। রেখা দাঁড়িয়ে আছে ঘরের সামনেই। মুখটা বিকৃত করে সে বলেছিল, হাঁটুর কাছে খুব ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে পেকে উঠেছে। একটু দেখবে গো?

কোনও সন্দেহ না করেই লোকনাথ ঘরের ভেতর ডেকে নিয়েছিল রেখাকে। লোকনাথের চৌকিটা বেশ উঁচু। সেটার ওপরেই পা ঝুলিয়ে বসেছিল রেখা। লোকনাথ সরল মনে বলেছিল, কী হয়েছে গো?

পরনের কাপড়টা হাঁটু অবধি তুলে দিয়েছিল রেখা। নিজের হাঁটুর ওপরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিল, এই যে এইখানে। ঘরে তেমন আলো ছিল না। অস্বস্তি হলেও ঝুঁকে দেখতে গেছিল লোকনাথ আর তখনই ভয়ংকর কাণ্ডটা করেছিল রেখা। দু’ হাতে লোকনাথের মাথাটা ধরে গুঁজে দিয়েছিল নিজের উরুসন্ধিতে। এক মুহূর্তের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়েছিল লোকনাথ। কিন্তু সেই বিহ্বলতা কাটতেই ঘেন্না পেয়েছিল সে। সামুদ্রিক শ্যাওলার মতো এক ভিজে ভাব বিবমিষা জাগিয়ে তুলেছিল তার সারা শরীর জুড়ে। এক ধাক্কায় রেখাকে সরিয়ে দিয়েছিল সে কিন্তু সামলাতে পারেনি। রেখার গায়ের ওপরেই বমি করে দিয়েছিল।

পরের দিন তার পা ধরে ক্ষমা চেয়েছিল রেখা। ক্ষমা করেওছিল লোকনাথ। কিন্তু মেয়েদের মনের ভেতর কী চলছে সে কথা দেবতারাও বুঝতে পারে না, সেখানে লোকনাথ তো সামান্য মানুষ। তখনও লোকনাথ মানুষ ছিল।

ধীরে ধীরে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল রেখার সাথে। দু’জনের কেউই ভুলেও ওই প্রসঙ্গ মুখে আনত না। কিন্তু লোকনাথ এবারও বুঝতে পারেনি রেখা আবার জমি তৈরি করছে। গায়ে বমি করে দেওয়ার অপমান সে ভুলতে পারেনি। আজ অবধি অমন ভয়াবহ ভাবে কেউ তাকে প্রত্যাখ্যান করেনি। তাই ভয়াবহ এক প্রতিশোধের অপেক্ষায় ছিল সে। তারই জমি তৈরি হচ্ছিল।

আবার একটা বিকেল। অবশ্য তখন বর্ষা পার হয়ে শরৎকাল এসে পড়েছে। আবার বাইরে থেকে ডেকেছিল রেখা। লোকনাথ বাইরে বেরোতে বলেছিল, একটা অনুরোধ করব ঠাকুরমশাই?

সন্দেহের চোখে রেখার দিকে তাকিয়েছিল লোকনাথ। একটা ঘৃণ্য বিকেলের স্মৃতি তাকে বিরক্ত করছিল। রেখা বলেছিল, তুমি তো জানো সুমনের বাবা আমাকে বাপের বাড়ি যেতে দেয় না। মা-বাবা নাতির মুখ দেখার জন্য হাপিত্যেশ করে। আজ একটা সুযোগ এসেছে। সুমনের বাবা আজ ফিরবে না। আমি বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে চলে চলে আসতে পারব।

তখনও অনুরোধটা বুঝতে পারছিল না লোকনাথ। বলেছিল, আমায় কী করতে হবে?

রেখা বলেছিল, এখানে অনেকেই কমলের চেনা। আমি সুমনকে নিয়ে বেরোলে ঠিক ওর কানে খবর পৌঁছে যাবে। তুমি যদি সুমনকে নিয়ে একটু আগে বেরিয়ে শ্মশানের কাছে অপেক্ষা করো খুব ভালো হয়। আমি পৌঁছে যাব।

খুবই সাধারণ প্রস্তাব। আপত্তি করার কোনও কারণ দেখতে না পেয়ে লোকনাথ রাজি হয়ে গেছিল। কিন্তু ওই রাজি হওয়াই কাল হল। লোকনাথ সুমনকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রেখা রটিয়ে দিল তার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকজন লোকনাথকে বাচ্চাটার সাথে দেখেছিল। তারা বলে দিল, লোকনাথ বাচ্চাটাকে নিয়ে শ্মশানের দিকে গেছে। এটারই অপেক্ষায় ছিল রেখা। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে আছাড় খেয়ে কেঁদে পড়ল, ও আমার ছেলেকে বলি দেবে গো। আমার ছেলেটাকে বাঁচাও।

সেই সময়ের নিস্তরঙ্গ জীবন কিছু একটা নতুন খবর পেলেই নেচে উঠত। তার ওপর লোকনাথকে কেউই তেমন পছন্দ করত না। সঙ্গে সঙ্গে লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে তৈরি হয়ে গেল। আর ভাগ্যের এমনই ফের সেদিনই শ্মশানের কাছে বাচ্চাটাকে নিয়ে অপেক্ষা করতে করতে শ্মশান লাগোয়া কালীমন্দিরে ঢুকেছিল লোকনাথ। বাচ্চাটার কপালে এঁকে দিয়েছিল প্রসাদী সিঁদুরের টিপ। লোকজন ওই অবস্থাতেই উদ্ধার করেছিল লোকনাথ আর বাচ্চাটাকে। রেখা লোকনাথকে মার খাওয়াতে চেয়েছিল। কিন্তু শাস্তির পরিমাণটা বেশি হয়ে গেল। লোকনাথ মার তো খেলই। বাবা-মা ত্যাজ্য করল তাকে। জুতোর বাড়ি মেরে বার করে দিল বাড়ি থেকে। সেই শুরু হল লোকনাথের ভবঘুরে জীবন।

প্রথমটায় কেমন যেন দিশাহীন হয়ে পড়েছিল লোকনাথ। কী থেকে কী হল কিছুই বুঝতে পারছিল না। পরে ধীরে ধীরে সবটা পরিষ্কার হল তার কাছে। কিন্তু কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না তার। অসহ্য রাগ বুকের মধ্যে পুষে রাখল লোকনাথ আর সেই শুরু হল তার মানুষকে বিশেষ করে মেয়েমানুষকে ঘেন্না করা।

ভাদুড়ি মশায় বলতেন, লোকনাথের হাতির মতো স্মৃতিশক্তি। কিচ্ছু ভোলে না। সত্যিই ভোলেনি লোকনাথ। অনেক বছর পরে রাক্ষস কিংবা অসুর হওয়ার পরে সে খুঁজে বার করেছিল রেখাকে। না মারেনি। হাত দুটো কবজি থেকে কেটে নিয়েছিল আর কেটে নিয়েছিল জিভটা। মরে গেলে রেখার প্রায়শ্চিত্ত হত কী করে?

কত্তা।

সরিতের ডাকে ভাবনার ঘোরটা ছিঁড়ে গেল লোকনাথের। এতক্ষণে আবার বেশ মনে জোর পেয়েছে সে। ঘুরে তাকাল সরিতের দিকে। এখন আর সে চোখে রাগ নেই। বরং একটা ক্ষমাসুন্দর ভাব ফুটে উঠেছে। এই ছেলেটাকে বড় পছন্দ করে লোকনাথ। কাজ করতে গেলে ভুলচুক তো হবেই। আর এই তো ভুল করার বয়স। কম বয়সে লোকনাথও কি ভুল করেনি? সবচেয়ে বড় ভুল করেছিল রমার আত্মাকে অরক্ষিত রেখে দিয়ে। এই ভুল যদি সে না করত তা হলে তিতাস নামের মাগিটা তার এত বছরের সাধনায় জল ঢেলে দিতে পারত না। যদিও এবার আর সে ভয় নেই। সে আপদ চুকে গেছে। নিজেই নিজের কপাল পুড়িয়েছে ভাগ্না। এই আনন্দে লোকনাথ খানিক হেসে নিল। এই যে সে তিতাসের এত বড় সর্বনাশ করেছে, রমা থাকলে কি চুপ করে বসে থাকত? থাকত না। যে করে হোক ওই ভাদুড়ি বুড়োকে জানিয়ে দিত।

লোকনাথের চোখ দেখে বুঝি খানিকটা সাহস পেল সরিত। পায়ের কাছে বসে পড়ে বলল, এবার কী হবে কত্তা? ক’টা দিন তো চুপ করে থাকতেই হবে। মাগিটা রিপোর্টার। পুলিশের কাছে তো যাবেই।

তা যাবে। তুই কি পুলিশকে ভয় খাস?

চোয়াল শক্ত হল সরিতের, তোমাকে ছাড়া সরিত কাউকে ভয় পায় না কত্তা। তবে কী জানো তো, ওই জেলের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে হবে ভাবলেই দম আটকে আসে।

তোরে আমি জেলে যেতেও দেব না। তোরে আমার দরকার। কিন্তু কী করে পুলিশের চোখ এড়ানো যায় সেইটাই ভাবছি। মাগিটার ছবি আছে তোর কাছে? দেখাতে পারবি একবার?

পারব কত্তা। একটা মিনিট সময় দাও। আমি একটা ফোন জোগাড় করে আনছি। মেয়েটা আছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

দৌড়ে গিয়ে একটা ফোন নিয়ে এল সরিত। তারপর একটু ঘাঁটাঘাঁটি করতেই খুঁজে পেয়ে গেল রোশনির অ্যাকাউন্টটা। ফোনটা বাড়িয়ে দিল লোকনাথের দিকে, এই যে কত্তা মাগিটার অ্যাকাউন্ট।

ফোনটা একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে সরিতের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে লোকনাথ বলল, মেয়েটা তোর নাম জানে?

না কত্তা, আমি ওকে নিজের নাম বলিনি। বলেছিলাম আমার নাম গেনু।

হুম। আঙুল দিয়ে ধুলোর ওপর আঁকিবুঁকি কাটতে লাগল লোকনাথ।

আচমকা সরিত বলে উঠল, উপায় আছে কত্তা।

কী উপায়?

একটু হেসে সরিত বলল, ধরো পুলিশ আমাকে ধরে নিল। মেয়েটা এসে আমাকে শনাক্তও করল। এরপর আমি যদি বলিও আমার একটা যমজ ভাই আছে, যাকে অবিকল আমার মতো দেখতে, পুলিশ কি আমার কথা বিশ্বাস করবে? করবে না। কারণ বিপদে পড়ে বাঁচার জন্য সবাই এ ধরনের আবোলতাবোল কথা বলে।

বাঁকা একটা হাসি ফুটে উঠল লোকনাথের মুখে। তার পর সে বলল, তুই তো দিনে দিনে গেনুরেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিস বাপ। নিজের ভাইরে জুয়োর ঘুঁটি করতে বোধ হয় গেনুও পারত না। তোর বুদ্ধিটা মন্দ না। কিন্তু তড়িৎ? তারে কতটা ভরসা করা যায়? সব বলে দেবে না তো পুলিশরে? বললেই কিন্তু চিত্তির।

লোকনাথের চিন্তা উড়িয়ে দিল সরিত, ধুর, ও আমাদের ব্যাপারে কতটুকু জানে? যা বলেছি করে গেছে। ভেতরের কথা ও কিছুই জানে না। তাই পুলিশ আমার নাগাল পাবে না। আর এসব তো অনেক পরের কথা। তড়িৎ যদি সব জানতও তা হলেও পুলিশকে কিছু বলত না। কারণ ও জানে, আমার নামে চুকলি খেলে আমি ওর গলা কেটে দেব।

খিক খিক করে হেসে লোকনাথ বলল, এইটা ঠিক বলেছিস। ও তোরে যমের মতো ভয় পায়। মাঝে মাঝে ঘর বন্ধ করে তুই ওরে মারিস না কি?

উত্তর দিল না সরিত। একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার ওপর আর তোমার রাগ নেই তো?

মাথা নাড়ল লোকনাথ, উঁহু। তবে এবার থেকে একটু বুঝেশুনে চলিস।

উঠে দাঁড়াল সরিত। মুখটা বিকৃত করে বলল, ওই মাগিটাকে তো আমি মারবই কত্তা। খুব বেশি সময় লাগবে না। তবে আমার জন্য তোমার সাধনায় ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে আমি একটা কাজ করেছি।

কী রে?

পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বার করল সরিত। তাতে কয়েকটা কাগজের পুরিয়া। সেগুলো হাতে নিয়ে বলল, ছ’টা বাচ্চার চুল আছে কত্তা। ফেরার পথে ফুটপাথ ঘুরে ঘুরে সুস্থ, সবল, তোমার বলে দেওয়া সুলক্ষণ মিলিয়েই জোগাড় করেছি। সব ক’টারই বয়স নয়ের কম। তোমার তো ভদ্রঘরের বাচ্চা না হলে মন ওঠে না। কিন্তু এগুলোও খারাপ না বিশ্বাস করো। কাজ শুরু করে দাও কত্তা। যা করার একবারে করে ফেলো।

একটুক্ষণ সরিতের দিকে তাকিয়ে রইল লোকনাথ। মুখে ফুটে উঠল মৃদু হাসি। সরিতের মাথায় আদরের হাত বুলিয়ে বলল, এই জন্য তোরে আমি গেনু বলে ডাকি। কাজের কাজ করেছিস। তবে ওখান থেকে একটা বাচ্চার চুল ফেলে দে।

কেন কত্তা?

তেরো নম্বর বাচ্চাটারে এভাবে মারলে হবে না। ওরে জ্যান্ত লাগবে।

১৬

হু হু করে গাড়িটা ছুটছিল বাইপাস দিয়ে। পল্লব চালাচ্ছে। পাশে বসে আছে রোশনি। চুপ করে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে সে। দুটো দিন কেটে গেছে কিন্তু এখনও সেই রাতের দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পায়নি সে। ট্রমাটা কাটতে পল্লবেরও সময় লেগেছে।

পল্লবের চিৎকারে খুব দ্রুত লোকজন জড়ো হয়ে গেছিল সে রাতে। পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতি অচেতন রোশনিকে নিয়ে ঘরে চলে গেছিলেন। খবর দেওয়া হয়েছিল পুলিশকে। পুলিশ এসে দরজা খুলে দেখেছিল ঘরে কেউ নেই। পুলিশ আন্দাজ করেছিল, চেঁচামেচিতে সবাই যখন এই ঘরের দরজায় জড়ো হয়েছে সেই অবকাশে আততায়ী ব্যালকনি দিয়ে নেমে পাঁচিল টপকে পালিয়েছে। তিনতলার ব্যালকনি থেকে নীচে তাকিয়ে আঁতকে উঠেছিল পল্লব, এদিকে তো রেন ওয়াটার পাইপ নেই। তা হলে নামল কী করে?

যে অফিসার এসেছিলেন তিনি একটু ভুরু কুঁচকে থেকে বলেছিলেন, সেক্ষেত্রে তো একটাই অপশন পড়ে থাকে। লাফ দেওয়া।

কথাটা মানতে পারেনি পল্লব, এখান থেকে লাফ দিলে তো নিশ্চিত ভাবে হাত-পা ভেঙে যাওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে বাইরের অত বড় পাঁচিলটা সে টপকাবে কী করে?

অফিসার বলেছিলেন, কিন্তু টপকেছে এটা তো শিওর। আমরা পুরো প্রিমাইস চিরুনি তল্লাশি করেছি। কেউ নেই।

পল্লবের হাঁ মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন, আপনার অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি। ব্যাপারটা সত্যিই অমানুষিক।

আর এই অমানুষিক শব্দটাই পরের দিন সকালে পল্লবের মাথার মধ্যে নতুন করে আছড়ে পড়েছিল, যখন সে রোশনির মুখে শুনেছিল, আততায়ীর নাম গেনু। কিছুক্ষণের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেছিল সে। তারপর কাঁপা গলায় বলেছিল, কী নাম বললে?

পল্লবের ফ্যাকাসে মুখ দেখে রোশনিও যেন নতুন করে ভয় পেয়েছিল, নামটা শুনে এমন চমকে উঠলেন কেন পল্লবদা?

উত্তর না দিয়ে পল্লব ভাবছিল, আততায়ীর চেহারার যে বর্ণনা রোশনি দিয়েছে তার সঙ্গে তো গেনুর চেহারার কোনও মিল নেই। তা ছাড়া গেনু তো তাদের চোখের সামনেই শেষ হয়ে গেছিল। তবে কি আবার নতুন কোনও রূপ ধরে ফিরে এসেছে সেই বিভীষিকা? রোশনিকে সে বলেছিল, আচ্ছা রোশনি, তুমি শিওর যে এসেছিল সে মানুষ?

প্রশ্নটা শুনে অবাক হয়ে গেছিল রোশনি। তার পর চোয়াল শক্ত করে বলেছিল, আর যাই হোক মানুষ নয় পল্লবদা। মানুষ অতটা নৃশংস হতে পারে না।

কিচ্ছু মেলাতে পারছিল না পল্লব কিন্তু অব্যক্ত একটা ভয় তাকে বিবশ করে দিচ্ছিল ক্রমশ। সেই মুহূর্তেই পল্লব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই রহস্যের সমাধান যিনি করতে পারবেন সময় নষ্ট না করে তাঁর কাছেই যেতে হবে। রোশনিকে বলেছিল, আজ তো হবে না। কাল তোমায় নিয়ে এক জায়গায় যাব। ফাঁকা থেকো।

ইচ্ছে করেই আজ তিতাসকে সঙ্গে আনেনি পল্লব। রোশনির সাথে তিতাসের ওই দুর্ব্যবহারের ব্যাখ্যা এখনও খুঁজে পায়নি সে। যদিও তিতাস বলেছে, ওই সময়টার কথা তার কিছুই মনে নেই কিন্তু কথাটাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি পল্লব। তিতাসকে অবিশ্বাস করতে তার মোটেই ভালো লাগছে না কিন্তু তিতাস যা বলছে তা যদি সত্যি হয় তা হলে ধরে নিতে হবে তিতাসের শর্ট টার্ম মেমোরি লস হয়েছে। ওই একটি ঘটনা ছাড়া তেমন কোনও লক্ষণ এখনও পল্লবের চোখে পড়েনি।

* * *

শ্রীরঞ্জনীর লাইব্রেরি ঘরে ঢুকে ঘটনার গৌরচন্দ্রিকাটা সেরে নিয়েছিল পল্লবই। তারপর বলতে শুরু করেছিল রোশনি। ভাদুড়ি মশায় বলেছিলেন, তুচ্ছতম ঘটনাও বাদ দেবে না মা। যা হয়েছে সব বলবে আমাকে।

পুলিশকে তো সে সবটাই বলেছে, তারপরেও পল্লবদা কেন এই বৃদ্ধের কাছে নিয়ে এল এবং কেন তিনি আবার সবটা শুনতে চাইছেন সেটা রোশনি বুঝতে পারছিল না। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছিল, এই বৃদ্ধের উপস্থিতির মধ্যে একটা নিবিড় আশ্রয় আছে। যা এই বিক্ষুব্ধ সময়ে তাকে শান্তি দিচ্ছিল। জোগাচ্ছিল সাহস। বদ্রিনাথের ফোন পাওয়া থেকে শুরু করে সে দিনের রাতের ঘটনা অবধি সবটাই বলেছিল রোশনি।

পুরোটা সময় চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়েছিলেন বৃদ্ধ। তারপর মাথা তুলে বললেন, সবই শুনলাম। তুমি যে বিপদের মধ্যে আছ আমি বেশ বুঝতে পারছি কিন্তু আমি কীভাবে তোমায় সাহায্য করব বুঝতে পারছি না। অবশ্য আমার প্রয়োজন না থাকলে পল্লব তো তোমাকে আমার কাছে আনতও না।

পল্লব বলল, স্যার আপনি এখুনি সবটা বুঝে যেতেন রোশনি যদি সবটা আপনাকে বলত।

রোশনি অবাক হল, সবই তো বলেছি পল্লবদা। কিচ্ছু বাদ দিইনি।

আসল জিনিসটাই তুমি বাদ দিয়ে ফেলেছ রোশনি। ছেলেটা ছেলেটা করে কথা বলে গেছ। নামটা বলোনি। স্যার, যে ছেলেটি রোশনির ওপর অ্যাটাক করেছিল সে তার নাম বলেছিল গেনু।

অচেতন মানুষকে স্মেলিং সল্ট শোঁকালে সে যেমন ভাবে শিউরে ওঠে ঠিক সেই ভাবে সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। পল্লব দেখল তাঁর সেই গভীর প্রজ্ঞাবাহী দুই চোখ আছন্ন হল তীব্র আতঙ্কে। যদিও মুহূর্তেই সামলে নিলেন নিজেকে তবু তাঁর সেই ভীত দৃষ্টি পল্লবকে দিশাহীন করে তুলল।

কী নাম বললে পল্লব? উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ল ভাদুড়ি মশায়ের কণ্ঠে।

স্যার, গেনু। বলতে গিয়ে যেন নতুন করে গলা কেঁপে গেল পল্লবের।

কথাটা শুনে সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তার পর স্বাভাবিক গলায় বললেন, এটা নিতান্তই কাকতালীয়। তুমি যা ভাবছ তা হতে পারে না পল্লব কারণ গেনু নেই। আর যদি সে থাকতও তা হলেও সে এই ছেলেটি হতে পারে না। কারণ গেনুর ছদ্মবেশ ধারণের ক্ষমতা নেই। আশা করি তোমরা পুলিশকে সব জানিয়েছ। পুলিশই এর তদন্ত করবে। আমি এবার একটু লিখতে বসব।

ভাদুড়ি মশায়ের বলার মধ্যে স্পষ্ট যে তিনি আর এ নিয়ে কথা বাড়াতে চান না। এ সব ক্ষেত্রে নিয়ম চলে যাওয়া কিন্তু পল্লব আজ নিয়ম না ভেঙে পারল না। বলে উঠল, কিন্তু স্যার...

কথা কেটে ভাদুড়ি মশায় অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে বললেন, আমার যা বলার ছিল আমি বলে দিয়েছি। এবার তোমরা এসো।

হতাশ গলায় পল্লব বলল, এসো রোশনি। আমরা যাই।

বাইরে বেরিয়ে জুতো পরতে পরতে রোশনি বলল, কী ব্যাপার বলুন তো পল্লবদা? গেনু নামটা নিয়ে আপনাদের এমন ট্রমা কেন?

সে অনেক গল্প রোশনি। পরে কোনও একদিন বলব।

আচ্ছা। তবে আপনার এই ভাদুড়ি স্যার কিন্তু বড্ড আনপ্রেডিক্টেবল। হঠাৎ কেমন করে আমাদের তাড়িয়ে দিলেন।

থমকে গেল পল্লব, সেটাই তো ভাবছি রোশনি। উনি এমন করার মানুষ নন। দেয়ার ইজ সামথিং রং। তুমি একটু বোসো তো। আমি আর একবার ভেতরে যাচ্ছি। বুড়ো কিছু একটা বুঝেছে কিন্তু চেপে যাচ্ছে।

রোশনিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে গেল পল্লব।

যদিও অনুমতি না নিয়ে ভাদুড়ি মশায়ের লাইব্রেরিতে ঢোকা একটা দুঃসাহসিক কাজ তবু আজ সেই কাজটাই করে ফেলল পল্লব। তার মন বলছিল, কিছু না কিছু বিপদের আঁচ পেয়েছেন বৃদ্ধ। আসলে তাঁর ওই আতঙ্কিত দৃষ্টিই পল্লবকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। যে মানুষ গেনুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেছেন সেই গেনুর নাম শুনে তিনি ভয় পাবেন কেন?

পা টিপে টিপে লাইব্রেরি ঘরে ঢুকে পড়ল পল্লব। ভাদুড়ি মশায় বসে আছেন তার দিকে পেছন করে। ক্রাচ দু’টি টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো। দু’হাতে মাথা ঢেকে বসে আছেন তিনি। চশমাটা খুলে রাখা একটা বইয়ের ওপরে। একটু ইতস্তত করেও পল্লব ডেকে উঠল, স্যার।

চমকে পেছন ফিরে তাকালেন ভাদুড়ি মশায় আর সেই মুহূর্তে পল্লবের ওপর যেন বাজ পড়ল। নিশ্চল হয়ে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে লাগল সে। বৃদ্ধের দু’চোখে টলটল করছে জল। শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি কাঁদছেন!

১৭

ইন্টারভিউটা বেশ ভালো হয়েছে। ভালো ইন্টারভিউ দিলে মনটাও ভালো লাগে। খুশি মনে প্রেসিডেন্সি কলেজের মেন বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিল সঞ্জয়।

মাস দুয়েক আগে একদিন হঠাৎ ফোন করেছিল পল্লব। হুড়মুড় করে বলেছিল, প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্সে ভ্যাকেন্সি বেরিয়েছে। দুটো পোস্ট আছে। একটা প্রফেসরের আর একটা অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। তোকে লিঙ্ক পাঠিয়েছি। এক্ষুনি অ্যাপ্লাই কর। কোনও বাহানা শুনব না সঞ্জয়। পাকামি করলে বিচি ফাটিয়ে দেব।

এটুকু বলেই ফোন কেটে দিয়েছিল পল্লব। সেই মুহূর্তে কিচ্ছু বলার সুযোগ পায়নি সঞ্জয় কিন্তু স্মৃতিসমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এসে তাকে আছড়ে ফেলেছিল অতীতের বেলাভূমিতে। মনে পড়ে গিয়েছিল সেদিনের সোনাঝরা সন্ধেগুলোর কথা। হিন্দু হস্টেলের ছাদে বসে তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখত তারা চার বন্ধু মিলে। সে, পল্লব, অমিয় আর সুপ্রতিম। ছোটবেলার ভয়ংকর স্মৃতি অনেকটাই সে তখন কাটিয়ে উঠেছে। নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে পদার্থবিদ্যার বিপুল সমুদ্রে। ভালো ছাত্র হিসেবে খানিক নামডাকও হয়েছে।

অনাথ আশ্রমে বড় হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হওয়াটাই সঞ্জয়ের কাছে স্বপ্নের মতো। অ্যাডমিশন টেস্ট দিতে এসেই এত ঘাবড়ে গিয়েছিল যে ঠিক করে ফেলেছিল, এই কলেজে পড়া যাবে না। কিন্তু হেডমাস্টারমশাই শোনেননি। লিস্টে নাম ওঠার পর জোর করে ভর্তি করে দিয়েছিলেন কলেজে। রেখে গিয়েছিলেন হিন্দু হস্টেলে। কলেজের প্রথম দিনটার কথা তো সঞ্জয়ের স্মৃতিতে আজও জ্বলজ্বল করছে। প্রথম ক্লাসেই চোস্ত ইংরেজিতে লেকচার দিলেন অধ্যাপক পি.আর.বি। প্রিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। সবটুকু সঞ্জয়ের মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। খুব মুষড়ে পড়েছিল সঞ্জয়। বুঝতেই যদি না পারে তা হলে শিখবে কী করে? পরের ক্লাসগুলোও কমবেশি একরকম। কেউ দু’ লাইন বাংলায় বলেন তো পরের কুড়ি লাইন ইংরেজিতে। একজন ছেলে খুব সাহস করে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল, স্যার একটু বাংলায় বলবেন?

তাতে চাপা হাসির আওয়াজে মুখরিত হয়েছিল ক্লাসরুম আর অধ্যাপক বলেছিলেন, আমি বলতেই পারি বাংলায় কিন্তু বাংলায় তো ফিজিক্সের ভালো বই নেই। ইংরেজিটা তোমায় শিখে নিতেই হবে।

ক্লাস শেষে কলকাতার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়া কিছু ছেলেমেয়ে খুব আওয়াজ দিয়েছিল বাংলায় বলতে বলা ছেলেটিকে। সেই দিনই সঞ্জয় বুঝে গিয়েছিল, কলকাতার ছেলেমেয়েরা কখনও মফস্বলের ভালো বন্ধু হতে পারে না। তারা সব সময়ই মফস্বলকে নিচু চোখে দেখে। জাজ করে। পরে এই কলকাতার ছেলেমেয়েরাই সঞ্জয়ের কাছে পড়া বুঝতে আসত। সঞ্জয় বুঝিয়েও দিত। সে অন্য কথা। তো প্রথম দিনের ক্লাসের শেষে সঞ্জয়ের ঝুলিতে ছিল শূন্য, হাতে পেনসিল। খুব মন খারাপ করে ফিরে এসেছিল হস্টেলে। সুপ্রতিম আলাপ করিয়ে দিয়েছিল বাংলা ডিপার্টমেন্টের ছেলে পল্লবের সাথে। সঞ্জয়কে চুপ করে থাকতে দেখে পল্লব বলেছিল, তোর মন খারাপ ভাই? কী হয়েছে?

সঞ্জয় খুলে বলেছিল সমস্যার কথাটা। শুনে হো হো করে হেসে উঠেছিল পল্লব। খুব রাগ ধরে গিয়েছিল সঞ্জয়ের। গম্ভীর গলায় বলেছিল, এতে হাসির কী আছে?

পল্লব বলেছিল, ইংরেজির মতো একটা সোজা ব্যাপার নিয়ে ঘাবড়াচ্ছিস, হাসব না তো কী করব?

আরও রেগে গেছিল সঞ্জয় পাকা ছেলেটার ওপর, তোর কাছে সোজা হতে পারে, আমার কাছে না।

ইংরেজি সবার কাছেই সোজা। একটু বুদ্ধি খাটালেই ইংরেজি বোঝা যায়। গড়গড় করে বলা যায়। বল তো, আমি গেলাম আর হাতে করে দুধ নিয়ে এলাম---এর ইংরেজি কী?

বেশ ঘাবড়ে গেছিল সঞ্জয়। ক্লাসের ইংরেজি লেকচার না বুঝলেও বাংলা থেকে ইংরেজি ট্রান্সলেশন সে করতে পারে। কিন্তু তখন কিছুই মাথায় আসছিল না। ওর অবস্থা দেখে পল্লব বলেছিল, তুই বেশি ভাবছিস তাই ঘেঁটে ফেলছিস। ভেরি ইজি। আমি গেলাম আর হাতে করে দুধ নিয়ে এলাম---এর ইংরেজি হল, ‘গোয়িং কামিং হ্যান্ড মিল্ক’।

প্রথমটায় থ হয়ে গেছিল সঞ্জয়। তারপর বলেছিল, এটা কোনও শুদ্ধ ইংরেজি না। এমন ভুলভাল ইংরেজি বলতে সবাই পারে।

একজ্যাক্টলি, লাফিয়ে উঠেছিল পল্লব, আমিও তো তোকে এটাই বলতে চাইছি ভাই। মফস্বলের ছেলে তুই, ইংরেজিকে শুদ্ধ করার দায় আজই তোকে কে নিতে বলেছে? আগে ধীরে ধীরে ঢোক ব্যাপারটার মধ্যে তারপর শুদ্ধ করিস। ভাষার মোদ্দা কথা তো কমিউনিকেশন না কি? এই যে গোয়িং কামিং হ্যান্ড মিল্ক---তুই তো বুঝলি কী বলতে চাইছি। ওটাই ইমপরট্যান্ট। আমার এক দিদি ছিল, মধুদি, সে প্রথম আমায় এটা বুঝিয়েছিল। ভাই, তুই ভার্ব, অ্যাডভার্ব, প্রিপোজিশনের চক্করে মন দিতে গিয়ে আসল জায়গাগুলো মিস করে গেছিস। ক্লাসে স্যার যখন লেকচার দিচ্ছেন ফিজিক্সের টার্মগুলো খেয়াল কর। ওগুলো তো তুই জানিস। ট্রাই করে দেখ দু’দিন, ব্যাপারটা ইজি হয়ে যাবে।

ট্রাই করেছিল সঞ্জয়। সত্যি লেকচারগুলো আগের থেকে অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষার কাঁধে ভর দিয়েই সে বুঝতে শুরু করেছিল পদার্থবিদ্যার নানা রহস্য। সেই থেকে ভাব জমে গেল পল্লবের সাথে। সুপ্রতিম তো আগেই ছিল, তারপর এল হ্যান্ডসাম অমিয়। গড়ে উঠল চারজনের সংসার।

সবচেয়ে বেশি স্বপ্ন ছিল পল্লবের চোখে। বৈষ্ণব পদাবলী কণ্ঠস্থ ছিল তার। সে বলত, বৈষ্ণব রসতত্ত্ব দুনিয়ার সব্বার পড়া উচিত। পদাবলীর থিয়োরি নিয়ে কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে উঠত। রেগে বলত, এই অ্যাকাডেমিশিয়নগুলো নিজেদের বিরাট তালেবর ভাবে। এমন ভাবে থিয়োরির বই লেখে লেম্যান বুঝতেই পারবে না। কিছু বলতে গেলেই বলবে, সব জিনিস সবার জন্য নয়। আগে অধিকারী হতে হয়। যত সব বালের যুক্তি। একদিন আমি পদাবলীর থিয়োরির ওপর একটা বই লিখব। এমন সোজা করে লিখব যাতে যে কেউ পড়ে বুঝতে পারে।

সত্যি বড় সহজ করে পদাবলী আর প্রাচ্য রসতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে পারত পল্লব। সে বলে যেত আর বুঁদ হয়ে শুনত বাকি তিন বন্ধু। কলেজে এই আড্ডা বসলে যোগ দিত তিতাসও। গবেষণা করার পরে প্রেসিডেন্সিতেই পড়াতে চাইত পল্লব। বলত, আমার বাপ, ঠাকুরদা মাস্টার। আমি বেনের ঘরের ছেলে, বিদ্যাবণিক। পড়ানো ছাড়া আর কিছুই তো পারি না। চোখ ধাঁধানো রেজাল্টও করেছিল সে। কিন্তু সেই পল্লবই যখন অ্যাকাডেমিয়া ছেড়ে বাণিজ্যিক লেখালিখিতে চলে গেল ভারী কষ্ট পেয়েছিল সঞ্জয়। কষ্ট পেয়েছিলেন পল্লবের মাস্টারমশাইয়েরাও। সঞ্জয় অনেকবার বলেছিল, পড়ানোয় ফিরে আয় পল্লব। অনেক ছাত্রছাত্রীকে তুই বঞ্চিত করছিস।

চুপ করে বসে থাকত পল্লব। তারপর বলত, ওটা একটা বদ্ধ জলা। পচা গন্ধ ছাড়ছে।

সঞ্জয় বুঝত, এ সবই পল্লবের অভিমানের কথা। যেভাবে নতুন ভিসির জমানায় প্রেসিডেন্সির রেজিস্ট্রার আর ডিন অব স্টুডেন্টসকে তাড়ানো হয়েছিলে সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি পল্লব। এ অবশ্য চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া। তবু কিছু লোক আজও চোরের ওপর রাগ করার সাহস রেখে মাটিতে ভাত খাওয়ার কৃচ্ছ্র করতে পারে। পল্লব তাদেরই একজন।

অবশ্য অভিমান কি সঞ্জয়েরও কম ছিল কিন্তু বছর দুয়েক আগে মিতুলের ঘটনাটা সবাইকে আবার কাছাকাছি এনে ফেলেছে। শুধু প্রতিম তাদের এই রিইউনিয়নের অংশ হতে পারল না।

পল্লবের পাঠানো লিঙ্কটা খুলে দেখেছিল সঞ্জয়। তারপর অনেক দ্বিধা পেরিয়ে অ্যাপ্লাই করে ফেলেছিল। আইআইটি ছেড়ে রাজ্য সরকারের কলেজে পড়াতে আসাটা অর্থকরী দিক থেকে খুবই অলাভজনক সিদ্ধান্ত কিন্তু এ কলেজ যে আর পাঁচটা কলেজ নয়। এ যে তাদের যৌবনের ওয়ান্ডারল্যান্ড। তাই চাকরি পাবে কি পাবে না, পেলেও করবে কি করবে না সে পরের কথা কিন্তু ইন্টারভিউটা দিতে চলে এসেছিল। আর সেটা ভালোও হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সে যে কলকাতায় এসেছে এটা পল্লবকেও জানায়নি। একবারে পল্লবের বাড়ি গিয়ে সারপ্রাইজ দেবে। সবটা শুনে পল্লবের কী অবস্থা সেটা ভাবতে ভাবতেই পোর্টিকোতে নেমে এল সঞ্জয় কিন্তু নিজেই এতটা সারপ্রাইজড হয়ে গেল যে মিনিটখানেক তার মুখ দিয়ে কথা সরল না। সে দেখল, পোর্টিকোতে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে অপালা। সঞ্জয়ের মনে হল, প্রেসিডেন্সি কলেজের পোর্টিকোতে একটা সূর্যমুখী ফুল ফুটেছে।

প্যারামাউন্টে ডাব শরবতে চুমুক দিতে দিতে অপালা বলল, সারপ্রাইজ কি তুমি একাই দিতে পারো?

উত্তর দিল না সঞ্জয়। এই মেয়েটির সঙ্গ তার ভারী ভালো লাগে। অপালার আপাত গাম্ভীর্যের মধ্যেও যে এমন একটা ছেলেমানুষি আছে সেটা দেখতে দেখতেই বিস্মিত হচ্ছিল সে। সারপ্রাইজ দেবে বলে সুদূর আমেরিকা থেকে কলকাতায় উড়ে আসা সহজ কথা নয়। এর জন্য ভেতরে তিন পুরুষের পাগলামি থাকতে হয়।

এই দু’বছরে অপালার সঙ্গে সঞ্জয়ের আলাপটা জমে উঠেছে মূলত হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জারে। বেশির ভাগই টেক্সট মেসেজ। ভিডিও কল কদাচিৎ। যদিও এই আলাপটা জমে ওঠার কথা ছিল না। কারণ সঞ্জয় স্বভাবগত ভাবেই স্বল্পভাষী। কলেজ বেলায় পল্লব তাকে মৌনীবাবা বলে ডাকত। সঞ্জয় দেখেছে, মেয়েরা সাধারণত ছেলেদের থেকে বেশি কথা বলে। আর শুধু কথা বলেই তারা ক্ষান্ত থাকে না, উল্টোদিকে যে শুনছে তাকেও কথা বলতে বাধ্য করে। মেয়েরা ভালো শ্রোতা পছন্দ করে না। তারা নিজেও বক্তা, তাদের পছন্দও বাগ্মী মানুষকে। পল্লব যে বরাবর নারী পরিবৃত হয়ে থেকেছে তার অন্যতম কারণ সে অবান্তর, অক্লান্ত বকতে পারে। সঞ্জয় তাই চিরকালই মেয়েদের থেকে দূরত্ব রেখে চলেছে কিন্তু একটা কথোপকথনকে কেন্দ্র করেই সে অপালার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল।

একটা প্রাচীন পুঁথিতে পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত কিছু শ্লোক পেয়েছিল অপালা। সে বিষয়েই সঞ্জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কথায় কথায় সঞ্জয় জানতে চেয়েছিল, পোস্ট ডকের পরে তোমার প্ল্যান কী?

অপালা বলেছিল, দেশে ফিরে আসব।

একটু অবাক হয়েছিল সঞ্জয়, ফিরে আসবে? চাইলেই তো তুমি ওখানের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারবে। আর সত্যি বলতে এ-দেশে কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

অপালা বলেছিল, বিদেশে কী আছে জানি না। তবে অন্যের মাটিতে বেশি দিন থাকা যায় না। আসলে নতুন ভাষা শিখে, খাওয়াদাওয়া রপ্ত করে হয়তো খানিকটা বিদেশি সাজা যায় কিন্তু ও দেশের আকাশে কোন মেঘে বৃষ্টি হবে সেটা ও দেশের শিশুও আমার থেকে ভালো জানে। আজীবন জানবে। তা ছাড়া ইমিগ্র্যান্ট, লোভে পড়ে অন্যের দেশে এসে বসে আছি এটা ভাবতেও ভালো লাগে না। তাই কাজটা শেষ হলেই ফিরে যাব ঠিক করেছি। দেশে কিছু না কিছু জুটে যাবে।

মুগ্ধ হয়ে গেছিল সঞ্জয়। তার চেয়েও বেশি মুগ্ধ হয়েছিল এটা বুঝতে পেরে যে অপালা তার চেয়েও কম কথা বলে। শরবতটা শেষ করে সঞ্জয় বলল, পল্লবের সঙ্গে দেখা করে আসবে না কি?

সঞ্জয় ভেবেছিল, প্রস্তাবটা শুনে অপালা খুশি হবে কিন্তু পল্লবের কথা শুনেই অপালা যেন একটু থমকে গেল।

অপালার অস্বস্তিটা চোখ এড়াল না সঞ্জয়ের। বলল, এনিথিং রং?

একটু চুপ করে থেকে অপালা বলল, ব্যাপারটা তোমাকে কীভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না। কিন্তু এটা তোমার জানা দরকার। গত কয়েকদিন ধরে পল্লব আমাকে খুব অদ্ভুত কিছু মেইল করছে। কিছুক্ষণ আগেও করেছে।

খুব অবাক হল সঞ্জয়, পল্লব মেইল করেছে!

কেন পল্লব মেইল করতে পারে না?

তা নয় কিন্তু আমি ওকে যতদূর চিনি ও এসবে অভ্যস্ত হতে চায় না। পল্লব যখন খবরের কাগজে চাকরি করত তখন রেজিগনেশন দেওয়ার পরেও ও পঁয়তাল্লিশ দিন নোটিস পিরিয়ড সার্ভ করেছিল যদিও নোটিস পিরিয়ড ছিল এক মাসের। আসলে ও অফিসিয়াল মেইলটাই চেক করেনি তাই জানতেও পারেনি কোম্পানি ওকে সময়েই রিলিজ করে দিয়েছে। ওই যে পনেরো দিনের মাইনে পায়নি সেটা নিয়ে ও আজও আফসোস করে। তাই মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ থাকতে ও তোমায় মেইল করল কেন বুঝতে পারছি না।

বোধ হয় মেসেঞ্জারে বা হোয়াটসঅ্যাপে লিখতে সাহস পায়নি। দেখো মেইলগুলো। দেখলেই বুঝতে পারবে। নিজের মোবাইল ফোনটা সঞ্জয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল অপালা, পরপর দেখো, আমি সেভ করে রেখেছি।

পড়তে শুরু করল সঞ্জয় এবং কিছুটা পড়েই তার গা গুলিয়ে উঠল। প্রত্যেকটা মেইলই বিরক্তিকর যৌনগন্ধী। সেখানে পল্লব ইনিয়েবিনিয়ে একটা কথাই লিখে গেছে, তিতাসের সঙ্গে সম্পর্কটায় সে আর কোনও চার্ম খুঁজে পাচ্ছে না। তিতাস বিছানায় খুব খারাপ, কোনওভাবেই সে পল্লবের কোনও চাহিদা মেটাতে পারছে না। এই সম্পর্কটা থেকে সে বেরোতে চায়। আশ্রয় চায় অপালার কাছে। অপালা ঢিলেঢালা জামাকাপড় পরলেও সে বুঝতে পেরেছে অপালার ফিগার দুর্দান্ত। অপালাই পারবে তার অতৃপ্তি দূর করতে। সেও কথা দিচ্ছে, অপালাকে বহুবার স্বর্গীয় অর্গাজম উপহার দেবে।

ফোনটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল সঞ্জয়। পল্লব এই মেইলগুলো করেছে অপালাকে! তার বন্ধু পল্লব! তিতাসের প্রেমিক পল্লব! পল্লবের অধঃপতন তাকে পীড়িত করতে লাগল ক্রমাগত, তিতাসের জন্য কষ্ট হতে লাগল কিন্তু সমস্ত এই অনুভূতিকে ছাপিয়ে অন্য যে অনুভূতি তার চেতনার দখল নিল তার নাম ক্রোধ। মনে হতে লাগল, পল্লবের সাহস কী করে হল অপালাকে কুদৃষ্টিতে দেখার! চমকে উঠল সে, পল্লব যে অপালাকে কামনা করেছে এটায় তার এত রাগ হচ্ছে কেন? আদি কাল থেকে পুরুষ নারীকে এবং নারী পুরুষকে কামনা করেছে। এটা তো স্বাভাবিক একটা ঘটনা। হ্যাঁ, তিতাস থাকা সত্ত্বেও অন্য নারীকে কামনা করা এবং তাকে যৌনগন্ধী মেইল করা অনৈতিক, খুবই খারাপ কাজ করেছে পল্লব। তাকে শাসন করা দরকার। কিন্তু সঞ্জয়ের ইচ্ছে করছে পল্লবের গলাটা টিপে ধরে। দেওয়ালে মাথা ঠুকে দেয়। রাগের গতিপথ খুবই একমুখী। সঞ্জয় ভাবল, অপালার জায়গায় এটা যদি অন্য কোনও মেয়ে হত তা হলেও কি সে পল্লবের ওপর এতটাই রেগে যেত? না বোধ হয়। তা হলে? এত দিনে এই প্রথমবার সঞ্জয় উপলব্ধি করল, সে আসলে অপালার প্রেমে পড়েছে।

১৮

সঞ্জয় আর অপালা যতক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছল ততক্ষণে মিতুলকে আইসিসিইউ-তে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। দীপক পাল পাথরের মতো বসে আছেন। একটা পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে পল্লব। তার সঙ্গে একটি অচেনা মেয়ে। পল্লবকে দেখেই ভুরুটা কুঁচকে গেল সঞ্জয়ের। অমিয়কে কোথাও দেখতে পেল না সঞ্জয়। পল্লবই প্রথম দেখতে পেল সঞ্জয় আর অপালাকে। সময়টা শোক ও নিদারুণ উদ্বেগের। তবু নিজের বিস্ময় চেপে রাখতে পারল না সে। ছুটে এগিয়ে এল, সঞ্জয় তুই? অপালা তুমি? তোমরা একসাথে? এই সময়?

পল্লব একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছিল কিন্তু সঞ্জয় দেখছিল তার অভিব্যক্তি, আর যত দেখছিল ততই ঘনীভূত হচ্ছিল সংশয়। অপরাধবোধ চেপে রাখা খুব সহজ কথা নয়। তার জন্য অনেক বড় অভিনেতা হতে হয়। পল্লব এক সময় দাপিয়ে অভিনয় করেছে মঞ্চে কিন্তু জীবনের রঙ্গনাট্যে তার অভিনয় প্রতিভার পরিচয় সঞ্জয় কোনওদিন পায়নি। বরং পল্লব মানুষটা একটা খোলা ডায়েরির মতো। আবেগ নিয়ন্ত্রণে সে একেবারেই পারদর্শী না। আজও পল্লব আগের মতোই উচ্ছ্বল। এই হাসপাতালের গাম্ভীর্যও তার স্বভাবসুলভ চাপল্যকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রিয় বন্ধুকে দেখে সে বরাবরের মতোই উদ্বেল।

অপালাও অবাক হচ্ছিল পল্লবকে দেখে। প্রথম দিন থেকেই তার আলাদা করে চোখে পড়েছিল পল্লবকে। সদাহাস্যময় মানুষটার রসবোধ নজর কেড়েছিল তার। তারপর সময় যত গড়িয়েছে তত বেশি করে ভালো লেগেছে পল্লবকে। পল্লবের মতো বন্ধু চট করে মেলে না। যে কোনও প্রয়োজনে পল্লব পাশে এসে দাঁড়িয়েছে নির্দ্বিধায়। কোনওদিন পল্লবের চাহনিতে অস্বস্তিকর কিছু লক্ষ্য করেনি সে। তাই পল্লবের মেইলগুলো পেয়ে সে ভারী চমকে উঠেছিল। কিছুতেই ওই কদর্য কথাগুলোকে মেলাতে পারছিল না পল্লবের সঙ্গে। কিন্তু দিনের পর দিন একই ধরনের মেইল পেতে পেতে সে পল্লবকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিল। কিন্তু আজ আবার সামনে থেকে দেখে অপালার মনে হল, ওই মেইলগুলো পল্লব করতে পারে না।

কী ব্যাপার? তোরা ওভাবে তাকিয়ে আছিস কেন আমার দিকে? পল্লবের কথাতেই ভাবনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল সঞ্জয় আর অপালার। মাথা নেড়ে স্বাভাবিক গলায় সঞ্জয় বলল, কিছু না। কী করে হল এমনটা? কিছু জানতে পারলি?

পল্লব বলল, বলছি। তার আগে বল, তোরা দু’জনে একসাথে কী করে?

সঞ্জয় বলল, আজ প্রেসিডেন্সির ইন্টারভিউ ছিল। তোকে সারপ্রাইজ দেব বলে জানাইনি। অপালাও না জানিয়ে বাড়ি ফিরছিল। বাইচান্স দেখা হয়ে গেছে। আমি অপালার সাথে স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। এসে শুনলাম এই কাণ্ড।

এবার একটু হতাশ লাগল পল্লবকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, মিতুল এমনটা করবে আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। জরুরি একটা দরকারে আমি স্যারের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। সেখানেই অমিয়র ফোন আসে। কাল সন্ধে থেকেই না কি মিতুলের মন খারাপ। ওর মা সেটা জানিয়েছেন। আজ সকালে মিতুলকে অনেকক্ষণ বাথরুমে দেখে পালদার সন্দেহ হয়। ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে দেখা যায় মিতুল কমোডের পাশে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। পাশে দুটো খালি ফিনাইলের বোতল।

ওহ গড! শিউরে উঠল অপালা, তারপর?

তারপর পালদা অমিয়কে ফোন করেন। ওরা দু’জন মিলে মিতুলকে নিয়ে এসেছে।

তিতাসকে জানিয়েছিস? জিগ্যেস করল সঞ্জয়।

একটু থেমে পল্লব বলল, না। অমিয় বারণ করল।

ভারী অবাক হল দু’জনেই। অপালাই বলে উঠল, হোয়াট? তিতাসকে জানাতে বারণ করেছে কেন? আর অমিয় কোথায়?

পল্লব বলল, অমিয় আইসিসিইউ-এর ভেতরে। মিতুলকে চোখের আড়াল করতে দিচ্ছে না। তবে তিতাসকে কেন জানাতে বারণ করল আমি বুঝতে পারিনি। খুব স্ট্রিক্টলি বারণ করল। বোধহয় তিতাস শক পাবে ভেবেই বারণ করেছে। তিতাস তো এখনও মেন্টালি পুরো ফিট নয়।

হুম, চশমাটা ঠিক করে সঞ্জয় বলল, ডাক্তার কী বলছে?

জানি না। আমি যতক্ষণে এসেছি ততক্ষণে মিতুলকে অ্যাডমিট করা হয়ে গেছে। পালদাকে যে জিগ্যেস করব ভরসা পারছি না। কেমন একটা চুপ হয়ে গেছে লোকটা।

সত্যিই দীপক পালের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। হাসিখুশি মানুষটার মুখে কেউ যেন কালি লেপে দিয়েছে। দুশ্চিন্তায় চোখ দুটো কোটরাগত। এমন সময় ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অমিয়। সকলে প্রায় একসঙ্গে ছুটে গেল তার দিকে। সবার চোখে একটাই জিজ্ঞাসা। অমিয় বলল, ওয়াশ করা গেছে। অবস্থা আগের থেকে ভালো। তবে আরও সময় লাগবে।

চোখের জল ভারী অদ্ভুত জিনিস। উদ্বেগেও বেরোয়, উদ্বেগ প্রশমিত হলেও বেরোয়। এতক্ষণে কেঁদে ফেললেন দীপক পাল। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। তাঁর কাঁধে হাত রাখল অমিয়। অমিয়র হাত ধরে দীপক পাল বললেন, স্যার, আপনাকে আমি ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসি। যেদিন থেকে মিতুল আর আপনার সম্পর্ক হয়েছে আমার থেকে খুশি আর কেউ হয়নি। কিন্তু আমার মেয়েটা যে বড্ড ছোট। কী এমন হল স্যার যার জন্য ওকে ফিনাইল খেতে হল? আপনি সামলে রাখতে পারলেন না ওকে?

পল্লব স্পষ্ট দেখল, অপরাধবোধে ঝুলে পড়ল অমিয়র চোয়াল। তবু নিজেকে শক্ত করে অমিয় বলল, মিতুল নিজে থেকে ফিনাইল খায়নি পালদা। ওকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে।

ঘরের ভেতর বাজ পড়লেও বুঝি কেউ এতটা চমকাত না। পল্লব প্রায় চিৎকার করে উঠল, কী বলছিস তুই? কে দিয়েছে আত্মহত্যায় প্ররোচনা?

একটু চুপ করে থেকে অমিয় বলল, পল্লব, তোর সঙ্গে আমার কথা আছে। বাইরে আয়। তোমাদের সঙ্গে একটু পরে কথা বলছি অপালা।

অমিয়র মধ্যে চূড়ান্ত একটা অস্থিরতা কাজ করছে। অপালা বা সঞ্জয়ের সম্মতির অপেক্ষা না করেই সে এগিয়ে গেল বাইরের দিকে। একটু থমকে থেকে পল্লবও এগোল তার পিছু পিছু।

হাসপাতালের মধ্যে একটা বড় নিমগাছ। তার গোড়াটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। সেখানেই এখন বসে আছে পল্লব আর অমিয়। প্রায় মিনিট পাঁচেক দু’হাতে মুখ ঢেকে থাকার পর অমিয় মুখ তুলল। রুমালে মুখ মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে বসল পল্লবের দিকে। তারপর পকেট থেকে একটা ফোন বার করল। পল্লব চিনতে পারল, এটা মিতুলের ফোন। একটা রেকর্ডিং চালিয়ে অমিয় ফোনটা এগিয়ে দিল পল্লবের দিকে, শোন।

‘ভালোবাসার মানুষ যখন এভাবে ধোঁকা দেয় তখন কী লাভ বল তো বেঁচে থেকে? এই যন্ত্রণা সহ্য করার থেকে মরে যাওয়া ভালো। তুই অনেক শক্ত মিতুল। অনেক শক্ত। পল্লব যদি আমার সঙ্গে এমন করত আমি হয়তো আত্মহত্যা করতাম। হয়তো কেন? আমি ঠিক আত্মহত্যা করতাম মিতুল। শেষ করে দিতাম নিজেকে। আমি সবসময় ব্যাগে ঘুমের ওষুধ রাখি। যদি কখনও পল্লব আমার সঙ্গে এমন করে আমি একসাথে সবক’টা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নেব। আমি আর কথা বলতে পারছি না মিতুল। আমি রাখছি।’

রেকর্ডিংটা শুনতে শুনতেই তীব্র উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল পল্লব। শেষ হতে, বিস্ময়ে বলল, এ যে তিতাসের গলা!

মাথা নাড়ল অমিয়, এটাই মিতুলের লাস্ট ফোন কল। তারপরেই মিতুল ফিনাইল খাওয়ার ডিসিশন নিয়েছে। মিতুলের ফোনের সেটিংসটাই এমন যে সব কল রেকর্ড হয়ে থাকে। মিতুলকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছে তিতাস।

পল্লবের পায়ের তলার মাটি দুলে উঠল। কয়েক মুহূর্ত সে কিছুই বলতে পারল না। তারপর অস্ফুটে বলে উঠল, কিন্তু তিতাস কেন এমন করবে?

এটা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয় পল্লব। তিতাস অনেকদিন থেকেই প্ল্যান করছিল।

মানেটা কী? পল্লবের কণ্ঠে উষ্মা, কী আজেবাজে কথা বলছিস তিতাসের নামে? তুই জানিস না তিতাস মিতুলকে কতটা ভালোবাসে? আর তুই তিতাসের দোষ দিচ্ছিস? রেকর্ডে তো স্পষ্ট শুনলাম, তিতাস বলছে, ভালোবাসার মানুষ যখন ধোঁকা দেয়... তার মানে তুই কিছু একটা করেছিস। কী করেছিস বল। নিজে অন্যায় করে বাচ্চা মেয়েটাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে তিতাসের নামে দোষ দিয়ে বাঁচতে চাইছিস?

না রে পল্লব। বাঁচতে চাইছি না। চাইলেও বাঁচতে পারব না। কারণ এই ঘটনার জন্য তো তিতাসের পাশাপাশি আমিও দায়ী। যা হয়েছে, তারপর মিতুল বা আমি, কাউকে তো একটা আত্মহত্যা করতেই হত।

অমিয়র বলার ধরনে সবটা গুলিয়ে গেল পল্লবের। অমিয়র কাতরতা স্পর্শ করল তাকে। অমিয়র হাত ধরে সে বলল, ভাই, কী বলছিস একটু স্পষ্ট করে বল। আমি যে কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

বলতে চাই পল্লব, কিন্তু জানি না কীভাবে তোকে বলব? আমি শুধু মিতুল না, তোর সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। বিশ্বাস কর পল্লব, সেই ঘটনার পর থেকে আমি রোজ রাতে সার্ভিস রিভলভারটা হাতে নিয়ে বসে থাকি, কখনও কপালে, কখনও থুতনিতে ঠেকাই। কিন্তু ট্রিগার আর টানতে পারি না। আমি তো ট্রেটার, তাই ভয়টা বেশি। মিতুলের তো কোনও পাপ নেই। তাই কত সহজে এই সাহসী সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিতে পারল। আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করিস না পল্লব। কোনওদিন ক্ষমা করিস না।, কাঁদতে কাঁদতে অমিয় বসে পড়ল নিমগাছের নীচে।

অমিয়, সঞ্জয়, পল্লব, সুপ্রতিম। এই চার বন্ধুর মধ্যে অমিয়ই সবচেয়ে হাট্টাকাট্টা। অমিয়কে কোনওদিন কাঁদতে দেখেনি পল্লব। সেই অমিয় কাঁদছে। শুধু কাঁদছে না, বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। পল্লবেরও কান্না পেয়ে গেল। অমিয়কে জড়িয়ে ধরে বলল, কী হয়েছে অমিয়। প্লিজ বল আমায়।

বড় করে একটা শ্বাস নিল অমিয়। কথায় বলে, সত্যি বলতে দম লাগে। এ সেই দম যা অস্বস্তিকর কোনও সত্যিকে সামনে আনার আগে নেওয়া বাধ্যতামূলক। অমিয় সেটাই করল। তারপর বলল, আই হ্যাড সেক্স উইথ তিতাস।

কথাটা শুনে কোনও প্রতিক্রিয়া দিতে পারল না পল্লব। শুধু হাঁ করে অমিয়র দিকে তাকিয়ে রইল।

* * *

কফির কাপটা হাতে করে নিয়ে বিছানায় এসে বসতেই মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিয়ে উঠল তিতাসের। কোনওমতে সামলে নিল। আর একটু হলেই কফিটা উলটে পড়ত বিছানায়। কফিটা কোস্টারের ওপর রেখে একটু ধাতস্থ হল তিতাস। কী হল ব্যাপারটা? হঠাৎ এমন মাথা ঘুরল কেন? এসব রোগ তো তার কখনও ছিল না। কী যে হচ্ছে আজকাল! ভাবতে ভাবতেই মেঝের দিকে তাকিয়ে ভারী অবাক হয়ে গেল তিতাস। মেঝেতে একটা ফাটল ধরেছে। সরু চুলের মতো ফাটল কিন্তু সেটা দেওয়ালের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত অবধি চলে গিয়েছে। একটু আগেও যখন কফি আনতে গেল তখনও তো এটা চোখে পড়েনি! সকালে কাজের মাসি ঘর মুছে গেছে। সেও তো কিছু বলল না! এত বড় ফাটল তার চোখে পড়বে না সেটা তো হয় না। তা হলে? ফাটলটা কি এই কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হল? একটু ঘাবড়েই গেল তিতাস। আজকাল প্রোমোটাররা খারাপ জিনিসপত্র দিয়ে বাড়ি তৈরি করে, তারপর এই সব গন্ডগোল শুরু হয়। ঝুঁকে পড়ে ফাটলটার গভীরতা বোঝার চেষ্টা করছিল তিতাস। তার মনে হল, ফাটলটা থেকে যেন একটা নীল আভা বেরোচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার তো! কোনওভাবে কি নীচের ফ্লোরের আলো আসছে ফাটল দিয়ে? তা হলে তো বাজে রকমের ফাটল ধরেছে। খুব বিরক্ত হয়ে প্রোমোটারকে ফোন করবে বলে উঠে দাঁড়াল তিতাস আর উঠেই দেখল, তার থেকে ঠিক এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই অখণ্ডমণ্ডলাকার বিস্ময়! সেই আশ্চর্য তেজোদ্দীপ্ত, প্রভাময় উপস্থিতিতে স্তম্ভিত হয়ে গেল তিতাস। তীব্র এক ভয় পাকে পাকে জড়িয়ে ধরতে লাগল তাকে। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে সাবধান করল, খুব খারাপ কিছু একটা হতে চলেছে। খুব ভয়ানক কিছু হতে চলেছে। নিজের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় করে চিৎকার করে উঠল সে তারপর ছুটে গেল দরজার দিকে। কিন্তু বেরোতে পারল না, তার আগেই কোনও এক দৈব ইঙ্গিতে সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল দরজা। তিতাস আছড়ে পড়ল দরজার ওপরেই। ধীরে ধীরে রাজকীয় লঘু চালে রত্নরাজি খচিত অলঙ্কারে ভূষিত অপূর্ব সেই নারীমূর্তি এগিয়ে এল তিতাসের দিকে। তার হাতে অদ্ভুতদর্শন এক দণ্ড। দণ্ডের ওপরে শোভা পাচ্ছে নীল রঙের এক অত্যুজ্জ্বল পাথর। তিতাসের মনে হল, এই নীল রংটা যেন পাথরের হৃদয় নিংড়ে বেরিয়ে আসছে। অস্ফুটে তিতাস বলে উঠল, লাপিস লাজুলি। এর আগে মাত্র একবারই তিতাস এই নারীমূর্তিকে দেখেছে। অমিয়র ব্যালকনিতে। আর বার দুয়েক তার উপস্থিতি অনুভব করেছে। কিন্তু চোখ খোলেনি। আগের বার বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কায় সম্ভবত এই নীল পাথর খেয়াল করেনি তিতাস। কিন্তু আজ এই পাষাণের হৃদয়ক্ষরা নীল রং দেখেই তিতাস চিনে ফেলল নারী মূর্তিকে আর তখনই নীল রঙের পাথরটিতে আলোর উদ্ভাসন হল। চোখ দুটো যেন পুড়ে গেল তিতাসের আর সেই দহনের মধ্যেই তিতাস দেখতে পেল সে তীব্রভাবে রমণ করছে অমিয়কে! দেখতে পেল, পল্লবের মেইল আইডি থেকে সে কুৎসিত সব মেইল পাঠাচ্ছে অপালাকে! শুনতে পেল, মিতুলকে সে বলছে, এর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো মিতুল। মিতুলকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিচ্ছে সে! কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই আচমকা এই সমস্ত রক্ত হিম করে দেওয়া দৃশ্যকল্প তার চোখের সামনে থেকে মুছে গেল। সে দেখতে পেল, সে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের ফাটলটার ঠিক সামনে। শুধু মাঝের এই সময়টুকুতে ফাটলটা বড় হয়েছে। এতটা বড় যে একটা মানুষ সেটার মধ্যে পড়ে যেতে পারে। কিন্তু পড়ে গেলেই বা মানুষটা যাবে কোথায়? এই ফাটলের গভীরতা মাপার কোনও একক নেই। যেন আদি অনন্তকাল ধরে এই ফাটল গড়িয়ে গেছে শুধুই নীচের দিকে। অন্ধকারের দিকে।

আর কিছু ভাবার অবকাশ পেল না তিতাস, তার আগেই সেই নারীমূর্তি তাকে ঠেলে ফেলে দিল ফাটলের গভীর, গহীন, নীলাভ অন্ধকারে।

১৯

শোক, ভয়, দুশ্চিন্তা এই প্রত্যেকটি অনুভূতিই মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেখানে সবগুলি যখন একসঙ্গে আছড়ে পড়ে চেতনায় তখন যে নৈঃশব্দ্যের জন্ম হয় তা মহামারীর মতো সর্বগ্রাসী, কবরের মতো অন্ধকার। ঠিক এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে ওরা সকলে। ভাদুড়ি মশায়ের লাইব্রেরি ঘরে বসে আছে পল্লব, সঞ্জয়, অপালা, অমিয়, দীপক পাল আর ভাদুড়ি মশায় স্বয়ং। কারও মুখে কোনও কথা নেই। অমিয় শুধু শক্ত করে পল্লবের হাতটা ধরে রেখেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাদুড়ি মশায় মাথা তুললেন আর প্রশ্ন করলেন সঞ্জয়কে, তোমার মামি এখন আর আসেন না? তিনি তোমায় কিছুর ব্যাপারে সাবধান করেননি?

এমনি এমনি এ প্রশ্ন করেননি ভাদুড়ি মশায়। গত চব্বিশ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে এই প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছে। অমিয়র কথাটা শোনার পর থেকেই পল্লবের মাথা কাজ করছিল না। যন্ত্রের মতো সে ফিরে এসেছিল বাড়িতে আর বাড়ি ফিরে আবিষ্কার করেছিল, তিতাস নেই। শোবার ঘরে বিছানার ওপর ল্যাপটপ খোলা, কফি থেকে ধোঁয়া উড়ছে, বিছানার চাদরটা অবধি কুঁচকে আছে যেন এইমাত্র কেউ সেখানে বসেছিল, কিন্তু তিতাস নেই। সারা বাড়িতে কোথাও নেই। অ্যাপার্টমেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ বলছিল, তিতাস বাইরে যায়নি অথচ তিতাস নেই। যেন কোনও এক মন্ত্রবলে সে উবে গিয়েছে।

এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেনি পল্লব। অমিয় আর সঞ্জয়কে ফোন করে সোজা ছুটে এসেছিল ভাদুড়ি মশায়ের বাড়িতে এবং তিতাসের অন্তর্ধানের খবর দিয়েছিল। একই সঙ্গে খুলে বলেছিল, অমিয়র সঙ্গে তিতাসের কী হয়েছিল সে কথা। বলেছিল, মিতুলের সঙ্গে তিতাসের শেষ কথোপকথনের কথাও। সংশয় ঘনিয়ে উঠছিল অপালা আর সঞ্জয়ের মনেও। তারাও কিছু গোপন না করে মেইলগুলো দেখিয়েছিল পল্লব, অমিয় এবং ভাদুড়ি মশায়কে। মেইলগুলো দেখতে দেখতে স্তম্ভিত হয়ে গেছিল পল্লব। তার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। সে বুঝতে পারছিল, তার মেইল আইডি ব্যবহার করে তিতাসই এই মেইলগুলো করেছে অপালাকে। চোখে জল এসে গেছিল পল্লবের। ভাদুড়ি মশায় বলেছিলেন, তিতাসকে ভুল বুঝো না পল্লব, এ কাজ তিতাস করেনি। তিতাস নিজের মধ্যে নেই, ওকে দিয়ে এই সব কিছু করানো হয়েছে আর আমি নিশ্চিত, ওর অন্তর্ধানও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই অবধি বলে চুপ করে গেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। অজানা এক আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে গেছিল বাকি সকলেই। তিতাস কোথায় আছে, কেমন আছে এই প্রশ্ন সকলকেই কুরে কুরে খাচ্ছিল। পল্লব কাঁপছিল থরথর করে। ওকে ধরে রেখেছিল অমিয়। তখনই নৈঃশব্দ্য ভেঙে ভাদুড়ি মশায় প্রশ্নটা করলেন।

তিতাসের অন্তর্ধানের সঙ্গে মামির আসার সম্পর্কটা ধরতে পারল না সঞ্জয়। তবু বলল, মামির তো আর আসার কথা নয় স্যার। কারণ মামার মৃত্যুর পরে আমি মামি আর দুই মামাতো ভাই বোনের নামে গয়ায় গিয়ে পিণ্ড দিয়ে এসেছি।

কী? ছিটকে সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। ত্রু«দ্ধ কণ্ঠে বললেন, তুমি পিণ্ড দিয়ে এসেছ? কেন?

অবাক হল সঞ্জয়। ভাদুড়ি মশায়ের রাগের কারণটা সে বুঝতে পারছিল না। কিন্তু তাকে উত্তর দেওয়ার অবকাশ না দিয়েই ভাদুড়ি মশায় ফের চিৎকার করে উঠলেন, কাকে জিগ্যেস করে তুমি পিণ্ড দিয়েছ? একবারও আমার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করলে না?

রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন তিনি। অপালা গিয়ে হাত দুটো চেপে ধরল, কী হয়েছে দাদু? তুমি এত একসাইটেড হচ্ছ কেন? প্লিজ শান্ত হও।

অপরাধী গলায় সঞ্জয় বলল, স্যার, আসলে মামা মারা যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম...

কেন ভেবেছিলে? কে তোমাকে ভাবতে বলেছিল সঞ্জয়? এত বড় একটা কাজ করলে আর তুমি আমাকে জানালে না? আমি যদি ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারতাম তুমি তোমার মামির পিণ্ড দেওয়ার কথা ভাবছ আমি তখনই তোমাকে আটকাতাম। তুমি জানো না কত বড় ভুল করে ফেলেছ তুমি। তোমার মামিকে যে আমাদের এখন খুব দরকার ছিল।

মামিকে দরকার কেন স্যার?

কারণ একমাত্র সেই আমাদের লোকনাথের গতিবিধির ব্যাপারে সাবধান করতে পারত।

লোকনাথ! একসঙ্গে বলে উঠল সবাই, কিন্তু সে তো মারা গিয়েছে!

দু’হাতে কপালের রগ ধরে মাথা নীচু করলেন ভাদুড়ি মশায়। আর চুপ করে থাকতে পারল না পল্লব। উঠে গিয়ে ভাদুড়ি মশায়ের সামনে হাঁটু ভেঙে বসল, চুপ করে থাকবেন না স্যার। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে আপনি নিশ্চয়ই এতক্ষণে সব বুঝতে পেরেছেন। বলুন আমাকে তিতাস কোথায়? ও কেন করল এসব? লোকনাথের কথা কেন বললেন আপনি? বলুন প্লিজ। চুপ করে থাকবেন না। বলুন।

অপরাধী গলায় ভাদুড়ি মশায় বললেন, লোকনাথ বেঁচে আছে।

ঘরের মধ্যে বাজ পড়লেও বুঝি বা কেউ এতটা চমকাত না। কথাটা বুঝতেই যেন কয়েক সেকেন্ড সময় লেগে গেল ওদের। কাঁপা গলায় অমিয় বলল, লোকনাথ বেঁচে আছে? কী করে?

আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল অমিয়। কিন্তু তাকে সেই প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে কঠিন গলায় পল্লব বলে উঠল, লোকনাথ যে বেঁচে আছে আপনি সে কথা জানতেন তাই না স্যার? তারপরেও আপনি সে কথা আমাদের কাছে গোপন করে গেছেন। আজ তিতাস যা যা করেছে তার সঙ্গে যে লোকনাথের কোনও যোগাযোগ আছে এ আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। যা ঘটেছে তার জন্য আপনি দায়ী। তিতাসের এই অন্তর্ধানের দায় আপনাকে নিতে হবে।

কোনওদিন ভাদুড়ি মশায়ের সঙ্গে এভাবে কেউ উঁচু গলায় কথা বলেনি। শিউরে উঠল অপালা, দাদুর রাগ ভয়ঙ্কর। সে গিয়ে পল্লবকে টেনে সরিয়ে আনতে চাইল, কী করছ পল্লব? প্লিজ কুল ডাউন।

এক ঝটকায় অপালার হাত সরিয়ে দিয়ে ভাদুড়ি মশায়ের একেবারে সামনে এগিয়ে গেল পল্লব। তার চোখে জল। চিৎকার করে বলল, চুপ করে থাকবেন না স্যার। উত্তর দিন। আপনি জানতেন তো লোকনাথ বেঁচে আছে?

ধীরে ধীরে মাথা তুললেন ভাদুড়ি মশায়, হ্যাঁ জানতাম।

তা হলে আমাদের বলেননি কেন? আর যদি নাই বলেন, কেন লোকনাথকে শেষ করে দেননি? আপনার তো অসীম ক্ষমতা। আপনি চাইলেই তো লোকনাথকে মারতে পারতেন। বলুন পারতেন না?

উত্তরটা দেওয়ার আগে নিজেকে যেন খানিকটা প্রস্তুত করে নিলেন ভাদুড়ি মশায়। তারপর বললেন, না পল্লব, পারতাম না।

কেন পারতেন না?

কী করে পারতাম আমি? যতই তন্ত্রচর্চা করি, দিনের শেষে আমি তো শিক্ষক। ছাত্র পড়ানো আমার পেশা, আমার ধর্ম। লোকনাথ আমার উজ্জ্বলতম ছাত্র। সে যতই বেয়াড়া হোক, শিক্ষক হয়ে ছাত্রকে আমি মারতে পারব না। সেদিনও পারিনি, আজও পারব না। তোমরা আমাকে ক্ষমা কোরো।

দু’হাতে মুখ ঢাকলেন ভাদুড়ি মশায়। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পল্লব। তার মনে পড়ে গেল সেই দিনগুলোর কথা যখন সুপ্রতিমকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে সঞ্জয়কে গ্রেফতার করার জন্য মুখিয়ে ছিল পুলিশ। সেই সময়কার প্রেসিডেন্সির অন্যতম উজ্জ্বল ছাত্র সঞ্জয়কে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন শিক্ষকেরাই। পল্লব নিজেও মাস্টার বাড়ির ছেলে। আজীবন শিক্ষকতাই করতে চেয়েছিল, ভাগ্য তাকে অন্য পথে চালিত করেছে। কিন্তু সে জানে উজ্জ্বল ছাত্রছাত্রীর প্রতি শিক্ষকের যে মায়া জন্মায় তা পুরোপুরি অপত্য না হলেও অপত্যের খুব কাছাকাছি তো বটেই। সে বুঝতে পারল কেন সেদিন জল দেখেছিল বৃদ্ধের চোখে। ধীরে ধীরে ভাদুড়ি মশায়ের হাঁটুর ওপর হাত রাখল সে। চোখের জল মুছে বলল, আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার। আপনার সাথে ওভাবে কথা বলে অন্যায় করেছি।

শক্ত করে পল্লবের হাত চেপে ধরলেন ভাদুড়ি মশায়, কোনও অন্যায় করোনি। তোমার জায়গায় আমি থাকলে এর থেকেও বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাতাম। তোমার সন্দেহ ঠিক। তিতাসের অন্তর্ধানের পেছনে লোকনাথের হাত আছে। এ লোকনাথ ছাড়া কারও কাজ হতে পারে না। কিন্তু, আমি তোমাকে একটা কথা বলছি পল্লব, লোকনাথকে আমি মারতে পারিনি ঠিকই কিন্তু তিতাসেরও আমি কোনও ক্ষতি হতে দেব না। লোকনাথ যদি তিতাসকে নরকে নিয়ে গিয়েও লুকিয়ে রাখে সেখান থেকে আমি ওকে উদ্ধার করে নিয়ে আসব।

ক্রাচে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর পল্লবের চোখে চোখ রেখে বললেন, দুশ্চিন্তা কোরো না। রামদাস ঠাকুরের প্রিয়তম শিষ্য নীরেন তোমায় কথা দিচ্ছে। এ কথার অন্যথা হয় না।

শিউরে উঠল পল্লব। একই সাথে বড় নিশ্চিন্ত বোধ করল সে।

২০

কবিতা করিবে আমারে বিজন/

প্রেমও করিবে স্বপ্ন সৃজন/

স্বর্গের পরী হবে সহচরী, দেবতা করিবে হৃদয় দান/

মলয় বাতাসে ভেসে যাব শুধু, কুসুমের মধু করিব পান...

স্নান করতে করতেই মোবাইলের রিংটোন শুনতে পেয়েছিল রোশনি। ভেবেছিল, স্নান সেরে বেরিয়ে কল ব্যাক করবে। কিন্তু ফোনটা যখন বারবার বাজতে লাগল, স্নান অসমাপ্ত রেখে তোয়ালে গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হল সে। ফোনটা হাতে নিতে নিতে আবারও বেজে উঠল রিংটোন। থানা থেকে ফোন! এতবার কেন ফোন করছে থানা থেকে? অবাক হয়েই ফোনটা ধরল রোশনি।

থানার সেকেন্ড অফিসার বিশ্বদীপ দত্ত বলে উঠল, আপনি এখুনি একবার থানায় আসুন তো ম্যাডাম। আপনার কথামতো যে স্কেচ করা হয়েছিল, মনে হচ্ছে সেই ছেলেটা ধরা পড়েছে। আপনি এসে আইডেন্টিফাই করে যান।

ফোনটা রেখে চুপ করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল রোশনি। আবার ছেলেটার মুখোমুখি হতে হবে ভেবেই একটা অস্বস্তি হচ্ছে। অস্বস্তি না কি ভয়? ঠিক বুঝে উঠতে পারল না রোশনি। ভয় তো সে পেয়েছিল সেদিন। খুবই পেয়েছিল। এর আগে কখনও মৃত্যু এভাবে ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলেনি। শুধু মৃত্যু তো নয়, ভয়ানক অপমানজনক মৃত্যু। নাহ, একা ওই ছেলেটার মুখোমুখি হবে না সে। ঠিক করল, পল্লবকে ফোন করবে।

পল্লব একা নয়, গেনু ধরা পড়েছে শুনে থানায় ছুটে এলেন ভাদুড়ি মশায় স্বয়ং। অপালা আর অমিয় তাঁকে নিয়ে এসেছে। ছেলেটিকে বসিয়ে রাখা হয়েছে একটা সেলের ভেতর। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। বিশ্বদীপ দত্ত অমিয়র চেনা মানুষ। বলল, রোশনি ম্যাডাম যা বলেছিলেন তারপর আর ওকে বাইরে রাখতে সাহস পাইনি।

রোশনিরা সকলে এসে দাঁড়াল সেলের সামনেটায়। ভেতরে মাথা নিচু করে বসে আছে ছেলেটা। পল্লবের খুব চেনা চেনা লাগল ছেলেটাকে। কোথায় যেন দেখেছিল! মনে পড়ছে না। এদিকে মন দিয়ে ছেলেটাকে দেখতে দেখতে রীতিমতো বিভ্রান্ত বোধ করল রোশনি। হ্যাঁ এ সেদিনের ছেলেটাই কিন্তু কোথাও যেন একটা বড় পার্থক্য আছে। কোথায় সে পার্থক্য? কোথায়? একটু ভাবতেই রোশনি উত্তরটা পেয়ে গেল। পার্থক্য চোখে। চাহনিতে। সে রাতে খুব কাছ থেকে ছেলেটার চোখ দেখেছিল রোশনি। অমন মৃত্যুহিম, ফর্মালিনে চোবানো, লাশকাটা ঘরের গন্ধমাখা চাহনি যে একবার দেখেছে, কোনওদিন ভুলতে পারবে না। এই ছেলেটির চাহনি তো তেমন নয়। বরং এর চাহনির মধ্যে একটা পালাই পালাই ভাব রয়েছে। বিশ্বদীপ দত্ত জিগ্যেস করল, ম্যাডাম এই ছেলেটাই তো?

রোশনি বলল, আমায় দুটো মিনিট দিন। তার পর পল্লবের দিকে তাকিয়ে বলল, পল্লবদা, একবার শুনুন এদিকে।

থানার বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল ওরা। রোশনি কিছু বলার আগেই ভাদুড়ি মশায় বললেন, এ সে নয় তাই তো মা?

চমকে উঠল রোশনি, আপনি কীভাবে বুঝলেন স্যার? আসলে আমি ঠিক শিওর হতে পারছি না। অবিকল একই রকম দেখতে কিন্তু...

ঠিকই বলেছ তুমি। এ সে নয়। কথা কেটে বললেন ভাদুড়ি মশায়, পাপের একটা গন্ধ আছে। আমি পাই সে গন্ধ। এই ছেলেটির মধ্যে পাপ নেই। যে তোমায় সে রাতে মারতে এসেছিল সে কিছুতেই এ হতে পারে না।

সকলেই থমকে গেল। অমিয় বলল, তা হলে?

ভাদুড়ি মশায় বললেন, তোমার সঙ্গে তো চেনাশোনা আছে অমিয়। তুমি ওই অফিসারটিকে অনুরোধ করো, আমি এই ছেলেটির সাথে একবার কথা বলতে চাই। আমার মনে হয় রহস্যের জট খুলতে পারব। কেন জানি না, মন বলছে, রোশনির ওপর হামলা থেকে তিতাসের অন্তর্ধান সবটাই এক সুতোয় বাঁধা।

এখুনি ব্যবস্থা করছি স্যার। আপনি আমার সঙ্গে আসুন। ভাদুড়ি মশায়কে নিয়ে অমিয় ঢুকে গেল ভেতরে আর পল্লব পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল থানার পেছন দিকটায়। সিঁড়ির ওপর ছায়া পড়েছে। ওখানেই বসে পড়ল সে। একটা দিন চলে গেল তিতাসের খোঁজ পাওয়া যায়নি। ইচ্ছে করেই পুলিশকে কিছু জানায়নি সে। এই আধুনিক পৃথিবীর মধ্যে যে আধিদৈবিক, আধিভৌতিক জগত আছে তার রহস্য পুলিশ জানে না। সবটাই এখন ভাদুড়ি স্যারের হাতে। তিতাসের কথা ভাবতে ভাবতেই চোখে জল এসে গেল পল্লবের। কোনওদিনই সে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তিতাস বলত, তোর সবটাই উঁচু তারে বাঁধা। মেঘলা দুপুরে প্রেসিডেন্সির ট্যাঙ্কে বসে গান ধরত তিতাস। সেই গান তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যেত ম্যাথামেটিকস ডিপার্টমেন্টের ছাদে। তখন প্রেসিডেন্সিতে চুমু খাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিল না। ভালোবাসায় ফতোয়া ছিল না কোনও। বয়স যত বাড়ছে তত বেশি করে মনে পড়ে যায় পুরনো দিনের কথা। তিতাসের না থাকা বুঝিয়ে দেয় এই প্রেম ঢুকে গেছে অস্থিতে অস্থিতে, অভ্যাসে যাপনে, রুধিরে রুধিরে। তবু কি নতুন প্রেম আসে না? এসে দাঁড়ায় না চৌকাঠে? জয় লিখেছিলেন, ‘এক আঘাতে ছিন্ন করব মন থেকে মুখ... আমি কি আর তেমন কসাই?’ একটা ছায়া এসে পড়ে পল্লবের পাশটিতে। পল্লব বুঝতে পারে রোশনি তাকে দেখছে। চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করে না পল্লব। সে বুঝতে পারে রোশনির চোখেও জল। রোশনির জীবনেও হয়তো বিচ্ছেদ আছে। বিচ্ছেদ থাকেই মানুষের জীবনে। পরিস্থিতি বিশেষে সফল প্রেম আর ব্যর্থ প্রেম মিলেমিশে যায় চোখের জলে।

বিশ্বদীপের সঙ্গে কথা বলে ভাদুড়ি মশায় এসে বসেন ছেলেটার সামনের চেয়ারে। সেই আশ্চর্য অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তার চোখের দিকে। চোখ সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সে কিন্তু পারে না। বুকটা কেঁপে ওঠে তড়িতের। সে বুঝতে পারে একটা বিরাট বড় ভুল করে ফেলেছে তার দাদা সরিত আর লোকনাথ ঠাকুর। এই বয়স্ক মানুষটা যে এই ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে পারে সেটা তাদের ধারণায় ছিল না। এবার ধরা পড়ে যাবে দু’জনেই। কারণ প্রাণের ভয় থাকলেও তড়িত কিছুতেই এই বয়স্ক মানুষটাকে মিথ্যে কথা বলতে পারবে না। এই মানুষের সামনে মিথ্যে বলা যায় না।

২১

বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ছিল লোকনাথ আর তার পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সরিত। লোকনাথের মনটা আজ ভারী ভালো আছে। সরিত যে বাচ্চাগুলোর চুল নিয়ে এসেছিল সেগুলোর কাজ আজ হয়ে গিয়েছে। দরকার ছিল পাঁচটা বাচ্চার চুল। সরিত এনেছিল ছ’টার। তাই কাজ শুরু করার আগে লোকনাথ লটারি করেছিল। লোকনাথ ভাবছিল, বাকি বাচ্চাগুলো যখন যন্ত্রণায় ছটফট করবে তখন একটা বাচ্চা খেলে বেড়াবে। নিজেকে ভগবান মনে হচ্ছিল লোকনাথের। ভগবান না, শয়তান। দু’জনের একই ক্ষমতা কিন্তু ভগবান আলুনি, পানসে। শয়তান রগরগে। আহা!

আর একটা বাচ্চা দরকার। কিন্তু এই বাচ্চাটাকে জ্যান্ত লাগবে। লুকিয়ে তুলে আনতে হবে বাচ্চাটাকে। তার পর তাকে নিয়ে লোকনাথ এক বিশেষ জায়গায় যাবে। কোনওদিন সেখানে যায়নি লোকনাথ। এই প্রথমবার যাবে। ভাদুড়ি স্যারের খাতার পাতাগুলো ভাগ্যিস সে চুরি করে এনেছিল। ওই পাতাগুলোয় লেখা ছিল দেশ-বিদেশের নানা তন্ত্রের মারণ প্রয়োগ। তার প্রতিকারও লেখা ছিল অন্য পাতাগুলোয় কিন্তু সেগুলো আনেনি লোকনাথ। মানুষের উপকারে লাগে এমন কিছুতে আগ্রহ নেই তার। মানুষকে সে ঘেন্না করে। লোকনাথ মনে মনে ভাবে, ভাদুড়ি স্যার চাইলে কত কিছু করতে পারতেন। এই দুনিয়া তাঁর পায়ের তলায় থাকতে পারত কিন্তু লোকটা কিছুই করল না। শুধু তন্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করে গেল। যেন ভাদুড়ি মশায়কে করুণা করেই মুখ দিয়ে চুক করে একটা শব্দ করল লোকনাথ।

সরিত চোখ তুলে তাকাল, কিছু ভাবছ কত্তা?

লোকনাথ হেসে বলল, কত কিছুই তো ভাবি রে বাপ। বয়স হলে নানারকম ভাবনা আসে। এইবার সাধনা শেষ হলে আমার ছুটি। তোকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়ে রিটায়ার করব।

সরিত একটু চুপ করে থেকে বলল, একটা কথা বলব কত্তা?

বল।

কীসের জন্য তোমার এই সাধনা কত্তা? কী চাও তুমি? কতবার ভেবেছি জিগ্যেস করব। কিন্তু সাহস হয়নি।

সোজা হয়ে বসল লোকনাথ, আজ সাহস পেলি কী করে?

একটু দমে গেল সরিত। কত্তা কি রাগ করল? কিন্তু তির যখন একবার বেরিয়ে গেছে তখন আর ভেবে কাজ নেই। মনে হচ্ছে কত্তার আজ মন ভালো। গলাটা ঝেড়ে সরিত বলল, তুমি সাধনার এত কাছাকাছি পৌঁছে গেছ, আর একটা বাচ্চা মারলেই সিদ্ধি। তাই জানতে চাইলাম। যদি মনে করো আমার এখনও সে কথা জানার যোগ্যতা হয়নি তবে বোলো না।

সোজা চোখে খানিকক্ষণ সরিতের দিকে তাকিয়ে রইল লোকনাথ। তার পর নিচু গলায় বলল, কীসের জন্য আমার এই সাধনা জানতে চাস? আমি একজন মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে চাই।

থমকে গেল সরিত। লকগেট খুলে দিলে যেমন হু হু করে জল বেরোয় তেমন করেই একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন ভিড় করে এল সরিতের মনে। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় এসেছিল সেটাই আগে জিগ্যেস করল সরিত, কত্তা, সত্যি সত্যি মরা মানুষ বাঁচিয়ে তোলা যায়?

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল লোকনাথ, যায়। কঠিনতম সাধনায় উলটে দেওয়া যায় দুনিয়ার নিয়ম। বেঁচে ওঠে মরা মানুষ। সারা জীবন লেগে যায় সে সাধনা করতে। প্রকৃতি চায় না তার নিয়মের অন্যথা হোক। তাই এই সাধনায় বাধা পড়ে। যতবার আমি সাধনার কাছাকাছি গেছি ঠিক শেষকালে কোনও না কোনও বাধা এসেছে। সে জন্যই তো যতক্ষণ না আঁচাচ্ছি আমি বিশ্বাস করতে পারি না।

আচ্ছা কত্তা, তুমি যদি সিদ্ধিলাভ করো যে কোনও মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে?

না রে। একজন। মাত্র একজন মরা মানুষকে বাঁচাতে পারব। পরের জনকে বাঁচাতে আবার একই রকম কঠিন সাধনা করতে হবে। দুনিয়ার নিয়ম উলটে দেওয়া কি ছেলের হাতের মোয়া?

লোকনাথের এই উত্তরটা শুনে ঘেঁটে গেল সরিত। একজন মাত্র মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য কত্তা এমন পাগলের মতো সাধনা করে যাচ্ছে? এত বড় বড় ঝুঁকি নিচ্ছে? শুধু এটুকুই চায় কত্তা? আর কোনও ক্ষমতা চাই না তার?

সরিতের অবস্থা দেখে হেসে উঠল লোকনাথ, কী ভাবছিস? কত্তার মাথা খারাপ তাই তো? সিদ্ধিলাভ করতে চায় শুধু এটুকুর জন্য? আর কিছু চায় না? না রে সরিত, আর কিছু চাই না আমি। আমার লোভ নেই, মোহ নেই, কাম নেই, মদ নেই, মাৎসর্য নেই। শুধু ক্রোধটুকু আমি বাঁচিয়ে রেখেছি। ওই রাগ আর ঘেন্নাটুকু না থাকলে আমি যে সাধনা করার উৎসাহ পাব না বাপ।

আজ যেন নতুন করে লোকনাথকে চিনছিল সরিত। এতদিন ধরে সে ভেবেছে সিদ্ধিলাভ করে লোকটা দুনিয়াকে পায়ের তলায় রাখতে চায়। কিন্তু এখন তো দেখছে তার ভাবনা ভুল। মিলিয়ে দেখছিল সরিত, সত্যিই তো কত্তার কিছুর ওপর লোভ নেই। ভালো খাবার, ভালো থাকার জায়গা কিচ্ছু চায় না। এই যে এত ক্ষমতা লোকটার কোনওদিন সাধনার কাজটুকু ছাড়া সেটা ফলাতে দেখেনি। কোনওদিন কোনওরকম অহংকার করতে দেখেনি। আর থাকতে পারল না সরিত। বলে ফেলল, কে সেই মানুষটা কত্তা? যাকে বাঁচানোর জন্য তুমি প্রায় তোমার গোটা জীবনটা সাধনায় কাটিয়ে দিলে? কে সে, যে তোমার কাছে এত প্রয়োজনীয়? এত গুরুত্বপূর্ণ?

অস্ফুটে লোকনাথ বলল, সে ছিল একজন। আছে একজন। ভাদুড়ি স্যারকে বলেছিলাম, মানুষটাকে বাঁচিয়ে দিন না স্যার। আপনার তো কত ক্ষমতা। কথা শোনেনি লোকটা। বলেছিল, ওসব ভূত মাথা থেকে তাড়া লোকনাথ। নিয়তির সঙ্গে লড়াই করলে সর্বনাশ হয়। যে চলে গিয়েছে সে তার নিয়তি। খুঁচিয়ে ঘা করতে গেলে প্রলয় হবেই। কিন্তু আমি জানি, চাইলে লোকটা করতে পারত। করল না। আর আমারে করতেও দিল না। আমি তো আমার মতো রাস্তা খুঁজে নিয়েছিলাম, কিন্তু আমারে পুলিশে ধরিয়ে দিল। আপনি আমার গুরু, আপনি আমায় সাত ঘা জুতো মারতে পারতেন, কিন্তু পুলিশে দেবেন কেন? সে কথা আমি আজও ভুলতে পারিনি। লোকটাকে আমি খুব ভালোবাসতাম সরিত। কিন্তু লোকটা আমার সাথে ঠিক করেনি।

তোমার যখন লোকটার ওপর এত রাগ লোকটাকে বাঁচিয়ে রাখলে কেন? মেরে দাও। বলো তো আমি...

কথা শেষ করতে পারল না সরিত, তার আগেই লোকনাথ ঠাটিয়ে এক চড় বসিয়ে দিয়েছে তার গালে।

চড়টা খেয়ে ঘাবড়ে গেল সরিত। তাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই গর্জে উঠল লোকনাথ, আর যদি কোনওদিন তুই এ কথা মুখে এনেছিল তোর জিভ ছিঁড়ে নেব শুয়োরের বাচ্চা। তুই ভাদুড়ি স্যারকে মারবি? ভাদুড়ি স্যারকে? হাতি দেখেছিস, বুনো দাঁতাল হাতি? তুই যদি একটা পিঁপড়ে হোস ভাদুড়ি স্যার তা হলে সেই হাতিটা। গেনু অবধি লোকটার একটা চুল ছিঁড়তে পারেনি আর তুই কে! শোন সরিত, ভাদুড়ি স্যারকে মারার কথা আমারও একবার মনে হয়েছিল। তখন আমি পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়েছিলাম, তাই আমার মাথা কাজ করছিল না। সুস্থ মাথায় থাকলে এ কথা আমিই কখনওই ভাবতাম না। পরে অনেক ভেবে দেখেছি, লোকটাকে আমি মারতে চাই না। লোকটা আমার গুরু। আমার পরম গুরু। আমি শুধু সিদ্ধিলাভ করে লোকটাকে দেখিয়ে দিতে চাই, লোকনাথ পেরেছে। তুমি চাওনি লোকনাথ শয়তান হয়ে উঠুক কিন্তু লোকনাথ শয়তান হয়েছে। অসুর হয়েছে। তুমি লোকনাথকে আটকাতে পারোনি গুরুদেব।

ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল সরিত, বুঝেছি কত্তা। আর কখনও এমন কথা বলব না।

হুম। একটা কথা জানবি, চোখে চোখ রেখে লড়াই করার একটা মানুষ না থাকলে যুদ্ধু করে মজা নেই। স্যারের ক্ষেত্রে সেই লোকটা আমি, আমার ক্ষেত্রে স্যার। লোকনাথ না থাকলে যেমন ভাদুড়ি বুড়োর কেরামতির কোনও দরকার নেই, তেমনই ভাদুড়ি বুড়ো না থাকলে লোকনাথও ফক্কা।

এই বলে, ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল লোকনাথ। সেই হাসি দেখতে দেখতে সরিত ভাবল, সে লোকনাথের থেকেও বড় অসুর হয়ে উঠবে একদিন। লোকনাথ তার গুরুকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। কিন্তু কাজ মিটে গেলে লোকনাথকে সরিয়ে দিতে তার হাত এতটুকু কাঁপবে না।

* * *

সেলের ভেতর থেকে যখন ভাদুড়ি মশায় বেরিয়ে এলেন তখন তাঁর মুখ বজ্রগর্ভ মেঘের মতো থমথমে। সকলেই অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। সবার আগে ছুটে গেল পল্লব, কী বুঝলেন স্যার?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাদুড়ি মশায় বললেন, বুঝলাম, লোকনাথকে মেরে ফেললেই বুঝি বা ভালো হত।

২২

বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছে। ওরা সকলে বসে আছে শ্রীরঞ্জনী বাড়ির লাইব্রেরি ঘরে। ভাদুড়ি মশায়ের মধ্যে অস্বাভাবিক এক অস্থিরতা কাজ করছে। তাঁর ডান হাতের আঙুলগুলো তিরতির করে কাঁপছে। অকারণেই দু’বার চশমার কাচ মুছে নিলেন। তারপর গলা ঝেড়ে বললেন, আসলে কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না।

এই কথাটাতেই ম্যাজিকের মতো কাজ হল। এতক্ষণ ঝিমিয়েছিল পল্লব। সোজা হয়ে বসল। বলল, আপনি জানতে পেরেছেন স্যার তিতাস কোথায় আছে? কেমন আছে?

থানা থেকে বেরিয়ে পল্লবকে ওই একটাই কথা বলেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর একেবারে চুপ হয়ে গেছিলেন। অপালাকে শুধু বলেছিলেন, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।

অপালার সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও চলে এসেছিল বারাসাতে। বাড়ি ফিরেই লাইব্রেরি ঘরে ঢুকে দরজা দিয়েছিলেন ভাদুড়ি মশায়। একটু আগে দরজা খুলে ওদের সকলকে ভেতরে ডেকে নিয়েছেন। পল্লবের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। বললেন, তিতাস ভালো আছে পল্লব। কিন্তু কোথায় আছে সেটা বলতে একটু সময় লাগবে। আমার কথাগুলো ধৈর্য ধরে শোনো।

সবাই উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে ভাদুড়ি মশায়ের মুখের দিকে। বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন, তিতাসের অন্তর্ধানের বীজ প্রোথিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগে। লোকনাথ এসেছিল আমার শিষ্য হতে। সে কথা তোমাদের আগেও বলেছি। কিন্তু যেটা বলিনি সেটা হল, লোকনাথ তন্ত্রবিদ্যার অধিকারী হতে চেয়েছিল কারণ সে একজন মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে চাইত।

চুপ করে থাকতে পারল না অপালা, কী বলছ দাদু! মরা মানুষ বাঁচিয়ে তুলতে চাইত? ইজ ইট পসিবল?

থিয়োরি অনুসারে পসিবল। পৃথিবীর সব দেশের তন্ত্রতেই মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার উপায় বলা আছে। কিন্তু সেসব সাধনা অত্যন্ত গূঢ়, গোপন এবং কঠিন। শুধু কঠিন বললে ভুল হবে, প্রায় অসম্ভব। কারণ যে মারা গিয়েছে সে তার নিয়তি। নিয়তি কেন বধ্যতে। তাই মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তুললে নিয়তির সাথে লড়াই করতে হয়। প্রকৃতির নিয়মের লঙ্ঘন হয়। প্রকৃতি চায় না তার নিয়মের অন্যথা হোক। কিন্তু লোকনাথের সাধনা এটাই যে সে মৃত মানুষকে বাঁচাতে চায়। তাই বারবার করেই সে বেছে নেয় কঠিনতম, গোপনতম সব সাধনার পথ। সে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল গেনুর থেকেও শক্তিধর এক দানব, যার সাহায্যে সে খুলে ফেলতে পারত নরকের দরজা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার সাধনা ভেস্তে দিয়েছিল তিতাস। তাই তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছিল তিতাসের ওপর। এতদিনে সে প্রতিশোধ নিয়েছে।

প্রতিশোধ? চমকে উঠল পল্লব, লোকটা তিতাসের কোনও ক্ষতি করে দিয়েছে তাই না স্যার? পল্লবের গলায় আর্তি, কিন্তু আপনি যে বললেন তিতাস ভালো আছে। কী হচ্ছে আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

শান্ত হও পল্লব। তিতাসের কোনও শারীরিক ক্ষতি লোকনাথ করেনি। সেদিক থেকে যদি দেখো তিতাস শারীরিক ভাবে সুস্থই আছে। ভালো আছে। কিন্তু তিতাস আর তিতাস নেই। সে এখন স্বয়ং ইনান্না!

ইনান্না!, সেটা আবার কী? অবাক গলায় বলে উঠল অমিয়।

কী নয়, কে? ইনান্না হলেন প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতার একজন দেবী। সম্ভবত সবচেয়ে চর্চিত দেবী। আমি ঠিক বলছি তো দাদু? বলে উঠল অপালা।

মাথা নাড়লেন ভাদুড়ি মশায়, ঠিক।

এক মিনিট, এক মিনিট। উঠে দাঁড়িয়েছে পল্লব, স্যার আপনি এইমাত্র বললেন, তিতাস এখন স্বয়ং দেবী ইনান্না। কিন্তু তিতাস দেবী হবে কী করে?

এটাই তো লোকনাথের অদ্ভুত প্রতিশোধ পল্লব। আমার পুরো কথাটা আগে শোনো। জেলে যে ছেলেটি বন্দি আছে তার নাম তড়িৎ। সে রোশনিকে মারতে আসেনি। এসেছিল তার যমজ দাদা সরিত। লোকনাথ তাকেই ভালোবেসে গেনু বলে ডাকে। তাই রোশনির কাছে ওই নামটাই বলেছিল ছেলেটি। সে যাই হোক, তড়িৎ স্বীকার করেছে সে একদিন ইচ্ছাকৃত পল্লবদের গাড়ির সামনে এসে পড়ে এবং হাসপাতালে যাওয়ার সময় তিতাসের একগুছি চুল কেটে নেয়।

চমকে উঠল পল্লব। ঠিক তো, এই ছেলেটার সাইকেলের সাথেই তো তার গাড়ির ধাক্কা লেগেছিল। তাই এত চেনা চেনা লাগছিল ছেলেটাকে। বলল, ছেলেটা তিতাসের চুল কেটে নিয়েছিল?

হ্যাঁ। লোকনাথই ওকে পাঠিয়েছিল। ছেলেটা ওই চুল দিয়েছিল লোকনাথকে আর তাই দিয়েই লোকনাথ জাগিয়ে তুলেছে এমন এক অভিশাপ যা সহস্রাধিক বছর ধরে গুমরে মরছে মহাসিন্ধুর ওপারে দুই নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এক প্রাচীন সভ্যতার উপকথায়। জাগিয়ে তুলেছে দেবী ইনান্নাকে। আমি তোমাদের ইতিহাস পড়াতে বসিনি। এখন সে পরিস্থিতিও নয়। তবু কিছুটা হলেও তোমাদের সবাইকে জানতে হবে কারণ এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে তিতাসের ঘটানো অদ্ভুত ঘটনাগুলোর কারণ, তিতাসের অন্তর্ধান এবং এই সমস্যার প্রতিকার।

এক চুমুক জল খেলেন ভাদুড়ি মশায়, একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করলেন, তোমরা জানো টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল মেসোপটেমিয়া বা সুমেরীয় সভ্যতা। এখন যেখানে ইরাক, ইরানের কিছুটা অংশ, কুয়েত আর সিরিয়া। এই সুমেরদের প্রেম, যুদ্ধ আর উর্বরতার দেবী হলেন ইনান্না। অনেকটা গ্রিসের আফ্রোদিতির মতো। দেবী সিংহবাহিনী। ইনান্নাকে নিয়ে অনেক মিথ রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত মিথ হল, ইনান্না স্বর্গ থেকে ‘মরালিটি’ অর্থাৎ নীতিজ্ঞান চুরি করেছিলেন। তার পর চলে গিয়েছিলেন নরকে। এই মিথকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল এক প্রাচীন তন্ত্রাচার। যার ওপর এই তন্ত্র প্রয়োগ করা হয় সে দেবীকে দেখতে পায়। অনুভব করতে শুরু করে। নিজেকে ক্রমশ দেবী ইনান্না ভাবতে শুরু করে। দেবী তাকে সমস্ত মূল্যবোধ, নীতিজ্ঞান জলাঞ্জলি দিতে উসকানি দেন। বুঝতেই পারছ তিতাস কেন ওই ভয়ানক ঘটনাগুলো ঘটিয়েছিল। এই করতে করতে যখন সেই তন্ত্রবিদ্ধ মানুষটা চূড়ান্ত অন্যায় করে ফেলে তখন তার নরকগমন হয়। এক মুহূর্তের জন্য খুলে যায় নরকের দরজা আর মানুষটাকে টেনে নেয় ভেতরে। তিতাসের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অন্যায় হল, মিতুলকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া। তিতাস এই মুহূর্তে রয়েছে নরকে।

সবাই অবাক হয়ে তাকিয়েছিল ভাদুড়ি মশায়ের দিকে। ওরা যদি এর আগে মিতুলের ঘটনাটা নিজের চোখে না দেখত তা হলে এসব কথা হয়তো উড়িয়েই দিত। কিন্তু ওরা জানে, এ দুনিয়ায় যতটা দেখা যায় তার বাইরেও অনেক বড় একটা দুনিয়া আছে। সেখানে ওদের দুনিয়াদারি চলে না। চলে ভাদুড়ি মশায়ের। চলে লোকনাথের।

আস্তে আস্তে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছিল পল্লবের। বারবার করে কানে বাজছিল ভাদুড়ি মশায়ের কথাটা, ‘তিতাস এখন নরকে’। বেপথু হয়ে যাচ্ছিল ভাবনা। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল তিতাসের সঙ্গে কাটানো আশ্চর্য দিনগুলো। প্রাণশক্তিতে ভরপুর তিতাস, আনখশির সৎ মানুষ তিতাস, তাকে দিয়ে এমন সব অন্যায় করাল লোকনাথ যে তিতাসের নরকবাস হল! পল্লব শুনেছে, দান্তের ইনফার্নোতে পড়েছে নরকের বর্ণনা। নরক ভালো জায়গা নয়। তিতাস খুব টিপটপ মানুষ। সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে ভালোবাসে। ওই নোংরা জায়গায় তিতাসের দম আটকে আসবে। এটা তিতাস ডিজার্ভ করে না। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠল পল্লব। তারপর আচমকাই পা চেপে ধরল ভাদুড়ি মশায়ের। কাঁদতে কাঁদতে বলল, তিতাসকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন স্যার। ওকে নরক থেকে বার করে আনুন প্লিজ। ওর তো নরকে থাকার কথা নয়। প্লিজ স্যার ওকে ফিরিয়ে দিন আমার কাছে। তিতাসকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না।

পল্লবের মাথায় হাত রাখলেন ভাদুড়ি মশায়। ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন। পল্লব বুঝতে পারছিল, এতক্ষণ যে ভয়াবহ যন্ত্রণা তাকে আচ্ছন্ন করেছিল তার উপশম হচ্ছে। আরাম হচ্ছে ব্যথার। চোখ মুছে সে তাকাল ভাদুড়ি মশায়ের দিকে। বৃদ্ধ বললেন, শক্ত হও পল্লব। আমরা খুব কঠিন একটা লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমি তোমাকে বলেছিলাম, লোকনাথ যদি তিতাসকে নরকেও লুকিয়ে রাখে আমি সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসব। বিশ্বাস করো আমিও ভাবিনি আমার কথা এতটা লেগে যাবে। আমি নিজেও ভয়ঙ্কর উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। এখন যদি তুমি ভেঙে পড়ো আমি দুর্বল হয়ে পড়ব। আমার গুরুদেব বলতেন, লেগেপড়ে থাক নীরেন, অলৌকিক হবেই। আমাদের প্রত্যেককে এখন লেগেপড়ে থাকতে হবে। কারণ, এই মুহূর্তে তিতাসকে উদ্ধার করতে গেলে অলৌকিক ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই। তিতাসকে ফিরিয়ে আনতে গেলে লোকনাথ যে তন্ত্রের সাহায্যে তিতাসকে নরকে পাঠিয়েছে সেই তন্ত্রের সাহায্যেই আমাদের নরকের দরজা খুলতে হবে। আর সেটা অসম্ভব না হলেও ভয়ানক রকমের দুঃসাধ্য।

পল্লব উত্তেজিত, দুঃসাধ্য বলছেন কেন স্যার? লোকনাথের থেকে আপনি তো বেশি জানেন। তাই না? তা হলে খুলে ফেলুন না স্যার নরকের দরজা। আমরা তিতাসকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি।

বেচারা পল্লব! তিতাসের কথা ভাবতে ভাবতে ছেলেটার স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। ছেলেটার জন্য বড় কষ্ট হল ভাদুড়ি মশায়ের। ম্লান হেসে বললেন, পল্লব, এ কি যেমন তেমন দরজা যে চাইলেই খুলে ফেলা যাবে? এ নরকের দরজা পল্লব। আমি কোনওদিন এই তন্ত্র অভ্যাস করিনি। প্রয়োগ করিনি।

আপনি জানেন না, অথচ লোকনাথ জানে!, বিস্ময় এবার সঞ্জয়ের গলাতেও।

সঞ্জয়, তোমরাও মাঝে মাঝে ভুলে যাও, আমি তান্ত্রিক নই। তন্ত্রচর্চা করেছি আমি অ্যাকাডেমিক কৌতূহলে। হ্যাঁ, গুরুকৃপায় কিছু শক্তি আয়ত্ত করেছি বটে কিন্তু সব তন্ত্র তো আমি প্রয়োগ করিনি। মেসোপটেমিয়ার এই অদ্ভুত তন্ত্রও তার মধ্যে একটি। আমি তো বললামই, এই তন্ত্র অনুসারে তন্ত্রবিদ্ধ মানুষটির পাপের ঘড়া পূর্ণ হলে নিজে থেকে নরকের দরজা খুলে যাবে এবং তার নরকপ্রবেশ হবে কিন্তু তাকে উদ্ধার করে আনার জন্য যদি নরকের দরজা খুলতে হয় তা হলে দরকার পড়বে দেবী ইনান্নার হাতের দণ্ড। যাতে খচিত আছে এক আশ্চর্য উজ্জ্বল লাপিস লাজুলি। সোজা করে বললে নীলকান্তমণি।

কোথায় আছে স্যার সেই দণ্ড? দ্রুত বলে উঠল পল্লব, বলুন আমায়, আমি নিয়ে আসব। বলুন কোথায় আছে?

সেই দণ্ড রয়েছে প্রাচীন সুমেরীয় উপকথায়। থেমে থেমে বলে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়।

মানে? ফের অস্থির পল্লব।

মানে দেবী ইনান্নার নীলকান্তমণি খচিত দণ্ডটির উল্লেখ ছড়িয়ে রয়েছে সুমেরীয়দের উপকথায়, লোকগানে কিন্তু খ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার বছর আগে থেকে আজ অবধি বহু মানুষ বহু খুঁজেও সেই দণ্ডের কোনও অস্তিত্ব পায়নি।

সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভাদুড়ি মশায়। বুঝি তাঁর ইষ্টকে বোঝাতে চাইলেন তাঁর অসহায়তার কথা। ঘরের মধ্যে পিন পতনের নীরবতা। সকলেই বুঝতে পারছে তিতাসকে উদ্ধার করার সম্ভাবনা আসলেই একটা অলীক কল্পনা। অনেকটা মিথের মতো। উপস্থিতি আছে কিন্তু নিশ্চয়তা নেই। চোখ মুছে পল্লব বলল, আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন স্যার, তিতাসের কোনও ক্ষতি হতে দেবেন না।

সে কথা আমি এখনও বলছি পল্লব।

কিন্তু কী করে?

দেবীর ওই দণ্ড আমাদের খুঁজে বার করতে হবে।

একসাথে চমকে উঠল সবাই। পল্লবের কণ্ঠে উত্তেজনা, এইমাত্র আপনি বললেন হাজার হাজার বছর ধরে ওই দণ্ড কেউ খুঁজে পায়নি। বললেন, ওই দণ্ডের কথা আছে শুধু প্রাচীন সুমেরীয় উপকথায়। তা হলে? যেটা আদপে নেই তা আমরা খুঁজব কেমন করে?

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর বললেন, এতদিন পর্যন্ত আমারও ধারণা ছিল দেবীর ওই দণ্ড মিথ। কিন্তু এখন আর তা মনে হচ্ছে না। আমার গুরু রামদাস ঠাকুর বলতেন, সমস্যার মধ্যেই তার সমাধানের ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে। লোকনাথ যখন ওই বিশেষ তন্ত্র তিতাসের ওপর প্রয়োগ করতে পেরেছে তখন আমরাও তিতাসকে উদ্ধার করতে পারব। আর সবথেকে বড় কথা, হাজার হাজার বছর ধরে কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি মানে সেটা নেই এমন তো নয়। মানব সভ্যতার শুরুর দিকে যে মানুষেরা ছিল তারা ডাইনোসরের কথা জানত না কারণ তারা আসার বহু বছর আগেই ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেছিল। তাই না? তার মানে ডাইনোসর ছিল না এমন তো নয়। আধুনিক মানুষ ডাইনোসরের ফসিল আবিষ্কার করার পর সে ব্যাপারে জানতে পেরেছে। তাই যদি সঠিক পথে খোঁজা যায়, আমার বিশ্বাস আমরাও খুঁজে পাব সেই মিথিক্যাল দণ্ড! আর তার থেকেও বড় কথা, আমাদের খুঁজে পেতেই হবে। তিতাসকে ফিরিয়ে আনার জন্য।

ভাদুড়ি মশায়ের ক্লান্ত চোখ এখন আত্মবিশ্বাসী। পল্লব বলতে গেল, স্যার...

হাত তুলে থামিয়ে দিলেন ভাদুড়ি মশায়, আজ আর কথা নয় পল্লব। তোমরা যাও। আমাকে একটু ভাবতে দাও। কোথা থেকে আমরা এর খোঁজ শুরু করব তার জন্য আমাকে ভাবতে হবে। আমি আগামী কাল সকালে তোমাদের সঙ্গে আবার বসব। আর হ্যাঁ, অমিয়, যে ছেলেটি পুলিশের কাস্টডিতে রয়েছে ও যেমন আছে তেমনই থাক। শুধু পুলিশকে বলো, তদন্ত প্রক্রিয়া যেন আপাতত বন্ধ রাখে। ওই ছেলেটিকে আমাদের দরকার হবে।

মাথা নাড়ল অমিয়, আচ্ছা স্যার।

এক-এক করে সকলে বেরিয়ে গেল লাইব্রেরি ঘর ছেড়ে। বেরনোর সময় দরজাটা ভেজিয়ে দিল অপালা। লাইব্রেরি ঘরে এখন ভাদুড়ি মশায় একা। সিলিং পর্যন্ত উঁচু তাকে থরে থরে সাজানো বই। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা সারা ঘর জুড়ে। এই ঘরটাতে এসেই বারবার নিজের মুখোমুখি হন তিনি। তিনি জানেন, যতটা সহজ করে পল্লবদের ওই দণ্ড খোঁজার কথা বলেছেন, সত্যি সত্যি খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়া হবে তার হাজার গুণ কঠিন। আর যদি বা সেই দণ্ড খুঁজে পাওয়া যায়, তার পর? দেবী ইনান্নার মিথের শেষটুকু যে তিনি বলেননি সবার সামনে। যদি নরক থেকে কাউকে এই দুনিয়ায় ফিরিয়ে আনতে হয় তা হলে এই দুনিয়া থেকেও কাউকে চলে যেতে হয় নরকে। এটাই নিয়ম। দেবী ইনান্নার বদলে নরকগমন করেছিলেন তাঁর স্বামী দুমুজি। এক্ষেত্রে তিতাসের বদলে পল্লব। এমন ভয়ানক এক তন্ত্র লোকনাথ প্রয়োগ করেছে যেখানে তিতাসকে বাঁচাতে গেলে বলি দিতে হবে পল্লবকে। কী করবেন তিনি? কাকে বাঁচাবেন? তিতাস, পল্লব দু’জনেই তাঁর আপন জন। কাউকেই তো হারাতে পারবেন না তিনি। বড় অসহায় লাগে তাঁর। লোকনাথ বেঁচে আছে জানার পরেও তিনি কোনও সাবধানতা নেননি। আজ তারই ফল ভুগতে হচ্ছে তিতাস আর পল্লবকে। বাকিদেরও। ভূতগ্রস্ত তিতাস যা করে গিয়েছে তাতে কি আর কোনওদিন স্বাভাবিক হবে অমিয় আর মিতুলের সম্পর্ক? পল্লব কি কোনওদিন আগের মতো ভালোবাসতে পারবে তিতাসকে? অবশ্য পল্লব আদৌ থাকবে কি না সেটাই তো প্রশ্ন। কী করবেন তিনি? সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে বৃদ্ধের। এখন একটাই পথ। চোখ বন্ধ করে গুরুর নাম স্মরণ করতে থাকেন ভাদুড়ি মশায়। ধীরে ধীরে মন সংহত হল একটি বিন্দুতে। মানস চক্ষে ভেসে উঠল সেই সদাহাস্যময় মুখ।

আবার সেই পুরনো দিনের মতো গুরুর সামনে নতজানু হল নীরেন। বুকে টেনে নিলেন রামদাস ঠাকুর, কাঁদিস কেন পাগলা? চোখ মোছ।

বড় অস্থির লাগে গুরুদেব। লোকনাথকে বাঁচিয়ে রেখে আমি কি ভুল করেছি? অপূর্ব কোনও মৃত্যু তো আমিও ওকে দিতে পারতাম। কিন্তু...

ওই তো, ওই কিন্তুতেই তো যত জ্বালা রে নীরেন। মানুষ অনেক কিছুই করে ফেলত যদি কিন্তু ঠাকুর না থাকতেন। তুই কোনও ভুল করিসনি। শিষ্যকে কি মারা যায়? গুরু তো মা। কুপুত্র যদি বা হয় কুমাতা কদাপি নয়। যা হয়েচে বেশ হয়েচে। অতীত নে পড়ে থাকিস নে। তুই জানিস কী করতে হবে। কঠিন কাজ কি আগে করিসনি? করেচিস তো। তবে? শক্ত হ। তুই লাতন হয়ে পড়লি যে ছেলেমেয়েগুলো খেই হারিয়ে ফেলবে হতভাগা। নীরেন থেকে তুমি ভাদুড়ি মশায় হয়েচ, তালেবর হয়েচ, ঝামেলা পোহাবে নে? আমি বলচি ভয় নেই নীরেন, তন্ত্রই পালক, তন্ত্রই সংহারক। যে তন্ত্র সংহার করতে চাইচে, তার শুভঙ্করী শক্তিই তোরে বাঁচাবে। লেগেপড়ে থাক। অলৌকিক হবেই। অলৌকিক হবেই। অলৌকিক হবেই...

গুরুর কণ্ঠ মিশে যায় লাইব্রেরি ঘরের বাতাসে। আহ বড় শান্তি। সোজা হয়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। তিনি বিশ্বাস করেন, এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অলৌকিক হল মানুষের বুদ্ধিমত্তা, ইনটেলিজেন্স। দৈবের সঙ্গে অসম লড়াইতে নামতে চলেছেন তাঁরা। বুদ্ধিমত্তা দিয়েই জয় করতে হবে দৈবকে। টেলিফোন নম্বর লেখা ডায়েরিটার দিকে হাত বাড়ালেন তিনি। একজনকে ফোন করতে হবে। দেবী ইনান্নার দণ্ডের খোঁজ কোথা থেকে শুরু করতে হবে সে কথা কিছুটা হলেও জানে এই লোকটা। ফোন করলেন ভাদুড়ি মশায়। ওদিকে রিং হচ্ছে, ক্রিরিরিরিরিরং, ক্রিরিরিরিরিরং...

২৩

কলকাতায় বড্ড দূষণ। রাতের তারাদের স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় না। সেই ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে শুয়ে আছে লোকনাথ। পাশে বয়ে চলেছে গঙ্গা নদী। লোকনাথ জানে, এতক্ষণে নিজের কাজ শুরু করে দিয়েছেন ভাদুড়ি মশায়। তিতাসকে খুঁজতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। এটাই তো সে চেয়েছিল। সমস্তটা তার প্ল্যানমাফিক চলছে। যে মুহূর্তে সরিত মোবাইল ফোন থেকে রোশনির ছবি দেখিয়েছিল সেই মুহূর্তে খেলার ছক বদলে ফেলেছিল লোকনাথ। রোশনি পল্লবের একটা ছবি দিয়ে লিখেছিল, ‘আজ প্রিয় লেখকের সাথে দেখা হওয়ার দিন।’ ছবিটা দেখেই লোকনাথ বুঝতে পেরেছিল, রোশনির সাথে পল্লবের যোগাযোগ আছে। আর পল্লবের সাথে যোগাযোগ আছে মানেই ভাদুড়ি স্যারের সাথে যোগাযোগ হতেও মেয়েটার বেশি সময় লাগবে না। তার ওপর মেয়েটাকে নিজের নাম ‘গেনু’ বলে কাজটা আরওই সহজ করে দিয়েছিল সরিত।

সুদেবের বাড়িতে সুদেবের মেয়ে পড়ে যাওয়া দাঁত দেখাতে এসেছিল। সেই দেখেই ধীরে ধীরে লোকনাথের মনে পড়ে গিয়েছিল অধীত বিদ্যা। এই যে সে তেরোটা বাচ্চাকে মারতে চাইছে এও এক প্রাচীন মেসোপটেমীয় তন্ত্র। ওই সময়টায় এই তন্ত্রগুলোই তার মাথার মধ্যে ঘুরছিল। তাই তিতাসের ওপরেও প্রয়োগ করেছিল দেবী ইনান্নার অভিশাপ। কিন্তু দুটো যে এভাবে মিলে যাবে লোকনাথ কখনও ভাবেনি। তেরো নম্বর বাচ্চাটাকে যেখানে সেখানে মারলে সিদ্ধি আসবে না। মারতে হবে নরকে নিয়ে গিয়ে। বাচ্চাটাকে উপহার দিতে হবে নরকের পাহারাদারদের। তার জন্য খুলতে হবে নরকের দরজা। নরকের দরজা এমনি এমনি খোলা যায় না। তার জন্য লাগে দেবী ইনান্নার হাতের দণ্ড। এ সবই লোকনাথ ভাদুড়ি স্যারের থেকে জেনেছে। স্যার বলেছিলেন, হাজার হাজার বছর ধরে ওই দণ্ড কেউ খুঁজে পায়নি। কিন্তু লোকনাথ বিশ্বাস করে, এই তন্ত্র যখন আছে, এই যখন তন্ত্রে কাজ হচ্ছে তখন ওই দণ্ডও আছে। সে জন্যই তো হুগলির শ্মশানে সরিতকে তার বিভূতি দেখিয়েছিল। সে জানত, এই অশক্ত শরীরে দেবীর দণ্ড খোঁজার ধকল সে নিতে পারবে না। শক্তপোক্ত লোক চাই তার। সরিতের মধ্যে সে অমিত সম্ভাবনা দেখেছিল। সরিত গেনুর মতো প্রভুভক্ত নয় লোকনাথ জানে। সে এও জানে, ক্ষমতা পেলে সরিত তাকে সরিয়ে দেবে। তাই তো সে আজও সরিতকে মন্ত্রদীক্ষা দেয়নি। নাকের সামনে সেই নয় নম্বর কুমিরছানার মতো আশা দুলিয়ে রেখেছে।

রোশনির সাথে পল্লবের যোগাযোগ আছে বুঝতে পেরেই সরিতের মাথার মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল লোকনাথ। তড়িৎকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে হবে এ কথা সরিতের মুখ থেকে বেরোলেও আসলে তার মাথার মধ্যে বসে কথাটা বলেছিল লোকনাথই। আসলে সে ভাদুড়ি স্যারকে বোঝাতে চেয়েছিল, তিতাসের অন্তর্ধানের পেছনে সে রয়েছে। সে বুঝতে পেরেছিল, রোশনি পল্লবকে বলবে, গেনু নামের একটা ছেলে তাকে মারতে এসেছিল। আর এই গেনু নামটা শুনলেই ভাদুড়ি স্যার বুঝবেন, লোকনাথ ফিরে এসেছে প্রতিশোধ নিতে। এর মধ্যেই তড়িৎ ধরা পড়ে যাবে আর ভাদুড়ি স্যার নিজে চোখে দেখতে আসবেন গেনুকে। তড়িতকে দেখলেই তিনি বুঝে যাবেন, এ সে নয়। কিন্তু কে সে, সেটা জানতে বুড়ো ঢুকে পড়বে তড়িতের মাথার মধ্যে আর জেনে ফেলবে লোকনাথ কোন তন্ত্র প্রয়োগ করে তিতাসকে নরকে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাচ্চা মারার ব্যাপারটা বুড়ো জানতে পারবে না। কারণ এ কথা তড়িতও জানে না।

এবার বুড়ো তিতাসকে উদ্ধার করতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। লোকনাথকে খোঁজার পেছনে বুড়ো সময় নষ্ট করবে না। এ এমনই এক তন্ত্র তিতাসকে নরক থেকে বার করে আনতে গেলে ওর প্রেমিক ওই পল্লব নামের ছেলেটা মরবে। সে যে খুশি মরুক, লোকনাথের কিছু এসে যায় না। আসল কথাটা হল, নরকের দরজা খোলার জন্য বুড়োই এবার খুঁজে বার করবে দেবী ইনান্নার দণ্ড। দেবী ইনান্নার দণ্ড খুঁজে বার করার জন্য সরিত বা তড়িতের থেকে ভাদুড়ি স্যার বা তাঁর ওই ছেলেমেয়েগুলো যে বেশি যোগ্য এ নিয়ে লোকনাথের কোনও সন্দেহ নেই। পারলে নিজেই সে নিজের পিঠ চাপড়ে দিত। খেলাটা সে দারুণ সাজিয়েছে। লোকনাথ জানে, আজ বা কাল ভাদুড়ি স্যার দেবীর ওই দণ্ড উদ্ধার করে ফেলবেন আর তার পর সে ওটা চুরি করবে। নরকের দরজা খুলে ফেলে তেরো নম্বর বাচ্চাটাকে উপহার দেবে নরকের পাহারাদারদের। অবশেষে তার সিদ্ধি হবে। অবশেষে।

উঠে দাঁড়াল লোকনাথ। ভোর হয়ে আসছে। জবাকুসুম রঙের আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’ হাত জড়ো করে কপালে ঠেকাল সে। শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ির উদ্দেশে শতকোটি প্রণাম নিবেদন করল। অস্ফুটে বলল, আশীর্বাদ করো গুরুদেব, যেন তোমার শিষ্য সিদ্ধিলাভ করে। সবই গুরুকৃপা। সবই গুরুকৃপা।

(আদি পর্ব সমাপ্ত)

অধ্যায় ৪ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%