বউকালীবাড়ির বেত্তান্ত

সৌভিক চক্রবর্তী

কলেজের ছুটি পড়তেই বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নিলাম। ছুটিতে কলকাতায় পড়ে থাকার কোনও মানেই হয় না। ছুটি কাটানোর আদর্শ জায়গা হল আমার মামার বাড়ি। মামাবাড়ির গ্রামটা এখনও গ্রামই আছে। শহরের নকল করতে গিয়ে দোআঁশলা হয়ে যায়নি। দিগন্তজোড়া ধানখেত। সন্ধে হলেই আকাশ কালো করে উড়ে যায় টিয়ার ঝাঁক। শীতকালে চারপাশ হলুদ হয়ে থাকে সর্ষেখেতে। এমন উজ্জ্বল সে হলুদ রং যে চোখে ধাঁধা লাগে। ফুলকপি খেতের ওপর ঝরে পড়ে হিম। ভিজে মাটি থেকে কেমন মায়া মায়া গন্ধ ওঠে। বড় বড় বাঁশবাগান। তলায় বিছিয়ে থাকে রাজ্যের শুকনো পাতা। আম-কাঁঠালের বাগানের তো লেখাজোকা নেই। এক একটা বাগান এমন ঝুপসি যে দিনের বেলাতেও ভালো করে আলো ঢোকে না। ইলেকট্রিকের একটা ট্রান্সফরমার বসেছে বটে কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কুড়ি ঘণ্টাই আলো থাকে না। তাতে অবশ্যি গ্রামের লোকের কোনও হেলদোল নেই। তারা যেন শহরের ছোঁয়াচ বাঁচাতে পারলেই ভারী তৃপ্তি পায়। কলকাতা থেকে মাত্র একশো কুড়ি কিলোমিটার দূরেও যে এমন একখানা ছবির মতো গ্রাম আছে ভাবলেই বড় অবাক লাগে। ছুটিছাটা পেলেই তাই আমি মামাবাড়িতে বডি ফেলে দিই। গাছের ফল, পুকুরের মাছ আর হাঁসের ডিম খেয়ে গায়ে গত্তি লাগিয়ে নিই খানিক। এবারও ভোর ভোর পৌঁছে গেলাম মামাবাড়িতে। যেতেই রাজকীয় আপ্যায়ন শুরু হয়ে গেল। ভারী পেতলের গ্লাসে বেলের পানা বানিয়ে দিদা বলল, খা বাবুসোনা।

মামাবাড়ির সামনে একটা বিশাল পুকুর। পেছনে আম-কাঁঠালের বাগান। সে বাগান পেরিয়ে আর একখান পুকুর। মাঝখানে উঠোন ঘিরে গোল করে ঘর উঠেছে। সে উঠোনের একপাশে হাঁস-মুরগির ঘর। মাঝে মাঝে বাগানের দিকে দরজা টপকে ভামবেড়াল ঢুকে পড়ে হাঁস-মুরগি ধরতে। তাই উঠোনে ভামধরা কল পেতে রাখা হয়েছে। কিন্তু ভামবেড়াল খুব চালাক প্রাণী। ওরা সহজে ফাঁদে পা দেয় না। বেলের পানা শেষ হতে না হতেই মামি এত বড় একটা জামবাটি হাতে ধরিয়ে দিল। তাতে খই, ঘরে পাতা টকদই, দু’টো পাকা মর্তমান কলা আর গোটা তিনেক আম। এতটা একসঙ্গে খাব কী করে ভাবছি তার মধ্যেই মামার ছেলে জিতু বলল, ওর মধ্যে একটু আখের গুড় নিবি না কি দাদা?

উত্তর দেওয়ার আগেই মামা বলল, দুপুরে কী খাবি? মাছ না মাংস? মাছ খেলে এই বেলা বল। পদা মুনিশকে দিয়ে জাল দেওয়াব। আর নয়তো দেশি মুরগিও খেতে পারিস। পদাকে বললেই কেটে দেবে।

মামি বলল, মাছ, মাংস দুটোই খাবে। এ কি বে বাড়ি না কি? মাছ খেলে মাংস নাই? তুমি পদাকে জাল দিতে বলো।

দিদা সরু চোখে আমার হাত-পা টিপতে টিপতে বলল, রোগা হয়ে যাচ্ছিস কেন বাবুসোনা? ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করিস না তাই না? ও বউমা, ওরে আর দু’টো আম কেটে দাও দিনি।

আমি আঁতকে উঠে কিছু বলতে যাব তার আগেই ছোটমামা হাতে একটা ভাঁড় ঝুলিয়ে হাজির। আমার হাঁ মুখে একটা পেল্লায় রসগোল্লা গুঁজে দিল।

* * *

জিতুর বিছানায় শুয়ে খালি এপাশ ওপাশ করছিলাম। এমন খাওয়া খাইয়েছে যে পেটটা অজগরের মতো ফুলে গেছে। ঠিক করে দমও নিতে পারছি না। জিতু দেখি ফুরর ফুরর করে নাক ডাকছে। খুব রাগ ধরে গেল আমার। পেটে এক খোঁচা মারলাম। জিতু ধড়মড় করে উঠে বসল, কী হল?

আমি রাগী চোখে বললাম, আমার ভালো লাগছে না জিতু। বাইরে দেখ কী সুন্দর বিকেল। এখন পড়ে পড়ে ঘুমোবি?

জিতু আলস্য ভরে একটা হাই তুলে বলল, কালকেও এমন বিকেল থাকবে। আজ তোর কল্যাণে হেবি খেয়েছি। একটু ঘুমোতে দে না।

আমি ঠেলে ওকে সোজা করে বসিয়ে দিলাম, খবরদার না। জিতু আমি যদি এখন ঘুমোই এটাই কিন্তু আমার শেষ ঘুম হবে। এমন অ্যাসিড হয়ে যাবে তখন আর আমায় বাঁচাতে পারবি না।

জিতু হতাশ গলায় বলল, তা হলে কী করতে চাস বল?

আমি বললাম, চল না বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি।

চল, ব্যাজার মুখে বলল জিতু।

ছোটমামার সাইকেলটা নিয়ে আমি আর জিতু বেরিয়ে এলাম। রোদ পড়ে এসেছে। ঝিরিঝিরি হাওয়া দিচ্ছে। ভারী মনোরম পরিবেশ। দু’জনে মাঠের ধার দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। মাঠে ছেলেরা গাদির কোর্ট কেটেছে। খুব হুল্লোড় করছে। পাখিরা ঘরে ফিরছে। আকাশে কয়েকখানা ঘুড়ি। একটা আবার কেটে গেল। মনটা বড় ভালো হয়ে গেল আমার। জিতুর গানের গলা দরাজ। বললাম, একটা গান ধর না জিতু।

জিতু বলল, কোন গান বল।

ওই যে, পৃথিবী আমারে চায়।

আচ্ছা।

জিতু গান ধরল, পৃথিবী আমারে চায়/ রেখো না বেঁধে আমায়/ খুলে দাও প্রিয়া/ খুলে দাও বাহুডোর...

গান শেষ হতে জিতুকে আমি সাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিলাম। বললাম, এই হল জল-হাওয়ার গুণ। মনটা একেবারে লাগামছাড়া হয়ে গেছে। আর একটা ধর জিতু।

আমি বিলমাঠের আল ধরে সাইকেল চালাতে লাগলাম। জিতু একটার পর একটা গান গেয়ে যেতে লাগল। কখন যে সন্ধে নেমে এসেছে বুঝতে পারিনি।

বিলমাঠের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছি আমরা। বিলমাঠ হল একটা নিচু জমি। বর্ষাকালে জল জমে গিয়ে বিশাল বাওড়ের মতো দেখায়। সেই জন্য মাঠটার নাম হয়ে গেছে বিলমাঠ। সন্ধের একেবারে আবছা আলোয় বাঁদিকের উঁচু ঢিপি আর মন্দিরের চুড়াটা দেখে বুঝলাম আমরা বিলমাঠের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে চলে এসেছি। ওটা বউকালীবাড়ি মন্দির। এই কালীমন্দিরের নাম বউকালীবাড়ি কেন তা নিয়ে একটা গল্প আছে। অনেক কাল আগে এ গ্রামে এক জমিদার ছিল। তার নাম ভবতোষ হালদার। সে জমিদার বাড়ি ভাঙাচোরা অবস্থায় এখনও দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের এক প্রান্তে। তা সেই জমিদার বাড়িতেই আগে কালীমন্দির ছিল। সেখানে বলি হত। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের পুজো করার অধিকার ছিল না। ভবতোষের দ্বিতীয় পক্ষের বউটা না কি ছিল খুব জেদি। সে লুকিয়ে লুকিয়ে এই বিলমাঠে এসে মায়ের পুজো করত। ভবতোষ একদিন সেটা জানতে পেরে যায়। দলবল নিয়ে এসে দেখে এই বিলমাঠে এক গাছতলায় ঘট পেতে বউ পুজো করছে। রাগে আগুন হয়ে বউয়ের চুলের মুঠি ধরে ভবতোষ। বলে, লুকিয়ে লুকিয়ে পুজো করিস তো? দেখি তোর ঠাকুর আজ তোকে কেমন করে বাঁচায়? এই ঘট পেতেছিস তার সামনেই বলি দেব তোকে।

বউটা কিন্তু কাঁদল না, কোনও কাকুতিমিনতি করল না। শুধু বলল, তোমার অকল্যাণ হবে।

বউটাকে এই বিলমাঠেই গাছের নীচে খুন করল ভবতোষ। কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখে অবাক কাণ্ড! তার বাড়ির মন্দিরে বিগ্রহ নেই। মায়ের মূর্তি উঠে এসেছে বিলমাঠের সেই গাছতলায়। সেই থেকে এখানেই তৈরি হল মন্দির। নাম হল বউকালীবাড়ি। শোনা যায়, ভবতোষের বীভৎস মৃত্যু হয়েছিল। কেউ যেন এই বউকালীবাড়ি মন্দিরের সামনেই ভবতোষকে দু’ আধখানা করে কেটে রেখেছিল। চিল, শকুনে তার চোখ খুবলে নিয়ে চলে গেছিল।

এই মন্দিরটা নিয়ে গ্রামের লোকের মধ্যে নানা গুজব আছে। লোকে বলে, রাত হলে এই মন্দিরে না কি নানা অশরীরী কাণ্ডকারখানা হয়। কারা যেন চলফেরা করে। অনেকে ধান কেটে রাত করে বাড়ি ফেরার পথে এই মন্দির থেকে নূপুরের শব্দ পেয়েছে। আবার কেউ দেখেছে, কে একটা বউ শাড়ি পরে মন্দিরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে রাতের বেলা। সুর করে ডাকে, আয়। আয়।

গুজব এমনই একটা জিনিস যত ছড়ায় তত বাড়ে। তাই মন্দিরটা একেবারেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। এক পূজারি আছেন। তিনি সন্ধে হবার আগেই মাকে আরতি করে বাড়ি ফিরে যান। আসেন আবার পরদিন সকালের আলো ফোটার পরে। দিনের বেলা কিছু মানুষ আসে পুজো দিতে কিন্তু বিকেলের আগেই সব কাজ সেরে ফিরে যায়। বিলমাঠের এদিকটা এমন ঝুপসি মতো আর একটেরে, কেউ আসে না। তা ঘুরতে ঘুরতে যে সেখানেই গিয়ে পড়ব আমরা বুঝতে পারিনি। আমি বললাম, জিতু, এ তো বউকালীবাড়ির কাছে চলে এলাম রে। চল ফিরে যাই।

জিতু ততক্ষণে আলের ওপর বসে পড়েছে। বলল, অনেকটা পথ সাইকেলে এলাম। কোমর ধরে গেছে। বোস না একটু জিরিয়ে নিই।

আমি বরাবরই দেখেছি, জিতুর ভয়ডর কম। আর আমিও এসব গুজবে বিশ্বাস করি না। নেহাত জায়গাটা বড় নির্জন বলে গা শিরশির করছে। সাইকেলটা শুইয়ে রেখে জিতুর পাশে বসে পড়লাম। একটু বসে থাকতেই বড় ভালো লাগল। মানুষ অন্ধকারকে যে কেন এত ভয় পায় কে জানে! অন্ধকারেরও একটা নিজস্ব মায়া আছে। আকাশে আজ চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। কী তিথি অত জানি না কিন্তু চাঁদহীন আকাশে তারাগুলো যেন আরও বেশি জ্বলজ্বল করছে। মনে হচ্ছে সারা আকাশ জুড়ে হলদে, সবুজ হীরের কুচি ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ। মাঝে মাঝে এক-একটা তারা যেন দপ করে জ্বলে উঠছে। দূরে মাঠের মাঝখানে একটা গোল ফুটকির মতো আগুন জ্বলে উঠল। কী একটা সুর ভেসে আসছে। হাওয়া উল্টো দিকে বইলে সুরটা আবার হারিয়ে যাচ্ছে। আমি বললাম, ও কিসের সুর জিতু?

জিতু বলল, সাঁওতালরা শুয়োর মেরেছে। ওরা রোজ পিকনিক করে।

তুই শুয়োর খেয়েছিস জিতু?

শুয়োর খাইনি কিন্তু নিতাই মুর্মু একদিন আমায় ধেড়ে ইঁদুর পুড়িয়ে খাইয়েছিল।

ধেড়ে ইঁদুর? ভালো খেতে?

নাহ। মাটি মাটি গন্ধ। সিগারেট খাবি দাদা?

সিগারেট? কোথায় পেলি?

ছোটকার প্যাকেট থেকে ঝেড়েছি।

আগুন আছে তোর কাছে?

জিতু শুয়েছিল। উঠে বসল, না। কিন্তু আগুনের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

আমি বললাম, কী করে? ওই সাঁওতালদের থেকে আগুন চাইবি?

না না, অদ্দূর কে যাবে?

তা হলে?

পুরুত তো কালীবাড়িতে প্রদীপ দেয়। ওই আগুন থেকে ধরিয়ে নেব।

আমি চমকে উঠলাম, তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে? এই ভর সন্ধেবেলা তুই বউকালীবাড়িতে ঢুকবি? না না ও সব পাকামো মেরে লাভ নেই। বাড়ি যাই চল। এবার সবাই চিন্তা করবে।

জিতু বলল, দাঁড়া না। সিগারেটটা ধরিয়েই চলে আসব। সাইকেলে করে সিগারেট খেতে খেতে যাব। মজাই আলাদা।

আমার কোনও কথা না শুনে জিতু গাছে গাছে ঝুপসি হয়ে থাকা ঢিপিটার দিকে এগিয়ে গেল। একটু পরেই জিতুকে আর দেখা গেল না। অন্ধকারে হারিয়ে গেল জিতু। শোঁ শোঁ করে হাওয়া দিল হঠাৎ। আমার গাটা কেমন ছমছম করে উঠল।

বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেল কিন্তু জিতু ফিরল না। এবার আমার বেশ অস্বস্তি হতে লাগল। সিগারেট ধরাতে এতক্ষণ লাগে? কে বলেছিল ওকে এই কায়দা করতে! ভীষণ রাগ হল জিতুর ওপর। আসলে আমার ভয় করছিল। আমি ভাবছিলাম, জিতু যদি না ফেরে তা হলে আমাকে ওই মন্দিরে ঢুকতে হবে। যদিও আমি গুজবে বিশ্বাস করি না তবু এই সন্ধেবেলায়, চাঁদহীন নক্ষত্ররাজিময় আকাশের নীচে, বিশাল বিস্তীর্ণ নির্জন বিলমাঠের বুকে দাঁড়িয়ে আমার মনে হতে লাগল যা রটে তার কিছু তো ঘটে। আমি প্রাণপণে চাইতে লাগলাম, এখন যেন কোনও নূপুরের শব্দ না শুনি।

সময় গড়াচ্ছে। কী করব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। এমন সময় অন্ধকার ঢিপির দিকে তাকিয়ে দেখি একটা ছায়ামূর্তি। হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে আমার গলার কাছে আটকে গেল। হাতে পায়ে কোনও সাড় পাচ্ছি না। তাও সবটা সাহস এক জায়গায় করে চিৎকার দিয়ে উঠলাম, কে? কে ওখানে?

এগিয়ে আসতে আসতে ছায়ামূর্তি বলল, আমি। জিতু।

ধড়ে যেন প্রাণ পেলাম আমি। ছুটে গেলাম জিতুর দিকে, এতক্ষণ লাগে তোর সিগারেট ধরাতে? আমি চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।

জিতু গম্ভীর গলায় বলল, ধরাতে পারিনি। প্রদীপ নিভে গেছিল।

আমি বললাম, বেশ হয়েছে। যত রাজ্যের উদ্ভট খেয়াল তোর। চল। সাইকেলে ওঠ।

জিতুকে পেছনে বসিয়ে আমি সাইকেল ছোটালাম আলের ওপর দিয়ে। অন্ধকারে সাইকেল চালাতে খুবই অসুবিধে হচ্ছে। বললাম, সন্ধেবেলায় এখানে আসাটা ঠিক হল না বুঝলি জিতু? খানাখন্দে পড়লে আর দেখতে হবে না।

জিতু কোনও উত্তর দিল না। আমার একটু খটকা লাগল। মন্দির থেকে ফিরে আসার পর থেকেই জিতু কেমন যেন একটা গম্ভীর হয়ে আছে। আমি বললাম, এই জিতু কী হয়েছে রে তোর?

জিতু কিছু বলার আগেই আমাদের খুব কাছে শেয়াল ডেকে উঠল। চমকে তাকিয়ে দেখি, সাইকেল থেকে কিছুটা দূরেই নীচে জমির মধ্যে জ্বলজ্বল করছে কয়েক জোড়া সবুজ চোখ। আমি ঘাবড়ে গেলাম, এই মরেছে। এখন আবার শেয়াল জুটল কোত্থেকে? কামড়েটামড়ে দেবে না তো। মুখে হ্যাট হ্যাট করলাম। কিন্তু আমার হ্যাট হ্যাটের প্রত্যুত্তরে শেয়ালগুলো আরও জোরে ডেকে উঠল। আমি জোরে চালাতে চেষ্টা করলাম আর তখনই লক্ষ্য করলাম আমি কিছুতেই জোরে চালাতে পারছি না। জিতু যেন অসম্ভব ভারী হয়ে গেছে। ঘুরে বলতে গেলাম, চাকায় কি হাওয়া নেই? কিন্তু যা দেখলাম তাতে আমার মাথা ঘুরে গেল। সাইকেলের ক্যারিয়ার খালি। জিতু নেই সেখানে। আমি টাল সামলাতে না পেরে নীচু জমির মধ্যে হুড়মুড়িয়ে পড়লাম। কোনওমতে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই দেখলাম, আমার থেকে হাত দশেক দূরে অন্ধকারে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখতে পাচ্ছি না। শুধু দেখতে পাচ্ছি তার গায়ের শাড়িটা হাওয়ায় উড়ছে। করুণ গলায় সে বলতে লাগল, আয়। আয়।

দেখলাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জিতু। জিতু তো ছিল না। তা হলে এল কোথা থেকে? না কি আমি ভুল দেখেছি? ভয়ে আমার বমি পেতে লাগল। তবু ওই ভয় পেতে পেতেই আমি বুঝতে পারলাম, জিতুর ওখানে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। আমি মাটিতে পড়ে থেকেই হাত বাড়িয়ে জিতুর পায়ের গোড়ালি চেপে ধরলাম। চিৎকার করে বললাম, যাস না জিতু। কিন্তু জিতুর গায়ে যেন মত্ত হাতির জোর। আমাকে নিয়েই এগিয়ে যেতে লাগল জিতু। মেয়েগলাটা তখনও বলে চলেছে, আয়। আয়।

* * *

বিলমাঠ থেকে আমাদের উদ্ধার করল চারটে মাতাল। নেশাড়ুদের ভয়ডর কম থাকে। তারা গেছিল আবডালে বসে নেশা করবে বলে। মৌতাত জমেও উঠেছিল ঠান্ডা হাওয়ায়। সম্ভবত আমার চিৎকারে তাদের চটকা ভাঙে। জিতুকে এই এলাকায় সবাই চেনে। আমাদের অচেতন হয়ে পড়ে থাকতে দেখে তারাই মামাবাড়িতে খবর দেয়। লোকজন সাথে করে গিয়ে বড়মামা আমাদের নিয়ে আসে। এই সবটাই শুনেছি পরের দিন দুপুরে ঘুম ভাঙার পরে। ছোটমামার মুখে।

ঘুম থেকে উঠে আমার শরীর কিন্তু বেশ ঝরঝরে হয়ে গেল। কাল সন্ধ্যায় যে অত কাণ্ড হয়েছে সবটাই কেমন দুঃস্বপ্নের মতো লাগছিল। তবে জিতু কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হল না। তার গায়ে একশো জ্বর। চোখ লাল হয়ে আছে। তার মধ্যেই জিতু আমাকে ফিসফিস করে বলল, আমি যে মন্দিরে ঢুকেছিলাম কাউকে বলিস না দাদা।

অবাক হলেও চুপ করে রইলাম। সবাই যখন জানতে চাইল কাল কী হয়েছিল, বললাম, বিলমাঠে আমি আর জিতু ভয় পেয়েছি। জিতুর কথামতো মন্দিরের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলাম। দিদা আমাদের দু’জনের গায়েই লোহা আগুনে সেঁকে ছুঁইয়ে দিল। চণ্ডীতলা থেকে চরণামৃত আনা হল। আমরা দুই ভাই সেই চরণামৃত খেলাম। বড়রা পইপই করে বলল, আর যেন সন্ধেবেলা বিলমাঠে না যাই। এটা না বললেও কিছু এসে যেত না। কারণ আমি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর ওমুখো হব না। যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। লোকমুখে যা ছড়িয়েছে সবটাই গুজব নয়। কারণ এখনও আমার কানে ভাসছে ওই আয়, আয় ডাক। কিন্তু হায় রে নিয়তি। এক দিনের মধ্যে আমাকে যে আবার ওই বিলমাঠে, ওই বউকালীবাড়ি মন্দিরে যেতে হবে সে কে জানত!

* * *

রাত্তিরে আমি জিতুর পাশেই শুলাম। জিতু খুব একটা ভালো করে খেল না। অবশ্য থার্মোমিটারে দেখলাম ওর গায়ে জ্বর নেই। ঘরে একটা মোমবাতি জ্বলছে। মাথার দিকে জানলাটা খোলা। বাগানের দিক থেকে সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। সে হাওয়ায় মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে মোমবাতির শিখা। আমি জিতুকে ডাকলাম, জিতু।

বল।

একটা কথা বলবি?

কী?

তুই সিগারেট না জ্বালিয়ে ফিরে এসেছিলি কেন?

বললাম তো আগুন নিভে গেছিল।

ব্যস?

আবার কী?, জিতু পাশ ফিরে শুল। বুঝলাম, কথা বাড়াতে চাইছে না।

কিন্তু কথা বাড়াতে না চাইলেই তো হবে না। আমারও তো কৌতূহল বলে একটা বস্তু আছে। হ্যাঁ, একটু ভয় ভয় করছে কিন্তু তা বলে কৌতূহল গিলে নেব? আমি ফের খোঁচালাম জিতুকে, এই জিতু। বল না মন্দিরের ভেতর কিছু দেখেছিলি?

জিতু বড় করে একটা শ্বাস ফেলল। বোধ হয় কিছু বলার জন্য আমার দিকে ঘুরল কিন্তু তখনই আর্তনাদের মতো একটা ঝোড়ো হাওয়া ঝাপটা মারল জানালায়। কটাস করে জানলার পাল্লাটা বন্ধ হল আর মোমবাতিটা নিভে গেল। কেউ যেন এক বালতি পিচগোলা অন্ধকার আমার মাথার ওপর ঢেলে দিল। এত অন্ধকার যে নিজের হাতটাও দেখতে পাচ্ছি না। জানলার পাল্লাটা কেমন একঘেয়ে কট কট শব্দ করছে। আমি অস্ফুটে ডাকলাম, জিতু। ঠিক তখনই মনে হল, খাটের পাশে কে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে পাথর হয়ে গেলাম। আমি ঘাড় ঘোরাচ্ছি না। আমি জানি না, কে এসে দাঁড়িয়েছে খাটের পাশে কিন্তু আমি তার নিঃশ্বাস অনুভব করছি আমার কাঁধে। আমি আস্তে করে বাঁ হাত দিয়ে জিতুকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার হাতটা শূন্যেই ঘুরে এল। বাঁ দিকে তাকাতে আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। জিতু আমার পাশে নেই। বিছানা খালি। তখনই আমার পায়ে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেলাম। কেউ যেন একটা আঙুল দিয়ে আমার পায়ের পাতায় সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আমি চিৎকার করতে চাইলাম কিন্তু আমার গলা দিয়ে একটুও আওয়াজ বেরোল না। হঠাৎ ঘরের মধ্যে একটা মৃদু আলো চলে এল। সে আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, জিতু আমার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে আছে। জিতুর চোখদুটো ভয়াবহ রকমের সাদা। আমি জিতুর চোখের মণি দেখতে পাচ্ছি না। অবিকল মেয়েদের মতো গলায় জিতু বলল, ভয় লাগছে দাদা? বলেই হেসে উঠল। নিঃশব্দ হাসি। কিন্তু হাসির দাপে জিতুর গা কাঁপছে। আমি দেখলাম, জিতুর মুখের মধ্যে একটা প্রদীপ জ্বলছে। জিতু হঠাৎ চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। তার পর ঘষটে ঘষটে ঢুকে যেতে লাগল খাটের তলায়। জানলার পাল্লাটা কট কট শব্দ করেই চলেছে।

খুব ভয়ের মধ্যেও কখনও কখনও মানুষের স্বাভাবিক চিত্তবৃত্তি কাজ করতে শুরু করে দেয়। আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলল, আমার এখনই এ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কোথা থেকে যে গায়ে বল পেলাম কে জানে। এক লাফে আমি খাট থেকে নেমে পড়লাম। দ্রুত ছুটে গেলাম দরজার দিকে। এক টানে খুলে ফেললাম দরজা। কিন্তু বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই বুঝলাম, খুব বড় ভুল করে ফেলেছি। বারান্দা থেকে সোজাসুজি তাকালে হাঁস-মুরগির ঘর। আমি স্পষ্ট দেখলাম সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারে মুখ দেখা যায় না কিন্তু বাতাসে তার শাড়ির প্রান্ত উড়ছে। করুণ গলায় সে বলল, আয়। আয়।

কীভাবে যে দিদার ঘরের দরজায় আছড়ে পড়েছি জানি না। যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমায় ঘিরে আছে বাড়ির সবাই। আমি শুয়ে আছি দিদার কোলে মাথা দিয়ে। আকুল গলায় দিদা বলছে, কী হয়েছে বাবুসোনা? ভয় পেয়েছিস?

আমি দিদাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার চোখে জল এসে গেল।

গ্রামটির পরিবেশ বড়ই মনোরম। গতকাল রাতে ভাদুড়ি মশায় এখানে এসে পৌঁছেছেন। প্রতি বছর এই সময়টায় তিনি বেরিয়ে পড়েন। ঘুরে বেড়ান গ্রামে গ্রামে। তিনি রামদাস ঠাকুরের প্রধান ঋত্বিক। ঠাকুরের নাম ছড়িয়ে দেওয়া, মন্ত্রদান করা তাঁর পবিত্র দায়িত্ব। আগে বছরে দু’বার বেরতেন। পা জখম হওয়ার পর থেকে বছরে একবারের বেশি বেরনোর অনুমতি পান না বাড়ি থেকে। আগে পায়ে হেঁটে ঘুরতেন। এখন বাড়ির গাড়ি আসে। এবার সঙ্গে এসেছে নাতনি অপালা। সে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করছে। আগে কখনও মন্ত্র দেওয়া দেখেনি সে। তাই তার খুব কৌতূহল। নাতনির আবদার অগ্রাহ্য করতে পারেননি ভাদুড়ি মশায়। তাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। যজমান গোবিন্দ মুহুরিকে আগে থেকেই বলা ছিল। তারা খুবই যত্ন করেছে। ভোর হতে নাতনির সঙ্গে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন ভাদুড়ি মশায়। অপালাকে গাছ চেনাচ্ছিলেন। আজকালকার ছেলেমেয়েরা গাছগাছালি চেনে না। ঝোপের ধারে ভীষণ সুন্দর ফুলের ঝাড়। লাল হলুদে মেশানো। ভাদুড়ি মশায় বললেন, বলো তো ওটা কী ফুল দিদিভাই?

তাঁকে অবাক করে অপালা বলল, পুটুস।

খুব খুশি হলেন বৃদ্ধ। ঘাড় নেড়ে বললেন, বাহ। বাহ। তুমি এ ফুলের নাম জানো? এ নাম কিন্তু শহরের ছেলেমেয়েদের জানার কথা নয়।

অপালার মুখটা সামান্য লাল হয়ে গেল। তাদের কলেজের একটি ছেলে শান্তনু, তারই এক বান্ধবীকে কিছুদিন আগে প্রপোজ করেছে, আর প্রপোজ করেছে গোলাপ বা সূর্যমুখী দিয়ে না, এই একরাশ পুটুস ফুল দিয়ে। ব্যাপারটা এত রোম্যান্টিক লেগেছিল অপালার যে বলার নয়। মনে হয়েছিল, তাকেও তো কেউ এমন ভাবে প্রপোজ করলে পারে। সে কথা তো আর দাদুর সামনে বলা যায় না। মিষ্টি হেসে সে বলল, গ্রামবাংলার সব ফুল চিনি না। ঘটনাচক্রে এই ফুলটাই চিনি।

এমন সময় একটা লোক ডাকতে ডাকতে ছুটে এল, ঠাকুরমশাই। ঠাকুরমশাই।

লোকটিকে চিনতে পেরেছেন ভাদুড়ি মশায়। এ হল গোবিন্দ মুহুরির বাড়ির মুনিশ ভজন। তিনি বললেন, কী ব্যাপার রে ভজন? এমন হুড়মুড় করে ছুটে এলি?

ভজন বলল, একবার বাড়ি চলেন ঠাকুরমশাই। সরকার বাড়ি থেকে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে। ওদের ছেলের খুব বিপদ।

ভুরুটা কুঁচকে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। এই ব্যাপারটাই তিনি চাননি। যেখানেই তিনি যান কী করে যেন রটে যায় একজন তন্ত্রসিদ্ধ মানুষ এসেছেন। ব্যস, লোকে নানারকমের সমস্যা নিয়ে আসতে শুরু করে। বেশির ভাগই বাজে আবদার। কেউ কেউ তো বউকে বশে আনার মন্ত্রও দিতে বলে। এসবে খুবই বিরক্ত হন তিনি। তাই এখানে আসার আগে পই পই করে গোবিন্দ মুহুরিকে এ ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেল কোনও লাভ হয়নি।

বিরক্তি নিয়েই বাড়িতে ঢুকলেন ভাদুড়ি মশায়। দেখলেন, একজন মধ্যবয়সী লোক হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। সে কিছু বলার আগেই গোবিন্দ মুহুরি এগিয়ে এসে বলল, অপরাধ নেবেন না ঠাকুরমশাই। এই মৃত্যুঞ্জয় আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আপনার কথা আমি খোলসা করে কাউকেই বলিনি কিন্তু আজ ভোরে যখন জানতে পারলাম ওর ভাগ্নার খুব বিপদ তখন আর চুপ করে থাকতে পারিনি। খুব ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ঠাকুরমশাই। কলকাতার কলেজে পড়ে।

ভাদুড়ি মশায় কিছু বলার আগেই অপালা উৎসাহিত হয়ে বলল, কলকাতার কোন কলেজ?

মাঝবয়সি লোকটা বলল, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় মা। খুব নামকরা।

লাফিয়ে উঠল অপালা, আরে আমিও তো যাদবপুরে পড়ি। কই সেই ছেলেটি? দেখি তো চিনি কি না?

গোবিন্দ বলল, ওই তো ঘরে শুইয়ে রেখেছি। যাও মা।

অপালা দ্রুত ঢুকে গেল ঘরে। ভাদুড়ি মশায় বুঝতে পারলেন এখানে না বলে বিশেষ লাভ হবে না। তিনিও অপালার পিছু পিছু ঘরের দিকে এগোলেন।

বিছানার ওপর নিস্তেজ হয়ে একটি ছেলে শুয়ে আছে। মুখটা দরজার দিকেই ফেরানো। ছেলেটির মুখ দেখেই চমকে উঠল অপালা, এ যে শান্তনু। যে তার প্রেমিকাকে পুটুস ফুল দিয়ে প্রপোজ করেছিল। শান্তনুকে দেখে বড় কষ্ট হল অপালার। আহা রে! অমন ছটফটে প্রাণচঞ্চল ছেলেটা এমন নিঝুম হয়ে শুয়ে আছে। সে বলে উঠল, এই শান্তনু। তুই এখানে? কী হয়েছে তোর?

কেমন ঘোলাটে চোখ মেলে তাকাল শান্তনু। অস্ফুটে বলল, অপালা তুই!

ততক্ষণে ঘরে ঢুকে এসেছেন ভাদুড়ি মশায়। তিনি বললেন, তুমি ছেলেটিকে চেনো দিদিভাই?

অপালা বলল, চিনি মানে? খুব চিনি। দাদু ও ইকোনমিক্সের শান্তনু। খুব ভালো ডিবেট করে।

ইতিমধ্যে ঘরে এসে ঢুকেছে গোবিন্দ মুহুরি এবং মৃত্যুঞ্জয় নামের লোকটি। মৃত্যুঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে ভাদুড়ি মশায় বললেন, কী হয়েছে আপনার ভাগ্নের?

মৃত্যুঞ্জয় বলল, আজ্ঞে ও খুব ভয় পেয়েছে ঠাকুরমশাই। এমনিতে খুবই শক্ত ধাতের ছেলে কিন্তু কী থেকে যে কী হল?

একটু হালকা হলেন ভাদুড়ি মশায়। বললেন, ভয় পাওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার। এর জন্য আমার কাছে আনার দরকার ছিল না। দু’দিন পরে এমনিই ঠিক হয়ে যাবে।

মৃত্যুঞ্জয় বলল, আমরাও তাই ভেবেছিলাম কিন্তু পরপর দু’দিন ভয় পেল ও। কাল রাতে তো অজ্ঞান হয়ে গিয়ে এখন তখন অবস্থা হয়েছিল। তার পর থেকেই কেমন নেতিয়ে রয়েছে। আপনি দয়া করে ওকে একটু দেখুন ঠাকুরমশাই।

একটু ভেবে ভাদুড়ি মশায় বললেন, বেশ ঠিক আছে। আপনারা বাইরে যান। আমি ওর সাথে একটু একা কথা বলতে চাই।

মাথা নেড়ে দু’জন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। অপালা বলল, আমিও কি বেরিয়ে যাব দাদু?

না। তুমি চাইলে থাকতে পারো। ছেলেটি তোমার পরিচিত। তুমি থাকলে ও কথা বলতে স্বস্তি বোধ করবে।

ক্রাচ দুটি পাশে রেখে চেয়ার টেনে আমার মাথার কাছে বসলেন বৃদ্ধ। আমার কপালে হাত রেখে বললেন, শরীরটা কি ভালো নেই বাবা?

এত মায়া মানুষের হাতে থাকে থাকে? আরামে আমার চোখ বন্ধ হয়ে এল। গত দু’দিনে যেন এই প্রথম একটু শান্তি পেলাম। এই মানুষটা যে অপালার দাদু বুঝতে পারছি। কিন্তু উনি আমাকে কীভাবে সাহায্য করবেন বুঝতে পারছিলাম না। ভ্যান গাড়িতে করে নিয়ে আসার সময় মামা বলছিলেন, যার কাছে নিয়ে যাচ্ছি খুব সিদ্ধ পুরুষ। মস্ত বড় তন্ত্রসিদ্ধ পণ্ডিত। সব খুলে বলবি বাবুসোনা। দেখবি উনি সব ঠিক করে দেবেন।

এমনি সময় হলে আমি এসব তন্ত্রসিদ্ধ, মন্ত্রসিদ্ধতে কতটা বিশ্বাস করতাম জানি না। কিন্তু গত দু’ দিন ধরে যা চলছে আমার সাথে তাতে আমার অবিশ্বাস করার মতো অবস্থা নেই। বৃদ্ধ আবার বললেন, তুমি কি এখন আমার সাথে কথা বলতে পারবে?

আমি ঘাড় নাড়লাম, পারব দাদু।

ছেলেটির দাদু ডাকে বেশ চমৎকৃত হলেন ভাদুড়ি মশায়। ছেলেটি অপালার সহপাঠী। সেই হিসেবেই তাঁকে দাদু বলে ডেকেছে। ছেলেটির প্রতি এক ধরনের অপত্য মায়া অনুভব করলেন তিনি। মৃদু হেসে বললেন, এবার আমাকে খুলে বলো তো কী হয়েছিল। কিচ্ছু বাদ দেবে না কেমন?

আমি বলতে শুরু করলাম। সবটা খুলে বললাম অপালার দাদুকে। জিতু বারণ করলেও, ওর মন্দিরে সিগারেট ধরাতে যাওয়ার ব্যাপারটাও বাদ দিলাম না।

সবটা গম্ভীর হয়ে শুনলেন অপালার দাদু। তার পর আমায় জিগ্যেস করলেন, তোমার মামাতো ভাই আসেনি?

না দাদু। ওর রেশন কার্ডে সমস্যা হয়েছে। আজ সেটা ঠিক করার ডেট পড়েছে। ওখানেই গেছে বাধ্য হয়ে। না হলে আসত।

আচ্ছা। তোমার থেকে কত বছরের ছোট এই মামাতো ভাই?

দু’ বছরের।

কী করে ও? কলেজে পড়ে?

হ্যাঁ। এখানকার কলেজেই পড়ে। ইকোনমিক্স অনার্স।

তুমিও তো ইকোনমিক্স।

হ্যাঁ দাদু। জিতু প্রথম দিকে বলেছিল প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হবে। আমি ওকে গাইডও করছিলাম। তার পর হঠাৎ মত বদলাল। বলল, শহরে যাবে না।

তা ভালো। সবাই যদি শহরে চলে যায় গ্রাম যে ফাঁকা হয়ে যাবে। পড়াশোনা নিজের হাতে। যে কোনও জায়গায় পড়লেই হল।

এই অবধি বলে চুপ করে গেলেন ভাদুড়ি মশায়। ভাবতে লাগলেন। তিনি ছেলেটির সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা করছেন। খানিকক্ষণ পরে মৃদু হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। বললেন, তোমার কিচ্ছু হয়নি। উঠে বোসো।

বৃদ্ধের বলার মধ্যে কী যেন একটা শক্তি ছিল। একটা সম্মোহন ছিল। আমারও মনে হল, সত্যি আমার কিছু হয়নি। আমি ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। বৃদ্ধ বললেন, তোমায় একটা প্রবাদ বলি বাবা। কথায় বলে, বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়। এর মানে জানো?

আমি ঘাড় নাড়লাম, না দাদু।

অপালা বলল, আমি জানি এর মানে। এর মানে হল আসলে বাঘটা নেই। বাঘের ভয়টা আছে।

বৃদ্ধ বললেন, ঠিক বলেছ দিদিভাই। দেখো শান্তনু, ওই যে বলে না, রজ্জুতে সর্পভ্রম। দড়ি দেখে সাপ ভেবে ভুল করা, এও অনেকটা তাই। তুমি এই মন্দির সম্পর্কে আগে থেকেই নানা মিথ শুনেছ। তার পর অন্ধকার মাঠে যখন তুমি এই মন্দির দেখলে তোমার একটু ভয় লাগল। কিন্তু তোমার যুক্তিবাদী মন সেই ভয়টাকে পাত্তা দিতে চাইল না। এখানেই বিপদটা হয়ে গেল। তোমার অবচেতনে ভয়টা চেপে বসল। এর চেয়ে তুমি যদি একটু ভয় পেয়ে নিতে তা হলে এত কাণ্ডই হত না। এর মধ্যেই তোমার ভাই জিতু মন্দিরের ভেতরে গেল। তার দেরি দেখে তোমার অবচেতন মন নানা কিছু কল্পনা করতে শুরু করল এবং তোমার যুক্তিবোধ প্রতি মুহূর্তে তাকে খণ্ডন করতে লাগল। এই দুইয়ের দ্বন্দে তোমার মনে একটা বিভ্রম সৃষ্টি হল। যার ফলশ্রুতিতে তুমি নানা অদ্ভুত জিনিস দেখতে শুরু করলে। আমার কথাগুলো কি তোমার যুক্তিগ্রাহ্য মনে হচ্ছে?

আমি বললাম, হ্যাঁ দাদু। মনে হচ্ছে কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি স্পষ্ট দেখেছি ওই ছায়ামূর্তিটা। তার কাপড় উড়তেও দেখেছি। সে যে আয় আয় বলে ডাকছিল সেটাও স্পষ্ট শুনেছি।

সবটাই তোমার অবচেতন মনের কল্পনা বাবা। আমরা আমাদের অবচেতনে যে ছবিগুলো তৈরি করি সেগুলো খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেখবে কিছু কিছু স্বপ্ন যেন বাস্তবের থেকেও সত্যি মনে হয়। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি তোমায় একটা উপায় বলে দিচ্ছি। এটা করে দেখো, তুমি চিরকালের মতো এই ভয় থেকে মুক্তি পাবে।

কী উপায় দাদু?

এর উত্তরে বৃদ্ধ যে কথাটা বললেন সেটা শুনে আমি খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলাম। তিনি বললেন, আজ সন্ধেবেলা তুমি আবার ওই মন্দিরের কাছে যাবে এবং এবার নিজে ওই মন্দিরে ঢুকবে।

নিজেকে সামলে আমি বললাম, একা ওই মন্দিরে যাব?

বৃদ্ধ বললেন, হ্যাঁ। শুধু যাবেই না, সেখানে খানিকক্ষণ বসবে। হাওয়া খাবে। দরকারে মায়ের পায়ের কাছে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবে। আমার বিশ্বাস, তুমি দেখবে ওই মন্দিরের মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকত্ব নেই। আর যে মুহূর্তে তুমি সেটা অনুভব করবে তোমার অবচেতন মনের ওপর থেকে চাপ কমে যাবে। আমি কোনও মনোবিজ্ঞানী নই বাবা। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে মানুষের ভয় পাওয়ার সাথে আমার পরিচিতি হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমি দেখেছি, মানুষকে তার ভয়ের উৎসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলে তার ভয় কেটে যায়। আজ সন্ধেবেলা একা ওই মন্দিরে যেও। সব মঙ্গল হবে। যাও, এবার নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও।

আমি অপালাকে আর অপালার দাদুকে বিদায় জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসে অপালার দাদু বড়মামার কাছেও একই নিদান দিলেন। একা একা মন্দিরে যেতে হবে শুনে বড়মামা একটু খুঁতখুঁত করছিলেন কিন্তু গোবিন্দ মামা বড়মামার কানে কানে বলল, ভাদুড়ি মশায় যা বলেন তা একেবারে অব্যর্থ। আমি আগেও এ জিনিস দেখেছি। ওনার কথা নিয়ে দ্বিমত করিস না মৃত্যুঞ্জয়। শান্তনুকে মন্দিরে পাঠা, ও ভালো হয়ে যাবে।

বড়মামা আমায় নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। ততক্ষণে কাজ মিটিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে জিতু। সব শুনে সে বেঁকে বসল, কিছুতেই না। দাদা একা একা বউকালীবাড়ি মন্দিরে যাবে না। আগের দিন বাইরে থেকেই দেখেই এত কাণ্ড হয়েছে। এর পর সন্ধেবেলা একা একা মন্দিরের ভেতরে গিয়ে বসে থাকলে আর দেখতে হবে না। কোথাকার কে মন্ত্রসিদ্ধ এলেন! উনি কী জানেন বউকালীবাড়ি মন্দির সম্পর্কে? শহরের লোক তো, সবজান্তা হাবভাব।

আমিই থামালাম জিতুকে, না রে জিতু। মানুষটাকে আমার ধাপ্পাবাজ মনে হয়নি। ওনার কথাগুলো খুবই যুক্তিযুক্ত। হতেও তো পারে আমার হ্যালুসিনেশন হয়েছে।

জিতু যেন একটু বিরক্ত হল। বলল, দেখ দাদা তুই জানিস আমি অত ভয়টয় পাই না। কিন্তু তুই যখন একবার ভয় পেয়েছিস এই রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে না। তুই যেতে চাইছিস যা। কিন্তু আমিও তোর সাথে যাব। মন্দির থেকে কিছুটা দূরে বসে থাকব।

মামি বলে উঠল, তুই একা না জিতু। তোর বাবা, কাকা আর পদা মুনিশকেও নিয়ে যা। বিপদ বুঝলে সবাই মিলে ছুটে যেতে পারবি। আর শান্তনু যখন মন্দিরে ঢুকবে তখন আমি চণ্ডীতলায় পুজো দেব। ওর কিচ্ছু হবে না।

শেষমেশ এই সিদ্ধান্ত হল যে আজ সন্ধেবেলায় আমি একা বউকালীবাড়ি মন্দিরে ঢুকব। মন্দির থেকে কিছুটা দূরে ঢিপির নীচে আমার জন্য অপেক্ষা করবে বড়মামা, ছোটমামা, জিতু, পদা মুনিশ এবং আরও কয়েকজন। বিপদ বুঝলে তারা ছুটে যাবে।

দিদা আমার হাত ধরে বলল, আমার যে খুব ভয় করছে বাবুসোনা।

মন্ত্রদান পর্ব সমাপ্ত হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। গোবিন্দ মুহুরির উঠোনে একটা বড় তেঁতুল গাছ। বেশ ছায়া হয়। তারই নীচে চেয়ার পেতে বসেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। অপালা ভেতরে বাড়ির মেয়েদের সাথে গল্প করছে। বিকেলবেলা তাঁরা রওনা হবেন এখান থেকে। মন্ত্রদানের পরেই ভাদুড়ি মশায় বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু গোবিন্দ আটকে দিয়েছে। অনেক অনুরোধ করেছে দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে যেতে। সাধারণত যজমানের কথা ফেলেন না ভাদুড়ি মশায়। থাকতে রাজি হয়েছেন। বসে বসে শান্তনু বলে ছেলেটির কথাই ভাবছিলেন তিনি। ছেলেটির কাছ থেকে যা শুনেছেন তাতে তিনি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন কিন্তু আবার পুরোটা ভাবতে বসে তাঁর মনে হতে লাগল কোথাও যেন একটা খটকা আছে। কিন্তু খটকাটা কী কিছুতেই ধরতে পারছিলেন না তিনি। এমন সময় একজনের গলার আওয়াজে তাঁর চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেল, নমস্কার ঠাকুরমশাই।

চোখ তুলে দেখলেন নামাবলী গায়ে এক প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে আছেন। বছর ষাটেক বয়স হবে। মাথার চুলে সাদা ছোপ ধরেছে। হাত জোড় করেই তিনি বললেন, ঠাকুরমশাই, আমি গ্রামের চণ্ডীতলার পূজারি শিবনাথ চক্রবর্তী। বউকালীবাড়িতেও আমিই পুজো করি।

প্রতিনমস্কার করলেন ভাদুড়ি মশায়। পাশে একটি মোড়া খালি ছিল, সেটা দেখিয়ে বললেন, বসুন।

বসতে বসতে শিবনাথ বললেন, সকালেই আপনার আসার খবর পেয়েছি। এই এতক্ষণ দৈনন্দিন পুজোপাঠ শেষ হল। ভাবলাম একবার দেখা করে যাই আপনার সাথে।

ভাদুড়ি মশায় বললেন, ভালো করেছেন। আপনি কি এ গ্রামেই থাকেন?

শিবনাথ বলতে লাগলেন, এ গ্রামে তাঁদের সাত পুরুষের বাস। সবাই পূজারি। তাঁর পূর্বপুরুষ ভবতোষ হালদারের বাড়ির প্রধান পুরোহিত ছিলেন।

কে ভবতোষ হালদার? বিখ্যাত কেউ? কৌতূহলে প্রশ্ন করলেন ভাদুড়ি মশায়।

শিবনাথ উৎসাহ পেয়ে ভবতোষ এবং বউকালীবাড়ির মিথ শোনাতে লাগলেন ভাদুড়ি মশায়কে। গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল তাঁর। তিনি বললেন, আমি বহুকাল থেকেই মন্ত্রদানের জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরছি। সব গ্রামেই কোনও একটি দেবস্থান নিয়ে এ ধরনের গল্প প্রচলিত থাকে। তবে এ গল্পটি আর পাঁচটার মতো নয়। বেশ অন্যরকম।

এ কথায় যেন খানিক ক্ষুব্ধ হলেন শিবনাথ। বললেন, আপনি তো আস্তিক। তার পরেও একে গল্পকথা বলছেন?

একটু হাসলেন ভাদুড়ি মশায়, আস্তিক্যের সাথে সংস্কার, বিশেষ করে কুসংস্কারের কিন্তু খুব একটা যোগ নেই শিবনাথবাবু। তা হলে তো হাঁচি, বেড়াল রাস্তা ডিঙানো সব মানতে হয়। আমি আপনার বিশ্বাসকে ছোট করছি না। কিন্তু আমার কী মনে হয় জানেন তো? দেব-দেবী তো অনেক দূরের বাসিন্দা অথচ মানুষ তাঁদের আপন করতে চায়। এ ধরনের গল্প আসলে দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা। কোনও মন্দিরে বা কোনও বিশেষ বিগ্রহে দেবতা জাগ্রত হন না সে কথা আমি বলছি না কিন্তু সে খুবই আশ্চর্য ঘটনা। কোটিকে গুটিক।

তাঁদের গ্রামের তথাকথিত জাগ্রত বউকালীবাড়ি মন্দিরকে খুব একটা পাত্তা না দেওয়ায় এবার যেন খানিকটা রেগেই গেলেন শিবনাথ। ফস করে বলে বসলেন, এই যুক্তিতেই আপনি মৃত্যুঞ্জয়ের ভাগ্নেকে ভর সন্ধেবেলায় মন্দিরে যাওয়ার নিদান দিয়ে দিলেন তাই তো? আপনি জানেন এর ফল কতদূর খারাপ হতে পারে?

শিবনাথের বলার ধরনে একটু অসন্তুষ্ট হলেন ভাদুড়ি মশায়। সোজা হয়ে বসলেন, কতদূর খারাপ হতে পারে শুনি?

তীব্র কণ্ঠে শিবনাথ বললেন, ছেলেটা বেঘোরে মারা পড়তে পারে ঠাকুরমশাই। বউকালীবাড়ি মন্দির বড় সহজ জায়গা নয়। আমরা এ গ্রামের আদি বাসিন্দা। আমি বলছি আপনাকে বউকালীবাড়ির খারাপ ইতিহাস আছে। এককালে ওই মন্দির ডাকাতরা দখল করেছিল। দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে ডাকাতদের আরাধ্যা ছিলেন বউকালী। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে ডাকাতরা ওখানে বলি দিত। গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে বলির জন্য বাচ্চা ছেলেমেয়ে ধরে আনত ডাকাতরা। সেই বলি তো বন্ধ হয়েছে হালে। বড়জোড় ষাট-সত্তর বছর আগে। পুলিশের তাড়া খেয়ে ডাকাতরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। চারদিকে জনপদ বাড়তে লাগল। প্রশাসন আগের থেকে শক্ত হল। ডাকাতির পরিমাণ কমতে লাগল। তাও লুকিয়ে চুরিয়ে বলি হত। আর এই বলি হতে হতে কী হল জানেন?

শিবনাথের বলার ভঙ্গিটি মনোগ্রাহী। শ্রোতাকে গল্পের মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়ার একটা ক্ষমতা আছে এই লোকটির মধ্যে। সম্ভবত ইনি কথকতা করেন। ভাদুড়ি মশায়ও মন দিয়ে শুনছিলেন শিবনাথের কথা। কৌতূহলী শ্রোতার মতো তিনি বলে উঠলেন, কী হল?

শিবনাথ বললেন, দেখুন ঠাকুরমশাই, আমি বিশ্বাস করি মা বলি চান না। তিনি সন্তানের রক্ত দেখতে পছন্দ করেন না। কিন্তু মা না চাইলেও মায়ের সাঙ্গপাঙ্গরা তো রক্তখেকো। কত ডাকিনী, হাঁকিনী, পিশাচ, প্রেত ঘুরে বেড়ায় কালীস্থানের আশপাশে। বলির রক্তে তাদের লোভ। আর বছরের পর বছর এই বলির রক্ত পেতে পেতে তাদের অভ্যেস খারাপ হয়ে গেছে। তারা হ্যাংলা হয়ে গেছে। তারা আজও চায় বলি হোক। একবিন্দু বলির রক্তের জন্য ছটফট করে। সে জন্যই তো রাতের বেলা নানা কাণ্ডকারখানা হয় ওখানে। ডাকিনীরা নানা ছল করে মানুষকে ডাকে। ছেলেটিকে সন্ধেবেলায় ওখানে পাঠাবেন না ঠাকুরমশাই। আমি ওর বাড়ির লোককে বারণ করেছিলাম। কিন্তু যা হয়, গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। আমার কথায় ওরা গুরুত্ব দিল না। কিন্তু আমি আপনাকে বলে যাচ্ছি, ছেলেটির যদি কোনও ক্ষতি হয় দায়ী থাকবেন আপনি।

সদর্পে পা ফেলে চলে গেলেন শিবনাথ। যেন এক অবাঞ্ছিত দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেলেন ভাদুড়ি মশায়ের ওপর।

* * *

ম্লান লাল রঙের সূর্য ডুবে গেল দিগন্ত সীমায়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল বিলমাঠের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। কালো সুতোয় বোনা মোটা এক তুষের চাদর কেউ যেন বিছিয়ে দিতে লাগল আমাদের মাথার ওপরে। একটু একটু করে অদৃশ্য হয়ে গেল গায়ের রোমরাজি। একটা দুটো করে তারা ফুটে উঠতে লাগল আকাশে। দূর থেকে ধেয়ে এল ঠান্ডা হাওয়া। আমার একটু শীত করতে লাগল। বড়মামা বলল, তা হলে আর দেরি করে লাভ কী বাবুসোনা? তুই ভেতরে যা।

আমি ঘাড় নাড়লাম।

জিতু বলল, আমরা এখানেই আছি। কিছু এদিক ওদিক হলেই চিৎকার করবি। আমরা ছুটে চলে যাব।

আমি মনে মনে অপালার দাদুর কথাগুলো আওড়াচ্ছিলাম, ‘বনের বাঘে খায় না। মনের বাঘে খায়।’ ঠিকই। মনের ওপর চাপ পড়াতেই আমি ভয় পেয়েছি। শহরে বড় হওয়া ছেলে আমি, এসবে কোনও দিন বিশ্বাস করিনি। আজ ভয়ের মুখোমুখি হয়েই আমাকে ভয়কে জয় করতে হবে। মামাদের পেছনে ফেলে আমি এগিয়ে যেতে লাগলাম গাছে গাছে ঝুপসি হয়ে থাকা ঢিপিটার দিকে। কিন্তু যত এগোতে থাকলাম আমি বুঝতে পারলাম ইনফ্লুয়েঞ্জার জ্বরে যেমন সারা গায়ে ব্যথা হয় তেমন ভাবেই ভয়টা ছড়িয়ে পড়ছে আমার সমগ্র চেতনা জুড়ে। আমার হাতে একটা টর্চ আছে। সেই আলোয় শুকনো পাতা পেরিয়ে আমি এগিয়ে যাচ্ছি মন্দিরের দিকে কিন্তু টর্চের আলোয় ওই নিশ্ছিদ্র অন্ধকার যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এক সময় টর্চ নিভিয়ে দিলাম আমি। চেষ্টা করলাম অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিতে। আবছা আবছা দেখতে লাগলাম চারপাশ আর তখনই খেয়াল করলাম মন্দির চত্বরটা যেন শ্মশানের চেয়েও নিস্তব্ধ। একটু আগেই বিলমাঠে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনছিলাম। মাঝে মাঝে ব্যাঙ ডেকে উঠছিল। কিন্তু এখানে কোনও শব্দ নেই। চারদিকে শুধু লেপটে আছে দমবন্ধকর মৃত্যুহিম নিস্তব্ধতা। পায়ে পায়ে মন্দিরের দরজার সামনে এসে পৌঁছলাম আমি। খুবই সাদামাটা স্ট্রাকচার। দু’ধাপ সিঁড়ি। তার পর একটুখানি দালান মতো। তার পরেই গর্ভগৃহ। সেখানে টিমটিম করে একটা প্রদীপ জ্বলছে। সেই আলোয় সামান্য আলোকিত হয়েছে কালীমূর্তিটুকু। প্রদীপের শিখার ক্ষমতা ওটুকুই। তার সাধ্য নেই কালিগোলা অন্ধকারের সাথে পাল্লা দেয়। তাই বাকি মন্দিরটা ডুবে আছে আঁধারে। গুটি গুটি পায়ে আমি গর্ভগৃহের ভেতরে গিয়ে ঢুকলাম। কতক্ষণ থাকতে হবে সে কথা অপালার দাদু আমায় বলেননি। আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম মিনিট দশেক থাকব। ভয়কে জয় করার চেষ্টা করতে করতে আমি গর্ভগৃহের দরজার কাছে বসে পড়লাম।

যে মন্দিরে নিয়মিত পুজো হয় সেখানে পুরনো ফুল, ধূপ, ধুনো, ফল-প্রসাদের একটা মিশ্র গন্ধ থাকে। এ মন্দিরও তার ব্যতিক্রম নয়। এই গন্ধটার মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। বসে থাকতে থাকতে, প্রদীপের শিখায় আলোকিত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার যেন একটু একটু করে ভয়টা কেটে যেতে লাগল। মনে হতে লাগল এই দেবস্থানে অমঙ্গলজনক কিছু হওয়া সম্ভব নয়। যা ঘটেছে সবই আমার উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা। তার পেছনে বউকালীবাড়ির কোনও ভূমিকা নেই।

মিনিট দশেক প্রায় হয়ে এসেছে। আমি ওঠার তোড়জোড় করছি এমন সময় মন্দিরের বাইরে খুব অস্পষ্ট একটা শব্দ পেলাম। কেউ যেন জোরে নিঃশ্বাস নিল। খুব আবছা শব্দ কিন্তু ওই নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতার সুর কেটে গেল। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। যে ভয়টাকে আমি মন থেকে সরিয়ে ফেলেছিলাম সেই ভয় যেন ফের শ্বাপদের মতো গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে। নিজের অজান্তেই হাত জোড় করে আমি বিড়বিড় করে উঠলাম, রক্ষা করো মা। রক্ষা করো। আর তখনই যেন আমার এই প্রার্থনাকে ব্যঙ্গ করে কেউ খলখল করে মেয়েগলায় হেসে উঠল। প্রদীপের অল্প আলোয় চকচক করে উঠল মূর্তির লাল জিভ আর দাঁতগুলো। আমার মনে হল এক্ষুনি ওই দাঁতগুলো আমার গলায় বসে যাবে। আমার পা টলে গেল। দরজার কপাট ধরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতেই করতেই শুনতে পেলাম আমার ঠিক পেছনে মন্দিরের চাতালটায় নূপুর বাজছে। রুমঝুম, রুমঝুম শব্দ করতে করতে কে যেন হেঁটে আসছে আমার দিকে। স্বাভাবিক প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় আমি পেছন ঘুরলাম আর ঘুরতেই দেখলাম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সেই ছায়ামূর্তি। হাওয়ায় অল্প অল্প উড়ছে তার আঁচলের প্রান্ত। খুব উচ্ছল কণ্ঠে সে বলল, আমি জানতাম তুই আসবি। আমার ডাক কেউ অগ্রাহ্য করতে পারে না।

সমস্ত শরীর অসাড় করে দেওয়া ভয়ে আমি পালাতে চাইলাম কিন্তু পালানোর উপায় নেই। অলঙ্ঘ্য নিয়তির মতো আমার পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে সে। অগত্যা পিছু হটলাম। কিসে যেন ধাক্কা খেলাম আমি। চমকে দেখলাম আমি দাঁড়িয়ে আছি কালীমূর্তির ঠিক খাঁড়াটার নীচে। আর তখনই নিভে গেল প্রদীপটা। হাড় জমিয়ে দেওয়া অন্ধকারে অভিশপ্ত এই মন্দির যেন আমার বলি গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিল। অজ্ঞান হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আমি শুনলাম, কে যেন বড় মায়া ভরা গলায় আমার নাম ধরে ডাকছে।

অজ্ঞান শান্তনুকে মন্দিরের ভেতর থেকে উদ্ধার করলেন ভাদুড়ি মশায়। সঙ্গে শান্তনুর মামাবাড়ির লোকেরা। মন্দিরের বাইরে এনে চোখে জলের ছিটে দিতেই প্রাথমিক ভাবে জ্ঞান ফিরে পেল শান্তনু এবং উদভ্রান্তের মতো বলল, ওই যে... ওই সেই ছায়ামূর্তি। আমায় নিতে এসেছে। আমায় নিতে এসেছে।

তার পরেই আবার অজ্ঞান হয়ে গেল। শান্তনুকে ওর মামার কোলে শুইয়ে রেখে যত দ্রুত সম্ভব মন্দিরের ভেতরে ঢুকলেন ভাদুড়ি মশায়। আসলে দুপুর থেকেই শিবনাথ চক্রবর্তীর কথাগুলো তাঁর কানে বাজছিল। যদিও এই মন্দিরের মিথে তিনি বিশ্বাস করেননি তবু পৌত্রসম ছেলেটির ক্ষতির আশঙ্কা তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। তাই বাড়ি ফিরতে গিয়েও সিদ্ধান্ত বদলে তিনি এসে পড়েছিলেন বউকালীবাড়ি মন্দিরে। শান্তনু যে অস্বাভাবিক ভয় পেয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই কিন্তু মন্দিরের গর্ভগৃহে ঢুকেই মনটা ভালো হয়ে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। বড় পবিত্র একটি সুগন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে আশপাশে। নিজে হাতে প্রদীপখানি ফের জ্বালালেন তিনি। সেই আলোয় মায়ের মুখখানি দেখে বড় শান্তি পেলেন। মা করালবদনা নন বরং মায়ের মুখে স্মিত হাসি। এ যে মায়ের শান্ত, স্নিগ্ধ রূপের প্রকাশ। বহুকাল ধরে আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক বিষয় নিয়ে চর্চা করছেন তিনি। কোনও জায়গায় গিয়ে এক মুহূর্তে বুঝতে পারেন জায়গাটির মধ্যে কোনও নেগেটিভিটি আছে কি না। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন এই মন্দিরে কোনও সমস্যা নেই। এমন পবিত্র জায়গায় কোনও সমস্যা থাকতে পারে না। তা হলে শান্তনু এত নিশ্চিত ভাবে ছায়ামূর্তির কথা বলছে কেন? মুহূর্তে একটা ভাবনা আলোড়িত করল ভাদুড়ি মশায়কে এবং তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে গোবিন্দ মুহুরিকে বললেন, গোবিন্দ তোমাদের গ্রামের পুরোহিত শিবনাথ চক্রবর্তীকে এখন কোথায় পাব?

ভাদুড়ি মশায়ের গলার স্বরে চমকে উঠল উপস্থিত জনতা। গোবিন্দ ভয়ে ভয়ে বলল, কেন ঠাকুরমশাই? ওনাকে দিয়ে কী হবে?

আহ! উল্টো প্রশ্ন না করে জবাব দাও। বিরক্তি ঝরে পড়ল ভাদুড়ি মশায়ের কণ্ঠে।

আজ্ঞে উনি তো এই সময় চণ্ডীমণ্ডপেই থাকেন।

এখুনি আমাকে সেখানে নিয়ে চলো। মৃত্যুঞ্জয়, আপনি শান্তনুকে নিয়ে বাড়ি যান। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আপনার বাড়ি আসছি।

দ্রুত এগিয়ে চললেন ভাদুড়ি মশায়। ক্রাচের সাহায্য নিতে না হলে বোধ হয় এতক্ষণে তিনি ছুটে চলে যেতেন।

গোবিন্দ মুহুরিকে সঙ্গে নিয়ে ভাদুড়ি মশায় যখন চণ্ডীমণ্ডপে এসে পৌঁছলেন ততক্ষণে সন্ধ্যারতি সেরে ফেলেছেন শিবনাথ। ভাদুড়ি মশায়কে অমন ঝড়ের বেগে আসতে দেখে তিনি বেশ খানিকটা অবাক হলেন, ঠাকুরমশাই আপনি?

কথা না বাড়িয়ে জলদমন্দ্র স্বরে ভাদুড়ি মশায় বললেন, আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?

প্রশ্নটা শুনেই একটু থতিয়ে গেলেন শিবনাথ। তার পর গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনি কি আমার কাছে কৈফিয়ত চাইছেন?

না। আমি সামান্য একটা প্রশ্ন করেছি। আপনি তাকে জটিল করছেন কেন?

আপনার প্রশ্ন করার ধরন দেখেই জিগ্যেস করছি ঠাকুরমশাই। কী হয়েছে একটু খুলে বলবেন কি?

একটু চুপ করে থেকে ভাদুড়ি মশায় বললেন, শান্তনু কিছুক্ষণ আগে বউকালীবাড়ি মন্দিরে গেছিল এবং ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে।

কয়েক মুহূর্ত ভাদুড়ি মশায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন শিবনাথ। তার পর হো হো করে হেসে উঠে বললেন, আপনার কী ধারণা আমি ভূত সেজে ছেলেটাকে ভয় দেখিয়েছি?

একেবারে সোজাসাপটা এই কথায় খানিকটা যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন ভাদুড়ি মশায়। কিন্তু তাঁকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কঠিন গলায় শিবনাথ বললেন, শুনুন ঠাকুরমশাই আমি বিশ্বাস করি বউকালীবাড়িতে কিছু সমস্যা আছে। আপনি আমাদের এলাকার মানুষ না, আপনি সে কথা বিশ্বাস নাই করতে পারেন। কিন্তু আমার কথাকে সত্যি প্রমাণ করার জন্য আমি লুকিয়ে থেকে ছেলেটাকে ভয় দেখাব এতটাও হীন আমি নই। আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলতে পারি, আমি বিকেল থেকে এই মন্দিরেই ছিলাম। আপনার বিশ্বাস না হয় আপনি গ্রামের লোকেদের জিগ্যেস করে দেখতে পারেন। অবশ্য গ্রামের লোকেদের কথাতেও আপনার প্রত্যয় নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি বরং শান্তনুর মামিকে জিগ্যেস করুন। সে নিজেই শান্তনুর নামে পুজো দিতে এসেছিল। এই যে তার দেওয়া ডালা। দেখুন। দেখুন।

এই বলে ভাদুড়ি মশায়ের সামনে একটা পুজোর ডালা তুলে ধরলেন শিবনাথ। লজ্জিত বোধ করছিলেন ভাদুড়ি মশায়। এখানে ছুটে আসার আগে তাঁর একটু ভাবা উচিত ছিল। শিবনাথের কাছে কীভাবে ক্ষমা চাইবেন বুঝতে পারছিলেন না কিন্তু তখনই তাঁর চোখ আটকে গেল ডালার একটা বিশেষ জায়গায়। চমকে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়। বাসরঘরের ছিদ্রগুলির চরিত্র একই রকম। চোখের সামনেই থাকে অথচ অদ্ভুত অন্তরালবর্তী আচরণ। কিছুতেই দেখা যায় না। শান্তনুর গল্প শুনে শুরু থেকে যে খটকাটা লাগছিল সেটা যেন এক মুহূর্তেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে এল। তবে এবার আর হঠকারী হওয়া যাবে না। নিশ্চিত হতে হবে। শিবনাথের কাছে ক্ষমা চেয়ে দ্রুত পায়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন ভাদুড়ি মশায়। এখন তাঁকে একটা ফোন করতে হবে। যাদবপুরের কলেজের বর্তমান উপাচার্য অমিতাভ গুপ্তর সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। অমিতাভ তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা করে। অনেকবার যাদবপুরের সেমিনারে নিমন্ত্রণ করেছে। একমাত্র অমিতাভই তাঁর সংশয় নিরসন করতে পারবে।

অমিতাভর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন ভাদুড়ি মশায়। তিনি একটি বিষয় জানতে চেয়েছেন। অমিতাভ জানিয়েছে, আধ ঘণ্টা পরে ফোন করবে। অমিতাভর ফোনের অপেক্ষা করতে লাগলেন ভাদুড়ি মশায়। মনটা তেতো হয়ে গেছে তাঁর। তাঁর আশঙ্কা যদি সত্যি হয় তা হলে সেটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক হবে। মিনিট কুড়ি কাটতে না কাটতেই ফোন করলেন অমিতাভ। অমিতাভর কথা শুনে ভুরু কুঁচকে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। অমিতাভকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রাখলেন তিনি। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই মুহূর্তে বড় অসহায় বোধ করলেন। বরাবর দেখেছেন, তাঁর অনুমান অভ্রান্ত। কিন্তু এক্ষেত্রে যেন তা না হলেই তিনি খুশি হতেন। গোবিন্দ মুহুরিকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিলেন শান্তনুর মামাবাড়ির উদ্দেশে।

* * *

ভাদুড়ি মশায়কে দেখে যেন খানিক বিরক্ত হল মৃত্যুঞ্জয়। শান্তনুর অবস্থা বিশেষ সুবিধের না। আবার জ্বর এসেছে। জ্বরের ঘোরে ভুল বকছে। ডাক্তার ডাকা হয়েছে। অনেকক্ষণ থেকেই মৃত্যুঞ্জয়ের মনে হচ্ছিল, ওই ভাদুড়ি মশায়ের কথা না শুনলেই ভালো হত। জিতু তো রীতিমতো রাগারাগি করছে। এমন একটা অবস্থায় ভাদুড়ি মশায়ের উপস্থিতি অনভিপ্রেত। তবু যথাসম্ভব সম্মান দিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বলল, ঠাকুরমশাই আপনি? কিছু বলবেন?

ভেতরে ঢুকে এলেন ভাদুড়ি মশায়, বলব বলেই তো এলাম মৃত্যুঞ্জয়। আপনি হয়তো আমার ওপর রুষ্ট হয়েছেন। আমি বলেছিলাম মন্দিরে গেলে শান্তনুর ভয় কেটে যাবে। সে কথা ফলেনি। কিন্তু কেন ফলেনি সেটা বলতেই আমি এসেছি। আমি আপনার এবং আপনার স্ত্রীর সঙ্গে একটু একান্তে কথা বলতে চাই।

অবাক হল মৃত্যুঞ্জয়। সে বুঝতে পারছে না ভাদুড়ি মশায় কেন একান্তে কথা বলতে চাইছেন?

ভাদুড়ি মশায় বললেন, বেশিক্ষণ সময় নেব না আমি।

এবার একটু ধাতস্থ হল মৃত্যুঞ্জয়। বলল, আমার স্ত্রী শান্তনুর মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। যা বলার আমাকেই বলুন।

স্মিত হাসলেন ভাদুড়ি মশায়, শুধু আপনাকে বললে হবে না। ওনাকেও লাগবে। কথাগুলো আপনাদের দু’জনেরই জানা দরকার।

একটু ভেবে মৃত্যুঞ্জয় বলল, ঠিক আছে। আপনি আমার ঘরে এসে বসুন। আমি মায়াকে ডাকছি।

ভাদুড়ি মশায়কে একটা ঘরে বসিয়ে মৃত্যুঞ্জয় বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল স্ত্রী মায়াকে সঙ্গে নিয়ে। ভাদুড়ি মশায় বললেন, দরজাটা বন্ধ করে আমার সামনে বসুন আপনারা।

চাপা গলায় মৃত্যুঞ্জয়কে উদ্দেশ্য করে মায়া কথা বলে উঠল। তার কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে পড়ছে, কী ব্যাপার বলো তো? একে তো ওনার কথা শুনে এই কাণ্ড হল। এখন আবার কী তামাশা হচ্ছে? দরজা বন্ধ করার কী আছে?

নিরাসক্ত ভঙ্গিতে ভাদুড়ি মশায় বললেন, দরজা বন্ধ করার দরকার আছে মা। কারণ এখন আমি যে কথাগুলো বলব সেগুলো হাটের কথা নয়। মাথা ঠান্ডা করে আমার কথাগুলো শুনুন। এতে শান্তনুর মঙ্গল হবে।

কয়েক মুহূর্ত ভাদুড়ি মশায়ের দিকে তাকিয়ে রইল মায়া। তার পর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। মৃত্যুঞ্জয় বসল ভাদুড়ি মশায়ের সামনে। মায়া বসল না। দাঁড়িয়ে রইল খাটের বাজু ধরে। গলা ঝেড়ে ভাদুড়ি মশায় বলতে শুরু করলেন, দেখুন, গুরুকৃপায় সামান্য কিছু বিদ্যা আমি আয়ত্ত করেছি। শান্তনুর কাছ থেকে সবটা শুনে প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল ও যে ভয় পাচ্ছে সবটাই ওর মনের ভুল। সে জন্যই আমি সন্ধেবেলায় ওকে একা মন্দিরে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু ওকে এ কথা বলার পরে আপনাদের গ্রামের পুরোহিত শিবনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তিনি আমাকে বউকালীবাড়ি সম্পর্কে নানা ভয়ের গল্প শোনান এবং এও বলেন, যদি শান্তনুর কোনও ক্ষতি হয় তার জন্য আমিই দায়ী থাকব। শান্তনু আমার নাতনির সহপাঠী। আমাকে দাদু বলে ডেকেছে। শিবনাথের এই কথায় আমি একটু হলেও চিন্তায় পড়ে যাই এবং বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদল করে বউকালীবাড়ি মন্দিরে ছুটে যাই। যতক্ষণে আমি ওখানে গিয়ে পৌঁছই ততক্ষণে শান্তনু ভয় পেয়ে গেছে। কিন্তু মন্দিরে ঢুকে মাকে দর্শন করে আমি নিশ্চিত হয়ে যাই যে এ মন্দিরে কোনও অপশক্তি নেই।

চাপা অথচ খর গলায় মায়া বলে উঠল, দেখেই আপনি বুঝে গেলেন? এই যে এতদিন ধরে বউকালীবাড়ি নিয়ে এত কথা শুনি তা হলে সেসব মিথ্যে?

হ্যাঁ মিথ্যে, তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে প্রায় গর্জন করে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়, সবটাই মানুষের কল্পনা ও বানানো গালগল্প।

ভাদুড়ি মশায়ের এই দৃষ্টির সামনে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা সহজ কথা নয়। মায়াও চোখ নামিয়ে নিল। একটু সময় নিয়ে ভাদুড়ি মশায় বললেন, তাই মন্দিরে ঢোকার পরেই আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে শান্তনুকে ভয় দেখিয়েছে সে মানুষ।

এ কথাটায় একসঙ্গে চমকে উঠল মৃত্যুঞ্জয় আর মায়া। মৃত্যুঞ্জয় বলল, এ আপনি কী বলছেন ঠাকুরমশাই? মানুষে ভয় দেখিয়েছে বাবুসোনাকে?

হ্যাঁ মৃত্যুঞ্জয়। শুধু আজ নয়, আপনার বাড়িতে যে রাতে শান্তনু ভয় পেয়েছিল সেটাও মানুষের কীর্তি।

রীতিমতো ঘাবড়ে গেল মৃত্যুঞ্জয়। অসহায় গলায় বলল, আপনি কী বলছেন আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ঠাকুরমশাই।

ম্লান হেসে ভাদুড়ি মশায় বললেন, আপনার স্ত্রী কিন্তু সবটা বুঝতে পারছেন। ওনাকে জিগ্যেস করুন।

এ কথায় মায়া যেন জ্বলে উঠল। তীব্র কণ্ঠে বলল, কী আবোলতাবোল বকছেন আপনি? কী বুঝব আমি হ্যাঁ? কী বুঝব?

মায়ার চোখে চোখ রাখলেন ভাদুড়ি মশায়, আপনিও বুঝতে পারছেন না? বেশ আমি বুঝিয়ে বলছি তবে। উঁহু মায়াদেবী চলে যাওয়ার চেষ্টা করে লাভ নেই। আমি না চাওয়া পর্যন্ত আপনি এ ঘর থেকে বেরোতে পারবেন না। বললাম না, গুরুকৃপায় সামান্য কিছু বিদ্যা আমি আয়ত্ত করেছি। আপনার ইন্দ্রিয়গুলি এখন আমার ইচ্ছাধীন। অতএব আমি যা বলছি চুপ করে শুনুন।

অবাক হয়ে মৃত্যুঞ্জয় দেখল, মায়া কেমন যেন কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শুধু চোখ দু’টো বিস্ফারিত। ভয় পেয়ে গেল সে। হাত জোড় করে বলল, আপনি ওর সাথে কী করলেন ঠাকুরমশাই? ঠিক করে দিন ওকে। ঠিক করে দিন।

নরম গলায় ভাদুড়ি মশায় বললেন, আমি খারাপ মানুষ নই মৃত্যুঞ্জয়বাবু। আপনার স্ত্রীর কোনও ক্ষতি করার উদ্দেশ্য আমার নেই। কিন্তু আমি এখন যে কথাগুলো বলব সেগুলো শুনতে ওনার ভাল লাগবে না। তাই এই ব্যবস্থা। আমি যাওয়ার আগে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। যাই হোক, যা বলছিলাম, শান্তনুকে ভয় দেখিয়েছে মানুষ। একজন নয়, দু’জন এই জঘন্য খেলার অংশীদার। আপনার স্ত্রী এবং আপনার ছেলে।

জলে পড়ে যাওয়া মানুষের মতো বড় বড় করে শ্বাস নিল মৃত্যুঞ্জয়। ভাদুড়ি মশায় বুঝতে পারছেন মৃত্যুঞ্জয় মনেপ্রাণে তাঁর কথা অবিশ্বাস করতে চাইছে কিন্তু মায়ার অবস্থা দেখে সে এক কঠিন দ্বন্দে পড়েছে। ইচ্ছে করেই মায়ার হস্তপদ বন্ধন করেছেন ভাদুড়ি মশায়। এটুকু আশ্চর্য না দেখালে তিনি মৃত্যুঞ্জয়কে সবটা বিশ্বাস করাতে পারতেন না। কোনও মানুষই নিজের স্ত্রী ও সন্তানের নামে খারাপ কথা শুনতে চায় না।

তিনি বলতে লাগলেন, আপনার স্ত্রী প্রথম থেকেই আপনার বোনের ছেলেকে হিংসে করেন। কেন করেন তা আমি জানি না। মানুষের মনোবৃত্তি বড় জটিল। কিন্তু দিনে দিনে এই হিংসে বাড়তে লাগল যখন দেখা গেল শান্তনু জিতুর চেয়ে লেখাপড়ায় ভালো। সব জায়গায় শান্তনুর প্রশংসা হয়। আপনি, আপনার মা এবং আপনার ছোটভাই সকলেই শান্তনুকে নিয়ে গর্ববোধ করেন। সেটা মায়াদেবীর ভালো লাগত না। ধীরে ধীরে জিতুর মনেও তিনি এই হিংসের বীজ বুনে দিলেন এবং জিতুকে বোঝাতে লাগলেন তাকে যে কোনও উপায়ে শান্তনুর সমকক্ষ হতে হবে। সেটার উপায় কী? না শান্তনু যে কলেজে পড়ে জিতুকেও সেখানে ভর্তি হতে হবে। সেই চেষ্টাও শুরু হল। জিতু শান্তনুর কাছে তালিম নিতে লাগল। কিন্তু সবার মেধা তো সমান নয়, জিতু যাদবপুরের প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হল না। জিতু যে যাদবপুরে পরীক্ষা দিয়েছে একথা কিন্তু আপনিও জানেন না। চান্স পেয়ে আপনাদের সবাইকে চমকে দিতে চেয়েছিল জিতু। আমার কথা বিশ্বাস না হলে আপনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে উপাচার্য অমিতাভ গুপ্তর সঙ্গে দেখা করবেন। কারা কারা এ বছর ইকোনমিক্সে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়েছিল তার তালিকা পেয়ে যাবেন আপনি। জিতুর ভালো নাম আমি জানতাম না। সরকার পদবি এবং ঠিকানা দেখে নিশ্চিত হয়েছি। তা যাই হোক, যাদবপুরে ভর্তি হতে না পেরে শান্তনুর ওপর অসূয়া আরও বেড়ে গেল জিতুর। তাতে প্রতিনিয়ত ঘৃতাহুতি দিতে লাগলেন আপনার স্ত্রী। সন্তানের এই ব্যর্থতা উন্মাদপ্রায় করে তুলল তাঁকে। এর মধ্যেই কলেজের ছুটিতে শান্তনু আপনাদের এখানে এল এবং বউকালীবাড়ি মন্দির থেকে ফেরার পথে ভয় পেল। সেবার কিন্তু শান্তনু সত্যি ভয় পেয়েছিল। আর এই ভয় পাওয়াই আপনার স্ত্রী ও ছেলের হাতে একটা অস্ত্র তুলে দিল। শান্তনু কী দেখে ভয় পেয়েছে সেটা জিতু জেনে নিল এবং আবার তাকে ভয় দেখাল। আপনার স্ত্রী অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আয় আয় বলে ডেকে উঠলেন। ভয় দেখিয়ে একটা মানুষের কতটা আর ক্ষতি করা যায়? কিন্তু হিংসে এমনই এক রোগ যা মানুষকে বিবেচনাহীন করে তোলে। যেকোনও ভাবে শান্তনুকে ব্যতিব্যস্ত করাই আপনার স্ত্রী ও জিতুর একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল। তাই আমি যখন শান্তনুকে মন্দিরে যাওয়ার নিদান দিলাম ওরা দু’জন হাতে চাঁদ পেল। কিন্তু এমন ভাবে বিষয়টাকে সাজাল যাতে কারও সন্দেহ না হয়। জিতু পুরোটা সময় আপনাদের সাথে বসে রইল এবং মায়াদেবী চণ্ডীতলায় পুজো দিতে গেলেন। ফলে মায়াদেবী যে বিলমাঠে যাননি তার পাকা অ্যালিবাই রইল। কিন্তু পুজো দিতে গিয়েই মায়াদেবী একটা ভুল করে ফেললেন। তিনি তাড়াহুড়ো করলেন। আর সেটাই স্বাভাবিক। কারণ পুজো দেওয়া তো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মন্দিরের পুরোহিতকে নিজের মুখ দেখিয়ে অ্যালিবাই পাকা করা। ডালাটা মন্দিরে দিয়েই উনি বিলমাঠে ছুটলেন এবং শান্তনুকে ভয় দেখিয়ে আপনারা ফেরত আসার আগেই বাড়ি ফিরে এলেন। দরকারে আপনি মন্দিরের পূজারি শিবনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বলে নেবেন। আপনার স্ত্রী কখন মন্দির থেকে বেরিয়ে গেছেন সেই সময়টা পেয়ে যাবেন। আর আপনার মাকে জিগ্যেস করলেই জানতে পারবেন মায়াদেবী কখন বাড়ি ফিরেছেন। আসলে মায়াদেবী ভাবতেই পারেননি কেউ তাঁকে সন্দেহ করতে পারে। সবটাই বউকালীবাড়ির মিথের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেবেন ভেবেছিলেন কিন্তু একটা ছোট্ট ভুল করে ফেললেন। প্রণামীতে একটা ছেঁড়া পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে দিলেন। সন্তানের মঙ্গলকামনায় মানুষ যে পুজো দেয় তা যথাসম্ভব ত্রুটিমুক্ত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু উনি তো সন্তানের ক্ষতি চেয়েছিলেন। তাই ডালাটাও সাজিয়েছিলেন দায়সারা ভাবে। ওনার মাথায় ঘুরছিল, কতক্ষণে বউকালীবাড়িতে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকবেন। যাই হোক আমি এবার উঠব। সত্য-মিথ্যা আপনার স্ত্রীর থেকে যাচাই করে নেবেন। আমি শান্তনুকে মিছিমিছি একটা তাবিজ দিয়ে দেব। তাবিজটা দেখে ও মনের জোর পাবে এবং সময়ের নিয়মে ওর এই ভয় কেটে যাবে। আসি।

উঠে দাঁড়ালেন ভাদুড়ি মশায়। মৃত্যুঞ্জয়ের চোখে তখন জল। ধরা গলায় সে বলল, একটা কথা বলব ঠাকুরমশাই?

তার কাঁধে হাত রাখলেন ভাদুড়ি মশায়, ভয় নেই। একথা আমি কাউকে বলব না। শান্তনু মনে করে তার মামাবাড়ি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জায়গা। ওর এই বিশ্বাস আমি ভেঙে দেব না। আপনি বরং আপনার স্ত্রী ও ছেলেকে সামলে রাখবেন। মানুষ ভুল করে, কিন্তু তাকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিতে হয়।

শান্তনু যে ঘরে আছে সে ঘরের দিকে এগিয়ে চললেন ভাদুড়ি মশায়। তিনি বুঝতে পারছেন মায়া কাঁদছে। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি, মানুষ বড়ই জটিল প্রাণী। দেবতা কিংবা অপদেবতার সাধ্য নেই এতটা জটিলতা অন্তরে ধারণ করে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%