পাথরের চোখ

হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

বৈশালী ব্যানার্জি কৌচে আধশোয়া অবস্থায়। হাতে একটা পত্রিকা। পত্রিকাটি খুব যে তার মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হচ্ছে এমন মনে হল না, কারণ বৈশালী মাঝে মাঝে চোখ তুলে বন্ধ জানলার দিকে দেখছে। বাইরের বিদ্যুৎ দীপ্তিতে কাচগুলো আলোকিত হয়ে উঠছে।

বৃষ্টি নেই, শুধু উত্তাল বাতাস, মেঘের গর্জন আর নীল বিদ্যুতের ঝিলিক।

তবু মন্দের ভালো। টানা এক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড দাবদাহ চলছে। এক ফোঁটা জলের জন্য হাহাকার। নলকূপের চারপাশ ঘিরে মানুষের ভিড়। প্রায় অন্ধকার ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। ধরিত্রীর জঠর থেকে যতটা সম্ভব জল টানার প্রচেষ্টায় মানুষ প্রায় কাহিল।

বৈশালী আবার পত্রিকায় মনোনিবেশ করল।

দরজার কাছে মৃদু পদশব্দ।

মুখ না তুলেই বৈশালী জিজ্ঞাসা করল, কী রে বাহাদুর?

নেপালি চাকর। বয়স পনেরো-ষোলো। ফুটফুটে চেহারা। পরিষ্কার বাংলা বলে।

বাহাদুরের মা-ও এ বাড়িতে কাজ করেছে। বাহাদুর আছে বছর পাঁচেক।

এক বাবু এসেছে।

বাবু?

বৈশালী জানলার দিকে চোখ ফিরিয়ে ভ্রূ কোঁচকাল।

এই দুর্যোগে আবার কে এল?

আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

নিয়ে এসো।

হাতের পত্রিকাটি টিপয়ের ওপর রেখে বৈশালী কৌচে হেলান দিয়ে বসল।

দু-একটা খুচরো চুল কপালের ওপর এসে পড়েছিল, বৈশালী হাত দিয়ে সেগুলো ঠিক করে নিল।

বাহাদুর বেরিয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত পরেই একটি প্রৌঢ় ঘরের মধ্যে এসে দাঁড়াল। পরনে ধুতির ওপর দামি প্রিন্সকোট, তার ওপর আড়াআড়িভাবে মুগার চাদর। গৌরবর্ণ, কপালে চোখের পাশে বয়সের কুঞ্চন। নীল চোখের তারা।

আপনিই কি বৈশালী ব্যানার্জি?

বৈশালী মাথা নাড়ল। সম্মতিসূচক।

আশ্চর্য! প্রৌঢ়ের কণ্ঠে বিস্ময়ের সুর।

কী আশ্চর্য?

আপনার বয়স আমি আরও বেশি ভেবেছিলাম।

কারণ?

কারণ, যেসব কাজের গুরুদায়িত্ব আপনি সুষ্ঠুভাবে পালন করেছেন, তাতে আপনাকে পরিণতবয়স্কাই মনে হয়।

বৈশালী মৃদু হাসল। কোনও উত্তর দিল না।

তারপর প্রৌঢ়ের দিকে ফিরে বলল, আপনি বসুন।

বিপরীতদিকে রাখা কৌচের ওপর প্রৌঢ় বসল।

আপনি খুব দামি মোটরে এসেছেন বলে মনে হচ্ছে।

কী করে বুঝলেন?

খুব সহজে। বাড়ির সামনে মোটর দাঁড়াল, অথচ কোনও শব্দ পেলাম না। সাধারণ মোটরে এটা সম্ভব নয়। যাক, এই দুর্যোগে বেরিয়েছেন, কী ব্যাপার?

বিপদ কি আর দুর্যোগ বিচার করে আসে?

তা সত্যি। বিপদটা বলুন?

তবু প্রৌঢ় কিঞ্চিৎ ইতস্তত করছে দেখে বৈশালী বুঝতে পারল, তার বয়সের ওপর প্রৌঢ় সম্পূর্ণ আস্থা স্থাপন করতে পারছে না।

আপনার কোনও অসুবিধা থাকার দরকার নেই।

না, না, তা মোটেই নয়—প্রৌঢ় রীতিমতো বিব্রত হয়ে উঠল। তারপর চোখ ফিরিয়ে দরজার দিকে বারকয়েক দৃষ্টিপাত করল।

বৈশালী বুঝতে পারল। তাই বলল, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি যতক্ষণ এ ঘরে আছেন, ততক্ষণ কেউ আসবে না।

প্রৌঢ় যেন একটু আশ্বস্ত হল।

প্রিন্সকোটের ভিতরের পকেটে হাত চুকিয়ে ভেলভেটে মোড়া একটা বস্তু বার করে টিপয়ের ওপর রাখল।

তারপর বৈশালীর দিকে ফিরে বলল, আমার ধৃষ্টতা মাপ করবেন। দরজাটা বন্ধই করে দিয়ে আসি।

প্রৌঢ় ওঠবার আগেই বৈশালী ক্ষিপ্র পায়ে এগিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

প্রৌঢ় এবার ভেলভেটের আবরণ খুলে ফেলল।

ব্রোঞ্জের একটি ময়ূর। অপূর্ব কারুকার্য। লাল দুটি চোখ। দীর্ঘ পুচ্ছ নানা বর্ণের পাথর।

বাঃ, চমৎকার জিনিসটি তো।

চমৎকার ছিল একসময়ে। এখন এর কিছুই আর অবশিষ্ট নেই বৈশালীদেবী।

বৈশালী এ আক্ষেপের হেতু ঠিক অনুমান করতে পারল না।

প্রৌঢ় ময়ূরটি বৈশালীর দিকে এগিয়ে ছিল।

আপনি ভালো করে এর চোখ দুটো দেখুন।

বৈশালী ময়ূরটি হাতে তুলে নিল, তারপর পাশের ড্রয়ার থেকে একটা আতশকাচ বের করে কয়েক মিনিট খুব অভিনিবেশ সহকারে ময়ূরের চোখ দুটি নিরীক্ষণ করল, তারপর টিপয়ের ওপর নামিয়ে রেখে বলল, একটা চোখ খুব দামি রুবির, অন্যটায় ঝুটো কাচ বসানো।

ঠিক বলেছেন।

এর জন্যই কি আপনি আমার কাছে এসেছেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ। তবে তার আগে আপনাকে পুরো ঘটনাটা শুনতে হবে।

বলুন।

বৈশালী কৌচে হেলান দিয়ে বসল।

প্রৌঢ় কাহিনি শুরু করার মুহূর্তে দরজায় শব্দ হল। ঠক ঠক।

প্রৌঢ় চমকে উঠে তাড়াতাড়ি ময়ূরটিকে কোটের পকেটে পুরে ফেলল।

কে?

বৈশালী হাতে অভয়মুদ্রা ফুটিয়ে বলল, বাহাদুর আপনার জন্য চা নিয়ে এসেছে।

চা? চা তো আমি খাই না।

বেশ, কী খাবেন বলুন? কফি, কোকো, ওভালটিন সব ব্যবস্থাই আছে।

না, মানে আমি দুধ খাই। তা ছাড়া, এখন কিছু খাবই না। সন্ধ্যা-আহ্নিক না করে আমি কিছু খাই না।

তাহলে অনুমতি করুন, আমি এক কাপ চা নিই।

নিশ্চয়, নিশ্চয়, এ কথা আবার আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন?

বৈশালী উঠে দরজা খুলে দিল।

তারপর বাহাদুরের ধরে-থাকা ট্রে থেকে এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট নিয়ে কৌচে ফিরে এল।

বলুন এবার।

আপনি শিলাগড়ের নাম শুনেছেন?

শুনেছি। আসানসোল থেকে প্রায় ষাট মাইল। একসময়ে খুব বর্ধিষ্ণু জনপদ ছিল।

প্রৌঢ় মাথা নাড়ল।

ঠিকই বলেছেন। আজ শিলাগড় প্রায় মরুভূমি। অন্তত আমার পক্ষে। অতীত দিনের কোনও সম্পদই তার নেই। আমরা বাজপেয়ি। বহু পুরুষ আগে সুদূর পাঞ্জাব থেকে অন্নের সন্ধানে এ দেশে এসেছিলাম। আসানসোলে পাথরের বাসনের দোকান শুরু করেছিলাম। গয়া থেকে পাথর আনা হত। একটু একটু করে গুছিয়ে নিলাম। এই সময়ে আশপাশের টিলায় ভূতত্ত্ববিদরা কয়লার সন্ধান পেলেন। অবশ্য তাঁরা স্থিরনিশ্চয় হতে পারেননি। কিন্তু তাতেই বণিকের দল ভিড় জমিয়ে ফেলল।

সেই সময় বরাত ঠুকে আমিও একটা টিলা ইজারা নিয়ে নিলাম।

এক পরিচিত জ্যোতিষী ছিলেন। তিনি ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন। কালো রং আমার জন্মগ্রহের অনুকূলে। সেইজন্য গয়ার কালো পাথরের কারবার শুরু করেছিলাম। কয়লাও কালো।

ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে দেরি হল না। যে টিলাটি আমি ইজারা নিয়েছিলাম তার আশপাশ থেকেই সবচেয়ে ভালো জাতের কয়লা বের হল। অন্যান্য লোকেরা রীতিমতো ঈর্ষান্বিত।

খুব বেশি খোঁড়ার প্রয়োজন হল না। কতকগুলো কয়লার খাদে তার প্রয়োজন হয় না। লম্বালম্বি কয়লার স্তর চলে যায়।

এখানে বৈশালী বাধা দিল, বুঝতে পারলাম, কয়লা আপনাকে প্রভূত অর্থের অধিকারী করল।

প্রৌঢ় ক্ষণেকের জন্য একটু বিব্রত হয়ে গেল, তারপর সে ভাব সামলে নিয়ে বলল, আসল কথায় আসছি বৈশালীদেবী। কয়লার সঙ্গে হাজারিবাগে একটা অভ্রের খনিও কিনলাম। যদিও অভ্র কালো নয়, তবু এ কারবারেও অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন হল। ছেলের এ কারবারে মন গেল না। বিশেষ করে আমার স্ত্রীবিয়োগের পর। সে বর্মায় চলে গেল কাঠের ব্যাবসা করতে। সেখান থেকে চিঠিপত্রে লিখল সে দেশে নানা রকমের পাথর পাওয়া যায়। পাথরের ব্যাবসা শুরু করলাম। কেনা-বেচা করতে করতে নিজের কিছুটা শখ জন্মে গেল—পাথর জমানোর।

এসব পাথর কি পার্সেলেই আসত? বৈশালী প্রশ্নের খোঁচা দিল।

না, দামি পাথর একটি লোক নিয়ে আসত।

কে সে লোক?

আমার বড়োছেলের পরিচিত এক বর্মি। নাম মং শান। সে-ই এই দুটো রুবি নিয়ে এল। এমন চমৎকার রঙের আর গঠনের রুবি আমি আর দেখিনি। ইচ্ছা করলেই রাজারাজড়ার কাছে খুব চড়া দামে বিক্রি করতে পারতাম, কিন্তু ওই যে বললাম, রত্ন জমাবার একটা নেশা আছে। তাই কারিগর দিয়ে এই ময়ূরের দুটি চোখে দুটি রুবি লাগিয়ে নিলাম।

ময়ূরটি কোথায় থাকত?

আমার শোবার ঘরের সিন্দুকে।

চাবি কার কাছে?

একটি আমার কাছে, বাকিটা আমার স্ত্রী-র কাছে।

কথাটা বলেই প্রৌঢ় একটু আরক্ত হয়ে উঠল।

মানে, আমি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছি।

ময়ূরের একটি চোখে যে ঝুটো পাথর বসানো হয়েছে, এটা আপনি কবে টের পেলেন?

দিন সাতেক আগে।

কী করে?

এক জহুরিকে দিয়ে অন্য পাথর যাচাই করছিলাম, সেই সময় ময়ূরটা বের করে টেবিলের ওপর রেখেছিলাম। একবার দেখেই কেমন সন্দেহ হল। জহুরিকে দেখাতে নিঃসন্দেহে হলুম।

আপনার স্ত্রী-কে বলেছিলেন?

আমার স্ত্রী এখানে নেই। মথুরায়। তার মা-বাপের সঙ্গে।

কতদিন তিনি নেই?

প্রায় তিন মাস।

কাউকে আপনার সন্দেহ হয়?

কাকে সন্দেহ করব?

বাইরের কোনও লোককে ময়ূরটা দেখিয়েছিলেন?

তা দেখিয়েছিলাম। বাড়ির লোকের মধ্যে আমার স্ত্রী, আমার ছেলে, মং শান আর কুমার বাহাদুর দেখেছে।

কুমার বাহাদুর কে?

রতনপুরের কুমার বাহাদুর। তাঁরও রত্নের খুব নেশা। আমার কাছ থেকে অনেকবার পাথর কিনেছেন।

আপনি কি পুলিশে খবর দিয়েছেন?

না, এ ব্যাপার আর পুলিশকে কী জানাব। পুলিশ এসেই তো হাঙ্গামা বাধাবে। কোথা থেকে এসব রত্ন কিনেছি তার কৈফিয়ত চেয়ে বসবে।

কৈফিয়ত দেবার পক্ষে অসুবিধাজনক এমন রত্নও আপনার কাছে আছে?

প্রৌঢ় কোনও উত্তর দিল না।

আমার একবার শিলাগড়ে যাওয়া প্রয়োজন। বৈশালী বলল।

বেশ তো, কবে কখন যাবেন বলুন, আমি মোটর পাঠিয়ে দেব।

খুব দেরি করতে চাই না। ধরুন যদি পরশু যাই।

কোনও অসুবিধা নেই। কখন?

খুব ভোরে রওনা হতে চাই।

তাহলে এক কাজ করব। কাল রাত্রে মোটর পাঠিয়ে দেব।

বৈশালী কিছুক্ষণ কী ভাবল, তারপর বলল, আপনার মোটর পাঠাবার দরকার নেই, আমি নিজের গাড়িতেই যাব।

কিন্তু আপনি ভুবন-নিবাস চিনবেন কী করে?

ভুবন-নিবাস!

মানে আমার নাম ভুবন বাজপেয়ি। আমার বাড়ির নাম ভুবন-নিবাস।

আসানসোল পর্যন্ত যেতে আমার কোনও অসুবিধা হবে না।

ঠিক আছে। আসানসোলে আমার লোক থাকবে। আপনার মোটরের নম্বরটা বলুন।

এস এস এস সাতশো আটানব্বই। ছাই রঙের স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড। আর-একটা কথা—।

বলুন।

আপনার স্ত্রী কবে ফিরবেন?

তিনি কাল ফিরছেন।

ভালোই হয়েছে, তাঁর সঙ্গে কথা বলবার সুযোগ পাব। আচ্ছা কিচ্ছু মনে করবেন না, একটা কৌতূহল—।

ভুবনবাবু উঠে দাঁড়িয়েছিল। আবার বসল।

আমার কাছে আসার পরামর্শ আপনাকে কে দিল?

আপনার খ্যাতি সুদূরবিস্তৃত। কোডারমার বেণিপ্রসাদের দশ লাখ টাকার জড়োয়া গয়নার কথা শুনেছি। সেটা আপনি কীভাবে উদ্ধার করেছিলেন, তাও আমার অজানা নয়। আপনি দয়া করে আমার এই রুবির একটা সুরাহা করে দিন। টাকার জন্য আটকাবে না।

ঠিক আছে। আমি একবার শিলাগড় ঘুরে আসি। তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলব।

দূরের গির্জার পেটা ঘড়িতে ঢং ঢং করে ন-টা বাজল।

ভুবনবাবু এগোতে এগোতে বলল, চলি, আমাকে অনেকটা পথ যেতে হবে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা। তাহলে পরশু আমার লোক দশটা থেকেই আসানসোল স্টেশনের কাছে থাকবে।

বৈশালী মাথা নাড়ল, তারপর ডাকল, বাহাদুর।

বাহাদুর এসে দাঁড়াতেই বলল, বাবু চলে যাচ্ছেন। মোটর পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।

অনেক রাত পর্যন্ত বৈশালী শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়ল।

ইংরেজি বই। দেশ-বিদেশের ধনরত্ন সম্বন্ধে।

অনেকগুলো আর্ট প্লেট আছে। নানা জাতের মহার্ঘ রত্নের ছবি। তাদের মূল্য। যাদের হেপাজতে আছে, তাদের নামধাম।

বর্মার রুবি সম্বন্ধে আলাদা একটা অধ্যায় আছে। বৈশালী সেটা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়ল।

পর পর অনেকগুলো নাম বৈশালীর মনের পটে ভেসে উঠল। ভুবন বাজপেয়ির স্ত্রী, মং শান, ভুবনবাবুর ছেলে।

পরের দিন বৈশালীর যখন ঘুম ভাঙল তখন বেলা হয়েছে।

জানলা থেকে পরদাটা সরাতেই রোদের ঝলক এসে ঘরে ঢুকল।

বৈশালী বাথরুম থেকে ফিরে এসে দেখল, টিপয়ের ওপর ধূমায়মান চায়ের কাপ, পাশে প্লেটে ডিম আর টোস্ট। একপাশে সেদিনের খবরের কাগজ।

চায়ে চুমুক দিতে খবরের কাগজের ওপর চোখ বোলানো বৈশালীর বহুকালের অভ্যাস।

আবহাওয়াবিদদের মতে মেঘ আকাশে থাকবে বটে, কিন্তু সে মেঘে শুধু বর্ষণের বঞ্চনা। আতপতপ্ত দেশের শীতল হবার কোনও সম্ভাবনা নেই।

পড়তে পড়তে বৈশালী হঠাৎ মেরুদণ্ড টান করে বসল।—

শোচনীয় দুর্ঘটনা। শিলাগড়ের বিখ্যাত ব্যবসায়ী ভুবন বাজপেয়িকে তাঁর মোটরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গিয়াছে। মোটরচালক নিখোঁজ। দামি মোটরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। ভুবনবাবুর টাকার ব্যাগ, ঘড়ি, আংটি কিছুই অপহৃত হয় নাই, তাহাতে অনুমিতি হয় যে, চুরির জন্য এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় নাই।

বৈশালী উঠে দাঁড়াল। দারুণ উত্তেজনায় পায়চারি করতে করতে অস্ফুটকণ্ঠে বলল, ময়ূর, ময়ূরটা কোথায় গেল? সেটার খোঁজ নেওয়া দরকার।

দুই

বৈশালী কিছুক্ষণ চুপচাপ জানলার ধারে দাঁড়াল।

দৃষ্টি চলমান জনতার দিকে নিবদ্ধ হলেও, বেশ বোঝা গেল সে গভীর কিছু চিন্তা করছে।

একসময়ে পরদার পাশে টেলিফোনের কাছে চেয়ার টেনে বসল। ডায়াল করল, তারপর বলল, একবার সত্যেন রায়কে দিন।

বৈশালীর কণ্ঠ শোনা গেল।

বিশেষ প্রয়োজনে আপনাকে এত সকালে বিরক্ত করছি মিস্টার রায়। আমি বৈশালী। বৈশালী ব্যানার্জি। হ্যাঁ, একরকম ভালোই আছি। খবর? আজকের কাগজে ভুবন বাজপেয়ির ব্যাপারটা বেরিয়েছে। ওটার সম্বন্ধে আমার একটু আগ্রহ রয়েছে। ঠিক আছে, আমি আধ ঘণ্টার মধ্যে আপনার কাছে যাচ্ছি। পথে মোটরটা একবার দেখে যাব। আচ্ছা, নমস্কার।

পোশাক পালটে বৈশালীর বের হতে মিনিট পনেরো লাগল।

যাবার সময় বাহাদুরকে বলে গেল, আমার একটু দেরি হতে পারে। তুমি খেয়ে নিয়ো।

লালবাজার থেকে বৈশালী খবর নিয়ে জানল যে, মোটরটা ডালহৌসি স্কোয়্যারের ফুটপাতেই পড়ে আছে।

বৈশালী যখন গিয়ে পৌঁছোল তখনও কিছু কিছু কৌতূহলী জনতা ভিড় করে আছে।

মোটর একধারে রেখে বৈশালী নামল।

একটি পুলিশ মোটরের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা রেলিং ভেঙে মোটরটা স্কোয়্যারের মধ্যে ঢুকে গেছে। ইমপালা শেভ্রোলে। মরাল-শুভ্র রঙের।

বৈশালী একটা গাছতলায় দাঁড়াল।

ভুবনবাবুর দেহ পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আজ বিকালেই রিপোর্ট আসবে। রিপোর্টে নতুন কোনও তথ্য বৈশালী আশা করে না। ভুবনবাবু মৃত এটাই চরম সত্য।

প্রশ্ন হচ্ছে, কে আততায়ী?

যদি ময়ূরটা তার প্রিন্সকোটের মধ্যে পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে ভুবনবাবুকে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্যাবসা সংক্রান্ত কোনওরকম রেষারেষি হওয়া বিচিত্র নয়।

বৈশালী এগিয়ে গিয়ে পুলিশের কাছে দাঁড়াল।

নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটা কার্ড বের করে দেখিয়ে চাপা গলায় বলল, আমার সেলাম দরকার নেই, তাহলে লোকদের কৌতূহল বাড়বে। আমি শুধু মোটরের কাছে গিয়ে একটু দেখতে চাই।

বৈশালীর পাশে পাশে পুলিশও এগিয়ে গেল।

বেশি কাছে যাবার প্রয়োজন হল না। কাচের মধ্যে দিয়ে দেখা গেল পিছনের সাদা সিট-কভারে রক্তের দাগ।

তার মানে ভুবন বাজপেয়ি পিছনের সিটে ছিল। চালনচক্র ছিল অন্য লোকের হাতে। কিন্তু চালক কোথায় গেল?

খুব সম্ভব কোনও কারণে মোটরের গতি যখন মন্দীভূত, তখন আততায়ী গুলি ছুড়েছিল। চালক হতবুদ্ধি হয়ে ভারসাম্য হারিয়ে মোটর ফুটপাতে উঠিয়ে দিয়েছিল। তারপর রেলিংয়ের সঙ্গে ধাক্কা। অবশ্য ধাক্কা এমন জোর নয় যে চালক আহত হবে।

চালক সাধারণভাবে পুলিশ স্টেশনে যাবে, এটাই সহজ বুদ্ধিতে ভাবা যেতে পারে। তার গা-ঢাকা দেবার কোনও হেতু থাকতে পারে না, যদি না সে-ও এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকে।

চালক কি পিছন ফিরে ভুবনবাবুকে গুলি করেছিল? আর সেই সময় মোটর পথ ছেড়ে বিপথে গিয়েছিল? সেটাও সম্ভব।

বৈশালী নিচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, লালবাজার থেকে কেউ এসেছিল?

হ্যাঁ, ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের লোক এসেছিল। তারা অনেক ফোটো তুলে নিয়ে গেছে।

ব্যালিস্টিক ডিপার্টমেন্টের কেউ?

না। তাঁরা বোধহয় বডির আঘাত দেখবেন। তাতেই বোঝা যাবে।

ঠিক আছে। আমি চলি।

গুঞ্জনরত জনতার মাঝখান দিয়ে পথ করে বৈশালী নিজের মোটরের দিকে এগিয়ে গেল।

নানা কথার টুকরো তার কানে ভেসে এল।

মেয়ে পুলিশ। দেখলি না, পুলিশটা কিছু বলল না। আর আমরা এক-পা এগোলেই চেঁচাচ্ছে।

না, না, মেয়ে পুলিশ নয়, তাদের পোশাকই আলাদা। এ বোধহয় যে খুন হয়েছে তার কেউ।

দূর, তাহলে এরকম খুশি-খুশি ভাব হয়?

অমন বড়োলোক আত্মীয় খতম হলে সবাইয়ের খুশি-খুশি ভাব হয়।

হাসি চেপে বৈশালী মোটর চালু করল। এবার গন্তব্যস্থল লালবাজার।

এখানে প্রায় সবাই চেনা। অনেকের সঙ্গেই কথা বলতে বলতে বৈশালী সোজা ডেপুটি কমিশনার সত্যেন রায়ের কামরার সামনে এসে দাঁড়াল।

আরদালি ছুটে আসতে জিজ্ঞাসা করল, সায়েব একলা আছেন?

হ্যাঁ, মেমসাব।

আরদালি এক হাত দিয়ে দরজা খুলে ধরল। প্রকাণ্ড টেবিল। ফাইল আর অন্যান্য কাগজের স্তুূপ। সত্যেন রায় খুব মনোযোগ দিয়ে কয়েকটা ফোটো দেখছিল। পায়ের শব্দে মুখ তুলল।

আরে এসো বৈশালী, তোমার কথাই ভাবছিলাম।

একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বৈশালী বলল, আমার ভাগ্য। হঠাৎ?

হঠাৎ নয়, ভুবন বাজপেয়ির কেসটার কথা ভাবছিলাম। তুমি যখন ফোন করেছ, বুঝলাম, ভিতরে রহস্য আছে। ভদ্রলোককে এভাবে কে গুলি করল?

এ কথার উত্তর তো আপনাদের বিভাগের দেবার কথা। লোকটি কাল রাতে আমার কাছে গিয়েছিল।

তা-ই নাকি? ভদ্রলোক শিলাগড়ের বড়ো ব্যাবসাদার তা জানি। আগে কয়লার ব্যাবসা ছিল, এখন খাদে তেমন কয়লা নেই। কিন্তু অভ্র আর হিরা-চুনি-পান্নার ভদ্রলোকের ঢালাও কারবার।

মিস্টার রয়, আপনি তো অনেক কিছুই জানেন।

জানি, কারণ দিল্লি থেকে টেলেক্স এসেছিল, আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি দল কলকাতায় এসেছে। ভুবন বাজপেয়ির সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

তারপর?

তারপর জাল বিস্তার করেছিলাম, কিন্তু পাখি ধরা পড়েনি।

কারণ?

বোধহয় আগে থেকে গন্ধ পেয়েছিল।

আমার একটু সাহায্যের প্রয়োজন।

হুকুম করো।

ভুবনবাবুর জিনিসগুলো একটু দেখব।

জিনিসগুলো মানে?

যেগুলো প্রিন্সকোটের পকেট থেকে আপনারা উদ্ধার করেছেন।

এসো।

সত্যেন রায় বেরিয়ে গেল। পিছন পিছন বৈশালী। কিছুটা এগিয়ে পাশের একটা ঘরে ঢুকে পড়ল।

গোটা দুয়েক সাব-ইনস্পেক্টর বসে ছিল। সত্যেন রায় ঢুকতেই তারা তটস্থ হয়ে উঠে দাঁড়াল।

বোস, কোণের আলমারিটা খোল তো।

একজন সাব-ইনস্পেক্টর চাবি দিয়ে আলমারি খুলল।

সত্যেন রায় বলতে আরম্ভ করল, একটা মানিব্যাগ ছিল, তাতে প্রায় হাজার দেড়েক টাকা, দুটো আংটি, হাতঘড়ি, আর একটা ভারী মজার জিনিস।

কী?

একটা ময়ূর।

ময়ূর?

বৈশালী এমন চমকে উঠল যে, আর-একটু হলে তার ভ্যানিটি ব্যাগটা হাত থেকে ছিটকে মেঝের ওপর পড়ে যেত।

হ্যাঁ, বেশ কারুকার্য করা। দু-চোখে দুটো লাল পাথর। পেখমেও চমকদার পাথর বসানো।

বৈশাখী কোনও কথা বলল না।

ময়ূরই যদি পাওয়া গিয়ে থাকে তাহলে ভুবন বাজপেয়িকে হত্যা করার আততায়ীর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? কিংবা, কোনও কারণে ময়ূরটা হস্তগত করা হয়তো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আলমারি থেকে বেরোল মানিব্যাগ, আংটি, ঘড়ি, শেষকালে ভেলভেটে মোড়া ময়ূর। পরিবেশ ভুলে বৈশালী তাড়াতাড়ি ভেলভেটে মোড়া ময়ূরটা তুলে নিল। খুব নিরীক্ষণ করার প্রয়োজন হল না। চোখের সামনে তুলে ধরেই বৈশালী বুঝতে পারল।

দুটো চোখে চুনি নয়, লাল সাধারণ পাথর।

আশ্চর্য! এত দ্রুত কী করে ময়ূর বদলানো সম্ভব হল!

কাল রাতে ভুবনবাবু তাকে যে ময়ূর দেখিয়েছিল, এ ময়ূর সে ময়ূর নয়।

রত্ন সম্বন্ধে বৈশালীর মোটামুটি একটা জ্ঞান আছে। ঝুটো পাথর আর আসল রুবির পার্থক্য সে বেশ বোঝে।

সত্যেন রায় বলল, ময়ূরটা আমি ইতিমধ্যেই চিমনলালকে দেখিয়ে নিয়েছি। পাথরগুলো সব ঝুটো।

বৈশালী হাসল।

পাথরগুলো যে ঝুটো সেটা বোঝবার জন্য চিমনলালকে ডাকবার দরকার নেই, আমার মতন লোকই সেটা বুঝতে পারে।

জিনিসগুলো সব আলমারিতে তুলে রাখা হল।

বৈশালী সত্যেন রায়ের দিকে ফিরে বলল, আমি চলি মিস্টার রয়। বিকালে পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা এলে আমাকে একবার খবর দেবেন।

কথাটা বলেই বৈশাখী কী ভাবল, তারপর আবার বলল, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নতুন তথ্য আর কী জানা যাবে। আপনারা তো বলছেন, গুলিতে মৃত্যু। রিভলভারের গুলিতে।

পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নিহতের শারীরিক অবস্থার কথারও উল্লেখ থাকবে। বিশেষ করে তার ভিসারার অবস্থা। চলো আমার ঘরে একটু বসে যাবে। চা খাবে এক কাপ।

বৈশালী এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে বলল, আর-একদিন এসে না হয় চা খাওয়া যাবে।

সত্যেন রায় কপট গাম্ভীর্যে বলল, তোমাকে তো এখন ছাড়তে পারব না।

কারণ?

কারণ নিহত ব্যক্তির সঙ্গে শেষ তুমি কথা বলেছ। অন্তত আমাদের যতটুকু জানা আছে। কাজেই এ কেসে তুমি একজন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সাক্ষী। তোমার স্টেটমেন্ট আমাদের দরকার।

আপাত-গাম্ভীর্যের সুরে কথা বললেও বৈশালীর পক্ষে সত্যেন রায়ের কণ্ঠের পরিহাসের সুরটুকু বুঝতে অসুবিধা হল না।

সত্যেনবাবু বৈশালীর পিতৃবন্ধু। বৈশালীর বাবা শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায় ইলেকট্রিক কোম্পানির নামী ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বর্তমানে অবসর গ্রহণ করে হাজারিবাগে রয়েছেন। বৈশালী এ দেশের শিক্ষা শেষ করে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডেও কিছুদিন শিক্ষানবিশি করেছিল। সত্যেনবাবু চেষ্টা করেছিল যাতে সে পুলিশে কাজ নেয়। বৈশালী রাজি হয়নি। সে শখের গোয়েন্দা থাকতেই চেয়েছিল।

বৈশালী আবার সত্যেন রায়ের কামরায় গিয়ে ঢুকল।

এবার বলো তো ভুবন বাজপেয়ি কেন তোমার কাছে গিয়েছিল?

থেমে থেমে বৈশালী সব ঘটনা বলল।

সত্যেন রায় চেয়ারে হেলান দিয়ে নিবিষ্টচিত্তে শুনল। তারপর সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, কিন্তু ময়ূরের এই পাথরের জন্য ভদ্রলোকের এত উদবেগের কারণ? দুটো পাথরই তো ঝুটো।

ভুবনবাবু কাল রাতে যে ময়ূর আমার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন সেটা এ ময়ূর নয়। সে ময়ূরের একটা চোখে খুব দামি চুনি বসানো ছিল।

তাহলে সে ময়ূর গেল কোথায়?

যে ভুবনবাবুকে গুলি করেছে সে-ই সরিয়েছে।

আর এ ময়ূরটা?

সম্ভবত পুলিশের চোখে ধুলো দেবার জন্য এ ময়ূর নিহতের পকেটে রেখে গেছে।

সত্যেন রায় মাথা নাড়ল।

সিলি, আততায়ী অতক্ষণ ঘটনাস্থলে ছিল? সামনে রাইটারস' বিল্ডিংস, দু-পা গেলেই লালবাজার। গুলির শব্দ হবার পরও আততায়ী ময়ূর বদলাবার জন্য অত সময় নষ্ট করবে?

যদি রিভলভারে সাইলেন্সার দেওয়া থাকে?

কী জানি, সব জিনিসটা আমার খুব ছেলেমানুষি মনে হচ্ছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্টরা সব কিছু তন্ন তন্ন করে খুঁজছে, কোথাও কোনও আঙুলের ছাপ পায়নি। তার মানে বাইরের কেউ ভুবনবাবুর পোশাক স্পর্শ করেনি। ব্যাপারটা রীতিমতো ঘোরালো হয়ে উঠছে। আচ্ছা, তুমি এখন কী করবে?

আমার কাল শিলাগড় যাবার কথা।

যাবে?

ঠিক বুঝতে পারছি না কী করব। শিলাগড়ে কি খবর পাঠানো হয়েছে?

হ্যাঁ, সকালেই টেলিগ্রাম করা হয়েছে।

তাহলে লোক আসবে সেখান থেকে। তারা যদি আমাকে যেতে বলে যাব। আজ উঠি।

আচ্ছা এসো। তোমার মা-বাবার খবর ভালো তো?

হ্যাঁ, গত সপ্তাহে চিঠি পেয়েছি। ভালোই আছে।

বৈশালী উঠে দাঁড়াল।

সত্যেন রায়ের হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আরে, তোমাকে চা খাওয়ানোর কথা ছিল।

আজ থাক, আর-একদিন হবে। এখন মাঝে মাঝে তো এখানে আসতেই হবে।

বৈশালী বেরিয়ে পড়ল।

সিঁড়ির কাছ বরাবর গিয়েই তাকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল।

দু-পাশে পুলিশ, মাঝখানে একটি লোক।

লোকটার পরনে শার্ট আর ফুলপ্যান্ট। পোশাকে ধুলোর ছাপ। এমনকী ধুলোর চিহ্ন মাথার চুলেও।

একনজর দেখেই বৈশালী বুঝতে পারল।

লোকটি মদে চুর। তাকে প্রায় টেনে ওপরে তোলা হচ্ছে।

বৈশালী একপাশে সরে দাঁড়াল।

পিছনে একজন সাব-ইনস্পেক্টর। সাব-ইনস্পেক্টরটি পরিচিত।

সে কাছে আসতেই বৈশালী জিজ্ঞাসা করল, মজুমদার, সিধু পানের কেস নাকি?

ঠিক বুঝতে পারছি না।

একেবারে বৈশালীর পাশে এসে সাব-ইনস্পেক্টর আবার বলল, ব্যাটা ড্রাইভার। পকেটের লাইসেন্স দেখে মালুম হল। একটা চিঠিও আছে। চিঠির ওপরে ভুবন-নিবাস, শিলাগড় লেখা। সেইজন্য একে স্যারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি, না হলে পাঁড় মাতালকে এখানে আনার কী দরকার।

এই তাহলে ভুবন বাজপেয়ির ড্রাইভার। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৈশালী ভাবতে লাগল। এখন তার চলে যাওয়া সম্ভব নয়। ব্যাপারটা দেখে যেতে হবে।

দলের পিছন পিছন বৈশালী সত্যেন রায়ের কামরায় ঢুকল। সত্যেন রায় জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তার দিকে চোখ ফিরিয়ে।

এতগুলো লোকের পায়ের শব্দে মুখ ফেরাল।

কী হল?

সাব-ইনস্পেক্টর এগিয়ে এসে বলল, ভুবন বাজপেয়ির ড্রাইভার স্যার।

অ্যাঁ! সত্যেন রায় চমকে উঠল।

তারপর লোকটার দিকে ফিরে বলল, কী হে, কী নাম তোমার?

লোকটি উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি মেলে সত্যেন রায়কে দেখল, তারপর চোখ নামিয়ে নিল।

কী নবাবপুত্তুর, কথা কানে গেল না?

লোকটি নির্বিকার।

এবার সাব-ইনস্পেক্টর বলল, আমরা অনেক চেষ্টা করেছি স্যার, একটি কথাও বের করতে পারিনি।

মারের চোটে ভূত পালায়, নেশা তো ছার।

তার চেয়ে এক কাজ করলে হয়।

বৈশালীর কথায় সবাই তার দিকে মুখ ফেরাল।

কী?

ডাক্তার রাহাকে একবার ডেকে পাঠান-না। একে পরীক্ষা করে দেখবেন।

দেখার আর কী আছে। ডাক্তার রাহা বলবেন স্টমাক পাম্প করতে। ঠিক আছে, ডাক্তার রাহাকে একবার ডাকো তাহলে কেউ।

একজন পুলিশ বেরিয়ে গেল।

তিন

সত্যেন রায় বলল, আচ্ছা বৈশালী, তুমি ডাক্তার ডাকতে বলছ কেন?

লোকটির চেহারা আমার ভালো ঠেকছে না। এ যেন ঠিক মদের কেস নয়। চোখ দেখে মনে হচ্ছে হাসিস কিংবা ওপিয়ম।

সত্যেন রায় হাসল।

ডাক্তার রাহা একেবারে রাস্তার উলটোদিকে বসে। রাহা ক্লিনিক।

পুলিশের সঙ্গে ডাক্তার রাহা এসে উপস্থিত।

ড্রাইভারের দিকে আঙুল দেখিয়ে সত্যেন রায় বলল, ওই আপনার পেশেন্ট। দেখুন তো কী ব্যাপার?

ডাক্তার রাহা অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করল। চোখের কোণ টেনে, স্টেথোস্কোপ বুকে বসিয়ে, নাড়ি টিপে।

ডাক্তার রাহার বাইরের পোশাক দেখে মানুষটাকে চেনা দুষ্কর। অনেকগুলো বিলিতি ডিগ্রি আছে। বিদেশের মেডিক্যাল জার্নালে মাঝে মাঝে প্রবন্ধ লেখে। বিভিন্ন দেশের নেশার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে।

ডাক্তার রাহা সত্যেন রায়ের দিকে ফিরে বলল, ঠিক যা সন্দেহ করেছি।

কী সন্দেহ করেছিলেন?

বড়ো রকমের নেশা করানো হয়েছে। খুব বেশি ডোজের মর্ফিয়া কিংবা...

পাদপূরণ করে সত্যেন রায় বলল, হাসিস?

হতে পারে, কিংবা মারজুয়ানা হওয়াও বিচিত্র নয়। সঠিক বলতে পারছি না।

মারজুয়ানা এ দেশে পাওয়া যায়?

পয়সা ফেললে সবই পাওয়া যায়। কলকাতা এক অদ্ভুত মহানগরী।

কথা বলতে বলতে ডাক্তার রাহা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ পরিষ্কার করতে লাগল।

এবার বৈশালী জিজ্ঞাসা করল, অ্যান্টিডোট কিছু দেবেন নাকি?

দেখি চেষ্টা করে, তবে কাজ হবে বলে মনে হয় না।

কেন?

জিনিসটা ব্রেন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

গোটা দুয়েক ইঞ্জেকশন দেওয়া হল।

ড্রাইভার অনড়, অসাড়।

ডাক্তার রাহা যেতে যেতে বলল, থাক শুয়ে। ঘণ্টা দুয়েক পরে একবার খোঁজ কোরো।

আমিও চলি। বৈশালীও উঠে দাঁড়াল।

রাস্তায় নেমে ডাক্তার রাহা বৈশালীকে জিজ্ঞাসা করল, লোকটি কি খুব প্রয়োজনীয় সাক্ষী নাকি?

সম্ভবত।

কীরকম?

আজ কাগজে দেখেছেন ভুবন বাজপেয়ি খুন হয়েছে। নিজের মোটরের মধ্যে দেহ পাওয়া গেছে।

লোকটি বুঝি সেই মোটরের ড্রাইভার?

হ্যাঁ।

বৈশালী মোটরে উঠল। পাশ কাটিয়ে ডাক্তার রাহাও চলে গেল।

বৈশালী যখন বাড়ি পৌঁছাল, তখন রোদ রীতিমতো চড়া।

খাওয়াদাওয়ার পর জানলা-দরজায় পরদা টেনে দিয়ে বৈশালী বিছানায় গা ঢেলে দিল।

শুল, কিন্তু ঘুমাল না। এত চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুমানো সম্ভব নয়। এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে, ভুবন বাজপেয়ির হত্যার ব্যাপারে ড্রাইভারের কোনও হাত নেই। যে লোকটি হত্যা করেছে সে ড্রাইভারের চেনা। চেনা বলেই ড্রাইভারের এই অবস্থা। যাতে সে আততায়ীর সম্বন্ধে কিছু বলতে না পারে।

আর-একবার বৈশালী সমস্ত ঘটনাটা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করল।

মোটরটি যখন চলছিল, তখন আততায়ী হাত তুলে মোটর থামাবার সংকেত করে। সে ভুবনবাবু আর ড্রাইভার—দুজনেরই পরিচিত। সুতরাং মোটর থেমেছিল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটি ভুবনবাবুকে লক্ষ করে গুলি ছোড়ে। খুব কাছ থেকে, কাজেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার প্রশ্ন ওঠেনি।

কিন্তু ড্রাইভারকে ইঞ্জেকশন কে দিল? সঙ্গে সঙ্গে না দিলে ড্রাইভার চিৎকার করে উঠত। লোক জড়ো হওয়া বিচিত্র নয়। রাত তখন কত?

ভুবন বাজপেয়ির হাতের ঘড়িতে এগারোটা কুড়ি। ঘড়িটা ভুবনবাবুর পরমায়ু শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেছে এমন মনে করার কোনও হেতু নেই।

কিন্তু আর-একটা কথা। মোটর যদি থেমেছিল আততায়ীর সংকেতে, তাহলে সেটা ওভাবে ফুটপাতে উঠে রেলিংয়ে ধাক্কা লাগাল কেন?

দুর্ঘটনার চেহারা দেখে মনে হয়, মোটর যখন চলন্ত অবস্থায়, তখন আততায়ী মোটরে উঠেছিল।

একাধিক লোকের আততায়ী হওয়াও সম্ভব। একজন ভুবনবাবুকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করেছিল, অন্যজন ড্রাইভারকে রিভলভার দেখিয়ে নির্বাক করে ইঞ্জেকশন দিয়েছে। তারপর একসময়ে নকল ময়ূর রেখে আসল ময়ূর নিয়ে সরে পড়েছে। টেলিফোনের শব্দে বৈশালীর ঘুম ভেঙে গেল। শুয়ে শুয়েই বৈশালী হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিল।

বৈশালী কথা বলছি।

আমি সত্যেন রায়।

কিছু খবর আছে?

খবর মানে পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা এসেছে।

নতুন কিছু আছে তাতে?

বিশেষ নয়। রিভলভারের গুলিতে মৃত্যু। খুব ক্লোজ রেঞ্জে ফায়ার। ক্ষতস্থানের চারপাশে বারুদের দাগ। তবে একটা খবর আছে।

কী?

ভুবনবাবুর মৃত্যু হয়েছে রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে।

তা হতে পারে, কারণ ভুবনবাবু আমার বাড়ি থেকে রাত ন-টায় উঠেছিলেন।

আচ্ছা, রাখছি বৈশালী, আমাকে আবার আর-একটা কাজে বের হতে হবে।

বৈশালী ফোন রেখে দিল।

দিন দুয়েক পর।

বৈশালী বিকালে বেড়াতে বের হচ্ছিল, হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ।

বৈশালী দাঁড়িয়ে পড়ল।

বাহাদুর সংবাদ নিয়ে আসবে। ঠিক তা-ই।

এক মাইজি এসেছে।

মাইজি? নিয়ে এসো।

বৈশালী ফিরে গিয়ে কৌচের ওপর বসল।

কে আসতে পারে? সহপাঠিনীদের কেউ? বিশেষ কেউই আসে না। সকলেই যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত।

মক্কেলও অবশ্য আসতে পারে।

দরজায় খুট করে শব্দ।

আসব?

আসুন।

তারপর ঘরের মধ্যে যে ঢুকল, বৈশালী অনেকক্ষণ তার দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইল।

গায়ের রং গজদন্তসদৃশ। ঈষৎ পীতাভ সাদা। দীর্ঘ, ঋজু চেহারা। অনেকটা রজনিগন্ধার স্তবকের মতন। ঘোমটা মাথার মাঝবরাবর। আয়ত ভ্রমরকৃষ্ণ দুটি চোখ, পদ্মপাপাড়িনিভ দুটি ঠোঁট। সারা মুখ বুদ্ধিদীপ্ত।

ঢুকেই দুটো হাত জোড় করে নমস্কার করল—নমস্তে।

বৈশালী দাঁড়িয়ে উঠে নমস্কার ফেরত দিল।

বলল, আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না!

আমি ভুবন বাজপেয়ির স্ত্রী।

আশ্চর্য, দ্বিতীয় পক্ষ সেটা ভুবনবাবু বলেছিল, কিন্তু দুজনের মধ্যে বয়সের এত তফাত সেটা বৈশালী ভাবতেও পারেনি।

এমন সৌন্দর্য সচরাচর দেখা যায় না। তার ওপর সদ্যপ্রাপ্ত বিষাদের ছায়া সে সৌন্দর্যকে যেন আরও পবিত্র করে তুলেছে।

দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন মিসেস বাজপেয়ি।

আমার নাম দীপালি বাজপেয়ি। দীপালি বসতে বসতে বলল।

আপনি মথুরায় ছিলেন শুনেছিলাম।

হ্যাঁ, মা-বাবা তীর্থ করতে গিয়েছিলেন। আমি তাঁদের সঙ্গে গিয়েছিলাম। কয়েকদিন আগে এসেছি।

আপনাকে কতকগুলো কথা জিজ্ঞাসা করব দীপালিদেবী।

বলুন।

আপনি হয়তো ইতিমধ্যে শুনেছেন, ভুবনবাবুর পকেটে একটা নকল ময়ূর পাওয়া গিয়েছে। নকল অর্থাৎ ঝুটো কাচ বসানো। অত্যন্ত আশ্চর্যের কথা যে, আততায়ী আসল ময়ূরটা নিয়ে গিয়ে নকল ময়ূরটা রেখে যাবার মতন এত প্রচুর সময় পেল কী করে? গঠনকৌশলে দুটো ময়ূরই এক ধরনের। এতে বোঝা যায় যে, দুর্বৃত্ত আসল ময়ূরটা খুব ভালোভাবেই দেখেছে, তা না হলে ঠিক একই রকমভাবে নকল ময়ূর তৈরি করতে পারত না।

দীপালি খুব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শোনবার চেষ্টা করল। তারপর খুব মৃদুকণ্ঠে বলল, আপনার অনুমান ঠিক নয়, মিসেস ব্যানার্জি।

অনুমান ঠিক নয়?

না।

কীরকম?

নকল ময়ূরটা বাইরের কোনও লোক রেখে যায়নি। সেটা মিস্টার বাজপেয়ির পকেটেই ছিল।

তার মানে?

মানে, মিস্টার বাজপেয়ি যখনই আসল ময়ূরটা সঙ্গে নিয়ে যেতেন, তখনই নকল ময়ূরটাও তিনি কাছে রাখতেন। ওটা তিনিই কারিগর দিয়ে তৈরি করেছিলেন।

বৈশালী দুটো হাত গালে রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। একটু পরে অনেকটা আত্মগতভাবে বলল, তার মানে মিস্টার বাজপেয়ি জানতেন এই ময়ূরটার ওপর বাইরের লোকের লোভ আছে। তাদের চোখে ধুলো দেবার জন্যই নকল ময়ূরটা কাছে রাখতেন। তা-ই না?

সম্ভবত।

একটু থেমে দীপালি আবার বলল, এ কথা তিনি কোনওদিনই আমার সঙ্গে আলোচনা করেননি। তবে তাঁর হাবেভাবে আমার সন্দেহ হত। সব দরজা-জানলা বন্ধ করে যখন ময়ূরটা দেখতেন, কোথাও একটু আওয়াজ হলেই চমকে উঠতেন। তারপর যখন ময়ূরটা নিয়ে মাঝে মাঝে বাইরে যেতেন, দেখতাম ভীষণ সাবধান হতেন। কোথায় যাবেন কাউকে বলতেন না।

আপনাকেও না?

মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে খুব মৃদুকণ্ঠে বলল, না, আমাকেও নয়।

আপনি কি আন্দাজ করতে পারেন, এই ময়ূরের ব্যাপারে কাদের আগ্রহ ছিল?

কিছুক্ষণ নীরব থেকে দীপালি বলল, সকলের কথা বলতে পারি না। তবে একজনের কথা জানি।

বৈশালী মেরুদণ্ড টান করে বসল।

কে সেই একজন?

অতীন।

অতীন? অতীন কে?

মিস্টার বাজপেয়ির ছেলে।

তিনি বর্মায় থাকেন, না?

হ্যাঁ, থাকে। কিন্তু দু-তিন মাস অন্তর সে এখানে আসে। কয়েক মাস আগে একটা কলহ আমার কর্ণগোচর হয়েছিল।

কীসের কলহ?

এই ময়ূর নিয়ে। শুধু ময়ূর নয়, কিছু দামি রত্ন নিয়ে।

কী ধরনের ঝগড়া?

মনে হল বিষয় ভাগাভাগির ব্যাপার। মিস্টার বাজপেয়ির ধনরত্নের একটা কারবার ছিল শুনেছেন কি?

হ্যাঁ শুনেছি। আন্তর্জাতিক চোরাকারবারির সঙ্গে তাঁর ব্যাবসার লেনদেন ছিল। সেটা কি আপনি জানেন?

না, জানি না। এ আমি বিশ্বাসও করি না।

দীপালির কণ্ঠস্বর রীতিমতো দৃঢ়।

বৈশালী এবার অন্য প্রসঙ্গ আরম্ভ করল।

আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না দীপালিদেবী।

দীপালি বৈশালীর দিকে চোখ তুলে দেখল।

এই ময়ূরের চোখের জোড়া রুবির দাম এমন কিছু বেশি নয়। সাধারণ রুবির চেয়ে কিছু বেশি হতে পারে, কারণ সচরাচর এত বড়ো রুবি দেখা যায় না। কিন্তু এর জন্য এত বড়ো একটা হত্যাকাণ্ড ঘটে যাবে, এটাই আমার কাছে খুব বিস্ময়ের মনে হচ্ছে। ভুবনবাবুর কাছে নিশ্চয় এর চেয়ে আরও অনেক দামি রত্ন ছিল, তা-ই না দীপালিদেবী?

আমার পক্ষে এর কোনও সদুত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।

আচ্ছা, আপনাদের ড্রাইভার, যিনি ভুবনবাবুর গাড়ি চালাতেন, তিনি কি বিশ্বাসী?

সম্পূর্ণ।

তাঁর নাম কী?

নিখিল কোনার।

কত বছর আছেন আপনাদের কাছে?

শুনেছি, প্রায় বিশ বছর। খুব নির্ভরযোগ্য ড্রাইভার।

হঠাৎ দীপালি সাশ্রুনয়নে বলে উঠল, শুধু আসল ময়ূরটাই নয়, আমার স্বামীর হত্যাকারীকেও আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে।

আপনার স্বামীর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপার পুলিশের হাতে। তাঁরা যথাসাধ্য করছেন। কিন্তু আপনি আমার কাছে এসেছেন কেন? ভুবনবাবুর কাছে কখনো কিছু শুনেছিলেন?

মিস্টার বাজপেয়ি যখন ময়ূরের চোখের একটা পাথর চুরি যাবার কথা আমাকে লিখেছিলেন, তখনই তাঁকে আমি আপনার হাতে কেসটা দেবার কথা জানাই। কারণ এ বিষয়ে আপনার খ্যাতির কথা আমার বাবার কাছে বহুবার শুনেছি।

আপনার বাবার নাম কী?

সুরজমল খেত্রী।

সুরজমল খেত্রী তো বিখ্যাত জহুরি। তাঁর রত্নের কারবার সারা ভারতবর্ষে ছড়ানো। আমার অনেকগুলো কেসে রত্ন যাচাই করার ব্যাপারে তাঁর সাহায্য নিয়েছিলাম।

একটু পরে বৈশালী প্রশ্ন করল, আচ্ছা, যে সিন্দুকে এই ময়ূর থাকত, তার একটা বাড়তি চাবি আপনার কাছে থাকে?

হ্যাঁ, সে চাবি আমি মথুরা নিয়ে গিয়েছিলাম। এই যে সেই চাবি।

দীপালি উঠে দাঁড়িয়ে উঠে কোমর থেকে সাদা রেশমের শাড়িটা সরিয়ে ফেলল। রুপোর কোমরবন্ধ। তাতে অনেকগুলো চাবি আটকানো।

বৈশালী একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল, হঠাৎ দীপালির কণ্ঠস্বরে চমক ভাঙল।

আপনার কত ফি আমার জানা নেই। আপাতত এই টাকা ক-টা রাখুন।

বৈশালী চোখ তুলে দেখল, দীপালির প্রসারিত হাতে একগাদা নোট।

বৈশালী হাত নাড়ল।

এখন আপনি টাকাগুলো রেখে দিন। আমি ভুবনবাবুকে বলেছিলাম, আপনাকেও বলছি, একবার আমি শিলাগড়ে গিয়ে নিজের চোখে সব দেখতে চাই। তারপর স্থির করব, কেসটা নেব কি না। যখন কেসটা হাতে নেওয়া ঠিক করব, তখন আমার ফি-এর কথা আপনাকে জানাব। বসুন, একটু চায়ের কথা বলে আসি।

না, দীপালি বিষণ্ণভাবে ঘাড় নাড়ল, আমি কিছু খাব না। আমার অশৌচ চলছে।

ও মাপ করবেন। আমার খেয়াল ছিল না। বৈশালী বিব্রতকণ্ঠে বলল।

দীপালি জিজ্ঞাসা করল, কবে আপনি শিলাগড়ে আসতে পারবেন?

আমার মনে হয় এখন আপনারা ভুবনবাবুর কাজের জন্য ব্যস্ত থাকবেন। ক্রিয়াকর্ম হয়ে যাক, তারপর যাব।

বেশি দেরি হয়ে যাবে না? আমার ইচ্ছা আপনি আরও আগে আসুন।

বৈশালী কিছুক্ষণ কী ভাবল, তারপর প্রশ্ন করল, আচ্ছা, এই ক্রিয়া উপলক্ষে অতীনবাবু কি বর্মা থেকে আসবেন?

হ্যাঁ; অতীন একমাত্র পুত্র। সব কাজ তো তাকেই করতে হবে।

তিনি কি এখানে কিছুদিন থাকবেন?

বলতে পারি না। অতীনের যাওয়া-আসা সম্বন্ধে আমি কিছু জানি না।

অতীনবাবু শিলাগড়ে এলে আমাকে খবর পাঠাবেন।

আমি আপনাকে ট্রাঙ্ককল করে দেব।

বেশ, সেই ভালো।

আজ আমি চলি। নমস্কার। দীপালি উঠে দাঁড়াল।

আপনি কি আজ রাতেই শিলাগড় ফিরে যাবেন?

না, আজ আমি এখানে এক আত্মীয়ের বাড়ি রাত কাটাব। কাল ভোরে রওনা হব।

চার

দীপালি ঘর থেকে বের হয়ে যাবার পরও একটা দামি সুরভি বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। শোকাচ্ছন্ন পরিবেশে এ ধরনের উগ্র গন্ধসার কিছু পরিমাণে অস্বাভাবিক।

বৈশালী জানলায় গিয়ে দাঁড়াল।

রাস্তার ওপর হালকা নীল অ্যাম্বাসাডর। উর্দি-পরা এক ড্রাইভার দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে।

দীপালি মোটরে উঠল।

মোটর রওনা হয়ে যেতে বৈশালী কৌচে ফিরে এল। এখন আর কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। বৈশালী চুপচাপ বসে রইল।...

আসতে পারি ম্যাডাম?

কণ্ঠস্বরেই চেনা গেল, তবু বৈশালী মাথাটা ঘুরিয়ে দেখল।

আরে এসো, এসো, তোমার কথাই ভাবছিলাম।

সুশ্রী, গৌরবর্ণ দীর্ঘ চেহারার একটি যুবক ঢুকল।

পরনে সাদা টেরিলিনের শার্ট, চকোলেট রঙের টেরিকটের প্যান্ট। উজ্জ্বল দুটি চোখ, ঠোঁটের গড়নে হাসি মাখানো।

সুজিত। বিদেশি একটা ফার্মের কেমিস্ট। বৈশালীর সঙ্গে আলাপ বিলাতে।

এসো কেমিস্ট, তোমার কথাই ভাবছিলাম।

কী ভাগ্য আমার!

সুজিত এসে বৈশালীর পাশে বসল।

একটা মুশকিলে পড়েছি। বৈশালী বলল।

তোমার কাজই তো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো।

শিলাগড়ের কেসটা শুনেছ?

দোহাই তোমার। আমাকে ওয়াটসন তৈরি কোরো না। আমি নিজের কাজ নিয়ে যথেষ্ট বিব্রত আছি।

কী খাবে বলো?

আপাতত এক কাপ চা দিয়ে তো শুরু করো।

বৈশালীকে উঠতে দেখে সুজিত বলল, আহা, তুমি উঠছ কেন? বাহাদুরকে বলে দাও-না।

কিন্তু বৈশালীকে উঠতেই হল। টেলিফোনটা ঝংকার তুলে চলেছে।

বৈশালী ফোন তুলে চুপ করে কী শুনল, তারপর বলল, সে কী, ডাক্তার কী বলে?

তারের ওপার থেকে কী উত্তর এল শোনা গেল না।

বৈশালীর মুখ রীতিমতো করুণ ঠেকল।

একটু পরে বৈশালী কৌচে ফিরে এল।

সুজিত কিছুক্ষণ তাকে জরিপ করে বলল, খারাপ খবর?

হুঁ। শিলাগড়ের ভুবন বাজপেয়ি কিছুদিন আগে নিহত হয়েছেন। আজ সত্যেনবাবু বললেন, তাঁর ড্রাইভারটিও মারা গেছে।

সে-ও কি গুলিতে নাকি?

না, কী একটা নারকোটিক প্রয়োগে তাকে প্রায় বোবা করে রাখা হয়েছিল। সেই অবস্থাতেই হাসপাতালে মারা গেছে।

যাক, তোমার একটা সুবিধা হল। সুজিত বলল।

কী সুবিধা?

সম্ভাব্য অপরাধীর সংখ্যা একজন কমল।

কমল?

তা ছাড়া আর কী! তোমরা তো থিয়োরি অব এলিমিনেশন নীতি অনুসরণ করো। কতকগুলো সম্ভাব্য অপরাধীর তালিকা ঠিক করো, তারপর বাদ দিতে দিতে মারাত্মক এক অবস্থায় উপনীত হও।

কী মারাত্মক অবস্থা?

শেষ পর্যন্ত দেখা যায় শুধু গোয়েন্দাই বাকি আছে।

কথা শেষ হতে দুজনেই হেসে উঠল।

বৈশালী বলল, এক কাজ করো।

কী?

আজ রাতে এখানে খেয়ে যাও।

আপত্তি নেই। তবে মা-কে একবার ফোন করে দিতে হবে।

ঠিক আছে। মাসিমাকে আমি বলে দিচ্ছি।

বৈশালী উঠে গিয়ে ফোন করে এল।

তারপর ফিরে এসে কৌচের ওপর ভালোভাবে বসে বলল, সুজিত, অফিস থেকে ক-দিন ছুটি নিতে পারবে?

তা পারি। কেন, দার্জিলিং যাবে?

না, শিলাগড়।

কপট আক্ষেপে সুজিত নিজের কপাল চাপড়াল।

হা হতোস্মি। আমি ভাবলাম, দারুণ অগ্নিবাণে রে, আমাকে নিয়ে শৈলবাসে যাবার বাসনা, তা নয়, সেই শিলাগড়। তোমার ঘটনাস্থলে।

চলোই-না। রহস্যটা দেখে আসা যাক।

তথাস্তু।

দিনকয়েক পরে বৈশালীর মোটর শহরের বিখ্যাত জুয়েলার্স রতনরাম রাজঘরিয়ার দোকানের সামনে থামল।

বৈশালী নামতেই কর্মচারীরা এগিয়ে এল।

বৈশালী জিজ্ঞেস করল, পুনমচাঁদ আছেন?

হ্যাঁ, আছেন।

বৈশালী তার নামের কার্ড এগিয়ে দিল।

এটা দিয়ে দেবেন।

কার্ড পাবার সঙ্গে সঙ্গে প্রোপ্রাইটার পুনমচাঁদ বেরিয়ে এল।

আসুন বৈশালীদেবী, গরিবের দোকানে কী মনে করে?

পুনমচাঁদের পিছন পিছন বৈশালী তার কামরায় ঢুকল।

সারি সারি লোহার সিন্দুক। সামনে কাচে ঢাকা টেবিল। তার ওপর গোটা তিনেক আতশকাচ।

কী খাবেন বলুন? একটা কোকাকোলা আনাই?

কিছু লাগবে না। আপনার কাছে একটা কথা জানতে এলাম।

বলুন, বলুন।

আপনাদের কারবার তো বহুদিনের।

হ্যাঁ, আমার ঠাকুরদা এর পত্তন করেন। এখন তো আপনাদের পাঁচজনের আশীর্বাদে একরকম চলছে। লন্ডনেও আমাদের ব্রাঞ্চ আছে। তবে একটা কথা, রাজরাজড়াদের যুগ শেষ হয়ে যাবার পর তেমন দরাজ-দিল খরিদ্দার নেই। মনে আছে, বাবা গায়কোয়াড়কে একটা হিরা বিক্রি করেছিলেন এক লক্ষ সাঁইত্রিশ হাজার টাকায়। এখন আর সেসব লোক কোথায়?

আচ্ছা চুনি কোন দেশের সবচেয়ে ভালো?

চুনি? বর্মার চুনিরই নাম খুব বেশি। ওখানকার মোগক মাইন বিখ্যাত।

সবচেয়ে মূল্যবান চুনি কত টাকায় বিক্রি হয়েছে বলতে পারেন?

এক মিনিট। আমাকে বই দেখে বলতে হবে।

পুনমচাঁদ ড্রয়ার খুলে কালো মোটা একটা বই বের করল।

হিন্দিতে 'রত্নদর্পণ' বলে একটা পত্রিকা প্রকাশিত হত, তার বেশ কয়েক বছরের সংখ্যা একত্রে বাঁধানো। কিছুক্ষণ ধরে পাতা ওলটাতে ওলটাতে পুণমচাঁদ এক জায়গায় থামল।

বলল, এই যে এখানে রয়েছে। চুনির দাম নিরূপিত হয় তার ঘন রক্তাভা আর গঠনসৌকর্যের ওপর। সবচেয়ে মূল্যবান চুনি ছিল সুপিয়ালার ব্রোচে। বর্মার শেষ স্বাধীন রাজা থিব। তাঁর পত্নী রানি সুপিয়ালা। বর্মার পতনের পর এক জেনারেল বিলাতে লেডি ব্রুমফিল্ডের কাছে এই চুনিটা বিক্রি করে ত্রিশ হাজার টাকায়। তবে এ কথাও এখানে লেখা আছে, সব দিক বিবেচনা করে দেখলে এর দাম পনেরো হাজারের বেশি হওয়া অনুচিত।

তাহলে জহুরিদের মতে এ পর্যন্ত সবচেয়ে ভালো চুনির মূল্য পনেরো হাজারের বেশি নয়?

তা-ই তো লিখেছে।

আচ্ছা চলি।

উঠবেন? আপনার শরীর ভালো আছে?

ভালোই আছে। ধন্যবাদ।

বৈশালী মোটরে উঠল।

বাড়ি ফিরল না। সোজা গেল ন্যাশনাল লাইব্রেরি। সেখানে বই খুলে কিছু নোট নিল।

পুনমচাঁদ ঠিকই বলেছে, চুনির দাম খুব বেশি নয়।

সবচেয়ে মহার্ঘ চুনির যদি এই মূল্য হয় তাহলে ময়ূরের রুবির চোখের কত দাম হবে? একটা পাথর খুব বেশি হলে পাঁচ হাজার। তার বেশি নয়।

আসল ময়ূরটা থাকলে জহুরিদের কাছে যাচাই করে নেওয়া যেত। এখন আর সেটা সম্ভব নয়।

এই সামান্য টাকার জন্য এত বড়ো হত্যাকাণ্ড। দুটো প্রাণ বিনষ্ট হল।

বৈশালীর মনে হল, এর মধ্যে আর কোনও রহস্য আছে। গূঢ়তর কিছু।

দিন দুয়েক পরেই ট্রাঙ্ককল এল। তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি।

বৈশালীর ঘুম খুব সজাগ। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল।

শিলাগড় থেকে দীপালি বাজপেয়ি।

বলুন, আমি বৈশালী কথা বলছি।

অতীন কাল এসেছে। আমার স্বামীর কাজ মঙ্গলবার। আপনি আজ আসতে পারবেন?

আজ পারব না। কাল ভোরে রওনা হব। ঘণ্টা পাঁচেক লাগবে বোধহয়।

ওইরকম।

আমার সঙ্গে একটি ভদ্রলোক থাকবেন।

ঠিক আছে। শুনুন, বলে দিই, আসানসোল পার হবার পর সোজা রাস্তাটা গেছে ধানবাদের দিকে। আপনি বাঁদিকের রাস্তাটা ধরবেন। শিলাগড়ে পৌঁছে ভুবন-নিবাসের নাম করলেই সবাই দেখিয়ে দেবে। তাহলে কাল আসছেন?

হ্যাঁ।

দীপালি লাইন ছেড়ে দিল।

বেলা আটটা নাগাদ বৈশালী দুটো ফোন করল।

একটা সুজিতকে। কাল রওনা হবার কথা জানাল। ভোর পাঁচটায় বৈশালী রওনা হবে। সুজিতকে বাড়ি থেকে তুলে নেবে। সে যেন তৈরি থাকে।

দ্বিতীয় ফোন করল সত্যেন রায়কে। কুশল প্রশ্নের পর খোঁজ নিল, ভুবন বাজপেয়ির খুনের কোনও কিনারা হল? কই আর হল? দুজনকে সন্দেহক্রমে ধরা হয়েছে। পুলিশ তাদের ধোলাই দিয়েছে।

আর কিছু?

কতকগুলো জহুরির দোকানে খানাতল্লাশি করা হয়েছে। এরাই সব চোরাই পাথর কেনা-বেচা করে, কিন্তু কিছু পাওয়া যায়নি। তুমি কিছু কিনারা করতে পারলে?

না, কাল আমি শিলাগড় যাচ্ছি।

পুলিশের সাহায্য দরকার?

পুলিশের সাহায্য?

মানে, সাদা পোশাকে বডিগার্ড?

না, না। সেসবের দরকার নেই। সুজিত যাচ্ছে আমার সঙ্গে।

পরের দিন ভোর চারটে থেকে বৈশালী তৈরি হতে লাগল। পোশাক পরা শেষ হতে কোমরের চামড়ার বন্ধনীর সঙ্গে ছোটো রিভলভার আটকে নিল। এটা বিদেশ থেকে কেনা। এ ধরনের কাজে বৈশালীর সঙ্গে সঙ্গে থাকে। তবে এ পর্যন্ত ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়নি।

সুজিতের বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখল, গেটের সামনে সুজিত দাঁড়িয়ে আছে। পিছনে তার মা।

বৈশালী মোটর থেকে নেমে সুজিতের মা-কে প্রণাম করল।

আপনি আবার এত ভোরে উঠেছেন কেন মাসিমা?

সুজিতের মা হাসল।

ও মা, উঠব না। তুমি জয়যাত্রায় চলেছ। খুব সাবধান মা। চারদিকে চোখ-কান সজাগ রেখে চলাফেরা করবে।

পাঁচ

ভুবন-নিবাস পৌঁছাতে প্রায় বারোটা হয়ে গেল।

বৈশালীর ধারণা ছিল বিরাট এক প্রাসাদ হবে, কিন্তু সেরকম কিছু নয়, দোতলা বাড়ি। পুরোনো আমলের। চারপাশে প্রচুর জায়গা। ফল-ফুলের বাগান।

লোহার গেট আছে। গেটে পাগড়ি-আঁটা দারোয়ান। সেলাম করে গেট খুলে দিল।

বাড়ির সামনের কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে মেরাপ বাঁধা হয়েছে। ডেকরেটররা তখনও সাজাচ্ছে।

মোটর থামতেই একটি ভদ্রলোক সামনে এসে দাঁড়াল। রং ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ, কোটরাগত চোখ, রুক্ষ চেহারা।

আমি অতীন বাজপেয়ি।

কণ্ঠস্বর চেহারার মতনই রুক্ষ।

বৈশালী নিরীক্ষণ করে দেখল। তারপর বলল, আপনি বর্মায় থাকেন?

হ্যাঁ।

বর্মায় কোথায়?

বর্মা সম্বন্ধে আপনার কিছু জানা আছে?

না, বিশেষ কিছু জানা নেই। ভূগোলে যেটুকু পড়েছি।

আমি থাকি কেমেনডাইনে। রেঙ্গুনের কাছেই।

কাঠের ব্যাবসা করেন?

ওই সামান্য।

আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল।

বেশ তো, হবে কথা। আপনারা বিশ্রাম করে নিন।

কথা শেষ করে অতীন ডাকল, চরণ, চরণ।

একটি ভৃত্য এসে দাঁড়াল।

এঁদের অতিথি কুটিরে নিয়ে যাও।

সুজিত জিজ্ঞাসা করল, মোটরটা কোথায় রাখব?

অতিথি কুটিরের সঙ্গেই গ্যারাজ আছে। অতীন জানাল।

ভুবন-নিবাসের পিছনেই একতলা বাড়ি। সঙ্গে দুটি গ্যারাজ।

চরণের নির্দেশে সুজিত মোটরটি একটি গ্যারাজে ঢোকাল।

তারপর এদিকের ঘরের চাবি খুলে দিতে বৈশালী আর সুজিত ঘরের মধ্যে গেল।

একটা বসবার ঘর। কৌচ-সোফা সাজানো, সামনে ফালি বারান্দা। ভিতরে শোবার ঘর। পাশাপাশি দুটি খাট।

শোবার ঘরের ব্যবস্থা দেখে বৈশালী আরক্ত হয়ে উঠল।

মুখে বলল, অতীনবাবুকে বলতে হবে আমাদের আর-একটা শোবার ঘর দরকার।

সুজিত বলল, কেন, আমি না হয় বাইরের ঘরে কৌচের ওপর কাটিয়ে দেব। ক-টা রাতের ব্যাপার বলো তো?

কী জানি, নিজেই আমি জানি না।

মিনিট কুড়ির মধ্যে অতীন এল। পিছনে ভৃত্যের হাতে চায়ের সরঞ্জাম। প্রচুর ফল আর মিষ্টি।

চা খেয়ে নিয়ে আপনারা স্নান সেরে নিন। আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা তো ভিন্ন, নইলে একসঙ্গেই খাওয়া যেত।

আমরা স্নান সেরে এসেছি। আপনারা চা-পানের যে এলাহি আয়োজন করেছেন, তারপর এবেলা আর কিছু খাওয়ার প্রয়োজন হবে বলে মনে করি না।

কী যে বলেন। অতীন বিনীতকণ্ঠে বলল।

আমাদের একটা কথা ছিল।

কী বলুন!

আমাদের আর-একটা শয়নঘরের প্রয়োজন হবে।

কয়েক মুহূর্ত অতীন বৈশালী আর সুজিতের দিকে ফিরে কী ভাবল, তারপর বলল, ঠিক আছে, পাশের ঘরের বেডরুমটাও খুলে দিতে বলেছি। দয়া করে আপনাদের যখন যা অসুবিধা হবে জানাবেন। বুঝতেই পারছেন, এ সময়ে আমরা একটু ব্যস্ত রয়েছি। বাবার কাজের জন্যে।

এখন মিনিট পনেরো আপনার সময় হবে?

মিনিট পনেরো? খুব হবে।

দয়া করে বসুন-না!

সামনের কৌচে অতীন বসে পড়ল।

আপনার বাবার কোনও শত্রু ছিল?

অতীনের মুখে একটু চিন্তার ছায়া পড়ল।

শত্রু, তেমন শত্রু তো কাউকেই মনে পড়ছে না। তবে ব্যাবসা করতে গেলেই তো কিছু শত্রুর সৃষ্টি হয়, জানেন।

আপনাকে স্পষ্ট করে বলতে চাই অতীনবাবু, আমরা বিশ্বাস করি না যে, সামান্য দামের রুবির জন্য কেউ আপনার বাবাকে এভাবে হত্যা করবে। উদ্দেশ্য নিশ্চয় আরও গভীর। সেই উদ্দেশ্য খুঁজে বের করার ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই। আশা করি আপনার কাছ থেকে অকৃপণ সাহায্য পাব।

নিশ্চয়। আমি যতটুকু জানি, সবই আপনাদের বলব।

আপনার সঙ্গে ভুবনবাবুর সম্পর্ক কেমন ছিল?

ভালোই।

মাঝে মাঝে বচসা হত শুনলাম।

অতীনের দুটি ভ্রূ কুঞ্চিত হয়ে এল।

কে বলেছে? কার কাছে শুনেছেন?

বৈশালী কোনও উত্তর দিল না।

অতীনই আবার বলল, নতুন মা বলেছে?

বচসা হত কি না বলুন-না? এবার বৈশালী কণ্ঠস্বরে জোর দিল।

কয়েকবার হয়েছে।

সম্পত্তি নিয়ে?

না, সম্পত্তির ওপর আমার লোভ নেই। আমি একলা মানুষ। বর্মায় আমার যে কাঠের কারবার আছে, তাতে ভালোভাবেই চলে যায়।

তবে?

অতীন একটু ইতস্তত করল। কথাটা বলবে কি না সে সম্বন্ধে দ্বিধাবোধ।

বৈশালীর সেটা বুঝতে অসুবিধা হল না।

শুনুন, একটা কথা বলি। আমাদের কাছে লুকোচুরি করে কোনও লাভ নেই। বরং সবকিছু পরিষ্কারভাবে জানালেই আপনার পক্ষে মঙ্গল।

অতীন নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল।

মঙ্গল-অমঙ্গলের কথা কী বলছেন বুঝতে পারছি না। কথাটা বলতে এখন আর বিশেষ বাধা নেই।

বলুন—

বাবার ওইসব রত্নের ব্যাপারে কিছু চোরাকারবারির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি। বাবার ইচ্ছা ছিল বর্মায় এদের সঙ্গে আমি যোগসূত্র রাখি। যাতে তাঁর কারবারটা আরও প্রসার লাভ করে। কিন্তু এসব ব্যাপারে আমার একেবারে আগ্রহ ছিল না। আগেই তো বললাম আপনাদের, সামান্য ব্যাবসায় আমার চলে যায়। আমি বাবাকে অনেক বুঝিয়েছিলাম, এসব খেলার মধ্যে বিপদ আছে। শুধু মান নিয়ে নয়, প্রাণ নিয়েও টানাটানি। তা ছাড়া, পুলিশের নজরও বাবার ওপর ছিল, তাও জানি।

কিন্তু আপনার বাবার তো অন্য ব্যাবসাও ছিল?

অন্য ব্যাবসা ভালো চলছিল না। যে টিলা ইজারা নিয়ে কয়লার ব্যাবসা শুরু করেছিলেন, সেখানে কয়লা বিশেষ পাওয়া গেল না। একটা স্তরেই শেষ। অভ্রের কারবারে শরিকের সঙ্গে গোলমাল চলছিল। কোর্ট অবধি মামলা গড়িয়েছিল। একমাত্র সম্বল ছিল সোনা আর পাথরের ব্যাবসা। আমি বর্মা থেকে চুনি জোগাড় করে পাঠাতাম। তাতে বিশেষ কিছু পাওয়া যেত না। লাভ হিরা আর সোনায়। বাবার ঝোঁক ছিল সেদিকে।

চকিতের জন্য বৈশালীর মনে হল, এমন তো নয় ময়ূরটার অভ্যন্তরে সোনার পাত দেওয়া ছিল, কিংবা সোনার তাল লুকানো ছিল, সেইজন্য তার আকর্ষণ এত বেশি!

কিন্তু না, বৈশালী ময়ূরটা হাতে করে দেখেছে। ওজন মোটেই তেমন বেশি মনে হয়নি। সোনা ওজনে রীতিমতো ভারী।

নিন, আপনারা খেয়ে নিন। চা ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি একবার ওদিকটা দেখে আসি। বলে অতীন বেরিয়ে গেল।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে বৈশালী বলল, সুজিত, ব্যাপারটা কী মনে হচ্ছে?

ভদ্রলোকের হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়ার ধরনটা আমার ভালো লাগল না। সুজিত বলল।

বাপ অসৎ পথে যাচ্ছেন, আর ছেলে নিবৃত্ত করতে চাইছে, এই নিয়ে বচসা, এটার চেয়ে চোরাকারবারের অংশ নিয়ে চেঁচামেচি, সেটা আরও স্বাভাবিক মনে হয় না?

কিন্তু বাপকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে কী লাভ হল?

সেটাই ভাবছি। ভুবন বাজপেয়ির উইলের খবর নিতে হবে।

উইলে কি চোরাই ধনরত্নের উল্লেখ থাকবে?

বৈশালী মুচকি হাসল, অবশ্যই না। চোরাই ধনরত্ন অর্থে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কালো টাকা সাদা হওয়ার মতন।

সুজিত জিজ্ঞাসা করল, ভুবনবাবুর স্ত্রী-র সঙ্গে কখন দেখা হবে?

উৎকণ্ঠিত হোয়ো না। ভদ্রমহিলা যখন আমন্ত্রণ করে এনেছেন, একবার নিশ্চয় দেখা দেবেন।

আরও ঘণ্টাখানেক পরে আহারের ডাক এল। খাওয়ার ব্যবস্থা ভুবন-নিবাসে।

টেবিল-চেয়ার নয়, মোজেইক মেঝেয় কার্পেটের আসন। রুপোর থালা গ্লাস।

বৈশালী আর সুজিত গিয়ে বসল।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভিতরের পরদা ঠেলে দীপালি এসে দাঁড়াল।

সাদা কাপড়ের ওপর ছোটো একটা চাদর জড়ানো। চোখে-মুখে বিষাদের আভা।

আপনাদের খুব কষ্ট হল।

না, না, কষ্ট আর কী, বৈশালী বলল, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা খুবই চমৎকার।

ঠিক এখন আমাদের পক্ষে আপনাদের তেমনভাবে তদারক করা কিছুটা অসুবিধাজনক, সেটা মনে রেখে আমাদের ত্রুটি ক্ষমা করবেন।

ওভাবে বলে আমাদের অপরাধী করবেন না। অতীনবাবুর সঙ্গে দেখা হবে না তাই, না হলে আপনাদের ক্রিয়াকর্ম চুকে গেলেই আমরা আসতাম।

অতীনের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

অতীনের নামোচ্চারণের সঙ্গেই দীপালির কণ্ঠ কিঞ্চিৎ রুক্ষ হয়ে উঠল।

হ্যাঁ, হয়েছে। তিনি অতিথি-কুটিরে আমাদের তদারক করছিলেন।

ইতিমধ্যে পাচক আহার্য নিয়ে আসাতে কথোপকথনে ছেদ পড়ল।

কিছুক্ষণ পরে দীপালি প্রশ্ন করল, আপনারা কতদিন এখানে থাকবেন?

দিন দুয়েকের বেশি দরকার হবে না।

বিশেষ কিছু যদি দেখতে চান, বলতে পারেন।

ভুবনবাবুর সিন্দুক যে ঘরে থাকত, সে ঘরটা একবার দেখার ইচ্ছা। মানে তাঁর শোবার ঘর।

বেশ, বিশ্রাম করে নিন। বিকালে দেখবেন।

আহার শেষ হতে ভৃত্যের সঙ্গে অতিথি-কুটিরে ফিরে আসতে গিয়ে বৈশালী হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। একেবারে কোণের একতলা ঘরের দরজা সম্পূর্ণ খোলা। একটি সুপুরুষ যুবক জানলার কাছে দাঁড়িয়ে। পরনে সিল্কের গেঞ্জি, গোলাপি পায়জামা।

বৈশালীর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই যুবকটি মুখ ফিরিয়ে নিল।

কিছুটা এসে বৈশালী ভৃত্যকে প্রশ্ন করল, একতলায় যাঁকে দেখলাম উনি কে?

ভৃত্য বলল, ওঁর নাম বলতে পারব না। বেখাপ্পা নাম। উনি বাঙালি নন।

বাঙালি যে নয়, সেটা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের মুখ-চোখ, কিন্তু বেশ দীর্ঘ।

বৈশালীর মনে পড়ে গেল।

উনি বোধহয় অতীনবাবুর সঙ্গে এসেছেন?

ভৃত্য ঘাড় নাড়ল। আজ্ঞে হ্যাঁ। দাদাবাবুর কারবারের লোক।

খুব আসেন বুঝি?

হ্যাঁ, প্রায়ই আসেন। বাবুর কাছে খুব আসতেন।

এই সময় বৈশালীর মনে পড়ে গেল, লোকটার নাম মং শান।

অতিথি-কুটিরে ঢুকে সুজিত জিজ্ঞাসা করল, এখন তোমার প্রোগ্রাম কী?

এক ঘণ্টা দিবানিদ্রা। তুমি এ ঘরে শোও, আমি পাশের ঘরে যাচ্ছি।

বৈশালী শুল বটে, কিন্তু ঘুমাল না। একটা হাত দিয়ে চোখ ঢেকে পড়ে রইল।

অতীন যখন আবার এসে দাঁড়াল, তখন রোদ কমে এসেছে। ভৃত্য বাগানে বেতের চেয়ার-টেবিল পেতে দিয়েছে।

বৈশালী আর সুজিতের চা খাওয়াও শেষ।

কিছু মনে করবেন না, আমি কালকের জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত আছি। অতীন বলল।

আপনি কতদিন আছেন এখানে?

আমি ভাবছি দিন দুয়েক পরেই রওনা হব, কারণ ওখানে আমার কারবার দেখার কেউ নেই।

তার ওপর মং শানও তো এখন এখানে।

বৈশালীর এই কথায় অতীন যেন একটু অপ্রতিভ হল, তারপর সামলে নিয়ে বলল, মং শান আমার কাঠের কারবার দেখে না। ও পাথর খুব ভালো চেনে। তাতেই আমাকে সাহায্য করে।

মং শানের সঙ্গে একটু আলাপ করতে পারলে খুশি হতাম।

বেশ তো, আমি ডেকে পাঠাচ্ছি।

এক ভৃত্যকে ডেকে অতীন মং শানকে আসতে বলল।

আচ্ছা, একটা কথা ভাবছিলাম।

বলুন।

সচরাচর বর্মিরা খুব দীর্ঘকায় হয় না, বরং বেঁটে হয়, অথচ আপনার মং শান বেশ লম্বা।

দেখা হয়েছে আপনাদের সঙ্গে?

আমরা যখন আহার সেরে বের হচ্ছিলাম, দেখলাম একতলার ঘরে দাঁড়িয়ে আছেন।

ও, মং শান ঠিক বর্মি নয়, ও জেরবাদী। ওর বাপ মুসলমান। সুরাটের মুসলমান, আর মা বর্মি। তাই মং শান অত লম্বা।

একটু থেমেই অতীন বলল, মং শান অবশ্য এসব ব্যাপারের কিছু জানে না।

কী সব ব্যাপারের?

এই বাবার মৃত্যু সম্বন্ধে।

জানেন না মানে? নিশ্চয় শুনেছেন, সংবাদপত্রেও পড়ে থাকবেন।

তা হয়তো পড়েছে, কিন্তু ওই পর্যন্ত। আর কিছু জানে না।

বৈশালী আর কথা বাড়াল না।

রাস্তার প্রান্তে মং শানকে আসতে দেখা গেল।

এবার পরনে দামি স্যুট। হাতে ফেল্ট হ্যাট।

বৈশালী অতীনের দিকে ফিরে বলল, একটা কথা অতীনবাবু, মং শানের সঙ্গে একান্তে দু-একটা কথা বলতে চাই। আপনার থাকবার দরকার নেই।

বেশ।

মনে হল অতীন যেন একটু অনিচ্ছাসত্ত্বেই স্থান পরিত্যাগ করল।

একটু পরে মং শান এসে দাঁড়াল।

বসুন মং শান, আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করতে চাই। বৈশালী ইংরেজি বলল।

চেয়ার টেনে বসতে বসতে মং শান বলল, আমার সৌভাগ্য।

আপনি কতদিন অতীন বাজপেয়ির সহকারী হিসাবে কাজ করছেন?

আমি জুনিয়র বাজপেয়ির সহকারী নই, আমি তাঁর সহযোগী। পাথর যাচাইয়ের ব্যাপারে আমি তাঁকে সাহায্য করে থাকি।

অতীন বাজপেয়ির পাথরের চোরাকারবারেও কি আপনি তাঁকে সাহায্য করেন?

মং শানের মুখ আরক্ত হয়ে উঠল।

কিছুক্ষণ বৈশালীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে তারপর বলল, তাঁর পাথরের কোনও চোরাকারবার আছে বলে তো আমার জানা নেই।

আপনি ভুবনবাবুকে দুটো রুবি দিয়েছিলেন?

দিয়েছিলাম, মানে বিক্রি করেছিলাম। রুবি দুটো খুব দামি।

কত দাম?

আমি ছ-হাজারে এক-একটা কিনেছিলাম। বিক্রি করেছিলাম প্রত্যেকটি আট হাজারে।

রুবি দুটো চুরি গেছে জানেন?

শুনেছি।

আপনার কি মনে হয় রুবি দুটোর এত দাম যে, তার জন্য একজন মানুষের প্রাণ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে?

মং শানের দু-ঠোঁটের প্রান্তে হাসির ক্ষীণ আভা।

মানুষকে কখন কীসের জন্য প্রাণ দিতে হয়, বলা যায়! আমাদের দেশে, মানে বর্মায় এর চেয়ে অনেক অল্প টাকার জন্য মানুষকে খুন করে।

ভুবনবাবুর শত্রু কেউ ছিল বলতে পারেন?

কী করে বলব! আমি তো এ দেশে থাকি না। তবে অনেক সময় ছেলেও বাপের শত্রু হয়।

এ কথা বলছেন কেন?

জুনিয়র বাজপেয়ির সঙ্গে সিনিয়র বাজপেয়ির সম্পর্ক খুব ভালো ছিল না। প্রায়ই ঝগড়াঝাঁটি হত।

আপনি কী করে জানলেন, আপনি তো এ দেশে থাকতেন না?

জুনিয়র বাজপেয়ি বর্মায় ফিরে গিয়ে বাপের নামে খুব মেজাজ দেখাতেন। বলতেন, বুড়ো শকুনের লালসার শেষ নেই।

কিন্তু তা বলে ছেলে বাপকে—

বৈশালীর কথা শেষ হবার আগেই মং শান বলে উঠল, আমি তা একবারও বলিনি। আর আপনার কোনও কথা আছে? আমি উঠব।

কথার সঙ্গে সঙ্গে মং শান দাঁড়িয়ে উঠল।

আপনি আর কতদিন এখানে আছেন?

দিন কুড়ি। রেওয়ার দেওয়ান আসবেন কিছু পাথরের খোঁজে, তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

আমার পাথরের নেশা আছে। কিছু পাথর দেখাতে পারবেন?

কেন পারব না? আপনার বাড়ির ঠিকানা আর সময় দেবেন, গিয়ে দেখিয়ে আসব।

এখানে দেখানো সম্ভব নয়?

না, কারণ পাথরগুলো এখানে নেই। কাজের বাড়ি, এখানে কিছু রাখিনি। আচ্ছা চলি।

মং শান উঠে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল।

বৈশালী সুজিতের দিকে ফিরে বলল, কীরকম বুঝছ সুজিত?

।। ছয় ।।

কম্পাসের কাঁটার উত্তরদিকে দেখানোর মতন, দীপালিদেবী আর মং শান দুজনেরই লক্ষ্য যেন অতীন বাজপেয়ি।

বৈশালী বলল, চলো, আমরাও বেরিয়ে আসি।

কোথায়? সুজিতের জিজ্ঞাসা।

জায়গাটা ঘুরেফিরে একবার দেখে আসি।

মিনিট পনেরোর মধ্যে বৈশালী মোটর নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। পাশে সুজিত।

খুব ছোটো জায়গা। শিলার প্রাচুর্য আছে, তবে গড় কেন তা বোঝা গেল না। মাঝে মাঝে ব্লাস্টিং-এর শব্দও ভেসে আসছে। মারোয়াড়ি আছে, তার ওপর বাঙালি, বিহারি।

মোটর রাস্তার ওপর রেখে দুজনে একটা কাপড়ের দোকানে গিয়ে বসল।

মারোয়াড়ি দোকানের মালিক কাপড় দেখাতে দেখাতে প্রশ্ন করল, আপনাদের এখানে নতুন দেখছি।

সুজিত বলল, হ্যাঁ, আমরা ভুবন বাজপেয়ির কাছে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছি।

আপনারা কি ভুবনবাবুর আত্মীয়?

না, তাঁর সঙ্গে আমাদের পাথরের ব্যাবসার লেনদেন ছিল।

মালিক বিজ্ঞের মতন ঘাড় নাড়ল।

ওঁর কয়লা আর মাইকার ব্যাবসায় মন্দা পড়াতে ইদানীং স্টোনের ব্যাবসার দিকে ঝুঁকেছিলেন।

বড়ো আপশোসের ব্যাপার। এইভাবে ওঁর আকস্মিক মৃত্যু!

মালিক বৈশালীর কথায় সায় দিল।

বড়ো ধার্মিক লোক ছিলেন। অনেককালের বাসিন্দা। তাঁর সব সওদা এখান থেকেই করতেন।

দুটো বিছানার চাদর কিনে বৈশালী আর সুজিত উঠে পড়ল।

মোটর উঠে সুজিত জিজ্ঞাসা করল, এরপর?

এরপর ভুবন-নিবাস। দীপালিদেবী আমাদের ভুবনবাবুর শোবার ঘর দেখাবেন।

অতিথি-কুটিরের সামনে এসেই দেখল, একজন ভৃত্য দাঁড়িয়ে আছে।

মা আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

চলো, যাচ্ছি।

মুখ-হাত ধুয়ে পোশাক বদলে দুজনে ভুবন-নিবাসে চলে এল।

দোতলার বারান্দার কাছে দীপালি দাঁড়িয়েছিল।

আসুন, আসুন। বেরিয়েছিলেন বুঝি?

সমস্ত দিন আটকে আছি, তাই একটু এদিক-ওদিক ঘুরে এলাম।

আসুন, ওঁর ঘরটা দেখিয়ে আনি।

একদিকে খাট। কোণের দিকে একটা সিন্দুক। তাতে সিঁদুরের দাগ। দেয়ালে ভুবন বাজপেয়ির ফোটো। মোটা বেল ফুলের মালা দুলছে।

মাঝখানে কাচে ঢাকা সেন্টার টেবিল ঘিরে গোটা দুয়েক চেয়ার।

আপনি কোথায় থাকেন?

বৈশালীর প্রশ্নে দীপালি একটু বুঝি আরক্তিম হল, মৃদুকণ্ঠে বলল, পাশের ঘরে।

ময়ূরটা এই সিন্দুকেই ছিল?

দীপালি মাথা নাড়ল। সম্মতিসূচক।

আপনি কোনওদিন সিন্দুক খুলেছেন? ভুবনবাবুর অনুপস্থিতিতে?

না, তার প্রয়োজন হয়নি। আমার চাবি দিয়ে অনেকবার খুলেছি, তবে ওঁর সামনে।

আপনার গয়নাগাটি কি এই সিন্দুকে থাকে?

না, ব্যাঙ্কে থাকে। প্রয়োজনমতো আমি আনিয়ে নিই।

ঘরের মধ্যে কিছুক্ষণ পায়চারি করে বৈশালী জিজ্ঞাসা করল, অতীনবাবু কোথায় থাকেন?

দোতলায় পিছনদিকে।

আচ্ছা, ভুবনবাবুর সঙ্গে অতীনবাবুর যে বচসা হয়েছিল সেটার বিষয়বস্তু সম্বন্ধে কিছু বলতে পারবেন?

বাংলার শুরু হলেও দুজনে ইংরেজিতে কথা বলছিলেন।

ইংরেজি ঠিক ঠিক বুঝতে আপনার কোনও অসুবিধা হয়নি?

একটু চুপ করে থেকে দীপালি উত্তর দিল, আমি গ্র্যাজুয়েট।

ও, ওঁরা কি সম্পত্তি সম্বন্ধে কথা বলছিলেন?

হ্যাঁ, অতীন বলছিল, বিষয়ের অংশ তাকে ভাগ করে দিতে হবে।

আর-একটা কথা—।

কী বলুন?

ভুবনবাবুর কোনও উইল আছে?

যতদূর জানি, নেই।

থাকলে এই সময় নিশ্চয় আপনি জানতে পারতেন।

পারতাম। আমাদের অ্যাটর্নি মিস্টার মজুমদারের কাছে খোঁজ নিয়েছিলাম। তিনি বললেন, কোনও উইল নেই।

আশ্চর্য!

কেন, আশ্চর্য কেন?

যতদূর জানতাম, ভুবনবাবু বিচক্ষণ ব্যক্তি। এসব কাজ তাঁর সম্পূর্ণ করে রাখাই উচিত ছিল। কাল থেকে তো আপনারা খুব ব্যস্ত থাকবেন?

হ্যাঁ, তা থাকব। সন্ধ্যার সময় ভালো কীর্তন আছে। যদি এ বিষয়ে আগ্রহ থাকে, আসরে আসবেন।

কলকাতা থেকে কেউ আসছেন?

কীর্তন-বিশারদ হিমাংশু ভট্টাচার্য আসবেন।

ঠিক আছে, থাকব।

দীপালির নির্দেশে ভৃত্য দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল।

অতীনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন? দীপালি বলল।

মোটামুটি।

দু-একদিনের মধ্যে তো সে বর্মায় ফিরে যাবে।

প্রয়োজন হলে ফিরে যাওয়া আমরা বন্ধ করে দেব।

মনে হল দীপালির চোখে-মুখে চাপা আনন্দের আভাস।

একেবারে হঠাৎ বৈশালী প্রশ্ন করল, আচ্ছা, মং শান লোকটি কেমন?

দীপালি ভ্রূ কুঞ্চিত করল।

অতীনের শাগরেদ আর কত ভালো হবে। তবে ওর সঙ্গে ভিতরের বাড়ির কোনও যোগাযোগ নেই। যখন আসে বাইরের ঘরেই থাকে। ভুবনবাবুর সঙ্গে পাথরের কেনা-বেচায় ওর যোগাযোগ ছিল। তবে এমন কিছু নয়। প্রথমদিকে কয়েকটা পান্না কেনার ব্যাপারে সাহায্য করেছিল।

থেমে গিয়ে দীপালি বলল, আমি চলি, ঠাকুরঘরে বাতি দিতে হবে।

বৈশালী আর সুজিত সামনের বাগানে এসে দাঁড়াল।

মণ্ডপ তৈরি শেষ। একটা বেদির ওপর ভুবনবাবুর ফোটো রাখা হয়েছে। কাল পুষ্পভূষিত করা হবে।

সকাল থেকে অনুষ্ঠান শুরু। অতীন মণ্ডপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তদারক করছে।

বৈশালীদের দেখে অতীন এগিয়ে এল।

কী, কাল আছেন তো?

হ্যাঁ, কালকের দিনটা থাকব। দীপালিদেবী থাকবার জন্য বিশেষ করে অনুরোধ করেছেন। একজন বিখ্যাত কীর্তনীয়া আসছেন।

বাবার হত্যাকাণ্ডের কোনও সুরাহা হল?

কই আর হল? ওসব তো পুলিশের কাজ।

আপনার কী কাজ?

বৈশালী হাসল। বলল, ময়ূর উদ্ধার করা।

তার কিছু হল?

এখনও কাজের ভার নিইনি। কথা ছিল, শিলাগড় দেখে তবে কাজটা নেব কি না বলব।

ময়ূর উদ্ধারের চেয়েও আমি কিন্তু বাবার হত্যাকারীর হদিশ পেতে বেশি ইচ্ছুক।

স্বাভাবিক। আপনি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

দেখি।

ডেকরেটরের একটা লোকের দিকে অতীন এগিয়ে গেল।

রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর বেতের চেয়ারে দুজন বসে ছিল। বৈশালী আর সুজিত।

সুজিত হেসে বলল, কী গোয়েন্দা সাহেবা, কেসের কোনও কিনারা হল?

কই আর হল? আর এত সহজে কি হয়?

কীরকম?

সস্তা গোয়েন্দা কাহিনি পড়োনি? এতক্ষণে গোয়েন্দার কানের পাশ দিয়ে গোটা তিনেক বুলেট ছুটত। চায়ে চুমুক দিয়ে একজন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। সেসব তো কিছুই হল না। একেবারে নিরামিষ ব্যাপার। আরে!

বৈশালী একটা হাত বাড়িয়ে সুজিতের হাত টিপে দিল।

সুজিত চাপা গলায় প্রশ্ন করল, কী?

ভুবন-নিবাসের দোতলায় দেখো।

সুজিত চোখ তুলে দেখল।

অন্ধকার রাত। দু-একটা নক্ষত্রের ম্লান দীপ্তি। দোতলার পিছনদিকের বারান্দায় অন্ধকার মূর্তি।

তার হাতে একটা টর্চ। মনে হচ্ছে টর্চ নেড়ে সে যেন ইশারা করছে।

বৈশালী উঠে বাগানের ধারে গেল।

বাগানের সীমানার বাইরে উঁচু-নিচু জমি। কয়লার খাদের কাছাকাছি এলাকা যেমন হয়। পিছনে টিলা।

ছোটো একটা ঢিপির পাশ থেকে আর-একটা টর্চের আলো দেখা গেল। একবার জ্বলছে, আর-একবার নিভছে।

এদিকের ইশারার উত্তর।

মিনিট পনেরো। তারপর সব চুপ। বারান্দার লোকটা সরে গেল। বাইরের টর্চের আলোও আর জ্বলল না।

বৈশালী চেয়ারে ফিরে এল।

কী বুঝলে?

আলোর সংকেত বলে মনে হল।

আরে সে তো অন্ধও বলতে পারো। বারান্দার লোকটি কে?

অন্ধকারে আর দেখতে পেলাম কোথায়?

না, সহকারী হিসাবে তুমি একটা অপদার্থ।

বেশ, গোয়েন্দা হিসাবে তুমিই বলো?

বৈশালী হাসল। চরণ আসুক, তারপর বলব।

চরণ একটু পরেই এল, কুঁজোয় ঠান্ডা জল ভরতে।

বৈশালী জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা চরণ, ওই পিছনদিকের ঘরে কে থাকেন? ওই যে বারান্দা দেখা যাচ্ছে।

চরণ একবার চোখ তুলে দেখে বলল, দাদাবাবু। ওটা দাদাবাবুর ঘর।

চরণ চলে গেলে সুজিত বলল, আর দেরি নয় বৈশালী, অতীনবাবুর ঘরটা সার্চ করা যাক?

রহু ধৈর্যং। অত তাড়াহুড়ো কোরো না।

পরের দিন সকালে বৈশালী চা-পানের আগেই ভুবন-নিবাসে এসে হাজির হল।

সোজা দোতলায় উঠে সামনে একটা ভৃত্যকে দেখে বলল, আমি অতীনবাবুর সঙ্গে দেখা করব।

দাদাবাবু এখনও ওঠেননি।

তুমি ওঠাও। বলো জরুরি দরকার।

ভৃত্য আর কিছু বলল না। এগিয়ে গেল।

বৈশালী তাকে অনুসরণ করল।

বেশ কয়েকবার দরজায় ধাক্কা দেবার পর ভিতর থেকে জড়ানো গলার শব্দ শোনা গেল।

কে?

বৈশালী উত্তর দিল। দরজাটা দয়া করে খুলবেন। খুব দরকার।

দরজা খুলে গেল।

চৌকাঠের ওপারে রাত্রিবাস পরিহিত অতীন। দুটো চোখ বেশ লাল। দৃষ্টি কিঞ্চিৎ উদ্ভ্রান্ত।

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বৈশালী ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

আপনার সঙ্গে কতকগুলো কথা আছে।

আমাকে ডেকে পাঠালেই পারতেন।

বৈশালী চোখ বুলিয়ে ঘরের অবস্থাটা দেখে নিল। কোণের দিকে গোল টেবিলে একটা মদের বোতল। পাশে গ্লাস। দুটোই শূন্য।

একটু বাইরে আসবেন?

কোথায়?

বারান্দায়।

অতীন পিছনের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। তার সামনে বৈশালী।

কাল একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম।

কী?

আপনি একটু দাঁড়ান এইখানে।

বৈশালীর নির্দেশমতো অতীন দরজার পাশে দেয়ালের ধারে দাঁড়াল।

ওই যে উঁচু-নিচু ঢিপি দেখছেন, কাল রাতে ওখান থেকে কে যেন টর্চের আলো ফেলছিল।

ফেলতে পারে। টর্চ হাতে লোকেরা আনাগোনা করে, তাদের হাতের আলো এদিক-ওদিক পড়তে পারে।

না, আনাগোনার আলো নয়। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যেন আলোর সংকেত করছিল।

ক-টার সময়?

রাত সাড়ে দশটা।

সাড়ে দশটা? জানি না, আমি তখন বাড়ি ফিরিনি।

তাহলে ভুলই দেখেছি হয়তো। সাতসকালে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত।

মুখে অতীন না বললেও, তাকে দেখে এটুকু বোঝা গেল, ভোরবেলা অযথা ঘুমটা ভাঙিয়ে দেওয়াতে সে মোটেই খুশি হয়নি।

বৈশালী নেমে এল।

সাত

সুজিত সবে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমের দিকে রওনা হচ্ছে, সামনে বৈশালীকে দেখে বলল, কী ব্যাপার, এত সকালে কোথায় গিয়েছিলে?

মর্নিং ওয়াক করে এলাম।

একলাই?

তোমরা যেমন মাঝে মাঝে নারীসঙ্গ বর্জনীয় মনে করো, আমরাও তেমনই কখনো কখনো তোমাদের পরিহার করে চলতে চাই, বুঝলে?

সুজিত কিছু বলল না। বাথরুমে ঢুকে গেল।

এরপর একসময়ে অতীন এসে দাঁড়াল। হাতে কার্ড।

বড্ড দেরি হয়ে গেল। আরও আগে নিমন্ত্রণ করা উচিত ছিল, কিন্তু আগে আর আপনাদের পাব কোথায়? দয়া করে অনুষ্ঠানে আসবেন। সকাল থেকে কীর্তনের আসর বসবে। অবশ্য রাত্রেই জমজমাট হবে আসর।

বৈশালী বলল, দিনের বেলা আমাদের একটু কাজ আছে। সন্ধ্যাবেলা আসরে আমরা উপস্থিত থাকব।

খাওয়াদাওয়ার পর বৈশালী বেরিয়ে পড়ল। সঙ্গে সুজিত। বৈশালীর হাতে স্টিয়ারিং।

সুজিত জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যাবে?

আশপাশটা একটু ঘুরে দেখব—আলোর খেলা কোথা থেকে হচ্ছিল।

তোমার কী ধারণা, যারা এসব করছিল তারা দিনের বেলাতেও ওখানে বসে থাকবে?

বৈশালী হাসল। বলল, তা কখনো থাকে না। মানুষ থাকে না, কিন্তু চিহ্ন রেখে যায়। হাত-পায়ের ছাপ কিংবা ব্যবহার-করা কোনও জিনিস।

তা সত্যি। তা না হলে তোমাদের মতন গোয়েন্দাদের অন্ন যাবে যে। চলো।

মোটর একটু দূরে রেখে দুজনে হাঁটল।

উঁচু-নিচু ঢিপির পাশে কাঁটাগাছের ঝোপ। বৃষ্টি হয়নি। শুকনো, খটখটে মাটি। পায়ের ছাপ পড়া সম্পূর্ণ অসম্ভব।

বৈশালী নিচু হয়ে ঝোপগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজল। হঠাৎ কী একটা কুড়িয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

এই দেখো।

সুজিত এগিয়ে এল।

কী?

একটা খাম। কারো পকেট থেকে পড়ে গেছে।

বৈশালী খামটা এগিয়ে দিল।

সুজিত দেখল। পুরোনো খাম। একটা ঠিকানা লেখা। স্পষ্ট নয়, কিন্তু পড়া যায়।

অতীন বাজপেয়ি। ফোর্থ স্ট্রিট। কেমেনডাইন। রেঙ্গুন। লোয়ার বার্মা।

এটা এখানে এল কী করে?

বৈশালীকে খুব চিন্তিত মনে হল। আস্তে আস্তে বলল, কারো পকেট থেকে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক।

সুজিত বলল, পড়লে অতীনবাবুর পকেট থেকেই পড়েছে, কারণ তাঁকে লেখা খাম।

বৈশালী এ কথার কোনও উত্তর দিল না। শুধু বলল, দাও খামটা।

খামটা নিয়ে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে রেখে দিল। তারপর হেঁটে একটু দূরে গিয়ে আবার ফিরে দেখল।

কী দেখছ?

কাল রাতে ওই জায়গা থেকেই কিন্তু আলোটা দেখা গিয়েছিল। আমি ওই উঁচু ঢিপিটা নিশানা রেখেছিলাম। রাতের বেলা ঢিপিটা দেখা যায়নি, শুধু একটা অন্ধকার স্তূপ।

তোমার বক্তব্যটা কী?

কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার হিসাবে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

কীরকম?

আর কিছুদিন আমাকে সময় দাও। যদি সম্ভব হয়, আশা করি, সব বলতে পারব।

তা ভালো, কিন্তু এবার কোনদিকে?

একবার থানায় যাব।

হঠাৎ?

ভয় নেই, ভিতরে নয়—বাইরে থেকে থানার অবস্থানটা দেখে আসব।

চলো।

দুজনে আবার মোটরে উঠল।

সদর রাস্তার ওপরই থানা। ভুবন-নিবাস থেকে বেশি দূরে নয়।

সুজিত বলল, ও.সি.-র সঙ্গে একবার আলাপ করে এলে হত না?

দরকার হলে পরে যাব। সত্যেন রায়ের চিঠি সঙ্গে আছে, তাতেই কাজ হবে।

একটু এদিক-ওদিক ঘুরে দুজনে যখন ফিরে এল, তখন জোর কীর্তন চলছে। খুব বেশি লোক নেই। বাড়ির লোকেরা রয়েছে। কিন্তু কীর্তনীয়া দরদ দিয়ে গাইছে।

চলতে চলতেই চোখ ফিরিয়ে বৈশালী দেখল, মঞ্চের একপাশে সাদা কাপড় জড়িয়ে দীপালি চুপচাপ বসে আছে। একমুঠো রজনিগন্ধা ফুলের মতন।

কী-ই বা বয়স। এই বয়সে জীবনের শ্রেষ্ঠ সুখে জলাঞ্জলি দিতে হল। পৃথিবীর সব রং মুছে গেল।

সন্ধ্যার সময়ে বৈশালী আর সুজিত দুজনে এসে আসরে বসল।

এখানকার আসর জমজমাট। পুরুষ আর মহিলাদের আলাদা অবস্থা। সুজিত একদিকে বসল। বৈশালী অন্যদিকে।

এবারের আকর্ষণের কারণ আছে।

মঞ্চে হিমাংশু ভট্টাচার্য, তাকে ঘিরে অনেকগুলো মেয়ে। হিমাংশু ভট্টাচার্য গাইছে, আর মেয়েরা কোরাসে অনুসরণ করছে।

বৃন্দাবনের জীবন। শ্রীকৃষ্ণ মথুরা চলে গেছেন। তাঁর বিরহে বৃন্দাবনের গাছপালা, পশুপক্ষী বেদনায় মুহ্যমান। গোপিনীরা উন্মত্তপ্রায়।

সেই বেদনা সংগীতের কথায়-সুরে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

বৈশালী এদিক-ওদিক চোখ ঘুরিয়ে দেখল।

পুরুষদের জায়গায় একেবারে কোণের দিকে মং শান বসে। একমনে গান শুনছে। কী বুঝছে কে জানে।

বৈশালী পাশে বসা মহিলাদের দিকেও দেখল।

বেশির ভাগই গ্রাম্য বধূ আর মেয়ে। তারাও গানে তন্ময়।

বৈশালী আস্তে আস্তে উঠল। কেউ লক্ষ করছে না। একটু দাঁড়িয়ে আসর থেকে বেরিয়ে এল।

চাকরবাকর কেউ ধারেকাছে নেই।...

বৈশালী সিঁড়ি দিয়ে উঠল। সামনেই মং শানের ঘর। দরজা ভেজানো।

হাত রাখতেই দরজা খুলে গেল। ঘর অন্ধকার।

একবার পিছনদিকে দেখে বৈশালী ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।

অন্ধকার চোখে সহ্য হতে আরও এগিয়ে গেল সে।

ব্লাউজের মধ্যে থেকে পেনসিল টর্চ বের করল।

প্রথমে টেবিলের ওপর, তারপর আলমারির দিকে আলোর রেখা ঘুরতে লাগল। ড্রয়ার টেনে দেখল, বন্ধ।

দেওয়ালের তাকে হাত বোলাতে বোলাতে হাতে কতকগুলো কাগজ উঠে গেল। টর্চের আলোয় সেগুলোর ওপর নজর বুলিয়েই ব্লাউজের মধ্যে সেগুলো রেখে দিল।

তারপর হাত বাড়িয়ে তাকের ওপর আরও জিনিসের খোঁজ করতে যাবার আগেই বাইরে জোর পায়ের শব্দ।

দরজা খুলে গেল। বাইরের আলোর রেখার কিছুটা ঘরের মধ্যে এসে পড়ল।

বৈশালী ত্বরিত পায়ের কোণের দিকের পরদার আড়ালে আত্মগোপন করল।

ভাগ্য ভালো বৈশালীর। মং শান বেশিক্ষণ ঘরের মধ্যে রইল না। টেবিলের ওপর থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

বৈশালী এতক্ষণ নিশ্বাস রোধ করে দাঁড়িয়ে ছিল। একটা হাত কোমরে। যেখানে আগ্নেয়াস্ত্রটা আটকানো।

কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে যখন পরদার আড়াল থেকে বাইরে এসে দাঁড়াল, তখন তার সারা দেহ ঘামে সিক্ত। খুব সন্তর্পণে ঘরের বাইরে এল। আর কীর্তনের আসরে নয়, বৈশালী অতিথি-কুটিরে চলে এল।

সুজিত আসরে বসে রয়েছে।

বৈশালী প্রথমে দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল। তারপর টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে কাগজগুলো নিয়ে বসল।

গোটা পাঁচ-ছয় কাগজ। একটা লন্ড্রির বিল, একটা শার্টের ক্যাশ মেমো আর একটা চামড়ার ছোটো ওয়ালেট। কাগজের সঙ্গে চলে এসেছে।

ওয়ালেটে একটা ঠিকানা—ধর্মতলা স্ট্রিটের কোনও এক হামিদ আলির। আর একটা খাম। ওপরে কোনও নাম নেই।

ছোটো ছোটো ভাঁজ করা অনেকগুলো কাগজ। সবগুলো ইংরেজিতে লেখা।

পড়তে পড়তে বৈশালীর দুটি ভ্রূ কুঞ্চিত হয়ে এল। দৃঢ়সংবদ্ধ ঠোঁট। চিঠিগুলো রেখে ওয়ালেটটা ঝাড়ল। যদি কিছু আটকে থাকে।

শুকনো একটা ফল পড়ল বৈশালীর কোলের ওপর।

সাবধানে ফলটা তুলে ভ্যানিটি ব্যাগের মধ্যে থেকে একটা শিশি বের করে তার মধ্যে রেখে দিল।

আর-একটা কাজ বাকি।

একটা চিঠি সরিয়ে রেখে অন্য কাগজগুলো ওয়ালেটের মধ্যে ভরে নিল।

এখন এই ওয়ালেটটা মং শানের ঘরে রেখে আসতে হবে। যেমন করে পারে।

দরজা বন্ধ করে বৈশালী বাইরে বেরিয়ে এল।

আসরে এসে দেখল, মং শান একভাবে বসে আছে। সুজিত নেই।

চোখ ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখল, অতীনও নেই।

অথচ সুজিতকে এই মুহূর্তে খুব প্রয়োজন।

মঞ্চের দিকে তাকিয়ে দেখল। হাত জোড় করে দীপালি চুপচাপ বসে আছে।

বৈশালী যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে, তখন দেখল, গেট দিয়ে সুজিত আর অতীন ঢুকছে।

বৈশালী এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কোথায় গিয়েছিলে?

সুজিত হাসল।

দুজনেরই গান ভালো লাগে না, তাই বেড়াতে বেরিয়েছিলাম।

অতীনের দিকে ফিরে বৈশালী গম্ভীরকণ্ঠে বলল, আপনি গান ভালোবাসেন না? শেকসপিয়র বলেছেন, যারা গান ভালোবাসে না, তারা মানুষ খুন করতে পারে।

অতীন কিছুক্ষণ বৈশালীকে জরিপ করল, তারপর বলল, আশা করি রহস্য করছেন।

বৈশালী এ কথার উত্তর দিল না। সুজিতকে বলল, একটা কথা আছে।

অতীন ইঙ্গিতটা বুঝল। আসরের মধ্যে গিয়ে বসল।

সুজিত, একটা কাজ করতে হবে।

কী বলো?

মং শানকে কথায় কথায় আটকে রাখতে পারো?

কেন?

ওর ঘরে আমার যাওয়া দরকার।

সর্বনাশ, ওসব করতে যেয়ো না, বিপদে পড়বে।

কিছু হবে না। শীঘ্র যাও। সময় নেই।

সুজিত মং শানের দিকে এগিয়ে গেল।

মং শানের পাশের চেয়ারে বসে বলল, আচ্ছা, আপনি তো বাংলা বোঝেন না।

উঁ, না।

তবে কী শুনছেন?

সুরটা আমার খুব ভালো লাগছে।

আপনাদের দেশে গানবাজনার চল আছে?

আছে বই কী। পোয়ে নাচ আছে। তার সঙ্গে গানও হয়।

যাক, আসল কথাটা আপনাকে বলি।

বলুন।

আপনাকে এই সময় বিরক্ত করছি বলে কিছু মনে করবেন না।

না, না, বলুন কী কথা?

আমার একটা পাথর দরকার।

এতক্ষণ পরে মং শানের চোখে-মুখে আগ্রহ ফুটে উঠল।

আমাকে জ্যোতিষী বলেছেন, ক্যাট'স আই ব্যবহার করতে।

মং শানের চোখে একটু যেন অবিশ্বাসের রেখা।

কলকাতা শহরে ক্যাট'স আই পাচ্ছেন না?

পাচ্ছি, কিন্তু কিনতে সাহস হচ্ছে না।

কেন?

যদি ঠকি!

বেশ, আপনার ঠিকানা দিন, আমি দেখা করব।

সুজিত পকেট থেকে কলম বের করে একটা কাগজে খসখস করে ঠিকানা লিখে দিল।

মং শান ঠিকানাটা রেখে দিল।

সুজিত একসময় আড়চোখে তাকিয়ে দেখল বৈশালী আসরের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।

সে উঠে দাঁড়াল।

মং শানকে বলল, ধন্যবাদ। দিন সাতেক পরে আপনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন।

সুজিত বৈশালীর সামনে এসে দাঁড়াল। চাপাকণ্ঠে বলল, হয়ে গেছে?

হুঁ। শোনো, এদিকে এসো।

সুজিত বৈশালীর দিকে সরে এল।

আজ রাত্রেই আমরা রওনা হব।

আজই রাত্রে?

হ্যাঁ। চলো, তৈরি হয়ে নিই।

এঁরা কী ভাববেন?

কিছু একটা বলে গেলেই হবে। তুমি যাও, আমি আসছি।

সুজিত চলে যেতে, বৈশালী দীপালির পিছনে গিয়ে দাঁড়াল।

দীপালি ফিরে দেখল।

কিছু বলবেন?

একটু কথা ছিল।

দীপালি উঠে এল।

আমরা আজ রাত্রেই কলকাতায় ফিরে যাব।

সে কী? আজই?

হ্যাঁ, জরুরি দরকার। যেতেই হবে।

আমাদের কেসের কী হবে?

আমি দিন সাতেক পরে আবার আসছি।

তার আগে তো অতীন পালাবে।

তিনি যাতে না পালাতে পারেন তার ব্যবস্থা করে যাব।

আপনাকে আগাম কিছু টাকা দেবার কথা ছিল।

আমি সাত দিন পরে এসে নেব।

রাত্রে আহার করে যাবেন।

আমরা পথে খেয়ে নেব। আপনি কিছু মনে করবেন না। আতিথেয়তার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

বৈশালী দুটো হাত যুক্ত করে নমস্কার করল।

আধ ঘণ্টার মধ্যে বৈশালী আর সুজিত বেরিয়ে পড়ল।

বৈশালী থানায় একবার নেমে ও.সি.-র সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে নিল।

কিছুক্ষণ পরেই ও.সি. দুটি পুলিশ সঙ্গে নিয়ে ভুবন-নিবাসে ঢুকল।

তখন আসর শেষ। লোকেরা উঠতে আরম্ভ করছে।

ও.সি. অতীনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, আপনি অতীন বাজপেয়ি?

সামনে পুলিশ দেখে অতীন একটু বিব্রত হল।

বলল, হ্যাঁ।

আপনি দশ দিন সকাল-বিকাল থানায় হাজিরা দেবেন।

সে কী? আমাকে যে বর্মায় ফিরে যেতে হবে।

আপনার ফিরে যাওয়া এখন সম্ভব নয়। আইনের প্রয়োজনে আপনাকে থাকতে হবে।

আমার অপরাধ?

যথাসময়ে জানতে পারবেন।

অতীন এবার রীতিমতো বিরক্ত হল।

আপনাদের এ অন্যায় আদেশ আমি মানি না।

ও.সি.-র কণ্ঠস্বর যথেষ্ট গম্ভীর।

আমাদের আদেশ আমরা জানিয়ে গেলাম। এরপর আমি যা করবেন নিজের দায়িত্বে। তার ফল কী হবে, নিশ্চয় বোঝবার মতন বুদ্ধি আপনার আছে।

পুলিশ নিয়ে ও.সি. চলে যাবার পর অতীন নিষ্ফল গর্জন শুরু করল। বৈশালীর বাপান্ত।

মং শানকে দেখতে পেয়ে বলল, দেখলে ঝামেলা। কাজকর্ম ফেলে দু-বেলা থানায় হাজিরা দাও। কেন, আমি কি চুরির দায়ে ধরা পড়েছি!

মং শান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কোনও উত্তর দিল না।

আট

সারাটা পথ বৈশালী অস্বাভাবিক গম্ভীর।

স্টিয়ারিং সুজিতের হাতে। সিটে হেলান দিয়ে বৈশালী নিস্পন্দ নির্বাক। তার এ চেহারার সঙ্গে সুজিতের পরিচয় আছে। সে বুঝতে পারল বৈশালীর মনের মধ্যে চিন্তার ঝড় উঠেছে। অনেকগুলো বিপরীতমুখী তরঙ্গের সংঘাত। এসবের মাঝখান থেকে সে সমাধানের সূত্র খুঁজছে।

বর্ধমান এসে বৈশালী নিজেই কথা বলল। এসো সুজিত, কিছু খেয়ে নেওয়া যাক।

খাওয়ার টেবিলেও বৈশালী বেশ চিন্তামগ্ন।

একসময়ে বলল, তুমি এখন কাজে যোগ দিয়ো না। তিন দিন পরে আমরা আবার শিলাগড়ে ফিরে আসব।

তিন দিন?

হ্যাঁ, দু-দিনও হতে পারে।

বৈশালী থেমে গেল। আর কোনও কথা হল না।

সুজিতকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে শুধু বলল, আমি তোমায় ফোন করব।

পরের দুটো দিন বৈশালী ভীষণভাবে ব্যস্ত রইল। খুব সকালে বের হয়ে যেত, ফিরত প্রায় দুটো-আড়াইটেয়। তারপর আবার বের হত। রাত দশটার আগে ফিরতে পারত না।

তিন দিনের দিন বৈশালী সুজিতকে ফোন করল—সুজিত, তুমি এর মধ্যে ফোন করেছিলে?

না, তুমি ব্যস্ত থাকবে ভেবে আর করিনি।

ভালোই করেছ। শোনো, দু-ঘণ্টার মধ্যে তৈরি থাকতে পারবে?

সুজিত বলল, আমি এখনই তৈরি আছি।

বৈশালী হেসে ফেলল। বা, এইরকম না হলে আমার সহকারী। এখন বেলা ন-টা, এগারোটায় তোমাকে তুলে নেব।

কোথায়? শিলাগড় তো?

ইচ্ছা তো তা-ই। রাখছি। বৈশালী ফোন রেখে দিল।

বাইরে যাবার জন্য বৈশালীর একটা স্যুটকেস গোছানো থাকে।

বৈশালী স্নান আর ভারী রকমের প্রাতরাশ সেরে নিল।

মোটরে সুজিত জিজ্ঞাসা করল, শিলাগড়ের রহস্যের কিনারা হয়ে গেছে?

আজ রাত্রে অপারেশন।

কিছুক্ষণ পরে বৈশালী বলল, শোনো, আর-একটা কথা—।

সুজিত ফিরে দেখল।

এবার আর অতিথি-কুটিরে উঠব না।

তবে?

শিলাগড়ে ঘোরবার সময় একটা মারোয়াড়ি ধর্মশালা দেখে রেখেছিলাম। সেন্ট্রাল রোডে। নাম বোধহয় রামবিলাস ধর্মশালা।

সুজিত সন্দেহ করল, থাকতে পারবে সেখানে?

বৈশালী হাসল।

মনে আছে, আগ্রায় গাছতলায় দু-রাত কাটিয়েছিলাম।

রাস্তায় আর কোনও কথা হল না।

সদর রাস্তা ছেড়ে মোটর ঘুরপথে সেন্ট্রাল রোড ধরল, যাতে ভুবন-নিবাসের সামনে না পড়তে হয়।

রামবিলাস ধর্মশালা।

ব্যবস্থা খারাপ নয়। শুধু মাছ, মাংস আর ডিম চলবে না।

বৈশালী আর সুজিত ঠিক করল এখানে থাকবে, কিন্তু খাওয়াদাওয়া বাইরেই সেরে নেবে।

সুজিত জিজ্ঞাসা করব, শুধু একটা রাত তো?

তা-ই তো মনে হচ্ছে। অবশ্য এসব ব্যাপারে কিছুই বলা যায় না।

থানার সামনেই ও.সি.-কে পাওয়া গেল।

বৈশালীকে অভ্যর্থনার বহর দেখে বৈশালী বুঝতে পারল, ইতিমধ্যে সত্যেন রায়ের ফোন এসে পৌঁছেছে।

অতীনবাবু ঠিকমতো থানায় হাজিরা দিচ্ছেন তো?

ও.সি. হাসল। হ্যাঁ, একেবারে নিয়ম করে। এবার অ্যারেস্ট করি তাকে?

না, এখন নয়। যখন প্রয়োজন হবে বলব।

একটু থেমে বৈশালী বলল, আজ রাত বারোটায় আমার গোটা চারেক পুলিশ দরকার। আর্মড। আপনি তো সঙ্গে থাকবেনই।

ও.সি. উত্তর দিল, ডি.সি. ফোনে আমাদের সবকিছু বলেছেন। আমরা এগারোটার মধ্যে তৈরি থাকব।

ঠিক এগারোটার একটু পরেই এখানে আসব। আর দড়ির মই চাই একটা।

সে কথাও স্যার বলেছেন। ঠিক আছে।

চিল, ঠিক সময়ে আসব। ভালোই হয়েছে। আজ রাতটা অন্ধকার।

আমাদের আলো আর অন্ধকার—সবই এক।

বৈশালীর পোশাক দেখে সুজিত অবাক।

পরনে কালো শার্ট আর আঁটো প্যান্ট। প্যান্টের রংও কালো। কোমরে অটোমেটিক।

কী ব্যাপার, রণাঙ্গনে নাকি?

প্রায় তা-ই।

আমি কী পরব?

তুমিও টাইট কিছু পরে নাও।

কেন, ছুটতে হবে নাকি?

সম্ভবত।

দুজনেই হেসে উঠল।

বৈশালী আর সুজিত যখন থানার সামনে এসে হাজির হল তখন জিপ নিয়ে ও.সি. তৈরি।

আমাকে অনুসরণ করুন।

জিপ খুব সাবধানে বৈশালীর মোটরের পিছন পিছন চলতে শুরু করল।

পিচকালো অন্ধকার। সূচিভেদ্য। এক হাত দূরের কিছু দেখবার উপায় নেই। আকাশে গোটাকয়েক নক্ষত্র আছে বটে, কিন্তু তাদের ক্ষীণ জ্যোতি পৃথিবীতে এসে পৌঁছাচ্ছে না।

একটা গাছের নীচে জিপ আর মোটর দাঁড়াল। সবাই নেমে এল।

বৈশালী তার রেডিয়াম ঘড়ির দিকে দেখল। এগারোটা বেজে পঁয়ত্রিশ।

বৈশালী ও.সি.-কে একপাশে ডাকল। অনেকক্ষণ ধরে চাপা গলায় কথা হল। তারপর একসময়ে বৈশালী বলল, চলুন আমরা এগোই।

ভুবন-নিবাসের পিছনের পাঁচিলের এপাশে এসে সকলে দাঁড়াল।

নিশাচর দু-একটা পাখির ডাক। মাঝে মাঝে ব্লাস্টিং-এর শব্দ। এ ছাড়া শিলাগড় যেন ঘুমে নিথর।

বারোটা বাজতে যখন দশ, তখন বৈশালী ইঙ্গিত করল।

ও.সি. দড়ির মইটা পাঁচিলের ওপর ছুড়ে দিল।

প্রথমে ও.সি., তারপরে বৈশালী আর সুজিত খুব সাবধানে পাঁচিলের ওপর উঠল।

গাছপালার জন্য এদিকটা যেন আরও অন্ধকার। দু-একটা জোনাকির ক্ষীণ দীপ্তি।

এক-এক করে পুলিশরাও উঠল। তারপর গাছের ডাল আঁকড়ে এদিকে নামল।

বৈশালী পুলিশদের দিকে ফিরে বলল, তোমরা এখানে অপেক্ষা করো। হুইসলের শব্দ শুনলেই ছুটে যাবে।

প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে গাছের আড়ালে বৈশালী, সুজিত, তারপর ও.সি. এগিয়ে যেতে লাগল।

অতিথি-কুটিরের পিছন দিয়ে একটা কাঁঠালচাঁপা ঝোপের পাশে তিনজন বসল।

এক-এক মুহূর্ত এক-এক প্রহর বলে মনে হচ্ছে।

নিজেদের হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন যেন বাইরের কোনও শব্দ।

হঠাৎ বৈশালী ও.সি.-র হাতে চাপ দিল।

দূরে একটা টর্চের আলো। একবার জ্বলে উঠেই নিভে গেল।

তিনজন আরও একটু এগিয়ে গেল।

একটা ছোটো ঝোপ। কাঁটার খোঁচা থেকে মনে হচ্ছে বোধহয় গোলাপের ঝাড়। এখানে সাদা গোলাপের গাছ ছিল।

বৈশালী লক্ষ করেছে, এর কাছেই বকুল গাছ।

আরও একবার টর্চের আলো দেখা গেল। মৃদু পায়ের শব্দ অনুভূত হল।

তিনজনই কোমর থেকে অটোমেটিক নিয়ে তৈরি।

বৈশালীর চোখের যেন পলকও পড়ছে না।

পায়ের শব্দ থামল। কিছুক্ষণ। তারপর টর্চের আলো ডানদিকে। খুব চাপাকণ্ঠের আওয়াজ।

মাটিতে শব্দ হল ধুপ, ধুপ, ধুপ।

মিনিটকয়েক। তারপরই বৈশালী, সুজিত আর ও.সি. ঝাঁপিয়ে পড়ল তিনদিক থেকে।

লোক দুজন। একজনকে বৈশালী অনায়াসেই কায়দা করতে পারল। বাকি লোকটিকে নিয়ে সুজিত আর ও.সি. কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি করার সময় রাত্রির আকাশ কাঁপিয়ে খুব জোরে আওয়াজ হল।

সঙ্গে সঙ্গে সজোরে হুইসল বেজে উঠল।

অনেকগুলো জোরালো টর্চের আলোয় দেখা গেল, হাত পিছনদিকে করা অবস্থায় মং শান। তার পাশে বৈশালীর কবলে অবনতমুখে দীপালি।

ধস্তাধস্তির সময় মং শানের রিভলভার থেকে গুলি বের হয়ে গিয়েছিল।

ও.সি. পুলিশের হাত থেকে হাতকড়া নিয়ে মং শানের হাতে পরিয়ে দিয়ে বলল, ভুবন বাজপেয়ি আর তার ড্রাইভারকে হত্যা করার অভিযোগে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হল।

তারপর দীপালির দিকে ফিরে বলল, সেই হত্যার প্ররোচনা ও মূল্যবান রত্ন অপহরণের অভিযোগে আপনাকেও গ্রেপ্তার করলাম দীপালিদেবী। আমাদের সঙ্গে আপনাদের যেতে হবে।

গুলির শব্দে, লোকজনের গোলমালে ভুবন-নিবাসের বাসিন্দারা সবাই এসে জড়ো হয়েছিল।

তার মধ্যে অতীনও ছিল।

বৈশালী তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, আপনাকে হয়রানি করার জন্য আমি খুব দুঃখিত অতীনবাবু। এটুকুর প্রয়োজন ছিল।

এবার তাহলে আমি বর্মায় ফিরে যেতে পারি? আমার কারবারের ক্ষতি হচ্ছে। আর কোনও দেখবার লোক নেই।

কাল আপনাকে বলব।

বারান্দায় সুজিত আর বৈশালী চায়ের কাপ নিয়ে বসে আছে। সুজিতদের বাড়ি।

সুজিত বলল, গোয়েন্দা সাহেবা, এবার একটু আলোকপাত করো। আমি যে অন্ধকারেই রয়ে গেলাম।

ঠিক আছে, একেবারে গোড়া থেকেই শুরু করেছি।

ভুবনবাবুর মৃত্যুর ব্যাপারটা দেখে এটুকু বোঝা যায় যে, কোনও পরিচিত লোকের দ্বারাই হত্যা সংঘটিত হয়েছিল। কোনও ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই, ভুবনবাবু বা ড্রাইভারের কোনও চিৎকারের শব্দও কেউই শোনেনি। খুব সম্ভব, যে হত্যাকারী সে ভুবনবাবুর সঙ্গে মোটরেই ছিল, যখন তিনি আমার বাড়িতে এসেছিলেন তখনও মোটরে অপেক্ষা করছিল। দেহরক্ষী হিসাবে। কিংবা হয়তো মাঝপথ থেকে মোটরে উঠেছিল। চেনা লোক বলে কেউ সন্দেহ করেনি।

লোকটা প্রথমে খুব কাছ থেকে সাইলেন্সার-লাগানো রিভলভার দিয়ে ভুবনবাবুকে হত্যা করে, তারপর ড্রাইভারকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দিয়ে অনড় করে দেয়।

ড্রাইভার হয়তো পিছন ফিরে ব্যাপারটা দেখে ফেলেছিল কিংবা সামনের আয়নার সাহায্যে পিছনের দৃশ্য দেখতে পেয়েছিল।

হত্যাকারী এত পরিচিত ব্যক্তি যে, ড্রাইভারকে সাময়িকভাবে নির্বাক করে দিয়েও সে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি, যাতে ড্রাইভার চিরদিনের জন্য নির্বাক হয়ে যায় তার ব্যবস্থাই করেছিল।

কিন্তু সে বিষক্রিয়াটি কী? পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তার স্বরূপ ধরা পড়েনি?

যথাসময়ে বলব। এখন কাহিনিটা শোনো।

দীপালিদেবী আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। শোকের মূর্ত প্রতিমূর্তি। আমি প্রথমে খুব বিচলিত হয়েছিলাম। তিনি প্রথম থেকেই অতীনবাবুর ওপর দোষারোপ করতে লাগলেন। আমার সন্দেহ যাতে অতীনবাবুর ওপর হয় তার জন্য দীপালিদেবীর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। পিতা-পুত্রের বচসার কথা বললেন। সম্পত্তির অংশ নিয়ে, তারও উল্লেখ করলেন। বচসা যে হয়েছে সে কথা অতীনবাবু অস্বীকার করেননি, কিন্তু বলেছেন, তার কারণ ভিন্ন।

পুলিশের খাতায় ভুবন বাজপেয়ির নাম আছে চোরাকারবারের অংশীদার হিসাবে যদিও তাঁকে অভিযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। দিল্লি থেকে একই রিপোর্ট পাঠিয়েছে।

তারপর সেই আলোর সংকেতের কথা তোমার মনে আছে। আমার চোখে ধুলো দেবার দীপালিদেবীর আর-এক প্রয়াস। অতীনবাবু যে ঘরে থাকেন তারই বারান্দা থেকে আলোর ইশারা চলেছিল। বাইরে টিলার পাশ থেকে তার উত্তরও এসেছিল।

ব্যাপারটা মারাত্মক কিছু নয়, তবু এটা অতীনবাবুকে জড়াবার একটা ফন্দি। স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে, অতীনবাবু কোনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন।

আমার এটাও মনে হয় যে, বাইরের লনে আমরা বসে আছি, আমাদের চোখে পড়বে, তা জেনেই ওভাবে আলোর সংকেত শুরু করা হয়েছিল।

তাহলে ওসব কি দীপালিদেবীই করছিলেন?

না, দীপালিদেবী অত কাঁচা মেয়ে নন। পরের দিন ভোরে আমি অতীনবাবুর ঘরে গিয়ে উঠি। গত রাতের আলোর ইশারার কথা বলে তাঁকে কৌশলে বারান্দার কাছে দাঁড় করলাম। আগের রাতে যে মানুষের কাঠামো দেখেছিলাম, সে আরও লম্বা। বুঝলাম অতীনবাবুর অনুপস্থিতির সুযোগে অন্য কাউকে সেখানে দাঁড় করানো হয়েছিল। খুব সম্ভব মং শানকে।

তারপর মনে আছে, কোথা থেকে আলোর রেখা আসছিল সেটা দেখবার জন্য আমরা দুজনে বের হলাম?

মনে আছে বই কী। তুমি একটা খাম কুড়িয়ে পেলে।

হ্যাঁ, খামটা ঝোপের ধারে এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল, যাতে সহজেই চোখে পড়ে। অতীনবাবুর নাম-লেখা খাম, যেটা স্বাভাবিকভাবেই অতীনবাবু ফেলে দিয়ে থাকবেন। যে-কোনও লোকের পক্ষে সেটা সংগ্রহ করা সহজ। এ ধরনের কেসকে আমরা বলি 'প্ল্যান্টেড' অর্থাৎ আরোপিত। এখানেও অতীনবাবুকে জড়াবার চেষ্টা। কিন্তু খামটার গন্ধতেই আমার সন্দেহ হয়েছিল।

খামের গন্ধ?

দীপালিদেবী যখন আমার কাছে এসেছিলেন, তখন তাঁর শরীর থেকে দামি একটা সুগন্ধ পেয়েছিলাম। প্যারির খুব নামকরা সুবাস। খামেও সেই গন্ধ।

বলে যাও।

মং শানকে দেখলাম। দিব্যকান্তি, আকর্ষণ করার মতন চেহারা। তাঁরও কথাবার্তায় একই ইঙ্গিত। অতীনবাবুর প্রতি দোষারোপ। মোট কথা, লোকটাকে আমার ভালো লাগেনি। যেরাতে আসরে কীর্তন হচ্ছিল, সেরাতে সাহস করে মং শানের ঘরে ঢুকে পড়লাম। এধার-ওধার খুঁজতে খুঁজতে কতকগুলো কাগজ হাতে এসে গেল। মোক্ষম দলিল। নিজের সম্বন্ধে মং শান এতটা সুনিশ্চিত ছিল যে, এসব কাগজগুলো গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তাই বোধ করেনি।

কিন্তু কাগজগুলো তুমি তো আবার রেখে এলে।

হ্যাঁ, কাগজগুলো হারালে মং শান সন্দেহ করত। তাহলে প্ল্যান বানচাল হয়ে যেত। তাই একটা কাগজ ছাড়া আর সব কাগজ রেখে দিয়ে এলাম। একবার প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলাম, তাই তোমাকে বললাম কোনওরকমে মং শানকে কথা বলে আটকে রাখতে।

রেখেছিলাম তো।

অজস্র ধন্যবাদ। তোমার মতন সহকারী দুর্লভ।

যাক, যে কাগজটা নিজের কাছে রেখে দিলে সেই দুর্লভ দলিলটা কী?

একটা পত্র।

পত্র?

হ্যাঁ, আসল পত্রটি পুলিশের হেপাজতে আমিই দিয়েছি। নকলটা পড়ো।

বৈশালী সুজিতের দিকে একটি কাগজ এগিয়ে দিল।

সুজিত পড়ল। ইংরেজিতে লেখা—

ডাউন তোমার বাবার কাছে চালান করে দিয়েছি।

নীচে লেখা ধন্যবাদ।

সুজিত অসহায়ভাবে বৈশালীর দিকে তাকাল।

অর্থোদ্ধার করতে পারলাম না।

শোনো, চিঠিটা মং শান লিখছে দীপালিদেবীকে। ডাউন বর্মি ভাষা। মানে ময়ূর। ওই চিঠির ওপরে দীপালিদেবী ধন্যবাদ লিখে ফেরত দিয়েছেন। আর-একটা জিনিসও আমি মং শানের ঘরে রেখে আসিনি।

কী সেটা?

ওয়ালেট ঝেড়ে শুকনো একটা ফল পেয়েছিলাম। সেটা প্রফেসর বসাকের কাছে দিয়ে এসেছিলাম। যিনি টক্সিন নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বললেন, ফলটার নাম বুনলুনদি। অত্যন্ত বিষাক্ত ফল। বর্মায় প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এর নির্যাস কাউকে ইঞ্জেকশন দিলে বেহুঁশ হয়ে যায়, মাত্রা বেশি হলে মৃত্যু। ড্রাইভারের মৃত্যুর কারণ যে এরই ইঞ্জেকশন, তাতে সন্দেহ করার কোনও হেতু নেই।

ময়ূরটির সন্ধান পাওয়া গেছে?

হ্যাঁ, সেখানকার পুলিশ দীপালিদেবীর বাবা জহুরি সুরজমল খেত্রীর বাড়ি খানাতল্লাশি করে ময়ূর উদ্ধার করেছে।

ময়ূরের রুবির চোখ?

ভুবনবাবু ময়ূরের একটা রুবির চোখের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়েছিলেন, কিন্তু গোটা ময়ূরের দাম ছিল অনেক বেশি।

কেন, তুমি না বলেছিলে ময়ূরটা ব্রোঞ্জের তৈরি?

ময়ূরের বুকের কাছে একটা জায়গা টিপলে ফাঁক হয়ে যায়, আর সেই গোপন গহ্বরে একটি কাগজ, তাতে ঠিক কোন জায়গায় ভুবনবাবুর কালোবাজারের টাকা লুকোনো, তার হদিশ ছিল। মং শানের ঘর থেকে যে কাগজগুলো এনেছিলাম, তাতে একটি কাগজ ছিল, লেখা— আগামী তেরোই রাত বারোটায় বকুলতলায় খুঁড়ব। সেখানেই মালিকের সব টাকা আছে। তুমি ঠিক এসো।

এই কাগজটা আমি মং শানের ঘরে আবার রেখে এসেছি।

কিন্তু ওগুলো কালোবাজারের টাকা কী করে বুঝলে?

বৈশালী হাসল।

সাধারণভাবে অর্জিত টাকা লোকে ব্যাঙ্কে রাখে, কিংবা সিন্দুকে, মাটির তলায় নয়।

কিন্তু আমার আরও একটা প্রশ্ন রয়ে গেল।

কী?

ময়ূরের রুবির একটা চোখ বদলে কে ঝুটো কাচ বসিয়ে দিল?

সম্ভবত দীপালিদেবী। তাঁর বাপকে দিয়ে এ কাজটি করিয়েছিলেন। তখন বোধহয় ময়ূরের পেটের কাগজের রহস্যের কথা তাঁর জানা ছিল না। ভুবনবাবু নিজেই দ্বিতীয় পক্ষের এই পরমাসুন্দরী স্ত্রী-র কাছে কথাটা বলে থাকবেন, তারপর থেকেই ষড়যন্ত্রের জাল বোনা শুরু হয়। মং শানের সাহায্য নিয়ে ভুবনবাবুকে সরিয়ে দেওয়া এবং কোনওরকমে অতীনবাবুকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারলেই পথ পরিষ্কার।

কিন্তু তোমাকে ডাকার কী অর্থ?

সাবধান, এবার মানহানির মামলা ঠুকে দেব। বোধহয় দীপালিদেবীর ধারণা, মেয়ে গোয়েন্দাদের যাহোক একটা কিছু বুঝিয়ে দেওয়া যাবে।

কিন্তু আর-একটা কথা—।

না, আর কোনও কথা নয়। ক-টা বেজেছে খেয়াল আছে? আমি চলি। অনেকদিন পর একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোব এবারে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%