কবন্ধ বিগ্রহের কাহিনি

হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

পরীক্ষা শেষ। এতদিনের দুশ্চিন্তার অবসান।

পরীক্ষার হল থেকে কুমুদ বাড়ি ফিরল যেন হাওয়ায় ভেসে। কাল থেকে আর রাত থাকতে উঠে বইখাতার ওপর ঝুঁকে পড়তে হবে না। তারপর কোনওরকমে স্নান-খাওয়া সেরে আবার পড়তে বসা। বিকালে ঘণ্টাখানেকের ছুটি। ওই সময়টা কুমুদ পার্কে একটু বেড়িয়ে আসে। সন্ধ্যার একটু পরেই খেয়ে নিয়ে আবার গভীর রাত পর্যন্ত অধ্যয়ন।

বিছানায় শুলেই কি নিস্তার ছিল? চোখের পাতা বন্ধ করলেই প্রশ্নপত্রগুলো ভয়াবহ মূর্তিতে সঙিন খাড়া করে এসে দাঁড়াল। ইংরেজি, ইতিহাস আর জ্যামিতি এই তিনটেতেই কুমুদের একটু ভয় ছিল।

পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কেমন একটা ভীতি কুমুদকে আচ্ছন্ন করে রাখত। কাপড়ে ফুটে-থাকা চোরকাঁটার মুক্তি।

পরীক্ষার ফল বের হতে অনেক দেরি। কবে যে ঠিক বের হবে, এ কথা কেউ বলতে পারে না। এমনকী যাঁরা পরীক্ষা পরিচালনা করছেন, তাঁরাও নয়।

বাড়ি ফিরে কুমুদকে দরজা ঠেলতে হল না। দরজা খোলাই ছিল। কুমুদের ফেরার সময়টা তার মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন। বিশেষ করে পরীক্ষার কদিন। গলির মোড়ে কুমুদকে দেখে নীচে নেমে দরজা খুলে দেন।

আজও কুমুদ ঘরের মধ্যে ঢুকতে মা জিজ্ঞাসা করলেন, কী রে, কেমন হল?

ভালোই।

অন্যদিন কুমুদ এত হাসে না। পরের দিনের পরীক্ষার কথা চিন্তা করে। মা সেটা লক্ষ করেই বললেন, আজ এত হাসি যে?

বাঃ, আজ পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। কাল থেকে কী করি বলো তো মা?

মা-ও হাসলেন, কী আর করবি। এতদিন এত খাটলি, এবার কদিন চেপে ঘুমোবি।

উঁহু, তুমি বলতে পারলে না।

কুমুদ মাথা নাড়ল।

তবে কী করবি?

ছাদ থেকে নীচে লাফাব। বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়োব, হাওড়া ময়দানে যাব সার্কাস দেখতে।

বেশ, তোর যা ইচ্ছে করিস। এখন মুখ-হাত ধুয়ে খাবি আয়। তোর জন্য লুচি আর পায়েস করে রেখেছি।

আর বেশি বলতে হল না। এ দুটি কুমুদের প্রিয় খাদ্য।

কুমুদ লাফাতে লাফাতে নিজের ঘরে ঢুকল।

কুমুদ মা-বাপের একটি ছেলে। তার এক দিদি আছে কুমুদের চেয়ে বয়সে বছর কুড়ি বড়ো। কুমুদ জন্মাবার কিছুদিন পরেই তার দিদির বিয়ে হয়ে যায়।

দিদির ছেলে তুলসীই প্রায় কুমুদের বয়সি।

দিদির বিয়ে হয়েছে রতনগড়ে। পুরোনো প্রতিপত্তিশালী জমিদারের বাড়ি। এখন জমিদারদের আর বিশেষ কিছুই নেই। জমিজমা সবই গেছে।

আসল কথা, টাকার ঝংকার আর নেই, তবে হুংকার আছে।

নিরক্ষর প্রজারা এখনও হাতজোড় করে দাঁড়ায়। কোনও কিছু বললে তখনই হুকুম তামিল করে।

কুমুদ যখন পরীক্ষার এক সপ্তাহের মধ্যেই বিশ্রাম নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তখন রতনগড় থেকে চিঠি এল।

দিদি লিখেছে, কুমুদের তো পরীক্ষা হয়ে গেছে। এখানে তুলসীরও স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষা হয়ে গেছে। কুমুদ তো অনায়াসেই দিদির কাছে চলে আসতে পারে।

এই সাতটা দিন কুমুদ ছাদ থেকেও লাফায়নি, বাসের সঙ্গেও দৌড়োয়নি। আর শীতকাল ছাড়া তো হাওড়া ময়দানে সার্কাসের তাঁবু পড়েই না।

কুমুদ শুধু ঘুমিয়ে আর গল্পের বই পড়ে কাটাল।

কিন্তু সময় যেন আর কাটতেই চায় না।

কুমুদের বন্ধুবান্ধবদের সংখ্যা খুব কম। ছেলেবেলা থেকে তার ব্যায়ামের দিকে ঝোঁক। স্কুলে বক্সিং আর জুজুৎসুতে খুব নাম ছিল।

কিন্তু তার বেশির ভাগ সহপাঠীরই এসব ব্যাপারে কোনও আকর্ষণ নেই।

মায়ের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে কুমুদ পড়ে ফেলল।

তারপর বলল, ঠিক আছে। রতনগড়ে চলে যাই। সময়টা ভালোই কাটবে।

তা তো কাটবে, কিন্তু তোমায় যেতে দিতে আমার সাহস হচ্ছে না।

মায়ের মুখের দিকে দেখে কুমুদ প্রশ্ন করল, সাহস হচ্ছে না? কেন মা?

আর কেন? বিনুর বাড়ির দু-পাশে দুটো দিঘি। তুমি তো সেই দিঘি তোলপাড় করবে। জলে আমার ভয়।

জলে আমার কিন্তু কোনও ভয় নেই মা। পৃথিবীর তিন ভাগ যখন জল, তখন জলে মিছামিছি ভয় পেয়ে লাভ কী বলো? তা ছাড়া আমি তো ভালো সাঁতার জানি। রতনগড়ে শিখেছি।

শুধু কি জলের ভয়? দুটো দিঘিতে ঘন পদ্মবন। আর পদ্মবনে যত বিষাক্ত সাপের বাসা।

কুমুদ হেসে উঠল।

কী ব্যাপার বলো তো মা? আমাকে রতনগড়ে না যেতে দেবার মতলব বুঝি? আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, আমি খুব সাবধানে থাকব।

রতনগড়ের দিঘির জলের চেয়েও কুমুদের অন্য আকর্ষণ ছিল অনেক বেশি।

যখন রতনগড়ের জমিদারদের প্রবল প্রতাপ ছিল, তখন একপাল লাঠিয়াল তাঁরা পুষেছিলেন। তারা হুকুম পেলেই প্রজাদের খেতে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ফসল কেটে আনত, দুর্বিনীত প্রজাদের ঘরে আগুন দিত, আবার নদীর বুকে কোথাও চর জাগলে, লাঠি ঘুরিয়ে সেই চর দখল করত।

এখন এদের এসব কাজ করতে হয় না। এরা নিজেদের মধ্যে লাঠি খেলে। বোধহয় অভ্যাস বজায় রাখবার জন্য।

অন্যবার রতনগড়ে গিয়ে অনেক খোশামোদ করে কুমুদ কয়েকটা প্যাঁচ শিখেছে। সর্দার লাঠিয়াল বলেছে, খোকাবাবু, এখন নয়, আরও বড় হও। তখন সব প্যাঁচ শিখিয়ে দেব।

এখন তো কুমুদ যথেষ্ট বড়ো হয়েছে। পরীক্ষার ফল বের হলেই কলেজে পড়বে। কাজেই প্যাঁচ শেখবার পক্ষে এখন কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়।

চিঠিটা কুমুদের হাত থেকে নিয়ে মা বললেন, তোমার বাবাকে কথাটা বলে দেখি।

কুমুদ খুশি হল। আর ভয় নেই। বাবা ভালো করে কথাটা শোনবার আগেই মত দিয়ে দেবেন। বাবা সর্বদাই অন্যমনস্ক। ব্যস্ত ডাক্তার। কেবল রোগীদের চিন্তা।

কুমুদের মনে আছে, মা একবার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কী মুশকিল দেখো, শোবার ঘরের জানালাটা কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। বর্ষায় বোধহয় কাঠ ফুলে উঠেছে।

বাবা বসে বসে মেডিক্যাল জার্নাল পড়ছিলেন। মুখ না তুলেই বলেছিলেন, অপারেশন করতে হবে। এ ছাড়া আর উপায় নেই।

মা খুব জোরে হেসে উঠতে বাবার খেয়াল হয়েছিল।

কুমুদ ঠিকই অনুমান করেছিল। মা বাবার কাছে কথাটা পাড়তেই বাবা রাজি হয়ে গেলেন।

বেশ তো, যাক-না। বিনুর ওখান থেকে ক-দিন ঘুরে আসুক। আজকাল তো আর পাড়াগাঁয়ে ম্যালেরিয়া নেই। তা ছাড়া এখন গরমও কমে এসেছে। অন্তত টাটকা ভিটামিন খেয়ে বাঁচবে। শহরে তো পয়সা দিলেও ভালো জিনিস পাবার উপায় নেই।

বাবা সচরাচর এত কথা বলেন না। সেদিন এত কথা বলতে মা বুঝতে পারলেন, বাবার হাতের রোগীদের অবস্থা ভালো। এ যাত্রা বোধহয় কুমুদ বেঁচে গেল।

কুমুদের রতনগড় যাওয়াই ঠিক হল।

মা বিনিকে যাবার তারিখ জানিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে এও জানালেন, কুমুদকে যেন চোখে চোখে রাখা হয়। দিঘির জলে বেশিক্ষণ পড়ে না থাকে, বনেজঙ্গলে না ঘোরে, কোনওরকম অনিয়ম না করে।

মায়ের গোছানো স্যুটকেস নিয়ে কুমুদ একদিন মোটরে উঠে বসল। এর আগেও কুমুদ বারকয়েক একলাই গিয়েছে।

রতনগড়ের পথ তার খুব চেনা।

মোটর চড়ে হাওড়া। সেখান থেকে ট্রেনে শক্তিগড় থেকে বাস। প্রায় আড়াই ঘণ্টা বাসে যাবার পর মদনমোহনতলা। সেখানে দিদির পাঠানো গোরুর গাড়ি মজুত থাকে। দুটো গোরুর শিঙে লাল রং করা, খড়-বিছানো বসবার জায়গা।

টানা এক ঘণ্টা। তারপরই রতনগড়।

রাস্তার পাশেই বিরাট দিঘি। কাকচক্ষু জল। ওপারে পদ্মবন। লাল লাল ফুল ফুটে থাকে। দিঘির পাড়েই জমিদারবাড়ি।

আর-একটা দিঘি খিড়কির দিকে। রাস্তা থেকে দেখা যায় না।

কুমুদ যখন মদনমোহনতলায় নামল, তখন সূর্যের তেজ কমে এসেছে। গাছের ছায়া বেশ দীর্ঘ।

বাস থেকে নামতেই চিৎকার কানে এল—কুমুমামা, এই যে, এদিকে।

কুমুদ চোখ ফিরিয়ে দেখল, একটা দেবদারু গাছের নীচে দাঁড়িয়ে তুলসী চেঁচাচ্ছে।

দিদি অনেকবার বলে দিয়েছে, মামা যখন একটাই, তখন নাম ধরে মামা ডাকবার কোনও দরকার নেই। শুধু মামা বলাই ভালো। কিন্তু তুলসী কথাটা কানে তোলেনি।

তুলসীর চেহারা অনেক বদলে গেছে। শার্টের তলায় তার পেশিপুষ্ট শরীরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মাথায় যেন একটু লম্বাও হয়েছে।

কুমুদ কাছে যেতেই তুলসী নিচু হয়ে পায়ের ধুলো নেবার চেষ্টা করল।

কুমুদ বাধা দিয়ে বলল, আরে, থাক থাক! গাড়ি কোথায়?

তুলসী হাত দিয়ে দেখাল।

একটু দূরে ঢালু জমিতে গোরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

গাড়োয়ান বোধহয় গোরু দুটোকে খুলে দিয়েছিল। বাস আসতেই সে দুটোকে বাঁধবার চেষ্টা করছে।

কুমুদ খুব পরিশ্রান্ত। সকালে রওনা হয়েছে। এখনও যাত্রার শেষ হয়নি। তুলসী তার হাত থেকে স্যুটকেসটা নিয়েছে।

ক্লান্ত পায়ে কুমুদ গোরুর গাড়ির দিকে এগোল।

গাড়োয়ান তিলকরাম কুমুদের চেনা। প্রত্যেকবার তিলকরামই গাড়ি নিয়ে আসে। বয়স ষাটের কোঠায়। এখনও বেশ শক্তসমর্থ চেহারা।

কুমুদ কাছে আসতেই তিলকরাম তার সামনে ঘাসের ওপর উপুড় হয়ে পড়ল। একেবারে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম।

ভালো আছেন খোকাবাবু? বাড়ির খবর সব ভালো?

এখানে এই এক মুশকিল। সবাই খোকাবাবু বলে ডাকে।

কেবল দিদি আর জামাইবাবু ডাকে—কুমুদ।

গোরুর গাড়ি চলতে শুরু করল।

তুলসী দু-একটা কথা বলেছিল, কিন্তু কুমুদের দিক থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে থেমে গেল।

মাঝে মাঝে শুধু তিলকরামের আওয়াজ শোনা গেল। গোরু দুটোকে ধমকাচ্ছে।

একসময় গোরুর গাড়ি রতনগড়ে পৌঁছাল।

দূর থেকে দেখা গেল দিঘির পাড়ে বিনতা আর তার স্বামী, মানে কুমুদের দিদি আর জামাইবাবু দাঁড়িয়ে আছেন।

কুমুদ নেমে তাঁদের প্রণাম করল।

সেদিন আর বেশি কথা হল না।

তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে কুমুদ শুতে গেল।

দোতলার এই কোণের ঘরেই বরাবর তার শোবার ব্যবস্থা হয়। বেশ বড়ো ঘর। উঁচু খাট। বিরাট আকারের কারুকার্য করা একটা আলমারি।

কুমুদ শোবামাত্র ঘুমিয়ে পড়ল।

মাঝরাতে তক্ষকের আওয়াজে একবার শুধু তার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। কুমুদ জানে বাইরের বট গাছের তলায় একজোড়া তক্ষক থাকে।

প্রতিবারই সে এদের ডাক শোনে।

যখন কুমুদের ঘুম ভাঙল, তখন বেলা হয়েছে। জানলা দিয়ে ঘরের মধ্যে রোদ এসে পড়েছে।

বাইরে পাখির ডাক। গোরুর হাম্বারবও শোনা যাচ্ছে।

কুমুদ তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল।

দরজার গোড়ায় দিদি দাঁড়িয়ে। কুমুদের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই হাসল।

কী, বাবুর ঘুম ভাঙল? তাড়াতাড়ি মুখ-হাত ধুয়ে নাও। বেলা হয়েছে।

কুমুদের খুব ইচ্ছা হচ্ছিল, নেমে দিঘির জলে মুখ-হাত ধোবে, কিন্তু বাইরে বেরিয়েই দেখল, বারান্দার এককোণে বালতিতে জল। তার পাশে সাবান আর তোয়ালে।

মুখ-হাত ধুয়ে কুমুদ নীচে নেমে এল।

মাঝখানে উঠান। উঠান পার হয়ে রান্নাঘর। তার পাশেই খাওয়ার ঘর। দুটোই সাইজে বিরাট।

কুমুদ দিদির কাছেই শুনেছে, আগে যখন জমিদারি ছিল, তখন খুব ঘটা করে অন্নপূর্ণাপূজা হত। গাঁয়ের লোক ঝে�টিয়ে আসত নিমন্ত্রণ খেতে।

ওই রান্নাঘরে রান্না হত, আর উঠানে সবাই খেতে বসত। কেবল যাঁরা একটু কেষ্টবিষ্টু, গাঁয়ের মোড়ল, থানার দারোগা, ডাক্তার—তাঁরা বসতেন খাওয়ার ঘরে।

শহরে কুমুদ সকালে এক কাপ চা খেত। এখানে চায়ের বদলে এল গরম দুধ। তার সঙ্গে বাড়ির তৈরি সন্দেশ, নারকেলের নাড়ুআর গজা।

কুমুদ আর তুলসী পাশাপাশি খেতে বসেছিল।

কুমুদ তার দিকে ফিরে চাপা গলায় বলল, স্নান করব কিন্তু পদ্মবিলে। অনেকদিন জলে নামতে পারিনি।

তুলসী হাসল—ঠিক আছে, তার আগে চলো গ্রামটা একবার ঘুরে আসি।

দুজনে বের হল।

যাবার সময় দিদি বলল, তাড়াতাড়ি ফিরবে। কুমুদের ঠিক সময়ে স্নান-খাওয়া করতে হবে। মা চিঠিতে লিখে দিয়েছে।

দুজনের কারো সে কথা কানে গেল বলে মনে হল না।

একেবারে গেটের কাছে জামাইবাবুর সঙ্গে দেখা।

জামাইবাবু বেড়িয়ে ফিরছে। হাতে মোটা লাঠি।

কুমুদ জানে এটা তার বহুদিনের অভ্যাস। খুব ভোরে বেরিয়ে পড়ে। মাইল তিন-চার ঘুরে বাড়ি ফেরে।

এখন আর জমিদারি নেই, কিন্তু যেটুকু জমি পেয়েছে, তাও নিতান্ত কম নয়। সে জমিতে চাষবাস হয়। জামাইবাবু নিজে দেখাশোনা করে।

বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে পায়ে-চলা পথ দিয়ে দুজনে এগোল। নিবিড় বাঁশবন। দিনের বেলাতেও অন্ধকার। ঝিঁঝি ডাকছে। দু-একটা অচেনা পাখির কিচিরমিচির।

বাঁশবন পার হয়ে কুমোরপাড়া। সার সার কুঁড়ে। মাটির দেয়াল। খড়ের চাল।

পূজার সময় এরা প্রতিমা তৈরি করে। হিন্দুদের বারোমাসে তেরো পার্বণ। গ্রামে বোধহয় আরও বেশি। বড়ো বড়ো পূজা ছাড়াও মনসা, ওলাইচণ্ডী নানা রকমের পূজা হয়।

অন্য সময়ে এই কুমোররা হাঁড়ি, কলসি, কুঁজো, সরা এইসব গড়ে।

কুমুদের খুব আশ্চর্য লাগল।

শহর রোজ বদলায়। নতুন বাড়ি, নতুন রাস্তা—এ ধরনের পরিবর্তন শহরে অন্তত সপ্তাহে একবার দেখা যায়।

গ্রাম কিন্তু বিশেষ বদলায় না। এর আগের বার এসে কুমুদ যেমন দেখেছে, ঠিক তেমনই আছে। এমনকী, কুঁড়েঘরগুলোর যেখানে যেখানে মাটি ধসে গেছে, যে জায়গায় খড় সরে গেছে, ঠিক একরকম রয়েছে। কোনও পরিবর্তন হয়নি।

কুমোরপাড়া ছাড়িয়ে আর কিছু দূর গিয়েই কুমুদ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

অনেকটা জায়গা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বেড়ার ধারে ধারে রাংচিতার গাছ।

মাঝখানে সাদা রঙের একটা মন্দির।

কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, হ্যাঁ রে তুলসী, এ মন্দির তো আগে দেখিনি। নতুন হয়েছে বুঝি?

তুলসী মাথা নাড়ল।

না, না। নতুন হবে কেন? কত বছরের পুরোনো মন্দির তার ঠিক আছে? আগে জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল, বিরাট একটা পাকুড় গাছের আড়ালে। চারদিকে ঘন জঙ্গল। লোকে ভয়ে কেউ এদিকে আসত না।

জামাইবাবু বুঝি এর সংস্কার করেছেন?

না, বাবা লেখালেখি করেছে। দেশের যত পুরোনো মন্দির, মসজিদ, স্মৃতিস্তম্ভ মানে সবরকম পুরাকীর্তির দেখাশোনা সরকার করে। সেরকম একটা আইনও আছে। খবর পেয়ে দু-তিনজন পণ্ডিত লোক এসে মন্দির ঘুরে ঘুরে দেখলেন। মূর্তি দুটোর ফোটো তুললেন, তারপর লোকজন এসে চারদিক পরিষ্কার করল। মন্দিরের সংস্কার করল।

দুটো মূর্তি আছে মন্দিরে? কীসের মূর্তি?

সেটা কেউ বলতে পারল না। পণ্ডিতেরা আমাদের বাড়িতে এসে উঠেছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তাঁরা বললেন, ঠিক কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তাঁরা দুটো মূর্তিরই ফোটো তুলে নিয়েছেন। এ বিষয়ে গবেষণা করে জানাবেন। মুশকিল হয়েছে, দুটো মূর্তিরই মাথা নেই।

মাথা নেই?

না। দুটো মূর্তিই গলা থেকে শুরু হয়েছে। তবে দেখে মনে হয় কেউ ধারালো কোনও অস্ত্র দিয়ে মুণ্ড দুটো কেটে নিয়ে গেছে।

কুমুদ আর কৌতূহল দমন করতে পারল না। বলল, চল, একবার মন্দিরের ভিতরে যাই। অসুবিধা নেই তো?

না, না। অসুবিধা কীসের? চল।

দুজনে বাঁশের ফটক খুলে ভিতরে ঢুকল।

মন্দিরের গায়ে একটা পাথরের ফলক।

সরকার থেকে লাগিয়ে দিয়েছে। তাতে একটা নম্বর লেখা। তলায় মন্দিরের বয়স প্রায় এক হাজার বছর বলে অনুমান করা হয়েছে।

সিঁড়ি বেয়ে দুজনে ওপরে উঠল।

মন্দিরের দরজা বন্ধ ছিল। তুলসী হাত দিয়ে ঠেলতেই দরজা খুলে গেল।

মন্দিরগর্ভ অন্ধকার। কিন্তু মুণ্ডহীন মূর্তি দুটো থেকে সোনালি আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তাতেই সবকিছু অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

একটা মূর্তি পদ্মের ওপর আসীন। অন্যটা অদ্ভুত এক জানোয়ারের ওপর বসে আছে। কুমুদ প্রথমে ভেবেছিল, বাহন প্যাঁচা, কিন্তু ভালো করে দেখে বুঝতে পারল, না প্যাঁচা নয়, চারটে পা রয়েছে। আবার ল্যাজের মতন কিছুটা দেখা যাচ্ছে। আবার বেড়ালও নয়। কারণ দু-পাশে ডানার অস্পষ্ট আভাস।

তুলসী বলল, দেখছ কুমুমামা, মূর্তি দুটো থেকে কীরকম জেল্লা বের হচ্ছে? পণ্ডিতরা বললেন, যেমন অষ্টধাতুর মূর্তি হয়, এ মূর্তি তেমনই দ্বাদশ ধাতু দিয়ে তৈরি। বাকি চারটে ধাতু যে কী, কেউ বলতে পারলেন না। সেই চারটে ধাতুর জন্যই এইরকম জ্যোতি বের হয়।

কুমুদ মন্দির থেকে নেমে এল।

দরজা ভেজিয়ে দিয়ে তুলসী পাশে এসে দাঁড়াল।

কুমুদ প্রশ্ন করল, এ মন্দিরে পূজা হয় না?

না। মুণ্ডহীন বিগ্রহের পূজা হবে কী করে? তবে দূর দূর গাঁ থেকে লোকেরা দেখতে আসে।

দুজনে বাঁশের ফটক পার হয়ে এপারে এল।

বিরাট দিঘিটা মন্দিরের পাশেই। পদ্মদিঘি। প্রায় নদীর মতন।

হঠাৎ তুলসী চিৎকার করে উঠল, কুমুমামা, সাবধান!

কুমুদ একটু অন্যমনস্ক ছিল। তুলসীর চিৎকার শুনে লাফিয়ে উঠল।

তার গোড়ায়, একেবারে কুমুদের পা ঘেঁষে একটা কুচকুচে কালো সাপ। ল্যাজে ভর দিয়ে প্রায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে। প্রসারিত ফণার ওপর যেন পদ্মের ছাপ।

তুলসী কুমুদকে ঠেলে একপাশে নিয়ে এল।

সাপটা মাটিতে বার দুয়েক ছোবল মেরে সরসর করে কেয়াঝোপের মধ্যে ঢুকে গেল।

সাপটা চলে যেতে তুলসী বলল, তোমার খুব ফাঁড়া গেল কুমুমামা। পদ্মগোখরো সাপ। এক ছোবলেই সঙ্গে সঙ্গে শেষ।

কুমুদেরও বুকের ভিতর ঢিপঢিপ করছিল। ঘামের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল কপালে।

একটু শান্ত হতে বলল, এসব বিষাক্ত সাপ গাঁয়ের লোকে মেরে ফেলে না কেন?

তুলসী জিভ কামড়ে বলল, এসব বাস্তুসাপ। আগে এই পদ্মগোখরো আর তার জোড়া মন্দিরের মধ্যে ছিল। মন্দির পরিষ্কার হয়ে যেতে এই কেয়াঝোপে বাসা বেঁধেছে। গাঁয়ের লোকেরা কেউটে, শঙ্খচূড়, লাউডগা এসব সাপ মারে, কিন্তু গোখরো নয়। চলো, এবার বাড়ি ফেরা যাক।

দুজনে ফেরার পথ ধরল।

পথে কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে দেখা হল। তারা হাটে চলেছে।

তুলসীকে দেখে হাতজোড় করে বলল, নমস্কার দাদাবাবু। বেড়াতে বেরিয়েছিলেন?

কুমুদ বুঝতে পারল, জমিদারি গেছে বটে, কিন্তু সম্ভ্রমটুকু এখনও আছে।

বাড়ির কাছাকাছি এসে তুলসী বলল, কুমুমামা, একটা কথা।

কী রে?

পদ্মগোখরোর কথা যেন মা-কে বোলো না।

বলব না?

উঁহু, তাহলে বাইরে বেরোনো একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। তোমারও, আমারও।

তুলসীর বলার ভঙ্গি দেখে কুমুদ হেসে ফেলল—ঠিক আছে, বলব না।

দুপুরবেলা সবাই একসঙ্গে খেতে বসল। জামাইবাবু, কুমুদ আর তুলসী। পাশাপাশি। কেবল দিদি বাদ। দিদি পরিবেশন করল।

জামাইবাবু জিজ্ঞাসা করল, আজ সকালে কোথায় গিয়েছিলে কুমুদ?

কুমুদ মন্দিরের কথা বলল।

জামাইবাবু ধীর গলায় বললেন, আমরা ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি ওটা ধর্মরাজের মন্দির। এত সাপের উপদ্রব, আর চারপাশে গভীর জঙ্গল ছিল যে আমরা মন্দিরের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারতাম না।

কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, ধর্মরাজের মন্দির? কিন্তু একজোড়া বিগ্রহ রয়েছে যে?

জোড়া বিগ্রহের খবর তখন আমরা জানতাম না। ধর্মরাজ মানে যমরাজাও হয়, আবার যুধিষ্ঠিরও হতে পারে। পাণ্ডবদের মূর্তি কোথাও পূজা হয় বলে শুনিনি, তবে যমরাজের মন্দির বর্ধমানে অনেক জায়গায় আছে।

যাঁরা কলকাতা থেকে এসেছিলেন, তাঁরা কী বলেন?

তাঁরাও তো ঠিকমতো কিছু বলতে পারছেন না। এ বিষয়ে আমার সঙ্গে চিঠিপত্র লেখালিখি হয়েছে। তাঁদের ধারণা মন্দিরটি হাজার বছরের পুরোনো, কিন্তু আমার মনে হয় এর বয়স আরও বেশি। তাঁরা স্বীকার করেছেন, মূর্তি দুটির মধ্যে বৌদ্ধ যুগের ছাপ আছে।

এবার তুলসী প্রশ্ন করল, ওই যে মূর্তিগুলোর জেল্লা?

জামাইবাবু বলল, ও জেল্লার কারণ কেউ বার করতে পারেনি। মনে হয় মূর্তি দুটো কোনওরকম লুমিনাস মেটাল দিয়ে তৈরি।

কী দিয়ে তৈরি?

বুঝতে না পেরে তুলসী জিজ্ঞাসা করল।

মানে এমন ধাতু যা থেকে জেল্লা বের হয়, অবশ্য এ বিষয়ে ঠিক কিছুই বলা যায় না। গত বছর আমেরিকা থেকে কয়েকজন ট্যুরিস্ট এসেছিলেন, তাঁরা অনেক ফোটো নিয়ে গেছেন। ইচ্ছা ছিল, মূর্তির গা থেকে কিছুটা চেঁছে নিয়ে যাবেন, কী ধাতু গবেষণার জন্য, কিন্তু সেটা করতে আমি দিইনি।

এবার কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, দুটো মূর্তিরই মাথা নেই কেন?

জামাইবাবু কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর বলল, ওটা অবশ্য বোঝা দায়। আমাদের দেশে মুসলমান আর বর্গিরা অত্যাচারের স্রোত বইয়ে দিয়েছিল। মন্দির ভেঙে দিয়েছে, বিগ্রহ চূর্ণ করেছে মোগল আর পাঠান। আর দামি বিগ্রহ বর্গিরা আহরণ করে নিয়ে গেছে। সেই সময় হয়তো বিগ্রহের মুণ্ড দুটো গেছে।

এতক্ষণ দিদি বসে বসে শুনছিল। জামাইবাবু থামতেই বলল, তোমাদের মন্দির নিয়ে গবেষণাটা খাওয়ার পর করলে হয় না? সব যে পাতে পড়ে রয়েছে।

আলোচনা থামিয়ে সবাই আহারে মন দিল।

খাওয়াদাওয়ার পর কুমুদ আর তুলসী বাইরে ঝাঁকড়া বট গাছতলায় গিয়ে বসল। রোদ আছে, কিন্তু তেজ কম। বেশ হাওয়া দিচ্ছে।

কুমুদ বলল, তুলসী, জামাইবাবুর একটা লাইব্রেরি ছিল না?

ছিল বলছ কেন, এখনও তো আছে। নীচের কোণের ঘরটা বইয়ে ঠাসবোঝাই। বাবা ইদানীং আবার চাষবাসের সব বই কিনেছে।

কুমুদ উঠে দাঁড়াল।

জামাইবাবু একটু পরেই সাইকেলে বেরিয়ে যাবে, তা-ই না?

হ্যাঁ, মাঠে না গেলে চাষিরা বড্ড ফাঁকি দেয়।

জামাইবাবু বেরিয়ে গেলে একবার লাইব্রেরিতে ঢুকব।

কেন, সেখানে কী?

দিদির কাছে শুনলাম, রতনগড় গ্রামের ওপর একটা বই আছে। বইটা হাতড়ে দেখব যদি মন্দিরের রহস্য সম্বন্ধে কিছু থাকে।

তুলসী হাসল, নিশ্চয় কিছু নেই।

কেন?

থাকলে বাবা পড়ে ফেলত। বাবার কাছ থেকেই তুমি জানতে পারতে।

কুমুদ স্বীকার করল, তা অবশ্য সত্যি কথা। যাহোক, নিজে একবার পড়ে না হয় দেখি।

তুলসী বলল, কুমুমামা, মনে হচ্ছে স্কন্ধকাটা মূর্তি দুটোর ভূত তোমার ঘাড়ে ভীষণভাবে চেপেছে। তুমি কিছুতেই ঝেড়ে ফেলতে পারছ না।

একেবারে কোণের ঘরে লাইব্রেরি। নীচের তলায়।

খুব যে সাজানো-গোছানো তা নয়। অনেক বই মেঝের ওপর স্তূপীকৃত।

সাদা রঙের ছোটো একটা কাঠের মই। ওপর থেকে বই পাড়বার সুবিধার জন্য। তুলসী আঙুল দিয়ে দেখাল।

ওই যে বাঁদিকে লাল রঙের বই। ওটা পাড়।

কুমুদ বইটা পাড়ল।

নতুন করে মলাট দেওয়া হয়েছে। ভিতরের পাতা কিন্তু জরাজীর্ণ।

খুব সন্তর্পণে কুমুদ পাতা ওলটাতে লাগল।

বইটার নাম, রত্নগড়ের ইতিহাস। রত্নগড় লোকের মুখে মুখে রতনগড় হয়েছে। রতনগড়ের পশ্চিমদিকে মাটি আর পাথরের তৈরি একটা গড় ছিল। সে গড় আজ নিশ্চিহ্ন।

বইতে লেখা, একসময়ে পদ্মবিলের সঙ্গে বিদ্যাপতি নদীর যোগাযোগ ছিল। পালতোলা নৌকা চলাচল করত। এখান থেকে নৌকা যেত তাম্রলিপ্ত বন্দরে।

সেই সময় এক শ্রেষ্ঠী একটি মন্দির নির্মাণ করেন।

নিবিষ্টচিত্তে পড়তে পড়তে কুমুদ চেঁচিয়ে উঠল, সর্বনাশ!

কী হল?

এরপরে আর কোনও পাতা নেই।

তুলসী হাসতে হাসতে বলল, তা তো জানি। পাতা থাকলে ওই মন্দির সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা যেত। বাবা বইটা ওই অবস্থায় পেয়ে বাঁধিয়ে রেখেছে।

তাহলে কী হবে?

কী আর হবে। পুরোনো এক মন্দির সম্বন্ধে জেনেই বা কী হবে। সরকার থেকে তো গবেষণা করছে। ঠিক সময়ে তাদের গবেষণার ফল জানতেই পারব।

কুমুদ চুপ করে রইল। কিছু বলল না।

তুলসী বলল, কুমুমামা, মন্দিরের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও, আর-একটা জবর খবর তোমায় দেব।

কী?

দেখো, মা-কে আবার কিছু বোলো না।

বলব না, তুই বল।

চলো আমাদের ঘরে যাই। লাইব্রেরির ভ্যাপসা গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছে।

দুজনে শোবার ঘরে চলে এল।

কী বলবি, বল এইবার।

কুমুদ বিছানায় শুয়ে পড়ল। তুলসী তার পাশে বসল।

শোনো, ভোর সাড়ে তিনটে-চারটের সময় উঠতে পারবে?

কেন, অত ভোরে উঠে কী হবে?

পারবে কি না বলো না?

না-পারবার কী আছে। পরীক্ষার আগে আমি তো রাত দুটোর সময় উঠে পড়তাম।

ঠিক আছে। কাল ভোরে উঠে দুজনে বেরিয়ে পড়ব। পদ্মবিলের পশ্চিম পাড়ে চলে যাব। আমার কাছে ছোটো জাল আছে। কী বিরাট সব মাছ আছে তোমাকে কী বলব কুমুমামা। রুই, কাতলা, কালবোস।

কিন্তু বাড়িতে যে ভাববে?

আরে, বেলা সাতটার আগে বাড়ি ফিরে আসব। ভাগ্য যদি ভালো হয়, সঙ্গে মাছ আনতে পারি তাহলে কিছুই বলবে না।

ঠিক আছে। আমি রাজি।

দুজনে একঘরে শোয়, কাজেই কোনও অসুবিধা হল না।

পরের দিন অন্ধকার থাকতে দুজনে বেরিয়ে পড়ল।

কুমুদের পরনে হাফ শার্ট আর প্যান্ট। তুলসীরও হাফ শার্ট কিন্তু ধুতি মালকোঁচা দেওয়া। রাস্তা ছেড়ে দুজনে জঙ্গলের পথ ধরল।

তখনও ঝোপে ঝোপে জোনাকির ঝাঁক। গাছের তলা দিয়ে দুজনের যাবার সময় পাখিরা ভয় পেয়ে চিৎকার করে উড়তে লাগল।

একটু দূরে বেশ কয়েক জোড়া জ্বলন্ত চোখ কুমুদ আর তুলসীর সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।

কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, ওগুলো কী?

তুলসী বলল, শেয়াল আর কী। প্রহরে প্রহরে চেঁচায়। আমাদের দেখে বোধহয় আজ চেঁচাতে ভুলে গেছে।

রাংচিতা আর ভেরেন্ডা ঝোপের মাঝখান দিয়ে দুজনে পদ্মবিলের ধারে এসে দাঁড়াল।

পদ্মবিল যেন বিরাট নদীর মতন। কালো কুচকুচে জল। ছোটো ছোটো ঢেউ উঠেছে। মাঝে মাঝে শর গাছের আগা উঁচু হয়ে রয়েছে।

এতক্ষণ পরে কুমুদের খেয়াল হল।

তুলসী, আমরা বিলের পশ্চিম পাড়ে যাব কী করে?

তুলসী এ কথার কোনও উত্তর না দিয়ে নিচু হয়ে পাশের বাঁশঝাড়ের মধ্যে ঢুকে গেল, তারপর টানতে টানতে একটা তাল গাছের ডোঙা বের করে নিয়ে এল।

কী কুমুমামা, চড়তে পারবে? দেখো, ভয় করবে না তো?

অবশ্য তাল গাছের ডোঙা খুব নিরাপদ বাহন এমন মনে হল না, বিশেষ করে এই বিশাল জলরাশির পক্ষে।

তবু কুমুদ ভয় পাবার ছেলে নয়। সে যথেষ্ট ডানপিটে। গায়ে শক্তিও আছে।

হেসে বলল, নাও আর দেরি নয়। ডোঙা জলে ভাসাও।

ডোঙা নামিয়ে কুমুদ আগে উঠল, তারপর তুলসী।

ডোঙার খোলের মধ্যে গোটানো ছোটো একটা জাল। সেটা তুলে তুলসী কুমুদের হাতে দিয়ে বলল, এখন এটা ধরে থাকো কুমুমামা, আমি ঠিক সময়ে তোমার কাছ থেকে নিয়ে নেব।

একটা বাঁশের টুকরো দিয়ে জল কেটে কেটে তুলসী ডোঙা এগিয়ে নিয়ে চলল। কুমুদ শক্ত হাতে ডোঙার দুটো ধার আঁকড়ে রইল।

আকাশে মেঘ করেছে। অসময়ের কালো মেঘ। সেই কালো মেঘের ছায়া পদ্মবিলের ওপর। চারপাশের ঘন গাছপালার জন্য সব যেন ঝুপসি অন্ধকার।

তুলসী ডোঙাটা ধারে নিয়ে আসছে।

এখানে জলের মধ্যে প্রচুর পানা আর ঝাঁজি। সবুজ হয়ে আছে জল।

জালটা কুমুদের হাত থেকে নিয়ে তুলসী সোজা হয়ে দাঁড়াল।

কুমুদের দিকে ফিরে বলল, সাবধান কুমুমামা, ডোঙাটা এবার খুব দুলবে। তুমি শক্ত হয়ে বসে থাকো।

জালটা ছোড়ার মুখেই বাধা।

ঝোপের ফাঁক দিয়ে তীব্র আলো জলের ওপর এসে পড়ল। সেই সঙ্গে শোনা গেল ধক ধক শব্দ।

কুমুদ ভ্রূ কোঁচকাল।

কীসের আলো?

তুলসী কোনও উত্তর না দিয়ে জালটা গুটিয়ে ডোঙার খোলের মধ্যে আবার রেখে দিল।

কালো আকাশের গায়ে মন্দিরের চুড়ো দেখা যাচ্ছে। মনে হল তার নীচে থেকেই যেন আলোটা আসছে।

কী ব্যাপার কুমুমামা, দেখতে হচ্ছে।

তুলসী ডোঙাটা আস্তে আস্তে ডাঙার কাছ বরাবর নিয়ে এল।

পাড়ে কচুবন। বুনো সব লতা কচুঝোপের ওপর বিছানো রয়েছে।

তুলসী পাশ দিয়ে ডোঙা একেবারে ধারে এনে বলল, কুমুমামা লাফিয়ে নেমে পড়ো।

কুমুদ লাফাল।

তারপর তুলসী নেমে ডোঙাটা বাঁশবনের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে সাবধানে নামল।

একটু এগোতেই আলোটা নিভে গেল, কিন্তু ধক ধক শব্দ বেশ শোনা গেল।

দুজনে গাছের ফাঁক দিয়ে পা টিপে টিপে এগোতে লাগল। একেবারে কাছাকাছি গিয়ে কুমুদ বসে পড়ল। তার দেখাদেখি তুলসীও বসল।

এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। অন্ধকার একটু তরল হয়ে আসছে। একটা লরি দাঁড়িয়ে। একেবারে মন্দিরের গা ঘেঁষে। সেই লরির ইঞ্জিনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। লরির হেডলাইট দুটো আগে জ্বলছিল, এখন নিভিয়ে দিয়েছে।

তুলসী ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, কী ব্যাপার?

কুমুদ এক হাত দিয়ে তুলসীর মুখ টিপে ধরল।

অর্থাৎ, এখন একদম কথা বলবি না।

হঠাৎ দেখা গেল মন্দিরের ভিতর থেকে দুটো লোক কী একটা বয়ে নিয়ে আসছে।

একটু আগে কুমুদের সাবধানবাণী ভুলে গিয়ে তুলসী চেঁচিয়ে উঠল। ওরা মূর্তি নিয়ে পালাচ্ছে!

ভাগ্য ভালো তুলসীর। ঠিক সেই সময় একটা হুতোম প্যাঁচা গাছের ওপর থেকে গম্ভীর গলায় চেঁচিয়ে উঠল, হুম, হুম, হুম।

তুলসীর গলার স্বর সেই আওয়াজে চাপা পড়ে গেল।

লোক দুটো বয়ে-আনা মূর্তিটা লরির ওপর চাপিয়ে দিল। তারপর দুজনে লরিতে উঠল। একজন চালকের আসনে। আর-একজন তার পাশে।

কুমুদ বুঝতে পারল এবার লরি ছাড়বে।

সে তুলসীর কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে আস্তে বলল, ওরা পালাচ্ছে। চল, আমরা লরিতে উঠে পড়ি।

প্রথমে কুমুদ, তারপর তুলসী লরির পিছন দিয়ে ওপরে উঠে পড়ল।

ততক্ষণে লরি চলতে শুরু করেছে।

রাস্তা নেই, কেবল সে ছোটো ছোটো ঝোপ, তাই লরিটা একটু আস্তে আস্তে চলছে।

কুমুদ আর তুলসী লরির ওপর উঠে দেখল, লরি ভরতি ডাব, তরিতরকারি আর ডালডার টিন।

বুঝতে পারল, মূর্তি দুটো এইসব জিনিসের তলায় কোথাও রাখা আছে।

একটা মূর্তি চুরি করতে তো কুমুদ আর তুলসী দেখেইছে। আর-একটা মূর্তিও নিশ্চয় আগে সরিয়েছে।

চুরি করতে যখন এসেছে তখন কি আর একটা মূর্তি ফেলে যাবে?

জঙ্গল ছেড়ে রাস্তার ওপর আসতেই লরির গতি বাড়ল।

একটু একটু করে অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। ভোরের আলো ফুটছে।

রাস্তায় শাকসবজি মাথায় দু-একজন চাষিকে হাটের দিকে যেতে দেখা গেল। লরির চালক পিছনদিকে দেখলেই এদের দেখতে পাবে।

কুমুদ তুলসীকে ইশারা করল।

লরির ওপর একটা ত্রিপল ঢাকা দেওয়া ছিল। কুমুদ ত্রিপলের এককোণ তুলে তার তলায় চলে গেল। তুলসীও তা-ই করল।

এবার লরি তিরবেগে ছুটছে।

কুমুদ শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল। খবরের কাগজে সে অনেক পড়েছে। আজকাল মূর্তি চুরির হিড়িক পড়ে গেছে। অনেকেই মূর্তি চুরি করে বিদেশে চালান দিচ্ছে। বিরাট আন্তর্জাতিক দলও রয়েছে। ভগবান জানেন, এরাও সেরকম কোনও দলের লোক কি না। খুব সম্ভব এরা মূর্তিগুলো কোনওখানে রাখবে। তারপর অন্য কোথাও পাঠাবার ব্যবস্থা করবে। সেই জায়গাটা দেখে রাখতে পারলেই কাজ হবে। কাছাকাছি থানায় গিয়ে খবর দিয়ে দেবে। একটু পরেই লরি থামল। দু-পাশে খেত। বসতির কোনও লক্ষণ নেই। এখানে যে লরি থামল!

খুব বাজখাঁই একটা গলার স্বর শোনা গেল।

ভজু, নাম, কিছু খেয়ে নিই। এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে।

আর-একজন কোনও কথা বলল না। তবে বোঝা গেল, সে লাফিয়ে লরি থেকে নামল।

সম্ভবত রাস্তার এদিকে চায়ের দোকান কিংবা সরাইখানা আছে। ওদিকে সরে গিয়ে দেখতে কুমুদের সাহস হল না।

প্রায় আধ ঘণ্টা লরি দাঁড়িয়ে রইল।

বেলা বাড়ছে। অন্ধকার থাকতে কুমুদ আর তুলসী বেরিয়েছে। এত বেলা হল এখনও পেটে কিছু পড়ল না। কখন এ যাত্রার শেষ হবে কে জানে!

আবার চলা শুরু।

কুমুদ দেখল, অনেক দূরে দূরে পাহাড়ের অস্পষ্ট রেখা দেখা যাচ্ছে। তাহলে কি লরি বাংলাদেশের সীমানা পার হয়ে যাচ্ছে?

বিকালের দিকে লরি থামল। ঘন জঙ্গলের মধ্যে বিরাট একটা গুদাম। ইটের দেয়াল। টিনের ছাদ।

সামনের দিক থেকে লোকেরা নামল।

আওয়াজে বোঝা গেল, ওরা গুদামের তালা খুলছে।

এই সুযোগ। কুমুদ আর তুলসী নিঃশব্দে নেমে দাঁড়াল। ভালো করে জায়গাটা চিনে নিয়ে পুলিশকে খবর দিতে হবে।

ওঃ। দুজনেই ভীষণ আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। দুজনেই জ্ঞান হারাল।

কুমুদের জ্ঞান হতে দেখল, অন্ধকার একটা ঘরে খাটিয়ার ওপর সে শুয়ে আছে।

আশা করেছিল, ধারেকাছে তুলসীকে দেখতে পাবে, কিন্তু এদিক-ওদিক চোখ ফিরিয়ে তুলসীকে কোথাও দেখতে পেল না।

মাথা ঘোরাতে গিয়েই বুঝতে পারল মাথায় অসহ্য ব্যথা। মনে পড়ে গেল, কেউ ভারী কিছু দিয়ে তার মাথার পিছনে আঘাত করেছিল।

তুলসী পাশেই ছিল। তাকেও নিশ্চয় একইভাবে ঘায়েল করা হয়েছিল। কিন্তু তুলসী কোথায় গেল?

ভালো করে কুমুদ ঘরটা লক্ষ করল। আগাগোড়া পাকা গাঁথুনি। দেয়াল-ছাদ দু-ই ইটের। একটামাত্র দরজা। খুব মজবুত কাঠের ভারী পাল্লা। একটাও জানলা নেই। তাতেই মনে হল, এটা গুদামঘর। কিন্তু, এখন একেবারে খালি।

হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হতেই কুমুদ চমকে উঠল।

দীর্ঘ, সবল চেহারার একটা লোক ঢুকল। এক হাতে একটা রেকাবি, অন্য হাতে চাবুক।

খোলা দরজা দিয়ে বাইরের কিছুটা দেখা গেল। প্রচণ্ড রোদে সব কিছু ঝলমল করছে। সামনে একটা কাঁঠাল গাছ। তার গুঁড়িতে একটা ছাগল বাঁধা। ঘন জঙ্গল। জঙ্গল ভেদ করে পিছনের কিছু দেখা যাচ্ছে না।

খাটিয়ার তলা থেকে টুল বের করে লোকটা বসল।

কাছে আসতে লোকটার বীভৎস চেহারা আরও পরিষ্কার দেখা গেল। গালে কাস্তের মতন বাঁকা একটা কাটা দাগ। গালপাট্টা গালের অর্ধেকটা নেমেছে।

কী রে, নাম কী তোর?

কুমুদের মনে হল ঘরের মধ্যে যেন বাজ পড়ল।

কী, কথা কানে যাচ্ছে না? না, চাবুক পিঠে না পড়লে মুখ খুলবে না?

কথার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা বাতাসে চাবুকটা আছড়াল।

সাপের মতন চাবুকটা হিস হিস শব্দ করে উঠল।

ক্ষীণকণ্ঠে কুমুদ বলল, কুমুদ লাহিড়ী।

হুঁ, লরির পিছনে উঠেছিলি কোন মতলবে?

কোনও মতলব নয়। দেখলাম তরকারি বোঝাই লরি দাঁড়িয়ে আছে। আমরা দুজনে উঠে পড়লাম।

উঠে একেবারে এতটা পথে চলে এলি?

লরি না থামলে নামব কী করে? তা ছাড়া অন্য কারণও ছিল।

কী কারণ?

আমরা আর বাড়িতে ফিরতে চাইনি।

হঠাৎ বৈরাগ্য। কী ব্যাপার?

আমরা দুজনেই পরীক্ষায় ফেল করেছি, তাই বাড়িতে আমাদের খুব হেনস্থা চলেছে।

ও ছোকরা তোর কে হয়?

আমরা মামা-ভাগনে, আমি মামা।

বা, বা, মামা-ভাগনে, একেবারে মানিকজোড়।

লোকটা কিছুক্ষণ কঠিন দৃষ্টিতে কুমুদকে দেখল, তারপর রেকাবিটা খাটিয়ার ওপর রেখে দিয়ে বলল, নে, খেয়ে নে।

কুমুদ আড়চোখে চেয়ে দেখল। খান চারেক রুটি আর একটু ডাল। সকাল থেকে পেটে কিচ্ছু পড়েনি। এইই অমৃত। কিন্তু তার আগে একটু জল দরকার।

লোকটা দরজার কাছে গিয়ে চেঁচাল। লছমি, এ লছমি, এক লোটা জল নিয়ে আয়।

একটু পরে বছর দশেকের একটি মেয়ে এক ঘটি জল এনে মেঝের ওপর রাখল।

ঠিক আছে, যা।

লোকটা জলের ঘটিটা কুমুদের হাতের কাছে এগিয়ে দিয়ে বলল, নে, খেয়ে নে। পরে আবার আসব।

লোকটা যখন দরজার কাছে গেছে, তখন কুমুদ বলল, শুনুন।

লোকটা ঘুরে দাঁড়াল।

আমার ভাগনে তুলসী কোথায়?

খতম হয়ে গেছে।

কথার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা দরজা বন্ধ করে দিল। বাইরে থেকে দরজায় তালা বন্ধ করার আওয়াজও কুমুদের কানে গেল।

রুটি ছিঁড়ে কুমুদ ডালে মাখিয়ে সবে মুখে দিতে যাচ্ছিল, লোকটার কথা কানে যেতেই হাত থেকে রুটির টুকরো মাটিতে পড়ে গেল।

তুলসী খতম!

যখন কুমুদকে আঘাত করে তখন নিশ্চয় তুলসীকেও আঘাত করেছিল। হয়তো তুলসীর আঘাতটা একটু জোরেই হয়েছিল। কিংবা এও হতে পারে, পরে তুলসীর কাছ থেকে কথা বের করার জন্য এরা সম্ভবত মারধর করেছে। নির্যাতনের মাত্রাটা একটু বেশিই হয়ে গিয়ে থাকবে।

তুলসীর যদি কিছু হয়ে থাকে, তার জন্য কুমুদ সম্পূর্ণভাবে দায়ী। মূর্তি চোরদের পিছনে যাবার জন্য কুমুদই তাকে উৎসাহিত করেছিল।

বসে বসে কুমুদ চিন্তা করতে লাগল। এমনও হতে পারে লোকটা মিথ্যা কথা বলে গেল। তুলসীর কিছুই হয়নি। তুলসী হয়তো আর-একটা ঘরে কুমুদের মতনই বন্দি।

কুমুদ লোকটাকে যে কথাগুলো বলেছে, সেগুলো সে তুলসীর কাছ থেকেও যাচাই করে নেবে। যদি দুজনে দুরকম কথা বলে, তাহলেই সর্বনাশ। দুজনের ওপর অত্যাচার শুরু হবে।

আবার খুট করে দরজায় শব্দ। এবার দরজা খুলে যেতে লছমি ঘরে ঢুকল।

খাটিয়ার কাছে এসে বিরক্তকণ্ঠে বলল, এ কী, এখনও নাস্তা হয়নি? তাড়াতাড়ি নাও, আমি লোটা আর থালা নিয়ে যাব।

রুক্ষ, কর্কশ কণ্ঠস্বর। লছমি হিন্দুস্থানি হলেও বাংলা ভাষা মন্দ বলে না।

কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা লছমি, অন্য ঘরে যে ছেলেটাকে আটকে রাখা হয়েছে, তার দেখাশোনা কি তুমিই করছ?

না, চাচাজি তাকে দেখছে। বড়ো বদমাইশ লেড়কা। চাবুক না খেলে মুখ খোলে না।

কুমুদ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। যাক, তাহলে তুলসী বেঁচে আছে। হয়তো নির্যাতিত হচ্ছে, কিন্তু প্রাণে মরেনি।

কুমুদ রুটি-ডাল শেষ করল। নিঃশেষ করল জলের লোটা।

লছমিকে বলল, আমাকে আর-এক ঘটি জল দিতে পারো?

লছমি খিঁচিয়ে উঠল, ও, নবাবপুত্তুর হুকুম করছে। আমি ওর কেনা বাঁদি, দশ লোটা জল এনে দেব।

কথা শেষ করেই লছমি ছোঁ মেরে থালা আর লোটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দরজায় তালা পড়ল।

কুমুদ আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। ঘরের চারদিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজল। কোথাও একটু ফাঁক নেই। দরজায় কান পাতল।

মনে হল কে যেন কাঠ কাটছে। কোনও মানুষের কথার আওয়াজ পাওয়া গেল না। ছাগল ডাকছে। কাকের শব্দ।

কুমুদ আবার খাটিয়ায় ফিরে এল।

খড়ের বালিশ। তার ওপর মাথা রেখেই শুয়ে পড়ল।

একটু বোধহয় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, হঠাৎ বাইরে অনেকগুলো লোকের সম্মিলিত চিৎকারে চমকে উঠে বসল।

বাইরে ভীষণ হইচই। অনেকগুলো লোক একসঙ্গে কথা বলছে বলে কথাগুলো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

দরজায় কান পেতে কুমুদ শোনবার চেষ্টা করল।

কতকগুলো লোক ছুটোছুটি করছে। কাকে যেন গালাগালও দিচ্ছে। দুজন লোক ঠিক দরজার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের কথা কুমুদ স্পষ্ট শুনতে পেল।

শয়তান গিরিধারীকে ঘায়েল করে পালিয়েছে।

সে কী? কী করে?

গিরিধারী জল দিতে এসেছিল। তার হাতে ছিল লোহা-বাঁধানো লাঠি। শয়তানটা করেছে কী, আচমকা গিরিধারীর মুখের ওপর জল ছুড়ে দিয়ে, তার লাঠি দিয়েই তার মাথায় সজোরে মেরে তাকে অজ্ঞান করে ফেলে খোলা দরজা দিয়ে পালিয়েছে।

আর কেউ পাহারায় ছিল না?

আর কে থাকবে। দরজা বন্ধ ছিল। শয়তানটা জোরে জোরে দরজা ধাক্কা দিতে গিরিধারী দরজা খুলে দেয়। তখন বলে খুব জলতেষ্টা পেয়েছে। জল আনতে এই বিপত্তি।

কিন্তু পালাবে কোথায়? চারপাশে তো ঘন জঙ্গল। আমাদের তিনজন লোক খুঁজতে বেরিয়েছে।

কুমুদ বুঝতে পারল তুলসী পালিয়েছে। তুলসী যদি কোনওরকমে পুলিশে খবর দিতে পারে, তাহলে পুরো দলটাই ধরা পড়ে যাবে।

কুমুদের নিশ্চিত ধারণা, ধারেকাছে অন্য গুদামে আরও অনেক চুরি করা মূর্তি আছে।

এ বিচ্ছুটা ঠিক আছে তো? তালাটা খোল। একবার দেখি।

কুমুদ বুঝতে পারল এখনই ওরা ঘরে ঢুকবে। সে তাড়াতাড়ি খাটিয়ায় উঠে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল ঘুমের ভান করে।

দরজা খোলার শব্দ হল। কুমুদ বুঝতে পারল লোক দুটো খাটিয়ার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

না, এটা ঘুমোচ্ছে।

সাবধানের মার নেই। আর লছমিকে জল নিয়ে পাঠাব না।

রাতে এ ব্যাটার খাওয়া বন্ধ। পেটে কিছু না পড়লেই ঠিক হয়ে যাবে।

লোকদুটো বেরিয়ে যেতে কুমুদ আবার উঠে পড়ল।

দু-দিকের দেয়ালের খুব ওপরে ছোটো দুটো ফুটো। বোধহয় হাওয়া চলাচলের জন্য।

সে ফুটো দিয়ে পালানো তো দূরের কথা, কুমুদের একটা পা-ও গলবে না। পালাবার আশা দুরাশা।

কুমুদের ভয় হল, এরা যদি তুলসীকে ধরতে পারে, তাহলে তাকে খতম করে দেবে। অচেনা জায়গা, তার ওপর চারদিকে জঙ্গল। তুলসীর পক্ষে এদের হাত থেকে বাঁচা প্রায় অসম্ভব।

খিদেয় কুমুদের পেটের মধ্যে মোচড় দিচ্ছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। সেই কতক্ষণ আগে কখানা রুটি আর ডাল খেয়েছিল। তারপর থেকে পেটে কিছু পড়েনি। এদের কথাবার্তায় যা মনে হল, আর কিছু খেতেও দেবে না।

এতক্ষণ পরে কুমুদ আপশোস করতে আরম্ভ করল।

পরীক্ষার পর দিদির বাড়ি কাটাতে এসেছিল। দিব্যি ভালো খেয়েদেয়ে এখানে-ওখানে বেড়িয়ে আনন্দে সময় কাটিয়ে দেবার কথা। কিন্তু ঘাড়ে যে কী ভূত চাপল। মূর্তি চোরের লরিতে উঠে বসার দুর্মতি কেন যে হল। এখন প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলে হয়।

তুলসী আবার নতুন বিপদ ডেকে আনল।

দেয়ালে হেলান দিয়ে কুমুদ চুপচাপ বসে রইল।

বাইরে গোলমাল থেমে গেছে। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।

শেয়ালের ডাক শুনে বোঝা গেল বাইরে অন্ধকার নেমেছে।

টর্চের আলো খাটিয়ার ওপর ফেলেই লোকটা চেঁচিয়ে উঠল। আরে, এটা আবার গেল কোথায়?

কুমুদ বসে বসেই উত্তর দিল, এই যে আমি এখানে।

উঠে দাঁড়া।

বড্ড খিদে পেয়েছে। দাঁড়াবার শক্তি নেই।

একটা লোক এগিয়ে এসে কুমুদের চুল ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, একেবারে জন্মের শোধ খাওয়াব তোকে।

আর-একজন লোক দড়ি দিয়ে কুমুদকে পিছমোড়া করে বাঁধল, তারপর একটা রুমাল জোর করে তার মুখে গুঁজে দিল।

কুমুদের মনে হল তার মুখ বুঝি ফেটে যাবে। অসহ্য যন্ত্রণায় দুটো চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল।

একটা লোক তাকে পাঁজাকোলা করে বাইরে নিয়ে এল।

উঠানের ওপর একটা লরি। কুমুদকে তার ওপর তুলে দিল।

এবারও লরি শাকসবজি বোঝাই। তলায় কী আছে অবশ্য বোঝবার উপায় নেই। একটা বড়ো ত্রিপল দিয়ে আগাগোড়া ঢেকে দিল।

কুমুদকে ঢাকা দেবার আগেই সে দেখতে পেয়েছিল, সামনে আর-একটা লরি দাঁড়িয়ে আছে।

গর্জন করে লরি দুটো ছাড়ল।

লরির ঝাঁকানিতে মনে হল খুব উঁচু-নিচু রাস্তা দিয়ে চলছে। মাঝে মাঝে চড়াই-উৎরাইও রয়েছে।

লরির শব্দের ফাঁকে ফাঁকে কিছু কথার টুকরোও কুমুদের কানে এল।

শয়তানটা যেন পাখি হয়ে উড়ে পালাল। চারপাশের জঙ্গল তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়েছে। কোথাও পাওয়া গেল না।

যদি সোজা কোনওরকমে ভগবতীপুর থানায় গিয়ে হাজির হতে পারে, তাহলেই সর্বনাশ। আমাদের আস্তানা দেখে গিয়েছে। দারোগাকে সঙ্গে করে এলেই একেবারে সব ক-টা বমাল গ্রেপ্তার।

আরে সেই ভয় করেই তো সর্দার এখান থেকে সরে যাবার হুকুম দিয়েছে। পুলিশ এলেও বোকা বনবে। উলটে ছোকরাটাকেই ধমক লাগাবে।

ত্রিপল ফাঁক করে কুমুদ দেখল, কালো আকাশ। দু-একটা তারা দেখা যাচ্ছে। মনে হল, একেবারে পাহাড়ের গা বেয়ে লরি চলছে।

একপাশে গাছপালা খুব উঁচুতে। কালো কালো পাথরের চাঙড়ও দেখা যাচ্ছে।

আবার কথাবার্তার আওয়াজ কানে এল।

এটাকে আমরা বয়ে নিয়ে যাচ্ছি কেন?

এটাকে রেখে গেলে এ তো পুলিশের কাছে সব বলে দেবে। দুজনের কথা মিলে গেলে পুলিশের মনে সন্দেহ হবে। বুঝতে পারবে আমরা অন্য কোথাও সরে গেছি। চারদিক তোলপাড় করে খুঁজতে আরম্ভ করবে।

কিন্তু একে আমাদের নতুন আস্তানায় নিয়ে গিয়ে লাভ কী!

আরে দূর! সর্দার কি আর এত কাঁচা কাজ করবে? ছেলেটার হাত-পা বাঁধা, মুখও বন্ধ করা হয়েছে। এখন পথে কোনও নদীতে স্রেফ ছুড়ে ফেলে দেওয়া। ব্যাস ঝামেলা শেষ।

কথাগুলো কানে যেতেই কুমুদ শিউরে উঠল। তাহলে এই ওদের মতলব। মাঝপথে কোনও নদীতে তাকে বিসর্জন দেবে। বাঁচবার কি কোনও উপায় নেই!

হাত-পা বাঁধা। কুমুদ অতি কষ্টে গড়িয়ে গড়িয়ে লরির একপাশে চলে এল। লরির পাল্লা দুটো লোহা দিয়ে আটকানো।

কুমুদ হাতের বাঁধন তার ওপর রেখে ঘষতে লাগল। যদি দড়ি কেটে যায়। কিন্তু কিছুই হল না। দড়ি যথেষ্ট মজবুত।

নিরুপায় হয়ে কুমুদ গড়িয়ে গড়িয়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরে এল।

ঝাঁকানি দিয়ে লরিটা থামতেই কুমুদের বুকের ভিতর গুরগুর করে উঠল।

বোধহয় কাছেই নদী। এবার তার ব্যবস্থা হবে।

এই প্রথম কুমুদের দু-চোখ জলে ভরে এল।

জীবনে খুব ইচ্ছা ছিল, হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে রসায়নে অনার্স নিয়ে কলেজে পড়বে। গতানুগতিক চাকরি করবে না। নামকরা কেমিস্ট হবে। মৃত্যুঞ্জয়ী ওষুধ আবিষ্কার করবে। সব বাসনার অবসান।

হাত-পা বাঁধা না থাকলে সাঁতার কাটবার চেষ্টা করত। এভাবে সাঁতার দেওয়া অসম্ভব। তার ওপর নিশ্চিন্ত হবার জন্য এরা হয়তো গলায় পাথর বেঁধে দেবে। জলে পড়ামাত্র টুপ করে ডুবে যাবে।

চোখ বুজে কুমুদ মৃত্যুর অপেক্ষা করতে লাগল। মা আর বাবার মুখ বন্ধ চোখের সামনে ভেসে উঠল। বেশ কিছুক্ষণ কুমুদ অপেক্ষা করল।

সে ভেবেছিল দুটো লোক লরিতে উঠে তার অসহায় দেহটা তুলে ছুড়ে কোনও নদীতে ফেলে দেবে।

কিন্তু না, কেউ এল না।

একটু পরেই কুমুদের কানে হাসির শব্দ এল। মনে হল লোকগুলো কিছু চিবুতে চিবুতে হাসছে।

আন্দাজ করল বোধহয় লোকগুলো খাওয়ার জন্য নেমেছে। সম্ভবত কোনও দোকানে বসে খাচ্ছে, কিংবা হয়তো সঙ্গে খাবার নিয়ে এসেছিল।

কে একজন চেঁচাল, এই রাজু, বোতলে করে ওই নদী থেকে জল নিয়ে আয়, তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে।

দে বোতল দে। এক বোতলে হবে না, দুটো বোতল দরকার।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটানা ঝিঁঝির শব্দ। দূরে বন্যজন্তুর গর্জনও শোনা যাচ্ছে। কী জন্তু কুমুদ বুঝতে পারল না।

খাওয়ার কথা কানে যেতেই কুমুদের পেটের মধ্যে আবার মোচড় দিয়ে উঠল। মুখে কাপড় গোঁজা না থাকলে সে চিৎকার করে কেঁদে উঠত।

একটু পরে লোকগুলো লরিতে এসে উঠল।

প্রথমে আগের লরিটা গর্জন করে ছাড়ল। তারপর পিছনেরটা।

কুমুদ যে লরিতে ছিল তার চালক আর সহকারী উচ্চকণ্ঠে গান শুরু করল। হিন্দুস্থানি গান। গানের একটা কথাও কুমুদ বুঝতে পারল না।

হঠাৎ গানের আওয়াজ ছাপিয়ে আর-একটা শব্দ শোনা গেল।

কুমুদ দু-বছর আগে মা-বাবার সঙ্গে রাঁচি গিয়েছিল। সেখান হুড্রু জলপ্রপাত দেখেছিল। অনেক ওপর থেকে পাথরের ধাপ বেয়ে বেয়ে জলের স্রোত নামছে। কী ভীষণ তার গর্জন।

এ শব্দও ঠিক সেইরকম। মনে হল প্রবল বেগে জলের ধারা নামছে।

সহকারীর চিৎকার কানে এল।

এই, সামলে সামলে। কী করছিস?

প্রচণ্ড একটা আওয়াজ। লরিটা ধাক্কা খেয়ে দুলে উঠল। তারপরই হেলে পড়ল একদিকে।

মুহূর্তে জলের স্রোত লরির মধ্যে ঢুকল। কী প্রবল শক্তি জলের। খড়ের কুটোর মতন লরিটাকে টেনে নিয়ে গেল।

কুমুদ বুঝতে পারল লরি নদীগর্ভে ঢুকছে।

আবার কান-ফাটানো শব্দ। লোহার রেলিংয়ের সঙ্গে লরিটার ধাক্কা লাগল। লরির পিছনের অংশ ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেল।

গিরিধারীকে তারই লাঠিতে ঘায়েল করেই তুলসী ছুটে দরজার দিকে গেল।

দরজা খোলাই ছিল। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে একবার চারদিক দেখে নিল। না, ধারেকাছে কেউ নেই।

তুলসী তিরবেগে পুকুরের পাড় দিয়ে ছুটতে আরম্ভ করল।

কতবার কাঁটাগাছে দুটো পা ক্ষতবিক্ষত হল। শক্ত বুনোলতায় পা আটকে মাটির ওপর ছিটকে পড়ল।

ধুলো ঝেড়ে উঠে আবার ছুটতে লাগল।

তুলসীর একমাত্র চিন্তা যেমন করে হোক এইসব দুশমনদের নাগালের বাইরে চলে যেতে হবে। একবার যদি ধরা পড়ে তাহলে তুলসীর কী অবস্থা হবে, তা ভাবতেই শিউরে উঠল।

অনেকটা চলার পর তুলসী পাকা রাস্তার ওপর এসে পড়ল।

বুঝতে পারল রাস্তার ওপর দিয়ে দৌড়ানো নিরাপদ হবে না। ওরা হয়তো লরিতে অনুসরণ করার চেষ্টা করবে।

তুলসী রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকল।

বিরাট গাছের সার। তলায় ছোটো ছোটো ঝোপ। নানা রঙের বুনোফুল ফুটে রয়েছে।

কিছুটা এগিয়ে তুলসী দেখল জঙ্গল প্রায় দুর্ভেদ্য। সাপখোপ কিংবা কোনওরকম জন্তুজানোয়ার থাকাও বিচিত্র নয়।

তুলসী ভাবল তার চেয়ে রাস্তায় ফিরে যাওয়াই ভালো।

একটু এগিয়ে তুলসী থেমে গেল।

পিছনে অনেকগুলো পায়ের শব্দ শোনা গেল। কারা যেন কথা বলতে বলতে দৌড়ে আসছে।

একটুও বিলম্ব না করে তুলসী কাছের গাছটায় চড়ে বসল।

উঁচু গাছ। হাতের কাছে কোনও ডালপালাও নেই।

কিন্তু পাড়াগাঁর ছেলে তুলসীর তাল-নারকেল গাছে চড়া খুব অভ্যাস আছে। অবলীলাক্রমে তুলসী প্রায় গাছের আগায় গিয়ে উঠল। বড়ো বড়ো পাতার আড়ালে একেবারে অদৃশ্য হয়ে রইল।

সেখানে বসে বসেই দেখল চারজন লোক, কারো হাতে বর্শা, কারো বল্লম, কারো লাঠি, দৌড়ে চলে গেল।

তুলসী বুঝতে পারল এরা তারই খোঁজে বেরিয়েছে।

জঙ্গলের মধ্যে না ঢুকে পড়ে যদি সে রাস্তা ধরে ছুটত, তাহলে এতক্ষণ তার কী হাল হত বেশ বুঝতে পারল।

একটু একটু করে সন্ধ্যা নামল। পাখিরা বাসায় ফিরতে আরম্ভ করল। এদিক-ওদিক জোনাকির আলো।

ডাল আঁকড়ে চুপচাপ বসে থেকে তুলসী দেখল লোকগুলো ফিরল না। হতে পারে ফেরবার অন্য রাস্তা আছে। কিংবা লোকগুলো অনেকটা পথ চলে গিয়েছে। রাতটা কোথাও কাটিয়ে কাল ভোরে ফিরবে।

তুলসী ঠিক করল গাছ থেকে নামাটা সমীচীন হবে না।

নিজের ধুতির কিছুটা খুলে সে গাছের ডালের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধল। যাতে ঘুমিয়ে পড়লে নীচে না পড়ে যায়।

একটু রাত হতেই জঙ্গল কাঁপিয়ে হা হা হাসির শব্দ উঠল।

তুলসী জেগেই ছিল। সেই বিকট শব্দে তার বুকের রক্ত শুকিয়ে জল হয়ে গেল।

সে প্রথমে মনে করল বুঝি লোকগুলো জঙ্গলে ঢুকে গাছের ওপর তাকে দেখতে পেয়েছে। তাই তাদের এই আনন্দের হাসি।

একটু পরেই তার ভুল ভাঙল। এ হাসি কোনও মানুষের নয়, বন্যজন্তুর।

ঠিক গাছের নীচে দিয়েই জন্তুটা ছুটে গেল। উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে। সঙ্গে সঙ্গে তুলসীর মনে পড়ল। বইতে পড়েছে হায়নার হাসি। কলকাতায় মামার বাড়ি গিয়ে বারকয়েক চিড়িয়াখানায় জন্তুটা দেখেছে। খাঁচার কাছে যাবার উপায় নেই, এমন বিশ্রী গন্ধ।

কয়েকটা শেয়াল চেঁচামেচি ছাড়া রাত্রে আর কোনও উপদ্রব হল না।

একটু একটু করে অন্ধকার কেটে গেল। ঘন গাছপালার জন্য জঙ্গলের ভিতর রোদ আসা দুষ্কর।

পাখিদের কিচিরমিচির আরম্ভ হল।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তুলসী গাছ থেকে নেমে পড়ল।

প্রায় সারারাত লরি চলেছে রাস্তা দিয়ে। লরির হেডলাইটের উজ্জ্বল আলো অনেকবার তুলসীর মুখে এসে পড়েছে।

তুলসী প্রথমে ভেবেছিল লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে থানায় চলে যাবে। সেখান থেকে পুলিশ সঙ্গে করে কুমুমামাকে বাঁচাবে আর চোরাই মূর্তিগুলো উদ্ধার করবে। তারপর ভাবল বিদেশে পুলিশের খোঁজ করতে যাওয়ার বিপদ অনেক। যাকে জিজ্ঞাসা করবে সে এই দুশমনদের লোক কি না কে জানে। আবার হয়তো তুলসীকে ফাঁদে ফেলবে।

তার চেয়ে একটা লরি দাঁড় করিয়ে বাংলার দিকে চলে যাবে। লরি যদি কলকাতায় যায় তাহলে দিদিমা আর দাদুকে সব ব্যাপারটা জানাবে।

আর যদি লরি কলকাতা পর্যন্ত না যায়, তাহলে শক্তিগড়ে তুলসী নেমে পড়ে রতনগড়ে ফিরে যাব। বাবাকে সব কথা খুলে বলবে। পুলিশমহলে বাবারও যথেষ্ট জানাশোনা। কিছু একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।

গাছের ছোটো একটা ডাল ভেঙে নিয়ে তুলসী রাস্তার ধারে দাঁড়াল।

দু-একটা কাঠুরে হাতে কুড়ুল নিয়ে চলেছে। দু-একজনের মাথায় ঝুড়ি, বোধহয় হাটে যাচ্ছে।

দূরে একটা লরির শব্দ হতেই তুলসী এগিয়ে গেল।

বাঁকের মুখে লরিটা দেখা যেতেই তুলসী গাছের ডাল নাড়তে লাগল।

নক্ষত্রবেগে লরিটা পার হয়ে গেল। থামল না।

একটা লোক কাঁধে বোঝা নিয়ে ছুটছিল, তাকে তুলসী জিজ্ঞাসা করল, এ জায়গার নাম কী?

লোকটা বোধহয় বাংলা বুঝতে পারল না। একবার ঘাড় ফিরিয়ে তুলসীর দিকে দেখেই আবার সোজা চলতে আরম্ভ করল।

তুলসী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

বেশ কিছুক্ষণ পর আবার লরির আওয়াজ শোনা গেল।

এবার তুলসী মরিয়া হয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গাছের ডালটা নাড়তে লাগল।

লরিটা একটানা হর্ন দিতে দিতে এসে তুলসীর খুব কাছে ঘচাং করে থামল।

ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে তুলসীকে গালাগাল দিল।

তুলসী ভ্রূক্ষেপ না করে ড্রাইভারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

কোথায় যাবে লরি?

ড্রাইভার দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল, বর্ধমান।

তুলসী করুণকণ্ঠে বলল, আমাকে বর্ধমান নিয়ে যাবে?

তোমাকে? কে তুমি? এখানে এলে কী করে?

এতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে তুলসী মুশকিলে পড়ে গেল।

সে শুধু বলল, আমাকে গুন্ডারা ধরে নিয়ে এসেছিল। আমি বহু কষ্টে তাদের হাত থেকে পালিয়ে এসেছি।

এবার ড্রাইভার সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

তুমি অতদূর বর্ধমান যাবে কেন? সামনেই থানা আছে, সেখানে নেমে নালিশ করো না। পুলিশের তাহলে গুন্ডাদের ধরবার সুবিধা হবে।

তুলসী বলল, আমার বাড়ি শক্তিগড়ের কাছে। বাড়ির লোক আমার জন্য খুব চিন্তিত রয়েছে। আগে একবার বাড়ি যাব, তারপর সেখান থেকে পুলিশে খবর দেব।

উঠে এসো।

তুলসী উঠে ড্রাইভারের পাশে বসল।

লরি ছুটল।

সারারাত তুলসী একটু ঘুমায়নি। শরীর ভীষণ ক্লান্ত বোধ হচ্ছে।

তা ছাড়া প্রচণ্ড খিদেয় পেটের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠছে।

একবার ভাবল, ড্রাইভারকে খিদের কথা বলবে, কিন্তু লজ্জায় পারল না।

হেলান দিয়ে চোখ বুজল।

তুলসী ঘুমিয়ে পড়েছিল, হঠাৎ প্রবল ঝাঁকুনিতে চমকে উঠে বসল।

লরি থেমেছে। রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকান। সামনে আরও তিন-চারটে লরি দাঁড়িয়ে আছে। চায়ের দোকানের সামনে অনেকগুলো খাটিয়া পাতা। সেই খাটিয়াগুলোর ওপর কিছু লোক বসে আছে। হাতে মগ। তাতে চা।

ড্রাইভার তুলসীকে ডাকল, নেমে এসো খোকা।

তুলসী নেমে ড্রাইভারের পাশে একটা খাটিয়ায় বসল।

এক মগ চা আর একটা বড়ো সাইজের পাঁউরুটির টুকরো।

তুলসী কয়েক মুহূর্তের মধ্যে চা-পাঁউরুটি শেষ করল।

ড্রাইভার তুলসীর দ্রুত খাওয়া লক্ষ করে জিজ্ঞাসা করল, আর চা-পাঁউরুটি খাবে?

তুলসী ঘাড় নাড়ল, হ্যাঁ, খাবে।

আর-এক মগ চা আর পাঁউরুটির টুকরো তুলসীকে দেওয়া হল।

ড্রাইভার প্রশ্ন করল, গুন্ডারা তোমাকে কিছু খেতে দেয়নি, না?

তুলসী উত্তর দিল, না।

তোমাকে কেন ধরেছিল?

কী করে জানব?

আমি জানি। তোমাকে আটকে রেখে তোমার গার্জেনকে চিঠি লিখতে বলত। পাঁচ-দশ হাজার টাকা না দিলে তোমাকে খতম করে ফেলত। তুমি খুব বাহাদুর ছেলে, তাই তাদের হাত থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছ।

তুলসী কোনও উত্তর দিল না।

একসময়ে দুজনে লরিতে গিয়ে উঠল।

এবার আর লরি বিদ্যুদগতিতে ছুটতে পারল না। সকাল হয়েছে। পথেঘাটে লোক চলাচল বাড়ছে।

প্রাইভেট মোটর, গোরুর গাড়ির ভিড়ও মন্দ নয়।

শক্তিগড় যখন পৌঁছুল, তখন সন্ধ্যা হয়েছে।

বেলা দুটোর সময়ে দুজন ভাত-তরকারি খেয়ে নিয়েছিল।

ড্রাইভার বলল, তুমি আর মিছামিছি কেন বর্ধমান যাবে। শক্তিগড়ের কাছে যখন তোমার বাড়ি, তখন এখানেই নেমে যাও। আমার কথা মনে থাকবে তো?

নিশ্চয় থাকবে। তোমার কথা কোনওদিন ভুলব না। তোমার নাম কী ভাই?

লরি চালু করে ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে বলল, প্রীতম সিং। চলি ভাই।

প্রচুর ধোঁয়া ছেড়ে লরি পথের বাঁকে মিলিয়ে গেল।

তুলসী বাড়ি ঢুকতে বাড়িতে হইচই শুরু হয় গেল।

তার মা প্রায় অনাহারে ছিল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কেবল কান্না।

বাবা ইতিমধ্যেই থানায় খবর দিয়েছিল। পুলিশ নানা জায়গা খুঁজে হয়রান।

তাদের ধারণা মামা-ভাগনে কোথাও পালিয়েছে। কেউ তাদের ধরে নিয়ে যায়নি।

তুলসীকে দেখেই তার মা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।

কোথায় গিয়েছিলি তোরা? কুমুদ কই!

তুলসী ধীরে ধীরে সব কাহিনি বলল।

কুমুদের খবর জানে না শুনে তার মা বুক চাপড়াতে লাগল।

কী সর্বনাশের কথা! আমি মা-বাবার কাছে কী করে মুখ দেখাব!

তুলসীর বাবা থানায় গিয়েছিল। পুলিশ কোনও খবর পেয়েছে কি না জানতে।

ফিরে তুলসীকে দেখতে পেয়ে যেমন খুশি হল, আবার কুমুদের কোনও খোঁজ নেই জেনে তেমনই চিন্তিত হয়ে পড়ল।

এ পর্যন্ত কুমুদের মা-বাবাকে কোনও খবর দেওয়া হয়নি।

মূর্তি চুরির ব্যাপারটা তুলসীর বাবা খুব মন দিয়ে শুনল।

এর মধ্যে মন্দিরের দিকে তুলসীর বাবা যায়নি। যাওয়া প্রয়োজন মনে করেনি, কাজেই জোড়া বিগ্রহ যে মন্দিরের মধ্যে নেই, তা জানতেই পারেনি।

তুলসীকে নিয়ে তার বাবা আবার থানায় গেল।

দারোগা মনোযোগ দিয়ে সব শুনল, মন্দিরে এসে সব দেখল, তারপর তুলসীর বাবাকে বলল, আপনি এক কাজ করুন। লালবাজারে গিয়ে সবকিছু জানান। আমাদের দেশে মূর্তি চুরির হিড়িক পড়ে গেছে। চোরাই মূর্তি বিদেশে চালান যাচ্ছে। এসব কেসের জন্য আলাদা একটা বিভাগ হয়েছে।

তুলসীকে নিয়ে তার বাবা বিকালের ট্রেনে রওনা হয়ে গেল।

প্রথমে কুমুদের বাড়ি গেল। তখনও কুমুদের বাবা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরেননি। মা ছিলেন।

তুলসীর কাছে সব শুনে কুমুদের মা একেবারে মাথায় হাত দিয়ে বসলেন।

অনেক বুঝিয়েও তাঁকে শান্ত করা গেল না।

কুমুদের বাবা বাড়ি ফিরে জামাইয়ের কাছে সব শুনে বিচলিত হলেও মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না। শুধু বললেন, কুমুদ আর তুলসীর ওভাবে লরিতে উঠে বসাটা ঠিক হয়নি। মূর্তি চোরদের ধারণা হতে পারে ছেলে দুটো পুলিশের চর। ধরবার জন্য ওদের পিছু নিয়েছে। যা-ই হোক, চলো লালবাজারে সবকিছু জানিয়ে আসি। বাড়িতে বসে কপাল চাপড়ালে কোনও সুরাহা হবে না।

সহকারী কমিশনার অতুল বসুর সঙ্গে আগে থেকেই কুমুদের বাবার পরিচয় ছিল। তিনি মন দিয়ে শুনলেন, তারপর আলমারি খুলে একটা অ্যালবাম বের করে তুলসীর সামনে রেখে বললেন, দেখো তো, এই ফোটোগুলোর মধ্যে চিনতে পারো কি না। এসব হচ্ছে নামকরা মূর্তি চোরদের ফোটো।

তুলসী নিবিষ্টমনে একটার পর একটা ফোটো দেখে গেল। নানা জাতের লোক রয়েছে। শুধু পুরুষ নয়, কিছু মেয়েও।

কিন্তু যাদের দেখেছে তাদের কারো ফোটো আছে বলে মনে হল না।

সেই কথাই সে সহকারী কমিশনারকে বলল।

তিনি একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, মূর্তি চুরির ব্যাপারে ছোটোখাটো অনেক দল আছে। সকলের খোঁজ পাওয়া পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। ঠিক আছে, আপনার নাতিকে নিয়ে আমরা একবার ওই আস্তানাটা দেখে আসব। এ বিষয়ে বিহারের পুলিশের সঙ্গেও যোগাযোগ করব। তবে সে আস্তানায় কাউকে পাব বলে মনে হয় না। আর আপনার ছেলের গোটাকয়েক ফোটো আমাদের দিয়ে যাবেন। দেখি কতদূর কী করতে পারি।

দিন দুয়েক পরেই পুলিশ রওনা হল। সঙ্গে তুলসী আর তার বাবা।

সহকারী কমিশনার ঠিকই অনুমান করেছিলেন। গুদামঘর খালি। একটি লোকও নেই।

বিহারের পুলিশও সঙ্গে ছিল। তারা বলল, চিড়িয়া পালিয়েছে।

ধারেকাছে কোনও বসতি নেই যে পুলিশ কিছু জিজ্ঞাসা করবে। চারপাশে দুর্ভেদ্য জঙ্গল। দিনের বেলাতেই অন্ধকার।

উঠানের ওপর লরির চাকার দাগ।

বিহারের পুলিশ বলল, আমরা জিপ নিয়ে একটু দেখি চাকার দাগ কতদূর পর্যন্ত গিয়েছে।

তুলসী, তার বাবা আর কলকাতার দুজন পুলিশ বসে রইল।

তুলসী তার বাবাকে দেখাল, যে ঘরটায় তাকে আটকে রাখা হয়েছিল।

তুলসীর বাবা বলল, তাহলে পাশের গুদামঘরে হয়তো কুমুদকে বন্দি করে রেখেছিল। তাকে কি দুর্বৃত্তরা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে, না মেরেই ফেলল?

মেরে ফেললে, তার দেহ তো এখানে পাওয়া যেত।

কিংবা এমন হতে পারে, সঙ্গে নিয়ে গেছে, পথে মেরে ফেলে দেবে।

সেই সম্ভাবনার কথা ভেবে তুলসীর বাবা শিউরে উঠল।

পুলিশ দুজন ঘুরে ঘুরে হাতের কিংবা পায়ের ছাপের সন্ধান করতে লাগল।

উঠানে অনেকগুলো পায়ের ছাপ। একটার সঙ্গে আর-একটা মিশে গিয়েছে।

দরজায় হাতের ছাপ কয়েকটা পাওয়া গেল।

তুলসীর মনে হল, কুমুমামার কিছু হয়নি। নিশ্চয় সে পালিয়ে ওই ঘন জঙ্গলের মধ্যে আত্মগোপন করে আছে।

একটা গুদামঘরে প্রচুর খড় আর কাঠের ছোটো-বড়ো বাক্স পাওয়া গেল। বোঝা গেল মূর্তিগুলো এর ভিতর প্যাক করে বাইরে পাঠানো হত।

পুলিশের একজন ইনস্পেকটর তুলসীর বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, শুনলাম, মূর্তি নিয়ে আপনি কিছু পড়াশোনা করেছেন, এ মূর্তি দুটো সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা?

তুলসীর বাবা বলল, এই মন্দিরকে সবাই ধর্মরাজের মন্দির বলত। কেন বলত জানি না। দুটো মূর্তিই কবন্ধ। মাথা নেই। সম্ভবত কোনও অত্যাচারী শাসকদের রাজত্বকালে মূর্তি দুটো এভাবে নষ্ট করা হয়েছিল।

আচ্ছা, মূর্তি দুটো থেকে নাকি জ্যোতি বের হত?

জ্যোতি ঠিক নয়। অন্ধকারে জ্বলজ্বল করত। যেমন জোনাকির শরীর থেকে আলো বের হয়।

হঠাৎ তুলসীর বাবা থেমে গেল।

পুলিশ দুজনও চমকে মুখ ফেরাল।

জঙ্গলের মধ্যে ঝপাঝপ শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কাঠুরেরা কাঠ কাটছে।

ইনস্পেকটর আর পুলিশ ছুটে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকল।

কাঠুরেরা রোজ যদি এখানে কাঠ কাটতে আসে, তাহলে এখানকার বাসিন্দাদের বিষয়ে কিছু জানতেও পারে।

দুজন কাঠুরে। দুজনের হাতে দুটো কুড়ুল।

তারা পুলিশ দেখেই হাতজোড় করল।

দোহাই হুজুর, এবারকার মতন আমাদের মাপ করুন। আমরা আর কোনওদিন এ জঙ্গলে আসব না।

এটা সংরক্ষিত বন নয়। এখানে গাছ কাটা অপরাধ নয়।

সে কথা ইনস্পেকটর এদের কিছু বলল না।

গম্ভীর গলায় বলল, ঠিক আছে, যদি একটা খবর দিতে পারো তাহলে তোমাদের পাকড়াও করব না।

বলুন হুজুর।

এ জঙ্গলে তোমরা আগে এসেছ?

মাঝে মাঝে এসেছি হুজুর।

তাহলে ওই গুদামঘরের ওখানে কারা থাকত, জানো?

না, হুজুর, তবে অনেক লোককে লরি করে যাওয়া-আসা করতে দেখেছি।

তাদের সঙ্গে তোমাদের কথাবার্তা কখনো হয়েছিল?

না, আমরা কাঠ কেটে সন্ধ্যা হবার আগে এখান থেকে সরে পড়ি।

এদিকে তুলসী আর তার বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

অনেকক্ষণ পর্যন্ত পুলিশরা না ফিরে আসাতে তুলসীর বাবা তুলসীকে বলল, তোর যাবার দরকার নেই, তুই এখানে দাঁড়া। আমি একবার জঙ্গলে ঢুকে দেখি পুলিশদের এত দেরি হচ্ছে কেন।

তুলসীর বাবা জঙ্গলের দিকে চলে গেল।

জঙ্গলে ঢোকবার তুলসীর একেবারেই ইচ্ছা ছিল না। বাবার ওই ঘন জঙ্গলের মধ্যে যাওয়াটাও তার মোটেই ভালো লাগল না।

সে চুপচাপ হিজল গাছের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

কুমুমামার জন্য তার মন খুব খারাপ হয়েছে। সব ব্যাপারটার জন্য তার নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে। এভাবে পদ্মদিঘিতে যাবার ব্যবস্থা না করলে এ দুর্ঘটনা হতই না।

হঠাৎ দুটো সবল বাহু পিছন থেকে তুলসীর মুখ চেপে ধরল। সঙ্গে সঙ্গে একটা রুমাল তার নাকের ওপর দিয়ে দিল।

কীরকম একটা গন্ধ। ধীরে ধীরে তুলসীর সারা দেহ অবশ হয়ে গেল। এইটুকু সে বুঝতে পারল, অসীম বলশালী একটা লোক তাকে কাঁধে তুলে নিয়েছে।

একটু পরে পুলিশরা ফিরে এল। তুলসীর বাবাও।

ইনস্পেকটর বলল, চলুন, এখানে অপেক্ষা করে আর লাভ নেই। আমার মনে হয়, বদমাইশগুলো মালপত্র নিয়ে পালিয়েছে।

তুলসীর বাবা চেঁচিয়ে তুলসীকে ডাকল, তুলসী, তুলসী।

কোনও সাড়া নেই।

তুলসীর বাবা ভাবল, সম্ভবত তুলসী ধারেকাছে কোথাও গেছে।

এদিক-ওদিক খুঁজেও তুলসীকে দেখতে না পেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল।

ইনস্পেকটরের দিকে ফিরে বলল, তা-ই তো, ছেলেটা গেল কোথায়? এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবার কথা।

ইনস্পেকটর বলল, যাবে আর কোথায়। এদিক-ওদিক গেছে নিশ্চয়। দাঁড়ান, আমি একজন পুলিশকে খুঁজতে পাঠাচ্ছি।

আধ ঘণ্টা ধরে আশপাশের জঙ্গল খুঁজেও তুলসীর সন্ধান মিলল না।

ইনস্পেকটর অবাক!

তা-ই তো, ছেলেটা চোখের সামনে থেকে ভোজবাজির মতন উড়ে গেল নাকি! আপনি ছেলেকে একলা ছেড়েই বা আমাদের কাছে জঙ্গলে ঢুকতে গেলেন কেন?

তুলসীর বাবা এ কথার কোনও উত্তর দিল না। তার মনের অবস্থা বর্ণনা করার মতন নয়। এত কষ্টে ছেলেকে ফিরে পেল, আবার সেই ছেলে হারিয়ে গেল এমনভাবে!

ইনস্পেকটর, তুলসীর বাবা আর পুলিশ এদিকে জঙ্গলে ঢুকল।

এপাশে শরবন। মানুষ-সমান উঁচু। মোটা মোটা বিরাট আকারের গাছ। দিনের বেলাতেই ঝিঁঝি ডাকছে।

বেশ কিছুটা ভিতরে গিয়ে ইনস্পেকটর দাঁড়িয়ে পড়ল।

তুলসীর বাবার দিকে ফিরে আঙুল দেখিয়ে বলল, এই দেখুন।

তুলসীর বাবা দেখল।

এখান থেকে শর গাছগুলো মাটির ওপর শুয়ে পড়েছে। বুঝলেন কিছু?

তুলসীর বাবা বললেন, এখান দিয়ে একটা গাড়ি গেছে।

ঠিক। মনে হয় কোনওরকমে আপনার ছেলেকে ধরে নিয়ে কেউ গাড়ি করে এখান দিয়ে গিয়েছে।

তুলসীর বাবা অবাক!

কিন্তু তুলসীকে এভাবে নিয়ে গেল, সে একটু চেঁচামেচিও করল না?

ইনস্পেকটর বলল, হয়তো চেঁচাবার সুযোগ সে পায়নি। তার মুখ চেপে ধরে তুলে নিয়ে গেছে।

এখন উপায়?

ইনস্পেকটর তুলসীর বাবার প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে পাশে দাঁড়ানো একজন পুলিশকে নির্দেশ দিল, যাও আমাদের জিপটা নিয়ে এসো।

জিপ আসতে সবাই উঠে বসল।

খুব দ্রুত চলা সম্ভব নয়। উঁচু-নিচু জমি। জিপ আস্তে আস্তে চলতে শুরু করল।

অনেকটা যাবার পর জঙ্গল শেষ হল। পায়ে চলা আঁকাবাঁকা পথ। তার ওপর স্পষ্ট টায়ারের দাগ দেখা গেল।

এবার জিপ একটু দ্রুতগতিতে ছুটল।

দূরে নীলচে পাহাড়। আশপাশে বসতির চিহ্ন নেই। মাঝে মাঝে কাঁটাঝোপ, কালো কালো পাথরের স্তূপ।

জিপের মধ্যে কেউ কোনও কথা বলছে না।

তুলসীর বাবার কথা বলবার শক্তি নেই। তার মনের মধ্যে ঝড় বয়ে চলেছে। বাড়িতে গিয়ে কী বলবে। কুমুদের সন্ধানে এসে এত কষ্টে ফিরে-পাওয়া ছেলেকে আবার হারাতে হল!

ইনস্পেকটর হাত তুলে শুধু সামনের দিকে দেখাল।

বেশ কয়েক গজ আগে একটা বিরাট কালো পাথরের আড়ালে একটা মোটরের পিছনদিকের কিছুটা দেখা যাচ্ছে।

হালকা নীল রঙের মোটর। দেখে মনে হচ্ছে, পিছনে কে একজন বসে রয়েছে। হালদে রঙের শার্ট পরনে।

তুলসীর বাবা সব ভুলে চেঁচিয়ে উঠল, ইনস্পেকটর, ওই তো আমার তুলসী রয়েছে গাড়িতে। যেমন করে পারুন, ওকে উদ্ধার করুন।

ইনস্পেকটর ভুরু কুঁচকে বলল, আঃ, চেঁচাবেন না। মোটরটা ওভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে কেন বুঝতে পারছি না।

কথা শেষ করেই কোমর থেকে ইনস্পেকটর রিভলভার বের করে জিপ থেকে নেমে পড়ল, তারপর দু-এক পা এগিয়ে সামনের মোটর লক্ষ করে ট্রিগার টিপল।

গুড়ুম করে শব্দ।

গাছের ডালে বসা কয়েকটা পাখি চিৎকার করে আকাশে উড়ে গেল।

গুলি সামনের মোটরের পিছনের একটা টায়ারে গিয়ে লাগল।

আবার একটা শব্দ। টায়ার ফেটে হাওয়া বের হয়ে গেল।

মোটর কেঁপে উঠে একদিকে সামান্য কাত হয়ে গেল।

ইনস্পেকটর পুলিশের দিকে ফিরে বলল, আমার পিছন পিছন এসো।

তারা বন্দুক তুলে ধরে ইনস্পেকটরকে অনুসরণ করল।

তুলসীর বাবা চুপচাপ জিপে বসে রইল।

তার ধারণা হল পুলিশরা মোটরের কাছাকাছি গেলেই মোটর থেকে গুলিবৃষ্টি শুরু হবে। কিন্তু সেরকম কিছুই হল না।

ইনস্পেকটর মোটরের পাশে গিয়ে উঁকি দিয়ে কী দেখল, তারপর হাত নেড়ে তুলসীর বাবাকে ডাকল।

তুলসীর বাবা জিপ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মোটরের দিকে গেল।

ইনস্পেকটর পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে নিয়ে বলল, শয়তানরা আমাদের আচ্ছা ঠকিয়েছে মশাই, এই দেখুন।

তুলসীর বাবা মোটরের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে দেখল তুলসীর শার্টটা একটা কঞ্চির মধ্যে ঢুকিয়ে পিছনের সিটে বসিয়ে রাখা হয়েছে। একটু দূর থেকে মনে হয়, তুলসীই বসে আছে।

স্টিয়ারিংয়ের হাতলে একটা কাগজ আটকানো। তাতে হিন্দিতে এক লাইন লেখা।

পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধু পুলিশ।

রাগে ইনস্পেকটরের মুখটা থমথম করতে লাগল।

দাঁতে দাঁত চেপে বলল, শয়তানদের একবার ধরতে পারলে উচিত শিক্ষা দেব।

মোটরের সিট তুলে পিছনের ডালা খুলে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল। কোথাও কিছু পাওয়া গেল না।

দুজন পুলিশ ঠেলে মোটরটা রাস্তার ওপর দাঁড় করাল।

ইনস্পেকটরের চালকের সামনে বসে চালাবার অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু সফল হল না।

ইনস্পেকটরের সন্দেহ হতে মোটর থেকে নেমে বনেট খুলেই মাথায় হাত দিয়ে বসল।

ইঞ্জিনটা ঘা মেরে অকেজো করে রেখে গেছে।

তাহলে এখান থেকে শয়তানগুলো গেল কোথায়!

চারপাশে একটু মাটি নেই, কেবল কালো কালো পাথরের স্তূপ। পাথরের ওপর পায়ের ছাপ পড়া সম্ভব নয়।

ইনস্পেকটরের পাথরের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলল। পিছনে আর সবাই।

তুলসীর বাবাও চলতে শুরু করল বটে, কিন্তু সে ভীষণ অন্যমনস্ক।

তার একমাত্র চিন্তা বাড়ি ফিরে সবাইকে কী বলবে।

তুলসীকে পেয়েও হারাল, এর জন্য তার নির্বুদ্ধিতাকেই সবাই দায়ী করবে। সে যদি তুলসীকে ছেড়ে না যেত, তাহলে এমন সর্বনাশ হত না।

একসময়ে পথ শেষ হল। পথ ঠিক নয়, পর পর কালো পাথরের স্তূপ।

তারপরই বিরাট এক নদী।

ওপার দেখা যায় না। গেরুয়া রঙের জল। দু-একটা নৌকা দেখা যাচ্ছে।

ইনস্পেকটর তুলসীর বাবার দিকে ফিরে বলল। এখান দিয়ে আপনার ছেলেকে পাচার করেছে। বোধহয় ঘাটে ওদের নৌকা বাঁধা ছিল।

তুলসীর বাবা কোনও উত্তর দিল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

ইনস্পেকটর বলল, চলুন ফিরে যাই। ওই মোটরটা নিয়ে থানায় গেলেই কার মোটর সে সম্বন্ধে পাত্তা পাওয়া যাবে।

সবাই ফিরে এল।

জিপের মধ্যে দড়ি ছিল, তা-ই দিয়ে জিপের সঙ্গে মোটরটা বাঁধা হল। একজন পুলিশ মোটরের স্টিয়ারিং ধরে বসল।

থানায় পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টা লেগে গেল।

ও অঞ্চলের বেশ বড়ো থানা।

বড়ো দারোগা মন দিয়ে সব শুনল, তারপর বলল, এদিকে মূর্তি চোরের কথা তো বিশেষ শুনিনি। এমনিই চোর-ডাকাত আছে। মাঝে মাঝে ডাকাতির সঙ্গে মানুষ খুনের খবরও আসে।

ইনস্পেকটর বলল, এ মোটরটা কার নামে আছে, তার নাম-ঠিকানার খোঁজ করে দেখুন তো। আমরা তার আস্তানায় হানা দিই।

বড়ো দারোগা একটা কাগজে নম্বরটা লিখে নিয়ে বলল, ঠিক আছে, আমি ফোন করে দেখছি।

ইনস্পেকটর, পুলিশ আর তুলসীর বাবাকে নিয়ে এক হোটেলে গেল। সকাল থেকে খাওয়া নেই। শরীর খুব দুর্বল লাগছে।

তুলসীর বাবা খাবারের থালার সামনে নামমাত্র বসল। বিশেষ কিছুই মুখে তুলতে পারল না।

তুলসীর কথা মনে পড়তে লাগল। ছেলেটা যখন আবার শয়তানদের পাল্লায় পড়েছে, তখন তাকে সহজে ছাড়বে বলে মনে হয় না।

কে জানে হয়তো মেরেই ফেলবে, কারণ আগের বার পালাবার সময় তুলসী একজনকে ঘায়েল করেছিল।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে সবাই আবার থানায় ফিরে এল।

বড়ো দারোগা নেই। খেতে গেছে। একটু পরেই এসে হাজির হল।

কী, মোটরের মালিকের নাম-ঠিকানা পেলেন?

বড়ো দারোগা গম্ভীর মুখে বলল, লোকগুলো অত্যন্ত পাজি।

ইনস্পেকটর বলল, নামটা বলুন, লিখে নিই।

নামটা নিয়ে কী করবেন? মোটরে ঝুটা নম্বর লাগিয়েছে।

ঝুটা নম্বর?

হ্যাঁ, ও নম্বর এস. ডি. ও. সায়েবের মোটরের।

সবাই চুপ।

তুলসীর বাবা বুঝতে পারল, বেশ বুদ্ধিমান দলের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হবে। এরা সাধারণ দল নয়।

আর কিছু করার নেই। সবাই ফিরে যাওয়াই ঠিক করল।

সারাটা পথ কেউ কোনও কথা বলল না।

তুলসীর বাবা বাড়ি ফিরে দেখল, কুমুদের বাবা অপেক্ষা করছেন।

তুলসীর বাবাকে একলা আসতে দেখে কুমুদের বাবা ব্যগ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, তুলসী কই?

তুলসীর বাবা মাথা নিচু করে বলল, ভিতরে চলুন, সব বলছি।

সব শুনে কুমুদের বাবা গম্ভীর হয়ে গেলেন।

একটু পরে বললেন, আমি তো ব্যাপারটা ভালো বুঝছি না। কুমুদ আর তুলসীকে জীবন্ত ফিরে পাব, এমন ভরসা খুবই কম।

খবর শুনে তুলসীর মা কাঁদতে শুরু করেছিল। কুমুদের বাবা মেয়েকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, কেঁদে আর কী হবে। যাহোক একটা ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে।

তারপর জামাইয়ের দিকে ফিরে বললেন, তুমি আমার সঙ্গে কলকাতায় চলো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।

ট্রেনেই তিনি কথাটা বললেন, তুমি পারিজাত বক্সীর নাম শুনেছ?

বিখ্যাত গোয়েন্দা?

হ্যাঁ, আমি ভাবছি, তাঁর কাছে একবার যাব। পুলিশ যেমন তল্লাশি চালাচ্ছে, চালাক। পারিজাত বক্সী যদি কেসটা হাতে নেন, বেঁচে যাই।

কিন্তু উনি তো শুনেছি খুব ব্যস্ত লোক।

ব্যস্ত তো বটেই, তবে ওঁর স্ত্রী-র আমি একবার চিকিৎসা করেছিলাম। খুব সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে তুলেছিলাম। সেই সময় পারিজাতবাবু বলেছিলেন, যদি কখনো আমাকে আপনার কোনও প্রয়োজন হয় জানাবেন।

বেশ তো তা-ই করুন। যা করবেন, একটু তাড়াতাড়ি করাই ভালো। দেরি হলে কী সর্বনাশ হয়ে যাবে, আমি ভাবতেই পারছি না।

কুমুদের বাবা বললেন, বাড়ি পৌঁছেই পারিজাতবাবুকে ফোন করব। যদি তাঁর অসুবিধা না থাকে তাহলে আজ বিকালেই তাঁর সঙ্গে দেখা করব। আমিও এ বিষয়ে তোমার সঙ্গে একমত, দেরি করলে ক্ষতিই হবে।

সন্ধ্যা সাতটায় পারিজাত বক্সীর সঙ্গে দেখা করার কথা। কুমুদের বাবা জামাইকে সঙ্গে নিয়ে ছ-টার মধ্যেই তাঁর বাড়ি হাজির।

চাকর তাদের বাইরের ঘরে বসিয়ে বলল, একটু অপেক্ষা করুন, বাবু ঠিক সময়ে আসবেন।

ছোটো সাজানো বসবার ঘর। দেয়ালে অনেকগুলো ছবি। সবই প্রাকৃতিক দৃশ্যের। একটি ফোটো পারিজাত বক্সীর। বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। তীক্ষ্ন দুটি চোখ।

তুলসীর বাবা টেবিলের ওপর রাখা একটা পত্রিকা নিয়ে পাতা ওলটাচ্ছিল। কুমুদের বাবা চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে ছিলেন।

দুজনেরই মনের অবস্থা দারুণ খারাপ। এক-এক মুহূর্তের দাম অনেক বেশি।

ঘড়িতে সাড়ে ছ-টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পরদা ঠেলে একটা লোক ঘরের মধ্যে ঢুকল।

পরনে দামি সিল্কের লুঙ্গি, গায়ে কাজ করা ফিনফিনে পাঞ্জাবি, গলায় রঙিন রুমাল বাঁধা। অল্প দাড়ি রামছাগলের মতন। পানের রসে ঠোঁট রাঙা।

লোকটা ঢুকেই কুমুদের বাবার দিকে ফিরে বলল, সেলাম ওয়ালেকুম ডাক্তার সায়েব। আপনি সময়ের একটু আগেই এসে গেছেন।

কুমুদের বাবা তো অবাক। কে এই লোকটা? তাঁর এখানে আসবার কথা জানলই বা কী করে?

একটু বসুন, আমি আসছি। লোকটা ভিতরের দিকে চলে গেল।

তুলসীর বাবা প্রশ্ন করল, কে লোকটা?

কুমুদের বাবাও সেই কথাই চিন্তা করছিলেন। হঠাৎ তাঁর কী মনে হতে তিনি বললেন, ইনি পারিজাত বক্সী নন তো? শুনেছি পারিজাতবাবু অদ্ভুত ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারেন। তাঁর আত্মীয়স্বজনই তাঁকে চিনতে পারে না।

ঠিক সাতটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পারিজাত বক্সী ঘরে ঢুকলেন। পরনে পাঞ্জাবি- পাজামা।

একটা কৌচে বসে বললেন, কী হয়েছে বলুন ডাক্তার সায়েব।

কুমুদের বাবা পারিজাতবাবুর সঙ্গে নিজের জামাইয়ের পরিচয় করে দিয়ে বললেন, বড়ো বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।

সব খুলে বলুন। দেখি কী করতে পারি।

কুমুদের বাবা সবিস্তারে সব বললেন।

পারিজাতবাবু দু-গালে দুটো হাত রেখে গভীর মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন, তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, যে মূর্তি দুটো চুরি গেছে তার বিশেষত্ব কী?

এবার তুলসীর বাবা বলল, দুটো মূর্তিই মুণ্ডহীন। সেটা সম্ভবত কোনও কালাপাহাড়ের কীর্তি, আর দুটো মূর্তিই কী ধাতুতে তৈরি জানি না, মনে হয় জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

পারিজাতবাবু কিছুক্ষণ কী ভাবলেন, তারপর প্রশ্ন করলেন, যে মন্দিরে মূর্তি দুটো ছিল, সেটা কি কোনও নদীর ধারে?

তুলসীর বাবা মাথা নাড়ল, না নদী নয়। মন্দিরটা পদ্মদিঘির ধারে। বিরাট দিঘি অবশ্য।

পারিজাতবাবু উঠে সামনের আলমারি খুলে কিছুক্ষণ খুঁজলেন, তারপর মোটা একটা বই বের করে পাতা ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় থেমে গেলেন। নিবিষ্টচিত্তে কিছু সময় পড়ে নিয়ে বললেন, এখন যেটা পদ্মদিঘি সেটার সঙ্গে একসময়ে সাগরের যোগাযোগ ছিল। পদ্মদিঘি ছিল বিদ্যাপতি নদী। বণিকরা তাদের জিনিসপত্র নিয়ে ওই পথে যাওয়া-আসা করত। কাজেই মূর্তি দুটো তাদের খুব কাজে লাগত।

পারিজাতবাবুর কথাবার্তা কুমুদের বাবা আর তুলসীর বাবা কারোই মোটে ভালো লাগল না।

কোথায় হারানো দুটো ছেলের অনুসন্ধান করার পথ বাতলাবে, তা নয়, দেশের ভৌগোলিক তথ্য নিয়ে ভদ্রলোক মাথা ঘামাচ্ছেন। মূর্তি দুটোর বিশেষত্ব শুনেই বা লাভ কী?

পকেট থেকে মূর্তি দুটোর ফোটো বের করে তুলসীর বাবা পারিজাতবাবুর হাতে দিয়ে বলল, এই দেখুন, মূর্তি দুটোর ফোটো।

সাগ্রহে পারিজাতবাবু হাত বাড়িয়ে ফোটোটা নিয়ে বললেন, ফোটো এনেছেন, অনেক ধন্যবাদ।

তুলসীর বাবা আর থাকতে পারলেন না। বলে ফেলল, ছেলে দুটির ফোটোও এনেছি। দেখবেন না?

পারিজাতবাবু মুখ না তুলেই বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দেখব। এখন আপনার কাছে রাখুন।

ফোটোটা মন দিয়ে দেখে পারিজাতবাবু বললেন, আমার মনে হয় মূর্তি দুটো গ্যালেনা পাথর দিয়ে তৈরি। এ পাথর সিংভূমের জঙ্গলে প্রচুর পাওয়া যায়। অনেকে একে সোনা বলে ভুল করে।

কুমুদের বাবা প্রশ্ন করলেন, তাহলে কি লোকগুলো সোনার মূর্তি ভেবে ও দুটো চুরি করে নিয়ে গেল?

পারিজাতবাবু হেসে মাথা নাড়লেন, না। এইসব মূর্তি চোরদের জ্ঞান আপনার আমার চেয়ে অনেক বেশি, অন্তত এসব বিষয়ে। তারা মূর্তির জন্যই মূর্তি চুরি করে। এসব মূর্তি বেশির ভাগই আমেরিকা চালান যায়। সেখানকার কোটিপতিরা প্রচুর মূল্য দেয় এসবের জন্য।

তুলসীর বাবা আবার বলে ফেলল, তা তারা যা ইচ্ছা করুক, কিন্তু আমাদের ছেলে দুটোকে এভাবে ধরে নিয়ে গেল কেন?

পারিজাতবাবু ভ্রূ কুঁচকে কী ভাবলেন, তারপর বললেন, সম্ভবত তাদের ধারণা হয়েছে ছেলে দুটি পুলিশের চর। সেইজন্য তারা দুজনে লরিতে উঠেছিল। যাক মূর্তি সম্বন্ধে যা বলছিলাম শুনুন। এসব মূর্তি নদীতে আলোকসংকেতের কাজ করে। জাহাজকে সাবধান করে দেয়। এর জ্যোতি দেখে নাবিকরা বুঝতে পারে তীরভূমি কাছেই। সেখানে অল্প জল, মাঝদরিয়া দিয়ে যাওয়াই মঙ্গল। এরকম মূর্তির খোঁজ বিদেশেও দু-এক জায়গায় পাওয়া গেছে। সেগুলোও গ্যালেনা পাথরের তৈরি।

একটু থেমে পারিজাতবাবু হাত বাড়ালেন, দিন, ছেলেদের ফোটোটা দেখি।

তুলসীর বাবা ফোটোটা তাঁর হাতে তুলে দিল।

একই ফোটোতে পাশাপাশি দুজন দাঁড়িয়ে। কুমুদ আর তুলসী।

একবার চোখ বুলিয়েই পারিজাতবাবু বললেন, এরা তো খুব ছেলেমানুষ দেখছি। আপনারা একটা কাজ করুন।

কী বলুন?

এদের ফোটো দিয়ে খবরের কাগজে ছাপিয়ে দিন, এরা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে পরীক্ষায় ফেল করার জন্য। যে এদের খোঁজ দিতে পারবে তাকে দুশো টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।

কুমুদের বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, তাতে লাভ কী হবে?

লাভ এই হবে যে, মূর্তি চোরেরা অন্তত এটা বুঝতে পারবে যে এরা পুলিশের চর নয়, নেহাত কৌতূহলবশত লরির ওপর চড়েছিল।

এবার তুলসীর বাবা অশ্রু-জড়ানো গলায় বলল, কিন্তু ছেলে দুটো কি বেঁচে আছে?

উত্তর দেবার আগেই পাশের ঘর থেকে ফোনের ঝংকার শোনা গেল। পারিজাতবাবু উঠে গেলেন।

মিনিট তিন-চার পরে যখন ফিরে এলেন, তখন মুখটা থমথম করছে।

বসতে বসতে বললেন, এইমাত্র মূর্তি চোরের দলের একজন ফোনে আমাকে শাসাল। আমি যদি এ কেসে হাত দিই, তাহলে সাত দিনের মধ্যে আমাকে খতম করে দেবে।

কুমুদ চোখ খুলে দেখল বিরাট আকারের কালো পাথরের মাঝখানে তার দেহ আটকে রয়েছে।

চারদিকে প্রবল জলস্রোত। তীব্র বেগে জল এসে পাথরের ওপর আছড়ে পড়ছে। আওয়াজে কান পাতা দায়।

কোনওরকমে পাথর আঁকড়ে ধরে কুমুদ তার ওপর উঠে বসল। এদিক-ওদিক চোখ ফিরিয়ে দেখল।

কাঠের পুলটা ভেঙে জলের মধ্যে পড়েছে। লরির চিহ্ন কোথাও নেই।

আর-একটা ব্যাপার কুমুদ সবিস্ময়ে লক্ষ করল। লরিটা ভেঙে পড়ার সময়ে ধাক্কায় তার হাত-পায়ের বাঁধন ছিঁড়ে গেছে।

খুব সাবধানে কুমুদ পাথরের ওপর উঠে দাঁড়াল।

কোনওদিকে লোকালয়ের কোনও চিহ্ন নেই। কেবল মাঠ আর মাঠ। অনেক দূরে অস্পষ্ট পাহাড়ের শ্রেণি।

পাথরের ওপর পা দিয়ে দিয়ে ডাঙায় পৌঁছানো সম্ভব, কিন্তু পাথরের গায়ে যেমন শ্যাওলা পড়েছে, তাতে পা পিছলে যাবার সম্ভাবনা খুবই বেশি।

কিন্তু এভাবে পাথরের ওপর তো বসে থাকা যায় না।

কুমুদ পা টিপে টিপে ডাঙার দিকে যেতে শুরু করল। দু-একবার জলের মধ্যে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। ডাঙায় লাফিয়ে পড়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইল। তার ওঠার ক্ষমতা নেই।

একসময়ে মনে হল যদি দলের লোকগুলোর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়!

লরি স্রোতের সঙ্গে যদি ভেসে গিয়ে থাকে তাহলে লরি আঁকড়ে লোকগুলোও হয়তো ভাসবে।

রাস্তা ধরে চলাও নিরাপদ নয়। আগের লরি ওই পথেই যাবে। পিছনে লরিটাকে অনুসরণ না করতে দেখলে তারা হয়তো সন্দেহবশে খোঁজ করতে পিছিয়ে আসবে।

তার চেয়ে কোনাকুনি মাঠ ধরে চলাই ভালো।

একটানা চলতে কুমুদের খুব কষ্ট হতে লাগল। খিদের জ্বালায় চোখে অন্ধকার দেখছে। তেষ্টায় তালু শুকিয়ে কাঠ। রোদ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। পথ চলাই দুষ্কর।

বেশ কিছুটা চলার পর একটা কুঁড়েঘর চোখে পড়ল।

কাছে গিয়ে দেখল এক বৃদ্ধ দাওয়ায় বসে হুঁকো টানছে।

কুমুদকে দেখেই হুঁকো একপাশে সরিয়ে রেখে বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করল, কে তুমি? এখানে কী চাই?

কুমুদ কোনও উত্তর দিতে পারল না। উঠানের ওপর বসে পড়ে ইঙ্গিতে জলের কথা জানাল।

বৃদ্ধ চিৎকার করল, এ পার্বতীয়া, এক লোটা জল নিয়ে আয়।

এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এসে কুমুদকে দেখে আবার ভিতরে চলে গেল।

একটু পরেই বেরিয়ে এল শালপাতার ওপর দুখানা রুটি আর গুড়, আর এক হাতে এক লোটা জল নিয়ে।

কুমুদ রুটি দুটো বৃদ্ধার হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে একনিমেষে শেষ করে ফেলল, তারপর ঢকঢক করে সব জল খেয়ে যেন একটু ধাতস্থ হল।

এবার বৃদ্ধ আবার জিজ্ঞাসা করল, কে তুমি? এখানে এলে কী করে?

বৃদ্ধের দেহাতি হিন্দি বুঝতে কুমুদের খুব অসুবিধা হল না, কারণ তাদের বাড়ির চাকরবাকর প্রথম প্রথম এ ধরনের হিন্দিই বলত।

কুমুদ উত্তর দিল, আমি কলকাতায় যাব। এখানে বদমায়েশ লোকের পাল্লায় পড়েছিলাম।

বদমায়েশ লোক? মানে ডাকু?

হ্যাঁ, সেইরকমই।

বৃদ্ধ মাথা নাড়ল, এ এলাকাটা বড়ো খারাপ বাবু। ওদিকের জঙ্গল হচ্ছে ডাকুর আস্তানা। তা তোমার টাকাপয়সা সব কেড়ে নিয়েছে?

হ্যাঁ, সব।

কী করে কলকাতায় যাবে বাবু? সে শহর তো এখান থেকে অনেক দূর।

এ জায়গার নাম কী?

এর নাম চৌতারিয়া। স্টেশন এখান থেকে চব্বিশ মাইল। ছোটো স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেন বদলে পাটনা যেতে হবে। পাটনা থেকে কলকাতা। আমার ছেলেরা সব কলকাতা দরোয়ানি করে। তাদের মুখে শুনেছি ভারী শহর কলকাতা। সেখানে কল টিপলে আলো, মেশিন ঘোরালেই জল। তা-ই না বাবু?

এসব কথার উত্তর দিতে কুমুদের ভালো লাগছিল না।

তবু সে ঘাড় নেড়ে বলল, ঠিক কথা।

এসব তো হল। কিন্তু যাওয়ার কী ব্যবস্থা হবে? চব্বিশ মাইল রাস্তা কুমুদের পক্ষে পায়ে হেঁটে যাওয়া অসম্ভব। তার ওপর পকেটে একটি ফুটো পয়সাও নেই। রেলভাড়া দেবে কী করে?

কুমুদের অসুবিধার কথা বোধহয় বৃদ্ধ বুঝতে পারল।

একটা কাজ করো। আজকের দিনটা কোনওরকমে এখানে কাটাও। কাল সকালে কাঠ-বোঝাই লরি যাবে শহরের দিকে। ড্রাইভার আমার জানা। সে তোমাকে স্টেশনে পৌঁছে দেবে। তারপর কী করে তুমি কলকাতা যাবে বাপু তা তো জানি না।

কুমুদ বলল, অনেক ধন্যবাদ, তুমি আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দাও, তারপর আমার ব্যবস্থা আমি করে নেব।

কুমুদ মনে মনে ঠিক করল, একবার স্টেশনে পৌঁছাতে পারলে স্টেশন মাস্টারের হাতে-পায়ে ধরে রেলে যাবার ব্যবস্থা করবে। নিতান্ত যদি তা না সম্ভব হয় তাহলে স্টেশন থেকে বাবাকে টেলিগ্রাম করে দেবে, তাহলেই একটি উপায় হয়ে যাবে।

পরের দিন খুব ভোরে বৃদ্ধ কুমুদকে জাগিয়ে দিল। কুমুদ চোখ খুলে দেখল, হাতে লাঠি, মাথায় পাগড়ি, বৃদ্ধ তৈরি।

দুজনে হেঁটে হেঁটে রাস্তার ধারে গিয়ে দাঁড়াল।

ইট-বোঝাই গোটা দুয়েক লরি গেল, বৃদ্ধ তাদের থামাল না।

তারপরই কাঠ-বোঝাই একটা লরি আসতে বৃদ্ধ পাগড়ি খুলে মাঝরাস্তায় দাঁড়াল। পাগড়িটা বাতাসে নাড়তে লাগল।

সশব্দে ব্রেক কষে লরি থামল।

ড্রাইভার জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল, রাম রাম ভাইয়া। কেয়া খবর?

বৃদ্ধ কুমুদকে দেখিয়ে কী বলতেই ড্রাইভার দরজা খুলে বলল, আইয়ে।

কুমুদ উঠতে গিয়েই বাধা পেল। বৃদ্ধ পিছন থেকে তার একটা হাত আঁকড়ে ধরেছে।

বাবু, আমি গরিব আদমি। আমার কিছু নেই। আপনি এটা রেখে দিন।

কুমুদ কিছু বলবার আগেই বৃদ্ধ তার হাতে একটি পাঁচ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে হনহন করে মাঠ ধরে নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।

কুমুদের চোখে জল এসে গেল।

বৃদ্ধ লোকটি হয়তো তার অনেক দিনের কষ্টে সঞ্চিত টাকাটা তার হাতে তুলে দিল।

ড্রাইভার হিন্দিতে কুমুদকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি যাবেন কোথায়?

কোনও একটা রেল স্টেশনে আমাকে নামিয়ে দাও।

ড্রাইভার আর কিছু বলল না। তিরবেগে লরি ছোটাল।

ঘণ্টা চারেক বাদে লরি থামল।

ইতিমধ্যে এক জায়গায় লরি থামিয়ে ড্রাইভার চা আর রুটি খেয়ে নিয়েছে।

কুমুদও বৃদ্ধের দেওয়া পাঁচ টাকা ভাঙিয়ে খেয়েছিল!

লরি থামতে ড্রাইভার বলল, এই রাস্তা ধরে চলে যান বাবু। মাইল দুয়েক গেলেই স্টেশন পেয়ে যাবেন।

কুমুদ চলতে আরম্ভ করল। দু-পাশে ছোটো ছোটো কুঁড়ে। শুয়োর আর মুরগির পাল ঘুরছে। পিছনে গমের খেত।

অনেকটা যাবার পর রেলের লাইন দেখা গেল। তারপর স্টেশন।

খুব ছোটো। বোধহয় এখান থেকে বেশি লোক ওঠানামা করে না, প্ল্যাটফর্ম জনশূন্য।

টিকিটঘরের সামনে গিয়ে দেখল দরজায় তালাবন্ধ।

এধারে নীল শার্ট গায়ে একটা লোক বসে ছিল। হাতে গোটানো লাল-নীল নিশান।

কুমুদ বুঝতে পারল লোকটা পোর্টার।

তার সামনে গিয়ে কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, ভাই, ট্রেন কখন আসবে?

কোথায় যাবেন?

পাটনা।

আজ আর ট্রেন নেই। শেষ ট্রেন বেলা বারোটা পঞ্চাশে ছেড়ে গেছে।

কোনও ট্রেন নেই?

মালগাড়ি আছে। এখান থেকে কাঠ বোঝাই হয়ে ছাড়বে।

স্টেশন মাস্টার আসবে না?

না। সেই রাত্রে একবার আসবে। মালগাড়ি ছাড়বার সময়।

কুমুদ মহাসমস্যায় পড়ল।

স্টেশনের গায়ে ছোটো একটা চায়ের দোকান। অগত্যা এক পেয়ালা চায়ের আশায় সেখানে গিয়ে হাজির হল।

বাচ্চা একটা ছোকরা বেঞ্চের ওপর অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ঠেলে ঠেলে কুমুদ তাকে উঠিয়ে চায়ের অর্ডার দিয়ে একটা বেঞ্চে বসল।

আপনাকে বাঙালি বলে মনে হচ্ছে।

এই বিদেশে বাংলা কথা শুনে কুমুদ চমকে মুখ ফেরাল।

পরনে খাকি শার্ট আর হাফ প্যান্ট। মাথায় শোলার টুপি। গায়ের রং কয়লার মতন। জবা ফুলের রং দুটি চোখের।

কুমুদ ফিরতেই লোকটা দুটো হাত বুকের কাছে জড়ো করে বলল, নমস্কার।

কুমুদ প্রতিনমস্কার করে বলল, হ্যাঁ, আমি বাঙালি।

নাম?

কুমুদ নাম বলল।

নিবাস?

নিবাসও কুমুদ বলল।

এখানে আগমনের হেতু?

লোকটার প্রশ্নের যেন আর শেষ নেই।

কুমুদ উত্তর দিতে ইতস্তত করছে দেখে লোকটাই বলল, বুঝতে পেরেছি। আমার কাছে লুকোতে পারবেন না। তা মনের মতন কিছু পেলেন?

কুমুদ বিপদে পড়ল। কী বুঝেছে লোকটা, কুমুদ একেবারেই বুঝতে পারল না।

জঙ্গল দেখতে এসেছিলেন তো? কাঠের ব্যাবসা? শুনুন মশাই, আমি বিশ বছর এ লাইনে আছি। এদিককার সব জঙ্গল আমার নখদর্পণে। আমি এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।

কুমুদ ঠিক করে ফেলল এ ধরনের কথাবার্তা বেশি দূর এগোবার আগে আসল কথাটা বলে ফেলাই ভালো।

ইতিমধ্যে কুমুদের চা এসে গেছে। সঙ্গে বিস্কুট।

ভদ্রতার খাতিরে কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, আপনার?

ব্যস্ত হবেন না। আমাকে ওরা খুব চেনে। ঠিক দিয়ে যাবে।

সত্যি, একটু পরেই বড়ো পেয়ালায় চা এল।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে কুমুদ বলল, আমি খুব বিপদে পড়েছি।

বিপদ? কীরকম বিপদ বলুন তো?

আস্তে আস্তে কুমুদ সব বলল।

সব শুনে লোকটা বলল, আপনি প্রাণে বেঁচেছেন মশাই। খুব/বেঁচেছেন, ওই বদমায়েশরা আপনাকে খতম করে ফেলত।

কুমুদ বলল, আমাকে আপনি বলবেন না। আমার বয়স আঠারো।

আমার বয়স আটত্রিশ। ঠিক আছে, তুমিই বলব। তুমি কী করো?

এইবার হায়ার সেকেন্ডোরি পরীক্ষা দিয়েছি।

বাড়িতে কে আছে?

কুমুদ বলল।

বাবা কী করেন? তোমার জন্য নিশ্চয় তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

বাবা খুব নামকরা ডাক্তার। আমার জন্য চিন্তিত হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

তোমাদের কলকাতায় কি নিজের বাড়ি? মোটর আছে?

কুমুদ ঘাড় নাড়ল। হ্যাঁ, বাড়ি-গাড়ি দুইই আছে।

তাহলে একটা কাজ করো। আজ রাতটা ধর্মশালায় কাটিয়ে কাল পাটনা চলে যাও। সেখান থেকে কলকাতা। আমি তোমাকে সঙ্গে করে একেবারে বাড়ি পৌঁছে দেব।

কিন্তু একটা মুশকিল হয়েছে যে।

কী আবার মুশকিল হল?

আমার সঙ্গে রেলভাড়ার টাকা নেই।

কুমুদের কথা শেষ হবার আগেই দু-হাতে পেট চেপে লোকটা হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়ার জোগাড়।

কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, আরে, এ আবার একটা কথা হল। আমি সব খরচ দেব, তারপর কলকাতায় গিয়ে তোমার বাবার কাছ থেকে না হয় টাকাটা নিয়ে নেব। আর তারই বা দরকার কী। আমার পেটে একটা দারুণ ব্যথা হয়। দিন দুয়েক অজ্ঞানের মতন পড়ে থাকি। ডাক্তার দেখাবার ফুরসতই পাই না। তোমার বাবাকে দেখিয়ে একটা ব্যবস্থা করব। চলো, আমরা বেরিয়ে পড়ি।

লোকটা কুমুদকে চায়ের দাম কিছুতেই দিতে দিল না। তাকে প্রায় বগলদাবা করে রাস্তায় নামল।

প্রায় আধ মাইল যাবার পর ধর্মশালা মিলল।

জরাজীর্ণ একতলা। দেয়ালের ফাটলে ফাটলে বট-অশ্বত্থের চারা। বাইরের রং আগে কী ছিল, বোঝা মুশকিল।

কুমুদকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে লোকটা বলল, তুমি একটু অপেক্ষা করো, আমি ঘর খালি আছে কি না খোঁজ নিয়ে আসি।

কুমুদ একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়াল।

সে খুবই ভেঙে পড়েছিল। বাপের কাছে ফিরে যাবার কোনও উপায় পাচ্ছিল না। ভগবান সদয়। হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে এমন এক মহানুভব মানুষের উদয় হল।

তুলসীর কথা মনে হল। হয়তো এতদিনে তুলসী তার মা-বাপের কাছে ফিরে গেছে। কুমুদের জন্য নানা দিকে জোর তল্লাশি চলছে। পুলিশ তাকে খুঁজে বের করবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে।

লোকটা ফিরে এল।

এসো, এসো, তোমার ভাগ্য ভালো। ছোটো একটা ঘর পাওয়া গেছে। একটু বিশ্রাম করো, আমি তোমার বাবাকে একটা টেলিগ্রাম করে দিয়ে আসব।

লোকটার পিছন পিছন কুমুদ ধর্মশালায় ঢুকল।

সামনের ঘরে একটা টেবিল, একটা চেয়ার। চেয়ারে দশাসই চেহারার একটি লোক বসে। ফরসা গায়ের রং। কপালে লাল ফোঁটা। টিকিতে ফুল বাঁধা।

কুমুদ সামনে যেতেই লোকটা উঠে দাঁড়াল।

দুটো হাত বুকের ওপর জড়ো করে বলল, রাম রাম বাবুসায়েব। আসুন, আসুন। আপনার মতন লোকের জন্য এ ধর্মশালা নয়। চেহারাতেই মালুম হচ্ছে আপনি রইস আদমির ছেলে। কষ্ট করে থাকুন, আর কী করবেন।

কুমুদ লোকটার সঙ্গে আরও এগিয়ে গেল।

পিছনের আগাছার জঙ্গলের মধ্যে একটা একতলা বাড়ি।

দরজা খুলে লোকটা বলল, লালাজির কথা শুনলে তো। কোনওরকমে ক-টা দিন এখানে কাটাও, তোমার বাবা না-আসা পর্যন্ত। আমার মনে হয় খবর পেলেই তিনি নিজে ছুটে আসবেন।

কুমুদ ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখল, কোণের দিকে একটা দড়ির খাটিয়া।

এদিকে একটা কাঠের টেবিল আর চেয়ার। কোনও জানলা নেই, একেবারে ওপরে ছোটো একটা ঘুলঘুলি।

ঘরের চেহারা কুমুদের মোটেই ভালো ঠেকল না। এ ঘরও সেই আগের মতন, যে ঘরে তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

কুমুদ বলেই ফেলল, এ কীরকম ঘর? আলো-বাতাস আসবে কোথা থেকে? জানলা নেই।

লোকটা খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল।

এ দেশে যেমন গরম, তেমনই ঠান্ডা। এখানে কোনও ঘরে জানলা থাকে না। ওপরের ওই ছোটো ঘুলঘুলি দিয়ে প্রচুর আলো-বাতাস আসবে। নাও, তুমি একটু বিশ্রাম করো। আমি লালাজির কাছ থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসি।

কুমুদ নিজের ক্লান্ত দেহ কোনওরকমে টেনে এনে খাটিয়ার ওপর বসল।

বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারল না। আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ল।

গায়ে ঠেলা দিতে কুমুদ চমকে বিছানা থেকে উঠে বসল, অস্ফুট চিৎকার করে। সে স্বপ্ন দেখছিল। মূর্তি চোরের দল তাকে তাড়া করেছে। তাদের হাতে হাতে নানারকম অস্ত্র। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কুমুদ তিরবেগে ছুটছে। লোকগুলো তার নাগাল পাচ্ছে না।

হঠাৎ একটা গাছের শিকড়ে পা আটকে কুমুদ পড়ে যেতেই তারা তাকে ধরে ফেলল।

তাই কুমুদ ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছিল।

কী হল?

কুমুদ চোখ খুলে দেখল লোকটা এক হাতে একটা শালপাতার ঠোঙা নিয়ে খাটিয়ার একপাশে বসে আছে।

দু-হাতে চোখ মুছে কুমুদ বলল, বিশ্রী একটা স্বপ্ন দেখছিলাম।

নাও, খেয়ে নাও। ঠোঙাতে পুরি আর তরকারি আছে। আর এই লোটাতে গরম দুধ।

লোকটা মেঝের ওপর রেখে একটা লোটা তুলে খাটিয়ার ওপর রাখল।

কুমুদ আর তিলমাত্র দেরি করল না।

ঠোঙা আর তরকারি দুইই গরম। কুমুদ যেন অমৃতের স্বাদ পেল।

খাওয়া শেষ করে কুমুদ লোটাতে চুমুক দিল।

ঘন দুধ। বোঝা যায় একবিন্দু জল পড়েনি।

কুমুদ এবার বলল, একটু জল।

লোকটা তাড়াতাড়ি ছুটে বেরিয়ে গেল, একটু পরেই ভাঁড়ে জল নিয়ে ফিরল।

জল শেষ করে কুমুদ বলল, আপনার ঋণ জীবনে শোধ করতে পারব না।

লোকটা লজ্জায় মাথা নিচু করল। মৃদুকণ্ঠে বলল, ছি, ছি, ওসব কথা বলে আমাকে লজ্জা দিয়ো না। বাঙালির ছেলে বিদেশে বিপদে পড়েছ, তোমাকে দেখা আমার কর্তব্য। আমি সেইটুকুই করেছি। নাও, তোমার বাবার ঠিকানা বলো।

কুমুদ বলল।

লোকটা পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে তাতে লিখে নিতে নিতে বলল, আমি ভেবে দেখলাম টেলিগ্রাম করে লাভ নেই। অজ পাড়াগাঁ, টেলিগ্রাম কখন গিয়ে পৌঁছায় তার ঠিক নেই, তার চেয়ে চিঠি লেখাই ভালো। তুমি লেখো চিঠিটা।

কথার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা পকেট থেকে একটা কাগজ আর কলম বের করে কুমুদের সামনে রেখে বলল, নাও, আমি যেমন বলছি, সেরকম লিখে দাও। ঠিক কাজ হবে।

কুমুদ কাগজ টেনে নিয়ে কলম হাতে তৈরি হয়ে বসল।

লোকটা বলে গেল।

শ্রীচরণেষু বাবা,

পত্রপাঠমাত্র বাহকের হাতে দশ হাজার টাকা দিবেন, নতুবা আমার জীবন-সংশয়।

কিছুটা লিখেই কুমুদ থেমে গেল। জিজ্ঞাসা করল, এর মানে?

লোকটা অমায়িক হাসল।

কোন জায়গার মানে বুঝতে পারছ না বাবাজি? এ তো একেবারে সহজ বাংলা ভাষা। এ চিঠি নিয়ে যে যাবে, তার হাতে তোমার বাবা দশ হাজার টাকা তুলে দেবেন, না হলে তোমার জীবন্ত ফেরার কোনও আশা নেই।

আপনি যে এত নীচ তা তো বুঝতে পারিনি।

বাইরে থেকে আমরা আর কতটুকু বুঝতে পারি বলো। তোমার চেহারা দেখেই কি আর আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তুমি এত বড়োলোকের ছেলে! যাক, যা বলছি, তা লেখো। দেরি কোরো না।

যদি না লিখি?

তাহলে যাতে লেখো, তার ব্যবস্থা করতে হবে।

কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে কুমুদের প্রচণ্ড ঘুসি এসে পড়ল লোকটার কপালে।

লোকটা আর্তনাদ করে মেঝের ওপর পড়ে গেল।

কুমুদ আর কালবিলম্ব না করে খোলা দরজার দিকে ছুটে গেল।

কিন্তু বের হতে পারল না। দরজা আগলে লালাজি।

বেড়াল যেমন ইঁদুরকে তুলে নেয়, তেমনি করে সে কুমুদের ঘাড় ধরে তুলে ঘরের কোণে ছুড়ে ফেলে দিল।

টেবিলের সঙ্গে ধাক্কা লেগে কুমুদ পড়ে গেল।

কুমুদের মনে হল তার হাড়গোড় যেন চূর্ণ হয়ে গেল। সে আর উঠতেই পারবে না।

অনেক কষ্টে টেবিল ধরে দাঁড়িয়ে দেখল লালাজি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাতে চকচকে ছোরা।

অন্য লোকটা তখনও মাটিতে পড়ে রয়েছে।

লালাজি হুংকার ছাড়ল, এই শয়তান, যা বলা হয়েছে তা-ই লেখ, নইলে একেবারে খতম করে দেব।

কুমুদের আপত্তি করতে আর সাহস হল না।

আপত্তি করলে এই তেপান্তর মাঠে তাকে মেরে ফেললে কাকপক্ষীতেও জানতে পারবে না।

কুমুদ লিখল। প্রথমে চিঠি, তারপর খামের ওপর ঠিকানা।

ঠিকানা লেখা শেষ হতে দেখল, লোকটা মেঝের ওপর উঠে বসল। কপালের একটা পাশ সুপুরির মতন ফুলে উঠেছে।

লোকটা কাতর গলায় বলল, উঃ, শয়তান ছেলেটার ঘুসির জোর আছে। এখনও চোখে অন্ধকার দেখছি।

লালাজি এগিয়ে এসে চিঠিটা তুলে নিয়ে লোকটার হাতে দিয়ে বলল, দত্ত, দেখ তো বদমায়েশটা আমরা যা চাই, তা-ই লিখেছে কি না।

কুমুদ বুঝতে পারল লোকটার পদবি দত্ত।

দত্ত চিঠিটা মনোযোগ দিয়ে পড়ে বলল, হ্যাঁ ঠিকই আছে।

লালাজি বলল, তাহলে চিঠিটা নিয়ে তোমার যা করবার করো। আমি ছেলেটার তদারক করি। যদি শুনি এর বাপ টাকা দিতে অস্বীকার করেছে, কিংবা পুলিশের সাহায্য নেবার চেষ্টা করে, তাহলে ছেলের বাপকে ছেলেটার মুণ্ড পার্সেল করে পাঠাব।

এমন ভঙ্গিতে লালাজি কথাগুলো বলল, শুনেই কুমুদ শিউরে উঠল।

একটু পরেই দত্ত আর লালাজি বের হয়ে গেল। বাইরের দরজায় তালা দেবার শব্দ কুমুদের কানে এল।

কুমুদের ব্যায়ামপুষ্ট শরীর। তার বয়সি ছেলেদের তুলনায় সে অনেক শক্তিশালী। কিন্তু লালাজির শক্তির কাছে সে যে কিছুই নয় সেটা বুঝতে তার বেশি সময় লাগল না।

অসহ্য একটা যন্ত্রণা সারা দেহে। সে খাটিয়ার ওপর শুয়ে পড়ল।

সম্ভবত এই দত্ত তার বাবার কাছে চিঠিটা নিয়ে যাবে। চিঠিটা পড়েই তার বাবা দত্তর হাতে দশ হাজার টাকা তুলে দেবেন, এমন মনে হয় না।

বাবা কড়া আর বিচক্ষণ লোক। কলকাতা শহরে গণ্যমান্য লোকের সঙ্গে প্রচুর জানাশোনা। পুলিশমহলেও খাতির আছে। দত্তকে কোনওরকমে আটকে ঠিক পুলিশে খবর দেবেন।

সে খবর যখন লালাজির কানে আসবে তখন তার কী অবস্থা হবে ভাবতেই তার সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠল।

যতবার কুমুদ বিপন্মুক্ত হবার চেষ্টা করছে, ততবার সে নতুন বিপদে জড়িয়ে পড়ছে।

তুলসীর কথা মনে পড়ল।

এতদিনে হয়তো নিজের মা-বাবার কাছে ফিরে গেছে। কুমুদ কোথায় রয়েছে সেটা জানা তুলসীর পক্ষে সম্ভব নয়। হয়তো সেই পুরোনো আস্তানায় সে পুলিশ নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেখানে তো কাউকেই পাবে না।

একটু তন্দ্রার মতন এসেছিল, হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে সে উঠে বসল। একটা ছোকরা একটা বাটিতে তরকারি আর একটা থালায় ভাত নিয়ে ঢুকল।

লাল রঙের ভাত। তাও মনে হল আধসেদ্ধ। ভাতের চেহারা দেখে কুমুদের খেতে ইচ্ছা করল না।

কুমুদ বলল, শরীর খারাপ। খাব না।

ছোকরাটাকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি দেখে নিয়ে ভাবতে লাগল, একে মোক্ষম এটা ঘুসি মেরে কাবু করা শক্ত নয়, তারপর যদি ছুটে বেরিয়ে গিয়ে কোনওরকমে স্টেশনে আশ্রয় নিতে পারে, তাহলে বোধহয় এ যাত্রা বেঁচে যেতে পারে।

কী করবে ঠিক করার আগেই দরজায় লালাজির বিরাট দেহ দেখা গেল। সেই সঙ্গে বাজখাঁই গলার স্বর ভেসে এল।

এ রঘুয়া, কী বলছে শয়তানটা?

রঘুয়া পিছনদিকে ফিরে বলল, বলছে তবিয়ত খারাপ। খাবে না।

লালাজি ঘরে ঢুকল। কুমুদের কাছে এসে খিঁচিয়ে উঠল, ওসব বেয়াদবি আমার কাছে চলবে না। নে, খেয়ে নে।

রাগে-অপমানে কুমুদের মুখ লাল হয়ে উঠল। এভাবে কেউ কোনওদিন তার সঙ্গে কথা বলেনি।

একবার ভাবল, যা হবার হবে, সে প্রাণপণ শক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে লোকটার ওপর। কিন্তু কষ্টে সে নিজেকে সংযত করল। এখন এসব করতে গেলে তার ক্ষতি হবার সম্ভাবনা। নিশ্চয় লালাজি একলা নয়। তার অনেক অনুচর আছে। তারা কুমুদকে ছাড়বে না। তা ছাড়া, লালাজির দৈহিক শক্তির পরিচয় সে আগেই পেয়েছে। কুমুদ মাথা হেঁট করে খেতে আরম্ভ করল।

ভাত শক্ত, তরকারি অসম্ভব ঝাল।

কুমুদের চোখ থেকে টপ টপ করে জলের ফোঁটা পড়তে লাগল।

খাওয়া শেষ হতে রঘুয়া থালাবাটি নিয়ে গেল। একটু পরে ফিরল জলের গ্লাস নিয়ে।

জল খেয়ে কুমুদ ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল।

আশ্চর্যের ব্যাপার, দরজা বন্ধ হল না। খোলাই রইল।

কুমুদ পা টিপে টিপে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

টুল খালি। কেউ নেই।

কুমুদ উঁকি দিয়েই পিছিয়ে এল।

দত্ত আসছে, তার কপালে ব্যান্ডেজ।

মুখে শুকনো হাসি ফুটিয়ে বলল, ও কুমুদ, তোমার ঘুসির জোর আছে বটে। এখনও আমার মাথাটা ঘুরছে।

কুমুদ কোনও উত্তর দিল না। খাটিয়ায় গিয়ে বসল।

দত্ত এগিয়ে এসে খাটিয়ার এককোণে বসল।

মাথা দুলিয়ে বলল, কলকাতা শহর একটা গোলকধাঁধা। গলি, উপগলি, চোরাগলির শেষ নেই। কী করে হাওড়া স্টেশন থেকে তোমাদের বাড়ি যাব, একবার তার হদিশ দিয়ে দাও তো। হাজার হোক আমরা পাড়াগেঁয়ে লোক।

কুমুদ এবারেও কোনও কথা বলল না। চুপ করে রইল।

দত্ত ঠোঁট টিপে হাসল।

কী, বাবুর গোসা হয়েছে? আরে চুপ করে থাকলে তোমার নিজেরই ক্ষতি। চিঠিটা নিয়ে যাব, টাকাটা হাতে এলেই তোমাকে একেবারে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কেটে ট্রেনে চড়িয়ে দেব। বলে ফেলো, বলে ফেলো।

কুমুদও ভেবে দেখল, চুপ করে লাভ নেই। কথা বলাবার ওষুধ এদের কাছে আছে। তাই সে কত নম্বর বাসে হাওড়া থেকে উঠে কোথায় নামতে হবে সে কথা বুঝিয়ে বলল।

দত্ত একটা কাগজে সব লিখে নিল।

কুমুদের বাবা চুপচাপ বাইরের ঘরে বসে ছিলেন। ইদানীং তাঁর কিছু ভালো লাগে না। হাসপাতালে, চেম্বারে যান, রোগীও দেখেন, কিন্তু সব সময়ে কেমন অন্যমনস্কভাবে।

সর্বদা ছেলে দুটোর কথা চিন্তা করেন। পারিজাত বক্সীর কথামতো কাগজেও বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, কোনওদিক থেকে আজ পর্যন্ত কোনও সাড়া পাননি।

কুমুদের মা শয্যাশায়ী। প্রায় অন্নজল ত্যাগ করেছেন।

বাবু, ও বাবু।

চিৎকারে কুমুদের বাবা মুখ তুলে দেখলেন।

জানলার বাইরে একটা লোক। সাজপোশাক রিকশাচালক বলেই যেন মনে হল। হাতে ছোটো একটা ঘটিও রয়েছে।

কী চাই?

একটা চিঠি।

চিঠি? কুমুদের বাবা উৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন। তাহলে কি বিজ্ঞাপনের উত্তর নিয়ে কেউ এল?

লোকটা হয়তো রিকশায় বসে আছে। চালকের হাতে চিঠিটা পাঠিয়েছে।

ভিতরে এসো।

তাকে কুমুদের বাবা ঘরের মধ্যে আসতে বললেন। রিকশাচালক ভিতরে এসে চিঠিটা কুমুদের বাবার দিকে এগিয়ে দিল।

চিঠিটা যখন নিলেন তখন কুমুদের বাবা বুঝতে পারলেন তাঁর হাতের আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে।

চিঠিটা পড়তে পড়তে তাঁর মুখ আরক্ত হয়ে উঠল।

পনেরো দিনের মধ্যে দশ হাজার টাকা ইডেন গার্ডেনের প্যাগোডার চাতালে রেখে আসতে হবে। না রাখলে কুমুদকে খতম করে ফেলা হবে। টাকাটা রাখতে হবে সকাল সাতটা থেকে দশটার মধ্যে।

এইসঙ্গে কুমুদের হাতের চিঠিও রয়েছে। সে-ও জানিয়েছে দশ হাজার টাকা না দিলে তার প্রাণসংশয়।

কুমুদের হাতের লেখা তিনি খুব চেনেন। তাঁর ভুল হবার নয়।

এ চিঠি তোমাকে কে দিয়েছে?

মোড়ে এক বাবু ট্যাক্সিতে বসে আছেন। আমার হাতে দুটো টাকা দিলেন, আর বললেন, চিঠিটা লাল বাড়িতে যে ডাক্তার থাকেন তাঁকে দিয়ে আসতে।

চলো তো দেখে আসি।

কুমুদের বাবার পরনে ছিল গেঞ্জি আর পাঞ্জাবি। পোশাক পালটাবার কথা তাঁর আর মনে হয় না। সেইভাবেই তিনি বেরিয়ে পড়লেন।

রাস্তার ওপর রিকশা ছিল, চালক তাঁকে চড়তে বললেও তিনি রাজি হলেন না। গোটা ছয়েক বাড়ির পরেই চৌরাস্তা। এটুকু রাস্তা তিনি অনায়াসেই হেঁটে যেতে পারেন।

মোড়ের মাথায় কোনও ট্যাক্সি দেখা গেল না।

কোথায় ট্যাক্সি?

এইখানেই তো ছিল। বাবু অবশ্য থাকবেন এমন কথা বলেননি।

বাবুকে দেখতে কেমন?

খুব ফরসা, মোটাসোটা চেহারা।

বাঙালি?

সেইরকমই মনে হল।

কুমুদের বাবা আর দাঁড়ালেন না। হনহন করে বাড়িতে ফিরে এলেন।

এখন কী করবেন?

কুমুদের মা-কে জানালেই কান্নাকাটি শুরু হবে। তিনি বলবেন ছেলের জীবনের কাছে দশ হাজার টাকা কিছুই নয়। এখনই টাকাটা রেখে আসতে।

কুমুদের বাবার মনের ইচ্ছাও অবশ্য তা-ই। কিন্তু যা-ই করুন পারিজাত বক্সীকে একবার জানানো দরকার। জামাইয়ের সঙ্গেও পরামর্শ করতে হবে। তুলসী কোথায় সে কথা কুমুদ কিছু লেখেনি। হতে পারে এ বিষয়ে তুলসীর বাবাও আলাদা চিঠি পেয়েছে।

সব দিক বিবেচনা করে কুমুদের বাবা ফোন তুলে নিলেন।

ভাগ্য ভালো পারিজাত বক্সী বাড়িতেই ছিলেন।

সব শুনে তিনি বললেন, আপনি অপেক্ষা করুন, আমি আধ ঘণ্টার মধ্যে আপনার কাছে যাচ্ছি।

আধ ঘণ্টার আগেই পারিজাত বক্সী এসে গেলেন।

অনেকক্ষণ ধরে চিঠি দুটো পরীক্ষা করে বললেন, এটা আপনার ছেলের হাতের লেখা তো?

হ্যাঁ, ওটা কুমুদের হাতের লেখা তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

পারিজাত বক্সী কিছুক্ষণ কী ভাবলেন, তারপর বললেন, মূর্তি চোরেরা সাধারণত এ ধরনের কাজ করে না, তবে কিছুই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। চলুন, রিকশাচালককে একবার দেখাবেন।

দুজনে রাস্তার মোড়ে এলেন।

গোটা চারেক রিকশা সেখানে ছিল। সেই রিকশাচালক গ্লাসে চা খাচ্ছিল, এঁদের দেখে সেলাম করে এগিয়ে এল।

ডাক্তারবাবুকে এ চিঠি তুমি দিয়েছ?

হ্যাঁ বাবু।

যে তোমায় এ চিঠি দিয়েছে সে কী বলেছে?

আমি রিকশা নিয়ে এখানে বসে ছিলাম, এক বাবু ট্যাক্সি চেপে এসে হাত নেড়ে আমাকে ডাকলেন। আমি কাছে যেতে বললেন, লাল বাড়িতে যে ডাক্তারবাবু থাকেন, তাঁকে এই খামটা দিয়ে এসো, আর এই নাও তোমার দু-টাকা বকশিশ।

তুমি জিজ্ঞাসা করোনি নিজে না গিয়ে এভাবে তোমার হাতে চিঠি পাঠাচ্ছে কেন?

না বাবু, বকশিশ পেয়ে আমি খুশি হয়েছিলাম, ওসব কথা ভাবিনি।

পারিজাত বক্সী আর কিছু না বলে কুমুদের বাবাকে নিয়ে ফিরে এলেন। নিজের মোটরে উঠতে উঠতে বললেন, এ চিঠি দুটো আপাতত আমার কাছে থাক।

কুমুদের বাবা উদবিগ্নকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, টাকার ব্যাপারে আমি তাহলে কী করব?

এখন কিছু করার নেই। পনেরো দিন সময় আছে, তার মধ্যে আপনাকে জানিয়ে দেব।

পারিজাত বক্সী মোটর চালু করলেন, থামলেন এসে লালবাজারে।

সহকারী কমিশনারের ঘরে তাঁর অবারিত দ্বার।

মিস্টার বাসু, দেখুন তো এ হাতের লেখাটা আপনার রেকর্ডে আছে কি না।

মিস্টার বাসু চিঠিটা পড়ে গম্ভীর হয়ে গেলেন, তার-ঘণ্টা বাজিয়ে মজুমদারকে ডাকলেন।

মজুমদার আসতে বললেন, এঁর সঙ্গে তোমার পরিচয় আছে মজুমদার, ইনি স্বনামধন্য পারিজাত বক্সী।

মজুমদার দুটো হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলল, ওঁর নামের সঙ্গে আমার খুব পরিচয়।

দেখো তো রেকর্ড থেকে এটা কাদের লেখা হদিশ পাও কি না।

চিঠিটা হাতে নিয়ে মজুমদার বলল, এ তো এখনই হবে না। অনেক রেকর্ড ঘাঁটতে হবে। অন্তত দুটো দিন সময় চাই।

পারিজাত বক্সী দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, ঠিক আছে, আমি পরশু বিকালে আসব।

পরশু বিকালে যেতেই খবর পেয়ে গেলেন। মজুমদারই দিল।

বলল, ও হাতের লেখাটা তোরাব আলির।

তোরাব আলি কে?

নামকরা ডাকাত। চিঠি লিখে লোকের বাড়ি ডাকাতি করতে যেত।

তার ফোটো যদি থাকে, দেখাতে পারেন?

তা পারি, কিন্তু একটা মুশকিল হয়েছে।

কী মুশকিল?

তোরাব আলি এখন দমদম জেলে। বছর তিনেক আগে তার সাত বছরের জন্য জেল হয়েছিল।

পারিজাত বক্সী হতাশ হলেন।

কীরকম হল? তোরাব আলি জেল থেকে নিশ্চয় এ চিঠি লেখেনি। সেটা সম্ভব নয়। অন্য কেউ লিখেছে।

মজুমদারকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বেরিয়ে এলেন।

মজুমদার মনে করিয়ে দিল, ফোটোটা দেখে যাবেন না?

দরকার নেই।

পারিজাত বক্সী কুমুদের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

জিজ্ঞাসা করলেন, কী করবেন, ঠিক করেছেন?

কুমুদের বাবা বললেন, আমি ঠিক করেছি, টাকাটা দিয়েই দেব, কারণ কুমুদের প্রাণের দাম আমাদের কাছে দশ হাজার টাকার অনেক বেশি।

বেশ, তাহলে একটা দিন ঠিক করুন। সেদিন আমিও আপনার সঙ্গে যাব।

দিন ঠিক আর কী। আমি কালই যেতে চাই।

আমি তাহলে ছ-টার মধ্যে আপনার কাছে চলে আসব।

কুমুদের বাবা প্রশ্ন করলেন, আমার নাতি তুলসীর কী হবে?

পারিজাত বক্সী কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর বললেন, আমার মনে হচ্ছে তুলসী আর কুমুদ এক জায়গায় নেই। থাকলে তুলসীর জন্যও টাকা দাবি করে এরকম চিঠি আসত।

কুমুদের বাবা স্বীকার করলেন, আমারও তা-ই মনে হচ্ছে।

তবুও আপনি একটা কাজ করুন।

কী বলুন?

আপনার জামাইয়ের কাছে একবার খোঁজ নিন।

তখনই কুমুদের বাবা পরিচিত একজনকে তুলসীর বাবার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। বলে দিলেন, তুলসীর বাবা যেন লোকটির সঙ্গে চলে আসে।

বিকালেই তুলসীর বাবা এসে পৌঁছাল।

এই কদিনেই তুলসীর বাবা উদবেগে-দুশ্চিন্তায় আধখানা হয়ে গেছে।

তার ধারণা হয়েছিল শ্বশুরমশাই বুঝি কুমুদ আর তুলসী দুজনেরই খবর পেয়েছেন। কিন্তু তুলসীর কোনও খবর পাননি জেনে মর্মাহত হল।

কুমুদের বাবা জামাইকে চিঠিটা দেখালেন।

এই দেখো, আমি এরকম একটা চিঠি পেয়েছি। আমি ভেবেছিলাম তুলসীর ব্যাপারে তুমিও বুঝি কোনও চিঠি পেয়েছ।

তুলসীর বাবা মাথা নাড়ল, না, আমি কিছুই পাইনি। তুলসীর মা তো আহার-নিদ্রা ত্যাগ করেছে। আমার ভয় হচ্ছে, সে কোনওরকম শক্ত অসুখে না পড়ে যায়।

কুমুদের বাবা সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন।

শরীর খারাপ করে লাভ কী। বিপদের মুখে এভাবে ভেঙে পড়ে তো কোনও লাভ নেই। পারিজাতবাবুর ধারণা, কুমুদ আর তুলসী এক জায়গায় নেই। থাকলে তুলসীর জন্যও এরকম টাকা দাবি করে চিঠি আসত। তবে ঈশ্বরের ইচ্ছায় কুমুদকে যদি ফিরে পাই, তাহলে তার কাছে হয়তো তুলসীর খবর পেতে পারি।

তুলসীর বাবা কিছু বলল না। চুপ করে রইল।

তারপর বলল, আপনি কুমুদের ব্যাপারে কী করবেন ঠিক করেছেন?

আমি তো টাকাটা দেব বলেই ঠিক করেছি।

তাহলে কি কুমুদকে পেয়ে যাবেন?

কুমুদের বাবা আশ্চর্য হয়ে গেলেন।

কেন, এ কথা বলছ কেন?

এ ধরনের কাহিনিতে পড়েছি দশ হাজার টাকা হাতে পেলে এদের লোভ বেড়ে যায়। আরও বেশি টাকা দাবি করে বসে।

অবশ্য কিছুই অসম্ভব নয়, তবে আমরা তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না। মাত্র পনেরো দিন সময়। এর মধ্যে টাকা না দিতে পারলে ওরা কুমুদকে শেষ করে দেবে। একটা মানুষের প্রাণের দাম ওদের কাছে কানাকড়িও নয়।

ভোর পাঁচটায় কুমুদের বাবার বাইরের ঘরে কলিং বেল বেজে উঠল।

কুমুদের বাবা ওপর থেকেই শুনতে পেলেন, নীচে চাকর রঘু কার সঙ্গে চেঁচামেচি শুরু করেছে।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে কুমুদের বাবা দেখলেন, রঘুর সামনে একটা ভিখারি দাঁড়িয়ে। পরনে ছেঁড়া গেঞ্জি, শতচ্ছিন্ন কাপড় হাঁটু পর্যন্ত। চুলে মাটি মাখা। গালের একদিকে দগদগে ঘা।

কে রে রঘু?

জানি না বাবু, বলছে আপনার সঙ্গে নাকি কী জরুরি দরকার আছে।

কুমুদের বাবার কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে গেল।

কুমুদকে যারা আটকে রেখেছে, সেই দলের কেউ নয় তো? হয়তো টাকার ব্যাপারে কিছু বলতে এসেছে, ইডেন গার্ডেনে নয়, অন্য কোথাও টাকাটা রেখে আসতে হবে।

তাই কুমুদের বাবা রঘুকে বললেন, ঠিক আছে, তুই যা, আমি দেখছি।

রঘু চলে যেতে ভিখারিটা কয়েক পা এগিয়ে বলল। আমি পারিজাত বক্সী। আমি আগে রওনা হয়ে যাচ্ছি। আপনি সাতটা নাগাদ চলে আসুন। ওখানে আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করবেন না।

কুমুদের বাবা ঘাড় নাড়ল, ঠিক আছে।

কুমুদের বাবা যখন ইডেন গার্ডেনে গিয়ে পৌঁছালেন, তখন ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় সাতটা। তিনি সঙ্গে ড্রাইভার নেননি। নিজেই মোটর চালিয়ে গিয়েছিলেন।

প্যাগোডার কাছাকাছি গিয়ে দেখলেন, ঘাসের ওপর পারিজাত বক্সী বসে। তাঁর সামনে একটা থালা। চেঁচিয়ে ভিক্ষা চাইছেন।

কুমুদের বাবা এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে বড়ো একটা খাম বের করে প্যাগোডার চাতালে রেখে দিলেন। আশপাশে দু-একজন লোক পায়চারি করছে। এত সকালে ভিড় নেই।

কুমুদের বাবা খামটা রেখে সরে গেলেন নিজের মোটরের কাছে।

একটু পরেই একটা জিপ এসে দাঁড়াল। তার মধ্যে থেকে পুলিশের পোশাক-পরা একদল লোক বেরিয়ে এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে খামটা তুলে নিয়ে দ্রুতপায়ে ফিরে এল।

জিপে বোধহয় স্টার্ট দেওয়াই ছিল। লোকটা উঠে বসতেই জিপ ছুটতে শুরু করল।

পারিজাত বক্সী আগেই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ছুটে রাস্তার ওপর চলে এলেন।

মিনিট দুই-তিন, তার মধ্যেই পারিজাত বক্সী কুমুদের বাবার মোটরে উঠে জিপটাকে অনুসরণ করলেন।

সোজা গঙ্গার কূল ঘেঁষে জিপ আর মোটর দৌড়াল। সন্ত্রস্ত পথচারী দু-পাশে ছিটকে গেল।

ঘোড়দৌড়ের মাঠের পাশে মোটর জিপের কাছাকাছি এসে গেল।

হঠাৎ গুড়ুম করে একটা শব্দ।

জিপ থেকে কে একজন নির্ভুল লক্ষ্যে মোটরের সামনের টায়ারে গুলি করল।

তীব্র আওয়াজ করে টায়ার ফাটল। মোটর ডানদিকে রাস্তা ছাড়িয়ে মাঠের মধ্যে গিয়ে পড়ল।

এদিকে ফাঁকা মাঠ। দূরে সেনাদের ছাউনি।

অনেক কসরত করে পারিজাত বক্সী মোটর থামালেন।

পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছে কুমুদের বাবার দিকে ফিরে বললেন, তা-ই তো, ব্যাটারা পালাল। আপনার নোটগুলোর নম্বর সব লেখা আছে তো?

চিন্তায়, ভয়ে কুমুদের বাবা অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন।

তিনি কোনওরকমে মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, আছে।

সব ব্যাঙ্কে আগেই আমরা বেতারে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি। সেসব জায়গায় নোট ভাঙাতে গেলেই মুশকিলে পড়বে।

কুমুদের বাবা শঙ্কিতকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, এতে কুমুদের কোনও ক্ষতি হবে না তো?

ক্ষতি আর কী হবে? ওরা টাকা চেয়েছিল, টাকা আপনি দিয়েছেন। এবার চুক্তিমতো কুমুদকে ছেড়ে দেওয়া উচিত।

কথা বলতে বলতেই পারিজাত বক্সী জ্যাক দিয়ে মোটর তুলে টায়ার বদলি করে ফেললেন।

তারপর মোটরে উঠতে কুমুদের বাবা প্রশ্ন করলেন, এবার কোনদিকে যাবেন?

চলুন, একটু এগিয়ে দেখা যাক, যদি জিপটার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়। জিপটার নম্বর আমি দেখে নিয়েছি, কিন্তু জানি সে দেখা কোনও কাজে লাগবে না। কারণ নিশ্চয় ওটা ভুয়া নম্বর।

মোটর খিদিরপুর পৌঁছাল। কোথাও জিপের চিহ্ন নেই।

মোটর একপাশে রেখে পারিজাত বক্সী নেমে পড়লেন।

কুমুদের বাবাকে অপেক্ষা করতে বলে রাস্তার ওপারে একটা সরাইখানায় গিয়ে ঢুকলেন।

নোংরা পরিবেশ। জন চারেক লোক বসে চা খাচ্ছে। এদিকে কাউন্টারের পিছনে হৃষ্টপুষ্ট একটি লোক ক্যাশবাক্স সামনে নিয়ে বসে আছে। সে-ই বোধহয় মালিক।

তার কাছে গিয়ে পারিজাত বক্সী বললেন, ওসমানকে একটু দরকার।

লোকটা ভিতরে চলে গেল।

একটু পরেই লুঙ্গি-পরা বেঁটে একটি লোক সেলাম করে এসে দাঁড়াল। তার গলায় রুমাল বাঁধা, একটা চোখ কানা।

তাকে একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে পারিজাত বক্সী জিজ্ঞাসা করলেন, এ রাস্তায় খুব জোরে কোনও জিপ যেতে দেখেছ ওসমান?

ওসমান মাথা নাড়ল, না।

তোমাদের এখানে অনেকেই তো হাজার টাকার নোট ভাঙাতে আসে?

আসে, সে তো আপনি জানেনই।

শোনো, এই নম্বরগুলো রেখে দাও, যদি এসব নম্বরের নোট কেউ ভাঙাতে আসে, আমাকে একটা খবর পাঠাতে পারো? খবর পাঠাবে আর লোকটাকে আধ ঘণ্টাখানেক আটকে রাখবে কোনও ছুতোয়। আমার ফোন নম্বর তো তোমার জানা।

তা জানা, তবে মালিককেও একবার বলে যান।

পারিজাত বক্সী মালিককে বলে মোটরে এসে উঠলেন।

মোটরের মধ্যে কুমুদের বাবা চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে।

তাঁর মনের অবস্থা পারিজাত বক্সী বুঝতে পারলেন।

তিনি ভাবছেন, গোয়েন্দা ব্যাপারটার কোনোই কূলকিনারা করতে পারলেন না। লোকগুলো টাকাও নিল, হয়তো তাঁর ছেলেকেও খতম করে দেবে।

পারিজাত বক্সী মোটর ঘুরিয়ে নিলেন।

রাত আটটা নাগাদ পারিজাত বক্সীর বাড়ির ফোন বেজে উঠল।

পারিজাত বক্সী বসে বসে একটা বই পড়ছিলেন, লাফিয়ে উঠে ফোন ধরলেন।

স্যার আমি ওসমান, শিগগির চলে আসুন। একটা নম্বরি নোট নিয়ে একজন এসেছে।

পারিজাত বক্সী যেমন পোশাকে ছিলেন, তেমনিভাবেই নেমে গেলেন।

মিনিট কুড়ির মধ্যে পৌঁছে গেলেন।

ওসমান দোকানের বাইরে পায়চারি করছিল, পারিজাত বক্সীকে দেখে এগিয়ে এসে বলল, আসুন স্যার, ওই যে মালিকের পাশে বসে আছে।

পারিজাত বক্সী ভিতরে ঢুকলেন। আড়চোখে দেখলেন, কাউন্টারের পিছনে মালিকের পাশে কালো রোগা একটা লোক বসে আছে।

পারিজাত বক্সী সোজাসুজি লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

শোনো, এদিকে এসো।

লোকটা উঠে দাঁড়াল।

হাজার টাকার নোটটা তুমি কোথায় পেয়েছ?

লোকটা নির্বাক। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

বার দুয়েক প্রশ্নের পরই পারিজাত বক্সী হুংকার ছাড়লেন, চাবকে তোমার পিঠের ছাল তুলে দেব, আমাকে তুমি চেনো না। এখন টানতে টানতে থানায় নিয়ে যাব। বলো, নোটটা কোথায় পেয়েছ?

এবার লোকটা কাঁপতে কাঁপতে বলল, হুজুর মা-বাপ, নোটটা কুড়িয়ে পেয়েছি।

খিদিরপুরের পথেঘাটে নোট কুড়িয়ে পাওয়া যায় নাকি?

বিশ্বাস করুন হুজুর, ডকের কাছে কুড়িয়ে পেয়েছি।

বুঝতে পেরেছি, ভালো কথায় হবে না। ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি। একে ধরে রাখো তো, আমি আসছি।

পারিজাত বক্সী বেরিয়ে খান তিনেক বাড়ি পরে এক ডাক্তারখানায় ঢুকে খিদিরপুর থানায় ফোন করলেন, নিজের পরিচয় দিয়ে।

মিনিট পনেরো পর দারোগা দুজন কনস্টেবল নিয়ে এসে হাজির।

লোকটা দারোগার সামনেও এককথা বলল, ডকের কাছে কুড়িয়ে পেয়েছি।

দারোগা কড়া ধমক দিল। কুড়িয়ে পেয়েছিলে তো থানায় জমা দাওনি কেন?

বোবার শত্রু নেই। লোকটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

দারোগা লোকটাকে টানতে টানতে জিপে নিয়ে তুলল। তাদের পিছনে পারিজাত বক্সী মোটর চালালেন।

লোকটাকে মোটেই নিরীহ মনে হচ্ছে না। থানায় ধমক দিলে হয়তো কিছু বের হতে পারে।

কিন্তু না, থানাতেও লোকটার মুখ থেকে একটা কথাও বের করা গেল না।

তখন পারিজাত বক্সী দারোগাকে একপাশে ডেকে ফিসফিস করে কী বললেন।

দারোগা লোকটাকে বলল, যা ব্যাটা, আজ তোকে ছেড়ে দিলাম। তোর নামধাম বলে যা। নোটটা আটকে রাখলাম, মালিককে দিয়ে দেব।

লোকটা নাম বলল, রতন পাঁড়ে। বর্তমান নিবাস মোমিনপুর। সবে ছাপরা থেকে এসেছে, এখনও কোথাও চাকরি পায়নি।

রতনকে ছেড়ে দিতে সে থানার বাইরে এসে এদিক-ওদিক দেখল, তারপর রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে হাঁটতে আরম্ভ করল।

অনেক পিছনে মোটরে পারিজাত বক্সী তাকে অনুসরণ করতে লাগলেন।

প্রায় মাইল দেড়েক। লোকালয় শেষ হয়ে একটা মাঠ। তার পাশে কয়েকটা টিনের ঘর।

রতন একটা টিনের ঘরের দরজায় তিনবার টোকা দিল।

টুক, টুক, টুক।

ভিতর থেকে গম্ভীর আওয়াজ শোনা গেল, এসো।

পারিজাত বক্সী একটা গাছের ছায়ায় অন্ধকারে মোটর রেখে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলেন।

রতন ভিতরে ঢুকতে পারিজাত বক্সী টিনের ফুটোর ওপর চোখ রাখলেন।

টেবিলের ওপর হ্যারিকেন জ্বলছে। চেয়ারে দীর্ঘকায় লোক। পরনে শার্ট আর প্যান্ট। কপালের একপাশে একটা কাটার দাগ।

তার সামনে রতন।

কী হল, নোটের খুচরো পাওয়া গেল না?

আজ্ঞে না, পারিজাত টিকটিকি পিছনে লেগে সব ভেস্তে দিয়েছে।

তাহলে ছেলেটার বাবা টিকটিকি লাগিয়েছে?

তা-ই তো মনে হচ্ছে।

পারিজাত বক্সী কোমরে হাত ছোঁয়ালেন। রিভলভারটা ঠিকই আছে।

ভাবলেন, রিভলভারটা হাতে নিয়ে ভিতরে ঢোকার এই উপযুক্ত সময়।

রিভলভারটা হাতে নিয়ে ঢুকতে যাবার মুখেই বাধা। পিছন থেকে কে তাঁর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত হানল। চোখের সামনে চাপ চাপ অন্ধকার। সমস্ত পৃথিবী যেন ঘুরে উঠল। পারিজাত বক্সী পড়ে গেলেন।

যখন জ্ঞান হল দেখলেন একটা খাটিয়ায় শুয়ে আছেন। সেই টিনের ঘর কিন্তু পাকা বাড়ি।

কাছেই একটা চেয়ারে সেই দীর্ঘকায় লোকটা।

পারিজাত বক্সী চোখ খুলতেই লোকটা বলল, কী পারিজাতবাবু, শরীর এখন কেমন?

কোনও উত্তর না দিয়ে পারিজাত বক্সী প্রথমে মাথায় হাত দিলেন। মাথায় ব্যান্ডেজ। এখন অল্প অল্প ব্যথা রয়েছে। কোমরে হাত দিয়ে দেখলেন রিভলভার নেই।

লোকটা হেসে বলল, যন্ত্রটা সরিয়ে রেখেছি। যদি হাত লেগে গুলি বেরিয়ে যায়।

পারিজাত বক্সী চুপ করে রইলেন।

কুমুদের বাবা কে? তারপর কুমুদের বাবা আপনাকে কত টাকা দিয়েছে? বোকা সাজবার চেষ্টা করবেন না, তাতে ফল হবে না। আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, সরে দাঁড়ান, নইলে খুব বিপদে পড়ে যাবেন।

খুব যে ভয় পেয়েছেন, পারিজাত বক্সীর মুখ-চোখে এমন কোনও ভাব ফুটল না। বরং তিনি বিস্মিতকণ্ঠে বললেন, আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না, বিশ্বাস করুন। কিছু জাল নোট বাজারে কারা ছড়িয়েছে। সেই ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য আমাকে নিয়োগ করা হয়েছে।

এবার লোক ভ্রূটা কোঁচকাল। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ কী ভাবল, তারপর বিড়বিড় করে বলল, জাল নোট?

হ্যাঁ, তারই একটা আপনার লোক ভাঙাতে গিয়েছিল।

লোকটা নিজেকে সামলে নিল। চাপা গলায় বলল, ঠিক আছে। নোটগুলো না হয় জাল, কিন্তু ছেলেটা তো আর জাল নয়। সে আমাদের হাতের মুঠোয় আছে। আপনাকেও কিছুদিন আমাদের আশ্রয়ে থাকতে হবে। নোট ভাঙাতে নানা দিকে লোক গেছে, তাদের রিপোর্ট শোনা যাক।

লোকটা উঠে দাঁড়াল।

শুয়ে শুয়ে পারিজাত বক্সী দেখলেন লোকটা দরজা বন্ধ করে তালা দিল।

কিছুক্ষণ চুপচাপ।

আস্তে আস্তে পারিজাত বক্সী উঠে দাঁড়ালেন। জানলা নেই, অনেক উঁচুতে একটা ঘুলঘুলি। এত ছোটো যে তার মধ্য দিয়ে কোনও পূর্ণবয়স্ক লোকের যাওয়া সম্ভব নয়।

পারিজাত বক্সী দেওয়ালে কান পাতলেন। জলের শব্দ খুব স্পষ্ট। একেবারে পাশেই বোধহয় নদী।

দুটো হাত পিছনে রেখে পারিজাত বক্সী পায়চারি শুরু করলেন।

এখান থেকে পালানো অসম্ভব। কতদিন এভাবে বন্দি থাকতে হবে কে জানে! এরা কি কুমুদকে ছেড়ে দেবে? এক হাজার টাকা থানা আটকে রেখেছে। খুব সম্ভবত এই এক হাজার টাকার জন্য এরা কুমুদের বাবাকে আবার চিঠি দেবে।

কিন্তু পারিজাত বক্সী বন্দি। পরামর্শ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

খট করে শব্দ হতে পারিজাত বক্সী ঘুরে দাঁড়ালেন।

দরজা খুলে একটা লোক ভিতরে ঢুকল। এক হাতে এক মগ চা, অন্য হাতে দুখানা রুটি।

সে চেয়ারের ওপর সবকিছু নামিয়ে রেখে হিন্দিতে বলল, নিন, খেয়ে নিন। আমি বাসন নিয়ে যাব।

পারিজাত বক্সী খাটিয়ায় বসে বললেন, আচ্ছা ভাই, যমুনার ঢেউয়ের এত শব্দ তো আগে শুনিনি।

লোকটা নিজের দুটো চোখ বিস্ফারিত করে বলল, এখানে আবার যমুনা কোথায়? এ তো গঙ্গা। হরিহরপুরের গঙ্গার পার দেখা যায় না। আর কী ঢেউ!

পারিজাত বক্সী বুঝতে পারলেন, জায়গার নাম হরিহরপুর। পাশেই গঙ্গা নদী।

চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবার বললেন, এখানে আর-একটা ঘরে যে ছেলেটা রয়েছে তাকে চা দেওয়া হয়েছে?

লোকটা কিছুক্ষণ পারিজাত বক্সীকে একদৃষ্টে দেখল, তারপর বলল, ভীষণ বদমাইশ ছেলে। রোজ খাবার সময় ঝামেলা করে। একদিন তো আমার ঘাড়ে আচমকা ঝাঁপিয়েই পড়েছিল, কিন্তু আমার সঙ্গে পারবে কেন? আমি তাকে—

এই পর্যন্ত বলে লোকটা হঠাৎ থেমে গেল। বোধহয় ভাবল, এতসব কথা এই বাবুকে বলা হয়তো উচিত হয়নি।

এর বেশি আর পারিজাত বক্সীর শোনারও দরকার ছিল না। তিনি বুঝতে পারলেন এখানেই কুমুদ কিংবা তুলসী বন্দি রয়েছে। তবে কুমুদ হবার সম্ভাবনাই বেশি, কারণ এরা কুমুদের বাপের কাছেই টাকা চেয়ে পাঠিয়েছিল।

লোকটা বাইরে চলে গেল। দরজা বন্ধ হল।

পারিজাত বক্সী দু-হাতে নিজের চুল মুঠোয় ধরে চুপচাপ বসে রইলেন।

তাঁর এতদিনের গোয়েন্দা-জীবনে এরকমভাবে বিপদে আর পড়েছেন বলে মনে করতে পারলেন না।

এটুকু বুঝতে পারলেন, হয়তো এরা তাঁর প্রাণহানি করবে না। কুমুদের বাবার কাছ থেকে টাকাটা পেলেই তাঁকে ছেড়ে দেবে। বাকি এক হাজার টাকা।

কিন্তু পারিজাত বক্সীর যে হার হল সে বিষয়ে তো সন্দেহ নেই।

যেমন করে হোক উপায় একটা বের করতেই হবে।

পারিজাত বক্সী পায়চারি করতে আরম্ভ করলেন আর মাঝে মাঝে মুখ তুলে ঘুলঘুলির দিকে দেখতে লাগলেন।

ঘুলঘুলিটা কোনও কাজে লাগবে এমন মনে হল না। তবে বাইরের পৃথিবীর শব্দ ওই ঘুলঘুলিটা দিয়ে এ ঘরে ঢুকছে।

রাত হল। কোনও বাতির ব্যবস্থা নেই। ঘন অন্ধকার।

একসময়ে আবার দরজা খুলে গেল।

লোকটা একটা থালায় ভাত, কিছু তরকারি আর বাটিতে ডাল নিয়ে ভিতরে ঢুকল। সবগুলো চেয়ারে রেখে মেঝের ওপর বসে পড়ল, তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন, আমি বাসনগুলো নিয়ে যাব।

লোকটার আর-এক হাতে জ্বালানো হ্যারিকেন। হ্যারিকেনটাও সে চেয়ারের ওপর রাখল।

ভাত-তরকারির চেহারা দেখে পারিজাত বক্সীর সেসব ছুঁতে ইচ্ছা হল না কিন্তু না ছুঁয়েই বা উপায় কী। না খেলে নিজেই দুর্বল হয়ে পড়বেন।

কোনওরকমে খাওয়া শেষ করলেন।

লোকটার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখলেন, লোকটা বসে বসে ঢুলছে।

পলকের জন্য লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে কাবু করে তার কাছ থেকে চাবি কেড়ে নিয়ে কুমুদকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে হয় না!

একটু ভাবলেন। না, এত তাড়াতাড়ি ঝুঁকিটা নেওয়া ঠিক হবে না।

বাইরে আরও লোক পাহারায় আছে কি না বলা যায় না। ধরা পড়লে পারিজাত বক্সীকে আরও কড়া শাসনে রাখবে। কিংবা দূরে কোথাও সরিয়ে দেবে। দুর্গম জায়গায়।

খাওয়া শেষ হতে বাসনপত্র আর হ্যারিকেন নিয়ে লোকটা যাবার সময় পারিজাত বক্সী বললেন, ভাই, হ্যারিকেনটা রেখে যাও-না। অন্ধকারে থাকব।

লোকটা যেতে যেতে গম্ভীরকণ্ঠে বলল, হুকুম নেই।

পারিজাত বক্সী চুপচাপ বসে রইলেন। রাত বাড়ল। খাটিয়ার ওপর শুধু একটা বালিশ। বেশ জোলো বাতাস বইছে। একসময় পারিজাত বক্সী শুয়ে পড়লেন।

সকাল হতেই দীর্ঘকায় লোকটি ভিতরে ঢুকল।

তখনও পারিজাত বক্সী বিছানায় শুয়ে।

নমস্কার বক্সী সায়েব, ভালো আছেন?

পারিজাত বক্সী উঠে বসলেন।

বললেন, কী করে ভালো থাকব? স্নান করতে পারছি না। রাতে একটা আলো নেই।

লোকটা হাসল, আরে স্নান করার ব্যবস্থা করে দেব। আর আলো? আপনি এত সাহসী পুরুষ, আপনার আলো কী হবে?

পারিজাত বক্সী হেসে বললেন, আর কিছু নয়, আমার ছুঁচোর ভয় খুব বেশি। অন্ধকারে ছুঁচোর উপদ্রব বেশি হয় কিনা।

লোকটি কী বুঝল কে জানে, কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থেকে তারপর বলল, কুমুদের বাবার কাছে চিঠি চলে গেছে। আশা করছি বাকি হাজার টাকা পেতে দেরি হবে না। বিশেষ করে যখন আপনার মতন পরামর্শদাতার সঙ্গে আলোচনা করতে পারে না।

পারিজাত বক্সী হাসলেন—চোটটা একটু কম। আপনার শাগরেদ তেমন জোরালো আঘাত করতে পারেনি।

জোরালো আঘাত করার নির্দেশ আমার ছিল না। আচ্ছা উঠি। আপনার স্নানের জল যথাসময়ে পাঠিয়ে দেব।

লোকটা বেরিয়ে গেল।

দুপুরের একটু আগে বড়ো এক বালতি জল আর গামছা এল। তারপর যথারীতি খাবারও! বিকালে চা।

তারপরই পারিজাত বক্সী কাজ শুরু করলেন।

চেয়ারটা বারকতক খাটিয়ার সঙ্গে ঠুকে ঠুকে একটা পায়া খসিয়ে ফেললেন।

ঘুলঘুলি দিয়ে ফিকে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে। আজ আর অন্ধকার নয়।

পারিজাত বক্সী ঠিক করে নিলেন, যা হবার হবে, এভাবে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকার কোনও মানে হয় না।

দরজায় খুট করে শব্দ হতেই চেয়ারের পায়াটা হাতে নিয়ে পারিজাত বক্সী দরজার পাশে দাঁড়ালেন।

দরজা খুলল। লোকটা হ্যারিকেন হাতে ঢুকে হ্যারিকেনটা মেঝের ওপর নামিয়ে রেখে আবার বাইরে গেল।

ভাতের থালা আর তরকারির বাটি বাইরে রেখেছিল, সেগুলো নিয়ে আবার ভিতরে ঢুকল।

সঙ্গে সঙ্গে পারিজাত বক্সী চেয়ারের পায়া দিয়ে তার মাথার পিছনের দিকে সজোরে আঘাত হানলেন। একটা হাত দিয়ে লোকটার মুখ চেপে ধরলেন, যাতে তার আর্তনাদ না বের হয়।

লোকটা মেঝের ওপর পড়ে গেল। হাত থেকে থালা আর বাটি ছিটকে পড়ল।

তারই পরনের ধুতির কিছুটা খুলে পারিজাত বক্সী লোকটার মুখ আর দুটো হাত বাঁধলেন, তারপর লোকটার কোমর হাতড়ে চাবির রিং খুলে নিলেন।

রিংয়ে তিনটে চাবি। চাবিগুলো নিয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলে পারিজাত বক্সী বাইরে বেরিয়ে এলেন।

আচ্ছন্ন অবস্থাতেই তুলসী বুঝতে পারল লোকটা তাকে কাঁধ থেকে নামিয়ে একটা মোটরে ওঠাল।

কিন্তু মোটর বেশি দূর গেল না। একটু গিয়েই দারুণ ঝাঁকানি দিয়ে থেমে গেল। লোকটা নেমে মোটরের বনেট খুলে কিছুক্ষণ কী দেখল, তারপর বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে তুলসীকে কাঁধে তুলে নিল।

রাস্তা ছেড়ে লোকটা জঙ্গলে নামল। ঘন জঙ্গল। মাঝে মাঝে কালো পাথরের চাঙড়।

দু-একবার লোকটা হোঁচট খেল। নিজেকেই নিজে গালি দিল।

তুলসী চোখ পিটপিট করে দেখল। পাশেই একটা ঝরনা। লোকটা দুটো হাত জোড় করে জল নিচ্ছে। বোধহয় তৃষ্ণার্ত।

কিন্তু না, জল নিয়ে এসে লোকটা তুলসীর মুখে চোখে ছিটিয়ে দিল।

একটু পরেই তুলসীর আচ্ছন্নভাব কেটে গেল। সে উঠে বসল।

কী রে শয়তান, এবার কী হবে? লোকটা দাঁত চেপে বলল।

তুলসী কোনও উত্তর দিল না।

গিরিধারীকে বেকায়দায় পেয়ে ঘায়েল করে পালিয়েছিলি, এবার তোকে কে বাঁচায় দেখি। তার আগে আমার একটা কথার জবাব দে। তোরা দুটো পুলিশের চর। চারদিকে মূর্তি চুরি হচ্ছে বলে লুকিয়ে মন্দির পাহারা দিচ্ছিলি। তারপর আমাদের লরিতে লাফিয়ে পড়েছিস, ঠিক কি না?

তুলসী মাথা নাড়ল, না। আগেই তো বলেছি, পুলিশের সঙ্গে আমাদের কোনও যোগাযোগ নেই। আমরা এমনি বেড়াব বলে তোমাদের লরিতে উঠেছিলাম।

লোকটা মুখ বেঁকিয়ে হাসল। বলল, ভোররাত্রে বেড়াতে উঠেছিলি? কী করে তোর কাছ থেকে কথা বের করতে হয় সে ওষুধ আমার জানা আছে। মূর্তিগুলো নিরাপদে চালান হয়ে যাক, তারপর তোর সঙ্গে বোঝাপড়া করব। নে ওঠ।

লোকটা তুলসীর একটা হাত ধরে এমন জোরে টান দিল যে তুলসীর মনে হল, কাঁধের হাড়গুলো বুঝি খুলেই গেল।

তুলসীকে লোকটা টানতে টানতে নিয়ে চলল। বনবাদাড় পার হয়ে ছোটো একটা পাহাড়। ঘোরানো পায়ে-চলা পথ। দু-ধারে কাঁটাগাছের ঝোপ।

পাহাড়ের অর্ধেকটা উঠতেই দেখা গেল একেবারে ওপরে একটা মন্দির। জরাজীর্ণ। আকার থেকে মনে হল শিবের মন্দির।

লোকটা তুলসীকে সেই মন্দিরের সামনে নিয়ে এল।

মন্দিরের দরজা নেই। দরজার জায়গায় ছোটো একটা গর্ত। হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হয়।

এবার লোকটা তুলসীর ঘাড় ধরে গর্তের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল, যা ভিতরে। এখানে দিন দুয়েক থাকলেই শায়েস্তা হবি। পরশু এসে তোর খোঁজ করব, অবশ্য যদি বেঁচে থাকিস।

লোকটা জোর করে তুলসীকে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল, তারপর বিরাট একটা পাথর নিয়ে এসে গর্তের মুখ আড়াল করে দিল।

তুলসী গড়িয়ে পড়ল। বেশ অন্ধকার। প্রথমটা কিছুই চোখে দেখতে পেল না। তারপর একটু একটু করে অন্ধকার চোখে সহ্য হয়ে আসতে দেখল, ঠিকই আন্দাজ করেছিল। শিব মন্দির। মাঝখানে ছোটো একটি শিবলিঙ্গ। কালো পাথরের। বোঝা যায়, এখানে সাত জন্মে কেউ পূজা দিতে আসে না। শান-বাঁধানো মেঝের চারদিকে ফাটল। দেওয়াল একেবারে চৌচির। সাপ লুকিয়ে থাকা মোটেই বিচিত্র নয়।

এখানে তুলসী কী করে কাটাবে ভেবে পেল না। একে তো এই পরিবেশ, তার ওপর খিদেয় পেটের মধ্যে দারুণ মোচড় দিচ্ছে। বসে থাকতে পারছে না।

লোকটা বলে গেল বটে পরশু আসবে, কিন্তু আসবে যে তার কোনও স্থিরতা নেই। তুলসীর মতন একটা ছেলে মরল কি বাঁচল, লোকটা কি তার পরোয়া করে!

তুলসী আস্তে আস্তে মেঝের ওপর শুয়ে পড়ল।

ক্লান্ত অবসন্ন দেহে ঘুম আসতে মোটেই দেরি হল না।

প্রায় ঘণ্টা তিনেক পরে তুলসীর ঘুম ভাঙল। মুখে রোদ লেগে।

চমকে তুলসী উঠে বসল। চারদিক বন্ধ, অথচ রোদ আসছে কোথা থেকে?

এদিক-ওদিক দেখতেই চোখে পড়ল। পাশের দেওয়াল অনেক ফাটা। চোখ রাখলে বাইরের আকাশ, কিছু গাছ নজরে আসে। কিন্তু সেখান দিয়ে মানুষের পালানো অসম্ভব।

তবু তুলসীর মনে ক্ষীণ আশা ফুটে উঠল। বাইরের জগৎ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। এই ফাটল দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা যাবে। পাখির গান, জন্তুদের চিৎকার ভেসে আসবে।

তারপর এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ চোখে পড়ে গেল। ঠিক শিবলিঙ্গের নীচে লোহার একটা পাইপ। সেই পাইপটা দেওয়াল ফুটো করে বাইরে গিয়ে পড়েছে।

বোঝা গেল একসময় এ মন্দিরে লোকসমাগম হত। লোকেরা শিবলিঙ্গে জল ঢালত। সেই জল যাতে মন্দিরে না জমে, তাই এই পাইপের ব্যবস্থা।

তুলসী নিচু হয়ে পাইপটা ধরে টান দিল। একবার, দুবার, তিনবার। সে শরীরে যথেষ্ট শক্তি রাখে।

কয়েকবার হ্যাঁচকা টানের পর পাইপটা বেঁকে গেল। এক জায়গা মরচে পড়েছিল। তুলসী পাইপটা কয়েকবার নাড়াতেই সেটা খুলে গেল। বেশ ভারী পাইপ। শাবলের কাজ করতে পারে।

তুলসী পাইপটা তুলে নিয়ে সবেগে ফাটলের ওপর আঘাত করতে লাগল। পাথরের দেওয়াল। অনেক দিনের পুরোনো হলেও শক্ত।

কিন্তু ফাটলের মধ্যে ঘা মারতে মারতে পাথরের টুকরো খসে খসে পড়ল। দারুণ উৎসাহে তুলসী আরও জোরে ঘা দিতে লাগল।

এক ঘণ্টা চেষ্টার পর একটা মানুষ যাবার মতন ফাঁক হল।

তুলসী আর অপেক্ষা করল না। কিছু বলা যায় না। লোকটা বলে গেছে পরশু আসবে। কথাটা হয়তো মিথ্যা। হঠাৎ যদি ফিরে আসে, তাহলে তুলসীর কাণ্ড দেখলে তাকে আর আস্ত রাখবে না।

তুলসী নিজের দেহটা সন্তর্পণে ফাঁকের মধ্য দিয়ে গলিয়ে দিল।

বেরোবার সময় পাথরের খোঁচা লেগে শরীরের দু-এক জায়গা কেটে গেল। তুলসী ভ্রূক্ষেপ করল না।

বাইরে লাফ দিয়ে পড়তেই ঢালু জায়গায় গড়াতে শুরু করল। টাল সামলাতে পারল না। গড়াতে গড়াতে এক গাছের গুঁড়িতে গিয়ে আটকাল।

প্রথমবার কোনওরকমে লরি থামিয়ে তুলসী তাতে উঠে পড়েছিল।

কিন্তু এখান থেকে রাস্তা অনেক দূরে। একটু পরেই অন্ধকার নামবে। অন্ধকারে অরণ্যের চেহারা বদলে যায়। মাটির তলা তো নিরাপদ নয়ই, গাছের ওপরেও ভয় নেই, এমন কথা বলা যায় না।

সাপ থাকতে পারে। চিতাবাঘ গাছে উঠতে অভ্যস্ত।

তবু এই মন্দিরের আওতা থেকে দূরে সরে যেতেই হবে।

তুলসী ছুটতে শুরু করল। দেহে একটুও শক্তি নেই। বার বার কাঁটাগাছে দুটো পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। তুলসী থামল না।

পাহাড় থেকে নেমে একটু দাঁড়াল। ঠিক কোন দিক দিয়ে এসেছিল, আধো-অন্ধকারে বুঝতে পারল না। পায়ে-চলা পথ তিন-চারদিকে গিয়েছে। তারই একটা ধরে তুলসী ছুটল।

আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে এল। ঝিঁঝি ডাকছে। ঝোপে জোনাকির ঝাঁক। হঠাৎ দূরে শেয়াল ডেকে উঠল।

তুলসী দাঁড়িয়ে পড়ল। আর এগোনো সম্ভব নয়। এগোনো নিরাপদও নয়। সামনে একটা গাছ। কী গাছ তুলসী নাম জানে না।

রাতটা গাছে কাটানো ছাড়া উপায় নেই। তুলসী ডাল ধরে গাছে উঠে পড়ল।

একটা ডাল থেকে আর-একটা ডালে পা রাখতে গিয়েই থেমে গেল। হিস হিস করে শব্দ।

ম্লান জ্যোৎস্না, কিন্তু তাতেই বেশ দেখা গেল।

কুচকুচে কালো শরীরের রং, চেরা জিভ, প্রসারিত ফণা সামনে যেন যমের দূত। আর-একটু হলেই তুলসীর মুখে ছোবল দিত।

তুলসী গ্রামের ছেলে। বিষাক্ত সাপও সে অনেক দেখেছে, কিন্তু এরকম ভয়ালদর্শন সাপ তার নজরে পড়েনি।

তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে তুলসী পা পিছলে নীচে পড়ল।

মন্দির থেকে বের হবার সময় আগেই তার শরীরে আঘাত লেগেছিল, এবার কাঁটাঝোপের ওপর গিয়ে পড়তে আবার সেসব জায়গায় রক্ত ঝরতে লাগল।

কিছুক্ষণ তুলসী দম বন্ধ করে রইল। দৃষ্টি অবশ্য সাপের দিকে।

কিন্তু এভাবে বসে থাকলেও বিপদ। পিছন থেকে হয়তো ধরবার জন্য লোকজন আসতে পারে।

তুলসী উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটতে আরম্ভ করল। কিন্তু এই অন্ধকারে বনের মধ্যে দিয়ে চলাও নিরাপদ নয়। গাছে রাত কাটানো ছাড়া কোনও উপায় নেই।

তুলসী দাঁড়িয়ে পড়ে গাছের সন্ধান করতে লাগল।

হঠাৎ জঙ্গল কাঁপিয়ে বিকট শব্দ গুডুম। বন্দুকের আওয়াজ।

তুলসী ছুটে একটু দূরের একটা ঝাঁকড়া গাছে উঠে পড়ল।

কোনও শিকারির বন্দুকের শব্দ হতে পারে, কিংবা হয়তো তুলসীর খোঁজেই লোকেরা বেরিয়ে পড়েছে। বন্যজন্তুকে তাড়াবার জন্য গুলির আওয়াজ করছে।

তুলসী পাতার আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে বসল।

মোটরের গর্জন। তীব্র আলোয় সব আলোকিত হয়ে উঠল। সেই আলোয় তুলসী দেখল একটা রক্তাক্ত হরিণ ছুটতে ছুটতে এসে গাছের তলায় পড়ে গেল।

তারপরই গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটা জিপ আসতে দেখা গেল। ফগ-লাইটের উজ্জ্বল আলো। জিপের ওপর দুজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। দুজনের হাতেই বন্দুক।

একটু দূরে জিপটা থেমে গেল। ভদ্রলোকরা লাফিয়ে নেমে সামনের দিকে ছুটে এল।

হরিণের কাছে এসে দুজনে দাঁড়িয়ে পড়ল। হরিণের চারটে পা প্রসারিত। জিভটা বেরিয়ে পড়েছে।

একজন ভদ্রলোক আর-একজনকে বলল, দেখলি কল্যাণ, বললাম হরিণটা এদিকেই এসেছে। ওই দেখ, তোর গুলিটা গলায় লেগেছে। অব্যর্থ শট।

অন্য লোকটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল।

বাংলা কথা শুনে তুলসীর বুকে সাহস এল। এঁরা তাহলে বাঙালি শিকারি। এঁদের কাছে সব কথা খুলে বললে এঁরা হয়তো উদ্ধার করতে সাহায্য করবেন।

এসো হরিণটাকে জিপে তোলা যাক।

দুজনে এগিয়ে এসে হরিণের পা ধরে তুলতে লাগল।

ঠিক সেই সময় তুলসী গাছের ওপর থেকে বলল, শুনুন, শুনছেন।

দুজনেই চমকে উঠল, হরিণের দেহটা ধপাস করে মাটির ওপর পড়ে গেল।

এই যে আমি ওপরে।

একজন শক্ত হাতে বন্দুক তাক করল। আর একজন প্যান্টের পিছনের পকেট থেকে টর্চ বের কর গাছের ওপর আলো ফেলল।

কে? কে ওখানে?

আমি নামছি। নেমে সব বলব।

তুলসী সাবধানে গাছ থেকে নেমে নীচে এসে দাঁড়াল।

লোক দুজন একদৃষ্টে তুলসীর দিকে দেখল।

তুলসী কাঁদো কাঁদো গলায় নিজের কাহিনি সব বলল। জামা তুলে নিজের দেহের রক্তাক্ত জায়গাগুলো দেখাল।

একজন ভদ্রলোক তুলসীর একটা হাত ধরে বলল, তুমি বাহাদুর ছেলে। কোনও ভয় নেই, এসো আমাদের সঙ্গে। জিপে ওষুধ আছে, লাগিয়ে দেব!

একরকম মলম তুলসীর ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেওয়া হল। ভদ্রলোকদের পরিচয় পাওয়া গেল।

একজনের নাম কল্যাণ ঘোষ। আর-একজন অনুপম সরকার। দুজনেই ভাগলপুরে থাকে। ওখানকার কোর্টের উকিল। শিকারের খুব নেশা, তাই মাঝে মাঝে বন্দুক নিয়ে জঙ্গলে চলে আসে। এ জঙ্গলে বাঘ নেই, শুধু হরিণ আর ভালুক। মাঝে মাঝে অবশ্য পাহাড় থেকে বুনো হাতির দল নামে। যখন আখের চাষ হয়।

হরিণ আর তুলসীকে নিয়ে জিপ ছুটল।

ক্লান্ত তুলসী সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

জিপ থামতে ঘুম ভাঙল। চোখ খুলে দেখল একটা একতলা বাড়ির সামনে জিপ থেমেছে।

অনুপম বলল, নামো তুলসী, এটা বনবিভাগের ডাকবাংলো।

তিনজনে নামল।

তুলসীকে হরলিকস আর পাঁউরুটি খেতে দেওয়া হল।

কল্যাণ আর অনুপম তুলসীকে সোজা ভাগলপুর নিয়ে গেল। সেখান থেকে ওদেরই নির্দেশে তুলসী বাবাকে একটা চিঠি লিখল। তুলসী ভালো আছে। শীঘ্রই বাড়ি ফিরছে।

কল্যাণ আর তুলসী দুজনেরই মত, যেমন করেই হোক এভাবে এ দেশ থেকে মূর্তি চুরি বন্ধ করতেই হবে। এজন্য প্রত্যেক দেশবাসীর সহযোগিতা দরকার। তুলসী আর কুমুদ খুব ভালো কাজই করেছে।

কল্যাণ নিজে সঙ্গে করে তুলসীকে বাড়ি পৌঁছে দিল।

তুলসীর বাবা উঠানে দাঁড়িয়ে ছিল, তুলসীকে দেখে ছুটে এসে তাকে বুকে জাপটে ধরল।

তুলসীর মা-ও এসে দাঁড়াল। কেঁদে কেঁদে তার দু-চোখ লাল।

তুলসীকে আদর করতে করতে বলল, তুলসী তো ফিরে এল, কিন্তু কুমুর কী হবে?

তুলসী জিজ্ঞাসা করল, কুমুমামার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি মা?

না বাবা। গোয়েন্দা লাগানো হয়েছে তবু কিছু হল না। বদমায়েশগুলো দশ হাজার টাকা চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। বাবা সে টাকা পাঠিয়েও দিয়েছিলেন, কিন্তু তবু কুমু ফিরে এল না।

গোয়েন্দার কথা কানে যেতে কল্যাণ তুলসীর বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, কোন গোয়েন্দাকে কাজের ভার দিয়েছেন?

পারিজাত বক্সী।

উনি তো বিখ্যাত গোয়েন্দা। অনেক বড়ো বড়ো কেসের সমাধান করেছেন।

হ্যাঁ, তা-ই তো শুনেছি। তবে এ কেসে একটু মুশকিল হয়েছে।

কী মুশকিল?

আমার শ্বশুরমশাইয়ের কাছে শুনলাম, তাঁকেও নাকি পাওয়া যাচ্ছে না।

পাওয়া যাচ্ছে না?

না। যেদিন আমার শ্বশুরমশাই টাকাটা ইডেন গার্ডেনে রাখতে গিয়েছিলেন, সেদিন পারিজাতবাবু সঙ্গে ছিলেন। যে লোকটা টাকা নিয়ে গেল, তাকে অনুসরণ করা হয়েছিল কিন্তু ধরা যায়নি। তার দু-দিন পর শ্বশুরমশাই পারিজাত বক্সীর বাড়ি গিয়ে শুনলেন, তিনি নেই।

সম্ভবত তিনি মূর্তি চোরদের সন্ধানেই গিয়েছেন।

তা হবে, কিন্তু শ্বশুরমশাইয়ের কাছে হাজার টাকা চেয়ে আবার একটা চিঠি এসেছে। সে টাকাও তিনি দিয়েছেন।

দশ হাজারের ওপর আবার এক হাজার?

হ্যাঁ, চিঠিতে লেখা ছিল, আগে পাঠানো টাকার হাজার টাকা নাকি টিকটিকি পারিজাত বক্সীর দোষেই হারিয়েছে। এবার শুধু কুমুদকে নয়, পারিজাত বক্সীকেও জামিন রাখা হয়েছে। টাকা না এলে দুজনকেই খতম করে দেওয়া হবে।

কল্যাণ মাথা নাড়ল। বলল, আমার মনে হয় এটা বাজে ধাপ্পা। শুধু ভয় দেখানো।

তা জানি না, তবে ওদের দাবি মেটানো সত্ত্বেও, পারিজাতবাবু আর কুমুদ কেউই এ পর্যন্ত ফিরে এল না।

কল্যাণ আর কিছু বলল না।

তুলসীর বাবা তাকে ছাড়ল না। খাইয়েদাইয়ে বিকালে যেতে দিল।

তুলসী বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তার বাবা বারণ করল।

না, তুমি বাড়ি থেকে এখন একদম বের হবে না। বদমায়েশগুলো তোমার সন্ধানে এখানে হানা দিতে পারে।

কল্যাণও তা-ই বলল।

তুলসীর বাবা সঙ্গে গেল।

যখন ফিরল তখন বেশ উত্তেজিত। আরক্ত মুখ, উত্তেজনায় বুকটা ওঠানামা করছে।

তুলসীর মা জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে?

বলছি, আগে এক গ্লাস জল দাও।

জল খেয়ে চেয়ারে কিছুক্ষণ বসল। ইতিমধ্যে তুলসীও মা-র পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

একটু সুস্থ হয়ে তুলসীর বাবা পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল।

বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটা লোক কাগজ বিলি করছিল। বলল, নতুন সাবান বেরিয়েছে। দামেও সস্তা, জিনিসও ভালো। একটা কাগজ আমাকেও দিল। কাগজটা পকেটেই রেখে দিয়েছিলাম। মাঝরাস্তায় কৌতূহল হল। কাগজটা খুললাম। দেখলাম 'সুরূপ' সাবানের বিজ্ঞাপন। তলায় লাল কালিতে লেখা। তুলসীকে খতম আমরা করবই, যদি তাকে সিন্দুকে বন্ধ করে রাখেন, তবুও।

তুলসীর মা চেঁচিয়ে উঠল। তুলসীও ভয় পেল না, এমন নয়।

তুলসীর বাবা বলল, তুলসীর এখন বাইরে বার হওয়া একদম বন্ধ। কোনও বন্ধুবান্ধব ডাকলেও যাবে না। কাউকে এখন বিশ্বাস নেই।

কাজেই তুলসী বাড়িতে প্রায় বন্দি হয়ে রইল।

তুলসীর বাবা কলকাতায় শ্বশুরের সঙ্গে দেখা করল।

কুমুদের বাবার শরীর খুব ভেঙে পড়েছে। রোগী দেখা খুব কমিয়ে দিয়েছেন। কুমুদের মা শয্যাশায়ী।

জামাইয়ের কাছ থেকে সব শুনে কুমুদের বাবা শুধু বললেন, তাহলে কুমুদের কোনও খবর তুলসী রাখে না?

তুলসীর বাবা বলল, তুলসী তো মন্দিরের মধ্যে একাই ছিল। প্রথমবারে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে কুমুদের সঙ্গে তুলসীর আর দেখা হয়নি।

কুমুদের বাবা নিশ্বাস ফেললেন, কী জানি, যা টাকা চেয়েছে, সেটাই পাঠিয়ে দিলাম, তবু ছেলেকে ফেরত পেলাম না। কুমুদ আর ফিরে আসবে এ ভরসা আমার নেই। পারিজাত বক্সীর খুব নাম শুনেছিলাম। অনেক বড়ো বড়ো কেসের ফয়সালা করেছেন খবরের কাগজে পড়েছি। পুলিশমহলেও তাঁর ওপর অগাধ বিশ্বাস, কিন্তু আমার বেলাতেই তিনি কিছু করতে পারলেন না।

পারিজাতবাবুকেও শুনছি কদিন পাওয়া যাচ্ছে না?

হ্যাঁ, আমি বারকয়েক গিয়েছিলাম, বাড়ির লোকও কোনও খবর বলতে পারল না। অবশ্য বাড়ির লোক জানলেও ঠিক খবর হয়তো দেবে না। হতে পারে ভদ্রলোক হয়তো অন্য একটা কেসে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

বাড়তি হাজার টাকাও তো আপনি দিয়েছেন?

হ্যাঁ, দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে একটা গাছের ডালে ঝোলানো টিনের মধ্যে টাকাটা রাখার নির্দেশ ছিল। আমি ঝোপের আড়াল থেকে দেখলাম একটা লম্বা লোক টিনটা খুলে নিয়ে চলে গেল। আমি তার পিছন পিছন গিয়ে দেখি লোকটা একটা লরিতে উঠে উধাও।

কুমুদের বাবার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে কোণের দিকে রাখা টেলিফোনটা বেজে উঠল, ঝন ঝন ঝন।

কুমুদের বাবা তাড়াতাড়ি গিয়ে ফোন ধরলেন।

খুব অল্পক্ষণ কথা হল। ফোন নামিয়ে কুমুদের বাবা যখন ফিরে এলেন, তখন তাঁর মুখ-চোখের চেহারা অনেকটা শান্ত।

ওদের কাছ থেকেই খবর এসেছিল।

তুলসীর বাবা প্রশ্ন করল, কী ব্যাপার?

কে একজন জানাল, আমার বাকি টাকা পেয়েছে। কুমুদকে এবার ছেড়ে দেব, তবে ওদের নিজেদের কিছু কাজ বাকি আছে, তাই কদিন দেরি হবে।

আর পারিজাত বক্সী?

কী জানি, তাঁর কথা তো কিছু বলল না।

তুলসীর বাবা বলল, যতক্ষণ না কুমুদ বাড়ি ফিরে আসে ততদিন বিশ্বাস নেই। তুলসীর কাছে যা শুনলাম তা তো ভীষণ ব্যাপার।

কীরকম?

তুলসীকে পাহাড়ের ওপর এক মন্দিরের মধ্যে ফেলে দিয়ে লোকটা চলে গিয়েছিল, বের হবার একমাত্র পথ পাথরচাপা দিয়ে। আমার তো মনে হয়, উদ্দেশ্যই ছিল তুলসীকে না খেতে দিয়ে মেরে ফেলা। তুলসী কোনওরকমে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছে।

এখন দেখছি ওদের অসাধ্য কোনও কাজ নেই।

তুলসীর বাবার ওঠবার মুখে তার শ্বশুর সাবধান করে দিল। তুমি নিজে একটু সাবধান হয়ে চলাফেরা করো।

আমি?

তুলসীর বাবা বিস্মিত হল।

কিছু বলা যায় না। তুলসীকে না পেলে তার রাগটা তোমার ওপর পড়াও বিচিত্র নয়। তুমি ফাঁকা জায়গায় একদম যাবে না, আর তুলসীকে বাড়ি থেকে কোথাও বের হতে দেবে না।

তুলসীর বাবা চলে যেতেই কুমুদের বাবা বেরিয়ে পড়লেন।

লালবাজারে গিয়ে সহকারী কমিশনার মিস্টার বাসুর কাছে নিজের কার্ড পাঠালেন।

মিনিট দশেক, তারপরই মিস্টার বাসু ডেকে পাঠালেন।

কী, বলুন?

কুমুদের বাবা সব বললেন। পারিজাত বক্সীর কথাও।

মিস্টার বাসু মাথা নাড়ালেন, মনে পড়ছে, পারিজাত বক্সী হাতের লেখার একটা ব্যাপারে এখানে এসেছিলেন। আমার তো মনে হয় আপনার ছেলে ফিরে আসবে। কয়েকদিন সময় নিয়েছে এইজন্য, এর মধ্যে তারা হয়তো মূর্তিগুলো বাইরে পাচার করবে। আপনি দিন পনেরো পর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। পারিজাত বক্সীর ওপর আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা আছে। তিনি নিশ্চয় একটা সুরাহা করতে পারবেন।

কুমুদের বাবা বেরিয়ে এলেন।

কোনও কাজে মন দিতে পারেন না। দারুণ একটা অস্বস্তি। কোথা থেকে যেন কী হয়ে গেল। ছেলে বোনের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে বিপদ ডেকে আনল।

ভাবলেন, একবার সরাসরি তুলসীর সঙ্গে কথা বলবেন। যদিও জামাইয়ের সঙ্গে সকালেই কথা হয়েছে, তবু তুলসী কী বলে সেটাও শোনা দরকার। মন্দিরটা ঠিক কোন জায়গায় সেটাও জানতে পারলে ভালো হত।

ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন সোজা জামাইয়ের বাড়ি যেতে।

ঘণ্টা আড়াই, তার মধ্যেই মোটর রতনগড়ে পৌঁছে গেল।

জামাইয়ের বাড়ির কাছ বরাবর গিয়েই কুমুদের বাবা চমকে উঠলেন। বহু লোকের জটলা বাড়ির সামনে। কুমুদের বাবা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।

কী হল, তুলসীকে কি আবার কোনওরকমে ধরে নিয়ে গেল!

কুমুদের বাবা মোটর থেকে নামতেই গাঁয়ের লোকেরা তাঁকে ঘিরে ধরল।

কী হয়েছে?

কুমুদের বাবার প্রশ্নের উত্তরে লোকেরা আঙুল দিয়ে দেখাল।

বাড়ির সামনে দিকের অনেকটা ধসে পড়েছে। জানলার দুটো পাল্লা ঝুলছে।

কী করে হল?

বোমা।

কুমুদের বাবা লোকের পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকলেন।

মাঝখানে ঘরে খাটের ওপর তুলসী। তার মাথায়, হাতে ব্যান্ডেজ। মাথার কাছে তুলসীর মা। একটু দূরে তুলসীর বাবা দাঁড়িয়ে।

বাবাকে ঢুকতে দেখেই মেয়ে ছুটে কাছে এল।

বাবা, এ সময়ে আপনি?

কেমন মনটা হল, ভাবলাম সবকিছু তুলসীর মুখ থেকে শুনে আসি। কিন্তু কী ব্যাপার?

তুলসীর বাবা বলল, তুলসীকে বারণ করে দেওয়া হয়েছে। সে বাড়ি থেকে বের হয় না। আজ বাইরের ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তায় একটা বাউল কাঁধে ঝোলা, একতারা বাজিয়ে গান করছিল। হঠাৎ ঝোলা থেকে বোমা বের করে জানলার দিকে ছুড়ে দিল। কী প্রচণ্ড আওয়াজ। সারা বাড়িটা থরথর করে কেঁপে উঠল। দেখেছেন তো সামনের দিকটা কীভাবে ভেঙে পড়েছে।

কুমুদের বাবা একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুলসীর চোট কি খুব বেশি?

তুলসীর বাবা বলল, তুলসী খুব সময়ে জানলা থেকে সরে এসেছে, নইলে কী হত বুঝতেই পারছেন। দেয়াল ভেঙে ইঁটের টুকরো মাথায় আর হাতে লেগেছে। ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিয়ে গেছে।

কুমুদের বাবা নাতির বিছানার ওপর বসলেন।

তুলসীর চোখ বন্ধ। ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়ে থাকবে।

কপালে হাত দিয়ে দেখলেন। না জ্বর নেই, তবে পরে জ্বর হতে পারে।

জামাইয়ের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলেন, বাউলটাকে কেউ ধরতে পারেনি?

ঠিক দুপুরবেলা, কোথাও কেউ ছিল না। আওয়াজ শুনে সবাই এসে জড়ো হয়েছে।

লোকটাকে তুলসী চিনতে পেরেছে?

না। বললে তো একে কখনো দেখেনি। তবে বোমার শব্দের একটু পরেই জঙ্গলের মধ্যে মোটরের শব্দ পেয়েছিল। লোকটা বোধহয় মোটরে এসেছিল।

উঃ, কী সাহস!

লোকটার পোশাক আর একতারা জঙ্গলের মধ্যে পড়ে ছিল। একটা লোক কুড়িয়ে এনেছে।

থানায় খবর দেওয়া হয়েছে?

দারোগা এসে সব লিখে নিয়ে গেছে। ভাবছি তুলসীকে কিছুদিন এখান থেকে সরিয়ে দেব। আপনাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেব। আবার ভাবছি নিয়ে যাবার সময় পথে গোলমাল না হয়।

কুমুদের বাবা একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, গোলমাল আর কী হবে। তোমরা যদি বলো, তাহলে আমি পুলিশ নিয়ে আসতে পারি।

দেখি, তুলসী সেরে উঠুক।

কুমুদের বাবা বাড়ি গিয়ে শুনলেন, লালবাজার থেকে ফোন এসেছিল।

লালবাজার থেকে ফোন। তবে কি পুলিশ কুমুদের কোনও খবর পেয়েছে? দুর্বৃত্তরা কুমুদকে ছেড়ে দেবে এ কথা ফোনে তাঁকে বলেছিল।

কে ফোন করেছিল কিছু বলেছেন?

হ্যাঁ, ডেপুটি কমিশনার মিস্টার বাসু ফোন করেছিলেন। বলেছেন আপনি এলেই যেন ফোন করেন।

কুমুদের বাবা তখনই ফোন তুললেন।

একটু পরেই মিস্টার বাসুকে পাওয়া গেল।

আপনি ফোন করেছিলেন?

হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে একবার দেখা হওয়া দরকার।

কখন বলুন?

কখন আপনার সুবিধা হবে?

সন্ধ্যার সময় যদি যাই।

ঠিক আছে। তা-ই আসুন।

কিছু খবর আছে?

আপনার সঙ্গে দেখা হলে বলব।

মিস্টার বাসু ফোন নামিয়ে রাখলেন।

কুমুদের বাবা রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়লেন। কুমুদ ফিরে এসেছে এমন খবর তো মিস্টার বাসু অনায়াসেই দিতে পারতেন।

নিশ্চয় অশুভ খবর, তাই তাঁকে ডেকে পাঠালেন।

কুমুদের বাবা যখন গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে, তখন তাঁর স্ত্রী ঘরে ঢুকলেন।

ক্লান্ত বিষণ্ণ চেহারা। কোনওরকমে ঘরে ঢুকে ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন। এই অল্প পরিশ্রমেই হাঁপাচ্ছেন।

তুলসী কেমন আছে?

কুমুদের বাবা ঠিক খবর বললেন না। বললে তাঁর স্ত্রী আরও চিন্তিত হতেন।

তাই তিনি শুধু বললেন, ভালো।

কুমুর কথা কিছু বলল?

না, কুমু আর তুলসী এক জায়গায় ছিল না, কাজেই কুমুর কথা তুলসী জানে না। কুমুর খবর তো পেয়েছি।

পেয়েছ? কই, আমাকে তো কিছু বলোনি।

উত্তেজনায় কুমুদের মা-র সারা মুখ আরক্ত হয়ে উঠল।

পুরো টাকা পাঠিয়েছি, এবার তাকে ছেড়ে দেবে।

কবে?

তা জানি না। আজ সন্ধ্যার পর তো লালবাজারে যাচ্ছি, দেখি যদি কোনও খবর পাই।

কুমুদের মা আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সন্ধ্যার আগেই কুমুদের বাবা লালবাজার রওনা হয়ে গেলেন।

মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করার পরই কুমুদের বাবার ডাক এল।

এবার মিস্টার বাসু যেন বেশ গম্ভীর।

একবার চোখ তুলে কুমুদের বাবাকে দেখে নিয়ে বললেন, আচ্ছা, আপনি যে কদিন আগে ফোন পেয়েছিলেন, তাতে আপনার ছেলে ছাড়া আর কারো কথা বলেছিল?

কুমুদের বাবা সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, আর কার কথা বলবে?

পারিজাত বক্সীর কথা?

না।

মিস্টার বাসু ড্রয়ার খুলে একটা খাম বের করে কুমুদের বাবার সামনে ঠেলে দিয়ে বললেন, চিঠিটা পড়ে দেখুন।

খামের ওপর লেখা—মিসেস পারিজাত বক্সী। তলায় ঠিকানা।

কুমুদের বাবা খাম থেকে চিঠিটা বের করলেন।

চৌকো সাদা কাগজ। টাইপ করা চারটে লাইন। তলায় কোনও নাম নেই—

টিকটিকি ফাঁদে পড়েছে। সহজে ছাড়া পাবে না। আমাদের পিছনে লাগার উপযুক্ত ফল ভোগ করতে হবে।

লেখাটা ইংরেজিতে। তার মানে পারিজাত বক্সীও ধরা পড়েছে।

পারিজাত বক্সীকে কুমুদের বাবাই নিয়োগ করেছিলেন, কাজেই কুমুদকে যে ছেড়ে দেবে, এমন মনে হয় না। কুমুদের বাবার ওপর রাগটা ছেলের ওপর পড়বে।

কুমুদের বাবা চুপচাপ বসে রইলেন, কী বলবেন ভেবে পেলেন না।

কবে কখন আপনার কাছে ফোন এসেছিল জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই, কারণ খোঁজ নিলে দেখা যাবে ফোনটা কোনও পাবলিক ফোন থেকে করা হয়েছিল। লোকের পাত্তা পাওয়া যাবে না।

এবার কুমুদের বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, কী করবেন ঠিক করেছেন?

ভাবছি আপনার নাতির সঙ্গে একবার কথা বলব।

কিন্তু সে তো কুমুদকে দেখেনি। মানে একসঙ্গে তারা ছিল না।

না দেখলেও, যারা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের চেহারার বর্ণনা শুনতে চাই। আপনার নাতিকে কতকগুলো ফোটোর অ্যালবাম দেখাব, যদি চেহারা মিলে যায়। তাকে কবে আনতে পারবেন?

তাকে আনার ব্যাপারে কিছু অসুবিধা আছে।

অসুবিধা? কী অসুবিধা?

কুমুদের বাবা বোমার ঘটনাটা বললেন। বাউলবেশী দুর্বৃত্তের কথাও।

শুনতে শুনতে মিস্টার বাসু উঠে দাঁড়ালেন। টেবিলের ওপর সক্রোধে ঘুসি মেরে বললেন, বড্ড বাড়াবাড়ি করছে। এ আমাদের চ্যালেঞ্জ করা। ঠিক আছে, আমরাও এবার আমাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। শুনুন, কাল আমি নিজে গিয়ে আপনার নাতিকে নিয়ে আসব। আমার সঙ্গে পুলিশ থাকবে। কোনও ভয় নেই। তবে আমি আপনার জামাইয়ের বাড়ি চিনি না, দয়া করে আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। কখন আপনার সুবিধা হবে, আপনাকে তুলে নিয়ে যাব। আপনার ঠিকানা আমার জানা।

আপনি যখন বলবেন।

সকাল দশটা।

মিস্টার বাসু তুলসীদের বাড়ি গিয়ে দেখলেন ফটকের দু-পাশে দুজন পুলিশ। থানার দারোগা এই বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন।

মিস্টার বাসুর সঙ্গে চারজন সশস্ত্র পুলিশ।

তুলসীর বাবা বাড়িতেই ছিল, হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল।

মিস্টার বাসু, কুমুদের বাবা তুলসীর কাছে গিয়ে বসলেন। তার কাছে মিস্টার বাসু সব শুনলেন।

মিস্টার বাসুর আসার খবর পেয়ে থানার দারোগাও এসে হাজির। তাকে মিস্টার বাসু প্রয়োজনমতো নির্দেশ দিলেন।

তুলসীকে যেন চোখে চোখে রাখা হয়। এ বাড়ির ত্রিসীমানায় উটকো লোক না ঢোকে। গাঁয়ে নতুন কোনও সন্দেহজনক লোক এলেই যেন তাকে পাকড়াও করে জেরা করা হয়।

কিছুক্ষণ পর তিনি তুলসীকে মোটরে উঠিয়ে নিলেন। সঙ্গে তুলসীর বাবাও গেল।

লালবাজারে তুলসীর সামনে বিরাট একটা ফোটোর অ্যালবাম রেখে মিস্টার বাসু বললেন, এই ফোটোগুলো দেখে যাও। তোমাকে যে ধরে মন্দিরের মধ্যে রেখে দিয়েছিল, দেখো তো তার ফোটো আছে কি না।

তুলসী খুব মনোযোগ দিয়ে গোটা অ্যালবাম দেখে গেল, তারপর মাথা নেড়ে বলল, না, তার ফোটো এখানে নেই।

লোকটাকে কেমন দেখতে?

খুব লম্বা, ফরসা, মাথার চুল ছোটো করে ছাঁটা। লোকটার গায়েও অসীম শক্তি।

অসীম শক্তি?

হ্যাঁ, তা না হলে অবলীলাক্রমে আমাকে কাঁধে ফেলে চলতে পারে!

মিস্টার বাসু গম্ভীরকণ্ঠে বললেন, লোকটার ফোটো যে থাকবে না, এটা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম, কারণ খোদ কর্তারা পিছনে থাকে। তাদের শাগরেদদের দিয়ে এসব কাজ করায়। যাহোক, তুমি কিন্তু বাড়ি থেকে একদম বের হবে না। যদিও আমরা পাহারা দেবার সবরকম চেষ্টা করছি, তবু সাবধান হওয়াই ভালো।

তুলসী সায় দিল। তার খুব শিক্ষা হয়েছে। সে কিছুদিন বাড়ির বাইরে যাবে না।

মিস্টার বাসু তুলসীর কাছ থেকে বাউলের চেহারার বর্ণনাও শুনলেন।

তুলসীদের ফেরার বন্দোবস্ত করে দিয়ে মিস্টার বাসু বিহারের পুলিশের বড়োকর্তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলেন।

তাঁর কাছে কুমুদ আর পারিজাত বক্সীর ফোটো পাঠিয়ে দিয়ে নির্দেশ দিলেন, অন্তত ভাগলপুরের কাছাকাছি থানায় এর কপি যেন পাঠিয়ে দিয়ে তল্লাশি করা হয়।

কুমুদের বাবা দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন, সে কথাও জানিয়ে দিলেন।

এরপর মিস্টার বাসু সহকারীদের নিয়ে জরুরি মিটিংয়ে বসলেন।

পারিজাত বক্সী তাঁদের শুধু পরিচিতই নন, বিশেষ বন্ধুলোক। বহুবার পুলিশের অনেক জটিল কেসের সমাধান করেছেন। লোকটার একমাত্র দোষ, ভীষণরকম বেপরোয়া। নিরস্ত্র অবস্থায় কিংবা সামান্য অস্ত্র নিয়ে বিপজ্জনক এলাকায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে। এ দেশের অপরাধীমহলের তিনি এক নম্বরের শত্রু। যদি হাতের কাছে পায়, তাহলে সহজে ছাড়বে, এমন মনে হয় না।

দুজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার বিহার রওনা হয়ে গেল।

মিস্টার বাসু রাত দশটায় বাড়ি ফিরে শুনলেন তাঁর একটা ফোন এসেছিল।

কার ফোন?

তা কিছু বলেনি। বলেছে রাত এগারোটায় আবার ফোন করবে।

মিস্টার বাসু বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। দুর্বৃত্তরা কি পারিজাত বক্সীকে খতম করে তাঁকে সেই সংবাদ জানাচ্ছে? এদের অসাধ্য কিছু নেই!

তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে মিস্টার বাসু ফোনের কাছে এসে বসলেন।

এগারোটায় নয়, ফোন বেজে উঠল এগারোটা দশে।

মিস্টার বাসু?

কথা বলছি।

ফোনের ওপারের কণ্ঠ শুনে মিস্টার বাসু অনেকটা আশ্বস্ত হলেন।

কুমুদের বাবা কথা বলছেন।

আপনার সঙ্গে বিশেষ দরকারি কথা আছে।

শুনুন, আপনাকে আমি একটা ফোন নম্বর দিচ্ছি, সেই ফোনে আমার সঙ্গে কথা বলুন।

মিস্টার বাসু একটা নম্বর দিয়ে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।

একটু পরেই তাঁর প্রাইভেট ফোন বেজে উঠল।

মিস্টার বাসু ফোন তুলে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ, এবার বলুন।

আমি একটা চিঠি পেয়েছি।

কী চিঠি?

পড়ে শোনাচ্ছি আপনাকে।

কুমুদের বাবা পড়ে শোনালেন—

আপনাকে আগে জানানো হয়েছিল যে আপনার ছেলেকে মুক্তি দেওয়া হবে। তার মুক্তিপণের টাকা আমাদের হস্তগত হয়েছে, কিন্তু পুনরায় বিবেচনা করে ঠিক করা হয়েছে যে, যেহেতু আপনি মূর্খের মতন সমস্ত ব্যাপারটা পুলিশের গোচরে এনেছেন এবং একজন টিকটিকি নিয়োগ করেছেন, সেইজন্য দণ্ডস্বরূপ আপনাকে আরও দশ হাজার টাকা দিতে হবে।

পাঁচ দিনের মধ্যে এ টাকা না পেলে আপনাকে পার্সেলযোগে আপনার পুত্রের ছিন্ন মুণ্ড পাঠানো হবে।

এই দশ হাজার টাকা একশো টাকার নোটে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দক্ষিণ গেটের সামনে যে মূর্তি আছে তার পায়ের ফাঁকে দুপুরবেলা রেখে চলে যাবেন। সেখানে অপেক্ষা করবেন না।

যদি আপনি সঙ্গে পুলিশ আনেন তাহলে সেই বোকামির চূড়ান্ত দায়িত্ব আপনার। শুধু পুত্রের নয়, আপনারও প্রাণসংশয় জানবেন।

কুমুদের বাবার চিঠিটা পড়া দেখেই বোঝা গেল তিনি অত্যন্ত ভয় পেয়েছেন। শুধু ভয়ই নয়, আশাভঙ্গও। আশা করেছিলেন, কুমুদ ফিরে আসবে। সে আশা শেষ হয়ে গেল।

আপনার চিঠিটা কি ডাকে এসেছে?

না, আমার রোগীর মধ্যে কেউ বন্ধ খামটা কম্পাউন্ডারের হাতে দিয়ে গেছে। রোগী মানে, রোগী সেজে এসেছিল।

চিঠিটা নিয়ে কাল আপনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন।

খুব ভোরে কুমুদের বাবা আবার এক ফোন পেলেন। মিস্টার বাসুর গলা।

শুনুন, ভেবে দেখলাম আপনার এখানে আসা ঠিক হবে না। বদমায়েশগুলো নিশ্চয় আপনার ওপর নজর রাখবে। আপনি আসবেন না, আমি দিন দুয়েকের মধ্যে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

পরের দিন কুমুদের বাবা বসে বসে রোগী দেখছেন, এমন সময়ে হাত-বাঁধা একজন এসে পিছনের বেঞ্চে বসল।

ইদানীং খুব জরুরি কেস ছাড়া কুমুদের বাবা দেখেন না। মনের এ চাঞ্চল্য নিয়ে বেশি পরিশ্রম করতেও পারেন না।

হাত-বাঁধা রোগী সব শেষে তাঁর কাছে এসে দাঁড়াল।

কী ব্যাপার? মারপিট নাকি?

লোকটা মুচকি হেসে বলল, আমি মিস্টার বাসুর কাছ থেকে আসছি।

পলকে কুমুদের বাবা গম্ভীর হয়ে গেলেন।

ভিতরে এসো।

রোগী দেখার ভিতরের চেম্বারে লোকটা ঢুকল। পিছন পিছন কুমুদের বাবা।

লোকটা বলল, মিস্টার বাসু আপনাকে জানাতে বলেছেন যে পরশু আপনি টাকাটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে রেখে আসবেন।

কুমুদের বাপ রীতিমতো বিস্মিত হলেন।

সে কী, মিস্টার বাসু টাকাটা দিয়ে দিতে বলেছেন! কিছুদিন আগে তাঁর এগারো হাজার টাকা গেছে, আবার দশ হাজার যাবে! টাকার জন্য নয়, এ পর্যন্ত ছেলে ফিরে এল না। দুর্বৃত্তদের যা ব্যাপার দেখা যাচ্ছে, এইভাবে কোনও না কোনও অছিলায় তারা কেবল টাকা চেয়েই যাবে। এই যদি পুলিশের কর্মতৎপরতা হয়, তাহলে লোকেরা এদের ওপর নির্ভর করবে কী করে!

লোকটা বোধহয় কুমুদের বাবার মনের অবস্থা বুঝতে পারল। আপনি বিচলিত হবেন না। টাকা আপনাকে দিতে হবে না।

টাকা দিতে হবে না?

না। টাকার মাপে কাগজ কেটে একটা খামে ভরে যেখানে রাখবার কথা সেখানে দুপুরবেলা রেখে আসবেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, বাকি যা করার মিস্টার বাসুই করবেন। তাহলে চলি। ওই কথা রইল। পরশু দুপুরবেলা।

লোকটা বেরিয়ে গেল।

কুমুদের বাবা চুপচাপ বসে রইলেন। শত্রু সামান্য তো নয়ই, রীতিমতো দুর্দান্ত এবং নিষ্ঠুর। ওদের সঙ্গে প্রতারণা করার ফল তাঁকেই ভোগ করতে হবে। হয়তো ছেলেকে চিরদিনের জন্য হারাবেন। নিজেরও বিপদ হতে পারে। কিন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে গিয়েও তো লাভ নেই।

অনেক ভেবেচিন্তে কুমুদের বাবা ঠিক করলেন পুলিশের কথামতো কাজ করাই ভালো। তারাই দেশের রক্ষক।

ঠিক দিনে কুমুদের বাবা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে গিয়ে হাজির হলেন। পকেটে খাম। তাতে নোটের সাইজের কাগজ।

দুপুরবেলা মেমোরিয়াল একেবারে ফাঁকা। ধারেকাছে কাউকে দেখা গেল না।

খামটা সন্তর্পণে মূর্তির পায়ের কাছে রেখে দিয়ে ফিরে একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড়ালেন।

মিনিট পনেরো-কুড়ি, কেউ এল না।

হঠাৎ একটা মোটরের শব্দ। কুমুদের বাবা মুখ ফিরিয়ে দেখলেন সবুজ রঙের একটা মোটর গেটের একটু দূরে এসে থামল।

মোটর থেকে কালো বেঁটে একটি লোক নামল। পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি। মাথায় টিকি। দেহাত থেকে শহর দেখতে যে ধরনের লোক আসে, ঠিক তেমনই।

লোকটা এদিক-ওদিক দেখে আস্তে আস্তে এগিয়ে মূর্তির কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

আর-একবার এদিক-ওদিক দেখে খামটা তুলে নেবার সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যয়।

ঝোপের আড়ালে একটা লোক লুকিয়ে ছিল। তার পরনে ছেঁড়া গেঞ্জি আর প্যান্ট। মাথায় কাপড়ের ফেট্টি, তাতে নানা রঙের কাগজ ঝোলানো।

লোকটাকে কুমুদের বাবাও লক্ষ করেননি।

পাগলা সিংহবিক্রমে সেই দেহাতি লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

সঙ্গে সঙ্গে দেহাতি লোকটা পকেট থেকে রিভলভার বের করে পাগলাটাকে লক্ষ করে গুলি ছুড়ল। গুড়ুম।

পাগলাটা রক্তাক্ত দেহে ঘাসের ওপর লুটিয়ে পড়ল।

দেহাতি লোকটা ছুটে গেটের দিকে পালাল।

কিন্তু গেট পর্যন্ত পালাতে পারল না, তার আগেই সাদা প্যান্ট-পরা চারজন লোক পিস্তল হাতে তাকে ঘিরে ফেলল।

গুড়ুম, গুড়ুম। এবার সবুজ মোটর থেকে গুলির শব্দ এল। মাত্র দুবার।

কুমুদের বাবা দেখলেন দুজন লোক যারা মাঠে আইসক্রিম বিক্রি করছিল, তারা মোটরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

দেহাতি লোকটাকে চারজন মিলে টানতে টানতে মোটরের দিকে নিয়ে গেল।

কুমুদের বাবা আর অপেক্ষা করতে সাহস করলেন না। ছুটে নিজের মোটরে গিয়ে উঠলেন।

বিকালের দিকে তিনি নিজের থেকেই লালবাজারে গেলেন।

মিস্টার বাসুর সঙ্গে দেখা হতে তিনি বললেন, সুখবর, দুজনকে ধরতে পেরেছি।

কুমুদের বাবা যে আড়াল থেকে সব দেখেছেন, সে কথা কিছু বললেন না।

তিনি শুধু বললেন, এতে আমার ছেলের কিছু অমঙ্গল হবে না?

মিস্টার বাসু মাথা নাড়লেন, কী হবে? এবার বরং ওরা ভয় পাবে। ওদের হাতে যেমন আপনার ছেলে আর পারিজাত বক্সী রয়েছে, তেমনই আমাদের হাতে ওদের দলের দুজন রয়েছে।

লোক দুটো স্বীকার করেছে?

এ পর্যন্ত নয়। একটা লোক তো বলছে সে দেহাত থেকে শহর দেখতে এসেছিল। মূর্তির পায়ের কাছে একটা খাম পড়ে থাকতে দেখে কৌতূহলবশত সেটা তুলে নিয়েছিল। যখন জিজ্ঞাসা করা হল, বাপু গুলি ছুড়লে কেন? বলল, নিজেকে রক্ষা করার জন্য। পাগলটা ওভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তারপর রিভলভারের লাইসেন্স দেখতে চাওয়া হল। তখন আর দেখাতে পারে না। সঙ্গীরও ওই এক অবস্থা। ছেলে চুরি কিংবা মূর্তি চুরির সম্বন্ধে একটি কথাও বের করা যাচ্ছে না। দেখা যাক, কতদিন মুখ বন্ধ করে থাকতে পারে।

কুমুদের বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাদের যে ছেলেটি পাগল সেজে আহত হয়েছিল, তার অবস্থা কেমন?

মিস্টার বাসু উত্তর দিলেন, ভালোই আছে। হাতে সামান্য চোট লেগেছিল। ভাগ্য ভালো গুলি চামড়া ছিঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।

কুমুদের বাবা চলে যেতে মিস্টার বাসু উঠে যে ঘরে টিকিধারী লোকটা আটক আছে সে ঘরে ঢুকলেন।

দুজনকে আলাদা ঘরে রাখা হয়েছে।

একেবারে কোণে একটা টুলের ওপর লোকটা বসে ছিল। ধস্তাধস্তির সময় মুখের দু-এক জায়গায় চোট লেগেছে।

মিস্টার বাসু ঘরে ঢুকতে লোকটা ভ্রূক্ষেপও করল না। একভাবে বসে রইল।

মিস্টার বাসু লোকটার একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

তোমার স্যাঙাত সবকিছু স্বীকার করেছে। দলের অন্য সকলের নামধামও বলে দিয়েছে। তোমার এ বিষয়ে কিছু বলার আছে?

লোকটি অবিচল।

কী হল?

লোকটি মুখ তুলে একবার মিস্টার বাসুর দিকে দেখল, তারপর বলল, এসব কথা আমাকে শুনিয়ে কোনও লাভ নেই। আপনাকে তো আগেই বলেছি এসব ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। আমি এ শহরে নতুন। শহর দেখতে বেরিয়েছিলাম।

এবার মিস্টার বাসু লোকটার দিকে আরও এক-পা এগিয়ে গেলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, তাহলে আর-একটা খবর শোনো। তোমার পক্ষে খুব দরকারি খবর।

লোকটা কোনও চাঞ্চল্য প্রকাশ করল না। ফিরেও দেখল না।

যে পাগলটিকে তুমি গুলি করেছিলে, সে আজ সকালে হাসপাতালে মারা গেছে। এর কী ফল হতে পারে এবং হবে, আশা করি বুঝতে পারার মতন বুদ্ধি তোমার আছে।

এবার লোকটা একটু নড়েচড়ে বসল। অস্ফুটকণ্ঠে বলল, নিজেকে বাঁচাবার জন্য আমাকে গুলি ছুড়তে হয়েছিল।

বিনা লাইসেন্সের রিভলভার দিয়ে? বেশ, কোর্টে ওই কথাই বোলো। আমি তোমার জন্য খুব দুঃখিত।

মিস্টার বাসু সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

শেষের ঘরে অন্য লোকটি বন্দি ছিল। সে ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।

সেখানে একটি ইনস্পেকটর বসে ছিল। মিস্টার বাসু ঢুকতেই সে স্যালুট করে বেরিয়ে গেল।

এ লোকটার পরনে শার্ট আর ফুল প্যান্ট। বলিষ্ঠ গড়ন। চেহারা দেখে নেপালি বলেই মনে হয়।

তোমার কিছু বলবার আছে?

কী বিষয়ে?

ময়দানের ঘটনা সম্পর্কে?

যা বলার আমি কোর্টেই বলব। আপনারা অযথা বিরক্ত করতে আসবেন না।

মিস্টার বাসু বুঝতে পারলেন, একেবারে পাকা লোক। এর কাছ থেকে কথা বের করা বেশ শক্ত ব্যাপার।

তবু শেষ চেষ্টা হিসাবে বললেন, আপনার সঙ্গী সব কথাই আমাদের বলেছেন। আপনাকে জ্বালাতন করার আর আমাদের দরকার হবে না।

লোকটা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ধন্যবাদ।

মিস্টার বাসু নিজের কামরায় ফিরে এলেন।

সহকারীকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, আমাদের অ্যালবামে এদের ফোটো আছে?

না স্যার। মনে হচ্ছে এরা নতুন।

মিস্টার বাসু সায় দিলেন, এরা এক লোক বেশি দিন এক জায়গায় রাখে না। দেশে- বিদেশে চালান দেয়। আমি ভাবছি একবার তুলসীকে ডেকে পাঠাব, যদি সে ওদের কাউকে চিনতে পারে।

সেই ভালো স্যার। ঘণ্টা দুয়েক ধরে এদের জেরা করেছি, একটি দরকারি কথাও বের করতে পারিনি।

মিস্টার বাসু বললেন, কুমুদের বাবাকে একবার ফোনটা দাও তো।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কুমুদের বাবাকে ফোনে পাওয়া গেল।

ডাক্তার সায়েব, আপনার নাতি তুলসীকে একবার আমার দরকার।

কী ব্যাপার?

আর কিছু নয়, লোক দুটোকে যদি চিনতে পারে।

কিন্তু তুলসীকে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিপদের কথা তো জানেন।

সে দায়িত্ব আমার। গতবারের মতন আমি নিয়ে আসার সব বন্দোবস্ত করব।

কবে দরকার?

দেরি করতে চাই না। কাল হলেই ভালো হয়। ধরুন, কাল সকাল এগারোটা। আগে আপনাকে তুলে নেব।

আগের বারের মতন সশস্ত্র পুলিশ পরিবৃত হয়ে তুলসী লালবাজারে এসে পৌঁছাল। সঙ্গে কুমুদের বাবা। প্রথমে তাকে নেপালির কাছে নিয়ে যাওয়া হল। তুলসী তাকে চিনতে পারল না। তারপর তাকে আর-একটা ঘরে নিয়ে আসা হল। লোকটা পায়চারি করছিল। তাকে দেখেই তুলসী চে�চিয়ে উঠল, ওই সেই লোক। তুলসী একটা হাত দিয়ে তার দাদুর হাত আঁকড়ে ধরল।

মিস্টার বাসু পাশেই ছিলেন। তিনি একটা হাত তুলসীর কাঁধে রাখলেন। কোনও ভয় নেই, লোকটা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তুমি বলো একে কোথায় দেখেছ।

এই লোকটাই আমাকে অজ্ঞান করে কাঁধে নিয়ে কিছুটা রাস্তা গিয়েছিল। এই লোকটাই আমাকে মন্দিরের মুখে ঠেলে দিয়ে পাথরচাপা দিয়ে এসেছিল।

মিস্টার বাসু জিজ্ঞাসা করলেন, ঠিক করে দেখছ তো? কোনও ভুল হয়নি?

তুলসী মাথা নাড়ল, ভুল হতেই পারে না। ও মুখ আমি জীবনে ভুলব না।

আশ্চর্য কাণ্ড, তুলসী যখন এসব কথা বলছে, তখন লোকটার চেহারাও যেন বদলে যাচ্ছে।

আরক্ত দুটি চোখ। কপালের, গালের শিরাগুলো স্পষ্ট, দাঁত কিড়মিড় করে কী যেন বলার চেষ্টা করছে।

একটু পরেই লোকটা রাগে ফেটে পড়ল, একবার যদি তোকে হাতের মধ্যে পাই, তাহলে খতম করে দেব। তুই বেঁচে আছিস, আমি ভেবেছিলাম বুনোজন্তুদের শিকার হয়েছিস।

মিস্টার বাসু হাসলেন, তোমার হাতে পড়বার এর আর কোনও অবকাশ হবে না, কারণ ফাঁসির পর আর মানুষ বাঁচে না। তোমার গুলিতে একজন প্রাণে মারা গেছে।

তুলসীকে নিয়ে মিস্টার বাসু সরে এলেন।

কুমুদের বাবা জিজ্ঞাসা করলেন, এদিকটা তো হল, কিন্তু কুমুদকে উদ্ধার করার কী হবে?

বোঝা গেল, এ বিষয়ে মিস্টার বাসুও যথেষ্ট চিন্তিত।

তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, দেখি কী করা যায়। আমার মনে হয় কুমুদ আর পারিজাত বক্সী একই জায়গায় আছে। সম্ভবত কুমুদকে বাঁচাতে গিয়েই পারিজাত বক্সী ধরা পড়েছেন। আপনি এক কাজ করুন, তুলসীকে আপনার কাছেই রাখুন। ওকে মাঝে মাঝে আমাদের দরকার হবে। অতদূর থেকে আনার অসুবিধা। এখন বাড়তি কোনও বিপদের ঝুঁকি অমি নিতে চাই না।

কিন্তু—

কোনও ভয় নেই। অষ্টপ্রহর যাতে পুলিশ প্রহরা থাকে সে ব্যবস্থা আমি করে দেব। আপনি ওকে একেবারে বাড়ির বাইরে যেতে দেবেন না।

কুমুদের বাবা নাতিকে নিয়ে চলে যাবার পাঁচ মিনিট পরই মিস্টার বাসুর কাছে একটা স্লিপ এল।

স্লিপে লেখা নামটা দেখে মিস্টার বাসু কিছুক্ষণ ভ্রূ কুঞ্চিত করে রইলেন, তারপর হুকুম করলেন, পাঠিয়ে দাও।

একটু পরেই একটি সুন্দরী মহিলা এসে ঢুকল।

মিস্টার বাসু দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, বসুন মিসেস বক্সী।

মহিলা বসল।

পারিজাত বক্সীর কোনও খবর আছে?

মহিলা কোলের ওপর রাখা ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটা কাগজ বের করে মিস্টার বাসুর হাতে দিল।

সাদা চৌকো কাগজ। তাতে টাইপ করা কয়েকটা লাইন।

মিস্টার বাসু পড়লেন।

মিসেস বক্সী,

আপনার স্বামী আমাদের বহু কাজ বিনষ্ট করেছে। তার জন্য অনেক কাজ আমরা নির্বিবাদে হাসিল করতে পারিনি। এবারেও তাকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সে কর্ণপাত করা প্রয়োজন মনে করিনি। এবার তাকে আমরা মুঠোর মধ্যে পেয়েছি। তার নিস্তার নেই।

মিস্টার বাসু বার দুয়েক চিঠিটা পড়লেন।

মুক্তির বিনিময়ে কোনও টাকার উল্লেখ নেই। শুধু ভয়-দেখানো চিঠি। তবে এদের অসাধ্য কোনও কাজ নেই।

মিস্টার বাসু মিসেস বক্সীকে জিজ্ঞাসা করলেন, এ চিঠি আপনি কবে পেয়েছেন?

আজ সকালে।

কীভাবে?

ডাকবাক্সের মধ্যে থেকে।

ডাকবাক্সের চাবি কার কাছে থাকে?

আমার কাছে আর মিস্টার বক্সীর কাছে। তবে সচরাচর ডাকবাক্স আমিই খুলি।

ঠিক আছে, চিঠিটা আমার কাছে রেখে যান। আর আপনাকে একটা সুখবর শোনাই। দলের দুটি লোক ধরা পড়েছে।

ধরা পড়েছে?

হ্যাঁ, আশা করছি তাদের কাছ থেকে কিছু খবর আমরা বের করতে পারব।

মহিলা উঠে দাঁড়াল।

মিস্টার বক্সীর কোনও খবর পেলে আমাকে জানাবেন।

নিশ্চয়, আপনি তো জানেন পারিজাত বক্সী আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে একজন।

মহিলা বেরিয়ে যেতে মিস্টার বাসু সহকারীকে ডাকলেন।

সে আসতে তার হাতে চিঠিটা দিয়ে বললেন, দেখো তো, অন্য যেসব চিঠি আমরা এই কেসে পেয়েছি, তার সঙ্গে মিলিয়ে। একই টাইপরাইটার থেকে টাইপ করা কি না আমাকে জানিয়ে যেয়ো।

সহকারী চলে যেতে মিস্টার বাসু পায়চারি করতে শুরু করলেন। যেখান দিয়ে বাইরে মূর্তি পাচার করা সম্ভব, জলপথে অথবা স্থলপথে, সেখানেই তিনি ওয়্যারলেস পাঠিয়ে দিয়েছেন। সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন। কোনওরকমে সন্দেহজনক প্যাকিং দেখলেই যেন আটক করা হয়।

কোনও জায়গা থেকে খবর আসেনি।

একটি লোককে শনাক্ত করা গেছে, কিন্তু মূর্তি চুরির সঙ্গে এই মুহূর্তে জড়ানো সম্ভব নয়। ছেলে চুরি এবং তাকে হত্যা করার চেষ্টার জন্য তাকে অভিযুক্ত করা চলে।

পারিজাত বক্সী আগেও এ ধরনের বিপদে পড়েছেন, কিন্তু সে বিপদ কাটিয়ে উঠেছেন। কিন্তু এবার ব্যাপার একটু আলাদা। দুর্বৃত্তদের দুজন ধরা পড়েছে সেই আক্রোশে পারিজাত বক্সী আর কুমুদের ওপর চরম আঘাত হানা বিচিত্র নয়। এরা ভীষণ নিষ্ঠুর, বিবেকহীন।

পারিজাত বক্সীর কিছু হলে পুলিশ মুখ দেখাতে পারবে না। দিল্লি থেকে অপদার্থতার কৈফিয়ত তলব করবে।

হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল।

মিস্টার বাসু ছুটে এসে ফোন ধরলেন।

লালবাজারের অপারেটর বলল, ট্রাঙ্ককল স্যার।

প্রথমে অস্পষ্ট কণ্ঠ। ঠিক কিছু শোনা গেল না।

জোরে, একটু জোরে বলুন।

কণ্ঠস্বর স্পষ্টতর হল।

খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে মিস্টার বাসু চিৎকার করে উঠলেন।

পারিজাত বক্সী বাইরে এসে দেখলেন একটু দূরে একটা চালাঘর, তার সামনে খাটিয়ার ওপর একটা লোক শুয়ে।

অস্পষ্ট কুয়াশার জন্য পরিষ্কার কিছু দেখা গেল না।

পারিজাত বক্সী আবার ঘরের মধ্যে ঢুকলেন।

লোকটা মেঝের ওপর পড়ে রয়েছে। তখনও অজ্ঞান।

পারিজাত বক্সী নিজের পোশাক খুলে লোকটাকে পরালেন। শক্ত করে মুখ বাঁধলেন। লোকটার ধুতি আর গেঞ্জি নিজে পরলেন। ধুতির কিছুটা খুলে নিজের মাথা ঢাকলেন, তারপর থালা-গ্লাস নিয়ে আবার বের হলেন। বেরিয়ে দরজায় তালা বন্ধ করে দিলেন।

তারপর সন্তর্পণে পা ফেলে চালাঘরের মধ্যে ঢুকলেন। যখন খাটিয়ার পাশ দিয়ে যাচ্ছেন, তখন খাটিয়ার ওপর শোয়া লোকটা জড়ানো হিন্দিতে বলল, নে বাবা তাড়াতাড়ি নে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। আজ সিদ্ধির নেশাটা খুব জব্বর হয়েছে।

পারিজাত বক্সী কোনও উত্তর দেবার চেষ্টা না করে চালাঘরে ঢুকলেন। আর-একটা থালায় ভাত, তরকারি আর গ্লাসে জল তৈরি ছিল, সেগুলো নিয়ে বেরিয়ে এলেন।

প্রথমে মাঝখানের ঘরটা খুললেন। চোখ কুঁচকে দেখলেন তিনটে বস্তু প্যাক করা। এগুলো মূর্তি হওয়াও বিচিত্র নয়।

এরপর কোণের ঘরটা খুলেই দেখলেন, একটি ছেলে খাটিয়ার ওপর শুয়ে।

এই হয়তো কুমুদ। কিন্তু একে জাগাতে গেলেই যদি চিৎকার করে ওঠে?

পা টিপে টিপে কাছে গিয়ে পারিজাত বক্সী দেখলেন। কুমুদের ফোটো তিনি আগেই দেখেছেন। কাজেই চিনতে অসুবিধা হল না।

পারিজাত বক্সী কুমুদের কাছে গিয়ে কুমুদের মুখটা সজোরে চেপে ধরলেন।

কুমুদ আঁ করে চিৎকার করেই চুপ হয়ে গেল।

পারিজাত বক্সী কুমুদের কানে কানে বললেন, কুমুদ, কোনও ভয় নেই, আমি তোমাকে উদ্ধার করতে এসেছি। কোনওরকম শব্দ করো না।

কুমুদ মাথা নাড়ল, অর্থাৎ সে বুঝেছে।

পারিজাত বক্সী তার মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলেন, তারপর ইঙ্গিতে তাঁর অনুসরণ করতে বললেন।

দুজনে মাঝখানের ঘরে এসে দাঁড়াল। তিনটি প্যাক করা বস্তু একটার পর একটা ধরে বাইরে আনা হল।

ঠিক নীচেই গোটা চারেক নৌকা বাঁধা। মাঝিরা পাটাতনের ওপর ঘুমাচ্ছে।

পারিজাত বক্সী কাদা ভেঙে একটা মাঝিকে ওঠালেন।

প্রথমেই তার হাতে দশ টাকার একটা নোট দিয়ে প্যাক করা জিনিসগুলো নৌকায় তোলালেন। দুর্বৃত্তরা তাঁকে আঘাত করে অজ্ঞান অবস্থায় তাঁর রিভলভারটা সরিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু সেলাই করা আস্তরণের মধ্যে লুকানো টাকার বোধহয় সন্ধান পায়নি।

কুমুদও এসে নৌকায় উঠল।

নৌকার মাঝি জিজ্ঞাসা করল, এত রাতে কোথায় যাবেন বাবু?

এখানে বড়ো থানা কতদূরে?

হরিহরপুর থানা এখান থেকে পাঁচ মাইল।

তাড়াতাড়ি সেখানেই চলো। ভোরের আগে পৌঁছে দিতে পারলে আরও দশ টাকা দেব।

মাঝি প্রাণপণ শক্তিতে নৌকা বাইতে লাগল।

এতক্ষণ কুমুদ কোনও কথা বলেনি। চুপচাপ ছইয়ের মধ্যে বসে ছিল। এবার ক্লান্তকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে?

আমার পরিচয় পরে জানতে পারবে, এখন এইটুকু জেনে রাখো, তোমার বাবা তোমাকে উদ্ধার করার জন্য আমাকে নিয়োগ করেছেন।

তুলসী, তুলসীর খবর জানেন?

তুলসী দুর্বৃত্তদের হাত থেকে একবার পালিয়ে এসেছিল, কিন্তু আবার ধরা পড়েছে।

সে কী! আবার কী করে ধরা পড়ল?

সেসব কথা পরে শুনবে, এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। জানি, তুমি খুবই ক্ষুধার্ত। তোমাকে আমি ভাত খাবার সময়টুকুও দিইনি, কিন্তু তুমি নিশ্চয় এটুকু বুঝতে পারবে, নষ্ট করার মতন একটু সময়ও আমাদের হাতে ছিল না। কোনওরকমে কেউ দেখে ফেললে, আমাদের দুজনেরই প্রাণ নিয়ে ফেরা সম্ভব হত না।

কুমুদ আর কিছু বলল না। হাত-পা মুড়ে শুয়ে পড়ল।

হরিহরপুর থানা পর্যন্ত নৌকাকে যেতে হল না। তার আগেই সাইরেন দিয়ে একটা স্টিমার নদীর মাঝবরাবর ছুটে এল।

মাঝি জিজ্ঞাসা করল, বাবু, আপনাদের ওই প্যাক করা জিনিসগুলো গোলমেলে কিছু নয় তো?

পারিজাত বক্সী এ প্রশ্নে বিস্মিত হলেন, কেন?

জল-পুলিশের স্টিমার আসছে। এত রাতে নৌকা চলতে দেখলে সন্দেহ করে হয়তো সার্চ করতে পারে।

জল-পুলিশের স্টিমার? তুমি এক কাজ করো তো। তোমার নৌকা স্টিমারের যত কাছাকাছি সম্ভব নিয়ে চলো।

মাঝি আশঙ্কা প্রকাশ করল, স্টিমারের যা ঢেউ বাবু, কাছে গেলে বিপদ আছে।

বেশি কাছে যাবার দরকার নেই। বললাম তো, যতটা সম্ভব ততটা কাছে নিয়ে চলো। ভয় নেই, জল-পুলিশ আমার জানা।

নৌকা স্টিমারের কাছ বরাবর যেতে পারিজাত বক্সী মাঝির গামছাটা নিয়ে পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে গামছাটা ঘোরাতে লাগলেন।

স্টিমারের সার্চলাইট নৌকার ওপর পড়তেই স্টিমারের গতি কমে এল।

স্টিমার থেকে একজন চোং মুখে দিয়ে চেঁচাল, কী ব্যাপার?

দুটো হাত মুখের দু-পাশে রেখে পারিজাত বক্সী চেঁচালেন, সাহায্য চাই।

আসছি।

আস্তে আস্তে স্টিমার একেবারে নৌকার গায়ে ভিড়ল।

স্টিমার থেকে সাদা পোশাক-পরা দুটি লোক লাফিয়ে নৌকার ওপর পড়ল।

একজন জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে বলুন তো?

পারিজাত বক্সী জামার ভিতর থেকে ছোটো একটা কার্ড বের করে লোকটার হাতে দিল।

কার্ডের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়েই লোকটা সম্ভ্রমের সুরে বলল, আপনি সেই বিখ্যাত গোয়েন্দা পারিজাত বক্সী! আপনার রহস্য সমাধানের অনেক কাহিনি খবরের কাগজে আমি পড়েছি। আপনাকে কী সাহায্য করতে পারি বলুন?

পারিজাত বক্সী সংক্ষেপে সব ঘটনাটা বললেন। তারপর প্যাক করা বস্তুগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, আন্দাজ করছি ওগুলো চোরাই মূর্তি। এ দেশের বাইরে চালান দেবার জন্য রেডি করে রাখা হয়েছে।

সাদা পোশাকপরা লোকটি বলল, দুঃখের বিষয়, এসব জল-পুলিশের এলাকার ব্যাপার নয়। আপনাকে অন্য কীভাবে সাহায্য করতে পারি বলুন?

পারিজাত বক্সী উত্তর দিলেন, আর কোনও সাহায্য নয়। আপনি দয়া করে আমাদের দুজনকে আর এই জিনিসগুলো স্টিমারে তুলে নিন। আমাদের ভয় হচ্ছে বদমাইশগুলো টের পেয়ে হয়তো আমাদের অনুসরণ করতে পারে। মোটর বোটে যদি আসে তাহলে আমাদের নৌকার নাগাল পেতে মোটেই দেরি হবে না।

সঙ্গে সঙ্গে স্টিমারের লোকটি বলল, ঠিক আছে, আপনাকে আমরা হরিহরপুর থানায় পৌঁছে দেব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

তারপর লোকটা স্টিমারের দিকে ফিরে ইঙ্গিত করতেই স্টিমার থেকে একটা লম্বা কাঠের তক্তা নৌকার ওপর ফেলে দিল।

স্টিমার থেকে দুজন লোক তক্তার ওপর দিয়ে নৌকায় এসে দাঁড়াল, তারপর প্যাক করা তিনটে জিনিস স্টিমারে উঠিয়ে নিল।

এরপর কুমুদ আর পারিজাত বক্সী। সব শেষে সাদা পোশাক-পরা লোকটা।

নৌকা ছাড়বার আগে পারিজাত বক্সী মাঝির হাতে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে বললেন, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। এই নাও তোমার ভাড়া।

মাঝি মৃদু আপত্তি করল, আপনারা তো পুরো রাস্তা যাননি বাবু, তবে এ টাকা কেন?

পারিজাত বক্সী হাসলেন, ধরো নাও এ টাকা তোমার বকশিশ।

মাঝি টাকাটা নিয়ে সেলাম করল।

স্টিমার জল কেটে তিরবেগে ছুটল। তার মধ্যেই স্টিমারের লোকেরা কুমুদ আর পারিজাত বক্সীকে চা, রুটি, ডিম দিল।

স্টিমার যখন পাড়ে ভিড়ল, তখন মাঝরাত।

বড়ো একটা অশ্বত্থ গাছের তলায় গোটা চারেক টাঙা দাঁড়িয়ে। চালকদের কোথাও দেখা গেল না।

স্টিমার থেকে একটা লোক সঙ্গে এসেছিল, সে বলল, একটু দাঁড়ান স্যার, আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

পারিজাত বক্সী জিজ্ঞাসা করলেন, থানা এখান থেকে কতদূর?

তা মাইল আড়াই হবে।

লোকটা আর দাঁড়াল না। জোরপায়ে রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল।

কুমুদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। নিজের মুক্তিতে তার যে আনন্দ হয়নি এমন নয়, কিন্তু তুলসীর কথা মনে হতেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠছে।

আহা বেচারি, পালিয়েও আবার ধরা পড়ে গেল। বদমাইশগুলো আবার তাকে হাতে পেয়ে রাগের চোটে হয়তো খতমই করে ফেলেছে।

তুলসী তার ভাগনে হলে হবে কী, দুজনে একবারে বন্ধুর মতন। একজনকে ছাড়া আর-একজনের অস্তিত্বও যেন কল্পনা করা যায় না।

কুমুদ হাত দিয়ে নিজের চোখ দুটো মুছে নিল। স্টিমারের লোকটা আর-একজন লোককে প্রায় টানতে টানতে এনে হাজির হল।

এই যে স্যার, আবদুলকে ধরে এনেছি, টাঙাওয়ালা আব্দুল। নে, কোন টাঙাটা তোর? ঠিক কর, আমরা হরিহরপুর থানায় যাব।

আধ-ঘুমন্ত আবদুল তার টাঙায় উঠে বসল।

পারিজাত বক্সী কুমুদকে নিয়ে উঠলেন। তারপর স্টিমারের লোকটির সাহায্যে তিনটে প্যাকিং করা জিনিসও ওঠানো হল।

চারদিক একেবারে নিশুতি। মাঝে মাঝে দু-একটা কুকুরের চিৎকার। একটা ষাঁড়কে ঘুরতে দেখা গেল।

চৌরাস্তার মোড়ে একটা ঘড়িতে তিনটে বাজতে দশ।

টাঙা যখন থানায় পৌঁছাল, তখন ঠিক তিনটে।

দারোগা ওপরেই ছিল, সিপাইয়ের চেঁচামেচিতে নেমে এল।

সব শুনে হুংকার ছাড়ল, জায়গাটা কোথায় বলুন তো, আমি সবগুলোকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসছি।

পারিজাত বক্সী বললেন, আপনার সঙ্গে আমিও যাব, নইলে জায়গাটা আর মানুষগুলো আপনি ঠিক চিনতে পারবেন না।

কুমুদ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, সে পারিজাত বক্সীর একটা হাত আঁকড়ে ধরে বলল, না, না, আপনি যাবেন না। আপনাকে হাতের কাছে পেলে বদমাইশগুলো আবার বিপদে ফেলে দেবে।

পারিজাত বক্সী হেসে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, ভয় নেই, এবার আমরা তৈরি হয়ে যাব।

দারোগা সঙ্গে চারজন সশস্ত্র পুলিশ নিল।

তার আগে পারিজাত বক্সী বললেন, দয়া করে একবার এ তিনটে প্যাকিং খুলুন। ভিতরে কী আছে দেখা যাক। আপনার সামনে খুলব বলেই এতক্ষণ আমরা হাত দিইনি।

প্যাকিং খোলা হল।

দুটো মূর্তি খুলতেই কুমুদ চেঁচিয়ে উঠল। এই তো রতনগড়ের ধর্মরাজের মন্দিরের মূর্তি। দুটোরই মুণ্ড নেই। একটা মূর্তি পদ্মের ওপর বসে, আর-একটা অদ্ভুত এক জানোয়ারের ওপর। দুটো মূর্তির দেহ থেকে উজ্জ্বল সোনালি আলো বের হচ্ছে।

তৃতীয় মূর্তিটি কষ্টিপাথরের গণেশ। আকারে ছোটো।

পারিজাত বক্সী বললেন, চোরাই মূর্তি শনাক্ত করা হয়েছে, আর দেরি নয়, বেরিয়ে পড়া যাক, নইলে আসল মূর্তি পালাবে।

পুলিশের জিপ যখন গিয়ে পৌঁছাল, তখনও ভালো করে ভোর হয়নি। অন্ধকার সবে একটু তরল হচ্ছে।

পারিজাত বক্সী হতাশ হলেন। খাটিয়া খালি, কেউ শুয়ে নেই।

সকলে পাশের চালাঘরে ঢুকল।

ঘরের একেবারে কোণে একটা খাটিয়া। তার ওপর কে যেন আপাদমস্তক আবৃত করে শুয়ে আছে।

তার ওপর টর্চের আলো ফেলতেই লোকটা ধড়মড় করে জেগে উঠল। তারপরই বালিশের তলা থেকে রিভলভার বের করে ছোড়ার চেষ্টা করল।

কিন্তু কিছু করার আগেই, পুলিশ দুজন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল।

তারপর পারিজাত বক্সী দারোগাকে নিয়ে যেখানে তিনি বন্দি ছিলেন, সেই ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।

চাবি দিয়ে তালা খোলবার আগে সাবধান করে দিলেন, আপনারা তৈরি থাকবেন। আমি লোকটিকে ভালো করেই বেঁধে গিয়েছিলাম, বাঁধন খুলে ফেলেছে কি না জানি না।

দরজা খুলতে দেখা গেল লোকটা গড়িয়ে ঘরের আর-এককোণে চলে গেছে। পায়ের বাঁধন খোলা।

নিঝুম হয়ে পড়েছিল, একটা পুলিশ নিচু হয়ে তাকে দেখবার চেষ্টা করতেই লোকটা তাকে সবেগে লাথি মারল।

আরে বাপ! বলে পুলিশটা মুখে হাত দিয়ে ছিটকে পড়ল। তার হাতের পাশে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়ল।

সঙ্গে সঙ্গে দারোগা বাকি দুজন পুলিশ নিয়ে লোকটাকে বেদম প্রহার দিতে আরম্ভ করল।

দুজনকে হাতকড়া দিয়ে পুলিশ জিপে ওঠাল।

জিপ যখন বেশ কিছুটা গিয়েছে তখন পারিজাত বক্সী আঙুল দিয়ে দারোগাকে দেখালেন, ওই দেখুন, ওই সবুজ গাড়িটা অনেকক্ষণ ধরে অনুসরণ করছে। আমার মনে হয় ওরা বোধহয় এদের দুজনকে উদ্ধার করার চেষ্টা করবে।

দারোগা বলল, ঠিক আছে। আসুক-না, আমরা তো দলে ভারী আছি।

পারিজাত বক্সী বললেন, এক কাজ করুন, সামনের বাঁকের মুখে জিপটা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে বলুন। আর একজন পুলিশকে বলুন, এ দুটো লোকের মুখে কাপড় গুঁজে দিতে, যাতে এরা চিৎকার না করতে পারে।

তা-ই করা হল। জিপটাকে ঘুরিয়ে একটা ঘন ঝোপের আড়ালে রাখা হল। পারিজাত বক্সীর নির্দেশে দারোগা আর পুলিশেরা রিভলভার হাতে কয়েকটা পাথরের পিছনে তৈরি হয়ে দাঁড়াল।

একটু পরেই সবুজ মোটরটা ক্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল। মোটর থেকে দুজন লোক নামল। একজনের চোখে দূরবিন, আর-একজনের হাতে বোমা।

দূরবিন-চোখে লোকটা সামনের রাস্তার দিকে কিছুক্ষণ দেখল, তারপর অন্য লোকটার কানে কানে কী বলল।

তারপর দুজনেই পাশের জঙ্গলের দিকে মুখ ফেরাল।

বোঝা গেল, তারা সন্দেহ করছে পুলিশের জিপ পাশের জঙ্গলে ঘাপটি মেরে রয়েছে।

দূরবিন-চোখে লোকটা দূরবিন নামিয়ে পকেট থেকে পিস্তল বের করল। দুজনেই সাবধানে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে লাগল।

একেবারে পাথরের সামনে আসতে পারিজাত বক্সী দারোগার গা টিপে ইশারা করলেন, সঙ্গে সঙ্গে দারোগার রিভলভার থেকে গুলি ছুটল।

অব্যর্থ লক্ষ্য। যে লোকটির হাতে বোমা ছিল, তার মণিবন্ধে গুলি লাগল।

লোকটা আর্তনাদ করে হাত চেপে বসে পড়ল। হাতের বোমা রাস্তার ওপর ছিটকে পড়ল। প্রচণ্ড শব্দ। ধুলোর বৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চারদিকে অন্ধকার। অন্ধকার কমতে দেখা গেল সবুজ গাড়িটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

অন্ধকার দূর হবার সঙ্গে সঙ্গে দারোগা আর পুলিশেরা লোক দুটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের বন্দি করে ফেলল। তারপর দড়ি দিয়ে ভালো করে বেঁধে জিপে তুলল।

দারোগা বলল, খুব জোরালো বোমা স্যার। আমাদের জিপের ওপর পড়লে কী হত বুঝতে পারছেন!

পারিজাত বক্সী কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু মুচকি হাসলেন।

থানায় যখন সবাই গিয়ে পৌঁছাল, তখন বেশ রোদ উঠেছে।

লোক চারজনকে হাজতে রাখা হল। পুলিশের সতর্ক প্রহরায়।

খাওয়াদাওয়া করে পারিজাত বক্সী দারোগাকে বললেন, আমি একটা ট্রাঙ্ককল করব।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, করুন।

পারিজাত বক্সী মিস্টার বাসুকে ফোন করে সব জানালেন।

মিস্টার বাসু খুব খুশি। আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন। তারপর বললেন, আমি বিহারের পুলিশের বড়োকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ব্যবস্থা করছি। তোমরা পুলিশের সঙ্গে ছাড়া আসবার চেষ্টা কোরো না। পথে বিপদ হতে পারে। মূর্তি চোরের দল সারা দেশে ছড়ানো। তোমাদের আবার আক্রমণ করাও বিচিত্র নয়।

পারিজাত বক্সী বললেন, ঠিক আছে, আমরা পুলিশ গার্ড ছাড়া বের হব না।

একেবারে রাজকীয় ব্যবস্থা। বিহার পুলিশের উচ্চপদস্থ এক অফিসার মোটর নিয়ে হাজির। সঙ্গে গোটা চারেক সশস্ত্র পুলিশ।

ওরা বাংলাদেশের সীমান্ত পর্যন্ত যাবে, সেখান থেকে দায়িত্ব নেবে বাংলার পুলিশ।

খাওয়াদাওয়া দারোগার বাড়িতেই হল।

দারোগা পারিজাত বক্সীর পিঠ চাপড়ে বলল, মিস্টার বক্সী, আপনার কৃতিত্বের কথা আমরা চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করব। আপনার জন্যই এই কুখ্যাত দলটিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলাম। এরা নিজেদের মাতৃভূমি থেকে পবিত্র দেব-দেবীর মূর্তি শুধু অর্থের জন্য দেশ-বিদেশে চালান দেয়। এমন ঘৃণ্য কাজ আর কী হতে পারে!

পারিজাত বক্সী বাধা দিয়ে বললেন, কৃতিত্ব আমার কিছুই নয়। আপনাদের সকলের সমবেত চেষ্টায় এ কাজ সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আসল কৃতিত্ব কাদের জানেন?

কাদের?

এই কুমুদ আর তার ভাগনে তুলসীর। এদের অসম-সাহসিকতার তুলনা নেই। একজনকে আমার সঙ্গে নিয়ে চলেছি, কিন্তু তুলসী কোথায় আমাদের জানা নেই।

দারোগা হুংকার ছাড়ল, তুলসীর বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। যখন এরা ধরা পড়েছে তখন কী করে মুখ খোলাতে হয়, সে ওষুধ আমার জানা আছে।

যাবার সময়ে কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, এই মূর্তিগুলো সঙ্গে নিয়ে যাবেন না? অন্তত রতনগড়ের মন্দিরের মূর্তি দুটো?

পারিজাত বক্সী হাসলেন, এ মূর্তি নিয়ে যাওয়া এখন সম্ভব নয়। বিহার কোর্টে কেস হবে। কেস শেষ হয়ে গেলে মূর্তি দুটো আবার রতনগড়ের মন্দিরে প্রতিষ্ঠা হবে। চলো কুমুদ, এবার আমরা রওনা হই।

এদের যাত্রার খবর পশ্চিমবাংলার পুলিশ কর্তৃ,পক্ষকে আগেই জানানো হয়েছিল।

বাংলা-বিহার সীমান্তে পৌঁছে পারিজাত বক্সী নিজেই অবাক। পুলিশ নিয়ে মিস্টার বাসু নিজে এসেছেন নিয়ে যেতে।

কুমুদ, ওই দেখো, কারা এসেছেন।

কুমুদ দেখল, রাস্তার ধারে দাদুর মোটর। মোটরের সামনে বাবা, মা, দিদি, জামাইবাবু আর তুলসী।

তুলসী ছুটে এসে কুমুদকে জড়িয়ে ধরতেই কুমুদ জিজ্ঞাসা করল, আরে তুলসী, তুই!

তুলসী বলল, কুমুদমামা চলো, যেতে যেতে তোমাকে সব বলব, কী করে আমি পালিয়ে এসেছি।

সকলের চোখে জল, তবে এ জল আনন্দের। বাড়ির ছেলের বাড়ি ফিরে আসার জন্য।

'শুকতারা' মে ১৯৭৭ থেকে ধারাবাহিক

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%