হারাধন

পৌলোমী সেনগুপ্ত

আমরা যখন প্রাইমারি স্কুল ছেড়ে হাই স্কুলে ভর্তি হলাম তখন হারাধনের সঙ্গে পরিচয় হল। পুরো নাম হারাধন দাস। হারাধন আমাদের আগে থেকেই হাই স্কুলে পড়ছে। ক্লাস ফাইভে যে কত বছর পড়ছে সেটা নিয়ে তিনটি মত ছিল। হারাধন নিজে বলে দু’ বছর, পণ্ডিতমশাইয়ের মতে তিন আর অঙ্কের সার গোপীবাবু বলেন চার। আমাদের চেয়ে মাথায় লম্বা, শরীবটা বেতের মতো ছিপছিপে এবং শক্ত, গায়ের রং তামাটে। এতবড় ছেলে ক্লাস ফাইভে একটু বেমানান লাগত। তখনকার দিনে স্কুলে ইনস্পেকটার আসার রেওয়াজ ছিল। গ্রীষ্মের ছুটির আগে একদিন ইনস্পেকটার এলেন। আগে থেকে জানা ছিল বলে আমরা সবাই সেজেগুজে গেছি। ইংরেজি ক্লাস চলছে, সেই সময় টকটকে ফরসা গায়ের রঙের ওপরদিকে গোলাপি রঙের শার্ট আর সাদা প্যান্ট পরে ইনস্পেকটার এসে ঢুকলেন আমাদের ক্লাসে। সঙ্গে হেডসার অনাদিবাবু আর পণ্ডিতমশাই। আমরা উঠে দাঁড়ালাম এবং ইনস্পেকটারের হাতের ইশারায় আবার বসে পড়লাম। হারাধন, অর্থাৎ হারুকে এমনভাবে সেদিন ক্লাসে বসানো হয়েছিল যে, ইনস্পেকটার-সাহেব যেন সহজে ওকে দেখতে না পান। ওকে বলা হয়েছিল তুই মাথা নিচু করে রাখবি। প্রথমদিকে হারু অবশ্য তাই করেছিল কিন্তু ইনস্পেকটার-সাহেবকে দেখে উঠে দাঁড়ানোর পর যখন বসল তখন আর ঘাড় নিচু করেনি বলে ক্লাসের মধ্যে ওর মাথাটাই সবার আগে নজরে এল। মাস্টারমশাই এবং আমরা যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই হল। ইনস্পেকটার-সাহেব হারুকেই জিজ্ঞেস করলেন, “কীসের ক্লাস চলছে?”

হারু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ইংরেজি।”

ইনস্পেকটার হারুকেই প্রশ্ন করলেন, “তোমার মা’র কাছে এক গ্লাস খাবার জল চাইতে হলে ইংরেজিতে কী বলবে?”

হারু নির্বিকারভাবে উত্তর দিল, “মা ইংরেজি জানেন না। তাঁর কাছে কেন শুধুমুধু ইংরেজি কপচাব।”

হেডসার অনাদিবাবু বিষম খেলেন। ইংরেজি-সার প্রভাতবাবু কটমট করে হারুর দিকে তাকালেন। ইনস্পেকটর-সাহেব চোখ থেকে চশমাটা খুলে হারুর দিকে তাকিয়ে একবার হাসলেন। তারপর বললেন, “বাঘের ইংরেজি যদি টাইগার হয় তা হলে বাঘিনীর ইংরেজি কী হবে?”

হারুর যেন উত্তরটা জানা আছে তেমনভাবেই বলল, “লেডিস টাইগার।”

হেডসার রুমাল দিয়ে টাকের ঘাম মুছতে লাগলেন। পণ্ডিতমশাই চোখ বুজে এমনভাবে দেওয়ালে হেলান দিলেন, যেন ফিট হয়ে যাওয়ার আগের অবস্থা। ইংরেজির সার প্রভাতবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই ইনস্পেকটার-সাহেব ওই হারুকেই আবার জিজ্ঞেস করলেন, “নাশপাতির ইংরেজি জানো?”

হারু উত্তর দিল, “জানি।”

প্রভাতবাবু তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, “ওটা একটা গাধা। ও কিচ্ছু জানে না।”

হারু দমবার পাত্র নয়। সে হাত তুলে বলে উঠল, ‘ন্যাসপাইট।”

ইনস্পেকটার এবার হেসে ফেলে বলে উঠলেন, “তুমি সব ক’টা প্রশ্নই চটপট উত্তর দিয়েছ বটে, কিন্তু একটাও ঠিক হয়নি। এবার অন্তত গাধা শব্দের ইংরেজিটা বলো তো। এটা তো খুব সোজা।”

আমরা স্কুলের মান রাখবার জন্য ফিসফিস করে হারুকে বলবার চেষ্টা করছি, কিন্তু হারু আমাদের গ্রাহ্যই করছে না। বরং উলটে আমাদের ধমক দিয়ে বলল, “ফিসফিস করে বলে দিতে হবে না। ইংরেজি আমি জানি। গাধা শব্দের ইংরেজি হচ্ছে এইচ ডি ডি।”

ইনস্পেকটার এবার চমকালেন। বার-দুই চোখ পিটপিট করে প্রশ্ন করলেন, “তার মানে?” হারু বলল, “মানে হারাধন দাস। ‘এইচ’ মানে হারা, ‘ডি’ মানে ধন আর আর-একটা ‘ডি’ মানে দাস। আন্ডারস্ট্যান্ড?”

অনাদিবাবু সহ মাস্টারমশাইরা আগেই কুলকুল করে ঘামছিলেন, এবার ইনস্পেকটার ঘামতে আরম্ভ করলেন এবং হারুর দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ ফ্যাকাসে হাসি হেসেই দ্রুত প্রস্থান করার জন্য মুখটা ঘোরাতেই হারু উচ্চকণ্ঠে ডেকে উঠল, “সার! আপনার প্রশ্নগুলি মোটামুটি পেরেছি। আপনি আমায় একটা বাংলা কথার ইংরেজি বলে দেবেন?”

ইনস্পেকটার-সাহেব বিব্রত মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, “বলো।”

হারু নিজের প্যান্টটা দু’ হাতে ওপরে টেনে তুলতে তুলতে বলল, “নাটা কাঁঠালের আঠাই বেশি।”

হতভম্ব ইনস্পেক্টার-সাহেব হারুর মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ক্লাসরুম ছেড়ে যেতে যেতে বললেন, “ছেলেটা কি পাগল?”

এহেন হারু আমাদের সঙ্গে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছিল। পড়েছিল বলা ভুল, থেকেছিল। আমরা অবশ্য ওকে বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করতে দেখিনি। ফাইভ থেকে সিক্স এবং সিক্স থেকে সেভেন পর্যন্ত আশ্চর্য উপায়ে হারু একবারেই পাশ করেছিল। কেমন করে করেছিল সেটা বলতে পারব না। ওর এই অভাবিত সাফল্যে স্কুলের মাস্টারমশাইরা যেমন অবাক ঠিক তেমনই উত্তেজিত হারুর বাবা হারুর বাবার নাম জীবনধন দাস। চাষের জমি আর গোরু-মোষের দুধ বিক্রি করে ভালই চলে ওদের। হারুর বাবাকে আমরা দেখতাম একটা বেঁটেখাটো মোষের ওপর চড়ে নিজের জমিতে ঘুরে-ঘুরে চাষ-আবাদের তদারকি করতেন। দৃশ্যটা দেখবার মতো ছিল। কালো মোষের পিঠে ততোধিক কালো সওয়ার, খালি গাঁ, কাঁধে গামছা, চোখে চশমা আর মাথায় কখনও থাকত ছাতা, কখনও বা টোকা। আগেকার দিনে লোকে যেমন ঘোড়ায় চড়ত, হারু বাবা জীবনধন তেমনই মোযে চড়তেন। নিজের গ্রাম থেকে নীলগঞ্জের হাটে সওদা করতে যেতেন মোষে চড়ে। একদিন মোষের পিঠে সওয়ার হয়ে হারুর বাবা স্কুলে এলেন। তখনও ক্লাস শুরু হয়নি। আমরা সব ছাত্র মিলে প্রেয়ার করছি। প্রথমে শিবস্তোত্র, তারপর রবিঠাকুরের গান ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে…।’ আমাদের সামনে মাস্টারমশাইরা আছেন। শিবস্তোত্র শেষ করে সবে আগুনের পরশমণি শুরু হয়েছে, তখনই হারুর বাবা কালো মোষের পিঠে চড়ে স্কুলে ঢুকলেন। গায়ে একটা ফতুয়া, চোখে চশমা, কাঁধে গামছা এবং মাথায় একটি টোকা।

এখানে আমাদের স্কুলের ভূগোলটা একটু বলে নেওয়া দরকার। এখনকার মতো পাকাবাড়ি আর পাঁচিল ঘেরা স্কুল ছিল না আমাদের। ক্লাসঘরগুলো ছিল চারপাশে বাঁশের বেড়া আর মাথার ওপর টিন দিয়ে তৈরি। মেঝেটা শুধু পাকা। তাও কেবল ক্লাস নাইন আর টেন-এ। পর পর ক্লাসঘরগুলো ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের মতো সাজানো। মাঝখানের অনেকটা জমিতে আম, কাঁঠাল আর খানদুই তালগাছ। একটা মেইন গেট আছে বটে, কিন্তু স্কুলে ঢোকার জন্য ওই গেটটা খুব জরুরি নয়। পুব, পশ্চিম এবং উত্তর তিন দিক দিয়েই স্কুলের মধ্যে ঢোকা যায়। দক্ষিণে একটা গভীর খাল। বর্ষাকাল ছাড়া তাতে বিশেষ জল থাকে না। শুধু কাদা আর পাঁক।

তা সেই হারুর বাবা মোষের পিঠে সওয়ার হয়ে কোনদিক দিয়ে যে স্কুলে ঢুকেছিলেন সেটা বলতে পারব না। আমরা তো স্থির হয়ে লাইন করে দাঁড়িয়ে গেয়ে চলেছি আগুনের পরশমণি…গানটা। কোরাসে যেই না তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ কর…লাইনটা গাইছি অমনি পণ্ডিতমশাইয়ের আর্ত চিকার ভেসে এল, “গুতা মারছে, গুতা মারছে রে, বাবা রে…।”

আমি চোখ বুজে গানের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলাম। চোখ খুলে দেখলাম লাইনবন্দি ছাত্ররা সব দৌড়োদৌড়ি করছে, হেডসার অনাদিবাবু “হোয়াট হ্যাপেন্ড”, “হোয়াট হ্যাপেন্ড” বলতে বলতে নিজের ঘর থেকে ছুটে আসছেন এবং পণ্ডিতমশাইসহ আরও দু’জন সার, টিচার-রুমের দিকে ছুটে যাচ্ছেন আর সওয়ারিসুদ্ধু একটা কালো মোষ স্কুলের মধ্যিখানের জমিটার ওপর এলোপাথাড়ি দৌড়চ্ছে। আমাদের স্কুলের হেডদফতরি ছিল নকুল। আমরা ডাকতাম নকুলদা বলে। নকুলদা একটু তোতলা ছিল তবে সেটা তেমন মারাত্মক কিছু নয়, খুব বেশি উত্তেজিত হলে কিংবা হেডসার বকাবকি করলে তোতলামিটা বেড়ে যেত আর তখনই সেটা একটু মারাত্মক হয়ে উঠত। নকুলদার কথা বলার মধ্যে যেটা সবারই কানে লাগত তা হল ‘ট’-এর দোষ। সহ কথাতেই ট-ট করে উচ্চারণ করত। যেমন, নকুলদার যদি বলবার কথা হত, “হেডসার বলেছেন এবার স্পোর্টসে দড়ি-টানাটানিতে সব ক্লাসের ছেলেরাই থাকতে পারবে,” তা হলে নকুলদার উচ্চারণের জন্য কথাটা শোনাত এইরকম, “টেটসার বটেছেন টেবার টোর্সে দটি টাটাটাটিতে টব টাসের টেলেরাই টাকতে টারবে।” নকুলদার কথা তাই খুব জানাশোনা লোক ছাড়া কেউ বুঝতেই পারত না। স্কুলের চত্বরে এই ভয়াবহ কাণ্ড দেখে নকুলদার কী মনে হল কে জানে, সে দৌড়ে গিয়ে হঠাৎ ঢং ঢং করে ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে দিল। আচমকা ঘণ্টাধ্বনি শুনে কিছু ছেলে জানলা টপকে স্কুলের বাইরে চলে গেল আর জীবনধনবাবুর কালো মোষটা জীবনধনবাবুকে পিঠে নিয়ে সোজা দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল হেডসাবের দরজায়। তাই দেখে নকুলদা মোষ তাড়াবার জন্য স্কুলের ঘণ্টা নিয়ে সোজা উঠে গেল টিচার-রুমের মাথার ওপর। ওই অংশটুকুই পাকা এবং ছাদে ওঠার সিঁড়িও আছে। নকুলদা ছাদে উঠে গিয়ে ঘন্টা বাজাতে লাগল আর চিৎকার করে বলতে লাগল, “টোষ, টোষ, কালো টোষ। টাসুন, টাসুন, আমাটের টাঁচান।” অর্থাৎ, “মোষ, মোষ কালো মোষ। আসুন, আসুন, আমাদের বাঁচান।”

স্কুলের ঠিক পাশেই বদ্যিনাথ বাগের বাড়ি। স্কুল-মাঠের কাছে তাঁর ইটের ভাটা আর দাঁতের মাজন তৈরির কারখানা। দুপুরে ভরপেট খাওয়ার পর বাইরের ঘরের বারান্দায় মাদুর পেতে তিনি আধ ঘণ্টা দু’পা মুড়ে পায়ের গোড়ালির ওপর বসে থাকেন। এটা তাঁর অনেকদিনের অভ্যাস। তিনি তেমনভাবে বসেই নকুলদার চিৎকার শুনতে পেলেন এবং তৎক্ষণাৎ মনে হল, স্কুলে বোধ হয় আগুন লেগেছে। কেন আগুনের কথাই তাঁর মনে হল সেটা অবশ্য পরে জানা গিয়েছিল। সে-কথা না হয় পরেই বলা যাবে। আগুন লেগেছে মনে হতেই তিনি চটপট ঘরে ঢুকে কামারহাটি ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করে দিলেন।

স্কুলে মোষের তাণ্ডব সবেমাত্র কমে এসেছে, টিচার-রুম থেকে সাররা গুটি গুটি বেরিয়ে আসছেন আর জীবনধনবাবু তাঁর সাধের মোযের পিঠ থেকে লাফ দিয়ে খালি মাটিতে নেমেছেন, ঠিক তখনই ঢং ঢং ঢং করে দমকলের ঘণ্টা বাজিয়ে তিনটে লাল গাড়ি স্কুলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। সেই শব্দ শুনে জীবনধনবাবু আবার লাফ দিয়ে মোষের পিঠে সওয়ার হলেন এবং কালো মোষটা প্রবলবেগে লাল রঙের গাড়িগুলোর দিকে ধেয়ে গেল।

এই তাণ্ডব কতক্ষণ চলত কে জানে। দমকলবাহিনীর লোকজনদের তৎপরতায় মিনিট-দশেক পরে মোষটিকে স্কুলের বাইরে পাঠানো সম্ভব হল৷ কিন্তু একটু পরেই টোকা মাথায় জীবনধনবাবু পায়ে হেঁটে স্কুলে ফিরে এলেন।

হেডসার ভর্ৎসনার সুরে বললেন, “আপনার কি কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই? স্কুলের মধ্যে মোষ নিয়ে ঢুকেছেন। কী বিশ্রী কাণ্ডটা হয়ে গেল বলুন তো।”

জীবনধনবাবু চোখের চশমাটা খুলে নিয়ে বললেন, “যা ঘটে গেল তার জন্য আমিও লজ্জিত। আশা করি আপনারাও। সামান্য একটা গৃহপালিত মোষ দেখে আপনারা এমন করলেন যেন সোঁদরবনের বাঘ এয়েছে। তা ছাড়া মোষ নিয়ে স্কুলে ঢোকা অন্যায় হবে কেন? আপনি তো রিকশাসুদ্ধুই স্কুলে ঢোকেন, স্কুলের প্রেসিডেন্ট গোপালবাবু তো মোটরগাড়ি নিয়েই ঢোকেন। আমার মোষ তা হলে ঢুকতে পারবে না কেন?”

হেডসার বললেন, “ওগুলো গাড়ি। গাড়ি স্কুলের মধ্যে ঢুকতে পারে।”

জীবনধন বললেন, “এই মোষটাও তো আমার গাড়ি। আমি তো ওতে চড়েই যাতায়াত করি।”

হেডসার হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “আপনার সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। তা ছাড়া এখন আর এত এনার্জিও নেই। আপনি কোন উদ্দেশ্যে এসেছিলেন দয়া করে সেটা বলুন।”

জীবনধনবাবু কাঁধের গামছা দিয়ে প্রথমে মুখটা মুছলেন। তারপর মাথা থেকে টোকাটা নামিয়ে বগলে নিলেন। যেমনভাবে থানার দারোগা টুপি খুলে বগলে রাখে, জীবনধনবাবুর ভঙ্গিটা সেইরকম। অন্য মাস্টারমশাইরা কৌতূহলী চোখ নিয়ে জীবনধনবাবুর দিকে তাকিয়ে। জীবনধনবাবু বললেন, “দেখুন সার, আমি জ্ঞানত কোনও অন্যায় করি না এবং চোখের সামনে কোনও অন্যায় হতে দিই না। আপনারা শিক্ষিত সম্প্রদায়, সমাজের মাথার মণি। আপনাদের সঙ্গে কোমর বেঁধে ঝগড়া করতে পারব না। অত বিদ্যে আমার নেই, সময়ও নেই। তাই আপনাদের অন্যায় কর্মের বিরুদ্ধে আমি মামলা করতে চাই। আমি যে মামলা করতে চলেছি সেই সংবাদটুকু নিজমুখে আপনাকে নিবেদন করতে এসে এত কাণ্ড ঘটে গেল।”

পণ্ডিতমশাই ফস করে বলে উঠলেন, “মামলা! মামলা কোন কারণে?”

হেডসার অবাক চোখে হারুর বাবাকে দেখতে দেখতে বললেন, “মামলা! আমাদের বিরুদ্ধে! আমাদের বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগটা কী?”

জীবনধন বললেন, “দেখুন, আপনাদের মতো বড় বড় পাশ না করলেও স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছি। সাহেব-মাস্টারদের কাছে পড়েছি। পেটে ছিটেফোঁটা বিদ্যে তো আছে।”

হেডসার বললেন, “সে-কথা তো আমরা কেউ অস্বীকার করছি না। কিন্তু কোন কারণে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা?”

জীবনধনবাবু উত্তর দিলেন, “কারণ একটাই। হারু দু’ দু’বার প্রমোশন পেল কী করে? ফাইভ থেকে সিক্স, ভাবলাম আপনারা ভুল করে তুলে দিয়েছেন, কিংবা চোত মাসে যেমন গোডাউন ক্লিয়ার করে, তেমনই বুঝি ওকে এক ক্লাস ওপরে তুলে ফাইভের গোডাউন ক্লিয়ার করেছেন। ওটা আমি চৈত্র সেল ভেবে কিছু বলিনি। কিন্তু সিক্স থেকে সেভেনে ও ব্যাটা কী করে প্রমোশন পায়? হারুর সেভেনে ওঠা মানে শিক্ষার মান কোথায় গেছে। স্কুলের লেখাপড়ার এমন হাল যে, হারুও এক চান্সে সিক্স থেকে সেভেনে ওঠে! তাই আমি মামলা করব। ওকে জোর করে পাশ করানো হচ্ছে। এটা এক ধরনের দুর্নীতি।”

হেডসার লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আমার এবং আপনার মধ্যে কারও একজনের মাথার গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে অথবা অচিরেই দেবে। ছাব্বিশ বছর শিক্ষকতা করছি। তার মধ্যে এক যুগ কেটে গেল হেডমাস্টার হিসাবে। ছাত্র প্রমোশন না পেলে অভিভাবকরা তদবির করতে আসেন, লেখাপড়ার অভিযোগ আনেন। কিন্তু ছেলে প্রমোশন পেলে বাবা মামলা করতে চান এমনটা কখনও শুনিনি।”

জীবনধনবাবু বলে উঠলেন, “তা যেমন শোনেননি, তেমনই আপনার ছাব্বিশ বছরের শিক্ষক জীবনে কি কখনও শুনেছেন ক্লাস সিক্সের ছেলে ‘বিধবা’র ইংরেজি লিখছে ‘হাজবেন্ড লুজার’, ‘সন্ধ্যাকাল’-এর ইংরেজি লিখছে ‘নো সান’, শকুন্তলার স্বামীর নাম লিখছে ‘আদিনাথ চক্রবর্তী’ আর আমাদের দেশে কোথায় কয়লা পাওয়া যায় তার উত্তরে লিখছে, ‘ধনঞ্জয় দত্তের গোলায় আর পিন্টুদের গোলায়’।”

হেডসার বললেন, “এগুলো কোথায় দেখলেন আপনি?”

জীবনধনবাবু বললেন, “আনুন হাফ ইয়ারলি খাতা। সে খাতা তো গার্জেনদের কাছে পাঠানো হয়। তাতে এসব লেখা ছিল না? প্রথম ছ’মাসে যার এই জ্ঞান, পরের পাঁচ মাসে তার জ্ঞান কতটুকু বাড়তে পারে? সে জ্ঞান কি উত্তরপাড়ার ধনঞ্জয় দত্তের গোলা থেকে রানিগঞ্জে পৌঁছবে?”

মাস্টারমশাইদের আর কিছু বলার ছিল না। জীবনধনবাবুর সান্নিধ্য তাঁদের কাছে আদৌ সুখের নয়। অতএব, তাঁরা তাঁকে যত তাড়াতাড়ি পারলেন বিদায় দিলেন।

জীবনধনবাবু চলে যেতেই স্কুলে এলেন বদ্যিনাথ বাগ। তিনি এখন ইটখোলায় যাচ্ছেন। যাওয়ার আগে স্কুলে এলেন পান চিবোতে চিবোতে। বললেন, “সার, দমকল টাইমলি এয়েছিল তো?”

হেডসার চাপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “দমকলকে কি আপনি ফোন করে খবর দিয়েছিলেন?”

বদ্যিনাথ বাগ গর্বের ভঙ্গি করে বললেন, “এ-তল্লাটে আমার ছাড়া আর কারই বা ফোন আছে। স্কুল বাড়িতে আগুন লাগলে আমি তো হাত গুটিয়ে থাকতে পারি না। ফোন ঘোরাতেই হয়। একবার ঘোরাতেই পেয়ে গেলুম।”

হেডসার আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। টেবিলের ওপর একটা বেত ছিল। ওটা আমাদের জন্যই নির্দিষ্ট। আজ সেই বেতটা টেবিলের ওপর সপাং করে মেরে গর্জে উঠলেন, “কে বলল স্কুলে আগুন লেগেছে?”

বদ্যিনাথবাবু বেতের শব্দে চেয়ার থেকে তিড়িং করে লাফ দিয়ে উঠে বিস্ফারিত চোখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললেন, “লাও ঠ্যালা! আপনাদের দফতরি ছাদে উঠে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে চিৎকার করছিল, আগুন আগুন। ওর চিৎকারেই তো ফোন করলুম। এ-সব ব্যাপারে কেউ কি সরেজমিনে তদন্ত করে তারপর ফোন করে?”

হেডসার বজ্রগম্ভীর গলায় হাঁক দিলেন, “নকুল!”

নকুল দরজার বাইরেই ছিল। সব শুনেছে। সে এক লাফে ঘরে এসে বলল, “মিট্যা কটা, ডাহা মিট্যা কটা। আমি বলছি আটুন, আটুন। লোক টাকচি টোষ তাড়ানোর জন্য।”

বদ্যিনাথবাবু তীক্ষ্ণ চোখে নকুলকে দেখতে দেখতে বললেন, “বলো তো কী বলে ডেকেছ?”

নকুল বলল, “আটুন, আটুন।”

বদ্যিনাথবাবু এবার টেবিলে ঘুসি মেরে বললেন, “ভয়েস অ্যান্ড ফোনেটিক্স এক্সপার্টদের ডাকুন। দেড়শো গজ দূর থেকে ওই শব্দটা আগুন মনে হয় না?”

হেডসার অনাদিবাবু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে একবার নকুলের দিকে আরেকবার বদ্যিনাথবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। এখন আপনি আসতে পারেন।”

বদ্যিনাথবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন, “ধন্যবাদ দেওয়ার দরকার নেই। আমার কর্তব্য আমি করেছি। আপনারা বিরক্ত হলেও আমি আমার কর্তব্য পালনে ত্রুটি করব না। সাহিত্যসম্রাট বলে গেছেন, তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?”

বদ্যিনাথ বাগ চলে যেতেই পণ্ডিতমশাই বলে উঠলেন, “আইজ বিদ্যালয়ের উপর দিয়ে একখান ঘূর্ণিঝড় বইয়া গেল।”

হেডসার অনাদিবাবুর মুখটা গম্ভীর। তিনি পণ্ডিতমশাইয়ের কথার কোনও উত্তর দিলেন না। ঠিক তখনই স্কুলের কেরানিবাবু গুটিগুটি হেডসারের ঘরে ঢুকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “সার ছুটির ঘণ্টা বাজানোর ফলে বহু ছাত্রই তো বাড়ি চলে গেছে সামান্য কিছু ছাত্র থেকে গেছে। তা বলছিলাম কী…”

হেডসার গর্জে উঠে বললেন, “কী বলছিলেন?”

কেরানিবাবু একবার ঢোক গিলে বললেন, “না, মানে স্কুল কি আর হবে?”

হেডসার বললেন, ‘কী করে হবে? অধিকাংশ ছাত্ৰই তো চলে গেছে।”

কেরানিবাবু একই ভঙ্গিতে বললেন, “তা হলে প্রেয়ারের পর ছুটি হওয়ার একটা কারণ তো…”

কেরানিবাবু থেমে গেলেন। হেডসার বুঝলেন, বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল হঠাৎ কেন ছুটি দেওয়া হল এটার একটা যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকা দরকার। তিনি গম্ভীর হয়ে ভাবতে লাগলেন। পণ্ডিতমশাই ফস করে বলে উঠলেন, “ডিউ টু ডিসটারব্যানস অব ব্ল্যাক বাফেলো, ফায়ার ব্রিগেড, বদ্যিনাথ বাগ অ্যান্ড অ্যাবাভ অল মিঃ জীবনধন দাস।”

হেডসার চাপা গলায় বললেন, “আপনি টিচার্স-রুমে গিয়ে বিশ্রাম করুন। যা লেখবার আমিই লিখে রাখব।”

এই ঘটনার পর থেকে আমরা আর হারুকে স্কুলে আসতে দেখিনি। ঠিক কোন কারণে সে স্কুল ত্যাগ করল সেটা জেনেছিলাম অনেক পরে।

হারু স্কুল ছেড়ে দেওয়ায় আমাদের অনেকেরই মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। লেখাপড়ার বিষয়টা বাদ দিলে অন্যান্য অনেক বিষয়েই হারু ছিল আমাদের হিরো। স্কুলের স্পোর্টসে ক্লাস নাইন-টেনের ছাত্ররাও হারুকে সমীহ করত। মাথায় একটু লম্বা আর বয়সে আমাদের চাইতে বড় ছিল বলে স্কুলের স্পোর্টসে ওকে সব গ্রুপেই নাম দিতে দেওয়া হত। যে-যে বিষয়ে হারু থাকত সেই সেই বিষয়ে প্রথম প্রাইজটি অন্য কোনও ছেলে পাওয়ার আশাই করত না। আমরা মনে মনে অনেকেই হারু হতে চাইতাম, কিন্তু হারু হওয়ার সাধ্য ছিল না আমাদের। আমাদের অভিভাবকরা কেউই চাইতেন না আমরা হারু হই। হারু লেখাপড়ায় ভাল ছিল না, পরীক্ষায় পাশ করতে পারত না, সব সময় টো-টো করে ঘুরে বেড়াত আর অদ্ভুত অদ্ভুত কাণ্ড বাধিয়ে ফেলত—এমন ছেলেকে অভিভাবকরা পছন্দ করেন না। স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষকই হারুর ওপর চটা ছিলেন। কেবল আমাদের হেডসার অনাদিবাবু আর স্পোর্টসের সার নিখিলবাবু হারুকে একটু পছন্দ করতেন। আমরা, যারা ওর সঙ্গে পড়েছি তাদের কাছে হারুর খাতির ছিল অন্যরকম। গঙ্গায় বান দেখতে গিয়ে কতবার দেখেছি বিশাল ঢেউ শোঁ-শোঁ গর্জন করে ছুটে আসছে, ঘাট থেকে লোক সরে যাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে আর ফাঁকা ঘাটের মানুষশুন্য সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নেমে যাচ্ছে ছিপছিপে গড়নের একটা ছেলে। সিঁড়ির মাথা থেকে বয়স্ক লোকেরা চিৎকার করে বলছেন, “ছোকরা ওদিকে যাচ্ছে কেন? ওটাকে ধরে এনে দুই গালে কষে চড় লাগাও।”

কিন্তু কেউ ধরতে যাওয়ার আগেই গঙ্গায় লাফ দিয়ে পড়ছে ছেলেটা, তারপর আগুয়ান বানের মুখোমুখি গঙ্গায় ভাসতে ভাসতে হঠাৎ এক সময় ডুব দিয়েছে। এমন সময় বুঝে ডুবটা দিত যে, ওর মাথাটা জলের নীচে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরেই হুড়মুড় করে বানটা আমাদের ঘাট ভাসিয়ে, বটগাছের গুঁড়িতে আর ঘাটের রানায় ধাক্কা খেয়ে শোঁ-শোঁ বেগে উত্তর দিকে চলে যেত। গঙ্গায় তখন উথাল-পাথাল অবস্থা। সেই উত্তাল ঢেউয়ের ওপর জেগে উঠত সেই ছেলেটার মাথা। যেন ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে সে ঘাটের দিকে এগোচ্ছে। ঘাটের ওপরে দ্বাদশ শিবমন্দিরের উঁচু বারান্দা থেকে ছেলেটার কালো মাথাটাকে দেখাত ছোট্ট একটা কতবেলের মতো। যারা জানত না তারা অবাক হয়ে, দুঃসাহসী ছেলেটাকে গালমন্দ করত। আমরা জানতাম ওই দুঃসাহসী ছেলেটা হচ্ছে হারু। মাঝগঙ্গায় দুরন্ত ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে সে পাড়ের দিকে এগোচ্ছে। আমরা এটাও জানতাম, লড়াই করতে করতে হারু ঠিক এসে পাড়ে পৌঁছে যাবে। ঘাটের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে দু’ হাতে মাথার ভেজা চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিতে দিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসবে এবং বলবে, “এখন ঢেউ কমে গেছে, তোরা যাবি?” হারুর এই প্রস্তাবে সায় দেওয়ার সাহস আমাদের ছিল না। অনেক কষ্টে গঙ্গায় এসে বান দেখার অনুমতি মিলেছে, এর পর যদি জলে নামি তা হলে বাড়িতে আমাদের আর আস্ত রাখবে না। আমরা সংসারের নিয়ম মেনে চলতাম আর হারু কোনও নিয়মের তোয়াক্কাই করত না। আমরা সন্ধেবেলা মাদুর পেতে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসতাম, আর হারু ওই সময় নাটাগড়ের বিলের ধারে কোচ নিয়ে মাছ ধরতে যেত। এমনও অনেক সময় হয়েছে, আমরা বইখাতা নিয়ে দত্তদের বাগানের মধ্যে দিয়ে স্কুলে যাচ্ছি হঠাৎ হারু চিৎকার করে ডাকল, “কী রে, তোরা ইস্কুলে যাচ্ছিস?”

আমরা এদিক-ওদিক তাকিয়ে হারুকে খুঁজছি আর হারু তালগাছের মাথা থেকে হাঁক দিয়ে বলছে, “এই যে, ওপরে তাকা। তালশাঁস খাবি, খুব কচি। খাবি তো বল এক কাঁদি নীচে নামিয়ে দিই।”

কিন্তু মাঝেমধ্যে হারু খুব বিশ্রী কাণ্ডও করে ফেলত। এগুলো কি হারু ইচ্ছে করে করত? একবার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সময় হারু একটা ঘটনা ঘটাল। স্কুলের পড়ানো ছাড়াও পণ্ডিতমশাই বিশেষ কয়েকটি বাড়িতে পূজা করতেন। সেবার হেডসার অনাদিবাবুর বাড়ির পুজো সেরে নতুন গামছায় প্রসাদ বেঁধে নিয়ে হনহন করে হেঁটে আসছিলেন। পূর্ণিমা থাকতে থাকতে আরও দুটো পুজো তাঁকে সারতে হবে। কোজাগরী পূর্ণিমায় ঝকঝকে চাঁদের আলো থাকে। সেই আলোয় গ্রামের পথ-ঘাট বড় মায়াবী দেখায়। পণ্ডিতমশাই পথের দূরত্ব কমাবার জন্য মাঠের মধ্যে দিয়ে আসছিলেন। মাঠের একপাশে ছাড়া ছাড়া কয়েকটা নতুন বাড়ি উঠেছে; অন্য দিকে খাবলা খাবলা ছন্নছাড়া গোছের জঙ্গল। মাঠের মধ্যিখান দিয়ে পায়েচলা পথ। দশ-বিশ হাত অন্তর অন্তর বড় বড় শিশুগাছ। খানকয়েক ঝাঁকড়ামাথা শ্যাওড়াগাছ। চাঁদের আলোয় সেদিন গোটা মাঠটা ভরে আছে। পণ্ডিতমশাই যখন মাঠের মাঝামাঝি এসে গেছেন ঠিক তখনই সামনের বিশাল শিশুগাছের ওপর থেকে কেউ একজন লাফিয়ে পড়ল তাঁর সামনে। উঁচু থেকে লাফ দিয়ে পড়ার আওয়াজ হতেই পণ্ডিতমশাই কেঁপে উঠেছিলেন। তারপর যে বস্তুটি শূন্য থেকে তাঁর সামনে পড়ল, তাকে ভাল করে দেখবার আগেই সেই বস্তুটি দু’হাত দিয়ে পণ্ডিতমশাইয়ের দুটি পা জড়িয়ে ধরতেই পণ্ডিতমশাই “ও বাবাগো” বলে আর্ত চিৎকার করে মূৰ্ছা গেলেন। এই ভয়ংকর কাণ্ডটা ঘটল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। অতিরিক্ত ভয় পাওয়ার জন্যই সেই রাত্রেই পণ্ডিতমশাইয়ের জ্বর এল। পরদিন পণ্ডিতমশাইকে বাড়িতে দেখতে এসে অনাদিবাবু দেখলেন, পণ্ডিতমশাইয়ের শিয়রে বসে কপালে জলপটি দিচ্ছে হারু। তিনি চাপা গলায় হারুকে ডাকলেন, “হারু, বাইরে আয়।”

হারু বাধ্য ছেলের মতো বাইরে এল। হেডসার বাঁ হাত দিয়ে হারুর একটা কান টেনে ধরে বললেন, “তুই এমন কাণ্ডটা করলি কেন? পণ্ডিতমশাইকে ভয় দেখাতে গিয়েছিলি? তোর হাত-পায়ে শিকল বেঁধে স্কুলের মধ্যে ফেলে এবার পেটাব। ছিঃ ছিঃ, তুই এত অপদার্থ!”

হারু নিজেকে ছাড়াবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে বলল, “আমি দিব্যি গেলে বলছি, সারকে আমি ভয় দেখাতে যাইনি।”

হেডসার বললেন, “তা হলে তুই গাছে উঠে হঠাৎ ওনার সামনে লাফ দিয়ে পড়ে পা চেপে ধরলি কেন?”

হারু নিজের চোখে হাত ছুঁইয়ে বলল, “এই চোখ ছুঁয়ে বলছি। মিথ্যে বললে আমি যেন কানা হয়ে যাই। বাড়িতে সন্ধেবেলা বাবা বকল। গেলাম এক বন্ধুর বাড়ি। সেখানে বিশুর বাবা আমাকে দেখেই খ্যাক খ্যাক করে বলে উঠলেন, এখানে কী চাই? তুই কেন বিশুর সঙ্গে মিশিস? কী আর করব। হঠাৎ শখ হল শিশুগাছে উঠে চাঁদ দেখতে কেমন লাগে। গাছে উঠে বসেই ছিলুম। হঠাৎ দেখি সার আসছেন। আমার মনে পড়ল এবার বিজয়াতে সব সারকে প্রণাম করা হয়েছে, শুধু পণ্ডিতমশাইকে দু’-দু’বার বাড়ি গিয়ে পাইনি। ভাবলাম এখনও তো বিজয়া আছে। তাই গাছ থেকে লাফ দিয়ে নেমে ওঁর পায়ে হাত দিতেই সার ফিট হয়ে গেলেন। এত জানলে কি আমি ওঁর সঙ্গে বিজয়া করতে যাই!”

হারুর কথা শুনে পণ্ডিতমশাইয়ের মেয়ে আঁচল চেপে হাসতে লাগল। হেডসার হারুর কানটা ছেড়ে দিয়ে বললেন, “এভাবে রাত্রিবেলা নির্জন মাঠের মধ্যে গাছ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে কেউ বিজয়ার প্রণাম করে এমন কথা জীবনে শুনিনি। তুই মানুষ না পিশাচ নাকি দানব সেটাই এখনও বুঝে উঠতে পারলুম না। তুই ঘৃণারও অযোগ্য।”

পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে সাত দিন লাগল পণ্ডিতমশাইয়ের। এই সাত দিন হারুই পণ্ডিতমশাইয়ের সেবাযত্ন করেছে। হাজার বলেকয়েও ওকে বাড়িতে পাঠানো যায়নি। রাত্রিবেলা পণ্ডিতমশাইয়ের খাটের নীচে মাদুর পেতে শুয়ে থাকত। পণ্ডিতমশাইয়ের স্ত্রী বিছানা দিতে চাইলে হারু বলত যে, তোশকে শুলে তার গা চুলকোয়।

জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পর পণ্ডিতমশাই হারুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “বাছা, অনেক সেবা করছ। তোমার সেবায় আমি মুগ্ধ। সইত্য যুগ হইলে তোমারে বর দিতাম। কইতাম, অচিরেই তোমার একখান ল্যাজ গজাউক। কলিতে বর ফলে না। অখন তুমি বাড়ি যাও।”

কিন্তু হারুর সেই এক গোঁ। সার আরও সুস্থ হয়ে যদ্দিন না কোচিং করাতে যাচ্ছেন তদ্দিন সে এখানেই থাকবে।

অবশেষে থাকতে না পেরে পণ্ডিতমশাই বললেন, “তুমি তো বাড়িছাড়া। আমার ওষুধ আনা, বাজার করা সবই তুমি করতাছ। পথে বাইর হইলে তোমার স্বভাব অনুযায়ী যে অপকর্মগুলি কইরা আসো এতদিন তার অভিযোগ যাইত তোমার বাবার কাছে। অখন সেই অভিযোগগুলি তোমার বাবার নির্দেশমতো রি-ডাইরেক্ট হইয়া আসতে আরম্ভ করছে আমার কাছে। এত যাতনা তো সহ্য হয় না।”

এহেন হারু স্কুল ছেড়ে দেওয়ায় আমরা মুষড়ে পড়লাম। প্রথমদিকে যেসব শিক্ষকমশাই হারু চলে যাওয়ায় স্বস্তিবোধ করেছিলেন, ধীরে ধীরে তাঁরাও হারুর অভাবটা টের পেতে লাগলেন। হারু থাকলে প্রতিদিনই একটা-না-একটা কাণ্ড ঘটত। অথচ এখন স্কুলে কিছুই ঘটে না। এখন বর্ষাকালে খালের দিক থেকে কোনও সাপ ক্লাস রুমের জানলায় উঁকি মারলে কেউ আর লাফিয়ে গিয়ে সাপের গলা টিপে ধরে না। বর্ষার আগে স্কুলের টিনের চালায় উঠে দগদগে রোদে কেউ আর নতুন করে আলকাতরা লাগায় না। এখন আর স্কুলে এমন কোনও ছাত্র নেই যাকে ডেকে হেডসার বলতে পারেন, “তোদের স্কুলটা বড় গরিব। কিন্তু তোরা তো আছিস। দেখছিস না কত জঙ্গল হয়ে গেছে চারপাশে। একটা শনিবার দেখে এগুলো সাফ করা যায় না?”

এ-সব হারু করত। এরকম কাজে ওর উৎসাহ ছিল দেখবার মতো। হারুর অভাবটা বেশি করে টের পাওয়া গেল সরস্বতী পুজোর সময়। পুজোর দিন সকালে ইংরেজির সার প্রভাতবাবু নিজের বাগান থেকে বিস্তর ফুল এনে বললেন, “এগুলো পুজোয় দিয়ে দিন। ফি-বছর তো মাঝ রাতে পাঁচিল টপকে হারুই এগুলো নিয়ে এসে এখানে দিত। সেজন্য আমার হাতে মারও কম খায়নি। আজ নিজে হাতে করেই নিয়ে এলাম।”

দুপুরবেলা দল বেঁধে যখন খিচুড়ি খেতে বসলাম তখন সবারই হারুর কথা মনে পড়ল। পণ্ডিতমশাই বলেই ফেললেন, “ওই বান্দর পোলাডার কথা বড় মনে পড়তাছে। খাইতেও পারত। হারু খাইতে বসলে আমরা টিচার-রুম থেইকা দল বাইন্দা আসতাম ওর খাওয়া দেখতে। দেড় বালতি খিছুরির কম ওর প্যাটই ভরত না।”

আমার মনে হল হারু বোধ হয় পালিয়ে গেছে। কিন্তু কথাটা হারুর বাবাকে জিজ্ঞেস করার সাহস হল না। আর হঠাৎ পালাতেই বা যাবে কেন? কত ভয়ংকর সব কাণ্ড করে ফেলার পরও হারু পাড়া ছাড়েনি, স্কুলে আসাও বন্ধ করেনি। আমরা যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ছোটদের দিয়ে বাংলার সার একটা নাটক করিয়েছিলেন। নাটকের নাম ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’। সেবার হারুও অনেক বলেকয়ে ঢুকে পড়েছিল নাটকের দলে। ওকে হনুমানের পার্ট দেওয়া হয়েছিল। মেকাপ-রুমে এসে হারুকে দেখে হেডসার বললেন, “এবার তোক মানিয়েছে। তুই তো লেজছাড়া বাঁদর। এবার লেজ দেওয়ায় তোর আসল চেহারাটা খুলেছে।”

আমাদের বাংলার সার সুনীলবাবু ছিলেন নাটকের ভক্ত। টিফিনের পর আমাদের নিয়ে চলত মহলা। কথা ছিল হনুমান সেজে হারু উইংস থেকে লাফ দিয়ে মঞ্চে আসবে। তারপর এদিক-ওদিক একটু তাকিয়ে আর-এক লাফ দিয়ে গিয়ে বসবে মঞ্চের সামনের দিকের একটা বেদিতে। সেখানে একটা কলাগাছে কিছু পাকা কলা সুতো দিয়ে ঝোলানো থাকবে। হারু সেগুলো খেতে থাকবে।

সেবার বার্ষিক অনুষ্ঠানে নাটক দেখতে ছাত্র আর অভিভাবকদের বেজায় ভিড়। এত ভিড় আগে নাকি কখনও হয়নি। আমাদের স্কুলের একজন প্রাক্তন ছাত্র রেডিয়োতে গান গায়। নিমন্ত্রণ পেয়ে সে এসেও খানপাঁচেক গান গেয়ে অনুষ্ঠান জমিয়ে দিয়ে গেল। এর পর শুরু হল আমাদের নাটক। নাটক বেশ চলছিল; কিন্তু যেই-না হারু লম্বা লেজ নিয়ে এক লাফ দিয়ে মঞ্চে এসে পড়ল অমনি সবাই, বিশেষ করে ছোট ছোট ছেলেরা হনুমানকে দেখে আনন্দে হই হই করে উঠল। হারু সুনীলবাবুর কথামতো মঞ্চের এ-প্রান্ত থেকে একলাফে গিয়ে বসল অন্য প্রান্তে তৈরি করা বেদির ওপর। তারপর বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে যেই না কলার কাঁদি টেনে নামাল, সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের মধ্যে থেকে সবাই হাততালি দিয়ে হারুকে অভিনন্দন জানাতে লাগল। উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে সুনীলবাবু হাসতে হাসতে বললেন, “হারুটা জিনিয়াস। অবিকল হনুমানের ভঙ্গিতে লাফিয়েছে। ছেলেটার অবজারভেশন দারুণ। ঠিক হনুমানের মতো গা চুলকোচ্ছে আর দাঁত খিঁচোচ্ছে।”

আমাদের স্পোর্টসের সার বললেন, “আমি হারুকে একটা প্রাইজ দেব। আপনি শো শেষ হলে ওটা অ্যানাউন্স করে দেবেন।”

হাজারখানেক দর্শকের চোখ তখন হারুর দিকে। রাম-লক্ষ্মণ কোনও সংলাপই শুরু করতে পারছে না। স্কুলের যে-সব ছাত্র জানত হারুই হনুমান সেজেছে, তারা উৎসাহে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, “হারুদা, একটা কলা দাও।”

কেউ কেউ বলতে লাগল, “অ্যাই হনুমান, কলা খাবি?”

হারু এ-সব কথায় উৎসাহ পেয়ে দর্শকদের দিকে কলা ছুড়তে লাগল আর সেই কলা ধরবার জন্য দর্শকদের সামনের সারিতে বসা ক্লাস ফাইভের ছেলেদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। বিপদ বুঝে সুনীলবাবু উইংসের পাশ থেকে চাপা গলায় বলতে লাগলেন, “স্টপ, হারু, স্টপ।”

হারুর কানে সে-সব কথা গেলই না। পরম উৎসাহে হারু লাফ দিয়ে উইংস ধরে ঝুলে পড়ল। স্টেজটা তখন কাঁপছে। সুনীলবাবু অন্যদিক থেকে কাতর গলায় বলছেন, “হারু, নেমে আয়! বাবা হারু, নেমে আয়!”

কলার কাঁদি কাঁধে নিয়ে উইংস থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় হারু লাফ দিল সামনের দিকে। সে একটা দৃশ্য বটে! মঞ্চ থেকে দীর্ঘ লেজসহ হারুর দেহ শূন্যে ভেসে যাচ্ছে দর্শক-আসনের দিকে। দর্শকরা হাততালিতে মুখরিত করে অভিনন্দন জানাল হারুকে। কিন্তু তারা তখনও জানে না, কী ঘটতে যাচ্ছে। হারু কলার কাঁদি নিয়ে গিয়ে ধপাস করে পড়ল হেডসারের কোলের ওপর। ওঁর পাশেই বসেছিলেন স্ত্রী আর মেয়ে। ওঁরা এমন ঘটনার জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না। হেডসারের কোলের ওপর পড়তেই অনাদিবাবুর স্ত্রী আর মেয়ে “ও মাগো” বলে লাফিয়ে উঠলেন। ওদিকে তখন অন্য দৃশ্য। উইংস থেকে লাফ দেওয়ার ফলে উইংসটা খুলে পড়ল স্টেজের ওপর, আর তাতেই ওপরের দড়িদড়া ছিঁড়ে ত্রিপলের একটা দিক খুলে গিয়ে স্টেজের ওপর বিশ্রীভাবে ঝুলতে লাগল। দর্শকদের মধ্যে তখন একটা হুড়োহুড়ি কাণ্ড। যথার্থ লঙ্কাকাণ্ড আর কী!

দর্শক-আসনে বসে ছিলেন হারুর বাবা জীবনধনবাবু। ছেলের কাণ্ডে তিনি অতিশয় লজ্জিত এবং বিরক্ত হয়ে হাতের লাঠি নিয়ে তেড়ে গেলেন ছেলের দিকে। পিঠে এক ঘা লাঠি পড়তেই হারু মারল এক লাফ। পড়ল গিয়ে স্কুল সেক্রেটারির পিঠের ওপর, তারপর আর-এক লাফে গিয়ে উঠল গাছে। জীবনধনবাবুও ছাড়বার পাত্র নন। তিনি লাঠি নিয়ে হনুমানরূপী ছেলেকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগলেন। একদিকে স্টেজ ভেঙে গিয়ে সব লণ্ডভণ্ড অবস্থা, অন্যদিকে জীবনধনবাবু আর হারুর লুকোচুরি খেলা।

বলা বাহুল্য, এর পর আর নাটক করার কোনও কথাই ওঠে না। সুনীলবাবু নাটক বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু হারুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। হতাশ হয়ে হারুর বাবা ফিরে এসে বললেন, “ব্যাটাকে কিছুতেই ধরতে পারলুম না। মনে হয় গ্রামছাড়া করে দিতে পেরেছি।”

সবাই চলে যাওয়ার পর নকুলদার কাছ থেকে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ নিয়ে এসে সুনীলবাবু আলো ফেলে ফেলে সব ক’টা গাছের মাথা তন্নতন্ন করে খুঁজেও হারুকে পেলেন না। সুনীলবাবুর মতো আমাদেরও চিন্তা হল। হারু গেল কোথায়? পণ্ডিতমশাই বললেন, “অতবড় ল্যাজ লইয়া পোলাডা যাইব কোনখানে?”

হেডসার অনাদিবাবু বোধ হয় হারুর ওপর বেজায় চটেছিলেন, কেন না, হারু তো লাফ দিয়ে উড়ে এসে ওঁর কোলেই পড়েছে। সুনীলবাবু খুব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “সার, আপনার লাগেনি তো? ইডিয়টটা যেভাবে আপনার ওপর গিয়ে পড়েছে…।”

অনাদিবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “তেমন কিছু নয়। তবে হারু কলার কাঁদি নিয়ে স্টেজ থেকে লাফ দিয়ে যেভাবে শূন্যে ভেসে আসছিল সেটা একটা দেখবার মতো দৃশ্য। আমি তো হতভম্ব হয়ে ওকে দেখছিলাম। শেষ পর্যন্ত যে আমার ওপর এসে পড়বে সেটা ভাবিনি। ওর ভেসে আসাটা দারুণ।”

পণ্ডিতমশাই বলে উঠলেন, “কিন্তু শ্যাষটা বড়ই নিদারুণ হইয়া গেল।”

স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান সেবার সেখানেই শেষ। আমরা ফিরে আসছিলাম। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আসছিলেন সুনীলবাবু আর তাঁর স্ত্রী। তিনিও হারুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নিজের বাড়ির সামনে এসে সুনীলবাবু বললেন, “তোরা বাড়ি যা। কাল যেভাবেই পারিস হারুকে ধরে এনে আমার সামনে হাজির করবি।”

সুনীলবাবুর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একতলা বাড়ির ছাদ থেকে হাতজোড় করে হারু বলে উঠল, “আমি তো সার হাজির হয়েই গেছি।”

সার প্রথমে চমকালেন, তারপর বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “নেমে আয়।”

হারু ছাদের কার্নিশ থেকে হাত বাড়িয়ে সুপুরিগাছ ধরল, তারপর তরতর করে এসে পেছনের লেজটা সামনে এনে দুই হাত জোড় করে হাঁটু মুড়ে সুনীলবাবু আর তাঁর স্ত্রীর সামনে এমনভাবে নিলডাউন হল যেন ক্যালেন্ডারে দেখা রাম-সীতার সামনে হাঁটু মুড়ে দাঁড়ানো হনুমানের ছবি—অবিকল একই ভঙ্গি। সুনীলবাবুর স্ত্রী বললেন, “তুমি ছাদে উঠলে কেমন করে?”

হারু জবাব দিল, “যেমনভাবে নেমে এলাম তেমনভাবেই উঠেছিলাম।”

সুনীলবাবু কড়া দৃষ্টিতে হারুর দিকে তাকালেন কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না। হারু সুনীলবাবুর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, “ছাদে আচার শুকোতে দিয়েছিলেন কিন্তু মনে করে তুলে রাখেননি। খিদে পেয়েছিল বলে এট্টু খেয়েছি।”

সুনীলবাবুর স্ত্রী জিভ কেটে বললেন, “এই যা! সত্যি তো তুলে রাখিনি। তা কতটুকু খেয়েছ?”

হারু একইভাবে বসে বলল, “কুল আর আমের ছিল। তা আমটা শেষ হয়ে গেছে। কুল বোধ হয় এট্টু আছে।”

সুনীলবাবু একটাও কথা বললেন না। ওঁর স্ত্রী উদ্বেগের সঙ্গে শুধু বললেন, “এক বয়েম আচার খেলে শরীর খারাপ করবে না?”

হারু বিগলিতভাবে বলল, “আমার করে না। একবার এক দোয়াত কালি খেয়ে ফেলেছিলাম, কিছু হয়নি।”

বাকি রাস্তাটা ওই লেজ নিয়েই হারু আমাদের সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল।

কিন্তু এতসব ঘটনার পরেও তো হারু স্কুল ছাড়েনি। তা হলে এমন কী ঘটল যাতে হারু স্কুল ছেড়ে দিল?

মাঝে মধ্যে রাস্তায় নীলগঞ্জের হাটে যাওয়ার পথের মধ্যে হারুর বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে, কিন্তু কথাটা ওঁকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। আর জিজ্ঞেস করবই বা কেমন করে? উনি তো সব সময় একটা কালো মোষের পিঠে চড়ে ঘোরাফেরা করেন। লাল-লাল চোখওলা সেই মোষটা আমাদের দেখলে ভোঁস ভোঁস শব্দ করে শিং নাড়তে নাড়তে এগিয়ে আসে। এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কেই-বা যাবে জীবনধনবাবুর কাছে হারুর সংবাদ নিতে। তা ছাড়া হারুর বাবাও তো কম বিপজ্জনক নন। অথচ আমরা সকলেই হারুর জন্য মনে মনে খুব ব্যাকুল ছিলাম। সেই ব্যাকুলতা কখনও প্রকাশ করতাম না। পাছে আমাদের অভিভাবকরা টের পেয়ে যান আমরা হারুর জন্য ভাবছি। কেননা, অধিকাংশ অভিভাবকের কাছেই হার ছিল একটা বাজে ছেলে। আমাদের অভিভাবকরা কেউই চাইতেন না আমরা হারুর সঙ্গে মিশি, অথচ আমরা অনেকেই মনে মনে হারু হতে চাইতাম। স্কুলের স্পোর্টসে হারু সব বিভাগ মিলিয়ে যত প্রাইজ পেত তা ও একা বয়ে আনতে পারত না। স্কুলের ফুটবল টিমে হারু থাকা মানেই স্কুলের জয় বারো আনা নিশ্চিত হয়ে যাওয়া। ফুটবল এগারোজনের খেলা, কিন্তু কখনও কখনও হারু প্রমাণ করে দিত মাঠের মধ্যে কোনও একজন অবিশ্বাস্য রকমের জ্বলে উঠলে একাই একটা ম্যাচকে জিতিয়ে আনা যায়। একমাত্র স্কুলের পরীক্ষা ছাড়া আর কোনও ব্যাপারেই হারুকে আমরা হারতে দেখিনি। অতএব, এহেন হারুর জন্য আমাদের কষ্টটা ছিল স্বাভাবিক।

মিশনের মাঠে যাত্রা দেখতে গিয়ে হারুর মা’র সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল। উনি আমাকে দেখতে পেয়ে ইশারায় ডাকলেন। ভেজা ভেজা গলায় বললেন, “হারু নেই বলে তোমরা আর আসো না। মাঝে-মধ্যে এলেই তো পারো। গাছভর্তি এত লিচু, জাম এগুলো কে খাবে?”

সুযোগ বুঝে আমি হারুর মা’কে জিজ্ঞেস করলাম, “হারু কোথায়?”

হারুর মা বললেন, “ওর কপালে লেখাপড়া নেই। কেবল নকল করে করে দু’বার ক্লাসে উঠেছে। বাড়ি থেকে টাকাপয়সা চুরি করতে আরম্ভ করেছিল। ওর বাবা ওকে সালকিয়াতে মামার বাড়ি দিয়ে এসেছে। ওখানে চটকলে কাজ শিখছে।”

সালকিয়া জায়গাটা যে কোথায়, সেটা তখন জানতাম না। চটকলের কাজ শিখে কী হয় সে ব্যাপারেও কোনও ধারণা ছিল না। শুধু এইটুকু বুঝলাম, হারু আর এ-পাড়ায় আসবে না। আমার মুখ থেকে কথাটা রটতে আরম্ভ করল। প্রথমে নিজের ক্লাসের ছেলেরা, তারপর অন্য ক্লাসের ছেলেরাও জানল। মাস্টারমশাইরাও জানলেন। তারপর আস্তে আস্তে গোটা ব্যাপারটাই থিতিয়ে এল।

একদিন পুরোদমে ক্লাস চলছে। হঠাৎ আমাদের দফতরি নকুলদা এসে আমাদের বাংলার সার সুনীলবাবুর হাতে একটা চিরকুট দিলেন। সুনীলবাবু সেই চিরকুটটাতে চোখ বুলিয়ে সোজা আমার দিকে তাকালেন। হাতের ইশারায় কাছে ডেকে বললেন, “হেডমাস্টারমশাই তোমাকে ডেকেছেন। এখনই যাও।”

আমার বুকের মধ্যে কাঁপন শুরু হল। আমিও খুব শান্তশিষ্ট ছেলে ছিলাম না। ছোটখাটো অভিযোগ আমার বিরুদ্ধেও স্কুলে আসত। আমি হেডসার অনাদিবাবুর ঘরের দিকে যেতে যেতে ভাবতে লাগলাম, গত দু’-একদিনের মধ্যে এমন কিছু করেছি কি না যার জন্য হেডসারের কাছে নালিশ আসতে পারে। দিদিমার নারায়ণ পুজোর ভোগ পুজোর আগেই আমি খেয়ে ফেলে একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটিয়েছি, কিন্তু তার জন্য দিদিরা কি হেডসারকে নালিশ করবেন? সে শাস্তি তো বড়মামা আর মা’র কাছেই পেয়ে গেছি। এক অপরাধের জন্য ক’বার শাস্তি হবে। হঠাৎ মনে পড়ল, স্কুলের মাঠ থেকে ফেরার পথে গত পরশু বিকেলে বদ্যিনাথ বাগের ইটখোলার কাঁচা ইট খানকয়েক ভেঙে দিয়েছিলাম। হয়তো সেই অভিযোগটাই আজ হেডসারের কাছে এসেছে। আমি তো দুরু দুরু বুকে হেডসারের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে অনাদিবাবু ডাকলেন, “এসো।”

ঘরে ঢুকে স্পোর্টসের সারকে দেখতে পেলাম। আমি ভেতরে ঢুকতেই অনাদিবাবু বললেন, “তুমি নাকি হারুর ঠিকানা জানো?”

আমার তো ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অবস্থা। আমি বললাম, “পুরো ঠিকানা জানি না। ওর মা বলেছেন হারু সালকিয়াতে মামার বাড়ি থাকে। চটকলে কাজ শিখছে।”

অনাদিবাবু বললেন, “আজ ছুটির পর নিখিলবাবুকে নিয়ে তুমি হারুদের বাড়িতে যাবে। ওখানে যা কথা বলার তা নিখিলবাবুই বলবেন। তুমি ছুটির পর ওঁর কাছে আসবে।”

হারুকে এত খোঁজাখুঁজির কারণটা জানতাম না। নিখিলবাবু যেতে যেতে বললেন, “ডিস্ট্রিক্ট স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় এবার আমাদের স্কুল নাম দিতে যাচ্ছে। কিন্তু হারুকে ছাড়া টিম করা যাচ্ছে না। হারু থাকলে একটা ভরসা থাকে। তাই হারুকে আনার চেষ্টা করছি।”

মাঝ-বিকেলে আমরা হারুদের বাড়িতে গেলাম। আকাশের আলো তখন পাকা বাতাবি লেবুর মতো রং ধরেছে। দক্ষিণ দিক থেকে হু-হু করে ছুটে আসছে হাওয়া। মার্চের গুমোট গরমের পর এই হাওয়া যেন মায়ের আঁচলের ছায়ার মতো স্নিগ্ধ। ওদের সদর দরজা হাট করে খোলা। দরজা পেরোতেই দেখা গেল হারুর মা দেওয়ালে ঘুঁটে দিচ্ছেন। সারকে দেখে মাথার কাপড় আরও লম্বা করে টেনে দিলেন। আমি সারের কথা বলতেই হারুর মা নিচু গলায় বললেন, “ভেতরে নিয়ে যাও। দাওয়ায় ওর বাবা আছেন।”

ভেতরে আসতেই জীবনধনবাবুর মুখোমুখি হলাম। উনি প্রথমে একটু অবাক, তারপর অতিব্যস্ত হয়ে বারান্দা থেকে একটা হাতলছাড়া চেয়ার এনে উঠোনের মাঝখানে বসিয়ে বললেন, “পরম সৌভাগ্য আমার। আপনি সার নিজে এয়েচেন আমার বাড়িতে। বসুন, এইখানটায় বসুন।” বলে উনি চেয়ারটা দেখালেন।

জীবনধনবাবু আমাকে দেখে বললেন, “তুমি তো ছাত্র হে! তোমার বসার দরকার নেই। তুমি দাঁইড়ে থাকো।” চেয়ারের তিনটে পা বোধ হয় সমান ছিল না। হয়তো অন্য কোনও গণ্ডগোলও থাকতে পারে। আসলে কী ছিল কে জানে, কিন্তু নিখিলবাবু যেই মাত্র চেয়ারটায় বসলেন অমনই চেয়ারসুদ্ধ ধপাস করে তিনি চিৎপাত হয়ে পড়ে গেলেন। আর ওঁর পড়ে যাওয়া মাত্র জীবনধন এক লাফ মেরে এসে নিখিলবাবুকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে এসে বারান্দার দড়ির খাটিয়াতে শুইয়ে দিয়ে হাঁকপাক করে ডাকতে লাগলেন, “জল আনো, পাখা আনো, ডাক্তার আনো!”

নিখিলবাবু যত বলেন, “আমার কিছু হয়নি, জীবনধনবাবু ততোধিক জোরে বলতে থাকেন, “আলবাত হয়েছে। এখনই জল না দিলে মাথায় আঁব বেরুবে।”

জীবনধনবাবুর ডাকাডাকিতে জনাতিনেক লোক এসে গেল। নিখিলবাবুর অবস্থা তখন শোচনীয়। তারা প্রায় জোর করে সারকে খাটিয়ায় শুইয়ে মাথায় বালতি বালতি জল ঢালতে লাগল। জীবনধনবাবু একটা হাতপাখা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “সারকে হাওয়া করো। আমি গরম দুধ নিয়ে আসছি।”

মিনিট দশেক ধরে এইসব কাণ্ড চলল। হয়তো আরও খানিকক্ষণ চলত। কিন্তু নিখিলবাবু এই অভাবিত সেবা-যত্ন সহ্য করতে না পেরে হঠাৎ “স্টপ ইট” বলে এক বিকট চিৎকার করে খাটিয়া থেকে উঠে পড়লেন এবং আমার হাত থেকে পাখাটা কেড়ে নিয়ে অন্যদের দিকে ধাবিত হতেই তারা দুপদাপ করে পালিয়ে গেল। এই সময় গরম দুধের বাটি নিয়ে জীবনধনবাবু এসে হাজির হলেন।

নিখিলবাবু অনেকক্ষণ কোনও কথাই বললেন না। তারপর রাগ কমে এলে নিজেকে সামলে নিয়ে হারুর ব্যাপারটা বললেন। হারুর কথা শুনে জীবনধনবাবু নির্বিকারভাবে বলে উঠলেন, “ও তো চটকলে কাজ শিখছে। খেলা-টেলা করে কি পেটের ভাত জুটবে, গাধাটার তো চাষ-আবাদেও মতি নেই। তাই চটকলে দিয়ে দিলুম। ওর দ্বারা কিস্‌সু হবে না। দশ-বিশটা মাস্টার বেটে খাওয়ালেও ও পাশ করতে পারবে না। দু’বার যে পাশ করেছে সেটা স্রেফ টুকে। মোজার মধ্যে বইয়ের পাতা ছিঁড়ে রাখত। আপনারা পারেননি। আমি ধরে ফেলেছিলুম বলেই তো স্কুলে গিয়েছিলুম মামলা করব বলে।”

নিখিলবাবু আর কথা বাড়ালেন না, শুধু সালকিয়ার ঠিকানাটা নিয়ে ভেজা মাথায় ও-বাড়ি থেকে চলে এলেন। তার এক সপ্তাহ পরেই হারু একদিন স্কুলে এসে হাজির। শোনা গেল, চটকলের চাকরি সে ছেড়ে দিয়ে এসেছে। তবে ঠিক ছাড়েনি, যা সে করে এসেছে তাতে মিলের ওপরওয়ালা আর তাকে কখনও মিলে ঢুকতে দেবেন কি না সন্দেহ। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “তুই কী করেছিস?”

হারু অম্লান বদনে উত্তর দিল, “যখন স্কুলে আসার সুযোগটা পেয়েই গেলাম তখন ভাবলাম আর যাতে চটকলে ফিরে আসতে না হয় তার ব্যবস্থাটা করে যাই। তা হলে বাবা আর মামা দু’জনেই শায়েস্তা হবেন।”

আমরা যত জিজ্ঞেস করি, “তুই কী করেছিস?” হারু তত আমাদের প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলে, “সে এমন কিছু নয়। পরে একদিন বলব।”

বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। দিন-দুয়েক পরেই হারু বলল, “আমাদের চটকলের বড় মিস্তিরি, ফোরম্যান না ফাইভম্যান কী যেন বলে, সে রোজ ক্যান্টিন থেকে খেয়ে এসে বলে, অ্যাই হারু, যা দু’ খিলি পান নিয়ে আয়। কাজ তো কিছুই শেখাত না, কেবল ফাইফরমাশ খাটাত। বিশেষ কিছু করিনি, একদিন দুটো পানে মাত্তর দুটি ধানি লঙ্কা কুচো কুচো করে দিয়েছি। জোড়া খিলি মুখে পুরে চিবুতেই ‘বাপ রে’ বলে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘পানে কী আছে রে! মুখ-গলা জ্বলে যাচ্ছে যে।’ আমি মিছে কথা বলতে পারি না। বলে দিলুম, ‘দুটি ধানি লঙ্কা।’ ব্যস, আমার ছুটি হয়ে গেল। পাছে ভাগনের জন্য মামার চাকরিতে কোনও ক্ষতি না হয় তাই সাত-তাড়াতাড়ি মামা আর মামিমাই আমাকে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।”

যত আশা করে হারুকে নিয়ে স্কুলের টিম করা হয়েছিল হারু কিন্তু প্রথম খেলাতে তেমন কিছু দেখাতেই পারল না। দুটো গোল যেভাবে হারু নষ্ট করল সেটা আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য। খেলার শেষে নিখিলবাবু বললেন, “হারুকে রোজ সকালে প্র্যাকটিস করাতে হবে। মনে হচ্ছে অনেকদিন পায়ে বল লাগায়নি। তার থেকেও বড় হচ্ছে ওকে তাতাতে হবে। হারুকে যত তাতিয়ে তুলতে পারবি তত ও ভাল খেলবে।”

দ্বিতীয় ম্যাচটা ছিল মিশন স্কুলের সঙ্গে। ওদের মাঠেই খেলা। মিশনের ছেলেরা বরাবরই বেশ ভাল খেলে। এই ম্যাচটা জিততে পারলে আমাদের স্কুল কোয়ার্টার ফাইনালে যাবে। প্রথম ম্যাচটা কোনওরকমে এক গোলে জিতেছি আমরা। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে সেমিফাইনালে যেতে হলে আমাদের হারাতে হবে গতবারের চ্যাম্পিয়ান বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠকে। ওদের জনাতিনেক ছাত্র তখনই কলকাতা মাঠে খেলে। ভাল খেলে বলে ওই তিনজন ছাত্র বার বার ফেল করেও সসম্মানে স্কুলে থেকে যাচ্ছে। ওদের সঙ্গে আমাদের জেতার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। হেডসার অনাদিবাবু বলেছেন, “ফাইনাল জিতে শিল্ড আনাটা গৌরবের ঠিকই, কিন্তু সেটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। আমরা এই প্রথম নাম দিয়েছি। সেমিফাইনালে হেরে ফিরে এলেও দুঃখ নেই, কিন্তু আমরা যেন এমনভাবে হেরে ফিরে না আসি যাতে লোকে আমাদের বলে, ওরা নাম দিয়েছিল কেন? ওদের ছেলেগুলো তো খেলতেই পারে না।”

প্রথমে হেডসার, পরে নিখিলবাবুর কথায় আমরা খুব অনুপ্রাণিত হলাম ঠিকই, কিন্তু যে এগারোজনকে নিয়ে আমাদের মূল টিম, তারা কতখানি অনুপ্রাণিত হল সেটা বোঝা গেল না। হারুকে বললাম, “হারু, তোর ওপর অনেকটা নির্ভর করছে। তুই তেড়েফুঁড়ে খেল।”

হারু কোনও জবাব দিল না। হারু যেন গম্ভীর। মনে হল কিছুটা বিষণ্ণ। ওর বাড়িতে এ-সব খেলাধুলো ওর বাবা একেবারেই পছন্দ করেন না। নিখিলবাবুর কথামতো সকালে উঠে আমরা প্র্যাকটিস দেখতে যেতাম। তাতে নাকি যারা প্র্যাকটিস করে তারা বাড়তি উৎসাহ পাবে। কিন্তু খেলার আগে একদিনও হারু প্র্যাকটিসে এল না। বাড়িতে লোক পাঠালে সেই একই উত্তর, হারু নেই।

হারু এল খেলার দিন বেলা বারোটায়। নিখিলবাবু তখন প্রথম টিমে হারুকে রাখবেন কি রাখবেন না তাই নিয়ে ভাবছেন। টিমের ক্যাপ্টেন ক্লাস টেনের সুরজিৎ বলল, “প্রথম খেলার পর হারুর টিকিও দেখা গেল না। আমাদের সঙ্গে কোনওরকম বোঝাপড়া নেই। ওকে দলের বাইরে রাখুন। তা ছাড়া সেদিন তো দেখলাম, হারুর একদম ফর্ম নেই।”

ঠিক এই সময় হারু এল। নিখিলবাবু প্রথমে খুব বলেন, তারপর বললেন, “আজকের ম্যাচটা জিততে না পারলে মাথা নিচু করে ফিরে আসতে হবে। তুই কি তাই চাস?”

হারু কোনও উত্তর দিল না। হারুকে কখনও এত শান্ত থাকতে দেখিনি আমরা। নিখিলবাবু হারুকে প্রথম এগারোজনের মধ্যে রাখলেন। সুরজিৎ এই সিদ্ধান্তে খুব খুশি হতে পারল না। টিচার্স-রুম থেকে বাইরে এসে গজগজ করতে লাগল।

আমরা যখন মিশন মাঠের দিকে রওনা হচ্ছি তখন হেডসার অনাদিবাবু এসে সবাইকে উৎসাহ দিয়ে বললেন, “আজ জিতলে পরশু তোদের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে হবে গতবারের চ্যাম্পিয়ান দলের সঙ্গে। আমি সেদিন মাঠে যাব। অতএব আমার মাঠে যাওয়া নির্ভর করছে তোদের আজকের খেলার ওপর।”

ছেলেরা সবাই হেডসারকে প্রণাম করে এগিয়ে যেতে লাগল। সবার শেষে হারু এসে হেডসারকে প্রণাম করতেই হেডসার হারুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “জানিস তো আমাদের স্কুলটা গরিব স্কুল। কিন্তু এই স্কুলের একটা সম্মান আছে। ফি-বছর ছ’-সাতটা লেটার পায়, স্কলারশিপ পায়। ইচ্ছে করলে তুইও স্কুলের সম্মান বাড়াতে পারিস।”

হারু বলল, “পড়াশোনা আমার মাথায় ঢোকে না। যা পড়ি তা মনে থাকে না।”

অনাদিবাবু হারুর কাঁধে হাত রেখে স্কুল-গেটের দিকে এগোতে এগোতে বললেন, “গত বছর অসীম, সুজিত আর কল্যাণরা যেমন স্কলারশিপ পেয়েছিল, লেটার পেয়ে স্কুলের মান বাড়িয়েছিল, আজকে তুইও মান বাড়াতে পারিস, তুই লেটার আনতে পারিস। এখন তোর স্কুল হচ্ছে মাঠ। তোর খেলা দিয়ে তুই স্কুলকে সেই সম্মান এনে দিতে পারিস, যে-সম্মান এখনও তোর স্কুল পায়নি।”

আমরা ছিলাম হারুর পিছনে। হারু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে অবাক চোখে হেডসারের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলল, “আমি যদি ভাল খেলে দলকে ফাইনালে নিয়ে যাই আর ফাইনাল জিতে শিল্ড আনি সেটা কি অসীমদের স্কলারশিপ পাওয়ার মতো হবে?”

হেডসার বলে উঠলেন, “তার থেকেও বেশি হবে।”

হারু অবাক গলায় অস্ফুটে শুধু বলল, “তার থেকেও বেশি! অসীম, সুজিতদের থেকেও বেশি।”

হেডসার হারুর পিঠে হাত দিয়ে মৃদু একটা চাপড় মেরে বললেন, “অনেক বেশি! তুই কি পেলের নাম শুনেছিস, তারও আগে পুসকাসের। সারা পৃথিবীর মানুষ ওদের জানে। ওরা যে স্কুলে পড়েছিল সেই স্কুলও ওদের জন্য গর্বিত। তুই বড় হলে তোর স্কুলও তোকে নিয়ে গর্ব করবে।”

হারু অভিমানের গলায় বলল, “তবে কেন সুরজিৎ আর বিশু আমাকে ‘স্কুলের কলঙ্ক’ বলে?”

হেডসার সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বললেন, “তুই আজ এমন খেল যাতে কাল থেকে আর বলতে না পারে।”

হেডসার রিকশায় ওঠবার আগে নিখিলবাবুকে বললেন, “মনে হয় হারুকে তাতিয়ে দিতে পেরেছি। ছেলেটা সরল আর মূর্ব বলে কিছুই জানে না। অন্যরা ওকে বিষিয়ে দেয়। ওর মধ্যে কোনও স্বপ্ন নেই। নিখিলবাবু, ওকে স্বপ্ন দেখতে শেখান। তা হলে ছেলেটার জীবন বদলে যেতে পারে।”

মিশনের মাঠে আমাদের সমর্থক বড়জোর শ’খানেক ছেলে। বাকি দু’শো-আড়াইশো ছেলে সবাই মিশনের। অন্য স্কুলের ছেলেরাও মিশনকে চিৎকার করে সমর্থন জানাচ্ছে। আমাদের অভিভাবকরা আমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছেন যেন আমরা হেরে বসে আছি।

খেলা শুরু হওয়ার দু’ মিনিট পরেই মিশনের ছেলেরা আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে লাগল। ওদের হাফ লাইন থেকে ঘনঘন বল বাড়াচ্ছে দুই উইঙ্গারের দিকে। আমাদের ডিফেন্স প্রায় তছনছ হওয়ার জোগাড়। সুরজিৎ মাথা ঠান্ডা রেখে খেলে, কিন্তু ক্রমাগত চাপ সহ্য করতে না পেরে সে-ও মিস পাস করতে আরম্ভ করল। ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় সুরজিতের মিস পাস থেকে আচমকা বল পেয়ে গেল ওদের আগুয়ান সেন্টার ফরওয়ার্ড। বল নিয়ে ঝড়ের গতিতে পেনাল্টি বক্সে যখন ঢুকছে তখন সামনে আমাদের গোলকিপার গোপাল একা। উপায় না দেখে সুরজিৎ দৌড়ে এসে পেছন থেকে পা বাড়িয়ে ওদের ফরওয়ার্ডকে ফেলে দিল। এই বিশ্রী ফাউলটা হল বক্সের মধ্যে। রেফারি একটুও দ্বিধা না করে মিশনের ছেলেদের পক্ষে পেনাল্টি দিয়ে দিলেন। সেই পেনাল্টি থেকে খুব সহজেই গোল করে মিশনের ছেলেরা এগিয়ে গেল।

পণ্ডিতমশাই ফিসফিস করে নিখিলবাবুকে বললেন, “লঘু পাপে গুরু দণ্ড হইয়া গেল।”

নিখিলবাবু রুমালে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, “রেফারি ঠিকই দিয়েছেন। সুরজিৎ ফাউল করলে এটা গোল হয়ে যেত।”

পেনাল্টিতে গোল দেওয়ার পর বিপক্ষের চাপ যখন আরও বাড়তে আরম্ভ করেছে, ঠিক তখনই দেখলাম ফরওয়ার্ড থেকে অনেকটা নীচে নেমে এসে হারু আমাদের হাফ লাইনের কাছে খেলছে। ঠিক ওখান থেকেই ওদের এক ফরওয়ার্ডের পা থেকে পায়ের টোকা মেরে বলটা বের করে নিয়ে প্রথমে সাইড লাইনের দিকে ছুটে গিয়ে ব্যাক পাস করল অমিতকে। অমিত পায়ে বেশিক্ষণ বল না রেখে হারুর জন্যই বলটা বাড়িয়ে দিল সামনের ফাঁকা জমিতে। মিশনের দু’জন খেলোয়াড় বলের দখল নেওয়ার জন্য দু’ দিক থেকে ছুটে আসছিল। হারু দৌড়ে গিয়ে বলটা ধরল এবং ওই দু’জনের মধ্যে দিয়ে বলটা নিয়ে তিরের মতো ছুটতে লাগল গোলের দিকে। আমরা শ’খানেক ছেলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছি আর ভাবছি এখনই বুঝি কিছু একটা হবে। পেনাল্টি বক্সের সামনে চারজন খেলোয়াড় বাধা দিতে এগিয়ে আসছে। হারু চিপ করে বলটা ডান দিকে ফেলল, ঠিক বিশুর পায়ের কাছে। ওর সামনে ফাঁকা গোল। বিশু গোলে শট নিল ঠিকই, কিন্তু বলটা গোলে রাখতে পারল না। বারের অনেকটা ওপর দিয়ে চলে গেল। সত্তর মিনিটের খেলার প্রথমভাগে আমরা গোল শোধ করতে পারলাম না ঠিকই, কিন্তু খেলার দখলটা আমরা নিয়ে নিলাম। হারুর বাড়ানো বল থেকে এতক্ষণে তিনটে গোল আমাদের পাওয়া উচিত ছিল।

হাফটাইমে নিখিলবাবু বললেন, “হারু এবার কিন্তু একজন নয়, দু’-তিনজন লোক লাগানো হবে তোকে আটকানোর জন্য। বিশু আর সুকুমার ফ্রি হয়ে যাবে। অতএব, বল পেলেই বিশু আর সুকুমারকে ঠেলবি। আর তুই মাঝখান দিয়ে বল নিয়ে ঢুকবি না। তাতে তোকে বেশি বাধা পেতে হচ্ছে। খেলাটাকে যতটা পারবি দু’ পাশে ছড়াতে চেষ্টা কর। এই গেম আমাদের জেতা উচিত।”

হাফটাইমের পর হারু যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল। ওদের ডিফেন্সকে টালমাটাল করে একাই দুটো গোল করে টিমকে এগিয়ে নিয়ে গেল। শেষ গোলটা হল খেলা ভাঙার পাঁচ মিনিট আগে হারুর পাস থেকে। গোলের সামনে বলটা যেন সাজিয়ে দিল বিশুর পায়ে। বিশু বাঁ পা দিয়ে ঠেলতেই বলটা গোলে ঢুকে গেল।

খেলার পর জার্সি খুলে গায়ের ঘাম মুছতে মুছতে হারু বলল, “যাক, এবার তা হলে হেডসার খেলা দেখতে মাঠে আসবেন।”

হারুর জন্যই আমরা ফাইনালে উঠলাম। কোয়ার্টার ফাইনালে গতবারের চাম্পিয়ান বিবেকানন্দ বিদ্যাপীঠ আমাদের কাছে হেরে গেল দু’ গোলে। প্রথম গোলটি করেছিল হারু, ব্যাকভলি থেকে। এই খেলার পর থেকেই হারু যেন স্টার হয়ে গেল। সবাই জিজ্ঞেস করে, “আপনাদের সেন্টার ফরওয়ার্ড হারাধন খেলছে তো?”

শুধু হারুর খেলা দেখবার জন্যই অনেক অভিভাবক, এমনকী দূর দূর থেকেও লোকেরা আসতে আরম্ভ করে দিল।

আমরা সেমিফাইনাল খেললাম মডার্ন হাই স্কুলের সঙ্গে। বেশ শক্ত দল। কিন্তু তার থেকেও শক্ত হল হারুকে রোখা। আমাদের এত চেনা হারু জার্সি পরে মাঠে নামলেই যেন অচেনা হয়ে যায়। মনে হয় নাটাগড়ের বিলে রাত্রিবেলা যে-হারু মাছ ধরে, গঙ্গার বানের মধ্যে যে-হারু লাফিয়ে পড়ে, তালগাছের মাথা থেকে যে-হারু ডেকে ডেকে আমাদের সঙ্গে কথা বলে, কালো মোষের পিঠে চড়ে যে-হারু ঘুরে বেড়ায়—এ যেন সেই হারু নয়। মাঠের মধ্যে ওর গতি, পায়ের কাজ, সময় বুঝে জায়গা বদলের বুদ্ধি, শরীরের ঝাঁকুনিতে বিপক্ষের ছেলেদের ছিটকে দেওয়া—আর আচমকা গোলে শট নেওয়া সব মিলিয়ে ও যেন এক অন্য হারু।

পণ্ডিতমশাই হয়তো ঠিকই বলেন। উনি নিখিলবাবুকে বলেছিলেন, ‘পোলাডার মইধ্যে একটা দানব আছে। মাঠে নামলে দানবটা জাইগা ওঠে। বাপ রে বাপ, পায়ে বল লইয়া কী একখান দৌড় মারে, য্যান তুফান মেল যাইতে আছে।”

নিখিলবাবু বোধহয় ভাবেননি, তাঁর নেতৃত্বে স্কুল প্রথমবার নাম দিয়েই ফাইনালে উঠবে। সুরজিৎ, বিশু আর কার্তিক, যারা প্রথমদিকে হারুকে দলে নেওয়া খুব পছন্দ করেনি তারা এখন হারুকে ছাড়া মাঠে নামবার কথা ভাবতেই পারে না। বিশু চারটে খেলায় চারটে গোল করেছে যার তিনটি গোলই হারুর বানিয়ে দেওয়া। বিশু এখন হারুর ভক্ত। প্র্যাকটিসে হারুর জন্য নিজে বাড়ি থেকে ডিমসেদ্ধ নিয়ে আসে। দোকান থেকে লস্যি কিনে খাওয়ায়। এদিকে বদ্যিনাথ বাগ ফাইনাল খেলার একদিন আগেই কলকাতা গিয়ে ব্যান্ডপার্টি বায়না করে এসেছেন। নিখিলবাবু আর হেডসারকে বলেছেন, “আমি মশাই আবেগপ্রবণ লোক। আমার বাড়ির পাশেই স্কুল। আমার দায়িত্ব কিছু কম নয়। ছেলেরা ফাইনালে জিতুক চাই হারুক, ব্যান্ডপার্টি নিয়ে নগর পরিক্রমা হবেই। এবং রাত্রে মাইকও বাজবে।”

নিখিলবাবু বললেন, “সে কী! হারলে ব্যান্ড বাজাবেন কেন? লোকে কী বলবে?”

বদ্যিনাথ বাগ বললেন, “হেরে গেলে তো ব্যান্ড বায়নার পঞ্চাশ টাকা ফেরত পাব না। বায়না যখন করেছি ব্যান্ড তখন বাজবেই। লোকের কথা শুনলে চলবে কেন? পঞ্চাশটা টাকা কি না-বাজিয়েই নেবে। না-হয় অর্ধেক বাজাবে।”

নিখিলবাবু যেন মহা সমস্যায় পড়েছেন এমনভাবে বলেন, “আমরা ফাইনালে উঠেছি। খেলা এখনও হয়নি, হারা-জেতার প্রশ্নও এই মুহূর্তে নেই। আপনি আগেই কেন বায়না করলেন?”

বদ্যিনাথবাবু বিষম চটে উঠে বললেন, “মেহবুব ব্যান্ডের বাজনাদাররা কি আপনার স্কুলের ছাত্র যে, ডাকলেই পাবেন। ফাইনাল জিততে জিততে বিকেল হয়ে যাবে। তখন কে যাবে কলকাতায়, কে আনবে ব্যান্ড, আর গেলেই যে পাবেন তার কোনও ঠিক আছে? এটা বিয়ের সিজিন।”

যখন বদ্যিনাথবাবুর সঙ্গে নিখিলবাবুর এইরকম কথাবার্তা চলছে তখন নকুলদা লাফাতে লাফাতে এসে বলল, “টুল চাই, টুল। টালা লাগবে।”

বদ্যিনাথবাবু হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, “টুলের ভাবনা কী! আমার বাড়িতে হরেক সাইজের টুল আছে, তালাও আছে।”

নিখিলবাবু বদ্যিনাথ বাগকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “ওর কথা বুঝতে পারেননি। নকুল টুল আর তালা চাইছে না। ও বলছে ফুল চাই, ফুল। মালা লাগবে।”

বদ্যিনাথবাবু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “আলবত লাগবে। মোটা মোটা গোড়ের মালা গলায় দিয়ে মাঠে নামবে ছেলেরা। গ্রামের স্কুল বলে কি ওরা ফ্যালনা। এত বড় ডিস্ট্রিক্টে ওরা চ্যাম্পিয়ান হবে, চাট্টিখানি কথা। আমি ফুলের অর্ডার পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

বদ্যিনাথবাবুর যেমন ইটের ভাটি, টালি তৈরির কারখানা এবং অন্যান্য ব্যবসা আছে, তেমনই আমাদের গ্রামে ধনী ব্যবসায়ী বলে কুঞ্জলাল সাহারও বেশ নাম। তাঁর চাল-ডালের আড়ত, রেশন দোকান, সোনা কেনাবেচার ব্যবসা। বদ্যিনাথবাবু স্কুলের জন্য কলকাতার ব্যান্ডপার্টি আনছেন জেনে তিনি মনে মনে ভাবলেন, গ্রামের ঘরে ঘরে যে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা চলছে তাতে যদি বদ্যিনাথ তাঁকে টেক্কা দিয়ে দেন তা হলে তো আর গাঁয়ে মান থাকে না। অতএব, তিনি সোজা চলে গেলেন হেডসারের কাছে। বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “আমাদের স্কুলের ছেলেরা এত বড় একটা কাণ্ড করতে যাচ্ছে তাতে আমাদের সকলেরই গর্ব। আমার ছেলেও তো ওই স্কুলে পড়ে। সুতরাং আমিও ব্যান্ডপার্টি আনব।”

হেডসার বললেন, “বদ্যিনাথবাবু তো ওটা আনছেনই। শুধু শুধু দু’ দল ব্যান্ডপার্টি এনে কী লাভ!”

কুঞ্জলালবাবু একটু ভেবে বললেন, “আমি তা হলে সানাই আনি।”

হেডসার পড়লেন মহাবিপদে। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “আনতে পারেন। তবে এ-সব ব্যাপারে সানাই কি খুব মানানসই হবে? সানাই তো ঘুরে ঘুরে বাজানো মুশকিল। তার চেয়ে অন্যকিছু ভাবুন। বাজনা-বাদ্য ছাড়া অন্যকিছু।”

কুঞ্জলালবাবু করজোড়ে মিনতি করার ভঙ্গিতে বললেন, “অন্য কিছু ভাবছি, কিন্তু বাজনার বাইরে কিছু ভাবতে পারব না। বদ্যিনাথ বাজনা বাজিয়ে পাড়া জানাবে, আর আমি কি মূকাভিনয়ের দল আনব। যা হোক একটা বাজনা আমারও চাই।”

শেষ পর্যন্ত কুঞ্জলালবাবু কোন ধরনের বাজনার আয়োজন করেছিলেন সেটা আর অগ্রিম আমরা জানতে পারিনি। বাজনা-বাদ্যির সমস্যা যখন মিটে এসেছে তখন খবর এল ফাইনালে হারু খেলতে পারবে না। গতকাল রাতে ওর বেদম জ্বর এসেছে। খবর পেয়ে নিখিলবাবু ডাক্তার নিয়ে গিয়েছিলেন। হেরম্বডাক্তার বলেছেন, সাত দিন বিছানা থেকে উঠতেই পারবে না।

অনাদিবাবু চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ঠিক এই সময়েই আমাদের ক্যাপ্টেন সুরজিৎকে সঙ্গে নিয়ে নিখিলবাবু এসে উপস্থিত হলেন হেডসারের বাড়িতে। ধপাস করে চেয়ারের ওপর বসে পড়ে বললেন, “ফাইনাল জেতার একটা সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সেটা এবার ধুয়ে মুছে গেল। হারুটা জ্বরে প্রায় বেহুশ। হারু না থাকলে…”

নিখিলবাবুর কথা শেষ হওয়ার আগেই সুরজিৎ বলল, “হারু না থাকলে আমাদের ফরওয়ার্ড লাইন ভোঁতা হয়ে যাবে। গোল করার এবং করাবার কোনও লোক নেই। তা ছাড়া ফরওয়ার্ডের একমাত্র হারু নেমে-উঠে খেলতে পারত বলে আমাদের ডিফেন্সের অনেক চাপ ও একাই সামলে নিতে পারত। ওকে ছাড়া ফাইনালে ব্যারাকপুর মডার্ন স্কুলের সঙ্গে এঁটে ওঠা খুব শক্ত। ওরা গতবার কপালের দোষে রানার্স হয়েছে। এবারের টিম আরও ভাল।”

অনাদিবাবু চুরুট খান। নিভে যাওয়া চুরুটটা জ্বালিয়ে নিয়ে একটা টান দিলেন। একটু ভেবে বললেন, “যা হওয়ার তাই হবে। কিন্তু আমরা তো একটা অসুস্থ ছেলেকে জোর করে মাঠে নামাতে পারি না। একটা ট্রোফি জেতার থেকে একটা ছাত্রের জীবনের মূল্য অনেক বেশি।”

নিখিলবাবু বিমর্ষভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “তা তো বটেই, তা তো বটেই।”

বিকেলবেলা আমরা গেলাম হারুকে দেখতে। গিয়ে দেখি হারুর মাথার কাছে বসে আছেন পণ্ডিতমসাই। বিশু ইশারায় আমাদের কথা বলতে নিষেধ করল। পণ্ডিতমশাই গলার পৈতে আঙুলে জড়িয়ে হারুর মাথার ওপর হাত রেখে কী একটা মন্ত্র বলে যাচ্ছেন। বিশু ফিসফিস করে বলল, “পণ্ডিতমশাই আদ্যাস্তোত্র পাঠ করছেন।”

আমার যাওয়ার একটু পরেই এলেন অনাদিবাবু, নিখিলবাবু আর বাংলার সার সুনীলবাবু। হারুর বাবা জীবনধন স্কুলের সব মাস্টারমশাইকে তাঁর বাড়িতে দেখে এতই পুলকিত হলেন যে, এক লাফে বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে বলতে লাগলেন, “আপনাদের আগমনে আমি সার ধন্য হয়ে গেছি। বলুন, কী করতে পারি।”

এদিকে বদ্যিনাথ বাগ লোকমুখে খবর পেয়েছেন যে, ফাইনালে হারু খেলতে পারছে না, কেননা হারু অসুস্থ। অথচ উনি তো কলকাতায় ব্যান্ডপার্টি আর সোদপুরে মাইকের বায়না দিয়ে বসে আছেন। কুঞ্জলাল সাহাও বাজনার আয়োজন করছেন— এ সংবাদও তিনি জেনে গেছেন। সুতরাং কুঞ্জলাল সাহাকে টেক্কা দেওয়ার জন্যই বোধ হয় তিনি ব্যারাকপুর থেকে এক ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে হারুর বাড়িতে উপস্থিত হলেন। বদ্যিনাথ বাগ পয়সাওলা লোক। তিনি হারুর জন্য ব্যারাকপুর থেকে ডাক্তার নিয়ে এসেছেন দেখে জীবনধনবাবু এমন পুলকিত হলে উঠলেন যে, তিনি “আমার কী সৌভাগ্য, আপনারাই আমার যথার্থ হিতৈষী” এই ধরনের কথা বলতে বলতে বদ্যিনাথ বাগের পরিবর্তে ডাক্তারকেই দু’ হাতে সাপটে জড়িয়ে ধরলেন। ঠিক এইরকম আপ্যায়নের জন্য ডাক্তার প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি জীবনধনবাবুর আকস্মিক আলিঙ্গন সামলাতে না পেরে উঠোনের মধ্যেই পড়ে গেলেন। কিন্তু জীবনধনবাবু তাতে হাল ছাড়বার পাত্র নন। তিনি ভূপতিত ডাক্তারবাবুকে তখনও জাপটে ধরে বলে যাচ্ছেন, “আপনাদের ঋণ আমি জীবনে শোধ করতে পারব না। আপনারা আমার অগ্রজ, আপনারা আমার…”

মাটির উঠোনের ওপর ডাক্তারবাবু তখন পড়ে গিয়ে ছটফট করছেন, কিন্তু উঠতে পারছেন না। তাঁর বুটজুতোসুদ্ধ পা জোড়া একবার শূন্যে উঠছে পরক্ষণেই মাটিতে পড়ছে। পায়ের এই দাপাদাপি দেখেই আমরা বুঝতে পারছিলাম বেচারা ডাক্তারবাবুর অবস্থা কেমন শোচনীয়। আমি বরাবর লক্ষ করেছি আমাদের গ্রামে যখনই কিছু ঘটে, তখন সেটা অবিশ্বাস্য রকমের বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়। উঠোনের মধ্যে যখন এই কাণ্ড চলছে এবং মাস্টারমশাইরা চিৎকার করে বলছেন, “ও জীবনধনবাবু, ওনাকে ছাড়ুন, ডাক্তারবাবুকে ছাড়ুন”, তখনই কুঞ্জলাল সাহার আগমন ঘটল। তাঁর তো আবার বদ্যিনাথ বাগের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার ব্যাপার। অতএব, তিনি যেইমাত্র শুনেছেন বদ্যিনাথ ব্যারাকপুরে ডাক্তার আনতে গেছেন তখনই তিনি নাকি হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছেন, “হুঁ, ব্যাটা ইটওলার দৌড় ওই ব্যারাকপুর পর্যন্ত। আমিও ডাক্তার আনব।” ভাগনে পল্টনকে ডেকে হুকুম দিলেন, “উত্তরে নয়, দক্ষিণে যা। গাড়ি নিয়ে গিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে কলকাতা থেকে ডাক্তার নিয়ে আয়। এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগলে তোর পিঠে আমি খড়ম ভাঙব।”

পল্টন খুব বুদ্ধিমান ছেলে। সে যেতে যেতে হিসেব করে দেখল শ্যামবাজারে গিয়ে ডাক্তার ধরা, তাকে রাজি করানো এবং নিয়ে আসা কোনওমতেই এক ঘণ্টার মধ্যে হতে পারে না। আর অচেনা ডাক্তার তার সঙ্গে অচেনা জায়গাতে আসবেনই বা কেন। সুতরাং সে ভেবেচিন্তে ঠিক করল ডানলপ ব্রিজ পেরোবার পরই তো কলকাতার সীমানা পড়ে যাচ্ছে। ওখানে যে ডাক্তার বসেন তিনি তো কলকাতার ডাক্তার। তাই ডানলপ থেকে এক বৃদ্ধ ডাক্তারকে সে গাড়ি করে এনে পৌঁছে দিল মামার কাছে। সেই ডাক্তার প্রথমে কুঞ্জলালবাবুর নাড়ি দেখতে চাইলেন।

কুঞ্জলালবাবু বললেন, “চলুন আমার সঙ্গে। যত টাকা লাগে দেব। চটপট জ্বর কমাতে হবে।”

সদর দরজা ডিঙিয়ে কুঞ্জলালবাবু আর কলকাতার ডাক্তার যেইমাত্র উঠোনে পা দিয়েছেন তখনই মাস্টারমশাইদের সমবেত চেষ্টায় আর চিৎকারে ব্যারাকপুরের ডাক্তার জীবনধনবাবুর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে ডাক্তারি ব্যাগ বগলে নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে সদর দরজা ডিঙিয়ে উধাও হলেন। কুঞ্জলালবাবু বিজয়গর্বে তাঁর ডাক্তারকে বললেন, “আসুন ডাক্তারবাবু।”

কলকাতার বৃদ্ধ ডাক্তার এক পা-ও না এগিয়ে ক্রুর দৃষ্টিতে সবাইকে একবার দেখে নিয়ে বললেন, “অমনভাবে পালাল কে?”

যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে জীবনধনবাবু বললেন, “ব্যারাকপুরের ডাক্তারবাবু। এট্টু অভিনন্দন জানাতে গিয়ে সামান্য ধস্তাধস্তি হয়ে গেল। যাকগে, আপনিই না হয় চিকিৎসা করুন।”

কলকাতার ডাক্তার দু’পা পিছিয়ে গিয়ে কুঞ্জলালবাবুকে ডাকলেন। চাপা গলায় বললেন, “আমি মশাই পাগলের চিকিৎসা করি না। আমার ভিজিট দিন, আমি চলে যাই।”

জীবনধনবাবু কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বলতে পারলেন না। নিখিলবাবু ছাতার বাঁকানো হাতল দিয়ে তাঁর গলা টেনে ধরায় তিনি থেমে গেলেন। হেডসার বললেন, “আপনি চুপ করে এখানে বসুন। একটিও কথা বলবেন না।”

অতি সন্তর্পণে কলকাতার ডাক্তার ঘরের ভেতর গিয়ে রুগি দেখলেন এবং ওষুধ লিখে দিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারলেন চলে গেলেন। ঝামেলা মিটে যাওয়ার পর সুনীলবাবু হেডসারকে বললেন, “সার, হারুর বাবার কি সত্যি মাথা খারাপ?”

হেডসার উত্তর দিলেন, “আপনার কি এখনও সন্দেহ আছে? আমার তো কণামাত্র সন্দেহ নেই।”

অনেক চেষ্টা করেও ফাইনাল খেলাটা একদিন পিছোনো গেল না। খেলার আধ ঘন্টা আগে কুঞ্জলালবাবুর গাড়িতে করে হারু মিশনের মাঠে এল। এ-বছর এই মাঠেই ফাইনাল হওয়ার কথা। সকালে হারুর গায়ে জ্বর ছিল, কিন্তু হারুর কথামতো আমরা থার্মোমিটারটা দু’বার ঝেঁকে হারুর বাবাকে দেখিয়েছি। সেই দু’বার ঝাঁকি মারা থার্মোমিটারে কোনও জ্বর ছিল না।

হেডসার বললেন, “হারু, তুই পারবি তো? বেশি খাটতে হবে না। অসুবিধা হলে মাঠ থেকে চলে আসবি।”

হারু হাসতে হাসতে বলল, “একদম ভাববেন না সার! আমি ফিট আছি।”

মিশনের ছেলেরা সব আমাদের পক্ষে। ওরা পালা করে হারুকে দেখে গেল। মাঠে নামবার আগে হারুকে দুটো ট্যাবলেট খাওয়ানো হল। মডার্ন স্কুল মাঠে নেমে যাওয়ার পর আমরা নামলাম। সত্যি বলতে কী, হারুর অসুখের সংবাদে গোটা গ্রাম যেন আমাদের স্কুলের খেলা দেখতে ছুটে এসেছে। জেলাশাসক বসে ছিলেন শিক্ষামন্ত্রীর পাশে। আজকের অনুষ্ঠানে ওঁরাই হচ্ছেন সম্মানিত অতিথি। মন্ত্রীর হাত থেকেই বিজয়ী দল ট্রোফি নেবে। মন্ত্রীমশাই বললেন, “দারুণ ভিড় হয়েছে তো। গ্রামের সবাই বেশ ক্রীড়ারসিক।”

জেলাশাসক বললেন, “খেলাধুলোর ব্যাপারে এ-গ্রামের নাম আছে। সরকারি সাহায্য পেলে এ-গ্রাম থেকে ইন্ডিয়া রিপ্রেজেন্ট করার দু’-তিনটে ছেলে পাওয়া যাবে।”

মন্ত্রীমশাই এর পর অবশ্য কিছু বললেন না। বলে লাথি মেরে খেলার উদ্বোধন হল। ছবি তোলা হল। তারপর তিনি এসে বসলেন তাঁর আসনে।

খেলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মডার্ন স্কুল যেন বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের বক্সের ওপর। বাঘ যেমন নখ দিয়ে হরিণের পেট চিরে ফেলে, তেমন করেই আমাদের ডিফেন্সকে ফালাফালা করে দিয়ে গোলে একটা শট নিল। শটটা গোলে রাখতে পারলে কী হত কে জানে, কিন্তু শটটা বাঁ দিকের গোলপোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে গেল। আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। মিনিট তিনেক যেতে-না-যেতেই ওদের সেন্টার ফরওয়ার্ড বল ধরে আমাদের সুকোমল আর লালটুর মাঝখান দিয়ে বলটা নিয়ে সোজা চলে এল বক্সের মধ্যে। আমরা দেখলাম বক্সের কোনা থেকে হারু একটা লম্বা দৌড় দিচ্ছে আমাদের গোলপোস্টের দিকে। এখনও পর্যন্ত হারুর পায়ে একটাও বল পড়েনি। আমাদের গোলকিপার স্বপন আগুয়ান ফরওয়ার্ডের পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য গোল ছেড়ে এগিয়ে এসে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তেই মডার্ন স্কুলের ফরওয়ার্ড পায়ের টোকা দিয়ে বলটা তুলে গোলের দিকে পাঠাল। শূন্য গোলপোস্টের দিকে বলটা উড়ে যাচ্ছিল। মডার্ন স্কুলের শ’দুয়েক ছেলের কানফাটানো চিৎকারে গোটা গ্রাম যেন কেঁপে যাচ্ছে। ঠিক তখনই আমাদের গোলপোস্টের সামনে উড়ে এল বাজপাখির ক্ষিপ্রতা নিয়ে একটা শরীর। বলটা গোলে ঢোকবার আগেই ওই উড়ন্ত শরীরটা মাথা দিয়ে বলটাকে সাইডলাইনের দিকে পাঠিয়ে দিতেই গোটা মাঠ কাঁপিয়ে হাততালি বাজতে লাগল আর নানা কণ্ঠে চিকার উঠল, “হারু, হারু, হারু।”

মন্ত্রীমশাই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। বসতে বসতে বললেন, “অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্যভাবে গোলটা বাঁচিয়ে দিল ছেলেটা। ওর নাম কী?”

হেডসার রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘হারু, মানে হারাধন দাস। আমার স্কুলের ছাত্র।”

সেদিন, সেই মর্মে আমরা টের পেলাম, একটা গোল করার চাইতে একটা অবধারিত গোল বাঁচানোর আনন্দ কত বড়।

মডার্ন স্কুলের থ্রো থেকে বলটা পেল সেই সেন্টার ফরওয়ার্ড, যে এইমাত্র গোল করে ফেলছিল। বলটা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই হারু ওর পা থেকে বলটা কেড়ে নিয়ে সামনের একজনকে কাটিয়ে সোজা দৌড় লাগাল গোলের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে লাগল মাঠের গর্জন। যেন একটা হরিণ ছুটে যাচ্ছে সবুজ মাঠের ওপর দিয়ে। বক্সের মাথা থেকে চিপ করে বল তুলে দিল বিশুর মাথায়। বিশু বলটা বুকে করে নামিয়ে সুরজিৎকে দিতেই সুরজিৎ ওদের দুই ব্যাকের মাঝখান দিয়ে গোলে মারল। শটটায় জোর ছিল কিন্তু বলটা গেল সোজা গোলকিপারের হাতে। হাফটাইমের আগে পর্যন্ত প্রায় সমানে সমানে লড়াই হল। দু’ দলই গোলের সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে পারল না। তবে মডার্ন স্কুল তুলনামূলকভাবে আমাদের চেয়ে বেশি সুযোগ পেয়েছিল।

হাফটাইমে এসে হারু শুয়ে পড়ল। মাস্টারমশাইরা ওকে ঘিরে আছেন। পণ্ডিতমশাই নিজে হারুর কপালের ঘাম মুছিয়ে দিয়ে বললেন, “তোর বুকে মা-কালীর ফুল ছোঁয়াইয়া দিছি। তুই ভাবিস না। নে, ঠাকুরের চরণামৃত খা।”

মাঠে নামবার আগে হেডসার বললেন, “এডুকেশন মিনিস্টাব যখন তোর নাম জিজ্ঞেস করছিল তখন তোর নামটা বলতে গিয়ে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। এমন গর্ব, এমন আনন্দ কোনও ছাত্রের নাম বলবার আগে আমার আগে কখনও হয়নি। আজ খেলার শেষে সেই আনন্দটুকু যেন থাকে। আমরা মাস্টারমশাইরা তোর জন্য আজ গর্বিত হতে চাই।”

মাঠে নামবার আগে হারু বলল, “এতসব তো আগে জানতুম না। আমি জানতুম যারা ভাল ডিভিশন পায়, স্কলারশিপ পায়, মাস্টারমশাইরা তাদের নিয়ে গর্ব করেন। খেলা-টেলা তো ফালতু ব্যাপার।”

আমি বললাম, “আজ তুই গোটা গ্রামের হিরো। তোর জন্য আমার মা-ও তো মানত করেছেন। ব্যান্ডপার্টি এসে গেছে। তুই জান লড়িয়ে আমাদের জিতিয়ে দিলে আজ সারারাত উৎসব করব।”

যেতে যেতে হারু থমকে পড়ল। অন্যরা মাঠে নেমে যাচ্ছে। হারু শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই জানটার এত মূল্য! ঠিক আছে, জান বাজি রইল।”

হাফটাইমের পর খেলা শুরু হতেই খেলার ছবিটা ধীরে ধীরে বদলে গেল। গোটা মাঠ জুড়ে শুধু হারু, হারু আর হারু। কখনও নেমে, কখনও উঠে, কখনও আক্রমণ রোখার কাজে, কখনও আক্রমণে উঠে যাওয়ার কাজে সর্বত্রই হারু। বিশু আর সুরজিৎকে নীচে নামতে দিচ্ছে না হারু। বিশ মিনিটের মাথায় আশ্চর্য কাণ্ডটা ঘটাল হারু। হারুর একটা শট মর্ডাণ স্কুলের গোলকিপার কর্নার করে বাঁচাল। আমরা প্রথম কর্নার পেলাম। সুরজিৎকে কর্নার করতে পাঠাল হারু। হারুর দু’পাশে দু’জন পাহারা দিচ্ছে। সুরজিতের কর্নার কিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারু ছিটকে পেছনে সরে এল। মডার্ন স্কুলের ব্যাক হেড দিয়ে বলটাকে বক্সের বাইরে পাঠাচ্ছিল, হারু আচমকা লাফ দিয়ে শুন্যে উঠে বক্সের মাথা থেকে শুন্যে শরীর বেঁকিয়ে সেই বলে শট করল। অব্যর্থ নিশানা। গোলকিপার কিছু বোঝবার আগেই বল গোলের মধ্যে ঢুকে গেছে। খেলা শেষ হওয়ার পনেরো মিনিট আগে আমরা গোল পেলাম এবং এমন অসাধারণ গোল।

চিৎকার আর জয়ধ্বনির সঙ্গে তখন নাচানাচি আরম্ভ হয়ে গেছে। নিখিলবাবু বাচ্চা ছেলের মতো সাইডলাইনের পাশ দিয়ে ছুটছেন আর চিৎকার করে বলছেন, “লাখ টাকার গোল! বাঁধিয়ে রাখার গোল। এমন গোল কলকাতার বড় মাঠে কে কবে দেখেছে!”

শিক্ষামন্ত্রী ডি. এম-কে উদ্দেশ করে বললেন, “ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের গোল। আমি তো ভাবতেই পারছি না গ্রামের একটা অজ্ঞাত পুঁচকে ছেলে এমন গোল কেমন করে দিল!”

হেডসারকে উদ্দেশ করে বললেন, “আপনার স্কুলের ছাত্র?”

হেডসারের গলা ধরে এসেছিল। তিনি মাথা নেড়ে জানালেন, “হ্যাঁ।”

আটাশ মিনিটের মাথায় আবার আকাশফাটানো চিৎকার উঠল, “হারু, হারু।” কিন্তু শট নেওয়ার আগেই রেফারি বাঁশি বাজিয়ে জানিয়ে দিলেন, বিশু অফসাইডে পড়ে গেছে। কিন্তু হারুর পা থেকে দ্বিতীয় গোল পেতে আমাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। প্রথম গোল খাওয়ার পর থেকেই মডার্ন স্কুলের খেলার ছকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। খেলা যত শেষের দিকে যেতে লাগল, মডার্ন স্কুল ততই ভুল করতে আর সেই ভুল সামাল দিতে ফাউল করতে লাগল। একত্রিশ মিনিটে বিশুর কাছ থেকে বল পেয়ে হারু ভেতরে ঢুকছিল। বক্সের বাঁ দিক দিয়ে ঢোকবার সময় ওকে দু’জনে মিলে বিশ্রীভাবে ফাউল করে মাটিতে ফেলে দিল। বক্সের হাতখানেক বাইরে। তবুও আমরা চিৎকার করে বললাম, “পেনাল্টি, পেনাল্টি।” •

পণ্ডিতমশাইও চিৎকার করে পেনাল্টির দাবি জানাতেই নিখিলবাবু বললেন, “বক্সের বাইরে হয়েছে। ওটা পেনাল্টি হয় না।”

পণ্ডিতমশাই বললেন, “কেন হয় না? ক্লাসরুমের বাইরে যদি ছাত্রের টুকলি ধরা পড়ে তাইলে পরীক্ষার সময় শাস্তি হয় না? নকল করে নাই কিন্তু করার জন্য লুকাইয়া বই আনলে সেই ছাত্র দণ্ডিত হয় না?”

হারু মাঠ থেকে উঠে দাঁড়াবার পর নিজেই বলটা, এনে বসাল। বসাবার আগে বলটার গায়ে চুমু খেল। বক্সের মধ্যে দু’জনের দেওয়াল। পেছনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দু’ দলের খেলোয়াড়রা। শট নেওয়ার জন্য হারু তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে। রেফারি বাঁশি বাজাতেই হারু খেলোয়াড়দের মাথার ওপর দিয়ে বলটা হাওয়ায় বাঁক খাইয়ে গোলের দিকে পাঠাল। বলটা বাঁক নিয়ে সেকেন্ড বারের কোনা দিয়ে গোলে ঢুকে গেল।

খেলা শেষ হতেই আমরা হইচই করে মাঠে নেমে পড়লাম। হারু এল সবার কাঁধে চড়ে। ওকে কাঁধে করে সারা মাঠ ঘোরানোর পর আমরা যখন ওকে নামালাম তখন দেখি হেডসার অনাদিবাবু হারুর জন্য দাঁড়িয়ে। হারু প্রণাম করবার জন্য নিচু হতেই হেডসার ওকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “আজ আমার মনে হচ্ছে আমার কোনও ছাত্র যেন স্কুল ফাইনালে প্রথম হয়েছে। তোর জন্য গর্বে আমাদের বুক ভরে গেছে।”

হারুকে বুকে জড়িয়ে ধরে হেডসার কেঁদে ফেললেন।

ততক্ষণে মাঠের দু’ দিকের দুটো গেট দিয়ে দুই দল বাজনাদার মাঠে এসে গেছে। একদিকে কলকাতার ব্যান্ডপার্টি, অন্যদিকে কুমোরটুলি থেকে আনা ছ’খানা ঢাক আর কাঁসর। বদ্যিনাথ বাগ বনাম কুঞ্জলাল সাহার বাজনা-যুদ্ধ। কিন্তু আজ দু’জনেই পরস্পরের হাত ধরে নাচতে নাচতে মাঠে আসছেন।

হঠাৎ পণ্ডিতমশাই হন্তদন্ত হয়ে এসে বললেন, “কাম সারছে। হারুর বাবা সেই কৃষ্ণবর্ণের মহিষটার উপর চাইপা মাঠে আসতাছে। উনারে আটকান।”

জীবনধনবাবুকে আটকাবার জন্য আমাদের বিশেষ চেষ্টা করতে হল না। ঢাক আর ব্যান্ডের প্রবল শব্দে মোষটা জীবনধনবাবুকে পিঠে নিয়েই ধাপার দিকে ছুটতে আরম্ভ করল।

প্রাইজ নেওয়ার আগে মডার্ন স্কুলের মাস্টারমশাইরাও এসে হারুর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে গেলেন। সেরা খেলোয়াড়ের স্বর্ণপদকটি হারুর গলায় ঝুলিয়ে দিতে দিতে শিক্ষামন্ত্রী বললেন, “তোমার খেলা দেখে সত্যিই আমি অভিভূত হয়ে গেছি। তুমি কলকাতার মাঠে খেলার চেষ্টা করো। তোমার নাম হবে। তোমার মধ্যে দিয়ে আমাদেরও নাম হবে।”

আমাদের বন্ধু হারাধন দাসের গল্প হয়তো এখানেই শেষ হওয়া উচিত। কিন্তু এর পরেও আরও একটি খেলায় সে জিতেছিল, সেই কথাটুকু জানানো দরকার। সেই খেলাটা ছিল হেডসারের বাড়ির বারান্দায়। হেডসার হারুকে বললেন, “হারু, বিপক্ষের এগারোজনের কঠিন বাধা ডিঙিয়ে তুই যদি জিতে আসতে পারিস, তা হলে মাত্র সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে কেন লড়ে জিততে পারবি না?”

হারু বুঝতে না পেরে বলল, “কোন মাঠে?”

হেডসার বললেন, “ফাইনালের মাঠে। এবার তোকে লড়তে হবে বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃত আর ইকনমিক্স-এর সঙ্গে। আমরা সবাই আছি তোর সঙ্গে। তুই লড়াই আরম্ভ কর। মনে কর, ওরা তোর ডিফেন্স। তুই একা এই ডিফেন্সকে ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছিস। মাঠের বাইরে রয়েছি আমরা, তোর সমস্ত শিক্ষক। এটাও একটা খেলা। জীবনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার খেলা। ফাইট—ফাইট ফর লাইফ, ফাইট ফর নলেজ, ফাইট ফর আওয়ার বেটার ফিউচার।”

শুরু হল এক আশ্চর্য খেলা। অনাদিবাবু ছায়ার মতো লেগে রইলেন হারুর সঙ্গে। হারুকে এনে রাখলেন নিজের বাড়িতে। নানা লোকে নানা কথা বলতে লাগল। হেডসার গায়ে মাখলেন না। বিকেলে খেলার মাঠ থেকে হারু ফিরত হেডসারের সঙ্গে। শীতের সকালে হারু দৌড়ত আর হেডসার বটতলায় ওর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতেন। তারপর হারুকে নিয়ে বসে যেতেন পড়াতে। স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে যেন একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। সবাই পালা করে করে হারুকে পড়াতে আসেন।

কেউ কেউ বললেন, “গাধাকে পিটলে গাধা কি আর সত্যি সত্যি ঘোড়া হয়, না কোনওদিন হয়েছে।”

হারু যেদিন আমাদের সঙ্গে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিতে গেল সেদিন বুঝিনি কী ঘটতে যাচ্ছে।

পরীক্ষার রেজাল্ট বেরনোর পর দেখা গেল হারু সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করেছে। মাত্র সাত নম্বরের জন্য ফার্স্ট ডিভিশন পায়নি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। হেডসার রিটায়ার করে নিজের পৈতৃক বাড়ি বারুইপুরে চলে গেলেন। হারু পেছন ছাড়ল না বলে হারুও সঙ্গে গেল। জীবনধনবাবু বিশেষ আপত্তি করেননি। তিনি বললেন, “আপনিই তো ওর প্রকৃত পিতা। গুরুর স্থান পিতার ওপরে। ও গুরুগৃহেই যাক।”

মাঝে মধ্যে হারুর চিঠি পেতাম। আস্তে আস্তে সেটাও কমে এল। কলেজ ছেড়ে চাকরি, সংসার ইত্যাদি নিয়ে আর দশজনের মতো মেতে আছি। হারু কলকাতার মাঠে বছর-দুই খেলেছিল। কাগজে ছবিটবি দেখেছি। তারপর আর কোনও খবর জানি না। বছরখানেক আগে আশ্চর্য উপায়ে হারুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।

মেয়েকে কলেজে ভর্তি করতে গেছি। আজকাল তো সুপারিশ ছাড়া কোথাও কোনও কাজ হয় না। অতএব, সুপারিশপত্রও একটা জোগাড় করেছি। কলেজের বারান্দায় অপেক্ষা করছি। হঠাৎ দেখি একদঙ্গল ছেলেমেয়ে সিঁড়ি দিয়ে কুলকুল করতে করতে নামছে। ওদের সঙ্গে কলেজেরই কোনও অধ্যাপক। কেননা, সকলেই ওঁকে ‘সার’, ‘সার’ বলে ডাকছিল। চলে যেতে যেতে ভদ্রলোক হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে আমাকে দেখতে দেখতে বললেন, “কিছু মনে করবেন না, আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে। আপনার নামটা…”

আমি নামটা বলতেই ভদ্রলোক দু’ হাতে আমার কাঁধ ঝাকিয়ে দিয়ে বললেন, “আমায় চিনতে পারলি না। আমি সুরজিৎ। তোদের স্কুলে দু’ ক্লাস ওপরে পড়তাম।”

কথায় কথায় হারুর প্রসঙ্গ উঠল। বললাম, “হারুর সঙ্গে বহুদিন যোগাযোগ নেই। কোথায় আছে জানি না।”

সুরজিৎ বলল, “হারুকে দেখবি? চল, আজই দেখা করিয়ে দিচ্ছি।”

মেয়েকে ভর্তি করিয়ে সুরজিতের সঙ্গে গেলাম এয়ারপোর্ট হোটেলে। হারু কি হোটেলে চাকরি করে?

ঘরের দরজা খুলে হারুকে দেখে আমি অবাক। হারু কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ এসে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। বলল, “আমি আজই ব্রাজিল যাচ্ছি ফুটবল কোচিং-এর বিশেষ ট্রেনিং নিতে। ফিরে এসে জুনিয়ার ইন্ডিয়ার ট্রেনিং দেব। মালাইচাকি ভেঙে যাওয়ায় নিজে আর খেলতে পারি না। এখন ট্রেনিং দিচ্ছি। হেডসার জোর করে গ্র্যাজুয়েট করিয়েছিলেন বলে লোভনীয় চাকরি আর বিদেশে ট্রেনিং নেওয়ার সুযোগটা পেলাম। বিদ্যে না থাকলে হারু এখনও বোধ হয় মোষের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াত।”

আমার মেয়ের দিকে তাকিয়ে হারু জিজ্ঞেস করল, “তোর মেয়ে এত বড়? আমার কথা জানে?”

আমার মেয়ে বলল, “বাবার মুখে শুনেছি।”

হারু আমার মেয়েকে আদর করে জিজ্ঞেস করল, ‘বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?”

মেয়ে একটুও না ভেবে উত্তর দিল, “ঠিক তোমার মতো।”

বড় দুঃখে, বড় বেদনার সঙ্গে মনে পড়ল, ছেলেবেলায় আমাদের অভিভাবকরা কেউই চাইতেন না আমরা হারুর সঙ্গে মিশি, আমরা হারু হই। আজ যখন আমার মেয়ে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল সে হারু হতে চায়, তখন আমার বুকের মধ্যে একটা আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে আমাকে কাঁপিয়ে দিল।

কিন্তু হারু হওয়া কি অত সহজ?

আমরা পারিনি। আমার মেয়ে যেন পারে। একেবারে শূন্য থেকে, প্রতিকুল পরিবেশে, অজস্র নিন্দা, তিরস্কার আর লাঞ্ছনার সঙ্গে যুদ্ধে করতে করতে ও যেন হারুর মতোই সম্মানের চুড়োয় পৌঁছয়—এ-দেশে এটাই যে রীতি আর রেওয়াজ।

১৩৯৭

অলংকরণ: সুনীল শীল

সকল অধ্যায়
১.
প্রোফেসর হিজিবিজ্‌বিজ্
২.
বাহাদুর
৩.
কুমির
৪.
ননীদা
৫.
হর্ষবর্ধনের ভাগনে ভাগ্য
৬.
কর্ভাস
৭.
বেণী লস্করের মুণ্ডু
৮.
টুম্পুর গল্প
৯.
বারীন ভৌমিকের ব্যারাম
১০.
বীর হওয়ার বিড়ম্বনা
১১.
নন্দগুপি
১২.
পালোয়ান ভূত
১৩.
হিসাব
১৪.
গান
১৫.
জ্যান্ত খেলনা
১৬.
মুড়ি
১৭.
কর্নেল মিত্র
১৮.
গুল-ই ঘনাদা
১৯.
ভয়ঙ্কর মুখোশ
২০.
দিনে ডাকাতি
২১.
গন্ধটা খুব সন্দেহজনক
২২.
মেজকর্তার খেরোখাতা
২৩.
গোয়েন্দা বরদাচরণ
২৪.
সাধু কালাচাঁদের ফলাও কারবার
২৫.
একটি ভুতুড়ে ঘড়ি
২৬.
বুনো হাতির বন্ধুত্ব
২৭.
গোয়ায় গোগোলের প্রথম কীর্তি
২৮.
ইঁদারায় গণ্ডগোল
২৯.
চোর সাধু
৩০.
টোরি জঙ্গলের ভক্ত-বাঘ
৩১.
জোনাকি-ভূতের বাড়ি
৩২.
বনবিড়াল
৩৩.
ভয় ও ভূত
৩৪.
সুপারমেন
৩৫.
রাত যখন বারোটা
৩৬.
প্রেতাত্মার উপত্যকা
৩৭.
আলুর চপ
৩৮.
হাবুলমামার ভূতের ব্যবসা এবং…
৩৯.
অশোকের কাণ্ড
৪০.
হারাধন
৪১.
হয়তো এইরকমই
৪২.
মহারাজা তারিণীখুড়ো
৪৩.
খুড়ো-ভাইপো
৪৪.
সহযাত্রী
৪৫.
দারিৎসু
৪৬.
চার বুড়োর আড্ডা
৪৭.
রামপলের অন্তর্ধান রহস্য
৪৮.
দেয়ালা
৪৯.
শুভ জন্মদিন
৫০.
ইন্দ্রনাথ সামন্তের বাড়ি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%