ব্রহ্ম বনাম পলিথিন মাতা

রূপম ইসলাম

—আচ্ছা ব্রহ্মদা, এই যে ড: পরিমল বাগচী আমায় আপনার কাছে রেফার করলেন, আমি এলাম। এরকম নিশ্চয়ই আরও ডাক্তার আছেন, যাঁরা আপনার কাছে গোলমেলে মামলা পাঠান?

—হ্যাঁ তা আছে। দু'তিনজন আছে।

—যেমন?

—যেমন ড: অরিন্দম কাঞ্জিলাল, ড: হারাধন মিস্ত্রী...

—আর অন্যভাবে কেউ মানে কোনও রোগী আসেন না?

—তাও এসেছে। যেমন ধরো তোমার রোগ সারালাম। এবার তুমি আরেকজনের রোগের সন্ধান পেলে। হয়তো মনে হল, একইরকম অবস্থা। তখন তুমিই তাকে বললে, ড: ব্রহ্ম ঠাকুরকে দেখিয়ে নাও একবার।

—সেসব লোককে দেখেছেন? মানে যদি শত্রুপক্ষের লোক এভাবে বাড়িতে ঢুকে আসে?

—দেখেছি, অনেক ঝামেলা করে। যদি সে আগে ফোন করে থাকে, ফোনে তার সঙ্গে কথা বলে যদি তাকে আমার জেন্যুইন কেস বলে মনে হয়। যার রেফারেন্সে আসছে, তার আগাপাশতলা যদি আগে থেকেই জানা থাকে আমার। এসব ধাপ পেরোলে, তবেই দেখেছি।

ড: ব্রহ্ম ঠাকুরের বাড়ির ছাদখোলা উঠোনে এক খোশআড্ডার কথোপকথন। বেশ কিছুদিন আগের এক অলস শেষ-সন্ধ্যা। আশ্চর্য শ্যুটিং শেষ করে নদুবাবুর দোকানের বিখ্যাত বেগুনি নিয়ে এসেছে। মুড়ি আর চা সহযোগে তার সদ্ব্যবহার চলছে। সঙ্গে গরম গরম গল্প!

—নিশ্চয়ই অনেক ইন্টারেস্টিং ঘটনা আছে! কাউকে বলা হয়নি।

—তা আছে।

—তো সেসব মাঝেমধ্যে একটু শোনালে তো পারেন!

ব্রহ্ম ঠাকুর বেগুনিতে এক কামড় দিয়ে কচোরমচোর করে চেবালেন। তারপর বললেন— শোনো আশ্চর্য, তুমি বাংলা ছবির হিরো হও আর যেই হও, বেগুনি চেবানোর সময়ে কিন্তু স্টাইল মারবে না। আরাম করে চেবাও। নির্লজ্জের মতো চেবাও। যত চেবাবে দাঁতের জোর বাড়বে। মুখের মাংসপেশি শক্তিশালী হবে। আর কী হবে জানো? হজম হবে। এই যে তোমাদের স্টুডিও পাড়ার নদুবাবু না কে, তার দোকান থেকে এনেছ, আমাদের পাড়াতেও একটি দোকান আছে, তেলেভাজার জন্য বিখ্যাত। মাধব সরখেলের দোকান। সে দোকানের খাবার খেলেই সবার দেখেছি, অবধারিত পেটখারাপ হয়। তবুও সে দোকান বিখ্যাত— কেন জানো?

—আহ ব্রহ্মদা, আমি জানতে আগ্রহী না। কথা ঘোরাবেন না। ইন্টারেস্টিং একটা কেসের গল্প ছাড়ুন তো!

—'ছাড়ব'? গল্প 'ছাড়ব'? বেড়ে বলেছ। তাও যদি বলতে গল্প ছড়ান, মণিমুক্তোর মতো ছড়িয়ে দিতাম।

—ওকে। আজ অনেকক্ষণ হল। এবার তাহলে ওঠা যাক...

ব্রহ্ম ঠাকুর উঠতে উদ্যত আশ্চর্যের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসলেন। বললেন— আরেহ বোসো বোসো। নাইট ইছ স্টিল ইয়াং। রাগ কোরো না। বলছি। আসলে ভেবে বের করতে একটু সময় নিলাম। কোনটা বলব, কোনটা বলব না। একবার আমার এক পুরনো রোগী, তার নাম হল : তখন বন্দ্যোপাধ্যায়...

—এ আবার কেমন নাম?

—কেন খারাপ কোথায়? তিনভাই ওরা। এখন, তখন আর যখন!

—ধুস, এগুলো কোনও নাম আবার...

—কেন নাম হবে না? রাম বা লখন হতে পারে, চিছ বা মাখন নাম হতে পারে, আর 'তখন' হলেই আপত্তি! এই যে তোমার নাম 'আশ্চর্য'। এবার তোমার ফিল্মের রিভিউয়ারের কী সমস্যা বলো তো! সে তো সমালোচনার কলামে 'বিস্ময়কর' অর্থে 'আশ্চর্য' শব্দটা ব্যবহারই করতে পারবে না!

—রিভিউয়ার হলেনই এক সমস্যা সংবলিত প্রাণী, ওদের অনেক সমস্যা—

—এই আশ্চর্য! কটাক্ষ কোরো না। তোমার ফিল্মের একটা কড়া রিভিউ পড়লেই কটাক্ষ করবে, এ আবার কেমন কথা? যদি লেখায় যুক্তি না থাকে, এমনিতেই পাবলিক ধুয়ে দেবে। আর যুক্তি থাকলে তোমাদের উন্নতিই তো হবে!

—নাহ ব্রহ্মদা। অনেকেই ফালতু সুযোগ নেয়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে। সেসব বিষয়ে আলাপ-আলোচনা আজ থাক। গল্পটাই হোক।

—তা বেশ। তা যা বলছিলাম, সেদিন তখন বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেফারেন্সে একজনের ফোন এল। নাম হল নিলু পাণ্ডে। ফোনে কথা বলে আমার মনে হল, ওসিডি রিলেটেড সমস্যা হতে পারে। তবে তার সঙ্গে হিংস্রতার একটা লেয়ার আছে। সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে, যদি রোগ না সারানো হয়। তাই ডেকে নিলাম। বেশি খোঁজখবর করলাম না। কারণ এখন, তখন আর যখন— তিন ভাইকেই খুব ভাল করে চিনতাম আমি।

...হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ধরেছ আশ্চর্য! এই তিনটে নামই নকল। আসল নামগুলো গোপনই থাক।

নিলু এল। মাঝবয়সি একটি লোক। গাঁট্টাগোট্টা গড়ন। উচ্চতা মাঝারি। গায়ের রং তামাটে। চোখে একটা বাইফোকাল চশমা আছে। লোকটি ঘাম-টাম মুছে তো কথা বলবার চেয়ারটায় শুয়ে পড়ল, আমি একটা তোয়ালে পেতে দিলাম। শুয়েই সে শুরু করল সারা গা চুলকোতে!

—এ আবার কেমন গল্প? ভাগ্যিস আমি এখন ওই চেয়ারটাতে শুয়ে নেই!

—আরেহ শোনোই না। কত রকমের লোক আসে! তা আমি বললাম— ভাল প্রিকলি হিট পাউডার আছে। দেব আপনাকে?

সে সেটা নিয়ে বাথরুমে গেল। ভাল করে পাউডার লাগিয়ে এল। তারপর শান্ত হয়ে বসে প্রথমেই বলল— ঠিক এক মাস হল ডাক্তারবাবু। বাড়িটা কিনেই ফেললাম।

আমি বললাম— কোন বাড়ি?

নিলু বলল— বাড়ি মানে পুরো একটা বাড়ি নয়। আসলে একটা ফ্ল্যাট। আমি যে ফ্ল্যাটে থাকতাম, সেটায় থাকতে থাকতে আমার একটু বোরিং লাগছিল। মনে হচ্ছিল নতুন একটা বাড়ি দরকার। সব কিছুই চেনা হয়ে গেছে, বাড়ির মধ্যেই একটু অ্যাডভেঞ্চার প্রয়োজন! এমনিতে আমি একা থাকি, ব্যাচেলর জীবন, সঙ্গী বলতে আমার সংগ্রহ করা প্রচুর দেওয়াল ঘড়ি। ওটা আমার শখ—ওই পুরনো আমলের যত ঘড়ি কিনে দেওয়াল ভরাই। অর্থনৈতিক দিক থেকে বড় চাকরির কল্যাণে সেটা অ্যাফোর্ড করতে পারি। এর মধ্যে একটা নতুন শখ তৈরি হল এক বন্ধুর বাড়িতে সন্ধে কাটিয়ে। তার বাড়িতে ইনডোর গেমস-এর এলাহি আয়োজন। আর এদিকে আমি প্রত্যেকটিতেই তার কাছে হারছি। আহা, ও তো খেলে খেলে প্র্যাকটিস করে রেখেছে। আর আমায় হারিয়ে মজা নিচ্ছে। রোখ চেপে গেছিল। মনে হচ্ছিল, আমার বাড়িতেও যদি এগুলো রেখে একটু প্র্যাকটিস করতে পারতাম! ওদিকে নতুন ঘড়ি কিনে তা টাঙানোর উপায়ও নেই। ফাঁকা দেওয়াল শেষ। তাই মনে হল, আরেকটু বড় বাড়ি না হলে আর চলছে না। কয়েকটা বাড়ি এদিক-সেদিক দেখলাম। হয় পছন্দ হল না, নয় দামে পোষালো না। এমন সময় একদিন খবর পেলাম, আমি দোতলায় যে ফ্ল্যাটে থাকি, ঠিক তার উপরের ফ্ল্যাট বিক্রি আছে। অর্থাৎ তিনতলার যে ফ্ল্যাটটি বন্ধ পড়েছিল প্রায় একবছর, তার মালিক সেটি বেচে দেবেন। যে দালাল এসে এই খবর দিল, সে আমায় বলল, সহজেই একটা সিঁড়ি বানিয়ে ফ্ল্যাটদুটো জুড়ে নেওয়া যাবে।

—তা আপনি কিনলেন? সিঁড়ি বানিয়ে জুড়েও নিলেন নিশ্চয়ই। এবার রাতের বেলা দেখতে পেলেন সেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামা করছে রহস্যজনক এক কালো ছায়া!

—ঠিক বলেছেন ডাক্তারবাবু। রহস্যজনক কালো ছায়ার একটা ব্যাপার আছেই। তবে সেটায় পরে আসছি। আগে আলোকিত অংশের বিবরণ শুনুন। সে ফাটাফাটি ব্যাপার। তিনতলার ফ্ল্যাটটাতে, মানে যেটা টেকনিক্যালি আমার দোতলা, সেখানে খেলাধুলোর দারুণ অ্যারেঞ্জমেন্ট রেখেছি। পুল-টেবিল আছে। ফুসবল আছে। ক্যারামবোর্ড আছে। এমনকী এক্স বক্সও রেখেছি। আসুন না একবার। হালকা মিউজিক চালিয়ে জমিয়ে খেলব। দেওয়ালঘড়ির আওয়াজে বুঝে যাব রাত কত হচ্ছে। বাড়িতে বাইরের খাবার আনিয়ে নেব। দারুণ কাটবে সময়টা।

—বুঝেছি। আপনার বন্ধুরা ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে আপনার বাড়িতে আসাযাওয়া করেনি। একলা একলা কত আর প্র্যাকটিস করবেন। তবুও যতক্ষণ সেসবে থাকেন, মন ভাল থাকে আপনার। কিন্তু যখন এগুলোও বোরিং লাগতে শুরু করে, তখন আপনার চোখ পড়ে যায় ওই সিঁড়িটার দিকে—

—না না ডাক্তারবাবু। সিঁড়ি ইছ ফাইন। ওটা ধরে টানবেন না, নড়বড়ে হয়ে যাবে। প্রবলেম এরিয়া যেটা, সেটা হল ব্যালকনি!

—ব্যালকনি? ব্যালকনির উলটোদিকে একটা গা ছমছমে অন্ধকার ভূতের বাড়ি? কিন্তু তা কী করে হবে! ঠিক তলার ব্যালকনিটা তো আগে থেকেই আপনার ছিল। তার সামনে ভূতের বাড়িটা তখন ছিল না?

—না না ডাক্তারবাবু। উলটোদিকের বাড়িটা ভূতের না। ভূতের বাড়ি একটা আছে, সে অন্য সাইডে। সেটা নিয়ে আমি বদার্ড নই। ভূতেরা দেখা দিয়ে আমায় ডিসটার্ব করে না। আমিও ওদের ঘাঁটাই না। সুতরাং ওটা কোনও ব্যাপার না। আমার মুশকিলটা হল, যখনই খেলতে খেলতে বিরক্ত লাগছে বলে আমি তিনতলার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াচ্ছি, উলটোদিকের বারান্দাটা আমার নজরে পড়ছে। এটা দোতলার ব্যালকনি থেকে এইভাবে ডাইরেক্টলি দেখা যেত না। এবং এই বারান্দাতে যেটা দেখছি, সেটা হল...

এই বলে নিলু চুপ করে রইল। খানিক বিরতির পর সে বলল—

বললে বিশ্বাস করবেন না। সারা বারান্দা জুড়ে ঝুলছে কালো কালো প্লাস্টিক। পলিথিনের প্যাকেট। ওই ফ্ল্যাটটায় এক ভদ্রমহিলা থাকেন। তিনি সারাদিন বারান্দায় আসেন না। দরজাটা বন্ধ থাকে। গভীর রাতে তিনি বেরোন। আমি বাড়ি থাকলে, তখন সাধারণত ঘুমোই। প্রতিদিন ভোরে দেখি ওই ব্যালকনিটার গ্রিলে নতুন কালো পলিথিন বাঁধা। তাই একদিন রাত জেগে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। রাত দুটো নাগাদ একটা প্রায় ভৌতিক দৃশ্য দেখে আত্মারাম খাপছাড়া হয়ে গেল।

—স্বাভাবিক। এমন মহিলার প্রকাশ ভূতুড়ে হওয়ারই কথা। তা কী দেখলেন?

—দেখলাম, মাঝবয়সি এক মহিলা। আমারই মতো বয়স। বেশ লম্বা। চুলগুলো খোলা। একটা কালো শাড়ি পরে তিনি হাতে একটা মোমবাতি নিয়ে বেরোলেন।

—মোমবাতি? কেন? হঠাৎ মোমবাতি কেন?

—ওঁর বারান্দায় আসলে আমাদের বাড়ির ছায়াটা গিয়ে পড়েছে। এভাবে আড়ালে থাকায় ব্যালকনিটা রাস্তা থেকে দেখাও যায় না। বোধহয় ব্যালকনিটাতে আলোও লাগানো নেই কোনও। অন্ধকারে দেখবেন কী করে?

—হুম। তারপর?

—উনি ব্যালকনির একটা কোনও রেলিংয়ে মোমবাতিটা রেখে অন্য কোনও একটা টুল থেকে কয়েকটা কালো পলিথিনের প্যাকেট হাতে তুলে নিলেন। তারপর পরম আদরে প্রতিটি পলিথিন মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে আদর করে ফুঁ দিলেন। তারপর গ্রিলগুলোতে বাঁধতে শুরু করলেন।

—হাঃ! কী অদ্ভুত! তা এগুলো সত্যিই ঘটেছিল? মানে আপনার কোনও হ্যালুসিনেশন নয় তো?

—না না! একদম সত্যি। আমি নিজেকে চিমটি কেটে দেখলাম তো! দিব্যি ব্যথা লাগল। আমি নিজেরই চিমটি খেয়ে 'উঃ' করে চেঁচিয়ে উঠলাম। তাই শুনে 'পলিথিন মাতা' —হ্যাঁ এই নামই দিয়েছি, বিশেষ করে পলিথিন থলিগুলির প্রতি বাবা-বাছা করবার ভড়ং দেখে— চমকে উঠে আমার দিকে তাকালেন। এক রক্ত জল করে দেওয়া স্থির দৃষ্টি। আমার ঠোঁট থেকে সিগারেট পড়ে গেল ভয়ে।

বুঝলে আশ্চর্য! এই হল মোর অর লেস নিলু পাণ্ডের কাহিনি। অত রাতে যদি ওরকম আনইউজুয়াল কিছু সে দেখে, একলা ফ্ল্যাটে তার তো আতঙ্ক হবেই। কাজেই ওই পার্টটা নিয়ে আমি চিন্তিত হলাম না। প্র্যাকটিক্যালি স্পিকিং, আমার নিলু পাণ্ডের মানসিক সুস্থতা নিয়ে এখন আর চিন্তা বিশেষ হলই না। বরং মনে হল সে নিজে অ্যাবসোলিউটলি ফাইন। একটা কারণে একটু মনটা খচখচ করল। বুঝতে পারলাম আমার কাছে নিলুর আসার পেছনে হয়তো কোনও মতলব আছে, আর ওর বলা কথার মধ্যে 'আমি রাতে বাড়ি থাকলে'...অংশটুকু সন্দেহজনক। কিন্তু আপাতত সেসব ছেড়ে আমি বেশি করে ভাবতে শুরু করলাম সেই মহিলাকে নিয়ে। যার নাম নিলু দিয়েছিল 'পলিথিন মাতা'। মনে হল, মহিলার মধ্যে কিছু একটা জবরদস্ত রহস্য আছে।

মহিলার গল্প শুনে তিনটে কথা আমার মনে হয়েছিল। ১। কাগতাড়ুয়া সিনড্রোম। ২। উইচক্র্যাফট বা ডাকিনীবিদ্যা ৩। কালো টিকা। খুলে বলি একটু। কিছু কিছু মানুষ থাকে, যারা কাক প্রাণীটিকে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। তারা কাক তাড়ানোর জন্য এমন কোনও পদক্ষেপ নেই, যা নেয় না। সুকুমার রায়ের লেখা 'দ্রিঘাংচু' গল্পটা আশা করি তোমার মনে আছে। মহিলা যদি কাক তাড়ানোর কথা ভেবেই কালো পলিথিনের জামা পরিয়ে গোটা বারান্দাটাকে কাগতাড়ুয়া সাজাতে চান? এটা অবশ্যই একটা সম্ভাবনা।

উইচক্র্যাফট অর্থাৎ ডাকিনীবিদ্যা নিয়ে চর্চা করা এক ধরনের মানুষের অবসরের খেয়াল। তবে এটার ব্যবহার আমি বিদেশিনিদের মধ্যে প্রচুর দেখেছি। এখানে ততটা না।

কালো টিকা দেওয়াটা, বিশেষত শিশুদের অনিষ্টকারীর খারাপ নজর থেকে বাঁচাতে, এখানকার লোকসমাজে প্রচলিত। যুক্তিহীন এই অভ্যেসের সম্প্রসারণ ব্যালকনিতে কালো পলিথিনের প্যাকেট বাঁধার মাধ্যমে হচ্ছে। এরকমও ভেবে নিতে পারি আমরা।

সব মিলিয়ে মনে হল, একবার অকুস্থল পরিদর্শন না করলে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাবে না। পাশাপাশি মহিলার সঙ্গেও আলাপ করা দরকার।

পরদিন সন্ধেয় একটা ফেসমাস্ক পরে, ওই যে পলিউশন থেকে বাঁচবার এক ধরনের মুখোশ আছে না, সেরকম একটা পরে আমি চলে গেলাম নিলুর বাড়ি। মেকআপ নিয়ে বেরনোর প্রয়োজন বোধ করিনি, যদিও তখনও আমি আত্মগোপন করেই ছিলাম। নিলুকে বলাই ছিল যে আমি আসব।

বাড়িটি সুন্দর। তাড়াহুড়ো করলাম না। ভাল করে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। খেললামও কয়েকটা খেলা। বেচারা নিলু সব ক'টাতেই হারল। কিছু কারণে আমার একটা হালকা সন্দেহ হল আবার— এ ব্যাটা ইচ্ছে করে হারছে নাকি? কোনও কারণে এ কি আমায় খুশি রাখতে চায়? নিজের দলে চায়? যাই হোক, নিলু পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাল। তবে একটা ঘর বন্ধ ছিল। বন্ধ ছিল মানে দরজাটা ভেজানো ছিল। দোতলার বারান্দার লাগোয়া ঘরটা। নিলু খুলে দেখাল না। আমিও জানতে চাইলাম না কী আছে সেই ঘরে।

খেলাধুলোর পর আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম তিনতলার ব্যালকনিতে। নিলু একটা সিগারেট ধরাল। আমি তো বহুদিন ধূমপান করি না। প্রথমবারের লন্ডন প্রবাসকালে পাইপ খেতাম। সেকথা মনে পড়ছিল।

নিলু যা বর্ণনা দিয়েছিল, মোটামুটি সেরকমই উলটোদিকের বারান্দাটা। বাড়তি জিনিস যেটা দেখলাম, একটা বড় কালো পলিথিনের খণ্ড জোগাড় করে বারান্দাটা অনেকটাই ঢেকে রাখা হয়েছে তা দিয়ে। তাতে কয়েকটা গোল গোল ফুটো লক্ষ করলাম।

ওহ, বলতে ভুলে গেছিলাম, নিলুর নীচতলার দেওয়ালে ঘড়িগুলো ছাড়াও আরেকটা জিনিস দেখেছিলাম। একটা এয়ারগান। ওকে জিজ্ঞেস করতে ও বলল, ছেলেবেলায় টার্গেট প্র্যাকটিস করত ওর সোদপুরের মামাবাড়িতে।

আমি এবার ওর থেকে একটা নোটপ্যাড নিয়ে খসখস করে একটা চিঠি লিখলাম। পাশে দাঁড়িয়ে নিলুও পড়ছিল আমি কী লিখছি। আমি ওকে পড়তে দিলাম। ও যে খেলাটা খেলছে, সেটা ওকেই গুটোতে দিতে হবে। চিঠিতে লিখলাম—

হে পলিথিন মাতা

আপনার গোটা ব্যালকনি জুড়ে কালো পলিথিন বাঁধবার নিকৃষ্ট অভ্যেস কোনও কোনও পরিবেশবিদকে বড় পীড়িত করছে। তারা বলছে, দৃশ্যদূষণ। কিন্তু আমার দারুণ লেগেছে। মনে হয়েছে, ব্যালকনিসজ্জার ইউনিক কনসেপ্ট! আপনার সঙ্গে আলাপ করতে আমি আগ্রহী। পাশাপাশি এমন কিছু আপনাকে জানাতে চাই, যা আপনার কাজে লাগবে। আপনি আমার নীচে দেওয়া ঠিকানায় আগামীকাল সন্ধেয় এলে বিশদে আলোচনা হবে। মনে রাখবেন, এলেই মঙ্গল। না এলে? অমঙ্গল।

ইতি

ব্রহ্মাণ্ড ঠাকুর

চিঠিটা হাতে করে মহিলার ফ্ল্যাটের নীচে গেলাম। ওই বাড়ির একজন দারোয়ানের সঙ্গে কথা হল। নিলুকে বিদায় জানিয়েই এসেছিলাম। তবু দেখলাম নিলু দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমায় লক্ষ করছে। তবে সে দাঁড়িয়েছে বারান্দায় শুকোতে দেওয়া একটা তোয়ালের আড়ালে। বুঝলাম, নিলুর এই লুকিয়ে দেখার একটা কারণ আছে। নিলুর আসলে একটা লুকনো উদ্দেশ্য আছেই। সে সবটা খুলে বলেনি আমায়। বিষয়টা খতিয়ে দেখব, এরকম ভাবলাম। মহিলা এবং নিলু— দু'জনই এখন আমার সন্দেহভাজন।

আপাতত মহিলার ফ্ল্যাটবাড়ির দারোয়ান ঢেঁকিলালের সঙ্গে আলাপ করে মহিলা সম্পর্কে যতটা যা জানলাম, সবটাই রহস্যজনক। ঢেঁকিলাল মাঝেমাঝে মহিলাকে রাত দুটো নাগাদ বেরতে দেখেছে। ভদ্রমহিলা নাকি হেঁটে হেঁটেই কোথায় যান। ভোরের দিকে ফিরে আসেন। ঢেঁকিলালের কাছ থেকে জেনে নিলাম মোটামুটি কতবার এইভাবে বেরিয়েছেন মহিলা।

জিজ্ঞেস করলাম— তা তোমরা বারণ করো না?

সে জানাল— বহুৎ বদদিমাগ অওরৎ। হরবখত জাত-পাত লেকে গালি দেতি হামলোগোকো। হিন্দুস্থানীকা বাচ্চা, বিহারি— ইয়ে সব বোলকে বোলতি হ্যায়— তুমলোগ পয়দায়েশি চোর হো। হামলোগ উনসে বাত নেহি করতা হুঁ।

আমি ঢেঁকিলালকে বললাম— এই চিঠিটা একটু মহিলার দরজায় পৌঁছে দিও। —তারপর তাকে বেশ ভালই বকশিশ-টকশিশ দিয়ে আমি একটা হলুদ ট্যাক্সি ডাকলাম। ফিরে এলাম বাড়ি।

এই বলে ব্রহ্ম ঠাকুর হাসলেন আশ্চর্যের দিকে তাকিয়ে। বললেন— তেষ্টা পেয়েছে নিশ্চয়ই। কফি খাবে?

আশ্চর্য বলল— আমিই বানাচ্ছি ব্রহ্মদা, দু'জনের জন্যই। দ্য নাইট ইছ স্টিল ইয়াং। গল্পটা শেষ না করে কিন্তু আজ উঠছি না!

ব্রহ্ম ঠাকুর কালো কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন— এই যে তোমার আনা বেগুনিটা খেলাম...

—মানে নদুবাবুর বেগুনি!

—কারেক্ট! নদুবাবুর বেগুনি। এই বেগুনিটা খেতে কেন ভাল লাগল জানো? মানে তোমারও তো ভাল লেগেছে, কিন্তু কেন ভাল লেগেছে কোনওদিন বিশ্লেষণ করে দেখেছ?

—ব্রহ্মদা, আপনাকে রিকোয়েস্ট করছি, ওই অ্যানালাইসিসটা আজ থাক। একটা গল্প আপনি বলতে শুরু করেছেন, যেটা বেশ ইন্টারেস্টিং একটা কেস। নাম হতে পারে 'ব্রহ্ম ঠাকুর এবং পলিথিন মাতা'। এটা প্লিছ শেষ করুন তাড়াতাড়ি। আমার আবার কাল সকালে শ্যুটিং।

—আশ্চর্য, তুমি দিনকে দিন কেঠো, রসকষহীন হয়ে যাচ্ছ। 'গল্প শেষ করুন তাড়াতাড়ি' মানেটা কী? গল্প বলবার একটা লয় থাকে! বৃথা দৌড়লে চলবে। তেমন কাজ থাকলে কাল এসো। পরশু এসো। একটা বুড়ো মানুষকে রাত জাগিয়ে বসিয়ে রেখে চাপ দিচ্ছ, এত নির্মম কেন তুমি?

আশ্চর্য ব্রহ্ম ঠাকুরের এইসব ডায়লগবাজিকে ভাল করেই চেনে। এতে প্রভাবিত সে হবে না। সে বরং তাঁকে আরও খানিকটা উস্কে দিয়েই বলল— বুড়ো মানুষ। হুঃ! ব্রহ্ম ঠাকুর দ্য গ্রেট আবার বুড়ো মানুষ। আমার মতো অনেক ছুঁড়োকে তুর্কিনাচন নাচিয়ে ছেড়ে দিতে পারে যে লোকটা, স্যরি, তাঁকে আর যে যাই বলুক, আমি অন্তত বুড়ো বলে মানি না।

ব্রহ্ম ঠাকুর কথাটা শুনে খুশি হলেন। বললেন— বলছ তাহলে? তা এই কেসটাতেও না, নিজের মুখে বলতে লজ্জাই করে, খানিকটা মারামারি আমায় করতে হয়েছিল। সফলভাবেই করেছিলাম। প্রতিপক্ষকে যতটা শক্তিশালী ভেবেছিলাম, তার দৈহিক ক্ষমতা তার চেয়ে বেশিই ছিল। অবশ্য আমিও বুদ্ধিবলে আগে থেকেই তৈরি ছিলাম...

—শুনি, শুনি! পুরোটা বলুন প্লিছ!

—শোনো। পরেরদিন সন্ধ্যায় তো দরজায় কলিংবেল বাজল। হ্যাঁ, তখনও কলিংবেলটা অক্ষত ছিল। বাজত। আমি বুঝলাম, নির্ঘাত ওই মহিলা এসেছেন।

আমি সদর দরজার সামনে একটু বালি ছড়িয়ে রেখেছিলাম। অতিরিক্ত কিছু বুঝে নেওয়ার জন্য। দরজাটা খুলে মহিলাকে ভেতরে আমন্ত্রণ জানালাম। মহিলা ঢুকছেন, আমিও ওই ছড়ানো বালির দিকে তাকিয়ে আছি। বালির উপর মহিলার পায়ের ছাপের ধরন যা দেখলাম, তিনি একবারেই হেঁটে এসে বেল বাজিয়েছেন। তাঁর আসায় কোনও দোনামনাভাব ছিল না। বুঝলাম, শক্ত চরিত্রের মহিলা। তবে যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি বেল বাজিয়েছেন, সেখানে জুতোর দাগ বেশ গভীর। বুঝলাম, বেল বাজানোর ঠিক আগে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন। হয়তো ভেবে নিয়েছেন, কী বলবেন। তবে এটাও কদাচ অ্যাবনরম্যাল বিহেভিয়র নয়।

কনসালটেশন রুমে এখনও আগের দিনের ঘামের গন্ধ ছিল। তবুও সেখানে বসালেই আমার ডিটেকশনে সুবিধা হয়। তাই মহিলাকে বসবার জন্য রিভলভিং চেয়ারটা দিলাম। আমি বসলাম আমার রকিং চেয়ারে। তাঁর দিকে তাকালাম। লম্বা খোলা চুল। কালো শাড়ি। সুন্দর ব্যক্তিত্ব। গায়ের রং একটু ফরসার দিকেই বলা যায়। নাক ঘামের গন্ধে কুঁচকে আছে। কাঁধে ঝোলানো আছে একটি থলির মতো ব্যাগ। ওই যেগুলোকে টোট ব্যাগ বলা হয়। ব্যাগটা কোলে নিয়েই মহিলা বসলেন।

প্রাথমিক আলাপ পরিচয়ের পর আমি কাজের কথায় এলাম। আমি ঠিক করলাম, 'আপনি' নয়, 'তুমি' করেই বলব। প্রথম থেকেই এর সঙ্গে আপারহ্যান্ডে থাকা জরুরি।

বললাম— তোমার নামে জাতিবিদ্বেষের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ গুরুতর। তবে আমি জানি সেই অভিযোগ পুরোপুরি সত্যি নয়। কালো পলিথিনের ব্যাপারটায় আমি পরে আসব। সেটা দিয়েই প্রমাণ করব, তোমার বিদ্বেষ অন্য জায়গায় আরও মারাত্মকভাবে কাজ করে। তবে প্রথমে জবাব দেওয়ার সুযোগ তোমারই থাকবে। জাতিবিদ্বেষের এই অভিযোগটা নিয়ে কিছু কি বলতে চাইবে তুমি?

—কে বলেছে? আমার বাড়ির ওই হিন্দুস্থানী দারোয়ান আর ওর গুড ফর নাথিং খোট্টা বন্ধুগুলো তো? আমি বলছি আপনাকে, এই প্রত্যেকটি লোকই হল তঞ্চক এবং দুর্বৃত্ত।

—তঞ্চক? দুর্বৃত্ত? বাঃ তোমার বাংলা তো চমৎকার মা। কিছুতেই বাংলা না জানা ইংরেজি মাধ্যমের বাঙালিদের সঙ্গে তোমাকে গোলানো যাবে না। কিন্তু 'হিন্দুস্থানী'? 'হিন্দুস্থানী' মানে? যারা হিন্দুস্তানে বসবাস করে, অর্থাৎ যারা ভারতীয়, তাই তো? মানে তুমি, আমি— আমরা সকলেই দুর্বৃত্ত? আমরা তঞ্চক?

—না না, যারা হিন্দিতে কথা বলে। বিহারে থাকে। ইউপি-তে থাকে। তাদের আমরা মুখের কথায় 'হিন্দুস্থানী' বলি না? এই সব অবাঙালি লোকগুলোই একেকটি সাক্ষাৎ ডাকাত।

—এই যে নিজেকে প্রাদেশিক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছ মা, এটা ভাল করছ না। এটা তো সবাই জানে যে ভারতের প্রচুর লোকই হিন্দিতে কথা বলে। তেমনি আবার অবাঙালি মাত্রেই হিন্দিতে কথা বলে না। তুমিও তো খুব ভাল করেই জানো যে শুধু ভাষার কারণে কেউই কাউকে ছোটো করতে পারে না। ছোটো করবার, দুঃখজনক কিন্তু চিরাচরিত ফ্যাক্টরটা আসলে অন্য। তাই এসো, লেটস সেলিব্রেট দিস ফ্যাক্ট যে মানুষে মানুষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা না থাকলে আমাদের দেশ টিকবে না। এসো আমরা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করি, একদা অতুলপ্রসাদ সেন যা লিখেছিলেন—

নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান

বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান

দেখিয়া ভারতে মহাজাতির উত্থান

জগজন মানিবে বিস্ময়

জগজন মানিবে বিস্ময়

আমাদের দেশের একটা ইউনিক ব্যাপার আছে তো মা, যেটাকে বলে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। এবার যদি প্রত্যেকটি প্রদেশেই এমন মাল খুঁজে পাই মা— স্যরি, তেমন লোক আদৌ পেলে তাদের বর্ণনা করতে 'মাল'ই হবে উপযুক্ত শব্দ— এমন মালেরা, যারা দাবি করবে যে শুধু তাদের ভাষায় কথাবলা লোকই ভদ্র, অন্য সবাই পাষণ্ড, তাহলে কী হবে বলতো মা? বুঝতেই তো পারছ, দেশটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। শোনো, আজকে তোমার বলা আজেবাজে কথার নয়, তোমার আসল অপরাধের বিচার করব। সেই বিচারসভার উদ্বোধনী গানটা আমি গাইছি। অবশ্যই এর বক্তব্যের লক্ষ্য তুমি নও, লক্ষ্য হল তারা, যাদের ভূমিকায় তুমি খানিকটা অভিনয় করছ বলা যায়। গান ভাল লাগলে হাততালিটা তুমিই দিও, কেমন? এই গানটা অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা। সলিল চৌধুরির সুর। রেকর্ড করেছিল শিশুশিল্পী অন্তরা।

এই বলে আমি গান ধরলাম—

তেলের শিশি ভাঙল বলে

খুকুর পরে রাগ করো

তোমরা যে সব বুড়ো খোকা

ভারত ভেঙে ভাগ করো !

তার বেলা?

ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা

জমি জমা ঘরবাড়ী

পাটের আড়ৎ ধানের গোলা

কারখানা আর রেলগাড়ী

তার বেলা ?

গানটা শুনে মহিলা খানিকটা নড়েচড়ে বসল। ব্যাপারটা তার পক্ষে যাচ্ছে না বিপক্ষে, সেটা এখনও সে ঠিক বুঝতে পারছে না। খানিকটা দুঃখ দুঃখ গলায় অনুযোগের সুরে আমায় বলল— ব্রহ্মাণ্ডবাবু, আপনি আমার কথা পুরোটা শুনুন আগে। আমার ফ্ল্যাটের ঠিক নীচেই ওই দারোয়ানগুলো বসে গল্প করে। কোনওদিন আবার ওদের বেয়াড়া সমস্ত, কী জানি ছাই, মুসলমান না খ্রীষ্টান দোস্তেরা গল্পে যোগ দিতে আসে। দেখেই বুঝতে পারি সবকটা চোরের বংশ, শয়তানের হাড্ডিখানা! লোকগুলো পাশের পাড়ার বস্তিতে থাকে। যেদিন যেদিন ওই লোকগুলো ওখানে আসে, রান্নাঘরে গিয়ে দেখি কোনওদিন খুন্তি খুঁজে পাচ্ছি না। কোনওদিন হাতা পাচ্ছি না। কোনওদিন আবার দেখি ছোট চামচ পাঁচটা ছিল, এখন গুণে দেখছি তিনটে রয়েছে। তাহলে তো বোঝাই যাচ্ছে, এইসব লোকেরাই চুরিগুলো করে!

—না মা! তোমার কথাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে আমায় শুনতে হবে। দেখতে হবে, তোমার মুখের কথার পেছনে কী কথা লুকিয়ে আছে। নাৎসি আমলে ইহুদিদের যেভাবে টার্গেট করা হয়েছিল, সেই উন্নত রক্ত আর বংশপরম্পরায় খারাপ— এই ভ্রষ্টবিজ্ঞান বা অপবিজ্ঞানের ছায়া এসে পড়েছে মা তোমার এসব বুকনিতে। কথা আমি অবশ্যই শুনব, তবে এসব কথার ভিত্তিতে তোমার বিচার হবে না। এই যেমন তুমি এখন প্রাদেশিক সেজে সুবিধে হল না বলে অতিদ্রুত সাম্প্রদায়িকতার মুখোশটি পরতে চাইছ, এর ফলে তোমার শাস্তি কিন্তু একচুলও কমবে না। আর আমি চেষ্টা করব যাতে না বাড়ে, কেমন? তবে একটু না হয় মেপেই দেখি তোমার উন্মাদাঙ্ক, মানে পাগলামির মিটার। বলো তো পলিথিন মাতা, কী করে তোমার রান্নাঘরে চুরিটা হওয়া সম্ভব হচ্ছে? এ ব্যাপারে তোমার থিওরিটা ঠিক কী?

—'পলিথিন মাতা' আবার কেমন নাম? বিচ্ছিরি! ওটা আমার নাম নয়। আমার নাম হল পারমিতা।

—'পলিথিন মাতা পারমিতা'! বাঃ চমৎকার মিলেছে। তা পারমিতা, কী করে এমনটা ঘটছে একটু বলবে বুঝিয়ে? তোমার ফ্ল্যাটের নীচে বসে কারা যেন গল্প করছে, আর তোমার রান্নাঘরে ছোট চামচের সংখ্যা কমছে। কী করে এটা হতে পারে? মানে লোকগুলো চোর, না ম্যাজিশিয়ান?

—ঠিক বলেছেন। ম্যাজিশিয়ান। তাই আমিও কালো পলিথিন দিয়ে ব্যালকনিটা ঢেকে রাখি। বড় পলিথিন, আবার ছোট ছোট প্যাকেটও। যাতে ওরা ওদের কালো জাদু করতে না পারে!

বুঝলে আশ্চর্য, এতটা শুনবার পর আমার আর কোনও সন্দেহই ছিল না, এই মহিলা মোটেই বদ্ধ পাগল না, অল্প পাগল। মহিলার মধ্যে সমানে কাজ করে যাচ্ছে এক দ্বৈতসত্তা। একটি সত্তা নিজের একটা গোলমেলে ইমেজ তৈরি করতে বদ্ধপরিকর, আর অন্য সত্তাটি হল এক গোপন লজিক্যাল মাইন্ড। অবশ্য সে লজিক এমন লজিক, সেটা একমাত্র ওর নিজের কাছেই লজিক্যাল। মানে ওই গোপন সত্তাটি কিন্তু অযৌক্তিক নয়, কুযৌক্তিক। আমি ওই গোপন কুযুক্তিবাদী সত্তাকে মনের অবচেতন থেকে সচেতন স্তরে টেনে আনবার জন্য যুক্তি-তর্কের লড়াইটা খানিকক্ষণ চালিয়েই যাব ভাবলাম। সেটা করবার জন্যই বললাম—

আচ্ছা পারমিতা, তুমি কি নিজেকে ভারতীয় বলে মনে কর?

—তা তো বটেই! নইলে কি পাকিস্তানি ভাবব নাকি?

—আবার চ্যাটাং চ্যাটাং কথা! আমায় ভুল লাইনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা! ও কৌশল নিও না পারমিতা! তবে পাকিস্তান দেশটার নাম নিলে বলে মনে পড়ল, ভারতবর্ষকে পাকিস্তানের জাতীয় কবি ইকবাল তাঁর অতি বিখ্যাত 'সারে জাঁহাসে আচ্ছা' গানে হিন্দৌস্তাঁ বলে বর্ণনা করেছিলেন। অর্থাৎ সাধারণ ভাষায়— হিন্দুস্তান। এ গান অবশ্য ১৯০৪ সালে প্রকাশিত এবং এতে বর্ণিত 'হিন্দুস্তান'-এর সঙ্গে হিন্দুধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। হিন্দ কথাটা সিন্ধ-এর অপভ্রংশ— সিন্ধু সভ্যতা, মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পা মনে আছে তো? সিন্ধ প্রদেশ এখন পাকিস্তানে পড়ে! তবুও 'হিন্দুস্তান' শব্দটার মানে যদি 'ভারত' হয়, তাহলে 'ভারতীয়' শব্দটার সমার্থক শব্দ দাঁড়াচ্ছে— 'হিন্দুস্থানী'। এবার দ্যাখো, তুমি প্রথমেই বলেছিলে সব হিন্দুস্থানীরা চোর। কিন্তু সব হিন্দুস্থানীই চোর হলে আমরা সবাই তো পাইকারি রেটে চোর। চোরে চোরে তুমি আমার মাসতুতো বোন, আমি তোমার মাসতুতো দাদা। সেক্ষেত্রে তোমার ফ্ল্যাটের তলায় বসা দারোয়ান এবং তার বন্ধুদের, নাকি তোমার নিজেরই, রান্নাঘর থেকে চুরির সুযোগটা বেশি থাকছে, তুমিই বলো! এতো স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে যে তুমি নিজেই নিজের জিনিস চুরি করে অন্যের ঘাড়ে চাপাচ্ছ! তাহলেই বলো, এত বোকা কথা বলা কি তোমায় মানায়? যে 'তুমি' কী না আসলে অন্য স্তরের শিল্পী?

—আহা, আপনি আবার ভুল দিকে গেলেন! আমি তো বলছি হিন্দুস্থানী মানে হল যারা হিন্দিতে কথা বলে—

—উফ মা, তুমি তো আজকে কেলেঙ্কারির পর কেলেঙ্কারি করে চলেছ! আবার একটি আদ্যোপান্তো বোগাস উক্তি। বহুদিন ধরে যে ভুল তথ্যটি আমাদের মানে গোটা ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়ার ওপরচালাকি করে আসছে কোনও কোনও ধান্দাবাজ ওপরওয়ালা, সেই একই চর্বিতচর্বন— 'হিন্দি আমাদের রাষ্ট্রভাষা'। কিন্তু এই কথাটা তুমিও জানো, আমিও জানি— আজগুবি। সংবিধানের কোথাও এটা লেখা নেই। বরং আঞ্চলিক সমস্ত ভাষাকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আমাদের দেশে। 'হিন্দুস্থানী মানে যারা হিন্দি বলে'? এর মানে তো দাঁড়াচ্ছে হিন্দুস্থানী মাত্রই হিন্দি বলে! এমন কথা বলে কেন এই সব ফালতু নেতার পেছনে লুকোতে চাইছ মা? এরা বাঁচাবে তোমায়, নাকি আমি সেটা করতে দেব তাদের? এসব বললে তোমাকে তুলে আছাড় মারবে, এমন লোকের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। তাই আমি বলি কি পারমিতা, সোজাসুজি পয়েন্টে আসা যাক এবার। ওব্বাবা, দাঁড়াও দাঁড়াও! পয়েন্টে আসব কী করে! মাঝখানে তুমি তো আবার কিছু লোকের ধর্ম আর বংশ ধরে টানাটানি করেছ। টানাটানিটা করেই ফেলেছ যখন, সে ব্যাপারটা আগে মিটিয়ে নেওয়াই ভাল। বাইপাস করে চলে গেলে কেমন একটা যেন ফাঁক থেকে যাবে, কী বলো?

আশ্চর্যকে ব্রহ্ম ঠাকুর বললেন— শোনো হে, পারমিতার সঙ্গে আমার কথোপকথনের এটি হল একদম মধ্য পর্যায়। একটু ভাল করে দেখে নেওয়া দরকার ছিল মহিলার উপর এর প্রভাব কেমন পড়ছে। দেখি, আমার কড়া কড়া কথাগুলো শুনে সে আরও কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে মূল বিষয়ের আমি কতটা জানি, কতটাই বা না জেনে বলছি, সেটা সে এখনও ধরতে পারেনি বলেই মনে হল। আমি ওকে ওর নিজেরই দ্বিধার একদম শেষ সীমায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বললাম—

তুমি ধর্ম ধরে টানাটানি করে সাম্প্রদায়িক সাজতে চেয়েছ পারমিতা। ওই যে তখন বললে না, কোনও কোনও ধর্মের লোক সবাই নাকি চোর— এটা অবশ্যই একটা সাম্প্রদায়িক উক্তি। এই যুক্তিহীন এবং নির্লজ্জ সাধারণীকরণের পেছনে তোমার যে কোনও দৃঢ় বিশ্বাস আছে বা কনভিকশন আছে, তার প্রমাণ আমি পাইনি, বরং মন্তব্যটিকে একটি ক্যাজুয়াল রিমার্ক, একটি অপরিণামদর্শী বালখিল্যতা বলেই ধরে নিতে চেয়েছে আমার পর্যবেক্ষণ। তবু সাবধানের তো মার নেই! তাই ধর্ম নিয়ে আমার ধারণাটা একটু তোমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যাক। মন দিয়ে শোনো, আশা করি খারাপ লাগবে না। আমার মতে, সব ধর্মই কিছু না কিছু ভাল কথা বলে। সব ধর্মই কোনও না কোনওভাবে মানুষে মানুষে একতার কথা বলে। কিন্তু এই সব ধর্মের অনুসরণকারীরা অনেক সময় বড় ভুল করে ফেলে। তারা অদ্ভুত এক অহংকারে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ আর অন্যদের নিকৃষ্ট ভাবতে শুরু করে দেয়। এই অকারণ প্রতিযোগিতার দরকার কী বলো তো? এর চেয়ে তো ফুটবল বা ক্রিকেট খেললেই সময়টা ভাল কাটত! ঝগড়া হলেও তা হত খেলাধুলো নিয়েই।

পারমিতা চুপ করে এখনও আমার দিকে তাকিয়েছিল। তার মুখে নতুন একটা কাঠিন্যের ভাব খেলা করছিল। আমি সেদিকটা লক্ষ করেই বললাম— আচ্ছা নাম করে করে কয়েকটি ধর্মের মানুষজন নিয়ে একটু আলোচনা করি এসো। ভারতের দুই পূর্বতন শাসক গোষ্ঠীর সরকারি ধর্মের উল্লেখ তুমি তো ভুল করে করেই ফেলেছ, তাই সে'দুটি বাদ রাখা যাক। আচ্ছা, বৌদ্ধ এবং শিখদের ক্ষেত্রে কী বিধান তোমার? ইহুদি বা জৈন ধর্ম অবলম্বনকারীদের সম্পর্কে তোমার মতামত কী? অথবা ধরো যাঁরা ব্রাহ্ম কিংবা কনফুসিয়াসের ধর্ম যাঁরা মানেন? আচ্ছা সেসব থাক। আমি প্রথমেই জানতে চাই তুমি নিজে কোন ধর্মের লোক? মানে কোন পরিচয়টাকে নিজের পরিচয় বলে মনে কর?

—কেন? নাম শুনে বোঝা যাচ্ছে না?

—তুমি হিন্দু হলে বোঝা যাচ্ছে না পারমিতা! বৌদ্ধ হলে বোঝা যাচ্ছে। 'পারমিতা' শব্দটি বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে এতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে। 'প্রজ্ঞা পারমিতা'— শোনোনি? আর তাছাড়া একটা প্রশ্ন করি— নাম শুনে কি সত্যিই বোঝা যায় কারোর ধর্ম? ধর্ম তো মনে মনে মানবার বিষয়। কোনও একটি মতকে মেনে জীবন চালাবার। আজকের খিচুড়ি সময়ে সেরকম যেকোনও একটি মত মেনে নিয়ে শুধু সেটাতেই বশংবদ থেকে যাওয়া আদৌ কি কোনও বাস্তবতা? বিশেষ করে বিজ্ঞান যখন আমাদের মুক্তির সন্ধান দিচ্ছে? যুক্তিবোধ মগজে কড়া নাড়ছে?... আচ্ছা, আমার নাম যে ব্রহ্ম ঠাকুর, তোমার কী মনে হচ্ছে? আমি কোন ধর্মের লোক?

—আমার তো মনে হচ্ছে আপনি নাস্তিক!

—আমার নাম শুনে নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে না। কথা বলে মনে হচ্ছে। তবে তোমার আন্দাজ সঠিক। আমি কৈশোরে আমাদের পারিবারিক ধর্ম হিন্দুধর্ম ছেড়ে কিছুদিন আমার এক বন্ধুর দেখাদেখি বৌদ্ধ হয়ে যাই। বৌদ্ধধর্মের হীনযান ধর্মমতটি নাস্তিকতার খুব কাছাকাছিই বলতে পার। তারপর সেটিও ছেড়েছুড়ে আমার পুরোপুরি নাস্তিকতায় আসা। আমার মা আবার ছিলেন খ্রীষ্টান। এই দ্যাখো, আমার নাম শুনে তুমি তো এতসবের কিছুমাত্র আঁচ করতে পারলে না। অথচ একটু আগেই কথায় কথায় কী না বলে ফেলেছ— খ্রীষ্টানরা চোরের বংশ। হয়তো অত সিরিয়াসলি বলোনি, ভুল করেই বলেছ, কিন্তু ধরো আমি সিরিয়াসলি নিলাম, ভুল করেই তোমার কথাটাকে সত্যি ভাবলাম, তখন কী হবে?

আমি কায়দা করে এইবার বক্তব্যে একটু বিরতি দিলাম। পারমিতার ঔৎসুক্যকে খানিকটা বাড়তে দিয়ে, যেন দারুণ উপভোগ্য একটা কাণ্ড ঘটবে, এমন গদগদভাব দেখিয়ে বললাম— দ্যাখো এইবারে কী মজাটাই না হবে! আকাশে থুতু ছুড়লে কী হয় জানো তো? নিজেরই মুখে এসে পড়ে। তেমনই একটা কিছু হবে। ক্ষতিটা পারমিতা, তোমারই হবে। তোমার কথাকে ধ্রুবক হিসেবে ধরলে, আমি আমার খ্রীষ্টান মায়ের বংশধর হওয়ার জেরে চোর হব, আর আমার মারফত বৌদ্ধ আর নাস্তিকরাও চোর বনে যাবে, কারণ আমি তো ওই দুই দলেই ভিড়েছি! এবার তোমার নাম শুনে আমার স্পষ্ট মনে হচ্ছে তুমি হিন্দু নও, তুমি বৌদ্ধ! এটা এই জন্যই বলা যে নাম শুনে ধর্মবিচারের কথা তুমিই তুলেছ। সেক্ষেত্রে 'বৌদ্ধরাও চোর' মানে দাঁড়াল— তুমিই চোর। এ একেবারে গাণিতিক সমাধান, ধাপে ধাপে কষা অঙ্ক! তা হলে কী পেলে ফলাফল? এই অঙ্কের ফলিত সিদ্ধান্ত স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে তুমি নিজেই নিজের রান্নাঘরে ঢুকে চুরিগুলো করেছ!

পারমিতা আমার বলা কথাগুলোকে অগ্রাহ্য করবার চেষ্টায়, আমায় প্রতিআক্রমণ করাটাই ভাল হবে বলে ভাবল। সে বলল— আমি কাল জানলার খড়খড়ির পেছনদিক থেকে দেখেছি। আপনি উলটোদিকের ব্যালকনিতে গেছিলেন। দাঁড়িয়েছিলেন ওই লোকটার সঙ্গে, যে একদিন রাতের বেলা বন্দুক বাগিয়ে গুলি করে আমার টাঙানো বড় কালো পলিথিনটায় গোলগোল ফুটো করে দিয়েছে...

বলতে বলতেই দেখলাম পারমিতা হাতটা ঢুকিয়ে দিয়েছে টোট ব্যাগের মধ্যে। সেখান থেকে কী বের করে আনতে চলেছে সে? গুলতি? সাঁড়াশি? হাতুড়ি? বন্দুক? স্ক্রু ড্রাইভার?

যাই হোক, আমি যেকোনও পরিস্থিতির জন্যেই তৈরি ছিলাম। একটা প্ল্যান ফলো করে আমি কথা বলেই চললাম। বললাম— আহা রে। কী অন্যায়! বড় কালো পলিথিনে গোল ফুটো আর এয়ারগানের সম্পর্কটা আমি বুঝেছিলাম পারমিতা, ওই লোকটিকে আমি মানা করে দেব তোমাকে ওইভাবে ভয় দেখাতে! কিন্তু তুমি কি আদৌ বুঝছ বা অনুভব করছ, তোমার এই বিদ্বেষমূলক আচরণ আর কথাবার্তার পরিণাম? তুমি অবাঙালিকে চোর বলে দাগাবার অভিমত রাখছ, মানে ঘুরিয়ে বলতে চাইছ— বাঙালি চোর নয়। ওদিকে আবার প্রকাশ করছ খ্রীষ্টান আর মুসলিমদের প্রতি তীব্র অসূয়া। পারমিতা, তার মানেটা তো এই দাঁড়াচ্ছে, তোমার কল্পনার বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে খ্রীষ্টানরা পড়ে না, মুসলিমরা পড়ে না, বোধ করি হিন্দু ছাড়া আর কেউই তোমার মতে বাঙালি নয়। এরপরেও কিন্তু বিহার বা ইউপির হিন্দুদেরও তুমি আপন করে নাওনি, হিন্দুস্থানী বা খোট্টা বলে তাদের বিদ্রূপ করে চলেছ। পারমিতা, তুমি মুক্তিযুদ্ধ ভুলে যাচ্ছ, ভাষা আন্দোলন বা ২১শে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস ভুলে যাচ্ছ। এর ফলে কী হবে জান? তোমার বিচার হবে আমার আদালতে নয়, আপামর বাঙালির আদালতে। কিন্তু সেটা হবে গুরু পাপে লঘু দণ্ড। তোমার এই যে সমস্ত অবোধ ভুল মন্তব্য—আমি হলে এর একটাই শাস্তি দিতাম। আরেকজন জাতীয় কবি, হ্যাঁ ইনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি, বাঙালির প্রাণের কবি, আমার প্রিয় কবি কাজী নছরুল ইসলামের খানদুয়েক বই তোমার নধর মাথাটিতে ছুড়ে মারতাম। এর বেশি শাস্তি এসব রামছাগল সুলভ মন্তব্যের জন্য দেওয়া যায় না, দেওয়া ঠিকও না। নছরুল, যাঁর নাম শুনলেই তুমি হয়তো অন্য একটি ধর্মের গন্ধ পাও, তিনি তো সেই কবেই লিখেছিলেন—

জাতের নামে বজ্জাতি সব

জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া

ছুঁলেই তোর জাত যাবে?

জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া

মনে হল, আমার আবৃত্তি করা চমৎকার এই কবিতাটা পারমিতা শুনল কিন্তু শুনল না। সে বরং ঝাঁঝিয়ে উঠে প্রশ্ন করল— আপনি আমায় ঘুরিয়ে 'রামছাগল' বললেন?

আমি বললাম— আমি তোমায় কী বললাম, সেটা বড় কথা নয়। ওসব গায়ে মেখো না। কী বলতে কী বলেছি! তবে—দাঁড়াও! তত্ত্বের বিচারে ভুল তো বলিনি। নারীবাদের মানে হল সাম্য। নারীপুরুষে সাম্য। তাই 'রামছাগল' বলেছি। তুমি চাইলে 'সীতাছাগলিনী' বা 'মহিলা ছাগল'ও বলতে পারি। তবে আমার মন্তব্য নিয়ে কথা হচ্ছে না। কথাটা হচ্ছে, তোমার করা মন্তব্য বিষয়ে, যেখানে তুমি বলেছ তোমার দারোয়ানের বস্তিবাসী অন্য ধর্মের বন্ধুরা চোর।

লক্ষ্যণীয়, তোমার এই চরম বৈষম্যমূলক মন্তব্যের প্রকাশ্য আস্ফালনের পরেও কিন্তু বন্ধুরা বন্ধুদের ছেড়ে যায়নি কোথাও। ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ থেকে গেছে। যদিও তোমার এই আচরণ সারা বিশ্বজুড়ে জন্ম নেওয়া কিছু নতুন নাৎসিবাদীর মনোভাবের সঙ্গেই তুলনীয়, তবুও তুমি একক এবং অনন্য থেকে যাচ্ছ, কোন জায়গাটায় জানো? নিশ্চয়ই জানো। এই ধরনের হঠকারী মন্তব্য করে তোমার আসল মনোবৃত্তি আর অপরাধের থেকে তুমি সবার নজর অন্যদিকে সরিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু ব্রহ্ম ঠাকুরকে ফাঁকি দিতে পারবে কি? সেটা তো সম্ভব নয় মা। আমি যে জেনে ফেলেছি তুমি একজন প্রকৃত গুণী, একজন শৈল্পিক খুনি! আমি যে জেনে ফেলেছি তুমি একজন আত্মগোপন করে থাকা সিরিয়াল কিলার!

আমার এ কথাটা শুনে পারমিতা কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। রাগে তার চোখমুখ লাল হয়ে গেছিল। হিংস্র গলায় সে চিৎকার করে উঠল— শেষবারের মতো বলছি। তোকে এবার চুপ করতেই হবে। চুপ কর শয়তান বুড়ো!— লক্ষ করে দেখলাম টোট ব্যাগ থেকে এর মধ্যেই সে বের করে এনেছে বেশ বড় সাইজের একটা কালো পলিব্যাগ।

আমিও উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি তখন। পারমিতা আমায় 'তুই' বলে সুবিধেই করে দিয়েছে, আমারও এখন 'তুই'-এই যাওয়ার ছিল। বললাম— তোকে আমি সম্পূর্ণ উন্মাদ ভেবেছিলাম। তুই তা নোস। তুই আসলে এক ভয়ংকর সেয়ানা পাগল। সাম্প্রদায়িক বা প্রাদেশিক তোকে বলতে পারব না, কারণ সম্প্রদায় বেছেবেছে তুই খুন করিসনি, এমনকী প্রদেশ বা ভাষা বেছেও না। তোর মধ্যে আসলে কাজ করছে অদ্ভুত এক শ্রেণীঘৃণা। এটা আসলে অর্থনীতি অনুপ্রাণিত সন্ত্রাসবাদ। তুই দারিদ্রকে ঘৃণা করতে পারতিস, দারিদ্র দূর করবার চেষ্টা করতে পারতিস, তা না করে দরিদ্র মানুষকে, পিছিয়ে পড়া মানুষকে ঘেন্না করেছিস। হতে চেয়েছিস তাদের ক্রুদ্ধ মুক্তিদূত, এগজিকিউশনার। তুই নিঝুম রাতে দরিদ্র শ্রমিক মজুর বা বাস্তুহারা ভিখিরির গলায় ওই কালো পলিথিন ব্যাগ পরিয়ে দম বন্ধ করে মারবার তালে বেরোস। গত চারমাসে মাত্র তিনবার সেভাবে মারতে পেরেছিস, যখন তোর শিকার খুঁজে পেয়েছিস কোনও অন্ধকার ক্যামেরাহীন জায়গায়। তাই খুনের সংখ্যা এত কম। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় টহলদারী ক্যামেরার আধিক্য খুনের সংখ্যা কমিয়েছে। নইলে তুই এভাবেই আরও গোটা চারেক খুন করতিস, তোর রাত্রি অভিযানের তালিকা সে কথাই বলছে।

পারমিতার রাগে চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছিল। আমি এবারে তাকে ঠান্ডা করবার উদ্যোগ নিলাম। বললাম— না না, তোকে আর 'তুই' করে বলব না। এবার অতিরিক্ত সম্মান দিয়ে 'আপনি'ই বলব। জেনেই যখন ফেলেছি, আপনি প্রকৃত গুণী, ইয়ে, মানে খুনি! বসুন বসুন পলিথিনখুনিদেবী, না না কী যেন নাম, পারমিতাদেবী। শান্ত হোন। যুক্তিহীনভাবে, না না, ঠিক যুক্তিহীন না, কুযুক্তির বশে মানুষের উপর এত রাগ পুষে রেখেছেন, খুনের পর খুন করে চলেছেন, ব্যাক স্টোরি তো আপনার একটা থাকবেই। সেটা কি আপনার নিজেরই নিপীড়িত শোষিত পরিবার থেকে উঠে আসবার গল্প? আপনার নিজেরই বড়-আপন বন্ধুবান্ধবদের উপর হওয়া অবিচারের কাহিনি? চলুন, গল্পগুলো শোনা যাক এবার। তারপর না হয় আপনার শেষ শাস্তির বিধান দিয়ে কলমের নিব ভেঙে দেব আমি। তা বলুন কী খাবেন? চা না কফি? কফি হলেই অবশ্য বানাতে সুবিধে হবে। থাক, আপনি তো হত্যাকারী, সিরিয়াল কিলার। আপনাকে অত অপশন দেবই বা কেন? শান্ত হয়ে বসুন। আমি একটু কফি বানাই। জঘন্য স্বাদের তেতো কফি ধীরেধীরে পান করুন, জীবনের গরল উপভোগ করুন, দেখবেন শরীরে বল পাবেন।

এই বলে উলটোদিকে ফিরে আমি কফি বানাতে টেবলটার দিকে এগোলাম। পেছনের পদশব্দের দিকে কান খাড়া ছিল। অতি দ্রুতবেগে আমার ঠিক পেছনে এসে তার হাতের কালো পলিথিন দিয়ে আমার মাথাটা মুড়ে দিয়ে হ্যাঁচকা টান দিল পারমিতাদেবী। বুঝলে আশ্চর্য, এটা এই কাহিনির একটা ক্লাইম্যাক্সের মুহূর্ত। অনেককিছু একসঙ্গে ঘটবে এবার। মাথার উপর কালো পলিথিন প্যাকেটের জোরালো ফাঁস। বলশালী এক পুরুষকণ্ঠের আক্রোশচিৎকার। বিস্ফোরণের মতো এক গুলির শব্দ। উঠোন পেরিয়ে ধুপধাপ করে তিনজন ব্যক্তির পিস্তল হাতে এঘরে ঢুকে আসা। একজন পুরুষ, দু'জন মহিলা। আমি ততক্ষণে ফাঁসবদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে গেছি। মাটিতে পড়া অবস্থায় গলায় ঠিক ফাঁসের জায়গায় চারটে আঙুল ঢুকিয়ে শক্ত করে ধরে ছিলাম পলিথিন ব্যাগটা। হ্যাঁচকা মেরে ওটা খুলে এক ঠ্যালায় পারমিতাকে মহিলা পুলিশদের দিকে ছিটকে দিয়ে উঠে বসলাম। তারপর বললাম— আসুন ডিকেকটিভ পাণ্ডে। আশা করি আপনার বসিয়ে যাওয়া গোপন ক্যামেরায় আক্রমণের প্রয়োজনীয় ছবি আপনি পেয়ে গেছেন। এরপর প্রমাণ করতে আর অসুবিধা হবে না, যে সিরিয়াল কিলারকে আপনারা হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন, এই পলিথিন মাতা পারমিতাই হল সে। ওর আগুপিছু যাত্রার অনেক ছবি আপনারা নিশ্চয়ই আগে পেয়েছেন। তবে সেসব ছিল সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স। কারণ ওকে খুঁজে পেয়ে ছবি তুলতে শুরু করবার পর ও আর খুন করেনি। যাই হোক, হাতেনাতে ওর পদ্ধতির প্রমাণ এবার পেলেন। এটা নিশ্চয়ই আগের দুটো খুনের সঙ্গে হুবহু মিলবে। এ প্রমাণ জোগাড় করতে টোপ হিসেবে আমার ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা ছিল। এ ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনার আমি প্রশংসাই করছি ডিটেকটিভ পাণ্ডে!

খুব বেশি অবাক হলে আশ্চর্যের মুখ মাঝেমাঝে ছেলেমানুষের মতো হাঁ হয়ে যায়। এবং সে নির্বোধের মতো অদ্ভুত কিছু কাজও করে বসে। এখন যেমন হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, প্লেটের এক কোণায় পড়ে থাকা, বহু আগে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া একটা বেগুনি সে কামড়াতে গেল। ব্রহ্ম ঠাকুর এক ধাক্কায় তার হাত থেকে বেগুনিটা ফেলে দিয়ে বললেন— না আশ্চর্য। ওটা এতক্ষণে বিষ হয়ে গেছে। ঠান্ডা বেগুনি একদম খাবে না। শোনোনি, শাস্ত্রে বলেছে 'ঠান্ডানাম বেগুনিঞ্চ পরিত্যজে, য ভক্ষতি স ভোগন্তি'? আশা করি মানেটা বুঝতে পারছ। এটা চলিত সংস্কৃত-র একটা উদাহরণ।

আশ্চর্য এই উদ্ভট রসিকতাটায় বিশেষ আমল দিল না। সে শুধু বলল— আপনি কী করে বুঝলেন? আপনি কি আগে থেকেই...

—অই! ওই একই প্রশ্ন আমায় সেদিন করেছিল স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের আন্ডারকাভার গোয়েন্দা-পুলিশ নিলু পাণ্ডে। আমি তাকে বললাম, না বুঝবার তো কিছুই নেই। সে বলছে দামি চাকরি, অথচ করে আসছে সারাদিন ফিল্ড ওয়র্ক! দামি চাকরি বলতে আমরা যা বুঝি সেই এসি ঘরে বসা, এসি গাড়ি চড়া লোক যে সে নয়, সে তো ওর শরীরে ঘামাচির প্রকোপ দেখেই বুঝেছিলাম। সারাদিন রোদে না দৌড়োদৌড়ি করলে অমন বীভৎস ঘামাচিও হয় না, আর রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রঙও হয় না। রাতেও ও যে সবদিন বাড়িতে থাকে না, সেটাও প্রথম দিনই আমায় বলেছিল। ওর বাড়িতে গিয়েও একটা ঘর বন্ধ দেখে মনে হয়েছিল, সেই ঘরটা এক ধরনের গোপন কনট্রোল রুমের মতো কিছু একটা হতে পারে। আমি খালি বুঝতে পারিনি সে আমায় এসে সব কথা খুলে বলল না কেন? তারপর ওর লাগিয়ে যাওয়া গোপন ভিডিও ক্যামেরাটা খুঁজতে খুঁজতে যখন পেছনের আলমারির মাথাটায় চোখ পড়ল, সব রহস্য সমাধান হয়ে গেল।

আশ্চর্য জিজ্ঞেস করল— কীভাবে সমাধান হল? কী ছিল আলমারির ওপরে?

—ওখানে ছিল গাদাগুচ্ছের বাংলা খবরের কাগজ। কিছু বান্ডিল করা, কিছু এমনিই রাখা, গত পাঁচ মাসের নিউছপেপার।

—খবরের কাগজ ওখানে গেল কেন?

—খবরের কাগজের উপর রাগ করে। এক সমালোচকের মানে রিভিউয়ারের উপর প্রচণ্ড রাগ আর অভিমানে খবরের কাগজ না পড়েই তুলে দিতাম তখন আলমারির উপর। আসলে বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন করা ছিল। তাই কাগজের আসাটা বন্ধ করা যায়নি। বিক্রি না করে তুলে রেখেছিলাম, কারণ রাগ মিটলে ওগুলো পড়বারও প্ল্যান ছিল। না পড়ে বেচে দিতেও গায়ে লাগছিল।

—তা রিভিউটা কীসের ছিল জানতে পারি?

—জানতে পারো। আমার দীর্ঘ প্রবাস-জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন দেশের সামাজিক রাজনৈতিক এমনকী সামরিক নীতিগুলোরও তুলনা করে একটা বই লিখেছিলাম 'গণশত্রু' ছদ্মনামে। বাংলায় ওরকম বিষয়ের ওপর বই আর পাবে না। কারোর তো অতটা অভিজ্ঞতাই নেই! লিখবে কী করে? তো একদিন দেখি কাগজে বড় করে তার একটা রিভিউ বেরিয়েছে। শিরোনাম— 'রাশিরাশি মিথ্যে কথায় ডুবে গেল দেশের রাজনীতি, বিদেশের কূটনীতি'। আশ্চর্য তুমি ভাবতে পারছ? যিনি এই সমালোচনা লিখেছিলেন, তাঁর বক্তব্য, তিনিও বিদেশ গেছেন। অনেক পূর্বলিখিত বই পড়েছেন। আমার মতো অভিজ্ঞতা নাকি তাঁর হয়নি! হতেই পারে হয়নি। তাঁকে তো পাঠিয়েছে নিশ্চয়ই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক মালিকপক্ষ। কী করেই বা থাকবে তাঁর আমার মতো ৩৬০ডিগ্রি লাগামহীন অভিজ্ঞতা অর্জনের স্বাধীনতা! অথচ বেকুবটা বলে কি না...! তো আমিও ঠিক করে নিয়েছিলাম, জবাব দেব। আবার একটা লেখা তৈরি করছিলাম, এই জাতীয় পেটি বুর্জোয়া সাংবাদিকের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দেব বলে। ঠিক করেছিলাম, ওই কাগজেই বড় করে লেখাটা প্রকাশ করতে হবে। যতদিন না লেখা শেষ হবে, দৈনিক কাগজের মুখদর্শন করব না আমি!

আশ্চর্য হতাশ হয়ে বলল— এদিকে আপনিই তখন আমায় সমালোচকদের 'কটাক্ষ' না করবার জ্ঞান দিচ্ছিলেন!

দুষ্টু হাসি হেসে ব্রহ্ম বললেন— আহা! ইচ্ছে করেই তো তোমায় তাতাচ্ছিলাম একটু!

—তা হলে এবার প্লিছ বলবেন, এই জমানো না পড়া খবরের কাগজের সঙ্গে সেদিনকার রহস্যভেদের যোগাযোগটা কোথায়?

—বুঝলে না? আরেহ এই নিলু পাঁড়ে তো নাম ভাঁড়িয়ে আমার কাছে আসেনি। সে তো তার ফ্ল্যাটের নেমপ্লেট দেখেই বুঝে গেছিলাম। তারপর তার দোতলার ব্যালকনি থেকে গোয়েন্দা-পুলিশ মার্কা উঁকিঝুঁকি দেখেই সন্দেহ হল। তাকে পাঠিয়েছিল যে, সেই শ্রীমান 'তখন' ব্যানার্জিকে ফোন না করে আমি তার দুই ভাইকে ফোন করলাম। ওদের দাদা 'এখন' ব্যানার্জি বলল সে নিলুকে চেনে না। ছোট ভাই 'যখন' ব্যানার্জি বলল, 'নিলুকে চেনেন না? স্বর্ণকার এবং স্বর্ণব্যবসায়ী প্রলয় পাণ্ডের ছেলে নিলয় পাণ্ডে। সে কিন্তু বাবার ব্যবসায় যোগ না দিয়ে চাকরি করছে লালবাজারে আন্ডারকাভার গোয়েন্দা অফিসার হিসেবে। বুঝলেন না, যার যে দিকে মন! —এই নিয়ে বাপের সঙ্গে মন কষাকষি। থাকেও আলাদা, নিজের মতো করে। তবে বাবার সঙ্গে একেবারেই যে সম্পর্ক নেই, তাও নয়।' এটা শুনবার পর পুরো ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেল। এবং আলমারির মাথা থেকে কাগজগুলো আমায় নেড়েচেড়ে দেখতেই হল। জানতাম তাতে প্রয়োজনীয় সূত্র পাবই! নিশ্চয়ই কোনও সাইকোপ্যাথের আবির্ভাব হয়েছে, নইলে গোয়েন্দা-পুলিশ আমার কাছে আসবে কেন? দেখলাম, এই তো— গত চারমাসে তিন-তিনবার কলকাতার রাস্তায় মজুর শ্রেণীর গরিব লোককে মুখে কালো পলিথিন পরিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে খুন করা হয়েছে। এটা পড়েই বুঝলাম নিলু কেন এসেছিল আমার কাছে। সে যে কাহিনি বলেছিল, তা বানানো নয়, সত্যি। সত্যিই সে অতি সম্প্রতি নতুন ফ্ল্যাট কিনেছে। সত্যিই সে বারান্দা থেকে ওই ব্যালকনিটা দেখেছে, যেটা কী না একটা লুকিয়ে থাকা ব্যালকনি, অন্য কোথাও থেকে ওই ব্যালকনিটা ঠিক করে দেখাই যায় না। ফলে খুনিও সেখানে তার অকাল্ট-প্র্যাকটিস এতদিন করে এসেছে অবাধে। নিলু কিন্তু অদ্ভুতভাবে সাজানো ব্যালকনিটা দেখেই রিলেট করতে পেরেছে খুনগুলোর সাইকো-নেচারের সঙ্গে। ওটাকে তো প্রায় একটা 'আনহোলি শ্রাইন'ই বলা চলে! বেশ কিছুদিন তক্কেতক্কে থেকেও সে যখন মহিলার দেখা পেল না, তখন বাধ্য হয়েই এয়ারগান দিয়ে পলিথিন ফুটো করল, যাতে আওয়াজ পেয়ে পলিথিন মাতা বেরিয়ে আসে! নিলু জানত, তার গল্পে 'পলিথিন'-এর উল্লেখ শুনলেই আমি উৎকর্ণ হব, রিলেট করতে পারব, এবং দু'জন মিলেই তদন্ত করব। সে ক্যামেরাটা বসিয়েছিল আমার ঘরে, যখন আমি পাশের ঘর থেকে পাউডার আনতে যাই। কিন্তু সে আমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে পুরো অ্যাটাকটা লাইভ দেখবার এবং ক্যামেরাবন্দি করবার জন্যই ওটা করেছিল। সে ওটা আমার কাছে গোপন রাখত না, বলেই দিত। কিন্তু যখন দেখল যে সাইকো কিলিংগুলোর কথা আমি ঘুণাক্ষরেও জানি না— সেই সময়টায় বই লিখবার চক্করে বহুদিন গ্যাপ পড়ে যেত টিভির নিউছ দেখাতেও আমার— তখন হয়তো ভাবল, ব্যাপারটা চেপে যাওয়াই ভাল। সে ভাবল, এসব ব্যাপারে তাহলে আমার আগ্রহ নেই। ফলে বলা যায় না, আমি যদি টোপ হতে রাজি না হই?

সম্ভবত সে আমার সঙ্গে সেশনটার পর 'তখন' ব্যানার্জিকে ফোন করে বলে দেয় তার পরিচয় আমায় না দিতে। এটা আন্দাজ করেই আমি 'তখন'কে নয়, 'এখন' আর 'যখন'কে ফোন করেছিলাম। আমি যে 'তখন'-এর ছোটভাই 'যখন'কেও চিনি, তা নিলু জানত না।

সেদিন তাকে বললাম— আপনি তাড়াহুড়োয় যেখানে ক্যামেরাটা বসিয়ে গেছিলেন, সেখান থেকে ভাল ছবি পেতেন না। তাই আমি ওটার পজিশন একটু পরিবর্তন করেছি। ওই যে, ওই চেয়ারের হাতাটায় দেখুন...

নিলু বলল— কিন্তু আপনি জানলেন কী করে যে সশস্ত্র পুলিশ রেডি আছে? আপনার উপর হামলা হলেই আমরা আপনার দরজার লক গুলি করে ভেঙে ভেতরে ঢুকে আসব— এটা তো আপনার জানবার কথা নয়। অথচ দেখলাম আপনি রেডিই ছিলেন...

আমি বললাম— ওই যে, সদর দরজায় গেলেই দেখবেন, ঢোকার মুখটায় পুরো জায়গাটা জুড়ে কিঞ্চিৎ বালি ছড়িয়ে রেখেছিলাম। পলিথিন মাতা যখন বাড়িতে ঢুকল, আমি মুখ বাড়িয়ে দেখে নিলাম কী কী জুতোর ছাপ পড়েছে সেখানে। দেখেই বুঝলাম পুলিশি টহলদারি নিয়মিত চলছে আমার বাড়ির সামনে দিয়ে। আর যাই হোক না হোক, পুলিশের জুতোর ছাপ বা তাদের গতিবিধি চিনতে আমার ভুল হবে না। এতদিন তো বিদেশে এফবিআই-এর সঙ্গেই কাজ করলাম...

তারপর চুপ করে থেকে বললাম— কিন্তু তারপরেও আপনারা যদি না আসতেন, অসুবিধে হত না খুব একটা। ফাঁসটা আমার গলায় দেওয়া হবে জেনেই আমি তো চারটে আঙুল আগেই রেখে দিয়েছিলাম ওখানে। ফাঁসটা তো আমার গলায় ফেলতে পারেনি পারমিতাদেবী, আঙুলে ফেলেছিল। আঙুল উলটোদিকে চাপ দিলেই ফাঁস আলগা হয়ে যেত। আর আমার পড়ে যাওয়াটা নিছক অভিনয়, আশা করি বুঝেছেন, যাতে ক্যামেরায় এই হামলার অভিঘাতটা ভাল করে বোঝা যায়।

*****

পারমিতাকে নিয়ে যেতে মহিলা পুলিশকর্মীদের ভালই বেগ পেতে হয়েছিল। এক বিরল ধরনের স্কিৎজে ফ্রেনিয়ার প্রকোপে হত্যায় উদ্যত হলেই কমনীয়তা লোপ পেয়ে দানবের মতো শক্তি এসে যেত ওর শরীরে। কণ্ঠস্বরও পালটে যেত।

—ও আচ্ছা!— আশ্চর্য বলল— তাই ক্লাইম্যাক্সের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন: শক্তিশালী এক পুরুষের রাগী চিৎকার! তাহলে মহিলা হিংস্রতার মুহূর্তে পুরুষ হয়ে যেতেন!

—হ্যাঁ। অন্তত শক্তি এবং কণ্ঠস্বরের দিক থেকে একজন পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠত সে, এটা বলাই যায়।

—তাহলে তাই জন্যই মারামারিতে তাঁর সঙ্গে পারলেন না। পড়ে গেলেন। আমার তো মনে হচ্ছে ওই নিলু পাণ্ডে ঠিক সময়ে এন্ট্রি নিলেন বলেই আপনি বাঁচলেন। নইলে ওখানেই অক্কা পেতেন! অথচ একটু আগেই গর্ব করে বলছিলেন, আপনার মারামারির একটা ভূমিকা নাকি ছিল এই তদন্তে।

—উফ আশ্চর্য! বললাম না পুলিশ ঢোকবার পরেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম পারমিতাকে! অক্কাই যদি পেতাম, তাহলে ছক্কা মারার ঢং-এ ওকে ছুড়ে ফেলে দিলাম কী করে! আর তাছাড়া একজন মহিলার উপর সম্ভ্রমজনিত কারণে হাত তুলতে চাইনি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝলাম তার মধ্যে দানবভাব প্রকট হয়েছে। তখন প্রত্যাঘাত করতে বাধল না।

তারপর যেন গোপন পরামর্শ করবার ভঙ্গিতে দেওয়ালের একদিকে সরে গেলেন ব্রহ্ম। হাতছানি দিয়ে আশ্চর্যকে সেদিকে ডাকলেন। তারপর বললেন—

এই যে, শোনো। এদিকে এসো। মারামারি কাকে বলে আদৌ জানো কি তুমি? দেওয়ালে টাঙানো এই ছবিটার দিকে তাকাও। যিনি মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে তুলে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন, এঁর নাম রকি বালবোয়া। একজন প্রসিদ্ধ বক্সার। ছ' সাতখানা ছবি তৈরি হয়েছে এঁকে নিয়ে। ছবিগুলো ডেডিকেটেডলি দেখবে। তাহলেই শিখবে— মারামারি করবার আসল ক্ষমতাটা অন্যকে মারায় আদৌ থাকে না। আসল ক্ষমতাটা থাকে মার সহ্য করায়। কতক্ষণ তুমি মার সহ্য করে রিং-এ টিকে থাকতে পারলে। অন্য লোক তোমায় মেরেই গেল, তুমি কিছু বললে না। চুপচাপ সহ্য করলে। সহ্য করলে সহ্য করলে সহ্য করলে। সহ্য করলে সহ্য করলে সহ্য করলে। সহ্য করলে সহ্য করলে সহ্য করলে। সহ্য করলে সহ্য করলে সহ্য করলে। সহ্য করলে সহ্য করলে সহ্য করলে—

—আহ ব্রহ্মদা কী হচ্ছে কী! গল্প শেষ করুন।

—আশ্চর্য, দেখছি একদম ধৈর্য নেই তোমার! জীবনে অনেক সহ্য করতে হয় বন্ধু। চুপ করে মার খাওয়া সহ্য করে যাবে। সহ্য করতে করতে করতে করতে শেষবেলায় সাপের ছোবলের মতো চমকে দিয়ে, ঝড়াং করে একটা নক আউট পাঞ্চ ঝাড়বে। ব্যস— গল্প ওখানেই শেষ!

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%