ব্রহ্ম ঠাকুর প্লাস টু

রূপম ইসলাম

—আচ্ছা আশ্চর্য, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বললেই তোমার কী মনে পড়ে?

—বারমুডা ট্রায়াঙ্গল? সে তো আস্ত এক কেলেঙ্কারি! সমুদ্রের মধ্যে ত্রিকোণাকৃতি একটা এলাকা, যেখানে অনেকগুলো জাহাজ ডুবে গেছিল, এরোপ্লেনও...

—জায়গাটাকে মিথ আর মিথ্যের মিশেল বললে অনেকেই খুশি হবেন— গবেষকরা, বৈজ্ঞানিকরা। ভৌগোলিক স্থাননির্ণয় যদি করি— উত্তর অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে বিন্যস্ত একটা ত্রিভুজাকৃতি এলাকাই হল এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। এই ত্রিভুজের একদিকে বারমুডা দ্বীপ, অন্যদিকে ফ্লোরিডা, অন্য কোণে পুয়ের্তো রিকো। বেশ কিছু বিমান ভেঙে পড়েছিল, অনেক জাহাজও ডুবে গেছিল ওখানে। কেউ কেউ বলেছিল অদ্ভুত রঙ ওখানকার জলের। একজন নৌ-আধিকারিক বলেছিলেন, বিমানগুলো মহাশূন্যের এক ছিদ্র খুঁজে পেয়েছিল আর সেই পথে পাড়ি দিয়েছিল মঙ্গলগ্রহে। কেউ কেউ আবার বলেছিল হারিয়ে যাওয়া শহর আটলান্টিসের রাস্তা লুকিয়েছিল ওখানে। এছাড়াও ছিল সময়াভিযানের তত্ত্ব! —এসবই নথিতে আছে। সব মিলিয়ে এই রহস্যের তরজা বেশ জমে উঠেছিল এক সময়ে।

—কিন্তু সেসব রহস্য তো নেই আর ব্রহ্মদা! সবই তো সমাধান হয়ে গিয়েছে। কোথায় যেন পড়েছিলাম...

—অ্যাই তো! সঠিক কথা বলেছ। 'কোনও রহস্যই নেই'—এ কথাটাকে সঠিক বলছি না। কিন্তু কোথায় যেন পড়েছ— তা তোমার মনে নেই। এই দাবি ইনসিগনিফিকেন্ট বলেই মনে নেই। আচ্ছা, 'রহস্য নেই'— এই কথাটা কে বলল বলো তো? এবং কেনই বা বলল? জেনে বলল? না মাতব্বরি করে? সে কথা যদি সঠিকই হবে, তাহলে আজও সব ক'টা জাহাজ আর সব ক'টা এরোপ্লেন জায়গাটা এড়িয়ে চলে কেন? কীসের ভয়ে? তার মানে কিছু তো আছে, রহস্য না হলেও! তবে রহস্য নেই এ কথাটাও এক অর্থে ঠিক। এক তরুণ বিজ্ঞানী, তরুণ হলেও তাঁর গুরুত্ব তখনই সুপ্রতিষ্ঠিত, ১৯৭৬ সালে জার্মানির বার্লিন শহরে একটা গোপন বৈঠকে আমায় বলেছিলেন— পৃথিবীতে আসলেই কোনও রহস্য নেই। গ্রহটাকে কিছু ক্ষমতাধরদের কুক্ষিগত করে রাখবার জন্যই আসলে রহস্যগুলো জিইয়ে রাখতে হয়। কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ। প্রায় দার্শনিক একটা কথা। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল রহস্যের সমাধান অত চট করে কিন্তু হবে না। কোনও রহস্য জুটলে একদল সর্ব'জ্ঞান'সম্পন্ন ব্যক্তি ঠিকই জুটে যায়, যাদের কাজই হল সব কিছু নাকচ করে দেওয়া। কিন্তু তোমায় চুপি চুপি বলছি আশ্চর্য, সে গবেষণা এখনও চলছে। শুধু বারমুডা কেন! আরও অনেক কিছু নিয়েই গবেষণা চলছে। মজার কথা হচ্ছে এই গবেষণা, সত্যিকারের গবেষণা, ঠিক পথের সন্ধান পেয়ে গবেষণা এবং শেষ সত্যটুকু খুঁড়ে বের করবার জন্য গবেষণা পৃথিবীতে মাত্র কয়েকজন লোক করছে। বলা ভাল, দু'তিনজন লোকের নেতৃত্বে চলছে এই কাণ্ডটা। আমি, ঘটনাক্রমে, নেহাতই দায়ে পড়ে এই দু'তিনজন ব্যক্তিকে জানি। খুব ভাল করেই জানি। আর এটা একটা বিশাল কারণ— যে কারণের জন্যই আপাতত আমার পক্ষে তোমার প্রস্তাবে রাজি হওয়া সম্ভব নয়। কিছু মনে ক'রো না।

এটা বলে একটা রিভলভিং চেয়ারে বসা অবস্থায় উলটো দিকে ঘুরে গেলেন ড: ব্রহ্ম ঠাকুর। রিভলভিং চেয়ারটা রাখা আছে তাঁর কনসালটেশন রুমের পশ্চিম দিকের দেওয়ালঘেঁষা টেবিলের সামনে। আরও দুটো চেয়ার রয়েছে এ ঘরে, একটা শোয়ানো দীর্ঘ প্রায় বিছানার মতো এলানো, ঘরটার বিপরীত কোণে যাতে পা তুলে দিয়ে লম্বা হয়ে আছে আশ্চর্য। অন্যটা ব্রহ্ম ঠাকুরের বিখ্যাত রকিং চেয়ার— আপাতত সেটা খালি। টেবিলটায় অনেকগুলো কফিমাগ রয়েছে বিভিন্ন রঙের, যেগুলো দূর থেকে ঠাহর করা যায় অন্ধকারেও। একান্তই বেমানান কিছু বাসনপত্র আর গেলাসও আছে। এছাড়া ছোটখাটো কফিমেকার একটা রয়েছে, রয়েছে বেশ কয়েকটা বোতলে কিছু রাসায়নিক দ্রবণও। ঘরের ওই অন্ধকার এলাকায় পিছন ফিরে টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ে কী যেন একটা দেখে নিয়ে আবার এ দিকে ঘুরলেন ব্রহ্ম। কিছু একটা ঘটে গেছে, তার জেরেই হয়তো তিনি বলে ফেলেছেন আপাত-অপ্রাসঙ্গিক কিছু কথা। ব্রহ্ম ঠাকুরের চোখেমুখে একটা আলগা উত্তেজনার ছাপ বেশ লক্ষ করা যায়। স্মৃতিরোমন্থনের একটু পড়ে পাওয়া নির্দোষ আনন্দও কি তাঁর চাহনিতে এখন প্রকাশ পাচ্ছে? আলবাত পাচ্ছে। অন্ধকার মুখটায় একটা চাপা আনন্দর আলোও ফুটেছে কোনও একটা স্তরে— যেমন আনন্দ অনুভব করা যায় অনেক দিনের জমানো গোপন কথা কোনও বন্ধুকে বলতে পারলে।

বন্ধুই বটে। অসমবয়সি এক দারুণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক দানা বেঁধেছে অভিনেতা আশ্চর্য এবং বৃদ্ধ মনোরোগবিশেষজ্ঞ (তিনি অবশ্য নিজেকে বলেন 'হাতুড়ে মনের ডাক্তার') ড: ব্রহ্ম ঠাকুরের মধ্যে। আশ্চর্য তার 'অজড় স্মৃতির জড়রূপ'-এর উৎপাত থেকে মুক্তি পেয়েছে বেশ অনেকটাই। মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন সে আজও দ্যাখে— কিন্তু আগের মতন প্রভাব পড়ে না আর। সে তো এখন তার অবস্থাটা জানে, তাই সামলে নিতে পারে। ড: ব্রহ্ম ঠাকুরও ওষুধ দেন, হয়তো তিনি আরও খানিক জটিলতা বোঝেন সে অসুখের, যা আশ্চর্যেরও জানা নেই। ওষুধ নিতে সে আসে তার ব্রহ্মদার কাছে। খোশগল্পও হয়। গত সপ্তাহে সে তো রোজই এসেছে কোনও না কোনও সময়ে, এতটাই নিকট সম্পর্ক এখন। সে খুবই কৌতূহলী ব্রহ্মদার অন্ধকার অতীত নিয়ে। ব্রহ্ম ঠাকুর সে ব্যাপারে অবশ্য খুব সাবধানী। তবুও আজ কে জানে কেন, ব্রহ্ম একটু মজা পাচ্ছেন নিজের কথা বলে। নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম এটা। মনে হতেই পারে, আজ সূর্য উঠেছে পশ্চিম দিকে!

আসলে প্রায় পশ্চিমী সূর্যের মতোই অদ্ভুত এক প্রস্তাব রেখেছে আশ্চর্য, ড: ঠাকুরের কাছে। সে একটা ছবি পরিচালনা করতে চলেছে। যুগ্ম পরিচালনা, অন্য পরিচালক তার বন্ধু অপ্সরা মিত্র। ছবিটা পিরিয়ড পিস। আশ্চর্য চাইছে ব্রহ্ম ঠাকুর এক জমিদারের চরিত্রে অভিনয় করুন। তার এই ছেলেমানুষি প্রস্তাব শুনে স্তম্ভিত ব্রহ্ম ঠাকুর। তবে তাঁর চোখের কোণে যে হাসিটা ঝিকমিক করে উঠেছে, তাতে কৌতুকের পাশাপাশি এটাও বোঝা গেছে, প্রস্তাবটা ফেরাতে পেরে আনন্দিত তিনি। দায়মুক্তির আনন্দ। খামোখা বাজে ঝঞ্ঝাটে না জড়াবার স্বস্তি।

হঠাৎ কী যে হল! ব্রহ্ম ঠাকুর তড়াক করে উঠে পড়লেন রিভলভিং চেয়ারটা ছেড়ে। একবার হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন তাঁর ডিটেকশন বা রোগ নির্ণয়ের বিশ্বস্ত সঙ্গী রকিং চেয়ারটাকে। তারপর তড়বড় করে এগিয়ে গেলেন অন্য দিকের লম্বা চেয়ারটায় শুয়ে থাকা আশ্চর্যের দিকে। তারপর প্রায় হুকুমের সুরেই চড়া গলায় বললেন— এই ছেলে। চট করে উঠে দাঁড়াও তো! এক্ষুনি ওঠো।

একটা অন্য সময়ের গল্প বলা যাক। যথাসময়ে এর তাৎপর্য বোঝা যাবে।

'দেবতা কি গ্রহান্তরের প্রাণী'— এই মর্মে যে চাঞ্চল্যকর গবেষণা করেছিলেন এরিক ফন দানিকেন, তার জন্যই তাঁকে দেশদেশান্তরে ছুটে বেড়াতে হত বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণপ্রাপ্তি এবং যাচাইয়ের সূত্রে। বহু ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর আলাপ-আলোচনা লেগেই থাকত এসব ব্যাপারে। একবার এরিক তাঁর সুইৎজারল্যান্ডের ছফিগ্যান শহরের বসতবাড়ির ঠিকানায় একটি সুলিখিত চিঠি পেলেন। জার্মান ভাষায় লেখা এই চিঠির প্রেরকের সঙ্গে তাঁর প্রথম নামটি হুবহু মিলে যায়। মিল শুধু সেখানে নয়, মিল গবেষণার বিষয়েও। 'এরিক ডাটা' নামের এই তরুণটির প্রতি কৌতূহলী হলেন দানিকেন। তরুণটি থাকেন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে। দানিকেন তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্য উৎসুক হয়ে পড়েন।

চিঠি চালাচালিতে অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেল। দানিকেন যে দেখা করতে চাইবেন এটা ভাবেননি এরিক দত্ত। পাশাপাশি দত্ত যে অর্ধেক ভারতীয় অর্ধেক জার্মান (তাঁর বাবা বাঙালি, মা জার্মান) এবং শিগগিরি যে তিনি কলকাতায় চলে যাচ্ছেন তাঁর গবেষণা ভারতীয় পটভূমিকায় নতুন করে সম্প্রসারিত করবার ইচ্ছে নিয়ে, এটা দানিকেনের অজানা ছিল। ফলে কলকাতায় চলে আসবার ঠিক আগের রাতে সাক্ষাৎ হল দু'জনের— ফ্রাঙ্কফুর্টের এক সরাইখানায়। এই সরাইখানাটি খুব একটা জনপ্রিয় নয়। মোটামুটি নির্জন একটা আলোচনার জায়গা হিসেবে দু'জনেরই মনে হল —এখানে দেখা করাই ভাল।

দানিকেন তখন একই সঙ্গে বিখ্যাত এবং কুখ্যাত। তাঁর প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহল তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনেছে। এই সব বিজ্ঞানীদের কিছু শক্তি সংগঠনও থাকে। শুধু মাথার জোরে অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গেই লড়া যায় না। কু ক্লাক্স ক্ল্যানের মতো ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী এবং কুসংস্কারের ডিপো সংগঠন যেহেতু খুব একটা শান্তির পথে চলে না, বিজ্ঞানীদেরও সময়-সময় প্রতিরোধের রাস্তা নিতে হয়। দানিকেনের প্রতিও এই বিজ্ঞানী শক্তি সংগঠনগুলো খুব সদয় ছিল না। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার অভিযোগে দানিকেনকে জেলে যেতে হয়েছিল। দানিকেনের মতে অবশ্য তাঁকে ফাঁসানো হয়েছিল। যাই হোক, সতর্কতার মার নেই। তাই ১৯৬৮ সালের জুলাই মাসের সেই সন্ধ্যায় বড় বড় নকল চুল আর দাড়িগোঁফের জঙ্গলে মুখ লুকনো গাঁট্টাগোট্টা যে লোকটি এরিক দত্তের টেবিলে এসে বসল— সেই যে দানিকেন— তা বুঝতে এরিকের একটু সময় লেগে যায়।

দানিকেন পরতে পরতে বিস্মিত হতে থাকেন, এত অল্পবয়সি হওয়া সত্ত্বেও এরিকের গবেষণার বহর দেখে ও শুনে। এরিকের কথা শুনে তিনি নিজেও কিছু নতুন তথ্য পান, অবিলম্বে এরিককে নিজের বই লিখবার পরামর্শ দেন, সম্ভব হলে তাঁর পিতৃভাষা বাংলায়। বলেন— এতে মতবাদটির প্রসার এবং প্রচার দুই-ই হবে।

এরিক দত্ত যে ধোঁয়াটে জায়গাটার কথা বেশি করে ভাবছিলেন সেটা হল আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ। গতিবেগ বিষয়টা সম্পূর্ণই আপেক্ষিক। চলমান বস্তু কতটা গতিবেগসম্পন্ন তা অন্য একটা চলমান বস্তুর উপর থেকে দেখলে যা লাগবে, অচল বস্তুর উপর দাঁড়িয়ে দেখলে লাগবে তার থেকে অনেক বেশি। মজার ব্যাপার হল পৃথিবী নিজেই তো চলমান! তা হলে তার উপর বসে আমরা যা হিসেব করছি তা তো ভ্রান্ত। এই ব্যাপারটা ঠিক ঠিক বুঝে ফেললে নিশ্চল স্থানে কোনও বস্তুকে সচল করবার শক্তির পরিমাপ কষা যায়। এই ভাবেই কমিয়ে আনা যায় সচল পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে প্রয়োজনীয় প্রদত্ত শক্তির পরিমাণ। এরিক গবেষণা করছিলেন এটা নিয়েই যে এই সূক্ষ্ম শিক্ষা প্রাচীন ভারত, চিন ও আফ্রিকার ভাষ্কর্য নির্মাতারা, স্থপতিরা পেলেন কোথা থেকে? এর পেছনে কি আছে গ্রহান্তরের প্রাণীর জ্ঞানের আমদানি? সত্যিই কি আছে পৃথিবীর জলে বা আকাশে কোনও মহাকাশের বহু বহু আলোকবর্ষ দূরের সংযুক্তিকা বা টানেল? আছে কি কোনও ওয়র্মহোল— যার অন্য নাম আইনস্টাইন-রোজেন সেতু? দানিকেন আকাশপথ নিয়ে ভাবছিলেন বেশি, আর এরিক দত্ত ভাবছিলেন মহাকাশের ফুটোর কথা।

বিয়ারের মাগ রাখা রয়েছে টেবিলে, দুই অসমবয়সি গবেষক আলোচনায় মশগুল। মাঝেমাঝে উদ্ধত তর্কাতর্কিও করছেন এরিক, তাঁর কম বয়সের সঙ্গে সংগতি রেখে। এরিক টেনে আনছেন কার্ল সাগানের যুক্তিযুক্ত অভিযোগের কথাও। দু'জনের কারুরই জানবার কথা নয় যে সরাইখানার ডাইনিং হলের বাইরে একটা জানালা দিয়ে তাঁদের নজরে রেখেছে দু'জোড়া চোখ। একজনের হাতে ওয়াকিটকি, তাতে কার সঙ্গে যেন চাপাকণ্ঠে বাক্যবিনিময় চলছে। অবশেষে বোধহয় সবুজ সংকেত পেল সে। এই জনহীন অঞ্চলটির, অজনপ্রিয় এই সরাইখানার এবং সুনসান রাতের নির্জনতার সুযোগ নেওয়াই ভাল। তার ডান হাতের একটা ইশারায় তার সঙ্গী হাত ঢুকিয়ে দিল ওভারকোটের পকেটে। হাতটা যখন সে বের করে আনল, দেখা গেল সেই হাতে ধরা আছে একটা আগ্নেয়াস্ত্র।

জানলার খুব কাছে এগিয়ে গিয়ে পেশাদার শীতলতায় দানিকেনের বুকের দিকে তাগ করে নিশানা নিল লোকটি। দানিকেন সংগঠিত ধর্মের বিরুদ্ধে, যুদ্ধের বিরুদ্ধে বড্ড বেশি কথা বলছে। যুক্তি সাজাচ্ছে। বড় চুলদাড়ি লাগিয়ে আজ আর লুকোতে পারবে না! গুপ্তচরদের চোখে ধরা পড়ে গেছে সে। একে অবিলম্বে শেষ করে দেওয়াটা দরকার।

ব্রহ্ম ঠাকুর রিভলভিং চেয়ার থেকে তড়াক করে উঠে প্রায় ছুটে গিয়ে একটা অভূতপূর্ব মেজাজে আশ্চর্যকে আদেশ দিলেন প্রায় বিছানার মতোই এলিয়ে থাকা চেয়ারটা থেকে উঠে পড়তে। হতচকিত হয়ে আশ্চর্য উঠে দাঁড়াতেই ব্রহ্মের গলায় শোনা গেল সিরিয়াস সুর।

—চলো আজ আমরা জায়গা বদলাবদলির খেলা খেলি। আজ তুমি বসবে আমার আসনে। আমার আসন বলতে যে আসনটা আজ এখনও পর্যন্ত অব্যবহৃত, সেই রকিং চেয়ারটা— ওই চেয়ারটা বড্ড ডাকাডাকি করছে, আমি চর্ম'কর্ণে' শুনতে পাচ্ছি। আমি 'তার ডাক' শুনলেও 'ডাক তার' আজ কিছুতেই হব না। আজ ডাক্তার হবে তুমি। চেয়ারটায় বসে তুমি অল্প অল্প দুলবে, অনেক কথা চুপচাপ বসে শুনবে, যেমনটা সাধারণত আমি করে থাকি। আজ আমি কথা বলব। আমিই, ধরে নাও, আজ তোমার পরামর্শপ্রার্থী। এই লম্বা চেয়ারটায় পা তুলে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ব আমি। তুমি সিনেমার কথা বলছিলে না? আমাকে অভিনয় করতে বলছিলে? আমি তোমায় শোনাব আমার ইতিমধ্যেই অভিনীত, অথবা অতিবাহিত বেশ কিছু চরিত্রের কথা। বাস্তব চরিত্র। ধরে নাও এটা একটা সিনেমার গল্প। যে সিনেমাটা বানানো হয়নি। আমিও একজন মনোরোগী। আমারও ডাক্তারের প্রয়োজন। কার কাছে যাব আমি? ড: পরিমল বাগচী? মন মানতে চায় না আশ্চর্য।

একটু আগেই হাসছিলেন ব্রহ্ম ঠাকুর। কিন্তু এখন তাঁর গলায় বিষণ্ণ এক সুর। কোথায় গিয়ে যেন ভেঙে পড়েছেন লড়াকু লোকটা। আশ্চর্য এরকম গলা শুনে দুঃখিত হয়। বলে— কী হয়েছে আপনার? আপনি তো বলেছিলেন আপনার জীবনের গুপ্ত অধ্যায়ের গল্প বলা যাবে না কখনও? তা হলে আজ অন্যরকম কী হল? আপনি দেখুন, অনেক সময় কোনও চরিত্রে অভিনয় করলে মনের একটা প্রসারণ হয়। যে জমিদার চরিত্রের কথা আমি ভেবেছি, তার ডিটেইলসটা শুনে দেখুন একবার। শুনুন, সিপাহি বিদ্রোহের পর অনেকদিন কেটে গেছে। ইংরেজরা শক্ত হাতে—

—ও সব কথা থাক। তুমি আমার কথা শোনো। ভাল ডাক্তারকে ভাল শ্রোতা হতে হয়। শ্রোতা হওয়ার চেষ্টা করো। আমি কত দিন বেঁচে আছি, কবে নেই— কোনও ঠিক নেই...

—কী বলছেন...

—ঠিকই বলছি। বলছি যে, তার কারণ আছে, পরে জানবে। শোনো, আত্মজীবনী আমি প্রকাশ করতে পারব না। সুযোগ বা সময় কোনওটাই আমার পক্ষে নেই। তাহলে আমার না বলা গল্পগুলোর কী হবে আশ্চর্য? কেউ জানবে না? আমি টুক করে মরে গেলে—

—এসব কী বলছেন আজ! কেন মরবেন আপনি ব্রহ্মদা? আপনি তো দিব্যি ফিট, সুস্থ—

—আমার ভাই আমার থেকেও ফিট ছিল। সুস্থ ছিল। সে একটা কলেজে ইতিহাস পড়াত। একটু আগে খবর পেলাম সে হঠাৎ মারা গেছে। আমার আত্মীয় বলতে তো সে-ই ছিল। আমার অজ্ঞাতবাসের কারণে যোগাযোগ ছিল না। সে জানেই না, মানে জানতই না, আমার এখনকার নাম ব্রহ্ম ঠাকুর। তাকে সে তথ্য তার নিরাপত্তার কারণেই আমি দিইনি। কিন্তু আমায় খবর দেওয়ার আছে কেউ কেউ। তেমনই একজন খবর দিল। বুঝলে আশ্চর্য, জীবন বড্ড অনিশ্চিত। কবে যে কী হবে কেউ জানে না। তোমাকে আমি ভালবাসি। আমার নিজের ছেলে হলে হয়তো তার বয়স তোমার চেয়ে খানিকটা বেশিই হত। তবুও তুমি পুত্রসম। তোমাকে বলতে ইচ্ছে করছে। একটু শোনো না আমার কথা...

আশ্চর্য চুপ করে রইল। সে বুঝল, এটা তার কথা বলবার সময় নয়। শুনবার সময়।

ব্রহ্ম বলে চললেন— মানসিক রোগীরা চাপা স্বভাবের হয়। তুমি দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যা লালন করেছ। তাই অবধারিতভাবেই তোমার স্বভাব চাপা। তুমিই পার। স্বচ্ছন্দে তুমি আমার ডাক্তার হতে পার। আমি জানি তুমি পাঁচকান করবে না।

এই বলে কী এক খেয়ালে ব্রহ্ম একটু মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন— সিনেমা বানাবে নাকি? তা বানিও। বাজেট থাকলে বানিও'খন। নামধাম পাল্টে দিলে কী আর আসবে যাবে? তবে বিগ বাজেট মাস্ট। আমার গল্পটা আন্তর্জাতিক।

আশ্চর্য কিছু বলল না। চুপ করে সে শুধু তাকিয়ে থাকল। নানা রঙের অনুভূতি খেলা করে যাচ্ছে তার ভিতরে। চাপা উত্তেজনাও কাজ করছে। সে তো প্রথম দিন থেকেই এই লোকটির সম্পর্কে আগ্রহী। সে কৌতূহলী লোকটির 'অন্ধকার অতীত' নিয়ে।

যেন আশ্চর্যের মনের কথাটা পড়ে ফেলেই ব্রহ্ম ঠাকুর বললেন— না। এক্ষুনি আমি নিজের কথা বলব না। আমি বরং বলব আর একজন লোকের কথা। কয়েকটা বেস্টসেলার বইয়ের লেখক হিসেবে লোকটার নাম হয়তো তুমি শুনে থাকবে। এক সময় অবশ্য খবরের কাগজের শিরোনাম হয়েছিল ফর অল দ্য রং রিছনস। লোকটার এই ভাবে খবরের শিরোনাম হওয়াটায় অবশ্য আমার কিছুটা, কিছুটা কেন, অনেকটাই কন্ট্রিবিউশন ছিল। লোকটার নাম এরিক দত্ত। ...নাম শুনেছ? পড়েছ ওর কোনও বই?

অ্যান এনিমি অফ দ্য পিপল।

হেনরিক ইবসেনের বিখ্যাত নাটকের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কারা যেন বাড়ির বাইরে, পাড়ার দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার মেরে গেছে রাতারাতি। 'এরিক দত্ত প্রতারক'। 'ভগবানের নামে বিকৃত কথা শুনব না'। 'ধান্দাবাজ এরিকের শাস্তি চাই'। 'এরিক দত্ত দেশদ্রোহী'। 'বিদেশি গুপ্তচরের গ্রেপ্তারের দাবিতে একজোট হউন'। ইত্যাদি ইত্যাদি!

অবশ্য এমনটা যে হবে তার ইঙ্গিত থেকে গেছিল এরিকের বিতর্কিত কর্মজীবনের প্রায় শুরুর দিকেই। তাঁর চোখের সামনেই দানিকেনকে গুলি করেছিল ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। সেদিন ফ্রাঙ্কফুর্টের এক নির্জন রাতের সরাইখানা-সাক্ষাতে এরিক টেবিলে সাজিয়ে রেখেছিলেন এক কিউরিও শপ থেকে সংগ্রহ করা মিং বংশের চিহ্ন বহনকারী কিছু দুষ্প্রাপ্য চিনামাটির পাত্র। এই পাত্রগুলো সাক্ষ্য দিচ্ছিল প্রাচীন মানুষের ইউএফও বা অজানা উড়ন্ত বস্তু দর্শনের অভিজ্ঞতার, সে ছবিই যেন আঁকা ছিল তাদের গায়ে। আর ছিল আফ্রিকার এক আদিম ধাতব ট্রে— যার উপরে ছিল মহাকাশের ছবি, নক্ষত্রবিন্যাসের চিত্র খোদাই করা। নক্ষত্রগুলির একে অন্যের একদম সঠিক আনুপাতিক দূরত্ব কীভাবে জেনেছিলেন প্রাচীন শিল্পী? একটা ছোট্ট মাপবার ফিতে দিয়ে মেপে মেপে বোঝাচ্ছিলেন এরিক। কখনও বা ব্যবহার করছিলেন আতসকাচ।

সেদিন ভাগ্যক্রমে বুলেটটা যখন ছোড়া হয়, ঠিক তক্ষুনি কেনিয়ার মাটির তলা থেকে প্রাপ্ত ধাতব ট্রেটা চোখের খুব কাছে এনে খুঁটিয়ে দেখবার জন্য তুলে ধরছিলেন দানিকেন। এক লহমাতেই ঘটনাটা ঘটে। বুলেটের অভিঘাতে ধাতব ট্রেটা পুরোপুরি তুবড়ে যায়। লাফ দিয়ে উঠে পড়েন এরিক দত্ত। আততায়ী আবার গুলি ছোড়ে, কিন্তু এবারও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় দানিকেন টেবিলের তলায় ঢুকে পড়ায়। বার-এর মালিক ষন্ডাগোছের এক মুশকো জার্মান, দেওয়ালে ঝোলানো একটা পুরনো অস্তর হাতে তুলে নিয়ে যতক্ষণে বাইরে বেরিয়ে আসে, তার মধ্যেই হামলাকারীরা অদৃশ্য হয়ে গেছে। দানিকেনকে দায়িত্ব নিয়ে সে-ই নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেয়। সেদিন থেকেই কি নতুন শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান এরিক দত্ত? কে জানে! হতেও পারে।

খুব একটা সহজ হয়নি কলকাতায় আসবার পর এরিক দত্তের জীবনযুদ্ধ। পরবর্তী আট বছর ধরে এরিকের জীবনে অনেক টানাপোড়েন ঘটেছে, গবেষণা এবং বই লেখার বাইরেও। বিয়ে করেছেন, তাঁর সন্তানের জন্ম হয়েছে, স্ত্রী তাঁর খ্যাপামি সহ্য করতে না পেরে তাঁকে ফেলে চলে গেছেন ছেলেকে নিয়ে। তবে এরিক বরাবরই তাঁর গবেষণা চালিয়ে গেছেন, সাময়িক কিছু বিরতি সত্ত্বেও। গবেষণার প্রয়োজনে কিছু অভিযানও তিনি করেছেন এর মধ্যেই। পাশাপাশি যখনই পেরেছেন, চেষ্টা করেছেন বাংলায় লেখা তাঁর বই প্রকাশ করতে। দীর্ঘ এই সময়টা ধরে প্রত্যাখ্যানই বেশি জুটেছে এরিকের। প্রকাশকরা বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করেননি তাঁর তত্ত্ব। কিছু প্রকাশক আবার ভয় পেয়েছিলেন। ধর্মীয় সংগঠনের আক্রমণের ভয়। তাঁরা যে খুব ভুল ভাবেননি, ভুল করে ভয় পাননি, তা আজ প্রমাণিত। ছ'মাস হল তাঁর বইটি বেরিয়েছে। বই বেরনোর পর অবশ্য একদফা হইহই হয়েছে তাঁকে নিয়ে। বইটি বেস্টসেলারও হয়েছে। তার ফলেই হয়তো অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বইটির সাফল্যে চটে গিয়ে তৎপর হয়ে উঠেছে 'সংস্কৃতি মঞ্চ' নামের একটি উগ্র সংগঠন। আপাত নিরীহ নাম হলেও এদের পেছনে যে একটা তীব্র দক্ষিণপন্থী রাজনীতি আছে— সেটা বুঝেছেন এরিক। এরা দাবি তুলেছে ভারতীয় দেবদেবীদের অবমাননা করেছেন এই প্রবাসী তথা অর্ধবিদেশি। তাঁকে তিনদিন সময় দেওয়া হয়েছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে স্বীকার করে নিতে যে তিনি জ্ঞানতই ভুলভাল কথা লিখেছেন। তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে, এমন কথাও বলছে কোনও কোনও শিবির।

এরিক অকুতোভয়। তিনি অটল থাকলেন নিজের বক্তব্যে। প্রেস কনফারেন্স ডেকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে দিলেন যে তিনি একবারও কারুর বিশ্বাসে আঘাত দেননি, অবমাননা করেননি। খোলা মনে ভাববার রসদ জুগিয়েছেন শুধু। কিন্তু ততক্ষণে বিক্রি হয়ে গেছে মিডিয়ার একাংশ। হেডলাইনে উঠে এসেছে জনতার বিক্ষোভ। নিজের পাড়ার দেওয়ালে দেওয়ালে পড়েছে পোস্টার।

এসবই মনে মনে ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন এরিক দত্ত। ভাবতে চেষ্টা করছিলেন কী হতে পারে তাঁর পরবর্তী কর্তব্য। এখানে থেকে তো আর কাজ করা সম্ভব হবে না। পালাতে হবে। চেষ্টা করতে হবে জার্মানিতে ফিরে যাওয়ার। ফিরবার অবশ্য অন্য একটি কারণও আছে। এমন একজনের কাছ থেকে একটা আমন্ত্রণ পেয়েছেন, যা এড়ানো অসম্ভব। চিঠি চালাচালি চলছিল বেশ কয়েক বছর। ফলাফল মিলেছে। আমন্ত্রণ এসেছে।

ঝনঝন ঝনাৎ। আঁতকে ওঠেন এরিক। জানলা ভেঙে একটা পাথরের টুকরো এইমাত্র টিভির কাচও ভেঙে দিল। ভাঙা কাচের জানলার কোণে চোখ ঠেকিয়ে তিনি দেখতে পান বাড়ির সামনে প্রচুর মানুষের ভিড়। তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করা হচ্ছে! কেউকেউ মহাআক্রোশ চরিতার্থ করছে তাঁর বই পুড়িয়ে। তিনি বুঝতে পারেন বিপদ এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর বাড়ির দোরগোড়ায়।

এসবের মধ্য দিয়েই একটা তীব্র আতঙ্কের রাত কাটল। কখন যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কে জানে। পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙল একটা ডোরবেলের শব্দে। উঠে গিয়ে আইহোলে চোখ লাগিয়ে এরিক দেখলেন এক দীর্ঘদেহী শান্তদর্শন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন দরজার ওপারে। বয়স তাঁর থেকে চার-পাঁচবছর বেশিই হবে। চুল সুন্দর পরিপাটিভাবে ব্যাকব্রাশ করা, গালে চাপদাড়ি, ভাবলেশহীন মুখ আর শীতল চোখ। তবে আক্রমণোদ্যত বলে মনে হল না। দরজা খুললেন এরিক।

অতিথি নিজের পরিচয় দিলেন। বললেন— আপনার বর্তমান পরিস্থিতি ভীতিপ্রদ। নিশ্চয়ই আপনি একটা সেফ প্যাসেজের কথা ভাবছেন। ভাবছেন কী করে ফিরে যাবেন যেখান থেকে এসেছিলেন সেখানে। দুঃখিত। এক্ষুনি তার ব্যবস্থা করা যাবে না। তবে আমি বিকল্প একটা পথ আপনাকে বলে দিতে পারি। সে পথে গেলে আপনি নিরাপদে থাকবেন যতক্ষণ না হাওয়া ঠান্ডা হচ্ছে। তারপর ফিরবেন না হয়। বাই দ্য ওয়ে, আমার নাম বিদ্যুৎ পাইন। গ্ল্যাড টু মিট ইউ।

এরিক অতিথিকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। জানতেও পারলেন না অতিথির কোটের ডানদিকের পকেটে রয়েছে একটা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ।

—বুঝলে আশ্চর্য, এখন যেমন আমার নাম ব্রহ্ম ঠাকুর, অনেকদিন আগে আমার অন্য যে নকল নামটা ছিল, সেটা হল 'বিদ্যুৎ পাইন'। —বললেন ব্রহ্ম ঠাকুর।

—আমি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তো ছিলামই, কিন্তু যে নামটায় ডাক্তার হিসেবে রেজিস্টার্ড ছিলাম, নামটা বেশিদিন ব্যবহার করা হয়নি। মনোবিদ্যার চর্চা করতে করতেই আসল মনস্কামনার সন্ধান পাই। আসল কামনাটা কী? মানুষ চায় স্বাধীন হতে। চায় বন্ধনমুক্তি। কিন্তু সমাজ তাকে দেয় পরাধীনতার মন্ত্র। পরায় দাসত্বের শৃঙ্ক্ষল। তো আমার মধ্যে টগবগ করে উঠছিল একটা লড়াকু সত্তা। আমি পৃথিবীতে অন্যের নিয়মে বাঁচতে চাইনি। আমি তৈরি করতে চেয়েছিলাম নতুন নিয়ম। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা— সবই তো স্বাধীনতা আন্দোলনের আবহে। তাই আমার গভীরে এই সত্তাটা ছিলই। কীভাবে এটা বের হয়ে এল একটু পরে বলছি। আগে বলো তো, আন্দাজ করো তো দেখি কে ছিলেন আমার প্রিয় কবি?

—এটা আমি জানি। আগে একবার বলেছিলেন।

—ঠিকই তো! জানবেই তো। কাজী নছরুল ইসলাম ছাড়া আর কেই বা হবেন! কেইবা লিখবেন ওঁর মতো করে

আমি চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস

মহা-প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!

আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর

আমি দুর্ব্বার

আমি ভেঙে করি সব চুরমার!

এই পর্যন্ত আবেগে আবৃত্তি করেই ব্রহ্ম ঠাকুরের আরও কী যেন মনে পড়ে গেল। তিনি বললেন— আহা, এই কবিতাটার শুরুর দিককার লাইনগুলো আমায় অন্যভাবে হন্ট করত, এখনও করে! এই যে, শোনো—

মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'

চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি'

ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া

খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া

উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!

—কী রকম একটা মহাকাশ-অভিযান প্রসঙ্গ যেন এসে পড়ল, না? আমার জীবনেও ঠিক তাই-ই হল। কীভাবে? বলছি শোনো। একদিকে কবি নছরুল নামক ঘূর্ণিঝড়কে বুকের মধ্যে বহন করছি, অন্যদিকে পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়াশুনোর তাগিদে এমডি পড়তে যাচ্ছি লন্ডনে— জীবন তো বহুমাত্রিক! ভর্তি হলাম রয়্যাল কলেজ অফ সাইকিয়াট্রিসটস-এ। আর হবি তো হ, সে বছরেই প্রকাশ পেল পিংক ফ্লয়েডের প্রথম অ্যালবাম 'দ্য পাইপার অ্যাট দ্য গেটস অফ ডন'— একটা দুর্দান্ত 'স্পেস রক' অ্যালবাম। আমার এই রক সংগীতের সন্ধান পাওয়াটাও একটা সমাপতন। কলেজের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে সপ্তাহান্তের গানবাজনা শুনতে গিয়েছিলাম এমন একটা ক্লাবে, যার নাম 'ইউএফও ক্লাব'। সেই ইউএফও ক্লাবে সেদিন আবার পিংক ফ্লয়েডের পারফর্মেন্স, তখনও অবশ্য ওদের প্রথম রেকর্ডটা বেরোয়নি, বেরোল কয়েকদিন পর। তা আমি লাইভ শুনলাম সেই রেকর্ডের গানগুলো। অসামান্য সাউন্ডস্কেপ! পারফর্মেন্সের পর আলাপ হল, পরে বন্ধুত্বও হল দলটার আসল লোক সিড ব্যারেটের সঙ্গে। সেও যেন মহাকাশের ইশারা পড়ে নিয়ে পৃথিবীর যত ক্ষুদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায়। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ে গেল 'মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'/ চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি'/ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া...' ইত্যাদি! এই রকতারকার মধ্যেই আমি আমার সময়ের মূর্তিমান বিপ্লবকে, অন্তত ভাবনার দিক থেকে, খুঁজে পেলাম। কাজী নছরুল তো তখন গুরুতর অসুস্থ, নিষ্ক্রিয়। নতুন বন্ধু সিড ব্যারেটের সঙ্গে বন্ধনহীন দিনযাপন থুড়ি রাত্রিভ্রমণ, আমার জীবনে নিয়ে এল স্বাধীনতার অন্য মানে। টেকনিক্যালি তুমি বলতেই পার আমার এই দুই ইনস্পিরেশনই শেষ জীবনে উন্মাদপর্ব কাটিয়েছেন, হ্যাঁ, সিড ব্যারেটও দু'তিন বছরের মধ্যেই প্রায়-পাগল হয়ে যায়, পিঙ্ক ফ্লয়েড তাড়িয়ে দেয় তাকে! আর আমি হয়ে উঠেছি 'মাথা খারাপির ডাক্তার'— কিন্তু সত্যি বলতে কী জানো— আমি যে খানিকটা— খানিকটা কেন— প্রচণ্ডই খ্যাপা একজন লোক— এটা লুকোব কী করে? আমাকে পাগল বললেও আমার আপত্তি নেই। আমি তো পাগলই। আমি হলাম গিয়ে, বলতে পারো— একজন 'রসিক পাগল'!

এতটা বলেই ব্রহ্ম ঠাকুর উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে উঠলেন—

এসে এক রসিক পাগল

বাঁধালে গোল

নদের মাঝে দ্যাখসে তোরা

পাগলের সঙ্গে যাব

পাগল হব গো...

তারপর বললেন—

পাগলামি করেই আমি 'বিদ্রোহী' কবিতাটা আবেগে আবৃত্তি করতাম। বারবার পড়তাম। এমনভাবে পড়তাম যেন যে লোকটার কথা নছরুল বলছেন, সেটা আমিই! নছরুলের কবিতা পড়েই কামাল আতাতুর্ক পাশা তখন আমার নায়ক, নছরুল তো কাব্যনাটক লিখেছিলেন— 'কামাল পাশা'। একজন স্বৈরনায়ক যিনি একা হাতে তৈরি করেছেন আধুনিক তুর্কিস্তান। নাঃ আশ্চর্য! আমার নিয়তিই ছিল একটা বৈপ্লবিক গুপ্তসংঘে যোগ দেওয়ার। সে দিকেই অদৃষ্ট আমায় তাড়িয়ে নিয়ে গেল।

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ব্রহ্ম ঠাকুর খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

—আমি পাগল। তাই পাগলামিই করছিলাম। তবে এটা বুঝেছিলাম গণতন্ত্র দিয়ে কিচ্ছু হওয়ার নয়। নানা মুনির নানা মত হলে মানুষ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তিন বছর পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এসে প্র্যাকটিস শুরু করলাম। হিসেব করে দ্যাখো— নকশাল পিরিয়ড সেটা। আমি ওই মুভমেন্টের মধ্যে তো ছিলাম না, ফিরে এলাম যখন শহরে তুমুল হিংসা আর সহিংস বিপ্লব দমনের প্রতিক্রিয়াশীলতা। বন্ধুবান্ধবদের অসহায় মৃত্যুর খবর পাচ্ছিলাম, তেমনই হত্যাহুমকির খবর পাচ্ছিলাম ধনী ব্যক্তিদেরও। সর্বাত্মক অত্যাচারের খবর। ফলে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে কোনও পক্ষেই তেমন করে যোগ না দিলেও একটা লড়াকু জোট তৈরি করে রাখাটা সময়ের দাবি বলেই মনে হয়েছিল আমাদের, ক'জন সমমনস্ক যুবকের, মনে হয়েছিল এটা নিরাপত্তার জন্যেই আমাদের করা দরকার। আমরা কয়েকজন জন্মদোষে অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, বিলেতফেরত, ফলে আমাদের সহজেই টার্গেট করা হতে পারে, সত্যি হোক, মিথ্যে হোক— এমন সম্ভাবনার ভয় পেয়েছিলাম। জোটে যোগ দেওয়ার আগেই অবশ্য আমি নিজের ছদ্মনাম রেখেছিলাম 'বিদ্যুৎ পাইন'। লন্ডনের এক নির্জন রাস্তায় বাজ পড়ে ঝলসে যাওয়া এক পাইনগাছ দেখেছিলাম। ওই গাছটার শহিদ হওয়াকে আমি সম্মান জানাতে চাইছিলাম। গাছটার লড়াকু একাকিত্ব আমার কাছে আদর্শের মতো হয়ে গেছিল। আমিও বিশ্বাস করতাম ঝলসে মৃত্যু ভাল, শয্যামৃত্যুর তুলনায়, বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাই আমার মানসিকতায় যে খুব বেশি তফাত ছিল তা নয়, তফাত ছিল আর্থনীতিক অবস্থানে। অনেক পরে নীল ইয়াং-এর গানে এই ভাবনারই প্রতিফলন শুনি। ‘It’s better to burn out than fade away’— এ কথাটায় কোনও ভুল নেই কিন্তু! নিরভানা-র কার্ট কোবেইন আরও অনেকদিন পরে ওর সুইসাইড নোটে এই কথাটাই লিখেছিল!—গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে বললেন ব্রহ্ম ঠাকুর।

—স্বাধীনতার ইচ্ছে বয়ে আনে যুদ্ধের সংকল্প, আর যুদ্ধ মানেই হল জয়ের কামনা, সর্বশ্রেষ্ঠ হবার বাসনা। না আশ্চর্য, ধর্মীয় উগ্রবাদী আমি কোনওদিনই ছিলাম না, চরমতম দুঃস্বপ্নেও না। তবে শ্রেষ্ঠত্বের ইচ্ছে ছিল। পৃথিবীর উপর একচ্ছত্র আধিপত্যের স্বপ্ন ছিল। সহিংস পদ্ধতিতে বিশ্বাস ছিল। আর তার জন্য কূটনৈতিকভাবে দরকার ছিল মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। অর্থাৎ শেষ মহা মানবউন্নয়নের লক্ষ্যে ভুল পদ্ধতি প্রয়োগে আমাদের কুণ্ঠা ছিল না।

হ্যাঁ, ঠিকই শুনলে। আমার নয়। আমাদের। চেনা রাজনৈতিক মতামতের বাইরেও বিশ্বজুড়ে একটা গোপন সংঘ ক্রিয়াশীল। তারা এক ধরনের বৈপ্লবিক ওলট-পালট বা 'হেলটার স্কেলটার'-এর স্বপ্ন দ্যাখে— অন্তত প্রাথমিকভাবে নতুন রিক্রুটদের এমনটাই বোঝায়। এদের সঙ্গে দেশে দেশে যোগ দেয় ইচ্ছুক নতুন প্রজন্ম। মানে কিছু তরুণতরুণী বিদ্রোহী-ভাবনা নিয়ে এককাট্টা হলেই এরা খুঁজে বের করে, যোগাযোগ করে নেয়। তারপর শুরু হয় মগজধোলাই, ট্রেইনিং। হাজার লক্ষ কোটি বোকা জনগণকে বিচ্ছিন্ন না করে রাখলে ভাল কিছু, উন্নত কিছু— 'গণতন্ত্রী সমাজ' নামক সার্কাসের উপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না— এটা তাদেরই শেখানো একটা মন্ত্র বলতে পার। অবশ্য সবশেষে গিয়ে বোঝা যায়, এরা আসলে রাষ্ট্রগুলোর লুকিয়ে রাখা গোপন দলিল হাত করে ব্ল্যাকমেইলিং, যুদ্ধনীতির ফাঁকফোকর খুঁজে অস্ত্রের দালালি— এসব কাজই করে পেশাদারি ভাবে। কোনও দেশকে তা বেচে দেয় চড়া দামে, কোনও দেশকে এসবের টোপ দিয়ে হাতের পুতুল বানায়। সে প্রসঙ্গে পরে খুলে বলব না হয়।

সেই সময়কালে ফিরি। আমি মেডিক্যাল প্র্যাকটিস শুরু করলাম। সময়ের অস্থিরতার সুযোগে মনের ডাক্তার হিসেবে আমার পসার জমে। আবার সেই অস্থিরতার সুবাদেই যখন উগ্রবাদের হাতছানি প্রবল হয়ে উঠল, অনিবার্য হয়ে উঠল তাতে আমার যোগ দেওয়া,— 'বিদ্যুৎ পাইন'— এই ছদ্মনামেরই আড়াল নিলাম। কিন্তু মনোবিদসত্তাটা তো আমার ছিলই। মানুষের মন পড়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম। ফলে অতি দ্রুতই এই আন্তর্জাতিক দলটারও স্থানীয় শাখার নেতৃস্থানীয়দের খুব কাছের একজন হয়ে উঠলাম।

আমি এরিক দত্তর সঙ্গে পরিচিত হলাম কবে? আমার জীবনের একটা গঠনমূলক সময়ে, তখন সবে প্রতিষ্ঠা করছি নিজেকে। চারপাশের বিপ্লব তখন শান্ত হয়ে আসছে। আমার মনের মধ্যে কিন্তু দ্বিগুনবেগে আগুন জ্বলছে। সেরকম সময়েই ওর সঙ্গে আলাপ।

অজ্ঞান এরিক দত্তকে যখন কয়েকজন পাঁজাকোলা করে গাড়ি থেকে নামাল, তখন তিনি 'আঃ! উঃ!' করে উঠলেন। যে কড়া মাত্রার ঘুমের ওষুধের ইঞ্জেকশন তাঁকে দেওয়া হয়েছিল, মনে হচ্ছে তার মেয়াদ ফুরোল। এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া এরিকের গায়ে এসে লাগে। তাঁর পা জোড়া করে বাঁধা, হাতও পিছমোড়া করে। মুখের ওপর চাপানো কালো ঠোঙার মতো বন্ধনী। এরিক বুঝতে পারলেন, তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে নির্জন একটা বাড়িতে। শহরের বাইরে কোথাও, কারণ শহরের মতো এই অঞ্চলে শব্দচাঞ্চল্য নেই। এরিকের বোধশক্তি অনেকের থেকেই তীব্র। হাওয়ার ছোঁওয়ায় তিনি সময় কত হল, তা বুঝতে পারেন। মধ্যরাতের বাতাস অন্যরকম হয়। হয়তো সে কারণেই এরিকের মনে হল, এটা সন্ধ্যা।

তাহলে নিশ্চয়ই অনেকদূর নিয়ে আসা হয়েছে তাঁকে। অপহরণ তো করা হয়েছিল সেই সকালবেলায়। বিদ্যুৎ পাইন নামের লোকটি অতর্কিতে তাঁর কাঁধে একটা ছুঁচ ফুটিয়ে দেয়, সেখানেই এই কিডন্যাপিং-এর শুরু। সবই ঘটেছিল অপহরণকারীদের আগাম পরিকল্পনা অনুসারে, একদম ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে।

এরিক বুঝলেন, কয়েকজন লোক তাঁকে বহন করে একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলা সমান উচ্চতার একটা ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ থাকলেও অনেকসময়ই ডাইনে-বাঁয়ে-সামনে-পিছনে বোঝা যায়। এর থেকেই তিনি বুঝলেন, এই সিঁড়িটি আছে বাড়ির পেছন দিকে। এরিককে ঘরে ঢুকিয়ে ঘরের মাঝবরাবর একটা চেয়ারে বসানো হল। এত কম উচ্চতার কাঠের চেয়ার খুব শক্তপোক্ত কিছু হয় না। মাথার ঢাকনার মধ্যে দিয়ে এরিক যখন একটা আবছা আলোর জ্বলে ওঠা অনুভব করলেন, তখনই তিনি বুঝলেন, এরা এ ঘর ছেড়ে এখন বেরিয়ে যাবে। মিনিট দশেক তিনি একা থাকবেন। তারপরে এখানে আবির্ভূত হবেন অন্য কেউ। এরিক দত্ত ঠিক করলেন, এই মিনিট দশেক তিনি শান্ত হয়ে থাকবেন। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় চেয়ার ছেড়ে উঠে লাফালাফির চেষ্টা করে কী লাভ? দেখাই যাক না কী হয়। এরিককে দেখে মনে হচ্ছে না তিনি বিশেষ ঘাবড়েছেন।

ঘরের দরজা বন্ধ করে সবাই চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তিনি এলেন। সঙ্গে এল আরও কয়েকজন। তিনি নির্দেশ দিলেন— মি. দত্তর মুখটা খুলে দাও। ওঁকে ওঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তো দিতেই হবে!

অপহরণকারীদের নেতার নির্দেশে এরিক দত্তের মুখের উপর পরানো কালো ঠোঙাটা ছুরি দিয়ে চড়চড় করে কেটে দিল কেউ। বিধ্বস্ত এরিককে দেখে যেন খানিকটা করুণা করেই লিডার এবার বললেন— এ হে! ঠিক লাইটের নীচে ওঁকে বসিয়েছ? দত্তবাবুকে ক্রিমিনাল-ক্রিমিনাল দেখাচ্ছে। বরং পেছনের দেওয়ালটার কাছাকাছি বসাও। হ্যাঁ হ্যাঁ— ওইখানে, আরেকটু কোণার দিকে।

দু'জন লোক দু'দিক থেকে তাঁর চেয়ারটিকে উঁচু করে ধরে ঘরের ভেতরের দিকের কোণে নামিয়ে দেওয়ার পরে যখন তাদের নির্দেশক এরিকের দিকে এগিয়ে গেলেন, মনে হল এটা করা হচ্ছে এরিকের মনে একটা দমচাপা অনুভূতির সঞ্চার করতে। যেন এরিক ইঁদুর কলে ধরা পড়া কোণঠাসা এক এলেবেলে ব্যতীত কিছুই নন। আসলে মানসিক চাপ সহ্য করতে যেমন, তৈরি করতেও এই সব গুপ্তসমিতিগুলো সিদ্ধহস্ত। এই যে লোকগুলোর একজন লিডার এসে এখন হুকুম দিচ্ছেন, তার গলাটাও বেশ গমগমে আর ভীতিপ্রদ। সকালের সেই লোকটা— বিদ্যুৎ পাইন না কী যেন— তার মতো তো নয়!

এরা সকলেই কালো মুখোশ পরে আছে। পোশাকের মধ্যে তেমন কোনও সাযুজ্য নেই। মুখোশ খুললেই এরা মিশে যেতে পারে যে কোনও ভিড়ে। এদের লিডার এবার কথা বলা শুরু করলেন।

—দত্তসায়েব, আপনি বই ছাপব ছাপব করছেন, তারপর ছাপাচ্ছেন, এসব ব্যাপারে প্রকাশকদের কাছে ঘোরাঘুরি করছেন, মিডিয়ার নজর আপনার দিকে ঘুরোবার নানা ধান্দাবাজি করছেন, ব্যক্তিগত জীবনেও কেলোর কীর্তি করছেন— আপনি কলকাতায় আসবার পরে তো বিভিন্ন রকম কাজে কেটে গেল অনেকগুলো বছর। তবে, আপনি কিন্তু বরাবর আমাদের নজরেই ছিলেন। নজরে থাকবার কারণটা অবশ্য বই-টই না। আমরা কু ক্লাক্স ক্ল্যান নই যে ধর্মীয় ভাবাবেগে রেগে গিয়ে হুট করে গুলি চালাব। না না, 'সংস্কৃতি মঞ্চ'-এর মতো মাথা-মোটা আমাদের মোটেই ভাববেন না। আমরা জানি আপনার ওই দেবতাবিরোধী গবেষণা ছাড়াও অন্য কিছু ব্যাপারে আপনি তলায় তলায় যুক্ত। সাংঘাতিক একটা ব্যাপার। সারা বিশ্বের পররাষ্ট্রনীতি এক ধরনের শাঁখের করাত। এদিকেও কাটে, ওদিকেও। এসব জিনিস নিয়ে খেলা করতে নেই। এদিকে কিছু উলটোপালটা লোকের সঙ্গে আপনি আঁতাত তৈরি করছেন যাতে এই স্টেটাস কো-টা, সহাবস্থানটা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আমাদের হস্তক্ষেপ করতেই হচ্ছে। আজ আপনাকে নিয়ে আসতে হল এখানে— কিছুটা জোর করে তো বটেই—

—কী সুন্দর সঠিক জায়গায় ব্রেকটা কষলেন মি. মুখোশধারী! 'সহাবস্থান' কথাটা শুনেই কান খাড়া করে ফেলেছিলাম— 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান' শুনে ফেললাম নাকি! তারপর দেখলাম আপনি কথাটা এড়িয়ে গেছেন অতি সাবধানে, এড়িয়ে না গিয়ে উপায়ই বা কী? অস্ত্র-মাফিয়াদের মদত না দিলে মুনাফা হবে কোত্থেকে, আর সহিংস স্টেটাস কো, যুদ্ধপূর্ণ অবস্থানে 'সহ' শব্দটা প্রায় অসহনীয়ই বলা যায়! মাফ করবেন, আপনাকে 'মুখোশধারী' বলে ডেকেছি, কারণ আপনার ঠিক নামটা আমি জানি না। আর আমার মুখোশ খুলে দিলেও নিজের ঠুলি খুলবার হিম্মত বোধহয় নেই আপনার। যতই ধর্মনিরপেক্ষ বলে নিজেদের পরিচিত করাতে চান না কেন, আপনারা আসলে তো বিচ্ছিন্নতাবাদেরই এজেন্ট। আর তা হবে নাই বা কেন— যত হর্তাকর্তাবিধাতাই নিজেদের ভাবুন না কেন, আপনারা নিতান্তই শাখা। নাকি শাখামৃগ বলব? জানেন শাখামৃগ কী? শাখামৃগ মানে হল বাঁদর। বাঁদর যেমন ডুগডুগির তালে তালে নাচে, আপনারাও নাচছেন আপনাদের অদৃশ্য নেতৃত্বের তালে তালে— যারা ঠিক কে, কোন পথে তারা নিয়ে চলেছে আপনাদের, তা আপনাদেরই বোধহয় ঠিক করে জানা নেই!

লিডার চুপ। অল্প অল্প দুলছেন। এরিকের কথা শুনে মুখোশের আড়ালে তাঁর মুখ রাগে লাল হয়েছে কি না বুঝবার কোনও উপায় নেই। পাশের লোক দু'জন দাঁড়িয়ে। হয়তো নির্দেশের অপেক্ষায়।

এরিক বলে চললেন— আপনার নিজেরই ঠিক করে জানা নেই আপনাদের কেন্দ্রীয় কমিটি, যাদের গালভরা নামটা হল 'দ্য গার্জিয়েনস অফ ব্যালেন্স', কি ঠিক বললাম তো?— তারা ঠিক কী চায় না চায়। শুনে রাখুন তবে— অনেক ক'টা বিষয়েরই পক্ষে তাদের অবস্থান, যেগুলোর বিপক্ষে আমি এবং আমার কাজ অস্বস্তি তৈরি করেছে প্রথম থেকেই। রক্ষণশীলতার এজেন্ট তারা, খারাপ অর্থে রক্ষণশীলতা, সেটার জন্য আবার এরা যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়ার মতো হিংস্রও হয়ে উঠতে পারে! পৃথিবীর রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোর অচলায়তনের অচলতা বাঁচিয়ে রাখবার জন্য সত্যিকারের মুখোশ ছাড়াও প্রতীকি মুখোশ পরে এদের সর্বত্র বিচরণ। এর মধ্যে বিশেষ করে দুটো বিষয়ের সঙ্গে আপনাদের নেতারা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। দুটো বিষয়ই কিন্তু আসলে ব্যবসা। এই দুটো বিষয় হ'ল, ধর্ম এবং একটু আগে যেটা বললাম, যুদ্ধ। যারা হিটলারকে এক রকম আদর্শই মানে, তারা আবার ধর্মীয় মৌলবাদ মুছে ফেলে সাধু সাজতে চায়! এতো কাঁঠালের আমসত্ত্ব কিংবা সোনার পাথরবাটি! শুনুন মুখোশধারীরা, জিজ্ঞেস করে নিন আপনাদের নিওনাৎসি প্রভুদের, জিজ্ঞেস করুন অশীতিপর সেই ব্যারন হিমলার ডি'লরেন্সকে— ইহুদি নির্যাতনই আপনাদের আসল শংসাপত্র কি না! আমি বলছি শুনে নিন— আগেও তাই ছিল, এখনও তাই।

—রাব্বিশ! অ্যাবসোলিউটলি বোগাস!

একথা বলে গর্জে উঠলেও লিডার মশাইকেই এখন একটু কোণঠাসা বলে মনে হয়। ঠিক এই ধরনের কথা হয়তো বন্দির মুখে তিনি শুনবেন বলে ভাবেননি। তবুও পরিস্থিতিটার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে বলে ওঠেন—

মি. দত্ত, আপনার কষ্টকল্পিত অনুমান সঠিক নয়। আমরা যারা কাজ করছি এখানে সবাই একটা আদর্শ নিয়েই চলছি। হিটলার নয়, ধরুন আমার আদর্শ হলেন কামাল আতাতুর্ক। আমি যুদ্ধবাদী নই। কিন্তু মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধ তো কামাল পাশাও করেছেন, নেতাজিও করেছেন— করেননি? আর যুদ্ধ আর বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বড় বড় কথা আপনার মুখে মানায় না এরিক দত্ত। আপনার দানিকেন-ঝাঁপা গবেষণার কথা বলছি না। কিন্তু আপনার গোপন চেহারাটা? আপনি আপনার গবেষণার আড়ালে যে সমস্ত বিদেশি গুপ্তসমিতির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা নিয়মিত চালাচ্ছেন, বা যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন, হলফ করে বলতে পারবেন তাঁরা কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী নন? কারও কোনও যুদ্ধ বা ধর্মবিভাজনের অ্যজেন্ডা নেই বা কোনওকালে ছিল না? আমি বলছি আছে। আলবাত আছে! আমরা যদি দোষী হয়ে থাকি, আপনিও সমান দোষী!

—এই তো! চমৎকার। 'We are on the same boat brother'! —বলে এরিক দত্ত খানিকটা হাসলেন। হেসে বললেন— তা হলে এক যাত্রায় আর পৃথক ফল হয় কেন? আমার মুখোশ খোলা হল, আপনার মুখোশটাও খোলা হোক। আসুন চোখে চোখ রেখে আপনাকে বলি— আপনার আরাধ্য কামাল পাশাকেও কিন্তু সব ব্যাপারে ক্লিনচিট দেওয়া যাবে না। কামাল পাশার সরকারও বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমেতকে বন্দি করেছিল। আবার এটা বললাম বলে ভাববেন না আমি কমিউনিস্ট লাইনে বলছি। আমি যদি বলি অস্বস্তিকর বুদ্ধিজীবীদের ধরে ধরে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠাতেন স্তালিন— কমিউনিস্টরা বিলক্ষণ চটবেন। কিন্তু আমার তো কোনও আনুগত্য নেই বিশেষ কারও প্রতি। আপনার আছে। আপনি সহিংস স্বৈরতন্ত্রে বিশ্বাসী। কী জবাব দেবেন এগুলোর আপনি! জবাব দিতে হলে তো মুখোশটা খুলতে হবে। এখন মনে হচ্ছে সেটা আপনি পারবেন না। কারণ আপনার মুখে একটা ভোকাল ফিল্টার লাগানো আছে। ছোটখাটো সিন্থেসিস ঘটে নকল গলা বেরোচ্ছে। সেক্ষেত্রে আজকের সন্ধ্যার এই খোশগল্পের মেজাজটা, আড্ডার আমেজটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি একটা ছোট্ট 'অনুমতি' চাইছি। একটু হাতটা খুলে দিন না প্লিছ। বলুন তো, পিছমোড়া করে হাত বেঁধে আড্ডা দিলে কি গপ্প করাটা জমে? না একটা সিগারেট খাওয়া যায়? পারমিশন চাইছি— একটা সিগারেট খাওয়াবেন মি.— কী যেন নাম আপনার— ওহ! মনে পড়েছে— মি. বিদ্যুৎ পাইন?

ব্রহ্ম ঠাকুর এরিক দত্তের কথা তুলেই কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন চোখ বুজে। ডাক্তারের রকিং চেয়ারে বসে আশ্চর্য উশখুশ করছিল— বুড়ো মানুষ, ঘুমিয়ে পড়লেন না তো? সে ডাকবে কি ডাকবে না ভাবছিল, এমন সময়েই ব্রহ্ম চোখ খুলে কড়িবরগার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন—

যে গোপন সংস্থার কথা বলছিলাম, তার আন্তর্জাতিক শাখা থেকে আমাদের জানানো হল এরিক দত্ত লোকটা বিপজ্জনক। লোকটা রাজনৈতিকভাবে আমাদের ঠিক উলটোদিকে ছিল। মানে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য দার্শনিক, গবেষক, বিজ্ঞানী এবং নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিল, যাদের আমাদের সংস্থা ক্ষতিকর এলিমেন্ট, ব্রাত্যজন বলে মনে করত। গোপনে গোপনে এরিকও একটা সংগঠন তৈরি করতে চাইছিল। যে গবেষণাটা বাইরে প্রকাশ করেছিল সেটা ছিল বাইরের মোড়ক। আমরা লক্ষ করছিলাম, পৃথিবীর ক্ষমতার ভরকেন্দ্র হয়ে উঠতে চাইছে যে ক'জন, তাদের মধ্যে ও ছিল। অর্থাৎ আমাদের দলের সরাসরি প্রতিপক্ষ। আমরা লোকটার চরিত্রহননে নামলাম। এরিকের পেছনে লাগলাম সক্রিয়ভাবে।

প্রথমে খবরের কাগজে হেডলাইনে খিস্তিখাস্তা, 'সংস্কৃতি মঞ্চ' বলে একটা মৌলবাদী সংগঠনকে ওর বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়া, এছাড়াও কিছু ভাড়াটে লোক লাগিয়ে হুজ্জুতি, আর এসবের ফলে ঘটা অসতর্কতা ও বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে সটান ওর বাড়িতে ঢুকে ইনজেকশনের খোঁচা। এ সবই আমাদের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের নীল নকশা করে দেওয়া। জ্ঞান ফিরে এরিক দত্ত দেখল— কী দেখল জানো?

ড: ব্রহ্ম ঠাকুর এতক্ষণ ধরে লম্বা পা-তোলা চেয়ারটায় শুয়ে শুয়ে কথা বলছিলেন। বলবার ভঙ্গিটি ছিল সিরিয়াস। এবার হঠাৎ তাঁকে যেন আলগা রসিকতায় পেল। শোওয়া চেয়ারটায় উঠে বসে খোলা গলায় গান ধরলেন—

আহা ব্রহ্মা পাগল বিষু পাগল গো

আরেক পাগল না দেয় ধরা

কৈলাসের শিব পাগল খেয়ে পাগল

সার করেছে ভাঙ ধুতুরা!

—হুঁ হুঁ বাছাধন! ধরা দেবে না মানে? ধরা তো দিতেই হবে। এই গল্পটা বারমুডা ট্রায়াঙ্গল প্রকল্পের গল্প। ট্রায়াঙ্গল শব্দটা লক্ষ করেছ তো আশ্চর্য! ট্রায়াঙ্গলের তিন কোণে আছে ব্রহ্মা মানে ব্রহ্ম ঠাকুর স্বয়ং, বিষু— তা হতভাগা এরিককে তুমি বিষু বলতেই পারো। বাকি রইলেন মহেশ্বর। তিনি কিনি— সে ব্যাপারে পরে আসছি। আমাদের গল্পে ধরা তিনি পড়বেন না মানে? নির্ঘাত পড়বেন! আলবাত পড়বেন। আপাতত দুষ্টুমিষ্টি এরিক দত্ত ধরা পড়বার পর কী হল বলি শোনো!

ওহোঃ সে কী মজার কাণ্ড। হাত পা বাঁধা এরিক যা দেখল, যা বলল, যা শুনল সব যেন ভয়ংকর চমৎকার একটা গুছনো স্ক্রিপ্টের লেখা। সে দিনের কথা ভাবলেই হাত পা ছুড়ে আমার ডিগবাজি খেতে ইচ্ছে করছে। তবে ফিটনেস এখন কমে গেছে, হাঁটুতে ব্যথা। তাই ওটা থাক। শুকনো গল্পই হোক। শুনলেই বুঝবে—এরিক ব্যাটা সেদিন ভালই ঢিট হয়েছিল! আশ্চর্য, একটু কফি খাবে নাকি? না না— ভয় পেও না। আজ আর কোনও ওষুধ মেশাবার দরকার পড়বে না তোমার কফিতে! নাকি মিশিয়ে দেব একটু? তোমার চয়েস!

ব্রহ্ম ঠাকুর চট করে উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা ছোট সাইজের কফিমেকারে কফি বানিয়ে ফেললেন। অনেক রঙের কালেকশন থেকে বেছে বেছে নীল রঙের একটা কফিমাগ আশ্চর্যকে ধরিয়ে বললেন— চলো আশ্চর্য, একটু ছাদে যাই। বাকি গল্পটা খোলা হাওয়ায় হোক। নেচে নেচে হোক। এই ঘরে ভাল করে নাচা যাবে না— বড্ড গুমোট। ছাদে নাচব! তোমারও তো চাঁদনি রাতে বিশেষ কীসব যোগাযোগ হয়-টয়! আজ তো পূর্ণিমা। দেখা যাক নিশাচরী ফিরে আসেন কি আসেন না! তিনি এলে তিনিও নাচে যোগ দেবেন— নাচ হল সেলিব্রেশন। হায়েস্ট লেভেল অফ অল সেলিব্রেশনস!

ছাদে এসেই ওরা দু'জন দেখল আকাশে ভারী চমৎকার টুকরো টুকরো মেঘ। একটা মেঘ দারুণ দেখতে। দু'জনেই সেই মেঘটার দিকে তাকিয়ে ছিল— এমন সময় মেঘটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা এরোপ্লেন।

ব্রহ্ম ঠাকুর ফিসফিস করে বললেন— মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ করতেন বলেই মেঘনাদকে কেউ হারাতে পারত না। অনেক সময় 'কী দেখলাম'-এর থেকেও বড় হয়ে ওঠে 'কী দেখলাম না'। যেমন আমাদের দু'জনেরই মনে হল এরোপ্লেনটা মেঘের ভেতরেই ছিল। তাই না? কিন্তু কেন? কারণ আমরা তো দেখিনি আগেই কখন এরোপ্লেনটা ঢুকে পড়েছিল মেঘটার ভেতরে। সেটা দেখলে আমরা আর অবাক হতাম না। কখনও কখনও আগেই সব বন্দোবস্ত করা থাকে। আর পরে যেটা হয়, সেটাকে বলে এগজিকিউশন। অথবা বলতে পার— অপারেশন!

একটু থেমে ব্রহ্ম ঠাকুর চোখ ছোটোছোটো করে হাসি মুখে বললেন— এই নাও ক্লু। ওই এরোপ্লেনটাই হল তোমার ক্লু। এরপর যা ঘটবে তার মূলে আছে ওই এরোপ্লেনটাই, 'লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার'— ওই কাণ্ডারীও একজন এরোপ্লেন যাত্রী। এবার বল তো দেখি আশ্চর্যবাবু— সিনেমার পরবর্তী দৃশ্যে ঠিক কী কী ঘটিতে চলিয়াছে?

এই বলে তিনি আশ্চর্যের কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিলেন। তার এক হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে হুঁ হুঁ করে ওয়ল্টছ-এর তালে 'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার'-এর সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ধীরছন্দে নাচতে শুরু করলেন। মনে হল এই খোলা ছাদই এখন তাঁর বলরুম।

এরিকের হাতগুলো মুক্ত করে দেওয়া হল। জুগিয়ে দেওয়া হল এক শ্বেতশুভ্র সিগারেট। এরিক আরাম করে 'আহ' বলে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর কথা বলা শুরু করলেন।

—সিগারেটটা পেয়েইছি যখন, তখন এর বিনিময়ে কিছু কথা বলি। আপনি একটা আন্তর্জাতিক পেশাদারি গুপ্তচরসমিতি এবং যুদ্ধদালালদের সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করছেন এই আলোচনায়, তবুও আপনাকে বলি। আপনি যে উদ্দেশ্যে আমায় এখানে এনেছেন তা সফল হবে না। কারণ আমি যা করছি তার কথা আপনারা যতটুকু জেনেছেন, ততটুকুতেই আটকে থাকবেন। আমার গবেষণা শুভঙ্কর। আমি সেসব ব্যাপারে আপনার কর্তৃপক্ষকে কিছুই বলতে রাজি নই। বরং আপনাকে উলটো কথা বলব। সৎ সাহস থাকলে ছেড়ে দিন এদের দাসত্ব। চলে আসুন আমার সঙ্গে। ভাই, আশেপাশে যাঁরা সঙ সেজে দাঁড়িয়ে আছেন, আপনারাও আসুন। আমি খোলাখুলি বলছি, আপনারা বিপদের ঊর্ধ্বে নন। এই যে ভাবছেন লুকিয়ে আছেন— পারছেন থোড়াই! আমি তো ঠিকই ধরে ফেলতে পারছি, আপনারা হলেন 'দ্য হিডেন ব্যালেন্স'-এর লোকাল অর্বাচীন ব্রাঞ্চ 'ব্যালেন্সকিপারস'এর দল! কী লাভ হবে এই ছোটমাপের অস্তিত্বে? কিছু করতে পারবেন? ধুস— শুধু কাঁচকলাই বেচবেন, রথ দেখা আর ইহজীবনে হবে না! শুনুন ভাই— আমাদের সব্বার ব্যক্তিজীবনই তো অতি নগণ্য, তুচ্ছ। আসুন, মনটাকে একটু উদার করি।

আপনাদের আজ ইন্টারেস্টিং কয়েকটা সূত্র দিতে চাই। কয়েকটি ঐতিহাসিক জটিলতা এবং আধিভৌতিক ধাঁধায় আসি— যেগুলো নিয়ে আমার কারবার। একটু ভেবে দেখুন না, আমায় সমাধান পেতে সাহায্য করুন একটু! বলুন তো, জন এফ কেনেডিকে খুন করেছিল কে? আচ্ছা, জেএফকে নিয়ে তো অনেক আলোচনা হয়েইছে, আজ বরং তাঁর ভাই ববির কথাই বলি। ববি কেনেডিকে ক্ষমতায় আসতে দিল না কারা, কী উদ্দেশ্যে? জানেন, ববির কী রকম জনপ্রিয়তা ছিল? তিনি যখন রাজনৈতিক প্রচারসফরে বেরোতেন, তখন গাড়ির কিনারে দাঁড়িয়ে তাঁকে রাস্তার ধারে দাঁড়ানো প্রত্যেকের সঙ্গে করমর্দন, চুম্বন করে যেতে হত। গাড়ির ওপরে, তাঁর কোমর ধরে তাঁকে টেনে রাখতেন দেহরক্ষী। এমন লোকটাকেও তো খুন করা হল প্রকাশ্যে। তাঁর দাদার ক্ষেত্রে বলির পাঁঠা করা হয়েছিল লি হার্ভি অসওয়াল্ডকে, রীতিমত ছক কষে। পরের প্রেসিডেন্ট জনসন এ ব্যাপারে কি যুক্ত নন? আমি যদি প্রমাণ দিই আপনাদের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাও জড়িয়ে ছিলেন এই ঘটনাটার সঙ্গে? আমি আরও অনেক ঘটনা জানি, বলতে পারি। আমার গবেষণা এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রগুলোর মুখোশ খুলবে, আর যেসব সংস্থা এগুলো ধামাচাপা দিয়ে রাখবার কাজ রীতিমতন পেশাদারি ভাবে করছে, যেমন আপনাদের বস-এরা, তারা অসুবিধেয় পড়বেই। আসলে বিদ্যুৎবাবু, মাফ চাইছি, সিন্থেসাইছড গমগমে গলাটার আড়ালে আপনার আসল গলাটা চিনে ফেলেছি বলে, কেনেডিরা বেঁচে থাকলে কিন্তু ইতিহাস অন্য খাতে বইত। রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোকে নিয়মিত স্পনসর করেন যে সব যুদ্ধব্যবসায়ীরা, যুদ্ধ মুলতুবির স্বাধীনতা অর্জিত হলে তাদের কী লাভ? লোকসান মশাই, লোকসান। কোটি কোটি ডলারের বার্ষিক লোকসান। যুদ্ধের এক সীমান্তে দাঁড়িয়ে যেমন জাতীয়তাবাদ আর ধর্মের কাঁটাতার, অন্য সীমান্তে তেমনই ঢাল-তলোয়ার-আণবিক বোমা-রাসায়নিক গ্যাস-জীবাণু অস্ত্রের ঢালাও বিকিকিনি।

ঠিক এই পর্যন্ত শুনেই মারমুখী ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন উগ্রবাদী লিডার। উদ্ধতভাবে বলে উঠলেন— আপনি তো যুদ্ধব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। সেল্ফ-প্রোক্লেইমড গান্ধিবাবা! অথচ অস্বীকার করতে পারবেন কি, গোপনে গোপনে যোগাযোগ করেছেন ইউরোপের, আমেরিকার সেইসমস্ত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে, যাঁরা কখনও না কখনও যুক্ত ছিলেন পরমাণু বোমার গবেষণায়? এঁদের ইনভলভমেন্টই তো তেজস্ক্রিয়তাকে বরাবর প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে! এঁদেরকে ছলে-বলে-কৌশলে কাজে লাগিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি। আপনি স্বেচ্ছায় পা দিয়েছেন এঁদেরই ফাঁদে, একথা জেনেবুঝে যে আপনার এই যোগাযোগ কোনও দেশেরই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে অনুকূল নয়। আপনি তো দেশদ্রোহী। সে আমি জার্মানি বা ভারত যে দিক থেকেই দেখি না কেন!

আগাগোড়াই মুখে হাসিটা ধরে রেখেছিলেন এরিক দত্ত। এবার আর থাকতে না পেরে হা হা করে হেসে উঠলেন। বললেন—

বুঝেছি, বুঝেছি। কেনেডির গল্পটা ভাল লাগেনি— ডেটেড বলে মনে হয়েছে। তাহলে বরং আইসল্যান্ডের হুসাভিক শহরের সেই কুখ্যাত হোটেলের গল্প বলি। হোটেলটা তো ভালই, পর্যটন মরশুমে আকাশে মহাজাগতিক আলোকছটা দেখতে লোকের অভাব হয় না ওই শহরে। হোটেলটিও মোটামুটি পূর্ণ থাকে। কিন্তু একটা ঘরের গল্প অন্য। সেই ঘরটা পারতপক্ষে কোনও পর্যটককেই দেওয়া হয় না। একবার হয়েছে কী, অন্য সব ঘরগুলো ভরতি, ম্যানেজার নতুন কেউ, ভুল করে ঘর দিয়ে দেওয়া হল একজন পর্যটককে। তিনি একা। মাঝরাতে তাঁর হঠাৎ মনে হল, বিছানাটা যেন আচমকা নড়ে উঠল...

—আপনি রাখুন আপনার আষাঢ়ে গল্প! —এতক্ষণে ধৈর্য হারিয়ে উঠে দাঁড়ালেন মুখোশধারী। তাঁর ইঙ্গিতে, এরিকের হাত পিছনে পেঁচিয়ে চেয়ারটার সঙ্গেই এবার বেঁধে দেওয়া হল। মুখোশধারী চিৎকার করে বলতে থাকলেন— আমরা জানি, যুবাবয়সে জার্মানি থেকে আপনি ঘোঁট পাকিয়েছেন ইউরোপের এখানে সেখানে। গোটা ইউরোপ জুড়ে কিছু গবেষক এবং বিজ্ঞানীর নিন্দনীয় যোগদান রয়েছে কিছু নিষিদ্ধ কাল্ট-এ। আপনি তো দানিকেনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, যখন জোচ্চোর লোকটা জেলের বাইরে ছিল। এমনকী আপনার এত বড় সাহস, স্টিফেন হকিং-এর অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়ে আপনি চিঠি অব্দি লিখেছিলেন! বলা বাহুল্য, হকিং আপনাকে পাত্তা দেননি। যাই হোক—

কী যেন মনে পড়ে গেছে ভাব দেখিয়ে ঘড়ি দেখলেন গুন্ডা সর্দার। তারপর বললেন— আমার একটু তাড়া আছে। বাকি কথা আগামীকালই হোক। আপনার মুখের ঘোমটা খুলে দেওয়া হয়েছে। একলা ঘরে যত খুশি চেঁচান, কেউ আসবে না। খাবারের বা জলের বন্দোবস্ত নেই, স্যরি, একটু কষ্ট করতে হবে। একটা রাতের ব্যাপার তো। কাল দেখা হবে। শুভরাত্রি!

মুখোশধারী বিদ্যুৎ পাইনের সঙ্গে এরিক আসলে একটা খেলা খেলছেন। সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক খেলা। সেই খেলাটা এমনভাবে হুট করে তিনি মোটেই শেষ করে দিতে চান না। বরঞ্চ এই তো সবে খেলাটা জমে উঠেছে! তাঁর আরও কয়েকটা তাস ফেলা বাকি।

অতএব এরিক যেন ভীষণ মজা পেয়েছেন এমন ভাব করে বলে উঠলেন— আহাহা চটছেন কেন? আসলে সব ভূতের গল্পই ভূতের গল্প নয়। আপনাকে একদম আসল কথাটা এইবার বলছি। আর হাবিজাবি নয়, বিশ্বাস করুন, এটাই আসল গল্প। আগেরগুলো বোগাস! গল্পটা হল— চার্লি চ্যাপলিনের ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এক নির্বাক ছবি 'সার্কাস'-এ হঠাৎ দেখা গেল রাস্তায় এক ভদ্রলোক কানে একটা যন্ত্র চেপে ধরে হাঁটছেন! ব্যাপারটা এমন যেন লোকটি ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটছেন, অথচ রাস্তায় কথা বলতে বলতে হাঁটা যাবে এমন কোনও যন্ত্র তো তখন কেন, এখনও মানে এই ১৯৭৬এও আবিষ্কার হয়নি! সারা বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা, আবিষ্কারকেরা নড়েচড়ে বসলেন। কেউ কেউ শুরু করে দিলেন এরকম যন্ত্র বা 'মোবাইল ফোন' তৈরি করবার চেষ্টা। তেমন টেলিফোন নিশ্চয়ই তৈরি হবে, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরা নিজেরাই তা ব্যবহার করব! কিন্তু অন্য আরেকদল বিজ্ঞানী কিচ্ছু করলেন না। তাঁরা গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসলেন: ১৯২৮ সালে ভবিষ্যৎ-মানুষের যন্ত্র— 'হাতে নিয়ে হাঁটবার টেলিফোন' এল কোত্থেকে? তারপর তাঁরা শুরু করলেন নানা রকমের অঙ্ক কষা, সম্ভাবনার অঙ্ক। আমার কাছে এই দ্বিতীয় দল বিজ্ঞানীর ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যাঁরা করছেন কম, ভাবছেন বেশি। তবে অঙ্ক কষছেন। তার কারণ আমি বিশ্বাস করি 'ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।' এবং 'ভাবিয়া'-র মধ্যে 'হিসেব কষিয়া'-ও জুড়ে দেওয়া যায়। যাদের অসতর্ক পদক্ষেপে যুদ্ধ বাঁধে, যুদ্ধ চলতে থাকে, তাদের জন্যও এই কথাটা যথার্থ। ভাইয়েরা, আপনারা সবাই শুনছেন তো? এই একটু আগে আপনাদের এই নেতা যাঁর নাম বললেন, সেই স্টিফেন হকিংকেও প্রশ্নটা করা হয়েছিল— ১৯২৮ সালে আমেরিকার রাস্তায় এরকম একটা ভবিষ্যতের যন্ত্র কী করে দেখা গেল? তাহলে কি মোবাইল ফোন হাতে ওই ব্যক্তি ছিল এক সময়-অভিযাত্রী?

এ পর্যন্ত শুনেই কোনও জবাব না দিয়ে লিডার এবং তাঁর সঙ্গীরা ঘর বন্ধ করে বেরিয়ে গেলেন বাইরে। বাতিটিও বাইরে থেকে নিভিয়ে দেওয়া হল। এরিক ভাবলেন, ভালই হল। বাতি বন্ধ থাকলে কনসেনট্রেট করতে কোনও অসুবিধে হবে না। এই পরিস্থিতিতে তাঁর পরবর্তী কাজগুলো মনের মধ্যে সাজিয়ে নিতে একটু মনসংযোগ করারই প্রয়োজন।

*****

লোকগুলোর পদধ্বনি অনেকক্ষণ মিলিয়ে গেছে। এরিক দত্ত তাঁর বন্ধনযুক্ত পা দু'খানি চেয়ারের তলা দিয়ে যতখানি সম্ভব হয় বাঁকালেন। ঘরের এক কোণায় তাঁকে বসানোয় সুবিধেই হয়েছে। পা বাঁকিয়ে তিনি দেওয়াল স্পর্শ করতে পারছেন। তিনি বুঝলেন ঠান্ডা মাথায় পরবর্তী অ্যাকশন শুরু করবার সময় আসছে। এরিক চোখ বুজলেন ছক কষে নিতে।

এরিক জানেন চেয়ারটা শক্তপোক্ত নয় এবং চেয়ারের পেছনের পিঠের সাপোর্টের সঙ্গে তাঁর হাতদুটো বাঁধা রয়েছে। চেয়ার ভাঙলে তাঁর হাতও মুক্ত হবে। বাঁধা পা দুটো চেয়ারের তলা দিয়ে যথাসম্ভব বেঁকিয়ে এরিক চেষ্টা করছেন দেওয়ালে চাড় দিয়ে চেয়ারটাকে মাটিতে ফেলতে। এখনও দেওয়াল ছুঁতে পারেনি তাঁর পা। মাথাটা ডানদিকে হেলিয়ে এরিক চেষ্টা করছেন যদি দড়াম করে চেয়ারসমেত পড়ে যাওয়া যায়...

অনেকক্ষণ চেষ্টা করবার পর ব্যাপারটা হল। তবে এভাবে পড়ার ফলে এরিক ডানহাতে ব্যথা পেলেন। কিন্তু সে ব্যথা সহনীয়, কারণ এরিক জানেন পেশিকে কখন শিথিল করে নিতে হয়, কখন প্রশ্বাস টানতে হয় বা নিশ্বাস ছাড়তে হয়। ঘরের এক কোণে থাকায়, এভাবে পড়ায় তাঁর পা চলে এল একটা দেওয়ালের নাগালে। পা দিয়ে দেওয়ালে চাড় দিয়ে আবার চেয়ারটাকে সোজা করে নিতে পারলেন তিনি।

চেষ্টা করেকরে এরিক চেয়ারখানাকে সঙ্গে নিয়ে ডানদিক-বাঁদিক দু'দিকেই পড়েছেন বেশ কয়েকবার। খানিক যন্ত্রণা তো হচ্ছেই এর ফলে। তবে আনন্দের বিষয়টা হল, হাতের বাঁধনসমেত চেয়ারের পিঠের সাপোর্টটা এখন চেয়ারের নীচের অংশটা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। হাতের বাঁধন আলগা হয়েছে, খোলেনি। এবার একটু টানাটানি করলেই বাঁধন খুলতে পারবেন। এমনটা ভাবতে ভাবতেই এরিক শুনতে পেলেন পায়ের শব্দ। সিঁড়ি বেয়ে কেউ যেন ওপরে উঠে আসছে। বুঝলেন, নীচে কোনও রাতের পাহারাদার ছিল। এরিকের এতবার পড়ে যাওয়ার শব্দ তাকে কৌতূহলী করে তুলেছে।

দমবন্ধ উত্তেজনায় অন্ধকারে অপেক্ষা করতে থাকেন এরিক। তাঁর কান সজাগ থাকে বন্ধ দরজাটার দিকে। যে কোনও মুহূর্তে দরজাটা খুলে যাবে। তখন হয় এসপার, নয় ওসপার।

ছাদে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন দুই অসমবয়সি বন্ধু। হঠাৎ নীচে সদর দরজায় দুম দুম করে শব্দ হল। কয়েকটা টোকাও পড়ল তারপর। পুরো ব্যাপারটাই যেন একরকমের মর্স কোড।

আশ্চর্যর মনে হল— ব্রহ্ম ঠাকুরের সমস্ত মনোযোগ শব্দটার দিকে ঘুরে গেল। হঠাৎ তিনি শিকারদর্শী চিতাবাঘের মতো অনড় হয়ে পড়লেন। শব্দটা কি আবার হবে?

হ্যাঁ। ওই যে আবার। একই প্যাটার্নের শব্দ আবার হতেই তিনি শশব্যস্ত হয়ে আশ্চর্যকে বললেন— আমাকে দরজাটা খুলতেই হবে। যদি প্রাণে বাঁচতে চাও তো লুকিয়ে পড়ো। যে এসেছে সে যেন তোমায় দেখতে না পায়। আবার বলছি, এক্ষুনি লুকোও!— এইটুকু বলেই দুদ্দাড় করে ব্রহ্ম ঠাকুর নীচে নেমে গেলেন। পিছনে তাকিয়ে দেখবার ফুরসত তাঁর আর ছিল না।

এবার একটু আগে এই দু'জনের মধ্যে কী কথা হয়েছিল তা বলে রাখা দরকার। ব্রহ্ম ঠাকুর সন্ধ্যার আকাশে হঠাৎ বাড়তে থাকা মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন— বন্দি হয়ে এরিক ঠিকই আন্দাজ করেছিল, অথবা আন্দাজ করবার চমৎকার ভাণ করেছিল, কারণ সে তো আগে থেকেই জানত, তার সঙ্গে ওই বন্ধ ঘরে কথোপকথন চালাচ্ছে 'ব্যালেন্সকিপার'-দের যে নেতা, সে আমিই। আমার মুখোশের নীচে মুখে আটকানো ছিল ভয়েস ফিল্টার। বন্দিকে ইন্টারোগেট করবার সময়ে আমাদের চেহারা দেখানোর নিয়ম ছিল না, নিজের গলা শোনাবারও না। আসলে, এরিক দত্ত সম্পর্কিত সব কাজকর্মের ভার আমার উপরই ন্যস্ত ছিল। এরিক বিশেষ ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি, সে জন্যই হয়তো এই ব্যবস্থা। এটা হত না, যদি ওরা— মানে আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আঁচ করতে পারত, এরিক দত্তর সঙ্গে আমার পুরনো আলাপ কতটা গভীর।

ব্রহ্ম ঠাকুর রসিয়েকষিয়ে গল্প বলতে জানেন। এ'টুকু বলেই তিনি আড় চোখে তাকিয়ে দেখেছিলেন— কাহিনিতে অপ্রত্যাশিত একটা মোচড়ের অভিঘাতে আশ্চর্য কতটা বিচলিত হয়ে উঠেছে!

ওর এই অবাকদশাটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফির কাপে চোঁ করে শেষ চুমুকটা মেরে ব্রহ্ম বলেছিলেন—

তুমি বুদ্ধিমান ছেলে আশ্চর্য! তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ করে থাকবে যে ইন্টারোগেশনের প্রথম থেকেই আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এরিককে কিছু না কিছু সুবিধে পাইয়ে দিতে থাকি। ওকে প্রথমে বসানো হয়েছিল ঘরের মাঝখানে, আমিই চেয়ারটা দেওয়ালের কাছে নিয়ে যাই, যাতে সে পা দুটো দিয়ে দেওয়াল ছুঁতে পারে। মাথার থলেমার্কা মুখোশ পরা থেকে আমিই ওকে অব্যাহতি দিই, যদিও এটা সত্যি যে, ওই মুখোশ ছুরি দিয়ে একবার কেটে ফেলবার পরে আবার জোগাড় করাটা মুশকিল। একবার যেন হঠাৎ রেগে উঠে হঠকারী হয়েই পিছমোড়া করে তার হাত চেয়ারের পিঠের সাপোর্টের সঙ্গে বেঁধে দিতে বলি। সেসময় ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক লেগেছিল, এটা যে কত বড় নাটক তা কেউই বোঝেনি। তুমি তো বুঝতেই পেরেছ নিশ্চয়ই, ওটা করেছিলাম যাতে এরিক ওটার সাহায্যে চেয়ারটাই শেষমেষ ভাঙতে পারে। কষ্ট করে পারলেও এরিক তা পারবে জানতাম, এরিক গোপনে কী ট্রেইনিং নিয়ে এসেছে আর নিয়মিত কতটা শরীরচর্চা করে তা আমার অজানা ছিল না। আরেকটা ব্যাপার— এটা বড় ব্যাপার— ঘরে বন্ধ থাকা একটা লোকের পাহারায় আমি দু'জনের বেশি নৈশরক্ষী রাখিনি ওই বাড়িতে। আমি মনে মনে জানতাম এরিক দু'জনের মহড়া ঠিকই নিতে পারবে। অবশ্য ও যা ডাকাবুকো— ওকে বললে হয়তো বলত— সংখ্যার তোয়াক্কা সে করে না।

হতবাক আশ্চর্য বাধা দিয়ে বলেছিল— আমি কিছুই বুঝছি না। কিচ্ছু বুঝছি না। আপনিই এরিকবাবুর চরিত্রহনন করবেন, আপনিই কিডন্যাপ করবেন, আবার আপনিই পালাবার ব্যবস্থা করবেন? এটা কী হচ্ছে কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না! ঢপ মারছেন না তো?

—সে কী! তোমায় যে একটু আগেই এত চমৎকার সূত্র দিলাম? বললাম, এরোপ্লেন কখন মেঘের মধ্যে ঢুকল তা জানলে বেরনোর সময় অবাক লাগত না! তোমায় তো এও বলেছিলাম এরিকের সঙ্গে আমার পরিচয় গুপ্ত সমিতিতে যোগ দেওয়ার আগেই, যখন নিজেকে এখানে সদ্য প্রতিষ্ঠিত করছি। খেয়াল করনি বুঝি? এ হে হে হে! —ব্রহ্ম ঠাকুর দুঃখিত হওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। চুক চুক করে আক্ষেপসূচক শব্দ করলেন।

—তাহলে শোনো। তখন আমি মনোরোগের চিকিৎসক। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড:... না, সে নামটা এখন না-ই বা জানলে! একদিন আমার চেম্বারে আধপাগলা একটা লোক এল। সব সময় তিতকুটে রসিকতা করে চলেছে, আর নিজের রসিকতায় নিজেই হ্যাঃ হ্যাঃ করে হাসছে। আমি বুঝলাম লোকটা ডিপ্রেশনের অন্য স্তরে আছে। ভয়ানক স্তর। এসব রসিকতা আর হাসি জোর করে তৈরি করছে ওর মনের সেল্ফডিফেন্স। কথা বলে জানলাম লোকটার খ্যাপাটে গবেষণার খামখেয়ালিপনায় বিরক্ত হয়ে ওর স্ত্রী ওদের শিশুপুত্রকে নিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। কোথায় যে গেছে কেউ জানে না। লোকটা সারারাত একটা টেলিস্কোপ চোখে লাগিয়ে আকাশের তারা দেখে। প্রচুর লেখে আর সেসব লেখা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে কাগজের কুচিগুলো দিয়ে যত্ন করে বাড়ি সাজায়। আধপাগল না পুরো পাগল? আমি প্রথমেই লোকটার বিপর্যস্ত স্নায়ুকে ঠান্ডা করতে কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ দিলাম।

এরিকের বই তখনও বেরোয়নি। অর্থাৎ দানিকেনের গুলি খাওয়ার ব্যাপারটায় সে প্রত্যক্ষদর্শী থাকলেও, জনমত আদায় করা জনপ্রিয় 'এরিক দত্ত', কিছু সংগঠনের রিয়েল থ্রেট 'এরিক দত্ত'— সে তখনও হয়ে ওঠেনি। আমার চিকিৎসায় সে সাড়া দিল। মন শক্ত করে গবেষণায় ফিরে গেল। এদিকে আমিও পরিচয় বদলে গুপ্ত সমিতিতে যোগ দিলাম।

এটা বলবার পর ব্রহ্ম ঠাকুর খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মুখে খেলা করে গেল একটা বলব কি বলব না-র দ্বিধা।

১০

খানিকক্ষণ চুপ করে থাকবার পর, মাথা হেঁট করে ড: ব্রহ্ম ঠাকুর প্রায় বিড়বিড় করেই বললেন— ভুল তো মানুষমাত্রই করে। আমিও করেছি। তার জন্য সবচেয়ে বড় খেসারত আমাকেই দিতে হয়েছে, হচ্ছে। পেয়েছি একটা সন্দেহপ্রবণ জীবন, আতঙ্কগ্রস্ত বাঁচা। আজ স্বীকার করতে আর দ্বিধা করব না, শুরুর দিকে আমার হিটলারের পলিসিতে বিরাট কিছু আপত্তি ছিল না। সবটা না হলেও হিটলারের কিছু জিনিস তো আমার ভালই লাগত। কোনও কোনও হিটলার-আলোচকের মতো আমিও তেমনভাবে পাত্তা দিইনি ইহুদি নির্যাতনের ব্যাপারটা, ওটাকে শুধুমাত্র একটা 'কোল্যাটের্যাল ড্যামেজ' বলে পাশ কাটিয়ে যেতাম। বরং আমি বড় করে দেখছিলাম ফোকাসটা— সর্বশ্রেষ্ঠ হবার ফোকাস, শ্রেষ্ঠ মানব-জিন খুঁজে পাওয়ার, আয়ত্ত করবার ইচ্ছেটাকে গুরুত্ব দিচ্ছিলাম, দেখছিলাম প্রশংসার চোখে। মনে হত, 'বাঘের বাচ্চার'ও একটা ভুল হতে পারে। তাও তো সে বাঘই থাকে!

এরিকই প্রথম আমায় জানায়, যে জাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বানাতে চেয়েছিল হিটলার, সেই জার্মানরা আজ হিটলারের কলঙ্ক কীভাবে লুকোবে বুঝে পায় না। এরিক তো নিজেই জার্মান, জার্মানিতেই তার জন্ম। অবশ্য কলকাতায় যাতায়াত ছিল শৈশব থেকেই। এরিক গল্প শোনাল— এক ভারতীয় টিভি প্রযোজকের অভিজ্ঞতার গল্প। প্রবাসী ভারতীয়দের এক পার্টিতে এরিকের সঙ্গে ভদ্রলোকের দেখা হয়েছিল একবার ফ্রাঙ্কফুর্টে। দোষের মধ্যে ভদ্রলোক ইহুদি অত্যাচারের কেন্দ্র কিছু কনসেনট্রেশন ক্যাম্প দেখতে চেয়েছিলেন, হয়তো ছবিও তুলতে চেয়েছিলেন। অনুমতি চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন টেলিভিশনের যে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি ওখানে গেছিলেন, তার আয়োজকদের। এর ফলে কী হল জানো? সে যাত্রায় তো কর্তৃপক্ষ একেবারে চুপ করে গেলেন, তাঁর সঙ্গে আর কেউ ভাল করে কথাই বলছে না। দেখা হলেই মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে, চোখাচুখি এড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি তো হাঁ! ব্যাপারটা তিনি বুঝলেন পরে। পরবর্তীকালে জার্মান সরকার আর তাঁকে সে দেশে ঢুকতেই দিল না, পাছে তিনি আবার সেই আবদার করেন। এসব কথা এরিক জানতে পারে, কলকাতায় আসবার পরে তাঁর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ায়। কতটা ধিকৃত হিটলার তাঁর নিজের দেশে বুঝতে পারছ? আমি এসব শুনে চমকে গেলাম। তখন এরিক আমায় শোনালো হিটলারের পেছনে লুকনো আসল শয়তান গোয়েবলসের মিথ্যে প্রচারণার কথা। কীভাবে মিথ্যে উস্কানিমূলক খবর ছড়িয়ে শান্তিপ্রিয় পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে খ্যাপানো হয়েছিল সাধারণ জার্মানদের। সেসব শুনে আমার গা গুলিয়ে উঠল। এই— আমার মানসিকতার পরিবর্তন শুরু এখানেই।

হ্যাঁ, আমি প্রয়োজনে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার বিরোধী নই। যদি আখেরে তাদের যোগ্য নেতৃত্ব দেওয়া যায়। কিন্তু তা বলে এই জিনিসটা তো আর মানা যায় না! প্রচার এবং প্রতারণা মিলেমিশে প্রচারণা! অতএব হিটলারে আমার অ্যালার্জি শুরু হল। আমি এবং আমার বন্ধুরা, যারা আম্তর্জাতিক এই গুপ্ত সমিতি 'হিডেন ব্যালেন্স'-এর নজরে পড়েছিলাম, যোগদানও করেছিলাম, তারা কিন্তু শুরুতে একেবারেই বুঝিনি এই সংগঠনের মাথাদের হিটলারপ্রীতির কথা। যখন বুঝলাম তখন আমরা অনেকটাই তাদের জালে জড়িয়ে পড়েছি। আর পিছু হঠবার উপায় নেই।

এরপর যখন মূল আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব থেকে এরিকের বিরুদ্ধে কাজকর্ম করবার নির্দেশ পেলাম, কারণ এরিকের প্রভাব বিদেশ আর এদেশ মিলিয়েই ছিল, বাধ্য হয়ে করতেও শুরু করলাম সেসব কাজ, তখন তা করতে মোটেও ভাল লাগেনি। বুঝেছিলাম বিপ্লবের আদর্শ থেকে পাতি গুন্ডামিতে নেমে যাচ্ছি। কু ক্লাক্স ক্ল্যানের সঙ্গে প্রভেদ আর থাকছে কই? তখন একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তৈরি করবার পরিকল্পনা করতেই হল। এমন একটা স্ক্রিপ্ট বানাতেই হল যাতে এরিকও বাঁচে, আমিও পালাতে পারি। অবশ্য সেটা করা সহজ ছিল না। হিসেব করে দেখলাম যে দরকার হবে একটা ত্রিমুখী ধাক্কার...

এতক্ষণে ব্রহ্মের মুখ উৎফুল্ল হয়ে উঠল। তিনি হাঃ হাঃ করে একটু হেসে বললেন— বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের প্রসঙ্গ দিয়ে আজকের আড্ডা শুরু হয়েছে তো, তাই ত্রিকোণ বারবার ফিরে আসছে গল্পে! যা বলছিলাম— আমি জানতাম একসঙ্গে তিনটে ধাক্কা খেলে 'ব্যালেন্স' দলটার আঞ্চলিক সমিতি বিপর্যস্ত এবং কর্মশক্তিহীন হয়ে পড়বে। তাই খুব সন্তর্পণে আমি আর এরিক, গোপনে গোপনে একটা দুর্ধর্ষ চিত্রনাট্য লিখলাম।

এরিককে 'ব্যালেন্স' কিডন্যাপ করতই। সেটা এড়ানো যেত না। কিডন্যাপ করত উলটো চাপ দেওয়ার জন্য। এরিকের মতো লোকেরা জনআন্দোলন তৈরি করতে পারে। কোথাও গিয়ে যুবমানসকে তারা দেশোত্তীর্ণ করে দিতে পারে। এধরনের মানুষকে দিয়ে যদি উলটো-টা বলিয়ে নেওয়া যায়, ধরা যাক— এরিককে দিয়ে এমন গবেষণা করানো হবে, যার ফলাফল থাকবে 'ব্যালেন্স' দ্বারা পূর্বনির্ধারিত। অন্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, এটাই আসল উদ্দেশ্য— নিজেদের ঘেরাটোপে রেখে এরিককে স্বাভাবিকভাবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিলে, পরমাণু বিজ্ঞানীরা এখন কী ভাবছেন, কী কী নতুন প্রযুক্তি তাঁদের গবেষণাগারে চর্চাধীন, ভিনগ্রহী প্রযুক্তি কোথাও নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে কি না, তা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলছে কি না— এই সবকিছুর খবর গিয়ে পড়বে 'দ্য গার্জিয়েনস অফ ব্যালেন্স'-এর হাতে। তখন চড়া দামে সেই তথ্য বেচাকেনা করা যাবে। ফলে এরিকের বই প্রকাশের পিঠোপিঠি সময়ে, গণ্ডগোল পাকিয়ে ওকে দলে টানবার একটা সুযোগ যারা পেয়েছিল, তারা ওকে ছাড়ত না। আমি আর এরিক তাই এরিকের অবশ্যম্ভাবী কিডন্যাপিংটাকে কেন্দ্রে রেখেই আমাদের পালটা প্ল্যানিং শুরু করি।

আরেকটা প্রশ্ন ছিল আন্তর্জাতিক এক্সপোজারের। 'ব্যালেন্স' আমাকে আগের বছরই চীনে পাঠিয়েছিল, আমার উপর একটা দায়িত্ব দিয়ে। কিন্তু একটুর জন্য আমার সেই 'মিশন-চায়না' সফল হয়নি, ভাগ্য-বিড়ম্বনাই বলতে পার! আমি অবশ্য ফেসরীডিং শিখেছিলাম খানিকটা এক চৈনিক গুরুর কাছে, কিন্তু সেটা আমার ব্যক্তিগত লাভ। দলের নেতৃত্বে ব্যর্থ হয়েছিলাম সুযোগ পেয়েও। ফলে 'ব্যালেন্স'-এর আন্তর্জাতিক লিডারশিপে আমার আসবার সুযোগ ফসকে যায়। এরিক প্রস্তাব দিল— এক 'তরুণতুর্কি' বিজ্ঞানীর সঙ্গে পৃথিবী বদলে দেওয়ার আলোচনায় সে আমায় অংশীদার করতে চায়। এটা তো বিরাট ব্যাপার! সবার জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ আসে না। এটা লুফে না নিয়ে আমার উপায় ছিল না।

কিন্তু তার জন্য দরকার তিনটে জোরালো ধাক্কা। একইসঙ্গে এই তিনটে ধাক্কা দিলে তবেই হয়তো পালানো যাবে। এই তিনটে ধাক্কা হল ১। এরিকের পলায়ন। ২। আমার অন্তর্ধান। ৩। 'দ্য হিডেন ব্যালেন্স'-এর কলকাতা শাখার সাময়িক অবলুপ্তি। —কিন্তু কীভাবে একসঙ্গে হবে এই অসাধ্যসাধন?

১১

একটা আধো-অন্ধকার ঘর। বড় একটা ওভাল শেপড টেবিল আছে সে ঘরে। গোটা দশেক চেয়ার রয়েছে টেবিলটাকে ঘিরে। পেছনের দেওয়াল জুড়ে আছে কয়েকটা ম্যাপ। ওয়র্লড ম্যাপ, ভারতের ম্যাপ, কলকাতার ম্যাপ। ম্যাপের উপরে বেশ কিছু জায়গায় লাল আলো জ্বলছে নিভছে।

এটা 'দ্য হিডেন ব্যালেন্স'-এর কলকাতা শাখার দপ্তর। এখন সন্ধ্যা। একটা আপৎকালীন সভা বসেছে। ব্রহ্ম ঠাকুর বলে একজন পলাতক ডাবল এজেন্টের খোঁজ মিলেছে। তাঁর বাড়িতে হামলা করে তাঁকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অর্থাৎ 'দ্য গার্জিয়েনস অফ ব্যালেন্স'-কে 'অপারেশন ব্রহ্ম ঠাকুর' বিষয়ে এখনই কিছু জানানো হবে না। এটা স্থানীয় লিডাররা অর্থাৎ 'ব্যালেন্সকিপার'রা তাঁদের সারপ্রাইছ গিফট হিসেবে দিতে চান। নইলে এসব অভিযান করা খুব মুশকিল হয়। প্রতি মুহূর্তে আপডেট দিতে দিতে শিকার ফসকে যায়। তা হতে দেওয়া চলবে না।

কী করে পাওয়া গেল ব্রহ্মের ঠিকানা? গল্পটা লম্বা। উত্তর পশ্চিম আমেরিকার সিয়াটেল শহরের বাইরের সীমায় একটা ল্যাবরেটরিতে এক মাস আগে আগুন লাগে। কর্মীদের নিয়েই ল্যাবটা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রথমে মনে করা হয়েছিল কোনও কর্মীই বুঝি বেঁচে নেই। এবং দুর্ঘটনাটা নির্দোষ শর্ট সার্কিট জাতীয়। কিন্তু ঘটনাটার পর এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই বেরিয়ে পড়ল ব্যাপারটার অন্য আরেক রং। বলা ভাল— আসল রং।

সন্দেহজনক আচরণ দেখানোয় লাস ভেগাস অভিমুখী একটি বড় গাড়িকে আটকেছিল হাইওয়ে পুলিশ। সেই গাড়িতে আরোহী যারা ছিল তাদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত হয় নকল পরিচয়পত্র, কয়েক লক্ষ মার্কিন ডলার, কিছু রহস্যময় এনক্রিপটেড নথি। আরেকটু খোঁজ নিতেই বেরিয়ে পড়ে ওদের আসল পরিচয়। ওরা প্রত্যেকেই সিয়াটেলের ওই ধ্বংস হয়ে যাওয়া গবেষণাগারটির অফিসার ছিল। পাঁচজন ফেরারি ল্যাব অফিসার। ল্যাবের মধ্যে কোনও এক ছোট বিস্ফোরণ ঘটায় সেটির গোপনীয়তা পণ্ড হওয়ার উপক্রম হয়। যে গবেষণা ওখানে হচ্ছিল তার পারমিশন নাকি ছিল না। ধরা পড়বার ভয়ে ওরা নিজেরাই বড় দুর্ঘটনাটা ঘটায় এবং ল্যাবে রক্ষিত টাকা যতটা পারে, ব্যাগে ভরতি করে নিয়ে পালায়।

প্রত্যেকদেশের পুলিশফোর্সেই 'হিডেন ব্যালেন্স'-এর চর আছে। সেইসব চরেরা ওদের সঙ্গে কথা বলে বের করে— ওই গবেষণাগার ছিল 'প্রোজেক্ট বিটিটু' বলে এক অতি গোপন গবেষণার অন্যতম একটি কেন্দ্র। 'বিটিটু'... 'বিটিটু'... এই নামটা কয়েকজনের মনে অনেক পুরনো একটা স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। গার্জিয়েনস অর্থাৎ কেন্দ্রীয় কমিটির মনে পড়ে, কানাঘুষো শোনা গেছিল এরকম একটা প্রজেক্টেই পৃথিবীর লুকিয়ে রাখা কিছু রহস্য এবং ইতিহাসের প্রকৃত তথ্য উন্মোচনকল্পে গবেষণা করছিল কয়েকজন। রাষ্ট্রগুলির প্রশাসন নিজেদের স্বার্থে, রাজনৈতিক বাস্তুতন্ত্র কায়েম রাখার জন্যই যেসব কথা নিয়ে নাড়াচাড়া হোক— একদম চায় না।

এটা একবিংশ শতাব্দী। এখন এসব এজেন্সির কাজকর্মও অনেক বেশি পেশাদারি। আবেগ নিয়ে প্রায় কোনও সভ্যই যোগ দেয়নি যে রাগ-অভিমান করে সংস্থা ভেঙে দেবে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনগুলিরই একধরনের বেতনভুক এরা। তবে এদের মোটিভটা জনগণকে জানালে সরকারের বিপদ। অতএব টাকা আসে ঘুরপথে, সরাসরি না।

ল্যাবরেটরির যে অফিসাররা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে কিছু আন্তর্জাতিক ফান্ডিংয়ের টাকা লুঠ করে পালাচ্ছিল, তাদের পুলিশি হেপাজতে রাখা নিরাপদ বলে মনে করেনি 'ব্যালেন্স'। প্রোজেক্ট বিটিটু-র ব্যাপারটা জনগণের জানা উচিত নয়। এটা ফাঁস হলে, বলা যায় না, তার অভিঘাতে প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা 'ব্যালেন্স'-এর কাজকর্মও প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে। সে চান্স নেওয়া যায় না। ফলে পুলিশি হেপাজত থেকে ওই পাঁচজনকে চটজলদি অন্তর্বর্তী জামিন পাইয়ে দেবার কাজটা করে ফোর্সের মধ্যে থাকা 'ব্যালেন্স'-এর চর। বা চরেরা।

এবার এদের নানাভাবে প্রশ্ন করা শুরু করে 'ব্যালেন্স' নিজেই। বিভিন্নরকম ভয় দেখিয়ে, নিয়মিত জেরা চলে এদের বসিয়ে। প্রাণান্তকর এই চাপে অতি সম্প্রতি একজন মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছে। সে বলেছে 'প্রোজেক্ট বিটিটু'-র ফুলফর্ম হল 'প্রোজেক্ট ব্রহ্ম টেগোর প্লাস টু'। অর্থাৎ ব্রহ্ম টেগোর এবং আরও দু'জনের নেতৃত্বেই এই প্রকল্প। ধরা পড়া অফিসারদের বক্তব্য— সেই অন্য দু'জন কে কে, তা তাদের জানা নেই।

'ব্যালেন্স'-এর কলকাতা শাখার এমারজেন্সি মিটিংয়ে যে ব্রহ্ম ঠাকুরের কথা আজ উঠে এসেছে, সেই লোকটি আসলে কে? যিনি বক্তব্য রাখছিলেন, তাঁর যতটা জানা আছে— তা তুলে ধরলেন সবার সামনে। চিন্তিত গলায় বললেন— শোনা যায় একসময় বিখ্যাত ডাচ ক্লেয়রভয়েন্ট জেরার্ড কঁসের ছেলে কঁসে জুনিয়রের সঙ্গে জোট বেঁধে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন যোগী এবং জ্যোতিষী হিসেবে কাজ করতেন এই ব্রহ্ম টেগোর! বিভিন্ন মামলায় হারিয়ে যাওয়া মানুষের খোঁজে বা আততায়ী সনাক্ত করতে কঁসে ব্যবহার করতেন তাঁর বিশেষ অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা, অর্থাৎ ভিক্টিমের জিনিস স্পর্শ করে তার সন্ধান বা তার আততায়ীর কথা বলা, টেগোর ব্যবহার করতেন জ্যোতিষ আর ফেসরিডিং পাওয়ার। বুঝতেই পারছেন, লোকটি এক নম্বরের ভণ্ড এবং প্রতারক, ধান্দাবাজ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এরকম একজন কুসংস্কারের ডিপো, লুম্পেন জ্যোতিষীকে নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে, সেকথা কস্মিনকালেও মনে হয়নি আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। —বক্তাকে যথেষ্ট ক্রুদ্ধ এবং বিরক্ত দেখাচ্ছিল।

১২

ড: ব্রহ্ম ঠাকুর বললেন— বিশ্বাস কর আশ্চর্য, এরিক বন্দি হয়ে সেদিন যা যা বলেছিল, তার চল্লিশ শতাংশই আমার জোগানো তথ্য, যেখানে ও আমাদের মূল নেতৃত্বের গোপন চেহারার মুখোশ খুলছিল, সবাইকে খোলা আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল ওর সঙ্গে যোগ দিতে। অনেকেই ভুল করে, ভুল বুঝে এই দলে জড়িয়ে পড়েছিল— এ সব কথা শুনলে তাদের আত্মদংশন হবেই। আমরা জানতাম কোনও বন্দির ইন্টারোগেশন করার প্রয়োজন হলে তা রেকর্ড করা হয়। সেটা পৌঁছে যায় 'ব্যালেন্সকিপারস' দপ্তরের নেতাদের কাছে অর্থাৎ স্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের কাছে। কর্তাব্যক্তিরা এরিক যে ধরনের কথা বলল, তা শুনে খানিকটা শ্লথ হয়ে পড়বেই, মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেই। কারণ তার কথায় অকাট্য যুক্তি ছিল, এমন কিছু কথা ছিল যা নেতারা নিজেরাও ভেবেছে মাঝেমধ্যেই, তর্ক-বিতর্ক করেছে নিজেদের মধ্যেই। আমি ওদের মাঝখানে থাকাকালীন তো করেছেই, আমার আড়ালেও করেছে। ভাবছ কী করে জানলাম? এটা জানবার উপায় ছিল আমার। আমার খুব কাছের একজন ছিল ওই বৃত্তটাতেই। এরিকের চেয়েও কাছের। নাহ এই অংশটা আজ থাক। পরে শুনবে কোনওদিন।

এই বলে ব্রহ্ম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন গোপন কোনও হতাশায়। তবে ওই অবস্থা থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে নিজেকে সামলে নিলেন। আবার বলতে শুরু করলেন—

এসব দল, এধরনের দল— চট করে, ইচ্ছে করলেই ছেড়ে বেরনো যায় না। তবে কর্তাব্যক্তিরা দল তক্ষুনি না ছাড়তে পারলেও, হঠাৎ আগত আঘাত মেরামতিতে পূর্ণশক্তিতে ঝাঁপাতে যাতে না পারে, আটকে যায়— তার ব্যবস্থা করলাম। তৈরি করলাম আত্মঘাতী একটা স্ক্রিপ্ট, যা দলের ভিতটাকেই নাড়িয়ে দেবে। এরিক আর আমি, আমরা দু'জনেই আলাদা আলাদা থেকেই তা আয়ত্ত করলাম। মুখস্থ করলাম। কিচ্ছু যেন বাদ না যায়। কিছু অতিরিক্ত কথা, কিছু ম্যানারিছম, কিছু মাথাগরম— সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে করতে হবে। ফাইনাল অভিনয়েই একসঙ্গে আসা যাবে, তার আগে নয়। এক টেকই যেন ফাইনাল টেক হয়।

নকল ছিল খালি ঘুমের ওষুধের চ্যাপ্টারটা। ইনজেকশন সিরিঞ্জটা ছিল বটে আমার কোটের পকেটে। ওটা তো রাখতেই হত, কারণ ওটা আমায় দেওয়ার দায়িত্বে ছিল আরেকজন। তাকে দেখিয়েই ওটা কোটের পকেটে ঢোকাই। তবে ওষুধটা ফেলে দিয়েছিলাম এরিকেরই কিচেনের ডাস্টবিনে। অজ্ঞান হবার ভাণটা জবরদস্ত করেছিল এরিক, এটা বলতেই হবে!

তবে এরিকের সেই রাতের পালানোটা আসল পালানো হতে হত। নইলে আমার গুম হয়ে যাওয়াটা দলের কাছে দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে আসত না, দেখা হত এরিকের পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে এক করে। তাহলে তিনটে ধাক্কা হত না, আমি আর এরিক প্ল্যান করে এটা করছি বুঝলে দলও ভাঙত না, বরং এককাট্টা হয়ে যেত। তাই জন্যই নাটকীয়তায় ভরা আসল জেরা পর্ব— যেখানে আমি জোরালো সওয়াল করেছিলাম 'ব্যালেন্স'-এর পক্ষেই—

—না ব্রহ্মদা, আপনি যা বললেন, তাতে মনে হচ্ছে আপনার কথা যথেষ্ট জমেনি। বরং এরিক দত্ত ফাটিয়ে দিয়েছিলেন—

—আঃ আশ্চর্য! আবার কথা বলে! চুপ করে শোনো তো, এখন শোনা প্র্যাকটিস করো! সবই কি তোমায় বলেছি নাকি? সংক্ষেপে বলেছি। আমিও তোমার ভাষায় যাকে বলে 'ফাটিয়েছিলাম'। নইলে ওরা আমায় সন্দেহ করত তো, নাকি? কেউ কিচ্ছু বোঝেনি! বরং আমি খবর পেয়েছিলাম, আমি উধাও হয়ে যাওয়ার পরে ওরা প্রথমে ভেবেছিল এরিকের কোনও গোপন দল উলটে আমাকেই কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়! তাই আমায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। আসলে সেরাত্রে এরিকের পালানোটা এমনভাবে ঘটে, সেটা দেখে আমায় সন্দেহ করবার কোনও উপায় ছিল না। রাতের প্রহরী দু'জন স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয়, আমি এরিকের পালানোয় কোনরকমের অংশীদার নই। এরিক একাই পালিয়েছে। আবার বলছি শোনো, আমাকে এরিকের কোন গোপন দল পালটা কিডন্যাপ করল— এসব ভেবেই মাথা গুলিয়ে গেছিল 'ব্যালেন্স'-এর। বিশ্বস্ত সূত্রে অনেক পরে জেনেছিলাম এই ভেতরের খবর।

কীভাবে পালিয়েছিল এরিক তা পরে বলা যাবে। আমার উধাও হওয়াটা আগে বলি। আমার তো মনে হয় ওটা বেশি থ্রিলিং লাগবে তোমার। ফেক আইডি তৈরি করাটা সমস্যা ছিল না আমাদের। ওটা আকছার হত। 'ব্যালেন্স'-এর মতো আন্তর্জাতিক গুপ্তচর সংস্থার কাছে নতুন পরিচয় এবং ভিসার ব্যবস্থা করা জলভাত! আমি যখন দায়িত্ব নিয়ে সে সব জোটালাম, যারা করল তারা 'ব্যালেন্স'-এর কাজ বুঝেই করল, গোপনেই করল। টিকিট তো আগেই করা ছিল। নতুন নাম নিলাম— 'দুষ্মন্ত মাহাতো'। ইচ্ছে করেই খটমট নাম, যাতে সাহেবরা যাত্রীতালিকা মিলিয়ে দেখলে ওভারলুক করতে বাধ্য হয়, মনে না রাখতে পারে। আরও বিচ্ছিরি নাম মাথায় এসেছিল— 'পুণ্ডরীকাক্ষ পতিতুণ্ডি'—আমার এক প্রিয় লেখক অসমঞ্জ মুখোপাধ্যায়ের লেখায় নামটা পেয়েছিলাম! দারুণ নিঃসন্দেহে— কিন্তু সেটা অনাবশ্যকভাবে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করত। মনে হল 'দুষ্মন্ত মাহাতো'— এই নামটার মধ্যে ভারসাম্য আছে। নতুন চেহারার অঙ্গ হিসেবে মাথা ন্যাড়া করে টুপি পরলাম। একগাল চাপদাড়ি কেটে ফেললাম। পাওয়ারহীন কাঁচের মোটা চশমা উঠল নাকে। পোশাক অন্যরকম হল। তিনটে ফ্লাইট বদলে আল্পসের উপর দিয়ে আকাশী সফর সেরে পৌঁছে গেলাম সুইৎজারল্যান্ডের লুগানো শহরে। সেখান থেকে গাড়ি করে বহু দূরের পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিলাম এক প্রত্যন্ত গ্রামে।

দু'সপ্তাহ পরেই জার্মানির বার্লিন শহরে 'ডয়শেভেলে' টিভির দফতরে আবার দেখা হল এরিকের সঙ্গে। এরিক সেখানে পৌঁছেছে আগের রাতেই। পূর্বনির্ধারিতই আমাদের এই সাক্ষাৎ, কারণ সেদিনই সেখানে আসছেন বিশ্বখ্যাত এক বিজ্ঞানী, একটা টেলিভিশন সাক্ষাৎকার ও বিজ্ঞান সম্মেলনের কাজ নিয়ে। তিনি এরিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, সময়াভিযান এবং এরিক-প্রস্তাবিত 'ইতিহাসের বাঁকবদলের যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ও সমান্তরাল সম্ভাবনা' বিষয়ক জটিল গবেষণায় সানন্দে যুক্ত হতে চেয়ে। একটা প্রকল্প তিনি ভেবেছেন— অত্যন্ত গোপন যে প্রকল্পের নাম— 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গল টু' ওরফে 'বিটিটু'। প্রোজেক্টের এমন নাম কেন, আশা করি তা বুঝতে পারছ। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য বিষয়ে যে আইনস্টাইন-রোজেন সেতুর কথা উঠে এসেছিল গবেষকদের চিন্তায়, আবার সেই 'ওয়র্মহোল' নিয়ে কার্যকরী ভাবনার সূত্রপাত করবে এই প্রোজেক্ট— তাই জন্যই এমন নাম। আরেকটা ভারচুয়াল ত্রিভুজও নাকি তৈরি করা হবে। এই বিষয়টা নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ গোপন মিটিং হবে, সেই মিটিং-এ এরিকের বদান্যতায় ঢুকে পড়েছে এই অধমের নাম। এরিক আমার পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছিল— 'আ রেবেল, আ ড্রিমার, আ বর্ন লিডার।' জবাবে সাহেব বলেছিলেন— 'ওকে নিয়ে এসো। ক্ল্যাসিফায়েড প্রোজেক্ট বিটিটু-তে আমার অত্যন্ত যোগ্য দু'জনকে প্রয়োজন। তোমার বন্ধুর যোগ্যতা থাকলে এই প্রোজেক্টে তার প্রবেশদ্বার আমি নিজে হাতে খুলে দেব। নইলে তাকে এই প্রোজেক্টের কথা বিন্দুমাত্র না জানিয়েই কীভাবে প্রস্থানপথটা দেখিয়ে দিতে হবে, সে পদ্ধতি আমার জানা আছে।' বলাবাহুল্য মিটিং-এর কথাই তখন জানতাম। প্রোজেক্টের কথা জানতাম না আদৌ। আশ্চর্য, তুমি কি আন্দাজ করতে পারছ কে এই তরুণ বিজ্ঞানী?

*****

ড: ব্রহ্ম ঠাকুর গল্পটা এ পর্যন্তই বলবার সুযোগ পেয়েছিলেন। এভাবেই অনেকরকম সম্ভাবনা আর প্রশ্নচিহ্নের পেরেকে ত্রিশঙ্কু হয়ে ঝুলছিল গল্পটা। এমন সময়েই অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স। দড়াম দড়াম করে দরজায় ধাক্কা। তড়বড় করে দরজা খুলতে ব্রহ্ম ঠাকুর নেমে গেলেন নীচে। নামবার আগে সতর্ক করে গেলেন আশ্চর্যকে।

কিন্তু 'কিউরিওসিটি কিলস দ্য ক্যাট' বলে একটা প্রবাদ আছে। আশ্চর্য একের পর এক অদ্ভুত ঘটনার আবহে আজ কৌতূহলের একদম শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। এ অবস্থায় 'প্রাণ বাঁচাতে হলে লুকোও'— এমন কথা সে শুনবে কেন? হাজার হোক সেও তো চলচ্চিত্রের নায়ক। তার নায়কসত্তা এই মুহূর্তে জেগে উঠেছে। সে ব্রহ্ম ঠাকুরের কিছুটা পেছন পেছন নীচে নেমে এল। ব্রহ্ম অবশ্য উত্তেজনার অভিঘাতে তা জানতে পারলেন না।

ড: ব্রহ্ম ঠাকুর একটানে সদর দরজাটা খুলে ফেললেন।

১৩

ব্যালেন্স-এর কলকাতা শাখার এমারজেন্সি মিটিংয়ে বর্তমান বক্তা বলে চলেছেন। তাঁর কথা থেকে জানা যাচ্ছে বর্তমানে ফসিল হয়ে যাওয়া কত পুরনো ইতিহাস। সত্যিই রেগে যাওয়ার মতো বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি!

আসলে আন্তর্জাতিক কমিটির তথ্যানুসন্ধানে 'বিটিটু' প্রকল্পের আসল লোক হিসেবে ব্রহ্ম টেগোরের নাম উঠে আসায় তাঁর ফাইল নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছিলেন এঁরা। তাতেই এইসব অদ্ভুত তথ্য সামনে এসেছে। ব্রহ্ম জ্যোতিষের কাজ শুরু ক'রে অনেকগুলো মিশন ক'রে ফেলবার পর— ভণ্ড জ্যোতিষের নিয়মানুযায়ীই যার কিছু কিছু সফল আর বেশ কিছু ব্যর্থ— একটা কাজের ডাক পেয়েছিলেন। কী এক সরকারি অভিযানে যেন টার্কিতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন বিশিষ্ট গবেষক এরিক দত্ত। টার্কির পুলিশ সাহায্য প্রার্থনা করেছিল জেরার্ড কঁসে জুনিয়র এবং ব্রহ্ম টেগোরের। অথচ ব্রহ্ম টেগোর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সমস্ত কাজ ছেড়েছুড়ে কলকাতায় চলে আসেন। ওদিকে এরিক দত্ত কিছুদিন পর আবার নিজেই জার্মানিতে আবির্ভূত হন। মাঝখানের দিনগুলো এরিক কী করছিলেন কেউ জানতে পারেনি।

এখন কথা হচ্ছে— ব্রহ্ম টেগোর কি তবে আগেই জানতেন এরিক জার্মানিতে ফিরবেন? তাই কি তিনি টার্কি পুলিশের আমন্ত্রণ নামঞ্জুর করেন? এমনকী এ নিয়ে কথা উঠতে পারে আন্দাজ করে পেশাটাই ছেড়ে দেন? এঁদের দু'জনের মধ্যে তাহলে কি কোনও গোপন আঁতাত আছে? 'বিটিটু'র ফুল ফর্ম যদি 'ব্রহ্ম টেগোর প্লাস টু' হয়ে থাকে, তবে এই 'প্লাস টু'-এর মধ্যে একজন এরিক দত্ত হওয়াটা মোটেই অসম্ভব নয়!

টার্কিতে এরিক নিরুদ্দিষ্ট হওয়ার আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল— যেটা 'ব্যালেন্স' জানে। কারণ 'ব্যালেন্স'ই ঘটনাটা ঘটিয়েছিল। এরিক সেখানে কিডন্যাপড হয়েছিলেন। ঠিক তারপরেই তাঁকে খুঁজে না পেয়ে টার্কির পুলিশ ব্রহ্মের সাহায্য চায়। ব্রহ্ম ঠাকুর যে ওই ব্যাপারটায় ঢোকেননি, তার কারণটা একটু অন্যরকমও হতে পারে। হয়তো এরিক দত্ত কিডন্যাপারদের হাত থেকে পালিয়ে গিয়ে তাঁকে জানান, তিনি 'ব্যালেন্স'-এর হাতেই আবার বন্দি হয়েছিলেন। নিশ্চয়ই ব্রহ্ম ঠাকুর তখন 'ব্যালেন্স'-এর থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে মনে করেছিলেন! এই দু'নম্বর সম্ভাবনা একটি কথাই বুঝিয়ে দিচ্ছে। ব্রহ্ম ঠাকুর 'ব্যালেন্স'-কে এড়িয়ে চলেন। কিন্তু কেন? ব্রহ্ম ঠাকুরই কি তবে অতর্কিতে গুম হওয়া 'ব্যালেন্স'-এর পুরনো নেতা সেই বিদ্যুৎ পাইন? এই সম্ভাবনায় পৌঁছনো যাচ্ছে, এমনকী এটা ডালপালা বিস্তার করছে কারণ বিদ্যুৎ পাইনের অন্তর্ধান আর ব্রহ্মের জ্যোতিষী হিসেবে কাজ শুরু করবার সময়টা ভীষণ কাছাকাছি, দু'একবছরের মধ্যেই। এটা ছাড়া তো অন্য কোনও সম্ভাবনা তৈরিই হয় না, কারণ এর আগেও এরিকের পলায়নের সঙ্গে বিদ্যুতের নিরুদ্দিষ্ট হওয়ার সময়গত একটা কানেকশন পাওয়া গেছিল! বারবার একই ধরনের যোগ খুঁজে পাওয়া গেলে তাকে তো স্রেফ কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না!

কেন বিদ্যুৎ পাইনের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি, যখন সে অন্তর্হিত হয়েছিল? তাকে সেসময়ে ট্র্যাক করলে তো নিশ্চয়ই ব্রহ্ম ঠাকুর তখনই ধরা পড়ে যেতেন! জানা গেল, তৎকালীন 'ব্যালেন্সকিপার'-রা এরিকের পলায়ন নিয়েই ব্যস্ততা দেখিয়েছিলেন বেশি। আজকের ব্যাখ্যা হল— ওই স্থানীয় লিডাররা অনেকেই ছিলেন বিদ্যুতেরই বন্ধুবান্ধব। সংঘের স্থানীয় শাখা প্রতিষ্ঠাতেও তাঁদেরই প্রাথমিক যোগদান ছিল। তাঁরা ব্যাপারটাকে বন্ধুর বিপদের সম্ভাবনাতেই বোধহয় ধামাচাপা দিয়ে দেন, ভাসিয়ে দেন 'এরিকের গোপন বাহিনী কর্তৃক বিদ্যুৎ পাইনকে গুমখুন করা হয়েছে'— এই তত্ত্ব। কিন্তু আসল কালপ্রিট যে ছিল একটা লুকিয়ে রাখা প্রেমের অ্যাঙ্গল, তা অনেক পরে জানা যায়। এরিকের পলায়নকালে কলকাতা শাখার সর্বময় নেতৃত্বে ছিলেন জনৈকা রুক্মিনীদেবী— এঁর সঙ্গে বিদ্যুতের একটা গোপন রসায়ন ছিল। যতদিনে তা আবিষ্কৃত হল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে যাই ঘটে থাকুক না কেন, অতীত হল অতীত। তা নিয়ে এখন আর ভাবনাচিন্তা, হাহুতাশ করে কী হবে? আলোচনাতেও বৃথা সময় নষ্ট। এখনকার অত্যন্ত পেশাদারি ব্যালেন্সকিপাররা সিদ্ধান্ত নিলেন— তাঁরা এবারে এই ব্যাপারটার শেষ দেখে ছাড়বেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অর্ডারের অপেক্ষায় বসে না থেকে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবেন— কলকাতা শাখার পুরনো বদনাম ঘোচাবেন। অতীতে একদিনেই এই শাখা একেবার ধসে গেছিল। ধসে যাওয়ার কারণ নিজেরাই বের করে চমকে দেবেন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রকে। সংশোধনও করা হবে অতীতের ভুলের।

এখন ইন্টারনেট ইত্যাদির মাধ্যমে পুরনো নথিটথির খোঁজ পাওয়া খুব সহজ হয়ে গেছে। আঞ্চলিক নেতৃত্ব যেইমাত্র জানতে পারলেন বিদ্যুৎ পাইন মনোচিকিৎসক ছিলেন, তখন সন্ধান করা হল বিদ্যুৎ পাইনের 'ব্যালেন্স'-এ কাজ শুরুর সময়কাল তৎকালীন কোন প্রতিষ্ঠিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অতর্কিতে কাজ বন্ধ করবার সময়ের সঙ্গে মেলে। একটা নামই জ্বলজ্বল করে সামনে এল— ড: সমীরেশ মজুমদার। সঙ্গে সঙ্গে খোঁজা হল সমীরেশের পরিবার-পরিজন কেউ বেঁচে আছেন কি না। পাওয়া গেল কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অম্বরীশ মজুমদারের নাম। ব্যালেন্সকিপাররা ঠিক করলেন অম্বরীশকে আঘাত করে দেখাই যাক না, প্রতিক্রিয়া কোনদিকে নির্দেশ করে। যেটাকে কেতাবি ভাষায় বলে 'ওয়াটার রিপল এফেক্ট'— সেটাই ব্যবহার করতে তাইলেন তাঁরা।

অম্বরীশকে আজ সকালে খুন করা হয়েছে। ক্লোছ রেঞ্জে তাঁর বুকে গুলি ক'রে একটা গাড়িতে বসা আততায়ীরা পালিয়ে গেছে। তবে আশেপাশে যারা হাঁ হাঁ করে ছুটে গেছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আসলে খুনিদেরই দলের লোক। তাদের কাজ ছিল পর্যবেক্ষণের। খুনের ঘটনাটি যাদের সবচেয়ে বেশি নাড়া দেবে, তারা তাদের বিচলিত হয়ে পড়া লুকোতে পারবে না। ফলে তারা চিহ্নিত হয়ে পড়বে। এদের মধ্যে কেউ কেউ কিছুক্ষণের মধ্যেই খানিকটা আড়াল নিয়ে ফোন করবে কাউকে কাউকে। এরকম লোক চোখে পড়লে, তাদের ফোনকলগুলো ইন্টারসেপ্ট করা খুব কঠিন কাজ নয়। আর এভাবেই পাওয়া গেল ব্রহ্ম ঠাকুরের খোঁজ। প্রথমে পাওয়া গেল ব্রহ্মের ফোন নম্বর। তারপর তার থেকেই উদ্ধার করা হল ঠিকানা।

অন্ধকার ঘরটায় সবার চোখে একটা আগাম সাফল্যের দ্যুতি। আজ রাতেই ব্রহ্ম ঠাকুরের বাড়িতে অভিযান। অভিযানে কারা নেতৃত্ব দেবেন, কারা পেছনে থাকবেন— সেসব পরিকল্পনার নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে। এখন সময় সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের।

নিজেদের কায়দায় একে অপরকে অভিবাদন জানিয়ে দুটো বড় গাড়িতে করে অপারেশনের সৈন্যরা বেরিয়ে পড়ল। ব্রহ্ম ঠাকুরের পাড়াপড়শিকে বিরক্ত করা যাবে না। জানান দেওয়াই চলবে না। সদর দরজায় বেল বাজিয়েই ঢুকতে হবে, যে কোনও সাধারণ অতিথির মতোই। কেউ দরজা না খুললে রাসায়নিক দিয়ে লক গলাতে হবে নিঃশব্দে। সেটা অবশ্য গভীর রাতের কাজ।

ব্যালেন্সকিপাররা পৌঁছে গেছে। উত্তর কলকাতার গলিতে পুরনো আমলের একটা বাড়ি, যদিও গলিটা অতটা সংকীর্ণও নয়— বাড়িগুলোর মধ্যে অল্প খানিকটা ফাঁক আছে। অযত্নলালিত একটা দরজা। কোনও নাম লেখা নেই, তবে ঠিকানা লেখা রয়েছে পাশের দেওয়ালে। ওরা কলিং বেল বাজায়। কয়েকবার বাজিয়ে ওরা বোঝে— বেলটি খারাপ, বাজছে না। একটু সময় এতে নষ্ট হয়। শেষমেষ ওরা অধৈর্য হয়ে দরজা ধাক্কায়।

তারপর তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ব্রহ্ম ঠাকুর ওরফে বিদ্যুৎ পাইন ওরফে সমীরেশ মজুমদারের অপেক্ষায়। অনেকদিন বিভিন্ন পরিচয় ও চেহারায় পালিয়ে বেড়িয়েছে লোকটা। আজ খেল খতম।

১৪

মুখে হাসি নিয়েই একটানে দরজাটা খুলে ফেললেন ব্রহ্ম ঠাকুর। তিনি দরজার মর্স কোড শুনেই বুঝে ফেলেছেন কে এসেছে। এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে বহুদিন পর আবার দেখা হবে আজ।

নীল রঙের একটা এসইউভি গাড়িকে পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং এরিক দত্ত। কোনও চালক নেই, বোঝা যায় গাড়িটা তিনি নিজেই চালিয়ে এসেছেন। পেছনের আসনের একপাশে একটা বড় ব্যাগ কাত হয়ে আছে। ব্রহ্মকে দেখেই এরিক কপটরাগ এবং রসিকতার সুরে বললেন—

এই যে ব্রহ্মদত্যিদের ডাক্তার! দাঁত ক্যালাবার প্রয়োজন নেই। আড্ডা মারতে আসিনি। তল্পিতল্পা গুছিয়ে নিয়েছ তো? চলো আর দেরি করবার উপায় নেই। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে। গাড়ি হাজির, হুজুর।

—তল্পিতল্পা? এই তো! এটা তল্পি, ওটা তল্পা! —একথা বলে ব্রহ্ম ঠাকুর তাঁর ধূসর আলখাল্লার বাঁ দিকের পকেট থেকে বের করলেন একটা রিভলভার এবং রিমোটের মতন দেখতে ছোট্ট একটা ট্রানসমিটর। তারপর বললেন— কিন্তু আমার তো এক্ষুনি বেরোবার উপায় নেই এরিক। আমার ইনট্যিউশন বলছে— ওরা আসছে। আমার ভাইয়ের হত্যাকারীরা। অম্বরীশকে ওরা মেরেইছে আমার সন্ধান পেতে, কিন্তু চাইলে আরও সহজে পেত। প্রবল আক্রোশ থেকে এটা করেছে, তবে আমিও তৈরি। আমার পুরনো অপরাধের জন্য নিরপরাধ ভাইটাকে জড়িয়ে ওরা বড় ভুল করেছে। এখন আমি অপেক্ষা করছি এই খুনের প্রতিশোধ নেব বলে।

এরিক দাঁত খিঁচিয়ে ওঠেন। বলেন— কীসের প্রতিশোধ? ভাইয়ের মৃত্যুতে এত বিচলিত আজ, অথচ জীবনে তো যোগাযোগ রাখনি! হ্যাং ইওর যাত্রাপালা। বুড়ো বয়সে আর কোনও গুন্ডাগিরিতে একদম জড়াতে হবে না তোমায়। ওদের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। এভরিথিং ইছ আনডার কনট্রোল। এই যে, তোমার সামনের রাস্তার উলটোদিকের বাড়িটা এই মুহূর্তে পুলিশে গিজগিজ। না না, অবাক হওয়ার কিছু নেই, এটুকু আমি করতে পারি। —আরে, আমি বিখ্যাত লোক। গল্প উপন্যাস এমনকী গান, মিউজিক ভিডিও তৈরি হয়েছে আমায় নিয়ে। কলকাতা পুলিশেরও অনেক কেষ্টবিষ্টুই আমার ভক্ত। একটা ফোনেই কাজ হয়ে যায়। তুমি খবরটা পেয়ে আমায় জানানোর পরে, আমি অম্বরীশের হত্যাকারী কারা হতে পারে— সেই তথ্য ওদের দিয়ে দিয়েছি। তোমার পুরনো 'ব্যালেন্স' দলের নতুন আমদানিরা জোরজবরদস্তি এ বাড়িতে ঢুকবার চেষ্টা করলেই হাতেনাতে আজ রাতে গ্রেপ্তার হবে। প্রথমেই আনা হবে ডাকাতির অভিযোগ! অতঃপর হাড়হিম করে দেওয়া বিশেষ জেরা। আশা করা যাচ্ছে জেরায় জানা যাবে 'ব্যালেন্স'-এর কলকাতা শাখার বাকি সব বদের ধাড়ি নেতাদের নামগুলো। তারপর তাদের নামে হুলিয়া বেরোবে। আর অম্বরীশের খুনের স্বীকারোক্তি না পাওয়া অব্দি জেরা থামবে না, আমার এটা বলাই আছে! অতএব ওই ব্যালেন্সকিপারদের দোকান আরেকবার বন্ধ করে দেওয়াটা এখন শুকনো আইনের কচকচি। তোমার রক্তারক্তি ঘটানোর কোনও প্রয়োজনই নেই। —আরে ওটি কে? পেছনদিক দিয়ে গুটগুট করে এসে কচি ছেলের মতো উঁকিঝুঁকি মারছে? ওটিই কি তোমার নতুন রিক্রুট নাকি? আহা, বলেছিলাম ওকে প্রাণের ভয় দেখিয়ে নিজে নীচে নেমে এসো, দু'একটা ব্যক্তিগত কথা আগে বলে নিই— উফ ডাক্তার, তোমার বোকামিগুলোকে নিয়ে কী যে করি! —তা এসেই পড়েছ যখন, হ্যাঁ বাবুসোনা তোমাকেই বলছি, চটপট গাড়িতে উঠে পড়ো। আলাপটা গাড়িতেই সেরে নেওয়া যাবে'খন! কী যেন তোমার বাহারি নামটা? 'আশ্চর্য', না? এখন এখানে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করা মানে গুলিচালাচালির মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়া। আমরা কেউই সুপারম্যান বা জেমস বন্ড নই! তুমি কি সুপারম্যান? নও তো? বেশ— চট করে গাড়িতে ওঠো তো দেখি।

*****

গাড়িতে উঠে পড়েছে ওরা তিনজন। এরিক আবার চালকের আসনে। পেছনের সিটের মোটা ব্যাগটাকে আরও পেছনে চালান করে দিলেন ব্রহ্ম ঠাকুর এবং আশ্চর্য। বড় গাড়ি, যুৎ করেই বসা গেল।

আশ্চর্য খানিকক্ষণ চুপ করেছিল, তবে বেশিক্ষণ নয়। ভুসভুস করে সোডার মতো উঠে আসছে প্রশ্ন। অবশেষে সে জিজ্ঞেস করেই ফেলল। ব্রহ্ম ঠাকুরকে সে বলল—

আপনি তা হলে সবই জানতেন?

—কী?

—ন্যাকামি করবেন না। কিছুই বলেননি আমায়। মানে আপনার ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ প্রথমেই দিয়েছিলেন— কিন্তু সেটা যে হত্যা, তা বলেননি। সেই খুনের পেছনে যে এত গল্প, তাও বলেননি। এদিকে সবই জানা ছিল কী হতে চলেছে—

এরিক দত্ত একবার পেছন ফিরে তাকালেন। গাড়িটা অজানা এক গন্তব্যের দিকে আপাতত নিরুপদ্রবেই এগিয়ে চলেছে। এরিকের চশমাটা নাকের ডগায় একটু নেমে এসেছে। তিনি চশমার কাচের উপর দিয়ে আড়চোখে তাকালেন আশ্চর্যের দিকে। তারপর বললেন—

ওহে ছোকরা। মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ, ওকে? তোমার দ্বিতীয় কথাটা ঠিক হলেও, প্রথমটা বাজে অ্যালিগেশন। ডাক্তারের মতো ধুরন্ধর লোক কম আছে পৃথিবীতে। সে জানবে না তো কে জানবে! তবে তোমায় সে কিছুই বলেনি মানে? যা বলা দরকার, ঠিকই বলেছে। সব খুলে বলবারও তো একটা রাইট টাইম থাকে, নাকি! তুমি এটুকু জেনে রাখ— তোমাকে সে যা বলেছে— অত কথা কেউই কাউকে এমনি এমনি বলে না। সে তোমায় বলেছে তোমার প্রতি কনফিডেন্স আছে বলেই। আশা করি তুমি ওর সেই ভরসার যোগ্য হবে। আর তোমায় এখন বকলাম বলে তুমি আবার মাইন্ড কোরো না যেন। আমারও তোমায় বেশ ভাল লাগছে, আপন লাগছে। কী জানো, তোমার কাছে আমার একটা জিনিস আজ রেখে গেলেই হয়...

এরিক চুপ করে গিয়ে সামনের রাস্তায় মন দিলেন।

১৫

ব্রহ্ম ঠাকুর অনেক কথাই আশ্চর্যকে বলেননি। সে বেচারির দোষ কী? ও তো অভিমান করতেই পারে! ব্রহ্ম ভাবলেন ওকে ব্যাপারটা একটু খুলে বলা দরকার। তাই এবার মুখ খুললেন। বললেন— একমাস আগে সিয়াটেলে আমাদের এক গবেষণাগারে কর্মরত কিছু বিশ্বাসঘাতক অফিসার ল্যাবটা ধ্বংস করে দেয় অযথা ভীত হয়ে, আমাদের অটোমেটেড সিকিউরিটি সিস্টেমে ভরসা রাখতে না পেরে। সেখান থেকেই বিপর্যয়ের শুরু। স্টিফেন হকিং-এর পক্ষ থেকে আমার কাছে তক্ষুনি নির্দেশ আসে— 'ড: টেগোর, প্লিছ অ্যাবর্ট মিশন বিটিটু ইম্মিডিয়েটলি।' লক্ষ্যণীয়, এরিকের কাছে সেরকম কোনও নির্দেশ কিন্তু আসেনি। কেন আমার কাছেই তবে এটা এল? ভাববার বিষয়— এটা ওঁদের জিজ্ঞেস করতে হবে। কী এরিক, তোমার কাছে কি এটার কারণ পরিষ্কার?

—না। তবে আমার মনে হয়েছিল ওটা প্যানিক করে বলা, একটা স্ট্রেসড এক্সপ্রেশন... অথবা ওদের মনে হয়েছিল শুধু এখানেই একটা অ্যাটাক হবে তোমার উপরে...

—যাই হোক! আশ্চর্য, যেটা বলছিলাম, এরিককে তৎক্ষণাৎ এই খবর দিলাম। ও ওই 'অ্যাটাক'-এর সম্ভাবনা আন্দাজ করে আমায় নিরাপত্তা দিতে কলকাতায় চলে এল। আসলে বিটিটু প্রকল্প আমার জীবন। জীবন দিয়ে এটাকে ভালবাসি। এটা আমি এত সহজে ছাড়তে পারি না। আমি জানতাম একদিন হয়তো আমায় স্থানান্তরিত হতে হবে। অনেক দোনামনা করেছি, এরিক কলকাতায় চলে আসার পর থেকে নিয়মিত ওর সঙ্গে কথা বলেছি, আজ হুট করে সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলি। যখন আশ্চর্য, তোমায় বলেছিলাম— 'এসো, জায়গা বদলাবদলির খেলা খেলি'— সিদ্ধান্তটা সেই মুহূর্তেই নেওয়া! বিশ্বাস করো আশ্চর্য, এটা জায়গা বদলাবদলি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাও অল্প ক'দিনের জন্য।

কামালগাজি ফ্লাইওভারটা পেরিয়ে এরিকের নীল এসইউভি সাদার্ন বাইপাসে ঢুকে পড়ল। আশ্চর্যের এতক্ষণে মনে হল— তারা কি তবে বারুইপুর পেরিয়ে সুন্দরবনের দিকে চলেছে? সে জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিল, এমন সময় ব্রহ্ম ঠাকুর আবার কথা বলা শুরু করলেন—

কোনও সিদ্ধান্ত নিলে এক নিমেষেই নিতে হয়, যদি সময় সেটা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট পরিপক্ক হয়েছে বলে মনে হয়। ঘরে বসে কথা বলতে বলতে ছাদে যাওয়ার কথা পেড়ে, আমি কফি বানাবার জন্য উঠলাম। তারপর কফি বানানোর ফাঁকে ওই টেবলেই একটা বোতাম টিপে এরিককে আসতে বলে দিলাম। জানিয়ে দিলাম 'জায়গা বদলাবদলির খেলা' শুরু হয়ে গেছে! ও স্বভাবসুলভ বাজে-রসিকতা করে একটা রিপ্লাই পাঠাল। আড়চোখে পড়েও নিলাম। অবশ্য সেসব তোমার নজরে পড়ল না। যাই হোক আশ্চর্য, মোদ্দা বিষয়টা হল— আমার জায়গাটা তোমায় ছেড়ে যাচ্ছি। সব বুঝিয়ে দেব। চিন্তার কিছু নেই। শিখে নিলে তুমি ঠিক পারবে। গাইডেন্সও পেয়ে যাবে—

এরিক বললেন— হ্যাঁ, ফোনটোন নয়, অতি সূক্ষ্ম এক সুপারসোনিক কমিউনিকেশন মিডিয়ামে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখি আমরা। ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিত কথা চলেছে আমার। সে কথা ইন্টারসেপ্ট করবার মেকানিছম আপাতত কারুর হাতে নেই। তবে জাপানের ড. কিশিমোতো—

আঃ! —দাবড়ানি দিলেন ব্রহ্ম ঠাকুর। ইঙ্গিতটা বুঝে ফেলে এরিক সঙ্গেসঙ্গেই মুখে কুলুপ আঁটলেন।

আশ্চর্য বিস্ময়ের সঙ্গে বলল— আর স্টিফেন হকিং! তার মানে বার্লিন শহরে বসা ওই গুপ্ত বৈঠকে আপনারা দু'জন ছাড়া ছিলেন স্টিফেন হকিং! এ তো অবিশ্বাস্য। এদিকে ব্রহ্মদা, আপনি ইন্টারোগেশনের সময় বলেছিলেন স্টিফেন হকিং নাকি পাত্তা দেননি এরিকদাকে—

চালবাজি! এক নম্বরের চালবাজি! —বলে উঠলেন এরিক— ওটা স্ক্রিপ্টে ছিল না মোটেই। মানে যে স্ক্রিপ্টটা আমরা কমা দাঁড়ি সমেত মুখস্থ করেছিলাম উগড়ে দেব বলে! তোমার ব্রহ্মদার মাঝেমাঝে একটু ওস্তাদি না করলে তো চলেই না! ওর হঠাৎ মনে হল ব্যালেন্সকে একটু জানিয়ে দেওয়া যাক, হকিং আমাদের সঙ্গে নেই! ব্যস আর যায় কোথায়? ইম্প্রোভাইছ করল—

ব্রহ্ম ঠাকুর মিটিমিটি হেসে বললেন— ও! আমি চালবাজ! 'আপনারা হলেন নেহাত শাখা'— এটা স্ক্রিপ্টে ছিল। কিন্তু শাখামৃগ, বাঁদর, বাঁদর নাচ, ডুগডুগি, খঞ্জনী, তানপুরা— এগুলো ঢপের কীর্তন নয়? নেহাত আমার মুখে মুখোশ ছিল বলে রক্ষে! হেসে ফেলেছিলাম, খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে অতি কষ্টে সামলাই!

এরিক বললেন— ব্র্যাভো ব্র্যাভো! অ্যান্ড দ্য অস্কার গোছ টু ব্রহ্মদত্যিদের ডাক্তার—

এক মিনিট!— হঠাৎ আশ্চর্য চিৎকার করে ওঠে— ব্রহ্মদা, আপনি একটু আগেই বললেন স্টিফেন হকিং বলেছেন 'অ্যাবর্ট দ্য মিশন'— কিন্তু এটা কী করে হতে পারে? হকিং তো মারা গেছেন বেশ কিছুদিন হল! আর আরেকটা জিনিসও আমায় প্লিছ বলুন এরিকদা, আপনি কিডন্যাপারদের খপ্পর থেকে সেবার পালিয়েছিলেন কীভাবে?

এরিক ঈষৎ গর্বের হাসি হেসে বললেন— কতবার যে কিডন্যাপড হয়েছি! আর পালিয়েওছি! কেউ ধরে রাখতে পারেনি! তা তুমি কোনবারেরটা শুনতে চাও? আচ্ছা, তোমায় বরং বলি, সেবার ডাক্তার আমায় বন্দি করে দরজা বন্ধ করে চলে যাওয়ার পর কী কী হল। হঠাৎ শুনতে পেলাম সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসছে কেউ...

১৬

পূর্বকথন ১

ভিনগ্রহী প্রাণীদের অবতরণ বা প্রভাবের খবর পেলেই এরিক চেষ্টা করতেন সেসব জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার। এই বিষয়টায় অবশ্যই তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য গবেষণা ছিল— সে তো দানিকেনও একবাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন! এরিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমিতিতে সঠিক সময়ে ভিনগ্রহীদের সম্ভাব্য অবতরণের খবর পৌঁছে দিয়েছিলেন বলে, সময়ে-অসময়ে সেইসব সংস্থার তরফেও এরিকের জন্য খবর এসেছে। এভাবেই নিয়মিত গেছেন এদিক-সেদিকে। চীন অধিকৃত তিব্বতি উপত্যকায় এরিকের কিছু আধিদৈব অভিজ্ঞতা আছে। বাংলায় মানে করে লিখলে 'মন্ত্রগুপ্তি'ই দাঁড়াবে, এরকম নামের এক চীনদেশীয় সমরকৌশল ওই অভিযান থেকেই শেখা এরিকের। বন্দি এরিকের রাতপাহারার দায়িত্বে যে ছিল, সে কাছাকাছি এগিয়ে এলে, চেয়ারের পিঠের সাপোর্ট চেয়ার থেকে বিযুক্ত হয়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে এই মন্ত্রগুপ্তি ব্যবহার করে প্রহরীকে ঘায়েল করা এরিকের কাছে বড় কথা নয়। বাঁধা পা দু'টি দিয়ে একত্রে মাটির দিকে জোরে বলপ্রয়োগ করলে নিউটনের সূত্র অনুযায়ী সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় এরিক খানিকটা লাফিয়ে উঠতে পারেন, আর সেই শূন্যে থাকা অবস্থাতেই চিনা-তিব্বতি মন্ত্রগুপ্তি প্রয়োগের দৌলতে তিনি ঘুরে যেতে পারেন অন্তত ১৮০ ডিগ্রি। ভাবতে অসুবিধা হয় না, হাতে বাঁধা চেয়ারের কাঠ সমেত এই গতিজাড্যের ফলে উৎপন্ন বলকে সঙ্গী করে যদি হুড়মুড়িয়ে পড়েন প্রহরীর ওপরে বেকায়দায়, কী হতে পারে। প্রহরী আহত হবে, নড়বড়ে কাঠ ভেঙে যাবে। কাঠ ভাঙলে হাতের বাঁধনও খুলে যাবে, কারণ তা কাঠের সঙ্গেই বাঁধা। তখন প্রহরীর ইঞ্জুরি টাইমের সুযোগ নিয়ে নিজের পায়ের বাঁধন খুলে ফেলবেন এরিক দত্ত।

এটা একটা রাস্তা। রাস্তা আরও ছিল। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায়, হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে বন্ধ দরজাটার একপাশে পৌঁছে যাওয়া, উলটোদিকে ঘুরে তক্কেতক্কে থাকা। কেউ ঢুকলেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া পিঠে বাঁধা কাঠসমেত।

স্ক্রিপ্টে এই দু'টি অপশন লেখা ছিল। জোর করে লিখেছিলেন ব্রহ্ম ঠাকুর ওরফে তখনকার বিদ্যুৎ পাইন। এরিক বারবার বলেছিলেন— ঘাবড়াচ্ছ কেন ডাক্তার? ওটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।

বিদ্যুৎ শোনেননি। জোর করেই লিখেছিলেন।

যখন এই স্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয়, বিদ্যুৎ বলেছিলেন রাতে পাহারার দায়িত্বে থাকবেন মাত্র একজন। সেকথা অবশ্য রাখা যায়নি। সেই রাতে বেরিয়ে আসবার সময় যখন একজনকে থাকবার নির্দেশ দিচ্ছেন, আরেকজনও বলে ওঠে— স্যর, আমিও থাকব।

একথা শুনে আপত্তি করতে পারেননি বিদ্যুৎ। আপত্তি করলে সন্দেহ তৈরি হত। বরং বলেন— থাকবে? দারুণ। নিশ্চয়ই থাকবে। এটাই তো চাই! তা দু'জন একসঙ্গে থেকো না যেন। ওতে লাভ হবে না। দু'জনের একসঙ্গে থাকাটা কাজে লাগানো চাই। আড্ডা মারবার জন্য কিন্তু থাকার অনুমতি দেব না। সমর, তুমি থেকো বাড়ির দায়িত্বে। আর চ্যাটার্জি— তুমি দাঁড়াবে বাউন্ডারির গেটে।

এটা বলে ভেবেছিলেন— আশা করি দু'জনকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে না আহত এরিককে। আলাদা আলাদাভাবে দু'জন এলে এরিক ঠিক সামলে নেবেন।

কিন্তু তা হয়নি। দুই প্রহরী বিদ্যুতের নির্দেশ অমান্য করে একসঙ্গে বসে তাস খেলছিল। বারবার এরিকের চেয়ার সমেত মাটিতে পড়ার শব্দে কৌতূহলী হয়ে দু'জনই উপরে উঠে এল। সিঁড়িতে দুদ্দাড় শব্দ শুনেই এরিক বুঝেছিলেন— একজন নয়। একের বেশি লোক আসছে। প্রথম অপশন সঙ্গেসঙ্গে বাতিল করেন। শরীর হেঁচড়ে দরজার পাশে পৌঁছন। কাঠের তক্তা হাতে বাঁধা অবস্থায় পেছন ফিরে দাঁড়ান। যে প্রথম ঢুকবে তার উপরেই উলটোঝাঁপ দেবেন। তারপর যা হবে দেখা যাবে।

খুট করে একটা শব্দ হল। বাইরের স্যুইচ টিপে গুন্ডারা বাতি জ্বালাল। এরিক কিন্তু তার আগেই চোখ বন্ধ করে ফেললেন। অন্ধকারে তাঁর চোখ সয়ে গেছে। তিনি তাই অন্ধকার অবস্থায় থাকলে অ্যাডভান্টেজ পাবেন। যদি বাতিটা কোনওক্রমে ভেঙে যায়, প্রহরীরা কিচ্ছু দেখতে পাবে না। এদিকে তিনি দেখতে পাবেন সবকিছুই।

বাতিটা ভেঙে যাওয়ার কিন্তু একটা 'আউটসাইড চান্স' আছে। সেই হিসেব কষেই রেখেছেন এরিক দত্ত। তিনি আত্মবিশ্বাসী— তিনি যা ভেবেছেন, তাই হবে। বাতিটা ভাঙবেই। না ভাঙলে, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা!

প্রথমে উঠে আসছিল চ্যাটার্জি নামের লোকটি। সে উঁচিয়ে রেখেছিল রিভলভার। অন্যজনের, মানে সমরের পিস্তল ছিল পকেটে। দু'জন যদি একইসঙ্গে ঘরে ঢুকে পড়ত, কীভাবে সামলাতেন এরিক? তবে বাড়ির পেছনের সিঁড়ি বলেই সেটা সংকীর্ণ, সরু। দু'জনের একসঙ্গে উঠবার উপায় ছিল না। এরিককে কোলপাঁজা করে যখন ওই সিঁড়িটা বেয়ে ওপরে ওঠানো হয়েছিল, এটা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি।

পিঠে চেয়ারের ভাঙা কাঠ বাঁধা অবস্থায় উলটোদিকে মুখ করে, দরজার পাশে লুকিয়ে আছেন এরিক। দাঁড়িয়ে আছেন দরজা খুলে যাওয়ার অপেক্ষায়। দরজা খুলতেই দড়াম করে চ্যাটার্জির গায়ে উলটোঝাঁপ দিলেন। এভাবে পড়তেই চ্যাটার্জির হাতে ধরা রিভলভার থেকে গুলি ছুটে গিয়ে লাগল ঘরের ঠিক মাঝখানে ঝোলানো নিচু বাতিটায়। কিন্তু কী করে এমনটা হল?

১৭

পূর্বকথন ২

চৈনিক 'মন্ত্রগুপ্তি' সমরকৌশল কতগুলো কৌণিক হিসেব শেখায়। ঠিক কোন অ্যাঙ্গলে কোথায় আঘাত করলে ফলাফল কী হতে পারে। মানবশরীরের অস্থিসন্ধিগুলোতে প্যাটেরাল রিফ্লেক্স বা নী-জার্ক পদ্ধতিতেই আরও কিছু ইনভলেনটারি মুভমেন্ট ঘটানোর কায়দা শিক্ষা করেছেন এরিক। ঘরে ঢোকা রক্ষীর কোন জায়গায় আঘাত করলে হাতটা ঠিক কত ডিগ্রি অ্যাঙ্গলে উপরে উঠে আগ্নেয়াস্ত্র ফায়ার করিয়ে দেবে, তার একটা আগাম আন্দাজ কষেই এরিক ঝাঁপ দিয়েছিলেন। ফলে বন্দুকের ঘোড়া ছুটল। বাতিও ভাঙল।

ঘর পুরো অন্ধকার, অস্ত্র মেঝেতে। একদম এরিক যা আঁচ করেছিলেন, তাই। ভাগ্যক্রমে পড়বার পর এরিকের পা ছিল দরজার দিকে। আর এবারে দরজা দিয়ে ঢুকতে যাচ্ছিল দ্বিতীয় নৈশপ্রহরী সমর সিংহ।

এরিকের হাত মুক্ত হয়ে গেছিল চেয়ারের কাঠ ভেঙে। তিনি দু'হাত পিঠের দু'পাশ দিয়ে মাটিতে ঠেকিয়ে সাপোর্ট নিলেন। তারপর বন্ধনযুক্ত জোড়াপায়ে দড়াম করে এক লাথি কষালেন প্রবেশোদ্যত সমরকে। তার ঠিক দু'পায়ের মাঝামাঝি জায়গায় লাথিটি লাগায় সে কিছুক্ষণের জন্য অচল হয়ে পড়ল।

অন্ধকার ঘর অন্য দুজনের জন্য অন্ধকার, এরিকের জন্য দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। তিনি তো ওরা আলো জ্বালালেও চোখ বন্ধ করেই রেখেছিলেন! চোখ খুলেছেন রিভলভারের গুলি ছুটে ঘর ফের অন্ধকার হওয়ার পরে। ফলে সবার আগে ছিটকে পড়া রিভলভারটা কুড়িয়ে নেওয়া অসম্ভব হয়নি। মাটিতে পড়া চ্যাটার্জিকে ওটার বাট দিয়ে আঘাত করায় সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ইতিমধ্যে সমর সিংহ পকেট থেকে পিস্তল বার করে এরিকের দিকে সেটা তাগ করে দাঁড়ায়। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, সে এখনও কষ্টে আছে। তার মুখটা মাঝেমধ্যেই বেঁকেচুরে যাচ্ছিল।

এরিক প্রথম গুলিটা করেন নিজের দুই পায়ে জড়ানো মোটা দড়ির গিঁটের উপর। বিরাট মোটা দড়ি। গিঁটে গুলি লাগবার সঙ্গেসঙ্গেই পা দুটো মুক্ত করে নেওয়া সহজ হয়ে যায়। তারপর এরিক আর তাঁর দিকে ভয়েভয়ে বন্দুক তাগ করা, ব্যথায় মুখ ব্যাঁকা সমরের সিচ্যুয়েশন সমান-সমান। দু'জনেই আহত। দু'জনেরই হাতের অস্ত্র একে অন্যের দিকে তাগ করা।

ভুল বলা হচ্ছে। দু'জনের অবস্থা মোটেই সমান-সমান নয়। একজন ভীত। অন্যজন অকুতোভয়। একজন সাধারণ প্রহরী। অন্যজন সুপারহিরো।

এরিক হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে নিজের হাতের রিভলভারটি নামিয়ে নিলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কথা বলা শুরু করলেন।

এরিক দত্ত যখন সে রাতে ওই ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসেন, পেছনে অন্ধকারে পড়েছিল অজ্ঞান দুই প্রহরীই। এরিকের হাতে একটা অস্ত্র, পকেটে আরেকটা। সমর সিংহ নামের বোকা লোকটাকে শুধু স্নেহভরা স্বরে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি— এরিক দত্ত— এক অত্যন্ত দামি আন্তর্জাতিক সম্পদ। 'দ্য গার্জিয়েনস অফ ব্যালেন্স' তাঁর অভিজ্ঞতা, গবেষণা ব্যবহার করতে চাইছে। তাঁর মেধা কাজে লাগিয়ে নিজেরা অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাওয়ার কথা ভাবছে। হয়তো তারা তা পারবেও একদিন না একদিন। এমতাবস্থায় তাঁর গায়ে সামান্য একটি আঁচড় লাগলেও স্থানীয় এই গুন্ডাটির ধড়ে প্রাণ থাকবে তো? তাঁর তো মনে হচ্ছে না!— বলতে বলতে খুব কাছে চলে এসেছিলেন লোকটার। একবার যেন বিষণ্ণ হয়ে তাকিয়েছিলেন লোকটার চোখের দিকে। লোকটার হাতের পিস্তলটা কাঁপতে শুরু করা মাত্র নিজের হাতে নিচু করে ধরা যন্তরটা এক লহমায় উঠিয়ে সজোরে একটা বাড়ি লোকটার মাথায়। লাট্টুর মতো ঘুরতে ঘুরতে পড়ে গেছিল লোকটার অচেতন দেহ।

রাস্তায় হেডলাইট নিভিয়ে অপেক্ষা করছিল একটা জিপ। চারজন আরোহী ছিল সেই জিপে চালকসমেত, ব্যাকসিটে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো ছিল দুটো গিটার। এদের মধ্যে দু'জন ফ্রেঞ্চ, দু'জন জার্মান। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আছে এদের, বেশ মোটা টাকায় ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছেন বিদ্যুৎ পাইন। এই জিপটার পঞ্চম আরোহী হবেন হাফ জার্মান এরিক। পাঁচজন হিপি নিরুদ্দেশ যাত্রা করছেন একটা হুডখোলা জিপে চড়ে, মেজাজটা এরকমই। এদের গন্তব্য অবশ্য দিকশূন্যপুর নয়, পন্ডিচেরির অদূরে অরোভিল নামের একটা জায়গা, যে জায়গাটা ভৌগোলিকভাবে ভারতের অন্তর্বর্তী হলেও আসলে এক আন্তর্জাতিক মুক্তাঞ্চল। জায়গাটা চালায় সেখানকার নিজস্ব ম্যানেজমেন্ট। ভারতের টাকাপয়সাও সেখানে অচল। আর সেই জায়গাটার অধিবাসীরা জড়ো হয়, থাকতে আসে বিভিন্ন দেশ থেকে। বেশিরভাগই ফরাসি কিংবা জার্মান। উধাও হয়ে গিয়ে দু'সপ্তাহ কাটিয়ে দেওয়ার জন্য এরিকের একদম পারফেক্ট ডেস্টিনেশন। তারপর এখান থেকেই তিনি উড়ে যাবেন বার্লিন। স্টিফেন হকিং-এর সঙ্গে গোপন মিটিং আছে যে!

১৮

সাদার্ন বাইপাস ধরে নিশুত রাতের রাস্তায় ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছে নীল রঙের এসইউভি-টা। ভেতরে যাত্রী তিনজন। ব্রহ্ম ঠাকুর প্লাস টু। একটু আগেই আশ্চর্যের কৌতূহল নিবৃত্ত করতে একটা ইন্টারেস্টিং গল্প শুনিয়েছেন এরিক। গল্পটা শুনে আশ্চর্য যথারীতি মুগ্ধ। সে নিজে অ্যাডভেঞ্চার ছবিতে অভিয় করেছে। মারামারির দৃশ্যও করতে হয়েছে। কিন্তু এর আগে কোনও রিয়্যাল লাইফ অ্যাকশন হিরোর নিজের মুখে তাঁর অ্যাকশন দৃশ্যের বর্ণনা শোনেনি। গল্পটা এই নায়কের যৌবনকালের হলেও অন্তত স্পিরিটে লোকটার মধ্যে এখনও সে বিশেষ কিছু পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছে না। গল্প শেষ হতেই সে তার ভাললাগা জানাতে হাততালি দিয়ে উঠল।

এরিক বললেন— এবার তোমার করা আরেকটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমিই দিচ্ছি! প্রশ্নটা ছিল স্টিফেন হকিং-এর মৃত্যু সংক্রান্ত।

ইয়াংম্যান তোমার জানা উচিত, স্টিফেন হকিং-এর মতো বিজ্ঞানী হুটহাট মারা যান না, সে যতই তাঁদের দৈহিক মৃত্যু হোক না কেন। মৃত্যু সম্ভাবনার হিসেব তাঁদের প্রথম থেকেই কষা থাকে। তাই তাঁরা নিজেদের প্রোটোটাইপ তৈরি করে যান মেশিনের মধ্যে, এমনকী একটা গোটা টিম তৈরি থাকে তাঁদের প্রতিনিধি হয়ে। আমাদের মিশনের জন্য তাঁর তরফ থেকে এখন যেমন মুখ্যত রয়েছেন উইলিয়াম গিলচার, ডাকনাম বিলি...

—এই বিলি গিলচার লোকটাই তো আমাদের ডেকেছে একটা জরুরি গোপন বৈঠকে যোগ দিতে! আমি কিন্তু বলে রাখছি, গন্তব্যে পৌঁছে প্রথমেই লোকটাকে দু'হাতে উপরে তুলে মাটিতে আছড়ে ফেলব আমি— রাগত স্বরে বললেন ব্রহ্ম ঠাকুর— এরিক, তুমি কিন্তু তখন আমায় বাধা দিতে পারবে না।

ব্রহ্মকে ঠান্ডা করবার চেষ্টা করলেন এরিক। বললেন—

শান্ত হও ডাক্তার। অবশ্য তোমার রেগে যাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, তা আমি মানছি।

ব্রহ্ম তবু নিজের মনেই গজগজ করতে থাকলেন— 'ব্রহ্ম ঠাকুর' —এই নামটা এক্সপোছ না করলে আমার বন্ধ হয়ে যাওয়া ফাইল খুলতে পারত না 'ব্যালেন্স'। আমার ভাই অম্বরীশের সন্ধান কিছুতেই পেত না। অম্বরীশের মৃত্যুর জন্য বিল গিলচারই দায়ী— এ কথাটা কি তুমি অস্বীকার করতে পার?

—এটা কিন্তু তুমি অন্যায় কথা বলছ। অম্বরীশের অস্তিত্বের কথা বিল কিছুই জানত না। জানলে ও কিছুতেই এটা করত না। পরিস্থিতি বিচারে এটাই ওর সেরা উপায় বলে মনে হয়েছিল। তুমি একটু ঠান্ডা হও ডাক্তার, আমি বুঝিয়ে বলছি। বিলি যেহেতু নিজেই আমেরিকার বাসিন্দা, তাই অবস্থানের সুযোগ নিয়েই সে ধরা পড়ে যাওয়া পাঁচজনের কাছে গোপন নির্দেশ পাঠায়। বলে দেয় যে তারা যেন যেকোনও মূল্যে 'বিটিটু'-এর আসল নাম যে 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গল টু'— তা গোপন রাখে, নইলে আমরা যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বিষয়ক আলোচনায় উল্লিখিত সেই ওয়র্মহোল বা আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজ খোঁজার কাজে অনেকটা এগিয়ে গেছি, তা চলে আসবে 'ব্যালেন্স'-এর রেডারে। পাশাপাশি তোমার, আমার আর হকিং-এর তিনটি প্রায় ছয় ঘন্টা দূরত্বের টাইম জেনে অবস্থান করা, যাতে ২৪ ঘন্টায় পালা করে-করে আমরা একই দিকনির্দেশে ট্রান্সমিশনটা চালু রাখতে পারি— এই যে আমাদের একটা ভৌগোলিক ত্রিকোণ, যেটা আমাদের মতে বারমুডার পর মহাকাশের ইঙ্গিতবাহী দ্বিতীয় ত্রিভুজ— এটা সবাই জেনে যাবে। তাই আর অন্য কোনও উপায় না দেখে 'ব্যালেন্স'-এর তদন্তের গতিপথ একটা মিশন থেকে একজন লোকের দিকে ঘুরিয়ে দিতেই—

—ঘুরিয়ে দিতেই বলে দাও— বিটিটু মানে হল 'ব্রহ্ম টেগোর প্লাস টু'— এটা কি চ্যাংড়ামি হচ্ছে? তুমি যাই বল এরিক, এই বিলিকে আমি আছাড় মারবই। তারপর না হয় বলব— ভুল করে হয়ে গেছে, আর কোনওদিন হবে না— এসব বলে ওর মনকে আরাম দিতে ওকে একটা রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনাব! তুমি তো জানোই আমি কতটা ভাল গাই গুরুদেবের গান। অন্তর থেকে গাই! যাই বলো, স্টিফেন হকিং বেঁচে থাকলে 'ব্রহ্ম ঠাকুর প্লাস টু' মার্কা ননসেন্স কিছুতেই সহ্য করতেন না!

ব্রহ্ম ঠাকুরের গান গাইবার কথা উঠলেই এরিকের ভরপুর পুলক জাগে। তিনি রসিকতার এইসব সুবর্ণ সুযোগ হারাতে চান না। এক্ষেত্রেও তাই হল। বিলি গিলচারকে শাস্তি দেওয়ার পর ব্রহ্ম ঠাকুর রবীন্দ্রসংগীত গাইবেন— এটা শুনেই এরিক হাল্কা পেছনে ঘুরে চশমার কাচের উপর দিয়ে ব্রহ্মের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন— কোন গানটা গাইবে? 'জনগণমন-অধিনায়ক' নাকি 'ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে'? নাকি 'বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা'?

—শাট আপ!—চেঁচিয়ে উঠলেন ব্রহ্ম ঠাকুর।

—ইউ শাট আপ ওল্ড হামবাগ। জোব্বা পরে হাঁটাহাঁটি করলে যদি রবীন্দ্রনাথ হওয়া যেত, তাহলে একটা কেন, তিনটে নোবেল থাকত ডাক্তার তোমার ছাদের ঘরের তানপুরাটার পাশে রাখা পুরনো তোরঙ্গে। তুমি তো জোব্বাও পরেছ, সুইডেনেও তো গেছ! —কী লাভ হল? নোবেল জুটল? তার বদলে যদি একটু ছাদে দৌড়তে সন্ধেবেলায় পঞ্চাশ পাক, উঠোনে ডিগবাজি খেতে ল্যাঙট পরে, তিনশোবার কান ধরে ওঠবোস করতে, উঠোনে কচ্ছপের মতো ধীরগতিতে পায়চারি না করে ট্রেডমিলে হাঁটতে, তাহলে বিলিকে মাথার উপরে তুলতে পারতে! এখন পারবে থোড়াই! কেতরে পড়বে।

ব্রহ্ম ঠাকুর কড়া চোখে এরিকের দিকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন— চ্যালেঞ্জ দিচ্ছ এরিক? গাড়িটা থামাও তবে একবার। চলো এই রাস্তাতেই নেমে একহাত হয়ে যাক। ভুলে যেও না, কেউ ধারে কাটে, কেউ ভারে। তোমাকে শরীর ঠিক রাখতে, ফিট রাখতে ওই সব লম্ফঝম্প নিয়মিত অনুশীলন করতে হয়, সে ভাল কথা, ক'রো তুমি। কিন্তু ব্রহ্ম ঠাকুরকে...

কথাটা শেষ হল না। এরিক সত্যিই গাড়ির গতিবেগ কমালেন। তবে ব্রহ্ম ঠাকুরের কথায় নয়। সামনেই একটা অস্থায়ী ব্যারিকেড। রাতের হাইওয়েতে পুলিশ নাকা চেকিং করছে। এরিক গাড়ি থামিয়ে জানলার কাচ নামিয়ে একটা কাগজ কর্মরত অফিসারের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

কাগজটা পড়ে তা ফেরত দিয়ে পুলিশ অফিসার একটা স্যালুট ঠুকে ব্যারিকেডটা সরিয়ে নিতে বললেন কনস্টেবলকে। এরিক আবার গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে নিলেন। তারপর বললেন—

আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। ডাক্তার, ডোনট বি স্যাড। নিশুত রাতে তোমার একটু ঢিসুম-ঢুসুমের সাধ হয়েছে, এই তো! ওর'ম হয়। মাথাগরম হলে তো হয়ই, এমন কী পেটগরম হলেও কারুর কারুর হয়েছে বলে শুনেছি। দেখছি আমি কী করা যায়। তবে একটা ব্যাপার— নিজের চোখেই তো দেখলে, এখানকার পুলিশ কতটা খাতির করে আমায়! যে কাগজটা ওদের দেখালাম, ওটা স্বয়ং পুলিশ কমিশনারের চিঠি। আমরা এই গাড়িটা করে আপাতত যাচ্ছি জয়নগর বলে একটা জায়গায়। সেখান থেকে বাঁদিক ঘুরে গ্রামের ভেতর দিয়ে যাব, রাস্তা খুব ভাল নয়, আশ্চর্যবাবুর একটু কষ্ট হবে। এভাবেই সে পথ ধরে আরও ঘণ্টাখানেক সফর করে পৌঁছব গিয়ে কৈখালি বলে একটা প্রায় নির্জন জায়গায়। এমনিতেই কৈখালির ফুলফর্ম হল— 'খালি জায়গা, লোকজন কই?' —মধ্যরাতে তো আরওই কেউ থাকবে না ওখানে। জায়গাটা নদীর ধারে। কী নদী বলতো? মাতলা! মাতলার তীরে পৌঁছে আমরা ওপারে অন্ধকার সুন্দরবন দেখতে পাব। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য অরণ্য নয়। লক্ষ্য হল সমুদ্র। নদীতে মিশমিশে অন্ধকারে দেখতে পাব একটা স্পিডবোট আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বোটে উঠব আমরা দুই বুড়ো। আমি আর তুমি। ইয়াংম্যান আশ্চর্য ওখান থেকে ব্যাক করবে। ফিরে যাবে কলকাতায়। তবে ফিরবে অন্য একটা গাড়িতে। এই গাড়িটা ওর জন্য নিরাপদ নয়। যদি এটা ইতিমধ্যেই মার্কড হয়ে গিয়ে থাকে?

ব্রহ্ম বিরক্ত হয়ে বললেন— এত কথা পুলিশ কমিশনারের চিঠিতে লেখা আছে? এসব পড়িয়ে পুলিশের স্যালুট নিলে তুমি?

—আরে না না! এই তো দ্যাখো না কী লেখা আছে! —পকেট থেকে চিঠিটা আবার বের করে ব্রহ্ম ঠাকুরের দিকে ছুড়ে দিলেন এরিক।

চিঠিটা লুফে নিয়ে ব্রহ্ম ঠাকুর জোরেজোরে পড়ে শোনালেন আশ্চর্যকে। সরকারি সিলমোহর দেওয়া কাগজে লেখা আছে—

আন্তর্জাতিক অভিযাত্রী এরিক দত্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিথি। ওঁর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমানা পেরনোর স্পেশ্যাল পারমিট আছে। ওঁর সঙ্গী ড: ব্রহ্ম ঠাকুরেরও আছে। ওঁরা একটা স্পিডবোটে করে মাতলা পেরিয়ে বিদ্যাধরী ধরে বঙ্গোপসাগরে পড়বেন। ওঁদের এই অভিযানে যাতে কোনও বাধাবিপত্তি না ঘটে, তা আপনারা সুনিশ্চিত করবেন। জয় হিন্দ!

১৯

চিঠিটা পড়ে এরিক দত্তকে সেটা ফেরত দিয়ে সামনের সিটের ব্যাক পকেটে রাখা একটা থার্মোফ্লাস্ক থেকে সাবধানে কফি ঢেলে নিলেন ব্রহ্ম ঠাকুর। এরিক আবার কথা বলতে শুরু করেছিলেন। জিজ্ঞাসু চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন সেদিকে।

এরিক তখন বলছেন— এবারে অবশ্য আন্তর্জাতিক সীমানা পেরোচ্ছি না আমরা। এদেশেই থাকছি। আন্দামানের একটা নির্জন সৈকতে গোপন বৈঠকটা হবে। কামিং ব্যাক টু ইয়োর 'বিলি গিলচারকে ছুড়ে ফেলব' মিশন— কাজটা আমিই করে দেব'খন! সেখানে বালির ওপর আমি ওকে তোমার হয়ে ধপ করে ফেলে দেব। তুমি তখন ওকে 'এই করেছ ভাল নিঠুর হে' গেয়ে শুনিও, কেমন?— কথা শেষ করে এরিক সামনে ঘুরে স্টিয়ারিং-এ মন দিলেন। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করতে থাকলেন— রগচটা এই পাগলা বুড়োকে নিয়ে পড়েছি মহাবিপদে। এখন এ একটু ধাতস্থ হলে বাঁচি!

অবশ্য ব্রহ্মকে 'বুড়ো' বলে সম্বোধন করলেও এরিক দত্তেরও বয়স কম নয়। ড: ব্রহ্ম ঠাকুরের চেয়ে তিনি অল্প কিছু বছরের ছোট। তবে সল্ট অ্যান্ড পেপার চাপদাড়ি, পনিটেইল করা চুল আর ফিটফাট সাহেবি পোশাকআশাকে তাঁকে অনেক বেশি চটপটে আর কেতাদুরস্ত বলে মনে হয়।

ব্রহ্ম ঠাকুর আশ্চর্যকে কালো কফি অফার করলেন। একটু কফি ঢেলে দিয়ে আড্ডা দেওয়ার মেজাজে বললেন— 'রবীন্দ্রসংগীত' বলতেই মনে পড়ে গেল আশ্চর্য— আমি দেশ থেকে পালিয়ে সুইৎজারল্যান্ডের পাহাড়ি গ্রামে যাঁর বাড়িতে গিয়ে পেয়িং গেস্ট হিসেবে উঠেছিলাম, তিনি তো কিছুতেই আমার তখনকার নাম 'দুষ্মন্ত মাহাতো' উচ্চারণ করতে পারেন না। শেষমেষ বললেন, 'তুমি টেগোরের দেশের লোক, তোমায় আমি টেগোর বলেই ডাকব।' একদিন ভারত নিয়ে গল্প করতে গিয়ে কথায় কথায় ভারতের যোগী আর জ্যোতিষবিদ্যা সম্পর্কিত একটি বই পড়ে তিনি কেমন মুগ্ধ সেকথা বলে ফেলেছেন— আর আমিও বেখেয়ালে বলে ফেলেছি 'আমার ওসব ব্যাপারে কিছুটা জ্ঞান আছে।' —ব্যাস আর যায় কোথায়! ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন এক্ষুনি হাত দেখতে হবে। তা আমি চীনদেশে শেখা ফেসরিডিং আর জ্যোতিষ মিলিয়ে যা বললাম— বেশ মিলেটিলে গেল। ভদ্রলোকও ওই গ্রামে রাষ্ট্র করে দিলেন— 'আমার বাড়িতে এক দারুণ জ্যোতিষী এসেছে ইন্ডিয়া থেকে। নাম হল টেগোর।' পরেরদিন থেকে সেখানে লাইন পড়ে যায়। আমিও কাজটা চালিয়ে যাই। অসুবিধে হয়নি। বরং অন্য একটা পরিচয় তৈরি হয়ে গিয়ে আত্মগোপনের সুবিধেই হল বেশ। ৮০ শতাংশ মিলিয়ে দিতে পারতাম। মনোচিকিৎসক হিসেবে আসলে কাজে লাগিয়েছিলাম মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের স্টাডি। কেউ কিছু প্রশ্ন করলে উত্তর দিয়ে দিতাম মোটামুটি নির্ভুল। প্রশ্ন এবং প্রশ্নের ধরনের মধ্যেই আসলে উত্তর লুকিয়ে থাকে। তা পড়ে নিতে হয়।

আশ্চর্যের দিকে মুখ ফিরিয়ে এরিক দত্ত বললেন— তাই তো স্টিফেন হকিং-এর মিটিং-এ কৌশলে নেওয়া যোগ্যতার পরীক্ষায় ডাক্তার পাশ করে গেল উইথ ডিসটিংকশন। হকিং বললেন, 'এত তাড়াতাড়ি যে নিজের নতুন একটা পরিচয় তৈরি করে মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, প্রিয় হয়ে উঠতে পারে, তার ক্ষমতা আছে মানতেই হবে।' ডাক্তারকে বললেন তিনি, 'তোমার এই জ্যোতিষী পরিচয়টা কাজে লাগাও। অনেককিছুরই ভেতরে ঢুকে পড়তে পারবে। আজকাল এফবিআইও ক্লেয়রভয়েন্টদের সাহায্য নেয়। ঢুকে পড়ো ব্যাপারটার মধ্যে। প্রচুর টাকাও রোজগার করতে পারবে। তবে এটাকে সিরিয়াসলি নিও না। আমি গ্রিন সিগনাল দিলেই তুমি ভারতে ফেরত যাবে। আপাতত আমি বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মহাকাশের ছিদ্রপথ-তত্ত্বটা নিয়ে ভাবছি। চ্যাপলিনের ছবিতে দেখা সময়-অভিযাত্রীর কথাও ভাবছি। কিন্তু প্রকাশ্যে সেসব কথা বলা যাবে না। একটা 'থিওরি অফ এভরিথিং'-এর খোঁজ যদি পাওয়াও যায়, আইনস্টাইনের আপাত পরস্পরবিরোধী 'থিওরি অফ রিলেটিভিটি' আর 'কোয়ান্টাম থিওরি' যদি মিলিয়েও ফেলা যায়— সেই ফলাফল অসম্পাদিতভাবে জনসমক্ষে এলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। কাজেই গোপনীয়তা রক্ষা করা দরকার। দরকার তিনটে ছয় ঘণ্টার টাইম জেনে পৃথিবীর আহ্নিক গতির ২৪ঘণ্টার মধ্যে ১৮ঘণ্টাকে ভাগ করে ফেলা। বাকি ছ'ঘণ্টা নিয়ে চিন্তা নেই। একটা ওয়র্মহোলের বাস্তবতার সন্ধানে ক্রমাগত ট্রান্সমিটার চালু রাখতে হবে। ঈশ্বর অবশ্য এটাকে ভাল চোখে দেখবেন না। তিনি বলবেন— '৬-৬-৬'? এতো শয়তানি ত্রিভুজ! ঠিক যেমন বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে বলা হত 'ডেভিল'স ট্রায়াঙ্গল'! —এই সব ভেবেচিন্তে আমি এই প্রোজেক্টের নাম রেখেছি 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নাম্বার টু'।'

ব্রহ্ম ঠাকুর বললেন— স্টিফেন হকিং থাকবেন আমেরিকায়, এরিক কখনও থাকবে গ্রিনিচ ভিলেজে, কখনও বা জার্মানি থেকেই সে ব্যাপারটা সামলাবে। আর আমি থাকব ভারতে। এইভাবে আমরা মোটামুটি প্লাস-মাইনাস ছয় ঘন্টার দূরত্বে থাকব। শুনলে তো— বিলি বলেছে, আমার নাম নাকি সে ফাঁস করে দিয়েছে 'প্রোজেক্ট বারমুডা ট্রায়াঙ্গল টু' থেকে নজর ঘোরাতে! হতচ্ছাড়া! আমি কিন্তু আসলে এই 'ব্রহ্ম ঠাকুর' নামটা তৈরিই করেছিলাম এই প্রোজেক্টের নাম থেকে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের আদ্যক্ষর দুটোর সঙ্গে মিলিয়ে! একেবারে সেই বার্লিন মিটিং-এ বসেই!

এরিক দত্ত বললেন— আরে ডাক্তার, তুমি তো বললে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে আমাদের কারবার। অতএব বি ফর ব্রহ্মাণ্ড। টি ফর ঠাকুর কারণ আমরা প্রমাণ করে দেব ব্রহ্মাণ্ড তথা বিশ্বপ্রকৃতিই ঠাকুর অথবা ঈশ্বর, আর এমনিতেই লোকে তোমায় 'টেগোর' বলা অলরেডি শুরু করে দিয়েছে। সুতরাং নামটা হবে 'ব্রহ্মাণ্ড ঠাকুর'! আমি বললাম, সবই ঠিক আছে, কেবল ব্রহ্মাণ্ড শুনলেই আমার কেন জানি না মাথায় আসছে —প্রকাণ্ড এক অকালকুষ্মাণ্ড— এই কথাটা। এটা ট্যাগলাইন করে নিতে পার তোমার। হাঃ হাঃ! একটা বিশেষণও বসিয়ে নিও সামনে। বিশেষণটা হল 'অপোগণ্ড'! কী? ঠিক কি না ডাক্তার?

এরিকের দিকে কটমট করে চেয়ে রইলেন ড: ব্রহ্ম ঠাকুর। মিচকে লোকটার এতটা অসভ্যতার যোগ্য উত্তর দিতে তাঁর রুচিতে বাধছে।

আশ্চর্য ব্রহ্মকে বলল— তাই আপনি নামটা শর্ট করে নিয়ে ব্রহ্ম হলেন? বাঃ! আচ্ছা— দুটো প্রশ্ন, আপনি তো ওই মিটিং-এর ঠিক পরেই ভারতে চলে আসেননি, সারা বিশ্বে ঘুরে বেরিয়েছেন। এটা কেন আর কীভাবে? আর ১৮ ঘণ্টাকে তিন দিয়ে ভাগ কেন? ২৪ঘণ্টাকে চার দিয়ে ভাগ নয় কেন?

ব্রহ্ম বললেন— আহ, এই সহজ ব্যাপারটা বুঝতে পারলে না। ধরা যাক মহাকাশে আমরা একটা লক্ষ্যকে নির্বাচন করেছি। এবার পৃথিবীর উপরে তুমি সময়ের হিসেবে ছ'ঘন্টার দূরত্বে তিনটি পয়েন্ট কল্পনা করো। পয়েন্ট এ, বি এবং সি। এবার মহাকাশের নির্বাচিত পয়েন্টটা থেকে গ্লোবের দিকে তাকাও। পয়েন্ট এ যখন তোমার পয়েন্ট অফ ভিউয়ে একেবারে বাঁদিকে, তখন বি আছে সেন্টারে, সি একদম ডাইনে। এবার পৃথিবী তো আহ্নিক গতির কারণে নিজেই অবিরত লাট্টুর মতো নিজের অক্ষে পাক খাচ্ছে। পয়েন্ট এ যখন সেন্টারে আসবে, তখন বি কোথায় যাবে বলো তো?

আশ্চর্য একটু ভেবে বলল— এ যখন সেন্টারে আসবে? তখন বি চলে যাবে একেবারে ডাইনে।

এরিক বললেন— আর এ যখন একেবারে ডাইনে তখন সি কোথায়?

আশ্চর্য খানিকক্ষণ চুপ করে হিসেব কষলো। তারপর হাসিমুখে বলল— সি তখন একেবারে বাঁদিকে। আই গট ইয়োর পয়েন্ট। একদম ঠিক। তিনটি পয়েন্ট ছ'ঘন্টার দূরত্বে বসিয়ে নিতে পারলেই কেল্লাফতে। মহাকাশের একটি নির্ধারিত বিন্দু কখনই চোখের আড়াল হবে না পৃথিবীর উপর থেকে। চমৎকার! এবার আমার অন্য প্রশ্নটা। আমি জানতে চাইছিলাম—

কিন্তু আশ্চর্যের কথাটা আর শেষ হল না। একটা বিশ্রী ব্রেক কষে গাড়িটা থামিয়ে দিতে বাধ্য হলেন এরিক দত্ত। হেডলাইটের আলোয় দেখা গেল বেশ দশাসই একটা লোক একটা সাবমেশিনগান তাগ করে রেখেছে এরিকের নীল এসইউভির উইন্ডস্ক্রিনের দিকে।

সাবমেশিনগান হাতে ধরা বিশালকায় লোকটার পোশাকের রঙ গেরুয়া। মাথার চুল বেশ দীর্ঘ, রাতের হাওয়ায় চুলগুলো উড়ছে। দাড়িটিও বেশ বড়, নেমে এসেছে প্রায় বুক অবধি। তার পেছনে দেখা গেল আরও কয়েকজনকে। অন্য যারা কেউ টর্চ, কেউ বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের পোশাকের রং কালো।

ব্রহ্ম ঠাকুর গাড়ির দরজাটা দ্রুত খুলে দুটো হাত মাথার উপর তুলে এগিয়ে গেলেন লোকটার দিকে।

২০

ব্রহ্ম তাগড়াই লম্বাচুল দাড়িওয়ালা লোকটার দিকে এগোতে এগোতে বললেন— বন্দুকটা নামিয়ে নে আতু। এটা আমাদেরই গাড়ি। আমরাই এসেছি। পেছনের লোকগুলো কি তোরই দলবল?

—ওহ— তোরাই? যাক! গাড়ির হেডলাইটের পেছনে তোদের মুখগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম না।

—বুঝতে পারলাম!

—হ্যাঁ রে! ঝুঁকি তো নেওয়া যায় না! তবে জায়গাটা নির্জন। তোদের গাড়িটাই প্রথম এল। আচ্ছা— হ্যাঁ রে— তুই তো বললি কৈখালিতে মাতলা নদীর ধারে তোদের একটা শেষ সংঘর্ষ হবে— তাই আমি কয়েকজন ভাড়াটে যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে এলাম। কিন্তু এখনও অবধি তো কাউকেই আসতে দেখলাম না। যোদ্ধারা বেশ আশাহতই হয়েছে। ভেবেছিল গোলাগুলি চলবে! এখন তো মনে হচ্ছে আবার তুই আমায় ভুজুংভাজুং দিয়েছিস, তোর তো দেখছি এটা অভ্যেস হয়ে দাঁড়িয়েছে— এই বলে হাঃ হাঃ করে হাসতে থাকলেন 'আতু' বলে সম্বোধিত বিশালদেহী ব্যক্তি।

এরিক দত্ত আর আশ্চর্য এতক্ষণে নেমে এসেছিল গাড়িটা থেকে। ব্রহ্ম তাদের দিকে ফিরে বললেন— আলাপ করিয়ে দিই। এটি আমার বছর ষোলোর পুরনো বন্ধু, পুরো নামটা বিশেষ কারণে বলছি না, ও-ও চাইবে না ওর এই লুকনো গুন্ডাগিরির পরিচয় প্রকাশ্যে আসুক। তোমরা 'আতুবাবু' এই নামেই ওকে ডাকতে পার। আর আমায় ও কখনও কখনও 'বোমা' বলে ডাকত, তবে বহুদিন হল ওর মুখে ওই ডাকটা শুনিনি। যাই হোক, আতুকে বলি—

এই বলে ব্রহ্ম ঠাকুর আতুবাবুর দু'হাত জড়িয়ে ধরে বললেন— আজকে আমার এই বিপদের দিনে তুই যেভাবে পাশে দাঁড়ালি, স্পিডবোটের পাহারার ব্যবস্থা করা থেকে আমাদের আসার জন্য অপেক্ষা করা অব্দি— এই ঋণ কী করে শুধব বল তো?

আতু বললেন— কী বলছিস? আমি একবার তোকে প্রাণে মারবার চেষ্টা করেছিলাম। তারপরেও তুই বড় মনের পরিচয় দিয়ে আমার কোনও ক্ষতি করিসনি। এমনকী তোর কথামতো আমি তোর দেওয়া বোমাটা ওই বাড়িটাতে প্লান্ট করে বেরিয়ে আসবার সময় তাড়াহুড়োয় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছিলাম * —এত বড় হোঁতকা চেহারা আমার, পাশাপাশি ধুতি পরে দৌড়তে গিয়ে পায়ে ধুতির খুঁট জড়িয়ে বিপত্তির একশেষ হয়েছিল। তুই চাইলেই তোর হাতে ধরা রিমোটে চাপ দিয়ে তক্ষুনি বাড়িটা উড়িয়ে দিতে পারতিস। কিন্তু তুই তোর পুরনো বন্ধুকে সেদিন ওই বাড়িটা থেকে বেরোনোর একটা সুযোগ দিয়েছিলি। শোন রে বোমা, সারা পৃথিবী আমায় 'সাধু' বলে চিনলেও আমি একজন অসাধু লোক। কিন্তু আমি বলব, অসাধু হতে পারি, অকৃতজ্ঞ আমি নই!

ব্রহ্ম ঠাকুর কী যেন বলতে গিয়েও বললেন না। মনে হল তিনি আবেগী হয়ে পড়েছেন কথাগুলো শুনে। একবার জড়িয়ে ধরলেন আতুকে। তারপর নিজের ভেজা চোখ চট করে মুছে নিয়ে আশ্চর্যের দিকে ফিরে তাকালেন। বললেন— তোমায় কয়েকটা কথা বলব। একটু ওইদিকে চলো তো।

ব্রহ্ম আর আশ্চর্য একটু তফাতে সরে এলেন। ব্রহ্ম ফিসফিস করে বললেন— আমাদের বিটিটু প্রোজেক্টের কথা বলছি। এসব আতুর সামনে বলা যাবে না। ও আমায় আজকে সাহায্য করছে মাত্র, আমাদের নিজস্ব লোক ও নয়। শোনো, আমি আজ ট্রানসমিটার বসানো মেশিনটা চালু করে এসেছি। এমনিতে রোজ শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়ে চালাতে হয়, কিন্তু কয়েকদিন একটানা চললেও মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। ট্রানসমিটারের মাধ্যমে মহাকাশে সংকেত পাঠানোর কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে। তবুও মাঝেমাঝে তুমি আমার বাড়ি যেও। যদি বাই চান্স কেউ হামলা ক'রে মেশিনের কাজ বন্ধ করে দেয়, তোমাকে আবার তা চালু করতে হবে। দরজার চাবি তোমার বাঁ পকেটে ভরে দিয়েছি। হাত ঢোকালেই পাবে। ওই বাড়ির সামনে আমি না ফেরা অব্দি পুলিশ পোস্টিং থাকবে, কাজেই মনে তো হচ্ছে কোনও ভয় নেই। এই ব্যাপারটা এরিক একটা কাজের কাজ করে এসেছে। তবুও তুমি আমার একটা ব্যাক আপ। আন্তর্জাতিক বিটিটু প্রোজেক্টেরই তুমি ব্যাক আপ। আমাদের ধরনের মিশনে ব্যাক আপ জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ১৮ঘণ্টাকে কেন তিন দিয়ে ভাগ করা হল, তার উত্তরে তুমি যা বুঝেছ, তা পুরোপুরি ঠিক না। ভেবে দ্যাখো— তুমি যা কারণ ভাবলে তা কিন্তু ১২ঘণ্টার দূরত্বে দু'টি কেন্দ্র বসালেও হয়ে যেত। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে মহাকাশের একটি বিন্দু সেভাবেও চোখের আড়াল হত না। কিন্তু এই ১২ ঘণ্টার একদম মাঝামাঝি, দুটো কেন্দ্র থেকেই ছ'ঘন্টার দূরত্বে যে থাকছে, সে আসলে সংযোগসাধক। এবং অন্য দু'জনেরই ব্যাক আপ বা আপৎকালীন বদলি। আসলে সেই মোস্ট ইম্পর্টেন্ট। একদম শূন্য দ্রাঘিমাংশ বা তার কাছাকাছিই তার অবস্থান। বুঝতেই পারছ, এরিক দত্তই ছিল সেই দায়িত্বে— হি ইছ অ্যান্ড অলওয়েছ উইল বি দ্য মোস্ট ইম্পর্টেন্ট পার্সন ইন দিস। এছাড়াও, তিনটি কেন্দ্র থেকে নিয়মিত সংকেত পাঠানোর কাজে যাতে আমরা আরও উন্নত হতে পারি, তার জন্য সহযোগী গবেষণাকল্পে আমাদের কয়েকটা ল্যাব আছে। সিয়াটেলেরটা যেমন ছিল। জাপানে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকেন্দ্র আছে, পরে তোমায় বলা যাবে সেটির কথা। এসব কাজকর্ম কিন্তু লুকিয়ে রাখা দরকার। মহাকাশের চোরাপথ আবিষ্কৃত হতে পারে যেকোনও দিন। তখন সময়াভিযান সম্ভব হবে। সে হদিশ পেলে দুরভিসন্ধিযুক্ত লোকেরা ইতিহাসকে আরও কালিমালিপ্ত করবে। সেই ভয়েই কি বিলি বলেছিল 'অ্যাবর্ট দ্য মিশন'? হতেও পারে!

আমি একটা ঝুঁকি নিচ্ছি। মিশন চলুক। আমরা বিলির সঙ্গে কথা বলে শেষ সিদ্ধান্ত নেব। 'দ্য গার্জিয়েনস অফ ব্যালেন্স'—অর্থাৎ 'হিডেন ব্যালেন্স'-এর কেন্দ্রীয় কমিটি কোন পথে চলে সেটাও দেখতে হবে। আমার নাম শত্রুদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে। তাই বিপদটা আমি আমার ঘাড়ে নেব। হয়তো আমি অতর্কিতে খুন হয়ে যাব। হয়তো কেন বলছি? জ্যোতিষে অল্পবিস্তর জ্ঞান এবং চর্চা, দুটোই আছে আমার। জেনে বুঝেই বলছি। আমার মৃত্যুযোগ রয়েছে, ওই যেটাকে তোমরা 'ফাঁড়া' বলো। ফাঁড়া কাটতেও পারে, নাও পারে। অবশ্য তাতে কীই বা এসে যায়? আমি বৃদ্ধ মানুষ। আমার জীবন এমনিতেও অতিক্রান্ত। কিন্তু এই মিশন অমর। মিশন চলবে।

একথাটা শুনে হঠাৎ চোখে জল এসে গেল আশ্চর্যর। সে বলল— বলুন ব্রহ্মদা, মেশিন বন্ধ হয়ে গেলে আমায় কী করতে হবে? আপনি ভালয় ভালয় ফিরে আসবেন সে আমি জানি। জ্যোতিষে আমি বিশ্বাস করি না। তাই মরবার কথা প্লিছ বলবেন না। প্লিছ। ব্রহ্ম ঠাকুর মরতে পারেন না। হেরে যেতে পারেন না।

ব্রহ্ম ঠাকুর আশ্চর্যের হাতটা ধরলেন। একটু আদর করে তার চুলটা ঘেঁটে দিলেন। তারপর বললেন— বেশি কিছু না। মেশিন কোনও কারণে বন্ধ হয়ে গেলে আমার কনসালটেশন রুমে একটা বিপবিপ শব্দ ক্রমাগত হতে থাকবে। যদি তুমি ওটা শোনো, আমার টেবলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। যে টেবলে আজ তোমায় কফি বানিয়ে খাওয়ালাম। ওই টেবলটা আসলে একটা প্যানেল। তুমি সবুজ রঙের কফি মাগটা তুলবে। প্যানেলে হাল্কা সবুজ আলোর ইনস্ট্রাকশন ফুটে উঠবে। সেই ইনস্ট্রাকশন অনুযায়ী কাজ করবে। আধঘন্টা লাগবে। কাজ শেষ হয়ে গেলে লাল কফি মাগ তুলবে। মেশিন হাইবারনেশন মোডে চলে যাবে।

আশ্চর্য বলল— কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ মিশনের আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক আপ হিসেবে আমায় বেছে নিলেন কেন ব্রহ্মদা? আমি তো অতি সাধারণ! আপনার মতে, আমার মধ্যে তো কোনও 'বিপ্লবী সত্তা'ই নেই। তাই না?

ব্রহ্ম আশ্চর্যের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন। আশ্চর্য যে তাঁকে একটু কটাক্ষ করেছে, তা বুঝলেন। ওকে মোক্ষম জবাবটা দেওয়ার জন্য মনে মনে কথা গুছিয়ে নিলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন— কী জানো, বিপ্লব শব্দটা নিয়ে খানিকটা অ্যালার্জি জন্মেছে আমার, বুঝলে! কেন, বলছি। কাগুজে বিপ্লবীদের প্লাস্টিক-তড়বড়ানি আমি অনেক দেখেছি। সত্যিকারের বিপ্লব তো বহুদূরের কল্পকথা, বাচাল ফেসবুক-তার্কিকদের সংগ্রাম যেন অন্যত্র! এক তত্ত্ব দিয়ে অন্য তত্ত্বকে ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ করে কাটাকুটিসর্বস্ব বেচাল জীবন অধিকাংশের। ফলে সবকিছু বানচাল হয়ে হাতে পড়ে থাকে ঘেঁচু। তত্ত্বের কচকচির আবর্তে মানুষগুলো হয়ে পড়ে সামাজিক প্রোফাইলমাত্র। আর বিপ্লব? সে যেন অন্তঃসলিলা এক ফল্গুনদী— বাইরে যার কোনও প্রকাশ নেই। পরিকল্পনাও নেই। শোনো আশ্চর্য, মনে রেখ— অতি দর্পে হত লঙ্কা, আর অতি তর্কে লবডঙ্কা! তুমি অবশ্য ওদের মতো নও। একটা অতি সাধারণ কিন্তু স্বাভাবিক ছেলে। তোমার মধ্যে কোনও লোক দেখানো ফুলিয়ে ফাঁপানো বিপ্লবী সত্তা নেই। তাই তুমিই আমার কাছে নির্ভরযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য। পাশাপাশি শেষ এক সপ্তাহে তুমি আমার পাশে ছিলে। ওই কয়েকটা দিন খুব দুশ্চিন্তায় কেটেছে আমার। নিজেকে সামাল দিতেই তোমায় বলেছিলাম 'তুমি রোজ কোনও না কোনও সময়ে একবার আমার বাড়ি ঢুঁ মারতে পারবে?' তুমি প্রতিদিন এসেছ। হয়তো ভেবেছ তোমার রোগ সারাতে তোমাকে ডাকছি। তোমার মাথার ব্যামোর কিছু জটিলতা নিয়মিত দেখভাল দাবি করে ঠিকই। কিন্তু তাই বলে এই রোগের জন্য রোজ হাজিরা দিতে হবে, তাও তো না। আসলে আমি দেখতে চাইছিলাম তুমি এই বুড়োটাকে সত্যিই ভালবাসো কি না। তার কথা মান্য কর কি না। আমিও তোমাকে খুব ভালবাসি— এটা জেনে রাখো।

আশ্চর্য লাজুক গলায় বলল— জানি ব্রহ্মদা।

ব্রহ্ম বললেন— শোনো, তোমার উপর যে ভরসা করতে পেরেছি, তার প্রতিদানস্বরূপ তোমার ছবিটা আমি করব। তোমার প্রস্তাবিত ওই জমিদারের রোলটা রেখে দাও। বেঁচে ফিরতে পারলে অবশ্যই করব। কিন্তু তার পরেও কথাটা হচ্ছে, আমি কি অ্যাক্টিং করতে পারব? ফিল্ম অভিনয়ের আমি কীই বা জানি!

২১

এরিক দত্ত আর আতুবাবু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে কীসব আলোচনা করছিলেন। ব্রহ্ম ঠাকুর জোরে একটা হাততালি দিয়ে উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সবাই তাঁর দিকে ফিরে তাকাতেই তিনি বললেন— আমার শত্রুদের ব্যবস্থা এরিক করে এসেছে। কিন্তু তারপরও যদি কেউ আমাদের পিছু নিয়ে থাকে, তাদের সঙ্গে সংঘর্ষের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা দরকার। আমি সহযোগী গুন্ডাভাইদের প্রতি বিনীত অনুরোধ করছি, আপনারা সতর্ক থাকুন। আমরা স্পিডবোট করে রওনা দেওয়ার আধঘণ্টা অব্দি অন্তত এই জায়গাটা আপনারা পাহারা দেবেন, এটুকু আমার প্রার্থনা।

এবার কথা বলবার পালা এরিক দত্তের। তিনি আশ্চর্যকে বললেন— তুমি ওই ডানদিকের রাস্তাটা ধরে মিনিট দশেক হাঁটলেই একটা নীল রঙের স্যান্ট্রো দেখতে পাবে। আমরা আমাদের বিটিটু প্রকল্পের কাজে শুধু নীল রঙের গাড়িই ব্যবহার করে থাকি। গাড়িটায় দেখবে একজন চালক ঘুমোচ্ছে। আসলে ঘুমোচ্ছে না। ঘাপটি মেরে পড়ে আছে আর মশার কামড় খাচ্ছে। হট্ট কোম্পানী যাত্রাপার্টিতে লোকটা ঘুমন্ত মানুষের অ্যাক্টো করে। তাই ওকে ওই ঘুমের পার্ট আমি দিয়েছি। ওকে তুমি ঠ্যালা মেরে উঠিয়ে বলবে— 'একটা খাব, দুটো খাব, সাত ব্যাটাকেই চিবিয়ে খাব।' কী বলতে পারবে তো? বলো— মুখস্ত করে নাও— তোমরা তো অভিনেতা— বড়বড় বক্তিমে তো মুখস্ত করো, নাকি?

আশ্চর্য তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল— একটা খাব, দুটো খাব, সাত ব্যাটাকেই চিবিয়ে খাব।

এরিক বললেন— সাব্বাশ! ভারী সুন্দর দরদী এবং মরমী এক্সপ্রেশন দিয়েছ। এভাবেই বলবে। এটা শুনলেই নীল গাড়ির ড্রাইভার তোমায় বলবে, 'কাঁচাগোল্লা খাবেন ? নাকি ল্যাংচা?' তুমি বলবে— 'কোনওটাই না। আমি লেডিকেনি খাব।' এই বলে গাড়িতে উঠে বসবে। গাড়িটা তোমায় বাড়ি পৌঁছে দেবে।—কী আশ্চর্য, পারবে তো ঠিকঠাক বলতে? বন্দোবস্ত করা আছে। বলতে পারলেই বাড়ি পৌঁছে যাবে। ক্যাবলামি করে যদি না পারো, বা ভুলে যাও— ঘোড়ার ডিম! কাঁচকলা! নিজের রাস্তা তখন নিজেকেই দেখে নিতে হবে! এরিক দত্ত তখন আর হেল্প করতে পারবে না।

ব্রহ্ম ঠাকুর বললেন— দ্যাখো, দ্যাখো— নিজের চোখেই দেখে নাও এরিকপ্যাঁচার নকশা! আর এই লোকটা নাকি আমাকে চালবাজ বলছিল। নিজে হাড়বজ্জাত একটা মানুষ। শয়তানের হাড্ডিখানা। কেন? সিম্পলি গাড়ির নম্বরটা ওকে বলে দিতে কী হয়েছিল? ড্রাইভারকেও ওর একটা ছবি দিয়ে রাখলেই হত। তাছাড়া ও তো ছবির নায়ক। ওকে দেখলেই যে কেউ নিয়ে যাবে। কেউ রিফিউছ করবে না!

এরিক হাল্কা হেসে আশ্চর্যকেই প্রশ্ন করলেন— তা হলে জমত? একটা অ্যাডভেঞ্চার গল্পের শেষটা ল্যাবামার্কা হয়ে যেত না? আমার তো মনে হয় এটাই ভাল! সামান্য একটু রগড় হল। একটু রগড়ে দিলাম! তোমার মতো শিল্পীদের মাঝেমাঝে আমি একটু রগড়ে দিই। শিল্পীরা জানে। যেমন ব্রহ্মদত্যিদের ডাক্তারও তো আসলে শিল্পীই। ছাদে বসে তানপুরা নিয়ে ক্ল্যাসিকাল গান গায়। ওকেও তাই আমি নিয়মিত রগড়াই।

আশ্চর্য অবাক হয়ে শেষবেলার এই রসালাপ শুনছিল। দুই বুড়োর রসায়ন মাপবার চেষ্টা করছিল। এরিক তাকে হঠাৎ চমকে দিয়ে বললেন— কিন্তু আশ্চর্য— কী গ্যারান্টি আছে যে আমরা ফিরবই? তোমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে যাব না? —না না। তুমি ভয় পেও না। আমরা অত খারাপ লোক নই। এই যে, আমি তোমায় অন্তত আমার ফেরার গ্যারান্টিকার্ডটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। এই নাও।

আশ্চর্য দেখল— তাঁর গাঢ় নীল ব্লেজারের পকেট থেকে বের করে এরিক দত্ত তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন একটা অতি পুরনো ছবি। ছবিতে তরুণ এরিক, এক ভদ্রমহিলা এবং এক শিশুপুত্রকে দেখা যাচ্ছে।

এরিক বললেন— ছবির ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই—এঁরা হলেন আমার নিরুদ্দিষ্ট স্ত্রী রুথলীন এবং পুত্র রুহ। রুথলীন আমার ছেলেকে নিয়ে চলে গেছিল বাড়ি ছেড়ে, তখন ছেলের বয়স কত হবে? বছর তিনেক। আমি সেসময় অনেক খুঁজেও ওদের সন্ধান পাইনি। এর দু'বছরের মধ্যেই আমায় ইউরোপ ফেরত চলে যেতে হয়, তারপর জীবনটাই তো আরও বদলে গেল!... আমি প্রায় সবকিছুতেই সফল হয়েছি বুঝলে, হেরেছি খুব কম। ধরে নাও এটা আমার একটা পরাজয়, একটা বড়সড় পরাজয়! আমার ছেলেকে দেখলে হয়তো আর চিনতেও পারব না, তারও তো অনেক বয়স হয়ে গেল। হয়তো তাকে আমার কথা কোনওদিন বলাই হয়নি ঠিক করে। সে হয়তো আমায় চেনেই না...

এই বলে এরিক দত্ত উদাস হয়ে অন্ধকার নদীর ওপারে তাকালেন। জঙ্গলের মধ্যে অকারণেই কী যেন খুঁজতে চাইলেন। তারপর দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ধরা গলায় বললেন—

পৃথিবীতে আসলেই অনেক রহস্য আছে, সব রহস্যের সমাধান তো সম্ভব নয়! সেরকমই একটা অমীমাংসিত রহস্য হল ভালবাসা। ...এই ছবিটার আমি কোনও ডুপ্লিকেট করিনি। করবও না। দেখাই যাক না কতদিন আমার কাছে এটা থাকে। তারপর না হয় হারিয়ে যাবে। কতকিছুই তো হারিয়ে যায়। ছবিটা তাই আমার কাছে সাত রাজার ধন এক মানিক। এটা আজ তোমার কাছে বন্ধক রেখে যাচ্ছি। এটা ফেরত নিতেই আমি ফিরে আসব। আশ্চর্য, পারলে ছবিটা সাবধানে রেখ।

হাতে পুরনো হলদেটে ছবিটা নিয়ে আশ্চর্য চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। অদ্ভুত এক আবেগের বিস্ফোরণে ওর গোটা শরীরটা যেন অবশ হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যেই রাতের অভিযাত্রী এবং তাদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা ব্যস্ত হয়ে উঠল। দুই বুড়ো গাড়ির ব্যাকসিটে রাখা বড় ব্যাগটা গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে স্পিডবোটে উঠে পড়েছিলেন। বোটে একজন চালক এবং একজন নৈশপ্রহরী আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। তারা দুই বৃদ্ধকে স্যালুট করে স্পিডবোটটা চালু করে দিল।

এ রকম একটা সময়েই আশ্চর্যের হঠাৎ মনে পড়ল, আরেহ! ব্রহ্ম ঠাকুরকে সে দুটো প্রশ্ন করেছিল। সেগুলোর মধ্যে একটার উত্তর পাওয়া গেলেও, অন্যটার উত্তর ব্রহ্মদা দিয়ে গেলেন না তো! মুখ তুলে তাকিয়ে সে দেখল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। স্পিডবোটটা ততক্ষণে বেশ গতি তুলে হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার নদীপথে।

স্পিডবোটের আরোহী দুই বৃদ্ধ কোনদিকে তাকিয়ে ছিলেন, অন্ধকারে ঠিক বোঝা গেল না। তাঁরা কি তাকিয়ে ছিলেন বোটের গতির অভিমুখে, অনাগত ভবিষ্যতের নিশানায়? নাকি মুখ ফিরিয়ে তাঁরা শেষবার দেখে নিচ্ছিলেন নির্জন নদীতীরটিকে? তবে নদীতীরের দিকে তাকালেও জমাট অন্ধকারে তাঁরা বোধহয় দেখতে পাবেন না, তীরে দাঁড়িয়ে হাত তুলে তাঁদের বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছে এক যুবক। তাঁদের এটা দেখতে পাওয়ার কথাও নয়, আশ্চর্য নামের নরম মনের অদ্ভুত ভাল সেই যুবকের চোখের কোল ভরে উঠেছে জলে, কোনও এক অজানা আশঙ্কায়...

ড: ব্রহ্ম ঠাকুর ফিরবেন তো?


* এই বিষয়টা সম্পর্কে বিশদে লেখা হয়েছে এই সিরিজের আগের উপন্যাস 'অনামিকা বলে ডাকতে পারি কি তোমায়?'-এ।

অধ্যায় ১ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%