চতুর্থ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড

চতুর্থ অধ্যায় – (বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড)

রচনাবলীর এই খণ্ডে নিম্নবর্ণিত গ্রন্থগুলি রয়েছে—

কবিতা ও গান—কথা, কাহিনী, কল্পনা, ক্ষণিকা, নৈবেদ্য ও স্মরণ, নাটক ও প্রহসন— ব্যঙ্গকৌতুক, শারদোৎসব ও মুকুট;

উপন্যাস ও গল্প—চতুরঙ্গ ও ঘরেবাইরে;

প্রবন্ধ—ব্যঙ্গকৌতুক ও সাহিত্য; এবং

গ্রন্থ পরিচয় অংশ। এর মধ্যে ঘরেবাইরে এবং সাহিত্য গ্রন্থে রামায়ণ-মহাভারতের প্রসঙ্গ মোটামুটি আছে; অন্যত্র নগণ্য। যাইহোক, রামায়ণ-মহাভারতের যে সব প্রসঙ্গ এই সমস্ত পুস্তকগুলিতে পাওয়া যাচ্ছে সেগুলিই এখন আলোচিত হবে।

কাহিনী কাব্যগ্রন্থের ‘বিসর্জন’ কবিতাতে মহাভারত প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে। বিসর্জন কবিতাটি মল্লিকা নাম্নী এক হতভাগিনী নারীর কথা। তার দুই ছেলে দু’বছর বয়স হওয়ার আগেই মারা গেছে, তার তৃতীয় সন্তানটি যখন জন্মালো, তার স্বামীও মারা গেল। এই শিশু সন্তানটিও হলো রুগ্ন। গ্রামের অশিক্ষিতা, দরিদ্রা, নিঃসম্বল মেয়েরা যেমন করে মল্লিকাও তেমনি তার শিশুপুত্রের মঙ্গলাকামনায় দেবতার কাছে মানত করা, ইত্যাদি সব কিছুই করেছিল কিন্তু শিশুটির রোগশান্তি হয়নি। এক ব্রাহ্মণ ঠাকুর তার দুঃখের কাহিনী শুনে বলেছিল—

”ব্রাহ্মণ কহিল, বাছা, এ যে ঘোর কলি।

অনেক করেছ বটে তবু এও বলি,

আজকাল তেমন কি ভক্তি আছে কারো?

সত্যযুগে যা পারিত তা কি আজ পারো?

দানবীর কর্ণ-কাছে ধর্ম যবে এসে

পুত্রেরে চাহিল খেতে ব্রাহ্মণের বেশে,

নিজহস্তে সন্তানে কাটিল, তখনি সে

শিশুরে ফিরিয়া পেল চক্ষের নিমেষে।

শিবিরাজা শ্যেনরূপী ইন্দ্রের মুখেতে

আপন বুকের মাংস কাটি দিল খেতে,

পাইল অক্ষয় দেহ। নিষ্ঠা এরে বলে।”

কর্ণের দানশীলতার কথা তো প্রবাদপ্রতিম। এই কবিতাটিতে কর্ণকে নিয়ে যে কাহিনীর কথা বলা হয়েছে, সে সম্বন্ধে সুবল চন্দ্র মিত্র মহাশয়ের সরল বাংলা অভিধানে’ (পৃ-৩৪৫) এই রকম লেখা হয়েছে—

”কথিত আছে যে, ইহার দানশীলতা ও সত্যপরায়ণতা পরীক্ষা করিবার নিমিত্ত শ্রীকৃষ্ণ একদা বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বেশে কর্ণের নিকট উপস্থিত হইয়া ইহার আতিথ্য স্বীকার করেন এবং ইহার পুত্রের মাংসভোজনের অভিলাষ প্রকাশ করেন। কর্ণ ও তৎপত্নী পদ্মাবতী অম্লানবদনে প্রিয় পুত্র বৃষকেতুকে ছেদন করিয়া তাহার মাংস ব্রাহ্মণের আহারার্থ প্রদান করেন। বলা বাহুল্য ব্রাহ্মণ পরিতুষ্ট হইয়া রাজা ও রানীর সবিশেষ প্রশংসা করিয়া বৃষকেতুকে পুনরুজ্জীবিত করিয়া দিলেন। কিন্তু মহাভারতে এ ঘটনার কোন উল্লেখ নাই।”

শিবিরাজার কাহিনী মহাভারতে আছে। কাশীরাম দাসের মহাভারতে বলা হয়েছে যে বিতস্তা নদী শিবিরাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। সেখানকার রাজা ছিলেন মহাধর্মশীল উশীনর। তাঁর ধর্মশীলতা পরীক্ষা করার জন্য অগ্নিদেব কপোত বা পায়রার রূপ ধারণ করলেন আর ইন্দ্র হলেন শ্যেনপক্ষী। শ্যেনের তাড়া খেয়ে কপোত উশীনরের কোলের মধ্যে আশ্রয় নিল। শ্যেন তাড়া করে এসে উশীনরকে বললো কপোতকে ছেড়ে দিতে কারণ কপোত তার খাদ্য। উশীনর শরণাগতকে পরিত্যাগ করতে রাজী হলেন না, বিনিময়ে শ্যেনকে নানাবিধ অন্য মাংস দিতে রাজী হলেন কিন্তু শ্যেন কপোত ছাড়া অন্যকিছুই নেবেনা। এই নিয়ে অনেক আলোচনা হলো—শেষে শ্যেন বললো যে কপোতের সমান ওজনের মাংস যদি উশীনর নিজের শরীর থেকে কেটে দেন, তবে শ্যেন সেটা নেবে। উশীনর খুব খুশি হয়ে তূলাদণ্ডের একদিকে কপোতকে স্থাপন করলেন এবং অন্যদিকে নিজের শরীর থেকে মাংস কেটে দিতে লাগলেন। কিন্তু উশীনরের দেহের মাংস কিছুতেই কপোতের ওজনের সমান হয় না। শেষে উশীনর নিজেই তূলাদন্ডে উঠে বসলেন। এবারে ইন্দ্রদেব ও অগ্নিদেব আত্মপ্রকাশ করলেন, তাঁরা উশীনরের ধর্মপরায়ণতায় খুব খুশি হলেন এবং ব্যাপারটির শুভ পরিণতি ঘটলো।

কল্পনা কাব্যগ্রন্থে দু’টি কবিতা আছে— মদনভস্মের পূর্বে ও মদনভস্মের পর। তপস্যায় বিঘ্ন ঘটাবার জন্য ক্রুদ্ধ শিব অনঙ্গদেবতা মদনদেবকে ভস্মীভূত করে দেন। পৌরাণিক এই কাহিনীর সঙ্গে ররীন্দ্রকবিতার বিশেষ যোগ নেই। তিনি শুধু ‘মদনভস্ম’ কথাটি গ্রহণ করেছেন আর নিজের কল্পনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন কবিতা দুটি।

ক্ষণিকা কাব্যের ‘বোঝাপড়া’ কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন—

”তোমায় কতক ফাঁকি দেবে

তুমিও কতক দেবে ফাঁকি,

তোমার ভোগে কতক পড়বে

পরের ভোগে থাকবে বাকি,

মান্ধাতারই আমল থেকে

চলে আসছে এমনি রকম-

তোমারই কি এমন ভাগ্য

বাঁচিয়ে যাবে সকল জখম।”

মান্ধাতার কাহিনী রামায়ণে আছে। ‘বহু প্রাচীন কাল’ বোঝাতে ‘মান্ধাতার আমল কথাটি ব্যবহৃত হয়।

ব্যঙ্গকৌতুক গ্রন্থে ‘ নূতন অবতার’ নাটিকাটিতে গঙ্গা, ভগীরথ, ষাট হাজার সগর সন্তান—এইসব কথা আছে। এটি একটি কৌতুককাহিনী, হাল্কাভাবে লেখা। অন্য কোথাও ভগীরথ প্রসঙ্গ আলোচনা করা যাবে। এই কৌতুক কাহিনীর তৃতীয় অঙ্কে ব্যাসদেবের নাম বলা হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবানের যে চতুর্বিংশাতি অবতারের কথা বলা আছে, ব্যাসদেব হলেন তার সপ্তদশ অবতার। মহাভারত মহাগ্রন্থের রচয়িতা তিনিই।

স্বর্গীয় প্রহসন—এই গ্রন্থের আর একটি কৌতুক-নাটিকা। পৌরাণিক দেবদেবী যেমন ইন্দ্র, চন্দ্র, বৃহস্পতি প্রভৃতি এবং লৌকিক দেবদেবী যেমন শীতলা ওলাবিবি ঘেঁটু প্রভৃতি এই নাটিকাটির বিভিন্ন চরিত্র। রামায়ণ বা মহাভারতের কোনো কাহিনী এই নাটিকাটিতে পরিবেশিত হয়নি তবে হিন্দুসমাজে নিত্যনূতন দেবদেবীর উদ্ভব নিয়ে ব্যঙ্গ সহজেই বোঝা যায়।

‘বশীকরণ’ কৌতুকনাটিকাটির তৃতীয় অঙ্কে ঊনপঞ্চাশ বায়ুর কথা বলা হয়েছে। কাশীরামদাসের মহাভারতে ঊনপঞ্চাশ বায়ুর জন্মকথা আছে। কশ্যপপত্নী অদিতি দেবগণের মাতা। দেবরাজ ইন্দ্র তাঁরই সন্তান। কশ্যপ অদিতিকে একবার এক মহাবলবন্ত পুত্রের বর দিয়েছিলেন। সেই বর অনুসারে পবনদের যখন মাতৃগর্ভে তখন দেবর্ষি নারদ সুররাজ ইন্দ্রকে সেই কথা জানিয়ে বলেছিলেন যে অদিতির এই সন্তান মহাবলিষ্ঠ হবে। ইন্দ্র চিন্তাম্বিত হয়ে ভাবলেন—

”এই ক্ষণে না করিলে সংহার ইহারে। জন্মিলে অনেক দুঃখ দিবেক আমারে।।

এতেক বিচার চিত্তে বাসব করিল। সূক্ষ্মরূপে জননীর গর্ভে প্রবেশিল।।

যেইকালে নিদ্রাগতা দক্ষের নন্দিনী। সেই গর্ভ কাটি ইন্দ্র করে সাতখানি।।

পুনশ্চ প্রত্যেকখানি কাটে সাতবার। তাহাতে হইল ঊনপঞ্চাশ প্রকার।।

”ক্রমে ঊনপঞ্চাশৎ জন্মে প্রভঞ্জন। দেখিয়া হইল ইন্দ্র সবিস্ময় মন।।”

মুকুট নাটকে তিন রাজকুমার—যুবরাজ চন্দ্রমাণিক্য, ইন্দ্রমাণিক্য ও রাজধর। মধ্যমকুমার ইন্দ্রমাণিক্য যুবরাজের খুব অনুগত। অনুচরদের একজন অন্যদেরকে বলছে—”আমাদের যুবরাজ বেঁচে থাকুন আর আমাদের মধ্যমকুমার ভাই লক্ষ্মণের মতো সর্বদা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে থেকে তাঁকে রক্ষে করুন, ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করো।” রামায়ণের লক্ষ্মণ-বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠভ্রাতা রামচন্দ্রের অত্যন্ত অনুগত এবং তাঁর ভ্রাতৃভক্তি প্রবাদ প্রতিম।

চতুরঙ্গ উপন্যাসে (সুলভ-৪ পৃ-৪৫৮) গীতার একটি শ্লোকের অর্ধাংশ-স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় : পরধর্মোভয়াবহঃ— বলা হয়েছে। এই শ্লোকটি নিয়ে আগে আলোচনা করা হয়েছে।

শতবর্ষ আগে লেখা রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসটি এখনও প্রচন্ড রকমের আধুনিক। সন্দীপের মতো মেকি ও কুটিল মানুষেরা এখনও সর্বত্র ছড়ি ঘোরায় এবং নিখিলেশের মতো সাচ্চা মানুষদের এখনও ভুল বোঝা হয়। এই উপন্যাসে রামায়ণ মহাভারতের অনেক প্রসঙ্গই বিভিন্নস্থানে আছে। বিমলার বিয়ে হয়েছে রাজপরিবারে, স্বামী নিখিলেশ রাজপরিবারের চালু অভ্যাসের বাইরে গিয়ে অত্যন্ত সৎচরিত্রের সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ।

বিমলা-নিখিলেশের সংসারে আছেন নিখিলেশের দুই বিধবা ভ্রাতৃবধু এবং ঠাকুমা। সেই ঠাকুমা যখন মারা গেলেন তখন লিখিলেশ চেয়েছিল স্ত্রী বিমলাকে নিয়ে কলকাতায় গিয়ে থাকতে। এতে বিমলা রাজী হয়নি কারণ সেক্ষেত্রে তাদের রাজ্যপাট, ঘরসংসার সবই বিমলার দুই জা-র হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে হয়। বিমলা তাই বলছে—

”এ সমস্তই ওঁদের হাতে দিয়ে সীতা যেমন নির্বাসনে গিয়েছিলেন তেমনি করে চলে যাব! আর, ওরা পিছন থেকে হাসবেন? ওঁরা কি আমার স্বামীর এ দাক্ষিণ্যের মর্যাদা বোঝেন, না তার যোগ্য ওঁরা?” রামায়ণের সীতা মনে হয় না এই মানসিকতা নিয়ে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গিয়েছিলেন।

সন্দীপের বক্তৃতা প্রসঙ্গে বিমলা বলছে ( সুলভ-৪, পৃ ৪৮৩) ”আমার মুখের দিকে চাওয়ার পর থেকে তার ভাষার আগুন আরো জ্বলে উঠল। ইন্দ্রের উচ্চৈঃশ্রবা তখন আর রাশ মানতে চাইল না—” উচ্চৈঃশ্রবা ইন্দ্রের অশ্ব। সমুদ্র মন্থনে উঠেছিল।

ঐ গ্রন্থেরই ৪৮৭ পৃষ্ঠাতে সন্দীপের কথা—”বিদ্বেষও পূজার অঙ্গ। কিরাতবেশী মহাদেবের সঙ্গে লড়াই করেই অর্জুন বরলাভ করেছিলেন।” মহাভারতে কিরাতবেশী মহাদেবের সঙ্গে অর্জুনের লড়াইয়ের বর্ণনা আছে। পাশাখেলায় হেরে গিয়ে পাশুবেরা তখন বনবাসে। তেরো বৎসর পর তারা যখন বনবাস ও অজ্ঞাতবাস পর্ব শেষ করবেন তখন দুর্যোধন যে তাঁদের রাজ্য ফেরৎ দেবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। প্রবল সেই শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলে তাঁদেরকেও তৈরী হতে হবে। পাণ্ডবদের প্রধান বীর হলেন অর্জুন। এটাই ঠিক হলো যে তপস্যা দ্বারা অর্জুন দেবতাদের প্রসন্ন করে তাঁদের কাছে দিব্যাস্ত্রসকল প্রার্থনা করবেন। তাঁকে বলা হলো যে দিব্যাস্ত্র পেতে হলে আগে তাঁকে মহাদেবকে প্রসন্ন করে তাঁর কৃপা প্রার্থনা করতে হবে। সেইমতো অর্জুন হিমালয়ে গিয়ে মহাদেবের তপস্যা শুরু করে দিলেন। একদিন একটা বন্য বরাহ অর্জুনকে আক্রমণ করার জন্য ছুটে এলো। আত্মরক্ষার জন্য অর্জুন তীর ছুঁড়লেন। সেই সময়ে এক কিরাত (ব্যাধ) এবং তাঁর পত্নীও সেইখানে এলেন। কিরাত বরাহকে লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়লেন। দুই তীর একই সঙ্গে বরাহ-কে বিদ্ধ করলো এবং বরাহ প্রাণত্যাগ করলো। এই নিয়ে কিরাতের সঙ্গে অর্জুনের ঝগড়া বেধে গেলো—তা থেকে যুদ্ধ। অর্জুনের মহাশক্তিশালী অস্ত্রসমূহ কিরাতের কাছে ব্যর্থ হলো। তারপর দু’জনের মল্লযুদ্ধ শুরু হলো, কিন্তু অর্জুন কিছুতেই সেই কিরাতকে পরাজিত করতে পারলেন না—বরং নিজেই বিধ্বস্ত হয়ে গেলেন। তখন অর্জুন নিজের ইষ্ট শিবের পূজা করলেন। পূজার সময় যে পুষ্পমালা তিনি শিবলিঙ্গকে পরিয়ে দিলেন অবাক হয়ে দেখলেন সেই মালা কিরাতের গলাতে। অর্জুন তখন বুঝতে পারলেন যে এই কিরাত স্বয়ং মহাদেব। অর্জুন তখন তাঁর স্মরণ নিলেন, ভক্তবৎসল মহাদেবও তাঁকে কৃপা করলেন।

এই গ্রন্থের (সুলভ-৪) ৫০৪ পৃষ্ঠাতে সন্দীপ চন্দ্রনাথবাবুর কাছে গীতার একটা মন্ত্রের একটুখানি বলছে— ‘মা ফলেষু কদাচন’। এই মন্ত্রটি নিয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। সন্দীপ সুবিধাবাদী, তাঁর চিন্তাধারা সঠিক নয়। এই খন্ডের ৫১৫ পৃষ্ঠাতে নিখিলেশ স্ত্রী বিমলাকে বলছেন—” তুমি তো আমাকে স্বয়ম্বর সভায় বেছে নাওনি, যেমনটি পেয়েছ তেমনি তোমাকে চোখ বুজে নিতে হয়েছে। কাজেই দেবত্ব দিয়ে আমাকে যতটা পারো সংশোধন করে নিচ্ছ। দময়ন্তী স্বয়ম্বরা হয়েছিলেন বলেই দেবতাকে বাদ দিয়ে মানুষকে নিতে পেরেছিলেন, তোমরা স্বয়ম্বরা হতে পারোনি বলেই রোজ মানুষকে বাদ দিয়ে দেবতার গলায় মালা দিচ্ছ।” দময়ন্তীর স্বয়ম্বরের কথা মহাভারতে আছে। বিদর্ভ রাজকন্যা দময়ন্তীর স্বয়ম্বরে ইন্দ্র, অগ্নি প্রভৃতি চারজন দেবতা দময়ন্তী কামনা করে স্বয়ম্বর সভাতে এসেছিলেন। পথে তাঁদের নলরাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। দময়ন্তী আগে থেকে নলরাজার প্রতি অনুরক্তা ছিলেন। দেবতারা চারজনই নলের রূপ ধারণ করে স্বয়ম্বর সভাতে নলের কাছে বসলেন। দময়ন্তী পাঁচজন নল দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন, ভাবলেন যে এটা দেবতার মায়া। দময়ন্তী তখন দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করলেন যাতে তাঁরা নলরাজকে চিনিয়ে দেন কারণ দময়ন্তী মনে মনে নলরাজাকেই বরণ করেছেন। দেবতারা দময়ন্তীর প্রার্থনা পূরণ করলেন।

৫২০ পৃষ্ঠাতে সন্দীপ অত্যন্ত অশ্রদ্ধেয় কথা বলেছে। অবশ্য তার মতো দুশ্চরিত্র নীতিজ্ঞানবর্জিত একটা দ্বিপদ জীবের পক্ষে সবকিছুই বলা বা করা সম্ভব। ”যে রাবণকে আমি রামায়ণের প্রধান নায়ক বলে শ্রদ্ধা করি সেও এমনি করেই মরেছিল। সীতাকে আপনার অন্তঃপুরে না এনে সে অশোকবনে রেখেছিল। অত বড়ো বীরের অন্তরের মধ্যে এ এক জায়গায় একটু যে কাঁচা সংকোচ ছিল তারই জন্যে সমস্ত লঙ্কাকাণ্ডটা একেবারে ব্যর্থ হয়ে গেল। এই সংকোচটুকু না থাকলে সীতা আপন সতী নাম ঘুচিয়ে রাবণকে পূজো করতো। এই রকমেরই একটু সংকোচ ছিল বলেই যে বিভীষণকে তার মারা উচিৎ ছিল তাকে রাবণ চিরদিন দয়া এবং অবজ্ঞা করলে, আর মোলো নিজে।”

এই কথাগুলো নিয়ে মনে হয় কিছু শোরগোল হয়েছিল। কারণ, গ্রন্থপরিচয় অংশে দেখা যাচ্ছে যে রবীন্দ্রনাথ ঘরে-বাইরে গ্রন্থটি নিয়ে অনেক সমালোচনার জবাব দিয়েছেন ‘সবুজপত্র’ বা ‘প্রবাসীর মাধ্যমে। সমস্ত গ্রন্থের সমালোচনার উত্তর আমাদের এই আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। ৫২০ পৃষ্ঠার যে উদ্ধৃতিটুকু দিয়েছি সেই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যটুকুই এখানে উল্লেখ করবো। প্রবাসীতে ‘সাহিত্য বিচার’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন —

”ঘরে-বাইরে বাহির হইবার পরেই আমার বিরুদ্ধে একটা নালিশ শোনা গেল যে, অমি এই উপন্যাসে সীতার প্রতি অসম্মান প্রকাশ করিয়াছি। কথাটা এতই অদ্ভুত যে আমি আশা করিয়াছিলাম যে, এমন-কি, আমাদের দেশেও ইহা গ্রাহ্য হইবে না। কিন্তু দেখিলাম লোকে উৎসাহের সহিত ইহা গ্রহণ করিয়াছে এবং জনগণের নিন্দায় একদা সীতা যেরূপ নির্বাসিত হইয়াছিলেন এ গ্রন্থও সেইরূপ গণ্যমান্যদের সভা ও লাইব্রেরীঘরের টেবিল হইতে নির্বাসিত হইতে থাকিল।”

”মহাকাব্যে নাটকে বা নভেলে যে আখ্যানবস্তু পাওয়া যায় তাহার নানা বৈচিত্র্য আছে। কিন্তু সকল বৈচিত্র্যসত্বেও সেই সমস্ত আখ্যানে একটি সাধারণ উপাদান দেখিতে পাই, সেটি আর কিছু নয়, সংসারে ভালোমন্দের দ্বন্দ্ব। তাই রামায়ণে দেখিয়াছি রাম-রাবণের যুদ্ধ, মহাভারতে দেখিয়াছি কুরু-পাণ্ডবের বিরোধ। কেবলই সমস্তই একটানা ভালো, কোথাও মন্দের কোনো আভাসমাত্র নাই, এমনতরো নিছক চিনির শরবত দিয়াই সাহিত্যের ভোজ সম্পন্ন করা অন্তত কোনো বড়ো যজ্ঞে দেখি নাই।”

”জানি আমাকে প্রশ্ন করা হইবে সন্দীপ যত বড়ো মন্দ লোকই হউক তাহাকে দিয়া সীতাকে অপমান কেন? আমি কৈফিয়ৎ-স্বরূপে বাল্মীকির দোহাই মানিব, তিনি কেন রাবণকে দিয়া সীতার অপমান ঘটাইলেন। তিনি তো অনায়াসেই রাবণকে দিয়া বলাইতে পারিতেন যে, ‘মা লক্ষ্মী, আমি বিশ হাতে তোমার পায়ের ধূলা লইয়া দশ ললাটে তিলক কাটিতে’ আসিয়াছি। বেদব্যাস কেন দুঃশাসনকে দিয়া, জয়দ্রথকে দিয়া দৌপদীকে অপমানিত করিয়াছেন? রাবণ রাবণের যোগ্যই কাজ করিয়াছে, দুঃশাসন জয়দ্রথ যাহা করিয়াছে তাহা তাহাদিগকেই সাজে। তেমনি আমার মতে সন্দীপ সীতা সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছে তাহা সন্দীপেরই যোগ্য, ………….. এবং সাহিত্যে নিন্দার বিষয় নহে।

যদি আধুনিক কালের কোনো উপাধিধারী এমন কথা গদ্যে বা পদ্যে বলিতে পারিতেন যে, রাবণের পক্ষে সীতাহরণ কাজটা অসংগত, মন্থরার পক্ষে রামের প্রতি ঈর্ষ্যা অযথা, সূর্পনখার পক্ষে লক্ষ্মণের প্রতি অনুরাগের উদ্রেক অসম্ভব, তাহা হইলে নিশ্চয় কবিগুরু বিচারসভায় হাজির থাকলেও নিরুত্তর থাকিতেন; কেননা এমন সকল আলোচনা সাহিত্যসভায় চলিতে পারে। কিন্তু তাহা না বলিয়া ইহাঁরা যদি বলিতেন এ-সকল বর্ণনা নিন্দনীয় কারণ ইহাতে সীতাকে রামকে লক্ষ্মণকে অপমানিত করা হইয়াছে এবং এই অপমান স্বয়ং কবিকৃত অপমান, ধর্মশাস্ত্র অনুসারে এই-সকল ভালোমানুষের প্রতি সকলেরই সাধু ব্যবহার করাই উচিত, তবে যে কবি সর্বাঙ্গে কীটের উৎপাত স্তব্ধ হইয়া সহ্য করিয়াছিলেন তিনিও বোধহয় বিচলিত হইয়া উঠিতেন।” (পরবর্তী অধ্যায়গুলিতে দেখা যাবে যে এই প্রসঙ্গ অনেক জায়গাতেই আছে)।

এই চতুর্থ খন্ডের ৫২৪ পৃষ্ঠাতে (সুলভ-৪র্থ) নিখিলেশ বলছেন—” আমার মধ্যে বোধহয় গুহক এবং একলব্যের রক্তের ধারাটাই প্রবল, আজ যারা আমার নীচে রয়েছে তাদের নীচ বলে আমার থেকে একেবারে দূরে ঠেলে রেখে দিতে পারিনে। আমার ভারতবর্ষ কেবল ভদ্রলোকেরই ভারতবর্ষ নয়। আমি স্পষ্টই জানি আমার নীচের লোক যত নাবছে ভারতবর্ষই নাবছে, তারা যত মরছে ভারতবর্ষ মরছে।”

গুহকের কথা আছে রামায়ণে আর একলব্যের কথা আছে মহাভারতে। চন্ডালরাজ গুহককে রামচন্দ্র মিত্র হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। নিষাদ রাজপুত্র একলব্যের অবশ্য সেরকম সৌভাগ্য হয়নি। একলব্য যখন অস্ত্রশিক্ষার জন্য গুরু দ্রোণাচার্যোর কাছে গিয়েছিল, নীচজাতি একলব্যকে দ্রোণ প্রত্যাখান করেছিলেন।

৫২৬ পৃষ্ঠাতে বিমলার আত্মকথাতে বিমলা ষাট হাজার সগর-সন্তানের ভস্মের কথা, ভাগীরথীর কথা, অহল্যার কথা, মনে করেছে। এগুলো সবই রামায়ণের কাহিনী। এইসব কথা পরবর্তী রচনাবলীতেও আসবে। রামায়ণের কাহিনীগুলো সংক্ষেপে এখানেই বলে রাখি। সূর্যবংশের রাজা সাগরের দুই পত্নী—কেশিনি ও সুমতি। শিবের বরে সুমতি ষাট হাজার সন্তানের মাতা হলেন আর কেশিনীর একপুত্র হলো অসমঞ্জ। অসমঞ্জের পুত্র অংশুমান। সগর রাজা অশ্বমেধ যজ্ঞ করলেন। ষাট হাজার পুত্রকে পাঠালেন অশ্বরক্ষণে। মদগর্বী এই পুত্রেরা কপিলমুনির অভিশাপে সবাই ভস্ম হয়ে গিয়েছিল। বহুদিন হয়ে গেলেও ঘোড়া নিয়ে যখন পুত্রেরা ফিরলো না, তখন সগর রাজা পৌত্র অংশুমানকে খোঁজখবর করতে পাঠালেন। অংশুমান কপিলমুনির আশ্রমে ঘটনা সব শুনলেন। কপিলের স্তব করে অংশুমান ঘোড়া ফেরৎ নিয়ে এলেন, যজ্ঞ সম্পন্ন হলো। সগর-পুত্রদের উদ্ধারের জন্য কপিলমুনি গঙ্গাকে মর্তে আনতে বলেছিলেন। অংশুমানকে রাজত্ব দিয়ে সগররাজা গঙ্গা আনয়ন করার জন্য বেরোলেন কিন্তু সফল হওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হলো। অংশুমানের পুত্র হলেন দিলীপ। তাকে রাজ্যভার দিয়ে অংশুমান গঙ্গার তপস্যাতে গেলেন। তিনিও সফল হলেন না। তারপর দিলীপ, তিনিও পারলেন না। দিলীপের পুত্র ভগীরথ। ভগীরথ তাঁর পূর্বপুরুষদের অপূর্ণ কাজ সফল করার দায়িত্ব নিলেন। কঠোর তপস্যা করে তিনি দেবরাজ ইন্দ্র, ভগবান শিব, ভগবান বিষ্ণু, মাতা গঙ্গা—সবাইকে প্রসন্ন করলেন। তিনি সক্ষম হলেন পতিতপাবণী গঙ্গাকে মর্তভূমিতে নিয়ে আসতে। পুণ্যতোয়া গঙ্গার সলিল স্পর্শে মুক্ত হয়ে গেলেন সগরাজার ষাট হাজার সন্তান।

অহল্যা-প্রসঙ্গ পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে ‘অহল্যার প্রতি’ কবিতার আলোচনা প্রসঙ্গে।

৫৪৬ পৃষ্ঠাতে বিমলা ও সন্দীপের কথোপকথনের মধ্যে সন্দীপ বিমলাকে বলছে—”অর্জুন যে কৃষ্ণকে তাঁর সামান্য সারথিরূপে সর্বদা দেখতেন তাঁরও একটা বিরাট রূপ ছিল, সে ও একদিন অর্জুন দেখেছিলেন; তখন তিনি পুরো সত্য দেখেছিলেন।” কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুন যখন মোহগ্রস্ত হয়েছিলেন তখন বিভিন্ন উপদেশের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্ব-স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন আর নিজের বিরাট রূপও তাঁকে দেখিয়েছিলেন।

অমূল্য হচ্ছে সন্দীপের চেলা যদিও অমূল্যর মধ্যে কিছুটা বিবেক বোধ রয়ে গেছে। সন্দীপের কাছে শেখা কথা সে বিমলাকে বলছে—”গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, আত্মাকে তো কেউ মারতে পারে না, কাউকে বধ করা, ও একটা কথা মাত্র। টাকা হরণ করাও সেইরকম একটা কথা। টাকা কার? ওকে কেউ সৃষ্টি করে না, ওকে কেউ সঙ্গে নিয়ে যায় না, ও তো কারও আত্মার অঙ্গ নয়। ও আজ আমার, কাল আমার ছেলের, আর একদিন আমার মহাজনের। সেই চঞ্চল টাকা যখন তত্ত্বত কারোওই নয় তখন তোমার অকর্মণ্য ছেলের হাতে না পড়ে দেশসেবকদের সেবায় যদি লাগে তাহলে তাকে নিন্দা করলেই সেকি নিন্দিত হবে?” এই রকম কথাবার্তার মধ্যে গীতার উল্লেখ অপব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়। তবে এগুলো যার মুখের কথা সেই সন্দীপের তো কোন নীতিবোধের বালাই নেই, যে কোন কথাই তার মুখ দিয়ে বেরোতে পারে।

ব্যঙ্গকৌতুক গ্রন্থে ‘প্রত্নতত্ত্ব’ নামক রচনায় ( সুলভ-৪র্থ; পৃ ৬০২-৬০৪) রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—” প্রাচীন ভারতে এত শত ঋষি-মুনির নাম আছে, তন্মধ্যে গল্বন ঋষির নাম বহু গবেষণাতেও পাওয়া যায় না কেন? যে পবিত্র ভারতে দধীচি বজ্রনির্মাণের জন্য নিজ অস্থি ইন্দ্রকে দান করিয়াছেন, ভীমসেন গদাঘাতের দ্বারা জরাসন্ধকে নিহত করিয়াছেন এবং জহ্নুমুনি গঙ্গাকে এক গণ্ডূষে পান করিয়া জানু দিয়া নিঃসারিত করিয়াছেন, যে ভারতে ঋষিবাক্য পালনের জন্য বিন্ধ্যপর্বত আজিও নতশির, সেই ভারতের সাহিত্য হইতে অক্সিজেন বাষ্পের নাম পর্য্যন্ত যে লুপ্ত হইয়াছে, সর্বসংহারক যবনের উপদ্রবই যদি তাহার কারণ না হয়, তবে হে ভাই বাঙালী, তাহার কি কারণ আছে জিজ্ঞাসা করি। ”গ্রন্থটির নাম ‘ব্যঙ্গকৌতুক’ এবং এই লেখাগুলির মধ্যেও প্রচুর ব্যঙ্গ এবং খোঁচা আছে।

ব্যঙ্গকৌতুক ছেড়ে আমরা এবার সাহিত্য অঙ্গনে প্রবেশ করছি। সাহিত্যের তাৎপর্য্য প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ব্যাস-বাল্মীকিকে স্মরণ করেছেন। ”ধরাবাঁধার অতীত বিচিত্র মানবচরিত্র, সাহিত্য ইহাকেও অন্তরলোক হইতে বাহিরে প্রতিষ্ঠিত করিতে চায়। অত্যন্ত দুরূহ কাজ। কারণ, মানবচরিত্র স্থির নহে, সুসংগত নহে, তাহার অনেক অংশ, অনেক স্তর, তাহার সদর-অন্দরে আবরিত গতিবিধি সহজ নয়। তাছাড়া তাহার লীলা এত সূক্ষ্ম, এত অভাবনীয়, এত আকস্মিক যে, তাহাকে পূর্ণ আকারে আমাদের হৃদয়গম্য করা অসাধারণ ক্ষমতার কাজ। ব্যাস-বাল্মীকি-কালিদাসগণ এই কাজ করিয়া আসিয়াছেন।”

‘সৌন্দর্য্যবোধ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—”পৌষ্যরাজা ঋষিকুমার উতঙ্ককে কহিলেন, ‘যাও, অন্তঃপুরে যাও, সেখানে মহিষীকে দেখিতে পাইবে।’ উতঙ্ক অন্তঃপুরে গেলেন, কিন্তু মহিষীকে দেখিতে পাইলেন না। অশুচি হইয়া কেহ সতীকে দেখিতে পাইত না; উতঙ্ক তখন অশুচি ছিলেন।” ( সুলভ-৪ পৃ-৬৩১)। পৌষ্যরাজা-উতঙ্কের কাহিনী কাশীরামদাসের মহাভারতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, মূল মহাভারতে বিশদ আছে। উদ্ধৃত অংশের বর্ণনা কাশীদাসী মহাভারতে নেই। রবীন্দ্রনাথ এটা মূল মহাভারত থেকে নিয়েছেন। উতঙ্ক মহর্ষি বেদের শিষ্য ছিলেন। বেদ একটু অন্যধরণের গুরু ছিলেন। নিজের ছাত্রজীবনে তিনি দেখেছিলেন বুঝেছিলেন গুরুগৃহে শিষ্যদের কঠোর পরিশ্রম ও কষ্টের কথা। তাই তিনি নিজে যখন গুরু হলেন তখন তিনি শিষ্যদের উপর কোন উৎপীড়ন করতেন না। উতঙ্কের ব্যবহারে গুরু খুব খুশি ছিলেন। কৃতবিদ্য উতঙ্ক যখন গুরুগৃহ ছেড়ে যাবেন, তিনি গুরুদক্ষিণা দিতে চাইলেন। বেদ তাকে গুরুপত্নীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। গুরুপত্নী উতঙ্কের কাছে গুরুদক্ষিণা হিসাবে চাইলেন পৌষ্যরাজার রানীর কানের কুন্ডলদুটো।

উতঙ্ক পৌঁছালেন পৌষ্যরাজার কাছে এবং গুরুদক্ষিণা দেবার প্রয়োজনে কুন্ডল চাইলেন। পৌষ্য বললেন যে কুন্ডলদুটি যেহেতু তাঁর স্ত্রীর জিনিষ, তাই উতঙ্ককে অন্তঃপুরে গিয়ে রানীর কাছে সেগুলো চাইতে হবে। উতঙ্ক অন্তঃপুরে গেলেন কিন্তু রানীকে সেখানে দেখতে পেলেন না। ক্রুদ্ধ উতঙ্ক ফিরে এসে রাজাকে সব বললেন। ”আমার প্রতি এইরূপ মিথ্যা আচরণ করা আপনার উচিত হয় নাই। অনেক অনুসন্ধান করিলাম, কিন্তু অন্তঃপুরে আপনার মহিষীকে দেখিতে পাইলাম না।” পৌষ্য একটু চিন্তা করে উতঙ্ককে বললেন—”মহাশয়! বোধহয় আপনি অশুচি আছেন, মনে করিয়া দেখুন। আমার গৃহিণী অতি পতিব্রতা, অপবিত্র থাকিলে কেহই তাঁহার সন্দর্শন পায় না।” উতঙ্ক তখন চিন্তা করে বুঝলেন যে তার আচমন করা ঠিকমত হয়নি। উতঙ্ক নিয়ম মেনে পুনরায় আচমন করলেন এবং তারপর রাজার অন্তঃপুর গেলেন। এবার তিনি পৌষ্যমহিষীকে দেখতে পেলেন ও কুন্ডলটি প্রাপ্ত হলেন।

ওই একই প্রবন্ধে পরের পৃষ্ঠাতে কবি লিখেছেন—” সৌন্দর্য্য বোধের যথার্থ পরিণতভাব কখনোই প্রবৃত্তির বিক্ষোভ চিত্তের অসংযমের সঙ্গে এক ক্ষেত্রে টিঁকিতে পারে না। পরস্পর পরস্পরের বিরোধী।

যদি বল কেন বিরোধী, তার কারণ আছে। বিশ্বামিত্র বিধাতার সঙ্গে আড়াআড়ি করিয়া একটা জগৎ সৃষ্টি করিয়াছিলেন। সেটা তাঁহার ক্রোধের সৃষ্টি, দম্ভের সৃষ্টি, সুতরাং সেই জগৎ বিধাতার জগতের সঙ্গে মিশ খাইল না, তাহাকে স্পর্ধা করিয়া আঘাত করিতে লাগিল, খাপছাড়া সৃষ্টিছাড়া হইয়া রহিল, চরাচরের সঙ্গে সুর মিলাইতে পারিল না—অবশেষে পীড়া দিয়া পীড়া পাইয়া সেটা মরিল। ”

বিশ্বামিত্র পৌরাণিক যুগের প্রভাবশালী ঋষি। রামায়ণে তাঁর কথা আছে, মহাভারতেও আছে। তাঁর স্বতন্ত্র জগৎ সৃষ্টি সম্বন্ধে সুবল চন্দ্র মিত্র মহাশয়ের অভিধানে এরকম লেখা হয়েছে (পৃ-৯৬৯)—

”রাজা ত্রিশঙ্কু সশরীরে স্বর্গে যাইবার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁহার গুরু বশিষ্ঠ ও তৎপুত্রগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হন। অবশেষে তিনি বিশ্বামিত্রের শরণাপন্ন হইলে রাজর্ষি তাঁহার ইষ্টসিদ্ধির নিমিত্ত এক যজ্ঞ করেন এবং যজ্ঞফলে তাঁহাকে সশরীরে স্বর্গে প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি দেবাদেশে মর্ত্যাভিমুখে নিপতিত হইতেছেন দেখিয়া বিশ্বামিত্র নিজ তপোবলে তাঁহাকে শূন্যে স্থাপনপূর্বক দ্বিতীয় ব্রহ্মান্ডের রচনায় চেষ্টিত হইলেন। তিনি দক্ষিণদিকে নক্ষত্রপুঞ্জের সৃষ্টি করিয়া অপর দেবগণের সৃষ্টি করিতে উদ্যেগী হইলে দেবতারা ইঁহার নিকটে উপস্থিত হইলেন এবং নবসৃষ্ট নক্ষত্রপুঞ্জমধ্যে ত্রিশঙ্কুর অবস্থান নির্দিষ্ট করিয়া বিশ্বামিত্রকে নিরস্ত করিলেন।”

এই প্রবন্ধেই ( সুলভ-৪, পৃ-৬৩৪) রবীন্দ্রনাথ মঙ্গল এবং সুন্দরের কথা বলেছেন—”মঙ্গল যে সুন্দর সে আমাদের প্রয়োজনসাধন করে বলিয়া নহে। ভাত আমাদের কাজে লাগে, কাপড় আমাদের কাজে লাগে, ছাতা-জুতা আমাদের কাজে লাগে, ভাত-কাপড় ছাতা-জুতা আমাদের মনে সৌন্দর্যের পুলক সঞ্চার করে না। কিন্তু লক্ষ্মণ রামের সঙ্গে সঙ্গে বনে গেলেন এই সংবাদে আমাদের মনের মধ্যে বীণার তারে যেন একটা সঙ্গীত বাজাইয়া তোলে। ইহা সুন্দর ভাষাতেই সুন্দর ছন্দেই সুন্দর করিয়া সাজাইয়া স্থায়ী করিয়া রাখিবার বিষয়। ছোটো ভাই বড়োভাইয়ের সেবা করিলে সমাজের হিত হয় বলিয়া যে একথা বলিতেছি তাহা নহে, ইহা সুন্দর বলিয়াই। কেন সুন্দর? কারণ, মঙ্গলমাত্রেরই সমস্ত জগতের সঙ্গে একটা গভীরতম সামঞ্জস্য আছে, সকল মানুষের মনের সঙ্গে তাহার নিগূঢ় মিল আছে। সত্যের সঙ্গে মঙ্গলের সেই পূর্ণ সামঞ্জস্য দেখিতে পাইলেই তাহার সৌন্দর্য আর আমাদের অগোচর থাকে না। করুণা সুন্দর, ক্ষমা সুন্দর, প্রেম সুন্দর।”

সাহিত্য গ্রন্থের বিশ্বসাহিত্য প্রবন্ধে (সুলভ-৪, পৃ-৬৪৬) রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—”প্রাচুর্যেই মানুষের যথার্থ প্রকাশ। মানুষ যে ভোজনপ্রিয় তাহা সত্য বটে, কিন্তু মানুষ যে বীর ইহাই সত্যতম। মানুষের এই সত্যের জোর সামলাইবে কে ? তাহা ভাগীরথীর মতো পাথর গুঁড়াইয়া, ঐরাবতকে ভাসাইয়া, গ্রাম নগর শস্যক্ষেত্রের তৃষ্ণা মিটাইয়া একেবারে সমুদ্রে গিয়া পড়িয়াছে।”

ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন বৃত্তান্ত আগে আলোচনা করা হয়েছে। এখন ‘ঐরাবতকে ভাসাইয়া’—কথাটার একটু ব্যাখ্যা করা যাক। রামায়ণেরই কাহিনী এটা। পাহাড়ের গহ্বরের মধ্যে পড়ে গঙ্গা আর বেরোনোর পথ পাচ্ছেন না। ভগীরথের আকুতিতে গঙ্গা বললেন ঐরাবতকে আনতে। ঐরাবত পাথর ভেঙে পথ করে দিলে তিনি বেরোতে পারবেন। ঐরাবত তো ইন্দ্রের হাতি, তার বড় অহঙ্কার। সে বললো গঙ্গা যদি ঐরাবতকে ভজনা করেন তবে ঐরাবত কাজটা করে দেবে। ভগীরথ এই কথাটা গঙ্গাকে বলতে পারছেন না লজ্জায়। গঙ্গা অনুমান করে নিয়ে ভগীরথকে বললেন ঐরাবত যদি গঙ্গার আড়াইখানা ঢেউ সহ্য করতে পারে তবে গঙ্গা ঐরাবতের কথামত কাজ করবেন। ঐরাবত খুশি হয়ে গঙ্গার পথ মুক্ত করে দিল। তখন গঙ্গা—

”এক ঢেউ মারিলেন ঐরাবত পরে। নাকে মুখে জল গেল হাঁসফাঁস করে।। আর ঢেউ মারিলেন প্রায় গতপ্রাণ। হস্তী বলে গঙ্গামাতা করো পরিত্রাণ।।”

ঐ একই প্রবন্ধে (পৃ ৬৪৮) রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—”একবার মনে মনে দেখো; এই রাস্তার দুই ধারে ঘরে ঘরে দোকানে-বাজারে অলিতে-গলিতে কত শাখায়-প্রশাখায় রসের ধারা কত পথ দিয়া কত মলিনতা কত সংকীর্ণতা কত দারিদ্রের উপরে কেবলই আপনাকে প্রসারিত করিয়া দিতেছে; রামায়ণ-মহাভারত কথা-কাহিনী কীর্তন-পাঁচালি বিশ্বমানবের হৃদয় সুধাকে প্রত্যেক মানবের কাছে দিনরাত বাঁটিয়া দিতেছে; নিতান্ত তুচ্ছ লোকের ক্ষুদ্র কাজের পিছনে রাম-লক্ষ্মণ আসিয়া দাঁড়াইতেছেন; অন্ধকার বাসার মধ্যে পঞ্চবটীর করুণামিশ্রিত হাওয়া বহিতেছে; মানুষের হৃদয়ের সৃষ্টি হৃদয়ের প্রকাশ মানুষের কর্মক্ষেত্রের কাঠিন্য ও দারিদ্রকে তাহার সৌন্দর্য ও মঙ্গলের কঙ্কণ-পরা দুটি হাত দিয়া বেড়িয়া রহিয়াছে। সমস্ত সাহিত্যকে সমস্ত মানুষের চারিদিকে একবার এমনি করিয়া দেখিতে হইবে।”

‘সৌন্দর্য ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ রামচন্দ্রের কথা লিখেছেন—”রামায়ণের রাম যে কেবল মহান বলিয়াই আমাদিগকে আনন্দ দিতেছেন তাহা নহে, তিনি আমাদের সুগোচর, সেও একটা কারণ। রামকে যেটুকু দেখিলে একটি সমগ্ররসে তিনি আমাদের কাছে জাগিয়া উঠেন, সমস্ত বিক্ষিপ্ততা বাদ দিয়া রামায়ণ কেবল সেইটুকুই আমাদের কাছে আনিয়াছে; এই জন্য এত স্পষ্ট তাহাকে দেখিতে পাইতেছি, এবং স্পষ্ট দেখিতে পাওয়াই মানুষের একটি বিশেষ আনন্দ।” (সুলভ-৪, পৃ-৬৫৪-৬৫৫)

এই গ্রন্থেরই ‘সাহিত্যসৃষ্টি’ (সুলভ, পৃ-৬৫৫) প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন যে, যেমন একটা সূতাকে মাঝখানে নিয়ে মিছরির কণাগুলো দানা বেঁধে উঠে, তেমনি আমাদের মনের মধ্যেও কোনো একটা সূত্র পেলেই অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ভাব তার চারদিকে দানা বেঁধে একটা আকৃতি লাভ করতে চেষ্টা করে। একটা কাব্য যদি বহুদিন ধরে চালু থাকে তখন তার উপর অনেকের হাত পড়ে—বহু লোক নিজেদের ধ্যানধারণা দিয়ে সেটাকে পুষ্ট করে। তার মধ্যে দেশের ইতিহাস, তত্ত্বজ্ঞান, ধর্মবোধ, ইত্যাদি এসে মিলিত হয়। ”যে কবি ইহার ভিত পত্তন করিয়াছেন তাঁহার আশ্চর্য্য ক্ষমতাবলেই ইহা সম্ভবপর হইতে পারে………………. এতদিন ধরিয়া এত লোকের হাত পড়িয়া কোথাও যে কিছু তেড়াবাঁকা হয় না, তাহা বলিতে পারি না—কিন্তু মূল গঠনটার মাহাত্ম্যে সে-সমস্তই অভিভূত হইয়া থাকে।” রবীন্দ্রনাথের মতে আমাদের রামায়ণ-মহাভারত, বিশেষভাবে মহাভারত, ইহার দৃষ্টান্তস্থল। এই প্রবন্ধে করি রামায়ণ নিয়ে খুব বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। সেটা বেশি সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা না করে প্রায় সবটাই তুলে দিচ্ছি —

”মহাকাব্য আমাদের জানা সাহিত্যের মধ্যে কেবল চারটিমাত্র আছে। ইলিয়াড অডেসি রামায়ণ ও মহাভারত। অলংকার শাস্ত্রে কৃত্রিম আইনের জোরেই রঘুবংশ, ভারবি, মাঘ, বা মিলটনের প্যারাডাইস লসট, ভলটেয়ারের আঁরিয়াদ প্রভৃতিকে মহাকাব্যের পঙক্তিতে জোর করিয়া বসানো হইয়া থাকে। তাহার পরে এখনকার ছাপাখানার শাসনে মহাকাব্য গড়িয়া উঠিবার সম্ভাবনা পর্যন্ত লোপ হইয়া গেছে।

রামায়ণ রচিত হইবার পূর্বে রামচরিত-সম্বন্ধে যে-সমস্ত আদিম পুরাণকথা দেশের জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত ছিল এখন তাহাদিগকে আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। কিন্তু তাহাদেরই মধ্যে রামায়ণের একটা পূর্বসূচনা দেশময় ছড়াইয়া ছিল, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

আমাদের দেশে যে-সকল বীরপুরুষ অবতাররূপে গণ্য হইয়াছেন তাঁহারা নিশ্চয়ই জগতের হিতের জন্য কোনো-না-কোনো অসামান্য কাজ করিয়াছিলেন। রামায়ণ রচিত হইবার পূর্বে দেশে রামচন্দ্র সম্বন্ধে সেইরূপ একটা লোকশ্রুতি নিঃসন্দেহই প্রচলিত ছিল। তিনি যে পিতৃসত্যপালনের জন্য বনে গিয়াছিলেন এবং তাঁহার পত্নীহরণকারীকে বিনাশ করিয়া স্ত্রীকে উদ্ধার করিয়াছিলেন, ইহাতে তাঁহার চরিত্রের মহত্ত্ব প্রমাণ করে বটে, কিন্তু যে অসাধারণ লোকহিত সাধন করিয়া তিনি লোকের হৃদয়কে অধিকার করিয়াছিলেন রামায়ণে কেবল তাহার আভাস আছে মাত্র।

আর্যদের ভারত-অধিকারের পূর্বে যে দ্রাবিড়জাতীয়েরা আদিম নিবাসীদিগকে জয় করিয়া এই দেশ দখল করিয়া বসিয়াছিল, তাহারা নিতান্ত অসভ্য ছিল না। তাহারা আর্যদের কাছে সহজে হার মানে নাই। ইহারা আর্যদের যজ্ঞে বিঘ্ন ঘটাইত, চাষের ব্যাঘাত করিত, কুলপতিরা অরণ্য কাটিয়া যে এক-একটি আশ্রম স্থাপন করিতেন সেই আশ্রমে তাহারা কেবলই উৎপাত করিত।

দাক্ষিণাত্যে কোনো দুর্গম স্থানে এই দ্রাবিড়জাতীয় রাজবংশ অত্যন্ত পরাক্রান্ত হইয়া উঠিয়া এক সমৃদ্ধিশালী রাজ্য স্থাপন করিয়াছিল। তাহাদেরই প্রেরিত দলবল হঠাৎ বনের মধ্য হইতে বাহির হইয়া আর্য-উপনিবেশগুলিকে ত্রস্ত করিয়া তুলিয়াছিল।

রামচন্দ্র বানরগণকে অর্থাৎ ভারতবর্ষের আদিম অধিবাসীদিগকে দলে লইয়া বহু দিনের চেষ্টায় ও কৌশলে এই দ্রাবিড়দের প্রতাপ নষ্ট করিয়া দেন; এই কারণে তাঁহার গৌরবগান আর্যদের মধ্যে প্রচলিত হইয়াছিল। যেমন শকদের উপদ্রব হইতে হিন্দুদিগকে উদ্ধার করিয়া বিক্রমাদিত্য যশস্বী হইয়াছিলেন, তেমনি অনার্যদের প্রভাব খর্ব করিয়া যিনি আর্যদিগকে নিরুপদ্রব করিয়াছিলেন তিনিও সাধারণের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এবং পূজ্য হইয়াছিলেন।

এই উপদ্রব কে দূর করিয়া দিবে সেই চিন্তা তখন চারিদিকে জাগিয়া উঠিয়াছিল। বিশ্বামিত্র, অল্প বয়সেই সুলক্ষণ দেখিয়া রামচন্দ্রকেই যোগ্যপাত্র বলিয়া স্থির করিয়াছিলেন। কিশোরবয়স হইতেই রামচন্দ্র এই বিশ্বামিত্রের উৎসাহে ও শিক্ষায় শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করিতে নিযুক্ত হন। তখনই তিনি আরণ্য গুহকের সঙ্গে বন্ধুতা করিয়া যে প্রণালীতে শত্রুজয় করিতে হইবে তাহার সূচনা করিতেছিলেন।

গোরু তখন ধন বলিয়া এবং কৃষি পবিত্রকর্মরূপে গণ্য হইত। জনক স্বহস্তে চাষ করিয়াছেন। এই চাষের লাঙল দিয়াই তখন আর্যেরা ভারতবর্ষের মাটিকে ক্রমশ আপন করিয়া লইতেছিলেন। এই লাঙলের মুখে অরণ্য হঠিয়া গিয়া কৃষিক্ষেত্র ব্যাপ্ত হইয়া পড়িতেছিল। রাক্ষসেরা এই ব্যাপ্তির অন্তরায় ছিল।

প্রাচীন মহাপুরুষদের মধ্যে জনক যে আর্যসভ্যতার একজন ধুরন্ধর ছিলেন নানা জনপ্রবাদে সে কথার সমর্থন করে। ভারতবর্ষে কৃষিবিস্তারে তিনি একজন উদযোগী পুরুষ ছিলেন। তাঁহার কন্যারও নাম রাখিয়াছিলেন সীতা। পণ করিয়াছিলেন, যে বীর ধনুক ভাঙিয়া অসামান্য বলের পরিচয় দিবে তাহাকেই কন্যা দিবেন। সেই অশান্তির দিনে এইরূপ অসামান্য বলিষ্ঠপুরুষের জন্য তিনি অপেক্ষা করিয়াছিলেন। প্রবল শত্রুর বিরুদ্ধে যে লোক দাঁড়াইতে পারিবে তাহাকে বাছিয়া লইবার এই এক উপায় ছিল।

বিশ্বামিত্র রামচন্দ্রকে অনার্যপরাভবব্রতে দীক্ষিত করিয়া তাঁহাকে জনকের পরীক্ষার স্থলে উপস্থিত করিলেন। সেখানে রামচন্দ্র ধনুক ভাঙিয়া তাঁহার ব্রত গ্রহণের শ্রেষ্ঠ অধিকারী বলিয়া আপনার পরিচয় দিলেন।

তারপর তিনি ছোটোভাই ভরতের উপর রাজ্যভার দিয়া মহৎ প্রতিজ্ঞাপালনের জন্য বনে গমন করিলেন। ভরদ্বাজ অগস্ত্য প্রভৃতি যে-সকল ঋষি দুর্গম দক্ষিণে আর্যনিবাস-বিস্তারে প্রবৃত্ত ছিলেন তাঁহাদের উপদেশ লইয়া অনুচর লক্ষ্মণের সঙ্গে অপরিচিত গহণ অরণ্যের মধ্যে তিনি অদৃশ্য হইয়া গেলেন।

সেখানে বালি ও সুগ্রীব নামক দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইয়ের মধ্যে এক ভাইকে মারিয়া অন্য ভাইকে দলে লইলেন। বানরদিগকে বশ করিলেন, তাহাদিগকে যুদ্ধবিদ্যা শিখাইয়া সৈন্য গড়িলেন। সেই সৈন্য লইয়া শক্রপক্ষের মধ্যে কৌশলে আত্মবিচ্ছেদ ঘটাইয়া লঙ্কাপুরী ছারখার করিয়া দিলেন। এই রাক্ষসেরা স্থাপত্যবিদ্যায় সুদক্ষ ছিল। যুধিষ্ঠির যে আশ্চর্য প্রাসাদ তৈরি করিয়াছিলেন ময়দানব তাহার কারিগর। মন্দির নির্মাণে দ্রাবিড়জাতীয়ের কৌশল আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষে বিশিষ্টতা লাভ করিয়াছে। ইহারাই প্রাচীন ইজিপটীয়দের স্বজাতি বলিয়া যে কেহ কেহ অনুমান করেন তাহা নিতান্ত অসংগত বোধ হয় না।

যাহা হউক, স্বর্ণলঙ্কাপুরীর, যে প্রবাদ চলিয়া আসিয়াছিল তাহার একটা কিছু মূল ছিল। এই রাক্ষসেরা অসভ্য ছিল না। বরঞ্চ শিল্পবিলাসে তাহারা আর্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিল।

রামচন্দ্র শত্রুদিগকে বশ করিয়াছিলেন, তাহাদের রাজ্য হরণ করেন নাই। বিভীষণ তাঁহার বন্ধু হইয়া লঙ্কায় রাজত্ব করিতে লাগিল। কিষ্কিন্ধ্যার রাজ্যভার বানরদের হাতে দিয়াই চিরদিনের মতো তিনি তাহাদিগকে বশ করিয়া লইলেন। এইরূপে রামচন্দ্রই আর্যদের সহিত অনার্যদের মিলন ঘটাইয়া পরস্পরের মধ্যে আদানপ্রদানের সম্বন্ধ স্থাপন করেন। তাহারই ফলে দ্রাবিড়গণ ক্রমে আর্যদের সঙ্গে একসমাজভুক্ত হইয়া হিন্দুজাতি রচনা করিল। এই হিন্দুজাতির মধ্যে উভয়জাতির আচারবিচার-পূজাপদ্ধতি মিশিয়া গিয়া ভারতবর্ষে শান্তি স্থাপিত হয়।

ক্রমে ক্রমে আর্য অনার্যের মিলন যখন সম্পূর্ণ হইল, পরস্পরের ধর্ম ও বিদ্যার বিনিময় হইয়া গেল, তখন রামচন্দ্রের পুরাতন কাহিনী মুখে মুখে রূপান্তর ও ভাবান্তর ধরিতে লাগিল। যদি কোনোদিন ইংরজের সঙ্গে ভারতবাসীর পরিপূর্ণ মিলন গঠে তবে কি ক্লাইবের কীর্তি লইয়া বিশেষভাবে আড়ম্বর করিবার কোনো হেতু থাকিবে? না ম্যুটিনির উট্রাম প্রভৃতি যোদ্ধাদের কাহিনীকে বিশেষভাবে স্মরণীয় করিয়া তুলিবার স্বাভাবিক কোনো উত্তেজনা থাকিতে পারিবে?

যে কবি দেশপ্রচলিত চরিতগাথাগুলিকে মহাকাব্যের মধ্যে গাঁথিয়া ফেলিলেন তিনি এই অনার্যবশ ব্যাপারকেই প্রাধান্য না দিয়া মহৎ চরিত্রের এক সম্পূর্ণ আদর্শকে বড়ো করিয়া তুলিলেন। তিনি করিয়া তুলিলেন বলিলে বোধ হয় ভুল হয়। রামচন্দ্রের পূজ্যস্মৃতি ক্রমে ক্রমে কালান্তর ও অবস্থান্তরের অনুসরণ করিয়া আপনার পূজনীয়তাকে সাধারণের ভক্তিবৃত্তির উপযোগী করিয়া তুলিতেছিল। কবি তাঁহার প্রতিভার দ্বারা তাহাকে এক জায়গায় ঘনীভূত ও সুস্পষ্ট করিয়া তুলিলেন। তখন সর্বাসাধারণের ভক্তি চরিতার্থ হইল।

কিন্তু আদিকবি তাঁহাকে যেখানে দাঁড় করাইয়াছেন সে যে তাহার পর হইতে সেইখানেই স্থির হইয়া আছে, তাহা নহে।

রামায়ণের আদিকবি, গার্হস্থ্যপ্রধান হিন্দুসমাজের যত-কিছু ধর্ম রামকে তাহারই অবতার করিয়া দেখাইয়াছিলেন। পুত্ররূপে, পতিরূপে, বন্ধুরূপে, ব্রাহ্মণ্যধর্মের রক্ষাকর্তারূপে, অবশেষে রাজারূপে বাল্মীকির রাম আপনার লোকপূজ্যতা সপ্রমাণ করিয়াছিলেন। তিনি যে রাবণকে মারিয়াছিলেন সেও কেবল ধর্মপত্নীকে উদ্ধার করিবার জন্য; অবশেষে সেই পত্নীকে ত্যাগ করিয়াছিলেন সেও কেবল প্রজারঞ্জনের অনুরোধে। নিজের সমুদয় সহজ প্রবৃত্তিকে শাস্ত্রমতে কঠিন শাসন করিয়া সমাজরক্ষার আদর্শ দেখাইয়াছিলেন। আমাদের স্থিতিপ্রধান সভ্যতায় পদে পদে যে ত্যাগ ক্ষমা ও আত্মনিগ্রহের প্রয়োজন হয় রামের চরিত্রে তাহাই ফুটিয়া উঠিয়া রামায়ণ হিন্দুসমাজের মহাকাব্য হইয়া উঠিয়াছে।

আদিকবি যখন রামায়ণ লিখিয়াছিলেন তখন যদিচ রামের চরিতে অতিপ্রাকৃত মিশিয়াছিল তবু তিনি মানুষেরই আদর্শরূপে চিত্রিত হইয়াছিলেন।

কিন্তু অতিপ্রাকৃতকে এক জায়গায় স্থান দিলে তাহাকে আর ঠেকাইয়া রাখা যায় না, সে ক্রমেই বাড়িয়া চলে। এমনি করিয়া রাম ক্রমে দেবতার পদবী অধিকার করিলেন।

তখন রামায়ণের মূল সুরটার মধ্যে আর-একটা পরিবর্তন প্রবেশ করিল। কৃত্তিবাসের রামায়ণে তাহার পরিচয় পাওয়া যাইবে।

রামকে দেবতা বলিলেই তিনি যে-সকল কঠিন কাজ করিয়াছিলেন তাহার দুঃসাধ্যতা চলিয়া যায়। সুতরাং রামের চরিত্রকে মহীয়ান করিবার জন্য সেগুলির বর্ণনাই আর যথেষ্ট হয় না। তখন যে ভাবের দিক দিয়া দেখিলে দেবচরিত্র মানুষের কাছে প্রিয় হয়, কাব্যে সেই ভাবটাই প্রবল হইয়া উঠে।

সেই ভাবটি ভক্তবৎসলতা। কৃত্তিবাসের রাম ভক্তবৎসল রাম। তিনি অধম পাপী সকলকেই উদ্ধার করেন। তিনি গুহক-চন্ডালকে মিত্র বলিয়া আলিঙ্গন করেন। বনের পশু বানরদিগকে তিনি প্রেমের দ্বারা ধন্য করেন। ভক্ত হনুমানের জীবনকে ভক্তিতে আর্দ্র করিয়া তাহার জন্ম সার্থক করিয়াছেন। বিভীষণ তাঁহার ভক্ত। রাবণও শত্রুভাবে তাঁহার কাছ হইতে বিনাশ পাইয়া উদ্ধার হইয়া গেল। এ রামায়ণে ভক্তিরই লীলা।

ভারতবর্ষে এক সময়ে জনসাধারণের মধ্যে এই একটা ঢেউ উঠিয়াছিল। ঈশ্বরের অধিকার যে কেবল জ্ঞানীদিগেরই নহে এবং তাঁহাকে পাইতে হইলে যে তন্ত্রমন্ত্র ও বিশেষ বিধির প্রয়োজন করে না, কেবল সরল ভক্তির দ্বারাই আপামর চন্ডাল সকলেই ভগবানকে লাভ করিতে পারে, এই কথাটা হঠাৎ যেন একটা নূতন আবিষ্কারের মতো আসিয়া ভারতের জনসাধারণের দুঃসহ হীনতাভার মোচন করিয়া দিয়াছিল। সেই বৃহৎ আনন্দ দেশ ব্যাপ্ত করিয়া যখন ভাসিয়া উঠিয়াছিল তখন যে সাহিত্যের প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল তাহা জনসাধারণের এই নূতন গৌরবলাভের সাহিত্য। কালকেতু, ধনপতি, চাঁদসদাগর প্রভৃতি সাধারণ লোকেই তাহার নায়ক ; ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় নহে, মানীজ্ঞানী সাধক নহে, সমাজে যাহারা নীচে পড়িয়া আছে, দেবতা যে তাহাদেরও দেবতা, ইহাই সাহিত্য নানাভাবে প্রচার করিতেছিল। কৃত্তিবাসের রামায়ণেও এই ভাবটি ধরা দিয়াছে। ভগবান যে শাস্ত্রজ্ঞানহীন অনাচারী বানরদেরও বন্ধু, কাঠবিড়ালির অতি সামান্য সেবাও যে তাঁহার কাছে অগ্রাহ্য হয় না, পাপিষ্ঠ রাক্ষসকেও যে তিনি যথোচিত শাস্তির দ্বারা পরাভূত করিয়া উদ্ধার করেন, এই ভাবটিই কৃত্তিবাসে প্রবল হইয়া ভারতবর্ষে রামায়ণকথার ধারাকে গঙ্গার শাখা ভাগীরথীর ন্যায় আর একটা বিশেষ পথে লইয়া গেছে।

রামায়ণকথার যে ধারা আমরা অনুসরণ করিয়া আসিয়াছি তাহারই একটি অত্যন্ত আধুনিক শাখা মেঘনাদবধকাব্যের মধ্যে রহিয়াছে। এই কাব্য সেই পুরাতন কথা অবলম্বন করিয়াও বাল্মীকি ও কৃত্তিবাস হইতে একটি বিপরীত প্রকৃতি ধরিয়াছে।”

এই সাহিত্য গ্রন্থে ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মত প্রকাশ করেছেন যে, উপন্যাসের খাতিরেও যে কাহিনী মানুষের বিশ্বাসে শিকড় গেড়ে বসে আছে তাকে একেবারে উল্টে দেওয়া ঠিক নয়। তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে তিনি উদাহরণ দিয়েছেন রামায়ণ মহাভারত থেকেই। ”রামচন্দ্রকে পামর এবং রাবণকে সাধুরূপে চিত্রিত করিলে অপরাধ নাই? অপরাধ আছে। কিন্তু তাহা ইতিহাসের বিরুদ্ধে অপরাধ নহে, কাব্যেরই বিরুদ্ধে অপরাধ। সর্বজন বিদিত সত্যকে একেবারে উলটা করিয়া দাঁড় করাইলে রসভঙ্গ হয়, হঠাৎ পাঠকদের যেন একেবারে মাথায় বাড়ি পড়ে।”

” এমন-কি, যদি কোনো ঐতিহাসিক মিথ্যাও সর্বসাধারণের বিশ্বাস আকর্ষন করিয়া বরাবর চলিয়া আসে, ইতিহাস এবং সত্যের পক্ষ লইয়া কাব্য তাহার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করিলে দোষের হইতে পারে। মনে করো আজ যদি নিঃসংশয়ে প্রমাণ হয় যে, সুরাসক্ত অনাচারী যদুবংশ গ্রীকজাতীয় এবং শ্রীকৃষ্ণ স্বাধীন বনবিহারী বংশীবাদক গ্রীসীয় রাখাল, যদি জানা যায় যে তাহার বর্ণ জ্যেষ্ঠ বলদেবের বর্ণের ন্যায় শুভ্র ছিল, যদি স্থির হয় নির্বাসিত অর্জুন এশিয়া-মাইনরের কোনো গ্রীক রাজ্য হইতে য়ুনানী রাজকন্যা সুভদ্রাকে হরণ করিয়া আনিয়াছিলেন এবং দ্বারকা সমুদ্রতীরবর্তী কোনো গ্রীক উপদ্বীপ, যদি প্রমাণ হয় নির্বাসনকালে পাণ্ডবগণ বিশেষ রণবিজ্ঞানবেত্তা প্রতিভাশালী গ্রীসীয়বীর কৃষ্ণের সহায়তা লাভ করিয়া স্বরাজ্য উদ্ধার করিয়াছিলেন, তাঁহার অপূর্ব বিজাতীয় রাজনীতি যুদ্ধ নৈপুণ্য এবং কর্মপ্রধান ধর্মতত্ত্ব বিস্মিত ভারতবর্ষে তাঁহাকে অবতাররূপে দাঁড় করাইয়াছে-তথাপি বেদব্যাসের মহাভারত বিলুপ্ত হইবে না, ………।”

সাহিত্য গ্রন্থের শেষ প্রবন্ধ ‘কবি জীবনী’। এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন— ‘আমাদের প্রাচীন ভারতবর্ষের কোনো কবির জীবনচরিত নাই। এই প্রসঙ্গেও তিনি আবার রামায়ণের কথা বলেছেন, বাল্মীকির কথা বলেছেন। মনে হয় তিনি আদিকবি বাল্মীকির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধাসম্পন্ন এবং রামায়ণের কাহিনীও তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। যাইহোক, এখন কবির কথা উদ্ধৃত করি—

”আমাদের প্রাচীন ভারতবর্ষের কোনো কবির জীবনচরিত নাই। আমি সেজন্য চিরকৌতূহলী, কিন্তু দুঃখিত নহি। বাল্মীকির সম্বন্ধে যে গল্প প্রচলিত আছে তাহাকে ইতিহাস বলিয়া কেহই গণ্য করিবেন না। কিন্তু আমাদের মতে তাহাই কবির প্রকৃত ইতিবৃত্ত। বাল্মীকির পাঠকগণ বাল্মীকির কাব্য হইতে যে জীবনচরিত সৃষ্টি করিয়া লইয়াছেন তাহা বাল্মীকির প্রকৃত জীবনের অপেক্ষা অধিক সত্য। কোন আঘাতে বাল্মীকির হৃদয় ভেদ করিয়া কাব্য-উৎস উচ্ছ্বসিত হইয়াছিল? করুণার আঘাতে। রামায়ণ করুণার অশ্রুনির্ঝর। ক্রৌঞ্চবিরহীর শোকার্ত ক্রন্দন রামায়ণকথার মর্মস্থলে ধ্বনিত হইতেছে। রাবণও ব্যাধের মতো প্রেমিকাযুগলকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছে, লঙ্কাকান্ডের যুদ্ধব্যাপার উন্মত্ত বিরহীর পাখার ঝটপটি। রাবণ যে বিচ্ছেদ ঘটাইয়া দিল মৃত্যুবিচ্ছেদের অপেক্ষাও তাহা ভয়ানক। মিলনের পরেও এ বিচ্ছেদের প্রতিকার হইল না।

সুখের আয়োজনটি কেমন সুন্দর হইয়া আসিয়াছিল। পিতার স্নেহ, প্রজাদের প্রীতি, ভ্রাতার প্রণয়, তাহারই মাঝখানে ছিল নবপরিণীত রামসীতার যুগলমিলন। যৌবরাজ্যের অভিষেক এই সুখসম্ভোগকে সম্পূর্ণ এবং মহীয়ান করিবার জন্য উপস্থিত হইয়াছিল। ঠিক এমন সময়েই ব্যাধ শর লক্ষ্য করিল, সেই শর বিদ্ধ হইল সীতাহরণকালে। তাহার পরে শেষ পর্যন্ত বিরহের আর অন্ত রহিল না।

দাম্পত্যসুখের নিবিড়তম আরম্ভের সময়েই দাম্পত্যসুখের দারুণতম অবসান।

ক্রৌঞ্চমিথুনের গল্পটি রামায়ণের মূল ভাবটির সংক্ষিপ্ত রূপক। স্থূল কথা এই, লোকে এই সত্যটুকু নিঃসন্দেহে আবিষ্কার করিয়াছে যে, মহাকবির নির্মল অনুষ্টুপ্ছন্দঃপ্রবাহ করুণার উত্তাপেই বিগলিত হইয়া স্যন্দমান হইয়াছে, অকালে দাম্পত্যপ্রেমের চিরবিছেদ-ঘটনই ঋষির করুণার্দ্র কবিত্বকে উন্মথিত করিয়াছে।

আবার আর-একটি গল্প আছে, রত্নাকরের কাহিনী। সে আর-এক ভাবের কথা। রামায়ণের কাব্যপ্রকৃতির আর-এক দিকের সমালোচনা। এই গল্প রামায়ণের রামচরিত্রের প্রতি লক্ষ্য করিয়াছে। এই গল্পে বলিতেছে, রামসীতার বিচ্ছেদদুঃখের অপরিসীম করুণাই যে রামায়ণের প্রধান অবলম্বন তাহা নহে, রামচরিত্রের প্রতি ভক্তিই ইহার মূল। দস্যুকে কবি করিয়া তুলিয়াছে রামের এমন চরিত্র-ভক্তির এমন প্রবলতা! রামায়ণের রাম যে ভারতবর্ষের চক্ষে কতবড়ো হইয়া দেখা দিয়াছেন এই গল্পে যেন তাহা মাপিয়া দিতেছে।

এই দুটি গল্পেই বলিতেছে, প্রতিদিনের কথাবার্তা চিঠিপত্র দেখাসাক্ষাৎ কাজকর্ম শিক্ষাদীক্ষার মধ্যে কবিত্বের মূল নাই; তাহার মূলে একটি বৃহৎ আবেগের সঞ্চার, যেন একটি আকস্মিক অলৌকিক আবির্ভাবের মতো—তাহা কবির আয়ত্তের অতীত।”

এই গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশে (পৃ-৬৯৩) ‘কাব্য’ নামে একটি প্রবন্ধ আছে। এখানেও রামায়ণ এবং বাল্মীকির প্রসঙ্গ আছে। ”কাব্যে আমরা আমাদের বিকাশ উপলব্ধি করি। তাহার সহিত নূতন তত্ত্বের কোনো যোগ নাই। বাল্মীকি যাহা ব্যক্ত করিয়াছেন তাহা বাল্মীকির সময়েও একান্ত পুরাতন ছিল। রামের গুণ বর্ণনা করিয়া তিনি বলিয়াছেন ভালো লোককে আমরা ভালোবাসি। কেবলমাত্র এই মান্ধাতার আমলের তত্ত্ব প্রচার করিবার জন্য সাত-কান্ড রামায়ণ লিখিবার কোনো আবশ্যক ছিল না। কিন্তু ভালো যে কত ভালো, অর্থাৎ ভালোকে যে কত ভালো লাগে তাহা সাত-কান্ড রামায়ণেই প্রকাশ করা যায়; দর্শনে বিজ্ঞানে কিংবা সুচতুর সমালোচনায় প্রকাশ করা যায় না।”

ওই পরিশিষ্ট অংশেই (পৃ-৬৯৯) দেখা যাচ্ছে যে ১২৯৯ সালের বৈশাখ মাসে লোকেন্দ্রনাথ পালিত মহাশয়কে লেখা একটা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের দুষ্মন্ত-শকুন্তলা এবং মহাভারতকারের দুষ্মন্ত-শকুন্তলা নিয়ে একটু আলোচনা করেছেন এবং তারা যে এক নয়, এরকম মতপ্রকাশ করেছেন। এটা খুবই স্বাভাবিক। ব্যাসদেবের দুষ্মন্ত-শকুন্তলা অনেক আগেকার সৃষ্টি এবং তাদেরকে দেখেই কালিদাস তাঁর নাটকের উপযোগী করে নতুন দুষ্মন্ত-শকুন্তলা সৃষ্টি করে নিয়েছেন। ব্যক্তি কালিদাসের চিন্তাভাবনার ছাপ যে তাঁর সৃষ্ট নাটকের চরিত্রের মধ্যে এসে যাবে, এটাও খুব স্বাভাবিক।

গ্রন্থ পরিচয় অংশে (পৃঃ-৭৩৯) দেখা যাচ্ছে ১৩১৪ সালে ‘জাহ্নবী’ পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশ’ নামে একটা কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছিলেন যে অকিঞ্চিৎকর বলে এ কবিতাটি তার কোনো গ্রন্থে স্থান পায়নি। এই কবিতাটিতে কবি রামায়ণের রামচন্দ্র এবং মহাভারতের ভীষ্মের কথা স্মরণ করেছেন। জননী ভারতভূমি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন—

”তব কোলে বাস মম।

ধন্য সে কোল ঋষির পরশে,

দেবতাপূজার পুষ্প বরষে,

গঙ্গাধারার পুলক-হরষে,

সে কোল পুণ্যতম।

দেবমানবের আনন্দমম

যে কোলে জনম লভিয়াছে রাম,

যে কোলে ভীষ্ম লভিলা বিরাম

সেই কোলে নমোনমঃ —

সেই কোলে বাস মম।”

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, প্রথম খণ্ড
২.
দ্বিতীয় অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, দ্বিতীয় খণ্ড
৩.
তৃতীয় অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, তৃতীয় খণ্ড
৪.
চতুর্থ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড
৫.
পঞ্চম অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, পঞ্চম খণ্ড
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, ষষ্ঠ খণ্ড
৭.
সপ্তম অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, সপ্তম খণ্ড
৮.
অষ্টম অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, অষ্টম খণ্ড
৯.
নবম অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, নবম খণ্ড
১০.
দশম অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, দশম খণ্ড
১১.
একাদশ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, একাদশ খণ্ড
১২.
দ্বাদশ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, দ্বাদশ খণ্ড
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, ত্রয়োদশ খণ্ড
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, চতুর্দশ খণ্ড
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, পঞ্চদশ খণ্ড
১৬.
ষোড়শ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, ষোড়শ খণ্ড
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, সপ্তদশ খণ্ড
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায় : রবীন্দ্ররচনাবলী—সুলভ সংস্করণ, অষ্টাদশ খণ্ড
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায় : বিশ্বভারতী প্রকাশিত মূল রবীন্দ্ররচনাবলী দ্বাত্রিংশ খণ্ড এবং কুরুপাণ্ডব
২০.
বিংশ অধ্যায় : চিঠিপত্র

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%