যক্ষপর্বত

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

কয়েক হাজার বছর আগের কথা। নর্মদা নদী তীরের অরণ্যসমূহে পাহাড়ি জাতের লোকেরা বাস করত। ওদের মধ্যে এক এক জাতের লোকের একজন করে নেতা অথবা রাজা থাকত। সেই সবাইকে পরিচালনা করত। ওদের মধ্যে ঐক্যমত না থাকায় ওরা একের বিরুদ্ধে অন্যে লড়তে লাগল।

ওই পাহাড়িদের একটি অংশ গণ্ডক জাতি নামে খ্যাত ছিল। সেই অরণ্যের পাহাড়ের একটিতে অরণ্যপুরম নামে এক বড়ো জনপদ ওরা গড়ে তুলল। গণ্ডারদের ভালো শিক্ষা দিয়ে তাদের চাষ-আবাদের কাজে এবং বাহন হিসেবে ব্যবহার করত। চাষের কাজে এবং বোঝা বওয়ানোর কাজে ব্যবহার করত বলেই ওদের নাম হয়েছিল গণ্ডক জাতি।

ওই গণ্ডক জাতের নতুন রাজা হল এক যুবক। তার নাম অরণ্যমাল্লু। সেই রাজাকে হটানোর জন্য গণাচারি নামে একজন ভীষণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু দু-জন ক্ষত্রিয় যুবকদের সাহায্যে অরণ্যমাল্লু ওই গণাচারির ছলচাতুরীর কথা প্রচার করিয়ে তাকে বাঘের মুখে ঠেলে দেয়।

গণাচারিকে মেরে ফেলার পর অরণ্যমাল্লু নিশ্চিন্তে রাজ্য শাসন করছিল। কোনো বাধা নেই। নিজের ইচ্ছেমতো চলছিল। আগে যে গণ্ডক জাতি শুধু শিকার করেই পেট চালাত আজ তারা চারদিকের জমিতে চাষ-আবাদ করছে। ভুট্টা, যব, গম প্রভৃতির চাষ করতে লাগল।

অরণ্যমাল্লুর সিংহাসনে বসার এক বছর পূর্ণ হল। সেদিন মহোৎসব পালনের আয়োজন করল গণ্ডক জাতের লোকেরা। যুবকেরা বর্শা, বল্লম ঘোরাতে ঘোরাতে নানান খেলা দেখাতে লাগল। নানান ধরনের লাঠি খেলা, কুস্তি প্রভৃতি অনেক রকমের খেলা দেখাতে লাগল। যুবক-যুবতি, ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি সবাই সেই উৎসবে মেতে আছে। স্বয়ং অরণ্যমাল্লু উঁচু জায়গায় খোদাই করা আসনে বসে সেইসব উপভোগ করছে।

সেই উৎসব মুখরিত সময়ে দু-জন গণ্ডক জাতের লোক বাহনে চড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বাহন থেকে নেমে দু-হাতে ভিড় ঠেলতে ঠেলতে অরণ্যমাল্লুর দিকে এগোতে থাকল।

অরণ্যমাল্লুর মন্ত্রীর নাম শিলামুখী। ওই দু-জনকে রাজার দিকে ধেয়ে যেতে দেখে ইশারায় ওদের কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার? এমনভাবে ছোটাছুটি করছ যেন কোথাও আগুন লেগেছে! এমন উৎসব আনন্দের সময় রাজাকে বিরক্ত করতে ছোটাছুটি করছ কেন? আমি কি নেই এখানে? কী ব্যাপার বল?' রেগে গিয়ে বলল মন্ত্রী।

মন্ত্রীর প্রশ্ন শুনে আগন্তুকরা পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। ওই দু-জনের মধ্যে লম্বা লোকটা গলা ঝেড়ে বলল, 'পাহাড়ের পাদদেশে আমাদের চাষের খেতে যে ভুট্টা, যব ফলেছে সেসব নতুন লোক এসে কেটে ফেলছে। ওরা আমাদের চেনাজানা আদিবাসীদের মতো দেখতে নয়। ওদের মাথায় বড়ো বড়ো পাগড়ি। ওদের সারা শরীর কাপড়চোপড়ে ঢাকা রয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের জিনিস হল এই অরণ্যের গোটা তল্লাটে যে ধরনের জন্তু কোনোদিন নজরে পড়েনি ওরা সেই ধরনের বিরাট বিরাট জন্তুর পিঠে চড়ে এসেছে। ওই জন্তুর পিঠেই কাটা ভুট্টা সব চাপাচ্ছে।'

'নতুন ধরনের জন্তুগুলো কেমন দেখতে?' বলল মন্ত্রী শিলামুখী।

'ওই জন্তুগুলো হাতির মতো উঁচু। হাতির চোখের মতো ওদের চোখ। ঘাড়গুলো বকের ঘাড়ের মতো এদিক-ওদিক ঘোরে। পিঠের ওপর ঢিপির মতো কী যেন আছে।' বলল ওদের মধ্যে বেঁটে লোকটা।

মন্ত্রী এবং ওদের দু-জনের মধ্যে কথা চলছে। অন্যেরা কৌতূহলবশত সে-কথা শোনার চেষ্টা করে। আস্তে আস্তে ওদের ঘিরে অনেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওই অদ্ভুত জন্তুর বর্ণনা কানে যেতেই ওদের অনেকে ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। এক কান দু-কান হয়ে কথাটা ছড়িয়ে গেল। বলাবলি করতে লাগল ওরা, 'কারা যেন অদ্ভুত জন্তুর উপর চেপে এসে আমাদের যব, ভুট্টা সব কেটে নিয়ে যাচ্ছে।' প্রত্যেকে কথা বলায় একটা হইচই শুরু হয়ে গেল। উৎসবের আনন্দ ক্রমশ যেন মিইয়ে যাচ্ছে। ওদের ব্যাপার-স্যাপার দেখে রাজা আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'এত হইচই কীসের? কী হয়েছে? মন্ত্রী শিলামুখী কোথায়?' বলল গর্জন করে।

শিলামুখী ওই অদ্ভুত জন্তুগুলোকে যারা দেখেছে সেই দু-জনকে নিয়ে রাজার কাছে এল। ওদের কাছে যা শুনল তা রাজাকে জানাল।

'আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো ফসল লুণ্ঠনকারীরা নিয়ে যাচ্ছে দেখে হাঁ করে বসে আছ। হাতিয়ার এখনও হাতে তুলে নাওনি। নামেই দেখছি আমি এক রাজা, মন্ত্রীও জুটেছে তেমনি! যতসব বোকাদের দেশ!' বলল অরণ্যমাল্লু।

অরণ্যমাল্লুর কথা শেষ হতেই শিলামুখী গণ্ডক জাতের লোকের দিকে ঘুরে জোরে জোরে বলল, 'এই আনন্দ উৎসব এখনকার মতো বন্ধ হোক। আমাদের খেতের ফসল লুণ্ঠনকারীরা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের হটিয়ে দিয়ে আমাদের ফসল রক্ষা করতে হবে।'

তৎক্ষণাৎ গণ্ডক জাতের লোকেরা বর্শা, বল্লম, ছোরা হাতে তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। একজন অনুচরের আনা গণ্ডারে চড়ে মন্ত্রী শিলামুখী সামনে এগিয়ে গেল।

রাজা অরণ্যমাল্লু ওদের উৎসাহ দিতে দিতে জোরে জোরে বলল, 'ওই লুণ্ঠনকারীরা যে অদ্ভুত জন্তু এনেছে তাদের আপনারা ভয় পাবেন না। আমাদের বাহন গণ্ডারের চেয়ে হিংস্র জন্তু পৃথিবীতে আর একটিও নেই। ওই লুণ্ঠনকারীদের কয়েক জনকে বন্দি করে আনুন। ওদের কাছ থেকে ওই দুরাত্মাদের সমস্ত খবর জানতে পারব।' বলল রাজা।

'জয় অরণ্য মাতা কী জয়! জয়! রাজা অরণ্যমাল্লুর জয়!' এই রণধ্বনি দিতে দিতে গণ্ডক জাতের লোকেরা ধাবিত হল ওই পাহাড়ের পাদদেশে।

ওরা সবাই নিজেদের ফসল ফলানো খেতে পৌঁছে প্রত্যেকে কেমন যেন হতবাক হয়ে গেল। যা ওরা দেখছে তাতেই ওদের চোখ ছানাবড়া হয়ে যাচ্ছে। লুণ্ঠনকারীদের সংখ্যা পঁচিশ কি তিরিশ। তাদের মধ্যে কয়েক জন ভুট্টা ও যবের গাছ কাটছে। কয়েক জন এক মুহূর্ত নষ্ট না করে সেই ফসল তুলছে। ওই বিরাটকায় জন্তুর ঢিপিওয়ালা পিঠে। আর চার-পাঁচ জন সেই বিরাটকায় অদ্ভুত জন্তুর পিঠে চড়ে খেতের এ-কোণ থেকে ও-কোণ পর্যন্ত ছোটাছুটি করছে। ওই জন্তুগুলো ঘাড় উঁচু-নীচু করতে করতে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে ছোটাছুটি করছে।

লুণ্ঠনকারী আর তাদের বাহক জন্তুদের দেখে গণ্ডক জাতের লোক খুব ভয় পেয়েছে। তার চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে লুণ্ঠনকারীরা গণ্ডারের পিঠে চেপে আসা গণ্ডক জাতের লোকদের দেখে।

লুণ্ঠনকারীদের মধ্যে ওই অদ্ভুত জন্তুর উপর উঠে বসে থাকাদের মধ্যে একজন হাতের বর্শা উঁচিয়ে ধরে চিৎকার করে বলল, 'এই, যারা আসছে ভয়ংকর জন্তুর উপর চড়ে তাদের দিকে আর ওই জন্তুদের দিকে ভালো করে তাকান। যারা গণ্ডারদের শিক্ষা দিয়ে বাহনের কাজে ব্যবহার করছে তারা যে কত বড়ো সাহসী হতে পারে বুঝতে পারছেন।'

সাথীদের একজনের ঘোষণা শুনে যারা যে কাজে লেগেছিল তারা একবার মাথা তুলে তাকাল। ওরা দেখতে পেল গণ্ডারের উপর চেপে সবার সামনে আসছে মন্ত্রী শিলামুখী, তার কিছুটা পেছনে আসছে গণ্ডারের পিঠে চড়ে আরও অনেকে। সবার পেছনে আসছে পায়ে হাঁটা লোক। ওরা ভয়ে ভয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছে।

লুণ্ঠনকারীদের একজন তাড়াতাড়ি ওই বিচিত্র জন্তুর উপর উঠে গণ্ডক জাতের লোকের দিকে তাকাল। ওদের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হল ওরা যেন আক্রান্ত। প্রত্যেকে কেমন যেন হুড়োহুড়ি করছে। গণ্ডারের উপর চড়ে কেউ ঠিক এগোচ্ছে না। সে চিৎকার করে নিজের লোককে বলল, 'হে উষ্ট্রবীরেরা! আমাদের কোনো ভয় নেই। আমাদের দেখে ওই গণ্ডক জাতের লোক যেন একেবারে মূর্ছা যাচ্ছে। চেয়ে দেখ, একজনও সাহসের সাথে ঘৃণাভরে দ্রুত এগিয়ে আসছে না। প্রত্যেকে কেমন যেন নিজেদের মধ্যে গুঁতোগুঁতি করছে। এই হল মোক্ষম মুহূর্ত। আমার সাথে চার-পাঁচ জন এসো। চারিদিক থেকে ওদের উপর বর্শা ছুঁড়ে ওদের ছত্রভঙ্গ করে ফেলব।' বলল ওদের নেতা।

নেতার ডাক শুনেই চার জন উটের পিঠে চড়ে বল্লম নিয়ে এগিয়ে গেল। ওই ক-জনকে ওভাবে এগোতে দেখেই মন্ত্রী শিলামুখী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অনুচরদের বলল, 'এই অদ্ভুত বিরাট উঁচু জীবের উপর বসে থাকা লুণ্ঠনকারীর দল উপর থেকে বল্লম ছুড়ে সহজেই আমাদের গেঁথে ফেলতে পারে। আমরা বরং একটু পেছিয়ে গিয়ে গাছের আড়ালে চলে যাই। লুণ্ঠনকারীরা আমাদের তাড়া করতে করতে আসবে। তখন আমাদের লোক গাছের উপর থেকে বর্শা ছুড়ে সহজেই ওদের জব্দ করতে পারবে। আমাদের অনুচরদের গাছে উঠতে বলা হোক।' চিৎকার করে হুকুম দিল মন্ত্রী শিলামুখী।

শিলামুখী তার অনুচরদের এই নির্দেশ অনেক দেরিতে দিল। মন্ত্রীর কথা কানে যেতেই যারা গণ্ডারের পিঠে বসেছিল তারা গণ্ডারের মুখ পেছনের দিকে ফিরিয়ে বলল, 'যারা পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করতে এসেছ তারা সব গাছে উঠে পড়। ওই লুণ্ঠনকারীরা গাছের নীচে আসতেই তাদের বল্লম দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করে ফেলবে।' ওরা চিৎকার করেই বলতে লাগল।

গণ্ডক জাতের কয়েক জন গাছের উপর উঠতেই লুণ্ঠনকারীদের নেতা অবস্থা বুঝে বলল, 'ওহে যব আর ভুট্ট কাটা বন্ধ করে এখন যে-যার বাহনে ওঠো। আমি কয়েক জনকে নিয়ে এই গণ্ডারের উপর বসে থাকা লোকদের ক্ষমতা একটু যাচাই করে দেখছি। আর বাকি যারা আছ তারা ওদের মধ্যে যারা গাছে উঠে বসে আছে তাদের বর্শা দিয়ে খোঁচা মেরে নীচে ফেলে দাও।' চিৎকার করে হুকুম দিল নেতা।

শিলামুখী নিজের গণ্ডারটার মুখ পেছনের দিকে ঘোরাতে যাবে এমন সময় হঠাৎ লুণ্ঠনকারীদের নেতা এবং তার অনুচরেরা তাকে ঘিরে ফেলল। শিলামুখী ধৈর্য ধরে লুণ্ঠনকারীদের নেতার আক্রমণ নিজের বর্শা দিয়ে রুখল।

জয় অরণ্য মাতা! সবাই গণ্ডারদের অরণ্যের দিকে ছোটাও!' চিৎকার করে বলল।

শিলামুখী নিজের প্রাণরক্ষার জন্য এত ব্যস্ত ছিল যে অন্যদিকে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা আর দেখতে পারেনি। ওদিকে গাছে উঠতে না উঠতেই গণ্ডক জাতের লোকেরা আক্রান্ত হল। লুণ্ঠনকারীরা তাদের আক্রমণ করতে থাকল। বাকি কয়েক জন গণ্ডক জাতের লোক মৃত্যুভয়ে আর্তনাদ করতে করতে সোজা অরণ্যপুরমের দিকে ধাবিত হল।

শিলামুখীও কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে পেছন দিক থেকে তাড়া করতে থাকা লুণ্ঠনকারীদের কাছে ধরা না দিয়ে গাছের আড়াল দিয়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করল। কিন্তু লক্ষ করল লুণ্ঠনকারীরা তার পিছু ছাড়ছে না। তাকে ঘিরে ফেলছে। তখন অগত্যা চিৎকার করে নিজের লোককে শিলামুখী বলল, 'আর আমরা এই লুণ্ঠনকারীদের তাড়াতে পারব না। অরণ্যপুরমের দিকে এখন পালানোই শ্রেয়।'

সেইসময় গাছের ডালের উপর থেকে গর্জন শোনা গেল, 'মহামন্ত্রী শিলামুখী! পালিয়ো না। তোমার গণ্ডারটাকে পেছনদিকে ফেরাও। ওই গণ্ডারটাকে তোমার পেছনে যে উট আসছে তার সাথে ভেড়াও। উটকে কাত করে ফেলতে পারে গণ্ডার। গণ্ডারের গুঁতো সহ্য করার মতো ক্ষমতা কোনো জন্তুর নেই। ইন্দ্রের ব্রজ আছে গণ্ডারের শিং-এ। গণ্ডারের ক্লান্তি নেই।' কথাগুলো পরিষ্কার শুনতে পেল শিলামুখী।

ওই কণ্ঠস্বর শিলামুখীর চেনা। ওই কণ্ঠস্বর তার দলের ক্ষত্রিয় যুবক স্বর্ণাচারির। কিন্তু ততক্ষণে শিলামুখীর মধ্যে পালটা আক্রমণ করার সামান্যতম সাহসও ছিল না। ওই কথা শুনে নিজের গণ্ডারটাকে আরও বেশি তাড়া দিয়ে নিজের অনুচরদের পেছনে পেছনে অরণ্যপুরমে পালিয়ে গেল মন্ত্রী শিলামুখী।

শিলামুখীকে উদ্দেশ্য করে স্বর্ণাচারি যা বলল তা লুণ্ঠনকারীদের নেতার কানে গেল। নেতা তৎক্ষণাৎ ভীষণ আগ্রহের সাথে ওই গাছের নীচে গিয়ে বলল, 'কে রে গাছে! আমার শত্রুকে কৌশল শেখাচ্ছে। আমি কে তা জানো?' হুংকার তুলে বলল নেতা।

'আমার নাম স্বর্ণাচারি। পদ্মপুরের শাস্ত্রজ্ঞ। আজন্ম বিনয়ী জন্তু উটকে দেখেই মহা পরাক্রমশালী জন্তু গণ্ডারকে ছুটতে দেখে প্রশংসা করতে পারলাম না। তাই শিলামুখীকে ওই পরামর্শ দিয়েছি। আমার কাছে অবশ্য উষ্ট্র জাতের লোক আর ওই গণ্ডক জাতের লোক সমান মিত্র।' বলল স্বর্ণাচারি গাছের ডালের উপর বসে।

'আচ্ছা, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার ঘটে বেশ বুদ্ধি আছে। এক্ষুনি গাছ থেকে নেমে আসবে না এই বল্লম ছুড়ে মারব?' বলতে বলতে লুণ্ঠনকারীদের নেতা উটের উপর থেকে বল্লম উঁচিয়ে ধরল।

দুই

লুণ্ঠনকারীদের নেতার মুখের ভাব এবং বল্লম তুলে ধরায় তার ওই রুদ্ররূপ দেখে স্বর্ণাচারি ভাবল যে তার মৃত্যু নিশ্চিত। গণ্ডক জাতির লোকের প্রাণ হাতে করে অরণ্যপুরের দিকে টেনে ছুটে পালানোর দৃশ্য দেখে স্বর্ণাচারি ভাবল তার পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয়। তার গাছ থেকে নামলেও বিপদ আবার না নামলেও বিপদ।

'গাছ থেকে ঝটপট নামবে না দেব বল্লমটা ছুড়ে?' লুণ্ঠনকারীদের নেতা দাঁতে দাঁত ঘষে বলল।

এই হুঁশিয়ারি পেয়ে স্বর্ণাচারি ভয়ে কাঠ হয়ে পরক্ষণে কাঁপতে কাঁপতে গাছ থেকে আস্তে আস্তে নামতে নামতে বলল, 'আমাকে অহেতুক মেরে ফেলে পাপের ভাগী হবেন না। আমি আগেই বলেছি যে আমি একজন শাস্ত্রজ্ঞ। রাজমহল থেকে শুরু করে কুঁড়ে ঘরের লোক পর্যন্ত আমাকে বাস্তু শাস্ত্রজ্ঞ হিসেবেই চেনে। ছোটো-বড়ো সবরকমের বাড়ি নিখুঁত নির্মাণের ব্যাপারে আমি দক্ষ।'

এই কথা লুণ্ঠনকারীদের নেতা শুনে হো-হো করে হেসে উঠে বলল, 'তোমার কথার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি কি ভেবেছ যে আমি এখানে তোমার খোঁজ করতে এসেছি? আমি মহল বানাতে চাই? মহল বানানোর লোক আমি আর পাইনি? আহাম্মক কোথাকার, গাছ থেকে নাম ঝটপট। হুঁ!'

স্বর্ণাচারি চুপচাপ গাছ থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। লুণ্ঠনকারীদের নেতা উটের উপর বসেই তীব্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোমাকে দেখে তো গণ্ডক জাতের লোকের মতো লাগছে না। তুমি এখানে জঙ্গলে পাহাড়ে কী করছ?'

'মশাই, আপনার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারছি না। আপনি ঠিকই ধরেছেন যে আমি গণ্ডক জাতের লোক নই। আমি পদ্মপুরের অধিবাসী। গৃহনির্মাণ আমার পেশা, আমি যন্ত্রপাতি বানানোর কলাকৌশল জানি। ঘরবাড়ি বানানোর কাজ যখন থাকে না তখন যন্ত্রপাতি বানাই। যন্ত্রপাতি দিয়ে আমি বিঘ্নেশ্বর পূজারির জন্য একটি কৃত্রিম হাতি বানিয়েছি। কিন্তু দু-জন ক্ষত্রিয় যুবক আমার রহস্য জেনে নিল। অগত্যা আমাকে নিজের নগর ছেড়ে এই জঙ্গলে চলে আসতে হল।' স্বর্ণাচারি বলল।

'আরে, তুমি কি নিজেকে এক মহাপুরুষ ভেবে বসে আছ নাকি? তুমি কি ভেবেছ আমি তোমার জীবনী জানতে এসেছি? তুমি তোমার জীবনের সব কথা আমাকে বলছ কেন? আমি তো তোমাকে শুধু জিজ্ঞেস করেছি এখানে থাকার কারণ। তুমি এখন যে নগরের নাম করলে সে নগরের লোক আর একজনও কি এখানে আছে?' উট থেকে নেমে লুণ্ঠনকারীদের নেতা স্বর্ণাচারির বুকে বল্লম ঠেকিয়ে রাখে।

স্বর্ণাচারি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'মশাই, আমাকে মারবেন না। আমি সব বলছি। এখান থেকে অল্প দূরেই দু-জন যুবক একটা কুঁড়ে ঘর বানিয়ে বাস করে। তার পাশেই পাথর দিয়ে বানানো বাড়িতে বিঘ্নেশ্বর পূজারির সাথে আমিও থাকি।'

ক্ষত্রিয় যুবকদের কথা শুনে লুণ্ঠনকারীদের নেতা স্বর্ণাচারির দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল, 'এখান থেকে অল্প দূরেই ক্ষত্রিয় যুবকরা ঘর বানিয়ে আছে? ওরা বসে বসে তপস্যা করছে না তো?'

'ওরা তপস্যা করবে কোন দুঃখে? ওরা যুদ্ধ সম্পর্কে নিপুণ, জঙ্গলে শিকার খেলা, প্রয়োজন হলে দুষ্টের দমন করা প্রভৃতি ওদের দৈনন্দিন কাজ।' স্বর্ণাচারি ভীষণ উৎসাহের সাথে এ-কথা বলল।

'ও তাই নাকি? বলে লুণ্ঠনকারীদের নেতা অট্টহাস্যে বলল, 'এখন আমরা যে গণ্ডক জাতির ফসল কেটে নিয়েছি একি দুষ্টদের কাজ হল? এই ঘটনার কথা ওই ক্ষত্রিয় যুবকেরা জানতে পারলে ওরা কী করবে?'

তারপর স্বর্ণাচারি বলল যে লুণ্ঠন করা অবশ্যই দুষ্টদের কাজ আর এই কথা জানার পর ক্ষত্রিয় যুবকেরা নিশ্চয় চুপ করে বসে থাকবে না। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল এভাবে কথা বলা তো জেনে-শুনে বিপদ ডেকে আনা। তাই সে ভাঙা স্বরে বলল, 'মশাই, আপনি ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কিত এমন সব জটিল প্রশ্ন করছেন যে কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।'

'তুমি বেঁচে গেলে।' লুণ্ঠনকারীদের নেতা বলল। কিছুক্ষণ পরে আবার বলল, 'তুমি ক্ষত্রিয় যুবকদের কুঁড়ে ঘরের কথা বলে ছিলে, ওদের ঘর দেখাবে চল তো। এত ভালো লোকের এই জঙ্গলে থাকা আমাদের মতো লোকের পক্ষে বিপদজনক।'

স্বর্ণাচারি লুণ্ঠনকারীদের নেতার কথার মানে বুঝতে পারল। ভাবল, এই লোকটা ওই দু-জন ক্ষত্রিয় যুবকদের খতম করতে চাইছে, আমি এখন আগেভাগে ওদের সাবধান করি কী করে!

'কী ভাবছ? পালানোর চেষ্টা করছ নাকি? সাবধান। তোমার বুকে বল্লম গেঁথে সোজা গাছে ঝুলিয়ে দেব।' লুণ্ঠনকারীদের নেতা গর্জে উঠল।

স্বর্ণাচারি ভাবল, এখন শুধু কথা বলে কাল ক্ষেপণ করার চেষ্টা জীবনের পক্ষেও ক্ষতিকর। তাই সে ক্ষত্রিয় যুবকদের কুটিরের দিকে এগোতে লাগল। লুণ্ঠনকারীদের নেতা আবার উটে চড়ে বসে নিজের দুই অনুচরকে সাথে যেতে বলল।

আগে আগে স্বর্ণাচারি হাঁটছে আর তার পেছনে তিন জন লুণ্ঠনকারী যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে ওই চার জন এক কুঁড়ে ঘরের কাছে পৌঁছাল। ফুল আর ফলে ভরা গাছপালার মাঝে এক সুন্দর পর্ণকুটির। ওই কুটিরের চারদিক বেড়া দিয়ে ঘেরা। ওই বেড়ার বাইরে একটি গোরু ছিল।

লুণ্ঠনকারীদের নেতা ওই গোরুকে দেখেই বলল, 'আরে হেই স্বর্ণাচারি, এই গোরুকে দেখে তো মনে হচ্ছে এ বেশ দুধালো গাই। কিন্তু এর বাছুর কোথায়?'

'মশাই, এটা সত্যি দুধালো গাই। বাছুর কুটিরের ওপাশে কোথাও হয়তো চরছে।' স্বর্ণাচারি বলল। এখন তার কাছে একমাত্র ভাবনা, কেমন করে আগেভাগে শত্রুর আগমনের কথা ক্ষত্রিয় যুবকদের জানাবে। কিন্তু লুণ্ঠনকারী গাই বাছুরের প্রশ্ন করে কথায় আটকে রাখছে।

'মশাই, আপনারা এখানেই দাঁড়ান। আমি দেখে আসছি ওই ক্ষত্রিয় যুবকরা ঘরে আছে কি না।' স্বর্ণাচারি যেন নিজের বোকামির পরিচয় দিয়ে বলল।

এই কথা শুনে লুণ্ঠনকারীদের নেতা হেসে বলল, 'তোমার এসব চালাকি আমার কাছে চলবে না। সিন্ধুর রেগিস্তান থেকে শুরু করে এখানকার এই জঙ্গল এবং পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে তোমার মতো অনেককে দেখেছি। তুমি এই বেড়ার কাছে দাঁড়িয়েই চিৎকার করে বল যে আত্মীয় এসেছে! বুঝলে? চিৎকার করে ডাক দাও।'

লুণ্ঠনকারীদের নেতার চাল বুঝতে পারল স্বর্ণাচারি। আত্মীয় এসেছে বলে চিৎকার করলে ক্ষত্রিয় যুবকদ্বয় বিনা অস্ত্রে বাইরে আসবে। তখন ওদের হত্যা করা সহজ হবে। এই কথা ভেবেই হয়তো লুণ্ঠনকারীদের নেতা ওভাবে ডাকতে বলছে। ওই নেতা যেভাবে বলছে সেভাবে না ডাকলে আবার প্রাণহানি হতে পারে। কী করা যায়?

'হুঁ! এত দেরি করছ কেন? যেভাবে ডাকতে বলছি সেভাবে ডাক!' এ-কথা বলে লুণ্ঠনকারী নেতা স্বর্ণাচারির পিঠে বল্লম ঠেকিয়ে দিল।

স্বর্ণাচারি উচ্চকণ্ঠে চেঁচিয়ে বলল, 'উটের পিঠে চড়ে দূর দেশ থেকে আত্মীয় এসেছেন।' স্বর্ণাচারি এই কথা বলে দু-তিন বার ডাক দিলেও ওই কুটির থেকে কেউ বেরুল না।

তখন স্বর্ণাচারি ভাবল, বিপদ তাহলে কেটে গেছে। বলল, 'আমার তো মশাই মনে হচ্ছে, এই ক্ষত্রিয় যুবকরা শিকার করতে বাইরে গেছে।'

'সন্দেহ যখন আছে আর একবার ডাক।' ওই নেতা বলল।

স্বর্ণাচারি এবার আরও জোরে চিৎকার করে ডাক দিল। কিন্তু কুটির থেকে কেউ বাইরে বেরিয়ে এল না। তখন লুণ্ঠনকারীদের নেতা নিজের এক অনুচরকে আদেশ দিল, উঠে বসেই স্বর্ণাচারির উপর নজর রাখতে। সে যেন পালিয়ে না যায়। তারপর অন্য অনুচরকে নিয়ে নিজে বেড়ার ভেতরে ঢুকে কুটিরের কাছে গেল।

কুটিরের দরজা ঝাঁপ ফেলে বন্ধ করা আছে। দরজা বন্ধ দেখে লুণ্ঠনকারীদের নেতা নিজের অনুচরকে বলল, 'স্বর্ণচারির কথা সত্য। ক্ষত্রিয় যুবক দু-জন কুটিরের ভেতর নেই। ভেতরে গিয়ে দেখে আসি। কোনো দামি জিনিস পেয়ে যেতে পারি।'

তারপর ওরা দু-জনে ঝাঁপ সরিয়ে কুটিরের ভেতরে ঢুকল। কোনো দামি জিনিস তাদের হাতে পড়ল না। দরজার কাছে বাঘ, ভালুক, হরিণ প্রভৃতির চামড়া দেওয়ালের সাথে ঝোলানো ছিল। কুটিরের এক কোণে দুটো বল্লম এবং তির-ধনুক ছিল।

'এরা দু-জনে ভালো তির চালক মনে হচ্ছে। দূর থেকে শত্রু অথবা জানোয়ার হত্যার পক্ষে তিরের মতো জিনিস আর নেই। তির-ধনুক চালানো আমাদেরও তাড়াতাড়ি শিখে নিতে হবে। তুমি ওই তির-ধনুক নিয়ে নাও।' লুণ্ঠন নেতা নিজের অনুচরকে নির্দেশ দিল।

নিজের নেতার নির্দেশ পেয়ে অনুচর এগিয়ে গিয়ে তির-ধনুক তুলে কাঁধে রাখল। লুণ্ঠন নেতা মনোযোগ দিয়ে কুটিরের আনাচেকানাচে ভালো করে দেখল কিন্তু কোনো দামি জিনিস না পাওয়ায় নিরাশ হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

'স্বর্ণাচারি, ক্ষত্রিয় যুবকরা দেখছি কুটিরে খাবার তো দূরের কথা তরিতরকারিও রাখেনি। বাঘ এবং হরিণের চামড়া বাদে হাতির দাঁতও নেই। ওরা কি জঙ্গলী হাতির শিকার করে না?' লুণ্ঠন নেতা জিজ্ঞেস করল।

'এই ক্ষত্রিয় যুবকেরা শুধু খাওয়ার জিনিস বাদে অন্য কোনো জংলি জানোয়ার শিকার করে না। আপনারা যে বাঘের চামড়া দেখেছেন সেই বাঘকেও নিতান্তই আত্মরক্ষার্থে মেরেছিল।' স্বর্ণাচারি বুঝিয়ে বলল।

'ওহো তাই নাকি! তাহলে তো এরা হাতির দাঁতের দামও জানে না।' লুণ্ঠন নেতা ব্যঙ্গ করে যেন বলল।

এরপর লুণ্ঠন নেতা অনুচরটিকে ইশারায় গোরুটিকে দেখিয়ে বলল, 'উটের দুধ খেতে খেতে মুখ ফিরে গেছে। ওই গাইটাকে দড়ি বেঁধে টেনে আনো। কিন্তু ওর বাছুর কোথায়?' চারদিকে তাকাতে তাকাতে লুণ্ঠন নেতা বলল।

অনুচরটি গোরুর গলায় দড়ি বেঁধে তাকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছিল উটের কাছে। গোরুও বাঁধন ছেঁড়ার জন্য টান মারতে মারতে আম্বা আম্বা ডাকছিল। ওই ডাক শুনেই কুটিরের পেছন থেকে বাছুর ছুটে এল।

'বা! আমি যা ভেবেছি তাই হল। এখন এই স্বর্ণাচারিকে উটের উপর বসাও।' লুণ্ঠন নেতা বলল।

এই কথা কানে যেতেই স্বর্ণাচারি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'মশাই, আমাকে আপনারা নিয়ে যাবেন না। আমি এখানে ভালোই আছি। আমার বাকি জীবনটা এখানেই কাটাতে দিন।'

'ওসব চলবে না। আমরা যেখানে থাকি ওখানে ভালো ভালো ঘরবাড়ি বানাতে হবে। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা এই দেশের চার-শো ক্রোশ দখল করে আমাদের শাসন চালাতে চাই। এখন যেখানে মহল বানাতে তোমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেই স্থান হবে আমাদের রাজধানী। আমরা চাই তোমাকে আমাদের দরবারের বাস্তুশাস্ত্রী বানিয়ে সম্মানিত করতে।' লুণ্ঠন নেতা যেন সব বুঝিয়ে বলল।

'মশাই, আমি এই ধরনের কোনো পদ চাই না। আমি এখানে বেশ আছি...'

স্বর্ণাচারির কথা শেষ হতে-না-হতেই লুণ্ঠনকারী তার ঘাড় ধরে উটের উপর বসিয়ে দেয়। স্বর্ণাচারি অগত্যা আর্তনাদ করে ওঠে, 'শত্রুর হাত থেকে আমাকে রক্ষা কর! রক্ষা কর!'

কুটিরের দিকে যেতে যেতে বিঘ্নেশ্বর পূজারি নিজের মিত্র স্বর্ণাচারির আর্তনাদ শুনে ভাবল স্বর্ণাচারি বোধ হয় কোনো বিপদে পড়েছে! এসব ভেবে পূজারি তাড়াতাড়ি কুটিরের দিকে এগোল। বিঘ্নেশ্বর দেখল স্বর্ণাচারিকে উটের পিঠে বসানো হয়েছে আর গোরুকে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

বিঘ্নেশ্বর পূজারির মনে হঠাৎ এক বুদ্ধি জাগল। ক্ষত্রিয় যুবকরা একটি সিংহশাবককে বাচ্চা বয়সে এনে পুষছিল। ক্ষত্রিয় যুবকরা যখন কুটিরে থাকে তখন সেই সিংহশাবক ছাড়া থাকে। শাবকটি আপন খেয়ালে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু যুবকেরা যখন কুটিরে থাকে না তখন ওরা ওই সিংহশাবকটিকে কুটিরের পেছন দিকে বাঁশের খাঁচায় রেখে দিয়ে যায়।

এখন বিঘ্নেশ্বর পূজারির মনে হল, সিংহশাবককে ছেড়ে দিলে হয়তো স্বর্ণাচারি এবং গোরু ছাড়া পাবে। গোরু এবং সিংহশাবকের মধ্যে ভালো ভাব ছিল। গোরুর আম্বা রব সিংহশাবককে আরও উত্তেজিত করতে পারে। ফলে লুণ্ঠনকারীদের বিরুদ্ধে তাকে লেলিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

বিঘ্নেশ্বর পূজারি ছুটে গিয়ে কুটিরের পেছনের বাঁশের খাঁচা থেকে সিংহশাবককে মুক্ত করে দিল। খাঁচার বাইরে বেরিয়েই সিংহশাবক লুণ্ঠনকারীদের দিকে ধাবিত হল। তাকে দেখেই উট ঘাবড়ে গিয়ে লাফিয়ে উঠল। লুণ্ঠনকারী থতমত খেয়ে হঠাৎ পড়ে গেল নীচে। সিংহশাবক একলাফে ওই লুণ্ঠনকারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলা টিপে ধরল।

তিন

হঠাৎ সিংহ লুণ্ঠনকারীদের একজনের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ায় লুণ্ঠনকারীদের নেতা চমকে উঠল। লুণ্ঠন নেতা মুহূর্তকাল ভেবে হাতের বল্লমটি উঁচুতে তুলে ধরে সিংহের দিকে ছুড়ে মারল। বল্লমটি সিংহের এক বিঘত দূরে মাটির গভীরে গেঁথে গেল। ফলে, সিংহ ভীষণভাবে রেগে গিয়ে প্রবল বিক্রমে লুণ্ঠনকারীর গলা টিপে ধরে এদিক-ওদিক টেনে-হেঁচড়ে জমিতে ফেলে রগড়াতে লাগল।

লুণ্ঠনকারীদের নেতা একবার চারদিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখতে পেল, তার একজন অনুচর সিংহের কবলে পড়েছে আর ওই অনুচরের উট ক্ষত্রিয় যুবকদের কুটিরের পিছনের দিকের জঙ্গলে পালাচ্ছে। অন্য অনুচরের উটের উপর স্বর্ণাচারিকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। স্বর্ণাচারি আর্তনাদ করে উঠল, 'আমাকে বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও!'

লুণ্ঠন নেতা বুঝতে পারল যে সিংহের কবল থেকে সে তার অনুচরকে রক্ষা করতে পারবে না। সিংহের মুখে পড়া লুণ্ঠনকারীটি দু-এক বার চেঁচিয়েই চুপ মেরে গেল। তারপর সিংহ তাকে দূরে টেনে নিয়ে গিয়ে, ছেড়ে দিয়ে, পিছনের পা দুটো মুড়ে বসে একবার ওই লুণ্ঠন নেতার দিকে আর একবার ওই গোরুটির দিকে তাকাতে লাগল।

সিংহের চোখ আর তার ভাবগতিক দেখে লুণ্ঠন নেতা ভাবল, এরপর হয় তার উপর নয় তার অনুচরটির উপর সিংহ ঝাঁপিয়ে পড়বে। পরক্ষণেই সে ভাবল সিংহ খাবার জন্য গাইটার উপরই আগে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই, তার ধারণা হল গাইটাকে ছেড়ে দিলে তারা সিংহের কবল থেকে মুক্তি পাবে।

এ-কথা ভেবে লুণ্ঠন নেতা ওই অনুচরটিকে বলল, 'আরে এই হাঁদা, তোর বোকামির জন্যই আমাদের একজন অনুচর সিংহের মুখে প্রাণ হারাল। সিংহ গর্জন শোনার সাথে সাথে তুই গোরুটাকে ছেড়ে দিলে এত বড়ো বিপদ ঘটত না। সিংহ গোরুটাকে মুখে তুলে নিয়ে সোজা জঙ্গলে চলে যেত। এখন তুই গোরুটাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দে। তোর ঘটে যে কিছু আছে তার প্রমাণ দে।' আর্তনাদকারী স্বর্ণাচারির দিকে তাকিয়ে লুণ্ঠন নেতা বলল, 'আরে এই বাস্তুঘুঘু! তুই চুপ করবি না তোকে উটের পিঠ থেকে সিংহের মুখে ঠেলে ফেলে দেব?' বলল লুণ্ঠন নেতা।

এই প্রশ্ন শুনে স্বর্ণাচারির মনে দারুণ আনন্দ হল। ক্ষত্রিয় যুবকদের পোষা সিংহ তাকে ভালোভাবেই জানে, চেনে। সেই সিংহ তাকে কিছুই করবে না। তাই স্বর্ণাচারি ভীষণ ভয় পাওয়ার মতো অভিনয় করে বলল, 'হে উষ্ট্রনায়ক, আমাকে সিংহের মুখের কাছে ছুড়ে দাও। আমি সিংহের পেটে যদি চলে যাই ক্ষতি নেই অন্তত সেইভাবেও জন্মভূমিতে আমি মরতে পারব। জন্মভূমির চেয়ে প্রিয় জিনিস আর কী আছে!

সেই মুহূর্তে লুণ্ঠন নেতার মনে হল, স্বর্ণাচারিকে উটের উপর থেকে নীচে ফেলে দেওয়াই ভালো হবে, কিন্তু পরক্ষণেই স্বর্ণাচারির মৃত্যুর কথা উঠতেই পাহাড়ের পাদদেশে তার রাজধানী তৈরি করার কথাও মনে পড়ল। সেইজন্য সে তার অনুচরকে বলল, 'ওরে হেই, ওই বাস্তুঘুঘুটিকে সিংহের মুখে এখানে ঠেলে দিসনি। আমরা যে নগরী তৈরি করতে যাচ্ছি সেটা তৈরির ব্যাপারে ওর সাহায্য ভীষণভাবে প্রয়োজন হবে। সেখানে সে আমাদের কথা ঠিকমতো না শুনলে, তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে নেকড়েকে খেতে দেব।' সেই কথা শুনে স্বর্ণাচারির মনে সত্যি সত্যি মৃত্যুভয় জাগল। সে তখন সিংহের দিকে ফিরে 'ভীম, ভীম,' বলে চিৎকার করে, 'আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও', বলতে লাগল।

পোষা সিংহের নাম ছিল ভীম। নিজের নাম কানে যেতেই সিংহ গর্জন করতে করতে উঠে একবার গা-ঝাড়া দিয়ে স্বর্ণাচারির বসে থাকা উটের দিকে ছুটল। কিন্তু ইতিমধ্যে মারাত্মক বিপদের কথা ভেবে লুণ্ঠনকারী গোরুটাকে ছেড়ে দিয়ে উটকে তাড়া দিল। উঠ ভুট্টার খেতের ভিতর দিয়ে সোজা ছুটতে লাগল। তার পেছনে পেছনে লুণ্ঠন নেতাও নিজের উটকে আরও দ্রুত ছোটাল।

যা কিছু ঘটছে তার সবটাই বিঘ্নেশ্বর পূজারি কুটিরের পেছন থেকে দেখছিল। জীবনে সুখে-দুঃখে যে স্বর্ণাচারিকে সদাসর্বদা পেয়েছে সেই সাথীকে এভাবে লুণ্ঠনকারীদের ধরে বেঁধে নিয়ে যেতে দেখে তার মনে ভীষণ দুঃখ হল। সময়মতো ক্ষত্রিয় যুবকরা কুটিরে থাকলে এই বিপদ ঘটত না। বিঘ্নেশ্বর পূজারি এইসব কথা ভাবছিল এমন সময় ওই ক্ষত্রিয় যুবকদ্বয় শিকার সেরে নিজেদের কুটিরের দিকে ফিরছিল। সেইদিন ওরা ভালো শিকার পেল। একজন যুবকের কাঁধে একটি হরিণ ঝুলছিল। অন্য যুবকের কাঁধে দুটো বুনো মুরগি আর হাতে চারটে খরগোশ ঝোলানো ছিল। ওরা নিশ্চিন্তে কথা বলতে বলতে হাঁটছিল।

ওই যুবকদ্বয় কুটিরের দিকে হাঁটার সময় সিংহ মৃদু গর্জন করতে করতে যুবকদের কাছে এসে ওদের একজনের পা জড়িয়ে ধরল। সিংহকে খাঁচার বাইরে দেখে যুবকরা আশ্চর্য হয়ে গেল। শিকার করতে যাওয়ার সময় ওরা সিংহকে খাঁচায় আটকে রেখে গিয়েছিল। এখন সে খাঁচা থেকে বেরিয়ে এল কী করে! কোনো হতভাগাকে আমাদের এই সিংহটা মেরে ফেলেনি তো! খাঁচা থেকে এ তো বেরোতেই পারে না। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে অবশেষে ওরা হতবাক হল।

যুবকদ্বয় একে অন্যের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এমন সময় গাছের আড়াল থেকে বিঘ্নেশ্বর বেরিয়ে এসে বলল, 'হে মহাবীরদ্বয়, বিরাট মারাত্মক সর্বনাশ হয়ে গেছে।'

সে-কথা শুনে মুহূর্তের জন্য যুবকদ্বয় থমকে গেল। ওদের মধ্যে একজন তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে পূজারির দিকে তাকিয়ে বলল, 'কি বলছ তুমি? সর্বনাশ, সর্বনাশ বলে চেঁচাচ্ছ কেন? তুমি আছ, আমরা আছি, এই বনও আছে, সর্বনাশটা তাহলে হল কোথায়? সর্বনাশ হল কার? আমরা অবাক হচ্ছি এই সিংহশাবক খাঁচা থেকে বেরিয়ে পড়ল কী করে? তাড়াতাড়ি বল কী হয়েছে?' কথা বলতে বলতে যুবকটি সিংহকে সামলাচ্ছিল।

বিঘ্নেশ্বর তাড়াতাড়ি অল্প কথায় যুবকদ্বয়কে এতক্ষণ কুটিরের কাছে যে ভয়ংকর কাণ্ড ঘটেছিল তা জানিয়ে বলল, 'হে খড়গবর্মা, হে জীবদত্ত, এখানে সময় নষ্ট না করে কুটিরের কাছে চল। ভীমের থাবা খেয়ে সেখানে মরে পড়ে আছে একজন লুণ্ঠনকারী। দেখবে চল। ঈশ্বরের কৃপায় গাই বাছুরকে ফিরে পেয়েছি।'

পূজারির কথা শুনে খড়গবর্মা এবং জীবদত্তের একদিকে যেমন খুব বিস্ময় জাগল তেমনি অন্যদিকে প্রচণ্ড ঘৃণাও জাগল। ওরা জানত ওদের বাসস্থানের অরণ্যে আরও অনেক আদিম জাতি আছে কিন্তু ওরা এতদিন উটবাহী কাউকে দেখেনি। এহেন অবস্থায় উটে বসে একদল লুণ্ঠনকারী তাদের কুটিরে আসাই নয়, এসে দিব্যি তাদের অতিথি স্বর্ণাচারিকে ধরে বেঁধে নিয়ে যাওয়ায় তাদের মনে ওদের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা জাগল।

'জীবদত্ত, আর এক মুহূর্ত আমাদের এখানে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। পূজারি তো আমাদের জানিয়েছে ওই লুণ্ঠনকারীরা কোন দিকে গেছে। আমরা এক্ষুনি চল বেরিয়ে পড়ি, স্বর্ণাচারিকে উদ্ধার করি আর ওই লুণ্ঠনকারীদের খতম করি!' এই কথা বলে খড়গবর্মা খাপ থেকে তরবারি বের করল।

জীবদত্ত নিজের বন্ধুর কাঁধে হাত দিয়ে বলল, 'খড়গবর্মা, আগে পিছে না ভেবে শত্রুকে আক্রমণ করলে বিপদ হতে পারে। শত্রুদের সংখ্যা জানতে হবে। আমাদের কুটিরে ওই লুণ্ঠনকারীদের ঢোকার পেছনে কোনো রহস্য আছে কিনা জানতে হবে। এইসব ব্যাপার খুব সাবধানে ভেবেচিন্তে দেখতে হবে। কোথাকার কোন দেশের বাহন উটকে লুণ্ঠনকারীরা এই অরণ্যে আনল কেন?... যাক, আগে চল কুটিরে ঢুকে ওরা কী নিয়ে গেছে দেখি, তারপর আমরা ঠিক করব আমাদের কর্তব্য।'

খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত এগিয়ে চলেছে। পেছনে যেতে যেতে বিঘ্নেশ্বর বলল, 'হে যোদ্ধাগণ, এই যে, এই পাশের জঙ্গলে পড়ে আছে একজন লুণ্ঠনকারী। ভীমের থাবা খেয়ে লোকটা পটল তুলেছে।

খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত ওই মৃতদেহের কাছে গেল। খড়গবর্মা পা দিয়ে ওই মড়াটাকে এদিক-ওদিক নাড়িয়ে দেখল। জীবদত্ত মড়ার দিকে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'এই লোকটা ঠিক বুনো জাতের নয়। এর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এ কোনো দূর দেশের অধিবাসী।'

'এ লোকটা বেঁচে থাকলে এর কাছ থেকে অনেক কিছু জানা যেত। বেচারা ভীম কী করে বুঝবে। রাগের চোটে ওর গলা ঝাপটে ধরেছে।' বলল খড়গবর্মা।

তারপর যুবকদ্বয় কুটিরের ভিতর ঢুকল। কুটিরের সমস্ত জিনিস তছনছ করা আছে। দরজার কাছে টাঙানো ধনুক এবং তূণ তারা দেখতে পেল না। 'আমাদের এইসব জিনিস যখন নিয়ে গেছে, ওদের আর ছাড়া যায় না। ধরতেই হবে। ওরা যে কোত্থেকে এল এবং কোনদিকে গেল তা এখানকার গণ্ডক জাতের লোক কেউ-না-কেউ দেখেছে নিশ্চয়।' জীবদত্ত বল। পরক্ষণে পূজারির দিকে ঘুরে জীবদত্ত বলল, 'বিঘ্নেশ্বর, তুমি গিয়ে আশেপাশে গণ্ডক জাতের কাউকে দেখতে পেলে তাকে এখানে নিয়ে এলো।'

কুটিরের বাইরে পা রাখতেই পূজারি দেখতে পেল গণ্ডক জাতের নেতা অরণ্যমাল্লু তার অনুচরদের সাথে, লুণ্ঠনকারীদের বাহন, তাদের ক্ষমতা ইত্যাদি সম্পর্কে কথা বলতে বলতে চলেছে। তা দেখে বিঘ্নেশ্বর পূজারি তাদের কাছে তাড়াতাড়ি গিয়ে বলল, 'ক্ষত্রিয় যুবকেরা এক্ষুনি শিকার থেকে ফিরেছে। উটের উপর বসে থাকা লুণ্ঠনকারীদের আপনারা কেউ এখন দেখেছেন? ওরা আমার প্রাণের বন্ধু স্বর্ণাচারিকে ধরে নিয়ে গেছে।'

এ-কথা শুনে অরণ্যমাল্লুর চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে বলল, 'কী বলছ পূজারি, আমরা কী শুধু ওদের দেখেছি, ওরা যে আমাদের ফসল কেটে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা ওদের প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করে হেরে গিয়ে পালাচ্ছি। ওদের এক বিচিত্র জীবের পিঠে স্বর্ণাচারিকে চেপে যেতে আমার অনুচররা দেখেছে। খড়গবর্মা অথবা জীবদত্ত তখন এখানে থাকলে ওদের একজনও প্রাণে বেঁচে যেতে পারত না।'

বাইরের কথাবার্তা কানে যেতেই খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত কুটিরের বাইরে এল। অরণ্যমাল্লু ওদের কাছে গিয়ে বলল, 'খড়গবর্মা, জীবদত্ত, বিরাট বিপদে পড়ে গেছি। ওই লুণ্ঠনকারীরা ফসল নিয়ে গেছে। যে গণ্ডক জাতের লোক পরাজয় কাকে বলে জানত না, তারা সবাই কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, পালিয়ে এল অরণ্যপুরে। এখন আপনারাই ভরসা।'

অরণ্যমাল্লুর কথা শুনে খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত বুঝল ওই উটের উপর চড়ে আসা লোকগুলোর কাজই লুণ্ঠন করা। ওরা এ-কথা ভেবে আশ্চর্য হল যে ওই লুণ্ঠনকারীরা শুধু যে সাহসের সাথে গণ্ডক জাতের লোককে মোকাবিলা করল তাই নয় ওদের পরাজিতও করল। এ এক আশ্চর্য ঘটনা।

'তুমি রাজা হয়ে ওই লুণ্ঠনকারীদের ভয় পেয়ে পালিয়ে এলে। তোমার কাপুরুষতা দেখে তোমার অনুচরেরা কী ভাববে!' রেগে গিয়ে খড়গবর্মা বলল।

'আজ্ঞে আমি পালিয়ে এসেছি ঠিক। কিন্তু রাজা ওদের আক্রমণ করতে আসেনি।' বলতে বলতে মন্ত্রী শিলামুখী এগিয়ে এল।

'তাহলে ওরা কি কোনো নতুন অস্ত্র তোমাদের উপর প্রয়োগ করেছে? নাকি ওই উটদের দেখে তোমাদের গণ্ডারগুলো ভয়ে ছুটে পালিয়েছে?' জিজ্ঞেস করল জীবদত্ত।

শিলামুখী সেই পাহাড়-জঙ্গলের পাদদেশে যা কিছু ঘটেছিল সমস্ত ঘটনা ওদের শুনিয়ে বলল, 'ওই লুণ্ঠনকারীদের কাছে বল্লম ও তরবারি ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র ছিল না। কিন্তু যে জীবের নাম আপনি উট বলছেন, সেগুলোকে দেখে কেন জানি না আমার লোক ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। ওই ধরনের জন্তু আমরা কোনোদিন দেখিনি। তাই ওটাকে দেখে সবাই ভয় পেয়েছে।'

'যাক যা হবার হয়েছে। এখন স্বর্ণাচারিকে ওদের কবল থেকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। শুধু তাই নয় ওই দুরাত্মারা যাতে এ পথ আর কোনোদিন না মাড়ায় তার জন্য উচিত শিক্ষা ওদের দিতে হবে। তোমাদের কয়েক জন দেখে এসো ওরা কোন দিক দিয়ে কতদূর গেল। আমরা দু-জনে সূর্যাস্ত হতে দু-এক দণ্ড বাকি থাকতে এখান থেকে রওনা দেব।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্তের কথা শেষ হতেই অরণ্যমাল্লু তার চার জন অনুচরকে কাছে ডেকে ওই লুণ্ঠনকারীদের গতিবিধি ভালো করে দেখে আসার হুকুম দিল। তৎক্ষণাৎ ওই চার জন গণ্ডারের পিঠে চড়ে পাহাড়ের পাশ দিয়ে যেতে লাগল।

চার

খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত ভাবল ওই চার জন গণ্ডক জাতের যুবকদের ফিরে আসার আগে রান্না সেরে প্রস্তুত থাকা উচিত। গণ্ডক জাতের রাজা অরণ্যমাল্লু এবং তার দু-জন অনুচর কুটিরের সামনে বসে লুণ্ঠনকারীদের সম্পর্কে আলোচনা করতে লাগল।

'এই লুণ্ঠনকারীদের সম্পূর্ণ খতম না করলে আমাদের বাঁচার আর কোনো পথ নেই। বাকি ফসল কেটে ঘরে তোলার সময় আর একবার এই লুণ্ঠনকারীরা আসতে পারে।' অরণ্যমাল্লু বলল।

সেই কথা শুনে মন্ত্রী শিলামুখী মাথা নেড়ে বলল, 'মহারাজ, আমাদের গণ্ডক জাতের লোক সেই লুণ্ঠনকারীদের চেয়ে ওদের বাহন, ওই বিচিত্র জীব দেখে বেশি ভয় পেয়েছে। তারা ভেবেছে ওই জন্তুগুলো ভীষণ ক্ষতিকর কোনো জীব। সেইজন্য আমার ধারণা, এবারে আমাদের যোদ্ধারা ওই জানোয়ার দেখে আর ভয় পেয়ে পিছু হটবে না।'

'ক্ষত্রিয় যুবকদের সাহায্যে, আমরা এখনই ওদের ধাওয়া করে, ওদের সর্বনাশ করলে সবচেয়ে ভালো হত। কিন্তু এখন ভাবছি, ক্ষত্রিয় যুবকরা আমাদের কথায় রাজি হবে কি না।' অরণ্যমাল্লু বলল।

'যুদ্ধের নাম শুনলে খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত চান-খাওয়া-ঘুম ভুলে যায়। লুণ্ঠনকারীরা স্বর্ণাচারিকেও ধরে নিয়ে গেছে। ক্ষত্রিয় যুবকদের খাওয়া-দাওয়া সেরে কুটিরের বাইরে আসতে দিন, তখন ওদের সাথে কথা বলব।' বিঘ্নেশ্বর পূজারি বলল।

ওরা এই ধরনের কথা বলাবলি করছিল। তখনই খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত খাওয়া-দাওয়া সেরে কুটিরের বাইরে এল। বিঘ্নেশ্বর পূজারি জীবদত্তকে অরণ্যমাল্লুর চিন্তাধারার কথা বলল।

'শিকার শেষ করে কুটিরে আসার সাথে সাথে আমার মাথায় এই চিন্তা এসেছিল। কিন্তু ততক্ষণে সেই লুণ্ঠনকারীরা এই অঞ্চল ছেড়ে চলে গেছে। উট আমাদের গণ্ডারের চেয়ে তিনগুণ দ্রুত দৌড়াতে পারে। ওরা যখন বুঝতে পারবে যে আমাদের হাতে ওদের মারাত্মক কোনো বিপদ হতে পারে তখনই ওরা সোজা পালাবে। তাই সে দুরাত্মাদের খতম করতে হলে ওরা যখন উট থেকে নেমে বিশ্রাম করতে থাকবে ঠিক তখনই ওদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে হবে।' জীবদত্ত বলল।

'বেশ তাই করা যাবে। আমরা কি এখন আমাদের পঞ্চাশ জন যোদ্ধাকে নিয়ে যাব?' অরণ্যমাল্লু দারুণ উৎসাহে বলল।

জীবদত্ত হাসতে হাসতে বলল, 'অরণ্যমাল্লু এত যোদ্ধাদের সাথে নিয়ে ওই লুণ্ঠনকারীদের অনুসরণ করা যাবে কী করে? ওরা আমাদের সহজেই চিনে ফেলবে এবং পালিয়ে যাবে। সেইজন্য আমি এবং খড়গবর্মা আগে যাব। প্রথমে আমরা জেনে নেব যে আজ রাত্রে ওরা কোথায় আস্তানা গাড়বে। সুযোগ বুঝে প্রথমে আমরা ওদের নেতাকে খতম করব। বাকি লোকদের হয় আমরা বন্দি করব না হয় এই অঞ্চল থেকে দূরে তাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করব।'

কিছুক্ষণের মধ্যেই যে চার জন খবর আনতে গিয়েছিল তাদের মধ্যে একজন ফিরে এল। সেই লোকটা যে গণ্ডারের উপর বসে এসেছিল সেই গণ্ডার হাঁপাচ্ছিল।

ওই লোকটাকে দেখেই অরণ্যমাল্লু ব্যস্ত হয়ে বলল, 'লুণ্ঠনকারীদের দেখা পেয়েছ? তোমার সাথে আর যে তিন জন গিয়েছিল ওরা কোথায়?'

গণ্ডক জাতের লোকটা সংক্ষেপে সমস্ত ব্যাপার জানিয়ে দিল। সে যখন তার ওই তিন জন সাথীসহ যাচ্ছিল তখন দেখল ওই লুণ্ঠনকারীরা উত্তর দিকে চলে যাচ্ছে। তারপর ওদের অনুসরণ করেছিল। লুণ্ঠনকারীরা এক নদীর ধার দিয়ে যেতে লাগল। সেই দৃশ্য দেখে ফিরে এসেছে।

'বাকি তিন জন কি লুণ্ঠনকারীদের অনুসরণ করছে?' জীবদত্ত জিজ্ঞেস করল।

'আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর। আমরা যতক্ষণ না যাচ্ছি ওরা তিন জন ওই লুণ্ঠনকারীদের নজর বাঁচিয়ে ওদের অনুসরণ করবে।' গণ্ডক জাতের যোদ্ধা বলল।

জীবদত্ত ক্ষণকাল মৌন থেকে পরক্ষণে বলল, 'খড়গ, এখন আমরা রওনা হতে পারি। সূর্যাস্তের পরই ওই লুণ্ঠনকারীদের আস্তানায় যাওয়া উচিত হবে। তারপর সুযোগ বুঝে ওদের আক্রমণ করব। আজ রাত্রেই স্বর্ণাচারিকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। তা না হলে ওরা স্বর্ণাচারিকে মেরে ফেলতে পারে।'

তারপর ওই ক্ষত্রিয় যুবকদ্বয় তির-ধনুক ছোরা বল্লম হাতে তুলে নিয়ে গণ্ডারের উপর চড়ে এগোতে যাচ্ছে এমন সময় বিঘ্নেশ্বর পুজারি হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়েছে, এমন ভাবে লাফিয়ে বলল, 'ক্ষত্রিয় যুবকদ্বয়, ওদের ধাওয়া করার জন্য ওদের বাহনকেই ব্যবহার করতে পার। আমাদের সিংহ যে লুণ্ঠনকারীকে মেরে ফেলেছে সেই লোকটার বাহন আশেপাশে জঙ্গলে কোথাও নিশ্চয় লুকিয়ে আছে। খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। উটে চড়ে তাড়াতাড়ি ওদের কাছে পৌঁছানো যাবে।'

এই কথা শুনে অরণ্যমাল্লু নিজের অনুচরদের বলল, 'তাইতো, সেই বিচিত্র জীবের কথা একেবারে ভুলে গেছি। এই কুটিরের পেছনেই কোথাও সেটা হবে। যাও, ওটাকে ধরে নিয়ে এসো।'

তৎক্ষণাৎ গণ্ডক জাতের চার জন ওই কুটিরের পেছনের জঙ্গলে গিয়ে কিছুক্ষণ পরে সেই উট ধরে টেনে আনল খড়গবর্মা ও জীবদত্তের কাছ। ওই যুবকদ্বয় সেই উটের উপর রওনা হল। যে যুবক লুণ্ঠনকারীদের খবর আনল সেই যুবক ক্ষত্রিয় যুবকদের সামনে পথ দেখিয়ে যেতে লাগল। সূর্যাস্তের সময় ওরা লুণ্ঠনকারীদের নদীর তীরে পাহাড়ের গা ঘেসে যাওয়া একটি পথে দেখতে পেল। তারপর, ওই যে তিন জন গণ্ডক জাতের যুবক আগে থেকেই লুণ্ঠনকারীদের অনুসরণ করছিল তারাও এদের সাথে জুটল। অন্ধকার হয়ে এল। তখন লুণ্ঠন নেতা নিজের লোকজনকে নির্দেশ দিল সেখানেই আস্তানা গাড়তে। লুণ্ঠনকারীরা উট থেকে নেমে উটগুলোকে বাঁধল। রান্নার জোগাড় করতে লাগল ওরা। কয়েক জন বেরিয়ে পড়ল শুকনো কাঠের সন্ধানে। বাকি ক-জন পাথর দিয়ে উনান তৈরি করল।

খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত নিজের অনুচরদের নিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে স্বর্ণাচারিকে খুঁজে দেখতে লাগল। স্বর্ণাচারিকে ওরা লুণ্ঠনকারীদের মধ্যে কোথাও দেখতে পেল না। জীবদত্ত ভাবল, এই দুরাত্মারা পথেই কোথাও তাকে মেরে ফেলে দেয়নি তো! সে খড়গবর্মাকে বলল, 'খড়গ, স্বর্ণাচারিকে তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। এই দুরাত্মারা স্বর্ণাচারিকে এখানে আসার পথেই মেরে ফেলেনি তো!'

'তা কখনোই হতে পারে না। স্বর্ণাচারি ওদের চোখে ধুলো দিয়ে কোথাও পালিয়েছে কি না সন্দেহ হচ্ছে। তবে স্বর্ণাচারির খবর জানা খুবই সহজ ব্যাপার। তুমি এখানেই থাক। আমি এখনই ফিরছি।' বলে খড়গবর্মা খাপ থেকে তরবারি বের করে ওখান থেকে অন্যদিকে চলে যেতে লাগল। জীবদত্ত তাকে থামিয়ে বলল, 'কী করতে যাচ্ছ? কোথায় যাচ্ছ?'

'কয়েক জন লুণ্ঠনকারী কাঠ কুড়োতে নদীতীরে গেছে। ওদের একজনকে ধরে আনলে সে প্রাণের ভয়ে সব কথা আমাদের কাছে জানিয়ে দেবে।' বলল খড়গবর্মা।

জীবদত্ত কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'এই পরিকল্পনা চমৎকার হবে মনে হচ্ছে। তুমি নিজের সাথে একজন গণ্ডক জাতের লোককে নিয়ে যাও। এমনভাবে কাজটা কর যাতে ওরা টের না পায় যে আমরা এখানে লুকিয়ে আছি।'

খড়গবর্মা একজন গণ্ডক জাতের যুবককে নিয়ে চলে গেল। অদূরেই সে লুণ্ঠনকারীদের একজনকে দেখতে পেল। লোকটা এদের দেখে চিৎকার করার জন্য হাঁ করতেই খড়গবর্মা এক লাফে তার কাছে গিয়ে তার মুখ চেপে ধরল।

লুণ্ঠনকারীরা শুধু যে শুকনো কাঠ কুড়োচ্ছিল তাই নয়, শুকনো ডালগুলোকেও ভেঙে ফেলছিল। খড়গবর্মা কিছুক্ষণ কী যেন ভেবে নিল। খড়গবর্মা তার অনুচরকে একটা গাছের শুকনো ডাল ভেঙে নীচে ফেলতে বলল। সেটা নীচে সশব্দে পড়ার সাথে সাথে ওরা একটা গাছের আড়ালে লুকোল। পরক্ষণেই একজন লুণ্ঠনকারী ওই ডালের কাছে এল। সেই লুণ্ঠনকারী ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে ওই ডাল গাছ থেকে কেন পড়ল।

লোকটা ওই ডাল টেনে নিয়ে যেতে যাবে এমন সময় খড়গবর্মা পেছন দিক থেকে গিয়ে তার গলা ঝাপটে চেপে ধরল দু-হাতে। ঠিক সেই মুহূর্তে গণ্ডক জাতের ওই লোকটা এসে তার বুকের কাছে বল্লম উঁচিয়ে ধরে বলল, 'চেঁচালে দেব শেষ করে।'

প্রাণের ভয়ে কাঁপছিল ওই লুণ্ঠনকারী। খড়গবর্মা তাকে বলল, 'কোনো কথা না বলে চুপচাপ আমার সাথে এসো। তোমার কোনো ভয় নেই। কিন্তু একবার যদি চেঁচানোর চেষ্টা কর তো তোমাকে এইখানেই একেবারে প্রাণে মেরে শেষ করে ফেলব।'

লুণ্ঠনকারী ভেজা বিড়ালের মতো নীরবে খড়গবর্মার পেছনে হাঁটতে লাগল। জীবদত্ত লুণ্ঠনকারীকে দেখে ভীষণ খুশি হয়ে খড়গবর্মাকে বলল, 'মনে হচ্ছে তুমি খুব সহজেই ধরে ফেলতে পারলে। এই লোকটা কি জানিয়েছে স্বর্ণাচারির খবর?'

'এখন পর্যন্ত একে কোনো প্রশ্ন করিনি। এর অনুচররা ওখানে চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাই, আমি সোজা তোমার কাছে একে নিয়ে এসেছি।' খড়গবর্মা বলল।

'ওরে এই, তোমরা লুণ্ঠন করে ফেরার পথে যে স্বর্ণাচারিকে ধরে এনেছিলে তাকে কী করলে?' জীবদত্ত জিজ্ঞেস করল ওই লুণ্ঠনকারীকে।

'সত্যকথা বললে আমাকে প্রাণে মেরে ফেলবেন না তো? ছেড়ে দেবেন তো?' লুণ্ঠনকারী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল।

'নিশ্চয় ছেড়ে দেব। কিন্তু তুমি যদি মিথ্যা কথা বল, আমাদের যদি ধোকা দাও, তাহলে তোমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলব। বুঝেছ?' জীবদত্ত সতর্ক করে দিয়ে বলল।

'শুনুন তবে। আচারি সারা রাস্তা আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও' বলে চিৎকার করছিল। আসলে আমাদের নেতা তাকে মেরে ফেলতে চায়নি। তাই ওকে ভুট্টার থলিতে পুরে গলায় বেঁধে রেখেছে। এখন ওকে নদীর তীরে আমাদের জিনিসপত্রের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছে।' লুণ্ঠনকারী এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল।

'আজ রাত্রে তোমরা কি এখানেই থাকবে? কাল সকালে এখান থেকে রওনা হয়ে যাবে নাকি?' জীবদত্ত আবার প্রশ্ন করল।

'আজ্ঞে হ্যাঁ। এখন আমাকে মেরে ফেলবেন না তো? আমি সব কথা বলে দিয়েছি।' ওই লুণ্ঠনকারী বলল।

'তুমি যে কথা বলেছ তা যতক্ষণ না যাচাই করে দেখছি, সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ তোমাকে গাছে বেঁধে রাখব। তোমার মুখে গাছের পাতা পুরে দেব, যাতে তুমি চিৎকার করে তোমার লোকজনকে না ডাকতে পার।' এই কথা বলে জীবদত্ত গণ্ডক জাতের একজনকে ইশারায় ডাকল।

গণ্ডক জাতের একজন যুবক ওই লুণ্ঠনকারীকে নিয়ে গিয়ে একটা গাছের সাথে ঝুরি দিয়ে বেঁধে দিল। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে গেছে। খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত একটা গাছে উঠে লুণ্ঠনকারীদের আস্তানা ভালোভাবে দেখে নিল। ওই আস্তানার এক জায়গায় আগুন জ্বলছিল। ওই আগুনের কাছে বসে লুণ্ঠন নেতা চার-পাঁচ জন অনুচরদের সাথে কথা বলছিল। অন্যেরা মাদুর, থলি প্রভৃতি বিছিয়ে শোবার তোড়জোড় করছিল।

'খড়গ, আর একটু অন্ধকার বাড়লেই আমরা কাজ শুরু করব। প্রথমে স্বর্ণাচারিকে মুক্ত করতে হবে। তারপর, গণ্ডক জাতের লোক পাঠিয়ে উটগুলোকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর আমরা চড়ব গণ্ডারের উপর। অতর্কিতে ওই ঘুমন্তদের আক্রমণ করে যাকে পারব তাকে মেরে ফেলব। আর বাকি যারা থাকবে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাবে।' বলল দেবদত্ত।

'ভালো লাগছে তোমার পরিকল্পনা। আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে স্বর্ণাচারিকে মুক্ত করা। তারপর...' হঠাৎ থেমে খড়গবর্মা লুণ্ঠনকারীরা যেখানে আস্তানা গেড়েছিল তার পেছনের পাহাড়ের গুহার দিকে বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বলল, 'জীবদত্ত, ওই পাহাড়ের গুহা থেকে কেমন মশালের শিখা দেখা যাচ্ছে দেখ! ওই অদ্ভুত ধরনের বিকৃত চেহারার রাক্ষুসে লোকটা কে? ওর পেছনে দাঁড়িয়ে যে ভয়ংকর লোকটা কড়া মেজাজে চাবুক চালাচ্ছে সে কে?'

খড়গবর্মা যে গুহার দিকে তাকাতে বলল সেইদিকে তাকাল জীবদত্ত। ওই গুহার মুখে একটা মশাল জ্বলছিল। ওই মশালের আলোতে দেখা গেল অদ্ভুত ধরনের একটা লোক জাদুর একটা দণ্ড না চাবুক কি যেন ঘোরাচ্ছে ওই লুণ্ঠনকারীদের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ এক সময় ওই ভয়ংকর রাক্ষস গর্জন করে উঠল। সাথে সাথে ওই অরণ্যে, পাহাড়ে সেই রাক্ষসের গর্জন যেন ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হল। গর্জন করতে করতে সেই রাক্ষস গুহা থেকে বেরিয়ে সোজা লুণ্ঠনকারীদের দিকে যেন ছুটে আসছে। তার কপালে অগ্নিপিণ্ডের মতো কি যেন দপ দপ করে জ্বলছে।

পাঁচ

আগুনের কাছে বসে নিজের অনুচরদের সাথে কথা বলার সময় হঠাৎ লুণ্ঠন নেতা দেখতে পেল গুহা থেকে গর্জন করতে করতে এক বিকৃত জটাধারী ওদের দিকে ছুটে আসছে। তার হাতে এক জ্বলন্ত মশাল।

'এ কেমনতর ভয়ংকর আকৃতি রে বাবা! একি কোনো রাক্ষস নাকি? নাকি পাহাড়ি পিশাচ? তোমরা সবাই মুহূর্তে সাবধান হয়ে যাও। আমাদের এক্ষুনি বিপদের মোকাবিলা করতে হবে।' এ-কথা বলে লুণ্ঠন নেতা ঝট করে উঠে দাঁড়াল।

'বাবু, এখানে আর আমাদের থাকা উচিত হবে না। প্রাণে মারা যাব। এ নির্ঘাত মানুষখেকো রাক্ষস।' এই কথা বলে লুণ্ঠন নেতার চার জন অনুচর সোজা নদীতীর ধরে ছুটতে লাগল।

'ওরে এই কাপুরুষের দল! থাম! আমরা এত জন আছি। আর এই রাক্ষস একা আমাদের কী করতে পারে? ফিরে এসো, আমরা সবাই মিলেমিশে একত্রে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি।' লুণ্ঠন নেতা চিৎকার করে এইসব কথা বলতে বলতে ওই অনুচরদের ডাকতে লাগল।

তার কথায় তারা কান দিল না। 'আপনি বাঁচলে বাপের নাম' ভেবে ওদের কেউ ছুটল উটের দিকে আবার কেউ ছুটল নদীর তীর ধরে। ইতিমধ্যে ঘুমন্ত লুণ্ঠনকারীদের ওই রাক্ষসটা পা দিয়ে ঠেলে তাদের কাপড়ে আগুন ধরিয়ে দিল।

গাছের ডালে বসে খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে লাগল। তারা এই দৃশ্য দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা ওই চার জন গণ্ডক জাতের লোক ভয়ে কাঁপতে লাগল।

'খড়গবর্মা, এই বিকৃত আকৃতিধারী কোনো রাক্ষস অথবা কোনো পিশাচ নয়। ওই গুহার কোনো তান্ত্রিক একে এই ধরনের রূপ ধারণ করিয়ে পাঠিয়েছে। এ হয়তো তান্ত্রিকের শিষ্য হিসেবেই রয়েছে।' জীবদত্ত বলল।

'সে যাই হোক, আমরা যা করব ভেবেছিলাম তা এই তান্ত্রিক করছে যখন করুক। আমরা শুধু সব দেখতে থাকব। যেই লুণ্ঠনকারীরা চলে যাবে অমনি আমরা গিয়ে আমাদের স্বর্ণাচারিকে ভুট্টার বস্তার ভেতর থেকে উদ্ধার করে সোজা নিজেদের পথ ধরব।' খড়গবর্মা বুঝিয়ে বলল।

ওই বিকৃত লোকটা কি করছে না করছে কিছুক্ষণ দেখে জীবদত্ত বলল, 'খড়গবর্মা, লুণ্ঠন নেতার বেশ হিম্মত আছে মনে হচ্ছে। ওই দেখ নিজের লোককে জোগাড় করে ওই বিকৃত লোকটাকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার তাল করছে।'

লুণ্ঠন নেতা নিজের পলায়নরত দশ-বারো জনের দিকে বল্লম উঁচিয়ে ভয় দেখাল। ওদের থামিয়ে ওই বিকৃত লোকটাকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলল।

'এই আক্রমণের ফলে ওই গুহার তান্ত্রিক এবং তার সৃষ্ট ওই বিচিত্র ভয়ংকর আকৃতির মহাশক্তির মৃত্যু হবে। ওই বিকৃত রাক্ষসের মৃত্যুর পর লুণ্ঠন নেতা ওই গুহার কাছে যাবে। হত্যা করবে ওই তান্ত্রিককে। কিছু একটা আমাদের করতে হবে। এখন লক্ষ রাখতে হবে যাতে স্বর্ণাচারি উটের পায়ের নীচে পড়ে মারা না যায়। ওকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।' খড়গবর্মা বলল।

খড়গবর্মার কথা শেষ হতে-না-হতেই গুহার ভেতর থেকে এক ভয়ংকর আগুনের হলকা বেরুল। তান্ত্রিক তেলে ভেজা মশালগুলোতে আগুন ধরিয়ে, 'শাম্ভবী! ভৈরবী!' বলে চিৎকার করে এক-একটা জ্বলন্ত মশাল ওই পাহাড়ের নীচের লুণ্ঠনকারীদের উপর ছুঁড়তে লাগল!

জ্বলন্ত মশালগুলো লুণ্ঠনকারীদের উপর একে একে পড়তে লাগল। এই নতুন ধরনের আক্রমণ লক্ষ করে লুণ্ঠন নেতা ঘাবড়ে গিয়ে নিজের অনুচরদের বলল, 'ওরে উষ্ট্রবীরেরা, এই বিকৃত পিশাচের মতো আরও পিশাচ ওই গুহার মধ্যে আছে মনে হচ্ছে। আর এখন যুদ্ধ করে কোনো লাভ নেই। তোমাদের কয়েক জন ভুট্টার থলেগুলো নদীতে ফেলে দাও। জোয়ারে ভাসতে ভাসতে ওগুলো অন্য কোনো প্রান্তে পৌঁছে যাবে। আমরা পরে ওই ভুট্টার থলে জোগাড় করে নেব। বাকিরা গাছে বাঁধা উটগুলো ছাড়িয়ে, উটের উপর চড়ে নদীতীর ধরে রওনা হয়ে যাও।' চিৎকার করে বলল।

লুণ্ঠন নেতার নির্দেশ শুনে নদীপথ ধরে যারা ছুটে পালাচ্ছিল তারা এবং গাছের আড়ালে যারা লুকিয়ে ছিল তারা এগিয়ে গেল। কিছু লোক গাছে বাঁধা উটগুলো খুলে দিল আর বাকি জন ভুট্টা ভরতি থলেগুলো নদীর জলে ফেলতে এগিয়ে গেল। ইতিমধ্যে গুহার ভেতর থেকে তান্ত্রিক বেরিয়ে এসে মশালটাকে নাড়াতে নাড়াতে বলল, 'ওরে এই জটাধারী ভূত! নদীতে যারা ভুট্টার থলে ফেলছে তাদের ধরে ওদের নদীমাতার আহার করে ফেল। একজনও যাতে না পালাতে পারে সেদিকে খেয়াল রেখ।'

যে বিকৃত ভয়ংকর লোকটা এতক্ষণ পা দিয়ে হাত দিয়ে লুণ্ঠনকারীদের মারছিল সে এখন তান্ত্রিকের নির্দেশ পেয়ে ভুট্টার থলে নদীর জলে ফেলতে যাওয়া লোকগুলোর দিকে এগোল। ততক্ষণে কয়েক জন লুণ্ঠনকারী কাঁধে পিঠে ভুট্টার থলে ফেলে নদীর দিকে এগোচ্ছিল। জটাধারী ভয়ংকর লোকটা ওদের এক-এক জনকে ধরে নদীতে ফেলতে লাগল। এই ঘটনা ঘটার সাথে সাথে লুণ্ঠনকারীদের আর্তনাদে গোটা তল্লাট হা-হা করে উঠল।

লোকের আর্তনাদ, চিৎকার প্রভৃতির ফলে গাছে বাঁধা উটগুলো দড়ি ছিঁড়ে সেই অন্ধকারে পালাতে লাগল। পালানোর সময় তারা লুণ্ঠনকারীদের মাড়িয়ে যেতে লাগল। কয়েকটা উট নদীর জলে গিয়ে পড়ল এবং স্রোতের সাথে ভেসে যেতে লাগল।

ঠিক সেইসময় একজনের আর্তনাদ শোনা গেল, 'আমাকে বাঁচান! আমাকে বাঁচান! আমাকে নদীতে ফেলবেন না!' আর তখনই ঝপ করে একটা থলি যেন নদীর জলে পড়ল।

'খড়গবর্মা, তুমি কি শুনতে পারছ? চিনতে পারছ? এই আর্তনাদকারী আমার মনে হচ্ছে স্বর্ণাচারি! ওকে লুণ্ঠনকারীরা নদীর জলে ফেলে দিয়েছে। ভুট্টার থলি জলে ডুববে না। স্বর্ণাচারির মাথাটা বাইরে আছে। থলিটা ভাসতে ভাসতে কোনো এক তীরে গিয়ে উঠবে। তবে আমরা একটু আগে চেষ্টা করলে বোধ হয় তাকে উদ্ধার করতে পারতাম।' জীবদত্ত গাছ থেকে নামতে নামতে বলল।

খড়গবর্মা তার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, 'এখন কী করতে যাচ্ছ?'

'গণ্ডক জাতের একজনকে নদীতীরের কাছে যেতে বলব। হয়তো সে স্বর্ণাচারির চিৎকার শুনতে পাবে। বাকি তিন জনকে লুণ্ঠনকারীদের বধ করতে বলব।' জীবদত্ত বলল।

'তাহলে আমরা কি হাত গুটিয়ে এসব দেখতে দেখতে বসে থাকব?' খড়গবর্মা একটু রেগে গিয়ে বলল।

'খড়গবর্মা! এখন তাড়াহুড়ো করো না। লুণ্ঠনকারীরা এখন ছোটাছুটি করছে বটে কিন্তু তাদের নেতা এখন ভুট্টার থলে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। এমনকী জটাধারী ভয়ংকর লোকটাকে আক্রমণ করারও তাল করছে। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না সে তার অনুচরদের কীভাবে মাঝে মাঝে নির্দেশ দিচ্ছে? আমাদের অনুচরদের হাত থেকে বেঁচে পালানোর চেষ্টা করলে আমরা তাকে তির বিদ্ধ করব। তার আগে আমাদের বুঝতে হবে এই জটাধারী এবং ওই তান্ত্রিকের ব্যাপারটাকে।' জীবদত্ত বলল।

'ঠিক আছে। গণ্ডক জাতের যুবকদের তুমি যা বোঝাতে চাইছ, বুঝিয়ে ফিরে এসো, আমি এখানেই থাকব।' এই কথার পর খড়গবর্মা তির-ধনুক নিজের হাতে তুলে নিল। শত্রু কোনোদিক দিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করতে আসছে কি না এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিল।

জীবদত্ত গাছ থেকে নেমে গণ্ডক জাতের যুবকদের কাছে গিয়ে তাদের সমস্ত ব্যাপার বুঝিয়ে দিল। মুহূর্তে এক গণ্ডক যুবক গণ্ডারের পিঠে চড়ে নদীর তীরে গেল। কিন্তু বাকি তিন জন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বলল, 'আজ্ঞে হুজুর, এই উটগুলোকে দেখে আমাদের কেমন যেন ভয় করত। এখন দেখছি ওই রাক্ষসটাকে। সে কি আর আমাদের ঘাড় মটকাবে না?'

ওই রাক্ষস এবং তার তান্ত্রিককে যা করার আমরা করছি। লুণ্ঠনকারীদের পেলেই মেরে ফেলবে। ওরা তোমাদের খেতের ফসল লুণ্ঠন করেছে। তোমরা খাবে কী? এ-কথা তোমরা ভুলে যেয়ো না।' জীবদত্ত ওদের গুরুত্ব সহকারে স্মরণ করিয়ে দিল।

নিজেদের খেতের ফসল লুঠ করার কথা মনে পড়তেই যুবকরা বলল, 'আমরা আর ছাড়ব না ওই লুণ্ঠনকারী যুবকদের। আমরা যাচ্ছি।' বলে যুবকরা গণ্ডারের উপর চড়ে বজ্রকণ্ঠে বলল, 'জয়, অরণ্যমাতার জয়! অরণ্যমাতার জয়!' চিৎকার করে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল লুণ্ঠনকারীদের উপর।

ওই ভয়ংকর রাক্ষসটার আক্রমণের ফলে যখন লুণ্ঠনকারীরা ছোটাছুটি করছিল ঠিক তখনই গণ্ডক যুবকদের আবার গণ্ডারের পিঠে চড়ে আসতে দেখে লুণ্ঠনকারীরা ভীষণ ভয় পেয়ে নেতাকে বলল, 'প্রভু, গণ্ডকরা আক্রমণ করতে আসছে! এখন পালানো ছাড়া আর পথ নেই।' এ-কথা বলে লুণ্ঠনকারীরা কেউ নদীর তীরের দিকে, কেউ গাছের দিকে ছুটে পালাল। একদিকে ভয়ংকর রাক্ষসের আক্রমণ আর অন্যদিকে বল্লম উঁচিয়ে ছুটে আসা গণ্ডকদের আক্রমণ। লুণ্ঠন নেতাও ভাবল, দু-দিকের আক্রমণের মোকাবিলা করা সহজ নয়। তাই সে চিৎকার করে বলল, 'তোমরা সবাই নদীর তীরের দিকে পালিয়ে যাও। ভুট্টার থলিগুলোকে আমাদের উদ্ধার করতেই হবে।' এ-কথা বলে সেও সেখান থেকে হঠাৎ সরে পড়ল।

'উফ! আমি দেরি করে ভীষণ বোকামি করেছি। সেই পাজি লোকটা প্রাণ নিয়ে পালাল।' এই কথা বলে গাছের ডালে বসে খড়গবর্মা লুণ্ঠনকারীদের নেতার উপর তিরের বৃষ্টি যেন বর্ষাতে লাগল। কিন্তু ততক্ষণে সে নিজের অনুচরদের নিয়ে নাগালের বাইরে, অনেক দূরে চলে গেল।

গণ্ডক জাতের যুবকরা তিন-চার জন লুণ্ঠনকারীকে বল্লম দিয়ে আক্রমণ করল। ততক্ষণে লুণ্ঠনকারীরা তাদের নেতার ঘোষণা শুনতে পেয়ে পড়ি-মরি করে পালাল।

গুহার ভেতর থেকে তান্ত্রিক বাইরে এল। মশাল তুলে ধরে নাড়তে নাড়তে বলল, 'আরে এই ভূত, তুই কোথায় আছিস! ভুট্টার থলেগুলো কি হাতে পড়ল না?'

সেই ভয়ংকর লোমশ ভূত নদীর তীর থেকে লম্বা লম্বা পা ফেলে গুহার দিকে এগোল। পথে গণ্ডক জাতের যুবকদের উপর নজর পড়তেই চিৎকার করে বলল, 'এরা যে মহাকালের দূত— এক সিংহধারী কালো বিরাট ভয়ংকর মোষের উপর চড়ে একেবারে এসে পড়েছে!'

সেই চিৎকার কানে যেতেই তান্ত্রিক গুহা থেকে সোজা বেরিয়ে এল। মশালের আলোতে দেখতে পেল গণ্ডার এবং তার পিঠে চড়ে বসে থাকা লোকদের। দেখেই মুহূর্তকাল চমকে উঠল। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে ভূতকে বলল, 'ওরে এই জটাধারী ভূত! আরে এই লোকগুলো মহাকালের দূত নয়, ওই এক-সিংহধারী মোষগুলো মোষ নয়। ওরা গণ্ডক জাতের লোক। আরে ওগুলো গণ্ডার, বুঝলে গণ্ডার, সাধারণ জন্তু। তুমি ওদের আক্রমণ করে প্রথমে লোকগুলোকে খেয়ে ফেলবে। তারপর ওই জন্তুগুলোকেও খেতে পারবে।'

তান্ত্রিকের কথা শেষ হতে-না-হতেই লোমশ ভূত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে চিৎকার করে বলে, 'হেই, পালিয়ো না! দাঁড়াও!' এই কথা বলেই গণ্ডক জাতের যুবকদের দিকে সে দুটো হাত ছড়িয়ে সশব্দে ধাবিত হল।

ওই ভয়ংকর রাক্ষসটাকে নিজেদের দিকে ছুটে আসতে দেখে গণ্ডক যুবকরা আর্তনাদ করে উঠল, 'হুজুর! আমরা মরে গেলাম!'

খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে গণ্ডক যুবকরা আক্রান্ত হতে পারে। তাই তারা গাছ থেকে নেমে ওদের দিকে ছুটতে ছুটতে আসছি! গণ্ডক যুবকদের আর্তনাদ শুনেই খড়গবর্মা লোমশ ভূতের দিকে তাক করে তির ছুড়ল। কিন্তু তার শরীরে খাড়া খাড়া চুল থাকাতে তির তার গা বিদ্ধ করতে পারল না।

'গুরু! আমার দিকে কাঠের টুকরো একটা ছুড়েছে!' লোমশ ভূত বলল।

তান্ত্রিক বিস্মিত হল। এবারে সে দু-হাতে দুটো মশাল তুলে ধরল। দেখতে পেল খড়গবর্মা এবং জীবদত্তকে। ওরা তার দিকেই যাচ্ছে। তখন তান্ত্রিক চোখ লাল করে দাঁতে দাঁত পিষে চিৎকার করে বলল, 'ওরে এই লোমশ ভূত! তোর শরীরে যেগুলো বিদ্ধ হয়ে আছে সেগুলো কাঠের টুকরো নয়, তির! তির যে ছুড়েছে তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে ক্ষত্রিয়। আর তার সাথে যে আছে তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে আধা ক্ষত্রিয় এবং আধা তান্ত্রিক। দাঁড়া আমি আমার মন্ত্র দণ্ড ছুড়ে ওদের দু-জনকেই ভস্ম করে ফেলছি।' এ-কথা বলেই তান্ত্রিক এক লাফে গুহার ভিতর ঢুকে গেল।

ছয়

জীবদত্ত ভাবছে, গুহার ভিতর ঢুকে তান্ত্রিকের ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না অন্য কীভাবে কী করবে!

খড়গবর্মা সন্দেহ ও আশঙ্কা ভরা চোখে গুহার দিকে তাকিয়ে জীবদত্তকে বলল, 'জীবদত্ত, মনে হচ্ছে তোমার পোশাক দেখে তান্ত্রিক একটু ঘাবড়ে গেছে। সে হয়তো তোমাকেও একজন তান্ত্রিক ভেবেছে। তাই সে তাড়াতাড়ি গুহার ভিতর ঢুকে গেছে। এখন কী করবে ভাবছ?'

জীবদত্ত দেখতে পেল ওই লোমশ ভূত গণ্ডক জাতের লোকের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে এধার-ওধার ছোটাছুটি করছে।

জীবদত্ত বলল, 'আমি এইজন্যই মাথার চুল গোল করে বেঁধে হাতে মন্ত্র দণ্ড নিয়েছি। ওরা আমার রূপসজ্জা দেখে যাতে ভাবে যে আমি শুধু ক্ষত্রিয়ই নই তন্ত্রমন্ত্রও জানি। সেইজন্যই ওই তান্ত্রিক আমাকে সহজেই ভেবেছে এক তান্ত্রিক। এখন আমাদের সামনে সমস্যা হল কীভাবে আমরা কী করব! কোনো কিছু করার আগে আমাদের জানতে হবে যে এই তান্ত্রিক আসলে কে!' জীবদত্ত বলল।

'তাহলে আর দেরি কেন? গুহায় ঢুকে পড়ি?' এ-কথা বলে খড়গবর্মা দু-চার পা এগিয়ে গেল।

জীবদত্ত খড়গবর্মাকে অনুসরণ করতে গিয়ে একবার চারদিকে তাকাল। ঠিক সেইসময় ওখানে লোমশ ভূতটাকে মোকাবিলা করার মতো কেউ ছিল না। কিছু লোক লোমশ ভূতের হাতে মার খেয়ে আহত হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, কিছু লোক লোমশ ভূতের হাতে হাত-পা কাপড় পুড়িয়ে আহত অবস্থায় গোঙাচ্ছিল আর বাকি লোকগুলো নদীর তীর ধরে প্রাণপণে ছুটে পালাচ্ছিল।

শুধু গণ্ডক জাতের তিন জন যুবক তিন দিক থেকে বল্লম নিয়ে ঘিরে ফেলার তাল করছিল। এখন ওই লোমশ ভূত 'গুরু গুরু' বলে চিৎকার করে গুহার দিকে ছুটছিল।

'বন্ধু, তুমি একে ভূত মনে করছ নাকি? এমনও তো হতে পারে যে ওই তান্ত্রিকই এই লোকটাকে নকল রূপ ধারণ করিয়ে অভিনয় করাচ্ছে!' খড়গবর্মা বলল।

'মানুষও যদি হয় তবু আমরা মনে করব ও মানুষ নয়। ও যে জিনিসের অভিনয় করছে আমরা তাকে তাই মনে করব।' জীবদত্ত এ-কথা বলে ওই গুহার দিকে ছুটে গেল। খড়গবর্মাও তাকে অনুসরণ করল।

দু-জনে যখন লোমশ ভূতকে অনুসরণ করল তখন সেও এক বাঁদরের মতো লাফাতে লাফাতে গুহার দিকে যেতে লাগল।

গণ্ডক জাতের যুবকরাও গণ্ডারের উপর চড়ে তাকে অনুসরণ করল। তারা ওই লোমশ ভূতের দিকে তাক করে বল্লম উঁচিয়ে রাখল।

হঠাৎ ওই তিন জনের একজন তাক করে বল্লম ছুড়ল ওই লোমশ ভূতের দিকে। বল্লম তার পিঠে লেগে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে গড়াতে গড়াতে পাহাড়ের নীচে পড়ে গেল।

গণ্ডক জাতের এক যুবক গণ্ডার থেকে নেমে জীবদত্তের কাছে এসে বলল, 'কর্তাবাবু একটা মস্তবড়ো ভুল হয়ে গেছে। আমাদের কাছে একটা মজবুত দড়ি থাকলে ভূতটাকে ধরে বাঁধা যেত। মনে হচ্ছে আমার বল্লমের আঘাতে সে চোট পায়নি। তার শরীরটাকে ওই লোমগুলো যেন বর্মের মতো রক্ষা করছে।'

'তোমার কথামতো এবার আমরা ওই ভূতটাকে দড়ি ছুড়ে বাঁধব। তোমরা এইখানেই থাক। আমরা গুহার ভেতর ঢুকে ওই ভূত এবং তার তান্ত্রিককে ধরে নীচে ফেলে দেব।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্ত ও খড়গবর্মা পাহাড়ের ওই গুহার কাছে পৌঁছানোর আগেই ওই ভূত গুহার কাছে গিয়ে বলল, 'গুরু, গুরু, এক-সিংওয়ালা মোষে চড়ে আসা যমদূতদের সাথে আরও দু-জন জুটেছে গুরু। ওরা সবাই মিলে আমাদের গুহার দিকে আসছে। তুমি গুরু, তাড়াতাড়ি ওদের ভস্ম করে দাও গুরু!'

কিন্তু গুহার ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। লোমশ ভূত ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পিছনের দিকে তাকাল। তার চোখে পড়ল খড়গবর্মা ও জীবদত্ত। তৎক্ষণাৎ সে চিৎকার করে উঠল। আর্তনাদ করে বলল, 'গুরু, তাড়াতাড়ি ওদের ভস্ম করুন।'

'আরে এই লোমশ ভূত! পালিয়ো না। আমরা তোমার গুরুর গুরু। তুমি তোমার গুরুকে বের করে নিয়ে এসো।' এ-কথা বলে জীবদত্ত হাতের মন্ত্র দণ্ড উপরে তুলে লোমশ ভূতের দিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যেতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে গুহার ভেতর থেকে আওয়াজ পেয়ে 'যাচ্ছি, গুরু! যাচ্ছি!' বলে লোমশ ভূত গুহার ভেতর ঢুকে গেল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত মুহূর্তে গুহার ভেতর ঢুকে গেল। কিন্তু তারা সেই লোমশ ভূতকে আর দেখতে পেল না। গুহার মাঝ থেকে চার-পাঁচ ফুট জায়গা জুড়ে আগুন জ্বলছিল।

তার অদূরে কয়েকটা তেলে ভেজা মশাল ছিল। ওই আগুনের আলোতে সমস্ত গুহায় ওরা ওই লোমশ ভূত ও তান্ত্রিককে খুঁজল।

দশ-বারো ফুট চওড়া, কুড়ি-বাইশ ফুট লম্বা ওই গুহার কোথাও ওদের পাত্তা পেল না। ওরা ভাবল এই গুরু-শিষ্য দু-জনে মিলে গেল কোথায়?

'জীবদত্ত, তুমি কি মনে কর যে এই পাজি বদমাইশ লোকগুলোর অদৃশ্য হবার শক্তি আছে?' খড়গবর্মা বলল।

'অত ক্ষমতা থাকলে তারা নিশ্চয় ওই লুণ্ঠনকারীদের লুঠ করে আনা ফসল হাতানোর জন্য এত কাণ্ড করত না। ওরা যা করেছে সে তো চোরের উপর বাটপাড়ি করার তাল। এই গুহা থেকে বেরিয়ে বাইরে পালানোর অবশ্যই কোনো গোপন পথ আছে। আমরা সাবধানে এক-একটা পথ ঘুরে ঘুরে দেখতে পারি।' জীবদত্ত বলল।

তারপর তারা দু-জনে গুহার প্রত্যেকটি পাথর জোরে ঠেলে ঠেলে একটা একটা পাথর পরীক্ষা করে দেখতে লাগল।

আধ ঘণ্টা ধরে ওরা প্রত্যেকটা পাথর ঠেলতে লাগল। হঠাৎ একটা চৌকানো পাথর নড়ে উঠল। সেই পাথরটা চার-পাঁচ ফুট উঁচুতে রাখা ছিল।

পাথরটা একটু পিছু সরতেই জীবদত্ত খড়গবর্মাকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলল, 'খড়গবর্মা, ওই তান্ত্রিক আর লোমশ ভূত এই পথে পালিয়েছে! পালিয়ে যাবার সময় আবার পাথরটাকে তারা যেমন ছিল তেমন বসিয়ে দিয়েছে। আমার ধারণা ওরা এর পিছনেই কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে আছে।'

'তাহলে তোমার কি ধারণা যে আমরা এই পাথর সরিয়ে ঢোকার সাথে সাথে ওরা আমাদের বল্লম দিয়ে আক্রমণ করবে? তরবারি দিয়ে কেটে ফেলবে নাকি?' খড়গবর্মা বলল।

'হ্যাঁ, সেটাই আমার সন্দেহ।' জীবদত্ত বলল।

'তাহলে তুমি এক কাজ কর। আমরা দু-জনে মিলে পাথরটাকে ঠেলে দেবার সাথে সাথে তুমি সরে যাবে। আমি ভেতরে একটা মশাল ছুড়ে দেব। দেখব কেউ আক্রমণ করতে আসে কি না। যদি না আসে তাহলে ওই মশালের আলোতে আমরা জায়গাটা দেখে নিতে পারব। আলোতে দেখার পর আমরা এক-পা এক-পা করে এগোতে পারি।' খড়গবর্মা বুঝিয়ে বলল।

'খড়গবর্মা তুমি যেভাবে কাজ করতে বলছ তা খুব একটা ভালো না হলেও অগত্যা এখন অন্য কোনোভাবে কী করা যায় তাও আমি ভেবে পাচ্ছি না। এই অবস্থায় তাই করা যাক।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্তের সমর্থন পাবার সাথে সাথে খড়গবর্মা গুহার মাঝের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের কাছে গিয়ে দুটো মশাল ধরাল। খড়গবর্মা সেই জ্বলন্ত মশাল দুটো দু-হাতে তুলে দেখল।

তারপর ওরা সেই চৌকোনো পাথরটাকে সরিয়ে দিল। সেই পাথরটা গড়িয়ে নীচে পড়ে যাওয়াতো দূরের কথা পাশেই জানালা দরজার মতো দাঁড়িয়ে গেল।

সেখান থেকে তারা দেখতে পেল এক সুড়ঙ্গ। জীবদত্ত একপাশে বসে পড়ল। খড়গবর্মা ওই সুড়ঙ্গে হাতের দুটো মশাল ছুড়ে দিল।

রুদ্ধশ্বাসে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত কিছুক্ষণ কান খাড়া করে রইল। সুড়ঙ্গের গভীর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। আরও কিছুক্ষণের কৌতূহলী প্রতীক্ষার পর খড়গবর্মা হো-হো করে হেসে উঠে বলল, 'বন্ধু, ওই বদমাইশগুলো নিশ্চয় পালিয়েছে। আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে ওরা সরে পড়েছে। আমার মনে হচ্ছে আরও একটা গুহা আছে। তা না হলে ওরা গেল কোথায়?'

'তাই হবে। আবার এও হতে পারে যে আমরা গুহায় ঢুকেছি জানতে পেরে তরবারি হাতে তারা আমাদের আক্রমণ করার প্রতীক্ষায় ওত পেতে আছে। অতএব আমাদের সব কিছু অত্যন্ত সাবধানে করতে হবে।' জীবদত্ত বলল।

'আর কতক্ষণ অপেক্ষায় থাকব! ভোর হয়ে এল যে!' এ-কথা বলে খড়গবর্মা খাপ থেকে তরবারি বের করে ওই সুড়ঙ্গের ভেতরের দিকে ঝুঁকে তাকাল। ঠিক তখনই জীবদত্ত বল্লম ছুড়ে মারল ওই সুড়ঙ্গে।

খড়গবর্মার ছুড়ে দেওয়া মশালের আলোতে ওই সুড়ঙ্গের এক কোণে অন্য এক সুড়ঙ্গের পথ দেখে বলল, 'খড়গবর্মা, চল ওই পথ ধরে আর এক সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ি। ওই পাজি তান্ত্রিক নিশ্চয়ই ওই সুড়ঙ্গের কোনো গোপন জায়গায় লুকিয়ে আছে। ব্যাটারা আমাদের অনেক জ্বালাচ্ছে তো! আজ ওদের শেষ করতে হবে।'

এই কথা বলে জীবদত্ত ঝট করে ওই সুড়ঙ্গে নেমে গেল। খড়গবর্মাও তাকে অনুসরণ করল।

সুড়ঙ্গের সেই অংশে ছোটো-বড়ো পাথর ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। খড়গবর্মা খোলা তরবারি উঁচিয়ে সুড়ঙ্গপথে এগিয়ে গেল।

জীবদত্ত মন্ত্র দণ্ড নিয়ে সরবে খড়গবর্মাকে অনুসরণ করতে লাগল।

ওই পথে এগোতে এগোতে তারা সামনে দেখতে পেল নগরের এক বিশাল প্রান্তর।

সেই প্রান্তরের পাশে বিরাট বিরাট শিথিল নগরের বাড়ি। সেই অট্টালিকা দেখে জীবদত্ত আনন্দিত হয়ে বলল, 'খড়গবর্মা, সূর্যোদয়ের সময় হয়ে এসেছে। আর আমরাও পৌঁছে গেছি সমতলভূমিতে। এই তো শিথিল নগরের বাড়ি।'

'এই কি শিথিল নগর? এখানে কী আছে? কয়েকটা বাড়ি ছাড়া আর কিছু নজরে পড়ছে না।' খড়গবর্মা বলল।

'শিথিল নগরের এই অংশই হয়তো সবচেয়ে সমৃদ্ধ। তান্ত্রিক ও লোমশ ভূত এই বাড়িগুলোর কোনটাতে হতে পারে। ওকে যেকোনোভাবে খুঁজে বের করতে হবে।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্তের অনুমান মতো তান্ত্রিক ও লোমশ ভূত ওই বাড়িগুলোর কোনোটাতে লুকিয়ে ছিল না।

তারা এক মণ্ডপের উঁচু আসনে বসে থাকা এক দেবী মূর্তির সাজে সজ্জিত নারীর সামনে বসেছিল। ওই নারীর আশেপাশে ভয়ংকর আকৃতির লোক অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে ছিল।

ওই নারী চোখ লাল করে দাঁতে দাঁত ঘষে গর্জে উঠল, 'ওরে এই তান্ত্রিক, লোমশ ভূত উঠে দাঁড়া। তোদের মূর্খতার ফলে এই রহস্যময় পবিত্র স্থানের সন্ধান মানুষ পেয়ে গেছে।'

'মহাশক্তি, আপনার অনুমতি পেলে এক্ষুনি ওই দু-জন মানুষকে আপনার সামনে এনে এই লোমশ ভূতের আহার করে ফেলতে পারি।' তান্ত্রিক কাঁপতে কাঁপতে বলল।

নারী অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে দু-হাত উপরে তুলে নাড়াতে নাড়াতে বলল, 'তোমার লোমশ ভূত এমন বোকা আর অকর্মার ঢেঁকি হয়ে গেছে যে খাবার মুখের সামনে এগিয়ে দিলেও খেতে পারে না। মহাভূতের দয়ায় ওই দু-জন মানুষ এখানে পৌঁছে গেছে। ওরা কারা? কোত্থেকে এসেছে? কেন এসেছে? এসব প্রশ্নের জবাব না জেনে ওদের বলি দেওয়া মহাভূতের পক্ষে ক্ষতিকর হবে।'

'আজ্ঞে হাঁ মহাশক্তি, আপনার কথা আমরা সবাই এখন ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি।' সেখানকার সমস্ত সেবক সমস্বরে বলল।

ওই নারী সবার দিকে তাকিয়ে বলল, 'এখন আমি যা বলছি কান খাড়া করে শোন মূর্খের দল! ওই দু-জন মানুষকে কোনোরকম জখম না করে নিরাপদে আমার কাছে নিয়ে এসো। সূর্যোদয় হয়েছে। ওরা এই শিথিল নগরের কোথায় কী আছে দেখতে বেরিয়েছে। তোমাদের মধ্যে কয়েক জন ছদ্মবেশে ওদের অনুসরণ কর। ওরা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কোন কথা বলছে সব ভালো করে দেখে-শুনে শেষে ওদের দু-জনকে ধরে, আমার কাছে নিয়ে এসো। ঠিক মধ্যাহ্নে আসবে আমার কাছে। ইতিমধ্যে ওরা যেখানে যেতে চায় যাক। যা করতে চায় করুক।'

'আজ্ঞে তাই হবে মহাশক্তি!' এ-কথা বলে ওই নারীর চার জন সেবক তান্ত্রিক এবং লোমশ ভূত ওই মণ্ডপ থেকে চলে গেল।

'গুরু, পিছন দিক থেকে গিয়ে আমি কিন্তু ওই দু-জনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব। খেয়ে ফেলব ওই দু-জনকে। ওই ব্যাটাদের জন্যই মহাশক্তির কাছে আমাকে বকা খেতে হল।' লোমশ ভূত বলল।

'তোমার চেয়ে অনেক বেশি অপমানিত হয়েছি আমি।' এই কথা বলে একটি ছোরা হাতে তুলে নিয়ে শক্তভাবে ধরে তান্ত্রিক বলল, 'দেখ, ওরা দু-জনে এই সুড়ঙ্গের মুখেই বসে আছে। আমরা ওই দু-জনকে মেরে ফেলে সোজা অরণ্যপথ ধরে পালাব। চল আর দেরি নয়।'

পরক্ষণেই ওরা খড়গবর্মা ও জীবদত্তের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল।

সাত

শিথিল ভবনগুলোর দিকে তাকাতে তাকাতে জীবদত্ত অবাক হয়ে ভাবছিল, কবেকার এই ভবন, কারা ছিল এই ভবনে, কেন এই ভবন জনমানবহীন হয়ে গেল। ইত্যাদি। অন্যদিকে খড়গবর্মার মাথায় অন্য চিন্তা, কতক্ষণে তান্ত্রিক এবং লোমশ ভূতকে ধরা যায়, তাদের মেরে ফেলা যায়।

কিছুক্ষণ খড়গবর্মা ও জীবদত্ত নিজের নিজের চিন্তাভাবনায় ডুবে ছিল। কারো মুখে কথা নেই। সেইসময় হঠাৎ একটা শব্দ তাদের কানে গেল। কাছের দরজার পাশ থেকে কোনো ভারী জিনিস সরানোর শব্দ তারা পরিষ্কার শুনতে পারল।

সেই শব্দ কানে যেতেই খড়গবর্মা চটপট উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'জীবদত্ত! এই শব্দ কীসের বলত? ওই দুই পাজি বদমাইশগুলো আমাদের উপর আক্রমণ করার তাল করছে না তো? কী করা যায় বলত? তাড়াতাড়ি ভেবে বল। মনে হচ্ছে খুব দেরি করা যাবে না। মনে রেখো, কিছু করে যেন আবার ওদের খপ্পরে পড়ে না যাই।'

'আবার এ-কথাও তুমি ভেবো না যে ওই তান্ত্রিক লোমশ ভূত আগে-পিছে না ভেবে হঠাৎ আমাদের আক্রমণ করার সাহস রাখে। যাই হোক, আমাদের ভীষণ সতর্ক থাকতে হবে।' এই কথা বলে জীবদত্ত উঠে দরজার কাছে গেল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত এক-পা এক-পা করে ওই শিথিল ভবনের পাথরের দরজার ওপারের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল। হঠাৎ দরজার কাছে তান্ত্রিক লাফিয়ে পড়ে চিৎকার করে বলল, 'ওরে এই নর! তোমাদের দু-জনকে আমি এক্ষুনি মহাভূতের কাছে বলি দেব!' তান্ত্রিক জীবদত্তের গলায় তরবারি চালাল।

খড়গবর্মা তৎক্ষণাৎ নিজের তরবারি দিয়ে তান্ত্রিকের তরবারি রুখে বলল, 'চুপ কর আহাম্মক, অতই যদি আমাদের বলি দিতে চাও তো আগে দাওনি কেন? অত বকবক করছ কেন? আমাদের আর বলি দিতে হবে না, এখন তুমি নিজের প্রাণ বাঁচাও। তোমার চালবাজির, তোমার দুষ্কর্মের উচিত শিক্ষা এক্ষুনি পাবে। তৈরি হও।' তারপর খড়গবর্মা তান্ত্রিকের হাত ধরে জোরে টান দেয়। তান্ত্রিক সরে গেল আর সশব্দে দরজা থেকে নীচে পড়ে গেল।

ঠিক তখনই দরজার ওপার থেকে অনেকগুলো কণ্ঠস্বর শোনা গেল, 'ওরে এই পাগলা তান্ত্রিক। আমাদের পূজারিনি ওদের মেরে আনতে বলেননি!'

ইতিমধ্যে 'বলি বলি' বলে চিৎকার করতে করতে লোমশ ভূত বাঁদরের মতো দরজায় লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে জানত না তার গুরুর কি দশা হয়েছে!

লোমশ ভূত দরজার পাশে দেখতে পেল তার গুরু ধুলোয় উপুড় হয়ে পড়ে আছে। এই না দেখে লোমশ ভূত আর্তনাদ করে উঠল। আর সেই মুহূর্তে জীবদত্ত তার পা ধরে জোরে একটা টান মারল। লোমশ ভূত নীচে পড়ে যাচ্ছিল এমন সময় তার পেটে সে কষে একটা লাথি মেরে বলল, 'খড়গবর্মা, আর বেশিক্ষণ আমাদের এখানে থাকা উচিত হবে না। এই গোটা অঞ্চল মনে হচ্ছে যেন তান্ত্রিকের বিবর। আমাদের তাড়াতাড়ি ওই মহলে ঢুকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। তাড়াতাড়ি চল।'

পরক্ষণেই ওরা দু-জনে শিথিল ভবনের দিকে ছুটল। একটি ঘরের কাছে দাঁড়িয়ে পিছনের দিকে ঘুরে তাকাল। কেউ পেছন দিক থেকে তাদের অনুসরণ করছে কি না দেখার জন্য। কিন্তু ওই লোমশ ভূত ও তান্ত্রিক ছাড়া আর কাউকে তারা দেখতে পেল না।

'দরজার ওপার থেকে একসাথে কয়েক জনের হুঁশিয়ারি তুমি শুনতে পাওনি?' খড়গবর্মা জিজ্ঞেস করল।

'এতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে? ওই হুঁশিয়ারি শুনে আমার মনে হল শিথিল ভবনের পূজারিনি ওদের যেরকম নির্দেশ দিয়েছেন ওরা সেটাই বলেছিল। আমাদের জ্যান্ত ধরে নিয়ে যেতে পূজারিনি বলেছেন। এখন আমাদের সাবধানে ওই পূজারিনিকে ধরার চেষ্টা করতে হবে। এরা বেচারা সব তো ওই পূজারিনির চাকর মনে হচ্ছে। এদের ধরে কী হবে! এ তো সব ভাড়া করা টাট্টু ঘোড়া।' জীবদত্ত বলল।

এরপর তারা কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবল। শত্রু কোনদিক থেকে তাদের আক্রমণ করবে, তার আভাস পাওয়ার আশাতেই তারা দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তারা কিছুতেই টের পেল না। লোমশ ভূত আর তান্ত্রিক ওই দরজার কাছে পড়ে পড়ে গোঙাচ্ছিল। শুধু ওদের গোঙানি ছাড়া আর কোনো শব্দ তারা শুনতে পেল না।

খড়গবর্মা দরজার দিকে এক মুহূর্ত তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে দেখে বলল, 'জীবদত্ত, এই ভারী কাঠের দরজার দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখ। মনে হচ্ছে এই দরজার পিছন দিক দিয়ে অন্য মহলে যাওয়ার পথ আছে। ওই দরজা ঠেলে দেখলে কেমন হয়?'

'এ ছাড়া উপায় বা কি আছে! আমরা এখানে এভাবে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব! ওই তান্ত্রিক আর তার লোমশ ভূতটাকে ছেড়ে চল আমরা আরও রহস্যের সন্ধান করি। তবে মনে রেখ, দরজা খুব সাবধানে সরাতে হবে। যাদের গলা আমরা পেয়েছি ওরা হয়তো ওই মারাত্মক দরজার কাছাকাছি আছে। হয়তো ওখান থেকে ওরা তাক করে বসে আছে আমাদের আক্রমণ করতে।' জীবদত্ত বলল।

তারপর খড়গবর্মা একহাতে তরবারি তুলে অন্য হাতে জোরে দরজা ঠেলল। কিরর আওয়াজ হল। দরজা নড়ল। কিন্তু খুলল না।

'আচ্ছা এও তো হতে পারে যে দরজা ওদিক থেকে বন্ধ করা আছে। খিল আঁটা আছে? যার ফলে খুলছে না।' এই কথা বলে জীবদত্ত দু-হাতে দরজা জোরে ঠেলে দিল। তখন ভয়ংকর আওয়াজের সাথে দরজা খুলে গেল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত ভিতরে ঢুকল। ঢুকেই দেখে বিরাট ঘর। কোনো মানুষ ওই ঘরে থাকে বলে মনে হল না। ঘরের আনাচেকানাচে বড়ো বড়ো মাকড়সার জাল। চাপ চাপ চামচিকের দল। ওই ঘরের একদিকের দরজা ভাঙা আর অন্যদিকেরটা হেলান দেওয়া।

'আর দেরি করে কী লাভ? ভিতরে যখন এসেই গেছি, তখন ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকটা ঘর দেখব। তান্ত্রিকের কর্ত্রী পূজারিনিকে খুঁজে বের করতেই হবে।' জীবদত্ত বলল।

দু-জনে মিলে ওই দরজা পেরিয়ে অন্য ঘরে ঢুকল। ওই ঘর প্রথম ঘরের চেয়ে আরও ভয়ংকর ছিল। ওদের দেখেই কয়েকটি বিরাট ইঁদুর কোঁক কোঁক ডাকতে ডাকতে লাফিয়ে এদিকে ওদিকে চলে গেল। বাজের মতো বড়ো পেঁচা হঠাৎ নেবে একটা ইঁদুর ধরে সোজা উঠে একটা জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

'বাবা এ কেমনতর ইঁদুর, আর কী ধরনের পেঁচারে বাবা! এতকাল যত বড়ো দেখে এসেছি এ দেখছি তার চেয়ে তিন-চার গুণ বড়ো। আচ্ছা এরা কী খায়? কী খেয়ে এত বড়ো বড়ো হয়েছে?' খড়গবর্মা জিজ্ঞেস করল।

পূজারিনি হয়তো নিজের মোটা মোটা শিষ্যদের মেরে-কেটে এদের মাঝে ফেলে দেন।' এ-কথা হাসতে হাসতে বলল জীবদত্ত। মুহূর্তকাল পরে আবার আরও কত বিচিত্র জিনিস দেখতে পাব কে জানে!'

এইভাবে আরও কয়েকটা ঘর তারা লক্ষ করল। কোনো মানুষ থাকার চিহ্ন নেই।

'খড়গবর্মা, আমার মনে হচ্ছে এই পূজারিনির আদেশ শিষ্যরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। আমাদের হয়তো কেউ অনুসরণ করছে। পূজারিনির আদেশ ছিল না আমাদের জ্যান্ত ধরে নিয়ে যাওয়ার? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কোন ঘর দিয়ে আমরা কোন ঘরে ঢুকে পড়লাম।' জীবদত্ত বলল।

'তাহলে আবার আমরা ফিরে যাব?' খড়গবর্মা জিজ্ঞেস করল।

'আর কী বা করতে পারি। এই শিথিল নগর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ ওই গুহা ছাড়া আর কি আছে! এখন অতদূর পৌঁছাতে পারব কি না কে জানে!' জীবদত্ত বলল।

'আমরা যে কোন পথে এসেছি তা ভুলে গেছি। কোনোভাবে এই ঘরগুলোর বাইরে গিয়ে ওই লোমশ ভূত আর তান্ত্রিককে মেরে ফেলে এই পূজারিনির খবর জানব।' খড়গবর্মা বলল।

এই কথা বলে ওরা পিছু ফিরে দু-চার পা যেতে-না-যেতেই তাদের মাথায় একসাথে অনেকগুলো লাঠির ঘা পড়ল। তারা সাথে সাথে মাথা ঘুরে চোখ উলটে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ পূজারিনির চার জন শিষ্য ওদের ধরে পরীক্ষা করে দেখল রক্ত বেরিয়েছে কি না। না, এক ফোঁটাও রক্ত বেরোয়নি।

'বাবা, আমাদের বরাত ভালো। ভেবেছিলাম এদের মাথা ফেটে গেছে। এরা মরে গেলে মহাশক্তি পূজারিনি আমাদের জানে মেরে ফেলত। এ-যাত্রা খুব জোর বেঁচে গেছি!' একজন বলল।

'এরা যাতে লাঠির আঘাতে না মরে তারজন্যেই তো লাঠির আগায় আমরা কম্বলের টুকরো জড়িয়ে ছিলাম। এদের হাত-পা বেঁধে এবার ঘাড়ে করে নিয়ে যাই পূজারিনির কাছে।' আর একজন শিষ্য বলল।

অচেতন খড়গবর্মা ও জীবদত্তের হাত-পা বেঁধে ওরা কাঁধে ফেলে নিল। অনেকগুলো অন্ধকার ঘর পেরিয়ে ওরা শেষে আনল এক বিরাট মণ্ডপে।

মণ্ডপের মাঝে উঁচু মোলায়েম জায়গায় বসে ছিল পূজারিনি। অদূরে হাত বাঁধা অবস্থায় কয়েক জন দাঁড়িয়েছিল। পূজারিনি একবার খড়গবর্মা ও জীবদত্তের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, 'এদের মধ্যে একজন মনে হচ্ছে তান্ত্রিক!'

'আজ্ঞে হ্যাঁ, তা হতে পারে মহাশক্তি পূজারিনি। এর হাতে একটা মন্ত্র দণ্ডও ছিল। অন্যজনের হাতে ছিল এক তরবারি।' একজন শিষ্য বলল।

'কোথায় সেগুলো? ফেলে আসোনি তো ওসব? পূজারিনি জিজ্ঞেস করল।

'যেখানে এদের ধরেছি সেখানেই ওসব ছেড়ে এসেছি।' শিষ্য বলল।

'যাও, ওসব নিয়ে এসো। তোমাদের মাথায় একেবারে গোবর ভরা দেখছি।' পূজারিনি চোখ লাল করে বলল।

পূজারিনির আদেশ শোনামাত্র দু-জন সেবক ছুটে গিয়ে সেখান থেকে তরবারি ও মন্ত্র দণ্ড নিয়ে এসে পূজারিনির সামনে সাজিয়ে রেখে দিল। পূজারিনি কিছুক্ষণ সাবধানে ওই দুটো পরীক্ষা করে দেখে বলল, 'মনে হচ্ছে এ দুটোতেই বিশেষ কোনো শক্তি নেই। এদের দু-জনকে একটা ঘরে রাখ। এই তরবারি এবং মন্ত্র দণ্ড তাদের পাশে ফেলে রাখ। তারপর দেখি কী হয়!'

তৎক্ষণাৎ চার জন সেবক ওই অচেতন দু-জনকে কাঁধে ফেলে একটা অন্ধকার ঘরে ফেলে রেখে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে শিকল এঁটে দিল।

অনেকক্ষণ পরে জীবদত্তের জ্ঞান ফিরল। সে এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে খড়গবর্মাকে ডেকে তুলে বলল, 'বন্ধু, সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হল আমরা এখনও প্রাণে বেঁচে আছি। আমাদের অস্ত্রও আমাদের কাছে আছে।'

খড়গবর্মা ঘরের চারদিকে একবার ভালো করে দেখে বলল, 'আমাদের না মেরে এভাবে ছেড়ে দেবার পিছনে পূজারিনির কোনো কৌশল থাকতে পারে।'

'পূজারিনিকে না দেখে তার কৌশল যে কি তা বুঝতে পারছি না। এখান থেকে আমাদের তাড়াতাড়ি পালানো উচিত।' বলে জীবদত্ত উঠে দাঁড়াল।

'ওই পাজিগুলো তক্কে তক্কে ছিল। সুযোগ পেয়ে আমাদের মাথায় লাঠি চালিয়েছে। এবার কোনোক্রমে আমাদের হাতে পড়লে ওদের প্রাণে...'

খড়গবর্মার কথা শেষ হল না। ওদের কানে গেল সিংহ গর্জন। তখন খড়গবর্মা বলল, 'পাজিগুলো চাইছে আমাদের উপর সিংহ লেলিয়ে দিতে।'

'তাহলে তো ভালোই হবে। সিংহকে ঘুরিয়ে আমরা ওদের পিছনেই লেলিয়ে দিতে পারব। ওদের এই গোটা অঞ্চল তছনছ করে দিতে পারব। মারাত্মক অবস্থা হবে এখানকার।' এই কথা বলে জীবদত্ত নিজের মন্ত্র দণ্ড দিয়ে দরজায় জোরে জোরে আঘাত করল। দরজার একটা অংশ হুড়মুড় করে পড়ে গেল নীচে। পাশের ঘরের সিংহ যেন চমকে উঠল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে গর্জন করতে লাগল।

'হে সিংহরাজ, যত ইচ্ছা তুমি খেতে পার। অনেক খাবার আছে।' এই কথা বলে জীবদত্ত নিজের দণ্ড দিয়ে অন্য এক দরজায় আঘাত করে ভেঙে দিল। দরজা ভেঙে নীচে পড়ে গেল।

পরক্ষণেই পূজারিনির দশ-বারো জন সেবক চিৎকার করে বলল, 'বন্দিরা পালাচ্ছে! ধর! ধর!' তৎক্ষণাৎ জীবদত্ত সিংহের কাছে ছুটে গিয়ে ওই দণ্ড দিয়ে পূজারিনির সেবকদের দিকে সিংহকে ফিরিয়ে দিল। সিংহ গর্জন করতে করতে ওই সেবকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

আট

ক্ষুধার্ত সিংহ পূজারিনির লোকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা প্রাণপণে ছুটে পালাচ্ছিল। কিন্তু সিংহ যাকেই তার থাবার মধ্যে পেল তাকেই ঘায়েল করে দূরে ছুড়ে দিল।

খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত ভাঙা দরজার এক ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অট্টহাসি হেসে বলতে লাগল, 'ওরে পূজারিনির চাকরের দল। পালাচ্ছিস কোথায়? চার-পাঁচ দিন সিংহকে খেতে দিসনি! তোরা পালালে ও খাবে কী? প্রথমে তোদের কেউ এসে তার পেটে যা, তা না হলে প্রত্যেকেই সিংহের থাবা খাবি, ঘায়েল হবি।'

পূজারিনির লোকদের তখন কথা শোনার অবস্থা ছিল না। তাদের চার-পাঁচ জন ইতিমধ্যেই ঘায়েল হয়ে মাটিতে পড়ে ছটফট করছিল। একজন সিংহের মুখে আটকে চিৎকার করছিল। এর মধ্যে কয়েক জন কোনোমতে বেঁচে গিয়ে ভাঙা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল।

সিংহ একবার চারদিকে তাকাল। তাকে দেখে মনে হল সে কাউকে খেতে চায় না। পালাতে চায় বনে।

সিংহকে নিজের দণ্ড দেখিয়ে জীবদত্ত বলল, 'সিংহরাজ! তুমি ভাবছ কাউকে খেলে তোমার ক্ষতি হবে। কেউ দেখে ফেলবে। তুমি আর কোনোদিন পালাতে পারবে না। কোনো ভয় নেই। এই পাশ দিয়ে সিঁড়ি আছে। এই পথ ধরে গেলেই তুমি শিথিল ভবনগুলো পাবে। সেখান থেকে সোজা বেরিয়ে গেলেই বনে যেতে পারবে।' এই কথাগুলো বলতে বলতে জীবদত্ত সিংহের দিকে এক-পা এক-পা করে এগিয়ে দণ্ড দিয়ে সিংহকে সিঁড়ির পথ দেখিয়ে দিল।

সিংহ গর্জন করতে করতে জীবদত্তের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। পেছনের দুটো পায়ে ভর দিয়ে সামনের দুটো পা তুলে দাঁড়াতেই জীবদত্ত সিংহের পেটের নীচে দণ্ড ঠেকিয়ে জোরে পাশে ঠেলে দিল। সেই ঠেলা খেয়ে সিংহ নীচে পড়ে গড়াতে গড়াতে সিঁড়িওলা কামরার দরজার কাছে গিয়ে আটকে গেল।

'সিংহরাজ! এবার উঠে দাঁড়াও। পূজারিনির সেবকেরা পূজারিনির কাছে খবর দেওয়ার আগেই তুমি এখান থেকে পালাও। এ ছাড়া তোমার রক্ষা নেই!' জীবদত্ত দণ্ড তুলে সিংহের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

ভাঙা দরজার কাছে পূজারিনির লোকগুলো দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। তারা অবাক হল জীবদত্তের সাহস দেখে। কেমন করে দণ্ড দিয়ে সিংহকে ঠেলে দিল! ওদের একজন জীবদত্তকে নমস্কার করে বলল, 'হে মহাতান্ত্রিক শিরোমণি! আমার নমস্কার গ্রহণ করুন। আপনার মন্ত্রশক্তি সাধারণ লোকের নাগালের বাইরে। মহাশক্তি পূজারিনিকে বধ করে আপনিই শিথিল নগরের শাসনভার গ্রহণ করুন। আমরা আপনার অধীনে ভালোভাবে থাকব। পূজারিনির জ্বালায় আমরা মরে যাচ্ছি। একজন নারীর অধীনে থাকার চেয়ে একজন মহাবরের সেবক হয়ে থাকা অনেক বেশি সম্মানের।'

তার কথা শেষ হতে-না-হতেই ওর সাথী 'গুরুদ্রোহ! গুরুদ্রোহ!' বলে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাঙা দরজার কাছে দু-জনের দ্বন্দ্বযুদ্ধ শুরু হল। পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে দু-জনেই পা হড়কে নীচে পড়ে গেল। সিঁড়ির কাছে ছিল সিংহ। সে গর্জন করতে করতে ওদের দিকে এগিয়ে গেল।

জীবদত্ত দণ্ড তুলে রেগে গিয়ে কর্কশ স্বরে বলল, 'তুমি সিঁড়ি থেকে নেমে সোজা নিজের পথ ধর। পূজারিনির অনুচরদের ঝগড়ার মধ্যে নিজেকে জড়িয়ো না। যাও, পালাও।'

সিংহ আগেই ওই দণ্ডের গুঁতো খেয়েছিল তাই আবার সেই দণ্ড উঁচিয়ে জীবদত্ত কথা বলতেই সিংহ গোঁ গোঁ করতে করতে চলে গেল সেখান থেকে।

খড়গবর্মা এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিল। আর থাকতে পারল না। সে বলল, 'জীবদত্ত, আমরাই বা এখানে আর থাকব কেন? এখন এখানে আর আমাদের বাধা দেবার কেউ নেই। আমরাও এখন এই শিথিল ভবন ছেড়ে চলে যেতে পারি।'

'ভালো কথা, সিংহ যে পথে গেছে আমরাও সেই পথে গিয়ে দেখে নিতে পারব গুহা থেকে বেরুনোর রাস্তা।' বলতে বলতে জীবদত্ত এগিয়ে গেল।

শিথিল ভবনে এখন আর তাদের মোকাবিলা করার কেউ নেই বলে ভাবাটা খড়গবর্মার মোটেই উচিত হয়নি। কারণ পূজারিনি ততক্ষণে খবর পেয়ে গেছে যে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত এখন মুক্ত। তার সেবকদের সিংহ আক্রমণ করেছে। সিংহের থাবা খেয়ে কয়েক জন সেবক ভীষণভাবে ঘায়েল হয়েছে।

খবরটা একজন সেবকের কাছ থেকে পেয়েই পূজারিনি চোখ লাল করে বলল, 'হে মহাভূত! এ কেমন অদ্ভুত কাণ্ড! বৃদ্ধ পূজারির মতো মহান ব্যক্তিকেও আমি মন্ত্রের প্রভাবে পরাজিত করে অন্ধকার ঘরে আটকে রেখেছি! আমাদের শক্তি অপরিসীম। সাধারণ দুটো মানুষ আমাদের উপর আক্রমণ করল? আমার রাজ্যে ঢুকে আমারই লোককে অপমান করার মতো সাহস ওরা পায় কোথা থেকে? এ আমি কোনোমতেই সহ্য করব না। ওরে এই উজবুক সেবকের দল। আমাকে দেখিয়ে দে ওই মানুষ দুটো কোথায়! আমি নিজে গিয়ে তাদের বন্দি করব।'

পূজারিনির দু-জন সেবক আগেই দেখেছিল জীবদত্ত এবং খড়গবর্মার অসীম ক্ষমতা। ওরা দেখেছিল কীভাবে ওরা সিংহকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওরা দেখেছিল কীভাবে ওরা লোমশ ভূতকে ল্যাজে-গোবরে অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল। সেসব ঘটনা ওরা মনে রেখে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'মহাশক্তি পূজারিনি! মানুষ দুটো মনে হচ্ছে মস্তবড়ো তান্ত্রিক। ওরা আমাদের তান্ত্রিক আর লোমশ ভূতকে...'

ওদের কথা শেষ হতে-না-হতেই পূজারিনি ওদের একজনের পিঠে শূল ঠেকিয়ে বলল, 'চুপ কর কাপুরুষের দল! আমি ওই দু-জনকে এখনই বন্দি করে ওদের মহাভূতের কাছে বলি দিতে যাচ্ছি। সর আমার পথ থেকে।' দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে পূজারিনি এগিয়ে চলল।

সেবকের দল ভয়ে ভয়ে এক-পা এক-পা করে এগোচ্ছে। তাদের সামনে যাচ্ছে তান্ত্রিক আর লোমশ ভূত। তান্ত্রিক আর লোমশ ভূত পূজারিনির পেছনে পেছনে যাচ্ছে। তারা কিছু একটা ভাবছে।

'গুরু! ওদের দু-জনকে ধরে আমি কিন্তু খেয়ে ফেলব!' লোমশ ভূত তান্ত্রিককে বলল।

'ওরে শিষ্য! এরকম ভুল কাজ কখনো করো না। আমাদের শিথিল ভবনে যে দু-জন যুবক এসেছে ওরা আমাদের পূজারিনিকে নিশ্চয়ই হারাবে। ওরা পূজারিনিকে হারালে আমি হব রাজা আর তুমি হবে মন্ত্রী। বুঝলে? তখন বুড়ো তান্ত্রিককে অন্ধকার কোঠর থেকে মুক্ত করে তার কাছ থেকে আমরা আরও কিছু মন্ত্রশক্তি লাভ করব।' তান্ত্রিক ফিসফিস করে বলল।

লোমশ ভূত তান্ত্রিকের কথা শুনে খুব খুশি হল। পিছনের দিকে একবার ঘুরে তাকিয়ে দেখে নিয়ে বলল, 'গুরু! কী মজা হবে! আপনি রাজা হবেন আর আমি হব মন্ত্রী।'

পূজারিনি এবং তার অন্য শিষ্যরা অনেক পিছনে আসছিল। পূজারিনি তার সেবকদের নির্দেশ দিল শিথিল ভবন থেকে ওই যুবক দু-জনকে খুঁজে বের করতে। কিন্তু ততক্ষণে খড়গবর্মা এবং জীবদত্ত শিথিল ভবন ছেড়ে অন্য অঞ্চলে পৌঁছে গিয়েছিল। সেখান থেকে তারা বনের পথের খোঁজ করছিল। কিন্তু যে গুহা দিয়ে ওরা ওই শিথিল নগরে প্রবেশ করেছিল সেই গুহার কোনো খোঁজ তারা পেল না।

'খড়গবর্মা! আমরা যে পথে এই শিথিল নগরে ঢুকেছি তার তো কোনো হদিশ পাচ্ছি না। আমরা বাইরে বেরুব কী করে! পূজারিনির দু-একজন সেবককে ধরে এনে পথ দেখাতে বলতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ দেখছি না।' জীবদত্ত বলল।

'মনে হচ্ছে পূজারিনির সেবকদের নাগালের বাইরে অনেক দূর চলে এসেছি। ওই সিংহটার হল কী! সিংহটা এই শিথিল ভবন থেকে বেরিয়ে বনের পথ ধরেনি তো?' খড়গবর্মা বলল।

'হয়তো সেও আমাদেরই মতো এখানেই কোথাও আটকে গেছে। তুমি কি মাঝে মাঝে সিংহ গর্জন শুনতে পাচ্ছ না?' জিজ্ঞেস করতে করতে জীবদত্ত শিথিল ভবনের একটি ঘরের দিকে উঁকি মেরে তাকিয়ে বলল, 'খড়গবর্মা এদিকে দেখবে এসো! দেখছ, কত ধনদৌলত এখানে ফেলে রাখা আছে। এগুলো নিশ্চয় পথচারীদের থেকে লুঠ করা জিনিস। মনে হচ্ছে এদের কারবারই লুণ্ঠন। ঘরে ঠাসা রয়েছে সব।' জীবদত্তের কথা শুনে খড়গবর্মাও ওই ঘরের মধ্যে উঁকি মেরে দেখল। একটার পর একটা বস্তা সারি সারি রাখা রয়েছে। কোনোটাতে আছে গম আর কোনোটাতে আছে ধান। আরও কত কী!

'তার মানে এই লোমশ ভূতকে দেখিয়ে পথচারীদের ভয় পাইয়ে দিয়ে তান্ত্রিক আর তার লোকজন লুঠ করে। মনে হচ্ছে পূজারিনি অনেক বেশি বুদ্ধি রাখে। যা কিছু এরা করছে, মনে হচ্ছে পূজারিনির পরিকল্পনাতেই করছে।' খড়গবর্মা বলল।

'এমন ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে যাতে এই খাদ্যের ভাণ্ডারে পূজারিনির কোনো লোক ঢুকতে না পারে। ওরা এখান থেকে খাদ্য না পেলে খুবই বিপদে পড়বে। ওরা খেতে পাবে না। খেতে না পেলে এই শিথিল ভবন থেকে বাইরে যেতেই হবে।' জীবদত্ত বলল।

'আমাদের দু-জনের মনে একই চিন্তা এসেছে।' এই কথা বলে খড়গবর্মা হেসে উঠল। তারপর নিজের ট্যাঁক থেকে চকমকি পাথর বের করল। পাথর ঘষে আগুন ধরিয়ে দিল ওই খাদ্যের বস্তায়।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। দেখতে দেখতে একের-পর-এক খাদ্যের বস্তায় আগুন ধরে যাচ্ছিল। ধোঁয়া আর আগুনে ওই ঘর ভরে গিয়েছিল।

'আগুন ধরানো তো গেল। এবার কী করা যাবে?' খড়গবর্মা বলল।

জীবদত্ত বলল, 'আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দেখা যাক। ভালোভাবে আগুন ধরে গেলে এই ভাণ্ডারের সমস্ত খাদ্য পুড়ে যাবে। আবার আর একটা ব্যাপারও হবে। পূজারিনি আগুন লাগার খবর পেয়ে সেবকদের নিয়ে চলে আসবেন। তখন...'

জীবদত্তের কথা শেষ হতে-না-হতেই জ্বলন্ত ভাঁড়ার ঘরের পাশের ঘর থেকে মানুষের আর্তনাদ শোনা গেল।

'খড়গবর্মা, পাশের ঘরের দরজা বন্ধ। মানুষের আর্তনাদ যেন শুনতে পাচ্ছি!' বলতে বলতে জীবদত্ত তাড়াতাড়ি ওই বন্ধ দরজার কাছে গিয়ে দরজায় সজোরে ধাক্কা মারতে লাগল।

খড়গবর্মা তার কাছে গিয়ে হাসতে হাসতে বলল, 'জীবদত্ত, তাড়াহুড়োর মধ্যে তুমি বোধ হয় দরজায় লাগানো ঝুলন্ত তালাও দেখতে পাচ্ছ না। তুমি তোমার মন্ত্র দণ্ড দিয়ে আঘাত করে এই তালা ভেঙে ফেল।'

তৎক্ষণাৎ জীবদত্ত নিজের মন্ত্র দণ্ড দিয়ে দরজার ঝুলন্ত তালায় জোরে মারল। তালা ভেঙে নীচে পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি ছিটকিনি খুলে খড়গবর্মা দরজায় জোরে ধাক্কা মারল।

ঘরে অন্ধকার ঘন ছিল না। দরজার উপরের দিকের একটা জানালা দিয়ে ঘরে আলো ছড়িয়ে পড়ছিল। ওই আলোতে দেখা গেল খুঁটির সাথে শেকল দিয়ে বাঁধা আছে এক বুড়ো। তার হাত হাঁটু পর্যন্ত ঝুলছে। বুড়োটাকে খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল। তার লম্বা দাড়ি হাওয়ায় উড়ছিল।

নয়

খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে দেখতে পেয়েই বৃদ্ধ বলল, 'কে তোমরা? ওই পাজি পূজারিনির শিষ্য বলে তো তোমাদের মনে হচ্ছে না! তোমরা যেই হও না কেন আমাকে বাঁচাও। পাশের ঘরের খাদ্য হয়তো পুড়ছে। তার আগুনের তাপে আমাকে যেখানে বেঁধে রেখেছে তা পুড়ে যাচ্ছে। আমার পিঠ জ্বালা করছে। পুড়ে যাচ্ছে আমার পিঠ। আমাকে খুলে দাও। আমি পুড়ে যাব।'

'কিছুক্ষণেই মধ্যেই ঘরের ছাদ ধ্বসে পড়বে।' বলতে বলতে জীবদত্ত বৃদ্ধের কাছে গেল। নিজের দণ্ডের আঘাতে বৃদ্ধকে বাঁধা শেকলগুলো ভেঙে ফেলল। বৃদ্ধের হাত ধরে তৎক্ষণাৎ তাকে টেনে বের করল ঘর থেকে।

বৃদ্ধ হতবাক হয়ে চারদিক তাকিয়ে বলল, 'ও! কতদিন পরে আমি মুক্তি পেলাম। ওই পাজি পূজারিনি কি এখনও এই শিথিল নগরে নিজের শাসন চালাচ্ছে। তোমরা কারা? এখানে এলে কেন? কী তোমাদের পরিচয়?'

'আমরা যেই হই না কেন তুমি যে পূজারিনির কথা বলছ আমরা তার শিষ্য নই। বিন্ধ্যাচলে অনেক বড়ো একটা কাজ করতে আমরা বেরিয়ে পড়েছি। কিন্তু পথে ছোটোখাটো গোলমালে পড়ে এখানে কেমন করে যেন চলে এসেছি। আমাদেরও এখানে বন্দি করার চেষ্টা হয়েছিল। তোমার কথায় মনে হচ্ছে তুমি এখানকার আসল পূজারি। এখানকার পূজারিনি তোমাকে যেকোনোভাবে এই অন্ধকার ঘরে বেঁধে রেখেছে। ঠিক কথা বলছি না?' জীবদত্ত বলল।

'হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ। ওই পাজি মেয়েটাকে আজ থেকে কুড়ি বছর আগে আমি এই বনে কুড়িয়ে পেয়েছি। তখন সে বালিকা। কেমন যেন মায়া হল তার উপর। ওকে আমি কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছি। আমার মন্ত্রতন্ত্র যা ছিল শেখালাম। কিন্তু ফল কী হল? এক ভয়ংকর ঝড় বাদলের দিনে, কী ভয়ংকর মারাত্মক রাত্রি, আকাশ যেন ভেঙে পড়ছে, মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে আর তখনই...।'

জীবদত্ত বৃদ্ধ তান্ত্রিকের কথা শেষ হতে-না-হতেই বলল, 'তোমার সমস্ত কথা শোনার সময় আমার নেই। আমরা পূজারিনির খপ্পর থেকে বেরিয়ে বনে যেতে চাইছি। আমাদের ঘরে বন্দি করতে এতক্ষণে পূজারিনি হয়তো সদলবলে বেরিয়ে পড়েছে। আমাদের তাড়াতাড়ি যেতে হবে। তুমি কি এখানেই থাকতে চাও না ভবন জ্বলে পুড়ে যাওয়ার আগে আমাদের পথ দেখিয়ে আমাদের সাথে বেরিয়ে বনে যেতে চাও?'

'আমি ওই পাজি পূজারিনির অপরাধের বদলা না নিয়ে, তার হাড় না ভেঙে এখান থেকে নড়ব না। আমার পুরোনো শিষ্যরা এই অবস্থায় দেখলে ওরা চট করে আমার দিকে চলে আসবে। ওদের সাহায্যে আমি ওই পাজি মেয়েটাকে মেরে টুকরো টুকরো করে চিল আর কাককে খাওয়াব। যতক্ষণ না আমি তা করছি ততক্ষণ আমার শান্তি ফিরে আসবে না।' বৃদ্ধ তান্ত্রিক বলল।

এই কথা শুনে খড়গবর্মা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলল, 'জীবদত্ত, আর দেরি নয়। এবার আমরা নিজেদের পথে যেতে পরি। পূজারিনি ও এই বৃদ্ধের মধ্যে যা হওয়ার হোক। এরা পরস্পরের মাথা কাটাকাটি করুক।' এ-কথা বলে সে এগিয়ে গেল।

জীবদত্ত খড়গবর্মার পেছনে যেতে যেতে বলল, 'ওই পাজি পূজারিনিকে ধরে টুকরো টুকরো করে তার মাংস কাক চিলকে খাওয়াতে চাইছ কেন? এই অঞ্চলে একটা ক্ষুধার্ত সিংহ ঘোরাঘুরি করছে। তাকে খেতে দাও না কেন? তোমারও পুণ্য হবে আর তারও পেট ভরবে।'

বৃদ্ধ কী যেন বলতে যাচ্ছিল ওই কথার জবাবে। কিন্তু ততক্ষণে পূজারিনি তার তান্ত্রিক, লোমশ ভূত ও পাঁচ-ছ-জন শিষ্যকে নিয়ে সেখানে পৌঁছে গেল। সেখানে বৃদ্ধ তান্ত্রিক, জীবদত্ত ও খড়গবর্মাকে দেখে চোখ বড়ো বড়ো করে রক্তচক্ষু করে ত্রিশূল উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন, 'ও! এই বুড়োটা অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে! চোরা পথে চোরের মতো আমাদের নগরে যে দু-জন ঢুকেছে তারাও দেখছি এখানেই আছে! তোমাদের শেষ মুহূর্ত এসে গেছে! সবাইকে ধরে আমি মহাভূতের কাছে বলি দেব।' ঘোষণা করে সে এগিয়ে এল।

খড়গবর্মা ঝট করে দু-পা পিছিয়ে পূজারিনির দিকে তির তাক করে সাবধান করে দিয়ে বলল, 'পূজারিনি আর এক-পা এগিয়েছ কী আমার এই তেজতির তোমার গলা এফোঁড় ওফোঁড় করে দেব! সাবধান!'

এই সাবধান বাণী শুনে পূজারিনি পাথরের মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তান্ত্রিক ও লোমশ ভূত তার কাছ থেকে একটু সরে দাঁড়াল। দু-এক মুহূর্ত নীরব থাকার পর পূজারিনির এক শিষ্য নিজের শূল তুলে ধরে বলল, 'মহাশক্তি পূজারিনি! দেরি না করে এই বৃদ্ধ পূজারি আর এই দু-জনকে মন্ত্রবলে ভস্ম করে ফেলুন!'

'না আমি এত সহজে এদের প্রাণনাশ করতে চাই না। এদের জ্যান্ত ধরে মহাভূতের কাছে বলি দিতে চাই।' তারপর পাশ ফিরে তান্ত্রিক ও লোমশ ভূতের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আরে, তোমরা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? ওই যুবক দু-জনকে বন্দি কর। ইতিমধ্যে আমি বুড়োটাকে দেখছি।'

এ-কথা শুনে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত হো-হো করে হেসে উঠল। জীবদত্ত লোমশ ভূতের দিকে এক-পা এগিয়ে বলল, 'ওরে ভূত, আমাদের ঠিক জানা নেই তোর আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে কি না। পূজারিনির আদেশ পালন না করে হাঁ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী?'

লোমশ ভূত কেমন যেন ঘাবড়ে গিয়ে তান্ত্রিকের কাছে গিয়ে বলল, 'গুরু এখন কী করব? ওদের দু-জনকে ধরে কাঁচা চিবিয়ে ফেলব?'

'না শিষ্য তা করো না। অত বড়ো অপরাধ করা মহাপাপ হবে। পূজারিনি তাদের জ্যান্ত ধরে মহাভূতের কাছে বলি দিতে চান। আমাদের অত তাড়াতাড়ি কিছু করার নেই।' তার গুরু বলল।

তান্ত্রিকের কথা শুনে পূজারিনি চোখ লাল করে শূল তুলে তার দিকে এগিয়ে যেতেই খড়গবর্মা বলে উঠল, 'পূজারিনি, তোমাকে একবার সাবধান করে দিয়েছি। এগোবে না। একটু নড়েছ কী তোমার গলা ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে আমার তির। পার তো ওখান থেকেই তোমার মন্ত্রশক্তি বলে তোমার শত্রুদের শেষ করে ফেল। আমাদের কোনো আপত্তি নেই।'

এই সমস্ত ব্যাপার এতক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে লক্ষ করে বৃদ্ধ পূজারি উচ্চকণ্ঠে বলল, 'এখন ওই গুরুদ্রোহিণীর কাছে কোনো মন্ত্রশক্তি নেই। আমি আমার সমস্ত মন্ত্রগুলো ফিরিয়ে নিয়েছি।'

'ওই বুড়োর একটি কথাও সত্য নয়। তোমরা ওই হারামির কথা বিশ্বাস করো না। শিষ্যগণ, আমি এক্ষুনি তাকে শূলে ফুঁড়ে তুলে ফেলছি।' বলতে বলতে পূজারিনি বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে গেল।

'থাম!' খড়গবর্মা পূজারিনির হাতে তির ছুড়ল। 'উফ!' আর্তনাদ করে উঠল পূজারিনি। তার হাত থেকে শূল নীচে পড়ে গেল।

'পূজারিনি! তুমি আমার সাবধানবাণী ভুলে গেছ! তাই বাধ্য হয়ে তোমার উপর তির ছুড়তে হল। আবার বলছি, সাবধান, এগিয়ো না আর!' খড়গবর্মা দৃঢ়তার সঙ্গে বলল।

পূজারিনির হাত থেকে শূল পড়ে যেতেই তার দু-জন শিষ্য লাফিয়ে উঠে বলল, 'মাটিতে ফেলে দিয়ে পূজারিনি অপবিত্র করেছে এই পবিত্র শূল। এবার থেকে আমাদের গুরু ওই বৃদ্ধ পূজারি। বৃদ্ধ পূজারির জয় হোক!'

'খড়গবর্মা, আমরা আমাদের আসল কাজের কথা ভুলে যাচ্ছি। এই বোকা হাবাদের এই শিথিল ভবনেই থাকতে দাও। এখানেই এদের থাকা ভালো। এরা বাইরে বেরুলে সাধারণ মানুষ এদের সাথে মিশে বোকা হয়ে যাবে।' জীবদত্ত বলল।

নিজের পক্ষে পূজারিনির দু-জন শিষ্য আসার ফলে বৃদ্ধ পূজারি খুশি হয়ে বলল, 'হে মহাভূত! তুমি কতদিন পরে আমার শিষ্যদের অন্ধকার থেকে টেনে আনলে আলোয়। এবার থেকে, আগের চেয়ে অনেক বেশি জীবন তোমার কাছে আমি বলি দেব।'

'খড়গবর্মা, এই পাজি বৃদ্ধ দেখছি পূজারিনির চেয়ে কম বদমাইশ নয়।' এ-কথা বলে জীবদত্ত মুখ ফেরাল সেখানে সমবেত অন্যদের দিকে। তাদের সম্বোধন করে বলল, 'তোমাদের ঝগড়ার মধ্যে আমরা কোনো পক্ষ নিচ্ছি না। তোমাদের কেউ একজন আমাদের এখান থেকে বাইরে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দাও। আমরা বনে চলে যেতে চাই।'

'তোমরা এখান থেকে পালাতে চাও? তা হয় কখনো? দাঁড়াও, আমি তোমাদের দু-জনকে শূলে গেঁথে মহাভূতের কাছে নিয়ে যাই। তবে তো...' বলতে বলতে পূজারিনি নীচে পড়ে থাকা শূল নিতে ঝুঁকল।

'একটা তির খেয়েও এই পূজারিনির জ্ঞান হল না।' বলতে বলতে খড়গবর্মা পূজারিনির দিকে আবার তির ছুড়তে উদ্যত হল। তক্ষুনি জীবদত্ত তার হাত চেপে ধরল।

'খড়গবর্মা, এ যত পাজিই হোক না কেন মেয়েছেলেকে মারা উচিত হবে না। এই বৃদ্ধ আর পূজারিনি শিথিল ভবনে লড়ে মরুক, আমাদের কী। চল। আমরা চলে যাই।' এ-কথা বলে জীবদত্ত মন্ত্র দণ্ড তুলে ধরে তান্ত্রিক ও লোমশ ভূতের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দেবার স্বরে বলল, 'তোমরা দু-জনে বনের পথ ধর। কোই? উঁ, হুঁ। দেরি করো না।'

তান্ত্রিক বৃদ্ধ পূজারি ও পূজারিনির দিকে ফিরে হাত জোড় করে তাদের বলল, 'আমার গুরুজন, যেকোনো কারণে গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে আমার মন্ত্রশক্তিতে কোনো কাজ হচ্ছে না। আমি এই দু-জনকে পথ দেখাতে পারব না। আপনারা আমাকে এদের হাত থেকে রক্ষা করবেন।'

বৃদ্ধ পূজারি ও পূজারিনি একে অন্যের দিকে তাকিয়ে নীরব ছিল। খড়গবর্মা কিছুক্ষণ ওদের দিকে তাকিয়ে খাপ থেকে তরবারি বের করে তান্ত্রিক ও লোমশ ভূতকে ধমক দিয়ে বজ্রকণ্ঠে বলল, 'আজেবাজে কথা বলে সময় নষ্ট না করে চল আমাদের পথ দেখিয়ে দাও।'

খাপ খোলা তরবারি দেখে তান্ত্রিক আর লোমশ ভূত ভয়ে কেঁপে উঠল। গুরু-শিষ্য ওদের বলল, 'হে মহাবীরগণ, আমাদের মেরো না! চল আমরা বনে যাওয়ার সুড়ঙ্গ পথ দেখিয়ে দিচ্ছি।'

ওই চার জনের চলে যাওয়ার পর বৃদ্ধ পূজারি ও পূজারিনির দলের মধ্যে লড়াই বেঁধে গেল। জীবদত্ত ওদের দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, 'খড়গবর্মা, এরা কেন লড়ছে জানো তো? মহাভূতের পূজারি কে হবে সেটাই এরা লড়াই করে ঠিক করতে চায়। এই ঝগড়ায় জড়িয়ে এই ধোকাবাজ তান্ত্রিক আর তার শিষ্যও লড়ে মরতে চায়।'

'এইসব পাজিদের মরতে দাও। এই ক্ষুধার্ত সিংহ কয়েক দিন পেট পুরে খেয়ে বাঁচুক।' খড়গবর্মা কথার পিঠে বলল।

এ-কথা শুনে লোমশ ভূত থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে তান্ত্রিককে বলল, 'গুরু! ওই খেতে না পাওয়া সিংহ পথে যদি কোনো গুহায় লুকিয়ে থেকে থাকে! যদি আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলে কী হবে? গুরু, যাহোক ভেবে বল।'

'কী আর করবে যার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাকে খেয়ে ফেলবে। বিশ্বাসঘাতক কোথাকার! চল। হুঁ।' খড়গবর্মা তরবারি ঝনঝন শব্দ করে বলল।

'ওরে শিষ্য তুমি অত ভয় পেয়ো না। সিংহ সামনে পড়ে গেলে আমি তাকে মুহূর্তের মধ্যে মন্ত্র দিয়ে বিড়াল করে ফেলব। চল আমরা গুহার সুড়ঙ্গ পর্যন্ত এসে গেছি। গুহায় প্রথমে তুমি ঢোক।' তান্ত্রিক বলল।

ওই গুরুর শিষ্যের পিছনে পিছনে সুড়ঙ্গপথে এগোতে লাগল জীবদত্ত ও খড়গবর্মা। ওইখানেই ওরা আগের দিন রাত্রে শিথিল নগরে ঢুকেছিল। ওরা শেষে বনে যাওয়ার গুহার মুখে পৌঁছাল। তারপর তারা গুহাপথে নামতে নামতে চারদিকে একবার তাকিয়ে লোমশ ভূত ও তান্ত্রিককে বলল, 'এবার তোমরা নিজেদের শিথিল নগরে ফিরে গিয়ে ভক্তিভরে মহাভূতের পূজা কর।'

এ-কথা শুনে তান্ত্রিক খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে নমস্কার করে বলল, 'হে মহাবীরগণ আমরা আর শিথিল নগরে ফিরে যাব না। ওই দূরের পাহাড়ে গিয়ে কোনোরকমে দিন কাটাব।'

'তবে মনে রেখো, আর কোনোদিন লুঠপাট করো না। বিপদে পড়ে যাবে। সেখানে পৌঁছানোর আগে হঠাৎ গণ্ডক জাতের নজরে পড়ে গেলে ওরা তোমাদের আস্ত রাখবে না। ওরা ভীষণ চটে আছে তোমাদের উপর।' জীবদত্ত বুঝিয়ে বলল।

তান্ত্রিক ও লোমশ ভূত চলে যাওয়ার পর খড়গবর্মা ও জীবদত্ত নদীতে স্নান করলে। কাছের বনে ঢুকে ফল পাড়ল। পেট ভরতি খেয়ে গাছের নীচে এক ঘণ্টা বিশ্রাম করল। তারপর নদীতীরে গেল। তাদের মনে হল স্বর্ণাচারিকে যারা ধরে এনেছিল তারা ওই অঞ্চলেই কোথাও আছে। তখন ওরা ঠিক করল যেকোনোভাবে স্বর্ণাচারিকে উদ্ধার করব।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত ঘণ্টাখানেক নদীর তীরে হাঁটতে লাগল। তীর ধরে হাঁটা পথে ওরা ছোটো-বড়ো অনেক পাহাড় দেখতে পেল। ওরা দেখল, বড়ো বড়ো পাথর উটের পিঠে চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

'খড়গবর্মা, এরা হয়তো ওই লুণ্ঠনকারীদের দলের লোক। এরা হয়তো জানে না যে সমতল ভূমি বা বালিতে যে উট চলে তাকে দিয়ে পাহাড়ের উপর পাথর চাপিয়ে টানানো অনুচিত। ফলে কত বড়ো বিপদ যে হতে পারে সে সম্পর্কে এদের কোনো ধারণা নেই।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্তের মুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই পাথর বোঝাই একটা উট গড়াতে গড়াতে মুখ থুবড়ে নীচে পড়ে গেল। তার পিঠে যে বসেছিল সেও রেহাই পেল না।

দশ

একটি উট পাহাড় থেকে গড়াতে গড়াতে পড়ছে। এই দৃশ্য খড়গবর্মা ও জীবদত্ত দেখতে পেল। উঁচু থেকে পড়ার ফলে উটের পা ভেঙে গেল। পা ভেঙে উট মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল। আর তার সঙ্গে যে লোকটা পড়ল তারও হাঁটুতে খুব চোট লেগেছিল। সে হাঁটুর উপর দুই হাত দিয়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট সহ্য করার চেষ্টা করছিল। তার চোখে-মুখে যন্ত্রণার করুণ ছাপ। লোকটার পোশাক দেখে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত অনুমান করল যে লোকটা নিশ্চয় লুণ্ঠনকারীদের দলের।

জীবদত্ত ওই লুণ্ঠনকারীর কাছে গিয়ে বলল, 'ওহে লুণ্ঠনকারী, তোমার দেখছি কঠিন প্রাণ। তোমার সাথে যে উট ছিল তার পা ভেঙে গেল, সে উট মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে আর তোমার কিছুই হল না।'

এতক্ষণ লুণ্ঠনকারী নিজের আঘাতের জন্য দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট পাচ্ছিল। চোখে অন্ধকার দেখছিল সে। জীবদত্ত ও খড়গবর্মা যে তার কাছে আসছে তা সে লক্ষ করেনি। জীবদত্তের গলার স্বর কানে যেতেই সে মাথা তুলে অবাক হয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'হুজুর, আমাকে মারবেন না। গণ্ডক জাতির খেতের ফসল লুণ্ঠনকারীদের মধ্যে আমি ছিলাম না। আমার কথায় বিশ্বাস না হলে স্বর্ণাচারিকে জিজ্ঞেস করে সত্য ঘটনা জেনে নিতে পারেন।'

তার কথা শুনে খড়গবর্মা ও জীবদত্তের বিস্ময়ের সীমা রইল না। ওরা বুঝল যে স্বর্ণাচারি জীবিত এবং লুণ্ঠনকারীরা তাকে এখনও সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছে।

খড়গবর্মা তৎক্ষণাৎ খাপ থেকে তরবারি বের করে আহত লুণ্ঠনকারীর বুকে ধরে বলল, 'এখন যা যা জিজ্ঞেস করব ঠিক ঠিক জবাব দাও। তা না হলে এই উট যেমন শেয়ালের খাবার হবে, তোমাকেও তাই হতে হবে। তুমি হয়তো লুণ্ঠনকারীদের সাথে গণ্ডক জাতের খেতের ফসল লুণ্ঠন করনি। কিন্তু আমাদের দেখেই তুমি বুঝলে কী করে যে আমরা গণ্ডক জাতের লোককে সাহায্য করতে এসেছি।'

জীবদত্ত খড়গবর্মাকে তরবারি খাপে পুরতে ইশারা করে বলল, 'খড়গবর্মা, এ পাজিটা প্রাণের ভয়ে আগে থেকেই কাঁপছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা চালিয়ে আর কী হবে। গণ্ডক জাতের এবং তাদের ফসলের কথা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই।' তারপর জীবদত্ত ওই লুণ্ঠনকারীর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, তুমি আমাদের কোথায় দেখলে বলত? কী করে চিনলে আমাদের?'

'হুজুর, আমি আপনাদের কোথাও এর আগে দেখিনি। আমার সাথী আপনাদের বনে দেখেছিল। সেই আপনাদের পোশাক আর অস্ত্রের কথা জানিয়ে ছিল। তাই আপনাদের দেখার সঙ্গেসঙ্গে চিনতে পেরেছি।' লুণ্ঠনকারী বলল।

'না তুমি দেখছি বুদ্ধিতে একেবারে বৃহস্পতি। কোথাও একটা আখড়া খুলে কিছু শিষ্য জুটিয়ে নিলেই তো পারতে, এসব লুণ্ঠনকারীদের দলে যোগ দিলে কেন? ভালো কথা, এত পাথর উটের পিঠে চাপিয়ে কোথায় যাচ্ছিলে বলত? কী করতে অত পাথর নিয়ে যাচ্ছ? বল।' পরিহাস করার স্বরে জিজ্ঞেস করল খড়গবর্মা।

'হুজুর, আমাদের নেতা আমাদের রাজধানীতে একটা দুর্গ বানাতে চান। সেইজন্যই আমাদের নেতা স্বর্ণাচারিকে নিয়ে যাচ্ছেন। ওই দুর্গ বানাতে অনেক পাথর লাগবে। তাই এত পাথর আমরা বয়ে নিয়ে যাচ্ছি। কী করব আমাদের কাছে এই উট ছাড়া আর কোনো বাহন তো নেই।' লুণ্ঠনকারী বলল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত লুণ্ঠনকারীর সঙ্গে কথা বলছিল। অন্যদিকে পাহাড়ের উপর যে কী হচ্ছিল তা তাদের নজরে পড়েনি। অন্য লুণ্ঠনকারীরা উটের উপর পাথর চাপিয়ে পাহাড় থেকে নামতে নামতে দেখতে পেল তাদের দলের একজনের উট পড়ে গেছে। ওদের কাছে দাঁড়িয়ে আছে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত।

ওই ক্ষত্রিয় যুবকদের দেখেই পাহাড়ের উপরের লুণ্ঠনকারীরা থমকে গেল। খড়গবর্মা ও জীবদত্ত তাদের কীভাবে যে নাস্তানাবুদ করেছে তা তাদের মধ্যে কিছু লোক হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। সেই দুরবস্থার কথা তাদের মনে আছে। তারা ভোলেনি খড়গবর্মা ও জীবদত্তের তরবারির আঘাতের জ্বালা। খড়গবর্মা ও জীবদত্ত যে কীভাবে তান্ত্রিক এবং লোমশ ভূতকে তাড়া করতে করতে পাহাড়ের গুহায় ঢুকে গেল তাও তারা স্বচক্ষে দেখেছে।

'এই মরেছে, এখন আমাদের নেতা নেই। ওই ক্ষত্রিয় যুবকরা আমাদের দেখে নিয়েছে। এখন তো আর রক্ষা নেই। ওরা সোজা পাহাড়ের উপর এসে আমাদের উপর চড়াও হবে। আর দেরি নয়, এখন পালানো উচিত। আপনি বাঁচলে বাপের নাম।' একজন লুণ্ঠনকারী বলল।

যে বিপদ আসছে তার হাত থেকে বাঁচতে হলে আমদের সামনে মাত্র একটি পথই খোলা আছে। তা হল স্বর্ণাচারির কাছ গিয়ে সব জানিয়ে তার কাছ থেকে পরামর্শ চাওয়া। শুনেছি স্বর্ণাচারি এই ক্ষত্রিয় যুবকদের বন্ধু। একমাত্র সেই এখন এই বিপদের হাত থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে। চল, আর দেরি নয়, এখনই স্বর্ণাচারির কাছে যাওয়া যাক।' অন্য এক লুণ্ঠনকারী বলল।

তারপর দশ-বারো জন লুণ্ঠনকারী স্বর্ণাচারির কাছে ছুটে গেল। স্বর্ণাচারি তখন এক উঁচু পাহাড়ের উপর বসে লুণ্ঠন নেতার জন্য দুর্গের নকশা আঁকছিল।

লুণ্ঠনকারীদের তার কাছে দাঁড়ানো দেখে, নকশা আঁকা থামিয়ে স্বর্ণাচারি গর্জে উঠে বলল, 'আরে, তোমরা নিজেদের কাজকর্ম ছেড়ে এভাবে ছোটাছুটি করছ কেন? শিকার করে তোমাদের নেতা ফিরে আসুক, সব বলব তাকে, মজা টের পাবে।'

লুণ্ঠনকারীদের একজন কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'হুজুর, নেতার অনুপস্থিতিতে আপনি তো আমাদের নেতা। একটা উট পা হড়কে পাহাড়ের উপর থেকে গড়াতে গড়াতে নীচে পড়ে গেছে। তার সাথে যে সাথী ছিল সেও পড়ে গেছে। ওদের পড়ে যাওয়া দেখতে পেয়েছে আপনার পুরোনো ক্ষত্রিয় যুবক বন্ধুরা। উট আর আমাদের সাথী মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর ওই যুবক দু-জন তার পাশে দাঁড়িয়ে সাথীকে কী যেন জিজ্ঞেস করছে। আমাদের ভয় হচ্ছে, ওরা না শেষে এই আস্তানার খবর পেয়ে যায়।'

ক্ষত্রিয় যুবকদের নাম শুনেই স্বর্ণাচারি চমকে উঠল। দাঁড়িয়ে পড়ল মহানন্দে। লুণ্ঠনকারীদের কাছে সব কথা শুনে তার ধারণা হল ক্ষত্রিয় যুবক দু-জন কাছাকাছি কোথাও এসে গেছে।

স্বর্ণাচারি পাহাড়ের নীচে নেমে আসতে আসতে লুণ্ঠনকারীদের বলল, 'তোমরা এত ধানাইপানাই না করে ঝট করে বললেই পারতে যে ক্ষত্রিয় যুবকরা এসেছে। এখন চুপ করে আমার সঙ্গে চলে এসো। তোমাদের কোনো ভয় নেই, বুঝলে?'

'ঠিক আছে আচার্য মশাই, আমাদের প্রাণে মারা পড়তে হবে না তো?' লুণ্ঠনকারীরা আশঙ্কা ও সন্দেহ প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করল।

'ওরে ভীতুর দল, তোমরা এত ভয় পাচ্ছ কেন? ওরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। তোমাদের বাঁচতে, প্রয়োজন হলে, আমি প্রাণ দেব। তবে তোমরা কিন্তু খুব সাবধানে তাদের সাথে ব্যবহার করবে।' স্বর্ণাচারি ভালো করে বুঝিয়ে বলল তাদের।

তারপর পাহাড় থেকে সমতল ভূমিতে নামতে নামতে সে চেঁচিয়ে ডাকল খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে। খড়গবর্মা ও জীবদত্ত মাথা তুলে স্বর্ণাচারিকে দেখেই চিনতে পারল। তার পিছনে কয়েক জন লুণ্ঠনকারীকে দেখে খড়গবর্মা বলল, 'জীবদত্ত, আমার কেমন যেন সন্দেহ জাগছে। পদ্মপুরের বাস্তুশাস্ত্রী ও যন্ত্রের হাতি নির্মাণকারী স্বর্ণাচারি এই লুণ্ঠনকারীদের দলে যোগ দেয়নি তো! আমাদের খুব সাবধান হতে হবে।' খড়গবর্মার কথা শুনে জীবদত্তের মনেও সন্দেহ জাগল। স্বর্ণাচারিকে এরা জোর করে ধরে এনেছে। বলা যায় না পরে স্বর্ণাচারির সঙ্গে ওদের হয়তো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।...

'খড়গবর্মা বিন্ধ্যাচল পৌঁছানো পর্যন্ত আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে। আমরা তো স্বর্ণাচারিকে মুক্ত করতেই এসেছি। এখন দেখা যাক স্বর্ণাচারির কী মতলব আছে!' জীবদত্ত বলল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত নিজেদের মধ্যে কথা বলছে এমন সময় চার জন লুণ্ঠনকারী সহ স্বর্ণাচারি তাদের কাছে এসে শ্রদ্ধাভরে নমস্কার করল। তারপর পালা করে প্রত্যেক লুণ্ঠনকারী সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।

জীবদত্ত হাসতে হাসতে স্বর্ণাচারির পিঠ চাপড়ে বলল, 'স্বর্ণাচারি, কেমন আছ? লুণ্ঠন নেতার জন্য জাদুর হাতি বা ঘোড়া বানাচ্ছ না তো? আমরা ভেবেছিলাম এদের হাতে পড়ে তোমাকে খুব কষ্ট পেতে হচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে তুমিও লুণ্ঠনকারীদের ছোটোখাটো নেতা হয়ে গেছ।'

এই কথা শুনে স্বর্ণাচারি কিছুক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থেকে পরে হাতজোড় করে বলল, 'আপনারা একবার আমাকে বাঁচিয়েছেন তারজন্য সারাজীবন আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। আমি নিরুপায় হয়ে লুণ্ঠন নেতার জন্য একটা দুর্গ তৈরির আয়োজন করছি। কাজটা শেষ হয়ে গেলেই আমি নিজের পথ ধরব। ফিরে যাব বিঘ্নেশ্বর পূজারির কাছে। একসঙ্গে আমরা কোনো বনে গিয়ে তপস্যা করব।'

'বিঘ্নেশ্বর পূজারি গণ্ডক জাতের অরণ্যপুরে আরামেই আছে। এখানে তুমি ভালো আছ তো? এবার আমরা নিজেদের পথ ধরব।' জীবদত্ত বলল।

এ-কথা শুনে স্বর্ণাচারি বিহ্বল হয়ে বলল, 'আপনারা আমার আতিথ্য গ্রহণ না করে চলে যাবেন? তা কখনোই হতে পারে না। আপনারা দয়া করে আজকের দিন আর রাতটা আমার এবং সমরবাহুর অতিথি হিসেবে কাটিয়ে যান।'

'সমরবাহু আবার কে?' জীবদত্ত অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।

'ভালো কথা, আপনারা কি লুণ্ঠন নেতার নাম শোনেননি। সিন্ধু রেগিস্থান থেকে আসা লুণ্ঠন নেতার নাম ওটা। এখন সে আস্তানায় নেই। দু-জন অনুচর নিয়ে সে শিকার করতে বনে বেরিয়ে পড়েছে। চলুন এবার।' বলতে বলতে স্বর্ণাচারি এগিয়ে যেতে লাগল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত তার পেছনে যেতে যেতে আহত লুণ্ঠনকারীকে দেখিয়ে বলল, 'একে কাঁধে তুলে তোমাদের নিয়ে যেতে হবে।'

তৎক্ষণাৎ দু-জন লুণ্ঠনকারী ওই আহত সাথীটিকে তুলে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা সবাই লুণ্ঠন নেতার আস্তানায় পৌঁছাল। ভালুকের চামড়া জড়িয়ে একটা লোক সেখানে বসে আছে। তাকে ঘিরে আছে কয়েক জন লুণ্ঠনকারী। ওরা নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করছিল। খড়গবর্মা, জীবদত্ত ও স্বর্ণাচারিকে দূর থেকে আসতে দেখে তারা এক ছুটে তাদের কাছে গেল।

'তা তোমার এত অস্থিরতা কীসের? তুমি কি ভালুকের বেশ পরে এখানে নাচানাচি করার তালে আছ নাকি?' স্বর্ণাচারি বলল।

ভালুকের চামড়া পরা লোকটা স্বর্ণাচারির সামনে এসে মাথা নত করে নমস্কার করে বলল, 'স্বর্ণাচারি মশাই, আমি এই চামড়া শখ করে পরিনি। আজ সকালে নেতার সাথে আমিও শিকার করতে বেরিয়ে ছিলাম। আমাদের নেতাকে জংলি জাতের ভয়ংকর নেতা বন্দি করে নিয়ে গেছে। আমি কোনোরকমে ওই জংলিদের হাত থেকে পালিয়ে বেঁচে এসেছি।'

'লুণ্ঠনকারীদের নেতা সমরবাহুকে কি জঙ্গলবাসীরা ধরে নিয়ে গেছে? এত বড়ো বীরকে বন্দি করার মতো জঙ্গলবাসী এতদঞ্চলে কোথাও আছে?' খড়গবর্মা হাসতে হাসতে বলল।

'খড়গবর্মা, সে যত বড়ো পাজিই হোক না কেন, এখন এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে যে সে তার চেয়ে বড়ো পাজির খপ্পরে পড়ে গেছে। ওভাবে হাসবে না। বেচারার এতক্ষণে কী অবস্থা হয়েছে কে জানে!' জীবদত্ত বলল।

লুণ্ঠন নেতার বন্দি হওয়ার খবর শুনে স্বর্ণাচারির মনে নানা আশঙ্কা জাগতে লাগল। তার নিজেরও তো অভিজ্ঞতা আছে। সেও তো একদিন বন্দি হয়েছিল লুণ্ঠনকারীদের হাতে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয়েছে তাকে। তারপর ধীরে ধীরে লুণ্ঠনকারীরা তার সাথে ভালো ব্যবহার করতে লাগল। শেষে একদিন লুণ্ঠন নেতার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠল।

'হে ক্ষত্রিয় বীরগণ, মনে হচ্ছে ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেল। আপনারা অপরিসীম শক্তির অধিকারী। যেকোনোভাবে জঙ্গলবাসীদের হাত থেকে সমরবাহুকে উদ্ধার করুন।' স্বর্ণাচারি কাতর কণ্ঠে বলল।

জীবদত্ত খড়গবর্মার দিকে তাকাল। খড়গবর্মা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নেড়ে বলল, 'জীবদত্ত, এ ব্যাপারে কি করবে না করবে তা ঠিক করার ভার তোমার। আমাদের বন্ধু স্বর্ণাচারির অনুরোধ তো আর আমরা ফেলতে পারি না। লুণ্ঠন নেতাকে বাঁচাব কি না ঠিক কর। তুমি যা বলবে তাই হবে।'

জীবদত্ত কিছুক্ষণ ভেবে ভালুকের চামড়া পরা লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, 'ওহে, তোমার নেতা আর তার অনুচরকে জঙ্গলবাসীরা বন্দি করল কীভাবে? জঙ্গলে কী ঘটেছিল সব ভালো করে বুঝিয়ে বল দেখি?'

ভালুকের চামড়া পরা লোকটা বলল, 'হুজুর, সমস্ত ঘটনা অল্প কথায় বলছি। আপনারা তাড়াতাড়ি গিয়ে আমাদের নেতাকে উদ্ধার না করলে ওই নরখাদক আমাদের নেতাকে হয়তো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলবে।'

এগারো

লুণ্ঠনকারীদের কথা শুনে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত অবাক হল। এতদিন ওরা বনে ঘুরে বেড়িয়েছে কিন্তু আজ পর্যন্ত ওরা কোনো মানুষখেকো জাতির লোককে দেখতে পায়নি।

জীবদত্ত কিছুক্ষণ চুপচাপ কী যেন ভেবে নিয়ে বলল, 'তোমাদের নেতাকে ওরা পুড়িয়ে খাবে কী এমনি কাঁচা খেয়ে নেবে সে-কথা আমরা পরে ভাবতে বসব। এখন আমাদের বল তো কেমন করে তোমাদের নেতা বন্দি হল? কী হয়েছিল?'

'হুজুর আমরা সকালে শিকার করতে গিয়েছিলাম। আমাদের চোখে পড়ল একটা হরিণ। হরিণ মেরে আমরা ফিরছিলাম। পথে আমরা একটা বাঘের গর্জন শুনতে পেলাম। আর শোনা গেল একটা মানুষের আর্তনাদ। যেদিক দিয়ে আওয়াজ আসছিল আমরা তিন জনে সেইদিকে ছুটে গেলাম। চোখে পড়ল একটা বাঘ আর একটা আদিবাসী। আর বাঘের বুকে বল্লম ঢুকে গেছে। বাঘের একটা বাচ্চা কাছাকাছি গর্জন করতে করতে ঘোরাঘুরি করছিল। লুণ্ঠনকারীরা বলল।

'ওটা হয়তো ওই মড়া বাঘিনীর বাচ্চা। আচ্ছা তারপর কী হল?' জীবদত্ত জিজ্ঞেস করল।

লুণ্ঠনকারীরা বলল, 'আমাদের নেতা জানালেন যে তিনি ওই বাঘের বাচ্চাকে এনে পুষবেন। আমি আস্তে আস্তে গিয়ে বাচ্চাটাকে ধরে ফেললাম। ইতিমধ্যে দশ-বারো জন আদিবাসী কোত্থেকে হাজির হল আমাদের সামনে। তাদের পরণে ভালুকের চামড়া। হঠাৎ তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের বন্দি করে ফেলল। আদিবাসীদের নেতা ভালুকের মাথার চামড়া ধারণ করেছিল। তাই তাকে ঠিক চেনা যাচ্ছিল না। নেতা আমার দিকে চোখ রেখে নিজের অনুচরদের বলল, 'আরে এই লোকটা তো চমৎকার করে ফেলেছে বাঘের বাচ্চাটাকে। লোকটা খুব হুঁশিয়ার মনে হচ্ছে। সাহসীও বটে। একে আমরা আমাদের দলে ঢুকিয়ে নেব। নাও একেও তোমরা ভালুকের চামড়া পরিয়ে দাও।' নেতার নির্দেশমতো তৎক্ষণাৎ তারা আমাকে ভালুকের চামড়া পরিয়ে দিল। আমাদের নেতা ও আমাদের এক সাথীকে ওরা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। বাঘের বাচ্চা নিয়ে ওদের সাথে আমাদের চলার হুকুম হল। আমরা চলতে লাগলাম। তারপর আমি...

লুণ্ঠনকারীর কথা শেষ হতে-না-হতেই জীবদত্ত বলল, 'তাহলে তো তোমার ভাগ্য খুলে গিয়েছিল। ওদের দলে থেকে গেলে একদিন-না-একদিন তুমি ওদের নেতা হয়ে যেতে পারতে।'

এ-কথা শুনে খড়গবর্মা ও স্বর্ণাচারির সঙ্গে যারা এসেছিল তারা সবাই হো-হো করে হেসে উঠল। ওই লুণ্ঠনকারীও হেসে বলল, 'কিছুক্ষণ যাওয়ার পর আমি বাঘের বাচ্চাটাকে ওদের নেতার উপর ছুড়ে দিলাম। বাঘের বাচ্চাটা নেতার কাঁধে পড়ে রাগে গর্জন করতে করতে তাকে কামড়ে আঁচড়ে অস্থির করে তুলল। নেতা বাঘের বাচ্চার সঙ্গে যুঝতে লাগল। তখন নেতাকে উদ্ধার করতে তার অনুচররা ব্যস্ত হয়ে উঠল। সেই সুযোগে আমি এক ফাঁকে ছুটে পালালাম।

জীবদত্ত লুণ্ঠনকারীকে বলল, 'বা! তুমি তো দেখছি খুব সাহসের পরিচয় দিয়েছ।' এ-কথা বলে জীবদত্ত স্বর্ণাচারির দিকে ঘুরে বলল, 'স্বর্ণাচারি, এখন আমাদের কর্তব্য কি ওই আদিবাসীদের নেতার কবল থেকে লুণ্ঠন নেতা সমরবাহুকে উদ্ধার করা?'

স্বর্ণাচারি জীবদত্তের কথার জবাব দিতে যাচ্ছে এমন সময় পাহাড়ের এক উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে যে লোকটা বনের সবদিক নজর রেখেছিল সে লাফাতে লাফাতে খড়গবর্মা ও জীবদত্তের কাছে গিয়ে বলল, 'হুজুর, আমাদের এই পাহাড়ের নীচের বনে একদল আদিবাসী বাজনা বাজাতে বাজাতে ভালুক নাচাতে নাচাতে এদিকে আসছে।'

'ওরা কি আমাদের দিকে আসছে না বনের দিকে আপন মনে চলেছে? এই প্রশ্ন করতে করতে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত বনের দিকে তাকাল।

লুণ্ঠনকারীরা ঠিকই বলেছিল। নানান ধরনের বাজনা বাজাতে বাজাতে দশ-বারো জন আদিবাসী লুণ্ঠন নেতা সমরবাহু ও তার এক অনুচরকে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিল।

'খড়গবর্মা, মনে হচ্ছে আদিবাসীরা আমাদের দিকে আসছে না। ওরা নিজেদের আস্তানার দিকে যাচ্ছে। ওরা যদি সত্যি মানুষখেকো হয় তাহলে তাদের কবল থেকে আমরা সমরবাহুকে উদ্ধার করতে পারব না।' জীবদত্ত বলল।

স্বর্ণাচারি পাহাড়ের নীচের বনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল আদিবাসীদের। সমরবাহুকে দেখেই সে বিচলিত হয়ে বলে উঠল, 'দেখুন আপনার যেকোনোভাবে ওদের কবল থেকে সমরবাহুকে উদ্ধার করুন। ওই ভালুক নাচানো আর বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানো নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোকের মধ্যে সমরবাহু বেশিদিন বাঁচতে পারবে না। আমার মনে হচ্ছে তাড়াতাড়ি উদ্ধার করতে না পারলে সমরবাহুর জীবন বিপন্ন হতে পারে।'

'স্বর্ণাচারি, তোমার অনুরোধে আমরা সমরবাহুকে বাঁচানোর চেষ্টা করব। ওই আদিবাসীদের অনুসরণ করে ওদের খপ্পর থেকে সমরবাহুকে উদ্ধার করতে একটু সময় লাগবে। এর মধ্যেই ওরা সমরবাহুকে মেরে ফেললে সেটা তার দুর্ভাগ্য মনে করতে হবে।' জীবদত্ত বলল।

'আপনাদের উদ্ধার কাজ যাতে তাড়াতাড়ি হতে পারে তারজন্য সমরবাহুর দলের কয়েক জনকে আপনাদের সঙ্গে পাঠাচ্ছি। ওদের এই অঞ্চলে মেরে ফেলে সমরবাহুকে উদ্ধার করুন।' স্বর্ণাচারি নিবেদনের সুরে বলল।

স্বর্ণাচারি ভূত-ভবিষ্যৎ কিছু না ভেবে কথা বলায় জীবদত্ত হেসে উঠে বলল, 'স্বর্ণাচারি ওই পাজি লোকগুলোকে মেরে ফেলা অত সহজ কথা নয়। আমরা ওদের উপর হামলা করতে যাচ্ছি টের পেলে ওরা তৎক্ষণাৎ সমরবাহুকে বধ করবে।... তাই বলে আমরা যে দেরি করতে চাই তা নয়, আমরা এক্ষুনি বেরুচ্ছি। আমরা ওকে মুক্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করব।' জীবদত্ত বলল।

তারপর খড়গবর্মা ও জীবদত্ত পাহাড় থেকে নেমে বনের দিকে এগিয়ে গেল। ওরা আদিবাসীদের দেখতে পেল না বটে কিন্তু ওদের ডমরু প্রভৃতি নানান ধরনের বাজনার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত ঠিক করল পা চালিয়ে তাড়াতাড়ি ওদের কাছাকাছি চলে যাবে। পিছন দিক থেকে অতর্কিতে আক্রমণ করে ওদের পর্যুদস্ত করে ফেলবে। কিন্তু গাছের ফাঁক দিয়ে ওদের কখনো দেখা যাচ্ছিল আবার কখনো ওরা গাছের আড়ালে পড়ে যাচ্ছিল।

'খড়গবর্মা, ভালুকের চামড়া পরা লোকগুলোকে ওদের আস্তানায় গিয়েই আক্রমণ করতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই। এই ঘন বনে এদের আক্রমণ করে ঠিক সুবিধা করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।' জীবদত্ত নিরাশ হয়ে বলল।

খড়গবর্মা জীবদত্তের কথার জবাব দিতে যাবে এমন সময় ওরা আর ওই বাজনার আওয়াজ শুনতে পেল না। সমস্ত বনে যে এক কঠিন নীরবতা!

'খড়গবর্মা, এ কি! মনে হচ্ছে যেন কোনো এক রাক্ষস একসঙ্গে সমস্ত আদিবাসীদের যেন গিলে ফেলেছে। কোনো সাড়া নেই, কোনো শব্দ নেই। হল কী?' জীবদত্ত বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল।

'কেমন যেন গোলমেলে লাগছে সব কিছু। এতক্ষণ আওয়াজ শুনে শুনে আমরা ওদের অনুসরণ করছিলাম। কিন্তু এখন, আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না, এগোবো কোন দিকে? আর না এগোলে ওদের ধরব কী করে? মারব কী করে? আর সমরবাহুকে উদ্ধারই বা করব কী করে? আমি তো কিছুই ভেবে পাচ্ছি না।' খড়গবর্মার প্রশ্নে উদবেগ প্রকাশ পেল।

ঠিক সেইসময় কাছের গাছের আড়াল থেকে নেকড়ের ডাক শোনা গেল। তাদের আর্তনাদ শুনে জীবদত্ত বলল, 'এ তো তাজ্জব ব্যাপার। দিনদুপুরে এই ধরনের নেকড়ের ডাক, কী ব্যাপার! নিশ্চয় কিছু ঘটেছে।' বলতে বলতে জীবদত্ত ওই গাছের দিকে এগিয়ে গেল।

গাছের কাছে গিয়ে দেখে ওই গাছের ডালগুলো নুয়ে আছে। তাদের আড়ালে দাঁড়িয়ে ওরা দেখতে পেল দূরের সবুজ খেত। চাষ-আবাদ করা খেতের মতো দেখাচ্ছিল ওই খেত। অন্যান্য গাছের ডালে ডালে ফলের বাহার। কিন্তু জীবদত্ত বা খড়গবর্মার কাছে ওসব বিশেষ আকর্ষণের বস্তু নয়। নজরে পড়ল চার জন লোক খেতে জল ঢালছে। ভালুকের চামড়া পরা বাকি দু-জন গাছের নীচে দুটো ভেড়া নিয়ে বসে আছে। এখন তারা গোটা ব্যাপার অনুমান করতে পারল।

'খড়গবর্মা, ভালুকের চামড়া পরা লোকগুলো বনের কিছুটা জমিতে চাষ-আবাদ করছে। ওরা যাদের দিয়ে খেতের কাজ করাচ্ছে তাদের অন্য জাতের লোক মনে হচ্ছে। হয়তো ওরা এই চামড়া পরা লোকগুলোর গোলাম।' জীবদত্ত বলল।

'তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মনে হচ্ছে ওই মানুষগুলোকে পাহারা দেবার জন্যই নেকড়ে রাখা হয়েছে। সমরবাহুকে বেঁধে একদল নিয়ে গেছে অন্য কোথাও।' খড়গবর্মা বলল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত এইসব কথা বলাবলি করছিল। আর তখনই ওরা দেখতে পেল খেতের গাছের আড়ালে আড়ালে নুয়ে হাঁটতে হাঁটতে একজন এগিয়ে যাচ্ছে। ভালুকের চামড়া পরাদের একজনের ঘুম পেয়েছিল। সে একটি গাছের নীচে বসে ঘুমে ঢুলে পরছিল। তা লক্ষ করে জীবদত্ত খড়গবর্মাকে বলল, 'খড়গবর্মা, মনে হচ্ছে ওই লোকটা ভালুকের চামড়া পরা ঝিমানো লোকটাকে শেষ করার তালে আছে। দেখতে পাচ্ছ ওর চলা...।' জীবদত্ত হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।

গোলাম পাহারাদারের পিছনে ছিল। জলপাত্র থেকে একটা পাথর তুলে পাহারাদারের মাথায় আঘাত করল। পাহারাদার আঘাতের চোটে জোরে আর্তনাদ করে উঠল। পরক্ষণেই সামনের দিকে তার মাথা ঝুঁকে পড়ল। গোলাম এক দৌড়ে বনে ঢুকে গেল।

সাথীর অবস্থা দেখে অন্য পাহারাদার গোলামকে ধরার জন্য তার পেছনে ধাওয়া করল। নেকড়েগুলোকেও তার দিকে লেলিয়ে দিল। নেকড়ে দুটো ভয়ংকর গর্জন করতে করতে ওই গোলামের পিছু ধেয়ে গেল। আর নেকড়ের পেছনে ছুটতে লাগল ওই পাহারাদার।

'খড়গবর্মা, সমরবাহুর কপাল ভালো যে আমরা এদিকে এসেছি। তিনটে গোলাম এখানেই রয়ে গেছে। আমরা তো ওই গোলামদের কাছ থেকে ভালুকের চামড়া পরা লোকদের আস্তানা কোথায় জেনে নিতে পারি।' এ-কথা আলোচনা করতে করতে জীবদত্ত খেতের গাছের আড়ালে ভয়ে ভয়ে দাঁড়ানো সেই লোকগুলোকে জোরে ডাকল।

জীবদত্তের কথা শুনে গোলামরা চমকে উঠল। খড়গবর্মা হাত তুলে ওদের ইশারা করে কাছে ডাকল। পরক্ষণেই ওই তিন জন গোলাম একসঙ্গে বনের দিকে ছুটে পালাল।

জীবদত্ত হো-হো করে হেসে উঠে বলল, 'খড়গবর্মা, মনে হচ্ছে আমরা পথ ভুলে এই পাগলদের মধ্যে এসে পড়েছি। পাহারাদার একজন গোলামের পিছনে ধাওয়ার করে চলেছে। এদের পাহারা দেবার কোনো লোক নেই তবু এরা এমনভাবে জল তুলছে যেন কিছুই হয়নি এখানে। আমাদের দিকে ওই তিন জন এমনভাবে তাকাল যেন ভূত দেখছে!'

এখন আমরা কী করব? পালানো গোলামকে ধাওয়া করব? নেকড়ের গর্জন শুনতে পেয়েছ তো? এবার চল এগিয়ে দেখি সমরবাহুকে যারা বেঁধে নিয়ে গেল সেই ভালুক চমড়াধারীদের দেখা পাই কি না। ওদের সন্ধান পেলেও পেতে পারি।' খড়গবর্মা বলল।

তারপর খড়গবর্মা ও জীবদত্ত দু-জনে বনে ঢুকল। যেদিকে নেকড়ের গর্জন শোনা যাচ্ছিল সেইদিকে ওরা গেল। কিছুক্ষণ যাবার পর ওরা ডমরু ও অন্য ধরনের বাজনার আওয়াজ শুনতে পেল। দু-জনে ওদিকে তাকল। দূরে দেখতে পেল কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে আকাশ যেন ছেয়ে ফেলেছে।

'খড়গবর্মা মনে হচ্ছে ভালুক চামড়াধারী লোকগুলো সমরবাহুকে নিয়ে মারাত্মক কিছু একটা করে ফেলবে। ওরা আগুন ধরাচ্ছে কেন? সমরবাহুকে পুড়িয়ে ফেলবে না তো?' জীবদত্ত জিজ্ঞেস করল।

'হয়তো পোড়াবে। আমাদের আরও জোরে পা চালিয়ে যাওয়া উচিত।' এ-কথা বলে খড়গবর্মা খাপ থেকে তরবরি বের করল। তারপর ওরা দু-জনে ওই আগুন আর ধোঁয়ার দিকে এগিয়ে গেল।

বারো

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত সেই গাছের কাছে গেল যেখানে আগুন আর ধোঁয়া দেখা গিয়েছিল। একটা গাছে উঠে ওরা দেখতে লাগল ভালুকের চামড়া পরা লোকের কাজকর্ম। কাজেই তারা দেখতে পেল এক বিল। ওরা শিকার করে আনা জন্তুজানোয়ারদের পোড়াচ্ছিল। কেউ আবার বাজনা বাজিয়ে ভালুক নাচিয়ে আনন্দ করতে লাগল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত যখন যেখানে পৌঁছাল তখন সেখানে সমরবাহু ছিল না। ভালুক জাতের নেতা তাকে সেই বিলের ভেতর নিয়ে গিয়েছিল। খড়গবর্মা ও জীবদত্ত দু-জনেই উঁচু গাছ থেকে অনুমান করল বিলে নামার সিঁড়ি থাকতে পারে। তাদের অনুমান যে সত্য তার প্রমাণও তারা পেল।

'জীবদত্ত, এই বুনোদের বাস মনে হচ্ছে এই বিলের ভেতরেই আছে। এই বিলের ভেতর থেকে নিশ্চয়ই বনে যাওয়ার অন্য কোনো রাস্তা আছে। এই লোকগুলো সমরবাহুকে পুড়িয়ে খাচ্ছে বলে আমার মনে হচ্ছে না।' খড়গবর্মা বলল।

জীবদত্ত ওই অঞ্চলটাকে ভালোভাবে লক্ষ করে দেখল। তারপর সে চাপা গলায় বলল, 'স্বর্ণাচারি ওদের মানুষখেকো ভেবেছে। তাই অতটা হাঁকপাক করছে। এরা বনে যেভাবে খেতের কাজ করছে তা দেখে এদের মানুষখেকো ভাবতে পারছি না। আমার মনে হয় এরা যেসব লোককে ধরে তাদের দিয়েই খেতের কাজকর্ম করায়। তাদের গোলাম করে খাটায়। সমরবাহু ও তার অনুচরদের এরা সুড়ঙ্গের ভেতরে নিয়ে গেছে বোধ হয়। আমি নিশ্চিত এরা মানুষখেকো নয়।'

খড়গবর্মাও মনে মনে এই কথাই ভাবছিল। সে গাছের অনেক উঁচু একটা ডালে উঠে বলল, 'এরা শিকার করা জন্তুজানোয়ার পোড়াচ্ছে। মানুষ পোড়াচ্ছে না।'

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত যখন এই ধরনের কথা নিজেরা বলাবলি করছিল তখনই ভালুক জাতের নেতা সমরবাহু ও তার অনুচরকে নিজেদের গুরুর কাছে নিয়ে গেল। ঝুঁকে তাকে প্রণাম করে বলল, 'গুরু ভালুক! এদের দু-জনকে আমরা বনে পেয়েছি। এদের দেখে মনে হচ্ছে এরা বীর, সাহসী এবং লড়াই করতে পারে। এদের আমাদের অধীনে আনা, মনে হচ্ছে শক্ত হবে গুরু!'

গুরু ভালুক গোলাকৃতি সমতলের উপর বসানো শিলার উপর বসেছিল। সেটা ঢাকা ছিল ভালুকের চামড়ায়। আসন থেকে সামনের দিকে ঝোলানো ছিল ভালুকের মাথা। গুরু ভালুকের দু-দিকে দুটো নেকড়ে ওত পেতে যেন মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়েছিল। বল্লম হাতে কয়েক জন ভালুক জাতের লোক এদিক-ওদিকে দাঁড়িয়ে বন্দিদের দিকে তাকিয়েছিল।

পরিবেশ এবং সকলের হাবভাব দেখে কেমন যেন লাগছিল। ভালুক জাতের লোক আর কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন সমরবাহু ও তার অনুচরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে। ওরাও নেকড়ের পেটে যাবে ভেবে নিয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ভালুক জাতের নেতার কথা শুনে গুরু ভালুক মাথা নাড়তে নাড়তে সমরবাহুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোমার পোশাক দেখে মনে হচ্ছে তুমি শহুরে লোক। তুমি কোন উদ্দেশ্যে এই বনে এলে?'

সমরবাহু বুঝতে পারল না এই প্রশ্নের কী জবাব দেবে! কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'আমি শহরের লোক নই। সিন্ধু রেগিস্থান থেকে এই প্রদেশে এসেছি। আমার অনুচরের সংখ্যা কয়েক-শো। আমাকে যে বন্দি করা হয়েছে তা আমার অনুচররা এক সময় ঠিক জানতে পারবে। তখন ওরা দল বেঁধে এই সুড়ঙ্গে ঢুকে তোমাকে আর তোমার এই সুড়ঙ্গ বাড়িটার সর্বনাশ করে ফেলবে।'

'বেশ, বেশ! তোমার গলার জোর আছে। তোমার সাহস আর পৌরুষ তারিফ করার মতো।' বলতে বলতে গুরু ভালুক জোরে হেসে উঠে বলল, 'তোমার অনুচররা আমার সুড়ঙ্গে ঢোকার আগেই আমার ভালুক সেবকরা তাদের নেকড়ের পেটে পুরে দেবে। তাই বলছি, আমার সামনে বড়ো বড়ো কথা বলে বক বক করো না। আমি জানি তোমাকে আর তোমার অনুচরদের কীভাবে আমাদের অধীনে আনতে হয়। কীভাবে তোমাদের গোলাম বানিয়ে অন্য গোলামদের সাথে জুড়ে খেতখামারের কাজ করাতে হয়।'

গুরু ভালুকের মুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই তার দু-জন অনুচর ছুটতে ছুটতে এসে সমরবাহু ও তার অনুচরকে দেখে থ বনে দাঁড়িয়ে পড়ল। গুরু ভালুক তাদের জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার, বল? তোমরা অমনভাবে ওদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছ কেন?'

আগন্তুক এ-কথা শুনে সমরবাহুর দিকে তাকিয়ে রইল। তখন গুরু ভালুক রেগে গিয়ে বলল, 'হোক গোপন কথা, বল। এরা আমাদের হাতে বন্দি। এদের কোনো ক্ষমতা নেই। এদের আমি এক্ষুনি নেকড়ের আস্তানায় ছুড়ে দিচ্ছি।'

'গুরু ভালুক, কথাটা যে অত্যন্ত গোপনীয়। আপনার একার এই কথা শোনা উচিত।' এ-কথা বলে দু-জনে গুরুর কাছে গিয়ে তার কানে কানে কী যেন বলল।

গুরু ভালুক কিছুক্ষণের জন্য থ বনে বসে রইল। তারপর সমরবাহুকে যে ভালুক নেতা ধরে এনেছিল তার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'তোমার ঘটে দেখছি কিচ্ছু নেই।' কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে নীরব থেকে আবার বলল, 'ভালো কথা, এই দু-জন বন্দিকে নেকড়ের আস্তানায় ছেড়ে দিয়ে এসো। হ্যাঁ, সেখানে ছাড়ার আগে এদের বাঁধন খুলে দাও। এই দু-জনের হাতে দুটো বল্লম দিয়ে দেবে।'

গুরু ভালুকের আদেশ পেয়ে তার অনুচররা সমরবাহু ও তার অনুচরের বাঁধন খুলে দিল। ওদের হাতে বল্লম দিয়ে বলল, 'এবার চল।' তারপর ওদের সুড়ঙ্গপথে নিয়ে গেল।

ওদের যাওয়ার পরেই গুরু ভালুক নিজের অনুচরদের দিকে ফিরে বলল, 'এই নবাগতরা আমাদের সুড়ঙ্গের রহস্য হয়তো জেনে গেছে। ওদের উপর তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখবে। ওরা এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করলে তৎক্ষণাৎ ধরে আনবে আমার কাছে।'

'আজ্ঞে তাই হবে হুজুর!' বলে মাথা নত করে নমস্কার করে দশ-বারো জন অনুচর সুড়ঙ্গপথে চলে গেল।

গাছের ডালে বসে সব লক্ষ করে খড়গবর্মা ও জীবদত্তের মনে হল, দিনের বেলা ভালুক জাতের লোকের সুড়ঙ্গের ধারে-কাছে গেলে বিপদে পড়তে হবে। ভালুক জাতের লোক ভালুক নাচিয়ে শিকার করে ধরে আনা জন্তুজানোয়ার পুড়িয়ে পোড়া মাংস খাচ্ছিল। দুপুরের কড়া রোদে সমস্ত বন যেন তেতে ছিল। জীবদত্ত গাছ থেকে নীচে নামতে নামতে খড়গবর্মাকে বলল, 'খড়গবর্মা, আমার যা দেখার, দেখা হয়ে গেছে। এখানে সময় কাটানো বৃথা। ভীষণ খিদে পেয়েছে। এখানকার কোনো পুকুরে স্নান করে গাছের ফল খেয়ে কাটাতে হবে। অন্ধকার হয়ে গেলে সুড়ঙ্গে ঢোকার চেষ্টা করতে হবে।

খড়গবর্মা জীবদত্তের কথা শুনে চুপচাপ গাছ থেকে নেমে পড়ল। দু-জনে জলের সন্ধানে বেরুল। কিছুক্ষণ পরে ওরা একটা পুকুরের সন্ধান পেল। ওই পুকুরের চারপাশে ঝোপঝাড় আর গাছপালা ভরা ছিল। জন্তুজানোয়ার যে ওই পুকুরে এসে জল খেয়ে যায় তার চিহ্ন জীবদত্ত লক্ষ করল।

'খড়গবর্মা, তাড়াতাড়ি স্নান করে এখান থেকে কেটে পড়া উচিত। মনে হচ্ছে এখানকার পশু আর ভালুক জাতের লোক এই পুকুরের জল ব্যবহার করে।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্তের মুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই ঝোপঝাড় থেকে চার-পাঁচটা বুনো মুরগি ডাকতে ডাকতে সেদিকে আসছিল। ওদের দেখেই তির ছুড়ে খড়গবর্মা বলল, 'অনেক দিন হয়ে গেল মুরগির মাংস খাইনি।'

তির সাঁ করে ছুটল কিন্তু কোনো মুরগির গায়ে তা বিদ্ধ হল না। ডাকতে ডাকতে মুরগিগুলো মুহূর্তে উড়ে গেল। পরক্ষণেই শোনা গেল মানুষের আর্তনাদ, 'হে গুরু ভালুক মরে গেলাম!'

এই আর্তনাদ শুনে মুহূর্তের জন্য খড়গবর্মা ও জীবদত্ত নীরব রইল।

'খড়গবর্মা এ এক বিচিত্র ব্যাপার তো! তোমার ছোড়া তির মুরগির গায়ে লাগল না, লাগল গিয়ে ঝোপে বসে থাকা বুনো লোকের গায়ে। কিন্তু এই গুরু ভালুকটা আবার কে?' এ-কথা বলে জীবদত্ত ওই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল। খড়গবর্মা তাকে অনুসরণ করল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত ঝোপের কাছে গিয়ে দেখতে পেল ভালুক চামড়াধারী একটা লোক রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। খড়গবর্মার তির তার বুকে বিদ্ধ ছিল।

জীবদত্ত তার কাছে গিয়ে বলল, 'তোমার পোশাক দেখেই আমরা বুঝতে পেরেছি তুমি কে? আমরা তোমাকে মারার জন্য তির ছুড়িনি। আচ্ছা, তুমি ঝোপে লুকিয়ে কী করছিলে?'

বিক্ষত লোকটা জীবদত্তের কথা শুনতে পেল কিন্তু জবাব দেবার মতো শক্তিসামর্থ্য তার ছিল না। মাটিতে গড়াতে গড়াতে বিড়বিড় করে বলছিল, 'গুরু ভালুক! গুরু ভালুক!'

'জীবদত্ত, লোকটা আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত বাঁচতে পারে। আমি বুঝতে পারছি না লোকটা মুরগি ধরার জন্য ঝোপে লুকিয়েছিল, না আমাদের লক্ষ করছিল।' খড়গবর্মা বলল।

'তোমার প্রশ্নের জবাব যে দিতে পারে তার আত্মা এতক্ষণে বোধ হয় গুরু ভালুকের মধ্যে মিশে গেছে।' এ-কথা বলে জীবদত্ত পিছনের দিকে ঘুরল।

খড়গবর্মা ভালুক জাতের লোককে ভালোভাবে লক্ষ করে দেখল। বুঝল লোকটা মারা গেছে। তখন সেও জীবদত্তের সাথে ঝোপ থেকে বেরিয়ে পুকুরের ধারে গেল। তারপর দু-জনে পুকুরে স্নান করল। আশপাশের গাছের ফল পেড়ে খেল। একটি গাছের নীচে শুয়ে তারা বিশ্রাম করল। অনুমান করল ভালুক জাতের লোক তাদের গতিবিধির উপর নজর রাখছে। অনেক ভেবে তারা ঠিক করল ওদের হাত থেকে সমরবাহুকে মুক্ত না করে সেখান থেকে যাওয়া উচিত হবে না।

সূর্যাস্তের একটু পরে সমস্ত বনে অন্ধকার ছেয়ে গেল। তারপর সুড়ঙ্গপথে পা বাড়াল খড়গবর্মা ও জীবদত্ত। খুব সাবধানে তারা এগোচ্ছিল। কেউ তাদের অনুসরণ করছে কি না সেদিকেও তারা সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে সুড়ঙ্গের কাছে গিয়ে তারা লক্ষ করল সেখানে কোনো পাহারাদার নেই।

'খড়গবর্মা এখানকার ব্যাপার বুঝতে পারছ তো? এই সুড়ঙ্গের ভালুক জাতের লোক ভাবছে ওরা আমাদের বেশ কায়দা করে বন্দি করতে পারবে।... ব্যাটারা বুঝতে পারছে না যে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের একটা বিরাট সর্বনাশ হতে যাচ্ছে।' জীবদত্ত সুড়ঙ্গপথে নামতে নামতে বলল।

খড়গবর্মাও তাকে অনুসরণ করে সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। ওরা এইভাবে অন্ধকারে সিঁড়ি ভেঙে যেতে যেতে একটা ফাঁকা জায়গায় গিয়ে পৌঁছাল। হঠাৎ অন্ধকার থেকে বল্লম উঁচিয়ে দশ-বারো জন ভালুক জাতের লোক বেরিয়ে এসে বলল, 'দাঁড়াও! আর এক-পা এগিয়েছ কী তোমাদের বুকে বল্লম গেঁথে দেব।'

জীবদত্ত ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, 'তোমরা অত কষ্ট করতে যাচ্ছ কেন? সোজা নিয়ে গিয়ে নেকড়েদের খেতে দাও না। কিন্তু তার আগে একটু গুরু ভালুকের দর্শন করিয়ে দাও।'

এ-কথা শুনে ভালুক জাতের একজন আস্তে আস্তে বলল, 'আ! অত জোরে বোলো না।' গুরু ভালুক এখন বৃকেশ্বরীর পূজা করছেন। তোমাদের আমরা এখন নেকড়ের আস্তানায় ফেলে আসব। সেখান থেকে নিজের ক্ষমতাবলে যদি ফিরে আসতে পার তখন গুরু ভালুকের দর্শন করিয়ে দেব।'

'ভালো কথা, তাড়াতাড়ি বল, ওই নেকড়ের আস্তানা কোথায়?' জীবদত্ত হাসি চেপে জিজ্ঞেস করল।

'তাড়াহুড়ো করো না। সেখানেই যাচ্ছি।' এ-কথা বলে ভালুক জাতের লোকেরা খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে ঘিরে নিয়ে যেতে লাগল। দূর থেকে ভেসে আসছে নেকড়ের গর্জন আর মানুষের ভয়ার্ত চিৎকার আর আর্তনাদ। সুড়ঙ্গের গায়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

'খড়গবর্মা, এই আর্তনাদ সমরবাহু ও তার অনুচরের হবে। নেকড়েগুলো ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে কি না কে জানে!' জীবদত্ত বলল। এই কথার জবাবে খড়গবর্মা কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় ভালুক জাতের একজন বল্লম উঁচিয়ে বলল, 'চুপচাপ চল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে নিজের চোখেই দেখতে পাবে নেকড়েগুলো কী করছে!'

তেরো

সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গপথ ধরে এগোতে এগোতে হঠাৎ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা।

সামনের লোকটা পিছনের লোকটাকে বলল, 'ওরে ও ভাই এ ব্যাটারা নেকড়েদের আস্তানাকে একটা মজার জায়গা ভেবে বসে আছে। এর আগের বারে যাদের এনেছিলাম তারা তো নেকড়ের গর্জন শুনেই ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। কিন্তু এই দু-জনকে দেখলে মনে হয় এরা একটুও ভয় পায়নি। এদের ভালো করে দেখিয়ে দিই নেকড়ের আস্তানা কী জিনিস!' তখন এদের পিলে চমকে যাবে।

দ্বিতীয় লোকটা খিঁচিয়ে উঠল, 'এখানে অহেতুক আজেবাজে কথা ভেবে সময় নষ্ট করে কী লাভ? এদের তো শেষপর্যন্ত সেখানেই নিয়ে যেতে হবে। এরা নিজেদের চোখে না দেখলে তো বিশ্বাস করতেই পারবে না।' তখন সবাই টের পাবে নেকড়ে কী জিনিস।

'না, আমি বলছি প্রথমেই যদি আমরা এদের সেই ভয়ংকর জায়গাটা দেখিয়ে দিই তাহলে এরা ভীষণভাবে ঘাবড়ে যাবে।'

এ-কথা বলে প্রথম লোকটা অন্ধকারে কিছুক্ষণ কী যেন খুঁজতে লাগল।

তারপর একটা কী যেন নাড়াল। তৎক্ষণাৎ একটা দরজা খুলে গেল।

সেই খোলা দরজা দিয়ে জ্যোৎস্না ছড়িয়ে পড়ল ঘরে।

সেই জ্যোৎস্নার আলাকে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত সুড়ঙ্গের ভিতরে কী আছে না আছে দেখে নিল। সুড়ঙ্গটা কেমন যেন খাড়া ও চওড়া। সোজা একটা পথ চলে গেছে। আবার ডাইনে বাঁয়েও দুটো পথ আছে। সেই পথগুলোও নজরে পড়ল খড়গবর্মা ও জীবদত্তের।

'খড়গবর্মা এটাকে খুব একটা ছোটোখাটো সুড়ঙ্গ বলে মনে হচ্ছে না। এই সুড়ঙ্গ ধরে এগোলে আমরা হয়তো একটা বিরাট অঞ্চল দেখতে পাব যা এই ভালুক জাতের লোক গঠন করেছে। এতে নিশ্চয় ওরা এমন সব জায়গা করে রেখেছে যাতে শত্রুর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্তের মুখ থেকে এই ধরনের কথা শুনে ভালুক জাতের একজন হেসে বলল, 'তোমার দেখছি অনুমান করার অসীম ক্ষমতা আছে। এতে যে শুধু লোকজন লুকোতে পারে তাই নয় প্রয়োজন বোধে অনেক দিন লুকিয়ে থেকে বসে বসে খেতেও পারে। বহুলোকের খাবার মতো খাদ্যের গোপন গোদামও অনেক আছে।'

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত ওর কথা মন দিয়ে শুনছে দেখে লোকটা উৎসাহিত হয়ে বলল, 'কোনোরকমে তোমরা যদি ওই নেকড়েদের কাছ থেকে বেঁচে আসতে পার তাহলে বাকি জীবনটা তোমরা বেশ ভালোভাবেই গুরু ভালুকের সেবা করে কাটিয়ে দিতে পারবে।'

'আমরাও নেকড়েদের আস্তানাটা তাড়াতাড়ি দেখে নিতে চাই। ওটা যে কতখানি ভয়ংকর জায়গা তা একবার নিজের চোখে না দেখে শান্তি পাচ্ছি না।' জীবদত্ত বলল।

তক্ষুনি ভালুক জাতের একটা লোক ওই দরজা দিয়ে ঢুকে বেরুল। খড়গবর্মা ও জীবদত্ত বাইরের দৃশ্যটা একবার দেখতে পেল। ভালুক জাতের লোকটা যা বলেছিল তাই সত্য। জ্যোৎস্নার আলাকে তারা দেখতে পেল বহু নেকড়ে এক জায়গায় অস্থিরভাবে ঘোরাঘুরি করছে। বিরাট এক সমতলভূমির মাঝখানে চোদ্দো পনেরো ফুট উঁচু এক পাহাড়ের উপরে দুটো বল্লম নিয়ে দু-জন লোক যথাসাধ্য জোরে ধমক দিচ্ছে নেকড়েদের। আর নেকড়েগুলো গর্জন করতে করতে ওই উঁচু পাহাড়ের অংশে উঠে ওই দু-জনকে টেনে নামিয়ে ছিঁড়ে খেতে চাইছে।

'আচ্ছা, ওই দু-জনের একজনকে দেখে, বিশেষ করে তার পোশাক দেখে মনে হচ্ছে ও সমরবাহু?' জীবদত্ত বলল।

প্রশ্নটা খড়গবর্মাকে করলেও একজন ভালুক জাতের লোক বলল, 'আমরা জানি না ও কোন বাহু। তবে এটুকু জানি যে সূর্যোদয়ের আগে ওরা নেকড়েদের পেটে যাবে। তারপর তোমাদের দু-জনকেও ওই পাথরের উপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে। তোমাদেরও ওই ওদের অবস্থাই হবে। তবে কোনোরকমে যদি দেবী বৃকেশ্বরীর কৃপায় তোমরা বেঁচে যেতে পার তাহলে তোমাদের বাকি জীবন গুরু ভালুকের সেবা করে সুন্দরভাবে কেটে যাবে।'

তার মুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই জীবদত্ত তাকে ধমক দিয়ে বলল, 'আরে বাবা, কথায় কথায় অত গুরুর নাম করছ কেন? ওই পাথরের উপর আমাদের রেখে দেওয়া হবে তো? ভালো কথা। আমরা ওই পাথরের উপরে যেতে চাই। আমাদের এক্ষুনি যেতে দাও না কেন। আমরা নিজেরাই চলে যেতে পারি। তোমরা তোমাদের কাজে যাও।'

'অদ্ভুত কথা। এখান থেকে ওই পাথরের উপরে যেতে হলে দরজার ওপার থেকে দশ ফুট নীচে লাফাতে হবে। তারপর নেকড়ের ভিতর দিয়ে হেটে গিয়ে ওই পাথরের উপর উঠতে হবে। নেকড়েদের কাছে গেলে তোমরা আর প্রাণে বাঁচতে পারবে? নেকড়েগুলো তোমাদের একেবারে ফেড়ে ফেলবে। চোখের পলকে তোমাদের দু-জনকে খেয়ে শেষ করে ফেলবে।' ভালুক জাতের একজন বলল।

'বেশ ভালো কথা। এখন তোমরা কীভাবে নিয়ে যেতে চাও বল?' খড়গবর্মা দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের প্রশ্ন করল।

'আর একটা সুড়ঙ্গ পথ আছে। সেই পথ ধরে গেলে সোজা ওই নেকড়েদের মাঝের পাথরের কাছে পৌঁছে যাবে। ওই পথে না গেলে কোনো উপায় নেই।' ভালুক জাতের লোক বলল।

'বেশ চল। অযথা দেরি করে আর আজেবাজে কথা বলে সময় কাটানোর কী দরকার!' জীবদত্ত বলল।

তাদের কাছে মনে হল বেশি দেরি হলে সমরবাহু ও তার অনুচরকে নেকড়েগুলো শেষ করে ফেলবে। এবং তা যদি হয় তাহলে এত কষ্ট করে এই সুড়ঙ্গপথে আসা অসার্থক হবে।

তারপর ভালুক জাতের লোক সুড়ঙ্গের উপরের দরজা বন্ধ করে দিল। কিছুদূর ওরা এগিয়ে গেল।

সেখানে সিঁড়ি দিয়ে তুলল খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে।

ওরা দেখতে পেল অদ্ভুত আলগা একটা পাথরের টুকরো। ওই পাথরের সংলগ্ন এক সোনার ছড়ি ধরে ওরা জোরে টান মারল। পাথরটা নড়ে একপাশে সরে গেল। ওরা সেখান থেকে দেখতে পেল সমরবাহু ও তার অনুচরকে। খুব কাছ থেকে তাদের এই প্রথম দেখা গেল ও পরিষ্কার চিনতে পারল।

পাথরটা সরার সময় যে আওয়াজ হল তা কানে যেতেই সমরবাহু আর্তনাদ করে উঠল, 'ওরে চন্দু, পাথরের পেট থেকে নেকড়েগুলো উপরের দিকে উঠে আসছে!'

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত উপরে উঠতে উঠতে বলল, 'সমরবাহু, ভয় পেয়ো না। আমরা তোমার বন্ধু।'

খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে দেখে সমরবাহুর তো চক্ষুস্থির! কী যেন বলার চেষ্টা করল কিন্তু তার মুখে কোনো কথা সরল না। ওই পথটা পাথরের টুকরো দিয়ে বন্ধ করতে করতে ভালুক জাতের লোক বলল, 'ও তোমরা তাহলে এক গোয়ালের গোরু। তাহলে তো ভালোই হল সবাই একসঙ্গে নেকড়ের পেটে যাবে। বেশ মজা হবে!'

খড়গবর্মা রক্তচক্ষু করে তার দিকে তাকাল কিন্তু তক্ষুনি ওই পাথরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জীবদত্ত সমরবাহুর কাঁধ চাপড়ে বলল, 'সমরবাহু, ভয় পেয়ো না। স্বর্ণাচারির কাছে আমরা সব খবর পেয়েছি। সে আমাদের পুরোনো বন্ধু। এই মারাত্মক জায়গা থেকে নিরাপদে নিজেদের আস্তানায় যাব। বিশ্বাস রাখ।'

'আমরা পৈত্রিক প্রাণটা নিয়ে এখান থেকে যেতে পারব! এ কী করে সম্ভব! এই পাথর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ তো ওরা পাথর চাপা দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। আর এমনি নামতে গেলে তো নেকড়েদের পেটে যেতে হবে।' সমরবাহু নিরাশ হয়ে বলল।

'ওই নেকড়ে আর আমাদের যারা বন্দি করেছে তারাই আমাদের পথ দেখাবে। এই পাথরের চারপাশে দুর্গের প্রাচীর। উপরে আমরা চাঁদ দেখতে পাচ্ছি। সব দেখে-শুনে মনে হচ্ছে এই অঞ্চলে ঢোকার দু-একটা সুড়ঙ্গ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।' জীবদত্ত বলল।

'আপনার কথা বুঝলাম। কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না কীভাবে, কোন কৌশলে আমরা এখান থেকে বেরিয়ে পালাতে পারব।' সমরবাহু বলল।

জীবদত্ত এই কথার জবাবে কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় একটা নেকড়ে লাফিয়ে ওদের প্রায় কাছে এসে পড়ল। পাথরের খাঁজে একটা পা রেখে উপরে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঠিক সেই মহূর্তে খড়গবর্মা তরবারি তুলে তার ঘাড়ে দিল একটা কোপ বসিয়ে। নেকড়ে ওই এক কোপেই মাটিতে পড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় গড়াগড়ি খেতে লাগল।

'খড়গবর্মা, খুব ভালো কাজ সময়মতো করেছ।' জীবদত্ত খড়গবর্মাকে প্রশংসা করল। বলল, 'বুঝলে সমরবাহু, এই মরা নেকড়েটা আমাদের কাজে দেবে। আচ্ছা তুমি কি শুনেছ ওরা নেকড়েদের খেতে দেয় কখন?'

'ওদের মুখে শুনেছি, সূর্যোদয় অথবা সূর্যাস্তের সময় ওরা কোনো জন্তুজানোয়ার মেরে ওদের সামনে ফেলে দেয়। তবে আজ আর ওদের সেই পরিশ্রম করার দরকার হবে না। কারণ আমাদের সবাইকে ছিড়ে খাবার পর নেকড়েদের আর খিদে থাকবে না।'

'খড়গবর্মা আমরা প্রথমে যে সুড়ঙ্গ পথ দেখতে পেয়েছিলাম সেই পথ দিয়েই ওরা বোধ হয় খেতে দেয়।' জীবদত্ত বলল।

দূরে একটা দরজা দেখতে পেল খড়গবর্মা। মাটি থেকে দশ ফুট উঁচুতে ছিল সেটা।

সেদিকে দেখিয়ে সে বলল, 'নেকড়েদের খাবার দেবার এটাই একমাত্র পথ আছে মনে হচ্ছে। কী ভাবছ? ভালো একটা পরিকল্পনা মাথা থেকে বের কর। তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরোতেই হবে।'

'গুরু ভালুক এমন একটা জায়গায় আমাদের পাঠিয়েছে যাতে কোনো পথ দিয়েই আমরা বেরোতে না পারি। এবং এটাই ওদের আর ওদের গুরুর কাল হবে।' জীবদত্ত চারদিক তাকাতে তাকাতে বলল।

তারপর কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই চুপচাপ। রাত গভীর হয়েছে। কোনোদিকে কোনো সাড়াশব্দ নেই নেকড়েদের গর্জন ছাড়া। একজন বাদে বাকি সবাই ওই পাথরের উপর ঘুমিয়ে পড়ল।

ভোর হতেই নেকড়েদের গর্জন যেন হাজার গুণ বেড়ে গেল। চারদিকে ছড়ানো নেকড়েগুলো যে পথে খাবার দেয় সেই পথের দরজার দিকে ধেয়ে গেল।

নেকড়েদের গর্জন শুনে সবার ঘুম ছুটে যায়। জীবদত্ত খড়গবর্মাকে ওই পথ দেখিয়ে বলল, 'আমরা যা ভেবেছিলাম সেটাই ঠিক। ভালুক জাতের লোকটা ওই দরজা দিয়ে নেকড়েদের খাবার ছুড়ে দেবার আয়োজন করছে। তুমি তির-ধনুক নিয়ে প্রস্তুত থাক। লোকটাকে দেখামাত্র তির ছুড়বে।'

জীবদত্তের কথামতো খড়গবর্মা তাক করে বসে রইল। সমরবাহু সে দৃশ্য দেখে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'অতগুলো লোকের মধ্যে আমরা দু-একজনকে মেরে ওদের কোনো ক্ষতি করতে পারব কি? আরও ঝামেলা বাড়বে। সবাই মারমুখী হয়ে যাবে। তখন আর কোনোদিক দিয়েই পালানোর পথ আমরা খুঁজে পাব না। ওরা আমাদের কাঁচা চিবিয়ে ফেলবে।'

সমরবাহুর সে-কথা শুনে হাসতে হাসতে জীবদত্ত বলল, 'সমরবাহু, এখন তো ওরা আমাদের নেকড়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নেকড়েগুলো যাতে টেনে ছিঁড়ে খেতে পারে তার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অপরাধীকে ঘৃণা করতে শেখ। ওদের বাঁচিয়ে রাখার অর্থ আমাদের মৃত্যু। মরার আগে মরিয়া হয়ে শেষ বারের মতো কিছু করা ভালো নয় কি?'

জীবদত্তের কথা শেষ হতে-না-হতেই ভয়ংকর এক আওয়াজ হয়ে দরজা খুলে গেল। ভালুক জাতের একটা লোক পশুর মাংস ভরতি একটা ঝুড়ি এনে নেকড়েদের দিকে মাংস ছুড়ে দিতে লাগল। ঠিক তখনই জীবদত্তের ইশারা পেয়ে খড়গবর্মা তির ছুড়ল। তির সোজা গিয়ে ভালুকজাতের একজনের মাথায় গভীরভাবে বিধল। সে আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। পরক্ষণে আর একজনও সুড়ঙ্গের পথে পড়ে গেল।

সাড়া সুড়ঙ্গে কোলাহল শুরু হয়ে গেল। বৃকেশ্বরীর সামনে পদ্মাসনে বসে ধ্যান করছিল গুরু ভালুক। আর্তনাদ আর কোলাহল শুনে চমকে উঠে বলল, 'এ কীসের চিৎকার? কোলাহল কীসের? নেকড়েগুলো কি খেতে পায়নি? কাল যাদের পাথরে তুলে দেওয়া হয়েছে তারা কি বেঁচে আছে?'

'গুরু! গুরু সর্বনাশ হয়ে গেছে। ওরা তির ছুড়ে আমাদের একজনকে মেরে ফেলেছে! ওদের কাছে আরও তির আছে! এখন আমাদের কী হবে গুরু?'

গুরু ভালুক চোখ লাল করে বলল, 'আমি বৃকেশ্বরীর শ্রেষ্ঠ ভক্ত! সাধারণ মানুষ কী করতে পারে আমার! ওদের সবাইকে আমি এক্ষুনি পঞ্চশূলের আহুতি করে দিচ্ছি।' বলে গুরু ভালুক সুড়ঙ্গপথে এগিয়ে গেল।

চোদ্দো

খড়গবর্মার তির লাগার সঙ্গে সঙ্গে ভালুক জাতের একজন শিষ্য আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ওর পড়ে যাওয়ার পর খড়গবর্মা ও জীবদত্তের টনক নড়ল। তারা তখন বুঝতে পারল যে তাদের বিপদ আসবে নেকড়েদের দিক থেকে নয়, তাদের এবার বিপদে ফেলবে ভালুক জাতের শিষ্যরা।

জীবদত্ত সুড়ঙ্গের উপরের দরজার দিকে কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকাল। লক্ষ করল তার দিকে কোনো শিষ্য এগিয়ে আসছে কি না। তারপর মাথা ঘুরিয়ে বলল, 'সমরবাহু, আমরা অবিলম্বে দু-দিক থেকে আক্রান্ত হতে পারি। আমরা যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছি তার নীচের সুড়ঙ্গপথে ওরা আসতে পারে আর অন্য পথ হল আমাদের সামনের ওই সুড়ঙ্গ পথ। তাই এই দুটো পথের দিকে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তাহাহুড়ো করে কিছু করলে আবার হিতে বিপরীত হবে।'

এ-কথা শুনে সমরবাহুর চোখ-মুখের অবস্থা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভাঙা গলায় বলল, 'হুজুর, আপনারা দু-জন আমার নেতা। আমাকে একমাত্র আপনারাই বাঁচাতে পারেন। আপনারা যা বলবেন তাই করব।'

সমরবাহুর অতটা ঘাবড়ানো দেখে খড়গবর্মার হাসি পেল। হাসি চেপে সে বলল, 'সমরবাহু, বিঘ্নেশ্বর পূজারি ও স্বর্ণাচারির কাছে তোমার সম্পর্কে শুনেছি। জানতে পারলাম তুমি নাকি রেগিস্তান থেকে এসেছ এখানে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে? এত বড়ো কাজে বেরিয়ে এই সামান্য ঘটনায় তোমার এত ভয়? এই বিপদ থেকে কীভাবে মুক্ত হতে পারি সে সম্পর্কে একটু ভাবতে পার না?'

'কী ভাবব? এরা যে কি মারাত্মক ধরনের আপনি তা জানেন না। শত্রু ক্ষত্রিয় হলে আমি তৎক্ষণাৎ তরবারি দিয়ে আক্রমণ করতে পারতাম। কিন্তু এরা যে মন্ত্রতন্ত্র জানা নেকড়ে আর ভালুকের চামড়া পরা অদ্ভুত মানুষ নামক জন্তু। এদের বিরুদ্ধে কীভাবে লড়তে হয় আমি যে তা জানি না।' সমরবাহু কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।

সমরবাহুর কথা শুনে জীবদত্তের হাসি পেলেও সে তা প্রকাশ না করে বলল, 'সমরবাহু, তুমি যে কত বড়ো বীর তার প্রমাণ দেবার সময় এসেছে। এই পাথরের নীচের সুড়ঙ্গ দিয়ে যাতে কোনো শত্রু না আসে তার ব্যবস্থা তোমরা দু-জনে কর। এতক্ষণে গুরু ভালুক খবর পেয়ে গেছে যে তার এক শিষ্য তিরবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। এবার দেখা যাক ও কী করে!'

জীবদত্তের মুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই গুরু ভালুক সুড়ঙ্গের দরজায় দাঁড়িয়ে রক্তচক্ষু করে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ওরাও তাকিয়ে ছিল গুরু ভালুকের দিকে। গুরু ভালুক বলল, 'পাজি বদমাইশের দল! তোমাদের এত বড়ো সাহস! হুঁ! তোমরা স্বয়ং বৃকেশ্বরীর শিষ্যকে তির দিয়ে মেরে ফেলেছ! এখন তোমাদের পঞ্চশূলে বিদ্ধ করে নেকড়েদের খাবার করে ফেলছি। প্রস্তুত হও।'

গুরু ভালুকের আওয়াজ শুনতে পেয়ে নেকড়েগুলো গর্জন করতে লাগল। তারা যেন জোট পাকিয়ে অভিযোগ করছে তাদের খাবার-দাবার দেওয়া হয়নি বলে। প্রত্যেক দিন এই সময় খাবার দেওয়া হয় অথচ আজ খাবার দেবার লোকের পাত্তা নেই। তারা গুরু ভালুকের দিকে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে গর্জন করে প্রার্থনা করছে কি দাবি জানাচ্ছে বোঝা গেল না। নেকড়েগুলো অস্বাভাবিকভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে গর্জন করছে। গুরু ভালুক যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে ছিল তা মাটি থেকে মাত্র দশ ফুট উঁচু। নেকড়েগুলো যেরকম করছে হঠাৎ ওই পাথরের উপর লাফিয়ে উঠে পড়াও বিচিত্র নয়। আবার তক্ষুনি সুড়ঙ্গপথে ফিরে গেলে সমরবাহু প্রমুখরা তাকে ভীত ভাবতে পারে। এইসব সাত-পাঁচ ভেবে গুরু ভালুক না পারছে এগোতে না পারছে পেছতে। আবার পারছে না দাঁড়িয়ে থাকতেও। সে কেমন যেন হয়ে গেল। পাথরের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

জীবদত্ত এমন ভাব করল যেন সে গুরু ভালুকের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছে। হঠাৎ হাতের মন্ত্র দণ্ড উপরে তুলে চিৎকার করে বলল, 'ওরে এই গুরু ভালুক! আমি বুঝতে পারছি না, তুমি নিজে ভালুক জাতের হয়ে কেন বৃকেশ্বরীর পুজো করছ। তোমার তো ভালুকেশ্বরীর পুজো করা উচিত। বেশ বুঝতে পারছি তুমি বুদ্ধি খাটো আছ। এই দেখ আমি তোমার সামনে এতগুলো নেকড়ের মাঝ দিয়ে তোমার কাছে যাচ্ছি। তুমি পালিয়ো না। ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক। নড়বে না কিন্তু।'

এই ঘোষণা শুনে সমরবাহুর ভীষণ ভয় করল। জীবদত্ত যা বলেছে তাই করেছে। এখন যা বলছে তাও করতে পারে ভেবে সে বলল, 'কী বলছেন হুজুর! এই এতগুলো নেকড়ের ভিতর দিয়ে ওর কাছে যাবেন? এ কিন্তু সেধে বিপদ ডেকে আনা হচ্ছে। তা ছাড়া গুরু ভালুক মন্ত্রতন্ত্রও জানে।'

এ-কথার পিঠে খড়গবর্মা হাতের তরবারি উপরে তুলে বলল, 'সমরবাহু, আমার এই তরবারি আর জীবদত্তের ওই মন্ত্র দণ্ডের ক্ষমতা যে কত বেশি তা তুমি জানো না বলেই অত ভয় পাচ্ছ ওই গুরু ভালুককে।'

খড়গবর্মার কথা শেষ হতে-না-হতেই ওরা যে পাথরের উপর দাঁড়িয়েছিল তার ওপার থেকে অনেকগুলো মানুষের গলা শোনা গেল। ওই চিৎকার হইচই শুনে জীবদত্ত সঙ্গীসাথীদের সাবধান করে দিয়ে বলল, 'তোমরা সাবধানে থেকো। গুরু ভালুক এই পাথরের নীচের সুড়ঙ্গপথে কিছু শিষ্যকে পাঠিয়ে আমাদের আক্রমণ করার ব্যবস্থা করেছে।'

এই সাবধানবাণী শুনেই সমরবাহু ও অনুচর বল্লম তুলে পাথরের নীচের সুড়ঙ্গপথের দিকে তাক করে দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে ওদিক থেকে গুরু ভালুক তার এক শিষ্যকে বলল, 'এরা এত বোকা হয়ে গেল কেন বুঝতে পারছি না। আমি বলেছিলাম চুপচাপ গিয়ে অতর্কিতে ওদের উপর আক্রমণ করতে। কিন্তু এই জানোয়ারগুলো হইহই করে একটা দেশ জয় করার মতো গেল! ওরা তো বুঝে গেছে। এখন কী হবে! ওদের হাতে অস্ত্র দিয়ে ওই পাথরের উপর পাঠানোই ভুল হয়েছে দেখছি।'

জীবদত্ত অনুমান করতে পারল গুরু ভালুকের চিন্তাভাবনা। খড়গবর্মাকে সে বলল, 'খড়গবর্মা, এখন গুরু ভালুকের উপর তির চালানো বৃথা, তুমি তার দিকে তির-ধনুক ঠিক করে দাঁড়ালেই সে টের পেয়ে পালাবে। ও সুড়ঙ্গপথে ঢুকে গেলে আর তাকে ধরা যাবে না।'

'তোমার কথা ঠিক। কিন্তু সমরবাহুকে এদের হাত থেকে উদ্ধার করে স্বর্ণাচারির কাছে পাঠানো যাবে কী করে?' খড়গবর্মা জীবদত্তকে জিজ্ঞেস করল।

জীবদত্ত কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'খড়গবর্মা, সমরবাহুকে কী করে মুক্ত করা যায় তা আমি ভেবেছি। মনে আছে, আমরা সিংহ শিকার করে পদ্মপুরের রাজার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। ঠিক ওইভাবেই নেকড়ে শিকার করে এই সুড়ঙ্গে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করতে হবে।'

'তাহলে আর দেরি কেন? শুরু করা যাক।' খড়গবর্মা উৎসাহভরে বলল।

'তবে তাই হোক। তুমি ওই মরা নেকড়েটাকে কাঁধে ফেলে নাও। এর মাংস খাওয়ার জন্য নেকড়েগুলো তোমার পিছনে ধাওয়া করবে। সুযোগ পেলে অবশ্য তোমাকেও আক্রমণ করতে ছাড়বে না। অতএব সতর্ক থেকো। নিজের তরবারি সবসময় উঁচিয়ে রাখতে ভুলো না।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্ত মরা নেকড়েকে কাঁধে ফেলে নিল। জীবদত্তের কথা আর খড়গবর্মার কাজ সমরবাহু বুঝতে পারল না। ভয়ে ভয়ে বলল, 'হুজুর, আপনারা কী বলছেন আর কী করছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি কিন্তু ভীষণ ভয় পাচ্ছি।'

'সমরবাহু, ভয় পেয়ো না। নীচের সুড়ঙ্গপথ দিয়ে ওরা যদি এখানে আসতে চেষ্টা করে এক-এক জনকে বল্লম দিয়ে মেরে ফেলবে। ওরা দল বেঁধে এখানে আসতে পারবে না। এক-এক করেই এই সরু পথে আসতে বাধ্য। আমরা দু-জনে নেকড়েদের মধ্যে নেমে যাচ্ছি। চেষ্টা করব যে পথে গুরু ভালুক এসেছে ওই পথেই নেকড়েদের ঢুকিয়ে দিতে। তাহলেই এই সুড়ঙ্গে, এই দুর্গে দারুণ ছোটাছুটি পড়ে যাবে।'

'হুজুর, এ কিন্তু দুঃসাহসের কাজ হচ্ছে।' সমরবাহু বলল।

'সাহসের কাজ হতে পারে কিন্তু এটাকে দুঃসাহসের কাজ কোনোক্রমেই বলা যায় না। সমরবাহু আর কিছুক্ষণের মধ্যে তুমি নিজেই দেখতে পাবে।' জীবদত্ত হাসতে হাসতে বলল।

'জীবদত্ত, আজেবাজে কথাতেই সময় চলে যাচ্ছে। আমি আর কতক্ষণ এই মরা নেকড়ে কাঁধে করে দাঁড়িয়ে থাকব?' খড়গবর্মা বলল।

'এবার তাহলে নামছি। যতগুলো সম্ভব নেকড়েকে নিজের দিকে আকর্ষণ করবে। আমি তোমার পিছনে পিছনে ছুটতে থাকব। তারপর...'

জীবদত্তের কথা শেষ হতে-না-হতেই খড়গবর্মা চিৎকার করে বলল, 'ওহে গুরু ভালুক, আমরা তোমার কাছে যাচিছ। জানে বাঁচতে চাও তো তুমি আর তোমার বৃকেশ্বরীদেবী এই সুড়ঙ্গ আর দুর্গ ছেড়ে পালাও।' এ-কথা বলে খড়গবর্মা পাথরের উপর থেকে নীচে ঝাঁপ দিল।

দু-জন মানুষকে মরা নেকড়ে কাঁধে নিয়ে লাফিয়ে পড়তে দেখে নেকড়েগুলো গর্জন করে ওদের দিকে ধেয়ে এল।

খড়গবর্মা মরা নেকড়ে কাঁধে নিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছোটাছুটি করতে লাগল। নেকড়েদের পিছনে ছুটল জীবদত্ত। জীবদত্ত মন্ত্র দণ্ডের আঘাতে আঘাতে বহু নেকড়েকে এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে দিল।

সুড়ঙ্গের মুখে দাঁড়িয়ে এইসব ব্যাপারকে তামাশা ভেবে চিৎকার করে হাততালি বাজাতে বাজাতে বলল, 'এ সবই মা বৃকেশ্বরীর ইচ্ছা। শত্রুর মতিভ্রম ঘটিয়ে তাদের নিজের বাহনের মধ্যে নামিয়ে দিয়েছেন। স্বয়ং মা বৃকেশ্বরী ইচ্ছা করলে কী না করতে পারে।' এ-কথা বলে সে চোখ বুজে ভক্তিভরে উপরের দিকে তাকাল।

এতক্ষণ ঘুরছিল খড়গবর্মা ও জীবদত্ত। গুরু ভালুকের অবস্থা দেখে তারা ঠিক করল এই সুযোগেই যা করার করে ফেলতে হবে। জীবদত্ত খড়গবর্মাকে সতর্ক করে দিয়ে বলল, 'খড়গবর্মা, এই হল মোক্ষম মুহূর্ত।'

খড়গবর্মা পরমুহূর্তেই মরা নেকড়েকে কাঁধ থেকে তুলে সোজা ছুড়ে দিল গুরু ভালুকের উপর।

নিজেদের খাদ্যকে পড়তে দেখে চার-পাঁচটা নেকড়ে লাফিয়ে পড়ল সেইখানে। চোখ খুলে গুরু ভালুক দেখে তার কাছে একটি মৃত ও চার-পাঁচটা জ্যান্ত নেকড়ে লাফালাফি করছে।

তারপর গুরু ভালুক 'হে বৃকেশ্বরী!' বলে ডেকে উঠে নেকড়েদের ধাক্কা মেরে নীচে ফেলে দিলে, 'নেকড়ে! নেকড়ে!' বলে চিৎকার করতে লাগল শিষ্য ক-জন। তারা সুড়ঙ্গে চিৎকার করতে করতে ছোটাছুটি করতে লাগল।

গুরু ভালুক কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে পেল, তার কাছেই মৃত নেকড়েকে টেনে ছিঁড়ে খাচ্ছে কয়েকটা নেকড়ে। একটি নেকড়ে কিছুতেই সুযোগ পাচ্ছে না এক টুকরো ছিঁড়ে নেবার। সে একটু সরে দাঁড়িয়ে গুরু ভালুকের দিকে গর্জন করতে করতে তাকাচ্ছিল। তার মতলব বুঝতে পেরে গুরু ভালুক শূলে বিদ্ধ করে বলল, 'দেবী বৃকেশ্বরীর প্রধান ভক্তকেই তুই খেতে চাস! তোর এত বড়ো সাহস!' বলে পেছিয়ে সুড়ঙ্গপথে ঢুকে গেল গুরু ভালুক।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত আপ্রাণ চেষ্টা করছে অন্য নেকড়েদের তাড়া করে ওই সুড়ঙ্গপথে ঢুকিয়ে দেবার। ওরা বুঝতে পারল না সুড়ঙ্গে ইতিমধ্যে কী ঘটে গেছে! তারা এও জানতে পারল না যে গুরু ভালুক নেকড়ের পেটে গেছে কি না।

'খড়গবর্মা, আমাদের আর এখানে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। একটা খটকা রয়ে গেল। গুরু ভালুক মারা গেছে কি না সঠিক জানা গেল না। তবে এটা ঠিক নেকড়ে ঢোকার ফলে সুড়ঙ্গে এক দারুণ আলোড়নের সৃষ্টি হবে। একটা কোলাহল শুনতে পাচ্ছ?' জীবদত্ত বলল।

'শুনতে পাব না কেন? আমার ধারণা এতক্ষণে ওই ভীতু লোকগুলো সুড়ঙ্গ ছেড়ে বনে পালিয়েছে। তবে যেকোনোভাবে গুরু ভালুককে জ্যান্ত ছাড়া উচিত নয়।' খড়গবর্মা নিজের মত জানাল।

'আমরাও চল ঢুকি ওই সুড়ঙ্গপথে। সমরবাহু ও তার অনুচরকে তাড়াতাড়ি ডাক এখানে।' জীবদত্ত বলল।

'খড়গবর্মার ডাক শুনে সমরবাহু ও তার অনুচর এক লাফে ওই পাথরের উপর থেকে নেমে ছুটে এল তাদের কাছে। জীবদত্ত ওদের বলল, 'সমরবাহু, আমরা এখন ওই পথ দিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকতে যাচ্ছি।'

'আমরা এই সুড়ঙ্গের সবাইকে জব্দ করতে পারব? সবচেয়ে ভালো হত অন্য কোনো পথ দিয়ে এখান থেকে পালিয়ে বনে চলে যাওয়া।' সমরবাহু ভয়ে ভয়ে বলল।

'আমরা নেকড়েদের মধ্যে ছিলাম। এখান থেকে বাইরে যাওয়ার অন্য কোনো পথ নেই। এই পথেই যেতে হবে আমাদের।' বলে জীবদত্ত এক লাফে সুড়ঙ্গপথের মুখে পৌঁছে গেল। তার পিছনে গেল খড়গবর্মা।

সমরবাহু ও তার অনুচর কী করবে ঠিক করতে না পেরে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই ওদের খাবার আশায় এক এক করে নেকড়েগুলো ওদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

পনেরো

সমরবাহু এদিক-ওদিক তাকিয়ে সুড়ঙ্গের দুর্গ এড়িয়ে অন্য কোনো পথে পালানো যায় কি না ভাবছে। হঠাৎ তার অনুচর লাফ দিয়ে চিৎকার করে উঠল, 'প্রভু, নেকড়েগুলো আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমাদের আর বাঁচার কোনো উপায় দেখছি না। চলুন যাই ওই সুড়ঙ্গের দরজায়।'

জীবদত্ত সমরবাহুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখল নেকড়েদের। তৎক্ষণাৎ নিজের মন্ত্র দণ্ড নিয়ে তা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নেকড়েদের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়ে বলল, 'সমরবাহু, যাই ঘটুক না কেন, আমদের দুর্গে যেতেই হবে। শত্রুকে হটাতেই হবে। তা ছাড়া আমাদের মুক্তি নেই। তোমরা দু-জনে তাড়াতাড়ি সুড়ঙ্গের দরজার কাছে চলে যাও। দেরি করো না। দেরি করেছ কী মরেছ!'

ইতিমধ্যে খড়গবর্মা দরজার ওপার থেকে হাত বাড়িয়ে বলল, 'সমরবাহু, চন্দু, তোমরা তাড়াতাড়ি আমার হাত ধরে উপরে উঠে এসো।'

সমরবাহু আর তার অনুচর খড়গবর্মার কথামতো তার হাত ধরে এক লাফে উপরে উঠে গেল। জীবদত্তও ওদের সঙ্গে ওই পথে এগিয়ে গেল।

এখন চার জনে মিলে সুড়ঙ্গপথে এগোচ্ছে। ওই ঘন অন্ধকারে ওরা সেই মরা নেকড়েকে দেখল। খড়গবর্মাই ওটাকে ছুড়ে ফেলেছিল।

'জীবদত্ত, আমরা যে কথা ভেবেছিলাম সেইমতোই সব হচ্ছে দেখছি। মরা নেকড়েকে ছোড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে চার-পাঁচটা নেকড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওগুলো কোথায়? আর ভালুক দলের লোকগুলো গেল কোথায়? ওরা কি দুর্গে আছে, না জঙ্গলে পালিয়েছে?' বলল খড়গবর্মা।

জীবদত্ত সাথে সাথে তাকে কোনো জবাব দিল না।

কান খাড়া করে কিছু শোনার চেষ্টা করে বলল, 'খড়গবর্মা, দুর্গে কী যেন হইচই হচ্ছে। মনে হচ্ছে কী যেন ঘটেছে! সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে শোনার চেষ্টা কর। তারপর আমরা কর্তব্য স্থির করব।'

কিছুক্ষণ নীরবতার পর চন্দু বলল, 'হুজুর, নেকড়েদের ভয়ংকর চিৎকার শুনতে পাচ্ছি।'

সমরবাহু চোখ বড়ো বড়ো করে মাথা নেড়ে বলল, 'আমি শুধু নেকড়েদের গর্জনই শুনতে পাচ্ছি না, গুরু ভালুকের চিৎকারও শুনতে পাচ্ছি। এখানে আমাদের এক মুহূর্তও থাকা উচিত নয়। আক্রান্ত হওয়ার আগেই আমাদের পালানো উচিত।'

'তুমি না একটা সাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখছিলে? তুমি এত ভীরু কেন? তোমার প্রাণের এত ভয়?' খড়গবর্মা কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে ও বিরক্ত হয়ে বলল।

সমরবাহু হাতের বল্লমটাকে শক্ত করে ধরে দৃঢ়তার সাথে বলল, 'সাম্রাজ্য স্থাপনের ইচ্ছে আছে বলেই এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না। আপ্রাণ চেষ্টা করে বাঁচতে চাই।'

সমরবাহুর কথা শুনে খড়গবর্মা হাসতে গিয়ে জীবদত্তের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। হাসতে পারল না। প্রতিপক্ষের বিষয়ে কি যেন বলতে গিয়েও বলতে পারল না। তার চোখে নির্দেশের ছাপ। জীবদত্ত এগিয়ে যেতে যেতে বলল, 'সমরবাহু, তুমি এই মন্ত্র দণ্ড আর খড়গবর্মার তরবারি দেখেছ? এই দুটো তোমাকে অক্ষত দেহে স্বর্ণাচারির কাছে পৌঁছে দেবে। তার মানে এই নয় যে চরম বিপদেও তোমাকে তোমার বল্লম ব্যবহার করতে বারণ করছি। আমরা তোমাকে উদ্ধার করতে এসেছি। এটা ঠিক যে তোমাকে উদ্ধার করার মূল দায়িত্ব আমাদের। আমরা সমস্ত রকমের ঝুঁকি নিয়ে তোমাকে উদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর। আমাদের সঙ্গে থেকে তুমিও নিশ্চয় চেষ্টা করবে উদ্ধার হতে। আমাদের মতো তোমাকেও আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতে হবে।'

তারপর তারা এগিয়ে যেতে লাগল সুড়ঙ্গপথ ধরে।

তারা যত এগোতে থাকে ভালুক জাতের লোকের আর্তনাদ ও নেকড়েদের গর্জন বেশি করে শুনতে পায়।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত আশ্চর্য হয়ে ভাবে মাত্র চার-পাঁচটা নেকড়ে দুর্গের মধ্যে এতটা আতঙ্কের সৃষ্টি করতে পারল কী করে!

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ভালুক জাতের লোকের আস্তানায় পৌঁছে গেল। জীবদত্তের সন্দেহ হল গুরু ভালুক বৃকেশ্বরী দেবীর কাঠের মূর্তির ঘরে আছে।

'খড়গবর্মা, আমার মনে হচ্ছে ভালুক জাতের সবাই জঙ্গলে পালিয়ে যায়নি। ওরা চলে গেলে নেকড়েগুলো এখানে থাকত না। আবার ওদের নজরে পড়ে গেলে এখান থেকে বেরোনো আমাদের পক্ষে কঠিন হবে।' চারদিকে তাকাতে তাকাতে জীবদত্ত বলল।

জীবদত্তের কথা শেষ হতে-না-হতেই ভালুক জাতের একজন আর্তনাদ করতে করতে ছুটে এল।

আর তার পেছনে তাকে ধাওয়া করে আসছে একটা নেকড়ে। মুহূর্তে খড়গবর্মা তৎপরতার সঙ্গে দ্রুতবেগে তরবারি বের করে ওই নেকড়েকে আঘাত করল।

খড়গবর্মার কাছ থেকে আঘাত পেয়ে গোঙাতে গোঙাতে নেকড়ে যে পথে এসেছিল সেই পথেই ফিরে গেল।

ভালুক জাতের লোক নেকড়ের তাড়া খেয়ে এসে একেবারে খড়গবর্মা ও জীবদত্তের সামনে পড়ে গেল। ওদের দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগল। ওর অবস্থা দেখে জীবদত্ত তার কাছে গিয়ে বলল, 'ওহে গুরু ভালুকের শিষ্য তুমি যে এখন আমাদের কাছে এসেছ এ সবই দেবী বৃকেশ্বরীর মহিমা। তুমি তাড়াহুড়ো করে জোরে জোরে কথা বল না। আমি যেসব প্রশ্ন করব তুমি আস্তে আস্তে তার জবাব দেবে।'

'আর শোনো, একটিও মিথ্যে কথা বলেছ কী গলা কেটে ফেলব।' খড়গবর্মা তরবারি দেখিয়ে বলল।

'এবার বল দেখি, তোমার গুরু ভালুক এখন কোথায়? তোমার দলের সবাই এখনও সুড়ঙ্গে আছে না জঙ্গলে পালিয়েছে। তাড়াতাড়ি সত্য কথা বল। আর তা না হলে...।' জীবদত্ত মন্ত্র দণ্ড নাড়তে নাড়তে বলল।

'আজ্ঞে আমাদের এই সুড়ঙ্গ থেকে একজনও পালিয়ে যায়নি। নেকড়েদের ভয়ে এদিক-ওদিক লুকিয়ে থাকতে পারে। গুরু ভালুক বৃকেশ্বরী দেবীর ঘরে পুজো করছেন।' ভালুক জাতের লোক বলল।

'তোমরা তো মানুষদের ধরে ধরে গোলাম বানিয়ে কাজ করাও! বীরপুরুষ! নেকড়েদের এত ভয় পাও কেন?' খড়গবর্মা বলল।

'মানুষগুলো তো ঠাণ্ডা হয়, পোষ মানে। কিন্তু ঠাণ্ডা হয় না এই নেকড়েগুলো। ওদের প্রাণের ভয় নেই।' ভালুক জাতের লোকটি বলল।

ওর কথায় জীবদত্ত হেসে বলল, 'ভয় পেয়েছ তা স্বীকার না করে বেশ ভালোভাবেই দেখছি তুমি অন্য কথা বলতে পার। যাক, গুরু ভালুক যদি বৃকেশ্বরী দেবীর ঘরে না থাকে তাহলে তোমাকে মেরে ফেলা হবে।'

'আমি মিথ্যা কথা বলি না হুজুর। ইচ্ছে করলে আপনারা গিয়ে দেখতে পারেন।' জীবদত্তের সামনে নুয়ে ভালুক জাতের লোকটা বলল। চারদিকে চোখ ফেরাতে ফেরাতে শুনছিল খড়গবর্মা।

'ঠিক আছে, চল। এখনই প্রমাণ পেয়ে যাব। ধোকা দেবার চেষ্টা করলে জ্যান্ত রাখব না।' জীবদত্ত গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বলল।

তারপর গুরু ভালুকের শিষ্য খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে নিয়ে এগোল। কিছুদূর গিয়ে ওদের বলল, 'ওই দেখুন হুজুর, বৃকেশ্বরী দেবীর ঘরে গুরু ভালুক রয়েছেন।'

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিল। এরপর কি করবে না করবে ঠিক করে নিল। অজানা জায়গায় অজানা মানুষের বিরুদ্ধে চরম আঘাত হানার প্রস্তুতি নিয়ে নিল তারা।

খড়গবর্মা পা টিপে টিপে এগিয়ে দরজা আস্তে আস্তে ঠেলল। একটু ঠেলতেই সহজেই খুলে গেল দরজাটা।

দেখতে পেল বৃকেশ্বরী দেবীর সামনে সাষ্টাঙ্গে গুরু ভালুক পড়ে আছে। কী যেন বিড়বিড় করে বলছে! ইঙ্গিতে জীবদত্তকে কাছে ডেকে ফিসফিস করে কী যেন বলল।

জীবদত্ত খড়গবর্মাকে পালটা প্রশ্ন করল, 'তুমি কি চাও এখানেই গুরু ভালুককে মেরে ফেলি।'

জীবদত্ত কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'খড়গবর্মা, এই গুরু ভালুককে মেরে কী হবে? আর ওর শিষ্যদেরই বা মেরে কোনো লাভ আছে? তার চেয়ে একটা মজা করা যাক। তুমি ওই মূর্তির পেছনে চলে যাও। সেখান থেকে অন্যরকম গলায় যেন বৃকেশ্বরী দেবী নির্দেশ দিচ্ছেন এমনভাবে বল যাতে গুরু ভালুক শিষ্যসহ এই সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে বনে চলে যায়।'

'বললেই চলে যাবে? তুমি বিশ্বাস কর? আমি আরও দু-চার কথা জুড়ে দেব। তবে একটা কথা ও যদি টের পেয়ে কায়দা করে এসে আমার উপরেই হামলা চালায় তাহলে কিন্তু আমি এই তরবারি দিয়ে ওকে মেরে ফেলব।' বলল খড়গবর্মা জীবদত্তকে।

'যা করতে চাও তাড়াতাড়ি কর। ওর পুজো হয়ে গেলে আর আমরা কায়দা করতে পারব না।' অনেক কিছু ভেবে বলার মতো জীবদত্ত বলল।

খড়গবর্মা বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে ওই মূর্তির পেছনে গিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় বলল, 'গুরু ভালুক আমি তোমার ভক্তিতে প্রসন্ন। দেবদ্রোহীরা এই সুড়ঙ্গে ঢুকে এটাকে অপবিত্র করে ফেলেছে। আমি এই মুহূর্তে এখান থেকে অন্তর্ধান হয়ে পূর্ব দিকের বনে চলে যাচ্ছি। বেশ কিছুদূর যাবার পর দেখতে পাবে একটি পুকুর আর তার পাশে বাবলা গাছ। তুমি তোমার সমস্ত শিষ্যদের নিয়ে এখান থেকে ওখানে চলে যাও।'

এ-কথা শুনেই গুরু ভালুক চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল।

কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় ধমক দিয়ে মূর্তির পেছন থেকে খড়গবর্মা বসে অন্যরকম গলা করে এক-একটা শব্দ থেমে থেমে বলল, 'ওরে পাষণ্ড, তুই এখনও দাঁড়িয়ে আছিস? এক্ষুনি চলে যা, শিষ্যদের নিয়ে যেতে ভুলবি না।'

গুরু ভালুক হতভম্ব হয়ে দেবীর সামনে আবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। ওকে বেরিয়ে আসতে দেখেই জীবদত্ত ও তার সঙ্গের অন্য লোকগুলো লুকিয়ে পড়ল।

গুরু ভালুকের মনে, দেবীর কথা শোনার পর, পূর্ণ বিশ্বাস এবং শক্তি যেন ফিরে এল। তার মনে আর কোনো দ্বিধা নেই। নিজের পঞ্চশূল উঁচিয়ে চিৎকার করে বলল, 'হে বৃকেশ্বরী দেবীর ভক্তগণ, তোমরা সবাই এই মুহূর্তে এই সুড়ঙ্গ ছেড়ে দূরে যাবার জন্য রওনা হয়ে যাও। দেবীর নির্দেশমতো আমাদের এখান থেকে এক্ষুনি বেরিয়ে যেতে হবে বনে।'

নেকড়েদের ভয়ে যারা এতক্ষণ এদিকে-ওদিকে লুকিয়েছিল তারা সব সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে গেল হুড়মুড় করে। নেকড়েগুলো দুর্গের ভিতরে ঘুরতে ঘুরতে আপন মনে যেখানে-সেখানে ঢুকে খুঁজে দেখতে লাগল কোনো খাদ্য আছে কি না আর খাদ্য না পেয়ে গর্জন করতে লাগল।

গুরু ভালুক সুড়ঙ্গের চারদিকে তাকিয়ে তার শিষ্যদের খুঁজতে লাগল। কিন্তু তাদের দেখা তো দূরের কথা সাড়াও পেল না। তারপর একাকী সুড়ঙ্গ থেকে বনের দিকে এগিয়ে গেল।

গুরু ভালুক সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসে দেখে শিষ্যরা তার অনেক আগেই বনের ভেতরে চলে গেছে।

বৃকেশ্বরী দেবীর কথা শোনার পর গুরু ভালুকের মনে এক চিন্তা এক পরিকল্পনা। কী করে বনে যাওয়া যায়! তার লোকজন সব কোথায়? ওরা লুকিয়ে আছে কেন? নেকড়েদের খাবার ঠিকমতো দেওয়া হয়েছে কি না? নেকড়েদের নিয়ে কি বনে যাবে? একবারও খড়গবর্মা, জীবদত্ত, সমরবাহু ও চন্দুর কথা তার মনে উঁকি মারল না। সে ভাবতেই পারল না যে ওরা তার কোনো ক্ষতি করতে পারে।

গুরু ভালুকের সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত খুঁজে খুঁজে নেকড়েদের তাড়া করে বের করে দিল সুড়ঙ্গ থেকে। একটা নেকড়ে ওদের দিকে তেড়ে এসেছিল কিন্তু পরমুহূর্তেই তাকে মারা পড়তে হল। নেকড়েগুলো বেরিয়ে এসেই দেখতে পেল সামনে গুরু ভালুককে। ক্ষুধার্ত নেকড়েগুলো গুরু ভালুককে ধরে টেনে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্য ধাওয়া করতে লাগল।

নেকড়েদের এই হিংস্ররূপ দেখে প্রাণের ভয়ে গুরু ভালুক ছুটতে ছুটতে আর্তনাদ করতে লাগল, 'হে বৃকেশ্বরী দেবী, আমাকে বাঁচাও!'

ষোলো

গুরু ভালুকের আর্তনাদ ও নেকড়েদের গর্জন শুনে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত, সমরবাহু ও চন্দু তাড়াতাড়ি সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এল। ওরা সামনেই দেখতে পেল ভালুক জাতের কয়েক জন লোক বনের দিকে ছুটছে। তার পেছনে ছুটছে গুরু ভালুক। আর সবার শেষে ছুটছে নেকড়ে।

খড়গবর্মা এই দৃশ্য দেখে বলল, 'একটা ব্যাপার আমার খুব আশ্চর্য লাগছে। বৃকেশ্বরী দেবীর এত ভক্ত গোটা কয়েক নেকড়ের ভয়ে এভাবে ছুটে পালাচ্ছে।'

তোমার আশ্চর্য লাগুক অথবা হাসি পাক, ওদের যখন নেকড়েগুলো ছিঁড়ে খাবে তখন সেই দৃশ্য দেখা আমাদের বোধ হয় উচিত হবে না। মানুষকে জন্তু ছিঁড়ে খাবে এই দৃশ্য মানুষ হিসেবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায় না। আমার কাছে এ অসহ্য। তুমি বরং এক কাজ করো। ওই নেকড়েদের তাড়িয়ে দাও।' জীবদত্ত বলল।

জীবদত্তের কথা শুনে খড়গবর্মা কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে তির দিয়ে সকলের পেছনে যে নেকড়েটা ছিল তাকে বিদ্ধ করল। তির বিদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ নেকড়েটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে লাগল। তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে অন্য নেকড়েগুলো তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভয়ংকর দেখাচ্ছিল নেকড়ের মাংস নেকড়েদের টেনে ছিঁড়ে খাওয়ার সেই দৃশ্য।

খড়গবর্মা নেকড়েদের দিকে তাক করে আর একটা তির ছুড়তে যাবে এমন সময় সমরবাহু বাধা দিয়ে বলল, 'হুজুর, কেন ওই নেকড়েগুলোকে মারছেন? কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার খেলাটা তো বেশ জমে উঠেছে, চলুক না। আপনি ওদের মেরে ফেললে গুরু ভালুক আর তার দলের লোককে খাবে কে?'

'সমরবাহু, গুরু ভালুক আর তার দলের লোক মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি সব বিপদ কেটে যেত তাহলে আর কথা ছিল না। আমরা এক মহান উদ্দেশ্যে বিন্ধ্যাচলের দিকে যাচ্ছি। পথে আমাদের একটা-না-একটা বাধা পড়ছে। কোনো বাধাই না সরিয়ে আমরা যেতে পারছি না।' জীবদত্ত বলল।

তারপর খড়গবর্মার দিকে ঘুরে জীবদত্ত বলল, 'এখান থেকে আমাদের তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া উচিত। গুরু ভালুকের ব্যাপারে আমাদের আর কিছু করার নেই। তবে ওকে একটা শেষ কথা বলে দেওয়া উচিত।' এই কথা বলে জীবদত্ত গুরু ভালুকের দিকে ছুটে গেল। তাকে অনুসরণ করল অন্যেরা।

জীবদত্তকে আসতে দেখে তিনটে নেকড়ে গর্জন করতে করতে বনের ভিতরে ঢুকে গেল।

তারপর গুরু ভালুকের কাছে যেতে যেতে জীবদত্ত গম্ভীর গলায় জোরে জোরে বলল, 'ওহে গুরু ভালুক, নাক-কান বুজে ছুটছ কেন? দাঁড়াও, আর তোমার কোনো ভয় নেই।' নিরুপায় হয়ে কাঠের মতো গুরু ভালুক দাঁড়িয়ে পড়ল।

গুরু ভালুক পরিষ্কার বুঝতে পারল যে শত্রুর খপ্পরে সে পড়ে গেছে। তার তখন আর শত চেষ্টা করেও পালানোর কোনো পথ নেই। জীবদত্ত ও তার সঙ্গে যারা ছিল তাদের দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে গুরু ভালুক বলল, 'মহাশয়, আমাকে প্রাণে মারবেন না। আমি যে পাপ করেছি তারজন্য আপনারা আমাকে যে শাস্তি দেবেন আমি মাথা পেতে তা মেনে নেব।'

'তুমি এমন একটা শাস্তির কথা বল তো, যাতে তোমার সমস্ত পাপ ধুয়ে-মুছে যায়? বল, এমন কোনো শাস্তি আছে যা তোমাকে দিলে তোমার হাতে যত লোক মারা গেছে প্রত্যেকে বেঁচে উঠবে। তুমি তো ইচ্ছে করলেই এই বনে মাটি খুঁড়ে গায়ে গতরে খেটে চাষ-আবাদ করে, ফসল ফলিয়ে তোমার অনুচরদের নিয়ে ভালোভাবেই দিন কাটাতে পারতে। ওসব না করে কোন এক বৃকেশ্বরী দেবীকে পুজো করার নামে কতগুলো লোককে প্রাণে মারলে বল দেখি? আমাদের আসার আগে কত নিষ্পাপ শিশু, নারী আর পুরুষ তোমার হাতে অকালে প্রাণ দিয়েছে বল তো!' জীবদত্ত বলল।

'আমি বসে বসে খেতে চেয়েছিলাম। আমি কোনোদিন পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলিয়ে খেতে চাইনি। আপনারা যতদিন না এখানে এসেছেন আমি আমার ইচ্ছেমতো চলতে পেরেছি। কেউ কোনো বাধা দেয়নি। ভেবেছিলাম ওইভাবেই সারাজীবন কেটে যাবে, কেউ আমার চলার পথে বাধা দেবে না। খুব আরামেই ছিলাম।' গুরু ভালুক বলল।

'তা তো বুঝতেই পারছি। তা এখন কী করবে ঠিক করেছ? তোমার অনুচররা তো তোমাকে নেকড়েদের কাছে ফেলে পালিয়েছে! একা কী করবে?' খড়গবর্মা প্রশ্ন করল।

'মশাই, আমার কোনো অনুচর আমাকে ছেড়ে যায়নি। ওরা সব একটা পুকুরঘাটে জড়ো হয়েছে। সেখানে দেবী বৃকেশ্বরীর আবির্ভাব ঘটবে। দেবী এখন আর সুড়ঙ্গে নেই। দেব-দেবীরা কখনো এক জায়গায় চিরকাল থাকেন না। আপনাদের আগমনের ফলে আমাদের সুড়ঙ্গ অপবিত্র হয়ে গেছে তাই দেবী পুকুরঘাটে চলে গেছেন।' গুরু ভালুক বলল।

'ঠিক আছে, চল সেখানে। আমি তোমার দেবীকেই জিজ্ঞাসা করব, তোমাকে কোনো শাস্তি দিতে চায়!' জীবদত্ত গম্ভীর স্বরে বলল।

ওরা কিছুদূর এগোতে না এগোতেই ভালুক দলের অনুচরদের ভয়ংকর আর্তনাদ শুনতে পেল।

ওরা চোখের সামনে দেখতে পেল ওদের গুরুকে খড়গবর্মা ও জীবদত্তের সঙ্গে। ওরা বুঝতে পারল ওদের গুরু শত্রুর কবলে পড়ে গেছে। বুঝেই ওরা অন্যদিকে পালাতে লাগল। তখন গুরু ভালুক চিৎকার করে বলল, 'তোমরা পালিয়ো না। বৃকেশ্বরী দেবীর দয়ায় আমাদের আর কোনো ভয় নেই।'

গুরুর কণ্ঠে অভয় বাণী শুনে ওরা কয়েক জন ভয়ে ভয়ে গুরুর কাছে এল। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, 'গুরু, ওই পুকুরের কাছে চার-পাঁচ জন রয়েছে। ওদের নেতা স্বর্ণাচারি। স্বর্ণাচারি আমাদের দু-জনকে মেরে ফেলেছে। আর পাঁচ জনকে বন্দি করে রেখেছে। আমরা কোনোরকমে পালিয়ে এসেছি। খবরটা আপনাকে দেবার জন্যই ছুটে ছুটে এসেছি।'

স্বর্ণাচারির নাম শুনে জীবদত্ত, খড়গবর্মা ও সমরবাহু অবাক হয়ে গেল। ওরা ভেবে পেল না দুর্গ নির্মাণের পরিকল্পনা করার দায়িত্ব যার উপর চাপানো আছে সে কেন চার-পাঁচ জন লোক নিয়ে পুকুরঘাটে এল!

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত স্বর্ণাচারিকে কথা দিয়েছিল শত্রুর কবল থেকে সমরবাহুকে মুক্ত করে আনবে। ওদের আসার কারণ আছে। খড়গবর্মা ও জীবদত্তর অনুপস্থিতিতে ওরা আক্রান্ত হয়েছিল। কারণ সেই অঞ্চলটা ছিল বীরসিংহ নামক এক রাজার। বীরসিংহের রাজধানী বীরপুর। আর সেই বীরপুরেই একটি বনে পাহাড়ের পাশে স্বর্ণাচারি পরিকল্পনা করছিল দুর্গ তৈরি করার। সেখানকার আদিবাসীদের উপর মাঝে মাঝেই আক্রমণ চালিয়ে বীরসিংহ তাদের কাছ থেকে করস্বরূপ জন্তুজানোয়ারের চামড়া, মোটা চাল, তরিতরকারি প্রভৃতি নানাপ্রকার জিনিসপত্র আদায় করে নিয়ে যেত। এইভাবে নানান দিকে আক্রমণ করে রাজা বীরসিংহ তার কোষাগার সোনা, রুপা, ফসল প্রভৃতি দিয়ে বৃদ্ধি করত।

গুপ্তচরদের মাধ্যমে বীরসিংহ জানতে পারল যে বনের মধ্যে পাহাড়ের পাশে উটে চড়ে একদল লোক এসেছে। আরও জানতে পারল যে ভালুক চামড়া পরা একদল লোক ওই অঞ্চলে ঘোরাফেরা করে। যুবকদের ধরে নিয়ে গিয়ে গোলাম বানায়। আর তাদের দিয়ে চাষ-আবাদের কাজ করিয়ে নেয়। ওদের দলে বেশ কয়েক জন লোক আছে।

বীরসিংহ প্রথমে গুপ্তচরদের এইসব কথায় কান দেয়নি। সে মনে মনে ভেবে নিয়েছিল উটে চড়া লোকদের বিরুদ্ধে ভালুক চামড়া পরা লোকগুলো যুদ্ধ করবে। এইভাবে দুটো দলই একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শেষ হয়ে যাবে। আর যদি তা না হয়ে একটি দল পরাজিত হয়ে অন্যদল শক্তিশালী হয়ে যায় তখন অন্য পরিকল্পনা করে ওই শক্তিশালী দলকে পরাস্ত করা যাবে। অথবা তখন এমন কিছু করা যাবে যাতে ওই দল প্রাণের ভয়ে এই অঞ্চল ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে। এই বনে এসে কোনো নতুন দলের পক্ষেই সব পথ চিনে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া সহজ নয়। তার চেয়ে পালানো অনেক সহজ। অতএব সেরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তখন দেখে নেওয়া যাবে।

এদিকে এক সপ্তাহ আগে রাজা বীরসিংহ লোকজন সহ নতুন জন্তুজানোয়ার শিকার করার জন্য ওই বনে এসেছিল। ওরা জাল পেতে শিকার ধরার সবরকম আয়োজন করে শিকারের জন্য অপেক্ষা করছিল। যথাসময়ে তাদের জালে শিকার ধরা পড়ল। বহু বুনো পাখি ও বাঘ ধরা পড়ল। মনের আনন্দে ওরা ওই বনে রান্না সেরে খেতে বসেছিল।

বীরসিংহের সেনাদের মধ্যে একজন তাড়াতাড়ি খেয়ে বনে ঘুরে ঘুরে চারদিকে নজর রাখছিল। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে লোকটা সেখান থেকে অনেক দূরে চলে গেল। হঠাৎ এক জায়গায় সে দেখতে পেল কিছুটা দূরে একটা মোটা গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে চারটে উট বাঁধা রয়েছে। লোকটা উটদের আকার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছিল। কিন্তু কোনোদিন নিজের চোখে সে দেখেনি। তাই দেখেই চিনতে পেরেছিল। আর কালমাত্র বিলম্ব না করে সে ফিরে গেল বীরসিংহের কাছে।

'উট? আমাদের রাজ্যে তো উট নেই? কোত্থেকে এল? কারা আনল?' এসব কথা ভাবতে ভাবতে সে ভয়ে কাঁপছিল।

খবর পেয়ে শিকারিদের মধ্যে যে নেতা সে খুব উৎসাহিত হয়ে বলল, 'কোথায়? কোথায় আছে উট? চল— চল, ধরে আনি।'

কিন্তু সেই সেনাটি নিরুৎসাহিত হয়ে বলল, 'আরে মশাই, অত হাঁকপাঁক করছেন কেন? এই চারটে উট কখনো কি একা একা আসতে পারে বনে? নিশ্চয়ই তার সঙ্গে কিছু লোক আছে।'

'তাতে আমদের কি এসে যায়! থাক না লোক! এই বীরপুর রাজ্যের প্রজা, মাটি, বন-জঙ্গল, জল, আকাশ সব কিছুর উপর পুরো অধিকার আছে আমাদের মহারাজ বীরসিংহের। তোমরা তিন-চার জন গিয়ে ওই উটগুলো ধরে নিয়ে এসো। ওই উটের সঙ্গে কোনো লোকজন যদি থাকে তাদের বল এখানে এসে দেখা করে যেতে।' প্রধান শিকারি বলল।

ওরা ভয় পেল, কিন্তু নিরুপায়। প্রধান শিকারি যখন বলছে, যেতেই হবে। শেষপর্যন্ত চার জন সৈনিক বেরিয়ে পড়ল। উটগুলো আগে যেখানে ছিল সেখানেই রয়েছে। আশেপাশে কোনো লোকজন নেই। চার জন সৈনিক সোজা গিয়ে উটগুলোর দড়ি খুলে টান দিতেই একটি উট পিছনের পা টান করে হিঁ হিঁ করে ডেকে উঠল। তার ডাক শুনে অন্য উটগুলোও ডাকতে শুরু করে দিল।

সমরবাহুর লোক উটগুলোকে গাছের সঙ্গে বেঁধে অদূরে প্রকাণ্ড একটা পুকুরের ঘাটে একটা গাছের নীচে বসে বিশ্রাম করছিল। হঠাৎ উটের ডাক শুনে ওরা ভাবল বাঘ কিংবা সিংহ হয়তো উটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে! ওরা তাড়াতাড়ি সেখান থেকে উঠে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে ছুটে এল উটের কাছে।

উটগুলোকে যারা নিয়ে যেতে এসেছিল তারা সমরবাহুর লোককে খোলা তরবারি নিয়ে ছুটে আসতে দেখে নিজেরাও খাপ থেকে তরবারি বের করল।

সমরবাহুর লোকের মধ্যে একজন দাঁতে দাঁত ঘষে চিৎকার করে বলল, 'কারা তোমরা? পরেছ তো সৈনিকের পোশাক! কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে তোমরা চোর! আমাদের উট চুরি করতে এসেছ কেন?'

'আমরা চোর নই। মহারাজা বীরসিংহের সৈনিক। তোমরা কেন আমাদের মহারাজাকে কর না দিয়ে উটগুলো নিয়ে এই বনে এসেছ? আমাদের উপর হুকুম হয়েছে উটগুলো নিয়ে যেতে।' একজন সৈনিক বলল।

'এখানে আবার বীরসিংহ নামে কেউ আছে নাকি? আমরা তো জানি এই বনটা আমাদের মহারাজা সমরবাহুর। তোমরা আমাদের উটগুলো চুরি করতে এসেছ। এইজন্য তোমাদের আমরা কঠোর শাস্তি দেব। তোমরা এক্ষুনি তরবারি মাটিতে ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ কর।' সমরবাহুর একজন অনুচর বলল।

পালানোর পথ নেই ভেবেও বীরসিংহের চার জন সৈনিক তরবারি হাতে সমরবাহুর অনুচরদের সামনে রুখে দাঁড়াল। সেই তরবারি যুদ্ধে বীরসিংহের দু-জন সৈনিক মারা গেল। একজন ভীষণভাবে আঘাত পেল। আর চতুর্থজন প্রাণ মুঠো করে পালিয়ে গেল। সোজা শিকারিদের প্রধানকে গিয়ে খবর দিল।

'এ তো তাজ্জব কথা। উট কোনোদিন মাংস খায় বলে তো আমি জানি না? তোমার সঙ্গে বাকি যে তিন জন গিয়েছিল ওদের কি উট খেয়ে ফেলেছে?' প্রধান শিকারি ক্রোধের সঙ্গে সৈনিককে জিজ্ঞেস করল।

'আরে মশাই, উট আমাদের ঘায়েল করেনি। উট যারা এনেছে, ওরাই আমাদের লোককে মেরে ফেলেছে, ঘায়েল করেছে। তরবারি চালাতে ওরা খুব দক্ষ মনে হল।' সৈনিক বলল।

'আমি বিশ্বাস করি না যে তরবারি চালানোর ব্যাপারে আমাদের চেয়ে যোগ্য লোক আছে।' এ-কথা বলে হাতে খাপ খোলা তরবারি নিয়ে এগিয়ে গেল প্রধান শিকারি। তার সঙ্গে গেল বাকি সৈনিক।

আঘাত পেয়ে পালিয়ে আসা সৈনিক ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। হঠাৎ আর্তনাদ করে বলল, 'এই যে ওরা এদিকেই আসছে। ওরা যে কী ভয়ানক, এক্ষুনি টের পাবেন।'

শিকারি প্রধান নিজের সৈনিকদের সাবধান করে সমরবাহুর লোকের দিকে এগিয়ে গেল।

সতেরো

বীরপুর রাজার প্রধান শিকারির সঙ্গে আর মাত্র সাত জন সৈনিক রয়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন সমরবাহুর অনুচরদের আঘাতে ঘায়েল হয়ে টলতে টলতে সবার পিছনে পড়ে গিয়েছিল। সমরবাহুর অনুচরদের মধ্যে মাত্র চার জন সেখানে ছিল। কিন্তু চার জন হলেও ওরা ওই সাত জনের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করছিল।

প্রধান শিকারি সমরবাহুর লোকজনকে চিৎকার করে বলল, 'ওহে তোমাদের দেখে তো মনে হচ্ছে তোমরা ব্যবসায়ী। তবে তোমাদের পাগড়ির বাঁধনটা কেমন যেন বেখাপ্পা। এইভাবে পাগড়ি কেউ বাঁধে নাকি? জংলিদের মতো। তরবারি চালানোর কায়দাকানুনও তোমরা বোধ হয় ঠিক জান না।'

সমরবাহুর অনুচরদের ভীষণ রাগ হল। ওরাও গর্জে উঠল, 'আমাদের তরবারির আঘাতের মজা ইতিমধ্যে তোমাদের তিন জন সৈনিক পেয়েছে। ওরা মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমরাও তরবারির আঘাত পাবে। এবার সাবধান হও। জয় সমরবাহুর জয়!' ধ্বনি দিতে দিতে ওরা বীরসিংহের সৈনিকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

কিন্তু ওদের মধ্যে যুদ্ধ বেশিক্ষণ চলল না। বীরসিংহের সৈনিকদের মধ্যে তিন জন ইতিপূর্বেই সমরবাহুর লোকদের তরবারির আঘাতে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যে আসছিল সে সমরবাহুর লোকজনের রণধ্বনি শুনে মুখ ফিরিয়ে পালানোর চেষ্টা করল। প্রধান শিকারি নিজেই পালানোর পথ খুঁজতে লাগল। ওদের আত্মসমর্পণের ভঙ্গি দেখে সমরবাহুর লোকেরা খুশি হল।

এই সামান্য পাঁচ-সাত জনকে পরাজিত করে সমরবাহুর লোক এত আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল যেন ওরা এক বিরাট রাজ্য জয় করে এসেছে। ওরা পরাজিতদের এবং নিজেদের তরবারি উপরের দিকে তুলে উচ্ছ্বসিত আনন্দে চিৎকার করে 'মহারাজা সমরবাহুর জয়' ধ্বনি দিতে লাগল।

ওদের এই সোচ্চার ধ্বনিতে ওই বনের ডালপালা ও পাতা যেন মুখরিত হয়ে উঠেছে। ধ্বনি যত বাড়ে বীরসিংহের সেনাদের মনে ভয়ও তত বাড়ে।

সমরবাহুর লোকজনের সঙ্গে বীরসিংহের সেনাদের যুদ্ধ দেখার জন্য ওই বনের কয়েক জন অধিবাসী জড়ো হল। সমরবাহুর লোকের রণধ্বনি শুনে আরও কয়েক জন বনের অধিবাসী জড়ো হল। ওরা অবাক হয়ে দেখল বীরসিংহের সেনাদের পরাজিত হতে। ওরা দেখল কীভাবে বীরসিংহের সেনারা তরবারি মাটিতে ফেলে আত্মসমর্পণ করল। নিজেদের রাজার সেনাদের মাটিতে গড়াগড়ি খেতেও ওরা দেখল। এইসব দেখে ওরা বুঝল যে সমরবাহুর লোক অনেক বেশি ক্ষমতাবান। যুদ্ধ করার কৌশলও ওদের অনেক ভালো।

ওরা রাজা বীরসিংহের সেনাদের চেনে। কিন্তু তাদের যারা হারিয়ে দিল তারা যে কোন রাজার সেনা তা তারা জানে না। ভেবেছিল আরও বড়ো কোনো রাজার সেনা। তা না হলে এতটা ক্ষমতা ওরা পায় কোত্থেকে। ওদের ধারণা বেশি ক্ষমতাবান রাজাদের সেনার ক্ষমতাও বেশি থাকে। ওদের সামনে হাতের তরবারি ফেলে দিয়ে করুণভাবে বীরসিংহের সেনাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখ ওদের কেমন যেন লাগল। তারপর বনের অধিবাসীরা নিজেদের মধ্যে ওই নতুন অচেনা ক্ষমতাবান রাজা সম্পর্কে নানা কথা বলাবলি করছিল।

বনের অধিবাসীদের বিস্ময় লক্ষ করে সমরবাহুর লোক গুরুগম্ভীর গলায় বলল, 'তোমরা এই বনের অধিবাসী? আজ থেকে তোমরা বীরপুরের রাজাকে কানাকড়িও কর দেবে না। এই বনের অধিবাসী হলেন আমাদের রাজা সমরবাহু। কর যা দিতে হবে রাজা সমরবাহুকে দিও। উনিই তোমাদের রক্ষা করবেন। আমাদের কথামতো না চললে তোমাদের বাঁচার পথ থাকবে না। কঠোর শাস্তি পেতে হবে বুঝেছ?'

বনের অধিবাসীদের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে এসে বলল, 'আজ্ঞে আপনারা যা বলবেন তাই করব। তবে আমরা বীরপুরের রাজা বীরসিংহকে দেখেছি। আপনারা রাগ করবেন না। দয়া করে আপনারা আপনাদের পরিচয় দিন। আপনারা কোন দেশের রাজার লোক জানান। আপনাদের রাজা কোথাকার রাজা?' ভয়ে ভয়ে বৃদ্ধটি এক এক করে প্রশ্নগুলো করল।

সমরবাহুর অনুচরদের মধ্যে একজন দূরের এক পাহাড়ের দিকে তর্জনী দেখিয়ে বলল, 'দেখ ওই পাহাড়ের দিকে তাকাও। ওই যে গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে পাহাড়টা। ওই পাহাড়ে রয়েছে আমাদের রাজধানী। তোমাদের মধ্যে কারও যদি সন্দেহ থাকে সে আমাদের সঙ্গে আসতে পারে। নিজের চোখে দেখে আসতে পারে। পথঘাট চিনে রাখা ভালো। সব দেখে সবাইকে জানিয়ে দাও।'

ওই বুড়ো কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় ঘোড়ার ডাক শোনা গেল। সমরবাহুর লোক চমকে উঠে এদিক-ওদিক তাকাল। ওদের মধ্যে একজন বলল, 'মনে আছে বীরসিংহের দলের দু-জন ছুটে পালিয়েছিল? ওদের ওভাবে ছেড়ে দেওয়া উচিত হয়নি। ওরাই আবার এখন ঘোড়া নিয়ে হয়তো এসেছে। ঘোড়া যখন এনেছে নিশ্চয়ই আরও কয়েক জন লোকও এনেছে। এখন সবাই সাবধান হয়ে যাও। সতর্ক থেকো। কেউ যেন পালাতে না পারে। সমরবাহুর চার জনই অজানা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হল। সুযোগ পেলেই আক্রমণ করবে। তা না হলে আত্মরক্ষা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। দুটো ঘোড়ার লাগাম ধরে দু-জন লোক তাদের কাছে এল। ওই দু-জনকে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।

সমরবাহুর লোক ভেবে পাচ্ছে না কী বলবে, কী করবে! ততক্ষণে ওই বৃদ্ধ এগিয়ে গিয়ে ওদের জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার? তোমরা এই ঘোড়াগুলো কোত্থেকে ধরে আনলে?'

'বীরপুরের রাজা বীরসিংহের সৈনিকরা ঘোড়ায় চড়ে পালাচ্ছিল। হঠাৎ ওরা একটা গাছের কাছে থেমে ওই গাছের সাথে বাঁধা ঘোড়া দুটোর দড়ি কেটে দিল। আমরা আড়াল থেকে এসব লক্ষ করেছিলাম। দড়ি কেটে ওরা আবার নিজেদের ঘোড়ায় চড়ে চলে গেল। আমরা কায়দা করে ঘোড়া দুটোকে ধরে এনেছি। ঘোড়াগুলোকে যারা এনেছিল তারা বলল।

'তোমরা খুব ভালো কাজ করেছ। আমরা আমাদের রাজাকে এই খবর জানাব। তিনি তোমাদের এই বুদ্ধির জন্য অনেক উপহার দেবেন। এই ঘোড়া দুটো নিয়ে চল আমাদের রাজধানীতে। ওই যে পাহাড় দেখতে পাচ্ছ ওই পাহাড়ের বুকেই আমাদের রাজধানী। কি যাবে?' সমরবাহুর একজন অনুচর বলল।

বনবাসী যুবকরা রাজি হল। সমরবাহুর অনুচর বীরসিংহের দুই পরাজিত সৈনিককে নিয়ে এগিয়ে যাবে এমন সময় ওই বনবাসীদের একজন যুবক বলল, 'এই যে কর্তারা পিঞ্জরায় বন্দি বাঘ ও সিংহকে নিয়ে যাচ্ছেন না? কয়েকটা পাখিকে জালে বেঁধে গাছে ঝোলানো আছে। ওদের কি ওখানেই রাখা হবে? নিয়ে যাবেন না?'

এই কথা কানে যেতেই সমরবাহুর লোকেরা তৎক্ষণাৎ থেমে বীরসিংহের বন্দি সেনাদের কাছে সিংহ, বাঘ ও পাখিদের ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে জানতে চাইল। নানা প্রশ্ন করে সৈনিকদের কাছে জানতে পারল যে প্রধান শিকারির নেতৃত্বে ওই পাখিগুলোকে ধরা হয়েছে। কীভাবে ওরা ওই পাখিগুলোকে ধরেছে সে বিষয়েও অনেক কিছু জানতে পারল সমরবাহুর অনুচরগণ।

সব কথা শুনে উৎসাহিত হয়ে সমরবাহুর লোক চোখ উজ্জ্বল করে বলল, 'বাঃ, তোমাদের বুদ্ধির তো তারিফ করতে হয়! এসব পশুপাখিদের এখানে ফেলে রেখে লাভ কী? নিয়ে যাওয়া যাক আমাদের রাজধানীতে। সেখানেই ওরা খেয়ে বাঁচতে পারবে।'

সমরবাহুর অনুচরদের পেছনে পেছনে ওই বনের বহু অধিবাসী যেতে লাগল। যাওয়ার পথ বাঘ সিংহের গর্জনে ও পাখির ডাকে মুখরিত হয়ে উঠল। সমস্ত অঞ্চলে বিরাট কিছু ঘটে যাওয়ার আবহাওয়া।

সমরবাহুর অনুচররা সমস্ত ব্যাপার লক্ষ করে বলল, 'আমরা কোনোদিন হিংস্র জন্তুজানোয়ারদের ধরিনি, বন্দি করে রাখিনি পিঞ্জরায়। তাই এদের ভালোভাবে নিয়ে যাওয়ার ভার তোমাদের।'

বনের অধিবাসীদের মধ্যে কয়েক জনের মনে সমরবাহুর লোকদের দেখে আগেই সন্দেহ হয়েছিল। ওরা ভেবেছিল ওরা বিদেশি। কারণ ওরা কোনোদিন উট দেখেনি। উটের পিঠে ওদের দেখে এই সন্দেহ ওদের হয়েছিল। হিংস্র পশুদের সম্পর্কে সমরবাহুর লোকদের কথা শুনে একজন বৃদ্ধ বনবাসী এগিয়ে এসে বলল, 'হুজুর প্রত্যেকটা পিঞ্জরার নীচে চাকা লাগানো আছে। খুব সাবধানে ঘোড়াদের দিয়ে টানিয়ে নিয়ে গেলে কোনো অসুবিধা হবে না। তারপর একটা বাগানের চারদিকে উঁচু দেওয়াল তুলে তার ভিতরে এই বাঘ, সিংহ প্রভৃতিকে রাখা যায়।'

'এইসব কাজের ব্যাপারে আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আমাদের রাজা তোমাদের অনেক কিছু দিয়ে খুশি করবেন।' বলল সমরবাহুর একজন লোক।

বনবাসী সিংহ ও বাঘের পিঞ্জরাকে দড়ি দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে উটের সঙ্গে দড়ির অন্যপ্রান্ত বেঁধে দিল। অন্য উটের পিঠে পাখিদের জাল গুটিয়ে রেখে দিল। তারপর সবাই মিলে ওই পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেল।

পাহাড়ের উপর থেকে স্বর্ণাচারি হঠাৎ দেখতে পেল, বাঘ, সিংহ, পাখি নিয়ে সমরবাহুর অনুচর এবং বহু বনবাসী ওই পাহাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। ওসব দেখে স্বর্ণাচারি বলে উঠল, 'আরে একি দেখছি? আমাদের লোক ঘোড়ায় চড়ে আসছে! পিঞ্জরা কোত্থেকে পেল! বনের অতগুলো লোক এদিকে আসছে কেন? কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না।'

স্বর্ণাচারির কথা শুনে সমরবাহুর লোকজন, যারা স্বর্ণাচারির কাছে ছিল তারা অবাক হয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। ওদের ওইভাবে চোখ ছানাবড়া করে তাকানো দেখে সমরবাহুর যে অনুচররা আসছিল, তাদের একজন বলল, 'দেখছ, মহামন্ত্রী স্বর্ণাচারি মশাই ও আমাদের লোকজন কীভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে? আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে ওদের সমস্ত ব্যাপার জানিয়ে দি।' বলে ঘোড়া থেকে একজন অনুচর লাফ দিয়ে নেমে লাফাতে লাফাতে পাহাড়ের উপরে উঠে স্বর্ণাচারির কাছে গেল।

তাকে ছুটতে ছুটতে লাফাতে লাফাতে আসতে দেখে স্বর্ণাচারি এগিয়ে এসে তাকে বলল, 'কী ব্যাপার বলত? তোমরা তো শিকার করতে গিয়েছিলে। এত ঘোড়া, বাঘ এসব কী এনেছ? এত বনবাসী তোমাদের সাথে আসছে কেন?'

সমরবাহুর ওই লোকটা স্বর্ণাচারির কাছে এসে প্রণাম করে বলল, 'মহামন্ত্রী, আমরা শিকার করতে গিয়েছিলাম বটে, কিন্তু অত সহজে শিকার করতে পারিনি। বীরপুর রাজার সৈনিকরা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমরা পালটা আক্রমণ করে তাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছি। ওদের দু-জনকে এনেছি। বাকিদের মধ্যে দু-জন বীরপুরের দিকে পালিয়েছে। আর অন্যেরা আমাদের তরবারির আঘাতে মারা গেছে।'

বীরপুরের দু-জন সৈনিকের পালানোর কথা শুনেই স্বর্ণাচারির চোখে-মুখে আশঙ্কা ও আতঙ্কের ভাব ফুটে উঠল। এত বড়ো বিজয়ের খবর শুনেও স্বর্ণাচারির মুখে কোনো আনন্দের চিহ্ন ছিল না। তার মনে হল সমরবাহুর লোকেরা ভবিষ্যৎ না ভেবেই মারাত্মক বিপদের ঝুঁকি নিয়েছে।

স্বর্ণাচারি রক্তচক্ষু করে সমরবাহুর ওই অনুচরকে বলল, 'তোমরা ওই দু-জন সৈনিককে পালাতে দিয়ে মারাত্মক ভুল করেছ। এর পর প্রস্তুত হও, বিরাট এক বিপদের মোকাবিলা করতে হবে। তা ছাড়া তোমরা এসব ঘোড়া আনতে গেলে কেন? আর তার চেয়ে বড়ো কথা বীরপুর রাজার সেনাদের বিরুদ্ধে ওরকম একটা মারাত্মক কাণ্ড করে বসলে কেন?'

স্বর্ণাচারির কথা শুনে আর তার রক্তচক্ষু দেখে বুঝল যে তারা ভুল করেছে। তবুও নিজেরা কোন অবস্থায় ওই কাজ করতে বাধ্য হয়েছে তা বিস্তারিতভাবে বলল। তাতে কিছু সত্য কিছু মিথ্যাও ছিল।

স্বর্ণাচারি নিজের আগের কথাকে আরও গুরুগম্ভীর গলায় বলল, 'যাই হোক না কেন, তোমরা যা করেছ ভুল করেছ। আমাদের নিজেদেরই থাকার ভালো একটা ব্যবস্থা এখনও হয়নি। যে দু-জন সৈনিক পালিয়েছে, ওরা বীরপুরের রাজাকে গিয়ে বিস্তারিতভাবে সব বলবে। তারপর রাজা নিজেই সেনা পরিচালনা করে আসবে অথবা অসংখ্য সেনাদের নিয়ে আমাদের এই অঞ্চল আক্রমণ করতে সেনাপতিকে বলবে। তোমাদের বোঝা উচিত ছিল যে সমরবাহু এখন নেই। জীবদত্ত ও খড়গবর্মাও এখানে নেই!'

স্বর্ণাচারির কথা অনুযায়ী একে অন্যের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। স্বর্ণাচারির অনুমান অনুযায়ী ওই দু-জন সেনা বীরপুরে গিয়েছিল। সারা পথে তারা চিৎকার করতে করতে গেল, 'দেশ এখন বিপদের মুখে, কোথাকার এক রাজা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসছে। সবাই সাবধান।'

ওদের কথা নানাভাবে মুখে মুখে রটতে লাগল, সবাই অজানা এক বিপদের কথা ভাবতে লাগল। নগরবাসী আত্মরক্ষার জন্য তরবরি, বল্লম, কুড়ুল প্রভৃতি অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হল।

আঠারো

বীরপুর রাজার পশুপালকদের অধিকারী একজন অনুচরকে নিয়ে সারা পথ ঘোড়া ছোটাতে ছোটাতে হুঁশিয়ারি দিতে দিতে রাজধানীর দিকে এগোতে লাগল। ওদের ভয়ার্ত চিৎকার রাজা বীরসিংহ ও তাঁর মন্ত্রীর কানে গেল। রাজা ও মন্ত্রী তখন রাজপ্রাসাদে রাজ্যের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছিলেন।

রাজা বীরসিংহ তাঁর নিজের লোকের গলা শুনে তাড়াতাড়ি উপর থেকে নীচে পথের দিকে তাকালেন। মন্ত্রীকে ডেকে পশুপাখিদের রক্ষাকারীকে দেখালেন। এই দৃশ্য দেখে রাজা বীরসিংহ মন্ত্রীকে বললেন, 'কী ব্যাপার মহামন্ত্রী? চিড়িয়াখানার অধিকারী এভাবে একজনকে সঙ্গে নিয়ে পাগলের মতো চিৎকার করছে কেন? কী বলছে সে? এত জোরে ঘোড়া ছোটাচ্ছে যেন তাকে বাঘে তাড়া করেছে। শত্রুরা যেন তাকে তাড়া করছে! কী ব্যাপার! কী হল!'

রাজার কথা শুনে মন্ত্রী নীচের দিকে ঝুঁকে তাকাল। মন্ত্রী দেখতে পেল শুধু চিড়িয়াখানার অধিকারী ও তার সঙ্গীই ছুটছে না তাদের অবস্থা দেখে অনেক পথচারিও ছোটাছুটি করছে। তখন মন্ত্রী দুর্গের দ্বারপালকে আসল ঘটনা যে কী তা জানার জন্য পাঠাল। ঠিক তখনই চিড়িয়াখানার অধিকারী ও সঙ্গী সেনাটি রাজপ্রাসাদের দ্বারে পৌঁছে গেল। ওরা ঘোড়া থেকে নেমে ভিতরে যেতে চাইল।

প্রাসাদের দ্বারে যে দাঁড়িয়ে ছিল সে কী যেন বলতে গেল এমন সময় চিড়িয়াখানারা অধিকারী তাকে ধমক দিয়ে বলল, 'কী বলতে চাইছ তুমি? এখন কি আজেবাজে কথা বলার সময় আছে? বাইরের শত্রু দেশের ভিতরে ঢুকে পড়েছে আর এরকম একটা চরম সংকটের সময় তুমি আজেবাজে প্রশ্ন করছ! সর সামনে থেকে!'

'দেশ বিপন্ন! দেশ আক্রান্ত!' বলে চিৎকার করতে করতে চিড়িয়াখানার অধিকারীর সঙ্গে যে সেনা ছিল সে কথার মাঝেই এগিয়ে গেল। ঢুকে গেল প্রাসাদে। মুহূর্তে তার পিঠে বিদ্ধ হল প্রাসাদের দ্বারে দণ্ডায়মান প্রহরীর বল্লম। সেনাটি, 'মহারাজ বীরসিংহের জয় হোক!' বলে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

প্রাসাদের উপর থেকে এই দৃশ্য দেখে রাজা খুশি হয়ে মন্ত্রীকে বললেন, 'দেখলে তো মন্ত্রী, আমার সেনাদের রাজভক্তি কত গভীর। এই ধরনের রাজভক্ত সেনাদের নিয়ে আমি ইচ্ছে করলে অনেক রাজ্য জয় করতে পারি।'

রাজার কথা মন্ত্রীর মনে ধরল না। মন্ত্রী চিড়িয়াখানার অধিকারীর কথা শুনেছিল। সে যে ভীষণভাবে বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায় ছোটাছুটি করছিল তাও তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।

মন্ত্রী হাত তুলে পাহারাদারকে ডেকে বললেন, 'ওহে, এক কাজ কর। ওকে ঘোড়াসহ অথবা ঘোড়া ছাড়া নিয়ে এসো।'

মন্ত্রীর আদেশে মুহূর্তে চিড়িয়াখানার অধিকারী মহলের ভিতরে ঢুকে গেল। আহত সেনাটিও গেল মহলের ভিতরে।

সেখান থেকে তাদের দু-জনকে মহলের উপরে মন্ত্রী ও রাজার কাছে নিয়ে গেল মহলের পাহারাদার সেনারা। মন্ত্রী তাদের গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা দু-জনে অনেক পুরোনো রাজকর্মচারী, তোমরা কি জানো না প্রাসাদের সামনে ঘোড়া ছুটিয়ে ঢোকা নিষেধ? এই সাধারণ জ্ঞানবুদ্ধি কি তোমাদের লোপ পেয়েছিল?'

মন্ত্রীর প্রশ্ন শুনে চিড়িয়াখানার অধিকারী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'মহামন্ত্রী, ক্ষমা করবেন। দেশ আক্রান্ত হওয়ায় সাধারণ নিয়মকানুনের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। উদবেগের ফলে জ্ঞানবুদ্ধি কিছুক্ষণের জন্য লোপ পেয়েছিল।'

ওর কথা শুনে রাজা বীরসিংহ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বীরপুর রাজ্যের উপর আক্রমণ করতে আসছে? কারা? কখন? রাজা বীরসিংহ অধিকারীকে প্রশ্ন করতে যাবেন এমন সময় মন্ত্রী গর্জে উঠে বলল, 'কী বললে? দেশ আক্রান্ত হয়েছে? কে আক্রমণ করেছে? কারা আসছে আমাদের দেশে? তুমি জানলে কী করে? দেশে কেউ পা রাখলে সীমান্ত সেনার কাছ থেকে প্রথমেই সেনাপতি খবর পেয়ে যায়। সেনাপতির আগে তোমাকে কে খবর দিয়েছে? তুমি থাক নগরে, পশুপাখিদের দেখাশোনার ভার তোমার। তোমার দৌড় চিড়িয়াখানা পর্যন্ত। তুমি সীমান্তের খবর জানলে কী করে? তাড়াতাড়ি আমার প্রশ্নের জবাব দাও।'

চিড়িয়াখানার অধিকারী আরও ঘাবড়ে গিয়ে বলল, 'মহামন্ত্রী ক্ষমা করবেন। আমি চিড়িয়াখানার পশুপাখিদের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আমাদের রাজ্যের উত্তর প্রান্তের বনে গিয়েছিলাম সেখানে সমরবাহু নামে এক রাজার সেনারা হঠাৎ আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমরা প্রবল পরাক্রমে তাদের পরাস্ত করেছিলাম। কিন্তু পরক্ষণেই উটে চড়ে আরও কয়েক জন লোক এসে আমাদের উপর আক্রমণ করল। আমরা বীরত্বের সঙ্গে তাদেরও মোকাবিলা করলাম। কিন্তু এইবার আমাদের কয়েক জন ওদের প্রচণ্ড আক্রমণের মোকাবিলা করতে গিয়ে আহত হল। আমাদের দু-একজন সেনা মারাও গেল। অবশ্য ওদের লোকও মারা গেছে। এরকম অবস্থায় আমি এই সেনাটিকে নিয়ে খবর দিতে জীবন মুঠোয় করে এসেছি।'

ওর কথা শুনে রাজা ও মন্ত্রী ভয় পেলেন। তাঁদের মনে হল কোনো এক প্রবল প্রতাপান্বিত পরাক্রমশালী রাজা বহু সেনা নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে তাঁদের রাজধানী আক্রমণ করতে পারে। যেকোনো মুহূর্তে তাঁরা শত্রুর কবলে পড়তে পারে।

রাজা ও মন্ত্রী দু-জনের কেউই মুখ খোলেন না। সব চুপচাপ। তাঁদের মুখে কথা সরছে না। অনেকক্ষণ পরে রাজা থেমে থেমে বললেন, 'আমাদের চিড়িয়াখানার অধিকারীর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমাদের দেশের উত্তরপ্রান্তে প্রবল শক্তিশালী কোনো রাজা এসে গেছে। শত্রুর কবলে হয়তো আমাদের উত্তর প্রান্ত আক্রান্ত। অবিলম্বে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। আপনি তাড়াতাড়ি সেনাপতিকে ডেকে পাঠান।'

মন্ত্রী সেনাপতিকে ডেকে পাঠানোর জন্য লোক পাঠিয়ে চিড়িয়াখানার অধিকারীর আপাদমস্তকের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তোমার কাজ হল পশুপাখিদের ধরা, তাদের লালনপালন করা। তাইতো? কিন্তু উত্তরপ্রান্তে তোমরা যেভাবে যুদ্ধ করেছ বলছ তাতে মনে হচ্ছে তোমরা যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিলে। তোমরা কি কোনো শত্রুর আক্রমণের আশঙ্ক করেই প্রস্তুত হয়ে বেরিয়েছিলে?'

'মহামন্ত্রী, আমাকে বাঘ, সিংহ ধরতে গিয়ে অনেক কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। ওই হিংস্র জানোয়ারদের সঙ্গে একরকম যুদ্ধ করেই জয়ী হতে হয়। কাজেই প্রস্তুতি আমাদের থাকেই। প্রাণের দায়েই রাখতে হয়। তাই এই প্রস্তুতি নিয়ে হঠাৎ আক্রান্ত হলে আমরা শত্রুকে পালটা আক্রমণ না করে কী বা করতে পারি! শত্রুকে আক্রমণ না করার অর্থই তো মৃত্যু।' চিড়িয়াখানার অধিকারী বলল।

তার কথা শুনে মন্ত্রীর মন থেকে যেন সন্দেহের মেঘ কাটল না। মন্ত্রী তাকে কাছে ডেকে একবার ঘুরে দাঁড়াতে বলল। অধিকারী মন্ত্রীর নির্দেশমতো ঘোরার সময় মন্ত্রী দেখছিল তার গায়ে বা কাপড়ে তরবারির আঘাতের কোনো চিহ্ন আছে কি না। কিন্তু তা ছিল না।

মন্ত্রী মাথা নেড়ে একটু কেশে বলল, 'মহারাজ, এর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমাদের দেশের উত্তর প্রান্তে এক দল লোক উটে চড়ে এসেছে। তবে এ যে ধরনের আক্রমণ, প্রতি আক্রমণ, যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়ে বলছে তাতে মনে হচ্ছে...'

ওর কথা শেষ হতে-না-হতেই সেনাপতি খাপখোলা তরবারি নিয়ে এসে রাজা ও মন্ত্রীকে নমস্কার করে দাঁড়াল।

মন্ত্রী তার নমস্কার করার পর চিড়িয়াখানার অধিকারীর বক্তব্য পরিবেশন করে, বলল, 'আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে দেশের ভিতরে উত্তর প্রান্ত থেকে কোথাকার কোনো রাজার সেনারা ঢুকে আমাদের লোকের উপর আক্রমণ করল অথচ সেনাপতির কিছুই জানা নেই। আপনি কি সীমান্ত গুপ্তচরদের রাখেননি? আশেপাশের দেশে কি আমাদের গুপ্তচররা ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে? কেন এরকম হল? কেন আপনি জানেন না?'

মন্ত্রীর কথা শুনে সেনাপতি অবাক হল। চিড়িয়াখানার অধিকারীর দিকে একবার কটমট করে তাকিয়ে বলল, 'আপনাকে চিড়িয়াখানার অধিকারী যা বলেছেন তার মধ্যে কিছুটা সত্য থাকতে পারে। তবে যতটুকু বুঝতে পারছি তাতে বেশির ভাগ কথাই তাঁর বানানো। উত্তর প্রান্তে উটের পিঠে চড়ে কিছু লোকের আসার খবর পেয়ে আমি ইতিমধ্যেই গুপ্তচর পাঠিয়েছি। কিন্তু গুপ্তচরদের মধ্যে সবচেয়ে যে বিশ্বাসী ছিল সে বনের অধিবাসী এক সুন্দরী যুবতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করে তাদের মধ্যে রয়ে গেছে। ফলে উটে চড়ে আসা লোকদের সম্পর্কে সঠিক খবর এখনও আমার কাছে এসে পৌঁছায়নি।'

'এই যে দেরি হচ্ছে এর মধ্যে নিশ্চয় শত্রু নিজের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে। পাঠালেন তো পাঠালেন এমন এক অবিবাহিত যুবককে পাঠালেন যে শত্রুপক্ষের মেয়েকেই ভালোবেসে বিয়ে করে ওদের খপ্পরে পড়ে গেল। এবার বুঝলেন তো কোনো অবিবাহিতকে গুপ্তচর বিভাগে রাখা কতখানি ক্ষতিকর।' মন্ত্রী রাগে গুরুগম্ভীর গলায় বলল।

রাজা গোঁফে তা দিয়ে বললেন, 'সেনাপতি আর দেরি করা যে কোনোক্রমেই উচিত নয় তা তো বুঝতে পারছ। শত্রুপক্ষের রাজার নাম যে সমরবাহু তাও জানলে। এরা আরও জানিয়েছে যে ওরা পাহাড়ের উপরে একটা দুর্গও তৈরি করেছে। আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি, তুমি আর কালমাত্র বিলম্ব না করে এক্ষুনি সেনা নিয়ে এগিয়ে যাও। ওদের হত্যা কর। আর ওই সমরবাহুকে জ্যান্ত ধরে নিয়ে এসো।'

'যে-আজ্ঞে মহারাজ।' এ-কথা বলে সেনাপতি রাজা ও মন্ত্রীকে নমস্কার করে চলে গেল। সেনাপতি এক-শো ঘোড়সওয়ার ও দু-শো পদাতিক সেনা নিয়ে সমরবাহু যেখানে দুর্গ বানাচ্ছিল সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হল।

সমরবাহু যেদিন থেকে ভালুক জাতের লোকের হাতে বন্দি হয়েছিল সেদিন থেকে স্বর্ণাচারিই ছিল সমরবাহুর দলের নেতা। চিড়িয়াখানার অধিকারীর দলের সঙ্গে সমরবাহুর লোকের সংঘর্ষের পরেই স্বর্ণাচারি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দ্রুত দুর্গের কাজ করতে লাগল। স্বর্ণাচারির একটা ব্যাপারে দুর্ভাবনা ছিল। তা হল, সমরবাহুর আসার আগেই যদি দুর্গ আক্রান্ত হয়, সেই দেশের রাজা যদি তাদের ধরে নিয়ে যায় তাহলে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত জানবে যে সে কোথায়? এই চিন্তাই স্বর্ণাচারির মনে গেঁথে রইল।

এসব কথা ভেবেই স্বর্ণাচারি ঠিক করল যেকোনোভাবে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেতে হবে এবং তারজন্য চাই ভালো দুর্গ। দুর্গও যদি আক্রান্ত হয় তাহলে পালানোর জন্য সুড়ঙ্গ তৈরি করল দু-একটা। সমস্ত ব্যবস্থা করে অজানা বিপদের আশঙ্কায় দিন গুনতে লাগল। এত বড়ো কাজ করতে অনেক লোকের দরকার হয়েছে। তাই ওই বনের বহু অধিবাসীকে হাত করতে হয়েছে। তাদের অনেক পয়সাকড়ি দিয়ে কাজ করাতে হয়েছে। বাঘ ও সিংহকে প্রতিরক্ষা শক্ত করার আশাতেই রাখা হয়েছিল। শত্রু যখন আক্রমণ করতে আসবে তখন প্রয়োজনবোধে ওই বাঘ ও সিংহকে ছেড়ে দেওয়া হবে। বাঘ সিংহের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য যখন শত্রু সেনারা ছোটাছুটি করবে তখন বিভ্রান্ত হয়ে, হকচকিয়ে গিয়ে কী ঘটেছে বুঝতে না পেরে বনের অধিবাসীদের বহু লোক হয় বন ছেড়ে পালাবে আর না হয় পয়সার লোভে ওই দুর্গে ঢুকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবে।

স্বর্ণাচারি সমস্ত দিক থেকে যখন প্রস্তুত হয়ে গেল তখন সে খবর পেল যে বীরপুরের সেনারা আক্রমণ করতে আসছে। স্বর্ণাচারি নিজের লোকের হাতে বল্লম দিয়ে বলল যে, যে মুহূর্তে শত্রু সেনা পাহাড়ের নীচে পৌঁছে যাবে তক্ষুনি কোনো কথা না বলে, কোনোরকম ঘোষণা ছাড়াই যেন তারা বল্লম ছোড়ে তাদের দিকে।

বীরপুরের সেনাপতির নেতৃত্বে এক-শো ঘোড়সওয়ার ও দু-শো পদাতিক সৈন্য পাহাড়ের নীচে এসে দাঁড়াল। সেনাপতি উচ্চস্বরে বলল, 'ওহে শোনো! আমি বীরপুরের সেনাপতি বলছি, তোমরা তোমাদের অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করো। আর তা না হলে তোমাদের প্রত্যেককে কেটে টুকরো টুকরো করা হবে।'

আর সেই মুহূর্তে পাহাড়ের উপর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বল্লম বীরপুরের সেনাদের উপর পড়তে লাগল। সেই বল্লম-বৃষ্টির হাত থেকে সেনাপতিও নিস্তার পায়নি। তার কাঁধেও বিদ্ধ হল একটি বল্লম। সে আর্তনাদ করতে লাগল।

উনিশ

সমরবাহুর অনুচরদের ছুড়ে মারা একটি বল্লম তীব্রবেগে এসে বীরপুরের সেনাপতির কাঁধে বিঁধেছিল। সেনাপতি সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে ঘোড়া থেকে নীচে পড়ে যায়। তখন তাকে নিয়ে সেনাবাহিনীর একজন লোক তাড়াতাড়ি সরে যায় সেখান থেকে। সেনাপতির কাঁধে পটি বেঁধে দেয় সেনাটি।

স্বর্ণাচারি সমরবাহুর অনুচরকে প্রশংসা করে বলে ওঠে, 'প্রথম আঘাতেই আমরা শত্রুকে নাজেহাল করতে পেরেছি। গুনতে গেলে আমরা সংখ্যায় মাত্র ছাব্বিশ জন আছি কিন্তু শত্রুর এই আঘাতেই ধারণা হবে যে আমরা সংখ্যায় অনেক বেশি আছি। এই আঘাত হানার ফলে শত্রু আমাদের এই পাহাড়ের উপর ওঠার সাহস করবে না।'

এ-কথা শুনেই সমরবাহুর একজন অনুচর বলল, 'মহামন্ত্রী, শত্রু যদি পাহাড়ে উঠতে চায় তো ভয় পাবার কিছু নেই। আমাদের সঙ্গে যে বনবাসী এসেছে তারা শত্রুর উপর বাঘ এবং সিংহ লেলিয়ে দেবে।'

স্বর্ণাচারি পাহাড়ের নীচে বীরপুরের যে সেনারা জমেছিল তাদের দিকে একবার ভালো করে দেখে নিল। তাদের মধ্যে মাত্র কয়েক জন ঘোড়ায় বসেছিল। অন্যেরা আহত সেনাপতিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল তার কাছ থেকে আদেশ বা নির্দেশ শোনার আশায়। আঘাতের ফলে কাতরাতে কাতরাতে সেনাপতি বোঝাচ্ছিল কীভাবে পাহাড়ের উপর উঠতে হবে।

সমরবাহুর দু-জন সাহসী অনুচর স্বর্ণাচারির কাছে গিয়ে বলল, 'মহামন্ত্রী, মনে হচ্ছে, শত্রুকে আক্রমণ করার এটাই উপযুক্ত সময়। আপনি নির্দেশ দিলে আমরা তাদের আঘাত হেনে এই মুহূর্তে তাদের ঘোড়াগুলো দখল করে নেব।'

সমরবাহুর অনুচরদের সাহস দেখে স্বর্ণাচারির খুব আনন্দ হল। কিন্তু নীচে নেমে বীরপুরের সেনাদের আঘাত হানার ব্যাপারটা তার কাছে কেমন যেন অবিশ্বাস্য ঠেকল। স্বর্ণাচারি তাদের বলল, 'দেখ, তোমরা তাড়াহুড়ো করো না। সংখ্যার দিক থেকে ওরা আমাদের দশ গুণ আছে। পাহাড় থেকে আমাদের নামতে দেখে ওরা মুহূর্তে সতর্ক হয়ে যাবে এবং আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে সর্বনাশ করে ফেলবে। ভালো কথা, আমাদের উটগুলো পাহাড়ের ওপাশের সমতল ভূমিতে সযত্নে রাখা আছে তো?'

'সমস্ত উট আমরা এক জায়গায় রেখে তাদের দেখাশোনার জন্য পাহারার ব্যবস্থা করেছি। এখন আপনার নির্দেশ তাড়াতাড়ি জানান। আমাদের বল্লমের নাগালের বাইরে ওরা চলে যাচ্ছে। এখন কি ওরা সেখানে আর আমরা এখানে বসে থাকব? ব্যাস, এই হবে আমাদের কাজ?' বলল সমরবাহুর দু-জন অনুচর।

ওই অনুচর দু-জন এমনভাবে কথা বলছিল যেন সেই মুহূর্তে স্বর্ণাচারির নির্দেশ পেলে তারা শত্রুপক্ষকে দূর করে দিতে পারবে। তাদের এই অস্থিরতা লক্ষ করে স্বর্ণাচারি কোনোরকম রাগ প্রকাশ করল না। স্বর্ণাচারি একটু হেসে বলল, 'তোমরা এ-কথা ভেব না যে লড়াই শেষ হয়ে গেছে। তোমরা কি ভাবছ যে ওদের সেনাপতি ঘায়েল হয়েছে বলে তার সেনারা সব পালাবে? জলে কি মাছ দুর্বল থাকে। বীরপুরের সেনারা বীরপুরের একটা অংশ অত সহজে ছেড়ে দেবে? পালালে বীরপুরের রাজা কি তাদের দেশদ্রোহী বলে ঘোষণা করবে না? তাদের ফাঁসি দেবে না?'

স্বর্ণাচারি এসব কথা বলতে-না-বলতেই দেখা গেল বীরপুরের সেনারা ছোটাছুটি করতে লাগল এবং কয়েক জন ঘোড়ায় উঠে বসল। আর দু-জন সেনা ধরাধরি করে সেনাপতিকে ঘোড়ায় বসিয়ে দিল। তার পাশে ছিল চার-পাঁচ জন সৈনিক। সেনাপতি ঘুরে ঘুরে পাহাড়ের চারদিক দেখতে লাগল।

সেনাপতির চালচলন লক্ষ করে স্বর্ণাচারি বুঝল যে সেনাপতি পথ খুঁজছে সহজে পাহাড়ে ওঠার।

প্রত্যেক দিন সমরবাহুর লোকেরা যে পথে পাহাড়ে ওঠানামা করে সেই পথ ওই সেনাপতির পক্ষে চিনে ফেলা খুব কঠিন কাজ নয়। এ-কথা মনে হতেই তার বুক আতঙ্কে কেঁপে উঠল। তখন স্বর্ণাচারি সমরবাহুর অনুচরদের বল্লম ও পাথর নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলল। আর নিজে গেল বাঘ ও সিংহ নিয়ে আসা বনবাসীদের সঙ্গে কথা বলতে।

স্বর্ণাচারিকে তাদের দিকে আসতে দেখেই বনবাসীরা খুশি হয়ে তাকে নমস্কার করে দাঁড়াল। ওদের নেতা সামনে এগিয়ে এসে শ্রদ্ধাভরে নমস্কার করে স্বর্ণাচারিকে সবিনয়ে বলল, 'মহারাজ, বীরপুরের সেনার চেয়ে আপনার সেনা বেশি ক্ষমতাবান মনে হচ্ছে। না নাহলে প্রথম আঘাতেই ওরা সেনাপতিকে আহত করতে পারত না।'

'ওদের সেনাপতি আহত হয়েছে, মরেনি। শত্রুপক্ষের সেনাপতিকে আহত করার অর্থ ওই পক্ষের সমস্ত সেনাকে সতর্ক করে দেওয়া। এখন শত্রু সেনারা চেষ্টা করছে পাহাড়ের উপর উঠে এসে আমাদের আক্রমণ করতে। পাহাড়ের উপর উঠে আসার যে পথ আছে সেই পথে তারা খুব সহজেই উপরে উঠে আসতে পারে। তোমরা আমার ইশারা পেলেই যাতে সিংহ এবং বাঘকে ছেড়ে দিতে পার সেইভাবে প্রস্তুত থেকো।' স্বর্ণাচারি বলল।

তারপর স্বর্ণাচারি সেই বনবাসীদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে পাহাড়ে ওঠার পথের পাশের একটি গুহা ওদের দেখিয়ে দিল। বাঘ ও সিংহের পিঞ্জরাগুলো ওই গুহার কাছে রাখা হল।

বনবাসীদের নেতা নিজের অনুচরদের দেখিয়ে স্বর্ণাচারিকে বলল, 'মহারাজ, যে মুহূর্তে বীরপুরের সেনারা এদিকে আসবে, আমার অনুচররা কালমাত্র বিলম্ব না করে এই বাঘ ও সিংহকে এই পিঞ্জরা থেকে বের করে দেবে। এই প্রাণী আজ কতদিন খেতে পায়নি। মুহূর্তে যাকে সামনে পাবে তাকেই ছিঁড়ে খাবে।'

'ওই জানোয়ারগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার পর ওরা শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আবার ছুটে বনেও ঢুকে যেতে পারে। তা ঘটনা যাই ঘটুক, তোমরা তোমাদের কাজ ঠিক সময়ে করবে। আর একটি কথা তোমরা যে আমাকে রাজা ভাবছ তা কিন্তু ঠিক নয়। আমি মন্ত্রী। তবে মনে রেখো আমাদের রাজা এই কাজের জন্য তোমাদের উপযুক্ত পুরস্কার দেবেন।' স্বর্ণাচারি বনবাসীদের বলল।

স্বর্ণাচারি বনবাসীদের সাথে কথা বলে সমরবাহুর অনুচরদের কাছে ফিরে এসে বার বার নীচের দিকে তাকাল। ইতিমধ্যে বীরপুরের সেনাপতি একটি পরিকল্পনা করে ফেলল। তারা পাহাড়ের উপর ওঠা শুরু করে দিল। পাহাড়ের উপর থেকে যখন পাথর এবং বল্লম তাদের উপর পড়তে লাগল তখন তার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তারা কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ত আবার পরক্ষণেই উপরের দিকে উঠত। উঠতে উঠতে তির ছুড়ত।

তাদের এই কৌশল দেখে স্বর্ণাচারি বুঝে নিল যে এইভাবে তির ছুড়তে ছুড়তে এবং আত্মরক্ষা করতে করতে শেষপর্যন্ত কিছু সৈন্য অবশ্যই উপরে উঠে আসবে। তখন নিজের মাত্র ছাব্বিশটি সৈনিক নিয়ে শত্রুপক্ষের সেনাদের পরাজিত করা সহজ হবে না। এইকথা ভেবে স্বর্ণাচারি অনুচরদের ডেকে বলল, 'যুদ্ধ করার একটা কৌশল আছে। সবসময় যে শুধু এগিয়ে যেতে পারব তা নাও হতে পারে, পেছতেও হতে পারে। এমন বহু যুদ্ধ হয়েছে যেখানে এক-পা এগিয়ে দু-পা পেছতে হয়েছে। তাই যত বেশি সম্ভব শত্রুদের খতম করে এখান থেকে আমাদের গোপন পথে পালানো ছাড়া অন্য কোনো পথ দেখছি না। আমাদের দু-জন লোক আগে থেকেই ওখানে আছে। আরও দু-একজন গিয়ে উট নিয়ে প্রস্তুত থেকো।'

ইতিমধ্যে বীরপুরের সেনারা পাহাড়ের উপর ভালোভাবেই ওঠা শুরু করে দিয়েছিল। সেনাপতি নীচে থেকে যেভাবে নির্দেশ দিচ্ছিল ওরা সেইভাবে উপরের দিকে উঠছিল।

'হে উষ্ট্রবীরগণ, আমার কথা মন দিয়ে শোনো। বীরপুরের সেনাপতি মুর্খের মতো তার ঘোড়সওয়ারকে পাহাড়ের উপর তুলছে। ওর ধারণা আমাদের উটগুলো পাহাড়ের উপরেই আছে। তোমরা এখন উপর থেকে বড়ো বড়ো পাথর গড়িয়ে দাও। ওরা হকচকিয়ে তাল সামলাতে পারবে না। ফলে ওদের অনেকে আহত হবে এবং কিছু লোক মারা যাবে। সঙ্গে সঙ্গে বল্লমও ছোড়।' স্বর্ণাচারি আদেশ দিল।

সমরবাহুর অনুচররা স্বর্ণাচারির নির্দেশ মতো পাথর গড়িয়ে দিতে লাগল। গড়িয়ে দেওয়া পাথরগুলো প্রত্যেকটা যে শত্রুর উপর পড়ছিল তা নয়। কয়েকটা গড়াতে গড়াতে এদিক-ওদিক পড়ে যাচ্ছিল। ওদের এই অসফলতার ফলে বীরপুরের সেনাদের মনে উৎসাহ বেড়ে যাচ্ছিল। ওরা তরবারি বের করে নিজের রাজার জয়ধ্বনি করছিল। ওদের কণ্ঠে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, 'বীর বীরপুরের রাজার জয়!'

কিছুক্ষণের মধ্যেই বীরপুরের সেনারা বাঘ ও সিংহ নিয়ে যে গুহায় বনবাসীরা অপেক্ষা করে বসেছিল, সেইখানে এল। এদিকে স্বর্ণাচারি তখন ভাবছিল বনবাসীরা ঠিক সময়ে বাঘ ও সিংহকে শত্রুর উপর ছেড়ে দেবে না নিজেরাই ভয়ে পালাবে। নিজেদের রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে কতটা যে এগিয়ে আসবে, সাহায্য করবে তার পরীক্ষা এখনও হয়নি। ঠিক তখনই শুনতে পেল সিংহ ও বাঘের গর্জন। উঁকি মেরে দেখতে পেল ওই জানোয়ারগুলো বীরপুরের সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই ঘটনার ফলে শত্রু সেনাদের মধ্যে দারুণ হাহাকার ও আর্তনাদ জেগে ওঠে। ওরা এই ধরনের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। চোখের পলকে চার-পাঁচ জন সেনা বাঘ ও সিংহের আক্রমণের ফলে পাহাড় থেকে নীচে গড়িয়ে পড়তে থাকে। কয়েক জন সেনা প্রাণ মুঠোয় করে পালাতে থাকে। ঘোড়সওয়ার সেনাদের মধ্যেও দারুণ অনিশ্চিত অবস্থা দেখা দিল। ঘোড়াগুলো যে যেদিকে পারল ছুটে পালাতে লাগল। কিছু ঘোড়া আহত হয়ে গড়াতে গড়াতে নীচে পড়ে গেল। আর ওদের চাপে পড়ে বহু সেনা আহত হল। সেনাপতির নির্দেশ আর কেউ মানছিল না। অবস্থা দেখে সেনাপতিও হকচকিয়ে গেল। কী যেন হচ্ছে কীভাবে যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিল না। গোটা ব্যাপারটা যেন তার নাগালের বাইরে। বহু সৈনিক যে যেদিকে পারল পালাতে লাগল। বীরপুরের সেনাদের এই অবস্থা দেখে স্বর্ণাচারি ও সমরবাহুর অনুচরদের মধ্যে দারুণ আনন্দ হল। যত জন পাহাড়ের উপরের দিকে উঠছিল, তারা প্রত্যেকে পালিয়েছে অথবা আহত হয়েছে। এই অবস্থা দেখে সমরবাহুর অনুচররা স্বর্ণাচারিকে বলল, 'মহামন্ত্রী, আমাদের নির্দেশ দিন, বীরপুরের পলায়মান সেনাদের বল্লম দিয়ে মেরে শেষ করে দি।'

স্বর্ণাচারি তাদের এই কথার কোনো জবাব দিল না। সে হিসেব কষে দেখল বীরপুরের যে সেনাদের মেরে ফেলা হয়েছে তাদের সংখ্যা ওদের দশভাগের এক ভাগ হবে। বাকি নয় ভাগ নিশ্চয় আশেপাশে বনজঙ্গলে লুকিয়ে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সেই মুহূর্তে বাঘ বা সিংহ সমরবাহুর লোকের হাতে আর নেই।

এদিকে পাহাড়ের নীচে অদূরে বীরপুরের সেনাপতি পলায়মান সেনাদের জড়ো করে তারপর কী করবে না করবে বোঝাচ্ছিল। সেনাপতির নির্দেশে কয়েক জন ঘোড়সওয়ার পাহাড়ের অন্য প্রান্ত ঘুরে ঘুরে দেখছিল। স্বর্ণাচারি সমরবাহুর লোককে ওই ঘোড়সওয়ারদের দেখিয়ে বলল, 'দেখ, সাহস ভালো জিনিস কিন্তু যুদ্ধের সময় দুঃসাহস ভালো নয়। ওই দেখ বীরপুরের সেনাপতি আবার উঠে-পড়ে লেগেছে আমাদের আক্রমণ করতে। এখন আমরা যে কয় জন আছি, আমাদের পক্ষে ওদের আক্রমণের জবাব দেওয়া সম্ভব নয়। শত্রু যখন সবল তখন তাকে আক্রমণ করা মূর্খতা। ওরা লড়বে ওদের মতো, আমরা লড়ব আমাদের মতো। এখন আমাদের শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। তা না হলে ওদের মোকাবিলা করতে পারব না। এখন আমাদের উচিত এখান থেকে সরে পড়া। আমাদের উট প্রস্তুত রয়েছে। বনে কিছুদূর যাওয়ার পর আমরা হয়তো দুই ক্ষত্রিয় যুবক ও সমরবাহুর সাক্ষাৎ পেতে পারি।'

'সিংহ ও বাঘ নিয়ে যে বনবাসী সঙ্গে এসেছিল ওরা আমাদের সঙ্গে কি নেই? ওদের সাহায্য পেলে শত্রুকে পরাজিত করা সহজ হত?' সমরবাহুর একজন অনুচর বলল।

'হয়তো ওরা ভয় পেয়ে বনে পালিয়েছে।' স্বর্ণাচারি বলল।

'মহামন্ত্রী, এখন যদি আমরা পালাই তাহলে কি শত্রু আমাদের কাপুরুষ ভাববে...' কথাটা শেষ হতে-না-হতেই সমরবাহুর সেই লোকটা দেখতে পেল তার অনুচররা ছুটতে ছুটতে আসছে। ওরা এসে স্বর্ণাচারিকে বলল, 'মহামন্ত্রী, শত্রু আমাদের উটগুলোর দিকে আসছিল। আমরা তখন তাড়া করতে এগিয়ে গেলাম। ওরা কিন্তু আমাদের কিছু না বলে চুপচাপ সরে পড়ল। ওদের গতিবিধি দেখে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে ওরা খুব সম্ভব আমাদের ওপর বড়ো ধরনের আক্রমণ করার জন্য জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।'

'তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ওরা যদি আমাদের উটগুলো নিয়ে যায়, তাহলে আমরা দু-দিক থেকে বিপদে পড়ব। অতএব আর দেরি নয় চল উটের কাছে যাই।' স্বর্ণাচারি এ-কথা বলে পাহাড় থেকে নীচে নামতে লাগল।

স্বর্ণাচারি ও সমরবাহুর অনুচররা পাহাড় থেকে নীচে নেমে উটের উপর বসতে না বসতেই দেখা গেল চল্লিশ-পঞ্চাশ জন বীরপুরের ঘোড়সওয়ার তরবারি ও বল্লম উঁচিয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। মুহূর্তে স্বর্ণাচারি ঠিক করে নিল যে শত্রু যখন দেখে ফেলেছে তখন আর পিছনের দিকে না পালিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই ভালো। নতুন পরিস্থিতিতে নতুন কৌশল প্রয়োগ করাই যুদ্ধের নীতি। আঘাত না হানলে আঘাত খেতে হবে শত্রুর কাছ থেকে। তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে স্বর্ণাচারি সমরবাহুর অনুচরদের উদ্দেশ্য করে বলল, 'হে উষ্ট্রবীরগণ, পাহাড়ি দুর্গের দেবীর কাছে শত্রুকে বলি দেবার জন্য তোমরা সামনের দিকে এগিয়ে চল।'

পরক্ষণেই রণধ্বনি তুলে বীরপুরের ঘোড়সওয়ার সেনারাও স্বর্ণাচারির দিকে দ্রুত ধাবিত হল।

কুড়ি

স্বর্ণাচারি তরবারি উঁচিয়ে বীরপুরের ঘোড়সওয়ার সেনাদের উপর উট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

এতে সমরবাহুর অনুচররাও খুব উৎসাহ পেয়ে বীরপুরের সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এগিয়ে গেল।

ফলে উভয় দলে প্রচণ্ড যুদ্ধ হল। উটের উপর সওয়ার হয়ে বল্লম ও তরবারি দিয়ে ঘোড়ায় চড়া বীরপুরের সেনাদের পর্যুদস্ত করতে থাকল। তবে যুদ্ধে কেউ হেরে যায়নি অত সহজে। ছলে-বলে সমস্ত রকমে মোকাবিলা করেছে ওরা।

পাঁচ সাত মিনিটের প্রচণ্ড যুদ্ধে উভয়পক্ষের কয়েক জন সৈনিক আহত হয়ে বাহনের উপর থেকে নীচে পড়ে গেল। বীরপুরের ঘোড়াগুলো কোনোদিন এর আগে উট দেখেনি।

ফলে কিছুক্ষণের জন্য ঘোড়াগুলো থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে লাগল। পালাতে লাগল কয়েকটা ঘোড়া। ফলে যারা এসেছিল সমরবাহুর অনুচরদের ঘিরে ফেলে পরাজিত করতে তারা পারল না জয়ী হতে। পালানোর চেষ্টা করেও পালাতে পারল না স্বর্ণাচারি। শেষে অবস্থা ফিরে গেল। স্বর্ণাচারিকেও কৌশল বদলাতে হল। কারণ তার পক্ষের লোকও অনেকে আহত হয়েছে।

মাত্র পনেরো-ষোলো জনকে নিয়ে আর কতক্ষণ যুদ্ধ করা যায়। ওদের নিয়ে স্বর্ণাচারি পালাল।

এই পালানোর পিছনে একটি কারণ আছে। স্বর্ণাচারির মনের গভীরে একটি উদ্দেশ্য আছে। ওই উদ্দেশ্যকে কার্যকরী তাকে করতেই হবে। এবং তা করতে হলে তাকে আর বিপদের ঝুঁকি এই ক্ষেত্রে নেওয়া উচিত নয়।

ততক্ষণে বীরপুরের সেনাপতি ওখানে এসে বলল, 'একি তোমাদের ভিতর থেকে শত্রুরা পালাতে পারল কী করে? তোমরা কী করছিলে?'

বীরপুরের ঘোড়সওয়ার নেতা এসে বলল, 'আমরা বহু শত্রুসেনাকে বধ করতে পেরেছি। অন্যেরা বনে পালিয়েছে।'

'যারা পালাচ্ছে তাদের বন্দি না করে তুমি এখানে কী করছ?' সেনাপতি রেগে গিয়ে বলল।

'আজ্ঞে আমি ভেবেছি আমার আহত সেনাদের বাঁচানোর ব্যবস্থা করে আরও ঘোড়সওয়ার সেনা নিয়ে জঙ্গলে ওদের আক্রমণ করে শেষ করে দেব।' ঘোড়সওয়ার সেনাদের নেতা বলল।

'তুমি ভাবছ, তুমি যতক্ষণ না তৈরি হয়ে ওদের আক্রমণ করতে যাচ্ছ ততক্ষণ ওরা তোমার অপেক্ষায় বসে থাকবে? তোমরা হেরে গেছ, অথবা তোমাদের ভেতর থেকে ওরা পালিয়েছে, এ দুটোর মধ্যে একটাও সত্য হলে তোমরা কি বুঝতে পারছ না যে রাজা তোমাদের কি শাস্তি দেবেন? ভেবে দেখেছ? তোমার আর আমার ফাঁসি হবে?'

সেনাপতি চটে গিয়ে বলল।

'আজ্ঞে ওদের আপনি ছোটো শত্রু ভাববেন না। আমি নিজের কানে শুনেছি অনুচররা ওদের একজনকে মহামন্ত্রী বলে ডাকছে। ওরা যেভাবে চলে ও কথা বলে তাতে মনে হয় ওরা এক মহাভারত...।'

ঘোড়সওয়ারদের নেতার কথা শেষ হতে-না-হতেই সেনাপতি গর্জে উঠে বলল, 'তুমি তোমার ভাষণ বন্ধ করবে? আর কালমাত্র বিলম্ব না করে যে ক-জন ঘোড়সওয়ারকে পাও, ওদের নিয়ে অনুসরণ কর। আমি আগে এই পাহাড়ের উপর উঠে পতাকা তুলে তোমাকে সাহায্য করতে যাচ্ছি। তখন আমি আরও কিছু সেনা নিয়ে যাব।'

ঘোড়সওয়ারদের নেতা সেনাপতিকে নমস্কার করে তার নির্দেশমতো স্বর্ণাচারিকে অনুসরণ করতে গেল।

সেনাপতির কথা শুনে ঘোড়সওয়ার নেতা বুঝতে পরল যে স্বর্ণাচারিকে ধরতে না পারলে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।

কিন্তু ততক্ষণে স্বর্ণাচারি সদলবলে অনেক দূর চলে গিয়েছিল। তার উদ্দেশ্য কোনোরকমে খড়গবর্মা, জীবদত্ত ও সমরবাহুকে পাহাড়ি দুর্গের হাতছাড়া হওয়ার খবর দেওয়া।

সে জানত কোন পথে গেলে সে ভালুক জাতের লোকের আস্তানা খুঁজে বের করতে পারবে। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর সদলবলে স্বর্ণাচারি একটি পুকুরের কাছে পৌঁছাল।

ওরা উট থেকে নামল। ওদের জল খাইয়ে চরতে ছেড়ে দিল। তারপর স্বর্ণাচারি তার দু-জন অনুচরকে বলল, 'শোনো, বীরপুর থেকে পদাতিক অথবা ঘোড়সওয়ার সেনা আমাদের খোঁজে আসতে পারে। ওরা যদি কম সংখ্যক সেনা থাকে তাহলে আমরা ওদের মেরে ফেলে মাটিতে পুঁতে ফেলব। আর যদি বেশি সংখ্যায় আসে তাহলে এই জায়গা ছেড়ে আমাদের তৎক্ষণাৎ পালাতে হবে। তাই এখন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে চারদিকে নজর রাখা।'

আধ ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। গাছের উপর বসে সমরবাহুর একজন অনুচর দেখতে পেল দশ-বারো জন ভালুক দলের লোক দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ওই পুকুরের দিকে ছুটে আসছে। এই দৃশ্য দেখে লোকটা স্বর্ণাচারির কাছে গিয়ে সব কথা বলল।

স্বর্ণাচারি অনুচরদের নিয়ে অদূরে গাছের আড়ালে লুকিয়ে বলল, 'যাদের খোঁজে আমরা যাচ্ছিলাম তারাই এদিকে আসছে। এই ভালুক দলের লোকেরাই আমাদের রাজা সমরবাহুকে বন্দি করে নিয়ে গিয়েছিল।'

ইতিমধ্যে ভালুক দলের লোক পুকুরের কাছে পৌঁছে গেল। ওদের একজন দেখতে পেল কয়েকটা উট চরে বেড়াচ্ছে। দেখেই তার গোটা শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল।

সে বলল, 'হে, মা বৃকেশ্বরী, আমাদের বাঁচাও।' সে তাড়াতাড়ি অন্যদের দেখাল ওই উটগুলোকে।

ভালুক দলের লোক মুহূর্তের জন্য কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদের সেই অবস্থা দেখে স্বর্ণাচারি মুহূর্তে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দু-জনের গায়ে বল্লম চালিয়ে দিল। ওরা 'হে মা, বৃকেশ্বরী' বলে আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। পরক্ষণেই পাঁচ-সাত জন ভালুক দলের লোক তাদের কাছে অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল। আর বাকি যারা ছিল তারা বাঘকে দেখে হরিণের মতো পালাল।

নতুন পরিস্থিতিতে নতুন কৌশল অবলম্বন করাই শত্রুকে পরাস্ত করার শ্রেষ্ঠ পন্থা। স্বর্ণাচারি মহামন্ত্রী হতে চায়। তাই সে নিজের বুদ্ধি সবসময় এ ব্যাপারে সজাগ রাখে।

ভালুক দলের যারা পালাল তারাই পুকুরের কাছে যা ঘটেছে তা পুকুরের দিকে যারা আসছিল সেই খড়গবর্মা, জীবদত্ত, সমরবাহু ও গুরু ভালুককে বলল।

'সে কি! যে স্বর্ণাচারির দুর্গের কাজে জড়িত থাকার কথা সে এখানে এসেছে কেন? এ তো বড়ো তাজ্জব ব্যাপার! পাহাড়ে কোনো বিপদ ঘটেনি তো! পালিয়ে আসেনি তো!' জীবদত্ত উদবিগ্ন হয়ে বলল।

'স্বর্ণাচারির রাজভক্তি সন্দেহাতীত। হয়তো ভালুক জাতের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করতে এখানে এসেছে।' সমরবাহু খুশি মেজাজে বলল।

জীবদত্ত কেন যে এ-কথা বলল তা সে বুঝতেই পারল না।

এইসব কথা গুরু ভালুক ঠিক বুঝতে না পেরে সে ভাবল নতুন কোনো দলের আক্রমণ সমাগত।

সে জোড় হাত করে খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে বলল, 'মশাই, আপনারা আমাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব নিয়ে ছিলেন, সে-কথা ভুলে যাবেন না।'

গুরু ভালুকের কথা শুনে জীবদত্ত হেসে উঠে বলল, 'গুরু ভালুক, আমাদের আর এই পুকুরের ঘাটে যারা আছে তাদের পক্ষ থেকে তোমার কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই। আমরা যা বলি তাই করি। আমাদের অবিশ্বাস করো না। আমরা যা করি বলে করি। রীতিমতো ঘোষণা করে করি। ভয় পেয়ো না।'

'সাক্ষাৎ বৃকেশ্বরী দেবীর কৃপা তো তোমার উপর আছে, তুমি ভয় পাচ্ছ কেন?' খড়গবর্মা উপহাস করে বলল।

ওরা সব এই ধরনের কথা বলতে বলতে পুকুরঘাটে পৌঁছাল। ততক্ষণে সমরবাহু কোথায় আছে কেমন আছে ইত্যাদি প্রশ্ন করছিল স্বর্ণাচারি বন্দি ভালুক জাতের লোককে। সে খড়গবর্মা, জীবদত্ত ও সমরবাহুকে দূর থেকে আসতে দেখতে পেল। তাড়াতাড়ি তাদের কাছে ছুটে এসে নমস্কার করে বলল স্বর্ণাচারি, 'মহারাজা সমরবাহু, ক্ষত্রিয় যুবকগণ, আপনারা আমার নমস্কার গ্রহণ করুন।'

জীবদত্ত স্বর্ণাচারির কাঁধে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে বলল, 'স্বর্ণাচারি, মনে হচ্ছে তুমি তোমার মহারাজার দুর্গ থেকে বনে বিহার করতে বেরিয়েছ?'

'ক্ষত্রিয় বীরগণ, সেই দুর্গ এখন শত্রুর কবলে পড়ে গেছে। দুর্গকে রক্ষা করতে আমি ও সমরবাহুর অনুচররা আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারিনি। এই চেষ্টা করতে গিয়ে আমাদের কয়েক জন অনুচর স্বর্গে গেছেন।' স্বর্ণাচারি গুরুগম্ভীর বিষাদপূর্ণ গলায় বলল।

'কিছু লোক বেঁচে থাকলেও চলবে। তোমার রাজার নাম রক্ষার জন্য কয়েক জন হলেই চলবে, কি চলবে না?' হাসতে হাসতে খড়গবর্মা বলল।

স্বর্ণাচারি নিজের সঙ্গে যাদের এনেছিল তাদের দেখিয়ে সমরবাহুকে বলল, 'আমাকে নিয়ে এখন মোট ষোলো জন আমরা আছি।'

'আমাদের পাহাড়ি দুর্গ শত্রু দখল করে নিয়েছে? কীভাবে দখল করতে পারল ওরা? কারা ওরা?' সমরবাহু দাঁতে দাঁত ঘষে বড়ো বড়ো চোখে গর্জে উঠে জিজ্ঞেস করল।

স্বর্ণাচারি কীভাবে চিড়িয়াখানার অধিকারী বনে এসেছিল, কীভাবে তারা সজ্জিত হয়ে এল এবং কীভাবে তারা তাদের ব্যূহ ভেদ করে বনে পালিয়ে এল ইত্যাদি সবিস্তারে জানাল।

সমস্ত কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে সমরবাহু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, 'তার মানে, বহুদিন ধরে আমরা যে খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে ছিলাম তা শত্রুর হাতে পড়ে গেল? বীরপুরের রাজাকে কোনোক্রমেই ক্ষমা করা চলে না। ওই রাজাকে শেষ করে ফেলতে হবে। হে ক্ষত্রিয় বীরগণ, এই মুহূর্তে আপনাদের সাহায্য আমি প্রার্থনা করি।'

জীবদত্ত সমরবাহুর দিকে তাকিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় খড়গবর্মা গর্জে উঠে বলল, 'সমরবাহু এখন তুমি কী ধরনের বিপদের মোকাবিলা করতে চাও? কী ধরনের কাজ তুমি আমাদের কাছ থেকে আশা কর? আমরা ভালুক দলের হাত থেকে তোমাকে উদ্ধারের কথা দিয়েছিলাম, উদ্ধর করেছি। এখন আমরা নিজেদের পথে যেতে চাই। আমরা বিন্ধ্য পর্বতে যাচ্ছি। বিপদের হাত থেকে অন্যদের রক্ষা ও উদ্ধার করতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় ব্যয় হয়ে গেছে। আর অপেক্ষা করা যায় না।'

জীবদত্ত খড়গবর্মার পিঠে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে তাড়াহুড়ো না করার ইশারা করে বলল, 'সমরবাহু তুমি রাজ্য উদ্ধারের জন্য এত আগ্রহ পোষণ করছ কেন? তুমি তো দেখলে একটি রাজ্য গড়া এবং তার দখল রাখা অত সহজ নয়। তার চেয়ে এই বিরাট অরণ্যের যেকোনো অঞ্চলে চাষ-আবাদ করে তুমি তো সদলবলে এখন আরামেই থাকতে পার।'

এই কথার পিঠে সমরবাহু কোনো জবাব দিতে পারল না।

মাথা নীচু করে কী যেন ভাবতে লাগল। তখন স্বর্ণাচারি নাক গলিয়ে বলল, 'হে ক্ষত্রিয় যুবকগণ, আমার কথা মন দিয়ে শুনুন। সমরবাহুর নাম শুনে আমার মনে হচ্ছে ইনি কোনো চন্দ্রবংশের লোক। আমার ভীষণ ইচ্ছা এঁর করায়ত্বে সুন্দর একটি ছোটোখাটো রাজ্য থাক আর আমি সেই রাজ্যের মন্ত্রী হই। আপনাদের সাহায্য পেলে আমার ধারণা আমরা সহজেই বীরপুরের রাজার কবল থেকে ওই দুর্গ উদ্ধার করতে পারব। তখন ওই দুর্গের আশেপাশের কিছু অঞ্চল জুড়ে একটি ছোট্ট রাজ্য গড়ে তুলে আমরা থাকতে পারব।'

তখন জীবদত্ত খড়গবর্মার দিকে তাকিয়ে বলল, 'খড়গবর্মা, ভাবছি সাহায্য করাই ভালো।' তারপর সমরবাহুও স্বর্ণাচারির দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমাদের প্রথম কর্তব্য হবে, এখানে যে বীরপুরের সেনারা আসবে তাদের মোকাবিলা করা। আমরা সংখ্যায় বেশি নেই। তাই মুখোমুখি আমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়তে যাব না। আমরা অন্য কৌশল নেব। ওই সেনাদের আমরা গুরু ভালুকের দুর্গে ঢোকাব।'

'সেটা কী করে সম্ভব? ওরা বোকার মতো ঢুকতে চাইবে কেন ওই দুর্গে?' স্বর্ণাচারি প্রশ্ন করল।

তখন জীবদত্ত বুঝিয়ে বলল, 'বলছি শোনো। এই গুরু ভালুকের দু-একজন লোক আগে বীরপুরের সেনাদের নেতাকে বলবে যে আমরা ওই দুর্গে ঢুকে আত্মরক্ষা করেছি। তখন ওরা আমাদের বধ করার উদ্দেশ্যে ওই দুর্গে ঢুকবে। তারপরে আমরা তাদের অল্প লোক নিয়ে সহজ কৌশলে খতম করতে পারব।'

তারপর জীবদত্ত গুরু ভালুককে বলল, 'আচ্ছা ভালুক, তোমার শিষ্যরা কি তোমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে? না কি বিশ্বাসঘাতকতা করে?'

এই প্রশ্ন শুনে গুরু ভালুক বলল, 'হুজুর, আমার শিষ্যদের গুরু ভক্তি আমি এক্ষুনি প্রমাণ করে দিচ্ছি। আমার নির্দেশে ওরা পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতে পারে। দেখুন আপনাদের সামনেই দেখিয়ে দিচ্ছি।' বলে পাশের এক অনুচরকে সে বলল, 'ওরে এই, গাছের উঁচু ডালে উঠে মাথা নীচের দিকে রেখে ঝাঁপ দাও তো।'

জীবদত্ত বাধা দেবার আগেই লোকটা একটা উঁচু গাছে উঠে 'গুরু ভালুক!' বলে চিৎকার করে মাথা নীচের দিকে রেখে পড়ে গেল।

একুশ

গুরু ভালুকের শিষ্য গাছ থেকে লাফ দিতেই জীবদত্ত গাছের নীচে দাঁড়িয়ে সেই শিষ্যকে ধরে ফেলল দণ্ড উঁচিয়ে। ভালুক জাতের ওই শিষ্য মাটিতে পড়ার আগে ওই দণ্ডের উপর পড়ল। পরক্ষণেই জীবদত্ত তাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিল।

এর ফলে ওই ভালুক যুবক কোনো আঘাত পায়নি। নিজের গুরু ভক্তির প্রমাণ দিতে না পারায় দুঃখ পেয়ে সে জীবদত্তকে বলল, 'মশাই, আপনি আমাকে ধরে ফেলে প্রাণে বাঁচিয়েছেন বটে তবে আমার স্বর্গে যাওয়ার পথও আপনি রুদ্ধ করে দিলেন। এতে আমার ক্ষতি হল।'

তার কথা শুনে জীবদত্ত হেসে বলল, 'আরে ভাই কে বলতে পারে তুমি এই গাছ থেকে নীচে পড়ে স্বর্গে যেতে না নরকে? যাই হোক, তুমি গাছ থেকে লাফ দিয়ে প্রমাণ করে দিলে যে তুমি গুরুর নির্দেশকে দেবতার নির্দেশের মতো মেনে চল। তোমাকে যে বাঁচালাম তার একটা উদ্দেশ্য আছে। ভবিষ্যতে তোমার গুরুকে এবং সমরবাহুকে তোমাকে সাহায্য করতে হবে।'

ততক্ষণে সেখানে গুরু ভালুক, সমরবাহু ও খড়গবর্মা পৌঁছে গেল। গুরু ভালুক খুশি হয়ে খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে বলল, 'আপনারা আমার শিষ্যদের গুরু ভক্তির পরিচয় পেলেন তো! এখন আপনারা আমার শিষ্যদের যে কাজে ব্যবহার করতে চান করতে পারেন। সমরবাহু যদি এই বনাঞ্চলের রাজা হন তো আমার সুড়ঙ্গে যে বৃকেশ্বরী দেবী আছেন তার পূজা নিয়মিত চলবে বলেই আমার ধারণা। আমি চাই প্রতিদিন পূজা হোক। এ ছাড়া আর কিছুই আমি চাই না।'

'ভালুক! এই দেবীর পূজার নামে যাতে কোনোরকম প্রাণী হত্যা না হয় তা দেখার ভার সমরবাহুর উপর থাকবে।' এ-কথা বলে জীবদত্ত গুরু ভালুকের শিষ্যদের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এই গাছ থেকে ঝাঁপ দেওয়া লোকের সঙ্গে আর একজন এসো আমার কাছে। আমি এই দু-জনের উপর একটা কাজের ভার দেব। ওই কাজ সেরে ফিরতে হবে।'

গুরু ভালুক নিজের শিষ্যদের একজনকে কাছে ডেকে গাছ থেকে লাফ দেওয়া লোকটার কাছে দাঁড় করিয়ে দিল। তখন জীবদত্ত ওই দু-জনকে ধরে উচ্চস্বরে বলল, 'শোনো, তোমাদের দু-জনকে একটা কাজ করে ফিরে আসতে হবে। এই কাজ করতে গিয়ে তোমাদের যদি জীবন যায় যাবে তবে কাজটা খুব গোপনে করতে হবে। কাক-পক্ষীও যেন টের না পায়। দেখ, সামনের ওই বনে বীরপুরের সেনারা কোথাও আছে। তোমরা হঠাৎ তাদের কাছে গিয়ে এমন হাবভাব দেখাবে যেন অজান্তে তাদের কাছে পৌঁছে গেছ। তাদের হাতে পড়ে যাওয়ার মতো ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বলবে যে সমরবাহুর সমস্ত সৈনিক গুরু ভালুকের সুড়ঙ্গে ঢুকে আছে। বুঝতে পারলে?'

'আজ্ঞে এ আর এমনকী শক্ত কাজ! এ তো শুধু আমাদের গুরুর কাজই নয়, আমাদের রাজারও কাজ। আমরা বীরপুরের ঘোড়সওয়ারদের সঙ্গে দেখা করব। মেলামেশা করব। তারপর আপনি যেভাবে বললেন সেইভাবে সব করব। আপনি আমাদের উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন। আমরা আপনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।' গুরু ভালুকের শিষ্যদ্বয় বলল।

'তাহলে আর দেরি কেন, ঝটপট রওনা হয়ে যাও।' জীবদত্ত বলল।

ওই দু-জন শিষ্য তারপর নিজেদের গুরুর সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল। গুরু ভালুক তাদের কানে কানে বলল, 'ওরা গুপ্তচর ভেবে তোমাদের মেরে ফেলার হুমকি দেবে, মৃত্যুভয়ও দেখাবে তবু তোমরা কিন্তু আসল রহস্য ভেদ করো না। বুঝতে পেরেছ আমার কথা?'

গুরু ভালুকের ওই শিষ্য দু-জন মাথা নীচু করে বলল, 'গুরু ভালুক, আপনার নির্দেশকে বৃকেশ্বরী দেবীর নির্দেশ মনে করি।' বলে ওরা দু-জন বেরিয়ে পড়ল।

ওই দু-জনে অনেকক্ষণ বনে ঘুরে বেড়াতে লাগল। শেষে ওরা এক গাছের নীচে বীরপুরের ঘোড়সওয়ারদের দেখতে পেল। চার জন ঘোড়সওয়ার ঘোড়া থেকে নেমে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। ওরা স্বর্ণাচারির অনুচরদের খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।

ওদের দেখে গুরু ভালুকের অনুচর দু-জন নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলে হঠাৎ চিৎকার করতে লাগল, 'গুরু ভালুক! তুমি কোথায়? আমরা এখানে।'

ওদের চিৎকার কানে যেতেই গাছের নীচের ঘোড়সওয়ার সেনারা চমকে উঠল। ঝট করে খাপ থেকে তরবারি বের করে ওদের নেতা বলল, 'এ কাদের চিৎকার? আমরা কয়েক দিন আগে শুনেছিলাম না ভালুক জাতের লোকের কথা? মনে হচ্ছে এ ওদেরই কণ্ঠস্বর। আমাদের সামনে আর এক বিপদ দেখা দিয়েছে। চলো, এগিয়ে দেখা যাক। কে জানে ওরা কত জন আছে। খুব সাবধানে এগোতে হবে। কে জানে ওদের হাতে কোন অস্ত্র আছে। কোন মতলবে চিৎকার করছে তাও তো আমরা জানি না। চল।'

ঘোড়সওয়ার সেনারা কাছে আসতেই ভালুক জাতের ওই দু-জন শিষ্য হাতের তরবারি নীচে রেখে দিয়ে বলল, 'মশাই, আমাদের মেরে ফেলবেন না। আমরা আপনাদের অধীনে থাকতে চাই। মনে হচ্ছে আমাদের গুরু শত্রুর কবলে পড়ে গেছে। গুরুই যখন নেই তখন আর আমাদের থাকার কী বা সার্থকতা! বাঁচার আর কোনো মানে হয় না।'

অশ্বারোহীদের নেতা কী করবে, কী বলবে ঠিক করতে পারল না কিছুক্ষণ। পরে বলল, 'আচ্ছা, তোমাদের গুরুকে শত্রু নিয়ে গেছে? কে সেই শত্রু?'

ভালুক শিষ্যদের একজন বলল, 'হুজুর, কী বলব সেই বিপদের কথা। আজ ভোরে উটে চড়ে কিছু লোক হঠাৎ আমাদের সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়েছিল। আমরা তখন দেবীর পূজায় মগ্ন ছিলাম। এর ফলে আমরা এই অতর্কিত আক্রমণের মোকাবিলা করতে পারিনি। ফলে ওদের হাতে আমাদের বহুলোক মারা গেছে। ওদের হাত থেকে কোনোরকমে রক্ষা পেয়ে আমাদের কয়েক জন গুরুর সঙ্গে সেই সুড়ঙ্গ থেকে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু আমরা এখন গুরুর খোঁজ পাচ্ছি না। আমরা আমাদের গুরুকে খুঁজছি। গুরু ছাড়া আমাদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। জীবন বৃথা।'

ভালুক জাতের লোকের মুখে এই কথা শুনে বীরপুরের দলের নায়কের মনে হল, এ নিশ্চয় স্বর্ণাচারির কাণ্ড। পাহাড়ি দুর্গের উপর আমরা যে আক্রমণ চালিয়েছিলাম তা সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে ছিল। স্বর্ণাচারির নেতৃত্বে শেষে ওরা ওই সুড়ঙ্গ দখল করেছে। এসব কথা ভেবে সে কয়েক জন অনুচরকে ওই পাহাড়ের কাছে যে সেনাপতি রয়েছে তার কাছে তাদের যেতে বলল। ওরা রওনা হতে যাবে এমন সময় বীরপুরের ওই নেতা বলল, 'শোনো, তোমরা দু-জন তাড়াতাড়ি আমাদের সেনাপতিকে গিয়ে বল যে স্বর্ণাচারি এক সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে আছে। আমাদের কর্তব্য এখন কী হবে জেনে এসো। যাও।' ওরা চলে গেল।

তারপর অশ্বারোহী নেতা ভালুক শিষ্যদের বলল, 'তোমরা দু-জনে আমাদের বড়ো উপকার করলে। আমরা খুঁজছিলাম আমাদের ওই শত্রুকে। আমাদের সেনাপতি এসে গেলেই আমরা তোমাদের উপহার দেব।'

উপহারের কথা শুনে ওই শিষ্য দু-জন অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলল, 'আজ্ঞে আমরা দেবীর উপাসক। আমাদের উপহারের কোনো দরকার হয় না। আমরা আমাদের গুরুর সন্ধান পেলেই খুশি। এ ছাড়া আমরা আর কিছুই চাই না। আচ্ছা, এবার আমরা যাই। গুরুর খোঁজ করি।' বলে ওরা দু-জনে এগিয়ে গেল।

দলের নেতা হঠাৎ ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে এসে ওদের মধ্যে একজনকে ধরে রেগে গিয়ে গর্জে উঠে বলল, 'দাঁড়াও, কোথায় যাচ্ছ? সুড়ঙ্গ দুর্গ কোথায় আছে আমরা জানব কী করে? ওটা দেখানোর ভার তোমাদের বুঝলে?'

'হুজুর, সুড়ঙ্গ দুর্গ এখান থেকে বেশি দূরে নেই। একটা সোজা পথ আছে, সেই পথ একেবারে দুর্গের ভিতরে চলে গেছে। আমরা সেই পথ আপনাদের দেখিয়ে দেব। তবে দয়া করে সুড়ঙ্গের ভিতরে যদি ওরা আমাদের গুরুকে আটকে রেখে থাকে আপনারা দয়া করে ছাড়িয়ে দেবেন।' একজন ভালুক শিষ্য বলল।

'ওই দুর্গ অধিকার করার পর কে যে রাজদ্রোহী আর কে যে রাজহিতৈষী তা বিচার করার ভার আমাদের সেনাপতির। আমরা সবাই মিলেই ওই সুড়ঙ্গের ভিতর যাব। তোমরা দু-জনে ততক্ষণ এই গাছের নীচে বিশ্রাম কর।' দলের নেতা বলল।

দু-জন অশ্বারোহী সেনাপতিকে জানাল যে স্বর্ণাচারিরা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে পালিয়ে সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রয়েছে। শুনে সেনাপতি বলল, 'তার মানে সমস্ত রাজদ্রোহী এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। ভালোই হল, ওদের সবাইকে বন্দি করে প্রকাশ্য রাজপথে ঘোরাব। তারপর ওদের সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেব। এসব যারা দেখবে তারা জীবনে আর কোনোদিন দেশদ্রোহী হওয়ার সাহস পাবে না।'

তারপর সেনাপতি, অশ্বারোহী ও পদাতিক সেনাদের নিয়ে ওই নেতার কাছে গেল। ওদিকে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত অনুমান করেছিল যে ভালুক শিষ্যদের কথা বিশ্বাস করে বীরপুরের সেনারা সুড়ঙ্গ দুর্গ দখল করতে আসবে। তাই তারা সমরবাহু, গুরু ভালুক ও অন্যদের নিয়ে সুড়ঙ্গের কাছে অপেক্ষা করতে লাগল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বীরপুরের সেনাপতি ও দলনায়কের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ হল। দলনায়ক সেনাপতিকে গুরু ভালুকের শিষ্যদের দেখিয়ে সমস্ত ঘটনা জানাল। সে বলল, 'ওই সব রাজদ্রোহী আমাদের জালে পড়ে যাবে।'

সেনাপতি ভালুক শিষ্যদের দিকে তরবারি উঁচিয়ে বলল, 'ওরে এই দুষ্টেরা, তোমরা সত্যি কথা বলছ তো? নাকি তোমাদের গুরুর কৌশল খাটাতে এসেছ?'

ভালুক শিষ্যরা তরবারি দেখে একটুও বিচলিত হল না। তারা বুক টান করে বলল, 'হুজুর, আমরা যা বলেছি তা বৃকেশ্বরী দেবীর বাণী। আপনারা ওই উট জাতের অত্যাচারীদের হাত থেকে অবিলম্বে অনুগ্রহ করে আমাদের উদ্ধার করুন। আমাদের কথা বিশ্বাস করুন। আপনারা ওদের মেরে ফেলে আমাদের হাতে ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে দিন। আমাদের গুরুকে ওই সুড়ঙ্গ পাইয়ে দিন।'

'আরে, আগে ওই সুড়ঙ্গ উদ্ধার তো করি, তারপর ভেবে দেখব কার হাতে ওটা তুলে দেওয়া উচিত।' সেনাপতি বলল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিজের সেনাদের বলল, 'শোনো, আমরা নীরবে ভালুক জাতের দুর্গের কাছে যাব। আরে এই উল্লুক ভালুকরা, তোমরা সামনে থাকবে। পথ দেখাবে। আর শোনো, তোমরা যদি কোনোভাবে আমাদের ধোঁকা দিতে চেষ্টা কর তাহলে তোমাদের আস্ত রাখব না। টুকরো টুকরো করে ফেলব।'

ভালুক শিষ্যরা পথ দেখাতে দেখাতে হাঁটছিল। ওদের পিছনে সেনাপতি ও সেনারা হেঁটে আধ ঘণ্টা পরে ওই দুর্গের কাছে পৌঁছাল। সেইসময় সুড়ঙ্গ দুর্গের কাছে কোনো লোক ছিল না। দুর্গের মুখে গাছপালা, কাঁটা গাছের ঝাড় ছড়ানো ছিল। সেনাপতি প্রথমে ঘোড়া থেকে নামল। চারদিকে কঠিন নীরবতা। একটি পাখিও ডাকছে না।

সেনাপতি প্রথমে ঘোড়া থেকে নেমে দুর্গের মুখের কাছে গিয়ে উচ্চস্বরে ডাকল, 'ওহে সুড়ঙ্গে লুকোনো কাপুরুষের দল! শোনো, আমি বীরপুরের সেনাপতি এসেছি। বহু সেনা নিয়ে এসেছি। দু-তিন মিনিটের মধ্যে তোমরা হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে খালি হাতে সুড়ঙ্গের বাইরে এসো। তা যদি না আসো তাহলে সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকে তোমাদের সবাইকে শেষ করে ফেলব।'

কিন্তু সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। দু-চার মিনিট অপেক্ষা করে সেনাপতি দাঁতে দাঁত পিষে ঘোড়সওয়ারদের ঘোড়াগুলোকে বেঁধে তার কাছে আসার নির্দেশ দিল। ঘোড়াগুলোকে পাহারা দেবার জন্য লোক বসানো হল। তারপর সেনাপতি ওই দু-জন ভালুক শিষ্যকে বলল, 'ওহে, আমরা এখন সুড়ঙ্গে ঢুকব। তোমরা দু-জন সামনে থাক। পথ দেখাও।'

ভালুক শিষ্যরা রাজি হল। সুড়ঙ্গে ঢুকল। ওদের পেছনে সেনাপতি ও সৈনিকরা গেল। ওদের সকলের সুড়ঙ্গের ভিতরে ঢুকে যাবার পর হঠাৎ সুড়ঙ্গের মুখের ঝোপঝাড়ের ভিতর থেকে চার জন ভালুক জাতের সেনা ঝটপট বেরিয়ে এল। ওরা মুহূর্তে বীরপুরের যে দু-জন সেনা ঘোড়াগুলোকে পাহারা দিচ্ছিল তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বল্লম দিয়ে তাদের মেরে ফেলে ঝোপে ফেলে দিল।

ঠিক সেইসময় জীবদত্ত, সমরবাহু ও গুরু ভালুককে নিয়ে সেখানে এসে বলল, 'দেখ গুরু ভালুক বীরপুরের ওই দুই সেনাকে মেরে ফেলা তোমার শিষ্যদের উচিত হয়নি। ওদের হাত-পা বেঁধে ঝোপে ফেলে রাখলেই পারত।'

'গুরু ভালুক এই কথার কোনো জবাব না দিয়ে শুধু মাথা নাড়ল। সমরবাহু অতগুলো ঘোড়াকে দেখে আনন্দিত হয়ে চিৎকার করে বলল, 'জীবদত্ত, আমাদের এতগুলো ঘোড়া পেয়ে খুব ভালো হল।'

'ঘোড়া পেয়েছ ঠিক তাই বলে ভেব না যে আমরা শত্রুমুক্ত হয়েছি। বুঝলে সমরবাহু, আমাদের এখন সমস্যা হল কী করে বীরপুরের সেনাপতিকে জ্যান্ত ধরা যায়। অবশ্য ওদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার একটি উপায় আছে। সুড়ঙ্গের মুখে যে গাছপালা ফেলা আছে তাতে আগুন ধরানো।'

ভালুক জাতের লোক ও সমরবাহুর অনুচররা আরও কাঠ জড়ো করে সুড়ঙ্গের মুখে আগুন ধরিয়ে দেবার আগে জীবদত্ত চিৎকার করে বলল, 'হে বীরপুরের সেনাপতি, তুমি এবং তোমার সেনা হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে দু-তিন মিনিটের মধ্যে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসো। তোমরা বেরিয়ে না এলে রাজা সমরবাহু ও বনবাসী যুবকেরা সুড়ঙ্গে ঢুকে তোমাদের হত্যা করবে।'

বাইশ

বীরপুরের সেনাপতি সেনাদের নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে শত্রুদের খোঁজ করছিল। এমন সময় শুনতে পেল জীবদত্তের হুঁশিয়ারি। শোনা মাত্রই সে হকচকিয়ে গেল। পরক্ষণেই সে দেখতে পেল সুড়ঙ্গে সে যে পথ দিয়ে ঢুকেছিল সে পথ দিয়ে ধোঁয়া ঢুকছে। সেনাপতি ও তার সেপাইরা সুড়ঙ্গের প্রত্যেকটি ঘরে ঢুকে ঢুকে দেখল। কিন্তু শত্রুপক্ষের কাউকে তারা দেখতে পেল না। সব মিলিয়ে তিনটি মরা নেকড়ে, কয়েকটা চামড়া ও তরবারি ছড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখল।

তাজ্জব ব্যাপার। অবাক কাণ্ড। রেগেমেগে সেনাপতি তার সেনাদের হুকুম দিল, বনের ভালুক জাতের যে দুটো যুবক আমাদের হাতে বন্দি হয়েছিল তাদের এক্ষুনি এখানে ধরে নিয়ে এসো। ওরা আমাদের নেকড়েদের সুড়ঙ্গে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

দু-জন সৈনিক গুরু ভালুকের শিষ্য দু-জনকে ধরে সেনাপতির সামনে হাজির করল। সেনাপতি ঝট করে তরবারি বের করে বলল, 'পাজি বদমাইশ কোথাকার, তোমরা আমাদের ধোঁকা দিয়েছ। এখানে আমাদের শত্রু কোথায়? এখনও শেষবারের মতো বলে দিচ্ছি সত্যি কথা বল। তা না হলে এই মুহূর্তে তোমাদের এই তরবারি দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলব।'

ভালুকের শিষ্যরা সেনাপতির কথায় একটুও বিচলিত না হয়ে বলল, 'আমরা আমাদের গুরুর নির্দেশ পালন করেছি মাত্র। আর পালন করতে পেরেই আমরা খুশি। এখন মরে গেলেও আমাদের কোনো দুঃখ নেই।' তারপর ওরা সুড়ঙ্গে ঢোকার পথের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনি শুনতে পাননি? ক্ষত্রিয় যোদ্ধা খড়গবর্মা ও জীবদত্ত আপনাদের হাতের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন। ওদের কথা মতো কাজ না করলে আপনারা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবেন। এই যে, ও সেনাপতি, সম্মান দিয়ে কথা বলছি বলে কানে যাচ্ছে না, না? ধোঁয়া ঢুকছে টের পাচ্ছ না? মরার খুব সাধ, না? এখনও সময় আছে কোন পথে যাবে বেছে নাও। মরার পথে না বাঁচার পথে!'

সেনাপতি ভাবল, ক্ষত্রিয় যুবক আবার কারা? ওদের সম্পর্কে তো কিছু জানা হল না। আগে ওদের সম্পর্কে জেনে নি। ওদের সঙ্গে সমরবাহুর কী ধরনের সম্পর্ক তাও জানা দরকার। কিন্তু এত কথা কায়দা করে জানার সময় কোথায়। ইতিমধ্যে আগুনের হলকা দেখে বীরপুরের সেপাইরা পরস্পরকে ধাক্কা মেরে ছোটাছুটি করতে লাগল। ওদের ছোটাছুটি দেখে সেনাপতি ভেবে পাচ্ছিল না কী করবে!

বীরপুরের সেনাপতির আর কোনো সন্দেহ রইল না যে সে এক বিরাট বিপদে পড়ে গেছে। সে পরিষ্কার বুঝতে পারল যে বাঁচার একটি মাত্র পথই আছে। আর তা হল হাতের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করা। তারপর সে নিজের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দিয়ে তার নিজের সেপাইদের নির্দেশ দিল তারাও যেন হাতের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দেয়। সেপাইরা তাই করল। সেনাপতি সুড়ঙ্গের মুখে এসে চিৎকার করে বলল, 'হে ক্ষত্রিয় যোদ্ধাগণ, আমি বীরপুরের সেনাপতি বলছি, আমি এবং আমার সেনারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করছি। আপনারা আগুন নিবিয়ে ফেলুন।'

সেনাপতির কথা খড়গবর্মা ও জীবদত্ত শুনতে পেল। ওরা ভালুক জাতের লোককে জ্বলন্ত কাঠ সরিয়ে নেভাতে বলল। ওরা তাড়াতাড়ি জ্বলন্ত কাঠ সরিয়ে নিভিয়ে দূরে ফেলে দিল। তারপর খড়গবর্মা ও জীবদত্ত সুড়ঙ্গের মুখে উঁকি মেরে দেখল। ধোঁয়ায় গোটা সুড়ঙ্গটা ভরে থাকায় ওরা তেমন কিছুই দেখতে পেল না। আরও এগিয়ে ওরা দেখতে পেল বীরপুরের সেনাপতি ও সেনাদের।

'খড়গবর্মা, মনে হচ্ছে সেনাপতি মিথ্যা কথা বলেনি। ওকে ডেকে দেব?' জীবদত্ত বলল।

খড়গবর্মার কোনো জবাব দেবার আগেই গুরু ভালুক তাড়াতাড়ি সেখানে এসে জীবদত্তকে বলল, 'মশাইরা, রাজা আর তার সেবকদের কথায় বিশ্বাস করবেন না। আগে আমার শিষ্যদের ডেকে এনে, ওদের কাছে আসল ব্যাপার জেনে নিন। তারপর যা করার করবেন। সেটাই ভালো হবে।'

'কুটিলদের চাল কুটিলরাই ধরতে পারে।' বলে হাসতে হাসতে জীবদত্ত বলল, 'ঠিক আছে ভালুক, তুমি তোমার শিষ্যদের আগে ডেকে নাও। এখানে আসতে বল ওদের।'

গুরু ভালুক হাতের বল্লমটিকে উপরে তুলে বলল, 'বৃকেশ্বরী মায়ের জয়।' তার চিৎকার যেন সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হল। তারপর সে আবার চিৎকার করে বলল, ওহে শিষ্যগণ, তোমরা আগে উপরে উঠে এসো। বীরপুরের লোককে এখন ওখানেই থাকতে বল।' পরে সে সমরবাহুর দিকে ইশারা করে বলল, 'এ হল আমাদের এখানকার পাহাড়ি দুর্গের মহারাজা সমরবাহুর নির্দেশ।'

নিজেদের গুরুর নির্দেশ পাওয়ামাত্র ভালুক শিষ্য দু-জন সিঁড়ি বেয়ে সুড়ঙ্গের বাইরে চলে এল। এই অবস্থা দেখে বীরপুরের সেনাপতি পরিষ্কার বুঝতে পারল যে সে একজন রাজা, দু-জন ক্ষত্রিয় যুবক ও কয়েক জন ভালুক জাতের লোকের হাতে বন্দি হয়ে গেছে। সে ভীষণ ঘামতে লাগল। তার সমস্ত গা দিয়ে তর তর করে ঘাম ঝরতে লাগল। বার বার ভাবতে লাগল তাদের মধ্যে একজনও যদি চটে যায় তাহলে তার গর্দান যাবে। ভাবতে ভাবতে বীরপুরের সেনাপতির শরীরটা কেমন অবশ হয়ে আসছিল।

ভালুকের শিষ্যরা খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে সুড়ঙ্গের ভেতরের অবস্থা সবিস্তারে জানাল। ওরা যে সত্যি সত্যি হাতের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দিয়েছে তা জানতে পারল। সব জেনে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত সেনাপতি প্রভৃতিদের বাইরে আসতে বলল। আর নিজেদের মধ্যে যারা ছিল তাদের অস্ত্র হাতে প্রস্তুত থাকতে বলল।

বীরপুরের সেনাপতি খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে সুড়ঙ্গ থেকে উঠে এসে প্রণাম করতে গেলে বাধা দিয়ে জীবদত্ত সমরবাহুকে দেখিয়ে তাকে বলল, 'ইনি হলেন এই অঞ্চলের রাজা। চন্দ্রবংশের লোক। নাম সমরবাহু। ইনি তোমাদের বুদ্ধি ও সৈন্যবলে পরাজিত করেছেন। এঁর অধীনেই তোমাদের থাকতে হবে। বুঝতে পেরেছ?'

বীরপুরের সেনাপতি মাথা নুইয়ে সমরবাহুকে প্রণাম করল। তাকে অনুসরণ করে অন্য সেপাইরাও সুড়ঙ্গ থেকে উঠে এল। সমরবাহু ওদের সবাইকে একটা ছোট্ট ময়দানে দাঁড়াতে বলে রাজার মতো সদম্ভে সে স্বর্ণাচারিকে জিজ্ঞেস করল, 'মহামন্ত্রী, আমরা এই শত্রুদের কী ধরনের শাস্তি দিতে পারি?'

স্বর্ণাচারি কিছুক্ষণ ভেবে খড়গবর্মা ও জীবদত্তের কাছে গিয়ে পরামর্শ করে সমরবাহুকে বলল, 'মহারাজ, এদের কী ধরনের শাস্তি দেব তা নির্ভর করছে বীরপুরের রাজা আমাদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করবেন তার উপর। এখন আমাদের কর্তব্য হবে এদের কোনো শাস্তি না দিয়ে হাতে রাখা। এদের আমরা এখন আমাদের পাহাড়ি দুর্গে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রাখতে পারি।'

'খুব ভালো কথা। তুমি আমাকে চমৎকার পরামর্শ দিয়েছ মহামন্ত্রী।' সমরবাহু খুশি হয়ে স্বর্ণাচারিকে বলল।

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত সমরবাহুর গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে অবাক হয়ে গেল। একজন লুণ্ঠনকারীর মধ্যে অদ্ভুত রকম রাজার ভাবমূর্তি এসে গেছে। রাজার মতোই চলন বলন হয়েছে। এসব বিষয় খড়গবর্মা ও জীবদত্তের কাছে মজার ছিল।

খড়গবর্মা জীবদত্তের কানে কানে বলল, 'ছোটোখাটো একটা অঞ্চল দখল করতে পারলে একজন লুণ্ঠনকারীর মধ্যে যে এতটা পরিবর্তন এত অল্পক্ষণের মধ্যেই দেখা দেবে আমি তা ভাবতে পারিনি।'

'আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগছে। শেষে আমরা দু-জনে আপ্রাণ চেষ্টা করে এক লুণ্ঠনকারীকে রাজা বানাতে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে বীরপুরের রাজা নিশ্চয় আমাদের শক্তি ও বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে গেছে। নিশ্চয় সে ভয় পেয়েছে। কারণ একজন রাজার সেনাপতি যখন ধরা পড়ে তখন রাজার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। পাহাড়ি অঞ্চলের অধিবাসীরা নিশ্চয় এই অবস্থায় রাজাকে সাহায্য করতে আসবে না। এটা নিশ্চিত যে সমরবাহু এই পাহাড়ি দুর্গকে কেন্দ্র করে এখানকার রাজা হিসেবে থেকে যেতে পারবে। আর কোনো বাধা নেই সামনে।' জীবদত্ত বলল।

কিছুক্ষণ পরে সমরবাহু খড়গবর্মা ও জীবদত্তের কাছে এসে বলল, 'হে ক্ষত্রিয় যোদ্ধাগণ, আপনাদের পরামর্শ চাই। এখন কি পাহাড়ি দুর্গে যেতে পারি?'

'রাজার আদেশ কেউ অবহেলা করতে পারে? যাওয়া যাক।' জীবদত্ত বলল।

উট ও ঘোড়ায় চড়ে সমরবাহুর কয়েক জন অনুচর সামনে আর কয়েক জন পিছনে চলতে শুরু করল। বীরপুরের বন্দি সেপাইদের মাঝখানে রাখা হল। কয়েকটা উট ও ঘোড়ায় কয়েক জন চড়ল। ওগুলোকে হাঁটাতে হাঁটাতে গুরু ভালুকের লোক গুরুর পিছনে পিছনে যেতে লাগল। সমরবাহু, স্বর্ণাচারি, খড়গবর্মা ও জীবদত্ত সবার সামনে ছিল। সবাই কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ি দুর্গের কাছাকাছি পৌঁছাল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখতে পেল একটু উঁচু জায়গায় এক বৃদ্ধকে ঘিরে কয়েক জন এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন তারা তাদের আসার খবর আগে থেকে পেয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

'সমরবাহু, এ কী ব্যাপার? মনে হচ্ছে বীরপুরের রাজা নিজেই তোমার মাথায় মুকুট পরাতে এসেছেন।' জীবদত্ত বলল।

সমরবাহু জীবদত্তকে কী যেন বলতে যাবে এমন সময় বৃদ্ধ এগিয়ে এসে প্রসন্নমুখে তাদের দিকে তাকাল। বৃদ্ধের দু-পশে দু-জন অনুচর ছিল। বৃদ্ধ কাছে এলে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত ভদ্রতাবশত ঘোড়া থেমে নামল।

বৃদ্ধ তাদের দিকে তাকিয়ে শান্তির সংকেত দেখিয়ে বলল, 'আমি বীরপুরের রাজার মন্ত্রী। আমাদের গুপ্তচরদের মাধ্যমে যে বর্ণনা পেয়েছি তা যদি সত্য হয় তাহলে আপনারাই খড়গবর্মা ও জীবদত্ত।'

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত বৃদ্ধকে নমস্কার করল। তারপর জীবদত্ত মন্ত্রীকে বলল, 'মহামন্ত্রী, আমাদের বিষয়ে গুপ্তচরদের মাধ্যমে অনেক খবর পেয়েছেন। আর আমরাও অনেকদিন ধরে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তা এত কষ্ট করছেন কেন? কোন প্রয়োজনে?' বলে জীবদত্ত পিছনের দিকে ঘুরে সমরবাহুকে দেখিয়ে আবার বলল, 'ইনি হলেন এই পাহাড়ি দুর্গের রাজা সমরবাহু আর ইনি এঁর মহামন্ত্রী।'

ওদের নাম শুনে মহামন্ত্রী মুখ কুঁচকে পরমুহূর্তে মুচকি হেসে বলল, 'মাত্র কিছুক্ষণ আগে গুপ্তচরদের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে আপনি অপূর্ব কৌশলে আমাদের সেনাপতি ও সেপাইদের সুড়ঙ্গে আটকে ফেলেছেন। আপনার কাছেই আমি আমার রাজার একটি নির্দেশ নিয়ে এসেছি। আমাদের রাজা আপনাকে এই দুর্গে রাজত্ব করতে সানন্দে বার্তা পাঠিয়েছেন। আমি অবশ্য বিশেষ করে এসেছি এই যুবক দু-জনের কাছে একটি গোপন খবর দিতে। আপনারা অনুগ্রহ করে একটু আড়ালে আসবেন?'

তারপর জীবদত্ত সমরবাহু ও স্বর্ণাচারিকে বলল, 'তোমরা বীরপুরের রাজার মহামন্ত্রীর কথা শুনলে তো? এখন উঠে-পড়ে এই পাহাড়ি অঞ্চলের শাসনকাজে হাত দাও। আমার ধারণা এখন বীরপুরের সেনাপতি ও সেনাদের ছাড়ার বিষয়ে তোমাদের কোনো আপত্তি থাকতে পারে না।'

সমরবাহু স্বর্ণাচারির দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। স্বর্ণাচারি বীরপুরের মহামন্ত্রীকে বলল, 'মহামন্ত্রী, আপনার রাজা প্রস্তুত হয়ে আর একবার যে আমাদের উপর আক্রমণ করবেন না তার কি কোনো প্রমাণ আছে।'

'আমাদের রাজা আপনার রাজাকে জানাতে বলেছেন যে কোনোদিনই আপনাদের উপর আমাদের পক্ষ থেকে আক্রমণ হবে না। আমাদের রাজা মুখে যা বলেন কাজেও তাই করেন।' বীরপুরের মন্ত্রী বলল।

এই জবাবে সমরবাহু খুব খুশি হল। তার আদেশে বীরপুরের সেনাপতি ও সেপাইরা মুক্ত হল। ওরা আনন্দে হইচই করতে করতে নিজেদের মহামন্ত্রীকে প্রণাম করল। কয়েক জন সমরবাহু ও স্বর্ণাচারির প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল।

এত অল্প পরিশ্রমে যে রাজা হয়ে যেতে পারবে তা সমরবাহু কোনোদিন ভাবতেও পারেনি। তাই খুব খুশি হয়ে সে বীরপুরের সেনাদের বলল, 'আজ তোমরা সবাই আমার অতিথি। কাল সকালে তোমরা সবাই যাবে রাজধানীতে।'

তারপর সমরবাহুর অনুচর, ভালুক দলের লোক ও বীরপুরের সেনারা গল্পগুজব করে গাছের নীচে খোশমেজাজে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

ওদিকে বীরপুরের মহামন্ত্রী খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে সঙ্গে নিয়ে একটু দূরে গিয়ে তাদের বলল, 'হে বীর যোদ্ধাগণ, আপনাদের বিষয়ে আমি যে শুধু আমার গুপ্তচরদের মাধ্যমেই জেনেছি তাই নয়; কাল রাত্রে এক যক্ষের কাছ থেকে আপনাদের সম্পর্কে আরও অনেক অজানা কথা জেনেছি।'

'যক্ষের কাছ থেকে! কে সেই যক্ষ?' জীবদত্ত অবাক হয়ে খড়গবর্মাকে জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা খড়গবর্মা, এ কি সেই যক্ষ যে পদ্মপুরের রাজকুমারী পদ্মাবতীকে অপহরণ করে পালিয়েছে?'

প্রশ্ন শুনে খড়গবর্মাও বিস্মিত হল। বীরপুরের মহামন্ত্রী ওদের অবস্থা লক্ষ না করে এগিয়ে গেল। একটু এগিয়ে একটি টিলার উপর উঠে দূরে তর্জনী দেখিয়ে বলল, 'বীরগণ ওই যে নদীর বুকে একটি নৌকা দেখা যাচ্ছে, আপনারা সেদিকে তাকান।'

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত সেই নৌকার দিকে তাকাল। শিলারথের আকৃতি তার। এই রথের বিষয়ে শুনেছে ওরা পদ্মপুরে। অরণ্যপুরে দেখেছেও। জীবদত্ত উৎসাহিত হয়ে দণ্ড উঁচিয়ে বলল, 'মনে হচ্ছে এত দিন পরে প্রস্তুত হয়ে এই যক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছে। ভালোই হল। আমরাও আমাদের শক্তির পরিচয় দিতে পারব।' বলে জীবদত্ত নদীর দিকে এগিয়ে গেল।

তেইশ

খড়গবর্মা, জীবদত্ত ও বীরপুরের মন্ত্রী যখন নদীর তীরে পৌঁছাল তখন রথের আকারের একটি নৌকা তীরের দিকে এগিয়ে এল। তীরের দিকে আসার সময় নৌকাকে দেখে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত বুঝতে পারল যে রথের আকারের ওই নৌকা যক্ষের তৈরি।

জীবদত্ত বীরপুরের মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, 'মহামন্ত্রী, আপনি বলেছিলেন যে এক যক্ষের কাছ থেকে আপনি আমাদের খবর পেয়েছেন। আপনি এই নৌকায় ওই যক্ষের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন? ওই যক্ষের সঙ্গে আপনার আলাপ কোথায় হল?'

বীরপুরের মন্ত্রী কিছুক্ষণ দোনামনা করে কী যেন ভেবে বললেন, 'আমি আপনাদের কাছে কোনো কিছু গোপন না করে বিস্তারিতভাবে সব কিছু বলে দিচ্ছি। কাল রাত্রে এক যক্ষ আকাশপথে আমার কাছে এল। রাজমহলে বান্ধবীদের মাঝ থেকে রাজকুমারীকে অপহরণ করে নিয়ে গেল। রাজকুমারী রাজার একমাত্র কন্যা। নাম বসন্তকুমারী। যক্ষ রাজমহলে যে তালপত্র ফেলে গেল তা থেকে জানতে পারলাম যে এই অপহরণের আগে সে মহারাজ পদ্মসেনের একমাত্র কন্যা পদ্মাবতীকেও একইভাবে অপহরণ করেছে।'

মন্ত্রীর কথা শুনে রাগে ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে জীবদত্ত বলল, 'ওই দুষ্ট যক্ষটা একটা বনে আমাদের কাছে মিথ্যা কথা বলেছে। সে বলেছিল যে সে রাজা পদ্মসেনের অনুমতিক্রমে তার একমাত্র কন্যা পদ্মাবতীকে বিয়ে করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা তার কথায় বিশ্বাস করেছিলাম। এখন আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে এইভাবে অপহরণ করাই তার একটা পেশা অথবা নেশা। কাল পদ্মাবতীকে অপহরণ করল আজ বসন্তকুমারীকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, এ তো তাজ্জব ব্যাপার!'

বীরপুরের মন্ত্রী তীরের দিকে এগোতে থাকা নৌকার দিকে তাকিয়ে বলল, 'জীবদত্ত পদ্মাবতীর বাবা নিজের একমাত্র কন্যাকে হারিয়ে কতখানি কষ্ট পেয়েছেন তা আমি নিজের চোখে দেখিনি কিন্তু বসন্তকুমারীকে হারিয়ে আমার রাজার যে কী পরিমাণ দুঃখ হয়েছে তা আমি বলে বোঝাতে পারব না। যক্ষের ফেলে যাওয়া তালপাতা থেকে জানতে পারলাম যে আপনারা দু-জনে বিন্ধ্যাচলের কোনো অজানা অঞ্চলেস্থিত শিলারথ সরাতে চলেছেন?'

খড়গবর্মা ঝট করে খাপ থেকে তরবারি বের করে ওই নৌকার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, 'মহামন্ত্রী, আপনি যে শিলারথের উল্লেখ করেছেন আমরা যে সেই শিলারথ ভেঙে ফেলব তাই নয় ওই যক্ষকেও আমরা এই তরবারির আঘাতে শেষ করে ফেলব। আর তারপর অপহৃত রাজকুমারীদের, ওই পদ্মাবতী ও বসন্তকুমারীকে উদ্ধার করে আনব। আর যদি না আনতে পারি তাহলে আমরা ক্ষত্রিয় সন্তান নই।'

ঠিক তখনই হঠাৎ জীবদত্তের মনে একটা প্রশ্ন জাগল। এটা কোন নৌকা? বীরপুরের মন্ত্রী জানল কী করে যে এই নৌকাতে ওই অপহরণকারী যক্ষ আছে? নাকি বীরপুরের রাজা ওই যক্ষকে বন্দি করার জন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করেছেন? বন্দি করতে কি রাজা নিজে যথেষ্ট নন? উনি কি এই মন্ত্রীকে পাঠিয়েছেন আমাদের সাহায্যের জন্য?

এইসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল জীবদত্তের সামনে। কিছুক্ষণ ভেবে সে বীরপুরের মন্ত্রীকে বলল, 'মহামন্ত্রী, আমি একটি প্রশ্ন করছি। আপনি কিছু মনে করবেন না। আপনি কী করে জানলেন যে রাজকুমারীদের অপহরণকারী ওই যক্ষ এই নৌকাতেই আছে?'

এই প্রশ্ন শুনে বীরপুরের মন্ত্রী বুঝতে পারল যে তার কথায় খড়গবর্মা ও জীবদত্তের মনে বিশ্বাস জাগেনি। তখন সে নিজের পোশাকের ভিতর থেকে চওড়া তালপাতার পুঁথি বের করে জীবদত্তের হাতে দিয়ে বলল, 'জীবদত্ত, এই পুঁথিতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে এখানে নৌকায় থাকার কথাও আছে। বিশ্বাস না হয় পড়ে দেখতে পারেন। পড়লে আরও প্রমাণ পাবেন।'

জীবদত্ত তালপাতার পুঁথি নিয়ে পুরোটা পড়ল। পড়ার পর খড়গবর্মার হাতে দিয়ে বীরপুরের মন্ত্রীকে বলল, 'মহামন্ত্রী, আপনার কথা অবিশ্বাস করার আর কোনো কারণ নেই। এই যক্ষ পদ্মপুরে যে তালপাতার পুঁথি ফেলে এসেছিল তার সঙ্গে এই পুঁথির বক্তব্যে মিল আছে। এই নৌকা যে ওই যক্ষেরই তাতে সন্দেহ নেই।'

খড়গবর্মা ওই পুঁথিটাকে দু-বার মনোযোগ দিয়ে পড়ে বলল, 'মহামন্ত্রী, এই পুঁথিটাকে আমরা কি নিজেদের কাছে রাখতে পারি? বিন্ধ্যাচলের যক্ষ পর্বতে গিয়ে ওই যক্ষকে বন্দি করার কাজে এই পুঁথি আমাদের বিশেষ উপকারে লাগবে বলে আমার ধারণা।'

বীরপুরের মন্ত্রী রাজি হওয়ার মতো মাথা নেড়ো বলল, 'এইতো নৌকাটা তীরে ভিড়ছে। এই পুঁথিতে যক্ষ লিখেছে যে নৌকাচালক তার বন্ধু। সে কোনো চালাকি করছে কি না ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আপনারা দু-জনে খুব সতর্ক থাকুন। আপনাদের দু-জনের মধ্যে যিনি আমাদের রাজকুমারীকে উদ্ধার করবেন তাঁর সঙ্গেই রাজকুমারীর বিয়ে হবে এবং যাঁর সঙ্গে বিয়ে হবে তিনি অর্ধেক রাজত্ব পাবেন।'

এ-কথা শুনে জীবদত্ত হেসে উঠে বলল, 'অনেক আগে আমরা পদ্মসেনের কন্যা পদ্মাবতীকে উদ্ধার করে বিন্ধ্যাচলের শিলারথ ভেঙে ফেলার প্রতিজ্ঞা করেছি। কোনো রাজ্য পাবার আশায় অথবা রাজকুমারীকে বিয়ে করার কথা কোনোদিন ভাবিনি। আগে আমরা আমাদের প্রতিজ্ঞা পালন করব তারপর অন্য চিন্তা করব।'

ইতিমধ্যে ওই নৌকা তীরে এল। বিচিত্র পোশাক পরা যক্ষের মতো একজন নৌকার সামনের দিকে এসে খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে ইশারা করে কাছে ডাকল। ইশারা পেয়ে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত বীরপুরের মন্ত্রীকে নিয়ে নদীর তীরে এল।

যক্ষ সকলের দিকে সতর্কতার সঙ্গে তাকিয়ে বলল, 'আপনাদের মধ্যে এমন কোনো মহাবীর কি আছেন যিনি বিন্ধ্যাচলের শিলারথ সরাতে পারেন?'

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত নীরবে হাত তুলল। যক্ষ পরিহাস করার ভঙ্গিতে বলল, 'তাহলে আপনারা নির্ভয়ে আমার সঙ্গে এই নৌকায় উঠতে পারেন। আমার বন্ধু যক্ষ মণিরঞ্জিত যে যক্ষপর্বতে থাকেন সেখানে আমি আপনাদের নিয়ে যাব। উনি যে পদ্মাবতী ও বসন্তকুমারীকে বিয়ে করতে চান সেই রাজকুমারী দু-জনও সেখানেই আছে। চলে আসুন।'

খড়গবর্মা ও জীবদত্ত তীরে গিয়ে এক লাফে নৌকায় উঠল। নৌকায় উঠে প্রথমেই বিদ্রূপ করে জীবদত্ত বলল, 'মধ্যরাত্রে অসহায় অবস্থায় পেয়ে যে রাজকুমারীদের অপহরণ করেছে, সেই যক্ষ মণিরঞ্জিতের বন্ধু তুমি? কী তোমার নাম?'

'আমার নাম মণিভূষণ। মনে হচ্ছে আমার বন্ধু যক্ষ মণিরঞ্জিতের বিষয়ে আপনারা কিছুই জানেন না। শৌর্যে, বীর্যে ও পরাক্রমে তার মতো শক্তিশালী লোক আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি। তিনি মস্তবড়ো তান্ত্রিক। আপনাদের এই ধরনের উপেক্ষার আচরণ যক্ষ মণি কিছুতেই সহ্য করতে পারবেন না। মনে হচ্ছে আপনারা এক বিরাট বিপদে পড়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন। এসব না করে যান, ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যান।'

ওর প্রশ্ন শুনে জীবদত্ত হেসে উঠল। নিজের দণ্ড খড়গবর্মার হাতে দিয়ে জীবদত্ত কিছুক্ষণ জপতপ করে যক্ষের ডান দিকের কাঁধে একটি আঙুল ছোঁয়াল। যক্ষ তৎক্ষণাৎ আর্তনাদ করে নীচে পড়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ ওইভাবে পড়ে থেকে আস্তে আস্তে উঠে ধীরে ধীরে বলল, 'আপনারই নাম জীবদত্ত না? আপনার মন্ত্রশক্তি অপূর্ব। আপনাকে পেয়ে আমার বন্ধু খুব খুশি হবে। আপনাদের মধ্যে শত্রুতার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি ইচ্ছা করলে শিলারথ সহজেই নাড়াতে পারেন। আপনাকে শিখিয়ে দেব কীভাবে সরানো বা নড়ানো যায়। তারপরে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাবেন। শিলারথ সরানোই তো আপনাদের প্রতিজ্ঞা? ঠিক আছে সরিয়ে ফিরে যান। কেমন?'

খড়গবর্মা দাঁতে দাঁত পিষে তরবারি তুলে বলল, 'ওরে এই যক্ষ, বেশি চালাকি করো না। চল, সোজা যক্ষপর্বতে চল। তোমার বন্ধু ওই দুই রাজকুমারীকে যদি ছেড়ে দিয়ে ক্ষমা না চায় তাহলে আমরা তাকে সহজে ছাড়ব না। টুকরো টুকরো করে কেটে তোমার বন্ধুর মাংস বিন্ধ্য অঞ্চলের কাক আর শকুনিদের খাওয়াব। কোনোক্রমেই সে পালাতে পারবে না। আমরা অপহরণের অপরাধ কোনোক্রমেই সহ্য করব না।'

দুটো সাধারণ মানুষের মেজাজ এবং স্পর্ধা দেখে মণিভূষণের ভীষণ রাগ হল। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'ওহে ওই ক্ষত্রিয় বীরগণ, আমার বন্ধু যক্ষ মণিরঞ্জিত আপনাদের দু-জনকে নিয়ে যেতে বলেছে। আমার কাজ সেরে চলে যাব। রাজকুমারীদের অপহরণ অথবা শিলারথের ব্যাপারে আমি কিচ্ছু জানি না।'

'এতক্ষণে মনে হচ্ছে তোমার দর্প এবং অহংকার দূর হয়েছে। এখন তুমি কিছুটা ভদ্র হয়েছ মনে হচ্ছে। এখন আর দেরি না করে তুমি নৌকাটাকে মাঝদরিয়ায় নিয়ে চল।' জীবদত্ত বলল।

তীরে দাঁড়িয়ে এইসব ঘটনা বীরপুরের মন্ত্রী এতক্ষণ দেখছিল। তাকে জীবদত্ত বলল, 'মহামন্ত্রী, বিদায়। আপনার রাজাকে বলবেন, আমরা বসন্তকুমারীকে উদ্ধার করবই করব। এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা। যক্ষ মণিরঞ্জিতের মাথা কেটে আনব। সেই মাথা আপনাদের রাজা দুর্গের দরজার উপর রাখতে পারবেন। বিদায়।'

নিজের চোখে যা সব দেখল তাতে বীরপুরের মন্ত্রীর পরিষ্কার ধারণা হয়ে গেল যে এই ক্ষত্রিয় যুবকরা যা বলে তা করার মতো ক্ষমতা রাখে। নৌকা মাঝদরিয়ার দিকে এগোতেই মন্ত্রী হাত নেড়ে চিৎকার করে বলল, 'আপনারা যেন অল্পদিনের মধ্যেই কাজে সফল হয়ে ফিরে আসেন। আপনাদের উদ্দেশ্য সফল হোক। আপনাদের যাত্রা শুভ হোক।'

অল্পক্ষণের মধ্যেই নৌকাটা অনেক দূর চলে গেল। খড়গবর্মা ও জীবদত্ত নৌকার চারদিকে ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখছিল আর ভাবছিল।

কিছুক্ষণ নৌকার চারদিক ঘুরে দেখে ওদের ধারণা হল এই নৌকাটা বাতাসেও চলতে পারে। এদিকে মণিভূষণ ভেবেছিল সাধারণ দুটো ক্ষত্রিয় বীরকে নৌকায় চাপিয়ে আনা এমন কিছু কঠিন কাজ হবে না। খুব জোর ওরা খড়গ যুদ্ধ ভালোভাবে করতে পারে। কিন্তু খড়গবর্মা ও জীবদত্তকে দেখে মণিভূষণের সেই ধারণা বদলে গেল। রীতিমতো তাদের হাবভাব দেখে তার ভয় করছিল। এমন সময় জীবদত্ত জানতে চাইল নৌকাটা বাতাসে উড়তে পারে কি না। একই প্রশ্ন খড়গবর্মাও করল। মণিভূষণ ভাবল ওরা তো মন্ত্রতন্ত্র জানে হয়তো সব জেনে গেছে।

খড়গবর্মা ও জীবদত্তের প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ কী যেন আরও ভেবে আমতা আমতা করে মণিভূষণ বলল, 'খড়গবর্মা ও জীবদত্ত, আকাশপথে ঘোরাঘুরি করার জন্য মণিরঞ্জিত যে শিলারথ তৈরি করেছে এটা সেটা নয়। রথাকৃতির কোনো কিছুর প্রতি মণিরঞ্জিতের আকর্ষণ প্রবল। সব কিছুই সে রথের আকৃতিতে বানাতে চায়। এমনকী তার বাড়িটাও রথাকৃতির।'

জীবদত্ত রেগে গিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, 'তাই নাকি, বিরাট গুণী লোক তাহলে! আমাদের হাতে পড়লে আমরা তাকে রথের আকারের কোনো গাছের সঙ্গেই প্রথমে বেঁধে ফেলব। রথাকৃতি বৃক্ষ কি তোমাদের যক্ষপর্বত অঞ্চলে আছে? না থাকলে মুশকিল!'

যক্ষ মণিভূষণ এই প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। না শোনার ভান করে অন্যদিকে তাকাতে লাগল। তারপর খড়গবর্মা ও জীবদত্ত নদীর দুই তীরের পাহাড় ও গাছপালার দিকে তাকিয়ে আনন্দ পেতে লাগল। অনুমানে বুঝতে পারল যে এই নদীপথে ওরা বিন্ধ্যাচল অঞ্চলে পৌঁছাতে পারবে। মণিভূষণকে প্রশ্ন করে জানতে পারল যে সামনে যে পর্বত দেখা যাচ্ছে সেটাই বিন্ধ্যাচল।

'এই পর্বতাঞ্চলের কোন অংশে যক্ষপর্বত আছে? আমাদের আরও কতদূর যেতে হবে?' জীবদত্ত বলল।

'আরও দশ-বারো ক্রোশ বাকি আছে। তীরে নৌকা ভেড়াতে চাই। খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার নৌকা চালানো যাবে।' মণিভূষণ বলল।

নৌকাতে শুধু ফলমূল ছিল। তীরে ভিড়লে কিছু পাখি অথবা পশু শিকার করা যেত। মণিভূষণের প্রস্তাব জীবদত্তের কাছে ভালোই লাগল।

জীবদত্ত এ বিষয়ে খড়গবর্মার পরামর্শ চাইল। খড়গবর্মা অস্তমান সূর্য ও পাহাড় পর্বতের দিকে তাকিয়ে বলল, 'ভালোই হবে। আজকের রাতের খাবার ভালোই জমবে। রাত্রে আমরা এখানেই বিশ্রাম করব। সকালে বিন্ধ্যাচলে যাওয়া যাব।'

তারপর জীবদত্ত মণিভূষণকে বলল, 'তুমি কি খড়গবর্মার কথা শুনতে পেয়েছ? নৌকাটাকে তীরে ভেড়াও। খাওয়া-দাওয়া সেরে নেওয়া যাক।'

মণিভূষণ কী যেন ভেবে থেমে থেমে বলল, 'আমার বন্ধু মণিরঞ্জিত আপনাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিয়ে যেতে বলল। আজকের রাতটা এখানে কাটালে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।'

মণিভূষণের কথা শুনে কঠোর স্বরে জীবদত্ত বলল, 'এখানে কী করতে হবে না হবে তার নির্দেশ আমরা দেব। আমাদের নির্দেশমতো তোমাকে কাজ করতে হবে। রাজকুমারীদের অপহরণকারী তোমার বন্ধু যক্ষ মণিরঞ্জিত নয়! বুঝেছ? চল, তীরে নৌকাটাকে নিয়ে চল।'

মণিভূষণ নীরবে নৌকাটাকে তীরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।

চব্বিশ

নৌকা তীরে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত লাফ দিয়ে তীরে উঠল। মাটিতে নেমে জীবদত্ত মণিভূষণকে বলল, 'নৌকোটাকে তীরের কোনো বটগাছের সঙ্গে বেঁধে দাও। তাতে যেসব ফলমূল আছে প্রয়োজন হলে তুমি খেয়ে নাও। এই ঘন অরণ্যে আমার মনে হচ্ছে হরিণ অথবা বুনো শুয়োর শিকার করে আনা যাবে।'

এই কথা শুনে ভয় পেয়ে যক্ষ মণিভূষণ বলল, 'জীবদত্ত, পাহাড়ের এসব অঞ্চলে বেশি ঘোরাঘুরি করা উচিত নয়। এখানে ভয়ংকর রাক্ষসদের নিবাস।'

'রাক্ষসের চেয়ে মন্ত্রে সিদ্ধ তোমার যক্ষ বেশি ভয়ংকর। আমরা তাকে মোকাবিলা করতে যাচ্ছি। সেক্ষেত্রে এই রাক্ষসগুলোকে ভয় পাব কেন?' বলে জীবদত্ত খড়গবর্মার দিকে ঘুরে বলল, 'খড়গ, আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুরে আসছি। তুমি মাটি দিয়ে একটা উনুন বানিয়ে আগুন ধরিয়ে রাখ।'

যেকথা সেই কাজ। এত তাড়াতাড়ি যে জীবদত্ত হরিণ শিকার করে আনবে, তা খড়গও ভাবতে পারেনি। শিকার করা হরিণকে কাঁধে ফেলে সে নৌকোর কাছে এল।

ততক্ষণে কাঠ জোগাড় করে খড়গ আগুন ধরিয়ে রাখল। অল্পক্ষণের মধ্যেই খড়গ ও জীবদত্ত হরিণকে কেটে আগুনে পুড়িয়ে পুড়িয়ে জমা করতে লাগল। পোড়া মাংসের সুগন্ধে চারদিক ভুর ভুর করছিল। এমন গন্ধ সেই অঞ্চলে এই প্রথম ছড়াচ্ছিল।

ঠিক সেইসময় ভয়ংকর শক্তিশালী রাক্ষসী হুংকার তুলতে তুলতে এগিয়ে আসতে আসতে বলতে লাগল, 'মানুষের গন্ধ, মানুষের গন্ধ!' থপ থপ করে পা ফেলতে ফেলতে রাক্ষসী কাছাকাছি এলে খড়গবর্মা থাপ থেকে তরবারি বের করে তাকে আঘাত করতে যেতেই জীবদত্ত বাধা দিয়ে ওই রাক্ষসীকে বলল, 'তুমি কি সত্যিকারের রাক্ষসী, না রাক্ষসীর রূপধারী যক্ষ? এখানে কি শুধু মানুষের গন্ধ আছে? হরিণের মাংসের গন্ধ নেই? তুমি সেই গন্ধ পাচ্ছ না?'

জীবদত্তের কথা শুনে অবাক হয়ে রাক্ষসী বলল, 'কে তুমি? তুমি যদি মানুষ হতে তাহলে আমাকে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠতে, তোমার বুক ধড়াস ধড়াস করত। মনে হচ্ছে তুমি ভয় পাওনি। তাই ঘুরিয়ে অমাকেই প্রশ্ন করছ। তুমি জানো আমি কত বড়ো শক্তিশালী? এত বড়ো সাহস তোমার।'

রাক্ষসী এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে খড়গবর্মা মুহূর্তে তার চুল ধরে ফেলল। তাকে তরবারি দিয়ে মারতে যেতেই জীবদত্ত তার তরবারি ধরে, মন্ত্র দণ্ডকে রাক্ষসীর মাথায় ঠেকিয়ে চাপ দিয়ে বলল, 'এখন বল, আমরা সাধারণ মানুষ না অন্য কিছু?'

রাক্ষসী কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'আজ্ঞে আপনারা মানুষ বলে মনে হচ্ছে না। আপনারা যক্ষ। আমাকে ছেড়ে দিন। আমার দুই ছেলেকে ইতিমধ্যেই আপনারা ধরে নিয়ে গেছেন যক্ষপর্বতে। আমি বুড়ো হয়ে গেছি। ওই পাহাড়ের পাথর ভেঙে, পাথর সরিয়ে আপনাদের জন্য তাল তাল সোনা আর আমরা তুলতে পারব না।'

ওর কথা শুনে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত হল বিস্মিত। একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল।

জীবদত্ত খড়গবর্মাকে তরবারি খাপে পোরার ইশারা করে রাক্ষসীকে বলল, 'দেখ রাক্ষসী, তোমাকে মেরে ফেলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তুমি যে বলছ, তোমার দুই ছেলেকে যক্ষ ধরে নিয়ে গেছে, সে-কথা যদি সত্য হয়, তাহলে আমরা তোমার দুই ছেলেকে উদ্ধার করে আনব। ওই যে দেখছ বসে আছে ওই হল যক্ষ। তাই আমাদের গোপন কথা ওর সামনে হওয়া উচিত নয়। তুমি কোথায় থাক? চল তোমার নিবাসে যাই। ওখানেই আমাদের কথা হবে।'

তারপর রাক্ষসী যক্ষ মণিভূষণের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো সুরে বলল, 'হে নরগণ, আপনারা আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন। আমাকে আমার পথে যেতে দিন।'

জীবদত্ত রাক্ষসীকে অভয় দিয়ে বলল, 'আমি আর আমার বন্ধু ওই দুরাত্মা যক্ষ যেখানে থাকে সেই যক্ষপর্বতে যাচ্ছি। আমরা তাকে কঠোর শাস্তি দেব। আমার ধারণা যক্ষ ঠিক কোথায় থাকে, কী করে সব তুমি জানো। তাই আমরা চাইছি তোমার আস্তানায় গিয়ে গোপনে সব খবর জানতে।'

যক্ষ মণিভূষণকে দেখার পর থেকে রাক্ষসীর অন্তরাত্মা পালাই পালাই করছিল। জীবদত্তের কথায় তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে বলল, 'হে নরগণ, আপনারা আসুন আমার গুহায়। আমার কর্তাও সেখানে আছেন। যক্ষপর্বতের অনেক খবর উনি আপনাদের দেবেন। অত খবর আমি কোনোদিন জানাতে পারব না। অনেক ভয়ংকর খবর উনি জানেন।'

জীবদত্ত তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে খড়গবর্মাকে বলল, 'খড়গ, আমার ফিরে আসা পর্যন্ত তোমার তরবারি ও আমার এই মন্ত্র দণ্ডের অসীম ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। যক্ষ মণিভূষণ অথবা যক্ষ মণিরঞ্জিত এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করলে তুমি বিনা দ্বিধায় তাদের উপর অস্ত্র প্রয়োগ করবে।'

ওই কথা শুনতে পেয়ে যক্ষ মণিভূষণ আমতা আমতা করে বলল, 'জীবদত্ত, তুমি ওর কথা শুনে যেও না। রাক্ষসদের বিশ্বাস নেই। ওদের চেয়ে নিষ্ঠুর আর কেউ হয় না। ওই রাক্ষসী তোমায় ভালো ভালো কথা বলে গুহায় নিয়ে যাচ্ছে। ওরা ভয়ংকর! ওরা নিষ্ঠুর! ওরা অদ্ভুত! ওরা কিম্ভুত! ওখানে আপনাকে টেনে ছিঁড়ে মহানন্দে খেয়ে ফেলতে পারে।'

জীবদত্ত হাসতে হাসতে বলল, 'তাতে কোনো ক্ষতি হবে না। আমার বন্ধু খড়গবর্মা রয়েছে। সে একাই যক্ষ মণিভূষণ ও মণিরঞ্জিতকে বধ করে রথ গুঁড়িয়ে দুই রাজকুমারীকে নিয়ে নিরাপদে ফিরতে পারবে।'

রাক্ষসী জীবদত্তকে নিয়ে চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটি গুহায় পৌঁছাল। গুহার কাছে চিতার মতো আগুন জ্বালিয়ে ওই রাক্ষসীর স্বামী রাক্ষস একটি পাথরের উপর বসেছিল। জীবদত্তকে নিয়ে রাক্ষসীকে আসতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রাক্ষসীকে বলল, 'কে এই নর? তোমার সঙ্গে নির্ভয়ে একা আসছে?'

রাক্ষসী তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে রাক্ষসকে বলল, 'তোমার চোখ-মুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তোমার খুব খিদে পেয়েছে। কিন্তু সাবধান, একে কিছু করো না। এর হাতে যে মন্ত্র দণ্ড আছে তা ভয়ংকর। এ আর এর বন্ধু, দু-জনে মিলে যক্ষদের বন্দি করেছে।'

বউয়ের কথা শুনে রাক্ষস হতবাক হয়ে গেল। মানুষ যে কোনো যক্ষকে বন্দি করতে পারে এ ছিল তার কল্পনার অতীত। সে জীবদত্তের কাছে এসে সবিনয়ে বলল, 'প্রভু, আমার বউ যা বলছে তা যদি সত্য হয়, আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না। আপনি বলুন। আমার বউ ভুল বকছে না তো প্রভু? কারণ ওর মাথার একটু গোলমাল আছে। এসব কি সত্য?'

জীবদত্ত একটু হেসে বলল, 'তোমার বউ যা বলছে তা মিথ্যা নয়। ওর কাছেই শুনেছি তোমার ছেলেদের নাকি যক্ষ ধরে নিয়ে যক্ষপর্বতের কোথায় যেন লুকিয়ে রেখেছে। তুমি যক্ষপর্বতের ব্যাপারে কিছু বলতে পার?'

রাক্ষস আপন মনে কিছুক্ষণ মাথা নেড়ে জীবদত্তের দিকে তাকিয়ে বলল, 'দেখুন, আপনার মন্ত্র দণ্ডের ক্ষমতা যে অনেক বেশি তা বুঝতে পারছি। তা না হলে আপনি আমার সামনে এসে এভাবে কথা বলতে পারতেন না। যক্ষপর্বতের ব্যাপারে আমি কী বলব? বিশাল বিন্ধ্য পর্বতমালার এই অঞ্চলে যক্ষপর্বত হল একটি ছোট্ট পর্বত। এই পর্বতের অধিপতি হল যক্ষ মণিরঞ্জিত। যক্ষরাজ বহুকাল আগে তাকে এই যক্ষপর্বতের অধিপতি করে দিয়েছিল। তারপর থেকে ও মণিরঞ্জিত করেনি এহেন খারাপ কাজ নেই।'

জীবদত্ত রাক্ষসের কথায় সহানুভূতির সঙ্গে সায় দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, 'ও মণিরঞ্জিত যে অত্যন্ত খারাপ প্রকৃতির লোক তা আমরা জানি। আমাদের দেশের দু-জন রাজাকে খুব দুঃখ দিয়েছে। তাদের একমাত্র কন্যাদের অপহরণ করে নিয়ে গেছে। আমরা সে ব্যাপারে যা করার যথাসময়ে করব। এখন আমরা জানতে চাই ওই যক্ষ মণিরঞ্জিত তোমাদের মতো রাক্ষসদের নিয়ে গিয়ে সেখানে কী করে?'

'শোনা কথা বলছি, আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ওই যক্ষপর্বতে নাকি মণিমাণিক্য আর তাল তাল সোনা আছ। বড়ো বড়ো পাথর কেটে ওইসব মাণিক্য সোনা তোলা খুব শক্ত কাজ। আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে যক্ষ সেই কাজগুলো করায়। একবার যে তার কবলে পড়েছে তাকে সারাজীবন ওই পাহাড়ের অন্ধকারে রাতদিন পরিশ্রম করতে হচ্ছে। শুধু যে ও রাক্ষসদেরই ধরে নিয়ে গেছে তা নয়, নানা বনের বহু মানুষ তার কবলে পড়ে দিনরাত খেটে মরছে।' বলল ওই বিশালদেহী রাক্ষস।

'তার মানে, একবার যাকে সে ধরেছে, সে যাতে পালাতে না পারে তার সব ব্যবস্থা সতর্কতার সঙ্গে সে করেছে। ভালো কথা, শুনলাম ওখানে নাকি একটা পাথরের রথ আছে?' জীবদত্ত সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল।

'আমিও শুনেছি। কোনোদিন দেখিনি। আর দেখতে চাইও না।' বলল রাক্ষস।

জীবদত্তের মনে হল তার সমস্ত প্রশ্নের জবাব সে পেয়েছে। পরের মুখে শুনে রাক্ষসের যে ধারণা হয়েছে তাই সে জানিয়েছে। বাড়িয়ে বা কমিয়ে বলেনি। জীবদত্ত ঠিক করল এবার ফিরে যাবে খড়গবর্মা ও মণিভূষণের কাছে। রাক্ষসীকে সে বলল, 'তুমি যে মানুষের গন্ধ মানুষের গন্ধ বলে ছুটতে ছুটতে এলে তাতে আমার ভালোই হল। আমার সঙ্গে এসো। ওখানে অনেক হরিণের পোড়া মাংস আছে। তোমার যত দরকার নিয়ে এসো।'

ওর কথা শুনে রাক্ষসীর খুব ভালো লাগল। সে রাক্ষসকে ফিসফিস করে কী যেন বলল। রাক্ষস জীবদত্তকে বলল, 'প্রভু, আপনার সাহস দেখে মনে হচ্ছে আপনারা মণিরঞ্জিতকে বধ করতে পারবেন। বধ করে দয়া করে আপনারা আমার দুই ছেলেকে উদ্ধার করে আমাদের কাছে পৌঁছে দিন।'

জীবদত্ত এগোতে এগোতে রাক্ষসকে বলল, 'দেখ রাক্ষস, তোমার নাম আমি জানি না। তবে এটুকু জেনে রেখো, আমরা যদি মণিরঞ্জিতকে জব্দ করতে পারি, তাহলে শুধু তোমার ছেলেরাই নয় সবাই সেখান থেকে মুক্তি পাবে।'

'আজ্ঞে আমার নাম চণ্ডমুখ। ভুলে যাবেন না।' বলল রাক্ষস।

দূর থেকে জীবদত্তের সঙ্গে রাক্ষসীকে আসতে দেখে ভীষণভাবে ঘাবড়ে গিয়ে মণিভূষণ খড়গবর্মাকে বলল, 'একি আপনার বন্ধু ওই রাক্ষসীকে নিয়ে আসছে কেন?'

'বলা যায় না হয়তো রাক্ষস রাক্ষসীদের খেয়ে ফেলার জন্য জীবদত্ত তোমাকে তাদের হাতে তুলে দেবে।' খড়গবর্মা মজা করার জন্য বলল।

'এটা কিন্তু খুব অন্যায় হবে। আমি কত বার বলেছি মণিরঞ্জিত আমার বন্ধু নয়, আমার প্রভু। ওর আজ্ঞা পালন করা ছাড়া আমি কারও কোনো ক্ষতি করিনি।' মণিভূষণ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কাকুতিমিনতি করে বলল।

ওই কথা কানে যেতেই জীবদত্ত রেগে গিয়ে বলল, 'ওহে মণিভূষণ, এখনি অত ঘাবড়ে যেও না। এই রাক্ষসীর স্বামীর কাছে তোমাদের যক্ষপর্বতের অনেক রহস্য জানতে পেরেছি। তোমাদের কপালে অনেক দুঃখ আছে। আজ আমি ও খড়গবর্মা তোমার প্রভু মণিরঞ্জিতকে যদি পরাজিত করতে না পারি তাহলেও বেশিদিন আর তোমাদের বাঁচতে হবে না। জেনে রেখো, যোগ্য নেতৃত্বে বিরাট এক রাক্ষসের সেনাবাহিনী যেকোনো মুহূর্তে যক্ষপর্বত আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। যেকোনো সময় ওরা তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।'

'রাক্ষসবাহিনী!' মণিভূষণ ভয়ে কাঠ হয়ে গেল।

'হ্যাঁ, রাক্ষসবাহিনী। ভুলে যেও না। ওরা সব প্রস্তুত।' বলে জীবদত্ত রাক্ষসীকে বলল, 'এখান থেকে হরিণের মাংস তোমার যত ইচ্ছে নিয়ে যাও। তোমাদের রাক্ষস সেনানায়ককে বল বাহিনীকে প্রস্তুত রাখতে। খবর পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে যেন সে ওইসব পথ দিয়ে চলে আসে।'

রাক্ষসী কিছু বুঝুক না বুঝুক মাথা নেড়ে হরিণের মাংস নিয়ে চলে গেল। তারপর খড়গ, জীবদত্ত, মণিভূষণ খাওয়া-দাওয়া সেরে একটি গাছের নীচে পাথরের উপর শুয়ে পড়ল। শোয়ার সময় মণিভূষণ ওই নৌকার দিকে মুখ রেখে বার বার তার দিকে তাকাতে লাগল। তখন জীবদত্ত আস্তে আস্তে খড়গবর্মাকে বলতে লাগল, 'মনে হচ্ছে এই যক্ষটা আমাদের ভীষণ ভয় পেয়েছে। মাঝরাত্রে সুযোগ বুঝে নৌকোয় করে ব্যাটা পালানোর চেষ্টা করবে। একটু সতর্ক থাকতে হবে আমাদের।'

ঠিক একই ধরনের সন্দেহ খড়গবর্মার মনেও জেগেছিল। খড়গবর্মা ও জীবদত্ত পালা করে ঘুমোতে লাগল। হরিণের মাংসের গন্ধে গভীর রাত্রে কয়েকটা জীবজন্তু সেখানে ঘোরাঘুরি করতে লাগল। ওরা মণিভূষণের দিকে এগোতে থাকলে খড়গ ঢিল ছুড়ে ওদের তাড়িয়ে দিল। সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে, মণিভূষণ ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, খড়গবর্মা, জীবদত্ত আপনারা উঠুন, রাক্ষসের বাহিনী এদিকে ছুটে আসছে।'

পঁচিশ

মণিভূষণের আর্তনাদ শুনে জীবদত্ত উঠে পড়ল। খড়গবর্মার ঘুম ভেঙে গেল। সে মণিভূষণকে অভয় দিয়ে বলল, 'মণিভূষণ তোমার আর কোনো ভয়ের কারণ নেই। ওদের বাহিনীর দু-জন রাক্ষস এসেছিল বটে, তবে আমি ওদের জানিয়ে দিয়েছি যে তুমি যক্ষ মণিরঞ্জিত নও, তুমি তার সামান্য চাকর। আমার কথা শুনে ওরা চলে গেছে।'

কিন্তু তার পরেও মণিভূষণের সে রাত্রে আর ঘুম হল না। সকাল পর্যন্ত ভয়ে তার চোখ খোলা ছিল। সূর্যোদয়ের সঙ্গে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত উঠে পড়ল। সবাই সকালের কাজকর্ম সেরে ফিরে এল সেই রথাকৃতি নৌকার কাছে।

নৌকা চালাতে লাগল মণিভূষণ। আধ ঘণ্টা পরে নৌকা নদীর এক তীরে ভিড়ল। সেইখান থেকে একটি খাল বেরিয়েছিল। সেই খালে নৌকাটা ঢুকল। কিছুক্ষণ পরে মণিভূষণ খালের ধারে নৌকা ভিড়িয়ে সামনের দিকে দেখিয়ে বলল, 'এই হল যক্ষপর্বত। এখন আপনারা নামতে পারেন। আরে! এই তো আমার প্রভু মণিরঞ্জিত। আমাদের সঙ্গে দেখা করতে স্বয়ং মণিরঞ্জিত এসে গেছেন। ওইতো ওখানে দাঁড়িয়ে।' খড়গবর্মা ও জীবদত্ত নৌকা থেকে নীচে নামল। পাহাড়ের দিকে মাথা তুলে তাকাল। পাহাড়ের উঁচু-নীচু অংশের একটিতে এক যক্ষ হাতে এক গদা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওই যক্ষ একদৃষ্টিতে খড়গবর্মা ও জীবদত্তের দিকে তাকাচ্ছিল। মণিভূষণ পথ দেখাতে দেখাতে এগিয়ে যাচ্ছিল। তাকে অনুসরণ করছিল খড়গবর্মা ও জীবদত্ত।

পাহাড়ে উঠতে উঠতে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত উপরের দিকে তাকাচ্ছিল। যাদের দূর থেকে দেখেছিল, তারা কাছে এলে তাদের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওই যক্ষ মণিরঞ্জিত বলল, 'খড়গবর্মা ও জীবদত্ত আপনাদের সাহসের বলিহারি। সাহস ভালো কিন্তু দুঃসাহস ভালো নয়। আপনাদের পাখনা গজিয়েছে মনে হচ্ছে। যাক যারা দুঃসাহসী তাদের কাছে এসব কথা বলা নিষ্প্রয়োজন।'

জীবদত্ত মণিরঞ্জিতের পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত তাকিয়ে হাসতে হাসতে তাকে বলল, 'মণিরঞ্জিত, তুমি খুব ভালো ফাঁদ পেতেছ। রাজকুমারী পদ্মাবতীর মনে একটা বিশ্বাস এনেছিলে। সেটা হল এখানকার পাথরের রথ যে নাড়াতে পারে সে একজন মহাবীর। সেই রথ নাড়াতে যারা আসে তাকে মেরে ফেল। তোমার এই ফাঁদ আজ তোমার গলার ফাঁস হয়েছে। কই দেখি সেই অপহরণ করে আনা রাজকুমারীদের? কাথায় রেখেছ? পদ্মাবতী ও বসন্তকুমারী কোথায়? আর ওই পাথরের রথটাই বা কোথায়?'

ওর কথা শুনে রেগে গিয়ে মণিরঞ্জিত গদা তুলে মারতে যেতেই খড়গবর্মা তরবারি ধরে বলল, 'মণিরঞ্জিত, এখনই আমাদের মেরে ফেলতে যাচ্ছ কেন? আমরা যদি ওই রথ নড়াতে না পারি তখন আমাদের মেরে ফেলো। বসন্তকুমারীর যে তোমার সম্পর্কে কি মত জানি না তবে পদ্মাবতী যে তোমাকে মহাবীর মনে করে, সে যে তোমাকেই বিয়ে করবে সে ব্যাপারে আমাদের মনে কোনো সন্দেহ নেই। তাই বলছিলাম আগে চল, দেখাও পাথরের ওই রথ কোথায় আছে। তারপর যা হয় হবে।'

মণিরঞ্জিতের রাগের আগুনে যেন ঘি পড়ল। কিন্তু তার কিছু বলার আগেই মণিভূষণ তাকে বলল, 'তাহাহুড়ো করো না মণিরঞ্জিত। এই যুবকদের আগে পাথরের রথের কাছে নিয়ে যাও।'

মণিরঞ্জিত একটু দমে গেল। এগিয়ে যেতে লাগল। তাকে অনুসরণ করল সবাই। কিছুক্ষণ পরে ওরা এক সমতল জায়গায় পৌঁছাল। সেই অংশের নীচের দিকে বহু ফুল আর ফলের গাছ।

সেই ফুল বাগানের মাঝে কাছাকাছি পাশাপাশি রথাকৃতি দুটো অট্টালিকা আছে। ওই দুটোর একটির ছাদে দাঁড়িয়ে পদ্মাবতী ও বসন্তকুমারী খড়গবর্মা ও জীবদত্তের দিকে একদৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। জীবদত্ত ওদের দিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'মণিরঞ্জিত, ওরাই কি তোমার অপহরণ করে আনা পদ্মাবতী ও বসন্তকুমারী?'

'হ্যাঁ, ওরা আপনাদের শৌর্য ও বীরত্ব দেখার জন্য ওখানে দাঁড়িয়ে আছে।' বলে অন্যদিকে দেখিয়ে মণিরঞ্জিত বলল, 'এই তো, ওটাই পাথরের রথ।' দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে সে বলল।

কাছেই একটা কুড়ি ফুট উঁচু পাথরের রথ ছিল। সেই রথের নীচ থেকে পাহাড় উঁচু-নীচু ঢেউ খেলিয়ে নীচে নেমে গেছে। খড়গবর্মা ও জীবদত্ত ওই রথের দিকে এগিয়ে যেতেই মণিরঞ্জিত পিছনের দিকে না তাকিয়েই 'মণিভূষণ' বলে ডাকল। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে পিছনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখে সেখানে মণিভূষণ নেই। চারদিক তাকাল কিন্তু তাকে কোথাও দেখতে পেল না।

ইতিমধ্যে খড়গবর্মা ও জীবদত্ত রথের চারদিকে ঘুরে ঘুরে ভালো করে দেখে নিল। জীবদত্ত নুয়ে রথের নীচের দিকটা দেখিয়ে খড়গবর্মাকে বলল, 'দেখ খড়গ, নীচের দিকটা ভালো করে তাকিয়ে দেখ। এই রথ, পাহাড় কেটে তৈরি হয়নি। পাহাড়ের উপরকার আলাদা একটা পাথর কেটে এই রথটাকে তৈরি করা হয়েছে। রথের নীচে একটু লক্ষ করে দেখ আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। কান খাড়া করে শোনো মনে হচ্ছে যেন এর নীচে মানুষ আছে। তাদের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। শুনতে পাচ্ছ?'

জীবদত্তের কথা কানে যেতেই তেলেবেগুনে চটে গিয়ে মণিরঞ্জিত বলল, 'তাই নাকি? বাঃ তাহলে তো খুব দেখতে পাচ্ছেন! রথের নীচে আলো আসবে কোত্থেকে? মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে কেন? এখানে মানুষ আসবে কোত্থেকে? যা অসম্ভব তাই বলছেন।'

'অসম্ভব হতে যাবে কেন? পাহাড়ের নীচে থেকে যেসব মানুষগুলো খুঁড়ে খুঁড়ে সোনা মণিমুক্তোগুলো তুলছে তাদের তুমি ক্রীতদাস বানিয়ে রাখলেও তারা তো মানুষ। ওরা তো নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে। ওরা তো মূক নয়?' ততোধিক রাগান্বিত স্বরে জীবদত্ত বলল।

মণিরঞ্জিত কিছুক্ষণ ভেবে পেল না কী করবে, কী বলবে। পরে সে বলল, 'এসব কথা কে বলেছে? মণিভূষণ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তাহলে আমার সঙ্গে? মণিভূষণ বলেছে?' রাগে ফেটে পড়ে মণিরঞ্জিত জিজ্ঞেস করল।

'না না, ও বেচারি কিছু বলেনি। ও তোমার চাকর তো বটেই বন্ধুও। সে আমাদের কাছে এমন কোনো কথা বলেনি যাতে আমরা এই রথ সম্পর্কে কিছু জানতে পারি। আমি আমার দিব্যদৃষ্টিতে এই যক্ষপর্বত ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি।' জীবদত্ত হাসতে হাসতে বলল।

মণিরঞ্জিত ভেতরে ভেতরে রেগে গেলেও বাইরে তা প্রকাশ না করে বলল, 'জীবদত্ত কথা বাড়িয়ে তো লাভ নেই? পাথরের রথ সরানোর কথা, সরানোর চেষ্টা করে দেখতে পার। তোমাদের ক্ষমতা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে পদ্মাবতী ও বসন্তকুমারী দাঁড়িয়ে আছে।'

জীবদত্ত খড়গবর্মাকে চোখের ইশারা করে বলল, 'ওই যে রাজকুমারীরা দাঁড়িয়ে আছে ওই অট্টালিকার পাশের অট্টালিকায় তুমি থাক না মণিরঞ্জিত?'

'হ্যাঁ, ওখানেই আমি থাকি। কিন্তু এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার কারণটা কী? প্রয়োজনটাই বা কী?' মণিরঞ্জিত জিজ্ঞেস করল।

'কারণ আছে বই কী। আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ওই ভবনটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আর তুমি তা নিজের চোখেই দেখতে পাবে।' বলে জীবদত্ত কিছুক্ষণ মন্ত্র পাঠ করে ওই মন্ত্র দণ্ড পাথরের রথের উপর রেখে চাপ দিয়ে রথের গায়ে কষে এক লাথি মারল। মুহূর্তে পাহাড় ফেটে যাওয়ার ভয়ংকর এক প্রচণ্ড শব্দ হল।

চোখের পলকে ওই রথ উড়ে গিয়ে মণিরঞ্জিতের অট্টালিকায় আছড়ে পড়ল। পরক্ষণে দেখা গেল ওই বিরাট অট্টালিকা এবং পাথরের রথ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ধুলো হয়ে গেল। চোখের পলকে যা ঘটে গেল তা দেখে মণিরঞ্জিত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে কথা নেই, চোখে ভাষা নেই। তারপর হঠাৎ সে তার গদা তুলে জীবদত্তকে আক্রমণ করতে গেল।

কিন্তু সে তা পারল না। তার নাকের ডগায় খড়গবর্মা তরবারি মেলে ধরল।

এই দৃশ্য দেখে আনন্দ আর চাপতে না পেরে জীবদত্ত হো-হো করে হেসে গন্ধর্ব বসুমতীর দেওয়া কাঁসার পাত্রটি জোরে বাজাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই যেখানে পাথরের রথ ছিল, তার নীচ থেকে বহু রাক্ষস এবং গন্ধর্বেরা দলে দলে বেরিয়ে এসে আর্তনাদ করতে লাগল। ওরা প্রত্যেকে আরও ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে ভেবে আশঙ্কা প্রকাশ করতে লাগল।

জীবদত্ত ওদের শান্ত হতে বলে ঘোষণা করল, 'এখন থেকে আপনারা প্রত্যেকে মুক্ত। যে যেখানে খুশি যেতে পারেন।' তারপর ওই কাঁসার পাত্রটি উপরের দিকে তুলে বলল, 'এই পাত্র আমার দেশের এক গন্ধর্ব, তাঁর নাম বসুমতী, আমাকে দিয়েছেন। আপনাদের মধ্যে যদি কেউ গন্ধর্ব থাকেন তিনি এই পাত্র সানন্দে নিতে পারেন।'

ওদের মধ্য থেকে একজন গন্ধর্ব এগিয়ে এসে ওই পাত্রটি নিল। তারপর রাক্ষস ও গন্ধর্বদের জীবদত্ত কী যেন গোপনে বলতে যাবে এমন সময় সে 'মাগো' বলে চিৎকার শুনতে পেল। সেটা ছিল মণিরঞ্জিতের আর্তনাদ। জীবদত্ত মুখ ঘুরিয়ে দেখল খড়গবর্মার আঘাতে নীচে পড়ে গিয়ে মণিরঞ্জিত ছটফট করছে। খড়গবর্মা তার বুকে পা রেখে গলায় তরবারি ছুঁইয়ে দাঁড়িয়ে হাসছিল।

সেই দৃশ্য দেখে জীবদত্তের ভীষণ আনন্দ হল। খড়গবর্মা জীবদত্তকে বলল, 'জীবদত্ত, এই দুরাত্মাকে কী করব? মেরে ফেলব না ছেড়ে দেব? এই পাপীটা পদ্মাবতী ও বসন্তকুমারীকে হরণ করেছে। ওদের আত্মীয়স্বজনদের দুঃখ দিয়েছে। অসংখ্য মানুষ ও রাক্ষসদের ধরে এনে ক্রীতদাস বানিয়েছে। তাড়াতাড়ি বল কী করব?'

ইতিমধ্যে সেখানে পদ্মাবতী ও বসন্তকুমারী এসে গেল। রক্তচক্ষু করে বসন্তকুমারী মণিরঞ্জিতের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এই নীচ পাপী যক্ষকে যে হত্যা করবে তাকেই আমি বিয়ে করব। একে বধ করা নিজের চোখে দেখে চোখ জুড়াতে চাই। একে হত্যা না করলে আমাকে সারাজীবন কুমারী জীবনযাপন করতে হবে।'

খড়গবর্মা অপরূপ সুন্দরী বসন্তকুমারীর রূপে মুগ্ধ হল। মনে মনে সে ভাবল তাকে স্ত্রী হিসাবে পেতে হলে মণিরঞ্জিতকে হত্যা করতেই হবে। ও তাকে হত্যা করতে যাবে এমন সময় আকাশ থেকে ধ্বনি শোনা গেল, 'থামুন'! পরক্ষণেই আকাশ থেকে নেমে এল হংসাকৃতির অপূর্ব সুন্দর একটি বিমান। সেই বিমান থেকে যক্ষরাজ ও মণিভূষণ নেমে এল। যক্ষরাজ সকলের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, 'খড়গবর্মা, জীবদত্ত, আপনারা যে মহান বীর, সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। যেসব ঘটনা এবং দুর্ঘটনা ঘটেছে সে সম্পর্কে আমি বিস্তারিতভাবে মণিভূষণের কাছে শুনেছি।

'মণিরঞ্জিতকে এখন আর মেরে ফেলার প্রয়োজন নেই, কারণ সে এখন জীবন্মৃত। যক্ষকুলের এই কুলাঙ্গারের আর কোনো ক্ষমতা নেই। একে ছেড়ে দিন।' যক্ষরাজ বলল।

'বীরপুরের রাজকুমারীর প্রতিজ্ঞার কথা কি আপনি জানেন না? তার জীবনের কী হবে? খড়গবর্মা বসন্তকুমারীর দিকে একবার তাকিয়ে বলল।

বসন্তকুমারী সলজ্জভাবে পদ্মাবতীর পেছনে দাঁড়াল। যক্ষরাজ হাসিমুখে বলল, 'মৃত্যুর চেয়ে জীবন্মৃত থাকা আরও বড়ো শাস্তি। তাই বসন্তকুমারীর প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের কোনো আশঙ্কা নেই। পাথরের রথ সরিয়ে যিনি বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তারজন্য জীবদত্তের সঙ্গে পদ্মাবতীর ও মণিরঞ্জিতকে কঠোরতম শাস্তি দেওয়ার জন্য খড়গবর্মার সঙ্গে বসন্তকুমারীর বিয়ে হবে।'

যক্ষরাজ, খড়গবর্মা, জীবদত্ত ও তাদের স্ত্রীদের বিমানে উঠে বসতে বলে সানন্দে বলল, 'খড়গবর্মা ও জীবদত্ত, এই বিমানে বসে আপনারা যেখানে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করবেন সেখানেই এই বিমান আপনাদের নিয়ে যাবে। আপনাদের যাত্রা শুভ হোক।'

'আপনার এই উপকারের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ, যক্ষরাজ।' খড়গবর্মা ও জীবদত্ত সানন্দে বলল।

'আর একটি কথা, এই বিমান আপনাদের কাছে এক মাস থাকবে। তারপর আপনা থেকেই বিমানটি আমার কাছে চলে আসবে। বিদায়।' যক্ষরাজ বলল।

সবাই যক্ষরাজকে নমস্কার করল। পরক্ষণেই বিমান বায়ুবেগে পদ্মপুর ও বীরপুরের দিকে ধাবিত হল।

অধ্যায় ১ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%