মায়া সরোবর

ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

অনেককাল আগে অমরাবতী নগরের রাজসভায় কুলশেখর নামে এক রাজ কর্মচারী ছিল। তার একটি মাত্র ছেলে ছিল। নাম জয়শীল। বাচ্চা বয়স থেকেই জয়শীলকে আদরযত্নে লালনপালন করত। এইভাবে জয়শীল বাড়তে লাগল। জয়শীলের বয়স যখন কুড়ি তখন সে ছিল যুদ্ধবিদ্যায় নিপুণ। ক্ষত্রিয়দের যত রকমের যুদ্ধবিদ্যা জানা উচিত ওই বয়সেই তার সেসব জানা হয়ে গিয়েছিল। কুলশেখর বৃদ্ধ হল।

বৃদ্ধ বয়সে ছেলের কথা সে বেশি করে ভাবছিল। ছেলেকে একদিন রাজসভায় নিয়ে গিয়ে রাজার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার কথা ভেবেছিল কুলশেখর। রাজা যাতে ছেলের জন্য একটি চাকরি দেয় তার অনুরােধও। করবে ভেবেছিল। কিন্তু কুলশেখরের মনের কথা মনেই রয়ে গেল। হঠাৎ অসুখে পড়ে যাওয়ায় তার আর ছেলেকে নিয়ে রাজসভায় যাওয়া হল না। তার অসুখ আর সারল না। কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেল।

জয়শীল এখন একা। মাকে হারিয়েছে বাচ্চা বয়সে। বাপকে হারাল সেদিন। জগতে আপনজন বলতে তার আর কেউ রইল না। বন্ধু যারা ছিল তারাও অত ভালাে ছিল না। ওদের ঠিক বন্ধু বলা চলে না। জীবনের ঠিক এমন সময় জয়শীলের কিছু উটকো বন্ধু জুটে গেল। ওদের পাল্লায় পড়ে বাপের রেখে যাওয়া সম্পত্তি কিছুদিনের মধ্যেই জয়শীল খরচ করে ফেলল।

বাপ মারা যাওয়ার চার-পাঁচ মাসের মধ্যেই সমস্ত সম্পত্তি খরচ হয়ে গেল। এমন দিন এল যে টানা তিন দিন জয়শীল দু-মুঠো খেতে পেল না। এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যাওয়ায় সে ভেবে পেল না কী করবে। কারও কাছে হাত পাততে তার লজ্জা করল। দয়া করে গােপনে যারা কিছু এনে ওকে দিত সে তাই খেত। জয়শীলের এক বন্ধু ছিল। একটু অন্য ধরনের। তার এই বিপদের দিনে এগিয়ে এসে দুটি ভালাে কথা বলল। এই বন্ধুটির নাম দেবশর্মা।

পেটে যখন আগুন জ্বলে কোনাে বন্ধুর কথাই কান পেতে শুনতে ইচ্ছে করে না। সে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘দেবশর্মা, তুমি যেসব উপদেশ দিচ্ছ, সেসব আমি জানি না তা নয়, তবে আমার এখন কিছুই ভালাে লাগছে না। আমাকে একা মরতে দাও।'

জবাবে দেবশর্মা হেসে বলল, 'জয়শীল, তুমি যদি সত্যি জানতে তাহলে হাতেনাতেও কিছু করতে। কিছুই জানাে না তাই দুঃখ ভােগ করছ। তােমার মধ্যে যে গুণাবলি রয়েছে সেগুলাে যদি একটু প্রয়ােগ কর তাহলে তােমার পক্ষে বাঁচা এমন কিছু শক্ত ব্যাপার নয়।'

জয়শীল কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। মনে হল, কী যেন ভাবছে। পরে মাথা নেড়ে বলল, 'দেবশর্মা, বিপদের দিনে দেখছি তুমিই প্রকৃত বন্ধু। তবে নতুনভাবে বাঁচতে হলে নতুন পরিবেশ চাই। এখানে এই দেশে পড়ে থাকলে কোনােদিন আমি বড়াে হতে পারব না। তুমি কি বল ?’

দেবশর্মা ও জয়শীলের মধ্যে এই কথা হচ্ছিল জুয়ােখেলার ঘরে।

জয়শীলের কথার জবাবে দেবশর্মা কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় জুয়াের ঘরের সামনে কোলাহল শােনা গেল। ওরা বেরােতে গিয়ে বাধা পেল। রাজার অশ্ববাহিনীর নায়ক চাবুক দিয়ে জুয়াের ঘর থেকে যারা বেরুচ্ছিল তাদের মারছিল। অশ্ববাহিনীর নায়কের নাম কৃপাণজিৎ।

জয়শীল কৃপাণজিতের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, 'দেখুন যাকে-তাকে মারবেন না। অন্যায়, অনুচিত।'

‘কোনটা উচিত আর কোনটা অনুচিত আমাকে শিখতে হবে এক জুয়াড়ির কাছে?’ বলেই কৃপাণজিৎ জয়শীলের পিঠে চাবুক মারতে লাগল।

জয়শীল তৎক্ষণাৎ হাতের কাছে যে লাঠি পেল সেই লাঠি দিয়ে কৃপাণজিতের মাথায় সজোরে আঘাত করল। আর্তনাদ করে উঠে কৃপাণজিৎ তরবারি বের করল। আঘাত করার আগেই জয়শীল কপাণজিতের কোমরে আঘাত করল।

সেই আঘাত সহ্য করতে না পেরে ঝট করে ঘােড়ায় চড়ে পালিয়ে যেতে গেল। এসব দেখে জুয়াের ঘরের অন্য লােকেরা অবাক হল এবং সাহস পেল। কৃপাণজিতের সঙ্গে যারা এসেছিল ওরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কৃপাণজিতের ঘােড়ায় চড়ার সঙ্গে সঙ্গে জয়শীল একলাফে তার পেছনে উঠল। কৃপাণজিতকেই পর্যদস্ত করতে লাগল জয়শীল। ঘােড়ার উপর দুজনের টানাহ্যাঁচড়া, ঘুষােঘুষি মারামারি চলতে লাগল।

পিঠে যাই ঘটুক-না-কেন কৃপাণজিতের ঘােড়া ছুটে চলল রাজপ্রাসাদের দিকে। পথের দু-পাশের লােক অবাক হয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। যারা দেখল তারা বুঝল কৃপাণজিতকে সায়েস্তা করার লােক আছে। সেইসময় রাজা তার ভবনের ছাদে মন্ত্রীর সঙ্গে আলােচনা করছিলেন। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটি ঘােড়ায় দুই সওয়ারি। রাস্তার আশেপাশের লােকের চিৎকার তার কানে এল। রাজা, কাছে যারা ছিল তাদের বললেন, 'দেখ তাে, ঘােড়ার পিঠে কারা যেন মাতলামি করছে। একটি ঘােড়ায় দু-জন চড়েছে কেন? ওই দু-জনকে আমার কাছে ধরে নিয়ে এসাে।'

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা কৃপাণজিৎ ও জয়শীলকে ধরে আনল রাজার সামনে। রাজা দেখে অবাক হলেন। অবাক হলেন অশ্ববাহিনীর নায়কের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে। জয়শীলকে রাজা চিনতেন না। মন্ত্রী জয়শীলকে তার বাবার সঙ্গে কয়েক বার দেখেছিলেন।

রাজা ভীষণ রেগে গিয়ে অশ্ববাহিনীর নায়ককে বললেন, ‘জিৎ, তুমি না অশ্ববাহিনীর নায়ক। ঘােড়ার পিড়ে চড়ে রাস্তার লােককে খেলা দেখাচ্ছিলে?’

‘মহারাজ, এই লােকটা একটা জুয়াড়ি। পেছন দিক দিয়ে আমার ঘােড়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সারা রাস্তা আমায় মারতে মারতে এসেছে। পথের দু-পাশের লােক সাক্ষী। একে কঠোর শাস্তি দিন মহারাজ।' কৃপাণজিৎ দাঁত কটমট করে বলল।

তার কথায় রাজা হেসে বললেন, 'তােমার কোমরে তরবারি আছে, তুমি আমার অশ্ববাহিনীর নায়ক। আর তােমার ঘােড়ায় চড়ে তােমাকে এক জুয়াড়ি মেরেছে। তুমি বলছ সারা পথে মেরেছে, পথের দুধারের লােক সাক্ষী। এসব বলতে তােমার একটুও লজ্জা করেনি। তােমার পেছনে হঠাৎ জুয়াড়িরা লাগল কেন?’

‘মহারাজ এই জুয়াড়িরা ভদ্রতা জানে না। আমাদের যাতায়াতের সময়ে এরা সম্মান দেখাতে দাঁড়ায় না। বসেই থাকে। আমাদের সম্মান দেখানাে যে ওদের কর্তব্য সেটা ওরা ভুলে গেছে। কীভাবে সম্মান দেখাতে হয় তা শেখাত জুয়া ঘরে ঢুকেছিলাম। সেখানেই এরা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।' কৃপাণজিৎ বলল। রাজা একবার মন্ত্রীর দিকে তাকালেন। মন্ত্রী অস্বস্তি বােধ করে বললেন, ‘মহারাজ, ঘটনা যাই ঘটুক না কেন আমাদের অশ্ববাহিনীর নেতা যা করলেন, যেভাবে মার খেতে খেতে এলেন তাতে আপনার ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার কথা।'

‘এই ধরনের লােক অশ্ববাহিনীর নায়কের পদে থাকলে সারা দেশের পক্ষেই ক্ষতিকর। এই খবর শত্রুর কানে গেলে ওরা আমাদের ক্ষমতা সম্পর্কে সহজেই অনুমান করতে পারবে।' রাজা বললেন।

কিছুক্ষণ ভেবে রাজা বললেন, ‘জিৎ, তুমি যে কাপুরুষতা দেখিয়েছ তাতে আমাদের বাহিনীর মাথা হেঁট হয়ে গেছে। তােমাকে আমি শুধু যে তােমার পদ থেকে সরাচ্ছি না নয়, আমার দেশ থেকেই বহিষ্কার করছি। চলে যাও।'

কৃপাণজিৎ কী যেন বলতে গেল। কিন্তু রাজার তর্জনী দেখে বুঝল রাজা আর কোনাে কথা শুনতে চান না। এই মুহূর্তে দেশত্যাগ না করলে তাকে প্রাণে মারা পড়তে হবে। তাই সে তরবারি নীচে রেখে চলে গেল।

তারপর রাজা জয়শীলের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি জুয়াড়ি?’

তােমাকে শিরচ্ছেদের শাস্তি দেওয়া হবে। মৃত্যুর আগে শেষ কথা বল।'

জয়শীল নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে দুঃখে ভেঙে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে আস্তে আস্তে মাথা তুলে বলল, 'মহারাজ, আমার শিরচ্ছেদের নির্দেশ যখন দিয়ে দিচ্ছেন তখন আমি আর কী বলব।'

‘তােমার মৃত্যুভয় নেই? মরার কথা ভেবে তােমার ভয় করছে না?’ রাজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

'দারিদ্রের চেয়ে ভয়ের আর কিছু নেই মহারাজ। দারিদ্র্যের ভয়ের কাছে প্রাণের ভয় তুচ্ছ।' জয়শীল বলল।

‘তুমি কি চিরকাল দারিদ্রই পেয়ে এসেছ? সুখের মুখ দেখনি?’ রাজা বললেন।

‘দেখেছি মহারাজ। আমার সব ছিল।' জয়শীল বলল।

‘ও ঠিক কথা বলছে মহারাজ। ওর বাবার যা সম্পত্তি ছিল তাতে ও সারাজীবন বসে খেতে পারত। কিন্তু খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বাবার মৃত্যুর চার-পাঁচ মাসের মধ্যে সব কিছু খােয়াল।' মন্ত্রী বললেন।

‘আপনি চেনেন?’ রাজা বললেন।

‘চিনি মহারাজ। এর বাবা আমাদের প্রাসাদের রাজকর্মচারী ছিল। এর নাম জয়শীল। বাপের একমাত্র ছেলে। বাপ মারা যাওয়ার পরে একে সঠিক পথে চালনা করার লােক ছিল না। অল্প বয়স, রক্ত গরম। ভুলবশত একটা অন্যায় কাজ করে ফেলেছে। এর প্রতি একটু দয়া করা উচিত মহারাজ।' বললেন মন্ত্রী।

রাজা একবার জয়শীলের দিকে আপাদমস্তক তাকিয়ে বললেন, 'ঠিক আছে। আমি এর শিরচ্ছেদের শাস্তি দিচ্ছি না। কিন্তু দেশ থেকে বহিষ্কার করব। ভবিষ্যতে কোনােদিন নিজেকে শুধরে ফিরে এলে রাজপ্রাসাদে এর বাবা যে কাজ করত সেই কাজ একে দেওয়া হবে।'

জয়শীল মাথা নীচু করে নমস্কার করে বিদায় নিল। মন্ত্রী বললেন, ‘এখনকার মতাে যাও। তবে মহারাজ যা বলেছেন তা মনে রেখ।'

ওর যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে রাজা বললেন, 'কৃপাণজিতের ফেলে যাওয়া তরবারিটা নিয়ে যাও। সাত দিনের মধ্যে দেশের সীমানার বাহিরে চলে যাবে।'

'তাই যাব মহারাজ,’ বলে জয়শীল তরবারি নিয়ে চলে গেল।

দেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে জয়শীলের ইচ্ছে করল দেবশর্মার সঙ্গে একবার দেখা করার। সােজা গেল দেবশর্মাকে যেখানে সে ছেড়ে এসেছিল সেখানে। সেই জুয়াের ঘরে। কিন্তু গিয়ে দেখল জুয়াের ঘর ভেতর থেকে বন্ধ।

জয়শীল অবাক হয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে ডাকল, 'ভেতরে কে আছ? দরজা খােল?’

ভেতর থেকে কে যেন বলল, 'এটা জুয়াের ঘর নয়। কে ডাকছেন ?’

এই জবাব শুনে জয়শীল আরও অবাক হয়ে বলল, 'আমি জুয়াের ব্যাপারে আসিনি। আগে দরজা খােল, সব বলছি।'

ভেতরের লােকটা ভেবেছে, নিশ্চয় রাজার লােক এসেছে। কিছুক্ষণ আগে যা ঘটে গেছে তার ফল খুব খারাপ হবে। ভাবতে ভাবতে জুয়াের ঘরের মালিক কাঁপতে কাঁপতে দরজা খুলল। 'তােমার টাকাপয়সা গেছে, গেছে। বলি তােমার বুদ্ধিও কি লােপাট হয়ে গেছে? তুমি ভালােভাবেই জানাে কেন আমি দরজা বন্ধ করে রেখেছি।' সে বলল।

জয়শীল হঠাৎ তরবারি বের করে ওর দিকে এগিয়ে ধরে বলে, 'জুয়া ঘরের মালিক হয়েছ এমনি এমনি? মনে রেখ আমার টাকাপয়সা গেছে কিন্তু হাতে তরবারি আছে। এই শরীরে এখনও তরবারি চালানাের ক্ষমতা আছে। আমি আমার বন্ধুকে খুঁজতে এসেছি। বল দেবশর্মা কোথায় আছে?’

জুয়াে ঘরের মালিক ভয়ে কাঁপতে লাগল। তার মুখ দিয়ে প্রথমে কথা সরল না। অনেক কষ্টে বলল, 'বাবা রাগ করাে না। আমি জুয়াে খেলা বন্ধ করে দিয়েছি। আর এখানে ওসব হতে দেব না।'

জয়শীল ভীষণ রেগে গিয়ে ওর বুকের উপর তরবারি ধরে বলল, ‘পাপী, নীচ, তুই অনেকক্ষণ আজেবাজে কথা বলছিস। আমি যে প্রশ্ন করছি তার জবাব দে। আমার বন্ধু দেবশর্মা আছে কি নেই? আমার প্রশ্ন বুঝতে পেরেছিস?’

‘আগে তরবারিটা সরাও। তুমি একজন বীর। বীরপুরুষ সবসময় বীরের বুকে তরবারি ধরে। আমার মতাে ভীরুর বুকে নয়।' জুয়াে ঘরের মালিক বলল।

জয়শীল তরবারিটাকে খাপে পুরে দু-হাতে ওর গলা টিপে ধরে বলল, 'আবার আজেবাজে কথা বলছ? তাড়াতাড়ি জবাব দাও। না হলে গলা টিপে শেষ করে দেব।'

‘আহা লাগছে, লাগছে। বলছি তাে জুয়াে খেলা বন্ধ করে দিয়েছি। এখানে কেউ নেই।' জুয়াে ঘরের মালিক বলল।

কিছুক্ষণ ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে জয়শীল বলল, ‘মিথ্যা কথা যদি বলে থাক রেহাই পাবে না। চললাম।' বলে জয়শীল চলে গেল।

কুলশেখরের ছেলে জয়শীল জননীকে হারিয়েছে বাচ্চা বয়সে। আজ জন্মভূমিকে হারাতে হচ্ছে। কত কথা মনে পড়ে জয়শীলের। তার টাকাপয়সা যখন ছিল কত বন্ধুবান্ধব ছিল। কত লােক আত্মীয় বলে তার কাছে আসত। কত ভালাে ভালাে কথা বলত। কিন্তু আজ তার পাশে কেউ নেই।

দেশ ছেড়ে যাওয়া ছাড়া জয়শীলের অন্য কোনাে পথ ছিল না। মনে মনে ভাবল কপালে থাকলে ভবিষ্যতে দেশে ফিরতে পারবে।

সেদিন বন্ধু দেবশর্মার সঙ্গে দেখাও হবে। তারপর সে এগিয়ে গেল যেদিকে দু-চোখ যায়। নগর থেকে গ্রাম। গ্রাম থেকে বনপথ। বনপথ থেকে অরণ্যপথে সে একা এগিয়ে গেল।

ক্রমাগত পথ চলার ক্লান্তি আছে। দেশ ছেড়ে যাওয়ার দুঃখ আছে। সব মিলিয়ে জয়শীল যেন নিজের মধ্যে থেকেও নেই। কোনাে এক অভিমানে অপমানে সে চলেছে তাে চলেছেই। যেখানে-সেখানে যা পায় তাই খায়। যেখানে রাত হয় সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম থেকে উঠে আবার চলার পালা। চলার যেন আর বিরাম নেই জয়শীলের।

এইভাবে সাত দিন পথ চলার পর সে অন্য দেশের রাজধানীতে গােধূলি বেলায় পৌছাল।

দুই

সেই রাত্রে জয়শীল এক বিরাট গাছের নীচে আশ্রয় নিল। অন্ধকারে কোনাে নগরে প্রবেশ করা নিরাপদ নয়। বনে যেমন বিপদ নগরেও তেমনি বিপদ আছে। এক দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এখানে এসেছে। এখান থেকে রাত্রের অন্ধকারে অন্য দেশে ঢুকলে সে দেশের রাজার হাতে পড়তে পারে। ওরা তাকে গুপ্তচর ভাবতে পারে। তারপর তার যে কী শাস্তি হবে কে জানে। এসব ভাবতে ভাবতে সে বটগাছের নীচে মাটির ঢিপিকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে পড়ল।

সারাদিন পথ চলার ক্লান্তির ফলে সে শােবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল। মাঝরাত্রে অনেকগুলাে শেয়ালের ডাক শুনে হঠাৎ জয়শীলের ঘুম ভেঙে গেল। অদূরে গাছের আড়াল থেকে কিছু ধোঁয়া এবং আলাে দেখা যাচ্ছিল।

‘যাক বাবা, তাহলে আমি শ্মশানের ধারে-কাছেই আছি। শ্মশানের পাশে বটগাছে তাে ভূতপ্রেত থাকার কথা। যাহােক আমার ভাগ্য ভালাে, ভূতপ্রেত দেখতে পাব।' বলে সে গাছের উপরের দিকে তাকাল। ডালে ডালে চোখ ফেরাল। কিন্তু হতাশ হল, কিছুই তার নজরে পড়ল না। মনে মনে হাসল। তরবারিটা ঠিক আছে কিনা দেখে নিয়ে আবার চোখ বুজল।

চোখ বুজল বটে কিন্তু সহজে ঘুম এল না। অনেকক্ষণ পরে তন্দ্রা এল। আর ঠিক সেইসময় তার কানে গেল, ‘বাঁচান! বাঁচান!’ আমাকে মহাকাল গিলে ফেলতে আসছে। 'বাঁচান! বাঁচান! সে এক গগনভেদী আর্তনাদ।

জয়শীল ঝট করে উঠে হাতে তরবারি নিয়ে যেদিক থেকে আর্তনাদ শােনা যাচ্ছিল সেদিকে ছুটল। দেখল শ্মশানে দু-তিনটে মড়া জ্বলছে। কালাে পােশাক পরা একটি লােককে ছুটে যেতে সে দেখল। রঙিন পােশাক পরা আর একটি লােক যেন তাকে তাড়া করছে অথবা তার পেছনে ছুটছে।

যে আর্তনাদ করছিল তার দিকে জয়শীল ছুটতে ছুটতে, এগিয়ে যেতে যেতে বলল, 'ভয় পেও না। তােমাকে যে গিলতে চায় তাকে আমি আমার এই তরবারি দিয়ে কেটে ফেলব।' জয়শীলের অভয়বাণী গােটা অঞ্চলে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হল।

জয়শীলের কথা শুনতে পেয়ে সে তার দিকেই ছুটে চলে এল। তাকে তাড়া করতে করতে এল ওই রঙিন পােশাক পরা মূর্তি। ওই মূর্তি বলছিল, ‘থামাে, দাঁড়াও। আমি মহাকাল নই। আমি মহাকালের দুত কালাে কাল।

আমাকে দেখে যখন এত ভয় তখন মহাকালকে তুমি তাে...।'

কথা শেষ হতে-না-হতেই, 'তুমি যেই হও তােমাকে আমার কোনাে ভয় নেই। আর যাই হােক, একটা অসহায় লােককে তুমি তাড়া করে মেরে ফেলবে তা আমি চোখের সামনে কিছুতেই সহ্য করতে পারব না। আমি তােমার মােকাবিলা করব। তুমি কালাে কালই হও, অথবা মহাকালই হও আমি তােমার ক্ষমতা একটু দেখতে চাই।' জয়শীল জোরে জোরে বলল।

জয়শীলের কথা শুনতে শুনতে কালাে কাল বিকৃত হাসি হাসতে হাসতে বলল, ‘সাবাস ব্যাটা! মনে হচ্ছে তােমার মধ্যেও একটু-আধটু সাহস আছে। এবার তুমি আমার নিজের রূপ দেখ।' বলে যে রঙিন কাপড় দিয়ে নিজেকে ঢেকে রেখেছিল সেই কাপড়টি ছুঁড়ে ফেলে দিল।

তখন দেখা গেল সেই কালাে কালের ভয়ংকর রূপ। গভীর কালাে তার গায়ে রং। চোখগুলাে যেন জ্বলছে। কথা বলার সময় তার মুখ দিয়ে যেন ধক ধক করে আগুন বেরুচ্ছিল। চোখের সামনে এরকম এক জ্বলন্ত মূর্তি দেখে জয়শীল মুহূর্তকাল থ বনে গেল।

পরমুহূর্তেই জয়শীলের সাহস ফিরে এল। সে কালাে কালের বুকে তরবারি ধরে গর্জে উঠল, 'তুমি কি ভেবেছ আমি তােমার এই বিকৃত রূপ দেখে ভয় পাব। আমি সে পাত্র নই। যে ভয়ে পালাচ্ছে তাকে যখন তুমি তাড়া করছ তখন তুমি নিশ্চয় খারাপ লােক। তুমি নিশ্চয় আসল লােক নও। তােমার মধ্যে খাদ আছে।'

ওই কথা শুনে কালাে কাল এক-পা এক-পা করে পেছিয়ে বলল, ‘যুবক আমি তােমার সাহস দেখে খুশি হয়েছি। অমানুষ শক্তিকে মহাশক্তিরাই অধীন করে রাখতে পারে। তবে তােমার মতাে শক্তিমানকেও ছেড়ে দেওয়া যায় না। তােমরা যেকোনাে সময়ে আমাদের ক্ষতি করবে। তাই তােমাকে—'বলে সে এগিয়ে এল।

জয়শীল আবার তার বুকে তরবারি ধরল। কালাে পােশাক পরা লােকটা পেছনে আছে কিনা দেখে নিল। সে তখনও শ্মশানের আশেপাশে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কালাে কাল চিৎকার করে বলল, 'আমাকে ওই সিদ্ধ সাধককে, ওই আর্তনাদকারীকে শাস্তি দিতে দাও। তা না হলে আমি তােমাকে কঠোর শাস্তি দেব।'

কিন্তু জয়শীল তার বুকের ওপর থেকে তরবারি সরাল না। তখন কালাে কাল হাত দিয়ে তরবারি সরিয়ে দিল।

ঝট করে জয়শীল তরবারি দিয়ে কালাে কালের গর্দানে আঘাত করল। চোখের পলকে মুণ্ডুটা ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই ওই মুণ্ডুটা মাটির উপর লাফাতে লাফাতে হাে-হাে করে হাসতে হাসতে বলল, ‘জয়শীল, আমি সত্যি তােমার সাহস দেখে খুশি হয়েছি। আমার গলার রক্ত তােমার তরবারিতে লাগার ফলে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে তােমার তরবারি। তুমি যার সঙ্গে যুদ্ধ করবে জয়ী হবে। যা চাইবে, তাই পাবে।'

এই কথা শুনে জয়শীল কিছুক্ষণের জন্য কেমন হয়ে গেল। কী যে করবে, কী বলবে ভেবে পেল না। তারপর বলল, 'কালাে কাল, আমি কোনাে মহাশক্তি অর্জন করার জন্য পথে বেরােইনি। শুধু চাই একটি চাকরি। রাজার অধীনে রাজকর্মচারী হিসেবে কাজ করে জীবন কাটাতে চাই। আমার চাহিদাও তেমন বড়াে কিছু নেই।'

কিন্তু জবাবে ওই কাটা মুণ্ডু কিছুই বলল না। কাটা মুণ্ডুর কাছে দাঁড়িয়ে তরবারি দিয়ে সেটিকে নেড়েচেড়ে দেখল জয়শীল। নড়ে না চড়ে না। মনে হল তাতে প্রাণ নেই। তার কানে নাকে অলংকার ছিল। গলায় মােটা হার ছিল। এ সব কিছুই জয়শীলের নজরে পড়ল।

জয়শীল আর কোনাে বিপদের আশঙ্কা নেই ভেবে তরবারিটাকে খাপে পুরে নিল। তারপর চারদিক চোখ ফিরিয়ে খুঁজতে লাগল ওই ছুটন্ত লােকটাকে। কিন্তু আশ্চর্য, কোথাও সেই মূর্তিকে আর দেখতে পেল না। ওই ভয়ংকর মূর্তির সঙ্গে যে ওই লােকটার কী সম্পর্ক বুঝতে পারল না। তার মনে প্রশ্ন জাগল, 'তাহলে সে কে? কীসের জন্য ছুটছিল? হয়তাে ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে কোথাও পড়ে আছে।' এসব কথা ভাবতে ভাবতে চারদিকে জয়শীল তাকে খুঁজতে লাগল। কোথাও কিছু পেল না।

শেষে ওই বটগাছের নীচে এসে দাঁড়াল। পেঁচার ডাক শােনা গেল। আগের মতােই অনেকগুলাে শেয়ালের ডাকও একসঙ্গে শােনা গেল। সে বুঝতে পারল তার ঘুম আর আসবে না। তার ভীষণ জল তেষ্টা পেল। সে এদিক-ওদিক তাকাল। কিন্তু কোথাও জল আছে বলে মনে হল না।

রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর কিছুক্ষণ বাদেই ভাের হয়ে যাবে। শ্মশানের ধারে-কাছে তাে জল থাকার কথা। চারদিকে ঘুরে দেখি। নিশ্চয় জল থাকবে। শুধু পান করাই নয় স্নান করতে হবে। তারপর ভাের বেলায় নগরে যাওয়া যাবে। জামাকাপড়ের অবস্থাও ভালাে নেই। অত ছেড়া পােশাক দেখেও নগরের লােক ভাববে আমি কোনাে ধনীর দুলাল। কী আর করা যাবে। কেউ প্রশ্ন করলে বলব, অরণ্যের সিংহের সঙ্গে লড়াই করে এসেছি। তাই জামাকাপড় ছিঁড়ে গেছে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে জয়শীল যাত্রা করল।

কিছুদূর হাঁটার পর একটা ছােট্ট ঘর দেখতে পেল। জানলা দিয়ে ওই ঘরের আলাে দেখা যাচ্ছিল। ভাবল, ওই বাড়ির লােককে তুলে জল চেয়ে আপাতত তেষ্টা মেটানাে যাক। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে জয়শীল ডাকল, 'বাড়িতে কে আছেন? আমি যাত্রী। আমার ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে। একটু জল খাব।'

তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে গেল। এক বুড়ি হাতে আলাে নিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এত রাত্রে তুমি কোত্থেকে এসেছ? কোথায় যাবে? ঘুমিয়ে সকালে উঠে রওনা দিতে পারলে না? অতই যদি তেষ্টা পেয়ে থাকে ভেতরে এসে জল খেয়ে যাও।'

জয়শীল ওই ঘরের ভেতর ঢুকল। বুড়ি তার মুখের সামনে আলাে ধরে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর বলল, ‘ভেবেছিলাম তুমি তীর্থযাত্রী। দলছাড়া হয়ে পথ হারিয়েছ? তােমার ব্যাপারটা কী? এত কাঁচা বয়সে কোমরে তরবারি বেঁধে চললে কোথায় ?’

জয়শীল কী যেন জবাব দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই বুড়ি বলল, ‘ওই তক্তার উপর বস। আগে তােমার তেষ্টার জল দিই।' বলে বুড়ি পাশের ঘরে গিয়ে এক পাত্রে জল এনে জয়শীলকে দিল।

জয়শীল চোঁ করে জল খেয়ে বলল, 'মা, তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ! আচ্ছা, ঘরে কি তুমি একা থাক? আর কেউ নেই?’

'আমার বলতে এ জগতে আর কেউ নেই বাবা। আমার বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি। এক বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছে। উনি রাজার অধীনে কাজ করতেন ওঁর মারা যাওয়ার পর থেকে ও যে মাইনে পেত তার তিন ভাগের এক ভাগ আমি পাই। এই দিয়ে পেট চালাই। কোনােভাবে বেঁচে আছি।' বুড়ি বলল।

‘মা, এই অঞ্চলে আমি প্রথম এসেছি। কাছাকাছি কোনাে নগর আছে? এখানকার রাজার নাম কি?’ জয়শীল জিজ্ঞেস করল।

বুড়ি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, 'বাবা, রাজার নাম কনকাক্ষ। আমাদের রাজা ধর্মাত্মা পুরুষ। প্রজাদের মঙ্গল কামনা করেন। একমাস আগে রাজার বিবাহযােগ্যা মেয়েকে এবং যুবরাজকে কে বা কার যেন অপহরণ করে নিয়ে গেছে। রাজার অবস্থা তারপর থেকে এত খারাপ হয়ে গেছে যে বলার নয়। সবসময় রাজা বিছানায় শুয়ে থাকেন। একসঙ্গে ছেলেকে এবং মেয়েকে যে হারাতে হবে তা রাজা কোনােদিন কল্পনাও করেননি। যে রাজা এত দুঃখে আছেন তার কাছে কী এখন যেতে পারবে বাবা?'

জয়শীল ভাবল, 'সত্যিই তাে। রাজার মনের অবস্থা যখন এতটা ভারাক্রান্ত তখন তার কাছে চাকরির জন্য যাওয়া উচিত নয়।' কিন্তু পরক্ষণেই জয়শীলের মনে হল, ‘চাকরি নাই-বা চাইলাম। যুবরাজ ও রাজকুমারী কবে থেকে হারিয়ে গেল, কারা ওদের নিয়ে গেল। এসব ব্যাপারে রাজার কাছে খোঁজখবর করলে কেমন হয়!’ এসব কথা ভেবে জয়শীল বুড়িকে বলল, 'আচ্ছা মা, রাজা যতই ভালাে হােক তার নিশ্চয় শত্রু আছে। প্রত্যেক রাজারই শত্রু আছে। কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়েকে নিশ্চয় শত্রুরা নিয়ে গেছে। এবং সে শত্রুকে রাজা নিশ্চয় চেনেন।'

'তাহলে তাে আর কথাই ছিল না। শত্রুকে যুদ্ধে হারিয়ে দিয়ে আমাদের রাজা নিজের ছেলে-মেয়েকে উদ্ধার করতেন। কোনাে মানুষ আমাদের রাজার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে যেতে পারে না। এ নিশ্চয় কোনাে যক্ষ বা রাক্ষসের কাজ।' বুড়ি বলল।

এমন সময় বাইরে কোলাহল শােনা গেল। কে যেন বলছে, 'শ্মশানে আমার বাবার মুণ্ডু যে কেটেছে সে এই ঘরেই ঢুকেছে। এই ব্রাহ্মণ বুড়ি ওই লােকটাকে আশ্রয় দিয়েছে।'

'তােমরা চুপ কর। অত হইচই করলে অপরাধী টের পেয়ে পালিয়ে যাবে। আমি সিদ্ধ সাধক। আমাকে ব্যাপারটা বুঝতে দাও আগে।' আর একজন চটে গিয়ে বলল।

গলাবাজি করে দুজনকেই থামিয়ে অন্য জন বলল, 'তােমরা সব চুপ কর। আমি নগররক্ষক। নগরে কে এসেছে না এসেছে তার খোঁজখবর নেওয়ার দায়িত্ব আমার। আমাকে মন্ত্রী পাঠিয়েছেন। আমিই খোঁজ নেব। তােমরা চুপ কর।'

এসব কথা শুনে জয়শীল বলল, 'মা, আমাকে তােমার ঘরে দেখলে তােমার ক্ষতি হবে না তাে? হলে বল। আমি খিড়কির দরজা দিয়ে পালাতে পারি?’

জয়শীলের কথা শেষ হতে-না-হতেই নগররক্ষক বুড়ির ঘরের দরজায় জোরে জোরে আঘাত করতে করতে বলল, 'দরজা খােল। তাড়াতাড়ি দরজা খােল।'

তিন

নগররক্ষক সেই গভীর রাত্রে দরজা খুলতে বলায় বুড়ি চমকে গেল। ভয় পেল। সে ভেবে পেল না দরজা কেন খুলতে হবে।

বুড়ি দরজা খুলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। জয়শীলকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, তুমি বাইরে কোনাে অপরাধ করে আমার ঘরে ঢােকনি তাে? তুমি যদি রাজার লােকের চোখে ধূলাে দেওয়ার জন্য আমার ঘরে ঢুকে থাক তাহলে বল। সত্যি কথা বললে যা করার আমি করব। আমার কাছে সত্যি কথা বলতে হবে।'

'মা, আমি কোনাে দোষ করিনি। আমার কপাল মন্দ, তাই দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। আমি যা বলছি সম্পূর্ণ সত্য। শপথ করে বলছি।' জয়শীল বলল।

‘তােমার কথা শুনলে, চেহারা দেখলে মনে হবে তুমি খুব বড়াে পরিবারের ছেলে। তুমি যদি দোষী না হও রাজার লােককে আর আমার ভয় কীসের।' বলে বুড়ি দরজা খুলে ফেলল।

নগররক্ষক ঘরে না ঢুকেই বাইরে দাঁড়িয়েই বুড়িকে বলল, 'আপনার স্বামীকে আমি ভালােভাবেই চিনতাম। এত রাত্রে দরজা খুলতে বলেছি বলে আপনি কিছু মনে করবেন না। শ্মশান পাহারাদারের বড়াে ছেলে আর এক সিদ্ধ সাধকের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া বেধেছিল। আর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আমাকে এখানে আসতে হল। আপনার ঘরে কি কোনাে যুবক আশ্রয় নিয়েছে? ওই যুবকের কোমরে একটা তরবারি ঝুলছে।'

বুড়ি ভেবে পেল না কি বলবে। তার কোনাে জবাব দেবার আগেই পাশের ঘর থেকে যুবক জয়শীল এগিয়ে এসে বলল, 'আপনারা যে যুবককে খুঁজছেন হয়তাে আমি সেই যুবক। আমার দিকে ভালাে করে তাকালে হয়তাে আপনারা চিনতে পারবেন।'

শ্মশানের পাহারাদারের বড়াে ছেলে চেঁচিয়ে উঠল, 'এই সেই লােকটা। আমার বাবার মুণ্ডু কেটেছে। এই লােকটাই মরে আবার বেঁচে ওঠা আমার বাবার মুণ্ডু কেটে লুকিয়ে পড়েছে।'

সিদ্ধ সাধক ধমক দিয়ে বলল, ‘বােকার মতাে কথা বল না। যে একবার মরে যায় সে আবার বাঁচতে পারে নাকি? এই যুবক তােমার বাবাকে মারেনি। মেরেছে তােমার বাবার রূপধারী ভূতকে। আমি নিজের কানে ওই ভূতের কথা শুনেছি। আমি যা বললাম তা বিশ্বাস কর। আর একটি কথাও বল না।'

‘আমি শেষবারের মতাে বলে দিচ্ছি তােমরা দুজনেই চুপ কর। আর একটি কথা যদি তােমাদের মুখে শুনি তাে তােমাদের দুজনকেই শ্মশানের চিতায় তুলব।' গর্জে উঠে নগররক্ষক সিদ্ধ সাধক ও শ্মশান পাহারাদারের ছেলেকে বলল। কিছুক্ষণ পরে জয়শীলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলল, 'তােমার নাম কী? এত রাত্রে তুমি এখানে কোত্থেকে এলে?’

'আজ্ঞে আমার নাম জয়শীল। আমার দেশের নাম অমরাবতী। আমাদের রাজার নাম রুদ্রসেন। হয়তাে তার নাম শুনেছেন। কয়েকটি কারণে আমি দেশ ছেড়ে চাকরির সন্ধানে ঘুরছি।' বলল জয়শীল।

নগররক্ষক সিদ্ধ সাধক ও ওই ছেলেকে দেখিয়ে বলল, 'তুমি এদের চেন? তুমি নাকি শ্মশানে এই ছেলেটির বাবাকে মেরে ফেলেছ? সত্য কথা বল।'

জয়শীল ওদের দুজনের দিকে একবার তাকিয়ে নগররক্ষককে বলল, 'এই সাধককে শ্মশানে দেখেছি। এক ভয়ংকর চেহারার লােক এই সাধককে তাড়া করেছিল। আমি বাধা দিয়েছিলাম। তখন সেই ভয়ংকর লােকটা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। নিতান্তই আত্মরক্ষার জন্য আমি ওই ভয়ংকর চেহারার লােকটা মুণ্ডু কেটেছি।'

'তুমি মনে রেখ যে তুমি আমার বাবার মুণ্ডু কেটেছ। আমি তাঁকে শ্মশানে রেখে কাঠ আনতে গিয়েছিলাম। আমার যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোন দেবতার আশীর্বাদের ফলে আমার বাবা বেঁচে উঠেছিলেন। ফেরার সময় দেখতে পেলাম তুমি আমার বাবার মুণ্ডু কাটছ।' রেগে গিয়ে বলল শ্মশান পাহারাদারের ছেলে।

‘ওটা যে কার দেহ তা লক্ষ না করেই আমি আমার মন্ত্রশক্তি দিয়ে ওই দেহের মধ্যে কালকে আহ্বান করেছিলাম। তারপর ওই দেহে প্রাণ এল। প্রাণ আসতেই সে আমাকে মারার জন্য তাড়া করতে লাগল। আমি তখন নিজের প্রাণ বাঁচাতে ছুটছিলাম। এই যুবক বাধা দিয়ে তার মুণ্ডু না কাটলে আমি বাঁচতে পারতাম না।' বেঁচে ওঠার আনন্দে বলল সাধক।

নগররক্ষক একটু হেসে বলল, 'তােমার নাম কী যেন বললে, জয়শীল? ওই দু-জন তুমি যা করেছ তা নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে তর্ক করছে। এদের কথা শুনে আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি আর পারছি না। আমি চাই সবাইকে মন্ত্রীর কাছে নিয়ে যেতে। বিচার যা করার মন্ত্রীই করবেন।' বলে সবাইকে অনুসরণ করার ইশারা করে নগররক্ষক এগিয়ে গেল। অদূরে একটি বিরাট গাছের নীচে তার ঘােড়া বাঁধা ছিল।'

জয়শীল যাবার আগে বুড়িকে বলল, 'মা, শুনলেন তাে সব কথা। আমি জানি আমি কোনাে দোষ করিনি। রাজা হােক, মন্ত্রী হােক, ঠিক বুঝতে পারবেন আমি দোষী নই। কোনাে একটি চাকরি জোগাড় করে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসব।'

‘তােমার মঙ্গল হােক বাবা।' জয়শীল প্রণাম করলে বুড়ি বলল।

ঘােড়ায় চড়ে নগররক্ষক আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে লাগল। পেছনে হেঁটে গেল জয়শীল, সাধক এবং ওই ছেলেটি। ভাের হয়ে এল। লােকের ঘুম ভাঙতেই দেখল নগররক্ষক ওই তিন জনকে নিয়ে রাজপ্রাসাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পথের ধারের লােক কাছাকাছি এলে শ্মশানরক্ষকের ছেলে বলতে লাগল, 'এই যে লােকটা তরবারি নিয়ে চলেছে এই আমার বাবার মুণ্ডু কেটেছে। আমার বাবা মরে বেঁচে উঠেছিল। আর এই যে কালাে পােশাক পরা লােকটা নিজেকে সাধক বলে, আসলে এর জন্যই আমার বাবা মারা গেল। আমি যাচ্ছি রাজার হুকুমে একেবারে আজকেই এই দু-জনের মুণ্ডু কাটতে।'

নগররক্ষক রাজপ্রাসাদে যাওয়ার আগেই মন্ত্রী সেখানে এসেছিল। নগররক্ষক মন্ত্রীকে সব কিছু বলল। কিছুক্ষণ ভেবে মন্ত্রী বলল, 'বৈদ্য যখন মারা গেছে বলেছে। তখন শ্মশানরক্ষক বেঁচে উঠবে কী করে? এ অসম্ভব! মরা মানুষ বেঁচে উঠতে পারে না। সাধকের কথা যদি সত্য হয় তাহলে অবশ্য যুবক যে মুণ্ডু কেটেছে তা বিশ্বাস করতে হয়। কিন্তু এরকম একটা অসম্ভব ব্যাপার... মন্ত্রী এরপর কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। এমন সময় জয়শীল বলল, বিচার আপনার হাতে। তবে আমি যা করেছি নিতান্তই আত্মরক্ষার জন্য করেছি। যতদূর জানি, শাস্ত্র মতে আত্মরক্ষার জন্য হত্যা করলে সেটা ঠিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না।'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক।' মন্ত্রী এমনভাবে বলল যেন তার মাথা থেকে বিরাট এক বােঝা নেমে গেছে; যেন তাকে আর কিছু ভাবতে হবে না। তার আর কিছু করার নেই।

সাধক আর থাকতে না পেরে বলল, 'এ ব্যাপারে আমার ছােট্ট একটি পরামর্শ আছে। অনুমতি দিলে বলতে পারি।'

মন্ত্রী মাথা নেড়ে অনুমতি দিল। সাধক গলা ঝেড়ে বলল, 'এই যুবকের শক্তি অসীম। এর তরবারির কাছে কোনাে কিছু এগােতে পারে বলে আমার মনে হয় না। আমি মন্ত্রশক্তি বলে যা শুনেছি এই যুবকের মাধ্যমে কনকাক্ষ মহারাজের অনেক লাভ হবে। অবশ্য কীভাবে হবে, কবে হবে আমি তা ঠিক বলতে পারি না।'

মন্ত্রী যেন আবার বিপদে পড়ল। বিরক্ত হয়ে সাধককে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি বলতে চাইছ? ছেলে এবং মেয়েকে হারিয়ে রাজার মন এমনিতেই খারাপ। তিনি ইদানীং কোনাে কাজে উৎসাহ পাচ্ছেন না। রাজার উপকার মানে তাে রাজার রাজ্যবিস্তার। তুমি কি বলতে চাইছ যে এই যুবকের মাধ্যমে আমাদের রাজার রাজ্যবিস্তার হবে? রাজা এই মানসিক অবস্থা নিয়ে যুদ্ধ করবেন ?’

‘ছেলে-মেয়েকে হারিয়েছেন বলেই তাে রাজার মন খারাপ। এমনও তাে হতে পারে যে জয়শীলের জন্যই রাজা নিজের ছেলে-মেয়ে ফিরে পাবেন? আমি। নিশ্চিত জয়শীলের তরবারির সামনে কেউ দাঁড়াতে পারবে না।' সাধক বলল।

কথাগুলাে শুনে মন্ত্রীর মনে হল তার ঘাড় থেকে বিরাট এক বােঝা নেমে গেছে। অনেকদিন ধরে অনেকভাবে অনেক কিছু তাকে করতে হচ্ছে। এবং সব কিছুই করতে হচ্ছে রাজার ছেলে-মেয়েকে খোঁজ করার জন্য। মন্ত্রী ভাবল, সাধকের কথা যদি সত্য হয় তাহলে এই মুহূর্তে রাজার ছেলে-মেয়েকে খোঁজ করার জন্য জয়শীলকে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার আগে এ-ব্যাপারে রাজার অনুমতি নেওয়া প্রয়ােজন।

জয়শীলকে অনুসরণ করার ইশারা করে মন্ত্রী এগিয়ে গেলেন প্রাসাদের ভিতরে।

মন্ত্রী গেলেন রাজার কাছে। রাজা সেইসময় সেনানায়কের ছেলে মঙ্গলবর্মার সঙ্গে কথা বলছিলেন। মন্ত্রীকে দেখতে পেয়ে রাজা হাত নেড়ে তাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘মহামন্ত্রী, মঙ্গলবৰ্মা আমার পুত্রকে খুঁজতে চায়। এ-ব্যাপারে কোনাে পরামর্শ আছে?’

মন্ত্রী কিছুক্ষণ ভেবে বলল, 'মহারাজ এসব কাজের জন্য বিশেষ অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন যুবকের প্রয়ােজন। আমরা এই ধরনের যুবককে পেয়েছি। নাম জয়শীল। তার তরবারির সামনে কেউ দাঁড়াতে পারে না।'

জয়শীল মাথা নীচু করে শুনল। কোনাে কথা বলল না।

কনকাক্ষ রাজা কী বলবেন ভেবে পেলেন না। মঙ্গলবর্মা মনে মনে মন্ত্রীর উপর ভীষণ রেগে গেল। তবে মনের রাগ মনে চেপে রেখে বলল, 'মহারাজ যেহেতু ঘােষণা করেছেন, পুত্র-কন্যাকে খুঁজে দিলে অর্ধেক রাজত্ব দেবেন সেইহেতু বহু যুবক মহারাজের পুত্র-কন্যাকে খুঁজতে আসতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। তা না হলে যার তরবারির সামনে কেউ এগােতে পারে না তার নাম এর আগে কেউ কি শুনেছেন?’

মন্ত্রী এই প্রশ্ন শুনে মনে মনে বিরক্ত হলেও প্রকাশ না করে বলল, ‘নামে কিছু যায় আসে না। রাজার পুত্রকন্যাকে মানুষ অপহরণ করেছে না দানব নিয়ে গেছে আমরা জানি না। তাই বিপদ থেকে উদ্ধার করে যে ওদের আনতে পারবে সেই তাে পাবে অর্ধেক রাজত্ব। না আনলে তাে আর পাবে না।'

তবু মঙ্গলবৰ্মা অত সহজে বিষয়টিকে হাতছাড়া করতে চায়নি। তাই সে বলল, 'জয়শীলের তরবারিতে যে এত ক্ষমতা আছে তা মহামন্ত্রী জানলেন কী করে? আপনি কি তার পরীক্ষা নিয়েছেন?’

মন্ত্রী বলল, 'ঠিক আমি পরীক্ষা নিইনি। তবে রাজার ইচ্ছা জাগলে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে।'

মঙ্গলবর্মার প্রশ্নের মধ্যে যেন অবিশ্বাসের সুর বেজে উঠল।

রাজ এতক্ষণ ওদের কথাবার্তা শুনে বললেন, 'মহামন্ত্রী, হাতে পাঁজি মঙ্গলবার করে কী লাভ? জয়শীলের তরবারির ক্ষমতা কতখানি তা পরীক্ষা করে দেখার ভার মঙ্গলবর্মাকে দেওয়া হােক-না-কেন? যদি সত্যি জয়শীলের তরবারিতে অসীম ক্ষমতা থাকে তাহলে তাকে আমরা উপযুক্ত কাজে ব্যবহার করতে পারি। চিরকালের জন্য আমাদের দেশে তাকে একটা চাকরি দিয়ে রেখে দিতে পারি।'

মন্ত্রী জিজ্ঞেস করল, 'কী ধরনের পরীক্ষা হবে মহারাজ?’

'আমাদের পশুশালার দুটো বাঘকে মােকাবিলা করবে একা মঙ্গলবর্মা। তার হাতে থাকবে শুধু জয়শীলের তরবারি।' রাজা বললেন।

এ-কথা শুনে জয়শীল খুব খুশি হয়ে নিজের তরবারি মঙ্গলবৰ্মার দিকে এগিয়ে দিল। পশুশালার রক্ষককে ডেকে পাঠানাে হল।

কিছুক্ষণ পরে একটি বিরাট খাঁচায় দুটি বাঘ ঢুকিয়ে দেওয়া হল। তারপর জয়শীলের তরবারি নিয়ে মঙ্গলবর্মাকে ওই খাঁচার ভেতরে ঢুকতে হল। মঙ্গলবর্মাকে দেখেই বাঘ দুটো তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

চার

মঙ্গলবর্মা ভালােভাবেই তরবারি চালাতে পারত। তির-ধনুক চালানাের ক্ষমতাও তার ছিল। কিন্তু দুটো বাঘ যখন হাঁ করে তার দিকে এগিয়ে গেল তখন সে ভীষণ ভয় পেল। ওদের গর্জন শুনে তার প্রাণবায়ু যেন বেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ বাঘ তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে। কীভাবে ওই খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসা যায় তা সে ভাবছিল। মাথা তুলে উপরের দিকে তাকাল। ঠিক সেইসময় একটি বাঘ থাবা মারার জন্য পা তুলল।

জয়শীল বুঝতে পারল মঙ্গলবার অবস্থা কাহিল। সে জানে তরবারিটা একবার ঠিকমতাে তুলে ধরলে বাঘ কিছুই করতে পারবে না। তাই খাঁচার বাইরে থেকে চেঁচিয়ে বলল, 'মঙ্গলবর্মা তােমার হাতে যে তরবারি আছে তার ক্ষমতা অসীম। তরবারির এক একটা আঘাতে এক একটা বাঘ মারা যাবে। ভয় পেও না, আঘাত কর। আঘাত করলেই বাঘ মরে যাবে।'

জয়শীলের কথা শুনে মঙ্গলবর্মার সাহস পেল। সে যেন নতুন করে বুঝল। পক্ষণেই তার মনে হল কথাগুলাে বলছে তাে জয়শীল? জয়শীল কি তার মঙ্গল চায়? সে কেন এত চিৎকার করে বলছে? ও যা বলছে তা যদি মিথ্যা হয়? আঘাত করলে যদি কিছু না হয়, তখন তাে বাঘ আমাকে ফেঁড়ে ফেলবে। তা ছাড়া তরবারিতে যদি অসীম ক্ষমতা সত্যি থেকে থাকে তাহলে তার কী লাভ...’

এই ধরনের কথা যত ভাবছে মঙ্গলবর্মার হাত তত কাঁপছে। পরক্ষণেই একটি বাঘ এসে তার কাধে থাবা মারল। তখন মূত্য নিশ্চিত জেনে মঙ্গলবর্মা তরবারি দিয়ে বাঘকে আঘাত করতে গেল। কিন্তু তার হাত থেকে তরবারি খসে পড়ল।

বাঘ দুটো তৎক্ষণাৎ পেছিয়ে গেল। একসঙ্গে মঙ্গলবৰ্মার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য লেজ নাড়তে নাড়তে তারা যেন প্রস্তুত হচ্ছিল। ওদের ওই অবস্থা দেখে মঙ্গলবৰ্মা এককোণে দাঁড়িয়ে খুব জোরে চোখ বুজে ফেলল।

‘হে বীর যুবক জয়শীল, দেখাও তােমার বীরত্ব’ চিৎকার করে বলে উঠল সিদ্ধ সাধক।

তৎক্ষণাৎ জয়শীল দশ-বারাে হাত উপর থেকে বাঘ এবং মঙ্গলবর্মা যেখানে ছিল সেখানে লাফিয়ে পড়ল। হঠাৎ আওয়াজ শুনে মঙ্গলবর্মা এবং বাঘ কেমন যেন হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে নীচে পড়ে থাকা তরবারি জয়শীল হাতে তুলে নিল।

এই দৃশ্য দেখে কনকাক্ষ রাজা অবাক হয়ে মন্ত্রীকে বললেন, ‘মহামন্ত্রী কত সাহস দেখছেন? এ ধরনের যুবকের সাহায্য পেলে আমার ছেলে এবং মেয়ে নিশ্চয় উদ্ধার পাবে।'

‘মহারাজ, দেখুন কী হয়? বাঘের খপ্পর থেকে আগে জয়শীল বেরিয়ে আসুক। তারপর অন্য কথা। মনে হচ্ছে বাঘ দুটো মঙ্গলবর্মাকে ছেড়ে একসঙ্গে জয়শীলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।' বলল মন্ত্রী ধর্মমিত্র।

এদিকে জয়শীল বুঝতে পারল যে দুটো বাঘ একসঙ্গে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার তাল করছে। সে তখন এমন ভাব দেখাল যেন ভীষণ ভয় পেয়েছে। এমন ভঙ্গি করল যেন সে দেয়াল টপকে পালাবে। তা লক্ষ করে একটা বাঘ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এগিয়ে এল। সঙ্গেসঙ্গে জয়শীল তরবারি তুলে তার মাথায় আঘাত করল। বাঘের রাগ আরও বেড়ে গেল। প্রচণ্ড আক্রোশে বাঘ জয়শীলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে, সামনের পা তুলতেই জয়শীল বাঘের বুকে তরবারি ঢুকিয়ে দিল। বাঘের গর্জন পরমুহূর্তে যেন আর্তনাদে রূপান্তরিত হল। সে গোঁ-গোঁ করতে করতে একটু পেছিয়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ে । গেল। এসব দেখে অন্য বাঘ যেন ভয় পেল। তখন জয়শীল তরবারি নিয়ে। ওই বাঘের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। সে যেখান থেকে এসেছিল সেখানে ফিরে গেল। বাইরে থেকে কনকাক্ষ রাজা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন। ততক্ষণ মঙ্গলবর্মার চোখ বােজা ছিল। বাইরের লােকের আনন্দধ্বনি শুনে এবং রাগে গোঁ-গোঁ করতে করতে ফিরে যাওয়া বাঘের আওয়াজ শুনে মঙ্গলবর্মা চোখ খুলল। খুলে দেখে একটি বাঘ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অন্য বাঘের পাত্তা নেই। সে তখন মাথা তুলে চিৎকার করে কণকাক্ষ রাজাকে বলল, 'মহারাজ, এই তরবারিতে যে অসীম ক্ষমতা আছে সে বিষয়ে আমার আর কোনাে সন্দেহ নেই। দুর্ভাগ্য আমার, আমার হাত থেকে তরবারিটা হঠাৎ খসে পড়েছিল। তা না হলে হয়তাে আমার হাতের তরবারির আঘাতে বাঘ মরে যেত। আমি যা করতে পারিনি, জয়শীল তা করতে পেরেছে?’

‘মঙ্গলবর্মা তুমি খুব ভাগ্যবান। তা না হলে বাঘ তােমার কাঁধে থাবা না মেরে অন্য জায়গায় হয়তাে মেরে দিত।' মন্ত্রী ধর্মমিত্র যেন পরিহাস করে বলল।

‘আমি তাে আগেই বলেছিলাম ওই তরবারি আশীর্বাদপুষ্ট। ওই তরবারি দিয়ে জয়শীল সমস্ত জগৎ জয় করতে পারে।' খুব খুশি হয়ে সিদ্ধ সাধক বলল।

এই ধরনের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে কনকাক্ষ রাজা বললেন, ‘তরবারির শক্তিটাই বড়াে কথা নয় সেই তরবারি ধরার মতাে ক্ষমতাও থাকা চাই। মঙ্গলবর্মার তাে সে ক্ষমতা ছিল না।'

রাজার কথায় মন্ত্রী খুব খুশি হয়ে জয়শীলকে হাত নেড়ে ডাকল, ‘জয়শীল চলে এসাে। তােমার সাহসের ফলে আমাদের মঙ্গলবর্মা প্রাণে বেঁচেছে। সে যে বাঁচতে পেরেছে তারজন্য আমরা তােমায় অভিনন্দন জানাই। মঙ্গলবর্মা আমাদের সেনানায়কের ছেলে। সেনানায়ক দেশের সীমানার সেনারা ঠিকমতাে পাহারা দিচ্ছে কি না দেখতে গেছেন। ফিরে এসে উনি যদি শুনতেন তার ছেলেকে বাঘে খেয়েছে তাহলে তাঁর দুঃখের সীমা থাকত না।'

জয়শীল তখনও উঁচু দেয়ালে ঘেরা ওই খাঁচার মধ্যে। তার দিকে হাত দেখিয়ে রাজা কনকাক্ষ বললেন, জয়শীল, 'যে পথে নেমে গেছ, সেই পথে কি উঠে আসবে?’

‘আমার উঠে যাওয়াটা খুব একটা বড়াে সমস্যা নয়। যে বাঘটা রেগে গিয়ে ফিরে গেছে আমার উঠে যাওয়ার পর সেই বাঘ ফিরে আসতে পারে। তখন মঙ্গলবর্মার পক্ষে সেই বাঘকে ঠেকানাে সম্ভব হবে না।' জয়শীল বলল।

'মঙ্গলবর্মার হাতে ইন্দ্রের বজ্র থাকলেও সে কিছুই করতে পারবে না। হাতে অস্ত্র থাকলেই হয় না। সে অস্ত্র প্রয়ােগ করার মতাে সাহস থাকা চাই।' সিদ্ধ সাধক বলল।

কনকাক্ষ রাজা এবং মন্ত্রী ধর্মমিত্র জয়শীলকে হাত বাড়িয়ে তুলে নিলেন। তার আগে ফিরে যাওয়া বাঘ আর যেন না আসতে পারে তার ব্যবস্থা হল। মন্ত্রী এবং রাজা জয়শীলের পিঠ চাপড়াতে চাপড়াতে অনেক প্রশংসার কথা বললেন। সিদ্ধ সাধক জয়শীলকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'জয়শীল, তুমি যে আমাকে সাহায্য করেছ তাই নয়, তুমি মহারাজের আশার মশাল, রাজার ছেলে এবং মেয়ে অনেক দিন ধরে নিখোঁজ; ওদের উদ্ধার করে আনার দায়িত্ব নেওয়া তােমার পক্ষেই সম্ভব।'

‘সাধক এসব কথা রাজভবনে বসে আলােচনা করা যাবে। এখন তুমি চুপ কর।' তারপর মন্ত্রী অনুচরদের নিদের্শ দিলেন মঙ্গলবর্মাকে সেখান থেকে তুলে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।

রাজার সঙ্গে সবাই রাজভবনে গেল। পশুশালার রক্ষক মঙ্গলবর্মার কাছে গিয়ে দেখে সে ফ্যালফ্যাল করে পাগলের মতাে তাকাচ্ছে। তার কাঁধের ঘা দেখে সে বলল, 'অত বেশি ঘাবড়ানাের কিছু নেই। এই ঘা সারতে এক সপ্তাহের বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু আমি দুঃখ পাচ্ছি অন্য কারণে। আমাদের পশুশালায় সবচেয়ে ভালাে যে বাঘ ছিল সেটাকেই জয়শীল মেরে ফেলল।

ওই বাঘটাকে ধরতে আমাদের দলের দু-জনকে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। দু-জন শিকারিকে হারিয়ে একটি বাঘ পেয়েছিলাম। আর সেই বাঘ আজ মারা গেল।' বলে পশুশালার রক্ষক চোখের জল ফেলতে লাগল।

‘মরা বাঘের জন্য অত দুঃখ করাে না তাে। এই ধরনের দুঃখ অসহ্য। এখন ভাবতে হবে জয়শীলের তরবারিতে সত্যি অতখানি ক্ষমতা আছে?’ মঙ্গলবর্মা জিজ্ঞেস করল।

পশুশালার রক্ষক তার কথায় দুঃখ পেল, রাগও হল। কিন্তু সেনানায়কের ছেলে শুধু তাকে মুখ ফুটে কিছু বলল না। আবার না বলেও থাকতে পারল না । কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে বলল, 'দেখুন ওই তরবারিতে কতখানি ক্ষমতা আছে তা আমি জানি না তবে লােকটা তরবারি চালাতে যে পারে তার প্রমাণ আমি পেয়েছি।'

‘তাহলে তাে সর্বনাশ। জয়শীলের হাতে অর্ধেক রাজত্ব চলে যাবে। শুধু কী তাই, রাজকুমারীকেও সে পেয়ে যাবে।' মঙ্গলবৰ্মা আপন মনে বলল।

মন্ত্রী যাদের পাঠিয়েছিল। তারা এসে মঙ্গলবর্মাকে নিয়ে গেল। সে ওদের জিজ্ঞেস করল, 'আচ্ছা, রাজা ওই লােকটাকে কিছু উপহার দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে তাে? নাকি যুবরাজ ও রাজকুমারীকে খোঁজার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন?

চারজনের একজন বলল, ‘আমরা ওসব কিছু জানি না। তবে জয়শীলকেও রাজভবনের ভেতরে যেতে দেখলাম। তাকে সবাই খাতির করছে। সে রাজার কাছে দাঁড়িয়েছিল।'

শ্মশান পাহারাদারের ছেলে এসে বলল, ‘প্রভু, মরে বেঁচে ওঠা আমার বাবাকে যে শেষ করে ফেলেছে তার কী ক্ষতি করতে পারেন আমাকে বলুন?’ আমি ওর কী ক্ষতি করেছি বলুন? তাকে মন্ত্রীর কাছে নিয়ে যাওয়া হল। মন্ত্রী তার কথা শুনে রাজার সঙ্গে আলােচনা করল। তারপর তাকে বলল, 'দেখ বাবা মারা গেছে বলে অত দুঃখ করছ কেন? রাজা শ্মশান পাহারার ভার তােমাকেই দেবেন। তােমার বাবা যে কাজ করত সেই কাজ তুমি করবে। সারা দেশে যত শ্মশান আছে সমস্ত শ্মশানের পাহারাদারের ওপরে তােমার স্থান থাকবে। তােমার রােজগার এক-শাে গুণ বেড়ে যাবে। প্রত্যেকেরই বাবা তাে একদিন মরে। তার জন্য দুঃখ করে কী লাভ? এখন যাও।'

‘আজ্ঞে যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন আপনার উপকারের কথা ভুলব না। আমার বাবা মারা গেলে দুঃখ পেয়েছিলাম। বেঁচে উঠে আবার মরে গেলে আরও দুঃখ পেয়েছিলাম। আপনি আজ আমাকে কত বড়াে পদ দিলেন।

সারা দেশের শ্মশান পাহারাদারদের চেয়ে আমি বড়াে! আনন্দে আমার বুক ভরে যাচ্ছে। বাবা থাকলে আমার এই উন্নতি দেখে কত খুশি হতেন।' শ্মশান পাহারাদারের ছেলে বলল।

মন্ত্রী ধর্মমিত্র একটু হেসে বলল, 'আচ্ছা এখন যাও বাকি কথা পরে হবে।' তারপর রাজা, মন্ত্রী ও জয়শীল রাজভবনের অন্য একটি ঘরে ঢুকে বসল।

কিছুক্ষণ ভেবে রাজা কনকাক্ষ বললেন, 'মহামন্ত্রী, এখন কী করা যায় ? যুবরাজ আর রাজকুমারীকে খোঁজার জন্য আমাদের যারা গিয়েছিল তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। এখন কি জয়শীলকে পাঠানাে যায়?’

মন্ত্রী জয়শীলের দিকে একবার তাকিয়ে কী যেন বলতে যাবে এমন সময় সিদ্ধ সাধক বলে উঠল, 'মহারাজ, যুবরাজ ও রাজকুমারীকে খোঁজার দায়িত্ব সাধারণ লােকের উপর দিয়ে কোনাে লাভ নেই। শুধু দৈহিক ক্ষমতা থাকলেই ওদের উদ্ধার করে কেউ আনতে পারবে না। ওদের আনতে হলে চাই দৈহিক শক্তি, মনের সাহস আর অলৌকিক জ্ঞান। এসব না থাকলে যে ওদের উদ্ধার করা যাবে না তা প্রমাণ হয়ে গেছে। এর আগে যারা গিয়েছিল তাদের অনেকেরই দেহবল ছিল। অস্ত্রবলও কয়েক জনের ছিল না তা নয়। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। তার একটি মাত্র কারণ তাদের অলৌকিক জ্ঞানের অভাব। তাই বলছি জয়শীলের সঙ্গে আমাকেও ওদের খোঁজার জন্য যেতে দিন। আমাকে এই অনুমতি দিলে আমার ধারণা আমি এবং জয়শীল সফল হব।'

জয়শীল কিছুটা অধৈর্য হয়েই যেন মাথা নেড়ে বলল ‘মহারাজ, আমার একটি নিবেদন আছে।'

‘বল, বল কী বলতে চাও। আমি তােমার কথা শুনতে চাই।' রাজা কনকাক্ষ বললেন।

‘মহারাজ, আমি আমার নিজের দেশ ছেড়ে আপনার দেশে এসেছি, একটি চাকরি পাওয়ার আশায়। চাকরিটা পেলেই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতাম।' জয়শীল বলল।

কনকাক্ষ মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কী যেন চোখে চোখে বললেন। মন্ত্রী জয়শীলকে বলল, 'যে মুহূর্তে তুমি বাঘের মােকাবিলা করেছ সেই মুহূর্ত থেকেই আমার রাজা তােমাকে চাকরি দিয়েছেন। নিদের্শমতাে কাজ করা কি তার অধীনস্থ কর্মচারীর কর্তব্য নয়? যেকোনাে কর্মচারীর ধর্ম তাে এই, তাই না?’

‘শুধু ধর্মই নয়, নীতিও। বলুন, কী করতে পারি?’ জয়শীল বলল।

‘রাজার নির্দেশ, যুবরাজ ও রাজকুমারীকে খুঁজে, তাদের উদ্ধার করে তুমি নিয়ে এসাে।? মন্ত্রী বলল।

জয়শীল মাথা নেড়ে সম্মত হল। তারপর কী যেন বলতে যাবে এমন সময় রাজার একজন অনুচর একটি মুক্তোর হার ও ভাঙা তরবারি এনে বলল, 'মহারাজ, এগুলাে মনে হচ্ছে যুবরাজ ও রাজকুমারীর। একটা গাছের নীচে একজন ব্যাধ অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার কাছেই পেলাম।

পাঁচ

কনকাক্ষ মহারাজ ও মন্ত্রী ধর্মমিত্র অনুচরের আনা ওই মুক্তোর হার দেখে অবাক হয়ে গেলেন। মন্ত্রী মুক্তোর হার নেড়েচেড়ে পরীক্ষা করে দেখে বলল, 'মহারাজ, এই হার কি যুবরাজের হতে পারে? এই ধরনের তরবারি কি যুবরাজের কাছে ছিল ?’

কনকাক্ষ রাজা ওই দুটিকে বার বার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে মন্ত্রীকে বললেন, ‘সন্দেহ যে আমার মনেও জাগছে না তা নয়। এই দুটো ঠিক এক জায়গায় পড়ে থাকাতে সন্দেহ জাগছে বই কী। মনে হচ্ছে এগুলাে ওদেরই। তবে নিঃসন্দেহে এ-কথা বলতে পারছি না।'

'তাহলে এ দুটো ভালাে করে পরীক্ষা করিয়ে দেখতে হবে মহারাজ। রাজকুমারীর প্রধান পরিচারিকা মল্লিকা হয়তাে এই হার দেখে চিনতে পারবে। হারের ব্যাপারটা ঠিক বােঝা গেলে তরবারি যে কার বুঝতে দেরি হবে না।' বলল মন্ত্রী।

রাজার নির্দেশে একজন অনুচর তৎক্ষণাৎ চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মল্লিকাকে নিয়ে সে ফিরে এল। রাজকুমারী হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে মল্লিকার দুঃখের আর সীমা ছিল না। তার মনে ভেঙে গিয়েছিল। শরীরও ভাঙছিল। কোথায় যে সেই হার পাওয়া গেছে তা না জানিয়ে রাজা সেটিকে মল্লিকার হাতে দিয়ে বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে, এই হার কেউ ভুলে ফেলে গেছে। এটা নিয়ে যাও। খোঁজ করে দেখ এটা কার। খোঁজ পেলে যার হবে তাকে দিয়ে দাও।'

মল্লিকা ওই হার হাতে নিয়ে প্রতিটি মুক্তো পরীক্ষা করে দেখতে দেখতে একটি মুক্তো দেখে চমকে উঠে আতনাদ করে ওঠে, 'মহারাজ এই হার রাজকুমারীর। উদ্যানে বেড়াতে যাওয়ার সময় এই হার পরে বেড়ানাে রাজকুমারীর শখ ছিল। শেষ যখন তাঁকে দেখেছি তখন তার গলায় এই হার ছিল।'

মল্লিকার কথা শুনে রাজার মন কেঁদে উঠল। কী যেন বলতে গিয়েও তিনি আর বলতে পারছিলেন না।

এই অবস্থায় মন্ত্রী ধর্মমিত্র মল্লিকাকে বলল, 'এই ধরনের হার ধনী পরিবারের মেয়েরাও তাে পরে, এটা যে রাজকুমারীর তা তুমি জানলে কী করে?’

মল্লিকা মন্ত্রীর কাছে এসে ওই হারের দুটো মুক্তো দেখিয়ে বলল, 'এই দুটো মুক্তো ভেঙে গেছে। একবার রাজকুমারী আমার উপর ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। কেন তা জানি না। রাগের মাথায় উনি এই হার আমার দিকে ছুঁড়ে মেরেছিলেন। আমি ঝট করে সরে গিয়েছিলাম। হার লেগেছিল একটি গাছে। তারপর থেকে এই দুটো মুক্তোতে এই ধরনের দাগ হয়ে যায়। রাজকুমারী ভেবেছিলেন, রাজস্বর্ণকারকে দিয়ে এই দুটো মুক্ত সরিয়ে ভালাে দুটো মুক্তো হারে লাগিয়ে নেবেন। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না।'

মল্লিকার জবাব শুনে রাজা ও মন্ত্রীর বিশ্বাস হল যে ওই হার রাজকুমারীর ছাড়া অন্য কারাের নয়। তারপর প্রশ্ন ওঠে তরবারিটি সম্পর্কে। সেটি যে যুবরাজ কাঞ্চনবর্মারই, সে ব্যাপারে কারও মনে সন্দেহ জাগেনি। তবে তরবারিটি যে কী করে ভাঙল, এই প্রশ্ন সকলের মনেই জেগেছিল।

কনকাক্ষ রাজা তরবারিটিকে জয়শীলের হাতে দিয়ে বললেন, ‘জয়শীল এই ভাঙা তরবারি দেখে অনুমান করতে পার যে এটা কী করে ভেঙেছে?'

জয়শীল ভাঙা তরবারিটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখে বলল, 'মহারাজ, মনে হচ্ছে যুবরাজ কারও বিরুদ্ধে লড়বার সময় অথবা ধস্তাধস্তি করার সময় এটি ভেঙে গেছে। তবে তরবারিটি যে শত্রুর দেহে ঢুকে ভেঙেছে তা নয়, পাথরে আঘাত পেয়ে হয়তাে ভেঙে গেছে। গাছে লেগেও ভেঙে যেতে পারে।'

'তাহলে তাে ভাঙা তরবারির অন্য অংশ ধারে কাছে কোথাও পড়ে থাকবে। ভালাে। কথা, সেই ব্যাধ কোথায়?’ বলে রাজা এগুলি যে এনেছিল তার দিকে তাকালেন।

অনুচর এগিয়ে এসে মন্ত্রীকে বলল, 'আজ্ঞে, ব্যাধ ঠিক সুস্থ অবস্থায় নেই। মাঝে মাঝে ভুল বকছে। ওর চাউনি দেখে মনে হচ্ছে পাগল। কখনাে কখনাে চিৎকার করে বলছে, দু-পা ওয়ালা ভয়ংকর জীব। মনে হচ্ছে ভূত চেপেছে। ওর বন্ধুরা ওঝা ডেকে ভূত ছাড়াচ্ছে। তরবারি ও হার দেখে মনে হল এগুলাে যুবরাজ ও রাজকুমারীর। তাই আমি নিয়ে চলে এলাম।'

কথাগুলাে শুনে সিদ্ধ সাধক বলল, 'মহারাজ, মহাকালের পরিবারের কয়েকটি পিশাচ এক-এক সময় এক-একটা রূপ ধরে বেরিয়ে পড়ে। আমি ওই ব্যাধের মাথায় যে ভূত চেপেছে সেই ভূতকে তাড়াতে পারি। ব্যাধ সুস্থ হলে ঠিক জানা যাবে যে সে কোত্থেকে এগুলাে পেল। এখন আমাকে আর জয়শীলকে ওই ব্যাধের কাছে যাওয়ার অনুমতি দিন।'

যুবরাজ ও রাজকুমারী উধাও হওয়ার পেছনে এই ব্যাধের কি কোনাে কারসাজি আছে? মন্ত্রীর মনে এই প্রশ্ন জাগল। কনকাক্ষ রাজার মনেও যে নানা প্রশ্ন জাগেনি তা নয়। রাজা ও মন্ত্রী, কী করা যায় তা নিয়ে আলােচনা করছিলেন। কিছুক্ষণ পরে জয়শীল বলল, 'মহারাজ, কোন গাছের নীচে এগুলি পাওয়া গেছে, আগে সেখানে যাওয়া দরকার মনে করছি। ব্যাধের মাথায় ঠিক কোনসময় থেকে ভূত চাপল তাও সেখানে গিয়ে জানতে হবে। এখান থেকে সব জানা যাবে না মহারাজ।'

রাজা ও মন্ত্রী জয়শীল ও সিদ্ধ সাধককে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। ওদের যাওয়ার জন্য ঘােড়া তৈরি ছিল। ওরা ঘােড়ায় চড়ে রওনা দিল। ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল সেই অনুচর যে মুক্তোর হার ও তরবারি এনেছিল। গভীর বনে ওরা ঢুকল। বন থেকে অরণ্যে। সেই অরণ্যের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি পাহাড়।

একটি বিরাট গাছের নীচে দশ-বারাে জন ব্যাধ বসেছিল। ওরা সেই ভূতে পাওয়া ব্যাধকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। ওঝা তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, আগুনে কী যেন ছড়াচ্ছে, ধোঁয়া উঠছে তার এক হাতে লাঠি অন্য হাতে ঝাঁটা । মাঝে মাঝে লাফাতে লাফাতে সে বলছে, 'হুম, হট হট, ফট ফট।'

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক একটু দূরেই ঘােড়া থেকে নেমে গেল। সিদ্ধ সাধক চিৎকার করে বলল, 'থামুন!’

ওঝা সাধকের দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁক কটমট করে কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় রাজার অনুচর তাকে বলল, 'ওহে, ওভাবে কার দিকে তাকাচ্ছ ? জানাে, ইনি রাজপ্রাসাদের তান্ত্রিক।'

অনুচরের কথা শুনে ওঝা একটু দমে গেল। সাধকের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাতে লাগল। সাধক এক-পা এক-পা করে এগিয়ে গিয়ে ওঝার কাছে গিয়ে বলল, 'কি হে, ওঝাগিরি করছ? উহু, ভূত তাড়াচ্ছ? আমার মন্ত্রশক্তি বলে তােমাকে এই কড়ে আঙুলের ডগায় নাচাতে পারি জানাে।’ বলার সময় সিদ্ধ সাধকের চোখ লাল হয়ে উঠেছিল। মুহূর্তে ওঝা কেমন যেন হয়ে গেল। 'আমাকে ক্ষমা করুন,’ বলে সে সাধকের পায়ে পড়ে গেল। সাধক পা দিয়ে তাকে সরিয়ে ওই ভূতে পাওয়া ব্যাধের কাছে। গেল। তাকে বলল, 'কী হে, ভীম, তােমাকে যে জীব ভয় পাইয়ে দিয়েছে তাকে এই যুবক জয়শীল মেরে ফেলেছে। এখন আর তােমার কোনাে ভয় নেই, ওঠো, দাঁড়াও।'

ওই ব্যাধ সাধকের কথা শুনতে শুনতে দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সেখানে যারা ছিল তাদের একজন সাধককে বলল, ‘এর নাম ভীম নয়, রাম।'

এই মুহূর্ত থেকে এর নাম হবে ভীম। আমার মুখ থেকে যা বেরােবে তাই হবে। জয়শীল, যে জীবটিকে তুমি মেরেছ তার রক্ত তােমার তরবারিতে লেগে আছে। সেটি দেখাও।' বলতে বলতে জয়শীলের তরবারি তার খাপ থেকে বের করে তার ডগায় লেগে থাকা লাল রং আঙুলে তুলে ভীমের কপালে সে লাগিয়ে দিল।

তা দেখে অবাক হয়ে ব্যাধ বলল ‘তাহলে ভয়ংকর ওই জীবটিকে মেরে ফেলা হয়েছে? ওই মৃতদেহটি কোথায়?’ এতক্ষণ জয়শীল কোনাে কথা বলেনি। সব কিছু লক্ষ করছিল। সাধকের কথা শুনছিল। সাধক যেভাবে ব্যাপারটাকে কচলাচ্ছে তাতে যেকোনাে মুহূর্তে অবস্থা অন্যদিকে ঘুরে যেতে পারে। তখন আবার তাকেই শক্ত হাতে তরবারি ধরতে হবে।

‘ওরে বােকা ব্যাধ, ভূতের মৃতদেহ কী আর থাকে? তুই যেটাকে ভয়ংকর জীব বলছিস সেটি সত্যিকারের ভয়ংকর জীব নয়। প্রকাণ্ড একটি ভূত। ওকে শেষ করা হয়েছে। তাের আর কোনাে ভয় নেই। এখন বল, এই হার, তরবারি কোথায় পেলি? ওই ভয়ংকর জীবকে দেখলি কোথায়।'

ব্যাধের ভয় তখনও কাটেনি। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে সিদ্ধ সাধককে বলল, 'এগুলাে বােধ হয় ওই ভূতের কাছেই পেয়েছি। ওই ভূতটাই ওগুলাে নিয়ে গেছে। এগুলাের জন্যই কি ওকে মেরে ফেলা হয়েছে?’

তাখন রাজার অনুচর বলল, 'ওরে পাগল, এগুলাে ভূত নিয়ে যায়নি।

আমি নিয়ে গিয়েছিলাম। এগুলাে আমি যখন তােমার কাছে নিচ্ছিলাম তখন তুমি আমার দিকে পাগলের মতাে তাকাচ্ছিলে। মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছিলে। তােমার হয়তাে এসব কিছুই মনে নেই। বিশ্বাস না হয় তােমার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করাে।'

এই কথা শুনে ব্যাধের কাছে যারা দাঁড়িয়েছিল তারা বলল, ‘রাজার লােক ঠিক কথাই বলছে। তােমার মাথায় ভূত চেপেছিল।'

আপনজনের মুখে যা শুনল তাতে রামের ভয় কেটে গেল। সে বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে রাজকুমার ও রাজকুমারীকে ওই ভূত তুলে নিয়ে গেছে। ও ছাড়া আর কেউ এই কাজ করতে পারে না।'

এই ধরনের কথাবার্তা শুনে জয়শীল অধৈর্য হয়ে সিদ্ধ সাধককে বলল, 'সাধক অহেতুক আমরা সময় নষ্ট করছি। আমাদের মনে রাখা উচিত আমরা এখানে কেন এসেছি। রাজকুমার ও রাজকুমারীকে কারা নিয়ে গেছে তা আমাদের খোঁজ করাই প্রধান কাজ। আগে কাজ শুরু করতে হবে, তারপর সময় থাকলে এদের সঙ্গে আলাপ করা যাবে। এখন চল আর এখানে সময় নষ্ট করা উচিত নয়।'

‘ওহে ভীম, ঠিক করে মনে করে দেখ তাে, তুমি এসব কোথায় পেলে? ঠিক কোন জায়গায় পড়েছিল বল তাে।'

ব্যাধ একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে বলতে আরম্ভ করল, ‘অন্যদিনের মতাে সেদিনও অন্ধকারে শিকার করতে বেরিয়েছিলাম। মনে হল, ওই গাছের ডালে একজোড়া বনমুরগি বসে আছে। আমি তির ছুঁড়লাম। তিরটি ওর বুকে বিদ্ধ হয়ে ডানায় বিদ্ধ হল। সে ওই তিরবিদ্ধ ডানা নিয়ে উড়তে গেল। উড়তে না পেরে সে ওই ঝােপের মধ্যে পড়ে গেল।'

‘ওই ঝােপ মানে? কোন ঝােপ? চল তাে দেখি।' জয়শীল বলল।

ব্যাধ কাছের একটি ঝােপের কাছে নিয়ে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে জয়শীল ব্যাধকে জিজ্ঞেস করল, 'এখানেই ?’ ব্যাধ মাথা নেড়ে বলল, 'আজ্ঞে হ্যাঁ।'

হঠাৎ ঝােপের ভেতর ঢুকে সিদ্ধ সাধক চিৎকার করে উঠল ‘জয়শীল, এই গভীর অরণ্যে ঢােকা আমার সার্থক হয়েছে। এই দেখ, তালপাতার পুঁথি। জয়, মহাকাল!’ সে বেরিয়ে এল।

ছয়

সিদ্ধ সাধক তালপাতার পুঁথি হাতে পেয়ে খুব খুশি হল। ওইরকম একটা জায়গায় ওই পুঁথি পেয়ে জয়শীল অবাক হয়ে গেল। সিদ্ধ সাধকের খুশি খুশি ভাব বেশিক্ষণ রইল না। পুঁথির দু-একটা পাতা ওলটাতেই তার সেই খুশিভাব উবে গেল। সেই পুঁথির লেখা দেখে সিদ্ধ সাধক বলল, 'এটা কোন ভাষা? এটা কোন লােকের অধিবাসীদের ভাষা? কিছুই বােঝা যাচ্ছে না। এখন মনে হচ্ছে এগুলাে ঠিক তালপাতা নয়। পদ্মপাতার মতাে কি যেন একটা পাতা। পাতাগুলাে যত্ন করে কাটা হয়েছে। প্রত্যেকটা পাতার মাপ সমান।

‘সাধক, কোন পাতা সেটা বড়াে কথা নয়। যা লেখা আছে তা কি পড়া যাচ্ছে?’ জয়শীল জিজ্ঞেস করল।

সিদ্ধ সাধক মাথা নেড়ে বলল, 'এটা কোনাে দেবভাষা। অথবা রাক্ষসদের ভাষাও হতে পারে। ওদের সাহায্য ছাড়া এটা তাে পড়া যাবে না। কনকাক্ষ রাজার অধীনে যেসব পণ্ডিতরা আছে তাদের মধ্যে কেউ এই ভাষা জানে কি না খোঁজ নিয়ে দেখলে হত। অনেক রাজার অধীনে বিভিন্ন বিষয়ের পণ্ডিত থাকেন।

সাধকের হাত থেকে পুঁথিটা নিয়ে জয়শীল নেড়েচেড়ে দেখে বলল, 'আচ্ছা, ব্যাধ যে বিচিত্র দু-পা ওয়ালা জীবের কথা বলছিল এটা হয়তাে সেই-ই ফেলে গেছে। কিন্তু আমরা তাে যাচ্ছি যুবরাজ ও রাজকুমারীর খোঁজ করতে। এই পুঁথির ভাষা উদ্ধার করলে আমাদের কাজের কি কোনাে সাহায্য হবে? কী হবে এটা?' বলে সে ওই পুঁথি ঝােপে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল।

ফেলে দিতে দেখে সিদ্ধ সাধক হা-হা করে উঠে বলল, 'এ কী করলে জয়শীল? কী আছে তা না জেনে ফেলে দেওয়া কি উচিত? হয়তাে এটা ধরেই মহাকালের বংশ পরিচয় জানা যাবে। কে বলতে পারে, এই পুঁথির সূত্র ধরে যুবরাজ ও রাজকুমারীর সন্ধান করতে হয়তাে পারব।' বলে ছুটে গিয়ে সাধক ঝােপ থেকে ওই পুঁথি কুড়িয়ে আনল।

জয়শীল রেগে গিয়ে সাধককে বলল, 'তােমার আসল উদ্দেশ্য হল মহাকালের বংশপরিচয় জানা। বনে-জঙ্গলে পড়ে থাকা পুঁথির প্রতি তােমার টান দেখে আমি অবাক হচ্ছি। যুবরাজ বা রাজকুমারীর ব্যাপারটা তােমার কাছে গৌণ। তাই না?’

এই প্রশ্ন শুনে সাধক কিছুটা দমে গিয়ে বলল, 'জয়শীল, আমি এই ভীমের মাধ্যমে ঠিক জানতে পারব ওই দু-পা ওয়ালা জন্তুটাই যুবরাজ ও রাজকুমারীকে নিয়ে গেছে।'

‘দু-পা ওয়ালা জন্তু বলতে যে মাথা-মুণ্ডু কি বােঝ আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না।' জয়শীল বেশ রেগে গিয়েই তাকে বলল।

সাধক ভীমের কাঁধে হাত রেখে বলল ‘শােনাে হে যুবক, তােমার কোনাে ভয় নেই। ওই যে জন্তুটা এসেছিল না, ও তােমাকে কী বলেছিল? ওই দু-পা ওয়ালা জন্তুটাকে তুমি কতদূর থেকে দেখেছ? তােমার কাছে এসেছিল কি? তােমার ঠিক মনে পড়ছে সব কিছু? জন্তুটা কোন ভাষায় কথা বলেছিল?’

ভীম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে সাধককে বলল, 'এর কথা বলা পর্যন্ত কি আমার জ্ঞান ছিল! মুরগিটাকে ঝােপ থেকে তােলার জন্য আমি একটা টান দিয়েছিলাম ঠিক সেইসময় একটা শব্দ হল। মুখ ঘােরাতেই চোখে পড়ল বিরাট দু-পা ওয়ালা জন্তু। মানুষের মতাে পা, কিন্তু দেহটা জন্তুর মতাে। ওকে দেখেই আমি জ্ঞান হারিয়েছি। তারপর যে কী হল তা কিছুই জানি না।'

'তুমি যে বুনাে মুরগিটাকে মেরেছিলে, কখন মেরেছিলে? কীভাবে মেরেছিলে? সেটা কোথায় গেল?’ জয়শীল বলল।

‘ওই মুরগিটাকে হয়তাে পাহাড় দেবতা নিয়ে গেছে। জানি তাে পাহাড় দেবতার কয়েকটা বিশেষ দিক আছে। সব কাজ ঠিক ঠিক ভাবে ঠিক সময়ে না হলে উনি ভীষণ চটে যান। সাতসকালে মুরগিটাকে মেরে এ খুব খারাপ কাজ করেছে। সেইজন্যই হয়তাে পাহাড় দেবতা এর উপর রুষ্ট হয়েছে।' ওঝা বলল।

ওঝার মুখ থেকে এই কথা শুনে জয়শীল তার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে সাধককে বলল, 'মনে হচ্ছে এখানে দাঁড়িয়ে আর কিছু হবে না। এমন কোনাে খবর নেই যে কনকাক্ষ রাজার কাছে গিয়ে আমরা বলতে পারি। তার চেয়ে এই অঞ্চলের আশেপাশে পাহাড়ের এধার-ওধার ঘুরে কিছু দেখলে হত। পাঁচ-সাত দিন এখানে ঘুরলে হয়তাে কোনাে কিছুর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।'

'মন্দ বলনি জয়শীল। আশেপাশে ঘুরলে হয়তাে কাজের কাজ কিছু হতে পারে।'

সাধক বলতে বলতে পুঁথির পাতা ওলটাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে বলল, ‘বুঝলে জয়শীল, এই পুঁথিটা যে ফেলে গেছে সেই যদি যুবরাজ ও রাজকুমারীকে নিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে সে নিশ্চয়ই রাক্ষস। অথবা দেবতা। কোনাে রকমে এই পুঁথির ভাষা যদি পড়া যেত! কিছুতেই বুঝতে পারছি না এতে কী লেখা আছে।'

‘সাধক এ-কথা তাে শুনেছি একবার। যেই হােক আমার এই তরবারি এবং কবজির জোরে আমি তাদের পরাজিত করে যুবরাজ এবং রাজকুমারীকে উদ্ধার করব। আমি কনকাক্ষ মহারাজের মুখে হাসি ফোটাবই।' জয়শীল বলল।

ওদের কথা শুনে রাজকর্মচারী জিজ্ঞেস করল, 'তাহলে আমি এখন ফিরে গিয়ে রাজাকে কী বলব।'

জয়শীল কী একটা বলতে যাবে এমন সময় তাকে বাধা দিয়ে সাধক বলল, ‘শােনাে, রাজাকে বলবে যে জায়গায় ভাঙা তরবারি ও মুক্তোর মালা পড়েছিল সেই জায়গায় একটা মহামূল্যবান পুঁথি পাওয়া গেছে। আর বলবে আমরা কিছুদিনের মধ্যেই যুবরাজ ও রাজকুমারীকে যেকোনাে ভাবে উদ্ধার করে ফিরছি।'

তার কথা শুনে জয়শীল মনে মনে হাসল।

তারপর দু-জনে আরও গভীর বনে ঢুকে গেল। ইতিমধ্যে অরণ্য প্রান্তের গ্রামের মানুষ ওদের খবর পেয়ে আতঙ্ক ও আশঙ্কায় নানারকম কথা বলাবলি করছিল। গ্রামবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার আর একটি কারণ হল খেতে পাহারা দেবার সময় একটি চোদ্দো বছরের ছেলে দূর থেকে একটি হাতিকে যেতে দেখল। সে পাহারা দিচ্ছিল ভুট্টার খেত। ভুট্টার খেতে হাতি ঢুকলে কিছুক্ষণের মধ্যেই খেত পরিষ্কার করে চলে যাবে।

ছেলেটির বয়স চোদ্দো হলেও তার সাহস ছিল। মাচায় বসে হাতিকে দেখে প্রাণের ভয় না করে মাচা থেকে নেমে সে গ্রামের মানুষকে ডাকতে গেল সে বুঝেছিল তার একার পক্ষে হাতিকে তাড়ানাে সম্ভব নয়। আবার সে ভাবল, গ্রামবাসীদের ডেকে আনার আগে দু-একটা পাথর হাতির দিকে ছুঁড়ে মারলে কেমন হয়। হয়তাে হাতি ভয় পেয়ে অরণ্যে ঢুকে যাবে।

এই কথা ভেবে সে খুব জোরে একটি পাথর হাতির দিকে ছুড়ল। পাথরটা সােজা গিয়ে হাতির গায়ে লাগল। সঙ্গেসঙ্গে এক বিচিত্র ঘটনা ঘটে গেল। একটি চেহারা হাতির পিঠে হঠাৎ যেন গজিয়ে উঠল। সে চিৎকার করে বলল, ‘পাথরটা কে ছুঁড়েছে রে? আমাকে এখনও চিনতে পারিসনি?'

এতক্ষণ সে যেটাকে হাতি ভেবেছিল কাছে আসতে দেখল সেটা হাতি নয়। ভয়ংকর জীব।

তারপর সে কী হুংকার। ছেলেটি ওই হুংকার শুনে ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। তার হাত-পা অবশ হয়ে গেল। সে আর নড়তে পারল না। সেখানেই পড়ে রইল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতিটি মাচার কাছাকাছি এল। তখন হাতিটিকে হাতির মতাে লাগছিল না। তার গােটা শরীর যেন ঢাকা ছিল বড়াে বড়াে মাছের আঁশে। সেই হাতির উপর যে বসেছিল তার মাথাটা দেখে মনে হচ্ছিল কুমিরের মাথা। তার গায়ের চামড়া ছিল কুমিরের চামড়া।

এই অদ্ভুত ধরনের জীবটিকে দেখে চোদ্দো বছরের ওই চাষির ছেলেটি ভয়ে কাঠ হয়ে রইল। তার দিকে তাকিয়ে ওই জীবটি বলল, 'শােন রে ছেলে, তুই অত ভয় পাচ্ছিস কেন। তাের কোনাে ভয় নেই। তুই সােজা গ্রামে যা। আমার জন্য খাবার নিয়ে আয়। আর শােন, যদি ভালাে বৈদ্য থাকে নিয়ে আয়। শল্য চিকিৎসক হলে আরও ভালাে হয়। একটা তরবারির টুকরাে শরীরে গেঁথে গেছে। সেটিকে টেনে বের করে প্রাণে বাঁচাতে হবে। যা বলছি তাই কর।'

চাষির ছেলে ভয়ে কাঁপতে লাগল। তার কথা শুনে, গ্রামের দিকে যাওয়ার শক্তি তার ছিল না। তার ওই অবস্থা দেখে সেই বিচিত্র চেহারার জীব ছেলেটিকে ধরে তুলে আবার মাটিতে দাঁড় করিয়ে দিল। তখন যেন ছেলেটি অনেক শক্তি পেল। সে এক নিশ্বাসে ছুটে গ্রামের ভেতরে ঢুকে গেল।

গ্রামের মুখে একটি গাছের নীচে বসে কয়েক জন গল্প করছিল। তাকে ওইভাবে ছুটে আসতে দেখে ওরা জিজ্ঞেস করল, 'কী রে খােকা, অত ছুটছিস কেন? কী হয়েছে?’

ছেলেটি থেমে হাঁপাতে হাঁপাতে যা যা ঘটেছিল বলল। ওখানে যারা ছিল তারা কেউ এর কথা বিশ্বাস করল না। দু-একজন ভাবল ছেলেটির মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ঠিক সেইসময় গ্রামের মােড়ল ওইদিক দিয়ে যাচ্ছিল। সে ছেলেটির কথা শুনে বলল, 'এরকম হতে পারে। আমি নিজে কত রকমের হাতি দেখেছি। শুধু হাতি নয়, দুটো মাথার সিংহও দেখেছি। তােমরা হয়তাে বিশ্বাস করবে না আমি আমার জীবনে দশটি মাথার মানুষও দেখেছি।'

‘সে না-হয় দেখেছেন। কিন্তু এখন কী করা যায়? এমনও তাে হতে পারে ওই বিচিত্র জীবটি আমাদের সবাইকে শেষ করে ফেলার জন্য এগিয়ে আসছে। তা ছাড়া হাতি যদি একবার ভুট্টার খেতে ঢােকে তাহলে কী আর রক্ষে থাকবে?’ ওদের মধ্যে একজন বলল।

'হাতির পিঠে বসে, আমাদের এদিকে এসে ডেকে, আনতে বলছে কাকে?

না শল্য চিকিৎসককে। তাহলে নিশ্চয় ব্যাপারটা সহজ নয়। ভাঙা তরবারি তার দেহে গেঁথে আছে। বিচিত্র জীব যদি হয়ে থাকে তাহলে সে থাকে কোথায়? কার শরীরে ভাঙা তরবারি ঢুকে গেঁথে আছে। এসব কিছু ভাববার কথা।' অন্য একজন বলল।

ইতিমধ্যে সেখানে হাজির হল ওই গ্রামের এক বৈদ্য। নাম চরকাচারি।

ওদের কথাবার্তা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শুনে তার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। এমন সময় কয়েক জন তাকে বলল, 'এই যে চরকাচারি মশাই, এতদিনে বােধ হয় একটা ভালাে মওকা পেয়েছেন। যান চিকিৎসা করে আসুন। মােটামুটি কিছু হবে।'

‘তােমাদের কি মাথা খারাপ হয়েছে। মানুষের চিকিৎসা করতে পারি বলে কি রাক্ষসের চিকিৎসাও করতে হবে? তা ছাড়া যা শুনলাম তাতে তাে মনে হচ্ছে এটা ওই শল্য চিকিৎসকের কাজ। কাটাকুটি করে আমাদের গ্রামের নাপিত বীরনারায়ণের খুব নামডাক হয়েছে। ও যদি কাটাকুটি করে ভাঙা তরবারি বের করতে পারে তখন না হয় আমি ওষুধ দিয়ে চেষ্টা করে দেখতে পারি কিন্তু কাটাকুটি করতে তাে পারব না।'

তৎক্ষণাৎ দু-জন লােক ছুটে গিয়ে বীরনারায়ণকে ডেকে আনল। সে ওদের কথা শুনে আর্তনাদ করে বলল, 'তােমরা কি আমাকে মেরে ফেলতে চাও? ওই রাক্ষসের শরীর থেকে কাটাকুটি করে আমি ভাঙা তরবারি বের করব? আমার কি এতটা শক্তি আছে?’

‘থাক বা না থাক সেসব বিচার পরে হবে। আগে তােমার কাটাকুটি করার অস্ত্রগুলাে নিয়ে এগিয়ে চল। আমাদের যেতে দেরি হলে ওইদিকে ভুট্টার খেত পরিষ্কার হয়ে যাবে। চল আর দেরি নয়।' বলল গ্রামের মােড়ল।

গ্রামের লােকগুলাে লাঠি, বল্লম, তরবারি নিয়ে ওইহাতি যেখানে ছিল সেদিকে দল বেঁধে এগিয়ে আসতে লাগল। ওদের ওই অবস্থায় আসতে দেখে ওই বিচিত্র জীবটি হাতিকে খোঁচা মারল হাতি হনহন করে ওই গ্রামবাসীদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

সাত

হাতির পিঠে না-মানুষ না-কুমির গােছের ওই বিচিত্র লােকটিকে দেখে গ্রামের লােক ভীষণ ভয় পেল। কিছুক্ষণ এরা থমকে দাঁড়াল। ওদের পা চলছিল না। জীবনে এই প্রথম এই ধরনের ভয়ংকর প্রাণী দেখে ওরা ঠিক করতে পারল না পালাবে না আক্রমণ করবে। এমন সময় সেই ভয়ংকর লােকটা বলে উঠল, 'তােমাদের মধ্যে যে পালাবে তার ক্ষতি করব। যে দাঁড়িয়ে থাকবে তাকে কিছু করব না।

তার কথা শুনে গ্রামবাসীরা অবাক হল। ওদের ভয় একটু কমল। যতই ভয়ংকর দেখাক, কথা শুনে মনে হল, হাতির পিঠে যে আছে সে মানুষ ছাড়া অন্য কোনাে জীব নয়।

ওরা এই ধরনের কথা ভাবছিল। হাতির পিঠে বসা লােকটা বলল, 'তােমাদের মধ্যে বড়াে কে? তােমরা কাকে মানাে? ওই মাচার উপর যে ছিল সে কী তােমাদের গ্রামের ছেলে? ওকে বলেছিলাম আমার জন্য ভালাে কিছু খাবার আনতে। একজন বৈদ্যকেও আনতে বলেছিলাম। কিন্তু তােমাদের দেখে মনে হচ্ছে তােমরা আমাকে আক্রমণ করতে আসছ। তা না হলে তােমাদের হাতে লাঠি সড়কি থাকবে কেন?’

ওর কথা শুনে গ্রাম প্রধানের মন থেকে ভয় টা কেটে গেল। সে ভাবল, দেখতে ভয়ংকর হলেও আচার আচরণে, কথাবার্তায় লােকটা আমাদেরই মতাে মানুষ। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারপর সে ওই লােকটাকে জোড়হাত করে, নমস্কার করে, এগিয়ে হাতির কাছে দাঁড়িয়ে বলল, 'আজ্ঞে কুমির মশাই, ক্ষমা করুন। আপনাকে যে কী নামে ডাকব ভেবে পাচ্ছি না। যাই হােক যে ছেলেটির কথা আপনি জিজ্ঞেস করছেন সেই ছেলেটি আমাদেরই গ্রামের ছেলে। আপনি ওকে যে কথা বলেছেন সেই সেই কথা আমাদের জানিয়েছে। কিন্তু তার মুখে শুনলাম, বিরাট হাতি, বিচিত্র ভয়ংকর লােক আমাদের গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। এই কথা শুনে আমরা ভয়ে, আতঙ্কে কী করব কিছুই ভেবে পাইনি। নানা কথা ভেবেছি। আমরা ভেবেছিলাম এই অরণ্যে কত রকমের ভয়ংকর জীব আছে। তাই আমরা ভয় পেয়ে আমাদের ফসল রক্ষা করার জন্য লাঠি সড়কি নিয়ে ছুটতে ছুটতে এসেছি। আপনি তাে জানেন অনেক সময় হাতিও দল বেঁধে এসে সমস্ত ফসল নষ্ট করে দিয়ে চলে যায়।'

হাতির পিঠে বসে থাকা লােকটা হাতির মাথায় চাপড় মেরে, মাথা উঁচু করে চিৎকার করে বলল, ‘ওরে এই গ্রাম প্রধান, তুমি অনেকক্ষণ ধরে অনেক কথা বলছ। কিন্তু এখনও আমার প্রশ্নের জবাব আমি পাইনি। আমি জানতে চেয়েছি, আমি যে খাবার ও বৈদ্যকে চেয়েছিলাম তার ব্যবস্থা কী হল? আমার প্রশ্নের সরাসরি জবাব চাই।'

ওর রাগ দেখে গ্রাম প্রধান একটু পেছিয়ে বলল, 'আজ্ঞে আপনি যা চেয়েছেন তার ব্যবস্থা হচ্ছে।'

হাতির পিঠের লােকটা নিজের শরীরের ভেতরে যে অর্ধেক তরবারি ঢুকেছিল সেটির দিকে একবার তাকিয়ে কিছুক্ষণ কষ্ট এবং যন্ত্রণা পাওয়ার মতাে মুখভঙ্গি করে গ্রামবাসীদের দিকে ফিরে বলল, 'কোথায় বৈদ্য ?’

গ্রাম প্রধান চতুর ছিল। সে হাতের লাঠি তৎক্ষণাৎ পেছনের দিকে তুলে বলল, 'ওরে, এই তােদের মধ্যে দু-একজন ছুটে গ্রামে যা। তাড়াতাড়ি খাবারটা আনবি। আর আমাদের চরকাচারি কোথায়? বীরনারায়ণ কোথায় মরতে গেল?’

গ্রাম প্রধানের কথা শেষ হতে-না-হতেই ওরা চরকাচারি ও বীরনারায়ণকে সামনের দিকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে এল। গ্রাম প্রধান ওদের দুজনের হাত ধরে টানতে টানতে হাতির কাছে এনে বলল, 'কুমির মশাই, এই যে আমাদের বৈদ্য। এরাই আমাদের চিকিৎসা করে থাকে। এই দুজনের খুব হাতযশ আছে। যেকোনাে রােগ এরা সারিয়ে তুলতে পারে।'

হাতির পিঠে বসে থাকা লােকটা ওদের দুজনের দিকে তাকাল। এতক্ষণ যে শিরস্ত্রাণ দিয়ে তার মাথাটা ঢাকা ছিল সেটি পেছনের দিকে টেনে নিল। তার মুখটা গ্রামবাসী দেখতে পেল।

‘আরে এ তাে সাধারণ মানুষ! এ তাে অন্য কোনাে জীব নয়। দেখে তাে মনে হচ্ছে কোনাে এক রাজপরিবারের ছেলে।' শল্য চিকিৎসক বীরনারায়ণ চরকাচারিকে বিড়বিড় করে বলল।

'রাক্ষস এবং দেবতারা মুহূর্তের মধ্যে যেকোনাে রূপ ধারণ করতে পারে। দেবতাই হােক আর রাক্ষসই হােক আমি চিকিৎসা করব।' চরকাচারি বলল।

গ্রাম প্রধান ওদের কথা শুনে বুঝল যে ওদের মনে আর কোনাে ভয় নেই। তখন সে নিজে পেছিয়ে গেল। দু-জন বৈদ্য এগিয়ে হাতির কাছে দাঁড়াল। চরকাচারি মাথা তুলে জিজ্ঞেস করল, 'আপনার কীসের কষ্ট? কী হচ্ছে জানান। না জানালে চিকিৎসা হয় না।'

হাতির পিঠের লােকটা বিরক্ত হয়ে রেগে গিয়ে বলল, 'তােমরা কি চোখের মাথা খেয়েছ? ছেলেটাকে আমি কী বলেছিলাম? দেখতে পাচ্ছ না তরবারিটা কীভাবে ভেঙে ভেতরে ঢুকে আছে। এটাকে টেনে বের কর।' চরকাচারি চট করে পেছনের দিকে সরে গিয়ে বলল, 'তাহলে আপনার কোনাে ভয় নেই। আমাদের এই বীরনারায়ণ শ্যল চিকিৎসায় অদ্বিতীয়। অতি সহজেই বীরনারায়ণ আপনার শরীর থেকে ওই ভাঙা তরবারি টেনে বের করতে পারবে। ঘা যাতে চট করে শুকিয়ে যায় তারজন্য যে গাছের পাতার রস লাগে তা জোগাড় করতে আমি যাচ্ছি।' সে বলে চলে গেল।

তারপর হাতির পিঠের লােকটা হাত বাড়াল। তার হাত ধরে বীরনারায়ণ হাতির পিঠে উঠল। ভালাে করে পরীক্ষা করে সে বলল, 'ভাঙা তরবারিটা দেখে মনে হচ্ছে, সাধারণ তরবারি এটা নয়। কোনাে রাজাবাদশার তরবারি হতে পারে।'

বিরক্ত হয়ে লােকটা বলল, 'হতে পারে নয়, যা ভাবছ তাই। এই তরবারি কার জানাে? এটা যুবরাজের তরবারি। রাজার একমাত্র ছেলের তরবারি। নেহাত এই কুমিরের চামড়া ছিল তাই, তা না হলে এতক্ষণে মরে যেতাম।'

এই কথা শুনে বীরনারায়ণের মনে পড়ে গেল, তার রাজার ছেলে এবং মেয়ের হারিয়ে যাওয়ার কথা। ওদের দুজনকে কারা যেন জোর করে নিয়ে গেছে। বীরনারায়ণ ভাবল, 'ইচ্ছে করলে আমি তরবারিটাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে লােকটাকে মেরে ফেলতে পারি। কিন্তু একে মেরে ফেললে কে বা কারা রাজার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে গেছে তা জানা যাবে না। তার চেয়ে একে জ্যান্ত রেখে কোনােরকমে রাজার হাতে তুলে দিতে পারলে হয়তাে একদিন রাজকুমার এবং রাজকুমারীর সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। এই কথা ভাবতে ভাবতে বীরনারায়ণ ছােটোখাটো যন্ত্রপাতি যা এনেছিল সেগুলাে বের করে সে বলল, ‘আমি এখন প্রস্তুত। কিন্তু প্রস্তুত হলেও এক্ষুনি ভাঙা তরবারিটা টেনে বের করতে পারছি না। কারণ এটা বের করার সঙ্গেসঙ্গে রক্ত ছুটবে। সেই রক্ত বন্ধ করতে না পারলে আপনার বাঁচার কোনাে আশা নেই।' এই কথা বলে বীরনারায়ণ গ্রাম প্রধানকে জোরে জোরে বলল, 'তরবারিটা বের করার পর একে কয়েক দিন বিশ্রাম নিতে হবে।'

বীরনারায়ণের কথা শেষ হতে-না-হতে হাতির পিঠের লােকটা তাকে বলল, 'নেহাত কষ্ট পাচ্ছি তাই। তা না হলে এতক্ষণে বুঝিয়ে দিতাম আমি কে? আমি তােমাকে যা বলেছি তার একটি কথাও যেন গ্রাম প্রধানের কানে না যায়। গেলে এইভাবে তােমার গলা ধরে টিপে শেষ করে ফেলব। বুঝেছ?’

‘ক্ষমা করুন, আমাকে মেরে ফেলবেন না। আপনি হয়তাে আমার রাজার সমপর্যায়ের কেউ। আপনার সাথে হয়তাে বিরােধ চলছে। আপনাদের বিরােধের মধ্যে আমি নাক গলাতে চাই না। আপনি একটু দাঁতে দাঁত চেপে থাকুন, আমি ছােরাটা বের করছি।' বীরনারায়ণ বলল।

এই কথাটা বলে তরবারিটা টানতে যাবে এমন সময় চরকাচারির চিৎকার শােনা গেল। সঙ্গেসঙ্গে দু-তিনটি হাতির ডাকও শােনা গেল।

হাতির ডাক এবং চরকাচারির আর্তনাদ শুনে হাতির পিঠের লােকটা সেদিকে তাকাল। কেউ কিছু বুঝতে পারল না। সবাই থতমত খেয়ে গেল। গােটা পরিবেশ মুহূর্তে কেমন হয়ে গেল।

গ্রামবাসীরা সবাই ভয়ে কাঁপতে লাগল। ওরা বাঘ, ভাল্লুক বা সিংহের চেয়ে হাতির দল এগিয়ে এলে ভয় পায়। হাতি দল বেঁধে গ্রামে যখন ঢােকে তখন সব কিছু তছনছ করে দেয়। ঘরবাড়ি গাছপালা কিছুই রাখে না।

গ্রাম প্রধান হাতির পিঠের লােকটার কাছে এসে বলল, 'চরকাচারি একবার মাত্র আর্তনাদ করে থেমে গেল। মনে হয় হাতিগুলাে একে মাড়িয়ে এগিয়ে আসছে। এখন এখান থেকে সরে যাওয়া ভালাে।

‘খুব ভালাে বলেছ! তাহলে আমার চিকিৎসার কী হবে? আর কতকাল এই ভাঙা তরবারিটা, এই বিষের ফলা শরীরের ভেতরে নিয়ে ঘুরে বেড়াব?’ বলল হাতির পিঠের লােকটা।

কয়েকটা হাতির ডাক শুনে বীরনারায়ণ ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল। সে বলল, 'সত্য কথা বলতে কী আমি ভয়ে কাঁপছি। যতক্ষণ না আমার ভয় কাটছে ততক্ষণ আমার শরীর কাপবে। কাঁপতে কাঁপতে আমি তােমার শরীর থেকে ভাঙা তরবারিটা টেনে বের করব কী করে?’

চরকাচারি চিৎকার করল ‘বাঁচান।' আতঙ্কে চেঁচিয়ে হাঁপাতে লাগল।

পরিষ্কার বােঝা গেল বহু বুনাে হাতি একসঙ্গে এগিয়ে আসছে। সব কিছু ভেঙে, মাড়িয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে। এসব কিছু বুঝে গ্রাম প্রধান হাতের লাঠিটা ঘােরাতে ঘােরাতে গ্রামবাসীদের বলল, 'ওহে, আর এক মুহূর্ত এখানে নয়। যে যেদিকে পার ছুটে পালাও।'

চোখের পলকে গ্রামবাসীরা যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। হাতির পিঠে লােকটা চট করে মাথায় শিরস্ত্রাণ পরে বীরনারায়ণকে বগলদাবা করে শূল দিয়ে হাতির মাথায় মারল। হাতি হনহন করে এগিয়ে যেতে লাগল। বীরনারায়ণ চরকাচারির চেয়ে জোরে চিৎকার করতে লাগল, 'আমাকে বাঁচাও। আমাকে বাঁচাও। আমি মরে গেলাম! আমি মরে যাচ্ছি! বাঁচাও!’

আট

হাতির পিঠের লােকটা বুঝতে পারল বুনাে হাতিগুলাে তার দিকে এগিয়ে আসছে। ছােটো-বড়াে মিলে পাঁচ-সাতটা হাতি আছে। সে মনে মনে ভাবল, ওই হাতিগুলাে কোনােদিন তার হাতিটাকে দেখেনি। হাতিটা অন্যভাবে সাজানাে আছে। এই হাতিকে দেখে যদি ওই হাতিগুলাে ভয় পায় তাহলে ভালােই হয়। তার হাতে অস্ত্র বলতে এক বল্লম আছে। এই দুটিকে ভয় পেয়ে বুনাে হাতিগুলাে কি ফিরে যাবে? অথবা এমনও হতে পারে একটি হাতিকে আক্রমণ করল অন্য হাতি বনে পালাতে পারে। আর যদি তৎক্ষণাৎ অন্য হাতি তাকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসে তাহলে বাঁচার কোনাে উপায় নেই।

এসব কথা ভাবতে ভাবতে হাতির পিঠে বসা লােকটা নিজের হাতিকে নাম ধরে ডেকে বলল, ‘জলগ্রহ, ওই সামনে যে হাতিটা তেড়ে আসছে সেটিকে তুমি গুতিয়ে শেষ করে ফেল।'

বলার সঙ্গে সঙ্গে জলগ্রহ হনহন করে এগিয়ে ওই বুনাে হাতিদের একটিকে গুতিয়ে দিল। সেই গুঁতাে খেয়ে বুনাে হাতিটি সেখানেই পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে আর একটা হাতির দিকে বল্লম ছুঁড়ে মারল কুমির রূপধারী লােকটা। বল্লমের আঘাত খেয়ে হাতিটা মাটিতে পড়ে গেল। তাকে মাড়িয়ে জলগ্রহ এগিয়ে আর একটা হাতিকে আক্রমণ করল। এইভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনটে হাতি আহত হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। অন্য হাতিগুলাে পালাতে শুরু করল। কুমির রূপধারী লােকটা ওই হাতিগুলােকে ধাওয়া করতে করতে বল্লম দিয়ে যত বার পারল তত বার আঘাত করতে লাগল। আঘাতের পর আঘাত খেয়ে ওই হাতিগুলাে কিছুক্ষণের মধ্যে অরণ্যের গভীরে পালিয়ে গেল। তারপর লােকটা জলগ্রহকে থামাল। তখন তার মনে পড়ল বীরনারায়ণের কথা। সে ভাবল, 'এই গােলমালের মধ্যে বীরনারায়ণ কোথায় গেল? কোনাে হাতির চাপে পড়ে মরে যায়নি তাে? সে যদি মরে যায় তাহলে তাে সর্বনাশ। ভাঙা তরবারিটা আজীবন আমার শরীরের মধ্যেই থেকে যাবে। ওটা বের না করলে আমি হয়তাে বাঁচতেই পারব না। সে চারদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘বীরনারায়ণ, তুমি কোথায়?’

সঙ্গেসঙ্গে তার পেছনের দিক থেকে আওয়াজ এল, 'এই যে কুমিরমশাই, আমি এখানে। এতক্ষণ আমি আপনার লেজ ধরে ঝুলছিলাম। ভয়ে এখনও আমার চোখ বােজা আছে। কে জিতেছে, বুনাে হাতি না আপনি?’

পিছনের দিকে তাকিয়ে কুমির রূপধারী লােকটা কিছু বলল না।

বীরনারায়ণ হাতির দল আসার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে যে কীভাবে বাঁচাবে ভেবে পাচ্ছিল না। প্রথমে ভেবেছিল জলগ্রহ হাতির পেছন দিক থেকে নেমে পালিয়ে যাবে। কিন্তু তা করল না। কারণ পরক্ষণেই তার ভয় হল।

সে ভাবল, ‘নেমে গেলে হাতির পায়ের তলায় পড়তে পারি। হাতির নীচে পড়লে প্রাণে বাঁচার কোনাে উপায় নেই। তখন এমন অবস্থা যে লেজ বেয়ে আবার উপরে উঠে এসে জলগ্রহের পিঠে যে বসবে তার সে সাহসও ছিল না। বুনাে হাতিগুলাে যদি কুমিররূপী লােকটাকে ফেলে দেয় তাহলে তাকেও ফেলে দেবে। আর একবার ফেলে দিলে বাঁচার উপায় নেই!’

কুমিররূপী লােকটা বলল, 'তাহলে তুমি আমার কাছেই আছ? তুমি পালানাের চেষ্টা করনি? না পালিয়ে ভালাে করেছ। পালাতে গেলে মরেই যেতে। এখন আমার এই ভাঙা তরবারিটা বের কর। আর কতদিন তরবারির বিষ নিয়ে ঘুরে বেড়াব?’

‘হাতি মারার গােলমালের মধ্যে আপনি হয়তাে আসল কথা ভুলে গেছেন। চরকাচারি আর্তনাদ করছিল মনে আছে? লতাপাতা আনতে গিয়েছিল। কারণ ভাঙা তরবারি টেনে বের করার সঙ্গেসঙ্গে রক্ত ছুটবে। সঙ্গেসঙ্গে লতাপাতার রস না লাগালে রক্ত আর থামবে না।' বীরনারায়ণ বলল।

এই কথা শুনে কুমির লােকটা চমকে উঠে বলল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়ছে। বাঁচান বাঁচান’ আর্তনাদের পর আর তাে কোনাে সাড়াশব্দ পেলাম না। আচ্ছা, চরকাচারি যদি মরে গিয়ে থাকে তাহলে আমার এই ভাঙা তরবারি বের করা। যাবে না। কোন পাতার রস লাগাতে হয় তুমি জানাে না?’

এই প্রশ্ন শুনে বীরনারায়ণ একগাল হেসে বলল, 'জানব না কেন। গ্রামে আমরা দু-জন বৈদ্য আছি। প্রত্যেকটা রােগ সারানাের ব্যাপারে আমরা এই কৌশল করে থাকি। যেকোনাে রােগ সারানাের জন্য লােকে আমাদের দুজনকেই ডাকতে বাধ্য হয়।'

কুমির লােকটা শুনে হাে-হাে করে হাসল। কিন্তু পরক্ষণেই ভীষণ ব্যাথা পাওয়ার মতাে ‘আঃ, করে উঠে বলল, 'ওহে, তুমি আর কতক্ষণ আমার লেজ ধরে ঝুলবে? আমার কাছে এসাে।

বীরনারায়ণের ভয় তখনও যেন কাটল না। সে ভয়ে ভয়ে এল। তার কাছে এখন সব কিছুই বিস্ময়ের বস্তু। জলগ্রহ হাতিটি একা দুটো হাতিকে মেরে ফেলল। একটা হাতি আর একটা হাতিকে গুতিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এই হাতি দুটো হাতিকে প্রায় মেরে ফেলেছে। অন্যগুলােকে মারতে মারতে ভাগিয়ে দিয়েছে। একটা হাতি এতগুলাে হাতিকে জব্দ করতে পারল কী করে?

এসব কথা সে যখন ভাবছিল, তখন কুমির লােকটি বলল, 'ওহে নারায়ণ, ওভাবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকো না। তাড়াতাড়ি এই তরবারিটা বের কর। তা না হলে…'

'কুমিরমশাই, ওটা বের করলে সত্যি রক্ত ছুটবে। ওই লতাপাত ছাড়া আমি ওটা বের করার সাহস পাচ্ছি না।' বীরনারায়ণ বলল।

‘আমি মরে গেলে তুমিও মরবে। কোনােক্রমেই এখান থেকে বেঁচে পালাতে পারবে না। ঠিক আছে। চল এখন আমার সঙ্গে। চরকাচারি কোথায় পড়ে আছে এখন খুঁজে বের করতে হবে। ওকে যদি কোনাে বাঘ অথবা সিংহ খেয়ে থাকে তাহলে অন্তত হাড়গুলাে পড়ে থাকবে।' বলল কুমির লােকটা।

তারপর সে জলগ্রহকে খোঁচা মেরে এগিয়ে যেতে বলল। যেদিক থেকে চরকাচারির আর্তনাদ শােনা গিয়েছিল সেদিকেই সে এগিয়ে গেল।

চরকাচারি বেঁচেছিল বটে তবে সে যেন মরে বেঁচে ছিল। সে গাছ খুঁজতে খুঁজতে একটি গাছের কাছে দাঁড়িয়ে আপন মনে বলছিল, 'বাঃ এই গাছটাকে আমি কতদিন ধরে খুঁজেছি। পাইনি। এটা নিয়ে গেলে গ্রামপ্রধানের বাতের রােগ সারানাে যাবে।' এই কথা বলতে বলতে সে গাছের পাতা ছিড়তে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার নজরে পড়ল এক বিরাট অজগর গাছের ডালে জড়িয়ে ঝুলছে। তাকে দেখে মনে হল কয়েক দিন তার পেটে কিছু পড়েনি। বড়াে কিছু ধরে খেলে তার পেট ভরবে। চরকাচারিকে দেখে অজগরটি আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। হঠাৎ গাছের বিরাট ডাল পড়ে যাওয়ার মতাে তার ঘাড়ে অজগর পড়ে গেল। সে নিজেকে ছাড়িয়ে ছুটে পালাবে ঠিক করল। কিন্তু তার হাত-পা অবশ হয়ে গিয়েছিল। হাত-পা অবশ হলেও তার অজান্তেই তার মুখ থেকে 'বাঁচান, বাঁচান’ আর্তনাদ বেরুল।

তার সেই আর্তনাদ গ্রামবাসী, বীরনারায়ণ, কুমির লােকটা এবং জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক শুনেছিল। জয়শীল ও সিদ্ধসাধক তখন লতাপাতার পুঁথির বিষয় ভাবছিল।

জয়শীল ও সিদ্ধসাধক ‘বাঁচান বাঁচান’ আর্তনাদ শুনতে পেলেও, কে যে আর্তনাদ করছে তা তারা বুঝতে পারল না। তবে যেদিক থেকে আর্তনাদ আসছিল সেদিকে তারা এগিয়ে গেল। এগিয়ে দেখল কয়েকটা হাতি ছুটে পালাচ্ছে। তারপরেই ওরা দেখতে পেল কুমির লােকটাকে এগিয়ে আসতে।

সিদ্ধ সাধক ওই পুঁথি উপরের দিকে তুলে ধেই ধেই করে নেচে বলল,'জয়শীল পেয়ে গেছি! আমাদের কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়েকে ওই দুরাত্মা ছাড়া আর কেউ নিয়ে যায়নি। ঠিক এই হবে। লােকটা যক্ষ গন্ধর্ব অথবা কিন্নর হবে।'

'তুমি যা বলছ তা নাও হতে পারে। তবে সে যে আমাদের মতাে মানুষ নয় তা বােঝা যাচ্ছে। আর ও যে হাতির উপর বসে আছে সেই হাতিটা দেখ, আমি অন্তত এই ধরনের হাতি দেখিনি।' জয়শীল বলল।

আবার শােনা গেল চরকাচারির আর্তনাদ। জয়শীল তৎক্ষণাৎ তরবারি বের করে সেইদিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, 'ভয় নেই, আসছি।'

সিদ্ধ সাধক অবাক হয়ে বলল, ‘জয়শীল, কী করছ? যুবরাজ ও রাজকুমারীকে যে অপহরণ করেছে তাকে হাতের কাছে পেয়েও ছেড়ে দেবে। কোথায় ছুটে যাচ্ছ?’

'তাকে বাঁচাতেই হবে। এই মুহূর্তে যে ‘বাঁচান বাঁচান’ বলে আর্তনাদ করছে তাকে বাঁচানাে আমার কর্তব্য। রাজকুমার ও রাজকুমারী এতদিন যদি বেঁচে থাকে তবে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবে। ভয় নেই।' বলে জয়শীল যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেদিকে ছুটে গেল। তার পেছনে ছুটল সিদ্ধ সাধক।

ওরা দুজনে চরকাচারির কাছে পৌছে দেখতে পেল অজগর চরকাচারির গােটা শরীর গ্রাস করতে যাচ্ছে।

খাপ খােলা তরবারি জয়শীল অজগরের মুখের কাছে ধরল। ধরতেই অজগল ফেঁস করে সেই তরবারির মুখে ছােবল মারল। তার মুখে তরবারি ঢুকে গেল।

‘জয়শীল, এই লােকাট ব্যাধ নয়। দেখে মনে হচ্ছে পণ্ডিত। অজগরটাকে মেরে ফেল। বলল সিদ্ধ সাধক। জয়শীল অজগরের মাথাটাকে ধরে নিজের দিকে টানল। পরক্ষণেই কেটে ফেলল তার মাথা। দূর থেকেই অজগরটাকে মেরে ফেলতে পারত। কিন্তু তার ভয় হল তরবারি চালানাের সময় যদি এদিক-ওদিক কিছু হয়ে যায়, তাহলে সেই আঘাত পড়বে চরকাচারির গায়ে।

মুণ্ডু কেটে ফেলার সঙ্গেসঙ্গে অজগরের গােটা শরীর ভীষণভাবে লাফাতে লাগল। চরকাচারির শরীর মুক্ত হল। চরকাচারিকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে জয়শীল সিদ্ধ সাধককে বলল, 'সাধক, ছুটে গিয়ে জল নিয়ে এসাে। মনে হচ্ছে লােকটা বেঁচে আছে।'

সিদ্ধ সাধক ছুটে গিয়ে কমণ্ডলু করে জল আনল। ভালােভাবে জলের ছিটে দেওয়ার পর চোখ তুলে চরকাচারি বলল, 'আমি কোথা? অজগরটি কি আমাকে এখনও জড়িয়ে আছে?'

'তুমি ভালােভাবেই বেঁচে আছ। আগে এই মন্ত্রজল পান কর। এই জল খেলে তােমার মন থেকে ভয় ভীতি কেটে যাবে।' বলল সিদ্ধ সাধক। তারপর তাকে জল খেতে দিল।

জল খেয়ে এদিক-ওদিক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে চরকাচারি বলল, ‘কে আপনারা? কুমীর লােকটা কোথায় ? বীরনারায়ণের কী অবস্থা হয়েছে?’

তার প্রশ্ন শুনে জয়শীল বুঝতে পারল চরকাচারি কার কথা জিজ্ঞেস করছে। সে সিদ্ধ সাধককে বলল, ‘সাধক, এ কি বলছে বুঝতে পারছ? এই কুমির লােকটা তােমার বন্ধু না শত্রু?’

ইতিমধ্যে ওই কুমির লােকটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল, 'এর নাম চরকাচারি। এ আমার নিজের বৈদ্য। কে তােমরা? সত্যি কথা না বললে এই জলগ্রহ হাতি তােমাদের মাড়িয়ে মেরে ফেলবে। তাড়াতাড়ি বল, কে তােমরা?’

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক দৃঢ়ভাবে দাঁড়াল। জয়শীল তরবারিটাকে শক্ত করে ধরল। যেকোনাে বিপদের মােকাবিলার জন্য সিদ্ধ সাধক শক্তহাতে নিজের মন্ত্রদণ্ড ধরে রইল।

নয়

জয়শীল ও সিদ্ধসাধক নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। পালানাের কোনাে প্রশ্নই ওদের মনে ছিল না। ওরা ভাবছিল কীভাবে আক্রমণ করবে। ওদের হাবভাব দেখে কুমির লােকটা চমকে উঠেছিল। সে ভেবেছিল, তার ওই কুমিরের মুখােশ দেখে ওরা ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু তা হল না ওরা অটল, অনড়।

কুমির লােকটা বল্লম তুলে বড়াে গলায় বলল, 'কে তােমরা? এই ভয়ংকর অরণ্যপ্রান্তে কেন এসেছে?’ সে এমনভাবে গর্জন করে প্রশ্ন করল যাতে সিদ্ধ সাধক ও জয়শীল ভয় পায়।

জয়শীল তৎক্ষণাৎ খাপ থেকে তরবারি টেনে বের করে বলল, ‘কুমিরের চামড়া গায়ে দিয়েছ কেন? মুখােশ? ওই চামড়া দিয়ে সব কিছু ঢাকা যায়? আমরা এখানে কেন এসেছি জানাব। কিন্তু তুমি কে? প্রশ্ন করার আগে নিজের পরিচয় দিতে হয়। একই প্রশ্ন তাে আমি তােমাকে করতে পারি। ভয়ংকর অরণ্যে জেনে-শুনে তুমি এখানে আছ কেন? তুমি যে হাতির পিঠে চেপে বসে আছ সেটাকেও বেশ সাজিয়েছ দেখছি। ওইসব দিয়ে কি হাতি ঢাকা পড়বে? এত মুখােশ, এত অভিনয় কীসের জন্য?’

‘ছি, এই তুচ্ছ মানুষের সঙ্গে কথা বলে কী হবে? ফিরে যাই নিজের ডেরায়।' বলে নিজের হাতিকে কুমির লােকটা বলল, 'জলগ্রহ, এবার চল ফিরে যাই।' এতক্ষণ কুমির লােকটার লেজ ধরে ঝুলছিল বীরনারায়ণ। সে কুমির লােকটার হাত ধরে মিনতি করে বলল, 'একটা কথা কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন। আপনার ভালাের জন্যেই বলছি। আপনার শরীরে যে ভাঙা তরবারিটা ঢুকে আছে সেটা কি আপনি বের করতে চান না? ওই দু-জনের খপ্পরে চরকাচারি আছে। আমার মনে হয়, এখন আপনার ওই দু-জনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা উচিত। চরকাচারিকে না পেলে ভাঙা তরবারিটা বের করা যাবে না। আর ওটা বের করার আগে কারও সঙ্গে বিরােধ করা আপনার উচিত নয়। চরকাচারি আপনার জন্য লতাপাতা আনতে গিয়েই হয়তাে ওদের খপ্পরে পড়ে গেছে। আপনার প্রধান কর্তব্য হল ওদের হাত থেকে এখন কৌশলে চরকাচারিকে উদ্ধার করা।'

বীরনারায়ণের কথা শুনে কুমির লােকটা তীক্ষ দৃষ্টিতে চরকাচারির দিকে একবার তাকাল। চরকাচারি উঠে দাঁড়িয়ে কী যেন ঠোট নেড়ে বিড়বিড় করে বলছিল। তার পাশেই পড়েছিল মণ্ডুকাটা অবস্থায় একটা বুনাে পাখি। পাখিটার দেহ ছটফট করছিল। এসব দেখে কুমির লােকটা কী যেন ভেবে নিয়ে বলল, ‘চরকাচারি, আমার জন্য তুমি বিপদে পড়ে গেলে? তুমি বললে হাতিকে গিলে ফেলার মতাে বড়াে বড়াে বুনাে পাখি এই বল্লম দিয়ে মেরে তােমার কাছে এনে ফেলতাম।'

চরকাচারি তৎক্ষণাৎ, 'কুমিরমশাই' বলে চিৎকার করে কী যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল। শেষে তর্জনী দিয়ে সিদ্ধ সাধক ও জয়শীলকে দেখাতে দেখাতে কাশতে লাগল।

কুমির লােকটা রক্তচক্ষু করে জয়শীল ও সিদ্ধ সাধকের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তােমরা এখনও এখানে আছ? হুঁ! ভালাে চাও তাে আমার নাগালের বাইরে চলে যাও। তা যদি না যাও তাহলে তােমাদের চরম পরিণতি হবে। তােমরা আমাকে দেখে যা ভাবছ আমি তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিমান! যা বলছি তােমাদের মঙ্গলের জন্যই বলছি, যাও, চলে যাও!’

সঙ্গেসঙ্গে জয়শীল তরবারি হাতে নিয়ে তার দিকে এক-পা এগিয়ে এল। তাকে এগিয়ে আসতে দেখেই বীরনারায়ণ একটু জোরে জয়শীলকে বলল, 'এই যে তরবারিধারী, একটু দাঁড়ান। এই কমির ভদ্রলােককে তরবারি দিয়ে আক্রমণ করা মস্তবড়াে অপরাধ হবে। এই বেচারির পেটে কত বড়াে তরবারি ঢুকে গেছে। দেখুন। এরকম একটা অসহায় লােককে তরবারি দিয়ে আক্রমণ করলে মহা অপরাধ হবে! এর পেট থেকে ভাঙা তরবারি বের না করলে বেচারা মরে যাবে!’

‘লােকটা খুব সুখে মরুক আমি তা চাই না। ওর পেটে ভাঙা তরবারির একটা অংশ আছে। অন্য অংশ কোথায় রয়েছে জানাে? অন্য অংশ রয়েছে কনকাক্ষ মহারাজের কাছে।' বলল জয়শীল।

ওর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে কুমির লােকটা বিরক্ত হয়ে বিকট গলায় বলল, 'তাহলে আমি যে কে তাও নিশ্চয় তুমি জানাে।'

‘জানি। তুমি সেই লােক যে আমাদের রাজকুমার ও রাজকুমারীকে অপহরণ করেছ। তােমার পেটে রয়েছে আমাদের যুবরাজের তরবারির ভাঙা অংশ।' জোরে জোরে জয়শীল বলল।

'তুমি যখন আমার সম্পর্কে এত কিছু জানাে তখন তােমাকে বাঁচিয়ে রাখা আমার পক্ষে নিরাপদ নয়।' বলে কুমির লােকটা হাতিকে খোঁচা দিল। জলগ্রহ হাতি জয়শীলের দিকে এগিয়ে এল। তৎক্ষণাৎ বীরনারায়ণ কুমির লােকটা যে হাতে বল্লম ধরেছিল সে হাতটা ধরে কাকুতিমিনতি করে বলল, ‘একী, এই অবস্থায় এত রাগ করলে চলে? এ যে রক্তারক্তি কাণ্ড হবে’ বলতে বলতে বল্লমটাকে শক্ত করে ধরে বীরনারায়ণ ধপাস করে নীচে পড়ে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে বিদ্যুদবেগে জয়শীল জলগ্রহের পেছন দিকে উঠে কুমির লােকটার গলা জাপটে ধরল। আর তখনই সিদ্ধ সাধক নীচে পড়ে থাকা বল্লমটাকে তুলে নিয়ে বলল, ‘জয় মহাকাল!’ মহা আনন্দে সে আবার জোরে জোরে বলল, ‘জয় মহাকাল!’

কুমির লােকটা থতমত খেয়ে গেল। চোখের পলকে সে তার বল্লম হারিয়েছে। শত্রুর হাতে সে ধরা পড়েছে। তার হাতে আর কোনাে হাতিয়ার নেই। জয়শীল তার গলার উপর তরবারি ধরে জিজ্ঞেস করল, 'তােমার নাম কী বল? আমি যা জিজ্ঞেস করছি বলতে হবে। তা না হলে তােমার মুণ্ডু কেটে ফেলব।'

কুমির লােকটা কিছুক্ষণ জয়শীলের দিকে তাকিয়ে বলল, 'ওহে মানুষ, তােমার সাহস দেখে আমি খুশি হয়েছি।'

সিদ্ধ সাধক হাে-হাে করে হেসে উঠে বলল, 'জয়শীলের সাহস দেখে খুশি হওয়ার তুমি কে হে? আসল বেশে থাকার তাে তােমার সাহস নেই। ভয়ে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছ। সাক্ষাৎ মহাকাল জয়শীলের উপর খুশি হয়ে তার। হাতে তরবারি তুলে দিয়েছেন। মহাকালের আশীর্বাদ পেয়েছেন জয়শীল।'

'কার কথা বলছ? মহাকাল আবার কে?’ অবাক হয়ে কুমির লােকটা সিদ্ধ সাধককে জিজ্ঞেস করল।

জয়শীল তার গলা ধরে জোরে নাড়িয়ে বলল, 'ওহে কুমির-চর্মধারী, ওসব গল্প বলতে তােমার কাছে কেউ আসেনি। ওসব কথা তােমাকে কেউ এখানে। বসে বলবে না। আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার জবাব দাও। তােমার নাম কী? প্রাণে যদি বাঁচতে চাও তবে আমার সঙ্গে হিরণ্যপুরের রাজার কাছে চল। রাজকুমার ও রাজকুমারীকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছ তা রাজাকে বল?’

‘আমার নাম মকরকেতু। রাজার ছেলে-মেয়েকে কোথায় রেখেছি তা জানানাের জন্য রাজার কাছে যাবার কী দরকার? তােমাকেই বলে দেব।' কুমির লােকটা তৎক্ষণাৎ বলল।

এত সহজে যে লােকটা রাজকুমার ও রাজকুমারীর ব্যাপার বলে দেবে তা জয়শীল ভাবতে পারেনি। তার মনে হল এত চট করে নত হওয়ার পেছনে কোনাে কারণ আছে। জয়শীল ভাবল, এই লােকটাকে যেকোনাে ভাবে রাজার কাছে নিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে ভালাে হবে। রাজা ও মন্ত্রী একে নানা ধরনের প্রশ্ন করে ঠিক করুক কী করবে না করবে।

এইভাবে ভেবে জয়শীল বলল, 'কেতু, তােমার শংকরজাতের হাতিটিকে ঘােরাও। হিরণ্যপুরের দিকে চল। পথে যদি কোনােরকম এদিক-ওদিক কর, পালানাের চেষ্টা কর তাহলে কিন্তু এক কোপে তােমার গলা কেটে ফেলব। কথাটা মনে রেখ।'

মকরকেতু কোনাে কথা না বলে জলগ্রহকে ঘােরাল। তখন সিদ্ধ সাধক হাতির কাছে এসে বলল, ‘জয়শীল আমাকে ধর। আমিও হাতির পিঠে উঠে বসব।'

জয়শীল সিদ্ধ সাধককে হাত বাড়িয়ে ধরে তুলল। হাততালি দিয়ে বীরনারায়ণ ও চরকাচারি বলল, 'শুনুন, শুনুন, কাছেই আমাদের গ্রাম। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথে নানা ধরনের বিপদ আছে। এই অরণ্যে হাতি বাঘ যখন-তখন যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের কথা একটু ভাবুন।'

‘তােমাদের কোনাে ভয় নেই। তােমরা এই পাজি লােকটার পেট থেকে তরবারি বের করার চেষ্টা করেছ বলেই এ আমাদের হাতে ধরা পড়েছে। অরণ্য পেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত এই হাতি আস্তে আস্তে এগােবে। তােমরা সঙ্গে সঙ্গে এসাে।' জয়শীল বলল।

ওরা হিরণ্যপুরের দিকে রওনা হল। কিছুক্ষণ চলার পর চরকাচারি গলা ঝেড়ে বলল, 'জয়শীলমশাই, আমাদের একটা আবেদন আছে।'

জয়শীল কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কীসের আবেদন?’

‘আমি আর বীরনারায়ণ সকাল থেকে এই কুমির লােকটার পেট থেকে তরবারি বের করার ব্যাপারে খুব ব্যস্ত ছিলাম। যত বড়াে ভাঙা তরবারি ওর পেটে ঢুকে আছে তা যদি অন্য কারুর পেটে থাকত তাহলে এতক্ষণে সে মরে যেত। কিন্তু এই লােকটা এমনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে যেন ওই তরবারি তার কাছে তরবারিই নয়, অলংকার। আর ওর নাড়ি দেখে মনে হল ও ঠিক মানুষ নয়। জলের জীব।' চরকাচারি বলল।

'তার মানে, তুমি বলতে চাও, এই লােকটা জলে ডাঙায় সমান দক্ষ। ঠিক আছে, কনকাক্ষ রাজার কাজ হয়ে গেলে তাকে বলব এই লােকটাকে আর এর হাতিকে তােমায় উপহার দিতে। তুমি নেবে তাে চরকাচারি?’ জয়শীল হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল।

ওদের কথাবার্তা শুনে মকরকেতু দাঁত কটমট করতে লাগল। ওর গলার উপর তরবারিটা ধরে জয়শীল বলল, 'শােন হে, তােমার চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমি একটা কিছু তাল করছ। সাবধান।'

সিদ্ধ সাধক হাসতে হাসতে বলল, ‘সত্যি, জয়শীল, সেদিন শ্মশানে ওর মুণ্ডুটাকে যেভাবে ফেলে দিলে তা দেখে আমি অবাক হয়েছি। কী অপূর্ব দৃশ্য! আজও আমার চোখের সামনে সেই দৃশ্য ভাসে!’

চরকাচারি ও বীরনারায়ণ একটু পেছনে পড়ে গিয়েছিল। বীরনারায়ণ বলল, 'কী হে চরকাচারি, আবেদন তােমার যে একেবারে উবে গেল।'

চরকাচারি জিভ কেটে বলল, 'এই যে জয়শীলমশাই, আমার আবেদন শােনা হল না? মানে পুরােটা শােনা হল না। বলছিলাম কী, ওই লােকটার ভাঙা তরবারি বের করার জন্য আমি আর বীরনারায়ণ সারাদিন খেটেছি। আমাদের অনেক পরিশ্রম হয়েছে। যতই হােক পরিশ্রমের একটা মূল্য আছে!’

ওর কথা শুনে জয়শীল মনে মনে হাসল। এমন সময় কাছের একটা গাছ থেকে একটি তির তীব্রবেগে এসে মকরকেতুর কাঁধে ঢুকে গেল। সে আর্তনাদ করে উঠল, 'জয়শীল, এ কিন্তু অন্যায় হচ্ছে। আমার কোনাে হাতিয়ার নেই আর এই সময় তুমি আমাকে মারছ?’

এই ঘটনায় জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক দু-জনেই অবাক হল। ওরা ভেবে পেল না কোত্থেকে তিরটা এল। জয়শীল চারদিকে ঘুরে ঘুরে গাছের ডালে ডালে খুঁজতে লাগল। গাছের আড়াল থেকে কে যেন হাে-হাে করে হেসে বলল, 'ওহে কুমিররূপী, আমি যে বুনাে মুরগিটাকে মেরেছিলাম সেটা কি তুমি নিয়ে যাচ্ছ? তুমি যে অন্য কোনাে জীব নও, তুমি যে মানুষ আমি তা জেনে গেছি। এতক্ষণ আমার তিরটা নিশ্চয়ই তােমার বুকে ঢুকে গেছে।'

ওই কথা শুনে সিদ্ধ সাধক ও জয়শীল বুঝতে পারল এ কার কণ্ঠস্বর। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধ সাধক মন্ত্রদণ্ড উপরে তুলে জোরে জোরে বলল, 'ওহে, শিকারি ভীম, চলে এসাে। আর তির ছুঁড়াে না। এবার তির ছুঁড়লে তােমাকেই মহাকালের প্রসাদ হতে হবে।'

‘কে হে? রাজার ওঝা নাকি?’ ভীম জিজ্ঞেস করল।

‘আমি ওঝা নই। সিদ্ধ সাধক, তান্ত্রিক। চুপচাপ গাছ থেকে নেমে চলে এসাে। নামলে আমি এই মন্ত্রদণ্ড বলে গাছটাকে পুড়িয়ে ফেলব।' সিদ্ধ সাধক বলল।

‘এ সেই শিকারি! মায়া সরােবরের লােক। দাঁড়াও এই মুহূর্তে আমি ওকে জলগ্রহ দিয়ে মাড়িয়ে শেষ করে ফেলছি।' বলে জলগ্রহকে ওই গাছের দিকে কুমির লােকটা হেঁকে নিয়ে গেল।

জয়শীলের কিছু করার আগেই জলগ্রহ হাতি সােজা গিয়ে ওই গাছে একটা ধাক্কা মারল। গাছের ডালে বসে থাকা ভীম মরে গেলাম! 'মরে গেলাম! বাঁচান। বাঁচান!' বলে হাত-পা ছুড়তে ছুড়তে আর্তনাদ করতে লাগল।

দশ

লােকটা ছিল ভিল। নাম ভীম। জলগ্রহ ওই গাছটাকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারল। গাছের সঙ্গে সঙ্গে ভীমও নীচে পড়ে গেল। জয়শীল মকরকেতুর কাঁধে হাত দিয়ে দু-বার ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, 'ওহে কুমিরের চামড়াধারী, কী আরম্ভ করেছ? আমার অনুমতি ছাড়া গাছটাকে ফেলে দিতে তুমি জলগ্রহকে বললে কেন?’

মকরকেতু তার বাঁ-কাঁধে যে তিরটা বিধেছিল তার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে কষ্টে বিড়বিড় করে বলল, 'জয়শীল, আমি ওই ভিলকে যদি নীচে না ফেলে দিতাম তাহলে সে এতক্ষণে আর একটা তির ছুঁড়ে আমার বুকে গেঁথে ফেলত। ওর হাতের তির সামনের দিক থেকে বিধে আমাকে এতক্ষণে মাটিতে ফেলে দিত। আমি যা বলছি তা তােমার বিশ্বাস হচ্ছে তাে।'

জয়শীলের মনে হল মকরকেতু যে কথা বলছে তা সত্য।

ইতিমধ্যে সিদ্ধ সাধক ওই লােকটার কাছে গেল। সে ঝােপে-ঝাডে পড়ে গিয়েছিল। গাছ থেকে পড়ার ফলে সে আহত হয়েছিল। তাকে তুলে দাঁড় করাতে করাতে সিদ্ধ সাধক বলল, 'ওহে, দাঁড়াও, দাঁড়িয়ে হাত-পা চালিয়ে দেখ কিছু ভেঙে-টেঙে গেছে কি না।' ভিল গা ঝেড়ে দাঁড়িয়ে বলল, 'শােনাে হে ভূতের ওঝা, আমার কোনাে চোটফোট লাগেনি। গরুড়পাখি যেভাবে গাছ থেকে ঝুলে নীচে নামে সেইভাবে নেমেছি। আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি ওই কুমির লােকটা আমার। তির বেঁধা সত্ত্বেও এখনও বেঁচে আছে। হাতি তাে নয় ওটা একটা পিশাচ। ওর মাথা আগে নাবিয়ে ফেলতে হবে। আর একটু সময় পেলে তির দিয়ে আমি ওই কুমির লােকটার কলিজা চিরে ফেলতাম।' বলে ধনুকে তির চড়াল।

সিদ্ধ সাধক ঝট করে তার হাত ধরে জলগ্রহের পিঠে বসে থাকা জয়শীলকে ডেকে বলল, ‘জয়শীল, এই ভিল তির ছুঁড়ে কুমির লােকটার বুক বিদ্ধ করতে চায়। তুমি কি একে তা করার অনুমতি দিচ্ছ?’

সেই প্রশ্ন শােনার সঙ্গে সঙ্গে জয়শীল জলগ্রহ থেকে নেমে ভিলের হাত ধরে বলল, 'কি হে, মাথা-টাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি হাতির উপর বসে আছি দেখেও তােমার তির ছোঁড়ার ইচ্ছা উবে যায়নি? তােমার তির যে ঠিক কুমির লােকটার বুকেই বিধবে তার কী মানে আছে? সেটা তাে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আমার গায়েও বিধতে পারে? আমাকে অকালে মারতে চাও?’

‘আমার তির লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। আপনি দেখতে চান? দেখুন। ওই কুমির লােকটার, যে কুমিরের চামড়া পরে আছে সেই কুমিরের দুটো চোখের মাঝখানে আমি তির মারছি।’ বলে ভিল ধনুকে তির চড়াল।

জয়শীল ঝট করে ধনুকটাকে ধরে টেনে দূরে ফেলে দিয়ে বলল, 'শােনাে, এখন ওই মকরকেত আমার অধীনে আছে। আমি ওকে রাজার কাছে নিয়ে যাচ্ছি। এই সময় তুমি যদি ওর কোনাে ক্ষতি কর তাহলে আমি কিন্তু তােমাকে ছাড়তে পারব না। প্রত্যেক দেশের কতকগুলাে নিয়ম থাকে। মকরকে এখন রাজার বন্দি। আমরা বন্দিকে নিয়ে যাচ্ছি। বন্দি পালালে দোষ চাপবে আমাদের উপর। বন্দি আহত হলে আমরা উদবিগ্ন হতে বাধ্য। আহত বন্দি পথে মরে গেলে কী অবস্থা হবে।'

'তাহলে আমার বুনাে মুরগির ব্যাপারটা কী হবে?’ তুমি জানাে ও আমার মুরগি চুরি করেছে।' ভিল খুব রেগে গিয়ে প্রশ্ন করল।

‘চোপ, আর কোনাে কথা আমি শুনতে চাই না। মুরগির ব্যাপারে তুমি যদি বিচার চাও তাে এসাে আমার সঙ্গে। রাজার কাছে অভিযােগ কর, উনিই বিচার করবেন।’ বলল সিদ্ধ সাধক। তারপর তার কাঁধে হাত দিয়ে সে তাকে সরিয়ে দিল।

ইতিমধ্যে সেখানে চরকাচারি ও বীরনারায়ণ পৌঁছে গেল। ওরা মকরকেতুর দিকে অবাক হয়ে তাকাল। চরকাচারি বলল, ‘এ কী! আগে পেটে ঢুকেছিল আধখানা তরবারি। এখন দেখছি কাধে একখানা তির বিধে আছে। কুমির লােকটার কপাল মন্দ।'

‘ছিঃ, এতগুলাে মানুষের হাতে লাঞ্ছিত অবহেলিত ও উপেক্ষিত হওয়ার চেয়ে আমার বল্লম দিয়ে নিজেকে নিজে শেষ করে ফেলা অনেক ভালাে।' বলে মকরকেতু এদিক-ওদিক ঘুরে বল্লমটাকে খুঁজতে লাগল।

সিদ্ধ সাধক নিজের হাতে ধরে থাকা বল্লম তুলে বলল, 'ওহে মকরকেতু তােমার বল্লম যে আমার হাতে অনেকক্ষণ ধরে আছে তা কি তুমি লক্ষ করনি?’ মকরকেতু হকচকিয়ে গিয়ে হতাশ হয়ে বলল, 'হায়, মায়া সরােবরেশ্বর, এখনও কি তুমি টের পাচ্ছ না এরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কি করতে চাইছে?

জয়শীল চরকাচারিকে কাছে ডেকে বলল, 'আচারি, এই মকরকেতুকে ঠিক। এইভাবে নিরাপদে হিরণ্যপুর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যাবে?’

‘আজ্ঞে জয়শীলমশাই, সেটা ঠিক হবে না। ওই ভাঙা তরবারি আর বিদ্ধ তির না বের করলে যেকোনাে মুহূর্তে সে মারা যেতে পারে। শেষে এর শব নিয়ে পৌঁছতে হবে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে বীরনারায়ণকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।' চরকাচারি বলল।

‘আচারি যা বলেছে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। এক্ষুনি একে আমদের গ্রামে। নিয়ে যাওয়া উচিত। সেখানে চিকিৎসার পরে দু-দিন বিশ্রাম সেরে রাজার কাছে নিয়ে গেলে বুদ্ধিমানের কাজ হত!' বিজ্ঞের মতাে বলল বীরনারায়ণ।

ওদের কথা শুনে জয়শীল ও সিদ্ধ সাধকের মনে হল ওদের কথাই ঠিক। মকরকেতুকে সুস্থ করে কনকাক্ষ মহারাজার কাছে নিয়ে গেল রাজার ছেলে-মেয়ের যে কোথায় আছে তা প্রশ্ন করে অবশ্যই জানা যাবে। তারপর যা করার রাজাই ভেবেচিন্তে করবেন।

তারপর আর দেরি না করে জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক জলগ্রহের উপর উঠে বসে মকরকেতুকে বলল, ‘কেতু, তােমার কোনাে ভয় নেই। কাছাকাছি যে গ্রাম আছে সেই গ্রামে নিয়ে গিয়ে তােমার দেহ থেকে ভাঙা তরবারি ও বিদ্ধ তির বের করা হবে। ওই ঘা গুলাে শুকিয়ে গেলে তােমাকে হিরণ্যপুরে নিয়ে যাওয়া হবে।'

মকরকেতু দুটো হাত উপরের দিকে তুলে বিড়বিড় করে বলল, ‘সবই, ওই মায়া সরােবরেশ্বরের দয়া। পথে আবার কোনাে ভিল হয়তাে আর একটা তির ছুঁড়ে আমার ডান কাঁধ বিঁধে ফেলবে। তখন কি আপনারা...’ ‘ওরকম কোনাে ভয়ের কারণ নেই। আমরা নজর রাখব। জলগ্রহকে এগােতে বল।' তারপর জলগ্রহ চলতে লাগল। চরকাচারি যেদিকে এগােতে বলল মকরকেতু জলগ্রহকে সেদিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। শেষে ওরা চরকাচারির গ্রামে পৌছাল। সেখানে পৌঁছে জয়শীল একটি বিষয়ে ভাবতে লাগল। মকরকেতুর মুখে সে দু-বার মায়া সরােবরেশ্বর শব্দটি শুনেছে। কেতু তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে জোরে জোরে বলেছে। একবার তার ইচ্ছা জাগল মায়া সরােবরেশ্বর কে তা জানার। কিন্তু পরে মনে হল কেতুকে এই প্রশ্ন করে কোনাে লাভ হবে না। সে তাে সত্য কথা বলবে না। তবে যেভাবে মকরকেতু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বার বার মায়া সরােবরেশ্বরকে ডাকছিল তাতে জয়শীলের মনে হল এই সরােবরেশ্বর নিশ্চয় কোনাে শক্তি। এই শক্তির পেছনে মায়া থাকতে পারে, মন্ত্র থাকতে পারে, তবে এটা ঠিক যে মায়া সরােবরেশ্বরের উপর মকরকেতুর বিশ্বাস আছে।

জয়শীল ভাবতে ভাবতে হঠাৎ লক্ষ করল কারা যেন আসছে। কান খাড়া করে শুনল দূর থেকে ঢােলক বাজার শব্দ। কিছুক্ষণের মধ্যে দশ-পনেরাে জন ভিল ঢােলক বাজাতে বাজাতে ওদের দিকে এগিয়ে এল। ওদের সঙ্গে ছিল একজন ওঝা। সে বলল, ‘বলি চাই, বলি। আমি হলাম ভিল মহাকালী। কুমির লােকটার গলা কেটে তার রক্তে পা ডােবাতে চাই। তােমরা যদি বাধা দাও আমি রেগে যাব। রেগে গিয়ে সমস্ত ভিলদের খেয়ে ফেলব। সব ধবংস করে ফেলব।' সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল।

হাতির পেছনে পেছনে আসছিল চরকাচারি, বীরনারায়ণ ও ভীম। ভীম তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বলল, 'মা, মাগাে, মা কালী!’ তারপর সে সিদ্ধ সাধককে বলল, ‘সাধক, এ হল আমাদের রাজার ওঝা। এর উপর এখন মা কালী ভর করেছে। মা র আমার কুমির লােকটার রক্ত চাই। কুমির লােকটাকে তাড়াতাড়ি নাবান। তারপর যা করার গণাচারি করে ফেলবে।'

জয়শীল বুঝল, ওঝাকে দেখে ভীম ঘাবড়ে গেছে। সে চোখের ইশারায় বীরনারায়ণকে কী যেন বলল। তৎক্ষণাৎ বীরনারায়ণ ভীমের কাছে যে অস্ত্র ছিল তা কেড়ে নিল। আর সেই মুহূর্তে জয়শীল মকরকেতুর কানে কানে কী যেন বলল ।

মকরকেতু হঠাৎ ভয় পেয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাতিকে বলল, 'জলগ্রহ, একে ধরে তুলে ফেল।'

জলগ্রহ ঝট করে ভীমের কোমরে শুঁড় জড়িয়ে ধরে ওপরের দিকে তুলে ফেলল। ভীম হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে আর্তনাদ করতে লাগল।

‘কেতু, এবার তুমি জলগ্রহটাকে ওই যারা বাজনা বাজিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে ওই দিকে নিয়ে যাও। তােমার কোনাে ভয় নেই, আমি আছি। আমার কথা না শুনলে আমি এবং সিদ্ধ সাধক তােমাকে শেষ করে ফেলব।' বলে জয়শীল ভীমকে উদ্দেশ্য করে বলল, 'শােনাে, ভীম, তােমার লােকজনকে ফিরে যেতে বল। ওরা যদি তির ছোঁড়ার চেষ্টা করে তুমি কিন্ত সঙ্গেসঙ্গে মারা পড়বে। ওরা আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করলে তােমাকে হাতির পায়ের নীচে ফেলা হবে। হাতি তােমাকে মাড়িয়ে শেষ করে ফেলবে। তারপর ওদের সবাইকে মেরে ফেলে আগুন ধরিয়ে দেব।'

'জয়শীল, তুমি এসব কী বলছ? স্বয়ং ভিল মা কালী কুমির লােকটার রক্ত চাইলে আমরা কি না দিয়ে পারি। তাতে মা কালী ভীষণ চটে যাবে। আমরা কি তাকে চটাতে পারি? আমাদের এই মা কালীর ক্ষমতা যে কত বেশি আমরা তার পরিচয় বহু বার পেয়েছি। এই কালী যখন যা চেয়েছে। আমরা তাকে তা দেওয়ার চেষ্টা করে এসেছি।' ভীম বলল।

‘দেখ ভীম আমার সঙ্গে তর্ক করাে না। এই মকরকেতু হল রাজার বন্দি। একে রক্ষা করার ভার আমার। এর যাতে কোনাে ক্ষতি না হয় সেদিকে আমাকে লক্ষ রাখতেই হবে। বুঝতে পেরেছ?’ ভীমের গায়ে তরবারি ঠেকিয়ে জয়শীল বলল।

‘ওহে জয়শীল, তরবারি সরাও। মা কালীর খাঁড়ার চেয়েও তােমার তরবারিতে বেশি ধার আছে মনে হচ্ছে।' গোঁ গোঁ করতে করতে ভীম বলল।

ঠিক সেইসময় ওঝা চুলে ঝাঁকানি দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে ওদের দিকে এগিয়ে এল। ওর পেছনে যে ভিলেরা ছিল ওরা ধনুকে তির চড়াল।

'জয়শীল, এখন কী হবে? চটপট বল আমাকে কী করতে হবে?’ আমার কী হবে?’ মকরকেতু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল।

বীরনারায়ণ চট করে জলগ্রহের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। চরকাচারি কাঁপতে কাঁপতে জয়শীলকে বলল, 'তাড়াতাড়ি বলুন, আমরা কী করব? আমাদের কী হবে?’

‘ওহে ভীম, আমার কথা কি বুঝতে পারােনি?’ বলে জয়শীল তরবারি দিয়ে ভীমকে খোঁচা মারল। ঠিক সেইসময় সিদ্ধ সাধক ‘জয় মহাকালী’ বলে ওই ওঝার বুকে বল্লম ধরল।

ভীম দুটো হাত তুলে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'ওহে মামা, খবরদার তির-টির ছুঁড়বে না। কুমির লােকটা রাজার বন্দি। জয়শীল এই বন্দিকে রাজার কাছে নিয়ে যাচ্ছে। বন্দির কোনাে ক্ষতি হলে জয়শীল আমাদের আস্ত রাখবে না।'

কুমির লােকটার রক্তে আমি পা ভেজাতে চাই। ভিলদের মহাকালী।' বলে গণাচারি জলগ্রহের দিকে এগিয়ে আসতে চাইল।

জয়শীল ওর উপর ভীষণ রেগে গেল। চোখের পলকে জয়শীল জলগ্রহ থেকে এক লাফে নীচে নেমে গণাচারির চুলের মুঠো ধরে আছাড় মেরে তাকে নীচে ফেলে বলল, মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাও না? মহাকালী তােমার উপর ভর করেছে? নেশাভাঙ করে এখানে ভয় দেখাতে এসেছ?’

‘ও মা কালী, মা কালী গাে, আমাকে বাঁচাও।' গণাচারি হাত-পা ছুঁড়ে আর্তনাদ করতে লাগল।

অন্যেরা কিছু করার আগেই সিদ্ধ সাধক বল্লম নিয়ে ‘জয় মহাকালী’ বলে ওই ভিলদের তাড়া করতে ছুটে গেল।

পরমুহূর্তেই দূর থেকে শােনা গেল, ‘দাঁড়াও! দাঁড়াও!’ দশ জন অশ্বারােহী দ্রুত এসে ওদের ঘিরে ফেলল।

এগারাে

অশ্বারােহীদের দেখে জয়শীল সহজেই বুঝল ওরা কনকাক্ষ রাজার সেনা। তরবারি নামিয়ে জয়শীল ওদের বলল, 'ওই দেখ, ওই যে কুমির রূপধারী বিচিত্র হাতির পিঠে বসে আছে ও হল কনকাক্ষ রাজার বন্দি। ও যাতে পালিয়ে না যায় সেদিকে লক্ষ রাখবে।'

অশ্বারােহীদের নেতা মকরকেতু যে হাতির উপর বসেছিল সেই জলগ্রহ হাতিটিকে ভালাে করে পরীক্ষা করে দেখে অবাক হয়ে জয়শীলকে প্রশ্ন করল, ‘এ কি পিশাচ, দেবতা না দানব?’

‘সেটাই তাে প্রশ্ন। এ দেবতা নয়, দানব নয়। মানুষ নয় জন্তুও নয়। এখনও বুঝতে পারিনি।' জয়শীল বলল।

ইতিমধ্যে সিদ্ধ সাধক, ব্যাধ ও গণাচারিকে আলাদাভাবে একটু দুরে নিয়ে গিয়ে বলল, 'ওহে, তােমরা ভুল করছ, ওকে তােমরা ভাবছ কালীভক্ত। ও কিন্তু কালীভক্ত নয়। ওর আচার-আচরণ সব কিছুর মধ্যে একটা মুখােশ আছে। আমি হলাম মহাভক্ত। ওকে দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। তােমার তির চালাতে চাও, চালাও। তবে এমনভাবে চালাবে যাতে ওর বুকে তিরগুলাে গেঁথে যায়। আমি এক, দুই, তিন বলব।'

সিদ্ধ সাধকের কথা শুনে ব্যাধেরা অবাক হল, কিছুটা ভয়ও পেল। দশ জন কালাে পােশাক পরা অশ্বারােহীকে দেখে ওদের ভয় আরও বেড়ে গেল। বিরাট দাড়িধারী সিদ্ধ সাধক আর খাপ খােলা তরবারি হাতে জয়শীল-এরা

সবাইকে এক দলের ভেবে ওদের ভয় বেড়ে গেল।

ব্যাধেরা বুঝল সিদ্ধ সাধকের কথা না শুনে উপায় নেই। ওদের নেতা সবাইকে জিজ্ঞেস করল, 'ওহে শােনাে, এখন কী করবে ভেবে দেখ? ওই মন্ত্র দণ্ডাধারী তান্ত্রিকের কথামতাে তির ছুঁড়বে?’

‘এতগুলাে লােক আমরা বিপদে পড়তে যাব কেন? কি বলেন গণাচারি?’ একজন ব্যাধ জিজ্ঞেস করল।

এই প্রশ্ন শুনেই গণাচারি ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে জয়শীলের কাছে প্রাণের ভয়ে গিয়ে বলল, 'বাঁচান, আমাকে আমার দলের এই ব্যাধদের হাত থেকে বাঁচান। ওদের হাত থেকে তির বেরিয়ে এলে আর আমার রক্ষে থাকবে না।'

'মৃত্যু তাে হবেই। তরবারিতে হলেই-বা কী আর তির বিধে হলেই-বা কী। মৃত্যুর হাত থেকে তােমার রেহাই নেই।' সিদ্ধ সাধক রাগের স্বরে বলল।

ব্যাধেরা একসঙ্গে ধনুকে তির চড়াল। তির ছোঁড়ার জন্য প্রস্তুত হল। তৎক্ষণাৎ জয়শীল ওদের থামতে বলে সিদ্ধ সাধককে বলল, 'সাধক, তুমি যা করছ তা ভালােভাবে ভেবে করছ না। তুমি রাজা নও। রাজাই পারে মৃত্যুদণ্ড দিতে।'

জয়শীলের গম্ভীর গলা শুনে সিদ্ধ সাধক থতমত খেয়ে বলল, 'তুমি কি এসব সত্য সত্যই করব ভেবেছ জয়শীল? গণাচারি কে নিয়ে একটু ঠাট্টাতামাসা । করছিলাম। এই অশ্বারােহীরা ঠিক সময়ে না এলে এই গণাচারি হয়তাে তার জাতভাইদের দিয়ে আমাদের মেরে ফেলার চেষ্টা করত।'

এতক্ষণ যা ঘটছিল তা অশ্বারােহীদের নেতা দেখে জয়শীলকে জোড়হাত করে বলল, 'আপনার নাম কি জয়শীল? আমরা মন্ত্রীর কাছে আপনার নাম শুনেছি। আপনি নাকি রাজকুমার ও রাজকুমারীকে যারা নিয়ে গেছে তাদের ধরেছেন? আপনাকেই খুঁজছিলাম।'

‘খুব ভালাে হল অশ্বনেতা। আমরা গােটা অরণ্য খুঁজে এ লােকটাকে ধরেছি। লােকটাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে না? আমি মানে সিদ্ধ সাধক আর এই জয়শীল আমরা একসঙ্গে খুঁজে একে ধরতে পেরেছি।' বলল সিদ্ধ সাধক। ‘লােকটাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। কাধে, পেটে, তির তরবারি গেঁথে হাতির পিঠে বসে আছে। এরকম দৃশ্য আমি দেখিনি। এমনভাবে বসে আছে যেন এগুলাে তার অলংকার।' অশ্বনেতা বলল।

‘ওগুলাে অলংকার নয়। ওগুলাে আছে বলেই সে মরে যাবে। আমি আর চরকাচারি ওকে গ্রামে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করব ভেবেছিলাম। আমার গ্রামের লােকের মুখেই মন্ত্রীমশাই সব খবর শুনেছেন।' হাতির আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বীরনারায়ণ বলল।

আর বেশিক্ষণ সেখানে থাকা জয়শীলের কাছে নিরাপদ বলে মনে হল না। খুব তাড়াতাড়ি গিয়ে মন্ত্রীকে সমস্ত জানানাে উচিত। রাজার ছেলে-মেয়েদের এখনও যে খুঁজে পাওয়া যায়নি, তা জানাতে হবে। মকরকেতু যাতে মরে না যায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। ও মরে গেলে রাজকুমার ও রাজকুমারীকে পাওয়া যাবে না।

জয়শীল এসব কথা ভাবতে ভাবতে মকরকেতুকে বলল, 'কেতু, তােমার আর কোনাে প্রাণের ভয় নেই। স্বয়ং কনকাক্ষ রাজা তােমার রক্ষণাবেক্ষণের ভার নিয়েছেন। স্বয়ং মন্ত্রী যখন কেতুর খবর রাখছেন তখন আর ভাবনার কিছু নেই।'

মকরকেতু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘পেটে যে তরবারিটা আছে, তার চেয়ে কাঁধে যে তির গেঁথে আছে সেটা বেশি কষ্ট দিচ্ছে। এই তির যে ছুঁড়েছে সে আর একটু হলে আমার জলগ্রহের খােরাক হয়ে যেত। তবে ওই যে একটু ধরেছে তাতেই হয়তাে লােকটা মরে গেছে।'

জয়শীল তাড়াতাড়ি গিয়ে ভীমকে দেখল। তাকে দেখে মনে হল তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। পেছনে পেছনে চরকাচারিও এল। সে পরীক্ষা করে দেখে বলল, ‘জয়শীলমশাই, এ তাে বেঁচে আছে। নাড়ী চলছে।'

‘সে-কথা ঠিক। কিন্তু একে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে কী করে? ভালাে হত, একে ওর জাতভাইদের হাতে যদি দেওয়া যেত।' জয়শীল বলল।

জয়শীলের কথা শেষ হতে-না-হতেই সিদ্ধ সাধক ভীমের কানে মুখ রেখে চিৎকার করে বলল, 'ওরে ভীম, এবার ওঠ। তুমি যে বুনাে মুরগিটাকে মেরেছিলে সেটা মন্ত্রীমশাই কুমির লােকটাকে খাওয়াবে ভেবেছিল। কিন্তু হঠাৎ সেটা নিয়ে গণাচারি ছুটে পালাচ্ছে।'

লাফিয়ে উঠে পড়ল ভীম। পালাতে যাবে এমন সময় অশ্বারােহীদের সে দেখতে পেল। দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কই ভূতের নেতা গণাচারি কোথায়?’

সিদ্ধ সাধক ভীমের কাঁধে হাত রেখে বলল, 'ওরে ভীম, তুমি যে দেখেও দেখছ না। দেখ, তােমার গণাচারি কি না?’

সাধকের কথা শুনে ভীম তাকিয়ে দেখল। তার জাতভাইরা একধারে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। গণাচারির দিকে তাকাতেই তার মুরগির কথা মনে পড়ল।

‘কোথায়? আমার মুরগিটা কোথায়? আমার মুরগি না দিলে আমি আস্ত রাখব । অনেক কষ্টে মুরগিটাকে মেরেছি। বলে ভীম পাথর তুলে গণাচারির দিকে ছুটল।

গণাচারি চিৎকার করে বলল, 'আমার এই লােকটার ঘাড়ে কুক্কুর পিশাচ ভর করেছে। বিড়াল মন্ত্র ছাড়া ওই পিশাচ ছাড়বে না। ও যাকে-তাকে মেরে দেব।' গণাচারির সঙ্গে সকলে ছুটল।

‘বেঁচে গেলাম জয়শীল মুক্তি পেয়েছি।' বলতে বলতে সিদ্ধ সাধক হাসল।

ওদের পালানাে দেখে জয়শীল বলল, ‘সাধক, এই গােটা ঝামেলাটা হয়েছে। তােমার জন্য। লােকটা এটা-ওটা মেরে খিদে মেটাচ্ছিল। ওর নাম ছিল রাম। তুমি ওর বিরাট একটা নাম দিলে ভীম। সেও বীরপুরুষ সেজে ছােটাছুটি করছিল। যাক, এখন সবাই পালিয়েছে, বাঁচা গেল।'

‘জয়শীল, কথাটা ঠিকই বলেছ। তবে একটা লাভ হয়েছে। ওরা এখন ওই খ্যাপা ভীমের জন্যে ছােটাছুটি করবে। আমাদের দিকে আর কেউ আসবে না।' সিদ্ধ সাধক বলল।

অশ্বনেতা বলল, ‘রওনা হওয়া যাক।'

‘ঠিক আছে।' বলে জয়শীল চরকাচারি ও বীরনারায়ণকে কাছে ডেকে বলল, 'এবার তােমরা সামনে থেকো। খবর পেয়েছি মন্ত্রীমশাই সদলবলে তােমাদের গ্রামে এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।'

‘ওদের গ্রামের কাছেই সেনাবাহিনীর তাবু পড়েছে। আপনার দেখা পেলেই আমাদের উপর ভার ছিল আপনাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার।' বলল অশ্বনেতা।

জয়শীল সবাইকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল, 'কথাটা সকলের কানে গেছে তাে? এবার রওনা হওয়া যাক।'

চরকাচারি বলল, 'তাহলে কুমির লােকটাকে রাজ বৈদ্য চিকিৎসা করবেন মন্ত্রীর সামনে ওর চিকিৎসা হবে?’ ‘দেখ চরকাচারি, রাজার অশ্বারােহী সৈন্য এখানে এসেছে। ওদের কর্তব্য আমাদের নিয়ে যাওয়া। আমাদের কর্তব্য হল সেখানে যাওয়া। সেখানে যাওয়ার পর মন্ত্রীমশাই যা বলবেন তাই আমরা করতে বাধ্য। চিকিৎসা রাজ বৈদ্যকে দিয়ে হয়তাে করাবেন।' জয়শীল বলল।

‘আজ্ঞে আমাদের একটা আশা ছিল। আমরা মন্ত্রীর সামনে চিকিৎসা করার সুযােগ পেলে তার নজরে পড়তাম, তাতে আমাদের ভবিষ্যত ভালাে হত।' চরকাচারি বলল। ঘাড় নেড়ে বীরনারায়ণ সায় দিল।

‘আচারি পদটা যে কীসের জন্য নামের সঙ্গে জোড়া হয়েছে জানি না। তবে মন্ত্রীর সামনে চিকিৎসা করার সময় যদি মককেতু মরে যায় তাহলে কিন্তু তােমরা দু-জনে, যতবড়াে বৈদ্য হও না কেন, শাস্তি পাবে। এটা মনে রেখাে।’ জয়শীল বলল।

‘ওদের দুজনকে শাস্তি দেওয়ার ভার আমাকে দিও জয়শীল। আমার খুব ইচ্ছে দু-জনকে মহাকালের সামনে বলি দেওয়ার। বলি দিতে পারলে শুধু আমাদের নয় জগতের মঙ্গল হবে জয়শীল।' বলল সিদ্ধ সাধক।

‘আর কথা নয়, এবার সবাইকে এগােতে হবে।' বলল জয়শীল।

আধ ঘণ্টার মধ্যে পাহাড়ের কোলে, যেখানে মন্ত্রীর তাঁবু পড়েছিল, সেখানে সবাই পৌঁছে গেল। মন্ত্রী ধর্মমিত্র সকলের দিকে তাকিয়ে জয়শীলকে বলল, ‘রাজার পুত্র-কন্যাকে উদ্ধারের সূত্র পাওয়ায় তােমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এই দুরাত্মাটা কি ওদের কোথায় লুকিয়ে রেখেছে, কিছু বলেছে?’

জয়শীল সংক্ষেপে সমস্ত ঘটনা বলে শেষে বলল, 'মন্ত্রীমশাই প্রথমে ওর শরীর থেকে ভাঙা তরবারি, তির ইত্যাদি বের করতে হবে। এগুলাে বের করার পর তাকে প্রশ্ন করা সঠিক ও শােভন হবে।'

'ঠিক আছে তাই করা যাবে। তবে চিকিৎসার পর সে যদি মুখ না খােলে, আমাদের প্রশ্নের জবাব না দেয়, তাহলে কিন্তু হাতি দিয়ে মাড়িয়ে ওকে প্রাণে মেরে ফেলব।' মন্ত্রী বলল।

ওদের কথাবার্তা মকরকেতু কান খাড়া করে শুনে বলল, 'জয়শীল, আমার এই জলগ্রহ অনেকদিন জলপান করতে পারেনি। জলখাইয়ে নিতে চাই।'

'তা করতে পার। তবে আমি এবং সাধক দু-জনেই জলগ্রহের পিঠে, তােমার পেছনে বসে থাকব। তােমাকে বিশ্বাস নেই। তুমি যেকোনাে মুহূর্তে জাদুর খেলা দেখাতে পার।' বলে জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক উঠে তার পাশে বসল।

মকরকেতু জলগ্রহকে হেঁকে কাছে যে পুকুরটা ছিল সেই পুকুরে নেমে অনেকদূর চলে গেল। সেখানে মকরকেতু বলল, ‘জয়শীল, আমাকে তাে মরতেই হবে। আগে আর পরে।' বলে, এক মুহূর্ত পরে চিৎকার করে বলল, ‘হে, মায়া সরােবরেশ্বর!’ তারপর জলগ্রহকে বলল, 'জলগ্রহ, জলে পথ কর।'

সঙ্গেসঙ্গে জলগ্রহ পিঠে জয়শীল ও সিদ্ধ সাধককে নিয়েই ডুবে গেল।

বারাে

জলগ্রহ হঠাৎ জলে ডুবে যাওয়ায় জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক জল থেকে উঠে আসতে পারল না। দু-জনে বুঝল জলে ডুবেই তাদের মরে যেতে হবে। সিদ্ধ সাধক আর বাঁচবার উপায় নেই ভেবে তার দেবীকে স্মরণ করল, ‘জয় মহাকাল!’

জয়শীল এই ডাক শুনতে পেয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। তার সামনেটা মকরকেতু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল। তার কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল। গভীর জলে নেমেও সিদ্ধ সাধকের গলা সে শুনতে পেল। সামনে সে মকরকেতুকে দেখতে পাচ্ছিল। এসব দেখে জয়শীল অবাক না হয়ে পারল না।

জয়শীল স্থান-কাল-পাত্র ভুলে যেন হঠাৎ মকরকেতুর কাঁধে হাত দিয়ে গর্জে উঠল, 'ওরে এই দুরাত্মা, কী করছ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আমরা অনেক আগেই তােমাকে মেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু মারিনি। প্রতিদানে তুমি আমাদের জলে ডুবিয়ে মারতে চাইছ?’

এই প্রশ্ন শুনে মকরকতু হাে-হাে করে হেসে বলল, ‘জয়শীল, তােমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তালগাছ প্রমাণ গভীর জলে আমরা এখন আছি। কোনাে মানুষ এত গভীর জলে ডুবে দেখতে পায়, কথা বলে? শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে? বাঁচতে পারে?’

‘সত্যি জয়শীল, এ তাে অদ্ভুত ব্যাপার। আমার মনে হচ্ছে, এসব মহাকালের দয়া।’ বলে সিদ্ধ সাধক চারদিকে তাকাল।

ওই পাহাড়ি পুকুরের গভীরে নানা ধরনের প্রাণী সাঁতার কেটে ওদের আশপাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। বড়াে বড়াে মাছ, কুমির সাপ আরও যে কত রকমের প্রাণী ছিল তা বলার নয়। জলগ্রহ মাঝে মাঝে শুঁড় তুলে এগিয়ে যাচ্ছিল সেখান থেকে ওরা ঢুকলে একটা পাহাড়ি গুহায়। ঝরনার জল বেরিয়ে আসছিল ওই গুহা থেকে।

মকরকেতু হুকুম দেওয়ার মতাে বলল, 'জলগ্রহ!’

'জয়শীল, সিদ্ধ সাধক, কথা বলছ না কেন? কী ভাবছ? এত গভীর জলে ঢুকেও কীভাবে বেঁচে আছ তাই ভাবছ? বুঝতে পারছ কীভাবে কি হচ্ছে? মকরকেতু হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল।

জয়শীল শক্ত হাতে তরবারি ধরে বলল, 'বুঝতে পেরেছি। তােমাকে আর তােমার জলগ্রহকে যতক্ষণ ছুঁয়ে আছি ততক্ষণ আমাদের গায়ে জল লাগবে না, আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারব।'

'আস্তে আস্তে সবই বুঝতে পারবে জয়শীল। অত শক্ত হাতে তরবারি ধরে আছ কেন?’ মকরকেতু বলল।

তােমার মুণ্ডু কাটার জন্যে। তুমি জলগ্রহকে নিয়ে উপরে উঠবে কি না জানতে চাই?’ জয়শীল বলল। সিদ্ধ সাধক হাতের ত্রিশূল উপরে তুলে জোরে জোরে বলল, 'জয় মহাকাল! জলের তলায় বলি দেওয়া নিষেধ। ধৈর্য ধর জয়শীল। এইবার দেখ কী হয়।' বলে ত্রিশূলটা মকরকেতুর গর্দানের উপর রেখে চাপ দিল।

মকরকেতু হাসতে গিয়ে হাসতে পারল না। ত্রিশূলের চাপ লাগছিল। হাত দিয়ে সেটা সরাতে সরাতে সে বলল, 'মহাবীরের আর মহাকালের ভক্তের— দু-জনেরই মাথা খারাপ হয়ে গেছে দেখছি। শুনে রাখ, আমি আর এই জলগ্রহকে নিয়ে জলের উপরে উঠছি না। আর তােমাদের হাতে বন্দি হতেও যাচ্ছি না। আর এ ও শুনে রাখ, তােমরা যে মুহূর্তে আমাকে মেরে ফেলবে সেই মুহূর্তেই তােমাদেরও মৃত্যু হবে। এত গভীর জল থেকে উপরে উঠে যাওয়ার ক্ষমতা তােমাদের কোনােক্রমেই থাকবে না। হয়তাে ভেসে উঠবে তবে জ্যান্ত অবস্থায় নয়।'

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক ভালােভাবেই বুঝতে পারল যে ওরাই এখন মকরকেতুর হাতে বন্দি। ওদের ভয় করল। কিন্তু করার কিছুই ছিল না। জলগ্রহ ওই গভীর জলে অবলীলাক্রমে এগিয়ে যাচ্ছিল।

‘মকরকেতু, তাহলে তুমি আমাদের দুজনকে বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছ শুনি?’ জয়শীল জিজ্ঞেস করল।

এমন সময় একটা কুমির বিরাট বড়াে মাছকে তাড়া করতে করতে ওদের দিকে এগিয়ে এল। জয়শীল তরবারি তুলে কুমিরটাকে মারতে গেল। তখন মকরকেতু কুমিরের লেজ ধরে কয়েক বার পাক দিয়ে তাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর সে বলল, ‘জয়শীল তােমরা দুজনে আমার বন্দি নও। আমিও এখন তােমাদের হাতে বন্দি নই। জলগ্রহ এখন যেখানে নিয়ে যাচ্ছে। সে জায়গায় পৌঁছে গেলে তােমরা তােমাদের পথে যেতে পারবে।'

মকরকেতুর কথা শেষ হতে-না-হতেই জলগ্রহ একটি গুহায় ঢুকল। ঘন। অন্ধকার গুহা। জয়শীল মকরকেতুকে শক্ত হাতে ধরে রইল। কারণ ওই অন্ধকারে একবার গড়িয়ে পড়লে আর রক্ষে ছিল না। সিদ্ধ সাধক ডাকতে লাগল, ‘জয় মহাকাল! বিপদ থেকে তুমিই একমাত্র রক্ষা করতে পার।' তারপর সে জয়শীলের কোমর শক্ত হাতে ধরল।

কিছুক্ষণ পরেই জলগ্রহ সেই গুহা থেকে বেরিয়ে একটি পাহাড়ের চূড়ায় উঠল। মকরকেতুর নির্দেশে জলগ্রহ সশব্দে ডাক ছাড়ল।

এতক্ষণ পরে জল থেকে বেরিয়ে আসার আনন্দে জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক টেনে শ্বাস-প্রশ্বাস নিল। তারপর যে জায়গায় ওরা দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে চারদিকে তাকাল। চারদিকেই পাহাড় ছিল। মাঝখানে নীচের দিকে জল ছিল।

পাহাড়ের ভেতর থেকে, গুহা থেকে জল আসছিল। অন্য গুহা দিয়ে জল সশব্দে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

এসব দেখে জয়শীলের মনে পড়ল আগের ঘটনা। জলে ডােবার আগে মাঝে মাঝে জয়শীল ‘মায়া সরােবরেশ্বর’ বলে চিল্কার করত। সে সরােবরেশ্বরকে স্মরণ করত। এটাই হয়তাে সেই সরােবর। জয়শীল মনােযােগ সহকারে চারদিকের সব কিছু দেখছিল।

মনের প্রশ্ন মনে না রেখে সে মকরকেতুকে জিজ্ঞেস করল। মকরকেতু তাকে বলল, ‘জয়শীল, তুমি যা ভাবছ তা ঠিক নয়। আমাদের রাজা সরােবরেশ্বর যে সরােবরে থাকে এটা সেটা নয়। যে মানুষ ওই জায়গাটা দেখেছে সে। আর ফিরে যেতে চায়নি।'

'তাহলে কি আমাদের সেখানে নিয়ে যাচ্ছ?’ জয়শীল জিজ্ঞেস করল।

মকরকেতু মাথা নেড়ে জানাল যে সেখানেই সে নিয়ে যাচ্ছে। তখন সিদ্ধ সাধক পেছন থেকে ত্রিশূল দিয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করতেই মকরকেতু নির্ভয়ে বলল, 'তােমরা দুজনেই বড্ড তাড়াহুড়াে কর। অহেতুক আমাকে ধরে তােমরা এই বিপদে পড়লে। আমার পেটে তরবারি ঢুকে রয়েছে দেখেও বের করতে দিলে না। উপরন্তু কাঁধে তির বেঁধালে। তােমরা কি সাঁতার জানাে? না জানলে, জলে ভেসে আসা কাঠ ধরে ভাসতে ভাসতে যেদিকে ইচ্ছে চলে যাও।' বলে সে জোরে জোরে বলল, জলগ্রহ এগিয়ে চল।'

জয়শীল বুঝতে পারল বিরাট একটা বিপদে তারা পড়ে যাবে। তাই জলগ্রহ জলে ডােবার আগেই সিদ্ধ সাধককে ইশারা করে জলে ঝাঁপ দিল। কিছুক্ষণ পর ওরা বিশাল গাছ ধরল। গাছ বেয়ে একটু উঠতেই সামনে দেখতে পেল একটি বাঘ।

একই সঙ্গে এরা বাঘকে আর বাঘ ওদের দেখতে পেল। একবার ডেকে সামনের দুটো পা তুলে বাঘ সিদ্ধ সাধকের দিকে তাকাল। সাধক ত্রিশূল তুলতেই জয়শীল। তাকে বলল, 'সাধক, খুব সাবধান! এমনও হতে পারে যে বাঘও আমাদেরই মতন জল থেকে ডাঙায় ওঠার চেষ্টা করছে। ত্রিশূল দেখেই হয়তাে সে তােমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা ভাবছে। সে হয়তাে তােমাকে ভয় পাচ্ছে। তােমার আর বাঘের লাফালাফিতে এই গাছ জলে ডুবে যেতে পারে।'

‘সেটা ঠিক। কিন্তু বাঘটা যেভাবে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পা তুলে আছে তা দেখে আমি কি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি?’ বলে এক দৃষ্টিতে বাঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই সাধক বলল, ‘জয়শীল, আমি মুখ ঘােরালেই বাঘ হয়তাে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই গাছটা ভাসতে ভাসতে কোথায় যে যাবে বুঝতে পারছি না।'

একটু ভয় পেয়ে জয়শীল বলল, ‘আমিও বুঝতে পারছি না সাধক। তবে মনে হচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই অঘটন ঘটে যাবে।'

সিদ্ধ সাধক ভয়ে কাঠ হয়ে বলল, 'এই গাছটা ছেড়ে দিলে কেমন হয় ?’

'খবরদার, গাছ ছেড় না। আর বাঘের দিকে যেভাবে তাকিয়ে আছ সেভাবেই থাক।' জয়শীল বলল।

পরক্ষণেই বাঘ গর্জন করে উঠল। সিদ্ধ সাধকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল। পর মহর্তেই জলপ্রপাতের মখে পড়ে গাছটা দু-তিন-শাে গজ নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তে লাগল।

জয়শীল ও সাধক ওই গাছ ধরে জলপ্রপাতের সঙ্গে গড়াতে গড়াতে নীচের দিকে পড়তে পড়তে, পরিষ্কার বুঝতে পারছিল যে ওরা জীবনের শেষ মূহূর্তগুলাে কাটিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে গাছটা যেখানে পড়ল সেখানে অনেকগুলাে বড়াে বড়াে পাথর ছিল। নীচে পড়ে গাছটা দু-ভাগ হয়ে গেল। একটা ভাগে রইল জয়শীল অন্যভাগে রইল সিদ্ধ সাধক ও বাঘ। জলপ্রপাতের সঙ্গে নীচে পড়ার কিছুক্ষণ পরে জয়শীল চোখ খুলে তাকাল। দেখতে পেল এক কোমর জলে সে দাঁড়িয়ে আছে। সে জলপ্রপাতের গর্জন শুনছিল।

‘তাহলে আমি বেঁচে আছি। হাত-পা আছে না ভেঙে গেছে!’ বলতে বলতে সে নিজের শরীরটাকে দেখল। হাত-পা নাড়ল। ডান হাতে খুব ব্যথা। দুটো পা-ই ব্যথা করছিল। নীচের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে সে অবার বলল, ‘আশ্চর্য ব্যাপার! আমার হাত-পা সব আছে! আমি বেঁচে আছি!’ কয়েক জায়গায় চোট লেগেছে। হঠাৎ মাথা তুলে বলল, 'তাই তাে, সাধক কোথায়!’

আশেপাশে বড়াে বড়াে পাথর ছড়িয়ে ছিল। গাছের যে অংশে সে ছিল। সেই অংশটা ওই পাথরের আড়ালে পড়েছিল। সে সাধককে দেখতে পেল না।

‘সাধক কোথায় গেল! সে কি আর নেই! কোনাে বড়াে পাথরের উপর পড়েই হয়তাে সে মারা গেছে! বলতে বলতে জয়শীল চারদিকে তাকাতে লাগল। সিদ্ধ সাধককে দেখতে না পেয়ে তার মনে কষ্ট হচ্ছিল। এর আগে কত বিপদে-আপদে একসঙ্গে কাটিয়েছে। এতক্ষণে হয়তাে সাধকের মৃতদেহ কুমিরের পেটে চলে গেছে। এখন কী করি? শ্রাদ্ধ ইত্যাদি কি আমাকেই করতে হবে?’ জয়শীল আপন মনে বলল।

সেখান থেকে এক-পা এক-পা করে পথ করতে করতে সে বেরােতে লাগল। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর জয়শীল শুনতে পেল বাঘের গর্জন। আর তখনি তার মনে পড়ল ওই বাঘের কথা।

‘সাধক হয়তাে বাঘের পেটে চলে গেছে।' বলে তরবারি বের করে যেদিক থেকে বাঘের গর্জন আসছিল সেদিকে সে এগিয়ে গেল। কিছু দূর যাওয়ার পর জয়শীল দেখতে পেল একজায়গায় সাধক কাঠ হয়ে পড়ে আছে। মনে হল, বাঘ পাথরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। জয়শীল দেখতে পেল বাঘ সাধকের দিকে এগােচ্ছে।

তেরাে

বাঘকে সিদ্ধ সাধকের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে জয়শীল বুঝেছিল সাধক বিপদে পড়েছে। দেখেই সে বাঘের দিকে ছুটে গেল। বাঘ থাবা তুলে সাধকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাবে এমন সময় জয়শীল একটি পাথর তুলে বাঘের দিকে ছুঁড়ল।

জয়শীল আর বাঘের মধ্যে দূরত্ব মাত্র তিরিশ ফুট। যে মুহূর্তে বাঘ সাধকের মুণ্ডুটা আশা করেছিল সেই মুহূর্তে পাথরের আঘাত খেয়ে সে থতমত খেয়ে গেল। চারদিকে তাকাতে লাগল সে। তীব্র বেগে জয়শীল ঠিক সেইসময় বাঘের পেছনে এসে তার পেছনের পা ধরে উপরের দিকে তুলল। বাঘ সামনের পা তুলতে না পেরে গর্জন করতে লাগল। এতক্ষণ সিদ্ধ সাধক অচেতন অবস্থায় পড়েছিল। গর্জন শুনে চোখ খুলতেই বাঘের মুখ তার চোখে পড়ল। সে যথারীতি ‘জয় মহাকাল’ বলে তার ত্রিশূল তুলতে গেল। কিন্তু ত্রিশূল কোথায় ? তখন তার মনে আরও বেশি ভয় ঢুকল।

এতক্ষণে জয়শীল বাঘের পেছনের পা দুটো ধরে বুঝতে পারল যে তার ওই দুটো পা-ই ভাঙা। ওই পাগুলাে ধরে বাঘকে টানতে টানতে সাধকের কাছে গিয়ে জয়শীল বলল, 'সাধক, শুধু বাঘ দেখছ, আমাকে দেখতে পাচ্ছ না?’

এই প্রশ্ন শুনে সাধক সােজা হয়ে দাঁড়িয়ে বড়াে বড়াে চোখে জয়শীলের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, 'আরে, জয়শীল! তুমি এখানে আছ! আমার অনেকক্ষণ চেতনা ছিল না। বাঘের গর্জন কানে যেতেই আমার জ্ঞান ফিরেছে।'

'যাই হােক, এখনও আমরা দু-জনে প্রাণে বেঁচে আছি।’ বলে জয়শীল বাঘকে টানতে টানতে আবার বলল, ‘বেচারা বাঘ, এর গায়েও আঘাত লাগে! পা দুটো তাে গেছে ভেঙে। জানাে সাধক, এর এখন নিজের খাবার জোগাড় করার ক্ষমতা নেই। খিদের জ্বালায় তিলে তিলে মরার চেয়ে এর বােধ হয় এক্ষুনি মরে যাওয়া ভালাে।' বলে তরবারি তুলে বাঘকে হত্যা করার জন্য যে প্রস্তুত হল।

ইতিমধ্যেই সাধক এদিক-ওদিক খুঁজে তার ত্রিশূল পেয়ে গেল। শূল হাতে করে সে জয়শীলের কাছে এল। বাঘ মাথা নীচু করে পড়েছিল। জয়শীল বলল, ‘সাধক এই বাঘটা তাে আমাদের কোনাে ক্ষতি করেনি। এটাকে মেরে ফেলতে আমার ইচ্ছে করছে না।'

সাধক জয়শীলের হাত থেকে তরবারি নিয়ে বলল, 'এই বাঘটা বেঁচে মরে আছে। খিদের জ্বালায় নরকযন্ত্রণা ভােগ করছে এখানে। ওকে এই কষ্ট থেকে মুক্তি দেওয়া উচিত। তাতে আমাদের পূণ্য হবে।' বলে সাধক এক আঘাতে বাঘের মুণ্ডু মাটিতে নামিয়ে দিল।

জয়শীল চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘সাধক, এখন আমরা কোনদিকে যাব? কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়েকে যে অপরহরণ করেছে, বলতে গেলে আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি। এটা বােধ হয় আমাদের উচিত হয়নি।'

'জয়শীল, ওকে আমরা ছেড়েছি না ও আমাদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল তা বলা শক্ত। আমরা তাকে ছাড়ি বা না ছাড়ি জলগ্রহের পিঠে বসে আমরা কতদিন বাঁচতে পারতাম। যাই হােক, এখন আমাদের ভাবতে হবে কী করা যায়। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। আমরা কীভাবে এখান থেকে যেতে পারব তাই ভাবতে হবে। পথ খুঁজে বের করতে হবে।' সাধক বলল।

সাধকের কথা শেষ হতে-না-হতেই বনজঙ্গলের আড়াল থেকে মানুষের আর্তনাদ শােনা গেল। শুধু মানুষ নয়, অন্য একটা জন্তুরও আর্তনাদ একই সঙ্গে শােনা গেল।

‘জন্তু কি মানুষকে ধরেছে, নাকি মানুষ জন্তুকে ধরেছে। একে অন্যকে ধরলে দু-জনের আর্তনাদ শােনা যাচ্ছে কেন? যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল। সেদিকে তাকিয়ে সাধক বলল।

‘সাধক, এমনও তাে হতে পারে যে মানুষ এবং জন্তু দুটোই অসহায় অবস্থায় পড়েছে। দুটোকেই অন্য কোনাে কিছু ধরে শেষ করে ফেলতে চাইছে। এই অবস্থায় জন্তু এবং মানুষ আর্তনাদ করে। চল, দেখা যাক।' বলে জয়শীল তীর ধরে এগিয়ে গেল।

সাধক ও জয়শীল কিছুদূর যাওয়ার পর ভয়াবহ এক দৃশ্য দেখতে পেল। জলের ধারে এক বিরাট গাছ। সেই গাছের ডালে ঝুলছে একটি জন্তু এবং মানুষ। জন্তুটাকে দেখে মনে হচ্ছে নেকড়ে। দূর থেকে পরিষ্কার বােঝা যাচ্ছে না কোন জানােয়ার। গাছের ডালে ছােটো ছােটো পাতা আছে।

‘এ তাে অদ্ভুত ব্যাপার। অন্য কাউকে তাে দেখা যাচ্ছে না গাছের উপরে। অথচ মানুষ এবং জন্তু এমনভাবে আর্তনাদ করছে যেন ওদের ওপর থেকে কেউ টানছে।' জয়শীল বলল।

‘আমার মনে হয় জয়শীল, ওদের টানছে ভূত অথবা পিশাচ। তুমি বললে, এই ত্রিশূল দিয়ে আমি পিশাচটাকে গাছ থেকে নামাব।' বলতে বলতে সাধক ওই ডালের দিকে এগিয়ে যেতেই অন্য একটা ডাল আস্তে আস্তে নেমে তার কাঁধ ধরতে গেল। সাধকের মনে হল কোনাে শক্তিশালী লােক যেন তার কাঁধ ধরে তাকে উপরে তােলার চেষ্টা করছে। তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়ে, সরে গিয়ে, সাধক বলল, ‘জয়শীল, সাবধান! এটা সাধারণ গাছ নয়। এটা নিশ্চয়ই রাক্ষুসে গাছ।'

‘এটা রাক্ষুসে গাছ নাকি ভূত পিশাচের গাছ আমি তা জানি না। তবে একটা ব্যাপার বেশ বুঝতে পারছি; এ গাছ মানুষ জন্তুজানােয়ার যা পায় তাই খায়।' বলে জয়শীল ছুটে গিয়ে যে ডালে মানুষ এবং জন্তু ছিল সেই ডালটা তরবারির এক আঘাতে, কেটে ফেলল। সঙ্গেসঙ্গে ওই জন্তু ও মানুষ ডালসহ জলে পড়ে গেল।

জয়শীল ও সাধক তাড়াতাড়ি গিয়ে লােকটাকে জল থেকে তুলে আনল। জন্তুটাও জল থেকে উঠে এল তীরে!

‘জয়শীল, ওই জন্তুটা দেখছি অদ্ভুত ধরনের। অনেকটা ঘােড়ার মতাে। এটাকে বােধ হয় কাজে লাগানাে যায়।' সাধক বলল।

যে লােকটা ওই গাছের ডালে মৃত্যুভয়ে আর্তনাদ করছিল সে ফ্যালফ্যাল করে জয়শীল ও সাধকের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আপনারা একজন সেনা নায়ককে মানুষখেকো গাছের খপ্পর থেকে বাঁচালেন। আমাদের রানি, এরজন্য আপনাদের পুরস্কৃত না করে পারবেন না।'

জয়শীল ওই অদ্ভুত চেহারার লােকটার দিকে তাকিয়ে বলল, 'এই অঞ্চল শাসন করার একজন রানি আছেন, সেই রানির সেনাবাহিনী আছে। সেই সেনাবাহিনীর, তােমার মতাে একটা সেনানায়ক হাছে। তাহলে তাে দারুণ ব্যাপার।'

‘জয়শীল, আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্য লাগছে এই গাছটা। মানুষখেকো গাছ আছে শুনেছিলাম, আজ প্রথম দেখলাম। গাছের পেছনের দিকে দিয়ে দেখ মানুষ আর জন্তুর কত হাড় পড়ে আছে। গাছটার দেখছি কুম্ভকর্ণের মতাে ক্ষুধা আছে।' সাধক বলল।

তারপর সাধক ও জয়শীল গাছের কাছাকাছি ঘােরাঘুরি করে অনেক হাড় দেখতে পেল। হাড় দেখতে দেখতে জয়শীল গাছের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। হঠাৎ তার চোখের সামনে একটি ডাল নেমে এল। দেখেই জয়শীল একলাফ দিয়ে দূরে চলে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে ওই গাছটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল।

এমন সময় ওই সেনানায়ক তার ওই জন্তুটিকে ধরে জয়শীল ও সাধকের কাছে এসে বলল, 'আপনারা আমাকে আজ প্রাণে বাঁচিয়েছেন। গড়ে জাতির উপকার করেছেন। আসুন, আপনাদের রানির কাছে নিয়ে যেতে চাই। আসুন।'

সাধক বিরক্ত হয়ে বলল, 'কীসের সেনানায়ক হে তুমি? একটা গাছের খপ্পর থেকে তুমি নিজেকে ছাড়াতে পারনি। তােমার মতাে সেনানায়ক যে রানির আছে। সে আমাদের কী পুরস্কার দেবে? হয়তাে দুটো ফল খাওয়াবে আর না হয়...।'

এমন সময় দূর থেকে শােনা গেল অন্য ধরনের আওয়াজ। কান খাড়া করে শুনে বােঝা গেল রথের মতাে কিছু আসছে। ওরা যা ভেবেছিল তাই। ওদের দিকেই একটি রথ আসছিল। আশেপাশে অনেক লােক। রথ দেখে মহাশব্দে ওদের সেনানায়ক এগিয়ে গিয়ে বলল, 'মহারানি’, বলেই মাথা নুইয়ে নমস্কার করে সাধক ও জয়শীলকে দেখিয়ে বলল, 'মহারানি, এই দু-জন আমাকে এই প্রাণীখেকো গাছের খপ্পর থেকে বাঁচিয়েছে।'

রানি ওই সেনানায়কের কথা শুনে জয়শীল ও সাধকের দিকে এগিয়ে এসে বলল, 'আপনারা কাল রাত্রে আমার স্বপ্নে এসেছিলেন। আমাকে কথা দিয়েছিলেন। আমার জাতিকে বিরাট বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।'

ওর কথা শুনে সাধক আস্তে আস্তে বলল, 'জয়শীল, এ মেয়ে তাে মেয়ে নয়। মারাত্মক কিছু হবে। বদমাইস মেয়ে না হলে এত ভালাে কথা বলে।'

'তা না হয় হল। কিন্তু এই বেঁটে বেঁটে লােকগুলাের শত্রু আছে সেটাই তাে আশ্চর্যের কথা। শত্রু যে কে তা জানতে আমার ইচ্ছে করছে। আমরা যদি পারি, তাে এই নিরীহ বেচারিদের একটু সাহায্য করলে ক্ষতি কি?’ জয়শীল বলল।

সাধক বিরক্ত হয়ে বলল, 'জয়শীল, যে উদ্দেশ্যে আমরা বেরিয়েছি সেটা তাে ভুলে গেলে আমাদের চলবে না। এসব ছােটোখাটো ব্যাপারে আমরা জড়িয়ে পড়লে কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়েদের আর উদ্ধার করতে পারব।'

‘সাধক, কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়েদের যেমন প্রাণ আছে, এই বেঁটেখাটো লােকগুলােরও তেমনি প্রাণ আছে। ওদের যদি বিপদ থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করতে পারি, এদের পারব না কেন?’ জয়শীল বলল।

তার কথা শেষ হতে-না-হতেই পাহাড়ের উপর থেকে বিকট চিৎকার শােনা গেল। সবাই সেই দিকে তাকাল। ওরা দেখতে পেল এক বিরাটদেহী প্রকাণ্ড পাথর তুলে, পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ফেলার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তার কোমরের লােহার চেন ধরে অদূরে একটি লােক দাঁড়িয়ে আছে। লােকটার এক হাতে চেন অন্য হাতে তরবারি।

ওই দৃশ্য দেখে রানি এবং তার আশেপাশে যারা ছিল তারা ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল। পাহাড়ের উপরের লােকটা তরবারি নাড়ছিল। সঙ্গে সঙ্গে ওই বিরাট আকৃতি নড়ছিল, চিৎকার করছিল।

এমন সময় জয়শীল সিদ্ধ সাধককে বলল, 'সাধক ওই বিরাট আকারের জন্তুটাকে যে লােকটা ভয় দেখাচ্ছে সে কিন্তু বেঁটে নয়। আমাদেরই মতাে শরীরের লােক।' বলে জয়শীল রানিকে জিজ্ঞেস করল, 'ওটা কি জন্তু ? ওই তরবারি হাতে কি মানুষ?’

রথ থেকে নেমে এসে রানি বলল, 'পাহাড়ের ওপাশের লােকগুলােও আমাদেরই মতাে বেঁটেখাটো। তবে ওরা মনে করে যে ওদের সৃষ্টি হয়েছে যক্ষজাতি থেকে। ওরা নাকি আমাদের চেয়ে উন্নত জাতির লােক। ওদের ক্ষতি করিনি কিন্তু ওরা আমাদের ধ্বংস করতে চায়।'

‘অত বড়াে জন্তুটাকে যারা হাত করতে পারে, তারা ইচ্ছে করলে অনেক আগেই তােমাদের ধ্বংস করে ফেলতে পারত।' বলল সিদ্ধ সাধক।

'আপনারা হয়তাে জানেন না। ওই বিরাট আকারের জন্তুটা হল নরদানব। সে পাহাড়ের উপর থেকে আমাদের উপর পাথর ছােড়ে। তরবারি হাতে লােকটা আপনাদেরেই মতাে লােক। দশ-বারাে দিন আগে এসে শত্রুদের দলে যােগ দিয়েছে।' বলল ওই বেঁটে রানি।

এমন সময় বিরাট পাথর উপর থেকে পড়তে লাগল।

চোদ্দো

পাহাড়ের উপর থেকে যে ভয়ংকর জন্তু পাথরটাকে ওদের উপর ছুঁড়ে ফেলল তার দিকে জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক তাকিয়ে রইল। ওই জন্তুর পাশে ছিল একটি মানুষ। জয়শীলের মনে হল পাশের লােকটাকে যেন কোথায় দেখেছে। এমন সময় ওই পাথরটা, ওরা যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে কুড়ি-পঁচিশ ফুট দূরে পড়ল।

ওই লােকটা পাথরটা পড়তে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে পেল। সবাই আর। একটু সরে দাঁড়াল। লােকটা জয়শীল ও সিদ্ধ সাধককে বলল, 'দেখুন ওই ভয়ংকর নরদানবের সঙ্গে যে লােকটা আছে সে গত দশ-বারাে দিন ধরে আমাদের ভীষণ জ্বালাচ্ছে। আমাদের চার-জন জাতভাই শিকারে গিয়েছিল। সে ওদের মেরে ফেলল। মনে হচ্ছে যেকোনাে সময়ে যেকোনােদিন লােকটা ওই নরদানব নিয়ে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের উপর।'

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক ওর কথা মন দিয়ে শুনল। শুনে ওদের উপর তাদের করুণা জাগল। এতগুলাে লােক কেন যে ওই একটি মাত্র নরদানবকে ভয় পাচ্ছে তার কারণ অনুধাবন করল তারা। তারা যত না ওই নরদানবকে ভয় করে তার চেয়ে দানবের সঙ্গে যে লােকটা আছে তাকে ভয় করে।

‘আচ্ছা জয়শীল, নরদানবের পাশে তরবারি হাতে যে লােকটা আছে সে আমাদের দেশের কেউ নয় তাে? ভালাে ভাবে লক্ষ করে দেখ তাে।' সিদ্ধ সাধক কিছু অনুমান করার মতাে বলল।

লােকটাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে জয়শীলের মনে হয়েছিল কোথায় যেন তাকে দেখেছে। কিন্তু নীচে থেকে তাকিয়ে উপরের লােকটাকে ভালােভাবে দেখা যায় না। বিশেষ কারণ না থাকলে, কোনাে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য না থাকলে কেউ এতগুলাে বন, পাহাড়, নদী পেরিয়ে এতদূর আসতে পারে না।'

জয়শীল ভাবছিল এসব কথা। হঠাৎ তার নজরে পড়ল পাহাড়ের উপরের ওই লােকটা নরদানবকে তরবারি দিয়ে খোঁচা মেরে কী যেন করতে বলছে। খোঁচা খেয়ে দু-একবার লাফ দিয়ে নরদানব একটা পাথর তুলতে গেল কিন্তু পাথরটি বিরাট হওয়ায় সে কিছুতেই তুলতে পারছিল না।

‘সাধক, লােকটাকে আবার একটা বড়াে পাথর আমাদের উপর ছুঁড়ে ফেলতে নরদানবকে বলছে। দানবটা তুলতে পারছে না। আমার মনে হচ্ছে লােকটার বুদ্ধি একটু কম। লােকটা জানে না যে অত বড়াে পাথর পড়তে দেখে, দিনের আলােতে, যেকোনাে লােক সরে যাবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাথরটাকে পড়তে দেখে কেউ এমন জায়গায় দাঁড়াবে না যে পাথরটা মাথায় পড়ে।' বলে জয়শীল ওই রানিকে বলল, 'তােমার প্রজারা শিকার করতে তির-ধনুক, বল্লম, ইত্যাদি যা ব্যবহার করে তা এখানে আনতে বল।'

ওরা সাধারণত শিকার করার সময় বল্লম ব্যবহার করে। ওটা ওদের জাতীয় অস্ত্র। ওদের সেনানায়ক বহুকাল আগে একবার একটা বড়াে বল্লম ও অনেকগুলাে তির-ধনুক পেয়েছিল। সেগুলােকে সে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল। সে যে রেখে দিয়েছে তা রানি জানত না। তাই হঠাৎ শিকারের অস্ত্রের কথা শুনে ওই লােকটা অন্যমনস্ক হওয়ার মতাে ভঙ্গি করে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

তার ওই ভঙ্গি লক্ষ করে সিদ্ধ সাধক তাকে বলল, 'কী হয়েছে? তুমি এত বড়াে যােদ্ধা, শিকার আর অস্ত্রের কথা শুনে তুমি যদি এত ভয় পাও, তােমার প্রজারা কী করবে? সেনাপতি হয়েছ যখন যেকোনাে বিপদের মােকাবিলা করতে তােমাকেই তাে এগিয়ে আসতে হবে। তুমি যদি ভয় পাও, মুখ ঘুরিয়ে থাক, তাহলে যুদ্ধ করবে কে? সেনাপতি ভয় পেলে সৈন্যরা তাে আরও ভয়ে গুটিয়ে যাবে।'

এই প্রশ্ন শুনে লােকটা ফ্যালফ্যাল করে একবার রানির দিকে আর একবার সাধকের দিকে তাকিয়ে শেষে বলল, 'মহারানি, বহু তির-ধনুক আছে বটে কিন্তু সেগুলাে ব্যবহার করা আমাদের নিষেধ। এমনকী ছোঁয়াও আমাদের নিষেধ। তবু আমি নিয়মভঙ্গ করে বনে যতগুলাে তির-ধনুক পেয়েছিলাম সবগুলাে আমার বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছি।'

ওদের রানি তার কথা শুনে কী যেন বলতে গেল। এমন সময় জয়শীল হাত উপরের দিকে তুলে রানিকে শান্ত হওয়ার ইঙ্গিত করে বলল, 'রানি, তােমার এই লােকটা যে কাজ করেছে তা তােমাদের দৃষ্টিতে যে কত বড়াে অপরাধ তা আমি জানি না। তবে এই মুহূর্তে যদি ওই তির-ধনুক আনানাে যায়, আমি ওই নরদানবের সঙ্গে মােকাবিলা করতে পারি। অবিলম্বে ওই তির-ধনুক আমার দরকার।'

রানি অন্য কোনাে কথা না বলে সেনানায়কের দিকে তাকাল। ওদের সেনানায়ক তৎক্ষণাৎ তির-ধনুক আনতে চলে গেল বাড়িতে।

ইতিমধ্যে নরদানব আর একটা বড়াে পাথর তুলল। তার কোমরে বাঁধা ছিল লােহার শেকল। একপ্রান্ত বাঁধা ছিল অন্যপ্রান্ত পাহাড়ের উপরের লােকটা ধরে ছিল। লােকটা তরবারি দিয়ে তার গায়ে খোঁচা মারছিল। এতে ভীষম রেগে গিয়ে নরদানবটি লােকটার উপরেই পাথরটা ফেলে দিতে গেল। তৎক্ষণাৎ লােকটা দানবের গলায় তরবারি ধরে গর্জে উঠল।

নরদানবকে শেকলে বেঁধে রেখেও লােকটা এত জোরে চিৎকার করল যে তার চিকার পাহাড়ের গায়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। জয়শীল এবং অন্যান্যদের কানেও সেই চিৎকার গেল। জয়শীল হেসে বলল, ‘সিদ্ধ সাধক, পাহাড়ের উপরের ওই লােকটা যে কে এখন আমি চিনতে পেরেছি। সে তােমার হিরণ্যপুরের লােক নয়। আমাদের অমরাবতী নগরের লােক। আমি যে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে তােমাদের দেশে গেছি। আর এই বনে-বাদাড়ে ঘরে। বেড়াচ্ছি— এসব কিছুর জন্য দায়ী হল ওই লােকটা সে এক সময় আমাদের রাজা রুদ্রসেনের অশ্বারােহী বাহিনীর সেনানায়ক ছিল। ওর নাম কৃপাণজিৎ।'

এই কথা শুনে সিদ্ধ সাধক অবাক হয়ে বলল, 'জয়শীল, এ তাে অদ্ভুত ব্যাপার! কোথায় তােমার অমরাবতী, আর এখন আমরা কোথায় আছি। তাহলে এখন তুমি কী করবে ভাবছ?’

জয়শীল কিছুক্ষণ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভেবে বলল, ‘সিদ্ধ সাধক, ওই নরদানবকে যেভাবে মারছে কৃপাণজিৎ তাতে আমি তাকে উপযুক্ত শিক্ষা না দিয়ে পারি না। তবে আর একটা দিকও লক্ষ করার মতাে, এত অত্যাচার নরদানব শেষ পর্যন্ত সহ্য নাও করতে পারে। রেগে গিয়ে সে কোমরের শেকল ছিড়তে পারে। এমনকী ওই পাথর নিয়েই কৃপাণজিতের উপর ঝাঁপিয়েও পড়তে পারে।'

জয়শীলের কথা শেষ হতে-না-হতেই তির-ধনুক এসে গেল। সমস্ত তির-ধনুক জয়শীলের পায়ের কাছে রেখে দিল ওরা। জয়শীল পরীক্ষা করে দেখল সেগুলাে। বেছে বেছে ছ-টা তির সে হাতে তুলে নিল।

সিদ্ধ সাধক ওই তিরগুলাের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জয়শীল, তােমার শত্রু কৃপাণজিৎ এবং নরদানবকে এই তির ছুঁড়ে মেরে ফেলতে চাইছ।'

এই প্রশ্ন শুনে জয়শীল হেসে বলল, 'সাধক, নীচে থেকে পাহাড়ের উপরের ওই দু-জনকে তির দিয়ে মেরে ফেলা কি অত সহজ? দেখতে তাে পাচ্ছ, তিরগুলাে মামুলি ধরনের। এ তাে আর ব্রহ্মাস্ত্র আর নাগাস্ত্র নয় যে যেখান থেকেই মারি-না-কেন লক্ষ্যভেদ হবে।'

এমন সময় পাহাড়ের উপর থেকে বিচিত্র ধ্বনি শােনা গেল। পাথরটা নিয়ে নরদানব কৃপাণজিতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে। সে ওকে মারতে চাইছে। আর কৃপাণজিৎ তরবারি দিয়ে নরদানবকে মেরে ফেলতে চাইছে। এমন সময় চার-পাঁচটা বেঁটেখাটো লােক দূর থেকে দড়ি ছুঁড়ে ওই নরদানবকে বেঁধে ফেলল। পাথরটা ফেলে দিয়ে নরদানব বাঁধা অবস্থায় লাফালাফি করতে লাগল।

নরদানবকে বাঁধা অবস্থায় দেখে রানির লােক জয়শীলকে মহাউৎসাহে বলল, 'এই হচ্ছে সুযােগ ! এক্ষুনি মারতে পারলে নরদানবটা মরে যাবে। আর দেরি নয়, এক্ষুনি তির ছুঁড়ুন।'

ওদের রানিও মাথা নেড়ে বলল, 'আমরা নরদানবের কাছে যে লােকটা আছে তাকে অত ভয় পাই না। আমাদের ভয় শুধু ওই নরদানবকে। ওই নরদানবকে মেরে ফেলতে পারলে ওই লােকটাকে আমরা দ-দিনেই জব্দ করতে পারব। তাকে এমন শিক্ষা দেব যে তার অনুচররা ভয়ে পালাবে।'

জয়শীল চিৎকার করে বলল, 'ওহে, নীচ কৃপাণজিৎ, তাকিয়ে দেখ, আমি জয়শীল। এখানে দাঁড়িয়ে আছি।' জয়শীলের চিৎকার পাহাড়ের উপরের লােকের কানে গেছে বলে মনে হল না । কৃপাণজিৎ নরদানবের কোমরে বাঁধা শেকলটাকে একদিকে টেনে রেখেছিল অন্যদিকে ওর সঙ্গীরা নরদানবকে ভালােভাবে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করছিল।

জয়শীল কিছুক্ষণ ভেবে রানিকে বলল, 'রানি, আমার একটি তির শত্রুপক্ষের উপর পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওরা সবাই আক্রমণ করতে এগিয়ে আসবে। ওদের আক্রমণ প্রতিরােধ করার প্রস্তুতি না থাকলে কিন্তু বিপদে পড়তে হবে।' এই কথার জবাবে রানি তার সেনাবাহিনীর দিকে তাকাল। ওরা ততক্ষণে হাতে বল্লম নিয়ে বুঝিয়ে দিল যে ওরা প্রস্তুত। ওদের সেনাপতি জয়শীলকে বলল, 'আপনি তির ছুঁড়তে পারেন। আমাদের শত্রুদের গায়ে দু-একবার বল্লমের আঘাত লেগেছে। কিন্তু তির বিধলে যে কি হয় তা তারা জানে না। একবার আপনার তির গিয়ে ওদের একজনের গায়েও যদি বেঁধে, দেখবেন ওরা চঞ্চল হয়ে উঠবে। ওরা হয়তাে জীবনে তির দেখেনি। শরীরে একবার ঠিকমতাে তির বিঁধে গেলে, যার গায়ে বেঁধে তার আর কিছু করার থাকে না। ওরা ঘাবড়ে গিয়ে চারদিকে ছােটাছুটি করবে। কেউ কেউ পালাবে। আমাদের সেনাবাহিনী লুকিয়ে থাকবে। যে যাকে যেখানে পাবে সে তাকে সেখানেই শেষ করে ফেলবে। প্রয়ােজন হলে আগুন লাগিয়ে দেবে।'

‘সেনাপতি, তােমার কথা শুনে যুদ্ধ করার উৎসাহ পাচ্ছি। তােমার কথায়। এবং কাজের মধ্যে মিল থাকে তাে? থাকলেই ভালাে। তবে তুমি হয়তাে সকলের কথা ভাবতে গিয়ে নরদানবের কথা ভুলে গেছ। নরদানব যেদিক দিয়ে যাবে সেদিক থেকে কি তােমার সেনাবাহিনী তার পথ আগলাতে পারবে? পারবে তাকে বন্দি করতে? যাই হােক, পারুক আর নাই পারুক, তােমাদের শক্তি যাচাই করার ইচ্ছে জাগছে।' জয়শীল বলল।

সিদ্ধ সাধক সঙ্গে সঙ্গে শূল তুলে বলল, 'জয়শীল আর দেরি নয়। এই হল উপযুক্ত সময়। নরদানব দড়ি ছিঁড়ে ওদের একজনকে ধরে ফেলেছে। এরা সবাই ঘাবড়ে গেছে। শত্রু যখন ঘাবড়ে যায় তখনই তাকে আক্রমণ করা উচিত।'

পরক্ষণেই জয়শীল নরদানবের দিকে তির ছুড়ল। তির বিদ্ধ হল তার কোমরে। সে আর্তনাদ করতে করতে যে লােকটাকে পেল তাকে ফেলে দিল।

এই ঘটনায় উৎসাহিত হয়ে রানির সেনাবাহিনী পাহাড়ের উপরের দিকে উঠতে লাগল।

পনেরাে

বেঁটেদের রানির সেনাবাহিনীকে পাহাড়ের উপর আসতে দেখে শত্রুপক্ষের খাড়াপাহাড় নামধারী তার লুকিয়ে থাকা সেনাবাহিনীকে ডাক দিল। অস্ত্র হাতে তার সেনাবাহিনী এগিয়ে এল। ওরা চিৎকার করতে করতে দল বেঁধে ছুটে এসেছিল। ইতিমধ্যে কৃপাণজিৎ এবং তার সঙ্গীসাথীদের নরদানবকে দমন করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল।

জয়শীল লক্ষ করল খাড়াপাহাড়ের অনুচরগুলাে সেনাবাহিনী নিয়ে রানির বাহিনীর দিকে এগিয়ে আসছে। সে সাধককে বলল, ‘সাধক, এক্ষুনি আমরা যদি রানির সেনাবাহিনীকে সাহায্য না করি রানির বাহিনী শেষ হয়ে যাবে। লক্ষ করেছ, কৃপাণজিৎ কি করছে? তার পােশাক দেখে মনে হচ্ছে সে মস্তবড়াে শিকারের সন্ধানে বেরিয়েছে। ভাবছি, আমি যখন তাকে লক্ষ করছি সে-ও হয়তাে আমাকে দেখছে।'

সিদ্ধসাধকেরও মনে হল, রানির বাহিনীকে সাহায্য করা উচিত। সে রানির দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘রানি, তােমার এখানেই থাকা ভালাে। আমরা তােমাদের সৈনিকদের সঙ্গে গিয়ে তােমার চিরশত্রু খাড়াপাহাড়ের মােকাবিলা করব। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শত্রু কৃপাণজিৎকেও এক চোট দেখে নেব।'

সাধকের কথা শেষ হতে-না-হতেই নরদানবের ভয়ংকর গর্জন শােনা গেল। তার ডাক শুনে জয়শীল ও সাধক পাহাড়ের উপরের দিকে তাকাল। দেখতে পেল আগের মতােই নরদানবের কোমরে শেকল বাঁধা আছে। শেকলের অন্যপ্রান্ত ধরে আছে কৃপাণজিৎ। নরদানব নীচের লােকের দিকে তাকিয়ে বার বার কাঁধটাকে উঁচু করছিল।

‘সাধক, মনে হচ্ছে নরদানব আবার কৃপাণজিতের কবলে এসে গেছে। এইবার ওই জন্তুটাকে যদি বড়াে পাথর তুলে রানির সেনাবাহিনীর উপর ফেলে তাহলে তার একটি সেনাও বাঁচবে না।' বলেই জয়শীল ছুটে গেল। সিদ্ধ সাধক তৎক্ষণাৎ তাকে অনুসরণ করল।

দু-জনে ছুটেই বেঁটেদের সেনবাহিনীর কাছে পৌছে ওই বাহিনীর সেনাপতিকে বলল, ‘সেনাপতি, তােমার বাহিনীকে একটু থামতে বল। নরদানবটি তােমাদের বাহিনীর উপর বিরাট পাথর হঠাৎ ছুঁড়ে মারতে পারে।' ‘আজ্ঞে, ওই ভয়ংকর জন্তুটা আমাদের যাতে কিছু না করে সেদিকে আপনারা লক্ষ রাখুন। আমরা চেষ্টা করব আমাদের শত্রুর নেতা খাড়াপাহাড়কে মেরে ফেলতে। আমরা ওদের দলের এক-এক জনকে ধরব আর পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ছুঁড়ে ফেলব।' বেঁটেদের সেনাপতি বলল।

‘তােমার মুখের কথা আর তােমার হাতের বল্লমের মুখ দুটোই বেশ ধারালাে মনে হচ্ছে। তুমি যা ভাবছ তা করার ক্ষমতা তােমার দেহে আছে? তুমি তাে দেবতা নও, দানবও নও। ক্ষুদ্র মানুষ।' সাধক গম্ভীর স্বরে বলল। জয়শীলের ইশারায় সাধক হঠাৎ চুপ করে গেল। এমন সময় নরদানবকে একটি বিরাট পাথর তুলে ধরতে সাধক দেখল। সে বলল, 'না, এই নরদানবের পাথর ছােড়া ছাড়া আর কোনাে কাজ নেই। আর সহ্য হয় না। ওকে এক্ষুনি উপযুক্ত শিক্ষা না দিলে ওর বাড় বেড়েই যাবে। আমি যাচ্ছি আমার এই ত্রিশূল দিয়ে তার সঙ্গে মােকাবিলা করতে।'

ত্রিশূল এগিয়ে সাধককে ছুটে যেতে দেখে জয়শীল ভাবল, আবার না সাধক কোনাে বিপদে পড়ে। সাধককে থামিয়ে জয়শীল নরদানবকে লক্ষ করে একটি তির ছুড়ল। তিরটা গিয়ে লাগল শেকলের উপর। কৃপাণজিতের হাত থেকে শেকলটা খসে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ নরদানব পাথরটাকে নীচে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যাবে এমন সময় হঠাৎ পড়ে যাওয়া শেকল হাতে তুলে নিয়ে তাকে পেছন দিক দিয়ে টান দিল। সেইসময় কৃপাণজিৎ তীক্ষ দৃষ্টিতে লক্ষ করল তির নিক্ষেপকারী জয়শীলকে।

কৃপাণজিৎ জয়শীলকে দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগল। তার পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত দুর থেকে ওদের দুজনকে দেখে কৃপাণজিৎ ভাবতেই পারেনি যে ওই দু-জনের মধ্যে একজন ছিল জয়শীল।

‘খাড়াপাহাড়, শত্রুর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘােষণা করার বা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার এটা উপযুক্ত সময় নয়। ওদের মধ্যে এমন একজন আছে যার তির গায়ে বিঁধলে আর বাঁচতে হবে না। নেহাৎ এটা নরদানব তাই তির বেঁধার পরেও বেঁচে আছে। আমরা হলে সঙ্গেসঙ্গে মরে যেতাম।' বলল কৃপাণজিৎ। বলতে বলতেই সে নরদানবকে নিয়ে সাবধানে পিছু হাঁটতে লাগল।

খাড়াপাহাড় জয়শীল ও সিদ্ধ সাধকের দিকে তাকিয়ে কৃপাণজিতকে বলল, 'মহারাজ, আপনার নির্দেশ অমান্য করব না, তবু একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে আপনি কি নরদানবকে নিয়ে সােজা গিয়ে ওই তির-ধনুকধারীকে মেরে ফেলতে পারেন না?’ এক ফাঁকে আমরা রানির সেনাবাহিনীকে খতম করে ফেলতে পারব। তার এই কথা শুনে কৃপাণজিৎ রক্তচক্ষু করে নরদানবকে নীচের দিকে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, 'খাড়াপাহাড়, তােমার মাথার পালকগুলাের মতােই তােমার বুদ্ধি! তুমি আমাকে কি পালক লাগানাে পাখি পেয়েছ যে উড়ে যাব আর তাকে মেরে ফেলব? ওদের মারার অন্য উপায় আছে। এখন আর দেরি না করে সকলের উচিত নিজেদের শিবিরে ফিরে যাওয়া, বুঝতে পেরছ?’

সঙ্গেসঙ্গে খাড়াপাহাড় তার অনুচরদের হুকুম দিল, নিজেদের শিবিরে ছুটে যেতে। খাড়াপাহাড়ের নির্দেশ পেয়ে তার বাহিনীর সবাই পালিয়ে গেল। ওদের পালাতে দেখে জয়শীল বেঁটেদের সেনাপতিকে বলল, 'সেনাপতি, এই হল সুবর্ণ সুযােগ। ওই সুযােগে যারা ছুটে ছুটে নাবছে তাদের উপর এখান থেকে পাথর ছুঁড়ে মার। ওরা যত নীচে নাববে এখান থেকে ছােড়া পাথরগুলাে ওদের উপর তত জোরে পড়বে। যার উপরে পড়বে সে ঠিক মরবে।'

শত্রুকে পালাতে দেখে বেঁটেদের সেনাপতির উৎসাহ উদ্দীপনা বেড়ে গেল। তার সাহসও বাড়ল অনকগুণ। সে তার বাহিনীর উদ্দেশে জোরে জোরে। বলল, 'ওহে শােনাে, অত বড়াে যে নরদানব, সে-ও পালিয়ে যাচ্ছে, দেখেছ, ওদের সেনাবাহিনী কীভাবে পালাচ্ছে? এখন তােমরা যত পার ওদের উপর বড়াে বড়াে পাথর ছুঁড়ে মার।'

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক খাড়াপাহাড় ও কৃপাণজিতের গতিবিধি লক্ষ করল।

সিদ্ধ সাধক ত্রিশূল উপরে তুলে ‘জয় মহাকাল’ বলে জয়শীলকে বলল, 'জয়শীল, আর এখানে সময় নষ্ট করা ঠিক নয়। চল, ওই খাড়া পাহাড়কে মেরে ফেলি। কৃপাণজিতকে ছাড়ার কোনাে মানে হয় না। ওর কবলে যে নরদানব আছে তাকে। এরা সবাই ভয় করে। অতএব, তাকে মেরে ফেললে এদের ভয় কেটে যাবে। ওই একটি নরদানবের জন্যই এরা সবাই ভয়ে গুটিয়ে এতটুকু হয়ে আছে।'

সিদ্ধ সাধকের কথা শুনে জয়শীল হেসে বলল, ‘সাধক, শত্রুকে অত ছােটো করে দেখার কোনাে কারণ নেই। পথে ওদের উপর আক্রমণ করা আর ওদের শিবিরে গিয়ে আক্রমণ করার মধ্যে পার্থক্য আছে। তার চেয়ে বড়াে কথা, ওদের উপর এইধরনের আক্রমণ করা বা ওদের মেরে ফেলার প্রয়ােজন আমাদের আছে কি না? আমি ভাবছি ওদের দু-দলের মধ্যে কীভাবে মিটমাট করা যায়।'

‘সে কি! আমি এখন এই ধরনের কিছু তাে ভাবছি না। ওদের কথা না-হয় বাদ দিলাম কিন্তু কৃপাণজিতকে কি ছাড়া হবে? ওই নরদানবকে চোখের সামনে দেখেও তাকে ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক হবে? বিশেষ করে নরদানব যখন নিজের ইচ্ছামতাে কিছু করছে না, করছে ওই শয়তানের নির্দেশে ? চারদিকের অবস্থা যা দেখছি কৃপাণজিতকে ছেড়ে দিলে ও হয়তাে কিছুদিনের মধ্যেই এখানকার সম্রাট হয়ে বসবে।' সাধক বলল।

জয়শীলের জবাব দেওয়ার আগেই বেঁটেদের সেনাপতি এসে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, 'আপনাদের নিদের্শ এবং সহযােগিতা থাকলে এক্ষুনি আমরা ওদের শিবির আক্রমণ করতে পারি। ভালােভাবে একবার আক্রমণ করলে আমাদের ভবিষ্যতের আর কোনাে দুর্ভাবনা থাকবে না। এখন আপনাদের নির্দেশ চাই।'

জয়শীল চারিদিকে একবার তাকিয়ে বলল, 'সেনানায়ক, তােমার সাহস এবং উদ্যম নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। যত জনকে পেরেছ মেরেছ। বাকিরা এতক্ষণে হয়তাে নিজেদের শিবিরে পৌঁছে গেছে। এখন আমরা গিয়ে আক্রমণ করলে। কিছুটা রক্তপাত হতে পারে। কিন্তু জয় যে নিশ্চিত এমন কথা বলা যায় না।'

'তাহলে এখন কী করতে বলেন ?' সেনাপতি জিজ্ঞেস করল।

‘এখন সবাই পাহাড় থেকে নীচে নেমে রানির কাছে যাও। তােমরা যে-যার শিবির সামলাও। এখানে আমরা শত্রুকে যেভাবে আক্রমণ করার কথা ভাবছি শত্রুও তাে আমাদের উপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা করতে পারে? তােমরা শুধু আক্রমণের কথাই ভাবছ, আক্রান্ত হওয়ার জন্যও প্রস্তুত হও। এগােও আমরা যাচ্ছি।' জয়শীল বলল।

জয়শীল সেখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। সাধক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বলল, 'কী ব্যাপার জয়শীল, তুমি নড়তে চাইছ না, আমাদের সময় কাটানাে কি ঠিক হচ্ছে?’

‘আমরা তাে ইচ্ছে করে এখানে আসিনি সাধক। ওই কুমির রূপধারী মকরকেতুর জন্যই আমাদের এই ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। হিরণ্যপুরের রাজা কনকাক্ষ নিশ্চয় আমাদের অপেক্ষায় প্রতিমুহূর্ত কাটাচ্ছেন। তবে এখান থেকে ফেরার আগে কৃপাণজিতকে মেরে ফেলতে চাই।' বলল জয়শীল।

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক যেখানে কথা বলছিল সেখান থেকে সামান্য দূরে, গাছের আড়ালে খাড়াপাহাড় ও কৃপাণজিৎ আলােচনা করছিল। ওরা একে অন্যের উপর দোষারােপ করে নিজেদের মধ্যে রাগারাগি করছিল। ‘আপনার শরীরটা বিরাট, কিন্তু এত বড়াে শরীরের ভেতরে যে মনটা আছে সেটা তত সাহসী নয়। আমাদের চেয়ে আপনি পালানাের জন্য বেশি আগ্রহী ছিলেন। আপনি বলেছিলেন, এই নরদানবটি আপনার কথামতাে চলে। কিন্তু এটি আপনাকেই মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল।' খাড়াপাহাড় বলল।

তার কথা শুনে কৃপাণজিৎ দাঁত কটমট করতে করতে বলল, 'ওহে অন্ধ পাহাড়, আমি শত্রুর কাছ থেকে পালাতে চাইনি। শত্রুকে আক্রমণ করার সুযােগের অপেক্ষায় থাকতে হয়। নরদানব আমার কথা শােনে। প্রমাণ এক্ষুনি দিতে পারি।' বলতে বলতে সে ইশারা করল।

নরদানব তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গিয়ে খাড়াপাহাড়কে দু-হাতে তুলে ভয়ংকরভাবে গর্জন করতে লাগল। দূর থেকে খাড়াপাহাড়ের দলের লােক এই দৃশ্য দেখে ভাবল, তাদের নেতাকে নরদানব মেরে ফেলছে। ওরা তৎক্ষণাৎ হাতের কাছে যা পেল তাই নিয়ে নরদানব ও কৃপাণজিতের কাছে ছুটে এল।

ষােল

খাড়াপাহাড়ের উপর নরদানবকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে তার দলের লােকজন অস্ত্র হাতে কৃপাণজিতের দিকে ছুটে এল। ওরা যতই অক্ষম হােক ওদের বিরুদ্ধে একা লড়ার সাহস কৃপাণজিতের ছিল না। অপরপক্ষে নিজেদের নেতাকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে ওরা জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিল।

ওরা এসে কৃপাণজিতকে ঘিরে ফেলল। সে তখন হাসিমুখে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তােমাদের ভয় পাবার কিছু নেই। নরদানব আমার কথামতাে চলে কি না তা তােমাদের নেতাকে দেখাচ্ছিলাম।' বলতে বলতে সে তাকে ছাড়িয়ে নিজের কাছে ধরে রাখল।

খাড়াপাহাড় প্রাণের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আস্তে আস্তে একটা ঢিপির উপর বসল। সঙ্গে সঙ্গে তার অনুচররাও তাকে ঘিরে বসল। ওরা তার নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল। খাড়াপাহাড় ভাবতে লাগল, ‘অজানা লােকের সাহায্য নিতে গিয়ে আমি তাে আচ্ছা বিপদে পড়েছি। কিছুক্ষণ পরে নিজের অনুচরদের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে খাড়াপাহাড় বলল, 'ওহে, আমি যা বলছি, কান খাড়া করে শােনাে। ওই বিশাল দেহী লােকটা তার ওই পােষা জন্তুটাকে পাশে নিয়ে কটমট করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর কাছে যতক্ষণ ওই ভয়ংকর জন্তুটা আছে ততক্ষণ সামনাসামনি ওকে জব্দ করা যাবে না। যেকোনােভাবে ওর কাছ থেকে ওই জন্তুটাকে সরাতে হবে। তারপর আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করে ওকে খতম করতে পারব।'

‘কথাটা তাে ভালােই। কিন্তু ও তাে সবসময় ওই নরদানবকে সঙ্গে নিয়েই ঘােরে। কীভাবে আলাদা করা যাবে?’ একজন অনুচর জিজ্ঞেস করল।

‘এই লােকটাকে মেরে ফেললে রানির লােক আমাদের উপর আক্রমণ চালাবে। ইদানীং ওর দলে আবার দুটো লােক সামিল হয়েছে। ওদের দেহ রাক্ষসের মতাে বিশাল। ওরা সবসময় রানির কাছাকাছি থাকে।' আর এক অনুচর বলল।

খাড়াপাহাড় প্রশ্নকারীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগের স্বরে বলল, ‘মরতেই যদি হয় স্বজাতির হাতে মরব। শুধু তাই নয়, আমরা যদি রানির কাছে মিলেমিশে থাকার প্রস্তাব দিই উনি কি আমাদের উপর আক্রমণ করবেন? কখনােই না।'

‘আমাদের উচিত এক্ষুনি রানির কাছে গিয়ে এক হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া।' অন্য এক অনুচর বলল।

খাড়াপাহাড় হাতের কাছে যে লাঠিটা পেল সেই লাঠিটা তুলে নিয়ে ওই লােকটার পিঠে বসিয়ে দিয়ে তাকে সতর্ক করে দিল। এতক্ষণ কৃপাণজিৎ ওদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আর থাকতে না পেরে আস্তে আস্তে ওদের কাছে এসে দাঁত কটমট করতে করতে বলল, 'কী ভাবছ? হঠাৎ আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাও? ? বল, সাহস থাকে তাে সত্য কথা বল।

খাড়াপাহাড়, নিজের দলের অনুচরদের চুপ করে থাকার ইশারা করে দাঁড়িয়ে কৃপাণজিৎকে বলল, আপনি যা ভাবছেন তা ঠিক নয়। রানির দল এখন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাই ভাবছি, ওদের বিরুদ্ধে আর যুদ্ধ না করে রাতারাতি অন্য কোথাও পালিয়ে যাব কি না। কেউ পালাতে চায়, কেউ চায় না। যারা চায় না তারা নিজেদের মত জানাচ্ছে। অন্যেরাও যাওয়ার পক্ষে কথা বলছে।'

ওর কথা শুনে কৃপাণজিতের ভয় করল। বনে ঘােরার জ্বালা যে কী ধরনের তা সে জানে। তা ছাড়া এখন ওরা যদি তাকে ছেড়ে যায় জয়শীল তাকে আস্ত রাখবে না। এসব কথা ভেবে কৃপাণজিৎ ভদ্রভাবে নম্রস্বরে বলল, খাড়াপাহাড়, আমি তােমার ভালাে বই মন্দ করব না। আমি ঠিক করেছি। আজ রাত্রের মধ্যে তােমাদের চিরশত্রু ওই রানি আর তার দুটো অনুচরকে শেষ করে ফেলব। আজ ঠিক মাঝরাত্রে তােমাদের মধ্যে যারা খুব সাহসী তারা আমার সঙ্গে থাকবে। আমার এই ভয়ংকর জীবটি ওদের ঘুমন্ত অবস্থায় আক্রমণ করবে। শত্রু যখন অসহায় অবস্থায় থাকবে তখনই তাদের আক্রমণ করা উচিত। রানি আর ওই দুটো অনুচর সহ কয়েক জনকে মেরে ফেললে তুমিই হবে এই বিরাট অঞ্চলের রাজা।'

বলে কৃপাণজিৎ নরদানবকে মেরে চাঙা করে তুলল।

হঠাৎ মার খেয়ে জন্তুটি কৃপাণজিতকে পালটা মার দিতে গিয়ে তার হাতের তরবারিটা উঁচিয়ে থাকতে দেখে থমকে দাঁড়াল।

কৃপাণজিতের কথা শুনে আর ওই জন্তুর আচরণ দেখে খাড়াপাহাড় বলল, ‘বেশ বােঝা যাচ্ছে আপনার এই জন্তুটি আপনার সবকথা শুনতে চায় না। আপনি ওকে আর একটু আদর দিলে ও হয়তাে আপনার কথামতাে চলত।'

‘আদর! জন্তুকে আদর! আদর দিয়ে জন্তুর কাছ থেকে কাজ পাওয়া যায় না। ভয় দেখালেই সবাই কাজ করে। মারলে আরও বেশি করে কাজ পাওয়া যায়। আমি এখন আমার এই জন্তুকে নিয়ে বিশ্রাম করতে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি আমার আর এই জন্তুর খাবার পাঠিয়ে দাও।' কৃপাণজিৎ গম্ভীর গলায় এই কথা বলে চলে গেল।

‘খাবার সব রাখা আছে।' বলল একজন অনুচর।

কৃপাণজিৎ নিজের আস্তানায় খেতে বসে চিৎকার করে বলল, ‘সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত আমাকে কেউ ডেকে তুলবে না। আমি ঘুমােব। সারারাত আমাকে জাগতে হবে। ঠিক মাঝরাত্রে শত্রুর উপর আক্রমণ করা হবে।' খাড়াপাহাড় খুব খুশি হয়ে মাথা নেড়ে বলল, 'শােনাে, যে কথা বলছিলাম, আমরা যদি কৃপাণজিতকে আক্রমণ করি, তা যদি নরদানব আগে জেনে যায় সে নিজেই পালাবে। আমাদের আক্রমণ করবে না। এখন প্রশ্ন হল, কৃপাণজিতের তরবারিটা কীভাবে কেড়ে নেওয়া যায়। সেটাও সম্ভব। প্রথমেই তরবারি কেড়ে নিতে হবে।' বলে কয়েক জন সাহসী অনুচরকে নিয়ে সে চলে গেল।

দু-তিন ঘণ্টা পরে হঠাৎ কৃপাণজিতের ঘুম ভেঙে গেল। উঠে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সে বলল, বাইরে কে রে? পচা তেলের গন্ধ বেরােচ্ছে কোত্থেকে? রেড়ির তেল নাকি! কে বাইরে?’

একজন অনুচর বাইরে থেকে বলল, 'আজ্ঞে এটা রেড়ির তেল নয়। অন্য জিনিসের তেল। তেলটা ছড়ানাে হয়েছে এখানে। এই তেলের গন্ধ থাকলে মশা-মাছি, পােকামাকড় আসে না। ওসব থাকলে আপনার ঘুম হবে না। সেইজন্যই এই তেল দেওয়া হয়েছে। খাড়াপাহাড়ের নির্দেশে এই তেল ছড়ানাে হয়েছে।'

তাই বল। ঠিক আছে ছড়াও, আরও ছড়াও।' বলে হাই তুলে কৃপাণজিৎ আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ওর ঘরের দরজার কড়ার সঙ্গে বাঁধা ছিল নরদানব। সে ওই তেলের গন্ধ সহ্য করতে না পেরে ছটফট করতে লাগল। কৃপাণজিৎ নাক ডেকে ঘুমােতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে খাড়াপাহাড় কয়েক জন অনুচর সহ সেখানে এল। তার ইশারায় একটা লােক ভেতরে ঢুকে, পা টিপে টিপে গিয়ে, তরবারিটা নিয়ে বেরিয়ে এল।

তরবারিটাকে হাতে নিয়ে খাড়াপাহাড় বলল, 'এই অস্ত্র আমরা তুলতে পারি কিন্তু ইচ্ছেমতাে ব্যবহার করতে পারব না।' বলে ওই অনুচরের হাতে তরবারিটা দিয়ে দিল।

পরিকল্পনা মতাে খাড়া পাহাড়ের লােকজন ঠিক সময়ে বল্লম নিয়ে হাজির হল।

সে সকলের দিকে এবার তাকিয়ে বলল, ‘এখন হয় আমরা বাঁচব, না হয় এই দুরাত্মাটা বাঁচবে। এবার আগুন ধরিয়ে দাও। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেই তাকে বল্লম দিয়ে আক্রমণ কর। নরদানব হয়তাে শেকল ছিঁড়ে পালাতে পারবে না। সে যদি পুড়ে মরে মরুক।'

খাড়াপাহাড়ের নির্দেশ পেয়েই চার দিক থেকে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। ঘরটা ছিল পাতার। পাতায় পাতায় ছড়ানাে ছিল তেল। আগুন ধরানাের সঙ্গেসঙ্গে দাউ দাউ করে গােটা ঘরটা জ্বলতে লাগল।

আগুনের আঁচ লাগার সঙ্গেসঙ্গে কৃপাণজিৎ উঠে চিৎকার করে বলল, 'এ ধােকাবাজির প্রতিশােধ নেব।'

বলে সে তরবারি খুঁজতে লাগল। তরবারি না পেয়ে সে ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল। এমন সময় একটা জ্বলন্ত কাঠ তার ঘাড়ে পড়ল। এদিকে নরদানব ভয়ংকর আওয়াজ করতে করতে টান মেরে শেকল ছিঁড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

শেকল ছেড়ার সঙ্গেসঙ্গে কৃপাণজিৎ নরদানবের শেকলটা ধরে ফেলল। ফলে এক লাফে জন্তুটা বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে-ও ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ঘরের বাইরে সে যখন পড়ল তখন তার হাত থেকে শেকলটা ছুটে গেল।

নরদানব ও কৃপাণজিতকে একসঙ্গে ঘরের বাইরে আসতে দেখে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা খাড়াপাহাড়ের অনুচররা প্রথমে ভয় পেল। কিন্তু পরক্ষণেই ওদের সাহস বেড়ে গেল। ওরা লক্ষ করল, ছাড়া পেয়ে নরদানব পালাচ্ছে। খাড়াপাহাড় চিৎকার করে বলল, 'ওই জন্তুটাকে কেউ বাধা দেবে না। সে যেখানে যাচ্ছে যাক। এই দুরাত্মাকে কিন্তু ছেড়াে না। বল্লম চালাও, আক্রমণ কর, মেরে ফেল।' বলে সে চিৎকার করতে লাগল।

অন্যদিকে অতগুলাে লােককে বল্লম হাতে দেখে নরদানব ভীষণ ভয় পেয়ে যাকে হাতের কাছে পেল তাকেই ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। এই অবস্থায় খাড়াপাহাড়ের অনুচররাও যেভাবে আক্রমণ করবে ভেবেছিল সেভাবে পারল না। তাদের মনে ভয় ঢুকে গেল। আর ভয় অমন জিনিস যা একবার মনে ঢুকলে আর বেরােতে চায় না।

এই গােলমালের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধা হল কৃপাণজিতের। সে আশেপাশে যেকোনাে অস্ত্রের খোঁজ করতে লাগল। হঠাৎ তার হাতে পড়ে গেল গাছের একটি শুকনাে ডাল। সে ঝট করে ওই ডাল হাতে নিয়ে জোরে চিৎকার করে। যাকে সামনে পেল তাকেই প্রচণ্ড জোরে আঘাত করতে লাগল। খাড়াপাহাড়ের লােকও, এই অবস্থায় মরণপণ করে বল্লম দিয়ে তাকে আক্রমণ করতে লাগল।

সেখানকার আগুনের শিখা দেখে কোলাহল শুনে নবাগত দুটো লােক কৌতুহলী হল ব্যাপারটা জানার জন্য। অত রাত্রে, গভীর বনে আগুন দেখে এবং চিৎকার শুনে ওই দুজন ঘটনাস্থলের দিকে এগােতে লাগল। ওরা বসেছিল দুটো অদ্ভুত জন্তুর উপর। জন্তুগুলাে টাট্ট ঘােড়ার মতাে। গায়ের চামড়ায় অসংখ্য মাছের আঁশ যেন লেগে রয়েছে। ওই লােক দুটোর গায়ে মাছের চামড়ার তৈরি পােশাক। ওদের দেখেই মনে হয় মকরকেতুর লােক। ওদের দুজনের হাতেই অস্ত্র ছিল।

মকরকেতু যেমন সুঠাম ও সুদৃঢ় ছিল এই দুজনের দেহেও সেই তেজ সেই ক্ষমতা বর্তমান বলে মনে হয়। মকরকেতুর বাহন ছিল বিচিত্র ধরনের হাতি। তার দাঁতগুলােও ছিল অদ্ভুত ধরনের আর এদের বাহন ঘােড়া। তবে ঘােড়ার গায়ে এই ধরনের চামড়া আগে নজরে পড়েনি।

অরণ্যে নবাগত এই দুজনের চোহারা, চলাফেরা দেখে মনে হয় ওরা বিশেষ কোনাে উদ্দেশে ঘােরাঘুরি করছে। মাঝে মাঝে তাদের চোখে মুখে উদবেগ ও আশঙ্কার ছাপ পড়ছিল।

সতেরাে

গভীর বনে ওই বিচিত্র দুটি লােক অবাক হয়ে এসব কিছু দেখে একজন আর একজনকে বলল, 'ওরে দাদা, সর্পনখা, নিশ্চয় কোনাে শত্রু ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। হয়তাে ইতিমধ্যেই লােকটার সর্বনাশ হয়েছে।'

এই কথায় সর্পনখা একটুও বিচলিত না হয়ে বলল, 'কার কী সর্বনাশ হল তা নিয়ে আমাদের কি দরকার সর্পস্বরা? আমরা কোন জগতের লােক আর এটা কোন জগৎ? এখানে যার যা ইচ্ছা করে যাক আমাদের কী। আমরা কেন যে এই বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি ভেবে পাই না। এত হেঁটেছি যে পায়ের চামড়া খসে যাবে।' ‘তােমার কথা ঠিক। কিন্তু এরকম একটা দৃশ্য দেখে কারণটা না জেনে যাওয়া যায়?’ বলে সর্পস্বরা ঘােড়ার উপর দাঁড়িয়ে, ঝট করে একটা লাফ দিয়ে গাছের ডালে ঝুলতে ঝুলতে ওই ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল, 'দাদা, অদ্ভুত একটা জন্তু আছে ভেতরে। ঠিক নরদানবের মতাে। এ জিনিস দেখে কেটে পড়া যায় না। একটা লােকও সেখানে আছে দেখছি।'

'তাহলে ওই নরদানব আর লােকটাকে ধরতে হবে তাে! আমাদের হারিয়ে যাওয়া লােকটার খবর হয়তাে ওই লােকটার কাছে পাওয়া যাবে।' তারপর সর্পস্বরা ঘােড়ায় দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। কিছুক্ষণ পরে দুজনে একসঙ্গে ওই ঘরের কাছে গেল। গিয়ে দেখল নরদানব ঘরের সমস্ত খুঁটি নাড়তে নাড়তে ঘর থেকে বেরােনাের চেষ্টা করছে। আর কৃপাণজিৎ ঘর থেকে বেরুতে গিয়ে খাড়াপাহাড়ের লােকের হাতে ধরা পড়ে। ওরা তার উপর আক্রমণ করছিল।

‘দাদা, আমি এই নরদানবকে উদ্ধারের চেষ্টা করছি। তুমি ওই বিরাটাকায় মানুষটাকে বন্দি কর।' বলে সর্পস্বরা নিজের ঘােড়াটাকে নরদানবের দিকে ছােটাল।

সর্পনখা গাছের লম্বা লতা দিয়ে কৃপাণজিতের গলা জড়িয়ে চিৎকার করে বলল, 'জয়, মায়া সরােবরেশ্বরের জয়।'

বিচিত্র ধরনের দুটো লােককে দেখে কৃপাণজিৎ ও খাড়াপাহাড়ের লােক অবাক হয়ে গেল। সর্পনখা যে লতা দূরে থেকে ছুঁড়েছিল তা চাবুকের মতাে কৃপাণজিতের গলা জড়িয়ে রইল। ওই লতা ধরে দু-একবার টান দিতে-না-দিতেই কৃপাণজিৎ আর্তনাদ করে উঠল, 'না না, আমাকে মের না। তােমাদেরই মতাে বিত্রিত ধরনের লােককে আমি অনেক সাহায্য করেছি। দয়া করে আমাকে মের না।'

তার এই কথা শুনে সর্পনখা অবাক হয়ে বলল, 'তাহলে তুমি মকরকেতুর খবর রাখ? অত বড়াে একজন যােদ্ধাকে তােমার সাহায্য নিতে হল কেন?

নিশ্চয় কোনো বড়ো ধরনের বিপদে সে পড়েছে! মকরকেতু এখন কোথায়?’

কৃপাণজিৎ জোড়হাত করে বলল, 'আগে গলায় যা জড়িয়েছ তা সরিয়ে নাও। আমার গলা দিয়ে কথা বােরােচ্ছে না। এত শক্ত করে গলাটা বাঁধা থাকলে কথা কী করে বলব?’

‘ঠিক আছে, বাঁধন খুলে দিচ্ছি। তবে তুমি যদি কোনােরকম পালানাের চেষ্টা কর তাহলে কিন্তু রক্ষে পাবে না। আমার হাতের এই লতার অনেক গুণ। পালানাের চেষ্টা করলে এটা আবার তােমার গলা জড়িয়ে ধরবে।' সর্পনখা গম্ভীর গলায় বলল।

কৃপাণজিৎ ছাড়া পেয়ে গলায় হাত বুলিয়ে, ঠিক আছে কি না দেখে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বলল, 'দেখুন, সত্যি কথা বলতে কী, মকরকেতু এখন যে ঠিক কোথায় আছেন আমি তা জানি না। তবে দুটো লােক মকরকেতুকে খুব কষ্ট দিয়েছে। সেটা আমি স্থানীয় লােকের কাছে শুনেছি। ওদের একজনের নাম জয়শীল। ওর সঙ্গে যে আছে সে একজন কাপালিক। এই বনের বাসিন্দাদের মুখে খবরটা শুনলাম।'

এই কথা শুনে সর্পনখা রক্তচক্ষু করে বলল, 'ওহে ধােকাবাজ, আমি তােমাকে কী জিজ্ঞেস করছি আর তুমি কী জবাব দিচ্ছ। আমার প্রশ্ন হল মকরকেতু এখন কোথায়? তােমার সাহসের বলিহারি আমার প্রশ্নের সঠিক জবাব না দিয়ে তুমি আজেবাজে কথা বলছ কেন?’

মারা যাওয়ার ভয়ে মকরকেতুর খবর দিতে রাজি হলেও কৃপাণজিৎ কিন্তু তাকে কোনােদিন দেখেনি। তবে মকরকেতুর সম্পর্কে সে বনে ঘােরার সময় লােকের মুখে শুনেছিল।

একটা মিথ্যা কথাকে ঢাকতে গিয়ে অন্য মিথ্যা কথা বলতে হয়। এবার যে কোন মিথ্যা কথা বলে পার পাওয়া যায় তা কৃপাণজিৎ ভাবতে লাগল। এমন সময় খাড়াপাহাড়ের লােক একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। সর্পনখা ওদের উপর রেগে গিয়ে কটমট করে ওদের দিকে তাকাল। তখন খাড়াপাহাড় নমস্কার করে বলল, 'ওহে জলজ ঘােড়ার আরােহী, এই পাজি লােকটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আপনি আপনার সাথীর কথা ভুলে গেছেন। তার অবস্থা যে কী হয়েছে একবার দেখে নিন। খাড়াপাহাড়ের কথা শুনে সর্পনখার মনে পড়ল ছােটো ভাইকে। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে চিৎকার করে ডাল, ‘ভাই সর্পস্বরা! তুমি কোথায়? নরদানবটা কোথায়?’

বার বার ডেকেও সাড়া না পেয়ে সর্পনখা দাঁত কটমট করতে করতে সকলের দিকে তাকাল। লক্ষ করল খাড়াপাহাড়ের লােকজন মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

এই অবস্থায় ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সর্পনখা ভীষণ রেগে গিয়ে বলল, 'তােমরা এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন? কী হয়েছে? বল, তাড়াতাড়ি বল।'

খাড়াপাহাড় সবিনয়ে বলল, 'হে জলজ ঘােড়ার আরােহী, আপনার ভাই এবং নরদানব একসঙ্গে ঝােপের ভেতর ঢুকে গেছে। মনে রাখবেন, ওই নরদানবটি এই বদমাইস লােকটার পােষা জন্তু। এই লােকটার মন বােঝে সে। এ যে কখন কী বলবে তা সে জানে। তাই অনেক সময় বলার আগে সে কাজ করে। আপনার ভাইকে ধরে কাঁধে ফেলে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল এই লােকটা। ইশারায় নির্দেশ দিয়েছিল বলেই আপনি টের পাননি।'

‘এত বড়াে মারাত্মক খবর তুমি বেশ ঠাণ্ডা মাথায় বলে যাচ্ছ তাে!’ বলতে বলতে যে লতা দিয়ে কৃপাণজিতের গলা জড়িয়েছিল সেটা আবার তার গলায় জড়িয়ে তার অন্য প্রান্ত খাড়াপাহাড়ের হাতে দিয়ে বলল, 'এই নাও, এটা ধর। আমি ঝট করে ওই নরদানবকে মেরে ফেলে, ছােটো ভাইকে উদ্ধার করে ফিরছি। এসে যদি দেখি এই লােকটাকে তােমরা ছেড়ে দিয়েছ তাহলে আর রক্ষে থাকবে না।’ বলে সর্পনখা ওই ঝােপের দিকে দ্রুত চলে গেল।

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধকের জানার ইচ্ছা করল খাড়াপাহাড়দের অবস্থা। কিন্তু তখন তারা ছিল পাহাড়ের অন্যপ্রান্তে। খাড়াপাহাড় যেভাবে জিদ ধরে কৃপাণজিতকে হত্যা করার জন্য এগিয়ে গেল তাতে অন্যের মনে কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক। যে দু-জন তাদের এগিয়ে দেওয়ার জন্য এসেছিল তাদের খবর জেনে আসতে পাঠাল জয়শীল।

ওই দু-জন অনুচর খাড়াপাহাড় ও কৃপাণজিৎ যেখানে মুখােমুখি লড়ছিল সেখানে এসে অনেকক্ষণ ধরে ওদের লড়াই দেখে উপভােগ করল। তারপর ওরা অবাক হয়ে দেখল বিচিত্র ধরনের দুটো লােককে সেখানে আসতে। ওরা যখন এল তখন কৃপাণজিতের ঘর জ্বলছিল।

খাড়াপাহাড়ের সঙ্গে কৃপাণজিতের যুদ্ধ হচ্ছে শুনে বেঁটেদের সেনাপতি খুব খুশি হল। এই খবরটা তাড়াতাড়ি জয়শীলকে জানাবার জন্য সে দু-পা এগােতেই লক্ষ করল অদ্ভুত ধরনের দুটো লােক ঘােড়ায় চেপে এসে অদূরে দাঁড়াল।

ওদের আর ওদের ঘােড়ার দিকে তাকিয়ে বেঁটেদের সেনাপতি খুব অবাক হল। চোখ বড়াে বড়াে করে সে দেখল একজন দড়ির মতাে কী একটা ছুঁড়ে দিয়ে কৃপাণজিতের গলায় জড়িয়ে টান দিচ্ছে। অন্যজন নরদানবের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

মহানন্দে বেঁটেদের সেনাপতি অনুচরদের সেখানেই বুঝিয়ে বলল, 'দেখ, খাড়াপাহাড়ের সমস্ত লােকজনকে শেষ করার এই হচ্ছে সুবর্ণ সুযােগ। আর এক মুহুর্ত এখানে অপেক্ষা করব না। যাই, তাড়াতাড়ি আমাদের রানিকে বলে। আসি। শুধু রানিকে জানালেই হবে না, জয়শীল ও সিদ্ধ সাধককে জানিয়ে আসতে হবে। তােমরা এখান থেকে নড়বে না। লক্ষ রাখবে ওদের উপর।' বলে বেঁটেদের সেনাপতি ছুটে বেরিয়ে গেল।

ওই সেনাপতির মুখে ঘটনার বিবরণ শুনে জয়শীল খুশি হল। আর সিদ্ধ সাধক মহানন্দে লাফিয়ে উঠে বলল, 'জয় মহাকাল! জয়শীল, আর আমাদের কোনাে ভয় নেই। ঘােড়াগুলাে যখন বিচিত্র ধরনের তখন লােকগুলাে নিশ্চয়ই মকরকেতুর লােক। মকরকেতুকে আমরা হাতে পেয়েও হারিয়েছি। এদের হারাব না। এদের ধরেই আমরা মায়া সরােবরেশ্বরের সন্ধান পাব। তারপর কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়ে— কাঞ্চনবর্মা ও কাঞ্চনমালার খোঁজ পেতে আমাদের একটুও দেরি হবে না। আমরা সহজেই উদ্ধার করে রাজার কাছে ওদের নিয়ে যেতে পারব।'

উৎসাহের সঙ্গে এতগুলাে কথা বললেও জয়শীল কোনাে কথা না বলায় সিদ্ধ সাধক কিছুটা বিরক্ত হয়ে তাকে বলল, 'কী হল জয়শীল, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ না?’

এই প্রশ্ন শুনে সিদ্ধ সাধকের উৎসাহের আগুনে যেন ছাই পড়ল। সে বিড়বিড় করে বলল, 'দেখ জয়শীল, প্রত্যেকটা ব্যাপারে তুমি গােড়াতেই যদি এই ধরনের প্রশ্ন কর তাহলে আমাদের সারাজীবন এই বনে ঘুরে বেড়াতে হবে। এখানেই আমরা বুড়াে হয়ে যাব।'

'না না, অত ভেঙে পড়ছ কেন? বুড়াে বয়েসে তুমি শহরের বিরাট ভবনে থাকতে পারবে। আমি ভাবছি, ওই দু-জনকে ধরা যাবে কী করে? ওরা যদি মকরকেতুর লােক হয় তাহলে কি ওদের ধরা অত সহজ হবে?’ জয়শীল বলল।

তার কথা শুনে সিদ্ধ সাধক ত্রিশূলটাকে মাটিতে খপ করে গেথে বলল, 'দেখ, জয়শীল ওদের কীভাবে ধরা যাবে তা আমি ভেবে ঠিক করতে পারব না। সে ভাবনা তােমার।'

জবাবে জয়শীল বলল, 'ঠিক আছে, সে না হয় আমি ভাবব। কিন্তু তুমি তােমার ত্রিশূলটাকে মাটিতে গেঁথে ফেললে কেন? তােমার মন্ত্রশক্তি কী কাজ করছে না?’

সিদ্ধ সাধক কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘জয়শীল, তুমি তাে জানাে। পুরােপুরি মন্ত্রশক্তি পাওয়ার আগেই বাধা পড়ল।'

'তা অবশ্য ঠিক।’ বলে জয়শীল এদিক-ওদিক তাকিয়ে বেঁটেদের সেনাপতিকে বলল, ‘সেনাপতি, কয়েক জনকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে আসতে পারবে?’

‘আমি তাে আপনার হুকুম পালন করার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছি। ওই দেখুন লােকজন আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে।' বলে সেনাপতি কয়েক জনকে ইশারা করল।

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক এগিয়ে গেল। তাদের সঙ্গে রইল সেনাপতি এবং তাদের লােকজন। হঠাৎ ওদের কানে গেল নরদানবের ভয়ংকর আর্তনাদ। যেদিক থেকে আওয়াজ এসেছিল সেদিকে জয়শীল সহ সবাই তাকাল। নরদানব লাফাতে লাফাতে কাঁধে একজনকে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল। কাঁধের লােকাট মৃত কি জীবিত বােঝা যাচ্ছিল না।

সিদ্ধ সাধক বলল, ‘জয়শীল, আমার মনে হচ্ছে এই লােকটা ওদের একজন।'

জয়শীল বলল, 'তাহলে অন্যজন কৃপাণজিতের হাতে মরে গেছে।'

তাদের কথা শেষ হতে-না-হতেই সর্পনখাকে জোরে জোরে ডাকতে শােনা গেল, ‘সর্পস্বরা! তুমি কোথায়? জয়শীল বলল, ‘সবাই লুকিয়ে পড়। যেকোনােভাবে এই লােকটাকে ধরতে হবে।'

আঠারাে

সর্পনখা একটি বড়াে গাছের নীচে এসে, তার ঘােড়াটিকে থামিয়ে চারদিকে একবার তাকিয়ে নিল। যেদিকে তাকায় গাছ আর গাছ। তাের ছােটো ভাই যে কোথায় আছে, এই গাছের ঝােপে-ঝাড়ে যে কোথায় লুকিয়ে আছে তা সে বুঝে উঠতে পারল না। সর্পনখা এবারে আরও জোরে ডাকল, ‘সর্পস্বরা।'

ডাক দিয়েও সে সাড়া পেল না। সর্পনখার মন ভেঙে গেল। ভীষণ রেগে গিয়ে তরবারি বের করে একটি গাছে গেঁথে চিৎকার করে বলল, 'আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমার ছােটো ভাইকে খুঁজে পাচ্ছি না। তাকে যদি কেউ মেরে ফেলে থাকে, সেই হত্যাকারীকে আর তার মালিককে আমি খতম না করে এই অঞ্চল ছেড়ে যাব না।'

ওই গাছের আড়ালে দাঁড়িয়েছিল জয়শীল। সর্পনখার শপথ শুনে সে খুশি হয়ে সিদ্ধ সাধককে বলল, 'সাধক, এই সর্পনখার প্রতিজ্ঞা শুনেছ তাে? অরণ্যকে সাক্ষী রেখে সে প্রতিজ্ঞা করেছে। আমি নিশ্চিত, সে এই প্রতিজ্ঞা পালন করবে।'

'জয়শীল, ছােটো ভাইয়ের খোঁজ না পেয়ে সে যা মুখে আসছে তাই বলছে। যাই হােক, এখন তাহলে তাকে ধরার ব্যাপারটা কী হবে?’ সিদ্ধ সাধক জিজ্ঞাসা করল।

সর্পনখার মন এখন ভেঙে গেছে। তাকে এখন বন্দি করা বৃথা। তার কোনাে প্রাণের ভয় নেই। তাকে ধরতে হলে সতর্কতার সঙ্গে ধরতে হবে…'

জয়শীল এইসব কথা ভেবে সিদ্ধ সাধককে বলল, 'সাধক, এদের চেহারা আর চালচলন সাধারণ মানুষের মতন নয়। তাই একে ধরার কায়দাকানুন তুমিই ভালাে জানাে। জীবিত অবস্থায় একে ধরা নির্ভর করছে মায়া সরােবরে আমারা পৌঁছাতে পারব কি না তার উপর। এ যদি জীবিত অবস্থায় ধরা না পড়ে আমরা আদৌ মায়া সরােবরে পৌঁছাব কি না সন্দেহ আছে।'

‘তা যা বলেছ। মকরকেতুকে ছেড়ে ভুল করেছি। সর্পনখাকে কিছুতেই ছাড়া যাবে না।' সাধক বলল।

‘সেই কথাই বলছি, যেকোনাে ভাবে ওর কাছে গিয়ে তার তরবারিটা নিয়ে নাও। তারপর ওকে বন্দি করে কীভাবে মায়া সরােবরে যাওয়া যায় তার ব্যবস্থা আমি করছি।' জয়শীল বলল।

তৎক্ষণাৎ সিদ্ধ সাধক সেখান থেকে সরে গেল। তার চলে যাওয়ার পর জয়শীল বেঁটেদের সেনাপতিকে বলল, 'দেখ, সেনাপতি, ওই জল-ঘােড়ার আরােহীর ক্ষমতা যে কতখানি আছে তা আমরা জানি না, তবে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। যেকোনাে মুহূর্তে সিদ্ধ সাধককে সাহায্য করার জন্য আমাদের ছুটে যেতে হবে। এখন আমাদের উচিত গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা।'

‘ওকে ধরা এমনকী আর শক্ত কাজ ? ওকে আমি একাই ধরে গাছের ডালে। বেঁধে ঝুলিয়ে রাখতে পারি।' বেঁটেদের সেনাপতি বলল।

কিছুক্ষণ পরে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে, ত্রিশূল উপরে তুলে চিৎকার করে উঠল, 'কে রে এটা, আমি যে গাছটাকে যত্ন করে বড়াে করেছি তাতে এভাবে কে তরবারি ঢুকিয়েছে? গাছের কান্না শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেছে। কে এই অপকর্ম করেছে?’ সিদ্ধ সাধক বলল।

তার চিৎকার শুনেই সর্পনখা ঝট করে গাছে গেথে থাকা তরবারি বের করে সিদ্ধ সাধকের সামনে গেল। ততক্ষণে সাধকও তার সামনে ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, 'হু! তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি মায়া সরােবরের সেবক।'

সেই গভীর অরণ্যে সিদ্ধ সাধকের কথা শুনে সর্পনখা ভাবল, 'এ নিশ্চয় সাধারণ মানুষ নয়। এক পলক দেখেই আমি যে কে যখন বলেছে এ নিশ্চয় কোনাে সাধক।' এই কথা ভেবে ভয়ে সে কাদতে লাগল। সাধক তার অবস্থা দেখে। মনে মনে খুশি হল। সর্পনখাকে সাধক বলল, ‘মায়া সরােবরেশ্বরের সেবক বলে তােমার এত অহংকার হয়েছে? আগে ঘােড়া থেকে নামাে।' গর্জে উঠল সাধক।

সর্পনখা তৎক্ষণাৎ ঘােড়া থেকে নেমে সাধকের কাছে যেতেই সাধক বলল, 'কই দাও ওই তরবারিটা।'

চট করে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে সর্পনখা সাধকের দিকে সন্দিহান দৃষ্টি হেনে বলল, 'আমার তরবারি দিয়ে তুমি কী করবে? আমাকে নিরস্ত্র করার পেছনে নিশ্চয় তােমার কোনাে উদ্দেশ্য আছে! আমি যে কার সেবক তা তুমি জানলে কী করে? তুমি এত বড়াে সাধক যে গাছের কান্না শুনতে পাও?’

সিদ্ধ সাধক হাে-হাে করে হেসে বলল ‘ওরে সর্পনখা, তােমার মতিভ্রম ঘটেছে। তা না হলে এই ধরনের প্রশ্ন তুমি করতে না। আমি তােমার বন্ধু মকরকেতুকে চিনি। ওই তরবারি যতক্ষণ তােমার হাতে আছে ততক্ষণ তােমার বিপদ।' বলে ত্রিশূল তুলে সাধক সর্পনখার দিকে এগিয়ে গেল।

মুহূর্তের মধ্যে সর্পনখা কেমন যেন হয়ে গেল। কিন্তু পর মুহূর্তেই দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল, 'এতক্ষণে বুঝতে পারলাম তুমি কে? নরদানবের মালিক কৃপাণজিৎ তােমাকে আর তােমার বন্ধুকে এই অরণ্যে দেখেছে। তুমি একটা কাপালিক, তাই না?’

তক্ষুনি সিদ্ধ সাধকের ইচ্ছে হল, ত্রিশূল দিয়ে তাকে আক্রমণ করতে। কিন্তু পরমুহূর্তে তার মনে পড়ল জয়শীলের নির্দেশ জ্যান্ত অবস্থায় তাকে ধরতে হবে। সর্পনখার আচরণ দেখে মনে হয় না যে সে অত সহজে ধরা দেবে। হঠাৎ সাধকের মাথায় এল একটি উপায়। ত্রিশুলটাকে মাটিতে গেথে সে বলল, 'ওহে সর্পনখা, তুমি আমাকে যা ভাবছ আমি তা নই। এক কাজ কর, আমি আমার ত্রিশূল দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি, তুমিও তােমার তরবারি দূরে ছুঁড়ে ফেল। তারপর দু-জনে বসে আলােচনা করব।'

'তুমি যে কী ধরনের আলােচনা করবে তা আমি জানি। তুমি চাও আমাকে নিরস্ত্র করে কোনাে এক ছােটোখাটো দেবতার সামনে বলি দিতে। না, তােমাকে আর জ্যান্ত ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না।' বলেই সর্পনখা তরবারি নিয়ে তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল।

বিপদের আশঙ্কায় ত্রিশূলটা হাতে তুলতে না তুলতেই সর্পনখার তরবারি সাধকের বুকে ঠেকল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বেঁটেদের সেনাপতির বাহন এসে সর্পনখার পেছনে গুঁতােল। সে চমকে উঠে পেছনের দিকে তাকাল। অদ্ভুত ধরনের ওই জীবটিকে দেখে সর্পনখার হাত থেকে তরবারি খসে পড়ল।

সঙ্গেসঙ্গে সাধক ওই তরবারি উপর পা চেপে হাে-হাে করে হেসে বলল, ‘সেনাপতি, তােমার সময়ের জ্ঞানের জন্য তােমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। জয় মহাকাল।'

ততক্ষণে জয়শীল সেখানে পৌঁছে গেল। সে সর্পনখাকে ধরে বলল, 'ওহে সর্পনখা তােমার নামটাই অদ্ভুত। তােমার আচার-আচরণ আরও অদ্ভুত। সাপের অনেক কিছু থাকে। কিন্তু নখ যে থাকে তা তাে জানি না। তুমি কি ভেবেছ, মহান সিদ্ধ সাধক তােমাকে তােমার ওই ভোঁতা তরবারি দিয়ে আক্রমণ করতে যাবে?’

সর্পনখা চিৎকার করে উঠল, ‘জয় মায়া সরােবরেশ্বর, তুমিই আমাকে রক্ষা কর।' তারপর ওদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে সে বলল, তােমরা যেই হও আমাকে যে ছলচাতুরী করে নিরস্ত্র করেছ সে ব্যাপারে আমার কোনাে সন্দেহ নেই। ওই তরবারিটা আমার হাতে থাকলে এতক্ষণে তােমাদের আমি কেটে টুকরাে টুকরাে করে ফেলতাম।'

তৎক্ষণাৎ জয়শীল সাধকের কাছে গিয়ে বলল, 'দেখি সাধক, পা-টা সরাও তাে। তরবারিটা ছাড়।'

সাধক পায়ের তলার তরবারি তুলে জয়শীলের হাতে দিল। জয়শীল সেটা সর্পনখাকে দিতে দিতে বলল, 'ওহে সর্পনখা, তােমার মায়া সরােবরেশ্বর, হিরণ্যপুরের রাজকুমার ও রাজকুমারীকে চুরি করে নিয়ে গেছে। সেদিক থেকে তুমি একটি চোরের সেবক। অনেক বড়াে বড়াে কথা বলছ। তােমার যদি ক্ষমতা থাকে তাে এসে আমার সঙ্গে তরবারিতে লড়াে। একটি কথা মনে রেখাে, যাই ঘটুক, আমি কিন্তু তােমাকে প্রাণে মারব না। শুধু আমার একটা কাজ করিয়ে নেবাে তােমাকে দিয়ে।'

তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সর্পনখা বলল, 'আমি জানি তুমি কোন কাজের কথা বলছ। নাও, এবার সামলাও।' বলে জয়শীলের গলা লক্ষ করে সর্পনখা তরবারি চালাল।

জয়শীল নিজের তরবারি দিয়ে তার তরবারি সরিয়ে বাঁ-পা দিয়ে মুখের উপর খপ করে মারল। সর্পনখা ধপাস করে নীচে পড়ে গিয়ে পরক্ষণেই উঠে বলল, 'এটা অন্যায়, তরবারিতে লড়তে লড়তে কেউ লাথি চালায় না।' বলে সে জয়শীলকে আক্রমণ করল।

‘আমি তাে আগেই বলেছি, তােমাকে মেরে ফেলব না। মকরকেতুকে দিয়ে যে কাজ করাতাম তা তােমাকে দিয়ে করিয়ে নেব।' জয়শীলের কথা শেষ হতে-না-হতেই সর্পনখা তার বুকে তরবারি ঢুকিয়ে দিতে গেল। জয়শীল তরবারির আঘাতে ওই তরবারিটা নীচে ফেলে দিয়ে সর্পনখার তলপেটে ডান-পা দিয়ে সজোরে মারল।

ওই লাথি খেয়ে আর্তনাদ করে উঠল সর্পনখা। তার হাতের তরবারিটা অনেক দূরে ছিটকে পড়ল। ক্ষীণ কণ্ঠে সে বলল, 'ছিঃ ছিঃ তরবারি যুদ্ধ কাকে বলে তা তুমি জানাে না কি?’ বলতে বলেতে সর্পনখা আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে বলল, 'তােমার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তুমি তরবারি চালানাের চেয়ে মল্লযুদ্ধ বেশি পছন্দ কর। তবে মনে রেখ, আমিও মল্লযুদ্ধে দক্ষ।'

তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই মল্লযুদ্ধ করতে গিয়ে সর্পনখা বলল, দোহাই আপনাদের আমাকে মেরে ফেলবেন না। আমার ভাই, সর্পস্বরাকে নিয়ে মকরকেতুকে খুঁজতে আমি এসেছিলাম।'

‘সর্পনখা, এবার পথে এসাে' বলে জয়শীল সিদ্ধ সাধককে বলল, ‘সাধক, এক্ষুনি একে বলি দিতে যেও না। একটু অপেক্ষা কর।' বলে জয়শীল সর্পনখাকে বলল, ওহে সর্পনখা, শােনাে, তােমার ছােটোভাইকে যে নরদানব নিয়ে গেছে তার মালিক কৃপাণজিৎ এখনও বেঁচে আছে। সে আমার শত্রু। তােমার ভাইকে খোঁজার ব্যাপারে তােমাকে আমি সাহায্য করব। তবে একটি শর্তে। তােমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, ছােটো ভাইকে খুঁজে পাওয়ার পর তুমি আমাকে মায়া সরােবরেশ্বরের কাছে নিয়ে যাবে।'

‘অনুমতি ছাড়া কোনাে মানুষকে নিয়ে যাওয়া যায় না।' সর্পনখা বলল।

'ঠিক আছে, সেটা কোথায় আছে আমাদের জানিয়ে দাও। আমরা নিজেদের চেষ্টায় যাব।' জয়শীল বলল।

অবাক হয়ে চোখ বড়াে বড়াে করে সর্পনখা বলল, 'সেই জায়গার সন্ধান দিলে আমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে।'

জয়শীল বলল, 'তাহলে, আমি আমার তরবারি দিয়ে তােমার মাথা কেটে টুকরাে টুকরাে করে ফেলি?' এমন সময় দূর থেকে শােনা গেল, ‘কোথায় জয়শীল? কোথায় সেই কাপালিক?’ চিৎকার করে এই কথাগুলাে বলতে বলতে জল-ঘােড়ায় চড়ে কৃপাণজিৎ সেদিকে তীব্রবেগে আসছিল।

উনিশ

সর্পনখার ঘাড়ে জয়শীলের তরবারি পড়তে যাবে এমন সময় সে কৃপাণজিতের চিৎকার শুনতে পেল। শুনে মাথা ঘুরিয়ে জয়শীল দেখতে পেল জল-ঘােড়ায় চড়ে কৃপাণজিৎ তার দিকে এগিয়ে আসছে। সিদ্ধ সাধক কৃপাণজিতকে দেখে মহানন্দে বলে উঠল, 'অনেক দিন পরে ওকে আজকে মুঠোর মধ্যে পাচ্ছি। আজ আমি ওকে আমার ত্রিশূলের খােরাক করবই।'

সর্পনখা ঝট করে সিদ্ধ সাধকের হাত চেপে ধরে বলল, 'আপনার কাছে অনুরােধ, দয়া করে বলুন, এই কৃপাণজিৎ কি একটি নরদানবের মালিক?’

‘হ্যাঁ । এই নরদানবটাই তাে তােমার ভাইকে জোর করে তুলে নিয়ে গেছে।' সিদ্ধ সাধক বলল।

'তাই যদি হয়, তাহলে একে মেরে ফেলার আগে আমাকে জেনে নিতে দিন আমার ছােটো ভাইকে তুলে নরদানব কোথায় নিয়ে গেছে।' সর্পনখা বলল।

‘ছাড়, হাত ছাড়। তােমার ভাই বাঁচুক, মরুক তাতে আমার কী? তুমি জানাে, এই লােকটা আমার এবং জয়শীলের কত বড়াে শত্রু। একে যতক্ষণ না পরলােকে পাঠাচ্ছি ততক্ষণ আমার শান্তি নেই। আগে একে মেরে ফেলি। তারপর তােমার কথা শুনব।' দাঁত কটমট করতে করতে সাধক তাকে বলল।

ওদের কথা শুনতে শুনতে জয়শীলের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। তার মনে হল, সর্পনখাকে হাত করার এটাই হল সুবর্ণ সুযােগ।

‘সর্পনখা, মায়া সরােবর যে কোথায় আছে তা জানাতে তুমি রাজি না হলেও আমরা কিন্তু তােমার ভাইকে খুঁজে বের করার কথা দিয়েছিলাম। এখন এক কাজ করি, আমি এবং সিদ্ধ সাধক গাছের আড়ালে চলে যাই। তুমি কৃপাণজিতের সঙ্গে কথা বল। নরদানব যে তােমার ভাইকে কোথায় নিয়ে গেছে তা যদি তুমি। জানতে পার তাহলে তােমার খুব ভালাে হবে।' জয়শীল বলল।

‘যেতে বলছেন বলুন, কিন্তু এই খালি হাতে আমি যাব কী করে? আমার তরবারি তাে আপনি কেড়ে রেখেছেন।' সর্পনখা সবিনয়ে বলল।

জয়শীল তাকে তরবারি দিয়ে বলল, ‘মনে রেখ, কৃপাণজিৎ খুব ভালাে তরবারি চালাতে পারে। যা করবে সাবধানে করবে, যাও।' তারপর সাধকের দিকে মুখ ঘুরিয়ে সে বলল, ‘চল সাধক অনেকক্ষণ আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি, চল গাছের ছায়ায় দাঁড়াই।' বলতে বলতে সে তাকে নিয়ে গাছের ছায়ায় চলে গেল।

সর্পনখা নিজের জল ঘােড়ায় উঠে বসে কৃপাণজিতের দিকে এগােল। কিছু দূর যেতে-না-যেতেই তার পিঠে কী যেন ঢুকে যাওয়ার মতাে মনে হল। পিছন ফিরে সে দেখল ওই ভেড়ার মতাে একটা জন্তুর উপর বসে বেঁটেদের বাহিনী তার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। ওদের হাতে বল্লম আছে।

‘ওহে, তােমরাই আমার পিঠে বল্লম মারলে? তােমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? মিছিমিছি আমাকে মারলে কেন?’ সর্পনখা জিজ্ঞেস করল।

ওই প্রশ্ন শুনে ওদের সেনাপতি হেসে বলল, 'শােন হে, জল ঘােড়ার আরােহী, আমি যদি সত্যি বল্লম দিয়ে মারতাম তাহলে এতক্ষণে তুমি পটল তুলতে। ছােট্ট খোঁচা দিয়েছি। তাতেই তুমি এত অস্থির হয়ে উঠেছ। আসলে আমি তােমার সঙ্গে একটু আলাপ করতে চেয়েছি মাত্র।'

‘এই কি তােমার আলাপ করার কায়দা? আমার সঙ্গে তােমার কী কাজ যে আলাপ করবে? আমি হলাম গিয়ে ঐশ্বৰ্য্যসম্পন্ন মায়া সরােবরেশ্বরের লােক আর তুমি হলে এই অরণ্যের একটা সাধারণ অধিবাসী।' সর্পনখা বলল।

এমন সময় কৃপাণজিৎ জল-ঘােড়ায় চেপে সর্পনখার কাছে এসে বলল, 'কে তুমি? পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে তুমিই কি আমার গলায় দড়ির ফাঁস দিয়ে টানছিলে?’

হ্যাঁ, আমি। কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি তুমি ওই ফাঁস ছাড়িয়ে পালালে কী করে? তুমি যে ঘােড়ার উপরে বসে আছ সেটা আমার ছােটো ভাইয়ের। তাকে কোথায় রেখেছ?' বলতে বলতে সর্পনখা নিজের ঘােড়াটিকে আস্তে আস্তে তার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ হাত তুলে কৃপাণজিৎ বলল, 'তুমি যেখানে আছ সেখানেই থাক। তােমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে।' কৃপাণজিৎ বলল।

'কীসের কথা? আগে জানতে চাই আমার ভাই কোথায়?’ সে জিজ্ঞেস করল।

'নরদানব হঠাৎ তােমার ভাইয়ের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় বার বার সে চিৎকার করে উঠেছে, ‘দাদা, সর্পনখা, তুমি কোথায়?' বলে।

তুমি ঠিকই বলেছ, এই ঘােড়াটা তােমার ছােটো ভাইয়ের।' কৃপাণজিৎ বলল।

‘এখনও আমি আমার প্রশ্নের জবাব পাইনি। আমি জানতে চাই, আমার ভাই কোথায়?’ 'সর্পনখা তরবারি নাড়তে নাড়তে দৃঢ়তার সঙ্গে বলল।

‘সর্পনখা, অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? তােমার ভাইয়ের কপালে যদি মৃত্যু থাকে তাহলে এতক্ষণে সে নরদানবের হাতে মরেছে। তার সম্পর্কে পরে কথা বলা যাবে। আগে আমাদের দুজনের শত্রু জয়শীল ও সিদ্ধ সাধককে কীভাবে খতম করা যাবে তা ঠিক করতে হবে। তুমি হয়তাে জানাে না, ওরা তােমাদের মকরকেতুকে ভীষণভাবে জ্বালিয়েছে। তার উপরে অনেক রকমের অত্যাচার করেছে। আমি সমস্ত খবর পেয়েছি।'

কৃপাণজিতের কথা শেষ হওয়ার আগেই অস্থির হয়ে উঠে সর্পনখা বলল, 'ওহে দুরাত্মা, আজেবাজে কথা বলে তুমি আমার ভাইয়ের প্রসঙ্গ চাপা দিতে চাইছ? অন্য শত্রুদের কথা পরে হবে। আমার কাছে তুমি প্রধান শত্রু। তুমিই আমার ভাইকে মেরে ফেলেছ। আগে তােমাকে মেরে ফেলে আমার ছােটো ভাইয়ের আত্মাকে শান্ত করি।' বলে নিজের ঘােড়াটাকে দ্রুত তার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ কৃপাণজিৎ পেছিয়ে গিয়ে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, আমার আজন্ম শত্রু জয়শীলকে যতক্ষণ না মেরে ফেলছি ততক্ষণ আমি শান্তি পাব না। তাই এখন আমি তােমার বিরুদ্ধে তরবারি হাতে লড়তে চাই না। কারণ লড়াইয়ে কে জিতবে তা কেউ বলতে পারে না।' বলতে বলতে কৃপাণজিৎ ঘােড়া ছুটিয়ে পালিয়ে গেল।

সর্পনখা তার পেছনে দ্রুত ঘােড়া ছুটিয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে জয়শীল সাধককে বলল, ‘সাধক, এই দুজনের মধ্যে একজন আমাদের চরম শত্রু। অন্যজনকে মিত্র করে ফেলার এই হল সুবর্ণ সুযােগ। সর্পনখাকে হাত করতে পারলে আমরা অতি সহজেই মায়া সরােবরে পৌঁছতে পারব।'

‘খুব ভালাে কথা বলেছ। কিন্তু এখন তাে দু-জনেই আমাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এখন ওদের ধরা যাবে কী করে?’ সাধক প্রশ্ন করল।

জয়শীল তার কথা শুনে চারদিকে তাকাতে লাগল। এমন সময় তাদের নজরে পড়ল বেঁটেদের সেনাপতিকে। সে ওই সেনাপতিকে বলল, 'ওহে, ওই দু-জনকে ধরে আনা যাবে?’

সে বলল, 'কেন আনা যাবে না?’

'কী করে? এতক্ষণে ওরা কোথায় চলে গেছে কে জানে? ওকে ধরবে কী করে?’ জয়শীল প্রশ্ন করল।

‘সহজেই ধরা যাবে। আমি এক্ষুনি গােটা বনে ঢাক বাজিয়ে সতর্ক করে দেব। ওরা আমাদের দেশের সীমার বাইরে যেতে পারবে না।' বলে সে নিজের বাহনে চড়ে দ্রুত চলে গেল।

‘সাধক, এক্ষুনি আমাদের তেমন কিছু করার নেই। তবে কী হচ্ছে না। হচ্ছে আমাদের নজর রাখতে হবে। চল ওই টিলার উপরে উঠে চারদিকে নজর রাখি।' বলে জয়শীল এগিয়ে গেল।

'জয় মহাকাল! আমার মনে হচ্ছে কি জানাে জয়শীল, আমরা যে সময় বেরিয়েছি সেই সময়টা ভালাে ছিল না। তা না হলে পদে পদে এত বাধা পড়ত না। আমার মনে হয় না যে ওই বেঁটে সেনাপতি ওদের ধরতে পারবে।' বলতে বলতে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সাধক জয়শীলের পেছনে পেছনে যতে লাগল। ওরা টিলার উপরে উঠল। উঠে চারদিকে তাকাল। ততক্ষণে গােটা অরণ্যে বেঁটে লােকগুলাে ছােটাছুটি করছিল। চারদিকে ঢাক বেজে উঠেছিল। ওই ঢাকের আওয়াজ যে শােনে সেই সতর্ক হয়ে যায়। অন্যদিকে ধাওয়া করতে করতে কাছাকাছি এসে সর্পনখা কৃপাণজিতকে বলল, 'ওহে, কৃপাণজিৎ, তােমার কথায় তাে বােঝা গেল না আমার ভাই বেঁচে আছে কি না? যদি বেঁচে থাকে তাহলে তাে তার ঘােড়ার দরকার হবেই। তুমি যাচ্ছ যখন যাও, তবে ঘােড়াটি রেখে যাও। ঘােড়া ছাড়া আমার ভাই এক-পা চলতে পারে না।'

‘আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে যে আমি ঘােড়া ফেরত দেব? ঘােড়া ফেরত দিলেই তুমি আমার উপর আক্রমণ চালাবে। আবার তােমার বিরুদ্ধে আমাকে তরবারি চালানাের কথা ভাবতে হবে। আমি ওই জয়শীলকে মেরে ফেলার আগে অন্য কারও বিরুদ্ধে লড়ব না। আগে ওকে শেষ করব তারপর তােমাকে এক হাত দেখে নেব।' বলে সর্পনখা ঘােড়া ছুটিয়ে নদীর তীরে গেল।

সর্পনখা বুঝল, 'ভালাে কথায় কৃপাণজিতের কাছ থেকে কাজ পাওয়া যাবে না । আর কথা নয়, এবার আক্রমণ। ওকে আক্রমণ না করলে ও আমার ভাইয়ের খবর কিছুতেই বলবে না।' ভাবতে ভাবতে সে নিজের ঘােড়া অত্যন্ত দ্রুত ছােটাল।

ইতিমধ্যে বেঁটে লােকগুলাে কৃপাণজিৎ ও সর্পনখাকে ধরে ফেলার জন্য অস্ত্র ধারণ করে, সবাই তাদের পথ আগলে দাঁড়াল। দূর থেকে ওদের দেখতে পেয়েই কৃপাণজিৎ ভাবল, এখন আমি কী করব! সামনে গেলে ওরা আমাকে ধরে ফেলবে। ওদের উপর আমার নরদানব অনেক অত্যাচার চালিয়েছে। ওরা নিশ্চয়ই আমার উপর দিয়ে তার প্রতিশােধ নেবে। আর পেছনের দিকে ছুটলে সর্পনখা ধরে ফেলবে। সে নিশ্চয় ভাইয়ের খোঁজখবর নিতে চাইবে। কী করি?’

এই অবস্থায় সে হঠাৎ ঘােড়াটাকে জলের দিকে চালিয়ে দিল। ঘােড়ার পা জলে ঢুকতেই দুটো কুমির ঘােড়ার দিকে এগিয়ে এল। ওই দুটোকে দেখে কৃপাণজিতের বুক ভয়ে ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। তার মাথা ঘুরতে লাগল।

ততক্ষণে সর্পনখা নদীর তীরে এসে গিয়ে বলল, 'ওহে ও বােকা কৃপাণজিৎ, তােমার বুদ্ধি কি লােপ পেয়েছে? তুমি যদি মায়া সরােবরে যেতে চাও তাহলে একমাত্র আমার ভাই তােমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারে। তুমি কি ভেবেছ। এই ঘােড়া থাকলে কুমিরগুলাে তােমাকে কিছু বলবে না?’ বলতে বলতে সে-ও জলে নেমে গেল। ইতিমধ্যে কুমির দুটো কৃপাণজিতকে ধাওয়া করল। তীর থেকে বেঁটে লােকগুলাে পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারল কৃপাণজিতকে। সর্পনখা ওদের বারণ করল।

ইতিমধ্যে একটি কুমির কৃপাণজিতের কোমরে কামড়ে ধরল। তৎক্ষণাৎ সর্পনখা ওই কুমিরটাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করল। ওই আঘাতের ফলে কুমিরটা ঘায়েল হয়ে গেল। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় কুমির বিরাট হাঁ করে কৃপাণজিতের দিকে এগিয়ে গেল। তা দেখে কৃপাণজিতের ঘােড়া ঘাবড়ে গেল। সে মুখ ঘুরিয়ে তীরে উঠে এল। ঘােড়াটা তীরে উঠে আসতেই বেঁটে লােকগুলাে চিৎকার করে বলল, 'ওহে, ঘােড়াটাকে ওই গাছের কাছে নিয়ে যেও না। ওটা মৃত্যুবৃক্ষ। ওর কাছে যে যায় সে আর বাঁচে না। তৎক্ষণাৎ কৃপাণজিৎ ঘােড়াটাকে অন্যদিকে ঘােরাতে চাইল। কিন্তু ঘােড়াটা জিদ ধরে ওই গাছের দিকেই এগিয়ে গেল। ফলে ওই গাছের কাছে যেতেই গাছের ডাল কৃপাণজিতকে ধরে ফেলল।

কুড়ি

মৃত্যুবৃক্ষের একটি ডাল কৃপাণজিতের মুণ্ডু ধরে একটু উপরের দিকে তুলতেই অন্য দুটো ছােটো ছােটো ডাল কৃপাণজিতের দিকে এগিয়ে এল। একটি ধরল তার কাঁধ আর অন্যটি তার হাত। কৃপাণজিৎ আর্তনাদ করে উঠল, 'বাঁচান— বাঁচান!’

কিন্তু তার এই আর্তনাদ শুনেও কেউ তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল না। যেকোনাে অবস্থায় মৃত্যুবৃক্ষের কাছাকাছি আসতে কেউ সাহস করে না। তা ছাড়া, এই কৃপাণজিতের জন্য অনেককেই অনেক বার বিপদে পড়তে হয়েছে। কিন্তু তাকে উদ্ধার করতে কেউ না এগােলেও তার সুন্দর জল-ঘােড়াটা ধরে ফেলল ওরা। অদূরেই পাথরের উপর দাঁড়িয়েছিল জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক। সর্পনখা মৃত্যুবৃক্ষের কাছে এসে বলল, 'আমার ছােটো ভাই যে কোথায় আছে তার সন্ধান একমাত্র কৃপাণজিৎ দিতে পারে। তাই ও এখন মরে গেলে আমার ছােটো ভাইকে কোনােদিন খুঁজে পাব না।' বলে সে তরবারি দিয়ে সজোরে ওই ডালের উপর প্রচণ্ড এক কোপ মারল।

তৎক্ষণাৎ সমস্ত গাছটা থরথর করে কেঁপে উঠল। গাছের একটি সরু লিকলিকে ডাল সাপের মত সর্পনখার গলা জড়িয়ে ধরল। সর্পনখা আর্তনাদ করতে লাগল, ‘হে মায়া সরােবরেশ্বর আমাকে বাঁচাও বাঁচাও!’

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক দ্রুত সেখানে এসে গেল। সিদ্ধ সাধক সর্পনখার পা দুটো ধরে নীচের দিকে টানতে লাগল। আর জয়শীল চোখের পলকে সর্পনখার গলায় জড়ানাে ডাল এক কোপে কেটে উড়িয়ে দিল।

তাকে উদ্ধার করে এনে শুইয়ে রেখে, উপরে তুলে, তার পা উপরের দিকে এবং মাথা নীচের দিকে ঝুলিয়ে তাকে জয়শীল বলল, ‘মায়া সরােবরে আমাদের নিয়ে যাবার পথ দেখানাের একমাত্র ভরসা তুমি। আর সেই তুমি মরে গেলে আমাদের চলবে কেন?’

কিছুটা সুস্থ হয়ে নিজের গলায় হাত বুলাতে বুলােতে সর্পনখা বলল, ‘দেখ, আমি এ-কথা ঠিকই জানতাম, যে আমাদের মায়া সরােবরেশ্বর আমাকে এই বিপদ থেকে নিশ্চয়ই উদ্ধার করবেন।'

তার কথা শুনে সিদ্ধ সাধক রেগে গিয়ে বলল, 'তাই নাকি? তাহলে আমরা কিছু করিনি? তােমাকে তাহলে মায়া সরােবরেশ্বরই উদ্ধার করেছে? আমরা করিনি?’

'সরাসরি উনি আমাকে উদ্ধার করেননি ঠিকই, তবে আপনাদের মাধ্যমে উনি নিজের কাজ করিয়ে নিয়েছেন।' বলে সে কৃপাণজিতের দিকে তাকাল। কৃপাণজিৎ তখনও মৃত্যুবৃক্ষের ডালে ঝুলছে। 'আমার ছােটো ভাইয়ের খবর যে জানে— হায় হায়! সে মরে যাচ্ছে! তাহলে আমার ভাইয়ের খবর আর পাব কোথায় কেমন করে?’ বলতে বলতে সর্পনখা ওইদিকে দ্রুত এগিয়ে গেল।

হঠাৎ জয়শীল তার হাত খপ করে ধরে, ধারে কাছে যে বেঁটে লােকগুলাে ছিল তাদের বলল, 'একে কয়েক বার জলে চোবাও তাে। ব্যাটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।'

ওরা তাকে ধরতে এলে সর্পনখা ধমক দিয়ে চিৎকার করে বলল, ‘মাথা আমার খারাপ হয়নি, মাথা খারাপ হয়েছে তােমাদের। যে-জলে তােমরা আমাকে চোবাতে চাইছ সেই জলে যে বড়াে বড়াে কুমির ভরতি!’

'জল-ঘােড়া নিয়ে ঘােরাঘুরি কর আর জলকে তােমার ভয়, কী বলছ হে? তােমাকে আমরা ওই কুমিরদের মধ্যেই ছেড়ে আসব।' বলে ওকে টানতে টানতে জলের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল বেঁটে লােকগুলাে।

এমন সময় বেঁটেদের রানি রথে চড়ে সেখানে এল। রানিকে দেখে সবাই নমস্কার করল। জয়শীল রানিকে বলল 'তােমাদের মহা শত্ৰু কৃপাণজিৎ এখন মৃত্যুবৃক্ষের ডালে ঝুলছে। এবার তােমাদের আর কোনাে ভয় নেই। আর আমরাও আমাদের পথে চললাম। তবে যাওয়ার আগে ভাবছি ওই রাক্ষুসে মৃত্যুবৃক্ষে আগুন ধরিয়ে দেব। অনেকের প্রাণ নিয়েছে এই বৃক্ষ।'

'তাই করুন। আপনারা যে উপকার করলেন তা আমরা বামন জাতির লােকেরা এ জীবনে ভুলব না। নরদানবের মালিক মারা গেল বটে কিন্তু সেই ভয়ংকর নরদানবটি এখনও এই অরণ্যে ঘােরাঘুরি করছে। তাই আমাদের সবসময় নিশ্চয়ই সজাগ থাকতে হবে।' রানি বিনম্রভাবে ওদের বলল।

জয়শীল রানির কথা সহানুভূতির সঙ্গে শুনে বলল, 'দেখ, আমরা এখন সর্পনখাকে নিয়ে ব্যস্ত আছি। তার ছােটো ভাইকে নরদানব তুলে নিয়ে গেছে। তার সাহায্য পেতে হলে নরদানবকে ধরতে হবে। ওই নরদানবটাকে একবার যদি আমরা হাতের মুঠোয় পাই তাহলে ওকে নিশ্চয়ই মেরে ফেলব।'

‘মেরে হয়তাে না-ও ফেলতে পারি। আমার ভীষণ ইচ্ছে, ওটাকে আমার বাহন করা। কিন্তু কিন্তু এক্ষুনি তাে আগুন একটু চাই। গাছটাকে পােড়াতে হবে যে—।' বলল সিদ্ধ সাধক।

কয়েক জন আগুন নিয়ে সিদ্ধ সাধকের কাছে এগিয়ে এল। সাধক আগুন হাতে নিয়ে বলল, ‘গাছটা অনেক মানুষ খেয়েছে। এত মানুষ যখন খেয়েছে তখন তার মধ্যে নিশ্চয়ই মাংস এবং চর্বি থাকতে পারে। থাকুক বা না থাকুক তার লক্ষণ নিশ্চয়ই থাকবে।'

গাছে আগুন লাগাতে যাবে এমন সময় সবাই শুনতে পেল কে কোথা থেকে যেন বলছে: 'থামাে মুখ কোথাকার! পাপী! অমন সুন্দর মৃত্যুবৃক্ষকে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতে চাইছ? ভাবছ এ-কাজ তুমি পারবে?’

সাধক ও জয়শীল এদিক-ওদিক তাকাল। যে লােকটা এই কথাগুলাে চিৎকার করে বলল চোহারায়, পােশাক-আশাকে তাকে সাধুর মতাে দেখতে। বলতে বলতে লােকটা জয়শীল ও সাধকের সামনে এসে দাঁড়াল। সাধক অস্থির হয়ে বলল, 'কে তুমি? আমি হলাম মহাকালের ভক্ত, আর তুমি আমাকেই পাপী বলছ? তােমার সাহস তাে কম নয় হে!’

লােকটা নির্ভীকভাবে ধমক দিয়ে সাধককে বলল, 'শােনাে—আমি হচ্ছি এই মৃত্যুবৃক্ষের পূজারি। কেন— তরবারি দিয়ে এই বৃক্ষের ডাল কেটে ফেলার সময় তােমরা কি কেউ শুনতে পাওনি বৃক্ষের সেই কাতর আর্তনাদ?’

তার কথা শুনে জয়শীল বলল, 'ওই গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তুমিই তাে আর্তনাদ করেছিলে। কি ঠিক কি না বল তাড়াতাড়ি?’

বেঁটে পূজারি একটুও না ঘাবড়ে বলল, 'হ্যাঁ, তা কী হয়েছে? ঠিকই ধরেছ, বৃক্ষদেবের নির্দেশে আমিই আর্তনাদ করেছিলাম।'

জয়শীল সাধকের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সে প্রশ্ন করছে এখন কী করা যায়। তখন সাধক বেঁটে পূজারির কাঁধের উপর থেকে কুঠার তুলে নিয়ে বলল, ‘চুল বাড়িয়ে ফেঁটা দিলেই পূজারি হয়ে যায়, না? যার জন্ম আছে তার মৃত্যুও আছে। আজকে মৃত্যুবৃক্ষের মৃত্যু। সঙ্গে সঙ্গে তােমার পূজারির চাকরিও গেল। কুঠার যখন আছে কাঠ কেটে পেট চালাও। তােমার বৃক্ষ আর কত প্রাণ নষ্ট করবে?’

এই বলে সিদ্ধ সাধক গাছের উপর আগুন ছুঁড়তে যাবে এমন সময় বেঁটে পূজারি লােকটা সাধকের হাত হঠাৎ চেপে ধরল।

‘তােমার এত বড়াে সাহস? আমাকে বলছ মূখ, পাপী?’ বলে এক ধাক্কা দিয়ে পূজারিকে সাধক সরিয়ে দিল। তারপর সাধক বেঁটে পূজারিকে মুখ ভেংচে বলল, 'তুমি পূজারি— না? এতদিন কত লােককে ঠকিয়েছ হে?’

এমন সময় জয়শীল পূজারিকে ধরে মৃত্যুবৃক্ষের দিকে ছুড়তে যেতেই সে কঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ছেড়ে দিন, ছেড়ে দিন, আমাকে দয়া করে ছেড়ে দিন।'

তখন জয়শীল হাসতে হাসতে তাকে মাটিতে দাঁড় করিয়ে বলল, 'সাধক, এখানে আমাদের সময় নষ্ট করা উচিত নয়। গাছে আগুন ধরিয়ে দাও।'

তৎক্ষণাৎ সাধক মৃত্যুবৃক্ষের উপর আগুন ছুঁড়ে দিল এবং এক মুহুর্তে সারা গাছে দাউদাউ করে আগুন ধরে গেল। ঘিয়ে আগুন লাগার মতাে, গােটা গাছটা দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল।

জয়শীল জ্বলন্ত মৃত্যুবৃক্ষে ঝুলন্ত কৃপাণজিৎকে দেখে বলল, 'এই লােকটা অমরাবতীর নগরের রাজার অশ্ববাহিনীর সেনানায়ক। একটা জুয়াখেলার ঘরে এর সঙ্গে আমার ঝগড়া বাধে। এর জন্যই আমাকে সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হয়। শুধু তাই নয়— এর জন্যই আমার এক বন্ধু দেবশর্মাকে ঘরবাড়ি পরিবার-পরিজন সব কিছু ছেড়ে পালাতে হয়েছে। আমার ওই পরম বন্ধু যে কোথায় আছে কে জানে।'

‘মায়া সরােবর থেকে হিরণ্যপুরের রাজকুমার ও রাজকুমারীকে উদ্ধার করার পর, আমার মন বলছে— তােমার বন্ধুর খোঁজ পাওয়া যাবে।' সাধক দৃঢ়কণ্ঠে বলল।

‘কেন জানি না— মাঝে মাঝে আমারও মনে হয় যে আমি তাকে খুঁজে পাব। যাহােক আর দেরি নয়, চল।’ জয়শীল ব্যস্ত হয়ে সিদ্ধ সাধককে বলল।

সর্পনখা জল-ঘােড়ার পিঠে চড়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল। জয়শীলের সেখানে যে অন্য একটা জল-ঘােড়া ছিল সেটাকে দেখিয়ে বলল, ‘সাধক, এই ঘােড়াটাকে এখানে ছেড়ে যাওয়ার কোনাে মানে হয়? আমাদের দুজনের মধ্যে যেকোনাে একজনের কাজে লাগতে পারে এই ঘােড়াটা।'

‘জয়শীল, ওই জল-ঘােড়ার উপর তুমিই চেপে বস। আমি তােমার সঙ্গে পায়ে হেঁটে যেতে পারব। একদিন-না-একদিন ওই নরদানবকে পেলে তাকেই আমি আমার যােগ্য বাহন করে তুলবাে।' সাধক অতি আনন্দের সঙ্গে জয়শীলকে বলল।

‘সাধক, তােমার সে ইচ্ছা পূর্ণ হােক— এটাই আমি চাই।' বলে জয়শীল রানিসহ সেখানে যারা ছিল তাদের সকলের উদ্দেশ্যে বলল, 'তােমাদের চিরশত্রু কৃপাণজিৎ পুড়ছে! তােমাদের আর কোনাে ভয় নেই, আশা করি এখন থেকে তােমারা তােমাদের দেশে সুখে শান্তিতে থাকবে। আমরা এখন তাহলে চললাম। বিদায়!'

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধকের মতাে সৎ, সাহসী আর বিপদ কালের পরম। বন্ধু দু-জন তাদের রাজ্য ছেড়ে চলে যাবে শুনে বামনদের মধ্যে হাহাকার উঠল। এতদিন ধরে ওরা এই দু-জন নির্ভীক মানুষের আশ্রয়ে নিশ্চিন্তে ছিল। তা ছাড়া জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক যেন তাদেরই লােকের মতাে হয়ে উঠেছিল। তাই ওরা দু-জন যাতে এ-রাজ্য ছেড়ে চলে না যায় তারজন্য বেঁটেরা বিভিন্নভাবে ওদের অনুরােধ করতে লাগল। ওরা দুজন চলে যাবে শুনে বেঁটেদের কেউ কেউ আবর কেঁদেও ফেলল।

কিন্তু, কর্তব্য বড়াে কঠিন জিনিস। কর্তব্যের ডাকে মানুষকে দয়া-মায়া বিসর্জন দিয়েও ছুটে যেতে হয়। তাই যদিও জয়শীল এবং সিদ্ধ সাধকের চলে যেতে খারাপ লাগছিল, তবু তাদের না গিয়ে উপায় ছিল না।

ওদের রওনা হওয়ার সময় সেখানকার রানি এবং প্রজাদের খুব দুঃখ হয়েছিল। ওরা আবেগের সঙ্গে জয়শীল ও সাধককে বিদায় দিল। ওদের রওনা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্পনখা তাদের অনুসরণ করতে করতে বলল, 'ওহে— জয়শীল, সাধক, আমাকে না নিয়েই তােমরা চলে যাবে নাকি? আমার সেই ছােটো ভাইকে সর্পস্বরাকে উদ্ধার করার কথা তােমাদের মনে আছে তাে?’

জয়শীল একবার তার দিকে ভালােভাবে তাকিয়ে একটু হেসে বলল, 'নদীর জলে কয়েক বার ভালাে করে চোবানাের ফলে তােমার মনমেজাজ বেশ ভালাে হয়েছে দেখছি। এখন তােমার যেখানে ইচ্ছা যেতে পার। আমরা পথ খুঁজে খুঁজে মায়া সরােবরে ঠিকই পৌঁছে যাব। আর তােমাদের মায়া সরােবরের কর্তাকে ধরে টুকরাে টুকরাে করে কেটে জলপাখি আর জলজন্তুদের খেতে দেব।'

এই কথা শুনে সর্পনখার মুখ ঝুলে গেল। জয়শীল আর সিদ্ধ সাধক নামের লােক দু-জন যে সাধারণ লােক নয়, সে-কথা সর্পনখা এর আগেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। ওরা যে মায়া সরােবর খুঁজে বার করতে পারবে সে-বিষয়েও তার আর কোনাে সন্দেহ নেই।

ঠিক সেইসময় একটি পাহাড়ের গুহার মুখে কী যেন দেখতে পেয়ে সর্পনখা জয়শীলকে বলল, 'দ্যাখ তাে দ্যাখ তাে জয়শীল—ওই গুহার মুখে কী যেন একটা দেখা যাচ্ছে—দেখ তাে। এটাই কী সেই নরদানব?’

'হুঁ! ঠিকই, এই সেই নরদানব!’ জয়শীল গুহার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে বলল।

ওদিকে নরদানবও ওদের দেখে গর্জন করতে করতে গুহা থেকে বেরিয়ে এল। আর সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে যেন মকরকেতুর বাহন জলগ্রহ হাতি হঠাৎ গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে ভয়ংকর নরদানবকে তার লম্বা শুঁড় দিয়ে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।

একুশ

জলগ্রহকে দেখেই জয়শীল সিদ্ধ সাধক ও সর্পনখা অবাক হয়ে গেল। সর্পনখা বলল, 'ওহে জয়শীল— ওহে সিদ্ধ সাধক ওই জল-হাতি জলগ্রহটাই মহাশক্তিমান মকরকেতুর বাহন। এই মহাশক্তিমান মকরকেতুই হল মায়া সরােবরেশ্বরের সেবকোত্তম। ওই দেখ— মকরকেতু!’

সর্পনখার কথা শুনে সাধক তার ত্রিশূল উপরে তুলে জোরে জোরে বলল, ‘জয় মহাকাল! ওহে জলমানব, তােমার মহাশক্তিমান মকরকেতুর যে কতখানি শক্তি আছে তা আমরা ভালােভাবেই জানি। আমরা কাউকে বাদ দেব না। ওই জল-হাতি এবং মকরকেতু, আর তােমাদের দুজনকেই মহাকালের কাছে বলি দেব।' বলতে বলতে সিদ্ধ সাধক সেই গুহার দিকে ছুটে যেতে চাইল।

তৎক্ষণাৎ তাকে থামিয়ে, বুঝিয়ে জয়শীল বলল, 'ওহে সাধক, অত তাড়াহুড়াে করাে না। মায়া সরােবরে পৌঁছানাের আমরা সুবর্ণ সুযােগ পেয়েছি। এখন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে মকরকেতুর সঙ্গে ভালাে ব্যবহার করে মায়া সরােবরে পৌঁছানাে, কনকাক্ষ রাজার রাজকুমার ও রাজকুমারীকে উদ্ধার করা। সুতরাং এক্ষনি তুমি কোনােরকম চাঞ্চল্য দেখাবে না। আমাদের এখন খুবই ধৈর্য ধরে সব কাজ করতে হবে।'

হইহই করে সাধক যে ত্রিশূল উপরের দিকে তুলেছিল সেটা নামিয়ে বলল, ‘ওই মকরকেতু এখনও বেঁচে আছে! এটাই তাে ভাবতে আমার আশ্চর্য লাগে। ওর পেটে ছােরা ঢুকে গেল, কাঁধে তির বিদ্ধ হয়ে গেল, ওর তাে কবেই মরে যাওয়ার কথা। আমার কী মনে হয় জানাে জয়শীল, হাতির পিঠে যাকে দেখছি, সে হয় আসলে মকরকেতু নয়, আর না-হয় নিশ্চয়ই মকরকেতুর মৃতদেহ ওটা।'

জয়শীল ও সিদ্ধ সাধকের মধ্যে যখন এই ধরনের কথাবার্তা চলছিল তখন জলগ্রহ হাতি ও নরদানবের মধ্যে শক্তির পরীক্ষা চলছিল দুরের পাহাড়ের উপরে। দু-একবার জলগ্রহের শুঁড় থেকে ছাড়া পেয়ে নরদানব হাতিকে জব্দ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হাতি তাকে শুঁড় দিয়ে ধরে পায়ের তলায় ফেলে রগড়ে পিষে মেরে ফেলার চেষ্টা করল।

‘সাধক, দেখছ তাে, দুই জন্তুর লড়াই? তুমি বললে মকরকেতু মরে গেছে। আর ওই দেখ— একজন নয়, দু-জন নয়, চার চারজন লােক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ওই জলগ্রহ আর নরদানবের মরণপণ লড়াইয়ের ভয়ংকর দৃশ্য দেখছে।' জয়শীল পাহাড়ের চূড়া দেখিয়ে বলল।

জয়শীল সাধককে যেদিকে তাকাতে বলল সেদিকেই তাকিয়ে পাহাড়ের উপর চার জনকে দেখে সাধক অবাক হয়ে গেল। ওই চার জনের মধ্যে পােশাক দেখে একজনকে মনে হল মকরকেতু। সেই চার জনের মধ্যে দু-জন লােক জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক বিশেষ করে জয়শীলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

পাহাড়ের ওপরে যে দু-জন লােক জয়শীলের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে ছিল— জয়শীলও তাদের লক্ষ করছিল কিন্তু ওরা যে ঠিক কারা সে-কথা কিছুতেই সে মনে করতে পারছিল না।

মকরকেতু জয়শীল ও সিদ্ধ সাধককে দেখে তার পাশের একজনকে বলল, 'বৈদ্যদেব, ওই সুন্দর জল ঘােড়ার পিঠে যে যুবককে দেখা যাচ্ছে সে হল জয়শীল। আর ওই ত্রিশূল হাতে সাধুর মতাে দাড়িওয়ালা যাকে দেখাচ্ছে। সে-ই হল সিদ্ধ সাধক। আর তৃতীয়জনকে তাে সহজেই চেনা যাচ্ছে ও হল আমাদের সহযােগী সর্পনখা।' ‘আমার দাদা এখনও বেঁচে আছে! এ তাে আমি ভাবতেই পারছি না!' সাগ্রহে ভাইয়ের কাছে যাওয়ার জন্য এগােতেই মকরকেতু তার হাত ধরে রেগে গিয়ে বলল, 'ওহে, সর্পস্বরা মনে রেখ ওই জয়শীল ও সিদ্ধ সাধক আমাদের মহাশত্রু। তবু মায়া সরােবরেশ্বরের নির্দেশ অনুসারে তাদের প্রতি আমাদের ভদ্র নম্র ব্যবহার করতে হবে। কীভাবে যে ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায় তা এখন আমাকে বিশেষভাবে ভাবতে হবে।'

তারপর মকরকেতু হাতছডিধারী দাড়িওয়ালাকে আবার বলল, ‘বৈদ্যদেব, আমরা কি এখন আপনার কাছ থেকে কিছু উপদেশ পাব?’

ওই বৈদ্যদেব নামধারী লােকটা হাতি ও নরদানবের যুদ্ধ দেখে বলল, ‘মকরকেতু, ওখানে কি ঘটছে দেখছ। জয়শীল আপ্রাণ চেষ্টা করছে তােমার পরমপ্রিয় আর বিশ্বস্ত জলগ্রহ হাতিকে বাঁচানাের।'

বৈদ্যদেবের কথাটা মকরকেতু উড়িয়ে দিতে পারল না। বৈদ্যদেব মিথ্যা বলেনি। কিন্তু মহাশত্রু জয়শীলের তাে জলগ্রহকে মেরে ফেলবারই কথা, তা না করে সে কেন জলগ্রহের প্রাণরক্ষায় ব্যস্ত?

মকরকেতু ওই দৃশ্য দেখে অবাক হয়ে বলল, 'সবই মায়া সরােবরেশ্বরের ইচ্ছা।' তারপর সে দ্রুত পাহাড় থেকে নীচে নামল। তার সঙ্গী সাথীরাও একে একে নীচে নামল। ওদের মধ্যে একজন ছিল একটু খোঁড়া। সে একটু আস্তে আস্তে পাহাড় থেকে নামছিল।

সাধক কাছাকাছি দাঁড়িয়ে লক্ষ করল, জলগ্রহ কোনােরকমে নিজেকে মুক্ত করে পালানাের চেষ্টা করছে। ওদিকে মকরকেতু ও তার সঙ্গীদের আসতে দেখে জয়শীল বলল, ‘সাধক, দেখতে পাচ্ছ, মকরকেতু এদিকে আসছে। সবদিক থেকে প্রস্তুত থেকো। হয়তাে ওদের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে।'

সাধক গা-ঝাড়া দিয়ে বলল, 'জয়শীল, এখন পর্যন্ত আমরা কাউকে তাে ভয় পাইনি। ভয়ের অবশ্য কোনাে কারণও ঘটেনি। তােমার হাতে আছে সাক্ষাৎ মহাকালের দেওয়া অপরাজেয় তরবারি আর আমার ত্রিশূলের ক্ষমতা যে কতখানি তা তাে তুমি ভালােভাবেই জানো ।'

জল-ঘােড়ায় চেপে ওদের পেছনে দাঁড়িয়ে সর্পনখা জয়শীল ও সিদ্ধ সাধককে বলল, 'শুনুন, আপনারা ওই নরদানবকে মারতে পারেন। কিন্তু দয়া করে জলগ্রহকে মেরে ফেলবেন না। যিনি এই জল-হাতি জলগ্রহের মালিক সেই মকরকেতু কিন্তু মহাশক্তিমান। তার ক্ষমতা অসীম।'

‘তােমার ওই শক্তিমানের চামড়া ছাড়িয়ে নেবাে এই ত্রিশূল দিয়ে, বুঝতে পেরেছ? তুমি একদম চুপচাপ থাকবে বলে দিচ্ছি।' বলে সিদ্ধ সাধক রক্তচোখে তাকিয়ে দাঁত কটমট করতে লাগল।

জয়শীলের তরবারির আঘাত লাগার সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে জলগ্রহ জয়শীলকে আক্রমণ করতে গেল। তখন সে ঝট করে জল-ঘােড়ার পিঠে চড়ে জলগ্রহকে আঘাত করার চেষ্টা করল। জলগ্রহ জয়শীলকে শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে ফেলতে চাইল। তখন নিরুপায় হয়ে জয়শীল তরবারি দিয়ে হাতির মাথায় আঘাত করল। ততক্ষণে হাঁপাতে হাঁপাতে মকরকেতু সেখানে পৌঁছে গেল। তাকে দেখেই জয়শীল বলল, ‘কেতু, তােমার এই হাতিটাকে একটু সামলাও তাে। এই তােমার জন্যে আমাকে আর সাধককে বনে-জঙ্গলে খামােখা এত কষ্ট পেতে হচ্ছে। দেখছ দেখছ, তােমার জলগ্রহের কাণ্ড দেখছ। আমাকে না মেরে ফেলে ওর যেন কিছুতেই শান্তি হচ্ছে না।'

‘জয়শীল, দোহাই তােমারা আমার জলগ্রহকে মেরে ফেল না। মনে রেখ, এই মুহূর্ত থেকে তােমরা এবং আমরা পরস্পরের বন্ধু। তুমি তাে কতদিন থেকে মায়া সরােবরে যাওয়ার জন্য আগ্রহী। তােমার সেই আগ্রহ আজ আমি মেটাব। আমিই তােমাকে সেই আশ্চর্য দেশ মায়া সরােবরের রাস্তা দেখিয়ে দেব।' মকরকেতু জয়শীলকে অনুনয়ের সুরে ও স্থির কণ্ঠে বলল।

শত্রু মকরকেতুর এই আশ্চর্য নরম সুর ও পরিবর্তনে জয়শীল সত্যই আশ্চর্য হল। এসব মকরকেতুর কোনাে নতুন ফন্দি নয় তাে? জয়শীল খারাপ দিকটাও ভাবল। কিন্তু এখন বড়ােই বিপদের সময় ভাবাভাবির সময় নয়। তাই তৎক্ষণাৎ জয়শীল মকরকেতুকে সাগ্রহে বলল, 'কেতু, আমি কিন্তু মায়া সরােবরে যাওয়ার জন্যই যে আগ্রহী তা ঠিক নয়, আসলে আমার আগ্রহ মায়া সরােবরে কনকাক্ষ রাজার যে রাজকুমার ও রাজকুমারী বন্দি আছে তাদের উদ্ধার করা। যেকোনােভাবে আমার এই অনুরােধ যদি তােমার মায়া সরােবরেশ্বরের কাছে পৌছানাে যায়, তােমার মায়া সরােবরেশ্বর যদি ওদের মুক্ত করেন তাহলেই আমি খুশি। এখন আমি কী করব তুমিই বল।'

সাধক আর ধৈর্য ধরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে তাড়াতাড়ি জয়শীলের কাছে এসে তাকে ফিসফিস করে বলল, 'জয়শীল, ওকে অত অনুরােধ করছ। কেন? ওকে অনুরােধ করার চাইতে বরঞ্চ ওকে আর ওই ওই সঙ্গীদের মেরে বেঁধে গুহার মধ্যে ফেলে রেখে চল আমরা মায়া সরােবরের পথে এগিয়ে যাই।'

তারপর সাধক নরদানবের দিকে তাকাল। সেটা চিতপাত হয়ে পড়েছিল। তার বুকে কান রেখে সাধক বলল, 'না, একেবারে মরে যায়নি। তবে উঠতে সময় লাগবে। ওহে সর্পনখা, ঝট করে নদীর জলে একটু কাপড় ভিজিয়ে নিয়ে এসাে তাে।' সাধক তাকে এমনভাবে বলল যেন সে তার চাকর।

এভাবে নির্দেশ দেওয়ায় সর্পনখা রেগে গিয়ে মকরকেতুর দিকে তাকাল। সর্পনখা যেন মকরকেতুর কাছ থেকে কিছু একটা আদেশের অপেক্ষায় আছে। মকরকেতুও সর্পনখার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলল না। তা লক্ষ করে সাধক সর্পনখার কাছে এসে বলল, ‘মনে রেখ— ওই মকরকেতু এখনও তােমার প্রভু নয়। আমি যা বলেছি তা তাড়াতাড়ি পালন করাে।'

সর্পনখা আবার মকরকেতুর পানে কিছু একটা নিদের্শ পাওয়ার আশায় তাকাল। কিন্তু মকরকেতুর কাছ থেকে নির্দেশ পাওয়া তাে দূরের কথা সে এমনভাবে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইল যেন সে সর্পনখার কথা শােনেনি, যেন সে তাকে চেনেই না। এই লুকোচুরি খেলাটা ভালাে করে লক্ষ করে সাধক মকরকেতুকে পরিহাসের সুরে বলল, 'ওহে কেতু, তুমি তােমার সঙ্গে আবার তিন জনকে আনলে তার মধ্যে একজন আবার খোঁড়া। কী ব্যাপার সত্যি করে বল তাে?

‘সাধক, এই খোঁড়া লােকটাও তােমাদের রাজকুমার ও রাজকুমারীকে খুঁজতে এসেছিল। এর নাম নাকি মঙ্গলবৰ্মা’ মকরকেতু বলল।

জয়শীল মনে মনে ভাবল: এই সেই মঙ্গলবৰ্মা! এই মঙ্গলবৰ্মাই কি আমার সঙ্গে প্রতিযােগিতা করতে গিয়ে বাঘের ভয়ে পালিয়েছিল। ততক্ষণে সাধক জয়শীলের কাছে এসে চুপি চুপি বলল, 'জয়শীল মঙ্গলবর্মাকে চিনতে পেরেছ?’

জয়শীল চোখের ইশারায় জানিয়ে দিল যে সে চিনতে পেরেছে। এদিকে মকরকেতু যাকে বৈদ্যদেব নামে ডাকছিল সে জয়শীলের কাছে এসে এমনভাবে ইশারা করল যাতে তাকে যেন দেবশর্মা নামে ডাকা না হয়।

প্রথমে রাগ হলেও পরে সর্পনখা মহাশক্তিমান মকরকেতুর এই নিস্পৃহ আচরণের কথা একটু একটু করে বুঝতে পারল। এবং সঙ্গে সঙ্গে এ-কথাও বুঝতে পারল যে তারা যত শক্তিধরই হােক— এখন তারাই বিপদগ্রস্ত।

সুতরাং নদীর জলে কাপড় ভিজিয়ে সর্পনখা ফিরে এল সাধকের কাছে। সাধক নরদানবের মুখে কাপড় নিংড়ে জল ঢেলে তার কপালে ভিজে ন্যাকড়া ছপ ছপ করে মেরে বলল, নরদানব, তুমি যে বেঁচে আছ তা আমি জানি।

আমি যাকে বাঁচাতে চাই সে বেঁচে ওঠে।'

কিছুক্ষণের মধ্যেই নরদানব পিট পিট করে চোখ খুলল। চোখ খুলেই অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জলগ্রহকে দেখে সে খুবই ভয় পেয়ে গেল।

তা লক্ষ করে সাধক তার পিঠ চাপড়ে বলল, 'নরদানব, তােমার কোনাে ভয় নেই। আমি আছি। এবার তুমিই হবে আমার বাহন।' এই বলে সাধক তার পিঠে ত্রিশূল চেপে ধরল।

নরদানব দাঁত কটমট করতে করতে সাধকের দিকে তাকাল। তার ওই ভাব লক্ষ করে সাধক তার পিঠে সপাং করে মারল। ওই আঘাত খেয়ে গোঁ গোঁ করতে করতে নরদানব দমে গিয়ে সাধকের পায়ের কাছে প্রণাম করার ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার ওই ভঙ্গি দেখে সিদ্ধ সাধক মহানন্দে হাে-হাে করে হাসতে লাগল।

বাইশ

মকরকেতু এবং সেখানকার অন্যলােকেরা যখন দেখল যে নরদানব সিদ্ধ সাধকের বশ হয়ে গেছে, তারা অবাক হয়ে যায়। জয়শীল খুশি হয় খুব, ‘দীর্ঘকাল পরে সিদ্ধ সাধক তাহলে নিজের জন্য এক বাহন পেয়ে গেল। কিন্তু এটা খুব বিপজ্জনক এক বাহন। বলা যায়, কৃপাণজিৎকে সেই বধ করে। সর্পস্বরাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। জানি না, কীভাবে সেটার কবল হতে বেঁচে এসেছে।'

‘আমিই সর্পস্বরাকে নরদানবের হাত থেকে বাঁচিয়েছি। তার কাছ থেকেই জেনেছি তুমি এখানে কোথাও আছ।' মকরকেতু বলল।

জয়শীল মকরকেতুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে তারপর বলল, 'তােমার সেই ক্ষতের কী হল? এত তাড়াতাড়ি তুমি সুস্থ হয়ে উঠেছ, খুবই আশ্চর্য লাগছে।'

দেবশর্মাকে দেখিয়ে মকরকেতু বলল, ‘পাহাড়ের উপরে অচৈতন্য হয়ে। পড়েছিলাম। আমার বেঁচে ওঠার কোনাে সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু ইনি আমার চিকিৎসা করে আমায় বাঁচিয়ে তুলেছেন। সকল বৈদ্যকে ভগবান বলা হয়, তাই আমিও এনাকে বৈদ্যদেব নামে ডাকছি। এরমধ্যে এনাকে নিয়ে আমি একবার মায়া সরােবরেও গেছি, তােমাকে সন্ধান করার জন্যই আবার এখানে আসি।'

অমরাবতী নগরে দেবশর্মা জয়শীলের বাল্যবন্ধু ছিল। এভিন্ন সে ছিল এক জুয়াড়ি। বহু বৎসর পর তাদের দুজনের সেই ভগ্ন পরিত্যক্ত গৃহে সাক্ষাৎ হয়। জয়শীল বুঝতে পারে না, দেবশর্মা কীভাবে কখন এই বৈদ্য শিক্ষা লাভ করে। কোথা থেকেই বা শেখে। সে দেবশর্মাকে নমস্কার জানাবার ভান করে। বলল, ‘বৈদ্যদেবজি, এই মঙ্গলবর্মা কি আপনার অনুচর?’

প্রশ্ন শুনে দেবশর্মা হসে বলল, মঙ্গলবৰ্মা আমার শিষ্য। এই বিদ্যা আমার কাছে শিখছে। মায়া সরােবরে যাওয়ার তার তীব্র ইচ্ছা ছিল। বর্মা, আমি সঠিক বলেছি তাে?’

মঙ্গলবৰ্মা এক কাতরধ্বনি করে দীর্ঘশ্বাস গ্রহণ করে, তারপর নিজের কাঠের পাটা দেখিয়ে কিছু বলতে যাবে তখনই আকাশে পাখার ঝাপটের বেশ জোর শব্দ শােনা যায়। সকলে মাথা উঁচু করে দেখে।

তারা দেখল, বিরাটাকায় হাঁসের এক দল উড়ে চলেছে, আর সেই সাথে আকাশ পথ দিয়ে একটা রথ টেনে নিয়ে চলেছে। ওই দৃশ্য দেখামাত্র মকরকেতু, সর্পনখা এবং সর্পস্বরা দুই হাত তুলে নমস্কারের ভঙ্গি করে চিৎকার করতে থাকে, ‘জয়, মায়া সরােবরেশ্বরের জয়!’

রথের আরােহীরা এই চিৎকার শুনতে পায়। রথ আকাশের শূন্যে পলকের জন্য থেমে যায়, তারপর দ্রুতগতিতে জয়শীল এবং অন্যদের দিকে দ্রুত নেমে আসতে থাকে। পাশের বয়ে যাওয়া নদীতে নামে।

নদীর কিনারায় দাঁড়িয়েছিল মকরকেতু, সর্পনখ ও সর্পরা। জলের উপর রথ নেমে আসামাত্র তারা আশ্চর্য হয়ে যায়, একজন অপরজনকে বলে, ‘অঙ্গরক্ষক একা রথে করে কেন এখানে এল?’ তারপর তিন জন সময় অপচয় না করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে রথের দিকে এগিয়ে যায়।

নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে রইল জয়শীল, সিদ্ধ সাধক, বৈদ্যদেব নামে পরিচিত দেবশর্মা এবং সেনাধিপতির পুত্র মঙ্গলবর্মা। জয়শীল ইশারায় দেবশর্মাকে কিছু বলে তারপর মঙ্গলবর্মাকে বলল, 'বর্মা, আমরা মােটেই চিরকালের জন্য পরস্পর শত্রু নই, আবার বন্ধুও নই। তােমাকে দেখে বােধ হচ্ছে, তুমি মায়া সরােবর ঘুরে এসেছ। আমি যা মনে করেছি, সেটা কি সত্য নয়? সেখানে কি তুমি রাজা কনকাক্ষর সন্তান কাঞ্চনমালা এবং কাঞ্চনবর্মাকে দেখেছ? তারা কেমন আছে?’

মঙ্গলবর্মা কোনাে উত্তর দেওয়ার পূর্বে তার কাঠের পায়ের দিকে দেখে, তারপর দেবশর্মার দিকে তাকিয়ে বলল, 'এরকম প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে বৈদ্যদেবের অনুমতি চাই।'

জয়শীল তার প্রশংসা করে বলল, 'তােমার গুরুভক্তি প্রকৃতই প্রশংসনীয়। ঠিক আছে, এই প্রশ্ন তােমার গুরুকেই আমি জিজ্ঞাসা করছি।'

এরমধ্যে ‘জয় মহাকাল’ হুংকার দিয়ে সিদ্ধ সাধক তার বাহন নরদানবের কাঁধের উপর থেকে নেমে আসে। 'জয়শীল, এরা তাে জলের পাখি। এদের সাথে কথা বলে কেন অযথা সময় নষ্ট করছ। ওখানে ওই কুমিরের মুখ-ওয়ালা, তার অনুচররা তাে ওই পক্ষীরথে করে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।'

'সাধক, যদি সত্যি তারা পালিয়ে যেতে চায় তবে পালাবেই। আমরা তাদের বাধা দিয়ে ধরে রাখতে পারব না। আমাদের সাথে তাে তাদের দুই অনুচর থাকছে।' জয়শীল বলল।

সিদ্ধ সাধক চোখ গােল গােল করে মঙ্গলবর্মা ও দেবশর্মাকে দেখে কয়েক বার ঘাড় ঘুরিয়ে, তারপর বলে, 'এই মঙ্গলবর্মাকে পূর্ব হতেই জানি। অন্যজনকে জলমানব বলে তাে মনে হচ্ছে না। মায়া সরােবরে যাওয়ার জন্য যাদের কাছ থেকে সহায়তা পেতে পারি তারা ওখানে নদীতে। যদি ওরা পালিয়ে যায় রথে করে তবে মায়া সরােবর পৌঁছতে আমাদের পক্ষে বড্ড অসুবিধা হয়ে উঠবে।'

তার কথা শুনে দেবশর্মা রেগে যায়, ‘সাধক, তুমি কথা বলাে বেশি আর রাগ কর বেশি, কিন্তু চিন্তাভাবনা খুবই কম। একবারও কি ভেবে দেখেছ, মকরকেতু কেন এই পর্বতপ্রান্তে এসেছে? তােমাকে আর তােমার বন্ধুকে মায়া সরােবরে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এসেছে। সেখানে তােমাদের দুজনকে ভয়ংকর জলবৃক্ষ রাক্ষসদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে, তাদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে হবে।'

‘জল রাক্ষস! মহকালের সহায়তায় তাদের এই শূলের দ্বারা বধ করে জল থেকে তুলে কিনারায় ছুঁড়ে দেব। আর, জয়শীলের কাছে রয়েছে মহাকালের সেবক কালাকাল প্রদত্ত তরবারি।' সিদ্ধ সাধক বলল।

জয়শীল বােঝে যে, ওভাবে চললে কথায় কথা বাড়তে থাকবে, ঝগড়া সৃষ্টি হবে, বিপদ হতে পারে তা থেকে। সাধক জানে না যে দেবশর্মা তার বাল্যবন্ধু। তাই সে কথায় বাধা দিয়ে দেবশর্মাকে বলল, 'বৈদ্যদেবজি, আপনি কি আপনার শিষ্য মঙ্গলবর্মাকে ওই রথের কাছে পাঠাতে পারবেন, তাহলে জানতে পারবে কি আলাপাদি হচ্ছে তাদের মধ্যে?’

দেবশর্মা বুঝতে পারে জয়শীল কেন বলল। সে মঙ্গলবর্মাকে বলল, ‘শিষ্য মঙ্গল, তুমি ওই রথের কাছে যাও এবং জানার চেষ্টা কর ওই হাঁস-রথে মায়া সরােবরেশ্বর কেন নেই, পরিবর্তে তার দেহরক্ষী কেন এসেছে?’

মঙ্গলবৰ্মা মাথা নীচু করে দেবশর্মাকে প্রণাম করে জলের দিকে যায়। জলে নেমে রথের দিকে এগােতে থাকে। সে চলে গেলে জয়শীল দেবশর্মাকে জিজ্ঞাসা করে, 'শর্মা, এবার বলাে, মায়া সরােবরেশ্বরের ওখানে হিরণ্যপুর হতে অপহরণ করে আনা রাজকুমার এবং রাজকুমারী কুশলে আছে তাে?’

‘দু-জনেই কুশলে আছে। তারা অপহৃত হওয়ার পরে ওখানে তাদের পিতা হিরণ্যপুরের রাজা দুঃখে হতাশায় রয়েছে, আর এখানে মায়া সরােবরেশ্বর নিজেও তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত, দুঃখ বােধ করছে' দেবশর্মা বলল।

তাদের দুজনের মাঝে দাঁড়িয়েছিল সাধক। উভয়ের মধ্যে আলাপ শুনে জোরে চেঁচিয়ে ওঠে ‘জয় মহাকাল’ চিৎকারে। তারপর জিজ্ঞাসা করে, 'জয়শীল, তােমরা কি প্রথম হতে দু-জন দুজনকে চেন? এতক্ষণ তুমি এ-কথা আমার কাছে লুকিয়ে রেখেছিলে কেন?’

জয়শীল তাকে খুব ধীর গলায় বলল, ‘সাধক, একটু শান্ত হও। দেবশর্মা আমার বাল্যবন্ধু। ওই নগরে ছিল, এক জুয়াড়ি। বিরাট বড়াে কাহিনি সেসব। কিন্তু, মকরকেতু যেন জানতে না পারে আমরা দু-জন বন্ধু। যদি এ-কথা সে জানতে পারে তাহলে এই মায়া সরােবরেশ্বরকে আমরা বন্দি করতে পারব না। সেই সাথে কাঞ্চনমালা ও কাঞ্চনবর্মাকেও আমরা মুক্ত করতে পারব না।'

‘সঠিক বলেছ তুমি। এবারে আমার মাথায় ঢুকল সমস্ত। সাবধানে থাকতে হবে। কিন্তু হাঁসে টানা রথ এখানে এসে নামল কেন? এ তাে আমাদের কাছে একটা প্রহেলিকা হয়ে দাঁড়াল। আমরা জানি না এর পিছনে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে। হয়তাে, আমাদের দুজনের বন্ধু দেবশর্মা এই রহস্য জানবে,’ বলে সাধক অত্যন্ত খুশিমনে তাকে আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরল।

দেবশর্মার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সেও সাধকের আন্তরিকতাকে গ্রহণ করে বলল, ‘মায়া সরােবরের জলবৃক্ষ রাক্ষসদের তুমি যদি বধ করতে পার তবে মহাকালের সকল শক্তিসামর্থ্য তুমি লাভ করবে। ওই জলবৃক্ষ রাক্ষসরা তােমার আরাধ্য মহাকালের পরমশত্রু।'

‘ও তাই নাকি! তাদের ধরব, ধরে এই নরদানবের খাদ্য তৈরি করব। নরদানব তুমি খেতে পারবে তাে?’ বলে সাধক নরদানবের কাঁধে তার শূল দিয়ে সামান্য খোঁচা দেয়।

ব্যাস, নবদানব যেন প্রাণ পায়, নদীর কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল জলগ্রহ হাতি, তার দিকে এগিয়ে যায়। সাধক তাড়াতাড়ি সেটার হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে বলল, 'দাঁড়াও নরদানব, দাঁড়াও। আমরা এখন মকরকেতু ও তার প্রভু মায়া সরােবরেশ্বরের মিত্র। এই জল-হাতিকে তুমি তােমার বড়াে ভাইয়ের মতাে মনে করাে।'

সাধকের কথা শুনে দেবশর্মা হাে হাে করে হেসে ওঠে। তারপর তার রত্নখচিত লাঠিটি তুলে নিয়ে নদীর দিকে নিশানা করে বলল, ‘মনে হচ্ছে, মায়া সরােবরের কোনাে বিষয় নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। যদি তা না হত, তবে সরােবরেশ্বরের ওই রথ এই নদীতে নেমে আসত না।'

ওই বিষয়ে দেবশর্মা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বলা হয় না। মকরকেতু এবং মঙ্গলবৰ্মা সেখানে আসে। দু-জনের চোখে-মুখে উদবিগ্ন ভাব। তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, কোনাে অপ্রিয় ঘটনা ঘটেছে। কান্নাভরা গলায় মকরকেতু বলল, ‘বৈদ্যদেব, এক ঘণ্টা পূর্বে যখন মায়া সরােবরেশ্বর তার হাঁসের রথে জলবিহার করছিলেন তাঁর সাথে ছিল কাঞ্চনমালা, তখন জলবৃক্ষ রাক্ষসেরা জলের গভীর হতে অকস্মাৎ উপরে উঠে এসে রথ আক্রমণ করে কাঞ্চনমালাকে ধরতে চায়। রথ চালক এবং অঙ্গরক্ষক ওই ভয়ানক বিপদ হতে বাঁচার জন্য রথ নিয়ে আকাশে উড়ে যায়, কিন্তু...' আর বলতে পারে না, দু-চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। চোখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

দেবশর্মা উৎকণ্ঠাভরা স্বরে জিজ্ঞাসা করে ‘রথের মধ্যে বসেছিল সরােবরেশ্বর এবং কাঞ্চনমালা, তাদের কী হল?’

মকরকেতু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'খুবই অনর্থ হয়ে গেছে। হাঁসরা রথ নিয়ে যখন আকাশে উড়ছিল তখন শকুনির এক বিরাট দল ওদের উপর এসে পড়ে। হাঁসরা ভয় পেয়ে এদিক-ওদিক পালাবার চেষ্টা করে, তখন রথ উলটে যায়। সরােবরেশ্বর এবং রথের চালক, রাজকুমারী নীচের মহারণ্যে কোথাও গিয়ে পড়ে।'

এ-খবর শুনে দেবশর্মা, জয়শীল, সিদ্ধ সাধক— সকলেই স্তম্ভিত হয়ে যায়। ‘রাজকুমারী কাঞ্চনমালা যখন এত উঁচু থেকে পড়েছে তখন তার বেঁচে থাকার আর কোনাে সম্ভাবনা নেই। সাধক, এতদিন আমরা যত পরিশ্রম করেছি, সমস্ত ব্যর্থ হয়ে গেল। আমরা যে কথা দিয়েছিলাম তা রক্ষা করতে পারলাম না।' জয়শীল কোমরে ঝুলন্ত খাপ হতে তরবারি খুলে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে।

'তার পিতার উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেল, তা জানতে পারলে পদ্মমুখী যা কিছু করে বসতে পারে,’ একথা বলে দেবশর্মা তার হাতের লাঠি মাটিতে রেখে বসে পড়ে।

সকলের উদাস চেহারা দেখে সিদ্ধ সাধক বলল তখন, 'নিরাশ হয়ে কী লাভ! হতে পারে, রথ থেকে তারা কোনাে সরােবরের জলে গিয়ে পড়েছে, অথবা কোনাে গাছের উপরে। তাদের অনুসন্ধানে কিছু লােককে পাঠানাে হােক, আর আমি জলরাক্ষসদের বধ করে মহাকালের কাছে বলি দেবার জন্য বেরিয়ে পড়ি। মায়া সরােবর এখান থেকে কতদূর?’

সিদ্ধ সাধক তার কথা শেষ করতে পারেনি, তার মধ্যেই নদী থেকে জোর চিৎকার শােনা যায়, 'জলরাক্ষস, জলরাক্ষস।'

জয়শীল সহ সকলে সেদিকে ফিরে তাকায়। নেকড়ের মুখ-ওয়ালা কিছু রাক্ষস পাথর দিয়ে তৈরি গদা উঁচিয়ে হাঁসের রথকে ঘিরে ফেলার জন্য দ্রুত সেদিক এগিয়ে যাচ্ছে।

তেইশ

জলরাক্ষসগুলাে চারদিক থেকে এসে রথটাকে ঘিরে ফেলেছে দেখে জয়শীল সতর্ক হল। সে যে তরবারিটা ফেলে দিয়েছিল সেটা কুড়িয়ে হাতে তুলে নিয়ে বলল, 'এরাই কি সেই জলরাক্ষস? এদের মুণ্ডুগুলােও দেখছি ভেড়ার মতাে। অথচ কী আশ্চর্য শরীরটা মানুষের!’

মকরকেতু নিজের হাতে যে অস্ত্র ছিল সেই অস্ত্র শক্ত করে ধরে নদীর দিকে দু-পা গিয়ে থেমে ডাকল, ‘জয়শীল, এই জলরাক্ষসগুলাে হংসরথকে ঘিরে ফেলবে। এদের এখান থেকে এক্ষুনি তাড়াতে হবে। তুমি কি আমাদের সাহায্য করবে?’

জয়শীল তরবারিটাকে খাপে ঢােকাতে ঢােকাতে বলল, 'আমাদের রাজা কনকাক্ষ মহারাজের ছেলে-মেয়েকে মায়া সরােবরের রাজা অপহরণ করেছে। এখন আমাকে যেকোনাে ভাবে রাজার ছেলে-মেয়েকে উদ্ধার করতে হবে। তারপর তােমাদের রাজাকে একহাত দেখে নেবাে। তােমাদের রাজার কপাল ভালাে যে সে এই মুহূর্তে রথে নেই। আমার কথা তুমি বুঝতে পারছ?’

তার এই কথা শুনে অবাক হয়ে দেবশর্মাকে বলল, 'বৈদ্যদেব, জয়শীল যে আমাদের বিরুদ্ধে এতটা শত্রুভাবাপন্ন তা আমি ভাবতে পারিনি। আপনি তাে নিজের চোখে দেখলেন কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়েকে আমাদের মহান মায়া সরােবরেশ্বর কত সুখে রেখেছেন।'

দেবশর্মা বলল, 'জয়শীল, তােমাকে আমার বিশেষ অনুরােধ, খাপ থেকে আগে তরবারি বের করাে। এটা মায়া সরােবরেশ্বরের বিরুদ্ধে প্রতিশােধ নেবার সময় নয়।' জয়শীল তৎক্ষণাৎ খাপ থেকে তরবারি বের করল। এমন সময় সিদ্ধ সাধক ‘জয় মহাকাল’ বলে প্রচণ্ড এক চিৎকার করে একলাফে গিয়ে নরদানবের পিঠে চেপে বসল। আর চোখের পলকে সবাইমিলে ছুটে গিয়ে জলরাক্ষসদের মােকাবিলা করল।

এতক্ষণ হংসরথের ভেতরে বসে মায়া সরােবরেশ্বরের অঙ্গরক্ষক আপ্রাণ চেষ্টা করছিল যাতে রথটা রাক্ষসদের হাতে না পড়ে। জলগ্রহের পিঠে চেপে মকরকেতুকে আসতে দেখে জলরাক্ষসগুলাে ভয় পেল। ওরা যেই ভয় পেল সঙ্গেসঙ্গে জলগ্রহ ওদের এক-একটাকে শুঁড় দিয়ে ধরে তীরে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। ওদিকে জয়শীল সেই নদীর জলে সাঁতার কাটতে কাটতে সুকৌশলে তরবারির আঘাতে ওদের এক-একটাকে কচুকাটা করতে লাগল।

সিদ্ধ সাধক নরদানবের পিঠে চেপে জলরাক্ষসদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। নরদানব অনেক্ষণ পরে একটি জলরাক্ষসকে ধরে তীরে উঠে এল। তার পেছন পেছন মকরকেতু, সর্পনখা আর সপৗঁরাও তীরে উঠে এল। জয়শীল কিন্তু তখনও জলেই ছিল। ওদের তীরে উঠে আসতে দেখে সে রথের ভেতর ঢুকে চিৎকার করে বলল, 'ওহে সরােবরেশ্বরের অঙ্গরক্ষক, রথটাকে তীরে নিয়ে যাও। তুমি যদি এখন তােমার রথটাকে নিয়ে নদী থেকে আকাশে ভোঁ করে উড়ে পালানাের তাল করাে তাহলে কিন্তু তুমি বাঁচতে পারবে না। অতএব যা বলছি তাই করাে। '

তার কথা শুনে অঙ্গরক্ষক চোখ লাল করে বলল, 'দেখ— মহাশক্তিসম্পন্ন মায়া সরােবরেশ্বরের অঙ্গরক্ষক আমি। আজ পর্যন্ত আমাকে এই ধরনের অপমানজনক কথা বলার সাহস কেউ পায়নি।'

'তাই নাকি! বেশ আমি তাহলে তােমাকে অপমান করছি। ঠিক আছে, তােমার ওপর এখন তরবারি চালাব না।' এই বলে তরবারি রেখে দিয়ে জয়শীল অঙ্গরক্ষকের গলা চেপে ধরল।

অঙ্গরক্ষক কোঁ কোঁ করে অনেক কষ্টে বলল, 'তুমি কে? তােমাকে আমি চিনি না। তবে মনে হচ্ছে তুমি খুব শক্তিশালী। আমার গলা ছেড়ে দাও।'

জয়শীল গলা ছেড়ে দিয়ে বলল, 'এখন বুঝতে পারলে তাে। রথটাকে ভালােয় ভালােয় তীরে নিয়ে চল। তােমার রাজার সম্পর্কে তােমার কাছে আমাকে অনেক কিছু জানতে হবে।'

অঙ্গরক্ষক আর একটিও কথা বলল না। সে রথটাকে নদীর তীরের দিকে চালিত করল। রথটা তীরে আসার সঙ্গেসঙ্গে মহা উৎসাহে সিদ্ধ সাধক নরদানবের পিঠ থেকে নেমে দানবটি যে রাক্ষসকে ধরেছিল তাকে জিজ্ঞেস করল, 'ওহে, আমার নরদানবের হাত থেকে তােমার মুক্তি নেই। পালানাের চেষ্টা করলে কোনাে লাভ হবে না।' তারপর সে রথের কাছে গিয়ে বলল, ‘জয়শীল, নরদানবকে নিয়ে। এই রথে চেপে হিমালয়ের শিখরে গিয়ে তপস্যা করার ইচ্ছা আছে। রথটা তাে তেমন বড়াে নয়, আমাকে আর এই নরদানবকে বইতে পারবে তাে?’ এই প্রশ্ন শুনে হেসে জয়শীল রথের ভেতরের অঙ্গরক্ষককে দেখিয়ে দিল। অঙ্গরক্ষক বলল, 'এই রথ সম্পর্কে দেখছি যে তােমাদের কোনাে ধারণাই নেই। লােক ভাবে, রথটাকে বুঝি হাঁসগুলােই টানে। তা নয়। এই হাঁসগুলাে বলা চলে রথের অলংকার। এই রথ স্বয়ং মায়া সরােবরেশ্বরের সৃষ্টি। এই রথ ইচ্ছা করলে যখন-তখন সাত দুগুণে চোদ্দোটা লােক নিয়ে ঘুরে আসতে পারে।'

‘সে কি! এরকম একটা রথ থেকে তােমাদের রাজা পড়ে গেল? তুমি কি তখন ঘুমােচ্ছিলে? আর আজেবাজে কথা বল না। অনেক হয়েছে। আর একটি কথা বলেছ কি এই ত্রিশূল দিয়ে তােমাকে শেষ করে ফেলব।' বলে তার দিকে তার ত্রিশূল তুলে ধরল।

জয়শীল সাধককে থামিয়ে বলল, 'সাধক, রথ থেকে শুধু সরােবরেশ্বর পড়ে যায়নি। হিরণ্যপুরের রাজা কনকাক্ষের মেয়ে কাঞ্চনমালাও পড়ে গেছে।'

মকরকেতুর চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ভাব ফুটে উঠেছে। সে বলল, জয়শীল আমরা এই রথে চড়ে আমাদের রাজাকে একটু খুঁজতে চাই। জানি না, এখন তিনি কোথায় কীভাবে আছেন।' বলে সে জয়শীলের জবাবের অপেক্ষায় রইল।

জয়শীল তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, ‘মকরকেতু, আমাদেরও বেরুতে হবে। রাজকুমারী কাঞ্চনমালার যে কী অবস্থা হয়েছে কে জানে! তার যদি কোনাে বিপদ হয়ে থাকে তাহলে সমস্ত দায়িত্ব তােমার রাজার উপর বর্তাবে। আমরা অবশ্যই বাধ্য হব, তােমাদের রাজার মুণ্ডুটা নিয়ে গিয়ে যথাযথভাবে কনকাক্ষ রাজাকে উপহার দিতে।'

এতক্ষণ দেবশর্মা চুপচাপ সব কিছু দেখছিল এবং শুনছিল। সে হঠাৎ মাথা উপরের দিকে তুলে ঝট করে বলল, 'জয়শীল, এখন আর এখানে মিছিমিছি সময় নষ্ট না করে মায়া সরােবরেশ্বর ও কাঞ্চনমালার খোঁজে আমাদের বেরিয়ে পড়া কি উচিত নয়?’

‘তা অবশ্য ঠিক বলেছ। আমরা সরােবরেশ্বরের ব্যাপারে বড়াে একটা আগ্রহী নই। আমরা উদবিগ্ন কাঞ্চনমালার জন্যে। কি বল সাধক? তুমি যদি আমার সঙ্গে একমত হও— তাহলে চল এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি।' জয়শীল বলল।

সিদ্ধ সাধক চারদিকে একবার বিজ্ঞের মতাে তাকিয়ে বলল, 'এই গভীর অরণ্যে কোথায় যে কে কীভাবে পড়ে আছে তা খুঁজে বের করা কি অত সহজ ব্যাপার?’

তখন সাধকের উদ্দেশে অঙ্গরক্ষক বলল, 'আজ্ঞে, কোথা যে রাজা এবং কাঞ্চনমালা পড়ে গেছে তা আমার মনে আছে। সেখানে একটি পাহাড় আছে। আর পাহাড়ের গা ঘেঁষে রয়েছে আকাশছোঁয়া গাছ। তারই পাশে একটু আগুন জ্বলছে— তাও লক্ষ করেছি। হয়তাে কেউ আছে সেখানে। অবশ্য আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই আমার বেশি নজরে পড়েছে।'

চমকে উঠে চোখ উজ্জ্বল করে দেবশর্মা রথের দিকে যেতে যেতে বলল, ‘তাহলে তাে আর কোনাে সমস্যাই নেই। আমরা সহজেই সেই জায়গায় পৌঁছে যেতে পারি। এবার সবাই রথে উঠে পড়ি।'

জয়শীল বলল, 'বৈদ্যদেব, ওই রথে সকলের কী জায়গা হবে? সাধক তুমি কি তােমার ওই বাহন নরদানবের সাহায্যে আর মকরকেতুর জলগ্রহ কি আমাদের রথ অনুসরণ করে যেতে পারবে না?’

দেবশর্মা সকলের দিকে একবার তাকিয়ে বলল, 'যাদের বাহন আছে তারা অবশ্যই বাহনে যাবে। অন্যেরা রথে যাবে। কি বল সিদ্ধ সাধক, কি হে মকরকেতু, তােমরা রাজি তাে?’

মকরকেতু সাধকের দিকে তাকাল। সাধক দাঁত কটমট করতে করতে মকরকেতুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি যথাসাধ্য তাড়াতাড়ি তােমাদের অনুসরণ করতে চেষ্টা করব। তবে একটি কথা আগে থেকেই বলে রাখি, এই মকরকেতু পথে যদি আমার কোনাে ক্ষতি করতে চায় তাহলে কিন্তু একে আমি নরদানবের পেটে চালান করে দেব।'

‘সাধক এখন কারও বিরুদ্ধে রাগ করার সময় নয়। এখন আমরা সবাই পরস্পরের বন্ধু।' মকরকেতু এমনভাবে কথাগুলাে বলল যেন এই জীবনে সে কোনােরকম অপরাধ করেনি।

‘ভালাে ভালাে কথা শুনতে ভালােই লাগে। যতদিন না আমরা কাঞ্চনমালা ও কাঞ্চনবর্মাকে জ্যান্ত অবস্থায় পাচ্ছি ততদিন আমরা কাউকে বিশ্বাস করতে পারব না। মুখে তুমি যতই বন্ধু বল না কেন মনে মনে আমি কিন্তু তােমাদের শত্রু হিসেবেই গণ্য করব।'

তারপর সাধক ও মকরকেতু বাদে সকলেই হংসরথে উঠল। শেষবারের মতাে অঙ্গরক্ষক ওদের বলে দিল, 'তােমরা মনে রেখ বিরাট পাহাড়ের পাশে আকাশছোঁয়া বিরাট গাছ আছে আর তারই মাঝখানে এক জায়গায় ! মকরকেতু মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল যে সে সব কথাই বুঝতে পেরেছে।

নরদানব যে জলরাক্ষসকে ধরে রেখেছিল সেই রাক্ষস সাধককে বলল, ‘হে মহাবীর, এবার থেকে আমি মনে-প্রাণে তােমাদের সেবা করতে চাই। হে সাধক, আমাকে তােমার সেবা করার সুযােগ দিয়ে এ জীবন ধন্য কর। সাধক তার কথা শুনে খুশি হয়ে বলল, 'ওহে জলরাক্ষস, এখন আমরা একজায়গায় যাচ্ছি। নরদানবের গতি বড়াে তীব্র। তুমি কি পারবে এই নরদানবকে অনুসরণ করতে?’

‘আজ্ঞে আমার পাখির মতাে ডানা নেই বটে, তবে আমি মাটির ওপর অতি দ্রুত হাঁটতে পারি। আকাশে পাখির গতি যত মাটিতে আমার গতিও প্রায় তত।' নম্রভাবে বলল জলরাক্ষস।

‘বা বা! দারুণ কথা বলেছ তাে।' বলে সাধক জলরাক্ষসের পিঠ চাপড়াল।

নরদানবের ঘাড়ে চেপে সাধক বেরােতে যাবে এমন সময় বেঁটেদের সেনাবাহিনীর লােকজন এল। ওদের দেখে চমকে উঠে, সাধক বলল, 'আরে, তােমরা এখানে চলে এসেছ, কী ব্যাপার?’

বেঁটেদের সেনানায়ক বলল, 'হে সাধক, এখানে যা ঘটেছে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আমরা তা লক্ষ করেছি। যেসব জলরাক্ষস আহত হয়ে পড়ে আছে তাদের কি ওইভাবে ফেলে রেখে যাওয়া উচিত হবে? অনুমতি পেলে ওদের আমরা সারিয়ে তুলতে পারি।'

‘ভালাে ভালাে—খুব ভালাে কথাই বলেছ। তবে সেরে উঠে ওরা যদি তােমাদের আক্রমণ করে তখন কী করবে?’ বলল সাধক।

সাধকের কথা শেষ হতে-না-হতেই বেঁটেদের সেনাপতি অরণ্যের এক কোণের দিকে দেখিয়ে বলল, 'কী হচ্ছে ওখানে? অত সাদা ধোঁয়া উঠছে কোত্থেকে? অরণ্যে কি আগুন ধরে গেছে? এবার কি অরণ্য পুড়ে ছাই হয়ে যাবে?’

‘না, না— অরণ্যে আগুন ধরেনি। মায়া সরােবরেশ্বর নামে এক দুরাত্মার শরীর পড়ছে। নরদানব, ওই যেখান থেকে ধোঁয়া উঠছে সেখানে ঝড়ের বেগে চল।' লাফ মেরে নরদানবের পিঠে বসতে বসতে ব্যস্তভাবে সাধক বলল।

নরদানব প্রচণ্ড গতিতে যেখানে ধোঁয়া উঠছিল সেদিকে গেল। তাকে অনুসরণ করল জলরাক্ষস এবং জলগ্রহের পিঠে চেপে মকরকেতু।

চব্বিশ

হংসরথের মুখটা যখন নীচের দিকে টলে গেল তখন তার ভেতর থেকে মায়া সরোবরেশ্বর ও কাঞ্চনমালা সহ রথের চালক অরণ্যের এক-এক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে গেল। ওভাবে পড়ে যাওয়ায় মায়া সরোবরেশ্বর খুবই অবাক হয়ে গেল। তার এ ধরণের অভিজ্ঞতা এই প্রথম।

মায়া সরোবরেশ্বর হংসরথ থেকে যেখানে পড়ল ঠিক সেখানেই দল বেঁধে থাকত মানুষখেকো একধরণের মানুষ। টানা এক হপ্তা ওরা কোনো জন্তু শিকার করতে পারেনি। কয়েক দিন আগে একদল বাঘ কোত্থেকে এসে ওই অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে অনেকগুলো পশু খেয়ে চলে গিয়েছিল। বিশেষ করে একটা হরিণও ওরা জ্যান্ত রাখেনি। ওদের গর্জন শুনে অরণ্যের জন্তুগুলো প্রাণপণে ছুটে পালাল। সেই যে পালাল আর তারা ফিরল না। ফলে অরণ্যের ওই প্রান্ত জন্তুদের অভাবে যেন খাঁ-খাঁ করছিল।

মানুষখেকোদের নেতার নাম ছিল বেব্বো। না খেতে পেয়ে কয়েক জন পালানোর তাল করছে বলে তার কানে গেল। খেতে না পাওয়ায় তারও যে খুব একটা ভালো লাগছিল তা নয়, তবু পূর্বপুরুষরা তার ঘাড়ে যে দায়িত্ব চাপিয়ে গেছে তা সে পালন করতে চায়। সে যদি সেখান থেকে চলে যায়, সেখানে পাথরের তৈরি মন্দিরের ভেতরে যে অরণ্যদেবতা আছে সেই দেবতার সামনে বছরে একবার অন্তত নরবলি না দেওয়া হয় তাহলে তো পাপ হবে। সে চলে গেলে কে এসব করবে?

বেব্বো এই ধরনের কথা ভাবতে ভাবতে ঠিক করল যেকোনোভাবে এমন একটা ব্যবস্থা করবে যাতে তার জাতভাইরা কেউ সেখান থেকে পালাতে না পারে। সে সোজা ওই মন্দিরের দিকে গেল।

মন্দিরের অবস্থা শোচনীয় ছিল। মন্দিরের দরজা জানালা ছিল না। ফলে প্রচণ্ড গরমে, বৃষ্টির সময় এবং ভয়ংকর শীতের সময় জন্তুজানোয়ার ওই মন্দিরের ভেতরে আশ্রয় নিত। দিনে না হোক রাত্রে তো জন্তুজানোয়ার থাকবেই।

সেদিন সূর্যোদয়ের সময় বেব্বো মন্দিরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেল। একটা মস্তবড়ো পাহাড়ি পাখি, অরণ্যদেবতার সামনে একটি হরিণকে ধরে বসে আছে। তার গলায় জড়িয়ে রয়েছে হরিণের শিং। একে অন্যের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য, অথবা একে অন্যকে শেষ করার জন্য ভীষণ চেষ্টা করছে যেন।

এই দৃশ্য দেখে বেব্বো ভয়ে পালাতে গিয়েও হঠাৎ কী যেন ভেবে দাঁড়িয়ে পড়ল। অরণ্যদেবতাকে উদ্দেশ্য করে সে ওই দেববিগ্রহের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, 'হে অরণ্যদেবতা, তুমি মহান! আমার গ্রামবাসী, তোমার ভক্তেরা আজ এক হপ্তা উপোস করে বসে আছে। অথচ তোমার সামনে এত খাদ্য। তুমি আমাকে নির্দেশ কর, আমি এখন কী করব?'

এমন সময় দেওয়ালের এক ফাঁক দিয়ে একটি বুনো বিড়াল বেরিয়ে এসে ম্যাঁও ম্যাঁও করতে লাগল।

'এটা নিশ্চয় কিছু বলছে। কী যে বলছে তা আমাদের বুড়ো পুরুত ঠাকুর বলতে পারবে।' মনে মনে বলে বেব্বো মন্দিরের বাইরে এসে চিৎকার করে জাতভাইদের ডাকল। ডাক শুনে জাতভাইরা সবাই ছুটে এল।

বেব্বোর লোকজন সেইসময় বনে-বাদাড়ে গাছ পাতা যা পাচ্ছিল তাই খাচ্ছিল। ওদের আসার পর বেব্বো ওদের উদ্দেশ্যে বলল, 'অরণ্যদেবতা আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। কোথায় আমাদের বুড়ো পুরুত ঠাকুর?'

বেব্বোর কথা শুনে ওরা ভাবল, দেবতা বুঝি মন্দিরের ভেতরে অসংখ্য হরিণ অথবা অন্য কোনো জন্তু লুকিয়ে রেখেছে। দেবতা খুশি হয়ে এখন সেগুলো বের করে দিচ্ছে। ওদের মধ্যে একজন বলে উঠল, 'বেব্বো, অরণ্যদেবতা ক-টা হরিণ দিচ্ছে?'

নিজের প্রশ্নের জবাব না পেয়ে বেব্বো বিরক্ত হয়ে ওদের বলল, 'ওরে আমি যা বলেছি তোরা আগে সেটা শুনবি তো। আমি জানতে চাই, বুড়ো পুরুত ঠাকুর কোথায়? তাকে না পেলে কোনো কাজ করা যাবে না। আমার কথার জবাব না দিয়ে তোমাদের যার যা মুখে আসছে তাই বলছ। অরণ্যদেবতার সামনে দাঁড়িয়ে আমি যা দেখেছি, যা শুনেছি তার অর্থ যে কী তা একমাত্র পুরুত ঠাকুর বলতে পারে। তোমরা এক্ষুনি তাকে যেখান থেকে পার ডেকে নিয়ে এসো। না থাক। খবর দাও, আমি যাব।'

পুরুত ঠাকুর একটা গাছের নীচে হেলান দিয়ে বসে ঝিমোচ্ছিল। তাকে দেখেই ওরা ছুটে গিয়ে খবর দিল। শুনেই বেব্বো পুরুত ঠাকুরের কাছে গিয়ে বলল সমস্ত ব্যাপার। শুনে পুরুত ঠাকুর চুপ করে রইল। তার ওইভাবে থাকাতে বেব্বো মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল, 'ওহে পুরুত ঠাকুর, আমি যা দেখেছি, যা শুনেছি তাতে কি আমরা এই আশা করতে পারি যে অরণ্যদেবতা কোনো-না-কোনো জন্তুজানোয়ার আমাদের খাওয়ার জন্য এখুনি পাঠিয়ে দিচ্ছেন?'

পুরুত ঠাকুরের ঝিমোনি যেন তখনও কাটেনি। কোনো কথা বলার আগ্রহ যেন তখনও ছিল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, 'পুরুত ঠাকুর হিসেবে তো আমার চুল পেকে ঝরে গেল। আজ পর্যন্ত অরণ্যদেবতা কোনো কথাই তো পরিষ্কার বলেননি। তবে তুমি যা দেখেছ, যা শুনেছ তার অর্থ হল এই যে দেবতা আমাদের বলে দিচ্ছেন জন্তুজানোয়ার যখন পাবে না তখন অন্য অরণ্যবাসীদের মতো, চাল ফুটিয়ে ভাত খাবে, ফল-মূল খাবে। এসব খেয়ে বাঁচার চেষ্টা করবে। বাঁচতে হলে এসব খেতে হবে।'

পুরুত ঠাকুরের কথা শেষ হতে-না-হতেই বিরক্ত হয়ে বেব্বো একটা লোকের হাত থেকে ছড়ি কেড়ে নিয়ে বুড়োকে শাসিয়ে বলল, 'ওরে পাজি বুড়ো, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? তুমি কি জানো না যে মাংস ছাড়া আমাদের আর কিছু খেতে নেই?' বলে বুড়োর পিঠে এক ঘা বসিয়ে দিল।

ঘা পড়তেই পুরুত ঠাকুরের যেন ঝিমুনি কেটে গেল। সে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, 'হে অরণ্যদেব, এখনও তুমি আছ? ওরে বেব্বো, কী যেন বলছিলি বল। তোমার ঘা খেয়ে আমার মাথা খুলেছে। এতক্ষণ খিদের জ্বালায় কথা বলতে পারছিলাম না।' বলে এক লাফে একটি গাছের ডাল ধরে বানরের মতো ঝুলতে লাগল।

বেব্বোর নির্দেশে দু-তিন জন বুড়োকে ধরে গাছ থেকে নামাল। তারপর বেব্বো মন্দিরের ভেতরের ঘটনা আবার বুড়োকে প্রথম থেকে বলল।

এবার পুরুত ঠাকুর সব কথা কান পেতে শুনে বুড়ো মাথা ওপরের দিকে তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ নুয়ে একমুঠো মাটি তুলে নিয়ে মন্ত্র পড়ে সেখানে যত জন ছিল প্রত্যেকের মাথায় ছড়িয়ে দিল। তারপর সবাইকে শুনিয়ে চিৎকার করে সে বলল, 'এখানে গাছপালা যা আছে তোমরা তাড়াতাড়ি নিয়ে এসে আগুন জ্বালো। বিরাট একপাত্র জল গরম কর। ওই মন্দিরে ঢুকে সেখানে যে পাহাড়ি পাখি, হরিণ এবং বুনো বিড়াল আছে সব ধরে নিয়ে এসো।'

বেব্বো বলল, 'এখনও কি ওই মন্দিরের ভেতরে বুনো বিড়াল বসে আছে? তবে পাহাড়ি পাখি আর হরিণ দুটোই হয়তো এতক্ষণে মরে গেছে। যা হোক— ওই দুটোকে আনছি।'

তার কথা শুনে বুড়ো চোখ পাকিয়ে বলল, 'বুনো বিড়ালটাকে না পাওয়া গেলে সেটা যে-পাথরের উপরে বসেছিল সেই পাথরটা আনতেই হবে। সেই পাথরটাকে গরম জলে চোবাতে হবে।'

'অরণ্যদেবতা হঠাৎ পাহাড়ি পাখি, হরিণ, বুনো বিড়াল এসব আমার চোখের সামনে তুলে ধরলেন কেন? আমরা কি দু-একদিনের মধ্যে অনেকগুলো জন্তুজানোয়ার পাব?' বেব্বো বলল।

এই প্রশ্ন শুনে পুরুত ঠাকুর হঠাৎ চিৎকার করতে করতে দু-তিন বার লাফাল। তারপর দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ টলতে লাগল। তাকে দেখে মনে হল কেউ তার উপর ভর করছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুড়ো বড়ো বড়ো চোখ করে বলল, 'তোমরা চেন আমাকে? আমি হলাম অরণ্যদেবতা। আমি যদি দয়া করি শুধু জন্তুর মাংস নয়, মানুষের মাংসও পাইয়ে দিতে পারি তা জানো? এখন যাও, এখান থেকে সরে পড়। যাও বলছি।'

পরক্ষণেই একটা মস্তবড়ো উনুন বানিয়ে বিরাট আয়তনের একটি জলের পাত্র সেই উনুনের উপর বসানো হল। সবাই মহা উৎসাহে উনুনে কাঠ জোগাতে লাগল। দাউদাউ করে উনুন জ্বলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা অঞ্চলের রূপ বদলে গেল। আকাশে আগুন ও সাদা ধোঁয়া দেখা গেল।

ঠিক এমন সময় মায়া সরোবরেশ্বর যে রথে ছিল সেই রথটি একপাল শকুন ঘিরে ফেলল। শকুনগুলো হংসরথের সামনের দিকে বসতেই হংসরথ সামনের দিকে ঝুলে পড়ল। অঙ্গরক্ষক রথের এককোণে ধরে ঝুলতে লাগল। রথের চালক, কনকাক্ষ রাজার মেয়ে এবং মায়া সরোবরেশ্বর রথ থেকে গড়াতে গড়াতে বিভিন্ন জায়গায় পড়ে গেল।

আগুন লাগে যেখানে ঝড় বয়ে যায় সেখানে। অত বড়ো উনুনে যে আগুন জ্বলছিল তার ফলে ঝড় উঠেছিল। ওই ঝড়ের তোড়ে এক-এক জন এক-এক দিকে ছিটকে ছড়িয়ে পড়ে গেল।

আকাশ থেকে মানুষকে পড়তে দেখে বুড়ো চিৎকার করে বলল, 'খিদের জ্বালায় আমরা যে মরে যাচ্ছি তা অরণ্যদেবতা টের পেয়েছেন। তিনি মানুষকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন আমাদের খাওয়ার জন্য। মানুষ, পাহড়ি পাখি, হরিণ এবং বুনো বিড়াল প্রভৃতিকে প্রথমে অরণ্যদেবতার কাছে নৈবেদ্য হিসাবে রাখতে হবে। তারপর আমরা অনেক মাংস পাব।'

পুরুতের কথা শুনে মায়া সরোবরেশ্বর পরিষ্কার বুঝতে পারল কাদের হাতে সে পড়েছে। এখন কি যে করবে তা সে ভেবে পেল না। বিরাট অঞ্চল যার অধীনে, যত সময় যাচ্ছিল, তত তার মনে ভয় বাড়ছিল। জলে পড়ার সময় জলটা সামান্য গরম ছিল বটে কিন্তু এখন বেশ গরম হয়ে গেছে। এতক্ষণে সে বুঝতে পারল সে যে জলে নেমেছে সেটা ডোবার জল নয়, একটি পাত্রের জল। এবং ওই পাত্রের নীচে উনুন আছে।

মায়া সরোবরেশ্বর জলের পাত্র থেকে উপরে উঠে আসার চেষ্টা করতেই বুড়ো পুরুত জ্বলন্ত কাঠ এনে তাকে শাসিয়ে বলল, 'ওহে শোনো, তুমি এমনি আসনি। অরণ্যদেবতার ইচ্ছায় তুমি এখানে এসেছ। এই যে জলের পাত্রে পড়েছ এও তাঁরই ইচ্ছায়। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া এখানে কিছু হয় না। এখন তুমি যদি ছটফট কর, জল থেকে উঠে আসতে চাও তাহলে কিন্তু আগুনে পুড়ে যাবে। আগুনে পুড়ে মরবে। খুব সাবধান!'

তার কথা শুনে মায়া সরোবরেশ্বর পরিষ্কার বুঝতে পারল তার মৃত্যু অবধারিত। সে মনে মনে ঠিক করল, গরম জলে তিলে তিলে পুড়ে মরবে না। যেকোনোভাবে ওই জলপাত্র থেকে সে উঠে আসবে। কিন্তু কীভাবে যে উঠে আসবে তা কিছুক্ষণ ভাবতেই তার মাথায় একটি বুদ্ধি এল। সে পুরুতকে ইশারায় কাছে ডেকে ফিসফিস করে বলল, 'তুমিই তো অরণ্যদেবতার পুরুত, তোমাকে একটি গোপন কথা বলছি শোনো। শুধু আমাকে নয়, তোমাদের দেবতা আকাশপথে আরও তিন জনকে পাঠিয়েছেন।'

পুরুত তার কথা শুনে অবাক হয়ে বলল, 'ওরা কোথায়? ওরা তোমার সঙ্গে পড়েনি কেন?'

'ওরা ওইদিকে পড়েছে। এই সামনে গিয়ে ডাইনে বেঁকে। অত কেন, তোমরা আমাকে নিয়ে গেলেই তো পার। আমি চটপট ওদের খুঁজে বের করতে পারতাম।' মায়া সরোবরেশ্বর বলল।

এই কথা পুরুত ঠাকুরের বিশ্বাস হল। সে মায়া সরোবরেশ্বরকে তাড়াতাড়ি গরম জল থেকে তুলে বেব্বোর কাছে খবর পাঠাল। তারপর চার জনকে সঙ্গে নিয়ে মায়া সরোবরেশ্বরের সঙ্গে অরণ্যের অন্য প্রান্তের দিকে পা বাড়াল।

সূর্যাস্ত পর্যন্ত ওরা খুঁজল। কিন্তু কোথাও অন্যদের পাওয়া গেল না। একটি গাছের নীচে মল পাওয়া গেল। মল দেখে মায়া সরোবরেশ্বর বুঝতে পারল যে সেগুলো রথের চালকের। রথচালক গাছের উপরে থাকবে ভেবে সে গাছের উপরে চোখ ফেরাল। তারপর সে ওদের বলল, 'আমার ধারণা, এই গাছের ওপরেই রথচালক পড়েছে।' সকলে গাছের ওপরের দিকে তাকাল। ওদের নজরে পড়ল হংসরথ।

ঠিক সেইসময়ে একরাশ ধোঁওয়া দেখে সিদ্ধ সাধক, মকরকেতু মানুষখেকোদের আস্তানার দিকে আসছিল। সিদ্ধ সাধক নিজের যোগ্য বাহন নরদানবকে আরও তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য হেঁকে চিৎকার করে উঠল, 'জয় মহাকাল!' তার গর্জন শুনে গাছের পাতাগুলো যেন নড়ে উঠল। মায়া সরোবরেশ্বর তো বটেই, এমনকী তার সঙ্গের মানুষখেকোরাও ভয়ে কাঁপতে লাগল।

পঁচিশ

সিদ্ধ সাধক 'জয় মহাকাল' বলে চিৎকার করে উঠেছিল। সেই চিৎকার শুনে মায়া সরোবরেশ্বর ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে চারিদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাতে লাগল। তার ভাবগতিক দেখে নরখাদকদের পূজারি খুব আশ্চর্যান্বিত হল। পূজারির সঙ্গে যে দু-চার জন জংলি নরখাদক ছিল তারা যেদিক থেকে আওয়াজ আসছিল সেদিকে এগিয়ে গেল।

তৎক্ষণাৎ মায়া সরোবরেশ্বর পূজারিকে বলল, 'তোমার লোকজন যেদিকে এগোচ্ছে সেদিকে এগোনো নিরাপদ নয়। কারণ যে লোকটা চিৎকার করে উঠছে সে মহাকালের ভক্ত। ওর মন্ত্রশক্তির কাছে তোমাদের ক্ষমতা নেই দাঁড়াবার।'

তার কথা শুনে পূজারি হো-হো করে হেসে বলল, 'শোনো হে, আমরা নরখাদক ওসব মন্ত্রতন্ত্রে আমরা ভয় মোটেই পাই না। তোমার ওই মহাকালের ভক্ত আসছে শুনে আমাদের আনন্দ বেড়ে গেছে। আমরা আর একটি মানুষকে মহানন্দে খেতে পাব। অরণ্যদেবতার অশেষ করুণা যে আমরা খাওয়ার জন্য আর একটি তরতাজা নাদুসনুদুস মানুষকে পেলাম।' পূজারির কথা শুনে ভয়ে সরোবরেশ্বরের হাত-পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাবার উপক্রম। বলে কি! এরা দেখছি বাঘের চাইতেও হিংস্র। মায়া সরোবরেশ্বর যে কি করে কি করবে ভেবে ভেবে কূল পেল না।

কিন্তু পূজারির কথা শেষ হতে-না-হতেই যে চার জন এগিয়ে গিয়েছিল তাদের আর্তনাদ শোনা গেল। পরক্ষণেই ওরা পূজারির কাছে এসে আছড়ে পড়ে বলল, 'ঠাকুরমশাই, আমরা আর বাঁচব না। হাতির মতো একটা বড়ো নরদানবের পিঠে বসে যমের মতো একটা লোক হুংকার দিতে দিতে এগিয়ে আসছে।'

ওদের কথা শুনে ময়া সরোবরেশ্বর এবং পূজারি ভয়ে কাঁপতে লাগল। দেখতে দেখতে নরদানবের পিঠে চেপে তীব্রগতিতে সিদ্ধ সাধককে ওরা আসতে দেখল।

সেই দৃশ্য দেখে বুড়ো পূজারি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'ওহে, এবার পালাতে হবে। কেউ একজন ছুটে গিয়ে খবর দাও। মনে হচ্ছে, এ যদি আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের বংশে বাতি দিতে কেউ আর থাকবে না।'

মায়া সরোবরেশ্বর আর পূজারির দাঁতে দাঁতে কত্তাল বাজতে লাগল। দু-জনেরই একবার একছুটে পালাবার মতলব হল। কিন্তু পালাতে গিয়ে কেউই পায়ে এতটুকু জোর পেল না। দু-জনেরই তখন একেবারে কাঁদো কাঁদো অবস্থা।

ততক্ষণে সিদ্ধ সাধক আরও কাছে এসে চিৎকার করে বলল, 'জয় মহাকাল! ওহে শোনো, কেউ পালাবে না। সবাই শোনো। তোমরা কে বল? কাঞ্চনমালা নামে এক রাজকুমারী হংসরথ থেকে তোমাদের এই জায়গায় কোথাও পড়েছে। তোমরা যদি কেউ দেখে থাক তো এখুনি বল। তা না হলে তোমাদের পরিণাম ভয়ংকর হবে এ-কথা জেনে রাখ।'

সিদ্ধ সাধকের কথা পূজারি অথবা তার সঙ্গী কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারল না। পূজারি এদিক-ওদিক তাকিয়ে লক্ষ করল, মায়া সরোবরেশ্বর গাছের আড়ালে গিয়ে পালানোর চেষ্টা করছে। তৎক্ষণাৎ সে সাধককে বলল, 'এই লোকটাই ওপর থেকে আস্তানায় পড়েছে। এ ছাড়া আর কেউ ওপর থেকে পড়েনি। তবে তোমার ইচ্ছে হলে ওকে জিজ্ঞেস করে সব কথা জানতে পার।'

এতক্ষণ সিদ্ধ সাধক মায়া সরোবরেশ্বরকে দেখতে পায়নি। গাছের আড়ালে তাকে দেখতে পেয়ে সাধক পরিহাস করে বলল, 'ওরে ব্যাটা, তুই এখানে লুকোচ্ছিস? তোর সাজপোশাক দেখে মনে হচ্ছে তুই-ই মায়া সারোবরেশ্বর। তা হ্যাঁরে ব্যাটা, পালাচ্ছিস কেন? সাবধান! চোরের মতো পালানোর চেষ্টা করিসনি, একেবারে বেঘোরে মারা পড়বি।'

সাধকের কথা শুনে মায়া সরোবরেশ্বর ভীষণ রেগে গেল। হঠাৎ তার মনে হল— সেও তো একটা রাজ্যের রাজা বটে। এ লোকটা আর যা হোক রাজা তো নয়। রাজার সঙ্গে কী করে কথা বলতে হয় সে এই বদমাইসটাকে শিখিয়ে দেবে। সে ক্ষুব্ধ হয়ে তরবারির বাঁটে হাত দিল। তারপর সোজা দাঁড়িয়ে বলল, 'ওহে, আমাকে তুমি ঠিকই চিনতে পেরেছ, তবে তোমার সাজপোশাক দেখে আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না যে তুমি কে। তা— তুমি যেই হও জেনে রাখ, আমার তরবারির সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কারোর নেই।'

'আমি হলাম সিদ্ধ সাধক, মহাকালের ভক্ত। তোমার সঙ্গে মোকাবিলা করার ইচ্ছা আমার নেই। আমার অধীনে যারা আছে তারাই তোমার মোকাবিলা করতে পারবে। কাঞ্চনমালাকে খুঁজে বের করতে আমি তাদের আশেপাশে পাঠাচ্ছি।' এই কথা বলে সাধক চিৎকার করে উঠল, 'কইরে জলরাক্ষস, তোদের শত্রু মায়া সরোবরেশ্বর এখানে আছে। শীঘ্র চলে আয়। তোরা যা করার কর এসে। এ ব্যাটা দেখছি খুব তড়পাচ্ছে।'

তার চিৎকার শুনে জলরাক্ষস চিৎকার করতে করতে আসতে লাগল। আসতে আসতে সে বলছিল, 'কই, কোথায় সে ব্যাটা? আজই ওকে শেষ করে ফেলব।'

জলরাক্ষসের চিৎকার শেষ হতে-না-হতেই মকরকেতু জলগ্রহের উপর চেপে সেখানে পৌঁছে গেল। সে ওই রাক্ষসের পথ আগলে দাঁড়াল। জলগ্রহ ভয়ংকর আওয়াজ করে শুঁড় ওপরের দিকে তুলে আবার নামিয়ে জলরাক্ষসকে ধরতে গেল। এমন সময় সুযোগ বুঝে মকরকেতু জলরাক্ষসের মাথায় আঘাত করল। 'ওরে জলরাক্ষস, তোকে এখনই পরলোকে পাঠাচ্ছি, দাঁড়া।' এই কথা বলে তরবারি দিয়ে এক কোপে তার গলা কাটতে গেল। কিন্তু ঝট করে জলরাক্ষস একপাশে সরে যাওয়ায় তরবারির আঘাত জলরাক্ষসের গলায় না পড়ে, পড়ল গিয়ে তার কাঁধে।

আড়াল থেকে সাধক এই দৃশ্য দেখে নরদানবকে নিয়ে সে একটা কিছু করার জন্য প্রস্তুত হতে তার চোখে যা পড়ল তাতে সে অবাক হল। সে দেখতে পেল প্রত্যেকটা গাছের আড়ালে নরখাদকরা দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে ওদের নেতা বেব্বো চিৎকার করে পূজারিকে বলল, 'ওহে পূজারি, আজ তো আমাদের বড়ো আনন্দের দিন। অরণ্যদেবতা আজ এতগুলো মানুষকে আমাদের ভোজ খাওয়ার জন্য দয়া করে পাঠিয়েছেন।'

নেতার কথা শুনে নরখাদকরা আনন্দে নাচানাচি করতে লাগল। চারদিকের অবস্থা দেখে সিদ্ধ সাধক ভাবল, যেকোনো মুহূর্তে তার বিপদ হলেও হতে পারে। তাই সে তৎক্ষণাৎ নরদানবকে মকরকেতু যেখানে ছিল সেইদিকে অতি দ্রুত যাওয়ার নির্দেশ দিল।

এদিকে মকরকেতু জলগ্রহের পিঠ চাপড়ে সেটাকে মায়া সরোবরেশ্বরের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, 'হে মায়া সরোবরেশ্বর! আপনি দয়া করে এই জলগ্রহের পিঠে বসুন। এই সিদ্ধ সাধক যথেষ্ট লম্ফঝম্ফ করে বটে, আসলে খুব একটা ক্ষতিকারক নয়। একে তত ভয় করার কিছু নেই। তা ছাড়া এর যে বন্ধু জয়শীল সে আসলে যেকোনো বিপদগ্রস্তের বন্ধু। কাজেই এদের কাউকে তেমন একটা ভয় করার কিচ্ছু নেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই জয়শীল আমাদের বৈদ্যদেবকে নিয়ে হংসরথে চেপে এদিকে আসবে।'

মায়া সরোবরেশ্বর তো জানত না ওই হংসরথ কোথায় পড়ল, কীভাবে পড়ল, তাই তার কাছে মকরকেতুর কথা অস্পষ্ট লাগল। তবু সে বুঝতে পারল যে এভাবে থাকার চাইতে জলগ্রহের পিঠে চেপে বসে থাকা নিরাপদ। এদিকে জলরাক্ষস আঘাত পেয়ে অতিকষ্টে সাধককে বলল, 'আমি কি এখন যেতে পারি?'

সাধক তাকে বলল, 'দেখ তুমি এমন কিছু আঘাত পাওনি। তোমার যাওয়ার সময় এখনও হয়নি। তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে।' বলে মকরকেতুর দিকে তাকিয়ে সাধক বলল, 'ওহে মকরকেতু, এখন তুমি বলতে পার, কে কার ক্ষতি করতে পারে? অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শত্রু মিত্র হয়, মিত্র শত্রু হয়। এই নরখাদকরা ভাবছে আমাদের সবাইকে ওদের দেবতা খাদ্য হিসাবে ওদের কাছে পাঠিয়েছে। আমাদের এখন প্রথম কর্তব্য হবে এদের খপ্পর থেকে মুক্ত হওয়া।'

তার বক্তব্য শুনে মকরকেতু তরবারির খাপে হাত দিয়ে এমন ভাব করল যেন সে যেকোনো রকমের ভয়ংকর অবস্থার মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।

তার মনোবল দেখে সাধক বলল, 'কেতু, তোমার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারছি না। আমরা কোনোদিন ভাবতে পারিনি যে কনকাক্ষ রাজার হাতে তার ছেলে-মেয়েদের তুলে দেওয়ার আগে এই ধরনের নরখাদকদের হাতে পড়ব। আমরা প্রথমে এদের বোঝানোর চেষ্টা করব। তবে ভালো কথায় যদি কাজ না হয়, আমাদের যদি এরা ক্ষতি করতে চায়, তখন বাধ্য হয়ে আমাদের এদের ওপরে, প্রচণ্ড আক্রমণ চালাতে হবে। তখন আর আমাদের এদের মধ্যে কে মেয়ে কে পুরুষ, কে বাচ্চা কে বুড়ো এসব দেখা মোটেই চলবে না। বুঝেছ আমার কথা?'

এতক্ষণ নরখাদকদের পূজারি এমন ভাব করেছিল যেন ভালো করে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। এখন সে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা ছুঁড়ে বলল, 'ওহে বেকুবগুলো, আমাদের প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। তোমরা আর এখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না। ঢের হয়েছে, আর নয়, এবার চল অরণ্যদেবতার মন্দিরে। আগে দেবতার ভোগে দিয়ে তারপর আমরা দেবতার প্রসাদ খেয়ে থাকি।

ওদের কথায় একটুও না ঘাবড়ে সাধক ত্রিশূল তুলে ওই পূজারিকে বলল, 'ওহে, তোমরা ভুল করছ। আমরা কেউ তোমাদের আহার নই। তোমাদের খাদ্য হওয়ার জন্য আমাদের কেউ পাঠায়নি। আমাদের লোক হংসরথ থেকে পড়ে গেছে এই অরণ্যে। তাদের খুঁজে বের করার জন্য আমরা এসেছি। যাকে আমাদের প্রথমেই দরকার ছিল তাকে পেয়ে গেছি। সে হল এই ধূর্তশিরোমণি মায়া সরোবরেশ্বর। এখন আমরা নিজেদের পথে চলে যাচ্ছি। আমাদের এখন অনেক কাজ, তোমরা এখন তোমাদের কাজে চলে যাও।'

'বা! আমরা আমাদের খিদে মেটাবো কী করে? আমরা আজ বহুদিন ধরে কিচ্ছুটি না খেয়ে আছি।' ওদের নেতা বেব্বো সাধককে বলল।

পূজারি বলল, 'আমরা যে পাত্রে জল ফোটাচ্ছিলাম অরণ্যদেবতা ঠিক সেই পাত্রে একটি মানুষকে নাবালো। এ নির্ঘাত আমাদের খাওয়ার জন্য।'

তার কথা শেষ হওয়ার পর সাধকের ভীষণ রাগ হল। তার নির্দেশে নরদানব বেব্বোকে দু-হাতে তুলে ওপরের দিকে সোজা তুলে ফেলল। অন্য দিক দিয়ে জলগ্রহ এগিয়ে এসে পূজারিকে কোমরে শুঁড় দিয়ে কষে লাগালো এক হ্যাঁচকা টান।

বেব্বো শুনতে পেল গণচারি বলছে, 'সাবধান! বেব্বো এদের কিছুতেই ছাড়া যাবে না। অরণ্যদেবতা এদের পাঠিয়েছেন আমাদের খাদ্য হিসাবে।'

ওর কথা শুনে সাধকের মেজাজ আরও গরম হয়ে গেল। ও বলল, 'ওহে জলরাক্ষস, দেখছ কী, তোমার যতটা ক্ষমতা আছে এইবার প্রয়োগ কর। তুমি যে কত বড়ো ক্ষমতাবান তা দেখানোর এটাই তো সুবর্ণ সুযোগ।'

'জয় সিদ্ধ সাধকের জয়' বলতে বলতে জলরাক্ষস তার পাথরের গদা তুলে নরখাদকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। নরখাদকরা না খেতে পেয়ে ছিল দুর্বল। ওরা যথাসাধ্য প্রতিরোধের চেষ্টা করল। ওদের চিৎকার আর আর্তনাদে গোটা অরণ্য থরথর করে কেঁপে উঠল।

সিদ্ধ সাধক লক্ষ করল, অতি অল্প সময়ের মধ্যে জলরাক্ষস বহু নরখাদককে প্রচণ্ডভাবে ঘায়েল করেছে। এতে সিদ্ধ সাধক যথেষ্ট সাহস পেল। তখন 'জয় মহাকাল' বলে সাধকও নরদানবের সাহায্যে নরখাদকদের আক্রমণ করল।

এই বনভূমি তখন তোলপাড় হতে লাগল। নরখাদকরা সংখ্যায় এদের চাইতে বহু বেশি। কিন্তু বুদ্ধি এবং বুদ্ধির সঙ্গে সাহস থাকলে সংখ্যায় কম হলেও যুদ্ধ জয় করা যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা শুনতে পেল কারা যেন বলছে 'হিরণ্যপুরের মহারাজাধিরাজ কনকাক্ষ মহারাজের নির্দেশ— তোমরা এক্ষুনি যুদ্ধ থামাও।'

সাধক লক্ষ করল ঘোড়ায় চড়ে কয়েক জন লোক এই কথাগুলো ঘোষণা করছে। মায়া সরোবরেশ্বর বলল, 'আর নয়, এবার চলো মায়াসরোবরে।'

কিন্তু পরক্ষণেই তার বুকে ত্রিশূল ধরে সাধক বলল, 'দাঁড়াও!'

ছাব্বিশ

সিদ্ধ সাধক মায়া সরোবরেশ্বরের বুকে তার ত্রিশূল ধরার সঙ্গেসঙ্গে সে প্রাণের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'এটা কিন্তু ঘোরতর অন্যায়, এ একেবারে অধর্ম। যে সত্যিকারের বীর সে শত্রুকেও নিরস্ত্র অবস্থায় কখনো অক্রমণ করে না।'

সঙ্গেসঙ্গে সাধক ত্রিশূলটাকে মাটিতে পুঁতে বলল, 'আমি বীরদের বীর। আমি তোমাকে অসহায় অবস্থায় আক্রমণ করতে চাই না। নাও, এসো তোমার সঙ্গে তাহলে তরবারিতেই যুদ্ধ করি।'

মায়া সরোবরেশ্বর তার তরবারি দিয়ে সাধকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আগেই তার অনুগত অনুচর মকরকেতুর দিকে একবার তাকাল। এমন সময় অশ্বারোহী ওদের সামনে এসে ঘোড়া থেকে নামল। ওদের নায়ক মায়া সরোবরেশ্বর ও সাধকের মাঝখানে হঠাৎ গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

সাধক ভীষণ রেগে গিয়ে তাকে বলল, 'কে তুমি? তুমি কেন আমাদের দু-জনের মধ্যে নাক গলাচ্ছ?'

অশ্বারোহীদের নায়ক তার প্রশ্ন হেসে উড়িয়ে দিল। কিন্তু হঠাৎ তার চোখে পড়ে গেল জলগ্রহ ও নরদানব। ওদের দেখে একটু ঘাবড়ে গিয়ে সে সাধককে বলল, 'আমি যে কে, আমাকে যে কে পাঠিয়েছে, তা আমাদের আসার শব্দ শুনেই তোমার বুঝে নেওয়া উচিত ছিল।'

'আমি এর ওপরই নজর রেখেছি। যেকোনো মুহূর্তে এ জাদুর সাহায্যে পালিয়ে যেতে পারে। তাই তোমাকে আবার প্রশ্ন করছি, এই ঘোড়া না গাধা কীসের ওপর উঠে এখানে যে এসেছ, কে তুমি? কী তোমার পরিচয়? সত্যি করে বল।' সাধক জিজ্ঞেস করল।

তার প্রশ্নের জবাব সঙ্গেসঙ্গে না দিয়ে অশ্বারোহীদের নায়ক সাধককে ভালোভাবে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল, 'তোমাকে কিন্তু আমি চিনি। তুমি তো সেই হিরণ্যপুরের লোক? শ্মশানের পাহারাদারের মুণ্ডু কাটার অপরাধে আর একজনের সঙ্গে বন্দি হয়েছিলে।'

'তাহলে তুমি ভালো করেই জানো আমি কে? এখন তোমাকে যেন একটু চেনা চেনা লাগছে। তবে তোমার নাম-ধাম ঠিক মনে পড়ছে না।' সাধক বলল।

'আমার নাম ধীরসেন। কনকাক্ষ রাজার অপহৃত রাজকুমার ও রাজকুমারীকে উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে তোমার সঙ্গে জয়শীলও বেরিয়েছিল। সে কোথায়? তাকে তো দেখতে পাচ্ছি না।' নায়ক বীরসেন সিদ্ধ সাধকে বলল।

'জয়শীল হয়তো এখন হংসরথে চেপে আকাশপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুমি এবার একটু সরে যাও এখান থেকে। আমি এই অহংকারী বীরটাকে একহাত দেখে নি।' বলে সাধক ত্রিশূল তুলে মায়া সরোবরেশ্বরকে আক্রমণ করতে গেল।

এমন সময় বীরসেন দৃঢ়কণ্ঠে বলল, 'শোনো— এখানে রক্তপাত হোক এটা আমি চাই না।' তারপর সে নিজের অশ্বারোহীদের ডেকে কাছে আনল।

অশ্বারোহীরা তার দিকে এগিয়ে আসতেই সাধক চারদিকে তাকিয়ে বীরসেনকে বলল, 'আমাদের চারদিকে নরখাদকরা গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে। ওরা অনেকদিন খেতে পায়নি। এখন যদি আমরা শক্ত না হই, এক হয়ে ওদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য প্রস্তুত না হই তাহলে কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে আমরা ওদের খাদ্য হয়ে যেতে পারি, এ-কথা মনে রেখো।'

'ওসব আমি জানি। কনকাক্ষ রাজা ভালোভাবেই জানেন যে এখানে কত জন নরখাদক আছে এবং তাদের ক্ষমতা কতখানি। এখন আমার সঙ্গে সবাই চলে এসো।' বীরসেন বলল।

সাধক রেগে গিয়ে রক্তচক্ষু করে বলল, 'এ্যাঁ— বলি আমাকে কি হুকুম করা হচ্ছে? আমি জগতের মকাকাল ছাড়া আর কারও হুকুম মানি না।'

এদিকে জলরাক্ষস বুঝতে পারল যে তার মালিক সাধক অশ্বারোহীদের নায়কের উপর চটে গেছে। তাই সাধকের তর্জন-গর্জন শুনে সেও একটা বড়ো পাথর তুলে নিয়ে হুংকার ছাড়তে লাগল। নরদানব এমন চিৎকার করল যে সারা অরণ্যে যেন তার চিৎকার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হল। এইসব দেখে অশ্বারোহীদের একটি ঘোড়া ভীষণ ভয় পেয়ে পেছনের দুটো পায়ের ওপর সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল আর পরমুহূর্তে ঘোড়ার পিঠের আরোহী ধপাস করে নীচে পড়ে গেল।

এসব দেখে বীরসেনও একটু ঘাবড়ে গিয়ে সাধককে বলল, 'সাধক, আসলে তুমিও হিরণ্যপুরের নাগরিক। আমারই মতো তুমিও হিরণ্যপুরের মানুষ। মহারাজা কনকাক্ষ অদূরেই আছেন। তাঁর সামনে হাজির হতে কার না ইচ্ছে করে। আমি তাঁর কাছে যাচ্ছি তাই তোমাকে ডাকলাম। তুমি কী বলতে কী শুনে ভাবছ আমি তোমাকে হুকুম করেছি।'

এই কথা শুনে সাধক যেন একেবারে গলে গেল। সে বলল, 'এই তো, এভাবে বললে সব কিছু পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। ঠিক আছে, চল। তবে নরখাদকদের আর ওই মায়া সরোবরেশ্বর নামক দূরাত্মাকেও নিয়ে যেতে হবে।' বলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সাধক দেখে মকরকেতু বা মায়া সরোবরেশ্বর কেউ সেখানে নেই। ভয় পেয়ে সাধক বলল, 'ওরা গেল কোথায়? দেখতে না দেখতে কোথায় হাওয়া হয়ে গেল!'

সঙ্গেসঙ্গে অনেকগুলো নরখাদক একসঙ্গে হেসে উঠল। তারপর নরখাদকদের নেতা এগিয়ে এসে সাধককে বলল, 'তোমরা দু-জনে এখানে কথার লড়াই চালাচ্ছিলে আর ওরা সুযোগ বুঝে আস্তে আস্তে গাছের আড়ালে গিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। তবে পালাবে কোথায়। আমাদের অরণ্যদেবতা যে খাদ্য এখানে পাঠিয়েছে সে খাদ্য অত সহজে আমাদের হাতছাড়া হবে না। গোটা অরণ্য তন্ন তন্ন করে খুঁজে আমাদের লোক ওদের ধরে আনবে।'

'ওদের যতক্ষণ না ধরতে পারছি ততক্ষণ এই দু-জন, এই নরখাদকদের নেতা আর ওদের পূজারি এই দু-জনই আমাদের কাছে বন্দি থাকবে। ওহে জলরাক্ষস, দু-জনকে ধরে ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে বেঁধে ফেল।' সাধক যা বলল তাই করার জন্য জলরাক্ষস এগিয়ে গেল। নরখাদকদের নেতা এবং তাদের পুরুতকে ধরে এনে একজন অশ্বারোহীকে ধাক্কা মেরে নীচে ফেলে দিয়ে ওই দু-জনকে ঘোড়ার পিঠে খুব কষে বেঁধে দিল।

তারপর সাধক তীক্ষ্নদৃষ্টিতে বীরসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, 'এবার তুমি কনকাক্ষ রাজার কাছে যেতে পার।'

তারপর সাধক নরখাদকদের নেতা ও পুরুতকে বলল, 'শোনো ভালো করে, মায়া সরোবরেশ্বরকে তোমার লোক যদি খেয়ে ফেলে তাহলে কিন্তু তোমাদের মেরে ফেলা হবে। একটু এদিক-ওদিক হলে তোমরা দু-জনেই এই নরদানবের পেটে যাবে।' কথাটা ওদের দু-জনকে বললেও আশেপাশে যে নরখাদকরা ছিল তাদের কানে কথাগুলো ভালো করেই গেল।

ঘোড়ার পিঠে বাঁধা অবস্থায় থেকে ওরা বার বার আপন মনে বলতে লাগল, 'হে অরণ্যদেবতা, ভেবেছিলাম তুমি আমাদের জন্য লোভনীয় খাদ্য পাঠিয়েছ। কিন্তু এখন দেখছি আমাদেরই প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়েছে।'

বীরসেন কনকাক্ষ রাজা যেখানে ছিলেন সেদিকে রওনা হল। তার পেছনে অন্যেরা রইল। সবার শেষে নরদানবের পিঠে চেপে সাধকও রওনা দিল। ওরা যখন যাচ্ছিল সেইসময় অরণ্যের এক জায়গায় এক যুবতীকে বাঘ তাড়া করছিল। যুবতী অতি দ্রুত বিভিন্ন গাছের আড়ালে ছোটাছুটি করে শেষে একটি ডাল ধরে গাছের ওপরে উঠে গেল।

এই দৃশ্য চোখে পড়ে গেল জয়শীল ও তার সঙ্গীদের। ওরা তখন হংসরথে চেপে আকাশপথে অরণ্যের বিভিন্ন অঞ্চল আঁতিপাঁতি করে ঘুরে ঘুরে দেখছিল।

দৃশ্যটি প্রথমে চোখে পড়ল বৈদ্যদেব নামধারী দেবশর্মার। অনেকদূর থেকে বাঘ দেখেও দেবশর্মার মনে ভয় ঢুকল। সে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে জয়শীলকে বলল, 'জয়শীল, দেখতে পাচ্ছ, যুবতীটি বাঘের থাবা থেকে বাঁচার জন্য কীভাবে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আমার ধারণা, ওই যুবতী কনকাক্ষ রাজার কন্যা কাঞ্চনমালা ছাড়া আর কেউ নয়।'

দেবশর্মা যেদিকে তাকাতে বলল জয়শীল সেদিকে তাকিয়ে ওই দৃশ্য দেখে রথচালককে বলল, 'ওহে চালক, ওই যে বাঘটাকে দেখছ ওখানে রথটাকে নামাও।'

রথচালক নীচের দিকে তাকিয়ে ঘন গাছের মধ্যে রথটা নামানো অসম্ভব ভেবে জয়শীলকে বলল, 'আজ্ঞে, এখানে তো রথটাকে নামানো যাবে না। ওই যে একটা জায়গা দেখা যাচ্ছে মাঠের মতো সেখানে রথটা নামালে সুবিধা হবে।'

তার কথা শুনে জয়শীল রেগে গিয়ে বলল, 'ওরে বোকা, ওইখানে তোমার রথ নামাতে নামাতে এদিকে রাজকুমারী বাঘের পেটে চলে যাবে। তাড়াতাড়ি রথটাকে নীচে নামাও। একটু নামলেই আমি যেকোনো গাছের ওপর লাফ দিয়ে নামব। তারপর ডালে ডালে ধরাধরি করে যেকোনোভাবে নেমে রাজকুমারীকে বাঁচানোর চেষ্টা করব।'

সঙ্গেসঙ্গে রথ নীচের দিকে নামতে লাগল। গাছের ওপরে আসতে না আসতেই জয়শীল একলাফে নেমে গাছের ডাল ধরে সেই ডালসুদ্ধ লাফ দিয়ে নীচে পড়ল। অত বড়ো ডাল নিয়ে নীচে পড়াতে বিরাট বিপদ ঘটতে পারত। কিন্তু জয়শীল এমন কায়দা করে পড়ল যে তার গায়ে আঘাত লাগল না। ঠিক সেইসময় কাঞ্চনমালাকে বাঘটা প্রায় ধরে ফেলেছিল। কিন্তু অত বড়ো একটা গাছের ডাল নীচে পড়ায় বাঘটাও থমকে দাঁড়িয়ে পেছনের দিকে তাকাল। বাঘ পেছনের দিকে তাকাতেই কাঞ্চনমালা গাছের আরও ওপরে উঠে গেল। এদিকে বাঘ মুখের গ্রাস হাতছাড়া হওয়াতে রাগে গর্জন করতে লাগল। দু-এক বার গর্জন করে বাঘটা উপরের দিকে লাফ দিয়ে কাঞ্চনমালাকে ধরতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে জয়শীল বাঘের পেছনের পা ধরে দু-এক বার ঘুরিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

গাছের শিখরে একটি ডালে ঝুলতে ঝুলতে জয়শীলের কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে কাঞ্চনমালা বলল, 'আপনি এখন না এলে আমি কিছুতেই বাঁচতে পারতাম না। আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। আমি অপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ।'

কাঞ্চনমালার দিকে তাকিয়ে জয়শীলের মনে হল সে যেন এক অপ্সরীকে দেখছে। মনে মনে তার দারুণ ভালো লাগছিল। যে কনকাক্ষ রাজার কন্যাকে উদ্ধার করার জন্য এতদিন ধরে সে ঘোরাঘুরি করেছে, বিভিন্ন বিপদে পড়েছে সেই রাজকুমারী কাঞ্চনমালা আজ তার সামনে। একে যখন পাওয়া গেল আশা করা যায় এর দাদা কাঞ্চনবর্মাকেও পাওয়া যাবে।

'তোমার নাম যে কাঞ্চনমালা, তুমি যে কোন দেশের রাজকুমারী আমি তা জানি। তোমার দাদা কাঞ্চনবর্মা কোথায়? তুমি তো হংসরথ থেকে নীচে পড়ে গিয়েছিলে। অত উঁচু থেকে পড়ে তুমি বাঁচলে কী করে?' জয়শীল বলল।

গাছ থেকে নেমে জয়শীলের মুখে নিজের নাম শুনে কাঞ্চনমালা রীতিমতো অবাক হয়ে গেল। সে জয়শীলের দিকে অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল, 'আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমার বাঁচার কোনো আশা ছিল না। সম্ভবও হত না। তবে সৌভাগ্যবশত আমি জলে পড়েছি তাই বেঁচে গেছি। আমার ধারণা, ওই রথ থেকে সরোবরেশ্বর এবং রথের চালক আশেপাশে কোথাও পড়ে গেছে। আমার দাদা কাঞ্চনবর্মাকে ওরা মায়াসরোবরের একটি ঘরে আটকে রেখে দিয়েছে।'

'মায়া সরোবরেশ্বরের খোঁজখবর আমি কিছুটা জানি। ওর অনুচর সর্পনখা, সর্পস্বরা ছাড়াও আর একটা বড়ো অনুচরও আমার চেনা। এখন যেকোনোভাবে মায়াসরোবর থেকে তোমার দাদাকে মুক্ত করতে হবে। কিন্তু তার আগে আমার একজন সঙ্গী সিদ্ধ সাধককে খুঁজে বের করতে হবে। ওকে পেতে বেশি কষ্ট পেতে হবে না। সিদ্ধ সাধক নিশ্চয়ই এই গভীর অরণ্যের আশেপাশে কোথাও আছে।' জয়শীল কাঞ্চনমালাকে বলল।

আঘাত পেয়ে অদূরে পড়ে থাকা বাঘ গর্জন করছিল। রাগে ফুলতে ফুলতে বাঘটা দাঁড়ানোর চেষ্টা করে আবার ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল।

'কী ভয়ংকর বাঘ এটা। আপনার আসতে আর একটু দেরি হলে আমাকে খেয়ে ফেলত।' কাঞ্চনমালা বলল।

গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ মায়া সরোবরেশ্বর এবং মকরকেতু ওদের লক্ষ করছিল। জলগ্রহের পিঠে চেপে ছিল মায়া সরোবরেশ্বর আর ঘোড়ার পিঠে বসেছিল মকরকেতু। মায়া সরোবরেশ্বর ফিসফিস করে বলল, 'মকরকেতু, জয়শীলকে বন্দি করার এই হল সুবর্ণ সুযোগ। তোমার দড়ির ফাঁস ছুড়ে জয়শীলের গলায় পরিয়ে দাও।'

'প্রভু, এই জয়শীল যে কি পারে আর না পারে তা আমি আজও বুঝতে পারলাম না। আমাদের সামান্য ফাঁস দিয়ে একে জব্দ করে বন্দি করা যাবে না। এর বিরোধিতা করলে অপকার ছাড়া উপকার হবে না।' মকরকেতু ভয়ে ভয়ে বলল।

'তোমার মতো ভীতু আর দেখিনি। দাও— দড়িটা আমার হাতে দাও।' বলে মকরকেতুর হাত থেকে লম্বা দড়িটা নিয়ে ফাঁস তৈরি করে কয়েক বার হাওয়ায় ঘুরিয়ে দড়িটাকে জয়শীলের দিকে ছুঁড়ল মায়া সরোবরেশ্বর।

সাতাশ

জয়শীল হঠাৎ এভাবে গলায় ফাঁস লেগে যাওয়ায় অবাক হয়ে গেল। পেছনের দিকে সরে গিয়ে লক্ষ করল, জলগ্রহের পিঠে বসে রয়েছে মায়া সরোবরেশ্বর। পাশে আছে মকরকেতু। মকরকেতুও ঘোড়ায় চেপে বসেছিল। জয়শীল তার তরবারি দিয়ে সাপলার মতো দড়িটাকে এক কোপে দু-টুকরো করে কাটতে গেল। ততক্ষণে দড়ির ফাঁসে আরও টান পড়ল।

'তুমিই কি সেই বীর জয়শীল? তা থেমে গেল কেন? তরবারি দিয়ে ফাঁস কেটে ফেলতে যাচ্ছিলে, ক্ষমতা থাকে তো কাট।' মায়া সরোবরেশ্বর গম্ভীর গলায় অসহায় জয়শীলকে ব্যঙ্গ করে বলল।

'হুঁ। এখন বুঝতে পারছি তুমিই তাহলে মায়া সরোবরেশ্বর। আমি না-হয় ফাঁস তরবারি দিয়ে কাটিনি, তুমিই বা ফাঁসটাকে জোরে টেনে আমাকে মেরে ফেলছ না কেন? আমার প্রাণ এখন তো তোমার হাতে। টানো। মেরে ফেল আমাকে।' জয়শীল বলল।

'দেখ, আমি হলাম মায়া সরোবরেশ্বর। তোমার মতো একটা সাধারণ মানুষের প্রশ্নের জবাব দেওয়া আমি প্রয়োজন বোধ করি না।' এবারেও ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে জয়শীলকে বলল মায়া সরোবরেশ্বর।

জয়শীল কী যেন বলতে যাচ্ছিল এমন সময় কাঞ্চনমালা মায়া সরোবরেশ্বরকে বলল, 'আপনি পুষ্পরথ থেকে মাটি পড়ে গেছেন। আমার খুব ভয় করছিল। আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না আপনার অবস্থা কি হবে। এখন আপনাকে দেখে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। তবে আপনাকে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ— এই যুবকের কোনো ক্ষতি করবেন না। ইনি না থাকলে আমি এতক্ষণে নিশ্চয় ওই প্রকাণ্ড হিংস্র বাঘের পেটে চলে যেতাম।'

'দেখ কাঞ্চন, এই যুবক কীভাবে যে তোমাকে বাঁচিয়েছে আমি তা আড়াল থেকে লক্ষ করেছি। ফাঁস পরিয়ে আমি একে মেরে ফেলতে চাই না। আমি একে জ্যান্ত অবস্থায় মায়া সরোবরে নিয়ে যেতে চাই।' মায়া সরোবরেশ্বর রাজকুমারী কাঞ্চনমালাকে সব কথা বুঝিয়ে বলল।

তারপর কাঞ্চনমালা জয়শীলকে বলল, 'মায়া সরোবর একবার দেখে আসতে পারেন তো। বন্দি করে নিয়ে যেতে হবে কেন। অমন সুন্দর জায়গা নিজের চোখে দেখতে ইচ্ছে করে না?'

'কাঞ্চন, এখন আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর কিছু নির্ভর করছে না। আমি ভবিছি, ইনি আমাকে পরাজিত করে বন্দি করে নিয়ে যাচ্ছেন। তা যদি না ভাবতাম আমি তো অনেক আগেই তরবারি দিয়ে ফাঁস কেটে পালানোর চেষ্টা করতাম।' জয়শীল বলল।

জয়শীলের কথা শুনে কিছুক্ষণ ভেবে মায়া সরোবরেশ্বর মকরকেতুকে বলল, 'কেতু, তুমি জয়শীলের ওপরে নজর রেখ। বন্দি করা যে কাকে বলে আমি তা ফাঁসে টান দিয়ে দেখিয়ে দেব।

মায়া সরোবরেশ্বরের কথা শুনে মকরেকতু এমন ভাব করল যেন এই ধরনের কোনো কিছু সে করুক তা সে চায় না। তবে মায়া সরোবরেশ্বরকে বারণ করার মতো ক্ষমতাও তার ছিল না।

এমন সময় কাঞ্চনমালা এগিয়ে গিয়ে জয়শীলের গলায় জড়ানো দড়িটা ধরে মায়া সরোবরেশ্বরকে বলল, 'শুনুন, ফাঁসে টান দিয়ে এঁকে কষ্ট দেওয়ার আগে আমাকে আপনি মেরে ফেলুন। আমি বেঁচে থাকতে আপনি এর কোনো ক্ষতি করতে পারবেন না।'

'আশ্চর্য ব্যাপার! এইটুকু সময়ের মধ্যে জয়শীলের ওপর তোমার এত টান কী করে হল? ঠিক আছে, আমি ওকে কষ্ট দেব না, তবে আমি যা বলব একে তা করতে হবে।' বলে মায়া সরোবরেশ্বর জয়শীলের দিকে তাকিয়ে বলল, 'জয়শীল তুমি চেষ্টা করলে হয়তো তোমার গলার ফাঁস কেটে ফেলতে পারবে। কিন্তু এখান থেকে কিছুতেই পালাতে পারবে না। বিশেষ করে এই জলগ্রহের সামনে থেকে পালানো অত সহজ নয়। আমার ছোট্ট ইশারায় জলগ্রহ তোমাকে মাড়িয়ে গুঁতিয়ে শেষ করে ফেলতে পারে।'

জয়শীলের মনে হল, মকরকেতু ভালো কথাই বলছে। কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শুধু মেয়ের খোঁজ পাওয়া গেছে। ছেলের খোঁজ না পাওয়া গেলে ফেরা যাবে না। রাজকুমার এখনও মায়া সরোবরে বন্দি। সেখানে না গেলে তাকে মুক্ত করে আনার কোনো প্রশ্ন আসে না। এদিকে কাঞ্চনমালা মায়া সরোবরেশ্বরের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছে যেন সে নিজের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কথা বলছে। এই অবস্থায় তার পক্ষে সরোবরে যাওয়াই উচিত।

'হে মায়া সরোবরেশ্বর, আমি যে দুর্বল সেটা এখন প্রমাণ হয়ে গেছে। তোমার হাতে মারা যাওয়ার চেয়ে তোমার কাছে নত হওয়া এখন অনেক ভালো। আমি কথা দিচ্ছি, এখন থেকে তুমি যা বলবে তাই করব।' জয়শীল বলল।

জয়শীলের কথা শুনে, তার দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে মায়া সরোবরেশ্বর বলল, 'হঠাৎ তুমি যে এত নরম হয়ে গেলে কেন সে কথাটা আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। এর পেছনে কোনো রহস্য নেই তো?'

'রহস্যের কি আছে। আমি এখন টের পেয়েছি যে আমি দুর্বল। এর পরেও আমি সবলের মতো আচরণ করব কী করে। যে সৎ সে নিজের অবস্থা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে স্বীকার করে। আমার ক্ষমতা তো মকরকেতুর জানা আছে।' জয়শীল মায়া সরোবরেশ্বরকে বলল।

'আমি যে জানি সে-কথা ওনাকে জানিয়েছি।' মকরকেতু বলল।

'মকরকেতু, এখানে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। জয়শীলের মতলব যদি খারাপ থাকে তা একদিন না একদিন প্রকাশ পাবেই পাবে। এর আগে আমরা অনেককে দেখেছি ভবিষ্যতেও দেখব। তারজন্যে আমাদের ভয় পাবার কিছু নেই।' সরোবরেশ্বর বলল।

'তাহলে এই ফাঁসটা কি এইভাবেই থাকবে?' জয়শীল জিজ্ঞাসা করল।

সরোবরেশ্বর কোনো জবাব দেওয়ার আগেই কাঞ্চনমালা হাসতে হাসতে জয়শীলের গলার ফাঁস খুলে বলল, 'এটা মেরে ফেলার ফাঁস নয়। এটাকে বলা চলে সাপলার হার।'

'মহারাজ, এখন তাহলে কী করবেন?' মকরকেতু প্রশ্ন করল।

'এখন আমরা সবাই সরোবরে যাব। তুমি আমাদের সামনে চল।' বলল সরোবরেশ্বর।

মকরকেতু জয়শীলের দিকে একবার তাকিয়ে সরোবরেশ্বরকে বলল, 'জয়শীল কি পায়ে হেঁটে যেতে পারবে?'

'ঠিক আছে— কাঞ্চনমালা আমার পেছনে জলগ্রহের উপরে চড়বে। তুমি আর জয়শীল ঘোড়ার উপের চেপে এসো।' সরোবরেশ্বর বলল।

কাঞ্চনমালাকে আবার সরোবরে নিয়ে যাওয়ার কথা উঠতেই জয়শীল চমকে উঠল। মকরকেতুকে বলল, 'কেতু, কাঞ্চনমালাকে আবার সরোবরে নিয়ে যাওয়া হোক এটা আমি চাই না। আমি কনকাক্ষ রাজাকেকে কথা দিয়েছি যেকোনোভাবেই হোক— আমি রাজকুমার ও রাজকুমারীকে নিয়ে যাব।'

বলতে বলতে জয়শীল লক্ষ করল, সরোবরেশ্বর ও কাঞ্চনমালা তীক্ষ্নদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের দৃষ্টি দেখে মনে হয় ওরা ভীষণ চটে গেছে।

'আমাকে এবং আমার দাদাকে যে অপহরণ করা হয়েছে এটা সত্য। তবে এখন আমরা কারও হাতে বন্দি নয়। আমি একা কোথাও ফিরে যাব না। বাবা-মার কাছে যখন ফিরব তখন আমরা ভাই-বোন একসঙ্গে ফিরব।' বলতে বলতে কাঞ্চনমালা জলগ্রহের কাছে গিয়ে মায়া সরোবরেশ্বরের হাত ধরে সটান হাতির পিঠে উঠে পড়ল।

জয়শীল অবাক হয়ে মকরকেতুর দিকে তাকিয়ে বলল, 'কেতু, অপহরণ সত্য। অথচ অপহরণকারীর প্রতি এত টান— সেটাও কম আশ্চর্যজনক নয়।'

'আগে চুপিচুপি এসে ঘোড়ার পিঠে বস। সময় হলে সব কিছু জানতে পারবে।' জয়শীলকে মকরকেতু বলল।

জয়শীল আর কথা না বাড়িয়ে সোজা গিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসল। মায়া সরোবরে গিয়ে তিরবেগে বিচিত্র হাতি জলগ্রহ ছুটে চলল। আবার ছুটে চলল মকরকেতুর ঘোড়া। হঠাৎ জয়শীলের মনে পড়ে গেল সিদ্ধ সাধকের কথা। একসঙ্গে অনেকদিন ওরা দু-জনে ছিল। অনেক বিপদ-আপদের মোকাবিলা করেছে ওরা। সাধককে খবর না দিয়ে এভাবে যাওয়া হয়তো ঠিক হচ্ছে না। এলোমেলো কথা ভাবতে ভাবতে জয়শীল আপনমনে বলল, 'সাধক আমাকে অনেকদিন দেখতে না পেয়ে হয়তো ভাববে আমি মরে গেছি। ভাবে ভাবুক, এখন এই অবস্থায় আমি কী-বা করতে পারি।'

জয়শীল যখন সাধকের কথা ভাবছিল তখন সাধক ছিল কনকাক্ষ রাজার কাছে জয়শীল ও সাধক ফিরছে না দেখে কনকাক্ষ রাজা সাধককে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার ছেলে-মেয়েদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব তুমি নিয়েছিলে। তোমরা কেউ ফিরলে না, কোনো খবর পাঠালে না। আমার ছেলে-মেয়েরা যে কোথায় আমি তা এখনও জানি না। শেষপর্যন্ত দেশের কাজকর্মের দেখাশোনার ভার মন্ত্রীদের উপরে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়তে বাধ্য হলাম। সারা অরণ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছি কিন্তু কোত্থাও ওদের কোনোরকম সন্ধান এখনও পাইনি।'

'মহারাজ, যুবরাজ ও রাজকুমারীকে যারা অপহরণ করেছে তারা আছে মায়া সরোবরে। বিচিত্র ধরনের মানুষ ওরা। জলে স্থলে ওরা সমানভাবে চলতে পারে। ওদের কয়েক জনকে আমরা ধরেছিলাম। ওদের রাজার নাম মায়া সরোবরেশ্বর। তাকে ধরতে পেরেছিলাম আমরা। নরখাদকদের হাতে সে ভালোভাবেই ধরা পড়েছিল কিন্তু বিশেষ মুহূর্তে সুযোগ বুঝে আবার পালিয়ে গেল। তবে কোথায় পালাবে। ওর সরোবর যে কোথায় তা জানে আমার এই জলরাক্ষস। এই জলরাক্ষসের সাহায্যে সরোবরের সন্ধান আমরা নিশ্চয়ই পেয়ে যাব।' সাধক বলল।

'পেয়ে গেলে ভালোই। কিন্তু আমি ভাবছি সেই যুবকের কথা— জয়শীলের কথা।' কনকাক্ষ রাজা বললেন।

'জয়শীলের কোনো ভয় নেই। সে যত বড়ো বিপদেই পড়ুক না কেন ঠিক কেটে বেরিয়ে আসতে পারবে। তা ছাড়া ওর সঙ্গে মায়া সরোবরের দু-জন লোক আছে। আর ওদের সঙ্গে আছে একটি হংসরথ।' সাধক রাজাকে বলল।

হংসরথের কথা শুনে কনকাক্ষ রাজা ও তাঁর সঙ্গে অরণ্যে যারা এসেছিল তারা অবাক হয়ে গেল। রাজা বললেন, 'হংসরথ! হংসরথ আছে নাকি?'

'শুধু হংসরথ কেন মহারাজ। এই জলরাক্ষস, নরদানব এদের ক্ষমতা সাধারণ ক্ষমতা নয়। এদের অসীম ক্ষমতা আছে। এই অরণ্যেরই একপ্রান্তে পেয়েছি বেঁটে বেঁটে মানুষ, এমন গাছ পেয়েছি যা মানুষ সহ যেকোনো প্রাণীকে টেনে ধরে খেয়ে নেয়। আমরা নগরের জীবন দেখেছি কিন্তু অরণ্যে যে কত ভয়ংকর বৈচিত্র্য আছে তা এখানে না ঢুকলে কোনোদিনই বুঝতে পারতাম না।' সাধক রাজাকে বলল।

অদূরে রাজার লোকের সঙ্গে নরখাদকদের জোর বাগবিতণ্ডা লেগে গেল। ওদের বক্তব্য হল ওরা একটা রহস্যের সন্ধান পেয়েছে। নরদানবের পিঠে চেপে তাড়াতাড়ি গেলে ওরা সেই বিচিত্র রহস্যের সন্ধান পেতে পারে। তাই ওরা এখন নরদানবকে নিয়ে যেতে চায়।

রাজার লোক নরখাদকদের জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কারা? তোমরা এখানে কেন এসেছ?'

সাধক ওদের ডেকে পাঠাল। নরখাদকরা সাধকের কাছে এসে বলল, 'আমাদের পুরুত ঠাকুর আর নেতাকে ছেড়ে দিলে তোমাদের আমরা একটা বিরাট রহস্যের সন্ধান দেব।'

রাজার লোক সাধকের ইশারায় নরখাদকদের বন্ধন খুলে দিল। পূজারি এবং ওদের নেতাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল। ওদের মুক্ত করে সাধকের সামনে আনা হল। নরখাদকরা যা চেয়েছিল তা করার পর সাধক ওদের বলল, 'এখন তো তোমরা খুশি। এখন বল, তোমরা কোন রহস্য জানাতে চাও।'

নরখাদকরা সাধককে বলল, 'শুনুন তাহলে বলছি একদিন যে কুমিরমুখো লোকটা তোমাদের খপ্পর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল তাকে, একটি সুন্দরী মেয়েকে, তোমাদের মতন একজন মানুষকে, অদ্ভুত ধরনের হাতিকে একসঙ্গে ওই পাহাড়ের দিকে আমরা যেতে দেখেছি। ওরা ওই হাতি এবং ঘোড়ার পিঠে চেপে যাচ্ছিল। আর একটা রহস্যজনক ঘটনা আমরা লক্ষ করেছি, হংসরথ থেকে যারা পড়ে গেছল তাদের মধ্যে কয়েক জনকে কী যেন খোঁজাখুঁজি করতে দেখেছি। ওরা ঠিক কি যে খুঁজছে তা অবশ্য আমরা বুঝতে পারিনি।'

আঠাশ

নরভক্ষকরা এমনভাবে ঘটনার বর্ণনা করল যে সিদ্ধ সাধক পরিষ্কার বুঝতে পারল, তার সঙ্গী জয়শীল সরোবরেশ্বরের কবলে পড়ে গেছে। কিন্তু সাধক অনেকক্ষণ ভেবেও বুঝতে পারল না সরোবরেশ্বর জয়শীলের সঙ্গে কোন যুবতীকে ধরে নিয়ে গেছে।

নরভক্ষকরা যা বলল তা শুনে অবাক হয়ে গেল রাজা। রাজাকে সাধক বলল, 'মহারাজ, এবার আমাকে বিদায় দিন। আমার সঙ্গী জয়শীলকে সরোবরের পশুগুলো বন্দি করে নিয়ে গেছে। আমি ভেবে পাচ্ছি না অত বড়ো বীর ওদের হাতে কীভাবে ধরা পড়ল। যেভাবেই সে ধরা পড়ুক, সে যেখানেই থাকুক তাকে আমায় উদ্ধার করতেই হবে। আমি যদি উদ্ধার করতে না যাই তাহলে আমার পাপ হবে। আমি যাচ্ছি।' বলে সে নরদানবের পিঠে চেপে বসতে গেল।

রাজা কনকাক্ষ তাকে শান্ত করে বললেন, 'সাধক, জয়শীলকে উদ্ধার করা আমারও কর্তব্য। কয়েক জন অশ্বারোহী নিয়ে আমিও তোমার সঙ্গে যাচ্ছি। আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে মায়া সরোবরেশ্বর যে কোথায় তা আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে। তোমার সঙ্গী ওই জলজ প্রাণীটিকে জিজ্ঞেস করে নাও মায়া সরোবর যাওয়ার রাস্তা কোন দিকে।'

সাধক মাথা নেড়ে রাজি হয়ে জলরাক্ষসকে বলল, 'ওহে, তুমি ছাড়া আমার এখন গতি নেই। তোমাকে নিয়ে একজায়গায় যেতে চাই। কিন্তু তার আগে তোমার কাছ থেকে একটি সত্যি কথা জানতে চাই। তুমি কি এখনও মনে মনে মায়া সরোবরেশ্বরকেই শ্রদ্ধা কর নাকি আমাদের প্রতি তোমার ভক্তিশ্রদ্ধা আছে? আর যদি আমাকে বিপদে ফেলার জন্য আমার সঙ্গে ভিড়ে থাক তাহলে অন্তত তুমি সত্যি কথাটা বল। সেই বুঝে আমি তোমাকে দিয়ে কোনো কাজ করাব কি না ভাবব।' সাধকের কথা শুনে রাক্ষস তার পাথরের গদা রেখে বলল, 'প্রভু, আমার জাতের লোক মিথ্যা কথা বলে না। আপনার জন্য আমি যেকোনো মুহূর্তে জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। আপনি যা বলবেন আমি তাই করব।'

'তাহলে এখন একটি সত্যি কথা বল। মায়া সরোবর কোথায় আছে?' সাধক জিজ্ঞেস করল।

'প্রভু, আগেই জানিয়েছিলাম, সরোবরের ঠিকানা জানানোর সঙ্গেসঙ্গে আমার মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। আমার জাতের কোনো লোক যদি কাউকে জানায় তাহলে তারও মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। আমাদের উপর সরোবরেশ্বরের দেয়া এই একটাই হল অভিশাপ।'

তার কথা শুনে সাধক হো-হো করে হেসে বলল, 'তোমার সরোবরেশ্বরের এমন ক্ষমতা নেই যে তার অভিশাপ লেগে যাবে। যার রথ আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে যায়, যে নরভক্ষকদের কবল থেকে নিজের শক্তিবলে মুক্ত করতে পারে না তার অভিশাপে কিছু হয় না। মনে রেখো, শকুনের অভিশাপে গোরু মরে না।'

জলরাক্ষস কেমন থতমত খেয়ে বলল, 'প্রভু, মনে হচ্ছে আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারছি না। শেষে কি আমায় মরতেই হবে? একটা কাজ করি, মুখে না বলে ইশারায় জানিয়ে দিই।' বলে সে গাছ থেকে ছোটো শুকনো কাঠি ভেঙে আনল।

'ওহে আমি তোমায় অভয় দিচ্ছি তোমার কোনো ভয় নেই। আমি হলাম মহাকালের ভক্ত। কোনো কারণে তোমার যদি মৃত্যু ঘটে, মুহূর্তের মধ্যে আমি তোমাকে স্বর্গে পাঠিয়ে দেব। তুমি যাতে স্বর্গসুখ ভোগ কর তার ব্যবস্থা করব।' সাধক ত্রিশূলটাকে উপরে তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল।

জলরাক্ষস কাঠি দিয়ে মাটির উপর ঘর কাটতে কাটতে বলল, 'প্রভু, আমার মনে হচ্ছে আমার মাথায় ফাটল ধরেছে। আর কিছুক্ষণ পরেই হয়তো মাথা চৌচির হয়ে যাবে। প্রভু আমার বুক ধড়ফড় করছে।'

কনকাক্ষ রাজা জলরাক্ষসের কাছে এসে সাধককে বললেন, 'আমার ছেলে-মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে কতরকমের বিপদেই না তোমাদের পড়তে হচ্ছে। যদি এই প্রাণীটির মাথা ফেটে যায় তাহলে সত্যি বড়ো দুঃখের বিষয় হবে।'

'মহারাজ, এ হল আস্ত মূর্খ, মহাকালের ভক্তের আশীর্বাদ পেলে কারও অভিশাপে কোনো ক্ষতি হয় না।' বলতে বলতে সাধক জলরাক্ষসের কাটা দাগগুলো দেখছিল। কিছুক্ষণ দেখে সে বলল, 'ওহে, শুধু দাগ কেটে গেলেই কি হবে? তোমার এই সোজা দাগগুলো কীসের চিহ্ন? আর এই আঁকাবাঁকা দাগগুলো দিয়ে কী বোঝাতে চাইছ? কোনো কথা না বলে শুধু এঁকে গেলে বুঝব কী করে?'

ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মাথা না তুলেই সে বলল, 'প্রভু, এগুলো হল পাহাড়ের চিহ্ন। আর এইগুলো হল অরণ্যের বড়ো বড়ো গাছের চিহ্ন। এ যে সবচেয়ে বড়ো দাগ এটি বড়ো গাছের চিহ্ন। এই গাছটি আছে একটি পাহাড়ের উপরে। এই গাছে উঠে শিখরে পৌঁছে একবার পুব দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই পশ্চিমে এবং উত্তর দিকে তাকালেই মায়া সরোবর নজরে পড়বে।' বলেই সে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'প্রভু, আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে। আমার বড়ো কষ্ট হচ্ছে। মরে যাব।' বলতে বলতে সে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল।

তৎক্ষণাৎ সাধক নুয়ে তার নাক চেপে ধরে শ্বাস প্রশ্বাস চলছে কি না পরীক্ষা করে দেখল। তারপর রাজাকে বলল, 'মহারাজ, এ যে কত বড়ো মূর্খ আপনাকে কী বলব। যেহেতু ওর দাগ কাটা শেষ হয়ে গেছে সেইহেতু ওর ধারণা হয়েছে ও মরে গেছে। ভয়ে এর বুক ধড়ফড় করছে। আসলে এ কিন্তু বেঁচে আছে। সরোবরেশ্বরের অভিশাপে যে কোনো কাজ হয় না এটাই তার প্রমাণ।' তারপর সাধক নরখাদকদের উদ্দেশ্যে বলল, 'ওহে, তাড়াতাড়ি কয়েক ঘড়া জল নিয়ে এসো।'

নরখাদকরা জলরাক্ষসকে হাঁ করে দেখছিল। ওদের অবস্থা দেখে সাধক ত্রিশূল তুলে নির্দেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, 'কিরে শুনছিস, আমার নির্দেশ যদি না শুনিস তাহলে আমি তোদের এক্ষুনি শেষ করে ফেলব।' বলে রক্তচক্ষু করে সাধক নরখাদকদের দিকে তাকাল।

নরখাদকদের নেতারা ইশারা পেয়ে বুড়ো পূজারি কাছে এসে কনকাক্ষ রাজাকে প্রণাম করে বলল, 'মহারাজ, আমরা বনে পড়ে থাকি। আপনাকে যে কীভাবে সসম্মানে রাখতে হয় আমরা তা জানি না। শুনেছি এই অরণ্য আপনার অধীনে আছে। আপনি যদি অনুগ্রহ করে এই জলরাক্ষসদের আমাদের হাতে তুলে দেন তাহলে অনেক উপকার হবে।'

তার কথা শেষ হতে-না-হতেই সাধক এসে পূজারির চুলের মুঠি ধরে বলল, 'ওহে, নরখাদক, জানোয়ার, তুমি কি চাও এই ত্রিশূলটা তোমার বুকে বিঁধে ফেলি।'

সাধক পূজারিকে ত্রিশূল দিয়ে মারতে যাবে এমন সময় জলঘোড়ায় চেপে সর্পনখা আসতে আসতে বলল, 'হে সাধক, শোনো সাধক, শোনো, এখন আমাদের আর উপায় নেই। জলরাক্ষসদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ অবধারিত। ওদের বিরুদ্ধে লড়ার সময় নরখাদকরা যাতে সাহায্য করে তা চেষ্টা করতে হবে।'

ওই চিৎকার শুনতে শুনতে সাধক ত্রিশূলটা মাটিতে নামিয়ে মুহূর্তকাল কী যেন ভাবতে গেল। এই সুযোগে বুড়ো পূজারি নরখাদকের মধ্যে ঢুকে ওদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে লাগল।

সর্পনখা সাধকের কাছে এসে ঘোড়া থেকে নেমে মাটিতে পড়ে থাকা জলরাক্ষসের দিকে তাকিয়ে বলল, 'সাধক, একে কি পরলোকে পাঠিয়ে দিয়েছ? তুমি না একদিন বলেছিলে এ তোমার খুব বিশ্বাসী? দেখলে তো কীরকম বিশ্বাসী?'

'এ এখনও আমার কাছে বিশ্বাসী। তবে এর বিশ্বাস, সরোবরেশ্বর যা বলে তাই ঘটে। মায়া সরোবরে পথঘাট চেনানোর জন্য দাগ কাটতে কাটতে শুয়ে পড়ল। এর ধারণা এ মরে গেছে।' সাধক বলল।

ততক্ষণে জল আনল রাজার লোক। জল ঢালার পর জলরাক্ষস এ-পাস ও-পাশ ফিরে চোখ খুলে ড্যাবড্যাব করে তাকাল। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, 'আমি কোথায় আছি, নরকে না সরোবরে?' আরও অনেক কথা সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল। সাধক কষে এক লাথি মেরে তাকে বলল, 'ওহে, উঠে পড়, অভিশাপ থেকে তোমাকে মুক্ত করেছি। আর কোনো ভয় নেই উঠে পড়।'

সাধকের কথা শুনে জলরাক্ষস উঠে পড়ল। তার হাবভাব দেখে সর্পনখা যেন খুশি হয়ে একবার রাজা এবং অন্য বার তার লোকজনের দিকে তাকিয়ে বলল, বৈদ্যদেব হংসরথে যখন ছিলেন তখন রাজার কথা শুনেছিলাম। ইনি কি সেই হিরণ্যপুরের রাজা কনকাক্ষ?'

রাজা কনকাক্ষ সর্পনখার বিচিত্র পোশাক লক্ষ করছিলেন। তার পোশাক এবং ঘোড়া লক্ষ করে রাজা বললেন, 'বৈদ্যদেব কে? সে কি আমারই দেশের?'

সর্পনখা সঙ্গেসঙ্গে জবাব দিল, 'মহারাজ, আমি তা জানি না। তবে আমার পেছনে তাকেও আসতে দেখেছি। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে সে এসে পড়বে।'

'সাধক, তুমি কি বৈদ্যদেবকে চেন?' কনকাক্ষ রাজা জিজ্ঞেস করলেন।

তাঁর প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে সাধক বলল, 'মহারাজ, বৈদ্যদেব যে কে তা মায়া সরোবরের বাসিন্দা, সরোবরেশ্বরের অনুচররা জানে না। তবে সে যে জয়শীলের মতোই অমরাবতীর নাগরিক সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।'

'কি বলছ তুমি, জয়শীল অমরাবতীর নাগরিক? ওই দেশের রাজা রুদ্রসেন আমার শত্রু। আমি বিপদে পড়েছি শুনে রুদ্রসেন নাকি আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এক জয়শীল ছিল, তার সঙ্গে আবার বৈদ্যদেব জুটল।' রাজা কনকাক্ষ বললেন।

'মহারাজ, জয়শীল, আর যাই হোক বিশ্বাসঘাতক নয়। তার কথার অনেক দাম। সে যা বলে তাই করে। আপনাকে যখন কথা দিয়েছে তখন কথা সে রাখবেই। আমি ওর সঙ্গে ঘুরে লক্ষ করেছি, জয়শীলের মতো মানুষ হয় না। হলপ করে বলতে পারি।' সাধক বলল।

সাধক রাজার সঙ্গে কথা বলতে বলতে লক্ষ করল, নরখাদকদের মধ্যে কয়েক জন ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সাধকের ইশারায় ওদের নেতা এসে বলল, 'তোমাদের মতো চার জন মানুষ জলরাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আমরাও যদি ওদের বিরুদ্ধে লড়ি কিছুদিনের জন্য আমাদের খাদ্য জুটে যায়।'

পরক্ষণেই সর্পনখা একলাফে নিজের ঘোড়ার পিঠে চেপে বলল, 'সাধক বুঝতে পেরেছি ওরা কারা। বৈদ্যদেব আর আমার ভাইও আছে ওই দলে। রাজার অঙ্গরক্ষকও ওই দলে ছিল। চলি!'

'জয় মহাকাল! বলে সাধক নরদানবের পিঠে চেপে বসে রাজা কনকাক্ষকে বলল, 'মহারাজ, জলরাক্ষসদের হাত থেকে এক্ষুনি ওদের বাঁচাতে হবে।' বলেই সে সর্পনখাকে অনুসরণ করল।

'হে অরণ্যদেবতা, তুমিই পার আমাদের খাদ্যের সন্ধান দিতে।' বলে নরখাদকরা সাধককে অনুসরণ করল।

সর্পনখা ও সিদ্ধ সাধক গিয়ে দেখল, সর্পস্বরা ঘোড়ায় চেপে জলরাক্ষসদের সঙ্গে লড়াই করছে। তরবারি দিয়ে ওদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করেছে। ওর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে জলরাক্ষসগুলো চেষ্টা করছে, বৈদ্যদেব নামধারী দেবশর্মা, হংসরথের চালক মঙ্গলবর্মা প্রভৃতিকে ধরার। কিন্তু দেবশর্মা হাতের লাঠিটা এদিক-ওদিক নেড়ে বলছে, 'শোনো তোমরা আমার কাছে আসবে না। এই লাঠির ডগায় কিন্তু বিষ আছে।'

কনকাক্ষ রাজার লোক সেখানে পৌঁছে গেল। ওদের দেখেই জলরাক্ষসদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিল। ওরা যে ভয় পেয়েছে তা বুঝে নিয়ে ওদের নেতা বলল, 'তোমরা দাঁড়াও। আমাদের রাজার নির্দেশ মনে রেখ। জ্যান্ত না আনতে পারলে, দেবশর্মার মৃতদেহও আনতে বলেছিলেন রাজা। মনে আছে? বলেই সে দেবশর্মাকে মারতে গেল।

তৎক্ষণাৎ দেবশর্মা এক-পা পেছিয়ে বলল, 'না তোমার মৃত্যু আমার হাতেই দেখছি!' বলে লাঠি দিয়ে তার গায়ে খোঁচা মারল। তৎক্ষণাৎ সে মাটিতে পড়ে আর্তনাদ করতে করতে মারা গেল। দেবশর্মা লাঠিটা তুলে বলল, 'ওহে, শোনো, সরোবরেশ্বরের মেয়ে পদ্মমুখী অথবা কাঞ্চনবর্মার যদি ক্ষতি হয় তাহলে কিন্তু সবাইকে শেষ করে ফেলব।'

এই ঘোষণা শুনে জলরাক্ষসদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। কেউ কেউ পালাল। সর্পনখা দেবশর্মার কাছে এসে বলল, 'বৈদ্যদেব, কি ঘটবে তা ঠিকভাবে না জেনে সরোবরে যাওয়া কি ঠিক হবে?' তার কথার জবাবে কিছুক্ষণ ভেবে দেবশর্মা বলল, 'সেটা তোমরা দুই ভাই আর সরোবরেশ্বরের অঙ্গরক্ষক ভালোভাবেই জানো।' তারপর জলঘোড়ায় চেপে সর্পনখা ও সর্পস্বরা এগিয়ে গেল। হংসরথও উড়ল আকাশে। নরখাদকরা জলরাক্ষসদের ধরার জন্য মহানন্দে চিৎকার করতে করতে ছুটল।

উনত্রিশ

নিজেদের খিদে মেটানোর জন্য নরভক্ষকরা জলরাক্ষসদের ধরতে তাদের পেছনে পেছনে ছুটছিল। এইসময় তারা লক্ষ করেনি ছুটতে ছুটতে কোথায় যাচ্ছে। দুটো জলরাক্ষস গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব কিছু লক্ষ করছিল। ওরা নেতার নির্দেশে সারাদিন গাছের আড়ালে থেকে সব কিছু লক্ষ করছিল।

অনেক উঁচু গাছে উঠে ডালপালার আড়ালে ওরা আরও দূরের ঘটনা লক্ষ করছিল। একজন অন্যজনকে বলল, 'আমাদের শত্রুর সংখ্যা বাড়ছে।'

দ্বিতীয় রাক্ষস ওর কথা কানে তুলল না। সে দেখতে পেল জলরাক্ষসদের পেছনে নরখাদকরা ছুটছে। আর নরভক্ষকদের পেছনে ছুটছে হিরণ্যপুরের সেনাবাহিনী। ওই বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছে মঙ্গলবর্মা।

জলরাক্ষস মঙ্গলবর্মাকে দেখিয়ে বলল, 'এই লোকটাকে ধরে আমাদের রাজার কাছে নিয়ে গেলে কেমন হয়? আমার ধারণা, একে গোটাকয়েক রদ্দা দিলেই এর বাহিনীতে কত জন আছে কীসের জন্য এরা এখানে এসেছে সব জানা যাবে।

'তোমার কথাটা ভালোই। তবে মায়া সরোবরের দিকে যারা যাচ্ছে তারা তো একটা দলে যাচ্ছে না। অনেক দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এত লোক যে মায়া সরোবরে যাচ্ছে এই খবরটা আগেভাগে রাজার কাছে জানানো কি উচিত নয়?' দ্বিতীয় জলরাক্ষস বলল।

তার কথায় আগ্রহ না দেখিয়ে অন্য রাক্ষস বলল, 'ওসব যা করার তুমি করগে যাও। আমি এই লোকটাকে ধরে রাজার কাছে নিয়ে যাবই যাব।' এই কথা বলে প্রথম জলরাক্ষস সন্তর্পণে গাছ থেকে নেমে মঙ্গলবর্মাকে অনুসরণ করল।

যারা ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিল তারা অনেকদূর এগিয়ে গেল। দেখতে দেখতে, কিছু দূর যাওয়ার পর মঙ্গলবর্মা পেছিয়ে পড়ল। পিছনদিক দিয়ে যে আক্রান্ত হতে পারে এমন ধারণা তার ছিল না। আসল জিনিস হল সাহস। বুকে সাহস থাকলে যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মঙ্গলবর্মা হাঁটছিল। এমন সময় পেছনদিক দিয়ে জলরাক্ষস তার কাছে পৌঁছে গেল। ঝট করে ধরার প্রবল আগ্রহের ফলে পথের দিকে না তাকিয়ে চোখ-কান বুঁজে মঙ্গলবর্মাকে ধরার জন্য ধাবিত হল ওই রাক্ষসটা। ফলে হঠাৎ সে পড়ে গেল এক গর্তে। তার পা ভেঙে গেল। সে আর্তনাদ করতে লাগল।

পেছনের দিকে তাকিয়ে মঙ্গলবর্মা বুঝল যে সে বিরাট বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। জলরাক্ষসকে খাদে পড়তে দেখে মঙ্গলবর্মা তার কাছে গিয়ে বলল, 'কী হে, খুব তো আমাকে ধরতে আসছিলে, এখন যে পা ভেঙে পড়ে আছে। কেমন মজা? এখন তোমাকে ওষুধ দেবে কে? তোমার রাজা তো আর তোমার ডাকে আসবে না। এর আগেও তো অনেকের ক্ষতি করার চেষ্টা করেছ। তার ফলভোগ করবে কে? অন্যের ক্ষতি করতে চাইলে এই হয়। দাঁড়াও দেখি— কী করতে পারি। শেকড়-বাকড় লাগিয়ে তুমি যাতে আবার হাঁটতে পার তার ব্যবস্থা করি।'

এসব লক্ষ করে অন্য জলরাক্ষসটা গাছ থেকে নেমে পাথরের গদাটাকে উপরের দিকে তুলে চিৎকার করে বলল, 'দাঁড়াও! তোমাকে এই মুহূর্তে একেবারে স্বর্গে পাঠিয়ে দিচ্ছি।' এই কথা বলে ছুটতে ছুটতে মঙ্গলবর্মার দিকে এগিয়ে এল।

রাক্ষসটাকে ছুটতে ছুটতে আসতে দেখে মঙ্গলবর্মা হাতের অস্ত্রটাকে ঝাঁকুনি দিয়ে উপরের দিকে তুলল। সঙ্গেসঙ্গে তার ভেতর থেকে একটি ঝকঝকে তরবারি বেরিয়ে এল। মঙ্গলবর্মা ওই তরবারি মাটিতে পড়ে থাকা জলরাক্ষসের গলায় ঠেকিয়ে যে রাক্ষসটা আসছিল তার উদ্দেশ্যে বলল, 'ওহে দুরাত্মা— আমি এক, দুই, তিন বলার সঙ্গেসঙ্গে তুমি তোমার গদা মাটিতে ফেলে দাও। মাথা নীচু করে খালি হতে তুমি আমার কাছে আসবে। তা যদি না কর তাহলে কিন্তু তোমার এই সঙ্গীটির গলা ঘ্যাচাং করে কেটে ফেলব। দেখতে পাচ্ছ তরবারিটা ওর গলায় ঠেকিয়ে রেখেছি। একটু টান দিলেই ওর গলা কাটা যাবে। যাও এবার বলছি। এক দুই...।'

মঙ্গলবর্মার মুখ দিয়ে 'তিন' বেরোনোর আগেই ওই জলরাক্ষস পাথরের গদাটিকে দূরে ফেলে দিল। সে নুয়ে সবিনয়ে বলল, 'আমার বন্ধুকে মেরে ফেল না।'

'না, তোমার দেখছি দয়ামায়া আছে। বন্ধুকে বাঁচিয়ে রাখতে চাও। শুধু বাঁচালেই হবে? বন্ধুর ঠ্যাং যে ভেঙে গেছে, সেটা ঠিক করতে হবে না? এসো আমার সঙ্গে। গাছগাছালির ওষুধ দিয়ে সারানোর চেষ্টা করি।' বলে মঙ্গলবর্মা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল।

কিছু দূর যাওয়ার পর মঙ্গলবর্মা কায়েকটি লতাপাতা ছিঁড়ে দ্বিতীয় জলরাক্ষসের হাতে দিয়ে বলল, 'এর রস তোমার বন্ধুর পায়ে লাগাও। যেখানে আছে সেখানেই অন্তত বারো ঘণ্টা থাক। নড়াচড়া যেন না করে। এই ওষুধ লাগানোর পর নড়াচড়া না করলে পা জোড়া লেগে যাবে। আর নড়াচড়া করলে ভাঙা পা ভাঙাই থাকবে। শেষে হয়তো পা কেটে বাদ দিতে হবে।'

মঙ্গলবর্মার কথা শুনে ওই দুই রাক্ষসের মুখ ঝুলে গেল। কোথায় কী ঘটছে তা লক্ষ রাখার জন্যই তাদের পাঠানো হয়েছিল। এখন যদি এক জায়গায় বসে থাকতে হয় তাহলে অন্য জায়গায় কী ঘটছে তা জানা যাবে না। এদিকে মঙ্গলবর্মা ভাবল, এরা যে এখানে কেন আছে তা এদের জিজ্ঞেস করে কোনো লাভ হবে না। কারণ এরা সত্যকথা বলবে না। জিজ্ঞেস করার তেমন আগ্রহও ছিল না মঙ্গলবর্মার। কারণ তাকে বাধ্য হয়ে একবার মায়া সরোবরে থাকতে হয়েছিল। কোন পথে গেলে মায়া সরোবরে তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যাবে তা সে জানে। কিন্তু অতটা পথ হেঁটে যাওয়া তার পক্ষে কষ্টকর।

সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মঙ্গলবর্মা আস্তে অস্তে হাঁটছিল। এমন সময় উঁচু গাছ থেকে সে শুনতে পেল, 'মঙ্গলবর্মা!' শুনে সে চমকে উঠল। ভাবল অরণ্যে নানারকম জীবজন্তু শুধু নয়, অনেক রকমের ভূত পিশাচও থাকতে পারে। কিন্তু যাই থাক, যেদিক থেকে ডাক শোনা গেছে সেদিকে না তাকিয়ে পারল না। গাছপালার আড়ালে, অনেকক্ষণ লক্ষ করার পর সে দেখতে পেল একটি মানুষের মুখ। এই সেই লোক যে মায়া সরোবরেশ্বরের হংসরথ চালায়। রথটা আকাশ থেকে উলটে পড়ার সময় লোকটাও রথ থেকে গড়িয়ে পড়েছিল। তবে সৌভাগ্যক্রমে সে মাটিতে না পড়ে পড়ল উঁচু গাছের ডালপালার উপর। ফলে সামান্য চোট পেলেও মারা গেল না।

তাকে চিনতে পেরে মঙ্গলবর্মা হাতে নেড়ে বলল, 'তাহলে তুমি বেঁচে আছ! খুব খুশি হয়েছি। তা গাছের উপর বসে আছ কেন? নামলে তো পারতে।'

হংসরথের চালক ইশারা করে আস্তে কথা বলতে বলে থেমে থেমে বলল, 'মঙ্গল, অত জোরে কথা বলো না। স্বয়ং যম এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নরদানবের উপর চেপে তাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছি! এদিকেই সে আসছে। তার সঙ্গে আছে কিছু সৈনিক। আমার ধারণা এরাই আমাদের শত্রু জয়শীল এবং সিদ্ধ সাধক।'

তার কথা শুনে মঙ্গলবর্মা খুব খুশি হল। ভাবল, যারা আসছে তাদের মধ্যে নিশ্চয় বৈদ্যদেব নামধারী দেবশর্মা আছে। এখন ওদের সঙ্গে মিশে গেলে খুব তাড়াতাড়ি মায়া সরোবরে পৌঁছানো যায়।

এই কথা ভেবে মঙ্গলবর্মা উপরের দিকে মুখ রেখে হংসরথের চালককে বলল, 'ওহে শোনো, এখন কিন্তু ওরা আমাদের শত্রু নয়। শত্রু যে নয় এটুকু জানি; তবে মিত্র কি না বলতে পারি না। স্বয়ং মায়া সরোবরেশ্বর নাকি জয়শীলকে নিয়ে সরোবরে গেছে। তুমি যাদের ওপর থেকে দেখেছ তাদের মধ্যে হয়তো বৈদ্যদেব আছে। আমার তো পায়ের এই অবস্থা। এক পায়ে আমি তো গাছে উঠতে পারি না। তুমি তো ওপরেই আটকে পড়ে আছ। যারা এদিকে আসছে হাততালি দিয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ কর। তাদের এদিকে আসার জন্য ইশারা কর।'

ওই দলে বৈদ্যদেব থাকতে পারে শুনে রথের চালকের আনন্দ হল। সে ভালোভাবে লক্ষ করল। তার মনে হল নরদানবের পিঠে যে আছে তার পেছনে রয়েছে বৈদ্যদেব। এইভাবে গাছের উপর দিনের পর দিন আটকে পড়ে থাকলে শেষপর্যন্ত জলরাক্ষস অথবা নরভক্ষকদের পেটে যেতে হবে। ওরা এলে হয়তো এখান থেকে মুক্তি পাওযা যেতে পারে।

রথের চালক চিৎকার করে বলল, 'এই যে এদিকে এদিকে তাকান। এই এখানে গাছের উপর আমি আটকে পড়ে আছি। আমাকে দয়া করে উদ্ধার করুন! আমাকে বাঁচান!'

অনেকদূর থেকে আওয়াজটা এলেও প্রথমেই তা শুনতে পেল নরদানব। ডাক শুনেই থেমে গিয়ে মাথা তুলে সাধককে ইশারা করল। দূর থেকে তা লক্ষ করে রথের চালক আবার প্রাণপণে চিৎকার করল, 'বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও!'

এবারে রথের চালকের আর্তনাদ সবাই শুনতে পেল। দেবশর্মা বলল, 'গলাটা যেন চেনা চেনা লাগছে। হয়তো সে এই রথের চালক। হংসরথ থেকে লোকটা বোধ হয় এই অঞ্চলেই পড়ে গিয়েছিল।'

'তাহলে তো আর কোনো অসুবিধেই রইল না। ওর সাহায্যেই আমরা মায়া সরোবরে খুব তাড়াতড়ি পৌঁছে যেতে পারব। একবার জয়শীলের দেখা পেলেই সবাইকে একসঙ্গে গাছে বেঁধে বলি দিতে পারব।' সাধক এই কথা বলে নরদানবকে দ্রুত সেদিকে যাওয়ার জন্য তাড়া দিল।

নরদানব মুহূর্তে সেই গাছের কাছে পৌঁছে গেল। তখন মঙ্গলবর্মা সাধকের কাছে এসে বলল, 'সাধক, যেকোনোভাবে গাছের মগডালে আটকে থাকা ওই লোকটাকে নীচে নামিয়ে আনতে হবে।'

সাধক চিৎকার করে বলল, 'জয় মহাকাল!' তারপর একটু থেমে চারদিকে তাকিয়ে বলল, 'সব কিছু দেখে-শুনে আমার অবাক লাগছে। মায়া সরোবরেশ্বর শুধু যে কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়েকে অপহরণ করেছে তাই নয় তার সাহস এতদূর বেড়ে গেছে যে আমার বন্ধু জয়শীলকেও সে নিয়ে গেছে। কেউ কেউ বলে, এই জঘন্য অপহরণকারী নাকি আবার আমাদের মিত্রও হতে পারে।'

তৎক্ষণাৎ দেবশর্মা এগিয়ে এসে তাকে শান্ত করার জন্য বলল, 'এখন আমাদের সবচেয়ে বড়ো শত্রু হল জলরাক্ষস। এখন সবাই মিলে আমরা যদি ওদের বিনাশ না করি তাহলে কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে কনকাক্ষ রাজার ছেলে-মেয়ের মৃত্যু ঘটবে। কারণ, মায়া সরোবর এখন কিন্তু মায়া সরোবরেশ্বরের হাতে নেই। সেটা এখন রয়েছে ওই জলরাক্ষসদের দখলে।'

দেবশর্মার কথা শেষ হতে-না-হতেই কয়েক জন সৈন্য নিয়ে কনকাক্ষ রাজা সেখানে পৌঁছে গেল।

গাছের উপর থেকে হংসরথের চালক চিৎকার করে বলল, 'আমার কথা কি সবাই ভুলে গেছ? একটা বিরাট পাখি পাহাড় থেকে উড়ে এসে আমার উপর বসতে যাচ্ছে। আমাকে বাঁচাও।'

তার আর্তনাদ শুনেই সাধক নরদানবকে বলল, 'ওই যে গাছের শিখরে দেখতে পাচ্ছ একটা লোক— ওই লোকটাকে যেকোনোভাবে নীচে নিয়ে এসো।'

চোখের পলকে নরদানব গাছের ডগায় উঠে গেল। একহাতে সে রথের চালককে ধরে অন্যহাতে পাহাড়ি পাখিটিকে ঠেকাল। নরদানবকে দেখে রথের চালক ভয়ে কাঁপতে লাগল। কয়েকটি ডাল নামার পর সে নরদানবকে বলল, 'এবার আমাকে ছেড়ে দাও। আমি নিজেই এখন নামতে পারব।'

এমন সময় জলরাক্ষসদের দল পাথরের গদা নিয়ে সেদিকে ছুটে এসে মহানন্দে চিৎকার করতে লাগল।

জলরাক্ষসদের নেতা এগিয়ে এসে মহানন্দে বলল, 'চারদিক থেকে এদের ঘিরে ফেল। এদের একটাও যেন ছিটকে পালাতে না পারে। অনেকদিন পরে এত খাদ্য একসঙ্গে পাওয়া গেছে। এদের সবাইকে বেশ মজা করে খাওয়া যাবে।'

গাছের উপর থেকে জলরাক্ষসের নেতার এই কথা শুনে নরদানব প্রচণ্ড চিৎকার করে হাতে থাকা পাহাড়ি পাখিটিকে জলরাক্ষসদের নেতার উপর ছুড়ে দিল।

ত্রিশ

জলরাক্ষসগুলো বুঝতে পারল যে তাদের নেতা আক্রান্ত হতে পারে। এটা বুঝতে পেরেই জলরাক্ষসগুলো দল বেঁধে এসে নরদানবকে চারদিক থেকে আক্রমণ করতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে কনকাক্ষ রাজা তার সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিলেন। সাধক ত্রিশূলটাকে উপরের দিকে তুলে হাতের কাছে যে জলরাক্ষসকে পেল তাকেই আক্রমণ করল।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে জলরাক্ষসদের বিরুদ্ধে সাধক, রাজার সেনাবাহিনী ও নরদানবের প্রচণ্ড সংঘর্ষ ঘটে গেল। এমন সময় জলরাক্ষসদের নেতা এগিয়ে এসে চিৎকার করে বলল, 'ওহে শোনো, তোমরা কি জানো আমি কে? আমি হলাম এখন মায়া সরোবরের সর্বেসর্বা। সেখানে যত জন বন্দি হয়ে আছে তাদের মধ্যে একমাত্র পদ্মমুখী বাদে সবাইকে শেষ করে ফেলব। দেখছ, আমার এই পাথরের গদা। এর এক-একটা আঘাতে এক-একজনের জীবন শেষ হয়ে যাবে।'

সাধক চড়া গলায় বলল, 'কইরে তোরা সব কোথায়? কী বলছে শোনো।'

সাধকের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে নরদানব আনন্দে লাফাতে লাগল। লাফাতে লাফাতে সে হাতের কাছে যে দু-চারটি জলরাক্ষসকে পেল ধরে ওপরের দিকে তুলে নীচে আছড়ে মেরে ফেলল।

তার ওইভাবে হঠাৎ ক্ষেপে যাওয়াতে সাধক ত্রিশূল তুলে বলল, 'ওহে নরদানব, এবার তুমি শান্ত হও। যাকে-তাকে ওভাবে মেরো না। আজ যে পর কাল সে আপন হতে পারে। এদের অনেকেই আমাদের পক্ষে আসবে। যদি পার জলরাক্ষসদের নেতাকে ধর। দেখছ, ও বোধ হয় মায়া সরোবরের দিকেই যাচ্ছে।'

বৈদ্যদেব নামধারী দেবশর্মা সাধকের কাছে এসে বলল, 'সাধক, ওই মায়া সরোবর এখান থেকে বেশি দূরে নেই। আমি সেখানে যাওয়ার পথ চিনি, তোমরা সবাই আমাকে অনুসরণ কর।'

সাধক মাথা নেড়ে দেবশর্মার কথা অনুসারে কাজ করার সম্মতি জানাল। রাজা কনকাক্ষ দেবশর্মার পাশে ছিলেন। তিনি দেবশর্মাকে বললেন, 'শর্মা, জলরাক্ষসদের নেতা পদ্মমুখী বাদে সবাইকে শাস্তি দেওয়ার কথা ঘোষণা করল। এর কারণ তুমি কিছু জানো?'

'মহারাজ, আমরা যা শুনছি আর যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে মায়া সরোবরের অনেকখানি এখন জলরাক্ষসদের কবলে। পদ্মমুখীকে বাঁচিয়ে রাখার কারণ একটাই। জলরাক্ষসের একটি ছেলে আছে। তার সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য।' দেবশর্মা বলল।

'তাহলে তো আমার মেয়ে কাঞ্চনমালাকেও কোনো রাক্ষস বিয়ে করতে চাইতে পারে।' রাজা কনকাক্ষ অত্যন্ত উদবিগ্ন হয়ে বললেন।

'মহারাজ, আপনি অহেতুক এতটা উদবিগ্ন হবেন না। আমাদের একমাত্র ভরসা জয়শীল। জয়শীল এবং সরোবরেশ্বর অনেক আগেই মায়া সরোবরে পৌঁছে গেছে। তাদের চোখের সামনে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে না।' বলল দেবশর্মা।

রাজা কনকাক্ষকে এই ধরনের কথা বলে দেবশর্মা তাঁর মনে সাহস জোগাচ্ছিল। অন্যদিকে ঠিক সেইসময় জয়শীল তার সঙ্গীদের নিয়ে মায়া সরোবরে পৌঁছে গেল। ওই সরোবরটা ছিল বিরাট আকারের। সরোবরের চারদিকে ছিল পাহাড়। পাহাড়ের উপর থেকে সরোবরের তীর পর্যন্ত ঘন বন ছিল।

সরোবরের তীরে পৌঁছে জয়শীল তরবারি দিয়ে জল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বলল সরোবরেশ্বরকে, 'তাহলে এটাই তোমার মায়া সরোবর? এই সরোবরের অধিকারী হয়ে তুমি আমার গলায় ফাঁস পরাতে গিয়েছিলে? কাঞ্চনমালাকে ধরে এনেছ? আমি ভেবে পাচ্ছি না এই মুহূর্তে তোমাকে শত্রু না মিত্র হিসেবে দেখব।'

মায়া সরোবরেশ্বর মুখ কাঁচুমাচু করে কাঞ্চনমালার দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে যাবে এমন সময় কাঞ্চনমালা হাঁকপাঁক করে বলল, 'জয়শীল, এখানে এখন যারা আছে তাদের মধ্যে কেউ আপনার শত্রু নয়। মকরকেতুর কাছে আমি শুনেছি ঠাকুরের আশীর্বাদে আপনার তরবারির ক্ষমতা অসীম। এই তরবারির আঘাতে আপনি অনেককে জব্দ করেছেন। তরবারি আপনার হাতে থাকলে কেউ যে আপনার ক্ষতি করতে পারে না তাও আমি মকরকেতুর কাছে শুনেছি। এখন আপনাকে কিন্তু একটা কাজ করতে হবে। জলরাক্ষসদের নেতার হাতে বন্দি হয়ে রয়েছে কাঞ্চনবর্মা এবং মায়া সরোবরেশ্বরের মেয়ে পদ্মমুখী। এই দু-জনকেই উদ্ধার করতে হবে।

'আমি একা জলরাক্ষসদের অত বড়ো বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারব এতটা ক্ষমতা আমার আছে? দেখি চেষ্টা করে। তোমার বাবা রাজা কনকাক্ষকে আমি কথা দিয়েছি প্রয়োজন হলে জীবন দিয়েও তোমাকে এবং কাঞ্চনবর্মাকে উদ্ধার করব। এই দু-জনের উদ্ধারের দায়িত্ব আমি আগেই নিয়ে বসে আছি। এর সঙ্গে যুক্ত হল পদ্মমুখী। ঠিক আছে দেখি কী করতে পারি।' জয়শীল বলল।

জয়শীলের কথা শেষ হতে-না-হতেই মায়া সরোবরেশ্বর এগিয়ে এসে জয়শীলের দুটো হাত ধরে সবিনয়ে বলল, 'জয়শীল, আমি কনকাক্ষ রাজার ছেলে এবং মেয়েকে তুলে এনেছি এটা সত্য। কিন্তু আমি মনে করি না যে আমি কোনো অপরাধ করেছি। অবশ্য মকরকেতু ও-কে পাঠিয়েছিলাম কাঞ্চনবর্মাকে ধরে আনতে। কিন্তু ওর যা বুদ্ধি ধরে আনতে বললে বেঁধে আনে। একজনকে আনতে বললাম ও দু-জনকে ধরে আনল।'

'অপরাধ করোনি মানে। কাঞ্চনবর্মাকেই বা তুমি ধরে আনতে পাঠালে কেন? নিশ্চয়ই কোনো উদ্দেশ্য ছিল।' জয়শীল মায়া সরোবরেশ্বরকে বলল।

'উদ্দেশ্য একটা ছিল বটে কিন্তু সেটা বিরাট বড়ো কিছু নয়। আমার বড়ো ইচ্ছা ছিল কাঞ্চনবর্মার সঙ্গে আমার মেয়ে পদ্মমুখীর বিয়ে দেওয়া। মেয়ের একটা গতি করে মায়া সরোবর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পারলে বাঁচি। কিন্তু যা ভেবেছিলাম তা হল না। কারণ কাঞ্চনবর্মাকে আমার মেয়ের পছন্দ হয়নি। সে তাকে বিয়ে করতে রাজি নয়। আর আমিও মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসব কাজ করতে চাইনি।' সরোবরেশ্বর জয়শীলকে বলল।

সরোবরেশ্বরের কথা জয়শীলের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হল। সে কাঞ্চনমালার দিকে তাকাল। কাঞ্চনমালা সরোবর থেকে একটি শাপলা তুলে এনে সেটা জয়শীলের কপালে এমনভাবে ঠেকাল যেন সে তার কপালে টিপ পরিয়ে দিচ্ছে। তারপর সে বলল, 'সরোবরেশ্বর যা বললেন তা সম্পূর্ণ সত্য। এখন সরোবরের একটি রহস্য আমি আপনাকে জানিয়ে দিচ্ছি। এই যে শাপলার জলের ফোঁটা আপনার কপালে লাগালাম এর ফলে আপনি জলের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে পারবেন, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারবেন। এককথায় জলের গভীরে বাস করতে আপনার অসুবিধা হবে না।'

'তাই নাকি! তাহলে— দেখি পরীক্ষা করে।' বলে জয়শীল একলাফে সরোবরের গভীরে চলে গেল।

তীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সরোবরেশ্বর, কাঞ্চনমালা এবং মকরকেতু এক দুই তিন চার করে গুণতে লাগল। ওদের ধারণা ছিল দু-এক মুহূর্ত পরেই জয়শীল উঠে পড়বে। কিন্তু অনেকক্ষণ পরেও যখন উঠল না তখন কাঞ্চনমালা উদবিগ্ন হয়ে বলল, 'এ তো দেখছি হিতে বিপরীত হল। কী করা যায়। জলরাক্ষস হয়তো জলের গভীরে আমাদের জব্দ করার জন্য বসে আছে। ওকে যদি একবার ধরতে পারে আর আস্ত রাখবে না।'

'কি রে! তুই বোধ হয় সরোবরের তীরে জলে ডুবে আমাদের কথা শুনছিলি? কে পাঠিয়েছে তোকে? তোর বাবা? উঁ? তোর বাবা এখন কোথায়?' মায়া সরোবরেশ্বর অস্ত্র নাড়তে নাড়তে তাকে জিজ্ঞেস করল।

'আমার বাবা এখন কোন এক রাজাকে জব্দ করতে গেছে। ওই রাজার সঙ্গে একজন কাপালিকও আছেন। ওদের তাড়িয়ে অথবা মেরে ফেলে বাবা এখানে আসবে। তারপর তোমাদের কেটে টুকরো টুকরো করে, তোমাদের মাংস কাক আর শুকুনকে খাওয়াবে।' যুবরাক্ষস সরোবরেশ্বরকে বলল।

'তাই নাকি! তাহলে তো বড়ো ভয়ের কথা! আচ্ছা ঠিক আছে ওসব ব্যাপার পরে ভাবা যাবে। আচ্ছা বলতে পার কাঞ্চনবর্মা আর পদ্মমুখী এখন কোথায় আছে?' জয়শীল জিজ্ঞেস করল।

'ওদের যে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে তা একমাত্র বাবাই জানে।' যুবরাক্ষস বলল।

এমন সময় দূর থেকে অনেকের গলা শোনা গেল। জয়শীল মকরকেতুকে বললল, 'কেতু, তোমার জলগ্রহকে বল শুঁড় দিয়ে যুবরাক্ষসকে ধরে দু-এক বার উপর নীচ করতে।'

সঙ্গেসঙ্গে মকরকেতু বলল, 'জলগ্রহ, নাও যুবরাক্ষসকে ভালো করে ধর! দু-এক বার নাড়িয়ে দাও ওকে।'

মকরকেতুর কথানুযায়ী জলগ্রহ যুবরাক্ষসকে ধরে কয়েক বার ওপরের দিকে তুলল আর নামাল আর ঝাঁকাল।

জলগ্রহ যখন যুবরাক্ষসকে ধরে তুলছিল এবং নামাচ্ছিল তখন জয়শীল দেখতে পেল সদলবলে নরদানব, সাধক ও সেনাবাহিনীসহ রাজা কনকাক্ষ সেদিকে এগিয়ে আসছেন।

যুবরাক্ষসকে ওই অবস্থায় দেখে রাক্ষসদের নেতা এবং অন্য রাক্ষসরা আর্তনাদ করে উঠল। ওদের নেতা বলল, 'শুনুন শুনুন ওভাবে হাতির কবলে আমার ছেলেকে ছেড়ে দেবেন না। আমার ছেলেকে মেরে ফেলবেন না। আমি এখন আপনাদের শত্রু নই। আপনাদের যে ক-জন আমার হাতে বন্দি আছে সবাইকে আমি ছেড়ে দেব।'

জয়শীলের কাছে রাজা কনকাক্ষ এসে দাঁড়াতেই কাঞ্চনমালা তাঁকে জড়িয়ে বলল, 'বাবা, দোহাই তোমরা সরোবরেশ্বরের কোনো ক্ষতি করো না। যা ঘটে গেছে তার জন্য সে অনুতপ্ত।'

জয়শীল হাসতে হাসতে রাজাকে বলল, 'এর মেয়ে পদ্মমুখী আর একটু হলে আপনার বউমা হয়ে যেত। একটুর জন্য হল না।'

কথার পিঠে কাঞ্চনমালা হাসতে হাসতে বলল, 'পদ্মমুখী যে কাকে পছন্দ করে আমি তা ভালো করেই জানি। সে দেবশর্মাকে বিয়ে করতে চায়।'

দেবশর্মা জয়শীলকে বলল, 'জয়শীল, জলরাক্ষসের নেতা কাঞ্চনবর্মা এবং পদ্মমুখীকে এখানে আনতে তার অনুচরদের পাঠিয়েছে। অনুচররা যদি না আনে, এই নেতা যদি আমাদের ধোঁকা দেয়, তাহলে আমাদের কী হবে?'

'ধোঁকা দিলে জলগ্রহ যেভাবে এর ছেলেকে তুলছে আর নামাচ্ছে ঠিক সেইভাবে রাক্ষসদের নেতাকে তুলবে আর নামাবে। আর আমাদের নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে মাটিতে আছড়ে ফেলে মেরে ফেলবে।' এমন সময় দেখা গেল কয়েকটি জলরাক্ষস কাঞ্চনবর্মা ও পদ্মমুখীকে নিয়ে এগিয়ে আসছে।

এতক্ষণ সাধক কোনো কথা বলেনি। এখন সে বলল, 'যা শুনেছি যা দেখছি তাতে মনে হচ্ছে দেবশর্মার সঙ্গে পদ্মমুখীর বিয়েটা হবেই।'

রাজা কনকাক্ষ জয়শীলের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমি ঘোষণা করেছিলাম যে, আমার ছেলে-মেয়েকে যে উদ্ধার করবে তার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দেব এবং তাকে আমার রাজ্যের অর্ধেক ভাগ দেব। জয়শীল যে শুধু আমার ছেলে-মেয়েদের উদ্ধার করেছে তাই নয়, তার বীরত্বের ফলে বহু জঘন্য পাপী উপযুক্ত শাস্তিও পেয়েছে।'

সাধক হাসতে হাসতে কাঞ্চনমালাকে বলল, 'তাহলে একজন বীরের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে। এই তো?'

কাঞ্চনমালা লজ্জা পেয়ে বাপের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। সাধক গুরুগম্ভীর গলায় বলল, 'তাহলে আমি ঘোষণা করছি কিছুদিনের মধ্যেই রাজধানীতে জয়শীলের সঙ্গে রাজকন্যা কাঞ্চনমালার এবং পদ্মমুখীর সঙ্গে দেবশর্মার খুব ঘটা করে বিয়ে হবে।'

জয়শীল প্রশ্ন করল, 'সাধক, তুমি তাহলে কোথায় থাকবে?'

'আমি এখন থেকে এই সরোবরের কাছাকাছি কিছুকাল ধরে উপাসনা করব ভাবছি।' এই বলে সাধক ত্রিশূলটাকে এমনভাবে তুলে ধরল দেখে মনে হয় যেন সে শপথ করছে।

তারপর রাজা কনকাক্ষ, জয়শীল, মায়া সরোবরেশ্বর, জলরাক্ষসদের নেতা এবং তার অনুচর ও সেনাবাহিনী সহ রাজধানীতে ফিরলেন। রাজার সঙ্গে কাঞ্চনবর্মা এবং কাঞ্চনমালাকে দেখে প্রজারা খুব খুশি হল।

অধ্যায় ২ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%