সাত পুতুল

সৈকত মুখোপাধ্যায়

কালোমানিক দাসের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল গত মার্চ মাসের শেষের দিকে। সে ছিল একজন বৈদ্য বা কবিরাজ। রাস্তার ধারে বসে জড়িবুটি বিক্রি করত। বলত পৃথিবীতে এমন কোনো অসুখ নেই, যা ওর ওই জড়িবুটিতে সারে না।

সে তো বলতেই হবে। না বললে লোকে ওর কাছে আসবে কেন? ওর তো নামের পেছনে একগাদা ইংরিজি ডিগ্রি নেই।

আলাপটা কেমন করে হয়েছিল বলি। বরাহনগর বাজারের রাস্তায় একটা ছোট কালিমন্দির আছে। মন্দিরের সামনের ফুটপাথটায় বসে বেশ কয়েকজন হকার তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করে। কেউ বিক্রি করে রেডিমেড কাপড়চোপড়। কেউ প্লাস্টিকের থালা, বাটি, বালতি। কেউ বা আবার ঘর সাজাবার নানান আইটেম। ওই মার্চ মাসের শেষের দিকেই একদিন ওখান দিয়ে যেতে গিয়ে দেখি, ওদের মধ্যে বসে একটি ছেলে বেশ উঁচু গলায় বক্তৃতা দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই তাকে ঘিরে বেশ কিছু লোক জমে গেছে।

ওই ছেলেটাই হচ্ছে কালোমানিক।

তখন তো ওর নাম জানতাম না। তবে প্রথম নজরেই চোখে পড়েছিল যে, ছেলেটার চেহারা আর কথাবার্তা দুটোই বেশ আকর্ষণীয়। পঁচিশ-বছরের বেশি বয়স হবে না। গায়ের রং শ্যামলা। ছিপছিপে গড়ন। নাক-চোখ বেশ কাটা কাটা। ঘাড় পর্যন্ত বাবরি চুল।

চেহারার সঙ্গে মানানসই ছিল তার পোশাক-আশাকের বাহার। মালকোচা মেরে পরা একটা হলুদ ধুতি আর লাল পাঞ্জাবি। দেখলেই বোঝা যায় সস্তার নকল সিল্কের তৈরি। গলায় বেশ কয়েক ছড়া পাথরের মালা। অনর্গল বাংলা হিন্দি মিশিয়ে পৃথিবীর যাবতীয় কঠিন-কঠিন রোগের ওপরে বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছিল। এরকম জড়িবুটি-ওলা কলকাতার রাস্তায় আকছার দেখতে পাওয়া যায়। ওদের নিয়ে আমার কোনোকালেই কোনো আগ্রহ ছিল না, তাই পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যেতে পারলাম না একটাই কারণে। ওর সামনে সাজিয়ে রাখা জড়িবুটিগুলোর মধ্যে একটা অদ্ভুত জিনিসে আমার চোখ পড়ে গেল।

এমনিতে আর যা-যা ছিল সেসবই অতি সাধারণ জিনিস। সেই ধনেশ পাখির ঠোঁট, বাঁদরের খুলি; সজারুর কাঁটা আর প্যাঁচার পালক। হয়তো শহুরে লোকেদের ওসব দেখে তাক লাগতে পারে, কিন্তু আমি নীল চ্যাটার্জি—ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফার। বছরের মধ্যে আটমাস আমার জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে দিন কেটে যায়। আমি কেন ওসবে ভুলব? বরং ওগুলো দেখলে আমার গা জ্বালা করে। নিরীহ পশুপাখিগুলোকে না মেরে তো আর ওগুলো সংগ্রহ করা যায়নি।

সেইজন্যেই আমি একবারও না থেমে জায়গাটা পেরিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমি লম্বা মানুষ। ভিড়ের মাথার ওপর দিয়ে চোখ চলে গেল কালোমানিক আর ওর সামনে সাজানো একশো-একখানা হাড়গোড়, আঁশ-নখ, শিশি-বোতল আর শেকড়-বাকড়ের দিকে। যে-জিনিসটার কথা বলছি সেটা এমন কিছু বড় নয়। অত জিনিসের ভিড়ে আমার চোখ এড়িয়েও যেতে পারত। কিন্তু এড়ালো না।

যা কিছু অলৌকিক, যা কিছু অকল্পনীয়, তা যে কেন এই নীল চ্যাটার্জিরই চোখে পড়ে তা কে জানে। কত কীই যে দেখলাম গত দশ-বছরের কেরিয়ারে। কখনো মরুভূমির দানবিক পতঙ্গ, যারা মানুষের মতন চলাফেরার ভঙ্গি দিয়ে মানুষকেই ঠকিয়ে মারে। আবার কখনো অন্য গ্রহের পরজীবী, যাদের মরণ-ছোবলে পৃথিবীর জীবেরা মণির মতন উজ্জ্বল লাল-পাথরে বদলে যায়। মরিশাসের প্যারাকিট দ্বীপে জীবন্ত টিউমারদের কথাও কি কোনোদিন ভুলতে পারব, যারা মানুষের ঘাড়ে কামড় দিয়ে আটকে থাকত আর ওইভাবেই মানুষগুলোকে বানিয়ে ফেলত নিজেদের হাতের পুতুল।

কিন্তু সত্যি বলছি, কালোমানিকের কাছে যে কঙ্কালটা সেদিন দেখেছিলাম, তার পরিণতি যে এমন অবিশ্বাস্য হতে পারে, সেকথা তখন স্বপ্নেও ভাবিনি।

হ্যাঁ। একটা কঙ্কালই দেখেছিলাম। খুব ছোট একটা প্রাণীর কঙ্কাল।

অন্যান্য সব মন-ভোলানো জিনিসের অনেকটা পেছনে, একটা বড় কাচের জারের মধ্যে কঙ্কালটা রাখা ছিল। জায়গাটায় রাস্তার আলো ভালো করে পৌঁছোচ্ছিল না, তাই একটু আলো-আঁধারি মতন হয়েছিল। তবু প্রথম নজরেই আমার মনে হয়েছিল ওটা একটা নতুন প্রজাতির বাঁদরের কঙ্কাল।

ইতিমধ্যে কখন যে আকাশে কালবৈশাখীর মেঘ জমেছিল আমরা কেউই খেয়াল করিনি। হঠাৎই গুরগুর করে মেঘ ডেকে উঠল। হাওয়ার বেগও বেড়ে উঠল। আকাশের দিকে তাকিয়েই বোঝা গেল ঝড়বৃষ্টি আসতে আর দেরি নেই। মুহূর্তের মধ্যে কালোমানিককে ঘিরে যে-ভিড়টা জমেছিল, সেটা উধাও হয়ে গেল। কালোমানিক বেজার মুখে একটা বাক্সের মধ্যে ওর জড়িবুটির সংগ্রহ গুছিয়ে তুলতে শুরু করল। তখনই আমি প্রথমবার ভালো করে কাচের জারের মধ্যে রাখা কঙ্কালটাকে দেখলাম এবং নিশ্চিত হলাম যে ওটা নকল। প্লাস্টিকের তৈরি। কারণ…আচ্ছা, কারণগুলো পরে বলছি। আমি কালোমানিকের কাছে গিয়ে জারটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, ‘ওটা প্লাস্টিকের তৈরি, তাই না?’

কালোমানিক হাতের কাজ না থামিয়েই একবার আড়চোখে দেখল আমি কোন জিনিসটার কথা বলছি। তারপর বেশ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উত্তর দিল, ‘আমার কাছে কোনো নকল জিনিস নেই। এসবই আসল, পবিত্র এবং দুর্লভ।’

আমি তাই শুনে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। যতক্ষণ ওর কাজ শেষ না হয় আর কোনো কথা বললাম না। কালোমানিক খেয়াল করেনি যে, আমি একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ও সব জিনিস বাক্সে ভরে উঠে দাঁড়াল। মুখে হতাশা এবং বিরক্তি। হতচ্ছাড়া কালবৈশাখীর জন্যে ওর আজকের ব্যবসাটা মাটি হল।

দেখলাম ও এদিক-ওদিক তাকিয়ে রিকশা খুঁজছে। অত বড় লোহার ট্রাঙ্কটা তো আর হাতে করে নিয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু রিকশা ছিল না কোথাও। ততক্ষণে ঝড়ের বেগ বেশ বেড়ে উঠেছে। চড়বড় করে বড়-বড় কয়েক ফোঁটা বৃষ্টিও ঝরে পড়ল। বোঝাই যাচ্ছিল, এক্ষুনি মুষলধারায় শুরু হবে।

আমার খুব মায়া হল। ছেলেটা আমার চেয়ে না হোক দশবছরের ছোট। ও যেটা করছে, তা করছে নিজের পেটের দায়ে। চুরি-ডাকাতি তো আর করছে না। ও ওষুধের যা দাম বলছিল তাতে আজকাল এক প্যাকেট চকলেটও হয় না। যদি সে-ওষুধ কাজ না করে তাতেই বা কী হবে? বড়জোর খদ্দেরদের সেই টাকাটুকু জলে যাবে।

ওকে জিগ্যেস করলাম, ‘তোমার নাম কী ভাই?’

ও গম্ভীরমুখে উত্তর দিল, ‘কালোমানিক। কালোমানিক দাস।’

বুঝলাম, সেই যে কঙ্কালটাকে প্লাস্টিকের তৈরি বলেছিলাম, সেই রাগ এখনো যায়নি। তাই গলাটাকে যথাসম্ভব নরম করে বললাম, ‘এখন কোথায় যাবে?’

‘কেন?’

‘আমার গাড়িটা কাছেই পার্ক করা আছে আর আমার হাতে এখন তেমন কাজও নেই। তাই তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসতে পারি। ঝড়জল থামার আগে তুমি রিকশা পাবে না, তাই বলছিলাম।’

সঙ্গে সঙ্গে কালোমানিকের মুখের চেহারা বদলে গেল। বলল, ‘দেবেন স্যার? সত্যিই তাহলে খুব উপকার হয়। বুঝতে পারছি ভগবান আপনাকে পাঠিয়েছেন তাঁর গরিব সন্তানকে বাঁচানোর জন্যে।’

কালোমানিক ওর বাসার যে ঠিকানা দিল, সেটা বরাহনগর থেকে বেশি দূরে নয়। ওকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আট-মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। ও বলল, ‘আসুন স্যার। একটু আমার ঘরে পায়ের ধুলো দিন।’

এমনিতে যেতাম কিনা জানি না। কিন্তু তখনও আমার মাথায় সেই অদ্ভুত বাঁদরের কঙ্কালটার কথা ঘুরছিল। তাছাড়া ঝড়টাও তখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। তাই গাড়িটা ওর বাড়ির বাইরে পার্ক করে একদৌড়ে ওর ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। কিন্তু ওইটুকু সময়ের মধ্যেই ভিজেও গেলাম পুরোপুরি।

বলছি বটে ‘ওর ঘর।’ কিন্তু আসলে ঘরটা ও ভাড়া নিয়েছিল। ডানলপ মোড় থেকে বেলঘরিয়ার দিকে যেতে ডানদিকে একটা সরু রাস্তা ঢুকে গেছে। তারই একপাশে তিনতলা পুরোনো বাড়ির গ্রাউন্ড-ফ্লোরের ছোট একটা ঘর। কালোমানিক বলল, ওর মতন বাইরে থেকে যারা কলকাতায় ব্যবসা করতে আসে, তারাই এক একজন একেকটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। কেউ থাকে দশদিন, কেউ থাকে দু-মাস। কোনো ঠিক নেই।

‘আসুন স্যার।’ ট্রাঙ্কটা ঘরে ঢুকিয়ে আলো জ্বালল কালোমানিক। বলল, ‘কিছু যদি না মনে করেন, এই শুকনো তোয়ালেটা দিয়ে গা-মাথা মুছে নিন। তারপর আমি আপনাকে একটা মশলাদার চা খাওয়াব। খেলেই দেখবেন শরীর কিরকম চাঙ্গা হয়ে যায়। এই চায়ের ফরমুলা আমার ফ্যামিলির বাইরে কেউ জানে না।’

আমি তো বসতেই চাইছিলাম। ততক্ষণে ও নিজের নামটা আমাকে বলেছে। আমার নাম আর কাজের ধরনটাও শুনে নিয়েছে। তাতে ওর বেশ খানিকটা ভক্তি বেড়েছে আমার সম্বন্ধে। গা-মাথা মুছতে-মুছতে ওকে বললাম ‘কালোমানিক! এবার তোমার নিজের কথা কিছু বলো। এত সব রোগ আর তার ওষুধের কথা শিখলে কোথা থেকে?’

ঘরের কোনায় রাখা একটা ছোট স্টোভে চায়ের জল চাপিয়ে কালোমানিক সেসব কথাই বলতে শুরু করল। আমি একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে নিয়ে ওর মুখোমুখি বসে শুনছিলাম।

‘স্যার, আপনার যখন বনজঙ্গল আর বন্যপ্রাণী নিয়েই কাজ, তখন আপনি তো নিশ্চয়ই মেদিনীপুর, ঝাড়খণ্ড আর ওড়িশার বর্ডার জুড়ে ছড়িয়ে-থাকা হাতিবাড়ি জঙ্গলের নাম শুনেছেন। ওই জঙ্গলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে আছে কিছু আদিবাসী গ্রাম। কবে থেকে রয়েছে তা কেউ জানে না।

‘পৃথিবীর ইতিহাসে কত কিছু ঘটে গেছে। বুদ্ধ জন্মেছেন, খ্রিস্ট জন্মেছেন, মহম্মদ জন্মেছেন। মুঘল কিংবা বৃটিশরা ভারতবর্ষ শাসন করে গেছে। আবার একদিন সমস্ত রাজত্বের অবসান হয়েছে। অনেক রক্তক্ষয়ের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু সেসবই জঙ্গলের বাইরে—শহরে আর গ্রামে। জঙ্গলের মধ্যে সেইসব মহাপ্লাবনের একটা ছোট ঢেউও কখনো ছিটকে আসেনি।

‘দশ-হাজার বছর আগেও বনের মধ্যে যে জলের কুণ্ডে হাতির পাল স্নান সেরে যেত, আজও তারা সেই কুণ্ডে, ঠিক সেইভাবেই জল উথাল-পাথাল করে স্নান সেরে যায়। দশহাজার বছর আগে যেভাবে সন্ধেবেলায় জঙ্গলের চতুর্দিক থেকে ময়ূরের ডাক ভেসে আসত, এখনো ঠিক সেইভাবেই সন্ধে নামে। আর আমাদের গ্রামের লোকেরাও ঠিক একইভাবে হরিয়াল আর তিতির পাখি শিকার করে। মাটি খুঁড়ে কন্দ তুলে আনে। মহুয়া আর বুনো জাম কুড়োয়।

‘হ্যাঁ স্যার। আমাদের গ্রামের লোকেরা কোনোদিনই চাষবাস করেনি। ইদানীং সরকারি উদ্যোগে অল্পস্বল্প চাষ করছে ঠিকই, কিন্তু ওতে আমাদের পোষায় না। কারণ জঙ্গলের মধ্যে চাষের জমি থাকলে তার ফসল ঘরে তোলা একরকমের অসম্ভবই বলতে পারেন। তার আগেই ফসল খেয়ে যাওয়ার জন্যে টিয়াপাখি রয়েছে, হরিণ রয়েছে, বুনো শুয়োর রয়েছে। আর এদের আটকানো গেলেও হাতির পালিকে আটকাবে কে? আমাদের ছ’মাসের পরিশ্রমে জমিতে যে ভুট্টা কিংবা ধান জন্মায়, হাতির পাল এসে এক রাতের মধ্যে সেই সব ফসল খেয়ে নিয়ে চলে যায়।

‘সেইজন্যেই জঙ্গল-গ্রামের মানুষরা এখনো সেই শিকার করে আর ফলমূল কুড়িয়েই বেঁচে থাকে।

‘দু-একটা পরিবারের অন্যরকমের কিছু জীবিকা থাকে। যেমন ধরুন কামার—যারা কাস্তে, কুড়ুল, তিরের ফলা এইসব বানায়। কামার তো সব গ্রামেই একঘর থাকতে হবে। তারপর ধরুন ছুতোর, ঘরামি এদেরও লাগে।

‘আর লাগে কবিরাজদের। নাহলে অসুখ-বিসুখ হলে কে দেখবে? জঙ্গলে তো আর পাশ করা অ্যালোপ্যাথ হোমিওপ্যাথ ডাক্তার নেই। তার জন্যে যেতে হয় অনেক দূরে—শহরে। আমাদের ফ্যামিলিটা স্যার কবিরাজের ফ্যামিলি। পুরুষানুক্রমে আমরা জঙ্গলের গাছ-গাছড়া, পশুপাখির শরীরের নানান অংশ আর নানারকমের মাটি আর পাথর মিশিয়ে ওষুধ তৈরি করে আসছি। আপনার মতন শিক্ষিত লোকেরা হয়তো বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু ঠিকঠাক ব্যবহার জানলে এইসব প্রাকৃতিক উপাদানেই ম্যাজিকের মতন রোগ সেরে যায়।’

আমি বললাম, ‘সে কি! অবিশ্বাস করব কেন? ওষুধ হিসেবে এইসব প্রাকৃতিক উপাদানই তো মানুষকে চিরকাল রোগের থেকে আরাম দিয়ে এসেছে। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথিতেও তো বহু গাছগাছড়া আর মিনারেলসের ব্যবহার হয়। এখনো হয়।’

চা হয়ে গিয়েছিল। একটা ঝকঝকে কাঁসার গ্লাসে করে একগ্লাস চা এনে কালোমানিক আমার হাতে ধরিয়ে দিল। এক-চুমুক খেয়েই বুঝলাম, অজানা কিছু মশলার ব্যবহারে সেই চায়ের গন্ধ হয়েছে যেমন খোলতাই, স্বাদও তেমনি চনমনে। জিগ্যেস করলাম, ‘চায়ে কী মিশিয়েছ, কালোমানিক?’ ও বলল, ‘নাম বললে তো আপনি বুঝতে পারবেন। হাতিবাড়ি জঙ্গলের বাইরে এই পাতা অন্য কোথাও পাওয়া যায় কিনা তাও জানি না। যদি আমার সঙ্গে আমাদের গ্রামের বাড়িতে যেতেন তাহলে আপনাকে গাছটা চিনিয়ে দিতাম।’

তারপর বলল, ‘আমাদের গ্রাম থেকে আমিই প্রথম ঝাড়গ্রাম স্কুলে পড়তে গিয়েছিলাম। হায়ার-সেকেন্ডারি পাশ করার পরে ইচ্ছে করেই আর পড়লাম না। ততদিনে কলকাতা, খড়্গপুর এইসব শহরগুলো আমি চিনে ফেলেছি। বুঝতে পেরেছি, ছোটবেলা থেকে বাবা-দাদুর কাছে যে চিকিৎসা-বিদ্যা শিখেছি, সেই বিদ্যা নিয়ে শহরে পৌঁছলে অনেক বেশি লাভবান হব।

‘ভুল ভাবিনি। আপনাদের আশীর্বাদে ভালোই ইনকাম হচ্ছে। তবে এই চিকিৎসা আমি কোনোদিন চেম্বারে বসে করতে পারব না। রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরেই করতে হবে। কারণ, যেসব গরিব মানুষেরা এই জড়িবুটির চিকিৎসায় বিশ্বাস করে, তারা কেউ ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা করায় না।’

চা শেষ করে অনেকক্ষণ ধরে ওকে যে-অনুরোধটা করব ভাবছিলাম, সেটা করেই ফেললাম। বললাম, ‘কালোমানিক! তোমার ওই বাক্সের মধ্যে কাচের জারে একটা কঙ্কাল আছে। মনে হয় বাঁদরের কঙ্কাল। সেটা একবার দেখাবে?’

কালোমানিক অবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘ওটা দেখে কী করবেন?’

বললাম, ‘দেখাও না একবার। তখন একপলক দেখে কেমন যেন মনে হয়েছিল, ওটা যে-জন্তুর কঙ্কাল, সেটা আমার অচেনা। তাই আরেকবার ভালো করে দেখতে চাইছি।’

কালোমানিক আর কোনো কথা না বলে ট্রাঙ্কটা খুলে কাচের জারটা সাবধানে বার করে এনে আমার সামনে বিছানার ওপর নামিয়ে রাখল। তারপর নিজেও আমার মুখোমুখি বসল।

আমি খুব মন দিয়ে বহুক্ষণ ধরে কঙ্কালটাকে দেখলাম এবং তিনটে জিনিসে নিশ্চিত হলাম।

এক, কঙ্কালটা অরিজিনাল। প্লাস্টিক বা অন্য কোনো জিনিস দিয়ে বানানো নয়। যে-জায়গাগুলো ক্ষয়ে গেছে সেখান থেকেই এটা বুঝতে পারছিলাম।

দুই, বাঁদর নয়। কঙ্কালটা মানুষের। অমন চওড়া কপাল, লম্বা ঘাড়, আর চ্যাপটা বুকের খাঁচা বাঁদর জাতীয় কোনো প্রাণীরই থাকে না। এগুলো একদমই মানুষের বিশেষত্ব। তাছাড়া পা আর কোমরের হাড়, যেটাকে পেলভিস বলে, সেগুলো দেখেও নিশ্চিত হলাম।

তিন, এটাই সবচেয়ে মারাত্মক। এটা পূর্ণবয়স্ক একজন পুরুষ মানুষের কঙ্কাল।

জীবনে প্রচুর অলৌকিক অভিজ্ঞতা হয়েছে। তবু কঙ্কালটা দেখে আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল। একটু সামলে নিয়ে বললাম, ‘কালোমানিক! তুমি এই কঙ্কালটা কোথা থেকে পেয়েছ?’

‘কেন স্যার?’

‘বলছি। আগে তুমি বলো এটা কোথা থেকে পেয়েছ?’

কালোমানিক বলল, ‘দেখুন। তিন-বছর আগে যখন জড়িবুটি বেচতে শহরে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম, তখনই মনে হল কিছু লোক জড়ো করার মতন জিনিস লাগবে। শুধু কথায় লোক জমবে না।

‘আমাদের গ্রামে এক বৃদ্ধ মানুষ আছেন। তাঁর নাম সুরেশ বা সুরেন কিছু একটা হবে। গ্রামের সবাই তাকে সুরোদাদু বলে ডাকি। সুরোদাদু যৌবনে ছিলেন নামকরা শিকারি। এখন বয়স হয়ে গেছে বলে আর শিকার করতে পারেন না। কিন্তু জঙ্গলে ঘোরার নেশাটাও ছাড়তে পারেন না। তাছাড়া ফিরবেনই বা কোথায়? সুরোদাদুর স্ত্রী মারা গেছেন অনেকবছর আগে। ছেলেমেয়েও নেই। তাই সুরোদাদু এখনো জঙ্গলে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান আর এটা-ওটা কুড়িয়ে জড়ো করেন। মাসে একবার করে হাটে গিয়ে সেগুলো বিক্রি করে আসেন।

‘এই ট্রাঙ্কের ভেতরে যা-কিছু দেখছেন, সবই সুরোদাদুর কাছ থেকে নিয়ে আসা। আমি নিজেই সুরোদাদুর ঘর থেকে বেছেবুছে নিয়ে এসেছিলাম। তিনি তাকিয়েও দেখেননি কী নিলাম আর না নিলাম। খুব ভালোবাসেন তো আমাকে, তাই।

‘এই ধনেশের ঠোঁট, প্যাঙ্গোলিনের আঁশ, ওই মাকাল ফলের খোসা, সব। বাঁদরের কঙ্কালটাও সুরোদাদুর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। সুরোদাদু ওটা কোথা থেকে পেয়েছিলেন, তা অবশ্য আমি জিগ্যেস করিনি। জঙ্গলের ভেতরে এরকম কত পশুপাখির মৃতদেহই তো পড়ে থাকে। ভেবেছিলাম সেইভাবেই পেয়েছে। কিন্তু আপনি বললেন না তো স্যার, এই কঙ্কালটা নিয়ে আপনি জানতে চাইছেন কেন।’

আমি বললাম, ‘কালোমানিক। এখনো আমার জানা শেষ হয়নি। বরং বলতে পারো সবে শুরু হল। বাকিটা জানার জন্যে আমাকে এক্ষুনি একবার তোমার সেই সুরোদাদুর সঙ্গে দেখা করতে হবে। তুমি গ্রামে ফিরবে কবে?’

কালোমানিক বলল, ‘আমি তো কালকেই ফিরব ভাবছিলাম। ভোর ছ’টায় ধর্মতলা থেকে একটা বাস ছাড়ে। ওটা ধরব।’

আমি বললাম, ‘দরকার নেই। কাল তুমি আমার সঙ্গে যাবে, আমার গাড়িতে। আমার মোবাইল নাম্বারটা রেখে দাও। আর তোমার নাম্বারটাও আমাকে দাও। আগামী কয়েকদিন এই নাম্বারদুটো আমাদের খুব কাজে লাগবে।’

তারপর জিগ্যেস করলাম, ‘আমি সঙ্গে গেলে তোমার অসুবিধে নেই তো?’

কালোমানিক বলল, ‘অসুবিধে আমার তো কিছুই নেই স্যার। বরং আপনার মতন মানুষ আমাদের গ্রামে পা দিলে আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন সকলেই খুব খুশি হবে। কিন্তু আপনারই কষ্ট হবে। আমাদের গ্রামে ইলেকট্রিসিটি নেই। সোলার ব্যাটারিতে সন্ধের দিকে কিছুক্ষণ আলো জ্বলে আর মোবাইলে চার্জ টার্জ দেওয়া যায়। এই গরমে ফ্যান আর এসি ছাড়া আপনার খুব কষ্ট হবে। খাবারদাবারও সেরকম কিছু...’

আমি ওর পিঠে একটা চাপড় মেরে ওকে থামালাম। বললাম, ‘বছরে আটমাস আমি তোমাদের গ্রামের থেকেও বেশি দুর্গম জায়গায় ঘুরে বেড়াই। তোমাদের গ্রামে তো তবু রাস্তা আছে। আমাকে বেশিরভাগ সময়ে বন কেটে নিজের রাস্তা নিজেকেই তৈরি করে এগোতে হয়। টিনের খাবার ফুরিয়ে গেলে তোমাদের মতোই জঙ্গলের ফলমূল আর পাখিটাখি শিকার করে খাই। কাজেই আমার অসুবিধের কথা ভেবো না। ঠিক আছে, কাল ভোর পাঁচটায় পৌঁছে যাচ্ছি। রেডি থেকো।’

বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। কালোমানিকের ঘর থেকে যখন বেরিয়ে যাচ্ছি তখন পেছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারছিলাম, ও হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। স্বাভাবিক। ও আমাকে বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া এই-মুহূর্তে আর কীই বা ভাববে?

কালোমানিকের গ্রামের নাম কুসুমকুঁয়া। জায়গাটা সত্যিই দুর্গম। শেষ সাত-কিলোমিটার ঘন জঙ্গলে ঢাকা এবড়ো-খেবড়ো পাহাড়ি চড়াই ভেঙে গাড়ি চালাতে হল। এই গ্রামের ছেলে হয়েও যে কালোমানিক কলকাতা, খড়্গপুর, পাটনা দাবড়ে বেড়াচ্ছে এটাই প্রমাণ করে ওর মনের জোর।

চৈত্রের শেষ হাতিবাড়ি ফরেস্টের সমস্ত শিমূল-পলাশের গাছ রাশিরাশি লাল ফুলে ভরে গিয়েছিল। রাত নামলে আর রঙিন ফুলগুলো দেখা যেত না। তার জায়গায় অজস্র চেনা-অচেনা বুনোফুলের গন্ধে নেশা ধরে যেত। প্রথমদিন আমাদের পৌঁছোতে-পৌঁছোতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। তাই সেদিন আর কোথাও বেরোলাম না।

কালোমানিকের বাড়িতে শুধু ওর মা-বাবা আর দুটি ছোট বোন ছিল। একটা ঘরে শুধু আমারই থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন ওরা। রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে, ভোর না হতেই আমি কালোমানিকের সঙ্গে বেরিয়ে গেলাম সুরোদাদুর কুড়েঘরের উদ্দেশে। বেরোবার সময় কালোমানিকের কাছ থেকে সেই খুদে-মানুষের কঙ্কালটা নিয়ে আমার ব্যাকপ্যাকের ভেতরে যত্ন করে ঢুকিয়ে রাখলাম। সুরোদাদুকে বুঝিয়ে বলতে হবে তো আমরা তার কাছে ঠিক কোন জিনিসটার কথা জানতে চাইছি। কঙ্কালটা ওকে না দেখালে শুধু মুখের কথায় বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়।

কিন্তু আমাদের কপালই খারাপ। কালোমানিক যেটা ভয় পাচ্ছিল, সেটাই হল। দেখা গেল সুরোদাদু বাড়িতে নেই। ভাঙাচোরা কুড়েঘরটার দরজার দুটো পাল্লা নারকোল-দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। ওটা গ্রামের কুকুরদের আটকানোর জন্যে। ওই ঘর খোলা পড়ে থাকলেও চোর ঢুকবে না। কারণ ঘরের ভেতরে নাকি কটা মাটির বাসন আর ছেঁড়া চাদর-কম্বল ছাড়া আর থাকে ওই বন থেকে সংগৃহীত জিনিস। কার অত দায় পড়েছে ওসব জিনিস চুরি করে।

পাশের বাড়ির বাসিন্দারা কালোমানিকের প্রশ্নের উত্তরে জানালেন, সুরোদাদু সবে গতকালই নাকি জঙ্গলভ্রমণে বেরিয়েছেন। এখন তার ফিরতে সাতদিনও লাগতে পারে চোদ্দোদিনও লাগতে পারে। সবটাই সুরোদাদুর মর্জির ওপরে নির্ভর করছে।

এদিকে আর ঠিক চারদিন পরেই আমাকে সিমলায় জুলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার একটা সেমিনারে যোগ দিতে হবে। কাজেই সাতদিন তো দূরের কথা, তিনদিনও আমি কুসুমকুঁয়ায় থাকতে পারব না। এখন আমরা তাহলে কী করব?

কালোমানিককে জিগ্যেস করলাম, ‘সুরোদাদু তো সবেমাত্র গতকাল জঙ্গলে ঢুকেছেন। আমরা যদি এখনই একটু পা চালিয়ে ওকে ফলো করি, তাহলে ধরে ফেলতে পারব না?’

কালোমানিক বলল, ‘হ্যাঁ। পারতেও পারি। যদি তিনি ঠিকঠাক কোনদিকে গেছেন সেটা বোঝা যায়। জঙ্গলে তো রাস্তা বলতে জন্তু-জানোয়ারদের পায়ে চলা রাস্তা। সেগুলো মাকড়সার জালের মতন সারা জঙ্গলে ছড়িয়ে রয়েছে। তার মধ্যে কোনটা ধরে সুরোদাদু গেছেন, সেটাই তো বোঝা মুশকিল।’

আমি বললাম, ‘তবু চলো, একবার চেষ্টা করে দেখি। যদি ওর খোঁজ না পাই তাহলে ফিরে আসব।’

কালোমানিক কিন্তু তখনো জানে না, আমি কঙ্কালটার মধ্যে এমন কী দেখেছি, যার জন্যে এরকম পাগলামি করছি। কিন্তু ও বোধহয় এটাও বুঝতে পারছিল যে, আমি যতক্ষণ নিজে নিশ্চিত হতে না পারছি, ততক্ষণ কিছুই বলব না। তাই আমাকে আর কঙ্কাল-প্রসঙ্গে কিছু জিগ্যেসও করছিল না।

যাই হোক, আমরা চটপট কালোমানিকের বাড়িতে ফিরে গিয়ে দিন-তিনেকের মতন শুকনো খাবার দুজনের দুটো ব্যাগে পুরে নিলাম। আমি তাছাড়াও আরও কিছু কিছু জিনিস নিলাম, যেগুলো না নিয়ে আমি জঙ্গলে ঢুকি না। যেমন টর্চলাইট, দুটো হালকা হ্যামক—যেগুলো গাছে দোলনার মতন টাঙিয়ে রাত কাটানো যায়। তাছাড়াও পোকামাকড় তাড়ানোর ক্রিম, ওষুধ, বাইনোকুলার এবং আমার রিভলভার।

বিশাল হাতিবাড়ি ফরেস্টের ভেতরেও যে সুরোদাদুকে খুঁজে পাব, সেই বিশ্বাস আমার ছিল। তার কারণ, দীর্ঘদিন অরণ্যবাসী মানুষদের সঙ্গে বন্ধুর মতন মেলামেশার ফলে যে-কটা জিনিস আমি ওদের কাছ থেকে শিখেছিলাম, তার একটার নাম ‘বুশক্র্যাফট।’ জঙ্গলে টিকে থাকতে গেলে বুশক্র্যাফট শিখে রাখা খুব জরুরি। বুশক্র্যাফট জানি বলেই কোনো জন্তু বা মানুষের চলার পথকে আমি নিখুঁতভাবে অনুসরণ করতে পারি। তার পায়ের নীচে মাড়িয়ে-যাওয়া একটা শুকনো পাতা, তার মাথায় লেগে ভেঙে যাওয়া একটা গাছের ডাল, এইসব চিহ্ন ধরে আমি বুঝতে পারি সে কতক্ষণ আগে, কোনদিকে গেছে।

সুরোদাদুকে পেয়ে গেলাম দ্বিতীয়দিন সন্ধের সময়। তবে কে যে কাকে পেলাম সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

তখন জঙ্গলে অন্ধকার নেমে এসেছে। একটু আগেই আমরা ঝোরার পাশে একটা নিভোনো আগুনের কুণ্ড দেখে এসেছি। ছাইয়ে হাত দিয়ে দেখেছিলাম তখনো গরম রয়েছে। তার মানে সুরোদাদু খুব বেশিক্ষণ আগে এখান থেকে যাননি। তারপর আর বড়জোর দুটো বাঁক ঘুরেছি কি ঘুরিনি, সাঁই সাঁই করে দুটো তির আমার আর কালোমানিকের থেকে ছ-ইঞ্চি দূরে একটা শাল গাছের গুঁড়িতে গেঁথে গেল। আমাদের পেছনদিক থেকে একটা গলার স্বর ভেসে এল, ‘হাতদুটো মাথার ওপরে তুলে ওখানেই দাঁড়িয়ে যাও। একটুও যদি নড়ো, পরের তিরদুটো তোমাদের বুকে ঢুকবে।’

সঙ্গে-সঙ্গেই সেই নির্দেশ মান্য করলাম। তবে তার মধ্যেই কালোমানিক ভয়ার্ত-গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘সুরোদাদু! আমি কুসুমকুঁয়া গ্রামের কালোমানিক। আপনার সঙ্গেই দেখা করতে এসেছি। আপনি দয়া করে তির-ধনুকটা সরিয়ে রাখুন।’

আমাদের পেছনদিক থেকে এক বৃদ্ধ আমাদের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন। বয়সের ভারে লম্বা শরীরটা সামান্য ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু চলাফেরা এখনো যথেষ্ট চটপটে। চোখের দৃষ্টি যে কতটা তীক্ষ্ণ তার পরিচয় তো একটু আগেই পেয়েছি, যখন সন্ধের অন্ধকারের মধ্যেও তিনি দুটো তিরকে নিখুঁত লক্ষ্যে গেঁথে দিয়েছিলেন।

আমাদের দুজনকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে বললেন, কিছুক্ষণ আগে থেকেই তোমাদের ওপরে নজর রাখছি। তবে দূর থেকে কালোমানিকের মুখটা চিনতে পারিনি। আর এই বাবুটির শহুরে পোশাক দেখে ভেবেছিলাম, চোরাশিকারি বুঝি। যদি তাই হতে, তাহলে আর তোমাদের বাঁচিয়ে রাখতাম না। মেরে এখানেই কোথাও গোর দিয়ে গ্রামে ফিরে যেতাম। যাই হোক, বলো দেখি কালোমানিক, আমার সঙ্গে তোমার এত কী জরুরি প্রয়োজন পড়ল?’

কালোমানিক আমাকে চোখের ইশারা করল। আমি প্রথমে নিজের পরিচয় আর কালোমানিকের সঙ্গে কীভাবে আমার আলাপ হয়েছিল, সেটা তাঁকে বললাম। তারপর পিঠের ব্যাগ থেকে সেই কঙ্কালটাকে আস্তে আস্তে তাঁর সামনে নামিয়ে রেখে বললাম, ‘সুরোদাদু। বলুন তো এই কঙ্কালটা কোথায় পেয়েছিলেন?’

তিনি কঙ্কালটার ওপরে ঝুঁকে পড়ে খুব মন দিয়ে ওটাকে দেখতে শুরু করলেন। তাঁর সুবিধে হবে বলে আমি সোলার লাইটটা জ্বেলে দিলাম।

বেশ কিছুক্ষণ ওটাকে খুঁটিয়ে দেখে তিনি মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। দেখলাম এর মধ্যেই তাঁর মুখটা কাগজের মতন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বুঝলাম, তিনি কালোমানিক নন। এর মধ্যেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন। বুঝে নিয়েছেন, এটা সত্যিকারেই একটা ছ-ইঞ্চি লম্বা পূর্ণবয়স্ক পুরুষমানুষের কঙ্কাল। যা সাধারণ বুদ্ধিতে অসম্ভব এবং অবিশ্বাস্য।

কিন্তু তারপরেই সুরোদাদু যা বললেন, তার জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না, কালোমানিকও নয়। তিনি বললেন, ‘এটা কোথা থেকে এসেছে আমি কেমন করে বলব বলো তো। আমি...আমি তো নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না।’

কালোমানিক এই কথা শুনে আঁতকে উঠল। বলল, ‘সুরোদাদু! তিন-বছর আগে আপনার ঘর থেকেই তো অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে এটা নিয়ে এসেছিলাম।’

‘অন্যান্য জিনিস মানে?’

‘মানে ওই ধনেশ পাখির ঠোঁট, সজারুর কাঁটা, বাঁদরের খুলি এইসব।’

‘তখন ওইসব জিনিসের মধ্যে তুমি এটা পেয়েছিলে? আমাকে তখনই বলোনি কেন?’ প্রশ্ন করলেন সুরোদাদু।

কালোমানিক বলল, ‘আমি কি জানতাম এটার মধ্যে কোনো বিশেষত্ব আছে। এখনো তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এটা দেখে তো বাঁদরের কঙ্কাল বলেই মনে হচ্ছে।’

সুরোদাদু বললেন, ‘বুঝতে পারছি। এই বাবুটিই তার মানে কঙ্কালটার বিশেষত্ব খেয়াল করেছেন। যাই হোক, বলছিস যখন আমার ঘর থেকেই পেয়েছিলিস, তখন আমাকে একটু ভাবতে দে।’

তিনি দু-চোখের ওপরে হাত চাপা দিয়ে একটা পাথরের ওপরে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লেন। আমি সেই সুযোগে কালোমানিককে কঙ্কালটা দেখিয়ে বুঝিয়ে বললাম কেন এটা আশ্চর্য, কেন এটা অলৌকিক। ও শুনে রীতিমতন ভয় পেয়ে গেল। বলল, ‘স্যার, এটাকে ফেলে দিন। ওই ঝোরার জলে ছুড়ে ফেলে দিন, প্লিজ। এটা ভূতুড়ে জিনিস। কাছে থাকলে আমাদের ক্ষতি হয়ে যাবে।’

আমি ওর পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ‘উল্টোটাই হবার সম্ভাবনা বেশি, কালোমানিক। একটা সাধারণ ফসিল খুঁজে পেয়ে কত মানুষ বিখ্যাত হয়ে গেছেন। তুমি যদি এই ছ-ইঞ্চি লম্বা মানুষের উৎস খুঁজে পাও তাহলে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা তোমাকে মাথায় তুলে নিয়ে নাচবেন। কারণ, তাহলে মানুষের অভিযোজনের ইতিহাসটাও আবার নতুন করে লিখতে হবে।’

কালোমানিক কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই সুরোদাদু হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসলেন। খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে কালোমানিকের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে বললেন, ‘একটু মনে করবার চেষ্টা কর তো ভাই, তুই আমার ঘরের যেখানে কঙ্কালটা পেয়েছিলিস, সেখানে আর কিছু ছিল?’

কালোমানিক অস্বস্তিতে পড়ল। বলল, ‘অনেকদিন আগের কথা তো। তবে আবছাভাবে যেন মনে পড়ছে এটার ঠিক পাশেই কাঠের তৈরি কিছু জামাকাপড়, গয়না, মুকুট এইসব পড়েছিল।’

সুরোদাদু খুব আগ্রহ নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে এলেন। ওর মুখের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘কী বললি? কাঠের তৈরি সাজ?’

‘হ্যাঁ, সুরোদাদু। এখন মনে পড়ছে, ওগুলোর গায়ে অসম্ভব সুন্দর কারুকার্য ছিল। আমি ওই কাঠের মুকুট, কাঠের জামা আর মুকুট সবই নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ব্যবসার কাজে লাগবে না বলে বাড়িতেই রেখে গিয়েছিলাম। সেটাই ভুল হয়েছিল। পরে আর খুঁজে পাইনি। হয়তো আমার কোনো বোন দুটোই খেলতে গিয়ে ওগুলোকে হারিয়ে ফেলেছিল।’

সুরোদাদু কালোমানিকের এই কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই কাঠের পুতুলের সাজ কোথায় পেয়েছিলাম সেটা তোমাদের দেখাতে পারি। কঙ্কালের কথা কিছু বলতে পারব না। চলো, দেখিয়ে দিচ্ছি।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এখন? এই অন্ধকারে?’

তিনি চারিদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওহো, তাই তো! অন্ধকার হয়ে গেছে দেখছি। আচ্ছা, তাহলে কাল সকালেই রওনা হওয়া যাবে। জায়গাটা এখান থেকে অনেকটাই দূরে। প্রথমে ঝোরার তীরধরে সাত-আট মাইল হাঁটতে হবে। তারপরে একটা হাজার ফুট গভীর খাদে নামতে হবে। সকালে বেরোলেও পৌঁছোতে বিকেল হয়ে যাবে।’

বললাম, ‘তাহলে আজ রাতটা আমরা এখানেই থেকে যাই?’

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, থাকতেই পারি। তবে জমিতে নয়, গাছের ওপরে। নীচে বড় শঙ্খচূড় সাপের উপদ্রব। মাথার ওপর দিয়ে পাখি উড়ে গেলে ওরা সেই পাখির ছায়াকে ছোবল মারে, এমন ওদের রাগ। আর বিষের কথা কী বলব। শঙ্খচূড়ের ছোবলে হাতিকে মরে যেতে তো আমি নিজের চোখেই দেখেছি।’

তাই হল। আমি আর কালোমানিক মাটির অনেক ওপরে হ্যামক টাঙিয়ে রাত কাটালাম। সুরোদাদু অবশ্য হ্যামকে শুতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন এতবছর ধরে যেমন উঁচু গাছের তেডালায় শুয়ে ঘুমিয়েছেন, তেমনই ঘুমোবেন।

অন্য দুজনের কতটা ঘুম হল জানি না। আমি প্রায় সারারাত জেগে নিশাচর পশু-পাখিদের অর্কেস্ট্রা শুনলাম। তারপর ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে আসতেই স্বপ্ন দেখলাম হ্যামকের দড়ির ওপর দিয়ে সার্কাসের খেলোয়াড়দের মতন ব্যালেন্স রেখে এগিয়ে আসছে সারি-সারি কঙ্কাল। চমকে জেগে উঠলাম। ইতিমধ্যে সূর্য উঠে গিয়েছিল। সুরোদাদু গাছের নীচে নেমে আমাদের তাড়া দিলেন, ‘চলো, চলো। আর দেরি করলে ওখানে পৌঁছোতে সন্ধে নেমে যাবে। তখন যেটা দেখাতে চাইছি, সেটা দেখাতে পারব না।’

আধঘণ্টা বাদে যখন ঝোরার তীর ধরে তাঁর পাশাপাশি হাঁটছি, তখন জিগ্যেস করলাম, ‘কোথায় যাচ্ছি সুরোদাদু? আর কী দেখাতে নিয়ে যাচ্ছেন?’

তিনি বললেন, ‘ভাই, জায়গাটার কোনো নাম তো নেই। আমার একটা গর্ব ছিল যে, এই পুরো হাতিবাড়ি জঙ্গলকে আমি হাতের তালুর মতন চিনি। সেই যে পনেরো-ষোলো বছর বয়সে বাবার সঙ্গে শিকার করতে এসে এই জঙ্গলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, তারপর থেকে গত পঞ্চাশ বছরে এই অরণ্যের প্রতিটি ইঞ্চি আমি পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখেছি। প্রতিটি ঋতুতে এখানে রাত কাটিয়েছি। এই বনের প্রত্যেকটা হাতির পাল আমাকে চেনে। আমার গায়ের গন্ধ পেলে দূর থেকে চিৎকার করে আমাকে জিগ্যেস করে, কী হে, কেমন আছ?

‘তবু সেই আমিই পাঁচবছর আগে এরকমই এক চৈত্রমাসের সন্ধেয় এমন এক জায়গায় গিয়ে পড়লাম, যে-জায়গায় আগে কখনো কেউ যায়নি।’

বললাম, ‘সেখানে কেমন করে পৌঁছোলেন আপনি?’

তিনি বললেন, ‘ইচ্ছে করে পৌঁছোইনি। একটা দুর্ঘটনা আমাকে ওখানে পৌঁছে দিয়েছিল। হয়েছিল কি, সেদিন একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। তাই খেয়াল করিনি ঝোপের মধ্যে একটা চিতাবাঘ বসে আছে। চিতাবাঘটা একলা থাকলে আমাকে কিছু বলত না নিশ্চয়ই, কারণ, আমি তো ওর শিকার নই। কিন্তু ওর সঙ্গে বাচ্চা ছিল। আর সঙ্গে বাচ্চা থাকলে যে-কোনো জন্তুই হিংস্র হয়ে ওঠে।

‘আমি বেখেয়ালে ঝোপটার কাছে গিয়ে পড়তেই চিতাটা ঝোপের ভেতর থেকে বিদ্যুতের মতন উড়ে এসে আমাকে অ্যাটাক করল। তখন নিজেকে বাঁচানোর দুটো রাস্তা ছিল আমার কাছে। হয় হাতের ছুরি দিয়ে ওটার পেট ফাঁসিয়ে দেওয়া আর নাহলে পেছনদিকে লাফ দিয়ে ওর আক্রমণটাকে এড়ানো। মারতে পারলাম না, কারণ ততক্ষণে আমি আড়চোখে ওর বাচ্চাগুলোকে দেখে নিয়েছি। মাকে মারলে বাচ্চাগুলোও বাঁচবে না। তাই আমি আর কিচ্ছু না দেখে পেছনে লাফ মারলাম আর গড়িয়ে পড়লাম হাজার ফুট গভীর খাদের মধ্যে।

‘বাঁচব বলে আশা করিনি, কিন্তু বেঁচে গেলাম।

‘তীব্রবেগে গড়িয়ে পড়ছিলাম। পাহাড়ের গায়ে সামান্য লতাপাতার আস্তরণ ছিল, কিন্তু ভালো করেই জানতাম ওই আস্তরণের নীচে রয়েছে অসংখ্য ধারালো আর শক্ত পাথর। কাজেই নিশ্চিত ছিলাম তারই মধ্যে কোনোটায় ঠুকে এক্ষুনি আমার মাথাটা দু-ফাঁক হয়ে যাবে। কিন্তু তা হল না। কেন হল না জানো? হল না, কারণ, ঠিক ওই জায়গাটাতে লতাপাতার নীচে ছিল মসৃণ এক পথ। সেই পথের ওপর দিয়ে গড়াতে-গড়াতে আমি পড়ছিলাম আর চেষ্টা করছিলাম দুহাতের কাছে যা পাই তাই আঁকড়ে ধরে পতনটাকে রুখতে।

‘প্রায় পাঁচশো ফুট ওইভাবে গড়িয়ে পড়ার পরে হাতের নাগালে একটা কিছু পেয়ে সেটা আঁকড়ে ধরে স্থির হলাম। চিৎ হয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলালাম। তারপর আস্তে আস্তে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের ডানহাতের মুঠোর দিকে তাকালাম। বুঝতে পারছিলাম, যে-জিনিসটা আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে সেটা কোনো গাছের ডাল কিংবা কিম্বা শেকড় নয়। তাহলে জিনিসটা কী, যেটা আঁকড়ে ধরে আমি পড়ে যাওয়া আটকালাম।

‘দেখলাম, একটা বড় লোহার কড়া। দেখে আমি যে কতটা অবাক হয়েছিলাম, তা তোমাদের বোঝাতে পারব না। কারণ, আমার কথা ছেড়েই দাও, আমার পূর্বপুরুষেরাও কখনো বলেননি যে, হাতিবাড়ি জঙ্গলের মধ্যে ওই-জায়গায় কোনোদিন মানুষের বসবাস ছিল। তাহলে এই জঙ্গলে ঢাকা রাস্তা, এই লোহার কড়ার মতন জিনিসটা—এসব এল কোথা থেকে?’

‘তারপর?’ আমি জিগ্যেস করলাম।

সুরোদাদু বললেন, ‘তারপর যা দেখলাম সেটাই দেখাবার জন্যে তোমাদের এখন সেখানে নিয়ে যাচ্ছি। এখন আর কথা বোলো না, কারণ, দেখতেই পাচ্ছ, আমাদের খাড়াই রাস্তা ধরে খাদের নীচে নামতে হবে। এখন অন্যমনস্ক হলে বিপদ।’

ওখান থেকেই ঝোরাটা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে খাদের দিকে নেমে গিয়েছিল। এতক্ষণের ধীরে বয়ে যাওয়া জলের ধারার চেহারাই গিয়েছিল বদলে। জলের স্রোত পাথরে-পাথরে ধাক্কা খেয়ে দুধের মতন সাদা ফেনা ছিটিয়ে, গর্জন করে নেমে যাচ্ছিল নীচে। মিথ্যে কথা বলব না, ঝোরার সেই চেহারা দেখে আমারও বুক কাঁপছিল। বুঝতে পারছিলাম, কোনোরকমে একবার ওই ঝোরায় পা পড়লে মৃত্যু অনিবার্য।

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘রাস্তা কই?’

তিনি বললেন, ‘আছে। এই ঝোরার পাশ দিয়েই রাস্তাটাও নীচে নেমে গেছে। ঘাসের নীচে চাপা পড়ে গেছে বলে দেখতে পাচ্ছ না। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। তোমরা আমার পেছন-পেছন এসো।’

এতক্ষণ কালোমানিক কোনো কথা বলেনি। এবার ও হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমি যাব না।’

সুরোদাদু বললেন, ‘সে কী! কেন?’

কালোমানিক বলল, ‘আমার তো আপনার বা নীলস্যারের মতন পাহাড় বেয়ে ওঠা-নামার অভ্যাস নেই। আমার ওই খাদের দিকে তাকালেই ভয় লাগছে। আপনারা ঘুরে আসুন, আমি এখানেই অপেক্ষা করছি।’

আমরা দুজনেই বুঝতে পারলাম, কালোমানিকের কথায় যুক্তি আছে। জঙ্গলের ছায়ায় সারা-বছর যে-রাস্তা ঢাকা পড়ে থাকে, যে রাস্তার ওপর দিয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে যায়, সে-রাস্তা যে কতটা পেছল হতে পারে তা আমরা জানি। তার ওপরে এখানে রাস্তাটা নেমে গেছে প্রায় পঁয়তাল্লিশ-ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে। যাদের অভ্যাস নেই তাদের এই-রাস্তায় না যাওয়াই ভালো।

সুরোদাদু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললেন, ‘বেশ, তুই তাহলে এখানেই থাক। সবথেকে ভালো হয় যদি ওই পাকুড়গাছটার ওপরে উঠে বসে থাকিস। তাহলে হট করে চিতা বা ভালুক-টালুক চলে এলেও চিন্তার কিছু থাকবে না।’

কালোমানিক তাই শুনে বিশাল পাকুড়-গাছটার ওপরে উঠে গেল। আমার ব্যাক-প্যাক, সুরোদাদুর কাঁধের ঝুলি সব ওর জিম্মায় দিয়ে দিলাম। আমার কাছে রইল শুধু আমার টর্চ, জলের বোতল এবং রিভলভার আর সুরোদাদুর পিঠে তাঁর চিরসঙ্গী তির-ধনুক।

আমি খুব সাবধানে সুরোদাদুর পেছন-পেছন ঘাসে ছাওয়া খাদের পাড়ের একটা জায়গায় পা দিলাম আর পা দিয়েই বুঝলাম, সুরোদাদু এতটুকুও ভুল বলেননি। আমার পায়ের নীচে একটা পাথরের চৌকোনা স্ল্যাব রয়েছে।

পুরো রাস্তাটাই ওরকম পাথরের স্ল্যাব দিয়ে বাঁধানো ছিল। নামতে-নামতে একটা সময় আর কৌতূহল সামলাতে না পেরে আমি হাঁটু গেঁড়ে বসে দু-হাত দিয়ে টেনে কিছুটা ঘাসের আস্তরণ ছিঁড়ে সরিয়ে দিলাম। যা দেখলাম তাতে আমার চোখ কপালে উঠে গেল।

ভেবেছিলাম, বহু পাহাড়ি-রাস্তাতেই লোকাল-লোকেরা যেভাবে যাহোক-তাহোক করে পাথরের টালি দিয়ে রাস্তা বাঁধিয়ে দেয়, এখানেও নিশ্চয়ই সেরকমই কিছু দেখব। কিন্তু না। দেখলাম নিখুঁত মাপে কাটা সমান মাপের সব টালি। শুধু তাই নয়। অবিকল আধুনিক ফুটপাথের টালির কায়দায় একটি টালির খাঁজে পাশের টালির কিছুটা ফালি ঢুকে গিয়ে একটার সঙ্গে আরেকটা টালিকে শক্ত করে আটকে রেখেছে।

অথচ সুরোদাদু বলছেন, তাঁর পূর্বপুরুষেরাও এখানে কোনো লোকালয়ের কথা জানতেন না। তার মানে বহুযুগ আগে এই রাস্তা নির্মিত হয়েছিল, হয়তো আদিবাসীরা এই বনে আসারও অনেক আগে। তাহলে তো আমাদের অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগের কথা ভাবতে হয়।

পাঁচহাজার বছর আগে এত নিখুঁত পাথরের কাজ!

আমি রিভলভারের বাটটা দিয়ে একটা টালির কোণে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করলাম। রিভলভারের বাটের সেই জায়গাটায় চলটা উঠে গেল, পাথরটা যেমনকার তেমনই রইল। সুরোদাদু এতক্ষণ চুপ করে আমার কাণ্ড-কারখানা দেখছিলেন। এবার গম্ভীর-গলায় বললেন, ‘আমিও চেষ্টা করে দেখেছিলাম, পারিনি। আরেকটা জিনিস দেখাই তোমাকে। এই নাও, এটা ধরো।’ এই বলে নিজের গলার বাঘনখের মালাটা খুলে আমার হাতে দিলেন।

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এটা নিয়ে কী করব?’

তিনি বললেন, ‘মালার মাঝখানে যে কালো-পাথরটা দেখছ, ওটা চুম্বক-পাথর। এই দেখো’ বলে নিজের ভোজালিটা কোমর থেকে খুলে পাথরটাতে ছোঁয়াতেই ভোজালিটা খট করে পাথরের গায়ে আটকে গেল।

বললাম, ‘হ্যাঁ। চুম্বকই তো দেখছি। তো?’

‘এবার ওটা রাস্তার ওই টালির গায়ে ছুঁইয়ে দেখো কী হয়।’

মালার চুম্বকটাকে আমি পাথরের কাছে নিয়ে যেতেই সেটা পাথরের গায়ে আটকে গেল। ছাড়াবার সময় বেশ জোর লাগাতে হল আমাকে।

উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, ‘কিছুই মাথায় ঢুকছে না। লোহার আকরিক আমি চিনি। এই পাথরগুলো মোটেই সেই হেমাটাইট নয়। এগুলোর রং তো সাদাটে আর হেমাটাইট হয় লাল। তাহলে চুম্বককে টানছে কেন?’

সুরোদাদু বললেন, ‘এই তো রহস্যের শুরু। যত নীচে নামবে, দেখবে পুরো জায়গাটা জুড়েই এরকম আরও অনেক রহস্য রয়েছে। সেইজন্যেই গত পাঁচবছরের মধ্যে নিজে এখানে কয়েকবার ঘুরে গেলেও, গ্রামের একটি লোককেও এই জায়গাটার কথা বলিনি। আমার তিনকুলে কেউ নেই। আমি মরে গেলেও কারোর ক্ষতি হবে না। কিন্তু আমার জন্যে অন্য কারুর ক্ষতি হোক, আমি চাই না।’

‘কে করবে ক্ষতি? কেউ কি এখানে আছে?’ আমি জিগ্যেস করলাম।

সুরোদাদু আমার এই প্রশ্নের উত্তরে একটা অদ্ভুত কথা বললেন। বললেন, ‘আমি চোখে কাউকে দেখিনি। কিন্তু এখানে এলেই আমার কেন জানি না মনে হয়, কারা যেন আমার দিকে নজর রাখছে। শুধু তাই নয়, ফিসফিস করে কারা যেন সারাক্ষণ বলে, ‘চলে যাও। চলে যাও এখান থেকে।’

আমি নীল চ্যাটার্জি। পৃথিবীর নির্জনতম জায়গায় বহু রাত একা কাটিয়েছি; এখনো কাটাই। বহু বীভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছি, একাই। কাজেই সুরোদাদুর এই-কথা শুনে আমার কোনো প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু হল। সত্যিই আমারও মনে হচ্ছেল, কারা যেন আমাদের দেখছে। কারা যেন ফিসফিস করে বলছে, ‘আর এগিও না, শান্তি নষ্ট কোরো না আমাদের।’

জোর করে মনের অস্বস্তিটা কাটিয়ে আবার নামতে শুরু করলাম। যতই সাবধানে যাই, রাস্তাটা তো আসলে ঢালু, তাই নীচে নেমে যেতে খুব বেশি সময় লাগল না। বড়জোর এক-ঘণ্টার মধ্যে সুরোদাদু আর তার পেছন-পেছন আমি খাদের নীচের মাটিতে পা রাখলাম। তারপর আমি বেকুবের মতন চারিদিকে তাকালাম।

জায়গাটার মধ্যে কোনো অসাধারণত্ব খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলেই আমি বেকুব হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা একফালি সরু জমির ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আমাদের ঠিক উল্টোদিকেই উঠে গেছে আরেকটা টিলা, যেটার উচ্চতাও ওই তিন-হাজার ফুট মতন হবে। আমাদের পেছনে ছোটখাটো একটা জলপ্রপাতের মতন নেমে এসেছে সেই ঝোরাটা; তারপর আমাদের সামনে দিয়ে বয়ে গেছে পশ্চিমদিকে। তাছাড়া আর সবটাই জঙ্গল, শুধুই জঙ্গল। যেরকম জঙ্গল খাদের ওপরেও দেখে এসেছি।

জায়গাটার মধ্যে বিশেষত্ব যদি কিছু থাকে, তা হল নিস্তব্ধতা। একটা মাছি ওড়ার শব্দও কোথাও পাওয়া যাচ্ছিল না। খেয়াল করে বুঝলাম, এখানে কোনো প্রাণী নেই। কোনো পাখিও না। কিন্তু সেটা খুব বড় ব্যাপার নয়।

সুরোদাদুকে সেটাই জিগ্যেস করলাম। বললাম, ‘কী জন্যে এখানে নিয়ে এলেন সুরোদাদু? ওই কঙ্কালটার সঙ্গে জায়গাটার কী সম্পর্ক? আপনি কীসব যেন কাঠের জামাকাপড়, গয়না, মুকুট এইসবের কথা বলছিলেন। সেগুলোই বা কোথায়?’

সুরোদাদু বললেন, ‘দেখাচ্ছি। তার আগে একবার তোমার ঘড়িটা দেখো তো।’

‘কেন? সেখানে যাওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়-টময় আছে নাকি?’ হালকাচালে কথাগুলো বলে আমি শার্টের স্লিভটা গুটিয়ে রিস্টওয়াচের দিকে তাকালাম এবং তাকিয়েই রইলাম। ঘড়ির কাঁটাগুলো বনবন করে ঘুরে যাচ্ছিল এবং তিনটে কাঁটাই ঘুরছিল উল্টোদিকে।

‘উল্টোদিকে ঘুরছে কী?’ সুরোদাদু বললেন।

আমি ঘাড় নেড়ে জানালাম, হ্যাঁ।

‘বলেছিলাম না তোমাকে, এখানে অনেক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে। যাই হোক, চলো, যেটা তোমাকে দেখাতে এনেছি সেটা দেখিয়ে আনি। আজ যেন জায়গাটা একটু বেশিই নিস্তব্ধ লাগছে। ভালো লাগছে না এখানে দাঁড়াতে।’

নিজের মনেই কীসব বিড়বিড় করতে-করতে সুরোদাদু সোজা সেই জলপ্রপাতের ধারা ভেদ করে ওদিকে চলে গেলেন। জলের পর্দা তাঁকে আমার চোখ থেকে আড়াল করে দিল। অগত্যা আমিও সেই জলের পর্দা ভেদ করে ওদিকে গেলাম, যদিও ব্যাপার-স্যাপার কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

ওদিকে গিয়েই বুঝতে পারলাম প্রপাতের আড়ালে একটা বড় গুহার মুখ রয়েছে। সেই গুহামুখেই দাঁড়িয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন সুরোদাদু। আমি তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বললেন, ‘চলো! এই গুহা ধরে কিছুটা যেতে হবে।’

আমি বললাম, ‘একমিনিট দাঁড়ান। টর্চটা জ্বালি। গুহার ভেতরটা খুব অন্ধকার।’

সুরোদাদু বললেন, ‘চেষ্টা কোরো না। টর্চ জ্বলবে না। আমি দেখেছি, খাদের নীচে এই পুরো অঞ্চলটায় মানুষের তৈরি-করা কোনো যন্ত্রই কাজ করে না।’

আমি টর্চটা জ্বালাবার বহু চেষ্টা করলাম। সত্যিই জ্বলল না।

সুরোদাদু কিছুক্ষণ আমার পণ্ডশ্রম দেখলেন। তারপর বললেন, ‘আমি নিশ্চিত, তোমার রিভলভারটাও এখানে কাজ করবে না। তবে আমার তির-ধনুক কাজ করবে। অবশ্য চাইব যাতে সেরকম পরিস্থিতি না আসে।’

আমরা দুজন ওই আবছা অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই হাঁটতে শুরু করলাম। গুহার ভেতরটা শুধু যে অন্ধকার তাই নয়, বেশ স্যাঁতসেঁতে। ছাদ থেকে, দেয়াল থেকে অবিরাম জল চুইয়ে পড়ছিল। অবশ্য আমরা তো ইতিমধ্যেই জলপ্রপাত পেরিয়ে আসার সময় আপাদমস্তক ভিজে চুপ্পুর হয়ে গিয়েছিলাম। তবু ব্যাপারটা অস্বস্তিকর।

আরও অস্বস্তিকর গুহার ভেতরের ভ্যাপসা গন্ধটা। পাথুরে ছাদটা এতই নীচু যে, আমাদের প্রায়ই গুড়ি মেরে হাঁটতে হচ্ছিল। তবে বেশিক্ষণ নয়। হঠাৎই সরু গুহাটা দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে এবং উচ্চতায় বিশাল হয়ে উঠল। চারদিকে তাকিয়ে বুঝলাম, ওই হলঘরের মতন জায়গাটাতেই গুহাটা শেষ হয়েছে। চারিদিকে পাথুরে দেয়াল; কোনোদিকে আর এগোবার জায়গা নেই।

এই জায়গাটায় মেঝে, দেয়াল সব খটখটে শুকনো। কোথাও জল চোঁয়াচ্ছিল না। আরও আশ্চর্য ব্যাপার, গুহার এই শেষ-প্রান্তে অন্ধকারও অনেকটাই হালকা লাগছিল; যদিও যুক্তি বলে এখানেই অন্ধকার সবচেয়ে গাঢ় হওয়া উচিত ছিল। মনে হচ্ছিল এখানে দেয়ালের কিছু পাথর স্বয়ংপ্রভ। তারা ফসফরাসের মতন নিজেরাই খুব মৃদু, হালকা-সবুজ একটা আলো বিকীরণ করছে। সেই আলোতেই দেখলাম, হলঘরের মতন জায়গাটার ঠিক মাঝখানে একটা মন্দির দাঁড়িয়ে রয়েছে।

সুরোদাদুও তন্ময় হয়ে ওই মন্দিরের দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি তাঁকে জিগ্যেস করলাম, ‘কার মন্দির, সুরোদাদু?’

তিনি ওদিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই উত্তর দিলেন, ‘জানি না ভাই। এমনকি এটাও জানি না যে, ওটা সত্যিকারেই মন্দির কিনা।’

তিনি কথাটা খুব একটা ভুল বলেননি। যেটাকে মন্দির বলছি, সেটার শেপ ঠিক একটা পেনসিলের মতন। গোল একটা টাওয়ার মাটি থেকে প্রায় কুড়ি-ফুট সোজা উঠে গেছে। তারপর হঠাৎই সরু হয়ে একটা বিন্দুতে গিয়ে মিলেছে। এরকম গঠনের কোনো মন্দির আমি আগে কোথাও দেখিনি। তবু মন্দির ছাড়া এটা আর কী হতে পারে?

সুরোদাদুকে আবার প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি কি এখানেই কঙ্কালটা পেয়েছিলেন?’

তিনি একটু অধৈর্য-সুরে বললেন, ‘না। তোমাকে বললাম তো, কঙ্কাল আমি পাইনি। আমি দেখেছিলাম ক’টা কাঠের পুতুল, যার মধ্যে একটা সেই প্রথমবারেই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। এখনো নিশ্চয় সেগুলো আছে। চলো দেখাচ্ছি।’

এই বলে সুরোদাদু ওই মন্দিরটার দিকে এগিয়ে গেলেন। আমিও তাঁর সঙ্গে গেলাম। কিন্তু তারপরে আর কী করব বুঝতে পারছিলাম না, কারণ, প্রায় আট-ফুট ব্যাসের বাড়িটার চারিদিকে একটা চক্কর দিয়ে আমি না পেলাম কোনো দরজা, না দেখলাম কোনো জানলা। যেন সলিড একটা পিলার। হাত দিয়েই বুঝলাম, পিলারটা তৈরি হয়েছে এখানে আসার পথে যে টালিগুলো দেখেছিলাম তাদের মতন একই মেটিরিয়ালে।

সুরোদাদুকে সবে জিগ্যেস করতে যাচ্ছিলাম, ‘ঢুকব কোথা দিয়ে?’ তার আগেই দেখি তিনি একটা অদ্ভুত কাণ্ড শুরু করেছেন। আমি খেয়াল করিনি। মন্দিরটার দেয়ালের একদিকে সারি দিয়ে নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত খাঁজ কাটা ছিল। তিনি তরতর করে সেই খাঁজগুলোর মধ্যে পা রেখে ওপরে উঠতে শুরু করেছেন।

মুহূর্তের মধ্যে চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়ে তিনি এক-জায়গায় দাঁড়ালেন। নীচ থেকে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তিনি ঠিক কোথায় পা রেখে দাঁড়ালেন তবে যেভাবে একটা হাত মন্দিরের দেয়াল থেকে সরিয়ে, সেই-হাতের ইশারায় আমাকেও ওপরে উঠে আসতে বললেন, তাতে বুঝলাম জায়গাটা দুজন মানুষের পক্ষেও যথেষ্ট। তাই আর দেরি না করে আমিও উঠে গেলাম এবং দেখলাম, ওখানে মন্দিরের দেয়াল ঘিরে একটা দু-ফুট চওড়া কার্নিশের মতন অংশ বেরিয়ে রয়েছে।

আমি কার্নিশে পা রেখে সুরোদাদুর পাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমাকে ইশারায় চূড়ার পেন্সিলের ডগার মতন সরু জায়গাটার দিকে দেখালেন। নীচ থেকে বোঝা যাচ্ছিল না, ওই অংশটা কাচের মতন স্বচ্ছ। তার মধ্যে দিয়ে দেখলাম, ঠিক ওই ঢাকনাটার নীচে দেয়াল ঘেঁষে গোল হয়ে বসে আছে পাঁচটা কাঠের পুতুল। প্রতিটি পুতুল ছ-ইঞ্চি মতন লম্বা। তাদের গায়ে কারুকার্য করা লম্বা ঝুলের পাঞ্জাবির মতন পোশাক। মাথায় মুকুট। বাহুতে আর গলায় অদ্ভুত দেখতে কিছু গয়না। দেখে মনে হচ্ছিল মেটিরিয়ালটা কাঠ। তবে অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কাঠ অতদিন টেঁকে না।

সুরোদাদু বললেন, ‘প্রথম যখন দেখেছিলাম, তখন ওখানে সাতটা পুতুল ছিল। আমি লোভ সামলাতে না পেরে এই ঢাকনার ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে একটা পুতুল তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম।’

আমি বললাম, ‘একটা? না দুটো?’

‘একটাই।’

‘তাহলে এখন পাঁচটা পুতুল রয়েছে কেন? আর কেউ তো এই মন্দিরের কথা জানে না। ছ-নম্বর পুতুলটা কোথায় গেল?’

বলতে-বলতেই মাথা উঁচু করে গুহার ওই জায়গার ছাদটার দিকে তাকালাম এবং মুহূর্তের মধ্যে আমি সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলাম। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, ‘সুরোদাদু! নামুন, জলদি নামুন! আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে। এক্ষুনি।’

আমার বলার ভঙ্গিতে নিশ্চয় এমন কিছু ছিল যার জন্যে সুরোদাদু আর কোনো প্রশ্ন না করে দেয়ালের খাঁজে পা রেখে নীচে নেমে গেলেন। পেছন-পেছন আমি। তারপর আর পেছন দিকে না তাকিয়ে আমরা যে-পথে এই গুহায় এসেছিলাম, সেই-পথ ধরেই দৌড়লাম সেই জলপ্রপাতের দিকে। একটুও না থেমে জলপ্রপাত পার হয়ে পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উঠতে শুরু করলাম।

কাজটা সহজ ছিল না, কারণ, আগেই বলেছি রাস্তাটার ঢাল প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি। তার ওপরে প্রচণ্ড পেছল। মসৃণ টালির বুকে হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরার মতন কোনো গ্রিপও পাচ্ছিলাম না। আমার দম শেষ হয়ে যাচ্ছিল ওপরে উঠতে। বয়সের কারণে সুরোদাদুর কষ্ট যে আরও বেশি হচ্ছিল সেটাও বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু আমার থামার উপায় ছিল না। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম, কালোমানিক এই-মুহূর্তে প্রচণ্ড বিপদের মুখে পড়েছে। এমনকী ওর মৃত্যুও ঘটতে পারে।

প্রায় দেড়-ঘণ্টার আপ্রাণ চেষ্টায় আমরা খাদের মাথার কাছে পৌঁছে গেলাম। এবার আমাদের আলোর প্রয়োজন, কারণ, আলো ছাড়া জঙ্গলে চলতে পারব না। আমি একবার থেমে, ব্যাকপ্যাক থেকে টর্চলাইটটা বার করে, বোতাম টিপলাম। আমি দেখতে চাইছিলাম, টর্চটা কাজ করছে কিনা।

হ্যাঁ, কাজ করছে। জোরালো আলোর বিম গিয়ে পড়ল ঠিক আমার পায়ের নীচের রাস্তাটায় আর তখনই আমি এবং সুরোদাদু সেই দৃশ্যটা দেখলাম, যার মতন আতঙ্কজনক দৃশ্য আমরা কেউই আগে দেখিনি। আমার পায়ের নীচে ছিল সেই পাথরের ব্লকটা, নামার সময় যেটার ওপর থেকে আমি নিজের হাতে ঘাস আর লতাপাতা পরিষ্কার করে গিয়েছিলাম। তখন ব্লকটা ছিল পরিষ্কার। এখন সেটার ওপরে কয়েকটা কাদা মাখা পায়ের ছাপ। ছাপগুলো আমাদের পায়ের নয়।

পৃথিবীর কোনো মানুষের পায়ের ছাপই নয়।

কারণ, এক-একটা পায়ের ছাপের মাপ একটা কুমড়োর বীজের চেয়ে বড় নয়। অথচ প্রতিটি ছাপের মধ্যে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে বুড়ো আঙুল থেকে কড়ে-আঙুল পর্যন্ত পাঁচটা আঙুল। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর পায়ের আঙুল অমন গায়ে-গায়ে সাজানো থাকে না।

সুরোদাদু ভয়ার্ত-মুখে আমার হাতটা আঁকড়ে ধরে ফিসফিস করে বললেন, ‘এরা কারা নীল? কাঠের পোশাকের আড়ালে এরা কারা?’

আমি বললাম, ‘অন্য গ্রহের প্রাণী। বাকি যা বুঝেছি পরে বলব। এখন শুধু এটুকুই বলছি, এই পায়ের ছাপ সেই ছ-নম্বর পুতুলের, যাকে আমরা একটু আগে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আর সে আমাদের আগে-আগে যাচ্ছে, পাঁচ-নম্বরের কঙ্কাল ফিরিয়ে আনতে। যে-কঙ্কালটা রয়েছে কালোমানিকের কাছে।

জঙ্গলের রাস্তায় উঠেই আমি আর সুরোদাদু ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োলাম সেই পাকুড়গাছটার দিকে, যেটার ওপরে কালোমানিক আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু গাছটার কাছে পৌঁছেই আমরা দুজনেই স্থির হয়ে গেলাম। আমাদের দুজনেরই মনে হয়েছিল আমরা বড্ড দেরি করে ফেলেছি। আর বোধহয় কিছু করার নেই। টর্চের আলোয় দেখতে পাচ্ছিলাম, গাছের নীচে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে কালোমানিক। হাতদুটো দু-পাশে ছড়ানো। চোখ বন্ধ। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে।

তবু কোনোরকমে জড়তা কাটিয়ে ওর পাশে গিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসলাম। নাকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে সুরোদাদুর দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘বেঁচে আছে, সুরোদাদু! নিশ্বাস পড়ছে।’

হ্যাঁ। বেঁচেই ছিল কালোমানিক, শুধু অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিতেই ওর জ্ঞান ফিরে এল। কিন্তু তারপর আর বিশেষ কিছুই বলতে পারল না। ওর শুধু মনে আছে, অন্ধকারের মধ্যে ও ওর পাশের ডালটায় একটা খসখস শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছিল, ডালটা থেকে ছ-ইঞ্চি ওপরে দুটো সবুজ চোখ জ্বলছে। ও ভেবেছিল বুনো-বেড়াল কিংবা ভামের মতন কোনো ছোটখাটো জন্তুটন্তু হবে। সেটাকে তাড়িয়ে দেবার জন্যে হাতটা তুলতেই একটা ইলেকট্রিক-শকের মতন ঝটকা ওই সবুজ চোখদুটো থেকে বেরিয়ে এসে ওকে অজ্ঞান করে ফেলে দেয়। আর কিছু ওর মনে নেই।

কালোমানিক যেখানে শুয়েছিল, তার ঠিক পাশেই পড়েছিল আমার ব্যাকপ্যাকটা। মুখের চেনটা খোলা। আর সমস্ত জিনিস ঠিকঠাকই ছিল। ছিল না শুধু সেই ছ-ইঞ্চি মানুষের কঙ্কালটা।

এই ঘটনার পর আমরা আর-এক মুহূর্তও ওখানে থাকার সাহস পাইনি। সন্ধের অন্ধকারের মধ্যেই আমি, সুরোদাদু আর কালোমানিক হাঁটা লাগিয়েছিলাম কুসুমকুঁয়া গ্রামের দিকে। যেতে-যেতে ওদের বলেছিলাম আমার ধারণার কথা।

বলেছিলাম, ওই মন্দিরের ঠিক ওপরে গুহার ছাদের দিকে তাকিয়ে আমি দেখতে পেয়েছিলাম, পাহাড়ের গায়ে একটা বিশাল ধসের চিহ্ন। পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম, একসময়ে ওখানে ছিল বিশাল এক গহ্বর। কিন্তু ওই ধসের সঙ্গে অজস্র পাথর নেমে এসে সেই গহ্বরটাকে চিরকালের মতন বন্ধ করে দিয়েছে।

সেই সঙ্গেই বন্ধ করে দিয়েছে অন্য গ্রহের সাতটি প্রাণীর ফেরার পথ।

কালোমানিক আর সুরোদাদু একসঙ্গে প্রশ্ন করলেন, ‘ফেরার পথ মানে? গর্ত থাকলেই ফিরতে পারত? কীসে করে ফিরবে?’

বললাম, ‘কেন? রকেটে করে। কালোমানিক তো দেখোনি, কিন্তু সুরোদাদু, আপনি তো সেই রকেটটা দেখেছেন। যেটাকে আপনি মন্দির বলছিলেন, পেন্সিলের মতন ওই স্ট্রাকচারটাই তো ওদের রকেট। ওটাকে ওরা পাহাড়ের গায়ের ওই গর্তের ভেতর দিয়ে গুহার ভেতরে ল্যান্ড করিয়েছিল—সে কত হাজার বছর আগে তা জানি না। কিন্তু জায়গাটা বেছে ছিল চমৎকার। একদম প্রকৃতির নিজের হাতে বানানো লঞ্চিং-প্যাড।

‘ওরা নিশ্চয় খুব বেশিদিন পৃথিবীতে থাকত না। কিন্তু হঠাৎই ধস নেমে ওদের ফেরার পথ বন্ধ হয়ে গেল।

‘ওদের আয়ু কতদিন তাও জানি না, তবে মনে হয় পৃথিবীর হিসেবে পাঁচ হাজার বছরের কম হবে না। তাই গত পাঁচ হাজার বছর ধরে ওরা ওই গুহার মধ্যেই থেকে গেছে। থাকতে বাধ্যই হয়েছে বলা ভালো, কারণ ইতিমধ্যে হাতিবাড়ির জঙ্গলেও মানুষের বসবাস শুরু হয়েছে। বেরোলেই তো মানুষের চোখে পড়ে যাবে।

‘তবুও ওরা মানুষের চোখ এড়াতে পারল না। সুরোদাদুর মতন মানুষ তো খুব কমই আছেন। সুরোদাদুই একদিন হঠাৎ করে গিয়ে হাজির হলেন ওই গুহায়। ওদের রকেটটাকে ভাবলেন মন্দির। ওদের নভোচরের পোশাক পরা শরীরগুলোকে ভাবলেন মন্দিরের মূর্তি। আর ওরকম একটা মূর্তিকে নিয়ে চলে এলেন নিজের ঘরে।’

সুরোদাদু এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতন আমার কথা শুনছিলেন। এবার প্রশ্ন করলেন, ‘আমি তাকে ঘরে নিয়ে আসার আগেই কি সেই প্রাণীটি মারা গিয়েছিল?’

বললাম, ‘নিশ্চয়ই তাই। নভোচরের পোশাকের মধ্যে ছিল শুধুই অন্য গ্রহের প্রাণীটির ছোট্ট কঙ্কাল। একদিন কোনোভাবে সেই পোশাক খুলে পড়েছিল। আপনি খেয়াল করেননি। কালোমানিক তুলে এনেছিল কঙ্কাল আর তার পোশাক। ওগুলো যে একদিন একসঙ্গেই ছিল সেটা ও বুঝতে পারেনি।’

‘তারপর?’ কালোমানিক জিগ্যেস করল।

বললাম, ‘ওই সাতজন নভোচরের মধ্যে একজন তো মারা গেছেই। সম্ভবত বাকিরাও সবাই জীবিত নেই। ছ-জনের মধ্যে দুজন, তিনজন কিংবা চারজনই ইতিমধ্যে মারা গিয়েছে। ন্যাচারাল-ডেথ। পাঁচ হাজার বছরের আয়ুও তো একদিন ফুরোয়। কাজেই ওরাও মারা যাচ্ছে।

‘সে যাই হোক। অন্তত একজন যে এখনো জীবিত আছে, সেকথা নিশ্চিত। সেই একজনই আজ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিল তার সহযাত্রীর দেহের অবশেষ। কালোমানিকের কাছ থেকে সে তার বন্ধুর কঙ্কাল ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে তাদের মহাকাশযানে। এই পৃথিবীতে একমাত্র যে জায়গাটুকু তাদের আপন, যে জায়গাটুকুতে এখনো তাদের ফেলে আসা মাতৃভূমির গন্ধ আর স্পর্শ লেগে আছে, সেইখানে। মৃতুর পরেও ওরা সাতজন একসঙ্গে ওই মহাকাশযানের ককপিটেই পাশাপাশি বসে থাকতে চায়।

‘হয়তো এখনই যদি আমরা আবার ওই গুহায় ফিরে যাই, যদি ককপিটের স্বচ্ছ ঢাকনাটা খুলে ভেতরে উঁকি মারি, দেখব যে ওরা সাতজনেই পাশাপাশি বসে আছে। তাদের মধ্যে আজ ঠিক কজন মৃত আর ক’জন জীবিত, আমরা জানতেও পারব না।’

সুরোদাদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ওদের এই ইচ্ছেটাকে আমি সম্মান করি। যতদিন বেঁচে আছি, ওই গুহার দিকে আমি আর পা ফেলব না। আর কাউকে বলবও না ওই গুহার কথা।’

কালোমানিক নিজের মনে বলল, ‘কেমন করে ভুলব, যে আজ বন্ধুর মৃতদেহ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিল সে অনায়াসে আমাকে খুন করতে পারত, কিন্তু করেনি। তার মানে ওরা উচ্চস্তরের জীব। এই সম্মান ওদের প্রাপ্য।’

আমি বললাম, ‘সাতটি দুঃখী জীবের স্মরণে আমিও আর এদিকে পা ফেলব না, কথা দিলাম। এই গল্প এখানেই শেষ হোক।’

অধ্যায় ৭ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%