পাঁচ-নম্বর স্পেশিমেন

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক

এক সপ্তাহ আগে যখন এই রুইং গ্রাম থেকে নন্দাদেবী স্যাংচুয়ারির দিকে ট্রেকিং শুরু করেছিলাম, তখন ভাবতেও পারিনি পরের কয়েকটা দিনে আমাকে এমন এক আশ্চর্য, অবিশ্বাস্য এবং বীভৎস ঘটনার সাক্ষী হতে হবে।

সাতদিনের ট্রেকিং শেষ করে আজ আবার সেই রুইং গ্রামেই ফিরে এসেছি। দাঁড়াইনি সেখানে। কী জন্যে দাঁড়াব? গ্রামে মানুষ তো দূরের কথা, একটা কুকুর পর্যন্ত যে নেই, সে তো যাবার পথেই দেখে গেছি। তাই নেমে এসেছি সেই পাহাড়ি গ্রামের পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে চলা ঋষিগঙ্গার তীরে। পিঠের রুকস্যাক আর কাঁধের ক্যামেরাব্যাগ নামিয়ে রেখে, একটা চ্যাটালো পাথরের ওপর পা ছড়িয়ে বসেছি।

একটু দূরে বদ্রিনাথজি রিভার-বেডের নুড়িপাথরের ওপরেই একটা প্লাস্টিকের শিট বিছিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। মাথার কাছে তাঁর নিজের আর করণজিতের হ্যাভারস্যাক। চোখের ওপরে একটা হাত ভাঁজ করে রাখা। আমি জানি, তিনি ঘুমোচ্ছেন না। এতক্ষণে একটু অবসর পেয়ে তিনিও আমারই মতন মনে-মনে সাজিয়ে নিচ্ছেন গত কয়েকটা ঝোড়ো দিনরাতের কথা।

করণজিৎ কোথায়? ওই তো, ব্রিজের মাঝখানে রেলিং-এর ওপরে দু-হাত রেখে, পায়ের নিচ দিয়ে ছুটে চলা ঋষিগঙ্গার দুরন্ত স্রোতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। জলপাই-সবুজ রং-করা লোহার মিলিটারি-ব্রিজ। ব্রিজ পেরোলে চওড়া পিচরাস্তা, যে-রাস্তার নির্মাণকাজ এখনো অর্ধেকও শেষ হয়নি। শেষ হলে ওই রাস্তা ধরেই ভারতের মিলিটারি কনভয় পৌঁছে যাবে চিনের সীমান্তে।

আপাতত যোশিমঠ থেকে রুইং গ্রামে যাবার এই পাহাড়ি পায়ে চলা পথের মুখ পর্যন্তই এসে পৌঁছেছে এই রাস্তা।

একটু বাদে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে যোশিমঠ থেকে সুন্দর সিং-এর ল্যান্ডরোভার এসে ব্রিজের ওপারে দাঁড়াবে। আমরা ব্রিজ পেরিয়ে গাড়িতে উঠব—ফিরে যাব যোশিমঠে। সেখান থেকে বদ্রিনাথজি আর করণ দেরাদুনে চলে যাবে আর আমি হরিদ্বার হয়ে ফিরে যাব কলকাতায়। পেছনে পড়ে থাকবে দেবভূমি গাড়োয়ালের সোনারুপোয় মোড়া তুষারশৃঙ্গ, সবুজ মখমলের মতন তৃণভূমি আর পাইনের বন।

যদি আবার কোনোদিন ফিরে আসি, আসব তো নিশ্চয়ই, তাহলে এদের সঙ্গে আবার দেখা হবে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ওই বরফের পাহাড়, তৃণভূমি আর অরণ্য একই রকম থেকে গেছে; আরও কয়েক লক্ষ বছরেও নিশ্চয় তাদের বদল হবে না। কিন্তু আমি জানি, মানুষগুলোকে আর দেখতে পাব না।

মানুষ বদলে যায়। মানুষ চলে যায় এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এটা সেই বদলে যাওয়ারই গল্প। লিখে রাখছি আমার স্ক্র্যাপবুকে।

সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। আমার পেছনদিক থেকে পাহাড়ের ছায়া দ্রুত নেমে আসছে নদীর তীরে। এতক্ষণ যে দুটো রেডস্টার্ট পাখি এক বোল্ডার থেকে আরেক বোল্ডারে লাফ দিয়ে পোকামাকড় ধরছিল, তারা শেষবারের মতন চিরিইইক-চিরিইইক আওয়াজ ছেড়ে নদীর ওপারের রডোডেনড্রন বনের দিকে রাতের আশ্রয় নিতে চলে গেল। এখন এই বিস্তীর্ণ রিভার-বেডের ওপর আমরা তিনজন ছাড়া আর কোনো জনপ্রাণী নেই।

এই কাহিনির সূত্রপাত হয়েছিল অবশ্য আরও কয়েকদিন আগে, আমার বন্ধু রণজিতের দেরাদুনের বাংলোয়।

আমেরিকার একটা নামজাদা নেচার ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে হিমালয়ান র‌্যাপটরসদের ওপরে একটা ফটো ফিচার লেখার অনুরোধ এসেছিল। ঈগল, চিল, বাজ—এইসব শিকারি পাখিদের একসঙ্গে বলা হয় র‌্যাপটরস। বার্ড ফোটোগ্রাফির দুনিয়ায় এই র‌্যাপটরসদের ছবি তোলাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। কারণ, মাটির কাছাকাছি এদের দেখতে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ওরা বেশিরভাগ সময়েই উড়ে বেড়ায় লেন্সের নাগালের বাইরে, অনেক উঁচুতে।

তবু প্রায় দিন পনেরোর পরিশ্রমে খুব ভালো কিছু ছবি তুলতে পেরেছিলাম। মনটা খুশি ছিল কিন্তু শরীর চাইছিল একটু বিশ্রাম। তাই দেরাদুনে নেমে এসে আমার স্কুলের বন্ধু রণজিৎকে ফোন করলাম। ক্যাপ্টেন রণজিৎ মিত্র। বছর তিনেক হল ও দেরাদুনের মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টেই পোস্টেড। অনেকবার আমাকে বলেছে, ‘তুই তো প্রায়ই এদিকে আসিস নীল। একবার আমার এখানে ঘুরে যাস।’

নানান ব্যস্ততায় যাওয়া হয়নি।

এবার আমার ফোন পেয়ে, রনো নিজেই জিপ হাঁকিয়ে বাসস্ট্যান্ডে চলে এল। ওর হাবভাব দেখে মনে হল, পারলে আমাকে মাথায় করেই নিয়ে যায়। নেহাত সেটা বাজে দেখায় বলে আমার ক্যামেরাব্যাগ আর অন্যান্য গিয়ারস জিপের পেছনের সিটে ডাম্প করে, আমার হাতের নড়া ধরে টেনে বসাল সামনের সিটে, নিজের পাশে। তারপরে ওর কোয়ার্টার পর্যন্ত বাকি রাস্তাটা অনর্গল বকবক করতে করতে ড্রাইভ করল।

সেটা কিছু আশ্চর্য নয়; তিন বছর দেখা না হলে দু’জন বন্ধুর মধ্যে অনেক কথাই জমে থাকে।

সেদিনটা দু’বন্ধু মিলে আমাদের ছোটবেলার স্মৃতির সিন্দুক তোলপাড় করেই কাটালাম। পরের দিন বিকেলের দিকে রনো বলল, ‘বুঝলি নীল, এক ভদ্রলোক তোর সঙ্গে আলাপ করতে চাইছেন। তাঁকে একটু বাদে আসতে বলেছি।’

আমি বললাম, ‘সেকি রে! বছরের মধ্যে ন’মাস বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াই। মানুষের চেয়ে হাতির ভাষা ভালো বুঝি। আমার সমস্ত শার্টে ঘামের গন্ধ, সমস্ত কার্গো প্যান্টের পেছনে ধুলোবালির দাগ। আমার সঙ্গে আলাপ করতে চান এমন ভদ্রলোকও আছেন নাকি?’

রনো তাই শুনে বলল, ‘আরে, শুক্লাজিও তোর মতনই বনে-জঙ্গলে ঘোরা মানুষ। তবে তিনি তোর মতন ‘নেচার লাভার’ নন। ব্যবসায়ী।’

প্রশ্ন করলাম, ‘কীসের ব্যবসা?’

রনো উত্তর দিল, ‘জড়িবুটির। ইংরিজিতে যাদের বলে “মেডিসিনাল হার্বস”। হিমালয়ের বনে-প্রান্তরে নানারকমের ভেষজ গাছগাছড়া পাওয়া যায় জানিস নিশ্চয়। নানান রোগের ওষুধ হিসেবে পুরাকাল থেকেই সেইসব গাছগাছড়ার হেভি ডিমান্ড। তিনি লোকাল লোকেদের দিয়ে সেইসব জড়িবুটি কালেক্ট করিয়ে এক্সপোর্ট করেন। এই কাজের জন্যে তাঁর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লাইসেন্স রয়েছে।’

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘তোর সঙ্গে তাঁর আলাপ হল কীভাবে?’

রনো বলল, ‘তাঁর পুরো নাম দীপন শুক্লা। আলাপটা একেবারেই অফিসিয়াল লেভেলে। তুই জানিস নিশ্চয়, চায়না বর্ডারের কাছাকাছি জায়গাগুলোয় যেতে গেলে আর্মির পারমিশন লাগে। এই দেরাদুন রিজিয়নে সেই পারমিশনটা আমিই দিয়ে থাকি। তো শুক্লাজি বছরে একবার করে সেরকম লাইসেন্স রিনিউ করাতে আসেন। সেই সূত্রেই আলাপ। পাসপোর্ট, ট্রেড লাইসেন্স, রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট এসব কাগজপত্র থেকে যেটুকু জানা যায় তার বাইরে আর বেশি কিছু জানতাম না তাঁর সম্পর্কে। তবে এটা বুঝতে পারতাম, ভদ্রলোক বেশ হাইলি কানেকটেড। তিনি আমার অফিসে আসার আগে প্রত্যেকবারই ‘মিনিস্ট্রি অফ ট্রেড অ্যান্ড কমার্স’ থেকে তাঁর কাজটা তাড়াতাড়ি করে দেওয়ার জন্যে ফোন আসে।’

বললাম, ‘তাতে তো অবাক হবার কিছু নেই। যারা এক্সপোর্টের ব্যবসা করেন তারা দেশের হয়ে বিদেশি মুদ্রা উপার্জন করেন। তাই যেকোনো সরকারই তাদের আদর করবেন। এটাই নিয়ম।’

রনো বলল, ‘তা হবে। তারপর শোন না। কাল যখন তোর ফোনটা এল, তখন তিনি আমার অফিসে আমার সামনেই বসেছিলেন। তুই আসছিস শুনে বললেন, এর চেয়ে ভালো যোগাযোগ আর হতেই পারে না। মনে হচ্ছে ভগবানই নীল চ্যাটার্জিকে পাঠাচ্ছেন। এবার আমার প্রবলেমটার একটা সুরাহা হতে পারে।’

আমি অবাক হয়ে শুক্লাজিকে জিগ্যেস করলাম, ‘আপনি নীল চ্যাটার্জির নাম জানেন!’

‘তিনি বললেন, কেন জানব না? আমি নিজেও তো এলাহাবাদ কলেজ থেকে বায়োসায়েন্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেছিলাম। আমাদের দেশের পশুপাখির ওপর লেখা নীল চ্যাটার্জির ফোটো ফিচারসগুলো আমি খুব ইন্টারেস্ট নিয়ে পড়ি। আপনি প্লিজ একবার চ্যাটার্জি সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দিন। আমি খুব সমস্যায় পড়েছি। সমস্যাটার কথাও বললেন। অদ্ভুত ঘটনা। আমার মনে হল, শুনলে তুইও ইন্টারেস্ট পাবি। সেইজন্যেই আমি তাঁকে কথা দিয়ে ফেললাম, বুঝলি নীল। তুই রাগ করিস না।’

ফ্যানেদের কথা জানতে পারলে কোন লেখকেরই বা ভালো না লাগে? দীপন শুক্লা নামে ওই অচেনা ভক্তটির সম্বন্ধে আমারও মনটা নরম হয়ে গেল। বললাম, ‘না না। রাগ করব কেন? তা ভদ্রলোকের প্রবলেমটা কী, তার কিছু আন্দাজ পেলি?’

রনো সবে বলতে শুরু করেছিল যে, প্রবলেমটা ঠিক ব্যবসার লাভ-ক্ষতির প্রবলেম নয়, বরং কোনো একটা জন্তুর বিষয়েই কিছু হবে। কিন্তু ওর কথা শেষ হবার আগেই কোয়ার্টারের বাগান পেরিয়ে একটা হার্লে ডেভিডসন বাইক এসে বারান্দার নীচে দাঁড়াল। সিলভার কালারের বিশাল বাইকটাকে স্ট্যান্ডের ওপরে দাঁড় করিয়ে চটপটে পায়ে বারান্দায় উঠে এল একটি ছেলে।

ছেলেই বলছি, কারণ তার বয়স আমাদের চেয়েও দু-তিন বছর কম; বড়জোর সাতাশ আঠাশ হবে। বিশাল লম্বা। হাইট সাড়ে ছ-ফিটের এক-ইঞ্চি কম নয়। পরিষ্কার করে কামানো দাড়িগোঁফ কিন্তু লম্বা চুলগুলোয় মনে হয় ইচ্ছে করেই চিরুনি ছোঁয়ায়নি। পরেছিল একটা স্টোনওয়াশড ব্লু-জিন্স আর ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট স্ট্রাইপড পুলওভার। দুটো পোশাকই বিদেশি এবং বেশ দামি ব্র্যান্ডের।

চোখ থেকে হাল্কা বাদামি শেডসটা একটানে খুলে ছেলেটি আমার দিকে ডানহাতের পাঞ্জাটা বাড়িয়ে দিল। চোস্ত ইংরিজিতে বলল, ‘লেট মি হ্যাভ দা প্লেজার অফ ইন্ট্রোডিউসিং মাইসেলফ। শুক্লা, দীপন শুক্লা। আই অ্যাম অ্যান অ্যাভিড ফ্যান অফ ইয়োরস, মিস্টার চ্যাটার্জি।’

আমাদের দু’জনের মুখোমুখি একটা বেতের চেয়ারে বসে দীপন শুক্লা আমার লেখার প্রসঙ্গে টুকটাক কথা শুরু করল। গ্রিনফিল্ড পত্রিকায় মাস-ছয়েক আগে এই হিমালয়েরই কিছু উভচর প্রাণীর শীতঘুম নিয়ে আমার একটা প্রবন্ধ বেরিয়েছিল। দেখলাম, দীপন সেই প্রবন্ধটা প্রায় ‘লাইন-বাই-লাইন’ মনে রেখেছে।

এরপরে ওর সম্বন্ধে আর উদাসীন থাকা যায় না। আমি যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েই ওর সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করলাম। জানতে পারলাম, জড়িবুটির ব্যবসাটা ওদের পারিবারিক ব্যবসা। প্রায় একশো বছর আগে ওর দাদুর দাদু এই ব্যবসার গোড়াপত্তন করেছিলেন। ওদের আদি-বাড়ি ছিল দেরাদুনের কাছেই, গাথরি বলে একটা গ্রামে। বাড়ি, কারখানা, অফিস সবই ছিল ওই গাথরি গ্রামে, একই কম্পাউন্ডের মধ্যে। এখনো কারখানা আর অফিস গাথরিতেই রয়েছে, শুধু দীপন আর ওখানে থাকে না। ও এখন দেরাদুনেরই কোনো একটা মহল্লায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে।

দীপন যে এলাহাবাদের একটা কলেজ থেকে বায়োসায়েন্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেছিল, সেটাও বলল। বলল, পাশ করার পরে অন্য কিছু করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ও কলেজ ছেড়ে বেরোনোর পরেই ওর বাবা মারা যান। ফলে বাধ্য হয়েই ওকে শুক্লাসুধার হাল ধরতে হয়।

হ্যাঁ, ওদের কোম্পানির নাম ‘শুক্লাসুধা।’ ওই ব্র্যান্ডনেমেই নাকি প্রতি বছর কোটি-কোটি টাকার জড়িবুটি চিন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি জায়গায় রপ্তানি হয়। ভারতের বাজারেও বিক্রির পরিমাণটা কম নয়।

রনোর হেল্পিং হ্যান্ড সহায়চাচা আমাদের তিনজনের জন্যে ধোঁয়া-ওঠা কফি আর রোস্টেড কাজু দিয়ে গিয়েছিলেন। কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘ক্যাপ্টেন মিত্র বলছিলেন, তুমি নাকি কী একটা প্রবলেমে পড়েছ। সেই ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও।’

দীপন একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘ঠিকই বলেছেন তিনি। কিন্তু এখন খুব সঙ্কোচ হচ্ছে কথাটা আপনাকে বলতে। ওটা কাউকে বলতে গেলে আমার নিজের কাছেই এত ‘সিলি’ লাগে। বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর জন্যে ঠাকুমা-দিদিমারা যেরকম ভয়ের গল্প বলেন, অনেকটা সেইরকম। কিন্তু আমার কাছে ঘটনাটা এত রিয়েল...।’

আমি ওর পিঠে আলতো করে একটা হাত রেখে বললাম, ‘ওটা নিয়ে ভেব না দীপন। প্রথম যখন ডুয়ার্সের জঙ্গলে ময়ূরকণ্ঠী টিয়ার কথা শুনেছিলাম তখন সেটাকে ভেবেছিলাম আজগুবি। যখন সুবর্ণরেখার তীরে সোনার কুচি মুখে নিয়ে এক সারি পিঁপড়েকে হেঁটে যেতে দেখেছিলাম তখন নিজেরই মনে হয়েছিল অবিশ্বাস্য। আজকাল তাই আর কোনো কথাকেই ‘সিলি’ ভাবি না। তুমি নিশ্চিন্তে বলো।’

দীপন একটু হেসে বলল, ‘আপনি যে আমাকে “তুমি” করে কথা বলছেন, এতে আমি ভারি খুশি হয়েছি। মনে হচ্ছে আপনি আমার নিজের দাদা। ক্যাপ্টেন সাহেবকেও কতবার বলেছি, আমাকে আপনি আজ্ঞে না করতে। তিনি পারেন না।’

আমি বললাম, ‘ক্যাপ্টেন সাহেব ইজ অ্যান অনারেবল ম্যান। যাই হোক, তুমি বলো।’

পরের পনেরো মিনিটে দীপন শুক্লা একটানা যা বলে গেল, তার সারসংক্ষেপ এইরকম—দীপনদের ব্যবসার জন্যে যেসব মেডিসিনাল হার্বস প্রয়োজন হয়, তার সবগুলো এক জায়গায় পাওয়া যায় না। হিমালয়ের এক-এক কোণে এক-একটা গাছ জন্মায়। তাদের মধ্যে কেউ জন্মায় রুক্ষ পাথুরে জমিতে, কেউ ঘন বনের স্যাঁতসেঁতে মাটিতে। কেউ মাটির নীচে কন্দ হয়ে ঘুমিয়ে থাকে আবার কেউ বা পরাশ্রয়ী...লুকিয়ে থাকে বড় গাছের ঝোপালো পাতার আড়ালে।

স্থানীয় মানুষের সাহায্য ছাড়া ওসব লতাগুল্ম খুঁজে বার করাই মুশকিল। তাই দীপন শুক্লা একা নয়, তার মতন যারাই জড়িবুটির কারবার করছে তারাই স্থানীয় লোকেদের হাতে জঙ্গল থেকে জড়িবুটি কালেকশনের দায়িত্বটা ছেড়ে দেয়। এ বিষয়টা আমার জানা ছিল। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্সের জঙ্গলেও আমি এইভাবেই জড়িবুটির ব্যবসা চলতে দেখেছি।

আর এই কারণেই, শুধু গাড়োয়াল নয়, কুমায়ুন, হিমাচল প্রদেশ, মেঘালয় এমনকী অরুণাচলের পাহাড়েও শুক্লাসুধা কোম্পানির মাইনে করা লোকজন ছড়ানো রয়েছে। তাদের হাত দিয়েই সারাবছর ধরে একেক জায়গা থেকে একেক রকমের ভেষজ গাছ সংগৃহীত হয়। তারপর সব এককাট্টা করে বিক্রি করে দীপন শুক্লার কোম্পানি।

এরকমই একটা জায়গার নাম তুয়াটোলি। ঋষিগঙ্গার উৎসে যে জানকী হিমবাহ, সেই হিমবাহের ঠিক নীচে শেষ জনবসতি তুয়াটোলি। উচ্চতা তেরো-হাজার ফিট।

উচ্চতার কথাটা শুনে আমি খুব অবাক হলাম। বললাম, ‘তেরো-হাজার ফিটের ওপরে গ্রাম! সত্যিই রয়েছে?’

আমার অবাক হওয়ার কারণ ছিল। ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতায় জানি, গাড়োয়াল হিমালয়ের ওই উচ্চতায় মাটির যা ধরন, তাতে চাষবাসের প্রশ্নই ওঠে না। শীতকালে তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের অন্তত চার-পাঁচ ডিগ্রি নীচে। গ্রীষ্মকালেও যে গরু-ভেড়া চরিয়ে খাবে, তেমন ঘাসজমি ওই উচ্চতায় মেলা দুষ্কর। যদি কোনোরকমের জিবিকার সুযোগই না থাকে, তাহলে মানুষ সেখানে গ্রাম বানিয়ে থাকবে কেন?

দীপন একটু হেসে বলল, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন বুঝতে পেরেছি। হ্যাঁ, সত্যিই তেরো হাজার ফিট ওপরে তুয়াটোলি বলে একটা গ্রাম ছিল। সেখানকার আবহাওয়া ছিল খুবই ক্রুয়েল। চাষবাস, পশুপালন কিছুই সম্ভব ছিল না সেখানে। তবু সেখানে শুধু যে বহু প্রাচীন একটা গ্রাম ছিল তাই নয়, সেই গ্রামের বাসিন্দারা হিমালয়ের গড়পড়তা অধিবাসীদের থেকে বেশি বড়লোক ছিল।’

‘কীভাবে?’ আমি নই, প্রশ্নটা করল রণজিৎ। বুঝলাম, ইন্ডো-টিবেট বর্ডার ফোর্সের ক্যাপ্টেন সাহেবও তাঁর অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাপারটাকে মেলাতে পারছে না।

দীপন বলল, ‘ওদের এই সমৃদ্ধির উৎস ছিল শিলাজিৎ। শিলাজিৎ কাকে বলে জানেন তো?’

আমি বললাম, ‘জানি। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে শিলাজিৎ প্রায় প্যানেসিয়ার মতন—সমস্ত রোগ সারিয়ে তোলে, এমনই নাকি এর গুণ।’

‘একদম ঠিক বলেছেন। জিনিসটা কিন্তু ভীষণ দুর্লভ। হিমালয়ের অনেক উচ্চতায় কোথাও-কোথাও পাথরের খাঁজ থেকে বেরিয়ে আসে চটচটে আঠার মতন এই পদার্থ। অলৌকিকে যাঁদের বিশ্বাস আছে তাঁরা বলেন, ওটা নাকি পাথরের ঘাম। আসলে যে কী, তা নিয়ে আবার বিজ্ঞানীদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। কেউ বলেন, অনেকগুলো দুর্লভ খনিজ পদার্থের মিশ্রণ। আবার কেউ বলেন বহুবছর ধরে পাথরের নীচে চাপা পড়ে থাকা গাছগাছড়ার জমাট রস।’

প্রশ্ন করলাম, ‘দামও নিশ্চয়ই আকাশছোঁয়া, তাই না?’

দীপন বলল, ‘এগজ্যাক্টলি। অরিজিনাল শিলাজিতের আকাশছোঁয়া দাম। আর সেইজন্যেই বহুযুগ আগে তুয়াটোলিতে ঘর বেঁধেছিল একদল পাহাড়ি মানুষ। প্রথম থেকেই তাদের জীবিকা ছিল শুধু ওই—পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে শিলাজিৎ সংগ্রহ। তাতেই তারা দিব্যি ভালোভাবে বেঁচেবর্তে ছিল। ঠিক কোথায়, কখন যে শিলাজিতের দেখা মিলবে সে কথা জানত শুধু ওই গ্রামের বাসিন্দারা। দাদুর কাছ থেকে বাবা, বাবার কাছ থেকে ছেলে—এইভাবে তারা জেনে নিত শিলাজিতের গোপন ঠিকানা।’

আমি বললাম, ‘আচ্ছা দীপন, তুয়াটোলির কথা বলতে গিয়ে প্রথম থেকেই তুমি পাস্ট টেন্স ব্যবহার করছ কেন? এখন কি তারা নেই?’

ও বলল, ‘না, উনিশশো-আটানব্বই সালের মার্চ-মাসে তুয়াটোলি গ্রামের সমস্ত মানুষকে ইন্ডিয়ান আর্মি উচ্ছেদ করে দিয়েছিল। তখন থেকেই তুয়াটোলি পাস্ট টেন্স হয়ে গেছে।’

দুই

দীপনের কথাটা এতটাই অবাক করে দেওয়ার মতন যে, আমি তক্ষুনি কিছু বলতে পারলাম না। ভূমিকম্পে কিম্বা বন্যায় কোনো গ্রাম শেষ হয়ে গেলে সেটা আলাদা কথা। কিন্তু নিজেদের দেশের একটা আস্ত গ্রামের সমস্ত লোকজনকে ইন্ডিয়ান আর্মি অন্য কোথাও সরিয়ে দেবে, এ তো ভাবাই যায় না। তাহলে কি গ্রামটা চাইনিজ আর্টিলারির রেঞ্জের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল?

আমি একবার দীপন আর একবার রণজিতের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলাম। রনো কোনো কথা না বলে ঘাড় নাড়ছিল। তার মানে ও-ও এই ব্যাপারটা জানে।

রনোই আমার কৌতূহল মেটাল। বলল, ‘আসলে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছিল, বুঝলি। ওপর-ওপর যেটুকু জানি বলছি। অবশ্য ব্যাপারটা এতটাই সিক্রেট যে, আমাদের মতন নীচের লেভেলে এর বেশি কেউই জানে বলে মনে হয় না।

‘হয়েছিল কী, উনিশশো-সাতানব্বইয়ের এপ্রিল মাসে, মিলিটারি ইনটেলিজেন্সের উদ্যোগে ওই তুয়াটোলির কাছে একটা টিলার মাথায় একটা হাই-ফ্রিকোয়েন্সি সেন্সর বসানো হয়েছিল। সেই সেন্সরের কাজটা যে এগজ্যাক্টলি কী ছিল, সে বিষয়ে কেউই কিছু বলতে পারে না। চিন সম্বন্ধে ইনফরমেশন গ্যাদার করার কাজ হতে পারে। গ্লেসিয়ারের গতিপ্রকৃতি মাপার কাজ হতে পারে। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং থিয়োরি হচ্ছে, অন্যগ্রহের প্রাণীদের ওপরে নজরদারি। ওই তুয়াটোলির আকাশে নাকি মাঝে মাঝে এমন সব আলোর চাকতি-টাকতি উড়ে যেতে দেখা যেত, যেগুলোর সঙ্গে মিসাইল, স্পাই-স্যাটেলাইট কোনোকিছুরই কোনো মিল ছিল না। কাজেই ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে, ওগুলো এলিয়েনসদের মহাকাশযান—ইউ.এফ.ও।

‘যাই হোক, সেই সেন্সর বেশিদিন কাজ করে উঠতে পারল না, কারণ, এগারো মাসের মাথায় একটা ভূমিকম্পে আস্ত টিলাটাই ধসে পড়ল এবং সেই অত্যাধুনিক যন্ত্র চাপা পড়ল পাহাড়প্রমাণ পাথরের স্তূপের নীচে আর তার কয়েকদিনের মধ্যেই আর্মির সায়েন্টিস্টেরা দেখলেন, তাঁরা যে ভয়টা পেয়েছিলেন, সেটাই ঘটেছে। মারাত্মক রেডিয়েশন ছড়িয়ে পড়ছে তুয়াটোলির বাতাসে, মাটিতে, এমনকী ঝোরার জলেও।’

আঁতকে উঠলাম। বললাম, ‘বলিস কী!’

‘যা ঘটেছিল তাই-ই বলছি। ঠিক কেমন ছিল সেই সেন্সর, কী যে ছিল তার কাজ, তা আমরা কেউই সঠিক জানি না। কিন্তু এটা সকলেই জানি যে, ওই যন্ত্রের মধ্যে তেজস্ক্রিয় কোনো পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল। সেইজন্যেই শুধু যে তুয়াটোলি গ্রামটাকেই ফাঁকা করে দেওয়া হল তাই নয়, সেই উনিশশো-আটানব্বই সালের জুলাই মাসের পর থেকে নন্দাদেবী স্যাংচুয়ারির ওই এরিয়াটাতেই মানুষের যাতায়াত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল।’

‘তারপর?’

‘এতদিন পরে বৈজ্ঞানিকেরা মনে করছেন, কুড়ি বছর ধরে রেডিয়েশন ছড়িয়ে সেই তেজস্ক্রিয়-পদার্থের বিষ ফুরিয়ে গিয়েছে। এখন ওখানে মানুষের যাতায়াত নিরাপদ।

‘জায়গাটা আর্মি মুভমেন্টের দিক থেকে ভীষণই গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন ওই রেডিয়েশনের সমস্যায় রাস্তাঘাট তৈরি করা যায়নি। এবার মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস জোরকদমে লেগেছে চায়না বর্ডার পর্যন্ত রাস্তা বানানোর কাজটা শেষ করে ফেলতে।’

রনো কথা থামিয়ে কফির কাপে চুমুক দিতেই দীপন ওর কথার খেই ধরল—‘বাপ-দাদাদের মুখ থেকে শুনে তুয়াটোলির নামটা আমি ছোটবেলা থেকে জানতাম। জানতাম সেরা জাতের শ্বেত শিলাজিৎ একমাত্র ওখানেই পাওয়া যায়। তার এক গ্রামের দাম বিদেশের বাজারে সমান ওজনের সোনার থেকেও বেশি। তাই যে-মুহূর্তে খবর পেলাম তুয়াটোলির কর্ডন আলগা করা হয়েছে আর ওদিকে নতুন করে রাস্তাও তৈরি করা হচ্ছে, সেই মুহূর্তেই আমি আমার সমস্ত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে কুড়ি বছর আগে উচ্ছেদ হওয়া কয়েকজন তুয়াটোলির বাসিন্দাকে আবার তাদের পুরোনো গ্রামের জায়গায় পৌঁছিয়ে দিলাম।’

রণজিৎ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, ‘শুক্লাজি নিপাট ভদ্রলোক, তাই তাঁর ইনফ্লুয়েন্সের কথাটা এক-কথায় সেরে দিলেন। কিন্তু আসলে তাঁর হাত অনেক লম্বা। দিল্লির মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্সেও তাঁর যাতায়াত আছে।’

দীপন কোনো উত্তর না দিয়ে ছোট একটা ‘শ্রাগ’ করল। মানে ইনফ্লুয়েন্সের ব্যাপারটা মেনে নিয়েও তা নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাইল না। বুঝতে পারছিলাম, ও আসলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভূমিকা শেষ করে ওর এখনকার সমস্যাটার কথায় পৌঁছতে চাইছে। তাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালাম।

থেমে-যাওয়া কথার খেই ধরে দীপন বলতে শুরু করল, ‘যে আটজন তুয়াটোলির বাসিন্দাকে খুঁজেপেতে বার করে ওখানে পাঠিয়েছিলাম, দেখলাম বয়স হলেও তারা কেউ রুক্ষ্ম দুর্গম পাহাড়ের বুক থেকে শিলাজিৎ খুঁজে বার করার বিদ্যা ভোলেনি। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই, এই ছ’মাসে তারা আমার হাতে তুলে দিয়েছে প্রায় পাঁচ-কেজি সেরা কোয়ালিটির সাদা শিলাজিৎ।’

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘তাহলে? সমস্যা কী হল?’

‘ওই আটজন লোক—ওরা তুয়াটোলিতে থাকতে ভয় পাচ্ছে। গত জুলাই মাসেই ওরা তুয়াটোলি থেকে পালিয়ে চলে এসেছে দেরাদুনে। সেপ্টেম্বর শেষ হতে চলল। ওদের ফেরানো যাচ্ছে না।’

আমি হেসে ফেললাম। বললাম, ‘দেখো দীপন, আমি জন্মসূত্রে কলকাতার মানুষ; কিন্তু বহুবছর ধরে বনে-জঙ্গলে ঘুরছি তো, তাই জানি, তুয়াটোলির মতন নির্জন জায়গায় মনের ওপরে একরকমের ভার চেপে বসে। চেপে বসে জঙ্গল কিম্বা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো বিপদের আশঙ্কা। তোমার ওই আটজন কর্মচারীও নিশ্চয় দিনের পর দিন ওখানে পড়ে থাকতে থাকতে সেরকমই কোনো কাল্পনিক দেও-দানোর ভয় পেয়েছে, তাই তো?’

‘উঁহু।’ দীপন ঘাড় নাড়ল। ‘আমিও প্রথমে সেইরকমই ভেবে নিয়ে ওদের বকাঝকা করেছিলাম। তারপর ভাবলাম, কোথাও সত্যিকারের কোনো একটা গন্ডগোল আছে। দেখুন, স্যার! যে যেখানে জন্মেছে, সেই জায়গাটাই তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। ওই আটজন মানুষ জন্ম থেকে অনেকগুলো বছর কাটিয়েছিল তুয়াটোলির পাহাড়েই। সেখানে ওরা শুধুমুধু কল্পনায় দৈত্যদানব বানিয়ে তুলবে এটা মেনে নিতে পারছিলাম না।

‘তাই ঠিক করলাম, আমি নিজে একবার যাব। গেলামও ওখানে, আজ থেকে ঠিক এক মাস আগে। কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম তাতে ওদের সাহস জোগানো তো দূরের কথা, আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম। সেই-যে তুয়াটোলির ক্যাম্প বন্ধ করে ফিরে এসেছি, আর ফিরে যাইনি।’

স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, এই কথাগুলো বলবার সময় আঠাশ বছরের সুদেহী তরুণ দীপন শুক্লার গলা কেঁপে গেল। ও এমন কিছু দেখেছিল, যার কথা ভাবতে গেলে এখনো ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে।

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কী দেখেছিলে দীপন? কী দেখে ভয় পেয়েছিলে?’

দীপন সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমার ফোন নাম্বারটা চাইল। তারপর বলল, ‘আপনার ফোনে কয়েকটা ছবি হোয়াটস-অ্যাপ করলাম। একটু দেখুন প্লিজ।’

আমি সঙ্গে-সঙ্গেই সামনের টি-টেবিলের ওপর থেকে আমার মোবাইল-ফোনটা তুলে নিয়ে ছবিগুলো দেখলাম। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ওগুলো ক্যামেরায় নয়, মোবাইলে তোলা ছবি। প্রত্যেকটা ছবিই কম আলোয় তোলা হয়েছিল। মোট পাঁচটা ছবি ছিল দীপনের পাঠানো ফাইলটায়।

রণজিতের হাতে ফোনটা দিতে যাচ্ছিলাম। ও বলল, ‘আমি আগেই দেখেছি। তিনি আমাকে দেখিয়েছেন। তবে আমি কিছু বুঝতে পারিনি।’

দীপনকে বললাম, ‘ছবিগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড—মানে কোথায় তোলা, কখন তোলা—এইসব না জানলে আমিও কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘বলছি।’ দীপন পকেট থেকে রুমাল বার করে একবার কপালটা মুছে নিল। দেখলাম, ওর মুখে একটা অদ্ভুত ফ্যাকাশে ভাব। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও নিচুস্বরে বলতে শুরু করল, ‘আগে যেখানে তুয়াটোলি গ্রাম ছিল সেখানেই একটুকরো সমতল জমির মাঝখানে আমার লেবারদের থাকবার জন্যে একটা বড়সড় কাঠের ঘর বানিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন আমি ওই ঘরে শুইনি। আমি ওই মাঠটার একেবারে অন্য-প্রান্তে টেন্ট খাটিয়ে শুয়েছিলাম। আমার টেন্টের পেছনদিকের জমিটা ঢালু হয়ে নীচের খাদে গিয়ে মিশেছিল।

‘সারাদিনের জার্নির ক্লান্তি ছিল। তাছাড়া ওয়েদারটাও হঠাৎই খুব বিগড়ে গেল। হালকা বরফ পড়তে শুরু করেছিল। তাই সন্ধে সাতটার মধ্যেই খাওয়াদাওয়া শেষ করে স্লিপিং-ব্যাগে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

‘রাত তিনটে নাগাদ হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। এমনি এমনি ভাঙেনি। একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুনেছিলাম।’

‘আওয়াজটা কেমন ছিল মনে পড়ে?’ আমি জিগ্যেস করলাম।

দীপন বলল, ‘হ্যাঁ। ঘুমটা পুরোপুরি ভেঙে যাওয়ার পরেও আমি একবার ওই আওয়াজটা শুনেছিলাম, তাই ভালো করেই মনে আছে। সর্দিকাশি হলে আমরা যখন নুনজল দিয়ে গার্গল করি, তখন যে শব্দটা হয়, সেই শব্দটাকেই আরও দশগুণ জোরালো করে শুনলে যেমন লাগবে, সেইরকম।’

‘তারপর?’

‘আমি টেন্টের হুড সরিয়ে বাইরে মুখ বাড়ালাম। তুষারপাত পুরোপুরি বন্ধ না হলেও, তার জোর কমে এসেছিল। সেই গুঁড়ো-বরফের পর্দা ভেদ করে বিশেষ কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। বড় টর্চলাইটটা হাতে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম।’

রণজিৎ বলল, ‘একটু বেশি রিস্ক নিয়ে ফেলেছিলেন না?’

দীপন বলল, ‘না স্যার। আমি বিপদের জন্যে তৈরি ছিলাম। আমার পকেটে একটা লোডেড রিভলভার ছিল। যাই হোক, বাইরে বেরিয়ে টেন্টের সামনের দিকটা আরেকবার টর্চের আলোয় ভালো করে দেখে নিলাম। অস্বাভাবিক কোনো কিছু দেখতে পেলাম না। তারপর টেন্টটাকে একটা বেড় দিয়ে পেছনদিকে যেতেই এই পায়ের ছাপগুলো দেখতে পেলাম, যেগুলোর ছবি আপনারা দেখছেন।

‘পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, খাদ থেকে উঠে এসেছিল কোনো জন্তু; আবার সে খাদেই ফিরে গেছে। আমি কয়েকটা ছবি তুললাম। কিন্তু বুঝতেই পারছেন, ক্রমাগত ঝরে পড়া বরফে ওইটুকু সময়ের মধ্যেই পায়ের ছাপগুলো অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বলুন তো মিস্টার চ্যাটার্জি, এ কেমন জন্তু? নাকি পাখি? নাকি...ওরা...ওই লেবাররা যা বলছে, সেটাই সত্যি? জন্তু, পাখি কিছুই নয়। অজানা কোনো দানব?’

আমার মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দীপনের এই প্রশ্নটারই উত্তর খুঁজছিলাম। খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি দেখছিলাম, নানান অ্যাঙ্গেল থেকে তোলা মোট পাঁচটা ছবি। প্রত্যেকটা ছবিতেই দেখা যাচ্ছে তুয়াটোলির বরফঢাকা জমি। সেই বরফের বুকে হাঁসের পায়ের পাতার মতন একসারি পায়ের ছাপ। সেইরকমই পাতলা চামড়া দিয়ে জোড়া লম্বা লম্বা আঙুল।

দীপন ওরকম একটা পায়ের ছাপের পাশে নিজের পায়ের ছাপ ফেলে ছবি তুলেছিল। ছবিটা দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল, ছাপটা একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের পায়ের যা সাইজ, তার প্রায় দ্বিগুণ।

অর্থাৎ পায়ের ছাপগুলো কোনো পাখির নয়। কোনো পাখির পায়ের ছাপ অত বড় হতে পারে না। তাছাড়া ছবি থেকে মনে হচ্ছিল ছাপগুলো বেশ গভীর। অর্থাৎ জন্তুই হোক বা পাখি, তার ওজনও একজন মানুষের থেকে অনেক বেশি।

আরও একটা জিনিস খেয়াল করলাম। যদিও ঝরে পড়া বরফে পায়ের ছাপগুলো কিছুটা ঘেঁটে গিয়েছিল, তবু ভালো করে দেখে মনে হল, সবকটা পায়ের ছাপ এক আয়তনের নয়। ওদের মধ্যে ছোট-বড় রয়েছে। তার মানে কি খাদের নিচ থেকে সেদিন দুটো প্রাণী কিম্বা পাখি তুয়াটোলির উপত্যকায় উঠে এসেছিল?

মোবাইলের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে দেখলাম, দীপন খুব আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার চোখে চোখ পড়তেই বলল, ‘কিছু বলুন মিস্টার চ্যাটার্জি।’

আমি বললাম, ‘একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় আসছে। বছরের এই সময়টায় সাইবেরিয়া আর ইওরোপের নানান জায়গা থেকে বিভিন্ন জাতের হাঁস হিমালয় পেরিয়ে ভারতে ঢোকে। পথের মধ্যে কোথাও-কোথাও তারা বিশ্রাম নেবার জন্যে মাটিতে নেমেও আসে। হয়তো সেরকমই একটা বা দুটো হাঁস...’

আমাকে কথার মধ্যেই বাধা দিয়ে দীপন বলল, ‘হাঁসের পায়ের ছাপ এত বড় হতে পারে?’

বললাম, ‘এটারও একটা ব্যাখ্যা হয়। বরফ যখন গলে, তখন বরফের ওপরে যে কোনো ছাপ চ্যাটালো ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ হাঁসের পায়ের ছাপকেও তখন বিশাল মনে হয়। ...কিন্তু নাঃ।’

চুপ করে গেলাম। নিজের কথাগুলো অন্য কয়েকটা কারণে নিজের কাছেই খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছিল না। দীপনের মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম, ওর কাছেও না।

প্রথম কথা, রাত তিনটের সময়, যখন স্নো-ফল কনটিনিউ করছে, তখন বরফ গলে না।

দ্বিতীয়ত, পরিযায়ী হাঁসেরা কখন কোথায় নামবে, তা দেখে ক্যালেন্ডারের তারিখ আর ম্যাপের পয়েন্ট দুটোই মিলিয়ে নেওয়া যায়। বছরের পর বছর, ওরা একই জায়গায়, প্রায় একই দিনে ফিরে আসে। যদি সত্যিই তুয়াটোলি গ্রামটা হাঁসেদের যাত্রাপথে সেরকম একটা বিশ্রামের জায়গা হতো, তাহলে ওখানকার আটজন বাসিন্দা সেটা নিশ্চয় জানতেন। আর হাঁসেরা বিশ্রাম করতে নামে জলাজমির ধারে। তুয়াটোলির মতন বরফের মরুভূমির বুকে নয়।

তৃতীয়ত, মানুষের দ্বিগুণ আয়তন আর ওজনের হাঁসের কথা আরব্য উপন্যাসে থাকলেও থাকতে পারে। বাস্তবে সেরকম কিছু নেই।

আমি আবার দুদিকে ঘাড় নাড়লাম। বললাম, ‘বুঝতে পারছি না। কিছুই বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, একটা কথা বলো তো দীপন। তোমার কাজের লোকেরাও কি ওই জন্তু কিম্বা পাখিটাকে দেখেই ভয় পেয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ। আমি গেছিলাম একমাস আগে। তারও দিন পনেরো আগে থেকে ওরা গভীর রাতে ওদের ঘরের বাইরে খুব ভারী শরীরওলা কোনো জন্তুর আনাগোনা টের পাচ্ছিল। আমি যেমন ঘরঘরে ডাক শুনেছি, ঠিক সেইরকম শব্দ ওরাও পেয়েছিল। আর বরফের ওপরে পায়ের ছাপ? হ্যাঁ, তাও ওরা দেখেছিল। তবে ওরা আরও বেশি কিছু দেখেছিল।’

‘কী দেখেছিল?’

‘ওদের মধ্যে একজন, হরি সিং ঠাকুর, তার সাহস অন্য সাতজনের থেকে অনেকটা বেশি ছিল। সেই হরি সিং একদিন ওই পাখি না জন্তুটা এসেছে বুঝতে পেরেই এক ঝটকায় দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল। সেদিন ছিল কৃষ্ণপক্ষের রাত। ভিজিবিলিটি খুব খারাপ ছিল। তবু হরি সিং নাকি দেখতে পেয়েছিল একটা কালো ছায়া ক্যাম্পের মাঠ থেকে প্রায় উড়ে গিয়েই টিলার ঢালের জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। হরি সিং হলফ করে বলেছে, ওর চেনা কোনো পশু বা পাখির সঙ্গে সেই জীবটার কোনো মিল নেই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হরি সিং যেটুকু দেখতে পেয়েছিল, তাতে ওর মনে হয়েছিল, প্রাণীটার গড়ন চৌকো।’

চৌকো! খুব দ্রুত চিন্তা করলাম, এই রিজিয়নে যে-সমস্ত জংলি প্রাণীর থাকার কথা তাদের মধ্যে কাউকে অন্ধকারে চৌকো বলে ভুল হতে পারে কিনা। চিতা, নেকড়ে, হরিণ, পাহাড়ি ভেড়া? উঁহু। নেই। অমন কোনো প্রাণী হিমালয়ের এই উচ্চতায় নেই।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমি আবার দীপনকে প্রশ্ন করলাম, ‘জন্তু কিম্বা পাখি যাই হোক, সে কি ওদের কোনো ক্ষতি করেছিল?’

দীপন বলল, ‘ওদের একটা পোষা কুকুর খাদের দিকে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। সেটা অবিশ্যি চিতার কাণ্ডও হতে পারে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বললাম, ‘না। এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো এক্সপ্লানেশন নেই। আরেকটু তথ্য না পেলে কিছু বলতে পারছি না। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকো, এর মধ্যে অলৌকিক কিছু নেই। কারণ অলৌকিক বলেই কিছু নেই পৃথিবীতে।’

দীপন দুম করে বলে বসল, ‘আর যদি পৃথিবীর বাইরের কিছু হয়?’

অবাক হয়ে বললাম, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’

‘আপনিও যখন বললেন, এমন কোনো প্রাণীর কথা আপনার জানা নেই তখন থেকেই আমার মনে হচ্ছে, ওগুলো কি তাহলে পৃথিবীর বাইরের কোনো প্রাণীর পায়ের ছাপ!’

‘কী বলতে চাইছ তুমি? এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল? গ্রহান্তরের জীব?’

‘এগজ্যাক্টলি। কেন নয়? গাড়োয়ালের ওই অঞ্চলের আকাশে যে ফ্লাইং সসারের আনাগোনো ছিল, এ তো অনেকেই জানে। যদি কোনো কারণে পৃথিবীর মাটিতে ওরকম কোনো এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়ালকে শেল্টার নিতেই হয়, তাহলে তার পক্ষে ওই তুয়াটোলির নির্জন প্রান্তরের চেয়ে বেশি স্যুটেবল জায়গা আর কী হতে পারে বলুন।’

অত্যন্ত উদ্ভট আইডিয়া। তবু হঠাৎই চোখের সামনে ভেসে উঠল বরফের ওপরে পাতলা চামড়ায় ঢাকা বিশাল পায়ের ছাপের ছবিগুলো। কিছু ছোট, কিছু বড়—তবু সবকটারই আয়তন মানুষের পায়ের ছাপের চেয়ে অনেক বড়।

বললাম, ‘আর কিছু বলবে?’

‘এটাও খুব সঙ্কোচের সঙ্গেই বলছি। তুয়াটোলি আমার কাছে একটা গোল্ডমাইন। শ্বেত শিলাজিতের ওই সাপ্লাই লাইন আমি ছাড়তে পারব না। আপনি আমাকে জায়গাটা ফিরিয়ে দিন। আমি—আমি আপনার কাছে প্রফেশনাল হেল্প চাইছি। আপনি ওই প্রাণীটাকে ওখান থেকে তাড়ান, জায়গাটাকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিন। আপনি যা রেম্যুনারেশন চাইবেন আমি দেব।’

রেম্যুনারেশন নয়, নতুন একটা রহস্য উদ্ঘাটনের লোভ আমাকে টানছিল।

দীপনকে বললাম, ‘আমি এক্ষুনি তোমাকে কোনো কথা দিতে পারছি না। আমাকে একটু ভাববার সময় দাও।’

ও তাড়াহুড়ো করে জবাব দিল, ‘অফ কোর্স। অফ কোর্স স্যার। আমি আপনার সঙ্গে কনট্যাক্ট করব। আই অ্যাম ইন নো পার্টিকুলার হারি।’

দীপনের বাইক গেট পেরিয়ে যাবার সঙ্গে-সঙ্গেই রণজিৎ আমাকে খুব সিরিয়াস মুখ করে জিগ্যেস করল, তুই কি সত্যিই হংসপদিকার সন্ধানে তুয়াটোলি যাবি নাকি?

আমি হেসে ফেললাম। বললাম, ‘হংসপদিকা! নামটা ভালো দিয়েছিস তো। দা ডাক-ফুটেড অ্যানিম্যাল।’

মনে পড়ে গেল, রণজিৎ পরে বায়োকেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করলেও, স্কুলে ও বাংলায় বরাবর হায়েস্ট মার্কস পেত।

ওকে বললাম, ‘যাব কিনা দ্যাট ডিপেন্ডস অন আ ফিউ ফ্যাক্টরস। আগে আমাকে কয়েকটা ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে হবে।’

‘বটে? কেমন খোঁজখবর শুনি।’

বললাম, ‘তাহলে একবার আমার সঙ্গে বেরো।’

‘কোথায় যেতে হবে?’

‘দীপন বলছিল, দেরাদুনের কাছেই একটা জায়গায় শুক্লাসুধার অফিস-কাম-ফ্যাক্টরি। কী যেন জায়গাটার নাম? ওখানে একবার যাওয়া দরকার।’

‘গাথরি। গাথরি হিলস। কিন্তু ওখানে যাবি কেন?’

‘একটা হাঞ্চ বলতে পারিস। শিলাজিৎ জিনিসটা গাছপালার মধ্যে পড়ে না। ও যদি কোনো পাতা বা শেকড়ের কথা বলত, তাহলে সন্দেহ হতো না। না রে, ওকে কোনো কথা দিয়ে ফেলার আগে একবার নিজেদের চোখে কারখানাটা দেখেই আসি, চল। গাড়ি নেব না। হেঁটে যাওয়া যাবে তো?’

রনো বলল, ‘আমি কখনো যাইনি। তবে শুনেছি রাস্তাটা একটু চড়াই আছে। যাবার সময় ঘণ্টাখানেক লাগবে, ফেরার সময় ন্যাচারালি অনেক কম।’

ঘড়ি দেখলাম। বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজে। আকাশে এখনো কিছুটা আলো আছে। রণজিৎকে বললাম, ‘চল বেরিয়ে পড়ি।’

তিন

পায়ে হেঁটে গাথরি-হিলস পৌঁছতে আমাদের যতক্ষণ সময় লাগল তার মধ্যেই অন্ধকার নেমে এল। একটা ভিজে-ভিজে দমকা হাওয়া বইছিল। মনে হচ্ছিল, বৃষ্টি আসবে।

ওখানে পৌঁছিয়ে দেখলাম, গাথরি জায়গাটাকে বড়জোর একটা মাঝারি মাপের গ্রাম বলা যেতে পারে। একটা টিলার ঢালে মাত্র খান-চল্লিশ বাড়ি। পাকা-বাড়ি নয়, পাথরের টালিছাওয়া ছাদ আর কাঠের দেয়ালের পুরোনো আমলের পাহাড়ি কুঁড়েঘর। পুরো গ্রামটায় একটাই কাঁচা রাস্তা। ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে-থাকা ঘরগুলোর মধ্যে দিয়ে সেই রাস্তাটা কোনোরকমে একটু জায়গা করে নিয়ে টিলার মাথায় উঠে গেছে।

সেই রাস্তা ধরে গ্রামের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত যেতেই চোখে পড়ল একটা শুঁড়িপথ বাঁ দিকে নেমে গেছে। শুঁড়িপথটার মুখে একটা প্রায় ভেঙে পড়া কাঠের সাইনবোর্ডের ওপরে তিরচিহ্ন দিয়ে লেখা ‘শুক্লাসুধা।’ অর্থাৎ কারখানাটায় যেতে হলে ওই শুঁড়িপথটাই ধরতে হবে।

আর সময় নষ্ট না করে আমরা ওই পথ ধরে নেমে চললাম। প্রায় দু’শো মিটার মতন যাওয়ার পরে একটা শালখুঁটির বেড়া দিয়ে ঘেরা বিশাল জংলা জমির সামনে পৌঁছলাম। রাস্তার ওপরেই বেড়ার গায়ে বড় লোহার গেট, তার লোহার পাল্লাদুটো ভাঙা কব্জার ওপরে কোনোরকমে ঝুলছিল। তালা-টালা কিছুই ছিল না। একটু ঠেলতেই খুলে গেল। গেটের ওদিক থেকে সেই একই পথ পাইন আর ধূপিগাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আরও নীচে নেমে গিয়েছিল।

রাস্তাটায় পা দিয়েই বুঝলাম, বহুদিন এই পথে কারুর পা পড়ে না। যে-রাস্তায় মানুষের চলাচল থাকে, গাড়ি যাতায়াত করে, সে-রাস্তায় এত শুকনো পাতা আর ধুলোকাদা জমে থাকতে পারে না। আমি আর রনো মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। কোটি-কোটি টাকার এক্সপোর্টের গল্প শুনেছিলাম না? সেই কারখানার রাস্তার এই চেহারা!

শুকনো পাতার স্তূপ আর কাদা মাড়িয়ে, কোনোরকমে পৌঁছলাম একটা পুরোনো দোতলা বাড়ির সামনে। বাড়িটার সারা গায়ে বয়সের করুণ ছাপ। পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে বারান্দার রেলিং আর জানলার পাল্লা।

কিন্তু এই বাড়িটাতেই যে এককালে শুক্লা-পরিবারের বসতবাড়ি, কারখানা আর অফিস ছিল সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই, কারণ, আমাদের মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় দিব্যি দেখতে পাচ্ছিলাম, বিশাল সদর দরজার ডানপাশে একটা বহু পুরোনো এনামেল-করা টিনের ফলক। তার গায়ে লেখা আছে কোম্পানির নাম আর প্রায় একশো বছর আগের একটা তারিখ, যেদিন ওই কোম্পানি স্থাপিত হয়েছিল।

কোথাও কোনো আলো জ্বলছিল না, মানুষের গলাও পাওয়া যাচ্ছিল না।

মোবাইলের আলোতেই আমি আর রনো বাড়িটাকে ঘিরে একটা চক্কর লাগালাম। সামনে আর দু’পাশে দেখার মতন কিছুই ছিল না। কিন্তু বাড়িটার পেছনে গিয়ে যা দেখলাম, তা অভাবনীয়। দেখলাম মূল বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা ছোট দু-কামরার কাঠের বাড়ি। সেটাও অনেক পুরোনো। মনে হয় এককালে ওটা কাজের লোকেদের থাকার আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। যাকে বলে ‘আউট-হাউস’। সেই বাড়িটাও অন্ধকারে ডুবে আছে। সেটারও দরজা-জানলা মূলবাড়ির মতনই আষ্টেপৃষ্ঠে বন্ধ। কিন্তু যে-দৃশ্যটা আমাদের দু’জনকেই বাড়িটার দিকে টেনে নিয়ে গেল, তা হল একটা জোনাকির মতন ছোট্ট সবুজ এল.ই.ডি ল্যাম্পের দপদপানি। চারিদিকে এত অন্ধকার বলেই সেই সবুজ আলোটাকে আরও অনেক তীব্র মনে হচ্ছিল। আলোটা জ্বলছিল সেই আউট-হাউসের বারান্দায়।

তিন ধাপ পাথরের সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠলাম। এগিয়ে গেলাম আলোটার কাছে এবং দেখলাম, ওটা আর কিছুই নয়, একটা ইলেকট্রিক মিটার। বিদ্যুৎ-সরবরাহকারী সংস্থাগুলো বিদ্যুতের খরচ বোঝার জন্যে গ্রাহকদের বাড়িতে যেরকম মিটার লাগিয়ে দিয়ে যান, ঠিক তাই। ওই মিটারটার গায়েই সবুজ আলোটা দপদপ করছিল।

এবং চেহারা থেকেই পরিষ্কার যে, ওটা সাধারণ ডোমেস্টিক মিটার নয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিটার। কল-কারখানায়, যেখানে প্রচুর বিদ্যুতের খরচ, সেখানে যেরকম মিটার লাগানো থাকে ওটা ঠিক তাই। এমনকী এই মুহূর্তেই ওই বন্ধ আউট-হাউস যে পরিমাণ বিদ্যুৎ টেনে নিচ্ছে, তা আমাদের বাড়ির লাইট-পাখা-ফ্রিজ চালাবার চেয়ে অনেক বেশি। সবুজ আলোর ঘন-ঘন দপদপানি সেই কথাই বলছে।

মিটারটার গায়ে সরু তার দিয়ে একটা আয়তাকার পিচবোর্ডের টুকরো বাঁধা ছিল। কাছে চোখ নিয়ে গিয়ে দেখলাম, ওটা একটা পেপার-টোকেন। টোকেনের গায়ে খোপ-কাটা ঘরে ইংরিজি মাসগুলোর নাম লেখা ছিল। লেখা ছিল কোন মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে। সেই খরচের হিসেব দেখে আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবার উপক্রম হল।

একটা ছোট্ট কাঠের ঘর—যেখানে কোনো মেশিনের আওয়াজ নেই, চিমনি নেই, এগজস্ট-ফ্যান নেই—সেখানে এত বিদ্যুতের প্রয়োজন হচ্ছে কেন?

রনোও আমার মুখের পাশে মুখ নিয়ে গিয়ে টোকেনটাকে দেখছিল। কিছুক্ষণ দেখার পরে মন্তব্য করল—‘মিটার বসানোর তারিখটা খেয়াল করেছিস, নীল? মাত্র ছ’মাস আগে এটা বসানো হয়েছে।’

‘হুঁ, দেখেছি। তার মানে এই মিটারের সঙ্গে শুক্লাসুধার ব্যবসার কোনো সম্বন্ধ নেই। সে ব্যবসা যে বহু আগেই এখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে তা তো পরিষ্কার।’

অন্ধকারের মধ্যেও বুঝতে পারলাম, রনো ওর জ্যাকেটের পকেট থেকে সার্ভিস-রিভলভারটা বার করে শক্ত করে হাতের মুঠোয় ধরল। তার মানে ওরও মনে হয়েছে, এখানে একটা খুব গোলমেলে কোনো ব্যাপার চলছে। নাহলে এত গোপনীয়তা কেন?

আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। রনো মাথাটা ঝাঁকিয়ে ওই বাড়ির দিকে এমন একটা ইশারা করল, যার একটাই মানে হয়—চল! ব্যাপারটা দেখে আসি।

খুশি হলাম। মনে পড়ে গেল ক্লাস-ফাইভে পড়ার সময় একবার আমরা দু’জনে মুক্তেশ্বরী ঘাটে বেঁধে রাখা ইলিশের নৌকা খুলে বর্ষাকালের ভরা গঙ্গায় ভেসে গিয়েছিলাম। সেদিন মরে যেতেই পারতাম, তবে মরিনি। মাঝি-দাদারা অন্য নৌকায় চড়ে আমাদের ভেসে যাওয়া নৌকাকে তাড়া করে ধরেছিলেন বলেই সেদিন বেঁচে ফিরেছিলাম।

আজ অনেক বছর বাদে আরেকবার নীল আর রনোর অভিযান শুরু করাই যায়।

আমি কোমরের পাউচ থেকে আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী সুইস-নাইফটা বার করে, ফলাটা কটেজের পেছনের একটা জানলার পাল্লার নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিলাম। তারপর ভেতর থেকে লাগানো ছিটকিনিটার নীচে ঠিক দুবার জোরালো চাড় দিতেই কটাস শব্দ করে ছিটকিনিটা ভেঙে গেল। পাল্লা ঠেলে দু’জনেই লাফিয়ে নামলাম ঘরটার ভেতরে।

অন্ধকারকে সইয়ে নিতে চোখের কিছুটা সময় লাগে, কিন্তু নাকের সেই সমস্যা নেই। তাই চোখে কিছু দেখতে পাওয়ার আগেই নাকে এসে লাগল বুনসেন বার্নারের গ্যাস, ফর্মালিন আর নানারকম কেমিক্যালের পাঁচমিশেলি সেই গন্ধটা, যেটা নাকে ঢুকলে অবধারিতভাবে স্কুল-কলেজের ল্যাবরেটরির কথা মাথায় আসে।

অন্ধকারে চোখ সয়ে এলে দেখলাম, ঘরটা একটা ল্যাবরেটরিই বটে, তবে স্কুল-কলেজের ল্যাবরেটরির থেকে অনেক বেশি আধুনিক। এখানে কাচের শিশি-বোতলের সংখ্যা কম। জটিল যন্ত্রপাতির সংখ্যা বেশি। একদিকের দেয়ালের গায়ে লম্বা ওয়ার্ক-টেবিলের ওপরে সার দিয়ে সাজানো রয়েছে যে-মেশিনগুলো, তার মধ্যে মাত্র দুটোকে চিনতে পারলাম। সেন্ট্রিফিউজ আর অ্যাক্সিলেটর। বাকিগুলো এতই হাই-ফাই যে, তাদের ছবিও কখনো দেখেছি বলে মনে হল না।

আর দেখলাম, ঘরের মেঝের নানান জায়গায় নামানো রয়েছে বেশ কয়েকটা দুধসাদা বাক্স। তাদের নানারকমের সাইজ। সবচেয়ে ছোটটা কোল্ড-ড্রিঙ্কসের ক্রেটের মতন। সবচেয়ে বড়টা প্রায় একটা বড়সড় আলমারির সাইজের। তবে সেই আলমারি দেয়ালের গায়ে খাড়া করে রাখা নেই, মাটির ওপরে লম্বালম্বি পাতা রয়েছে। আর এই ছোট আর বড়র মাঝখানে রয়েছে আরও তিনখানা সাদা বাক্স। মোট পাঁচটা।

হাসপাতালের ইন্টেন্সিভ-কেয়ার-ইউনিটের রোগিদের শরীরের সঙ্গে লাগানো মনিটরের স্ক্রিনে যেমন সারাক্ষণ হৃদস্পন্দনের গ্রাফ ফুটে ওঠে, এই বাক্সগুলোর গায়ে লাগানো মনিটরেও সেরকম গ্রাফের ওঠানামা দেখা যাচ্ছিল। আর ছিল সাধারণ ডিজিটাল থার্মোমিটার; তাদের রিডিং যদি ঠিক হয় তাহলে প্রতিটি বাক্সের ভেতরের তাপমান শূন্যের অনেক নীচে।

অত্যাধুনিক সব কন্ডেন্সার, ক্যাপাসিটরের মধ্যে দিয়ে এসে প্রতিটি বাক্সের সঙ্গেই মিশেছে একটা করে ইলেকট্রিকের তার। প্রতিটি বাক্সের ভেতর থেকে খুব মৃদু গুনগুন আওয়াজ বেরিয়ে আসছে। ভূতুড়ে বাড়িতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল-লাইনের প্রয়োজনটা স্পষ্ট হল।

কিন্তু একইসঙ্গে কয়েকটা জরুরি প্রশ্ন মাথার মধ্যে রাগী বোলতার মতন বোঁ বোঁ করে ঘুরতে শুরু করে দিল।

প্রশ্ন এক—এই ল্যাবরেটরির গবেষকটি কে?

প্রশ্ন দুই—সারা পৃথিবীতে যখন একা গবেষণা করার রেওয়াজটা উঠেই গিয়েছে, তখন কেন কেউ এমন ভয়ঙ্কর নির্জন জায়গায় লুকিয়ে গবেষণা করছেন? এমন গোপনীয়তার কারণটা কী?

এবং প্রশ্ন তিন—কী নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি?

প্রথম দুটো প্রশ্নের উত্তর ল্যাবরেটরির মালিকের সঙ্গে দেখা না হলে জানা মুশকিল। তবে শেষ প্রশ্নটার উত্তর আমরা নিজেরাই খোঁজার চেষ্টা করতে পারি। রনোকে বললাম, ‘তুই সামনের দিকের একটা জানলার পাল্লা অল্প ফাঁক করে কটেজে পৌঁছনোর রাস্তাটার দিকে চোখ রাখ। কাউকে আসতে দেখলে বলবি; পেছনের জানলা গলে পালাব।’ রনো বারান্দায় বেরিয়ে যেতেই আমি সবচেয়ে ছোট বাক্সটার ডালা খুলে ফেললাম আর সঙ্গে সঙ্গেই একরাশ হিমঠান্ডা কুয়াশা বাক্স থেকে কুণ্ডলি পাকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

এদিক-ওদিক তাকিয়ে যা খুঁজছিলাম, পেয়ে গেলাম। দেয়ালের একটা হুকে টাঙানো ছিল কনুই পর্যন্ত ঢাকা দুটো রাবার-গ্লাভস। গ্লাভস দুটো হাতে পরে নিয়ে, বাক্সর মধ্যে থেকে একটা ছোট ট্রে তুলে আনলাম। ট্রের মধ্যে শোয়ানো ছিল একটা গিনিপিগ। জমে বরফ হয়ে গেছে তার শরীর। জমে যাওয়ারই কথা, কারণ, যে-বাক্সটার মধ্যে খুদে প্রাণীটি শুয়েছিল, তার ভেতরের তাপমাত্রা শূন্যের চার-ডিগ্রি নীচে। থার্মোমিটার তাই দেখাচ্ছে।

এই টেম্পারেচারে প্রাণীটার বেঁচে থাকার কথা নয়। এমনিতে জীবনের কোনো লক্ষণ দেখাও যাচ্ছে না। তবু কার্ডিয়াক-মনিটর দেখাচ্ছে হৃদস্পন্দন। খুব ধীরে ধীরে একটা আলোর ঢেউ স্ক্রিনের বাঁ-দিক থেকে গড়িয়ে যাচ্ছে ডানদিকে—মিলিয়ে যাচ্ছে—আবার নতুন করে ঢেউ গড়াতে শুরু করছে।

কেমন করে এটা সম্ভব হচ্ছে?

আমি চাপা গলায় ডাক দিলাম, ‘রনো। একবার শুনে যা তো।’

রনো পা টিপে-টিপে ঘরে ঢুকে আমার পাশে দাঁড়াল। ওকে আমি ইশারায় পরপর আমার হাতে ধরে থাকা গিনিপিগ, বাক্সের গায়ের থার্মোমিটার আর কার্ডিয়াক মনিটরের দিকে দেখালাম। রনোর ভুরুদুটো সঙ্গেসঙ্গেই কুঁচকে গেল। ও আপনমনে বলল, ‘কবে থেকে এটা ওই টেম্পারেচারে রয়েছে? সামহোয়ার দেয়ার মাস্ট বি অ্যান ইন্ডিকেশন। এই তো।’

বাক্সটার গায়ের সঙ্গে নাক লাগিয়ে খুঁজতে খুঁজতে ও পেয়ে গেল একটা ছোট কাগজের লেবেল, যেখানে অন্য দুয়েকটা ইনফর্মেশনের সঙ্গেই লেখা আছে এক্সপেরিমেন্ট শুরুর দিনটা।

রনো সাবধানতা ভুলে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘ইনক্রেডিবল! অবিশ্বাস্য!’

‘আস্তে!’ আমি ওর মুখ চেপে ধরলাম। বললাম, ‘কী হল? এক্সাইটেড হয়ে পড়লি কেন?’

‘এক্সাইটেড হবো না?’ মুখ থেকে আমার হাতটা সরিয়ে দিয়ে রনো উদভ্রান্তের মতন বলে উঠল। ‘এই তারিখটা দ্যাখ। পাঁচ মাস আগের তারিখ। তার মানে, পাঁচমাস ধরে বিলো দা ফ্রিজিং-পয়েন্টে বেঁচে রয়েছে এই গিনিপিগটা। বুঝতে পারছিস, এটা কী বিশাল ব্রেক থ্রু?’

আমি বোকার মতন মাথা নাড়লাম। সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না যে, এটাকে ও যুগান্তকারী ঘটনা বলে ভাবছে কেন।

রনোই বুঝিয়ে দিল। বলল, ‘ক্রায়ো-প্রিজার্ভেশনের কথা শুনেছিস? খুব ঠান্ডার মধ্যে রেখে প্রাণী কিম্বা উদ্ভিদের শরীরের কোষ আর টিসুকে অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখার বিজ্ঞানের নাম ক্রায়ো-প্রিজার্ভেশন। তবে তার দৌড় এতদিন ছিল ওই সেল আর টিস্যু পর্যন্তই। ওর চেয়ে বড় কোনো প্রাণীকে ক্রায়ো-প্রিজার্ভ করতে গেলেই কোষের ভেতরে আর বাইরে আইস-ক্রিস্টাল জমে যাচ্ছিল। সেই আইস-ক্রিস্টাল কোষকে ভেঙে ফেলছিল। আরও হাজার রকমের অসুবিধে ছিল, তুই বুঝবি না।’

আমি বললাম, ‘দরকার নেই বোঝানোর। তুই বলে যা।’

‘হ্যাঁ, যা বলছিলাম। ওই কোষ কিম্বা টিস্যুর মতন ছোটখাটো জিনিসকেই বৈজ্ঞানিকেরা বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন। মেডিক্যাল-সায়েন্সে ক্রায়ো-প্রিজার্ভেশনের ব্যবহারও হচ্ছিল নানান ভাবে। কিন্তু আস্ত একটা প্রাণীকে ক্রায়ো-প্রিজার্ভ করার দরকারটা দিন দিন বেড়ে চলেছিল। বিশেষত মানুষকে।’

আমি বললাম, ‘ওরে বাবা! জিন্দা লোককে ফ্রিজে ঢোকাতে চাইছিল? কিন্তু তাতে লাভ?’

‘লাভ?’ রনো বলল, ‘এতদিন পর্যন্ত মানুষকে নিয়ে এমন কোনো স্পেস-ট্র্যাভেলের কথা ভাবা যেত না, যে-যাত্রার ডিউরেশন খুব লম্বা; ধরা যাক ষাট কিম্বা সত্তর-বছর। কারণ অমন লম্বা জার্নির শেষে স্পেসশিপ হয়তো তার লক্ষ্যে পৌঁছত, কিন্তু সেই স্পেসশিপের ভেতরে মহাকাশচারীরা সম্ভবত বেঁচে থাকতেন না। মানুষের আয়ুর তো সীমা আছে।

‘কিন্তু এখন চোখের সামনে যা দেখেছি, তাতে তো মনে হচ্ছে এরপর থেকে তাঁরা বেঁচে থাকবেন—হিমায়িত অবস্থায়। ডেস্টিনেশনে পৌঁছনোর পরে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় তাঁদের শরীরের হিমের আবরণ গলে যাবে। ষাট-সত্তর বছর কিম্বা আরও দীর্ঘ সময়ের ঘুম ভেঙে মহাকাশচারীরা পা রাখবেন অনেক দূরের কোনো গ্রহে।’

রনোর কথা শোনার পরে কেন জঙ্গলের মধ্যে ল্যাবরেটরির প্রয়োজন পড়েছে, সেটা যেন একটু-একটু মাথায় ঢুকছিল। এমন দামি গবেষণা যদি সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন সেটাকে একটু লোকজনের চোখের আড়ালে রাখাই উচিত। রিসার্চ পেপার চুরির অনেক ঘটনাই কাগজে পড়েছি।

এরপর আমরা খুব দ্রুত দুই, তিন আর চার নম্বর বাক্সের ভেতরের স্পেশিমেনগুলোকেও দেখে নিলাম। যেমন যেমন স্পেশিমেনের সাইজ বেড়েছে তেমন তেমন বড় বাক্সের প্রয়োজন হয়েছে। গিনিপিগের পরে বেরিয়ে এল একটা বাঁদর, একটা পথের কুকুর আর প্রমাণ সাইজের একটা হনুমান। প্রত্যেকেরই শরীরের সঙ্গে লাগানো কার্ডিয়াক-মনিটর সচল। দেখে মনে হচ্ছে ওরা মারা গেছে কিন্তু আসলে ওদের শরীরের কাজকর্ম একেবারে থেমে যায়নি। ক্ষীণ হয়ে গেছে কেবল।

আমি জন্তুগুলোকে একবার করে দেখে নিয়েই, আবার যত্ন করে তাদের বরফের বিছানায় ফিরিয়ে দিলাম।

এবার সেই পাঁচ-নম্বর আলমারিমার্কা বাক্সটার ডালায় হাত দিলাম। আমার বুকটা প্রবলভাবে ঢিব ঢিব করতে শুরু করল। মন বলছিল, এই বাক্সে একজন হিমায়িত মানুষ থাকবে।

চট করে বাক্সের ডালাটা খুলে আমি হাতটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম। হাতটা এদিক ওদিক ঘোরালাম কয়েকবার কিন্তু আঙুলের ডগায় কিছুই ঠেকল না। তখন মাথাটা প্রায় বাক্সের ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে, ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় তন্নতন্ন করে বাক্সের ভেতরটা দেখলাম। নাঃ, কিছুই নেই। শুধু রাশি রাশি কৃত্রিম-তুষার। শুধুই কুয়াশার কুণ্ডলি।

কোথায় গেল পাঁচ-নম্বর স্পেশিমেন?

রনোও আমারই মতন অবাক। বলল, ‘তাহলে? এবার কী করবি নীল?’

আমি বললাম, ‘এই মুহূর্তে বিশেষ কিছু করার নেই। অন্য ঘরটা একবার দেখে নিয়ে ভালোয়-ভালোয় বেরিয়ে যাই।’

ল্যাবরেটরি-ঘর থেকে বেরিয়ে এবার পাশের ঘরটায় ঢুকলাম। হাতের মুঠোয় আড়াল করে রাখা মোবাইল-ফ্ল্যাশের আলোটা সাবধানে একবার ঘুরিয়ে আনলাম পুরো ঘরটার চারপাশে। বোঝাই যায় এটা কাজের ঘর নয়, বই পড়ার আর শোবার ঘর। ঘরটার একপাশে একটা বড়সড় খাট। একটা টেবিলের দুপাশে দুটো চেয়ার। টেবিলের ওপরে আর দুটো কাঠের আলমারিতে স্তূপীকৃত বই আর ম্যাগাজিন—সবই ইংরিজিতে লেখা।

বইগুলোর ওপরে একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিলাম। দেখলাম সবই অত্যন্ত অ্যাডভান্সড লেভেলের রেফারেন্স বুক। তাদের দুটো বিষয়ে ভাগ করা যায়। এক, ক্রায়ো-বায়োলজি। আর দুই, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং।

খুবই আশ্চর্য লাগছিল। ভাবছিলাম, একইসঙ্গে এমন দুটো দুরূহ বিষয়ের ওপরে কোনো একজন মানুষের দখল থাকতে পারে কি? কয়েকটা বইয়ের মলাট ওল্টাতেই রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল। একজন নয়, দু’জন মানুষের বই রয়েছে এই টেবিলের ওপরে। একজনের নাম কার্তিকেয়ন আয়েঙ্গার। আরেকজনের নাম বৃষ্টি দত্ত আয়েঙ্গার। স্বামী-স্ত্রী অবশ্যই। বিজ্ঞানী দম্পতি।

টেবিলের একদিকে একটা মাউসপ্যাড পড়ে রয়েছে। তার মানে ওখানে কম্পিউটারও ছিল। এখন আর নেই। থাকলে হয়তো আরও অনেক কিছুই জানতে পারতাম।

আমাদের সেই সন্ধের আউট-হাউস অভিযানে আর একটাই মাত্র ইন্টারেস্টিং জিনিস চোখে পড়েছিল। টেবিলে নয়, বিছানার ওপরে নামানো ছিল একটা ম্যাগাজিন, যেটার নাম গ্রিনফিল্ড। একটা কাজ চালানোর মতন কাগজের পেজমার্ক ম্যাগাজিনটার একজায়গায় ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পাতাটা খুলে দেখলাম, ওখান থেকেই শুরু হয়েছে গোমুখ উপত্যকায় শূন্যের বারো ডিগ্রি নীচে যে ছোট্ট ব্যাঙগুলো টানা ছমাস বরফের নীচে ঘুমিয়ে থাকে, তাদের পুরো জীবনচক্রের ছবি নিয়ে নীল চ্যাটার্জির ফোটো ফিচার।

দীপন শুক্লা যে আয়েঙ্গার দম্পতির বইয়ের সংগ্রহ থেকেই এই প্রবন্ধটা পড়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, বৃষ্টি আর কার্তিকেয়নের সঙ্গে ওর যোগাযোগটা কোন সূত্রে? আর সেই প্রতিভাবান দম্পতি এখন কোথায়?

আর কিছু ভাববার বা দেখবার আগেই দূর থেকে ছাদের ওপর ভারী পাথর গড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার মতন একটা চাপা গুমগুম শব্দ ভেসে এল। হার্লে ডেভিডসনের পৃথিবী বিখ্যাত ‘বুমিং’—ও আওয়াজ ভুল করার প্রশ্নই নেই। আমি আর রনো বিদ্যুৎগতিতে জানলা গলে বাইরের মাঠে লাফিয়ে পড়লাম। যে গাছপালা আর ঝোপঝাড়গুলোকে আসবার পথে মনে হয়েছিল আপদ, পালাবার সময় সেগুলোই আমাদের আড়ালের কাজ করল। নিরাপদ দূরত্বে চলে আসার পর একবার গাছের আড়াল থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম, দীপন শুক্লা পকেট থেকে চাবি বার করে আউট-হাউসের দরজা খুলছে। রনোকে জিগ্যেস করলাম, ‘জানলার পাল্লাটা চেপেচুপে লাগিয়ে দিয়েছিলিস তো?’

রনো বলল, ‘সে-তো লাগিয়েছি। কিন্তু দীপন যদি এখনই ফিরে আসে তাহলে কোথায় লুকোবি সেটা ঠিক করেছিস কি?’

গ্রামের পথ দিয়ে জোরে পা চালাতে চালাতে বললাম, ‘সেটাই ভাবছি। রাস্তা তো এই একটাই। লুকোবো কোথায়?’

বলতে না বলতেই কানে এল বাইকের আওয়াজ। সত্যিই দীপন শুক্লা ফিরে আসছে। এত তাড়াতাড়ি ফিরে এল কেন? ঘরের ভেতরে ঢুকে ও কি এমন কিছু দেখেছে যাতে আমরা ওখানে ঢুকেছিলাম সেটা বোঝা যায়? সেটা কী? জুতোর কাদার ছাপ? জানলার ভাঙা ছিটকিনি?

যাই হোক, তা নিয়ে এখন ভেবে লাভ নেই। এখন শুধু এটাই সত্যি যে, দীপন আমাদের ধরতে আসছে। অতএব আমাদের রাস্তা থেকে সরতে হবে। কিন্তু সরব কোথায়? যে-জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি সেখানে দুদিকেই গায়ে-গায়ে লাগানো কুঁড়ে ঘর। তাদেরও আবার দরজা-জানলা বন্ধ।

হঠাৎ সেরকমই একটা ঘরের দরজা খুলে গেল। খুব রোগা আর লম্বা একজন ভদ্রলোক চটপট আমাদের দিকে এগিয়ে এসে দুহাতে আমাদের দু’জনের কাঁধ দুটো চেপে ধরে নরম গলায় বললেন, ‘আমি কে, কেন এসব করছি—সেসব পরে শুনবেন। শেল্টার খুঁজছেন তো? আমার ঘরে ঢুকে পড়ুন। দীপন ইজ আ ভেরি গুড শ্যুটার।’

তাঁর কথায় রনোর ভেতরের আর্মি-অফিসার জেগে উঠল। ফোঁস করে উঠে বলল, ‘তো? গুলি কি ও একাই চালাতে পারে নাকি?’

ভদ্রলোক বললেন, ‘না, আপনিও হয়তো পারেন। কিন্তু মানুষ খুন করতে আপনার হাত কাঁপবে। ওর কাঁপবে না। আর গাথরি হিলসে দুটো লাশ গুম করা দীপনের পক্ষে যত সহজ, আপনার পক্ষে ততটা নয়। আরও কারণ আছে, পরে শুনবেন। চলুন।’ এই বলে তিনি হ্যাঁচকা টান দিয়ে আমাদের দু’জনকে ওর ঘরের ভেতরে ঢুকিয়ে দরজাটা আলতো হাতে ভেজিয়ে দিলেন আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সদ্য টেক-অফ করা এরোপ্লেনের মতন আওয়াজ তুলে সেই কুড়েঘরের সামনে দিয়ে বেরিয়ে গেল দীপন শুক্লার হার্লে ডেভিডসন।

চার

তার পরেও প্রায় মিনিট-দুয়েক আমি, রনো আর ঘরের মালিক সেই লোকটি দেয়ালে হেলান দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। দীপন শুক্লার বাইকের আওয়াজ পুরোপুরি মিলিয়ে যাবার পরে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে লোকটা বলল, ‘বড় জোর বাঁচা বেঁচে গেলেন। চলুন, এবার শান্তিতে বসে দুটো কথা বলা যাক।’

রনো এতক্ষণ ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ আমাদের সেই উদ্ধারকর্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘একটা কথা বলুন তো। বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে কেমন করে বুঝলেন, বাইরে দু’জন মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেমন করে বুঝলেন, দীপনের সামনে তারা পড়তে চাইছে না।’

তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘ইসমে কোই ম্যাজিক-উজিক নেহি হ্যায় জি। ঘরটা মোটেই পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। আমি একটা জানলার পাল্লা অল্প ফাঁক করে বাইরের দিকে চোখ রেখে বসেছিলাম। গাথরির রাস্তায় দীপনের বাইকের আওয়াজ পাওয়া গেলেই আমি এইভাবে নজর রাখি। তারপর যখন দেখলাম, দু’জন বাইরের লোক প্রায় দৌড়তে দৌড়তে এদিকে আসছেন আর তাদের পেছনে পেছনে ধাওয়া করে আসছে দীপনের মোটরবাইকের আওয়াজ, তখনই ঠিক করে ফেললাম, আগে ওই ইনসান দু’জনকে বাঁচাই। তারপরে জানব তারা কে। মামলাটা কী।’

‘আপনি দীপনের দিকে নজর রাখেন কেন?’

‘তার কারণ, দীপন এই গ্রামে আসে কোনো না কোনো ক্রাইমের কানেকশানে। গাথরি গ্রামটাকে বলতে পারেন ওর “ডেন”। দীপনের বাবা কিম্বা দাদুর আমলে এই গ্রামের যে-মানুষগুলো শুক্লাসুধা কোম্পানিতে ওষুধ বানানোর কাজ করে দিন গুজরান করত, তাদেরই ছেলে কিম্বা নাতিদের দীপন অনেক সহজে অনেক বেশি পয়সা রোজগার করার রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। তারাই এখন গাথরিতে মেজরিটি। দীপন শেঠ বললে তারা করবে না এমন কাজ নেই।’

রনো অবাক হয়ে বলল, ‘তাই নাকি! কেমন সেই রাস্তা শুনি।’

ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, ‘স্মাগলিং-এর রাস্তা। তবে এখনই সবকথা আপনাদের বলব না। আগে আপনাদের থেকেও কিছু শুনি। দীপন কাউকে তাড়া করলেই যে সে ভালোমানুষের দলে পড়বে এমন তো কোনো গ্যারান্টি নেই। মস্তানদের মধ্যেও গ্যাং-ওয়ার থাকে।’

শুধু কথার মধ্যে নয়, ভদ্রলোকের চোখের মণিতে আর ঠোঁটের হাসিতেও এমন একটা বাচ্চাছেলের মতন বিচ্ছুমি ছিল যে, রাগ করতে পারলাম না। বরং আমি আর রনো দু’জনেই হেসে ফেললাম।

আমাদের দু’জনকে দুটো চেয়ারে বসতে দিয়ে ভদ্রলোক নিজে চৌকির ওপরে পা তুলে বসলেন। তারপর বললেন, ‘অধমের নাম বদ্রিনাথ। বদ্রিনাথ সিং। এটা আমারই গরিবখানা।’ তারপর বদ্রিনাথজি গলা তুলে ডাক দিলেন, ‘তুয়া! তুয়া মাইয়া! একটা বাত্তি দিয়ে যা তো বিটিয়া!’

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের অন্যদিকের একটা দরজা খুলে একটা ছোট্ট মেয়ে ঘরে ঢুকল। হাতে একটা কেরোসিনের ল্যাম্প। মেয়েটার বয়স হবে বছর বারো-তেরো। ফুলের মতন সুন্দর মুখ। কপালের ওপরে বাদামি চুলের গুছিগুলো বাতির আলোয় সোনার সুতোর মতন ঝলমল করছিল। ল্যাম্পটা টেবলের ওপর নামিয়ে রেখে, চুলগুলো কপালের ওপর থেকে সরিয়ে মেয়েটা বলল, ‘চায় বানাকে লাউ দাদাজি?’

‘হাঁ, হাঁ, জরুর বেটি। যাও, মেহেমানোকে লিয়ে বড়িয়াসা আরু-চায় বানাকে লাও।’

মেয়েটা একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

রনো বলল, ‘ভারি মিষ্টি নাতনি আপনার। নামটাও ভারি সুন্দর। তুয়া!’

বদ্রিনাথজি বললেন, ‘তুয়া আমাদের গ্রামের দেবীর নাম। দেবীর নামেই আমাদের গ্রামেরও নাম তুয়াটোলি।’

কথাটা শুনেই শক খাওয়ার মতন চমকে উঠলাম। তারপর আমি আর রনো একসঙ্গেই ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকালাম। এতক্ষণ একটা মাত্র লণ্ঠনের কমজোরি আলোয় তাঁকে ভালো করে দেখতে পাইনি। এইবার দেখলাম। বয়স ষাটের কিছু ওপরেই হবে। মাথার চুলগুলো বেশিরভাগই সাদা, কিন্তু চাবুকের মতন শক্ত আর সোজা চেহারা। মুখের চামড়ায়, হাতের খোলা অংশে আর চোখের নীচে সেইরকম কাটাকুটি আর ঝলসানো দাগ, বছরের পর বছর কোনো রুক্ষ্ম জায়গায় বাস করলে যেরকম দাগ আপনা থেকেই চেহারায় খোদাই হয়ে যায়।

কোনোরকমে জিগ্যেস করলাম, ‘আপনি তুয়াটোলির বাসিন্দা?’

বদ্রিনাথ ম্লান হেসে উত্তর দিলেন, ‘ছিলাম—বিশ-বরষ আগে। আমার যখন চুয়াল্লিশ-বছর বয়স, তখন আমাদের গ্রামে সেই দুর্ঘটনাটা ঘটে যায়। জানেন নিশ্চয়ই সেই অ্যাকসিডেন্টের কথা?’

‘জানি।’ রনো বলল।

‘তখন থেকেই দেরাদুনে ডেরা বেঁধেছি। আর্মি থেকে একটা ছোটখাটো চাকরি দেওয়া হয়েছিল। চার বছর আগে রিটায়ার করার পরে মার্কেটের মধ্যে একটা ছোট দোকান খুলেছি—স্যুভেনিয়র-শপ।’

দেরাদুনের ব্যবসার খারাপ হাল নিয়ে কিছু কথা বলতে বলতেই তুয়া আবার ঘরে ঢুকল। একটা ট্রেতে করে তিন কাপ চা আর সেঁউভাজা আমাদের সামনে নামিয়ে রেখে তুড়িলাফ মেরে ভেতরবাড়ির দিকে পালিয়ে গেল। বদ্রিনাথ কেমন একটা একইসঙ্গে মায়া আর দুঃখ মেশানো দৃষ্টিতে ওর চলে যাওয়াটা দেখলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘নিন, চা নিন।’

লিকার চা। প্রথম চুমুকেই সুন্দর চনমনে একটা গন্ধে প্রাণ জুড়িয়ে গেল।

বদ্রিনাথজি মুচকি হেসে বললেন, ‘কেমন লাগছে? গন্ধটা চিনতে পারছেন?’

‘উঁহু।’ মাথা নাড়লাম।

‘অ্যাপ্রিকটের জুস। আমরা বলি আরু। তুয়াটোলির লোকেদের খুব প্রিয় এই আরু। ওখানে তো গ্রাম থেকে একটু নীচে নামলেই অ্যাপ্রিকটের জঙ্গল ছিল। এখানে খুব কষ্ট করে অল্পস্বল্প জোগাড় করি।’

চা শেষ করে কাপটা নামিয়ে রেখে আমি রনোর দিকে তাকালাম। বললাম, ‘রনো, আমার মনে হয় বদ্রিনাথজিকে আমাদের সব কথা খুলে বলাই ভালো। দীপন যে খুব সহজ লোক নয় সে ব্যাপারটা এখন পরিষ্কার। কিন্তু তুয়াটোলির রহস্যটা কী, সেটা বদ্রিনাথজি হেল্প না করলে আমরা বুঝতে পারব না।’

রনো বলল, ‘একদম ঠিক বলেছিস। তুই শুরু কর।’

বদ্রিনাথ সিং-কে প্রথমে আমার আর রণজিতের পরিচয় দিলাম। তারপর আমরা দু’জনে মিলে তাঁকে সমস্ত কথা খুলে বললাম। শিলাজিতের খোঁজে তুয়াটোলিতে দীপনের লোক পাঠানোর কথা, সেখানে অদ্ভুত জন্তু কিম্বা দানোর আনাগোনার কথা এবং শেষকালে আজ একটু আগে আমরা এই গ্রামেরই গোপন ল্যাবরেটরিতে আয়েঙ্গার-দম্পতির যে আশ্চর্য আবিষ্কারের খোঁজ পেয়েছি তার কথা।

তিনি সবটাই মন দিয়ে শুনলেন। তারপর গলাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে বললেন, ‘এবার আমি যা জানি সেগুলো বলে যাচ্ছি, শুনে যান। দীপন আপনাদের যা বলেছে, তার মধ্যে অনেক মিথ্যে রয়েছে। থাকবে যে, সেটাই স্বাভাবিক। সত্যিগুলো তো বলার মতন নয়।

‘প্রথম কথা হচ্ছে দীপন শুক্লার শিলাজিত সম্বন্ধে কোনো ইন্টারেস্ট নেই। কোনোকালেই ছিল না। কারণ, ও হার্বাল-মেডিসিনের ব্যবসা করে না। শুক্লাসুধার কারখানার হাল আপনারা নিজের চোখেই দেখে এলেন। ও যেটা করে সেটা হচ্ছে ‘ফেক এক্সপোর্ট’। নকল কাগজপত্র বানিয়ে দেখায় যেন কোটি-কোটি টাকার মাল রপ্তানি করছে। সেসব পেপারের মধ্যে আপনাদের আর্মির পারমিশন, ফরেস্ট-ডিপার্টমেন্টের পারমিশন সবই রাখতে হয়। তা না হলে ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য হয় না।

‘ফেক এক্সপোর্টের ব্যবসায় ওর দুরকমের ফায়দা থাকে। এক, বর্ডারের ওপাশ থেকে চাইনিজ-মাল স্মাগলিং করে এদিকে এনে বিক্রি করে ও যে ব্ল্যাকমানি কামায়, ইনকাম-ট্যাক্সের কাছে সেটাকে এক্সপোর্টের ব্যবসার লাভ বলে দেখায়। আর দুই, এক্সপোর্টের ব্যবসায়ীদের জন্য সরকার থেকে যে বিশাল আর্থিক সুবিধেগুলো দেওয়া হয়, সেগুলোও এনজয় করে। ওর এই জড়িবুটির ব্যবসার কথাটা হল প্রথম মিথ্যে।’

রনো বলল, ‘আপনি এত কথা জানলেন কেমন করে?’

বদ্রিনাথজি বললেন, ‘উত্তর পেয়ে যাবেন। সবটা শুনুন আগে। দীপনের দ্বিতীয় মিথ্যেটা ফাঁস করার আগে আপনাদের বৃষ্টি দত্ত আয়েঙ্গার আর কার্তিকেয়ন আয়েঙ্গার সম্বন্ধে যতটুকু জানি বলি। আজ থেকে ছ’মাস আগে তাঁরা দু’জন দেরাদুনে এসে স্বেচ্ছায় দীপন শুক্লার সঙ্গে দেখা করে ওর সাহায্য চান।

‘বৃষ্টি আর কার্তিকেয়ন দু’জনেই ছিলেন এলাহাবাদের কলেজে দীপনের সহপাঠী। কলেজ থেকে বেরিয়েই অবশ্য দীপন শুক্লা আর আয়েঙ্গারদের রাস্তা আলাদা হয়ে যায়। দীপন ছিল সাদামাটা ছাত্র। তার ওপরে ওর পয়সার লালচ বরাবরই খুব বেশি। উল্টোদিকে তাঁরা দু’জনেই ছিলেন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে বৃষ্টি আর কার্তিকেয়ন একটা আমেরিকান ইনস্টিটিউটে রিসার্চ-স্কলারের কাজ নিয়ে চলে যান। কিন্তু বছর দুয়েকের মাথায়, রিসার্চ একটা জায়গায় পৌঁছনোর পরে তাঁরা বুঝতে পারেন যে, তাঁদের পেপারস চুরি করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। দু’জনেই পালিয়ে ভারতে ফিরে আসেন এবং এখানে কাজ শুরু করার জন্যে দীপনের সাহায্য চান।

‘বন্ধু বন্ধুর কাছে সাহায্য চাইবেন, এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। শুধু তাঁরা জানতেন না, কলেজ ছাড়ার পরের পাঁচটা বছরে দীপন এত নীচে নেমে গেছে, এমন অন্ধকার জগতের লোক হয়ে গেছে ও। জানলে নিশ্চয় তাঁরা দীপনের ত্রিসীমানার মধ্যে আসতেন না।’

রনো প্রশ্ন করল, ‘ঠিক কেমন সাহায্য চেয়েছিলেন তাঁরা?’

বদ্রিনাথজি বললেন, ‘প্রথমে তাঁরা শুধু গোপন একটা ডেরার খোঁজই করেছিলেন। দীপন ওদের এই গাথরি হিলসের ঘরটা অ্যারেঞ্জ করে দিয়েছিল। ওই ল্যাবরেটরির মধ্যেই তাঁরা শীতঘুমের মধ্যে দিয়ে কোনো-কোনো প্রাণীকে বহুকাল বাঁচিয়ে রাখার টেকনিক আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন।

‘দীপন যেমন ঘাটিয়া ইনসান, তাতে আমার স্থির বিশ্বাস, বন্ধুদের ওপর ভালোবাসায় ও এসব করেনি। তাঁদের রিসার্চ সাকসেসফুল হলে দীপন নিশ্চয় তার রেজাল্ট হাতিয়ে নিত।

‘কিন্তু তাঁদের রিসার্চ সাকসেসফুল হয়নি। এমন একটা গাঁটে আটকে গিয়েছিলেন, যে-গাঁট তাঁরা ল্যাবরেটরির মধ্যে ছাড়াতে পারছিলেন না। তাই তাঁরা এবার দীপনকে বললেন, এমন একটা জায়গায় রিসার্চের যন্ত্রপাতি সমেত তাঁদের পৌঁছে দিতে হবে, যে-জায়গাটা একইসঙ্গে হবে বরফে ঢাকা, নির্জন, জনমানবশূন্য। দীপন মনেপ্রাণে ওদের সাফল্য চাইছিল। তাতে ওরই লাভ হতো। তাই ও রাজি হয়ে গেল।

‘হিমালয়ে বরফে ঢাকা জায়গার অভাব নেই। কিন্তু নির্জন? নাঃ। আজকালকার দিনে সত্যিকারের জনমানবশূন্য জায়গা বলতে যা বোঝায় তা হিমালয়েও নেই, সাহারাতেও নয়। প্রতিটি জায়গায় আর্মির লোকের যাতায়াত আছে, টুরিস্ট আছে। যেখানে টুরিস্ট যায় না, সেখানেও ট্রেকাররা যায়, ক্লাইম্বাররা যায়। একমাত্র একটা জায়গার কথাই দীপনের জানা ছিল যেখানে কেউই যায় না। সে জায়গাটার নাম তুয়াটোলি। সত্যিকারের জনমানবশূন্য জায়গা।

‘তুয়াটোলিতে কেউ যেতে চায় না, কারণ, বিজ্ঞানীরা যতই বলুন রেডিয়েশনের বিপদ আর নেই, কেউই সেই কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। বিজ্ঞানীরা কি ওই বিশাল ভ্যালির সমস্ত কোনায় গিয়ে রেডিয়েশনের মাত্রা মেপে দেখেছেন? তাহলে কেমন করে নিশ্চিত হচ্ছেন?

‘বৃষ্টি আর কার্তিকেয়ন আয়েঙ্গারকে দীপন তাদের মালপত্র সমেত তুয়াটোলিতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করল। তাঁদের কাছে সবরকমের আধুনিক গিয়ার্স ছিল। শুনেছি নর্থ-পোলে রিসার্চাররা যে ধরনের ইকুইপমেন্টস ব্যবহার করেন, সেইসব টেন্ট, জ্যাকেট, স্লিপিং ব্যাগ আর ক্যানড-ফুড তাঁরা ইওরোপের বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে আনিয়েছিলেন।

‘কিন্তু তবু তাঁরা দু’জনেই ছিলেন সমতলের মানুষ—একজন বাংলার আরেকজন তামিলনাডুর। হাই-অলটিচ্যুডে একটানা একমাস থাকতে গেলে পাহাড়কে হাতের তালুর মতন চিনতে হয়। পাহাড়ের খামখেয়াল, পাহাড়ের হিংস্রতা সবকিছু জানতে হয়। সমতলের মানুষ হিসেবে সেটা তাঁরা জানতেন না। তাই তাঁরা সবাই মিলেই ঠিক করলেন, একজন গাইডকে নিয়ে যাবেন, যে হবে একইসঙ্গে বিশ্বাসী, আর পাহাড়ের ব্যাপারে অভিজ্ঞ।

‘সেরকম একজন হাতের কাছেই ছিল। এই গ্রামেই তার বাড়ি, নাম করণজিৎ সিং। সবাই ডাকত করণ বলে। করণের যেটা বাড়তি সুবিধে ছিল, তার আটত্রিশ-বছর বয়সের মধ্যে প্রথম আঠারোটা বছর সে তুয়াটোলিতেই কাটিয়েছিল। তুয়াটোলির রাস্তাঘাট সে ভোলেনি। কাজেই দু’মাস আগে বৃষ্টি আর কার্তিকেয়ন তাদের গবেষণার কাজ শেষ করার জন্যে তুয়াটোলি চলে গেলেন। সঙ্গে গেল করণ।

‘বুঝতেই পারছেন, শিলাজিতের খোঁজে আটজন শ্রমিককে তুয়াটোলি পাঠানো হয়েছিল, এটাই সেই দ্বিতীয় মিথ্যে, যার কথা আপনাদের বলেছিলাম।’

পরের কথাগুলো বলার আগে বদ্রিনাথজি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে রইলেন। যেন কথাগুলো বলার জন্যে নিজের মনেই শক্তি সংগ্রহ করলেন। তারপর হঠাৎ সরাসরি আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একমাস বাদে, মানে অগাস্ট মাসের শুরুতেই তাঁদের ফিরে আসার কথা ছিল। ওদের সঙ্গে একমাসেরই রসদ ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর শেষ হতে চলল—এখনো ওরা কেউই ফেরেনি।’

‘বলেন কি!’ আমরা দু’জনেই একসঙ্গে বলে উঠলাম।

‘হ্যাঁ। অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি আমরা সকলেই বুঝতে পারলাম কোথাও একটা বড়সড় গন্ডগোল হয়েছে। দীপন ঠিক করল ও নিজেই বন্ধুদের খোঁজে তুয়াটোলি যাবে। ওর এই আগ্রহের কারণটা আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারিনি। ওর মতন লোকের কাছে তিনটে মানুষের প্রাণ এমন কিছু দামি নয়। মনে হয়, আয়েঙ্গারদের রিসার্চের শেষ ফলাফলটা দেখার লোভে ওখানে গিয়েছিল।’

আমি বললাম, ‘আরেকটা কারণ থাকতে পারে। কর্ণপ্রয়াগের আর্মি-ক্যাম্পের রেকর্ডে নিশ্চয় রয়েছে বৃষ্টি, কার্তিকেয়ন আর করণের ওখানে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল দীপন শুক্লা। ওরা না ফিরলে দীপন দায়িত্ব এড়াতে পারবে না।’

বদ্রিনাথজি তেতো হেসে বললেন, ‘আমাদের এতক্ষণের কথাবার্তাতেও আপনি দীপনকে চিনতে পারলেন না, চ্যাটার্জি সাহেব? কোথাও কোনো রেকর্ড নেই। দীপন শুক্লা একজন পাক্কা স্মাগলার। ও তিনজনকেই চোরাগোপ্তা রাস্তায় তুয়াটোলি পাঠিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য আয়েঙ্গার-দম্পতিও সেরকমটাই চেয়েছিলেন। রিসার্চ কমপ্লিট হওয়ার আগে কোনো জায়গায় তাঁদের নাম-ঠিকানা থাকুক সেটা তাঁরাও চাননি। আর করণজিৎ তো ছিল হুকুমের চাকর মাত্র। ওর চাওয়া না-চাওয়াতে কারুরই কিছু এসে যায়নি।’

‘দীপন কি ওদের খোঁজে ওখানে একা গিয়েছিল?’ প্রশ্ন করল রনো।

বদ্রিনাথজি বললেন, ‘হ্যাঁ। দীপন পাহাড়ি ছেলে। শরীর-স্বাস্থ্য চমৎকার। স্মাগলিং-এর কাজ সামলাবার জন্যে ওকে সত্যিকারেই ভারত-টিবেট বর্ডারের খতরনাক ভ্যালিগুলোতে ঘোরাফেরা করতে হয়। তাই তুয়াটোলিতে একা গিয়ে ফিরে আসতে ওর অসুবিধে হয়নি। যদিও এত গোপনীয়তা কীসের জন্যে, সেটাও আমি জানি না। সঙ্গে কাউকে নিতেই পারত। কিন্তু নেয়নি।’

‘তারপর?’

‘তার পরে যা হয়েছিল, সে তো আপনারা ওর মুখ থেকেই শুনেছেন। ওই একটা ব্যাপারে ও কোনো মিথ্যেকথা বলেনি। বরফের ওপর ওই পায়ের ছাপ সত্যিই ও দেখেছিল। আর জন্তুটার ডাক আর চেহারার কথা—যেটা ও আপনাদের কাছে লেবারদের অভিজ্ঞতা বলে চালিয়েছে—সেগুলো আসলে ওরই অভিজ্ঞতা। ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। ভয়ের চোটেই দীপন সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল। তবু যেটুকু সময় ও তুয়াটোলিতে ছিল, তার মধ্যে বৃষ্টি, কার্তিকেয়ন কিম্বা করণের কোনো চিহ্ন ও খুঁজে পায়নি। পেলে ও নিশ্চয় অত তাড়াতাড়ি ফিরে আসত না।’

এতক্ষণ বদ্রিনাথজি বেশ উত্তেজিতস্বরে কথা বলছিলেন। হঠাৎই সেই স্বর খাদে নেমে গেল। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন, ‘তিন-তিনটে জলজ্যান্ত মানুষ কোথায় হারিয়ে গেল বলুন তো!’

এর কোনো উত্তর তো আমাদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। তবে আকাশ-পাতাল ভাবতে শুরু করেছিলাম। দীপনের কাছে যা শুনেছিলাম আর এইমাত্র বদ্রিনাথজির মুখ থেকে যা শুনলাম, সব মিলিয়ে চেষ্টা করছিলাম গোটা ঘটনাটাকে সাজাতে।

রনো হঠাৎ বলে উঠল, ‘একই প্রশ্ন আবার করছি বলে কিছু মনে করবেন না সিংজি। আপনি এত কথা জানলেন কেমন করে?’

বদ্রিনাথজি এর উত্তরে যা বললেন, শুনে আমরা দু’জনেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। তিনি বললেন, ‘করণজিৎ সিং আমার ছেলে, ক্যাপ্টেনসাব। আমার একমাত্র সন্তান। কুড়ি-বছর আগে যখন তুয়াটোলি ছেড়ে চলে আসি, তখন আমার বয়স চুয়াল্লিশ আর ওর আঠারো। এই গ্রামের কত ছেলে দীপন শুক্লার কালা-ধান্দায় নাম লিখিয়ে সহজে পয়সা কামানোর রাস্তা ধরেছে। কিন্তু আমার বেটা ট্রেকারদের টিমে গাইডের কাজ করে ইমানদারির সঙ্গে পয়সা রোজগার করত। তবু দীপনের জালে শেষ পর্যন্ত সেই জড়িয়ে গেল।’

হঠাৎ চোখে পড়ল, দরজার পাল্লায় মাথা ঠেকিয়ে চুপ করে আমাদের কথা শুনছে তুয়া। আমাদের তাকাতে দেখে সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে বদ্রিনাথজির পাশে দাঁড়াল। বদ্রিনাথজি নাতনিকে জড়িয়ে ধরলেন। তুয়া কান্না-ভেজা গলায় বলল, ‘বাবা কবে ফিরবে দাদাজি?’

‘এই তো বিটিয়া। ওয়ান মোর উইক। এই আঙ্কল আর আমি যাচ্ছি তোমার বাবাকে ফিরিয়ে আনতে।’

তুয়া ওর বড়-বড়, ভেজা-ভেজা চোখদুটো সরাসরি আমার চোখে রেখে জিগ্যেস করল, ‘দাদাজি ঠিক বলছে গো আঙ্কল? তোমরা যাবে?’

তুয়ার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে বদ্রিনাথজির মুখের দিকে তাকালাম। দেখলাম, তাঁর চোখে নীরব মিনতি। বুঝতে পারলাম, তিনি বলছেন, ‘চলুন চ্যাটার্জি সাহেব। আপনি সাহায্য না করলে আমার ছেলেকে ফিরে পাব না।’

ভাববার জন্যে একমিনিট সময় নিলাম। তারপর তুয়ার বাদামি চুলে ভরা ছোট্ট মাথাটায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, যাব। তোমার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরব।’

তুয়া ঝটপট দু-হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে দুটো চোখ মুছে নিল। হাসিতে ঝলমল করে উঠল ওর সুন্দর মুখটা। তারপর দাদি দাদি, মাম্মি মাম্মি বলে ডাকতে ডাকতে মহা উল্লাসে দৌড়ে চলে গেল বাড়ির ভেতরে।

রনো একবার বলেছিল, ‘তোদের দু’জনের যাওয়ার দরকার নেই। এখনই একটা আর্মির সার্চ-পার্টি পাঠিয়ে দিই তুয়াটোলিতে। তারাই গিয়ে খুঁজে আনুক করণজিৎ আর আয়েঙ্গার দম্পতিকে।’ তাতে আমি আর বদ্রিনাথজি দু’জনেই আপত্তি জানালাম। ওকে মনে করিয়ে দিলাম, বৃষ্টি আর কার্তিকেয়ন চেয়েছিলেন নির্জনতা। সেই নির্জনতার প্রয়োজন যে শেষ হয়েছে কেমন করে জানব? যদি তাঁদের রিসার্চ এমন একটা স্টেজে পৌঁছে গিয়ে থাকে যে, আর দু-চারদিন তুয়াটোলিতে থাকতে পারলেই সাফল্য পেয়ে যাবেন—তাহলে? একদল কম্যান্ডোর ক্লাইম্বিং-বুটের তলায় কি সেই সম্ভাবনাকে পিষে ফেলব? সেটা কি উচিত হবে?

রনো আমাদের যুক্তি মেনে নিল।

আমি, রনো আর বদ্রিনাথ সিং তারপরেও অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা করলাম, কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়। রনো আমাদের কথার মধ্যেই একবার উঠে গিয়ে কাকে যেন ফোনে বেশ কিছু নির্দেশ দিয়ে এল বলে মনে হল।

আমাদের কথা যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তখন রনো বদ্রিনাথজিকে বলল, ‘আপনার ফ্যামিলিকে একটু তাড়াতাড়ি দিন সাতেকের মতন জামাকাপড় গুছিয়ে নিতে বলুন। আর কিছু নেবার দরকার নেই। আমি অফিসে ফোন করে দুটো গাড়ি পাঠাতে বলেছি। আপনারা এখন আমার সঙ্গে দেরাদুন ক্যান্টনমেন্টে যাবেন। আপনি এবং নীল ফিরে না আসা পর্যন্ত তুয়া, ওর মা আর ঠাকুমা আমার কোয়ার্টারেই থাকবেন।’

আমি এবং বদ্রিনাথজি কিছুক্ষণ রনোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কোনো প্রশ্ন করলাম না। বুঝতে পারছিলাম, আজ এই রাতেই যে মরণখেলা শুরু হয়ে গেছে, তার প্রথম চালটা আমরা দু’জনে ভুল চেলেছিলাম। রনো সেটাকে শুধরে দিল। দীপন আমাদের রাস্তায় দেখতে না পেয়ে এখানে আবার ফিরে আসবে। সারা গ্রামে ওর অনুচর ছড়ানো রয়েছে। তাদের মধ্যেই কেউ ওকে বলে দেবে যে, আমাদের দু’জনকে এই বাড়ি থেকে বেরোতে দেখা গেছে। তারপর কী হতো?

সেটা আন্দাজ করা মুশকিল। তবে খুব সম্ভবত একটি শিশু, দু’জন মহিলা আর এক বৃদ্ধ খুন না হলেও গুম হয়ে যেতেন; অন্তত ততদিন, যতদিন না আয়েঙ্গার দম্পতির রিসার্চের ফল দীপন হাতে পাচ্ছে। রনো সেই অত্যাচারের রাস্তাটা বন্ধ করে দিল।

আর্মির গাড়িতে চড়ে যখন আমরা সবাই রনোর কোয়ার্টারে পৌঁছলাম, তখন ঘড়িতে রাত ন’টা আর ঠিক তখনই আমার সেলফোনে দীপনের একটা মেসেজ এল—‘গুড-ইভনিং স্যার। কিছু ডিসিশন নিলেন?’

আমি মেসেজটা রনোকে দেখালাম। ও বলল, ‘জানিয়ে দে পরশু বেরোচ্ছিস। সত্যিকারেই মাঝে একটা দিন সময় লাগবে তোদের প্রিপারেশন নিতে।’

দীপনকে সেই কথা জানিয়ে উত্তর পাঠাতেই ও একটা চওড়া হাসির স্মাইলি পাঠাল। তারপর লিখল, ‘উইল রিমেইন গ্রেটফুল টু ইউ স্যার। আমি আপনার সঙ্গে যাব। কাল সকালে দেখা করে সব ডিটেইলস ঠিক করে নিচ্ছি।’

রনো আর বদ্রিনাথজিকে দীপনের রিপ্লাইটা দেখালাম। তারপর আমরা তিনজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলাম।

জানতাম, দীপন আসবে না। এলও না। তার পরিবর্তে পরের দিন একদম সাতসকালে একটা কালো অডি গাড়িতে চেপে দীপনের উর্দিধারী খানসামা নিয়ে এল শুকনো ফল, কাজু, চকোলেট ইত্যাদির এক বিরাট বাস্কেট। তালঢ্যাঙা খানসামাটি যতটা সম্ভব নিচু হয়ে আমাকে কুর্নিশ জানাল। তারপর ইসারায় দেখিয়ে দিল বাস্কেটের ডালার ওপরে গ্লু-টেপ দিয়ে চিটকানো রয়েছে একটা ছোট চিঠি। চিঠিটা খুলে দেখলাম, দীপন লিখেছ্‌ ‘ভেরি স্যরি স্যার। আমাকে ব্যবসার কাজে আজ দুপুরেই দিল্লি চলে যেতে হচ্ছে। ভেবেছিলাম, দু’জনে মিলে তুয়াটোলি যাব, সেটা আর হল না। তবে এটা জানি, ক্যাপ্টেন রণজিৎ মিত্র যার বন্ধু, তার কোথাও যেতেই কোনো অসুবিধে হবে না। ক্যাপ্টেন মিত্র উইল অ্যারেঞ্জ ফর এভরিথিং। সঙ্গে একজন ভালো গাইড অবশ্যই নেবেন। টেক কেয়ার স্যার। নিরাপদে ফিরে আসুন। তারপরে দেখা হবে।’

খানসামাটি অডি গাড়িতে চেপে বেরিয়ে যাওয়ার পর, চিঠিটা রনো আর বদ্রিনাথজিকে দেখালাম। তারপর তিনজনে মিলে আবার কিছুক্ষণ হাসলাম। আমাদের আন্দাজ মিলে গেছে।

পাঁচ

এই শীত-ঋতুতে হিমালয়ের হাই-অলটিচ্যুডের গ্রামগুলো থেকে মানুষজন নীচে নেমে যায়। শুধু মানুষ কেন? পশুপাখিরাও রক্ত-জমানো ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে লোয়ার অলটিচ্যুডে নেমে যায়।

আর নেমে যান দেবতারা।

হ্যাঁ, গাড়োয়াল আর কুমায়ুনের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই নিজস্ব গ্রামদেবতার একটা করে মন্দির থাকে। মানুষ যখন নীচে নামে, তখন সেই গ্রামদেবতাকে সঙ্গে নিয়েই নামে। নাহলে শীতের তিন-চারটে মাস তো দেবতার পুজোই হতো না।

রুইং-এ পৌঁছে দেখলাম, গ্রামটার সেই অবস্থা। মানুষ নেই, পাখি নেই। খাবারের টুকরো ছুড়ে ফেললে কুড়িয়ে নেবার মতন একটা কুকুর পর্যন্ত নেই কোথাও। থাকার মধ্যে হলুদ ঠোঁট আর ইস্পাতনীল পালকের সেই পাখিগুলো, যাদের নাম অ্যালপাইন শ্যাফ। আমাদের দেখতে পেয়ে ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে দিয়ে তারা গ্লাইড করে নেমে এল খাবারের আশায়।

আমাদের, মানে আমার আর বদ্রিনাথ সিং-এর থেকে একটু দূরত্ব রেখে পাখিগুলো ঠিক কাকের মতন কর্কশ গলাতেই কয়েকবার ডাকল।

যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তার চারিদিকে আকাশছোঁয়া পাহাড়। সেইসব পাহাড়ের গায়ে কিছুটা সবুজের ছোঁয়া লাগিয়েছে বার্চ, পাইন, দেওদারের বন। অনেক নীচে ঋষিগঙ্গার তীরে সবুজ ঘাসজমি। রুইং-এর উচ্চতা ন’হাজার ফিট। তাই গাছপালা দেখা যাচ্ছে। আজ এখানে রাত কাটিয়ে কাল উঠে যাব আরও অন্তত দু’হাজার ফিট ওপরে। পেরিয়ে যাব ট্রি-লাইন। শুরু হবে ছোটখাটো ঝোপঝাড়ের রাজত্ব। আর তার পরের দিন আমাদের পথ যাবে জানকী হিমবাহের মোরেন-রিজিয়নের মধ্যে দিয়ে। ‘মোরেন-রিজিয়ন’ মানে হিমবাহের চাপে গুঁড়িয়ে যাওয়া পাথুরে জমি। সেখানে শুধুই নুড়িপাথর আর বোল্ডারের রাজত্ব। একটা ঘাসের কুচি পর্যন্ত পাব না সেখানে।

এই সবই বদ্রিনাথজির কাছ থেকে শোনা। আজ সকালে আমাদের দু’জনকে ঋষিগঙ্গার ওপারে পাকা রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে, রনোর ঠিক করে দেওয়া ল্যান্ডরোভার যোশিমঠে ফিরে গেছে। ওই গাড়িটাই আবার ঠিক সাতদিন বাদে ফিরে আসবে।

দেরাদুন থেকে এই পর্যন্ত আসতে অনেকক্ষণ সময় লেগেছে। পুরো সময়টাই বদ্রিনাথজি আমার সঙ্গে গল্প করতে করতে এসেছেন। সেইসব গল্পের সিংহভাগ জুড়েই ছিল তাঁর তুয়াটোলির দিনগুলোর কথা; শিলাজিতের খোঁজে পাহাড়ে-পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় যেসব অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার গল্প। তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছি, ভদ্রলোকের মনে কোনো কুসংস্কার নেই। এমনকি একবার যখন তাঁকে আলতো করে জিগ্যেস করলাম যে, তুয়াটোলির হংসপদিকা অন্যগ্রহের প্রাণী হতে পারে কিনা, তখন সেই কথাটাকেও ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন।

ভদ্রলোককে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। পাইনগাছের মতন, পাহাড়ি ভেড়ার মতন, নদীর স্রোতে পড়ে থাকা সবুজ নুড়িপাথরগুলোর মতন তিনিও যেন এই পাহাড়িয়া প্রকৃতিরই একটা অংশ। তাঁর হাঁটাচলার মধ্য এমন একটা সহজ ছন্দ আছে যেটা এই চড়াই-উৎরাই রাস্তার পক্ষে সবচেয়ে উপযোগী। বরং আমারই মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যাচ্ছিল। যেমন, একটা জায়গায় আমাদের রাস্তাটা হঠাৎই অনেকটা নীচে নেমে আবার ওপরে উঠে গিয়েছিল—একটা ইংরিজি ইউ অক্ষরের মতন।

আমি ঢাল বেয়ে দৌড়ে নামতে যেতেই তিনি পেছন থেকে আমার রুকস্যাকের স্ট্র্যাপ টেনে ধরে আমাকে থামালেন। তবে তিনি থামানোর আগেই যে কয়েকবার দুমদাম করে স্টেপ ফেলেছিলাম, তাতেই পাহাড় থেকে নুড়িপাথর গড়িয়ে নামতে শুরু করে দিয়েছিল। লজ্জা পেলাম খুব। জানাই ছিল, এই ন্যাড়া পাহাড়গুলোয় সামান্য কাঁপুনিতেই ধস নামে। তবু ভুল করে ফেলছিলাম। বদ্রিনাথজি বাঁচালেন।

আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, প্রথম রাতটা আমরা রুইংয়েই কাটাব। আমাদের সঙ্গে একটা ছোট টেন্ট ছিল। এই টেন্টগুলো খাটানো খুব সহজ, প্রায় ফোল্ডিং-ছাতা খোলার মতন। জনশূন্য গ্রামের ঠিক মাঝখানে একটা খোলা জায়গায় সেই টেন্ট খাটিয়ে ফেললাম। সেদিন যেহেতু বিকেল-বিকেলই রুইং-এ পৌঁছে গিয়েছিলাম, তাই ডিনার সারার খুব একটা তাড়া ছিল না। বরং এক কাপ করে চা আর গরম থুকপা খাবার ইচ্ছে হল। বদ্রিনাথজিও তাতে খুব রাজি। তিনি বললেন আমি যতক্ষণে থুকপা বানাচ্ছি, তিনি ততক্ষণে টেন্টের মেঝেয় ম্যাট্রেস পাতার মতন জরুরি কাজগুলো সেরে ফেলবেন।

পাথরের চুলা বানিয়ে কাঠকুটোর আঁচে রান্না করার কাজটা আমি খুব ভালোই পারি। তার জন্যে কিছু শুকনো গাছের ডাল কুড়োতে আমি আমাদের টেন্টিং-গ্রাউন্ডের একপাশে একটা একটা বড় ঝোপের ভেতরে ঢুকেছিলাম এবং ওখানেই এমন একটা জিনিস দেখলাম যাতে বেশ চমক খেলাম। ডাকলাম, ‘বদ্রিনাথজি! একবার দেখে যান তো এইদিকে।’

পাহাড়ে নিয়ম হচ্ছে যে-ই আগুন জ্বালাক, তাকে সেই আগুন ভালো করে নিভিয়ে তবে সেই জায়গা ছাড়তে হবে। তা না হলে আগুনের ফুলকি থেকে দাবানল শুরু হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, যে কোনোরকমের নোংরা, তা সে প্লাস্টিকের প্যাকেট হোক, কিম্বা ছেঁড়া কাগজ, সবকিছু ভালো করে গর্তে চাপা দিয়ে তবেই পরের গন্তব্যে রওনা হতে হবে।

ঝোপের অন্যদিকে ওরকম একটা গার্বেজ-পিট আমার চোখে পড়েছিল।

বদ্রিনাথজিও সেটা দেখলেন এবং আমারই মতন চমকে উঠলেন। সাধারণ একটা গার্বেজ-পিট দেখেও যে আমরা চমকে উঠলাম তার কারণ, তুয়াটোলি মোটেই কোনো ট্রেকিং-রুট নয়। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কিম্বা মিলিটারি কেউই এখানে টুরিজমকে প্রশ্রয় দেয় না। ট্রেকিং টুরিজমের পক্ষে জায়গাটা বড় বেশি বিপজ্জনক।

তাহলে এই গার্বেজ-পিট কারা তৈরি করল?

আমি হাঁটু গেঁড়ে সেই পিটের পাশে বসে পড়লাম। তারপর আমার সর্বকর্মা সুইস-নাইফ দিয়ে পিটের ওপরের ঝুরো মাটি কিছুটা সরাতেই দেখতে পেলাম বিদেশে তৈরি শুকনো-খাবারের খালি প্যাকেট আর এনার্জি-ড্রিঙ্কসের খালি ক্যান। প্যাকেট এবং ক্যানগুলোর গায়ে তখনো খাদ্য এবং পানীয়ের দাগ লেগে রয়েছে। অর্থাৎ স্থানীয় কোনো মানুষ নয়, শহরের মানুষই এ’পথ ধরে গিয়েছে। এবং গিয়েছে খুব সম্প্রতি।

তারা কারা? এখন তারা কোথায়? কোন উদ্দেশে তারা তুয়াটোলি যাচ্ছে?

পিটের পাশ থেকে উঠে এসে টেন্টিং-গ্রাউন্ডটার চারপাশে একটু নজর চালাতেই একজায়গায় চোখে পড়ল, বড় পেরেক-জাতীয় যে জিনিসগুলো দিয়ে মাটির সঙ্গে টেন্টের দড়ি আটকানো হয়, সেরকম পেরেকের দাগ। দাগগুলো দেখে বুঝলাম, ওখানে একটাই মাত্র টেন্ট খাটানো হয়েছিল। আমাদেরই মতন ছোট টেন্ট, যাতে একসঙ্গে দু’জনের বেশি শোয়া যায় না।

দ্রুত রাত নেমে এল। চাঁদ উঠল। এখন শুক্লপক্ষ চলছে। প্রায় বৃত্তাকার চাঁদের আলোয় দিগন্তে ঝলমল করে উঠল নন্দাদেবী আর ঋষিপর্বতের তুষারশৃঙ্গ। তবে ওই দুই পাহাড়ের মাথায় যে ধূসর মেঘের টুকরোটা এখন নিরীহ বেড়ালের মতন শুয়ে রয়েছে, বদ্রিনাথজি বললেন, সেটি নাকি তাঁর অনেকদিনের চেনা। একটু রাত বাড়লেই ওই বেড়াল বাঘ হয়ে আকাশ ঢেকে ফেলবে। শুধু তাই নয়, শুরু করবে বরফবর্ষণ। তবে এখানে নয়। আরেকটু ওপরে, আরেকটু হাই অলটিচ্যুডে। কাল আমরা যেখানে পৌঁছোব, সেখানে।

ব্যাপারটা আমাকে বুঝিয়ে বলার পর, বদ্রিনাথজি চোখ কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, ‘ভাগ্য আমাদের সহায়, সেটা কি বুঝতে পারছেন চ্যাটার্জি সাহেব?’

আমি বললাম, ‘না তো। স্নোয়িং জিনিসটাকে সব সময়ে অপছন্দ করি। এর মধ্যে আপনি আবার সৌভাগ্যের কী দেখলেন?’

তিনি বললেন, ‘আহা, বুঝছেন না কেন? যে বা যারা আমাদের চেয়ে একদিনের বেশি অ্যাডভান্টেজ নিয়ে তুয়াটোলির দিকে রওনা হয়েছে, তারা ওই স্নোয়িং-এ আটকে যাবে না? কপাল ভালো থাকলে কাল ওদের ধরে ফেলব।’

আমি আরেকবার মনে-মনে কুর্নিশ জানালাম তাঁর বুদ্ধিকে।

তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়ার পাট চুকিয়ে টেন্টে ঢুকে পড়লাম। কিছুক্ষণ সোলার-ল্যাম্পের আলোয় একটা বই পড়ার পরেই দেখলাম, ঘুমে চোখ জুড়ে আসছে। বদ্রিনাথজি ওই ঠান্ডার মধ্যেও বাইরে বসেছিলেন। একবার ডেকেছিলাম; বলেছিলাম, এই ঠান্ডায় বাইরে না থাকাই ভালো। তাতে তিনি বললেন, বহুদিন বাদে জন্মভূমির পথে পা দিয়ে তাঁর এতই ভালো লাগছে যে টেন্টে ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। আমার অবশ্য ধারণা, দেরাদুনেও তিনি হারিয়ে যাওয়া ছেলের চিন্তায় এইভাবেই রাত জাগেন।

তারপর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বদ্রিনাথজি কখন টেন্টে ঢুকেছেন, কখন ঘুমিয়েছেন, কিছুই টের পাইনি। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, হাতিঘোড়া, ঋষিশৃঙ্গ, নন্দাদেবীর মতন স্নো-পিকগুলোর গায়ে সবে সোনালি রং লেগেছে। বুকের ওপরে দুটো হাত জড়ো করে সেইদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন বদ্রিনাথজি। জিগ্যেস করলাম, ‘আপনি ঘুমোননি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। খুব ঘুমিয়েছি। আপনি নিজে ঘুমোচ্ছিলেন বলে টের পাননি।’

তারপর বললেন, ‘দেখেছেন চ্যাটার্জি সাহেব, আকাশ কেমন ঝকঝকে নীল। তার মানে সেই ধূসর মেঘ রাতে বরফ ঝরিয়ে নিজেকে শেষ করে ফেলেছে। চলুন, যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে পড়ি। দেখি, আমাদের আগে যারা গিয়েছে, খারলুমে গিয়ে তাদের ধরতে পারি কিনা।

আমাদের পরের হল্টের নাম খারলুম। উচ্চতা এগারো হাজার ফিট। রাস্তা প্রচণ্ড খাড়াই, তাই এমনিতেই রুইং থেকে পায়ে হেঁটে যেতে প্রায় ছ’ঘণ্টা সময় লাগে। তার ওপরে যদি কিছুটা ওপরে গিয়ে বরফ পাই তাহলে তো আমাদের চলার স্পিড আরওই কমে যাবে।

ঠিক সাতটায় টেন্ট গুটিয়ে রওনা হলাম খারলুমের পথে। ঘণ্টা চারেক হাঁটার পরে যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেটাই হল। রাস্তার ওপরে শিট আইসের খপ্পরে পড়লাম।

পাহাড়ে বরফ পড়লে তার দু’রকম চেহারা হতে পারে। যখন টেম্পারেচার একটু বেশি থাকে, তখন বরফ পড়লেও সেটা নুনের মতন ঝুরো অবস্থায় জমে থাকে। সেরকম ঝুরো বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়াটা অস্বস্তিকর কিন্তু বিপজ্জনক নয়। কিন্তু এখন গাড়োয়ালের এই হাইটে যেরকম মারাত্মক ঠান্ডা তাতে বরফ আর ঝুরো অবস্থায় থাকতে পারে না; ঝরে পড়ার পরেই আয়নার কাচের মতন শক্ত আর পেছল হয়ে যায়। তার নাম শিট আইস।

এই শিট আইসের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া ভীষণ বিপজ্জনক। পা পিছলে আছাড় তো খেতে হয় বটেই। তার চেয়েও যেটা মারাত্মক, বরফের নীচে কোথায় খানাখন্দ রয়েছে বোঝা যায় না বলে গর্তের মধ্যে পা ঢুকে হাড় ভাঙার একটা প্রবল সম্ভাবনা থাকে। ভাগ্যিস আমাদের দু’জনের হাতেই ছুঁচলো মুখের স্টিক ছিল। কোনোরকমে সেই স্টিকের ওপরে ভর দিয়ে ইঞ্চি ইঞ্চি করে শেষ পাঁচশো ফিট চড়াই ভেঙে যখন খারলুমের ক্যাম্পিং-গ্রাউন্ডে পৌঁছোলাম তখন বিকেল নেমে এসেছে।

একটা ফুটবল মাঠের মাপের পাথুরে সমতল জমি। উত্তরদিকে ঢালু হয়ে অনেকখানি নেমে গেছে। তারপর আবার উঠতে উঠতে মিশে গেছে আকাশছোঁয়া স্নো-পিকগুলোর সঙ্গে। কুড়িবছর আগে যখন ইন্ডিয়ান আর্মির লোকেরা তুয়াটোলিতে সেই সেন্সরটা বসাতে এসেছিলেন, তখন তাদের হাতেই খারলুমের এই ক্যাম্পিং-গ্রাউন্ড তৈরি হয়েছিল। একটা অত বড় মেশিনকে এরকম ঝোড়ো হাওয়া আর নুড়িপাথরের দেশে তো আর এমনি-এমনি দাঁড় করিয়ে রেখে যাওয়া যায় না। তার জন্যে বেশ শক্তপোক্ত গাঁথনির স্ট্রাকচার লাগে। সেই স্ট্রাকচার বানানোর মালমশলা একটানা তুয়াটোলি পর্যন্ত বয়ে না গিয়ে এই খারলুমে স্টোর করে রাখা হতো। এখান থেকেই প্রয়োজন মতন অল্প অল্প করে ইঁট সিমেন্ট ওপরে নিয়ে গিয়ে জওয়ানরা তুয়াটোলির স্ট্রাকচার বানিয়েছিলেন।

বলা বাহুল্য, এসব তথ্যও বদ্রিনাথজির কাছ থেকেই পাওয়া।

আমরা যখন খারলুমে পৌঁছলাম, তখন ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। সে যে কী হিম ঠান্ডা হাওয়া, বলে বোঝানো যাবে না। সারা শরীরের যেখানেই একটু খোলা অংশ ছিল, সেইটুকুই যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছিল। অন্তত আমার তো তাই মনে হচ্ছিল।

বদ্রিনাথ সিং-কে দেখে অবশ্য মনে হচ্ছিল না তিনি দেরাদুনের সঙ্গে খারলুমের কোনো তফাত খুঁজে পাচ্ছেন। পিঠ থেকে থেকে রুকস্যাকটা নামাতে যেটুকু সময় নিয়েছেন। তারপরেই, ঠিক একটা শিকারি কুকুরের মতন বরফের সঙ্গে প্রায় নাক ঠেকিয়ে, পুরো-ক্যাম্পিং-গ্রাউন্ডটার এধার থেকে ওধার ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছেন তিনি।

আকাশের আলো দ্রুত নিভে আসছিল। তার সঙ্গে বেড়ে চলেছিল হাওয়ার দাপট। সকালের সেই নীল রং মুছে গিয়ে একটা ঘোলাটে আলো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা আকাশে। বুঝতে পারছিলাম, আবার তুষারপাত হবে। আর এটাও বুঝতে পারছিলাম, ওই অবশিষ্ট আলোটুকু থাকতে-থাকতেই এই খারলুমের ক্যাম্পিং-গ্রাউন্ড আর তার চারপাশের তল্লাশি শেষ করা দরকার। নিশ্চিত হয়ে নেওয়া দরকার যে, ঘুমের মধ্যে আমরা নিরাপদ থাকব কিনা। বদ্রিনাথজি ঠিক সেই কাজটাই করছেন।

তিনি যতক্ষণে আমাদের নিরাপত্তা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হচ্ছেন, তার মধ্যে অন্যান্য কাজগুলো আমার সেরে ফেলা উচিত। তাই আমিও পিঠ থেকে টেন্টের ব্যাগটা নামিয়ে একটা পছন্দসই জায়গা খুঁজতে বেরোলাম, যেখানে হাওয়ার ঝাপটাটা একটু কম লাগে।

আমরা যেদিক দিয়ে এই ক্যাম্পিং-গ্রাউন্ড এসে পৌঁছেছিলাম, ঠিক তার উল্টোদিকে, জমিটার একেবারে কিনারা ঘেঁষে দুটো বিরাট বোল্ডার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। মনে হল যদি ওই বোল্ডারদুটোর মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা থাকে তাহলে সেটাই হবে আজ রাতে টেন্ট খাটানোর সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। কারণ, ওখানে ব্লিজার্ডের দাপট অনেকটাই কম থাকবে। আমি পা চালালাম পাথরদুটোর দিকে এবং দু-মিনিটের মধ্যেই দুটো পাথরের মাঝখানের ফাঁকটায় ঢুকে পড়লাম।

হ্যাঁ, ওখানে টেন্ট খাটানোর মতন যথেষ্ট জায়গা ছিল। কিন্তু জায়গাটা ফাঁকা ছিল না।

একটা লাশ পড়ে ছিল ওখানে।

আমি আবার বোল্ডারের আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ডাক দিলাম, ‘বদ্রিনাথজি!’

আমার ধারণা, আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। বেরোলেও ঝোড়ো হাওয়ায় সেই আওয়াজ নিশ্চয় উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বদ্রিনাথজিও পরে বলেছিলেন, আমার ডাক তিনি শুনতে পাননি, কিন্তু আমার হেঁটে আসার ভঙ্গির মধ্যেই এমন একটা কিছু ছিল যে, তিনি আর কালক্ষেপ না করে আমার দিকে দৌড়ে এসেছিলেন।

আমরা দু’জনে মিলে আবার ফিরে গিয়েছিলাম যেখানে ডেডবডিটা পড়ে ছিল সেখানে। বদ্রিনাথজির হাতের সোলার-টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে দেখেছিলাম লোকটার মুখ। চিনতে পেরেছিলাম তাকে।

এ সেই লোকটা—যে পরশু সকালে রণজিতের কোয়ার্টারে আমার জন্যে শুকনো ফলের বাস্কেট নিয়ে গিয়েছিল। দীপনের খানসামা।

লোকটা কীভাবে মরল বুঝতে পারছিলাম না, যতক্ষণ না বদ্রিনাথজি বডিটাকে উপুড় করে দিয়েছিলেন। লোকটার ঘাড়ের কাছে একটা ছুরি আমূল গাঁথা ছিল।

পেছনদিক থেকে এইভাবে কাউকে মারলে তার উপুড় হয়েই পড়ার কথা। এ চিৎ হয়ে শুয়েছিল। তার মানে লোকটাকে একটু দূরে কোথাও খুন করে তারপর এই আড়ালে টেনে এনে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

লোকটা বেশ লম্বা। মাত্র পরশু সকালেই ও আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল বলেই আমি জানি, ওর হাইট প্রায় পাঁচ-ফিট দশ ইঞ্চি হবে। তবু ছুরিটা ঢুকেছে ওর কাঁধের একটু নীচে—সরাসরি ওপর থেকে নীচের দিকে গেঁথে দেওয়া হয়েছে ফলাটা। এত লম্বা একজন মানুষের কাঁধের ওপর থেকে অত জোরে হাত নামিয়ে এনে যে স্ট্যাব করতে পারে, তার নিজের হাইট সাড়ে ছ-ফিটের কম কিছুতেই নয়।

আমি আর বদ্রিনাথজি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। বুঝতে পারলাম, সেই দীর্ঘকায় খুনির পরিচয় নিয়ে আমরা একমত।

দীপন শুক্লা দিল্লি যায়নি। ও আমাদের থেকে ঠিক একদিন আগে তুয়াটোলির পথে রওনা হয়েছে এবং রাস্তার মধ্যে নিজের শাগরেদকে খুন করেছে।

মৃতদেহটাকে একটা প্লাস্টিকের শিটে মুড়ে, খোলা জায়গার একদিকে বরফ চাপা দিয়ে রাখলাম। সারা রাত ধরে শরীরটার ওপরে আরও বরফ জমবে। যদি আমরা নিজেরা বেঁচে ফিরতে পারি, যদি কোনোদিন এই খুনের কথা পুলিশকে জানানোর সুযোগ পাই, তাহলে এই শরীরটার ওপরে তখনো পোস্ট-মর্টেম করা যাবে। এই সাব-জিরো টেম্পারেচারে দীপন শুক্লার শাগরেদের শরীরে যে তাড়াতাড়ি কোনো পচন ধরবে না, সেটুকু নিশ্চিত।

ছয়

খারলুমের সেই রাতটা যে কীভাবে কাটিয়েছিলাম তা এখন ঠিকমতন মনে পড়ছে না। টেন্ট যে খাটিয়েছিলাম সেটা ঠিক। নাহলে বরফে চাপা পড়ে যেতাম। হয়তো কিছু খেয়েওছিলাম। কিন্তু ঘুমোইনি। দু’জনের কেউই সেই রাতে একফোঁটা ঘুমোতে পারিনি। ঘুমোনো সম্ভব ছিল না। দিনের আলোয় সোনায় গড়া সব পাহাড়চূড়া, ঋষিগঙ্গার দুধসাদা স্রোত, হলুদ শৈবালে ঢাকা ছোটবড় পাথরগুলো যে উপত্যকাকে স্বর্গ বানিয়ে রাখে, সেই রাতে তাকেই মনে হচ্ছিল মৃত্যু-উপত্যকা।

সারারাত আমরা কান খাড়া করে শোনবার চেষ্টা করেছিলাম ব্লিজার্ডের তীব্র শিসের আড়ালে কোনো মানুষের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে কিনা। টেন্টের দুই দেয়ালে দু’জন সারাক্ষণ মুখ ঠেকিয়ে বসেছিলাম। দেখবার চেষ্টা করছিলাম, ঘোলাটে চাঁদের আলোর মধ্যে দিয়ে কোনো কালো ছায়া পা টিপে-টিপে এগিয়ে আসছে কিনা আমাদের তাঁবুর দিকে। পাহাড়ের গা দিয়ে একটা নুড়িপাথর গড়িয়ে পড়বার শব্দেও আমরা হাতে তুলে নিচ্ছিলাম ছুরি আর রিভলভার।

অবশেষে ভোর হল। আমরা টেন্টের বাইরে বেরিয়ে এলাম। বদ্রিনাথজি বললেন, ‘তার মানে কাল আমরা এখানে পৌঁছনোর আগেই দীপন তুয়াটোলির দিকে রওনা হয়ে গেছে। আমাদের আটকানোর ব্যাপারটা ও পরে দেখবে। তুয়াটোলিতে ওর নিশ্চয় আরও অনেক বেশি জরুরি কাজ পড়ে রয়েছে। চ্যাটার্জি সাহেব, তুয়াটোলিতেই ওর সঙ্গে মোলাকাত হবে।’

আমি রুকস্যাকের কভারের স্ট্র্যাপে শেষবারের মতন একটা জোরালো টান দিয়ে বললাম, ‘একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, বদ্রিনাথজি। দীপন যদি নিজেই আবার এখানে ফিরে আসতে পারে, তাহলে শুধুমুধু আমাকে তুয়াটোলির আশ্চর্য জন্তুর কথা বলতে গেল কেন?’

বদ্রিনাথজি হেসে ফেললেন। বললেন, ‘ওর তো ইচ্ছে ছিল অন্যরকম। ও সত্যিকারেই আপনাকে সঙ্গে নিয়েই এখানে আসতে চেয়েছিল। ওই পায়ের ছাপের ব্যাপারটা ছাড়াও এমন কিছু জিনিস নিশ্চয় তুয়াটোলিতে রয়েছে যার জন্যে একজন নীল চ্যাটার্জির প্রয়োজন হয়। কিন্তু আপনারা যখন গাথরি হিলসের ল্যাবরেটরি আবিষ্কার করে ফেললেন আর কপালগুণে আমিও আপনাদের দলে ভিড়ে গেলাম, তখনই ও বুঝতে পারল এবার আর একসঙ্গে নয়, ওকে আসতে হবে আপনার আগে। নীল চ্যাটার্জির হেল্প তো পাবেই না, বরং তার হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে যেতে হবে আয়েঙ্গারদের আবিষ্কার।’

আমি বললাম, ‘জানি না তুয়াটোলির রহস্যময় পায়ের ছাপ কোন প্রাণীর। তবে এখন মনে হচ্ছে ওই পায়ের ছাপের সঙ্গে বৃষ্টি দত্ত আয়েঙ্গার আর কার্তিকেয়ন আয়েঙ্গারের রিসার্চের একটা সম্পর্ক রয়েছে। ওই সম্পর্কটা বার করার জন্যেই আমাকে দীপনের প্রয়োজন হয়েছিল।’

আমরা হাঁটতে হাঁটতেই কথা বলছিলাম। এখন আমরা মোরেন-রিজিয়নে পৌঁছে গিয়েছি। কোথাও সবুজের কোনো চিহ্ন নেই। গ্লেসিয়ারের বিশাল খাত ধরে উঠে চলেছি তুয়াটোলির দিকে। সেই খাতে জলের কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু জানি, পাথর আর নুড়ি সরিয়ে যদি অনেকটা নীচে নামা যায় তাহলে দেখতে পাব কয়েক লক্ষ বছরের পুরোনো বরফ—‘ফসিল-আইস।’ ফল্গু যেমন বালির নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী, জানকী তেমনি পাথরের নীচে ঘুমিয়ে থাকা গ্লেসিয়ার।

সাদা পাথর আর বালি থেকে দুপুরের রোদ ঠিকরে এসে আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। চোখে সানগ্লাস না থাকলে এই তীব্র আলো মানুষকে অন্ধ করে দিতে পারে।

এত উঁচুতে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ খুবই কম। তাই অল্প কিছুটা চড়াই ভাঙার পরেই দম শেষ হয়ে যাচ্ছিল। কিছুটা জিরিয়ে, জোরে-জোরে শ্বাস নিয়ে, তারপর আবার আমরা চলতে শুরু করছিলাম। বদ্রিনাথজির বয়স যেহেতু আমার থেকে অনেক বেশি, তাই তিনি আমার চেয়ে একটু তাড়াতাড়িই হাঁপিয়ে পড়ছিলেন। অবশ্য মুখের হাসিটা কখনোই মিলিয়ে যাচ্ছিল না। কেবলই বলছিলেন, এই তো, প্রায় এসেই গিয়েছি। আর দুটো চড়াই, তিনটে উৎরাই। তারপরেই পৌঁছে যাব আমাদের গ্রামে।

এত কষ্টের মধ্যেও ভালো দিক একটা ছিল। এই নুড়িপাথরের প্রান্তরে একটা গিরগিটিরও লুকিয়ে থাকার মতন জায়গা ছিল না। দীপন হঠাৎ এসে যে আমাদের অ্যাটাক করবে সেই ভয়টা তাই পাচ্ছিলাম না।

অবশ্য বদ্রিনাথজির মতে, এই-মুহূর্তে দীপন মোটেই আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। ও কোথাও লুকিয়ে থেকে নজর রাখবে আমাদের ওপর। আগেরবার তুয়াটোলিতে গিয়ে দীপন যখন করণ সিং আর আয়েঙ্গার দম্পতিকে খুঁজে বার করতে পারেনি তখন এবার ও চাইবে, সেই কাজটা আমরাই করি। আমরা ওদের খুঁজে পাওয়ার পরেই দীপন স্বমূর্তি ধারণ করবে। তার আগে নয়।

বদ্রিনাথজির কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতন নয়।

এইসব ভাবতে ভাবতেই সামনে ঝুঁকে, মাথা নিচু করে চড়াই ভাঙছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে বদ্রিনাথজি বললেন, চ্যাটার্জিসাব। মুখ তুলুন। ওদিকে দেখুন।

চিন্তার ঘোর কাটিয়ে সামনে তাকাতেই এক আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। দেখলাম অজস্র টিলার ঢেউ ভাঙতে-ভাঙতে কখন যেন পৌঁছে গেছি এই পথের শেষ চড়াইয়ের মাথায়। এখন আমাদের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বরফে ঢাকা ঋষিশৃঙ্গ-রেঞ্জ। এতই কাছে সেই স্নো-পিক যে, মনে হচ্ছে হাত বাড়ালে ছুঁতে পারব। আমাদের এই টিলা আর ঋষিশৃঙ্গের মাঝখানে সরু একফালি সমতলভূমি। একটা পাহাড়ি ঝোরা সেই জমির মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। এখন সেই ঝোরার বুকে শুধুই বরফ, কিন্তু গ্রীষ্মকালে নিশ্চয়ই ওই ঝোরায় জল থাকে। ঝোরার ডানদিকে ধাপ-কাটা জমির ওপরে সাজানো রয়েছে ছোট-ছোট অনেকগুলো কুড়েঘর।

বদ্রিনাথজি স্বপ্নমাখা গলায় বললেন, তুয়াটোলি—আমাদের গ্রাম।

ওই দেখুন চ্যাটার্জিসাব, গ্রামের মাঝখানে পাথরের মন্দিরটা দেখতে পাচ্ছেন? ওই হল তুয়া-মাতার মন্দির। আর ওই যে রাস্তার ডানদিকে শেষ যে বাড়িটা দেখছেন, ওটাই ছিল আমাদের বাড়ি।

তারপর আমাকে অনেকটা পেছনে ফেলে রেখে বদ্রিনাথজি দ্রুতগতিতে উৎরাই বেয়ে নেমে চললেন তুয়াটোলির দিকে। পুরো রাস্তায় এই একবারই দেখলাম, তিনি পাহাড়ে চলার নিয়ম ভাঙলেন। ভুলে গেলেন যে, ঢালু রাস্তায় কখনো জোরে পা চালাতে নেই।

গ্রামটার কাছাকাছি এসে কিন্তু মনখারাপ হয়ে গেল। বৃষ্টি এই অঞ্চলে হয় না। শুকনো ওয়েদার। শুধুমাত্র সেই কারণেই কাঠ আর পাথরের তৈরি বাড়িগুলো এখনো মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু ওইটুকুই। ঝোরার এপাশে দাঁড়িয়েই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, প্রতিটি বাড়ির দেয়ালে বড়-বড় ফাটল। ছাদ ভেঙে পড়েছে মেঝের ওপর। পুরো তুয়াটোলি গ্রামটাই গত কুড়ি বছরে একটা ধ্বংসস্তূপের চেহারা নিয়েছে।

বদ্রিনাথজির মুখটাও দেখলাম থমথমে হয়ে রয়েছে। সত্যিই তো। কারই বা ভালো লাগে নিজের গ্রামকে এমন চেহারায় দেখতে? একবার তুয়াদেবীর মন্দিরে যাবেন বলে ওদিকে কিছুটা এগিয়েও গেলেন। কিন্তু তারপরে আর গেলেন না। বললেন, নষ্ট করার মতন সময় নেই। চলুন চ্যাটার্জিসাব। খোঁজাখুঁজি শুরু করি।

সত্যিই আমাদের হাতে নষ্ট করার মতন সময় ছিল না। এই ভয়ঙ্কর আবহাওয়ায় শখ করে কেউ দিন কাটায় না।

আমাদের প্রথম কাজ, হারানো তিনজন মানুষকে খুঁজে বার করা। মন বলছে, সেই কাজটা করতে পারলে বাকি কাজটাও সহজ হয়ে যাবে। প্রায় দু’মাস ধরে যারা তুয়াটোলিতে রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কি আর হংসপদিকার মুলাকাত হয়নি? নিশ্চয় হয়েছে। অবশ্য সেই জন্তু যদি তাঁদের আসার সময় পর্যন্ত এখানে থেকে থাকে, তবেই সেটা সম্ভব। আর যদি তার আগেই ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যায় তাহলে তাকে নিয়ে আর ভাববারও কিছু নেই।

আপাতত সবচেয়ে বড় ভাবনা অবশ্য দীপনকে নিয়ে। সে যে কোথায় ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না। চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র ভাঙা বাড়ি। ঠান্ডা হাওয়া আর বরফের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে এখনো তারা যথেষ্ট। বুঝতেই পারছি, ওই বাড়িগুলোর কোনোটার মধ্যেই দীপন লুকিয়ে আছে। কিন্তু কোনটায় সেটা বুঝব কেমন করে?

আয়েঙ্গার দম্পতি আর করণকে নিয়েও একই সমস্যা। যদিও তাঁরা টেন্ট ইত্যাদি নিয়েই এখানে এসেছিলেন, কিন্তু তাতে যে আর বাস করেন না সেটা আমরা জেনেই এখানে এসেছি। তা যদি করতেন তাহলে আগেরবার এখানে এসে দীপন তাঁদের খুঁজে পেত।

আমার মন বলছে, তাঁরাও এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছেন। কিন্তু কেন? কারণটা বুঝতে পারছি না।

আমি আর বদ্রিনাথজি গ্রামের রাস্তায় তন্নতন্ন করে এমন একটা কোনো চিহ্ন খুঁজতে শুরু করলাম, যার থেকে বোঝা যায় মানুষগুলো কোথায় রয়েছে। কাছে-পিঠে কয়েকটা বাড়ির জানলার ফোকর দিয়ে টর্চের আলো ফেলে দেখছিলাম। কিন্তু গ্রামের সিকিভাগ রাস্তাও ঘোরা হয়নি, তার মধ্যেই অন্ধকার নেমে এল। আর বাইরে থাকা যায় না।

আমরা বদ্রিনাথজির পুরনো বাড়ির মধ্যে ঢুকে একটা ঘর একটু সাফসুতরো করে নিয়ে স্লিপিং-ব্যাগ বিছিয়ে বসলাম। আমাদের সঙ্গে একটা ছোট স্টোভ ছিল। কিছু ক্যানড-ফুড গরম করার জন্যে আমি যতক্ষণে স্টোভটা জ্বালছিলাম, বদ্রিনাথজির তার মধ্যেই উঠে গিয়েছিলেন বাড়ির পেছনের ঝোরা থেকে এক বালতি জল আনার জন্যে। কিন্তু দরজা পেরোনোর আগেই কী যেন একটা দেখে তাঁর মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল। আমি ঘরের ভেতর থেকেই দেখতে পেলাম, খোলা দরজার অন্ধকার ফ্রেমে মুখোমুখি দুটো সিল্যুয়েট।

একটা বদ্রিনাথজির।

আরেকটা ছায়া অনেক লম্বা...জিন্স, জ্যাকেট, হাই-বুট। স্নো-ক্যাপের পেছনে ঘাড় পর্যন্ত চুল।

খুব ভেবেচিন্তে যে কিছু করেছিলাম তা নয়। আমার হাতটা নিজে থেকেই কখন যেন পাশে নামিয়ে রাখা রিভলভারটা তুলে নিয়েছিল। তারপর এক ঝটকায় সাইটের মধ্যে নিয়ে এসেছিল ওই দ্বিতীয় ছায়ার মাথাটাকে। কিন্তু ঠিক তখনই বদ্রিনাথজি তাঁর বাঁ-হাতটা তুলে, চাপা গলায় বলে উঠেছিলেন—‘নো।’

বদ্রিনাথজি চোখের কোণ দিয়ে দেখেছিলেন, আমি গুলি চালাতে যাচ্ছি। তিনি আমাকে ঠিক সময়ে আটকেছিলেন। আটকেছিলেন যে তার একটাই কারণ। তাঁর সামনে সেই রাতে যে এসে দাঁড়িয়েছিল, তার নাম দীপন নয়। করণজিৎ। বদ্রিনাথজির হারিয়ে-যাওয়া ছেলে। তুয়ার বাবা করণজিৎ।

করণজিৎ ঘরে ঢোকেনি। দরজার আড়াল ছেড়ে বেরোয়নি। ঠিক দু’মিনিট বাদে একটা স্নো-লেপার্ডের মতন নিঃশব্দে—গাছের ছায়া থেকে পাঁচিলের ছায়া, সেখান থেকে পাথরের ছায়ায় নিজের শরীর মিশিয়ে—পালিয়েছিল করণজিৎ।

করণ চলে যাওয়ার পরে বদ্রিনাথজি ঘরে ঢুকলেন। কোনো এক গভীর চিন্তায় তাঁর ভুরুদুটো কুঁচকে ছিল। তাঁকে এত চিন্তিত কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। আমি একবার জিগ্যেস করলাম, ‘করণ কী বলে গেল বদ্রিনাথজি?’

তিনি বললেন, ‘বলছি। তার আগে দুটো জানলার পাশে দুটো সোলার-ল্যাম্প জ্বালিয়ে দিন তো।’

আমি আমতা-আমতা করে বললাম, ‘কেন বদ্রিনাথজি? আমরা তো বসে আছি এই ঘরে। বাইরের জানলায় আলো জ্বালিয়ে কী হবে?’

তিনি বললেন, ‘করণ বলে গেল, দীপন কনস্ট্যান্ট আমাদের ওপরে নজর রাখছে। আপনাকে ওর দরকার ঠিকই, কিন্তু আমাকে তো ওর দরকার নেই। উল্টে আমি অনেক কিছুই জানি যেটা ওর পক্ষে ভালো নয়। তাই আমাকে ও এখনি সরিয়ে দিতে চায়। করণ ঠিকই বলেছে।’

‘কিন্তু আলো দুটো...’

‘দীপনের জন্যে। যতক্ষণ ও দুটো জ্বলবে, দীপন নিশ্চিন্ত থাকবে যে, আমরা এই বাড়িতেই আছি। জ্বেলে দিয়েছেন? চলুন, এবার বেরোনো যাক। স্টোভটা নিভিয়ে দিন। মালপত্র যা বেরিয়েছিল, আবার ঢুকিয়ে ফেলুন রুকস্যাকে। আলোদুটো এখানেই থাক। না, ওদিকে নয়। পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে নদীর বেডে নেমে যেতে হবে। ওখানে করণ অপেক্ষা করছে। আসুন।’

আমরা দু’জনে রিভারবেডে নামলাম। ঘর থেকে খোলা-জায়গায় বেরোতেই কাঁপুনি ধরে গেল, এত ঠান্ডা। রিভলভারটা মুঠোর মধ্যে ধরা ছিল ঠিকই, কিন্তু যেরকম কাঁপছিলাম তাতে ছ’ফুট দূর থেকে একটা রোড-রোলারের গায়ে গুলি লাগাতেও বললে যে মিস করতাম সে সম্বন্ধে সন্দেহ নেই। তবে একটাই ভরসা, রিভারবেডে আড়ালের অভাব ছিল না। এক বোল্ডার থেকে আরেক বোল্ডারের আড়ালে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে যাচ্ছিল করণজিৎ। ওকে ফলো করছিলাম আমরা। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট এইভাবে চলার পরে হঠাৎই করণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল। ও যেখানটায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল সেখানে নদীর পাড়টা পুরোটাই পাথরের চাঁইয়ে ভর্তি। তারই মধ্যে একটা ছোট ফাটলের দিকে করণ ইশারা করল।

করণের পেছন-পেছন আমি আর বদ্রিনাথজি ফাটলটার ভেতরে পা রাখলাম। কিছু বোঝার আগেই একটা পাথরের ঢালু চাতালের ওপর দিয়ে পিছলে নেমে গেলাম প্রায় ছ’ফুট নীচে। তারপরেই পায়ের নীচে সমতল জমি পেলাম। দেখলাম, আমরা একটা প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছি। সুড়ঙ্গটা বাইরের তুলনায় অনেক গরম যে শুধু তাই নয়, আলোকিতও। আলোটা আসছে কয়েকটা মোমবাতির শিখা থেকে। তার মধ্যে একটা মোমবাতিটা হাতে নিয়ে যিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁকে দেখলে যদিও ক্লাস টুয়েলভের ফার্স্ট-গার্লের থেকে বেশি কিছু মনে হয় না—সেরকমই রোগা ছোটখাটো চেহারা, সিরিয়াস চোখ আর ছোটছোট চুল— কিন্তু তিনিই যে বৃষ্টি দত্ত সেটা আমাদের বলে দিতে হল না।

বৃষ্টি হঠাৎ হাতের মোমদানিটা করণের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, প্রায় দৌড়ে আমাদের কাছে এগিয়ে এলেন। তারপর দুহাতে আমার দুটো হাত চেপে ধরে, অবিকল একটা হারিয়ে-যাওয়া বাচ্চা-মেয়ের মতন আকুল গলায় বললেন, ‘আমার ভয় করছে, ভীষণ ভয় করছে। দীপন এখানে এসেছে শুনেছি। ওর হাত থেকে আমার হাজব্যান্ডকে বাঁচাতে পারব তো?’

তিনি যে একদম বিনা আলাপে, বিনা ভূমিকায় এইভাবে আমাদের কাছে প্রশ্নটা করলেন, তার থেকেই বুঝতে পারলাম, কি ভীষণ টেনশনে রয়েছেন ভদ্রমহিলা। বদ্রিনাথজি একটা হাত দিয়ে ওকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘নিশ্চয় পারবে মা। চলো, আমরা কোথাও বসি। তারপর শুনি কী হয়েছে।’

করণ মোমের আলোয় পথ দেখিয়ে আমাদের নিয়ে গেল আরেকটু ভেতরে, যেখানে সুড়ঙ্গটা প্রায় একটা ঘরের মতন চওড়া হয়ে গেছে। বলল, ‘গত একমাস ধরে ম্যাডামকে নিয়ে এখানেই আছি। মাঝে মাঝে একবেলার জন্যে নীচে যাই, রুইং-এর গৃহস্থবাড়ির মড়াইয়ে জমিয়ে রাখা ভুট্টা, ঝোরা থেকে মাছ, এইসব নিয়ে আসি। বুনো তিতিরও পেয়ে যাই মাঝেমধ্যে। সেইসব খেয়ে বেঁচে আছি। আর সেই আঠারোবছর আগে শিলাজিতের খোঁজে বেরিয়ে আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম এই গুহা। যখন দীপন আমাদের খোঁজে এখানে এল আর আমরা অনেক দূর থেকে দেখলাম ও আসছে, যখন বুঝতে পারলাম আমাদের পালাতে হবে, নাহলে স্যারকে বাঁচাতে পারব না, তখন কি আশ্চর্যভাবে এই গুহাটার কথাই মনে পড়ে গেল।’

পাথরের মেঝেয় পেতে-রাখা প্লাস্টিকের শিটের ওপর জড়োসড়ো হয়ে বসে বৃষ্টি বললেন, ‘হ্যাঁ, সত্যি। করণভাই যদি না থাকত আমি সেদিনই মারা পড়তাম। আর আমি মরে গেলে কার্তিকেয়নও বাঁচত না। ও বেচারা এখন তো শুধু আমাদের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে আছে।’

আমি বললাম, ‘তিনি কোথায়? মিস্টার আয়েঙ্গার? তাঁকে দেখছি না যে।’

বৃষ্টি বললেন, ‘সে কী! আপনারা জানেন না? করণভাই আপনাদের বলেনি কিছু?’

করণ বলল, ‘সময় পেলাম কোথায়? এতক্ষণ তো পালাতেই ব্যস্ত ছিলাম। তাছাড়া আমি কি আর অত গুছিয়ে সব বলতে পারি? আপনি এবার বলুন ম্যাডাম।’

তারপর বৃষ্টি আমাদের এক আশ্চর্য কাহিনি বললেন। সেই কাহিনি শুনতে-শুনতে আমার আর বদ্রিনাথজির চোখের সামনে খুলে গেল তুয়াটোলির রহস্যের জাল।

বৃষ্টি ওইভাবে জড়োসড়ো হয়ে বসেই বলে চললেন, ‘কলেজে দীপন আমাদের দু’জনেরই খুব ভালো বন্ধু ছিল। তাই ইন্ডিয়ায় ফিরে এসে যখন আমাদের রিসার্চটা শেষ করার জন্যে একটা নির্জন জায়গা খুঁজছি, তখন ওর কথাই প্রথমে মনে পড়ল। তখনো তো জানি না, ও এতটা নীচে নেমে গেছে। দীপন আমাদের ল্যাবরেটরি বানানোর জন্যে গাথরির আউট-হাউস ছেড়ে দিল। শুধু তাই নয়, ওর বিরাট সোর্স কাজে লাগিয়ে আমাদের রিসার্চের জন্যে যখন যা দরকার—বিদেশি মেশিন থেকে শুরু করে জীবন্ত স্পেশিমেন পর্যন্ত—সমস্ত কিছু ও জোগাড় করে দিত। আমরাও কৃতজ্ঞতায় গলে গেলাম। আমাদের প্রোজেক্টের অনেক কথাই ওর কাছে বলে ফেললাম।’

‘কী করতে চাইছিলেন আপনারা?’ আমি জিগ্যেস করলাম।

বৃষ্টি বলল, ‘আমরা চাইছিলাম শূন্যের নীচের তাপমাত্রায় মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে। যতদিন ইচ্ছে ততদিন। তখন শরীরে প্রাণের কোনো লক্ষ্মণ থাকবে না, শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ছে কিনা বোঝা যাবে না, খাওয়ার প্রয়োজন থাকবে না, নড়াচড়া তো থাকবেই না। কিন্তু প্রাণ থাকবে। আবার ইচ্ছেমতন কোনো একটা সময়ে—সে দু’বছর পরে হতে পারে, দশবছর পরেও হতে পারে—সেই শীতঘুম থেকে তাকে জাগিয়ে তুলব। এই সময়ের মধ্যে তার শরীরের বয়স একদিনও বাড়বে না।

‘কিন্তু কাজটা কঠিন ছিল। চরম ঠান্ডায় না রাখলে শরীরকে ওভাবে ঘুম পাড়ানো যায় না। আবার সেই ঠান্ডাতেই কোষের ভেতরে আর বাইরে বরফ জমে যায়। আরও অনেকগুলো সমস্যা হয়। সেইজন্যেই উন্নতস্তরের কোনো প্রাণীকে এইভাবে ক্রায়ো-প্রিজার্ভ করা যায়নি।

‘কিন্তু আমরা পেরেছিলাম।

‘আমরা দেখেছিলাম সাব-আর্কটিক রিজিয়নের এক জাতের গেছোব্যাঙ শূন্যের চার-পাঁচ ডিগ্রি নীচেও ছ-সাত মাস দিব্যি ঘুমিয়ে কাটায়। তখন তাদের শরীরের বাইরেটা তো বটেই, ভেতরের অনেক জায়গাতেও বরফ জমে যায়। তবু আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে উঠলেই তারা আবার গা ঝাড়া দিয়ে মাটির গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে।

‘এটা তারা পারে কারণ ওইসময়ে ব্যাঙগুলোর শরীরে নিজের থেকেই কিছু রাসায়নিক তৈরি হয়, যা বরফ জমার হাত থেকে ওদের শরীরের কোষকে বাঁচায়। আমি আর কার্তিকেয়ন মিলে ওই জাতের কানাডিয়ান উড-ফ্রগের শরীরের কিছু নির্দিষ্ট জিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করলাম একটা গিনিপিগের শরীরে। আমাদের এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হল। সাব-জিরো টেম্পারেচারে গিনিপিগটাকে বাঁচিয়ে রাঝতে পারলাম। তারপর...’

আমি বৃষ্টির কথার মধ্যেই বলে ফেললাম, ‘তারপর বাঁদর, কুকুর আর হনুমান। ক্রমশ আরও বড় আকারের প্রাণীকে আপনারা ক্রায়োপ্রিজার্ভ করতে সক্ষম হলেন।’

বৃষ্টি অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে চাইল। আমি বললাম, ‘ক্ষমা করবেন। কয়েকদিন আগেই চুরি করে আপনাদের ল্যাবরেটরিতে ঢুকেছিলাম। তখনই দেখে এসেছিলাম আপনার ওই চারটে স্পেশিমেনকে। ওরা ভালো আছে। ঘুমোচ্ছে। কিন্তু পাঁচনম্বর স্পেশিমেনের বাক্সটা দেখেছিলাম খালি। ওটার মধ্যে কে ছিল?’

বৃষ্টি দত্ত যা উত্তর দিলেন সেটা আমাদের কাছে অকল্পনীয় ছিল। শুধু আমাদের কাছে কেন, পৃথিবীর যে-কোনো মানুষের কাছেই বোধহয় উত্তরটা অকল্পনীয় হতো। তিনি বললেন, ‘কার্তিকেয়ন। আমার রিসার্চ-পার্টনার। আমার এককালের সহপাঠী, এখন স্বামী।’

এইটুকু বলেই তিনি চুপ করে গেলেন। ওর মুখে একইসঙ্গে গভীর চিন্তা আর ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বদ্রিনাথজি বললেন, ‘চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি বলে যাও।’

বৃষ্টি ম্লান হেসে আবার কথা বলতে শুরু করলেন, ‘আমাদের পরীক্ষাটা যে কতটা বিপজ্জনক ছিল, সে তো আমরা জানতাম। আপনারা যে চারটে স্পেশিমেনকে ঘুমোতে দেখে এসেছেন তারা তো প্রথম নয়। ওদের আগে আরও কতগুলো গিনিপিগ, কুকুর কিম্বা বাঁদর আমাদের হাতে শহিদ হয়েছে জানেন? তারপর ওই চারটে লাকি চ্যাপ বেঁচে গেছে। পরীক্ষার নামে ওইভাবে কোনো মানুষকে মেরে ফেলার অধিকার তো আমাদের নেই। তাই কার্তিকেয়ন বলল, ও নিজের ওপরেই ওই এক্সপেরিমেন্ট করবে।

‘অনেক কান্নাকাটি করেও শেষ পর্যন্ত ওর কথা মেনে নিলাম, কারণ বুঝতে পারছিলাম, তাছাড়া আর উপায় নেই। আমাদের দু’জনের মধ্যে আমিই জেনেটিক-ইঞ্জিনিয়ার। কাজেই ওর শরীরের ভেতরের চেঞ্জগুলোকে রেগুলেট করার জন্যে আমাকে জেগে থাকতেই হবে। গিনিপিগ হতে গেলে কার্তিকেয়নকেই হতে হবে।

‘কার্তিকেয়নের শরীরে উড-ফ্রগের জিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করলাম। ওর নিজের হাতে অ্যারেঞ্জ করা ফ্রিজারে ওকে শুইয়ে দিলাম। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সাকসেস পেলাম না। শরীরের ভেতরে বরফ আটকানোর রাসায়নিকগুলো তৈরি হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু কোষ সেগুলোকে মেনে নিচ্ছিল না। নানান মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছিল।

‘কী আশ্চর্য কো-ইনসিডেন্স জানেন দাদা, ঠিক সেইসময়েই আমাদের হাতে এল গ্রিনফিল্ড ম্যাগাজিনে আপনার ওই ফোটো ফিচারটা। ওখান থেকেই জানলাম শুধু কানাডার মতন দেশেই নয়, আমাদের এই কুমায়ুন-রিজিয়নেও অমন উড-ফ্রগ রয়েছে, যারা সাব-জিরো টেম্পারেচারে বছরের অর্ধেক সময় শীতঘুমে কাটিয়ে দেয়। মাথার মধ্যে বিদ্যুতের মতন একটা চিন্তা খেলে গেল। ভাবলাম, আমরা তো আসলে নেচারকেই নকল করার চেষ্টা করছি। ছোটখাটো প্রাণীদের নেচার যে ক্ষমতা দিয়েছে, কৃত্রিমভাবে মানুষকে সেই ক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাহলে আমাদের এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে নেচারকেও জুড়ে নিচ্ছি না কেন? বিশেষত যখন কুমায়ুনের এত কাছে রয়েছি। লিকুইড নাইট্রোজেন দিয়ে ঠান্ডা করা চেম্বারের মধ্যে না রেখে সত্যিকারের সাব-জিরো ওয়েদারে কার্তিকেয়নকে ক্রায়ো-প্রিজার্ভ করার কথা আপনার ওই ফিচারটা পড়েই আমাদের মাথায় এসেছিল।

‘দীপনকে বললাম, আমাদের প্ল্যানের কথা। ও সমস্ত কথা খুব মন দিয়ে শুনল। এখন বুঝতে পারি, ওর মুখে কেন সেদিন অমন একটা শয়তানি হেসে খেলে গিয়েছিল। সে যাই হোক, ও খুব আন্তরিকভাবে বলল, আমি তোমাদের সমস্ত হেল্প করব বৃষ্টি। কাকপক্ষীতেও জানবে না, তোমরা উইথ অল ইয়োর ইকুইপমেন্টস পৌঁছে যাবে তুয়াটোলি বলে একটা নির্জন জায়গায়। সঙ্গে একজন গাইডও দিয়ে দেব।’

আমি জিগ্যেস করলাম, ‘সেদিন ও শয়তানের মতন হেসেছিল কেন সেটা এখন বুঝতে পারেন?’

‘পারি। আমাদের এখানে পৌঁছিয়ে দিয়ে ফিরে যাওয়ার আগে দীপন বলে গেল আমাদের আবিষ্কারের সমস্ত কাগজ তুলে দিতে হবে পাহাড়ের ওপাশের ওই দেশটার হাতে। তার বিনিময়ে ও আমাদের বড়লোক করে দেবে।

‘আমরা ওকে বললাম, আর যদি না দিই? যদি এরপর সারা পৃথিবীর সমস্ত বৈজ্ঞানিককে ডাকি আমাদের গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে?

‘দীপন খুব ঠান্ডা গলায় বলল, তাহলে তোমাদের তিনজনকেই গুলি করে মেরে এই বরফে পুঁতে ফেলা হবে। সেসব কাজ করার লোক রয়েছে আমার হাতে।

‘কার্তিকেয়নের মাথাটা বরাবরই খুব ঠান্ডা। ও সঙ্গে সঙ্গেই হেসে দীপনের হাতটা চেপে ধরে বলল, রাগ করছ কেন? অবশ্যই সমস্ত পেপার তুমি যাদের বলবে তাদেরই দিয়ে দেব। তবে রিসার্চটা কমপ্লিট হতে দাও। আগে একমাস বরফের নীচে ঘুমিয়ে সহি-সলামৎ ফিরে আসি—তারপরে ওসব কথা।

‘দীপন বলল, বেশ। একমাস বাদেই আমি তোমাদের নিতে আসব।’

বদ্রিনাথজি বললেন, ‘বুঝলাম। দীপন ফিরে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু তোমাদের দেখতে পায়নি। উল্টে হাঁসের মতন পা-ওলা দানবকে দেখে পালিয়েছিল।’

করণ ওর বাবার কথা শুনে বলল, ‘আমাদের পাবে কেমন করে? ওকে আসতে দেখেই তো আমরা এই গুহায় এসে লুকিয়েছিলাম।’

বললাম, ‘আর দানব? তাকে তোমরা কখনো দেখোনি?’

বৃষ্টি খুব থেমে-থেমে, সময় নিয়ে বলল, ‘দানব নয়। কার্তিকেয়ন।’

সাত

তখন সেই গুহার মধ্যে বাজ পড়লেও আমরা এতটা চমকাতাম না। বদ্রিনাথজি ভূতগ্রস্তের মতন বিড়বিড় করে বললেন, ‘কী বলছ! কার্তিকেয়ন—হাঁসের মতন পায়ের পাতা—মানুষের দ্বিগুণ শরীর...!’

বৃষ্টি বলল, ‘ঠিকই বলছি চাচা। সেই যে রেডিয়েশন, কুড়ি বছর ধরে যার ভয়ে এই উপত্যকার ধারেকাছে মানুষের যাতায়াত ছিল না, যে রেডিয়েশনের জন্যে আপনাদের এই গ্রাম শ্মশান হয়ে গিয়েছিল, সেই রেডিয়েশনের কয়েকটা ঝলক তুয়াটোলির মাটির তলায় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে ছিল।

‘এমন দুর্ভাগ্য, জানেন চাচা—পাথরে ভরা জায়গাটায় আমি আর করণ মিলে কার্তিকেয়নের ঢাকাঢুকি দেওয়া শরীরটাকে বরফের নীচে রেখে এসেছিলাম, পরে বুঝতে পারলাম সেটাই ওই ভেঙে পড়া টিলা। যেখানে কার্তিকেয়নকে রেখে এসেছিলাম, সেখানেই মাটির নীচে কোথাও চাপা পড়েছিল সেই আর্মির সেন্সর।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী? ‘জিন মিউটেশন’ কথাটা শুনেছেন নিশ্চয়ই। কার্তিকেয়নের শরীরের ভেতরে উড-ফ্রগের জিনগুলো ওই রেডিও-অ্যাকটিভিটির প্রভাবে মিউটেটেড হয়ে গেল। পাগলামি শুরু করে দিল তারা। আর আমাদের চোখের সামনে একদিন আমার হাজব্যান্ড ওর কোল্ড-চেম্বার ভেঙে বেরিয়ে এল। পাহাড়ের মতন শরীর। সারা গায়ের চামড়ায় বড়বড় আঁচিল। হাত আর পায়ের আঙুলগুলো চামড়া দিয়ে জোড়া। শুধু ওর চোখ দুটো বদলায়নি। ঠিক আগের মতনই শান্ত, ইনটেলিজেন্ট চোখদুটো আমার চোখের ওপরে রেখে ও কিছু বলতে গেল। কিন্তু ওর গলা দিয়ে কথার বদলে বেরিয়ে এল একটা বীভৎস আওয়াজ। আমাদের গার্গল করার শব্দটাকেই যদি দশগুণ বাড়িয়ে দেন, তাহলে যেরকম হয়, ঠিক সেরকম।’

‘তারপর?’

‘কিছুক্ষণ অসহায়ের মতন এদিক-ওদিক তাকাল কার্তিকেয়ন। তারপর দু-পায়ে হেঁটে আমার দিকে এগিয়ে আসতে গেল। পারল না। অমন ভারী শরীর আর চ্যাটালো পায়ের পাতা নিয়ে দু’পায়ে হাঁটা যায় না। চার হাতে-পায়ে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে খাদের মধ্যে নেমে গেল। তারপর থেকে ওটাই ওর থাকার জায়গা। মাঝে মাঝে উঠে আসে। রাতের অন্ধকারে এদিক-ওদিক ঘোরে। এরকম একটা রাতেই ও দীপনের টেন্টের কাছে চলে গিয়েছিল।

‘আমরা ওর সঙ্গে খাবার ভাগ করে খাই। আবার ও চলে যায় খাদের মধ্যে ওর গোপন আস্তানায়। মনে হয় স্বাভাবিক বুদ্ধিতেই ও বুঝতে পেরেছে যে, ওর ওই ব্যাঙের মতন চেহারাটা আমি সহ্য করে পারি না। আমার কান্না পায়, ভীষণ কান্না পায়। সেইজন্যেই ও আমার কাছ থেকে লুকিয়ে থাকে।’

বৃষ্টি সত্যিই কাঁদছিল। আমি, বদ্রিনাথজি আর করণ পাথরের মতন বসেছিলাম। একটু বাদে বৃষ্টি চোখ মুছে বলল, ‘তবে এর মধ্যে দুটো জিনিস হয়েছে, বুঝলেন। এক, কার্তিকেয়ন আস্তে আস্তে আবার আগের মতন হয়ে যাচ্ছে। ওকে দেখলে এখন মানুষ বলে চেনা যাচ্ছে। আর দুই, ও কোথা থেকে যেন পাথর-টাথর সরিয়ে সেই ভাঙা সেন্সরের রেডিও-অ্যাকটিভ পার্টটুকু কুড়িয়ে এনেছে। ওটাকে আমরা সীসের চাদরে মুড়ে রেখে দিয়েছি। একটা বড় ক্যাসেটের মতন জিনিস। ওটাই সম্ভবত মেশিনটার মেমারি-স্টোর, যেখানে দশমাস ধরে যা রেকর্ড করেছিল সব স্টোর করা আছে। এতদিনে একটা ব্যাঙ-মানুষের হাতে সত্যিই তুয়াটোলি বিপদমুক্ত হল।’

‘এক্সেলেন্ট।’

কথাটা আমাদের চারজনের মধ্যে কেউ বলিনি। কে বলেছে দেখবার জন্যে আমরা গুহার দরজার দিকে তাকালাম। দেখলাম দীপন শুক্লা দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর মুখে একটা তৃপ্তির হাসি। হাতে খুব খতরনাক চেহারার একটা আগ্নেয়াস্ত্র।

আমাদের দিকে দু-পা এগিয়ে এসে দীপন আবার বলল, ‘এক্সেলেন্ট। ওই ক্যাসেটটা আমার চাই। বৃষ্টি, তোমাদের এক্সপেরিমেন্ট যে ভণ্ডুল হয়ে গেছে সে তো বুঝতেই পারছি। বরফের ওপরে এদের তিনজনের পায়ের ছাপ ফলো করে আসতে-আসতে ভাবছিলাম, এত পরিশ্রম কি বৃথা যাবে? খালি হাতেই কি ফিরে যাব দেরাদুনে? তাহলে কী জন্যে আমার লোকটাকে মারতে গেলাম? বেঁচে থাকলেও তো তেমন গোপন কিছুর সাক্ষী থাকত না।

‘এখন দেখছি ভগবান আছেন। ওই ক্যাসেটটার দাম কম হবে না। অত বছর আগে, অত কোটি টাকা খরচা করে এমনি এমনি তো বসায়নি।’

হঠাৎই দীপনের গলার স্বর চড়ে গেল। হুঙ্কার দিয়ে উঠল—‘গেট আপ। গেট আপ, অল অফ ইউ। এক এক করে বাইরে চলো—একজনের পেছনে একজন। এই করণ, তুই সবার শেষে যাবি। তোর পিঠে মেশিন ঠেকিয়ে রাখব। সামনে একজন লাইন ছেড়ে বেরোবে তো তুই শেষ হয়ে যাবি।’

বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, হিমালয়ের রাতের আকাশ কোনো জাদুকরের কালো ভেলভেটের জ্যাকেটের মতন মসৃণ, তার ওপরে যাদুকরের বুকের মেডেলের মতন বড়বড় রুপোলি তারা ধকধক করে জ্বলছে। কিন্তু কোনো ম্যাজিকই যে আর আমাদের বাঁচাতে পারবে না, সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম।

দীপন আমাদের চারজনের দিকে বন্দুক তাক করে রেখে বলল, বৃষ্টি, তুমি জানো ক্যাসেটটা কোথায় আছে। ওটা নিয়ে এসো। যদি না আসো, আমি ঠিক দশমিনিট অন্তর একজনকে গুলি করে মারব।

বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গেই দৌড় শুরু করতে যাচ্ছিল। আমি নিশ্চিত, ও দশমিনিটের অনেক আগেই ক্যাসেটটা নিয়ে ফিরে আসত। কিন্তু ওর যাওয়া হল না। হঠাৎই পাশের রিভারবেড থেকে একটা বিশাল কালো শরীর লাফ মেরে উঠে এল আমাদের পাশে। কলকল করে একটা বিকট ডাক রাতের নৈঃশব্দ্যকে খানখান করে দিল।

একটা রাক্ষুসে ব্যাঙ। না, মানুষ। বিশাল মোটা। ঘাড় বলে কিছু নেই। চার হাতেপায়ে ভর দিয়ে থপথপ করে এগিয়ে এসে বৃষ্টির পাশে দাঁড়াল। এখন দীপনের বন্দুকের নলের সামনে আমরা পাঁচজন।

দীপন খুব তাড়াতাড়ি হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠল। তারপরেই ওর মুখে ফুটে উঠল একটা পৈশাচিক হাসি। ও চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, ‘ওয়েলকাম আয়েঙ্গার, মাই ফ্রেন্ড! সেদিন বড্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছিলিস। আজ কিন্তু সবটা শোনার পরে হাসিই পাচ্ছে। আয়, তোকে এই বিশ্রী অবস্থা থেকে মুক্তি দিই।’

দীপন এক ঝটকায় রাইফেলের নলটা কার্তিকেয়নের বুকের দিকে ঘুরিয়ে ধরল। বৃষ্টি বুকফাটা হাহাকার করে উঠল। আমি চোখের কোনা দিয়ে দেখলাম, করণের শরীরটা একটা চিতাবাঘের মতন গুটিয়ে গেছে। ও লাফ মারবে...আমি নিশ্চিত ও এক্ষুনি দীপনের ওপরে লাফ দিয়ে পড়বে। কিন্তু এটাও জানি, ও দীপনের কাছে পৌঁছতে পারবে না। দশফুট দূরত্ব এক লাফে পেরোনো যায় না। ওকে মাঝপথেই গুলি করে মারবে দীপন। তবু জানি, করণ একটা শেষ-চেষ্টা করবেই।

কিন্তু তার দরকার পড়ল না। হঠাৎই কদাকার কার্তিকেয়ন আয়েঙ্গারের মুখের ভেতর থেকে একটা বিশাল চওড়া কালো রিবন বেরিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে আছড়ে পড়ল দীপনের মুখের ওপর। পরের মুহূর্তেই রিবনটা আবার কার্তিকেয়নের মুখের ভেতরে ফেরত চলে গেল। তার সঙ্গেই চলে গেল দীপনের মুন্ডুটা। মুণ্ডহীন শরীরটা কয়েক-সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঢলে পড়ল মাটিতে।

মনে পড়ল, ব্যাঙের জিভ আমাদের মতন মুখের পেছনদিকে আটকানো থাকে না। আটকানো থাকে সামনের দিকে। আর সেই আঠালো জিভ শিকারের ওপর ছুড়ে দিয়ে একটা ব্যাঙ ঠিক এইভাবেই শিকার ধরে, যেভাবে কার্তিকেয়ন এইমাত্র দীপনের মাথাটা ধড় থেকে ছিঁড়ে নিল।

আট

চলুন চ্যাটার্জি সাহেব, গাড়ি এসে গেছে।

একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালাম। আমরা এবার জলপাই-সবুজ ব্রিজ পেরিয়ে চলে যাব। আমি, বদ্রিনাথজি আর করণজিৎ। করণজিৎ মাত্র একবেলা থাকবে দেরাদুনে। তুয়াকে নিশ্চয় তার মধ্যেই অনেক আদর করে দেবে। তারপর ও আবার ফিরে আসবে তুয়াটোলিতে। সঙ্গে করে নিয়ে আসবে আগামী কয়েক মাসের খাবার আর বৃষ্টির লিখে দেওয়া কিছু কেমিক্যাল, ওদের ল্যাবরেটরিতেই পাওয়া যাবে সেগুলো।

ও ততদিনই তুয়াটোলিতে থাকবে, যতদিন না কার্তিকেয়ন আবার পুরোপুরি মানুষের চেহারা ফিরে পাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে দেরাদুনে ওর মেয়ের কাছে ফিরবে বইকি। সেইসময়ে বদ্রিনাথজি আসবেন ওকে রিলিফ দিতে।

তুয়াটোলিতে তাঁর ভাঙা ঘরটাকে সারিয়ে নিয়েই তিনি থাকবেন। গাড়িতে উঠতে-উঠতে লাজুক-মুখে আমাকে বললেন, ‘আফটার-অল জন্মভূমি, বুঝলেন চ্যাটার্জি সাহেব। টান এড়ানো ভারি মুশকিল।’

জানলার কাচটা তুলে দিতে-দিতে বললাম, ‘আমাকেও কলকাতা টানছে। আমার জন্মভূমি। চলুন ভাই সুন্দর সিং। স্টার্ট দিন।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%