৪. চিত্রা ও কল্পনা

আবু সয়ীদ আইয়ুব

মানসসুন্দরীর সন্ধানে আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম মানুষী প্রেমের অতৃপ্তি ও নৈরাশ্য মনে নিয়ে। সোনার তরীতে নিরুদ্দেশ যাত্রা লক্ষ্যবস্তুর কাছে আমাদের নিয়ে গেল কিনা বোঝা গেল না। কিন্তু ‘চিত্রা’য় এসে আমরা কবির একাধিক মানসপ্রবাহের সংগমাভিমুখিনতা দেখতে পাচ্ছি। তারা সংগমস্থলে, অর্থাৎ বিশ্বলোকের স্রষ্টা ও বিধাতা, মানুষের পরম পিতা ও সখা, সত্য-শিব-সুন্দরের পরম প্রকাশ ঈশ্বরে এখনো ঠিক পৌঁছয়নি, কিন্তু সেই দিকে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ বেশ স্পষ্ট ভাষায় তাঁর পাঠকদের বুঝিয়ে দিয়েছেন যে জীবনদেবতা ঈশ্বর নন, ‘ধর্মশাস্ত্রে যাঁহাকে ঈশ্বর বলে তিনি বিশ্বলোকের, আমি তাঁহার কথা বলি নাই; যিনি বিশেষরূপে আমার, অনাদি অনন্তকাল একমাত্র আমার…চিত্রা কাব্যে তাহারই কথা আছে।’ লক্ষণীয় এই যে, জীবনদেবতা মানসসুন্দরীর মতো কল্পলোকবিহারী নন, তাঁর উদ্ভব প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে। কবি উপলব্ধি করছেন— এটা প্রতিভাদীপ্ত কবিমাত্রের সামান্য উপলব্ধি— যে অনেক সময়ে তাঁর কবিতা এমন এক স্তরে পৌঁছে যায় যেখানে পৌঁছে দেওয়া তাঁর নিজের পরিমিত শক্তিতে এবং সচেতন চেষ্টায় সম্ভব ছিল বলে তিনি ভাবতে পারেন না। কোন্‌ এক অদৃশ্য মহাশিল্পী যেন তাঁর হাত দিয়ে অসাধ্য সাধন করে চলেছেন। এই অন্তর্যামী কবি-প্রতিভাই কবির জীবনদেবতা।

আমরা ঈশ্বরের আরও এক ধাপ কাছে পৌঁছই যখন রবীন্দ্রনাথ জীবনদেবতার সংজ্ঞাকে প্রশস্ততর করে বলেন, কবির অন্তরালে যিনি কবি— ‘রচয়িতার মধ্যে আর একজন কে রচনাকারী’— তিনি কেবল কবিকর্মের গতিপ্রকৃতিই অন্তরাল থেকে নির্ণয় করছেন না, ‘আমার সমস্ত ভালোমন্দ, আমার অনুকূল ও প্রতিকূল উপকরণ লইয়া আমার জীবনকে রচনা করিয়া চলিয়াছেন।’ বধূ যেমন বরের হাতে নিজেকে অর্পণ করে পরম সুখ ও সার্থকতা লাভ করে, কবি তেমনি তাঁর জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ও কর্ম, রাগিণী ও ছন্দ দিয়ে তাঁর পরম বরের জন্য বাসরশয়ন রচনা করেন। এই স্বামীসোহাগের চিত্রকল্পেই “জীবন-দেবতা”-র আরম্ভ:

গলায়ে গলায়ে বাসনার সোনা
প্রতিদিন আমি করেছি রচনা
তোমার ক্ষণিক খেলার লাগিয়া
মুরতি নিত্যনব।

“চিত্রা” নামক কবিতাটির উপলব্ধি একাধারে অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী; জগতের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বিচিত্ররূপিণী মানস-সুন্দরীকে, অন্তরের মধ্যে জীবনদেবতাকে।[১] এই যুগল মূর্তির ধ্যানে বসেও রবীন্দ্রনাথের মনে সন্দেহ জাগে, হয়তো তাঁর জীবনে সত্য দেবতার আবির্ভাব ঘটেনি, এঁরা তারই আপন মনের বাসনা ও কল্পনা দিয়ে গড়া মূর্তি:

আমি যে কাতর
অনন্ত তৃষায়, আমি নিত্য নিদ্রাহীন,
সদা উৎকণ্ঠিত, আমি চিররাত্রিদিন
আনিতেছি অর্ঘ্যভার অন্তর-মন্দিরে
অজ্ঞাত দেবতা লাগি— বাসনার তীরে
একা বসে গড়িতেছি কত যে প্রতিমা
আপন হৃদয় ভেঙে, নাহি তার সীমা।

ঈশ্বরের উপলব্ধি এখনও সত্য হয়ে ওঠেনি, ‘নৈবেদ্য’-পরবর্তী কয়েকখানি কাব্যে যেমন হয়ে উঠবে। তবে অজ্ঞাত দেবতার জন্য তৃষ্ণা ও উৎকণ্ঠা ইতিমধ্যেই তাঁর কাব্যানুভূতিকে অনুরঞ্জিত করেছে, সংরক্ত করেছে।

যে-দুই দেবতার (মানসসুন্দরী ও জীবনদেবতা) কথা শুনি এ-পর্বের কাব্যে, তাঁরা স্পষ্টতই আরও উপরে উঠবার সোপান। কিন্তু নিজের কাব্যরচনা ও জীবনরচনার বাইরে যখন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন কবি, পৃথিবীর এবং পৃথিবীর মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখেন, তখন তাঁর ব্যাকুল হৃদয়ের নিরাশ্রয় শূন্যতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। “সন্ধ্যা” কবিতাটি এই শূন্য ক্লান্ত হৃদয়ের সার্থক প্রকাশ। এমন স্মরণীয় কবিতা কেন যে সমালোচক ও সংকলকদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে তা আমার কাছে একটু আশ্চর্য ঠেকে। কবিতাটির প্রথম স্তবকের ঈষৎ করুণ সন্ধ্যার বর্ণনা করুণতর হয়ে ওঠে নিস্তব্ধ শান্ত গ্রামের একটি কুটির-প্রাঙ্গণের বেড়া-ধরে-দাঁড়ানো কোনো গৃহবধূর রেখাচিত্রে। তারপরে একটি তুলনা:

শিশুরা খেলে না; শূন্য মাঠ জনহীন;
ঘরে-ফেরা শ্রান্ত গাভী গুটি দুই-তিন
কুটির-অঙ্গনে বাঁধা, ছবির মতন
স্তব্ধপ্রায়। গৃহকার্য হল সমাপন—
কে ওই গ্রামের বধু ধরি বেড়াখানি
সম্মুখে দেখিছে চাহি, ভাবিছে কী জানি
ধুসর সন্ধ্যায়।

অমনি নিস্তব্ধপ্রাণে
বসুন্ধরা, দিবসের কর্ম-অবসানে,
দিনান্তের বেড়াটি ধরিয়া আছে চাহি
দিগন্তের পানে। ধীরে যেতেছে প্রবাহি
সম্মুখে আলোকস্রোত অনন্ত অম্বরে
নিঃশব্দ চরণে; আকাশের দূরান্তরে
একে একে অন্ধকারে হতেছে বাহির
একেকটি দীপ্ত তারা, সুদূর পল্লীর
প্রদীপের মতো। ধীরে যেন উঠে ভেসে
ম্লানচ্ছবি ধরণীর নয়ননিমেষে
কত যুগ-যুগান্তের অতীত আভাস,
কত জীবজীবনের জীর্ণ ইতিহাস।
যেন মনে পড়ে সেই বাল্যনীহারিকা;
তার পরে প্রজলন্ত যৌবনের শিখা;
তার পরে স্নিগ্ধশ্যাম অন্নপূর্ণালয়ে
জীবধাত্রী জননীর কাজ বক্ষে লয়ে
লক্ষ কোটি জীব— কত দুঃখ, কত ক্লেশ,
কত যুদ্ধ, কত মৃত্যু, নাহি তার শেষ।

ক্রমে ঘনতর হয়ে নামে অন্ধকার,
গাঢ়তর নীরবতা— বিশ্বপরিবার
সুপ্ত নিশ্চেতন। নিঃসঙ্গিনী ধরণীর
বিশাল অন্তর হতে উঠে সুগম্ভীর
একটি ব্যথিত প্রশ্ন, ক্লিষ্ট ক্লান্ত সুর,
শূন্যপানে— ‘আরো কোথা? আরো কত দূর?’

এই কবিতার শেষ চরণ মনে করিয়ে দেয় বলাকার নাম-কবিতাটির শেষ চরণকে— ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোন্‌খানে।’ দুই চরণেই গতির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কত ভিন্ন ভাবে, প্রায় বিপরীত মেজাজ থেকে। প্রথমটিতে গতি এনেছে শুধু দুঃখ ও হতাশা। ধরণী লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরে আপন কক্ষপথে চলতে চলতে দেখেছে ‘কত দুঃখ, কত ক্লেশ/কত যুদ্ধ, কত মৃত্যু, নাহি তার শেষ।’ তাই আজ প্রশ্ন তার নিরাশ, সুর ব্যথিত ও ক্লান্ত, আর যেন সে পারছে না, এবার সব শেষ হয়ে গেলেই শান্তি। আর দ্বিতীয় কবিতাটিতে ‘পুলকিত নিশ্চলের অন্তরে অন্তরে/বেগের আবেগ’, নিখিলের পাখা ‘অস্ফুট সুদূর যুগান্তরে’ উড়ে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল, অধীর; ক্লান্তি বা বিষাদের এতটুকু ছোঁয়া লাগেনি তাতে। ‘গীতাঞ্জলি’ পর্বে যে ‘দুখযামিনীর বুক-চেরা ধন’ কবি লাভ করেছিলেন তার দীপ্তিচ্ছটা ‘বলাকা’ রচনাকালেও নিষ্প্রভ হয়ে যায়নি, যদিও মহাযুদ্ধের ছায়া পড়েছে তার উপর। কিন্তু ‘চিত্রা’ কাব্যে সে গুপ্তধনের জন্য আকুলতা যতই দেখা যাক, তার সন্ধান তখনো পাননি কবি। তাই সে-পর্বে গতি মানেই প্রগতি নয়, দূরে যাওয়া মানেই কোনো চরম লক্ষ্যের দিকে এগুনো নয়; গতিবোধ কোনো উচ্ছ্বাস জাগায় না, জাগায় শুধু নৈরাশ্য আর বিষাদ।

বসুন্ধরা-বিষয়ক এই কবিতার সঙ্গে আর-একটি কবিতার প্রতিতুলনা সহজেই মনে আসে— ‘পত্রপুট’-এর তিন নম্বর কবিতা (‘আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করো পৃথিবী’)। চিত্রায় ধরণীর ছবিটি অত্যন্ত করুণ, সে ভাগ্যপীড়িত মানবসন্তানদের সঙ্গে একীভূত, তাদেরই মতো অসহায়, ক্লান্ত, করুণার্হ। ‘পত্রপুট’-এর পৃথিবী সমগ্র জাগতিক শক্তির প্রতীক; মানবসন্তানদের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্নেহপরায়ণা জননীর সঙ্গে একান্ত নির্ভরশীল পুত্র-কন্যার নয়; সম্পর্ক আরও দূরের, অনেকটা যেন খামখেয়ালী দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজার সঙ্গে পদানত প্রজাবর্গের। ‘বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে’, ‘কৃপা করো না কৃপাপাত্রকে’, ‘ছারখার করছ আপন সৃষ্টিকে’; আবার কখনো ‘চাঁদের পেয়ালা ছাপিয়ে দিয়ে উপচিয়ে পড়েছে/স্বর্গীয় মদের ফেনা।’ একাধারে সে সুন্দরী অন্নপূর্ণা এবং অন্নরিক্তা ভীষণা। সবসুদ্ধ সে প্রণম্যা, প্রচণ্ড সুন্দর তার মহিমা। কিন্তু যে-দৃষ্টি দিয়ে কবি দেখছেন এই উদাসীন পৃথিবীকে তা বিশুদ্ধ নান্দনিক, ভালোমন্দ বিচারের ঊর্ধ্বে, মানুষের সুখদুঃখে সংক্ষুব্ধ নয়; বহুদূর থেকে যেন এই মহা-নাট্যকারের নাট্যলীলা দেখে কবি রূপমুগ্ধ। চিত্রার কবি মানুষের অনেক বেশি কাছাকাছি, মানুষের ভাগ্য নিয়ে অনেক বেশি দুর্ভাবিত ও পীড়িত।

“সন্ধ্যা” কবিতাটিতে অভিব্যক্ত জাগতিক বেদনা ও হতাশা রবীন্দ্রনাথকে কতখানি বিচলিত করেছিল, তা আমরা বুঝতে পারি মাত্র কয়েকদিন পরে লেখা “এবার ফিরাও মোরে” থেকে। এ-দুটি রচনা— প্রথমটি একটি উৎকৃষ্ট এবং প্রায় অখ্যাত কবিতা, দ্বিতীয়টি বহুবিখ্যাত প্রায় অকবিতা— পরপর পড়ে গেলে রবীন্দ্রনাথের একটা দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অমঙ্গলবোধ তাঁর মনে যখনই অতিশয় তীব্র হয়ে উঠেছে তখনই তিনি ‘উত্তরি’ ছেড়ে ‘বর্ম’ ধারণ করতে উদ্যত হয়েছেন। নিজের অন্তর্বাসী কবিপুরুষকে ধিক্কার দিয়েছেন, ‘ছিন্নবাধা পলাতক বালকের মতো/মধ্যাহ্নে মাঠের মাঝে একাকী বিষণ্ণ তরুচ্ছায়ে’ বাঁশি বাজানো অসহ্য লেগেছে; ডাক দিয়েছেন সেই কর্মী-পুরুষটিকে যিনি তাঁর সত্তায় সর্বদাই লুকানো রয়েছেন, ঘোষণা করেছেন কবিকে কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হতে হবে:

কবি, তবে উঠে এস— যদি থাকে প্রাণ
তবে তাই লহ সাথে, তবে তাই করো আজি দান।
বড়ো দুঃখ, বড়ো ব্যথা— সম্মুখেতে কষ্টের সংসার
বড়ই দরিদ্র, শূন্য, বড়ো ক্ষুদ্র, বদ্ধ, অন্ধকার।

তারপরে নিজের প্রতি অজস্র উপদেশবাণী:

কী গাহিবে, কী শুনাবে! বলো, মিথ্যা আপনার সুখ,
মিথ্যা আপনার দুঃখ। স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ
বৃহৎ জগৎ হতে সে কখনো শেখে নি বাঁচিতে।

ভাষাটিও নীতি-উপদেশের, কবিতার নয়। কবি ও কর্মী এই দ্বৈতসত্তার অন্তর্বিরোধ মাঝে মাঝে কবিকে করে তুলেছে উপদেষ্টা, কিন্তু সে যৎসামান্য ও তৎসাময়িক উন্মার্গগতি তাঁর মূল কাব্যধারাকে মোটের উপর আরও বেগবান, আরও উত্তরঙ্গ করেছিল।

.

চিত্রার “সন্ধ্যা” যে ‘ক্লান্ত ক্লিষ্ট’ সুরে শেষ হলো সেই ক্লান্তি রূপায়িত হয়েছে আরও গভীর, পরিব্যাপ্ত ও সার্থক ভাবে সন্ধ্যা-বিষয়ক অন্য একটি কবিতায়— কল্পনার “দুঃসময়”-এ। সমস্ত পৃথিবীর বিষণ্ণ অবসাদ যেন কবি টেনে নিয়েছেন নিজের মধ্যে, নিজের দুটি ক্লান্ত ডানার মধ্যে। নীড় কোথাও নেই, ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম পাওয়া যেতে পারে এমন গাছপালাও দেখা যাচ্ছে না, আছে শুধু নিবিড়-তিমির-আঁকা মহানভ-অঙ্গন— যে-মহানভে উষার দিশা পর্যন্ত গেছে হারিয়ে। উষার অস্তিত্ব বিষয়ে অবশ্য কবির মনে কোনো সন্দেহ নেই, নইলে কেন বারে বারে ক্লান্ত বিহঙ্গকে পাখা বন্ধ না করতে উপরোধ করা হবে। সম্মুখে এখনো অবশ্য ‘সুচির শর্বরী’ রয়েছে এবং ‘নিম্নে গভীর অধীর মরণ,’ তবু নিরাশ হলে চলবে না।

বিহঙ্গকে কেন ‘অন্ধ’ বলা হলো এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কিন্তু কবি এবং মানবাত্মা মাত্রই (বিহঙ্গ যার প্রতীক এই কবিতায়) তো স্বভাবগুণে অন্ধই, বহু দীর্ঘ ও কঠিন সাধনার ফলে তাকে চোখের জ্যোতি লাভ করতে হয়। মনে রাখা ভালো যে উপনিষদে কোথাও বলা হয় নি চোখের সামনেই আলো রয়েছে। আদিত্য-বর্ণ মহান্ পুরুষ আছেন অবশ্য, কিন্তু তমসার পরপারে। এই দীর্ঘ দীর্ঘ তামসী রাত্রি পার হবার বেদনা ও ক্লান্তিই অভিব্যক্ত হয়েছে এই কবিতায়। ‘ওরে আশা নাই, আশা শুধু মিছে ছলনা’ এর অর্থ এই নয় যে একেবারেই কোনো আশা নেই[২], কারণ সঙ্গেই বলা হচ্ছে ‘ওরে ভয় নাই।’ অল্পেতে সংকট কেটে যাবে, সহজেই আলো দেখা দেবে— এই আশাকেই ‘মিছে ছলনা’ বলা হয়েছে।

কিন্তু ইতিমধ্যে তারাগুলি ইঙ্গিত করছে, ‘বহুদূর তীরে’ কারা যেন অঞ্জলি বেঁধে ডাকছেও। তারাগুলি কি উপনিষদের বাণী, এবং ‘বহুদূর তীর’ কি প্রাচীন ভারতবর্ষ? কল্পনার পরবর্তী কবিতাগুলি পড়লে এই ধারণাই মনে স্থান পায়। সোনার তরী ও চৈতালি রচনাকালে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শিলাইদহের পদ্মাতীরে, সমসাময়িক কাল ঘেঁষে। কল্পনা-তে তিনি চ’লে গেলেন রেবা-শিপ্রার তটে কালিদাসের কালে; আর নৈবেদ্যে তাঁকে দেখা যাবে সরস্বতী-দৃষদবতীর তীরে, উপনিষদের যুগে। অতীত যুগে অবগাহনের একাধিক বাহ্যিক ও আপতিক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু একটি আভ্যন্তরীণ তাগিদও ছিল। মানসী কাব্যে যে নৈরাশ্য ও বিষাদের সুর তরুণ প্রমথ চৌধুরী লক্ষ্য করেছিলেন তা মানসীতেই কেটে যায় নি, অন্যান্য সুরের মধ্যে এই সুরের গভীর থেকে গভীরতর অনুরণন শুনতে পাওয়া যায় কল্পনা পর্যন্ত।

কবি তাঁর সমসাময়িক কালকে—কালের মানুষকে, সঙ্গিণীকে, প্রকৃতিকে— ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু গভীর অতৃপ্তিও লাভ করেছিলেন। প্রেমের ক্ষণিকতা, প্রেমাস্পদের অপূর্ণতা (যে অপূর্ণতাবোধ তাঁর প্রেমকে মানবী থেকে মানসীর দিকে চালিত করেছিল) তাঁকে ব্যথা দিয়েছিল; মানুষের বহুবিধ দৈন্য দুর্দশা অক্ষমতা অসহায়তা (‘মোরা শুধু খড়কুটো স্রোতোমধ্যে চলি-য়াছি ছুটি’) তাঁকে পীড়া দিয়েছিল; প্রকৃতি মনোহর কিন্তু নির্মম ও নিষ্ঠুর (‘হৃদয় কোথায় তোর খুঁজিয়া বেড়াই/নিষ্ঠুরা প্রকৃতি’), নিয়মের নিগড়ে নিজেকেও বেঁধেছে, মানুষকেও পিষে মারছে। এই পরিব্যাপ্ত নৈরাশ্য ও বিষাদের ঘনায়মান অন্ধকার থেকে নিষ্ক্রমণের পথ খুঁজছিলেন কবি, তাই বারে বারে তাঁর অন্তরের ক্লান্ত পাখিকে ডেকে বলছেন— ‘তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর/ এখনি অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।

.

১ ‘বাইরে যার প্রকাশ বাস্তবে সে বহু, অন্তরে যার প্রকাশ সে একা। …জগতে বিচিত্ররূপিণী আর অন্তরে একাকিনী, কবির কাছে এ দুই-ই সত্য।’ –চিত্রা কাব্যের সূচনা, রবীন্দ্র-রচনাবলী, ১ম খণ্ড, পৃ ৪৬৪

২ তুলনীয় :

তবু একদিন এই আশাহীন পন্থ রে
অতি দূরে দূরে ঘুরে ঘুরে শেষে ফুরাবে,
দীর্ঘ ভ্রমণ একদিন হবে অন্ত রে,
শাস্তিসমীর শ্রান্ত শরীর জুড়াবে। (কল্পনা— “অসময় “)

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%