কবিতার ভাষা

আবু সয়ীদ আইয়ুব

সাহিত্য শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে রবীন্দ্রনাথ তার সংজ্ঞা দিয়েছিলেন— যা মনের সঙ্গে বিশ্বের ‘সাহিত্য’ অর্থাৎ মিলন ঘটায়। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে সাহিত্য, বিশেষত কবিতা, আর মিলনের সেতু নয়, বিচ্ছেদের প্রাচীর হয়ে উঠেছে ইদানীং। কবিতার বাহন অবশ্য ভাষা, কিন্তু ভাষার দ্বারা যোগ এবং বিয়োগ দুইই সাধ্য। ভাষা যদি হয় কাচের মতো দৃষ্টিভেদ্য, তবেই ওপারের আলো নিয়ে আসতে পারে মনের কক্ষে, মনকে প্রসারিত করতে পারে বিশ্বের প্রাঙ্গণে। ‘বাহিরের তথ্য বা ঘটনা যখন ভাবের সামগ্রী হয়ে আমাদের মনের সঙ্গে রসের প্রভাবে মিলে যায় তখন মানুষ স্বভাবতই ইচ্ছা করে সেই মিলনকে সর্বকালের সর্বজনের অধিকারভুক্ত করতে।’ এই ইচ্ছার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ কবিকর্মকে যুক্ত করেছিলেন। আধুনিক কাব্যস্রষ্টা ও কাব্যতাত্ত্বিকদের চোখে কবিকর্মের লক্ষ্য কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রায় আশী বছর আগে মালার্মে দেগাসকে যে-উপদেশ দিয়েছিলেন — “one makes poetry with words, not with ideas” (শব্দ দিয়ে কাব্য রচনা করতে হয়, ভাব দিয়ে নয়)— তারই মধ্যে এই লক্ষ্যান্তরের পথনির্দেশ ছিল বোধ করি। শব্দকেই কবিতার মূল তন্মাত্র এবং ভাবকে ভেজাল মনে করার ফল হ’ল এই যে, কাব্যসৃষ্টিতে শব্দযোজনা কেবল ধ্বনির দিক লক্ষ্য রেখে হতে লাগল, কবিতার ভাষারও যে-একটা বোধগম্য, অন্তত হৃদয়গ্রাহ্য, অর্থ থাকা আবশ্যক এই অনুশাসনের বিরুদ্ধে কবিদের বিদ্রোহ ক্রমাগত প্রবলতর হয়ে উঠল।

আলংকারিকদের ভাষায় কাব্যের অর্থ দুই প্রকার— বাচ্যার্থ ও ব্যঙ্গ্যার্থ। বাচ্যার্থ সাদাসিধেভাবে অর্থ বলতে যা বোঝায় তাই। ব্যঙ্গ্যার্থ বলতে ঠিক কী বোঝায় সেটা স্পষ্ট ক’রে বলা খুব সহজ নয়, তবে এই ব্যঙ্গ্যার্থেই কাব্যের প্রাণ। সেকেলে অর্থাৎ মালার্মে-পূর্ববর্তী কাব্যে বাচ্যার্থ তো থাকত ই, তদুপরি থাকত ব্যঙ্গ্যার্থ; গদ্যের চেয়ে অর্থসম্বল বেশি বই কম ছিল না কবিতার। আজ শুনছি অর্থের বোঝা পারাপার করতে আছে গদ্যরূপী গাধাবোট; কবিতার ময়ূরপঙ্খী নায়ে যে-শৌখিন ভাষা ভেসে বেড়ায় তার সঙ্গে অর্থের মালপত্র থাকলে নৌকাযুদ্ধ ভরাডুবি হবার আশঙ্কা। এলিয়ট বলেছিলেন, কাব্যের বাচ্যার্থ বা আভিধানিক অর্থ ছেঁটে ফেললে ক্ষতি নেই কারণ তার কাজ সামান্যই, পাঠকের প্রহরীচিত্তের সামনে ফেলে-দেওয়া এক টুকরো মাংসের চেয়ে বেশি নয়। ঐ প্রহরীটিকে একটা-কিছু দিয়ে ভুলিয়ে তবেই কবিতা ঢুকতে পারে অন্তঃপুরে।

এটা প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। বছর কুড়ি আগে আধুনিক সাহিত্যের আর-একজন কর্ণধার, জ্যাঁ পোল সার্ত্র[১] ঘোষণা করলেন যে কাব্যের পক্ষে অর্থমাত্রই অনর্থকারী। গদ্যের ভাষা স্বচ্ছ কাচের মতো, নিজেকে দৃষ্টিগোচর না ক’রে আমাদের দৃষ্টিকে এগিয়ে দেয় ওপারের বস্তুগুলির দিকে। কবিতার ভাষা কিন্তু নিজেকেই চোখের সামনে তুলে ধরে, দৃষ্টিকে আটকে রাখে ঐ কারুকার্য খচিত কাচের মধ্যে, কাব্যেতর কিছু দেখতে দেওয়া তার পক্ষে আত্মাবমাননার সামিল। আমরা কখনো কখনো ফুলকেও তো ভাষার মতো ব্যবহার করি, গোলাপকে প্রেমের সংকেত বানিয়ে তুলি, পদ্মকে পূজার, ইত্যাদি। কিন্তু তখন ফুলের গন্ধ বর্ণ কোমলতা মসৃণতাকে আর গ্রাহ্য করি না, আমাদের লক্ষ্য ফুলের বাস্তবিকতাকে স্বচ্ছন্দে ভেদ করে (অর্থাৎ তাকে সংকেতরূপে গণ্য— বা নগণ্য— ক’রে) চ’লে যায় সংকেতিত বস্তুর দিকে। সেটা কিন্তু ফুলের পক্ষে স্বধর্মচ্যুতি, ফুলের স্রষ্টার দিক থেকে তার প্রতি অবিচার। তেমনি কবিতার ভাষাকে যদি অর্থবাহী ক’রে ফেলি, অন্য কোনো বিষয় বা বস্তুর সংকেতরূপে ব্যবহার করি, তবে তারও মর্যাদাহানি হয়, পাঠকের দ্বারা লাঞ্ছিত হয় তার একান্ত স্বকীয়, আপনাতে আপনি পরিপূর্ণ সত্তা। কাব্যপদসমূহের ধ্বনিময়তা ও চিত্রলতাই সাত্র-এর মতে তার সবটুকু, তার প্রথম ও শেষ সার্থকতা। গদ্যলেখকদের মতো কবি ভাষাকে কোনো কাজে লাগান না; তিনি শব্দগুচ্ছ পাঠকের চোখের সামনে বা কানের কাছে একটি মহামূল্য উপহারস্বরূপ তুলে ধরেন।[২] কবিতা কান দিয়ে শোনবার জিনিস, শোনো, চোখ দিয়ে, কল্পনার চোখ দিয়ে দেখবার জিনিস, দেখো; বুঝতে চেষ্টা কোরো না। এলিয়ট যাঁকে বলেছেন বর্তমান কালের কাব্যসাহিত্যের অবিসংবাদিত প্রতীক, সেই ভালেরী স্বয়ং বিশ্বাস করতেন যে কবিতায় অর্থ কেন, শব্দও তেমন গুরুতর নয়। তিনি তাঁর শিষ্যদের বারণ করেছেন শব্দ নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে — ‘যখন কবিতা লিখতে বসেছ তখন তোমার সামনে শব্দ নেই, আছে সিলেব্‌ল্ আর ছন্দের বৈচিত্র্য!’ এর পরে পাঠক শুনে বিস্মিত হবেন না যে, ফরাসী দেশে এমন কবিও রয়েছেন যাঁরা বাক্য বা শব্দের ধার ধারেন না, কেবলমাত্র স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের অপূর্ব সমাবেশে বাক্যরচনা ক’রে খ্যাতিমান হয়েছেন।[৩]

এই শতাব্দীর তৃতীয় দশকে পাশ্চাত্ত্যে, বিশেষত ইঙ্গ-মার্কিন দেশের বিদ্বৎসমাজে একটি দার্শনিক চিন্তাধারা বা স্কুল হঠাৎ আবির্ভূত হ’ল এবং অল্পকালের মধ্যেই বেশ আসর জেঁকে বসল। স্কুলটি লজিকাল পজিটিভিজম্ নামে পরিচিত। এঁদের কয়েকটি প্রধান প্রতিপাদ্যের মধ্যে বোধকরি সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং সোচ্চার ছিল এই যে, এ-যাবৎকাল দর্শনশাস্ত্রের সেই শ্রদ্ধেয় বিভাগটা যাকে মেটাফিজিক্স বলা হয়, আপন মূল বক্তব্যগুলি যে-ভাষায় ব্যক্ত করে তার আদৌ কোনো অর্থ হয় না। অবশ্য এই রায় দেওয়ার সময়ে ‘অর্থ’ বলতে কী বোঝায়— ভাষান্তরে অর্থের অর্থ কী— তা নিয়ে অনেক চুলচেরা বিচার ও বাদানুবাদ করতে হয়েছিল তাঁদের। মোটকথা, যখন তাঁরা ঘোষণা করলেন যে পরাবিদ্যার সিদ্ধান্তগুলি অর্থহীন, তখন তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে এ-ফরমানটাও জারি করলেন যে অতঃপর ভূয়দর্শনশাস্ত্র একদম ভুয়ো এবং বাতিল ব’লে গণ্য হবে, ঐ জঞ্জালটাকে শেল্‌ফ থেকে নামিয়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দেওয়া দরকার। কিন্তু সার্ত্র এবং তাঁর সহধুরীরা যখন ঘোষণা করলেন যে কবিতার ভাষার কোনো মানে নেই, তখন তাঁরা একথা মোটেই বললেন না যে, অতএব কবিতা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার মতো রদ্দি মাল। বরঞ্চ বললেন— অর্থভারমুক্ত কাব্য হ’ল শুদ্ধতম শিল্প-সামগ্রী, সুতরাং বড় সমাদরের বস্তু। সংগীতের ধ্বনিবিস্তারের তো কোনো অর্থ নেই, অথচ তার মূল্য অর্থযুক্ত শব্দবিন্যাসের চেয়ে অনেক বেশি।

তরুণ বয়সে ভালেরী* এবং তাঁর কবিবন্ধুরা ছিলেন ভীষণ সংগীতপ্রিয়। সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা কাটাতেন কনসার্ট শুনে, ফিরে আসতেন উচ্ছ্বসিত আনন্দ ও ঈর্ষান্বিত অভিমান বুকে নিয়ে। শিল্পকলার যে-তুষারশুভ্র শিখরে সংগীত বিরাজমান, সেখানে কি তাঁরা কখনো তাঁদের একান্ত প্রিয় শিল্পকর্ম কবিতাকে নিয়ে যেতে পারবেন? তাঁদের কাব্যসাধনায় একটি সংকল্প দানা বেঁধে উঠল : কবিতাকেও সংগীতের মতো অত্যন্ত শুদ্ধ নির্মল ক’রে তুলতে হবে। যা-কিছু কবিতা নয় অথচ কবিতার মধ্যে নানা দিক থেকে ঢুকে প’ড়ে বিশুদ্ধ রসসৃষ্টি ও রসাস্বাদনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, তার কলুষ-স্পর্শ থেকে কবিতাকে মুক্ত করতে হবে। সুতরাং কাঁকর বাছার মতন ক’রে কবিতার থালা থেকে বেছে বেছে ফেলে দেওয়া হ’ল তত্ত্বকথা, ধর্মকথা, নীতিকথা, সমাজচেতনা, বাস্তবের বর্ণনা, ইত্যাদি। সংগীত তো এ-সমস্ত বাদ দিয়েও, বা দিয়েই, শিল্পসৃষ্টির চূড়ান্ত সার্থকতায় পৌঁছতে পেরেছে; কবিতাই বা পারবে না কেন? ভালেরী বলেছেন প্রতীকী আন্দোলনের গোড়ার কথা এই। সিম্বলিস্ট কবিগোষ্ঠীর শব্দচয়নের খেয়ালিপনা, ব্যাকরণের স্বৈরাচার, ছন্দের অনিয়ম, ভাষার অনধিগম্যতা— এ-সবের ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে ঐ সংগীতের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায়।

[* ভালেরীর মতটি একটু তলিয়ে দেখা দরকার। তিনি শুধু বিংশ শতাব্দীর শীর্ষস্থানীয় ফরাসী কবি ব’লে স্বীকৃতই নন, বর্তমান কালের কবি ও সমালোচকদের উপর তাঁর প্রভাব অপরিমেয়! তা ছাড়া কাব্যের তত্ত্ব ও আঙ্গিক বিষয়ক তাঁর ফরাসী প্রবন্ধগুলির ইংরেজি অনুবাদ কয়েক বছর আগে প্রকাশিত হওয়াতে আলোচনার সুবিধে হয়ে গেছে। (Paul Valéry-The Art of Poetry, Routledge & Kegan Paul, 1958)]

এহেন উচ্চাভিলাষী অসমসাহসিক সংকল্প নিয়ে তো তাঁরা নামলেন কাজে; কিন্তু মুশকিল বাধল গোড়াতেই। প্রথম পদক্ষেপটা ছিল নেতিবাচক, তাতে অবশ্য কোনো বিঘ্ন উপস্থিত হয় নি। ভাষার গৌরব তার অর্থব্যঞ্জনায়, সেদিকটা নির্মমভাবে ছেঁটেছুঁটে ভাষাকে প্রায় সা রে গা মা-র মতো রিক্ত ক’রে ফেলা গেল সহজেই। কিন্তু তারপর রইল কী? সংগীতে আছে সাতটি সুর, একাধিক স্বরগ্রাম, ধ্বনির তারতম্য এবং গুণগত বিস্তার, মীড়, মূর্ছনা, গমক, তাল-মান-লয়ের বিচিত্র খেলা, আর পাশ্চাত্ত্য সংগীতের পলিফনি, সিম্ফনি, কাউন্টার-পয়েন্ট— সবসুদ্ধ এলাহি ব্যাপার। শুধু ছন্দ আর মিল আর অনুপ্রাসের তহবিল নিয়ে সংগীতের বিপুল ধ্বনিভাণ্ডারের সঙ্গে কবিতা টেক্কা দেবে কোন্ ভরসায়?

অবশ্য কবিতার মাধ্যম কথা। সেই কথার বারো আনা ভাগ— যেটাকে আমরা বলতে পারি তার গদ্যভাগ— ছাঁটাই ক’রে ফেললেও কিছু অর্থ তো তার অবশিষ্ট থাকে, তার বিশুদ্ধ কাব্যিক অর্থ। কবিতার ধ্বনির দিকটা যদিও সংগীতের তুলনায় দীনদরিদ্র এবং অর্থের দিকটা গদ্যের তুলনায় সাদামাটা, তবু দুটোতে মিলে সে মোটেই নিঃসম্বল নয়, কারও কাছে মাথা হেঁট করবার দরকার নেই তার।

কিন্তু দুটোকে কি সহজে মেলানো যায়? শব্দসমূহের অর্থ ও ধ্বনির মধ্যে কোনো স্বভাবজ, সার্বজনীন সম্বন্ধ না থাকার দরুন কবিকে বড় অসুবিধায় পড়তে হয়। ভালেরী উদাহরণ-স্বরূপ পেশ করেছেন ইংরেজি হর্স, গ্রীক হিপ্পস, লাতিন একুয়স, ফরাসী শেভাল্— আমরা আরো যোগ করতে পারি বাংলা ঘোড়া, সংস্কৃত অশ্ব, পার্সী অস্প— এ-সবের তো অর্থ একই, অথচ ধ্বনি কত বিচিত্র! সংগীতকারকে এই দ্বৈত সত্তার টানাপোড়েন বিধ্বস্ত করে না, অর্থের ঝামেলা পোহাতে হয় না তাঁকে। অন্য কিছুর দিকে মন না দিয়ে কেবল ধ্বনির একটি অত্যাশ্চর্য রূপকল্প তৈরি করেন তিনি। সেই বিশেষ ধ্বনিরূপটি তাঁর তৎসাময়িক সৃজনী-প্রেরণার রূপায়ণে চরিতার্থ হলেই তাঁর শিল্পকর্ম সমাপ্ত হ’ল। কিন্তু কবি যদি ধ্বনির কথা ভেবে কতকগুলো শব্দ চয়ন করেন, তবে অর্থের দিক দিয়েও সেই শব্দপরম্পরা কি তাঁর রূপকারী অভীষ্টসিদ্ধির সবচেয়ে সহায়ক হবে? অথবা উলটো ক’রে দেখলে,— যে-শব্দবিন্যাস অর্থ প্রকাশের দিক দিয়ে তাঁর উপলব্ধির অনুগামী হ’ল, ঠিক সেই শব্দগুলির ধ্বনিসংগঠনও কি তাঁর রূপকল্পনার অনুকূল হবে? কাজেই কাব্যরচনা মানে একই সঙ্গে কুল আর শ্যাম রাখার দুঃসাধ্য অঙ্গীকার। শেষপর্যন্ত কুলের মায়া ত্যাগ করতে হয়েছিল রাধিকাকে, শ্যামের বাঁশি তাকে এমনি উতলা করেছিল। তেমনি শব্দের স্বর ও ব্যঞ্জন ধ্বনির মোহিনী মায়ার টানে আধুনিক কবিদের মধ্যে অনেকেই শব্দার্থের দিকে পিঠ ফেরাতে উদ্যত হয়েছেন।

ভালেরীর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি তাঁকে বোঝালো যে কবি সিদ্ধকাম হবেন তখনই যখন তিনি অর্থ ও ধ্বনিকে মেলাতে পারবেন, একেবারে হরিহরাত্মা সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন দুটোর মধ্যে। কিন্তু এটা তো একরকম অসম্ভব ব্যাপার। কারণ প্রায় যে-কোনো শব্দের বেলাতেই দেখা যায় তার অর্থ ও ধ্বনি একত্রিত হয়েছে নিতান্ত বাহ্য কারণে, পরস্পরের স্বাভাবিক টানে নয়। যাদের স্বভাবে মিল নেই, কবি তাদের মেলাবেন কেমন ক’রে? এ-সমস্যার সমাধান করেছেন ভালেরী একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বকথা ব’লে। কবিতার সার্থকতা নির্ভর করবে ভাষা ব্যবহারের রীতি, নীতি ও উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটানোর উপর। সাধারণ ভাষার, অর্থাৎ গদ্যভাষার, নিয়মই এই যে যখন আমি তাতে কিছু প্রকাশ করি তখন আমার বক্তব্যটি শ্রোতা বা পাঠক বুঝে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে সে-ভাষা নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তার অর্থ রয়ে গেল শ্রোতা বা পাঠকের মনে, উদ্দিষ্ট কর্ম বা ভাবনার পথে তাদের চালিত করল; কিন্তু সেই অর্থের বাহন ছিল যে-ধ্বনিপুঞ্জ তা এখন সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন, সুতরাং তা পাঠকের মন থেকে একেবারে অন্তর্হিত। যেন বক্তার তীর থেকে নদীর ওপারে শ্রোতার তীরে একটি রেলগাড়িকে পার ক’রে দেওয়ার দরকার পড়েছিল ব’লে আলাদিনের জিন মুহূর্তের মধ্যে ঠিক মাপের একটা সাঁকো তৈরি ক’রে ফেলল; তারপর রেলগাড়িটি যেই ওপারে নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেল, অমনি সাঁকোটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ভালেরী এই উপমা প্রয়োগ করেন নি, কিন্তু অনায়াসে করতে পারতেন।

পক্ষান্তরে, কবিতার ভাষা পাঠককে যা বলতে চায় তা ব’লে ফেলার শেষে একেবারে নিঃশেষিত হয়ে যায় না। যে-পরিমাণে তা অর্থব্যঞ্জনার মাধ্যম সে-পরিমাণে তার স্বকীয় সত্তা নেই। কিন্তু অর্থ বোঝানোর পরও সে যেন আর-একবার নতুন জন্ম লাভ করে শ্রোতা বা পাঠকের চৈতন্যে, অর্থ থেকে আবার শ্রোতার মনোযোগ ফিরে আসে ভাষার ধ্বনিরূপের দিকে। গদ্যভাষার বক্তব্য বিষয়টাই সব-কিছু, বলার ভঙ্গিটা কিছুই না। কবিতার ভাষার বিষয় এবং ভঙ্গি, অর্থ এবং ধ্বনি, উভয়ই সমমর্যাদাসম্পন্ন; সমান মূল্যের দাবি রাখে তারা। ফলে পাঠকের মন পেণ্ডুলামের দোলকের মতো একবার ফর্ম থেকে কন্টেন্টের দিকে দুলে যায়, আবার সেখান থেকে ফর্মের দিকে ফিরে আসে। কাব্যপাঠের রসানুভব যতক্ষণ স্থায়ী হয়, এ-দোলা থামে না ততক্ষণ।

এমনি এক দোদুল্যমান অভিজ্ঞতার কথা তুলেছিলেন রোজার ফ্রাই চিত্রকলা প্রসঙ্গে। প্রকৃত সমঝদার যখন তন্ময় হয়ে কোনো রূপদক্ষ চিত্রকরের আঁকা ছবি দেখেন তখন সে-ছবির বর্ণসংস্থানের সুষমা আর রেখার সৌষ্ঠব এক বিশেষ ধরনের অনুভূতি জাগায় তাঁর মনে, রোজার ফ্রাই এবং ক্লাইভ বেল যার নাম দিয়েছেন নান্দনিক অনুভূতি (aesthetic emotion)। এই অনুভূতিটি বিশেষরূপে শিল্পজগতেরই অনুভূতি; প্রাকৃত বস্তু (কোনো ল্যাণ্ডস্কেপ বা একটি ফল, ফুল কিংবা মনুষ্যদেহ) থেকেও পাওয়া যেতে পারে সে-অনুভূতি, যদি আমরা ঐ বস্তুকে শিল্পীর শুদ্ধ নিরাসক্ত দৃষ্টিতে দেখি। কিন্তু অধিকাংশ চিত্র— রেনেসাঁস থেকে সেজান পর্যন্ত প্রায় যাবতীয় য়ুরোপীয় চিত্র— জীবনের প্রতিবিম্বও বটে। মনে করুন ছবিটি একটি শোকার্ত মাতার কিংবা কুষ্ঠ রোগীর সেবারত কোনো সাধুপুরুষের। ছবির এই প্রতিবিম্বিত বিষয়টি আমাদের মনে আর-এক ধরনের অনুভূতি জাগাবে। সে-অনুভূতিকে উক্ত চিত্র সমালোচকদ্বয় লৌকিক অনুভূতি (life emotion) ব’লে অভিহিত করেছেন। অবশ্য বাস্তব জীবনে কোনো শোকার্ত মাতাকে দেখলে আমরা যা অনুভব করি তার সঙ্গে এই চিত্র-দর্শন-সঞ্জাত অনুভূতির পার্থক্য আছে— যে-পার্থক্য বোঝাবার জন্য এদেশের আলংকারিকেরা দুটি ভিন্ন শব্দ, ‘ভাব’ ও ‘রস’, ব্যবহার করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, ভাবকে রসে রূপান্তরিত করাই শিল্পীর কাজ। তবু এই অনুভূতিটি জীবন-সংক্রান্তই এবং বাস্তব জীবনের অনুভূতির খুব কাছাকাছি। পক্ষান্তরে, আমরা যদি চিত্রের বিষয় থেকে মনটাকে সরিয়ে নিয়ে একাগ্র হয়ে নিজেকে নিবিষ্ট করি তার রঙ ও রেখার সূক্ষ্ম কারুকর্মে, তা হলে যে-শুদ্ধ— বলতে গেলে পারলৌকিক— অনুভূতি লাভ করব তার জাতই আলাদা।

এ দুই অনুভূতি যে ভিন্ন জাতের শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যে কোনো স্বাভাবিক সহযোগিতা নেই, বরঞ্চ তারা অনেক ক্ষেত্রেই অসমঞ্জস। ফ্রাই কয়েকটি বিখ্যাত য়ুরোপীয় চিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ক’রে দেখিয়েছেন কোথায় এবং ঠিক কীভাবে এই অসামঞ্জস্য ঘটেছে। অন্য অসংগতি যদি না-ও থাকে, তবু দুই ভিন্ন জাতের অনুভূতিকে আমরা কেমন ক’রে একই সময়ে যথাযথভাবে মনে স্থান দিতে পারি? একদিকে গভীর মনোযোগ ঘটলে অন্য দিক থেকে মন আপনিই আলগা হয়ে যাবে না কি? ফ্রাই বলছেন, চিত্র যদি একাধারে জীবনের প্রতিবিম্বরূপে কৃতকার্য হয় এবং রঙ ও রেখার সুদক্ষ বিন্যাসের অর্থাৎ ফর্মের দিক থেকেও চরিতার্থ, তা হলে এই মানসিক দ্বন্দ্ব আমরা এড়াতে পারি না।

এই মানসিক দ্বন্দ্ব বা দোদুল্যমানতা যেহেতু শিল্পানুভূতির অখণ্ড একাগ্রতা নষ্ট করে, তাই ফ্রাই এবং বেল চেয়েছিলেন চিত্রকলা থেকে অনুকারিতার বা প্রতিবিম্বকারিতার নির্বাসন, চিত্রকে করতে চেয়েছিলেন বিশুদ্ধ ও বিষয়বস্তুনিরপেক্ষ। বোঝাই যাচ্ছে যে এঁদের পক্ষপাত ছিল নির্বস্তুক চিত্রকলার, অ্যাবস্ট্রাক্ট পেন্টিং-এর, দিকে। সংগীতভক্ত ভালেরীও ছিলেন বক্তব্য-রহিত বিশুদ্ধ কবিতার পক্ষপাতী। পরে তাঁর শিষ্য সার্ত্র এই মতটাকেই সৎসাহসপূর্বক দ্বিধাহীন ভাষায় ব্যক্ত করলেন। তার পরিচয় আমরা আগেই পেয়েছি।

স্বীকার করছি বিশুদ্ধ ধ্বনির শক্তিও কম নয়, তা দিয়েও মহৎ শিল্পরচনা সম্ভব। কিন্তু সে-শিল্প কবিতা নয়, সংগীত। সংগীতেই ধ্বনি আপন পূর্ণ মহিমায় বিরাজিত। প্রতিতুলনায়, ধ্বনির প্রকাশ-শক্তির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশমাত্র ব্যবহৃত হয় কবিতায়। বিশেষজ্ঞ মহলে শোনা যায়, ধ্বনির অত্যাশ্চর্য রূপায়ণে সবচেয়ে সার্থক কবি মালার্মে আর ভালেরী। মালার্মের একটি বিখ্যাত কবিতা ‘ফনের দিবাস্বপ্ন’ অবলম্বন ক’রে প্রেলিউড রচনা করেছেন দেবুসী। একান্ত ধ্বনিরই বিচারে কি দেবুসীর সংগীতের সঙ্গে মালার্মের কবিতার কোনো তুলনা সম্ভব? ছন্দের বৈচিত্র্য, মিলের অভিনবত্ব, স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণের সুচতুর বিন্যাস ইত্যাদি, অর্থ-ব্যঞ্জনায় যতই সহায়তা করুক (সেদিক থেকে এসবের মূল্য অবশ্যই স্বীকার্য), কবিতার ধ্বনিরূপকে স্বতন্ত্র ক’রে, স্বাধিকারে প্রতিষ্ঠিত ক’রে ওটাকেই বড় ক’রে দেখানোর যে-পরিশ্রমী দক্ষতা পাওয়া যায় অতি আধুনিক সমালোচনায়, তার একমাত্র ফল কবিতাকেই ছোট করা। সমালোচকরা যখন ভাবেন এ-যুগের কাব্যসমালোচনার প্রধান কাজ হচ্ছে খুঁটে খুঁটে দেখানো, তাঁদের আলোচ্য কবিতার কোন্ পঙক্তিতে তিনটে ‘শ’ ধ্বনি পাওয়া যায় আর কোনটাতে দুটো বা চারটে ‘ক’ ধ্বনি, কোথায় ক’টা হ্রস্ব স্বরের পর একটি দীর্ঘ স্বর পড়ছে আর কোথায় তার বিপরীত (বাংলা ভাষায় আবার হ্রস্ব-দীর্ঘ স্বরের ভেদ প্রায় লুপ্ত, অতি কষ্টে বাঙালী কবিরা তার অল্পস্বল্প সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন), তখন তাঁরা একটি মহৎ শিল্পরচনাকে প্রশংসনীয় কারুকার্যে পরিণত করা ছাড়া আর কিছুই করছেন না।

এ তো গেল কবিতার ধ্বনির দিক, তার সাংগীতিক মূল্যের দিক। কবিতার চিত্রের দিকটা অবশ্য অপেক্ষাকৃত সক্ষম। কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য বা মনুষ্যদেহের এমন সার্থক বর্ণনা কবির ভাষায় সম্ভব যা শিল্পীর আঁকা চিত্রের তুলনায় নগণ্য নয়। কিন্তু ঠিক তুলনীয়ও কখনো হয় না। আমরা বলি ছবির মতো উজ্জ্বল ইমেজরি; কিন্তু ইমেজরির মতো উজ্জ্বল কিংবা প্রাণবন্ত ছবি বলার কি কোনো মানে হয়? তুলির আঁকা ছবির পাশে কলমে আঁকা ছবি রাখলেই দেখা যাবে (পরীক্ষাটা অবশ্য কল্পনা-নির্ভর) দ্বিতীয় ছবিটি কত ফিকে এবং দুর্বলরেখ। আঁকার তারতম্য তো আছেই, তদুপরি দেখার প্রভেদও অপরিমেয়। প্রথমটি আমরা চোখে দেখি, দ্বিতীয়টি দেখি মনশ্চক্ষে। মনশ্চক্ষে আমরা ক’টি রঙ দেখতে পারি? অনেকে সাদা, কালো ও ধূসর ছাড়া আর কোনো বর্ণই কল্পনা করতে পারেন না। এবং কতক্ষণ ধ’রে একটি রেখাকে স্থির রাখতে পারি মানসপটে? সেকেন্ডের ভগ্নাংশ মাত্র।

দ্বিতীয়ত, এবং স্বভাবতই, কাব্যের চিত্র উপেয় নয়, ভাব-প্রকাশের উপায় মাত্র; তার সার্থকতা বাহন বা মাধ্যম রূপেই। চিত্রকল্পের সাহায্যে কবি তাঁর উপলব্ধিকে মূর্ত ও সুস্পষ্ট ক’রে তোলেন, মানব-জীবনের বা বিশ্বপ্রকৃতির কোনো অন্তগূঢ় স্বরূপের সঙ্গে আমাদের পরিচয়— রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘সাহিত্য’— ঘটান। ক্যানভাসে আঁকা প্রতিবিম্বকারী চিত্রও তাই করে অবশ্য। তবে সে-চিত্রের আর একটা দিক থাকে, তার বিশুদ্ধ ফর্মের দিক, বর্ণ-সংস্থান ও রেখাসন্নিপাতের দিক। আগেই বলেছি যে ফ্রাই প্রভৃতির মতে এই দিকটাই চিত্রকলার আসল দিক, তার অনাবিল নান্দনিক দিক। কিন্তু কবিতায় যে-চিত্রকল্প পাই তার মধ্যে এই বিশুদ্ধ চিত্রলতা, রঙ ও রেখার কাজ প্রায় অনুপস্থিত। কোনো সাম্প্রতিক কবির উদ্ভাবিত চিত্রকল্প যতই অভিনব চমকপ্রদ ও হৃদয়গ্রাহী হোক, তার আঙ্গিকগত নৈপুণ্য বিষয়ে কোনো পারদর্শী আলোচনা আধুনিকতম কাব্যকলাবিদ সমালোচক-মণ্ডলীর লেখায় পড়েছি ব’লে তো মনে করতে পারছি না।

তাই আমি এ-কথা কিছুতেই বুঝতে পারি না যে দুটি মহৎ শিল্পসৃষ্টির— সংগীত আর চিত্রকলার— ঈর্ষান্বিত অক্ষম অনুকরণ বা অত্যল্প ভাগমাত্র পরিগ্রহণ ক’রে তৃতীয় এক শিল্পকর্ম কবিতা কেমন ক’রে উত্তমর্ণদের ছাড়িয়ে যাবে বা তাদের সমকক্ষ হবে। অথচ ঠিক এই কথাই কি আজ বলছেন না সেই সমালোচকেরা যাঁরা কবিতার ধ্বনিগত এবং চিত্রগত উপাদানের মূল্যকে অত্যধিক প্রাধান্য দিয়ে সমালোচনা-সাহিত্যকে বিভ্রান্ত করছেন? কবিতার মাধ্যম ভাষা— আমার মতে সংগীতের মাধ্যম ধ্বনি এবং চিত্রের মাধ্যম রঙ ও রেখার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু এই বিপুল শক্তির বারো আনাই নির্ভর করে তার সাংকেতিক বৃত্তি অর্থাৎ অর্থব্যঞ্জনা-বৃত্তির উপর, সার্ত্র যাকে বলেছেন ভাষার বস্তুধর্ম, তার উপর নয়। বুঝতে পারি না এ কোন্ জাতীয় মর্ষকাম যার আওতায় প’ড়ে আধুনিক কবি তাঁর প্রকৃষ্ট মাধ্যমের সিকি ভাগ মাত্র ব্যবহার ক’রে সংগীতকার ও চিত্রকরের সঙ্গে এক অসম প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। কবে তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবেন স্বমহিমায়?

কবিতায় কবির যে-সামগ্রিক উপলব্ধি ব্যক্ত হয়েছে (পুনরুক্তি নিষ্প্রয়োজন যে এ-উপলব্ধি স্বর ও ব্যঞ্জন ধ্বনির শ্রুতিমধুরতার বা চিত্রকল্পের বর্ণসুষমার উপলব্ধি নয়, এ-উপলব্ধি মানবজীবন ও বিশ্বজগতেরই কোনো গহ্বরেষ্ঠ গুহাহিত সত্যের) সেই উপলব্ধিকে সম্যক প্রকাশ করতে কবিতার ছন্দ মিল অনুপ্রাস এবং চিত্রকল্প যতখানি সহায়তা করে ততখানিই তারা মূল্যবান, তার চেয়ে একতিল পরিমাণ বেশি নয়। প্রকাশিত উপলব্ধির মূল্যেই কবিতার মূল্য। বলা বাহুল্য প্রকাশই যদি না হ’ল, অর্থাৎ শিল্পরূপে যদি প্রকাশ না হ’ল, তবে সে-উপলব্ধির মূল্যের কথা ওঠে না। তুচ্ছতম উপলব্ধির প্রকাশও একটি কবিতা। কিন্তু সে-কবিতা মহৎ কি তুচ্ছ তা নির্ভর করে উপলব্ধির মহত্ত্ব বা তুচ্ছতার উপর।

এখানে অবশ্য প্রতিমান-দ্বৈতের, ডাবল স্ট্যাণ্ডার্ডের, কথা তোলা যেতে পারে। উপলব্ধির গভীরতা ও ব্যাপ্তিতে যেমন তারতম্য থাকা সম্ভব, প্রকাশেরও উৎকর্ষভেদ ঘটতে পারে। উপলব্ধি যত গভীর ও বৈচিত্র্যগ্রাহী হবে এবং সেই সঙ্গে প্রকাশ যত পূর্ণ হবে, কবিতা ততই উঁচু দরের হবে। কোনো কোনো সমালোচক মূল্যায়নের এই দুটি স্বতন্ত্র মানদণ্ড অনুযায়ী কাব্যালোনায় গ্রেট এবং এক্সেলেন্ট এই দুই ভিন্ন বিশেষণ প্রয়োগ করেন: উপলব্ধি গভীর হলে কবিতা হবে মহৎ, এবং প্রকাশ যথাযথ হলে কবিতা হবে উৎকৃষ্ট। গদ্যের চেয়ে কবিতা কিছু বেশি প্রকাশ করে ব’লে কিছু বাহুল্য উপকরণের প্রয়োজন আছে তার, কিন্তু ঐ কাব্যোপকরণগুলিই কবিতা নয়, কাব্যিক মূল্যের আধারও নয়।

আমাদের দেশের একজন আলংকারিকও ভালেরীর মতো কাব্যরসের মধ্যে এমনি এক পেণ্ডুলামের দোলা দেখতে পেয়েছিলেন। কুন্তক বলেছিলেন: কবিতা হচ্ছে সেই শিল্পকর্ম যাতে বাক্য ও অর্থ পরস্পরস্পর্ধী, তারা পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ করেছে, কিন্তু কেউ কাউকে হারাতে পারে না। যেন খড়্গো খড়্গ ভীম পরিচয়, এ বলে আমায় দেখো, ও বলে আমায় দেখো। কিন্তু রসগ্রাহী চিত্ত কি এ দাও-কষাকষির দৃশ্যে সেই শান্তরস খুঁজে পাবে, যা সব রসের মূল রস? কবিতায় বাক্যকে, অর্থাৎ তার ধ্বনিরূপকে হার মানতে হয় বাক্যার্থের কাছে, সংগীতে অর্থকে ধ্বনির কাছে; নইলে কোনো রসেরই যথার্থ আস্বাদন হয় না। দুই সমান পাল্লার মল্লবীরের পরস্পর-স্পর্ধা আখড়ায়ই উপভোগ্য, রসের ক্ষেত্রে নয়। সেখানে চাই বিনয় এবং সর্বোপরি সমন্বয়।

রসের ক্ষেত্রে সমানে সমানে মোকাবিলা— ভালেরীর ভাষায় ‘an equality of value and power’— কি কোথাও নেই? আমার মতে সংগীতে যেমন একটি মূল্য সর্বেসর্বা, তেমনি কবিতায় অন্য মূল্যটি স্বরাট। তবে অর্থ ও ধ্বনির সাযুজ্য ঘটেছে হয়তো সেই ক্ষেত্রে যেখানে দেখা যায় কবিতা আর সংগীতের দ্বৈরাজ্য— গানের ক্ষেত্রে। সেখানেও কিন্তু নির্বিশেষিতভাবে সমাধিকারের কথা বলা সংগত নয়। কালোয়াতী গানের বেলা সুরের আধিপত্য অবিসংবাদিত, কথা সেখানে নিতান্তই গৌণ, তাঁবেদারি আর তল্লাবরদারি করা ছাড়া তার উপায় নেই। প্রথমত, অধিকাংশ কালোয়াতী গান কবিতা হিসেবে অশ্রদ্ধেয়, গান শোনার সময়ে সে গানের কাব্যিক মূল্য সম্বন্ধে যদি আমরা সচেতন হয়ে উঠি, তা হলে রসের ব্যাঘাত ঘটে। ফৈয়াজ খাঁর জৌনপুরী অতি চমৎকার গান, কিন্তু তার কথাগুলির দিকে— ফুলবনকি গেঁদন মৈকা না মারো রে— মনোনিবেশ না থাকাই ভালো। সমস্ত গানটা এবং অধিকাংশ মার্গ সংগীতের গান— কেবল সরগমে গাওয়া হলেও বিশেষ ক্ষতি হ’ত ব’লে তো মনে হয় না।

পক্ষান্তরে, রবীন্দ্র-সংগীতে আমরা দেখি কথাই রাজাধিরাজ। প্রথম বয়সের ধ্রুপদাঙ্গ এবং গোটা কতক টপ্পা শ্রেণীর গান বাদ দিলে কথার মহিমার কাছে সুরের গৌরব সর্বত্রই নতিস্বীকার করেছে। বোধ হয়, এমন হাজারখানেক গান দৃষ্টান্তস্বরূপ পেশ করা যায় যার কথা বাদ দিয়ে গুনগুন ক’রে শুধু সুর ভাঁজলে (বা ওস্তাদী গানের কায়দায় সরগমে সারলে— পঙ্কজ মল্লিক যেমন ক’রে মাঝে মাঝে রেডিয়োতে গেয়ে দেখান), তাদের সমগ্র মূল্যের যৎসামান্যই পাব আমরা; অথচ সুর বাদ দিয়ে শুধু কবিতা হিসেবে পাঠ করলেও ঐ গানগুলির কাব্যিক উৎকর্ষে অভিভূত হতে হয়। বুদ্ধদেব বসু বলেন, গীতাঞ্জলি পর্বের গান তিনি পড়তেই ভালোবাসেন, কেউ এস্রাজ ও তবলা সহযোগে গেয়ে শোনালে তাঁর মনে হয়, গোলাপ ফুলের উপর রঙ লাগানো হয়েছে। এ-বিষয়ে আমি কিন্তু তাঁর সঙ্গে একমত নই। ‘আরো আঘাত সইবে আমার’, ‘অশ্রুভরা বেদনা দিকে দিকে জাগে’, ‘এসো শরতের অমল মহিমা’, ‘কোথা যে উধাও হ’ল মোর প্রাণ উদাসী’— কবিতা হিসেবে অতীব সুন্দর সন্দেহ নেই। কিন্তু কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, নীলিমা সেন আর দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে শোনার পর ঐ গানগুলির মূল্য আমার কাছে বহুগুণীকৃত হ’ল, অন্তরের আরো গভীরে প্রবেশ করল। তবু বলব, রবীন্দ্রনাথের অত্যধিক সংখ্যক গানে আমাদের রসোপলব্ধি প্রধানত কথার উপর নির্ভরশীল; সুর মোটেই উপেক্ষণীয় নয়, কিন্তু তার ভূমিকা সহকারীরূপে, প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে নয়।

গান শোনার অভিজ্ঞতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা পরস্পর-স্পর্ধা যে আমি নিজে কখনো লক্ষ্য করি নি, তা নয়। মীরার ভজন শুভলক্ষ্মী যে-ভাবে গেয়েছেন, তাতে কথা আর সুরের মধ্যে কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যেতে পারে নি। দুটোই আমাকে সমান মুগ্ধ করে। মহাজন-পদাবলি সুগায়কের কণ্ঠে শুনেও দুটি রসের ভারসাম্য অনুভব করেছি আমি। আমার এক বন্ধু, যিনি একাধারে কাব্য-রসিক এবং সুরের সমঝদার, রবীন্দ্রনাথেরও কয়েকটি গানের উল্লেখ করলেন (বিশেষত, ‘বাজে করুণ সুরে হায় দূরে’, আর ‘নীলাঞ্জন ছায়া’), যাতে তাঁর মন বারে বারে কথা থেকে সুরে চ’লে যায়, আবার ফিরে আসে কথায়, দুটোর কোনোটাই একাধিপত্য বিস্তার করতে পারে না তাঁর রসাস্বাদনে।

এগুলিকে আমি বলব যুগ্ম শিল্পসৃষ্টি; দুটি স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম ও শিল্পমূল্য একত্রিত হয়েছে তাতে, কিন্তু এক হয়ে যায় নি। পরিপূর্ণ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে একটিকে অন্যটির বশ্যতা এবং খানিকটা আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ফ্রাই-এর মতে প্রতিবিম্বকারী চিত্রও এমনিতর যুগ্ম শিল্প, তাতে সাহিত্য ও চিত্রকলা আপন স্বাতন্ত্র্য না হারিয়ে সহবাস করছে মাত্র। এ-সব যুগ্ম শিল্প-সৃষ্টির রসাস্বাদনে আমাদের মন সত্যিই একটা থেকে অন্যটাতে দোলা খেতে থাকে, কোনো-একটাতে স্থিতিলাভ করতে পারে না। কোনো কোনো বিখ্যাত চিত্রের ক্ষেত্রে অবশ্য দুটো শিল্পকর্ম পরস্পরের সহায়ক হয়ে আমাদের সমগ্র রসানুভূতিকে ঘনীভূত করে। কিন্তু সেটা প্রত্যাশিত নয়, দৈবাৎ ঘ’টে যায়। রোজার ফ্রাই-এর সঙ্গে একমত হয়ে আমিও সাধারণভাবে শিল্পে শুদ্ধতার পক্ষপাতী।

রবীন্দ্রনাথ অল্পবয়সে লেখা “সংগীত ও কবিতা” শীর্ষক একটি প্রবন্ধে সংগীত ও কবিতা উভয়কেই ভাবপ্রকাশের উপায় বলেছিলেন। এ-কথা সত্যি যে, সুরের দ্বারা মেজাজ বা মুড (যথা করুণ, বিষণ্ন, উৎফুল্ল, উদ্দীপ্ত, ইত্যাদি) উদ্রেক করা যায়। কোনো গানের সুর যদি বিশেষ একটি মেজাজ তৈরী করে এবং গানের কথা সেই মেজাজেরই বিশেষীকৃত, স্পষ্টীকৃত ও বিস্তৃত কোনো ভাব প্রকাশ করে, তবে কথা আর সুর হয় হরিহরাত্মা, দুটোর বৃত্তি (function) খানিকটা স্বতন্ত্র হয়েও অনেকটা পরস্পর-সম্পূরক ও পরিবর্ধক হবে। সুর ভাবকে গভীরতা, প্রগাঢ়তা ও তীব্রতা দান করবে; কথা ভাবকে আমাদের মননে ও সংবেদনে কতকটা (কতকটার উপর জোর দিতে চাই) স্পষ্ট ক’রে তুলবে; এবং ভাব যে-কালে নিরালম্ব নয়, বহির্জগতের উপলব্ধিবিশেষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিরূপে জড়িত, তাই ভাবের সেই বিষয়গত দিকটাও কখনো আভাসে ইঙ্গিতে, কখনো-বা নাতি-পরোক্ষ বর্ণনার দ্বারা জানিয়ে দেবে। রবীন্দ্র-সংগীতে কথা ও সুরের ভূমিকা মোটের উপর এই প্রকারের।

কিন্তু তার মানে রবীন্দ্র-সংগীতে সুর আপন পূর্ণ মহিমায় বিরাজিত নয়, সুরের একটা দিক মাত্র, অর্থাৎ কেবল ভাবোদ্রেক বা মেজাজ-সৃষ্টির শক্তিটাকেই কাজে লাগানো হয়েছে শব্দবাহিত ভাবকে প্রগাঢ়তর ক’রে তুলবার জন্য। কিন্তু সুরের আর-একটা দিক আছে— তার শৈলীগত বিস্তারের দিক, তার রূপকল্পের অত্যাশ্চর্য বৈভবের দিক। এই দিকটার পূর্ণ প্রতিষ্ঠা মার্গ সংগীতে। যখন কোনো রাগিণীর জটিল এবং মহদৈশ্বর্যবান রূপ ধীরে ধীরে অভিব্যক্ত হতে থাকে আব্দুল করিম খাঁ বা গঙ্গুবাঈয়ের মতো গাইয়ের কণ্ঠে, তখন তা আমাদের মনকে সম্পূর্ণ টেনে নেয়। গানের কথা, অর্থাৎ কথার অর্থ, তখন তুচ্ছ হয়ে যায়। এমনকি, সুরকে আর হর্ষবিষাদাদি ভাবপ্রকাশের বাহনও মনে হয় না; তেমন একটা ভাব মনে জাগলেও সেটাকেই সুরসৃষ্টির শেষ কথা ব’লে ভাবতে পারি না। রাগিণীর পূর্ণাঙ্গ স্বরূপ ঠিকমতো প্রকাশ পেলে এক বিশেষ ধরনের অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হয়, আগেই যার কথা বলেছি এবং যাকে ক্লাইভ বেলের ভাষায় বিশুদ্ধ নান্দনিক অনুভূতি আখ্যা দিয়েছি। সংগীতের এই সূক্ষ্ম ও বহুলাঙ্গ রূপকল্প বা ফর্মের যথোপযুক্ত রসসম্ভোগে যিনি অধিকারী, তিনি সংগীতের অন্য বৃত্তিগুলিকে গৌণ এবং সহকারী না মনে ক’রে পারেন না।

কবিতারও যে-একটা ধ্বনিময় রূপ আছে, তা আমি অস্বীকার করতে চাই না। কিন্তু সে-ধ্বনিরূপকে বিশুদ্ধ সংগীতের পর্যায়ে তুলবার চেষ্টা বৃথা। এমনকি, গানের সঙ্গেও তুলনা হয় না কবিতার শ্রুতিগত প্রকাশ-শক্তির। কোনো কবিতাতে ধ্বনির কৌশল যত পরিশীলিতই হোক, মূল্যের পরিমাপে তা ঐ কবিতায় অধিব্যক্ত ও আধো-ব্যক্ত অর্থের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না, যেমন কোনো সর্বাঙ্গসুন্দর গানে সুর হতে পারে কথার প্রতিদ্বন্দ্বী। উচ্চারিত শব্দপরম্পরা আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে অন্তর্নিহিত অর্থের দ্বারা, শুধু তার আওয়াজটুকু শুনবার জন্য কে কান বা মন পাতবে? যে-ভাষা আমরা একটুও বুঝি না, সে-ভাষায় উৎকৃষ্ট কাব্যপাঠ দু-মিনিট শুনবার পরই বিরক্তি জাগে। আর যদি-বা কোনো কবি বহু যত্নে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে একটি সূক্ষ্ম সুন্দর ধ্বনিরূপ আপন মনে রচনা করতে সক্ষম হন, সেটাকে তিনি পাঠকের কাছে পৌঁছিয়ে দেবেন কোন্ উপায়ে? তিনি কি সংগীতের নোটেশনের অনুরূপ কোনো অভিনব সাংকেতিক চিহ্ন উদ্ভাবন করবেন? ছাপার অক্ষর তো ধ্বনির সমস্ত সূক্ষ্মতা, জটিলতা ও মাধুর্য বর্জন ক’রে তার স্থূলতম সর্বসাধারণীকৃত রূপ মাত্র বহন করে।

কাজেই, আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, কবিতার বেলায় অন্তত ধ্বনির ভূমিকা অত্যন্ত গৌণ, সহকর্মী বা সহধুরীর নয়, পরিচারকের মাত্র। কোনো আধুনিক কবি যদি ভালেরীর ফরমুলা অনুযায়ী পাঠকের চিত্তকে কবিতার ধ্বনি থেকে অর্থে এবং অর্থ থেকে ধ্বনিতে দোদুল্যমান করতে প্রয়াসী হন, তা হলে এই তুচ্ছ থেকে মহৎ এবং মহৎ থেকে তুচ্ছে দ্রুত ওঠা-নামার ফলে সে-পাঠকের রসোপলব্ধি নিশ্চয়ই গুরুতরভাবে ব্যাহত হবে। ভালেরী সুকবি হতে পারেন, সদ্‌গুরু মোটেই নন।

.

কিন্তু কেন মালার্মে আর ভালেরীর মতো শক্তিমান কবিরা কাব্যের অর্থব্যঞ্জনাবৃত্তির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে কবিতার ভাষাকে প্রধানত অর্থের বাহন জ্ঞান না ক’রে রূপের আধার বলেই গণ্য করলেন? ভালেরী তো সোজাসুজি ব’লেই ফেললেন যে তাঁর জাগতিক উপলব্ধিতে এমন কোনো অপূর্বতা নেই যার উপযুক্ত বাহন হবার গৌরব অর্জন করতে পারে তাঁর কবিতার ভাষা। ‘আমি একজন এন্‌জিনীয়র মাত্র, আমার কাজ শব্দের ইট-পাথর দিয়ে একটা সুরম্য ইমারত খাড়া করা।’ কবিদের মধ্যে শব্দের প্রতি এই অত্যুৎসাহ যখন লক্ষণীয় হয়ে উঠল তার কিছু আগেই দেখা দিয়েছিল মানুষ ও প্রকৃতি বিষয়ে উৎসাহের অতিশয় অভাব, শুধু অভাব নয়, বিপরীত ভাব। এই পারম্পর্যটাকে কাকতালীয় মনে করবার কারণ নেই।

রেনেসাঁসের সময়ে সবাই না হলেও বিদগ্ধজনেরা প্রকৃতি ও মানুষ সম্বন্ধে গভীর কৌতূহল, উৎসাহ ও অনুরাগ বোধ করতে আরম্ভ করেন। বলা উচিত পুনরায় আরম্ভ করেন, তাই ঐ যুগের নাম ‘রেনেসাঁস’ বা পুনরুজ্জীবনের যুগ। দু-হাজার বছর আগে পেরিক্লিয়ান এথেন্‌সেও এমনি বা আরো প্রবল চিত্তের উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। তারপর (গ্রেকো-রোমান সভ্যতার পতনের পর) য়োরোপীয় মানস রইল তমসাচ্ছন্ন, বিমূঢ়, নিঃঝুম হয়ে কয়েক শতাব্দী। দশম শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত মধ্যযুগ নামে অভিহিত। তখনও একপ্রকার চিত্তজাগরণ অবশ্যই ঘটেছিল, কিন্তু যাঁরা জাগলেন, তাঁরা মানুষ বা প্রকৃতির দিকে চোখ মেলে চাইলেন না, মনকে একান্তভাবে নিবিষ্ট করলেন জগতোত্তীর্ণ ঈশ্বরের চিন্তায় ও ঈশ্বর-প্রেরিত শাস্ত্রের ব্যাখ্যায়। রেনেসাঁসের সময় থেকে ঈশ্বরের স্থান ধীরে ধীরে অধিকার করল মানুষ এবং প্রকৃতি। অল্পবিস্তর জোয়ার-ভাঁটা সত্ত্বেও এই মানবমুখিনতা ও প্রকৃতিপ্রিয়তা হয়ে দাঁড়াল য়োরোপীয় চিত্তের স্থায়ী মেজাজ।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই মনোভঙ্গিই রোম্যান্টিক রিভাইভালের নামে নতুন ক’রে এবং বলিষ্ঠতর হয়ে আবার প্রতিষ্ঠিত হ’ল। তবে রোম্যান্টিকদের মনে মানুষ সম্বন্ধে যত উচ্ছ্বাসই থাক, তাঁরা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, স্বার্থপরতা, পরস্পর বিদ্বেষ ইত্যাদি বিষয়ে অনবহিত মোটেই ছিলেন না। কিন্তু সর্বব্যাপী দুঃখ ও পাপের চেতনা তাঁদের মানববিমুখ ক’রে তোলে নি। কীটস-এর মতো কেউ ভাবতেন জীবনের নিষ্করুণ পরীক্ষায় মানবাত্মা শুদ্ধ ও পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়; শেলির মতো কেউ এক অনাগত সুষ্ঠু সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যাতে মানুষমাত্রেই দৈহিক ও মানসিক সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনধারণ করতে পারবে; কেউ বা এক অতীত স্বর্ণযুগের কল্পস্মৃতিচারণে মশগুল হয়ে উঠলেন। কিন্তু মানুষকে, দুঃখী ও পাপী মানুষকেও, ভালোবাসতেন তাঁরা সবাই, আর মানবীকৃত প্রকৃতিকে।

বাইরের জগৎ সম্বন্ধে যে-কবিদের মনোভাব এতখানি ইতিবাচক ও রসগ্রাহী, তাঁরা স্বভাবতই কবিতার ভাষাকে স্বচ্ছ রাখতে চাইবেন, সেই ভাষার কাচের ভিতর দিয়ে দেখাতে চাইবেন মানবিক ও প্রাকৃতিক জগতের অশেষ রূপবৈচিত্র্য বা সেই রূপবৈচিত্র্যে আভাসিত কোনো অন্তগূঢ় সত্য যা সংসারের শত কর্মে লিপ্ত মানুষের দিনানুদৈনিক দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। কবিতার ভাষা একাধারে প্রকাশ করবে শিল্পী মনের অনন্য ভঙ্গিকে, এবং সেই মনোভঙ্গির বিশিষ্ট দর্পণে বিশ্বজগতের স্বরূপটি যেমনভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে, তাকে। সে-রচনা সব-কিছুকে আড়াল ক’রে নিজের অতিদক্ষ চারুকর্মকেই সর্বাপেক্ষা দৃশ্যমান ও মূল্যবান ক’রে পাঠকের দৃষ্টিকে ঐখানে আটকে রাখবে— এমন কথা তাঁরা কখনো ভাবতেই পারতেন না।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং তার অনুকূল শিল্পভাবনায় বেশ বড় রকমের পরিবর্তন দেখা দিল। পরিবর্তনের কারণ বহুবিস্তৃত। সে ঐতিহাসিক আলোচনায় প্রবৃত্ত হবার মতো বিদ্যেও আমার নেই, এখানে স্থানেরও অভাব। প্রাসঙ্গিক দু-কথা খুব সংক্ষেপে বলতে গেলেও নাম করতে হয় ডারুইন এবং মার্ক্সের। বহু কষ্টসাধ্য গবেষণার পর ডারুইন প্রতিপন্ন করলেন যে, মানুষ পতিত দেবদূত নয়, দেবতার প্রতিচ্ছবি নয়, বৃহৎকায় বানরজাতীয় কোনো জন্তুরই বংশধর। এর ফলে স্বভাবতই মানুষের দিব্য-গুণাবলী অপেক্ষা তার জান্তব বৃত্তিগুলিই অধিকতর প্রকট ও প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠল জ্ঞানী এবং শিল্পীর চেতনায়। অন্য দিকে, শ্রমশিল্পবিপ্লবের প্রথম ধাক্কা লেগে এবং ধনিকতন্ত্র গ’ড়ে ওঠার প্রাথমিক পর্যায়ে (বলা যেতে পারে তার প্রসব-বেদনায়) সমস্ত সমাজজীবনে যে-চারিত্র্যনৈতিক দুর্গতি এবং শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে যে-অর্থনৈতিক দুর্দশা চরমে দেখা দিয়েছিল, তার মর্মস্পর্শী চিত্র আঁকলেন ঐতিহাসিক কার্ল মার্ক্স। দার্শনিক ও সমাজ-বিজ্ঞানী মার্ক্স বোঝালেন যে, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম— এক কথায় গোটা সাংস্কৃতিক হর্ম্যপ্রাসাদের ভিত্তিমূলে রয়েছে সত্য-শিব-সুন্দরের কোনো মহান আদর্শ বা ঐশী প্রেরণা নয়, নিতান্ত স্থূল অর্থনৈতিক স্বার্থ ও তজ্জনিত শ্রেণী-সংঘাত। মানুষের এই উভয়বিধ জান্তব কদর্য রূপ দেখে অনেক কবির স্পর্শকাতর চিত্ত মানববিমুখ হয়ে উঠল।

প্রকৃতি সম্বন্ধে উৎসাহেও ভাঁটা পড়ল ঐ সময়ে, কিন্তু স্বভাবতই ভিন্ন কারণে— প্রাকৃত বিজ্ঞানের যুগান্তকারী উন্নতির ফলে। প্রকৃতির রহস্যাবরণ একে একে ছিন্ন হতে লাগল। যে-সব প্রাকৃতিক বস্তু ও ঘটনা বুদ্ধিকে প্রতিহত করত ব’লে বিস্ময়ের রোমাঞ্চ জাগিয়ে তুলত, একপ্রকার অতীন্দ্রিয়ানুভূতি বা মরমীয়াভাবে কবিচিত্ত ভ’রে দিত, সে-সব যাবতীয় ব্যাপার দেখা দিল জড় ও বৈদ্যুতিক শক্তির গোটাকতক গাণিতিক সূত্র রূপে। এই সূত্রগুলিকে হাতের মুঠোয় চেপে ধরে যার সঙ্গে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক স্থাপিত হতে চলেছে, সেই প্রকৃতিকে নিয়ে কি ওয়ার্ডওয়ার্থের মতো মিস্টিক ভাবে বিভোর হওয়া যায়? কোলরিজ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, যেহেতু কবির দেখা জগৎ বিজ্ঞানীর মাপজোখ-করা জগতের সঙ্গে আদৌ মিলছে না, তাই কবির জগৎ তাঁর মনেরই ব্যাপার, বিজ্ঞানীর জগতের তুলনায় নিতান্ত অলীক:

We in ourselves rejoice;
And thence flow all that charms or ear or sight,
All melodies the echoes of that voice
All colours a suffusion from that light.

যে-প্রকৃতি বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় এবং যে-প্রকৃতি কবির আনন্দ ও বিস্ময়ের উৎস, এ দুই প্রকৃতি যে একাধারে— যদিও ভিন্ন অর্থে— সত্য হতে পারে, এ-কথাটা ঊনবিংশ শতাব্দীতে অনেকের কাছে স্পষ্ট হয় নি। আমার তো মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যেমন ক’রে এই কথাটা বুঝেছিলেন তাঁর পরিণত বয়সের কবিতায়, আর কোনো কবি তেমন ক’রে বোঝেন নি। রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন যে, বিজ্ঞানের জয়তোরণ যতই চোখে ধাঁধা লাগাক, তাই ব’লে বিজ্ঞানের সত্যের কাছে কবিতার সত্য নতিস্বীকার ক’রে পিছু হ’টে যাবে, এবং সমগ্র বাস্তব সত্তার উপর বিজ্ঞান-শাস্ত্রের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য মেনে নিয়ে কবিতা রিচার্ডস্-এর উপদেশ অনুযায়ী নিজেকে অলীক কল্পনার জাল বোনায় বা সাত্র-এর পূর্বোক্ত কথামতো অর্থহীন শব্দের ভোজবাজিতে পরিণত ক’রে সন্তুষ্ট থাকবে, এটা কবিতার পক্ষে অসহনীয় আত্মাবমাননা।

যাই হোক, মানুষ ও প্রকৃতি বিষয়ে যখন কবিদের উদ্দীপনা নিভু-নিভু, এমন সময়ে দেখা দিলেন আধুনিক কাব্যের মন্ত্রগুরু বোদলেয়র। বললেন, মানুষের সামনে দুটিমাত্র পথ খোলা আছে— জীবনকে আর জগৎকে ভালোবাসলে আমরা যাব শয়তানের দিকে; ঘৃণায় সে-দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে হয়তো বা ভগবানের ঠিকানা খুঁজে পাব। তাঁর কথা আমি ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। এখানে এইটুকু বলা প্রয়োজন যে, তাঁর শিষ্য-অনুশিষ্যরা— র্যাবো, মালার্মে, ভালেরীরা— উত্তরাধিকার-সূত্রে পেলেন ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যানের মনোভঙ্গি। অথচ তাঁদের মনে বোদলেয়রের ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাস আদৌ বদ্ধমূল ছিল না। বিশ্বজগৎকে, প্রকৃতিকে, মানুষকে যদি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা হয়, অথচ ভগবানের দিকে মনের জানালা বন্ধই থাকে, তা হলে কী নিয়ে মানুষ বাঁচবে? কবিতা নিয়ে। মালার্মে থেকে (প্রকৃতপক্ষে বোদলেয়র থেকে) য়েট্স পর্যন্ত প্রায় সব প্রতিভাবান কবির মুখে এই একই বার্তা ঘোষিত হ’ল— কবিতাই একমাত্র সত্য, আর-সব কিছু মিথ্যা, ভুচ্ছ, পরিত্যাজ্য।’ রবীন্দ্র- নাথের সমস্ত জীবন, মনন, হৃদয়ানুভূতি ও কাব্যসৃষ্টি এ-বার্তার তীব্রতম প্রতিবাদ।

কবি যদি জগতের সব-কিছু প্রত্যাখ্যান করেনও, তবু তাঁর অন্তরের গোপন রহস্য তো রইলই, সেখানেই তাঁর কাব্যসৃষ্টির উৎসের সন্ধান করবেন তিনি, সেখান থেকেই পাবেন সঞ্জীবনী শক্তি। শিল্পসৃষ্টি বহির্জগতের প্রতিবিম্ব নয়, অভিব্যক্তি— রোম্যান্টিক যুগে এই মতটি ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছিল। রবীন্দ্রনাথেরও সায় আছে এতে। কিন্তু অন্তরকে বাহির থেকে বিচ্ছিন্ন ক’রে রবীন্দ্রনাথ দেখেননি কখনো। বলছেন, জগতের যতটা জ্ঞানের দ্বারা আমি জানিব ও হৃদয়ের দ্বারা আমি পাইব ততটা আমারই ব্যাপ্তি, আমারই বিস্তৃতি। জগৎ যে-পরিমাণে আমার অতীত, সেই পরিমাণে আমিই ছোটো। আরো স্পষ্ট ক’রে জানিয়েছেন, ‘আমার বাইরে যদি কিছু অনুভব না করি তবে নিজেকেও অনুভব করি নে। বাইরের অনুভূতি যত প্রবল হয়, অন্তরের সত্তাবোধ তত জোর পায়।’⁶ মানুষের অন্তর তো স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাশ্রয়ী সত্তা নয়, বিশ্বজাগতিক সত্তার আধার মাত্র। সে-আধারের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য আছে, বৈচিত্র্য আছে, তবু তা আধার— অর্থাৎ ভ’রে না দিলে শূন্যই থাকবে। মানবিক ও প্রাকৃতিক জগতের প্রতি কবি যদি অবজ্ঞাবশত তাঁর মনের দরজা-জানালাগুলি বন্ধ ক’রে রাখেন, তবে সেই অন্ধকার ঘরের শূন্যতা (‘void’) ছাড়া আর কী উপলব্ধি করবেন? কাজেই বোদলেয়রের পরে আসেন র্যাঁবো এবং অনিবার্যত মালার্মে।

আধুনিক কবিরা একেবারেই শূন্যবাদী হতে পারতেন, শূন্যের মহিমা-কীর্তন করতে পারতেন মালার্মের মতো সাদা কাগজের শুচিতা কালি দিয়ে কলঙ্কিত না ক’রে। কিন্তু ভালেরী তাঁদের বাঁচালেন: দিব্যাপী শূন্যতায় তিনি দেখতে পেলেন একটি জ্যোতির্ময় রূপ। সে-রূপ শব্দের। ঐ শব্দ স্বভাবতই হবে অনচ্ছ, এবং ঐ অনচ্ছ শব্দযোজনায় কবি রচনা করবেন একটি আক্ষরিক অর্থে সৃষ্টিছাড়া ইমারত। কবিতাই যখন একমাত্র সত্য, কবিতায়া ন পরং কিঞ্চিৎ সা কাষ্ঠা সা পরাগতিঃ, তখন কবিতার ভাষা নিজেকে ছাড়া আর কাকে প্রকাশ করবে, কার রহস্য উন্মোচন করবে, কার ইঙ্গিত বহন করবে? পরমকে তো আর অপরমের, উত্তমকে তো আর অধমের সংকেত বা বাহন করা যায় না। কাজেই কবিতা আর সব-কিছুর অকিঞ্চিৎকরতা ঘোষণা ক’রে নিজেই হবে স্বয়ম্ভূ ও বিভূ। সেকালের তান্ত্রিকদের যেমন ছিল শব-সাধনা, আজকের কবিদের তেমনি আছে শব্দ-সাধনা; এটাই তাঁদের আদি, অকৃত্রিম এবং অন্তিম সাধনা। কবিতার ঐন্দ্রজালিক শব্দ সম্বন্ধে সার্ত্র বলছেন: ‘its sonority, its masculine endings, its visual aspect compose for him a body of flesh?’ এ সুন্দর মুখের প্রেমে পড়েছেন আধুনিক কবিরা, আর কিছুই ভালোবাসতে পারছেন না তাঁরা; এ-বিশ্বজগতে ভালোবাসার যোগ্য অন্য কিছুও হতে পারে এমন কথা তাঁদের ধারণার মধ্যেই আসে না। এই শব্দপ্রেমিক অভিনবত্বের সাধক কবিদের পক্ষে বিশ্বপ্রেমিক মহাকালের মন্ত্রশিষ্য রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করা সহজ নয়।

.

বলা বাহুল্য, উপরের মন্তব্যগুলি যাবতীয় আধুনিক কবি সম্বন্ধে প্রযোজ্য নয়। আধুনিক কবিতার দুটি প্রধান ধারার আলোচনাই আমার অভিপ্রেত ছিল। প্রথমটির মূলভাব— জগতের প্রতি বিতৃষ্ণা; দ্বিতীয়টির গোড়ার কথা— কবিতাকে বহির্জগতের কবিহৃদয়ানুরঞ্জিত উপলব্ধির বাহন জ্ঞান না ক’রে দুর্ভেদ্য (আক্ষরিক অর্থে দুর্বোধ্য) করা। বর্তমান শতাব্দীর অধিকাংশ পাশ্চাত্ত্য কবিদের উপর এই দুটি প্রবণতার অল্পবিস্তর ছায়া পড়েছে, যেমন পড়েছে ১৯৩০-এর পর থেকে অধিকাংশ বাঙালী কবিদের উপর। হালের শক্তিমান কবিগোষ্ঠীর মধ্যে শ্রদ্ধেয় ব্যতিক্রম অবশ্যই পাওয়া যাবে, পাশ্চাত্যে (যথা রবার্ট ফ্রস্ট) এবং বাংলা দেশেও (যথা অমিয় চক্রবর্তী)। সম্মানিত ব্যতিক্রম মার্ক্সবাদী কবিরাও; তবে কবিতাকে সমাজগঠনের মহৎ কাজে উৎসর্গ করার আদর্শ অন্য নিরিখে বিচার্য। আধুনিকতার কোনো সংজ্ঞা দিতে যাওয়া দুঃসাহসের কাজ; এক হিসেবে যাঁরাই আধুনিক কালে কবি রূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন প্রতিভা ও সাধনার যুগ্ম-অধিকারে, তাঁরাই আধুনিক কবি— যুগলক্ষণ-অধিকৃত না হলেও। তবু কবিতার ক্ষেত্রে আধুনিকতার দুটি প্রধান দুর্লক্ষণ আমার চোখে যেমন প্রতিভাত হয়েছে, তারই কিঞ্চিৎ আলোচনা করেছি এ-বইয়ের প্রথম ও বর্তমান অধ্যায়ে। আধুনিক কবিতার পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে হলে তার সুলক্ষণগুলির কথাও বলতে হয়; কিন্তু তা আমার সীমিত প্রসঙ্গের বহির্ভূত ছিল, তার সুযোগ এখানে ঘটে নি।

.

১ Jean Paul Sartre— What is Literature, pp 4-5 (Methuen, 1950)

২ এর উদাহরণস্বরূপ মালার্মের বিখ্যাত সনেটের সুদক্ষ অনুবাদখানি তুলে দেওয়া যায়:

Her pure nails very high dedicating their onyx,
Anguish, this midnight, upholds, the lamp-bearer,
Many vesperal dreams by the Phenix burnt
That are not gathered up in the funeral urn

On the credences, in the empty room: no ptyx,
Abolished bibelot of sounding inanity
(For the Master is gone to draw tears from the Styx
With this sole object which Nothingness honours.)

But near the window void Northwards, a gold
Dies down composing perhaps a décor
Of unicorns kicking sparks at a nixey,

She, nude and defunct in the mirror, while yet,
In the oblivion closed by the frame there appears
Of scintillations at once the septet.

ব্যাখ্যাপ্রসঙ্গে লব্ধপ্রতিষ্ঠ সমালোচক শার্ল মোরঁ বলছেন— এই সনেটের মূল্য নির্ভর করছে ফরাসী ভাষায় তরল ও কঠিন ব্যঞ্জনবর্ণের এবং হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরবর্ণের অত্যাশ্চর্য ধ্বনিবিন্যাসের উপর। এত সব কালোয়াতি করতে গিয়ে কবিতার অর্থটাকে বেশ নির্মম হস্তে দুমড়ে মুচড়ে নাকালের একশেষ করা হয়েছে বটে, তবে ‘the words themselves, rare and chiselled, suffice to give the poem the air of a jewel in gold and agate’। সমালোচক মহোদয় মালার্মে-ভক্ত না হলে ভাবতাম জড়োয়া গয়নার সঙ্গে তুলনা ক’রে তিনি কবিতাটির তুচ্ছতার দিকেই ইঙ্গিত করছেন। কারণ গয়নাগাটির চেয়ে তুচ্ছ জিনিস আর কী আছে এ সুন্দর ভুবনে।

৩ ইংরেজি ভাষায় এই আদর্শে রচিত হার্বার্ট রীডের কয়েকটি ছোট কবিতা মার্চ ১৯৫৯-এর এনকাউন্টার পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তার একটি:

hot rod
vellum list fell dole
packed pendulum red roar
esteem wet spindle
auriculur thy lung
scut thews cold selvage
out angular out out odd
yet not.

সুখের বিষয় বাঙালী কবিরা এদিক দিয়ে এখনো পেছিয়ে আছেন। তবে কতদিন পশ্চাৎপদ থাকবেন বলা যায় না।

৪. Exclude, if you begin,
The real which is cheap
Its too sharp sense rubs thin
Your vague literature. (Stephane Mallarmé)

And therefore I have sailed the seas and come
To the holy city of Byzantium
…………………..
Once out of nature I shall never take
My bodily form from any natural thing.

(W. B. Yeats – “Sailing to Byzantium”)

৫. সাহিত্য, পৃ. ৫

৬. সাহিত্যের পথে, পৃ. ৪০

৭. ‘The poet remains empty to himself if he does not fill himself with the universe, the poet knows himself only on the condition that things resound in him, and that in him, at a single awakening, they and he come forth together out of sleep.’

কথাগুলি রবীন্দ্রনাথের মতো শোনায়, কিন্তু বলেছেন আধুনিক কালের প্রথিতযশা দার্শনিক ও শিল্পসমালোচক জাক্ মারিতা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%