৬৫. জাহাজ মারা হাবীব

হুমায়ূন আহমেদ

নদীর নাম ধলেশ্বরী। তারিখ বারই আগষ্ট।

সাতটা জাহাজের বিশাল বহর এগুচ্ছে। তাদের গন্তব্য ফুলছরিঘাট। জাহাজ বোঝাই অস্ত্রশস্ত্ৰ গোলাবারুদ এবং রসদ। ফুলছরিঘাটে মাল খালাস হবে। সেখান থেকে যাবে রংপুর এবং সৈয়দপুর। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে।

জাহাজ বহরের দায়িত্বে আছেন ক্যাপ্টেন আমানুল্লাহ, সহকারী কমান্ডার লেফটেনেন্ট আতাউল্লাহ। জাহাজগুলি মালামাল বহন করছে, কাজেই নৌবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত না। স্থলবাহিনীর বেশ বড় দল জাহাজে আছে। তারাই নির্বিঘ্নে জাহাজগুলি গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। জাহাজের সারেংরা সবাই বাঙালি, নদী ভালো চেনে। তারা নদীর গভীরতা দেখে দেখে এগুচ্ছে।

ক্যাপ্টেন আমানুল্লাহ আছেন এস. ইউ. ইঞ্জিনিয়ারস এলসি থ্রি জাহাজে। তাঁর সঙ্গে আছেন লেফটেনেন্ট আতাউল্লাহ। বিশাল আকৃতির এই জাহাজের পাশাপাশি যাচ্ছে ত্রিপল ঢাকা ট্যাংকার এস. টি. রাজন। এখানে আছেন সুবেদার রহিম খান।

ক্যাপ্টেন আমানুল্লাহ জাহাজের ডেকে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার কাছে এই প্রথম মনে হচ্ছে তিনি ছুটি কাটাতে এসেছেন। আনন্দময় নৌভ্রমণ হচ্ছে। জাহাজ বহর দেখে দুই তীরের আতঙ্কিত মানুষদের ছোটাছুটিতেও তিনি খুব মজা পাচ্ছেন। বাঙালি অতিরিক্ত মাছ খাওয়ার কারণে ভীরু স্বভাবের হয় বলে তিনি জানেন। আজ তার প্রমাণ দেখছেন। বাড়িঘর ছেড়ে লোকজন পালাচ্ছে। মাছ মারতে আসা জেলেরা নৌকা এবং জাল ফেলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ছে পানিতে। ক্যাপ্টেন আমানুল্লাহ তাদের দোষ দিতে পারছেন না। সাতটা জাহাজের বহর দেখে যে-কেউ ভয় পাবে। ভীতু বাঙালির ছোটাছুটি দেখতে ভালো লাগে।

জাহাজ এগুচ্ছে ধীর গতিতে। নদী সব জায়গায় সমান গভীর না। জায়গায় জায়গায় চর জেগেছে। নদীর গভীরতা দেখে দেখে এগুতে হচ্ছে সাবধানে। জাহাজের গতি আরেকটু বেশি হলে ভালো হতো।

লেফটেনেন্ট আতাউল্লাহ ডেকে উঠে এলেন। তার হাতে ক্যামেরা। তার উদ্দেশ্য নিজের কিছু ছবি তুলবেন। দেশে পাঠাবেন। ছবি এমনভাবে তোলা হবে যেন জাহাজ বহরের অনেকটাই ছবিতে আছে। তার বৃদ্ধা মা ছেলের ছবি খুব আগ্রহ করে দেখেন।

ক্যাপ্টেন আমানুল্লাহ হাসিমুখে বললেন, হ্যালো মি. ফটোগ্রাফার, তুমি যে হারে ছবি তোল, তোমার ক্যামেরায় ফিল্ম অবশিষ্ট থাকার কথা না। যদি থাকে আমার একটা ছবি তুলে দাও।

লেফটেনেন্ট আতাউল্লাহ বললেন, অবশ্যই স্যার।

ছবিটা এমনভাবে তুলবে যেন আমাকে দেখে মনে হয় আমি ক্রিস্টোফার কলম্বাস।

অবশ্যই স্যার। এখানে ছবি না তুলে চলুন ছাদে যাই। ছাদে ছবি ভালো আসবে। জাহাজ বহরের অনেকখানি পাওয়া যাবে।

চল যাই।

ক্যাপ্টেন আমানুল্লাহ ছাদে উঠার সিঁড়িতে পা রেখেছেন, তখনই মটারের গোলা এসে জাহাজে পড়ল। ব্যাপার কী বুঝে উঠার আগেই বৃষ্টির মতো মেশিনগানের গুলি এসে পড়তে লাগল। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, What is happening? বিশাল এই জাহাজ বহর আক্রমণ করার স্পর্ধা কে দেখাচ্ছে? লেফটেনেন্ট আতাউল্লাহ বলল, স্যার আমরা কাদের সিদ্দিকীর এলাকার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের আক্রমণ করেছে কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী। সে ছাড়া এই কাজ আর কেউ করবে না।

ততক্ষণে নারকীয় কাণ্ড শুরু হয়েছে। পেছনের জাহাজগুলি উল্টোদিকে চলতে শুরু করেছে। তার জাহাজটি এবং এস. টি. রাজন ছাড়া সামনের জাহাজগুলিও দেখা যাচ্ছে না। এস. টি. রাজনে যেভাবে মর্টারের গোলা এসে পড়ছে যে-কোনো মুহুর্তে এতে আগুন ধরে যেতে পারে। এই ট্যাংকারটিতে ডিজেলই আছে এক লক্ষ আশি হাজার গ্যালন।

জাহাজের কন্ট্রোলরুম থেকে ওয়্যারলেসে হেড কোয়াটারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো।

আমরা আক্রান্ত হয়েছি। আমরা আক্রান্ত হয়েছি। বৃষ্টির মতো মর্টারের গোলা, এসে পড়ছে। লেফটেনেন্ট আতাউল্লাহ নিহত। সুবেদার রহিম খান নিহত।

কী বলছ এসব?

মে ডে। মে ডে।

জাহাজ নিয়ে পিছিয়ে আসা। কোনোক্রমেই যেন জাহাজ কাদের সিদ্দিকীর হাতে না পড়ে। জাহাজ বোঝাই অস্ত্রশস্ত্ৰ।

আমরা চড়ায় আটকা পড়েছি। সেনাবাহিনীর প্রায় সবাই নিহত। বিমানবাহিনীর সাহায্য লাগবে। অবিলম্বে বিমানবাহিনীর সাহায্য লাগবে।

বিমানবাহিনীর সাহায্য যাচ্ছে। জাহাজের অস্ত্ৰ যেন তাদের হাতে না পড়ে। কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী এগিয়ে আসছে। তাদের দেখতে পাচ্ছি। হেভি মেশিনগান দিয়ে ওদের আটকে রাখ; বিমানবাহিনীর সাহায্য আসছে।

মেশিন গানাররা কেউ জীবিত নেই। কথা শেষ হবার আগেই বিকট শব্দে রকেট লাঞ্চারের গোলা ফাটল। ক্যাপ্টেন আমানুল্লাহ ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন পানিতে।

———–

* মাটিকাটা অঞ্চলে অসীম সাহসিকতায় যে মানুষটি জাহাজ আক্রমণের নেতৃত্ব দেন। তিনি কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর এক বীর যোদ্ধা। তাঁর নাম মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান। জাহাজ দখলের পর তাঁর নাম হয়ে গেল জাহাজ মারা হাবীব। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর বিক্রম সম্মানে সম্মানিত করেন। কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীতে যোগদানের আগে তিনি ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার।

সকল অধ্যায়
১.
০১. মাওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরী
২.
০২. শাহেদের অফিস মতিঝিলে
৩.
০৩. পুলিশ ইন্সপেক্টর মোবারক হোসেন
৪.
০৪. নীলগঞ্জ হাইস্কুলের বারান্দা
৫.
০৫. কলিমউল্লাহ নামটা
৬.
০৬. মোবারক হোসেনের ছুটির দিন
৭.
০৭. কবিতা একবার পড়লে
৮.
০৮. অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর
৯.
০৯. মরিয়ম কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না
১০.
১০. মোবারক হোসেন
১১.
১১. চায়ের কাপ নামিয়ে
১২.
১২. আকাশে ট্রেসার উড়ছে
১৩.
১৩. ২৬ মার্চ ভোর আটটায়
১৪.
১৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্ৰ
১৫.
১৫. ভয়ঙ্কর রাতের পরের যে ভোর
১৬.
১৬. মাত্র দুঘণ্টার জন্যে কারফিউ-বিরতি
১৭.
১৭. ভয়ঙ্কর দিন যাচ্ছে
১৮.
১৮. পিরোজপুর মহকুমার পুলিশপ্রধান ফয়জুর রহমান
১৯.
১৯. জেনারেল টিক্কা খান
২০.
২০. দৈনিক পাকিস্তান-এর সাহিত্যপাতা
২১.
২১. শিউলি গাছে আশ্বিন কার্তিক মাসে ফুল ফুটবে
২২.
২৩. গৌরাঙ্গ বিরক্ত দাস
২৩.
২৩. ফাঁকা রাস্তায় ঠেলাগাড়ি
২৪.
২৪. শাহেদের চেহারায় পাগল পাগল ভাব
২৫.
২৫. চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই
২৬.
২৬. দারোগাবাড়ি
২৭.
২৭. ফজরের নামাজ
২৮.
২৮. নীলগঞ্জ থানার ওসি ছদারুল আমিন
২৯.
২৯. সকাল থেকে বিরামহীন বৃষ্টি
৩০.
৩০. রুনি বলল, মা, আমরা কোথায় যাচ্ছি
৩১.
৩১. আয়েশা বেগম নৌকায় বসে আছেন
৩২.
৩২. হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মেয়ে বেগম আখতার সোলায়মান
৩৩.
৩৩. পাকিস্তান সরকার স্বীকার করে
৩৪.
৩৪. বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি
৩৫.
৩৫. জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট
৩৬.
৩৬. গভর্নর টিক্কা খান
৩৭.
৩৭. কবি শামসুর রাহমান
৩৮.
৩৮. ডেইলি পিপল পত্রিকার সাব-এডিটর নির্মলেন্দু গুণ
৩৯.
৩৯. ফজরের ওয়াক্তে
৪০.
৪০. ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেতের চিঠি
৪১.
৪১. দলিলপত্ৰ : অষ্টম খণ্ড
৪২.
৪২. রাত দশটা
৪৩.
৪৩. একটা সময় পর্যন্ত দেশের মানুষ
৪৪.
৪৪. কাঁদছে আমাদের বাংলাদেশ
৪৫.
৪৫. দুর্ধর্ষ ক্র্যাক প্লাটুন
৪৬.
৪৬. বেগম সুফিয়া কামালের দিনলিপি
৪৭.
৪৭. জেনারেল ইয়াহিয়ার সাক্ষাৎকার
৪৮.
৪৮. লায়ালপুরের জেলের একটি বিশেষ কক্ষ
৪৯.
৪৯. বেগম মুজিবের বিষাদঘন দিনগুলো
৫০.
৫০. নীলগঞ্জ জামে মসজিদ
৫১.
৫১. বেলুচ রেজিমেন্টের সেপাই আসলাম খাঁ
৫২.
৫২. আসমানী হতাশ চোখে
৫৩.
৫৩. রফিকের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাতেও নেই
৫৪.
৫৪. জেড ফোর্স
৫৫.
৫৫. মেজর জিয়া
৫৬.
৫৬. দিন ঘনায়ে আসলে মানুষ ধর্ম কপচায়
৫৭.
৫৭. কলিমউল্লাহর বাবুর্চি বাচ্চু মিয়া
৫৮.
৫৮. মাওলানা ভাসানী
৫৯.
৫৯. জনৈক মুক্তিযোদ্ধার চিঠি
৬০.
৬০. ডাক্তার ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম, বীর প্রতীক
৬১.
৬১. শ্রাবণ মাসের এক দুপুরে
৬২.
৬২. ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী
৬৩.
৬৩. মিলিটারিরা গৌরাঙ্গকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে
৬৪.
৬৪. ৩৬ ডিভিশনের প্রধান মেজর জেনারেল জামশেদ
৬৫.
৬৫. জাহাজ মারা হাবীব
৬৬.
৬৬. হেমায়েতউদ্দিন ‘হিমু’
৬৭.
৬৭. আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের
৬৮.
৬৮. ইন্দিরা গান্ধী
৬৯.
৬৯. ডিসেম্বরের ছয় তারিখ
৭০.
৭০. আত্মসমৰ্পণ করুন
৭১.
৭১. চৌদ্দই ডিসেম্বর ভোরবেলা
৭২.
৭২. ১৬ ডিসেম্বর সকাল

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%