সৈকত রক্ষিত
দু-কুড়ি ঘর নিয়ে গড়ে উঠেছে চাপাইটাঁড়। ঘরে বসবাসকারী মানুষগুলোর মতো ঘরগুলোও অত্যন্ত আদিম প্রকৃতির। শিল্প ও স্থাপত্যের কোথাও এতটুকু চিহ্ন নেই। এবড়ো-খেবড়ো হাতে মাটির তাল নিয়ে, থাপি দিয়ে দিয়ে, কোনোরকমে খাড়া করা হয়েছে ছোটো ছোটো দেয়াল। অনুচ্চ আবার অপরিসরও। বাইরে থেকেও বোঝা যায় ঘরগুলো ঘুপচিমতো। অন্ধকার অন্ধকার। আলো-হাওয়া ঢোকানোর জন্য পাল্লাবিহীন খোপ কাটতেও তাদের যেন কার্পণ্য রয়েছে। জায়গায় জায়গায় দেয়ালের মাটি প্রক্ষিপ্ত মনে হয়। যেন খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে আসা মদ্দার সঙ্গে মাদি ঘুসুরের গুঁতোগুঁতি লাগার ধাধসেই সে-মাটির চাকলা খসে পড়তে পারে। আর তা যাতে না পড়ে হয়তো তার জন্যই গাঁথুনির মাঝে মাঝে গুঁজে দেওয়া হয়েছে তেকুনো-চৌকুনো ভোঁতা পাথর, যে-পাথর দূরের কোনো ডুংরি কিংবা খাদান থেকে আনা। ঝড়া মাথায় বয়ে এনেছে এই চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা। পুরুষদের সঙ্গে তাদের বউমানুষ আর ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাও হাত লাগিয়েছে। ফুর্তি নিয়ে।
চৌদিকে ঘোরানো এই বেঁটে বেঁটে মোটা দেয়ালের ওপরে, তেমনি ঘরামির হাতের নৈপুণ্যে বসানো হয়েছে চালা। এই চালা, আসলে, চিহড়লতা দিয়ে বাঁধা জংলি গাছের সরুমোটা ডাল কেটে বানানো ‘ধাঁচা’। তাতে পুরু করে বিছানো পুয়াল। যদিও এখন আর তেমন পুরু করে পুয়াল বিছানোর আর্থিক সামর্থ্য ঘাসিদের নেই। একপণ পুয়াল চাষিদের কাছ থেকে কিনতে গেলে—নাই-এর কম—একটি কড়কৈড়া নম্বরি নোট লাগে। তেমন নোট তারা চামড়ার চোখে দেখে কদাচিৎ।
তবে একেবারেই যে দেখে না তাও নয়। কিন্তু দিন দিন তা কমে আসছে। কমে আসছে চাপাইটাঁড়ের অগল-বগলের গাঁ-গেরাম থেকে মানুষজনের সময়ে-অসময়ে রাতে-ভিতে ঘাসিদের ঘরকে আসা। অথচ ঘাসিরা, তাদের দুস্থ-দরিদ্র-অনাহারী পরিবার নিয়ে আজও দিনভর অপেক্ষায় থাকে—কখন তারা আসে। কখন মুকুন্দপুর, পালৈজ্ঞা, হন্যাটাঁড়, ঝালমামড়া কিংবা খয়েরটাঁড়, বাঁধডি, বুরুয়াডি, জাহাজপুর থেকে লোক সিধা তাদের গ্রামটির দিকে এগিয়ে আসে। বাঁকাবাঁকি নাই—কাহান কিংবা হন্যাটাঁড়ের কাঁচা সড়প ধরে সিধা চাপাইটাঁড়।
তেমন কেউ এলে ঘাসিরা অবশ্য অনেকটা আগে থেকে তা টের পেয়ে যায়। চোড়কু ঘাসি কিংবা ফটিক ঘাসির মতো কেউ কেউ তো সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাঁধ যাওয়ার আগু গ্রামের বাইরে ডুমৈরতলটিতে দু-দন্ড ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। ভুরুতে হাতের ছাউনি রেখে, অনেকটা দূর অবধি তাকিয়ে দেখে—যদি সত্যি-সত্যিই তেমন কেউ তাদের গ্রামের দিকে এগিয়ে আসছে। তাহলে হয়তো চাপাইটাঁড় ঢোকার আগুই তাকে টেকানো হবে। একথা-সেকথা বলে অন্য কারও ঘরের আঙিনায় তাকে না তুলে, সটান নিজের ঘরের কপাটবিহীন দরজা দিয়ে ঢোকানো হবে উঠোনে। তারপর, সাধারণত এটাই হয়ে থাকে যে, সেই অনাহূতকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগে সে নিজেই বলে ওঠে, ‘শ্লা, বুঢ়াটা গেল ত গেল, হামদেরকে টুকুও শান্তি দিঁয়ে গেল নাই!’
‘কন বুঢ়াটা?’
‘অ বাবাআ! তুঁই যে ঘাসি হঁয়ে উদারকলা করছিস র্যা বাপ। কন গাঁয়ের কন বুঢ়াকে তরা জানিস নাই, ন চিনিস নাই? সবাইকে জানিস। যত বুঢ়াবুঢ়ি আছে। আর সবার দিগে তরা ক্যাঁকলাসের পারা ভাইলে আছিস য্যা কখন ইয়ারা ভোগ কাটাবেক। বল বঠে কি নাই?’
‘বঠে।’ ঘাসি তাদের সম্পর্কে এই অভিযোগকে অকপটে স্বীকার করে নেয়। বাস্তবিক, তারা চাপাইটাঁড়ের আশপাশের গ্রামগুলোর লোকজনদের মোটামুটি সবাইকে জানে। বিশেষ করে যারা ‘বয়সালু’। যাদের পরমায়ু প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এবং যে-কোনো দিন ‘ভোগ কাটাতে’ পারে।
‘ভোগকাটা’র অর্থ হল—‘ভোকাট্টা’। স্বগগে যাওয়া। তাদের অগস্ত্যযাত্রার সংবাদ পেলে তারা খুশিও হয়। খুশি হয় এই জন্য যে, এই সূত্র ধরে ওই মরা-হারা ঘরটিতে ডাক পড়বে তাদের। ঘাসিদের। মদনভেরি নিয়ে গিয়ে অশৌচান্তে তাদের ঘাটে তোলার জন্য। তখন চাল-চিড়া-ধুতি আর নগদ মুদ্রাও কিছু তাদের শুকনো করতলে এসে পড়ে। এই প্রত্যাশায় তারা অপলক বসে থাকে। দিন গোনে। ঘর থেকে বেরিয়ে ডুমৈর তলে দাঁড়িয়ে ভুরুতে হাতের ছাউনি ঠেকিয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। তাকিয়েই থাকে, দূরে।
উপরোক্ত কথোপকথন ঘাসিদের ঘরে প্রায়ই শোনা যায়। এমন অনেক লোকই আসে, মদনভেরির জন্য, যে মনে করে, যার সৎকারকে কেন্দ্র করে ভেরি বাজানোর আমন্ত্রণ জানাতে ঘাসিদের ঘরে আসা, তার মৃত্যুতে এবার তারা হাড়ে বাতাস পাবে। কোনো কোনো পরিবারে, হয়তো একটি বুড়ি জীবনভর দুঃখ-কষ্ট-দারিদ্র্য আর গঞ্জনা সইতে সইতে, ঘাটে যাওয়ার দিনগুলিতেও স্বস্তি পায় না। উপরন্তু সংসারের সবাই তার ওপরে অতিষ্ঠ হয়ে থাকে। তারা দিনরাত উঠতে-বসতে ওই মানুষটিকে গালমন্দ করে, দাঁত খিঁচায়, শাপশাপান্ত করে চলে। বলে, ‘ই-বুঢ়িটা য্যা কবে মরবেক! মরলে হামরা হাই করে বাঁচি! গটা সংসারটাকে জ্বালায়-পুড়ায় মরাছে!’ এই কটু মন্তব্য শোনার পরেও কোনো কোনো বৃদ্ধার প্রত্যুত্তর দেওয়ার শারীরিক ক্ষমতাও থাকে না। কিংবা এতদিন জীবদ্দশায় চাপান-উতোর চালিয়ে যে-কথা সে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি, আজ কি তার জবাব দিয়ে সে তাদের উগ্র মনকে কোমল ও মমতাময় করতে পারবে? আজ তো সে জীবন্মৃত! তাই অন্তর্গত দুঃখ ও আবেগে, মনোক্লেশে সে গুমরাতে থাকে। এই করুণ যাত্রাকালে তাদের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার চোখের কোলে অভিমানে জমে-ওঠা অশ্র, নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ে যায়।
কিংবা এই আক্রাবাজারে, মা-বাপ হলেই বা, বুঢ়াবুঢ়ির পেট চালানো কি চাট্টিখানি? যেখানে এককেজি চাল কিনতে গেলে কড়কৈড়া দশটি টাকা লাগে? আবার কেউ কেউ অতটা নিষ্ঠুর হতে পারে না। ঘরের এই মানুষগুলি তাদের কাছে আপদ বা জঞ্জাল নয়। তাদের মৃত্যু তাই তারা সহজে মেনে নিতে পারে না। কেউ কেউ তো ঘাসিদের উঠানে এসেও কথায় কথায় কাঁদুমাদু হয়। বলে, ‘ঘরের বুঢ়ামানুইষ চলে গেল মানে সংসারের লাগামটাই খসে গেল। আর কী থাকল সংসারের? বশের টাঁক!’
যদিও চোড়কু ঘাসির ঘরে-আসা লোকটির কথা থেকেও টের পাওয়া যায় যে, বৃদ্ধটি যখন বেঁচে ছিল তখনও সংসারের মানুষ শান্তি পায়নি, মৃত্যুতেও পেল না। চোড়কু প্রশ্ন করে, ‘কন বুঢ়া?’
‘বুঢ়া, বুঢ়া! আমার বাপ!’ লোকটি বলে, ‘তার কথা-ই বলা হছে। মরেও শান্তি দিল নাই।’
‘ক্যানে?’
‘এই য্যা এখন ভাইয়ে-ভাইয়ে ঠেঙাঠেঙি হছে। ঘাটখরচা, কুটুম্বিতার খরচা কেউ দিতে মানছে নাই। তার হতেই খাওয়া-কামড়া। তাইলে ইয়ার মানে কী বুঝাছে? মরেও শান্তি আছে?’
‘নাই।’
ঘাসিরা কখনো কোনো বিতর্কে যেতে চায় না। দুস্থ দরিদ্র ও করুণ মুখাপেক্ষী মানুষের মতো তারা ভেরি নিতে-আসা এইসব মানুষদের পক্ষে কথা বলে তাদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। তা না হলে যদি তারা অসন্তুষ্ট হয় এবং এমন কথা বলে যে, ‘হেই শ্লা! তুঁই ঘাসি হঁয়ে আমার ল্যা বেশি জানিস? আঁইড়া তক্ক করছিস! যাহ, তোর ভেরি আর লিবই নাই।’ যদিও, বাস্তবে এটা অতিশয়োক্তি। এবং অতিশয়োক্তি যদি নাও হয়ে থাকে, তাহলেও এই ভাবনা তাদের সরল ও অধীনস্থ জীবনকথাকেই প্রতিধ্বনিত করে।
বস্তুতপক্ষে, গ্রামীণ মানুষদের লোকাচারের মধ্যে এই ভেরি-বাজিয়ে ঘাসিদের একটা ভূমিকা রয়ে গেছে। বহু প্রাচীনকাল থেকে ভূমিকা তাদের মদনভেরির। যে-ভেরির সঙ্গে, ভেরির ধ্বনির সঙ্গে জন্ম ও মৃত্যুর অদৃশ্য সংযোগ রয়েছে বলে, এবং বংশপরম্পরায় তারা এই বৃত্তিকে বহন করে চলেছে বলে, তাদের জীবনযাপন হয়ে উঠেছে সরল, মুগ্ধতাহীন এবং হীনম্মন্যতাপূর্ণ। এই বর্ণময় জগৎ, এই বিস্তৃত বৈচিত্র্যময় চরাচর তথা জীবন সমাগম দেখেও তাদের চোখেমুখে কোনো বিস্ময়বোধ নেই। বেঁচে থাকার মধ্যে কোনো ভিন্ন সুর নেই, অভিনবত্ব নেই, গৌরব নেই। পুরুষানুক্রমিকভাবে বেড়িবদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে আসার কথাও তারা বড়-একটা ভাবতে পারে না। ভাবতে পারে না তাদের কালো ও রুগ্ন হাত দুটি থেকে আবহমানকাল ধরেবয়ে-আনা মদনভেরিটিকে চিরতরে মাটিতে নামিয়ে দিতে! ‘চুনকুড়ি’ তে আর-একটিও ফুঁ না দিতে। আর তাই, কখনো কখনো, মদনভেরিকেই মনে হতে পারে তাদের আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে-ফেলা অস্বচ্ছল হীয়মান জীবনের অভিশাপ।
লৌকিক ঘাসিরা অবশ্য তা মনে করে না। মদনভেরি তাদের অভিশাপ হতে যাবে কেন? সংগীতরসিক সাঁওতাল তার হাতের কেঁদরিটিকে সন্তানের মতো, দেবতার দান স্বরূপ তাকে লালন করে। সেই কেঁদরির তারে মোলায়েম ঘর্ষণ করে সে সুর সৃষ্টি করে। এই সুর তো তার প্রাণের সুর—যা সে ভূমন্ডলে ছড়িয়ে দিয়ে আনন্দ পায়। মদনভেরিও কি ঘাসির হাতে তেমনি অলৌকিক গান্ধর্ব উপহার নয়? যে-ভেরি বাজিয়ে তারা মর্ত্য থেকে স্বর্গে মানুষের আবির্ভাব ও তিরোভাবের বার্তা প্রেরণ করছে, তা কখনো অভিশপ্ত করতে পারে, মানুষকে? বরঞ্চ সর্বদা সর্বাথেই তা হৃদয়াবেগের, উল্লাসের। একটি নবজাতক ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদ যেমন আনন্দের, তেমনি ঘাটশ্রাদ্ধের মধ্য দিয়ে, একটি মানুষের, ‘অদৃষ্টের লিখন’ অনুযায়ী তার নির্দিষ্ট জীবনকাল শেষ করে, এই মায়াময় জগৎ ছেড়ে অনন্তের অভিমুখে নির্বাক চলে যাওয়াও আনন্দের। খুশির। অনন্ত যাত্রার সুযোগ পায় ক-জন?
দুঃখময়, মায়াময়, কর্তব্যময় এই জগৎ। দুঃখকে জয় করে, কর্তব্য সমাধা করে, মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে তবেই তো মানুষ পারে অনন্তের দিকে যাত্রা করতে? জীবনের অন্তিম দশায় পৌঁছে, একটা সময় সে জীবনের সব কোলাহলকে এই ধরাতলে রেখে দিতে চায়। পরপারের জন্য তখন তার প্রাণ আনচান করতে থাকে। তখন গার্হস্থ্য জীবনে থেকেও সে যেন সন্ন্যাস যাপন করে চলে। আর দন্ডে দন্ডে বলে, দয়াল, পার কর আমারে। মৃত্যুই হল সেই পারে যাওয়ার তরি।
যদিও, লোকজীবনে মানুষ যতদিন পারে মনকে সাজিয়ে রাখতে চায়। এই সাজিয়ে রাখার অর্থ মোটেই কোনো পার্থিব বিষয়-সম্পদ ও প্রাচুর্য দিয়ে অন্তরাত্মাকে ভারাক্রান্ত করে রাখা নয়। সে সুখ-শান্তি-মমতা দিয়ে, প্রেম ও ঔদার্য দিয়ে, সাজাতে চায়। এগুলিই তো মনের অলংকার। কিন্তু যখন তার অন্ধকার ঘনায়ে আসে?
হ্যাঁ, আসে। কখনো কখনো দারিদ্র্য ও অনাহারে জীবননির্বাহের পথগুলি ঘনঘটাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। কোথাও কোনো দিশা পাওয়া যায় না। যখন করুণ দৈন্য ঘাসিদের দুর্ভাবনাগ্রস্ত করে তোলে, যখন ছোটো ছোটো মাটির ঘরগুলির ভেতরে অভক্ষিত ও নির্জীব পড়ে থাকা স্ত্রীকন্যাদের নিয়ে দাঁড়ানোর অত্যল্প দিশাও খুঁজে পায় না, তখন ফাটা দেয়ালের গায়ে পাড় বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা মদনভেরিটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার ভেতরে ফিরে ফিরে আসতে থাকে অপরাপর মানুষের মৃত্যুচিন্তা। যেন সে তার মনশ্চক্ষু দিয়ে বারে বারে এমন একটি দৃশ্যকেই দেখতে চায় যে, ক্ষৌরকর্ম ও স্নানাদি সেরে শোকার্ত পরিবার পড়ন্ত বেলায় উঠে আসছে ঘাট থেকে এবং তাদের সবার আগে আগে সে কীর্তনিয়াদের খোল-কীর্তনের সঙ্গে ভেরির ধ্বনি ফুৎকারে দিতে দিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাসগৃহের দিকে।
তারপর বাসগৃহে পৌঁছে, নিকোনো ও পরিচ্ছন্ন আঙিনার মাঝে দাঁড়িয়ে, কোমরে বহুযুগ গুঁজে রাখা তেলচিকুটি ধুতির প্রান্তটি দু-হাতে ওসার করে ধরে বলবে, ‘দাও মা, কী দিবে দাও! চাল দাও, পয়সা দাও। দু-মুঠা বেশিয়েই দাও মা। ঘরে পুয়াতি বউ আছে। ছুটু-ছুটু ছা আছে। তুমরা না দিলে আমরারাকে কে দিবেক? উয়ারা কী খাঁইয়ে বাঁচবেক? বল ন?’
আহা! পরনির্ভরশীলতার এত করুণ অকপট অভিব্যক্তি আর হয় না। করুণা উদ্রেককারী এমন মর্মন্তুদ প্রেক্ষাপটও দৃশ্যগোচর হয় কদাচিৎ। কখনো কখনো সেই নিরীহ ঘাসি-পিতার গা-ঘেঁষে, ঠিক তার পাশটিতে, নির্বাক নিরুত্তেজ দাঁড়িয়ে থাকে তার ধূসর শিশু সন্তানও। কোমরে তার একবিঘৎ বস্ত্রখন্ডও নেই। অনাহারে অর্ধাহারে চুপসানো পেট। নিম্নাঙ্গের উপরে যেন অনেকটা ভার দিয়েই ঝুলে রয়েছে ঘুনসিতে বাঁধা ভেলাবিচিগুলি। বাপের মদনভেরিটিও হয়তো তখন সে বাপের হাত থেকে নিজের হাতে রেখেছে। গোয়ালঘরের দেয়ালে কিংবা পায়ের সামনে মাটিতে নামিয়ে রাখেনি।
এ এক আশ্চর্য ব্যঞ্জনাময় নৈসর্গিক চিত্রপট! বেদনা যেখানে মর্মস্পর্শী, হৃদয়বিদারক, হয়তো সেখানেই এমন অকিঞ্চন অপার্থিব চিত্ররচনা সম্ভব। বঞ্চনা যেখানে অসহ, করুণাকাঙ্ক্ষা যেখানে জীবনবোধ, বস্তুত সেখানে, সেখান থেকেই এমন চিরঞ্জয় চিত্রকলার সৃষ্টি সম্ভব। শিল্প ও জীবন এভাবে একাকার না হলে সৃষ্টি কখনোই কালোত্তীর্ণ হতে পারে না। এখানে তাই হাড়পাঁজরা নিয়ে দু-হাতে ধুতির মুড়ি ধরে দাঁড়িয়ে-থাকা ঘাসির মতো, তার শিশুটিরও মতো, এই মদনভেরিটিকে তাদেরই একজন বলে প্রতীয়মান হয়। যেন সে শুধুই ধাতব চোঙ আর বাঁশের ফালি দিয়ে বানানো কোনো আদিম শব্দযন্ত্র নয়। যে তার চ্যাপটানো চুনকুড়িতে ঠোঁট রেখে ফুঁ দেয়, ধ্বনি তোলে, সেই ধ্বনি দিয়েই সে ঘাসির আর্তনাদকেও আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে দিতে চায়।
আবার অন্যদিকে, ঘাসি-পিতা যেন তার সুপ্রাচীন নিয়মেই তার পুত্রের সঙ্গে চাক্ষুষ পরিচয় করিয়ে দিতে চায়, এই বর্তমানের। যে-বর্তমানকে দ্বিধাহীনভাবেই সে লাভ করবে। যে-বর্তমান এমনই সংকটময়, বেদনাময়। তার পিতার মতো একদিন সেও মাঝ উঠোনে দু-হাতে ধুতির প্রান্তটি ধরে করুণাপ্রার্থীর মতো বলে উঠবে, ‘দাও মা’! যা আগেও ঘটেছে, পরেও ঘটবে হুবহু। আর তাই মনে হয়, ঘাসিদের যেন অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই, তাদের সবটাই ঘটমান বর্তমান। একটি অনড় অপরিবর্তিত নিষ্ঠুর বর্তমানকেই তারা উত্তরাধিকারসূত্রে যুগ যুগ ধরে বহন করে চলেছে। আজ চোড়কু ঘাসি যে-বর্তমানকে তার মদনভেরির সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলেছে, তার বাপ কিংকর ঘাসিও সেই বর্তমান অতিবাহিত করে গেছে। চোড়কুর ব্যাটা মদ্দৈনাও সেই মদনভেরি, সেই অতীতকেই সশরীরে শেষ বলবিন্দু দিয়ে টেনে নিয়ে যাবে। ঘাসির এই জীবন ও জীবিকায় আশ্চর্য দ্যোতনাপূর্ণ এই মদনভেরিটিই যেন স্বয়ং প্রবহমান এক বর্তমান। মহাকালের মতোই তা অকাট্য, অখন্ডনযোগ্য।
যখন কোনো মৃত্যুসংবাদ আসে না, যখন চাপাইটাঁড় গ্রামের বিশ-পঁচিশটা পরিবারের মরদগুলো মনমরা হয়ে থাকে, তাদের কামকাজে ফুর্তি থাকে না, বউবিটিদের সঙ্গে কথায় কথায় কেলেকেচে লেগে যায়, তখন হয়তো মদ্দৈনার মতো সাত-আট বছরের ছোটো শিশুও এর অন্তর্নিহিত কারণ কিছুটা টের পেয়ে যায়। সে তার বাপকে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘হ্যাঁ বাবা, আজ কৌ নাই ঘাটে উঠবেক? একলোকও নাই?’
‘না বাপ। ই দেশদুইনাটার কী য্যা হৈল! মানুষ মরছেই নাই।’ এমন কথা রীতিমতো গম্ভীর হয়েই চোড়কু কতবার যে বলেছে! আর মৃত্যুর প্রসঙ্গ ধরে সে বিস্ময় প্রকাশ করে বলিরাম, চন্দমহন, গতিককিষ্ণ, শিশুপাল কিংবা গ্রামের অন্য কোনো ঘাসিকে বলেছে, ‘বললে তুমরা পৈতাবে নাই। বলবে য্যা আমি মিছা বলছি। কিন্তুক মিছা কথা লয়—মানুইষ এখন আশি বসসরেও মরছে নাই। আগু আগু, হামদের বাপঠাকুদ্দাদাদের দেখেছি, চারকুড়ি বয়স যাঁহতক হৈল, তখনকে বুঝে লিবে উ ঘরের ল্যা বাহারকে চলে গেল, হাও গুহাইল ঘরে আর নাই ত ধারীয়ে বসে ঠ্যাঙা আগুলে মুড়গুঁজে বসে আছে। কিন্তুক আজের দিনে দেখ—আশি বসসরেও মানুইষ মিনিস্টারির কাম করছে। দিল্লি-ধাক্কা-বিলাত যাছে। সঁ-সঁ!’
সত্যিই চোড়কুর কাছে এটা বড়ো বিস্ময়ের। শুধু বিস্ময়ের না, সেইসঙ্গে দুঃখেরও। মানুষ না মরলে তাদের চলবে কী করে? এটা ভাবলে একেক দিন গভীর রাতেও ঘুম আসে না চোড়কুর। তখন ফাঁকা মাঠ প্রান্তর কিংবা জঙ্গল থেকে ভেসে-আসা শিয়ালের ডাক শুনে সে শিয়ালের ওপরে বিরক্ত হয়ে ওঠে। বলে, ‘ই-শ্লা শিয়ালগুলাও হঁয়েছে তেমনি। ডাকছে ত ডাকছেই। বিরাম নাই। তাও যদি কুকুর-বিড়াল কাঁদত।’
বাস্তবিক, কুকুর-বিড়াল কাঁদলে হয়তো তবু সে সক্কালেই কোনো মৃত্যুসংবাদ আশা করতে পারত। হয়তো পুবে গাড়াফুসড়া কিংবা শিবচড়কার কোনো মাহাতঘর থেকে কেউ চাপাইটাঁড়ে এসে চোড়কুর ঘরের চালার সামনেই এসে দাঁড়াল আর বলল, ‘চোড়কুভাই! উঠেছ ন এখনো ঘুমে আধমরা হঁয়ে আছো?’
‘নাই! শিয়ালগুলো রাতটায় ঘুমাতে দিবেক তবে ন? দমতক হক্কা হুয়া! হুক্কা হুয়া!’
‘হুক্কা হুয়া?’
‘তবে আর কী বলছি? ই-অঞ্চলে শিয়ালের কমতি আছে? চাপাইটাঁড়ের চারোতরফেই দেখছ নাই কেমন শূন্যক্কার! ধু-ধু টাঁড় আর ফরেস্টের বন।—এখন বল, কী বিত্তান্ত?’
‘তুমার দুয়ার ছামুয়ে যখন আইসেছি, তখনকে, কী বিত্তান্ত হতে পারে স্যাটা নাই মালুম করতে পারছ?’
‘পারছি। তবে বাছনিক করে না বললে—’
‘তুমি ত জানোই হামদের বাখৈলে বুঢ়ি বলতে একেইটা ছিল? ত সেই বুঢ়িটা ঢেরদিন ল্যা রোগে গোহৈলতেছিল১—’
‘কী হঁয়েছিল বুঢ়িটার?’
‘পাঁড়কি রোগ।’
‘পাঁড়কি রোগ? কী রোগ স্যাটা?’ চোড়কু এমনভাবে বিস্ময় প্রকাশ করে যে, বোঝা যায়, এমন বিচিত্র রোগের নাম সে বাপের কালেও শোনেনি। শোনার কথাও নয়। বাস্তবে, এই নামে তো কোনো রোগ নেইও। লোকটিও স্বীকারে করে। বলে, ‘হামি কি ক্যালার রোগের নাম জানি, ন ডাক্তর-কৈবরাজ দেখায়ছি? একটা আম-ফাবড়া দিলি বলে! যে আজ বাদ কাল, কাল বাদ পরশু মরবেকেই, তাকে ডাক্তর দেখায় কী হবেক? ফালতা খরচা। ত সেই বুঢ়িটা এতদিনে ‘‘সীতারামপুরের টিকিৎ কাটেছে’’২।’
‘এখন ত জাড়টাও পড়ে নাই। তাই বুঢ়াবুঢ়ি মরছে?’
‘হঁ। আজ ঘাটে উঠা বঠে। বেলা বারটাকে তকে পঁহচিতে হবেক। কী বুঝলি?’
‘বুঝেছি, বুঝেছি। ত, হামি একাই যাব?’
‘একা ক্যানে যাবিস রে বাবু? একহাঁতে তালি বাজে? আরেক ঘাসিকে তুঁই সঙে লিবি। ঠিক বারটাকে। ঘঁড়াডুবা ঘাটে।’
লোকটি যাওয়ার সময় বায়না বাবদ একটা দশটাকার নোট চোড়কুর রুক্ষ ও শীর্ণ হাতে গুঁজে দিয়ে উলটোমুখে সাইকেল ঠেলে বেরিয়ে যায়। যদিও শ্রাদ্ধশান্তির বাড়িতে যে-কাজের জন্য ঘাসিদের ডাকা হয়, তাতে অগ্রিম দেওয়ার চল নেই বললেই চলে। তবু, সংলাপসহ এই কাল্পনিক দৃশ্যটিকে যতটা সম্ভব সুন্দর ও মনোমত করেই রচনা করে চোড়কু। বায়নার টাকা সে কড়চে গুঁজেও নিয়েছে এবং সাইকেল আরোহীকে আশ্বাস দিয়ে বলেছে, ‘হঁ হঁ যাও ন। ক-ন চিন্তা নাই। হামরা ঠিক ঘঁড়ি ধরে ঘঁড়াডুবার ঘাটে ঠেসে যাব।’ বলে, সে নিশ্চিন্তে চুটি ধরিয়েছে।
তারপর ভোরবেলা যখন তার পচা খড়ের চালার ফোকর দিয়ে পিড়পিড় করে পৌষের ঠাণ্ডা বাতাস ঢোকে এবং তার ঘুম ভেঙে যায়, তখন সে একটু ধাক্কা খায় বৈকি! কোথায় তার ডাক আর কোথায়-বা বায়না। কে তাকে ডাকছে ঘঁড়াডুবা ঘাটে গিয়ে, মাহাতদের কুটুমজনদেরকে মদনভেরি বাজিয়ে বাজিয়ে, ঘাট থেকে তুলে ঘরে নিয়ে আসার জন্য? সে টের পায় যে, এই দিনটি তার মোটেই আলাদা কিছু নয়। আর পাঁচটা দিনের মতোই।
চোড়কু কিছুটা হতাশ হয়। বিরক্তও। আর পাঁচটা দিনের মতো, আজও সে দেখে তালের চাটাইয়ে গড়াগড়ি দিয়ে পড়ে আছে তার ব্যাটাবিটি চারটি। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতে তাদের গায়ে মোটা কোনো কাঁথাকাপড় নেই। কাঁপছে। একরাশ ক্লান্তি নিয়ে শুয়ে-পড়া তার বউটির শায়ার বাঁধন এখনো খোলাই রয়েছে। লোম দেখা যাচ্ছে। খোঁয়াড়ে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছে বরাগুলো। চালার ছাঁচে উড়ে এসে বসেছে জোড়া রামবোনি।
তবু আর পাঁচটা দিনের মতো দিকচক্রবালে সূর্য এসে দাঁড়ানোর আগেই সে এসে গ্রামদেবতার থানটি পেরিয়ে, ঠুঁটা তালগাছটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আর দাঁড়িয়ে থেকে লক্ষ করে পত্তাপপুর, জাহাজপুর, তানাসি, কাহান, নাওয়াডি বা আশপাশের কোনো গ্রাম থেকে ঘাসিদের খোঁজে চাপাইটাঁড়ের দিকে কেউ আসছে কি না। তেমন কাউকে দেখলে, চোড়কু বাতাসে উড়তে থাকা লুঙ্গিতে হদ হদ শব্দ করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় তার দিকে। লোকটির সঙ্গেই পা মিলিয়ে ছন্দে ছন্দে হাঁটে আর জিজ্ঞেস করে, ‘কথায় যাছো ব? পাছে তুমি চাপাইটাঁড়ে যাছো? ঘাসির খোঁজে? বল, হঁ?’
লোকটি ‘হঁ’ না বললেও চোড়কু যেন জোর করে তার মুখ থেকে নিজের মনপসন্দ জবাবটি আদায় করে নিতে চায়। সে অস্থির হয়ে বলে, ‘জড়ুর তুমার ঘরে কৌ মরেছে? বল, হঁ? আর নাই ত তুমার বাখৈলে ব্যাটা ধেনায়ছে। বল, হঁ?’
এই ধরনের প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে অনেকসময় কেউ কেউ রেগে খেঁকিয়েও ওঠে। বলে, ‘দুট্ ক্যালার৩। হামি বিহা-ই করি নাই আর ব্যাটা ধেনাবেক?’ আবার কেউ বলে, ‘আচ্ছাআআ বকাচদা লোক ত! ঘরের জিয়ন্ত মানুইষগিলাকেই মরাতে খুজছে! আর যদি মরেও, ত অ্যাঁড়ের তদের মদনভেরি ছাড়াই হামরা ঘাটে উঠব। আজকাল উ-সোব কে পুঁছে? মদনভেরি ন ফদনভেরি!’
কথাটা সত্যিই দুঃখের। অন্তত ঘাসিদের কাছে। যদিও এটা ঠিক যে, এখন মানুষ আর অতটা মদনভেরির প্রয়োজন বোধ করছে না। তাই জন্ম-মৃত্যুর ঘরে ঘাসিদের ডাক দিনকে দিন কমে আসছে। চোড়কু নিজে অবশ্য এটাকে জোরালো কারণ বলে মনে করে না। তার ধারণা, বিশেষ করে মাহাত, কুমার ইত্যাদি জাতের মানুষ মরলে তাদের যখন দশ দিনের দিন ঘাট হয়, মাথা মুন্ডন করা হয়, তখন তাদের ঘাটে তোলার জন্য তারা চাপাইটাঁড়ের ঘাসিদের ডাকবেই। মদনভেরি না বাজালে আর ঘাটে ওঠা কী? এই ভেরির ঊর্ধ্বমুখী ধ্বনিই তো স্বর্গের দেবতাদের জানিয়ে দেয় মর্ত্যলোক থেকে একটি মানুষের বিদায়বার্তা। কিংবা সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে তার আগমনবার্তাও।
তবে সন্তানের জন্ম বা বিবাহোপলক্ষে এখন তাদের আর ডাকা হয় না বললেই চলে। এখনো তারা যেটুকু ডাক পায় তা ওই মরা-হারা ঘর থেকে। এই ডাক পেয়ে তারা মদনভেরি নিয়ে ফুর্তিপায়ে চাপাইটাঁড় থেকে বেরিয়ে যায়। ঠায়ে-পাশে হলে কেউ সঙ্গে তার ছোটো ছেলেটিকেও নিয়ে নেয়। বাপের আঙুল ধরে যেতে যেতে, এভাবে শৈশব থেকেই সে চিনতে শিখে যায় বাপের জীবন-জীবিকা ও পরিপার্শ্বকে। যে পরিপার্শ্ব, বেঁচে থাকার যে-জগৎ, নিকট ভবিষ্যতে তাকেও ডাকতে চায় হাতসান দিয়ে। বলে, ‘বাজা, বাজারে! ফুঁক!’
আর হয়তো এই আশ্চর্য আকর্ষণের প্রাবল্যেই মায়ের কাঁখ থেকে থতোমতো শিশু ভেরির ধ্বনি শুনে দাপিয়ে নামতে চায় ধরার ধুলোয়। ছুটে যেতে চায় বাবার কাছে। বাজনরত বাবার হাতটি ধরে সেও যেন ফুঁ দিতে চায় চুনকুড়িতে। একদিন সে দেয়ও। আর এভাবেই ফুঁ দিতে দিতে নিজের অজান্তে সেও একদিন হয়ে যায় ঘাসি। শম্ভু ঘাসি, মনহর ঘাসি, চোড়কু ঘাসি।
চোড়কু তার জীবনের সেই কথাটাই বলছিল প্রতিবেশী আরেক ঘাসিকে। বরার লোম কাটাতে কাটাতে কখনো সে ঝুমুর থামায়, আবার কখনো হাতের কাঁচি এবং ঝুমুর দুটোই থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘হামার বাপের কিসে মরণ হঁয়েছিল জানিস বলিরাম? আর পেট ক্যানে ফুলেছিল জানিস?’
‘নাই জানি।’
‘হামার বাপের পেটের ভিৎরে বহুত কুছু কথা ছিল। বলবার কথা। কিন্তুক বলবার অবসরেই পাই-ল নাই। পেটের কথা পেটেই থাইকে গেল। আর উ মরে গেল!’
‘কী কথা?’ বলিরাম চুটির পঁন্দে ফুঁক দিয়ে বলে, ‘কই, দুটা-একটা শুনাও ন দেখি।’
‘শুনাব?’ চোড়কু প্রস্তুতির ভঙ্গিতে সময় নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করে। সত্যিই কি সে শোনাতে পারবে তার বাপের অকথিত কথাগুলি? যে-কথা পেটের ভেতরেই থেকে গিয়েছিল তার মৃত্যুর শেষদিন অবধি? চোড়কুও তো শোনেনি। সে কী করে শোনাতে পারে বলিরামকে? সে মনগড়া বলে, ‘মদনভেরি ফুঁকের ফেরি/যে করে তার হেরিফেরি/তারেই ঘরে বেরিবেরি!’
‘বাহ বা! বাহ বা!’ সশব্দে তারিফ করে উঠল বলিরাম। সত্যিই তো, এমন কথা সে কখনোই শোনেনি। ভেরি নিয়েও যে এমন উচ্চমার্গীয় ভাব ও বক্তব্যপূর্ণ অন্ত্যমিল হতে পারে তা বলিরাম কল্পনাও করতে পারেনি।
বলিরাম কেন, খোদ চোড়কুই কি জানতো সে সত্যি সত্যিই এটা বলতে পারবে? এ যেন ব্যাধের মুখ থেকে ‘মা নিষাদ!’-এর মতোই বেরিয়ে এল! এবং সে যে সত্যিই এই মুহূর্তে এটা বলে ফেলল, তা যে কোন অলৌকিক-বলে সম্ভব হল তা সে নিজেও জানে না। বলার পরে, সঙ্গে সঙ্গে তৎক্ষণাৎ এর পক্ষে কিছু না বলে সে ঠোঁটে একসুতো হাসি ফেলে রাখে। আর সেই অন্তর্বতী সময়ে নিজের বলা ‘কবিতা’টির একটা লাগসই ভাবার্থ উদ্ধার করতে চেষ্টা করে। ভাব যে নেই তা তো নয়। কবিতা যখন।
এমনকী, এটা কী অর্থবহ হতে পারে, তাও তার অজানা। তার জন্যই এটাকে যথার্থ সৃষ্টিশীল বলে মনে হয়। প্রকৃত সৃষ্টি সর্বদাই তার সৃজককে বিস্মিত ও বিভোর করে দেয়। সৃষ্টি যে আবেগের বস্তু। তাকে কখনোই নিজস্ব ভাবনার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। এই পঙক্তিগুলিও তেমনি চোড়কুরও ভাবনার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। চোড়কু তাকে উদ্ধার করার প্রয়াস করে। মনে মনে।
বলিরামের বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। খাড়িতে আগুন চেয়ে চুটি ধরাতেও সে ভুলে যায়। মদনভেরি ফুঁকের ফেরি! অর্থ বুঝতে না পারলেও সে তার রস উপভোগ করে। আর চোড়কুকে বলে ‘ইটা তুমি বলেই বলতে পারলে। অন্য কৌ হলে ছেরে লিত। কম ডিমাগের কথা? মদনভেরি ফুঁকের ফেরি...’
‘অন্য কৌ মানে?’
‘নাআ, মানে বলছি য্যা আ-র ত বহুত ঘাসি আছে? শিশুপাল, গতিক, চন্দমহন ইয়ারাও ত ভেরিয়ে ফুঁক দেই। কই, গাঁহে দেক ন এমন একটা জিনিস।’
‘নাই নাই। উয়ারা ক্যানে পারবেক? উয়াদের ঝুমৈরের শিক্ষাটাও ত নাই। ইটা ভাবের জিনিস। বাপের শিক্ষাই ত হামি পাঁইয়েছি। হামার কথা মানে হামার বাপেরেই কথা।’
বলিরাম মাথা নাড়ে। চোড়কু অবশ্য বলেছে ঠিক। সে মুখে মুখে ঝুমুর রচনা করতে পারে, গাইতেও পারে। উত্তরাধিকার-সূত্রে তার পক্ষে অনায়াসে লোককবিতার আদলে অন্ত্যমিল দিয়ে এই ভাবটি প্রকাশ করা সম্ভব হল।
‘ইয়ার মানেটা তাইলে কী? হ্যাঁ চোড়কুদ্দা, কী মানে?’
‘মানে হৈল—ইয়া—’ চোড়কু মদনভেরি এবং ভেরিবাজিয়েদের জীবনে মাহাত্ম্য আরোপ করে বলে যে, জগতে হাড়ি-ডম-মুচি-মেথর-মাহলী, কামার-কুমার-কুইরি-কুড়মী এমনি বহু মানুষ আছে আর তাদের জীবিকাও বহুবিধ। নিজের জীবন ধারণের জন্য মানুষ নিজের জীবিকা নিজে বেছে নেয়নি। ঈশ্বর তাদের যার হাতে যা দিয়েছে তাই তারা পেয়েছে। কেউ ঝাঁটাঝুড়ি, কেউ হাপর-হাম্বার, কেউ চাক, কেউ ক্ষুর-ভাঁড়, কেউ বাঁশলাবাটালি ইত্যাদি। তেমনি ঘাসিরা পেয়েছে মদনভেরি। ঈশ্বরপ্রদত্ত এই লোকযন্ত্রটিকে জীবিকার অবলম্বন করে তাদের জন্মজন্মান্তর ধরে বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এবং মনে কোনো অসন্তোষ নিয়ে নয়। যদি কেউ কখনো তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে, প্রলোভনে সে তার নিজস্ব জীবিকা বা বৃত্তি ছেড়ে অন্যের বৃত্তি ধরে, তাহলে সে ঈশ্বরের অভিশাপে নির্বংশ হয়ে যাবে। মরাহারা ঘরের আমন্ত্রণে যে-ঘাসির ডাক ভেরি বাজানোর জন্য, চুনকুড়িতে ফুঁ দেওয়ার জন্য, তাকে ফেরিওয়ালাদের মতোই এই মদনভেরি সঙ্গে নিয়ে নিয়ে ফুঁ দিয়েই যেতে হবে। তবু সে ফেরিওয়ালা নয়—ঈশ্বরের কাছে মাঙ্গলিকবার্তা প্রেরণকারী সে ঈশ্বরেরই দূত।
‘ওঃ! ও হোহোহোহোহো!’ চোড়কুর মুখ থেকে এমন ভাবার্থ শুনে বলিরামের ভেতরটা আকুলি-বিকুলি করে ওঠে। বলে, ‘বঠে বাবু! বঠে! শুনলে জী-টা যেমন হুদকে উঠছে! ঘাঁইটে দিল ভিতরটা। কি দুঃখু-দুঃখু কথা! কি মর্ম!’
বলিরামের তারিফ এবং উল্লাসূচক শব্দ শুনে উঠোনের উলটোদিকের মাটির দাওয়া থেকে ছুটে আসে চোড়কুর ব্যাটাবিটি। মদ্দৈনার পেছু পেছু সুতোয় বাঁধা বাগঢুলু নিয়ে নাকের পোঁটা মুছতে মুছতে আসে তার দিদি, ডোড়োতি। সুতোটা আঙুলে পাক দিয়ে রাখায় বাগঢুলুটি ডানা ফর্কর করে মাথার ওপরে উড়ছে। বাঁধন ছিঁড়ে পালিয়ে যেতে পারছে না।
মদ্দৈনা লাফ মেরে ধপাস করে এসে দাঁড়ায় বলিরাম আর চোড়কুর সামনে। বলে, ‘অ্যা বাবা, কী বললি? ঘুরে৪ বল ন। বল ঘুরে।’
ব্যাটার পীড়াপীড়িতে আরেক বার বলতেই হয় চোড়কুকে। যদিও সে নিজেও নিজের মুখ থেকে আরেক বার শুনতে চাইছিল। ওদিকে শুয়োর খোঁয়াড়ের পাশে দাঁড়িয়ে হাতে দাউলি নিয়ে ডকার ডাল কাটছে চোড়কুর বউ, সমবারী। তার কোনো বিকার নেই। চোড়কু তবু চাইছিল সমবারীকে তার এই আবেগের অংশীদার করতে। সে তার দিকে তাকিয়ে, দাউলির কোপ মারার ছন্দে ছন্দে আঘাত করতে লাগল কাব্য ছন্দে—
মদনভেরি ফুঁকের ফেরি
যে করে তার হেরিফেরি
তারেই ঘরে বেরিবেরি...
খুটা ধরে দাঁড়িয়ে, লাজুক ডোড়োতি, খটখট করে হাসতে লাগল। দড়ির খাটে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচতে লাগল কালিন্দীও। আর ঠিক তক্ষুণি ছন্দপতন ঘটানোর মতো পেঁপটি বাঁশির সুরে কেঁদে উঠল মাটি-খাওকি ছোট্ট মেয়ে, সঁচি। আঙুল থেকে পাক খুলে লম্বা সুতোটি ল্যাজে নিয়ে, তখনো, উড়ে উড়ে আসমানের দিকে চলে যাচ্ছে বাগঢুলুটি৫।
শনশন করে বইছে চৈৎমাসের হাওয়া। খেতের আলে পড়ে-থাকা পাত-পুয়াল কিংবা পলাশ গাছের তলে ঝরে-পড়া ফুলের পাপড়ি, শুকনো পাতা উড়ে উড়ে এসে ঢোকে ঘাসিদের ঘরের উঠোনে। ঘরের ভেতরেও ঢুকে যায়, যেখানে আবছা অন্ধকারে দড়ির খাটের ওপারে সাবেকি জামবাটি কিংবা কানাভাঙা পোড়া হাঁড়িতে মাটির সরা ঢাকা দিয়ে রাখা আছে কিছুটা উদ্বৃত্ত মাড়জল।
এভাবে মাঠের ধুলো-আবর্জনা সরাসরি তাদের ঘরে ঢুকে পড়াতে কোনো বাধা নেই। কেন না, তাদের ঘর ও বাহিরের কোনো প্রতিবন্ধক সীমারেখা নেই। দেয়াল, দরজা থেকেও না-থাকার মতো। এমনকী, পরিবারভিত্তিক উঠোনও নেই। মনে হয় গন্ডাদুয়েক ঘর এক জায়গায় চক্কর মেরে হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়াতেই সৃষ্টি হয়েছে একটা বারোয়ারি আঙিনা। এই আঙিনাতে যে যখন পারে হড়াস করে দড়ির খাট পেতে দেয়। রোদে অনাহারে ক্লান্তিতে ঝিমুতে থাকা ঘুসুরের ছানাগুলি প্রায়শ সেই খাটের তলায় ঢুকে পিঠ ঘষতে থাকে। আমতলে, ছাইগাদায়, ঘাসিদের মতো তারাও অলস পায়চারি করে। খোঁয়াড়ের কাছে থেকেও, খোঁয়াড়ে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে থাকা ঘুসুরনি মায়ের কাছে আসতে মন সরে না। সকাল হতে না হতে ঘাসিদের মতো তারাও যে-যন দিগে ছড়িয়ে যায়। শুধু অপেক্ষায় থাকে, দূরের ঠুঁটা মহুল গাছটির মাথা থেকে উপচে-পড়া রোদ কখন তাদের খোঁয়াড়ের গায়ে পড়ে এবং কখন ঘাসিবউ তাদের আগুড়টি সরিয়ে নেয়। তারা গুড়গুড় করে আঙিনা দিয়েই দেয়ালের ধার ধরে আস্তাকুঁড়ের দিকে চলে যায়।
সকাল হতে না হতে, ঘাসিরাও এভাবে তাদের আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি হিসেবে তারা সকালের ছোটো ছোটো কাজগুলি সমাধা করে নেয়। কেউ প্রাতঃকৃত্য সারতে বাইদ-বহাল খেতে যেতে যেতে, পথে পড়া নিম গাছটির মাথায় টপ করে উঠে পড়ে। দাঁতন করতে ডাল ভাঙে। চিবোতে চিবোতে চলে যায়। ভোরের মুক্ত শীতল হাওয়ায় হদ হদ শব্দ করে উড়তে থাকে নোংরায় ভারি হয়ে থাকা পরনের লুঙ্গি। চোড়কু বা পরীক্ষিত ঘাসির মতো কেউ কেউ গান গেয়ে যায়। চলতে ফিরতে দুটি-একটি ঝুমুরের কলি লেগেই থাকে তাদের ঠোঁটে। আর এভাবেই নিজের বাসিমুখের পচা বাতাসকে তারা ভোরের সমীরণের মধ্যে মিশিয়ে দেয়। নির্ভার প্রফুল্ল করে নিজেকে। কাড়া ধোওয়া পুকুরে নেমে, আঁজলায় আঁজলায় জলের ঝাপটা দিয়ে, কুলকুচো করে চোখ-মুখ ধোয়। পিঁচুটিহীন চোখে দেখে প্রত্যুষের চরাচর। দেখে খেতের আল ডিঙে ডিঙে, হাঁসের পাল, ঢাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে পুকুর-ঘাটে। কুসুম গাছের ভেঙে-পড়া ডালটিকে দু-পায়ে খাড়া হয়ে ধরার চেষ্টা করছে পাঁঠি ছাগলটি। কাউয়াহারা জঙ্গলের দিকে ঝাঁকবেঁধে উড়ে যাচ্ছে ঝুরাবোনি। ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে ফরেস্ট মোড় দিয়ে চলে যাচ্ছে পুরুলিয়াগামী জয়পুরের যাত্রিবাহী বাস।
ঝুরাবোনির কিচির-মিচির আর বাসের দূরাগত যান্ত্রিক আওয়াজের কোনোটাই শুনতে পেল না চোড়কু। পুকুরের ঘাট থেকে ফিরে এসে সে আচমকা একটি দৃশ্য দেখে তটস্থ হয়ে যায়। দাঁড়িয়ে পড়ে। করম গাছের তলে যে গরামথান, সেখানে, থানটির দিকে সে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। এ কী দেখল সে! যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারে না চোড়কু। থানে উপর্যুপরি ডাঁই হয়ে থাকা মাটির ঘোড়াগুলির ওপরে ভোরের আবছা অন্ধকারের মধ্যে, সে দেখল যুগলসর্প। মাটিতে তার পা পড়তেই কম্পন টের পেয়ে, সরসর করে ঘোড়াগুলোর তলায় ঢুকে পড়তে ব্যস্ত হয়ে উঠল তারা। তবু আরও একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে সে দিকে অপলক চেয়ে থাকে সে। নাহ! মুহূর্তের মধ্যে তারা ছন্ন হয়ে গেল! ভয় পেল চোড়কু!
চোড়কু সাপ চেনে। কোনটা বিষাক্ত আর কোনটা নির্বিষ। যেভাবে গ্রামের কোনো কোনো মানুষ চিনে থাকে। সেই চেনার অভিজ্ঞতা থেকে সে প্রত্যক্ষ করল সাপদুটির একটি রীতিমতো বিষধর। সর্প দর্শনে মানুষের সর্বপ্রথম দংশনের ভীতি জন্মায়। চোড়কুরও তা জন্মাল। সে ভেতরে ভেতরে ভীত হয়ে পড়ল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি তার মধ্যে জেগে উঠল অপরাধবোধ।
এমন একটি দৃশ্য অবশ্যই দুর্লভ। সচরাচর মানুষ তা দেখতে পায় না। তবু তার মনে হল এ দৃশ্যটি তার চোখে না পড়লেই ভালো হত। সে আজ এ পথে না এলেই পারত। সাধারণত সে আসে না। আজ কি মনে করে পুকুর থেকে উঠে ডাঙা বরাবর রাহেড় খেতের দিকে না গিয়ে কুসুমতলের দিকে বাঁক নিল। প্রতিদিনকার পথে না গিয়ে সে ভোরের নির্জনতাকে আরও একটু উপভোগ করার উদ্দেশ্যেই গরামথানের পাশ দিয়ে ঢুকবে চাপাইটাঁড়ে। যেন স্বেচ্ছায় নয়, কোনো অলৌকিক টান তাকে নিয়ে এসেছে এখানে। এই দৃশ্য দেখাতে। এবং দেখামাত্র, মনে হল, কোনো অদৃশ্য হাত তার পিঠে সজোরে একটা ‘কররা’ দিল। আর তখনি তার মনে পড়ে গেল ‘ভাও’ পরবের কথা।
মাঘী পূর্ণিমায় এই গাছতলে গরামথানে অনুষ্ঠিত হয় ভাও পরব। পরবে অনেক ভক্তের মতো চোড়কুও আসে ‘কররা’ নিতে। গাছের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে যখন থানে এসে দাঁড়ায়, তখন, গ্রামের মুখিয়া সজোরে চাবুক মারে তার পিঠে। এই আঘাতই হল ‘কররা’। প্রকৃত ভক্তের কাছে এই কররা হল পুণ্যাঘাত। সে নাকি এই আঘাত টের পায় না। তাই আর্তনাদও করে না। ভক্ত যে! লোকবিশ্বাস আছে—এতে পাপীর পাপের বিনাশ হয়।
চোড়কুও এই অদৃশ্য কররার আঘাতে চেঁচিয়ে উঠল না। কিন্তু নিজের ভেতরে সে নিঃশব্দ আর্তনাদ করে উঠল। তারপর, পা-দুপা করে গরামথানের দিকে এগিয়ে, গাছের মূলে ডাঁই করা মাটির ঘোড়াগুলিতে মাথা ঠুকে ঠুকে নাগাড়ে বলতে লাগল, ‘দে, হামকে আ-র কররা দে! মার হামকে! হামি ঘাসি বঠি। মাইরে মরা হামকে!’
বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে উঠল চোড়কু। থানের পাশে মুড়িয়ে দেওয়া পলাশ গাছটি থেকে একটা ডাল ভেঙে নিয়ে সে, কাঁধের ওপর দিয়ে, নিজেই নিজের পিঠে দুমুখ্যা চাবুক মারতে মারতে, হাঁটুতে বুয়ান-বাবলার ঝোপ ঠেলে এগিয়ে গেল ঘরের দিকে!
‘চোড়কুদ্দা! এ চোড়কুদ্দা! হাঁকাছি—’ বাইরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে, খয়ে-যাওয়া দেয়ালের ওপার থেকে ঘরের দিকে তাকিয়ে ডাক দিল গতিককিষ্ণ। মাথা তুলে তাকানোর প্রয়োজন নেই। বৃষ্টিতে ধুয়ে ধুয়ে এমনিতেই সীমানার পাঁচিল অনেকটাই নীচু ও এবড়ো-খেবড়ো হয়ে গেছে। কোথাও ফাটল ধরেছে, ভেঙেও পড়েছে। এখন অনায়াসে ছাগল লাফিয়ে ঘাসিদের আঙিনায় গিয়ে পড়তে পারে। খোঁয়াড় থেকে ছাড়া পেয়ে ঘুসুরগুলি তো অনবরত দেয়ালের কোলে পিঠ ঘষে ঘষে দেয়ালগুলিকে আরও পাতলা করে দিচ্ছে। কখনো দেখা যায়, দেয়ালের ওপরে ছাগল পায়চারি করছে। কানঝাপটা দিয়ে ম্যাঁ-ম্যাঁ করে হয়তো পালহার জন্যই ডাকছে ঘাসিবউকে।
গতিক আরও একবার হাঁকায়। চালাঘরের ভেতর থেকে সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় থেকে সে তাকিয়ে থাকে আঙিনার দিকে। আঙিনায় কয়েকটি দড়ির খাট পাতা রয়েছে। বেয়াড়াভাবে। কোনো খাটের ওপরে বসে ঘাসিশিশু—নাকে-মুখে সিগাঁন মেখে চুষছে লাল-নীল কাঠের লাটিম। বাইন্৬-এ মুখ ডুবিয়ে মাড়জল খুঁজে বেড়াচ্ছে শুয়োরের ছানা। ছাঁচে ঝুলছে ছিটা৭ কম্বল। পেঁপে গাছের মাথা থেকে ঝুলন্ত আঁকশি একা-একা দোল খাচ্ছে দমকা হাওয়ায়। তাকে নামিয়ে কাঁথকোলে ফেলে রাখা হয়নি।
গতিকের ডাক শুনে অন্য ঘরের ঘাসিবউ সাড়া দেওয়ার আগেই, ঘরের পিছন থেকে হাতে টির-ডাং নাচাতে নাচাতে ঢুকল মদ্দৈনা। অবশ্য সে যে পিছন থেকে এল, তাই-বা কী করে বলা যায়? ঘরগুলোর সামনে-পিছনে বলে কিছু নেই। তেমনভাবে কোনো চৌহদ্দিই নেই। সদরদুয়ারও নেই। খেত দিয়ে, মাঠ দিয়ে, ঝুড়জংগল, আমতল, ছাইগাদা—যে-কোনো দিক দিয়েই আঙিনায় এসে ঢোকা যায়। বাস্তুভূমি আর কৃষিভূমি এতটাই লাগালাগি যে, জাড়কালে৮ কেউ আঁচলে মূলা-মুঢ়ি কিংবা বাটিতে তেলমাখা অড়হর সিদ্ধ নিয়ে, দু-পা গিয়েই খেতের আলে পা ছড়িয়ে বসে খায়। রোদ পোহায়। বিটিছারা শিংয়ের চিরুনি দিয়ে চুল ছাড়ায়, লিকি বাছে। আর এখন যে-খেতগুলো ঠা-ঠা করছে, রুক্ষতায়, এই খেতগুলোই তখন, বাঁধনা পরবের সময়, লহ-লহ করে পাকাধানে। সে-ধান ঘাসিদের নয়। ধানজমিই তাদের নেই। তারা কেউ কেউ হালচালোয়ার মজুরি নিয়ে পরের খেতে ফসল ফলিয়ে দেয়।
গতিক আবার ডাক দিলে, মদ্দৈনা বলে, ‘বাবা নাইখে। কী বলছ?’
‘আর তোর মা? কথায়?’
‘মা কে-জানে ঘরভিৎরেই আছে।’ মদ্দৈনা সুরেলা ডাক দিল, ‘অ্যা-মা-আ-আ! হাই বাবাকে হাঁকাছে!’
‘যাছি যাছি, থাম।’ ভিতর ঘরে দড়ির খাটের আড়াল দিয়ে মাসিকের কাপড় লাগাচ্ছিল সমবারী। কোনোরকমে শাড়িটা কোমরে বেধায় নিয়ে সে দাওয়ার প্রান্তে দাঁড়ায়। গতিককে বলে, ‘কই আসে ইয়ার বাপ? বাঁধকে গেছে।’
‘এখনো আসে নাই? বাব্বা! বাঁধে এৎক্ষণ ল্যা কী ধুনছে! শিল হাগছে ন নঢ়া হাগছে।’ বলতে বলতে গতিক চলে গেল।
গতিক চলে যাওয়ার পরেও অনেকটা সময় কেটে গেছে। সকালের রোদ জোলার গামছার মতো পড়ে রয়েছে। উঁচু-নীচু আলবাঁধা শস্যহীন খেতগুলোতে। এখন আর আকাশে আচমকা উড়ে যেতে দেখা যায় না রামবোনি-ঝুরাবোনির ঝাঁক। টেসোরাজাও উড়ে আসে না। পাকদন্ডিতে হাঁটে কাক। মানুষের চলাচল টের পেয়েও উড়াল দেয় না।
মানুষের চলাচলের সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু করে বাড়ছে তাদের কর্মব্যস্ততা। ঘাসিদের সেই অর্থে কর্মব্যস্ত জীবন নেই বললেই চলে। ঘাসিবউরা তাদের ঘর-সংসারের কাজপাট নিয়ে থাকে। জ্বালানির কাঠকুচো জোগাড় করে, চুলহা জ্বালে, সোডা ফুটায়। কেউ ভাঙা চুলহায় খেত-মাটি লেপে। চার-পাঁচ বছরের ছোটো ছোটো বিটিছারা তাদের চেয়েও ছোটো মেয়ে-গুলোকে কাঁখে নিয়ে দিব্যি ছ্যেলা-পদরি করে। এদিক-সে দিক ঘোরে। কোথায় কোথায় যে চলে যায়! আর যেগুলো এখনো আলছ্যেলা, সদ্য মাই ছেড়েছে বা ছাড়েনি—দু-আঙুল দিয়ে মায়ের চুচুক খোঁটে! তাদেরকে ঘাসিবউরা অনেকসময় ঝামটা দিয়ে ভুঁইয়ে নামিয়ে উধাও হয়ে যায়। তারা কাঁদতে কাঁদতেই একসময় কান্না ভুলে যায়। মাটিতে হামাগুড়ি দেয়। চিমটি দিয়ে দঁড়া৯ ধরে। মাটি খায়।
পুরুষদের বায়না ধরা থাকলেও সকাল থেকে ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। একটু বেলা না হলে তো আর ঘাটে ওঠানোর কাজে বেরোনো যায় না। দশটা-এগারোটাকে তারা যে-যার ভেরি নিয়ে জোড়া-জোড়ায় যাত্রা করে—কোঁচড়ের বিড়ি বের করে, ফুঁকতে ফুঁকতে। কেউ বা দু-এক কলি ঝুমুর গেয়েই যাত্রার শুরুয়াত করে।
আর যার কোনো বায়না হয়নি, সে আর পাঁচজন ঘাসির সঙ্গে গ্রামের আমতলে-জামতলে সময় কাটায়। হাতে কাজ না থাকলে সময় কাটানোটাই ঝঁকমারি হয়ে দাঁড়ায়। ভভ ঘাসির মতো, কেউ কেউ এই একঘেয়ে জীবন থেকে কিছুটা রেহাই পেতে, কখনো-কখনো, অকারণে ঢেরটা পথ ফরেস্ট মোড়ের দিকে হেঁটে ফিরে আসে। মোড়ে আড্ডাবাজিও করে। ঘণ্টা-দুঘণ্টা কাটিয়ে, ঘরে এসে, মাড়ভাত মারে। আমানি১০ খায়।
ফরেস্ট মোড়ে দু-চারটি চা-পান-বিড়ির দোকান আছে। বুধন মাহাতর দোকান, ললিতের দোকান। তবে এখানের বাজার বলতে যা বোঝায়, তা কিন্তু এই ফরেস্ট মোড় নয়। বাজার হল জয়পুর। ফরেস্ট মোড় থেকে পাকা সড়কটি ধরে পায়দলে যেতে হয়। তানাসি, পালৈজ্ঞা, ডুমৈরডিকে বাঁয়ে-ডাঁয়ে ফেলে সিধা মিনিট পনের-কুড়ি গেলে চৌধুরী ও গোস্বামীদের মুখোমুখি দুটি কাঠগোলা। কাছাকাছির মধ্যে ভিডিয়ো হল, খেলার মাঠ, ইস্কুল সবই আছে। আছে জয়পুরের রাজাদের বাড়ি। তারপর আটাকল মোড়ে দাঁড়ালে ঘন ঘন ঝালদা-পুরুলিয়ার বাস পাওয়া যায়। রাঁচির বাসও মেলে। রাঁচি রোড নামের মূল সড়কটি ধরে বাস ঢুকে যাচ্ছে পুরুলিয়ায়। জেলা শহরে। দশ-পনের মিনিট অন্তর অন্তর। মনে হয় যেন বাস চালানোটাই এখানকার মানুষজনের মূল জীবিকা।
বস্তুত, এখানে কাপড় দোকান, মিষ্টির দোকান, পান, বই দোকান, ডেকোরেটার্স, থানা এবং টিকিট-কাউন্টার ও প্ল্যাটফর্ম বিহীন গড়জয়পুর স্টেশন—কী নেই? সেইসঙ্গে এখানকার মানুষদের এটা একটা বড় যোগাযোগক্ষেত্র বলে, এখানে নিকটবর্তী প্রায় সব গ্রামের লোক দেখা যায়। টিকমু, খটংগা, শুশনিডি, আলকুশা থেকে শুরু করে ভাড্ডি, মকুন্দপুর, জাহাজপুর, কাহান সবকটি গ্রামের লোককেই কাজে-অকাজে আসতে হয় এখানে। আনন্দমার্গীরা তো রীতিমতো দাপটের সঙ্গে তাদের উজ্জ্বল দাড়ি ও ঝলমলে পোশাকে বাইক চালিয়ে চলে যাচ্ছে আনন্দনগর, পুনদাগ। সেখানে তারা গড়ে তুলছে তাদের নিজস্ব সাম্রাজ্য।
ফরেস্ট মোড় ছাড়া এই আটাকালেও কখনো-কখনো বুলতে বুলতে চলে আসে চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা। হাট-বাজার, বিজলিবাতি, তারখাম্বা১১, ক্যাসেটের দোকান, গান, বাস-খালাসির চিৎকার এইসব নিয়ে জয়পুরকে দেখলে মন যেন চাঙ্গা হয়ে যায়। রাত্তিরের দিকে তারা আসে না। বেলাবেলি এসে সন্ধে সন্ধে চাপাইটাঁড়ে ফিরে যায়।
চাপাইটাঁড়ে বিজলিবাতি নেই। ধারে-কাছে অনেক গ্রামে আছে। এমনকী, চাপাইটাঁড়ের কয়েক হাত ফারাকে খাম্বাও গাড়া আছে। কিন্তু ওই খাম্বা থেকে তার টেনে কে ঘাসিদের ঘর আলো করবে তা তারা জানে না। জানার তেমন কৌতূহলও নেই। কেন-না, তাদের এই অন্ধকার তো আজকের অন্ধকার নয়। তা বহু বহু প্রাচীন। এই সুপ্রাচীন অন্ধকার আজ তাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। তারা জেনেই গেছে, এই অন্ধকারই তাদের নিয়তি। তাদের অদৃষ্ট। আর হয়তো সে-কারণেই এই অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যেতে না পারার জন্য তাদের ক্ষোভ নেই, অভিমানও নেই। দিনে তাদের মাথার ওপরে থাকে সূর্য্যিদেব। রাত্তিরে অন্ধক রাক্ষসের সঙ্গে তাদের বসবাস।
সমবারীর এতক্ষণে খেয়াল হল! সত্যিই তো, লোকটা এখনো ঘরে এল না। অন্য দিন আরও আগেই এসে ঢুকে পড়ে। ভেরিতে দু-চারবার ফুঁ দিয়ে দেখে নেয় তা ঠিকঠাক আছে কি না। তারপর আবার তাকে দেয়ালে গজালের সঙ্গে পাড় বেঁধে আটকে রেখে দেয়। কখনো-কখনো সে খান থেকে নামিয়ে মদ্দৈনাও সেটা বাজানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু আজ এতক্ষণ কী করছে সে? নাকি সমবারী জানে না, গোঁজ থেকে ছাগলটাকে খুলে সে তাকে জামপালহা খাওয়াতে নিয়ে গেছে? না, ছাগল তো যেখানের সেখানেই রয়েছে। তাহলে কি বাঁধের আইড়ে বসে গলফে মেতে উঠেছে? নাকি সঙ পেয়ে জয়পুরের দিকেই চলে গেল, বুলতে বুলতে? এখন এই সকালবেলায় জয়পুরে গিয়েই বা কী করবে? ভাবতে গিয়ে চোড়কুর ওপরে রাগ হতে লাগল সমবারীর। কাছটায় থাকলে আর কিছু না হোক দুটো কাঠও তো চ্যালা করে দিতে পারত? কেমন ধারার যে মানুষ! এখন যদি ক-ন গাঁয়ের লোক বায়না করতে আসে? জাহাজপুর-খয়েরটাঁড় বা এমনি কোনো মুদি-মাহাত ঘরের কেউ এসে বলে, ‘এগৌ ঘাসিবউ, তোর মরদটাকে দেখাছে নাই য্যা? কথাকে গেছে? হামদের ঘরে লোক মরেছে—ঘাটে উঠাতে যাতে হবেক।’
সমবারী যখন এইসব ভাবছে আর কাঠের উনুনের ফাটলে চিটা মাটির প্রলেপ দিচ্ছে, তখন মদ্দৈনাই ছুটে এসে খবর দিল, ‘এ মা! মা গৌ! বাবা কেমন করছে!’
‘কথায় তোর বাবা?’
‘হাউ বড়তলে। ঠাকুরথানটা পাইরায় বড়গাছটা আছে নাই? ওই খিনটায়।’
‘অত ধুরে? কী করতে গেছে সকালেই উধারে?’
‘হামি তার কী জানি?’
‘কে তোকে খোবোর দিল? তুঁই দেখে আলিস?’
‘নাই। তপার কাকা বলল। বলল-বলল—যা দেখবি তোর বাপটা কেমন খ্যাপার পারা করছে।’
মদ্দৈনার কথা শুনে পাশের ঘর থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে এল পান্ডু ঘাসির বউ, নুনকি। মেয়েকে মাই খাওয়াতে খাওয়াতে বলল, ‘কী হঁয়েছে কাকী? কী বলছে মদ্দৈনা?’
সমবারীর যেন মদ্দৈনার কথাটা বিশ্বাস হয় না। এমনিভাবে সে নুনকিকে বলে, ‘ই কী য্যা বলছে! ইয়ার বাপটা নকি বড়তলে মাথার ছিঁটের পারা করছে!’
‘মাথার ছিঁট?’ নুনকি বলে, ‘ইয়ার কথার ক-ন সোর-ঘোর আছে? ই নিজেই আলহা খ্যাপা বঠে। কী বলতে কী বলে। তুমি চুপ দিঁয়ে থাক। দেখবে টুকু বাদে আপনেই ঘরকে আসছে।’
কিন্তু সে ভাবে উদাসীন হয়ে থাকতে পারল না সমবারী। মনটা তার আটুপাটু করতে লাগল। সে তো আর মদ্দৈনার মতো নাবালক নয়—বাপের এই খবর পেয়েও যার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মন পড়ে আছে টির-ডাং খেলার দিকে। খবর দিয়েই সে ছুটে পালাল।
সমবারী ঘরের দাওয়ায় নেমে একটু এগিয়ে গেল। ছাইগাদার দিকে। ডোড়োতি তো নেই। তার বয়সি গ্রামের ছোটো ছোটো বিটিছ্যেলাদের সঙ্গে সেও ঝুড়ি কাঁখে গোবর-লাদ কুড়াতে বেরিয়ে গেছে।
আস্তাকুঁড়টিতে দাঁড়িয়ে, সমবারী, কয়েকবার নাম ধরে ধরে ডাকতে লাগল তার মেজ মেয়ে কালিন্দীকে। —‘এ কালিন! সঁচিকে নিয়ে তুঁই কনদিগে মরতে গেলি! আয় ন চাঁড়ে! এলৌ, এ কালিন...’
কোনো সাড়া পেল না। দূরে একপাল ছেলেমেয়ের হইচই শুনে সে দিকে তাকাতেই দেখতে পায়—একটা চাকা বসানো গাড়ি, যেটা আসলে পিঁড়ির মতো, তাতে থতোমতো মুখে বসে রয়েছে ধুলোমাটি মাখা সঁচি। কালিন্দীসহ তাকে কয়েকজন মিলে গড়গড়-গড়গড় করে টেনে নিয়ে চলেছে। আর যেতে যেতে সবাই মিলে বলছে—‘চাক গড়গড় চাক/যথা যাবেক যাক!’ হয়তো এই হট্টগোলে উদ্বিগ্ন মায়ের তীক্ষ্ণ ডাকও কানে পৌঁছয়নি তার।
সমবারী আর ডাকাহাঁকা না করে নিজেই সেখানে গেল। আঁচলটি কোমরে গুঁজ মেয়েকে ছোঁ মেরে কোলে তুলে সে সটান দুলকি চালে—কখনো হেঁটে কখনো ছুটতে ছুটতে, এগিয়ে যেতে লাগল। বড়তলের দিকে।
সমবারী যখন সেখানে পৌঁছল, তখন বড়তলে দশবিশ জন গ্রামবাসী জুটে গেছে। তাদের মাঝে গাছতলে হাঁটু তুলে বসে রয়েছে চোড়কু। তার গায়ে ধুলো-মাটি আর চাবুক মারার দাগ। হাতে তখনো ধরা জামডালটি। আর সে নিজে ভদর-ভদর কীসব বকে চলেছে।
সারা শরীরে কালসিটে-পড়া প্রহারের টাটকা দাগ দেখে, চোড়কুকে কোনো কথা জিজ্ঞেস না করেই কেওট বউদের মতো মুখরা হয়ে উঠল সমবারী। গাছতলের লোকদেরই যেন দায়ী করছে, এমনিভাবে তাদের দিকে আঙুল বাড়িয়ে সে বলতে লাগল, ‘ইয়াকে এমন করে মারতে আছে? বল তুমরা? ই কী ক্ষেতি করেছে তুমাদের? তুমাদের কার বাঢ়াভাতে ই ধুলা ঝিঁটেছে? বল?’
অঙ্গভঙ্গিসহকারে তার এই চড়া সুরে সংলাপ নিক্ষেপ, গাছতলের বেদিটাকে ঘিরে গ্রামবাসীদের জমায়েত, তাদের নিরুত্তর থাকা, চোড়কুর সারা গায়ে প্রহারের চিহ্ন এবং হাতে গাছের ডাল নিয়ে তখনো বিড়বিড় করতে থাকা—এইসব দেখে আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে—কাহানের কাছাকাছি চাপাইটাঁড় গ্রামটির প্রায় শেষ সীমানায় চলছে কোনো গ্রামীণ পালাগান বানোটংকি। যদিও এই মুহূর্তে পুরো পরিবেশটিই অত্যন্ত করুণ। সমবারী তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোড়কুর গায়ের ধুলোময়লা মুছে দিতে দিতে, প্রায় ধমকের সুরে তাকে বলে, ‘ক্যানে লাগতে যাস তুঁই লোকের সঙে? কার সঙে লাইগে ছিলিস, হ্যাঁহ?’
চোড়কু তার বউয়ের দিকে কেমন যেন লক্ষ্যহীন নজরে চেয়ে থাকে। নিজের মনেই বলে ওঠে, ‘মাইরে মরা হামকে! মরা! হামি ঘাসি বঠি! মার হামকে!’
তার প্রশ্নের জবাবে তার মরদটির কথা অসংলগ্ন মনে হয় সমবারীর। বোধগম্য হয় না। বলে, ‘কী বলছিস গো তুঁই? ঘাসি বঠিস ত কী হঁয়েছে? চাপাইটাঁড়ে তুঁই একাই ঘাসি আছিস? আর কৌ নাই?’
আষাঢ়ী বলল, ‘নাই গো, ইয়াকে কৌ মারে নাই। ক-ন লিয়াই-ঝগড়াও হয় নাই কারো সঙে। কুচ্ছুটি হয় নাই।’
ফটিকও বলল, ‘লিয়াই কিসের হবেক? হামাদের চোড়কুদ্দার পারা মানুষ ই চাপাইটাঁড়ে আর কৌ আছে? ই আজ তক্ক কারো সঙে লাগতে আসে নাই, আচকায় মারবেক?’
‘হঁ, হঁ।’ ভিড়ের লোকজনও ফটিককে সমর্থন করে চোড়কুর ভালোমানুষীর পক্ষে সরব হয়ে উঠল।
কেউ না বললেও সমবারী নিজেও কি তা জানে না? গ্রামে তার কোনো বাদীদার নেই। এমন একটি মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না যার সঙ্গে তার রা-সা বন্ধ। গ্রামের সবার সঙ্গে চোড়কুর সদ্ভাব। আর যতক্ষণ সে ঘরে থাকে, বায়না ধরে ভেরি নিয়ে বেরিয়ে না পড়লে, অথবা অন্য কোনো কাজে জয়পুর-জাহাজপুরে চলে না গেলে, সারাক্ষণ তার ঘরে কেউ না কেউ আসছেই। আসছে, পাঁচকথা বলছে, আড্ডা দিচ্ছে, আর শুনতে চাইছে তার স্বরচিত ঝুমুর। সে ঝুমুর বাঁধে যেমন, তেমনি আবার গায়ও।
এই ঝুমুরই তার নেশা। অনেকসময় সমবারীও বিরক্ত হয়ে বলেছে, ‘তকে ওই ঝুমৈরেই খাইল। ঝুমৈর ঝুমৈর করে ইয়ার মাথাটা একবারকেই গেল। ঘর-গিরস্থর কাজপাটও করতে দিবেক নাই।’
এমন বললেও, সমবারী নিজেও যে চোড়কুর ঝুমুর পছন্দ করে না তা নয়। তা যেমন গ্রামীণ জীবনের কাব্যময় প্রতিচ্ছবি, তেমনি সুরেলাও। সত্যিই নেশা ধরিয়ে দেয়। তখন আর ঘরের কাজে মন লাগে না।
সমবারী যদিও সে ভাবে ঝুমুর শোনার জন্য গ্রামের পুরুষ-মানুষের মাঝে এসে বসে না। ঝুমুর শুনতে ঘরের মেয়েছেলেদের এসে বসাটা অস্বস্তিকরও। প্রেমলীলার অন্যতম বাহন এই ঝুমুর। পুরুষরা একঠিনে জড়ো হয়ে ঝুমুর গাওয়াগায়ি করলে তারা যত সহজে, স্বতঃস্ফুর্তভাবে তা উপভোগ করতে পারে, সামনাসামনি মেয়ে বসে থাকলে কোথাও যেন একটা সংকোচ বোধ হয়। এমনকী, অপরিণত ছেলেদেরও গ্রামের লোকেরা ঝুমুরের আড্ডায় আসতে দিতে চায় না। তাতে তাদের মনমতি অন্যদিকে চলে যেতে পারে। তাই বড়রা খেঁকসাতে পারে জেনে তারা অনেকক্ষেত্রে আড়ালে চলে গিয়ে এই গান গায়। বিশেষ করে, রঙের ঝুমুর। চৈতালি, ভাদরিয়া।
চাপাইটাঁড়ে আরও কেউ কেউ ঝুমৈর হাঁকালেও, তারা ঝুমৈর বাঁধতে জানে না। গ্রামের অনেক পাকা মাথার লোকও বলে, ‘ঝুমৈর ল্যাখা বহুত কঠিন কাজ। পেটে কালির আখর না থাকলে ই-কাজ তুমি থোড়ুই পারবে?’
‘কালির আখর’ বলতে বিদ্যা। সে-বিদ্যা অবশ্য চোড়কুরও নেই। সে লেখাপড়া জানে না। অক্ষরের সঙ্গে তার কোনো পরিচয় হয়নি। তাহলেও তার ঝুমুর শুনলে যে-কেউ বলতে পারে প্রকৃত বিদ্যার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটেছে। বিদ্যা তো অক্ষরে থাকে না। যথার্থ বিদ্যা বা জ্ঞানের প্রকাশ হল মনের সংবেদনশীলতায়, মানুষ-পরিবেশ ও প্রকৃতিতে নিজেকে বিলীন করার মধ্যে। চোড়কুর মধ্যে এটা আছে বলে তার ঝুমুরে ভাব-রস-আবেগ ও বক্তব্যের গহিনতা রয়েছে। কেউ কেউ পারা না-পারার এই সৃষ্টিশীল ব্যাপারটিকে আরও সুন্দর উপমা দিয়ে বলে, ‘একটা সাইটকা দিলেই তুমি ভেড়ি চরাতে পারবে। কিন্তুক কই, একটা কলম দিলে দু-কলি ঝুমৈর লেখে দেখাও ন? নাই পারবে।’ চোড়কুর পক্ষে গ্রামবাসীদের এইসব কথাগুলো উঠে আসে বলে, বোঝা যায়, চাপাইটাঁড়ের মানুষ তাকে কতটা ভালোবাসে। আর তাই গ্রামের লোকেরা তাকে প্রহার করেছে এই আশঙ্কা করাতে তারা ভুল ভাঙিয়ে দেয় সমবারীর।
তাহলে কে তার এই দশা করল? সমবারীর কেমন যেন গোলমাল হয়ে যায়। সে ধরতে পারে না। চোড়কুর কাছেই সে জানতে চায়। বলে ‘কী হঁয়েছে বল ন তুঁই? কীসে তোর এমন হৈল?’
এবারও সে সেই একই জবাব দিল, ‘কররা দে হামাকে। মরা। হামি ঘাসি বঠি। দে কররা!’
সমবারী চমকে উঠল ‘কররা’ শব্দটি শুনে। এই শব্দটির সঙ্গে তাদের প্রাত্যহিক জীবনের যোগ নেই বললেই চলে। বছরের একটি বিশেষ দিনে, বিশেষ ক্ষেত্রে, কিছু মানুষের মুখে এই শব্দ শোনা যায়। মাঘী পূর্ণিমার পরদিনে গরামথানে ভক্তরা এসে জড়ো হয়। গ্রামদেবতাকে পাক দেয় এবং চংক্রমণ শেষে দাঁড়িয়ে পড়ে—ঘর্মাক্ত ও আদুড় গা পেতে দিয়ে মুখিয়াকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, ‘কররা দে’!
চোড়কু এখন কেন সেই কররার কথা বলে? কেন সে দৈব আঘাতে নিজের মৃত্যু উচ্চারণ করে? নিজেকে বারেবারে ঘাসি বলেই বা কেন নিজের প্রতি ঘৃণাকে এভাবে অভিব্যক্ত করে? ঘাসিরা কি এতটাই ঘৃণার্হ?
‘নাআআ গো! কররা বলছে বলে তুঁই ডরাছিস ক্যানে?’ আষাঢ়ী বলে, ‘হামার মনটায় বলছে, ইয়ার কুছু হয় নাই। মাথাটা টুকু ঘুরে গেছে। মানুইষের কোবো-কেমনো এমন হয়। ইয়াকে এখন ঘরে নিয়ে যাঁইয়ে মাথায় জল-থল দে। তাবাদে দেখবি ঠিক হঁয়ে গেছে।’
ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন বলে দিল, ‘বোধোয় ইয়ার মাথায় কালরাতে বিরাল ডেঙেছে!’
‘বিরাল?’ সমবারী কপাল কুঁচকে তাকায় পরীক্ষিত ঘাসির দিকে।
‘স্যাটাও হতে পারে।’ পরীক্ষিত বলে, ‘বিরাল ত ভাল লয়। অশুভ।’
এই প্রসঙ্গে সে একটি ঘটনারও উল্লেখ করে। ঘটনাটি আজকের নয়। বহুদিন আগের। তবে এটা তার আত্মীয়ের মধ্যে ঘটেছিল বলে সে এর সত্যতা সম্পর্কে জোর দিয়ে বলতে পারে।
ভূমিকা হিসেবে পরীক্ষিত অনেকটা আগে থেকে শুরু করে। জড়ো হওয়া লোকগুলোও অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে এবং আরও একটু ঠেসাঠেসি করে দাঁড়ায়। সে বলে যে, এই গ্রামের অনেক অনেক ঘাসির মতো তাদেরও আত্মীয়-স্বজন ছড়িয়ে আছে রাঁচি-বুন্ডু তামাড়-সিলির দিকে। পরীক্ষিতের ছোটো কাকা থাকত সিলিতে। বাবা-জ্যাঠা ভিনু ভিনু সংসার করে থাকত তামাড়ে। পরীক্ষিতের দিদি অর্থাৎ ঠাকুমা যখন মারা যায়, তখন শ্রাদ্ধশান্তির জন্য তার কাকা সিলি থেকে আসে তামাড়ে। সঙ্গে গ্রামের ঘর থেকে একটা খাসিও আনে। কিন্তু এখানে আসার পরে কোনো কারণে পরীক্ষিতের বাবার সঙ্গে কাকার মনকষাকষি হয়ে যায়। কাকা তখন ‘টেক’ দেখিয়ে বলে সে আলাদা করে মায়ের শ্রাদ্ধ করবে। আলাদা ঘাটে উঠবে। তাকে অনেক করে নিষেধ করা হয়। বোঝানো হয় যে, এভাবে একই জায়গায় এসে ভাইয়ে-ভাইয়ে বিবাদ করে দুটো শ্রাদ্ধঘর করাটা ঠিক নয়। সে মানেনি। নাপিত ডেকে আলাদা করে সে ঘাটে ওঠে, কুটুম্বিতাও করে আলাদা। যেদিন সে কুটুম্বিতা করে, সে দিনই রাত্রে ঘটল কান্ডটি। রাত তখন দশটা-এগারোটা। তার বারো-তেরো বছরের বড়ছেলে সুনীল শুয়েছিল মাটির বারান্দায়। আচট ঘুমের মধ্যে থেকে হঠাৎ সে ভয়ার্ত চিৎকার করে বলতে থাকে যে, এইমাত্র তার মাথার ওপর দিয়ে একটা কালো বিড়াল লাফ মেরে চলে গেল এবং সে দেখতে পেল কালী ঠাকুরকে! এই একটাই কথা বারে বারে বলতে বলতে পাগল হয়ে গেল সে।
ঘটনাটি শুনে ভয় পেয়ে গেল সমবারী। নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে সে মেয়েকে কাঁখে নিয়ে আষাঢ়ীর হাত ধরে বলে উঠল, ‘ইয়ার কী হৈল মাইশা১২?’ ই ক্যানে এমন করছে? পাছে ইয়ার মাথার ছিঁট হৈল নকি...’
‘চুপ দে। কুচ্ছুটি হয় নাই। আগু ইয়াকে তুঁই ঘরকে নিয়ে যা।’
সমবারী ও চোড়কুর পেছু ধরে গ্রামের লোকেরাও এসে ভিড় করল উঠোনে। একটু আগেও যে-মদ্দৈনা ছিল চঞ্চল, টির-ডাং খেলার জন্য মন যার সর্বদা উড়ু-উড়ু করে, দু-দন্ড যার ঘরে বাস থাকে না, সেই মদ্দৈনা খেলা ছেড়ে চুপটি করে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে রয়েছে। কেমন গম্ভীর হয়ে গেল সে। হাতের গুলি-ডান্ডাটিও পড়ে আছে দড়ির খাটে। সে ভিড় ফাঁক করে চেয়ে চেয়ে দেখছে তার বাবাকে। আর ভাবছে...চোখের জল নিয়েই সবার অলক্ষে পিছন দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল মদ্দৈনা!
চোড়কুর খবরটি গোটা গ্রামে চাউর হয়ে গেল। সকালে সেই বড়তলে তো ছিল পরীক্ষিত, ফটিক, আষাঢ়ী নায়েক, তরুবর এরা। এদের মুখ থেকে জনে জনে শুনল। ভভ, লারাণ, পান্ডু, রাধেশ্যামখুড়াও। এ ছাড়া সমবারীর ঘরেও তো ভিড় লেগেছিল আরও কত ঘাসিদের।
শুধু চাপাইটাঁড় কেন, তুন্তা, শ্রীরামপুর, পত্তাপপুর, বাঙৈনটাঁড়, পুবে গাড়াফুসড়া, শিবচড়কা, নাওয়াডি আর দক্ষিণে কাঁসাই নদীর ওপারে ফস-ক, কুদাগাড়াও জেনে গেল। ঘটনাটি এমন কিছু ঢিঢি পড়ার মতো নয়, তবু দূরবর্তী অনেকের কানে তা পৌঁছে গেল। এভাবে পৌঁছে যাওয়ার কারণও আছে। চাপাইটাঁড়ে চারোতরফের লোকের আনাগোনা। মদনভেরির জন্য ঘাসিদের বায়না করতে লোক আসছে। আবার ঘাসিরাও ভেরি নিয়ে বাহারকে গেলে প্রসঙ্গটির উত্থাপন করছে। এবং তা করছে রীতিমতো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে। আসলে, এই গ্রামের মানুষদের জীবন অনেকটাই একরৈখিক। বৈচিত্র্যহীন। এখানে যদি ছোটোখাটোও কিছু ঘটে থাকে তাহলে তাতে গ্রামের সকলে জড়িত হয়ে পড়ে। কাজে-অকাজে, আড্ডা-আলোচনায় তারা তখন নিয়ে-দিয়ে ওই একটি প্রসঙ্গকে টেনে আনতে ভালোবাসে। তাতে যে যত রং চড়িয়ে অজ্ঞাত মানুষের কানে খবরটি ফেলে দিতে পারে, ততই তার কৃতিত্ব।
ফলত, খবরটি বর্ণবহুল হয়ে উঠতে লাগল এবং অনিবার্য পরিণতি হিসেবে, প্রত্যেকটি ঘটনাতে যা হয়ে থাকে, এখনেও তার ব্যত্যয় ঘটল না। এই ঘটনাতেও আরোপ করা হল অলৌকিকতা। এখানে তার অবকাশও ছিল ঢের। ঘটনাটির সূত্রপাত তো গ্রামদেবতার থানে। সেখানে সে দর্শন করেছিল যুগলর্সপ। এই মিথুন দৃশ্যের পরে, করম গাছের মূলে ডাঁই হয়ে থাকা মাটির ঘোড়াগুলির ওপরে মাথা কুটে কুটে সে বলেছিল, ‘কররা’র কথাও।
যদিও ঠিক সেই সময়ে তার কাছাকাছি কেউ ছিল না। কেউ শোনেওনি এ-কথা। হেঁট কাহানের কোনো বাগালছ্যেলা নাকি লক্ষ করেছিল। বড়গাছের তলায় দাঁড়িয়ে চোড়কু নিজেই জাম-সাটিক হাতে নিজের পিঠে এলোপাথাড়ি চাবুক মারছিল আর বলছিল...
বাগালছ্যেলাটি ঠিক তার আগে গ্রামদেবতার থানের পাশ দিয়ে আসতে দেখেছে চোড়কুকে। দূর থেকে সে গাছতলে দন্ডবতের মুদ্রায়ও দেখেছে। সেই প্রত্যক্ষদর্শীর মুখ থেকে এটা শোনার পরই তাতে আরোপিত হতে লাগল অলৌকিকতা। দৈব মাহাত্ম্য। এমনকী গ্রামদেবতার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথাও।
কী সেই ইচ্ছা-অনিচ্ছা?
কেউ কেউ বলল, চোড়কু পাগল হয়নি। তার মধ্যে ধীরে ধীরে গরামঠাকুর ভর করছে। এরপরে সে আর কররার কথা বলবে না। তার কাছে মানত করার কথা বলবে, পুজো-পাশা করতে বলবে, এমনকী তার রক্তপিপাসার কথাও বলতে পারে। আবার কেউ বলল যে, গ্রামাঞ্চলে দুর্দিন ঘনিয়ে আসছে। তা না হলে মানুষ পাগল হবে কেন? এবছরটাই হয়তো সেই ঘোরতর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বছর হয়ে উঠবে—পটা পট মানুষগুলি সব পাতালে চলে যাবে আর চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে এই ভবের বাহারী সংসার।
কয়েকদিন ধরে চাপাইটাঁড় ঘিরে এই বার্তার জোর রটনা চলতে লাগল লোকমুখে। চোড়কুকে এইসব দৈববার্তাবহনকারী ভেবে অনেকে তার ঘরে আসতে সাহস পেল না। বিশেষ করে ভভ ঘাসি, পরীক্ষিত, লারাণ মাছুয়াররা। আবার ফটিক বা রাধেশ্যামখুড়ার মতো লোকরা তো এসব গুজব কানেই নিল না। তারা দিব্যি চোড়কুর ঘরে বসে এসে মজলিশ চালাতে লাগল। তাতে চোড়কুকে তাদের মোটেই অস্বাভাবিক মনে হয়নি। হয়তো তার অন্তর্নিহিত কোনো ব্যর্থতা বা অপরাধবোধ তার মনের মধ্যে গভীর ছাপ ফেলে। এর থেকে মানসিক মুক্তি পেতে হয়তো সে নিজেকে গরাম ঠাকুরের কাছে সমর্পণ করতে চাইছিল। তখন এই লোক-বাস্তবটি তার চেতনার মধ্যে ছিল না। কখনো কোনো মুহূর্তে মানুষ তার জ্বালা-যন্ত্রণাময় এই পার্থিব পরিমন্ডল থেকে উত্তীর্ণ হয়ে এমন একটি অলৌকিকস্তরে পৌঁছে যায়, যেটা সেই মুহূর্তে তার কাছে প্রকৃত বাস্তব বলে ধারণা হয়। ধীরে ধীরে সে আবার প্রবেশ করে তার প্রাত্যহিক জগতে।
চোড়কুও ফিরে এল তার জগতে। তার জীবনে। দু-চার দিনের মধ্যে। তবে সে এল কিছুটা মিতভাষী এবং অন্তর্মুখী হয়ে। আগের চোড়কুর সঙ্গে এই চোড়কুর তফাত শুধু এইটুকুই।
সমবারী বড়ো খুশি। খুশির চোটে সে নানান বিধি-নিষেধের বেড়ায় এখন বেঁধে ফেলতে চাইল তার মদরটিকে। প্রথম কথাই হল পুকুর থেকে ফেরার পথে প্রাতর্ভ্রমণে গরামথানের দিকে যাওয়া চলবে না। তাতে সে আবার গরামঠাকুরের কাছে পুণ্যাঘাতের কথা বলে ফেলতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোথাও কোনো অবস্থাতে তার সর্পদর্শন চলবে না। তাতে তার মধ্যে আবার নতুন করে সেই মানসিক বৈকল্য ফিরে আসতে পারে। সবশেষে সে যা বলল, তা বড়োই দুঃসহ। বলল, ‘আর ঝুমৈর-তুমৈর হাঁকাতে হবেক নাই। কি য্যা বাবা দিন নাই রাত নাই শুধু ঝুমৈর আর ঝুমৈর! বউবিটিকে নিয়ে তোর ঘরসংসার করতে নাই মন যায়?’
এই কথার উত্তরে, চোড়কু, নিরবচ্ছিন্ন দৃষ্টিতে, চেয়ে থাকল সমবারীর দিকে। সে-যেন বলতে চাইল, মানুষের এই দারিদ্র-অনাহার দেখে, দুর্দশা দেখে, আমি কাঁদছি। ঝুমুরেই তো সে-কান্নার অশ্রু বিমোচিত হয়!
কিন্তু চোড়কুর এই বিষাদপূর্ণ দৃষ্টির ভাষা বুঝে উঠতে পারল না সমবারী। চাহনি দেখে সে বোধ হয় ভয় পেয়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ তাকে সংসারের বাতাবরণে ফিরিয়ে আনতে, নিজের কোল থেকে সঁচিকে তার কোলে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ইয়াকে খেলা ন, খেলা। হামি চাকৈন্দা শাগ খুজতে খেতের ধারকে যাছি।—অ্যা কালিন, কালিন! চ ন হামার সঙে ঝুড়িটা নিয়ে! এলৌ!’ মাইতর বিটির সাড়া না পেয়ে, উঠোন থেকে বাঁশের পাঁইছাটা নিয়ে, সে একাই গনগন করে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে ডোড়োতির উদ্দেশে বলে গেল, ‘আর বড়কীটা কন চুলহাকে গেল? ই খালঢুকনিরও এক দন্ড ঘরটায় বাস নাই। কবে য্যা ইয়াকে পরের ঘরে বিকব!’
দুপহরের দিকে কচর-কচর পান চিবিয়ে এল ভভ-র শালা। বৈতরণ। দু-কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে পিক। হাতে পানের বোঁটায় চুন—কথার ফাঁকে দাঁতে ঘষে নিচ্ছে। ভুর-ভুর করে বেরুচ্ছে ‘ডবল ইসপেশেল দক্তা’র গন্ধ। বয়স সাতাশ-আটাশ। হাতে পলিথিনের থলি। তাতে গামছা-গেঞ্জির সঙ্গে শালপাতের খালায় চারটি গুড়ের মিঠাইও আছে। সে যমজ ভাইগ্না আর দিদিকে দেখতে এসেছে। দিদি তার চেয়ে বয়সে অনেকটাই বড়ো। দশবছরের। বৈতরণ বাসনাকে দিদি বলে না। ‘বাসনি’ বলেই ডাকে।
তবে কেবল দেখতে আসা নয়, ভভর শাশুড়ি ছেলেকে পাঠিয়েছে চাপাইটাঁড়ে গিয়ে বিটি আর লাইৎনা দুটোকে যাতে কয়েকদিনের জন্য বাপের ঘরে নিয়ে আসে। যথারীতি ঘরে বাচ্চা দুটি ছিল না। ভরদুপুর, তার ওপরে মেঘলা-মেঘলা, বৃষ্টি এল বলে। এখন কি আর ঘরে থাকার সময়?
ঘরে ছিল বাসনি। মাটির খাপরিতে ছঁচমাটি নিয়ে দেয়ালে বুলোচ্ছিল। অভ্যেসবশত ভভ তার হাতের লাঠিটি নিয়ে ঘরের ‘ধারী’তে বসার আগে, ঝুলি খাটটির ‘পঁথাড়ের দড়ি’ খুলে টান টান করে বাঁধছিল। এমনি সময়ে ‘জল-কাউয়া’র মতো ঝাঁ-করে আঙিনায় এসে দাঁড়াল বৈতরণ। ঠিক তক্ষুণি হালকা ঝড় উঠল। ঘূর্ণি হাওয়ায় আঙিনার ধূলাধূলি-পাতপুয়াল সব—বৈতরণ আর ভভর মাঝখানে, পাক দিয়ে দিয়ে উঠতে লাগল। ভভ শালাকে দেখেও না চেনার ভান করে চোখ কচলাতে কচলাতে বলে, ‘কে বঠিস রে? পান্ডু নকি? এ পান্ডু—’
‘পান্ডু লই, হামি তুমার বড় কুটুম বঠি। বৈতরণ!’
‘অ বৈতরণ? অবাআআআক কান্ড!’ খরায় কুটুমের আগমন! ভভ নিরুত্তাপ ডাক দিল, ‘এগৌ! হাই বৈতরণ আইসে ছে। ঘদ্দিগে ঢুকা।—ত হঠাৎ আইসে পঁহচিলে?’
‘স্যা কথার জবাব দিব পরে। তার আগু তুমিই হামার কথার জবাব দাও।’ ঘরের ভেতরে থেকে ভাইয়ের গলা পেয়ে বাসনি আসে। তাকে সাক্ষী রেখে বৈতরণ বলে, ‘বল ন বাসনি, জামাইদাদা কেমন! আজ নাই-এর কম দশ বস্সর বিহা হওয়া হৈল, ঘরে ছ্যেলা-পুইলা দৈঁড়ছে, কিন্তুক এখনো হামাকে চিনতে পারল নাই। বলছে কে বঠিস রে, পান্ডু?’
‘নাআ, চৈখে ধূলা সামাঞ গেল। তার হতেই—’ ভভ, হাতে বাঁশলাটা নিয়ে, তাদের সঙ্গে ঘরে ঢোকে। মেঘ গুড়গুড় করে। বিদ্যুৎ চমকায়।
বাসনির হাতে গুড়ের মিঠাইগুলো দিয়ে, বৈতরণ বলে, ‘আর নদা-বানশা কন ধারে গেল?’
‘বাহারেই আছে।’ বাসনি বলে। মিঠাইয়ের পোঁটলাটি কুলুঙ্গিতে রেখে, সে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে দেখে ছুটে চলে যায় কুলহির দিকে। মাঝকুলহিতে দাঁড়িয়ে তারস্বরে ডাক দেয়, ‘নদা-আআ বানশাআআ! এরেই নদা-বানশা। ঘরকে আয় চাঁড়ে। মামা আইসেছে তদের। হাই তদের লাইগে কী আইনেছে দেখে যা!’
মামার নামে আমতল থেকে ছুটতে ছুটতে আসে কোমরে ঘুনসি বাঁধা ন্যাংটো দুই শিশু। সারা গায়ে ধুলো। মুঠায় ধরা কচি আম। তারা ঘরে ঢুকেই আগে কাড়াকাড়ি লাগিয়ে দেয় মিঠাইয়ের জন্য। হাত থেকে হাতে ছাড়াছাড়ি করতে গিয়ে মিঠাই ভেঙে যায়। ব্যাস! দুই ভাইয়ে আর মায়ে কুরুক্ষেত্র লেগে যায়। ভাঙা মিঠাই কেউ নেবে না। নতুন করে পাকিয়ে দিলেও না। গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে থাকে। শেষে দুজনকেই একটি করে আধুলি দিয়ে মান ভাঙায় বৈতরণ।
‘ছুটছ্যেলাকে ভুলাতে জানতে হয়। মারলেই কি ছ্যেলা বশে আসে?—হঁ, ইবার শু-ন জামাইদাদা—’, দু-হাতে জাপটে ধরা ভাইগ্নাদের সে খালাস করে দিয়ে বলে, ‘হামি ক্যানে আলি? মায়েই পাঠাল। বলল, ঢেরদিন ল্যা বাসনিকে দেখি নাই। ত যা তোর জামাইদাদাকে বলবি যেমন কিছুদিনের লাইগে পাঠাঞ দেই। একবারেই রথ পরবের বাদে ফিরবেক।’
‘হঁ, যাক যাক!’ ভভ বৌকে পাঠানোর ব্যাপারে সামান্যও আপত্তি প্রকাশ করে না। বরং এই আমন্ত্রণে সে খুশিই। এখানে যেমন গরম তেমনি রোদ। তার ওপর জলের কষ্ট, খাওয়ারও সুবিধে নেই। সপ্তাহে দু-একটাও যদি ডাক না আসে, তাহলে পেট চালাবে কী উপায়ে? ভভ হাসতে হাসতে তার শালাকে বলে, ‘রথ বাদ ক্যানে, একবারেই জিতা ষষ্ঠী তক্ক রাইখে দাও। ‘আঢ়াই কামড়ে’ করে তা বাদে চাপাইটাঁড়ে আসবেক। মামাঘরে গেলে তুমার দিদির শরীরটাও টেনকাবেক!’
বৈতরণও তেমনি ‘ফ-প’। মানে, ফালতু বারফাট্টাই আছে আবার ফোপর দালালও। দাঁতে চুন নিয়ে সে বসে-বসেই চৌকাঠের অপারে পিক ফেলে। দাঁতে চুনের বোঁটা ঠেকায়। পা থেকে হাওয়াই চপ্পলটা খুলে ফিতেয় সে ফটিপিন লাগাতে লাগাতে বলে, ‘পাছে তুমি হামাকে ডর খাওয়াছ নকি? হামরা ডরাই নাই। হামরা ত আর চাপাইটাঁড়ের ঘাসি লই, ঝালদার ঘাসিবঠি। তুমার বউ যদি বলে য্যা ‘আঢ়াই কামড়’ করেই আসব, ত স্যা হিম্মৈতও আছে। একটা পেটে আর কত খাবেক?
‘একটা লয় তিনটা পেট।’
‘আহ ছুটুছ্যেলার কথা বাদ দাও ন। বড়-র কথা হছে।’ কষ-বেয়ে গড়িয়ে-পড়া টকটকে লাল পানের পিক হাতের চেটোয় মুছে নেয় বৈতরণ। বলে, ‘তুমার বউকে হামরা জিতা ষষ্ঠী তক্ক নাই খাওয়াতে পারব? কী মহনভোগ খাবেক?’
ভভও রসিকতার ছলে সত্যি কথাটাই বলে ফেলে, ‘খাবেক মাড়ভাত আর খসলার তরকারি।’
‘খসলা’ হল দরিদ্র মানুষদের কাছে পোস্তর বিকল্প। পোস্ত যেখানে ১৫০ টাকা কিলো, সেখানে খসলা মাত্র ৩০ টাকা। তবে এটা রান্নার পিছনে একটু খাটুনি আছে। তিলের মতো এর খোসা আগে ছাড়িয়ে তা বাদে বাঁটাবাঁটি। স্বাদ অনেকটাই পোস্তর মতো। আলু দিয়ে, ঝিঙে দিয়ে সুন্দর রান্না করা যায়। সামান্য তেল ফেলে একটু নাড়াচাড়া করে, বড়ার মতো খসলা ভাজাও খাওয়া যায়। যদিও এ জিনিসটার ব্যাপক প্রচলন পুরুলিয়া জেলায় এখনো নেই। অনেকে জানেও না।
খসলার নাম শুনে বৈতরণ বলে, ‘খসলা ক্যানে খাওয়াব? পস্তুই খাওয়াব। কিন্তুক হামি বলে দিলি—এই তুমি লেখে লাও—’
‘হ্যাঁহ?’ লেখালেখির কথা শুনে চমকে ওঠে ভভ। মনে মনে বলে, ‘কী লেখবি রে বাছা, ঘাসি ঘরে কলম কুথায়?’
‘বলছি তুমি বারেক লেখে লাও জামাইদাদা—যাঁহাতক এক হপ্তা ঘুরবেক, তুমার বউ বলবেক আর নাই থাকব। এ বাসনি, তুঁইয়েই বল ন—ঠিক বলছি ন ভুল?’
বাসনি টিনের থালায় চিঁড়ে ধুয়ে কাত করে তার জল ঢালতে ঢালতে, আড়চোখে তাকিয়ে হাসে। উঠে এসে সে ভিজে চিড়ের ওপরে নুন, সামান্য সরষের তেল মাখিয়ে ভাইয়ের হাতে দেয়। বলে, ‘তদের সেই বলে নাই! যত ফালতা কথা!’
‘ফালতা কথা? হামি মিছা বলছি?’
‘মিছা নাই ত কী? বাপের ঘরে কৌ ছ-মাস ল-মাস থাকে?’
‘ছ-মাস ক্যানে, ছ-দিনও তুঁই থাকবিস নাই। বলবিস—পালাব!’
ভভও মেকি বিস্ময় দেখিয়ে বলে, ‘অ্যা? অমন বলবেক?’
‘একশ বার বলবেক। ক্যানে বলবেক স্যাটা জান জামাইদাদা? যদি নাই জান ত তুমি হামার ঠিনেই জাইনে লাও।’ বৈতরণ বলতে থাকে, ‘ইয়ার ভিৎরি কারণটি কী, জান?’
‘বল, তবে ন জানব?’
‘এই চাপাইটাঁড়ে যে ভেল্কিটি আছে স্যাটি ত আর হামদের ঘরে নাই। স্যাটি হৈল—ঐটি। ওই য্যা কাঁথে লড়কিছে।’ বৈতরণ সোজা তার চিড়ে-মাখা আঙুলটি বাড়িয়ে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা মদনভেরিটিকে দেখিয়ে দেয়। আর মসমস করে চিঁড়ে চিবোতে চিবোতে বলে, ‘এই ভেরির আওয়াজ না শুনে চাপাইটাঁড়ের ঘাসি থাকতে লারে। মনটা কুঁহু-কুঁহু করে।’
‘কুঁহু-কুঁহু?’
‘হঁ। কুঁহু-কুঁহু।’
বৈতরণের মুখ দিয়ে কথা প্রসঙ্গে চলে আসা এই ধ্বন্যাত্মক শব্দটির অর্থ তারা কেউ জানে না। তবু উভয়ের কাছে তার অর্থ পরিষ্কার হয়ে যায়। বৈতরণ হয়তো বলতে চাইছে, মদনভেরির এই বহুশ্রুত শব্দটি শোনার জন্য ঝালদাতে থেকেও বাসনির মন পড়ে থাকবে চাপাইটাঁড়ে।
এটাই স্বাভাবিক। ভভও তা জানে। ঘাসিদের মন্দা কি আর চিরদিন থাকে? জন্মিলে মরিতে হবে। মানুষের গঙ্গাযাত্রা তাই থেমে যেতে পারে না। আবহমানকাল ধরে তা চলছে, চলবে। তবু কটাদিন আলছ্যেলাটিকে নিয়ে বউ তার বাপের ঘারেই থাক, এটা ভভও চায়। তা বাদে ভভর বউ যখন খোবোর পাবে যে, চাপাইটাঁড়ের নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে মানুষ মরছে, তখন সে নিজেই পরলোক-সংবাদের টানে, পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে, সানন্দে ফিরে আসবে চাপাইটাঁড়ে।
যদিও ভভর শ্বশুরঘরের অবস্থা ভভর চেয়ে ভালো। তারাও ঘাসি। তবে মদনভেরি তাদের উপার্জনের মাধ্যম নয়। তাদের কিছু কিছু জায়গাজমি আছে, শুয়োরপাল আছে। তা ভিন্ন তার শ্বশুর এবং শালারা গালাকুঠিতে খোরাকির কাজও করে। তাহলে তাদের পেটের চিন্তা থাকবে কেন?
এখানে সে-সুযোগ কই? গালাকুঠি তো দূরের কথা, ইটভাটাও নেই। জলের আকাল।
তাদের এই কথোপকথন চলতে চলতেই সোঁ-সোঁ বাতাস কখন যে থেমে গিয়ে গুমোট ভাব শুরু হয়েছে! হঠাৎ ঘাড় কুঁজো করে, বাইরে তাকিয়ে ভভ বলে, ‘জলটা আইসেই গেল! ওই য্যা কাহানের দিগে বর্ষিছে মনে হছে!’ বলতে না বলতে তড়বড় করে ফোঁটা পড়তে লাগল। ভভ উঠোনে নেমে দড়ির খাটটাকে আগে ঘরে ঢুকিয়ে পেতে দেয়। সেই খাটে সে বৈতরণকে বসতে বলে। নিজেও বসে। পা দুলিয়ে দুলিয়ে দেখতে থাকে—ছাঁচার জলের বহিটি কখন গড়িয়ে গড়িয়ে, আঙিনায় পড়ে-থাকা শুকনো তালের আঁটিটাকে ছোঁয়।। সে মনে মনে গুনতে থাকে। এক কুড়ি পুরতে না পুরতে বহিতে ভাসিয়ে নিয়ে গেল তালের ওই আঁটিটা। এই বৃষ্টিতে খুশি হয়ে ভভ বলে, ‘হোক, হোক। মাটিটা দমে তাইতে আছে। জুড়াক টুকু!’
নদা-বানশাও হইহই করে ছাঁচতলে দাঁড়ায়। নেচে নেচে ভিজতে থাকে। মায়ের বারণ তারা অকান করে যায়। ভভ তাদের প্রশ্রয় দিয়ে বলে, ‘ভিজুক অ্যাল্প। নাই কুছু হবেক।’
কিন্তু বাসনি তা শোনে না। নতুন জল! সে তাদের পিঠে গুম-গুম কিল মেরে, চেড়ু ধরে দু-জনকে ভেতরে টেনে নিয়ে যায়। ধমক দিয়ে ভভর উদ্দেশে বলে, ‘ভিজবেক! তা বাদে যখন খকখক কাশবেক?’
মায়ের মার খেয়ে, তারা চিৎকার করে কান্না শুরু করে দেয়। এটা যে তাদের মামাকে দেখানোর জন্যই, তা ধরে ফেলে বাসনি। বলে, ‘মস্ত হাইটাটকা১৩ বঠে। যত প্যাঁমকান্না!’
‘ছুটুছ্যেলাকে কাঁদাস ক্যানে? উয়ারা লাবালক। অত কি বুঝে?’
ছাঁচের জলে হাত ধুতে ধুতে বৈতরণ বলে, ‘হামি যখন এই নদা-বানশার পারা ছিলি, শুনছ জামাইদাদা—’
না, জামাইদাদা শুনছে না। বৃষ্টির জলে ভাসমান পটকাগুলি দেখতে দেখতে সে অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
মদনভেরি ফুঁকের ফেরি! অনেকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল আগের সেই কথাটা। ঘাসিরা পছন্দ করেছে তাদের নিয়ে বানানো চোড়কুদ্দার এই ‘গীত’টাকে। যদিও এর মধ্যে গীতের কিছু নেই। যা আছে তা হল শব্দের মিল। অন্ত্যমিল ঘটানোটাই তাদের কাছে একটা ডাগর প্রতিভার পরিচয়। ‘ডিমাগ’ না থাকলে কি ভাবের দিকটি বজায় রেখেও ‘মদনভেরি’র সঙ্গে ‘ফুঁকের ফেরি’ কিংবা ‘হেরিফেরি’র সঙ্গে ‘বেরিবেরি’র মিল ঘটানো সম্ভব? একি চাট্টিখানি কথা?
নদা-বানশা-মদ্দৈনার মতো গ্রামের কিশোররা দঙ্গলবেঁধে খেলাধুলা করার সময়, ঝুড়ে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময় হঠাৎ ফুর্তিতে বলে ওঠে, ‘লেঃ মদনভেরি/ফুঁকের ফেরি!’ তাদের এই আনন্দ-উত্তেজনার মুহূর্তগুলিও আশ্চর্য। হয়তো আমগাছে ঢিল ফাবড়ে সে নির্দিষ্ট আমটিকে মাটিতে ফেলে দিতে পেরেছে কিংবা বুয়ান ডালে লেপ্টে থাকা কোনো কৃকলাসের দিকে টিপ করে গুলতি চালিয়ে তাকে প্রথম বারেই ভূপাতিত করে দিয়েছে, তখনি...
ঘাসিদের এই ছোটো ছোটো ছেলেগুলো দেখতে ছোটো হলেও এরা কম দস্যি নয়। সেইসঙ্গে দুঃসাহসীও। সকাল হতে-না হতে ঘর থেকে সেই যে বেরিয়ে পড়ে, ঘরের গলির দিকে আর আসতেই চায় না। টাই-টাই করে বেড়ায়। মাঠে, খেতে, জঙ্গলে। কেউ আরও দূরে চলে যায়। কাঁসাইয়ের দিকে। তবে যেখানেই যাক-না-কেন, খাওয়ার সময়ে ঠিক ঘরে আসে। কেউ আমানি খায়, কেউ মাড়ভাত খায় সৈল্লা শাক দিয়ে। তখন আদুড় গায়ে পেটটি তাদের ঢুমু ঢুমু হয়ে যায়। যেন ফোলা পেটে চামড়া দিয়ে ঢাকা বাঁশফালির মতো পাঁজরগুলো টান খেয়ে রটরট করতে থাকে। এমন টইটম্বুর পেট নিয়েও টির-ডং হাতে তাদের ছুটাছুটির বিরাম নেই।
তবে দিনের সব খেলা, হুটোপুটি শেষ হয় বেলাডুবুর পরে-পরেই। তখন সে দিনকার মতো যে-যার ঘরে এসে সামায়। সন্ধের পরে অন্ধকার এতই পুরু হয়ে ওঠে যে, ঠেললে ঠেলায় না। পথঘাট ঠাওর করা যায় না। ঘাসিদের অনুচ্চ ও ছোটো ছোটো মাটির ঘরগুলি, যেগুলিতে দিনের বেলাতে চলে নানা মানুষের হইচই, লিয়াই-ঝগড়া, ঘাসি-বউদের গেরস্থালি কাজের চেঁচামেচি, যখন-তখন ভেরির প্যাঁ-পোঁ ধ্বনি। উঠোন-জুড়ে ঘাসি শিশুদের হামাগুড়ি আর কান্না, সেই ঘরগুলিকেও অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া দায় হয়ে পড়ে। কখনো-কখনো কন্ঠস্বর শুনে চিনে নিতে হয়। তাও এই চৈৎ-বৈশাগের সময়। অন্ধকার উঠোনে খাট বিছিয়ে তারা ঘরোয়া কথোপকথন চালায়। কোথাও কোথাও শিলনোড়ার দ্রুতগতি আওয়াজ ঘাসিদের জাগরণ এবং ঘাসি-বউদের রাঁধাশালেরতৎপরতা জানান দেয়। মাটিতেলের১৪ অভাবে আলো যে তারা একেবারেই জ্বালে না তা নয়। কেউ ডিবু কিংবা লালটেন জ্বালে। তার ক্ষীণ আলোকশিখা ভেতরঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে আঙিনায় আসতেই পারে না।
তা ছাড়া চাপাইটাঁড়ে তো বিজলিবাতি নেই। তার নিকটস্থ গ্রামগুলিতে আলো রয়েছে। এক গ্রাম থেকে তারখাম্বা ঘুরে গেছে আরেক গ্রামের দিকে। ওদিকে ভাড্ডি, ডুমৈরডি, মুকুন্দপুর, খয়েরটাঁড়, জাহাজপুর। আর এদিকে হন্যাটাঁড়, ঝালমামড়া হয়ে ‘কুথায় নাই কুথায়’ চলে গেছে সেই তারের খুঁটি, ঘাসিরা জানে না। চাপাইটাঁড়ের দিকে তারখাম্বা ঘুরে না আসায়, ঘাসিদের এই গ্রামটিকে আরও বেশি ‘আঁধাইরা’ দেখায়। ঘাসিরাও এই অন্ধকারের জন্যই, যে-যেখানেই কামকাজে কিংবা বায়না নিয়ে যাক-না কেন, বেলাবেলি ঘরে ফিরে আসে। বয়স্ক ঘাসিদের যদিও অন্ধকারে গ্রামে ঢোকার পথটি খুঁজে পেতে অসুবিধে হয় না। আজ বলে নয়, সেই স্মরণাতীত কাল ধরে তারা পায়ে পায়ে অন্ধকার নিয়ে হাঁটছে।
অন্ধকারের মধ্যে ধারীয়ে বসে গল্প করছিল কয়েকজন ঘাসি। ‘ধারী’ হল, মাটির ঘরগুলির সদরের দিকে দেয়ালের গায়ে লম্বালম্বি বেদি। ঘরোয়া আড্ডার জন্য এই ধারী খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেই বেদিতে পরপর বসে আছে শিশুপাল, চন্দমহন, রাধেশ্যাম, ফটিক এরা। কেউ কেউ মুখোমুখি দাঁড়িয়েও রয়েছে। কাউকেই দেখা যায় না। শোনা যায় তাদের কথোপকথন। তাদের হাতে-মুখে ধরা জ্বলন্ত চুটিগুলি মাঝে মাঝে অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে ওঠে। দূর থেকে দেখে মনে হয়, একই জায়গায় ওড়াওড়ি করছে গুচ্ছেক জোনাকি। যাকে ওরা বলে, ‘ঝুনপুকি’।
ঘন ঘন চুটি টানা থেকে মালুম হয়, আলোচনা জমে উঠেছে। জমে ওঠারই কথা। বুড়ো রাধেশ্যাম গড়াৎ তাদের একটি প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবটি হল, চাপাইটাঁড়ে একরাত ঝুমৈরের আসর বসাও। ‘আর যদি তুমাদের ঝুমৈর পসন্দ নাই, ত ছোলাচের আসর কর।’ রাধেশ্যাম বলে, ‘কোবো-কেমনো একটুকু লাচখেল-ফুর্তিফার্তা দরকার। শুধু ভের ফুঁকলেই চলবেক?’
‘তাও কই চলছে?’ চন্দমহনও নিজেদের বৃত্তির প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে বলে, ‘ইটা হামদের নামের বৃৎ, কাজের লয়। মানুইষ নিজের বৃৎ ধরে যদি রোজগারেই না করতে পারল, যদি বউ-বিটি-ছ্যেলাপুলার পেট পালতে না পারল, তবে সেটা কী বৃৎ?’
‘ঠিক ঠিক।’ রাধেশ্যাম সুস্থিরভাবে তার চাঁদলা মাথাটি নাড়তে থাকে। বলে, ‘তবে ঘাসিদের ত চিরদিনেই এমনি চলে। অ্যাল্প উনিশ-বিশ। হামদের যেমন বৃৎ, তেমনি রোজগার। আজ যদি হামি ভাবি যে খয়েরটাঁড়ের ডমরা, মাহালিরা হামদের ল্যা বেশি কামাছে, হামরাও মাহালির কাম করব—বাঁশ ছুলব, বাঁশ চিরব, ঝুড়ি-ঝাঁটা-টুপা বেনাব, ত স্যাটা ভাবাটা ভুল।’
‘ভুল?’
‘নাই ত কী?’ ফটিক বুড়োকেই সমর্থন করে, ‘রাধেশ্যামখুড়া যেটা বলছে খাঁটি কথা। লিজের বৃৎ তুমার যেমনেই হোক তুমি স্যাটাকে নিয়েই শান্তিয়ে থাক। দুসরা লোকের বৃৎ দেখে যদি আটুপাটু কর, তাইলে আখিরে তুমার মন্দ বৈ ভাল হবেক নাই।’
‘যার যেটা বৃৎ তার স্যাটাই করা উচিত। কথায় বলে, কামারের বৃৎ কুমারে লিলে পঁন্দেমুড়ে ছ্যাঁকা লাগে। বঠে কি নাই?’ কেউ কোনো জবাব না দেওয়াতে রাধেশ্যাম আবারও বলে, ‘তুমি যখন বাজনদার, তখন তুমাকে ফুঁকেই যাতে হবেক। মনে রাখবি, হামরা হলি ঘাসি। হামদের ফুঁকটাই কাম। ইটা একটা সুর-কাম।’
‘চোড়কুদ্দার সেই গীতটা? কী বলেছে?’ ফটিক মনে করিয়ে দেয়, ‘যে করে তার হেরিফেরি/তারেই ঘরে বেরিবেরি।’ একপ্রস্থ হেসেওঠে সবাই।
‘থাক। উসোব কথা বাদেই দাও।’ রাধেশ্যাম পরিবেশকে গম্ভীর করার চেষ্টা করে। বলে, ‘যে কথাটা হতেছিল স্যাটাই হোক।’
‘ঝুমৈরের আসর।’ শিশুপাল ধরিয়ে দেয় পূর্বপ্রসঙ্গটি।
‘হঁ, ঝুমৈরের আসর। স্যাটা করতে গেলে ত শিল্পীরও অভাব হবেক নাই।’ রাধেশ্যাম বলে, ‘হামদের গাঁয়েই ত একলম্বরের শিল্পী আছে। চোড়কু। তার বাদেও হামরা আশপাশের ডি-ডিহাতের শিল্পী-গুলানকেও ডাইকে আনব। আসর যখন।’
‘হামার মন বলছে, আসর করলে হামরা কে-জানে চোড়কুদ্দাকে পাবই কি নাই।’ ফটিক বলে, ‘চোড়কুদ্দা এখন ই-গাঁয়ে স্যা-গাঁয়ে চলে যাছে।’
‘ঝুমৈর হাঁকতে?’
‘নাই নাই।’
‘কিস্যার লাইগে যাছে? সেই উয়ার বিটিটার বিহা-র লাইগে পাত্তর দেখতে?’ ফটিককে ধমক দিয়ে শিশুপাল বলে, ‘আচ্ছা ব-ক-ভঁ-ড় লোক। পাত্তর দেখতে কি উ দিল্লি-ধাক্কা যাছে? গেলেও ত সেই বেলাডুবুকে ঘুরৎ আসবেক।’
শিশুপাল এমন করে বলে দেওয়াতে ফটিক দমে যায়। সে অবশ্য না ভেবে বলেছে। অনেকটা বাহবা পেতে যে, চোড়কুদ্দার ব্যাপারে গ্রামের অনেকের চেয়ে সে-ই বেশি ‘খোবোর-তোবোর’ রাখে।
চোড়কুর বড় বিটি ডোড়োতি। বয়স এখন বারো পুরেনি। মদ্দৈনার চেয়ে বছর তিনেকের বড়। তার বিয়ের জন্য সে নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে পাত্রের সন্ধান করছে। তার মানে এই নয় যে, দুদিন ছাড়াই যে চাপাইটাঁড় থেকে পাত্র দেখতে ভিনু গাঁয়ে চলে যাচ্ছে। যাব বললেই কি যাওয়া চলে? যোগাযোগ না হলে? আশপাশের গ্রামগুলোতে গেলেও দশ-বিশটাকা খরচ তো আছে? চোড়কু তাই যতটা সম্ভব তার আত্মীয় বা কুটুমজনদের সঙ্গে দেখা হলে বলছে। নিজেও গেছে দু-একবার। ঝালদা পেরিয়ে ইলু-জারগতে।
কিন্তু সেখানে পাত্রপক্ষের হাঁকডাকের সামনে সে দাঁড়াতে পারেনি। তার কি ক্ষেমতা আছে থাল-বাসন-গরৈয়া-হাঁড়ি ছাড়াও পাঁচ-সাতটা ‘লুগা’ দেওয়ার? ‘লুগা’ হল কাপড়। তার বাদে আছে পণ। বাসন-কোসন-লুগা যদি বা সে কোনো মতে জোগাড় করবে, কিন্তু লগদ তিন হাজার টাকা? কোথায় পাবে? তার খোঁয়াড়ে যতগুলো ঘুসুর আছে, সবকটা একসঙ্গে পাইকারকে ‘মলাই’ দিয়ে দিলেও হাজার-বারোশ-র বেশি হবে না। আর সর্বস্ব দিলে সংসারটা থাকবে কীসের বলে? খাবে কী তারা? তা ছাড়া এতটাকা খরচ করে একবিটির বিহা দিলেই হবে? ডোড়োতির পরে কালিন্দীর, সঁচির বিয়ে দেবে কী দিয়ে? এই সাতপাঁচ ভেবে সে এখন চেষ্টা করছে যাতে হাজার-বারোশ পণের মধ্যে ডোড়োতিকে ‘বিকতে’ পারা যায়।
এই ব্যাপারে চোড়কু যে বেদম তদবির করনেওয়ালা, তা মোটেই নয়। তার এসব ভালো লাগে না। না লাগার কারণ হল, আর্থিক সামর্থ্য না থাকা। বুকপকেটে টাকার নুড়া থাকলে, এক জায়গা কেন—দশ জায়গাতেও ছুটে যাওয়া যায়। ইলু-জারগ ছাড়াও, রাঁচি-বুন্ডু-লটকিতা-জনা-সিলি-তামাড়-যন যন জায়গায় তাদের কুটুমঘর আছে সোব ঠিনে যাওয়া চলে।
কিন্তু তার এই যুক্তি তার বউ শুনবে কেন? সমবারী দিনেরাতে চোড়কুকে খেঁচরাতে থাকে। ‘ক্যানে নাই বিটির লাইগে পাত্তর দেখছিস? দিনকে দিন যে বিটিটা ডাগর হছে, দেখে হামারেই বুকটা ধস-ধস করছে।’ শুনতে শুনতে খ্যাপা-পাগলার পারা হয়ে যায় চোড়কু! তখনকে মনে হয়, ‘ই-সংসারে আর থাকবই নাই। শ্লা, চৈলে যাব যনদিগে পারব। কালীর দিব্যি!’
ওই ভাবা তক্কই। চোড়কুর প্রকৃত যাওয়া আর হয়ে উঠল না। বিয়ে করার পর বছর ঘুরতে না ঘুরতে সে টের পেয়েছিল, সংসারের পাঘায় সে আটকে পড়েছে। দারিদ্র্যের খুঁটায় বাঁধা পাঘা শত চেষ্টা করেও সে গলা থেকে খুলে ফেলতে পারবে না। এমনকি, বয়ার কাড়ার মতো সর্বশক্তি দিয়েও সে গলাসিসমেত উৎপাটিত করতে পারবে না ওই ‘মালখাম’টিকে, যা মাটির গভীর-গভীর-গভীরে প্রোথিত।
এই না-পারার অনুশোচনা ও আক্ষেপ নিয়ে সে আজ চোদ্দ বছর সংসারী জীবন যাপন করে চলেছে। বাকি জীবনটিও তাকে এভাবে যাপন করে যেতে হবে। সংসারী অথচ সংসারজীবনের প্রতি আসক্তিহীন।
এক অর্থে, বিয়ের পরে সত্যিই মালখামে বাঁধা পড়ে গেছে চোড়কু। এই বাঁধা পড়া শুধু দারিদ্র্যে নয়, বৃত্তিজনিত হতাশায় নয়। দারিদ্র্য তো বিয়ের আগেও ছিল। তখনো তো সে ঘাসিই ছিল। তখনো সে বাপের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে ভেরি নিয়ে গেছে, বায়না পেয়ে। চাল-চিঁড়ে-ধুতি নিয়ে ঘরে এসেছে। আর যখন মন হয়েছে ছকরাপটির সঙ্গে দলবেঁধে সে এ-গ্রাম সে-গ্রাম চলে গেছে। ঝুমুরের আসরে। রাতভর আসরে থেকে অন্যের ঝুমুর শুনেছে, নিজেও গেয়েছে। এবং দিন-দিন বেঁধেছে নতুন নতুন ঝুমুর। তার সেইসব ঝুমুরগুলো এখনো বিভিন্ন আসরে কত কত ঝুমৈরা গায়। এখনো বাইনাচের আসরে কত খেমটি-রসিক গাইতে গাইতে ভনিতায় উল্লেখ করে চোড়কুর নাম। তখন বাপের কাঁধে সংসারের জোয়ালটা থাকায়, তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল—‘গোঠে থেকেও পাঘায় না থাকা’।
কিন্তু এখন তো সে আর একা নয়। তার মুখ চেয়ে আছে একটা গোটা পরিবার। তার সঁচি, কালিন্দী, মদ্দৈনা, ডোড়োতিরা। তার বউ সমবারীও। কোন টানে সে এখন ছিঁড়ে যাবে এই পাঘা? তা কি আদৌ সম্ভব? এই না যেতে পারার আক্ষেপকে ভুলতে, কখনো কখনো, সে গ্রামবাসীদের সঙ্গে আড্ডায় আত্মহারা হয়ে থাকে। আবার কখনো এই অক্ষমতা, এই পঙ্গুত্বকে নিয়েকপাটকুণে বসে বসে রো ফেলে। ভিৎরে ভিৎরে কাঁদে। আর ঝুমুর বাঁধে।—‘বিধি, কী বাঁধনে বাঁধলে হামাকে/হামি লড়তে-চড়তে লারি...’
এভাবে চোড়কুর নিয়ে বলতে গেলে বহুত কথা এসে যায়। কে জানে, হয়তো ফটিকও কোনো সূত্র ধরে এই আড্ডাতেও আনতে চেয়েছিল চোড়কুর প্রসঙ্গটি। যদিও তার আগে রাধেশ্যাম খুড়া চোড়কুর নামোল্লেখ করেছে। গ্রামে ঝুমৈরের আসর হলে অনিবার্যভাবে চোড়কুর নাম এসে যাবে।
চন্দমহন চায় আসর যদি হবেই তবে জমাট আসরই হোক। চাপাইটাঁড়ে তো কিছুই হয় না। সে বলে, ‘শুধু ঝুমৈরে তুমি কৎক্ষণ আসরকে ধরে রাখতে পারবে? যদি গটা রাতের আসর করবে তাইলে ত বহুতগুলা শিল্পীকে মজুত রাখতে হবেক। তার ল্যা বরুংচু, হামি কি বলছি জান? ঝুমৈর যৎক্ষণ চলবেক চলুক, তার বাদে তুন্তার ছোনৃত্য পাটিটাকে খোবোর দাও। আর দাও লাগায়—গ্যাদা-গ্যাদা-গুডুম! দেখবে চৈখের দেখুতে ভোর হঁয়ে গেল!’
এমন জোরদার প্রস্তাব শুনে সবাই হই-হই করে উঠল। বলল, ‘হঁ হঁ! হছে যখন ভালো করেই হোক। পুরাই হোক।’
চন্দমহন আবার বলে, ‘এই চাপাইটাঁড়ে গটা বছরটার ভিৎরে ক-ন লাচখেল, পরব-তিহার, কুছু হয় নাই। বস্সরে যা ওই একবার করে হয় ভাও পরব। সেও ত সেই মাঘ মাসে। কিন্তুক আসর করার ম্যান সময় ত এইটা। এই চৈৎ-বৈশাগ মাসে, যখন চাআআআআরো তরফে খরায় খরা, টাঁড়-টিখর পুড়ছে, খেতে ধানধুন নাই, ঘরে একপৈলা চাল নাই, ভোখের জ্বালায় নুনি কাঁদছে...’ অত্যন্ত নাটকীয় ভাবাবেগ নিয়ে বলতে থাকে চন্দমহন। অন্ধকারে তার অঙ্গভঙ্গি তেমনভাবে কারোর চোখে পড়ছে না। তবু তার এই আবেগময় কন্ঠের অভিব্যক্তি দিয়ে সে যেভাবে তাদের জীবনের বঞ্চনা আর অস্তিত্বের সংকটের দিকটিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে পালাকারদের মতো প্রকাশ করে, তাতে তার এই ‘জরক’ দেখে সবাই ঢোক গিলে গিলে হাসতে থাকে।
কিন্তু সত্যিই কি তা হেসে ফেলার মতো? আসলে, তারা হাসে তার কৃত্রিম আবেগ এবং অভিব্যক্তির নাটুকেপনার জন্য। নচেৎ এর পশ্চাতপটে তাদের জন্মমৃত্যুর অন্তবর্তী কালের যে করুণ চিত্রটি রয়ে গেছে, তা আজকের নয়। যেন জন্মজন্মান্তরের। আর জন্মজন্মান্তরের বলে এক অকাট্য অভিশাপের মতো আকীর্ণ তাদের অদৃষ্টে। যার কোনো নড়ন-চড়ন নেই। অন্যথা নেই। আজ থেকে দুকুড়ি-পাঁচকুড়ি বছর আগেও যে-ঘাসি ছিল বাজনদার, আজও সেই ঘাসিরই উত্তরপুরুষ বাজনদার। সে দিনও সে সন্তানের জন্মের সংবাদ পেয়ে মাহাত-কুমার-বাউরি ঘরে ছুটে গেছে, মরা-হারা ঘরে গিয়ে শোকার্ত পরিবারবর্গকে ঘাটে তুলেছে মদনভেরি বাজিয়ে আর মজুরির ভাগবাবদ নোংরা ধুতির প্রান্তে চাল-চিঁড়ে, কখনো কাঁধে লুগা নিয়ে, নিজের অভুক্ত নাবালক ঘাসিশিশুটির কচি কচি আঙুলগুলি ধরে ঘরে এসে ঢুকেছে। আজও সে ভাবেই ছুটে যেতে চায় জন্মঘরে, মরা-হারা ঘরে, আজও তার নোংরা ধুতির প্রান্তে...
চন্দমহনও হাসতে লাগল। হ্যাঁ, এভাবেই নিজের জীবনের কারুণ্যকে নিয়ে হাসা যায়, তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও যায়, কিন্তু কখনোই তাকে অস্বীকার করা যায় না। আর সত্যি বলতে কি, হেসে খেলে থেকে তারা আসলে বুকের ভেতরে বদ্ধ হয়ে থাকা সুপ্রাচীন কুবাতাসটিকে সাময়িক মুক্তি দিতে চায়।
তবে আসরের পক্ষে সত্যিই এটা ভালো সময়। এই সময়ই পুরুলিয়া-মানভূম অঞ্চলে গ্রামে গ্রামে চলে নানান পরব-তিহার। নানান আসর। গাজন-ভগতা তো আছেই, সেইসঙ্গে ছোনাচ, খেমটি নাচ, মুরুগ লড়াই। কোথাও আসর বসেছে, কোথাও মহলা চলছে। সন্ধে হতে-না-হতে দূরবর্তী গ্রাম থেকে মহুয়ার গন্ধের মতো বাতাসের হেলকে হেলকে আসতে থাকে ডুমু-ডুমু-ডুমু-ডুমু বাজনার ধ্বনি। যেন ‘ব্যাঙা রাজা সাজে রে বৈরাত।’ আর ধামসার গ্যাদা গ্যাদা। আচমকা ছোনাচের উল্লাসমুখর কোরাস। কোথাও-বা রাঁই রাঁই করে বাজছে মাদল। এইসবের সঙ্গে, অনিবার্যত, ‘কাঁচা আমে নুনের মতো’ ধ্বনিত হয় কোথাও গণেশ বন্দনা, কোথাও রং-এর ঝুমৈর—‘বঁধু হেএএএএএ...’
এই সময় মানভূম-তথা পুরুলিয়া অঞ্চলের মানুষের জীবন যতই অসহ্য হয়ে উঠুক না কেন, আকালের এই দিনগুলি তাদের খোলা-খাপরা-মাটির ছোটো ছোটো ঘরগুলির ভেতরে যতই দারিদ্র্যজনিত অভাব আর অনাহারের অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে উঠুক না কেন, পরব-তিহারের জন্য আনচান করা তাদের রসিক-মনটিকে দমিয়ে রাখতে পারে না। এভাবেই বর্ষার আগে পর্যন্ত তারা উপভোগ করে প্রকৃত মনের মুক্তি। বর্ষা পড়লে তো লাঙল নামাতে হবে মাঠে। শুরু হয়ে যাবে ফের আবড়-জাবড়-জভি-কাদা। ক্ষেতিকাম।
কিন্তু এখন মাঠ ধু-ধু। জলের অভাবে পুরো তল্লাট একফসলি। খেতেমাঠে তাদের কাজ নেই। এখন সেই শস্যহীন অনেক অনেক খেতজুড়ে, মাঠজুড়ে, চলে মোরগ লড়াই। খেতের আলে, মাঠে-ময়দানে পলাশ আর জৈড় গাছের ডালগুলিতে গজিয়ে ওঠা হারা-হারা পাতাগুলিও যেন পরবের ফুর্তি নিয়ে সিটি-সিটি কাঁপতে থাকে। বোনি-বগা-কাউয়া উড়ে এসে বসে। আহা! সত্যিই, নেচে ওঠে মন! মন রে!
এই ফুর্তিকে, পরবের এই আমেজকে, তারা যেন এখনি অনুভব করতে পারছে। সবার উৎসাহ দেখে, রিজ দেখে, রাধেশ্যাম আরও একবার তার প্রস্তাবটিকে যাচাই করে নিতে চায়। বলে, ‘হবেক তাইলে?’
সবাই বলে ওঠে, ‘হঁ, হঁ!’
‘তাইলে হোককেই!’ ডানহাতের মুঠো করা বুড়ো আঙুলটিকে, রাধেশ্যাম বাতাসে গোত্তা মেরে, কোমরে বড়বাঁধা ধুতি নিয়ে সে একপাক নেচেও দিল। বলল, ‘হাঁকা তাইলে। চোড়কুকে, গতিককে আর যে-যে আছে সোবগুলাকে হাঁকা!’
শিশুপাল বলে, ‘কাল তাইলে—’
‘দুট বকাচদা! কাইল-তাইল নাই। এখনেই।’
‘হঁ হঁ। এখনেই।’ চন্দমহন মন্তব্য করে, ‘ভাদৈরা তাল। ফেলে রাখলেই পকা হবেক!’
‘নাআ, বলছি সবাই মেলে একটা মিটিন করা ত দরকার? কি ফটিক?’
‘মিটিন ন ফিটিন!’ রাধেশ্যাম বলে, ‘তোর নাখে কাজ ন বাতাসে কাজ? এই ত হামরা একঠিনে হঁয়েছি, এইটাই মিটিন।—এ ফৈটকা, যা হাঁকা ন চোড়কুকে। বল রাধেশ্যামখুড়া তকে ডাকছে। আগু বলিস না কিস্যার লাইগে।’
রাধেশ্যাম চায় না, এমন একটি উত্তেজক খবর চোড়কু ফটিকের মুখ থেকে শুনুক। খবর দেওয়ার সাবাশিটা সে-ই বা একা পাবে কেন?
ফটিক যখন চোড়কুর ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য ধারী থেকে নেমে, চুটির খন্ড ফেলে, লুঙ্গিটা আঁট করে নিচ্ছে, অমনি রাধেশ্যাম বলে, ‘আর নাই ত উয়াকে ইখেনে ডাকার কী দরকার? হামরাই চ ক্যানে উয়ার ঘরকে? ঘরে আছে ন?’
কেউ বলল, ‘আছে আছে।’ আবার কেউ বলল, ‘কে জানে, উ বোধোয় হাটে বরা নিয়ে গেছে। পরীক্ষিতাও গেছে।’
‘পৈরখাও গেছে? কন হাটে?’
‘আআআই দেখ! তুমোও য্যা আনাড়ি সাজছো।’ ফটিক এবার রাধেশ্যামকে বলে, ‘ঘাসিরা কন হাটকে যায়, নাই জান?’
চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা বেচাকেনার জন্য মূলত জয়পুরের হাটেই যায়। এই হাটটি বড়। খুব দূরেও নয়। এখানেই তারা প্রয়োজন মনে করলে তাদের পালিত শুয়োরগুলিকে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। হাটের ভিড়ে কোনো এককোণে বসে তারা জ্যান্ত ঘুসুরগুলির পায়ে দড়িদড়া বেঁধে ক্যাঁন্দ কাঠের মতো ফেলে রাখে। হাটের নানা কিসিমের মানুষের ভিড়ের থেকেও দুটি-একটি করে মানুষ এদিকে সরকে আসে। তাদের ফুর্তিহীন নিরীহ পায়ে আসার ভঙ্গিটা অনেকটা যেন গন্ধ শুঁকে শুঁকে ঘুসুর মালিকের দিকে এগিয়ে আসার মতো। তারা প্রথম দৃষ্টি দিয়ে প্রাণীটিকে কুৎ করার চেষ্টা করে। পরে টিপে-টাইপে ওজন মালুম করে। মাটিতে পড়ে-থাকা সেই ঘুসুরটি ধুলোতে ঘষটাতে ঘষটাতে গর্গর করে গোঙাতে থাকে। ক্রেতার সঙ্গে ঘুসুরওলার চলে ‘দর মলাই’। প্রথমে ওজনের মলাই, তা বাদে দামের মলাই। ওজন যদি পাঁচ কেজি হয়, তাহলে ক্রেতাকে দিতে হয় চার কেজির দাম। এক কেজি সে ছাড় পায়। ৪০ টাকা কেজি হিসেবে সে রচ রচ করে কোমরে পাকিয়ে রাখা নোট, থুতু দিয়ে গুনে লুঙ্গি পরা ঘুসুরওলার কোলের দিকে ফেঁকে দেয়। পড়ে অন্ডকোষে। কখনো আস্ত বিক্রি না করে, কেটেও বিক্রি করে। ডাঁড়িতে চাপিয়ে।
আবার একেক দিন দেখা যায়, ঝালদার দিক থেকে সাইকেলে করে পাইকার আপ-ডাউনে দোল খেতে খেতে চাপাইটাঁড়ে আসে। আর সাইকেল সুদ্দা গজগজাঁয় ঢুকে যায় ঘাসিদের ঘরে। সাইকেলে তাদের ঘণ্টি থাকলেও এইসব পাইকাররা ঘণ্টি বাজাতে চায় না। বাজায় না। গ্রামের পথে আসতে আসতে যদি কোনো ছুটু-ছা চাকার দিকে এগিয়ে আসে, তখনকে প্যাডেল বিপরীত দিকে ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, ‘হেই-হেই-হেই! কনদিগে সামাছিস রে বাবু। দেখবি ন।’
এই পাইকাররা যখন ঘাসির ঘরে ঢোকে, তখন সব্বার আগু ঘাসিবউগুলোর আদুড় গায়ের দিকেই তাকায়। দেখার চেষ্টা করে তাদের অসাবধানতাবশত আঁচলার তলে তলে জেগে থাকা ডুমো ডুমো স্তন।
ঝালদার পাইকার অবশ্য অনেকদিন হল গ্রামে আসছে না। হয়তো তারা এখন তুলিন-মুরি-ইলু-জারগা-র দিকে চলে যাচ্ছে। যদিও, সুবর্ণরেখা পেরিয়ে, মুরিতে কাচ কারখানা আছে। মাল সেখানে ততটা সুবিস্তা দরে পাবে বলে তো মনে হয় না। বরং যেটুকু সুবিস্তা তারা পাবে তা এই চাপাইটাঁড়ে। এখানে একছোটর ল্যা মানুষ করা ঘরের জানুয়ারগুলোকে তারা পাইকারের হাতে বিকে দিতে বাধ্য হয়। পেটের দায়ে। এখানে দারিদ্র বেশি বলে ‘লে লে’র দরে না দিয়ে উপায় থাকে না। ‘দে দে’র দাম পায় না।
চোড়কু, পরীক্ষিতরা হাটে গিয়ে থাকলেও এতক্ষণে নিশ্চয় ফিরে এসেছে। যেমন ফিরে এসেছে আরও দুজোড় ঘাসি। বলিরামের সঙ্গে ছিল তার জ্যাঠার ব্যাটা ভাই, দিগম ঘাসি। আর অন্য জোড়টিতে ছিল বুড়ো খইবর মাছুয়ার এবং তার জোয়ান ব্যাটা লারাণ মাছুয়ার। এরাও ঘাসি। আসরের কথা তাদের কানে যেতেই তারাও ঘর থেকে এসে দলে ভিড়ে যায়। তারপর পুরো দলটাই এগিয়ে যায় চোড়কুর ঘরের দিকে।
অন্ধকারের মধ্যেই ওরা গল্প করতে করতে হাঁটে। দূরে দূরে দেখা যায় তারখাম্বায় জ্বলছে বিজলিবাতি। এই গ্রামে আলো নেই বলে, এরা, এই চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা বড় বেশিই যেন চিনে ফেলেছে ওই দূরবর্তী লালচে আলোগুলিকে। তারা চিনতে পারে, কোন আলোটি কোন গ্রামের চৌমাথায় জ্বলছে। আবার হঠাৎ কোনো কারণে আলো আচমকা নিভে গেলে, ঘাসিরাই চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, ‘কী হৈল ব? জ্বলা আ-লটা য্যা দপ করে নিমহে গেল?’ উত্তরে হয়তো কোনো ঘাসি মজা করে বলে, ‘পাছে চাপাইটাঁড়ের মাছুয়াররা কৌ ইখেন ল্যা ফুঁকে দিল?’ তখনও এক প্রস্থ ঢেউ ওঠে, হাসির। আবার এই আলোগুলি চাপাইটাঁড়ের ঘাসি-মাছুয়ার-গড়াৎ-নায়েকদের কাছে সময়জ্ঞাপকও হয়। সন্ধেবেলায় যখন টুম-টুম করে একটার পর একটা বাতি জ্বলে ওঠে, তখন কেউ হয়তো বলে ফেলে, ‘হাই দেখ। বিজলি জ্বলল। তার মানে এখন টায়েম? কাঁটায় কাঁটায় সুয়া ছটা। একতিল ইধার-উধার হবেক নাই।’
চোড়কুর ঘরের দুয়ারে পৌঁছে, ফটিক ডাক দিল, ‘চোড়কুদ্দা! হেই চোড়কুদ্দা!’
‘হঁ, হঁ। সামাও।’ আঙিনায় দড়ির খাটটি পেতে, উলটোদিকে মাথা করে, অনেকটা যেন দুর্বোধ্য বিষণ্ণতা নিয়ে শুয়ে ছিল চোড়কু। দুই করতলের ওপরে মাথা রেখে, সে তাকিয়েছিল আকাশের গায়ে ফুটে-ওঠা তারাগুলির দিকে। যেন শালবনে জুনপুকির মতো ওরা অন্ধকারে মহাশূন্যে খেলা খেলছে।
চোড়কু হড়বড় করে ওঠে। সদরের দিকে তাকাতেই কারো মুখ সে দেখতে পায় না। দেখে একঝাঁক জুনপুকি ঢুকতে চাইছে তার ঘরের আঙিনায়।
‘আইস! আইস!’ চোড়কু চেঁচিয়ে বলে, ‘এ গো, মদ্দৈনার মা! এ ডোড়োতি! ঘর-ভিৎরের ল্যা হারকেনটা আন ন।’
হেঁশেলঘর থেকে ঘাড় কাত করে আঙিনার দিকে তাকায় সমবারী। কোলে ঘুমিয়ে পড়েছে সঁচি। হাতের থাবড়ানিতে লন্ঠনের পোকা মারছিল কালিন্দী। ফাটা কাঁচের ফাঁক দিয়ে সেই পোকা সে শিখার আগুনে ফেলছিল! সমবারী বসে-বসেই কালিপড়া লন্ঠনটাকে চৌকাঠের দিকে ঠেলে দেয়।
ডোড়োতি গিয়ে নিয়ে আসে। লন্ঠনের আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার নোলকটি। চৈত্রের হাওয়ায় ফিনফিন করছে।
খাটের খুরার সামনে, ডোড়োতি, নিঃশব্দে নামিয়ে রাখে শিস-ওঠা লন্ঠনটি।
জোরকদমে চলতে লাগল প্রস্তুতি।
প্রথম দু-তিনটি দিন তো বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে চলে গেল। এই আলাপ-আলোচনায় কাউকে বাদ দেওয়া হল না। যেহেতু আসরের উদ্যোক্তা চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা এবং এটা গ্রামের বারোয়ারি আসর, তাই হরেককে ডাকা হল। তাতে কারুর মনে কোনো ক্ষোভ থাকল না। সবাই বুঝল গ্রামের এটা ষোলো আনার আসর। গ্রামের সাবইকে এরসঙ্গে জড়িত হতে হবে। মেলে-ভাবে কাজ করতে হবে।
স্বাভাবিকভাবে এর দায়িত্বও পড়ে গেল সবার উপরে। একা রাধেশ্যামখুড়া বা চোড়কুর ওপরে নয়, ফটিক-চন্দমহন কিংবা শিশুপালের ওপরেও নয়। বালিরাম, গতিককিষ্ণ, পান্ডু ঘাসি, খইবর মাছুয়ার, লারাণ মাছুয়ার, দিগম ঘাসি প্রত্যেকে তালচোটির মতো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে এসে জড়ো হতে লাগল। কখনো রাধেশ্যামখুড়ার ঘরে, কখনও চোড়কুর ঘরে। কিংবা আমতলের ঘনছায়ায়। তবে এরই মধ্যে যে-যখন বায়না পাচ্ছে, সে বেরিয়ে পড়ছে ভেরি নিয়ে। এই যেমন ফটিক। যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘চোড়কুদ্দা, ঘাটের ল্যা ফিরতে ফিরতে, এই ধরে লাও ক্যানে—’ কব্জিতে অদৃশ্য ঘড়ি দেখার ভঙ্গি করে—‘পুরাপুরি পাঁচ বাইজে যাবেক। তা বাদে তুমি যা-যা বলবে, ঝিঙার ল্যা শিঙা তক্ক হামি তুরন্ত করে দিব। হামার যেটা-যেটা করবার আছে।’
‘ক-জোড় ভের যাছে?’
‘গরিবঘর বঠে। একটার বেশি করতে মুরাদ নাই।’
‘জোড়ে কে যাছে তোর সঙে?’
‘লারাণ মাছুয়ারকে নিয়েছি।’
‘ঘাসিদের নিজেদের মধ্যে পদবি বলার রেওয়াজ নেই। তবু ফটিক লারাণের পদবি উল্লেখ করে। মাছুয়ার পদবি হলেও লারাণ কিন্তু ঘাসিই। যেমন গড়াৎ এবং নায়েকও ঘাসি। এই চারটেই তাদের পদবি। যেটা খুশি তারা ব্যবহার করতে পারে। তবে পদবিটা তাদের কোনো কাজেই আসে না। তারা এমন কোনো কাজ করে না যাতে সই-সাবুদটুকুও করতে হয়। সই করতে জানেও না। তাদের পূর্বপুরুষ এবং তারাও লেখাপড়া করার সুযোগ পায়নি। শিক্ষার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক তাদের নেই। তবে এখন ঘাসিদের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা কখনো-সখনো ইস্কুলে যাচ্ছে। ঘাসি বাপ ইস্কুলে ব্যাটার ভরতির খাতায় ব্যাটার পদবি লিখছে ঘাসি। কেউ ঘাসি না লিখে লিখছে মাছুয়ার, গড়াৎ। অনেকে নায়েকও লেখে।
নায়েক লেখার ব্যাপারে ঘাসিদের কাছে কেউ কেউ আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে জয়পুরের আশপাশে যে দু-চারজন নায়েক ব্রাহ্মণ আছে, তারা। এতে নাকি তাদের অমর্যাদা হচ্ছে। জাতের বিচারে তারা অনেকটা ‘ডাউনে’ চলে যাচ্ছে। একথা সিপ্যাম পার্টি থেকেও বলা হয়েছে। প্রধানও তাদের চাপাইটাঁড়ে এসে বলে গেছে। আজ নয়, বছর চার-ছয় আগে। যখন সেই ‘সেরেফ পাঁচটা’ তারখাম্বার জন্য তারা একে-তাকে বলাবলি করছিল। তখন পরীক্ষিৎ তার পদবি নায়েক বলাতে উল্টুরাম মাহাত তাকে বলেছিল, ‘এরেই শ্লা পৈরখা, কই দেখি কথায় বেধায় রাইখেছিস পৈতাটা? নায়েক বলছিস য্যা! নায়েক ত বেরাম্ভণ। তোর পৈতাটা তাইলে কই?’ তারপর পরিষ্কার বলেই দিয়েছিল, ‘শুন, তরা বাবু ঘাসি-মাছুয়ার-গড়াৎ বাল-ছাল যা লেখবি লেখ। কিন্তুক ‘নায়েক’ লেখিস না। তাইলে যদি বা তাদেরকে দুশো-পাঁচশো টাকা ঘুসুর লোন ফোন হিসাবে বাইর করে দিবার চ্যাষ্টা করা যাতক, স্যাটাও আর হবেক নাই।’
ঘাসিরা অবশ্য কখনো সরকারি লোন নেওয়ার চেষ্টা করেনি। চায়ওনি। লোন নিলেই তো সেটা সরাসরি পেটে চলে যাবে। বিনা লোনে তাদের প্রায় প্রত্যেকের খোঁয়াড়ে দু-চার গন্ডা করে ঘুসুর প্রতিপালিত হচ্ছে। তা ছাড়া সরকার যে লোন দেয় ই-খোবোরটাও তারা জানে না। ‘ব-লক ওপিস’ টা কুথায়, সেখানে কী কাজ হয়-না-হয় তাও তাদের অজানা। কেউ তাদের এটা জানিয়ে দেবারও প্রয়োজন মনে করেনি। সেই অর্থে তাদের সঙ্গে সভ্য-শিক্ষিত মানুষজনদের যোগাযোগ নেই বললেই চলে। ভোট পরব-তরব হলে তখনকে ‘পাটি-পুটির’ ‘বকাচদা’ লোকদের চাপাইটাঁড়ে সামাতে দেখা যায়। তখন ইবেলা-উবেলা আইসে যেমন গটাগাঁটাকে গাঁটা ফৈচ্ছ ফুটাঁয় দেয়। ঘাসি-পুরুষরা কিছু না বললেও তাদের বউরা মুখে কুলুপ আঁইটে বসে থাকতে পারে না। তারা বড় মুখরা। দলীয় কর্মীদের দিকে সরাসরি আঙুল তুলে বলে, ‘ইয়াদের সঙে হামাদের কিস্যার ষষ্টি-সমুদ১৫? কিস্যার ল্যানাদেনা? তবে কিস্যার লাইগে ই-লোকগুলা হামদের গাঁয়ে আইসে ঢুকছে?’
কিন্তু তবু ভোটের জন্য, ক্ষমতার জন্য, গ্রামে গ্রামে পঞ্চায়েতের টাকা নয়-ছয় করার জন্য মোটা চামের এই মতলবি মানুষগুলি—এই রাবণের দল—নির্লজ্জের মতো গরিবের পিঢ়ায় এসে সাধুর বেশে দাঁড়ায়। ওঃ! তখন কি মিষ্টি মিষ্টি কথা! মুহে যেমন মধু বর্ষিছে! তারপরে ঘুরেও ভালবেক নাই। কথা বলা ত দূরের কথা। যদি-বা বলে ত যেমন ‘ম্যাজেস্টরের’ পারা। ঘাসিদের মানুষই মনে করে না। চুয়াড়-ছোটোলোকদের পারা ভাষা ব্যবহার করে। আর ঘাসিরাও তেমনি। তাদের ত সাত চড়েও রা নাই।
ফটিক কথা বলতে বলতে বগলে চেপে-রাখা মদনভেরিটিকে একবার দেখে নেয়। দেখে নেয় চুনকুড়িটিও। ফুঁ দিয়ে। আওয়াজে কোথাও একটু কর্কশ ভাব কানে আসছে টের পেয়ে, চোড়কু বলে, ‘এমন ক্যানে শুনাছে?’
‘সেইটাই ত বুদতে পারছি নাই।’
‘বুদতেই যদি না পারবিস ত ঘাসি হঁয়েছিস ক্যানে? কই, দে দেখি।’ চোড়কু হাত বাড়িয়ে মদনভেরিটা নেয়। লম্বা বাঁশের ‘ঠেকনো’টিকে পেটে চেপে সে একদম বাজিয়ে দিতেই, ফটিকের মনে হয়, এই আওয়াজটা যেন আগের চেয়ে অনেকটাই শ্রুতিমধুর।’
‘কই চোড়কুদ্দা! আওয়াজটা ত আগের পারা কানে লাগছে নাই আর? কই খরখৈসা শুনাছে?’
‘শুনাছে শুনাছে। ভালো করে ধিয়ান দিঁয়ে শুনবিস তবে ন।’
ততক্ষণে লারাণও এসে পড়েছে। চোড়কুর বাজানো মদনভেরির ধ্বনিটি শুনে সে মন্তব্য করে, ‘আসলে ফুঁকের গুণ। হামরা কি চোড়কুদ্দার পারা ফুঁকতে পারব? হামরা আর কদিন ভের ফুঁকছি?’
বাজানোর কৌশল, যাকে ওরা বলে ‘ফুকের গুণ’, সেটা অবশ্যই একটা ব্যাপার। তবু চোড়কু বলে যে, তার ফুঁ দেওয়া ধ্বনির মধ্যেও এখনো কর্কশ ভাবটি রয়েছে। পুরোপুরি যায়নি।
‘আছে?’
‘হঁ, এখনো আছে।’
চোড়কু আবার বাজায়। তারপর ভেরিটি উলটে দিয়ে সে ফটিক ও লারাণকে ভেরির ধাতব অংশটি দেখিয়ে বলে, ‘হাই দেখ। কী দেখছিস?’
ফটিক দেখতে পায় পিতলের গায়ে একটা সুক্ষ্ম চিড় ধরেছে। বলে, ‘অঅঅঅঅ! তার হতেই এমনি শুনাতেছিল।’
লারাণ বলে, ‘দেখ। আসলি বাজানদার কাখে বলে! এই হৈল এক লম্বর ঘাসি। যে বাজনার মর্ম কানে বুঝে।’
‘ইয়াকে তাইলে পালটাতে হবেক? মেরামত করলে নাই হবেক?’
‘ক্যানে নাই হবেক? ওই কাজ চলাবার পারা হবেক।’ চোড়কু জানায়, মেরামত করাবার পরে শব্দেরও কিছুটা হেরফের ঘটবে। সেই শ্রুতিমধুর ধ্বনি প্রলম্বিত নল দিয়ে নির্গত হবে না। এমন কী, তার ধ্বনির জোরটাও কমে আসবে। এখন যেমন, এই চাপাইটাঁড়ে কেউ যদি দক্ষিণমুখী হয়ে ভের বাজিয়ে দেয়, তো সেই ভেরের আওয়াজ কাঁসাই নদী পেরিয়ে রাঙামাটি গ্রামেও শোনা যাবে। ১৪ মাইল দূরে। নিমতলে জামতলে খাট বিছিয়ে-বসে থাকা ওখানকার মাঝি-কুড়মিরা হয়তো এ-ওকে হাসোল্লোভি করে বলবে, ‘হাই শুন, শুন! শামের বাঁশি বাজছে!’ কিংবা কেউ বলবে, ‘শ্লা, ঘাসিগুলা অজব মানুইষ! অজব! দিন নাই রাত নাই উয়ারা ভের ফুঁকছেই, ফুঁকছেই!’
‘ফুঁকবেক নাই? যার যেটা বিত্তি। মানুষকে পেটে খাঁইয়ে বাঁচতে ত হবেক?’ বলতে বলতে হয়তো কেউ গাঁইহে দিবেক—
শাম ডাঁড়ায়ে কদম তলে
বঁধু কলসি ভরছে হেলে-দুলে
নারী কতই না ছল জানে গোওওওওও...
অহোহোহো! বাহরে পুরুলিয়া! এর মাহাত্ম্যের কথা, বিশেষত এই সময়ে, বলে শেষ করা যায় না। এই চৈৎ-বৈশাগ মাসে। বৈপরীত্যের মধ্যে মানুষের কি স্পৃহা! ঘরে অনাহার-অন্ধকার, খেতে-মাঠে উদাসীন রুক্ষতা, কিন্তু তৎসত্ত্বেও রোদে পুড়ে-যাওয়া ঝামা-ধরা কালো কালো মানুষগুলির মধ্যে যেন প্রাণের অন্ত নেই। চোখ-মুখ তাদের ঢুকে গেছে, গায়ে-মাথায় তেলের স্পর্শ নেই, চামড়ায় টান হয়ে থাকে পাঁজরা। তবু মন তাদের আশ্চর্য কাব্যময়। শিল্পময়। কল্পনাপ্রবণ। ছোনাচের ছন্দ, ঝুমুরের কলি তাদেরকে সবকিছু ভুলিয়ে দিয়ে মুখর করে রেখেছে। তাদের কথায় কথায় ঝুমুর। যেন মাটির মস্ত বাইন-এ ধান বলকিছে। সারা পরিমন্ডল জুড়ে লটাচ্ছে তার মিষ্ট প্রাকৃত সুবাস!
ফটিকের মনটা খারাপ হয়ে গেল। এখন এই মুহূর্তে তার পক্ষে তো নতুন একটা ভের কেনা সম্ভব নয়। একজোড়া ভের করতে কমসে-কম পাঁচশ টাকা। তাও যে যখন-তখন মাল পাওয়া যাবে, তা নয়।
মদনভেরি পাওয়া যায় দুটি জায়গাতে। বড়কাখানায় এবং সতীঘাটায়। বড়কাখানাতে রথের মেলার সময় কিছু দুস্থ দরিদ্র গ্রামবাসী এই ভেরি নিয়ে বসে। তারা কোথা থেকে যে আসে! আর মেলার পরে কোথায় যে চলে যায় তাও কেউ জানে না। তবে তাদের দেখে বড়োই অভাবী মনে হয়। অনেক সময় তারা সপরিবারেও আসে। প্রত্যেকের পোশাক-আশাক নোংরা, অপ্রতুল। কালিমাড়া গা। মাথায় তেল-চিরুনির বালাই নেই। প্রয়োজনও নেই তার। ভেরিগুলি যেখানে সাজিয়ে বসে, সেখানেই মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে তাদের দুধের শিশুগুলি। আহা! বিক্রেতা বাবা তখন হয়তো মেলার খদ্দেরের সঙ্গে দরাদরি করে, ভেরিতে কতখানি ‘তাম্বা’১৬ আছে, চুনকুড়ি কেমন—ফুঁ দিলে তা কেমন স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে আসছে এবং সর্বোপরি ভেরির আওয়াজ কতখানি শ্রুতিমধুর, তীব্র ও সুদূরপ্রসারী ইত্যাদি বোঝায় আর বোঝাতে বোঝাতেই সে আচমকা বাজিয়ে দেখিয়েও দেয়। হামাগুড়িরত শিশুটির দিকে তখন আর খেয়ালই থাকে না। এই এদের কাছ থেকেই ভেরি কিনে নিয়ে আসে চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা। দীর্ঘদিন ধরে বহু কষ্টে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে।
বড়কাখানা ছাড়াও ঘাসিরা আরও একটা জায়গায় যায়। তা হল সুইসা-কালিমাটির কাছে। সতীঘাটার মেলার সময়ে শুধু এখানে ভেরি পাওয়া যায়। পৌষ মাসে সংক্রান্তির জমজমাট মেলা বসে। বিভিন্ন জায়গার ঘাসিরা এইসব মেলায় এসে দরে-দামে মনপসন্দ ভেরি কিনে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। মোটামুটিভাবে জোড়ে শ-পাঁচেক টাকা পড়ে যায়।
বিক্রিটা জোড়ের দরে হয়ে থাকে। জোড় ধরে দাম বলাটাও একটা প্রথার মতো চলে আসছে। যদিও কেনার সময়ে কেউ জোড়ের দর করে একটা ভেরিও কিনতে পারে। আসলে, বাজনাদারদের বায়না করা হয় জোড়ে জোড়ে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ঘর হলে তারা একজোড়ের জায়গায় দুজোড়, তিনজোড়ও ঘাসি নিয়ে যায়। তাতে তাদের ঘাটে ওঠাটা বেশ জমকালো হয়। এতগুলো মদনভেরি যখন ঘাট থেকে বাজতে বাজতে গাঁয়ের ভেতর দিয়ে শোকার্ত ঘর পর্যন্ত যায়, তখন ঢিঢি পড়ে যায়! ঘর-ঘর থেকে মেয়ে-বউরা বেরিয়ে আসে। তাদের দেখার জন্য। এতে লোকমুখে একটা তাৎক্ষণিক প্রচারও হয়ে যায় যে, ‘দেখঅঅ, তিন-তিন জড়া ভের নিয়ে ঘাটে উঠল। তাইলে কুটুম্বিতায় কত টাকা খরচা করবেক? কত লোক খাবেক?’
আবার কেউ কেউ ঘাটে-কুটুম্বিতায় এভাবে খরচা করে গ্রামের লোকজনকে দেখাতে চায় যে, তারা তাদের গত হওয়া বাপ-মাকে কতখানি ভালোবাসত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, জীবিতকালে বাপ-মায়ের মুহে একলোট জলও তারা তৃষ্ণার সময়ে দেয়নি। বাপ-মাকে ‘বোঝা’ মনে করে তাদের না-খাইয়ে না-খাইয়ে মেরে ফেলেছে। সেই কুলাঙ্গারদের ঘাটে তোলার জন্যও ঘাসিরা মদনভেরি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কারণ, তারা তো ধ্বনি দেয় ঈশ্বরের উদ্দেশে। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশেও। ভেরিকে আসমানমুখী করে সরাসরি স্বর্গে পৌঁছে দেয় একটি মানুষের বিদায়বার্তা।
শুধুই বিদায়বার্তা নয়। ঘাসিরা অনেকসময় তাদের এই ভূমিকাটিতে অন্য মাত্রাও দেয়। তারা এমনও বলে যে, কেবল একটি মানুষের মর্ত্য হতে চলে যাওয়ার বার্তাই তারা পৌঁছে দেয় না, সেইসঙ্গে আরও অনেক কথাই নিবেদন করে। বস্তুত, তারা এই স্বর্গ-মর্ত্যের সরাসরি সংযোগরক্ষাকারীও। এই সংযোগের মাধ্যমে তারা ভেরির ধ্বনি দিয়ে স্বর্গের দেবতাদের ঘুম ভাঙায়—‘উঠো ঠাকুর, উঠো! রঙ্গ দেখ!’
রঙ্গই বটে! জগৎ মায়াময়, জীবন ক্ষণস্থায়ী। মৃত্যুই মানুষের ভবিতব্য, অদৃষ্টের অয়স্ককঠিন লিখন। তবু সেই মৃত্যুর জন্য মানুষের শোক, কি অপরিসীম! মৃত্যুর পরেও এই শোকমুক্তির জন্য অবোধ মানুষের কী হাস্যকর আয়োজন! তারা এও বলে যে ‘ঠাকুর, তোমার দৃষ্টি সর্বব্যাপ্ত। তুমি এই মানুষটির তিরোধান বিচার কর। বিচার কর তাদেরও, যারা আজ অশৌচ সমাপন করে ঘাটে উঠল। এই ভন্ডরা জীবদ্দশায় কে-কী করেছে সেই মৃতের জন্য? যে-যেটুকু করেছে, তার প্রকৃত মূল্য দাও। দুষ্টের দমন দাও। আর সহৃদয়কে দাও স্বর্গভূমি! মৃতের সঙ্গে যে যেমন ব্যবহার করেছে, তুমিও তার সঙ্গে তেমনই ব্যবহার কর। উৎপীড়ককে তুমি গরম তেলে ছাঁক, শিষ্টকে দাও বরাভয়।’ গতিককিষ্ণ, খইবর, রাধেশ্যামখুড়া—এরা এইসব বলে। হাসতে হাসতে। বলে, ‘হঁ, হামরা মনে মনে এই বলেই ভেরি ফুঁকে দিই। তা বাদে তুমি ভোগ কর। ঠিক যেমন কালীর থানে বলির সময়, সিনান করিয়ে আনা ভিজা পাঁঠার কপালে সিঁদুর দিয়ে, কাটরায় মুড় ঢুকাবার আগু, ঠাকুর কানে তিনবার ফুঁক দিয়ে বলে, ‘বধে বধ!’ হামরাও তেমনিই ফুঁকি। আর তেমনেই বলে দিই। তার মানে? যে তুমাকে বধ করেছে—তুমাকে ভখা পেটে খাতে দেই নাই, জাড়ের দিনে নিজে কাঁথা-কম্বল নিয়ে তুমাকে একটা উঢ়বারও দেই নাই, দিনে-রাতে গঞ্জনা দিয়েছে, সংসারে খাটায়-খাটায় দুদন্ড জিরাতে দেই নাই—দগ্ধে দগ্ধে তুমাকে সাঁতায় মাইরেছে, তুমোও তাকে মার! হামি আর কুছুই জানি নাই বাপ। জানি মানুইষের ভিৎরেই দ্যাবতা আছে!’
ফটিক আর দাঁড়ায় না। চোড়কুর হাত থেকে ভেরিটা নিয়ে বলে, ‘যাক, যা আছে কপালে/তাই হবেক সকালে।’ বলে, লারাণকে সে টেনে নিয়ে ফরেস্ট মোড়ের রাস্তা ধরে। যেতে যেতে ফের বলে, ‘তাইলে চোড়কুদ্দা, বেলা পাঁচটাকে ঘুরব। বায়না ধরে আলকুশা যাছি।’
‘আলকুশা? স্যা ত বহুত ধূর? গয়াই লদীর অপারে।’
‘অপারে লয়, এপারেই। অপারে তুমার শুতানডি। তারও আগে কসাংগি-পুনদাগ-আনন্দনগর।’
‘হঁ-হঁ, বুদতে পাইরেছি। আর বলতে হবেক নাই।’
লারাণ বলে, ‘তাও বলছে যখন টুকু শুনে লাও। শুনতে ত তুমার বেটরি পুড়ছে নাই?’
চোড়কু হাসে। ফটিক বলে, ‘পরশু বাদ তরশুই ত আসর? আসরটাকে জমাতে হবেক।—চ চ।’
ফুর্তিতে লারাণ গেয়ে ওঠে, ‘বনের ফুল ঢাকা থাকে যত লতেঝুড়ে/যৌবন ফুল দেহে ফুটে মনে মহক উড়ে...’
ঠোঁটে বিষণ্ণ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চোড়কু। অনেক দূর অবধি ওদের চলে যাওয়ার পথটি দেখতে দেখতে, পুরো ঝুমুরটিই সে গুনগুন করে ওঠে—
হামাকে সেই মহকে মাতাল করে
ঘুরালি তুঁই ডুংরি ধারে
এখন চৈখে চৈখে ভাললে পরে খোবোর যাছে বিনা তারে
তুঁই ভালবাসার খাম্বা গাইড়ে দিলি লো অন্তরে —
মন কুলুকুলু করে হামার কুলুকুলু করে...
এই প্রস্তুতির সময়ে গ্রামের ছুটু ছুটু ছাগুলানের ফুর্তি দেখার মতো। তারা এমনিতেই লাগামছাড়া ছিল, ঘরে একদন্ড বাস ছিল না, এখন তো আরও বেশি মাকাচ্ছে। তাদের মায়েরা যখন ডাকে, কানেই নেয় না। কিন্তু তবু ডাকাহাঁকার বিরাম নেই। কিছুক্ষণ পরে-পরেই একেকটি প্রলম্বিত স্বরের ডাক শোনা যাচ্ছে। কখনো আমতলের দিক থেকে, কখনো রাহেড় বাড়ির দিক থেকে। কখনো শুকনো ঠা-ঠা রোদে খেতের আলে কিংবা আস্তাকুঁড়ের ঢিবিতে দাঁড়িয়েই—‘এরে এইইইই বেলবুঢ়ি! এইইই সুরধ্বনি!’
‘কন খালকে গেলি রেইইই রৈঞ্জা খালভরা!’
‘এৎ তপা! খাবি ন ভাতগিলা বিরালকে দিব? ঘরকে আয় তোকে ছেঁচব!’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
অধৈর্য হয়ে এইসব অনাদর বাক্যে ডাক দিচ্ছে ঘাসিবউরা। পেমলা, রমণী, সুশীলা, সুসারী, ভারতী, সমবারী এরা। আর ছেলেমেয়েগুলিও হয়েছে মস্ত ভেঁটর১৭। ডাক শুনেও রা দেয় না। মাঠে মাঠে গুড়গুড় করে ছুটে আরও দূরে পালিয়ে যায়। আবার কেউ কেউ পালটা সুরে জবাব দেয়। বলে, ‘এখন হামি নাই যাবঅঅঅঅঅ! চিৎভিৎ খেলছি!’ এই কারণে ঘাসি-বউরা আরও বেশি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে তাদের ছা-ছুদের নিয়ে। ঘরের সামান্য আঢ়ান-বাঢ়ান শোনারও কেউ নেই। রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক। আর এই সূত্রে তারা রাগ করছে মরদগুলানের ওপরেও। রাধেশ্যামখুড়ার বউ পেমলা উঠতে-বসতে বুঢ়াকে বাখান দিচ্ছে, ‘বুঢ়া বয়সে তুমার এত রিজ লাইগেছে? দুটা পালহা পাইড়ে আনতে ফুরসত হছে নাই? আর ইদিকে আসর-আসর করে গটা বেলাটা কাটাছে। কত ব্যস্ত! যেমন চাপাইটাঁড়ে ক-ন সারকেস পাটি আসছে। তেমনি!’
রাধেশ্যামখুড়া কী বলবে? তার খরখরি বউয়ের গালবাখানও সে এখন নির্বিবাদে হজম করে নেয়। দুটো দিন পেরিয়ে যাক। আসর শেষ হয়ে গেলে তা বাদে সে ইয়ার উচিত জবাব দেবে। এখন ঘরে বেশি লিয়াই-ঝগড়া করলে, আখিরে আসরের কাজে ক্ষতি হয়ে যাবে। যতই হোক, আসরে তার দায়িত্বও তো কম নয়। একটুকু যদি ক-ন উনুশ-বিশ হয়ে যায়, ত সেটা কাদের বদনাম? ধারপাশের যৎগুলা গাঁ আছে, এই যেমন গাড়াফুসড়া, শিবচড়কা, পত্তাপপুর, তানাসি, তুন্তা, ফস-ক, কাহান, জাহাজপুর, পটমপুটরা, বেলকুড়ি সব গ্রামের লোকই তো আসবে। শুধু তাই নয়, আড়ষা, চিটিডি, মানকিয়ারি, তড়াং, পলপল ইত্যাদিগ্রামের মানুষজনও দশ-বিশ জন করে আসতেই পারে। তাই লোকমুখে সব গ্রামে খোবোর পৌঁছে যাচ্ছে।—‘চৈলে আইস! চৈলে আইস! ঝাঁ গ্যাজাঘ্যান!’ তারা যদি দেখে যে, ঘাসিরা এত বড় আসর করে বিশ-পঁচিশটা ‘ভলান্টার’ও জোগাড় করতে পারে নাই, তখন কী বলবে? প্যাঁন্দা আসর! আবার কেউ কেউ বলবে, ইয়াদের ফুঁকা কর্মটাই ভালো। ইয়ারা অ্যাঁড়ের১৮ আসরের কুছুই জানে নাই। এই ধরনের বদনাম হলে প্রতিবেশী গ্রামবাসীদের কাছে মুরুব্বিদের মাথাগুলি হেঁট হয়ে যাবে না?
তারপর শিল্পীদেরও সম্মান দেওয়ার ব্যাপার আছে। মিটিনে ঠিক হয়েছে, আসর সন্ধে থেকে শুরু কর গটা রাত চলবে। মানে ভোর-ভোরকে ‘খেল খতম/পৈসা হজম!’ তার মানেই তাদের এক-পতরি করে খেতে দিতে হবে। বিশেষ কিছু না, ডিংলার ঘ্যাঁট আর খেঁচড়ি ঘাঁটা১৯? এটাই অনেক। চাল আন রে, ডাল আন রে, কুমড়া আন রে! কম ঝঞ্ঝাট? এখন আকালের সময়। ঘরের একপাই চাল দিতে হলেও মাথায় যেমন ‘বজ্জাঘাত’ হয়ে যায়। হঁ, এটা যদি পৌষমাস হত, তাহলে থোড়ুই ততোটা চিন্তার ছিল?
যদিও, তখনও যে ঘাসিরা তাদের খামারের ধান দিত, তা অবশ্যই নয়। তাদের তো নিজেদের কোনো চাষ নেই, জমিও নেই। তবু সে সময় তারা অন্যের খেতে কামকাজ করে বলে মজুরি বাবদ যে-ধানটা পায়, তার থেকেও দিতে পারত। কিন্তু এখন তো তা বললে হবে না। এখন আর ‘মুড়পুচকা’২০ দিবারও উপায় নাই। আসরের পাকা খোবোর বিনা তারে ডি-ডিহাত তক্ক চৈলে গেছে। তার মানে ‘ছাড়ঘরে’ যখন ঢুকে গেছ, দন্ড না দিঁয়ে পারাঙ্গত নাই!
তবে গ্রামের দশমুড় একঠিনে হয়ে যখন স্থির হয়েছে, তখনকে ইয়ার একটা ইন্তেজাম করতেই হবেক। তাতে যদি কারও ঘরে চাল এই মুহূর্তে না থাকে, যা থাকার কথাও নয়, তাহলে সে নগদেও ধরে দিতে পারে। যে-যা বায়না ধরছে, ঘাট থেকে ফিরে চালে-টাকায় যা পাচ্ছে, তার থেকেই কিছু কিছু দিতে হবে। নিজেদের কাজ যখন।
‘সারকেস পার্টি’র কথায় রাধেশ্যামখুড়া তলমুহে পুক-পুক হাসে। গ্রামে এখনো চারোতরফে রব উঠে যাওয়ার মতো জিনিস সার্কাস ছাড়া আর কিছু নেই। চাপাইটাঁড়ে অবশ্য কোনোদিনই সার্কাস আসেনি। চাপাইটাঁড়ে তো আসার প্রশ্নই নেই, এলে জয়পুরে। কিন্তু আজ অবধি জয়পুরেও তেমন বড় ঘটনা ঘটেনি। জেমিনি সার্কাস, রেমন সার্কাস ইত্যাদি সবই আসে পুরুলিয়ায়। রাসের সময়ে। তখন জয়পুরের অনেকে বাসে করে হোক বা বাজারের ছেলে-ছোকরারা ‘গাড়ি রিজাপ’ করে হলেও পুরুলিয়াতে গিয়ে দেখে আসে। ঘাসিদের সে-সৌভাগ্য কখনো হয়নি। তাদের সে-সামর্থ্যও নেই।
সার্কাসের নাম করাতে ‘অঁড়ররর’ শব্দে রাধেশ্যামখুড়ার গায়ের উপরে যেমন ঝাঁপায় এল পিঁজরার বাঘটি! এমনি ভাবেই সে চমকে ওঠে। তারপর হাসতে হাসতে বলে, ‘যে বসসরে জয়পুরে সারকেস আসবেক, হামি জড়ুর তকে নিয়ে যাব। সারকেস দেখাতে। দেখবি, পিঁজরার ভিতর ল্যা কেমন বাগ হালসাতে আসছে। আর হাপপ্যান পরা গরা গরা বিটিছাগুলান কেমন একচাখার সাইকেল চলাছে। হিটিগ ডিডিগ! হিটিগ ডিডিগ!’ বলে, সে খটখট করে হাসে। আর এভাবেই ঠাণ্ডা করতে চেষ্টা করে পেমলাকে।
ওদিকে পরীক্ষিৎ, শিশুপাল, বলিরাম এদেরও সেই একই অবস্থা। বলিরামকে তো তার বউ সুশীলা যেমন ‘বঁঠিন নিয়ে খাদাতে’২১ আসছে। কখনো ঝাঁটা নিয়ে রগদিছে২২। বলছে, ‘ওই বুঢ়াটার কথায় তোর অত লাচবার কী দরকার ছিল? উয়ার ঘরে গন্ডা পাঁচেক ঘুসুর আছে, বিকে বিকে পেট চলাবেক। উয়ার ব্যাটা জয়পুরে মটর গাড়িয়ে খালাসির কাম করে। উয়ার কিস্যার ভাবনা? বায়না ধরে উয়ার ছ্যেলাপুলা কি চাল-চিড়ার আশে পেট দাবড়ি দিঁয়ে বসে আছে? তবে?’
‘তা বলে গাঁয়ের ভিৎরে লাচখেল হবেক নাই? ঘাসিদেরও সাধ-আহ্লাদ আছে ন?’ বলিরাম বলে, ‘খাইটে খাবার লাইগে ত গটা জীবনটাই পড়ে আছে। ঘাসির ঘরে জন্মেছি, সুয়াং না খাটায় উপায় আছে? তাও ত গাঁয়ে কোবো কুছু হয় নাই। আজ যখন হছে ত হোক ক্যানে। এই মাঁইঞা মানুইষকে পরিহরি! হরেক কাজে মরদকে ন্যাজে ধরে পেছুদিগেই টানবেক।’
বলিরামের কথা শুনে, উঠোনে গোবর দিতে দিতে, না হেসে পারে না ভারতী। হাতে বাঁশের ঝাঁটা নিয়ে সে এমনভাবে তার দিকে তাকায়, যেন আর একটি রা কাড়লে সে তার মরদটিকে ঝাঁটায় মরাবেক। হাসতে হাসতে বলে, ‘হামি তোকে ন্যাজ ধরে টানছি? কবের ল্যা তোর ন্যাজ বেরাল? দেখা ন।’
‘ওই যেদিন ল্যা তকে বিহা করেছি।’
মেয়েরা যতই রাগারাগি করুক না কেন, তারাও যে ব্যাপারটা উপভোগ করছে না, তা তো নয়। তাদের মরদগুলোর আমতলে ভিড় করা, আড্ডা-শলাপরামর্শ করা, চুটির ধোঁয়া, হইচই করা—আবার ওদিকে রৈঞ্জা, মদ্দৈনা, বেলবুঢ়ি, সুরধ্বনি, ডোড়োতি ইত্যাদি বিচিত্র নামের ছেলেমেয়েগুলোর ফুর্তি বেড়ে যাওয়া, আরও বেশি অবাধ্য হয়ে-ওঠা এবং যতটা সম্ভব ঘরের বাইরেই পড়ে-থাকা—এইসব থেকে গ্রামের একটা অন্যরকম পরিবেশ যে গড়ে উঠছে তা বেশ টের পাওয়া যায়। সর্বত্রই চলছে জল্পনা-কল্পনা, কথায় কথায় ঠাট্টা-তামাশা-হাসোল্লোভী। আর যখন-তখন ভাঙা-আধভাঙা গলায় ঝুমৈরের কলি হাঁকানো। মনে হয় চাপাইটাঁড়ের প্রতিটি মানুষের মনে—তা সে ঘাসিবউ হোক, মরদ হোক বা শিশুই হোক, ভেতরে ভেতরে জমে উঠেছে আসরের রং।
পুরুষদের মতো করে নয়, ঘাসিবউরা নিজেদের রঙকে অন্যভাবে প্রকাশ করে। যেদিন থেকে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, আসরের, তারা আরও বেশি বেশি তাদের স্বামীদের সঙ্গে বোলচাল শুরু করেছে, কারণে-অকারণে ছেলেমেয়েরা মায়ের ডাকে সাড়া না দিলে প্রতিবেশী ঘাসিবউকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে ওঠে, ‘ওঃ! কবে য্যা এই ল্যাঠাটা চুকবেক! জীবনটায় যেমন খিজলান্তি ধরে গেল! ওহোহোহো!’
‘কী হৈল গো পেমলাদিদি? কিস্যা খিজলান্তি ধরে গেল?’
‘নাআ ধন। মনে হছে কবে যে ইটা ফুরাবেক। আসর ন ফাসর!’
‘এখনি ফুরাবেক? এখন ত শুরুই হৈল নাই। আগু শুরু হতে দাও!’
‘ধুর-ধুর-ধুর! লেহোর করছি। গলায় কাপড় লিছি! এমন জিনিস যেমন চাপাইটাঁড়ে কোবৌ না হয়। হামি ঠাকুরকে বলছি, হে ঠাকুর, আসছে ভাও পরবে...’ বলতে গিয়েও থেমে যায় পেমলা। গ্রামদেবতার থানের দিকে তাকিয়ে সে মানসিক করতে গিয়েছিল। হয়তো বলেই ফেলত, ই-বছর যদি এই আসর বন্ধ হয়ে যায়, যদি তা আর এই গরিবদের গ্রামে কখনো না হয়, তাহলে সেথানে ‘জড়া জীব’ দেবে।
‘জীব’ বলতে কোনো পশু নয়। পুজোয় পশুবলি দেওয়ার মানত করলে তা রক্ষা করা তাদের অসাধ্য। তাই ভাও পরবেও ছাগল, ভেড়া ঠাকুরথানে বলি দেওয়ার রেওয়াজ প্রায় নেই। তারা যা দেয়, তা হল, পায়রা। বাকুম-বাকুম।
কিন্তু পেমলা এখন পায়রা দেওয়ার মানত করে না। সে তো চায় না ঠাকুরথানে মানত করে এই আসর চিরতরে বন্ধ করে দিতে। ভেতরে ভেতরে সেও চায় এটা হোক। গ্রামের সবাই তা চায়। চায় এই একঘেয়ে, বিরক্তিকর, দারিদ্র্যপূর্ণ, রোঁয়া-ওঠা জীবনে, অন্তত দুটি-একটি দিনের জন্য হলেও বৈচিত্র্য আসুক। ঘাসিদের মনে রং লাগুক, ঝুমৈরে ঝুমৈরে ছয়লাপ হয়ে যাক চাপাইটাঁড়। মাদলে প্রতিধ্বনি উঠুক রাঁই রাঁই! ছোনাচের ধামসার ধাধসে তাদের ছোটো ছোটো মাটির ঘরগুলির পলকা দেয়ালের গা থেকে ঝরে ঝরে পড়ুক প্রাচীন ‘গুলাচ’ মাটি। জীবনের এই প্রাচীনত্ব যে অসহ্য হয়ে উঠেছে!
তৎসত্ত্বেও ঘাসিবউদের এই আপাত বিরক্তি, রাগারাগি, আসলে তাদের তৃপ্তিদায়ক অসহিষ্ণুতারই অভিব্যক্তি। সংসারে ছোটো-মোটো কাজও থাকে হাজার-একটা। এই যেমন-ঘুসুরপালকে খোঁয়াড়ে ডহরায় নিয়ে আসা, তাদেরকে ফের সকাল হতে-না-হতে খোঁয়াড় থেকে বের করে দেওয়া, খোঁয়াড়ের লাদ-গোবর-রোঁয়া ঝেঁটিয়ে বের করে খোঁয়াড় সাফসুতরা করা, ভেড়ি-বকরির জন্য পাত-পালহা পেড়ে আনা, সময়ে সময়ে পাল খাওয়াতে নিয়ে যাওয়া, মাড়ের সঙ্গে সজনে শাগ খেতে মন গেলে, মদ্দৈনার মতো কোনো ছুটু ছা-কে ল্যাদা গাছে উঠিয়ে কচি কচি দুটো-চারটে ডাল ভেঙে আনা, মুতা কাঁথা-বিছনা উঠোনে দড়ির খাটে মেলে রোদে দেওয়া এমনি ফালনা ফালনা বহুত কাজ। এইসব কাজের জন্যও যখন কাউকে ডাকলে পাওয়া যায় না, তখন বিরক্ত হয়ে ওঠাটাও কি অস্বাভাবিক?
হেঁসেল সামলানো থেকে শুরু করে সংসারের অনুকুট্টির কাজ তো ঘাসিবউদেরই সামলাতে হয়। তবু, বেলাডুবুর পরে-পরে, যখন দিনের কাজ-পাট চুকে যায়, তখন তারাও দু-দন্ড হায় করে বসে। ঘর্মাক্ত আঁচল গা থেকে ফেলে দিয়ে দুটো হালকা গল্প করার অবকাশ পায়। তখন আবার এই ঘাসিবউরাই অন্যরকম। তাদের কথোপকথন থেকেও বোঝা যায়, তারাও চায় এই উৎসবের পরিবেশটাকে তাদের কর্মব্যস্ততা, খাটাখাটুনি আর তুচ্ছ লিয়াই-ঝগড়ার মধ্যেও উপভোগ করতে।
বেলাডুবুর পর দিনের আলহা কমতে শুরু করে। তখন বাতাসের উত্তাপ গায়ে ততটা অনুভূত হয় না। সারাদিনের নিরবচ্ছিন্ন তাপ বিকিরণের পর সূর্যও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ধ্বস্ত ও পঙ্গু দেয়ালগুলির মাথা থেকে টপকে, উঠোনে ট্যাঁড়রানো২৩ দড়ির ছেঁড়া খাট থেকে, আঙিনা থেকে অবসন্ন রোদ ঘষড়িতে ঘষড়িতে পেপে গাছের তল পেরিয়ে, আস্তাকুঁড় পেরিয়ে, শস্যহীন রুক্ষ ধানখেতগুলি পেরিয়ে ঢের ফারাকে চলে যায়। তখন, উঠোনে হড়াস হড়াস করে খাট পাতে ঘাসিবউরা। শুরু হয় তাদের বৈকালিক প্রসাধন।
প্রসাধন বলতে আর কিছুই নয়, চুল আঁচড়ানো আর পরিপাটি করে বিনুনি করা, খোঁপা করা, মাথা বাঁধা। কাঠের চিরুনি দিয়ে তখন এক ঘাসিবউ অরেক ঘাসিবউয়ের পিঠ ঘেঁষে দু-হাঁটুর ভরে উঁচু হয়ে বসে, কাঠের চিরুনি তার মাথায় ডুবিয়ে লম্বা লম্বা করে চুল ছাড়িয়ে দেয়। লিকি বেছে দেয়। উকুন মেরে দেয়। খোঁকৈরে খোঁকৈরে২৪ ভাঁড় থেকে যদি এক-আধ দসান২৫-ও তেল বেরোয়, তাহলে সেই তেল বড়ো সুন্দর করে সারা মাথায় বুলিয়ে দেয়। আর এই পরিচর্যা চলতে চলতেই, এক ঘাসিবউ তার চুলের টান নিয়েই আড়চোখে আরেক ঘাসিবউয়ের দিকে তাকিয়ে কত গল্পই না করে যায়।
চোড়কুর ঘরের উঠোনেই আজ চার-পাঁচটি খাট পড়েছে। পেমলা, সরলা, সুসারী, রমণীরাও এসে জড়ো হয়েছে সমবারীর আঙিনায়। পুরোদমে চলছে তাদের কেশচর্চা আর সেইসঙ্গে মরদদের নিয়ে মেয়েলি ঠাট্টা-তামাশা। তারই ফাঁকে ফাঁকে আসরের প্রসঙ্গ।
সমবারীর ঘরে প্রায় দিন বিকেলের দিকে এই আসর জমে ওঠে। তারপর যেই আঁধার নামবো-নামবো করে, গোধূলির সূর্য ঘাসিবউয়ের কপালের সিঁদুরের মতো চহট হয়ে, কাদাখেতে ঘাসি-কিশোরের মতো, যখন দিগন্তে ‘উলফা’ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে, যখন সেই আলোর দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে তালচটি, তখন ঘাসিবউরাও যে-যার ঘরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। কিন্তু সে তো পরের কথা। তার আগে?
নেঙা-হাতে২৬ চুলের গোছটাকে ধরে, ডানহাত দিয়ে পেমলার মাথায় চিরুনি ডোবাচ্ছে মঞ্জুলা। জোরে আঁচড় কেটে যাওয়ায় পেমলা চেঁচিয়ে ওঠে। বলে, ‘হাই মরাল গৌ! অত জোরে না গবচাস ন ধন! তুঁই যে রকত বার করে দিবিস!’
‘কই জোরে দিই?’ মঞ্জুলা বলে, ‘চিরুনটারেই দোষ। ইয়ার দাঁতগিলা দেখছিস নাই কেমন বাবলা কাঁটার পারা।’
‘সমবারীর চিরুনটা লে ক্যানে।’
সমবারী তখন চুলের গোছ ধরে দাঁত দিয়ে চুলে টাসেল বাঁধতে ব্যস্ত। চোখের ইশারায় খাটের দড়িতে পড়ে-থাকা শিংয়ের চিরুনিটা দেখিয়ে দেয়। খোঁপা বাঁধা হয়ে গেলে, সুসারীকে বলে, ‘ক্যানে তুঁই উয়ার রকত্ বার করে দিছিস? রকত্২৭ বেরালে তখনকে উয়ার মরদটায় দমে খিজলাবেক।’ সমবারীর এই কথার মধ্যে গূঢ় যৌন ইঙ্গিত থাকায় হাসে পেমলাও। বলে, ‘নাই নাই। হামার মরদের এখন উদিগে মনেই নাই।’
‘নাই?’ ভারতী জিগ্যেস করে, ‘গটা রাতটায় তাইলে কী করে?’
‘তোর মরদের পারা কি হামার মরদ বঠে? হামার মরদ বুঢ়া মরদ। তাও ত এখন ঝুমৈর শুনবার লাইগে আসর-আসর করে মাথা পাগল হঁয়ে যাছে। ঝুমৈর পালে আর কুছু খুজবেক নাই।’
সরলা বলে, ‘তাইলে কেমন মরদ বঠে তোর? হামার মরদকে যদি বলি ত কিসোতৌ ও মানবেক নাই। বলবেক—দিনের বেলি ঝুমৈর আর রাতের বেলি ডুমৈর।’
সরলার কথা শুনে আবার হাসির রোল ওঠে। তাকে সমর্থন করে মঞ্জুলা, রমণী। বলে, ‘তুঁই ঠিকেই বলেছিস-বা। মরদ মানুইষের স্বভাবটাই অমনি। লুচকা-লুচকি২৮ করা স্বভাব’
‘হঁ ভাই। মিছা বলব নাই। হামার মরদ আধারাতে হলেও ক্যুঁচে ক্যুঁচে উঠাবেক। বলবেক, এ গৌ, উঠ ন গো। জলের ঘটিটা পাছি নাই। টুকু খুজে দে ন। তাবাদে উঠে কে-কাকে জলের ঘটি দিবেক? হামি উয়াকে জল খাওয়াব কি, উলটা উয়েই হামকে জল খাওয়ায়!’
‘ধুর! ধুর!’ হাসতে হাসতে পেট ছিঁড়ে যায় পেমলার।
‘ঠিকেই বলেছিস ধন। তার হতেই বলে নাই—’ সমবারী গেয়ে ওঠে, করম নাচের গানের দুটি পঙক্তি—
এত যদি ছিল মনে আগু না বলিলি ক্যানে
ঘুমের ঘোরে ছঁড়া খেঁচরায় উঠালি মোরে...
গানটির ভাবের মধ্যে লোকজীবনে যৌন আবেদন তথা অনিবার্য সংগম-লিপ্সার প্রতি অকপট ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে ঘাসিবউরা তা বেশ উপভোগ করে। মুখ লুকিয়ে গুব গুব হাসেও। তাদের দাম্পত্য জীবনে এমনটা ঘটেই থাকে। সমবারীর গাওয়ার মধ্যে, তার চাপা-চাপা উচ্চারণের মধ্যেও সেই আবেদনে সাড়া দেওয়া অথচ ঘুম থেকে উঠতে না চাওয়ার সুখকর দুর্বল প্রত্যাখানটি অন্যমাত্রায় প্রকাশ হয়ে পড়ে। এবং সেটাই তাদের পরিবেশকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলে।
গানটি যে গাওয়ার মতো করে সমবারী গেয়েছে, তা বলা চলে না। এমন গান গলা খুলে প্রকাশ্যে গেয়ে ওঠা যায় না। ঘরের সামনে আনাগোনা করছে পুরুষমানুষ। তবে সমবারীর ঘরে এখন কোনো মরদ নেই। মরদ বলতে, চোড়কু নেই। বড়বিটি ডোড়োতিও এর-ঘর তার-ঘর বুলে বুলছে। হয়তো তার বয়সি জোসনা, ফুলটুঙি কিংবা কুঁড়চির কাছে গিয়ে গল্প করছে। হয়তো তাদের কারো ঘরে ঢেঁকিতে পাড় দিতে দিতে, নিজের বিয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই, গ্রামীণ বালিকাসুলভ হাসাহাসি করছে আর নুন দিয়ে দিয়ে খাচ্ছে—মদ্দৈনা বা কুশধ্বজের মতো কোনো দুরন্ত ‘ফোরোয়াড়’ ছেলের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেওয়া ‘কুহুপাদা’ আম।
গানটি আরও একবার শোনাতে বলে ভারতী। শোনানোর মধ্য দিয়ে সমবারী নিজেও রসাস্বাদন করে গানটির। হাসে। অন্য সময় এই সমবারীকে দেখলে মনে হয় না যে, সেও এতখানি আমুদে। এত রসিক। ব্যাটাবিটি আর মরদের মাঝে যখন সে থাকে, তখন কেমন গম্ভীর-গম্ভীর দেখায়। মুখটা অলমে থাকে। কথায় কথায় ছা-গুলানকে খিজলায় আর চোড়কুর সঙ্গে মনে হয় সারা দিনটার ভিৎরে বড়জোর দু-চারটি কথা বলে। তাও খুব প্রয়োজন পড়লে তবেই।
চোড়কু নিজেও তেমন কথাবার্তা বলে না। সব-সময় সে অন্তর্মুখী হয়ে রয়েছে। তবে আগে আগে খুব বলত। ঠাট্টা-রসিকতা করত। এখন যতদিন যাচ্ছে, সে আরো আরো বেশি করে নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছে। হয়তো সে-কারণেই সমবারীর মধ্যেও একটা আপাত গাম্ভীর্য লক্ষ করা যায়। কিন্তু এখন সমবারী যেন নিজেকে পুরোপুরি উন্মোচিত করে উপভোগ করতে চায়। আর পাঁচজন ঘাসিবউয়ের মতো।
ভারতী বলাতে সমবারী আরেকবার ওই গানটি শোনায়। কিন্তু সে বলে, ‘হামি একাই শুনাব? তরাও একটা করে শুনা। তবে ন।’
‘ঠিকেই বলছে সমবারী।’ ভারতী বলে, ‘দেখ ভাই, কৌ তরা বেমান্টি করিস না। সবকাইকে একটা করে করম আর নাই ত টুসু গাঁইহে দিতে হবেক। দিবি ন?’
পেমলা বলে, ‘এখন ত বৈশাগ পড়েছে। এখনি তরা করম গায়বিস? ভাদর মাসটা পড়তে দে। কথায় বলে, যে-সময়ের যে-জিনিস। আষাঢ় মাসে কৌ নিমছেঁচকি খায়, ন পোষ মাসে গোগলি খায়? বল ন ভালা!’
পেমলার কথা সত্যি হলেও, করমের ব্যাপারে তা খাটে না। এই গানের ভাব, ভাষা, লোকায়ত আবেদন এতটাই আন্তরিক যে, যে-কোনো সময় তা মানুষের মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। বিশেষ করে মেয়েদের কাছে এই গান কখনো কোনো মুহূর্তে অনাদৃত হতে পারে না। আখেরে সবাই তাতে রাজি হয়ে যায়। হ্যাঁ, সবাই। গ্রামের কোনো মেয়ে করম-টুসু দুটো-চারটে জানে না এটা সচরাচর দেখা যায় না।
করম তো লোক-জীবনের গান। সাধারণত ভাদর মাসের মাঝামাঝির মধ্যে এই অঞ্চলে ধান রুয়ারুয়ি হয়ে যায়। রোদ-বৃষ্টি পেয়ে আফরগুলি ফনফন করে বাড়তে থাকে। এমনি সময়ে, ভাদর মাসের শুক্লপক্ষে পর্যাপ্ত ফলোৎপাদনের প্রত্যাশায় ‘জাওয়া’ নামের একটি শস্যোৎসবের আয়োজন চলতে থাকে, গ্রামে গ্রামে। শুক্লপক্ষের প্রথম দিনে কুমারী মেয়েরা একটা বাঁশের ডালার মধ্যে বালি দিয়ে, এই অঞ্চলে তারা যেসমস্ত শস্য ফলায় তার বীজগুলি কাঁচা হলুদ-জলে রাঙিয়ে, সেই বালির মধ্যে অঙ্কুরোদগমের জন্য রাখে। এরপর একাদশী পর্যন্ত প্রতিদিন তারা ওই ডালাটিকে কেন্দ্র করে নৃত্যগীত পরিবেশন করে। ইতিমধ্যে বীজগুলি অংকুরিত হয়। নৃত্যগীত আসলে চারাগাছগুলির বন্দনা। একাদশীর দিন হয় করমঠাকুরের ব্রত উদ্যাপন। কুমারী মেয়েরা করমঠাকুরের পূজার জন্য ফুল তুলতে বনে যায়। তুলসী তলায় ফুল রেখে, দিনভর নির্জলা উপবাসে থাকা মেয়েরা, যাদের ‘পার্বতী’ বলা হয়, স্নান সেরে খেত থেকে নিয়ে আসে নবীন ধানের সবুজ পাতা। করমঠাকুরের পদতলে অঞ্জলি দিতে। তারপর ওই ফুল, ফল ইত্যাদি থালায় সাজিয়ে, প্রদীপ জ্বালিয়ে করমঠাকুরের পূজা দিয়ে তারা গ্রামের সেই বাড়িতে যায়, যে-বাড়িতে করম-ডাল গাড়া হয়েছে। এই ডালটিই হল ‘করমঠাকুর’।
পার্বতীদের থালায় ফলের মধ্যে থাকে একটি সবৃন্ত বা ‘বঁকওয়ালা’ কাঁকুড়, যা তাদের কাছে পুত্রের প্রতীক। এখানে করমঠাকুরের পূজার জন্য থাকে গ্রামের পুরোহিত বা ‘লায়া’। লায়া ব্রতকথার মাধ্যমে করমঠাকুরের ব্রতের মাহাত্ম্য তাদের বুঝিয়ে দেয়। সারারাত ধরে চলে নাচ-গান। পরদিন সকালেও ‘জাওয়া’ ঘিরে পার্বতীরা নৃত্যগীত পরিবেশন করে। গ্রামের বৃদ্ধরা সেখানে জড়ো হয়। বেলা হলে তারা এই পার্বতীদের আগামী দিনে পতিগৃহে গিয়ে দাম্পত্য জীবন যাপনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এদিন করম-ডালটিকে নদী-পুকুরের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। আর হলুদ-রাঙানো চারাগাছগুলি বাঁশের ডালা থেকে নিয়ে ধানের গোলায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভক্তিনম্রভাবে। তাতে পরের বছর শস্যে তাদের গোলা পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে তাদের বিশ্বাস।
বলা বাহুল্য, করমঠাকুরের গানে অবিবাহিত মেয়েদের ভূমিকাই মুখ্য বলে, গানের কথাবস্তুর মধ্যে মেয়েরা তাদের দুঃখ-যন্ত্রণা, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, প্রেমহীন নারীজীবন তথা গ্রামবাংলার কর্মমুখর নারীর বিষণ্ণ অবয়বটিকে তুলে ধরে।
প্রথমে শুরু করে মঞ্জুলা। গাওয়ার আগে, লজ্জা লজ্জা মুখ করে সে জিজ্ঞেস করে পেমলাকে, ‘এ পেমলাদিদি, দে ন বলে। কনটা শুনাব?’
‘হামি নাই জানি ধন!’
‘বাব্বা! তুঁই নাই জানিস? ই-বস্সর করমঠাকুরের পূজার দিন হামরা আর গাইভই নাই। সোব তকে গাইতে হবেক।—ই বহুত করম গান জানে।’
‘উ জানে ত তোরকী লো বাপভাতারী?’ ভারতী বলে, ‘তোকে গাইতে বলছে তুঁই একটা গাঁহে দে ক্যানে? ওই য্যা ওইটা—বাগাইলা রে বাগাইলা...’
উল্লিখিত গানটি তাদের সকলের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। প্রথম কলিটি ধরিয়ে দিতেই বউগুলি কলকল করে হেসে ওঠে। হাসার কারণও আছে। আসলে এই গানটিতে গোরুবাগালের প্রতি গৃহবধূর নিরুপায় প্রেম ও তার প্রেমজনিত প্রবল আকর্ষণ, অমিলনের যাতনা তথা নিরুপায়তার বর্ণনা কাব্য-সুন্দর রূপে বর্ণিত হয়েছে। এর বাস্তবতা এতটাই অবিকল এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রেক্ষিতকে এই গানে এমন সজীবতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে যে, তা একদিকে যেমন কাব্যিক রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি এই চিরন্তন সম্পর্কের বাস্তবতাও অত্যন্ত মর্মিক হয়ে উঠেছে।
‘হঁ, হঁ। মনে পড়েছে।’ সুসারী বলে। তারপর সে খাটের ওপরে জানু দুটি নড়াচড়া করে আরও জুত করে থাপসি গেদে বসে। রমণীর মাথায় কাঠের চিরুনি ডুবিয়ে, চুলের ভেতর দিয়ে লম্বা লম্বা টান দিতে দিতে গাইতে থাকে—
বাগাইলা রে বাগাইলা, বাঁশিয়ায় দিলি শান রে
কী করে বাইরাভ বাগাইলা—
ঢেঁকিশালে ধান রে...
প্রধানের সঙ্গে রাস্তাতে দেখা। পত্তাপপুর থেকে সে ফিরে আসছিল ফটফটি করে। এখন চাঁপাইটাঁড় হয়ে দেড়-দুশো গজ যাবে, গাড়াফুসড়া।
প্রধানের ফটকটি যখন শ-গজ ফারাকে, তখন থেকেই বাঁ-হাতটি শূন্যে হাপরের মতো উপর-নীচ করে, গাড়ি থামানোর নিশানা দেখাতে লাগল লারাণ মাছুয়ার আর বলিরাম ঘাসি। গাড়ি খাল-ডোবে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসতে থাকে। তাদের প্রায় গা-ঘেঁষে ব্রেক কষতেই, তারা দু-হাত পেছিয়ে যায়।
বলিরাম বলে, ‘উল্টু খুড়া! তুমার সঙে হামাদের একটা জরুরি-আর্জেন কথা আছে। তুমি—’ তর্জনীর কলে বুড়ো আঙুল ঠেকিয়ে দেখায়, ‘অ্যাল্প ডাঁড়াও।’
‘কী কথা? তোদের সেই আসরের নিয়ে? আসর কবকে হছে?’
‘আজ কী বার? বুধোবার? ত বুধোবারের পরে গুরুবার? গুরুবারের পরের দিনেই—তার মানে শুক্কর বারেই হামদের আসর। সেই আসর নিয়েই তুমাকে একটা জরুরি জিনিস বলবার আছে। তুমি দু-মিনিট এই আমতলে তুমার ফটফটিটা ট্যাঁড়রায় দাও। তা বাদে বলছি। সেরেফ দু-মিনিট।’
‘হঁ ত বন ন রে ক্যালার! কী তদের বৈলবার আছে?’
‘বলছি, বলছি!’ বলিরাম এদিক-ওদিক তাকিয়ে চাপাইটাঁড়ের অন্যসব ঘাসিদের দেখার চেষ্টা করে। যদি অন্তত চোড়কু, গতিককিষ্ণ, ফটিক এমনি দু-একজনকেও পাওয়া যায়। ধারেপাশে তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
দূরের আমতলগুলিতে ছোটে ছোটো ঘাসি-ছেলেদের ভিড়। তারা হইচই করছে। ঢ্যালা ফাবড়াচ্ছে। কচি কচি আমগুলোকে সিলে ছেঁচে নুন-মরিচ দিয়ে ‘ছেঁচকি’ করে খাওয়ার জন্য দুহুরে নামাচ্ছে। কোনো খেতের আলে পলাশ গাছের ছায়ায় ছা-ছু নিয়ে জিরিয়ে নিচ্ছে অভুক্ত শূকরী। গ্রামের ভেতর দিয়ে, গোরুর গাড়ির চাকা গড়াতে গড়াতে, গল্প করতে করতে, চলে যাচ্ছে দুই গ্রামবাসী। এরা নিশ্চয় উপর-কাহানের লোক। নামো-কাহানেরও হতে পারে। হন্যাটাঁড়ের মোড়ে পশু কামারের কাছ থেকে গোরুর গাড়ির চাকা দুটোতে লিঘা লাগিয়ে ফিরছে। চাষবাসের সময় তো এল বলে। একটা বড় বর্ষা নামলেই খেতে হাল নামাতে হবে। যদিও বর্ষার কোনো পূর্বাভাস নেই। রাত্তিরের দিকে দু-একদিন অবশ্য আকাশে মেঘ ঘনিয়েছে। তারপর মহুল পড়ার মতো ইখেনে-সেখিনে দু-দশ ফোঁটা পড়ে থেমে গেছে। তাহলেও বর্ষা নামতে আর কত দেরি? তার আগে সরঞ্জাম সব মজুত রাখতে হবে বলে এখন গ্রামবাসীদের কখনো চাক নিয়ে, কখনো ঝালমামড়ার হাটে নতুন হাল-লাঙল কিনেও কাঁধে করে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
‘কই রে বাবু? তুঁই অমন হা-ফাইড়ে কী দেখছিস?’
প্রধানের কথার জবাব দেওয়ার আগে, ঘাড় ঘোরাতেই সে দেখতে পায়—চালের মাথায় উঠে, চোড়কু, তার জরাজীর্ণ চাল ছাইছে। নিচের থেকে সমবারী তাকে ধরিয়ে দিচ্ছে একটা করে আটি। চালায় গুঁজে দেওয়ার জন্য বাতার গোছাও চোড়কু রেখেছে তার পায়ের কাছে।
‘এচ্চোড়কুদ্দা! এ এ এ এ এ এ ই! হা ভাল, হা ভাল! ইধারে ভালবে ন—’ বলিরাম এখান থেকেই তর্জনী দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে দেয় প্রধানকে। হাতে ঝটকা দিতে দিতে বলে, ‘নামো, নামো তুমি টুকু।’
লারাণ মাছুয়ারও চেঁচিয়ে বলে, ‘তুমি না হয় দু-মিনিট বাদেই চালটা জুতাবে। এখন নাই য্যা জল পড়ে। বতরটা বুঝবে ন? বহুত ভাগ্য ভাল য্যা হামরা এমন লিরিবিলিতে পর্ধান সাহ্যাবকে পাঁইয়েছি!’ লারাণ মাছুয়ার প্রধানকে একান্তে পাওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ আর হাতছাড়া করতে চায় না। এমনিভাবেই খাঁকায়-মাকায় সে ডাকতে থাকে। যেন তার হাতসানের জোরেই চাল থেকে চোড়কুদ্দা ধাঁ করে এসে পড়বে পর্ধানের ফটফটির কাছে। এতই তার অঙ্গ সঞ্চালনের ক্ষিপ্রতা। বলে, ‘ডাঁড়ায় আছে। একদম বিলম্বি নাই—ছুটে আইস, দৈঁড়ে যাবে।’
চোড়কুও দেরি করে না। চাল থেকে সে দেয়ালে পা দিয়ে ঝপ করে হুমচে নামে। লাইবুকুর তলে লুঙ্গি আঁট করতে করতে এসে হাজির হয়। আসে গ্রামের আরও কেউ কেউ। ছেলেরাও জড়ো হয়। ফটফটির আকর্ষণে। তারা ঘুরেফিরে প্রধানের ঝকঝকে গাড়িটিকে দেখে। বিশেষ করে দেখে গাড়ির চাক দুটি।
সত্যি বলতে কি, এই চাক জিনিসটাই কেবল তাদের কাছে পরিচিত। হয়তো সে ভাবে গাড়ি তারা কখনো দেখেনি। কাছ থেকে। গাড়িতে চড়া তো দূরের কথা। কিন্তু তৎসত্ত্বেও ‘চাকা’ তারা দেখেছে। সাইকেলের চাক, গোরুর গাড়ির চাক। চাপাইটাঁড়ে ঘাসিদের চাষবাসের তেমন রেওয়াজ নেই। তবু দু-একটা গোরুর-গাড়ি এখনো রয়েছে। হয়তো দূর অতীতে কোনো ঘাসির এক-আধখন্ড ধানিজমি ছিল। চাষের কাজের জন্য তাই গাড়িও সে রেখেছিল। এখন গাড়িটুকুই অবশিষ্ট রয়ে গেছে। গোরু নেই। চাকগুলিও সে চুরির ভয়ে খুলে রেখেছে ঘরে। এমন একটি গাড়ি, যাকে বলে, ‘উদল’, প্রায় সারাবছর মুখথুবড়ে পড়ে থাকে গতিককিষ্ণর ঘরের সামনে।
চোড়কুর বাবা, কিংকর ঘাসি, যে পেটফুলে মারা যায় এবং যার পেটের ভেতর ‘বহুত কথা’ রয়েই গিয়েছিল, সে তার জীবদ্দশায় এই ‘চাক’ নিয়ে ‘অজব অজব’ কথা বলত। সে গ্রামবাসীদের বলত, ‘এই চাককে তরা যে-সে মনে করিস না। গটা পিত্থিমীটা চলছে চাকের উপরে। এই দেখ ক্যান্নে—গাঁয়ে-ঘরে চলছে গো-গাড়ির চাক, শহরে চলছে মটরগাড়ি আর ফটফটির চাক, আর তার ল্যা বড় শহরে—যাও দেখে লিবে—কৈলকাতা-হিল্লি-দিল্লিয়ে গটা আসমানটায় চাঁইপকপক উড়ছে উড়াকল, যার গুলগুল্লার পারা ছুট ছুট চাক। তাইলে? এই চাকেই মানুইষকে মাটির ল্যা আসমানতক নিয়ে যাছে। আজ যদি মানুইষ এই চাক না বেনাতে পারত?’
খুব মোটা করে, বললেও, জগমহন হয়তো বলতে চেয়েছিল যে, মানুষের মাথায় যদি এই চাকা তৈরির ভাবনা না আসত, তাহলে কি এমন দ্রুতগতিতে মানুষের সমাজ ও সভ্যতা প্রগতির মার্গ ধরে এগিয়ে যেতে পারত? মানুষের ভাবনায় চক্র থেকেই তো গতির উদ্ভব। এই ঐতিহাসিক উদ্ভাবনে গোরুর গাড়ির চাকাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখতে হবে। যদিও হাজার হাজার বছর আগে, মানুষের মনে এই চাকা তৈরির ভাবনা আসে গাছেরগুঁড়ির চক্রাকারে গড়িয়ে যাওয়া থেকে। সেই আদিম চাকাই মানুষের সমাজে, জীবনে, সভ্যতায় নিয়ে এসেছে গতি। এখনও সেই গতি অব্যাহত। চাকা ঘুরেই চলেছে।
প্রধানের ফটফটির চাকায় লেগে রয়েছে একলাদ গোবর। এমন সুন্দর চাকে গোবর দেখে, ঘাসি-ছেলেমেয়েগুলোর ইচ্ছে হয় ভেঁড়রি খাড়ি দিয়ে সেটা সরিয়ে দিতে। সাহস পায় না।
রোদে ফটফটি চালিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে প্রধান। তার ঘাড়ে-গলায় বিজবিজ করছে ঘাম। রোদের তেজটাও দিন দিন বাড়ছে বৈ কমছে না। প্রধান মাঠের দিকে তাকায়।
ফটফটির স্টার্টটা সে বন্ধ করেনি। বলিরামের মনে হয়, চোড়কুদ্দা এখানে আসার আগেই যদি সে ‘বাদে কথা হবেক’ বলে চলে যায়? সে প্রধানকে কথায় কথায় দু-দন্ড ভুলিয়ে রাখে। বলে, ‘মানুইষে যা করছে স্যা ত করছেই। তার উপরি হাই দেখ—আসমানও হামদের টেকতে দিছে নাই। আজ বল ন, বৈশাখ মাসের কদ্দিন হঁয়ে গেল? একফঁটাও পানি বর্ষিছে? নাই। তাইলে হামরা জ্বলে-পুড়ে নাই খৈরে যাব?’
প্রধান সিটের ওপরে বসে বসে অন্যমনস্কভাবে মাথা হিলায়। বোঝা যায় তার মন পড়ে আছে গাড়াফুসড়ায়। কিন্তু তাহলেও, বলিরামের প্রথম কথাটা তাকে আচমকা থাপ্পড় দিল। সে ফের জিজ্ঞেস করে, ‘কী বললিস? মানুইষে যা করার করছে? কী করছে মানুইষে? কন মানুইষে কী করেছে তদেরকে?’
‘নাই নাই। ইটা মানে একটা কথার কথা বলা হছে।’
‘হঁ, হঁ, লারাণও তার হঁ-তে ‘হঁ’ মিলায়। বলে, ‘কথার কথা।’
বলিরাম থতোমতো খেয়ে য়ায়। একটু চিন্তা করে সে, যে-ক্ষোভ থেকে তার ওই উক্তিটি বেরিয়ে এসেছিল প্রধানের সামনে সেটা বলে ফেলা ঠিক নয় ভেবে, কথাটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়। বলে, ‘কিস্যার হতে বলা হছে তবে শুনবে? বলা হছে, আশপাশের যত-যা গাঁ-গ্যাঁরামের মানুইষজন আছে, তাদের নিয়ে। হামরা যে চাপাইটাড়ে আসর করছি, ইটা কি হামরা শুধু হামদের লাইগেই করছি? অন্য অন্য গাঁয়ের লোকও ত স্যাটা দেখতে-শুনতে আসবেক? তাইলে ই-কাজেও সবারেই ‘হেলেপ’ দরকার? ত সেই বুঝে হামরা কাহানের ছৌনিত্য পাটিটাকে বললি য্যা তরা একরাত আয়, লইচে দে। ত, উয়ারা কী বলল জান? বলল, হামরা বিন-পওসায় নাই লাচব। ত হামরা তখনকে বললি, তাইলে কী দিতে হবেক ভাই তদেরকে? ত উয়ারা বলল, কিছু না দিলেও কমসে কম প্যান্টিং আর পাউডারের খরচ-খরচা বাবদ দুশ-এক টাকা দিতে হবেক। বল ন, হামদের স্যা ক্ষ্যামতা আছে? হামরা কি ইখিনে টিকিৎ করে আসর করছি? ওই দুশ টাকা দিতে হলে মুড়ের ঘাম টুঁড়ে২৯ পড়বেক।’ লারাণ বলে, ‘হামরাও সাপা বলে দিঁয়েছি। পটপৈটা করে। তাদেরকে লাচতে হবেক নাই। তুন্তার রঘুখুড়া—’
‘রঘুনন্দন মাহাত?’
‘হঁ। হামরা তুন্তাখুড়াও বলি। ত, সেই রঘুখুড়া বলেছে উয়ার দলটাকে নিয়ে আসবেক। লবযুবক সংঘকে। একটা লাল পওসাও রঘুখুড়াকে দিতে হবেক নাই। তখনকে হামরাও রাজি হঁয়ে বলে দিয়েছি—ইয়েস-নো-ভেলি গুড়।’’
‘মানে?’
‘মানে, ঠিক আছে। হামরা রাজি।’
‘তাইলে ত ভালোই বঠে। ফিরি হঁয়ে গেল।’
‘ভাল আর কুথায়? এখনো হামদের বহুত সোমৈস্যা আছে।’
লারাণও বলে, ‘স্যা তুমি কাগজে লেখে যদি লিস্টি কর ন, ত এক লম্বরে শুরু করে এগার লম্বরেও ফুরাবেক নাই। এত সোমৈস্যা। একটা আসর করতে গেলে য্যা এত ফ্যাচেং হয় স্যাটা আগু জানা ছিল নাই।’
চোড়কু প্রায় ফটফটির কাছে ঠেসে গেছে দেখে বলিরাম শুরু করে, ‘সোমৈস্যা আ-লর। ই-কথাটা বলার লাইগেই তুমাকে ইখিনে টেকালি৩০। —চল, চল তুমি টুকু ওই আমতলটায় ফটফটিটাকে ট্যাঁড়রাও। ইসটাট বন্ধ কর ন! তেলটা ক্যানে উদমায়৩১ পুড়াছ?’
‘বল ন, বল ন। আমি ইখিনেই সোব শুনছি।’
তবু ওরা উল্টুরামকে রোদটা থেকে সামনের গাছতলটায় নিয়ে যায়। ওদের, বিশেষ করে লারাণ আর বলিরামের, ইচ্ছে ছিল আমতলে গিয়ে লিশ্চিন্তে দুটো কথা বলার। শুধু কথা বলার জন্যই যাওয়া নয়, যেহেতু আসরটি হবে ওই আমতলে, তাই আসর সংক্রান্ত যে-কোনো কথা, আলাপ, আলোচনা, মিটিং-সিটিং তারা ওখানে বসেই করছে। জায়গাটির সঙ্গেও পরিচয় হয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন লোকজনের।
আমতলের চারপাশে অনেকটা খোলামেলা জায়গা আছে। জায়গা বলতে খেত। এই খেতগুলি ঘাসিদের ঘরের দুয়ারে। চাপাইটাঁড়কে বেড় দিয়ে রাখা ঝালমামড়া, বরুয়াডি, উপর-কাহান, নামো-কাহান গ্রামের লোকেরা এইসব জমির দখলদার। মালিক। ঘাসিরা চাষের সময় এই জমিগুলোতে মজুর খাটে। মুনিষ খাটে। পুরুষরা প্রবল অনন্দে ‘হিঈঈঈঈরেঃ—লেহে-লেহে-লেহে’ করে কাড়ার ন্যাজ মুচড়ে দিয়ে লাঙল চালায়। হাল বাহে। কাদা করে। ঘাসিবউরা দলবদ্ধভাবে সেই কাদাখেতে আফর লাগায়। আর ধান পাকলে কাৎতিক মাসে ফের আরেক প্রস্থ তাদের ডাক পড়ে। তখন ধান কাটা, মাথায় সেই ধান খামারে তোলা, গান গাইতে গাইতে ধান পিটা ইত্যাদি।
তবে এখন যতই রুক্ষ, যতই ধু-ধু করুক না কেন প্রান্তর, বর্ষার পরে লাগালাগি হয়ে গেলে অন্যরকম হয়ে যায়। আর আশ্বিন-কাৎতিক মাসে তো কথাই নেই। তখন খেতের পর খেত পাকা ধান লহ-লহ করে। প্রত্যুষে সেই খেতের অতল থেকে, লুকোচুরি খেলায় মত্ত দুষ্টু ঘাসি-কিশোরের মতো চুপি চুপি ওঠে প্রথম সূর্য! দিনান্তে সেই খেতের হরিদ্রাভা আর গোধূলির আলো যেন ঠিকরে ঠিকরে এসে পড়ে ঘাসিদের চোকলা-ওঠা মাটির ঘরগুলিতে।
আহা, সে-দৃশ্য ভোলার নয়। যেমন নয়নাভিরাম, তেমনি হৃদয়স্পর্শী। তখন খেত থেকে ধানের গুছি ছিঁড়ে নিয়ে চম্পট দেয় বাঁদর ছেলের দল। মুকুট বানিয়ে মাথায় নেয়। মায়ের কোল থেকে গড়িয়ে-পড়া অভুক্ত শিশু, ওই আলে বসে ডুকরে কাঁদে মায়ের জন্য। মা! মা! কোথায় গেল তার মা? সে অভুক্ত অনাহারী হলেও, নবান্নের এই খেত, এই পরিপূর্ণা লক্ষ্মী তার মা নয়? আল বেয়ে উদাসীন সাপের চকচকে যাওয়া দেখে শিশু খলবল করে ধরতে যায়। সেও যেন বৈপরীত্যপূর্ণ আরেক নিষ্পাপ সৌন্দর্য।
কিন্তু এখন? এখন সে সবের কিছুই নেই। শবহীন মহাশ্মশানে যেমন কখনো কখনো ঘুরে-ফেরে একাকী সারমেয়, তেমনই এখন মাইল মাইলব্যাপী শস্যহীন খরা খেতগুলিকে আগলে রেখেছে ওই আমগাছটি।
প্রধান সে দিকে ঘুরেও তাকায় না।
চোড়কু তাদের প্রকৃত সমস্যাটা গুছিয়ে বলার চেষ্টা করে। সে জানায় যে, বৈশাগের সাতদিনে৩২ চাপাইটাঁড়ের এই আসরের খোবোর এখন সবার জানা হয়ে গেছে। কাল ফরেস্ট মোড় দিয়ে কাউয়াহারা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে, ফটিক গিয়েছিল মদনভেরি নিয়ে। কুড়মীদের গ্রামে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে, যে-যে গ্রামের লোকের সঙ্গে তার ভেট হয়েছে, বা চুটি ধরানোর জন্য যার কাছে সে আগি চেয়েছে, সবাইকেই চাপাইটাঁড়ে আসতে বলেছে। বলেছে, ছোনাচ আর ঝুমৈরের জমাট আসর বসছে। যদিও ওদিককার গ্রামের লোক হয়তো চাপাইটাঁড়ের দিকে নাও আসতে পারে, কিন্তু কাছাকাছি গ্রামের লোকেরা এই আসরে আসার জন্য আগ্রহী হয়ে আছে। পুরুষরা ছাড়াও তাদের সঙ্গে আসবে তাদের পরিবার। বউবিটি, ছ্যেলাপুলা সোব। অগল-বগলের গ্রামবাসীরা মিলে সংখ্যায় কম করে হলেও হাজার পাঁচেক হয়ে যাবে।
‘পাঁচ হাজার?’ উল্টু আমগাছের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ওই গাছতলটায়? ধরবেক এত লোক? আঁটাবেক?’
বলিরাম বলে, ‘পাঁচ ক্যানে, তুমি যদি সাত হাজার লোক বল ত তাও বসতে কুলাবেক। কারও অসুবিস্তা কিছু হবেক নাই। একদম হৈলফৈল৩৩ করে বসতে পারবেক।’
চোড়কু বলে, ‘হামরা সোব দিক চিন্তা করেই ত এই জায়গাটা বাইছেছি। যদি সত্যিয়েই গাঁ ভাইঙে লোক চৈলে আসে? তুমি কাখে বলবে যে, ভাই তদেরকে আসরে বসতে দিয়া হবেক নাই? পারবে বলতে? নাই পারবে।’
লারাণ বলে, ‘এই যে তুমাদের পাটির যখন জয়পুর-তয়পুরে মিটিন হয়—ফালনা হয়—তখনকি সোবগুলো থোড়ুই তুমাদের পার্টির লোক থাকে? জানে য্যা জুলুসের ভিৎরে ঢুকে যদি বারকতক ‘ইনক্যালাপ!’ ‘ইনক্যালাপ!’ করি, তাইলেই ইয়ারা হাঁতে দু-পাঁচটা টাকাও দিবেক, এক আধ সের চালও দিতে পারে। আর কিছু না দিলেও গাদালে৩৪ আছি বলে এক পাট মদ ত খাতে দিবেকেই? সেই লোভেই ত সবাই আইসে আইসে তুমাদে সিপিয়েনে ঢুকে দেই। তেমন হামদেরও মুকুন্দপুর, জাহাজপুর, তানাসি, বরুয়াডি, হন্যাট্যাঁড়, ঝালমামড়া—ফালনা ফালনা গাঁয়ের যত যদা-মধা-বদা লোকও আসতে পারে? কী বিশ্বাস?’
‘তার হতেই বড় জায়গা।’ চোড়কু বলে, ‘তাদের বসতে ত কুছু দিতে হবেক নাই। ভুঁইয়েই বসবেক। কিন্তুক ভুঁইয়ে বসলে হবেক কি? আ-লটা ত দিতে হবেক? কি বল?’
‘আর আ-ল যদি তুমি নাই দিবে তাইলে এত এত লোক! আঁধারে বজড়া-বজড়ি ঠুকাঠুকি হঁয়ে মরবেক নাই?’ বলিরাম বলে, ‘তার আগাম কে বলতে পারে? ভগমান না করুক, যদি একটা ক-ন বেচাল হঁয়ে গেল?’
‘বেচাল?’
‘মানে গোলমাল।’ লারাণ বলে, ‘আসর-তাসরে ত স্যাটা হতেই পারে।’
প্রধান বলে, ‘ইখেনে কে তদের আসর বেচাল করতে আসবেক? কীভাবে গন্ডগোল হবেক?’
যদিও, আসরে গন্ডগোল হতেই পারে। তবে এমন কোনো ঘটনা এখনও অবধি ঘটেনি। তবু লারাণ বলাতে বলিরাম যেন সেরকম একটা গোলমালের সম্ভাবনা আঁচ করে। চিন্তিত মুখে বলে, ‘হামার কি মনে হছে তবে বলব? বল, বলব?’
লারাণ তাকে উসকানি দেয়। বলে, ‘হঁ বলেই ফেল ন। অত লুকু-ছুপুর কী আছে? হামরা ল্যাপড়ার কাকৌ ডরাই নাই। বল তুঁই।’
বলিরাম বলেই ফেলে। সে অনুমান করছে, গোলমাল যদি কেউ করে তো ওই কাহানের বদমাইশগুলাই করতে পারে। ক্যানে? ন, তাদের মনে রাগ হয়েছে। তাদের সঙ্গে চাপাইটাঁড়ের আসর-মালিকরা প্রথম কথা বলেছিল, আসরে এসে ছোলাচ করার জন্য। কিন্তুক আখিরে পৈটলো নাই। তাদের বাদ দেওয়া হল। তার বদলে নেওয়া হল তুন্তার পাটিটাকে। ‘নবযুবক ছোনৃত্য পাটি’কে। তুন্তার কাছেও অপমানিত বোধ করবে। এবং চাপাইটাঁড়ের কাছেও তাদের কোনো সম্মান থাকল না। সেই রাগে যদি তারা ‘লেঃ খেপি কালী দেখ!’ বলে কুছু করে বসে?
‘তখনকে?’
লারাণ বলে, ‘তখনকে সোব গুড় সতর সের!’ মানে পন্ড।
গন্ডগোলের সূত্রে আসর পন্ড হওয়ার ব্যাপারে বলিরামের এই আশঙ্কাকে কানেই নেয় না প্রধান। তবে লারাণকে একটু চিন্তিত দেখায়। আসলে, তাদের এই আশঙ্কাটিকে অমূলক বলা চলে না। গ্রামে তো এমনটা হর-হামেশা হয়ে থাকে। আসর বেশ জমে উঠেছে, হঠাৎ দেখা গেল দূরের বিটিছাদের গাদালের দিকে সবাই হইচই করে উঠে যেতে লাগল। কারণ কী? না, বিরোধীপক্ষের কেউ শালপাতের ডঁড়রাতে এক ডঁড়রা গু নিয়ে, গাছের মগডালে উঠে সেখান থেকে সেটা ছুঁড়ে দিয়েছে ভিড়ের মধ্যে। ব্যাস! রামের মা সীতা। আসর এইখিনেই খতম—জয় হে! জয় হে! জয় জয় জয়...ইবার তুমি চঙা ফুঁকে বল—খোবোড়দার! তুমরা আপন আপন ভুঁইয়ে বসে থাক। যেটা ডঁড়রায় করে আসমান ল্যা পড়েছে উ-টা কুছু লয়। হামদের আসর ফের ইসটাট হবেক। তুমরা কৌ চলে যাইঅ না।—ভলান্টার! ভলান্টার! (শ্লাদের হবিদবির সময়ে ডাকলে পাওয়াবেকেই নাই। খাবার সময়ে ঠিকেই আসবেক!)—ভলান্টার! তুমরা সাতো কাজ ছাইড়ে আগু আসরের বিটিছ্যেলাদেরদিগে লজর দাও! সামলাও! দেখ, বিটিছ্যেলাদের গাদালে যেমন ক-ন পুরুষ মানুইষ না সামাতে পারে। ‘ঘুসপৈঠ’দের আটকাও! আটকাও! ভলান্টার!...স্যা তুমি ইবার যতই হ্যাঁকাডাকা কর ক্যান্নে, বিটিছ্যেলা যখন একবার ভিঁড়কে গেছে, তখনকে উয়াদেরকে আর টেকাতে পারা যাবেক নাই। উয়ারা ওই আঁধারেই কোলে কোলে ছ্যেলাকে নিয়ে টাঁড়ে-টিখরে চলতেই শুরু।
‘উসোব ফালতা কথায় গুলি মার!’ চোড়কু বলিরামকে থামতে বলে। বলিরাম কিন্তু থামে না। বরঞ্চ ততোধিক উৎসাহ নিয়ে বলে চলে, ‘মনে নাই, সেই য্যা সেই হামি আর তুমি একবার এই বৈশাগ মাসটার সময়ে গেছলি বনকাটা? নাই মনে পড়ছে? সেই মানবাজার-পেদ্দা-বনকাটা? সেখিনে কী ঘটনা ঘটেছিল? অজব ঘটনা।’
ঘটনাটি ঢেরদিন আগেকার। যখন এমনি অনেক গ্রামে মাঝে মাঝে রাতভর আসর শুনতে চলে যেত চোড়কু। আজ এতদিন পরে বনকাটার ঘটনাটি তেমনভাবে মনে করতে পারল না। তবে এমন ঘটনা যে ঘটে না তা নয়। অনেক জায়গাতে সে এই ধরনের আচমকা উৎপাতের ফলে অনুষ্ঠান বানচাল হতে দেখেছে। দেখলেও, প্রধানের সামনে এই বাহুল্য আলোচনাটা কি না করলেই নয়?
তবু বলিরাম তাকে না মনে করিয়ে ছাড়বে না। সে জানায়, সেবারে গোটা মানবাজার-জুড়েই চলছিল খরা। বৈশাগ মাস পেরিয়ে যখন জষ্টি পড়ব-পড়ব, তখন বনকাটার গ্রামবাসীরা বৃষ্টির জন্য নামসংকীর্তন করানোর মনস্থ করে। অষ্টপ্রহর করানের মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের না থাকায়, তারা ঠিক করে দু-দিন দু-রাত ধরে চলবে হরিনাম! তৃতীয় দিনে গ্রামবাসীদের মনোরঞ্জনের জন্য আয়োজন করা হয় বুলবুলি নাচের।
এই নাচ চলাকালীন ঘটে অভূতপূর্ব একটি ঘটনা। দেখা যায়, মেয়েদের জায়গায় তুলকালাম হইহাল্লা শুরু হয়ে গেল। প্রত্যেকে উঠে তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসরের বাইরে চলে আসছে। কেন? না, অন্ধকার থেকে কারা আলকুশি ছুঁড়ে দিয়েছে। পড়েছে মেয়েদের গায়ে, তাদের কোলে বা পাশে থাকা ছোটোছোটো ঘুমন্ত শিশুদের গায়েও। তারাও ছটফট করতে করতে মায়ের সঙ্গে ভিড় থেকে বেরিয়ে আসে। গায়ের জামা খুলে প্রবলভাবে চুলকাতে থাকে। মেয়ে-বউরাও ব্লাউজ খুলে, আঁচল ফেলে দিয়ে গা চুলকাচ্ছে আর নাম না করে গালাগাল করে যাচ্ছে সেইসব বদমাইশদের, যারা উদ্যোক্তাদের জব্দ করতে আসর পন্ড করার মতলবে এই অসভ্য কাজটি করেছে।
আবার কোথাও কোথাও জ্যান্ত সাপের ল্যাজ ধরে, তাকে মাথার ওপরে ‘চাঁইপকপক ‘চাঁইপকপক’ ঘুরিয়ে ‘যাআআআ চৈলে যা’ বলে ভিড়ের দিকে ছুঁড়ে দেয়। বুঝ কান্ড! চাপাইটাঁড়ের ঘাসিদের আসরে নিশ্চয়ই এমন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে সাহসী হবে না কেউ। অপরাধীরা আখেরে ধরা পড়ে গেলে তো প্রতিবেশী গ্রামবাসীরাই তাদের ‘উচিত শিক্ষা’ দেবে।
‘তবে আসরে গন্ডগোল হোক আর নাই হোক, বাতি ত রাখতেই হবেক?’ চোড়কু বলে, ‘তার হতেই, হামরা কী বলতেছিলি জানলে উল্টুখুড়া? বলতেছিলি ঢেরদিন ত হৈল, সেই পাঁচটা তারখাম্বা তুমি এই বতর টুকু গাইড়ে দাও। যদি খাম্বা একবার গাড়াঞ যায়, তাইলে—’
‘ও হোহোহো! বৌড়ো সুন্দর হবেক তাইলে। সেই যেমন ফসর খাওয়া কাড়া তার তেলচকচৈকা শিং! ওঃ!’
বলিরাম বলে, ‘আর কুছু না হোক, আসরের জায়গায় হামরা লাল-লীল গুচ্ছেক ডুম ত ইধারে-সেধারে লড়কায় দিতে পারব?’
উল্টুরাম কী বলবে ভেবে পায় না। সে কীভাবে এদের বকবকানি থেকে নিজেকে খালাস করে নিয়ে যাবে, তাও বুঝতে পারে না। ‘একটি কথা বলব তদেরকে?’
‘একটি ক্যানে, তুমি শ-কথা বল ক্যানে। হামরা শুনতে মুহায় আছি।’ লারাণ গোঁ ধরার মতো করে বলে, ‘কিন্তুক আ-লটা তুমাকে করে দিতেই হবেক। সেরেফ পাঁচটা তারখাম্বা!’
‘নাআ। হামি বলছি, এখন সদ্যম তদের আসরটা উদ্ধার করতে তরা জয়পুরের ল্যা একটা দু-ঘঁড়ার ছুটু জ্যানার্যাটার ভাড়া করে আন? তদের কাজটা সদ্যম হঁয়ে যাক। তা বাদে—’
প্রধানের প্রস্তাব শুনে চমকে ওঠে ওরা। বলে, ‘জ্যানার্যাটার? ভাড়ায়?’
‘কীঈঈঈঈঈ বলছ উল্টুখুড়া?’ বলিরাম হেসে উড়িয়ে দেয়। লোককথার উপমা দিয়ে বলে, ‘লাংটা বরের মাথায় পাগ। আটিসদের খেঁচড়ি খাওয়াবার চাল-ডিংলাটাও এখনও জগাড় করতে পারি নাই। জ্যানার্যাটারের পসা কথার ল্যা আসবেক? হঁ, হামাদের এই চাপাইটাঁড়ের কৌ যদি তুমার পারা পর্ধান হৈত, তাইলেও নাই ত পঞ্চাতের টাকা পৈসা ইধার-উধার ‘রিচু’৩৫ করে করা চলত। তখন জ্যানার্যাটার ক্যানে—এই এমনি ফটফটিও হত।’
বলিরামের মন্তব্যটি শুনে গা জ্বালা করে প্রধানের। লারাণ বলিরামের কথার উপসংহার টেনে বলে, ‘তার মানে উ-টা হামাদের ‘আউটের বইরে’। ভাড়া দিঁয়ে হামরা জ্যানার্যাটার লিতেই লারব।’
‘তাইলে ক্যালা তরা ইবার মারা। হামি চললি। আসর না ফাসর। দেশের মানুইষ খাতে পাছে নাই, আর আসর!’ প্রধান রেগেই তার ফটফটিয়ে স্টার্ট দিতে পা বাড়ায়। বলিরাম তাকে ফের আটকানোর চেষ্টা করে। প্রধান বলে, ‘নাই, ছাড় ছাড়। বহুত ডেরি হঁয়ে গেল। এখনি গাড়াফুসড়া যাতে হবেক। পাটির আর্জেন মিটিন আছে।’
‘আই দেখ। চলে গেলে কী করে হবেক? উল্টুখুড়া? হঁ-না একটা কুছু বলে যাও?’ চোড়কু বলে, ‘যদি হামদের গাঁয়ে আর ক-ন দিনেই বিজলি হবেক নাই, ত স্যাটা বলে দাও ক্যানে। আর যদি আজ বাদ কাল হবেক, ত স্যাটাও বল। ইয়ার একটা কিনারা ত হওয়া দরকার? লয়?’
‘বলছি ত হবেক। উটা কি হামার কাজ বঠে য্যা বললেই হঁয়ে যাবেক। সরকারি কাজ। আর সরকারি কাজ মনেই হৈল গরমেটের কাজ। বহুত চেকিনের কাজ। তাও বলছি ত—কাগজ ল্যাখালেখি সোব কমপিলিট। ইয়ার-উয়ার টেবেলে ফাবড়া-ফাবড়িও হঁয়ে গেছে। এখন গরমেটের ঘর ল্যা অড়ারটা৩৬ আসতেই যা সময় লাগছে। স্যাটা যদি কাল আসে ত দেখবিস পরশুয়েই চাপাইটাঁড়ে গনগনায় বিজলি ঢুকে যাছে।’
‘অ অ অ! শুধু এইটুকু অটকে আছে?’ লারাণ বলে, ‘ইয়ার মানে গটা হাঁতিটা চৈলে গেছে, ন্যাজটা অটকে আছে। তাইলে খঁচে লাইগে গেছে।’
‘ঠিকেই ধরেছিস!’ উল্টু হাসতে হাসতে বলে, ‘এই ন্যাজটা টানবার লোক পাওয়াছে নাই।’
‘ধৌর! লোক পাওয়াছে নাই। ইটা ক-ন গলফ হৈল?’ বলিরাম বলে, ‘তুমি হামরাকে বল ন। হামরা রোজেই ঘুসুরের ন্যাজ টানছি। এমন টানন টাইনে দিব—’
‘তরা হাসোল্লোভী করে দিছিস ক্যানে? হামি তদেরকে মিছা বলছি? পৈতাছিস নাই।’ উল্টুরাম ফের বলে, ‘বলছি ত গরমেটের ঘর ল্যা—’
‘ঘরমেটের ঘর আর গরমেটের ঘর!’ বলিরাম বিরক্ত হয়েই বলে, ‘রোজেই সেই একেই কথা? চল ত, আজেই তুমি হামরারাকে গরমেটের ঘরকে লিয়ে চল। কথায়, কন কুলহিয়ে ঘর বঠে?’
‘হঁ, হঁ। চল সোকৈলে মেলেই যাব। হামরা চাপাইটাঁড়ের যৎগুলা ঘাসি আছি।’ লারাণ একপ্রস্থ মহড়া দিয়ে নেয়। —‘বলব, তুমরারাকে কত করে রোজেই বলা হছে। তুমরা খেল পাঁইয়েছ নকি? হামদেরকে কতদিন আর আঁধারে রাখবে? ক্যানে হামরারাকে বিজলি দিবে নাই?’
চোড়কু বলে, ‘হঁ। তুমরা হামদেরকে গটা জীবনটায় আঁধারেই রাইখে দিবে?’
‘ইটা ডাগর ঐন্যায় কাজ।’ লারাণ বলে, ‘ঘাসিরা কি তুমাদেরকে ভোট-তোট নাই দেই? তুমরা যখনি হামদের ঘরকে বলতে আইসেছ, হামরা লিজে যাঁইয়ে ভোটের কাগজে তুমাদের বাচনিক করা ছাপেই ছাপ দিয়েছি। আর শুধু তুমরারাকে নাই—সিপিয়েন, কংরেস, ঝাড়খন, যে আইসেছে সোকৈলকে দিঁয়েছি। ক্যানে দিব নাই? কারো সঙে ত হামদের দুশমনি নাই। তার হতেই কারো মনে দুঃখু দিই না। তা সত্ত্বেও তুমরা ঘাসিদেরকে ল্যায্য বিচার করছ নাই। লিয়ে-দিঁয়ে ওই একেইটা ভুলুক দেখাছ—গরমেট!’
‘তাও ও বলছি, চল।’ চোড়কু বলে, ‘হামরা এখনেই গরমেটের ঘরকে যাব। এখনেই।’
এরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে দেখে, উল্টুরাম তাদের ঠাণ্ডা করতে চেষ্টা করে। বলে, ‘নাই নাই! এখন লয়। আড়বেলা হঁয়ে গেছে।’
‘আহ, তুমার যদি এমন অসময়ে উয়ার ঘরকে যাতে শরম লাগছে, বল ক্যানে। তুমাকে যাতে হবেক নাই। তুমি গরমেটের দুয়ার ছামুটায় হামদের নিয়ে যাঁইয়ে ছাইড়ে দিবে। তা বাদে হামরাই উয়ার বাখৈলের ভিৎরে যাব।’ বলিরাম বলে, ‘যা বলার সোব হামরাই বলব। তুমাকে কুচ্ছু বলতে হবেক নাই? তুমি গাছতলে ডাঁড়ায় উড়া পাইখের পাঁখা গৈনবে। তাৎকে হামাদের হঁয়ে যাবেক।’
‘হঁ।’ চোড়কু বলে, ‘দেখবে, হামরা উয়াকে এমন লরম লরম করে বলব ন! য্যা হামদের দুঃখু দেখে উয়ার চৈখের ল্যা দু-ধারনি রো পড়বেক। আর তখনেই বলবেক, বহুত ডেরি করেছি, আর ডেরি লয়। ঘাসিদের চাপাইটাঁড়ে এখনেই বিজলি পঁহচা! এই! হাইলা৩৭ বাইর কর—’
এভাবে প্রধানকে ঘিরে ওদের কথোপকথন যখন জমে উঠেছে, তখন একফাঁকে লারাণের চোখে পড়ে যায় পরীক্ষিতকে। একটি রুগ্ণ ছাগল ঘাড়ে নিয়ে সে ঘরের পথে চলেছে। যেতে যেতে সারাটা পথ সে নিজের মনে মেহনাতে মেহনাতে আসছে। যেন সে কথা বলছে তার ছাগসঙ্গীটির সঙ্গে। হাটে এই ছাগলটিকে সে নিয়ে গিয়েছিল বিক্রি করবে বলে। কিন্ত কেউ তাকে উচিত মূল্য দেয়নি। যেকোনো লোক কুৎ করলেই বলবে, এর ওজন কমপক্ষে সাতসের। অন্তত পাঁচসের মাংসের দাম তার ন্যায্য পাওনা। তার মানে ৬০ টাকা করে পাঁঠামাংস, পরীক্ষিতের এই ছাগলের দরুন দাম পাওয়া উচিত ৩০০ টাকা। অথচ ২০০ টাকার এক ছেদাম বেশি দাম কেউ দিতে রাজি হয়নি। সেকি তাহলে কাঁধে করে ঘুসুর নিয়ে এসেছে? রেগে-মেগে সে বিক্রির চেষ্টা না করে ঘুরৎ নিয়ে আসছে। আর গোটা রাস্তা সে নিজেই ক্রেতা, নিজেই বিক্রেতা হয়ে এই ধরনের সংলাপ বলতে বলতে আসছে—
‘ধৌর! সাত সের! বৈশাগমাসেও এখন মেঘের দেখা নাই। খরায় খরায় তুমার পাঁঠাও খরে গেছে। ইয়ার ওজন কখনো সাতসের হয়? হরগিজ হবেক নাই। বড়জোর পাঁচ সুয়া পাঁচ। ছুটু পাঁঠা!’
‘যা ন ভাই। তকে লিতেই হবেক নাই। তোর সঙে হামর কোবৌ পটবেক নাই। হামার হছে ষোলো ছটাকে সের, আর তোর হছে বাইশ ছটাকে সের। তাইলে কী হিসাবে লিয়া-দিয়া হবেক?’ ইত্যাদি।
পরীক্ষিৎকে দেখতে পেয়ে, লারাণ, তার দিকে তর্জনী বাড়িয়ে অন্যদের দেখিয়ে দেয়, ‘হাই দেখ, হাই দেখ। পৈরখাদ্দা যাছে। হামরা ইয়াকৌ সঙে নিয়ে যাব—’ বলেই, সে ডাক দিল, ‘এপপৈরখাদ্দা! পৈরখাদ্দা! ইধারে টুকু ভাইলে দেখ। ইধারে—পটাশ গাছটার তলে! আচ্ছাআ তালকানা লোক ত!’
ছাগল ঘাড়ে নিয়েই একটা চক্কর মারার পরে পরীক্ষিৎ ইউক্যালিপ্টাস গাছের নীচে তাদের দেখতে পায়। কাছে এসেই সে ক্ষিপ্ত হয়ে বলে ওঠে, ‘য়্যাঁঃ ভাবছিস পেটের দায়ে বিকছে। ইয়াকে তাইলে ভাঁইড়ে’৩৮ লিব। স্যাটি হতে দিব নাই।’
লারাণ এবং অন্যান্যরাও তার মুখ থেকে আকস্মিকভাবে এমন ঝাঁঝের কথা শুনে ঘাবড়ে যায়। লারাণ বলে, ‘ভাঁইড়ে লিছি? হামি?’
পরীক্ষিৎ লজ্জা পেয়ে যায়। এতক্ষণে যেন তার ঘোর কাটে। হেসে বলে, ‘নাই। এই হাটের পাইকারের কথা হছে। তুমরাই কুৎ কর ন। কুৎ কর। ইয়ার লীট ওজন কৎটা হবেক? হামি ত বলব সাত সেরের একছটাক কম হবেক নাই। কিন্তুক শালা ধড়িবাজ পাইকারগুলা বলছে নকি পাঁচসের হবেক। ছুটু পাঁঠা। শা-আ-আ-লা!’
‘অ, এই ব্যাপার?’
‘হঁ, এই ব্যাপার।’ পরীক্ষিৎ ঘাড়ে পাঁঠা এবং দু-হাতে দুটো করে ঠ্যাং ধরে থাকা অবস্থাতেই প্রধানের দিকে আড়ে তাকায়। বলে, ‘উল্টুখুড়াকে তরা টেকায় রাইখেছিস? কী মতলবে?’
‘মতলব কুছুই নাই। আর নাই ত দেখতে গেলে বহুত ডাগর মতলব।’ বলিরাম বলে, ‘তুমাকে হামাদের সঙে যাতে হবেক। এখনেই।’
‘কথাকে?’
‘হামরা গরমেটের ঘরকে যাব।’
‘গরমেটের ঘর? উয়ার ঘর ত ভাই হামি চিনহি নাই।’ পরীক্ষিৎ বলে, ‘কোবো যাইয়েই নাই। ডাকা-হাঁকাইও নাই, রা-সাও নাই।’
‘আহ, হামরাই কি গেছি নকি? উল্টু খুড়াই হামদেরকে ডহরায় নিয়ে যাবেক।’
‘হঁ, স্যা ত বুঝলি। কিন্তুক পরের ঘরকে কিসকে যাবিস? বিনা নিমন্তন্নে?’
‘কিসকে? এই চাপাইটাঁড়ে বিজলিবাতির কিনারা করতে।’
‘বিজলিবাতি? গরমেটের ঘরকে গেলে মিলবেক? তাইলে ক্যানে নাই যাব? বকরি টাঁড়ে ফেলে হামি তদের সঙে যাব।’ বলামাত্র সত্যিই সে তার ঘাড়ের ওপরে ধরে রাখা ছাগলছানাটিকে খেতে ছেড়ে দিয়ে জোর হাঁক ছাড়ল, ‘এ-এ-এ-এ গুড়ধৈনা! হা ভাল। যা ন, ইয়াকে গুচ্ছেক পালহা খাওয়ায় ঘরকে নিয়ে ঢুকা। আর তোর মাকে বলে দিবিস হামি বিজলি আনতে যাছি। গরমেটের ঘরকে।’
বাপের ডাক শুনে, গুড়ধৈনাও, ছাগলছানাটির মতোই লাফাতে লাফাতে খেতের আলগুলি ডেইঙ্গে এগিয়ে আসে। হাতে তার ছোটো একটি ভেঁড়রা ডাল। তা দিয়ে নিজের পায়েই সে চাবুক মারে আর গাইতে গাইতে আসে, ‘তকে কে দিল রে ঝালবড়া। /অ রে কানা খালভরা...’
ভারমুক্ত হয়ে পরীক্ষিৎ তালি মেরে হাত ঝাড়ে। তারপর বলে, ‘হঁ, উল্টু-খুড়া, তুমি যখন গাঁয়ের পর্ধান, তখনকে, ওই যে বিজলি লাইনটা খাম্বায় খাম্বায় হন্যাটাঁড়ের দিগে ঘুরে গেছে, স্যাটাকেই চাপাইটাঁড়ের দিগে অ্যাল্প ঘুরায় হামদের কুলহি গড়াটায় তুমাকে আইনে দিতে হবেক। ব্যাস! ইটা কী এমন কাজ? সেরেফ পাঁচেইটা তারখাম্বা...’
‘চুপ দে, চুপ দে? সোব বলা হঁয়েছে।’ চোড়কু তাকে পুনরুক্তির সুযোগ না দিয়ে বলে ওঠে, ‘লিয়া-দিয়ার মালিক যখন গরমেট, তখন উয়ার ঘরকে গেলে জুডুর একটা ফসলা হবেক।’
‘হবেক মানে? আজ ইয়ার একটা কিনারা করতেই হবেক।’ লারাণ নিজের হাতের তালুতেই যেন দাউলি মেরে মেরে ছাগলভুঁটি খিদি খিদি করে কাটছে, এমনি ভঙ্গিতে নিষ্পত্তির কথাটিকে সে ‘স্বরচিত প্রবচন’, দিয়ে জোরের সঙ্গে বলে, ‘আজ হয় ভেঁড়া থাকবেক, আর নয় কাটরা থাকবেক। দুইয়ের ভিৎরে এক।’
বলরাম বলে, ‘কি উল্টুখুড়া? তুমি য্যা দেখছি থুথুস সাপের পারা সুগুম মাইরে গেলে? কী চিন্তা করছ?’
‘হামি ত তোদের লিয়েই চিন্তা করছি রে বাপ। হামারও মনে হছে, যদি গরম্যাটের ঘরকে যাওয়া যায়, তাইলে সোব ফসলা হঁয়ে যাবেক। কিন্তুক বাবু গরম্যাটের ঘর ত ঠায়ে লয়। সেই কাউয়াহারা বনকে ঢুকতে হবেক।’
‘বনের ভিতরে থাকে? গরম্যাট? জংলি গরম্যাট।’ পরীক্ষিৎ কিছু বুঝতে পারে না। শুধু দূরত্বজনিত বিস্ময় প্রকাশ করে, ‘কাউয়াহারা বন? তাইলে ত ঢেরটায় বঠে।’
‘হঁ, ঢেরটা। আর এখন যে গরম—’
উল্টুরামের কথা সম্পূর্ণ করে দিতে বলিরামই বলে, ‘এখন যেমনি রোদ, তেমনি ধূপ। যাকে বলে, হিট-গ্রম।’
‘তার হতেই বলতেছিলি, এত হিট-গরমে গেলে বাবু, হামার ত ঝলা লাইগে যাবেক। বরুংচু রোদের আলহাটা টুকু কমুক। উ-বেলাকে যাব। আর এই বতরে আমি গাড়াফুসড়ার ল্যা ঘুরে আসছি। যাতেই হবেক। উখেনে হামদের সাইক্ষরতার মিটিন আছে। গটা পুরুইলা জ্যালা আজ ল্যা ‘পুর্ণ সাইক্ষর’ ঘঁষিত হবেক।’
‘অ অ অ অ অ হৈল! সাইক্ষরতা! এত কথা বলে আখিরে এই হৈল?’ বলিরাম বলে, ‘ইয়াকেই বলে রে—চোর পালাছে বাইগান বাড়ি/কোতোয়াল দিছে মঁচে পালিশ।’ উপযুক্ত ক্ষেত্রে লারাণের এই লোককথাটির প্রয়োগে উল্টুরামও হেসে ফেলে।
‘ক্যানে, উখেনে কী এমন কাজ আছে তুমার? না গেলেই লয়?’ চোড়কু জানতে চায়। উল্টুরাম বলে, ‘ঐ ত বললি। সাইক্ষরতার—’
‘তুমাদের দিনরাতে শুধু সাইক্ষরতা আর সাইক্ষরতা। ইয়ার ফের-ব্যাপারটা কী বঠে বল ন? খুলে বল।’
‘ওই সাইক্ষরতাই বটে। ঐন্য কুছু লয়।’
‘অ। ঐন্য কুছু লয় ত? তাইলে ভাল।’ পরীক্ষিৎ বলে, ‘ইয়ার মতলবটা তাইলে কী? এই সাইক্ষরতার?’
‘মতলব ঐটাই। ঐ য্যা’—নিরক্ষর উল্টুরাম নিজেও সাক্ষরতার অর্থ-উদ্দেশ্য কিছুই জানে না। সে থতোমতো খায়। বলে, ‘সাইক্ষরতার মতলব হৈল—সাইখ—খরতা। তার মানে হছে—ঐ য্যা ইয়ার-উয়ার কাঁথে ল্যাখ্যা থাকে নাই—বামফ্রন দিচ্ছে ডাক/সাইক্ষরতা লিপাত যাক।’
‘অ অ অ। ইগুলা ত হামদের ছা-গুলাকেই বলতে শুনেছি। উয়ারা এমন বহুত সাইক্ষরতা জানে। ঐ য্যা আ-র একটা বলে—দাদু-লাতি দই ভাই/ব্যাঙ মারে ঠুই-ঠাই।’
‘দই ভাই লয়, দই-ভাত।’ লারাণ সংশোধন করে দেয়।
‘হঁ হঁ। দই হলে ত ভাতেই হবেক। তা না হলে মিশ খাবেক ক্যানে? তাবাদে—ধিয়ানে আসছে নাই—’ পরীক্ষিৎ চোড়কুকে বলে, ‘তুমার ক-ন সাইক্ষরতা মনে আসছে? হামদের ছ্যেলাগুলা কী বলে নাই—অ-য়ে অজগর আসছে তাইড়ে/যাস না বাছাকে খেতের আইড়ে।’
‘ধুৎ। খেতের আইড়ে অজগর ক্যানে আসবেক? গই আসে, গই। গো-সাপ।’
‘ঠিক ঠিক। তাইলে সাইক্ষরতাটা এমনি হবেক—অ-য়ে গো-সাপ আসছে পাইড়ে/আ-য়ে আনারস খাব তাইড়ে। মনে পড়েছে।’
‘কী মনে পড়েছে? তরা জানিসেই নাই। যত আনসান বকছিস।’ লারাণ চিন্তা করে বলার জন্য তৈরি হতে থাকে। আসলে, সবাই যিসতিস বলে দেওয়াতে ওদের মাথাটা গুলিয়ে যায়। ওরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কে তেড়ে আসে আর কাকে পেড়ে খেতে হয় সেটাই তৎক্ষণাৎ গুছিয়ে বলতে পারে না। লারাণ বলে, ‘সময় এখন ঐন্যরকম হঁয়ে গেছে। এইসব সাইক্ষরতাগুলানও কেমন উলটা হঁয়ে গেছে। আসলটি হবেক কেমনটি? এমনটি—আ-য়ে আনারস আসছে তাইড়ে/অ-য়ে অজগর খাব পাইড়ে।’
ওরা সবাই মিলে তারিফ করে লারাণের। শুধু গম্ভীর হয়ে যায় উল্টুরাম। গাম্ভীর্য গোপনে রেখেই, সে এদের এতগুলো মুখ থেকে ‘খাব খাব’ শুনতে শুনতে বলে ওঠে, ‘তদের বহুত ভোখ লাইগেছে, লয়? তরা তাইলে সিনান-তিনান করে, মাড়জল খাঁইয়ে, জুঁতা-জামা পরে, আলবেট কাইটে ঘরেই বসে থাক। বেলাডুবু হামি তদেরকে লিতে আসব। কুটুমঘরে গেলে বাবু হঁয়ে যাতে হয়।’ বলে, সে ফটফটিতে চেপে বসে।
কিন্তু তখনও তাকে ছাড়তে চায় না বলিরাম, বলে, ‘চৈলে যাবে? এখন নাই লিয়ে যাবে?’
‘বলছি ত। তরা পশাক পরে বসে থাক ন। হামি ঠিক আসব।’
‘ঠিক? আসবে?’ পরীক্ষিৎ হাসতে হাসতে বলে, ‘শেষে এমন হবেক নাই ত—ঘরেও খাঁইয়ো না আর না ডাকলেও যাইঅ না?’
এই কথায় হাসতে থাকে অন্য ঘাসিরাও। উল্টুরাম রীতিমতো গম্ভীর হয়ে বলে, ‘স্যাটি ক্যানে হবেক? বলছি যখন আসব, তখনকে ঠিকেই আসব—মরদের বাত/হাঁতির দাঁত। ইঁটা জাইনে লিবি। ব্যাপারটা হঁয়েছে কেমন—আজ হামদের পুরুইয়া জ্যালা পূর্ণ সাইক্ষর ঘঁষিত হবেক। মানে পুরুইলাতে আর একটাও লিরক্ষর নাই। সবাই শিক্ষিত হঁয়ে গেছে। কতবড় আনন্দের জিনিস।’
‘গটা জ্যালা? তাইলে হামরাও আজের ল্যা শিক্ষিত হঁয়ে গেলি? চোড়কু বলে, ‘হামরা য্যা শেলেট পেনসিলের মু দেখলি নাই জীবনে।’
‘আই দেখ। অমন দেখতে গেলে শিক্ষার হামিয়েই কি বশের টাঁক জানি? কচু পড়াটি!’ উল্টুরাম তার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেয়। ফের বলে, ‘হামি না হঁয়েছি ত কী হঁয়েছে? দেশের কাজে দশের কথা ভাবতে হয়। জ্যালা মানে ত আর চাপাইটাঁড় লয়, জাহাজপুর-বুরুয়াডি-মানকিয়ারি-পলপলও লয়। জ্যালা হৈল ই-মুড়ার ল্যা হাও মুড়া তক। সবাই ‘পূর্ণ সাইক্ষর’ হঁয়েছে য্যা ইটাই আনন্দ। সবার পেটেই কালির আঁক পড়ে গেছে।’
বলরাম বলে. ‘শুধু হামরা বাদে। ঘাসিরা বাদ।’
‘হঁ।’ লারাণ হাসতে হাসতে বলে, ‘হামদের পেটে কালীর আঁকও নাই আর সরস্বতীর আঁকও নাই। যদি বিশ্বাস না হছে ত দেখ—হামদের সবার পেটে টুকু টুকু ঘুসুর মাস আছে।’
ফট-ফট-ফট-ফট-ফট...
আসরের আর মাত্র একটা দিন বাকি।
আজও ওরা আলোর কোনো ব্যবস্থা করতে পারল না। আলো বলতে, এখন ওরা বিজলিবাতির কথা আর চিন্তা করছে না। আসরের সময় তা পাওয়ার তো সম্ভাবনাই নেই, এমনকি দশ-বিশ-পঞ্চাশ বছরের মধ্যেও চাপাইটাঁড়ের ঘাসিদের গ্রামে বিজলিবাতি জ্বলবে বলে ওদের বিশ্বাস হয় না। ওরা এখন চিন্তা করছে হ্যাজাকের কথা।
জয়পুর থেকে জেনারেটার ভাড়া করে আনা যে তাদের সাধ্যেরও অতীত, তারা তা নিজমুখে স্বীকার করেছে। জেনারোটর আনার জন্য আবার বাহনও দরকার। তার মানে সিন্ধুসভ্যতার সেই দ্বিচক্রযান জোটাতে হবে। তাতে ‘হাই-হুই’ করে নিজেদেরই তুলতে হবে, নিজেদেরই গাড়োয়ানি করে আনতে হবে—পৌঁছেও দিতে হবে। জেনারেটারের একদিনের জন্য ভাড়া লাগবে অন্তত দেড়শো টাকা। সেটা সন্ধে থেকে রাতভর চলবে। তেল পুড়বে কমসে কম আরও একশো-সুয়াশো টাকার। ডিজেল এখন দশটাকা লিটার। এই তিনশো টাকা আসবে কোথা থেকে? আর্থিক সামর্থ্যের প্রেক্ষিতে দেখলে এই খরচ তাদের ‘আউটের বাইরে’। কোনো প্রশ্নই আসে না।
তা ছাড়া, আসরের খরচ বলতে শুধু এইটুকুই নয়, তার সঙ্গে শিল্পীদের খাই-খরচা জুড়তে হবে। শিল্পী বলতে ঝুমুর শিল্পী এবং ছৌশিল্পী। তারা যে-যার মতো হেঁটে, সাইকেলে, গোরুর গাড়িতে আসবে। শিল্পী ছাড়াও কিছু ‘ভলান্টার’ তো থাকবেই। সেইসঙ্গে আয়োজকরাও খাবে এই আসরের খাবার। আর ঘাসিদের ছুটু ছুটু ছ্যেলাগুলা? রৈঞ্জা-তপা-নদা-বানশা-কুশধ্বজ-মদ্দৈনা—এই বীরপুংগবের দল? তারা তো বাবু ছাড়বে না। তারা বতর বুঝে গুড়গুড় গুড়গুড় করে এসে রসোই-ঘরে ঢুকে পাত নিয়ে বসে পড়বে। আর তা না হলে থালে থালে খেঁচড়ি নিয়ে দে দৌড়।
তবে যদি দেখা যায় যে, শিল্পী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা খাওয়ার পরে ‘খেঁচড়ি ঘাঁটা’ আর অবশিষ্ট থাকছে না, তাহলে আয়োজকরা যে-যার ঘরেই খাবে। এতে তাদের বউরা গুরগুরালেও তারা কিন্তু কেউ রাগরোষ করবে না। এটা চোড়কু এবং গতিককিষ্ণ আমতলে সবার সামনেই বাছনিক করে বলে দিয়েছে। হঁ, আগে বলে দিয়াই ভালো। তা নাইলে পরে বলবে, ইটি ক্যানে হৈল? সেটি বলা চলবে না।
হড়াস হড়াস করে গোটা চারেক খাট পড়ে গেল। গতিককিষ্ণর ঘরের সামনে। রাস্তার ধারে পড়ে-থাকা তার ‘উদল’টার ওপরেও থাপসি গেদে বসে পড়ল কেউ কেউ। গতিক আসছে একটু পরে। জল শুকিয়ে-যাওয়া পুকুরে হাঁটু অবধি পাঁকে নেমে সে গোটা ছয় মাছ ধরে আনছে? এখন যদি শুধাও, ‘বঁধু কী মাছ ধরেছ বঁড়শি দিয়া?’ চ্যাং মাছ! তার নোংরা ও খাটো ধুতির প্রান্তটিতে লটপটিয়ে সেই মাছ ক-টা সে উঠোনের মাটিতে ঘঁষে ঘঁষে আঁশ ছাড়িয়ে, নুন-হলৈদ মাখিয়ে পুড়িয়ে খাবে। গরম মাড়ভাতের সঙ্গে। বাসিভাতের সঙ্গেও খাওয়া চলে। কথায় আছে, ‘মাছপড়া বাসিভাত/নাই খাবি ত ঢাকাঁয় রাখ।’
দিনের আলো নিস্তেজ হয়ে আসছে। খেতমাঠের ওপর দিয়ে মুখের লালায় সিক্ত লাল লাটিমের মতো সূর্য, হামাগুড়ি দিতে দিতে, চলে গেছে দিগন্তে। সেখান থেকে চাপাইটাঁড়ের যত ঘাসিরা মিলে যেন সারা পশ্চিম আকাশজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে মুঠো মুঠো আবির গুলাল। সেই গোধূলি আলোয়, গাছের মগডালগুলিতে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়াউড়ি করছে তালচটিরা। বাঁশবনের ধারে ধারে মিলনের জন্য শূকরীর পিছনে তাড়া করে যাচ্ছে শূকর। এভাবেই আসরকে নিয়ে ঘাসিদের উল্লাস যেন ছড়িয়ে গেছে প্রকৃতির মধ্যেও।
কোমরের দু-পাশে দুটো হাত রেখে, ঠমক ঠমক নাচতে নাচতে বলিরাম ঘাসি, গলি দিয়ে ঢুকে গতিকের উঠোনে গিয়ে দাঁড়াল। মাটিমাখা মাছগুলির দিকে তাকিয়ে গতিককে সে বলে, ‘কি খুড়া, আর কৎক্ষণ? পাছে গরম গরম কলমকাঁঠি চালের ভাত আর কাতলা মাছের গরগৈরা ঝোল খাঁইয়েই বাইরাবে নকি?’
গতিক তার ঠোঁটের জোড়ে জমে-থাকা লালা সুড়ৎ করে টানে। হাঁটুর ওপরে থোৎনা রেখে, কোনো জবাব না দিয়ে টুব টুব হাসতে থাকে। ওদিকে খাটে খাটে বসে আসরের শেষ আলোচনা জমে উঠেছে। তাদের হাসি-মশকরা শলাপরমর্শও ভেসে আসছে গতিকের কানে। বলিরাম সেই উল্লাসে মত্ত হয়েই গতিকের বউয়ের উপস্থিতিতে লজ্জিত না-হয়ে ফের লেটো শিল্পীর মতো অনায়াসে কোমর ঘুরিয়ে, একপাক নেচে, গেয়ে উঠল—
মাছ গাঁথব হালা হালা
পলাশ পাতের খালা হে
বৈশাগ মাসে পানি নাই
বোড়ো ভোখের জ্বালা...
ভোখের জ্বালায় খাটতে যাব বিহার-বদ্ধমান
ডর লাগছে বিটি ডাগর—মায়ের সমান...
গাইতে গাইতে হঠাৎ থেমে যায় বলিরাম। হাত দুটো পিছনে রেখে, নাটকীয় ভঙ্গিতে ঝুঁকে সে লক্ষ করে গতিককে। গতিকের মাছের দিকে গভীর মনোযোগ এবং দৃষ্টি। বারে বারে কষের লালা সুড়ুৎ সুড়ুৎ টেনে নিচ্ছে। হয়তো সে না তাকিয়েও টের পায় বলিরাম তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বলে, ‘হই, ভালোই বলতেছিলিস। থামলি ক্যানে? পুরা কর।’
‘পুরা কর! এৎক্ষণে ঘাড় লাড়লে হবেক? এমন সুন্দর গান আর তুমি শুনলেই নাই?’
‘কে বলল শুনলি নাই?’ গতিক বলে, ‘হামি ত শুনেইছি, আর তোর খুড়িও শুনেছে।’
বলিরাম বলে, ‘আরেক লোকও শুনেছে।’
‘আরেক লোক? কে?’ গতিক এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে পাছে ফটিক, লারাণ বা অন্য কেউ এল নাকি। গতিকের বউ শরাবনীও গলির দিকে ঘাড় ঘোরায়।
বলিরাম চোখের কাছে তর্জনী ঠেকিয়ে পিট পিট করে অদ্ভুতভাবে দেখায় গতিককে—‘সাই দেখ খুড়া! সাই দেখ! কেমন হামার গান শুনে থৎনা লাইড়ে লাইড়ে তারিফ করছে।’
গতিক দেখে সজনে গাছের কান্ডে বেঁধে রাখা তার পাঁঠিছাগলটি। জাবর কাটছে আর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে বলিরামকে। গতিক, এবং সঙ্গে সঙ্গে শরাবনীও হাসে। ম্যাঁ, ম্যাঁ ডাকতে থাকে ছাগলটি। সজনে গাছের শুকনো বাকলে লেপ্টে-থাকা একটা বৃদ্ধ কৃকলাসও থেকে থেকে ঘাড় নাড়ছে।
শরাবনীও বলে, ‘ঝুমৈরটা বোড়ো ভালো। কে জুড়েছে? তুই লিজে?’
‘হামি? ধৌর!’ বলিরাম বলে, ‘চাপাইটাঁড়ে ঝুমৈরের অস্তাদ থাকতে আর কে ঝুমৈর জুড়বেক?’
‘হঁ। স্যা বা ঠিক কথা।’ গতিক বলে, ‘চোড়কুর পারা অস্তাদ ই-এলাকার ভিৎরে পাওয়া ভার। উয়ার ঝুমৈরের মর্মটাই এক-আলাদা। অন্তরটা যেমন কাঁদায় ছাইড়ে দেই। সেই মনে আছে—ওই ঝুমৈরটা—কনধারের লদী রে বঁধু—?’
গতিক বাকিটুকু আর জানে না। যদিও চোড়কুর এই ঝুমৈরটি বহু লোকেরই মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু তবু গতিক মনে রাখতে পারে না। তার স্মরণ-বল অশক্ত।
‘হঁ-হঁ-হঁ।’ বলিরাম চনমন করে উঠে। পুরুলিয়া তথা মানভূমের খরাবিবর্ণ মানুষের অসহায় ও করুণ জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে এই গানটির মধ্যে। আর তাই শুধু যে মনকে স্পর্শ করে তা নয়, ঘরের মুধুন যেমন সমগ্র চালাটিকে ধরে থাকে, এই ঝুমুরটিও তেমনি তাদের অখন্ড বিলাপের আধার হয়ে ওঠে।
‘চোড়কুদ্দা’র ঝুমুরের অন্যতম অনুরাগী এই বলিরাম। বায়না ধরে মনদভেরি সঙ্গে নিয়ে গ্রামের বাইরে না চলে গেলে সে চোড়কুর ঘরে এই চর্চাই করে। চোড়কুর অনেক ঝুমুরই তার মুখস্ত। এই ঝুমুরটিও, প্রথম কলির শুরুতেই, তাকে ভেতর থেকে যেন নাড়া দিল। আবেগে, বেদনায়। শরাবনী বা গতিককিষ্ণ তাকে গাইতে বলার আগেই সে ডানহাতটি সামনের দিকে তরঙ্গায়িত করে ধরল—
কনধারের লদী রে বঁধু, কনধারকে গেলি
সাঁঝে ফুটল ঝিঙাফুল বিহানে হারালি
বঁধু, তুঁই কনধারকে গেলি
বরষে বরষে মাটি ফাটে
শুকায় গায়ের চাম
পানি বিনা ফাটে ছাতি না চলে ক্ষেতিকাম
গোরুহাল নিয়ে হামি কি ফেরেই না পড়িলি
বঁধু, তুঁই কনধারকে গেলি।। সাঁঝে ফুটল ঝিঙাফুল...
‘ব্যাস-ব্যাস-রোককেই। বেরেক দাও—ঘ্যাচাং!’ নিজেই মুখে মুখে ব্রেকের আওয়াজ করে গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া গোরুর গাড়িটি থেকে তড়াক করে লাফ দিয়ে নামল লারাণ মাছুয়ার। পাছায় ঘন ঘন সশব্দ চাপড় মেরে ধুলোমাটিও ঝাড়ল।
‘বাব্বা!’ চলে-যাওয়া গোরুর গাড়িটিকে থুতনি দিয়ে দেখিয়ে, রাধেশ্যাম বলল, ‘ই-বাসটাকে তুঁই কথায় ধরলি লারাণ? আটাকালের মোড়ে, ন ফরেস্ট মোড়ে?’
লারাণ হাসে। সে জানায়, পায়দলে পায়দালে সে চলে গিয়েছিল ভাড্ডি পেরিয়ে। কাঁসাইয়ের ওপারে অবস্থিত দেউলঘাটা থেকে আরও আন্দাজ আধাঘমণ্টার রাস্তা। সেখানে দুটো হ্যাজাকের ব্যবস্থাও সে করে এসেছে।
ফেরার পথে কাহানের কাছে ওই গোরু গাড়িটি পেয়ে সে উঠে পড়েছে। যদিও বুড়ো গাড়োয়ান তাকে নিতে চায়নি। গোরু দুটো বড়োই দুর্বল। তার ওপর সারাদিন তেমন খাওয়াপানি জোটেনি। কেমন করে ভার টানবে? কিন্তু লারাণ ‘খুড়া’র কথা মানেনি। একরকম জোর করেই সে ‘লৈদকে’ দিয়েছে। তারপর পুরো রাস্তাটা হাসিফুর্তির কথা বলতে বলতে ‘খকরা বুঢ়া’কে ভুলিয়ে-ভালিয়ে এসেছে চাপাইটাঁড়। এমনকী, নদীতে সে গাড়ি থেকে গোরু খুলে ঘাটে তাদের জলও খাইয়েছে। এবার লারাণ শুরু করে—
‘রাধেশ্যামখুড়া! আর ক-ন চিন্তা নাই। লিবভাবনায় থাক!’
‘কী চিন্তা নাই রে বাপ? গটাই ত চিন্তার।’
‘আ-ল বাতির।’ লারাণ কৃতিত্বের সঙ্গে বলে, ‘একটা লয়, দু-দুটা ‘হ্যাঁসেক’ লাইট হামি ইন্তেজাম করে আইসেছি।’
‘দুটা হ্যাঁসেক? কথার ল্যা?’ গতিককিষ্ণ শুধায়, ‘তুন্তার ল্যা?’
‘তুন্তা? তাইলে এৎক্ষণ কী বিত্তান্ত শুনলে? হামি ত গেছলি ভাড্ডি পাইরায়। তবে হঁ, তুন্তাও গেছলি বা।’
লারাণ মাছুয়ার এবার পুরোটা খুলে বলে। প্রথমে সে তুন্তাই গিয়েছিল। সেখানে যাওয়ার তার দুটো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমটা হল, ‘নবযুবক ছোনৃত্য পাটি’কে নিশ্চিত করে দেওয়া যে, আসর হচ্ছেই। চাহে আ-ল বাতির ব্যবস্থা হোক, আর চাহে না হোক। আমতলে কয়েকদিন ধরে খেতের মাটি ফেলে ফেলে যে ডিডিং৩৯ করা হয়েছিল, এখন সেই মাটি দিয়ে বেদি বানিয়ে ‘ইস্টেজ’-এর কাজ প্রায় শেষের মুখে। এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে ‘জল ছিপকনা’র৪০ কাজ। কাল সকাল থেকে তাকে দুরমুশ পিটাপিটি করে ঠিক করা হবে। চারপাশে খুঁটাও গাড়া হবে। এই খুঁটায় বোরোই দড়ি দিয়ে বাঁধা হবে মাইক। একসেট মাইক ভাড়া করা হচ্ছে। দুটি চঙা। দন্ড ৬০ টাকা। সেই সঙ্গে ভখা মাইকওয়লাকে একপাত ‘খেঁচড়িঘাঁটা’। যদিও এই ৬০ টাকা ভাড়ার মধ্যে ৫০ টাকা দিয়ে ‘হ্যানসেক’ করা হবে। তাতে যদি না মানে তবে তার পায়ের কাছে আড়াগড়া পড়ে দিয়ে ‘লেগসেক’।
আর হ্যাঁ, ওই খুঁটাগুলোতেই ঝোলানো হবে ‘হ্যাঁসেক লাইট’। কমপক্ষে দরকার গোটা ছয়েক লাইট। ওরা আশা করেছিল যে, তুন্তাতেই পেয়ে যাবে গোটা তিনেক। কিন্তু ছৌপাটি জানিয়েছে, তাদের কাছে অৎগুলা ‘হ্যাঁসেক’ নাই। আছে মাত্তর একটি। যেটি নাচের সময় শিল্পীদের ‘সাজ-পশাক’ পরতে, ‘প্যান্টিং’ করতে লাগবে। এ ছাড়াও ওই গ্রামেরই অন্য এক ‘ভম্বল কুমারের’ ঘরেও একটা কি দুটা লাইট আছে। কিন্তু সে লাইট গ্রামের বাইরে কাউকে দেবে না। খোদ ‘মনতিরি-ম্যাজেস্টার এলেও না। এমনি কড়া লোক ‘ভম্বল খুড়া’।
তবে তুন্তাতেই সে খোঁজ পেয়ে যায় যে, ভাড্ডিতে অমূল্য কুমারের ‘হ্যাঁসেক’ আছে। সেগুলো গ্রামের ষোল আনার লাইট। কাজে-ভোজে তারা অনেককে দিয়ে থাকে। ভাড়াও নেয় না। আর অমূল্য কুমার নিজেও ভালো কুড়মালি ঝুমৈর শিল্পী। সন্ধান পাওয়ামাত্র লারাণ মাছুয়ার সেখানে চলে যায়। তাতে ভালোই হল। লারাণ অমূল্য কুমারকে আসরে ঝুমৈর পরিবেশন করতে আমন্ত্রণ জানিয়ে দিল। লাইট দিতে তারা কোনো আপত্তি করল না। তবে লাইট তারা হাতছাড়া করবে না।
নিজেরা দলবল নিয়ে আসর দেখতে যাবে। তার আগেই তাদের গ্রামের ‘ছকরাপাটি’ এই লাইট নিয়ে যাবে। তেল ভরে ‘পাম’ দিয়ে জ্বেলে, লাইট খুঁটার পাশে ‘পোঁথৈলের পারা’৪১ সে এক-ঠ্যাঙে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। আসর শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে এভাবেই ‘গাড়’ দিয়ে যাবে।
‘ব্যাস। ভাড়াভুতা কুচ্ছু লাগবেক নাই।’ লারাণ ডান হাতের পাঞ্জাটি অর্ধচন্দ্রাকারে ঘুরিয়ে বলে, ‘সেরেফ মাটিতেলটি ভরে লিতে হবেক।’
‘স্যা ত লিতেই হবেক।’ চোড়কু বলে, ‘মুরুগ দিল এই ঢের। মশলাও দিবেক? কিন্তুক দুটা হ্যাঁসেকে হবেক? এত এত লোক। কমসে-কম গটা আটেক লাইট ত জ্বালতেই হবেক।’
‘ধৌর! আটটা।’ রাধেশ্যামখুড়া বলে, ‘হামরা কি ক-ন কৈলকাতার যাত্রা করছি। আটটা হ্যাঁসেকে তেল ভরতে হবেক ষোল বোতল। কে দিবেক? তেল কিনতেই ভোগা খুলে যাবেক।’
গতিক বলে, ‘আর দিলেও আটটা হ্যাঁসেক তুঁই পাবি কথায়? তবে হঁ, আ-র গটা তিনেক চাইয়েই।’
‘হঁ।’ চোড়কুও সেটা সমর্থন করে। বলে, ‘লোকও হবেক।’
‘হবেক মানে?’ ফটিক বলে, ‘কাল হামরা আলকুশা গেছলি। ত যাতে যাতে কাউয়াহারা বনের ভিৎরে যৎগুলা গ্যারামের লোককে পাঁইয়েছি, সবাইকে বলে দিঁয়েছি—ভাই, তরা বৈশাগ মাসের ৭ দিনে চাপাইটাঁড়ে আসবিয়েই আসবি। বহুত লাচখেল-ঝুমৈর হবেক।—তাইলে এখন আগাম বুঝে দেখ, ওই সোব লোক যদি চাপাইটাঁড়কে আইসে ঢুকে যায়, তাইলে আসরে দশ-বিশ হাজার লোক হঁয়ে যাবেক।’
‘ধেৎ চুপ দে!’ রাধেশ্যামখুড়া ফটিককে ধমকে থামিয়ে দেয়। বলে, ‘বিশ হাজার লোক মুহের খেল? ক-হাজার লোক হলে তবে বিশ হাজার হয়, সেটা আগু বল ন?’
‘বড়জোর চার-পাঁচ।’ চোড়কু বলে, ‘তিনটা না হলেও আ-র দুটা হ্যাঁসেক চাইয়েই। পাওয়াবেক কথায়?’
চিন্তা করতে করতে দু-তিনজন বেরিয়ে পড়ে। কাছাকাছি গ্রামগুলোতে গিয়ে এর-তার ঘরে ঢুকে একটু খোঁজ-খবর করলে জানা যেতে পারে। পাওয়াও যেতে পারে। গ্রামে ‘হ্যাঁসেক লাইট’ হল মূল্যবান জিনিস। সবার কাছে থাকে না। আর যার কাছে থাকে, সে বিশেষ প্রয়োজনে অন্যকে যে দেয় না তা বলা যাবে না। লারাণ কোনো সম্পর্ক ছাড়াই দুটো লাইটের ব্যবস্থা তো পাকা করে এল। এই প্রত্যাশার জোরে বলিরাম, ফটিক এবং লারাণ মাছুয়ারও লাইট জোগাড় করতে যে যন দিগে পারল লেলে মাছির পারা ছড়িয়ে পড়ল। উৎসাহে টগবগ করে বলকিতে থাকা লারাণ, যাওয়ার আগে চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘হ্যাঁসেক লাইট/চলাও ফাইট!’
চাপাইটাঁড়ে আজ যেন অন্য বাতাস বইছে। শুধু বাতাস নয়, বাতাসের সঙ্গে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে দরবারি ঝুমৈরের ভাঙা-ভাঙা কলি, কখনো কোনো ঘাসির নাম ধরে ডাক—‘লারণ মাছুয়ার। শিরি লারাণ মাছুয়ার—ঘাসি—গড়াৎ। তুমি খঁয়াড়ে, খামারে যেখিনেই থাক তুরন্ত আমতলে ইস্টেজে দৈঁড়ে আইস। ছাগলকে পালহা খাওয়াতে নিয়ে যাবার এখন সময় লয়। তুমাকে রাধেশ্যামখুড়া বহুতক্ষণ ল্যা খুজছে। লারাণ মাছুয়ার—’
কেবল লারাণের নামই না, বলিরাম, চোড়কু ফটিক, গতিককিষ্ণ, পান্ডু ঘাসি প্রত্যেকের নাম ঘুরে ফিরে ঘোষণা করা হচ্ছে। এটা যে ঘোষণা করছে এবং যার নাম ধরে ঘোষণা করা হচ্ছে, তাদের দু-পক্ষেরই ভালো লাগছে। সে-কারণে অনেক তুচ্ছ ব্যাপারেও যে-যাকে পারছে একবার নাম ধরে মাইকে ফুঁকে দিয়ে চলে যাচ্ছে। এই যেমন—‘বলিরাম ঘাসি, তুমি বোরহৈ দঁড়ির গছাটা কথায় রাইখেছ? খুজে দিঁয়ে যাও। সারাই খুজেও পাওয়াছে নাই।’
কিংবা, ‘পান্ডু ঠাকুর। শুনতে পাছো ন নাই? পান্ডু ঠাকুর তুমাকেই বলা হছে—রাঁধাশালে ডেগ-বালতি-চাটু সাবধানে রাখবে। মেলায় বারোভূতের কাজ। চুরি হলে জরিমানা লাইগে যাবেক।’
কিংবা, ‘হ্যা-ল। হ্যা-ল। যারা ইস্টেজে বাঁধাছাঁদা করছ, তাদেরকে বলা হছে, খুঁটায় খুঁটায় আমডাল দমতক বাঁইন্ধে দাও। আমডালের কমতি নাই। দেখতে সৌষ্টব লাগবেক।’
ঘোষণা থামার সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠছে নাচনী নাচের ঝুমৈর—‘ডিংগৈলা ধরেছে জালি জালি...’
বড়দের দেখাদেখি, অনেকসময় ঘাসিদের ছোটো ছোটো ছেলেরা, যারা একদন্ডের জন্যও ঘরের দিকে পা না বাড়িয়ে সকাল থেকেই খুঁটা গাড়া, ইস্টেজ করা, চঙা বাঁধা ইত্যাদি কাজ দেখছে এবং আমগাছের পেল্লায় কান্ডটিকে ঘিরে ‘লুকাঝুড়ি’৪২ খেলছে, তারা বতর বুঝে হঠাৎ হঠাৎ কোথা থেকে এসে মাইক্রোফোনের সামনে ‘মদ্দৈনা গড়াৎ! তুমি বাটুল৪৩ নিয়ে আমতলে চৈলে আইস।’ কিংবা ‘মদনভেরি/ফুঁকের ফেরি’—এমনি কিছু উলটোপালটা বলে লোক হাসিয়ে ছুটে পালাচ্ছে। ঘোষণার দায়িত্বে যে রয়েছে, সে দেখতে পেয়ে তেজি কুকুরের পারা হালসাতে আসছে—‘বকাচদা! এমন কানপাটিটায় টালাব ন!’
আবার এটাও ঠিক, চাপাইটাঁড়ে এই প্রথম মাইক ঢুকেছে বলে, মাইকের ঘোষণার ফলে তাদের কাজে বা দৌড়াধুপাতে তারা ফুর্তি পাচ্ছে। অন্যের কাছে তাদের ডাঁটও বেড়ে যাচ্ছে। এর আগে তো কেউ কখনো তাদের নাম ধরে ডাকেনি। মাইক হাতে ধরে নিজের কথা অন্যকে শোনানোর সুযোগও পায়নি। ফলে মাইকের ঘোষণাটি তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করছে। হয়তো তরুবর ঘাসি তখন টিনের থালায় আমানি নিয়ে নুন দিঁয়ে ‘চঁচায়’ মারছে, ঠিক তখনি তার নাম ঘোষিত হচ্ছে, ‘তুমি যেখিনেই থাক দু-এক লোককে নিয়ে—লোক বসবার জায়গাটায় ইমুড়া-উমুড়া ‘বড়’ বাঁইন্ধে—মহিলা-পুরুষ ভিনু-ভিনু করে দাও। নাইলে মরদ লোকের সঙে মাইঞালোকের কেলেকেচে লাইগে যাবেক। তরুবর ঘাসি! তরুবর! কই শুনলে...’ এই ঘোষণা শোনামাত্র তরুবর আমানির সঙ্গে শাগরাঁধা না খেয়েই চলে গেল।—‘শাগ নাই খাব। থাক পৈড়ে। রাধেশ্যামখুড়া বহুত আর্জেন কাজে হাঁকাছে। —যাছি! যাছি!’
ঘাসি-বউরাও সকাল থেকে বেশ খুশি খুশি। মাইকের শব্দ তাদের নিকোনো উঠোনে, ঘরের ভেতরেও এসে ঢুকে যাচ্ছে। এতে তারাও কাজে আনন্দ পাচ্ছে। আসর শুরু হবে সেই সন্ধেবেলা, কিন্তু এই বিকেল থেকেই তারা হুডুজুবু করছে। কেউ পাঁঠি ছাগলকে পালহা দিয়ে রাখছে, ঘুসুরের জন্য বাইন-এ মাড় দিচ্ছে, আঙিনায় জল-ছিপকনা দিয়ে বাঁশের ঝাঁটায় সরসর ঝাঁট দিচ্ছে। আবার কেউ কপালে বড়ো করে টিপ পরছে, মাথায় বলখঁপা করছে, সুঁটি পাকাচ্ছে। অন্যদিনের চেয়ে আজ তারা চুলে বেশি বেশি তেল নিচ্ছে। আর এই তেল নিতে গিয়ে খাটে বসে, ওরা আজ বেশি করে হাসি-মশকরাও করছে।
বুড়ি পেমলাও কি আজ কম খুশি? যে ঘাসি-বউদের মাথায় এক দসান সাঁচিতেলও নিয়মিত জোটে না, তাদের ঠাট্টা করে সে বলে, ‘এ ধন, হাই শুন। আজ তরা সবাই টুকু টুকু ফুলন তেল লে। তাইলে দেখবিস রাতে তোদের মরদন্ডলান কেমন গায়ে ঝাঁপাতে আসবেক।’
পেমলার এমন অকপট কথায় ওরা প্রত্যেকে হাসতে হাসতে খাট থেকে ঢলে পড়ে। কেউ শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে হাসি থামানোর চেষ্টা করে। কেউ-বা মুখ নীচু করে হাঁটুর ওপরে থুতনি চেপে হাসে।
‘হামাকে না বলিস গো পেমলাদিদি।’ মঞ্জুলা, রমণী, ভারতীয়দের দেখিয়ে সরলা পেমলাকে বলে, ‘তুই ইয়াদেরকে স্যাটা বল। হামার মরদ বিন-ফুলনতেলেই—’
‘মাঝরাতে উঠে জল খাওয়ায়?’ মঞ্জুলা তার মুখের বাক্যটি সম্পূর্ণ করে দেয়। এতে আরও হাসির রোল পড়ে। সে বলাতে ওদের মনে পড়ে যায় ‘জল খাওয়ানো’র প্রসঙ্গটি। যেটা একসময়, এই চুল ছাড়ানোর আড্ডাতে সরলা নিজেই ঘাসি-বউদের শুনিয়ে ছিল। সে বলেছিল তার মরদ নাকি আধারাতেও তাকে খেঁচরায় উঠায়। বলে, ‘এ গৌ, উঠ ন গো। জলের ঘটিটা যে পাছি নাই। দে ন টুকু খুজে।’ এবং শেষমেশ নিজে তৃষ্ণার্ত হয়েও সে ‘জল’ খাওয়ায় তার বউকে।
এই সূত্র ধরে, ওরা আবার সবাই মিলে সরলার পেছনে লাগে। এও একধরনের যৌন খুনসুড়ি, যা এই মুহূর্তে প্রফুল্ল মনে ওরা বেশ উপভোগ করে। রমণী বলে, ‘হামাদের মরদগুলা তর মরদের পারা লয় বাবা। শুতে আইসেও হড়বড়-দড়বড় করে। সুস্থির থাকতেই লারে।’
এই মন্তব্যের সঙ্গে মঞ্জুলা আরও জুড়ে দেয়। বলে, ‘আর হামাদের মরদ বউয়ের খাটে শুয়ে বউয়ের কাছে টুসুগীতও শুনতে খুজে নাই।’
‘টুসুগীত?’ পেমলা বিস্ময় প্রকাশ করে সরলাকে বলে, ‘এ সরলি তুঁই মরদকে টুসুগীত শুনাস নকি?’
‘কন গীতটা, দিব বলে?’ মঞ্জুলা বলতে গেলে, চিরুনি সুদ্ধ হাতে সরলা মুঠা পাকিয়ে, তার পিঠে হাসতে হাসতে গুম গুম কিল মারে। বলে, ‘বলিস না। যদি বলেছিস ন তাইলে ব্যাটার মাস খাবি!’
‘আহ, অত জোরে কিলাস না ধন। ছাড়, নাই বলব?’
কিন্তু মঞ্জুলা বলব না বললেও ওরা সরলাকে ছাড়ে না। মরদের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়ে, সেই রাতে কোন টুসুগীতটা সরলা তার মরদকে শুনিয়েছে, সেটা ওরা তার মুখ থেকেই শুনতে চায়। আর এই নিয়ে পীড়াপীড়ি করতে থাকে। সরলাও না শুনিয়ে পারে না।
মরদকে টুসুগীত শোনানোর ঘটনাটি ঘটেছিল গেল পৌষ-পরবের সময়। সরলার এখন মনে হচ্ছে মঞ্জুলাকে সেটা বলে ফেলাতেই তাকে এমন অপদস্থ অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। তবে এই বউগুলোর মধ্যে এসব নিয়ে হাসি-ঠাট্টা তো হয়েই থাকে।
এই মানভূম অঞ্চলে পৌষ মাস পড়তে-না-পড়তে হাটে-ঘাটে লোকমুখে শোনা যায় টুসুগান। প্রেম-অপ্রেম-আনন্দফুর্তি-আকাঙ্ক্ষা এবং অভীষ্ট নারীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার বাসনা, যৌন চাপান-উতোর ইত্যাদি গানের কথাবস্তু। টুসুর যে-কয়েকটি সুর প্রচলিত, যে-সুরগুলি লোকায়ত, গ্রামবাংলার জীবনে গার্হস্থ্য সুর, তার মধ্যে একটা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী কোমলতা আছে। মনকে বিগলিত করে, দোলা দেয়। এখানে কোনো চটুলতা, চপলতা নেই। তাই এই গান ও তার মর্মিক অভিব্যক্তি আজও রাঢ় অঞ্চলে সজীব হয়ে আছে। তার আরও একটি বড় কারণ হল, যাকে উদ্দেশ করে বা যাকে কেন্দ্র করে এই গান এবং এই পরব, সেই ‘টুসু’ রাঢ়ের এক কুমারী কন্যা। সে কখনো শিশু, কখনো কুমারী, কখনো-বা সদ্য-বিবাহিত। তার বেশি নয়। ঘরের মহিলাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক তাই সন্তানের মতো, আবার সখির মতোও। তাকে যেমন অন্তর দিয়ে ভালোবাসা যায়, তার কাছে নানান বিষয়ে অভাব-অভিযোগ করা যায়, তেমনি আবার তার সঙ্গে কলহ-বিবাদও করা যায়। এমনকী, গ্রামের মেয়েরা তাদের আপন আপন দলের টুসুর শ্রেষ্ঠত্ব জানান দিয়ে প্রতিবেশী অন্য ঘরের টুসুর ছিদ্রান্বেষণ করে, তাদের সঙ্গে গানে গানে কলহ করে। খেলাচ্ছলে। কারণ, প্রতিঘরেই টুসু তাদের আদরের ধন।
এই টুসুকে নিয়ে পৌষসংক্রান্তিতে হয় পৌষ-পরব। সকালে মেয়েরা টুসু ভাসাতে গান গাইতে গাইতে পুকুরে, নদীতে যায়। এই সময় ছেলের দলের সঙ্গে মেয়ের দলের গানের ভেতর দিয়ে কথা কাটাকাটি চলে। এটা তাদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ঘরে ঘরে পিঠা-লাঠা হয়। এমনি সব কারণে বিবাহিত মেয়েরাও টুসু পরবের সময় বাপের ঘরে যাওয়ার জন্য চঞ্চল হয়ে পড়ে। তারা ফিরে পেতে চায় তাদের বিবাহ-পূর্ব ফেলে-আসা শিশু-কৈশোর-বালিকা জীবনের স্মৃতি।
বিবাহ-পূর্ব জীবনে সরলাও কি নদীতে যায়নি তার সখিদের সঙ্গে? টুসুর জবাবে টুসু গেয়ে মুখরা হয়ে ওঠেনি? নদীতে সে কি করেনি জলকেলি? এইসব নিয়ে একদিন কৌতূহলী হয়ে উঠেছিল তার মরদটি। সে তাকে বলেছিল, ‘বুঢ়ির মাঈ! কই, হামাকে একটা টুসু গান শুনাও ন।’
‘টুসু?’ সরলা লজ্জা পেয়ে বলেছিল, ‘হামি নাই জানি!’
‘বাব্বা! তুমি আ-র জান নাই। পৌষ পরবের সময় নদীয়ে যাতে তুমি ছঁড়াদেরকে কি কম শুনায়ছ? লাও, শুনাও ন একটা। হামি কিছু নাই মনে করব। পরবের সময় বিটিছ্যেলারা ত লদীকে সিনাতে যাবেকেই। আর যদি তুমি এখনও বলবে পরবে লদীকে যাবে, ত যাও ক্যানে। হামি নাই বারুণ করব।’
সরলা হাসে। একথা মুখে বললেও, এটা ঠিক যে, বিয়ের পরে কোনো স্বামীই চায় না যে তার বউ সেই আগের মতো নদীতে গিয়ে কেলি করুক, ছোঁড়াদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করুক। তাই তেমন ইচ্ছে প্রকাশ করলে, ঘরে কলহ লেগে যায়—মাঁঞা-মরদে। একটি গানে তো বলা-ই হচ্ছে, বউ যদি তার পুলককে দমন করতে না পেরে পরবের সময় শিলাই নদীতে যায়, তাহলে তার মরদ পিঠে গুরুগম্ভীর কিল মেরে মেরে প্রহার করে, তাকে ফিরিয়ে আনবে সেই নদীঘাট থেকে। তার ভেতরের উদ্দীপনাকে সে এভাবেই জব্দ করবে—
‘শিলাই গেলে কিলাঁয় ঘুরাব
অ তোর কুরকুরিটা ঘুচাব!’
সরলা তার মরদকে একটা গীত অবশ্য শুনিয়েছিল। তার সেই গীতটির মধ্যেও রয়েছে সেই আবেদন। এখানে বউটি তার স্বামীর কাছে বাপের ঘরে যাওয়া নিয়ে দরবার করছে। সে এমন কথাও বলছে, যদি তাকে এই পরব উপলক্ষ্যে বাপের ঘরে যেতে না দেওয়া হয়, তাহলে সে কোনো কিছুকে তোয়াক্কা না করেই চলে যাবে। তাতে যদি তার স্বামী পুনর্বিবাহ করে বা ‘সাঙহা’ও করে, তাতেও সে কাতর হবে না।
‘সাঙহা করা’র অর্থ হল, কোনো বিবাহিত মহিলাকে আটপৌরে আয়োজনের মাধ্যমে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করা। স্বাভাবিকভাবেই বিয়ের চেয়ে সাঙহার মান-মর্যাদা তুলনায় কম।
সরলা তখনও লাজুক মুখ করেই রয়েছে। রমণী বলে, ‘তুঁই যে বাসরঘরে মাথায় কাপড় দিছিস লো? কই শুনা গীতটা?’
‘তদের বোড়ো রিজ। বৈশাগ মাসে টুসুগীত শুনতে খুজছিস।’ সরলা বলে। তারপর সে গুনগুন করে সুর ধরে—
পৌষ পরবে যাবই বাপের ঘর
অ তুঁই বিহা কর আর সাঙহাই কর।...
গানটি শুনতেই ওরা এ-ওর গায়ে হেসে ঢলে পড়ল। গানের বক্তব্যটির মধ্যে অংশত সত্যও রয়েছে, তাই ওরা তার ভাবে উদ্বেলিত হয়ে পড়ল। তারপর খাটে খাটে বসে, পা দুলিয়ে, ওরা ওই দুটি পঙক্তিকেই সমবেতভাবে গাইতে লাগল—‘পৌষ পরবে যাবই বাপের ঘর...’
কথা ছিল, আসরে দুটো চোঙা লাগানো হবে। আর এই দুটোই থাকবে ইস্টেজে। কিন্তু জয়পুরে মাইক ভাড়া করতে গিয়ে, লারাণ মাইকওয়ালাকে পটিয়ে-পটিয়ে আরও একটা চোঙা আদায় করতে পেরেছে। ওই একই টাকার ভেতরে। এই বাড়তি চোঙাটা টাঙানো হয়েছে আমগাছের টঙে। লারাণের ইচ্ছে ছিল সেটা একেবারে মগডালে দেওয়ার, যাতে তার শব্দ চাপাইটাঁড় থেকে ফরেস্ট মোড়ের দিকে অনেকটা দূর অবধি ‘বাসাতে বাসাতে’ চলে যায়। কিন্তু মাইকওয়ালা সেখানে টাঙায়নি। অত ‘স্বগগে’ দিতে হলে যে-পরিমাণ তার লাগবে, তা ওদের নেই। উলটে লারাণকে সে ধমকে দিয়েছে। বলেছে, ‘উখেনে চঙাটা দিঁয়ে কি স্বগগের দ্যাবতাদের শুনাবি? ইটা মদনভেরি লয়, মাইক বঠে।’
যাহোক, কিছুটা নীচে চোঙাটা দিতে হয়েছে। তাহলেও মাইক যে গাছে ঝোলানো হয়েছে, এতেই তাদের মনে ফুর্তি আর ধরে না। ছেলেবুড়ো সবার। এভাবে মাথা খাটিয়ে গাছে চোঙা দেওয়ার জন্য তারা সাবাশি দিচ্ছে লারাণকে। যদিও, বিজলি-লাইন পেলে লারাণের মাথায় অন্য একটা পরিকল্পনা ছিল। সে চেয়েছিল, ওই আমগাছের ডালে-পাতে কিছু ‘লাল-লীল’ ডুম দিতে। সেটা যখন হলই না, তখন সে চোঙা বেঁধে দেওয়ার কথা চিন্তা করে। আসর আমতলে বসছে। আমগাছটিকে কিছু একটা করা দরকার বলে তার মনে হয়েছে। তবে তো লোক ছুটে আসবে আসরের দিকে?
লোক এখন থেকেই আসতে আরম্ভ করে দিয়েছে। এই বিকেল থেকেই। তবে এখন ঘরের মেয়েরা আসেনি। তাদের জন্য জায়গা রাখছে আদুড়-গায়ে ছোটো ছোটো ছেলেরা। তাই নিয়ে তাদের মধ্যেও লিয়াই-ঝগড়া কম হচ্ছে না।
মেয়েদের পাশেই পুরুষদের বসার জায়গা করা হয়েছে। জায়গা মানে পলিথিনের বস্তা সেলাই করে করে বানানো চট বা ‘তিরপাল’ পেতে দেওয়া হয়। বিটিছ্যেলা এবং পুরুষ মানুষদের আলাদা করতে মাঝখানে একটা একমুঠো পরিধির বিশ-পঞ্চাশ হাতের মস্ত একটা ‘বড়’ এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত অবধি টেনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
‘বড়’ হল খড় পাকিয়ে পাকিয়ে বানানো বেশ মোটা ‘দড়ি’।
এটা দিয়ে ধান-চাল রাখার মরাই তৈরি করা হয়। পান্ডু এই বড়টি এনেছে গ্রামের ডমন মহাতর ঘর থেকে চেয়ে। অনুষ্ঠান শেষে আবার তাকে পিঠে লাদিয়ে যেমনকার তেমনি ফেরত দিয়ে আসতে হবে শ্লা ডমনার ঘরে। এই দড়িটির দু-পাশেই খেতের ওপরে বসে পড়বে শ্রোতারা। গানের অনুষ্ঠান অর্থাৎ ঝুমৈর শেষ হয়ে গেলে, রাত বারোটা নাগাদ শুরু হবে ছোনাচ। যদিও বারোটা মানে বারোটা নয়। একটার আগে কিছুতেই না। তখন থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত চলবে—গ্যাদা-গ্যাদা-গ্যাদ্দা-গ্যাদা গুড়ম! গ্যাদ্দা গুড়ুম! চ্ছৌ!
ছোনাচটা কিন্তু মাটি ফেলে বানানো ওই ঢিপিমতো স্টেজটির ওপরে হবে না। স্টেজে করার জিনিস নয়। গান শেষ হয়ে গেলে একটা বিরাট হইচই শুরু হবে। ঘাসি-মেয়েদের কোলে কোলে ঘুমিয়ে-পড়া শিশুরা তখন একপ্রস্থ কান্না কেঁদে নেবে। বিভিন্ন জায়গা থেকে এই কান্নার পোঁ শোনা যাবে। শোনা যাবে মেয়েদের বিরক্তি, কান্না থামানোর জন্য তাদের পিঠে গদ-গদ কিল মারাও। আসর থেকে উঠে খেতের আলে, মাঠে ছেলেরা দাঁড়িয়ে এবং মেয়ে-বউরা বসে কোমরের ওপরে কাপড় তুলে প্রচুর পেচ্ছাব করবে। ভেসে আসবে পোড়া তেলে চপ ছাঁকার দুর্দমনীয় গন্ধ।
এই সময় দর্শকাসনের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন রজ্জুটিকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এবং আসরের ঠিক মাঝখানটিতে গোল করে করা হবে ছোনাচের জায়গা। সেই গোলটিকে রেখে সামনে বাচ্চারা, মেয়েরা এবং বুড়োরাও বসে পড়বে। ‘ছকরাপাটি’ বেশিরভাগ পিছনের দিকে দাঁড়িয়ে নাচ দেখবে। দু-পাশের ভিড় সরিয়ে একটা অপরিসর রাস্তা করা হবে, যে-রাস্তা দিয়ে গনেশ, দুর্গা, ‘শি-ব’, রাম-রাবণ, কার্তিকেয় প্রভৃতি সবাই ধামসার তালে এসে আখড়ায় ঢুকবে। সেই আখড়ারই একদিকে ঢোল, ধামসা, হারমোনিয়াম, ফুলেট বাঁশি, পেঁপটি, জুড়ি-নাগড়া ইত্যাদি নিয়ে বসবে ‘সুরপাটি’। এই বাজনদারদের সঙ্গেই থাকবে একজন ঝুমৈরা। আর সেখানেই পাশাপাশি থাকা সেই ছোনৃত্য পাটির লোকজন তথা দর্শকরাও ভুঁটিওলা গণেশের কিংবা কিরাত-কিরাতীর উল্লম্ফন দেখে মাঝে মাঝে সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠবে, ‘চ্ছৌ!’
ওদিকে ইস্টেজের কাজ শেষ। দড়ি টানাও হয়ে গেছে। এখন চলছে মাঠে দুটো-একটা খোঁটা পোঁতার কাজ। এই খোঁটাগুলোতেই বাঁধা হবে হ্যাঁসেক লাইট। শেষ অবধি পাঁচটি লাইট তারা জোগাড় করতে পেরেছে। এই যথেষ্ট। সেগুলোতে ‘মাটিতেল’৪৪ ভরে রেডি করে রাখা হয়েছে। তবে জ্বালানো হয়নি। আঁধার হতে এখনও প্রায় আধাঘণ্টা বাকি। আগে থেকে জ্বেলে তেল পোড়াবে কেন? তখন মাঝরাতে তেল ফুরিয়ে গেলে ‘হৈরার মা! হৈরার মা!’৪৫ করে ছুটে বুলতে হবে। তাই আলো জ্বালানো হবে ‘প্রকৃত আঁধার’ হলে—বিরাট সমারোহ করে। দেখা যাবে, লাইট জ্বালানোর সময়েও তাকে ভিড় করে রয়েছে সেইসব দুষ্টু ছেলের দল।
তিনটে চোঙাই ঝোলানো হল। আমগাছের ওপরে একটা এবং বাকি দুটো ইস্টেজে। ইস্টেজের চারিদিকে চারটে খোঁটা পোঁতা হয়েছে। তার দুটো খোঁটাতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে চোঙা দুটো। চোঙাগুলো এমন মুখ করে বাঁধা হয়েছে, যাতে প্রতোকটি চোঙার আওয়াজ ‘বাসাতে বাসাতে’ একেক দিকে ভেসে যায়। আমগাছের চোঙাটিকে দেওয়া হয়েছে হন্যাটাঁড়-ফরেস্ট মোড়ের দিকে মুখ করে। ইস্টেজের একটিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে খয়েরটাঁড়-বুরুয়াডির দিকে এবং অন্যটিকে কাহানের দিকে, যাতে উপর-কাহান এবং হেঁটে-কাহানের লোকেরা পুরা শুনতে পায়।
ইস্টেজের খোঁটাগুলোতে ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত দড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাঁধা হয়েছে আমডাল—‘আমডালের কমতি নাই’। এ ছাড়া ইস্টেজের চারকুণের চারাটি খোঁটার মাথায় দড়ির চৌকো ঘের করে, সেই দড়িগুলোতেও একটা একটা করে আমপল্লব ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাতে দেখতে ‘সৌষ্টব’ লাগে।
‘হেলো! হেলো!’
মাইকে ঘোষণা শুরু হয়েছে। জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আসর আরম্ভ করে দেওয়া হবে। ‘আর কিছুক্ষণ’ মানে কত ক্ষণ তা বলা মুশকিল। কয়েক ঘণ্টাও হ’তে পারে।
‘হেলো! হেলো! ঝুমৈরাদের বলছি। তুমরা রাধেশ্যামখুড়ার কাছে বিঁড়ি খুজো না। বিঁড়ির ক-ন সিন নাই। আর কিছুক্ষণের মধ্যে...’ যদিও ইতিমধ্যেই বেশ কিছু লোকজন তাদের আসন দখল করে গ্যাঁট হয়ে বসে পড়েছে। পায়ের বুড়ো আঙুল মটকাচ্ছে। মহিলাদের আসনে অনেক বউমানুষও মাথায় ঘোমটা নিয়ে ছেলে কোলে চুপটি মেরে বসে আছে। আর তাদের টানেই অন্যান্য মেয়েরাও রদবদিয়ে আসছে। খেতের আলপথ আর পাকদন্ডী ধরে আসতে শুরু করেছ কাছাকাছি গ্রামের মানুষ. মেয়েদের চহটদার শাড়ি ব্লাইজ। মাথায় লাল-সবুজ-গোলাপি ফিতে। তাদের সঙ্গেই রঙিন কাগজের ফিরফিরি আর ঘূর্ণি বিক্রেতারাও বিক্রির আশায় আসছে চাপাইটাঁড়ে।
‘হেলো! হেলো!’
‘হঁ হেলেছি! হেলেছি! বল ন!’ দর্শকদের ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ এমন মন্তব্য করছে, মাইকের হেলো শুনে। যতবার মাইকে বলছে, ততবার সেও ওই একই কথা বলে তার পাশাপাশি দর্শকদের হাসাচ্ছে। অন্য একজন দর্শক আর ধৈর্য ধরতে না-পেরে রেগে-মেগে বলে উঠল, ‘ধুর লেপড়া! তদের শুধু হেলো আর হেলো! ইবার শক্তায় ঝুমৈরটা শুরু করবি ত কর, আর নাই ত হামরা অ্যাঁড়ের চললি।’
শুরু হল ঝুমুর।
সন্ধেবেলাতে তা শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেইমতো তোড়জোড়ও চলছিল। কিন্তু হতে হতে রাত আটটা হয়ে গেল। তবে এরজন্য উদ্যোক্তাদের দোষ দেওয়া যায় না। তারা তাদের সমস্ত কাজ ঠিক সময়ে করে নিশ্চিন্ত ছিল যে, এরপর শিল্পীকে একে একে ডাকা হবে। বাজনদারদেরও বলা হবে যে, তুমরা তুমাদের ‘হারমোনি’, পেঁপটি ইত্যাদি অস্তাদি জিনিসগুলা নিয়ে ফুঁকাফুঁকি ঠুঁকাঠুঁকি ইত্যাদি যা করার করে রেডি করো আর মাদৈলাকেও হাঁকায় তুমাদের সঙেই রাখ—নাইলে বলবে—‘শালা বদনা এখনেই ছিল, কনধারে বিঁড়ি খাতে গেল।’ তখন গোরু ডাঁড়াবেক ত গাড়ি ডাঁড়াবেক নাই। পুরা তৈরি থাক, যাতে মাইকে ‘ঘঁষিত’ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে তুমরা হুমচে ইস্টেজের চাইপে যাতে পার।
কিন্তু গন্ডগোল হয়ে গেল মূলেই। দেখা গেল, মাইক থেকে ‘ম্যাঁ-হাম্বা’ কোনো আওয়াজই বেরোচ্ছে না। লেব্বাছাকে!
এদিকে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। দর্শকদের আর তর সইছে না। ইতিমধ্যে এদিক-ওদিক থেকে কটু ভাষা, কখনো-বা গ্রাম্য রসিকতাপূর্ণ মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে। তাতেই ভয় পেয়ে গেল উদ্যোক্তারা।
লারাণ, বলিরাম, ফটিক, পান্ডু, শিশুপাল-এরা এক এক জন করে ঘন ঘন মাইকওয়ালার কাছে এসে তাগাদা দিচ্ছে, ‘এ বসন, আর কৎক্ষণ লাগবেক রে ভাই? বল ন মাইরি। লোকগুলা ওস্থির করে দিছে!’
মাইকওয়ালা বসন্ত তাতে আরও রেগে যায়। বলে, ‘অস্থির হছে ত আমি ক্যালার কী ছিঁড়ব? তরা শ্লা সেই দুপহর ল্যা মাইকটাকে এতটুকু বিরাম দিছিস নাই। হেলো আর হেলো! খারাপ হবেক নাই? সবারেই জীবন বঠে ন।’
বসন্তও আসলে ঠিক ধরতে পারছে না গোলমালটা কোথায়। অন্ধকারের মধ্যে সে অ্যামপ্লিফায়ারে লাগানো তার কখনো খুলে ফেলে, আবার কখনো দাঁত দিয়ে তারের গোড়া কেটে নাটে আটকে দেয়। বারে বারে নব ঘোরায়, মেশিনের ঢাকন খোলে, ব্যাটারি দেখে। কিছুতেই কিছু হয় না। এই সময় তাকে এই নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলেই তার আর মাথার ঠিক থাকছে না।
বসন্তের চৌকস জবাবে তাদেরও কিছু বলার থাকে না। সত্যিই তো, মিশিনটা বিশ্রাম পায়নি এতটুকু। মিশিন হলেও তারও তো মানুষেরই মতো জীবন? কোনো বৃদ্ধ গ্রামবাসী বলে ঠিক উলটো কথা। হন্যাটাঁড়ের একটা বুড়ো যেন লাঠির ভরেই হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কখনো-কখনো সে তার ডান পা-টি তুলে ওই লাঠিটিকে আরও জড়িয়ে নিচ্ছে এবং সেইভাবেই দাঁড়িয়ে থেকে সে বসন্তের কাজ নিঁখুত পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। সে বলে, ‘মিশিন ন ফিসিন! ইয়াদের ক-ন বিশ্বাস আছে? ইয়ারা রা কাড়তেও পারে, আর নাইও কাড়তে পারে। মানুইষের পারা ত লয়। যখন যেটা মন স্যাটা বলবেক। এই এখনি দেখবে—হেলো হেলো করে, গান-তান গাঁইহে গটাই গমগমা করাবেক। আর তখনি দেখবে ববা সাজে দিল। সাত চড়েও রা নাই। আর অবলা জীব। ভিৎরে য্যা কী অসুখ হছে স্যাটা ত মুখ ফুটে বলতেও লারবেক। ইয়াকেই বলে...’
‘এই বুঢ়া। চুপ দে, চুপ!’ বুড়োর বকবকানিতে মাথা খারাপ হয়ে যায় বসন্তের। সে রেগে বলে, ‘তখন ল্যা ক্যানগড়াটায় বকর বকর করেই যাছে। হাই লে, তুঁয়েই সার! তাথে যতই রাত হবার হোক।’
বসন্তের কাছ থেকে সরে যেতে যেতে, বুড়ো নিজের মনেই বিড়বিড় করে যায়, ‘আজ আইসেছি যখন, তখনকে চোড়কুর ঝুমৈর না শুনে যাবই নাই। হঁঃ! তুমিয়েই সারো। রাত একটা-দুটা-তিনটা তক্ক সারতেই থাক ক্যান্নে!’
কিন্তু বুড়ো সরে গেলে কি হবে, ওদিকে শ্রোতারা আরও বেশি হইচই শুরু করে দিয়েছে। কেউ ঠাট্টা করে বলে, ‘মিশিন আর ম্যারামত হবেক নাই। উয়ার লিঘাটা ভাইঙে গেছে। হন্যাটাঁড়ের পদ্ম কামারের কাছকে লেগতে হবেক তুরনত।’ কেউ আবার গোরুর গাড়ির জোয়ালের সঙ্গে তুলনা করে বলে, ‘ম্যান জিনিস হৈল ‘টুঁড়’। ইয়ার মাইকের টুঁড়টা বোধেয় শিমৈল কাঠের বঠে। তার হাতেই মিশিনটা বসে গেল।’ আবার কেউ মাইক-মিস্ত্রির ওপরে রাগ করে বলে, ‘ঠ্যাং-ভুঁটি-চাম-ফৈড়া সোব গুঁটায়-গুঁটুয় তুঁই জয়পুরকে নিয়ে চৈল যা! কমা জিনিসের ভাড়াভূতা-পসাপাতি কুছু দিয়া হবেক নাই!’
‘আর যদি তাতে না মানে?’
‘তাইলে উয়ার মিশিনটার ভিৎরে একটা ঘুসুরছা ঢুকাঁয় দাও। ঘাসিদের ঘরেও দমে ঘুসুরছা আছে। ঐটায় মাইকের পারা ভেবাবেক!’
‘থাক থাক। আর মাইকের দরকার নেই, ঝুমৈর শুনবারও দরকার নাই। বহুত হৈল। হামরা তাল্লে মদনভের শুনব। ইস্টেজে চাপাও গতিকখুড়াকে!’
এত সবের পরেও কেউ একজন হাতে আমডাল নাড়িয়ে চেঁচিয়ে দিল, ‘পাটি ধুয়া জল খাওয়াও! পাটি ধুয়া জল!’
পুয়াতি বউয়ের প্রসব করতে দেরি হচ্ছে বুঝলে, তাকে, ঘাটের পাথর-ধোয়া পুকুরের জলটা বাটিতে এনে একটু খাইয়ে দেয়। প্রসব হয়ে যায়। এখানে পাটি ধুয়া জল খাওয়ানোর কথায় মেয়েরাও হাসতে হাসতে ঘোমটা চিবিয়ে ধরে।
এমনি প্রতিটি মন্তব্যে শ্রোতাদের ভেতর থেকে হাসির রোল ওঠে। আর এভাবে সময়ও কেটে যায়। কিছু লোক হাসাহাসি করছে বটে, তবে কিছু লোক আবার বিরক্তিও প্রকাশ করছে। চেঁচাচ্ছে। কেউ কেউ অসহিষ্ণু হয়ে বেচারা ঘাসিদের নিয়ে গাল-বাখান করে যাচ্ছে। বলছে, ‘ইয়ারা হামদের বসায় রাইখে ছ্যেলাখেল করছে। আসর হবেক নাই ত বলে দে রে ভাই!’
‘ইয়াদেরকে বাঁইন্ধে মার! আসর হবেক নাই মানে?’
‘মাইক যদি নাই ম্যারামত হবেক, ত বিন-মাইকে ছো-লাচাটাই শুরু করা হোক। ঝুমৈর তখন বাদে হবেক।’
‘হঁ, আসর শুনব বলেই ত মদটা খাঁইয়ে পসাটা ফুরালি। আসর হতেই হবেক!’
উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ বিষম চিন্তায় পড়ে। ভয়ও পেয়ে যায় লারাণ, ফটিক, পান্ডু এরা। বলিরাম বিভ্রান্তের মতো তাদের কাছে এসে দাঁড়ায়। তারা আবার সবাই মিলে হস্তব্যস্ত হয়ে রাধেশ্যামখুড়ার কাছে যায়। রাধেশ্যাম তখন হ্যাঁসেক লাইটে পাম দিচ্ছিল। লারাণ বলে, ‘রাধেশ্যামখুড়া, কী বুঝছ?’
রাখেশ্যামখুড়া বসে থেকেই, ওপরের দিকে ঘাড় তুলে দেখে লারাণ, ফটিকদের। বলে, ‘কিস্যার কী বুঝছ?’
‘নাআ, ইয়ারা পাছে গোলমাল করবেক? কী বলছে শুনছ ন? বলছে বাঁইন্ধে মার!’
কয়েকদিন ধরে নাগাড়ে এত পরিশ্রম করে, নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে তারা নিজেদের সংস্কৃতিকে ভালোবেসে, গ্রামবাসীদের মনোরঞ্জনের কথা ভেবে, এই আসরের আয়োজন করেছে। আর মানুষ এমনি অকৃতজ্ঞ যে, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে উদ্যোক্তাদেরই মারার কথা বলছে।
‘এত বড় মরদ?’ কথা শুনেই মাথা গরম হয়ে গেল রাধেশ্যামখুড়ার। ফঁপায় উঠল, ‘কন গুদির ব্যাটা মারবেক? কই, আসুক দেখি! ক-ন রঙ বঠে নকি? মারবেক!’
রাধেশ্যামখুড়ার এমন ফুঁশে ওঠা কন্ঠস্বরের সমর্থনে অন্ধকারের মধ্যে একটি পরিচিত কন্ঠও যেন মোলায়েমভাবে গর্জে উঠল। বলল, ‘ঘাসিদের মারবেক? কার এতবড় হিম্মৈত হঁয়েছে রে ব?’
‘হই, উল্টুখুড়া! তুমি? পঁহচিলে?’ লারাণ যেন তার অকূলে কূল পেল এমনিভাবে খুশি হয়ে, তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতে সে একটা বাছোট মিথ্যা বলে, ‘এখনি—এই-টুকু আগে—এক স্যাকেনও হয় নাই—হামরা সবাই মেলে তুমার কথা চিন্তা করতেছিলি। তুমার নিয়েই বলাবলি হতেছিল য্যা, হ্যাঁ ভালা, উল্টুখুড়া ত এখনো আইসে পঁহচিল নাই? পাছে গটা রাতেই সাইক্ষরতা করবেক নকি! তা বাদে ভাবলি, নাঃ আজের দিনে হামাদের উল্টুখুড়া না আইসে হরগিজ থাকতে পারবেক নাই—পারবেকেই নাই!’
‘ক্যানে আসব নাই? তরা এত মেহনত করে একটা জিনিস করছিস!’ উল্টুরাম বলে, ‘সাইক্ষরতা ফেলে হামাকে আসতে হৈল!’
‘সাইক্ষরতা ফেলে?’ ফটিক অবাক হয়ে বলে, ‘তাই য্যা বললে পূর্ণ সাইক্ষর হঁয়ে গেছে?’
‘হঁ, মানে একটুকু বাকি ছিল। এক আঙুল। স্যাটাও হঁয়ে গেল।’
‘পূর্ণ সাইক্ষর হঁয়ে গেল? আজ রাতেই? অঃ, তাইলে আর ল্যাখাপঢ়ার কি দরকার?’ লারাণ বলে।
‘নাহ! এখন আর ল্যাখাপঢ়ার দরকারেই নাই। এখন বিশ-পঞ্চাশ বছর লিশ্চিন্ত!’
‘ভালই হঁয়েছে। ঠিকেই যোগে-যোগে তুমি আইসে পড়েছ!’ ফটিক বলে, ‘এৎবড়ো মেলায় তুমি না আইলে চলে? ইয়াকেই বলে, তকদিরের খেল!’
রাধেশ্যামখুড়া রাগত মুখে একবার লারাণের দিকে, একবার ফটিকের মুখের দিকে চায়। একটি কথাও না বলে সে আক্রোশবশত আরও জোরে লাইটে পাম দিতে থাকে।
তবে সত্যিই, ভাগ্য না থাকলে এমন মহাপুরুষ গ্রামপ্রধানকে কি আকস্মিকভাবে এই আসরে পাওয়া যায়? যদিও উল্টুরাম ফটিকের এই প্রশংসাসূচক বাক্যটি নিতে পারল না। সে তো ‘তকদির’-এর বদলে শুনল ‘তদবির’ আর বলল, ‘স্যা ত বঠেই। তদবির না করলে কি আজ তরা এৎবড়ো আয়োজনটা করতে পারতিস? শাস্তরে বলেইছে—’
কী বলেছে শাস্ত্রে? পাটি-ধুয়া জল?
উল্টুরাম একটু চিন্তা করে নেয় কী বলবে। তারপর উল্টুরাম-প্রণীত ‘উল্টুচন্ডাল শাস্ত্র’ থেকে সে একটি শ্লোক শুনিয়ে দিল। বলল, ‘যার আখডাঁড়িয়ে মন—বঝা বঁহে বঁহে শিয়াল, তার ঘরে পাঁহচায় ধন।’
‘অহোহোহো! বেড়ে বলেছ খুড়া! যার আখডাঁড়িয়ে মন—’ ওরা সমস্বরে প্রধানের এই স্বরচিত চাষাড়ে শাস্ত্রবাক্যটির প্রশস্তি না করে পারে না। তবে চাষাড়ে হলেও মন্দ কী। ভাবার্থটা অনেকটা এই রকম—যদি সত্যি কোনো কিছুর প্রতি তোমার আন্তরিক নিষ্ঠা থাকে, লক্ষ্য থাকে, আকাঙ্ক্ষা থাকে, তাহলে যেকোনো উপায়েই হোক না কেন এই অভীষ্ট বস্তুর প্রাপ্তি তোমার ঘটবেই। যদি ইক্ষুদন্ডের প্রতিই তোমার অনিবার্য আকাঙ্ক্ষা থাকে, তাহলে দেখা যাবে—একদিন শৃগাল তার পিঠে সেই বোঝা নিয়ে খেত থেকে তোমার ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে। ভাবা যায়!
রাধেশ্যামখুড়া বোধ হয় রাগে গুরগুর করতে করতেই, ভিড়ের ভিতর দিয়ে, লাইট হাতে চলে গেল। আমতল ছাড়িয়ে, খেতের দিকে। যেখানে অনেকটা অন্ধকার জায়গা-ঘিরে চলেছে রাঁধাবাড়া। সেখানেই আছে চোড়কু, গতিককিষ্ণ আরও কেউ কেউ। তারা কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। কেউ কুসুম-কাঠ চ্যালা করছে, কেউ কানাভাঙা মাটির হাঁড়া কাঁধে নিয়ে পুকুর থেকে জল বয়ে আনছে, কেউ রাঁধুনি ঠাকুরকে জিনিসপাতি মুহায় দিচ্ছে।
রাঁধুনি হয়েছে পান্ডু ঘাসি। বড়বাঁধা করে ধুতি পরেছে। মাঝেমাঝে সে খিঁচায় উঠছে হাতের কাছে সবকিছু ঠিক সময়ে না পেয়ে। বলছে ‘অঅঅবাবা! নুন পাছি ত তেল নাই, তেল পাছি ত ডিংলা নাই। এমন মতে কী করে হবেক? হামি কি ল্যাপড়ার কুশি৪৬ দুটা ভাইজে দিব? তরা-ই বল ন?’
রাঁধুনির পদ পেয়ে, পান্ডু নিজেকে এখন জয়পুরের নামজাদা কল্যাণী ঠাকুরের সমগোত্রীয় ভাবছে। যেন তাকে রাঁধাবাড়ার জন্য বহুত টাকায় বায়না করে আনা হয়েছে। আবার প্রতিটি রাঁধুনি ঠাকুরের মতো সেও তার ধুতিটি কোমরে মস্ত পাক দিয়ে হাঁটুর ওপরে তুলে পরেছে।৪৭ তাতে তার পেটটা দশমাসের পুয়াতির মতো দেখাচ্ছে। সেই অবস্থাতে সে হাতে ডাবু নিয়ে পেঁদায় এদি-ওদিক ব্যস্ত হয়ে ছোটোছুটি করছে। এই করতে করতে, অন্ধকারে তার নিজেরই পায়ে লেগে কুমড়োগুলো কোন দিকে কোন দিকে গড়িয়ে গেছে! সে হাতের ডাবু দিয়ে খোঁজে। তারপর না পেয়ে, চোড়কুর ঝুমুরের কলিকে বিকৃত করে নিছক লোক হাসানোর জন্য, ডাবু হাতে নেচে নেচে গাইতে থাকে—
কনধারের ডিংলা রে বঁধু, তুঁই কনধারকে গেলি
আঁধারঘরে হাঁতড়ায় হামি খুঁজে না পালি
বঁধু, তুঁই কনধারকে গেলি...
গৈড়খে গৈড়খে আয় ডিংলা
হামার বঠিনের পাশকে আয়
খিদি খিদি কাইটে তোকে তরকারি বেনায়
খাতে বসে ঝাল না পাইলে সবকাই দিবেক গালি
বঁধু, তুঁই কনধারকে গেলি! আঁধারঘরে হাঁতড়ায় হামি...
পান্ডু ঠাকুরের সঙ্গে সেখানে আরও যারা ছিল, তারাও আবছা অন্ধকারে পান্ডুর এই গান এবং কিম্ভূত নাচ দেখে হেসে কুটি কুটি। তারাও গলা মিলিয়ে দেয়। এও আরেক আসর। আর এভাবেই তারা রাঁধাশালে মেতে থাকে হাসি-মস্করায়। তাদের যেন এই মুহূর্তে মূল অনুষ্ঠানের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। সেখানে লোকজন যে খেপে উঠেছে তাও তাদের অজানা। অথবা তারা জেনেও উদাসীন। তারা মনে করে, গ্রামের আসর নির্ধারিত সময়ের দু-ঘণ্টা বাদে শুরু হলেও কিছু যায় আসে না। গটা রাতটাই তো পড়ে আছে। যে একবার আসরের নেশায় এখানে এসে পড়েছে, সে কি দেরি হচ্ছে বলে ঘরকে ফিরে যাবে?
এই ভাবনাটা খুব ভুলও নয়। কিন্তু তাহলেও ভেতরে ভেতরে ভয় পায় লারাণরা। ফটিক উল্টুরামকে বলে, ‘লাও, ইবার তুমি টুকু সামলাও।’
উল্টুরাম মৃদু হাসে। ‘কী সামলাব?’
‘দেখছ নাই কেমন গোল করছে?’ ফটিক বলে, ‘হামদের ত ডরেই লাগছে।’
‘কিস্যার ডর?’ লাইটটা হাতে নিয়ে যেতে যেতেও থমকে দাঁড়ায় রাধেশ্যামখুড়া। রীতিমতো ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, ‘হামরা কী করেছি? কার ধারি হামরা? হঁ, যদি টিকিৎ করে, লোকের ঠিন ল্যা পসাপাতি লিতি, তাইলে বলা চলত।’
‘না না’। উল্টুরাম নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে, ‘বারো গাঁয়ের লোক একঠিনে জড়ো হলে অমন হাল্লাগুল্লা টুকু হবেকেই। তাথে ডরাবার কী বঠে?’
‘যদি সেই কাহানআইলারা...’
‘ধুট!’ উল্টুরাম বলিরামের সেই পুরনো আশঙ্কাকে এককথাতে উড়িয়ে দেয়। সে জানায় যে, খোদ প্রধান দাঁড়িয়ে থাকতে কাহানের লোকেরা এখানে এসে ঝামেলা করবে?
এই কথা হতে হতে সত্যি সত্যি ঝামেলা বেঁধে যায়। তবে বোঝা যায় যে, সে-ঝামেলাটা এই আসরকে নিয়ে নয়। একগ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের লোকের। যথারীতি মেয়েছেলে নিয়ে। দু-পক্ষেই প্রচন্ড বোলচাল শুরু হয়ে গেছে। বোলচাল থেকে লাঠালাঠির হুমকি। এদিকের একজনকে কয়েকজন গ্রামবাসী জাপটে ধরে রেখেছে, ওদিকেও তেমনি আরেকজনকে তার হাত ধরে টেনে রাখা হয়েছে। এই অবস্থাতেই চলছে চাপান-উতোর। এ বলছে, ‘আন তদের হন্যাটাঁড়ের কতগুলা ডাং আছে। নিয়ে আয়!’ ওদিক থেকে জবাব আসছে, ‘ডাং-এর কী দরকার? যদি হিম্মৈত থাকে ত আয় ন তুঁই! আওগা! তোর দাড়িগুলা সোব পুনকা শাগের পারা একটা একটা উপড়ায় লিব। বকাচদা কথাকার!’
‘কী বললিস? আজ তোরেই একদিন কি হমারেই একদিন! বাহিনচোদ—’
আসর থেকে লোকজন ভিড় ভিড় করে এদিক-ওদিক ছুটে চলে যেতে থাকে। আর ঠিক সেই সময় মাইকটিও গ্যাঙায় ওঠে! ঠিক হয়ে যায়।
উল্টুরাম উদ্যোক্তাদের সান্ত্বনা দেয়, ‘থির হও। থির। ঘাবড়াবার কুছু নাই।’—এই বলে সে নিজেই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ইস্টেজে উঠে ছত্রভঙ্গ দর্শকদের উদ্দেশে বলতে লাগল, ‘তুমরা গোলমাল থামাও! আর অ্যাল্পক্ষণ বাদেই হামাদের আসর শুরু হছে। বসে যাও। আগুদিগে যারা আছো—মা—বহিনরা, তারাও বৈস। ধূরে-ধূরে যারা ডাঁড়ায় আছ—ভাই-বেরাদাররা, তারাও আপন আপন জমিনে বৈসে পড়। আসর শুরু হছে। যারা মাঁইঞাছ্যেলার গাদালে ঢুকে আছ তাদেরকে দঁড়ির এপারে আসতে বলা হছে। ভলান্টার! ভলান্টার! হেলো! হেলো! যৎক্ষণ না তুমরা বসবে, তৎক্ষণ হামদের আসর চালু করা যাবেক নাই। এখন হামদের মাইক ঠিক হঁয়ে গেছে, শিল্পীও আইসে পড়েছে। তুমরা চুপ না দিলে...’
প্রধানের এই ‘মধুর ভাষ্যে ঘোষণা’র পরে-পরেই গোলমাল ধীরে ধীরে থেমে যেতে লাগল। কিছু লোকজনও বসে পড়ল। কিন্তু তরপরও প্রধান হাতে মাইক্রোফোন পেয়ে মাগনা বলতে লাগল, ‘এই চাপাইটাঁড়ের মানুইষকে আজ আর শুধুই ঘাসি বা লিরক্ষর বলা যাবেক নাই। আজ তারাও বুদতে শিখেছে যে, ক্যাবল পেটে খাঁইয়ে বাঁচলেই হবেক নাই। মানুষকে বাঁচতে হবেক তার সঁগসকিতিকে নিয়ে। ভাত যদি মানুইষের পেটের আহার হয়, তাইলে মানভূমের এই সঁগসকিতি হৈল তার জল-বাসাত। ইটা কত বড় চ্যাতনার কথা? হামরা তাই বড়ত্তাই করে বলতে পারি, চাপাইটাঁড়ের মানুষইকে হামরা বিজলিবাতি দিতে না পারলেও, তাদেরকে হামরা জল-বাসাত দিয়েছি। যে-জলবাসাত ভিন্ন মানুইষ একডন্ড বাঁচতে পারে নাই। যে-জলবাসাত...’
এইবার দর্শকরা ফের চিৎকার করতে থাকে। তারা প্রধানের আলফাল ভাষণে বিঘ্ন ঘটিয়ে বলতে থাকে, ‘হামরা ইসোব শুনতে আসি নাই। নামাও শালা চাঁইচোর পর্ধানকে।’
‘হঁ! নামাও উয়াকে! আর ইসটাট কর ঝুমৈর।’
প্রধান হাওয়া টের পেয়ে আর কথা বাড়ায় না। সে কী বলে তার এই প্রারব্ধ বক্তব্যে ইতি টানবে বুঝতে না পেরে—‘প্রুলিয়া সঁগসকিতি কি—জয়হিন্দ!’ বলে ইস্টেজ থেকে নেমে যায়।
শুরু হয় ঝুমৈর। প্রথম শিল্পী জাহাজপুরের প্যালারাম মাহাত।
লারাণই শিল্পীর নাম ঘোষণা করল। শিল্পীর নাম শোনামাত্র ছেলেছোকরার দল হাততালি দিয়ে উঠল। জাহাজপুরের এই প্যালারাম এমন কোনো নামকরা শিল্পী নয়। গন্ডগোলের পরেও আসর শুরু হল এই আনন্দেই তাদের করতালি। তা ছাড়া, জাহাজপুর তো আর জয়পুর থানার বাইরের কোনো গ্রাম নয়। চাপাইটাঁড়ের লাগালাগি বলা চলে। তাই হয়তো তার চেনাজানা লোকও এখানে আসর শুনতে এসেছে, তারাই এভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল শিল্পীকে।
শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান যে শুরু করা গেল তার জন্য উদ্যোক্তারাও খুশি। পান্ডু তার হারানো কুমড়ো খুঁজে পেয়েছে। এতক্ষণে হয়তো সে তাকে বঠিনে বেনাবেনি করে কড়াইয়ে চাপিয়েও দিয়েছে। জিরে ফোড়ন তেজপাতা দিয়ে নুন-হলৈদও দিয়েছে। মাইকে ঝুমুর শুনে হেঁশেলের দিক থেকে এখন কেউ কেউ আসরের দিকে আসছে।
আসর চলাকালীন একজনের লোমশ কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে, খুশিতে ডগমগ হয়ে লারাণ বলছে, ‘দেখঅঅঅ। কেমন জমে গেল। কেমন সুন্ডম মাইরে সবাই শুনছে। কিন্তুক অ্যাল্প অ্যাগেও যেমন মনে হতেছিল খটংগায় অস্তর পড়েছে। এত হৈরাগোল। আর এখন? এখন যদি এই রুঁয়াটাও পড়ে—’ বলে, সে সত্যিই বেঁটে ও বুড়ো শিশুপালের চামচিকের ডানার মতো কান থেকে আচমকা একটি পাকা চুল উপড়ে মাটিতে ফেলে বলে, ‘টঙ করে আওয়াজ হবেক।’
‘তোর গুষ্টির পিঠা!’ শিশুপাল তাকে মারার জন্য তেড়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে লারাণ চলে গেছে ইস্টেজের আড়ালে।
আসর চলতে থাকল।
রাত বারোটা। পান্ডু একাই এখন হেঁশেল পাহারা দিচ্ছে। আর মাঝে মাঝে সে একে-তাকে বলে পাঠাচ্ছে—যাদের যাদের এখনো খাওয়া হয়নি—যারা ভলান্টার এবং শিল্পী—তারা যেন একে একে এসে খেয়ে চলে যায়। কতক্ষণ পর্যন্ত সে রাঁধাশাল আগুলে শুগনির পারা বসে থাকবে? সে এমনও ‘এস-ও-এস’ তারবার্তা পাঠিয়ে দিয়েছে যে, যদি খেতে আসতে তারা আরো ‘আনটাইম’ করে, তাহলে পাতে পাতে তাদের ‘ঝালরাঁধা’ নাও থাকতে পারে। তখন ‘ঠাকুরেই সোব মাইরেছে’ বলে যেন পান্ডুকে কেউ দায়ী না করে।
তার এই জোরালো হুমকিতে খানেবালারা তড়িঘড়ি এসে ‘ভুঁই চাপড়ে’ খেতেও বসে গেল, আন্দাজ করে দেখেছে—এখনো ‘সিকি শিল্পী’র খাওয়া বাকি। কিন্তু তাদের কথা ভেবে সে তার শরীরের ক্লান্তি নিয়ে আর জেগে থাকতে পারছে না। দু’চোখ জড়িয়ে আসছে ঘুমে। সে এখন শালপাতার বস্তায় হেলান দিয়ে, মুরলীধরের ভঙ্গিতে পায়ের ওপর পা চাপিয়ে ‘চ্যাঁ-চোঁ-চ্যাঁ-চোঁ’ নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। ওদিকে চট-চট শব্দ করে পতরি ঢাকা ‘খেঁচড়ি’ খাচ্ছে ঘাসিদের কুকুর, ‘ভুলা’।
তবে এভাবে ঘুমিয়ে নেওয়ার আগে, পান্ডুর ইচ্ছে ছিল হেঁশেলের এই পর্বটা শেষ করে একটু আসরের দিকে যাওয়ার। তাতে তার ঢুলটাও কেটে যেত আর চোড়কুর ঝুমৈরটাও শোনা হত। কিন্তু চোড়কুকে তো এখনো ইস্টেজেই তোলা হয়নি। তাকে গাইতে দেওয়া হবে ‘লাস্টেরও পরে’। এখনো পাঁচ-সাত জন ঝুমৈরা আছে। তারপর। উদ্যোক্তাদের আশংকা, চোড়কুর গান শোনার পরে আসরের অনেক লোক ভিড় করে যার-যার তার-তার গ্রামে ফিরে যেতেও পারে। যদি তাদের ছোনাচ দেখার ইচ্ছে না থাকে। তবে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। ছোনাচের আকর্ষণ কি তাদের কাছে কম?
উদ্যোক্তারা মুখে মুখে আগে থেকে অনেক শিল্পীর নাম প্রচার করে দিলেও একজনের নাম তারা সেভাবে কাউকে জানায়নি। সে হল গরাচাঁদ কর্মকার। সে থাকে জয়পুরের উত্তরে—কসাংগি, পুনদাগ, আনন্দনগর যাওয়ার পথে আলকুশা গ্রামে। গোয়াই নদীর ওপারে শুসানডি, এপারে আলকুশা।
গরাচাঁদ নিজের লেখা পুরুলিয়ার লোকগান গেয়ে ইতিমধ্যে বেশ প্রশংসা পেয়েছে। তার গানের বিষয় সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি। পরিবেশনের ঢঙ অত্যন্ত ব্যঙ্গাত্মক। ফটিকের মুখ থেকে আসরের খবর পেয়ে সে নিজেই গান গাওয়ার জন্য এসে পড়েছে এখানে। তার নামও ঘোষণা করা হয়নি। তার মানে চোড়কু, গরচাঁদ নিয়ে এখনো আরো কয়েকজন শিল্পী বাকি। এদের গান শেষ হতে হতেই তো ঢেররাত হয়ে যাবে। তাহলে ছোনাচ শুরু হবে কখন?
অস্থির হয়ে পড়েছে তুন্তার রঘুনন্দন মাহাত। সে একটু পরে-পরেই আসছে আর লারাণকে বলছে, ‘এ লারাণভাই, আর কত রাত করবে? ছুটু ছ্যেলাগুলা য্যা ঘুমায় যাছে। ইবার চোড়কুকে উঠায় স্যাঁষ করে দাও ন।’
‘এখনি?’
‘তুমি ক্যানে নাই বুঝছ? ছুটু-ছুটু ছ্যেলা। উয়ারা ঘুমে লটায় যাছে।’ রঘুনন্দন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। বলে যে, ছোনাচের দলে সাত-আট বছরের কিছু বাচ্চাও অংশগ্রহণ করে। তাদের দরকার হয় নন্দী-ভৃঙ্গি ইত্যাদি সাজার জন্য। আরো বেশি রাত করে দিলে তারা সত্যিই ঘুমে অঘোর হয়ে থাকবে। তখন পালার সময়ে মহাদেব যতই ডাকাহাঁকা করুক নন্দী-ভৃঙ্গিকে কাছে পাবে না। তখন আরেক ফ্যাচেং। ‘ইটা বুঝে দেখবে ন?’
লারাণ বলে, ‘আর মোটেই জনা চারেক শিল্পী আছে। এই ঝিঁটপাণি মাহাত নামলেই আলকুশারটাকে দিব। তাবাদেই ভাড্ডির অমূল্যকুমার আর ওই খ্যাপলা মণীন্দ্রকে দিব। আর সব্বাইকার লাস্টে আমাদের চোড়কুদ্দাকে। তাবাদেই শুরু হঁয়ে যাবেক তুমাদের ঢোল-ধামসা-সুরপাটি-প্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ গ্যাজা-গ্যাজা-গ্রুম! গ্যাজা...’
মদ খেয়ে টালমাটাল বলিরাম। আসর থেকে অন্ধকার ক্ষেতের দিকে গড়িয়ে নেমে যায়। তার খিদে পেয়েছে। হেঁশেলে ঢোকার মুখে সে দেখে মিজমিজ করে জ্বলছে কালিপড়া লালটিন। আর তার অস্পষ্ট আলোয় দেখা যায়, প্রবল নাক ডেকে কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে পান্ডু। যদিও তাকে সেভাবে দেখা যায় না। কিন্তু ফুলেট বাঁশির মতো নাসিকা গর্জনে মালুক করে নেয় বলিরাম। আর এদিকে তখনো খেঁচড়ি খেয়েই চলেছে ভুলা।
‘হ্যান সাপ।’ অস্ত্রপড়ার পরে-পরেই খটংগাতে আসা সশস্ত্র বাহিনীর লোকের মতো ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে ভুলার দিকে বন্দুক তাক করে চেঁচিয়ে ওঠে বলিরাম।
‘সাপ’ শুনে হড়বড়িয়ে উঠে পড়ে পান্ডু। সে বস্তার ওপর থেকে ছিটকে এসে এদিক-ওদিক তাকায়। হতচকিত হয়ে বলে, ‘কথায় সাপ? কথায়? কী সাপ?’
‘হ্যান সাপ।’
এমন দুর্বোধ্য নামের সাপ নিশ্চয় অতীব ভয়ংকর! কয়েক পা পিছিয়ে এসেও পান্ডু কোথাও সাপ দেখতে পায় না। সে দেখে অদৃশ্য বন্দুকধারী বলিরামকে। তখনো সে বন্দুকের নলসদৃশ তর্জনী তাক করে রেখেছে ভুলার দিকে আর ধমকের সূরে বলে চলেছে, ‘মানুইষের পেটের আহার তুমি কুকুর হঁয়ে কন এক্তিয়ারে খাছো? তুমাকে এখনেই আরেস্টো করা হবেক। চলৌ—চলৌ—ইস্টুপিট!’
গরাচাঁদের নাম শোনা মাত্র হইচই করে উঠল অনেক। কেউ বলল, ‘বাব্বা! ইয়ারা তাইলে বহুত আয়োজন করেছে। আলকুশার ল্যা গরাচাঁদকে লিয়ে আইসেছে। দেখঅঅঅ!’
‘ভালোই করেছে। বহুক্ষণ ল্যা ঝুমৈর হছে। ইবার একটুকু অন্যকিছু হোক। আসরটায় চ্যাঠা আসবেক।’
আবার কেউ তাকে দেখে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ‘হামরা আগু হনুমানের গান শুনব। তাবাদে ঐন্য কিছু।’
‘খটংগা! খটংগা!’
গরাচাঁদ হাসতে থাকে। বোঝা যায় এখানেও তার বেশ কিছু অনুরাগী আছে। খটংগা শুনে সে বলল, ‘অস্ত্র পড়া নিয়ে গান ত পুরান হয়ে গেছে। হামি লতুন গান শুনাব। —হনুমান সমাচার।’
‘নাই নাই। আগু খটংগা। তার বাদে হনুমান সমাচার শুনব।’
পীড়াপীড়িতে গরাচাঁদকে আগে অস্ত্রের গানই গেয়ে নিতে হয়। এই গান সে বেঁধেছিল কয়েক বছর আগে। ১৯৯৫ সালে। সে-সময় উড়োজাহাজ থেকে রাতের অন্ধকারে আচমকা বিপুল পরিমাণে অত্যাধুনিক অস্ত্রবর্ষণ হতে থাকে খটংগার মাটিতে। গ্রামবাসীরা এই অস্ত্রপতন দেখে তাজ্জব বনে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। যে-খটংগা গ্রামের নাম জয়পুর থানার অনেক মানুষের কাছেও ছিল অজানা, সেই খটংগা হয়ে গেল পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি বিশিষ্ট নাম। গরাচাঁদ শুরু করে—
উড়াকল রে! কী ফেললি খটংগায়
দুনিয়াভর খোবোর হৈল চল খটংগায়...
প্রথম কলি গাইতে না গাইতে হাততালি। হইচই করে উঠল শ্রোতারা। যেন অতিসাম্প্রতিক কোনো ঘটনাকে নিয়ে এই গান তারা এই প্রথম শুনছে। তারা হুল্লোড় করে সাবাশি দিতে লাগল গরাচাঁদকে। বলতে লাগল, ‘বাহ ভাইরে! বাহবা! বাহবা!’
শ্রোতাদের উল্লাস আর চিৎকারে গানটি কেউ শুনতেই পায় না। পিছনের দিকে যেসব ছেলে-ছোকরারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা বলতে লাগল, ‘তুমরা অমন ক্যানে করছ? উয়াকে আগু গাইতে দাও।’
গরাচাঁদ গান থামিয়ে নিজেও বলে সে-কথা। তারপর সে আবার নতুন করে শুরু করে—‘উড়াকল রে...’
ইস্টেজের পাশেই সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে খটংগায় অস্ত্র পতনের গান বেশ উপভোগ করছিল উল্টুরাম। মাতা হিলাচ্ছিল, তালি দিচ্ছিল। সবার সঙ্গে সেও বলে উঠছিল, ‘হোক! হোক! চলুক এখন যত রাত তক্ক চলবেক!’
দড়ি বিভাজিত মহিলা শ্রোতাদেরও ভাল লাগছিল গরাচাঁদের গান। অস্ত্র পড়ার মতো এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি তো তাদেরও অজানা নয়। কাগজে দূরদর্শনে প্রতিদিনই এই ঘটনার তদন্তের অগ্রগতির সংবাদ প্রকাশ পাচ্ছিল। ছাপা হচ্ছিল খটংগা গ্রামে পুলিশের সশস্ত্র অভিযানের কথা, দোষী-নির্দোষ নির্বিশেষে সংশ্লিষ্ট গ্রামবাসীদের ওপর তাদের চাপের কথা, জিজ্ঞাসাবাদের কথা।
সত্যি বলতে কি, পুরুলিয়াতে এখানো অব্দি এত বড় মাপের ঘটনা তো ঘটেনি। খটংগার মতো পুরুলিয়ার কোনো গ্রামই এমন সর্বজনবিদিত হয়ে ওঠেনি। তাই স্থানীয় মানুষরাও এই ঘটনাটির গুরুত্ব বেশ টের পাচ্ছিল। সে-কারণেই অস্ত্র-উদ্ধারপর্বে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা বা খবর সংবাদপত্রের আগেই হু-হু করে গ্রামবাসীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে যাচ্ছিল নিকটবর্তী প্রায় সবকটি গ্রামে। সে-খবর যেমন শ্যামপুর, বারবেন্দ্যা, কসাংগিতে পৌঁছে যাচ্ছিল, তেমনি তা জয়পুর থেকে বাতাসের গতিতে চলে আসছিল খেদাডি, রুগড়ি, তড়াং, চিটিডি, ডুমৈরডি, বাঁধডি, ঝালমামড়া আর চাপাইটাঁড়েও।
খটংগাতে গ্রামবাসীরা যেমন ঘরে অস্ত্র না রেখেও অস্ত্রের ভয়ে পুলিশের ভয়ে আতংকিত হয়ে থাকত দিনরাত, এখানেও তেমনি শুধু সংবাদ শোনার অপরাধেই সরল গ্রামবাসীরা পুলিশের ভয়ে তটস্থ হয়ে উঠেছিল। অথচ এই ঘটনাটির সঙ্গে তো তাদের আদৌ কোনো যোগ নেই, তাহলে তারা কেন স্ত্রীপুত্র-পরিবার নিয়ে এই মানসিক চাঞ্চল্য এবং ত্রাসের শিকার হবে? যদিও গানের মধ্যে এই প্রতিবাদকে তুলে ধরা হয়নি। তার বদলে তুলে ধরা হয়েছে তাদের অজ্ঞতাকে। তারা জানে না, এ-কে ৪৭ আসলে কী। তারা আজও জানে না, খটংগায় এমন কী জিনিস পড়ল যার জন্য তোলপাড় হয়ে গেল ‘গটা দুনিয়া’? কেনই-বা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে হল গ্রামের যুবকদের? কেন নিজের ব্যাটাবিটিকে নিয়ে কাউয়াহারা বনে কিংবা পুয়ালগাদায় গা ঢাকা দিতে হল বৃদ্ধ ‘ভুটন মাহাত’কে?
উড়াকল রে! কী ফেললি খটংগায়...
আরো দুটি গান গাওয়ার পর গরাচাঁদ ধরল ‘হনুমান সমাচার’। তার আগে ছোট্ট একটি ভূমিকা করল, যা না করলেও পারত। সে বলল যে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রপ করার উদ্দেশ্যে রচিত এই সমাচার। আজকের নেতাদের ন্যক্কারজনক নগ্নচরিত্র সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। দেশের শত্রু, জাতির শত্রু এইসব চরিত্রকে এখন মানুষের জমায়েতে এভাবে হাস্যাস্পদ করা ছাড়া উপায় নেই। গরাচাঁদ গান ধরল—
বন করছে খাঁ-খাঁ বনে থাকে কী করে
যত হনুমান এখন আইসেছে শহরে
দেখ হনুমানের কান্ড...
‘বাব্বাব্বাব্বা! চালাও! চালাও!’ শ্রোতাদের সঙ্গে সঙ্গে চেঁচাতে লাগল উল্টুরামও। গানের উপযোগী মিউজিক না থাকায় সে বলল, ‘মেজিকটা ভাল করে দাও! মেজিকটা! যেমন গান তেমন মেজিকটার সুবিধা নাই! চলুক!’
মাঝে মাঝে হারমোনিয়াম ছেড়ে দিয়ে, গরাচাঁদ তার হাতটি দর্শকদের দিকে বাড়িয়ে গায়—
ছাতের মাথায় ঘরের চালে
লম্ফঝম্প ডালে ডালে
কারো ভাঙে খলাখাপরা কারো মাটির ভান্ড
দেখ হনুমানের কান্ড...
উপর্যুপুরি সিটি পড়তে থাকে। হাসতে থাকে মেয়েরাও—ভিড়ের মধ্যে বসে হাসতে দেখা যায় ঘাসিবউদের। ভারতী, মঞ্জুলা, পেমলা, রমণী, সমবারীকে। কোলে ঘুমিয়ে পড়া মেয়েকে নাড়া দিয়ে গান শোনার জন্য জাগিয়ে তুলতে থাকে সরলা। বলে, ‘এ নুনি, উঠ। হাই দেখ কেমন গায়েন বলছে! হনুমানের গায়েন! হাই দেখ—শুনবি ন—’
দেশে আর ত ক-ন পশু নাই
বাগ-সিংহ গেছে ফুরাঁয়
এখন হনুমানেই গটা দেশ করছে লন্ডভন্ড
দেখ হনুমনের কান্ড...
উল্টুরামও মাথা হিলাতে থাকে—‘দেখ হনুমানের কান্ড!’
ঠিক এই মুহূর্তে একটি ছোকরা সেটা দেখতে পেয়ে, তাকে কান ফুসফুসি দেয়। বলে, ‘হেঃ, তুমি এই গান শুনে মস্তি করছ? নাই বুদতে পারছ ইয়ার মর্মটা কী?’
উল্টুরাম সহজ জবাব দেয়, ‘মর্ম ত গানেই বলে দিছে রে বাবু! মন দিয়ে শুনবিস তব ত।’
‘কী বলছে গানে? তুমি শুনো।’
‘ওই ত যেটা বলছে ওইটায় ত মর্ম।’
‘কী বলছে বল ন?’
‘ওই যে হনুমানে যে-যে কীত্তি করে সেইলাই ত বলছে। ইয়ার-উয়ার খলা ভাঙে, হাঁড়ি ভাঙে।’
‘অ্যান্টা ভাঙে। কী ছিঁড়তে য্যা ন্যাতা হঁয়েছ।’ ছেলেটা রেগে উল্টুরামকে বোঝাতে থাকে, ‘এই গানে ইয়ারা তুমাকেই বাখান দিছে। যত পাটিপুটির লোককে, ন্যাতাকে, মনতিরিকে বাখান দিছে। শুনো ভালো করে।’
এতক্ষণে উল্টুরামের চ্যাঠা হয়। দোষটা অবশ্য তার। আবার অন্যভাবে দেখতে গেলে তারও কোনো দোষ নেই। হনুমান যে লাঙুলবিহীন এবং দু-পায়ের হতে পারে তা সে জানবে কেমন করে? এখন তাকে বুঝিয়ে দেওয়াতে সেও রেগে ওঠে। বলে, ‘শালাদের এতবড় বিদ্যাপ! যা ত, মাইকের তারটাকে ঝাঁইকে দে। আসরের গুষ্টির তিন খেদছি।’
উল্টুরামের সেই ছায়াসঙ্গীটি তৎক্ষণাৎ ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
তখনো গান চলছে। একটু পরেই হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল মাইক। শুরু হয়ে গেল চিৎকার। চেঁচামেচি। গান থামিয়ে, গরাচাঁদ, এদিক-ওদিক দেখতে থাকে মাইকওলাকে। কোথায় গেল বসন্ত? তাকে ডাকাডাকি করতে লাগল উদ্যোক্তারা। তার খোঁজে ভিড়ের মধ্যে ছুটে গেল কেউ। পরে কে যেন এসে জানিয়ে গেল, বসন্ত ভুলার সঙ্গে বসে ‘খেঁচড়ি মারছে’।
মঞ্চে বলিরামের প্রবেশ। চুল রুক্ষ, উস্কোখুস্কো। মদ্যপানের দরুন লাল হয়ে উঠেছে চোখ। চোখের কোলে পিঁচুটির ঢেলা। তার চুপসানো পেট আর লুঙ্গির আলগা বাঁধুনি দেখে বোঝা যায় এখনো খাওয়া হয়নি। উপরন্তু ভুলাকেও সে ‘আরেস্টো’ করতে পারেনি। অথবা করলেও ভুলা তৎক্ষণাৎ নেতার ফোনে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এবং পুনরায় তার গর্হিত এক্তিয়ারে সে ‘মানুইষের পেটের আহার’ খাচ্ছে বসন্তের সঙ্গে।
ইস্টেজে চাটাই বিছিয়ে বসে গাইছিল গরাচাঁদ। মাইক্রোফোন ছিল নিচুতে। বলিরাম হামাগুড়ির ভঙ্গিতে সেই মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে যায়। হারমোনিয়ামে ডানহাতের পাঞ্জা রেখে, সে মাথাটিকে নিজের বাঁ-কাঁধের দিকে একটা মোচড় দিয়ে ঘোষণা করতে থাকে, ‘বসন, তুমি যেখিনেই থাক...’
তার কান্ড দেখে হাসতে থাকে অনেকে। গরাচাঁদ তার হারমোনিয়াম সামলাতে ব্যস্ত। ছুটে আসে লারাণ। বলিরামকে সে টেনে আনে। ‘লোকহাসি করছিস ক্যানে? যা-যা, হাঁইশাল ঘর ল্যা বসনাকে ডাইকে আন। বল, মাইকটা খারাপ হঁয়ে গেছে। যা!’
‘পচা মাইক দিঁয়েছে। ই-শ্লা বারে বারে ফাচোট হঁয়ে যাছে।’ বলতে বলতে বলিরামের প্রস্থান।
ফটিক আসে, শিশুপাল আসে। লারাণের সঙ্গে তারাও হাত নেড়ে শ্রোতাদের উদ্দেশে বলতে থাকে, ‘তুমরা, যে-যেখিনে আছ, বসে পড়। হামরা মাইকআইলাকে ডাকতে লোক পাঠাঞছি। এখনি মাইক মেরামত করা হবেক। আসরের এখনো ঢের বাকি। ঢের শিল্পী এখনো আছে। তুমরা চুপ দিয়ে বৈস!’
কিন্তু কে-কার কথা শোনে? শ্রোতাদের আসন থেকে লোকজন উঠে যাচ্ছে দেখে, গতিককিষ্ণ, চোড়কু, রাধেশ্যামখুড়া এরাও ধরে ধরে তাদের বসানোর চেষ্টা করে। মেয়েরা তাদের জায়গা থেকে কোলের ছেলে নিয়ে নিয়ে যখন উঠে পড়তে লাগল, তখন সত্যিই আসর ভেঙে যাওয়ার মতো মনে হতে লাগল। অন্যান্যরাও আর থাকতে রাজি হল না। কেউ বলল, ‘নাঃ, ছোলাচটাও কে-জানে হবেক ন নাই।’
‘ম্যান পাটির ঝুমৈরটাই শুনা হৈল নাই। কপালে না থাকলে আর কী হবেক?’
‘এখন খতম হঁয়ে যাওয়াই ভাল। গটা রাতটা থাকলে বতর বুঝে ফাঁকা ঘরে চোর সামাবেক। যেও দুটা থালবাটি আছে, সেও নিয়ে পালাবেক।’
এদিক-ওদিক থেকে কিছু কিছু লোক চলে যেতে লাগল। রাতও হয়েছে ঢের। একটা। তাদের এভাবে চলে যাওয়া দেখে রঘুনন্দন মাহাতর আফশোসের ওড় থাকল না। সেই কখন থেকে সে তার পুরো দলটাকেই সাজপোশাক পরিয়ে তৈরি করে রেখেছিল। শুধু এইটুকুর জন্য সে তার ছো-দলের কেরামতি আর দেখাতে পারল না।
‘মহিষাসুর মর্দিনী’ পালার জন্য কয়েকদিন ধরে সে উঠাউঠি মহলা দিয়েছে। যাতে সেটা সুন্দর এবং নিখুঁত করে পরিবেশন করা যায়। আর পালার মাঝে ময়ূর নাচ ঢোকানোর জন্য একটি বিরাট ময়ুরও সে বানিয়েছিল। ময়ুরটি ডানা মেললে দেখা যেত তার অপূর্ব কারুকাজ। সে মন্ডলাকার দর্শকদের ভেতরে থেকে ঘুরে নাচত, পেখম মেলে দিত। প্রায় আটফুট লম্বা এই ময়ুরটির ভেতরে ঢুকে থেকে পাখির অভিনয়টি করে দর্শকদের বাহবা নিত যে ছেলেটি, সে মাত্র সাত বছরের। নাম বৈদ্যনাথ—সবার স্নেহের বদি। সে অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। রঘু তাকে জাগিয়ে সাজ পরিয়ে রেখেছিল। কিন্তু হায়!
রঘুনন্দন মাইকওলার ওপরেই রাগ করতে লাগল। অভিযোগের সুরে বলতে লাগল কেন পুরো পয়সা নিয়ে সে এরকম খারাপ লঝঝড়ে মার্কা মাইক দিল। বসনও তার জবাব দিয়ে সবাইকে অবাক করে দিল। সে এনে দেখিয়ে দিল একমুঠো ছেঁড়া তার। বলল, ‘লাও দেখ! ইবার বল তুমরা কী বলবে? লঝঝৈড়া মাইক দিঁয়েছি?’
‘ইটা কী রকম হৈল?’ চোড়কু বলল, ‘ই-তারগুলা কথার ল্যা আইল? কথায় পালি তুঁই?’
বসন্ত না বললেও সবাই বুঝতে পারে যে, ঘটনাটি আসলে কী হয়েছে? কোনো দুষ্টুলোক তাদের আসর বাঞ্চাল করার জন্যই এই অমানুষিক কান্ডটি করেছে। সবাই যখন গান শুনতে মত্ত হয়েছিল, সেই সময়ে সে কোনো এক ফাঁকে মেশিনের এই তার ছিঁড়ে দূরে ফেলে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে পুরো সাউন্ড সিস্টেম।
ওরা হতবাক হয়ে গেল। এটাও মানুষ করতে পারে?
তখনো হইচই করতে করতে চলে যাচ্ছে শেষ কিছু লোক। তাদের পেছু পেছু চলেছে উল্টুরাম। সঙ্গে তার দলবল। তাদের মধ্যে কয়েকজন জয়পুরের র্যাংহা ছেলেও আছে। যারা মিটিং-মিছিলে উল্টুরামের সঙ্গে থাকে। তার হয়ে কাজ করে। তারা চেঁচিয়ে যাচ্ছে, ‘জয়পুরের মহান ন্যাতা উল্টুরামের চিন্তাধারা দিকে দিকে ছৈড়াঞ দাও। ছৈড়াঞ দাও!’
‘ছৈড়াঞ দাও! ছৈড়াঞ দাও!’
হাসি-মস্করা করে চেঁচাতে চেঁচাতে ওরা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। নিঃস্তব্ধ চারপাশ!
মুহূর্তের মধ্যে শূন্যপুরী হেয়ে গেল জমজমাট আসরটি। এখন মনে হচ্ছে তারা কয়েকজন নির্বাক দাঁড়িয়ে রয়েছে কোনো মহারাত্রির শ্মশানে। এতক্ষণ যে লাইটগুলি সুন্দর ও নির্বিঘ্নে আলো দিয়ে যাচ্ছিল, এখন সেগুলোর মধ্যে দপদপ করে লালচে আগুন উঠতে লাগল। সেই আগুনের ঝিলিকে একেকবার ফুটে উঠতে লাগল তাদের সারিবদ্ধ বিষণ্ণ মুখগুলি। রাধেশ্যামখুড়া, বলিরাম, লারাণ, গতিককিষ্ণু, পান্ডু, শিশুপাল, ফটিক, ভভ, ভুলা, পরীক্ষিত, চোড়কু। ওদিকে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রয়েছে লাইটের পাশে ছোকরাটি। হতবাক রঘুনন্দনও। ছোনাচের মুখোশ পরা দলবল নিয়ে। মুখে মুখে তাদের ঝলমল করছে মহড়াগুলি। পিন পিন করে কাঁপছে মহড়ায় লাগানো রঙিন টিকলি আর চুমকি। ঝিলিক উঠছে সাজানো মুখোশের জরিগুলি থেকেও। গণেশ, দুর্গা, শিব, নন্দী-ভৃঙ্গি, ময়ুর।
তেল কমে এসেছে হেঁসেক লাইটে। অমূল্য কুমারের লোকেরা আপন আপন লাইট ঘাড়ে করে নিয়ে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যেত লাগল ঘাসিদের মুখ। ছোনাচের মুখ—গণেশের মুখ, শিবের মুখ, দুর্গার মুখ—পুরো চাপাইটাঁড়।
অন্ধকার আমতলে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠল চোড়কু। যেন এই অসহায় নীরব রাত্রিতে ঘাসিদের ঘরেই বেজে উঠল মদনভেরি। মৃত্যুর বার্তা।
১ কষ্ট পাচ্ছিল
২ প্রস্থান করেছে
৩ গ্রাম্য খিস্তি
৪ পুনরায়
৫ ফড়িং
৬ জাবনার পাত্র
৭ ছেঁড়া
৮ শীতের সময়
৯ ডেয়ো পিঁপড়ে
১০ বাসি মাড়
১১ বৈদ্যুতিক খুঁটি
১২ মেসো
১৩ সামান্য শাসনে যে কেঁদে কঁকিয়ে ওঠে
১৪ কেরোসিনের
১৫ সম্পর্ক
১৬ তামা
১৭ ঢেঁটা। অবাধ্য
১৮ অশালীন গ্রাম্য শব্দ
১৯ কুমড়োর তরকারি আর খিচুড়ি
২০ গলাসি বাঁধা অবস্থায় মাথা গলিয়ে আনা
২১ বঁটি নিয়ে কোপ মারতে
২২ তেড়ে আসছে
২৩ খাড়া করে রাখা
২৪ চেঁছে চেঁছে
২৫ পলা
২৬ বাঁ হাতে
২৭ রক্ত
২৮ খামচে নেওয়া
২৯ গোরুর গাড়ির জোয়ালের মধ্যবর্তী অংশ
৩০ দাঁড় করালাম
৩১ অহেতুক
৩২ ৭ বৈশাখ
৩৩ চাপাচাপি নয়
৩৪ ভিড়ে
৩৫ ‘চুরি’র শ্লেষাত্মক উচ্চারণ
৩৬ ওয়ার্ক অর্ডারটা
৩৭ গোরু (গাড়িতে জোতানোর জন্য)
৩৮ ঠকিয়ে
৩৯ ঢিবি
৪০ জল ছিটানো
৪১ পুতুলের মতো
৪২ লুকোচুরি
৪৩ গুলতি
৪৪ কেরোসিন
৪৫ হা-হুতাশ করা
৪৬ অন্ডকোষ
৪৭ হেঁসেলের জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখার সুবিধের জন্য অনেক রাঁধুনি এভাবে ফুলিয়ে রাখে পরনের ধুতি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন