সৈকত রক্ষিত
দেখতে দেখতে জষ্টিমাস পড়ে গেল। চাপাইটাঁড়ের মাটিতে বৃষ্টির একটি ফোঁটাও পড়ল না। কেবল কাহান, চাপাইটাঁড়, বরুয়াডি, পালৈজ্ঞা নয়, পুনদাগ, আনন্দনগর, কসাংগি থেকে শুরু করে সমগ্র জয়পুর এলাকাতেই বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই। এই নিয়ে হাপ্তার হাটগুলিতে চলেছে গ্রামবাসীদের অদৃষ্টের প্রতি দোষারোপ এবং আসন্ন খারায় তাদের শোচনীয় পরিণতি নিয়ে নানাবিধ কথোপকথন।
হাটগুলিতে আনাজপাতি, সবজির আমদানি নেই। চালের দাম দুদিন ছাড়াই একসিকি করে বেড়ে যাচ্ছে। বাড়ছে চিড়া-মুড়ির দামও। কিন্তু তবু এই আক্রা নিয়ে নয়, তাদের আলোচ্য এখন খরা।
আটাকল কিংবা ফরেস্ট মোড়ে গেলে দুপ্রান্তের খবরই পাওয়া যায়। একদিকে ঝালদা-তুলিন-মুরি-রাঁচি, আরেক দিকে পুরুলিয়া। পুরুলিয়া জেলা শহর। এদিককার গাদা-গাদা লোককে হাজার এক কাজে সেখানে যেতে হয়। পাঁচ-দশ মিনিট বাদে বাদে ৪০৭-এর মতো মিডিবাস আর ট্রেকারগুলিতে মানুষের ঠেলাঠেলি ভিড়। এখন বড় বাস তেমন দেখতে পাওয়া যায় না। খুব কম।
অথচ একটা সময়, এই পনের-ষোল বছর আগেও, শুধু বড়বাসই চলত। সেসব এখন কোথায়? কোথায় দেবযান, মহালক্ষ্মী? শক্তিবাসের ছিল রমরমা ব্যবসা! প্রেমচাঁদ ময়রা যার প্রতিষ্ঠাতা। প্রেমচাঁদ মোদকের ছেলে শক্তি মোদকের নামে একাধিক বাস চলত বিভিন্ন লাইনে। পুরুলিয়াতে সাহেব বাঁধ রোডে ছিল হেড অফিস ও গ্যারেজ। কালের চক্রে আজ কোথায় হারিয়ে গেল সব। জেগে উঠল ছোট ছোট পুঁজি। ছোট ছোট বাস।
ছোট বাসের ব্যবসায় জেলার মধ্যে এই জয়পুর এগিয়ে। এত মিডিবাস আর ট্রেকার বোধ হয় আর কোনো লাইনেই চলে না। এমনকি সাঁওতালডি লাইনেও না। যাত্রীরও কমতি নেই। প্রতিটি বাসে গাদাগাদি। মানুষের সঙ্গে উঠছে ছাগল-ভেঁড়ি, মুরগির ঝাঁপি।
ভভ ঘাসি ফরেস্ট মোড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু বাসগুলিকেই দেখে যায়। রাম-দুই করে গোনার চেষ্টা করে। আর নিজের ভেতরে উৎসারিত বিস্ময়কে সে নিজেই উপভোগ করে। সত্যিই, তার বিস্ময়ের অন্ত থাকে না। ঠোঁটের গোড়ায় একসুতো মিহি মিহি হাসি নিয়ে, মোড়ের চা-দোকানিকে সে জিগেস করে, ‘হ্যাঁ বুধনকা, রোজেই সকাল হলে এত লোক কথার ল্যা আসছে বল ন? আর কথায়-বা যাছে? অবাআআআক কান্ড।’
বুধনও তেমনি। একটা কাঁচের গেলাস রগ-রগ করে ধুতে ধুতে বলে, ‘তুমার ডিমাগ খারাব করবার আছে কি? যে-যথায় যাছে যাক। গুলি মার। ধরে লাও ক্যানে ঝালদা-তুলিন সাইডের ল্যা যারা আসছে, তারা সবাই রাইক্ষসের কাছ যাছে।’
‘রাইক্ষসের কাছকে।’
‘মানে, শহর হছে একেকটা রাইক্ষস! বক-রাইক্ষস! আশপাশের সোব গাঁগুলাকে সকাল হলে গিলছে আর সৈঞ্ঝা হলে উগরিছে।’
শহর সম্পর্কে দোকানির এই ব্যাখ্যা শুনে ভভ ঘাসি আধপাগলার পারা খটখট হাসতে থাকে। বলে, ‘তুমি যাহোক বলতে পার বুধনকা। একশ-এক কথা বলতে পার। ইয়ার হতেই তুমার দকানে এত পোকোড়ি বিকায়। এখন বুদতে পারছি, তুমার কথা শুনতেই ডি-ডিহাতের লোক তুমার ঠিনকে আসছে।’
‘তবে যা বিকায়ছে বিকায়ছে। আর বিকাবেক নাই।’
‘ক্যানে? এমন বলছ ক্যানে?’
‘মানুইষের হাঁতে পওসা কই? ইবারের খরায় গাঁয়ের লোকগুলাই শুঁকায় পোকোড়ি হঁয়ে যাবেক।’
বেঞ্চিতে বসা খদ্দেররাও বুধনের কথা সমর্থন করে। যত লঘু করেই বলা হোক না কেন, এর অন্তর্নিহিত সত্যটিকে কি অস্বীকার করা যায়? গ্রামগুলি তো এখনি শুকিয়ে যেতে বসেছে। শুরু হয়ে গেছে গ্রামবাসীদের অনাহার-অর্ধাহারের জীবন। এমনিতে, যখন খরা থাকে না, তখনই তো তাদের পরিবারগুলিতে বিরাজ করে স্বাভাবিক দৈন্যদশা। তার ওপরে এ-বছরের খরা তাদেরকে আরো বেশি মরাভূমির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ধূ-ধূ করছে প্রতিটি গ্রাম। ক্ষেতে-মাঠে লোকজনের চলাচল নেই। গ্রামের ভেতরের কোনো মেঠোপথ দিয়ে গোরুর গাড়ি গেলে তার দু-চাকার ঘূর্ণনে ওঠা ধুলোর রাশি বহু দূর অব্দি চোখে পড়ে। উৎসাহহীন নিস্তেজ গ্রামবাসীরা, গাছতলে বসে, দেখে যাচ্ছে প্রকৃতির এই নিষ্ঠুরতা। এই অবিচারকে।
ঝালদা-কোটশিলা-জয়পুর-চাষমোড় ইত্যাদি হাটগুলিতেও গ্রামের মানুষের সেই আগের মতো আমদানি নেই। লোক আসবেই-বা কেন? কী নিয়ে তারা আসবে আর কী নিয়ে যাবে? অন্য অন্য বছর এ-সময় এইসব হাটে তাদের বেদম তোড়জোড় পড়ে যায়। চাষের সরঞ্জাম কেনাবেচার জন্য। কিন্তু এখন মানুষের সে-তোড়জোড় নেই। হাল-কোদাল-চাকা নিয়ে কেউ কেউ গাছতলে বসলে তা কেনার লোক নেই। হাটের প্রান্তে বসে কামারশাল। গ্রামবাসীরা এই শালে এসে তাদের নতুন কেনা গোরুর গাড়ির চাকাতে লিঘা লাগিয়ে নেয়। তারপর সেই চাক তারা প্রবল উদ্যমে নিজের গ্রামের পথ ধরে গড়াতে গড়াতে নিয়ে যায়। হাল নিয়ে যায় কাঁধে করে। কখনো গান গেয়ে, গল্প করে, হাটফেরত সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে বড় বড় পা ফেলে।
এবারে হাটগুলিতে এখনো পর্যন্ত সে-ফুর্তি দেখা যাচ্ছে না। হাটে কাঁচা সবজির আমদানি নেই বললেই চলে। যদি কিছু থাকেও, চড়া দামে তা কেনার সামর্থ্য হয় না সবার।
চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা আকালে সবজির কথা তো চিন্তাই করতে পারে না। যেখানে একবেলা পেটে দেওয়ার জন্য আমানিও জুটছে না, সেখানে ঝিঙা-কাল্লা-বাইগন-কুঁদরি কি তাদের পাতে জুটবে? এমনকি যা বিনে পয়সাতে জুটতে পারে তা থেকেও তারা বঞ্চিত। গ্রামের পুকুরগুলোতে জল ঢের দিন আগে থেকে কমতে শুরু করেছিল, এখন টুবকা ডোবানোর মতো জলও নেই। ঘাটে ঘাটে পাঁক শুকিয়ে ঘটখটে হয়ে গেছে। শুকানোর আগে এইসব গৈড়া-পুকুরগুলোতে ঘাসিদের বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে এমনকি গতিককিষ্ণর মতো বুড়োও চ্যাং-গঢ়ৈ খুঁজতে, গোগলি খুঁজতে কোমর অব্দি পাঁকে নেমে সারাটা বেলা তোলপাড় করে গেছে। দুটো-চারটে মাছ পেলে পরনের ধুতিতে, লুঙ্গিতে লটপটিয়ে ঘরে এনেছে। নিজেই আঙিনার মাটিতে ঘষে ঘষে তার আঁশ ছাড়িয়েছে। নুন মাখিয়ে পুড়িয়েছে। মেয়েরা গোগলির খোলা ভেঙেছে পাথরে থেঁৎলে।
কিন্তু এখন? পুকুরগুলির ঘন পাঁকে ফাটল ধরেছে। ফাটলের ফাঁকে ফাঁকে প্রকৃতির দাবদাহকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে জেগে উঠছে সবুজ আগাছা। আহা!
এই সবুজ আগাছাগুলিকে বাদ দিলে মনে হয়, চাপাইটাঁড়ের কোথাও যেন প্রাণের লক্ষণ নেই। চিহ্ন নেই। এই সবুজ আগাছাগুলিই প্রাণের সতেজ নিশানা হয়ে তিরতির করে কাঁপছে—দুপুরের দহন জ্বালাকে গায়ে মেখে। এমনকি, এই জনহীন স্তব্ধ ও মিহি মিহি বাতাস বইতে থাকা দুপহরে চিরিক-চিরিক উড়তে থাকা বোনিপাখিও দেখা যায় না। ঝুরাবোনি, রামবোনি, শিমটুনি কোথায় কোন খঁদড়ে আত্মগোপন করে রয়েছে। দেখা যায় না একটিও টেসোরাজা। যার বর্ণাঢ্য ডানাদুটির দিকে তাকালে, মনে হয়, সে যেন সারা গায়ে রঙের জেল্লা নিয়ে বর্ণবিমোহন জাগাতে আসছে মাঠে মাঠে ক্রীড়ারত ঘাসিদের শিশু-কিশোরদের মনে। কোথায় গেল সব!
এই ক-দিনের ভেতরে কি আমূল পাল্টে গেছে চাপাইটাঁড়। মনে হচ্ছে কেউ তাকে, তার সারল্যের সুযোগ নিয়ে, আছড়ে আছড়ে মেরেছে। বিধ্বস্ত ও জরাজীর্ণ করে দিয়েছে নিরীহ-গোবেচারা চাপাইটাঁড়কে! এখন উঠে দাঁড়ানোর সামর্থ্যটুকুও তার আর নেই। এক আদিগন্ত ক্লিষ্টতা ও বিষণ্ণতায় মুহ্যমান চাপাইটাঁড়। আমাদের নির্দোষ, বোকাসোকা, সরল চাপাইটাঁড়।
ক্ষেতে মাঠে, গাছতলায় দুরন্ত শিশুদের সেই ভরদুপুরের উপস্থিতি নেই। কোলাহলও নেই। হয়তো তারা নিরুপায় হয়ে যে-যার মায়ের কোলে আশ্রয় নিয়ে পেতে চাইছে ক্ষণিক শীতলতা। প্রাণ জুড়োনো স্পর্শ। যদিও আমগাছগুলিতে একটাও আম ওরা অবশিষ্ট রাখেনি। কচি থেকে যখন-তখন ফাবড় মেরে মেরে ঝেড়ে নামিয়েছে। তাই এখন আর ঢিল ফাবড়ানো নেই। কুহুপাদা আমের জন্য নেই তাদের মধ্যে তীব্র কাড়াকাড়ি। চেঁচামেচি। কুসুম গাছে জাম গাছেও ফলের বংশ নেই। ছায়ার লোভে লোভে ছাগল এসে গাছতলে শুকনো বিচি শোঁকে। খায়। ম্যাঁ ডাকে। ঢেপচু পাখি উড়ে এসে বসে ছাগলের পিঠে।
তখনো, দূরের বাঁশ বাগান থেকে হাওয়ার হেলকে ভেসে আসছে ঝুমুরের সুর। বাঁশবাগানের ক্ষীণ ছায়ায় বসে কোনো ছাগল-বাগাল, হয়তো কাছে-পিঠে তার ‘মনোময়ী’কে দেখতে পেয়ে গাইছে—
টাঁইড়ে-টিকরে ঘুরেই বুলি আর ঝুমৈর গাঁইহে চরাই ভেঁড়ি
ঝুমৈর শুনে দিদি আইড়-গড়ায় লুকাঞ দিল
বঁধুহে, জংটি মাটি ভাঙতে না ভাঙিল...
পান্ডু বড়ই খুশি। পালৈজ্ঞা গ্রামের একটি সাঙা-ঘরে সে কাল রাঁধাবাড়ার কাজ পেয়েছে। ‘সাঙহা’ মানে তো কোনো বিবাহিতাকে বিয়ে করা। মদন মাহাতর ব্যাটা ডুবহু মাহাত সাঙা করছে টুসিকে। টুসির বিয়ে হয়েছিল বছর তিনেক আগে। তানাশি গ্রামে। বিয়ের পর থেকে তার পুরুষটি টুসিকে খাওয়াতে খাটাতে পারছে না। সন্ধে হলে সে নিজেই হাঁইড়া খাচ্ছে, মহুলা খাচ্ছে। কিন্তু বউকে ভাতকাপড় দিতে পারে না। এই নিয়ে তাদের মধ্যে লিয়াই-বিবাদ চলছিল।
আকালে সেই তিক্ত সম্পর্কটি আরো তিক্ত হয়ে উঠছে। এখন গ্রামের ষোল আনা ডেকে টুসি বলেছে সে তার এই মরদটির সঙ্গে আর ঘর করবে না। এর সঙ্গে ঘর করলে তাকে উপাসে-অনাহারে পেট-দাবড়ি দিয়ে মারতে হবে। সে ছাড়াছাড়ি চায়। টুসির মরদের পক্ষ থেকেও তেমন জোরালো আপত্তি ছিল না। তানাশির গ্রামবাসীরা মিলে তাদের মধ্যে সুষ্ঠ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়।
এই টুসিকেই দ্বিতীয়বার বিয়ে করছে ডুবহু। এই ধরনের বিয়েকে সমাজ কিছুটা অবনত দৃষ্টিতে দেখে তাই। বিয়ে না বলে, বলা হয় ‘সাঙা’। ডুবহুর বয়স হয়েছে। তার বিয়েও হয়েছিল পাঁচ-সাত বছর আগে। কিন্তু বউকে সে সংসারের মায়ায় বেঁধে রাখতে পারেনি। যদিও তার কাছে ভাত-কাপড়ের তেমন অভাব ছিল না। অভাব ছিল সুরের—মাদল-পেঁপটি-জুড়ি লাগড়ার ঝংকারের। বিবাহ-পূর্ব জীবন থেকেই এই সবের প্রতি আকর্ষণ ছিল তার বউয়ের। উত্তরোত্তর সেই আকর্ষণ তীব্র হয়ে উঠেছিল। মানভূমের ঝুমুর শুনতে শুনতে এবং আসরে আসরে নাচনীদের দেখতে দেখতে, কল্পনায় নিজেকেও সে বিমলা, বুটন, মালাবতী, কলাবতী রূপে দেখত। একসময় তার মনে হল—বাসনা চরিতার্থ না হলে জীবন অসার্থক। তার অন্তর জুড়ে সুরের জগৎ এতোটাই মোহময় হয়ে উঠেছিল! সে ভেবেই নিল পুরুষের প্রবল গরাদে থাকা গৃহবধু মানেই হল পিঞ্জরের পাখি। সে এভাবে নিজেকে জীবনভর দাঁড়ে বসিয়ে রাখতে পারবে না। তাতে জীবনের অপব্যয় হয়। তাকে সদ্ব্যবহার করতে হলে, জীবনের মুক্তি কাঙ্ক্ষিত হলে, প্রকৃত রসিকের সঙ্গে মনোজগৎ গড়ে নিতে হয়। সে বুটন-এর রসিকের সঙ্গে গোপনে ফিসফাস করে একদিন পালিয়ে গেলে রাঁচির দিকে। বুন্ডু-তামাড়। তারপর থেকে তার আর কোনো খবর নেই। সত্যিই সে নাচনী হয়ে উঠল কি না, ডুবহু তাও জানে না। জেনে হবেটাই বা কী? যে স্বতন্ত্র জীবনের খোঁজে পরপুরুষের সঙ্গে ভেসে গেল, তাকে কি সে আর কোনোভাবেই তার সংসারে রাখতে পারবে?
টুসির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে তার সঙ্গে ডুবহুর চোখ ঠারাঠারি ভালোবাসা হয়। কাউয়াহারা বনে। এই ভালোবাসার জোরেই টুসি বিচ্ছেদের পক্ষে বল পেয়েছিল। যার পরিণতি হল ডুবহুর সঙ্গে তার সাঙা।
ধানধুন, পয়সাকড়ি যার থাকে, সে সাঙাঘরেও বিয়ের মতোই খরচাপাতি করে। লোক ডেকে খাওয়ন-দাওয়ন করায়। আর কিছু না হোক, শাগ-ভাত-ঝালরাঁধা তো খাওয়ায়। এটাও যে এক ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান। মুদি-মাহাত-ভূমিজ ইত্যাদি সম্প্রদায়ের মধ্যে সাঙার প্রচলন এখনো রয়েছে। প্রথাটি বেশ পুরোনো। এখন এই নিয়ে কেউ কেউ হাসাহাসি করলেও তা লুপ্ত হয়ে যায়নি। সাঙা নিয়ে মানভূমে বহু ঝুমুরও আছে। যেমন—
আলতা-সিঁদুরে রাঙা
বিহা ছাইড়ে করব সাঙা
দেখি কেমন খাটে কি না খাটে—
খাটে হে
বতরে পিরিতি-ফুল ফুটে...
খাওয়ন-দাওয়ন হবে কাল দুপহরে। পাত পড়তে বিকেল গড়িয়ে যাবে। তাহলেও পান্ডু চাপাইটাঁড় থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বে। সঙ্গে ‘হেলপারি’র জন্য নিয়ে যাবে তার বউকে, ছোট ছেলেটিকেও। এটা সে আগেই কথা করে নিয়েছে ডুবহুর সঙ্গে। পরে ‘হ-জ-গ-জ’ ভাল লয়। তাদের নিয়ে গেলে তাদের পেটেও দুটি খাবার পড়বে। এই আশায়!
পান্ডুকে এই ‘যগাযগ’টা ঘটিয়ে দিয়েছে চা-দোকানি বুধন। ডুবহু আগেই রাঁধুনির কথা বলে রেখেছিল। সেই যোগে-যোগে ফরেস্ট মোড়ে হাজির হওয়াতে, বুধন, তখনি তাদের মধ্যে কথা করিয়ে দেয়। পান্ডু রাঁধাবাড়া করে দেবে, খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে গেলে তার বউ হেঁশেলের বাসনকোসনগুলো ইঁদারা থেকে জল তুলে এনে রগরৈগা করে ধুয়ে-মেজে গুছিয়ে দেবে এবং তারা তিনজনে তিনপাত খাবে আর যত এঁটো ভাত ঘরকে নিয়ে যাবে। এর জন্য খরাকি হিসেবে ভভ-র হাতে দেওয়া হবে একশটি টাকা। এটাই বা কম কিসের? চাল তো দু’দিন আগেও ছিল সাড়ে সাতাটাকা। এখন সাড়ে ন-টাকায় পৌঁচেছে। দশকেজি চাল তো হবে? সঙ্গে পুয়াটেক নুন। খাও মাড়ভাত।
মাড়ভাতের সঙ্গে সৈল্লা শাগ হলে ভাল। কিন্তু পেটের জ্বালায় ঘাসিরা গ্রামের সমস্ত সজনে গাছগুলির ডাল ভেঙে শাগ খেয়ে ঠুঁটা করে দিল। বাচ্চারা যেমন কচিকাচা আম সমস্ত দুহুরে নামিয়েছে, কুসুম আর জামগাছগুলিতেও এখন একটিও ফল পাড়তে বাকি রাখেনি, তেমনি বয়স্ক ঘাসিরা শাগ-শামুক-ডুমুর কিচ্ছুটি রাখেনি। কচড়াও আর নেই।
পান্ডুকে এই কাজটা জুটিয়ে দিতে পেরে বুধনও খুশি। কড়াই থেকে চেঁছে চেঁছে সে তেলের ‘কাইট’৪৮ তোলে ঝাঁঝরায়। তুলে কড়াইয়ের কানায় ঠোক্কর মেরে মেরে ফেলে। বলে, ‘আমি তকে ই-কাজটা জুটাঁয় দিলি। আমার কোমিস্যানটা কই রে ব?’
‘কোমিস্যান? কী কোমিস্যান তুমাকে দিতে হবেক, বল?’
বুধন হাসতে থাকে। বলে, ‘আমি মরলে বাবু একজোড় মদনভের নিয়ে তুঁই ঘাটে উঠাতে আসবিস।’
‘আলবাত আসব। তুমি যখন বলছ তখনকে জড়ুর আসব। কিন্তুক—’
‘আ-র কিন্তুক কিস্যার?’
কিন্তু-র কারণ জানাতে গিয়ে ঠোঁট থেকে হাসিটি মুহুর্তেই মিলিয়ে গেল পান্ডুর। বলল, ‘বুধনকা, পেটে দিবার পারা ঘরে একচঁচ দানা নাই, মদনভেরের ডাক নাই, ক্ষেতে কাম নাই—হামরা কে-জানে এই আকালটা সামলাতেই পারি কি নাই।’ বলতে বলতে সে কেঁদেই ফেলল। যদিও চোখ থেকে তার রো পড়ল না।
প্রখর দহনে ঘাসিদের চোখের জলও শুকিয়ে গেছে!
রোদে রোদে নাগাড়ে বেশি দূর পায়দল করা যায় না। চোড়কু কিছুটা পথ যায়, ঠা-ঠা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। তারপর একটা আসন গাছের ছায়ায় ব্যাটাকে নিয়ে সে দু’দন্ড জিরিয়ে নেয়। বলে, ‘আয় ব্যাটা, জিরা টুকু। জিরা। রাখ ইখেনে ভেরটা।’
মদ্দৈনা বাপের নির্দেশমতো গাছতলে বসে। থাপসি গেদে সে বসে না, বসে গুলি খেলার ভঙ্গিতে। হাঁটু দুটো ওপরের দিকে তুলে। পাশে নিঃশব্দে নামিয়ে রাখে বয়ে আনা মদনভেরিটি। যদিও ভেরিটি দৈর্ঘ্যে প্রায় মদ্দৈননার সমান। তাই বাপে-ব্যাটায় যখন পাশাপাশি হাঁটে, দু’জনের সঙ্গে দুটি মদনভেরি, তখন দেখে মনে হয় আদিম প্রজাতির কোনো জনগোষ্ঠী। এই কাউয়াহারা জংগলের ভেতর দিয়ে চলেছে শিকারের সন্ধানে। দীর্ঘকায় ভেরিটি হল তাদের শিকারের অস্ত্র।
কিন্তু যখন কঠোর সত্যটি জানা যায় যে, শিকারের জন্য নয়, তারা চলেছে সুদূর গোয়াই নদীর তীরবর্তী একটি হরিজন গ্রামে, রুজির সন্ধানে, তখন সব দুঃসাহসিকতা আর কল্পনার জগৎ মুহূর্তেই ভেঙে ছত্রখান হয়ে যায়। জন্ম হয় নতুন আবেগের। যে-আবেগে ক্ষুধার্ত বাবা গভীর অশ্লেষে জড়িয়ে ধরে তার ক্ষুধার্ত শিশু সন্তানকে। মদ্দৈনা তো এখনো শিশুই। ঘাসি শিশু। হলেই বা তার বয়স বছর দশেক।
যদিও এই কটা দিনের ভেতরে মদ্দৈনাও আশ্চর্যরকম পরিণত ও গম্ভীর হয়ে উঠেছে। হয়তো সে প্রকৃত অর্থে গম্ভীর হয়নি, বাইরের প্রতিকূল পরিবেশে নিজের ভেতরেই থমকে গেছে তার শিশুসুলভ চাঞ্চল্য, বিস্ময়বোধ আর দস্যিপনা। তবে সে পরিণত হয়েছে নিঃসন্দেহে। পরিণত হতে বাধ্য। তাকেও তো শেষমেশ হতে হবে সেই ঘাসিই? আজ নয় কাল, বাপের দেখাদেখি তাকেও তো তুলে নিতে হবে মদনভেরি। ডাক পেয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে পড়তে হবে দূরবর্তী কোনো অজগ্রামের উদ্দেশে। বাউরি-কুমার-মাহাত-সিংসর্দারের গ্রামে। মরা-হারা ঘরের ঠিকানায়।
এখন এই লিরন ও অভাবের সময়ে গ্রামগুলি থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদ তেমন আসে না। মদনভেরি নিয়ে যাওয়ার ডাকও আসে না। বায়না পায় না হাতে। সন্তানের জন্ম হলেই তো আর ল্যাঠা চুকে গেল না। তার জোগানও দিতে হবে। এই লাইড় কাটতে ধাই ডাকো রে, চিড়া ভাজ রে, ভুঁড়সি জ্বাল রে, তাবাদে ছোলা-পুয়াতিকে মালিশ করার তেলে আন রে—এমনি বহুত কিছু। ছ্যেলা করা মানে ‘চিড়ার বাইশ ফের’৪৯। কোথা থেকে এই হাজার-একটা জোগান দিতে পারবে?
তাছাড়া এবছর গ্রামবাসীরা ক্ষেতগুলিতে এখনো অব্দি হাল নামতে না পারলেও, সাধারণত, এটাই তাদের চাষবাসজনিত কাজের সময়। বীজধান ফেলা, ক্ষেত তৈরি করা, তলা ফেলা ইত্যাদি। তাসত্ত্বেও, এই আকাল ও হাহাকারের মধ্যেও কোনো কোনো দরিদ্র গ্রাম-ঘরে শোনা যায় নবজাতকের কেঁদে ওঠা। এই কান্নাই তার আজন্ম আমৃত্যু সঙ্গী হয়ে থাকে। অপুষ্টি অনাহার দারিদ্র ও খরার মধ্যে বড় হতে হতে সে বুঝতে শেখে এই কান্নাটুকুরই যথার্থ উত্তরাধিকারী সে। ধন নয়, মান নয়, যশ নয়। ধানচাল, জায়গা-জমি, বরা-বকরি নয়। চাল উড়ে যাওয়া একটি জরাজীর্ণ নিঃস্ব ঘরে এই কান্নাই তার সম্বল। এই কান্নায় অশ্রু নেই। ভেরির গগনভেরী ধ্বনি হয়ে কান্নার ভাষা ছড়িয়ে পড়ে সারা আসমান।
আর সে-কারণে এই ভেরিটিও তার আমরণ সহচর। নব্যপ্রজন্মের দায় হিসেবে এই ভেরিটিও সে লাভ করে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটি মদনভেরি কখন যে তার হাতে এসে যায়! সে নিজেও জানতে পারে না। তারপর খেলাচ্ছলে চুনকুড়িতে ফুঁ দিতে দিতে একটা সময় আসে, যখন, তার থেকে আচম্বিতে বেরিয়ে আসে ধ্বনি। ধ্বনি থেকে সুর। তখনি ঘাসিদের শিশু হয় পরিণত। এই পরিণতি বয়সের নয়, বোধের নয়, সাংসারিক অভিজ্ঞতার নয়—এই পরিণতি উপার্জনের। ভেরি বাজাতে শিখলেই তো বাপ তাকে ‘জোড়’ করে নিয়ে যাবে সঙ্গে। ঘাটশ্রাদ্ধের বাড়িতে গিয়ে মাঙনের সমান অর্থ সেও পাবে। পাবে চালচিঁড়ে আর ‘লুগা’রও অর্ধেক ভাগ। লুগা হল বস্ত্র। ধুতি।
ঘাসিদেরকে সবাই যে ধুতি দেয়, তা নয়। যার যেমন সামর্থ্য সে তেমন মাঙন দেয়। ঘাটে ওঠার পরে। লুগা যারা দেয়, তারা সাধারণত একটাই দেয়। একজোড় ভেরি থাকলে একটা লুগা। একটা লুগাই ভাগ করে নিতে হয় দুজন ঘাসির মধ্যে। ভাগটি হয় প্রয়োজনের বিচারে। হয়তো যে দু-এক মাসের মধ্যে একটা লুগা পেয়েছে, তার তো তক্ষুণি আরো একটা লুগা না হলেও চলে যায়। তখন সে তার জোড়ের অন্য ঘাসিকে উদার হয়ে তা দিয়ে দেয়। বলে, ‘হঁ, ইটা তুঁই লিবি ত তুঁইয়েই লে। হামি ত একটা পাঁইয়েছি।’ এমন কথা বলার মানে এই নয় যে, দানের অন্তরীয়টির সত্ত্ব সে নিঃশর্তভাবে তার সঙ্গীকে ছেড়ে দিচ্ছে। বাজারে এমন একটা ধুতির দাম অনুযায়ী তার অর্ধেক মূল্য দিয়ে দিতে হয় তার জুড়িকে।
কয়েকদিন আগে ফটিক-লারাণ জোড় হয়ে গিয়েছিল কোনো একাট গ্রামে। মাহাতদের ঘাটে তুলতে। অবস্থাপন্ন ঘর। সেখানে তাদের ‘নসিবে’ জুটে গিয়েছিল একটা লুগা। এমনি জোটেনি, অবস্থাপন্ন পরিবার বলে তারা আবদারও করেছিল—‘হামদের যদি নাই দিবে ত আর কাখে দিবে?’ লারাণও সেই সঙ্গে বলেছিল, ‘তুমরা হামদের দিলে উপরআইলা তুমাদের দিবেক। খুঁজতে হবেক নাই!’
এই অকপট আবেদনটির অন্তর্নিহিত ভাব গৃহস্থকে আচ্ছন্ন করেছিল। সত্যিই তো, যে প্রকৃত দানী, তার ভান্ডার কখনো অপূর্ণ থাকে না। যারা কৃপণ তারাই ধন-সম্পদ-অর্থের জন্য ঈশ্বরের কাছে ভিক্ষার্থী হয়। দানশীল ব্যক্তি কারো কাছেই হাত পাতে না। বৃদ্ধ ‘গলা’৫০ গোপনে চোখের জল মুছে চৌকাঠের ওপরে একটি মোটা ধুতি নামিয়ে দিয়েছিল।
লুগাটি পেয়ে লারাণ তা ফটিককে দিয়ে দেয়। ফটিকের কাছ থেকে লগদ কুড়িটি টাকা নিয়ে।
এই ভাগাভাগি যাতে করতে না হয়, তাই ঘাসিরা চায় নিজের ভাইকে, ব্যাটাকে বা ঘরেরই কাউকে ‘জোড়’ করে নিয়ে যেতে। তাতে মাঙনের কিছুই হাতছাড়া করতে হয় না। লুগাটিও ঘরেই থাকে। বলা বাহুল্য, এই আকালের ঘরে জন্মানো ঘাসি, এই অখন্ড মাঙনের লোভে চায় তার ঘরেই জন্ম হোক আরো এক ঘাসির, যে বড় হয়ে ভেরি নিয়ে বেরিয়ে পড়বে বাপের সঙ্গে। লেখাপড়া করবে না, ইস্কুলেও যাবে না। যখনি খেয়াল হবে বাপের দেখাদেখি সে নাড়াচাড়া করে দেখবে ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা বাপের মদনভেরিটি। এতে বাপের প্রশ্রয়ও থাকে। ঘাসিবাপ অপেক্ষা করে করে তার শিশুটির একটি ফুঁ মদনভেরির ধ্বনি হয়ে বেরিয়ে আসবে। ছড়িয়ে যাবে আকাশে-বাতাসে। আসমানে। এটাই হবে তার বংশানুক্রমিক শিক্ষার পরিচয়।
অর্থাৎ বৃত্তিজীবী ঘাসি হয়ে ওঠার জন্য কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। আকালই তার মহা প্রশিক্ষক। যদিও দুর্দিনে আর দুরবস্থার কথা শুনিয়ে কোনো ঘাসি শিশু-কিশোরকেই লাগাম ধরে টানতে হয় না তাদের চিরাচরিত জীবন ও জীবিকার দুশ্চর পথে। মদ্দৈনাকেও তা করতে হয়নি। করতে হয়নি বলেই, পুরুষানুক্রমিক এই বৃত্তিতে তাদের চলে আসাটা এতোটাই ভেতর থেকে যে, এই আসাটাই তাদের চুড়ান্ত চলে আসে। এখানে থেকে প্রত্যাবর্তনের কথা ভাবতেও পারে না। প্রত্যাবর্তন সম্ভব নয়। ঘাসিদের এই একতরফা জীবনে তাই কোনো পশ্চাদপদতা নেই। ঘাসির নিয়তি ঘাসিই। ঘাসির নিয়তি মদনভেরি।
তবু কেউ কেউ এখন তাদের এই ‘কপালের ল্যাখা’ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তারা আর মেনে নিতে পারছে না যে, এমন একটি বৃত্তি তাদের জাতবৃত্তি বলেই তা ছেড়ে রুজিরোজগারের চেষ্টায় অন্যত্র যাবে না। অন্য কোনোভাবে আয়-উপায়ের প্রয়াস চালাবে না। যদিও এই ‘বৃৎ’-এর সঙ্গে তাদের এতোদিনকার হাসি-অশ্রু-আবেগ-ভালোবাসা জড়িয়ে আছে। তাই অনায়াসে ছেড়ে যেতেও কি মন মানে?
ঘাসিরা যাতে তা ছেড়ে না যায়, যাতে তারা ‘ভগমানের’ দেওয়া এই জীবিকাকে ধরে নিজেকে এবং স্ত্রী-সন্তানাদিকে প্রতিপালিত করে, সেই ইচ্ছে পোষণ করে গেছে তাদের পূর্বজরা। হয়তো তাদের ধারণা ছিল, জাতবৃত্তি থেকে সরে গেলে মানুষের জীবনে নেমে আসবে ঘোর অমঙ্গল। দুর্নিমিত্ত। এই বিধানকে মাথায় রেখেই তো চোড়কুর—‘মদনভেরি/ফুঁকের ফেরি...’
ওরা গাছতল থেকে আবার নামে বনের পথে। আবার সেই শুকনো খটখটে মাঠ আর পাথুরে পথ দিয়ে তাদের উদাসীন হেঁটে যাওয়া। মদ্দৈনা খুব জোরে হাঁটতে পারে না। পা-ও তেতে উঠছে। অথচ বেলা পড়লে যে বেরবে তারও তো উপায় নেই। বেলা দশটার মধ্যে তারা মাহাতঘরে পৌঁছে যাবে। তবে তখন ভেরি বাজাতে যাবে না। ঠিক একটা-দেড়টার মধ্যে যখন গুষ্টি-ভায়াদরা মাথা-মুন্ডন করে, নখ-চুল-দাড়িদুঢ়ি কেটে ঘাটে ডুব দিয়ে উঠবে, তখন তাদের সবার আগে ভেরি বাজিয়ে বাজিয়ে ফের সেই ঘরটিতে আসবে তারা।
ততক্ষণে এই প্রখর রোদটাও আর প্রখর মনে হবে না। গা-সওয়া হয়ে যাবে। রোদে ঝলসে গিয়ে মুখ তাদের পোড়া ঝামাধারা হলেও তখনো বাপে-ব্যাটায় বাজিয়ে যাবে মদনভেরি। তখনো সারাটা রাস্তা আসমানের দিকে মুখ করে তারা অদৃশ্য দেবলোকে পৌঁছে দেবে—মর্ত্য থেকে একটি মানুষের চিরবিদায়ের করুণ বারতা।
মদ্দৈনা বলে, ‘হ্যাঁ বাবা, আর কৎটা যাতে হবেক? কথায় বঠে, মাধবপুর?’
‘লয় য্যা ঢের ধূর। এই ত বনটার ভিৎরে ঢুকলি। ইবার টুকু বড়-বড় ডেগ ফেল। তাইলেই গয়াই নদীর ধারেই মাহাত গাঁ-টা।’
‘মাধবপুর?’
‘হঁ, মাধবপুর!’
ওরা হাঁটতেই থাকে। হাঁটতে হাঁটতে একটা সময়, নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তবু ধুলো পড়া বিবর্ণ ও রুগ্ন পাগুলি তাদের থেমে থাকে না।
‘এ ব্যাটা—’
বাপের ডাক শুনেও সাড়া দেয় না মদ্দৈনা। তার পায়ের গতিও অনেকটাই নিষ্প্রাণ। শ্লথ। তাকে এভাবে হাঁটতে দেখে, চোড়কু ফের বলে, ‘মাধবপুর শুধাছিস য্যা? পাছে নাই চলতে পারছিস? পায়ে দুখাছে নকি?’
‘জল-তিষ্যাছে!’
ব্যাটা অমন করুণ মুখ করে জলের কথা বলাতে, চোড়কুরও জিভ শুকিয়ে যায়। ক্রমশ তারই পিপাসা বাড়তে থাকে। তবু মদ্দৈনাকে সে ওই একই কথা বলে, ‘লয় য্যা আর বেশি ধূর। হা দেখ, হাই দেখাছে গয়াই লদী। ওই লদীয়েই হামরা টুকু টুকু পানি খাঁইয়ে লিব। দু-লোট করে।’
যদিও নদী কোথাও দেখা যায় না। নদীর নামে চোড়কু তাকে দূরে দূরে অঙ্গুলি নির্দেশ পূর্বক যা দেখায়, তা হল সারি সারি কিছু গাছ। কোথাও একই তল্লাটে গোলাকার হয়ে রয়েছে পলাশ, কোথাও বনডুমুর জাম, ঢেলা, মহুল ইত্যাদি। পাথুরে পথ চড়াই-উতরাইয়ে হাঁটতে হাঁটতে তারা একেকবার বাঁক নেয় বাঁয়ে, ডাইনে। কখনো ঢালু থেকে চড়াইয়ে উঠতে গেলে, দেখা যায়, তাদের ডেগ ফেলার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দিকে চেয়েই, ধাপে ধাপে উঠে যাচ্ছে তালগাছগুলির মাথা। তারপর একসময়, দেখা হয় গোয়াই-এর সঙ্গে।
কিন্তু প্রকৃতির কি নিষ্ঠুর পরিহাস! নদীর সঙ্গেই দেখা হল শুধু, জলের সঙ্গে না! বালি ঝুরঝুর সেই গোয়াইকে দেখে মনে হয়, তার বুকে এখন এই খরায় আর জলের প্রবাহ নেই, আছে বালুকারশির অবিচ্ছেদ্য প্রবাহ। ঠিক যেন মাতৃদৃগ্ধহীন স্তন নিয়ে অনাদরে পড়ে আছে জননী! নিজের সঙ্গে তৃষ্ণার্ত সন্তানকে নিয়ে, চোড়কুর মনে হয়, এও যেন এক বঞ্চনার মুখোমুখি হওয়া। অনেক দুর থেকেই সে এই আশা লালন করে আসছিল যে, গোয়াইয়ে সংকীর্ণ হলেও জলের একটি রেখা সে পেতে পারে। কিন্তু কোথায় জল? এ তো শুধুই মরাভূমি! কোথায় গেল তবে নদী? স্নেহময়ী জননী কোথায়?
এই নদীকে দেখে জলের তৃষ্ণা মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল চোড়কু। তার ভেতরে জলরাশির মতো এক প্রবল ভাবাবেগ বারে বারে আছাড় খেয়ে তাকেই যেন জিগ্যেস করতে লাগল, ‘কনধারের লদীরে বঁধু, তুঁই কনধারকে গেলি...’
জল নয়, দু’চোখ বেয়ে তার কান্না নেমে আসতে চাইল। যাকে সে ভুলে থাকতে চেয়েছিল তা আবার তাকে নাড়িয়ে দিল অন্তর থেকে। আবার সেই ঝুমুর। বুকে তার একটি অব্যক্ত ক্লেশ, একটি অপরিসর বদ্ধতা পীড়া দিতে লাগল। মনে পড়ে গেল সেই ৭ই বৈশাখ! তাদের সেই আসরের কথা।
সেদিন শব্দযন্ত্রের তার ছিঁড়ে দিয়ে কে তাদের আসর বাঞ্চাল করেছিল? চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা আজও তা পরিষ্কার জানে না। তাদের কাছে অজ্ঞাতই থেকে যাবে—অনেক রহস্যের মতো এই রহস্যও। যদিও প্রথমেই তাদের সন্দেহ হয়েছিল, সেই কাহানের লোকগুলোর প্রতি, যারা শত্রুতাবশত এমন কাজ করলেও করতে পারে বলে আগে আঁচ করেছিল লারাণরা।
রঘুনন্দনকেও তারা এই সন্দেহের কথা জানিয়েছিল। তারপর ঘাসিদের নিয়ে রঘুনন্দন গিয়েছিল উপর-কাহান। গ্রামের পাঁচজনকে একঠিনে জড়ো করে রঘুখুড়া তাদের বলেছিল, ‘ভাই, তরা কাল যে কান্ডটা করে আলিস, স্যাটা কি উচিত কাজ হৈল?’
‘কন কান্ডটা?’ তারা নিজেরাই বলেছিল, ‘পাছে তুমরা আসরের কথা বলছ?’
‘নাই ত কী?’
‘হাই দেখ, রঘুখুড়া এই চৈক্ষের কিরা! আর যদি যাবে ত চল হৈরবোল মেলায় হাঁত রাইখে বলতে পারি, তুমাদের আসরের ক-ন ক্ষেতি হামরা করি নাই। বরুংচ হামদেরও দুঃখ হঁয়েছিল। হামরাও বলাবলি করতেছিলি—দেখরে...’
তাদের এই বলার ভঙ্গিতেই বোঝা যায় যে, তারা একাজ করেনি। করলে কি হরিবোল মেলায় গিয়ে হরির থানে হাত দেওয়ার দুঃসাহস হয়? ‘রগাঁয়’ যাবে না? তারা বিশ্বাস করে, ঠাকুরথানে গিয়ে অপরাধ গোপন করলে কুষ্ঠব্যাধি অনিবার্য!
তাহলে আর কে-ই বা এটা করতে পারে? উল্টুরামের কাছেও তারা জানতে চেয়েছিল। সেও বলতে পারেনি। এর জন্য সামান্য বেদনাবোধও প্রকাশ করেনি সে। উল্টে তাদের ধমক দিয়ে বলেছে, ‘তাদের যেমন কাজ তেমনি ঠিকেই হঁয়েছে। ওই শ্লা গরাচাঁদ কামারটাই তদের অযাত্তা। উয়ার হতেই ইটা হৈল। ফের যদি উয়াকে আইনেছিস...’
গোয়াইয়ের নির্জন ধু-ধু তীরে দাঁড়িয়ে, চোড়কু, নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে বালুকারাশির দিকে। যেন এই মরাভূমি ছাড়া তার দৃষ্টির সম্মুখে আর পট নেই। প্রেক্ষিত নেই। কেমন একটা আচ্ছন্নতা ঢেকে দিল তাকে। তার এই দৃষ্টিকে। মনকে।
মদ্দৈনা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো অর্থই খুঁজে পেল না। উরন্তু বাবাকে তার বড়ই অপরিচিত মানুষ বলে মনে হল। সে চোড়কুর হাত টেনে নাড়া দিয়ে দিয়ে বলতে লাগল, ‘অ্যা বাবা, কী দেখছিস তুঁই? কী আছে লদীয়ে?’
‘পানি নাই!’ একবুক ভালোবাসায় ব্যাটাকে কোলে টেনে নিয়ে তার এমনটাই বলতে ইচ্ছে হল যে, তার বঞ্চিত বুকের দীর্ঘশ্বাস নিয়েই তপ্ত হয়ে আছে এই নদী। শুকিয়ে আছে এই নদী। মমতাহীন হয়ে আছে এই নদী। এই নদীর কোথায় শেষ কোথায় শুরু চোড়কু ঘাসি তা জানে না। তার মনে হয়, এই কাউয়াহারা বন, এই চাপাইটাঁড়, হন্যাটাঁড়, জাহাজপুর, ঝালমামড়া, খয়েরটাঁড়—ঘাসিদের সমগ্র পরিমন্ডল, সমগ্র বিচরণক্ষেত্র তথা দৃশ্যজগৎটিই যেন এরকমই একটি শেষহীন শুরুহীন বালি ঝুরকুর গোয়াই নদী।
ব্যাটার হাত ধরে, চোড়কু, হাঁটতে লাগল সেই নদীর তপ্ত পাড় ধরে। বলল, ‘চ ব্যাটা আগুয়ে হামরা পানি পাব।’
‘কথায়?’
‘পাব পাব।’
কোথায় তা কি চোড়কু জানে? সামনের গাঁ-টির দিকে মুখ তুলে তাকাতেই তার কানে আসে কিছু মানুষের কোলাহল। ঠিক কোলাহল নয়, মনে হচ্ছে সম্মিলিত কথোপকথন। সেই কথোপকথনের মাঝে মাঝে অস্পষ্ট কান্নার সুরও।
হঠাৎ উজ্জীবিত হয়ে উঠল চোড়কু। মনে হল, তাহলে কি মারা গেল কোনো মানুষ? এই অতিরিক্ত রুক্ষ-গরম ও উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে মৃত্যু ঘটেছে কোনো বৃদ্ধের? ভেতরে ভেতরে ফুর্তিতে চনমন করে উঠল তার অন্তর। ব্যাটার হাত টেনে বলল, ‘আট্টুকু চ ক্যানে। হাও গাঁটায় ঢুকে মাহতঘরেই খাব।’
আবার সেই নদীর পাড় বরাবর ওরা পায়দল করে যেতে লাগল। সামনের গ্রামটির দিকে। বাতাসে ভেসে আসা মানুষগুলোর কান্নার শব্দ ধরে। তাকে অনুসরণ করে তারা এগিয়ে যেতে লাগল। শোকের উৎসের দিকে।
যখন জিভ ল্যাটল্যাট করা তৃষ্ণা নিয়ে এসে হাজির হল সেই ঘরটির সামনে, দেখল, একটি মাথা মুড়োনো করৈঞ্জা গাছের তলে বেশ কিছু গ্রামবাসীর ভিড়। কেন্দ্রের দিকে হুমড়ি খেয়ে রয়েছে সবাই। ভিড়ের কেন্দ্র থেকে উঠে আসছে নারীকন্ঠের কান্নার রোল।
ওরাও ভিড় ঠেলে উঁকি মারার চেষ্টা করল। দেখল—মানুষ নয়, পড়ে আছে একটা মরা গোরু। তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে, ফেনা আর জাবর কাটা খড়, যা ঠেলে বেরিয়ে এসেছে পেটের ভেতর থেকে। গোরুটির পাশে বসে মাহাতান কাঁদছে। কপাল চাপড়ে।
চোড়কুর মনে হল, হয়তো এই মারাত্মক গরমে ঝলা লেগে মৃত্যু হয়েছে ভগবতীটির। পরে সে জানতে পারে, গোরুটি যে-খড়ের আটি চিবোচ্ছিল, তার ভেতরে ছিল চিতিসাপের বাচ্চা। গোরুটি খড়ের সঙ্গে সাপটিকেও চিবিয়ে চিবিয়ে খেলে ফেলে। তার ফলেই তার এই দশা। এটা গুলিন৫১ বুঝতে পারে, যখন অবশিষ্ট পুয়ালগুলির ভেতর থেকে সে খুঁজে পায় ওই বিষাক্ত সাপের ল্যাজটি।
ভিড়ের ভেতরে চোড়কু ও তার ছেলেকে দেখতে পেয়ে ক্ষেপে যায় মাহাতানের ব্যাটা। বলে, ‘শ্লা, ভগবতীর মরা এখন একঘণ্টাও হয় নাই, ইয়ার ভিৎরেই তরা খোবোর পাঁইয়ে গেলি? বাসাতে বাসাতে? নাই দিব তদেরকে! যা ইখেন ল্যা, যা!’
মাহাতানের ছেলেকে জোর দিয়ে বলতেও পারে না চোড়কু যে, না বাতাসে তারা গোরু মরার সংবাদ পায়নি। এমনকি, বাপে-ব্যাটায় চামড়ার লোভে মরা গোরু টেনে নিয়ে যেতেও এখানে আসেনি। সে শুধু বলে, ‘নাই বাবু! নাই!’
‘কী নাই নাই? কিস্যার লাইগে তরা আইসেছিস?’
‘নাই, হামরা মুচি লই বাবু। হামরা—’
‘মুচি লইস? তবে কে বঠিস তরা? কন ম্যাজেস্টার?’
‘হামরা চাপাইটাঁড়ের ঘাসি বঠি।’
‘অঅঅ! চাপোইটাঁড়ের ঘাসি?’
‘ঘাসি’ শুনে মন্ডলাকার গ্রামবাসীরা তাদের একঝলক দেখে নেয়। আর তখনি দেখতে পায় তাদের সঙ্গের মদনভেরিগুলি। কেউ একজন বলল, ‘ইয়াদের হাঁতের যন্ত্রগুলা দেখেও স্যাটা নাই বুদতে পারছ, ভজনদা? বিষ্ণুর যেমন শঙ্খ-চক্র, ইয়াদের সেমনি মদনভেরি!’
‘হঁ হঁ।’ চোড়কুও বলতে চায় যে, ওই ভেরি দেখলে অনায়াসে তাদের চিনে নেওয়া যায়। তারা ঘাসি। এটাই তাদের লোকায়ত আদিম পরিচয় বহন করে। একমাত্র পরিচয়। এমন ভেরি তো আর আশপাশে কারো নেই। যা আছে ঘাসিদেরই আছে। ঘাটে ওঠানোর এই বিচিত্র বৃত্তিও আর কারো মধ্যে দেখা যায় না।
সেই লোকটি আবার বলল, ‘ইয়ারা জড়ুর কারো মরাঘরকে যাছে। বায়নায় যাছিস তরা?’
‘হঁ! তুমি ঠিকেই বলেছেন বাবু।’
মাহাতানের ছেলে ভজন জিগ্যেস করে, ‘কন গাঁকে যাছিস? পাছে মাধবপুর যাছিস? হামদের পাশের ই-গাঁটাকে?’
‘হঁ। মাধবপুর!’
এবার ভজন প্রতিবেশীদের জানিয়ে দেয়, ঘাসিরা যাচ্ছে ল্যাদা মাহাতর ঘরকে। ল্যাদার বাপ টঙটৈঙা মাহাত আজ পাঁচ-সাত বছর থেকে বদ্ধ উন্মাদ অবস্থায় ছিল। ঘরে উলংগ হয়েই থাকত। বাইরে থেকে শিকল তুলে তাকে দিনরাত বন্দী করে রাখা হত। কিছুদিন হল তার মৃত্যু হয়েছে। আজ ঘাট। ঘরের লোকদের ঘাটে ওঠাতে এই ঘাসিরা বায়না ধরে যাচ্ছে সেই গ্রামে। মদনভেরি নিয়ে।
মাহাতান তখনো শোকাহত গলায় লোকজনদের বলে চলেছে যে, এই গোরুটা তার হঠাৎ করে মরে যাওয়াতে কি ক্ষতিই না হল! চাষের গোরু। তার ক্ষতির কথা বলতে হবে! কথায় বলে, ‘শোল-বহাল, হালবাহা গোরু আর বছর-বিয়ানী গাই—একবার গেলে আর ফিরে আসে না।’ কারণটা হল, মানুষ চরম দুরবস্থায় না পৌঁছলে এসব জিনিস বিকতে চায় না। আর একবার বিকে দিলে ফের তার পক্ষে কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এই জিনিসগুলি চলে যাওয়া মানে ঘরের লক্ষ্মী বিদেয় হওয়া। কে চায় সেই লক্ষ্মীকে বিদেয় করতে?
তবু গ্রামবাসীরা মাহাতানকে বোঝাচ্ছে যে, বাস্তবিক, ক্ষতি তার যা হবাব তা তো হলই। তবে ই-বছর আর চাষের আশ না করাই ভাল। লোকে সাধে বলে—‘চাষবাস/স্বগ্গের আশ।’
মাছি বসছে গোরুর নাকের সিকনিতে। চোয়ালের ফেনায়। মদ্দৈনা সেদিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে। এত নিবিষ্টভাবে এর আগে সে কখনো গোরুকে দেখেনি। লক্ষ করেনি গবাদির নাকের ফুটো এত বড় বড় ও গভীর হয়।
‘কিসে এমন হৈল ইয়ার। কী খাঁইয়েছিল?’ চোড়কু ইতিমধ্যে যদিও তা জেনে নিয়েছে, তবু, কথোপকথনের সুযোগে তাদের কাছে এই নিমতলে আরেকটু জিরিয়ে নেওয়া এবং পরিশেষে কিছুটা জল চাওয়া—এই উদ্দেশ্যেই তার এই প্রশ্ন।
মাহাতান ঘরে ঢুকে যায়। চোড়কুর প্রশ্নের জবাবে ভজন বলে, ‘ইয়ার? যা হবার স্যা ত হৈলই। তারপর সে প্রথম থেকে বলে যায় গোরুটির এই অপঘাতে মৃত্যুর কারণ।—‘হামি দেখলি গোরুটা ঢলমল ঢলমল করে মাতাছে। তখনেই হামার মনে সন্দেহ হৈল—হ্যাঁ ভালা, ই এমন মাতাছে ক্যানে? দেখলি মুহের ল্যা ফেন বাইরাছে। তখন চাঁড়েমাড়ে ইয়ার গলার পাঘাটা আগু খুলে দিঁয়েছি। পাপের ভাগী কে হবেক?’
ভজন বলে চলে। যদিও এখানে ‘পাপের ভাগী’ হওয়ার ব্যাপারটিকে সে আর ব্যাখ্যা করে না। গ্রামের সবাই জানে যে, গৃহস্থের ঘরে গলাসি বাঁধা অবস্থায় গাই-গোরুর মৃত্যু হলে গৃহস্থকে ‘গৌভৈদা’ হতে হয়। মানে, গো-হত্যাকারী। সে এক মস্ত পাপের ভাগীদার হওয়া। এই পাপে প্রায়শ্চিত্তের জন্য তখন তাকে এই গোরুর পাঘাটিকে নিজের গলায় বেঁধে, গ্রামের ঘরে ঘরে ঢুকে ভিক্ষে চাইতে হয়। এবং ভিক্ষে চাওয়ার সময় মুখ দিয়ে একটিও কথা বলা চলে না। অনেকে কথা বলানোর জন্য প্ররোচিত করে। এমনকি, কথা না বললে ভিক্ষে দেওয়া হবে না এমনও বলে। যারা প্রকৃতই গোভৈদা, তারা কখনোই মুখ খোলে না। অতঃপর সংগৃহীত ভিক্ষে থেকে ভগবতীর শ্রাদ্ধশান্তি করতে হয়, পিন্ডি দিতে হয়। এখন বাঁধনমুক্ত অবস্থায় মৃত্যু হওয়াতে এই দায় থেকে খালাস পেয়েছে ভজন।
মদনভেরিটি নিজের গায়ের সঙ্গে অনড় ধরে থেকে চোড়কু শোনে। ‘চুচচুঃ’ শব্দ করে নিরীহ ভগবতীর মৃত্যুর জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করে।
এসব শুনতে ভালো লাগে না মদ্দৈনার। সে ফের বাপের হাত ধরে টানে। ফিসফিস করে বলে, ‘এ্যা বাবা, জল তিষ্যাছে! দমে!’ ব্যাটার রোদে পড়া শুকনো মুখের দিকে তাকায় চোড়কু। বলে, ‘তিয়াস লাগছে?’
লোকজনের মাঝে নিজের তৃষ্ণার কথা স্পষ্ট ও সজোরে উচ্চারণ করতে বুঝি সংকোচ হয় মদ্দৈনার। সে তলমুখ করে গম্ভীর হয়েই থাকে। মাথা নাড়ে।
‘টুকু পানি দিবে বাবু? হামার এই ব্যাটাটার দমে তিয়াস পাঁইয়েছে।’
‘পানি!’ জলের নাম শুনেই চমকে ওঠে ভজন। এই খরায় অন্য যে কেউ তার কাছে জল চাইলে হয়তো সে বলতে পারত, ‘ঐটি মাঙিস না বাবু। পানি বাদে যা মাঙবিস দিব। দু-পৈলা ধান লে ভূতমুড়ি, সেভি আচ্ছা। কত ধূর ল্যা এই পানি আনতে হয় জানিস? গটা গাঁটায় কারো বাঁধে এক লোট পানি নাই, ইঁদারায় পানি নাই। হাও ধুরে—ফুলকুসমা পাইরাঁয়—গয়াই লদী যেখিনটায়—’
‘হই! চোড়কুদ্দা য্যা!’ আচমকা একটি ছোকরা এসে বলে, ‘হামি তাইলে ঠিকেই ধরেছি? মুহের ফেস-কাটিন দেখেই ধরেছি। আর এইটা—এই য্যা তুমার গান্ডীবটা দেখে—’ছেলেটি চোড়কুর মদনভেরিটিতে নাড়া দিয়ে অন্যদের কাছে চোড়কুর পরিচয় দিয়ে বলে, ‘বহুত গুণীধর লোক বঠে।’
‘গুণিন?’ সচকিত হয়ে চোড়কুকে দেখে ভজন। ভাবে তাইলে কি লোকটির সাপকাটি বিদ্যা জানা আছে? বিষ নামানো ঝাড়ফুঁক? যদি তা জানা থাকে, তাহলে সাপের বিষে ঢলে পড়া এই গোরুটিকে ‘মন্তর-তন্তর’ দিয়ে, ফুঁকাফুকি করে, বাঁচিয়ে তোলার জন্য সে অনুরোধ করতে পারে তাকে। এই ভেবেই সে তার গ্রামের ছোকরাটিকে চোড়কুর বিষয়ে জিগোস করে, ‘সাপ-তাপ ধরে নকি? বাইদা বঠে?’
‘দুট! তুমরা নাই শুন ইয়ার নাম? চোড়কু ঘাসি। সাকিম চাঁপাইটাঁড়।’
‘হঁ, বলেছে-বা। চাপাইটাঁড়ের ল্যা আসছি। মাধবপুরকে যাবেক।’
‘যাব বললেই যাতে দিয়া হবেক খোড়ুই? কি চোড়কুদ্দা?’ ছোকরাটি ভজনের দিকে তাকিয়ে ফের সেই একই কথা বলে, ‘গুণিন বলি নাই। বলছি বহুত গুণীধর লোক বঠে হামদের চোড়কুদ্দা। ইয়ার ঝুমৈর যদি তুমরা শুন ন, তাইলে লড়তে মন যাবেক নাই। হঁ!’
এতোর পরেও ওরা ঝুমুর গায়ক হিসেবে চোড়কু ঘাসির নাম শুনেছে বলে তো মনে হল না। তবে সে ঝুমুর গাইতে পারে এবং বেশ ভালোই গাইতে পারে এটা জানতে পেরে গ্রামবাসীরা চনমনিয়ে ওঠে। ভগবতীর তাৎক্ষণিক শোক ভুলে গিয়ে বলে, ‘তাইলে হোক একটা। শুনাও, শুনাও।’
‘নাই নাই। এখন কি অস্তাদি জিনিসের সময়?’ চোড়কু অত্যন্ত মোলায়েম সুরে নিচু গলায় বলে, ‘সোব জিনিসের একটা টায়েম-টেবুল আছে ন? ইটা—যাখে বলে—আনটায়েম!’
‘আই দেখ। ইটা ক-ন গলফ হৈল চোড়কুদ্দা?’ ছোকরাটি বোঝানোর চেষ্টা করে। ঝুমুরের তো এটাই আদর্শ সময়। চৈত্রমাস থেকে শুরু করে যতদিন না বর্ষা নামছে, হাল-লাঙল নামছে মাঠে, ততদিন, ক্ষেতে-বনে-বাদাড়ে, টাঁড়ে-টিখরে টো-টো করতে থাকা মানভুঁইয়া-বরাভুঁইয়া মানুষ তো ঝুমুরেই মত্ত হয়ে থাকে। ভুলিয়ে রাখে নিজেকে। নিজের দুঃখ-বেদনা-হাহাকার-বঞ্চনাকে।
চোড়কু কি তা জানে না? তবু সে অন্য যুক্তিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। বলে, ‘মাধবপুর যাতে হবেক। এখন ইখেনে যদি হামি ঝুমৈর হাঁকাতে থাকি, ত উয়াদের ঘাটে উঠতে ডেরি হঁয়ে যাবেক নাই? তুমরাই বল?’
‘ক্যানে ডেরি হবেক? এখন যাও ক্যানে দেখবে, উয়াদের কামাতে-কামাতেই বেলাডুবু হঁয়ে যাবেক। —লাও, লাও।’
তাকে ঘিরে থাকা গ্রামের অন্য লোকরাও পীড়াপীড়ি করতে থাকে। সে মদ্দৈনাকে দেখিয়ে বলে, ‘ব্যাটাটার বোড়ো তিয়াস পাঁইয়েছে। তার হতেই ইয়াকে টুয়েক পানি খাওয়াতে ইখেনে আলি। বুঝছোই ত কেমন রোদের আলহাটা আসছে! আর ছুটু ছা!’
‘সোব মানলি। যদি বলিস য্যা ষাঁড়া হাসে ঘুন্নিয়ে বসে, তাও মানছি, কিন্তুক বাবু—’ ভজনও এবার গোঁ ধরে। রসিকতা করে বলে, ‘ঝুমৈর না শুনালে তোর ব্যাটাকে হামি পানি খাওয়াব নাই।’
‘নাই খাওয়াবে?’ শুকনো করে হাসে চোড়কুও। আসলে, সে কেমন গুটিয়ে গেছে নিজের ভেতরে। তার চারপাশের পরিমন্ডল জুড়ে একটা ‘নাই-নাই’ বিষণ্ণ রব তার সমগ্র দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মনে হচ্ছে ঘাসি হয়ে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে অখন্ড একটি দাহভূমির মধ্যে। নিজের সন্তানের হাত ধরে। এই দাহভূমি জীবিতদের আশ্রয় নয়। এখানে তাই চতুস্পার্শ্বে কেবলি হাহাকার। খরা-মৃত্যু-অজন্মা। তার চোখের সামনে, একদিকে, ধূ-ধূক্কার বালুকারাশি নিয়ে দিগন্তের দিকে প্রবহমান গোয়াই, অন্যদিকে প্রাণহীন নিষ্পন্দ পড়ে থাকা ভগবতী! একদিকে শস্যহীন ক্ষেত, পাতা ঝরে যাওয়া শুকনো উলংগ বৃক্ষসকল, খটখটে পাঁকাল পুকুর, আবার আরেক দিকে তারই হাতে ধরা পিপাসার্ত অভুক্ত সন্তান। সে কোথায় দাঁড়াবে? ভেতরের কান্নাকে বাইরের উদাসীন বিষণ্ণ হাসিতে রূপান্তরিত করে চোড়কু ব্যাটাকে নিমতলে বসায়, নিজেও আড়ষ্টতা নিয়ে বসে—ডালে-ডালে নিমের পাতা কাঁপছে ঝিরি-ঝিরি। তারপর রুগ্ন ও চন্ডালের মতো কৃষ্ণকায় হাতটি গোয়াইয়ের দিকে বাড়িয়ে, গুনগুন করতে করতে, সে গলা খুলে গেয়ে ওঠে—
কন্ধারের লদীরে বঁধু, কন্ধারকে গেলি
সাঁঝে ফুটল ঝিঙাফুল বিহানে হারালি
বঁধু, তুঁই কন্ধারকে গেলি...
খরায় ক্ষেতের মাটি ফাটে—শুকায় গায়ের চাম
পানি বিনা ফাটে ছাতি না চলে ক্ষেতিকাম
গোরুহাল নিয়ে হামি কি ফেরেই না পড়িলি
বঁধু, তুঁই কনধারকে! সাঁঝে ফুটল ঝিঙাফুল...
বঁহে বঁহে আয় লদী ঘরকে হামার আয়
দু’দন্ড বসলে খরায় জীবন জুড়ায়
ঘরে হামার জ্বলে আগুন মনেও আগুন জ্বলে রে
মনে আগুন জ্বলে
কন আগুনে ঝাঁপ দিলে হামি ডুবব মরণজলে
হামার একদিগে য্যা শ্মশানভূমি
আরেক দিগে—ডাঙায় কুঁড়াজালি
বঁধু, তুঁই কন্ধারকে গেলি। সাঁঝে ফুটল ঝিঙাফুল...
মাঝখানে ঘাসিরা আসর নিয়ে মেতে ওঠায়, বলিরামের ভাবনাটি চাপা পড়ে গিয়েছিল। এখন তা আবার নতুন করে জেগে উঠেছে। শুধু জেগে উঠেছে বলা ভুল—ভাবনাটিকে সে রীতিমত বাস্তবায়িত করতে চলেছে। বালিরাম একা নয়, আছে গতিক, শিশুপাল, লারাণ মাছুয়ার এমনি জনা ছয়েক।
চোড়কুদ্দা তাদের দলে ভিড়বে বলে এখনো জানায়নি। দলে ভিড়তে গেলে কিছু টাকাপয়সা দেওয়ারও ব্যাপার আছে, এই মুহূর্তে চোড়কুর পক্ষে দেওয়াটা কষ্টকর। আয়-উপায়ের ক্ষেত্রেও সে টের পাচ্ছে খরা। যদিও অন্যান্য বছরগুলিতে এতবেশি গরম না পড়লেও মাঝেসাঝে বুঢ়াবুঢ়ির স্বর্গযাত্রার খবর পাওয়া যেত। কিন্তু এ বছর বৃষ্টিহীন, চারপাশে অজন্মার প্রাদুর্ভাব, রোদের তেজ অত্যন্ত বেশি, তা সত্ত্বেও গ্রামগঞ্জে মানুষের মরার কোনো নাম নেই। যে মানুষ শয্যাগত, মর-মর, দিনের পর দিন রোগে গোহৈলছে, তার শিয়রে খাতা কলম হাতে নিয়ে ধর্মরাজের দূত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝিমুচ্ছে। সে যে কবে মরবে তার নিশ্চয়তাও নেই। বাধ্য হয়ে সেই দূতের চোখে ঘুম আসায় একেকবার আলিসে ঢুলে পড়ছে। কি কান্ড!
এদিকে ঘাসিরা হা-হুতাশ করছে। তারা ভয়ও পাচ্ছে। কী যে হবে! মানুষের আয়ু যে দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে ভাঙন ধরছে তাদের ধর্মপ্রাণতায় এবং সংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতায়। এই পরিস্থিতিতেও অধিকাংশ দিন তাদের মদনভেরির দিকেই চেয়ে থাকতে হয়। আশায় আশায়। তারপর সে-আশা যখন ভঙ্গ হয়, যখন তিনচার সপ্তাহের মধ্যেও দূরে-কাছে কোনো গ্রাম থেকে ‘সুসংবাদ’ আসে না, বায়না আসে না, তখন নিজেকে ক্ষ্যাপা-পাগলের মতো মনে হয় না?
‘হঁ, মনে হয় য্যা কী নাই কী করব।’ লারাণও বলে সেই যন্ত্রণার কথা, ‘মনে হয় জিয়ন্ত মানুইষের মাথায় দিব বাছাকে পাথর বাজড়ায়! আর নাই ত সাইটকায় মরাব! কিন্তুক স্যাটা কি করা যায়? লোকে পাপীষ্ট বলবেক নাই? বলবেক—ই-শালা ঘাসিকে আর ডাকাই চলবেক নাই। ইয়ার ভিৎরে দমে পাপ আছে।’
চোড়কু এতোটা ফেটে পড়ে না। তার ভাব-অভাব, আবেগ-উচ্ছ্বাস-যন্ত্রণা নিয়ে সে অনেকটাই অন্তর্মুখী। নিজের ভেতরে পুঞ্জীভূত দুঃখ-ক্রোধ-অভিমান আর আক্রোশকে সে চোখের জল হয়ে সহজে গড়িয়ে পড়তে দেয় না। ঘাসিদের চোখের জলের কী মূল্য। ইদানিং সে যতটা সম্ভব তাই নিজের ভেতরেই নিজে আত্মগোপন করে থাকে। বলে, ‘মানুইষের ত ক-ন দোষ নাই। দোষ হামদের তোগদিরের। ঘাসি হঁয়ে জন্মটাই দোষের।’
এমন কথা বলে সে কি সত্যিই পারে, নিজের ভেতরে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে? কখনো কখনো তার ঝুমুরগুলোই কি তাকে অন্তর থেকে উন্মোচিত করে দেয় না? যেভাবে তুঁষকে উন্মোচিত করলে বেরিয়ে আসে ধিকিধিকি আগুন, সেভাবেই উন্মোচিত হয় চোড়কুও। তার ঝুমুরের কথাবস্তুতে এবং বেদনার উৎস হতে উৎসারিত সুরে, গায়কীতে।
আবার কখনো এমনটাও মনে হতে পারে, খরা যতোই তীব্র হয়ে উঠুক না কেন, যতোই তা দাবদাহের মতো বিভীষণ রূপ পরিগ্রহ করুক না কেন, ঘাসিরা তাতে দগ্ধ হয় না। ভস্মীভূত হয় না। যেন ঘাসিদের ঘরে ঘরে একতরফা শুধু জন্মই আছে, মৃত্যু নেই। আবাহনের শেষে নেই ধর্মতঃ বিসর্জন! ঘাসিদের ঘাটশ্রাদ্ধে কখনো আসমানমুখী বেজে ওঠে না মদনভেরি। নবজাতকের আনন্দবার্তা কিংবা কোনো ঘাসির পরলোকযাত্রায় তার সহায়সম্বলহীন পরিবারটির শোকসংবাদ স্বর্গীয় পূর্বপুরুষদের জানানো হয় না। এই সমাজে, পৃথিবী নামের মস্ত একতাল মাটি নিয়ে গড়ে ওঠা এই লোকজগতে ঘাসিদের আবির্ভাব ও তিরোভাব এতোটা অকিঞ্চিতকর। এতোটাই নগন্য।
এটা মনে হওয়ার একটাই কারণ—তাদের অমিত সহনশীলতা। কেবল অনাবৃষ্টিজনিত কয়েকটি মাসের আকাল ও জলাভাব নয়, তাদের ঘরে ঘরে সংবৎসর বিরাজ করে খরা। খরা কোথায় নেই? স্থাবর আস্তানাগুলি থেকে শুরু করে অস্থাবর মানুষগুলি, লোমকাটা শীর্ণকায় বরাহগুলি, পাঁঠি ছাগলগুলি পর্যন্ত প্রসারিত তাদের খরা। ধ্বস্ত দেওয়াল, শুয়োর-চামের মতো বিবর্ণ পচা পুয়ালের চালা, ছিঁটে যাওয়া ছালট দড়ির লচপৈচা ঝুলি খাটিয়া, খালখাবলা উঠোন— সমস্ত কিছুতে প্রকট আকালের জীবন্ত ভাষা। আর কোমরে আঁট করে পরা খাটো খাটো ধুতি-লুঙ্গি এবং আদুড় গায়ে থাকা স্বয়ং ঘাসিরা তো খরা ও অজন্মার মূর্তিমান চলচ্ছবি!
কিন্তু তবু জীবন থমকে নেই। সে তার নিজস্ব ছন্দেই প্রবহমান। অদ্ভুত বৈপরীত্যের এই প্রবাহ! যে সীমানা-প্রাচীরগুলি, অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলে মনে হয়, মানুষের নিঃস্বতা, বিষণ্ণতা ও হাহাকারের কাহিনী বলতে চাইছে, দেখা যায়, সেই প্রাচীরের ওপরে সওয়ার হয়ে ঘাসি ছেলেরা কৈশোরের প্রবল কলরবে মত্ত। তারা কখনো অদৃশ্য লাগাম হাতে, সহিসের মতো, টাট্টু ঘোড়া ছোটাচ্ছে—‘চল ঘঁড়া চল/অড়তল বড়তল মাহত বুঢ়ির পঁন্দতল!’
পড়ন্ত বেলায় গোধুলির অলস আলো গায়ে নিয়ে, খাটে বসে বসে ঘাসি বউরা রঙ্গ-রসিকতা করে কেশচর্চা করছে, আমানি খেয়ে পঁটা-মুখে চৌকাঠ ডিঙিয়ে উঠোনের দিকে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসছে থতমত শিশু, খাটের তলে ঢুকে আরামদায়ক পিঠ ঘষছে ঘুসুরছা। জীবন কোথায় নেই? আর প্রকৃত জীবন তো সেটাই, যা প্রতিকূলতার মধ্যেও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। প্রখর তাপে, জলাভাবে, রুক্ষ বাতাসের সংস্পর্শে যখন একদিকে ঝরে যেতে থাকে জৈড়গাছের পাতা, অন্যদিকে তখন রক্তরাগ নিয়ে ডালে-ডালে গজিয়ে ওঠে ঝলমলে পত্রপুঞ্জের বাহার! এই খরায় গ্রামের মেঠোপথে যখন আকন্দ গাছের ডালপাতে জমে ওঠে ধুলো, তখনি আবার সেই মালিন্যের ভেতর থেকে ফুটে উঠতে থাকে ধঁপা-ধঁপা বেগুনি রঙের আশ্চর্য সৌন্দর্যমন্ডিত ফুল!
এখানে, বলিরামের নতুন উদ্যাগটিও যেন সেরকমই। বিবর্ণের মাঝে প্রস্ফুটিত বর্ণময় আকন্দের ঝাড়! এই চাপাইটাঁড়ে যে উদ্যোগটি সে নিতে চলেছে, নিঃসন্দেহে তা একটি বৈপ্লবিক উদ্যোগ। তার এই পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে নিজস্ব বৃত্তির প্রতি অনাস্থা। যে-বৃত্তি ঘাসিদের পূর্বপুরুষরাও এতোদিন ধরে করে আসছে এবং এখনো গতানুগতিকভাবে তা টেনে নিয়ে চলেছে, যাকে ওরা বলে, ‘বৃৎ’, সময়ের ধাক্কায় আজ তাদের সেই ‘বৃৎ’ অচল। এরজন্য চোড়কুর হয়তো কিছুটা সৃষ্টিশীল বিষণ্ণতা, আবেগ ও মনখারাপ থাকলেও থাকতে পারে, বলিরামের তা নেই। একেবারেই নেই। বৃত্তি তো জীবনধারণের উপায়। যা তাদের জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, তা কী করে সমাজে বৃত্তি হিসেবে বেঁচে থাকতে পারে? একবৃত্তি ছেড়ে আরেক বৃত্তির দিকে যাওয়ার প্রবণতা আজ তাই তাদের জীবনে অনিবার্য হয়ে উঠছে।
জাতবৃত্তিতে এই অনাস্থা ঘাসিদের অন্যান্য গ্রামগুলিতে দেখা দিয়েছে আরো আগে। হাতিমুড়ি-তুম্বা কিংবা আড়ষার কাছে চিতিডির ঘাসিরাও এখন আর ডাকের অপেক্ষায় গ্রামে ঠায় বসে থাকে না। তারা চাষবাস করে খায়। ঘরামির কাজ করে। মুনিষের কাজ করে, কুলিমজুর খাটে।
আড়ষার দিকে যেতে আরো কয়েকটি গ্রামেও ঘাসি রয়েছে। বড়ামের ঠাকুরসীমা গ্রাম কিংবা মানকিয়ারিতেও আছে ঘাসি। আছে উলহুগড়িয়াতে, বেগুনকুদরের সামনে রামপুরে এবং দুয়ারসিনিতে। এর মধ্যে ঠাকুরসীমার ঘাসিদের সেই অর্থে নির্দিষ্ট কোনো ‘বৃৎ’ বা বৃত্তি নেই। জাতবৃত্তির জন্য অপরিহার্য যে ঢাউস উপকরণটি—মদনভেরি, তা নষ্ট হয়ে যাওয়াতে অর্থাভাবে নুতন করে আর কেনা হয়ে ওঠেনি। আর এভাবেই তা তাদের সমাজ থেকে, জীবন ও জীবিকা থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। যাবেই। এখন চাপাইটাঁড়ের ঘাসিদের পক্ষেই কি সম্ভব পাঁচশো টাকা জোগাড় করে সুইসা-কালিমাটি থেকে একজোড় ভেরি কিনে আনা? তাও সম্ভব হত, যদি থাকত সেই অনুপাত ডাক।
নগদ টাকার চলাচল তাদের হাতে নেই, আর থাকলেও তা হাতছাড়া করতে চোখ দিয়ে ভাপ বেরিয়ে যায়। সঞ্চিত, মজুত অর্থও তো কারুর কিছু নেই। অর্থ কেন, জীবনের প্রসারিত উপকরণ প্রায় কিছুই মজুত থাকে না। বড়জোর যদি থাকে তো দু-দশ সের চাল-চিঁড়ে, দুটো-চারটে টিনের আটপৌরে বাসন, জ্বালানির জন্য ক্ষেত-মাঠ-ঝুড়-জংগল থেকে কুড়িয়ে আনাগুচ্ছেক শুকনো অর্জুন ফল, রান্নাঘরে উঠোনে এখানে-সেখানে গড়াগড়ি খায় কানাডাঙা মাটির হাঁড়ি, খাপরি। এটা যদি ঘাসিদের অস্থাবর সম্পত্তি হয়ে থাকে তো তাই।
এই সম্পত্তি এতোই নগন্য যে, চুরি যাওয়ার কথাটাও তারা কল্পনা করতে পারে না। ঘাসিদের অধিকাংশ ঘর তাই অষ্টপ্রহর হাং-হাং খোলা থাকে। কারো ঘরের কপাটে কুলুপ পড়ে না। তার ফলে হয় কি, অনেক সময় আলগা ঢাকা দিয়ে রাখা খাপরির মাড়, ঘাসি ছেলে খাওয়ার আগে হেঁশেলে কুকুর ঢুকে চুপিসাড়ে খেয়ে চলে যায়।
তবে হ্যাঁ, দু-এক গন্ডা করে শুয়োর প্রত্যেকের আছে। কারো আছে ছাগল-ভেঁড়ি। এই শুয়োর-ভেঁড়ি থেকে কিছু কিছু নগদ টাকা তাদের হাতে আসে। কখনো মাংস বিকে, কখনো বা আস্ত প্রাণীগুলোকে পাইকারকে দরচুক্তা দিয়ে। তাও সব তো আর দেওয়া চলে না। পুঁজি রাখতে হয়।
সাধারণত পনের কিলোর ওপরে ওজন হলে তবেই তারা বিক্রি করে। যদিও পাইকার যখন গ্রামে আসে—সে চায় একদফাতেই যত বেশি সম্ভব মাল কিনে নিয়ে যেতে। তাতে একই গ্রামে খুব অল্পদিনের ভেতরে দ্বিতীয়বার আসার প্রয়োজন হয় না। দরেও সুবিস্তা হয়। এই সুবিধের কথা চিন্তা করে তারা এমন এমন সময়ে আসে, যখন গ্রামবাসীদের নগদ টাকার খুব দরকার। তাই খরা, আকাল আর গ্রামীণ পরব-তিহারগুলোতে পাইকারদের বেশি বেশি করে গ্রামে ঢুকতে দেখা যায়। তারাও জানে, এই সময় এলে ল-কড়ার ধন ছ-কড়ায় পেলেও পেতে পারে।
পাইকাররা তো এটা চাইবেই। তারা সর্বদা সুযোগসন্ধানী এবং চতুর হয়ে থাকে। সাইকেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে এই কাজই তারা করে যাচ্ছে। বারোবাস। পাইকাররা আসে চাষ, বোকারো এবং ঝালদার দিক থেকে। তারা অধিকাংশ হাড়ি-ডোম। ঘাসি পাইকারও আসে শুয়োর কেনার জন্য ঘাসিদের গ্রামে। গ্রামে ঢুকে সে দুয়ার ছামুয়ে মুখে আওয়াজ করে সাইকেলে ব্রেক কষে—‘ক্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ-চঁ!’ প্যাডেল উল্টোদিকে ঘুরিয়ে টিংটিং বেল বাজিয়ে হাঁকায়, ‘কই ব, গতিকখুড়া! মাল আছে, ন পাছে গাড়ির ইস্টিয়ারিং হাতিমুড়ির দিগে ঘুরাব?’
এইসব পাইকারদের মুখ খুব ধারালো। তারা রসিকও হয়ে থাকে। গ্রামের ছোটো ছোটো ছেলেদের কাছেও তারা পরিচিত। সাইকেল নিয়ে গ্রামের অভিমুখে পাইকার আসছে দেখে, অনেক সময় ন্যাংটা পঁন্দের ঘাসিশিশু ছুটতে ছুটতে এসে খবর দেয়, ‘এ বাবা, গনা আসছে গনা। ঘুসুর কিনতে!’
গনা ঘাসি ছাড়াও আসে বৈদা, চন্ডী, রাবণ হাড়ি। সাইকেলের আওয়াজ শুনে কখনো ঘরের ভেতর থেকে পাল্টা রসিকতা করে জবাব দেয়, ‘মাল নাই বাল আছে।’ কথাটা রসিকতার ভঙ্গিতে বলা হলেও তা নিছক রসিকতা নয়। শুয়োরের লোম বা রোঁয়া যথেষ্ট পরিমাণে জমলে তাও তারা পাইকারকে বিক্রি করে দেয়। একশো গ্রাম দশ টাকায়। শুয়োরের ঘাড়ের লোম বেড়ে উঠছে দেখলেই তারা সময়ে সময়ে কাঁচি দিয়ে কেটে কৌটোয় জমিয়ে রাখে।
আবার যার এই মুহূর্তে পাইকারকে বিক্রি করার মতো কোনো শুয়োর নেই, ‘বাল’ও নেই, সে তখন গরজ দেখিয়ে বলে, ‘হাতিমুড়ি ক্যানে, তোর যনদিগে মন সে দগেই চৈলে যা ক্যানে। যা চৈলে চিতিডি-রামপুর-দুয়ারসিনি-মানকিয়ারি।’
এক ঘাসির ঘর ছেড়ে সাইকেল গিয়ে দাঁড়ায় আরেক ঘাসির দেয়াল ঘেঁষে।
শহর থেকে সবরকম খবর নিয়ে বলিরাম যখন গ্রামে এসে ঢুকল, তখন সন্ধে হয়-হয়। মিহি-মিহি ঠান্ডা বাতাস বইছে। হয়তো কাছে কোথাও বৃষ্টি হল। জয়পুর-কাউয়াহারার দিকে নয়। বৃষ্টি হয়তো হয়েছে আড়ষার দিকে। আড়ষা-পলপল-তুন্তা-তড়াং-খেদাডি-মানকিয়ারির দিকে। যেদিকেই হোক না কেন, বৃষ্টি হওয়াটা এখন আনন্দের।
পিন-পিনে শীতল বাতাস গায়ে লাগাতে বলিরামের মনও আকস্মিক আনন্দে উদ্বেলিত হতে লাগল। বলিরাম নিজেও জানে না, এই আনন্দের প্রকৃত কারণ কী।
গ্রামবাসীদের কাছে শহর থেকে গ্রামে ফিরে আসাটাই আনন্দের। মস্তবড় আনন্দের। একটি বেলার জন্য হলেও শহর তাদের স্বস্তি দিতে অপারগ। শহরে জীবন কোথায়? সেখানে থাক-থাক ইট সাজানো চোখ ধাঁধানো নিষ্প্রাণ পাকাবাড়ি, কর্মব্যস্ত মানুষের ছোটাছুটি, বাজার-হাটগুলিতে শুধুই লেনদেনের ভিড়। সেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের লাভক্ষতির সম্পর্ক। সেখানে মানুষ অকারণে হাসে না, হাল্লা করে না, মনের আনন্দে অবসর যাপন করে না। সময় সেখানে অর্থের নিরিখে বিচার্য। সেখানে ডালপালা ছড়িয়ে গোলাকার ছায়া নিয়ে একটি গাছও হাতছানি দিয়ে ডাকে না, ‘আয় ঘাসি, জিরা টুকু’। সেখানে বৃষ্টিভেজা বাতাসে মাটির সোঁদা-সোঁদা গন্ধ নেই। জোড়ের ধারে ভিজে বালি কেটে কেটে ‘ঘুরঘুইরা পকা’ করে না ঘর, ঢেলাগাছের আড়ে ডাকে না কেরকেটা পাখি। আকাশের মতো নীলাভ রঙিন ডানা নিয়ে কৌ-গাছের দিকে উড়ে যায় না টেসোরাজা! পড়ন্তবেলায় গোধূলির আলোকে ঢুসো মেরে-মেরে সরিয়ে দিয়ে যখন অল্প-অল্প করে অন্ধকার নামে, গুঁড়ি মেরে, তখন সেই আবছা আলো-আঁধারিতে ওড়াউড়ি খেলে না চামচিকের দল। সেখানে গোরুও হামলায় না। হামলায় শুধু মানুষ। কেউ অর্থের জন্য, কেউ ক্ষমতার জন্য, কেউ খ্যাতি-প্রতিষ্ঠা-রিরংসার জন্য।
গ্রাম-শহরের এই ফারাকের কথা যুক্তি দিয়ে বুঝতে জানে না গ্রামের মানুষ। তারা বোঝে অনুভূতি দিয়ে। বলিরামও তাই। গ্রামের চৌহদ্দিতে ঢুকতেই, যখন সে মিষ্টি-মিষ্টি বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসা ভুলুয়ার একটানা ভু-ভু শুনতে পেল, তখনি তার মনে হল, পরিযান শেষে সে এখন পা রেখেছে তার স্বভূমিতে। আর সেই আনন্দে, ফুর্তিতে, সে পিঠে ফেলে রাখা গামছার প্রান্তে বাঁধা পোঁটলাটি আরো ভালো করে, সবেগে পিঠে ফেলে দিয়ে, নিজেকে ভুলুয়ারই সগোত্র মনে করে, তারই মতো আদিম ভাষায় তার আগমনী জানান দিতে ডেকে উঠল, ‘ভুঃ-ভুঃ-ভুউউউ...’, যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘আমি এসেছি। আমি এসেছি! আমি এসেছিইইই বঁধু হে!’
আসর হওয়ার পর থেকে আমতলটি এখন ঘাসিদের আড্ডা আলোচনা-মজলিসের ভালো জায়গা হয়েছে। এই আমতলটি যে আগে ছিল না, তা নয়। কিন্তু অমন একটি স্মরণীয় আসর তাকে সবার চোখে স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাই যে কোনো ব্যাপারে তারা এখন দু-দশজন জড়ো হলেই বলে, ‘চলৌ আমতল!’
বলিরামের সঙ্গে আরো কয়েকজন ঘাসি এসে বসল আমতলের উঁচু বেদিতে। ছাগল-গুলো আলস্য নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পালাল। এলো রাধেশ্যামঘুড়া, গতিককিষ্ণ, চোড়কু, নাটা, শিশুপাল, ভভ এরা। সবাই তো আর আসতে পারেনি। কেউ কেউ ডাক পেয়ে সকাল-সকাল মদনভেরি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। কেউ আবার ঘরে না থেকে ঠিকা-কাজের চেষ্টায় ফরেস্ট মোড়ে ধর্ণা দিয়ে রয়েছে। যদি মুনিষের মাটি কাটার কাজ, বাগানবাড়ি সাফসুতরা করার কাজ কিংবা এঁটো থালবাসন ধোয়া বা জল লেগালেগির কাজও পাওয়া যায়।
তবে তেমন কাজ আর কে দিচ্ছে? জলের অভাবে তো কামিন-মুনিষ-ঘরামির কাজ বন্ধ। তাই তারা অধিকাংশই এখনো মানুষের জন্ম-মৃত্যুর ঘরে ডাক পাবার আশায় বসেই থাকে। যতোই খরা হোক, অকাল কিংবা লিরন হোক, মানুষ তার বংশ প্রসব করেই যাবে। আর জন্মের মতো মৃত্যুরও মানুষের ঘরে কামাই থাকবে না। তবে কামাই না থাকলেই যে ডাক পড়বে তা তো নয়। তা যদি হত, তাহলে ঘাসিদের মদনভেরি আজ এমনভাবে ঠায় ঝোলানো থাকত, দেয়ালে? প্রয়োজন হতো কি তাদের বিকল্প জীবিকার কথা চিন্তা করার?
রাধেশ্যামুখুড়া পা তুলে বেদির ওপরে বসে। হাঁটু দুটো খাড়া রেখে সে দু’পাশ থেকে ধুতিটিকে ঢেলা পাকিয়ে নেয়। বলিরামকে বলে, ‘লে, ইবার বল দেখি তুঁই। পুরুইলার ল্যা কী ইনকুয়ারি করে আনলি? বল।’
বলিরাম এতোক্ষণ মুখিয়েই ছিল। বলে, ‘তুমি বল ন কী শুনবে? হামি কাল চোকবাজারে নাগের দকানে গেছলি। ত ঐ য্যা উয়াদের মালিকটা—কী নামটা বঠে, গতিকখুড়া?’
‘হামি জানিয়েই নাই। পুরুইলায় হামি আর কবকে গেলি। নাগের দকান ন বাগের দকান!’
‘অ! নাই জান? থুকড়ুম্বা! মনে পড়েছে। ইয়া—পর্কাশ নাগ। ত হামি যাঁইয়ে বললি, পর্কাশবাবু, এই য্যা আপনার দকানে ইখেনে-উখেনে দেখছি টাঙা আছে, ত বলুন ন এই বাজনাটি—ইয়ার নাম কী? বলল, ফুলোট বাঁশি। হামি বললি, লৌতন কিনতে গেলে ইয়ার দাম কত? ত বলল, হাজার। ফের হামি বললি, আর হাওখেনে লৈড়কে আছে—উ জিনিসটার নাম কী? দাম কত? এমনি করে করে হামি তিনচারটা বাদ্য-বাজনার নাম আর কিমত জাইনে লিলি। তখন পর্কাশবাবু আমাকে শুধাল, ক্যানে? কিস্যার লাইগে তুঁই এত খোঁজখোবোর লিছিস? হামি তখন আর লুকাছাপা না করে খুলেই বললি।’
রাধেশ্যামখুড়া জানতে চায়, ‘কী খুলে বললি?’
‘হামি বললি য্যা, জয়পুরের চাপাইটাঁড়ে হামার পারা আ-র কতকজন ঘাসি আছে। ত হামরা মনে ভাবছি য্যা একটা ‘ব্যাঙপাটি’ করব। তখনকে ফের পর্কাশবাবু শুধাল—ব্যাঙপাটি? কী ব্যাঙ? হামি বললি, ওই য্যা বাজা-ব্যাঙ। তখনকে ফের বলল, ইটা কী ব্যাঙ রে ভাই!
বাজা-ব্যাঙ ত কোবৌ শুনি নাই—টুরি ব্যাঙ, কলা ব্যাঙ, রাজা ব্যাঙ শুনেছি। তাবাদে হামি যখনি দুটা হাত মুহের কাছে আইন্যে ‘পঁ-অঁ-অঁ’ করে দিলি, তখনেই পর্কাশবাবু হামার বলার বক্তব্য বুঝে গেল।’ বলতে বলতে একটু থেমে, বলিরাম, দম নিয়ে নেয়।
প্রকাশবাবু তার মতলব আগেই ধরে ফেলেছিল। তবু সে তার সঙ্গে কিছুটা রসিকতাও করেছে। এবং বলিরাম যা যা জানতে চায়, সবই সে জানিয়েও দিয়েছে। সে জানিয়ে দিয়েছে একটা ব্যাণ্ডপার্টি করতে গেলে ন্যূনপক্ষে কী কী বাজনা দলে থাকা দরকার, কোন বাজনা কটা দরকার, তার দাম কত ইত্যাদি।
একটা দল গড়ে তুলতে হলে অন্তত পাঁচ রকম বাজনা তো লাগবেই। তা না হলে তার জমক সৃষ্টি হয় না। এই জমকটিই হল আসল। বাজনাগুলো বাজাতে বাজাতে ব্যাণ্ডপার্টি যে-দলের সঙ্গে যাবে—রাজনৈতিক শোভাযাত্রা হোক, বিজয়মিছিল হোক, বরাত হোক অথবা কোম্পানির প্রচার, যাই হোক না কেন—বাজনা শোনামাত্র তা শ্রোতাদের যেমন আকৃষ্ট করে, তেমনি আবার যে-দলের হয়ে বাজনা বাজছে, সে-দল সম্পর্কেও তাদের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়। বিয়ে করতে আসা বরের বাজনার যদি এই জেল্লা না থাকে, যদি তা নেহাতই সাদামাটা, সিড়িংসিটিং হয়, তখন ঘরের মেয়ে-বউরা কাজ ছেড়ে সেটা দেখার জন্য সদর দুয়ারে আসার তাগিদ অনুভব করে না। ভাবে যে, ‘কে জানে কন উইড়া-ধুইড়ার বিহা! ধনীঘরের লয়!’ ভাবে, পণ বিশেষ পাচ্ছে না। খরচে তাই টান।
যে-পাঁচ রকমের বাজনার কথা নাগ ব্রাদার্সের পর্কাশবাবু তাকে বলেছে, নামসহ তার মূল্য তালিকাটি এইরকম—
১। ফুলেট—১টি— ১০০০/-
২। কর্নেট—২টি— ১১০০ × ২/-
৩। ড্রাম (বড়)—১টি— ৪০০/-
৪। সাইড্রাম—২টি—৩৫০×২/-
৫। ম্যারাকস একসেট (ঝুমকা)—২টি—২০×২/-
..............................................................................
মোট—৪৪৫০/-
এর সঙ্গে আবার বাজনাদারদের পোশাকটাও ধরতে হবে। পোশাকের ভাড়া বাজনাদার পেছু ২০ টাকা। মানে দলের ছ-জন হলে ১২০ টাকা। যদিও বলিরাম এখনি পোশাকের কথাটা বলতে চায় না। সে যা বলেছে, বলিরাম তার একটা মোটামুটি হিসেব জুড়ে দেখেছে যে, চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকার কম ‘ব্যাঙপার্টি’ হতে পার নাই। কলা ব্যাঙ তো নয়ই, টুরি ব্যাঙও হবে না।
ভভ বলে, ‘টুরি ব্যাঙ না রাজব্যাঙ?’
‘হামার ত শুনেই হাসি পাছে।’ গতিক বলে।
‘তুমার ত হরেক কথাতেই হাসি। ইটা হাসির কথা হৈল, চোড়কুদ্দা?’
চোড়কু নীরবই থাকে। গতিক আবার বলে, ‘হাসির কথা হৈল নাই? শ্লা, ঘরের বউবিটিকে খাওয়াবার পাঁচসের চাল জুটছে নাই, আর তুঁই যাছিস নাগের দকানে সাড়ে চার হাজার টাকায় ব্যাঙপাটি কিনতে? ইটা হাসির কথা হৈল, ন কাঁদার কথা হৈল?’
‘ইটা কেমন হছে বলব? ইয়াকে বলে’,—গতিকের সুরে সুর মিলিয়ে ভভ একটা লোককথার উল্লেখ করে বলে, ‘পাঁশ ফেলবার কুলা নাই/নাগরার খোঁজ মুচিঘরে।’
উপযুক্ত ক্ষেত্রে এই লোককথাটির প্রয়োগে আমতলের সবাই একপ্রস্থ হেসে নেয়। বলিরাম নিজেও। তারপর গম্ভীর হয়ে বলে, ‘হাসি-দিল্লাগি করে দিলে কাজ হবেক? ইটা এখন চিন্তা করবার বঠে। সাড়ে চার হাজার যদি লাগেও, ত টাকাটা কি একলোকের পোকেট ল্যা দিতে হছে? স্যা ক্ষ্যামতা কন ঘাসির আছে? কারোই নাই। তার হতেই বলছি—’
শিশুপাল কিছু বলতে গেলে রাধেশ্যামখুড়া তাকে বাধা দেয়। বলে, ‘থাম। আগু উয়াকে বলে পুরাতে দে। বল তুঁই।’
বলিরামের বক্তব্য হল, যদি সত্যিই দেখা যায় যে, ব্যাণ্ডপার্টির জন্য সাড়ে চার হাজার টাকা লাগছে, তাহলে ছ-জন তো থাকছেই। এই টাকাটাও তখন মাথা পেছু সমান ভাগ করে দেওয়া হবে। তাতে প্রত্যেককে সাড়ে সাতশ টাকার বেশি দিতে হবে না। যদিও রাধেশ্যামখুড়া, গতিককিষ্ণ, চোড়কু এমনি তিনচারজনকে বাদ দিলে, চাপাইটাঁড়ের কোনো ঘাসির পক্ষেই পাঁচ-সাতশ টাকা ‘হাড়কেস’ বের করা সম্ভব নয়। কে জানে, চোড়কুর পক্ষেও এই মুহুর্তে সম্ভব কি না। তবে যদি কিছু ‘হাড়কেস’ থাকে, আর বাকিটা বরা বিকে দিতে পারে, তাহলে শেষমেশ হয়তো হয়ে যেতে পারে। ঝালদার পাইকার কবে চাপাইটাঁড়ে এসে ঢুকবে তার অপেক্ষায় না থেকে যদি জয়পুর, চাষমোড় এমনি দু-একটা হাপ্তার হাটে বরা কাটা হয়, তাহলে, একটু বেশি মেহনত করতে হবে ঠিকই কিন্তু টাকাটা হয়ে যাবে। তবে আর মোটেই ‘বিলম্বি’ করা যাবে না। কথায় বলে, ‘ফুটা খই! ডেরি হলেই মেঁহাবেক। চপ বাসি হলেই লোচ কাটবেক।’
এবার আর কেউ বলিরামের প্রস্তাবটা এককথায় উড়িয়ে দিতে পারে না। অর্থের সংকটকে তো অস্বীকার করা যায় না, তাহলেও ব্যাপারটা নিয়ে তারা সত্যিই উদ্যোগী হয়ে পড়ে। এমনকি রাধেশ্যামখুড়াও বলে, ইঁটা হলে যদি ছ্যেলাপুলাদের পেটের ভাতটাও হয়, ত ক্যানে করব নাই?’
গতিক বলে, ‘তাইলে হোকেই ব্যাঙপাটি!’
সঙ্গে সঙ্গে শিশুপাল আরেকটা খরচের কথা মনে করিয়ে দেয়। বলে, ‘শুধু বাদ্যবাজানা-গুলা কিনলেই হবেক? আর ব্যাঙপার্টির ডেরেসটা?’
সত্যিই তো! বাজনাদারদের পোশাকটাও তো ভাড়ায় নিতে হবে। গায়ে বেশ লাল-হলুদ রঙের ড্রেস, মাঝে মাঝে ঝালর দেওয়া, আর মাথায় সিপাহীদের মতো ‘খুঁকড়াঝুটি’ টোপি পরে সাজলন্ত হয়ে না থাকলে লোকে বিহাঘর-তিহাঘরে তাদের ডাকবে কেন? পোশাকের সঙ্গে মানানসই ফিটফাট রঙের ফুলপ্যান আর ‘কেসজুঁতাও তো পরতে হবে?
‘ধৌর! অত কিছু? তাইলে ত ‘গুহালের খরচায় গাই বিকতে হবেক।’ রাধেশ্যামখুড়া বলে, ‘এখন সদ্যম বিনা ডেরেসেই চলুক। হঁঃ!’
‘তাবাদে আ-র দিনকতক গেলে টোপি-ফুলপান-কেসজুঁতা পরে’—বলতে বলতে, বলিরাম নাগের দোকানের ভাড়াটে ব্যাণ্ডপার্টিওলাদের ভঙ্গিতে গাল ফুলিয়ে বাঁশিতে প্যাঁপে-প্যাঁপে করে সুর ধরে—মেরি পেয়ারি বেহনিয়া বনেগি দুলহনিয়া...
তার পেছু ধরে লাইন করে ব্যাণ্ড বাজাতে বাজাতে যায় ভভ, গতিক, শিশুপাল, নাটা এরা। দুহাতে ধামসা পিটার ভঙ্গিতে আমতলের বেদিটি পাক খেতে থাকে—ঢম পর! ঢম পর! ঢম!! ঢম পর! ঢম পর! ঢম...
যত তাড়াতাড়ি ভাবা হয়েছিল, নতুন উদ্যোগটি তত তাড়াতাড়ি কার্যকর হল না। সবাই রাজি হয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু কেউই বলামাত্র নগদ টাকা বের করতে পারে না। এমনকি সময় নিয়েও জোগাড় করে উঠতে পারে না। রাধেশ্যামখুড়াও বলে, ‘দুদিন সবুর কর রে বাবু। সাড়ে সাতশ টাকা হাড়কেস। বললেই কি আর দিতে পারব?’
বলিরামও তেমনি। বলে, ‘হাড়কেস না দিতে পারবে ত চামকেসেই দাও ন। ব্যাঙপাটি যখন বলেছি হবেক, তখনকে হবেকেই।’
‘স্যা ত হবেকেই।’
‘তাহলৈ? তুমার আর কিস্যার চিন্তা? তুমার ব্যাটাটাও ত ৪০৭-এ কন্টাকটারি করছে। আর কিছু না হলেও উ ত তুমাকে দৈনিক বিশটা হলেও টাকা ঘরকে আইনে দিছে?’
‘পাঁশ দিছে! পর্থম পর্থম দিতেছিল। কিন্তুক এখন?’ রাধেশ্যামখুড়া বুড়ো কৃকলাশের চ্যাপ্টা মাথার মতো তার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে বলে, ‘এখন গাড়ির ওই ডাইবর পাঁঠা উয়াকে চাষমোড়ে পাঞ্জাবীর দকানে মদ খাওয়া শিখায়ছে। খাটালির পসা আর থাকে?’
‘তাইলে এখন উপায়?’
‘উপায় একটা হবেকেই। হামি থোড়াই ব্যাটার রোজগারের দিগে ভাইলে থাকি? তুঁই ত দেখেছিস—দশ-দশ কেজির বরা গুলান আছে। বিকে দিলেই টাকা হবেক। কিন্তুক এখনি বিকতে খুজছি নাই। দাম পাওয়াবেক নাই। পড়তা হওয়া চাই ন? আর কটা দিন যাক। এই খরায় হাটগুলাতে লোকও ত আসছে নাই। কে খাবেক মাস?’
রাধেশ্যামখুড়ার কথায় যুক্তি আছে। যতোই হোক, পাকামাথার লোক। অন্য ঘাসিরাও বলল এই একই কথা। তাই অনিবার্যত ব্যাপারটা কিছুদিনের জন্য থেমে থাকল। কিন্তু আলোচনা থেমে থাকল না। প্রায় প্রতিদিনই তারা এখন ‘ব্যাঙপাটি’ নিয়ে একটা সময় কাটিয়ে দেয়। আর এই ‘জরক’ দেখে, গতিক বলে, ‘চাপাইটাঁড়ের ঘাসিদের সোবেই উল্টা উল্টা। সোব গাঁয়ে মানুইষ যখন সিপিয়েন পাটি, কংরেস পাটি নিয়ে গলফ করছে, তখন হামরা করছি কী নিয়ে? ব্যাঙপাটি নিয়ে।’ বলে, নিজেই সে নিজের হাঁটুটিতে সজোরে চাপড় মেরে হাসতে থাকে, ‘হঁ, ঠিকেই আছে। ইটাও ত একটা পাটি বঠে।’
এই ব্যাঙপাটি তাদের ভেতরে অন্য একটা পুলক এনে দিয়েছে। এই নিয়ে তাদের কত রকম যে রঙ্গরসিকতা তার ইয়ত্তা নেই। বলিরাম বলে, ‘বুঝলে চোড়কুদ্দা, হামি ভাবছি, যখন ‘মুর্গাটোপিটা মাথায় পরে, আর ঝিঙ্গাফুইলা ডেরেসটা গায়ে দিঁয়ে, ফুলপ্যান আর কেসজুঁতা পরে মচমচ করে রাধেশ্যামখুড়া চাপাইটাঁড় ল্যা বাইরাবেক, তখনকে খুড়াকে কেমন দেখতে লাগবেক? বল ন? ঠিক জয়পুরের রাজার পারা।’
লারাণ মাছুয়ার আবার তার সঙ্গে যোগ দেয়, ‘তবে মাঝ-সাড়পে যদি ধুতির ছটটা খসে যায় ন, তাইলে ত হামদের ব্যাঙপাটিটা ডিংলাপাটি হঁয়ে যাবেক!’ চোখের সামনে সেই দৃশ্যটি ভেসে উঠতেই ওরা হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল।
‘আর একটা কথা চিন্তা করবার বঠে।’ শিশুপাল বলে, ‘লিজের গাঁয়ের ভিৎরে ব্যাঙপাটি থাকারও ডাগর সুবিধা আছে। এই য্যা আজ বাদ কাল আমাদের ফটিক ভাইগ্নার বিহা হবেক, চোড়কুর ঘরেও বিটির বিহা লাগবেক, তখনকে কুটুমজনকে মদ আর মুঢ়ি-চিড়া খাওয়াবার চিন্তা থাকলেও ব্যাঙপাটি লিয়ে ক-ন চিন্তা থাকবেক নাই। গাঁয়ের জিনিস ফিরি পাঁইয়ে যাবেক আর ভোরের ল্যা মাঝরাত তক্ক বাজাতেই থাকবেক—ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ গুডুম! ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ!’
ফটিক বলে ‘দুট! হামার বিহায় হামি ব্যাঙপাটি-তাটি নিয়েই যাব নাই।’
‘ক্যানে?’ বলিরাম বলে, ‘বিহাঘরে যদি ডমের বাজনাই না বাজল তাইলে স্যাটা আর কী বিহাঘর?’
‘স্যাটা ত ঠিকেই। তাও হামি নিয়ে যাব নাই। শ্বশুরঘরের লোকগুলান দমে হাসবেক। বলবেক, হাই দেখ, যারা বরাত আইসেছে, তারাই বাজনদার!’
এটা সত্যিই তারা ভাবেনি। এখন ফটিক বলে দেওয়াতে আরেক চোট হাসি। রাধেশ্যামখুড়া বলে, ‘তাইলে, তুঁই একাট কাজ কর ক্যানে। ব্যাঙপাটি না নিয়ে তুঁই ঝুমৈরপাটি নিয়ে বিহা করতে যা। চোড়কু ত আছেই। তোর শ্বশুরঘরে যাঁইয়ে ঝুমৈর গাঁইহে দিবেক। একটা লৌতন জিনিস হবেক, কি লারাণ? হবেক ন নাই?’
‘ইটা-বা ভালোই বলেছ। তবে চোড়কুদ্দা ঝুমৈর গাইতে শুরু করলে কী হবেক বল ন?’
লারাণ বলে, ‘তখন দেখবে বরের মুহের দিগে কৌ ভালছেই নাই। সবাই ঝুমৈর শুনছে। আর যদি সেই বারমাইসা ঝুমৈরটা শুনায় দেই—’
‘কনটা—কনটা? সেই য্যা—শরাবেন ভাইবেছিলি...?’
‘হঁ, হঁ। ইটা গাঁইহে দিলে দেখবে ছামড়াতলের ল্যা কৈনা পালাছে। শেষতক বিহাটাই আর হবেক নাই।’
তারা এমন রঙ্গ করে বললেও, এই বারোমাস্যা ঝুমরটা যে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী তা তারা প্রত্যেকে জানে। বিশেষ করে, চোড়কু এটাকে যেভাবে দরদ দিয়ে গায়, তাতে যে শুনবে তার অন্তর কেঁদে উঠবে। বিয়ের পরে শ্বশুরঘরে বন্দী কন্যা। বিয়ের নামে বিটিকে বাপ-মায়ে পরের ঘরে যেন চিরদিনের জন্য বিক্রিই করে দিয়েছে। এখন সেই মেয়ে আর কোনোভাবে আসতে পারছে না তার আশৈশব সঙ্গী মা-বাবা-ভাই-বোনের কাছে। যাদের সঙ্গ পেয়ে, ভালোবাসা পেয়ে সে বড় হলো, এতটা বয়স সুখে-দুখে, হাসি-কান্নায়, আহ্লাদে-আব্দারে যাদের সঙ্গে দিন কাটাল, আজ তারা প্রত্যেকে তার কাছে থেকে কত দূরেই না সরে গেল। এটা কি কন্যা মেনে নিতে পারে? তার মন মানছে না। বাপের ঘরে যাওয়ার জন্য, পরব-পালিতে ইটা-স্যাটা খাওয়ার জন্য সে আটুপটু করছে। কিন্তু প্রেমহীন নিষ্ঠুর স্বামী তাকে কিছুতেই বাপের ঘরে পাঠাচ্ছে না। এই নিয়েই চোড়কুর ঝুমুর। বারে বারে শুনলেও মন যেন ভরে না—
শরাবনে ভাইবেছিলি ভাদর মাসে যাব
ভাদর মাসে গাদর জনহার লাল টুপায়৫২ খাব
খালভরা না ছাড়িল হামাকে—
গাদর জনহার চিড়ুয়ে৫৩ ডংশিল।
অ তুঁই করলি ক্যানে যাবার আশ
শ্বশুরঘর হৈল গলার ফাঁস।।
আশিন মাসে ভাইবেছিলি কাৎতিক মাসে যাব
বাঁদনা পরবে হামি গুড়পিঠা খাব
খালভরা না ছাড়িল হামাকে —
গুড়পিঠা ঝাঙ্গৈড়া৫৪ মারিল।
অ তুঁই করলি ক্যানে যাবার আশ ...
এই বারমাস্যা ঝুমটির প্রসঙ্গ উঠতেই বলিরাম বলে, ‘এ চোড়কুদ্দা, দাও ন বারেক শুনায়। হামরা এৎগুলা যখন একঠিনে জুটে গেছি, তখনকে ঝুমৈরের আসরটাই হোক।’
চোড়কু তাদের এত কথোপকথনের মধ্যে থেকেও এতক্ষণ অন্যমনস্ক হয়েছিল। মুখে তার সর্বদা লেগে থাকা বিষাদময় অনুচ্চ হাসি। সে তাকিয়ে ছিল দূরে। ক্ষেতের শুকনো আল ধরে একদল বাচ্চা সারিবদ্ধ ভাবে এগিয়ে চলেছে। কারো হাতে ভেঁড়রা ডাল, কারো হাতে পলাশ-ঝুড়। কেউ দুহাতে দুটো সরু লাঠি নিয়ে, গলায় মাদলের মতো ঝুলিয়ে রেখেছে পেঁপে গাছের কান্ডের খোল। শস্যহীন রুক্ষ ক্ষেতে মোষের পিঠে উদাসীন দোল খাচ্ছে ‘ঢেবচু’ পাখি। মোটা আলপথ থেকে গুটি গুটি পায়ে ক্ষেতের দিকে নেমে আসছে পাইড়কার ঝাঁক। এইসবের মধ্যে কোথাও একটা ভালোলাগা বিষাদ যেন ছড়িয়ে রয়েছে।
আর সেটাই চোড়কুকে বারে বারে অন্যমনস্ক থেকে আরো অন্যমনস্ক করে দিতে লাগল। তার মনে হতে লাগল এই হাহাকার, এই বিষণ্ণতাই মানুষের জীবনের যথার্থ সত্য। যথার্থ সৌন্দর্যও। হাহাকার এবং শূন্যতার ভেতরে যে পরিপূর্ণতা থাকে, তা প্রাচুর্যের মধ্যে থাকে না। একফোঁটা চোখের জল, বস্তুত, কত সহস্র শূন্যতার প্রতীক। কিন্তু সেই শূন্যতার পিছনেও রয়েছে কত মানুষের নিত্যকার জীবনের দুঃখ-কষ্ট-বেদনা-অনুশোচনা আর দীর্ঘশ্বাসের কাহিনী। চোড়কুর মনে হলো, আহা, এইসব কিছুকেই যদি সে তার ঝুমুরের মধ্যে অভিব্যক্ত করতে পারত। এখনো অনেক-অনেক বাকি রয়ে গেছে।
ছাগলের গলায় মাদলটি ঝুলিয়ে, ঘাসি ছেলের দল, ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। ক্ষেতে ক্ষেতে। চোড়কু তাকিয়ে থাকল সেদিকেই।
দু-এক পশলা বৃষ্টি নামার পরও, সেভাবে বর্ষা নামলো না চাপাইটাঁড়ে। জষ্টি পেরিয়ে আষাঢ়ের মাঝামাঝি। রোদের তাত আছে, গরম আছে। দুপহরের হল্কা ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে বসতিতে ঢুকে পড়তে চায়। সারা দুপুর হয় ঘরের ভেতরে, আর নয়তো আঙিনার ছায়ায় খাট পেতে আলিস ভাঙে ঘাসি বউরা। পুরুষরা আমতালে কিংবা যে যার ঘরের ধারীতে বসে গলফ-সলফ করে। চুটি ধরায়। আর ঘাসিদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর তো ভরদুপুরেও দৌরাত্মের শেষ নেই। কিছু না পেলে ঝুড়ে-জংগলে গিরগিটিই মেরে বেড়ায়। বাবলা আর কুলকাঁটায় হাতে-আঁঠুতে ছাঁলায়-ছুঁলায় রক্ত বেরোলেও কাঁদে না। ঘরেও দেখায় না। কাটা জায়গায় ধুলোমাটি বুলিয়ে ফের গাজাড়ে ঢোকে।
এই শূন্যতা ও বিষাদের মধ্যেও চাপাইটাঁড়ে হঠাৎ করে একদিন শোনা গেল উল্লাসের কলরোল। বাতাসে বাতাসে তার ধ্বনি পৌঁছে যেতে লাগল আরো অনেক দূরে। পটমপুটরা, বেলকুঁড়ি না হলেও গাড়াফুসড়া, নাওয়াডি, শ্রীরামপুর, বাঙৈনটাঁড় আর নদীর এপারে কাহানেও নিশ্চয়ই খবর পৌঁছে গেল—চাপাইটাঁড়ে চলে এসেছে ব্যাঙপাটি। ঢম্পর! ঢম্পর! ঢম্!!
বাজনার এই আওয়াজে চাপাইটাঁড়ের ঘাসিরা ভিন্ন অন্য যেসব মাহাত-মুদি মন্ডলদের ঘর আছে, তাদের ঘর থেকে চোঁ-চোঁ করে ছুটে আসতে লাগল বাচ্চারা। বড়রাও। আশপাশের গ্রামগুলো থেকেও আপাত-উৎসাহহীন দু-একজন এসে ভিড় করল ঘাসিদের গ্রামে। যারা এর-ওর মুখে ‘ব্যাঙপাটি’ সম্পর্কে আগাম শুনেছিল, তারা এখন নিশ্চিত হলো। আর যারা তা শোনেনি, তাদের ধারণা হলো, হয়তো আবার কোনো আসর-তাসর বসছে চাপাইটাঁড়ে।
ঘাসিদের দু-পাশাড়ি চালাঘরের মাঝখানে যে অপরিসর রাস্তা, সেই রাস্তার ওপরে চলছিল প্যাঁ-পোঁ। দেখতে দেখতে এতোই ভিড় হয়ে গেল যে, কেউ চৌকাঠ, কেউ ধারীতে উঠে দেখতে লাগল এই ‘অবাআআআক কান্ড!’ শেষতক তারা সেই পুরো ভিড়টিকেই নিয়ে চলল আমতলে। আর এটাই হয়ে গেল তাদের মহড়ার জায়গা। সেইদিনেই ঠিক হয়ে গেল ব্যাঙপাটির নামও। রাধেশ্যামখুড়াই নাম দিল—‘চাপাইটাঁড় বাজনদার পাটি’। এই নামটি অর্ধচন্দ্রাকারে আলতা দিয়ে লেখা হবে ড্রামের চামড়ায়।
‘চাপাইটাঁড় বাজনাদার পাটি’তে মোট বাদ্য আছে আটটি। ড্রাম-সাইড্রাম আছে তিনটি। একটা ফুলোট বাঁশি। কালো লম্বামতো এবং গায়ে রিড বসানো। আরেকটা চোঙওলা বাঁশি, যার চোঙের সঙ্গে যুক্ত পিতলের পাইপটি দুবার পাক খেয়ে রয়েছে। এটারও গায়ের ওপরে রয়েছে লম্বা রিড—ফুঁ দেওয়ার সঙ্গে রিড টিপে যেতে হয়। আর আছে দুহাতে ঝাঁকুনি দিয়ে ঝুন-ঝুন করে বাজানোর জন্য ‘ঝুমকা’।
এই বাদ্যযন্ত্রগুলোর কোনোটারই ঠিকঠাক নাম ওরা এখনো জানেনি, বাজাতেও শেখেনি। তবে ওরা নিজেরা বাজনদার বলে, এইসব বাজনা বাজানোর কৌশল রপ্ত করতে সময় বিশেষ লাগবে না। মহড়া শুরু হয়ে গেছে এখন থেকেই। তাছাড়া বলিরাম, ভদর কালিন্দী নামে একজন বাজানেওয়ালাকে ধরে এনেছে। তার বাড়ি গাড়াফুসড়া। ঝালদার ‘মোদক ব্যান্ড হাউসে’ একসময় ব্যান্ড বাজাতো। এখন জয়পুরে মৈটাগিরি করে। মালের ঠ্যালা চালায়। ভদরের চেহারাও সেইরকম। মোটাসোটা গ্যাড়গেট্টা! মাথায় ঝাঁকড়া চুল। গামছার মতো করে কোমরে একটা বস্তা জড়িয়ে খালি গায়ে থাকলে যেকেউ দেখলে তাকে মুটিয়াই বলবে। আবার এই ভদর কালিন্দীকেই এখন বাদ্যবাজনার মাঝে দেখে মনে হচ্ছে পাক্কা বাজনদার। ব্যাঙ-মাস্টার।
বলিরাম বড় খুশি। সে খুশি এইজন্য যে, তার ঢের দিনের পরিকল্পনাটি সে এতদিনে বাস্তবে রূপায়িত করতে পারল। যে ছ-জন ঘাসি নিয়ে এই চাপাইটাঁড় বাজনাদার পার্টি, তারা ছাড়াও অন্যান্য ঘাসিরাও এই উদ্যোগকে তারিফ করছে। চন্দমহন বলল, ‘ই কঠিন ছকরা বঠে। যেটা বলে করব, ত স্যাটা করবেকেই। যাক, তাও চাপাইটাঁড়ে একটা লৌতন জিনিস হৈল। এতদিন ছিল মদনভের/এখন হৈল ব্যাঙপাটির ফের।’
‘ব্যাঙপাটি ত হৈল। কিন্তু হামি কি ভাবছি জানলে খুড়া? এ চন্দমহনখুড়া—’
‘ইবাবা!’ চন্দমহন তরুবরকে বলে, ‘তোর পেটের ভিৎরে কী ভাবনা আছে, স্যাটা আমি কী করে জানব? আমি থোড়ুই অন্তরযামিনী বঠি? বল ন!’
‘নাআ। আমি বলছি—এই য্যা ইয়ারা এখন ব্যাঙপাটি কিনে আনল, তাইলে ইয়াদের মদনভেরগুলার কী দশা হবেক?’
‘কী আর হবেক? ঘাটে উঠাতে কি ব্যাঙপাটিয়ে কাজ হবেক? তখনকে দেখবি ভেরআইলাদের ডাক পড়ছে। তখন ফের ছুটো। ঘাসিদের বৃৎ কি আর সহজে যাবেক? এখন দেখবি গাঁয়ে গাঁয়ে সেলুন হঁয়েছে। তা বলে কি গ্যারামে লাপিতের ডিবটি উঠে গেছে? ছুয়াছুত ঘরে, লত্তাঘরে, লেগভোগ কামাকামি করতে আর নখকুনি কাটতে দেখবি ঠিকেই ডাক পড়ছে।’
‘ধৌর! এখন যদি বা কেউ ডাকছে, আর কিছুদিন বাদে দেখে লিবে তাও ডাকছে নাই। তখন আমাদের এই মদনভেরগুলান আধামূলায় দিলেও কেউ ছুবেক নাই।’ বলে, প্রবল স্ফূর্তিতে বলিরাম, প্যাঁ-প্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা...করে ফুঁকে দিল তার হাতের ঝলমলে বাঁশিটি। কেউ বাজাতে লাগল ড্রাম, কেউ ম্যারাকস, কেউ বা কর্নেট। তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, ভদর কালিন্দী, একে-তাকে বাজানোর কায়দা কৌশল দেখিয়ে দিতে লাগল আর শুনতে লাগল তাদের বাজানো। তাদের অদক্ষ ব্যবহারে যন্ত্রগুলো থেকে এখনো তেমন সুরেলা আওয়াজ বেরিয়ে আসে না। সব কটা বাজনা বাজতে থাকলে মনে হয় যেন বাজনা সারাইয়ের দোকানে বাজনার হট্টগোল চলছে। কোনো সুর নেই, তাল নেই।
রাধেশ্যামখুড়া প্রথমেই বিরক্ত হয়ে যায়। বলে, ‘ধুর ধুর! হামদের মদনভেরেই ভাল। একেইটা বাজনা—একটাই ছেঁদা—যেমন পার ফুঁকে—দাও আসমানে আওয়াজ পাঠায়।’
‘আহ। অমন খিজলালে হবেক। সোব জিনিসেই শিখবার বঠে ন? শিখতে ত সময় লাগবেকেই। স্যা সময়টা তুমি নাই দিবে?’ বলিরাম বলে, ‘কি ভদরদা, সময় লাগবেক ন নাই?’
ভদর কালিন্দী হাসে। তার অর্ধেক থাকা আর অর্ধেক পড়ে যাওয়া দাঁতগুলো দেখিয়ে। তাদের মাঝে গুড়গুড় খেলা করতে থাকে পান-খাওয়া মুখের লাল টকটকে জিভটি। কোনো কথা সে বলে না। গাল ফুলিয়ে ফুলোট বাঁশিতে ফুঁ দেয়। রিড টিপে গানের সুর ধরে। তারপর বলে, ‘এখন যন্ত্রটা লৌতন আছে। বাঁশি যত বাজবেক, তত তার সুর আসবেক। আর বাজনার এই বাঁশিটাই হছে ম্যান। বাঁশিটাতেই ত বাজনার সুর-তাল ধরে নিয়ে চলে। বাঁশির তালেই পিটতে হয় ড্রাম। উয়াদের ক-ন ক্যারামতি নাই।’
ভদর বলেছে ঠিকই। ড্রাম বাজানোতে তেমন কিছু শেখার নেই। তালজ্ঞান থাকলে সেই তালে তালে তাকে পিটে যাওয়া। সময় যেটুকু লাগে, তা ওই কর্নেট বাজানো রপ্ত করতে। এই বাঁশি তো আর আড়বাঁশি নয়। মদনভেরিও নয়।
কর্নেট বাজানো শক্ত। কেন শক্ত, ভদর তাও তাদের ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেয়। যতোটা সম্ভব তাদের মতো করে, তাদের বোধগম্য ব্যবহারিক শব্দ দিয়েই সে বোঝায়। তার আগে ভূমিকা হিসেবে সে বলে, এই যে ব্যাঙপাটি ব্যাঙপাটি বলা হচ্ছে, এটা তো আসলে ব্যাঙপাটি নয়। ব্যাঙপাটি অনেকদিন আগেই উঠে গেছে। তাও বছর পঁচিশ-তিরিশ হলো। তবু ওই নামেই চলছে। এখন যেটা চলছে, এটাকে বলে ‘ইংলিশ বাজনা’।
ব্যান্ডপার্টির সঙ্গে ইংলিশ বাজনার বাদ্যযন্ত্রগত মূল পার্থক্যটি হলো ‘মশক’টিতে। ‘মশক’ নামের অপূর্ব বাদ্যযন্ত্রটি এখন ইংলিশ বাজনায় থাকে না। ‘মশক’ দেখতে অনেকটা মাথা বেরিয়ে থাকা বড় আপেল শামুকের মতো। তার গায়ে গাঁথা ডাঁটির মতো টলটলে বাঁশি-গুলোতে ফুঁ দিলে তাতে সানাইয়ের মতো মিষ্টি সুরেলা আওয়াজ বেরিয়ে আসত। এটা সানাই-ই। এই সানাইয়ের সুর টেনে নিয়ে যেত পুরো দলটাকে। এখন ‘ইংলিশ বাজনা’য় সেই সানাইয়ের বদলে চলছে ফুলেট আর কর্নেট। এরা ধ্বনি বিচারে স্ত্রী-পুরুষ। কর্নেটের ধ্বনি গাম্ভীর্যপূর্ণ, মোটা। বলা বাহুল্য, দুটোতেই ২১টা করে পর্দা আছে। থাকতেই হবে।
কর্নেটের তুলনায় ফুলেট বাজানোটা সহজ। তার কারণ হলো, ফুলেটে ২১টা পর্দা আলাদা আলাদা আছে এবং দুহাতে ১০টা আঙুল দিয়ে সেগুলো বাজানো যায়। কিন্তু কর্নেটে তা হয় না। কর্নেটে তিনটি আঙুল দিয়ে ওই ২১টা পর্দা বাজাতে হয়। ৩টিই মাত্র ব্যান্ড। এই ব্যান্ডগুলি কম-বেশি টেপার মধ্যেই পর্দার পার্থক্যটা আসে। উদারা-মুদারা-তারা উপরে। আলতো করে টিপলে একরকম, মাঝামাঝি চাপ দিয়ে টিপলে আরেক রকম, আবার পুরোটা টিপে দিলে অর্থাৎ একেবারে নিচে আরেক রকম সুর বেরিয়ে আসে। তার মধ্যে আবার নিচে দুটো ‘সা’ এবং মাঝের ‘পা’ না টিপে শুধুমাত্র ফুঁ দিলে বাজে বলে এদের ‘ছাড়া সা’ এবং ‘ছাড়া পা’ বলে। এই ৩টির সঙ্গে ১৮টি পর্দা মিলিয়ে ২১টি হয়।
কিন্তু মুশকিল হলো, কোন আঙুল দিয়ে কোনটা টিপবে? কতটুকুই-বা টিপবে? বলিরাম তা জানতে চাইলে ভদর বলে, ‘ওইটিই ত শিখবার জিনিস। ওইটিই হৈল ম্যান। এই দুটা জিনিসের শিক্ষা যদি হঁয়ে গেল, তাইলে আর ভাবনা কি? সুন্দর কর্নেট বাজতে থাকবেক। কিন্তুক মনে রাখতে হবেক—কন আঙুলে কনটা টিপতে হবেক।’
‘কন আঙুলে কনটা? শ্লা, ভুলেই যাছি। আরেক বার দাও বলে।’
‘হঁ, এখন ভুল হবেকেই।’ ভদর বলে। সাদা পর্দা এবং কোমল পর্দায় কখন কোন আঙুল ব্যবহার করতে হবে, ভদর বারে বারে তাদের বলতে থাকে। ভুলে গেলে চলবে না। শুনে শুনে মনে রাখতে হবে—
সাদা পর্দা (নিচের দিকে)
সা—ছাড়া
রে—তর্জনী, অনামিকা
পা—মধ্যমা, তর্জনী
মা—তর্জনী
পা—ছাড়া
ধা—মধ্যমা, তর্জনী
নি—মধ্যমা
সা—ছাড়া
কোমল পর্দা
সা—ছাড়া
রে—তর্জনী, অনামিকা
গা—মধ্যমা, অনামিকা
মা (কোমল মা) তর্জনী
পা—ছাড়া
ধা—মধ্যমা, অনামিকা
নি—তর্জনী
সা—ছাড়া
ভদর আবার বাজিয়ে দেখিয়ে দেয়। সেইভাবে বাজাতে চেষ্টা করে বলিরাম। অন্যরা তাদের হাতের বাদ্যগুলি বাজায়। তাই দেখে হাসাহাসি করে দর্শক ঘাসিরা। কোনো সুরতাল কানে না আসায় তারা কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলে, ‘এমন করে বাজালে তদেরকে কেউ বায়না করবেক? বলবেক, ধুর! ভের বাজোয়া ঘাসি ব্যাঙপাটি কি বাজাবেক!’
‘বাজাবেক! বাজাবেক!’ ভদর তাদের হতাশ না করে বলে, ‘দু-চারদিন এমন পেকটিশ করলেই হঁয়ে যাবেক। এমন আহামরি কিছু লয়।’
‘তাইলেও, বুঝলে ভদরদা, তুমি আমাদেরকে মাঝে মাঝে একটুকু রিংমাস্টারিং করে যাবে।’ বলিরাম বলে।
‘আহ, আমি কি আর রোজেই আসতে পারব? আসার দরকার কী? এই পত্তাপপুরেই ত আছে কালিন্দীরা। উয়াদেরও পাটি আছে। বললেই দেখায় দিবেক।’
‘হঁ হঁ, ঠিকেই বলেছ।’ বলিরাম নিশ্চিন্ত হয়। পাশের দু-একটি গ্রামের পরেই তো পত্তাপপুর। তারা কেউ কেউ চাপাইটাঁড় দিয়েও যাতায়াত করে। প্রয়োজনে তাদের বললে তারা দেখিয়ে দিয়ে যাবে।
‘তবে আর কী? চলাও পেকটিশ!’ পানের পিক ফেলে চলে চলে যায় ভদর কালিন্দী। যেতে যেতে অনেক দূর অব্দি তার কানে আসতে থাকে বাজনার আবোল-তাবোল শব্দ।
‘পেকটিশ’ চলতেই থাকে।
হপ্তা ঘুরতে না ঘুরতে ঘাসিরা মোটামুটি পাকা হয়ে গেল। এখন আমতলে তাদের বাদ্যবাজনা বাজলে বোঝা যায় সত্যিই গ্রামে কোনো ব্যান্ডপার্টি এসেছে। চলতি গানগুলোকেও তারা একটু একটু করে রপ্ত করে ফেলেছে। বিশেষ করে বিয়ে বাড়িতে যে-যে হিন্দি গানের সুর বাজানো দরকার তা তারা শিখে নিয়েছে।
গানের কথা তো জানার দরকার হয় না। সুরটা তুলতে পারলেই হলো। তবে এই ধরনের বিয়ে বাড়িতে নতুনের চেয়ে পুরনো গানেরই চল বেশি। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চলে—‘মেরি পেয়ারি বহনিয়া/বনেগি দুলহনিয়া’। তা সে ছেলের বিয়েই হোক আর মেয়ের বিয়ে হোক। আর চলে, ‘মেরে মন কি গ্যাঙ্গা ঔর তেরে মন কি যমুনা-কি/বোল রাধা বোল সঙ্গম হোগা কি নহি’, ‘বাহারো ফুল বর্ষাও’ কিংবা ‘চল-চল-চল মেরি হাঁথি’ ইত্যাদি। এইকটি হলেই যথেষ্ট। তবে কেউ কেউ এখন ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’-এর গান শুনতে চাইছে। ‘জুতে লে লো/পৈসা দে দো’ বা ‘দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা’। ঘাসিরা এত হালফিল, গান নিজেরাই শোনেনি। তবু তারা যেসব সুর তুলে ফেলেছে তাতে মোটামুটি কাজ চলে যাবে।
ইতিমধ্যে জয়পুরের আটাকলের কাছে একটা ক্লাবের ছেলেরা এসে প্রভাতফেরি করার জন্য তাদের ভাড়াও করেছে। তবে ন্যুনতম ভাড়াতে। ৩০০ টাকায়। সঙ্গে চা-পোকোড়ি/তপন বিড়ি। ক্লাবের ছেলে-ছোকরাদের ব্যাপার। তার ওপর প্রথম ভাড়া। ওরা ছেড়ে দিতে পারেনি। এই দিয়েই বউনি হয়েছে ‘চাপাইটাঁড় বাজনাদার পাটি’র।
এদিকে পত্তাপপুরের কালিন্দীদের ব্যাপারে ঘাসিরা যা ভেবেছিল তা কিন্তু হলো না। তাদের কাছে এর প্রতিক্রিয়া হলো অন্যরকম। ঘাসিরা ভেবেছিল, বাজনা বাজানোর ব্যাপারে পত্তাপুরআইলারা প্রয়োজনে সাহায্য করবে চাপাইটাঁড়আইলাদের। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল এই আক্রা-বাজারে সে-ভাবনা ভুল।
একদিন সন্ধের মুখে মহলা চলাকালীন পত্তাপপুরের কালিন্দীরা দলবল নিয়ে এসে হাজির। আমতলে। দলের ম্যানেজার মনহর কালিন্দী বলল, ‘ইটা তুমাদের কীরকম কাজ হৈল বল ন?’
বাজনা থামিয়ে দিয়ে বলিরাম জিগ্যেস করল, ‘কনটা?’
‘এই য্যা তুমরা চাপোইটাঁড়ে আচকায় একটা ব্যাঙপাটি ইসটাট করে দিলে—’
‘আচকায় ক্যানে হবেক?’ রাধেশ্যামখুড়া বলে, ‘আমাদের ত বহুত দিন ল্যা ই-কাজটার আন্দোলন চলতেছিল। শেষতক এতদিনে পসাপাতি জগাড় করে আনতে পারা গেল।’
এবার মনহরকে থামিয়ে একটা দাড়িওলা ছোকরা এগিয়ে আসে। নটবর কালিন্দী। বলে, ‘দেখ ভাই, হামরা এখন তুমাদের সঙে লিয়াই-ঝঞ্ঝট করতে আসি নাই। ক্যানে, কি, তুমরাও যা করছ পেটের লাইগে করছ, আর হামরাও যা করছি সেই পেটের লাইগেই করছি।’
‘তাইলে ত মেটেই গেল। বলার কিছু নাই।’
‘নাই, বলার আছে। মেটে নাই।’ নটবর বলে। মনহর তার উত্তেজনা চেপে রেখে নরম সুরে বলার চেষ্টা করে। ‘তুমরা ত মদনভের নিয়ে ছিলে, ভালই ছিলে। এখন ফের ইংলিশ-বাজনা করতে গেলে ক্যানে?’
শিশুপাল বলে, ‘আহ, মদনভেরের সঙে ইংলিশ বাজনার কি সঙ? ভের ত হামাদের আছেই। ভেরের কাজে এখন আর তেমন ডাক পাওয়াছে নাই। তার হতেই—’
‘ডাক পাওয়াছে নাই বলে তুমরা হামাদের বৃৎটা নিয়ে লিবে? ইটা ক-ন কথা হৈল?’ নটবর জাতবৃত্তির প্রসঙ্গ আনে। বাজনাপাটির কাজটি ডোম বা কালিন্দীদের। আর ঘাসিদের বৃত্তি মরাহারা বা জন্মঘরে গিয়ে মদনভেরি ফুঁকে আসা। কালিন্দীদের বক্তব্য, সমাজে যখন বৃত্তির বিভাজন আছে, তখন যার যা বৃত্তি তাই নিয়েই জীবিকা নির্বাহ করা উচিত। একবৃত্তিতে মন্দা দেখে অন্যের বৃত্তির দিকে হাত বাড়ানো অন্যায় নয়? তাই আজ থেকে দশপুরুষ আগেও যে-কালিন্দীরা ঢাকঢোল বাজিয়েছে, মেয়েরা বাঁশের ঝুড়িঝাঁটা বানিয়েছে, আজও তারা সেই কাজই করে চলেছে। নিজের কাজের প্রতি অসন্তোষ বা ঘৃণা থাকলে সে-মানুষ কখনো কর্ম করে সুখশান্তি পেতে পারে না। সমাজেও শান্তিশৃঙ্খলা থাকে না।
কিন্তু এই ‘ধর্মের কথা’ ঘাসিরা শুনতে নারাজ। গতিককিষ্ণ, রাধেশ্যামখুড়া, বলিরাম, শিশুপাল এরা কালিন্দীদের সাফ বলে দেয়, ‘হামরা তুমাদের ইসোব কথা মানি নাই।’
ওরাও চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। বলে, ‘মানবে নাই? বললেই হৈল? তুমরা তাইলে জোর করেই হামাদের বৃহৎটা নিয়ে হামাদেরকে পেটে মাইরে দিবে?’
‘হাই দেখ—হাই দেখ—’ রাধেশ্যামখুড়া ভিড় থেকে বেরিয়ে আবার ভিড়ে ঢোকার চেষ্টা করে। একটা হাত আসমানের দিকে বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, ‘উপরবালা থাকতে কে-কাখে পেটে মারবেক হে? স্যা ঠুঁটায় যাবেক!’
‘উপরবালা-ফালা বলে পারাঙ্গত পাবে নাই। তুমরা তুমাদের বৃৎ কর, হামাদের বৃৎটা লিয়া চলবেক নাই। উটা তুমাদের ছাইড়ে দিতে হবেক।’ নটবর এবার জোরের সঙ্গে বলে, ‘তুমাদেরকে ই-কাম হামরা করতেই দিব নাই।’
এই কথা বলাতে তুমুল হৈচৈ লেগে যায়। ঘাসিরা ছাড়াও চাপাইটাঁড়ের মাহাত-মুদিরাও ছুটে আসে আমতলে। মাঠের এদিক-সেদিকে যেসব বাগাল ছেলেরা ছিল, তারাও ক্ষেতের আল ডিঙে ডিঙে ছড়ি হাতে আসতে থাকে। ফুর্তিতে, উত্তেজনায় বলে ওঠে, ‘লেহে-লেহে! লাইগে গেল ডমে-ঘাসিয়ে ঠুঁকাঠুঁকি! লাগুক।’
প্রায় হাতাহাতি হবার উপক্রম। বাজনদার ঘাসি ছাড়াও বাকি যারা ছিল, তারা মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে আসে। আসে, তরুবর, পরীক্ষিত, খইবর, নাটা, পান্ডু ঘাসি। চোড়কু ভিড় থেকে টেনে আনতে চেষ্টা করে কালিন্দীদের। সে কখনো নটবরকে টানে, কখনো মনহরকে কালিন্দীকে। বলে, ‘আহা, তুমরাও ত হামাদের আপন লোকেই ব-ঠ ন? তুমরা পত্তাপপুরের আর হামরা চাপাইটাঁড়ের। বহুত ধূর হৈল? তাইলে ক্যানে এমন লিয়াই-ঝগড়া করছ? চুপ দাও।’
কিন্তু কে শোনে? রাধেশ্যামখুড়া তার ধুতি কোমরে শক্ত করে বেঁধে মারমুখী হয়ে এগিয়ে আসে। বলে, ‘তদের পারা বহুত মরদ হামার কড়চে খুঁজে রাখতে পারি! কী করবি তরা? হামদের একটা রুঁয়াও ছিঁড়ে সজা করতে লারবি। যা যা!’
‘দেখে লিবিস। এই বলে গেলি। যদি না ওই চাঁদলা বুঢ়াকে ঢাঁড়াই, ত হামরা পত্তাপপুরের ডম লই। ওই যেদিনেই উ তুন্তার দিগে আসবেক, উয়াকে বাঁধগড়ায় ঢাঁড়াব। যেখিনে পাব সেখিনেই।’ নটবরের এই শাসানি হইচই-এর কারণে রাধেশ্যামখুড়ার কানে যায় না।
কালিন্দীরা অবশ্য চাপাইটাঁড়ে এসে এর বেশি কিছু করতে চায় না। মুখে বলবে ‘ললি ছিঁড়ে লিব’, কিন্তু ওই পর্যন্তই। যতই হোক, এটা তো আর তাদের গ্রাম নয়। এখন ঘাসিরা যদি তাদের সপাটে দু-ঠ্যাঙা বসিয়েও দেয়, তাহলেও তাদের কিছু করার থাকবে না। পাল্টা লাঠি আনতেও তো যেতে হবে সেই পত্তাপপুর? পাঁচ কিলোমিটার। তাই তারা শুধু গর্গর করতে করতে আপাতত সম্ভ্রম নিয়ে পিছিয়ে গেল।
এই ধরনের বিবাদে সাধারণত দুর্বল পক্ষরা এভাবেই পিছিয়ে আসে। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে তারা সেই মুহুর্তে সেই ঘটনাস্থলে প্রতিপক্ষের ওপরে আক্রমণ শানাতে পারে না। অন্য কোথাও তাদের শায়েস্তা করার কথা সাড়ম্বরে ঘোষণা করতে করতে চলে যায়। তার মানেই হল যে, প্রতিপক্ষের পৌরুষ অনুমান করে তারা আপন ইজ্জত বাঁচাতে বায়বীয় হুমকি দিয়ে সংঘর্ষ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিল। ঝামেলার এখানেই ইতি। তারা হাত-পা নেড়ে উত্তেজিত ভঙ্গিতে প্রস্থান করে।
যেতে যেতে, এখানেও তারা শাসানি দিয়ে গেল। ‘চাপাইটাঁড় বাজনদার পাটি’কে তারা ছাড়বে না। যেখানেই তারা ভাড়ায় খাটতে যাবে, সেখানেই এই পত্তাপপুরআইলারা ‘চোদ্দচুয়াড়ি’ করে আসবে। যদি না ডাং ঢুকিয়ে তাদের ড্রামের ছাউনি ভসকে দিয়েছে! ওরা চেঁচাতে চেঁচাতে চলে গেল।
আমতলে সেদিন আর পেকটিশ জমলো না।
ঘাসিরাও ওই হুমকিতে কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। যদিও পত্তাপপুরআইলাদের তারা এরকম ধাকলানি দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছে, তবু মনে ধকধকি থেকেই গেল। কোনো বিহাঘরে, ভুজনাঘরে তাদের পেয়ে যদি সত্যিই এই কালিন্দীরা লাঠি ঢুকিয়ে তাদের ড্রামের চামড়া ফাঁসিয়ে দেয়? যেভাবে সর্বস্ব দিয়ে তারা আটজন মিলে এই বাজনাগুলি কিনেছে, তাদের পক্ষে আবার নতুন করে কি টাকা জোগাড় করে বাজনা কেনা সম্ভব? তাছাড়া এখনো তাদের তো ভাড়া জমেনি। হাতে টাকা পয়সাও কেউ পায়নি। শুরুতেই এমন ক্ষতি তারা সহ্য করতে পারবে? শেষতক তাদের উদ্যোগটাই না চৌপাট হয়ে যায়।
বলিরাম অবশ্য এই ফালতু ভয়ে ভীত হয়ে থাকতে নারাজ। বয়স হয়েছে বটে রাধেশ্যামখুড়ার, কিন্তু সেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে, যেকোনো হুজ্জুতের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। বলে, ‘হামরা ওই শালা ডমগুলোকে ডরাব? হামাদের কিস্যার কমি আছে? গায়ে তাকত নাই? হামরা মরদ লই? ন, হামাদের গাঁয়ে ডাং-এর অভাব?’
রাধেশ্যামখুড়ার মুখ থেকে এই ভরসা পেয়ে ভীত শিশুপাল, গতিক, চন্দমহন এরাও চনমন করে উঠল। তবে তারা এটাও বলল যে, হুজ্জত-হাঙ্গামা হতে পারে ধরে নিয়ে তাদেরও আগাম তৈরি থাকতে হবে। ওরা যদি দলবল নিয়ে ঘাসিদের বাজনা ভাঙতে আসে, তাহলে ঘাসিরাও যেন তাদের মাথা ভুলকিয়ে ছাড়ে! তারপর দেখা যাবে!
যদিও ঘাসিরা যেখানে ভাড়া খাটতে যাবে, সেখানে গিয়ে কালিন্দীরা যদি কোনো পাঁয়তারা কষে তাহলে সেই বাবুঘরের লোকেরাই তাদেরকে উত্তম-মধ্যম দেবে। এমনকি, অন্য কোনো গাঁয়ে গিয়েও তারা এমন ‘কায়দিস’ দেখাতে সাহস পাবে না। তবু তারা সতর্ক হয়ে থাকতে চায়। এমনও তো হতে পারে, পত্তাপপুরের কাছাকাছি কোনো গ্রাম থেকে কেউ তাদের লছনা করে ভাড়ায় নিয়ে গেল, তারপর সেখানে কালিন্দীরা চারপাশ থেকে রে-রে করে ছুটে এল—উপর্যুপরি তাদের পিটাপিটি করে, ঠ্যাঁং খড়া করে, ড্রাম-বাঁশি চ্যাড়পেটি সোব ভেঙেভুঙে ছতিচ্ছিনি করে চলে গেল?
এতোটা সাহস কি হবে? তবু দরকার কি! তারা কাহান, জাহাজপুর, শালাগ্রামের দিকেই যাবে না। ভাড়া পেলেও যাবে না। বলবে, ‘অমুক দিনে? না ভাই। হামদের বড়টাঁড়ে বুকিন আছে। হাজার টাকার বায়না, খাই-খরচা ভিনু। যাওয়া চলবেক নাই!’
এই কয়েক মাসের ভেতরে সবার অগোচরেই ডোড়োতি অনেক বড় হয়ে গেছে। আমাদের সেই ছোট্ট কিশোরী ডোড়োতি। নাকে লুলুক-পরা ডোড়োতি। সবে বারো পেরিয়েছে। কিন্তু তার লাজুক মুখ ও অচঞ্চল আচরণ আর মায়ের সঙ্গে নিঃশব্দে ছোট ছোট সাংসারিক কাজ করা দেখে মনে হয়, ডোড়োতি সত্যিই বড় হয়ে গেছে। সে নম্র হচ্ছে, তার মধ্যে অনূঢ়া কন্যার থমথমানিও দেখা দিতে শুরু করেছে। আর ভোরের আকাশে দমকে দমকে যেভাবে বালার্ক উঠতে থাকে, তেমনিভাবেই, সারা আকাশ জুড়ে, শরীর জুড়ে অদৃশ্য সিন্দুরাভা ছড়িয়ে প্রকট হয়ে উঠছে তার ‘কাঁচা অঙ্গের লাবনি’!
অথচ ডোড়োতি তো এমনটি ছিল না। জোসনা, ফলটুঙি, কুড়চির সঙ্গে সেও কি কম দস্যিপনা করেছে? ডোড়োতির এইসব ছোটো ছোটো বন্ধুরা এখনো তেমনি আছে। এখনো তারা এর-তার ঘরে গিয়ে ছুটোছুটি করছে, ভাডি-কিৎকিৎ খেলছে। তারা অনেক সময় ডোড়োতিকে ডাকতে এলেও সে যেতে চায় না। ঘরেই মায়ের সঙ্গে এটা-সেটা কাজ করতে শেখে, রাঁধাবাড়া করতে শেখে, কালিন্দীকে সামলায়, সঁচিকে কোলে নেয়। প্রয়োজন হলে তাকে কাঁখে নিয়ে উঠোনময় দুলিয়ে বেড়ায়।
এখন অবশ্য মদ্দৈনাকে দেখতে হয় না। সে নিজে নিজেই কেমন করে যেন বড় হয়ে গেল! চারপাশ দেখে-শুনে, সেও তার বাবার মতোই, নিজের ভেতরে নিজেই থুম মেরে গুটিয়ে যাচ্ছে! তার সেই দুরন্তপনাও কমেছে। বাপের সঙ্গে প্রায় সে মদনভেরি নিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়। বিশেষ করে কাউয়াহারা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে ভীষণই ভালো লাগে তার। তাই চোড়কু যখন হাড়গাড়া-হাতিমুড়ি ছটকা-সিংঘাগরার দিকে ডাক পায়, তখন মদ্দৈনাকে বলে, ‘এ ব্যাটা, যাবি নকি রে?’
‘কথাকে যাবিস তুঁই?’ মদ্দৈনা জিজ্ঞেস করে, ‘আলকুশা-শুষনিডি যাবি?’
‘অত ধূরকে? কাউয়াহারা হঁয়ে?’
‘হঁ, ওইটা হঁয়েই যাব। কাউয়াহারা হঁয়ে।’
মদ্দৈনা রাজি হয়ে যায়। কাউয়াহারা দিয়ে গেলে প্রায় পুরোটা রাস্তা জঙ্গলের ভেতরে ভেতরে যাওয়া যায়। কত গাছপাত, পাখি, কাউয়া-বনি। কখনো কখনো পাথুরে বিস্তীর্ণ মাঠ আর জল শুকিয়ে যাওয়া বালি-ঝুরঝুর নদী। এই নদী প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতির আশ্চর্য সৃষ্টি। এই খরাতেও, লিরনেও, নদী নদীই। জল থাকলেও সে নদী, জল শুকিয়ে গেলেও নদী। কোনো অবস্থাতে সে আকর্ষণহীনা নয়। নদী স্বয়ং আশ্চর্য এক রূপকথা। বহু ভাষা আর ভাবভাবনার জনক হয়ে সে নির্জনে একাকী পড়ে থাকে। বুক-টলটল জল নিয়ে নদী যখন উত্তাল স্রোতস্বিনী, তখনের চেয়েও নদী যখন এমনি খরায় এক বিশাল বালুকারাশি নিয়ে বিষাদে পড়ে থাকে, তখন সে যেন আরো বাঙ্খয়, আরো গম্ভীর, আরো ব্যঞ্জনাবহুল। যেন বহু বহু মানুষের কান্নাকে গ্রাস করে সে পাষাণ হয়ে রয়েছে। যার দিকে অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে দু’দন্ড তাকিয়ে থাকা যায়। তরঙ্গময় উত্তাল নদীকে তো বাইরের চোখ দিয়েই শুধু দেখা যায়। ভরা নদী কোনো কল্পনার জন্ম দেয় না। কিন্তু মরা নদী? আশ্চর্য মোহময়ী। তাকে দেখতে হয় অন্তর্গত চেতনা দিয়ে। ভাব, আবেগ ও কল্পনা দিয়ে।
বস্তুত, মানুষের মনে প্রেম ও কল্পনার জন্ম তো হয় এই বৈচিত্রময় প্রকৃতি থেকেই। এই গাছপালা, আকাশ, নদী-পাথর-পাহাড় থেকে। এই কাউয়াহারা জংগলের ভেতরে বিরাট পাথর ছড়ানো মাঠ পেরিয়ে যেতে যেতে, কখনো কোথাও কোনো মানুষজন দেখা যায় না। গাছপালাও চোখে পড়ে না। তারপর হঠাৎ করে যখন চোখে পড়ে যায় একটি একাকী ধ-গাছ, তখন মনে হয়, এই গাছটিই যেন এই নির্জন প্রান্তরে অভয় মুদ্রায় দাঁড়িয়ে কাছে ডেকে নিতে চাইছে। বলছে, ‘একাকী পথিক, তুমি কোথায় চলেছ? এই সহস্র সহস্র বছরের নির্জনতার ভেতর দিয়ে? তুমি দুঃখী, নিঃসঙ্গ কেন? এই কোলাহলময় জগতে একমাত্র দুঃখী মানুষদেরই সঙ্গী নির্জনতা।’
একেক দিন এমনি বিষণ্ণতার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে, ব্যাটাকে আঙুল ধরে নিয়ে যেতে যেতে, কখনো চোড়কুর এটা মনে হয়। তার এটাও মনে হয়, মানুষ দুঃখী হয়, বিষণ্ণ হয়, কিন্তু কখনোই সে নিঃসঙ্গ হয় না। ঝুমুরের ভেতর দিয়ে নিজের সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, যে-সৃষ্টি অখন্ডকালের জন্য মানুষের অন্তর স্পর্শ করে থাকে, তার উৎস কখনোই আনন্দ-উল্লাস হতে পারে না। কেননা, আনন্দ-উল্লাসের পিছনে কোনো প্রতীকী ভাষা নেই, ব্যঞ্জনা নেই, তা মানুষের মন ও হৃদয়কে উসকে দেয় না, উদার ও প্রসারিত করে না, তাকে মরমিয়া করে তোলে না। ঠিক সেই ভরা নদীর মতো। ভরা নদী মানেই দৃশ্যত একরাশ জল। অথচ মরা নদী? তার অর্থ কিন্তু শুধুই এক-ধরিত্রী বিমর্ষ বালুকারাশি নয়।
হ্যাঁ, চোড়কুর এটা মনে হয়, মানুষ কখনো নিঃসঙ্গ হয় না। এই বৈচিত্র্যময় ব্যাঙ্খয় প্রকৃতি তার মহাসঙ্গ। একাকী মানুষ নদীর কাছে দাঁড়ালে নদী যেন তাকে বলে, এসো, আমার সঙ্গে তুমিও গান গাও। আকাশ বলে, আমিই তো তোমার সঙ্গ। তুমি আরো আরো প্রসারিত হও। ব্যাপক হও। পাহাড় বলে, তুমি শোকসন্তপ্ত হয়ো না। শোককে অতিক্রম করো, স্থিতধী হও। আর ধরিত্রী বলে, তুমি মানুষ। আমারই মতো সর্বংসহ হও। তুমিও আমৃত্যু মানুষকে তোমার কোলে স্থান দিয়ে যাও। কার্পণ্য কোরো না।
প্রকৃতির এই উদার অবারিত ভাবনা চোড়কুকে অনেক সময় আচ্ছন্ন করে ফেলে। সেই আচ্ছন্নতার দৃষ্টিতে সে নিজের বিটিকে দেখলেও মনে হয়, সে নিছকই তার বারো বছরের ডোড়োতিকে দেখছে না। তার ভেতর দিয়ে সে দেখছে কোনো আকাশকে, পাহাড়কে। অথবা জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রে সে দেখছে বালিয়াড়ির ওপরে পড়ে থাকা একখন্ড চাঁদ।
বাস্তবিক ডোড়োতি এখন সেই চাঁদের মতোই হয়ে উঠেছে। সুন্দর-লাজুক অথচ গম্ভীর। তার আয়ত লোচন দুটি দেখলে মনে হয় সে বাংলার মেয়ে বিশালাক্ষী। বলা বাহুল্য, যেদিন থেকে তার বিয়ের জন্য দেখাশোনা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই ডোড়োতিও কেমন লজ্জাশীলা হতে শুরু করেছে। সমবারী তাকে একটু একটু শিখিয়েছে কীভাবে সংসারের কাজবাজ করতে হয়। একদিন তো তাকে এই আবাল্য স্মৃতি জড়ানো বাপের ঘরের মায়াময় আকর্ষণ ছেড়ে চলে যেতে হবে। হায় ডোড়োতি!
কিন্তু সেই চলে যাওয়া যে এত শিগগির হবে তা সমবারীও ভাবতে পারেনি। আর ডোড়োতি? এখানো সে একঘর ছেড়ে আরেক ঘরে যাওয়ার সামাজিক অর্থ অনুধাবন করতে পারেনি। যতোই বলি না কেন, সে তো এখনো ছোটই? ছোট ছোট হাত দিয়ে গাছের ডাল ভেঙে সে পাঁঠি ছাগলকে পালহা খাওয়ায়। অন্ধকার উঠোনে দড়ির খাটে সঁচিকে কোলে বসিয়ে গুন গুন গান গেয়ে ঘুম পাড়ায়। আর ছোট ছোট হাত দিয়েই সে মায়ের মতো করে শিলের বাঁটনা বাঁটতে শেখে। যদিও এই শেখা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ডোড়োতিকে চলে যেতে হবে।
কোথায় যাবে ডোড়োতি? ছেঁড়া ফ্রক ছেড়ে সে এবার শাড়ি পরবে। একমুঠি চুলের জোড়া বিনুনি খুলে সে টাসেল বাঁধবে, বলখোঁপা করবে আর সেই খোঁপায় গুঁজবে বেলকাঁটা। আহা, আমাদের এই ছোট্ট ডোড়োতি! তার ছোট্ট অপুষ্ট বুড়ো আঙুল পাথরবাটির আলতায় ডুবিয়ে মায়ের ফাটা ফাটা গোড়ালি আর রাঙিয়ে দেবে না? ভাবতেই সমবারীর চোখে জল এসে গেল। হঠাৎ ডোড়োতিকে কোলে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ‘তুই চলে যাবি বিটি? নাই থাকবি আর হামাদের সঙে? চলে যাবি...’
হ্যাঁ, ডোড়োতি চলেই যাবে। আষাঢ়ের তের দিনে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। রিগিজডুমু গ্রামে। ব্রজপুর-কলমার দিকে আরো কয়েক জায়গাতেও দেখাশোনা হয়েছিল। অঘনুডিতে তো বলতে গেলে অনেকটাই পাকা হয়ে গিয়েছিল। পাকা বলতে মুল যে-ব্যাপারটা, দেওয়া-থোয়া, সেটা চোড়কু-সমবারীর সামর্থ্যের মধ্যে ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও হল না। না হওয়ার কারণ পাত্রীকে অপছন্দ নয়। পাত্রীর শরীর এখনো ডাঁটো হয়নি। এখনো সে অনেকটাই ছোট। শারীরিকভাবে অপরিণত। যদিও এই বয়সেই মেয়েকে বেশ বড় বলে মনে হয় সমবারীর। তাই কিছুদিন ধরে চোড়কুকে সে তাড়া দিচ্ছিল মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে। ঝালদা-হেঁসাহাতু-ব্রজপুর বা গোকুলনগরের দিকে কোথাও যোগাযোগ করতে।
ঘাসিদের আত্মীয়স্বজনের তো অভাব নেই। বেশি আছে ঝালদা-ইলু-জারগো-রাঁচির দিকে। নামকুম, বুন্ডু, জনা, বুঢ়াম, নাওয়াডি, গড়াডি, সিলি, বামনিয়াতে। আরো কত কত জায়গায়। ইঁচাক, পিলোই গড়াবাঁধা, সিন্দরী, চৈড়দা, ডবহা, তড়াং মুকবুর, বুড়দা, কুশলডি, সাজুমাতু, পাথরডি-সারিডির দিকেও আছে এমনি অনেক ভের-বাজনদার। তবে চোড়কু তো অত দূরে দূরে যোগাযোগ করতে পারেনি। ভভ-র সূত্রে সে ঝালদার দিকে কোথাও কোথাও যোগাযোগ করেছিল। সেটা ভভ-র শালা বৈতরণই করেছিল। কিন্তু লাগছিল না। পণ চাইছিল বেশি। দুহাজারের ওপর। পরে কাছাকাছির মধ্যে এই কলমা, বকদ, ব্রজপুর অঞ্চলে সে কয়েকটি পাত্রের সন্ধান পেয়ে যায়। আখেরে রিগিজডুমুতেই ‘ফাইলেল’।
পাত্রের নাম সোঁডু ঘাসি। পণ চেয়েছিল দুহাজার। দেড় হাজারের কম মানতে চায়নি। শেষে চন্দমহন নিজে বহু দরাদরি-ধরাধরি করে। সে ওই গ্রামেরই জামাই। তখন তেরশ টাকায় ‘ফসলা’ হয়। আর সেই সঙ্গে থাল-বাটি-ডোল-বঠিন-খুশনি-গোরোয়া-টুবকা আর শ্বশুরঘরের লোকজনদের গোটা পাঁচেক বিদায়ী শাড়ি। তবে কেবল এইটুকুই তো নয়। আনুষঙ্গিক খরচটাও যে ঢের। বরযাত্রীরা আসামাত্র তাদের নাস্তা-বিঁড়ি হাতে হাতে ধরিয়ে দেওয়া, রাতে বরার মাস আর ভাতের ব্যবস্থা করা, তার বাদেও আবার জামাই মান করবে। ‘মানের জিনিস’ও তো একটা কিছু লাগবে? আর ‘লাস্টেরও শেষে’ বরযাত্রী এবং কনে-ঘরের লোকজনদের জন্য বোতল-বোতল মদের জোগান দেওয়া।
তবু যেটুকু যা লাগছে, সেই তুলনায় বলা যায় যে, পাত্র সস্তাতে পাওয়া গেছে। ছকরাটি। দেখতে শুনতে ভাল। বয়স গোটা কুড়ি-বাইশ। গায়ের রঙ হাঁড়ির ‘পেঁদা’র রকম। মাথায় ‘কুকশা কুঁকশা’ চুল। বাপ-মা বেঁচে আছে। সংসারে তিনছেলে আর দুই মেয়ের মধ্যে সোঁড়ুই বড়। চাষবাড়ি কিছুটা আছে। পাঁচটা গ্রামের থেকে কাঁচা তরকারি সংগ্রহ করে তারা ঝালদায় এসে বিক্রি করে। এছাড়াও ধান পিটাপিটি হয়ে যাবার পর নতুন খড় গোরুর গাড়িতে তালগাছের মতো বোঝাই করে হেঁসাহাতু দিয়ে বিহারে নিয়ে যায়। গ্রামের লাগোয়া বর্ডারটি পেরলেই তো বিহার। কাছেই মুরি। এখানে আছে কাঁচ-কারখানা। এই কারখানাতে প্রচুর খড়ের প্রয়োজন হয়। লণ্ঠনের কাঁচ, গেলাস ইত্যাদি প্যাকিং করার সময় খড় লাগে। আমদানির সময় তারা খড়টা কিনে নেয়। মোটা দাম পাওয়া যায়। এবছর খরা বলে তারা এইসব কাজে মার খাচ্ছে ঠিকই, তা না হলে এটাই তাদের এখন জীবিকা হয়ে গেছে।
এখানের ঘাসিরা মদনভের নিয়ে পড়ে নেই। দুকুড়ি টাকা আর একআধটা ‘লুগা’ খয়রাতী পাবে বলে তারা পায়দলে-পায়দলে মাইল-মাইল পথ পাড়ি দিতে নারাজ। এরা অনেক বেশি চটপটে, চালাক-চতুর, কর্মিষ্ঠী এবং প্রয়োজনে কিছুটা অসৎও। চাপাইাটাঁড়ের ঘাসিদের সারল্য এখানের ঘাসিদের মধ্যে বিরল। আর তাই সারা বছর দুমুঠো খাওয়ার চিন্তায় তারা শুকিয়ে মরে না।
সমবারীও খুশি হয়েছে এটা জেনে। বিটি যেন তার লিবনের দিনে ভোখে না মরে। কথায় আছে, ‘পৌষ-ফাগুনে হুড়ারের পাতেও ভাত জুটে, কিন্তুক লিরনে গুলিনও মরে মাড় না পাঁইয়ে।’ এই পুরুলিয়া জেলায়। খরায় যার মাড়জল জুটল তার আর কিসের আকাল? সমবারী তাতেই সন্তুষ্ট!
কিন্তু চোড়কুর মধ্যে তেমন খুশির প্রকাশ নেই। তাকে দেখে মনে হয়, সে বাইরে যতখানি আছে, তার চেয়ে বেশি রয়েছে ভেতরে। ভেতরে ভেতরে তার মন ছটপট করছে। ডোড়োতিকে তাদের এই ভাঙা দেয়ালঘেরা উঠোন, দঁড়ির ঝুলি খাট, ঘরের লাগোয়া শূন্য শস্যহীন ক্ষেত, আমতল আর এই চাপাইটাঁড় ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে। নাড়ির টান ছিঁড়ে। যেভাবে চাপাইটাঁড়ে আসা শুয়োর-পাইকারকে নিঃশর্তে দিয়ে দিতে হয় শুয়োরকে। সে নিষ্ঠুর আঁটুনি দিয়ে বেঁধে, খালখাবলা মেঠো পথ দিয়ে, গ্রাম থেকে সাইকেলের কর্কশ শব্দ করে চলে যায়।
সেভাবেই একদিন ডোড়োতিও...
বরাত এলো বেলাডুবু। রিগিজডুমু থেকে।
ঘনুকডির মোড়েই দাঁড়িয়েছিল গ্রামের ছেলেছোকরারা। বর আর বরাত নিয়ে ৪০৭-গাড়িটি যখন একরাশ ধুলো উড়িয়ে প্রাইমারি ইস্কুলের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছিল, তখন সেই গাড়ির মাথায় বাঁধা মাইকের আওয়াজ শুনে, ঘাসিদের বাচ্চাগুলো কলকল করে ছুটে চলে যায় খবর দিতে। ‘গাড়ি আইসেছে! গাড়ি আইসেছে!’
কি উল্লাস তাদের। কারো জোড়া তালি দেওয়া প্যান্ট খসে পড়েছে শুকনো কোমর থেকে, কারো কালো ফ্রকের পিঠ খোলা, সেফটিপিন নেই। কোমরের নিচ থেকে সেলাই খুলে গিয়ে ফ্রকের একাংশ ঝুলছে। খড়িওটা হাত-পা, মাথার চুল মেটে মেটে, ধুলোয় ভরা, মুখে শুকিয়ে যাওয়া পোঁটার রেখা। আর বিনুনিতে বাঁধা বহু দিনের ময়লা ও তৈলাক্ত বিবর্ণ ফিতে। চোখের ওপরে কার ঝুলছে। তা সত্ত্বেও ফুর্তির অভাব নেই।
চোড়কুর ঘরের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই, রাধেশ্যামখুড়া হাতের ইশারা করে গাড়িকে আরো সামনের দিকে এগিয়ে আসতে বলে। সেই আমতলে। গাড়ি সেদিকেই ঘোরে। মাইক চলতেই থাকে—‘ইলু ইলু! ইলু ইলু!...’
গাড়ির সামনে-পিছনে ভিড় জমে যায়। পাঁচ-সাতজন ঘাসি হাতসান দিয়ে পিছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে, গাড়িকে ডাকতে থাকে, ‘আগে বাঢ়ৌ। ঔর আগে বাঢ়ৌ!’ গাড়িও সেভাবেই আগে বাড়তে থাকে। গ্রামের ধুলোভরা রাস্তা থেকে বেরিয়ে, গাঢ়া-ঢড়ায় হদলাং হদলাং ঝাঁকুনি দিতে দিতে ক্ষেতে ঢুকে যায়। তারপর ক্ষেতের আল ভেঙে সুখকর দুলুনি দিয়ে আমতলে ঠেসতে না ঠেসতে, সেখানে জড়ো হওয়া ঘাসিরা সমন্বয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ব্যাস! ব্যাস! রোককেইইইই!’
গাড়ি আর এগোয় না। আমতলের বেদিতে উঠে, দুহাত দিয়ে বন্দুকের ভঙ্গিতে তাক, করে দাঁড়িয়েছিল লারাণ মাছুয়ার। ভভ ঘাসিও ছিল একটু দূরে। একা। সব দেখে শুনে, গাড়ি থামাতেই সে শুধু মন্তব্য করে, ‘অবাআআআক কান্ড!’
পাইলটের দরজা ঠেলে লাফ মেরে নামে আণ্ডার প্যান্ট পরা ড্রাইভার। মাঝবয়সী, গোলগাল। কালিমাড়া মুখ। হঠাৎ সে বিরক্তিতে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘মাইকটা ক্যালার বন্ধ কর ন!’ বলেই সে দুপা গিয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, উইঢিবির মাথায় পেচ্ছাব করতে থাকে। মাইক থামে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কনেপক্ষের ঘাসিরা বলতে শুরু করে, ‘আহ, বন্ধ করে দিলে ক্যান ‘র্যাকড়’টা? চলুক চলুক। বড়ো সুন্দর বাজছে।’ ফের চালু হয়ে যায়—‘ইলু কা মতলব আই লাই ইউ...’
গানের ছন্দে ছন্দে বরযাত্রীরা ধড়াধ্যাড় নামতে থাকে গাড়ি থেকে। ওদিক থেকে কয়েকজন ঘাসি লাইন করে ছুটতে ছুটতে আসে। একটা করে দড়ির খাট নিয়ে। হড়াস হড়াস করে সেই খাট পড়ে আমতলের ছাঁইরাতে। বরযাত্রীরা বাবুয়ানি দেখাতে কেউ কেউ পাকিট থেকে পাট-করা রুমাল বের করে। ঘাড়ের ঘাম মোছে। খাটে না বসে মুখের কাছে রুমাল ঘোরাতে ঘোরাতে দেখে ধূ-ধূ প্রান্তর। যেন এই দৃশ্য তারা কখনো দেখেনি। কৈলকাতা থেকে আসছে। কৃত্রিম নাগরিক বিস্ময় নিয়ে অনেক দূর অব্দি তাকিয়ে থাকে। ক্ষেতে চরে বেড়ায় না কোনো গবাদি। মানুষও নেই। শূন্য ক্ষেতে খেলা করে ছোট ছোট ঘূর্ণি বাতাস। মিহি ধুলো ওড়ে।
অন্য বছর এই ক্ষেতগুলোতে এখন পুরদস্তুর চাষবাসের কাজ চলত। সবুজ হয়ে থাকত আফরে। এবারে বীজধানই ফেলা হল না। বয়ার কাড়ার মতো শিং বাগিয়ে আরো তীব্র হয়ে আসছে আকাল।
মাঠের ওপ্রান্তে, দূরবর্তী গ্রামগুলো, দিনভর রোদে পুড়ে, পড়ন্ত বেলায় ধকল সামলে ভিজা পাঁঠার মতো কাঁপছে। পাকা পাতা ঝরে গিয়ে বাঁশঝাড়ও এখন ন্যাড়া। তার তলে দাঁড়িয়ে হয়তো এক আঁজলা জলের জন্য হামলাচ্ছে তৃষ্ণার্ত বাছুর। সেই হামলানিও বড় নিস্তেজ। ক্ষেতের আলে বেড়ে ওঠা খেজুর ঝাড় থেকে ডানায় মিহি ধুলো নিয়ে ছুরুক করে উড়াল দিল একাকী চড়ুই।
বিষণ্ণ-বিভোর গোধূলির আভা। আমগাছের পাশ দিয়ে তেরছা হয়ে পড়ছে দড়ির খাটের তলায়। যেন গুড়গুড় করছে ঘাসিদের শূকরছানা। আর এভাবেই এই বিদায়োদ্যাত সূর্যও তার বিদায় বেদনা জানিয়ে যাচ্ছে চরাচর জুড়ে। তার আরক্তিম বিষাদাচ্ছন্ন মুখ দেখে মনে হয়, সে ডোড়োতির মতোই। ঘোমটার আড়ালে তার থমথমে মুখ।
মাইক এবার বন্ধ করে দেওয়া হল। ব্যাটারির ‘মশলা’ কমে আসছে। পুরো ব্যাটারিটা এখনি শেষ করে দিলে, বিয়ে করে তারা যখন নতুন বউ নিয়ে গ্রামে ঢুকবে, তখন তো আর বাজানো যাবে না। অথচ তখন রিগিজডুমুতে বর-বউ ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মাইকের গান না হলে জমবে কী করে?
বরযাত্রীরা খাটে বসে পা দুলিয়ে গল্প করছে। কেউ বলল, ‘আমাদের গাড়িটা চাপাইটাঁড়ে ঢুকার আগে যে-গাঁটায় ঘুরে গেল, তার নাম কী? ধনুকডি?’
‘ধনুকডি লয়, ঘনুকডি’। অপর এক বরযাত্রী জানায়, ঘনু মাহাতই সর্বপ্রথম ওই জায়গাতে ঘর করে থাকতে শুরু করে। পরে সেখানে বসতি গড়ে ওঠে। ‘ঘনুর গ্রাম’ থেকেই কুড়মালীতে ‘ঘনুকডি’। এখন সেখানে বসতি বেড়েছে। ছোটোখাটো চা-পানের দোকান, সাইকেল সারাই-এর দোকানও হয়েছে।
ওই মোড় থেকে একটা রাস্তা ঢুকে যাচ্ছে সোজা চাপাইটাঁড়ে। আর ফরেস্ট মোড় থেকে এই চাপাইটাঁড়ে আসার আগে পড়ে বরুয়াডি। চাপাইটাঁড়ের টোলা। কপিচাষের জন্য বরুয়াডি এই অঞ্চলে সকলের পরিচিত। প্রায় প্রত্যেক কুড়মীর সবজি চাষের বড় বড় ক্ষেত রয়েছে। পাতকুয়ো আছে। এই কুয়োর জল সবজি ক্ষেতে ঝিঁটে তারা প্রচুর আনাজ ফলায়। অথচ এখন গ্রামটিকে দেখলে মনে হয় যেন কাকতাডুয়া। তাদের জমির সীমানা বরাবর লম্বা লম্বা বাঁশঝাড়গুলি ছাড়া কিছু নেই। কুয়োর জল নেমে গেছে কোন তলায়। অবহেলায় ভেঙে পড়ে রয়েছে ‘টাড়াডাং’। দেয়ালে দেয়ালে ফাটল ধরেছে। কতকাল গুলচ মাটি পড়েনি। গোরুর গাড়ির কাজ নেই বলে, রাস্তার ধারে ধুলোর মধ্যে পড়ে রয়েছে ‘উদল’।
বাতাস বইতে থাকে ফুরফুর। বরযাত্রীরা সেখানেই থাকে। কনেপক্ষের লোকের সঙ্গে হাসিদিল্লাগি করে। বরকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় কনের ঘরে। তালাই বিছিয়ে তাকে বসিয়ে দেওয়া হয়। এবার বরযাত্রীদের নাস্তাপানি দেওয়ার পালা।
পলাশপাতের খালায় খালায় তাদের দেওয়া হয় দুহাতা করে সুজি-ঘাঁটা। তার ওপরে সামান্য বোঁদে আর একমুঠো আন্দাজ ‘সেও’। যাকে বলে ‘ঝুরিভাজা’। লারাণ মাছুয়ার গুন গুন সুর ভেঁজে চটপটে হাতে তাদের দিয়ে-দিয়ে যায়। তুচ্ছ তুচ্ছ রসিকতা করে। বলে, ‘মারৌ মুঢ়ি ত্যাল দিঁয়ে!’
বরযাত্রীরা অবাক। কেউ একজন বলে, ‘তুমাদের মুঢ়িয়েই কথায় আর তেলেই কথায়? দি-ছ ত দুটি-দুটি বৈঁন্দা আর সুজিঘাঁটা।’
‘আহ, ইটা মানে একটা কথার কথা বলা হছে। দিল্লাগিরকম। লোকের মুখে মুখেই-কথাটা দমে চলছে এখন।’
‘দমে চলছে?’
‘হঁ। শুধাও ক্যানে যাখে শুধাবে?’
বরপক্ষের বুড়োটি এবার রেগে যায়। বলে, ‘হামি ক্যানে শুধাব, তুঁই শুধা ক্যানে? ইটা হামদের সঙে তুমাদের বাচালতা করা হছে। আ-র বলছে দিল্লাগি।’
‘হঁ, হঁ। দিল্লাগি।’
‘চুপ মাইরে থাক! আর নাইলে এখনি তুমাদের এই সুজি-বৈঁন্দার ডঁড়রা বাইগন-বাড়িয়ে ঝিঁটে হামরা গাড়ি ঘুরাঁয় ফের চলে যাব রিগিজডুমু!’
লারাণ অবাক! সে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। মাটির খাপরিতে বোঁদে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে, ‘ইটা কী রকম? হামি কী বলেছি?’
‘কী বলেছি মানে? এখনো সিঁদুর দান হৈল নাই, তুমাদের সঙে হামাদের ক-ন ঘরানা হৈল নাই, আর এখনি তুমরা হামাদের সঙ্গে দিল্লাগি করছ?’
ব্যাস! লেগে গেল। গোলমাল আর উত্তপ্ত বোলচাল শুনে কনে পক্ষের লোকরা এদিক-সেদিক থেকে ছুটে আসে। তাকে সবাই মিলে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। শেষে বরপক্ষেরই কেউ কেউ বলে যে, ‘মারৌ মুঢ়ি ত্যাল দিঁয়ে’ কথাটা সত্যিই এখন মানুষের মুখে মুখে চলছে। কাউকে উপহাস বা ঠাট্টা করার জন্য নয়, পুরুলিয়ার সাধারণ লোকজন নিছক ফুর্তিতে এটা বলে থাকে। তখন সেই বুড়ো শান্ত হয়। তখন ফের অবস্থা আগের মতো স্বাভাবিক হয়। কিন্তু তখনো, বুড়ো নরম সুরে বলছে, ‘তা বলে যেটা পাতে পড়ছে নাই, সেটা নিয়ে তুমাদের—এই চাপাইটাঁড় আইলাদের ই-কেমন দিল্লাগি?’
তার পাশে বসা আরেকজন তাকে সমর্থন করে বলে, ‘হঁ, ঠিক কথাই ত। বৈঁন্দা যখন দি-ছ, তখন বৈঁন্দার নিয়েই দিল্লাগি কর।’
লারাণও তেমনি। এবার তৎক্ষণাৎ সে-আরো বেশি প্রচলিত অন্য একটি ‘বাজারী-বোলি’ বলে সুজির সঙ্গে বোঁদে পরিবেশন করতে লাগল, ‘লে বৈঁন্দা ঝপ ঝপ!’
রিগিজডুমু আইলারা এবার না হেসে আর পারে না। হাসতে হাসতেই তারা, নাস্তা শেষে খাওয়ার জন্য, আপন আপন ভাগের একটা করে বিঁড়ি হাত বাড়িয়ে নিতে থাকে।
একটা লাঠির ওপরে হেলান দিয়ে, তফাতে দাঁড়িয়েছিল ভভ। সেও গুবগুব হাসে। ভুলুয়া এসে তার লাঠিটা ঘুর-ঘুর করে শোঁকে। পেচ্ছাব করতে পা তোলে। ঠিক তখুনি, বিঁড়ি-পরিবেশন থামিয়ে, লারাণ হঠাৎ ভভকে দেখে বলে ওঠে, ‘অবাআআআক কান্ড!’
যত ঘাসিবউদের ভিড় এখন চোড়কুর ঘরে। তাদের হাত-পা-মুখ কোনোটায় বিরাম নেই। প্রত্যেকে কিছু না কিছু করে চলেছে, আবার কেলেবেচেও করছে। কেউ ছামড়াতল সাজাচ্ছে, কেউ সরা বসাচ্ছে। কেউ হড়র-হড়র করে শিলনোড়ায় বাঁটনা বাঁটছে।
ঘাসি পুরুষরা দেয়ালকোলে খাট পেতে বসে রয়েছে। ছেলে-ছোকরারা বরযাত্রীদের দেখভাল করছে, ছোটাছুটি করছে। অনবরত লোকজনের আনাগোনা লেগে রয়েছে।
পাশের ছোট ঘরে বর আছে তার ‘ছকরাপাটি’দের নিয়ে। ওই ঘরেই রাখা হয়েছে বিদায়ের বাসনপত্র। আর ‘মানের জন্য’ একটি পাঁঠিছাগলকে। এটাকে এবং ভোজের দুটো বরাকে রেখে সব বিক্রি করে দিয়েছে চোড়কু। তাই দিয়ে সে খরচ চালাচ্ছে মেয়ের বিয়ের।
পাঁঠিছাগলটিকে ‘মান’ দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না সমবারীর। কিন্তু এছাড়া আর কী ই বা আছে দেওয়ার? বর-কনের মান তো ভাঙাতেই হবে। সিঁদুর দানের পরে বর-কনেকে খেতে বসানো হয় হেঁশেলে। তাদের সঙ্গে ‘ঘঁড়া’ও খেতে বসে। ‘ঘঁড়া’ হল মেয়ের ঘরের জামাই। যে বাহন হয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে ছামড়ায় ঘোরায়। ছেলের ঘরেরও ‘ঘঁড়া’ থাকে। পাতায় পাতায় অল্প চিঁড়ে, সামান্য ঢেলাগুড় আর জল দিয়ে তাদের খেতে বলা হয়। বলামাত্র মেয়ে খাবারে হাত দেয়। তার তো বাপের ঘরের ওপরে টান আছে। কিন্তু দেখা যায়, বর মুখ নিচু করে গুমসে আছে। সে খাবার ছুঁতে চায় না। তখন তাকে বলা হয়, ‘কী দিলে তুমার মান ভাঙবেক জামাই? বল তুমি? লিজের মুহেই বল। হাই দেখ জামাই, এইটা লিবে—’ শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে হয়তো একটা জারমনির গেলাস কিংবা কাঁসার থালা-ঘটি দেখায়। সেটা আড়চোখে দেখে জামাই নিরুত্তর থাকে। অর্থাৎ তার এখনো মান ভাঙেনি। আরো মূল্যবান, আরো পছন্দসই কিছু সে চায়। তখন আবার অন্য জিনিস দেখানো হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ হাতঘঁড়ি, রেডুও, হেঁসেক লাইট, ষাঁড়া হাঁস থেকে শুরু করে গুহাল ঘরে খুঁটায় বাঁধা ফেটানি বাছুর ইত্যাদি দেখায়।
সমবারী জামাইয়ের জন্য রেখেছে পাঁঠিছাগলটি, যা মানভঞ্জনে পেলে জামাই খুশিই হবে। এমন জিনিস তো আর তক্ষুণি ফুরিয়ে যায় না। বরঞ্চ রাখলে আয় দেয়। পুঁজি হয়। ভবিষ্যতে এই একটি পাঁঠি থেকে আরো কয়েক গন্ডা বাচ্চা পেতে পারে।
ভিড়ের মধ্যেই, উঠোনে একটা ভাঙা চাটান পাথরে গোড়ালি ঘষছে ডোড়োতি। আলতা পরানোর আগে সমবারী পা ঘসে সাবান দিয়ে ঝকঝকে করে দিচ্ছে। যদিও ডোড়োতির এটা ভালো লাগছে না। সে কাঁদছে। কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকে দেখছে জোসনি আর বেলবুঢ়ি। তার কান্না দেখে পেমলা বুড়ি হাসে। বলে, ‘এগো, তুঁই যে বাপের ঘরেই কাঁদছিস। তাইলে শ্বশুরঘরে কাঁদবিস কখন?’
‘বিটিছ্যেলা বঠে ধন।’ শরাবনী বলে, ‘বাপের ঘরেই কি আর শ্বশুরঘরেই কি? সারাজীবন উয়াকে কাঁদতে হবেক।’
কথাটা যেন বোরহৈলের পারা চোড়কুর মনে বিঁধে যায়। মদ খেয়ে ঝিম মেরে সে বসেছিল খাটে। উঠে ভাঙা দেয়াল ডিঙে পরীক্ষিতের ঘরের উঠোনে চলে যায়।
উঠোনের একদিকে বড় দুটো কাঠের উনুন করা হয়েছে। রান্নার দায়িত্বে এখানেও আছে সেই পান্ডু ঘাসি—কনধারের ডিংলা রে! তার হেলপার চন্দমোহন এবং তরুবর ঘাসি। একটা উনুনে কাঠ ঢোকানো হয়েছে। মাটির হাঁড়ায় জল ঢালা রয়েছে। পান্ডু এখনি ভাত বসিয়ে দেবে। এখন না বসালে—লহাশাল চাল! দু’ঘণ্টাতেও সিজতে না সিজে। এদিক-ওদিক থেকে কাঠ এনে ডাঁই করে রেখেছে ফটিক। ছোট একটি চালবস্তার মুখ সুতলি দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাঁধা ছিল। দড়ির বাঁধন টেনে ছিঁড়ে ফেলে পান্ডু। বস্তার ভেতর থেকে কাঠের পাইটা বের করে সে চেঁচিয়ে জিগোস করে, ‘চালটা তাইলে কৎটা ফেলব? রাবণের গুষ্টি ত চৈলে আইসেছে। পঁচিশ বলে চল্লিশ!’
ইতিমধ্যে বরযাত্রীর মুড় গুনতি হয়ে গেছে। সত্যিই তারা সংখ্যায় বেশি এসেছে। হয়তো বাসে জায়গা রয়েছে দেখে পটাপট আরো দশ-পনেরজন ছেলেবুড়ো উঠে পড়েছে। গ্রামে এমনটাই হয়। আকালের দিন। একপেট খেতে পেলেও তো লাভ। আবার আকাল বলেই লোক বেশি আসাটাকে ভয়।
চোড়কু কিছু বলার আগে চন্দমহন বলে, ‘ঠিকের ঠিক ফেল। ভাত বাঁচলে মশকিলেই বঠে। লিজের ঘরে ভাত রাঁইন্ধে ‘কুঁড়া’ খাবার নাই।’
পান্ডু সপ সপ বস্তার চাল মাপাতে থাকে। একেক পাই করে চাল সে বস্তা থেকে নিয়ে মাটির খাপরিতে ফেলে আর এইভাবে পাই গুনতি করে যায়—‘রাম-রাম-রাম-রাম! দুই-দুই-দুই-দুই! তিন-তিন-তিন-তিন! চাচ-চাচ-চাচ...’ আর চাল মাপতে মাপতে সে চন্দমহনের কথার জবাব দেয়। বলে, ‘সাত-সাত-সাত-সাত-কুঁড়া করবার পারা ভাত বাঁচবেক তবে ত?—আট-আট-আট-আট—তুঁই কি ভাবছিস, রাস্তায় ইয়ারা হুঁটেলে খাঁইয়ে আইসেছে?—ন-ন-ন-ন—বাপের কলা!’
বরযাত্রীরা বেরিয়ে পড়েছে ঠিক সময়ে। কিন্তু বাঙ্গুলহরের কাছে এসে তাদের গাড়ির পাত্তি ফেটে যাওয়ায় ঝালদাতে এসে ওয়েলডিং করতে হয়। আর তাতেই সময় লেগে যায় ঘণ্টাখানেকের বেশি। স্বাভাবিকভাবেই তারা বেশ ক্ষুধার্ত হয়ে আছে। ‘দুটি দুটি বৈঁন্দা আর সুজিঘাঁটা’ তাদের সেই ক্ষিদেকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কাজেই তারা যা খাবে তাতে ভাত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই নেই। আর ভাত বাড়লে তবেই না হবে ‘কুঁড়া’?
‘কুঁড়া’ ঘাসিদের একটা খাদ্য। এই কুঁড়া হয় ভাত থেকে। পাশাপাশি কোথাও কোনো চাষাভুষো লোকের ঘরে যদি বড়সড় ভোজঘর থাকে, ঘাসিরা সে-খোবোর জানতে পারলে অনেক সময় সেই বাড়িতে গিয়ে ধর্ণা দেয়। তাদের আমন্ত্রিতদের এঁটো বাসনকোসন ধুয়ে বাড়তি ভাত পেলে ঝুড়ি করে ঘরে নিয়ে আসে। সেই ভাত রোদে মেলে দিয়ে, শুকিয়ে, তারপরে তাকে ঢেঁকিয়ে কুঁটে কুঁটে ‘কুঁড়া’ করে। এই কুঁড়া তারা নুন দিয়ে গুড় দিয়ে ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের খাওয়ায়। নিজেরাও খায়।
পান্ডু বড় অসন্তুষ্ট। দুহাতে চাল ধুতে ধুতে সে বিড়বিড় করে বরযাত্রীদের উদ্দেশে বলে চলে, ‘হাইশূইন্যা! হাঁড়িপেটা!’ এমনি যিসতিস গালাগাল করে যায়। চোড়কু বলে, ‘বাখান ক্যানে দিছিস? দশবিশ লোক বেশি আইসেছে ত আইসেছে। কুটুমকে বাখান দেই?’
এদিকে মাঝ-আঙিনায় চলছে আরেক নাটক। পাতাপুতা জ্বেলে ধুঁড়সানো হচ্ছে বরার গায়ের লোম। পরে ক্ষুর দিয়ে চেঁছে নিয়ে ভভ ও শিশুপাল মিলে কাটবে তার মাংস। এটা হয়ে গেলে আরো একটা বরাকে এভাবে আগুনে ঝলসে কাটা হবে। এখন সেটাকে সবে দড়িদড়া বেঁধে, বস্তা চাপা অবস্থায় কুড়ুলের মাথা দিয়ে থেঁৎলে মেরে, ফেলে রাখা হয়েছে। মাছি বসছে বস্তার তলা দিয়ে চুঁইয়ে আসা রক্তে।
মদের নেশায় সেই রক্ত মাড়িয়ে, ফুর্তিতে টলমল করতে থাকে বলিরাম। বলে, ‘হামার মনে হচ্ছে, এখনি ব্যাঙপাটিটাকে আইনে দমতক বাজাঞ দিব। বিহাঘরে হৈরাগোল না হলে চলে!’ বলিরামও সেই লারাণের মতো। ফুর্তিবাজ। রিঝে-রঙে থাকে। গতিকের দু’হাত ধরে ঝুমুর বলে সে আলং-ঝালং নাচতে থাকে—
চল বঁধু চাঁড়ে চাঁড়ে ডুগুঁরিকা আড়ে আড়ে
পরবে পোকোড়ি খাব আর লিড়িবিড়ি
তুরুধুতু তুরুধুতু বাজে রে ভেরি...
তাদের এই কান্ড দেখে কুলকুলি দেয় ছেলের দল। রৈঞ্জা, গুড়ধন, কুশধ্বজরা।
ঢের রাতে বসল খাওয়া-দাওয়ার আসর। শুয়োরের মাংস, ভাত আর জারা-বিরহির ডাল। খাওয়ার আগেই কেউ কেউ একপেট মদ খেয়ে নিল, কেউ খেল খাবার পরে। আর সারারাত ধরে চলল লাচখেল, ঠাট্টা-তামাশা। ভোরের দিকে ক্ষেতে মাঠে গাছতলে যে-যেখিনে পারল জুমঢ়া কাঠের পারা পড়ে থাকল। ফিনফিনে কালহা বাতাসে শেষরাতের দিকে ঘুমে চোখ যখন বাবলা আঠার পারা লেগে আসছিল, ঠিক তখনি তাদের তুলে দিতে লাগল বরকর্তা হাড়িরাম। বলল, ‘উঠো ব, উঠো। বেলা যত বাড়বেক তত রোদ! রোদের আলহাটা গায়ে লাগবেক। আর ডেরি করলে দেখবে ঘর পঁহচিতেই বারটা!’
ওদিকে খাওয়ার পরেও দু-বোতল বাড়তি মদ সিটের তলায় ঢুকিয়ে রেখে, ডাইভার, গাড়ি ছাড়তে দেরি হওয়ায় হাল্লা করতে লেগেছে। বলছে, ‘শ্লা, ই-মাতালগুলাকে আনাটাই ডাগর গোলতি হঁয়ে গেছে। লাইনের গাড়ি। আমার লাইনটাই ইবার মার খাঁইয়ে যাবেক! পঙা মারাব!’
এ-ওকে ডাকাহাঁকা করে, কুঁচাকুঁচি করে তুলল। বিদায়ের থালাবাসন চটে বেঁধে তুলে দেওয়া হল গাড়ির মাথায়। আবার নুতন করে বাঁধা হল মাইক।
বাবাকে-মাকে পণণাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো শাড়ি পরা ডোড়োতি। বাইরে এসে দাঁড়ালো না চোড়কু। মদ্দৈনাও থাকল বাবার পাশটিতে। খাটে বসে। সদর দুয়ারে দাঁড়িয়ে মেয়ের মুখে আদুরে হাতের স্পর্শ দিয়ে, ‘সুখে থাক’ বলতে গিয়েও, বলতে পারল না সমবারী। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে বলতে লাগল, ‘তুঁই সত্যিয়েই চলে গেলি মা! তকে ছাইড়ে হামি কী করে থাকব লো...’
আমতলে একটা পাক দিয়ে, গাড়ি, ক্ষেতে ক্ষেতে চলে গেল সোজা ঘনুকডির দিকে। ঘাসিদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গাড়ির পেছু ধরে কিছুটা মিহি ধুলোর মধ্যে ছুটল। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকল শুধু। বেজে উঠল মাইক—‘ইলু, ইলু! ইলু ইলু...’
পুবের আকাশে একটু একটু করে উদ্ভাসিত হতে লাগল আরেক ডোড়োতি। বিষণ্ণ-ঘোমটায় ঢাকা মুখ!
যথাসময়ে জলের অভাবে চাষবাসের আশা না করলেও, মানুষ চায় দু-এক পশলা বৃষ্টি আসুক। না হলে বাঁচবে কী করে? রোদের তেজে শরীর জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে। নদীপুকুরে এক আঁজলাও জল নেই। তাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকের ঝলা লাগছে। আঁতবেড়ি হয়ে মরছে ভেড়ি-বকরি। গ্রামগুলোর চেহারা যেন কাকতাডুয়ার মতো। খাঁ-খাঁ করছে। গ্রামের ভেতরে, ছোট ছোট চা-দোকানগুলিতে ঝাঁপ পড়ে গেছে। গ্রামবাসীরা চাকভাঙা বোরহৈলের মতো যে-যেদিকে পারছে বেরিয়ে যাচ্ছে। যদি এক-আধবেলা কোনো খাটালির কাজ পাওয়া যায়। দোকানে-বাজারে মৈটা-মুনিষের কাজ। ট্রেকার স্ট্যান্ডে প্যাসেঞ্জার হাঁকানোর কাজও।
ভভ ঘাসি ফরেস্ট মোড়ে বুধন মাহাত-র দোকানে সেই সকাল হলে পড়ে থাকত। মাঝে মধ্যে সে তার রসের কড়াই, ঝাঁঝরা, বেসন-ফেটা গামলা ইত্যাদি ধুয়ে-মেজে দিত। টিউকল চেপে গামালাভর্তি জলও এনে দিত। দোকানি না বললেও চুলহার ছাই কেড়ে ভাঙা ঝুড়িতে নিয়ে ফেলে আসত রাস্তার ধারে। আর দোকানের সামনে ঝালদা-রাঁচি-পুরুলিয়ার গাড়ি দাঁড়ালেই ছুটে গিয়ে জলের গেলাস জানলা দিয়ে বাড়িয়ে দিত ‘ডাইবরসাব’কে। এর জন্য দোকানি তাকে ‘হাপচা’ দিত আর গুঁড়াগুঁড়ি পোকোড়ি, মুড়ি। কিন্তু তাও কি রোজ-রোজ দেওয়া যায়? ভভ তাই এখন তার মনোমত অন্য একটি ডেরা বেছে নিয়েছে। কালীমন্দিরের ঠান্ডা চাতাল। লেভেল-ক্রসিং-এর ধারে।
পুরোহিত থাকে মন্দিরের ভেতরে। রাস্তা দিয়ে চলন্ত গাড়ি থেকে প্রায়ই ড্রাইভার এবং যাত্রীরা খুচর পয়সা ছুঁড়ে দেয় ঠাকুরের উদ্দেশে। বেশিরভাগ পয়সা পড়ে মন্দিরের বাইরে। এই কড়া রোদে তা তুলে আনতে পুরোহিতের পা পুড়ে যায়। চাতালে বসে থেকে থেকে ভভ সেই পয়সা কুড়িয়ে থালায় রাখে। পুরোহিত তার থেকে কিছু বকশিস দেয়। খুশি হয়ে ভভ শুধু বলে, ‘অবাআআআক কান্ড!’
প্রথম প্রথম ভভকে এখানে দেখে ড্রাইভাররাও হাসাহাসি করত। বলতো, ‘হই! বুধনা তকে এই টোল-ট্যাক্সের ওপিসে ট্যান্যাসফার করে দিল? অবাআআআক কান্ড!’
ওদের এখন যত রাগ বলিরামের ওপরে। রাধেশ্যামখুড়া রেগে গিয়ে বলতে লাগল, ‘এই শালা বৈলা-র হতেই আমরা এমন ফেরে পড়লি। টাকাকে টাকাও গেল, ভাড়াভুতা কিছু নাই, উল্টা ডমদের সঙে লিয়াই-ঝঞ্ঝট। আর মদনভেরও ফাচোট!’
‘আই দেখ রাধুখুড়া। তুমি আমাকে অমন উল্টা বুঝছ ক্যানে? এমন বোমফুটা গরমে মানুষের জীবন যায়-যায় করছে। জল নাই একফঁটা। লোকে এখন বিহাসাদি করবেক ক্যানে? আর বিহাসাদি না হলে কে তুমার ব্যাঙপাটিকে বায়না করবেক?’
‘ধুর!’ রাধেশ্যামখুড়া বলিরামের এমন যুক্তি মানতে নারাজ। বলে, ‘তাইলে কি লোকের বিহা হছে নাই? আর যাদের ঘরে বিহা হঁয়েছে তাদের ছোলাপুলাও হছে নাই? বকার মতন বলছিস। খরা ত গ্যারামে। শহরে আর কিস্যার খরা?’
রাধেশ্যামখুড়ার বক্তব্য অনেকাংশ সঠিক। চাপাইটাঁড়, কাহান, জাহাজপুর কিংবা চিৎমু, কসাংগি, ডামরুঘটু ইত্যাদি গ্রামের বিবর্ণদশা দেখে জয়পুরে বাজারে এসে দাঁড়ালে মনে হয়, দোকানদানি তো ঠিকই চলছে। কোথায় খরা আর কোথায় কী? কিছুটা মন্দা থাকলেও এটা তাদের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে না।
‘ম্যান জিনিসটা হৈল—এখন ই-জিনিসের আর চল নাই। ছোট জাতের লোকও এখন কাজেভোজে ব্যাঙপাটি ডাকছে নাই। আর সেই জিনিস আমরা কিনলি।’ রাধেশ্যামখুড়া এখন আফশোস করে।
আফশোস যে বলিরাম এবং অন্যরাও করে না, তা নয়। এখন তারা বুঝতে পারে, তারা সত্যিই পিছিয়ে। সমাজের এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে টেক্কা দিয়ে তারা ভাবতে শেখেনি। যদিও সামজের এই এগিয়ে যাওয়া এবং পিছিয়ে যাওয়া ব্যাপারটা তাদের মাথায় ঢোকে না। সমাজের এগিয়ে যাওয়া মানে কি সত্যিই এগিয়ে যাওয়া? ওরা ধন্দে পড়ে যায়। তারা যখন ব্যাণ্ড পার্টি-র কথা ভাবল, তখন এই ব্যাণ্ডপার্টি ব্যাপারটা পুরনো হয়ে এসেছে। বাসের মাথায় ব্যাণ্ডপার্টি চাপিয়ে বিয়ে করতে যাওয়া এখন আর বাঙালি বাড়িতে দেখা যায় না। ব্যাণ্ডপার্টি বাজিয়ে নাচতে নাচতে কনে ঘরে যাওয়াও সম্ভ্রান্ত ঘরে বিয়ের মর্যাদাকে নষ্ট করে দেয়। এটাকে কেউ মন্তব্য করে, ‘বাইজ্কারদের বিহা’৫৫ বলে। নিম্নশ্রেণীর মানুষও এখন বিয়েতে সাউন্ড বক্স বাজাচ্ছে না। রাতভর চালানোর জন্য ভাড়া করে আনছে ভিডিও। তাহলে আর কে ডাকবে ‘চাপাইটাঁড় বাজনাদার পার্টি’কে?
হয়তো এই মন্দার কারণে পত্তাপপুরের ডমরা চাইছিল চাপাইটাঁড়ে যেন আরেকটা ব্যান্ডপার্টি না হয়। তারাও শুধু বাজনার ওপরে ভরসা করে বসে নেই। জীবিকার সংকটটা কাটাতে তাদের মেয়েবউদের, বুড়োদের পাশাপাশি অন্য কাজও করে যেতে হচ্ছে। ঘাসিদের তো তেমন সমান্তরাল কোনো জীবিকা নেই। তবু বৃষ্টিবারিস হলে তারা কখনো অন্যের ক্ষেতে ফসল ফলিয়ে দেয়, কেউ গাড়িতে খালাসির কাজ করে, কোনো কোনো ঘাসি আবার বিঁড়িয়াল। ঘরে বসে তারা হাজার-দুহাজার বিড়ি বাঁধে। সামান্য বানি পায়।
‘হ্যাঁ খুড়া, এখন তাইলে কী হবেক?’ বলিরাম বলে, ‘সাড়ে চার হাজার লগদ দিঁয়ে বাজনাগুলা য্যা কিনা হৈল?’
রাধেশ্যামখুড়া অভিমান করেই বলে, ‘কী আর হবেক? দে আধামুলাই বিকে! আর নাই ত ওই আমতলে আগুন জ্বাইলে সোবগুলাকে দে পুড়াঁয়! ল্যাঠা চুকে যায় যাক!’
অনেকদিন হল ডোড়োতির কোনো খবর পায়নি সমবারী। মেয়ের ভাবনায় এখন তার মন সবসময় গুমসে থাকছে। মায়ের মন যে! যতোই হোক, মেয়ে তো তার এখন নাবালিকাই। ঘরে ননদ আছে, শ্বশুর-শাশুড়ি আছে, একটা কানা ভাসুরও আছে। সবার মন জুগিয়ে কি সংসার করতে পারবে? তাছাড়া লোকগুলোও তো সুবিধের নয়। কুটুমের মানসম্মান জানে না। বিয়ের পরে-পরেই বাপের ঘরের লোক গিয়েছিল রিগিজডুমু। এই গ্রামের বলিরাম আর গতিককিষ্ণ। তাদেরকে মুড়ি-চিড়া দেওয়া তো দুরের কথা, বসতে পর্যন্ত বলেনি। উপরন্তু বলেছে, ‘বিটিছ্যেলার বিহা হৈল ন ফুরাল। বাপের ঘরের সঙে আর কিস্যার ল্যান-দেন? হামরা ইটা পসন্দ করি নাই।’
নতুন কুটুমকে এরকম পটপৈটা কথা তারা শুনিয়ে দিয়েছে। বেচারা বলিরাম-গতিক চোড়কুদ্দার কথা ভেবে খুব উৎসাহ নিয়ে গিয়েছিল সেখানে। ফিরে এসেছে অপমানিত হয়ে। এটা শুনে সমবারী বলেছে, ‘উ লোকগুলার ন্যাচার ভাল লয়। চঁথা বটে।’
চোড়কু কোনো মন্তব্য করেনি। মেয়ের বিয়ে দিয়ে সে যেন আরো নির্বাক হয়ে গেছে। পরিস্থিতির চাপে।
যদিও মান-সম্মান না পেলেও, বলিরাম-গতিক এটা দেখে এসেছে যে, মেয়ের বাইশাম খাওয়া, দুপহৈরা খাওয়া আর রাতের খাওয়ার অভাব হবে না। তেমন সংস্থান তাদের আছে। সেভাবেই তারা এখানে এসে বলেছে, ‘ডোড়োতি সুখেই আছে। পেটের অভাব হবেক নাই’।
তবে এটা নিছকই মনরাখা কথা। বাপ-মাকে নিশ্চিন্ত করার জন্য এমনটা বলা। সুখেই আছে। কতটা যে সুখে আছে সে-খোবোর পাওয়া যায় চন্দমহনের মুখ থেকে। তার শালা কখনো কখনো ডোড়োতিরও খবর দিয়ে যায়।
ডোড়োতি তার শ্বশুরঘরের গাঁয়ের ওই ছেলেটির মারফত নিজের দুর্ভাগ্যের কথা মা-বাপকে জানায়। ঘরে যে সত্যিই খাওয়া-পরার আকাল আছে, তা নয়। চলে যায়। কিন্তু বউ বলেই তাকে ভোর থেকে সন্ধ্যারাত তক্ক শুধু খেটেই যেতে হয়। তারপরেও পেটভরে একথাল খেতে দেয় না। অথচ এই নিয়ে বলার উপায় নেই। শ্বশুর-শাশুড়ি কাঁসার বাসনের মতো ঝনঝন করে ওঠে। কাজের খুঁত ধরে। তখন লেগে যায় ঝুনাঝুটি। তাকে খোঁটা দেওয়া হয় ‘গদী’ বলে। অর্থাৎ সে অলস, কুঁড়ে। আবার বলে, ‘বয়স কম হলে কি হবেক—খাবার দিগে ষোলআনা। খাবেক দু-পতরি!’
শালার মুখ থেকে এসব কথা শুনেও চন্দমহন সমবারীকে বলেনি। কিন্তু কতদিন সে গোপন রাখবে? একদিন চোড়কুর উঠোনের ছায়ায় খাটে বসে, চুটি খেতে খেতে বলেই ফেলল। শুনে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে সমবারী। চোড়কুরও মনটা খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু কী করবে সে? দেখে শুনেই তো দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের জিনিস তারা মর্জিমত রাখবে। খাটাবে। খাওয়াবে। কিছু তো বলারও নেই। একবার যাকে ‘বিক্রি করে’ দেওয়া হয়েছে, তাকে তো ঘুরৎ নেওয়া যায় না?
খবরটা শোনার পর থেকে কয়েকদিন যাবৎ মনটা হু-হু করে পুড়ছিল চোড়কুর। আখিরে এই কি ছিল তার কপালে? ঘরের সর্বস্ব দিয়ে সে বিটির বিয়ে দিল। বরা-বকরি যা ছিল সব বিক্রি করল। একপৈলা চালও ঘরে মজুত নেই। শিকে দুলছে বাতাসে। নাবালিকা দুটি মেয়ে ভোখের জ্বালায় কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কোলে নেতিয়ে পড়ছে।
মদ্দৈনাও তো নাবালক। তবু সে এই দারিদ্রের আবর্তে পড়ে কেমন যেন বুঝদার হয়ে উঠছে। ঘরের শোকাবহ পরিবেশকে কাটিয়ে দিতে আপন খেয়ালে কখনো-সখনো ভেরটা বাজিয়ে দেয়। ভাঙা মদনভেরিকে নিজেই মেরামত করতে চেষ্টা করে। তার এই আন্তরিক নিষ্ঠা দেখে বুকটা ফেটে যেতে থাকে চোড়কুর। নিজেকে তার অক্ষম, ‘নাড়ানাংটা’ মনে হয়। মনে হয়, প্রতিটি সকাল যেন যাবতীয় প্রতিকূলতা নিয়ে অন্ধক দৈত্যের মতো তাকে অবরোধ করে দাঁড়াচ্ছে। তবু নিঃস্ব ঘরে এতগুলো নিরীহ, নির্দোষ প্রাণের তাড়নায় তাকে সেই দৈত্যের সঙ্গে লড়াই করতে যেন বেরিয়ে পড়তে হচ্ছে। ভেরি নিয়ে। তাকে বেরোতেই হচ্ছে। যেভাবেই হোক, যেখান থেকেই হোক, তার নোংরা ও জীর্ণ লুঙ্গিতে আর কিছু না হলেও দু-এক পৈলা চাল তাকে সংগ্রহ করে আনতেই হবে।
সংসারের এই দুঃসহ পরিণতি অবশ্যম্ভাবী জেনেও সে বিয়ে দিল মেয়ের। শুধু এইটুকুই সান্ত্বনা ছিল যে, মেয়ে তার দুটো খেতে পাবে। আধপেটা খেয়ে হলেও শান্তিতে ঘর করবে। কিন্তু সে-টুকুও তার কপালে লেখা নেই। সমবারীর মতো চোড়কুর ভেতরেও দিনরাত এই চিন্তা ঘাঁটতে থাকে। তার মনের ভেতর জাবর দিতে থাকে। কখনো ভেরিতে ফুঁ দিতে দিতেও সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। আর পিঁচুটি পড়া অস্বচ্ছ দৃষ্টি নিয়ে ভেরির সামনে দেখে দুরের প্রান্তর-জোড়া নীল আকাশ!
সেভাবেই একদিন! জ্বালানীর জন্য জড়ো করে রাখা ‘সিন্দোর’ গাছের শুকনো ডালের বোঝাটার ওপরে, উদাসীন বসে থাকতে থাকতে, হঠাৎ গুনগুন করে প্রকাশ করল তার অন্তর্বেদনা—
হামার কাঁদিতে জীবন গেল সুখ হৈল নাই মনে
বাপে হামার বিহা দিল লদীপারের বনে
ভাইদাদা কেউ আসে নাই বাপের ঘরেও যাওয়া নাই
ও খুড়ি, টুকু বলে দিবে বাপকে হামার
বলবে হামার মাঈকে—
বিটি তুমার সুখেই আছে চাষের ধান খায় কে
বোড়ো সুখে আছি মাঈ বোড়ো সুখে আছি গো
একদিনকার হোলৈদ বাঁটা তিনদিনকার বাসি লো...
আগেকার মতো এখন আর তেমন জোরে জোরে পা ফেলে হাঁটতে পারে না চোড়কু। মদ্দৈনার যেন তার এই বাবাকে অনেকটাই অপরিচিত ঘাসি বলে মনে হয়। এই কাউয়াহারা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এর আগেও সে বাবার সঙ্গে গেছে। কুড়মিদের গ্রামে, বাউরিদের গ্রামে, সিংমুড়া আর মুদিদের গ্রামেও। তখন বাবা তার কত রাগে-রাগেই না পথ চলেছে! চলতে চলতে, মদ্দৈনা পিছিয়ে গেলে, সে কি মমতা মেশানো পিতৃত্ব পরিপূর্ণ গলায় আহ্বান করেছে, ‘এ ব্যাটা, মদ্দৈনা রে! আয় ব্যাটা, টুকু চাঁড়ে চাঁড়ে আয়।’
‘কত ধূর?’
‘লয় য্যা বেশি ধূর! হাই দেখাছে, হাই—’ বলতে বলতে, সে, কচি-কচি পায়ে হেঁটে আসা নাবালক সন্তানকে কখনো কোলের কাছে টেনে নিয়ে গাছতলে দাঁড়িয়েছে। নতুন কোনো গাছ কিংবা চোখের সামনে দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি দেখে বলেছে, ‘হা ভাল ন! হাই উড়ে গেল বনপায়রা! আর হুই যে গাছটা দেখাছে, ওই গাছটাকে চিনিস? কী গাছ বঠে উটা?’
‘নাই জানি!’
‘সাহাড়া। সেই কথায় বলে নাই—সাহাড়া যদি হল সজা, ত পাশে পাশে গাঁট।’
সাহাড়া গাছকে নিয়ে এই প্রবাদটির অর্থ তাকে বলে দেয়নি চোড়কু। গাছটিকে চিনিয়ে দিয়েছে। মোটা তার কান্ড। লেবুপাতার মতো ছোট ছোট পাতা। সোজা উঠে যাওয়া কান্ডের পাশে পাশে অজস্র গাঁট। যে-মানুষ আপাত সরল অথচ মনে পাপ, তার সম্পর্কেই এই প্রবাদ প্রযোজ্য।
কিন্তু তা কি বোঝার বয়স হয়েছে মদ্দৈনার? জগৎ এবং জীবনকে দেখতে দেখতে, চিনতে চিনতে, সে নিজেই অর্জন করুক মানুষ সম্পর্কে তার আমূল ধারণাও। শুধু সাহাড়া নয়, এমনি আরো অনেক কিছু কথা বলতে বলতে বন্ধুর মতো তারা হেঁটে গেছে এই কাউয়াহারা দিয়ে। আর তখন থেকে মদ্দৈনার মধ্যেও এটা-সেটা নিয়ে কৌতূহলও তৈরি হয়েছে। তার সব কৌতূহলেরই জবাব দিয়ে গেছে চোড়কু।
অথচ এখন? সেই চোড়কুকে কেমন অথর্ব, পঙ্গু, ন্যুব্জ, বিমর্ষ দেখায়। যেন বাইরের এই উন্মুক্ত চরাচরকে সাক্ষী রেখে এই ঘাসি, আসলে নিজের ভেতরেই কোনো সহযাত্রীর সঙ্গে নির্বাক কথোপকথন চালিয়ে যাচ্ছে। আত্মমগ্নতায় সে উদাসীন। একটি বারের জন্য সে নতুন করে দেখছে না চরাচর। পিছন ফিরেও তাকায় না।
পিছনে ঝুড়ি মাথায় সমবারী। সঁচিকে কোলে নিয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে হেঁটে আসছে। পাশে কালিন্দী। ক্যাঁন্দ পাকা খেতে খেতে আসে। আঁচলে তার এখনো গুচ্ছেক ক্যাঁন্দ। আগের ছেড়ে আসা গ্রামটিতে ঢোকার আগে জঙ্গলে গাছে চড়ে গ্রামের ছেলেরা ফল পাড়ছিল। তাদের কাছ থেকেই আঁচলা ভরে ক্যাঁন্দ চেয়ে নেয় সমবারী। রাস্তায় খেতে। যেতে তো হবে সেই সিংঘাঘরা। গধন কুলহুর ঘরে। বিটির বিয়েতে সে মদনভেরি বাজাতে চায়। সিংঘাঘরার সে অবস্থাপন্ন লোক। ঘরে বড় বড় কাঠের ঘানি আছে, গোরুগোয়াল আছে। দোকানদারিও আছে। নুন-তেলের দোকান। এছাড়া জঙ্গলের নানা ধরনের ফলের শুকনো বীজ সে গ্রামের হাড়ি-বাউরি ভূমিজ মেয়েদের কাছ থেকে ঝুড়ি ধরে কিনে নেয়। সেই বীজ ঘানিতে ভেঙে তেল করে। এমন লোকের বিয়েতে যে এই খরার দিনেও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে শ-দুশো লোক দুবেলা পাত পেড়ে খাবে তাতে সন্দেহ কি? এই আশাতেই ‘জোড়’ হিসেবে মদ্দৈনাকে নিয়েও চোড়কু তার বউ এবং মেয়ে দুটিকেও নিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এতোটা পথ হাঁটিয়ে। রোদে রোদে।
শুধু তাই নয়, অবস্থাপন্ন ঘর বলে খাবার-দাবারও কিছু বাঁচবে নিশ্চয়। তারা এঁটো বাসনপত্র ধোঁয়ামাজা করে দেবে। তার বিনিময়ে কোনো পারিশ্রমিক না চেয়ে তার কাছ থেকে নেবে শুধু ভাত। এই আশা করে ঝুড়ি-গামছাও নিয়ে যাচ্ছে। গামছায় বেঁধে আনা ভাত রোদে শুকিয়ে কুঁড়া করে তারা দু-চারদিন খেতে পারবে। তার জন্যই তাদের এই সপরিবার অভিযান। আজ কুলহু ঘরেই তারা ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকবে। ফিরবে কাল সকাল-সকাল। তাদের প্রত্যাবর্তনও এই কাউয়াহারার ভেতর দিয়ে। যদিও তাদের ফেরার তাড়া নেই। আর ফিরবেই-বা কোথায়? ঘরের ভান্ডার শূন্য! গ্রাম খাঁ-খাঁ!
জলের জন্য কাঁদছে সঁচি। জিভ তার শুকিয়ে গেছে। সমবারী তাকেও যে ক্যাঁন্দ খাইয়ে দিয়েছে। ধারেকাছে এখন আর দেখা যাচ্ছে না কোনো গ্রাম। ছোটোখাটো বসতিও নেই। নদী কিছুটা দূরে। খুব দূরে নয়। তবে নদী দেখা গেলেই বা কী? জল তো কবেই শুকিয়ে গেছে। নদী এখন মরা নদী। জল পেলে কোনো হাড়ি-বাউরি কিংবা মন্ডল ঘরে পাওয়া যেতে পারে। বাউরিদের গ্রাম তারা ইতিমধ্যে পেরিয়ে এসেছে। সামনেই মাধবপুর। কুড়মীদের গ্রাম। ওরা হাঁটতে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতে নদীর সঙ্গে দেখা। সেই গোয়াই নদী। তাকে দেখেই মায়ের কোলে থেকেও সঁচি যেন কেঁদে উঠল ভয়ে। জল কোথায়! একদিকে পত্র-পল্লবহীন হারা-মরা জঙ্গল, আরেক দিকে সর্বগ্রাসী নদী। কোথাও তিষ্ঠানোর এতটুকু আশ্রয় নেই। বুকের শান্তি নেই। সামান্য পাঞ্জা দিয়ে আড়াল করা যায় মানুষের ছাতি। অথচ এইটুকুও ছাতিও এতবড় ধরিত্রীর কাছে শান্তির আশ্রয় পায় না। হায় ধরিত্রী!
সঁচির তৃষ্ণার্ত কান্না থামাতে সমবারী তার শুকনো মাই মুখে গুঁজে দেয়। কিন্তু মরা নদী যার চোখে ভয়াবহ, মরা স্তনও কি তার কাছে ততোধিক ভয়াবহ নয়? সঁচির কান্না থামে না। শিশুটির করুণ কান্নায় জঙ্গলে প্রতিধ্বনি ওঠে। ওরা হাঁটতে থাকে।
হাঁটতে হাঁটতেই, চোড়কুর মনে পড়ে গেল, একবার এই গোয়াই নদীর কাছাকাছি জায়গাতে এসে পিপাসার্ত হয়ে পড়েছিল মদ্দৈনাও। সে আর হাঁটতে পারছিল না। চোড়কু তাকে বলেছিল, ‘আয় ব্যাটা। নাই পারছিস চলতে? আর লয় য্যা বেশি ধূরে! এই লদীটা ধরে গেলেই মাহাতদের গাঁ-টা। মাধবপুর।’
আজ সে নিজেই বারে বারে পিছিয়ে পড়ছে। আজ কাকে সে এই প্রশ্ন করবে? কে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলবে তার গন্তব্য আর খুব দূরে নয়? হায়! মদনভেরিটাই এখন তার মহাভার মনে হচ্ছে। এই ভেরিটিকে নিয়ে সে যেন আর হাঁটতে পারছে না। পারছে না।
অথচ মদ্দৈনা দিব্যি হেঁটে চলেছে ভেরি নিয়ে। তার ছোট অপোক্ত পায়ে সে এখনি আয়ত্ব করে ফেলেছে ক্রোশ-ক্রোশ পথ পায়দল করার হেটো মানুষের সহনশীলতা। তাকে দেখে কে তা বিশ্বাস করবে? অবশ্য তাকে দেখে এটাও কি কেউ বিশ্বাস করতে পারে, প্রায় তার উচ্চতার সমান এই মদনভেরিটি সে তুখোড় ভেরি-বাজিয়েদের মতোই বাজাতে পারে? এবং বাপের সঙ্গে বাজানোর জন্য জোড় হয়ে সে এখন পাড়ি দিচ্ছে তার না-দেখা সিংঘাঘরা গ্রামের উদ্দেশে? ভেরিটিকে মাঝে-মধ্যে কাঁধে নিয়ে সে দুলকি চালে হাঁটে। যেন কোনো অসভ্য বন্য প্রজাতির সন্তান!
সমবারী পিছন থেকে ডাক দেয় চোড়কুকে। বলে, ‘এগৌ! নুনি য্যা জল তিষ্যায় কাঁদছে! এই বনটার ভিৎরে ঢুকলে নাই গাঁ পাওয়াবেক?’
‘নাই নাই!’ মদ্দৈনাই জানিয়ে দেয়। এখন গোয়াই নদীকে বাঁদিকে রেখে, ডানদিকে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে গেলে অন্তত আধা ক্রোশের আগে কোনো গ্রাম মিলবে না। বাবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে এসবও তার জানা হয়ে গেছে। আজ না হয় কাল তো জানতেই হত।
গ্রাম যে নেই তা জঙ্গলের দিকে তাকালে বোঝা যায়। জঙ্গল এখন কার্তিক মাসের ‘জনহার বাড়ি’র মতো খাঁ খাঁ করছে বহুদূর অব্দি। ধস্ত ও নির্জন। কোথাও বসতির একছিটে চিহ্ন নেই।
আরো কিছুটা নাগাড়ে যাওয়ার পর মদ্দৈনা হঠাৎ চনমন করে ওঠে। কয়েকটি পরিত্যক্ত ঘর নিয়ে জোট একটি গ্রাম। লোকজন নেই। রাস্তার ধারেই দাঁড়িয়ে আছে মস্ত করৈঞ্জা গাছ। বাঁ-কাঁধে ভেরিটিকে রেখে, সে, ডান হাত দিয়ে গাছটি দেখিয়ে চোড়কুকে বলে, ‘এইটা সেই করৈঞ্জাটা বঠে ন বাবা? সেই য্যা সেই—’
‘হঁ, বঠে বঠে!’ চোড়কুরও মনে পড়ে যায়। এই তো সেই গাছ, যার তলে ওরা ভগবতীর জন্য শোক করতে দেখেছিল মাহাতানকে। ভিড় জমেছিল গ্রামবাসীদের। এই গাছেরই তলায়। মদ্দৈনা চেঁচিয়ে তার মাকে সবিস্তারে বলতে থাকে সেই ঘটনা। যদিও সঁচি কাঁদতে থাকায় মদ্দৈনার কথা ভালোভাবে কানে যায় না, সমবারীর। শুধু সঁচি না, এবার কালিন্দীও জল চায়। ক্যাঁন্দপাকায় তার অরুচি ধরে গেছে।
কিন্তু আশ্চর্য! গ্রামের এই দশা কেন? গাছটি তেমনিই রয়ে গেছে, কেবল মাহাতানদের সেই ঘরটিকে যেন কেউ লাথি মেরে মেরে ধ্বস্ত করে দিয়ে গেছে। চালা থেকে খুলে নিয়ে গেছে বাঁশ-রলা। যত্রতত্র পড়ে আছে পচা খড়। পাশাপাশি অন্য ঘরগুলিরও অবস্থা তাই। ঘরের কপাট-জানলাগুলিও উধাও। কাছে-পিঠে একটিও লোক নেই। ভিটে ছেড়ে ভয়ে পালিয়েছে গ্রামবাসীরা।
‘কী হঁয়েছে? কথায় গেছে ই-গাঁয়ের লোকগুলা সোব?’ সমবারী জিগ্যেস করে, ‘পাছে লিরনে ইয়ারা খাটতে গেছে মুরিয়ে?’
‘মুরিয়ে? খাটতে?’ চোড়কুর সন্দেহ হয়। মুরিতে কাঁচ-কারখানা আছে। কিন্তু সেখানে এই আকালের সময় গ্রামবাসীরা খাটতে যায় বলে চোড়কু কখনো শোনেনি। তার ধারণা এরা এই তল্লাট ছেড়ে নিশ্চয়ই অন্য কোথাও চলে গেছে। চলে যাওয়ার একটাই কারণ হতে পারে, তা হল, জল। এখানে কাছে কোথাও কুয়ো নেই, ঢেঁকিকল নেই, নদীও শুকনো। জল না পেয়ে বাঁচবে কেমন করে? তাই যেখানে তারা জলের সন্ধান পাবে, সেখানেই আবার নতুন করে গড়ে নেবে তাদের বসতি। যা চিরদিনই অস্থায়ী। পুরনো কাঠবাতা তাই সঙ্গেই নিয়ে গেছে। চোড়কু সেই বিধ্বস্ত ঘরগুলোর দিকে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চেয়ে থাকে। চেয়েই থাকে।
মদ্দৈনা ততক্ষণে পাড় বেয়ে নেমে পড়েছে নদীতে। সিংঘাঘরা যাওয়ার এই তো রাস্তা। এখান থেকে নদী পেরোতে হয়। এক পাড় থেকে নেমে আরেক পাড়ে উঠে আবার তেরছাভাবে মাইল সুয়া-মাইল জঙ্গলে জঙ্গলে গেলেই গ্রাম। কিন্তু নদী এখানে ঢের চওড়া। তাতা বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে এখন চোড়কুরই ভয় বেশি। রোদে পিঠ পুড়ছে, পায়ের পাতাও পুড়বে। তাছাড়া ছেলেদের নিয়ে সমবারীও যে আছে পিছনে।
কাঁধের মদনভেরিতে দুলুনি দিয়ে ডাকে মদ্দৈনা। চোড়কু পাড় বেয়ে নামে বিস্তৃত বালিয়াড়িতে। সমবারীও নামে। মায়ের হাত ধরে আস্তে আস্তে নামে কালিন্দী। যেন উত্তাল নদীতে যেকোনো মুহূর্তেই তাদের ভরাডুবি হতে পারে এমনি ভয়ে ভয়ে। অথচ এতবড় নদীর বুকে এক গোসস্পদও জল নেই কোথাও। সমবারী ইতিমধ্যে কালিন্দীকে আশ্বাস দিয়েছে, এই নদী পেরোলেই সে পাবে তৃষ্ণার জল! ওরা হাঁটতে থাকে।
ওরা হাঁটতে থাকে এক জঙ্গল ফেলে আরেক জঙ্গলে ঢোকার উদ্দেশ্যে। উত্তরের সীমানাহীন জঙ্গলের দিকে চেয়ে, হাঁটতে হাঁটতে, মদ্দৈনা প্রশ্ন করে চোড়কুকে, ‘হ্যাঁ বাবা, ইয়ার নাম কাউয়াহারা বন ক্যানে?’
‘বনটার নাম? কাউয়াহারা ক্যানে?’ চোড়কু জানায়, এই নামের সঙ্গে জঙ্গলের বিশালতার ইঙ্গিত রয়েছে। লোকে বলে, এই বিশাল বনে নাকি কাক ডিম পাড়ার পর তার খঁদাটিকে খুঁজে পায়নি। বাসা হারিয়ে কাকটি তখন দিগ্ভ্রান্ত হয়ে যত্রতত্র পাগলের মতো উড়ে বেড়াচ্ছিল। সেই থেকে বনের নাম কাউয়াহারা।
আজ তারাও তো গৃহহারা। বসতি নেই। আশ্রয় নেই। চাপাইটাঁড়ের যে কুঁড়ে ঘরটি ছেড়ে সে আজ দুমুঠো আহার্যের প্রত্যাশায় সপরিবার দীর্ঘ অভিযানে বেরিয়ে পড়েছে, সেই কুঁড়েঘরটিতে তার না ফিরে গেলেই-বা ক্ষতি কী? সেখানে তার হারাবার কিছু নেই, ফিরে পাবারও কিছু নেই। বস্তুত, সেখানে তার কোনো ঘরই নেই। রয়েছে শুধু ঘরের কল্পনা।
‘বাবা! নাই চলতে পারছিস তুঁই? আর লয় য্যা বেশি ধূর। হুই য্যা দেখাছে! অপারে উঠলেই গাঁ-টা।’ কাঁধের মদনভেরিটি বাড়িয়ে মদ্দৈনা দেখিয়ে দেয় তার বাপকে।
চোড়কুর চোখে জল! তার মনে হয়, মদ্দৈনা যেন তাকে নিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত কোনো গৃহের সন্ধানে। সে প্রবল উদ্যম নিয়ে তপ্ত বালির ওপর দিয়ে দ্রুত হাঁটতে চেষ্টা করে। কিন্তু সে যতোই এগিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ প্রয়াস চালায়, ততোই রাশি রাশি ঝুরঝুরে বালি বেড়ির মতো চেপে ধরে তার দুটি পা। তবু সে থেমে থাকে না। নিজেকে সে মরিয়া হয়ে নাড়াতে চেষ্টা করে।
‘আয় চাঁড়ে, আয়! আর লয় য্যা বেশি ধূর! হুই—’
বালির ভেতরে ডুবে যাওয়া পা-টি তুলে, চোড়কু, আবার তাকে সামনে বাড়িয়ে দেয়। তার পেছু ধরে ধরে আসে সমবারী, কালিন্দী।
ওরা এগিয়ে চলে। অনন্ত অভিযাত্রায়।
৪৮ ময়লা
৪৯ প্রচুর ঝামেলা (মানভূমি প্রবাদ)
৫০ মাহাত পরিবারের গৃহস্বামী (কুড়মালী শব্দ)
৫১ মাহাত পরিবারের গৃহকর্ত্রী (কুড়মালী শব্দ)
৫২ বাঁশের ছোটো পাত্র
৫৩ কাঠবেড়ালিতে
৫৪ বাঁধনা পরবের রাতে গোরু-জাগানিয়া
৫৫ ভবঘুরে বাজিকরদের বিয়ে
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন