অভীক দত্ত

একবছর আগের একদিন
নতুন দিল্লি। রাত বারোটা। পালিকা বাজার পেরিয়ে লোকটা খানিকটা হেঁটে একটা গলির ভেতর প্রবেশ করল।
খানিকটা হাঁটার পর গলির শেষে একটা ছোট দরজা। লোকটা দরজা খুলে একটা নেমে যাওয়া সিঁড়ি দেখতে পেল। অভ্যস্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। লোকটা খানিকটা উত্তেজিত। বেশি উত্তেজিত হলে তার চোখ পিটপিট করে। এখন সেরকমই একটা কিছু হচ্ছিল তার মধ্যে। হাঁটছে বটে, একইসঙ্গে চোখ পিটপিটও করে যাচ্ছে।
ছোট্ট একটা ঘরের মধ্যে সিঁড়িটা নেমেছে। সেখানেই চারজন বসে আছে। তাকে দেখে একজন বলে উঠল, ‘পাঁচ মিনিট লেট স্যার।’
লোকটা বলল, ‘মাঝে মাঝে সব কাজ ভুলে রাতের শহরটা দেখতে হয়। এত মেকানিকাল আমি হয়ে যাইনি।’
‘আপনি ভালো মুডে আছেন উস্তাদ। খবরটা ভালোই মনে হচ্ছে। তাই না?’
লোকটা বলল, ‘মন্ত্রীসাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। তাকে বোঝালাম বাংলাদেশে কেন আমার ফুল কন্ট্রোল চাই। আমি আমার মতো করে কাজ করব। আই এস আই যেভাবে কাজ করবে, আমাদের সেটার সঠিক কাউন্টার করতে হবে। মিনিস্ট্রি আমাদের অ্যাপ্রুভাল দিয়ে দিয়েছে। ঢাকায় আমরা যেভাবে খুশি অপারেট করতে পারব। কাউকে কিছু জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এবার আমরা আমাদের মতো কাজ শুরু করতে পারি।’
ঘরের বাকি চারজন উল্লাস করে উঠল। লোকটা একটু হাসল, ‘উল্লাসের সময় নেই। কাজ শুরু করতে হবে। এজেন্ট রেডকে অ্যাক্টিভেট কর। সেন্ড হিম সিগন্যাল।’
একজন চমকে উঠল, ‘রেড? ওকে তো কোনও রকম কাজে না নেওয়ার নির্দেশ আছে স্যার।’
লোকটা বিরক্ত গলায় বলল, ‘ছিল। এখন নেই। এখন আমি যা বলব তাই হবে। বললাম তো, আমি বুঝে নেব। বাকিটা পরে দেখা যাবে।’
‘ওকে স্যার।’
এতক্ষণে যেন লোকটা ঠান্ডা হল। চোখ পিটপিটানিও বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের বাকিরা সেটা বুঝলেও সে ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন করল না। পরস্পরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে একবার দেখল শুধু। লোকটাকে অত কথা বলার সাহস তাদের নেই...
শেয়ালদা নেমে রাণা ক্যাব নিল। সেরকমই নির্দেশ ছিল। ভি আই পি রোডে ম্যাপ অন করে দিল। তার বরাবরই মাথা ঠান্ডা। যে ধরনের কাজ সে করে, তাতে মাথা ঠান্ডা রাখতেই হয়।
রাস্তাঘাটে জ্যাম। এই জন্য রাণার কলকাতা পছন্দ হয় না। তার মসৃণ রাস্তা পছন্দ। যাতায়াত হতে হবে নিশ্চিন্তের। যে রাস্তায় বাধা আসবে, তার সে রাস্তা পছন্দ নয়। বিরক্ত মুখে বসে রইল রাণা। ক্যাব ড্রাইভার বক বক করতে আর পানের পিক ফেলতে ভালোবাসে। রাণার সঙ্গে কিছুক্ষণ বক বক করার চেষ্টা করে বুঝল রাণা কথা বলতে উৎসাহী নয়। তখন সে তার বন্ধুস্থানীয় একজনকে ফোন করে বক বক শুরু করে দিল।
লোকেশনে পৌঁছে রাণা ক্যাব ছেড়ে দিল। পরপর চারটে আঠেরো তলা বিল্ডিং। এ, বি, সি আর ডি। চারটে বিল্ডিং। রাণা মোবাইল খুলে আরেকবার ঠিকানা দেখে নিল। সি বিল্ডিং চারশো তেরো নাম্বার রুম। নিজের মনেই সে একবার বলে নিল, ‘ওকে। চাপ নেই।’
সিকিউরিটি গেটে আটকাল। রাণা আই কার্ড দিয়ে নাম নথিভুক্ত করল। এই বিল্ডিং-এর এগারোতলায় রুবেল পাল নামে একজনের ফ্ল্যাটে যাবে লিখল। তেমনই নির্দেশ আছে। রাণাকে বলা হয়েছে, রুবেল পাল গত তিন মাস ধরে এই বিল্ডিং-এ ভাড়া নিয়ে আছে। অসুবিধে হবার কথা নয়।
সিকিউরিটি রুবেল পালকে ফোন করে জিগ্যেস করল, রাণাকে যেতে দেবে নাকি। রুবেল হ্যাঁ বলতেই সিকিউরিটি রাণাকে এন্ট্রি দিয়ে দিল।
লিফটে উঠে রাণা মাস্ক পরে নিল। মাস্ক না পরলেও হয়। কাজটা করে সে আট ঘন্টার মধ্যে বাংলাদেশে ঢুকে যাবে, আগামী এক বছর তার আসার কোনও প্রয়োজন নেই, তবু পরল। একটা পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে তার মা উঠল ফার্স্ট ফ্লোরে। বাচ্চাটা রাণাকে দেখে হাসল। রাণা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
লিফট চার নম্বরে দাঁড়াতেই রাণা লিফট থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল। বলা আছে লিফট থেকে নেমে ডান দিকে যেতে হবে। রাণা তাই গেল।
ঠিক বলা হয়েছিল। ডানদিকে প্রথম ফ্ল্যাটটাই চারশো বারো, তারপর আরেকটু যেতেই চারশো তেরো পেয়ে গেল।
এসব সময়ে রাণার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় না। আগে হলে বাড়ত। আজকাল বাড়ে না। এই জন্যই তার ডিমান্ড এত বেশি। হালকা একটা শ্বাস ফেলে রাণা কলিং বেল টিপল।
সেকেন্ড ত্রিশেক পরে দরজাটা খুলে গেল। কিন্তু কেউ বেরোল না। রাণা সতর্ক হয়ে দরজা ঠেলল। ঘরে ঢুকতেই দেখল মেঝেতে একটা লাশ পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘরটা।
‘দরজাটা বন্ধ করে দাও।’
রাণা চমকে পাশে তাকিয়ে দেখল তার দিকে একটা রিভলভার উদ্যত হয়ে আছে। সে ঘাবড়ে গেল না। এটা প্রত্যাশিত ছিল। দরজা খোলা থাকার অর্থ আগে থেকে কেউ এসে গেছিল। সে লোকটার কথা অনুযায়ী দরজা বন্ধ করে দিল।
‘বোস।’
রাণা সোফায় বসল। লোকটা তার থেকে একটু দূরে একটা চেয়ার নিয়ে বসল। ছ’ফুট দু’তিন ইঞ্চি লম্বা হবে। টানটান চেহারা। বয়স পঞ্চাশের বেশিই হবে। মাথায় কাঁচা পাকা চুল। লোকটা পায়ের উপর পা তুলে বলল, ‘কত টাকা দিচ্ছে তোমায় এই অ্যাসাইনমেন্টটায়?’
রাণা বলল, ‘তিন লাখ।’
লোকটা মুখে চুকচুক শব্দ করে বলল, ‘এটাই এখানকার সমস্যা। এরা খুব কম টাকা দেয়।’
রাণা বলল, ‘আপনি কোথাকার?’
লোকটা বলল, ‘আমি এখন পাটায়া থাকি। এই যে, মেঝেয় পড়ে আছে হুসেন, আমার বহুদিনের টার্গেট ছিল। ওর জন্যই আমি এ দেশে এসেছিলাম। শুনলাম কী সব পেটি গ্যাংওয়ারে জড়িয়ে পড়েছিল। এর অপোজিট টিম তোমাকে পাঠিয়েছে। ওরা জানেই না হুসেন আসলে কী মাল।’
লোকটা জোরে হেসে উঠল। রাণা বলল, ‘কী মাল?’
লোকটা বলল, ‘ভালো দাম পেলে এরা বাপকেও বেচে দেয়। দেশ-টেশের সেন্টিমেন্ট এদের একবারেই নেই। হুসেনকে মারলে তোমার পুণ্যই হতো। তোমার কপাল খারাপ, ওকে আমি মারলাম।’
রাণা বলল, ‘আপনি কী করে জানলেন আমি আসব?’
লোকটা মাথা নাড়ল, ‘তুমি বুদ্ধিমান। তোমার হবে। রাণা দাস, বাবার নাম পরাগ দাস, আদি বাড়ি ত্রিপুরায়, এ রাজ্যে ২০০২-এ বাবার সঙ্গে চলে আসা, তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেও বেকার, তারপর হঠাৎই অপরাধজগতে প্রবেশ। এখন অবধি তেরোটা নিখুঁত অপারেশন করেছ। গুড, ভেরি গুড।’
রাণা অবাক হল। প্রাণপণে সেটা ঢাকার চেষ্টা করে বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি এগুলো জেনে গেলেন কী করে?’
লোকটা মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব এনে বলল, ‘ওসব হয়ে যায়। আমায় সব খোঁজখবর রাখতে হয়। যাক গে, তোমায় টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তোমার অ্যাকাউন্টে আমি অলরেডি তিন লাখ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি। তোমাকে যারা রিক্রুট করেছিল, তাদের কেউ তোমাকে এ নিয়ে প্রশ্ন করবে না।’
রাণা বলল, ‘যে কাজ আমি করিনি, সে কাজের টাকা আমি নিই না।’
লোকটা হাসল, ‘গুড বয়। আমি জানি তোমার এই ব্যাপারটা আছে। এই যে মাটিতে পড়ে আছে লোকটা, যাকে আমি আমার রিভলভার দিয়ে পরপর পাঁচটা গুলি করেছি, ওর এসব ছিল না। কলকাতায় বসে আই এস আইকে ইনফরমেশন দিয়ে যাচ্ছিল। তুমি জানো তো হোয়াট ইজ আই এস আই?’
রাণা বলল, ‘পাকিস্তানের ইন্টেলিজেন্স। না জানার কিছু নেই।’
লোকটা বলল, ‘গুড। এই জন্য এই লাইনে শিক্ষিত ছেলে দরকার। শিক্ষিত না হলে এই লাইনে নামাই উচিত না। যত আজে বাজে পাবলিকে চারদিক ভরে গেছে।’
রাণা উঠল, ‘আমি এবার যাই। এখানে বসে থেকে কী করব?’
লোকটা সঙ্গে সঙ্গে রাণার দিকে রিভলভার তাক করল, ‘উহুহু, এ ভুল কোরো না। আমি না বললে ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে যেও না। কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে সেটা আমার ভাল্লাগবে না। তুমি যে কলেজে গ্র্যাজুয়েশন করছ বাবা, সে কলেজের আমি মালিক। আমি না বললে তুমি এ ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোবে না। ইন ফ্যাক্ট বেরোনোর কথাই ভাববে না।’
রাণা বিনা বাক্যব্যয়ে বসে পড়ল। লোকটা বলল, ‘তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে রাণা। এতগুলো খুন করেছ, অথচ তোমার রেকর্ড ক্লিয়ার। ভেরি ইম্প্রেসিভ। ভেরি মাচ ইম্প্রেসিভ। আমি অনেক দেখেশুনে তোমাকে রিক্রুট করার কথা ভেবেছি।’
রাণা বলল, ‘ওরকম হলে আমি অনেক আগেই কোথাও না কোথাও ঢুকে যেতাম। আমি ওভাবে কাজ করি না।’
লোকটা বলল, ‘আহ্...তুমি কী করে ভেবে নিচ্ছো আমি তোমার মতামত জানতে চাইছি? চাইছি না। আমি বলছি আমি ঠিক করেছি আমি তোমাকে রিক্রুট করব। ব্যস। তোমার হাতে আর কোনও অপশন নেই। তোমার বাবা নেই, ফ্যামিলি নেই, বিয়ে করোনি, এর থেকে ভালো আর কিছু হতেই পারে না।’
রাণা উঠে দাঁড়াল, ‘আপনি আমাকে গুলি করতে চাইলে করে দিন। কিন্তু এসব কাজ আমি করি না। আমি আমার নিজের মর্জিতে চলি।’
লোকটা বলল, ‘সে চলো। তোমাকে যেখানে পাঠানো হবে, তুমি নিজের মর্জিতেই চলবে। তবে যাবার আগে জেনে যাও, এ কাজটা তোমাকে দেশের জন্য করতে হতো। আজে বাজে কাজ না। ফর দ্য কান্ট্রি। কাল তুমি কী করবে তুমি কি জানো? এই যে টাকাগুলো পাও, এদিক সেদিক খরচ করে আসো, এসব করে কী লাভ হবে তোমার? এই পৃথিবীতে এভাবে উদ্দেশ্যহীনভাবে বেঁচে থেকে কি আদৌ কোনও লাভ আছে? তোমার মনে হয় না, দেশের জন্য তুমি কিছু করতে পারতে?’
রাণা ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘দেশের জন্য?’
লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, দেশের জন্য। করবে?’
রাণা বলল, ‘কী কাজ? কত টাকা পাবো?’
লোকটা বলল, ‘তুমি রাজি?’
রাণা বলল, ‘আমি জানি না। আমি কাজের ডিটেলসটা চাইছি।’
লোকটা কয়েক সেকেন্ড রাণার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি বেরিয়ে যাও এখন। রাত আটটার সময় নিকো পার্ক বাস স্ট্যান্ডে চলে এসো।’
রাণা বলল, ‘আর যদি না যাই?’
লোকটা ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘এসব বাজে প্রশ্ন করার মতো বোকা তো তুমি নও। এতক্ষণে তোমার বোঝা উচিত ছিল আমি কী ধরনের লোক। বোঝোনি?’
রাণা লোকটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘বেরোলাম।’
লোকটা হাসিমুখেই বলল, ‘আমি খুব পাংচুয়াল। দেরি কোরো না। আমাকে যেন তোমাকে খুঁজে না আনতে হয়। বয়স হচ্ছে। এখন ওসব ঝক্কিতে যেতে চাই না।’
সন্ধে সাতটা বাজে। ট্যাক্সিতে চুপ করে বসে ছিল রাণা। সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সে।
ট্যাক্সিওয়ালা অধৈর্য হয়ে বলল, ‘দাদা আমাকে ছেড়ে দিন না! কেন শুধু শুধু বসিয়ে রেখেছেন?’
রাণা ঘড়ি দেখে বলল, ‘ঠিক আছে, আপনি আমাকে নিকো পার্কের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যান।’
ট্যাক্সিওয়ালা বলল, ‘ওদিকে যাব না। আগে বলবেন তো! নেমে যান।’
রাণা বলল, ‘নো রিফিউজাল ট্যাক্সি। আমাকে বোকা পেয়েছিস? চুপচাপ চল, নইলে তোর কপালে দুঃখ আছে।’
ট্যাক্সিওয়ালা ট্যাক্সি থেকে নেমে গিয়ে রাণার দিকের দরজা খুলে বলল, ‘নাম, নাম বলছি।’
রাণা রিভলভার বের করে ট্যাক্সিওয়ালাকে দেখাল, ‘তুই আমাকে চিনিস না, আমিও তোকে চিনি না। তুই জানিস না ঠিক এই জায়গায় আমি এটা চালিয়ে দিয়ে চুপ চাপ গা ঢাকা দিয়ে দিতে পারি। যেখানে যেতে বলছি, চল। নইলে তোর কপালে দুঃখ আছে। সেকেন্ডবার বললাম। আর বলব না।’
ট্যাক্সিওয়ালা সুড়সুড় করে ট্যাক্সিতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল।
রাণা সিগারেট ধরিয়ে ব্যাঙ্কের অ্যাপ খুলল। লোকটা তিন লাখ বলেছিল, অ্যাকাউন্টে চার লাখ টাকা ঢুকেছে। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ অ্যাকাউন্ট ব্যাল্যান্সের দিকে তাকিয়ে রইল সে। ট্যাক্সিওয়ালা একটা সিগনালে গাড়ি দাঁড় করিয়েই দরজা খুলে দৌড়ল। একজন পুলিশের সঙ্গে উত্তেজিত ভাবে কথা বলছে। রাণা নামল না। চুপ করে সিগারেট টেনে যেতে লাগল। পুলিশটা ভ্রু কুঁচকে গাড়ির দিকে এগিয়ে এসে তাকে গাড়ি থেকে নেমে যেতে বলল। রাণা নামল।
পুলিশ অফিসার বলল, ‘আর্মসটা দেখি।’
রাণা পকেট থেকে রিভলভার বের করে বলল, ‘খেলনা রিভলভার স্যার। ভাইপোর জন্য নিয়ে যাচ্ছি।’
পুলিশ অফিসার বলল, ‘এটা দিয়ে আপনি ভয় দেখাচ্ছিলেন ওকে?’
রাণা বলল, ‘কী করব স্যার? নো রিফিউসাল লেখা, অথচ যাবে না বলছে। কোথাও কিছু পাওয়া যায় না, মাথা এমন গরম হয়ে গেছিল যে ওকে এটা দেখিয়ে ভয় দেখিয়েছি।’
ট্যাক্সিওয়ালা তাকে মারতে চলে এল। পুলিশ অফিসার তাকে ধমকে সরিয়ে দিল। বলল, ‘এটা যে আপনি করলেন, আপনার জেল হতে পারে জানেন?’
রাণা বলল, ‘দরকারের সময় এরা যে রিফিউজ করে দেয়, তাতে এদের কি কিছু হবে না স্যার? আমার জরুরি দরকার ছিল অথচ আধঘণ্টা ধরে একটা ক্যাব বা ট্যাক্সি কিচ্ছু পাচ্ছি না। আমি কী করতাম?’
ট্যাক্সিচালক লাফঝাঁপ করছিল, ‘আমি তোকে কিছুতেই নেবো না। তুই যেখানে খুশি গিয়ে মর। আমি নেই।’
পুলিশ অফিসার রাণাকে বলল, ‘শুনুন, আপনি অন্য কোনভাবে চলে যান। ও মনে হয় না আপনাকে আর নেবে।’
রাণা বলল, ‘আমাকে নিকো পার্কে পৌঁছতেই হবে। আপনি ব্যবস্থা করে দেবেন তবে?’
অফিসার বলল, ‘হ্যাঁ। আমাদের গাড়ি ওদিকেই যাবে। আপনাকে নামিয়ে দিচ্ছি। চলুন। ওকে আপনি ছেড়ে দিন।’
রাণা বলল, ‘ঠিক আছে। কত হয়েছে?’
রাণা ট্যাক্সিচালকের দিকে তাকাল। ট্যাক্সিচালক বলল, ‘লাগবে না তোর টাকা, যা এখান থেকে।’
রাণা একটা পাঁচশো টাকার নোট পকেট থেকে বের করে ট্যাক্সিচালকের দিকে ছুড়ে মারল। নোটটা রাস্তায় পড়ে গেল।
রাণা বলল, ‘ভাড়াটা। নিয়ে নিন।’
ট্যাক্সিচালক ঝুঁকে টাকাটা নিল। পুলিশ অফিসার বলল, ‘চলুন।’
রাণা পুলিশের জিপে উঠল। অফিসার গাড়িতে উঠে হাসতে হাসতে বলল, ‘আপনি যা তা লোক মশাই। খেলনা রিভলভার নিয়ে ঘুরছেন?’
রাণা বলল, ‘খেলনা কিনেছিলাম। এভাবে কাজে লেগে যাবে বুঝিনি।’
অফিসার বলল, ‘সত্যি, কতরকমের লোক যে ঘুরে বেড়ায়। আপনার কথা আমার বহুদিন মনে থাকবে।’
নিকো পার্কের সামনের বাস স্ট্যান্ডে সাড়ে সাতটায় নামল রাণা। পুলিশের জিপটা বেরিয়ে গেল।
রাণা সিগারেট ধরাল। ফোন বাজছে। ধীরাজ শর্মা ফোন করেছে।
রাণা ধরল, ‘হ্যাঁ।’
ধীরাজ বলল, ‘কীরে, কাজটা করার পর জানালি না তো? টিভি দেখে জানতে হচ্ছে। তোর টাকা লাগবে না?’
রাণা বলল, ‘না। টাকা পেয়ে গেছি।’
ধীরাজ অবাক হয়ে বলল, ‘মানে? কে টাকা দিয়েছে তোকে?’
রাণা বলল, ‘ও আছে। আপনি জেনে কী করবেন?’
ধীরাজ বলল, ‘কী বলছিস তুই? আমি তোকে এত কাজ দিয়েছি, তুই এখন আমাকে গরম নিচ্ছিস?’
রাণা বলল, ‘ফ্যামিলি রিলেশন তো নেই ধীরাজ ভাই। কাজ বলেন, কাজ করি। এখানে গরম ঠান্ডার কী আছে?’
ও-প্রান্ত খানিকটা চুপ করে গেল। তারপর বলল, ‘পুলিশে সব দিয়ে দেব। তখন বুঝবি! বেশি বেড়ে গেছিস তুই। তোর ডানা ছাটার টাইম হয়ে গেল।’
রাণা ‘বেস্ট অফ লাক’, বলে ফোন কেটে দিল। ধীরাজ রেগেমেগে আবার ফোন করা শুরু করেছে। রাণা পাত্তা দিল না। ফোন কেটে দিল।
ঠিক রাত আটটায় বাস স্ট্যান্ডের সামনে একটা এস ইউ ভি এসে দাঁড়াল। একটা কাচ নেমে গেল। ড্রাইভিং সিটে রাণা সকালের লোকটাকে দেখতে পেল। সে গাড়িতে উঠে লোকটার পাশে বসল। গাড়ি স্টার্ট নিল।
লোকটা বলল, ‘ধীরাজকে রাগিয়ে দিলে? পরে ওকে দরকার হতে পারে।’
রাণা অবাক হয়েও সামলে নিল। তার কল শুনছিল লোকটা। তবে সকালেই মনে হয়েছিল এর অনেক ক্ষমতা আছে। অবাক হবার কিছু হয়নি। সে বলল, ‘আমায় কী করতে হবে বলুন।’
লোকটা গাড়ির এসির তাপমাত্রা কমিয়ে দিল, হিমশীতল হয়ে গেল গাড়ির ভেতরটা। বলল, ‘এত কথা জেনে কী করবে তুমি রাণা? কোনও পিছুটান নেই, টাকার চিন্তা করতে হবে না, একটা সুযোগ পেয়েছো জীবনটাকে পাল্টে ফেলার, এত প্রশ্ন করে কী লাভ হচ্ছে?’
রাণা বলল, ‘আমার ধোঁয়াশায় থাকতে পছন্দ হয় না। আমি সবটা জানতে চাই। কী কাজ, কোন ধরনের রিস্ক জড়িয়ে আছে তাতে, সব জানতে চাই।’
লোকটা গাড়ির মিউজিক বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘গান শোন আপাতত। বলছি।’
রাণা চুপ করে গেল। এখন বলতে চাইছে না যখন, তখন খুঁচিয়ে লাভ নেই। কিছুক্ষণ পর একটা শপিং মলের পার্কিং স্পেসে গাড়ি দাঁড় করিয়ে লোকটা বলল, ‘একটা খুন করতে হবে। গুলি করবে, চলে আসবে।’
রাণার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল, ‘সেই একই কাজ। আগে বললেই হতো।’
লোকটা বলল, ‘ঢাকায়।’
রাণা বলল, ‘ইম্পসিবল। ও দেশে আমি কিছু করি না। আপনি ও দেশের কাউকে ধরুন।’
লোকটা বলল, ‘কাজটা আমাদের করতে হবে। আমাদের এজেন্সিকে। তুমি ছাড়া আমার হাতে এই মুহূর্তে আর কেউ নেই।’
রাণা বলল, ‘আমি ছাড়া? সকালে আমাকে পেলেন, বিকেলে আমি আপনার এজেন্সির লোক হয়ে গেলাম?’
লোকটা হাসল, ‘সাত মাস আগে ভুবনেশ্বরে হোটেল লিস্টারে তুমি তারেককে উড়িয়েছিলে। তখন থেকে তোমার উপরে আমার নজর আছে। আমাদের পুলিশ তোমার ডিটেলস অনেক আগেই আমার কাছে পাঠিয়েছিল। আমি চাইলে অনেক দিন আগেই তুমি শ্রীঘরে থাকতে। শুধু আমি চাইনি বলে হয়নি। আর কিছু জানতে চাও?’
রাণা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ‘আপনি মিথ্যে কথা বলছেন। ওই হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ আমি নষ্ট করে দিয়েছিলাম।’
লোকটা তার ফোন বের করে একটা ভিডিও চালিয়ে দিল। রাণা দেখল লিস্টারের রুমে ঢুকতে তাকে দেখা যাচ্ছে। লোকটা বলল, ‘ব্যাক আপ ফুটেজটা ওড়াতে পারনি। ব্যাড লাক। সে ঠিক আছে, তুমি কাজটা না করতে চাইলে কোরো না, আমি তোমাকে ফাঁসাব না, কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে তোমাকে সাজেশন দেব এটা তোমার খুব ভালো কাম ব্যাক হতে পারে। তুমি যে কাজ করো, যে-কোনওদিন তোমাকে পুলিশ কুকুরের মতো গুলি করে মারবে। তার পরিবর্তে তুমি একটা সম্মানজনক পুনর্বাসন পেতে পারো। ডোন্ট মিস দিস চান্স রাণা।’
রাণা শ্বাস ছাড়ল। বলল, ‘ডিটেলস দিন।’
লোকটা বলল, ‘গুড বয়। তোমাকে একজনকে সরাতে হবে। আমাদের নিজেদের লোক।’
রাণা বলল, ‘নিজেদের লোককে সরাতে হবে, সেজন্য আমাকে রিক্রুট করছেন? কেন? আপনারা করছেন না কেন?’
লোকটা বলল, ‘আমি কাউকে বিশ্বাস করছি না বলে। আমি শুধু তোমাকে বিশ্বাস করছি।’
রাণা বলল, ‘বুঝলাম। আপনি নিশ্চিত, আমাকে কাল কেউ পাঁচ লাখ টাকা দিলে আমি অন্য দিকে চলে যাব না?’
লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত তুমি যাবে না। তুমি অনেকটা সিনেমার নায়কের মতো। যে কাজ একবার করবে বলে ঠিক করে নাও, সেটা করেই ছাড়ো। এছাড়া তুমি খুনি হতে পারো, দেশকে ভালোবাসো। জাতীয় সংগীত বাজলে উঠে দাঁড়াও।’
রাণা বলল, ‘সেটা ছোটবেলার অভ্যেস। ওসব আমি আপনাকে এক্সপ্লেইন করতে যাব না। তাছাড়া আপনি যে এ দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছেন, তার কোনও প্রমাণ আমি পাইনি।’
লোকটা পকেট থেকে একটা ছোট ব্যাগ বের করে তার দিকে এগিয়ে দিল, ‘পাসপোর্টটা নাও। ভিসা করানো আছে। এখন থেকে তোমার নাম গৌতম বসু। নামটা মনে করে নাও। কাজ সেরে এই ব্যাগে থাকা ছোট ফোনটায় একটাই নাম্বার আছে। সেটায় ফোন করবে। ওরা তোমাকে এ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। বাকিটা আমি বুঝে নেবো।’
রাণা বলল, ‘ইনফরমেশন ক্লিয়ার নেই। আপনার কোনও কথাই ক্লিয়ার নয়। আমি টার্গেটকে খুঁজব কী করে? দ্বিতীয়ত আমি মারব কী দিয়ে? আর্মস?’
লোকটা বলল, ‘গুড কোয়েশ্চেন। ব্যাগের মধ্যে একটা স্মার্টফোন আছে। ঢাকায় পৌঁছে ওই স্মার্টফোনে একমাত্র সেভড নাম্বারে ফোন করবে। তোমাকে কী করতে হবে, ওখান থেকে ইন্সট্রাকশান দিয়ে দেওয়া হবে।’
রাণা বলল, ‘আমি এখনও বুঝতে পারছি না আমাকে কেন প্রয়োজন হচ্ছে।’
লোকটা বলল, ‘ওয়েলকাম টু আওয়ার টিম। বাকি কথা পরে হবে। চলো, ঢাকার ফ্লাইটের জন্য তোমাকে আর আধঘণ্টার মধ্যে এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে। আর দেরি করা যাবে না।’
রাণা বলল, ‘কাজটা না হলে কী হবে?’
লোকটা বলল, ‘আমি যখন বুঝে যাব বা প্ল্যান চেঞ্জ করব, তোমাকে তখন দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে দেব। এছাড়াও বরিশালে তোমার আত্মীয় থাকে, যাদের বাড়িতে পালানোর প্ল্যান করেছিলে। খুব সমস্যা হলে সেখানে গা ঢাকা দিয়ে দেবে।’ রাণা মৃদুস্বরে বলল, ‘হু।’
লোকটা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল, ‘ইয়োর কান্ট্রি নিডস ইউ রাণা। খুব বড় অপারেশন হতে যাচ্ছে এটা। তোমাকে পারতেই হবে।’
রাণা উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর সে এয়ারপোর্টে প্রবেশ করল।
লোকটা রাণাকে নামিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গেল।
ইমিগ্রেশন পেরিয়ে বেরিয়ে এসে রাণা লোকটার দেওয়া ফোন সুইচ অন করল। ফোন বুকে থাকা নাম্বারটা ডায়াল করতেই ও প্রান্তে ফোন রিসিভ হয়ে গেল, ‘এসে গেছেন?’
রাণা বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘ঠিক আছে। মাল নিয়ে নিয়েছেন?’
‘মাল নেই কিছু।’
‘বাহ্। তাহলে তো খুব ভালো। দু’নম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে আসুন। আমি দাঁড়িয়ে আছি।’
রাণা বেরোল। একজন যুবক বলল, ‘ও গৌতমদা, আসুন আসুন। আমার সঙ্গে আসুন।’
কিছুক্ষণ পর পার্কিং-এ পৌঁছল তারা। ছেলেটা বলল, ‘উঠুন উঠুন। অনেকটা যেতে হবে।’
রাণা বলল, ‘আপনার নাম?’
ছেলেটা বলল, ‘অমল। অমল সরকার। উঠুন উঠুন, গাড়িতে উঠুন। অনেক কাজ আছে।’
রাণা চুপ করে গাড়িতে উঠে বসল।
‘এখানে খুব জ্যাম হয়।’ অমল বলল।
রাণা বলল, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
অমল বলল, ‘কেন? উস্তাদ বলেনি কিছু?’
অমল গাড়ি চালাচ্ছে। একটা গান চালিয়ে দিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না জীবনে তার কোনও চিন্তা আছে। রাণা বলল, ‘উস্তাদ মানে?’
অমল বলল, ‘যে আপনাকে ঢাকা পাঠিয়েছে।’
রাণা কী বলবে বুঝতে পারল না। সে কী বলবে? তাকে তো অনেক কথা বলতে বারণ করা হয়েছে। কী বলবে তাও জানে না। চুপ করে থাকতে হবে। সেটাই মঙ্গল।
অমল তাকে আরেকবার খোঁচালো, ‘ও দাদা। উস্তাদ কিছু বলেনি?’
রাণা বলল, ‘না। আমাকে কিছু বলেনি।’
অমল বলল, ‘তাহলে কথা বলে নিন। আমি গাড়ি দাঁড় করাচ্ছি।’
অমল গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল। রাণা বিস্মিত হয়ে অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘আমার সামনে কথা বলতে অসুবিধে হলে আমি নেমে যাচ্ছি। কথা শেষ হলে ডেকে নেবেন। সিগারেট টেনে আসি।’
সত্যি সত্যি অমল নেমে গেল। রাণা তার ফোন বের করে লোকটাকে ফোন করল। একবার রিং হতেই ফোন ধরল লোকটা, ‘তুমি এই সিমটা এখনই ফেলে দেবে। ইউজ করবে না। ইন ফ্যাক্ট আমাকে আর ফোনই করবে না।’
রাণা বলল, ‘টার্গেট কে? বলা যাবে?’
লোকটা হাসল, ‘ধরে নাও, তুমি এখন যার সঙ্গে যাচ্ছ, সেই।’
রাণা চমকে উঠল, ‘মানে?’
লোকটা বলল, ‘এরকমই তো হয়। চাকরিতে ছাঁটাই হওয়া লোকটা চিঠি পাওয়ার আগে অবধি জানতে পারে না তার চাকরি চলে গেছে। তার জায়গায় যে লোকটা রিক্রুট হয়েছে, নিজের অজান্তে সে নতুন লোকটাকে সবকিছু শিখিয়ে দিয়েছে এর মধ্যেই। অমলের থেকে সবকিছু শিখে নাও। তারপর সুযোগ বুঝে কাজটা করে ফেলো। তুমি তো ঢাকা চেনো। তোমার ঢাকায় সড়গড় হতে বেশি অসুবিধে হবার কথা নয়।’
রাণা বলল, ‘মানেটা কী? আমায় কি এখানে থাকতে পাঠানো হয়েছিল? কাজটা সেরে ফেরার কথা বলেছিলেন। আমি এখানে থেকে যাব নাকি?’
ও-প্রান্ত থেকে ঠান্ডা গলায় উত্তর এল, ‘প্ল্যান চেঞ্জ হয়েছে। ইন্ডিয়ায় থেকে করবেটা কী বলো তো? দেশের কাজ করো, জীবনে কোনও কিছুর অভাব হবে না।’
রাণা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বলল, ‘আপনি নিশ্চিত অমল ট্রেইটর? ওকে মারতেই হবে?’
লোকটা বলল, ‘সেটা আমি বুঝব। আমি তোমাকে যে কাজে পাঠিয়েছি, মনে রেখো সে কাজটাই তোমার ফাইনাল ডেসটিনেশন। অমলের থেকে যতটা জানার জেনে কাজটা শেষ করে দাও।’
রাণা বলল, ‘আমি কী জানব? আমি কি এসব কাজ কোনওদিন করেছি নাকি?’
লোকটা বলল, ‘জেনে যাবে। ওসবে কোনও চিন্তা নেই। নাও ডু ইয়োর জব। সিমটা এখনই ডেস্ট্রয় করো।’
রাণা বলল, ‘আমি কি ওকে শেষ করার আগে আরেকবার আপনার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করে নেবো?’
লোকটা বলল, ‘আমার অত সময় নেই। কী করবে, নিজে বুঝে করবে। আর যদি ঢাকা পুলিশ বা যে কেউ তোমার সম্পর্কে কিছু জানতে পারে, আমরা কিছু জানি না। আমি তোমাকে চিনি না।’
রাণা বলল, ‘আমি খুব বড় ভুল করেছি আপনার কথা শুনে। আপনার কথা শোনা আমার একদম উচিত হয়নি।’
লোকটা হেসে বলল, ‘বেস্ট অফ লাক। ডেস্ট্রয় দ্য সিম।’
রাণা একটু থমকে গিয়ে বলল, ‘আর আমাকে মারতে কবে লোক পাঠাবেন?’
লোকটা বলল, ‘আশা করি কাউকে পাঠাতে হবে না। তুমি পারবে। আমি জানি। বেস্ট অফ লাক।’
ফোন কেটে গেল। রাণা চুপ করে বসে থেকে সিমটা ফোন থেকে বের করে নষ্ট করে দিল।
অমল সিগারেট টানছে। রাণা চুপ করে অমলকে দেখতে লাগল। সুধাকর দাসকে মারার কথা মনে পড়ে গেল। মারার আগে লোকটার কাছে লাইটার চেয়েছিল সে। সুধাকর রাগী গলায় বলেছিল, লাইটার হবে না। লাইটার দেওয়ার কাজ না তার।
লাইটার দিলে হয়তো সুধাকরের প্রতি কিছুটা মায়া হতো তার। না দিয়ে ভালোই করেছে। সুধাকরের শরীরটা রেল লাইনের উপর ফেলে এসেছিল রাণা। কাজটা শেষ করে দু’মাস গোয়াতে ছিল।
কাচে টোকা মারল অমল। ইঙ্গিতে জানতে চাইল কথা হয়েছে নাকি। রাণা হ্যাঁ সূচক ঘাড় নাড়ল।
অমল গাড়িতে উঠে বসে বলল, ‘কী বলল?’
রাণা বলল, ‘আপনার সঙ্গে থেকে কাজ শিখতে বলছে।’
অমল শিস দিয়ে উঠল, ‘তাহলে তো ভালোই হল। একজন পার্টনার পেলাম। একা একা সত্যি ভালো লাগে না।’
রাণা বলল, ‘কী কাজ আছে এখানে?’
অমল বলল, ‘কিছুই নেই। দু-চারজনের বাড়ি যাওয়া। কথা বলা। খাওয়া। ঘুমোনো। কোনও কাজ নেই।’
রাণা বলল, ‘এই উস্তাদের নাম কী?’
অমল একটু চমকাল, ‘সে কী! আপনাকে কেউ বলেনি, উস্তাদের নাম নেওয়া যাবে না? কিছু জানতে চাওয়া যাবে না?’
রাণা বলল, ‘না।’
অমল বলল, ‘তাহলে জেনে নিন। ওটাই ফার্স্ট লেসন।’
রাণা বলল, ‘এখন কাকে টার্গেট করতে হবে?’
অমল বলল, ‘সাদিককে।’
রাণা অবাক হল, ‘সাদিক কে? আপনি আমাকে তুমি বলতে পারেন।’
অমল বলল, ‘ওকে। সব একদিনে বুঝে যাবে? সাদিক ওয়াই। আমাদের পরের টার্গেট ধরো এক্স। এখানে অনেক এক্স ওয়াই-এর ব্যাপার আছে।’
রাণার মাথা ঝিমঝিম করছিল। এই বুঝে নেওয়ার পদ্ধতিটা বেশ বিরক্তিকর লাগছে তার। সে বলল, ‘ওয়াইটা কে?’
রাস্তায় ভীষণ জ্যাম হয়ে গেছে। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দিয়ে অমল বলল, ‘ভুবনেশ্বরে হোটেল লিস্টারে তুমি তারেককে উড়িয়েছিলে না? সাদিক হল তারেকের ভাই।’
রাণা চমকে উঠল, ‘আপনি কী করে জানলেন আমি তারেককে উড়িয়েছি?’
অমল হাসল, ‘ওটা আমার ইন্সট্রাকশনেই হয়েছিল।’
রাণা রাস্তার দিকে তাকাল। সব কিছুর সঙ্গেই কি সব কিছু মিলে যায়? তারেককে ওড়ানোর দরকার ছিল বলে ওরা তাকে রিক্রুট করেছিল। আবার হোটেল লিস্টারের সিসিটিভি ফুটেজও ওরা রেখে দিয়েছে তাকে ব্ল্যাকমেল করবে বলে। বৃত্ত মেলানোই ওদের কাজ? নাহ্। এত ভেবে লাভ নেই। দেখা যাক, সময় তাকে কোথায় নিয়ে যায়। বেঁচে থাকাটাই একটা যন্ত্রণা তার কাছে। যদি এরা তাকে মেরেও ফেলতে চায়, ফেলুক। কী আর হবে তাতে? জীবন একটা ওভার রেটেড জিনিস। অকারণে সেটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনও অর্থ হয় না। তার চেয়ে অমল কী করছে, সেটাই দেখা যাক।
অমল বলল, ‘সাদিকের বাড়িতে আমার মিটিং আছে আজ। সাদিক একটা প্রোজেক্ট করছে। সে ব্যাপারেই মিটিং। তুমি আমার বন্ধু। কলকাতা থেকে পালিয়ে এসেছ। এখানে কাজ খুঁজছ। আমি তোমাকে ওদের কাছে আমার বন্ধু হিসেবে নিয়ে যাচ্ছি।’
রাণা বলল, ‘ওরা ব্যাক গ্রাউন্ড চেক করবে না?’
অমল বলল, ‘করে ফেলবে। চাপের কিছু নেই। তোমার কভার রেডি আছে। দেখা যাবে।’
রাণা বলল, ‘আমাদের কী কী জানতে হবে?’
অমল বলল, ‘এক্স লোকটাকে কারা ফান্ড করছে? আই এস আই করছে না অন্য কেউ করেছে? ওদের রুট কী হতে পারে? কোন কোন শহর?’
রাণা বলল, ‘তারেক কী করত?’
অমল বলল ‘ইন্ডিয়ায় বসে আই এস আইকে হেল্প করতো। ইউ ডিড এ গ্রেট জব।’
রাণা শ্বাস ছাড়ল। তারেকের ব্যাপারে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ভুবনেশ্বরের সুবল মোহান্তি। দু-দিন খোঁজ নিয়েছিল, তৃতীয় দিন অপারেশনটা কমপ্লিট করেছিল।
অমল বলল, ‘তুমি কাচ্চি খাও তো? আজ কাচ্চি খাওয়াব তোমায়। নাকি ভেজটেজের ব্যাপার আছে? বৃহস্পতিবার, শনিবার নিরামিষ খেতে হবে, এরকম কোনও ব্যাপার আছে নাকি?’
রাণা বলল, ‘খাই, আমি সব খাই। আমার ওসব ব্যাপার নেই।’
অমল খুশি হল, ‘গুড। এদেশে ওসব খাওয়ার সমস্যা হলে ভুগতে হতো। যাক, নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।’
রাণা নিশ্চিন্ত হতে পারল না। অমল ঠিক কী বিশ্বাসঘাতকতা করছে যার জন্য তাকে শেষ করতে হবে?
অমল বেশ খুশি মনে গাড়ি চালাচ্ছে। শহরের তুমুল জ্যাম পেরিয়ে অবশেষে একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে পৌঁছল তারা।
অমল বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি খাবার ব্যবস্থা করছি।’
কিছুক্ষণ পর অমল খাবার নিয়ে এল। গরম গরম বিরিয়ানি প্লেটে ঢেলে বলল, ‘বসে পড়, বসে পড়।’
দুজনে বসে গেল। খেতে খেতে রাণা বলল, ‘এক্স যে লোকটা, মানে আমাদের টার্গেট যে, সে ঠিক কী করে?’
অমল খেতে খেতে হেসে ফেলল, ‘একদিনেই সব শিখে নেবে দেখছি। এত তাড়া কীসের? ধরো, এক্স বিভিন্ন শহরে থাকে। এক জায়গায় থাকে না। ঘুরে বেড়ায়। মূলত মিডল ইস্ট কান্ট্রিগুলোতে ওর অবাধ বিচরণ। ধরো পাকিস্তানে থাকে। শেষ দেখা গিয়েছিল কায়রোতে। তার আগে দুবাইয়ের একটা ক্রিকেট ম্যাচে বেটিং করিয়েছিল।’
রাণা বলল, ‘তার মানে ও ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা হঠাৎ করে ব্লাস্ট করাতে যাবে কেন?’
অমল খুশি হল, ‘গুড কোয়েশ্চেন। আবার ব্যাডও। তোমাকে আরেকটু তলিয়ে ভাবতে হতো। ইন্ডিয়াতে এক একটা ব্লাস্টের বা টেররিস্ট অ্যাটাকের সুদূরপ্রসারী ফলাফল থাকে। পার্লামেন্ট অ্যাটাক হোক, তাজ অ্যাটাক হোক কিংবা পুলওয়ামা। হয়তো ওরা এমন কোনও অ্যাটাক করতে চাইছে, যার ফলে ওদের দরকার পড়ে।’
রাণা বলল, ‘এক্সকে ফান্ড করতে অর্গানাইজেশন লাগছে কেন? এক্সের নিজস্ব ইন্টারেস্ট নেই তাতে?’
অমল বলল, ‘আছে। তবে লক্ষ্য একই থাকলে এরা দু-চারটে ফান্ডিং পার্টনার ঠিকই জুটিয়ে ফেলে। খেলার মাঠে দেখো না, খেলে একজন, মূল স্পন্সর এক থাকলেও অনেক ছোট ছোট স্পন্সর থাকে। যত গুড়, তত মধু। বাই দ্য ওয়ে, তোমার দরকারি কয়েকটা জিনিস আমি গুছিয়ে রেখে দিয়েছি। যন্তরটা সব জায়গায় নেওয়ার দরকার নেই। আমি বলে দেব, কখন ক্যারি করতে হবে।’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। আপনার এখানের এস্টাব্লিশমেন্ট কস্ট কে পাঠায়?’
অমল বলল, ‘কে পাঠাবে? আমাকেই রোজগার করে নিতে হয়।’
রাণা বলল, ‘সোজা পথে, না বাঁকা পথে?’
অমল হাসল, ‘ডিপেন্ডস। যখন যেভাবে সম্ভব হয়। তবে যাই করবে, কিছুতেই এক্সপোজ হবে না। মাথা ঠান্ডা করে, সিক্রেটলি করতে হবে। এখানে বিপদে পড়লে কেউ বাঁচাবে না তোমায়। নিজের দেশ সবার আগে হাত তুলে নেবে। সেরকম হলে আই এস আই-এর হাতেও তুলে দিতে পারে। আই এস আই-এর টর্চার খুব ইনোভেটিভ হয়। ওর থেকে মনে হয় কুম্ভীপাক নরক বেটার জায়গা।’
রাণা বলল, ‘আপনি পাকিস্তান গেছেন?’
অমল বলল, ‘গেছি।’
রাণা বলল, ‘আপনি ওদের ভাষা জানেন?’
‘হ্যাঁ জানি। জানতে হবে। তোমাকেও জানতে হবে। এদেশেও বাংলাভাষার অসংখ্য ভাগ আছে। চট্টগ্রামে এক রকম, নোয়াখালীতে একরকম, আবার বরিশালে আরেকরকম। শিখে নিতে হবে।’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘শিখে নেবো।’
অমল খুশি হল, ‘গুড। খাওয়া হয়ে গেলে প্লেট বেসিনে নিয়ে গিয়ে ধুয়ে রেখো। এখানে কাজের বুয়া নেই। আমাদেরই সব করতে হবে।’
অমলের খাওয়া হয়ে গেছিল। সে প্লেট নিয়ে উঠে গেল। রাণার অস্বস্তি হচ্ছিল। লোকটা, যাকে অমল উস্তাদ বলে ডাকছে, তাকে এদেশে পাঠিয়ে দিল। সে সব জায়গার ভাষাও জানে না ঠিক করে। অমল এতদিন ধরে এখানে কাজ করে যাচ্ছে। রাণার কোনও ট্রেনিংও নেই। ঠিক কী হিসেবে লোকটা তাকে অমলের বদলি হিসেবে এখানে পাঠিয়ে দিল? ভাবতে হবে। না ভাবলে কোনও হিসেবই মেলাতে পারা যাবে না।
অমলের ফ্ল্যাটটা ছোট হলেও ছিমছাম। অমল নিজেই গুছিয়ে রাখে সব কিছু। লোকটার কথা অনুযায়ী সে যদি অমলকে মেরেও ফেলে, তারপর তাকে বরিশালে চলে যেতে হবে। এখানে থাকতে পারবে না। উফ্! কী একটা জালে জড়িয়ে পড়ল! যতক্ষণ না পুরো ছবিটা স্পষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ অস্বস্তিটা কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না তার।
বিরাট একটা বাড়ি। বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলাই ভালো। একটা সুদৃশ্য ঘরে বসানো হল। রুমান নামে এন্ট্রি করেছে অমল। গৌতম নামে রাণা। এসির তাপমাত্রা কম। ঘর তীব্র শীতল হয়ে গেছে।
‘বেশিক্ষণ অপেক্ষা করাই নাই আশা করি।’
সাদিক ঘরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়াল অমল। সাদিককে কর্পোরেট বড় কর্তার মতো দেখতে। ঝকঝকে চেহারা। রিমলেস চশমা পরে আছে।
অমলের দেখাদেখি রাণাও উঠে দাঁড়াল। সাদিক রাণাকে দেখে ভ্রু কুঁচকাল। অমল বলল, ‘আমার কলকাতার দোস্তো। একটা কেচ্ছা করে বর্ডার পেরিয়ে পালিয়ে চলে এসেছে।’
সাদিক সোফায় বসল, বলল, ‘বলেন কী? কেচ্ছা করেছে? কী কেচ্ছা?’
অমল বলল, ‘বোঝেনই তো। জোয়ান বয়েস। এই বয়সে যা হয়।’
সাদিক হো-হো করে হেসে উঠে বলল, ‘রক্ত গরম। কী বলেন? গরম রক্তের অনেক সমস্যা। ঠিক আছে, চিন্তার কিছু নাই, আমি আপনার দোস্তোর ব্যবস্থা করে দিমু নে। সব গরম ঠান্ডা করার ব্যবস্থা আছে বুঝলেন মিয়াঁ? চিন্তার কিছু নাই। কোক খাবেন?’ দরজার দিকে তাকিয়ে সাদিক গলা তুলল, ‘এই আসগর, দুই খান কোক নিয়ে আয়।’
অমল বলল, ‘সাদিকভাই, আমি আপনার প্রোজেক্টের জন্য ভাবছিলাম রাজশাহী যাব। ওখানে কিছু লোককে আমি চিনি। ওরা আমাদের কাজে আসতে পারে।’
সাদিক বলল, ‘ঠিক আছে। আমার গাড়ি নিয়া যান। আমি ড্রাইভারের ব্যবস্থা করে দেব।’
অমল বলল, ‘না, না। গাড়ি নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। বাসে যেতে হবে। গাড়ি নিয়ে গেলে অনেকের চোখে পড়ে যাব।’
সাদিক ক্যালেন্ডার দেখল, ‘কবে যাবেন আপনি? দশ তারিখ কিন্তু আমাকে ফোন করবেন না। ওদিন একটা মিটিং করতে হবে। সারাদিন আমায় পাবেন না।’
অমল মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। সে নিয়ে ভাবছি না। আপনার দোয়া থাকলেই হবে।’
সাদিক রাণার দিকে তাকাল, ‘আপনার নাম কী?’
রাণা গলা খাকরে বলল, ‘গৌতম।’
সাদিক রাণাকে আরেকবার খুঁটিয়ে দেখল। তারপর বলল, ‘ক’দিন থাকবেন এ পারে? কোন প্ল্যান করেছেন?’
রাণা ইতস্তত করে মাথা নাড়ল, ‘না। সেরকম কিছু ভাবিনি...।’
অমল রাণার কথার মাঝখানেই বলে উঠল, ‘আমি এ জন্যই ওকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছিলাম। মানে বুঝতেই পারছেন, বেঁচে তো থাকতে হবেই। কিছু কাজ যদি পাওয়া যেত।’
সাদিক বলল, ‘হইয়া যাইব। কিন্তু ইন্ডিয়া ফিরে আমারে ভুললে চলবে না। মনে রাখতে হবে। কী মিয়াঁ? মনে রাখবেন তো আমারে?’
রাণা হাসার চেষ্টা করল, ‘আপনি এত উপকার করছেন, আমি কী করে আপনাকে ভুলে যাব সাদিকভাই?’
একটা মোটামতো ছেলে কোক নিয়ে এসে টেবিলে রাখল। সাদিক বলল, ‘আপনারা যারা কলকাতার মানুষ, তারা খুব তাড়াতাড়ি মুখ মুছে ফেলেন, বুঝলেন ভাই! এ দেশে এসে আতিথেয়তা নিয়ে যায়, ও দেশে গেলে ভুলে যায়। কতবার হয়েছে এখানে কত আদর করলাম, ও আল্লা, কলকাতায় গিয়ে দেখি আমারে চিনতেই পারে না। ঠিক আছে, ব্যাপার না, আমি ওসব নিয়ে ভাবি না। আপনি রুমানভাইয়ের সঙ্গে আইছেন যখন, আপনি আমারও দোস্তো। আপনার দায়িত্ব আমি নিলাম। রুমানভাই, আপনার দোস্তোকে প্রোজেক্টে নিয়ে নিন। একটু ঘোরাঘুরির কাজ আছে। পারবেন না মিয়াঁ?’
রাণা ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ পারব।’
সাদিক খুশি হল, ‘বাঃ। তাহলে তো ভালোই হল। চিন্তা নেই আর। কী রুমানভাই, আপনিই তো বিশ্বস্ত লোক খুঁজছিলেন, ভালোই হল।’
রাণা বলল, ‘আমাকে কী করতে হবে?’
সাদিক বলল, ‘রুমান ভাই বলে দেবে। তবে মিয়াঁ কাজের মাঝপথে ফিইরা যামু বলে কাঁদলে কিন্তু হইব না। এ কাজে সময় লাগব। আপনি না পারলে আগে থেকে বইলা দিয়েন।’
রাণার পায়ে আলতো করে চিমটি কাটল অমল। রাণা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘না না। আমি থাকবো। কাজ করে তারপরেই না-হয় ফেরার কথা ভাবব।’
সাদিক খুশি হল, ‘বাহ্। তাহলে তো খুবই ভালো।’
রাণা কৌতূহলী গলায় বলল, ‘কিন্তু কাজটা কী?’
সাদিক হাসল, ‘সময়ে সব বলব দাদা। এখন আপনার গরম রক্ত। সেটার তো ব্যবস্থা করি আগে। আসগর, শুনছস? শুইনা যা!’
আসগর এসে দাঁড়াল...।
গরম লাগছে। লতিফ চৌধুরী পান খাচ্ছে। কষ গড়িয়ে পানের রস পড়ছে। তার দাড়ি মেহেন্দি করা। কোত্থেকে একটা বলিউডি গান বাজছে।
লতিফ চৌধুরী চিৎকার করল, ‘এইসব হারাম গান বন্ধ কর। বন্ধ কর। কতবার বলছি এসব গান চালানো এইখানে নিষেধ।’
লতিফের ছেলে সফিক এসে বাবার কাছে বসল। ‘আব্বা।’
লতিফ বলল, ‘কও। তোমার আর কাম কী? সারাদিন ঘরে শুইয়া থাকো।’
সফিক বলল, ‘আব্বা, সাদিক ভাই আসবে বলছে। ফোন দিছিল।’
লতিফ বলল, ‘কখন আইবে?’
সফিক বলল, ‘সকাল দশটায়।’
লতিফ ঘড়ির দিকে দেখল, রাগী গলায় বলল, ‘এখন দশটা বাজতে পাঁচ মিনিট আছে। তোমারে কখন ফোন দিছিল?’
সফিক বলল, ‘কাল রাইতে।’
লতিফ রাগী চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাইর হও। বাইর হও।’
সফিক লজ্জিত মুখে বলল, ‘টেকা লাগবে আব্বা।’
লতিফ বলল, ‘কী কামে লাগবে?’
সফিক বলল, ‘আম্মা কইসে।’
লতিফ পকেট থেকে টাকা বের করে ছুঁড়ে মারল।
বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। লতিফ উঠে দাঁড়াল, ‘তুই যা। আমি দেখতাসি। যা যা।’
সফিক দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সাদিক ঘরে ঢুকে লতিফকে কদমবুসি করে সালাম করল।
লতিফ খুশি হয়ে প্রত্যুত্তরে সালাম জানিয়ে বলল, ‘কী দরকার ছিল তোমার আসার? আমারে বললেই পারতা! আমি চইলা যাইতাম।’
সাদিক বলল, ‘আসার দরকার ছিল। সরকার থেকে আবার একটা কমিটি বানাইছে রাজাকারদের তালিকা তৈরির জন্য। অন্য কেউ থাকলে সমস্যা ছিল না। শেখের বেটি আছে না? শেখের বেটির নিজস্ব রাগ আছে রাজাকারদের বিরুদ্ধে।’
লতিফের মুখ শুকিয়ে গেল, ‘আবার? আগেরবার ফাঁকি দেওয়া গেছিল। এবার কী হবে? আমার বয়স হইসে। এই বয়সে টানাটানি করবে নাকি?’
সাদিক বলল, ‘করবে না। আমার এক দোস্তোরে বলা আছে। ও সব দেখবে। ও আবার আপনার খুব বড় ভক্ত। দেখা করতে আইসে।’
লতিফ বলল, ‘কই?’
সাদিক ডাকল, ‘রুমান। আস।’
ঘরে অমল প্রবেশ করল। লতিফের পা ছুঁয়ে কদমবুসি করল।
সাদিক বলল, ‘খুব ভালো ছেলে, বুঝলেন? তালিকা তৈরির কাজ ওরেই দেওয়া হইসে। রুমান। আমার পরিচিত।’
রুমান বলল, ‘আপনার কথা অনেক শুনছি। কত গ্রামে আপনি তখন পাকিস্তানি সেনা লইয়া গেছেন।’
লতিফের মুখে আলাদা আভা চলে এল, ‘তা আর কী কই? আমি ছিলাম বইলা গ্রামের পর গ্রাম মালাউন পালাইসিল। তাও পারে নাই। কম করসি?’
সাদিক বলল, ‘আমাদের লক্ষ্য একই আছে। আমরা আবার পাকিস্তান দেখতে চাই আমাদের দেশে। আমরা চাই তার লক্ষ্যে চাচা আপনি আমাদের নেতৃত্ব দেন। আমাদের শিক্ষা দ্যান। পথ দেখান। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’
সাদিক আবেগে কেঁদে ফেলল লতিফের হাত ধরে।
লতিফ বলল, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ। কোনও খবর আইসে?’
সাদিক অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাইরে যাও।’
অমল সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সাদিক বসে বলল, ‘খবর আছে। বড় মিয়াঁভাই আসবেন।’
লতিফের মুখ খুশিতে ভরে উঠল, ‘মাশাল্লাহ। কবে আসবেন?’
সাদিক বলল, ‘জানাবো। সব জানাবো। আমরা এবার আমাদের লক্ষ্যে সফল হবই। অনেক মালাউন আছে এখন সরকারের কান ভারী করছে। ইন্ডিয়া চেষ্টা কইরা যাইতাসে। আমরা এখনই আমাদের কাজ না করতে পারলে সমস্যা বাড়বে জনাব।’
লতিফ বলল, ‘জানি তো। আমি সেই কবে দিয়া বলতাসি। মিয়াঁ ভাই আইলে কিন্তু আমারে ডাকবা। আমি কথা কমু। কতদিন উর্দু কই না। আহা, কী সুমিষ্ট ভাষা। প্রাণের ভাষা।’
সাদিক বলল, ‘সেদিন নিকটে চইলা আইসে। বেশিদিন আমাগো অপেক্ষা করতে হবে না। সব ব্যবস্থা হইয়া যাইব। আপনি কিন্তু রুমানের লগে কন্ট্যাক্ট রাখবেন। মাঝে মাঝে ফোন দিবেন। এখন সময় ভালা না। কত লোকের লগে ঝামেলা লাগে। ও ভুইলা গেলেও আপনি ভুলবেন না। আমি যাই চাচা।’
লতিফ ঘাবড়ে গিয়ে সাদিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আবার ভুলবে ক্যান?’
সাদিক বলল, ‘কথার কথা চাচা। আপনি কন্ট্যাক্ট রাইখেন।’
লতিফ ব্যাজার গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। রাখব।’
সাদিকের গাড়িটা জাহাজের মতো বড়। আসগর দরজা খুলে দিয়ে তাকে বসাল। নিজে রাণার উল্টোদিকে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল।
রাণার অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। আসগর একটাও কথা বলছে না। চুপ করে বসে আছে।
রাণা জানলার বাইরের ঢাকা শহরটাকে দেখতে লাগল। সাদিক যেন একপ্রকার জোর করে তাকে পাঠিয়ে দিল। এখন এই বিকেলবেলাতেই পাঠিয়ে দিল? অদ্ভুত!
সোনাগাছিতে রাণার একটা বাঁধা মেয়েছেলে আছে। তারা। যাওয়ার আগে ফোন করে যায়। তারা আর কাউকে ঘরে ডাকে না। একবার তারাকে নিয়ে দীঘা গেছিল রাণা। তারা খুব খুশি হয়েছিল। সন্ধেবেলাতেও সমুদ্রে স্নান করার জন্য বায়না ধরেছিল।
অদ্ভুত দিন কাটে তারার সঙ্গে। এখানে, ঢাকায় এসে আবার সেরকম একটা মেয়ের সঙ্গে তার দেখা হবে? জীবনটা ভারি অদ্ভুত। কখন কোন চমকের সামনে নিয়ে এসে দাঁড় করায়, কেউ জানে না।
একটা গলির সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আসগর দরজা খুলে বলল, ‘চলেন।’
রাণা গাড়ি থেকে নামল।
আসগর হাঁটতে শুরু করল। রাণা তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।
একটা ছোট গলিতে ঢুকল আসগর। চারদিকে এত ভিড়, অথচ এই গলিটায় একটা লোকও নেই। খানিকটা হাঁটার পর বুঝল এটা আসলে একটা কানা গলি। গলিটা একটা জায়গায় গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। আর যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানেই একটা দরজা।
আসগর এগিয়ে গিয়ে দরজায় দুবার নক করল। দরজা খুলে গেল। আসগর রাণার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘যান।’
রাণা চারদিকে দেখল। কেউ কোথাও নেই। কেউ তাকে দেখছে না। সে ভিতরে প্রবেশ করল। আসগর বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সে। সামনে আরেকটা দরজা। রাণা এগিয়ে দিয়ে দরজায় নক করল।
একটা কমবয়সি মেয়ে দরজা খুলে বলল, ‘আসেন।’
রাণা বলল, ‘আপনি?’
মেয়েটা খিলখিল করে হেসে বলল, ‘আমাকে আপনি বলার দরকার নাই।’
রাণা অপ্রস্তুত হল। সে বলল, ‘জল খাওয়াবেন?’
মেয়েটা আবার হেসে বলল, ‘পানি বলেন। জল বলেন ক্যান?’
রাণা ঘাড় নাড়ল, ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ। আমাকে পানি দিন।’
মেয়েটা বলল, ‘আসেন, ভিতরে আসেন।’
একটা ছোট ঘরের ভিতর ঢুকল। মেয়েটা রিমোট দিয়ে এসি চালিয়ে দিল। বলল, ‘ভাইজানের গরম লাগে বুঝি?’
রাণা বলল, ‘তোমার নাম কী?’
মেয়েটা বলল, ‘আমি জরিনা। সাকিনা আমার আপা। আপনের কেমন মাইয়া পছন্দ? বুড়ি না ছুড়ি?’
রাণা গলা খাকড়াল। কী বলবে বুঝতে পারছে না সে। দরজা খুলে আরেকজন মেয়ে ঢুকল। জরিনার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, ‘তুই যা। দরজা বন্ধ করে দিয়ে যা।’
জরিনা থতমত খেয়ে, ‘জি আপা’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
মেয়েটা রাণার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে বলল, ‘এসব করতে আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে?’
রাণা চমকে মেয়েটার দিকে তাকাল, ‘কে আপনি?’
‘সাকিনা। কেন, রুমান কিংবা অমল কি কিছুই বলেনি আমার সম্পর্কে?’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘না। বলেনি কিছু। তাছাড়া সাদিক আমাকে হঠাৎ করে এখানে পাঠিয়েছে। তার আগে আমাকে কোনও কথা বলার সুযোগও পায়নি।’
সাকিনা সিগারেট বের করল। রাণাকে বলল, ‘ফুঁকবেন?’
রাণা মাথা নাড়াল, ‘না।’
একটা ফোন বাজতে শুরু করল। সাকিনা ফোনটা ধরেই অবিকল জরিনার মতো খিলখিল করে হাসতে হাসতে বলল, ‘বল জান, মেহেমান এসে গেছে তো, মেহেমানকে আমি দেখছি। তোমায় কিচ্ছু ভাবতে হবে না। ভাবার কিছু নাই। উম্মা।’
ফোনে বড় একটা চুমু খেয়ে ফোন কেটে দিল সাকিনা। রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘প্রথম যখন এলাম, বলতো তুমি শুধু আমার, আর কাউকে তোমাকে দেব না। সময় পাল্টে গেল। এখন আমাকে শেয়ার করা যায়। শুয়োর! শুনুন, আপনাকে বলছি’, কড়া গলায় বলল সাকিনা, ‘আপনাকে এখানে ঘুরতে পাঠানো হয়নি।’
রাণার মাথা গরম হল, ‘তাহলে কী করতে পাঠানো হয়েছে? আমার কী করার ছিল যদি আমাকে এখানে পাঠিয়ে দেয়?’
সাকিনা বলল, ‘সেটাই তো খেলা। উস্তাদ আমাকে বলে দিয়েছে আপনাকে অমলের সঙ্গে থাকতে হবে। একা থাকতে দেবেন না ওকে। কিছুতেই যেন আপনাকে ঝেড়ে ফেলতে না পারে। আপনাকে এখানে পাঠিয়ে ও সাদিকের সঙ্গে কোথায় গেছে জানেন?’
রাণা বলল, ‘আমি আজকে এসেছি। আমি কি ম্যাজিক জানি নাকি? সময় লাগবে তো!’
সাকিনা চিন্তিত মুখে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হায়! আমাদের হাতে এই জিনিসটিই মোটে নেই!’
রাণা বলল, ‘অমল কী করেছে?’
সাকিনা কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আমি কিচ্ছু জানি না। উস্তাদ আপনাকে এটা বলতে বলেছে, বলে দিলাম।’
রাণা আরও দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ল...।
আধঘণ্টা পর রাণা ঘর থেকে বেরোল। জরিনা যেমন শুরুতে এসেছিল, তেমনই এসে খিলখিল করে হেসে বলল, ‘ভাইজান, সব ঠিক আসে তো?’
রাণা উত্তর দিল না। ঘরের বাইরে বেরোতে জরিনা দরজা বন্ধ করে দিল। আসগর বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে।
রাণা বেরোতে আসগর হাঁটতে শুরু করল। রাণা আসগরের পিছন পিছন হাঁটতে লাগল। ভিড় গলির মুখে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আসগর দরজা খুলে দিল।
রাণা গাড়িতে উঠে অবাক হয়ে গেল। গাড়িতে সাদিক বসে আছে। সে অবাক হলেও মুখে বিস্মিতভাব দেখাল না।
সাদিক হাসল, ‘কেমন ভাই? সাকিনা খুশি করতে পেরেছে তো?’
আসগর গাড়িতে উঠল না। গাড়ি চলতে শুরু করল।
রাণা মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। সাকিনা খুব ভালো।’
সাদিক বলল, ‘একদম জোশ, তাই না?’
রাণা বলল, ‘হ্যাঁ, একদম জোশ।’
সাদিক অদ্ভুতভাবে হাসল, ‘আপনি রুমানভাইয়ের দোস্তো মানে আমারও দোস্তো। ইন্ডিয়ায় কী করসিলেন আপনি? পালায়ে আসতে হইল কেন?’
সাদিক বেশ অদ্ভুতভাবে কথা বলে। কখনও পুরো বাঙাল ভাষায় কথা বলে, কখনও শান্তিপুরি বাংলায়। রাণা বলল, ‘ঝামেলা হয়ে গেল। মেয়েঘটিত।’
সাদিক বলল, ‘ভাইয়া মনে হয় কথা বলতে ভালোবাসেন না। কম কথা বলেন, তাই না?’
রাণা বলল, ‘রুমান কোথায়?’
সাদিক বলল, ‘আমার বাসাতেই আছে। আমি ভাবলাম আপনার সাথে একবার দেখা করে আসি। মানে মেহমান তো আপনি। আমরা আবার মেহমানদের জন্য জানও দিতে পারি। কোক খান ভাই। অনেক পরিশ্রম হয়েছে।’
গাড়ির ভেতর থেকে একটা কোকের বোতল রাণার দিকে এগিয়ে দিল সাদিক। রাণা ইতস্তত করে বোতলে এক চুমুক দিল।
সাদিক বলল, ‘এই যে ঢাকা শহর দেখছেন না ভাই, আমি এই শহরে যখন এসেছিলাম আমার পকেটে কত টেকা ছিল জানেন? পঞ্চাশ টেকা। কী করি নাই? ভিক্ষা করসি, ট্রেনে পকেটমারি, দোকানে কাজ...কী করি নাই? সব করসি। সময় পাল্টায় ভাই। কিন্তু সময় কী দিতে পারে না জানেন? বলেন তো?’
রাণা সাদিকের দিকে তাকিয়ে রইল। উত্তর দিল না। কী বলবে বুঝতে পারছিল না।
সাদিক নিজেই বলে চলল, ‘সময় একজন বন্ধু দিতে পারে না ভাই। বন্ধু খুব কঠিন জিনিস। রুমানভাইয়ের সঙ্গে খুব বেশি দিন হয় নাই আলাপ হয়েছে, কিন্তু রুমানভাইরে আমি আমার দোস্তো বইলা ভাবি। রুমানভাইয়ের প্রবলেম, আমার প্রবলেম। নইলে আমার খাস জায়গায় শুরুতেই আমি আপনারে লইয়া আসি? আপনিই বলেন?’
গাড়ি ফাঁকা রাস্তায় উঠেছে। সাদিক চেঁচিয়ে ড্রাইভারকে বলল, ‘ভালো গান চালা। ও রুস্তম। ভালো গান চালা।’
রাণা সতর্ক হল। সাদিক কি অন্য কিছু প্ল্যান করছে? অহেতুক আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছে। অমলের কথা শুনে তো মনে হয়নি তার সঙ্গে সাদিকের এত বন্ধুত্ব হয়ে গেছে?
সাদিক গানের তালে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, ‘কাজের কথায় আসি গৌতম ভাই। ফাউ প্যাঁচাল পাইড়া যাইতাসি। কুনো মানে হয় না। আপনারে প্রথম দেইখাই আমার ভালো লাইগা গেছে। তাই বলছি। আমি একটা ছোট সিন্ডিকেট খুলসি। কিছু জিনিসপত্র, এদেশ থেকে আমরা বিভিন্ন দেশে পাঠামু, আবার ও সব দেশ থিকাও নিয়া আসতে হইব। তার মধ্যে ইন্ডিয়াও আছে ভাই। কিন্তু আপনি ওদেশে এখন যাইতে পারবেন না, আমি বুঝি। তাই আপনারে ইন্ডিয়ায় পাঠাবো না।’
রাণা বলল, ‘স্মাগলিং-এর কাজ?’
সাদিক বলল, ‘ওরকমভাবে বলবেন না ভাই। স্মাগলিং আবার কী কন? এখনকার দিনে সব পথই এক। যে পথে টেকা আসে, সেই পথই ঠিক। খারাপ ভালো ভাইবেন না ভাই। আমার আপনাকে পছন্দ হইসে। রুমান ভাইয়ের মতো আপনিও আমার সাথে কামে আসেন ভাই।’
রাণা সাদিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী কাজ করতে হবে?’
সাদিক বলল, ‘ঘুরতে হইব। আজ সিঙ্গাপুর, কাল ব্যাংকক, পরশু দুবাই। ঘুরবেন মনের সুখে, এদিক সেদিক যাবেন। একটা কাগজ দিলে, সেটা নিয়া চইলা আইলেন। এই তো কাম। এর বেশি কিছুই করতে লাগব না।’
রাণা বলল, ‘তার জন্য ধরা পড়লে কী হবে?’
সাদিক খুব খুশি হল যেন। দুলে দুলে হাসল। হাসতেই হাসতেই বলল, ‘আপনারে তো আমি সোনা দিমু না। হিরাও দিমু না। এক খান কাগজ। কাগজের জন্য আপনারে কেউ ধরবে না। নিশ্চিন্ত থাকেন।’
রাণা অবাক হল, ‘শুধু কাগজের জন্য ট্রাভেল করতে হবে? আর কিছু না?’
সাদিক বলল, ‘না। আর কিছু না ভাইজান। শুধু কাগজ। রুমানভাই আপনেরে কি খাওয়াইসে? লাচ্ছি খাবেন?’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘নাহ্। ওসব খাব না এখন। আপনি কোক খাওয়ালেন তো। তাতেই হবে।’
সাদিক বলল, ‘আপনি আমার এখানে জয়েন করেন ভাই। এই দেশে লোকের কমতি নাই। কিন্তু একটা মাইনসের মধ্যে দুইটা জিনিস এক লগে পাওয়া যায় না। বিশ্বস্ত মানুষ আছে। কিন্তু তার মধ্যে লুকস নাই ভাই। লুকস বোঝেন তো? এই আসগররে যদি আমি ব্যাংকক পাঠাই, ওরে তো পুলিশে ধইরা আগে পিটাইবে তার পর বাকি কথা শুনবে। তাই না?’
রাণা তীক্ষ্ণচোখে সাদিকের দিকে তাকিয়ে রইল। সাদিকরা কী জিনিস দেওয়া নেওয়া করে?
তাকে প্রথম দেখাতেই এত পছন্দ হয়ে গেল যে তাকে নিতে চলে এল? শুরুর দিকে হলে রাণা ভাবত, তার তখন মাথা পরিষ্কার ছিল। মানুষ মেরে মেরে এখন আর বেশি ভাবতে ইচ্ছে করে না। শুধু মনে হয়, ঘরে ফিরে কখন ঘুমোবে। এপাশ ওপাশ করে শোবে। টিভি দেখবে। এই মানসিকতা থেকেই লিস্টার হোটেলের ভুলটা হয়ে গেছে। বোঝে সে। হয়তো আরও অনেক ভুল হতো। ঢাকায় যদি কাজ করতে গিয়ে মরেও যায়, কোনও খেদ থাকবে না। বেঁচে থেকে খুব বেশি লাভ নেই। মরে গেলে যাবে। অত বুদ্ধি খাটাতে যাবে না।
সাদিকের প্রাসাদে গাড়ি এসে দাঁড়াল। সাদিক বলল, ‘আসেন ভাই। রাতে না খাওয়াইয়া আপনাকে ছারুম না।’
রাণা দেখল আসগর দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে চলে এসেছে? অদ্ভুত ব্যাপার তো!
অমল ড্রইংরুমে ক্রিকেট ম্যাচ দেখছিল। তাকে ঢুকতে দেখে হাসল, ‘কী, সব ঠিক আছে তো?’
রাণা মাথা নাড়ল। সাদিক বসল। সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘দোস্তোরে কইলাম রুমানভাই। আমি ইন্ডিয়ায় যাওয়ার জন্য জোর করুম না। আমার জন্য মাঝে মাঝে ব্যাংকক, দুবাই, কলম্বো যাইতে হইব। আপনি তো যান, ভাইরে বোঝাইয়া কন না।’
রাণা বিরক্ত মুখে অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘যাবে যাবে। গৌতমের দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। আপনি অত ভাবছেন কেন? এর পরে দোস্তো আমার কলকাতা ফিরতেই চাইবে না, দেখবেন।’
সাদিক বলল, ‘তাই তো চাই। আমার কাছে থাকলে চিন্তার কিছু নাই ভাই।’
অমল উঠে দাঁড়াল। টিভির পাশে সাদিকের সঙ্গে তারেকের ছবি। অমল বলল, ‘অনেকবার বলেছি, আবারো বলছি, আপনাদের দেখলে যমজ লাগে ভাই।’
সাদিক বলল, ‘বড় ভাইজান থাকলে কি এখন এত হেডেক নিতে হইতো রে ভাই? সব একাই সামলাইয়া রাখত।’
রাণার মনে পড়ে গেল। তারেক প্রচুর মদ খেয়ে ছিল সেদিন। কলিং বেল টিপতে চিৎকার করতে করতে দরজা খুলল। রাণা দেরি করেনি। পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুণে গুণে চারটে গুলি করে বেরিয়ে চলে এসেছিল। সাইলেন্সার থাকায় কেউ শব্দ পায়নি। লাশটা লুটিয়ে পড়েছিল মেঝেতে। লিস্টার ছোট হোটেল। স্টাফরা তখন ডিনার করছিল। কাজটা করে চুপচাপ হোটেল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছিল সে।
তারেকের সঙ্গে সাদিকের চেহারার অনেক মিল আছে। সাদিক ধরাগলায় বলল, ‘আমার যাওয়ার কথা ছিল জানেন মিয়াঁ? ভাইজান বলল তোর যাওয়ার দরকার নেই। তুই ভুবনেশ্বর চিনবি না। আমি আর জোর করি নাই। আমারও ভয় ছিল। ভাইজান হয়তো বুঝতে পারসিলো। তাই আমারে না পাঠায়ে নিজে গেছিল।’
অমল আড়চোখে রাণার দিকে তাকাল। সাদিক সিগারেট ফেলে সোফায় এসে বসল। অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাইরে বলেন মিয়াঁ। আমার বিশ্বস্ত লোক দরকার। টেকার বিষয়ে চিন্তা করতে বারণ করেন।’
অমল বলল, ‘করবে তো! গৌতম করবে। কী রে গৌতম, সাদিকভাই এত আদর করে বলছে, তুই করবি না?’
রাণা মাথা নেড়ে বলল, ‘করব।’
সাদিক খুব খুশি হল। ছুটে এসে রাণার হাত ধরে বলল, ‘শুক্রিয়া ভাই। আপনারে অনেক শুক্রিয়া। ইলিশ খাবেন ভাই?’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘আপনি যা খাওয়াবেন সাদিকভাই।’
সাদিক রাণাকে জড়িয়ে ধরল।
সাদিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেই রাণা বলল, ‘এটা কী হল? আপনি কি এখন এই কাজই করছেন? স্মাগলার হয়ে গেছেন?’
অমল অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে বলল, ‘ও ইনফরমেশন আদান প্রদান করে। কোনরকম অনলাইন সিস্টেমে সাদিক বিশ্বাস করে না। ওই কাজ না করলে আমি কী করে জানতাম ওরা ইন্ডিয়াতে কী প্ল্যান করছে?’
রাণা বলল, ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ছাড়া ও আমাকে নিচ্ছে কেন?’
অমল বলল, ‘আমার জন্য নিয়েছে। আমার ট্র্যাক রেকর্ড বেশ ভালো। এগারোটার উপর দেশ ঘুরে এলাম সাদিকের কল্যাণে। ও আমার মুখের কথা বিশ্বাস করেছে। পরে চেক করবে হয়তো। তবে তার আগে আমাদের কাজ হয়ে যাবে।’
রাণা বলল, ‘আমার সব অদ্ভুত লাগছে। আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে মাঝখান থেকে কোনও সিনেমা দেখতে শুরু করেছি।’
অমল বলল, ‘কেন? তোমার তো এতক্ষণে অনেকটাই সড়গড় হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। এরকম বললে কী করে হবে? আমাদের কাজ খুবই সিম্পল। সাদিক একটা চুনোপুটি। ও যার যার কথা শুনে কাজ করে, আমাদের সেগুলো খুঁজে বেড়াতে হবে। আর তাদের পেয়ে গেলে...’
রাণা বলল, ‘কী করতে হবে? মেরে দেব?’
অমল শিস দিয়ে উঠল, ‘মারতে পারলে আর কিছু চাই না।’
বৃষ্টি নেমেছে। গাড়ির জানলার বাইরে তাকিয়ে রাণা বলল, ‘আপনি যে দেশগুলোতে গিয়ে সাদিককে হেল্প করছেন, এটা উস্তাদ জানে?’
অমল বলল, ‘উস্তাদ সব জানে। না জানিয়ে আমি এ কাজ করব কেন?’
রাণা কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেল।
অমল বলল, ‘কী হল? কী বলতে যাচ্ছিলে?’
রাণা বলল, ‘কিছু না।’
অমল বলল, ‘এ দেখি মেয়েদের মতো করো। মেয়েরাও এরকম করে। কথা বলতে গিয়ে বলে কিছু না।’
রাণা বলল, ‘আমার একটা রিভলভার লাগবে। কিছু বুলেট।’
অমল বলল, ‘পেয়ে যাবে। সময়মতো সব পেয়ে যাবে। সাদিকের বাড়িতে ওসব নিয়ে গেলে ধরা পড়ে যাবার চান্স আছে। ওই চান্স নেওয়া যাবে না।’
রাণা বলল, ‘সাদিকের এদিক সেদিক পাঠানোর স্বভাবটা ভালো লাগছে না। ও যদি রিস্কি কোথাও পাঠিয়ে দেয়?’
অমল বলল, ‘পাঠাতেই পারে। এভ্রিথিং ইজ পসিবল। সে কাজে অস্তর লাগলে ও-ই তোমাকে দিয়ে দেবে। আমরা যে কাজে নেমেছি, সে কাজে নামার আগে ভাবতে হয়। নামার পরে ভেবে লাভ নেই। তুমি ঠান্ডা মাথার খুনি, তুমি খুন করার পরে কি ভেবেছ কাজটা ঠিক হয়নি? সেটা ভাবলে কি বেঁচে থাকতে পারতে?’
রাণা চুপ করে গিয়ে জানলার বাইরে তাকাল। প্রথম খুন করার আগে কি সে কোনওদিন ভাবতে পেরেছিল এ জন্মে সে একজন মানুষকে মারতে পারবে? নিজের মতোই হাত চোখ কান ওয়ালা একটা লোক, তার হাতে মরে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে, দৃশ্যগুলো কতদিন তাকে ঘুমোতে দেয়নি। জাগিয়ে রেখে দিয়েছে রাতের পর রাত। ধীরে ধীরে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যেটা ইচ্ছে, সেটা করতে পেরেছে। একটার পর একটা পাপবোধ তাকে বিদ্ধ করে গেছে।
শক্ত না থাকলে সবার আগে নিজেকে মরতে হবে। সেটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাবে না। আদিম মানুষ একে অপরকে মেরেই বেঁচে থাকত। তাকেও বেঁচে থাকতে হবে। তাকে গুরুত্ব পেতে হবে। প্রতিটা মানুষ তাকে গুরুত্ব দেবে। মরতে যেমন ভয় পাবে না সে, একইভাবে যতদিন বেঁচে থাকবে, কারো উপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকবে না। কাউকে ভয় পেয়ে বেঁচে থাকবে না।
অমলের গাড়ি ফ্ল্যাটের পার্কিং-এ দাঁড়াল। অমল গাড়ি লক করে বলল, ‘পেছনে একটা টয়োটা গাড়ি ফলো করছিল লক্ষ করেছ?’ রাণা দেখল সাদা রঙের গাড়িটা বেরিয়ে চলে গেল। সে বলল, ‘সাদিক পাঠিয়েছিল?’
অমল বলল, ‘সাদিক তোমার ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করে দেখবে। মুখে দোস্তো দোস্তো করবে, কিন্তু ঠিকই সব যাচাই করবে। চিন্তা নেই। তোমার কভার ঠিকঠাক সাজানো আছে। চলো।’
অমলের ফ্ল্যাটে ঢুকল দুজনে। অমল দরজা বন্ধ করে আলো জ্বালাল। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বের করে গ্লাসে ঢেলে গ্লাস নিয়ে সোফায় বসল, ‘কঠিন খেলা চলছে। কে জিতবে কেউ জানে না।’
রাণা বলল, ‘হারলে কী হবে?’
অমল তার দিকে তাকাল, ‘কী হতে পারে বলে তোমার মনে হয়?’
রাণা বলল, ‘বাইরের দেশগুলোতে যখন পাঠায়, সে কাগজ থেকে ব্লাস্টের লোকেশন সম্পর্কে কিছু লেখে না?’
অমল ঘাড় নাড়ল, ‘লেখে। কোডে লেখে। যেমন এই মুহূর্তে কোচিতে ওদের একটা স্লিপার সেল জেগেছে। আসামেও। এই দুই সেলের জেগে ওঠার কোড ওই কাগজ থেকেই গেছে। কাগজগুলো রিমোটের কাজ করে। ব্যাংককের কোনও এক দেহপসারিণী একটা মিসড কল মেরে একটা স্লিপার সেলের ঘুম ভাঙিয়ে দিতে পারে। ইন্টারেস্টিং না?’
রাণা বলল, ‘হুঁ। উস্তাদকে ফোন করেন কখন?’
অমল বলল, ‘দরকার পড়ে না। রোজ রোজ ফোন করবই বা কেন? তাছাড়া যখন তুমি বাইরের কোনও দেশে থাকবে, তখন তোমার মালিক তুমি নিজেই। অন্য কারো নির্দেশের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। তোমার মাথায় একজন বন্দুক ধরে আছে, আর তুমি তখন দিল্লিতে ফোন করে জিগ্যেস করবে এখন তোমাকে কী করতে হবে? নাহ্, এসব ওভাবে চলে না। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শেখো। নিজের রুটির ব্যবস্থাও নিজে করবে। বুঝলে?’
রাণা বলল, ‘হুঁ।’
‘তুই আমাকে চিনিস না। তাও গুলি করে দিলি? তোর একবারও মনে হল না, কাজটা ঠিক হচ্ছে না? টাকা পেলে তুই সব করে দিবি? এভাবে তুই আমাকে খুন করে ফেললি?’
ধড়মড় করে উঠে বসল রাণা। আজ তারেক দুঃস্বপ্নে হানা দিয়েছিল। এভাবেই কেউ না কেউ হানা দিয়ে রাতের ঘুমটার দফারফা করে দেয়। ঘাম হচ্ছে রীতিমতো। রাণা উঠে ফ্রিজ থেকে জলের বোতল নিয়ে অনেকটা জল খেয়ে নিল। অস্বস্তি হচ্ছে।
ঘড়ি দেখল। রাত তিনটে বাজে। বাংলাদেশি সময় রাত তিনটে মানে ভারতে এখন রাত আড়াইটা। সময়ের দিক থেকে বাংলাদেশ আধ ঘণ্টা এগিয়ে আছে। জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল রাণা। রাস্তার গাড়ি চলাচল এখন নেই। মাঝে মাঝে ছুটকো-ছাটকা এক-আধটা গাড়ি যাচ্ছে। এ কথাটা আজকাল প্রায়ই মনে হয় তার। এত এত গ্রহ আছে চারদিকে। অথচ এই পৃথিবীতে সে একটা মানব জন্ম পেয়েছে। কাজ না পেয়ে সে কী করে? আরেকটা মানুষকে খুন করে! খুন করতে তার হাত কাঁপেনি কোনদিন। আগুপিছু কোনদিন ভাবেনি।
তবে আজকাল রাতের মধ্যে সেই লোকগুলো হানা দেয় কেন? ঘুমোতে দেবে তো! ঘুমটা তো তার দরকার!
ব্যালকনির দরজাটা চোখে পড়ল। রাণা দরজা খুলে ব্যালকনিতে গেল। চেয়ার রাখা আছে। ক্লান্ত শরীরে একটা চেয়ারে বসল সে। সামনের রাস্তায় বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। শহরে জায়গা এতটাই অপ্রতুল যে মানুষ রাস্তাতেই গাড়ি রেখে দেয়।
হঠাৎ রাণা নড়ে-চড়ে বসল। একটা কালো গাড়ির ভেতর লাইটার জ্বালিয়েছে কেউ। সিগারেট ধরাল। এই গাড়ির ভেতরে লোক আছে? এই ফ্ল্যাটের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছে কেন? সাদিকের লোক কি এখনও এখানে আছে? গাড়িটার দরজা খুলে গেল। রাণা অবাক হয়ে দেখল, গাড়ি থেকে অমল নামছে। তার মানে অমল এতক্ষণ গাড়িটায় ছিল?
রাণা যে ব্যালকনিতে আছে সেটা দেখেনি এখনও। অমল নামতেই গাড়িটা চলে গেল। অমল চোখের আড়াল হতে সঙ্গে সঙ্গে রাণা ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকে ব্যালকনির দরজা বন্ধ করে ছোট ঘরে ঢুকে গেল। বাইরের দরজা খোলার শব্দ হল। ঘরের ভেতর অমলের চলে যাবার শব্দ।
রাণা চুপ করে শুয়ে পড়ল। এত রাতে অমল বাইরে গেছিল? চোখ খুলে ভাবতে ভাবতেই কখন যেন দুচোখে ঘুম নেমে এসেছিল তার।
ঘুম ভাঙল অমলের ডাকে, ‘আরে ভাই ওঠ, আর কত ঘুমোবে? সকাল ন’টা বেজে গেল তো!’
ধড়মড় করে উঠে বসল রাণা। ন’টা বেজে গেল? অদ্ভুত তো! বহুদিন ন’টা অবধি ঘুমোয়নি সে। তবে কি পথের ক্লান্তিতেই, রাতে ঘুম ভাঙার পর এতক্ষণ ঘুমোল?
অমল বলল, ‘ফ্রেশ হয়ে নাও। ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করছি।’
রাণা বলল, ‘কোথাও বেরোবেন?’
অমল বলল, ‘হ্যাঁ...বেরোব। তোমাকেও নিয়ে যাব। কয়েকটা জায়গা চিনতে হবে তোমাকে। ইন কেস, ইমারজেন্সি সিচুয়েশন অ্যারাইভস...’ অমলের ফোন শব্দ করে উঠল।
অমল সচকিত হল, ‘কেউ আসছে। সেন্সর বেজে উঠল।’ অমল ফোনের স্ক্রিনে দেখে অবাক হয়ে গেল, ‘সাদিক আসছে। এখানে চলে এল?’
কলিং বেল বেজে উঠল। অমল দ্রুতপায়ে গিয়ে দরজা খুলল। দরজায় আসগরকে নিয়ে সাদিক দাঁড়িয়ে আছে। হাসিমুখে বলল, ‘এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম রুমানভাই, ভাবলাম আপনাদের সঙ্গে দেখা করে যাই।’
অমল বলল, ‘আসুন আসুন, ভিতরে আসুন।’
সাদিক আসগরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই গাড়িতে গিয়ে বোস।’ আসগর একটাও বাক্যব্যয় না করে চলে গেল। সাদিক ঘরে ঢুকে সোফায় বসে বলল, ‘গৌতমভাইয়ের পাসপোর্ট করাইতে হবে রুমানভাই। আমার একখান পার্সেল আনাইতে হইব।’
রুমান বলল, ‘হ্যাঁ, আমি ওকে সেই কথাই বলছিলাম কাল রাতে।’
সাদিক রাণার দিকে তাকাল, ‘আপনার কোন নাম পছন্দ ভাই? আপনি বলেন। যে নাম বলবেন, সেই নামে পাসপোর্ট বানায়ে দিমু।’
রাণা বলল, ‘আপনার যে নাম পছন্দ আপনি সেটাই দিন।’
সাদিক অমলের দিকে তাকাল, ‘দেখলেন মিয়াঁ, কী কয়? এই জন্যই ভাইরে আমার পছন্দ হইসে। কইরা দি তাইলে আমার খুশিতে?’
রুমান বলল, ‘করে দিন। কোনও ব্যাপার না।’
পড়ন্ত বিকেলের আলো পড়ছে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে।
আলম হোসেন সিগারেট ধরিয়ে চুপ করে বসে আছে। স্নান করবে ভেবে এসেছিল। আর ইচ্ছে করেনি। সারাদিন বসেই কেটে গেল। মুখটা কেমন টক টক লাগছে। অ্যাসিড হয়েছে বোধহয়। অ্যাসিড হলে এরকম টক ভাব আসে।
দূরে একজন হেঁটে আসছে। তার দিকে চোখ পড়ায় আলম সিগারেট ফেলে উঠে দাঁড়াল। বিরক্ত মুখে সেদিকে চেয়ে রইল। ঈষৎ হেলে হাঁটা লোকটা সরাসরি আলমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আদাব।’
বিরক্তভাব কিছুতেই যাচ্ছিল না আলমের। সে বলল, ‘এখানে কী মরতেও আসতে দেবে না? কী হয়েছে?’
লোকটা বলল, ‘সিগারেট এনেছি। নেবেন সাহেব?’
আলম বলল, ‘দাও।’
লোকটা সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল। সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে উর্দু লেখা দেখে আলম বালিতে আবার বসে পড়ে বলল, ‘বোস।’
লোকটা আলমের পাশে বসল।
আলম বলল, ‘কোথায় গেছিলে রিয়াজ?’
রিয়াজ বলল, ‘এক জায়গায় গেলে তো বলব। শুরুতে ডাকল করাচীতে। গিয়ে শুনি হুজুর লাহোর চলে গেছেন। আমি ছুটলাম লাহোরে। সেখানেও নেই। তারপর মুজফফরাবাদে গিয়ে দেখা হল।’
আলম প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। সিগারেটে লম্বা টান মেরে বলল, ‘কী আদেশ এল?’
রিয়াজ বলল, ‘আর না ঘুমিয়ে থাকার আদেশ এল।’
আলম মাথা নাড়ল, ‘আচ্ছা। তুমি সমুদ্রে স্নান করবে? সাগর পারে আইসা তোমার মাতাল মাতাল লাগে না?’
রিয়াজ বলল, ‘না। লাগে না। যতক্ষণ আমার ভাইরা কষ্টে আছে, ততদিন আমার কিছুই লাগে না।’
আলম বলল, ‘আহ্। তুমি বড় উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছ। তোমাকে এত উত্তেজিত হতে আমি বলিনি। আমি শুধু বলেছি স্নান করতে ভালো লাগে নাকি?’
রিয়াজ রাগী গলায় বলল, ‘না, লাগে না। আমার কিছুই ভালো লাগে না। তবে মুজফফরাবাদ থেকে আমাকে একটা বিষয়ে জানতে চেয়েছে।’
আলম জোরে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘কী?’
রিয়াজ বলল, ‘সাদিক সেখ কক্সবাজারে একজন জেনানা নিয়ে এসেছিল। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সে কোথায় আছে?’
আলম কয়েক সেকেন্ড থমকে গিয়ে আবার সিগারেটে টান দিয়ে বলল, ‘সেটা আমি কী করে জানব? তুমি জানো না, ওরা এখানে কী হারাম কাজকর্ম করতে আসে?’
রিয়াজ বলল, ‘আমি সব জানি। এও জানি সাদিক আপনার কাছে এসে ওঠে। আপনার বাসায় থাকে। এই এলাকার সব কিছু আপনার নখদর্পণে। তার পরেও সে মেয়ে গুম হয়ে গেল কী করে?’
আলম বলল, ‘জানি না। আমাকে জরুরি কাজে চিটাগাং যেতে হয়েছিল সেদিন। সিসিটিভিতেও কিছুই পাওয়া যায়নি।’
রিয়াজ বলল, ‘সিসিটিভি খারাপ ছিল। তাই না?’
আলম বলল, ‘হ্যাঁ। খারাপ ছিল। ঠিক করা হয়েছে। আর আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, একটা বেশ্যা মারা যাওয়ার জন্য মুজফফরাবাদ এত চিন্তায় পড়ে গেছে কেন?’
রিয়াজ বলল, ‘সেটাও জানতে পারবেন খুব শিগগিরি। তবে এর মধ্যে যদি আপনার কোনও ইনভলভমেন্ট পাওয়া যায়, তাহলে আমি জানি না আপনাকে কুরবানি হওয়া থেকে বাঁচাতে পারব কিনা।’
আলম রেগে গেল, ‘তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছ? তোমার তো সাহস কম না’!
রিয়াজ বলল, ‘আমার সাহস কমই। আমি শুধু আমার কম সাহসের কথাগুলোই আপনাকে বললাম সাহেব। আপনি জানেন, ওরা কী করতে পারে। সাদিক সেখ জেনানার বুকে মাথা গুঁজে পড়ে থাকতে পারে, হুজুর কিন্তু তা করে না। তারা রেগে আছে। সাদিকের উপরে যতটা রেগে আছে, তার থেকে অনেক বেশি আপনার উপর রেগে আছে।’
আলমের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। সে বলল, ‘আমি কিছু জানি না বিশ্বাস করো। আমি চিরকাল হুজুরের পায়ের তলায় পড়ে আছি। আমি কোনও দোষ করব না।’
রিয়াজ বলল, ‘সাদিকের এক নতুন পাখি এসেছে। তাকে চেনেন তো?’
আলম ঘাড় নাড়ল, ‘ন-না...না। আমি চিনি না।’
রিয়াজ ঠান্ডা চোখে আলমের দিকে তাকিয়ে থাকল। আর কিছু বলল না। সমুদ্র থেকে একটা ঝোড়ো হাওয়া আসছে। তা সত্ত্বেও আলম দরদর করে ঘামতে শুরু করল...
রাণার একটা অস্বস্তি হচ্ছে। প্রবল অস্বস্তি। কিন্তু কী হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। বিরক্তিও লাগছে। সে কেন সাদিকের কথা শুনবে? অথচ না শুনে চললেও যে সমস্যা আছে, তা বোঝা যাচ্ছে।
সাদিক বলল, ‘আজ যাইতে পারবেন গৌতমভাই?’
রাণা অবাক হল, ‘আজকেই?’
সাদিক বলল, ‘হ্যাঁ। রাতের ফ্লাইট আছে ভাই। কুয়ালালামপুর। কী আছে কন? প্লেনে উঠবেন। পৌঁছাইবেন, থাকবেন, খাইবেন, খাম নেবেন, চলে আসবেন। আমি ভাবতেছিলাম রুমানভাইরে কমু, তারপর মনে হইলো এইডা ছোট কাজ। আপনার বিসমিল্লাহও হইয়া যাইব।’
রাণা অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘আপনি না সাদিকভাই, শুধু চমক দেন। কাল বললেই পারতেন। তাহলে দোস্তো তৈরি হবার সময় পাইত। আসগররে পাঠায়ে দেন না।’
সাদিকের চোয়াল শক্ত হল। পরক্ষণেই হালকা গলায় জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘আরে না রে ভাই। এক লাইন ইংলিশ বলতে আসগর হাইগা দিবো নে। আমার তো ওই ইংলিশ বলার লোকেরই অভাব। বোঝেন না মিয়াঁ?’
রাণা বলল, ‘ঠিক আছে। আপনি আমার পাসপোর্ট আর ভিসার ব্যবস্থা করে দিন। আমি ঘুরে আসব।’
সাদিক খুশি হয়ে বলল, ‘এই তো চাই। আপনি আমার লগে চলেন। আমার বাসায় থেকে আপনাকে তৈরি করায় দি।’
অমল বলল, ‘দুপুরে যাব তো ভাই। গৌতমভাইরে নিয়েই যাব। আপনি ব্যস্ত হবেন না।’
সাদিক বলল, ‘ব্যস্ত কী আর সাধে হই রে ভাই? একটার পর একটা কাজ যখন তখন চইলা আসে। আমার আর কী দোষ? দোস্তো সবে আইলো, কোথায় দেশ ঘুরামু, তা না, পাঠাইতে হইতাসে। আপনে ফিরে আসেন, আপনেরে নিয়া আমি কক্সবাজার যামু। সাকিনা ক্যান, সাকিনার থিক্যাও ভালো ভালো জিনিস নিয়া যামু।’
সাদিক চোখ মেরে উঠে দাঁড়াল, ‘রুমানভাই, ভাইরে নিয়া চলে আসবেন কিন্তু। খুব দরকার। আজ যাইতেই হইব।’
অমল বলল, ‘আপনি বললেন, সেটা হুকুম। নিশ্চিন্তে যান। আমরা দুপুরের মধ্যে চলে যাব।’
সাদিক বেরিয়ে গেল। অমল চিন্তিত হয়ে বসে পড়ে রাণাকে বলল, ‘তুমি পারবে?’
রাণা বলল, ‘ওর এত ইম্পরট্যান্ট কাজ, আমাকে কী করে বিশ্বাস করছে?’
অমল বলল, ‘বিশ্বাস করছে না। কাজটা এমন, যে তুমি ধরা পড়লে ওর ডিজওন করতে অসুবিধা হবে না। দিস ইজ এ ব্যাড সিচুয়েশন। উস্তাদের সঙ্গে কথা বলে নেবে?’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘না। দরকার নেই। উনি কী বলবেন? সাদিককে যখন দরকার, তখন ওর কাজটা করব।’
অমল বলল, ‘ব্যাপারটা অত সোজা না। কাজ করার মধ্যেও অনেক সমস্যা আছে। জানিয়ে করতে হবে এ কাজ। সাদিক ইজ ভেরি ডিস্টারবিং। পিছনে লেগে আছে এঁটুলির মতো। তুমি ফ্রেশ হয়ে এস। আমি উপরমহলে কন্ট্যাক্ট করি।’
রাণা ফ্রেশ হয়ে এল বাথরুম থেকে।
অমল বলল, ‘সাদিকের কথা শুনে চলার ইন্সট্রাকশান এসেছে তোমার কাছে। যেরকম বলবে, সেরকম করতে হবে।’
রাণা বসল। বলল, ‘ঠিক আছে। আমি তৈরি।’
অমল বলল, ‘জিগশ পাজল দেখেছ? একটা একটা করে জুড়তে হয়। সাদিক একটা একটা করে লিংক জুড়ছে। এখন ওদের ঘুঁটি সাজাতে অসুবিধা হচ্ছে। প্রথমত, কাশ্মীরে কড়াকড়ি অনেক বেড়ে গেছে। ঠিক করে টেরর ফান্ডিং করতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, ডিজিটালাইজেশন বাড়ছে, সিসিটিভির যুগ চলে এসেছে। ওরা ফোনে কন্ট্যাক্ট করতেও ভয় পাচ্ছে। এখন ব্যাক টু ওল্ড এজে চলে গেছে সব। আগেকার দিনে ঘোড়ায় করে খবর দিতে যেত। এখন ধরে নাও সেই প্রচলনটাই আবার শুরু হয়েছে। সাদিক আমাদের ঘোড়া হিসেবে ব্যবহার করছে। যেই মুহূর্তে ওরা আমাদের অরিজিন জানবে, আশা করি বুঝতে পারছ তখন কী হতে পারে!’
রাণা বলল, ‘কিন্তু এসব কাজে এক্সটেনসিভ ব্যাকগ্রাউন্ড চেকিং করে ওরা। আপনি এত বিশ্বস্ত হলেন কী করে?’
অমল বলল, ‘সময় লেগেছে। সেভাবে কভার তৈরি করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে একটাই অ্যাডভান্টেজ ছিল আমার। সাদিকের এ কাজ করার মতো লোক নেই। বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না। ওই বাড়িটা তৈরি করতে প্রতিটা ইট মূল্যবান। তুমি যেমন প্রথমেই ওর কাছে চলে গেছ, আমি পারিনি। সময় লেগেছে। এখন টার্গেটের এত কাছে এসে গেছি, আর রিস্ক নেওয়ার কথা ভাবতে পারছি না।’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। দেখা যাক কী হয়...।’
জাহির হোসেন বসে আছেন ওয়েটিং রুমে। টিভি চলছে। এসির তাপমাত্রা শীতলতম। জাহিরের ঠান্ডা লাগছে। অ্যালার্জি হয়েছে। নাক কুঁচকে হাঁচি আসতে পারে যেকোনও সময়। জাহির এটাই ভয় পাচ্ছেন। একবার হাঁচি দিতে শুরু করলে হাঁচি আসতেই থাকবে। একটার পর একটা হাঁচি শুরু হয়ে যাবে। সেটা যদি ম্যাডামের ঘরে ঢোকার পর শুরু হয়ে যায়, তাহলে বিপদের শেষ থাকবে না।
জাহির প্রাণপণে অন্য কথা ভাবছেন। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট টিম খেলতে এসেছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা আছে। জাহির ভাবছেন, কী কী করলে শ্রীলঙ্কাকে হারানো যেতে পারে। মাথায় অন্য কথা এলে হাঁচিটা ডিরেইল হবার চান্স থাকে।
এত চেষ্টা করেও অবশ্য কোনও লাভ হল না। জাহিরের হাঁচি শুরু হল। ভয়াবহ হাঁচি। একটার পর একটা হয়েই যাচ্ছে। রুমাল বের করলেন। নাক দিয়ে শব্দ আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলেন।
‘আপনি মাস্ক পরে আসেন।’
ম্যাডামের আপ্তসহায়ক এসে দাঁড়িয়েছেন দরজায়। জাহির উঠলেন। মাস্ক পরে নিলেন। হাঁচিটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
ফাইল হাতে জাহির বড় ঘরটায় ঢুকলেন। দেওয়ালে জাতির পিতার ছবি টাঙানো। জাহির কয়েক সেকেন্ড দেখলেন।
‘এস। খুব ব্যস্ত হয়ে এসেছ বুঝতে পারছি। অ্যালার্জির খবর কী তোমার?’ ম্যাডাম সস্নেহে বললেন।
ম্যাডাম বসতে বলেননি, জাহিরের খেয়াল ছিল না। আগে বসে পড়েছিলেন। পরক্ষণেই উঠে দাঁড়ালেন, ‘এক্সট্রিমলি সরি ম্যাডাম, আপনি বসতে বলেননি, তাও বসে পড়লাম।’
ম্যাডাম বললেন, ‘ধুর, তুমি আমার সাথে ফর্মালিটি করছ কেন? বোস বোস। লজ্জা দিও না। কী খবর এনেছ বল।’
জাহির বললেন, ‘ম্যাডাম করিডর থার্টি টু নড়বড় করছে। খবর ভালো না।’
ম্যাডাম চিন্তিতমুখে বললেন, ‘সে কী?’
জাহির বললেন, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম। অনেক অনুপ্রবেশকারী আসছে শোনা যাচ্ছে।’
ম্যাডাম বললেন, ‘পাকিস্তানিই তো? মিডল ইস্ট কিংবা সিরিয়ার লোক না তো?’
জাহির বললেন, ‘না ম্যাডাম। আইসিস আছে, তবে স্লিপার সেল হিসেবে। এখানে আই এস আই-ই অপারেট করে যাচ্ছে। রাজাকার বিরোধী লিস্ট তৈরি করার খবরটাও বেরিয়ে গেছে। কোনও খবরই চাপা থাকছে না আর কী!’
ম্যাডাম বললেন, ‘যা করতে হয় করো। ভোটের অজুহাতে এ হবে আমি জানতাম। কোনটাই ভাবিনি, এমন নয়।’
জাহির বললেন, ‘বিরোধী পক্ষ ভোট চায়। তাদের দিকে পাল্লা ভারি। সেটাও একটা সমস্যা।’
ম্যাডাম বললেন, ‘ভোট চায়, ভোট হবে। চিন্তার কিছু নেই। আমার কথা হল, এসবের অজুহাতে আবার একটা হোলি আরটিজান হবার ঝুঁকি আমি নিতে পারব না।’
জাহির বললেন, ‘লড়াই জারি আছে ম্যাডাম। তাছাড়া আপনার সিকিউরিটিও জোরদার করার ব্যাপারে বলে দিয়েছি।’
ম্যাডাম বললেন, ‘ওসব ভয় পাই না। যার পরিবারের বেশিরভাগ মানুষ রাজাকারদের হাতে মরেছে, সে যখন আবার একই পথে এসেছে, তার অত ভয় মানায় না।’
জাহির বললেন, ‘না ম্যাডাম, থ্রেট আছে। আমি রিস্ক নেব না।’
ম্যাডাম হাল ছেড়ে দিলেন, ‘ঠিক আছে। তুমি তোমার মতো করে এগিয়ে যাও। প্রয়োজনে ব্যাপকহারে ধরপাকড় শুরু করো। র আর কিছু ইনপুট দিয়েছে?’
জাহির বললেন, ‘না। তবে অন্য একটা জায়গা থেকে শুনেছি, র-এর অন্য একটা উইংস এখন এ-দেশে অপারেট করছে। তারা অন্য ধরনের। নিষ্ঠুর টাইপ।’
ম্যাডাম ভ্রু কুঁচকালেন, ‘নিষ্ঠুর টাইপ মানে?’
জাহির বললেন, ‘যেন তেন প্রকারেণ কাজ আদায় করাটাই ওদের লক্ষ্য। এথিকস মানে না। এই ইউনিট নিয়ে ঝামেলা আছে। এরকম কোনও ইউনিট ঢাকায় সক্রিয় হওয়া আমাদের জন্য সুবিধের হবে না।’
ম্যাডাম মাথা নাড়লেন, ‘ইন্ডিয়ার সঙ্গে কথা বলছি। আমরা তো আলোচনার দরজা সব সময় খোলা রেখেছি। এখানে ওদের সমস্যা হবার কথা না। কথা কি?’
জাহির হাসলেন, ‘না ম্যাডাম।’
ম্যাডাম বললেন, ‘নিজের খেয়াল রাখো।’
জাহির ঘাড় নাড়লেন, ‘জি ম্যাম।’
জাহির উঠতে যাচ্ছিলেন, ম্যাডাম বললেন, ‘সাদিক শেখ নামে কাউকে চেন?’
জাহির থমকে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, ‘না ম্যাডাম।’
ম্যাডাম কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওকে। এস। খোদা হাফেজ।’
এহসান খান। রাণার পাসপোর্টের নাম। এই নামে ভিসাও করে দিয়েছে সাদিক। কী করে করেছে সেটা জানা সম্ভব না। তবে দুরুদুরু বক্ষে রাণা আবিষ্কার করল সব মসৃণভাবে হয়ে গেল। প্লেনে বসে সে দেখল পাঁচটা সিট দূরে আসগর বসে আছে। সে অবাক হল। এ কথা তো ছিল না। কথা ছিল কাজ হয়ে গেলে সে ফিরে আসবে। সাদিক আবার আসগরকে পাঠাল কেন?
বিরক্ত মুখে আসগরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। আসগর তার দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করে ঘুমনোর ভান করছে।
রাণার মনে হল, অমল আর সাদিক আসগরের মাধ্যমে তাকে পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করছে না তো? নাহ্, যা হবে দেখা যাবে। বিমান সেবিকাদের ইন্সট্রাকশান অনুযায়ী বেল্ট বেঁধে নিল সে।
প্লেন যখন টেক অফ করল, তখন ঢাকার সময় রাত সাড়ে বারোটা। কুয়ালালামপুর পৌঁছতে বেশ খানিকটা সময় লাগবে। রাণা চোখ বুজল।
ঘুমের মাঝে অবশ্য একবার সে দেখে নিল আসগরও ঘুমোচ্ছে। ঘুমোতে ঘুমোতে পাশের প্যাসেঞ্জারের গায়ে পড়ে যাচ্ছে।
কুয়ালালামপুর পৌঁছতে ভোর হয়ে গেল। পাসপোর্টটা আরেকবার দেখে নিল রাণা। এখানে তো আর ঢাকার পুলিশ নেই! সাদিকের লোকজনও নেই। এখানে ধরা পড়লে সমস্যা হবে। মরতে ভয় পায় না সে, তবে আজীবন কোনও বদ্ধ কুঠুরিতে আটক হয়ে থাকতে তার আপত্তি আছে।
মজার ব্যাপার হল, কুয়ালালামপুরেও কোনও অসুবিধা হল না। ইমিগ্রেশন পেরিয়ে সে দিব্যি এয়ারপোর্টের বাইরে বেরোতে পারল। লাইনে আসগর অনেকটা পেছনে ছিল। আসগর বেরোনোর আগেই সে বেরিয়ে গেল।
সাদিক বলে দিয়েছিল ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে চেক ইন করতে। রাণা একবার ভাবল আসগরের জন্য অপেক্ষা করবে।
পরক্ষণে সে প্ল্যান ক্যান্সেল করল। আসগর যদি তাকে ফলোই করে, তাহলে সাদিকের সেটা তাকে বলা উচিত ছিল। বলেনি যখন, তখন আসগর কী করবে, সেটা দেখার দায়িত্ব তার নয়। তড়িঘড়ি একটা ক্যাবে উঠে বলল, ‘আমাকে কাছাকাছি কোনও একটা পিসিওতে নিয়ে চলো।’
কুয়ালালামপুর আধুনিক শহর। দিনের ব্যস্ততা এখনও শুরু হয়নি। ক্যাব ড্রাইভার একটা পিসিওর সামনে দাঁড়াতে ক্যাব থেকে নেমে লোকটার নাম্বারে ফোন করল সে। রিং হতেই ও-প্রান্ত থেকে ফোন ধরল লোকটা, ‘স্পিকিং।’
রাণা বলল, ‘সাদিক আমাকে কুয়ালালামপুর পাঠিয়েছে।’
‘জানি। অমলের সঙ্গে কথা হয়েছে।’
‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। অমল এত অসংখ্য ব্যাপারে জড়িয়ে আছে, আমাকে ঠিক কোন পথে এগোতে হবে, কত তাড়াতাড়ি সব কিছু জানতে পারব, তার কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘সেটাই স্বাভাবিক। ওখান থেকে কখন বেরোবে?’
‘একটা ঠিকানা দিয়েছে। দুপুরে ওই ঠিকানা থেকে একটা খাম নিয়ে ফিরব। এর মধ্যে সাদিক ওর একটা সাগরেদকে পেছন পেছন পাঠিয়ে দিয়েছে।’
‘ও কি এখনও তোমাকে ফলো করছে? ফোন করতে দেখছে?’
‘না। ওকে কাটিয়ে চলে এসেছি। তবে আমি কোন হোটেলে যাব, ও জানে। আমায় কি এভাবেই এ দেশ সে দেশে ঘুরে বেড়াতে হবে?’
‘তোমার যতক্ষণ না মনে হচ্ছে তুমি প্রস্তুত, ততক্ষণ তাই করতে হবে। আর যেকোনও আনপ্রোটেক্টেড নাম্বার থেকে এভাবে ফোন করার দরকার নেই।’
‘শুনুন শুনুন।’
‘বলো।’
‘মাঝরাতে অমল বেরিয়েছিল। একটা গাড়ি এসেছিল।’
‘ওকে। বাই।’
রাণা বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিল। লোকটা ইচ্ছে করে তাকে এরকম একটা পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। ক্যাবে উঠে বসে সে বিরক্ত গলায় ড্রাইভারকে বলল, ‘হোটেল স্টার ইন্টারন্যাশনাল।’
বস্তি অঞ্চলে হোটেলটা। সরু রাস্তার পাশে স্যাঁতস্যাঁতে একটা ছোট হোটেল।
রিসেপশনে তার পাসপোর্ট দেখাতে ঘরের কার্ড পেয়ে গেল রাণা। ছোট একটা ঘুপচি হোটেল। ঘরগুলো অপরিষ্কার।
বিরক্ত মুখে ঘরে ঢুকে সোফায় বসল সে। দুপুর অবধি অপেক্ষা করতে হবে।
টিভি আছে। বেশ কিছুক্ষণ টিভি দেখল সে। সকাল দশটা নাগাদ ফোনে মেসেজ টোন বেজে উঠল।
ঠিকানা এসেছে। শ্বাস ফেলল সে। যাক, দুপুর অবধি অপেক্ষা করতে হবে না।
হোটেল রুম তালা বন্ধ করে রাস্তায় নামল রাণা। ঠিকানাটা বার্ড পার্কের টিকিট কাউন্টারের দেওয়া হয়েছে।
রোদ উঠছে। তবে আকাশে বেশ খানিকটা মেঘ আছে। বৃষ্টি হতে পারে। রাণা চারদিকে দেখল।
কোনও বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে যদি তাকে নজরে রাখে, তাহলে সেটা দেখা সম্ভব না। রাণা ঠিক করল আসগরকে খুঁজে সময় নষ্ট করবে না।
ইদানীং তার সঙ্গী আগ্নেয়াস্ত্রটিকে বড় মিস করছে রাণা। যন্ত্রটা সঙ্গে না থাকলে নিরাপত্তাহীনতা চলে আসে। সঙ্গে থাকলে মনে হয় সে যা ইচ্ছে করতে পারে। কেউ তাকে আটকাতে পারবে না।
হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাব ড্রাইভারকে জিগ্যেস করল, বার্ড পার্ক যাবে নাকি। ড্রাইভার বলল, গাড়িতে উঠে বসতে। রাণা গাড়িতে উঠে বসল।
তার ফোনে আরেকটা মেসেজ এল। মেসেজে শুধু লেখা, ৩ নাম্বার বেঞ্চ, কোড তাজমহল।
রাণা শ্বাস ছাড়ল। কী কুক্ষণে যে এসব ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল সে।
বস্তি পেরোতেই আবার ঝাঁ চকচকে শহরের রাস্তায় নামল গাড়িটা। কোনও শহরেরই বাইরের রূপ দেখে বোঝা যায় না, সে শহরের বস্তিবাসীরা কীভাবে জীবনধারণ করছে। ঝাঁ চকচকে শহুরে আলোর তলায় ঢাকা পড়ে থাকে এসব অন্ধকারময় রাস্তাগুলো।
রাণার হঠাৎ করে মনে হল, সে যদি এই শহরে হারিয়ে যায়, তাহলে সাদিক বা উস্তাদ কিংবা অমল, কেউই তাকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু সে এখানে বেঁচে থাকবে কী করে? কিচ্ছু চেনে না সে। সাদিক নিশ্চয়ই এর পরে তাকে এমন কোনও শহরে পাঠাবে যেখানে সে অনায়াসে হারিয়ে যেতে পারে।
এরকম কোনও শহরে তাকে গা ঢাকা দিতে হবে। দেশপ্রেমী হোক কিংবা দেশদ্রোহী, এদের ধরার কাজ তার নয়। সে পারবে না। এই দু-তিন দিনেই কেমন অস্বস্তি লাগছে। এরকম জীবন সে চায় না। চায়ওনি কোনওদিন।
বার্ড পার্কের সামনে পৌঁছতে এগারোটা বেজে গেল।
টিকেট কাউন্টারের সামনে পর পর পাঁচটা বসার বেঞ্চ আছে। প্রত্যেকটাতেই নম্বর দেওয়া। রাণা মেসেজটার কথা মাথায় রেখে তিন নম্বর বেঞ্চে বসল। বাকি কোনও বেঞ্চেই কেউ বসেনি। টিকেট কাউন্টারে ট্যুরিস্টদের লাইন শুরু হয়েছে।
প্রায় ছ ফুট লম্বা এক বোরখা পরিহিতা মহিলা তার পাশে এসে বসে বলল, ‘মহল।’
রাণা কোনও কিছু না ভেবেই বলল, ‘তাজমহল।’
মহিলাটি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল। কোনও খাম বা কিছু ফেলে গেল না। রাণা কী করবে বুঝতে না পেরে ফলো করল।
একটা লাল রঙের সেডান দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। মেয়েটা সেটায় উঠে দরজা খোলা রেখে দিয়েছে। কিছু না ভেবে রাণা সেটায় উঠে পড়ল। মেয়েটা প্রায় তার গায়ের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
গাড়ি স্টার্ট হল। রাণা প্রস্তুত ছিল না একবারেই। মেয়েটা হ্যান্ডব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট বোতল বের করে রাণার মুখে কিছু একটা স্প্রে করতেই রাণা জ্ঞান হারাল।
‘উঠো বিসি, টাইম হো গয়া, উঠো।’ চোখে জলের ছিটে দিলে কেউ। রাণা কোনমতে চোখ খুলল।
সামনে অপরিচিত একজন লোক বসে আছে। তার পাশে আসগর।
লোকটা উর্দুতে বলল, ‘অনেক বেশি সাবধানে থাকতে হবে। দু’মিনিটের মধ্যে ধরা পড়ে গেলে তুমি।’
রাণা বলল, ‘আপনি কে?’
লোকটা বলল, ‘বাঃ। যার কাছে এসেছ, তাকেই চেনো না?’
রাণা বলল, ‘আমি জানতাম না আমাকে কার কাছে পাঠানো হয়েছে। আমাকে শুধু বলা হয়েছিল একটা পার্সেল নিয়ে ফেরত যেতে হবে।’
লোকটা আসগরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এসব লোক জোগাড় করে সাদিক?’
আসগর দুলে দুলে হাসছে। বোঝা যাচ্ছে তার বেশ রগড় হয়েছে।
রাণার রাগ হচ্ছিল। যদিও সে শান্ত থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
লোকটা বলল, ‘যাও। ফ্লাইটের টাইম হয়ে গেছে। একটা কাজও যদি ঠিক করে করতে পারে। বুরবক।’
এবারও রাণা নিজেকে সামলাল। কোনওমতে উঠে দাঁড়াল। লোকটা একটা ছোট ব্যাগ বের করে রাণার দিকে এগিয়ে দিল, ‘পাসপোর্ট, টিকেট সব আছে। যাও। আমার একটু দেখার দরকার ছিল সাদিকের লোক কতটা সতর্ক। আমার দেখা হয়ে গেছে।’
রাণা ব্যাগ নিয়ে আসগরের দিকে তাকাল। আসগর অন্য দিকে তাকিয়ে আছে।
রাণা ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল এটা আসলে একটা হোটেল রুম। ঘুম ঘুম ভাব আসছে একটা। না দাঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে হোটেলের বাইরে বেরিয়ে ক্যাবে উঠে বলল, ‘এয়ারপোর্ট।’
গাড়ি চলতে শুরু করলে সে প্রাণপণে নিজেকে সামলাল। ইচ্ছে হচ্ছে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে লোকটাকে উড়িয়ে দেয়। এত সাহস! ওকে টেস্ট করছিল!
মাঝরাতে ঢাকা পৌঁছল সে। অমল দাঁড়িয়ে ছিল এয়ারপোর্টে। গাড়িতে উঠতেই বলল, ‘কী হল?’
রাণা বলল, ‘আমাকে গাড়িতে তুলে বেহুঁশ করে দিয়েছিল। পরে জানা গেল সেটা নাকি আমাকে টেস্ট করার জন্য করেছে। আমার কী করা উচিত এখন?’
অমল হাসল, ‘রাগ হচ্ছে?’
রাণা বলল, ‘সেটা হওয়াই তো স্বাভাবিক। আচমকা অপমান করার অধিকার তো কারো নেই, তাই না?’
অমল বলল, ‘ওদের অনেক অধিকার আছে। যত তাড়াতাড়ি জেনে নিতে পারো, তত ভালো। পার্সেল কোথায়?’
রাণা বলল, ‘আমাকে কিছু দেয়নি তো! আসগরকে দিয়েছে।’
অমল অবাক হয়ে বলল, ‘তোমাকে দেয়নি? উফ্...ওটা তো তোমার কাছেই থাকার কথা ছিল! এই পার্সেলেই তো সব শহরগুলোর মধ্যে লিংকের কাজ করত।’
রাণা বলল, ‘আমায় অজ্ঞান করে দিয়েছিল। জ্ঞান ফিরতে ব্যাগ ধরিয়ে দিল...’ বলতে বলতে টনক নড়ল রাণার। তড়িঘড়ি হ্যান্ডব্যাগ বের করল। একটু ঘাঁটতেই একটা খাম পাওয়া গেল। বলল, ‘পেয়েছি।’
অমল খুশি হল, ‘গুড। দাঁড়াও।’
রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল অমল। খামটা হাতে নিয়ে সন্তর্পণে খুলল।
জোরে জোরে পড়ল, ‘মার্ক সেভেন ফাইভ ডট।’
তারপর সেটা বার বার আওড়াতে থাকল, ‘মার্ক সেভেন ফাইভ ডট...মার্ক সেভেন ফাইভ ডট।’
রাণা অবাক হয়ে বলল, ‘এটা কী?’
অমল বলল, ‘কোড। এখন মুখস্ত করে নিই। বাড়ি গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ডিকোড করব। দাঁড়াও। খামটা আবার আগের মতো করে দি।’ অত্যন্ত সন্তর্পণে খামটা বন্ধ করল অমল।
রাণা বলল, ‘মালয়েশিয়ায় কে থাকে? আমি একদিন না একদিন ওর হিসেব করব। আমাকে অজ্ঞান করবে কেন?’
অমল বলল, ‘হিসেব সবার হবে রাণা। তার জন্য সঠিক সময় আসবে। আপাতত জেনে রাখো মালয়েশিয়ায় তোমার সঙ্গে যার দেখা হয়েছিল, তার নাম জামিল পাশা। ইন্ডিয়ার মোস্ট ওয়ান্টেড টেরোরিস্ট। বেশ কয়েকটা ব্লাস্টে অভিযুক্তের তালিকায় ওর নাম আছে। সাদিক জামিলের কাছে শিশু। ভুল বললাম। শিশু বললেও কম বলা হবে। জামিল হিউম্যান ট্রাফিকিঙে যুক্ত। শিশু হোক, মেয়ে হোক, ওর কোনও মায়া-দয়া নেই।’
রাণা জানলার বাইরে তাকাল। এতদিন এ ধরনের লোককে সে না জেনে মারত। এখন সব জানার পর মনে হচ্ছে কবে মারতে পারবে...!
ঢাকা ব়্যাব দফতর
নির্মল সরকার কম্পিউটারে গেম খেলছে। ফোন বাজল। ধরতেই গলা ভেসে এল, ‘আমার চেম্বারে এস।’
নির্মল গেম বন্ধ করে তাড়াতাড়ি আনোয়ার আলির চেম্বারে গিয়ে নক করল।
আনোয়ার বললেন, ‘এস।’
নির্মল চেম্বারে ঢুকল। আনোয়ার বললেন, ‘কক্সবাজারে একটা লাশ পাওয়া গেছে। আলম হোসেন নাম।’
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ স্যার শুনেছি।’
আনোয়ার বললেন, ‘যে বুলেটটা ইউজ হয়েছে, সেটা মামুলি বুলেট না। এ দেশের ছোটখাটো গ্যাংস্টারদের পক্ষে এ রিভলভার ইউজ করা সম্ভব না। অটোমেটিক জিনিস। সাইলেন্সার আছে। বুঝলে?’
নির্মল বলল, ‘নরওয়ের একটা মডেল আছে স্যার। ওটা ইউজ করেছে তার মানে।’
আনোয়ার মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ, তাই দাঁড়ায় বটে। তা তুমি আমাকে একটা কথা বলো, এই আলম কত বড় গ্যাংস্টার ছিল যে তাকে মারতে এত দামি রিভলভার ইউজ করা হল?’
নির্মল বলল, ‘ছোটখাটো কাজ করত স্যার। লোকাল লোক। মূলত টেক্সটাইলের ব্যবসা করত।’
আনোয়ার বললেন, ‘সেটা তো পানির উপরিভাগ। তলদেশে কী আছে, সেটাও তো দেখতে হবে। রেকর্ড ক্লিন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু হতে পারে সে গভীর পানির মাছ।’
নির্মল বলল, ‘ঠিক স্যার। আমাকে কী করতে বলছেন স্যার?’
আনোয়ার বললেন, ‘ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে যাতায়াত করা গাড়িগুলোর ডিটেলস বের করে ফেলো, আলমের বংশলতিকা। কতক্ষণ লাগবে?’
নির্মল বলল, ‘একদিন।’
আনোয়ার মাথা নাড়লেন, ‘না। একদিন না। বহিঃশত্রুর আক্রমণের কেস যদি হয়, তবে আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। উই হ্যাভ টু অ্যাক্ট অ্যাজ আরলি অ্যাজ পসিবল।’
নির্মল বলল, ‘ওকে স্যার।’
আনোয়ারের চেম্বার থেকে ব্যাজার মুখে বেরোল সে। আজ তাদের ম্যারেজ অ্যানিভারসারি ছিল। দীপা বসে থাকবে। দীপাকে ফোন করতে ইচ্ছে করছে না এখন। ফোন করলেই গম্ভীর হয়ে যাবে। ওর মুড অফ হয়ে যাবে। দীপার মুড অফ হলে মাথা ধরে যায়, সে আরেক সমস্যা।
আইটি ডিপার্টমেন্টে ফোন করে সিসিটিভি ফুটেজ আনাল সে। কাজ করতে করতেই অবশ্য অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল নির্মল। দীপাকে না জানালেও সমস্যা হতে পারে। তৈরি হয়ে বসে থাকবে।
দীপার কথা ভাবতে ভাবতে একটা সময় ফুটেজে মগ্ন হয়ে গেল সে। ঢাকা ‘ভ ৩৪১২’ নম্বরের একটা গাড়ি সৈকতের বাইরের রাস্তায় ভোরবেলা ঘোরাফেরা করছে। এইটুকুই দেখা যাচ্ছে। ভেহিকেলসে নাম্বারটা পাঠিয়ে দিল নির্মল।
আলমের ফোন রেকর্ড বের করল সে। তেমন কিছুই নেই।
‘স্যার, খুব কম ফোন করত আলম। আজকালকার দিনে কেউ এত কম ফোন করে নাকি কে জানে!’
‘বিদেশে ফোন গেছিল?’
‘না। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় ও স্যাটেলাইট ফোন ইউজ করত।’
অবাক হয়ে আনোয়ার বললেন, ‘বলো কী? এটুকু ব্যবসায়ী, সে স্যাটেলাইট ফোন ইউজ করতে যাবে কেন? ওসব কারা ইউজ করে জানো তো?’
নির্মল বলল, ‘স্যার যাকে খুন করতে বিদেশি বুলেট ব্যবহার হয়, সে চোখের আড়ালে অনেক কিছুই করতে পারে। এতে তো অবাক হবার মতো কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না।’
আনোয়ার চিন্তিতমুখে নির্মলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গন্ধটা সন্দেহজনক মনে হচ্ছে তোমার?’
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। তদন্ত শুরু করা উচিত। একে সুবিধার লাগছে না।’
আনোয়ার বললেন, ‘কী করতে বলছ তুমি?’
নির্মল বলল, ‘লোকাল থানা আপাতত ওর পরিচিতদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমরা যদি সন্দেহজনক কিছু দেখি, তখন তাদের তুলে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা ঠিক হবে।’
আনোয়ার বললেন, ‘তাই করো। দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।’
নির্মল বলল, ‘ওকে স্যার।’
আনোয়ার সাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে নির্মল দীপাকে ফোন করল। দীপা ফোন রিসিভ করল না।
নির্মল ঠোঁট কামড়ে আবার তার ডেস্কে গিয়ে বসল। আজ রাতে আর তার বাসায় ফেরা হবে না। অনেক ভেবে দীপাকে মেসেজ করেই দিল সে।
আলমগির একটু দূরে বসে ছিলেন। নির্মলকে দেখে বললেন, ‘কী হল? টেন্সড মনে হচ্ছে?’
নির্মল লাজুক হাসল, ‘দাম্পত্য কলহ।’
আলমগির বললেন, ‘স্বাভাবিক, ছুটি নেওয়া হয় না। এ তো হবেই। বেশ কয়েকটা সন্ত্রাসীকে টার্গেটে রেখেছি আমরা। সব ক’টা না ধরলে ছুটিও পাবে না।’ কপট দুঃখ দেখিয়ে হাসলেন আলমগির।
‘আমি মাফ চাইতাসি ভাই। আমি বুঝি নাই জামিলভাই রাইগা যাইব।’
সাদিক যেভাবে তাকে কথাটা বলল, তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে বিন্দুমাত্র দুঃখিত নয়। রাণা বলল, ‘ঠিক আছে। আপনি কী করবেন?’
আসগরকে ডাকল সাদিক। লোক দেখানো বকাবকি শুরু করে দিল। আসগর চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক মিনিট পরে সাদিক বলল, ‘ভাইজান, আজ বিশ্রাম করেন, সারাদিন আমি আর জ্বালামু না। আর কিছু টেকা রাখেন।’
একটা মোটা খাম রাণার দিকে এগিয়ে দিল সাদিক। রাণা খামটা নিল।
সাদিক বলল, ‘বোঝেনই তো মিয়াঁ, আমাগো কামে বিশ্বস্ত লোকের দরকার হয়। আপনার তো তাও ভালো। আসগররে জামালভাই যা করসিলো, তা যদি আপনারে বলি, আপনি তো হয়রান হইয়া যাইবেন। ইলেকট্রিক শক দিসিল ভাই।’
শরীর দুলিয়ে হেসে উঠল সাদিক।
অমল বলল, ‘ভাই আমরা তাহলে উঠি। অনেক রাত হয়েছে।’
সাদিক ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘সে কী ভাই, খাইয়া যাইবেন না? খাইয়া যান। না খাইলে এত রাতে কোথায় খাবার পাইবেন? এই আসগর, তোর ভাবিরে বল বিরানি গরম করতে। খাইয়া না গেলে হয় কন? চলেন, টেবিলে চলেন।’
অমল বলল সে খেয়ে এসেছে। সাদিক জোর করে রাণাকে নিয়ে গেল। বিরিয়ানি বিন্দুমাত্র গরম করে দেয়নি। ফ্রিজ থেকে বেরোনো ঠান্ডা বিরিয়ানি। রাণা খানিকটা খেয়ে ফেলতে যেতেই সাদিক বলল, ‘খাইয়া নেন ভাই। খাবার ফেলাইতে নাই।’
রাণার অস্বস্তি লাগছিল। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল সে। বেসিনে মুখ ধুতে ধুতে দেখল সাদিক তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বলল, ‘ভাই, সিক্রেট কামে বাইরে যাইতাসেন। মাইয়া ছেলে দেখলেন, পিছন পিছন চইলা গেলেন, এভাবে কী হইব? শেখেন, ভালো কইরা কাম শেখেন।’
রাণার মাথা গরম হচ্ছিল। সে কিছু বলল না। সাদিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অমলের গাড়িতে উঠে সে রাগে ফেটে পড়ল, ‘আপনি ইচ্ছে করে আমাকে এখানে পাঠিয়েছিলেন, তাই না? আমাকে হ্যারাস করতে?’
অমল অবাক হল, ‘সে কী? কেন?’
রাণা বলল, ‘সেটা আমি কী করে জানবো? আপনি ওকে বলে দিতে পারতেন আমি যাব না।’
অমল বলল, ‘আমি তো চেষ্টা করেছিলাম। তুমি দেখেছিলে!’
রাণা গুম হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘আপনি আমায় একটা কিছু জোগাড় করে দিন। সাদিককে আমি উড়িয়ে দেব। ওকে দেখলে আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।’
অমল হেসে ফেলল, ‘আরে, এটা কি এত সোজা কোনও ব্যাপার? সাদিক কত বড় মাছ, সে খেয়াল আছে? মাথা গরম করলে এ কাজ কিন্তু ভীষণ কঠিন হয়ে যাবে।’
রাণা বলল, ‘ও আমাকে টার্গেট করেছে। এমনভাবে ট্রিট করছে আমি যেন ওর বাবার চাকর।’
অমল বলল, ‘সেটা তো ভালো। তার মানে ও তোমাকে বিশ্বস্ত ভাবছে। ওর সবথেকে কাছের চামচা আসগর। ওকে ও এতো বিশ্বাস করে যে যা ইচ্ছে তাই বলতে পারে, তুমিও সেরকম হয়ে যাচ্ছ।’
রাতের ঢাকা শহরে অমল গাড়ি চালাচ্ছিল। রাণা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বলল, ‘আমি এভাবে পারব না। আমার সমস্যা হয়। আসগর কোথায় থাকে? আমি আসগরকে ওড়াব। শুয়োরটা সব জেনে আমাকে ওই সিচুয়েশনে ফেলেছিল।’
অমল ব্রেক চেপে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল। ঝাঁকুনি খেলো রাণা। অমল বলল, ‘তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?’
রাণা বলল, ‘মাথা খারাপ হয়নি। আমি এভাবেই কাজ করি। আসগরকে এই মুহূর্তে না ওড়াতে পারলে আমি কনসেনট্রেট করতে পারব না। আপনি জানেন ও কোথায় থাকে?’
অমল বলল, ‘আজ হয়তো সাদিকের বাড়িতেই থাকবে। কাল পুরান ঢাকায় যেতে পারে।’
রাণা বলল, ‘আপনি লোকেশন কনফার্ম করুন। আমি ওকে ওড়াব।’
অমল রাস্তার দিকে মুখ করে কিছুক্ষণ বসে রইল।
রাণা অধৈর্য হয়ে বলল, ‘কী হল?’
অমল বলল, ‘ঠিক আছে। আসগরকে ওড়াতে পারো, তবে সাদিক জানলে কিন্তু তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে না।’
রাণা বলল, ‘সেটা আমার উপর ছেড়ে দিন। আপনি ওকে লোকেট করুন।’
অমল মাথা চুলকোতে চুলকোতে হেসে ফেলল, ‘আচ্ছা পাগল পাঠিয়েছে তো উস্তাদ। বলে না মারলে কনসেনট্রেট করতে পারবে না। ঠিক আছে। দেখা যাক।’
ফ্ল্যাটে পৌঁছে অমল ঘড়ি দেখল, ‘সাড়ে তিনটে। তোমার যন্তরের ব্যবস্থা করি। তুমি রেস্ট নেবে, না যাবে?’
রাণা বলল, ‘যাব।’
অমল ফোন বের করল, ‘হ্যাঁ, আমি এসেছি।’
ফোন কেটে বলল, ‘চলো।’
দুজনে নামল। ফ্ল্যাটের উল্টোদিকে একটা বাইক দাঁড়িয়ে আছে। অমল সন্তর্পণে চারদিক দেখে বাইক আরোহীকে বলল, ‘আনসস?’
‘হ ভাই। এই যে।’
কাপড়ে মুড়িয়ে একটা রিভলভার অমলের হাতে তুলে দিল লোকটা। অমল সেটা নিয়ে বলল, ‘তুই যা। কাল আমারে খবর দিবি আসগর কোই আছে। ঠিক আছে?’
‘জি ভাই।’
ফ্ল্যাটে এসে অমল রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি আরেকবার ভেবে নাও। দরকার হলে উস্তাদের সঙ্গে কথা বলে নাও।’
রাণা বলল, ‘এই ব্যাপারে আমি কারো সঙ্গে কথা বলব না।’
অমল কালো কাপড়ে মোড়া রিভলভারটা টেবিলে রেখে বসে রইল। মেসেজ টোন বাজল তার ফোনে। বলল, ‘আসগর বেরিয়েছে। মগবাজারের ফ্ল্যাটে যাচ্ছে সম্ভবত।’
রাণা বলল, ‘তাহলে এখনই যাব।’
অমল রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভোর হয়ে যাবে তো?’
রাণা বলল, ‘চলুন।’
অমল কাঁধ ঝাকালো ‘অ্যাজ ইউ উইশ। চল।’
গাড়িতে উঠে অমল তার ফোনটা গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রেখে বলল, ‘লাইভ লোকেশন আছে। চল।’
গাড়ি স্টার্ট করল অমল। রাণার মাথা গরম হয়ে আছে।
ঠিক এটাই হয় তার। একটা সময়ের পরে কাউকে না মারলে শান্তি হয় না। সাদিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে ট্রিগারড হয়ে আছে।
ড্রাইভ করতে করতে অমল ফোন করল কাউকে, ‘একা আছে? মগবাজারে যাচ্ছে তো? ঠিক আছে। আমি ওর বিল্ডিং-এ যাচ্ছি।’
ফোন রেখে অমল বলল, ‘সিসিটিভি নেই ও রাস্তায়। এটা বাঁচোয়া।’
রাণা চুপ করে বসে রইল।
বিল্ডিং-এর সামনে এসে গাড়ি দাঁড় করাল অমল। ফোনে কথা বলে বলল, ‘ফ্ল্যাটে ঢুকে গেছে। আমি গাড়ি রাখছি। চলো।’
গাড়ি রাস্তায় রেখে অমল বলল, ‘ইয়াসমিন অ্যাপার্টমেন্ট। হ্যাঁ। এই বিল্ডিংটাই। থার্ড ফ্লোর। চলো।’
রাণা বলল, ‘আপনি গাড়িতে থাকুন। ফ্ল্যাট নাম্বার বলুন শুধু।’
অমল বলল, ‘পারবে?’
রাণা বলল, ‘একাই করি এসব। নাম্বার?’
অমল হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, ‘থ্রি এ। মাস্ক পরো। এই নাও।’
রাণা মাস্ক পরে নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। সিকিউরিটি তাকে দেখে চিৎকার করতে গেল, রাণা তার মাথায় রিভলভারের বাট দিয়ে মারল। একটা ছোট শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেল সে।
রাণা সিঁড়িতে উঠল। তার মাথায় রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। তিন তলায় উঠে ফ্ল্যাটের নাম্বার দেখল সে। থ্রি এ দেখে কলিং বেল টিপল। দরজা খুলল না। রাণা আবার কলিং বেল টিপল।
হালকা শব্দ করে দরজা খুলল এবার। বিরক্ত গলায় আসগর বলল, ‘কোন হালার পু...’
কথা শেষ করতে পারল না আসগর। গুলি তার দু’চোখের মাঝের অংশের নিখুঁত জায়গায় গিয়ে লাগল। সাইলেন্ট রিভলভার বিন্দুমাত্র শব্দ করল না। আসগর লুটিয়ে পড়ল মেঝেয়। রাণা চুপ করে কয়েক সেকেন্ড সেদিকে তাকিয়ে থেকে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। সিকিউরিটির লোকটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে সে ‘সরি’ বলে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। অমল গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রেখেছিল। রাণা ওঠামাত্র সে অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিল।
রাণা চুপ করে গাড়িতে বসে আছে। অমল বলল, ‘কমপ্লিট?’
রাণা বলল, ‘হু।’
অমল বলল, ‘আশা করব, সাদিক আমাদের ফলো করবে না। করলে...’
রাণা বলল, ‘গুষ্টিসুদ্ধ উড়িয়ে দেব। ভয় পাবেন না।’
অমল আর কোনও কথা বলল না। চুপ করে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল।
‘তোমার মাথা ঠান্ডা হয়েছে?’
ফ্ল্যাটে পৌঁছে প্রথম কথা বলল অমল।
রাণা বলল, ‘স্নান সেরে এসে বলছি।’
অমল হাসল, ‘যাও।’
সময় নিয়ে স্নান করল রাণা। এই সময়টা মাথা ঠান্ডা করার সময়। এরপর ঘুমোতে হবে। অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমোনোর পর তার জীবন রিস্টার্ট হবে। আসগরের দু’চোখের মাঝখানে গুলিটা চালানোর বড্ড দরকার ছিল। সব থেকে ভালো হতো সাদিককে ওড়াতে পারলে। স্নান করতে করতেই লোকটার কথা মনে করার চেষ্টা করছিল সে।
লোকটা বলেছিল, অমল বিগড়েছে। অমল ঠিক কী বিগড়েছে? অস্পষ্ট কথা বলে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। কোনও একটা উদাহরণ দিয়ে বলা উচিত ছিল। সাকিনা কি জানবে? সাকিনার কাছে যাওয়াটা সম্ভব না। সাদিক সন্দেহ করবে।
ভাবতে ভালোও লাগছে না। আবার না ভাবলে হচ্ছেও না।
স্নান সেরে বেরিয়ে রাণা বলল, ‘আমি ঘুমোব।’
অমল বলল, ‘সাদিক ফোন করেছিল। আসগরের ব্যাপারটা বলল। আসগর একটা সময় ছিনতাইবাজদের দলে ছিল। সাদিক ওদের সন্দেহ করছে। আজ রাতের মধ্যে ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটা ছিনতাইবাজের খবর হবার চান্স আছে। সো গুড জব।’
অমল হাসল। রাণা বলল, ‘আসগরের রিপ্লেসমেন্ট কাকে নেবে সাদিক?’
অমল বলল, ‘ওর কী লোকের অভাব আছে? কেউ না কেউ হয়ে যাবে। ওরাও জানে এ লাইনে লোক তৈরি করে নিতে হয়। যেভাবে তোমাকে তৈরি করতে চাইছে। একবার এ লাইনে ঢুকে গেলে কেউ আর ফিরতে পারে না। সাদিকদের মতো লোকেরা সমাজের জঞ্জাল।’
রাণা বলল, ‘আমি ঘুমোই। সাদিক আজকে ফোন করবে না বলেছিল। আমাকে ডাকলে বলবেন, ঘুমোচ্ছে।’
অমল বলল, ‘ঠিক আছে।’
রাণা তার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। এই ঘুমটার জন্য তাকে কোনদিন নিজেকে সাধ্যসাধনা করতে হয়নি। কাজ শেষে ঘুমটা ভীষণ দরকার।
বেলা বারোটা নাগাদ রাণা উঠে বসল। আসগর যেভাবে তার পেছন পেছন যায়, দুঃস্বপ্নেও সেভাবেই এসেছিল। শুধু তার দুই ভ্রু-র মাঝে বুলেট বসে আছে। শরীর থেকে রক্ত বয়ে চলেছে। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জলের বোতল নিয়ে জল খেল। অমল টিভি দেখছে। বলল, ‘নিউজ চ্যানেলে আসগরকে দেখাচ্ছে। হাই ফাই ব্যাপার হয়ে গেছে।’
রাণা টিভির সামনে বসল। রাস্তায় অবরোধ হচ্ছে। ‘বিশিষ্ট সমাজসেবী’ আসগর মিয়াঁর খুনের ঘটনায় শোকের আবহ। সে হেসে ফেলল। অমল চিন্তিত গলায় বলল, ‘হেড অফিস বিরক্ত হয়েছে। আসগরকে সরানোর ফলে সাদিক যদি ব্যাকফুটে চলে যায়, তাহলে সমস্যা হতে পারে।’
রাণা বলল, ‘আপনার কী মনে হয়? সাদিক অপারেশন শিফট করবে?’
অমল বলল, ‘জানি না। তবে সাদিকের বাড়ি যাওয়া দরকার। আমরা এখানে বসে থাকলে ওর সন্দেহ হতে পারে। শোকের আবহ, চুপ করে গিয়ে বসে থাকলে ভালো হয়।’
রাণা বলল, ‘গেলে যদি আবার নতুন কাজ দিয়ে দেয়?’
অমল বলল, ‘সেটা না গেলেও দিতে পারে। কাজের সঙ্গে ওদের কোনও খাতির নেই। কী করবে? যাবে?’
রাণা বলল, ‘চলুন।’
অমল বলল, ‘খেয়ে নিই চলো।’
খেয়ে নিয়ে দুজনে বেরোল।
সাদিকের বাড়ি পৌঁছে দেখল পরিবেশ থমথমে। সাদিক পান খাচ্ছিল মুখ লাল করে। তাদের দেখে জড়ানো গলায় বলল, ‘বসেন মিয়াঁ। খানকির পুলাগুলানরে পাইলে আমি কুত্তার মতো মারব। আসগর ছিল আমার ডান হাত, আসলে ছোট ভাইয়ের থেকেও বেশি।’
রাণা শান্ত মুখে বসল। অমল বলল, ‘আসগরকে মারলো কেন সাদিকভাই?’
সাদিক বলল, ‘শালার টাকার লোভ তো কম না ভাই। আমার লগে কাজ করত, আবার অন্যদিকেও তো সব কাম ছাড়ে নাই। সাউগার ভাই সোহেলের লগে কাম করত। কক্সবাজার গেসে। ওইডারে আনানোর ব্যবস্থা করসি। সব বাইর হইব। আপনি খালি দেইখা যান।’
অমল বলল, ‘আপনার তো সমস্যা হয়ে গেল ভাই। আসগর না থাকলে এত কাজ করবেন কী করে?’
সাদিক বলল, ‘না সে ঠিক আছে। কাসেম আছে। ওরে দিয়াই কাম চালাইতে হইব। আমার চিন্তা অন্য মিয়াঁ। আসগরের কাছে আমাগো পাসপোর্টগুলান ছিল। কাল গৌতমভাই যে পাসপোর্টে গেছিল, সেটাও ওর কাছে ছিল। পুলিশ এখন ঘর তল্লাশি করতে গিয়া ওইগুলান পাইলে বিপদ। আসগর কোই রাখতো সেসব, আমি তো জানি না।’
অমল বলল, ‘সেরকম হলে আমাদের গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে ভাই। আর তো কিছু করার নেই।’
সাদিক বলল, ‘এখন যা কাম চলে, তাতে আপনার কি মনে হয় আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকলে হইবে? আমি তো ভাবতাসিলাম গৌতমভাইরে কাল কলম্বো পাঠামু, গেল সেসব প্ল্যান!’
অমল বলল, ‘ঠিক আছে। মাথা ঠান্ডা করেন ভাই। এক দুটো দিন যেতে দিন। আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’
সাদিকের ফোন বেজে উঠল। সাদিক ফোন তুলে উত্তেজিতভাবে ঘরের বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বলল, ‘সোহেল কিছু জানে না। বলে ওর লগে আসগরের তো কোনও ঝামেলাই নাই। উল্টে আসগরের লগে ওর ইন্ডিয়া যাবার কথা ছিল। না ভাই, আমারও মনে হইতাসিলো, সোহেল আসগররে মারবে না।’
অমল বলল, ‘তাহলে কে মারবে?’
সাদিক গম্ভীর মুখে বসে রইল, ‘কম পাপ তো করে নাই। কোথায় কী কইরা রাখসে সেটা দেখতে হইব। বেশিদিন লাগব না, বাইরাইয়া যাইব। আমারে কলম্বো ম্যানেজ করতে হইব ভাই, নইলে দুঃখ আছে। যদি পুলিশ পাসপোর্ট না পাইয়া থাকে, তাইলে গৌতমভাইরে কাল যাইতে হইব। আর যদি পাইয়া থাকে তাহলে তার ব্যবস্থা কী, দেখি। আপনি যাইতে পারবেন রুমানভাই?’
অমল বলল, ‘হ্যাঁ। কেন পারব না?’
সাদিক চিন্তিতমুখে রাণার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘কেমন বাজে ব্যাপার বলেন গৌতমভাই। ছেলেটা কাল গেল, রাতে ফিরাই খুন হইয়া গেল। যে খানকির পুত এইটা করসে, সে জানে না কী করসে। ঠিক আছে। দেখা যাইব, ছাড় সে পাবে না।’
রাণা বলল, ‘ছাড়া উচিতও না। আসগরই আমাকে প্রথম সাকিনার কাছে নিয়ে গেছিল।’
সাদিক খুশি হল, ‘ও মিয়াঁ, আপনার দেখি আবার সাকিনার কথা মনে পইড়া গেল। আবার যাইতে ইচ্ছা করে নাকি?’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘না, না। সেরকম কিছু না।’
সাদিক বলল, ‘আমি তো বুঝছি। আপনার রক্ত গরম মিয়াঁ। কখন যাইবেন বলেন, আমি ব্যবস্থা কইরা দিমু নে।’
রাণা বলল, ‘না না ভাই, এখন এখানে এই অবস্থা, এই পরিস্থিতিতে ওসব থাক।’
সাদিকের ফোন বাজছিল আবার। সাদিক ফোন ধরল, ‘জি মিয়াঁ, জি, হ, ঠিক আসে। আচ্ছা। ঠিক আছে।’
ফোন রেখে সাদিক বলল, ‘অগো বিল্ডিং-এর সিকিউরিটির জ্ঞান ফিরসে। সে বলতাসে লোকটারে দেখতে পায় নাই। মুখোশ পইরা ছিল। হালার পুত। আসগররে ওই ফ্ল্যাট কিইনা দেওয়াই আমার ঠিক হয় নাই। কত দাম জানেন ওই ফ্ল্যাটের? তার দিয়া ও যদি এইখানে থাকতো, সেইটাই ভালো হইত।’
কাসেম এসে দাঁড়াল। সাদিক বলল, ‘কী হইল?’
কাসেম বলল, ‘পুলিশ আইসে।’
সাদিক তাদের দিকে তাকাল, ‘দ্যাখসেন মিয়াঁ, এবার ওগোও খাওন লাগব। আপনারা বসেন। আমি দেইখা আসি।’
সাদিক উঠে গেল।
অমল বলল, ‘সাদিক প্রবল চাপে পড়ে গেছে দেখছি।’
রাণা বলল, ‘ওকে আসগরের কাছে না পাঠানো পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না।’
অমল হেসে ফেলল, ‘এত মাথা গরম তোমার?’
রাণা বলল, ‘কাসেম কোথায় থাকে?’
অমল রাণার দিকে হাঁ করে তাকাল, ‘কাসেমের সঙ্গে তো তোমার ঝামেলা নেই?’
রাণা বলল, ‘আমার সাদিককে দেখলেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে।’
অমল বলল, ‘ঠিক আছে। ফিরে আমরা এটা নিয়ে কথা বলছি। দরকার হলে তোমার সঙ্গে উস্তাদের কথা বলিয়ে দিচ্ছি।’
আধঘণ্টা ধরে পুলিশ সাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করল। সাদিক এসে গুম হয়ে বসে রইল। অমল বলল, ‘কী বলছে পুলিশ?’
সাদিক বলল, ‘আমার কাছে কাজ করত, কাল এতো রাতে ফিরেছে কেন, এসব। আমি কেন আসগরের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে কাজে রাখি নাই, খাওয়াতে হইব। বোঝেন না? খাইতে চায়। এদের হাঁ অনেক বড় রে ভাই। ছোট কিছুতে এদের পেট ভরবে না।’
অমল বলল, ‘মিনিস্ট্রি লেভেলে আপনার পরিচিতি আছে না?’
সাদিক বলল, ‘পুঁটি মাছে কাজ হইলে ভাই রুই-কাতলা লাগে না। সব সময় বড় মানুষদের বিরক্ত করার কি দরকার আছে? কী বলেন গৌতম ভাই?’
রাণা মাথা নাড়ল, ‘না। দরকার নেই।’
সাদিক বলল, ‘একটাই ভালো খবর আছে মিয়াঁ, ওরা পাসপোর্টের খবর পায় নাই।’
রাণা বলল, ‘কিংবা আপনাকে বলেনি।’
সাদিক চোখ ছোট ছোট করে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা তো আপনি ভালো কথা বলছেন ভাই। অনেক ভালো কথা বলছেন। আপনার বুদ্ধি আছে। এই জন্যই আপনারে আমার পছন্দ, বুঝছেন মিয়াঁ?’
অমল বলল, ‘রিস্ক নেওয়ার দরকার নেই। আপনি চাইলে আমি কলম্বো চলে যাব।’
সাদিক বলল, ‘আমি রাতে বলতাছি ভাই। কলম্বোর সিগনাল এতক্ষণ গ্রিন ছিল, এখন লাল হইয়া গেছে। আসগরের খবর সব জায়গায় চলে গেছে।’
অমল ঘাড় নাড়ল, ‘জি।’
সাদিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অমল থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাণা বলল, ‘কী হল?’
অমল বলল, ‘একবার লতিফ চৌধুরীর বাড়ি হয়ে যাই। আমার কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। নাহ্, ঘুরেই আসি, চলো।’
পূর্বের কথা
‘হরি, ও হরি!’
মিনু চিৎকার করে ডাকল। হরি ছুটছিল বাড়ির সামনে। মা’র ডাক শুনে দৌড়ে এল। মিনু ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করতে যাচ্ছিল। হরি তাড়াতাড়ি ঘরে সেঁধিয়ে গেল।
গজগজ করতে লাগল মিনু, ‘কাম নাই কাজ নাই, সারাদিন খালি খেইলা যাইতাসে। তর বাপ আসুক। তরে দেখাব কেমন লাগে।’
হরি কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, ‘মা, কারা আইতাসে। কত লোক।’
মিনু বলল, ‘কারা আসে?’
হরি বলল, ‘মনে হয় পাকিস্তানি সেনা। অনেক লোক নিয়া আইতাসে।’
মিনুর মুখ শুকিয়ে গেল। সে বলল, ‘গ্রামে ঢুকসে?’
হরি ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ, ঢুকসে। আমি দেখলাম সব মসজিদে ভিড় করসে।’
মিনু তড়িঘড়ি ঘরের বাইরে বেরিয়ে গিয়ে কাপড় চোপড় তুলে ঘরের মধ্যে নিয়ে এসে বাইরে থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে জানলা দরজা সব বন্ধ করে দিল।
হরি কেঁদে ফেলল, ‘ওরা কি মাইরা ফেলব মা?’
মিনুর বুক ধড়ফড় করছিল। বলল, ‘চুপ থাক। শব্দ করবি না। ওরা যেন ভাইবা লয়, আমরা এখানে নাই।’
হরি বলল, ‘ঠিক আছে।’
মিনিট দুয়েক পরে হরি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল।
মিনু ভয় পেল, ভাবল আতঙ্কে ছেলে পাগল হয়ে গেল কি না। বলল, ‘কী হইল?’
হরি বলল, ‘মজা করসি। কেউ আসে নাই।’
মিনু হরির পিঠে দুম দুম করে কিল মারল। ‘মজা করার বিষয় এইডা?’
হরি তাও হেসে যাচ্ছে খিল খিল করে। মিনু বিরক্ত হয়ে উঠল। আবার দরজা খুলে দিল। কাপড় মেলতে মেলতে বলল, ‘তর বাপ আসুক। মজা দেখাব নে, বুঝবি কারে মজা কয়।’
হরি ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল।
রাস্তায় একটা কুকুর ডেকে উঠল। মিনু চমকে তাকাল। প্রায় পঞ্চাশজনের একটা ছোটখাটো বাহিনি তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। মিনু ভীতচোখে হরির দিকে তাকাল।
হরি চমকে উঠেছে। দুজনের কেউই ভাবেনি মজাটা এভাবে সত্যি হয়ে গেছে। সেনারা তাদের বাড়ি ঘিরে দাঁড়াল।
রাজাকার লতিফ চৌধুরী তার মেহেন্দি করা দাড়িতে হাত বুলিয়ে মেজরকে বলল, ‘মালাউন ঘর।’
মেজর খানের ফরসা চেহারা। হাসিমুখে মিনুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ক্যায়সে হো? সব ঠিক?’
মিনু কাঁদো কাঁদো মুখে খানের দিকে তাকাল।
মেজর এগিয়ে এসে মিনুর হাত ধরে বলল, ‘চলো।’
মিনু পালাতে গেল। মেজর মিনুর পিঠে সজোরে ঘুষি চালাল।
মিনু মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। পাক সেনা আর রাজাকারের দল হেসে উঠল। হরি মেজরকে মারতে এল। মেজর রিভলভর বের করে হরির মাথায় গুলি করল।
গুলি খেয়ে দশ বছরের বাচ্চাটা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। মিনু হাহাকার করে উঠল। মেজর মিনুর মাথার চুল ধরে টানতে টানতে মিনুকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেল।
লতিফ চৌধুরী একটা বিড়ি ধরাল। মিনুর আর্তস্বর বাইরেও শোনা যাচ্ছে। লতিফ তার দাড়িতে হাত বুলিয়ে এক সেনাকে বলল, ‘বিড়ি লেঙ্গে? আচ্ছা লাগতা সাব।’
সেনা লতিফের হাত থেকে বিড়ি নিল। লতিফ আগ্রহ ভরে সে বিড়ি ধরিয়ে দিল। কয়েক মিনিট পর বেল্ট ঠিক করতে করতে মেজর বেরিয়ে এসে চিৎকার করল, ‘মুদাসসর।’
মুদাসসর নামের জওয়ান বলল, ‘জি জনাব।’
মেজর বলল, ‘যা।’
মুদাসসর আগ্রহসহকারে ভেতরে চলে গেল। মেজর লতিফের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ক্যা হাল হে আপকা? খোয়াইশ হে?’
লতিফ লজ্জিত মুখে বিড়ি ফেলে দিয়ে আধো উর্দুতে যা বোঝাল, তার মানে দাঁড়ায় হুজুরের যদি দয়া হয়, তাহলে সেও মালাউন মেয়েকে চেখে দেখতে চায়।
মেজর জানাল মুদাসসরের হয়ে গেলে সে যেতে পারে। লতিফ খুশি হয়ে অনেক শুক্রিয়া দিল।
বর্তমান সময়
‘বুঝলা রুমানভাই, কী সময় কাটাইছিলাম?’
বৃদ্ধ লতিফ চৌধুরী হাসি হাসি মুখে গল্পটা শোনাচ্ছিল অমলকে।
অমল চুপ করে লতিফের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে। অথচ এখন তার অভিনয় করার কথা!
রাণা গাড়িতে অপেক্ষা করছিল। অমল লতিফের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বলল, ‘বাস্টারড।’
রাণা অবাক হল, ‘কী হয়েছে?’
অমল রাগী গলায় বলল, ‘৭১-এর গল্প বলছিল জানোয়ারটা। বিরাট কিছু কাজ করে ফেলেছে। এ শুয়োরগুলোর ধারণা এরা খুব ভালো কাজ করেছিল। কাফেরদের মেরে পুণ্য করেছে ভাবে। জাস্ট নেওয়া যায় না।’
রাণা বলল, ‘তাহলে এদের উড়িয়ে দেওয়া হয় না কেন?’
অমল বলল, ‘কতজনকে ওড়াবে? প্রচুর মানুষ এটাই ভাবে। এদেশে কতজন রাজাকারদের সমর্থন করে, তোমার কোনও ধারণা আছে? ধর্ম মানুষকে মানুষ রাখে না আর। তাছাড়া এ লোকটাকে এখনই মারলে হবে না। বড় মাছেরা ওদেশ থেকে আসবে। এ লোকের ডাক পড়বে। একে হাতে রাখলে ভেতরের অনেক খবর পাওয়া যাবে।’
রাণা বলল, ‘কাজ হয়ে গেলে? তখন?’
অমল গাড়ি স্টার্ট দিল, ‘তখন তোমাকে হ্যান্ডওভার করে দেব। যা করার করে নিও।’
রাণা ঠান্ডা চোখে জানলার বাইরে তাকাল। কাজ হয়ে গেলে অমলকেও ওড়ানোর আদেশ আছে। অমল সেটা জানে? জানলে তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারত? যা বোঝা যাচ্ছে, ঢাকায় আই এস আই এখন প্রবলভাবে সক্রিয় হবার চেষ্টা করছে। অমল সেসব খবরই বের করছে। আরও কতখানি খবর পেলে অমলকে সরানো যাবে, সেটা তাকে ঠিক করতে হবে। তাকে এখানে থাকতে হবে। সে পারবে? তারপর একদিন তাকেও ওড়াতে এভাবেই কাউকে পাঠাবে উস্তাদ? অস্বস্তি হচ্ছিল।
অমল বলল, ‘সাদিক কিন্তু খুঁজে বেড়াচ্ছে। যেভাবে হোক ও ট্র্যাক করতে চাইছে আসগরকে কে উড়িয়েছে। আমাদের এখন সাদিকের কাছে থাকতে হবে। কিপ ইয়োর এনিমিস ক্লোজ এই মন্ত্র মেনে চলতে হবে।’
রাণা বলল, ‘কত ক্লোজে যাব? আমার লোকটাকে দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়।’
অমল হাসল, ‘এরকম মাথা গরম হয়ে যায় দেখলে টাইপ লোকেদের নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। কিছু করার নেই। সাদিকের অনেক ব্যবসা আছে। তার মধ্যে একটা ব্যবসা হল, ও এদেশের আট-নয় বছরের ছেলেমেয়েদের তুলে নিয়ে আরবে পাচার করে। সে বাচ্চাদের একটা অংশ আইসিসে যায়। ওরা ওই বাচ্চাদেরকেই নিয়ে শোয়। জাস্ট ইমাজিন।’
রাণা বলল, ‘এসব আমাকে বলছেন কেন? আমি রেগে যাচ্ছি। রেগে গেলে আমার মাথা ঠিক থাকে না।’
অমল বলল, ‘তোমায় মাথা ঠান্ডা রাখাটাও শিখতে হবে রাণা। তুমি এফিসিয়েন্ট। তুমি ভালো। কিন্তু আরও ভালো হতে হবে। আসল তো মাথা। এ কাজে আসল হল রিপু। আমাদের নিজেদের কন্ট্রোল করা জানতে হবে। নইলে সমূহ বিপদ। আসগরের কেসটা আমাদের কি ফ্রন্টফুটে রেখেছে? রাখেনি। বরং অনেকটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। এটা তোমার মাথা গরম করার ফলাফল। দয়া করে এ কাজে সেটা কোরো না।’
রাণা বলল, ‘বাচ্চাদের নিয়ে এসব করবে, আর কিছু বলব না?’
অমল বলল, ‘বলব। অ্যাক্ট করব। তার সময় আছে। বাঘের টোপ ফেলার মতো অপেক্ষা করাটাই আমাদের কাজ। তার আগে টোপ সাজাও। টোপ চিৎকার করুক, গন্ধ ছড়াক। মজা তো তখনই। একটা জিনিস ভালো হল না খারাপ হল, বুঝতে পারছি না। আসগর নেই বলে সাদিক তোমাকে কলম্বো পাঠাবে না। তুমি বেঁচে গেলে। কিন্তু কলম্বোর কোডটাও তো দরকার ছিল। সেটা কী করে পাব?’
রাণা বলল, ‘দু-দিন পরে আবার শুরু হবে নিশ্চয়ই।’
অমল চিন্তিত গলায় বলল, ‘দেখা যাক। যাহ্, ঢাকার বিখ্যাত জ্যাম শুরু হয়ে গেল। এবার কী হবে?’
রাস্তায় একটার পর একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে তাল মিলিয়ে রিক্সা। সুদৃশ্য কত রকমের রিক্সা। রাণা বলল, ‘আমরা এখন কোথায় যাচ্ছিলাম?’
অমল বলল, ‘সাদিকের বাড়িতে। যেতে তো হবেই ভাই। বসে থাকলে হবে না।’
রাণা বলল, ‘আবার? কী করে যাব?’
অমল হতাশ গলায় বলল, ‘জানি না।’
নির্মল হন্তদন্ত হয়ে আনোয়ার সাহেবের চেম্বারে ঢুকে বলল, ‘স্যার, আসগর আলির নাম শুনেছেন?’
আনোয়ার সাহেব চিন্তিতমুখে বললেন, ‘শোনা শোনা লাগছে। কেন বল তো?’
নির্মল বলল, ‘সকালে ওকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অদ্ভুতভাবে এ বুলেটটাও বিদেশী।’
আনোয়ার সাহেব হাতের ইশারায় নির্মলকে বসতে বলে বললেন, ‘আসগরের হিস্ট্রি কী?’
নির্মল বলল, ‘সাদিকের কাছে কাজ করত। সাদিক হোসেন। টেক্সটাইল কিং উইথ নো ক্রিমিনাল হিস্ট্রি।’
আনোয়ার সাহেব বিস্মিতগলায় বললেন, ‘বলো কী? এত বড় কিং লোক, তার ক্রিমিনাল হিস্ট্রি নেই?’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘নেই স্যার।’
আনোয়ার বললেন, ‘আসগরকে কী করে...?’
নির্মল বলল, ‘ফ্ল্যাটে ঢুকে, ভোরবেলায়। সিকিউরিটিকেও হালকা জখম করেছে। আমাদের কাছে সেরকম কোনও সিসিটিভি ফুটেজ নেই।’
আনোয়ার বললেন, ‘রাস্তার ফুটেজ? ভোরবেলায় কত গাড়ি চলে?’
নির্মল হতাশ গলায় বলল, ‘অনেক স্যার। সেভাবে কিছু বোঝা সম্ভব না।’
আনোয়ার বললেন, ‘নজর রাখো। আর এই সাদিক সাহেবের ব্যাপার কী জানা আছে?’
নির্মল বলল, ‘কিছু না। আমার শুধু একটাই অবাক লাগছে, এত বড় এম্পায়ার সামলাচ্ছে, অথচ একটা ছাড়া আর কোনও কালো দাগ নেই।’
আনোয়ার বললেন, ‘কী সেই কালো দাগ?’
নির্মল বলল, ‘পুরান ঢাকায় ওর একটা ব্রথেল আছে। মেয়ে পোষে। নিজস্ব মেয়েছেলে।’
আনোয়ার হাত দিয়ে কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে বললেন, ‘ওটা কালো দাগ হিসেবে আইডেন্টিফাই করা যাবে না। আরও খোঁজো। খোচর লাগিয়ে দাও। সাদিক কি তারেক হোসেনের ভাই?’
নির্মল বলল, ‘জি স্যার।’
আনোয়ার বললেন, ‘তারেক হোসেন ইন্ডিয়ায় খুন হয়েছিল। ওই লোকের খবর আসার পর অনেকে নড়েচড়ে বসেছিল। তারপর সব ঠান্ডা হয়ে গেল। বলা হল তারেকের কাছে ওদেশের কোনও তোলাবাজ টাকা চেয়ে না পাওয়ায় কাণ্ডটা ঘটায়। অদ্ভুতভাবে সেটা নিয়ে কেউ কোনও কথাও বলল না। সাদিক তারেকের ভাই, তার সাগরেদকে কেউ ফজরের সময়ে...ইন্টারেস্টিং নির্মল! সাউন্ডস ভেরি ইন্টারেস্টিং! ছাই পেয়েছ, ওড়াতে শুরু করো। দেরি কোরো না।’
নির্মল বলল, ‘স্যার, সাদিকের ফোন ট্র্যাক করার পারমিশন পাওয়া যাবে?’
আনোয়ার বললেন, ‘আহ্, আবার জিগ্যেস করছ কেন? যা খুশি করো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করো। সাদিক ইজ এ বিগ ফিস। হতে পারে নিজের লোককে নিজেই...কোনও কথা শোনেনি বলে...’
নির্মল বলল, ‘স্যার, আমার মনে হয় না এখানে সাদিক ইনভলভড আছে। নিজের লোক হলে লোকটা গুম করে দিতে পারতো। এভাবে কাজ করত না।’
আনোয়ার ভ্রু কুঁচকে নির্মলের দিকে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে বললেন, ‘তাও ঠিক। সাদিকের অ্যান্টি কে আছে?’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘নো আইডিয়া স্যার। রেকর্ড বলছে সাদিকের শত্রু নেই। অজাতশত্রু। নিজের কাজটা মন দিয়ে করে। অন্য কোনও বিষয়ে মাথা ঘামায় না।’
আনোয়ার হাসলেন, ‘হতে পারে না। বাঙালি অজাতশত্রু হতে পারে না, আনলেস হি ইজ এ মহাপুরুষ। টেক্সটাইল এম্পায়ারের মালিক অজাতশত্রু হওয়া সম্ভব না। তার অ্যান্টি গ্যাংগুলোর ব্যাপারে জানতে হবে।’
নির্মল ঘাড় নাড়ল, ‘রাইট স্যার। আপনি যা বলবেন।’
আনোয়ার বললেন, ‘দেখো দেখো। দেরি কোরো না।’
নির্মল আনোয়ার সাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে নিজের ডেস্কে এসে বসল। সাদিকের ফাইলটা বের করে আবার পড়তে শুরু করতেই তার ফোন বেজে উঠল। নির্মল দেখল দীপা ফোন করছে। দীপা এখন রাগ করে আছে। সে তড়িঘড়ি ধরল, ‘বলো।’
দীপা বলল, ‘তুমি কি বাসায় আসতে পারবে?’
নির্মল অবাক হয়ে ঘড়ি দেখল, ‘এখন?’
দীপা রাগী গলায় বলল, ‘তোমায় বলেছিলাম না ইন্ডিয়া থেকে আমার মামারা আসবে? বলেছিলাম তো?’
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। এসে গেছেন?’
দীপা বলল, ‘বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়ে আছে। দয়া করে ওদের রিসিভ করে আনা যাবে কি?’
নির্মল আমতা আমতা করে বলল, ‘শোন না, খুব বড় কাজে ফেঁসে আছি। যাও না প্লিজ।’
দীপা ফোন কেটে দিল।
‘স্যার আসব?’ আনোয়ার আলির চেম্বারে নক করল নির্মল।
আনোয়ার বললেন, ‘এসো, বোস বোস।’
নির্মল চেম্বারে ঢুকে বসে বলল, ‘স্যার সাদিককে ইন্টারোগেট করা দরকার। আমার মনে হচ্ছে দেরি করা ঠিক হবে না।’
আনোয়ার বললেন, ‘বেশ তো। সাদিকের বাসায় চলে যাও। গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করো।’
নির্মল অবাক হয়ে বলল, ‘এত সোজা? সমস্যা হবে না?’
আনোয়ার বললেন, ‘তুমি যাও। আমি বুঝব।’
নির্মল ঘাড় নাড়ল। এইজন্য আনোয়ার স্যারকে এত ভালো লাগে। কোনরকম সিদ্ধান্ত নিতে একটু দেরি করেন না।
আনোয়ারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে নির্মল চার জনকে নিয়ে সাদিকের বাড়ির দিকে রওনা দিল। আকাশ মেঘলা করে আছে। যেকোনও সময় বৃষ্টি নামতে পারে। দীপা এখনও কথা বলছে না। ভীষণ রাগ করে আছে। কাজের যন্ত্রণায় সংসার মাথায় উঠেছে। রোজ কিছু না কিছু সমস্যা লেগেই আছে। কোনদিন সময়ে বাড়ি ফিরতে পারে না। দীপা জানে তার কাজ এরকমই। বিয়ের আগেও জানত। তারপরেও এরকম করবে। ইন্ডিয়া থেকে দীপার মামারা এসেছে। এখন বায়না ধরেছে, ওদের নিয়ে দেশ ঘোরাতে হবে। নির্মল যতবার বলেছে ছুটি পাবে না, ততবার কথা বন্ধ করে দিচ্ছে।
সাদিক শেখ বাড়িতেই ছিল। ডেকে নিয়ে আসতে হল। তাকে দেখে বলল, ‘থানা থেকে আসছিল তো। যা বলার বলে দিয়েছি।’
নির্মল বলল, ‘আমি থানা থেকে আসি নাই। অন্য জায়গা থেকে এসেছি।’
সাদিক বলল, ‘কোত্থেকে আসছেন স্যার? ব়্যাব?’
নির্মল বলল, ‘ওরকমই।’
সাদিক গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, ‘আসগর আমার কর্মচারী ছিল। এর বেশি কোথায় কী করেছে, তা তো আমি বলতে পারি না স্যার।’
নির্মল সাদিকের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘আমি তো একবারও বলিনি আসগরের ব্যাপারে এসেছি। আপনি আসগরের প্যাঁচাল পাড়তে শুরু করে দিলেন কেন?’
সাদিক বলল, ‘আমি ছোট ব্যবসায়ী স্যার। এছাড়া আর কোন কারণেও আমার কাছে ব়্যাব আসবে ক্যান?’
নির্মল বলল, ‘আপনার রেকর্ড কিন্তু তা বলছে না সাদিক।’
সাদিক ভ্রু কুঁচকাল, ‘রেকর্ড কী বলছে?’
নির্মল বলল, ‘রেকর্ড বলছে আপনার ব্যবসা বেশ ভালোই ছড়িয়েছে। মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইন্ডিয়া, থাইল্যান্ড। এর মধ্যে অনেকবার আপনার যাতায়াত হয়েছে।’
সাদিক বলল, ‘জি স্যার, এই কান্ট্রিগুলোতেই আমার ব্যবসা। বাংলাদেশের ব্যবসা এখন গ্লোবাল হতে যাচ্ছে। আমাদের গর্ব করা উচিত। তাই না মিয়াঁ?’
নির্মল বলল, ‘আসগরকে নিয়ে কিছু বলুন।’
সাদিক বলল, ‘খারাপ পথে ছিল। রাস্তা থেকে তুইলা নিয়া মানুষ করেছি জানেন? মগবাজারে ফ্ল্যাট কিনে দিলাম। আগের জীবন পিছু ছাড়ল না। অনেক খারাপ লাগে।’ সাদিক মন খারাপের মুখ করল।
নির্মল বলল, ‘আলম নামে কাউকে চেনেন?’
সাদিক চমকে সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিল, ‘চিনি। কেন বলুন তো?’
নির্মল বলল, ‘এমনি জিগ্যেস করলাম।’
সাদিক অবাক হয়ে নির্মলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী করেছে আলম?’
নির্মল বলল, ‘খুন হয়েছে, জানেন না?’
সাদিক বলল, ‘আমি কী করে জানব ভাই? আমার উপর দিয়ে কী যাচ্ছে বলেন তো! সকালে পুলিশ আসে, বিকালে ব়্যাব আসে। আমার কাজ-কাম মাথায় উঠসে। আলমের লগে অনেকদিন কন্ট্যাক্ট নাই। আসগরই তো ওদের সব খোঁজ খবর রাখত।’
বলতে বলতে হঠাৎ করে কাঁদতে শুরু করল, ‘আসগর, ভাইরে, আমাগো ছাইড়া তুই কোথায় চলে গেলি রে!’
নির্মল তীক্ষ্ণচোখে সাদিকের দিকে চেয়ে রইল। অতি শোক চোরের লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে।
সে বলল, ‘আমাদের হেড অফিসে না জানিয়ে আপনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। আপনার পাসপোর্ট আমাদের কাছে জমা করে দেবেন।’
সাদিক রেগে গেল, ‘এসব কী বলেন আপনি? আমার বেশিরভাগ কাজই তো বাইরে। দেশের বাইরে না যাইতে পারলে কী হবে?’
নির্মল বলল, ‘এটা আমার ডিসিশন না। তদন্তের স্বার্থে আপনাকে এটুকু সহযোগিতা করতেই হবে।’
সাদিক বিরক্ত মুখে বলল, ‘জি আচ্ছা। আসগরের খুনিরে ধরতে পারলে আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনারে পুরস্কার দিমু, কইয়া দিলাম সার।’
নির্মল উঠে দাঁড়াল, ‘ব্যক্তিগত পুরস্কারের লোভে আমি চাকরি করি না। তবে খোঁজ পেলে হয়তো আপনি জানতে পারবেন।’
সাদিক গম্ভীর মুখে বসে।
নির্মল সাদিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। এখন আবার দীপার মামাদের রিসিভ করতে ছুটতে হবে। জীবনে একটুও শান্তি নেই।
রাণা অমলের সঙ্গে বসে টিভি দেখছিল। কিছুক্ষণ আগে জ্যাম থেকে মুক্তি পেয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকেছে তারা। সাদিকের ফ্ল্যাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে।
অমলের ফোনে মেসেজ টোন বাজল। অমল মেসেজ টোন দেখে বলল, ‘সর্বনাশ।’
রাণা বলল, ‘কী হল?’
অমল বলল, ‘সাদিক ব়্যাবের নজরে পড়ে গেছে।’
রাণা বলল, ‘সেটা কী করে জানা গেল?’
অমল বলল, ‘সাদিকের বাড়ির কাছে আমাদের লোক রাখা আছে। সেই খবর দিল। একজন ইনফরমার আরেকজন ইনফরমারকে খুব ভালো করে চেনে।’
রাণা বলল, ‘তাহলে তো আপনার ইনফরমারও ধরা পড়ে যাবে।’
অমল চিন্তিতগলায় বলল, ‘ঠিকই। ধরা পড়ে যাবার চান্স খুব বেশি। তাকে সরে যাবার ইন্সট্রাকশন দিয়ে দিই তবে।’
অমল মেসেজ করে দিল।
রাণা বলল, ‘তাহলে আমরা কী করব? সাদিকের বাড়ি যাব না?’
অমল বলল, ‘আমাকে জিগ্যেস করছ কেন? তুমি আসগরকে ওড়ানোর ডিসিশন নিলে। সমস্ত সাজানো প্ল্যান ভেস্তে গেল। এবার তুমিই ঠিক করো কী করবে? দেখলে তো? এরকম ভুল ডিসিশনের জন্য হাতের কাছে চলে আসা জিনিসগুলো কেমন দূরে চলে যায়? এবার ব়্যাবের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে। আর যদি সেটা করতে হয়, তাহলে দিল্লিকে দিয়ে ঢাকায় কন্ট্যাক্ট করাতে হবে! উফ্, মহা ঝামেলা।’
রাণা বলল, ‘তাহলে বোধহয় আমাদেরও এখন আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেলেই ভালো হয়।’
অমল বলল, ‘তুমি পারবে? দু’দিন আন্ডারগ্রাউন্ড থাকার পর তিন দিনের দিনই তুমি বলবে আমার মাথা কাজ করছে না, কাউকে একটা ওড়াতে হবে।’
রাণা বলল, ‘আমরা সাদিকের বাড়ি না গেলেই সাদিক সন্দেহ করবে। আপনি নিশ্চয়ই সাদিককে বলতে যাবেন না যে ওকে ব়্যাব টার্গেট করেছে?’
অমল দু’হাতে মাথা চেপে বসে থেকে বলল, ‘সব গেল। আমার গোটা কাজটা নষ্ট হয়ে গেল। যে ক’টা কো-অরডিনেট সাদিকের কাছে আছে, ওরা সেগুলো আর ইউজ করবে না এর পরে।’
থমথমে মুখে অমল ফোন করল। ও-প্রান্ত ফোন ধরতে অমল সবটা জানিয়ে বলল, ‘এবার কী করব?’
ও-প্রান্ত থেকে উত্তর এল, ‘যেখানে আছ, সে জায়গা ছেড়ে দাও। ঢাকায় অন্য কোনও জায়গায় চলে যাও।’
অমল বলল, ‘সেক্ষেত্রে সাদিক সতর্ক হয়ে যাবে।’
‘তোমাদের ধরা পড়ার রিস্ক দিল্লি নিতে পারবে না।’
রাণা জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল রাস্তার উপর। চার-পাঁচজন গাড়ি থেকে নেমে অমলের গাড়িটা দেখতে শুরু করল। রাণা অমলকে ইশারা করল। অমল জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে ফোন রেখে রাণাকে বলল, ‘হয়ে গেল, মামারা এসে গেছে। এখনই বেরোতে হবে। চলো।’
তড়িঘড়ি তৈরি হল তারা। বেশ কিছু কাগজ ঘরের মধ্যেই আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে একটা ব্যাগে জিনিসপত্র নিয়ে নিল অমল। ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে তারা দেখলো পুলিশ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ফোন করছে। অমল বলল, ‘আমাকে ফলো করো।’
ফ্ল্যাটের পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে সি এন জি ধরে উঠে বসল। অমল বলল, ‘উত্তরা যাব।’
সি এন জি চালক বলল, ‘উত্তরা যাব না।’
অমল বলল, ‘ঠিক আছে। কমলাপুর যাবা? না তাও যাবা না?’
সি এন জি চালক গম্ভীর মুখে বলল, ‘যাব। একশো টাকা বেশি লাগব।’
অমল বলল, ‘দিমু নে। চলো।’
সি এন জি চলতে শুরু করল। অমল পিছনের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত হল। রাণা বলল, ‘কোথায় যাচ্ছি?’
অমল রাণার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, ‘এখন কোনও কথা নয়।’
কমলাপুর পৌঁছতে কুড়ি মিনিট লাগল। সি এন জি থেকে নেমে অমল বলল, ‘রাজশাহী এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে আছে। চলো ওতে উঠে বসি।’
অমল টিকেট কাটল। ট্রেনে উঠে বসার জায়গা পাওয়া গেল।
অমল বিরক্তভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘ব্লান্ডার করে ফেললাম। তোমার কথাটা কেন যে শুনতে গেলাম!’
মন্ত্রণালয়ের ওয়েটিং রুমে বসে আছে নির্মল। আনোয়ার সাহেব ফোনে ব্যস্ত।
মামাবাড়ির লোকেদের নিয়ে চট্টগ্রাম গেছে দীপা। মেসেজ করে জানিয়েছে। এর পর কতদিন কথা বলবে না, কে জানে। বাড়ি গেলে বার বার তাকে জিগ্যেস করেছে যাবে নাকি। নির্মল ছুটি পায়নি বলায় খুব রাগারাগি করেছে। নির্মল হাল ছেড়ে দিয়েছে। কাঁহাতক আর বোঝানো যায়।
ফোনে সাদিকের বাড়ির এন্ট্রির সিসিটিভির লাইভ ফুটেজ দেখছিল নির্মল। কেউ নেই আপাতত। কাসেম একবার বেরিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরে ঢুকে গেছে। বাইরে থেকে অন্য কারো গাড়ি আসেনি সারাদিনে। এত ঘটনাহীনতাই অবাক করছে। সব কিছু কেমন অদ্ভুতভাবে শান্ত। এত শান্ত কেন হবে? ভ্রু কুঁচকে ভাবার চেষ্টা করছিল।
মন্ত্রীর পি এ এসে বলল, ‘ভেতরে যান।’
আনোয়ার ফোন রেখে নির্মলকে ব্যস্ত গলায় বললেন, ‘চলো, চলো।’
ফিরোজ হাসান ফোন করছিলেন। তারা ঘরে ঢুকতে ইশারায় বসতে বললেন। বেশ কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলার পর ফোন রাখলেন মন্ত্রী। আনোয়ার আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলুন।’
আনোয়ার বললেন, ‘সাদিক শেখের প্রচুর বিদেশী মুদ্রা বিনিময়ে যোগ পাওয়া গেছে। লেনদেনের নথির কোনও ঠিক নেই।’
ফিরোজ বিরক্ত গলায় বললেন, ‘মানে? তিনি একজন গণ্যমান্য ব্যবসায়ী। দেশের সম্পদ। বিদেশি খুনিদের থেকে আপনার তার দিকেই চোখ পড়ল? আমি শুনেছি সব বাইরের বুলেট পাওয়া গেছে। সাদিক কী করবে এখানে?’
নির্মল বলল, ‘সাদিককে ঠিক লাগছে না জনাব। ওর অনেক সমস্যা আছে।’
ফিরোজ নির্মলের দিকে তাকালেন, ‘বাংলাদেশের ইয়ং ম্যানেদের এই হল সমস্যা। কী নাম আপনার?’
নির্মল নাম বলল।
ফিরোজ বললেন, ‘ও, সংখ্যালঘু? এই তো। আপনারা হলেন আমাদের দেশের পোস্টার বয়। ওসব দেখলে হবে না। প্রায় সব ব্যবসায়ীরই এসব আছে। তার সঙ্গে অপরাধজগতের কিছু নাই মিয়াঁ। ভাববেন না। এত সবকিছু নিয়ে ভাবার কোনও দরকার নেই।’
নির্মল কুঁকড়ে গেল একটু। এই ধর্মের জায়গাটা এলে সে বরাবর কুঁকড়ে যায়। এবারেও সমস্যাটা হল। ‘ওকে জনাব।’
ফিরোজ আনোয়ারকে বললেন, ‘আপনি সাদিককে জ্বালাতন করবেন না। জ্বালাতন করার মতো ছেলে সাদিক না। ওকে ওর কাজ করতে দিন।’
আনোয়ার বললেন, ‘জি জনাব।’
মন্ত্রীর চেম্বার থেকে বেরিয়ে আনোয়ার বললেন, ‘মন খারাপ কোরো না নির্মল। মন্ত্রীরা আজ আছে, কাল নেই। তুমি থাকবে, তোমার কাজ থাকবে। যারা ধর্ম দিয়ে মানুষকে ভাগ করে, তাদের আসলে চোখ বন্ধ থাকে। তুমি তোমার কাজটা করে যাও।’
নির্মল বলল, ‘সাদিকের সারভেইলেইন্সটা করে যাব?’
আনোয়ার বললেন, ‘হ্যাঁ।’
গাড়ি অবধি যাওয়ার আগে মন্ত্রীর পি এ ছুটে এসে আনোয়ারকে বললেন, ‘স্যার আপনাকে ডাকছেন।’
আনোয়ার বললেন, ‘আবার কী হল? চলো দেখি।’
পি এ বলল, ‘শুধু আপনাকে স্যার।’
নির্মল গাড়িতে বসল। আনোয়ার কিছুক্ষণ পর গম্ভীরমুখে বেরিয়ে ড্রাইভারকে বললেন, ‘চলো।’
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করলেন। আনোয়ার গলা খাকড়িয়ে বললেন, ‘নির্মল, মন্ত্রী বলছেন তোমাকে এই কেসটায় এখন রাখা যাবে না। সেনসিটিভ ব্যাপার। আপাতত ছ মাস তুমি পুলিশ ট্রেনিং ইন্সটিটিউটটা দেখো। আমি সময়মতো আবার তোমাকে ডেকে নেব।’
নির্মল বলল, ‘ওকে স্যার। আপনি যেমন বলবেন।’
সে মোটেইই অবাক হয়নি। এ ধরনের কিছু না হলেই বরং সে বেশি অবাক হতো। ভালোই হল। এবার দীপার মামার ফ্যামিলির সঙ্গে নিশ্চিন্তে দেশ ঘোরা যাবে।
ফ্ল্যাটে ফিরে নির্মল জুতো খুলে সোফায় চুপ করে বসে রইল।
এ যেন একপ্রকার গলা ধাক্কা দিয়ে দিল তাকে। দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইল সে।
মোবাইলটা সামনে পড়ে আছে। এ ক’দিন সাদিকের বাড়ির সামনের সিসিটিভিগুলো দেখা অভ্যাস হয়ে গেছিল। সে অভ্যাসবশতই ফোনটা হাতে নিয়ে অ্যাপ খুলল।
রাত বারোটা এখন। সাদিকের বাড়িতে একটা কালো সেডান ঢুকে গেল।
নির্মল মোখলেশকে ফোন করল। সাদিকের বাড়ির সামনের ফুটপাথে মোখলেশ শোয়। মোখলেশের ফোন বেজে গেল। পরপর তিনবার চেষ্টার পর ফোন ধরল, ‘জি স্যার।’
‘কোথায় ছিলে?’
‘ঘুমায় পড়সিলাম সার। বলেন।’
‘একটা বড় গাড়ি ঢুকল। দেখেছ?’
‘না সার। দেখা হয় নাই।’
বিরক্তিতে ফোন ছুঁড়ে মারল নির্মল।
‘আমরা এখন কী করব?’ রাণা প্রশ্ন করল।
অপরিসর অপরিচ্ছন্ন একটা ঘর। ঢাকার ভেতরেই। রাজশাহীর ট্রেনে খানিকটা গিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে এসেছে অমল। আপাতত সেখানে আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। অমল সিম বের করে রেখেছে ফোনের।
রাণার প্রশ্নের উত্তরে অমল চিন্তিতগলায় বলল, ‘সাদিক আমার অনেকদিনের টার্গেট। তিলে তিলে রুমানের কভার তৈরি করেছি আমি। সাদিকের কাছে আমাকে যেতেই হবে।’
রাণা বলল, ‘পুলিশ ফ্ল্যাটের হদিশ পেয়ে গেছে যে?’
অমল বলল, ‘সেটা অন্য কারণেও হতে পারে। হতে পারে ওরা সাদিকের দলের সবার বাড়িতেই যাচ্ছে। আমরা তো চলে এসেছি। কেন গেছিল তা এখনও ক্লিয়ার না। সাদিককে ফোন করতে হবে।’
রাণা বলল, ‘কখন করবেন?’
অমল বলল, ‘দেখছি কখন করা যায়। অবশ্য ফোন ট্যাপ হবে। অন্য পথ লাগবে।’
রাণা বলল, ‘অন্য পথ?’
অমল চোখ বন্ধ করল, ‘একটু ভাবি। ভাবতে দাও।’
রাণার বিরক্ত লাগছে। মনে হচ্ছে কী কুক্ষণে যে ওই লোকটার কথা শুনে সে ঢাকায় আসতে গেছিল? দিব্যি চলছিল সব কিছু।
অন্য একটা অস্বস্তিও হচ্ছে তার। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে অমলের সমস্যা বাড়িয়েছে সে, আসগরকে সরিয়ে দিয়ে। কিন্তু ঠিক কী করত সে? আসগরকে দেখলেই রাগ হচ্ছিল। অদ্ভুত নির্লিপ্ত টাইপের লোক, যে কুয়ালালামপুরে তাকে ওরকম একটা পরিস্থিতিতে ফেলে মজা দেখছিল। হয়তো সেটাও সাদিকের নির্দেশেই করেছিল, কিন্তু কিছুতেই আসগরের উপর থেকে রাগটা সরছিল না তার। কোনও কোনও মানুষের উপর কারণ ছাড়াই ভীষণ রাগ হয়। আসগর সেরকম একটা লোক। সমাজের ময়লা বললে কি ময়লারও অপমান হয়? ট্রাফিকিং-এর সঙ্গেও তো যুক্ত থাকে সাদিক, আসগরও নিশ্চয়ই যুক্ত ছিল। বেশ করেছে সে! যা করেছে, ঠিক করেছে।
অমল চোখ খুলল, ‘চুপ করে বসে থাকলে হবে না রাণা। আমাদের কাজে নামতে হবে। তার আগে সাদিকের কাছে যেতে হবে। রাত হলে বেরোতে হবে। এখন ক’টা বাজে?’ অমল ঘড়ি দেখে বলল, ‘আর আধঘণ্টা। তারপর বেরোব। ওকে?’
রাণা ঘাড় নাড়ল। বুঝতে পারছিল অমল ছটফট করছে। ওর মাথার মধ্যে এখন কী চলছে? রাণা কী করত অমলের জায়গায় থাকলে? দেশে পালাত? কী আশ্চর্য! শুরুতেই পালানোর কথা মনে হল কেন? অমলরা নিশ্চয়ই পালায় না? এসব সিচুয়েশনে কাজ করতে হয় ওদের।
নিজের মনেই হাসল রাণা। উস্তাদ লোকটা তাকে কেন এ কাজে পাঠাল? লোকটা শুধু অমলকে মারতেই পাঠিয়েছে। এখানকার কোনও কাজ যে তাকে দিয়ে হবে না, উস্তাদ সেটা খুব ভালো করেই জানে। সে রগচটা, রাগী, এ কথা লোকটা জানে না, হতে পারে না।
সম্ভবত অমলকে মারার পর অন্য খেলা শুরু হতে পারে। তাকে ধরিয়েও দিতে পারে উস্তাদ! উফ, কী বাজে একটা কাজে ফেঁসে গেল। প্রাণপণে মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করতে শুরু করল রাণা। এই পরিস্থিতিতে কয়েকটা দিন আন্ডারগ্রাউন্ড হলে পুলিশ বা ব়্যাবের ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। অমল সাদিককে হাতছাড়া করতে চাইবে না। গা ঢাকা দেবে না। কী করবে তবে?
শিকারের কাছে বেশি দিন থাকলে দুর্বল হবার মানসিকতা তার কোনকালেই ছিল না। তবু উস্তাদের আদেশ মেনে অমলকে ওড়ানোর চিন্তাটা তার মাথাতে কিছুতেই আসছে না। কোনও কোনও লোক থাকে, যাদের সঙ্গে থাকলে বা কথা বললে বোঝা যায় তারা আদতে ক্ষতি করার লোক নয়। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে বলছে অমল খারাপ কাজ করতে পারে না। যদি খারাপ কাজ করত, তাহলে কি কিছুই বোঝা যেত না? কিন্তু সেদিন রাতে অমল বেরিয়েছিল...কেন? জিগ্যেস করবে? থাক।
আধঘণ্টা কেটে গেল। অমল উঠে দাঁড়াল, ‘চলো। বেরোন যাক।’
রাণা বলল, ‘এখন?’
অমল মাথা নাড়ল, ‘কিছু করার নেই। ঘরে বসে থাকলে চলবে না। কাজ বন্ধ থাকলে বিপদ বাড়বে। চলো।’
সন্ধে নেমেছে।
বৃষ্টি পড়ছে। জানলায় চোখ রেখে চুপ করে বসেছিল রুমা। আজকাল অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হয়। বুকটা হঠাৎ করেই কেমন করে ওঠে। ঘুমের ঘোরে আতঙ্ক আসে। অদ্ভুত সব দুঃস্বপ্ন আসতে শুরু করে।
এই ভয়টা কোত্থেকে আসে সে জানে না। তবে এলে শরীর খারাপ লাগে।
‘সাহেব আইসে।’
জরিনা নিচুগলায় বলে গেল। রুমা সামলে বসল। সাদিক চিন্তিত মুখে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে খাটে বসল, ‘কেমন আছ তুমি?’
রুমা বলল, ‘ভালো। আপনি?’
সাদিক মাথা নাড়ল, ‘একবারেই ভালো নাই। আসগরের কথা শুনছ?’
রুমা ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ। শুনছি।’
সাদিক বলল, ‘বুঝতে পারতাস কেমন ভয়ের কাজ করি? আজ আছি, কাল কখন আজরাইল চইলা আইব, কেউ জানি না।’
রুমা সাদিকের দিকে ভালো করে দেখল। চোখের তলায় কালি পড়েছে। বোঝা যাচ্ছে, সাদিক বেশ টেনশনে আছে। সে বলল, ‘বুঝছি। আপনি একটু শান্ত হন।’
সাদিকের ফোন বাজতে শুরু করল। সাদিক ফোন ধরল, ‘কী হইল?...হ...বুঝছি...ব়্যাব নজর দিছে? ঠিক আছে। দেখা যাব।’
ফোন রেখে সাদিক ঘামতে শুরু করল। রুমা বলল, ‘কী হইল?’
সাদিক বলল, ‘ব়্যাবের কয়েকটা লোক ঘুরতেছে। কী চায় বুঝছি না।’
রুমা বলল, ‘কেউ নাই? আপনি তো অনেকরে চেনেন।’
সাদিক বলল, ‘চিনলে হবে? তুমি বুঝবা না। কতজন যে কত ধান্দায় ঘুরতাছে, সবার আলাদা আলাদা ধান্দা। আমি বুঝতাছি না কী করুম।’
রুমা বলল, ‘আপনার লগে একখান কাগজ ছিল। দিমু?’
সাদিক খানিকটা চমকাল, ‘কে দিছে?’
রুমা খাটের তোশকের তলা থেকে একটা কাগজ বের করে সাদিকের হাতে দিল। একটা চিরকুটে লেখা, ‘ফ্ল্যাটে পুলিশ এসেছিল। আমরা দুজন সাইডে থাকলাম। কাগজ ছিঁড়ে দেবেন। খোদা হাফেজ।’
সাদিক রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রুমান আইছিল?’
রুমা বলল, ‘আনোয়াররে দিয়া পাঠাইছে।’
সাদিক বলল, ‘ওর ফ্ল্যাটেও পুলিশ চলে গেছে?’
রুমা বোঝার চেষ্টা করছিল, সাদিক অমলের ব্যাপারে কী ভাবছে। সে বলল, ‘আপনার কাছের লোক বলে পুলিশ গেছে?’
সাদিক টাওয়েল নিয়ে মুখে জমে থাকা ঘাম মুছল, ‘পুলিশ তো না, তুমি বোঝো না, বললাম তো। পুলিশ না। ব়্যাব গেছে।’
রুমা বলল, ‘আপনি টেনশন করেন ক্যান?’
সাদিক বলল, ‘কারণ আছে। বুঝবা না।’
রুমা রাগের ভান করল, ‘আপনি শুধু কন বুঝবা না, বুঝবা না, আপনি বোঝায়ে দেখেন না।’
সাদিক মাথা নাড়ল, ‘তোমার বুইঝা কাম নাই। কামিজ খোল।’
রুমা নগ্ন হল। সাদিক রুমাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল কিছুক্ষণ। রুমার বুকে মাথা গুঁজে বলল, ‘মাথায় হাত বুলায়ে দাও।’
রুমা অবাক হল। তবে সাদিকের মাথায় হাত বোলাতে শুরু করল। সাদিক বলল, ‘খুব চিন্তা গো সাকিনা, খুব চিন্তা।’
রুমা বলল, ‘কোথাও চইলা যাওন যায় না?’
সাদিক সোজা হয়ে বসল, ‘এইটা তুমি ভাইবা বললা?’
রুমা বলল, ‘না। এমনিই মনে হইল।’
সাদিক বলল, ‘আমার মাথায় আসে নাই জানো। কথাটা খারাপ কও নাই। মাঝে মাঝে মাইয়া মাইনষের বুদ্ধিও নেওন লাগে। আমি দু-দিন দুবাই ঘুরতে যাইতেই পারি। কে কী কইব? তুমি যাবা আমার লগে?’
রুমা বিস্মিত হল, ‘আমারে নেবেন আপনি?
সাদিক বলল, ‘হ। আমার আর ভাল্লাগে না কিছু। একা একা কই যামু? তুমি আমার লগে যাবা। আমি ব্যবস্থা করতাসি।’
রুমা বলল, ‘কবে যাবেন?’
সাদিক বলল, ‘কালই যামু। সব ঠিক কইরা ফেলুম, তুমি ভাইব না।’
রুমা বলল, ‘ভাবি যাবে না?’
সাদিক জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘না। ও থাকবে। ও গেলে ওগো সন্দ হইবে।’
রুমা বলল, ‘কাগো সন্দ হইবে?’
সাদিক বলল, ‘আছে। তুমি বুঝবা না। আমি যাই। ব্যবস্থা করি।’
ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেল সাদিক।
রুমা কামিজ পরে নিল। বাইরে গিয়ে দেখল জরিনা টিভি দেখছে। সে বলল, ‘চল। বাজার যামু।’
জরিনা অবাক হল, ‘এখন যাবা?’
রুমা বলল, ‘হ। কাম আছে। চল।’
জরিনা উঠল, ‘চলো।’
দুজনে বেরোল। গলিটা অন্ধকার। রুমা খানিকটা যাওয়ার পর থমকে দাঁড়াল। পেছনে কেউ আসছে। সে ঘাড় ঘোরাল। কেউ নেই। জরিনাকে বলল, ‘কে রে?’
জরিনা ভয় পেয়ে রুমার হাত চেপে ধরল। রুমা চিৎকার করল, ‘কে ওখানে?’
অন্ধকার চিরে একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসতে শুরু করল। রুমা জোর পায়ে আলোর দিকে হাঁটতে শুরু করল।
ভিড়ের মধ্যে পৌঁছে দেখল মূর্তিটা আর ফলো করছে না।
জরিনা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘ভয় লাগে আপা।’
অন্য সময় হলে রুমা ভয় পেত না। এখন হঠাৎ করেই একটা অস্বস্তি হল। তার পরিচয় যদি বেরিয়ে যায়, তাহলে কি ওরা তাকে বাঁচিয়ে রাখবে?
নির্মল বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙল, কোনমতে ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’
‘তুই কোথায়?’ সোহানের উত্তেজিত গলা ভেসে এল।
নির্মল বলল, ‘কেন?’
‘আনোয়ার স্যার খুন হয়েছেন।’
‘মানে?’
‘মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছিলেন। সেখানেই কেউ শ্যুট করেছে। ওখানেই স্পট।’
ফোন কেটে দিল নির্মল। মাথা কাজ করছে না। আনোয়ার স্যার কি সাদিকের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলেছিলেন? ওরা কি তার ব্যাপারেও কিছু জেনে গেছে?
তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল সে। আনোয়ার স্যার তার বাবার মতো। সব সময় আগলে রাখতেন। এমন লোক হঠাৎ করে নেই হয়ে যাওয়া একটা বিরাট ধাক্কা। বাইক না নিয়ে যাওয়াই ঠিক করল। গাড়ি বের করল। মাথা পুরো ফাঁকা হয়ে গেছে। ড্রাইভ করতে গিয়ে পা কাঁপছে। গাড়ি চালাতে চালাতে চারদিকে দেখে নিল। কেউ ফলো করছে নাকি বোঝা যাচ্ছে না। আনোয়ার আলিকে মেরে দিল? অবিশ্বাস্য এবং অভাবনীয়!
স্যারের বাড়ির সামনে বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। খানিক দূরে গাড়ি পার্ক করে বাড়ির ভেতর ঢুকল সে। থমথমে হয়ে আছে গোটা বাড়ি। বডি শোয়ানো। ম্যাডাম পাথরের মতো বসে আছেন। দু’চোখে জলের ছিটেফোঁটাও নেই। সোহান বলল, ‘তুই ঘুমোচ্ছিলি?’
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ। বডি পোস্ট মর্টেমে কখন যাবে?’
‘এখনই। এই রে, সোবাহান স্যার তোকে ডাকছে কেন?’
নির্মল দেখল সত্যি সত্যিই সোবাহান স্যার হাত নেড়ে তাকে বাড়ির বাইরে যেতে ইশারা করছেন। সে বেরিয়ে গেল। সোবাহান এসে বললেন, ‘কী ভীষণ আনফরচুনেট না?’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
সোবাহান বললেন, ‘কাল রাতেও কথা হল। তোমার ব্যাপারে মিনিস্টার স্যারের অর্ডারটাও বললেন। বলছিলেন নির্মলের সঙ্গে ব্যাপারটা ঠিক হল না।’
নির্মল বলল, ‘ইটস ওকে স্যার। যেমন অর্ডার আসবে, মানতে তো হবেই।’
সোবাহান বললেন, ‘হ্যাঁ। সেটাই। তুমি আজকেই জয়েন করে যেও। আমাদের অফিসে তোমার অ্যাক্সেসটা বন্ধ করার অর্ডার আছে। আমার কিছু করার নেই বুঝলে তো? উপর মহলের অর্ডার, আমি কী করতে পারি বল? আনোয়ার স্যারও থাকলেন না, ওর দায়িত্বটা আমাকেই নিতে হবে। সমস্যা বেড়ে গেল।’ সোবাহান দুঃখি মুখ করার চেষ্টা করলেন। তিনি যে বিন্দুমাত্র দুঃখিত না, তা দিব্যি বোঝা গেল।
নির্মল বলল, ‘ঠিক আছে স্যার। যেমন বলবেন, তেমনই হবে।’
সোবাহান নির্মলের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘অনেক দায়িত্ব বেড়ে গেল আমার। আমি চেষ্টা করছি তোমাকে অফিসে ফিরিয়ে আনার। ভেবো না তুমি। মন খারাপ কোরো না। যেভাবে কাজ করছিলে সেভাবেই করো। তোমার সার্ভিস রিভলভার অফিসে জমা দিয়ে দিও।’
নির্মলের মুখটা তেতো হয়ে যাচ্ছিল। সোবাহানকে সে কোনকালেই পছন্দ করে না। মিষ্টি মুখের আড়ালে এভাবেই ছুরি চালায়। ইচ্ছে ছিল আরও কিছুক্ষণ আনোয়ার স্যারের মৃতদেহের কাছে থাকে, কিন্তু সোবাহানের মতো লোক থাকলে সেখানে থাকা সম্ভব না। সে ঠিক করল বাসায় ফিরে যাবে।
হাঁটতে শুরু করল। অনেক লোক আসছে। পাড়ার কৌতূহলী লোকের ভিড়ও বাড়ছে।
গাড়ির সামনে এসে নির্মল দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ির পেছনের কাচে কেউ ইট মেরে গেছে। কাচের অনেকটা অংশ ভেঙে গেছে।
ফোন বাজছে। দীপা ফোন করছে। ধরল সে, ‘বল।’
‘কী গো, কী হয়েছে? আনোয়ার স্যার নাকি খুন হয়েছেন?’
‘হুঁ। এখানেই আছি।’
‘তুমি ঠিক আছ তো? কোথায় ছিলে তুমি?’
‘ঘুমোচ্ছিলাম। বাসায় ছিলাম।’
‘আমি ফিরছি। আজকেই চলে আসছি।’
‘আসতে হবে না। ভেবো না। তোমরা ঘোর। চিন্তা করতে হবে না।’
‘চিন্তা করতে হবে না মানে? আমি চিন্তা করব না তো কে করবে? তোমার চিন্তা করার নতুন লোক হয়েছে নাকি?’
‘আমি স্যারের বাসায় আছি। পরে কথা বলছি। ফিরতে হবে না। অসুবিধা নেই।’
‘ঠিক তো?’
‘হ্যাঁ। ঠিক আছি। রাখলাম।’
ফোন কেটে নির্মল গাড়ির কাচ দেখল। আশেপাশে কেউ নেই। শ্বাস ছাড়ল। কেউ কি লোক লাগাল তার পেছনে?
লতিফ চৌধুরী তার ঘরে পায়চারি করছে। মাঝে মাঝেই দাড়িতে হাত বুলোচ্ছে। লতিফের বয়স পঁচাত্তর পেরিয়েছে, তবু চেহারায় এখনও যথেষ্ট শক্তি আছে। ছেলে সফিক একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে আছে। আব্বা এখন যেমন গম্ভীর হয়ে আছে, কথা বলা যে যাবে না, বুঝতে পারছে।
লতিফ অনেক দিন পর বাসার বাইরে বেরোবে। নতুন পাঞ্জাবি আনা হয়েছে। পান দেওয়া হয়েছে। নিজে নিজেই বক বক করে যাচ্ছে সে।
‘দাঁড়ায় আছ ক্যান? কিছু বলবা?’ হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল লতিফ।
সফিক মাথা চুলকে বলল, ‘টেকা লাগব।’
লতিফ পকেট থেকে গার্ডার দেওয়া এক তাড়া নোট বের করে সফিকের দিকে ছুঁড়ে মারল, ‘লও। উড়াও।’
সফিক নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। নোটের তাড়া মেঝেয় পড়ে গেছিল। তড়িঘড়ি সেটা তুলে পকেটস্থ করে বলল, ‘আপনি কই যাবেন?’
লতিফ বলল, ‘সেটা তোমার জানবার দরকার নাই। নিজের কাজ করো।’
সফিক ঘাড় নাড়ল। হর্নের শব্দ পাওয়া গেল ঘরের বাইরে থেকে। লতিফ ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। সফিক অবাক হয়ে দেখল আব্বা হুজুর একটা বড় গাড়িতে গিয়ে উঠল।
গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়া কেউ নেই। লতিফকে দরজা খুলে গাড়িতে তুলে ড্রাইভার দরজা বন্ধ করে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করল। লতিফের ঘরে এসি নেই। গাড়ির এসি একেবারে হিমশীতল করে দিচ্ছিল। সে মৃদু গলায় বলল, ‘ড্রাইভার সাহেব, একটু গরম করা যাইব না?’
ড্রাইভার গাড়ির তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিল। এবার লতিফের আরাম লাগল। আহ্লাদিত গলায় বলল, ‘এবার ঠিক আছে।’
ড্রাইভার নিঃশব্দে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল। লতিফের ভারি মজা লাগছিল। কী ভালো গাড়ি! দেশটা পাকিস্তান থাকলে এরকম গাড়ি তারও থাকত। জীবনে যা চাইত তাই পাওয়া যেত। এমন ভাগ্য, কিছুই হল না। বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
একটা ছোট অথচ ছিমছাম বাড়ির ভেতর গাড়ি প্রবেশ করল। ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দিল।
লতিফ গাড়ি থেকে নামামাত্র একজন সুবেশ যুবক এসে বলল, ‘আইয়ে।’
লতিফ খুশি হল। এরা অনেক সম্মান দিচ্ছে তো তাকে। দেওয়ার কথা ছিল না। দিচ্ছে এই অনেক।
ঘরের ভিতর মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক লতিফকে দেখামাত্র সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উর্দুতে বলল, ‘আসুন জনাব। আসুন।’
লতিফের চোখে জল চলে এল। তাকে সোফায় বসানো হল।
মাঝবয়সি ভদ্রলোক হাসিমুখে বলল, ‘আমি সঈদ। আপনার দেশে এই প্রথম আসা আমার।’
লতিফ তওবা করে বলল, ‘এসব কী বলছেন জনাব? এটা তো আপনাদেরই দেশ। আমাদের দেশ বলে শরমিন্দা করছেন আমায়!’
সঈদ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নাড়াল, ‘ওসব আমায় বলবেন না জনাব। এই দেশ এখন আর পাকিস্তানের নেই। থাকলে এভাবে লুকিয়ে আসতে হতো না। শুনলাম সাদিক শেখও দেখা করতে আসতে পারবে না?’
লতিফ দুঃখিত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ। আমাকে একাই আসতে হল। সাদিকের উপর অনেকের নজর পড়েছে।’
সঈদ বলল, ‘স্বাভাবিক। হিন্দুস্তানিরা পেছনে লেগে পড়েছে। আপনাদের দেশ তো ওরাই দখল করে নিল। কেউ কিছু বলবে না, সবাই শুধু ওদের খিদমত খাটার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।’
লতিফ বলল, ‘বেতমিজ জনাব। সবাই বেতমিজ। তবে সুখবর হল, দেশে আমাদের পন্থী মানুষও সংখ্যায় ওদের সমান সমান। কোথাও কোথাও বেশি। ইনশাল্লাহ, ভালোয় ভালোয় ভোটটা হয়ে গেলে আমাদের আর এ দেশের ভেতরে লুকিয়ে থাকতে হবে না।’
সঈদ বলল, ‘ঠিক আছে। সেটা ভবিষ্যতের ব্যাপার। আর ভবিষ্যতকে নিরাপদ করাই আমাদের কাজ।’
লতিফ ঘাড় নাড়ল, ‘সেটা আমরা পারব জনাব। ইন্ডিয়ার হাত থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আমরা বাঁচাবোই।’
সঈদ একটা ট্যাব বের করে লতিফের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘চারটে মাদ্রাসা। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল আর রাজশাহী। এই চারটে মাদ্রাসায় আপনার ভালো কন্ট্রোল আছে শুনেছি।’
লতিফ ঘাড় নেড়ে বলল, ‘জি জনাব। আমি যা বলবো, এরা তাই করবে।’
সঈদ খুশি হয়ে বলল, ‘আপনার বলার সময় এসে গেছে জনাব।’
লতিফ আনন্দে অনেকবার হাত কচলে ফেলল।
রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। অন্য ঘরগুলো ভর্তি হয়ে গেছে। গানের শব্দ ভেসে আসছে। রুমা দরজা বন্ধ করে বসে আছে।
অস্বস্তি হচ্ছে একটা। ছায়ামূর্তিটাকে ভোলা যাচ্ছে না। তার পিছু নিয়েছিল কেন? খবরটা জানাতে হবে। না জানালে অন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে। বেরোলে এখনই বেরোতে হবে। সকালে বেরোনোর অনেকরকম সমস্যা আছে। তাকে যে দুবাইতে নিয়ে যেতে চাইছে সাদিক, সেটা তো জানানোই গেল না তখন।
জরিনা শুয়ে আছে মেঝেতে। রুমা উঠে দাঁড়াল। বোরখা পরে নিয়ে দরজা খুলল। ছেলেগুলো ঘরে আছে। বারান্দায় কেউ নেই।
সে বাইরের দরজা ঠেলে রাস্তায় এল। সন্তর্পণে চারদিকে তাকাল। না। কোথাও কেউ নেই। ধীরপায়ে হেঁটে বড় রাস্তায় পৌঁছল। দোকানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফুটপাথের লোকজন শুয়ে পড়েছে।
রুমা মাথা নিচু করে অন্ধ ভিখারির উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করল। সোনার দোকান, তার সামনে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে লোকটা। তার কাছেই রিপোর্টিং-এর অর্ডার ছিল।
হাঁটতে হাঁটতে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা লোকটার কাছে এসে দাঁড়াল সে। একটা পুঁচকে তার মাকে জড়িয়ে শুয়ে আছে খানিকটা দূরে।
চাদর জড়ানো লোকটার পায়ে পা দিয়ে আলতো করে ঠেলা দিল সে। সাড়া পেল না। গলা খাকরে রুমা বলল, ‘পাখি পালানোর তালে আছে।’
তাকে চমকে দিয়ে চাদর সরে গেল। রুমা চমকে উঠে দেখল তার দিকে একটা রিভলভার তাক করে রাখা। লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে রুমার চুলের মুঠি ধরে বলল, ‘চল।’
রুমা বিস্মিত হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে এতটাই বিস্মিত হয়ে গেছিল, ন্যূনতম প্রতিরোধটুকুও করতে পারল না।
খেয়াল হল রাস্তায় একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
অসম্ভব তৎপরতায় তাকে গাড়িটায় টেনে তুলল লোকটা। রুমার চুলে ব্যথা লাগছিল। বমি পাচ্ছে। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। রুমা বলল, ‘কে আপনি?’
লোকটা বলল, ‘তুই কে?’
রুমা বলল, ‘আমি সাকিনা। সাদিক শেখের বাসায় থাকি। আপনারা জানেন না সাদিক শেখ কে।’
লোকটা সিগারেট ধরাল, ‘খুব ভালো করে জানিস এসব ঢপের কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। যত তাড়াতাড়ি তুই বলে দিবি এখানে তুই কী করতে এসেছিস, তত তাড়াতাড়ি ছাড় পাবি। নইলে তোর কপালে যে কী আছে, তুই নিজেও ঠিক করে জানিস না।’
রুমা জোরে শ্বাস নিল। লোকটা যে বাজে কথা বলছে না স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
সে চুপ করে বসে রইল। গাড়ির মধ্যে সিগারেটের গন্ধ মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে।
জানলার বাইরে দেখার চেষ্টা করল রুমা। কিছু বোঝা যাচ্ছে না। রাতের শহরে গাড়ির গতিবেগ অনেকটাই বেশি।
বেশ খানিকটা পথ যাবার পর অলসভাবেই লোকটা পকেট থেকে একটা স্প্রে বের করে রুমার নাকি ছিটিয়ে দিল।
রুমা জ্ঞান হারাল।
জ্ঞান যখন ফিরল, রুমা দেখল একটা ঘরে ধবধবে সাদা খাটে তাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। উঠে বসল সে।
তার সামনে প্রফেসরের মতো একটা লোক সোফায় বসে আছে। এত সুন্দর মানুষ হতে পারে, তার ধারণা ছিল না। রিমলেস চশমা পরে কেমন কবির মতো মুখ করে তার দিকেই তাকিয়ে বসে ছিল। তার জ্ঞান ফিরেছে দেখে লোকটা উঠে দাঁড়াল।
শান্ত মুখে একটা ছোট ব্লেড নিয়ে এসে রুমার হাতে চালিয়ে দিল। রুমা বিস্মিত হবার সময়টুকু পেল না। রক্ত পড়তে শুরু করেছে হাত থেকে।
লোকটা পকেট থেকে একটা ছোট কাগজ বের করে ক্ষতস্থানে চেপে ধরল। কী অসহ্য যন্ত্রণা! রুমা আর্তনাদ করে উঠল। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই দিনগুলো যখন দিব্যেন্দু ঠিক এই ধরনের কাজগুলোই দিনের পর দিন করে যেত তার সঙ্গে। সে চিৎকার করে উঠল, ‘কে? কে আপনি?’
লোকটা ফিস ফিস করে বলল, ‘আমি? আই এস আই। গিয়াস। আই এস আই কা নাম তো সুনাহি হোগা, নেহি?’
রুমা শিউরে উঠল।
একটা ডায়েরি খুলে বসে আছে অমল। কথা বলতে বারণ করেছে। রাণা চোখ বন্ধ করে শুয়েছে ঘুপচি ঘরটাতে। কোনমতে দিন কেটেছে। সন্ধে হয়েছে। দুপুরের দিকে রাণার ঘুম পেয়েছিল। উঠে দেখল অমল তখনও ডায়েরিতে লিখে যাচ্ছে। সে জিগ্যেস করল, ‘বাথরুম যেতে হবে।’
অমল বলল, ‘বাইরে বেরিয়ে করিডোরের শেষে।’
রাণা বাথরুম থেকে ঘুরে এল। বাথরুম অপরিষ্কার। অভ্যাস আছে তার। ফিরে এসে বলল, ‘আমরা কি ঢাকায় থাকব?’
অমল বলল, ‘না। বেরোতে হবে। থাকা যাবে না হয়তো।’
রাণা বলল, ‘ডায়েরিতে কী আছে?’
অমল বলল, ‘বেশ কিছু কন্ট্যাক্ট। সবক’টা ঝালিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। আপাতত চলো বেরোই।’
তৈরি হতে বেশিক্ষণ লাগল না। অমল দুজনেরই ভোল পাল্টে ফেলেছিল।
স্টেশন পৌঁছে রাজশাহীর ট্রেনে উঠে বসল। অমলের নির্দেশমতো রাণা খানিকটা দূরত্ব রেখে বসল।
ট্রেনে রাণার পাশে বসে থাকা ভদ্রলোক বেশ কয়েকবার ভাব জমাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষমেশ রাণার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন।
রাণা বারণ করল না। বিরক্ত লাগছে। নিজেকে অসহায় লাগছে। এখানে কিছু করার নেই তার। অমলের নির্দেশে চলা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। অমল এতটাই গম্ভীর হয়ে আছে, ওর সঙ্গে কথা বলার কথাও ভাবতে পারছে না সে।
জানলার বাইরে দেখল রাণা। ট্রেন নিজের গতিতে চলছে। কয়েকটা স্টেশন একবারে ফাঁকা। ট্রেনে কেউই উঠল না এত রাতে।
রাত দেড়টা নাগাদ উল্লাপুর স্টেশনে এসে পৌঁছল। অমল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ইশারা করল নেমে যেতে।
রাণা উঠল। ট্রেন থেকে বেশ কয়েকজন নামল।
অমল হন হন করে এগিয়ে যাচ্ছে। রাণা খানিকটা দূরত্ব রেখে অমলকে ফলো করল। স্টেশনের বাইরে কয়েকটা অটো দাঁড়িয়ে আছে। সি এন জি গ্যাসে চলে বলে এখানে সে নামেই ডাকা হয়। অমল সি এন জি চালককে তুলল। চালক ঘুম চোখে উঠে বলল, ‘কোথায়?’
অমল বলল, ‘চৌধুরী পাড়া।’ অটো স্টার্ট হবার সঙ্গে সঙ্গে রাণা অটোতে উঠে বসল। সি এন জি চালক অটো দাঁড় করিয়ে দিল। অমল চাপা গলায় বলল, ‘চলেন, উনি আমার লগেই আছে।’
নিস্তব্ধ পাড়া। মোড়ের কাছে তাদের নামিয়ে অটো চলে গেল। পাড়ার কুকুরগুলো ছুটে এল। অমল অদ্ভুত একটা শিস দেওয়া শুরু করল। কুকুরগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো চুপ করে গেল। রাণা বিস্মিত হল। এ ক্ষমতা সবার থাকে না। অমলের মধ্যে একজন ম্যাজিশিয়ানও লুকিয়ে আছে তবে? অদ্ভুত তো!
অমল ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘বেশিদূর হাঁটতে হবে না। এই তো।’
একটা দরজার সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে অমল কলিং বেল টিপল। রাণার মনে হল সত্যিই অমল কাউকে চেনে তো? নাকি হুট করে বেল টিপে দিল?
তার আশঙ্কা অমূলক প্রমাণ করে একজন মাঝবয়েসি লুঙ্গি পরা লোক খালি গায়ে বেরিয়ে এল। অমল সঙ্গে সঙ্গে হাসল, ‘কী চাচা? কেমন আছ?’
লোকটা সভয়ে চারদিক দেখে নিয়ে বলল, ‘এসো এসো ভেতরে এসো।’
অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘ইমতিয়াজ চাচা। চিন্তা নেই। এসো।’
রাণাকে নিয়ে অমল ঘরের ভেতর ঢুকতেই ইমতিয়াজ তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘এখানে কী করতে এলে তোমরা?’
অমল বলল, ‘জল খাওয়াও। কী আছে খাওয়াও, খিদে পেয়েছে।’
ইমিতিয়াজ ফ্রিজ থেকে মিষ্টি নিয়ে এল। ঠান্ডা জলের বোতল দিল। দুজনে সেসব খেয়ে নিল তাড়াতাড়ি।
অমল বলল, ‘ঢাকায় মনে হচ্ছে হুলিয়া বেরিয়ে গেছে। ধরা পড়ে যাব। আপাতত এখানেই আন্ডারগ্রাউন্ড থাকতে হবে।’
ইমতিয়াজ ঘাবড়ে গেল, ‘কী করেছ?’
অমল হাই তুলে বলল, ‘জানো না? আসগরকে উড়িয়ে দিয়েছি। ধরে নাও ব়্যাব এবার সাদিকের গুষ্টি খুঁজে ফেলবে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘জানি না তো!’
অমল বিরক্তগলায় বলল, ‘খবর দেখো না?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘অনেকদিন দেখা হয় না।’
অমল বলল, ‘কেউ খবরও দেয়নি?’
ইমতিয়াজ মাথা নাড়ল, ‘নাহ্। এবার কী হবে?’
অমল বলল, ‘দুটো উপায় আছে। হয় তোমার বাড়িতেই এক বছর থাকব। নয় রাতের মধ্যে ইন্ডিয়া পালিয়ে যেতে হবে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘পালিয়ে যাও। আমি তোমাদের একবছর ধরে টানতে পারব না। এগুলো ছোট জায়গা। লোকজন খোঁজ খবর নেয়। পারলে ঘরের ভেতর চলে আসে। এখানকার কালচারটাই ওরকম। মাঝখান দিয়ে আমিও ধরা পড়ে যাব।’
অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘তাহলে? তোমার আর চিন্তা নেই। দেশে ফিরে যাবে।’
রাণা বলল, ‘তাহলে ঢাকায় ফিরে গিয়ে সাদিককে উড়িয়ে দিয়ে দেশে ফিরলেই তো হত।’
ইমতিয়াজ অবাক হয়ে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এত রাগ কেন আপনার?’
অমল বলল, ‘ওকে ঠান্ডা বিরিয়ানি খাইয়েছে, ওটাই ওর রাগের কারণ।’
রাণা বলল, ‘না। ওটা রাগের কারণ না। কিছু কিছু মানুষ আছে যারা অন্য মানুষের সঙ্গে চাকরের মতো ব্যবহার করে। এ ধরনের মানুষ দেখলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। সাদিক হল এই ধরনের মানুষ।’
অমল ইমতিয়াজকে বলল, ‘সাকিনা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কেউ সাদিকের খবর দিতে পারবে না। সাকিনাকে কন্ট্যাক্ট করতে হবে।’
ইমতিয়াজ গম্ভীর মুখে বলল, ‘তোমরা বোস। আমি আসছি একটু।’
ইমতিয়াজ ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, ‘সাকিনাকে কন্ট্যাক্ট করা যাচ্ছে না। রাত বলে হয়তো।’
অমল হাই তুলে বলল, ‘ঠিক আছে। আপাতত ঘুম দরকার। বালিশ বিছানা লাগবে।’
ইমতিয়াজ কটমট করে অমলের দিকে তাকাল।
‘ঠিক কোন জায়গা থেকে তুলেছে তোকে? পশ্চিম বাঙ্গাল?’
উর্দুতে প্রশ্ন করল গিয়াস। একটা চেয়ারে হাত বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে রুমাকে। কেটে যাওয়া জায়গাটায় অসহ্য ব্যথা করছে। রুমা বাঙাল ভাষাতে বলল, ‘আমাকে ছাইড়া দেন। আমি কিছু করি নাই।’
গিয়াস চোখ ছোট ছোট করে বলল, ‘তাহলে ওই খবরিটার কাছে অত রাতে কী করছিলিস?’
রুমা বুঝল গিয়াস বাংলা ভালো বোঝে। সে কাঁদার অভিনয় করল, ‘উনি তো ঔষধ দেন আমায়। উনি দিনে ভিক্ষা করেন, রাইতে ঔষধ দেন। আমি তাই আনতে গেছিলাম।’
গিয়াস বলল, ‘ওষুধ দেয়? কীসের ওষুধ দেয় আজহার তোকে?’
রুমা বলল, ‘আমি ওর নাম জানি না। আমি শুধু জানি, আমার যখন খুব শরীল খারাপ লাগে, বাবার এঁটো খাবার খেলে সে অসুখ সেরে যায়। সবার এঁটো খাবার পর বাবা কিছু খাবার রেখে দেয়, আমি সেটা আনতে যাই।’
গিয়াস তীক্ষ্ণ চোখে রুমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ‘কক্সবাজারে যে মেয়েটাকে মারা হয়েছিল, তোকে এখানে আনার জন্যই তো?’
রুমা সজোরে মাথা নাড়ল, ‘না ছার। আপনি খোঁজ নেন। আমি খুব গরিব একজন মাইয়া। আমার কুনো দোষ নাই।’
গিয়াস চেয়ার এগিয়ে নিয়ে এসে রুমার কাছে বসে বলল, ‘হয় তুই সত্যি বলছিস, নয় তুই ভীষণ ওয়েল ট্রেইন্ড। কে ট্রেনিং দিয়েছে তোকে? তুষার রঙ্গনাথন? আশরফ খান? নাকি সায়ক বড়াল? বল।’
রুমা আকাশ থেকে পড়ার ভান করল, ‘কীসব বলতাসেন আপনি! এরা কারা?’
গিয়াস চোখ নামিয়ে রুমার বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুল দেখল। বলল, ‘তোর পায়ে কী হয়েছে?’
রুমা গিয়াসের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘উনি খুব অত্যাচার করতেন।’
গিয়াস উঠে রুমার হাত খুলে দিল। হাতে সিগারেটের ছ্যাকা দেখে বলল, ‘এটা?’
রুমা বলল, ‘উনি করতেন।’
গিয়াস রুমার চুলের মুঠি ধরে বলল, ‘কেন করত? কী করতিস তুই?’
রুমা বলল, ‘আমি কিছু করতাম না। এমনি মারতেন।’
গিয়াস হিস হিস করে বলল, ‘তুই শালী সাদিকের বেশ্যা, আমাকে বোঝাচ্ছিস তুই কিছু করতিস না? বেশ্যাগিরি করতিস তাই তো? বেতমিজ আওরাত, তোর বর কী করে মারা গেছিল?’
রুমা কাঁদতে শুরু করল। সজোরে কাঁদতে লাগল। গিয়াস রুমার গালে চড় কষিয়ে বলল, ‘বল কী করে মারা গেছিল?’
রুমা বলল, ‘খুন হয়েছিল। কে নাকি ওর মাথায় হাতুড়ি মেরে খুন করে ছিল ওকে।’
গিয়াস বলল, ‘কে মেরেছিল? আমি নামটা জানতে চাই।’
রুমা বলল, ‘আমি জানি না। বিশ্বাস করুন।’
গিয়াস বলল, ‘কী করতে পাঠিয়েছে তোকে র?’
রুমা বলল, ‘সেটা কী?’
গিয়াস কিছুক্ষণ একা একা দাপাল। রুমাকে আরও কয়েকটা চড় কষাল। কোনও লাভ হল না। রুমার পেট থেকে একটা কথাও বের করতে পারল না। তার ফোন বাজছিল। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল সাদিক ফোন করছে। সে ফোন তুলল, ‘বলো।’
সাদিক নরম গলায় বলল, ‘জনাব, আমার খুব কাছের একজন আওরাতকে পাওয়া যাচ্ছে না। শুনলাম আপনি নাকি তাকে তুলে নিয়ে গেছেন। আমি কিন্তু খুব ভালো করে জানি সে নির্দোষ।’
গিয়াস গালাগাল দিতে শুরু করল, ‘তোদের লজ্জা লাগে না? আমাদের কাছ থেকে এত ডলার নিচ্ছিস, আর এ দেশে বসে মেয়েবাজি করে যাচ্ছিস? এভাবে জিহাদ আসবে?’
সাদিক বলল, ‘জনাব, ও মেয়ে খুবই ভালো মেয়ে। দুঃখী মেয়ে। আপনি ওকে কষ্ট দিয়েন না। আপনাকে আনন্দ দিবে। সাত দিন রেখে দেন। তারপরে না হয় ছেড়ে দেন। কিন্তু ওরে অত্যাচার করেন না। এদেশে ভালো মাইয়া পাওয়া যায় না, কোথায় সাকিনার মতো ভালো মাইয়া আছে?’
গিয়াস বলল, ‘বুঝলাম। তার আগে বল আগের মেয়েটা কক্সবাজারে হারিয়ে গেছিল কী করে?’
সাদিক বলল, ‘জনাব, আমার কথা শুনেন। ও মেয়েকে আটকায়া রাখা যাইত না। সব দিয়েছিলাম, তারপরেও অন্য দিকে যাওয়ার আসক্তি ছিল। পূর্ব পরিচিত এক ছেলের সঙ্গে এক ঘরে ছিল জনাব। আমি মাথা ঠিক রাখতে পারিনি, উড়ায় দিছিলাম। কিন্তু এ মেয়ে একবারে পবিত্র।’
গিয়াস বলল, ‘পবিত্র?’
সাদিক বলল, ‘জি জনাব।’
গিয়াস বলল, ‘এক দিনের মধ্যে এ মেয়ের যেখানে বাড়ি, সেখানকার লোকেদের দিয়ে একে চিনিয়ে আনার ব্যবস্থা কর। লোকাল লোক যদি এই মেয়েটাকে চেনে, আমি ছেড়ে দেব। নইলে বাকিটা আমি বুঝব।’
সাদিক বলল, ‘এটা একটা কথা জনাব? আমি এখনই দেখছি। কিন্তু আপনি সাকিনারে কষ্ট দিয়েন না।’
গিয়াস ফোন কেটে দিল।
রুমার গোটা শরীর যন্ত্রণায় জ্বলছে। সে শুধু একটা কথাই মনে করে চলেছে। গিয়াস দিব্যেন্দুর তুলনায় কিচ্ছু না।
ট্রেনিং সেন্টারে জয়েন করে নির্মল হতাশ হয়ে বসে রইল। কোনও কাজ নেই। এখন নিউ ট্রেনিও নেই। একটা ঘরে সারাদিন একা একা বসে বাড়ি চলে যেতে হবে। মানুষ তো হতাশাতেই মরে যাবে এই ডিপার্টমেন্টে এসে! বোঝাই যাচ্ছে পানিশমেন্ট পোস্টিং এটা।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে নির্মল মোখলেসকে ফোন করল। মোখলেস বলল, ‘আপনারে সরায় দিসে শুনলাম। আনোয়ার স্যারের খবরের পর থেকে মাথা কাজ করতাসে না স্যার। পুরা আউলাইয়া গেছি। আমি কি করুম সার?’
নির্মল বলল, ‘কী খবর ওদিকে?’
মোখলেস বলল, ‘আজ তো মাল হেবি ব্যস্ত। তিনবার বাইরাইসে।’
নির্মল বলল, ‘আর? কেউ এল?’
মোখলেস বলল, ‘না। কেউ আসে নাই।’
নির্মল বলল, ‘ঠিক আছে। নজর রাখো। ধরা পড়ে যেও না যেন।’
মোখলেস হাসল, ‘নিশ্চিন্তে থাকেন স্যার।’
ফোন রেখে নির্মল পায়চারি শুরু করল। সাদিকের উপর নজরদারি রাখা দরকার ছিল। কিছুই হল না। ট্রেনিং-এর বস রাসেল সাহেব পাশের চেম্বারে আছেন। জয়েনিং-এর সময় বলে দিয়েছেন সে কোথাও গেলে যেন তাকে বলে যায়। নির্মল দরজার ফাঁক থেকে দেখল রাসেল সাহেব ঘুমোচ্ছেন। এখানে হয়তো এটাই কাজ।
সে কিছুক্ষণ এদিক সেদিক করে রাসেল সাহেবকে না বলে সেন্টার থেকে বেরিয়ে গেল। সি এন জি নিয়ে সরাসরি আয়কর দফতরে চলে গেল।
আলম টেবিলেই ছিল। নির্মল ইশারা করে তাকে রাস্তায় ডেকে নিল। আলম বেরিয়ে আসতে অফিসের রাস্তার পাশের ছোট গলিতে ঢুকে এল।
আলম এসে বলল, ‘কী হল দোস্ত? এত লুকিয়ে চুরিয়ে ডাকো কেন? এরকম লুকায় লুকায় দেখা করার কী হল?’
নির্মল বলল, ‘অনেক কারণ আছে। আনোয়ার স্যারকে খুন করা হয়েছে শুনেছ তো?’
আলম বলল, ‘হ্যাঁ।’
নির্মল বলল, ‘আমার মনে হয় সাদিক শেখের কেসটার জন্য। আমার গাড়িতেও ইট মেরে আমাকে হুশিয়ারি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে ভালো কোনও সমস্যা আছে। তুমি সাদিকের স্টেটমেন্ট বের করেছিলে। সেটা আছে?’
আলম অবাক হয়ে বলল, ‘আরে কী হয়েছে শোন। আজকেই আমাকে অর্ডার দেওয়া হল সাদিকের ফাইল ঘাঁটার দরকার নেই। কুমিল্লায় কোনও এক ব্যবসায়ী আছে, তার প্রোফাইল পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি তো এতক্ষণ ধরে এটাই ভাবছিলাম যে এ আবার কী হল?’
নির্মল বলল, ‘মানে? তোমার কাছে এখন সাদিকের ফাইলের অ্যাক্সেস নেই?’
আলম বলল, ‘তা থাকবে না কেন? এ কি আমেরিকা পাইসো ভাই? সব পাইয়া যাইব। কী লাগবো কী?’
নির্মল বলল, ‘সব লাগবে। যা পাবে তাই। বিশেষ করে ফরেন ট্রানজাকশান। ওর ফাইল সব হোয়াইট। ওর কোথাও কোনও সমস্যা নেই। এর থেকে সন্দেহজনক আর কী হতে পারে?’
আলম বলল, ‘ঠিক আছে। আমি ব্যবস্থা করে দেব। তুমি ভেবো না।’
নির্মল বলল, ‘ভাবাভাবি বাদ দাও ভাই, তুমি যে এটা করছ, কাউকে ঘুণাক্ষরেও বোল না। এখানে সব জায়গায় ওদের লোক সাজানো আছে। ভীষণ কনফিডেন্সিয়ালি এগোতে হবে আমাদের।’
আলম বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি ভেবো না।’
নির্মল বলল, ‘আমি যাই। তুমি মাথায় রেখো।’
আলম বলল, ‘ঠিক আছে। যাও।’
অফিসে ফিরে এসে নির্মল দেখল রাসেল সাহেব থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখে বললেন, ‘কোথায় গেছিলে?’
নির্মল বলল, ‘বাসায় গেছিলাম স্যার। ভাবলাম গ্যাস বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে । তাই চেক করতে গেছিলাম।’
রাসেল বললেন, ‘আমি কিন্তু তোমাকে বলেছিলাম কোথাও গেলে আমাকে বলে যেতে। বলেছিলাম না?’
নির্মল বলল, ‘জি স্যার। আর হবে না।’
রাসেল বললেন, ‘তোমার বাসায় তোমার স্ত্রী ছিল না? তাকে ফোন করে জিগ্যেস করে নিলেই তো হতো।’
নির্মল বলল, ‘না স্যার, ওর আত্মীয়রা এসেছে, ও এখন নেই।’
রাসেল বললেন, ‘তুমি চাকরি করতে এসেছ। যথেষ্ট সিনিয়র অফিসার। তোমাকে এখন অফিস ডেকরাম শেখানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। আশা করব, ভবিষ্যতে তুমি আমাকে জানিয়ে যাবে।’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘জি স্যার।’
রাসেলের থেকে ছাড়া পেয়ে চেম্বারে এসে বসল সে। মোবাইলে মোখলেস ছবি পাঠিয়েছে। সাদিকের বাড়ি থেকে গাড়িটা বেরিয়েছে।
নির্মল গাড়ির নাম্বার দিয়ে সার্চ করল। সাদিকের নামেই এ গাড়িটার রেজিস্ট্রেশন করা আছে। সাদিক এটা নিয়ে কী করছে? এ গাড়িটা নিয়ে তো কোনও দিন বাইরে যায়নি!
নির্মল চিন্তিত মুখে বসে রইল। মোখলেস আবার ফোন করছে। ধরল সে, ‘হ্যাঁ বল।’
‘সার, আমাদের মিয়াঁর পুরান ঢাকায় একটা বাড়ি আছে। ওখানে মেয়ে পোষে।’
‘জানি এটা। নতুন কিছু বল।’
‘একটা ডেরাইভার এখানে চা খায়। কথা শুনে বুঝলাম মাইয়াটারে কোথায় নাকি লইয়া গেছে।’
‘গুড। কোথায় নিয়ে গেছে?’
‘জানি না সার। এদের চলা ফেরা দেখলে কিছু বোঝন যায় না।’
‘কিছুই বোঝা যায় না?’
‘না সার। খুব ব্যস্ত আর সিরিয়াস। সবাই খুব দৌড়াইতাসে।’
‘ঠিক আছে। গুড জব।’
ফোন রেখে নির্মল সাদিকের পুরান ঢাকার ঠিকানাটা বের করল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হল। ছুটির এখনও কত সময় বাকি!
রাত আটটা। বাইকটা বড় রাস্তায় রেখে মোখলেসের দেওয়া ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছিল। এর মধ্যে ফোন বেজে উঠল তার। সোবাহান ফোন করছেন। ভ্রু কুঁচকে সেটার দিকে তাকিয়ে ধরল সে, ‘জি জনাব।’
সোবাহান বললেন, ‘আরে, আমি তোমার খবর নেওয়ার জন্য ফোন করছিলাম। সারাদিন ধরেই ভাবছিলাম তোমার খোঁজ নেই, কিন্তু সময় পাইনি, এত কাজের চাপ। তারপর বলো, নতুন ডিপার্টমেন্ট কেমন লাগছে?’
নির্মল বলল, ‘ভালো স্যার।’
সোবাহান বললেন, ‘কোনও সমস্যা নেই, তাই না?’
নির্মল বলল, ‘না, স্যার, ঠিক আছে।’
সোবাহান বললেন, ‘নির্মল, আমায় একটা কথা বলো, এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে যদি কোনও অফিসার কাজ করে, তাহলে কি আমার চুপ করে থাকা উচিত?’
নির্মল বুঝল সোবাহান কেন ফোন করছেন। সে বলল, ‘বুঝলাম না স্যার।’
সোবাহান বললেন, ‘না মানে এক অফিসার আছে, আমি দেখছি সে বড় বাড়াবাড়ি শুরু করেছে, অতিসক্রিয়তা দেখাচ্ছে। আমার না এই অতিসক্রিয় মানুষদের একদম পছন্দ না বুঝলে না? কে জানে কখন রিমান্ডে নিয়ে নিতে হয়। ভালো লাগে না রে ভাই, সব সময় এত জটিলতা ভালো লাগে না। যাই হোক, তুমি ঠিক করে কাজ করো, ডিপার্টমেন্টের নাম উজ্জ্বল করো। রাখি বুঝলে?’
নির্মলের কান মাথা জ্বলছিল। সে বলল, ‘জি স্যার।’
সোবাহান ফোন কেটে দিলেন। নির্মল আলমকে ফোন করল, আলম একবারেই ধরল, ‘বল দোস্তো। কেন ফোন দিলা?’
নির্মল বলল, ‘কেন আর দেব? খোঁজ পেলে কিছু?’
আলম বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি হবে না। অফিসে এখনও অনেকে আছে। আরেকটু রাতের দিকে দেখছি। তুমি যে কাবাবের খোঁজ করতাস, ওইটা খাইতে অনেক দূর যাইতে হইব।’
নির্মল বলল, ‘ঠিক আছে। জানিও।’
ফোন রাখার পর নির্মল কয়েকমুহূর্ত ভাবল। আলম কি সন্দেহ করছে তাদের ফোন ট্যাপ হচ্ছে? ট্যাপ না হবার তো কিছু নেই। বরং তারই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল সোবাহানের সঙ্গে কথা বলার পরে।
মোখলেসের দেওয়া ঠিকানার বাড়ির সামনে আবার কিছুক্ষণ ঘুরে, চারপাশ দেখে নিয়ে দরজায় নক করল নির্মল।
জরিনা দরজা খুলল, ‘জি, বলেন।’
নির্মল বলল, ‘সাদিক সাহেব আছেন?’
জরিনা নির্মলের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ‘জি উনি তো এখানে থাকেন না’!
নির্মল মুখে বিস্মিতভাব ফুটিয়ে বলল, ‘সে কী? উনি তো আমাকে এখানে আসতে বলেছিলেন।’
জরিনা বলল, ‘ঠিক আছে, আপনি বসেন, আমি দেখছি।’
নির্মলকে সামনের ঘরে বসিয়ে জরিনা ভেতরের ঘরে গেল।
রঙচটা একটা বিছানার চাদর খাটে পাতা। একটা প্লাস্টিকের চেয়ার। টিভি চলছে। চটুল বলিউডি গান চলছে টিভিতে। ভেতরের ঘরে যাবার দরজাটা ভেজানো। নির্মল দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। বাড়ির মাঝে বড় একটা বারান্দা ঘিরে চারটে দরজা। কোথাও কেউ নেই। জরিনা কোথায় গেল?
‘কী চাই?’
একটা লম্বামতো লোক কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে দেখতে পায়নি নির্মল। ঘুরে দাঁড়াতেই লোকটার সামনে পড়ে গেল সে। অপ্রস্তুত না হয়ে বলল, ‘সাদিক এখানে আসতে বলেছিলেন।’
লোকটা সন্দিগ্ধ মুখে তাকে দেখে বলল, ‘না। এখানে কারো আসার কথা নাই।’
নির্মল বলল, ‘ফোন করেন। দেখেন।’
ফোন বের করতে যেতেই নির্মল লোকটাকে জোরে ঠেলে ফেলে দিল। লোকটা খাটের উপর পড়ল। নির্মল পালাতে গেলেই লোকটা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধরল। নির্মল লোকটাকে সামলাতে যাবার আগে আরেকজন দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। নির্মল কিছুক্ষণ দুজনের সঙ্গে লড়লেও অসম লড়াইয়ে তাকে অচিরেই পরাস্ত হতে হল। নির্মলকে মাঝের বারান্দায় বাঁধা হল।
দ্বিতীয় পুরুষটি চিৎকার করল, ‘জরিনা? এই জরিনা।’
জরিনা ছুটে এল, ‘হ ভাইজান।’
‘কোথায় থাকস? বাইরে থিক্যা লোক ঢুইকা যায় ভিতর? কী করস তোরা?’
জরিনা বলল, ‘আমি কী করুম? কইসিল সাদিক সাহেবরে চেনে।’
লোকটা ছুটে গিয়ে জরিনাকে জোরে একটা চড় কষাল। মেয়েগুলোর মধ্যে একজন বলল, ‘একী জব্বার ভাই, ওরে মারো ক্যান?’
জব্বার বলল, ‘মারুম না? আমি কী বলসিলাম? কাউরে ঢুকতে দিবি না? বলসিলাম?’
নির্মলের পিঠে ব্যথা করছিল। তার হাত-পা বাঁধা হয়েছে। গা হাত পা ব্যথা করছে। হাত-পা বাঁধা না-হলে সে লড়াই করার জায়গায় থাকত।
খায়রুল বাইরে থেকে এসে নির্মলের দিকে ঝুঁকে বলল, ‘সত্যি করে বল। তুই কে? নইলে আজ এইখান দিয়ে তুই বাইচা ফিরতে পারবি না।’
নির্মল দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘আটকে রাখিস না। সমস্যায় পড়বি। খোল।’
নির্মলকে নির্লিপ্ত থাকতে দেখে দুজনে অবাক হল এবার। দুজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করে বাইরে বেরিয়ে গেল।
জরিনা তাড়াতাড়ি নির্মলের কানের কাছে এসে বলল, ‘সাকিনা আপুর কোনও খবর আছে? আপনারে কি উনি পাঠাইসে?’
নির্মল অবাক হয়ে জরিনার দিকে তাকাল।
ধানখেতের পাশে কারো বাড়ি হলে জানলা খোলা থাকলে ভোরবেলা যে হাওয়াটা আসে, সেটার তুল্য বোধহয় আর কিছু হতে পারে না। অমল জানলা খোলা রেখে ঘুমোতে বলেছিল। ভোরবেলা জানলার বাইরে তাকিয়ে রাণার মনে হল এই দৃশ্যটা দেখার জন্যই হয়তো সে এখনও বেঁচে আছে। সবুজ ধানের ওপরে ভোরের আলো পড়ছে। পাখির ডাক ভেসে আসছে। রাণা বেশ কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে রইল।
অমল ঘুমোচ্ছে। ক্লান্তির ঘোরেই ঘুমোচ্ছে। রাণা উঠে বাইরে এল। ইমতিয়াজ দাঁতন ঘষছে দাওয়ায় বসে। তাকে দেখে বলল, ‘ঘুম হল?’
রাণা বলল, ‘হ্যাঁ।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘দিনের বেলায় বেরোবে না। ঠিক আছে?’
রাণা বলল, ‘হ্যাঁ।’
ইমতিয়াজ তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘কতদিন কাজ করছ?’
রাণা বলল, ‘বেশিদিন না। এখানেই প্রথম।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘ট্রেনিং?’
রাণা বলল, ‘কোনও ট্রেনিং হয়নি।’
ইমতিয়াজ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘এরকম হয় নাকি?’
রাণা বলল, ‘হ্যাঁ, এরকমই হয়েছে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘কে পাঠিয়েছে তোমায়?’
রাণা বলল, ‘জানেন না?’
ইমতিয়াজ মাথা নাড়ল।
রাণা বলল, ‘তাহলে আর জেনে কী করবেন? আপনি এখানে ক’দিন আছেন?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘বছর দশেক। তার আগে ঢাকায় ছিলাম। এখন তো রিটায়ারমেন্ট হয়ে গেছে।’
রাণা অবাক হল, ‘মানে? আপনি ইন্ডিয়ার লোক নন?’
ইমতিয়াজ বিরক্ত হল, ‘গলা নামিয়ে কথা বলো। না আমি ইন্ডিয়ার লোক নই।’
রাণা বলল, ‘তবে?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘সময়ে ঠিক জানবে। অত জেনে কী করবে তুমি?’
রাণা চুপ করে গেল। ইমতিয়াজ বলল, ‘ওখানে নিম ডাল আছে। দাঁতন করে নাও। অ্যাডের টুথপেস্টের থেকে অনেক ভালো।’
রাণা তাই করল। গ্রামে থাকতে এ অভ্যাস তার ছিল। দাঁতন করতে করতে বলল, ‘অমলদাকে কত দিন ধরে চেনেন?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘অমলকে বর্ডার পার করে আমিই এনেছিলাম। এদিকে কে আসত তখন? সব তো যাচ্ছে। আউট গোয়িং। বাংলাদেশের ইম্পরট্যান্সটা দিল্লি ঠিকই বুঝত, তাও খুব বেশি বাজেট ছিল না। ধীরে ধীরে আই এস আই যত বেড়েছে, ওদিকেও টনক নড়েছে।’
রাণা বলল, ‘প্রথম দিকের তাহলে?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘বললাম তো, সব একবারে বলব না। এত কথা হওয়াও ঠিক হল না। ভোরের দিকে মুড ভালো থাকে। তোমার কি মনে হয়, এই জায়গায় আমার থাকতে ভালো লাগে? না আছে কোনও উত্তেজনা, না আছে কিছু। এর থেকে পাকিস্তানে থাকা ভালো। কত রকম রিস্ক থাকে। এই আছি, এই নেই। মনে হয় ম্যাজিক চলছে।’
ইমতিয়াজ টেনে টেনে হাসল। কল থেকে জল নিয়ে মুখ ধুয়ে তার সামনে এসে বসল, ‘একটা রুল সব সময় আছে মনে রাখবে। আই এস আইকে কোনদিন হালকাভাবে নিতে নেই। ওদের দেশের লোক না খেয়ে মরলেও ওরা ওদের মতো করে স্ট্র্যাটেজি বানিয়েই যাবে।’
রাণা বলল, ‘আমি অত কিছু বুঝি না। বোঝার দরকার নেই।’
ইমতিয়াজ অবাক হয়ে বলল, ‘তাহলে তুমি এখানে কী করছ?’
রাণা স্থির চোখে কয়েক সেকেন্ড ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাংলাদেশ ঘুরতে এসেছি। ঘুরে চলে যাব।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘মজা করো? আমার সঙ্গে মজা করো? আমি কত সিনিয়ার জানো? তোমার ইয়ারবন্ধু ভেবেছ নাকি?’
রাণা কলের জলে মুখ ধুতে শুরু করল। ইমতিয়াজ বলল, ‘কমবয়সি ছেলেদের এই হল সমস্যা। সিনিয়রদের সম্মান করতে জানে না।’
রাণা মুখ ধুয়ে বলল, ‘আমি আপনাকে রাগানোর জন্য কিছু বলিনি। আমার ব্যাপারটা এরকমই। অত ভেবে কিছু করি না। যেটা মনে হয় করি। আমার মনে হয় না পাকিস্তানকে নিয়ে এত চিন্তা করার কিছু আছে বলে। কী করবে আই এস আই? কোনও ক্ষমতা নেই। অকারণ হাওয়া দিয়ে ফোলানো হচ্ছে এই ব্যাপারগুলোকে।’
ইমতিয়াজ ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল, ‘ভালো লোক পাঠিয়েছে তো! কোত্থেকে তুলল তোমাকে?’
রাণাও হেসে ফেলল ইমতিয়াজের কথা শুনে, ‘ওই, তুলে পাঠিয়ে দিয়েছে আর কী!’
ইমতিয়াজ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল, ‘ঠিক আছে। তুমি ঘরে চলে যাও। বেরিও না আর। এলাকার লোক যেন তোমাদের বাইরে না দেখে।’
রাত দশটা।
সোবাহান সাহেব এসেছেন। নির্মলের বেঁধে দেওয়া হাত খুলে দিচ্ছে নুরুল।
মেয়েগুলো কেমন কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে।
একটু দূরে জরিনা দাঁড়িয়ে নির্মলকে দেখছে।
বাড়িটা থেকে বেরিয়ে গলিতে এসে সোবাহান চারদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নির্মল।’
নির্মল বলল, ‘জি স্যার।’
সোবাহান বললেন, ‘তুমি এখানে কী করছিলে?’
ঠোঁটের পাশটা নোনতা লাগছে। রক্তটা দেখা যাচ্ছে কি? নির্মলের অস্বস্তি হচ্ছিল। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে? সাদিক সোবাহানকে ডেকে তাকে নিয়ে যেতে বলেছে। তাও সশরীরে আসেনি, ফোন করেছে। সোবাহান তাতে এরকম কুকুরের মতো চলে এসেছে। সোবাহানের প্রশ্নের উত্তরে নির্মল বলল, ‘একটা ঠিকানা খুঁজতে এসেছিলাম।’
সোবাহান বললেন, ‘ঠিকানা? কীসের ঠিকানা?’
নির্মল বলল, ‘আমার এক বন্ধু থাকে এদিকেই। সাদিক আলম নাম।’
সোবাহান বাকিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এগিয়ে যাও সবাই।’
সোবাহানের সঙ্গে যারা এসেছিল তারা গলির মুখের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সাদিকের ঘরটার বাইরে যে ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে সোবাহান বললেন, ‘আমাকে তোমার কী মনে হয় নির্মল?’
নির্মল বলল, ‘কিছু না স্যার। আমি পার্সোনাল কাজে এসেছিলাম, বললাম তো।’
সোবাহান বললেন, ‘পেছনে লাথ মেরে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেব তোকে। ইন্ডিয়ার দালাল। তোর লজ্জা লাগে না? এদেশের খাস আর ইন্ডিয়ার হয়ে কাজ করিস?’
নির্মলের কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছিল। সোবাহান যে এই কথাটা বলবে, সে ভাবতে পারেনি। সে বলল, ‘এগুলো কী বলছেন আপনি?’
সোবাহান বললেন, ‘ঠিক বলছি। তুই র-এর হয়ে কাজ করিস, তাই না? আনোয়ার তাই করত, তুই তো ওর সঙ্গেই ছিলিস। ওর চামচা। ও যেভাবে বলত, তুই সেভাবে কাজ করতিস। এখন দেখছিস আমি এসেছি, তোর পাখনাগুলো কাটতে শুরু করেছি, তাতে তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তাই না?’
নির্মল কাতর গলায় বলল, ‘একবারে বাজে কথা স্যার। আমি আনোয়ার স্যারকে চিনতাম। উনি দেশের বাইরে কোনদিন কিছু ভাবেননি। আমিও ভাবিনি। ইন্ডিয়ার হয়ে কাজ করতে যাবই বা কেন? এদেশে আমার সাতপুরুষ থাকে, আমি জন্মেছি এদেশে, আমাকে অন্য কোনও দেশের হয়ে কাজ করতে হবেই বা কেন? আমি ইনভেস্টিগেশনে এসেছিলাম স্যার, সাদিকের এখানে কতগুলো মেয়ে থাকে, সেগুলো দেখতে এসেছিলাম।’
সোবাহান আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁটে দিলেন, ‘একদম চুপ থাক। একদম চুপ। তোর ভাগ্য ভালো যে তোকে জেলে না নিয়ে গিয়ে বাইরে নিয়ে বোঝাচ্ছি। যা বলছি, মন দিয়ে শুনে রাখ। বাসায় যাবি, খাবি দাবি, ঘুমাইয়া পড়বি। কাল থেকে তুই একটা অন্য মানুষ। তোকে যেন কেউ সাদিক বা ওর লোকজনের ধারে কাছে দেখতে না পায়। সাদিক এ দেশের সম্পদ। ও কী করবে, না করবে, সব আমি বুঝব। আমি দেখব। তোকে দেখতে হবে না, ক্লিয়ার?’
নির্মল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সোবাহান এবার গলা তুলল, ‘ক্লিয়ার কি না?’
নির্মল বলল, ‘ক্লিয়ার স্যার।’
সোবাহান বললেন, ‘ওয়েল অ্যান্ড গুড। চল এবার।’
সোবাহান হাঁটতে শুরু করলেন। নির্মল একবার ঘাড় ঘুরিয়ে বাড়িটার দিকে তাকাল। জানলা দিয়ে জরিনার মুখটা দেখা যাচ্ছে। পর্দা তুলে দেখছে তাদের। কয়েক সেকেন্ড থেমে রাস্তার দিকে হাঁটতে শুরু করল সে। গাড়িতে উঠে সোবাহান তাকে তার পাশে বসালেন। ড্রাইভারকে বললেন, ‘নির্মল স্যারকে ওর বাসায় নামিয়ে দাও আগে।’
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করল। নির্মল চোখ বন্ধ করল। জরিনা ফিসফিস করে তাকে তখন বলল, ‘সাকিনা আপুরে কে জানি তুইলা নিয়া গেছে। আপনি জানেন সে কোথায় আছে?’ মোখলেস যে মেয়েটার কথা বলছিল, মেয়েটার নাম তবে সাকিনা?
বাইরে থেকে ছেলেগুলো ছুটে এল তখন। চিৎকার করে জরিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যা, ঘরের ভিতর যা। বাইরে যেন না দেখি।’
জরিনা ভীত চোখে তার দিকে তাকিয়ে চলে গেল। নির্মলকে একটা ছেলে এসে চড় মেরেছিল। নির্মল ছেলেটার মুখ মনে করার চেষ্টা করতে লাগল। মনের ভিতর রিক্যাপ দরকার। খুব জরুরি রিক্যাপগুলো। মাথার ভেতর সোবাহানের ‘ইন্ডিয়ার দালাল’ শব্দগুলো ভাসছে। সেটা যেন মনে প্রভাব না ফেলে। মনের রিক্যাপটা ওর মতো করে হোক। দাঁতে দাঁত চিপল সে। সোবাহানের অপমানটা সে কোনদিন ভুলবে না।
মাটিতে পড়ে আছে রুমা। মাথার ভেতরে কেমন একটা আচ্ছন্ন ভাব। গায়ে হাতে পায়ে অসহ্য ব্যথা করছে।
দরজা খুলে গেল।
‘একী? এরকম অবস্থা করসে তোমার?’
সাদিকের গলা। কোনওমতে চোখ খুলল রুমা। চোখ ভারি হয়ে ফুলে গেছে। গিয়াস চোখে ঘুষি মেরেছিল।
সাদিক তার কাছে এসে বসল। গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করল।
রুমা কথা বলতে পারছে না।
এই লোকটা তার সঙ্গে কত রাত কাটিয়েছে। কত আদর করেছে। তাকে কি উদ্ধার করবে?
কথাটা ভাবতে ভাবতেই মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করল সে। সাদিক তার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরেছে, সাপের মতো গলায় হিসহিস করে বলল, ‘কে তুই? তুই তো সাকিনা না। তোর দেওয়া ঠিকানায় তোর ছবি দেখে কেউ চিনতে পারেনি। সত্যি করে বল তুই কে।’
এইভাবে দুঃস্বপ্ন সত্যি হয়ে যাবে সে ভেবেছিল, এত তাড়াতাড়ি সত্যি হবে ভাবেনি। বলল, ‘কোনও ভুল হইতাসে আপনাগো, আমি সাকিনা। আমার গ্রামের লোক চিনবে না ক্যান আমারে?’
গিয়াসের গলা পাওয়া গেল, ‘চিনবে না, কারণ তুই ইন্ডিয়ান, আমি শুরুতেই বুঝেছিলাম। এবার তুই বলবি তোকে কে পাঠিয়েছে। নইলে তোর কী হতে পারে তুই জানিস না। তুই চাইবি তোর মৃত্যু হোক, কিন্তু হবে না। বুঝতে পারছিস?’
রুমা বিহ্বল গলায় কেঁদে উঠল, ‘আমারে এরকম কইরেন না, আমি একটা দুঃখী মেয়ে, এরকম কইরেন না। ও সাদিক সাহেব, আপনি আমারে এরকম করতাসেন?’
সাদিক হাতের মুঠি আলগা করল, রুমার চুল ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘ধরে নিলাম তুই ইন্ডিয়ান না, তাহলে মিজানরে ফিট করসিলি কী কইরা?’
রুমা বলল, ‘মিজানভাইরে জিগান।’
সাদিক বলল, ‘তুই জানিস না মিজান মার্ডার হইসে?’
রুমা আকাশ থেকে পড়ার ভান করল, ‘আল্লাহর কসম খাই, জানি না। আমি তো ঘর ছাইড়া কোথাও যাই নাই। মিজান ভাইয়ের খবর আমি কেমনে পামু?’
সাদিক বলল, ‘সন্দেহটা ওই জন্যই তো হচ্ছে। মিজান একা মরেনি, যাদের যাদের তোর সঙ্গে যোগ থাকার কথা, সবাই মরসে। তোর গ্রামের লোক তোর ছবি দেখে চিনতে পারে নাই। আমারে কী ভাবোস, গাধা?’
রুমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘হায় আল্লাগো, আপনাগো কেমনে বিশ্বাস করাই, গেরামে আমি বোরখা পইরা থাকতাম, আমারে কে কী কইরা চিনবে? আমি কঠিন পর্দা করতাম, আমারে ওরা দেখবে কেমনে?’
গিয়াস বলল, ‘শি ইজ লাইং সাদিক। সি ইজ ভেরি স্টেডি। আমার কথা শোন, ওকে আমি দেশে নিয়ে যাই। তারপর দেখছি ওকে কী করা যায়।’
সাদিক দ্বিধাগ্রস্থ গলায় বলল, ‘আমাকে একটু দেখতে দেন। তারপর নিয়া যাইবেন।’
গিয়াস রাগী গলায় বলল, ‘কী দেখবে?’
সাদিক বলল, ‘ওর কথা মিথ্যা নাও হইতে পারে। আমাদের গ্রামগুলোতে অনেক মাইয়াই কঠিন পর্দা করে। তাগো চিনতে পারে না অনেকেই।’
গিয়াস বলল, ‘হতে পারে না। এত ধার্মিক তোমরা নও।’
সাদিক গলা নরম করে বলল, ‘জনাব। এই মাগীরে আমারে দিয়া দেন। যদি দেখা যায় মাগী মিথ্যা কয়, আমি নিজের হাতে ওরে শেষ করুম। কিন্তু জনাব, যদি মাগী দোষী না হয়, তাহলে অকারণ ওরে শাস্তি দেওন হইবে না?’
গিয়াস বলল, ‘তোমার মেয়ের অভাব? কোথাকার মেয়ে লাগবে তোমার? তুমি আমার সঙ্গে পাকিস্তানে চলো, কত মেয়ে লাগবে তোমার আমি দেখব।’
সাদিক বলল, ‘জনাব, আমি তো কইতাসি আপনেরে, আমার হাতে ছেড়ে দেন, আমি বুইঝা নিমু। আপনি চিন্তা কইরেন না।’
গিয়াস বলল, ‘আমি চিন্তা করব নাকি সেটা আমার ব্যাপার। আমার কাজ আমাকে করতে দাও। তুমি চলে যাও। আমি দেখছি ওকে।’
সাদিক অনুনয় বিনয় করতে লাগল, ‘জনাব। ছাইড়া দেন জনাব। আমার মনে হয় না সাকিনা মিথ্যা কইতাসে।’
গিয়াস গম্ভীর গলায় বলল, ‘তোমার সঙ্গে এই বিষয়ে আমি আর কোনও কথা বলব না। জাস্ট গেট লস্ট ইউ ফুল।’
সাদিক শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রুমার দিকে একবার তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল...।
নতুন দিল্লি। রাত দুটো। তুষার ঘুমোচ্ছিলেন।
ফোনটা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠে ফোন রিসিভ করলেন। ওপাশ থেকে ভেসে আসল, ‘বেকারার করকে হামে...রিমেকের বাজার হিট হয়ে গেছে নাকি?’
তুষার হাসলেন, ‘রিমেকেরই তো বাজার। সব পুরোনো জিনিস নতুন মোড়কে চলে এসেছে।’
‘বলছি কী, বলিউডের চাহিদা তো সব দিকেই আছে, তবে শুনছিলাম, ইস্টার্ন সাইডে নাকি বলিউডের কোনও সিঙ্গার প্রোগ্রাম করতে গিয়ে চোক করে গেছেন।’
তুষার সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসলেন, ‘ইস্ট?’
‘হ্যাঁ।’
‘ওটা আমাদের স্টুডিওর জুরিসডিকশনে নেই এখন।’
‘শুনেছি। স্টুডিও ভেঙে গেছে। হিট গান এখন আর স্টুডিওতে রেকর্ড হচ্ছে না। সমস্যা হল, এর ফলে প্রতিযোগী স্টুডিওর গান হিট হয়ে যাবে। সিঙ্গার এখন তাদের কাছে আছে।’
‘স্টুডিওর ঠিকানা?’
‘আপাতত ইস্টার্ন রিজিয়নেই। কিন্তু ওয়েস্টার্ন সাইডে গেলে সিঙ্গার উইল বি ইন বিগ ট্রাবল। প্রোডিউসারদের খুব তাড়াতাড়ি যা করার করতে হবে। গুড নাইট।’
ফোন কেটে গেল। তুষার তৎক্ষণাৎ খানের নম্বরে ফোন করলেন। তিনবার রিং হবার পর আশরফ খান ফোন ধরলেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’
তুষার বললেন, ‘বড়াল কল্ড। বাংলাদেশে আমাদের কেউ আই এস আইয়ের হাতে আছে। এখনও বাংলাদেশেই আছে, তাকে পাকিস্তান নিয়ে যেতে পারলে সমস্যা ভয়াবহ হয়ে যাবে।’
খান বললেন, ‘কিন্তু স্যার, আমরা কী করব এখানে? বাংলাদেশের কোনও আপডেটও তো নেই।’
তুষার বললেন, ‘সব জানি। কিন্তু এসব জানার পরে হাতে হাত রেখে বসতে পারছি না। আমাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি মিনিস্ট্রিতে কন্ট্যাক্ট করছি। তুমি তৈরি হও।’
খান হাসলেন, ‘আগে আপনি কথা বলুন স্যার। কলকাতার মতো লজ্জার ব্যাপার হলে ভালো লাগবে না। বাংলদেশে কোড সেভেন অ্যাক্টিভেট করা আছে। আমরা কাজ করতে গেলেই ঝামেলা হবে।’
তুষার বললেন, ‘আমি বুঝে নেব, বললাম তো। শেখাওয়াত লাস্ট কবে কন্ট্যাক্ট করেছিল?’
খান বললেন, ‘দু’মাস হয়ে গেল। পুওর কমিউনিকেশনটা একটা প্রবলেম তো বটেই। ওর মতো হুইমজিকাল একটা লোক কী করে ইস্টার্ন রিজিওন সামলাচ্ছে আমি সত্যি জানি না স্যার।’
তুষার বললেন, ‘হিস্ট্রি ঘেঁটে লাভ নেই। তুমি কি মাথুরকে নেবে?’
খান বললেন, ‘আপনি যা বলবেন। মাথুর অরুণাচল থেকে আজকেই ফিরেছে। ওর যাওয়াটা কি ঠিক হবে?’
তুষার বললেন, ‘কথা বলো। যেতে চাইলে নিয়ে যাও। অবশ্য যেতে চাইবে না, তা নয়। শেখাওয়াত কাকে ঢাকা পাঠিয়েছিল, তাও জানি না। সায়ক জেনে গেল, অথচ আমরা জানতে পারলাম না।’
খান বললেন, ‘আপনি কী করবেন স্যার, আপনি এই ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করলে নিশ্চয়ই জানতেন। আপনি কথা বলে নিন। তারপর মাথুরকে ফোন করে নেব।’
তুষার ফোন কাটলেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে জানলার বাইরে তাকালেন। সবাই ঘুমোচ্ছে। কেউ জানেও না দেশের এক সন্তান এই মুহূর্তে আই এস আইয়ের হাতে বন্দী। তুষার চোখ বন্ধ করলেন। যারা জানে না, তারা ভাবতেও পারবে না আই এস আই কী ভয়ানক অত্যাচার করে। ছেলে হলে একরকম, মেয়ে হলে আরেকরকম। কিছুদিন আগে মুজফফরাবাদে এক এজেন্টের শরীর থেকে একটু একটু করে চামড়া আলাদা করে দিয়েছিল। সারা শরীর ক্ষত আর ঘায়ে ভর্তি হয়ে উঠেছিল সে এজেন্টের, সে শরীরের উপর দিয়ে নুন লঙ্কার মিশ্রণ প্রয়োগ করে অত্যন্ত শীতে বরফের উপরে তাকে ফেলে দিয়ে গেছিল। ভারতীয় সেনা যখন সে শরীর উদ্ধার করে, মানসিকভাবে অত শক্তিশালী সেনারাও ও দৃশ্য নিতে পারেনি।
বাংলাদেশে ঠিক কী অবস্থা তৈরি হয়ে আছে এখন? তুষার শেখাওয়াতকে ফোন করার চেষ্টা করলেন। লাভ হল না। শেখাওয়াত ফোন ধরলেন না। তুষার সরাসরি প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে হটলাইনে ফোন করলেন। মন্ত্রীকে ফোনে পেতে মিনিট পাঁচেক লাগল। ঘুমঘোরে বললেন, ‘বলুন।’
তুষার বললেন, ‘স্যার, আই এস আইয়ের হাতে আমাদের এক এজেন্ট বন্দী হয়েছে বাংলাদেশে। এই মুহূর্তে আমরা অন্য কোনও অর্গানাইজেশনের হাতে বাংলাদেশ ছাড়তে পারব না। আমি বাংলাদেশের পরিস্থিতির কন্ট্রোল হাতে নিয়ে নিতে চাই। শেখাওয়াতকে কন্ট্যাক্ট করতে পারিনি। আমার কাছে আর কোনও অপশন নেই। কোড সেভেন ব্রেক করার অর্ডার দিন স্যার।’
মন্ত্রী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘আর ইউ সিওর?’
তুষার বললেন, ‘আপনার কাছে এখনও অবধি বাংলাদেশ রিলেটেড এরকম কোনও ইন্টেল এসেছে? আপনি জানেন ওখানে আমাদের এজেন্ট ধরা পড়েছে?’
মন্ত্রী বললেন, ‘না।’
তুষার বললেন, ‘আমি ঝুঁকি নিতে চাইছি না। আমার কন্ট্রোল চাই।’
মন্ত্রী বললেন, ‘গিভ মি ফাইভ মিনিটস।’
তুষার বললেন, ‘ওকে স্যার।’
ফোন কেটে গেল। মিনিট পাঁচেক পরে মন্ত্রীই ফোন করলেন, ‘শেখাওয়াত ফোন ধরছে না তুষার। আমাকে কোন খবরও দেয়নি।’
তুষার বললেন, ‘স্যার প্লিজ, আপনি আমাদের এগোতে বলুন। আর দেরি করা যাবে না।’
মন্ত্রী বললেন, ‘ওকে। গো অ্যাহেড।’
তুষার বললেন, ‘থ্যাংক ইউ স্যার। আর প্লিজ, এর পর শেখাওয়াত যে ঝামেলা করুক...।’
মন্ত্রী বললেন, ‘আমি বুঝে নেব। ইউ গো অ্যাহেড।’
তুষার খুশি হলেন, ‘ওকে স্যার।’
সকাল ন’টা বাজে।
পরোটা আর আলুভাজা করে দিয়েছে ইমতিয়াজ।
অমল ওঠেনি। রাণা টিভি দেখছিল। ইমতিয়াজ রাণার সামনে বসে বলল, ‘আমি কিছুতেই সাকিনাকে ফোনে পাচ্ছি না। কী হতে পারে?’
রাণা বলল, ‘ওর সাথে আমার তেমন যোগাযোগ হয়নি। অমল বলতে পারবে হয়তো।’
ইমতিয়াজ চিন্তিত গলায় বলল, ‘সমস্যার ব্যাপার হল। অমল উঠবে না? ওকে তুলি?’
রাণা বলল, ‘না তোলাই ভালো মনে হচ্ছে। পরিশ্রম হয়েছে।’
ইমতিয়াজ কাঁধ ঝাঁকাল, ‘ঠিক আছে। যা ভালো বোঝো। তুমি খেয়ে নাও।’
রাণা বলল, ‘ঠিক আছে।’
একটা ফোন বাজার শব্দ হল। ইমতিয়াজ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল, ‘ওরে বাবা, এই ফোনটা বাজে কেন আবার?’
ব্যস্ত হয়ে ইমতিয়াজ ঘরের ভেতর চলে গেল। রাণা দেখল ইমতিয়াজ বেশ নিচু স্বরে কথা বলছে। এমনিতে ইমতিয়াজের গলার স্বর অনেকটা চড়া। সে লোক গলা নামিয়ে কথা বলছে মানে চিন্তার ব্যাপার।
মিনিট পাঁচেক পরে ইমতিয়াজ ফোন রেখে এসে অমলকে ঠেলে তুলে দিল, ‘ওঠো ওঠো।’
অমল ঘুমচোখে উঠে বসে বলল, ‘কী হয়েছে?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘হাই অ্যালার্ট ফোন এসেছে দিল্লি থেকে। আমাদের কোনও এজেন্ট নাকি আই এস আইয়ের হাতে আটকে পড়েছে। এদিকে আমি সাকিনাকেও ফোনে পাচ্ছি না। দিল্লি থেকে একটা টিম এসে যাবে আজ। কী করব?’
অমল বলল, ‘সাকিনাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না?’
ইমতিয়াজ ঘাড় নাড়ল, ‘না।’
অমল রাণার দিকে চাইল, ‘আমাদের ঢাকা যেতেই হবে। সাকিনাকে তুলে নিয়ে গেলে সমস্যা আছে।’
ইমতিয়াজ রেগে গেল, ‘মাথা খারাপ হয়েছে? এখন ঢাকা যাবে?’
অমল বলল, ‘এছাড়া কী করব? আচ্ছা, আমি সাকিনার কাছে লোক পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। গিয়ে দেখে আসুক। তারপর দেখছি কী করা যায়।’
অমল পকেট থেকে ফোন বের করে নাম্বার ডায়াল করল। মিনিটখানেক কথা বলে ফোন রেখে বলল, ‘সাকিনাকেই তুলেছে যা মনে হচ্ছে। বাজারের ওখানে সাকিনার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করার জন্য আমাদের একজনকে বসানো ছিল। তার বডি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সাকিনাও মিসিং। দুইয়ে দুইয়ে চার হতেই হবে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘কার কার নাম জানে সাকিনা?’
অমল ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে দেখল, ‘অলমোস্ট অল। ঢাকার গোটা অপারেশন ওর উপর টিকে আছে।’
ইমতিয়াজ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘আমার নাম?’
অমল ঘাড় নাড়ল, ‘জানে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘বলে দেবে কি?’
অমল বলল, ‘না বলার চান্স আছে। কিন্তু আমি তো ওই চান্সের দিকে যেতে চাইছি না। ওর লাইফ রিস্ক হয়ে গেছে। আই এস আইয়ের গিয়াসের আসার কথা আছে। গিয়াসের সামনে সাকিনা পড়লে চাপ আছে।’
ইমতিয়াজ ভীত গলায় বলল, ‘করাচীর গিয়াস? হাতে মাথা কাটে যে? কোয়েটাতে বালোচ লিবারেশনের চারজনকে নিজের হাতে মেরেছিল ছেলেটা। ওর হাতে সাকিনা পড়া মানে...’
অমল বলল, ‘হ্যাঁ। ধরে নিলাম সাকিনা গিয়াসের হাতে পড়েই গেছে। গিয়াসের কাছে থাকা মানে সমস্যা তৈরি হয়ে গেছে এর মধ্যেই। ওকে বের করতেই হবে। দিল্লি থেকে কে আসছে? উস্তাদ আসবে?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘উস্তাদের সাথে কন্ট্যাক্ট করতে পারছি না। কথা শুনে বুঝলাম খান আর মাথুর আসবেন। ওরা এখানকার সব রিপোর্ট নিতে চাইছেন।’
অমল বলল, ‘কে রিপোর্ট দেবে? আমি? আমি এখান থেকে কী রিপোর্ট দেব? আমার ঢাকায় যাবার ব্যবস্থা করতে হবে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘সাকিনাকে নিয়ে যাবার প্ল্যান করছে। সেটার কথাও ভাবতে হবে।’
অমল বলল, ‘নেপাল হয়ে নিয়ে যাবার প্ল্যান করবে। সব দিকে রেড অ্যালার্ট জারি করে দিতে হবে। দিল্লি সে কাজ করবে জানি, তাও তুমি একবার দিল্লিকে জানিয়ে দাও সে কথা। সমস্যা হল উস্তাদ ছাড়া সাকিনার এই অপারেশনের কথা দিল্লির কেউ জানে না। সাকিনা পুরোপুরি উস্তাদের আবিষ্কার। সাকিনার ব্রিফ দিতে হবে যে টিম আসবে তাকে। আমি এখান থেকে সেটা কী করে দেব?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘আমি গাড়ির ব্যবস্থা করছি। দুপুরের মধ্যে ঢাকা রওনা দেব।’
অমল ঘাড় নাড়ল, ‘বেটার। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’
অমল উঠে বাথরুমের দিকে রওনা দিল। ইমতিয়াজ রাণার দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে বলল, ‘আমার বরাবরের আতঙ্ক এটাই। কভার উড়ে যাওয়া। সাকিনা এখন আমাদের থ্রেট’!
রাণা উত্তর দিল না। কে যে কার থ্রেট! এসব কাজে মানুষের উপর থেকে বিশ্বাসই উঠে যেতে বসেছে...
দু-দিন আগের কথা
লতিফ চৌধুরী গম্ভীর হয়ে বসে আছে।
তার সামনে মাদ্রাসার প্রধান মজনুদ্দিন বসে বসে জানলার বাইরের প্রকৃতি দেখছে।
লতিফ বলল, ‘কী খবর আপনের?’
মজনুদ্দিন বলল, ‘চলতেছে।’
লতিফ বলল, ‘কথা কম বলতেছেন?’
মজনুদ্দিন হাসার চেষ্টা করল, ‘জি জনাব। অধিক কথা কওন ভালা না।’
লতিফ বলল, ‘ভালো। পাকিস্তান গড়ার লক্ষ্যে আপনের মতো মানুষ দরকার। আপনি পাকিস্তান গড়ার একজন কারিগর। ভুলবেন না।’
মজনুদ্দিন বলল, ‘জি জনাব। আপনের অসীম করুণা।’
লতিফ বলল, ‘আমায় বলবেন না। তারে বলুন। তিনিই সব কিছুর মালিক। আমার কুড়িজন ছেলে লাগবে মজনুদ্দিন সাহেব।’
মজনুদ্দিন ঘাবড়ে গেল, ‘কুড়িজন?’
লতিফ ঠান্ডা চোখে মজনুদ্দিনকে দেখল, ‘কেন? পারবেন না? কুড়িটা ছেলে পাকিস্তান গড়ার জন্য দিতে পারবেন না? তাহলে এত এত টেকা পাঠানো হয় কী জন্য?’
মজনুদ্দিন বলল, ‘জনাব, আমারে হিসাব করতে দেন। এতিম ছেলে জোগাড় করতে হবে তো! বাপ-মায়ে থাকলে অনেক ঝামেলা করে।’
লতিফ বলল, ‘বাপ-মা থাকা ছেলেই জোগাড় করবেন। আপনারে শুধু ছেলে মানুষ করার জন্য টেকা পাঠানো হয় না। ছেলে, তার অভিভাবক, তার পাড়া প্রতিবেশী, সবাই যেন পাকিস্তান গড়ার লক্ষ্যে দীক্ষা পায়, তার জন্য টেকা পাঠানো হয়। টেকাগুলান আপনার ভুঁড়ি বাড়ানোর জন্য পাঠানো হয় না।’
মজনুদ্দিন বলল, ‘জি জনাব। আমি এক মাসের মধ্যে আপনারে তালিকা পাঠাইতেছি।’
লতিফ রাগী গলায় বলল, ‘একমাস না। আমার এখন লাগবে তালিকা। আমাকে জায়গামতো জবাব দিতে হয়। বোঝঝেন মিয়াঁ?’
মজনুদ্দিন বিষম খেল। লতিফ বলল, ‘বিষম খাইলে তো হবে না। কর্তারা আসছেন, তাগো হিসাব দিতে হইব। এত এত টেকা আসে, সৌদি থিকা আসে, বাইরে থিকা আসে, তার তো হিসাব লাগব না? এমনি এমনি তারা টেকা পাঠায়? চরিত্র তৈরি করতে পাঠায়, যখন লাগব, তখন সে ছেলেদের কামে পাঠাইতে হইব। হইব না?’
মজনুদ্দিন বলল, ‘ছেলেরা এখনও ছোট জনাব।’
লতিফ চোখ ছোট করল, ‘কত ছোট?’
মজনুদ্দিন বলল, ‘বারো-তেরো বছরের ছেলে। এদের দিয়া কী হইব?’
লতিফ বলল, ‘সেইডা কে ঠিক করবেন? আপনে?’
মজনুদ্দিন বলল, ‘রাজনৈতিক বিষয় আছে জনাব। এলাকা থিকা একসঙ্গে এত গুলান ছেলে লা পাতা হইলে অনেক জবাবদিহি করতে হইব।’
লতিফ বলল, ‘ঢাকা বেড়াইতে লইয়া আইবেন। যাদের নির্বাচিত করবেন, তাদের আলাদা বাসে রাখবেন। সে বাস মিসিং হইয়া যাইব। বোঝঝেন?’
মজনুদ্দিন অবাক চোখে কয়েক সেকেন্ড লতিফের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘বুঝছি।’
লতিফ বলল, ‘দেশ গড়া বোঝেন? দেশ গড়তে কত বলিদান লাগে জানেন? ছহি ইসলামি পাকিস্তান গড়তে হইব আমাদের। চারদিকে ন্যাংটা পুলাপান ভরতি হইয়া গেছে। কায়ামতের দিন করিব চইলা আইসে। কেন হইসে এরূপ? আমরা আর পাকিস্তান নাই বইলা। দেশরে ইন্ডিয়ার কাছে বেইচা দিলে হইব? হইব না। দেশ গড়ার জন্য ছেলে লাগব।’
মজনুদ্দিন বলল, ‘জনাব, কুড়ি জন ছেলের বাবা-মায়ের লগে কথা বইলা নিমু?’
লতিফ হাত দিয়ে মাছি তাড়াবার ভঙ্গি করল, ‘দরকার নাই। গরিব হতদরিদ্র ঘরের ছেলে তারা। তাগো খাওন-দাওন সব আমরা দিতেছি। পরিবর্তে আমাগোও যা লাগব, তাগো তা দিতে হইব। আপনি জানেন, পাকিস্তান সরকারের লোকেরা আপনার নাম জানবে, যদি আপনি এই কাজ ঠিক কইরা করতে পারেন তবে?’
মজনুদ্দিন বলল, ‘জনাব, আপনি যা বলবেন, তাই মেনে চলার চেষ্টা করি। তবু এই কামটা বড় ছোট কাম না জনাব। একসঙ্গে কুড়িজন ছেলে, এলাকায় ঝামেলা হইবে, পুলিশ আইব, অনেক রকম সমস্যা হইব।’
লতিফ বলল, ‘পুলিশ আমি বুইঝা নিমু নে, আপনি মিডিয়ারে সামলাইবেন। উলাঝুলা মুখে কান্না করবেন শুধু। বুঝঝেন?’
মজনুদ্দিন বলল, ‘বুঝছি জনাব। এই ছেলেরা কী করবে জনাব?’
লতিফ ঠান্ডা চোখে বলল, ‘পাকিস্তান গড়বে। আপনারে কবার কওন লাগব? আপনি চান না পাকিস্তান জিতুক? চান না?’
মজনুদ্দিন ঘাবড়ে গিয়ে মাথা নাড়ল, ‘চাই জনাব। ইনশাল্লাহ তাই হবে।’
লতিফ খুশি হল। বলল, ‘ঢাকার ট্যুর দেন। তারপর বাকি কথা কমু। ফান্ডে টেকা পৌঁছায়ে যাইব। কুড়িজন পাইলে কেউ হিসাব চাইব না মনে রাখবেন।’
মজনুদ্দিন শুকন মুখে বলল, ‘জি জনাব।’
বর্তমান সময়
দুপুর আড়াইটা।
বৃষ্টি পড়ছে। নির্মল নিস্তেজ হয়ে ঘরে শুয়ে আছে। অফিস যায়নি সে। টিভিটা একঘেয়ে খবর পরিবেশন করে যাচ্ছে।
কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। সোবাহান সাহেবের কথাগুলো মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, ‘ইন্ডিয়ার দালাল।’
এই কথাগুলো অনেকবার শুনেছে সে। ঠারে ঠোরে তাকে এটাই বোঝানো হয়েছে বরাবর। আনোয়ার সাহেব যেদিন এসেছিলেন, সেদিন একটা কথা বলেছিলেন, ‘নির্ভয়ে কাজ করো। যদি তুমি সততার সঙ্গে কাজ করো, আর কেউ কোনদিন না থাকে, আমি থাকব।’
ছিলেনও। বিনা প্রশ্নে যখন সে যা বলেছে, তাই শুনেছেন। প্রকৃত অভিভাবকের মতো মাথার উপর ছিলেন। সে মানুষ নেই ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে।
সোবাহান সাহেবের কথা শুনে বোঝা গেল উনি আনোয়ার সাহেবকে ভারতের দালাল হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন। সোবাহান সাহেব বরাবরই পাকিস্তানপন্থী। কথাবার্তায় পাকিস্তান প্রায়ই বেরিয়ে আসে। প্রায়ই বলেন এ দেশকে ভারত নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। দেশকে ভারতের নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে রাখা দরকার। প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্য বা পাকিস্তানের থেকে সুযোগ-সুবিধা নিতে হবে।
আনোয়ার অন্য কথা বলতেন। বার বার বলতেন, দেশ স্বতন্ত্রভাবে চলা উচিত। কোনও ধর্মাবলম্বী নয়, যে দেশ ধর্মনিরপেক্ষ, কোনও ধর্মকে অনুসরণ করে না, সে দেশের উন্নতি অনেক বেশি হয়। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ সে দেশের উন্নতির পদে বাধা দেয় সব সময়। স্বাধীনতার পর ভারত যতটা এগিয়েছে, পাকিস্তান ততটাই পিছিয়েছে। কূটনৈতিক ভাবে তারা ধর্মীয় জঙ্গি সন্ত্রাসবাদী সংস্থাগুলোকে ভারতের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। ফলে বাঘের পিঠে উঠতে হয়েছে। এই বাঘ তাদেরও খেতে শুরু করেছে এবারে। গোটা দেশটাকে খাবার পর সে বাঘ যেন বাংলাদেশেও না আসে, সেটা আটকাতে হবে বাংলাদেশকেই। কথাগুলো সোবাহানসহ অনেকেরই ভালো লাগত না। তবে আনোয়ার সাহেবকে টলানো যায়নি কোনদিন। এ জন্যই হয়তো সরতে হল।
নির্মল জরিনার কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করল। সাকিনা কে? সে নিরুদ্দেশ হয়েছে? সাদিকের সঙ্গে সাকিনার কী সম্পর্ক ছিল?
পর পর একগাদা প্রশ্ন মাথায় আসছে।
ফোন বাজছে। আলমের ফোন। নির্মল সঙ্গে সঙ্গে ধরল, ‘বল।’
আলম বলল, ‘দোস্ত, তোমারে একখান কথা কই।’
নির্মল বলল, ‘বল। তোমার কথা শোনার জন্যই তো বসে আছি।’
আলম বলল, ‘সাদিক একটা পক্ষী বুঝলা।’
নির্মল অবাক হল, ‘মানে?’
আলম বলল, ‘ঘুঘুপক্ষী। এক্কেরে দারুণ এক ঘুঘুপক্ষী। যে পক্ষীর এত ডানা আছে, সে সব ডানার নাগাল পেতে আমার কালঘাম ছুইটা গেছে।’
নির্মল বলল, ‘যেমন?’
আলম বলল, ‘চার খান ফাইল আছে তার। দুটো সাদা, দুটো কালো। কালো ফাইলগুলান আবার আলাদা জায়গায় রাখা। আমি তার মধ্যে একটা ফাইলের ছবি তুলতে পারসি। আরেকখান এখনও নাগালে নাই।’
নির্মল উত্তেজিত হয়ে দেওয়ালে ঘুষি মারল, ‘ইয়েস। কী পাওয়া গেল?’
আলম বলল, ‘ইস্তানবুল, করাচী, কুয়ালালামপুর, কলম্বো, কাঠমান্ডুতেও তিনি ব্যবসা করেন। এক্সপোর্ট দেখানো হইছে। ক্লাসিফায়েড টেক্সটাইল। মানে কী?’
নির্মল বলল, ‘মানে জানার দরকার নেই। কত ডলারের ট্রানজাকশান?’
আলম বলল, ‘শুধু এই অর্থবর্ষে একশো সাতাশ কোটি বাংলাদেশি টাকা।’
নির্মল বিস্মিত হয়ে বলল, ‘কী? এত টাকা? সম্ভব? এ দেশের ধনী লোকেদের তালিকায় তার নাম কোথায়?’
আলম হাসল, ‘ভাইরে, তালিকা বাইরে গেলে তাইলে তো ধনী হবে সে। সমস্ত ট্রানজাকশানই হিডেন।’
নির্মল বলল, ‘তোমাদের ডিপার্টমেন্টের একটা চক্র যতক্ষণ না তাকে সরাসরি হেল্প করবে, ততদিন ও এ কাজ করতে পারবে না। এর মানে হল তোমাদের একটা অংশ এর সঙ্গে জড়িত।’
আলম বলল, ‘সন্দেহ নাই। এ দেশের অনেক রাঘববোয়ালদের ফাইলই এভাবে আছে। সাহেবেরা তাদের মতো করে এসব হ্যান্ডেল করে। তবে সাদিক ভাই ইজ টুরু লাভ রে ভাই। এত টাকা সবার কাম না।’
নির্মল বলল, ‘টাকাটা তো এখানেও শেষ হয়নি। আরেকটা ফাইলও তো আছে।’
আলম বলল, ‘রাতটা দাও। বের করছি। আনুমানিক এই সংখ্যাটাকেই দুই দিয়ে গুণ করে খুশি থাকো।’
নির্মল বলল, ‘খুশি থাকতে পারছি কোথায়? যে পার্টিগুলোর সঙ্গে ট্রানজাকশান হয়েছে, সেগুলিও লাগবে তো। এ দেশে টাকা পাঠায় কোথাও?’
আলম বলল, ‘জি পাঠায়। নোয়াখালি, চিটাগাং-এর অনেক মাদ্রাসাতেই পাঠায়।’
নির্মল ভ্রু কুঁচকাল, ‘মাদ্রাসায়?’
তাকে অবাক করেই যেন টিভিতে সংবাদ পরিবেশক বলে উঠল, ‘ব্রেকিং নিউজ। নোয়াখালি থেকে ঢাকায় শিক্ষামূলক ভ্রমণের জন্য আসা মাদ্রাসার তিনটি বাসের একটি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে। ঘটনাটি জানা গেছে একটু আগে যখন বাসগুলোর একটির সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন জানার পর মজনুদ্দিন সাহেব বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যোগাযোগ করেন। আমরা এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত খবর নিয়ে আসছি খুব শিগগিরি। সঙ্গে থাকুন।’
নির্মল ফোন রেখে চিন্তিত মুখে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল।
সকাল দশটা।
এয়ারপোর্ট থেকে নেমে গাড়িতে উঠলেন দুজনে।
মাথুর আগেই ফোন অন করেছিলেন। খানকে বললেন, ‘পীযূষ ফোন করতে বলেছে।’
আশরফ ইশারায় বোঝালেন সেফ হাউজে পৌঁছে ফোন করবেন।
গাড়ি প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে একটা দরজির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দুজনে নেমে গিয়ে দোকানের ভেতরে প্রবেশ করলেন। দোকানদার বলল, ‘কী চাই?’
খান বললেন, ‘ভাত খাব। ইলিশ দিয়ে। টাকা এনেছি।’
একটা দশ টাকার বাংলাদেশি নোট এগিয়ে দিলেন খান। তার কোণটা ছেঁড়া।
দোকানদার নোট হাতে নিয়ে দেখে বললেন, ‘আসুন। ট্রায়াল রুম এদিকে।’
দোকানের পেছনের দিকে একটা ছোট ঘর। দুজনে সে ঘরে ঢুকলেন।
খান মোবাইলের টর্চ জ্বেলে দেওয়ালে কিছু একটা খুঁজতে শুরু করলেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই তার মুখে হাসি ফুটল। একটা সুইচে হাত দিলেন। গোপন দরজা খুলে গেল। দুজনে ঢুকতে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। একটা ছোট খাটো ঘর। অ্যাটাচড বাথরুম। এসি চালালেন খান। আলো জ্বালিয়ে বললেন, ‘দেখি, পীযূষ কী বলে।’
মাথুর খাটে বসে বললেন, ‘ফোন করো।’
খান পীযূষকে ফোন করলেন। পীযূষ ফোন তুলেই বললেন, ‘একটা অডিও পাঠাচ্ছি। শোন। ফ্রেশ রিলিজ।’
খান বললেন, ‘পাঠাও। ওকে দেখছি।’
ফোনটা কেটে খান মেসেজ বক্স দেখলেন। অডিও মেসেজটা এসেছে। অন করলেন খান,
‘প্রিয় বন্ধুরা,
উপরওয়ালার প্রিয়তম বান্দারা,
আমাদের বন্ধুরা যারা এতদিন আমাদের হয়ে কথা বলত, তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একটার পর একটা আইন। আমাদের ভাইদের বেঁচে থাকাটাকেই দুষ্কর করে দিয়েছে সবাই। দেশের প্রতিটা অঞ্চলের ভাইরা জানে, কাশ্মীরে কী হচ্ছে। এত সহজে আমরা কাশ্মীর ছেড়ে দেব না। দুটো সেনা রেখে যারা ভেবেছে কাশ্মীর দখল হয়ে যাবে, তারা ভুল ভেবেছে। আমরা জড়ো হব, আমাদের স্বাধীনতার যুদ্ধে, এই জিহাদে আমরা কাশ্মীরকে মুক্ত করবই। লড়াই ছাড়লে চলবে না বন্ধুরা। আমাদের প্রত্যেকের রক্ত চায় এ জেহাদ। জিততে আমাদের হবেই।
কণ্ঠরোধ করে কাশ্মীরকে চুপ করে রাখবেন ভেবেছেন? অত সোজা হবে? হতে দেব না। এত সহজে হতে দেব না...আমরা আসছি। বেঁচে থাকাটাই কঠিন করে দেব। প্রতিটা রক্তের হিসেব নেব আমরা। বুঝে নেব সবটা।’
মাথুর ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘সে কী গো? গলাটা চেনা লাগছে না?’
আশরফ বললেন, ‘হু। হাসান মাকসুদের গলা। রেকর্ডেড।’
মাথুর বললেন, ‘তুমি শিওর হাসান মাকসুদকে আমরা সেই শাস্তিই দিয়েছি? জানা গেছে কি কিছু?’
খান মাথা নাড়লেন, ‘না। এখনও কিছুই জানি না। ক্লাসিফায়েড ইনফরমেশন। তুষার স্যার জানতে পারেন।’
মাথুর বললেন, ‘জিগ্যেস করো। ফোন করো।’
খান বললেন, ‘জেনে কী করবে?’
মাথুর বিরক্তগলায় বললেন, ‘এখন আমাদের আবার ওই হাসান মাকসুদের ভূত তাড়া করবে? জেনে নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যেত না?’
খান চেয়ার টেনে বসলেন, ‘ঠিকই। তুষার স্যারকে ফোন করি। দেখা যাক কোনও ইনফো দেন নাকি।’
মাথুর খানের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললেন, ‘করো।’
খান তুষারের নাম্বার ডায়াল করে ফোন স্পিকারে দিলেন।
ফোন রিং হচ্ছে। একবার পুরো রিং হয়ে যাবার পরেও তুষার ফোন ধরলেন না। খান আবার ফোন করলেন। এবার তুষার ফোন ধরলেন।
খান বললেন, ‘স্যার, পীযূষের অডিওটা পেয়েছেন?’
তুষার বললেন, ‘আমিই পাঠাতে বলেছি। তোমাদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, তাই তো?’
খান বললেন, ‘বুড়োটার বেঁচে থাকার দরকার ছিল না স্যার। দয়া-মায়া দেখিয়েছেন কি? ওর অডিও বেরোল কী করে এখন?’
তুষার বললেন, ‘জ্যোতির্ময়ের অডিও নিয়ে ভেবো না। এ আই এর জমানায় তোমার বেসুরো গলা দিয়ে কিশোর কুমারের গান গাওয়ানো যাবে। এভ্রিথিং ইজ পসিবল।’
খান হাঁফ ছাড়লেন, ‘ওকে স্যার। মাথা থেকে এটা সরালাম। আমাকে জানান, এখন আমরা কী করব?’
তুষার বললেন, ‘সেল অ্যাক্টিভেট করো, গিয়াস কোথায় আছে খোঁজো। আমাদের যে এজেন্টই ওর কাছে থাকুক, আজ রাতের মধ্যে তাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করতে হবে। প্রাইমারি টার্গেট এটাই।’
খান বললেন, ‘রাইট স্যার। কাজ শুরু করছি।’
তুষার বললেন, ‘ওখানে আমাদের যারা আছে, লিস্ট পাঠাচ্ছি। কতজনের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করতে পারছ দেখো। বাকিটা আমি পরে বলছি।’
খান বললেন, ‘রাইট স্যার।’
তুষার ফোন কাটলেন। খান দেখলেন, তার ফোনে একটা লিস্ট চলে এসেছে। দুজনে ফোন নিয়ে বসে গেলেন।
‘ঠিক কত দিন ঢাকার পরিচিতি বানাতে লেগেছে আমার, জানো? রুমান নামের চরিত্রটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে?’
অমল চায়ে চুমুক দিয়ে বলল।
রাণা জিজ্ঞাসুচোখে অমলের দিকে তাকাল। ইমতিয়াজ গাড়ির ব্যবস্থা করতে বেরিয়েছে। কিছুক্ষণ পরে গাড়ি এলে তারা ঢাকা রওনা দেবে।
অমল বলল, ‘তেরো বছর! উনচল্লিশ বছর বয়স আমার। তেরো বছর আগে আমি এ দেশে এসেছিলাম।’
তেরো বছর? রাণার কত দিন হল? সবে এল! তাও এত বড় একটা কাজে? সে সংকুচিত হল।
অমল বলে চলল, ‘ওল্ড স্কুল মেথড বুঝলে? ওই সময়টা চারদিকে এত ক্যামেরা ছিল না। ভিড়ে মিশতে সুবিধে হয়েছিল। হাতের তালুর মতো চিনতে হবে শহর। প্রথম পোস্টিং কোথায় ছিল জানো?’
রাণা বলল, ‘কোথায়?’
অমল হাসল, ‘মগবাজার। ভিক্ষা করতাম ছেঁড়া জামা পরে। জিগ্যেস করতাম কী হবে স্যার ভিক্ষা করে? কাউকে ফলো করতে হবে? উত্তর আসতো, না। কাউকে মারতে? উত্তর এল, না। তাহলে কী করতে? বিস্মিত হয়ে জিগ্যেস করতাম। একটাই উত্তর আসতো। করে যাও। আমাকে কেউ কোনও কাজ দিত না। হঠাৎ করেই সাদিকের কাজটা এল। সব তৈরি করে ওর বিশ্বাস অর্জন করলাম। সব এত সহজে চলে যাবে?’
রাণা বলল, ‘আসগরের জন্য আপনি কি আমাকে দোষ দিচ্ছেন?’
অমল মাথা নাড়ল, ‘না। দিচ্ছি না। দিলে শুরুতে বাধা দিতাম। মনে করে দেখো, আমিও তোমাকে ওকে মারতে বলেছিলাম, বাধা দিইনি। হিসেব করে দেখতে গেলে ও ব্যাটাকে আমিও অনেকদিন ভেবেছি উড়িয়ে দিই। তোমার গিল্ট ফিলিং হতে পারে, ভেবো না, যা করেছ ঠিক করেছ। পাচার করার আগে ওই বিকৃতমনস্ক আসগর সাত-আট বছরের বাচ্চাদের সঙ্গে যা করত, তার বিস্তারিত বিবরণ দিলে তোমার সব গিল্ট ফিলিং চলে যাবে। ওসব নিয়ে ভেবো না।’
রাণা বলল, ‘কিন্তু সাদিক আপনাকে সন্দেহ করতে পারে। সাকিনা যদি নাম বলে দেয়?’
অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘কী আর হবে? মরে যাব? মেরে ফেলবে? মারুক। এর বেশি আর কী হতে পারে? মরতে ভয় পাই না। পাবো না।’
রাণার অস্বস্তি হচ্ছিল। অমল তার টার্গেট? কী করে হয়? ঠিক কী করেছে অমল যে উস্তাদ তাকে অমলকে মারতে পাঠিয়েছেন? মানুষের সঙ্গে থাকলে তার কুকীর্তিগুলো বাইরে আসতে শুরু করবেই একটা সময়ে, অথচ অমলের সঙ্গে থাকার পর কী হয়েছে? এক রাতে অজ্ঞাতপরিচয় কারো সঙ্গে দেখা করেছিল। করতেই পারে। এরকম কাজে অনেকের সঙ্গেই গোপনে দেখা হতে পারে। সেটা নিয়ে অভিযোগ করার কোনও কারণ নেই। জিগ্যেস করবে? না থাক। এখনও সে সময় আসেনি।
ইমতিয়াজ ব্যস্ত হয়ে ঢুকল, ‘গাড়ির ব্যবস্থা করেছি। আমি দিয়ে আসব। ভেক ধরবে না? এইভাবেই বেরোবে?’
অমল বলল, ‘আধ ঘণ্টা লাগবে। চলো রাণা, তোমাকেও তৈরি করে দিই।’
আধঘণ্টাই লাগল। রাণাকে বয়স্ক লোক বানিয়ে দিল অমল। নিজের বয়স সামান্য বাড়িয়ে নিল। রাণাকে বলল, ‘চাচা ভাতিজা। ঠিক আছে না? চলো।’
রাণা হাসল। চাচা সাজতে হবে ভাবেনি কোনও দিন।
গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে ইমতিয়াজের বাড়ির সামনে। ইমতিয়াজ বলল, ‘আমার মনে হয় না তোমাদের পথে কোনও সমস্যা হবে। তবে হলে জিনিস আছে তো?’
অমল বলল, ‘না। রাণার কাছে ছিল, সে হারিয়ে বসে আছে।’
ইমতিয়াজ অদ্ভুত চোখে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী করতে এদেশে এসেছ, তাও ভুলে গেছ নাকি?’
রাণা চমকে ইমতিয়াজের দিকে তাকাল। ইমতিয়াজ হাসি হাসি মুখে তার দিকে চেয়ে আছে। রাণা মাথা ঠান্ডা করে বলল, ‘ভুলিনি।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘দাঁড়াও। নিয়ে যাও।’
অমল আপত্তি করল, ‘না, না। দরকার পড়বে না।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘তোমার না লাগতে পারে, রাণার জন্য দিচ্ছি। রাণা, এসো।’
রাণা অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘নিয়ে নাও। ইমতিয়াজ ভাই বললে দরকার আছে তার মানে!’
ইমতিয়াজ ঘরের ভেতর গেল। পেছন পেছন রাণা। ইমতিয়াজ আলমারি খুলতে খুলতে বলল, ‘ভুলে গেছ, কেন এসেছ?’
রাণা চাপা গলায় বলল, ‘আপনি কী করে জানলেন?’
আলমারি থেকে একটা অটোমেটিক রিভলভার রাণার হাতে দিয়ে ইমতিয়াজ বলল, ‘তোমায় যিনি পাঠিয়েছেন, তিনি আমায় এ কথাটা তোমাকে জিগ্যেস করতে বললেন।’
রাণা বলল, ‘ভুলিনি। সময় লাগবে। আমি এখনও কিছু শিখিনি।’
ইমতিয়াজ হাসি মুখে রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাত্রা শুভ হোক। যাও।’
কলকাতা বিমানবন্দর। তুষার ফ্লাইট থেকে নেমে লাগেজ নেওয়ার ভিড়ে গেলেন না। তাঁর লাগেজ নেই। সরাসরি এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠলেন।
ড্রাইভার তাকে নিতে এসেছিল। রাঘব নাম। তুষারের পূর্বপরিচিত। তুষার বললেন, ‘কেমন আছ রাঘব?’
রাঘব বলল, ‘ভালো স্যার। আপনি ঠিক আছেন তো?’
তুষার বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তো থাকতে হয়। আচ্ছা শোন, তুমি এই ঠিকানাটা চেন নাকি দেখো তো।’
রাঘবের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিলেন তুষার।
রাঘব বলল, ‘লোকেশন দেখে চলে যাচ্ছি স্যার। অসুবিধা হবে না।’
তুষার খুশি হলেন, ‘ফাইন।’
গাড়ি চলতে শুরু করল। তুষার পকেট থেকে পেন বের করে নোটপ্যাডে লিখলেন, ‘আছে? না নেই? কিপিং মাই ফিঙ্গারস ক্রসড। থাকতেই হবে যে করে হোক।’
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা নিউটাউনের অত্যাধুনিক বৃদ্ধাশ্রমে প্রবেশ করল। গাড়ি থেকে নেমে কোনদিকে না তাকিয়ে তুষার রিসেপশনে গেলেন।
রিসেপশনে একজন ছেলে আর একজন মেয়ে বসে আছে। তুষারকে দেখে দুজনেই হেসে বলল, ‘স্যার, হাউ মে উই অ্যাসিস্ট ইউ?’
তুষার বললেন, ‘আমার বন্ধু আছে এখানে। দেখা করতে চাই।’
মেয়েটা বলল, ‘নাম বলুন স্যার।’
তুষার বললেন, ‘অনিল শেখাওয়াত। কোন ফ্ল্যাটে থাকে, কোন ঘরে, কিছু জানি না। আপনারা হেল্প করলে সুবিধা হয়।’
দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ছেলেটা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘সরি স্যার, ওই নামে এখানে কেউ থাকে না।’
তুষার হেসে ফেললেন, ‘যে আপনাদের এসব লুকোতে বলেছে, তাকে বরং একবার ফোন করুন। বাকিটা আমি বুঝে নেব না হয়।’
ছেলেটার হাসি কমল। বলল, ‘কেউ বলেনি স্যার। সত্যিই এখানে কেউ থাকে না।’
তুষার ছেলেটার দিকে স্থির চোখে চেয়ে থেকে বললেন, ‘কৌশিক সেন। আধার নাম্বার ৩৪৫২*৪২৫*৫। বাঁ হাতি, বাড়ি বাগুইহাটি, বাবা মা-র এক ছেলে। অথচ কলেজ লাইফে একবার পরীক্ষা না দিয়ে পালিয়ে গেলে। সেই থেকে ড্রপ আউট। বাবা-মা আছেন। দিদির বিয়ে হয়েছে পাটনাতে। মাঝে মাঝে এখানে ঢপ মেরে ছুটি নিয়ে পাটনায় দিদির সঙ্গে দেখা করে আস। ডান পায়ে হাঁটুর কাছে একটা কাটা দাগ আছে, ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়ে হয়েছিল। কলেজ লাইফে প্রেম করতে, কিন্তু তুমি ড্রপ আউট জেনে প্রেমিকা কেটে গেল। ব্রাউজারে রাত দশটার পর ইনকগনিটো মোডে পর্ণ সাইট দেখো।’
ছেলেটা আর মেয়েটা হাঁ করে তুষারের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা বলল, ‘আপনি কে?’
তুষার বললেন, ‘কথা বাড়াচ্ছ কেন কৌশিক? আমার হাতে বেশি সময় নেই। তুমি নিয়ে যাবে না আরও নতুন কোনও ইনফো দেব? দেরি করলে তোমার সমস্যা বাড়বে এটুকু বলতে পারি। আর হ্যাঁ, শেখাওয়াতকে কোনও ফোন করবে না।’
কৌশিকের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি ডেস্ক থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘চলুন স্যার। আমি নিয়ে যাচ্ছি।’
তুষার কথা বাড়ালেন না। কৌশিকের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলেন।
কয়েক মিনিট পরে একটা দরজার সামনে নিয়ে গিয়ে ছেলেটা বলল, ‘এই রুমটা। আমি আসি।’
তুষার মাথা নাড়লেন, ‘ওকে।’
কৌশিক চলে গেল। তুষার কলিং বেল টিপলেন।
দরজা খুলে গেল। যে দরজা খুলল তিনি তুষারের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘মনে হচ্ছিল আপনি আসবেন। আসুন।’
তুষার ঘরে ঢুকে বললেন, ‘তোমরা মিনিস্ট্রিকে কনভিন্স করে অর্গানাইজেশনকে ভাগ করলে, মেনে নিলাম। নিজেদের জন্য সব রকম স্বাধীনতা চাইলে, তোমাদের তাও দেওয়া হল। এবার দয়া করে কি বলবে ঢাকায় ঠিক কী চলছে?’
শেখাওয়াত ঘাড় নাড়লেন, ‘কিছু না তো। এভ্রিথিং ইজ নর্মাল।’
তুষার মৃদু হাসলেন, ‘ওকে। তুমি যা বলবে, তাই মেনে নিতে হবে। বাই দ্য ওয়ে, তোমার কী খবর শেখাওয়াত? কাউকে কোনও রিপোর্ট করার প্রয়োজন বোধ করছ না, আমরা জানি তুমি থাইল্যান্ডে সেটল করে গেছ অথচ দেখা যাচ্ছে কলকাতায় এরকম একটা বৃদ্ধাশ্রমে একা একা বসে আছ। সমস্যাটা কী?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘আমি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তোমাকে দিতে বাধ্য নই।’
তুষার পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ড কাজ করে ফোনটা শেখাওয়াতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মিনিস্ট্রি অর্ডার। আমার আগের সমস্ত চার্জ রিস্টোর হয়েছে। আমি বাংলাদেশও দেখব তার অর্ডার আছে। এবার কি তুমি আমাকে বলবে ঢাকায় কী হচ্ছে?’
শেখাওয়াত থমথমে মুখে তুষারের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
টিভিতে খবরটা মাঝে-মাঝেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাচ্ছে। কুড়িজন ছাত্রসহ বাস নিখোঁজ হয়ে গেছে। বৃষ্টি নেমেছে। বাইরেটা সাদা হয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির ধোঁয়ায়।
নির্মল তার স্ক্র্যাপ বুক বের করল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খবর সে এই স্ক্র্যাপবুকে আঠা দিয়ে চিপকে রাখে।
মৌলানা বজলুদ্দিনের একটা উক্তি সে নিজেই লিখে রেখেছিল। বজলুদ্দিন একটা সময়ে আওয়াজ তুলেছিল, এ দেশ পাকিস্তানকে ফিরিয়ে দিতে হবে নিজের সৈনিকদের জন্য। তখনই একটা সমাবেশে বজলুদ্দিন একটা কথা বলেছিল, ‘আমাদের সৈন্য দরকার। ছোট থেকে যেখানে যত লোক আছে, তাদের জড়ো করো। বিরাট সৈন্য দরকার। তাদের একসঙ্গে এনে পাকিস্তান তৈরি করতে হবে।’
নির্মল নিজের মনেই বলল, ‘একজ্যাক্টলি সেম মডেল ফলো করছে। কোনও ছেলে হারায়নি। এরা এদের ব্রেন ওয়াশ করে কোথাও পাঠাবে এবার। কোথায় পাঠাবে? কে রিকুইজিশন করেছে? এতগুলো ছেলেকে কোনও জায়গায় পাঠাতে গেলে প্রচুর টাকা লাগবে। টাকার সোর্স কে? সাদিক?’ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াল সে। পায়চারি করতে শুরু করল, ‘সাদিক টাকা একসঙ্গে করছে, বা সাদিকের কাছে টাকা আসছে। সে টাকা যাচ্ছে এই ধরনের ছেলেদের ট্রেনিং-এর কাজে। ট্রেনিং অনেকেই দিতে পারে, আইসিস হতে পারে বা এই ধরনের কোনও সংগঠন। উফ! আমি কী করব এবারে?’
দেওয়ালে জোরে ঘুষি মারল নির্মল। এভাবে হবে না। ঘরে বসে থাকলে কিছুতেই হবে না। মোখলেসকে ফোন করল সে। মোখলেস সঙ্গে সঙ্গে ফোন তুলল, ‘জি স্যার।’
নির্মল বলল, ‘সাদিকের বাড়ি থেকে কত দূরে আছ?’
মোখলেস বলল, ‘ফুটপাথেই আছি। ঝুপড়ির ভিতরে। কেউ নাই এখন।’
নির্মল বলল, ‘আমার সেসব জানার দরকার নেই। পাখি বেরিয়েছে?’
মোখলেস বলল, ‘না স্যার। পাখি সকাল থেকে বেরোয় নাই।’
নির্মল একটু থমকে গিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। রাখছি।’
সাদিকের কারখানাগুলোর তালিকা করেছে সে। শহরের বাইরে একটা কারখানা আছে। বাস যদি সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তো অসুবিধা হবার কথা না! কিন্তু নিশ্চিত হবে কী করে যে সাদিকের কাছেই গেছিল?
তার মাথায় সাদিক ছাড়া অন্য কেউ আসছে নাই বা কেন? হতেই পারে সাদিক কিছু করেনি এখানে। কুড়িটা ছেলেকে নিয়ে বাসটা কেউ অপহরণ করেছে। করলে অবশ্য এতক্ষণে মুক্তিপণের দাবি আসত। তাও খটকার জায়গা হল, কিডন্যাপাররা কিডন্যাপ করলে বড়লোকদের বাড়ির বাচ্চাদের কিডন্যাপ করবে। গরিব, আধা এতিম, দুঃস্থ মাদ্রাসা ছেলেদের কেন কিডন্যাপ করতে যাবে? ধাঁধার উত্তর একটাই, বাস হারায়নি। ছেলেগুলো অন্য কোথাও গেছে।
ঘরে থাকতে ইচ্ছে করছে না। অথচ ধরা পড়লে সোবাহান সাহেব অন্য সমস্যায় ফেলতে পারেন। কী যে করে!
বিরক্ত হয়ে স্ক্র্যাপবুকটাই ঘাটতে শুরু করল সে। আরেকটা নিজের হাতে বানানো নোট পেল, জাহির স্যারের, ‘সমস্যায় পড়লে ফোন করবে। আমি আছি।’
জাহির...ইনি আনোয়ার সাহেবের বন্ধু। এক পার্টিতে দেখা হয়েছিল। জাহির বলেছিলেন নির্মলকে তার পছন্দ হয়েছে। পরে কথা বলবেন। পরে আর কথা বলা হয়নি। এঁর সঙ্গে কি কথা বলবে? অনেক উঁচু পদে আসীন। কথা বলবে? না বলবে না? বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নির্মল ঠিক করল ফোন করবে। ফোনবুকে নাম্বার পাওয়া গেল। সে খানিকটা ইতস্তত করেই ফোন করল, কয়েকটা রিং হবার পর জাহির ফোন ধরলেন, ‘বলুন নির্মল।’
নির্মল বিস্মিত হল, ‘আমার নাম্বার আপনার ফোনে সেভ আছে স্যার?’
জাহির হাসলেন, ‘তুমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। তোমার নাম্বার সেভ থাকবে না, তা কি হয়? বলো কী হয়েছে।’
নির্মল বলল, ‘স্যার দেখা করা যাবে?’
জাহির বললেন, ‘শিওর। কখন বলো।’
নির্মল বলল, ‘এখনই?’
জাহির বললেন, ‘আমার অফিসে চলে এস। বুঝতেই পারছি খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনও কথা হবে। চলে এস।’
ফোন রেখে নির্মল দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে গাড়ি স্টার্ট করল। হৃদস্পন্দন বেড়ে চলেছে তার, কেমন জ্বর জ্বর লাগছে।
খানিকটা পথ যেতে ফোন বাজতে শুরু করল। নির্মল দেখল সোবাহান ফোন করছে। ধরল সে, ‘হ্যালো।’
‘তুমি অফিস ছুটি নিলে হঠাৎ?’
নির্মল বলল, ‘শরীর ভালো লাগছে না স্যার।’
‘বেরিয়েছ কেন?’
নির্মল থমকে গেল। তার ফোন ট্যাপ হয়েছে? এখন ফলো করছে তাকে?
তুষার চুপ করে বসে আছেন।
অনিল শেখাওয়াত বেশ কয়েকবার ফোন করেও দিল্লিতে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
তুষার বললেন, ‘অকারণ চেষ্টা করে যাচ্ছ। তোমার সঙ্গে কেউ কন্ট্যাক্ট করবে না। আমি চার্জ হ্যান্ডওভার করে নিতে চাইছি। দেরি করলে ক্ষতিটা আমাদেরই। তোমার পাঠানো এক এজেন্ট আই এস আইয়ের হাতে পড়েছে। জানো সেটা?’
শেখাওয়াত হাল ছেড়ে দিলেন। ফোনটা খাটে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। জানি। আমার আরেক এজেন্টকে মেরেও দিয়েছে।’
তুষার বললেন, ‘এরা কেউ স্লিপিং ছিল না? সব স্লিপিং সেলগুলোকে তুলে নিয়েছ নাকি?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘কী করতাম? আই এস আই ম্যাক্সিমাম ম্যান পাওয়ার তুলতে শুরু করছে বাংলাদেশ থেকে। আমরা বসে থাকব?’
তুষার ভ্রু কুঁচকালেন, ‘কবে থেকে হচ্ছে এসব? এগুলো মিনিস্ট্রি জানে?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘তুমি সব মিনিস্ট্রিকে জানাও? পলিটিকাল লোকেরা সব জানলে তোমার চলবে তো?’
তুষার শ্বাস ছাড়লেন, ‘ওকে। তা ঠিক করেছ। তোমার এজেন্টকে ওরা ধরল কেন?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘আমি জানি না কীভাবে ধরল। ধরার কথা না। নিশ্চয়ই বোকার মতো কাজ করেছে মেয়েটা।’
তুষার চোখ বড় বড় করলেন, ‘মেয়ে? বাংলাদেশে কোন মেয়ে আছে? আমি কোনও মেয়েকে ট্রেইন করিনি বাংলাদেশের জন্য। কবে হয়েছে এসব?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘আমি ট্রেন করে পাঠিয়েছি। নতুন মেয়ে।’
তুষার বললেন, ‘নতুন মেয়ে? কত দিনের ট্রেনিং?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘ছ’মাস। এনাফ ফর হার। শি ইজ টাফ।’
তুষার বললেন, ‘ওকে। কোথায় পাঠিয়েছ?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘সাদিক শেখের ব্রথেলে।’
তুষার কয়েকসেকেন্ড শেখাওয়াতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যদি কোনও রোগ ধরে, তখন?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘ওহ, কোন যুগে পড়ে আছ তুমি? দেশের জন্য এটুকু করতে পারবে না?’
তুষার শ্বাস ছাড়লেন, ‘দেশের নাম করে আর কী কী করেছ তুমি? জাল নোট ছড়ানোর কাজ করেছিলে বর্ডারে, আমি সেটা জানি। সেটা কেন করেছিলে?’
শেখাওয়াত কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘ওই সাদিকের বিশ্বাস অর্জনের জন্যই। বড় মাছ। খুব বড় মাছ। ঢাকায় আই এস আই ছাড়াও অনেক কিছুর সঙ্গে যুক্ত। আমার এজেন্টরা ওর গতিবিধির রিপোর্ট আমার কাছে পাঠায়। তোমাকে সব দিয়ে দেব, দেখে নিও।’
তুষার বললেন, ‘আর কোনও এজেন্ট?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘অমল।’
তুষার উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ‘তুমি অমলকে অ্যাক্টিভেট করে দিয়েছ?’
শেখাওয়াত পকেট থেকে একটা চিউইং গাম বের করে তার মোড়ক খুলে গামটা অর্ধেক করে তুষারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘চিবোও। উত্তেজিত হচ্ছ কেন? শোন যেটা বলছি।’
তুষার চিউইং গামটা নিয়ে চিবোতে শুরু করলেন, ‘কবে করেছ?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘ঢাকার চার্জ নিয়েই। অমলকে আমার দরকার ছিল। অমল ছাড়া সাদিক আর তারেকের কীর্তি কেউ জানত না। অমল ওর মতো করে সাদিকের দলে ভিড়েছে। সাদিকের হয়ে কাজ করে, সাদিকের হোয়ার অ্যবাউটস আমাদের পাঠায়।’
তুষার পায়চারি শুরু করলেন, ‘অমল কোথায় এখন?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘জানি না।’
তুষার দাঁড়িয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে, ‘জানো না মানে?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘সাদিকের এক সাগরেদকে অমল আর রাণা উড়িয়েছে। ওর ডেরায় রেইড হবার পর থেকে ওরা নিখোঁজ আপাতত।’
তুষার বিস্ফারিত চোখে বললেন, ‘অমলের কভার এক্সপোজ হয়ে গেছে?’
শেখাওয়াত আমতা আমতা করে বললেন, ‘সেটা এখনও কনফার্ম নই।’
তুষার বললেন, ‘আর এই রাণা কে?’
শেখাওয়াত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘ওকেও নতুন পাঠানো হয়েছে। কাজ শেখানোর জন্য।’
তুষার শেখাওয়াতের সামনে বসলেন, ‘কতদিন ট্রেনিং?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘একদিনও না। অমল শেখাবে বলে পাঠানো হয়েছে।’
তুষার বললেন, ‘তোমার নতুন রিক্রুটদের ব্যাপারে অ্যাপ্রুভালগুলো কে করেছিল?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘তার কেন দরকার হবে? আমরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট বডি। আমায় কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না।’
তুষার হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করতে লাগলেন। শেখাওয়াত বললেন, ‘রাণা ইজ গুড। ভেরি গুড। ওই তারেককে সরিয়েছিল।’
তুষার বললেন, ‘তারেককে কন্ট্র্যাক্ট কিলার সরিয়েছিল।’
শেখাওয়াত বললেন, ‘এই সেই কন্ট্র্যাক্ট কিলার।’
তুষার আবার উঠে দাঁড়ালেন। চুইং গামটা মুখ থেকে বের করে ডাস্টবিনে ফেলে ইলেকট্রিক কেটলিতে জল গরম করে চা বানালেন। টি ব্যাগ গরম জলে নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘এজেন্সির অবস্থা এত খারাপ ছিল জানতাম না তো! কন্ট্র্যাক্ট কিলার পাঠিয়ে দিচ্ছ, মেয়েটার হেলথের কেয়ার না করে সাদিকের ব্রথেলে পাঠিয়ে দিলে, এবার কী হবে? মেয়েটার কী হবে?’
শেখাওয়াত চুপ করে রইলেন। তুষার চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘সাত আট নাম্বারের ব্যাটসম্যানকে হঠাৎ করে ফার্স্ট ডাউনে ব্যাট করতে পাঠানো হতো কয়েকটা শট খেলার জন্য। তাদের বলা হতো পিঞ্চ হিটার। ঢাকায় তুমি পিঞ্চ হিটার পাঠালে কেন? কাকে মারতে?’
শেখাওয়াত একটু চমকে উঠে সামলে নিয়ে বললেন, ‘মারতে পাঠাইনি। ছেলেটার কাজ ক্লিন। আমি দেখেই নিয়েছি। হি ইজ গুড, বিলিভ মি।’
তুষার সন্দিগ্ধ চোখে শেখাওয়াতের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তার মনে প্রশ্নের ঝড় উঠছে। কিছু একটা জিগ্যেস করতে গিয়েও চুপ করে গেলেন তিনি।
তার মনে হল শেখাওয়াত কিছু একটা লুকোচ্ছে। কী লুকোচ্ছে সেটাই বুঝতে চাইছিলেন তিনি...।
ইমতিয়াজ গাড়ি চালাচ্ছে। অমল ইমতিয়াজের পাশে বসে আছে।
রাণা গাড়ির পেছনে। তার পকেটে ইমতিয়াজের দেওয়া রিভলভার। যন্ত্রটা পকেটে এলেই রাণার হাত নিশপিশ করতে থাকে। মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত। একটা সময় অবধি মানুষ একটা পিঁপড়ে অবধি মারতে ভয় পায়। সেই মানুষটাই যখন রক্তের স্বাদ পায়, তখন আরেকবার রক্তের স্বাদ না পাওয়া অবধি সে ছটফট করতে থাকে।
রাণা বুঝতে পাচ্ছিল তার অস্বস্তি হচ্ছে। তার রক্তই তাকে সব কিছু ভুলিয়ে দিচ্ছে।
ইমতিয়াজ বলল, ‘চার ঘণ্টার ব্যাপার। বেশিক্ষণ লাগার কথা না। তাও রাস্তার কথা তো বলা যায় না। কখন মামাদের ইচ্ছে হবে গাড়ি সার্চ করার। রাণা ঘাবড়িও না।’
রাণা পাত্তা দিল না। ভয় পাবার কিছু নেই। অহেতুক ভয় পেতে যাবে কেন? অমল তখন বাইরের ঘরে ছিল। ইমতিয়াজ গলা নামিয়ে বলল, ‘রাস্তায় কাজটা করতে চাইলে করতে পারো। আমি সামলে নেব। উস্তাদকে বলে না হয় তোমাকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেব কিছুদিনের জন্য।’
রাণা অবাক হয়ে বলেছিল, ‘আর সাকিনা?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘ও দিল্লি সামলে নেবে।’
রাণা কিছু বলেনি। চুপ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিল।
এখন অমলের সঙ্গে কেমন সুন্দর করে কথা বলছে ইমতিয়াজ। অমল কি জানে ইমতিয়াজ আসলে তাকে মারতে বলছে? অদ্ভুত একটা পরিস্থিতি তো! লাইব্রেরিতে পড়া ঠগিদের গল্প মনে পড়ে গেল তার।
ঠগিরা তো এমনই ছিল। সর্বক্ষণ বন্ধুর মতো পাশে থাকত। গল্প করত। একসঙ্গে খেত। তাদের শিকারকে তারা তারিয়ে তারিয়ে খেলাত। তাদের ওভাবেই আত্মগোপন করে বন্ধু সেজে শিকারের সঙ্গে ঘুরতে ভালো লাগত। একটা সময় মওকা বুঝে পেছন থেকে গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে দিত। অদ্ভুত একটা ঠান্ডা টাইপের দল ছিল তাদের। নিজেকে ঠগি বলে মনে হচ্ছিল রাণার।
অমল চিন্তিত গলায় বলল, ‘ঢাকায় গিয়াস এলে কোথায় থাকতে পারে? সাদিকের কাছে থাকার রিস্ক কি ও নেবে? আসগরের ঘটনার পর সাদিকের ক্রেডিবিলিটি কমার চান্স আছে।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘সাদিককে ফোন করতে পারো তো। খোঁজ নাও।’
অমল বলল, ‘করব?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘হ্যাঁ, করো। বেশি দূরে থাকলে সন্দেহ বাড়বে। অবশ্য জানি না এখন কী সিচুয়েশন আছে।’
অমল পকেট থেকে ফোন বের করে সাদিককে ফোন করল। একবার রিং হতেই সাদিক ফোন ধরল, ‘সালাম ওয়ালাইকুম রুমানভাই। আপনি নেই, আমার অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারছি না কী করে সামাল দিব।’
গলাটা আন্তরিকই শোনাল। অমল বলল, ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী আর বলি বলেন তো ভাই, আমার ফ্ল্যাটে পুলিশ দেখার পর থেকে আমার মাথার ঠিক নাই। খুব ভয় লাগতাসে ভাই।’
সাদিক বলল, ‘আপনেরা আমার কাছে চলে আসেন মিয়াঁ। কুনো হালার পুত আপনাগো গায়ে হাত দিতে পারব না। আমি কইতাছি। আমার ওয়াদা রইল। কই আছেন কন, আমি গাড়ি পাঠাইতেছি।’
অমল বলল, ‘দরকার নাই ভাই। আমি আসতাছি আপনার বাসায়।’ অমল গলায় কান্না নিয়ে এল, ‘আসগরের লইগা খুব মন খারাপ লাগে ভাই।’
সাদিক বলল, ‘ভাববেন না ভাই, আপনি আসেন। আমি সব সামলায়ে নিতাছি। অনেক কাম আছে ভাই, আপনি ছাড়া হবে না।’
অমল বলল, ‘আইতাছি ভাই। আইতাছি।’
ইমতিয়াজ আয়নায় রাণার দিকে তাকাল। রাণার চোখে পড়ল ইমতিয়াজ তাকে দেখছে। ইমতিয়াজ চোখ নামিয়ে বলল, ‘খুব ভালো সেটিং করে ফেলেছ যাই হোক।’
অমল বলল, ‘নাটক নাকি বুঝতে পারলাম না। হি ইজ আ টাফ নাট টু ক্র্যাক। দু-তিন বার দেখেছি, এভাবেই নিজের লোকেদের ডেকে এনে হাপিশ করে দিত। ভেরি শ্রুড ব্রেইন। ওকে অত তাড়াতাড়ি পড়ে নেওয়া অসম্ভব।’
ইমতিয়াজ হঠাৎ গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল রাস্তার পাশে। অমল বলল, ‘কী হল?’
ইমতিয়াজ দাঁত বের করল, ‘হালকা হই।’ ইমতিয়াজ গাড়ি থেকে নেমে গেল।
অমল বলল, ‘সাদিকের কাছে যাওয়া ঠিক হবে রাণা? তোমার কী মনে হয়?’
রাণা বলল, ‘আমার থেকে আপনি ওকে বেশিদিন চেনেন। আপনি যা বলবেন তাই করা যাবে।’
অমল বলল, ‘তোমার ইন্সটিংক্ট কী বলছে?’
রাণা বলল, ‘সাকিনাকে বাঁচাতে হলে যেতেই হবে। না গিয়ে উপায় নেই। ওকে ছাড়া সাকিনার কাছে পৌঁছনোর উপায় আছে কি?’
অমল ঘাড় নাড়ল, ‘রাইট। মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। ওভাবে জানোয়ারদের হাতে মেয়েটাকে ছাড়া যাবে না।’
রাণা আরও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। অমল ঠিক কী করেছে যার জন্য এরা এভাবে...?
জাহির হোসেন চেম্বারেই ছিলেন। তার সেক্রেটারিকে গিয়ে নাম বলায় চেম্বারে প্রবেশের অনুমতি মিলল।
জাহির নির্মলকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন, ‘এস এস। কী সৌভাগ্য আমার, তুমি এখানে এসেছ।’
নির্মল লজ্জা পেল, ‘এরকম বলবেন না স্যার। আমি নিতান্ত নিরূপায় হয়েই আপনার কাছে এসেছি।’
জাহির বললেন, ‘বোস।’
নির্মল বসল। জাহির বললেন, ‘বলো কী হয়েছে।’
নির্মল একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘স্যার, আমার মনে হয় না আনোয়ার সাহেবের মৃত্যুটা স্বাভাবিক।’
জাহির ভ্রু কুঁচকালেন, ‘কেন এরকম মনে হচ্ছে?’
নির্মল বলল, ‘সাদিক শেখের নাম জানেন?’
জাহির বললেন, ‘কে সে?’
নির্মল বলল, ‘একজ্যাক্টলি স্যার। সাদিক শেখ এই সেদিনও কী করত আমরা কেউ জানতাম না। আমি জানলাম, আনোয়ার সাহেব জানলেন, তার ঠিক পরেই সাহেবের অকস্মাৎ মার্ডার...তারপর থেকে ক্রমাগত আমি থ্রেট পাচ্ছি একটা জায়গা থেকে, আমাকে হঠাৎ করে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়েছে। আমি বুঝতেই পারছি না আমি ঠিক কী করব এখন। এত কিছুর পরে আবার আজকে দেখলাম কুড়িটা ছাত্র নিয়ে একটা বাস নিখোঁজ হয়ে গেছে। আমি কোনও দিশা না পেয়েই আপনার কাছে এলাম স্যার।’
জাহির পেপারওয়েট হাতে নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘তুমি বলছ আনোয়ার সাহেব সাদিক শেখের ব্যাপারে জানার পর মার্ডার হলেন। সাদিক শেখটা কে?’
নির্মল বলল, ‘যার কয়েক কোটি টাকা ব্ল্যাক ট্রানজাকশান চলছে বিদেশের কয়েকটা দেশের সঙ্গে অথচ আমাদের কর দফতর যার ব্যাপারে লিস্ট ইন্টারেস্টেড। যখনই আমি ওর সাগরেদ আসগর খুনের পর কেসটা তদন্ত করতে শুরু করি, একটার পর একটা অদ্ভুত তথ্য সামনে আসতে শুরু করল। কিন্তু বাধা পাচ্ছি প্রতি মুহূর্তে। এখন মনে হচ্ছে আমারই বোধ হয় লাইফ থ্রেট...’
জাহির জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, ‘একবারেই না, ওসব ভেব না। ভালো হয়েছে তুমি আমার কাছে এসেছ। আমি বিষয়টা দেখছি। বাই দ্য ওয়ে, সোবাহানকে তো টেম্পোরারি পোস্ট দেওয়া হয়েছে, সে তো রীতিমত পাকিস্তানপন্থী লোক, সবাই জানে সেটা। সে লোক তোমার পেছনে লাগবে সেটা জানা কথা...ওয়েট।’
জাহির সোবাহানকে ফোন করে ফোন স্পিকারে দিলেন। সোবাহান ধরলেন, ‘সালাম ওয়ালাইকুম সাহেব।’
জাহির প্রত্যুত্তরে সালাম জানিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম আপনার খবর নিচ্ছিলেন জনাব।’
সোবাহান বললেন, ‘ম্যাডাম মানে? পিএম?’
জাহির বললেন, ‘হ্যাঁ। কেমন চলছে ইত্যাদি। উনি কয়েকজন পাকিস্তানপন্থী রাজাকারদের ব্যাপারে ইতিমধ্যেই বেশ বিরক্ত হয়েছেন। কয়েকটা সিক্রেট রিপোর্ট এসেছে ওর কাছে। আপনি জানেন তো?’
সোবাহান উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘আপনার কাছে মালাউনটা গেছে, না? আমি জানি তো, ও আপনার কান ভারি করছে।’
জাহির গলা খাকরে বললেন, ‘মালাউন? আপনি ওই পদে থেকে এই শব্দটা ইউজ করছেন? আপনি জানেন তো এই শব্দটার ব্যাপারে ম্যাডাম কতটা স্ট্রিক্ট?’
সোবাহান বললেন, ‘জনাব আপনি আমার কথা শুনুন। আমি যেটা বলছি, সেটা শুনুন। আমরা একসঙ্গে বসতে পারি। কথা বলতে পারি। সাহেব, দেশটা তো আমারও, তাই না?’
জাহির বললেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন আপনি যে পদে আছেন সে পদটা আপাতত টেম্পোরারি? সাদিক শেখের ফাইলগুলো কোথায়?’
সোবাহান আমতা আমতা করতে শুরু করলেন। জাহির বললেন, ‘এখন দুপুর দুটো বাজে। আমি তিনটে অবধি আমার চেম্বারেই বসে আছি। আপনি সশরীরে এসে সাদিকের সম্পর্কে রিপোর্ট দিয়ে যাবেন।’
সোবাহান বললেন, ‘আপনার কাছে নির্মল বসে আছে তো? ওর কাছেই সাদিকের সব রিপোর্ট আছে।’
জাহির ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘একজন এফিশিয়েন্ট অফিসারকে আপনি অকারণে হ্যারাস করছেন, তাকে ফলো করছেন, সম্ভবত তার ফোন ট্যাপও করছেন। আপনি যদি ভেবে বসে থাকেন যা ইচ্ছে তাই করবেন, আপনার হাতে অগাধ ক্ষমতা আছে, তাহলে আপনি মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। আমার ডেস্কে দুপুর তিনটের মধ্যে সাদিক সম্পর্কিত সব ডকুমেন্ট চাই। নইলে আপনি ওই সময়েই পদত্যাগ করবেন প্রেস ডেকে। অ্যাম আই ক্লিয়ার?’
বলেই ফোন কেটে দিলেন। জাহির নির্মলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভয় কমেছে?’
নির্মল হেসে ফেলল।
জাহির বললেন, ‘নির্ভয়ে কাজ করো। আমি আছি। এসব সোবাহান দিয়ে বাংলাদেশ চলবে না। ওসব গল্প একাত্তরেই শেষ হয়ে গেছে। রাইট?’
নির্মল ঘাড় নাড়ল, ‘রাইট স্যার।’
জল পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা।
বাথরুমের মেঝেতে পড়ে আছে রুমা। সাদা ধবধবে টাইলসের উপরে সে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শুয়ে।
চোখ খুলতে কষ্ট হচ্ছে। কোনমতে চোখ খুলে দেখল তাকে বাথরুমে ফেলে রেখে গেছে। হাতটা কি ভেঙে গেছে? কী প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছে!
শরীরটা ঘষে ঘষে কলের তলায় পৌঁছে মাথা দিল সে।
চুলটা একটু একটু করে ভিজছে।
দিব্যেন্দুর কথা মনে পড়ছে। দিব্যেন্দুও একবার তাকে বাথরুমে আটকে রেখেছিল। বিয়ের প্রথম প্রথম। সেদিনই সম্ভবত বলে দিয়েছিল তার প্রথম প্রেমের কথা। আবেগের বশে। দিব্যেন্দুকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেনি সে! কী ভালো ভালো কথা বলত ছেলেটা!
‘এ তো কিছুতেই হতে পারে না তোমার জীবনে আমিই প্রথম পুরুষ। মানুষের জীবন দীর্ঘ হয়। সে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে এই সময় দেখা করে। তোমারও নিশ্চয়ই কারো না কারো সঙ্গে দেখা হয়েছিল। হতেই পারে। এ নিয়ে চিন্তার তো কিছু নেই। হিংসার কথা তো থাকতেই পারে না!’
রুমা গড় গড় করে বলে দিয়েছিল। দিব্যেন্দু শুনে হাসি হাসি মুখে বসে রইল।
রাত দশটা নাগাদ রুমা টিভি দেখতে বসেছিল। বৃষ্টি হচ্ছিল তখন বাইরে। বাজ পড়ছে। কী মনে হতে উঠে টিভি বন্ধ করে সবে প্লাগটা খুলেছে, হঠাৎ পিঠে কে যেন সজোরে চাপড় মারল। সে ছিটকে গিয়ে মেঝেতে পড়ল।
‘খানকি মেয়েছেলে, আমার সঙ্গে বিয়ে করেছিস তুই? চরিত্রহীন কোথাকার!’
রুমা শিউরে উঠেছিল। পিঠে কী ব্যথা করছে তখন। কিছুই বুঝতে পারছে না! পাগলের মতো তার গায়ে লাথি মারছে তখন দিব্যেন্দু, ‘শুওরের বাচ্চা, আমাকে ঠকিয়ে দিলি? কেন আগে বলতে কী হয়েছিল? এতদিন পরে আমি কেন জানতে পারব তুই কী করে এসেছিস? শুয়েছিলি লোকটার সঙ্গে? কী রে? শুয়েছিস?’
রুমা ‘মা গো’ বলে চিৎকার করে উঠছিল। দিব্যেন্দু চুলের মুঠি ধরে বলেছিল, ‘নাটক মাড়াচ্ছিস? এখন সিমপ্যাথি আদায় করার চেষ্টা না? কী ভেবেছিস? আমি কিছুই বুঝতে পারব না? চল...চল।’
চুল ধরে টানতে টানতে তাকে বাথরুমে ছুঁড়ে ফেলে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দিয়েছিল দিব্যেন্দু। এখানেই তো সে দুপুরে স্নান করেছিল! সাবান শ্যাম্পুর গন্ধটা তখনও আছে। অবিশ্বাস আর যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রুমা শুয়ে পড়েছিল। ঘুম ভেঙেছিল মাঝরাতে। তার ভীষণ ভূতের ভয় করতে শুরু করল। সে দরজা ধাক্কাল, ‘খোলো, দরজা খোলো না।’
দরজা খুলল না। ধাক্কাতে ধাক্কাতে একসময় ক্লান্তিতে মেঝেতে বসে পড়ল সে।
সকালে দরজা খুলে দিব্যেন্দু অফিস চলে গেল।
তার জ্বর এল। জ্বর নিয়েই কোনমতে ঘরের বাইরে গিয়ে মেঝেয় অনেকক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে ছিল রুমা।
মা-র কথা মনে পড়ছিল তার, ‘শ্বশুর বাড়িতে অনেক কিছু হতে পারে। বর গায়ে হাতও তুলতে পারে। তা বলে রাগারাগির তো কিছু নেই। তোর বাবা আমার গায়েও কত হাত তুলত। নতুন বউ সংসারে পাগলা হাতির মতো। তাকে বশ করার জন্য গায়ে মাথায় চড়-চাপড় মারতেই পারে। ওগুলোকে ধরে বসে থাকলে হবে না। বুঝতে হবে ওই সংসারটাই তো সারাজীবন করতে হবে। বর যেভাবে বলবে, তোকে তেমনভাবেই চলতে হবে। আমি কোনও কথা শুনব না।’
চোখের জলও কখন যেন শুকিয়ে গিয়েছিল। একটা সময় সে উঠে রান্না বসিয়ে খেয়েও নিল।
অফিস থেকে দিব্যেন্দু যখন ফিরল, একবারে স্বাভাবিক। মিষ্টি কিনে এনেছিল। হাসিমুখে প্যাকেটটা তার হাতে দিয়ে বলল, ‘নতুন দোকান খুলেছে। খেয়ে দেখো তো।’
যেন কিছু হয়ইনি। রুমা বলতে গেছিল, ‘তুমি কি আমার উপর রেগে আছ?’
দিব্যেন্দু হাত নেড়ে বলেছিল, ‘ধুস, কী যে বলো!’
প্যাকেট খুলে একটা মিষ্টি মুখেও দিয়েছিল সে। হঠাৎ আঁতকে উঠে দেখল, দিব্যেন্দু তার গলা টিপে ধরেছে, ‘খুব নোলা? আমি এনেছি, আমাকে না দিয়ে নিজে নিজে খেয়ে নিচ্ছিস?’
দম বন্ধ হয়ে উঠছে তার, বমি উঠে আসছে...দিব্যেন্দুর সেই রূপ, সে এখনও, এতদিন পরেও কিছুতেই ভুলতে পারেনি।
...
বাথরুমের দরজা খুলে গেল।
একটা কাপড় তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে গিয়াস বলল, ‘গেট রেডি।’
কাপড়টা হাতে নিয়ে চুপ করে বসে থাকল রুমা...।
সোবাহান তিনটের সময়েই এলেন।
জাহিরের চেম্বারের ওয়েটিং রুমে নির্মল টিভি দেখছিল। সোবাহান এলে নির্মলকে ডেকে নিলেন জাহির।
নির্মল চেম্বারে প্রবেশ করতেই সোবাহান তাকে দেখে বললেন, ‘সাদিকের ফাইল তোমার কাছে কিছু আছে?’
নির্মল বলল, ‘না। আমার কাছে কিছু নেই। অফিসেই ছিল যা থাকার।’
সোবাহান একটা মাত্র ফাইল নিয়ে এসেছিলেন। জাহিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জনাব আমার কাছে এই একটা ফাইলই আছে। এই ফাইলে সাদিকের বিষয়ে তেমন সন্দেহজনক কিছু নেই। আসগর এককালে ক্রিমিনাল ছিল, পরে ভালো হয়ে যায়৷ সাদিক ওকে সৎ পথে নিয়ে আসে।’
নির্মল বলল, ‘ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে সাদিকের ফাইলগুলো আনার ব্যবস্থা করা হোক। সেখান থেকেই ওর যাবতীয় ট্রানজাকশানের সম্পর্কে জানা যাবে।’
জাহির বললেন, ‘সে সব ঠিক আছে। সোবাহান সাহেব, আপনি নির্মলকে ট্রেনিং ডিপার্টমেন্টে দিয়েছেন কেন?’
সোবাহান বললেন, ‘আমি দিইনি তো। আনোয়ার সাহেবের সময় থেকেই ওকে ওখানে দেওয়া হয়েছে। আমি মন্ত্রীসাহেবের হুকুম তামিল করেছি মাত্র। ওকে ওর ভালোর জন্যই ওখানে দেওয়া হয়েছিল জনাব। নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। যদি সাদিক শেখ সত্যিই বড় প্লেয়ার হয়, তাহলে নির্মলকে টার্গেট করবে। সেটা তো হতে দেওয়া যায় না।’
জাহির বললেন, ‘ওকে যেখানে ছিল, সেখানে দিন। বাকিটা আমি দেখছি।’
সোবাহান বললেন, ‘জি জনাব। আমি যাব এখন?’
জাহির বললেন, ‘যান। বাই দ্য ওয়ে নির্মল, সাদিকের ট্যাক্সের ফাইলটা কে দিয়েছে তোমাকে?’
নির্মল বলল, ‘আমার এক বন্ধু। সোর্সটা বলা যাবে না স্যার।’
জাহির মাথা নাড়লেন, ‘তা ঠিক। তোমার ফ্যামিলি আছে তো?’
নির্মল বলল, ‘জি জনাব। স্ত্রী।’
জাহির বললেন, ‘তোমার ভয় লাগে না? বউ নিয়ে সংসার করছ, এই যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ফাইল নাড়াচাড়া করছ, যদি ওদের কাছে খবর যায়, তোমার বউকে তুলে নিয়ে যায়, তাহলে কী হবে?’
নির্মল চমকে জাহিরের দিকে তাকাল। জাহির বললেন, ‘সোবাহানকে আমিই চার্জ দিয়েছিলাম।’
নির্মলের মাথা কাজ করছিল না। এই একটু আগেই তো জাহির অন্য কথা বলছিলেন! সোবাহান হাসছিলেন। জাহিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সংখ্যালঘুদের নিয়ে এই সমস্যা বুঝলেন জনাব। এরা সবসময় দেখাতে চায় এরা দেশকে ভালোবাসে। আসলে তো কাজ করে ইন্ডিয়ার জন্য। আবার কেমন সাহস দেখুন, আপনার কাছেও চলে এসেছে।’
নির্মলের শরীরটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
জাহির বললেন, ‘তোমরা ইন্ডিয়ায় চলে যাও না কেন নির্মল? সুন্দর দেশ। কলকাতা সাইডে একটা জমি কিনে নিলে। নেতাদের টাকা খাইয়ে ওখানকার আইডিও পেয়ে যাবে। কী দরকার এ দেশে পড়ে থাকার? তুমি ট্রেনিং ডিপার্টমেন্টে থাকতে চাও না, ঠিক আছে, এক কাজ করো, আমি তোমাকে মায়ানমার সীমান্তে ট্রান্সফার করছি। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের চার্জটা বরং তুমি নিয়ে নাও। ওদিকে থাকলে খানিকটা বুঝতে পারবে বাকি দেশগুলো কীভাবে সংখ্যালঘুদের ট্রিট করে। নিজেই ঠিক করো, কলকাতা পালাবে না মায়ানমার সীমান্তে যাবে।’
সোবাহান বললেন, ‘তাই দিন জনাব। ওর রক্ত গরম। এখন ব্যস্ত থাকুক। ঢাকা ওর জন্য না। ছোট ভাইয়ের মতো বোঝালাম, বাবা, আনোয়ার সাহেবকে দেখে শিক্ষা নাও। ওই লোকেরও তো অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল। সে থাকতেই পারে। ছেলের সে ইচ্ছাই নাই! তোমাকে রিম্যান্ডে নিলাম না, হ্যারাসও করলাম না, শুধু তোমাকে একটা ভদ্র জায়গা দিলাম, বললাম শান্ত হয়ে বসে চাকরিটা কন্টিনিউ করো, ট্রেনিং দাও, কিন্তু না! ছেলের হিরো সাজতে লাগবে। সব ইন্ডিয়ান সিনেমা দেখার ফল। এভাবেই আমাদের দেশটা ইন্ডিয়া ধীরে ধীরে কিনে নিচ্ছে। সবই বুঝতে পারি, কী করব, সহানুভূতির সঙ্গেই তো নির্মলের ব্যাপারটা বিবেচনা করেছি। অন্য কেউ হলে কি ওকে বাঁচিয়ে রাখত বলুন?’
জাহির বললেন, ‘আমিই রাখতাম না। আপনি পরম ক্ষমাশীল।’
বমি পাচ্ছিল নির্মলের। মনে হচ্ছে মাথার উপর যেন কেউ একমণ ভার চাপিয়ে দিয়েছে। দেওয়ালে বঙ্গবন্ধুর ছবিটা যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
সোবাহান বললেন, ‘তাহলে নির্মলের ট্রান্সফার লেটারটা...?’
জাহির বললেন, ‘পেয়ে যাবে এখনই।’
দুজনেই হেসে উঠলেন...।
দাবা খেলছেন দুজনে। মাথুর জিতছেন।
খান চিন্তিত মুখে বললেন, ‘তুমি এত ভালো খেলা শিখলে কবে বল তো? আগে তো আমিই তোমাকে কতবার কিস্তিমাৎ করেছি। ইদানীং তুমি একবারে নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়েছ দেখছি। দাঁড়াতেই দিচ্ছ না। এত আক্রমণাত্মক খেলা শিখে গেছ, ভয় লাগছে তোমার সঙ্গে খেলতে।’
মাথুর বললেন, ‘কাশ্মীরে জওয়ানদের সঙ্গে খেলে খেলে হাত পাকিয়েছি। কর্নেল রায় যেমন। উনি যদি সেনায় না গিয়ে দাবা খেলতেন, তাহলেও অনেক দূরে যেতেন। দে আর অসাম।’
খান কোনমতে রানি বাঁচিয়ে বললেন, ‘সে তো ঠিক আছে, কিন্তু এখানে কাকে ডাকলে লাভ আছে বলে তোমার মনে হয়?’
মাথুর বললেন, ‘আমার তো একজনের কথাই মনে পড়ছে।’
খান বললেন, ‘কার কথা?’
মাথুর বললেন, ‘আরে সায়কের আগে যে করাচীতে ছিল। ওকে কী যেন একটা কারণে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়ে বলা হয়েছিল না যে তুমি জাস্ট এখানে থাকো। তোমাকে আর কোথাও যেতেও হবে না, তোমাকে আর কিছু করতেও হবে না। একপ্রকার শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।’
খান বললেন, ‘অমল? ভেবোও না। তুষার স্যার রেগে যাবেন।’
মাথুর বললেন, ‘হ্যাঁ, সে তো জানি, রেগে যাবেন, কিন্তু ঘটনাটা কী হয়েছিল করাচীতে? কী করেছিল অমল?’
খান বললেন, ‘জানি না। সেগুলো স্যার জানেন। তবে ঢাকার কোনও ব্যাপারে ওকে ইনভল্ভ করা হয় না, এটা তো অলিখিতভাবে সবাই জানে।’
খানের ফোন বেজে উঠল। তুষার ফোন করছেন। খান স্পিকারে দিলেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’
তুষার বললেন, ‘তোমাকে অদ্ভুত একটা খবর দিই খান। শেখাওয়াত বহু আগেই অমলকে অপারেশনে নিয়ে নিয়েছিল। অমল ঢাকায় বেশ খানিকটা সময় ধরেই সক্রিয়!’
মাথুর শিস দিয়ে উঠলেন, ‘কী অদ্ভুত ব্যাপার স্যার, আমরা এতক্ষণ ওর ব্যাপারেই আলোচনা করছিলাম। আপনি আমাদের বলতেন ওকে অপারেশনে নেওয়া যাবে না, এদিকে শেখাওয়াত ওকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে? এরকম কন্ট্রাডিক্টরি কেন ব্যাপারটা?’
তুষার বললেন, ‘জানি না। শেখাওয়াতের কথা একবারেই ট্রান্সপারেন্ট না। আমার মনে হচ্ছে ও অনেকখানি কথা পেটে রেখে তবেই কথা বলছে। ওকে আমি সবটা বিশ্বাসও করতে পারছি না। কিন্তু এই মুহূর্তে যদি অমল অ্যাক্টিভ থাকে, তাহলে আমি অমলকে ছাড়া আর কারো নাম ভাবতে পারব না। শেখাওয়াত একটা নাম্বার দিয়েছে। সেন্ড করছি। কন্ট্যাক্ট অমল।’
খান বললেন, ‘ওকে স্যার।’
তুষার বললেন, ‘শেখাওয়াত ঠিক কী কী করে রেখেছে, আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। অমলের সঙ্গে আরেকটা ছেলে থাকার কথা। সে কন্ট্র্যাক্ট কিলার। শেখাওয়াত ওকে অমলের কাছে পাঠিয়েছে কাজ শেখার জন্য।’
খান ভ্রু কুঁচকে মাথুরের দিকে তাকালেন, ‘যা ইচ্ছে তাই করছে তো!’
তুষার বললেন, ‘করতে পারে। শেখাওয়াত সব সময় কিছু না কিছু প্রমাণ করার চেষ্টা করেই যায়। এবারেও তাই করেছে। যাই হোক, ওসব নিয়ে ভেবো না, ওকে কন্ট্যাক্ট করো। আই এস আইয়ের হাতে আমাদের যেই থাকুক, তাকে রেসকিউ করা আমাদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি। বাকি পরে দেখা যাবে। ক্লিয়ার?’
খান এবং মাথুর দুজনেই বললেন, ‘ক্লিয়ার স্যার।’
তুষার বললেন, ‘ওকে, টেক কেয়ার। আপডেট দিয়ে যাবে।’
ফোন কেটে দিলেন তুষার। খান মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘শেখাওয়াত কী করতে চাইছে বল তো? ওর মধ্যে আমি দেখেছি হিরো সাজার একটা ব্যাপার ছিল বরাবরই। যেদিনই ঢাকা থেকে আমরা সরে গেলাম, সেদিন থেকে ও অমলকে অ্যাক্টিভেট করেছে। অথচ আমি জানতাম...’
মাথুর বললেন, ‘কী জানতে?’
খান বললেন, ‘থাক। পরে সব ঘটনা মনে করে তারপর না হয় বলব। হতে পারে আমি ভুল।’
তুষার নাম্বার পাঠিয়েছেন। খান দেরি করলেন না, নাম্বারটায় ফোন করলেন। একটা রিং হতেই ও-প্রান্তে ফোন রিসিভ হল, ‘হ্যালো।’
খান বললেন, ‘আকাশে মেঘের সঙ্গে অ্যালিয়েন দেখা যাচ্ছে।’
ও-প্রান্ত বলে উঠল, ‘অ্যালিয়েন আমেরিকা ছাড়া কিছু চেনে না।’
খান হেসে উঠলেন, ‘রিয়েলি ফানি। আপনি অমল?’
‘না। ইমতিয়াজ। আপনি?’
খান বললেন, ‘বাবা চাইছে ছেলে মা’র সঙ্গে কথা বলুক।’
একটু নীরবতা। তারপর অমলের গলা পাওয়া গেল, ‘বলুন।’
খান বললেন, ‘পাখি শহরের কাছে ঘুরছে না?’
‘না। পাখি তাড়া খেয়েছিল।’
‘ওকে। বুঝেছি। পাখির ঈদে জামা হবে, ট্রায়াল দেওয়ার দরকার। সব কাজ ফেলে আগে জামা কেনা দরকার।’
‘কিন্তু ঈগল সীতাকে নিয়ে গেছে।’
‘একসঙ্গে খোঁজা যাবে। আগে এখানে।’
‘ওকে।’
খান মাথুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আসছে।’
মাথুর বললেন, ‘ওকেই জিগ্যেস করব করাচীতে কী হয়েছিল?’
খান হেসে ফেললেন, ‘একবারেই না। কাজের বাইরে কোনও কথা বলবে না।’
মাথুর কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘ওকে হুজুর। আপনার যেমন মর্জি।’
বৃষ্টি পড়ছে গাড়ির উইন্ডশিল্ডে। সাদা হয়ে যাচ্ছে চারদিক। নির্মল চুপ করে বসে আছে। চোখের কোণে জল আসছে, সে আর মোছার চেষ্টা করছে না।
এ দেশটা তার না? জন্মভূমি, তার সব স্মৃতি তো এই দেশেই। এই দেশের মানুষদের কোনদিন পর বলে ভেবেছিল সে? চাকরি করতে গিয়ে প্রতিকূলতা থাকলেও যতদিন আনোয়ার সাহেব ছিলেন, কোনদিন মনে হয়নি এদেশ তার না। আজকে এভাবে অপমানিত হতে হল?
জাহিরের চেম্বার থেকে বেরোনোর সময় শরীর খারাপ লাগছিল তার। আশাভঙ্গ একরকম, আর এ তো কেউ ডেকে এনে চড় মারার মতো ব্যাপার!
গাড়ি স্টার্ট দিতে পারছে না। পা কাঁপছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
বৃষ্টিটা ধরে এল হঠাৎ করেই। একটু বসে থেকে গাড়ির দরজা থেকে বেরোতেই দেখল আলমগির হোসেন দল নিয়ে চলে এসেছেন, ‘চলো।’
নির্মল বুঝল তাকে রিমান্ডে নিতে এসেছে। সে বলল, ‘স্ত্রীকে একটা ফোন করতে পারি? এতদিন একসঙ্গে কাজ করেছি, এটুকু করতে দেবেন তো?’
আলমগির থমথমে মুখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘করে নাও।’
নির্মল কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন বের করে দীপাকে ফোন করল।
দীপা ফোন ধরেই বলল, ‘কোথায় থাকো বলো তো? আমরা কক্সবাজারে এসেছি। কী মজা হচ্ছে! মামা বলছে যেখানেই থাকুক জামাইকে এখানে চলে আসতে বল। চলে এস না।’
নির্মল কয়েক সেকেন্ড ধরে থেকে বলল, ‘আমাকে রিমান্ডে নিচ্ছে দীপা।’
দীপা আর্তনাদ করে উঠল, ‘মানে? ইয়ার্কি মারছ তুমি?’
নির্মল বলল, ‘না। রিমান্ডে নিচ্ছে। সাবধানে থেক। আমি যদি আর কোনদিন না ফিরি...’
আলমগির নির্মলের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ফোন কেটে সুইচ অফ করে দিয়ে বললেন, ‘চলো।’
নির্মল গাড়ির চাবিটা আলমগীরের হাতে দিয়ে বলল, ‘আমার গাড়িটা বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।’
আলমগির নির্মলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি পাশে বসছি। তুমি বাড়িতে গাড়ি রেখে চলো।’ আলমগির বাকিদের বললেন, ‘নির্মলের গাড়িটা ফলো করে এস।’ বাকিরা জিপে উঠে পড়ল।
নির্মল গাড়িতে উঠে বসল। আলমগির তার পাশে। নির্মলের পা কাঁপছে, হাত কাঁপছে। আলমগির সেটা দেখে বললেন, ‘আমি চালাচ্ছি।’
নির্মল গাড়ি থেকে নামল। আলমগির ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন। নির্মল বসল। গাড়ি স্টার্ট করে আলমগির বললেন, ‘কী করেছ তুমি? এই তো সারাক্ষণ আনোয়ার সাহেবের সঙ্গে কাজ করছিলে। এখন রিম্যান্ডে নিচ্ছে কেন?’
নির্মল জানলার বাইরে তাকাল। শহরটাকে অচেনা লাগছে। এখন তাহলে সে বিদেশে আছে? এ দেশটা তো তার নয়!
আলমগির হর্ন দিলেন, ‘শুনতে পাচ্ছ কী বলছি? কী করেছ যে সোবাহান সাহেব আমাকে স্পেশাল ইন্সট্রাকশন দিলেন তোমাকে এখনই রিমান্ডে নিতে হবে? তাড়াতাড়ি বলো, দেরি কোরো না।’
নির্মল বলল, ‘আমাকে বলা হয়েছে আমি ইন্ডিয়ার এজেন্ট। আমি জানি না আমি কী করেছি ইন্ডিয়ার এজেন্ট হবার মতো।’
আলমগির বললেন, ‘ব্যস? আর কিছু করোনি?’
নির্মল বলল, ‘একজনকে এক্সপোজ করতে গেছিলাম। বুঝলাম তার হাত অনেক উপরে। আর কী বলি বলুন তো?’
আলমগির বললেন, ‘হুঁ। মানে তোমার জায়গায় যেকোনও দিন আমিও থাকতে পারি আর কী।’
নির্মল বলল, ‘তা কেন? আপনি তো আর সংখ্যালঘু নন। আপনাকে শুনতে হবে না আপনি ইন্ডিয়ার এজেন্ট।’
আলমগির চুপ করে গেলেন। নির্মলের বাড়িতে গাড়ি পার্ক করা হল। নির্মলকে জিপে তোলা হল। সেই একই বিল্ডিং। কত লোককে এখানে এনে জেরা করেছে সে। এবার তাকে জেরা করা হবে। বাজে একটা কারণ দেখিয়ে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে। নির্মল অনেকটা স্বাভাবিক হচ্ছিল। শেষটা জানলে টেনশন করার কোনও কারণ থাকে না।
করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আলমগির গলা নামিয়ে বললেন, ‘লোকটা কি সাদিক শেখ?’
নির্মল অবাক হল, ‘আপনি কী করে জানলেন?’
আলমগির বললেন, ‘সাদিক সোবাহানের দুলাভাই। তুমি কেন, অনেকেই জানে না সেটা। আমরা যারা পুরোনো লোক, তারা জানি।’
নির্মল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘আমরা সাদিকের বাড়ি নামব না। আগে নেমে যাব।’
গাড়ি সবে শহরে ঢুকেছে। ফোন রেখে অমল ইমতিয়াজের দিকে তাকাল। অমলের কথা শুনে ইমতিয়াজ অবাক হল।
‘কেন? কী হয়েছে?’
অমল বলল, ‘তুমি চলে যাও। আমাদের নামিয়ে দাও।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘ফোনটা কে করেছিল?’
অমল বলল, ‘তোমার জানা উচিত। তুমি জানো না?’
ইমতিয়াজ গম্ভীর হয়ে বলল, ‘উস্তাদ ফোন করেননি। উস্তাদ ছাড়া অন্য কারো কথা শোনা ঠিক হবে না।’
অমল বলল, ‘আমি কোডের গোলাম বস। আমার এখানে কিছু করার নেই।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘বেশ। তুমি যখন বলছ, তখন তাই হোক। কোথায় নামাব?’
অমল বলল, ‘এখানেই নামিয়ে দাও। এখান থেকে ফিরতে সুবিধে হবে তোমার।’
ইমতিয়াজ বলল, ‘আমি যাব না?’
অমল বলল, ‘না। তুমি চলে যাও।’
রাণা অবাক হল। ফোনটা আসার পর থেকে অমল কেমন পাল্টে গেল।
ইমতিয়াজ গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল। অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘অস্ত্রটা ফেরত দিয়ে দাও।’
রাণা কোনও কথা না বলে ইমতিয়াজের গাড়ির সিটে সন্তর্পণে রিভলভারটা রেখে দিল।
অমল গাড়ি থেকে নামল, ‘চলো।’
রাণা নামতে যেতেই ইমতিয়াজ বলল, ‘আজকেই করবে। মাথায় রেখো।’
রাণা কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। ইমতিয়াজ বেরিয়ে গেল। অমল একটা সি এন জি ধরে ঠিকানা বলল। সি এন জি চলতে শুরু করলে রাণা ফিসফিস করে বলল, ‘কী হচ্ছে বুঝতে পারছি না।’
অমল ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় রাণাকে চুপ করে যেতে বলল।
রাণা আর কোনও কথা বলল না। দোকানের সামনে এসে সি এন জি ছেড়ে দিল অমল।
ট্রায়াল রুমে ঢুকে নক করতেই দরজা খুলে গেল।
খান বললেন, ‘এস এস।’
দুজনে ঘরে ঢুকতে খান দরজা বন্ধ করে দিলেন।
মাথুর বললেন, ‘সেই ফেমাস অমল, হ্যাঁ? আপনার কথা অনেক শুনেছি। কত গল্প, কত মিস্ট্রি, ভাবাই যায় না।’
অমল হাসল, ‘ও রাণা। ওকে উস্তাদ পাঠিয়েছেন আমার সঙ্গে থেকে কাজ করতে।’
খান রাণার দিকে হাত বাড়ালেন, ‘তুমি জানো তুমি কত বড় কাজ করেছিলে? তারেক শেখকে কেমন অনায়াসে উড়িয়ে দিয়েছিলে! আনবিলিভেবল!’
রাণা বলল, ‘আমার কাজই ওটা। তারেক শেখ কী কাজ করে, আমি কিছুই জানতাম না।’
খান বললেন, ‘ঠিক। তোমাকে শেখাওয়াত এখানে পাঠিয়েছে কেন, আমরা সেটাই এখনো বুঝতে পারছি না। যাই হোক, এখন সবার আগে আমাদের লোককে উদ্ধার করতে হবে। তারপর বাকি কথা। আপনি বলুন অমল, আমরা কীভাবে ওকে উদ্ধার করতে পারব।’
অমল বলল, ‘জল খাই একটু? তারপর বলি?’
মাথুর ব্যস্ত হয়ে অমলের দিকে জলের বোতল এগিয়ে দিলেন। অমল অনেকটা জল খেয়ে বলল, ‘লাস্ট তিন বছরে আই এস আই এখানে অনেকটাই শক্তিবৃদ্ধি করেছে। অনেকগুলো জায়গায় ওদের ডেরা হয়েছে। তিন-চারজন রাজাকারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কাজে লাগানো শুরু হয়েছে। তবে আমার মনে হয় গিয়াস ঢাকার বাইরে নয়, ঢাকার মধ্যেই কোথাও সাকিনাকে রেখেছে। তবে এখনো আছে নাকি জানা নেই। ওরা ওকে নিয়ে যেতে চাইবে যদি না কোনও ম্যাজিকে সাদিক সাকিনাকে আবার নিজের কাছে রেখে দেয় কিংবা...’
একটু চুপ করে থেকে অমল বলল, ‘মেরে ফেলে।’
মাথুর মাথায় হাত দিলেন। খান বললেন, ‘সে মারতেই পারে। কিন্তু ধরে নিয়ে গেলে...কতটা কী জানে আমাদের অ্যাসেট?’
অমল বলল, ‘ঢাকা অপারেশনের সবটাই।’ রাণা অবাক হয়ে অমলের দিকে তাকাল।
খান বললেন, ‘মাই গড। ইজ শি কেপেবল এনাফ?’
অমল বলল, ‘কোন মেয়ে এসে সাদিকের মতো নরকের কীটের সঙ্গে শোবে বলুন তো? আর কত কেপেবিলিটি প্রমাণ করতে হবে?’
খান লজ্জা পেলেন, ‘ছি ছি। আমি সেটা বলিনি। সব জানে বললেন বলেই বললাম। তার মানে শি ইজ দ্য মোস্ট ইমপরট্যান্ট অ্যাসেট নাও। ওর কাছে সব থেকে তাড়াতাড়ি পৌঁছনোর কী উপায়?’
অমল বলল, ‘সাদিক।’
খান বললেন, ‘সাদিক আপনাকে সাকিনার ডিটেলস দেবে কেন?’
অমল বলল, ‘জানি না। কিন্তু ও ছাড়া অত তাড়াতাড়ি কেউ গিয়াসের কাছে নিয়ে যেতে পারবে না। একটা ফোন দিন।’
খান তার ফোন এগিয়ে দিলেন। অমল নাম্বার ডায়াল করল। চট্টগ্রামের ভাষায় কিছুক্ষণ কথা বলে ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘কুড়ি জন মাদ্রাসা স্টুডেন্ট হারিয়ে গেছে। আমাকে সাদিক যেখানে যেখানে পাঠিয়েছিল, তার মধ্যে একটা জায়গার কোডে M ছিল। কাঠমান্ডুর কোড। M=মাদ্রাসা? আমি কাঠমান্ডু গেছি প্রায় এক মাস আগে। এক মাস আগে আজকের প্ল্যানটা করা ছিল তাহলে। আমাকে একটা কাগজ আর পেন দিন প্লিজ।’
খান একটা প্যাড আর পেন এগিয়ে দিল।
অমল দ্রুত গতিতে প্যাডে লিখল
T M S = Twenty Madrasa Students (?)
ভ্রু কুঁচকে সেদিকে কয়েকসেকেন্ড তাকিয়ে অমল বলল, ‘এত সোজা? এর জন্য কেউ কাঠমান্ডু যাবে কেন? অদ্ভুত!’
‘আপনি শেষ কবে ইন্ডিয়া গেছেন নির্মল?’
একটা বাল্ব ঝুলছে। এই ঘরটা তার চেনা। কতবার প্রশ্নকর্তার জায়গায় বসেছে সে।
এখন উল্টো দিকে তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। প্রশ্ন করছেন আরিফ রহমান। আরিফ সব সময়ে আসেন না। মাঝে মাঝে আসেন। হাই প্রোফাইল অপরাধীদের জন্য। সে তাহলে এদের কাছে হাইপ্রোফাইল অপরাধী। হয়ত আজ রাতেই তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে ফেলে দেওয়া হবে। গরম সীসার বুলেট ভেদ করে ফেলবে তার শরীর। এই দেশের মাটি, যাকে সে সবথেকে বেশি ভালোবেসেছিল, সে মাটি ভিজে যাবে তার রক্তে।
আরিফ রহমানের প্রশ্নের উত্তরে নির্মল তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নভেম্বরে। কলকাতায়, স্ত্রীর মামার ছেলের বিয়েতে।’
আরিফ তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘সেখানে কার কার সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?’
‘আমার শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে।’
‘আর?’
‘আর কেউ না।’
‘আপনি শিওর?’
নির্মল হেসে ফেলল। আরিফের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি আমার সঙ্গে কি র-এর লিংক খুঁজতে চাইছেন? এমনিই তো মেরে ফেলবেন বুঝতে পারছি। খামোখা নাটক প্যাঁচাচ্ছেন কেন?’
আরিফ রাগী গলায় বললেন, ‘আমি যা প্রশ্ন করছি তার উত্তর দিন।’
নির্মল বলল, ‘ওকে। করুন।’
আরিফ বললেন, ‘আপনার ফোনে মাঝে-মাঝেই ইন্ডিয়া থেকে ফোন আসে। তারা কারা?’
নির্মল বলল, ‘উনিশশো সাতচল্লিশ সালের আগে পাকিস্তান বলে কোনও দেশ ছিল না। শুধুই ইন্ডিয়া ছিল। দেশ ভাগ হল। এ-প্রান্তে থাকা অনেকেই ও-প্রান্তে চলে গেলেন। আত্মীয়তা সূত্রে অনেক মানুষই এখন এভাবেই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত আছে। যদি সত্যিই আপনি সোর্সগুলো দেখতে চান, এমব্যাসিতে খবর পাঠান, তারা ঠিকই বলে দেবে ফোনগুলো আমি আমার আত্মীয়-স্বজনকেই করেছিলাম।’
আরিফ বললেন, ‘আপনার কথাগুলো কোনটাই সোজা না। আপনি কি এভাবেই টেরিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন?’
নির্মল বলল, ‘গল্পের শেষটা দেখতে পারলে ছোটখাটো ভয়গুলো চলে যায়। আমি আমার গল্পের শেষটা জানি। একজন কোরাপ্টেড মানুষের সঙ্গে কতগুলো কোরাপ্টেড মানুষ যুক্ত হয়ে একটা দেশবিরোধী কাজ করছে। আমি মাঝে পড়ে গেছি। আমাকে সরাতে হবে। অকারণে আপনি নাটক করছেন আরিফ সাহেব। আপনার সময়ের দাম আছে। আপনি চলে যান। যা করার ওদের করে নিতে দিন। আমি সম্পূর্ণ সহযোগিতা করব, কথা দিচ্ছি।’
আরিফ নির্মলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটু থেমে বললেন, ‘কোরাপ্টেড মানুষ মানে?’
নির্মল বলল, ‘একটা ইনভেস্টিগেশন করছিলাম। সেখানেই সাপের ল্যাজে পা পড়েছে। আপনি কিছু জানেন না এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?’
আরিফ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে বললেন, ‘ইন্ডিয়ার এজেন্টরা এভাবেই কথা বলতে শিখিয়ে দিয়েছে?’
নির্মল বলল, ‘ইন্ডিয়ার এজেন্ট? আমার পারফরম্যান্স দেখেছেন আপনি? আনোয়ার সাহেবকে চিনতেন না আপনি? আপনি জানেন না উনি ইন্ডিয়ার হয়ে কাজ করেছেন না বাংলাদেশের জন্য শেষ দিন অবধি কীভাবে ভেবে গেছেন?’
আরিফের ফোন বেজে উঠল। আরিফ ভ্রু কুঁচকে ফোনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘ওকে। এখনকার মতো এই অবধিই। রেস্ট করুন অফিসার।’
অদ্ভুতভাবে আর কোনও কথা না বলে আরিফ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
নির্মল টেবিলে চুপ করে বসে রইল। আলমগির কাচের জানলার ওপাশ থেকে তাকে দেখছিলেন।
নির্মল বলল, ‘কী হল? সাহেব চলে গেলেন কেন? অকারণ বসিয়ে রেখেছে কেন রাজাকারগুলো? যা করতে চায়, করতে বলে দিন না।’
আলমগির চেম্বারে প্রবেশ করে বললেন, ‘তুমি মাথা ঠান্ডা করো। তুমি কেন ধরে নিচ্ছ যে এখনই সব শেষ হয়ে গেছে?’
নির্মল বলল, ‘আমি তো বুঝতে পারছি। এটা না বোঝার কি কিছু আছে? আমি ইন্ডিয়ায় কার সঙ্গে দেখা করতে যাব? প্রশ্নগুলো কোনদিকে যাচ্ছে, তা বোঝার মতো বুদ্ধি কি আমার নেই?’
আলমগির নির্মলের কাঁধে হাত দিলেন, ‘আবারও বলছি। আরিফ সাহেব কেন বেরোলেন সেটা দেখা যাক।’
নির্মল দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে রইল।
দুপুর তিনটে৷ একটা এস ইউ ভি গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে হাইওয়ের উপরে। গাড়ি থেকে কেউ নামেনি। যেন অপেক্ষা করছে গাড়িটা। অপেক্ষাটা সফলও হল। একটা সেডান এসে দাঁড়াল এস ইউ ভির পেছনে।
সেডান থেকে সাদিক নেমে এস ইউ ভির দরজার কাছে দাঁড়াতেই দরজা খুলে গেল। সাদিক গাড়িতে উঠে বসে দরজা বন্ধ করল। গিয়াস বসে আছে গাড়িতে। সাদিককে দেখে ঘড়ি দেখল, ‘পনেরো মিনিট লেট। সময়ের দাম দেওয়া উচিত।’
সাদিক বলল, ‘জ্যাম। ঢাকার জ্যাম। বোঝেন তো কী সমস্যা?’
গিয়াস ভর্ৎসনার চোখে সাদিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাই হোক, মেয়েটা কিছুই বলছে না। ওকে হেডকোয়ার্টারে পাঠানোর অর্ডার এসেছে।’
সাদিকের মুখ ছাইবর্ণ হয়ে গেল, ‘সে কী? আমি তো কিছু জানি না।’
গিয়াস বলল, ‘সব কথা তোমাকে জানানোর কথা তো নয়। এটা নিয়ে এত ভাবনারই বা কী আছে?’
সাদিক মাথা নিচু করে বলল, ‘জনাব, আমি জানি মেয়েটা কিছু করেনি। এ মেয়ের অত ক্ষমতা নেই।’
গিয়াস বলল, ‘সেটা আমরা বুঝব। আমাদের বুঝতে দাও।’
সাদিক বলল, ‘আপনারা যা ভালো বোঝেন। আমাকে কী করতে হবে?’
গিয়াস বলল, ‘তোমার কাছে আরেকটা মেয়ে আছে। জরিনা বলে। ওকেও আমি নিয়ে যেতে চাই।’
সাদিক চমকে উঠল, ‘কেন জনাব? জরিনা কী করল?’
গিয়াস বলল, ‘ওর কোনও ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। ঘুমের ঘোরে সাকিনা অনেকবার ওর নাম নিয়েছে।’
সাদিক বলল, ‘যন্ত্রণা থেকে নিয়েছে জনাব। জরিনাকে আমি জন্ম থেকে চিনি। ওর কোনওভাবেই কোনও কিছুতে থাকার কথা না। ঘর থেকে ও মেয়ে বেরোয় না।’
গিয়াস বলল, ‘কী রকম চেনো তুমি ওকে?’
সাদিক বলল, ‘জরিনার মা আমার ওখানেই ছিল। ওখানেই ওর জন্ম। ও কিছুতেই কোনও ব্যাপারে জড়িত না৷ সাকিনাও না। আপনি ওকেও অকারণে নিয়ে যাচ্ছেন।’
গিয়াস বলল, ‘সেটা আমি ঠিক করব। হেডকোয়ার্টার ঠিক করবে। তুমি না। জরিনাকে রাত আটটার মধ্যে এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা কর। ওকেও ইন্টারোগেট করার দরকার আছে। হতে পারে এই সাকিনা জরিনার মাধ্যমেই র-এর এজেন্টের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করত।’
সাদিক কয়েক সেকেন্ড গিয়াসের দিকে চেয়ে থেকে বলল, ‘দেখছি কী করা যায়।’
গিয়াস রেগে গেল, ‘দেখছ মানে? এখানে দেখার কী আছে? আমি বলছি, তোমাকে সেটাই শুনতে হবে। আমার কথার অমান্য করার অধিকার তোমায় দেওয়া হয়নি।’
সাদিক বলল, ‘মেয়েটাকে আপনার কাছে রেখে দিলেন। অকথ্য অত্যাচার করলেন। ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করালেন। কিছুই পেলেন না। অকারণে টেনে টেনে নিয়ে যাবেন। তারপর জরিনাকেও নিয়ে যেতে চাইছেন। এভাবে কি কিছু করা যায়? আপনি আপনার ব্যর্থতা ঢাকতে এই মেয়েগুলোকে নিয়ে গিয়ে কষ্ট দিতে চাইছেন কেন?’
গিয়াস বিস্মিত হয়ে সাদিকের দিকে তাকাল, ‘আরে? তুমি আমার সঙ্গে তর্ক করছ? তোমার এত সাহস? তুমি জানো আমি কে?’
সাদিক বলল, ‘আপনি যখন এখানে আছেন, তখন আপনারও জানা উচিত আমি কে? জানেন আশা করি?’
গিয়াস থতমত খেয়ে গেল, ‘তুমি কিন্তু প্রসিডিওর মানছ না। এটা কথা ছিল না। কথা ছিল আমি যা যা বলব, যা যা চাইব, তা তোমাকেই সাপ্লাই করতে হবে। তুমি এখন বেঁকে বসছ, সমস্যাটা কী? জরিনাকে দিতে তোমার কী সমস্যা?’
সাদিক বলল, ‘শুধু জরিনা কেন, সাকিনাকে দিতেও আমার সমস্যা আছে। আপনি ওকে আমার কাছে হ্যান্ড ওভার করে দিন।’
গিয়াস বড় বড় চোখ করে সাদিকের দিকে তাকাল।
গিয়াস বলল, ‘কী হয়েছে তোমার?’
সাদিক বলল, ‘কিছু হয়নি। তবে কুড়িটা ছেলেকে বর্ডার পার করতে হলে আপনার আমাকে প্রয়োজন। সেটা ভুলে যাবেন না। অকারণে এসব মেয়েদের ট্যানাহ্যাচড়া করলে ফল ভালো হবে না। আমি দরকার হলে ইসলামাবাদেও কথা বলব।’
গিয়াস বলল, ‘ওকে। জরিনাকে লাগবে না। কিন্তু ডোন্ট টক অ্যাবাউট সাকিনা। আমার গাট ফিলিং বলছে ও অনেক গভীর জলের মাছ।’
সাদিক বলল, ‘আমার সাকিনাকে লাগবে। ওকে আমি নিয়ে যেতে দেব না।’
গিয়াস ফোন ঘাঁটতে শুরু করল, ‘তুমি এখন যাও। আমরা বরং পরে কথা বলব, কেমন?’
সাদিক বলল, ‘আপনি ঢাকা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমি জানি, সাকিনা আপনার সঙ্গে আছে। কোথায় আছে?’
গিয়াস বলল, ‘নেই তো।’
সাদিক পকেট থেকে রিভলভার বের করে গিয়াসের মাথায় তাক করল, ‘ডিকি খোল।’
গিয়াস রাগল না। ড্রাইভারকে বলল, ‘ওকে ডিকি খুলে দেখাও।’
ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে ডিকি খুলল। সাদিকও নামল। ডিকি ফাঁকা। সাদিক গাড়ির দরজা খুলে রাগী গলায় বলল, ‘কোথায় সাকিনা?’
গিয়াস হাসি হাসি মুখে বলল, ‘বাই। পরে কথা হবে।’
সাদিক বলল, ‘বাইরে আয়। গাড়ির বাইরে আয়।’
গিয়াস মুখে চুক চুক শব্দ করে বলল, ‘একজন বেশ্যার জন্য এত প্রেম তোমায় মানায় না সাদিক। তোমার জন্য ভালো মেয়ে পাঠিয়ে দেব। দরজা বন্ধ কর। দেরি হলে মৌলানাকে আমি উত্তর দেব না। তুমি দেবে।’
মৌলানা শব্দটায় যেন সাদিকের মুখে নুন পড়ল। সে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিল। গিয়াসের গাড়িটা বেরিয়ে গেল।
সাদিক পকেট থেকে ফোন বের করল। কয়েকটা রিং হতে জরিনা ধরল, ‘জি সাহেব। কিছু বলবেন?’
সাদিক বলল, ‘না। কিছু বলার নাই।’
জরিনা বলল, ‘তাহলে ফোন দিলেন কেন?’
সাদিক বলল, ‘কোনও কারণ নাই। তুই ফোন রাখ।’
জরিনা বলল, ‘জি।’
ফোন কেটে গেল। সাদিক অসহায়ের মতো কয়েক সেকেন্ড রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে আবার ফোন করল, ফোন বাজতে শুরু করল। ও-প্রান্ত দুটো রিং হবার পর ফোন তুলল, ‘জি ভাই।’
সাদিক বলল, ‘রুমানভাই, আপনি আমার লগে এখন দেখা করতে পারবেন?’
‘সাদিক ডাকছে।’
অমল ফোন রেখে বলল।
খান বললেন, ‘ঠিক কী রকম পরিস্থিতি হল যে তোমাকে ডাকতে হচ্ছে?’
অমল বলল, ‘বুঝতে পারছি না। সাদিক গিয়াসকে পারসোনালি ডিল করে। সেখানে আমাদের সবার প্রবেশ নিষেধ। আমি জানতেও পারি না গিয়াস ঠিক কী করছে বাংলাদেশে এসে। আন্দাজ করার চেষ্টা করি শুধু। এই ফোনটা গিয়াসের ব্যাপারে নাকি তাও জানি না।’
খান মাথুরের দিকে তাকালেন। মাথুর বললেন, ‘ডাকছে যখন, তখন যাওয়াই ভালো। কী বলো?’
অমল বলল, ‘জানি না। কভার এক্সপোজ হয়ে গেলে অনেক সময় সিচুয়েশন ক্রিয়েট করে মেরেও দিতে পারে। অবশ্য আমি ঠিক করেই এসেছিলাম সাদিকের কাছে যাব। আমাদের এজেন্টের জীবনের ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। সাদিক ছাড়া ওর কাছে যাওয়াও যাবে না।’
খান বললেন, ‘তাহলে যাও। রাণাও যাও অমলের সঙ্গে।’
অমল মাথা নাড়ল, ‘না, থাক। একসঙ্গে দুটো উইকেট পড়লে কী করে হবে? রাণাকে দরকার হলে বরং তখন ডেকে নেওয়া যাবে।’
খান বললেন, ‘আমরা ঠিক কী ভাবে তোমাকে হেল্প করতে পারব?’
অমল বলল, ‘এই মুহূর্তে আমাকে কেউ হেল্প করতে পারবে না।’
খান বললেন, ‘তোমাকে পাঠিয়ে আমরা এখানে বসে বসে কি সিনেমা দেখব? সেটা তো সম্ভব না। আমরা একটা গাড়ি নিয়ে যাই, দূরে অপেক্ষা করি। তুমি সাদিকের সঙ্গে ডিল করো। কী হবে, পরে দেখা যাবে।’
অমল বলল, ‘ঠিক আছে। কী বলে দেখা যাক।’
মাথুর বলল, ‘গাড়ির ব্যবস্থা?’
অমল বলল, ‘করছি।’
একটা নম্বরে ফোন করল অমল। ফোন রেখে বলল, ‘চলুন, বেরোন যাক। গাড়ি আসছে পার্কের সামনে। তার আগে চারজন প্রত্যেকের সঙ্গে একটা দূরত্ব রেখে এখান থেকে বেরোব। আমি বেরিয়ে ফুটপাথের উল্টো দিকে যাচ্ছি। ঠিক দু’মিনিট গ্যাপে একজন করে বেরোবেন।’
খান বললেন, ‘ফাইন।’
অমলের প্ল্যান অনুযায়ী সবাই এক একজন করে বেরিয়ে রাস্তার অপর প্রান্তে গিয়ে অমলের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল।
একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল পার্কের গেটের সামনে। অমল গাড়ির সামনের সিটে গিয়ে বসল। একজন একজন করে তিনজনে গাড়ির পেছনের সিটে বসল। গাড়ির ড্রাইভারকে রাণা চিনতে পারল। মাঝরাতে উঠে অমল এর সঙ্গেই দেখা করেছিল।
রাণার মধ্যে দ্বিধা তৈরি হতে শুরু করল। এই লোকটা কে? গিয়াসের লোক নয়তো? অমলকে কেন উস্তাদ মারতে বলেছিল? গিয়াসের লোক যদি এই দুজন লোককে ধরে ফেলে তাহলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। অমলকে অবিশ্বাস করার মতো এখনও কিছু হয়নি কিন্তু হঠাৎ এই ড্রাইভারকে দেখার পর থেকে তার অস্বস্তি হচ্ছে।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে। অমল মাথা ঘুরিয়ে বলল, ‘ও জামাল। সাদিকের সঙ্গে প্রথম দেখা করতে ওই আমাকে সাহায্য করেছিল। সাদিকের বাড়ির উপর নজর রাখার জন্য ওই লোক রেখেছে।’
খান আর মাথুর একসঙ্গে জামালকে সালাম জানালেন। জামাল প্রত্যুত্তরে সালাম জানিয়ে বলল, ‘সাদিক খানিকটা দিশেহারা হয়ে গেছে যা বুঝতে পারছি। সকাল থেকে অনেকবার বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। শেষবার বেরোনর পর ফেরেনি। আপনাকে বাড়িতে ডেকেছে মানে বাড়িতে ফিরছে।’
অমল বলল, ‘হ্যাঁ। তাই হবে। ও বাইরে বেরিয়ে আমাকে ফোন করেছে, তার মানে দাঁড়ায় ও গিয়াসের সঙ্গে মিট করেছে। সাকিনা যদি আমার কভার এক্সপোজ করে দেয়, আর গিয়াস যদি সেটা সাদিককে বলে থাকে, তাহলে আমার আজ শেষ দিন হওয়া উচিত।’
কথাটা বলে অমল হেসে ফেলল।
রাণা অবাক হল। অমলের ভয় একবারেই নেই। কেমন স্বাভাবিকভাবে কথাটা বলছে।
খান বললেন, ‘এরকম সিচুয়েশনে আমরা এরকম মিট আপ অ্যাভয়েড করতে বলি...’
খানের কথা শেষ করতে দিল না অমল, ‘একবারেই না। এই চান্স আমরা কিছুতেই নিতে পারি না।’
মাথুর বিষণ্ণ গলায় বললেন, ‘হোয়াট আ সিচুয়েশন।’
ওয়াকিটকি বেজে উঠল জামালের। ও-প্রান্ত থেকে জড়ানো গলায় কী বলল তার কিছুই শোনা গেল না, তবে জামাল বলল, ‘সাদিক বাড়িতে ঢুকেছে।’
রাণা অমলের দিকে তাকাল। অমল কেমন ভাবলেশহীন হয়ে বসে আছে।
ওর মাথায় অন্য কিছু ঘুরছে না তো? সে সন্দেহ করতে না চাইলেও মনে সন্দেহ আসছে।
কলকাতা অফিস। সন্ধে সাড়ে ছ’টা।
বৃষ্টি হচ্ছে। জানলার বাইরে কিছুক্ষণ বৃষ্টি দেখে তুষার তার ডায়েরিটা টেনে নিলেন।
পেন দিয়ে লিখলেন,
‘শেখাওয়াত।’ ‘স্লিপার সেল বাংলাদেশ...কেন?’ ‘কন্ট্রাক্ট কিলার ইন এজেন্সি- কেন?’
ভ্রু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে ফোন বের করে পীযূষকে ফোন করলেন। পীযূষ ফোন ধরতেই বললেন, ‘তেরো-চোদ্দ বছর আগে এজেন্ট ট্রেনিং চিফ কে ছিল একবার চেক করে বল তো। আমি জানি কে ছিল, আরেকবার ক্রস চেক করতে হবে।’
পীযূষ বললেন, ‘দু’মিনিট স্যার।’
তুষার বললেন, ‘হ্যাঁ। ধরে আছি।’
পীযূষ দু’মিনিট নিলেন না। এক মিনিটের মাথায় বললেন, ‘শেখাওয়াত ছিলেন স্যার।’
তুষার বললেন, ‘ওই সময় ওর আণ্ডারে অমল ছিল?’
পীযূষ ত্রিশ সেকেন্ড সময় নিলেন এবার, দেখে বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার ছিল।’
তুষার বললেন, ‘ওকে। রাখো এখন।’
ফোন কেটে তুষার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে আরেকটা নাম্বার ডায়াল করলেন। রিং হতেই ও-প্রান্ত থেকে একজন বয়স্ক মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘তুষার। আমি কি ঠিক দেখছি? এত দিন পরে বুড়ো মানুষটার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে হল তোমার?’
তুষার হাসলেন, ‘কেমন আছেন স্যার? অবসর জীবন কেমন কাটছে? আই এস আই এখন আর জ্বালাতন করছে না তো?’
সিং বললেন, ‘নাহ্। ওরা এখন তোমার মাথার চুল শেষ করবে। আমার না। আমার তো ওদের চুপ করে থাকাটাই ভয় লাগে বরাবর। যখনই দেখি কিছু হচ্ছে না, ভয় লাগতে থাকে যে আবার কোনও প্ল্যান করছে নাকি। কমপ্লিট ডিসগ্রেস টু হিউম্যানিটি যদি কিছু হয়ে থাকে, তা হল এই দেশটা। বাদ দাও। এসব কথা বললেই আমার প্রেশার বেড়ে যায়। নিজের প্রেশার অকারণ বাড়িয়ে লাভ নেই। কেন ফোন করেছিলে বলো।’
তুষার বললেন, ‘স্যার তেরো-চোদ্দ বছর আগের একটা ব্যাপারের জন্য ফোন করেছি। আমি তখন ইরানে ছিলাম বলে এখনও আমার ঘটনাটা অত স্পষ্ট করে মনে নেই। আপনার শেখাওয়াতকে মনে আছে?’
সিং বললেন, ‘অনিল শেখাওয়াত?’
তুষার বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’
সিং বললেন, ‘কেন মনে থাকবে না? এক্সট্রিমিস্ট তো বরাবরই। ওর ধারণা গোটা পৃথিবীটা ওকে ঘিরেই ঘুরছে। আজব টাইপের ছেলে। আমাকে বলত স্যার আমরা কতগুলো শিক্ষিত মেয়েকে সেক্স ওয়ার্কার বানিয়ে পাকিস্তানে ছেড়ে দিতে পারি। বেস্ট রেজাল্ট আসবে। আমি ওকে অনেকবার বুঝিয়েছিলাম, এসব আমাদের ওয়ার্ক এথিকসের বিরুদ্ধে। কিন্তু মনে হয়নি সে কথাগুলো ও কোনভাবে কানে নিয়েছিল বলে।’
তুষার বললেন, ‘নেয়নি। এবং শেখাওয়াত একটা উইঙ এর চার্জেও আছে এখন।’
সিং বিস্মিত গলায় বললেন, ‘সে কী? আজে বাজে কিছু করে বসে আছে নাকি?’
তুষার বললেন, ‘সেসবই বুঝতে চেষ্টা করে যাচ্ছি স্যার। আপাতত আমি যেটা জানতে চাইছি, সেটা হল শেখাওয়াত থাকাকালীন আমরা অমল বলে একজন বাঙালি ছেলেকে পাকিস্তানে ইনফিল্ট্রেট করেছিলাম। সে ছেলেটাকে এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। আমাদের বলা হয়েছিল অমলকে ইউজ করা যাবে না। অমলের ফাইলের অ্যাক্সেস অবধি আমাদের দেওয়া হতো না একটা সময়ে। অমলকে পাকিস্তান থেকে যে সরানো হয়েছিল, তার কারণটা কী ছিল?’
সিং বললেন, ‘অমল? নামটা চেনা লাগছে। এক বছর পাকিস্তানে ছিল?’
তুষার বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’
সিং ইতস্তত করে বললেন, ‘খুব ইম্পরট্যান্ট ম্যাটার কী? বলাটা স্কিপ করা যাবে না?’
তুষার বললেন, ‘বললে ভালো হয় স্যার। সিচুয়েশন ডিমান্ডটাই এমন এখন।’
সিং বললেন, ‘ওকে। তাহলে বলছি। করাচীতে শেখাওয়াত অমলের হ্যান্ডলার ছিল। কিছু হয়ে থাকবে ওদের দুজনের মধ্যে। শেখাওয়াত রিপোর্ট করেছিল, অমল কথা শুনছে না, নিজের মতো করে চলাফেরা করছে। আমি ওর রেকমেন্ডেশনেই অমলকে বাংলাদেশে স্লিপার সেল থাকার নাম করে ট্রান্সফার করে দিই। ঠিক কী কী কারণ দেখিয়েছিল সেটা জানতে চেও না, সেটা বলব না।’
তুষার বললেন, ‘ঠিক আছে স্যার, এটুকু জানলেই হবে। থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। গুড নাইট।’
ফোন কেটে তুষার ভ্রু কুঁচকে বসে রইলেন। হিসেবগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে...।
‘সাকিনাকে যেভাবে এখানে কাজে লাগানো হল, তুমি সাপোর্ট করেছিলে?’ খান অমলকে জিগ্যেস করলেন। খান অমলকে শুরুর দিকে আপনি বললেও পরে তুমি করে বলছেন।
খানের আচমকা প্রশ্ন শুনে অমল ঘাবড়াল না। বরং সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘আমি কোডের চাকর। আমি তো এখানে একরকম রেস্ট করছিলাম। কোনও কিছুতেই জড়িত ছিলাম না। হঠাৎ করে আমাকে উস্তাদ যোগাযোগ করলেন। সাকিনার ব্যাপারে জানালেন। ওর সলিড কভার বানাতে হল। আমি প্রশ্ন করিনি। তবে এখন সময় পাল্টাচ্ছে। এক একটা এজেন্সি এক একরকম ভাবে তার অ্যাসেটদের কাজে লাগাচ্ছে। অবাক হলেও একবারে যে আকাশ থেকে পড়েছি, তা নয়। আই এস আই বেশ কয়েকটা হানি ট্র্যাপ ইউজ করেছে আমাদের লোকেদের উপর। সেটাও মাথায় ছিল।’
খান ঘাড় নাড়লেন, ‘ঠিকই। আমাদের উপায় থাকে না।’
জামালের গাড়ি এসে দাঁড়াল সাদিকের বাড়ির সামনে। অমল জোরে শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে। জামাল, তুমি ওদের নিরাপদে রাখবে। আমি যাচ্ছি।’
রাণা মরিয়া হয়ে বলে উঠল, ‘আমি যাব। আমি গাড়িতে বসে থাকব না।’
অমল বিরক্ত হল, ‘জেদ করছ কেন? তুমি তো বুঝতে পারছ কতটা ঝুঁকি আছে?’
মাথুর অবাক হয়ে বললেন, ‘সেটাই তো। রাণার কী হল আবার?’
রাণা বলল, ‘আমার অস্বস্তি হচ্ছে। আমি এভাবে বসে থাকতে পারব না।’
অমল বলল, ‘থাকতে হবে। জেদ কোরো না।’
রাণা অমলের দিকে তাকাল। সে একবার ভাবছে খান আর মাথুরকে বলে দেবে সবটা। পরক্ষণে তার মনে হচ্ছে হতে পারে অমল সত্যিই কিছু জানে না। কিন্তু দুরকম ভাবনার একটাই ফলাফল আসছে। সে গাড়িতে বসে থাকতে পারবে না।
রাণা বলল, ‘নিয়ে চলুন। আপনাকে কিছু করতে গেলে একটা বাধা তো দেওয়া যাবে। এমনি এমনি উড়িয়ে দেবে নাকি?’
অমল বলল, ‘ওদের সবার হাতে অটোমেটিক গান থাকে। তুমি গিয়ে কী বাধা দেবে বলো তো?’
রাণা বলল ‘না, আমি যাব। আপনাকে একা ছাড়ব না।’
অমল শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘কী বাচ্চা ছেলের মতো শুরু করলে তুমি রাণা? ঠিক আছে। কী আর বলি? চল।’
অমল রাণাকে নিয়েই গাড়ি থেকে নামল। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে সাদিকের বাড়ির দিকে রওনা হল। তাদের ছদ্মবেশ আগেই মুছে দিয়েছিল অমল। নিরাপত্তারক্ষীরা দুজনের কাউকেই আটকাল না।
সরাসরি ড্রইং রুমে প্রবেশ করল দুজনে। অমলকে দেখে সাদিক শ্বাস ছাড়ল, ‘রুমানভাই, আপনি ছিলেন না, আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিল।’
অমল বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’
সাদিক বলল, ‘সর্বনাশ হয়েছে। আর কী বলি বলুন? আমার মাথা কাজ করছে না। সাকিনাকে তুলে নিয়ে গেছে, তারপর থেকে যা চলতাছে, আমি আপনাকে যে কী বলি।’
অমল অবাক হবার ভান করল, ‘সাকিনাকেও তুলে নিয়ে গেছে? কে তুলেছে? পুলিশ? ওকে আসগরের ব্যাপারে সন্দেহ করছে নাকি?’
সাদিক জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘না না। কী যে কন! তাহলে তো এত ঝামেলাই থাকত না। পুলিশ না। অন্য ব্যাপার।’
অমল বলল, ‘কী ব্যাপার?’
সাদিক স্তিমিতচোখে অমলের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল, ‘কীভাবে বলি আপনাকে। বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছি না।’
অমল বলল, ‘বলুন না।’
সাদিক বলল, ‘আপনার তো বর্ডারে চেনা জানা আছে। জরিনারে কোনভাবে ইন্ডিয়া পাঠানো যায়?’
অমল চোখ ছোট করল, ‘জরিনাকে? জরিনার কী হয়েছে?’
সাদিক অস্বস্তিতে কাশতে শুরু করল, ‘কিছু লোকের ওর উপরে নজর পড়েছে।’
অমল বলল, ‘এটা তো আপনিই মিটিয়ে নিতে পারেন। আপনি আছেন, ওকে কেন ইন্ডিয়ায় পাঠাতে হবে? যাদের নজর পড়েছে তাদের চোখ গেলে দিন!’
সাদিক মাথা নাড়ল, ‘কী যে বলেন ভাই, যাদের নজর পড়েছে, তাদের চোখ কেন, তাদের দিকে তাকানোর ক্ষমতাও আমার নেই। আমাকে আর জিগাবেন না, আমি বলতে পারুম না। গৌতমভাই, আপনি জরিনাকে পার করাইতে পারবেন?’
সাদিক রাণার দিকে তাকাল। রাণা বলল, ‘আমাকে ওপারে খুঁজছে। আমি কী করে...?’
সাদিক বলল, ‘তাও ঠিক। রুমানভাই, আপনি দেখেন তবে।’
অমল বলল, ‘দেখছি। আর সাকিনার কী হবে?’
সাদিক অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল, ‘আমি কোনও আশাই দেখতাছি না।’
অমল বলল, ‘এখানে কি তারা জড়িত যাদের দিকে তাকানো যাবে না?’
সাদিক বলল, ‘জি ভাই।’
অমল বলল, ‘কোথায় আছে এখন?’
সাদিক বলল, ‘বুঝতে পারছি না ভাই। বেশি কিছু বলা যাবে না।’
অমল সাদিকের দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল। সাদিক মিথ্যে বলছে বলে মনে হচ্ছে না তার।
আরিফ রহমান কিছুক্ষণ পর এসে ইন্টারোগেশন চেম্বারে প্রবেশ করলেন আবার। নির্মল আলমগিরের দিকে দৃষ্টি ফেরাল। আলমগির থমথমে মুখে নির্মলের দিকে তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিলেন।
আরিফ বসে বললেন, ‘বলো। তোমার ইন্ডিয়ান ট্রানজাকশানের ব্যাপারগুলো বলো। আমি শুনি।’
নির্মল বলল, ‘আমার কোনও ইন্ডিয়ান ট্রানজাকশান নেই।’
আরিফ বললেন, ‘তুমি শিওর?’
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ, শিওর।’
আরিফ পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে নির্মলের দিকে এগিয়ে দিলেন, ‘এখানে তোমার ফরেন ট্রানজাকশান দেখা গেছে। ইন্ডিয়ান রুপি কনভার্ট করেছ।’
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ। কত রুপি বলুন।’
আরিফ বললেন, ‘দশ হাজার রুপি।’
নির্মল হেসে ফেলল, ‘দশ হাজার রুপি মানে বাংলাদেশী টাকায় কত? ও দেশে গেছিলাম, এ টাকাটা বেঁচে গেছিল, নিয়ে এসে কনভার্ট করেছি আবার। এ টাকার জন্য আমার কী হতে পারে?’
আরিফ বললেন, ‘তোমার ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে?’
নির্মল বিরক্ত গলায় বলল, ‘এটা বাজে প্রশ্ন হচ্ছে আরিফ সাহেব। আপনার পারসোনালিটির সঙ্গে যাচ্ছে না একবারেই। নিজেও বুঝতে পারছেন।’
আরিফ থতমত খেলেন খানিকটা। নির্মল বলল, ‘সাদিক শেখের অ্যাকাউন্টে লাস্ট মান্থে দেড় লাখ দিনার ঢুকেছে। চেনেন আপনি সাদিক শেখকে? তাকে কোনদিন আমার জায়গায় বসানোর সাহস হবে আপনাদের?’
আরিফ আরও একটু হকচকিয়ে গেলেন। তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গেছেন।
সোবাহান চেম্বারে প্রবেশ করলেন। হাসি মুখে নির্মলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অসভ্যতা করছ তুমি। কোরো না। ফল ভালো হবে না।’
নির্মল বলল, ‘আমাকে আটকে রাখা হয়েছে কেন স্যার? আমার দোষ কী?’
সোবাহান চেয়ার নিয়ে বসলেন, ‘ওই যে, ইন্ডিয়া যোগ। তোমার সঙ্গে ইন্ডিয়ার লিংক আছে। তুমি র-এর কথা শুনে কাজ করছ।’
নির্মল হেসে ফেলল, ‘কী অদ্ভুত ব্যাপার বলুন তো স্যার। আমি নিজেই জানি না আমি র-এর হয়ে কাজ করি, অথচ আপনি জানেন।’
সোবাহান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে নির্মলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘তোমাকে আমি সুযোগ দিয়েছিলাম নির্মল। তুমি সেটা নিতে পারলে না। তোমার একগুঁয়ে স্বভাব তোমার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আই অ্যাম সরি। ভেরি সরি।’
নির্মল ম্লান হাসল, ‘আমি তো অঙ্কের উত্তরটা জানতাম। ঘাবড়াইনি, যেটা করতে চান, করতে পারেন।’
সোবাহান বললেন, ‘ট্যাক্স থেকে সাদিকের ফাইল কে দিয়েছে তোমায়?’
নির্মল বলল, ‘কেউ দেয়নি।’
সোবাহান বললেন, ‘তোমার ফ্যামিলি এই মুহূর্তে বাইরে আছে নির্মল। আশা করব এমন কিছু কাজ করবে না যাতে তোমার সঙ্গে তোমার ফ্যামিলিরও ক্ষতি হয়।’
নির্মল সোবাহানের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমি আপনাকে বললাম তো, সাদিকের যাবতীয় তথ্য আমি নিজেই বের করেছি।’
সোবাহান আরিফের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘দেখলেন আরিফ সাহেব, ছেলেটা কেমন তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের দেশের ছেলেদের এত সাহস থাকত? র-এর থেকে ট্রেনিংটা পেয়েছিল বলেই না এদের এত সাহস হয়ে গেছে?’
আরিফ সোবাহানকে বললেন, ‘সাদিক শেখটা কে?’
সোবাহান বললেন, ‘একজন তরুণ তুর্কী। খুব ভালো ব্যবসা করছে। দেশের উন্নতি করার চেষ্টা করছে। সে তো এই সব ভারতের দালালদের সহ্য হবে না। তার ফলে যা হবার তা হচ্ছে। দে হ্যাভ টু ফেস দ্য মিউজিক, তাই না?’
আরিফ বললেন, ‘নির্মল বার বার বলছে ও একটা ইনভেস্টিগেশন করছিল, আপনি সেটা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেটা কি এই সাদিক শেখকে নিয়েই?’
সোবাহান আরিফের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন, ‘আহ্ সাহেব, আপনি বুঝতে পারছেন না, সব র-এর শেখানো বুলি তো। এ দেশটাকে তো র কিনে নিয়েছে।’
আলমগির দরজা ঠেলে চেম্বারে প্রবেশ করলেন, ‘স্যার, একটা ব্রেকিং নিউজ আসছে।’
সোবাহান বিরক্ত মুখে বললেন, ‘কী নিউজ?’
আলমগির ফোন এগিয়ে দিলেন, ‘এক অনলাইন চ্যানেলে খবর বেরিয়েছে বাংলাদেশের এক ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকার বিদেশি ট্রানজাকশান হয়েছে, এই ফরেন ফান্ডের অনেকটাই এমন একটা সন্দেহজনক ফান্ড থেকে আসে যা সন্দেহ করা হচ্ছে বাংলাদেশে টেরর ফান্ডের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। বেনামি সূত্রে এই ট্রানজাকশানের রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে তাদের দফতরে।’
সোবাহান খবরটা দেখে থমথমে মুখে নির্মলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা করে তুমি ভালো করলে কি?’
নির্মল হাসল, ‘আমি করিনি। কিন্তু যে করেছে, ঠিক করেছে।’
সোবাহান বললেন, ‘কে করেছে? আশা করি তোমার উপর আমায় থার্ড ডিগ্রি অ্যাপ্লাই করতে হবে না।’
আরিফ উশখুশ করছিলেন। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি ভুলে গেছিলাম। আমার একটা ফ্যামিলি মিট আছে। আমাকে বেরোতে হবে।’
সোবাহান রাগে লাফিয়ে উঠলেন, ‘বসুন আপনি। এখানে বসবেন। একদম কোথাও যাবেন না।’
আরিফ সোবাহানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মানে? আপনি আমাকে বাধা দিচ্ছেন নাকি?’
সোবাহান বললেন, ‘হ্যাঁ দিচ্ছি। আমার সে ক্ষমতা আছে। জানেন তো আমার কী ক্ষমতা আছে?’
আরিফ আঙুল তুলে বললেন, ‘সোবাহান সাহেব, আমি অনেক দিন ধরে এই কাজ করি। আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল এই কাজটা আপনি নির্মলকে ফ্রেম করার জন্য করছেন। আপনার এই ঘৃণ্য প্ল্যানে আমি থাকব না। আমি বেরোলাম।’
সোবাহান চিৎকার করলেন, ‘আলমগির, আরিফ সাহেবকে আটকাও।’
আলমগির চেম্বারে প্রবেশ করে সোবাহানের কপালে রিভলভার তাক করে বললেন, ‘বসুন। অনেকক্ষণ ধরে আপনার বাড়াবাড়ি সহ্য করছি। বসুন।’
সোবাহান চমকে আলমগিরের দিকে তাকালেন।
আকাশে মেঘ করে আছে। গরম বাড়ছে। সাদিকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাণা মাঝে মাঝেই পিছন ফিরে দেখছিল। তার বার বার মনে হচ্ছিল, কেউ তাদের ফলো করছে। অস্বস্তি হচ্ছে কেমন। অমল বলল, ‘ভয় পাচ্ছ?’
রাণা বলল, ‘সাকিনাকে কোথায় রেখেছে বলল না তো! পাচার করে দিয়েছে?’
অমল বলল, ‘সাদিককে বলেনি। জরিনার জন্য সাদিক চিন্তিত হয়ে পড়ছে কারণ জরিনা সাদিকেরই মেয়ে। ওরই কোনও নারীসঙ্গের ফলশ্রুতি ওই মেয়েটা। যতই যাই হোক, মেয়েটা ওর রক্ত। তাকে গিয়াস তুলে নিয়ে যেতে চাইছে বুঝতে পেরেই সাদিক খানিকটা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। আমাদের এই ছোট ফাঁক দিয়ে ঢুকতে হবে। ঢুকতে পারলে ভালো। না পারলে আমাদের কপাল খারাপ। আর কী বলব? চলো, গাড়িতে ফেরা যাক। সাদিকের লোক কাছে পিঠে নেই। থাকলে জামাল এতক্ষণে জানিয়ে দিত।’
রাণা আর কিছু বলল না।
গাড়িতে ফিরে অমল বলল, ‘সুখবর হল সাকিনাকে ওরা ভাঙতে পারেনি। আমাদের কভার এক্সপোজ হয়নি।’
খান বললেন, ‘স্ট্রং গার্ল। ভেরি কমেন্ডেবল। আর্মি ট্রেনিং নিয়েছে?’
অমল হাসল, ‘শুনেছি হাজব্যান্ড ট্রেনিং। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সেই মেয়েটা স্ট্রং হয়ে গেছে।’
খান বিস্মিত হয়ে অমলের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বললেন, ‘বোঝো। আর দুঃসংবাদ?’
অমল বলল, ‘সাকিনা কোথায়, সাদিক লুকিয়ে যাচ্ছে।’
মাথুর বললেন, ‘তাহলে সাদিককে তুলতে হবে। আর কোনও উপায় নেই।’
রাণা অবাক হল। এই দুর্গ থেকে সাদিককে তোলা হবে কী করে?
অমল অবাক হল না। বলল, ‘ওরা যদি বুঝে যায় আমরা সাদিককে তুলেছি তাহলে বিপদ হতে পারে।’
মাথুর বললেন, ‘রিস্ক নিতে হবে। কিছু করার নেই।’
রাণা আর থাকতে পারল না। বলল, ‘সাদিককে তুলব কী করে? এখানে এত লোক নিয়ে আছে। সেটা সম্ভব নাকি?’
অমল হাসল, ‘দেখছি। জামাল! আমাদের আর কোনও অপশন নেই। কী করে ব্যাপারটা কমপ্লিট করা যায়?’
জামাল বলল, ‘আটটা ছেলে আছে এখন সাদিকের কাছে। এতগুলোকে মেরে বের করে আনা যায়। ব্যাপারটায় রক্ত পড়বে। অন্যান্য ঝামেলাও আছে।’
খান বললেন, ‘বেরোয় কতজনে?’
অমল বলল, ‘কখনো কখনো শুধু ড্রাইভার নিয়েও বেরোয়।’
জামাল বলল, ‘অপেক্ষা করতে হবে সেক্ষেত্রে।’
খান অমলের দিকে তাকালেন, ‘ফোন করো। কিছু একটা করে ওকে বের করো।’
অমল বলল, ‘ঠিক আছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক। তারপর ফোন করছি।’
মাথুর ঘড়ি দেখলেন, ‘ঠিক আছে। তাই হোক। সাদিককে চাই।’
অমল বলল, ‘জামাল আরিচা হাইওয়ের দিকে এগিয়ে চলো।’
জামাল গাড়ি স্টার্ট দিল।
রাণা বলল, ‘সাদিক যদি লোকগুলোকে নিয়ে আসে।’
অমল ঠান্ডা গলায় বলল, ‘তুমি আছ তো। জামালের অটোমেটিক মেশিনগান আছে। একটাকেও বাঁচিয়ে রাখার দরকার নেই।’
মাথুর খুশি হয়ে খানের দিকে তাকালেন, ‘এই তো, খাঁটি কথা বলে দিয়েছে। এবার ঠিক আছে।’
খান বললেন, ‘ঠিক। এবার অল আউটেই যেতে হবে। আর সময় নেই।’
রাণা ঘাড় নাড়ল, ‘আমি তৈরি।’
জামাল অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল। মাথুর বললেন, ‘আমরা এখানে জড়াচ্ছি, তুষার স্যারকে একবার বলার দরকার আছে?’
খান বললেন, ‘না। এই মুহূর্তে কিছু বললে বারণ করে দেবেন। সাদিক ছাড়া আর কোনও অপশন নেই। তাই থাক আপাতত।’
মাথুর ঘড়ি দেখলেন, ‘অমল, ফোন করো।’
অমল বলল, ‘শহর ছেড়ে একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছই। আমি কী বলব সেটাও ভাবতে হবে।’
খান বললেন, ‘বলে দাও তুমি জানতে পেরেছ কে ওর ভাইকে মেরেছিল। সাদিক চলে আসবে।’
অমল বলল, ‘খারাপ আইডিয়া না। এটাই ঠিক লাগছে। সাদিক তারেককে খুব ভালোবাসত। ও কিছুতেই তারেকের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না। যাই হোক, এতক্ষণে একটু শ্বাস নেওয়ার সময় পেলাম। আপনাদের আরেকটা খবর জানিয়ে রাখি।’
খান আর মাথুর দুজনেই উৎসুক চোখে অমলের দিকে তাকালেন।
অমল বলল, ‘এই যে এত বাইরে বাইরে পাঠানো হচ্ছিল আমাকে বা রাণাকে একবার পাঠানো হয়েছিল। সে কোডগুলো সব ফেলে ডিকোডের চেষ্টা করেছিলাম। উত্তর দাঁড়াচ্ছে, ওরা খুব বড় কিছু প্ল্যান করছে। মিডল ইস্ট স্টাইলে ড্রোন অ্যাটাক। বায়োলজিক্যাল ওয়্যারের চেষ্টা হয়েছিল। পাকিস্তান ওতে আগ্রহী নয়। ওরা ডিরেক্ট অ্যাকশনে বিশ্বাসী। ড্রোন পার্টস বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে আলাদা আলাদা করে সাদিকের কারখানার স্টোরে আসছে। ওরা প্রচুর ফান্ডিং পাচ্ছে। এর অর্থ হল অদূর ভবিষ্যতে ওরা ড্রোন অ্যাটাকের প্ল্যান করছে।’
খান আর মাথুর দুজনে একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘মাই গড। লোকেশন?’
অমল বলল, ‘বাংলাদেশের পাঁচটা জায়গার কো-অরডিনেটস আর ভারতের সাতটা শহরের কো-অরডিনেটস আছে। নর্থ ইস্টের টানাপোড়েনে আই এস আই-এর ইন্ধনও আছে। সাদিকের সমস্ত ব্যবসার আসল জায়গা ওর স্টোরগুলো।’
খান বললেন, ‘একইসঙ্গে এখানে আইএসআই সম্পূর্ণ আলাদাভাবে সক্রিয়। তাই তো?’
অমল বলল, ‘হ্যাঁ। যার সঙ্গে সাকিনার মাধ্যমে আমরা যোগাযোগ করতাম, তার কভার এক্সপোজ হয়ে গেছিল। তাকে মরতে হয়েছে। ওর কভার এক্সপোজ হওয়া সম্ভব ছিল না। এর অর্থ হয় আমাদের মধ্যেই কেউ ওদের খবর দিয়েছিল।’
খান বললেন, ‘কে কে জানে ওই এজেন্টের কথা?’
অমল বলল, ‘আমি আর উস্তাদ ছাড়া কেউ জানত না।’
খান বললেন, ‘আই এস আই এত এফিশিয়েন্ট হয়ে গেছে যে আমাদের ভেতরের কারো ইনপুট ছাড়া এত বড় অপারেশন করে নেবে, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। যাই হোক, এগুলো নিয়ে পরে ভাবা যাবে। তুমি সাদিককে ফোন করবে এখন? এখানে তো চারদিকে আর কাউকে দেখছি না। এ জায়গাটাও শুনশান।
অমল ঘাড় নেড়ে পকেট থেকে ফোন বের করল, ‘রাইট। লেটস স্টার্ট দ্য অপারেশন।’
সোবাহান অবিশ্বাসী চোখে আলমগিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার এত বড় সাহস? তুমি জানো আমি তোমার কী করতে পারি?’
আলমগির বললেন, ‘কিচ্ছু করতে পারেন না। আরিফ সাহেব নিজে দেখেছেন আপনি নির্মলকে ফ্রেম করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ক্রমাগত। আপনি কী চান, সেটা আমরা বুঝতে পেরেছি। জাহির সাহেবের সঙ্গে মিলে আপনি যেটা করতে চাইছেন, সেটা আমরা করতে দেব না। বুঝেছেন? আপনার ফোন দিন।’
সোবাহান কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, আলমগির সোবাহানের মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে বললেন, ‘একদম সময় নেই আপনার হাতে। আমি এখানেই যা করার করে দেব। যা বলছি করুন। ফোন দিন।’
সোবাহান কাঁপা কাঁপা হাতে তার পকেট থেকে দুটো ফোন বের করে আলমগিরের হাতে দিলেন। আলমগির সোবাহানের ফোন দুটো নিয়ে পকেটে রেখে বললেন, ‘আপনাকে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে অর্ডার এসে গেছে। আপনি এখানেই বসবেন।’
সোবাহান অবিশ্বাসী চোখে আলমগিরের দিকে তাকালেন। আলমগির বললেন, ‘কী ভাবেন? তলে তলে কাজ করে যাবেন, কেউ কিছু বুঝতে পারবে না? আমরা এখানে ঘাস খাবার জন্য আছি? আনোয়ার সাহেবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং তাকে হত্যার দায়ে আপনাকে রিমান্ডে নেওয়া হল। আপনি আপনার উত্তর তৈরি করুন। এস নির্মল, আসুন আরিফ সাহেব।’
সোবাহান দরদর করে ঘামছিলেন।
আলমগির আরিফ এবং নির্মলকে নিয়ে ইন্টারোগেশন চেম্বার থেকে বেরিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলেন। আরিফ নির্মলের হাত ধরে বললেন, ‘বিশ্বাস করো, আমি জানতাম না এত জঘন্যভাবে তোমাকে ফ্রেম করার প্ল্যান চলছিল। পরে বুঝেছি।’
নির্মল বলল, ‘ঠিক আছে সাহেব। আপনি যে সোবাহান সাহেবের কথায় প্রভাবিত হননি, তার জন্যই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
আলমগির বললেন, ‘আমি তো বুঝতে পারছিলাম আরিফ সাহেবের মনে দ্বিধা কাজ করছে। অনলাইনে খবর পাঠানোর কাজটা অবশ্য আমিই করেছি। আমার মনে হয়েছিল খবরটা বেরোনো দরকার। পি এম আমাকে এখানে সিক্রেট মিশনে রেখেছিলেন। সোবাহানের ব্যাপারটা তিনি জানতেন। সাদিকের ব্যাপারটা নির্মল না থাকলে জানা সম্ভব ছিল না। পি এম স্পেশাল অর্ডার পাঠিয়েছেন সাদিকের ব্যাপারটা যেন নির্মল নিজে দেখে। এই মুহূর্তে কী করা উচিত বলে তোমার মনে হয় নির্মল?’
নির্মল অবিশ্বাসী চোখে আলমগিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি সত্যি বলছেন? পি এম অর্ডার করেছেন?’
আলমগির বললেন, ‘হ্যাঁ। জাহিরের ব্যাপারে উনি সন্দেহ করেছিলেন। সোবাহান যে এত বেড়ে গেছে, তিনি ধারণা করতে পারেননি। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কী হয়েছিল তুমি কি ভুলে গেলে? কাছের লোকেরাই তো সব থেকে বড় শত্রু হয়। সবখানেই নজর রাখা প্রয়োজন। যাক গে, যা হয়, ভালোর জন্যই হয়। তুমি গেম প্ল্যান বল।’
নির্মল বলল, ‘এই মুহূর্তে সাদিককে রিমান্ডে নিতে হবে। আমি ওকে জেরা করতে চাই। প্রয়োজনে সোবাহান সাহেবের পাশে বসিয়ে দুজনকে একসঙ্গে জেরা করতে হবে।’
আলমগির বললেন, ‘ডান। তুমি যাবে সাদিককে তুলতে?’
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ। আমাকে বাহিনি দিন।’
আলমগির বলল, ‘দু’কোম্পানি বাহিনি নিয়ে যাও। প্রয়োজনে বাড়ি ঘিরে রেখে কলার ধরে ওকে তুলে নিয়ে আসবে। মিডিয়ায় খবর চলে গেছে। সাদিক আজকের মধ্যেই এক্সপোজ হয়ে যাবে।’
নির্মল বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’
আলমগির বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ আমাকে না, তোমাকে আমার দেওয়া উচিত। তুমি ক্রমাগত সাদিকের পেছনে না লেগে থাকলে, জাহিরের কাছে না গেলে এদের নেক্সাসটা কিছুতেই ধরা পড়ত না। সোবাহান আর জাহির বড় কিছু প্ল্যান করছিল, সেটা আমরা বুঝতে পারছিলাম। কে জানে, সাদিকের কাজেও হয়তো এ দেশের বিরুদ্ধেই বড় কিছু প্ল্যান আছে।’
নির্মল বলল, ‘আছে স্যার। এত টাকার ট্রানজাকশান অকারণে হতে পারে না। এ ছাড়া আমি মাদ্রাসার প্রধানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই স্যার। আমার মনে হচ্ছে এই কুড়ি জন ছাত্রকে ইচ্ছে করে অদৃশ্য করা হয়েছে। এই বাচ্চারা তো কিছুই জানে না, এদের যদি তুলে নিয়ে গিয়ে মগজধোলাই করে কোনও অর্গানাইজেশনে জুড়ে দেওয়া হয়, সেটা আমাদের দেশের জন্য একবারেই ঠিক হবে না।’
আলমগির মাথা নাড়লেন, ‘রাইট। ওকেও তোলার ব্যবস্থা করা হোক।’ নির্মলের সঙ্গে যাওয়ার জন্য বাহিনি এসে উপস্থিত হল। নির্মল তার অফিস থেকে মাথা উঁচু করে বেরোল। এবার সাদিককে ধরার পালা।
বড় রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে।
কেউ গাড়ি থেকে নামেনি। সবাই গাড়ির ভেতর চুপ করে বসে আছে।
জামালের ওয়াকিটকিতে সংকেতের মাধ্যমে কেউ কিছু বলল। জামাল সেটা শুনে বলল, ‘সাদিক বেরিয়েছে। গাড়িতে ড্রাইভার বাদে তিন জন আছে।’
রাণা বলল, ‘ঠিক আছে।’
অমলের ফোন বেজে উঠল। অমল ফোন কানে দিল। ও-প্রান্ত থেকে কেউ একজন কিছু বলল। অমল সঙ্গে সঙ্গে ফোন রেখে মোবাইলের ব্রাউজার খুলে বিরক্ত গলায় বলল, ‘উফ্! এবার কী হবে?’
মাথুর বাদাম খাচ্ছিলেন। অমলের বিরক্তি দেখে বললেন, ‘কী হল?’
অমল বলল, ‘সাদিক এক্সপোজড। নিউজ এজেন্সিগুলোতে সব বেনামে সাদিকের ফরেন ট্রানজাকশানের ডকুমেন্টস পাঠিয়ে দিয়েছে।’
খান বললেন, ‘সে তো ভালো কথা।’
অমল বলল, ‘সাকিনাকে পাওয়ার জন্য ভালো কথা না স্যার। বুঝতে পারছেন না, সাকিনাকে পেতে গেলে আমাকে সাদিককে লাগবে। ওর কোনওরকম সমস্যা, আমাদের সমস্যা বাড়িয়ে দেবে।’
খান ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘তাহলে?’
অমল বলল, ‘আমি সাদিককে ফোন করে অবস্থা বোঝার চেষ্টা করি? যদি এখানে না এসে চলে যায়? এখানেই ফার্স্ট আসুক, আমি বরং সেটা কনভিন্স করাই?’
খান ভেবে নিয়ে বললেন, ‘করো।’
অমল সাদিককে ফোন করল। সাদিক ফোন ধরে নার্ভাস গলায় বলল, ‘রুমানভাই, খবর পেয়েছেন?’
অমল বলল, ‘মাথা ঠান্ডা রাখুন। আমার কাছে চলে আসুন। আমি দেখছি কী করা যায়।’
সাদিক বলল, ‘আপনি কী করবেন জনাব? আমার তো আর বাসায় ফেরা হবে না বুঝতে পারতাছি। দু’কোম্পানি ব়্যাবও নাকি আসতাছে। আপনার ভাবিরে আমি কী বুঝামু?’
অমল বলল, ‘ব়্যাবে আপনার আত্মীয় আছে না?’
সাদিক বিরক্ত গলায় বলল, ‘আর বইলেন না, তার আমি ফোনই পাই না। কিছুতেই ফোন ধরে না, এত বড় অফিসার।’
অমল বলল, ‘আপনি ফোন অফ করে চলে আসুন। দেখছি।’
সাদিক বলল, ‘আইতাছি জনাব। আমি ফোন অফ কইরা দিলাম। চইলাই আইতাছি।’
অমল বলল, ‘আসুন। গাড়ির নাম্বার বলছি, ঢাকা ভ ৩৪৫৩। রাস্তার বাঁ-দিকে দাঁড়িয়ে আছি। তাড়াতাড়ি আসুন।...’
অমল বলল, ‘এসে গেছে প্রায়। আপনারা দুজন কি গাড়িতে থাকবেন?’
খান আর মাথুর পরস্পরের দিকে তাকালেন।
মাথুর খানকে বললেন, ‘এবার তুষার স্যারকে জিগ্যেস করি?’
খান গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লেন, ‘করো।’
মাথুর তুষারকে ফোন করলেন। একবার রিং হতেই তুষার ফোন তুললেন, ‘বলো মাথুর।’
মাথুর বললেন, ‘স্যার, সাদিককে হাইওয়েতে ডাকা হয়েছে। এখানেই পাকড়াও করে থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার প্ল্যান করছি।’
তুষার বললেন, ‘সর্বনাশ! অমল কোথায়?’
মাথুর বললেন, ‘আমার কাছেই আছে।’
তুষার বললেন, ‘অমল এই বুদ্ধি অ্যাপ্রুভ করছে?’
অমল বলল, ‘কিছু করার নেই স্যার, সাদিককে ইন্টারোগেট না করলে সাকিনাকে আর পাওয়া যাবে না। এছাড়াও একটু আগে সাদিক এক্সপোজড হয়ে গেছে। গিয়াস সাদিকের সঙ্গে সবরকম সম্পর্ক বন্ধ করে দেবে। আমাদের হাতে এক ঘণ্টারও কম সময় আছে আমি যা বুঝতে পারছি।’
তুষার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘গো অ্যাহেড। আমি দেখছি কী করা যায়। কেউ মরে যেও না, তাহলেই হবে। অ্যাম আই ক্লিয়ার?’
খান হাসলেন, ‘টু হান্ড্রেড পারসেন্ট।’
সাদিকের গাড়ি দেখা যাচ্ছে। অমল গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে দাঁড়াল। জামাল খান, মাথুর এবং রাণা, তিনজনের হাতেই প্রয়োজনীয় অস্ত্র দিয়ে দিয়েছিল।
সাদিকের গাড়ি দাঁড়ান মাত্র কাচ নামিয়ে সাদিকের গাড়ির সামনে বসে থাকা আসলাম অমলকে বলল, ‘গাড়িতে আসেন।’
রাণা সময় দিল না মুহূর্তের মধ্যে গাড়ি থেকে নেমে আসলামের দু’চোখের মাঝখানে গুলি চালাল, আসলাম আর নড়ার সময়ও পেল না। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিতে গেছিল, রাণা তাকেও গুলি করল। শব্দহীন গুলি। আশে পাশে কেউ কোনও শব্দও পেল না। সাদিকের সঙ্গে আরেকজন ছিল। গাড়ি থেকে নামার আগেই তাকেও রাণা মেরে দরজা খুলে সাদিককে বলল, ‘নামুন।’
সাদিক ফ্যাকাসে মুখে অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গৌতমভাই, রুমানভাই, এসব কী?’
অমল বলল, ‘আমাদের গাড়িতে আসুন। আপনার কোনও ক্ষতি হবে না। আসুন। ব়্যাব আসছে আপনাকে তুলতে। তার আগে চলুন।’
সাদিক বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের গাড়িতে উঠল। মাথুর তখনও বাদাম খেয়ে যাচ্ছিলেন। সাদিক গাড়িতে উঠতেই মাথুর বললেন, ‘বাদাম খাবেন?’
সাদিকের বিস্ময়ভাব কাটেনি তখনও। অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাই এগুলো কী হচ্ছে?’
গাড়ি চলতে শুরু করে দিয়েছে। অমল বলল, ‘কিছু হয়নি। আমি আপনারই লোক সাদিকভাই। আমাকে বলুন গিয়াস এখানে এসে কোথায় উঠেছে।’
সাদিক হতভম্ব গলায় বলল, ‘আপনি আসলামকে মেরে দিলেন? ড্রাইভারকে মারলেন? হারুনকে মারলেন কেন?’
রাণা সাদিকের কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে বলল, ‘আসগরকেও মেরেছি। এবার গিয়াস কোথায় আছে বল, নইলে তোর কী হতে পারে তুই নিজেও জানিস না।’
সাদিক সিঁটিয়ে গেল।
অমল বলল, ‘আহ রাণা। তুমি সাদিকসাহেবকে ভয় দেখাছ কেন? সাহেব কি বলেছে বলবে না? বলেন সাহেব, দেরি করবেন না।’
সাদিক বলল, ‘আপনাকে তো আমি বলেছি রুমানভাই, সাকিনাকে গিয়াস কোথায় রেখেছে আমি বুঝতে পারছি না। আমি জানি গিয়াস কোথায় ছিল। এখন কোথায় আছে তা জানি না।’
অমল বলল, ‘যেখানে ছিল সেখানেই চলুন আগে। তারপর দেখা যাবে।’
সাদিক বলল, ‘গুলশানে আমার হোটেলে ছিল।’
রাণা সাদিকের মাথায় রিভলভারটা আবার ঠেকিয়ে বলল, ‘কোনওরকম নাটক করবি না।’
সাদিক বলল, ‘এমন করেন কেন গৌতমভাই, আপনারে কোনওদিন পর ভাবসি?’
রাণা বলল, ‘তোকে এত প্রশ্নের উত্তর দেব না। তুই যদি মিথ্যে বলিস, তাহলে তোর কী হবে, তুই নিজেও জানিস না।’
সাদিক বলল, ‘গুলশানে চলেন। দেরি কইরেন না। আমি তো এমনিই শেষ ভাই। আমার নামে নিউজ বাইরায় গেছে।’
অমল বলল, ‘দেখব আমি। দরকার হলে আপনাকে ইন্ডিয়া নিয়ে যাব। ও নিয়ে চিন্তা নাই।’
সাদিক চমকে গিয়ে বলল, ‘ইন্ডিয়া?’
খান খুক খুক করে কেশে বললেন, ‘আমরা ছাড়া আর আছেই বা কে?’
জিপে উঠেই মোখলেসকে ফোন করল নির্মল। মোখলেসের ফোন পুরোটা রিং হয়ে কেটে গেল। বিরক্ত হল সে। এখন প্রতিটা মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেরি হওয়া মানেই অন্য কোথাও সমস্যা তৈরি হওয়া। গাড়িটা কিছুটা পথ যাবার পর সে দেখল দীপা ফোন করছে। নির্মল লজ্জা পেল। ছাড়া পাবার পর তার দীপাকে ফোন করার কথা মনে হয়নি! ছি-ছি।
সে সঙ্গে সঙ্গে ধরল, ‘বলো।’
দীপা কান্নায় ভেঙে পড়ল, ‘কোথায় তুমি? আমি ঢাকায় রওনা দিয়েছি।’
নির্মল বলল, ‘না না। রওনা দেওয়ার দরকার নেই। তখন একটা সিচুয়েশন হয়েছিল। ঠিক হয়ে গেছে। চিন্তা কোরো না।’
দীপা বলল, ‘তুমি ঠিক বলছ তো?’
নির্মল দেখল, মোখলেস ফোন করছে। সে বলল, ‘হ্যাঁ। নিশ্চিন্তে ঘোর। আমি একটা রেইডে যাচ্ছি। রাখছি, পরে কথা বলছি।’
দীপাকে কিছু বলতে না দিয়েই ফোন কেটে দিল নির্মল। মোখলেসের ফোন ওয়েটিঙে ছিল। ধরে বলল, ‘বল বল। পাখি ঘরে আছে?’
মোখলেস বলল, ‘আমি বেরোয়ছিলাম তো স্যার। এখনও বাইরে আছি।’
নির্মল বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কোথায় বেরিয়েছিলে?’
মোখলেস বলল, ‘আমি ভাবলাম কেস ক্লোস হয়ে গেছে। আমি আগের ডেরায় ফিরে গেছিলাম।’
নির্মল বলল, ‘এখনই এস। আমি যাচ্ছি।’
মোখলেস বলল, ‘জি স্যার।’
নির্মল ফোন কেটে ড্রাইভারকে বলল, ‘তাড়াতাড়ি চল।’
ড্রাইভার চেষ্টা করছে, কিন্তু বিশেষ লাভ হল না। কিছুক্ষণ পরেই গাড়ি জ্যামে পড়ে গেল। নির্মল হতাশ হয়ে ড্যাশবোর্ডে ঘুষি মারল।
ড্রাইভার বলল, ‘হাইওয়ের দিকে রাস্তা ফাঁকা আছে স্যার। এদিকেই জ্যাম আজ।’
নির্মল বলল, ‘আমি হাইওয়ের দিকে গিয়ে কী করব? আমার ওদিকে কোনও কাজ নেই।’
বাহিনীর কয়েকজন গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা করে নিল। সাদিকের বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই নির্মল জিপ থেকে নেমে গেটে বলল, ‘দরজা খোল। ব়্যাব।’
গেট খুলল। নির্মল সাদিকের বাড়ির কলিং বেল টিপল। সাদিকের এক শাগরেদ বেরিয়ে এল। নির্মল বলল, ‘সাদিক শেখ কোথায়?’
শাগরেদ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘সাহেব বেরিয়ে গেলেন। আধঘণ্টা হয়েও গেছে গিয়া।’
নির্মল ভ্রু কুঁচকে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিথ্যে বলছিস?’
ছেলেটা জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘না স্যার। আপনি ক্যামেরা দেখেন। স্যার সত্যিই বাইরইয়া গেসে।’
নির্মল বুঝল ছেলেটা মিথ্যে বলছে না। তবু বাহিনীর ছেলেদের ঘর তল্লাশি করতে বলে দিল। মিনিট দশেকের মধ্যে সবাই জানিয়ে দিল সত্যিই বাড়িতে সাদিক নেই। নির্মল বিরক্ত মুখে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। সাদিকের না থাকার লক্ষণ একবারেই ভালো না। এ ধরনের প্রভাবশালী অপরাধীদের ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, ধরামাত্র এদের সবরকম যোগাযোগের উপায় বন্ধ করে দিতে হয়। ফোন একটা মারাত্মক যন্ত্র। এটার সাহায্যে এরা যেকোনও জায়গা থেকে সাহায্য পেয়ে যেতে পারে। পোর্টালে খবর বেরনোর পর থেকে কি সাদিক পালিয়ে গেল? সেক্ষেত্রে সাদিককে কী করে পাওয়া যাবে?
নির্মল ফোন বের করল। ট্যাক্সের নথি থেকে সাদিকের সম্পত্তিগুলোর তালিকা পাওয়া গেছে। সেগুলোতে হানা দেওয়া যেতে পারে। সাদিকের বাড়িতে থাকা শাগরেদগুলোকে আটক করে ভ্যানে তোলার নির্দেশ দিয়ে জিপে উঠে ড্রাইভারকে বলল, ‘আলোছায়া টেক্সটাইল মিল চল।’
ড্রাইভার অবাক হয়ে বলল, ‘ওখানে গিয়ে কী করবেন স্যার? ওখানে তো কাপড় তৈরি করে।’
নির্মল বলল, ‘চল। যা বলছি কর।’ ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিল।
মোখলেস ফোন করছে। নির্মল ফোন ধরে বলল, ‘কী হল? কোথায় আছ?’
মোখলেস বলল, ‘আমি এসে গেছি স্যার। এই দাঁড়ায় আছি। আপনার গাড়ি বেরোয় গেল, দেখলাম তো।’
নির্মল বলল, ‘সাদিকের ব্যাপারে কী জানা গেল?’
মোখলেস বলল, ‘এখানের দোকানি বলল কিছুক্ষণ আগে গাড়ি বাইর হইছে। সাদিক ওতে করেই গেছে।’
নির্মল বলল, ‘এই জন্য তোমার এখানে থাকার কথা ছিল। তুমি থাকলে ও কোথায় গেছে সেটা জানা যেত।’
মোখলেস বলল, ‘হোটেল যায় তো দু’দিন ধরে। মাঝে মাঝেই হোটেল যায়।’
নির্মল বলল, ‘কোন হোটেল?’
মোখলেস বলল, ‘গুলশানের হোটেল।’
নির্মল বলল, ‘ওখানে যেতে পারে?’
মোখলেস বলল, ‘যাইতেই পারে। আমি জানি না স্যার।’
নির্মল শ্বাস ছাড়ল, ‘তুমি কিছুই জানো না। রাখো।’
ফোন কেটে ড্রাইভারকে বলল, ‘গুলশান চলো তো।’
ট্রাক চলছে বন্দরের দিকে।
ট্রাকের ভিতরে বাচ্চাগুলো গাদাগাদি করে বসে আছে। কেউ ভীত চোখে তাকিয়ে আছে। দু’চারজন কান্নাকাটি করছে।
লতিফ চৌধুরী বসে বসে ঢুলছিল। বলল, ‘কান্নাকাটি করার কী আছে? তোমরা আমাগো ভবিষ্যৎ।’
একটা বাচ্চা বলল, ‘বাসায় যাব।’
লতিফ চৌধুরী বলল, ‘বাসায় যাবা? কেন? বাসায় কী আছে?’
বাচ্চাটা বলল, ‘আব্বা আম্মা আছে।’
লতিফ বলল, ‘কিছুই শেখ নাই। তোমরা জানো না, আমাগো আব্বাহুজুর একজনই? জানো? তোমাগো যাতে কষ্ট না হয়, তার জন্য আমি নিজে যাইতাসি তোমাগো লগে। তোমরা আমার কষ্ট দেখতে পাও না?’
বাচ্চাটা চুপ করে গেল। লতিফ বলল, ‘কও তো পোলারা, তোমরা কোন দেশের নাগরিক?’
সবাই একযোগে বলল, ‘বাংলাদেশ।’
লতিফ দাড়ি নেড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘না-না, হয় নাই। আমাগো দেশের নাম পাকিস্তান। কও জোরে। কী আমাগো দেশের নাম?’
কেউ কেউ পাকিস্তান বলল। বেশিরভাগ বাচ্চা চুপ করে রইল।
লতিফ রেগে গেল, ‘কিছু শেখায় না এরা। শুধু টাকা লইয়া যায়। কামের কাম কিছু হয় না। আমাগো দ্যাশের নাম পাকিস্তান। ঠিক কইছি?’
এখনও অনেকে চুপ করে রইল। লতিফ এবার চিৎকার করল, ‘ঠিক কইছি কি না? যার মনে হবে ভুল কইছি, সে জাহান্নামে যাবে। বুঝছ?’
একটা বাচ্চা ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল, ‘আমরা এখন কোই যাইতাছি হুজুর?’
লতিফ বলল, ‘কাম শিখতে যাইতাছি। আমরা কেউ তো কাম শিখি নাই। শিখছি? শুধু তর্ক করতে শিখছি। কেউ কিছু জানি না। শিখুম না? শিক্ষামূলক ভ্রমণ মানে কি বোঝো তোমরা?’
বাচ্চাগুলো কেউ কিছু বলল না।
ট্রাক দাঁড়াল। লতিফ ঘাবড়ে গিয়ে ফোন করল ড্রাইভারকে। ‘কী হইল? থাইমা গেলা কেন?’
ড্রাইভার বলল, ‘জ্যাম লাগছে হুজুর।’
লতিফ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এই জন্য এখানে এত সমেস্যা। রাস্তায় নামলেই শুধু জাম হয়। পাকিস্তান হইয়া গেলে এসব হইবো না। আমাগো লক্ষ্য পাকিস্তান। দেখি সবাই কও দেখি, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। কও কও। পাকিস্তান...’ বাচ্চাগুলো কেউ কেউ বলল, ‘জিন্দাবাদ।’ একসঙ্গে বলল না।
লতিফ রেগে গিয়ে বলল, ‘শিখাতে হবে। সব কয়টারে শিখাইতে হবে। অনেক কাম।’
ট্রাক আবার চলতে শুরু করল। লতিফ একসময় বসে বসে ঘুমিয়ে পড়ল। ঢুলে ঢুলে ঘুমাতে শুরু করল।
ফোন বেজে উঠল আবার তার। সে ধড়মড় করে উঠে বসে ফোন ধরল, ‘জি হুজুর।’
‘আপনারা প্রায় পৌঁছে গেছেন?’
‘জি হুজুর।’
‘আপনাদের আনলোড করে দেওয়া হবে। বাকিটা আমরা রিসিভ করে নেব। চিন্তার কোনও ব্যাপার নেই।’
‘জানি তো হুজুর। চিন্তা আমি করি না। আমি এই ছেলেগুলারে আপনাদের হাতে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত হব।’
‘গুড জব চৌধুরী। তুমি পুরস্কৃত হবে। তোমার জন্য আমরা গর্বিত।’
‘কী যে বলেন জনাব! যতক্ষণ না আর একবার এ দেশ পাকিস্তান হবে, ততক্ষণ আমার জীবনে বেঁচে থাকার কোনও মানে আমি খুঁজে পাব না।’
‘ইনশাল্লাহ।’
‘ইনশাল্লাহ জনাব।’
ফোন কেটে লতিফ বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তোমরা কত সৌভাগ্যবান জানো? তোমাগো নির্বাচন করা হইছে তার কাজে। স্বয়ং উপরওয়ালা তোমাগো নির্বাচন করসে। তোমরা এবার লড়াই করা শিখবা।’
কয়েকজন আবার কেঁদে উঠল, ‘বাসায় যামু।’
লতিফ বিরক্ত হয়ে হাতের কাছে যে ক’টা বাচ্চাকে পেল, তাদের চড় মারতে শুরু করল।
বাচ্চাগুলো ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করল।
লতিফ ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল, ‘চুপ। সবাই চুপ। আমরা এসে গেছি। আর চিন্তা নেই। বসে থাকো।’
কেউ কেউ চুপ করল। বেশিরভাগই আতঙ্কে কান্নাকাটি করে যাচ্ছিল। একটা ছেলে হঠাৎ করে লতিফের হাতে কামড়ে দিল। লতিফ চিৎকার করে উঠল, ‘ও মাগো, কত সাহস? এই শিখছ তোমরা মাদ্রাসায়?’
লতিফ ঘাবড়ে গেছে দেখে ছেলেটার দেখা দেখি বাকি বাচ্চারাও লতিফকে আক্রমণ করল। কেউ কামড়াল, কেউ লতিফের দাড়ি ধরে টান মারল। একটা ছেলে লতিফের ফোন নিয়ে ট্রাকের দেওয়ালে সজোরে ছুঁড়ে মারল।
কুড়িটা ছেলে একসঙ্গে লতিফকে আক্রমণ করল। লতিফ হাত-পা ছুঁড়েও সামলাতে পারল না। কয়েক মুহূর্তের আচমকা হানায় ছেলেগুলো তার জামাকাপড় ছিঁড়ে বিধ্বস্ত করে দিল।
ট্রাক গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই লতিফ অজ্ঞান হয়ে গেল।
‘এই দেশগুলোর সমস্যাই হল একনায়কতন্ত্র। কেউ যখন ক্ষমতায় বসে, তখন সে এমনভাবে চলতে শুরু করে, দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বলে আর কিছু থাকে না। সবটাই চেয়ারের প্রতি আনুগত্য। এই দেশগুলোতে কাজ করতে গিয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হয়৷ তার রাজনৈতিক বিষয়ে সম্যক ধারণা না থাকলে আমরা সমস্যায় পড়ে যাব। সন্ত্রাসবাদী দেশগুলো এই দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সুবিধা নিতে চায় সবসময়।’
মিটিং শেষ হয়ে এসেছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কথায় সবাই সায় দিল। মন্ত্রী বললেন, ‘ঠিক আছে। আজকের মতো এখানেই আমি মিটিংটা শেষ করছি। তুষার, আপনি প্লিজ থাকবেন। আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে।’
তুষার হাসলেন, ‘আমি কলকাতা থেকে ফিরে আপনার জন্যই বসে আছি স্যার।’
কনফারেন্স রুম ফাঁকা হতে বেশিক্ষণ লাগল না। তুষার মন্ত্রীর কাছেই বসে ছিলেন। ঘর পুরোপুরি ফাঁকা হলে মন্ত্রী বললেন, ‘কী আপডেট? পাওয়া গেছে?’
তুষার মাথা নাড়লেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। এই ডিফারেন্ট উইং যেভাবে কাজটা করেছিল, সেটাকে তাড়াতাড়ি বুঝে নিয়ে অপারেশনটা চালাতে হচ্ছে, কিছু গ্যাপ তো আছেই।’
মন্ত্রী বললেন, ‘শেখাওয়াত কী বলছে? ও আমাদের বুঝিয়েছিল বাংলাদেশে আমাদের অনেক বেশি গভীরতার সঙ্গে কাজ করা উচিত। এমন ইন্টেন্সিটি নিয়ে কাজ করল যে নিজেদের এজেন্টই ধরা পড়ে গেল। কী লজ্জার ব্যাপার বলুন তো?’
তুষার বললেন, ‘এই মুহূর্তে আমি কোনও গ্রুপের কথা মাথায় নিচ্ছি না স্যার। শেখাওয়াতের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি।’
মন্ত্রী বললেন, ‘ও সহযোগিতা করছে?’
তুষার মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার অনেক কিছু জায়গা ক্লিয়ার না। হয়তো আমাকে বলতে চাইছে না। হয়তো আপনিই আমাদের কাউকে বলতে বারণ করেছেন। ওদের উইংটা তো আপনার অর্ডারেই আমাদের থেকে আলাদা হয়েছিল। শেখাওয়াত এমন কিছু কাজ করেছে, যেটা প্রেসে এলে আমরা সমস্যায় পড়তে পারি।’
মন্ত্রী বললেন, ‘তুমি কি আমাকে ইন্ডাইরেক্টলি দোষী বলতে চাইছ?’
তুষার বললেন, ‘আমার এজেন্টরা এতদিন ধরে কাজ করছে স্যার। আমরা কখনো এত বাজেট গ্র্যাান্ট পাইনি যেটা শেখাওয়াত পেয়েছে। ও ঠিক কী বলে আপনাদের কনভিন্স করেছিল? কোনও অ্যাপ্রুভালের ব্যাপার নেই, যাকে খুশি যখন তখন এজেন্সিতে রিক্রুট করে নিচ্ছে, যেখানে ইচ্ছে থাকছে, এত ইন্ডিপেন্ডেন্টলি কাজ করার পারমিশন পেল কোত্থেকে? আমরা তো পাই না স্যার। আমাদের হাজার ঝঞ্ঝাটের মধ্যে বরাবর কাজ করতে হয়েছে৷ কতবার বাজেটে স্যাংশানও পাইনি। এখানে ঠিক কী হচ্ছে যে এরা এত বাজেট নিয়ে চলে গেছে?’
মন্ত্রী ইতস্তত করে বললেন, ‘বেশিদিন তো এটা হয়নি।’
তুষার বললেন, ‘হ্যাঁ, এই তো লাস্ট বছর দুয়েক। শেখাওয়াত ওর মতো করে নেটওয়ার্ক বাড়িয়ে গেছে, অ্যাক্টিভিটি বাড়িয়ে গেছে, আমাদের সঙ্গে কোনরকম কো-অর্ডিনেশন করেনি, যা ইচ্ছে, তাই করেছে। আমি সেটাই বুঝতে চাইছি। ঠিক কীভাবে এসব হয়েছে?’
মন্ত্রী বললেন, ‘ইস্টার্ন কান্ট্রিগুলোতে আই এস আই এর অ্যাক্টিভিটি বেড়েছে৷ শেখাওয়াত আমাকে সেটার প্রমাণ দিয়েছিল। ইন্ডিপেন্ডেন্টলি কাজ করতে চেয়েছিল। তাতে সমস্যা হবার কথা ছিল না।’
তুষার বললেন, ‘অনেক বড় সমস্যা তৈরি হয়ে গেছে স্যার। আমাদের আবার নতুন করে ঘুঁটি সাজাতে হবে। আশা করব, এজেন্ট সুস্থভাবে ফিরবে।’
মন্ত্রী বললেন, ‘আর এজেন্ট কম্প্রোমাইজড হয়ে গেলে?’
তুষার বললেন, ‘আমাদের সব ড্যামেজের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। প্রাইমারিলি আমরা রিস্ক অ্যানালিসিস করছি।’
মন্ত্রী বললেন, ‘কীরকম?’
তুষার বললেন, ‘ধরা যাক একজন লোক বর্ডার পেরিয়ে দেশে প্রবেশ করেছে। তার ইন্টেনশন এ দেশের ভিড়ে মিশে যাওয়া। এ ধরনের লোকের থেকে রিস্ক থাকে। আবার থাকেও না। কিন্তু এই লোকই যখন একটা ভিড় বাসে বা ট্রেনে একটা এক্সপ্লোসিভ জ্যাকেট পরে উঠে পড়বে, তখনই আমাদের সমস্যা শুরু হয়। বাংলাদেশের যেসব জায়গায় এসব মগজ ধোলাইয়ের কাজ হয়, আমাদের এজেন্ট তার প্রাইম সাসপেক্টের কাছে ছিল। তার সম্পর্কে প্রচুর তথ্য শেখাওয়াতকে পাঠিয়েছে। ওদের ফিউচার প্ল্যান কী, তা হয়তো আমাদের এজেন্ট জানে, শেখাওয়াত জানে না। সে প্ল্যান না জানলে কী সমস্যা হতে পারে, আমরা সেটাই অ্যানালাইজ করছি স্যার।’
মন্ত্রী ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘ইন্টেলিজেন্স ফেইলিওর থেকে এজেন্ট ধরা পড়ল?’
তুষার বললেন, ‘দেখছি সেটাও। আপাতত আপনি শেখাওয়াতকে যদি ইন্সট্রাকশন দিয়ে আমাকে রিপোর্ট করতে বলেন, তাহলে ভালো হয়। আমি ওর সঙ্গে দেখা করলেও ও আমায় সব বলেছে বলে আমার মনে হয় না৷ প্লিজ এটা আপনি দেখুন। ন্যাশনাল সিকিউরিটির ব্যাপার, এখানে ইগো জিনিসটা যত কম আসে, তত ভালো। তাই না স্যার?’
মন্ত্রী বললেন, ‘ঠিক। বলে দিচ্ছি৷ সরি মিস্টার রঙ্গনাথন। আপনার সঙ্গে আমার আগে কনসাল্ট করা উচিত ছিল।’
তুষার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে স্যার। আগে ক্রাইসিস কাটুক, পরে দেখা যাবে।’
মন্ত্রী চিন্তিতমুখে চুপ করে বসে রইলেন।
সাদিক ঢোক গিলছে। ওকে দেখে বোঝা যাচ্ছে, বেশ ভয় পাচ্ছে। খান বলল, ‘কী প্ল্যান আছে এখন মিয়াঁ? এ দেশটাকে আবার পাকিস্তান করে ফেলবে?’
সাদিক হাসার চেষ্টা করল, ‘কী যে বলেন ভাই! আমার অত ক্ষমতা আছে? আমাকে যেভাবে বলা হয়, আমি সেভাবে কাজ করি।’
অমল সাদিকের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সাদিক সেটা দেখে বলল, ‘ঠিক বলিনি রুমানভাই?’
অমল বলল, ‘গিয়াস কী করছে এখানে? বলবেন? বলে দিলে ঠিক থাকবেন। না বললে আমি আপনার গ্যারান্টি নিতে পারব না।’
সাদিক ঢোক গিলে বলল, ‘আমি কী জানি ভাই? সাকিনার উপর খুব নজর ওর। জরিনার উপরেও। জরিনা তো আমার মাইয়া। ও যদি ওরে চালান কইরা দেয়, তাহলে কী হইত আপনিই বলেন।’
অমল বলল, ‘প্রায় সাড়ে ছ’শো মেয়েকে আরবে পাঠিয়েছেন। তারা কারো মেয়ে ছিল না বলুন?’
মাথুর চোখ কপালে তুললেন, ‘সাড়ে ছ’শো? শিওর?’
অমল মাথুরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কম হবে না। বেশি হবে। চাইল্ড ট্রাফিকিং দিয়েই শুরু করেছিল।’
সাদিক বলল, ‘রুমানভাই, আপনি একজন পাকিস্তানপন্থী পরিবারের ছেলে হয়ে ইন্ডিয়ার হয়ে কাজ করতাসেন?’
খান হেসে ফেললেন। অমলও হাসল, ‘আপনি একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের হয়ে কাজ করছেন আর আমি করলেই দোষ?’
সাদিক মুখ কালো করে বসে রইল। সাদিকের হোটেলের বেসমেন্টে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল জামাল। বেসমেন্ট ফাঁকা। অমল বলল, ‘আপনারা সাদিককে দেখুন। চল রাণা...সরি গৌতমভাই।’
খান বললেন, ‘দুজনে কী করে হবে?’
অমল বলল, ‘আমার মনে হয়, আমি জানি কোথায় ছিল গিয়াস। অধিক সন্ন্যাসী দরকার নেই।’
রুমাল মুড়িয়ে সাদিকের মুখে ঢুকিয়ে অমল বলল, ‘জামাল, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাও। এখানে সাদিককে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ না। অন্য কেউ এলেই একে চিনে ফেলবে। দরকার হলে আমি ডাকব।’
গাড়ি থেকে নেমে গেল অমল। জামাল গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
অমল বলল, ‘চলো রাণা।’
দু’জনে লিফটের সামনে দাঁড়াল।
লিফট খুলতে অমল চার নম্বর টিপে বলল, ‘সাদিকের মিটিং রুম। আগেই বোঝা উচিত ছিল আমার।’
রাণা বলল, ‘সিসিটিভি আছে তো?’
অমল বলল, ‘ওই ফ্লোরে নেই। নিশ্চিন্ত থাকো।’
রাণা আশ্বস্ত হল।
চার নম্বর ফ্লোরে পৌঁছে লিফটের দরজা খুলে গেল। হোটেলের ইউনিফর্ম পরে একটা ছেলে ছুটে এল, ‘কী দরকার?’
অমল ছেলেটার কাঁধে ছোট একটা রদ্দা মারল। ছেলেটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
করিডোরের দুদিকে ডানদিক বাঁদিকে দরজা। অমল বলল, ‘ওহ্, মাস্টার কী, এই ছেলেটার পকেটে আছে নাকি দেখো তো!’
রাণা ঝুঁকল। ছেলেটার ডানদিকের পকেটে কিছু নেই। বাঁপকেটে একটা কার্ড খুঁজে পেল। অমলকে দিতে সে প্রথম দরজাটা খুলল।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা ঘর। পরিপাটি করে বিছানা করা। অমল বাথরুমের দরজা খুলল। নাহ। কিছু নেই। রাণাকে বলল, ‘ওইদিকের দরজাটা দেখো।’
রাণা দরজা খুলল। এই ঘরটাও পরিষ্কার। এভাবে ডানদিক বাঁ দিকে সবক’টা ঘরের দরজা খুলে দেখা শুরু হল। করিডোরের শেষ ঘরে গিয়ে চাবি দেওয়ার দরকার হল না। দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। অমল শিস দিয়ে উঠল।
একটা বিরাট স্যুইট রুম। দুটো ছোট ছোট সোফার মাঝে একটা কাচের টেবিল রাখা। টেবিলের উপরে চাপ চাপ রক্ত। পাশের ঘরে দরজা ঠেলতেই দেখা গেল খাটে কোনও চাদর নেই। চাদর মেঝেতে পড়ে আছে।
অমল ঘরে রাখা ওয়ার্ডরোব খুলল। ওয়ার্ডরোব ফাঁকা।
রাণা বলল, ‘কেউ নেই?’
অমল বলল, ‘নাহ্। তুমি বাথরুমটা দেখো তো তাও।’
রাণা বাথরুমে ঢুকল। বিরাট বড় বাথরুম। একদিকে স্নানের জায়গা, সেটা কাচ দিয়ে ঘেরা। রাণা স্নানের জায়গার দরজা ঠেলে ঢুকল। বাথটবে জল উপচে পড়ছে। মেঝেতে রক্ত। সে ঝুঁকে রক্ত দেখতে গিয়ে টের পেল বাথরুমের দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেল।
সে সঙ্গে সঙ্গে স্নানের জায়গা থেকে বেরিয়ে দরজা খুলতে গেল।
দরজা খুলল না...।
গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। স্ট্রিট লাইট খারাপ। আলো জ্বলছে না। জামাল দেখেশুনেই গাড়িটা রেখেছে।
সাদিকের মুখের রুমাল খুলে দেওয়া হয়েছে।
সাদিক খান আর মাথুরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারা দেখি খুব ভালোই বাংলা বলেন।’
খান সাদিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অবাক হলেন?’
সাদিক বলল, ‘অবাক তো আমার হবার কথা জনাব। ইন্ডিয়ান লোকজন আমারে মুরগি কইরা গেল, আমি তো যত ভাবি, তত অবাক হই।’
মাথুর বললেন, ‘আমরাও অবাক হই, যখন কোনও শান্তশিষ্ট জায়গায় হঠাৎ করে ব্লাস্টের খবর আসে, আপনারাই সেগুলো করান, তখন আমরা অবাক হই। বুঝলেন?’
সাদিক ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘তাহলে আপনাদের অনেক অবাক হওয়া বাকি জনাব। এখনও সেভাবে অবাকই হন নাই।’
মাথুর প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, খান সঙ্গে সঙ্গে মাথুরের হাত চেপে ধরে সাদিককে বললেন, ‘চুপ করে বসে থাক। তোর সঙ্গে ভদ্রলোকের মতো ব্যবহার করছি বলে ভাবিস না আমরা ভদ্রলোক। বেশি বক বক করলে তোর কপালে দুঃখ আছে।’
সাদিক খানের দিকে তাকাল, ‘আপনি ভুইলা যান নাকি আপনি কোথায় আছেন? এত তাড়াতাড়ি ভুইলা গেলে হইব?’
একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। সাদিক চোখ ছোট ছোট করে বলল, ‘দুই খানা ইন্ডিয়ান এজেন্ট৷ আমার তো আর চিন্তাই নাই জনাব।’
খান পকেট থেকে রিভলভার বের করে সাদিকের মাথায় ধরলেন, ‘চুপ কর। মাথুর এর মুখে রুমাল দাও। বড্ড কথা বলছে।’
জামাল হঠাৎ গাড়ি স্টার্ট দিল। খান বললেন, ‘কী হল?’
জামাল বলল, ‘এই গাড়িটা কেন দাঁড়িয়ে গেল বুঝছি না। দাঁড়িয়ে থাকব না, একটু এগিয়ে যাই।’
সাদিক হাসতে শুরু করল। তাদের গাড়ি কিছুটা এগোতেই পেছনের গাড়িটা এগোতে শুরু করল। খান পকেট থেকে রুমাল বের করে সাদিকের মুখে গুঁজে দিলেন। মাথুর দড়ি বের করে বলল, ‘যদি এরই গাড়ি হয়, রিস্ক নিয়ে লাভ নেই। হাত বেঁধে দিই।’
সাদিক ছটফট করছিল। খান সপাটে চড় কষালেন, ‘অনেক হয়েছে। এবার আমার মতো করে কাজ হবে।’
মাথুর সাদিকের হাত বেঁধে দিল। খান বললেন, ‘জামাল, কী আপডেট? গাড়িটা আসছে?’
জামাল বলল, ‘না। দেখছি না।’
খান বললেন, ‘আবার দাঁড়িয়ে যাও। ও গাড়ি এলে দেখা যাবে।’
জামাল আবার গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল।
সাদিকের মুখ রুমাল দিয়ে বন্ধ করা সত্ত্বেও হেসে যাচ্ছে। মাথুর জানলার বাইরে দেখে নিয়ে খানকে তামিল ভাষায় বললেন, ‘কী ব্যাপার? এ এত কনফিডেন্স পাচ্ছে কোত্থেকে?’
খান বললেন, ‘বুঝতে পারছি না। ওরা কোনও আপডেট দিল না। আপাতত আমাদের কিছু করার নেই। একে সামলে রাখতে হবে।’
মাথুর বললেন, ‘বেশিক্ষণ সামলে রাখা যাবে না। এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাটা সুইসাইডাল হতে পারে। কোনও ঘরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখতে পারলে ভালো হতো।’
খান ঘড়ি দেখলেন, ‘দশ মিনিট দেখি আর। অমল কোনও আপডেট না দিলে...’
জামাল আবার গাড়ি স্টার্ট দিল। খান বললেন, ‘কী হল?’
জামাল বলল, ‘ওই গাড়িটা।’
খান বললেন, ‘কজন আছে দেখা যাচ্ছে?’
জামাল বলল, ‘ভেতর দেখা যাচ্ছে না।’
খান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘দাঁড়িয়ে যাও। দেখি কজন আসে।’
মাথুর বললেন, ‘ঠিক। দাঁড়িয়ে যাও।’
জামাল দাঁড়াতেই পিছনের গাড়িটাও দাঁড়িয়ে গেল৷ কেউ এল না। খান বললেন, ‘দেখা যাক আসে নাকি।’
জামাল বলল, ‘রিস্ক হয়ে যাবে স্যার, সাদিকের অনেক লোক।’
খানের ফোন বেজে উঠল। অমল। খান ধরলেন, ‘বলো।’
অমল বলল, ‘হোটেলে ব়্যাবের রেইড হয়েছে। কী করে খবর পেয়েছে জানি না।’
খান বললেন, ‘আমাদের লোক?’
অমল বলল, ‘কোনও আপডেট নেই।’
খান বললেন, ‘কী করব?’
অমল বলল, ‘অপেক্ষা করুন। দেখছি।’
খান বললেন, ‘শিওর?’
অমল বলল, ‘হ্যাঁ।’
ফোন কেটে দিল অমল।
সাদিকের হোটেলের সামনে তাদের গাড়ি দাঁড়াতে ভিড় হয়ে গেল। নির্মল সেদিকে পাত্তা না দিয়ে হোটেলের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দৌড়ে রিসেপশনে গেল।
রিসেপশনে একজন যুবক বসে আছে। নির্মলকে বাহিনীর সঙ্গে রিসেপশনে ঢুকতে দেখে বলল, ‘ইয়েস স্যার?’
নির্মল প্রবল উত্তেজিত হয়ে ছিল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘সাদিক শেখকে ডাকুন।’
রিসেপশনিস্ট থতমত হয়ে বলল, ‘কাকে স্যার?’
নির্মল বলল, ‘হোটেলের ওনারকে ডাকুন।’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘উনি নেই স্যার।’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘ওকে। এটা একটা রেইড। আপনি কাউকে ফোন করবেন না। রজ্জাক, তুমি ওর পাশে বসে থাকো। আমি দেখছি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখি।’
রিসেপশনিস্ট ঘাবড়ে মনিটরের দিকে তাকাল, ‘দেখুন স্যার, এখানে কিছু দেখা যাচ্ছে না।’
স্ক্রিনে করিডোরগুলো দেখা যাচ্ছে। নির্মল দেখল সন্দেহজনক তেমন কিছুই নেই। সে বলল, ‘রুম এন্ট্রি দেখি।’
রিসেপশনিস্ট খাতা দেখাল। নির্মল ধমক দিল, ‘আইডিগুলো দেখান।’
রিসেপশনিস্ট আইডির ফটোকপিগুলো নির্মলের দিকে এগিয়ে দিল।
মিনিট খানেক রেজিস্টার চেক করে নির্মল বুঝল, এন্ট্রিতে কোথাও সমস্যা নেই। কিন্তু রিসেপশনিস্ট অতিরিক্ত ঘেমে যাচ্ছে। সে তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী নাম আপনার?’
রিসেপশনিস্ট বলল, ‘রায়হান।’
নির্মল বলল, ‘রায়হান সাহেব, আপনি যদি কিছু জানেন, তাহলে বলতে পারেন। পরে যদি আমি অন্যভাবে জানতে পারি, আপনার কপালে দুঃখ আছে। আমার মনে হচ্ছে আপনার পেটে অনেক কথা জমে আছে। বলার ইচ্ছে থাকলে, বলে ফেলুন। কোনও সমস্যা নেই। আমি সব শুনে নেব।’
রায়হান ঘাম মুছল। নির্মল বলল, ‘বলুন কী বলবেন।’
রায়হান বলল, ‘আমি নতুন জয়েন করেছি। এক মাস হল।’
নির্মল বলল, ‘ওকে। আর?’
রায়হান চারদিকে দেখে বলল, ‘ফোর্থ ফ্লোরে কোনও ক্যামেরা নেই স্যার।’
নির্মল রজ্জাকের দিকে তাকাল, ‘এখানে থাকো। দেখো এ কোথাও ফোন না করতে পারে। আর রায়হান সাহেব, হোটেলের বাকি স্টাফ কোথায়? কাউকে দেখছি না?’
রায়হান বলল, ‘রিসেপশনে কেউ নেই এখন। সার্ভিস স্টাফরা সার্ভিস রুমেই আছে।’
নির্মল বাহিনীর কয়েকজনকে নিয়ে লিফটে উঠে চার টিপল। ফোর্থ ফ্লোরের দরজা খুলতেই দেখতে পেল মেঝেতে একজন পড়ে আছে। নির্মল নিচু হয়ে পরীক্ষা করে বলল, ‘বেঁচে আছে। ঘরগুলো চেক কর।’
বাহিনীর জওয়ানরা ঘর চেক করতে শুরু করল। কোনও ঘরে কিছু পাওয়া গেল না। শেষ ঘরটার দরজা বন্ধ। নির্মল বলল, ‘রায়হানের কাছে মাস্টার কি আছে। কেউ নিয়ে এসো।’
রাণা বাথরুমে আটকে গেছে। কিছুতেই বেরোতে পারছে না। সে জানলার দিকে তাকাল। জানলায় শক্ত কাচ দেওয়া, খোলা সম্ভব না। অনেক চেষ্টা করেও কিছু করা গেল না। সে কি ইঁদুর কলে আটকে গেল?
রাণার জোরে জোরে শ্বাস পড়ছিল। অমল? অমল তাকে আটকে দিল? দরজায় ধাক্কা মারল। খুলল না। তারমানে উস্তাদ ঠিকই বলছিলেন?
ঘাড়ে জলের মতো কিছু একটা পড়ল। রাণা সঙ্গে সঙ্গে সরে উপরের দিকে তাকাল।
বাথরুমের লফট থেকে রক্ত পড়ছে!
রাণা তড়িঘড়ি চারদিকে দেখল। স্নানের জায়গায় একটা টুল আছে। সেটাকেই নিয়ে টুলের উপর উঠে লফটের দরজা খুলে তার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। লফট রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সম্পূর্ণ নগ্ন রুমাকে গুটিসুটি করে ওখানেই রাখা হয়েছে। রাণা চিৎকার করল, ‘একী!’
তখনই বাথরুমের দরজা খুলে গেল। অমল বিরক্ত গলায় বলল, ‘তুমি বাথরুমে কী করছ? ব়্যাব ঢুকে গেছে। চলো।’
রাণা অবিশ্বাসী চোখে অমলের দিকে তাকাল। পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে বলল, ‘আমি আটকে পড়ে গেছিলাম। দরজা ধাক্কাচ্ছি, আপনি শুনতে পাননি?’
অমল বলল, ‘আমি জানলা দিয়ে ব়্যাবের গাড়ি আসতে দেখে ওদের ফোন করতে গিয়ে দেখি টাওয়ার নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে যেতে হয়েছিল। এর মধ্যে তুমি বাথরুমে আটকে গেছিলে। এই লকটাই ঠিক নেই যা বুঝছি। লকে কোনও সমস্যা আছে। কিন্তু এখানে রক্ত পড়ছে কী করে?’
রাণা বলল, ‘টুলে উঠে দেখুন।’
অমল সঙ্গে সঙ্গে টুলে উঠে রুমাকে দেখে বলল, ‘মাই গড। একটা চাদর নিয়ে আসো শিগগিরি। জানোয়ারটা ওকে এখানে রেখে গেছে! আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল।’
রাণা দৌড়ে চাদর নিয়ে এল। সন্তর্পণে রাণা আর অমল মিলে রুমাকে নামিয়ে বিছানায় শোয়াল। অমল নাড়ি দেখে বলল, ‘বেড়ালের প্রাণ। এখনও বেঁচে আছে। চলো। হাসপাতালে নিয়ে যাই। সাকিনা। সাকিনা।’
অমল রুমাকে ঠেলল। রুমার চোখ মুখ ফুলে গেছে। চোখ মুখ থেকে রক্ত পড়ছে। অমল বলল, ‘ভয়াবহ অবস্থা। ভয়াবহ। গিয়াস মানুষ না, জানোয়ারেরও অধম। চলো। এখানে সময় নষ্ট করা যাবে না।’
রাণা বলল, ‘ব়্যাব?’
অমল বলল, ‘কিছু করার নেই। সারেন্ডার করতে হবে। সাকিনাকে বাঁচানোটা আসল। বাকি পরে দেখা যাবে।’
অমল পকেট থেকে রুমাল বের করল। রাণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গুলি চলতে পারে। তুমি উত্তর দিতে যেও না। আমি সাদা পতাকা দেখানোর ব্যবস্থা করি।’
রাণা একটু থমকে বলল, ‘বাংলাদেশের জেলে পচব?’
অমল বলল, ‘কিছু করার নেই। আগে মেয়েটার প্রাণ। পরে বাকি সব।’
অমল সন্তর্পণে দরজা খুলে সাদা রুমাল দেখাল।
নির্মল অমলের হাতে রুমাল দেখা মাত্র বাহিনীর প্রতি চেঁচিয়ে বলল, ‘দাঁড়াও, দেখি কে আছে ওখানে। বেরিয়ে আসুন।’
অমল বেরিয়ে এসে বলল, ‘আগে অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন। পরে বলছি।’
নির্মল চিৎকার করল, ‘সেটা আমরা ঠিক করব। আপনি ডিরেক্ট করবেন না। হাঁটু গেড়ে বসুন।’
অমল দ্বিরুক্তি না করে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল...
তুষার চুপ করে তার চেম্বারে বসে ছিলেন। খান আর মাথুরকে একবার ফোন করতে গিয়েও করলেন না। সাধারণত কেউ কোনও অপারেশনে গেলে আগে তারা ফোন করে রিপোর্ট না করলে তুষার নিজে থেকে ফোন করেন না।
পীযূষ চেম্বারে নক করলেন। তুষার বললেন, ‘এস।’
পীযূষ ঘরে ঢুকে বললেন, ‘স্যার, আমি একটা ফাইল পেয়েছি। কনফিডেন্সিয়াল ফাইল। আমাদের অ্যাক্সেস নেই। একমাত্র আপনারই অ্যাক্সেস আছে।’
তুষার বললেন, ‘কার বিষয়ে?’
পীযূষ বললেন, ‘বালুচিস্তান রিলেটেড। অনিল শেখাওয়াত তখন করাচীতে ছিল।’
তুষার নড়ে চড়ে বসলেন, ‘আর অমলও? টাইমলাইন ম্যাচ করেছে?’
পীযূষ মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’
তুষার বললেন, ‘কোথায় সে ফাইল?’
পীযূষ বললেন, ‘আর্কাইভ রুমে। যাবেন?’
তুষার বললেন, ‘চলো চলো।’
ব্যস্ত হয়ে আর্কাইভ রুমে পীযূষের সঙ্গে রওনা দিলেন তুষার। তুষারের আলাদা অ্যাক্সেস রুম আছে। তুষারের বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি ছাড়া সে রুমের দরজা খুলবে না। ঘরে ঢোকার আগে তুষার বললেন, ‘ইনডেক্স মিলেছে তো? ফাইল নাম্বার কত?’
পীযূষ বললেন, ‘আমি ওইটুকুই মিলিয়েছি। ফাইল নাম্বার সেভেন থ্রি ওয়ান স্যার।’
তুষার বললেন, ‘ওকে।’
পীযূষ চলে গেলেন। তুষার ফাইলটা বের করে টেবিলে রাখলেন। গোটা ফাইলটাই বাইনারি কোডে লেখা। শুধু ১ আর ০ ব্যবহার করে। তুষারের এরকম ফাইল পড়ার অভ্যাস আছে। বেশ কিছুক্ষণ ফাইলটা ওলটপালট করে দেখে চুপ করে চেয়ারে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ফোনটা বের করে অনিল শেখাওয়াতকে ফোন করলেন।
শেখাওয়াত প্রথমে ফোন ধরলেন না। তুষার আবার ফোন করলেন।
এবার ধরলেন, ‘বলো।’
তুষার বললেন, ‘বাজে কথা বলব না। সরাসরি কাজের কথাতেই আসি। তুমি অমলকে এজেন্সি থেকে বের করে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলে। সেই এজেন্টকে দিল্লি তোমার সুপারিশ না মেনে বাংলাদেশ স্লিপিং এজেন্ট হিসেবে পাঠিয়েছিল। তোমার রিপোর্ট অনুযায়ী অমল সিনিয়রের কথা শোনেনি, বালোচ নেতাদের সঙ্গে একা একা গিয়ে দেখা করে এসেছিল, প্রোটোকল ফলো করেনি। ইনসাবোরডিনেশনের মতো গুরুতর বিষয়ে তুমি অভিযোগ করেছিলে। সে ছেলেকে কেন তুমি বাংলাদেশে সবার আগে অ্যাক্টিভেট করলে?’
শেখাওয়াত কয়েকসেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমার মনে হয়েছিল ওকে দিয়ে কাজ হবে।’
তুষার বললেন, ‘হয়েছে?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘হ্যাঁ, ও ঠিক করেই কাজ করছিল।’
তুষার বললেন, ‘ঠিক কী কারণে ওর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছিলে তুমি করাচীর সময়ে?’
শেখাওয়াত বললেন, ‘সেসব তো বলেছিলাম রিপোর্টেই। আমার কথা শুনত না।’
তুষার বললেন, ‘আমি যদি বলি ব্যাপারটা সেটা না। অমল তখন নতুন ছিল, অতিরিক্ত উত্তেজনার বশে বালোচ নেতাদের একটা অ্যাটাকের প্ল্যান তোমাকে বাইপাস করে ও দিল্লিতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তুমি চেয়েছিলে পাকিস্তান আর্মির উপরে বালোচ অ্যাটাক হোক। কিন্তু অমল বুঝেছিল ওই অ্যাটাকটা হলে আমাদের সঙ্গে বালোচ নেতাদের সমঝোতা প্রকাশ্যে চলে আসবে। ও সেই খবরটাই দিল্লিতে জানিয়ে ব্যাপারটা থেকে তোমাকে নিরস্ত করেছিল। এই ঘটনার পর থেকেই তুমি অমলের উপরে রেগে গেছিলে।’
শেখাওয়াত বললেন, ‘তুমি কী করতে? তুমি একটা ডিসিশন নিয়েছ, তোমার সাবরডিনেট সেটা তোমাকে বাইপাস করে উপরে জানিয়ে দিলে ভালো লাগত তোমার?’
তুষার হাসলেন, ‘এখানে ভালো লাগালাগির কিছু নেই তো। তুমি এ ঘটনার পর অমলকে পাকিস্তান থেকে তাড়িয়েছিলে। নেহাত দিল্লির কাছে অমলের ভালো ইম্প্রেশন ছিল বলে ওকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তুমি অমলের উপর সেই তখন থেকেই রেগে ছিলে। এতদিন পরে এমন কিছু ম্যাজিক হয়নি যাতে তোমার রাগ কমে। সেটা কমার কোনও কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না। তুমি এই রাণা ছেলেটাকে পাঠিয়েছ অমলকে সরাতে। তাই না?’
শেখাওয়াত চিৎকার করতে শুরু করলেন, ‘হাউ ডেয়ার ইউ! তোমার এত সাহস তুমি এত সিরিয়াস একটা ব্যাপারে আমাকে অ্যাকিউজ করে দিলে? প্রমাণ দেখাতে পারবে?’
তুষার বললেন, ‘প্রমাণ তো পরে। আপাতত আমাদের ফিল্ড এজেন্টদের কিছু হলে তোমার কপালে অশেষ দুঃখ আছে। তুমি যে ভাবেই তোমার কাজের জন্য গ্র্যান্ট নিয়ে থাকো, আমি কিন্তু ঠিক বের করব তুমি কেন রাণাকে পাঠিয়েছ। এবং খুব সম্ভবত কাজটা হবার পর তোমার রাণাকেও সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। তোমার যদি এখনও কিছু বলার থাকে, বলতে পারো। এরপরে কিন্তু আমি বুঝব, এখানে অ্যাকিউজিশনের কোনও ব্যাপার নেই। যদি কিছু থাকে, বলে ফেলো।’
ফোন কেটে দিলেন শেখাওয়াত। তুষার শান্তমুখে আর্কাইভ রুমে বসে রইলেন।
মিনিটপাঁচেক পরে মেসেজ এল। তুষার দেখলেন শেখাওয়াত লিখে পাঠিয়েছেন, ‘আই ক্যানট কনট্যাক্ট রাণা নাও। টেল দেম টু স্টপ হিম।’
তুষার মেসেজটা দেখে হাসলেন। অঙ্কের উত্তর মেলার পর যে হাসি পায়, এ হাসিটা তেমনই...।
কত দূর থেকে কে যেন ডাকছে তাকে। সে শুনতে পাচ্ছে না কিছু। এই যন্ত্রণাটা নতুন নয়। আগে হয়েছে। কিন্তু এ যন্ত্রণার তীব্রতা বেশি। সে কি বেঁচে আছে? মরার ভয় তো সেই কবেই চলে গেছিল, যখন দিব্যেন্দু তাকে দরজা বন্ধ করে বাথরুমে রেখে যেত। সে ভয় তার আর নেই।
এখন সে আর ভয় পাচ্ছে না। প্রাণপণে চোখ খুলতে চাইছে। দেখতে হবে চারদিকে। দেখাটা বড় দরকার। যারা তাকে এখানে পাঠিয়েছিল তারা কোথায়? তাদেরকেও দেখতে ইচ্ছে করছে। প্রতিটা মানুষকে দেখার দরকার এখন।
রুমা শুয়ে আছে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে।
ডাক্তার খোন্দকার ভালো করে দেখে বললেন, ‘মারাত্মক অত্যাচার হয়েছে! বলে বোঝানো সম্ভব না কী হয়েছে। অবজারভেশন দরকার। আমরা নজর রাখছি।’
নির্মল বলল, ‘ওকে। জ্ঞান ফিরলে আমি কি একটা ফোন এক্সপেক্ট করতে পারি?’
খোন্দকার বললেন, ‘সারটেনলি।’
নির্মল আইসিউ-এর বাইরে গেল। দীপা ফোন করছে। বেশ কয়েকবার করেছে সে ধরতে পারেনি। তার শরীরেও সাকিনার রক্ত লেগে গেছে।
ফোনটা রিং হচ্ছে। নির্মল ধরল, ‘বলো।’
‘ঠিক আছ তুমি?’ দীপার গলায় স্পষ্ট উদ্বেগ।
নির্মল বলল, ‘হ্যাঁ। ঠিক আছি। পরে কথা বলছি।’
দীপা বলল, ‘ঠিক আছে। ফোন দিও।’
নির্মল বলল, ‘দেব।’
ফোন কেটে সে চুপ করে বসল। সাদিককে পাওয়া গেল না। সাদিক কোথায় এখন? পালিয়েছে? অমলকে আর রাণাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে হাসপাতালের একটা ছোট ঘরে। নির্মল কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে সে ঘরে ঢুকল। অমল তাকে দেখেই বলে উঠল, ‘সাকিনা কেমন আছে নির্মলবাবু?’
নির্মল অমলের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আমার নাম জানলেন কী করে?’
অমল বলল, ‘আমি আপনাকে হেল্প করতে পারি। আনোয়ার আলিকে যে খুন করা হয়েছে আমার কাছে তার প্রমাণ আছে। সাদিকের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে সাকিনার জীবনটা যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা হয়তো আমি আপনাকে বোঝাতে পারব না।’
নির্মলের ভ্রু কুঁচকাল, ‘কে আপনি? আন্ডারকভার? পরিচয় দিন।’
অমল বলল, ‘সাকিনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিন স্যার। ও একটু কিছু বলতে পারলেও আমাদের লাভ। বিশ্বাস করুন, ওতে বাংলাদেশেরও লাভ।’
নির্মল কড়া গলায় বলল, ‘আগে পরিচয় দিন। সাদিক কোথায়?’
অমল বলল, ‘সাদিককে পেয়ে যাবেন। সাদিকের ঘুঁটিগুলিও আমি আপনাকে দিয়ে দেব, কী করে ও এ দেশে পাকিস্তানি প্রভাব আনার চেষ্টা করছে এবং সেটা কাকে কাকে দিয়ে। আশা করি, আপনি জানেন বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তার চেনা লোকেরাই কিন্তু করেছিল। যদি এখন আবার সেরকমই একটা প্ল্যান ওরা করে থাকে? কিন্তু এগুলোও এখন গুরুত্বপূর্ণ না। সাকিনাকে আই এস আই তুলে নিয়ে গেছিল। ওরা সন্দেহ করেছিল সাদিকের এই বাধা রাখা মেয়েটার কোনও বড় পরিচয় আছে।’
নির্মল বলল, ‘কোনও পরিচয় আছে?’
অমল নির্মলের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘সাদিকের সম্পর্কে সব জানতে পারবেন আপনি, সাদিকের সমস্ত মুখোশগুলো আপনার কাছে চলে আসবে। বাকি পরিচয় আপনার কি আদৌ জানার দরকার আছে?’
নির্মল শ্বাস ছাড়ল। সাদিকের বাধা মেয়েটা সব জানবে? মাথা কাজ করছে না তার। সে অনেক ক্যাজুয়াল্টি দেখেছে, কিন্তু এই মেয়েটাকে ওরা যেভাবে মেরেছে, তা অবিশ্বাস্য রকমের নিষ্ঠুর। চোখে দেখা যায় না। ছেলেটার বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কিত কথাটার তথ্যপ্রমাণ তো সে নিজেই পেয়েছে। সে জানত জাহির ম্যাডামের কাছের লোক। কিন্তু জাহির আসলে সোবাহানের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে ছিল। জিগশ পাজলের অন্য একটা দিক প্রকাশ পাচ্ছে না? ভুল কিছু বলছে বলে মনে হচ্ছে না। বিশ্বাস করে দেখা ছাড়া তার হাতে অন্য কোনও অপশন আছে কি? কিছুক্ষণ আগে তাকেই ওরা সরিয়ে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। চক্র যে আছে, তা নিয়ে কোনও দ্বিধা নেই আর। সে সম্পর্কে এতক্ষণে নিঃসন্দেহ হওয়া গেছে।
তার ফোন বাজছে। ডাক্তার খোন্দকার সাহেব ফোন করছেন। নির্মল সঙ্গে সঙ্গে ধরল, ‘বলুন।’
ডাক্তার বললেন, ‘মেয়েটা কিছু একটা বলছে। আসবেন?’
নির্মল উঠে পড়ল, ‘আসছি।’
নির্মল ফোন রাখতেই অমল বলল, ‘জ্ঞান ফিরেছে।’
নির্মল অমল আর রাণার দিকে দ্বিধাগ্রস্থ মুখে তাকিয়ে বলল, ‘আসতে চাইলে আসুন?’
রুমা বিড় বিড় করে কিছু বলে যাচ্ছে। নির্মল ঘরে প্রবেশ করতেই ডাক্তার বললেন, ‘দেখুন তো কী বলছে।’
অমল দৌড়ে রুমার মুখের কাছে গিয়ে কান পাতল। রুমা বিড় বিড় করে যাচ্ছে, ‘কন্টেনার ফোর টু ওয়ান থ্রি, চিটাগং পোর্ট, লতিফ, লতিফ, ফোর টু ওয়ান থ্রি, মাদ্রাসা, লতিফ...।’
শব্দগুলো বলতে বলতেই রুমা চুপ করে গেল। অমল ডাক্তারের দিকে তাকাল, ‘কী হল?’
ডাক্তার খোন্দকার নার্সদের ডাকতে শুরু করলেন।
‘রাণাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল অমলকে মারতে। শেখাওয়াত পুরোনো রাগের বদলা নিতে পাঠিয়েছিল। আরেকটা এজেন্ট কাছেই থাকবে যে রাণাকেও সরাতে চাইবে। কিপ দ্যাট ইন মাইন্ড।’
তুষার মেসেজ করেছেন। খান মেসেজটা মাথুরকে পড়ালেন। মাথুর ভ্রু কুঁচকে চুপ করে বসে থেকে বললেন, ‘গাড়িটা?’
খান বললেন, ‘ওয়েল, এখন বুঝতে পারছি। সাদিককে ক্লোরোফর্ম দাও তো জামাল...।’
মাথুর অবাক হলেন, ‘কী বুঝতে পারলে?’ মাথুর কিছু বুঝে ওঠার আগেই দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামলেন। গাড়িটা দশ হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে। খান সরাসরি গাড়িটার দরজা খুলে বললেন, ‘কী চাই?’
ড্রাইভার সিটে ইমতিয়াজ বসে আছে। খানকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বলল, ‘আপনাদের জন্যই ফলো করছিলাম। আপনাদের নিরাপত্তার দিকটাও তো দেখতে হবে, তাই না?’
খান বললেন, ‘নামো। ভিড়ের মধ্যে বেশি নাটক আমার পছন্দ না। তুমি নামো।’
ইমতিয়াজ ঘাবড়ে গিয়ে নামল গাড়ি থেকে। খান বললেন, ‘এখানে কী চলছে? ফলো করছ কেন? যদি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছ তাহলে কথা বলনি কেন? গাড়িতে চলো। ওখানে গিয়ে বসবে। তোমার নামে আমার কাছে অনেক রিপোর্ট আসত।’ ইমতিয়াজ গাড়িতে উঠতে গেল তড়িঘড়ি।
খান বজ্রকঠিন হাতে ইমতিয়াজের হাত ধরে বললেন, ‘চলো। ওই গাড়িতে চলো। কোনও চালাকি করবে না। তোমার রিভলভারটা আমি দেখেছি। চলো।’
রাস্তায় বেশ জ্যাম হয়ে গেছে। ভিড়ের মধ্যেই কোনমতে ইমতিয়াজকে ঠেলতে ঠেলতে গাড়িতে নিয়ে গেলেন খান। জামাল সাদিককে অজ্ঞান করে দিয়েছিল। সাদিকের শরীরটা বসেই আছে। খান ইমতিয়াজকে সাদিকের পাশে বসালেন। খান বললেন, ‘লুকিয়েছিলে কেন?’
ইমতিয়াজ বলল, ‘আমার কী করার ছিল বলুন স্যার? অমল আমাকে বলল না কোথায় যাচ্ছে। আমার কৌতূহল হচ্ছিল। ফলো করছিলাম তাই।’
খান রিভলভার বের করে হাতে নিলেন, ‘আর?’
ইমতিয়াজ ঘাবড়ে গেল, ‘আর কিছু না।’
খান সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, ‘রাণাকে সরাতে পাঠিয়েছে তোমায়, তাই তো? রাণা অমলকে না সরালে তুমি দুজনকেই সরিয়ে দিতে আজ, হিসেবটা তো খুব সহজ, না বোঝার কোনও কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি না।’
ইমতিয়াজ ঘামছিল। খান ঘড়ি দেখলেন, ‘আজকে রাতের মধ্যে তুমি এ দেশ ছাড়বে। দিল্লিতে রিপোর্ট করবে কাল ভোরে। কী করে করবে আমি জানি না। নইলে তোমার এখানের সমস্ত কভার আমি ঢাকাকে দিয়ে দেব। গেট লস্ট!’
ইমতিয়াজ বলল, ‘প্লিজ স্যার, আমাকে আরেকটা সুযোগ দিন।’
জামাল উত্তেজিত গলায় বলল, ‘হোটেল থেকে ওদের বের করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। আমার লোক খবর দিল। কী করব?’
খান বললেন, ‘ব়্যাবের হাতে দুজন ধরা পড়েছে?’
জামাল বলল, ‘হ্যাঁ।’
খান শ্বাস ছেড়ে মাথুরের দিকে তাকালেন, ‘এবার?’
মাথুর বললেন, ‘হাসপাতাল চলো। আমাদের আর কী করার আছে?’
খান বললেন, ‘সাদিক?’
মাথুর বললেন, ‘ইমতিয়াজ দেখুক। না দেখলে ইমতিয়াজকে আমরা দেখব।’
ইমতিয়াজ হাতে চাঁদ পেল, ‘দেখব স্যার। চিন্তা করবেন না।’
খান জামালকে বললেন, ‘ওরা যেখানে গেছে সেই নার্সিং হোমে চলো।’
জামাল গাড়ি স্টার্ট করল। খান বললেন, ‘অমলকে সরানোর প্ল্যানটা তোমার উস্তাদের, তাই তো?’
ইমতিয়াজ মাথা নিচু করে বলল, ‘শুরুতে আমাকেই বলা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম তাহলে আমার এখানের কভার এক্সপোজ হয়ে যাবে। ঝুঁকিও ছিল। উস্তাদ তখন রাণাকে পাঠানোর প্ল্যান করেন।’
খান বললেন, ‘কী বলা হয়েছিল?’
ইমতিয়াজ ইতস্তত করে বলল, ‘যে অমল সাদিকের এজেন্ট হয়ে গেছে।’
মাথুর শিস দিয়ে উঠলেন, ‘ঠিক কী চলছিল এখানে, স্পষ্ট বুঝতে পারছি। আপাতত তোমার উস্তাদকে তুমি ভুলে যাও। যা উস্তাদ আছে, তা আমরাই। নয়তো তোমার কপালে অশেষ দুঃখ আছে।’
ইমতিয়াজ সিঁটিয়ে গেল, ‘ওকে স্যার।’
হাসপাতালের থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে গাড়িটা থেমে গেল। খান বললেন, ‘এখন কী করা যায়?’
মাথুর বললেন, ‘অমল কোনও ভাবে যোগাযোগ করতে পারে নাকি দেখা যাক। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও গতি নেই।’
খান গলা তুললেন, ‘জামাল, সাদিকের ক্লোরোফরমের ডোজ আর কতক্ষণ?’
জামাল বলল, ‘খুব বেশি হলে আধঘণ্টা।’
খান বললেন, ‘ওকে। চলবে। মিনিট পনেরো পরে আবার দিও। আপাতত এটাকে ওদেশে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’
হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষার প্রহর গোণা শুরু হল...
‘একটা সাধারণ মেয়ে চিটাগং পোর্ট ওভাবে উচ্চারণ করবে না। মেয়েটা কে?’
ডাক্তার খোন্দকার তাদের আইসিইউ-এর বাইরে দাঁড়াতে বলেছেন। রুমার জ্ঞান না ফিরলেও এখন নাড়ি আছে।
নির্মল বেরিয়েই অমলকে জিগ্যেস করল।
অমল চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘কুড়িটা বাচ্চা। নয়, গিয়াস। এদের মধ্যে যে কেউ থাকতে পারে ওই কন্টেনারে। আপনি পারবেন? না আমাকে দেখতে হবে?’
নির্মল ভ্রু কুঁচকে অমলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ইন্ডিয়ার লোক, তাই তো?’
অমল বলল, ‘বাচ্চাগুলো কিন্তু ইন্ডিয়ার না সাহেব।’
নির্মল শ্বাস ছাড়ল। বলল, ‘গোটা ডিপার্টমেন্ট কম্প্রোমাইজড হয়ে গেছে। আমাকে কখন আটকে দেবে আমি নিজেই জানি না। আমি কী করে কী করব জানি না।’
অমল বলল, ‘ফোন করতে পারি?’
নির্মল মাথা নাড়ল, ‘করুন।’
রাণা চুপ করে বসে আছে। অমলকে মারতে পাঠিয়েছিল তাকে উস্তাদ। অথচ এখানে তো অমলই আছে। আর কে আছে? এই মেয়েটার কাছে সাদিক তাকে পাঠিয়েছিল। মেয়েটা সাদিকের কাছ থেকে এত বড় সব খবর বের করেছে।
অমল ফোন করল। মিনিট পাঁচেক কথা বলে ফোন রেখে নির্মলকে বলল, ‘বললাম। দেখা যাক।’
নির্মল বলল, ‘কাকে বললেন?’
অমল বলল, ‘যেখানে বললে ওই কন্টেনারটা ধরা যাবে। সোবাহান আর জাহিরের ব্যাপারটাও বলেছি। ম্যাডামের জানা দরকার তার কাছের লোকেরা ঠিক কী করছে! তাই না?’
নির্মল অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘হু।’
অমল বলল, ‘সাদিকের মাস্টারমাইন্ডও জাহির সাহেবই। আমার সেটা বের করতে সময় লেগেছে। জানলে অনেক আগে স্টেপ নেওয়া যেত। অবশ্য এই কৃতিত্বটাও সাকিনারই।’
নির্মল চমকে অমলের দিকে তাকাল। অমল বলল, ‘সাকিনার জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া উপায় নেই। মেয়েটা অসাধ্যসাধন করেছে। আমার মনে হয় না কন্টেনারে গিয়াস আছে। ওরা এখনও বাংলাদেশের মানুষদের ক্যাটল ক্লাসই মনে করে। নিজেরা কন্টেনারে কোনদিন যাবে না। কুড়িটা বাচ্চা আইসিস বা কোনও লস্কর ট্রেনিং ক্যাম্পে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।’
নির্মলের ফোনে মেসেজ এল। আলমগিরের মেসেজ এসেছে। পি এমের দফতর থেকে আলমগিরকে ব়্যাবের প্রধান করার ফাইনাল অর্ডার এসে গেছে। তার মুখে হাসি ফুটল, ‘আপনার ফোনে কাজ হয়েছে মনে হচ্ছে।’
অমল বলল, ‘বিপদ বিন্দুমাত্র সরেনি সাহেব। এদেশে পাকিস্তান সিমপ্যাথাইজাররাই সংখ্যাগুরু। বিন্দুমাত্র লাভ হয়নি কোথাও। সোবাহানরাই এগিয়ে থাকবে। চ্যালেঞ্জটা বুঝতে পারছেন আশা করি।’
নির্মল বলল, ‘আমার মনে হয় আপনারা চলে গেলে ভালো হয়। এখানে থাকলে অন্য সমস্যা হবে। আশা করি বুঝতে পারছেন কী বলতে চাইছি?’
অমল বলল, ‘আমরা অন্য কোথাও অপেক্ষা করব। সাকিনাকে ছেড়ে আপাতত কোথাও যাবার কথা ভাবতে পারছি না।’
নির্মল হাত তুলে বাইরের পথ দেখাল, ‘প্লিজ গো। থাকবেন না। আমি আর কোনও বিতর্ক চাই না।’
অমল রাণার দিকে তাকাল, ‘চলো। আমাদের রিমান্ডে নিচ্ছে না চোদ্দোপুরুষের ভাগ্য ভালো।’
রাণা উঠল। দুজনে হাঁটতে শুরু করল। ফ্লোর থেকে বেরিয়ে সিঁড়িতে এসে অমল রাণাকে বলল, ‘তারপর? উস্তাদের কাজটা কখন করবে?’
রাণা চমকে উঠে অমলের দিকে তাকাল, ‘আপনি জানেন?’
অমল হাসল, ‘এস, রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াই। খান আর মাথুর স্যারের গাড়িটা কোথায় আছে দেখি। সাদিককে হালকা ভাবে নিলে হবে না। ব্যাটার লোক গোটা শহরে ছড়িয়ে আছে।’
রাণা বলল, ‘আপনি জানলেন কী করে?’
অমল রাণার কাঁধে হাত রাখল, ‘জানাটাই তো আমার কাজ। তা তুমি তোমার কাজটা করলে না কেন?’
রাণা বলল, ‘আমি কখনোই কনভিন্স হইনি যে কাজটা আমার করার দরকার আছে। সিম্পল।’
অমল হাসল, ‘তুমি বুদ্ধিমানও বটে। তবে উস্তাদ কাঁচা কাজ করার লোক না। নিশ্চয়ই আরও কাউকেও আমার পেছনে পাঠিয়েছে।’
রাণা বলল, ‘কিন্তু আপনাকে কেন টার্গেট করেছে?’
নীচের ফ্লোরে এসে গেছিল তারা। অমল বলল, ‘পুরোনো রাগ। পরে কোনদিন পুরো গল্পটা শুনবে।’
অমলের ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠল। মেসেজ দেখে অমল দাঁড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই সে হেসে ফেলল।
রাণা বলল, ‘কী হল?’
অমল ফোনটা রাণার দিকে এগিয়ে দিল, খানের মেসেজ। লেখা ‘বি ওয়ার ফ্রম ইওর পার্টনার। হি ওয়ান্টস টু কিল ইউ।’
রাত বারোটা।
অন্ধকার জায়গাটায় একটা ছোট গাড়ি এসে দাঁড়াল। গিয়াস গাড়ির ভেতর চুপ করে বসে আছে। তার ফোন বাজছে। সে ফোন তুলল, ‘বলো।’
‘জনাব, আপনি এসে গেছেন?’
গিয়াস বলল, ‘হ্যাঁ। তোমরা কোথায়?’
‘কাছেই। গাড়ির ভেতর বাচ্চাগুলো এত বেতমিজ যে কী বলব! চৌধুরী সাহেবকে অসুস্থ করে দিয়েছে।’
গিয়াস রাগী গলায় বলল, ‘বেত্তমিজি করুক না। কোনও অসুবিধে নেই। ঠিক জায়গায় ঠিক দাওয়াই পড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তার কোনও ব্যাপার না।’
‘তাহলে কি চলে আসব? চৌধুরী সাহেবের কী হবে?’
‘যা অবস্থা আছে, সে অবস্থায় নিয়ে এস। আমি বুঝে নেব।’
‘জি জনাব।’
ফোন কেটে অন্য একটা নাম্বার ডায়াল করল গিয়াস। ও-প্রান্তে একবার ডায়াল হতেই ফোন ধরল, ‘বলো।’
‘জনাব, কন্সাইনমেন্ট এসে গেছে।’
ও-প্রান্তে উল্লাসের শব্দ শোনা গেল, ‘আহ্...এটা যে কত বড় কাজ হয়েছে, মৌলানা সাহেব তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। ধরো।’
গিয়াস ফোন ধরে রইল।
ও-প্রান্ত থেকে মৌলানা সাহেবের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আমার বাচ্চা, আমার সন্তান। তুমি পেরেছ শেষ অবধি।’
আবেগে গিয়াসের গলা বুজে আসছিল, ‘হুজুর, পেরেছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাব।’
‘আমি জানতাম তুমি পারবে’, মৌলানার আবেগাপ্লুত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘তোমাকে আমরা এই জন্যই ট্রেনিং দিয়েছিলাম। আজকের কাজে তুমি আমাদের যেভাবে গর্বিত করেছ, তার কোনও তুলনা হয় না। আল্লাতালা তোমার মঙ্গল করবে। তুমি পাকিস্তান এসেই আমার সঙ্গে দেখা করবে। বাকি কথা সেখানে হবে।’
গিয়াস বলল, ‘জি জনাব।’
মৌলানা বলল, ‘শুনলাম তুমি ওখানে এক জেনানাকে আটকে রেখেছিলে?’
গিয়াস রাগী গলায় বলল, ‘জি জনাব। সাদিকের পোষ্য মেয়ে। ভেবেছিলাম মেয়েটা র-এর এজেন্ট। পরে দেখা গেল একবারে বুরবক। কিছুই জানে না।’
মৌলানা বলল, ‘সরিয়ে দিয়েছ?’
গিয়াস ক্রুর গলায় বলল, ‘না জনাব। সাদিকের জিনিস, ও বুঝে নিক। বাকি জীবন আর কোনও কাজে লাগাতে পারবে না।’
মৌলানা হো হো করে হেসে উঠে বলল, ‘বেশ করেছ। ওখানে আমরা সাদিককে কাজের জন্য রেখে দিয়েছি, আর ও এই সব করে বেড়াচ্ছে। যা করেছ, ঠিক করেছ। আমি তোমাকে সমর্থন করছি। কন্সাইনমেন্ট নেক্সট স্টপেজে পৌঁছালে আমাকে জানাবে।’
গিয়াস বলল, ‘জি জনাব।’
ফোন কেটে গেল। ট্রাক আসছে। গিয়াস টর্চ বের করে সিগনাল দেখাল।
তার গাড়ির সামনে এসে ট্রাক দাঁড়িয়ে পড়ল। ট্রাক ড্রাইভার ট্রাক থেকে নেমে বলল, ‘বাচ্চাগুলো বড় জ্বালাতন করেছে। চৌধুরী সাহেব মনে হয় অজ্ঞান হয়ে গেছেন।’
গিয়াস হাত নেড়ে বলল, ‘ও মরে যাক। ওকে নিয়ে আমার চিন্তা নেই। ওকে সুদ্ধ কন্টেনার লোড করে দাও।’
ড্রাইভার অস্বস্তির সঙ্গে বলল, ‘যদি সত্যি মরে যায়, তাহলে বাচ্চাগুলো ওই ডেড বডি নিয়েই থাকবে?’
গিয়াস বিরক্তমুখে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাতে তোমার কী? তোমাকে সেটা দেখতে বলেছি? সাদিককে ফোন করেছিলে?’
ড্রাইভার বলল, ‘সাদিককে ফোনে পাচ্ছি না। ওর বাড়িতে ব়্যাবের রেইড হয়েছে।’
গিয়াস মাথা নাড়ল, ‘শুনেছি। ওতে কোনও ক্ষতি নেই। তুমি শিপের দিকে এগিয়ে যাও...’
গিয়াসের কথা শেষ হবার আগেই তার মুখে একটা টর্চের আলো এসে পড়ল।
গিয়াস চিৎকার করে বলল, ‘কোন বেতমিজ? কে?’
ড্রাইভারও চিৎকার করল।
আরেকটা টর্চের আলো এসে পড়ল গিয়াসের মুখে। গিয়াস রিভলভার বের করতে গেল, গুলির শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। গিয়াস পা ধরে বসে পড়ল। ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল। সভয়ে বলল, ‘কে?’
টর্চ নিভে গেল। একজন এগিয়ে এসে গিয়াসের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘ভালো আছেন জনাব? ইসলামাবাদে আপনি আমার কাছ থেকে সিগারেট কিনতেন। মনে আছে?’
গিয়াস হাঁ করে কণ্ঠস্বরের মালিকের দিকে তাকাল, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘কে? কে তুই?’
লোকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘আদর করে আপনার দেশের লোকেরা আমায় বাজ বলে। নাম শুনেছেন?’
গিয়াস আর কিছু বলে ওঠার আগেই রিভলভারের বাট তার মাথায় মেরে তাকে অজ্ঞান করে দিল...
সকাল সাতটা। নরম সূর্যের আলো মুখের উপর পড়ছে সাদিকের।
চোখ খুলে সাদিক দেখল তার সামনের সিটে বসে খান আর মাথুর চা খাচ্ছেন।
খানের পাশ থেকে মাথুর চুক চুক করে শব্দ করে বললেন, ‘হুমকিগুলো ভালো ছিল কিন্তু। মানে যেভাবে ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছিল, আমি তো খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। লাহোরে ছিলাম কয়েকদিন, তখন আমাদের ঘরের সামনে আইএসআই-এর এক অফিসার আসত। সেদিনের থেকেও তুমি বেশি ভয় দেখিয়ে দিয়েছিলে।’
খান শব্দ করে হেসে ফেললেন। দরজা খোলা। সাদিক তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে বাইরে নামল।
বাইরে চায়ের দোকানে লেখা ‘ভূতের কড়ক চা।’
সাদিক চোখ ছোট করে চারদিক দেখার চেষ্টা করল। খান গাড়ি থেকেই গলা ছাড়লেন, ‘চিনতে পারছিস? কোথায় আছিস বল তো?’
সাদিকের মাথায় ঘোর লেগে আছে। কোনওমতে বলল, ‘বরিশাল এলাম?’
খান হাসি হাসি মুখে সাদিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘না। আরও বল। দেখি মেলে কি না।’
সাদিক কোমরে হাত দিয়ে চারদিক দেখতে লাগল। রাস্তার উপর দিয়ে একটা বাস গেল। সাদিক চোখ ছোট করে বাসের নাম্বার পড়ে নিজের মনেই বলল, ‘এইডা আবার কোন জায়গায় চইলা আইলাম?’
চায়ের দোকানি ব্যস্ত ছিল। সাদিক তার কাছে গিয়েই জিগ্যেস করল, ‘কোন জায়গা এইটা?’
দোকানি বলল, ‘দত্তপুকুর।’
সাদিক অবাক হয়ে বলল, ‘সেইটা কোথায়?’
দোকানি রেগে গিয়ে বলল, ‘পাগল নাকি?’
সাদিকও রেগে গেল, ‘আমারে চেন তুমি? তুমি জানো আমি কে?’
দোকানের বাকি খদ্দেররা হাসতে লাগল, ‘কে তুমি? খয়ের খাঁ? পাগলা গারদের লোক ধরে নিয়ে যাচ্ছে নাকি?’
সাদিক জোর পায়ে হেঁটে গিয়ে গাড়ির জানলার কাছে গিয়ে খানকে বলল, ‘কোথায় এইটা? সত্যি কথা বলেন।’
খান বলল, ‘ইন্ডিয়া। আমরা সাফল্যের সঙ্গে এপারে এসে গেছি। এবার সাদিক সেখ, তোমার তো কোনও চিন্তাই নেই, আমরা দুজন শুধু না, তুষার রঙ্গনাথনও আছেন। আহা...তোমার জন্য আমার খুব ভালো লাগছে। ভালো ভালো লোকের সঙ্গে দেখা হবে। আরও ভালো ব্যাপার হল দিল্লিতে তুমি আরও দুজন পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা করতে পারবে। তোমার বন্ধু গিয়াস আর লতিফ চৌধুরী। লোকগুলো তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য কেমন হা-হুতাশ করছে তুমি জাস্ট ভাবতে পারবে না।’
মাথুর ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করলেন। সাদিক মাথায় হাত দিয়ে বড় বড় চোখ করে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। কলকাতা বিমানবন্দর পর্যন্ত বাকি পথ সে আর কোনও কথাই বলতে পারল না...।
তিন দিন পরের কথা
নতুন দিল্লি।
বিশেষ কক্ষে জরুরি ইন্টারোগেশন শুরু হয়েছে অনিল শেখাওয়াতের।
অনিল ঘাম মুছছেন। তুষার বললেন, ‘রেকর্ডার অন করি শেখাওয়াত?’
অনিল ক্রুদ্ধ চোখে তুষারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হু।’
তুষার ঈশারা করলেন। ভিডিও রেকর্ডার অন করা হল।
‘ওকে শেখাওয়াত। প্রথমেই আমি জানতে চাই রুমা মেয়েটির সম্পর্কে।’ তুষার অনিলের চোখে চোখ রাখলেন।
অনিল শেখাওয়াত ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘প্রত্যেকটা দেশই অ্যাগ্রেসিভ প্রসেসে স্পাইং করে। আমি আমার মতো করে রুমাকে ঠিক পথে আনতে চেয়েছি। ওর হাজব্যান্ড ওকে কষ্ট দিত, মারতো, ও এমনিই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। আমি ওর জীবনে একটা লক্ষ্য দিয়েছিলাম।’
তুষার পেপারওয়েট নিয়ে খেলতে শুরু করলেন, ‘অ্যাগ্রেসিভ স্পাইং? ওকে। তুমি আমাকে একটা কথা বলো, রুমার লাইফ প্যাথেটিক ছিল বলে তুমি ওকে ইউজ করনি, তাই তো?’
অনিল বললেন, ‘করিনি বলিনি। করেছি। সাদিকের ওই একটাই লুপ হোল ছিল। সেখানে ঢুকতে হলে আমাকে একটা মেয়েকে আনতেই হতো। এত বড় ঝুঁকি আর কেউ নিত না। আমার কিছু করার ছিল না। দেশ বাঁচানোর জন্য আমি এই স্টেপটা নিয়েছিলাম।’
তুষার বললেন, ‘আর রাণাকে রিক্রুট করা হয়েছিল কেন?’
অনিল বললেন, ‘আমি নতুন এজেন্টকে কাজ শেখাতে চেয়েছিলাম বলে রাণাকে পাঠিয়েছিলাম। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে ফিল্ডে কাজই আসল কাজ। যে ফিল্ডে থাকবে, সে একটা ট্রেনিং রুমে থাকা ছেলের থেকে অনেক বেশি জানবে।’
তুষার বললেন, ‘তাহলে কোনও ট্রেনিং ছাড়া আমি যাকে খুশি এই কাজে এনগেজ করে দিতে পারি। তাই তো?’
অনিল বললেন, ‘ট্রেনিং কেন লাগবে? তারেককে মেরেছিল রাণা। ওর থেকে কোয়ালিফায়েড আর কে ছিল? আমাদের সবার পছন্দ ছিল ওকে।’
তুষার মাথা নাড়লেন, ‘বুঝলাম। এবার জাল নোটের ঘটনাটা শুনি।’
অনিল বললেন, ‘ইস্টার্ন সাইডে বাংলাদেশের কয়েকটা ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার দরকার ছিল। ওরা জাল নোটের ব্যবসা করত। এভাবেই ওদের বিশ্বাস জিতেছিলাম।’
তুষার বললেন, ‘আর পূর্ণ বলে ছেলেটি? ও কোথায়?’
অনিল বললেন, ‘পূর্ণকে আমরা উদ্ধার করেছিলাম। আমার অফিসে চা দেয়। ওখানেই থাকে। ওকে কিছু করা হয়নি।’
তুষার হাসলেন, ‘উদ্ধার করেছিলে? না ওকেও মারার প্ল্যান ছিল?’
অনিল বললেন, ‘মারার কথা ভাবিনি কখনোই।’
তুষার বললেন, ‘বেশ। অমলকে মারতে চাইছিলে কেন? মিথ্যে বলে লাভ নেই, ইমতিয়াজের সাক্ষ্য আমি পেয়ে গেছি। যা বলবে, ভেবেচিন্তে বলো।’
অনিল কুঁকড়ে গেলেন। মাথা নিচু করলেন।
তুষার বললেন, ‘তুমি নিজে জানো তুমি কী করতে যাচ্ছিলে?’
শেখাওয়াত টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে জল নিয়ে পুরো গ্লাসটা খালি করে দিয়ে বললেন, ‘আমি স্বীকার করছি আমি ভুল করেছিলাম। ঠিক করিনি।’
তুষার বললেন, ‘গোটা অপারেশনটা পারফেক্ট সাজিয়েছিলে। আমি একেবারেই রুমাকে রাখার কাজটা সমর্থন করছি না, সেটা আমি এথিকস কমিটিকে ফরোয়ার্ড করব। কিন্তু তুমি আমাকে একটা কথা বলো তো অনিল, এটা কি পার্সোনাল স্কোর সেটল করার জায়গা ছিল?’
অনিল বললেন, ‘ছিল না। ঠিক সে কারণেই আমি রাণাকে বলেছিলাম অমলের থেকে কাজ শিখে নিতে। আমি জানতাম সেটা টাইম কনজিউমিং ব্যাপার। অবচেতনে আমিও চাইনি অমলের ক্ষতি হোক।’
তুষার চুপ করে গেলেন। শেখাওয়ার উশখুশ করতে শুরু করলেন। ঘরে শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না।
মিনিট দুয়েক পর নীরবতা ভঙ্গ করে তুষার বললেন, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট। অবচেতন। একজন কন্ট্র্যাক্ট কিলারকে পাঠিয়ে দিয়ে তোমার মনে হচ্ছে তোমার অবচেতন সেটাকে মানতে পারেনি। দুঃখের বিষয় শেখাওয়াত, আমাদের এখানে কার কী মনে হল, তা নিয়ে আমরা বিন্দুমাত্র চিন্তিত নই। যা হয়েছে সেটা নিয়ে চিন্তিত। গোপন খবর যাতে বাইরে না আসে, সে ভয়ে তুমি একজন গরিব চা-ওয়ালাকে পর্যন্ত খুন করেছিলে। তোমার সম্পর্কিত প্রতিটা রিপোর্ট আছে আমার কাছে। তোমার জন্য অমলের মতো এজেন্টকে অবধি আমাদের হারাতে হতো। তোমার কী মনে হয়? তোমার এখন কী করা উচিত?’
অনিল ঘামছিলেন। রুমাল বের করে ঘাম মুছে বললেন, ‘আ আ...আমি...আমি ক্ষমা চাইতে চাই।’
তুষার কড়া গলায় বললেন ‘চাইবে। তবে তা বলে ভেবো না তাতে তোমার সাতখুন মাফ হয়ে যাবে। আমি তোমার ইউনিট ভেঙে দিচ্ছি শেখাওয়াত। স্ট্রংলি রেকমেন্ড করছি যাতে রুমার মতো কোনও মেয়ের জীবন নষ্ট না করা হয়। শেম অন ইউ! রাষ্ট্রের নামে তুমি একজনের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করেছ। শেম...। আন্তর্জাতিক মিডিয়া আমাদের ছিঁড়ে খাবে। আমি জানি না কী করে এত সব কিছু আমি ধামাচাপা দিতে পারব। সত্যিই জানি না। শেম...।’
অনিল মাথা নিচু করে বসে রইলেন...
কয়েক দিন পরের কথা
কলকাতা।
ফ্ল্যাটের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। কলিং বেল টিপে দাঁড়িয়ে রইলেন। ক্লান্ত দৃষ্টি তার। চেহারায় হেরে যাবার ছাপ স্পষ্ট।
দরজা খুলে গেল। ভদ্রলোক বললেন, ‘আসতে পারি?’
মেয়েটি কয়েকসেকেন্ড ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসুন।’
লোকটা ঘরের ভেতরে ঢুকল। মেয়েটি বলল, ‘বসুন।’
ভদ্রলোক সোফায় বসে বললেন, ‘আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি। আমি যেটা করেছি ঠিক করিনি। আপনাকে আমার ওভাবে ব্যবহার করা ঠিক হয়নি। অনেক পরে আমার উপলব্ধি হয়েছে। হ্যাঁ, আমাকে টিম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে এই ক্ষমা চাওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। আপনি আমার মেয়ের মতো। আমাকে ক্ষমা করবেন কি?’
মেয়েটা চুপ করে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকল।
কিছুক্ষণ পর বলল, ‘একটা মেয়ে নরকে আছে দেখে তাকে আরও সহজেই আরেকটা নরকে ঠেলে ফেলে দেওয়া যায়, বলুন?’
লোকটা মাথা নিচু করে বলল, ‘কিন্তু তুমি পেরেছ রুমা, অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। তুমি অসাধ্যসাধন করেছ, তুমি নিজে জানো না, তুমি কী করেছ।’
রুমা হাসল, ‘আমার জানার দরকার নেই। তার থেকেও বড় কথা, আমি করিনি, পরিস্থিতি করিয়ে নিয়েছে। আপনি, আর আপনার বিচার ভালো থাকুক। আপনি আসুন বরং। আর কোনদিন দেখা না হলেই খুশি হব মিস্টার শেখাওয়াত।’
লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রুমা দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল...।
দুবাই এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ। কিছুক্ষণ আগেই ঢাকা থেকে দুবাই এসে পৌঁছেছে তাদের বিমান। এক্সিকিউটিভ লাউঞ্জে তারা ছাড়া আর কেউ নেই এই মুহূর্তে।
অমল বলল, ‘দেশটা ছাড়তে খারাপ লাগল।’
রাণা গলা নামিয়ে বলল, ‘সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু আপনি এখনও কোনও ব্রিফ দেননি আমায়। আমরা কী করব, কোথায় যাব, দুবাই গিয়ে কী করব?’
অমল হাসল, ‘অনেকদিন তুমি তোমার প্রিয় কাজ করনি। এবার করবে। আসগরেই কাউন্ট থামিয়ে দিলে চলবে? অপারেশন ব্লু উইং। দেখো তো, নামটা পছন্দ হচ্ছে নাকি?’
রাণা বিস্মিত হয়ে অমলের দিকে তাকাল।
দরজা খুলে গেল। অমল সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘স্যার এসে গেছেন।’
একজন বয়স্ক ভদ্রলোক ঘরের মধ্যে ঢুকে রাণার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, ‘হাই রাণা, আমি তুষার, তুষার রঙ্গনাথান...।’
শেষ
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন