প্লট ১: দিন প্রতিদিন

অভীক দত্ত

‘জয় কালী ফ্লুটস।’

অফিস থেকে ফেরার সময় রোজই দোকানটা দেখে দিব্যেন্দু। দেখাই হয়। সাতজন্মে তাদের পরিবারে কেউ গান বাজনা করেনি। গানের ব্যাপার পরিবারে নেই। কেউ শোনেও না। তাই দোকানটা দেখাই হয়। এর বেশি কোনকালেই হয়নি। শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা।

প্রবল গরম পড়েছিল।

এখন মেঘ হচ্ছে। বৃষ্টিও হচ্ছে। অফিস ফেরতা বৃষ্টির চোটে জয় কালী ফ্লুটসেই আটকে গেল দিব্যেন্দু। গিটার, মাউথ অর্গান, হারমোনিয়াম, তবলা...কত জিনিস।

দিব্যেন্দু মরা চোখে দেখতে লাগল।

হঠাৎ একটা জিনিসের উপর তার চোখ আটকাল। বাঃ। ভালো তো। এটা কাজের।

‘কত দাদা?’

দাম বলল দোকানদার। দিব্যেন্দু দরদাম না করেই কিনে ফেলল।

বৃষ্টি নামতে দৌড়। শেয়ালদা অবধি দৌড়ে যেতে পারলে বাস ভাড়াটুকু বাঁচে।

বাসভাড়া X মাসের ওয়ার্কিং ডে = সেভিংস। খারাপ না।

ট্রেন শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে আছে। ঝড়ের মতো পাবলিক ছুটছে। ডানদিক থেকে বাঁদিক থেকে। সামনে থেকে পাঁচ নাম্বার বগি। তাদের গ্রুপের ওই একটাই কামরা।

দিব্যেন্দু ছুটল না। জানে সিট রেখে দেবে কামরুল।

কামরুলকে সবাই ভিমরুল বলে। কামরুল রাগে না। কিংবা রাগলেও দেখায় না। হাওয়া খারাপ হচ্ছে। রাগ দেখিয়ে লাভ নেই।

দিব্যেন্দু ঢুকতেই কামরুলের চোখ খুশিতে ভরে উঠল, ‘এসো এসো।’

দিব্যেন্দু বসল। উইন্ডো সিট। সিটে বসার আগে একটু দেখে নেয় দিব্যেন্দু। লোকজন খুব হারামি। একবার ফাঁকা সিট দেখে বসার পর দেখা গেল কেউ হেগে রেখে দিয়েছিল।

লোকজন ট্রেনে কী করে হাগে কে জানে। হাগার পর ছোঁচে কোথায়? কই, তার তো হাগা পায় না এতো। সেদিন গোটা রাস্তাটা কী করে ফিরেছিল সেই জানে।

তাস সাফল করছে তাপস। আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কালকের পেমেন্টটা পাইনি কিন্তু।’

দিব্যেন্দু ফোন বের করে বলল, ‘দিয়ে দিচ্ছি। ভাবখানা এমন করছ, যেন পালিয়ে যাব।’

তাপস খিকখিক করে ওর বিশ্রী হাসিটা হেসে বলল, ‘শালা বাঙাল, কাঁটাতার পেরিয়ে এসেছিস। কবে আবার ও পারে চলে যাবি।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘চোপ শালা, পোকা খোর।’

তাপস কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কামরুল অন্য কথা তুলল। অন্য কথা তোলার দায় কামরুলেরই থাকে। না তুললেই সব ঝামেলা শেষমেশ হিন্দু-মুসলমানেই চলে যাবে। কামরুল বলল, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ কীভাবে হারলো দেখলে?’

তাপস বলল, ‘নেদারল্যান্ডের কাছে তো? হবেই তো। যে দেশে মোল্লা নেই, সে দেশ উন্নতি করবেই।’

কামরুল দাঁত বের করল। এটা ছোট। গায়ে লাগছে না।

ট্রেন ছাড়ল। বিকাশ বলল, ‘আদা তিনশো টাকা কেজি। খাব কী রে ভাই? কার পেছনে গুঁজব?’

তাপস বলল, ‘আদা খাবি না। যেটার দাম বেশি, সেটা খাবি না।’

বিকাশ চুপ করে গেল। সে কথা কম বলে।

তাপস দিব্যেন্দুর দিকে তাকাল, ‘কীরে বাঙাল, তুই দেখলি আমি টেক্কা দিয়েছি, তারপর তুই ট্রাম্প করলি? এই শুঁটকি মাছের বুদ্ধি নিয়ে খেলতে আসিস?’

দিব্যেন্দু ফ্যাকাসে মেরে গেল। অন্যমনস্ক হয়ে ভুল করে ট্রাম্প করে দিয়েছে। তাপস এবার ছাড়বে না। দিব্যেন্দু গলা তুলল, ‘ঠিক আছে গেড়ি গুগলি। থাম। অনেক হয়েছে। বাড়ি গিয়ে মাংস রান্নার সময় আরও দু’থাবা চিনি দিয়ে দিস।’

তাপস বলল, ‘খেলতে পারিস না, খেলতে আসিস কেন?’

ও পাশ থেকে একটা বাচ্চা ড্যাবড্যাব চোখে তাদের দেখছে। দিব্যেন্দু সেটা দেখে চুপ করে গেল।

এক-একটা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াচ্ছে, আরও লোক উঠছে। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অফিসে মারাত্মক ঝামেলা হয়েছে আজ। চাকরিটা যাবে যাবে করছে। দিব্যেন্দুর কাঁধের কাছটা কেমন দপ দপ করছে। প্রেশার বেড়েছে। ওষুধ খেতে হবে।

তাপসের বক বক আর উল্লাসে গোটা রাস্তাটা কাটল।

তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।

স্টেশনে ট্রেন থামার পরে অপেক্ষা করল না দিব্যেন্দু। দৌড়ে সাইকেল স্ট্যান্ডে গিয়ে সাইকেল নিয়ে সাইকেলে উঠে পড়ল। দাঁড়ানো যাবে না। পায়খানা পেয়েছে।

প্রতিদিন ঠিক এই সময়টাই পায়খানা পায়। ট্রেন দাঁড়ালেই। ঠিক কোন টাইমটেবিলে এটা হয় জানা নেই।

মুখে মারিতং বীর তাপস ভেজা বেড়ালের মতো স্টেশনেই দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনে বাতেলায় অন্ধকার করে দেওয়া তাপস বাড়িতে খুব একটা কথা বলে না।

তাপসের বাড়িতে যেতে ভালো লাগে দিব্যেন্দুর। তখন কী ভদ্র!

তাপসের বউ বাঙাল। বাড়িতে পারে না। বাঙাল বউয়ের উপর সব ফ্রাস্ট্রেশন ট্রেনে ঝাড়ে।

বৃষ্টি হচ্ছে। অনেক কষ্টে পায়খানা আটকে দিব্যেন্দু মফস্‌সলের রাস্তায় সাইকেল দৌড় করাচ্ছে।

রুমা জানলা দিয়ে দেখছিল দিব্যেন্দু আসছে। দৌড়ে দরজা খুলে দিল।

দিব্যেন্দু সাইকেল ফেলে জামা প্যান্ট খুলে গামছা নিয়ে বাথরুমে দৌড়ল।

দশ মিনিটে শান্তি নেমে এল।

দিব্যেন্দু এরপর স্নান করবে কুড়ি মিনিট ধরে। গান বর্জিত জীবন। একটাও গান বেরোবে না। কোনও হু হাও না।

আধঘণ্টা পর সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে লুঙ্গি পরল।

ফতুয়া পরে ব্যাগ থেকে জয় কালী ফ্লুটস থেকে কেনা জিনিসটা বের করে রুমাকে ডাকল, ‘এসো দেখি।’

রুমা ঘরে ঢুকল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘এসো। কাছে এসো।’

রুমা আরেকটু এগিয়ে এল।

দিব্যেন্দু অভ্যস্ত হাতে রুমার চুল ধরল, ‘এসেছিল আজ? তোর নাং?’

রুমা চুপ করে রইল। কথা বলল না।

দিব্যেন্দু হাতে নিল জিনিসটা। তবলার হাতুড়ি। ছোট অথচ কার্যকর।

মেঝেতে বসে রুমার বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুলে এক বাড়ি মারল। রুমা আর্তনাদ করে মেঝেয় বসে পড়ল।

রক্ত বেরোচ্ছে।

দিব্যেন্দু রুমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘আজকেই কিনলাম। এটা কাজে দেবে। যাও, মুড়ি গরম করে নিয়ে এসো।’

রুমা ফ্যালফ্যাল করে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে আছে।

তার ব্যাকগ্রাউন্ডে তাদের প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের ছবিগুলো কোলাজ করা। রুমার এক ভাই করে দিয়েছিল...

‘যখন মারবে, তখন দেখবে যেন পোশাকের উপর দিয়ে মারে। তাতে লাগে কম।’

পলা বলল।

পায়ে ব্যান্ডেজ করতে হয়েছে। ইনজেকশন পড়েছে। ব্যথা হচ্ছে ভীষণ।

ওষুধের দোকানে জিগ্যেস করেছিল কী হয়েছে। রুমা বলেছে পায়ে হাতুড়ি পড়েছে। দোকানদার বিশ্বাস করছিল না।

এই দোকানেই পলার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল রুমার। পলার হাত ভেঙে দিয়েছিল ওর বর। এখন অনেকটাই ঠিক আছে। আজ পলার হাতে ইস্তিরি ঘষে দিয়েছে। কালো হয়ে ভয়াবহ দেখাচ্ছে।

রুমা বলল, ‘তোমাকে যখন ইস্তিরি দিল, তখন কি জামা পরেছিলে?’

পলা মাথা নাড়ল, ‘না। স্নান করে এসেছিলাম। কী মনে হয়েছিল, ছ্যাকা দিয়ে দিল।’

আজমত স্টোরের গেটের পাশ দিয়ে ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। রাত আটটা বেজে গেছে। বৃষ্টি প্রচুর হয়েছে। রাস্তা ভেজা।

দিব্যেন্দু যেমন রুমাকে সন্দেহ করে, পলার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সেটা না। পলার বাবার কাছে ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে পনেরো লাখ টাকা পণ চেয়েছিল। পলার বাপের বাড়ি তেরো লাখ জোগাড় করতে পেরেছিল। ওই দু’লাখের জন্যই মার খেতে হচ্ছে এখনও। ওর বরের ইচ্ছে হলেই পলাকে মারে।

রুমার পায়ে বেশ ব্যথা হচ্ছে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটছে।

পলা বলল, ‘সেই যে ছেলেটা, যাকে নিয়ে তোমাকে সন্দেহ করে, সে এখন কোথায় আছে?’

রুমা মাথা নাড়ল, ‘জানি না।’

পলা বলল, ‘আমার বাবাকে ফোন করেছিল। বলেছে এই সপ্তাহের মধ্যে টাকা না পেলে যেভাবে শুয়োর মারে, সেভাবে রড গরম করে আমার ওখানে...’

পলার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

রুমা তাদের বাড়ির সামনে পৌঁছতে দেখল পাড়ার কোন এক বয়স্ক লোকের সঙ্গে দিব্যেন্দু গল্প করছে। পাড়ায় দিব্যেন্দুর ইমেজ অত্যন্ত ভদ্র সভ্য একজন মানুষের। রুমা ফিসফিস করে বলল, ‘আমি ঢুকলাম। সাবধানে যাও।’

পলা বলল, ‘ঠিক আছে।’

দিব্যেন্দু দেখল রুমা ঘরে ঢুকছে। সে কিছু বলল না। যার সঙ্গে দিব্যেন্দু কথা বলছিল, সেই ভদ্রলোক বললেন, ‘কী হয়েছে বউমা? খুঁড়িয়ে হাঁটছ যে?’

রুমা বলল, ‘ওই রান্না করতে গিয়ে...’

দাঁড়াল না সে। দ্রুত পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। বাইরে থাকলে রাতে দিব্যেন্দু এসে বলবে সে ওই লোকটার সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করছিল। রুমা যখন বলবে লোকটা তার বাবার বয়সি, তখন দিব্যেন্দু বলবে সুগার ড্যাডি বোঝো? বোঝো না? কোথায় কী ফুল ফুটিয়ে রাখছ আমি কী করে বুঝব? আমি তো বুঝতে পারব না।

রুমা ঘরে ঢুকে গেল। ফোনে প্রত্যুষের নাম্বার ডায়াল করল। ফোন এখনও অফ। রুমা হাল ছাড়ে না। রোজই একবার চেষ্টা করে।

দিব্যেন্দু হুট করে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।

রুমার হাতে ফোন দেখে বলল, ‘কী হল? কাকে ফোন করছিলে?’

রুমা বলল, ‘কাউকে না।’

দিব্যেন্দু স্থির চোখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যথা হয়েছে পায়ে?’

রুমা ঘাড় নাড়ল। দিব্যেন্দু বসার ঘরে গিয়ে টিভি চালাল।

রুমা শ্বাস ছাড়ল। ফুলসজ্জার রাতে দিব্যেন্দু জিগ্যেস করেছিল, ‘প্রেম করেছ কোনও দিন?’

রুমা মাথা নেড়ে ‘না’ বলেছিল।

দিব্যেন্দু খাটে শুয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলেছিল, ‘আমার ছিল। কেটে গেছে। খুব ভালোবাসত। শোন, প্রেম টেম নিয়ে এত চাপ নেবে না। ওগুলো পাস্ট লাইফ। অত চাপের তো কিছু নেই।’

রুমা বলেছিল, ‘না, সত্যি নেই।’

দিব্যেন্দু স্থিরচোখে তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘আমাদের আগে বন্ধু হওয়া দরকার। তাই না?’

রুমা তাও বলেনি। রাত কেটে গেল। পরের দিন দিব্যেন্দু কেমন মায়াভরা চোখে তার সঙ্গে কথা বলল। ভালো ভালো চকলেট এনে দিল। তিন চার দিন কেটে গেল। রুমার মনে হল সে খুব বড় কোনও অন্যায় করছে। তার এভাবে লুকিয়ে রাখা ঠিক হচ্ছে না। রাতে ক্রিম মাখতে মাখতে বলেছিল, ‘একজন ছিল। কথা হত ফোনে। এটুকুই। আর কিছু না।’

দিব্যেন্দু খুশি গলায় বলল, ‘এই তো। সব বলা উচিত। ঠিক করেছ।’

রুমা একটু একটু করে বলতে শুরু করল।

হাসি হাসি মুখ করে সব কথা শুনছিল দিব্যেন্দু।

তারপর রাত বাড়তেই শুরু হল অকথ্য অত্যাচার...

‘আদা কত? পঁয়ত্রিশ টাকা শ? কী বল?’

বলভদ্র দামটা শুনে দাঁড়িয়ে গেলেন। মাথাটা কেমন বন বন করছে। জিনিসের দাম যে হারে বাড়ছে, তাতে সামলানো যাচ্ছে না আর। গিন্নি বলল আদা আনতে, তিনিও হ্যাঁ-হ্যাঁ করে বেরিয়ে এলেন। দোকানে একটু আদা আর কাঁচালঙ্কা নেওয়ার পর বলছে পঞ্চাশ টাকা। প্রথমে ঠাহর করতে পারছিলেন না, দামটা কোনটার বেড়েছে। আদা, না কাঁচালঙ্কার। এবার পরিষ্কার হল।

টাকা মিটিয়ে পোস্ত কেনার আগে একবার জোরে দম নিয়ে নিলেন। এটা করতে হয়। পোস্ত কিনতে গেলেও বুকে একটা ধাক্কা লাগে। তবে পোস্ত বরাবরই মহার্ঘ্য। ভোটের আগে জনগণের দাম যেমন বেড়ে যায় আদার মতো, পোস্তর ব্যাপারটা সেরকম নয়। পোস্ত সারাবছরই ঘ্যাম নিয়ে থাকে।

দিব্যেন্দুকে দোকানে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল বলভদ্রের। ভারি ভালো ছেলে। মিষ্টি ভাষী। সম্মান করে বড়দের। এরকম ছেলে দেখলে মন ভালো হবেই।

দিব্যেন্দু তাকে দেখে হাসল, ‘ভালো তো দাদা?’

বলভদ্র বললেন, ‘ভালো আর কী দেখলে হে? আদা সাড়ে তিনশো। ভাবো! এবার তো আদা পাদা লবনচাদা বলার আগেও টাকা দিতে হবে মনে হচ্ছে।’

কথাটা বলে একচোট হেসে নিলেন বলভদ্র। জমেছে জোকটা। লিখে রাখতে হবে। দিব্যেন্দু হাসল না। কেমন গুটিশুটি মেরে গেল।

বলভদ্র অপ্রস্তুত হলেন, ‘আহা, তুমি আবার খারাপ ভাবলে নাকি?’

দিব্যেন্দু লাজুক গলায় বলল, ‘না না দাদা। ঠিক আছে।’

জোকটা তার মতো লোকের হিসেবে অশ্লীল হয়ে গেছে বুঝে বলভদ্র মেক আপ দেওয়ার চেষ্টা করলেন, ‘আজ তো ছুটি?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ দাদা।’

বলভদ্র বললেন, ‘তো আজ চলে এসো আমাদের বাড়ি। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে যাও।’

দিব্যেন্দু অবাক হল, ‘আজ?’

বলভদ্র বললেন, ‘হ্যাঁ, চলে এসো। তোমার বউদি তো অনেক দিন ধরেই বলছিল। কী খাবে বল? খাসি না ইলিশ?’

দিব্যেন্দু আমতা আমতা করতে লাগল, ‘আজ? মানে দাদা, আজ...’

বলভদ্র দিব্যেন্দুর হাত চেপে ধরলেন, ‘ওসব কথা শুনবো না ভাই। আজকেই আসতে হবে। অনেক ডেট পিছিয়েছ। আর না।’

দিব্যেন্দু নিমরাজি হয়ে মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে দাদা। যাব।’

বলভদ্র খুশি হলেন, ‘ঠিক আছে। এসো তবে। আমি মাছ আর মাংস নিয়েনি।’

পোস্ত নিয়ে বলভদ্র হন্তদন্ত হয়ে মাছ বাজারের দিকে রওনা হয়ে গিন্নিকে ফোন করলেন, ‘হ্যাঁ, শোন, দিব্যেন্দুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে। দুপুরে বলে দিয়েছি।’

গিন্নি শান্ত গলায় বলল, ‘বাজার নেই কিছু নেই, এখন প্রায় দশটা বাজে।’

বলভদ্র বললেন, ‘ও যা করবে তাই খেয়ে নেবে। দিব্যেন্দু ভারি ভালো ছেলে।’

ফোন কেটে বলভদ্র চোখ বন্ধ করে হিসেব করে নিলেন। যা টাকা আছে হয়ে যাবার কথা।

ঠিক আছে। যা হবে দেখা যাবে। কিনে নেওয়া যাক।

সাড়ে দশটা নাগাদ বাজার হল।

স্কুটির সামনে ব্যাগ ঝুলিয়ে বলভদ্র রওনা দিলেন। বৃষ্টির মধ্যেই রোদ উঠে গেছে। তাতে প্রবল গরম লাগছে। স্কুটি চালালে যদিও হাওয়া লাগায় গরম কম লাগে।

বাড়ির সামনে এসে স্কুটি রেখে আগে তালা খুললেন তিনি। সাধারণত কোথাও গেলে বাড়ির দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ করে দিয়ে যান।

দরজা খুলে আবার স্কুটির থেকে ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে বললেন, ‘এই নাও। করে ফেলো।’

গিন্নি বললেন, ‘করছি।’

বলভদ্র বললেন, ‘গলার কাছটা কিছু একটা দাও। দিব্যেন্দুর বউয়ের সামনে আবার গল্প করতে বসে যেও না দাগটা আমার সিগারেটের ছ্যাকায় হয়েছে।’

গিন্নি ঘাড় নাড়লেন।

বলভদ্র সিগারেট ধরালেন। দিব্যেন্দুকে দিয়ে একটা পলিসি করাতেই হবে। নইলে এ মাসের টার্গেট ফুলফিল হবে না। জীবনে কত জ্বালা!

দিব্যেন্দু মিষ্টি নিয়ে এসেছে। বলভদ্র প্যাকেটটা নিয়ে বললেন, ‘আরে, আবার এসবের কী দরকার ছিল? এসো এসো।’

রুমাকে নিয়ে দিব্যেন্দু ড্রইংরুমে ঢুকল।

বলভদ্র বললেন, ‘বস।’

রুমা খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। বলভদ্র বললেন, ‘বউমার কী হয়েছে?’

রুমা সসংকোচে বলল, ‘চোট লেগেছে।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘খুব চিন্তায় আছি বুঝলেন দাদা, পা বেশ ফুলেছে। একজন ভালো ডাক্তার দেখাতে পারলে ভালো হত।’

বলভদ্রের স্ত্রী রুপালী ঘরে ঢুকেছিলেন। দিব্যেন্দুর কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস পড়ল তার। দিব্যেন্দু কত খেয়াল রাখে স্ত্রীর।

বলভদ্র বললেন, ‘সরকারবাবুকে দেখিয়ে নাও। ভালো ডাক্তার। অনেক দিন ধরে প্র্যাকটিস করছেন।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আজকেই দেখাচ্ছি।’

রুমা চুপ করে বসে রইল।

বলভদ্র তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বউমাকে নিয়ে ঘরে যাও।’

রুপালী রুমাকে নিয়ে তাদের বেডরুমে গেলেন। রুপালী বললেন, ‘দিব্যেন্দু খুব খেয়াল রাখে তোমার?’

রুমা ঘাড় নাড়ল।

রুপালী গলা থেকে কাপড় সরালেন। রুমা সেটা দেখে বলল, ‘এটা সিগারেটের ছ্যাকা। তাই না?’

রুপালী বললেন, ‘ওই আর কী, লেগে গেছিল।’

রুমা বুকের কাপড় সরাল। ডান স্তনে গোল করে ছ্যাকার দাগ। রুপালী বড় বড় চোখ করে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। রুমা কাপড় ঠিক করে নিয়ে বসল। রুপালী বললেন, ‘দেখে তো মনে হয় না!’

রুমা বলল, ‘আপনার বরকে দেখেও মনে হয় না।’

রুপালী বললেন, ‘কিছু ভেবেছ?’

রুমা বলল, ‘একজন আছে। রোজ ফোন করি। একদিন ফোনে পাবো নিশ্চয়ই। সেদিনের অপেক্ষায় আছি।’

বলভদ্রের ডাক এল, ‘ভাত বেড়ে দাও। দুটো বাজতে চলল।’

রুপালী শশব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘চল। দেরি করলে অন্য সমস্যা হবে।’

দিব্যেন্দু আর বলভদ্র টেবিলে বসেছে। রুপালী খাবার দিতে শুরু করলেন। বলভদ্র বললেন, ‘তোমরা দুজনেই বসে যাও। আবার দাঁড়িয়ে আছ কেন?’

রুমা বসল। বলভদ্র বললেন, ‘দুই পরিবার মিলে কোথাও বেড়াতে যেতে হবে। কী বউমা, কোথায় যেতে ভালো লাগে তোমার? পাহাড় না সমুদ্র?’

রুমা থালায় আঁকিবুঁকি কাটছিল। বলভদ্রের প্রশ্ন শুনে বলল, ‘সমুদ্র।’

বলভদ্র বললেন, ‘বাঃ। খুব ভালো। বুঝলে দিব্যেন্দু, ছুটি ম্যানেজ কর। আমরা গোয়া ঘুরে আসব।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘সে তো অনেক খরচ দাদা।’

বলভদ্র বললেন, ‘আরে সে লোক আছে আমার। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ওসব নিয়ে ভেবো না। ডিসেম্বরেই ব্যবস্থা করছি। ওই সময়টা ওখানে কার্নিভাল হয়। পঁচিশে পৌঁছব, একবারে ইয়ার এন্ডিংটা কাটিয়ে ফেরা যাবে, কী বল?’

রুপালী ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘গোয়ায় শুনেছি পাবলিক প্লেসে স্মোক করলে খুব বড় অ্যামাউন্ট ফাইন করে। গোপাল ঠাকুরপোরা গেছিল, বলছিল।’

বলভদ্র বললেন, ‘সে দেখা যাবে। হোটেলের রুমের ভেতর কে কী করছে, কে কী খাচ্ছে, সেটা তো আর দেখতে আসবে না। ওই মেটে কারিটা দাও তো।’

রুপালী মেটে কারি এগিয়ে দিলেন। বলভদ্র বললেন, ‘আমার এই জিনিসটা দারুণ লাগে। আর ভালো লাগে মুরগির কচকচি। যেন ছেলেদের...’ রুমার দিকে তাকিয়ে জিভ কাটলেন বলভদ্র।

দিব্যেন্দু চুপ করে খেয়ে যাচ্ছিল। বলভদ্র দিব্যেন্দুকে বললেন, ‘মেটে কারিটা খাও ভাই, তোমার বউদি এটা খাসা রাঁধেন। খেয়ে বল।’

দিব্যেন্দু নিল।

খেতে আরও দশ মিনিট সময় লাগল। রুমাকে নিয়ে রুপালী ঘরে গেলেন। বলভদ্র সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ‘বুঝলে দিব্যেন্দু, একটা ইনসিউরেন্স এসেছে। ডেথ বেনিফিট প্রচুর টাকার। একবার দেখতে পারতে।’

দিব্যেন্দু বলভদ্রর কথা শেষ হবার আগেই বলল, ‘হ্যাঁ, শুনছিলাম আপনি সেদিন কাউকে একটা বোঝাচ্ছিলেন। আমি যদি আমার বউয়ের নামে করি? ও তো চাকরি করে না।’

বলভদ্র বললেন, ‘হ্যাঁ, করা যাবে। একটু কমপ্লিকেশন আছে। দেখেনি। করে নিও।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমার নামে তো পলিসি আছেই। ওর নামেও থাক।’

বলভদ্র খুশি মনে মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ। তুমি যে বউমার কথা এতো চিন্তা কর, সেটা খুবই ভালো।’

দিব্যেন্দু লাজুক হাসল।

দুজনে বাড়ি ফেরার পর দিব্যেন্দু দরজা বন্ধ করে বেডরুমে গিয়ে রুমাকে ডাকল, ‘এদিকে এসো।’

বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা হয়েছে। গরমের তেজটা নেই, ঘামটাও চলে গেছে।

রুমা দিব্যেন্দুর সামনে এসে দাঁড়াল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘গোয়া যাবে?’

রুমা বলল, ‘তুমি গেলে যাব।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কী বলছিল ওই মুটকিটা? বলভদ্রর বউকে কী বলেছ?’

রুমা বলল, ‘বলিনি কিছু।’

দিব্যেন্দু রুমার ডান হাতটা ধরল। নিজের হাতের মধ্যে হাতটা নিয়ে খেলতে খেলতে বলল, ‘গোয়া ভালো জায়গা। তোমাকে বিকিনি কিনে দেব। বিকিনি কিনে বিচে বসবে। সব লোক তোমার শরীর দেখবে। ভালো লাগবে, তাই না?’

রুমা বলল, ‘তুমি না গেলে আমি যাব না।’

দিব্যেন্দু রুমার হাত মুচড়ে দিল, ‘যাবে না কেন? যাবে। ভালো লাগবে। রাতে বুড়োটাকে তোমার ঘরে পাঠিয়ে দেব। আরও ভালো লাগবে।’

রুমা যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করল। কিন্তু কোনও শব্দ বেরোল না তার মুখ দিয়ে।

দিব্যেন্দু রুমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার বাবা-মা আসবে কাল। ঘর-দোর পরিষ্কার রাখবে।’

রুমা কিছু বলল না।

দিব্যেন্দু জানলার পর্দা সরিয়ে বৃষ্টি দেখতে শুরু করল। ভালো লাগে বৃষ্টি দেখতে। মফস্‌সলে গাছপালা বেশি। অফিসে থাকলে বৃষ্টি দেখাও যায় না।

রুমা ঠাকুর ঘরে গেল। ফোনটা বের করে আবার নাম্বারটা ডায়াল করল। প্রত্যুষের ফোন যে সুইচড অফ, তিনটে ভাষায় শুনিয়ে দিল।

পায়ে যন্ত্রণা ছিল। দিব্যেন্দু হাত মুচড়ে দেওয়ার পর পায়ের যন্ত্রণাটা কম লাগছে। হাতের ব্যথাটা অনেক বেশি মনে হচ্ছে। পলা বলেছিল কাপড়ের উপর দিয়ে মারলে কম লাগে। হাত মুচড়ালে কাপড় দিয়ে কী হবে?

একটা ভিডিও দেখেছিল আফগানিস্তানের। বোরখার উপর দিয়ে মারছে। বোরখা পরে ছিল বলে কি মারটা কম লেগেছে? তা তো হবে না। ঠিকই লেগেছে। ভিডিওটা দিব্যেন্দুই পাঠিয়েছিল। পাঠিয়ে লিখেছিল ‘দেখো তুমি কত ভালো আছ। এসব জায়গায় মেয়েদের অনেক বেশি মারা হয়।’

একটা মেয়েকে পশ্চিমী পোশাক পরেছিল বলে গুলি করে মারা হয়েছিল। এগুলো পরা ঠিক না। দিব্যেন্দু বলেছিল অনেক ভালো রাখা হয় তাকে।

‘শোন।’

দিব্যেন্দু ডাকছে আবার।

তাড়াতাড়ি উঠল রুমা। বেশি দেরি করলে সমস্যা বাড়বে।

দিব্যেন্দু শুয়ে আছে।

সে ঘরে ঢুকতে বলল, ‘আমার চাকরিটা চলে যেতে পারে। সেরকম হলে তোমাকে রোজগার করতে হবে। কী পারবে? লোকের সঙ্গে শুতে পারবে? তাহলে তো দারুণ ব্যাপার হবে। আনন্দে আনন্দে টাকা আসবে।’

রুমা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এই কথাটার মানে কী? তাকে পরীক্ষা করছে?

সে বলল, ‘চাকরি চলে যাবে কেন?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আছে অনেক ব্যাপার। কোম্পানির অবস্থা ভালো না। লোক ছাটাই চলছে। বিরাট কেচ্ছা।’

রুমা কিছু বলল না।

দিব্যেন্দু বলল, ‘সারাদিন ঘরে থাকব তখন। ভালো হবে। তাই না?’

রুমা মাথা নেড়ে ‘হু’ বলল।

দিব্যেন্দু সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘হু? মানে খুশি হওনি তাই না? খুশি হওনি?’

রুমা বলল, ‘হয়েছি।’

দিব্যেন্দু খাট থেকে নেমে রুমার থুতনি ধরে বলল, ‘তাহলে হাসছ না কেন? হাসো। হাসো। হাসো বলছি।’

রুমা হাসার চেষ্টা করল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘খুশি তো কম হবেই। আমি গেলেই তো সে ছেলেটা আসে।’

রুমা বলল, ‘আসে না। তুমি তো সিসিটিভি লাগিয়েছ। দেখতে পাও না?’

দিব্যেন্দু লাল চোখে বলল, ‘ঠিক দেখতে পাই। আমার চোখে ফাঁকি দিয়ে অভিসারে যাওয়া তো? একদিন ঠিক ধরা পড়বে। তারপর পুঁতে রাখব। এই ঘরের মধ্যেই পুঁতে রাখব।’

রুমা আবার চুপ করে গেল।

দিব্যেন্দু রুমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘বাপকে জিগ্যেস কর কী খাবে, মাছ না মাংস।’

রুমা বলল, ‘রাতে করব।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘করে রাখ। আমাকে কিনতে যেতে হবে তো।’

রুমার বলল, ‘করছি।’

দিব্যেন্দু খাটে এসে শুল। কাল অফিসের ছাঁটাইয়ের লিস্ট বেরোনোর কথা। তার নাম থাকার সম্ভাবনা আছে।

সে ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাং রেখে পা দোলাতে শুরু করল।

‘ক’টাকা ভাই?’

সিম লাগছে নতুন ফোনে। বাপ্পার দোকান। বাপ্পার মেজাজ সবসময় তিরিক্ষি হয়ে থাকে।

পূর্ণ যে প্রশ্নটা জিগ্যেস করল, বাপ্পা কোনও উত্তরই দিল না। মন দিয়ে সিম লাগিয়ে স্ক্রিন মুছতে শুরু করে দিল।

পূর্ণ বলল, ‘কী রে বাপ্পা? টাকা নিবি না?’

বাপ্পা হাই তুলল, ‘সাত হাজার পাঁচশো। কিছুক্ষণ পর সিম চালু হবে। তখন ফোন করতে পারবে।’

পূর্ণ পকেট থেকে টাকা বের করে শো কেসের উপর নামিয়ে রেখে বলল, ‘গুনে নে।’

বাপ্পা টাকা গুনছে। থুতু দিয়ে দিয়ে টাকা গুনছে। একবার গুনল।

এবার উল্টো করে গুনছে। পূর্ণ বলল, ‘কতবার গুনবি রে?’

‘ঠিক আছে ঠিক আছে। যাও এবার।’

পূর্ণ বলল, ‘দেখাবি না, কী করে ফোন চালায়? আমি কি অত জানি?’

বাপ্পা বলল, ‘ফোন ধরতে আর কাটতে জানো তো, তাহলেই হবে। এখন কেটে পড় তো। অনেক কাজ আছে আমার।’

পূর্ণ বলল, ‘পানু লোড করলি ভাই?’

বাপ্পা বলল, ‘পুলিশ ধরতে পারলে তোমায় হুড়কো দিয়ে দেবে। পানু ফানু নিষেধ এখন।’

পূর্ণ অবাক হল, ‘বলিস কী? পানু দেখলে বুঝে যাবে?’

বাপ্পা বলল, ‘হ্যাঁ। ফোন থেকে হাত বেরিয়ে কান ধরে থানায় নিয়ে যাবে।’

পূর্ণ একগাল হেসে বলল, ‘যাহ্‌। ইয়ার্কি মারিস না।’

বাপ্পা বলল, ‘ওই দেখো। ইয়ার্কি মারব কেন? সত্যি কথা।’

পূর্ণ বলল, ‘এই ফোন থেকে হাত বেরিয়ে আসবে? কোথায়, হাত কোথায় আছে?’

বাপ্পা বলল, ‘ও ঠিক আছে। তুমি এখন বুঝবে না, পানু দেখলেই বেরিয়ে আসবে। এটাই এখন স্লোগান। না পানু দেখুঙ্গা, না দেখনে দুঙ্গা।’

পূর্ণ মাথা চুলকিয়ে দোকান থেকে বেরোল। হাতে ব্যাগ। নতুন ঝাঁ চকচকে ফোন।

ফোন কেনার টাকা দিয়েছে বাপিদা। বাপিদার বাড়ি দেখভাল করতে হবে। বাপিদা জার্মানিতে থাকে। এর আগের কেয়ারটেকার পালানোর পরে পূর্ণকে রাখা হয়েছে। পূর্ণর একটাই কাজ। সারাদিন বাপিদার বাড়িতে থাকা। এই ফোনে ভিডিও কল করে বাপিদা আপডেট নেবে বলেছে। যখন ফোন করবে তখনই ধরতে হবে। নইলে চাকরি নট। আগের কেয়ারটেকার ছেলেটা একটা জিনিস ছিল। মাঝে মাঝেই রাতে বাড়িতে বাইরের ছেলেপিলে নিয়ে এসে মধুচক্রের আসর বসাত। পুলিশ রেইড হবার দিন ছেলেটা পালাল।

পাড়ার কেষ্টু-বিষ্টুদের ফোন করে বাপিদা পূর্ণকে রিক্রুট করেছে। বেশ বড় বাড়ি।

পূর্ণ বাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ঘরে ঢুকে সোফায় বসল। খুব বেশিদিন এই স্বাধীনতা পাওয়া যাবে না। বাপিদা বলে দিয়েছে, ঘরে বাইরে সিসিটিভি বসবে। সব জার্মানি থেকে দেখবে। পূর্ণ খি-খি করে হাসল। আগে ক্যামেরা লাগানো থাকলেই ভালো হতো। তাহলে ঘরে মধুচক্র চলত আর জার্মানি থেকে বাপিদা দেখত। ভারি মজা। যারা পানু বন্ধ করে দিয়েছে, তারা কি আর এটা বন্ধ করতে পারত? দিব্বি জমে যেত তাহলে।

ফোনটা বেজে উঠল। ইরিব্বাস, এখনও তো বাপিদাকে নাম্বার দেওয়া হয়নি, নাম্বার পেয়ে গেল নাকি? কী সর্বনাশ!

সে তাড়াতাড়ি ফোন ধরল, ‘হ্যালো...বাপিদা?’

ওপ্রান্ত থেকে মহিলা কণ্ঠ ভেসে এল, ‘প্রত্যুষদা, আমি...উফ্‌, এতদিন পরে তুমি ফোন অন করেছ?’

পূর্ণ বলল, ‘জার্মানিতে ঠান্ডা কেমন গো?’ এই কথাটা জিগ্যেস করবে আগে থেকেই ভেবে নিয়েছিল পূর্ণ। এবারের শীতেই তার সব কিছু জমে গেছিল, জার্মানিতে নাকি হেবি শীত। ওখানে কী করে টিকে থাকছে বাঙালির ছেলে বাপিদা, এটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন।’

‘কে? প্রত্যুষদা? শুনতে পাচ্ছ? আমি রুমা।’

পূর্ণ অবাক চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রুমা? সেটা কে রে বাপ?’

‘প্রত্যুষদা, আমার ভারি বিপদ, আমায় বাঁচাও। যেভাবেই হোক, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। প্লিজ, আমি তোমার পায়ে পড়ি। আমার বর আমায় মেরে ফেলবে।’

পূর্ণ ভিরমি খেল। মেরে ফেলবে? বলে কী করে? বলল, ‘কে? কে বলছেন? আমি পুন্ন বলছি।’

‘একী! এটা তো প্রত্যুষদার নাম্বার? কে আপনি?’

‘ইল্লি আর কী? টাকা দিয়ে ফোন কিনলাম, টাকা দিয়ে সিম কিনলাম, উনি বলতে এয়েচেন এটা আমার ফোন না। তোর বাপের ফোন নাকি রে?’

‘আপনি প্রত্যুষদা না? নাকি ওর ফোন চুরি করেছেন?’

‘তোর বাপ চোর হারামজাদি। কারে কী বলিস তুই?’

‘আপনি প্রত্যুষদা নন?’

‘তোর বাপ প্রত্যুষ।’

ফোনটা কেটে গেল। পূর্ণ রাগী চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। এ কী রে? প্রথম দিন থেকেই এসব ঝামেলা শুরু হয়ে গেল?

শেয়ালদায় ট্রেন পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে দৌড় শুরু হয়ে যায়। সবাই দৌড়চ্ছে। সমগ্র ভিড়টার একটাই লক্ষ্য। যেভাবে হোক স্টেশন চত্বর থেকে দৌড়তে হবে। ট্রেন থেকে নেমে ব্যাগটা বুকে নিয়ে রোজের মতোই দৌড় শুরু করল দিব্যেন্দু।

পার্থক্য একটাই। আজ বুক ধুকপুকুনি অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেকটা বেশি। চাকরিটা চলে যেতে পারে আজ।

এটা গেলে বিকল্প কিছু একটা করতে হবে। কী করতে হবে মাথায় এখনও আসেনি। আসবে নিশ্চয়ই। প্রত্যেকটা সমস্যার সমাধান আছে। এই সমস্যারও কিছু না কিছু সমাধান একটা থাকবেই। চাকরি গেলে অনেকের বড় সমস্যা হবে। পালদার যেমন। পালদার আর দশ বছর চাকরি আছে। বড় সংসার। সামনে আবার মেয়ের বিয়ে।

ভিড়টা বাজার পেরোচ্ছে। তাদের সঙ্গে দিব্যেন্দুও। রোদ উঠেছে। মেঘ কোথায় যেন উবে গেছে। এই সময় রোদ, মানে গরম অনেক বেশি লাগবে। দিব্যেন্দুর ঘাম বেশি হচ্ছে। সে জোর পায়ে রাস্তার কাছে এসে পার হল। এবার হাঁটা। রাস্তা ঘাট, দোকান বাজার সব পেরিয়ে সে জোর পায়ে হেঁটে অফিসে এলো।

থমথম করছে চারপাশ। পালদা জল খাচ্ছে। দিব্যেন্দু সিটে বসে বলল, ‘লিস্ট বেরিয়েছে?’

পালদা বলল, ‘ওই তো, দেখো না। মিটিঙে ঢুকেছে সব। আজকেই জানিয়ে দেবে। উফ। আমার শরীর খারাপ লাগছে।’

দিব্যেন্দু অন্যদিকে তাকাল। রঘু সামন্ত টেবিলে মাথা রেখে বসে আছে। অমর বাগদীর মুখ শুকনো।

মিটিং শেষ হয়ে গেছে। সাহেবরা সব নিজেদের চেম্বারে সেঁধিয়ে গেলেন।

‘দিব্যেন্দু রায়। স্যার ডাকছেন।’

পিওন ডেকে গেল। দিব্যেন্দু দুরুদুরু বুকে সাহেবের চেম্বারে প্রবেশ করল।

‘বোসো রায়।’ সাহেব কম্পিউটার মনিটরের দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন।

দিব্যেন্দু বসল। সাহেব তার দিকে তাকালেন, ‘রায়।’

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘তোমাকে যদি বলা হয় একজন নন পারফর্মিং স্টাফকে বাদ দিতে, তুমি কাকে বাদ দেবে?’

দিব্যেন্দু সাহেবের দিকে তাকাল। সাহেব কেমন অন্যমনস্কভাবে প্রশ্নটা করলেন। উত্তরে কী বলবে সে? সাহেব কি তার নামই শুনতে চাইছেন?

সে গলা খাকড়িয়ে বলল, ‘স্যার আপনি কি আমার মুখ থেকে আমারই...’

‘যেটা প্রশ্ন করছি, শুধু সেটার উত্তর দেবে। নন পারফর্মিং স্টাফ। একজনের নাম বল।’

দিব্যেন্দু সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পালদা স্যার।’

‘কেন?’

‘ওর বয়স হয়েছে। চাপ নিতে পারছেন না, বোঝা যাচ্ছে।’

‘গুড।’

সাহেব মাথা দোলালেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘ম্যানেজমেন্ট লোক কমাতে চায় রায়। আবার কয়েকজনকে প্রমোশনও দিতে চায়।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমাকে কি বাদ দিচ্ছেন স্যার?’

সাহেব বললেন, ‘তোমার কি মনে হয় আমি এখানে বিগবসের ভোটাভুটি করতে এসেছি? তোমার থেকে একজনের নাম নেবো, আরেকজনের থেকে তোমার নাম নেবো, সারাদিন এই করে যাব?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘না মানে স্যার...সেটা ভাবিনি...’

সাহেব বললেন, ‘অ্যাকচুয়ালি এটা ভেবে থাকলে ঠিকই ভেবেছ। আমি এভাবেই করতে চাই। দেখছিলাম বিগবসের ফরম্যাটটা। চমৎকার ফরম্যাট। লোক কমাতে বলছে, লোক কমানোর কাজ, একটা মজা করে তো কমানোই যায়, কী বল?’

দিব্যেন্দু মাথা নিচু করল। সাহেব বললেন, ‘তোমার কি রাগ হচ্ছে?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘না স্যার। রাগ হচ্ছে না।’

সাহেব বললেন, ‘তাহলে তোমার ভোট পালবাবুর দিকে। তাই তো?’

দিব্যেন্দু মাথা তুলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’

সাহেব পেপারওয়েট নিয়ে খেলতে খেলতে বললেন, ‘স্কুল টিচারে অ্যাপ্লাই করনি?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘না।’

সাহেব বললেন, ‘আমার শালা পেয়েছে। শালা বলে কথা, টাকা দিতেই হল। আমি দিয়েছিলাম। এখন বলছে চাকরি থাকবে না। তোমাদের মতোই ব্যাপার, তাই না?’

দিব্যেন্দু চুপ করে রইল।

সাহেব বললেন, ‘ঠিক আছে। তুমি যাও। পালবাবুকে পাঠিয়ে দাও। দেখি কাকে ভোট দেন।’

দিব্যেন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে পালবাবুকে পাঠিয়ে দিল। এভাবে এক এক করে সবাইকেই ডাকলেন সাহেব।

দুপুর একটা নাগাদ দিব্যেন্দু জানতে পারল তাকে একজনও ভোট দেয়নি। তার চাকরিটা থাকবে।

পালবাবুর চাকরিটাই গেল। সব থেকে বেশি ভোট পেয়েছেন পালবাবু।

খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে পালবাবু বুকে হাত দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেলেন।

দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়েছে।

পালবাবুর টেবিলটা সুন্দর। বেশ ভালো লাগে তার।

দিব্যেন্দু তার ব্যাগটা পালবাবুর টেবিলের উপর রাখল। এর পর থেকে এটায় বসবে সে।

কাতলা, ভেটকি, ইলিশ, চিতল।

রুমার বাবা মাছ খেতে ভালোবাসেন বলে দিব্যেন্দু চার রকম মাছ নিয়ে এসেছিল।

রুমার মা সেটা দেখে বললেন, ‘দেখেছ? জামাইটা এতো ভালো। এই জন্যই তো আমি সব সময় বলি, তোদের মধ্যে যদি কোনও ঝামেলা হয়, আমি সব সময় জামাইয়ের দিকে থাকব। কপাল করলে এমন ছেলে পাওয়া যায়।’

রুমা আলু কাটছিল। কিছু বলল না। রুমার বাবা টিভি দেখছেন।

রুমার মা বললেন, ‘একবছর তো হল। জামাইয়ের বাড়ির লোকেরা কিছু বলে না? বাচ্চা কাচ্চা নেওয়ার ব্যাপারে?’

রুমা মাথা না তুলে বলল, ‘চুপ করো না মা। তুমি বাবার সঙ্গে টিভি দেখো গিয়ে।’

রুমার মা বললেন, ‘কেন রে? কী হয়েছে? ঠিক করে জামাইয়ের দেখাশোনা করিস তো? ঝগড়া করেছিস নাকি?’

রুমা কেঁদে ফেলল। মা ভীত গলায় বললেন, ‘কী হয়েছে?’

রুমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ও খুব মারে মা।’

মা সঙ্গে সঙ্গে রুমার কাছে এসে গলা নামিয়ে বললেন, ‘আস্তে বল। বাবা শুনতে পাবে। পাঁচ হাজার টাকা পেনশন পায়। এখনও ছোটটার বিয়ে দেওয়া বাকি। তোর কথা শুনলে তোকে নিয়ে চলে যাবে।’

রুমা বলল, ‘তাই নিয়ে যাও না। আমি না হয় কিছু একটা করে নেবো।’

মা রেগে গেলেন, ‘কী করবি তুই? কী জানিস তুই? চাকরি করবি? চাকরি আছে? রাস্তায় নামিয়ে দেবে। আর ছেলেরা ওরকম সবাই গায়ে হাত তোলে। তুই কি ভাবিস তোর ওই দেবতুল্য বাবা কোনদিন গায়ে হাত তোলেনি? হুহ্‌, কতবার মেরেছে আমায়। ও সব প্রথম প্রথম হয়। পুরুষ মানুষ শুরুতে একটু গরম দেখাবে। তারপর দেখবি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হবে। বউ ছাড়া চলবে না। তোর বাবাকে দেখিস না? আমাকে ছাড়া এখন কোথাও যাবে?’

রুমা আবার আলু কাটতে শুরু করল, ‘জানতাম তুমি এটাই বলবে। যেদিন আমি মরে যাব, সেদিন তোমাদের বুক জুড়াবে।’

রুমার মা বললেন, ‘কিচ্ছু হবে না। মেয়েদের বেড়ালের প্রাণ। ও দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। তোকেই তো মারে। তাও ঘরের ভেতরে। বাড়ির বাইরে গিয়ে কোনদিন লোকের সামনে বাজে ব্যবহার করেছে কি? করবে না। আমাদের জামাই সে ছেলেই না। কত সম্মান করে। এই তো, আমি তো শুনলাম অফিসে নাকি ওর ভালো অবস্থা না। তাও দেখ কত বাজার করে দিয়ে গেছে। সম্মান না করলে কি ওসব হয়?’

রুমা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ও সব লোক দেখানো।’

রুমার মা রেগে গেলেন, ‘ওরে মুখপুড়ি, তুই কারো পাল্লায় পড়েছিস নাকি বল তো? আমাদের মুখে চুনকালি দিবি নাকি? শোন রুমা, আমি কিন্তু ভালোর ভালো, খারাপের খারাপ। এত বড় বাড়িতে থাকিস। ছেলের বাবা-মা নেই। গোটা বাড়িতে শাসন করিস। এখন যদি আবার ওই ছোঁড়াটাকে এখানে জুটিয়ে এনে কোনও ঝামেলা করতে দেখেছি, তাহলে তোর কপালে অশেষ দুঃখ আছে।’

রুমা বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি টিভি দেখো। তোমাকে অত ভাবতে হবে না। আমার এই পা দেখেছ? হাতুড়ি দিয়ে মেরেছে।’

রুমার মা বললেন, ‘হাতুড়ি দিয়ে মারেনি। অন্য কোনভাবে চোট পেয়েছিস। এখন আমার কাছে গল্প দিচ্ছিস। তোর ধান্দা তো আমি জানি। তোকে পেটে ধরেছি, আমি জানবো না তুই কী চাস? তুই ওই আগের রসটা ভুলতে পারিসনি। বাড়ি যাবি সব সর্বনাশ করে, তারপর ওই ছেলেটার সঙ্গে পালাবি, তাই না? এই তো তোর প্ল্যান? আমি তো জানি। শুরু থেকেই তুই এই প্ল্যান করেই চলছিস। আজকের তো গল্প না এটা। সেই কবেকার গল্প।’

রুমা ক্লান্তচোখে মা-র দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গল্প দিচ্ছি? এটা হাতুড়িতে মারা, বুঝতে পারছ না তুমি?’

রুমার মা বললেন, ‘না। কোনভাবেই হাতুড়িতে মারা না। তুই মিথ্যে কথা বলছিস। সোনার টুকরো ছেলেটার নামে কলঙ্ক দিচ্ছিস। আমি তো সব জানি। স্কুলের পেছনের মাঠে সন্ধেবেলায় তোকে ওই হারামজাদাটার সঙ্গে আমিই তো ধরেছিলাম। তুই তার শোধ নিচ্ছিস।’

রুমা কিছু বলল না আর। চুপ করে রইল।

বাড়ি-ঘর শখের জিনিস। সবার কি আর সে ভাগ্য হয়? কেউ অনেক টাকা রোজগার করে দামি বাড়ি বানিয়েও শান্তিতে থাকতে পারে না। কেউ কম টাকা রোজগার করে ভাড়ার ঝুপড়িতে থেকেও সুখী।

বাপিদা কোন ক্যাটাগরিতে পড়বে, সেটাই ভাবে পূর্ণ। জার্মানিতে তো ভালোই থাকে। আর হয়তো এ জন্মে এ দেশে ফিরবে না। একটা বিলিতি মেম বিয়ে করবে। সে মেম কাগজ দিয়ে পেছন মুছবে।

এমন লোক এ দেশে বাড়ি করে থাকতে তো পারবে না। তাহলে সুখটা কীসে? বাড়ি বানানোর সুখ? টাকা থাকলে মানুষ কত কিছু করতে পারে। বাথরুমে আবার কাচের ঘর আছে। সিনেমায় যেমন দেখায়। কাচের ঘরের ভেতর ল্যাংটা হয়ে চান করবে পাবলিক। পূর্ণ প্রথম দিনই স্নান করে দেখে নিয়েছে। গরম ঠান্ডা জিনিসটা সড়গড় হয়নি বলে ঝামেলা হয়ে গেছে। প্রথমে ঠান্ডা জলে দিব্যি শাওয়ার ছেড়ে স্নান করছিল সে। কখন গরম জলের নল চালিয়ে দিয়েছিল। গা হাত পা যেন পুড়ে গেল। ‘ওরে বাবা রে মারে’ বলে বেরিয়ে এসেছে কোনও রকমে।

বড় লোকেদের এই সমস্যা নেই। তারা জানে কোন কল দিয়ে ঠান্ডা জল বেরোবে, কোনটা দিয়ে গরম বেরোবে। পূর্ণ তো আর জানে না। চিড়বিড়ে গরম আগুন জলে স্নান করার কোনও মানে হয়?

যাই হোক, পূর্ণর সারাদিনে তেমন কাজ নেই। বাপিদার বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখে। দোতলা বাড়ি। অনেক কায়দা করে করা। সব ঘর তালা দেওয়া। বসার ঘর বাদে। তালা চাবি তার কাছেই থাকে। সব ঘরেই তালা খুলে খুলে দেখে পূর্ণ। ফ্যান চালিয়ে নরম বিছানায় ছাদের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে। এত সুখ কি সইবে? সইবে না। তার পোড়া কপালে এত সুখ বেশিদিন সইবে না, পূর্ণ ঠিকই বোঝে।

বাপিদা পড়াশুনায় বিরাট কিছু ভালো ছিল না। হঠাৎ করেই চাকরি পেয়ে চলে গেল। তারপর এসব অশৈলী কাণ্ডকারখানা হল। এত বড় বাড়ি করল। পাড়ার সবাই দেখল। বাইরে গেলেই নাকি টাকা। এ পোড়া দেশে টাকা কোথায়? টাকার নামগন্ধ নেই। শুধু ঝামেলা। পূর্ণ ক’টা দিন টোটো চালিয়ে দেখেছে। অনেক ঝামেলা। লাইনে সবাই টোটো চালায়। এলাকায় চড়ার লোকের থেকে এখন চালানোর লোক বেশি। শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই হয় টোটো চালায়, নয় খাবার ডেলিভারি দেয়। তার থেকে বাপিদার চাকরিটাই ভালো। দিব্যি চাকরি। এক বছর এ বাড়িতে টিকে গেলে কি বাপিদা তাড়িয়ে দেবে? সামনে থাকলে তো পায়ে পড়ে যেত! নাহ, এসব নিয়ে বেশি ভাববে না সে।

তিনতলায় একটা ছোট ঠাকুর ঘর আছে। পূর্ণ ঠাকুরঘরের তালাও খুলল।

বড় লোকদের লক্ষ্মী ঠাকুর? এই ঠাকুর কি তার ঘরে থাকেন না? বাপিদাদের জন্য কি আলাদা ঠাকুর আছে? কে জানে!

ভারি মিষ্টি মুখখানা। পূর্ণ কিছুক্ষণ ঠাকুরের সামনে বসে থাকল। ভালো লাগে তার। তাও তো কারো সামনে ভক্তিভরে বসে থাকা যায়। বাপিদার কঠিন নির্দেশ আছে এ বাড়িতে কাউকে ঢোকানো যাবে না। একা থাকতে হবে তাকে। প্রণাম সেরে পূর্ণ উঠতে গিয়ে দেখল ঠাকুর আসনের পাশে স্টিলের আলমারি রাখা। কী আছে এতে? চাবির থোকা থেকে চাবি বের করে চেষ্টা শুরু করল। না। একটাতেও খুলছে না।

ঠাকুর ঘরের বাসনকোসনই থাকবে। ধুস, অত দেখার কী আছে? তারও আজকাল সব কিছুতে বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।

চাবিগুলো আবার পকেটে নিয়ে ঠাকুরঘর থেকে বেরোতে গিয়ে চোখ পড়ল আসনের ড্রয়ার আছে। ঠিক তো। এটা চোখে পড়েনি।

সে বসল। ড্রয়ার ঘাঁটতে ড্রয়ারের ভেতরেই আরেকটা গোপন কুঠুরি খুঁজে পেল। অন্য কেউ হলে পেতো না। পূর্ণ পেল। কিছুদিন একটা ফার্নিচারের দোকানে কাজ করেছিল।

ওই কুঠুরি খুলতেই আলমারির চাবি পাওয়া গেল।

পূর্ণ থম মেরে কিছুক্ষণ বসে রইল। পরের বাড়ি তাকে দেখাশুনা করতে দিয়ে গেছে, বিশ্বাস করেই তো। এটা কি ধর্মে সইবে?

পরমুহূর্তে মনে হল, দেখতে কী হয়? দেখে শুনে আবার না হয় যেখানকার চাবি সেখানে রেখে দেবে?

দ্বিতীয় যুক্তিটা জিতে গেল। কিন্তু তাতেও বাধা এসে গেল। চাবিটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে যেতেই ফোনটা আবার বাজতে শুরু করল।

‘ধুত্তোর’ বলে ফোন ধরল সে, ‘হ্যালো।’

‘হ্যালো, প্রত্যুষদা...হ্যালো...প্লিজ শোন। আমি জানি এটা তুমিই। আমাকে বাঁচাও। আমাকে মেরে ফেলবে। বিশ্বাস কর, আমি বাঁচব না। ও আমাকে মেরে ফেলবে। আমার মাকে তো তুমি চেনো বল। আমি মেয়ে তো, মেয়ে সন্তানদের বিন্দুমাত্র দাম নেই, শুনতে পাচ্ছো?’

‘আরে আপনাকে বললাম না, এটা নতুন নাম্বার! কী আজে বাজে ফোন করে যাচ্ছেন বলুন তো?’

‘আপনি ফোন চুরি করেছেন। তাই না? প্রত্যুষদার ফোনটা আপনি চুরি করেছেন।’

‘তুই চোর। তোর বাপ চোর। তোর চোদ্দ গুষ্টি চোর।’

পূর্ণ চিৎকার করে উঠল।

‘শুনুন না, আমার ভারি বিপদ, যার ফোন, তাকে একটু দেখুন না দেওয়া যায় নাকি?’

‘কারো ফোন না। এটা আমার ফোন।’

‘আপনার ফোন? তা কী করে হয়? এটা কোথায়?’

‘এটা তোমার মুন্ডু।’ রেগেমেগে ফোন কেটে চাবিটা আবার ড্রয়ারেই রেখে দিল পূর্ণ। কাজে যখন বাধা এসেছে, তখন সে কাজ না করাই ভালো।

১০

কামরায় উঠে দিব্যেন্দু দেখল তাপস মুখ চুন করে বসে আছে। কামরুল শাফল করছে।

দিব্যেন্দু বলল, ‘কী হল তোমার? মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেউ পেছন ভিজিয়ে চলে গেছে।’

তাপস রেগে গিয়ে বলল, ‘ওরে বাঙাল, আমার কী হয়েছে, সেটা বললে তুই বুঝবি? তোর সে বুদ্ধি আছে?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘বোলো না। কে বলতে বলেছে?’

কামরুল বলল, ‘দাদার পকেটে পঞ্চাশটাকা ছিল। কে ভিড়ের মধ্যে তুলে নিয়েছে।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘চিনি কেনার টাকা নাকি? মাংসে দিতে?’

তাপস জ্বলন্ত চোখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চিনি কতটা সায়েন্টিফিক জানিস? রান্নায় মাপমত দিলে চিনি অনেক কাজে দেয়।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘হাফ চামচটাকে মাপ মতো বলে। চার কাপকে না।’

তাপস বলল, ‘কী রে বাঙাল, আজ এত বুলি ফুটছে কেন? সুখবর আছে নাকি? বউ কি বাচ্চা বিয়োবে?’

দিব্যেন্দু দাঁত বের করল, ‘প্রমোশন হয়েছে।’

কামরুল বলল, ‘মিষ্টি ছাড়া চলে এলে? খাওয়াবে না?’

তাপস বলল, ‘সেই তো! বাঙালরা তো আমাদের মতো কিপটে হয় না। তুই মিষ্টি আনলি না?’

ট্রেন ছেড়েছে। অন্য সিটে যারা তাস খেলছিল, তারাও দিব্যেন্দুর খবরটা শুনে হই হই করে উঠল। শোনপাপড়ি উঠেছিল। তাই খাওয়াতে হল।

তাপস ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আজ যা ওয়েদার আছে, তার উপর এই সুখবর, বাঙাল আজ বাড়িতে কাঁটাতার পার করে দেবে।’

বিচ্ছিরিভাবে হাসল তাপস।

দিব্যেন্দু তাসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যারা নিজেরা পারে না, তারা লোকের কাজকর্ম নিয়ে ফ্যান্টাসাইজ করে। চিনি খেয়ে খেয়ে তোমার শক্ত হয় না।’

তাপস রেগে গেল, ‘বার বার চিনিকে অ্যাটাক করবি না।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘তুমি যখন অ্যাটাক কর, তখন কোনটা ছেড়ে দাও?’

তাপস সুর করে বলল, ‘ওরে বাঙাল, বুঝেছি। প্রমোশনের গরম মাড়াচ্ছিস তাই না? কত মাইনে বেড়েছে তোর?’

দিব্যেন্দু গোটা রাস্তা ফিক ফিক করে হাসতে থাকল। অন্যান্যদিন তাপস গরম নেয়। আজ কিছুতেই আপার হ্যান্ড নিতে পারল না। স্টেশন নেমেই অবশ্য বেগ পেয়ে গেল। ঝড়ের গতিতে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি এসে শ্বশুরের সামনেই জামা প্যান্ট খুলে বাথরুমে ঢুকে গেল।

রুমা চা বসাল। রুমার মা ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ‘ছেলেটা এতটা রাস্তা তেতেপুড়ে এলো, কিছু খেতে দিবি না?’

রুমা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘মুড়ি দেব একটু পরে। ভেবো না। ও ঠিকই চেয়ে খেতে পারে।’

মা রেগে গেল, ‘এই জন্যই তো এত ঝামেলা হয়। কখন কোনটা দরকার বুঝিস না? তোকেই তো দেখতে হবে।’

রুমা বলল, ‘কেন? খিদমৎ খাটার জন্য বিয়ে দিয়েছো নাকি?’

মা বলল, ‘শোন রুমা, যদি তুই এরকম চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলিস, আমি কিন্তু জামাইকে বলে দেব তুই মাঠে প্রত্যুষের সঙ্গে কী করছিলিস। বলব দেখবি?’

রুমা বলল, ‘বলে দাও। গলা নামিয়ে কথা বলছ কেন? গলা তুলেই বল। তোমরা সবাই মিলে আমাকে একবারে ফ্যানের সঙ্গেই ঝুলিয়ে দাও না, তাহলেই তো বেঁচে যাই।’

মা রাগী চোখে তার দিকে তাকিয়ে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

দিব্যেন্দু বাথরুম থেকে স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে বেরিয়ে ঘরে গিয়ে রুমাকে ডাকল। ‘এদিকে এসো।’

রুমা ভাবলেশহীন মুখে বেডরুমে ঢুকল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘দরজা বন্ধ কর।’

রুমা বলল, ‘বাবা-মা আছে। এখন বন্ধ করলে খারাপ দেখাবে।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘খারাপ দেখাবে কেন? খাট কিনে দিয়েছে শ্বশুর-শাশুড়ি, ওরা জানে না মেয়ে-জামাই কী করবে?’

রুমা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার পা কাঁপছে।

দিব্যেন্দু বলল, ‘দরজা বন্ধ না করলে এখানেই শাড়ি খুলে দেব। ভালো লাগবে সেটা?’

রুমা সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ করে দিল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘কাছে এসো।’

রুমা কাছে গেল।

দিব্যেন্দু অফিসের ব্যাগ থেকে একটা ছোট গয়নার বাক্স বের করে বলল, ‘কানের দুল। পরে নাও।’

রুমা অবাক হয়ে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে রইল।

১১

‘যাও। বাবা-মাকে দেখিয়ে এসো।’

রুমা কানের দুল পরে চুপ করে বসে আছে। দিব্যেন্দুর কথা শুনে উঠে দাঁড়াল।

দিব্যেন্দু ডাকল, ‘শোনো।’

রুমা দাঁড়িয়ে পড়ল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘এবার একটা বাচ্চা নিতে হবে। লোকে জিগ্যেস করছে। এক বছর তো হল।’

রুমা কিছু বলল না।

দিব্যেন্দু বলল, ‘কীরে? কথা বলছিস না কেন? অন্য প্ল্যান আছে নাকি? ছেলেটাকে ডাকব? ল্যাঙটো হয়ে ওর সঙ্গে শুয়ে থাকবি?’

রুমা দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একা একা বাচ্চা নেওয়া যায় কি?’

দিব্যেন্দু স্থিরচোখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চেষ্টা করছি। দেখছি কী করা যায়। ডাক্তার দেখাব। তুই তাই বলে অন্য লোকের সঙ্গে শোয়ার তাল করবি?’

রুমা বলল, ‘মাকে দেখিয়ে আসি।’

দিব্যেন্দু রুমার চুল ধরে তাকে কাছে আনল। রুমা শব্দ করল না। দিব্যেন্দু বলল, ‘মা বাবাকে বলেছিস আমি পারি না?’

রুমা মাথা নাড়ল। দিব্যেন্দু বলল, ‘বললে এখানেই পুঁতে রেখে দেব।’

চুল ছেড়ে দিল সে। রুমা ঘর থেকে বেরোল। মা-বাবা টিভি দেখছিল। রুমা মাকে বলল, ‘এই যে, ও দিয়েছে।’

মা সেটা দেখে খুশি হয়ে বলল, ‘কী ভালো। আমি বলি না। আমাদের জামাই সোনার টুকরো।’

দিব্যেন্দু ঢুকল। মাটিতে শুয়ে পড়ে শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম করল। রুমার মা আপ্লুত হয়ে গেল, ‘এ কী বাবা! থাক থাক। এরকম করলে খুব লজ্জা লাগে।’

দিব্যেন্দু প্রণাম সেরে মাটিতে বসে বলল, ‘মা-বাবা ভগবানের রূপ। প্রণাম তো করতেই হবে। আমার নিজের বাবা-মা নেই। আপনারাই আমার বাবা-মা। কেমন আছেন আপনারা?’

রুমার মা বলল, ‘ভালো আছি বাবা।’

রুমার বাবা বলল, ‘অফিসে সব ঠিক ঠাক তো?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ। এই তো, আজ প্রমোশন পেলাম। কঠিন পরীক্ষা ছিল। আমি চেষ্টা করেছিলাম। অনেক পড়াশুনা করতে হয়েছিল। ভেবেছিলাম পেয়ে যাব। তাই হয়েছে। মাইনে বাড়ল। এখন অনেক দায়িত্ব এসে পড়েছে। আচ্ছা, আমি রুমাকে টাকা দিয়ে যাচ্ছি। আপনারা কাল বাজারে গিয়ে পুজোর বাজার করে নেবেন। আমিই নিয়ে আসতাম। কিন্তু তাহলে আপনারা পছন্দ করে কিনতে পারবেন না।’

রুমার মা লজ্জায় পড়ে গেল, ‘এমা বাবা, আবার এসব কেন?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আবার আমাকে আপনি এরকম বলছেন? আমার বাবা-মা থাকলে কি এরকম বলতো? এগুলো তো আমার কর্তব্য।’

রুমার মা বলল, ‘আমি সবাইকে বলি। আমার জামাইকে দেখে শেখা উচিত। এত ভালো একটা ছেলে।’

দিব্যেন্দু উঠে দাঁড়াল, ‘আপনারা টিভি দেখুন। আমি ও ঘরে...’

রুমার মা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘কিছু খাবে বাবা? করে দেব?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আপনার সেই ঝিঙে দিয়ে রুই মাছের ঝোলটা খেতে ইচ্ছে করছে মা। সময় পেলে একটু করে খাওয়াবেন?’

রুমার মা বলল, ‘নিশ্চয়ই। এ আবার কী কথা? আমি এখনই করে দিচ্ছি।’

দিব্যেন্দু ঘর থেকে বেরোতেই রুমার মা বলল, ‘দেখেছিস? এরকম ছেলে পাবি আজকালকার দিনে? তোর তাতেও মন ভরে না। আর কী করতে হবে ওকে? ঠিক আর কী করলে তোর মন পাওয়া যাবে বলতে পারিস?’

রুমার বাবা ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’

রুমার মা বলল, ‘ও কিছু না। তুমি টিভি দেখো। এই, তুই রান্না ঘরে আয়।’

রুমার মা রুমাকে নিয়ে রান্নাঘরে গেল। বলল, ‘শোন, আমি তোকে ভালো করে বোঝাই। মেয়েরা হচ্ছে ঘরের লক্ষ্মী। পুরুষ মানুষ বাইরে থেকে কাজ করে আসে। তেতেপুড়ে কত কষ্ট করে রোজগার করে। ঘরে এসে সব সময় তাদের মাথা ঠান্ডা নাও থাকতে পারে। তার জন্য তুই যেভাবে জামাইয়ের নামে মিথ্যে কথা বলে যাচ্ছিস, সেটা কি ঠিক? এমন সোনার টুকরো ছেলে পাবি আজকালকার দিনে?’

রুমা মা’র দিকে তাকিয়ে রইল।

মা বলল, ‘দেরি করবি না। একটা বাচ্চা নিয়ে নে। দেখবি সব ঝামেলা ঠিক হয়ে যাবে। সব সংসারেই এরকম সমস্যা শুরুর দিকে হয়। একটা বাচ্চা এলে তখন দেখবি ধীরে ধীরে আর ঝামেলা হবে না। তুই হবার আগে তোর বাবা আমাকে কম মেরেছে? আমার এই হাতের কালো দাগটা দেখ। মেরে কালশিটে ফেলে দিয়েছিল। তাতে কি আমি ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেছিলাম? তোদের সহ্যশক্তি এত কম, উফ!’

রুমা ক্লান্ত গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। বুঝেছি। বার বার এক কথা বলতে হবে না।’

দিব্যেন্দুর গলা ভেসে এলো, ‘রুমা একবার শোনো।’

মা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘যা যা। জামাই ডেকেছে।’

রুমা ঘরে গেল।

দিব্যেন্দু দরজা বন্ধ করে রুমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এস, চেষ্টা করি। একটা ওষুধ খেয়েছি।’

রুমা দাঁড়িয়ে পড়ল।

দিব্যেন্দু রুমার শরীর খাবলাতে শুরু করল।

১২

পাশের বাড়িতে পিউদিকে পড়াতে আসত প্রত্যুষদা। সেভাবে দেখেনি কোনও দিন। ক্রিসমাসের মেলা বসেছিল বড় মাঠে। সেখানেই হঠাৎ করে দুজনে মুখোমুখি হয়ে গেছিল।

রুমা চোখ সরায়নি। কেমন যেন ভালো লেগে গিয়েছিল প্রত্যুষদাকে। সে কথা বলেছিল নিজে থেকেই, ‘আমি একা চলে এসেছি। বাড়িতে বলিনি।’

প্রত্যুষদা বলেছিল, ‘সে কী? তোমার বাড়ি থেকে চিন্তা করবে না?’

রুমা বলল, ‘সন্ধে সাতটার আগে ফিরলে করবে না।’

প্রত্যুষদা বলেছিল, ‘চল। আমি তোমাকে বাড়ি দিয়ে আসি।’

সেই শুরু। রাস্তা দিয়ে সে আগে যাচ্ছে। একটু দূরত্বে প্রত্যুষদা। কী অদ্ভুত একটা অনুভূতি।

বাড়ি ফেরার পর রাতে অনেকক্ষণ জেগে ছিল।

পরের দিন প্রত্যুষদার সাইকেলটা দেখে গুটি গুটি পায়ে বাড়ির বাইরে গিয়ে বসেছিল। পড়িয়ে বেরনোর সময় প্রত্যুষদা একটু হাসল। রুমা সেটুকুতেই একবারে ক্লিন বোল্ড। ধীরে ধীরে সকলের অলক্ষ্যে একটু একটু করে জমাট বাঁধতে শুরু করল তাদের গল্পটা।

মেলা শেষের মাস খানেক পরে ওই মাঠেই দেখা করেছিল তারা। প্রত্যুষ জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। সেই প্রথম।

পাড়ার ভজা তাদের ফলো করেছিল। সেই মাকে নিয়ে এসেছিল...

দিব্যেন্দু মোবাইল ঘাঁটছে। রুমা চুপ করে শুয়ে আছে। দিব্যেন্দু আলো নিভিয়ে রুমাকে বলল, ‘মা-বাবা জানে তোমার কেসটা?’

রুমা উত্তর দিল না।

দিব্যেন্দু জোরে রুমার পিঠে চিমটি কাটল।

রুমা বলল, ‘না।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘বলা উচিত। বাড়ির মেয়ে বাইরে প্রেম করে বেড়িয়েছে, বাবা-মার জানা উচিত না?’

রুমা বলল, ‘তুমি জানো তো। তাহলেই হবে।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি জানি? কোথায় আর জানি? একদিন সামনা-সামনি কথা বলব। দেখব কেমন তোমার হিরো।’

রুমা চুপ করে রইল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘কী কী করেছ? কতটা? যেরকম পানুতে দেখায়, সব?’

রুমা ক্লান্ত গলায় বলল, ‘তোমাকে বলেছি তো ওসব হয়নি।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘হলেও বলবে নাকি? তুমি খুব চালাক। হলেও বলবে না।’

রুমা বলল, ‘বলব না কেন? তুমি কম মেরেছ আমায়? মার না খাওয়ার জন্য হলেও কিছু করলে বলে দিতাম।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘তোমার গরম লাগছে না?’

রুমা বলল, ‘না।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমার লাগছে। কাপড়-চোপড় খুলে শোও।’

রুমা বলল, ‘তোমার লাগছে যখন তুমি খুলে শোও।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি বলছি তো। আমরা চেষ্টা করতে পারি। সবাই বলছে বাচ্চা হওয়া দরকার।’

রুমা বলল, ‘তুমি ডাক্তার দেখাও।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘তোমার ইচ্ছা করে খুব, তাই না? আমি যখন বাড়ি থাকি না, কার সঙ্গে ইচ্ছে মেটাও?’

রুমা বলল, ‘তুমি তো সিসিটিভি বসিয়েছ। কেন জিগ্যেস করছ? কেন বার বার একই কথা বলছ?’

দিব্যেন্দু উঠে বসল। রুমার পিঠে খুব জোরে একটা কিল মেরে বলল, ‘বেশ করেছি। আমি জানি তুই কী করে বেড়াস। বাড়ি থেকে কী করে এসেছিস, আমি ডেকে তুলব তোর বাপকে? গিয়ে বলব?’

রুমার দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। সে উঠে বসে শ্বাস নিতে চেষ্টা করল। দিব্যেন্দু বলল, ‘নাটক শুরু করে দিয়েছিস? তোর জন্য কানের দুল আনলাম আর তুই নাটক করছিস এখন?’

রুমা কোনমতে বলল, ‘আমি কি আনতে বলেছিলাম তোমায়?’

দিব্যেন্দু হঠাৎ ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল। রুমা বুঝল বাজে কোনও কথা বলবে। দিবেন্দু তাইই বলল, ‘শোন না। তোর বাবা-মা ওই ঘরে কী করছে এখন?’

রুমা বলল, ‘জানি না।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি তো চাইলেই জানতে পারব। দেখবি?’

রুমার গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল। সে বলল, ‘কী করে?’

দিব্যেন্দু ফোন বের করে দেখাল। ফিসফিস করে বলল, ‘ওই ঘরে স্পাই ক্যামেরা আছে দেখ। এই দেখ তোর বাবার গায়ে তোর মা পা তুলে দিয়েছে।’

রুমার বমি পাচ্ছিল। শরীর জুড়ে প্রবল অস্বস্তি শুরু হল। চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো হতো হয়তো এখন...

১৩

গলিটার উল্টোদিকের চায়ের দোকানে চুপ করে বসে ছিল সুখেন। দুটো ছেলে কথা বলছে। সুখেন সেটাই শুনছে। একটা ছেলে বলল, ‘তুই ঠিক জানিস?’

অপরজন উত্তরে বলল, ‘হ্যাঁ। আমি ঠিক জানি। ওই পায়েলের সুগার ড্যাডি আছে। আমি ওকে গাড়ি থেকে নামাতে দেখেছি।’

বলে দুজনেই খিক খিক করে হাসল। প্রথমজন বলল, ‘ওই বুড়োটা পারে?’

‘পায়েলকে জিগ্যেস করব।’

কিছুক্ষণ হেসে দুজনেই চুপ করে গেল। চা শেষ করে প্রথমজন বলল, ‘এ ভাই। আজকের দিনটা ছেড়ে দে। এখানে শুনেছি গুন্ডা থাকে।’

দ্বিতীয়জন অভয় দিল, ‘আমি আছি তো। তুই আমার সঙ্গে থাকবি।’

সুখেন এবার ঘাড় ঘুরিয়ে দুজনের দিকে তাকাল। দুজনে তার ঘাড় ঘোরানো দেখে খানিকটা চমকাল।

সুখেন বলল, ‘বাজেট?’

দুজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। দ্বিতীয়জন বলল, ‘হাজার।’

সুখেন বলল, ‘আসুন।’

প্রথম জন ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘আজ থাক। আমি বাড়ি যাব।’

সুখেন বলল, ‘দেখুন, আমি থাকলে আপনাদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না। তাছাড়া গ্রাম থেকে নতুন প্রোডাক্ট এসেছে। খারাপ লাগবে না। চলুন।’

দ্বিতীয়জন প্রথমজনকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে। রাস্তা পার হয়ে সুখেন অভ্যস্ত ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে পাপিয়ার ঘরে গিয়ে নক করল।

দরজা খুলে গেল। পাপিয়া বেরিয়ে এসেছে। সুখেন ছেলে দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যান। দরকার হলে আমার নাম্বার রেখে দিন। সমস্যা হলে ফোন করবেন।’

দ্বিতীয় ছেলেটা সুখেনের নাম্বার নিয়ে প্রথমজনকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। পাপিয়া ঘরের ভিতরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল, ‘ফুলি, দেখ তো।’

ফুলি এলে পাপিয়া সুখেনের দিকে ঘুরে বলল, ‘দুশো নিস না। দুশো বড় বেশি। এত কমিশন নিস তুই!’

সুখেন বলল, ‘চলে এই টাকায়? তুই বল।’

পাপিয়া ব্লাউজের ভেতর থেকে দুটো একশো টাকার নোট বের করে সুখেনের হাতে দিয়ে বলল, ‘ভুল কিছু বলিসনি। ঠিকই। এই টাকায় চলে না।’

সুখেন বিড়ি ধরিয়ে বলল, ‘লকডাউনের পর থেকে ব্যবসা খুব মন্দা যাচ্ছে। লোকে নাকি কী সব পুতুল বের করেছে। সেসব দিয়েই কাজ হয়ে যাবে।’

পাপিয়া ফ্যাকাসে মুখে বলল, ‘আমিও শুনেছি। মোবাইলে দেখলাম। হ্যাঁরে, এর পরে আমাদের কী হবে রে?’

সুখেন বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘জানি না। মাঝে মাঝে মনে হয় বাসের তলায় মাথা দিয়ে দি। এভাবে দালালি করে চলে না। লটারি বেচবো ঠিক করলাম, ছেলেগুলো এমন তাড়া দিল, হল না। বাবা কত করে বলল পড়াশুনাটা ছাড়িস না। তখন শুনলাম না। এখন এই দশা।’

পাপিয়া বলল, ‘এসব বলা পাপ। বলিস না। তুই না থাকলে আমাদের কী হবে?’

সুখেন শ্বাস ছাড়ল। গলির বাইরে সাহেবের গাড়ি দাঁড়িয়েছে। পাপিয়া বলল, ‘কদিন ধরে সাহেব আসছে, লক্ষ্য করেছিস?’

সুখেন বলল, ‘হ্যাঁ। দেখেছি। নতুন মেয়ে আনবে শুনছিলাম তো।’

পাপিয়া গলা নামিয়ে বলল, ‘তেরো বছরের দুটো মেয়ে নিয়ে এসেছিল। কার থেকে এনেছিল কে জানে। সারাদিন কাঁদছে।’

সুখেন বলল, ‘গরীবের মেয়ে। বিক্রি করে দিয়েছে। সাহেবের আসার অন্য কারণ আছে। আমি শুনেছি, সাহেব নাকি বলেছে মাসোহারা বাড়াতে হবে। এত কম টাকায় তোদের সিকিউরিটি দেওয়া যাচ্ছে না।’

পাপিয়া হতাশ চোখে বলল, ‘আমিও শুনেছি সে কথা। সব কিছুর দাম বাড়ছে। আমাদেরই বাড়ছে না।’

একটা লোক গলিতে ঢুকল। সুখেন সচকিত হল, ‘দাঁড়া তো, এ লোকটা অনেক দিন পরে এসেছে। দেখি কী করে।’

পাপিয়া কিছু বলার আগেই সুখেন হাঁটতে শুরু করল। লোকটা ফোন করছে, সুখেন সেটাই শুনতে চেষ্টা করল। লোকটা বলছে, ‘হ্যাঁ, কাল সিসিটিভি লাগবে। লোক যাবে। আমি বলে দিয়েছি। তুমি সব ঘরে ক্যামেরা লাগানোর কথা বলে দেবে। হ্যাঁ, ও আমি বুঝে নেবো। টাকা পাঠিয়ে দেব। কী? জার্মানি থেকে টাকা পাঠানো সমস্যা? ও আমি বুঝব। টাকা পেয়ে যাবে। ঠিক আছে, রাখছি...না, দেশে ফেরার চান্স নেই এখন...ঠিক আছে। ঠিক আছে।’

লোকটা গলা নামিয়ে কথা বললেও সুখেন ঠিকই সব শুনতে পেল। কাকে আবার ঢপ মেরেছে মালটা, দেশের বাইরে থাকে নাকি! কী যা তা!

লোকটার পেছনে এসে ফিসফিস করে বলল সে, ‘স্যার, কলেজ গার্ল?’

লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ে রুমাল দিয়ে কপাল মুছে বলল, ‘একটা ঘর পাচ্ছি না। দালাল তো? শমিতার ঘরে নিয়ে চল তো। পাঁচশো দেব ঠিক ঘরে নিয়ে গেলে। আমার সঙ্গে চালাকি কোরো না, পুরোনো লোক, তুলে নিয়ে এমন গুঁতবো বাপের নাম ভুলে যাবে। চল দেখি।’

১৪

ঘরে ঘরে ক্যামেরা লাগছে। পূর্ণ তদারকি করছে।

বাপিদা ছেলে পাঠিয়েছে। টাকা দিয়ে দিয়েছে। তার কাজ দেখে নেওয়া।

কিন্তু কাজ পুরো হল না। মইয়ে চড়ে যে ছেলেটা ক্যামেরা লাগাচ্ছিল, আচমকা মই ভেঙে পড়ে গেল। মই যে ভাঙতে পারে, পূর্ণ ভাবতে পারেনি। কোনমতে ধরে তুলে পাড়ার লোক ডেকে ছেলেটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল।

বাপিদাকে ফোনে জানাতে বাপিদা বলল, ‘কী করছিলে তুমি? দেখোনি?’

পূর্ণ বলল, ‘আমি কী করব? আমি তো কাজ দেখছিলাম। মই ভেঙে পড়ে যাবে, তুমি কখনও দেখেছ?’

বাপিদা বলল, ‘পাড়ার লোককেও বাড়ির মধ্যে ঢুকিয়েছ?’

পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ। কী করব? না ঢুকলে অত বড় চেহারার ছেলেটাকে কী করে নিয়ে আসতাম?’

বাপিদা বলল, ‘তাও ঠিক। তুমি বাড়ি যাও। আমি ছেলেটার কোম্পানিতে ফোন করে দিচ্ছি। ওরা সামলে নেবে।’

পূর্ণ বলল, ‘ঠিক আছে। তাই হবে।’

হাসপাতালে ছেলেটাকে রেখে আবার ফিরে এল পূর্ণ।

তার কপালেই এসব হয়। কত ছেলে এসি লাগাচ্ছে, কতজন ফ্যান লাগাচ্ছে, বড় বড় বিল্ডিংয়ে উঠে কতজন আবার রঙ করছে ঝুলে ঝুলে, তাদের কিছু হল না, এ বাড়িতেই এসব হতে হল। মানে অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়। একেই বলে কপাল।

ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল সে। বাপিদা নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করবে। আবার কিছু না কিছু করে ক্যামেরা লাগবে। লেগে যাক বাবা। যদি এত করে ক্যামেরা লাগাতে চায়, তার কী যায় আসে। যার মাছ, সে যেদিক দিয়ে খুশি কাটুক।

আবার সেই নাম্বার থেকে ফোন আসছে। পূর্ণ ধরল, ‘আবার আপনি ফোন করেছেন?’

‘শুনুন না। আপনি সত্যি বলছেন আপনি এই সিমটা তুলেছেন?’

‘হ্যাঁ। মিথ্যা বলব কেন? আমি মিথ্যা বলি না। মিথ্যা বলার দরকার পড়ে না।’

‘আপনি একটু দোকানে জিগ্যেস করে দেখবেন কার সিম দিয়েছে?’

‘দোকানে? হ্যাঁ জিগ্যেস করেছিলাম তো।’

‘কী বলল?’

‘বলেছে অনেকে এরকম সিম রাখে। রিচারজ না করলে সে সিম আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানি সেই নাম্বার আরেকজনকে দিয়ে দেয়। আপনি যাকে খুঁজছেন, তিনি সেই নাম্বার আর রিচারজ করেননি বলেই আমার কাছে এসেছে এই সিমটা।’

‘ও। তাহলে কী হবে?’

‘কী হবে? আপনি কাকে চাইছিলেন বলুন। আমি যোগাযোগ করে দেখব?’

‘কুমুদপুরে। প্রত্যুষ হালদার। কিন্তু প্রত্যুষদা আর কুমুদপুরে থাকে না।’

‘কোথায় থাকে?’

‘আমাদের এলাকা থেকে ওকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।’

‘কেন? চোর-ডাকাত ছিল নাকি?’

‘না। তা ছিল না।’

‘তবে?’

‘আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।’

‘ও তাই বলুন। তাকেই আর পাচ্ছেন না, তাই তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘কেন খুঁজছেন তাকে?’

‘আমার বর আমাকে খুব মারে। আমার বাড়ির লোকও আমার বরের সঙ্গে আছে। আমি প্রত্যুষদাকে খুঁজছি। ওকে খুঁজে পেলে পালাবো। আমি আর পারছি না বিশ্বাস করুন। রোজ মারে আমাকে। অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে আছি।’

‘আপনি পুলিশকে জানান।’

‘কী হবে? পুলিশ আমার কী করবে? সেই তো একটা হোমে দেবে। আমি কী করব সেখানে? আমার বাবা-মা বেঁচে আছে। তারা আমার কথা বিশ্বাস করছে না। অন্য লোকে কেন করবে?’

‘দেখুন আমি বোকা সোকা মানুষ। তার উপর অন্য লোকের বাড়িতে থাকি। আমি কী করে বুঝব বলুন তো?’

‘আমি আর পারছি না।’

ওপাশ থেকে মেয়েটা কাঁদতে শুরু করল। পূর্ণ চুপ করে শুনল। তার খারাপ লাগছে। কিন্তু সে কী করবে? সে নিজেই তো অন্য লোকের ভরসায় থাকে। তার অত বুদ্ধিও নেই।

বাপিদা আবার ফোন করছে। সে ধরল, ‘বল।’

‘ফোন বিজি কেন তোমার? কার সঙ্গে কথা বলছিলে?’

‘আরে আর বল কেন? একটা মেয়েকে ওর বর খুব মারে। আমাকে ফোন করে নালিশ করছিল।’

দাঁত বের করল পূর্ণ।

বাপিদা বলল, ‘তাই? দাও তো আমাকে নাম্বারটা!’

১৫

ফোনটা নিয়ে ঠাকুরঘরে চুপচাপ বসে আছে রুমা। ঠাকুরঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে রেখেছে। মাকে বলেছে পাঁচালি পড়বে।

দিব্যেন্দু অফিসে গেছে।

বুকটা কেমন ঢিব ঢিব করছে।

কয়েক মিনিট আগে একটা নাম্বার থেকে ফোন এসেছিল। সে ধরতে ও পাশ থেকে একজনের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘আমি শুনলাম আপনার বর আপনাকে মারে?’

রুমা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘কে বলছেন আপনি?’

‘আমি কে, তা জানার দরকার নেই। আপনি আমাকে শুধু বলুন, আপনার জীবন কি খুব খারাপ হয়ে গেছে?’

রুমা সতর্ক হল। দিব্যেন্দুই কাউকে দিয়ে ফোন করাতে পারে। সে বলল, ‘রঙ নাম্বার।’

‘শুনুন, শুনুন। কাটবেন না। আমার কথা শুনুন। আপনি একজনকে ফোন করেছিলেন তো? আপনি কাউকে একটা খুঁজছিলেন। সিম নিয়েছে নতুন? তাই তো?’

রুমা এবার নিশ্চিত হল। বলল, ‘আপনি কে বলছেন?’

‘আমি কে বলছি তা জানার দরকার নেই। এটা বলতে পারি যে, আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি। আপনি কি বাড়ি ছেড়ে পালাতে চান? একটা নিশ্চিন্ত জীবন পেতে চান?’

রুমা ফোন কেটে দিল। লোকটার কথাগুলো কেমন টেলি কলারের মতো শোনাচ্ছে।

লোকটা আবার ফোন করছে। রুমা ধরল না। লোকটা হাল ছাড়েনি। চেষ্টা করেই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে ধরল রুমা, ‘আপনাকে আমি চিনি না। আপনি আমাকে বার বার ফোন করবেন না।’

‘শুনুন ম্যাম, আপনাকে আমি হেল্প করতে পারি। আপনি জীবন থেকে কী চান? একটু শান্তি তো? আমি দেব।’

‘মানে? কেন দিতে যাবেন অজানা অচেনা কাউকে?’

‘কারণ আপনি একজন মানুষ। আমাদের কাছে একজন মানুষও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ ব্যাপারটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা লোক জড়ো করছি। আমরা খুঁজছি, কারা আমাদের সঙ্গে জুড়তে পারে। সবাই তো আর সব কিছু ছেড়ে চলে আসার পরিস্থিতিতে থাকে না। কেউ সন্তান থাকার কারণে সব কিছু ছেড়ে আসতে পারে না। পড়ে পড়ে মার খায়। আপনার তো কেউ নেই? আছে?’

রুমা বলল, ‘না। আমার বাবা-মা থেকেও নেই। আমি শুধু মার খাই। দুবেলা ভাত খাবার জন্য আমাকে মার খেতে হয়।’

‘আপনি আপনার লোকেশনটা পাঠান। আমরা আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসব।’

‘উদ্ধার করে কোথায় নিয়ে যাবেন?’

ও প্রান্ত থেকে হাসির শব্দ এল। লোকটা হেসে বলল, ‘ভালো থাকবেন, কেউ মার খাবে না, এটুকু নিশ্চিত করতে পারি। তারপরেরটা না-হয় তার পরে দেখা যাবে?’

রুমা ফোন কেটে অফ করে রেখে দিল।

মা বাইরে ঘুর ঘুর করছে। তাকে দেখে বলল, ‘শোন, একজন ভালো ডাক্তার পাওয়া গেছে। তোর এই যে বাচ্চা হচ্ছে না, সেটার ব্যাপারে কথা বলা যাবে। ডাক্তারবাবুকে দেখা। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।’

রুমা অবাক গলায় বলল, ‘আমার বাচ্চা হচ্ছে না কে বলল তোমায়?’

মা বলল, ‘জামাইই তো বলল। তোর নাকি কী সব সমস্যা আছে?’

রুমা স্তম্ভিত হয়ে বলল, ‘আমার সমস্যা আছে? এ কথা বলল?’

মা বলল, ‘হ্যাঁ। তুই ভাবিস না। আমি কথা বলে রেখেছি। রবিবার তোকে দেখিয়ে আনবো। অনেক রকম উপায় আছে এখন।’

রুমা ঘরে এসে মাথায় হাত দিয়ে বসল। মা তার পিছন পিছন এসে বলল, ‘ছেলেটা এত ভালো। তোর জন্য সব সময় ভেবে যাচ্ছে।’

রুমা অন্যমনস্ক গলায় বলল, ‘হু।’

মা বলল, ‘কানেরটা দেখেছিস? অনেকটা সোনা দিয়ে করা। কত ভালোবাসে। আর তুই কোথাকার একটা জঞ্জালের সঙ্গে পালাবি ভেবে বসেছিলিস। ছি-ছি। কী হতো বলত? কোনও একটা বস্তিতে ঘুটে কুড়ানির কাজ করতে হতো। ভাবতেও লজ্জা লাগে। আমি তো তোর বাবাকে বলি, তোর বোনের জন্য জামাইয়ের মতো একটা ছেলে খুঁজতে হবে।’

রুমা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। হাসি পেয়ে গেল হঠাৎ করে। খিলখিল করে হেসে উঠল।

মা বলল, ‘তুই খোলা চুলে বাইরে গেছিলি না? আমি আগে থেকেই জানি, তোর উপর কিছু একটা ভর করেছে। তোকে ঝাড়াতে হবে ভালো করে। তার ব্যবস্থাও করছি।’

রুমা আরও জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে গেল একেবারে...

১৬

শমিতার ঘরটা ভেতরের দিকে। লোকটাকে সুখেন ছেড়ে দিয়ে এল দরজার সামনে। লোকটা নক করল দরজায়। শমিতা লোকটাকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দিল।

এইসব জায়গায় কাজ করতে হলে চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। সুখেনের তা বরাবর প্রখর। লোকটা শমিতার কাছে কেন এলো, তা জানার কৌতূহল হচ্ছিল তার।

বাইরে থেকে যে মেয়েগুলো আসে, তারা প্রথমে কয়েকদিন এসে শমিতার কাছে থাকে। শমিতা তাদের ট্রেনিং দেয়, কী করে খদ্দেরের সামনে দাঁড়াতে হয়, কথা বলতে হয়। এত লোক থাকতে এই লোকটা শমিতার কাছে এসেছে বলেই সুখেনের অস্বস্তি হচ্ছিল। বীথিকার ঘরটা শমিতার ঘরের কাছেই। সুখেন বীথিকার ঘরের সামনে বসল। বীথিকা তাকে দেখে বলল, ‘কী হল? এখানে কী করছিস তুই?’

সুখেন বিড়ি ধরিয়ে বলল, ‘কিছু না। লোকজন কম আসছে বলে ব্যবসা ভালো নেই।’

বীথিকা বলল, ‘ভালো হবে কী করে? কচি কচি সব ধরে আনছে কোত্থেকে। এবার আর আমাদের কেউ নেবে? আর তো কোনও কাজও জানি না ছাই।’

সুখেন বিড়িতে টান দিল। বলল, ‘অনেক লোকই আছে তোদের মতো বুড়ি পছন্দ করে। নিয়ে আসব। ভাবিস না।’

বীথিকা সুখেনকে কনুই দিয়ে ঠ্যালা দিল, ‘এই হারামজাদা। আমি বুড়ি? আমার তিরিশও হয়নি।’

সুখেন বলল, ‘তাই নাকি? জানতাম না তো?’

লোকটা বেরোল শমিতার ঘর থেকে। সুখেন বলল, ‘এই বীথিকা, দেখ তো, এ লোকটাকে চিনিস?’

বীথিকা আগেই দেখেছিল। বলল, ‘অনেক দিন আগে দেখেছিলাম। আজ এলো আবার। আমি তো ডেকেওছিলাম, শমিতা তো আমার থেকেও বুড়ি, ওর কাছে গেছিল কেন কে জানে!’

সুখেন দাঁড়াল, বলল, ‘সেই।’

লোকটা এগোচ্ছে। গলি দিয়ে সিধে হেঁটে চলেছে। সুখেন একটু দূরত্ব রেখে লোকটার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। বড় রাস্তার কাছে এসে লোকটা ঘুরে দাঁড়াল। তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকে বলল, ‘বল ভাই, কিছু জানতে চাও?’

সুখেন থতমত খেয়ে বলল, ‘না তো। আমি তো এইদিকেই আসছিলাম, খদ্দের ধরার জন্য।’

লোকটা পকেট থেকে একটা লম্বা সিগারেট বের করে ধরিয়ে বলল, ‘খদ্দের? তাই নাকি?’

সুখেনের পাড়ায় এসে সুখেনকে গরম নিচ্ছে লোকটা। কিন্তু সুখেন তাও কিছু করতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে এ লোকটার বড় কোনও জাহাজে দড়ি বাঁধা আছে। নাকি লোকটাই একটা জাহাজ? কে জানে।

সুখেন বলল, ‘হ্যাঁ। শমিতার সঙ্গে কাজ মিটেছে?’

লোকটা তার মুখে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘তা জেনে তোমার কী হবে? যত কম জানবে, তত ভালো থাকবে। বুঝেছ?’

সুখেন ভালো ছেলের মতো মাথা নাড়ল। লোকটা চলে গেলে সুখেন শমিতার ঘরে ঢুকল। শমিতা তাকে দেখে বলল, ‘কীরে? কাউকে নিয়ে এসেছিস, না তোরই লাগবে আজ?’

সুখেন বলল, ‘এই লোকটা যে এসেছিল, কে রে?’

শমিতার মুখটা একমুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেছিল। সে তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বলল, ‘কোন লোকটা? সারাদিন কত লোক আসছে!’

সুখেন চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘তুই জানিস কোন লোকটার কথা বলছি। কে লোকটা? পার্টির নাকি পুলিশের?’

শমিতা রেগে গেল, ‘যেই হোক, তোর কী তাতে? ফোট এখান থেকে।’

সুখেন বলল, ‘রোজ রাতে তোর ঘরে চার পাঁচটা মেয়ে আসছে। এরা কোথাকার? সবক’টাকে বাঙালি বলে মনেও হচ্ছে না।’

শমিতা বলল, ‘গায়ে খুব জ্বালা ধরে তোদের না রে? আমি রোজগার করছি, তোদের জ্বলছে। বেশি বাড়িস না সুখেন, আমি কিন্তু বুঝে নেব তোকে। বেরো এখান থেকে।’

সুখেন বেরিয়ে গেল। সমিতির অফিসে শম্পা একা বসে ছিল। সুখেনকে দেখে বলল, ‘কী রে? কী হয়েছে?’

সুখেন বলল, ‘শমিতার ঘরে অনেক মেয়ে আসছে। খবর পেয়েছ?’

শম্পা অবাক হল, ‘না তো। কেউ বলেনি কিছু। কোত্থেকে আসছে মেয়েগুলো?’

সুখেন বলল, ‘বাইরে থেকে। রেজিস্ট্রেশন বা হেলথ চেক আপ করায়নি কারো?’

শম্পা ঠোঁট ওল্টালো, ‘আমি জানি না। মাইনর ধরে ধরে আনছে নাকি?’

সুখেন বলল, ‘তাই তো মনে হয়। খোঁজ নাও।’

শম্পা বলল, ‘আমি নিতে পারব না। আমার অত আগ্রহ নেই ভাই। কারা কোথায় কী করে বেড়াচ্ছে, তার দায় কি আমার নাকি? শমিতার ঘরে অনেকেই আসে। সব জানার দরকার নেই আমার। আর তোকেও বলি, এত কিছু জানার ইচ্ছা ভালো না। কম জানলে ভালো থাকবি।’

সুখেন ছোট ছোট চোখ করে শম্পার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবল। কিন্তু কিছু বলল না।

১৭

‘বাড়ি যাবি এখন?’

অফিস থেকে বেরোতেই সুদেব পিছু ডাকল। দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ।’

সুদেব বলল, ‘প্রমোশন পেয়েছিস, সেলিব্রেট করবি না?’

দিব্যেন্দু জানে, সুদেব একটু এদিক সেদিক যায়। তবু প্রথমে বুঝতে পারল না সুদেব কী বলতে চাইছে। সে বলল, ‘সেরকম কিছু করার কথা ভাবিনি।’

সুদেব এসে ফিসফিস করে বলল, ‘এরিয়া টুয়েন্টিতে চল। নতুন ফ্রেশ স্টক এসেছে। ভালো লাগবে।’

দিব্যেন্দু ঘড়ি দেখল। সুদেবের ভাট বকা শুনলে চলবে না। সে বলল, ‘পরে যাব। এখন তাড়া আছে।’

সুদেব মুখে বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘আরে ভাই, কতদিন আর বাচ্চা ছেলে থাকবি, বড় হ।’

দিব্যেন্দু দাঁড়াল না। সুদেব এর আগেও বলেছে। অফিস থেকে ওই পাড়াতেই চলে যায় ও।

সে স্টেশনে এসে শেষ মুহূর্তে ট্রেন ধরল। তাপস বলল, ‘অ। বাঙাল এসে গেছে? আমি তো ভেবেছিলাম আসবে না।’

দিব্যেন্দুর জন্য রুমাল দিয়ে জায়গা রাখা ছিল। সে বসে তাস হাতে নিয়ে বলল, ‘এক কলিগ ধরেছিল। তোর জন্মস্থানে নিয়ে যাবে বলে। গেলাম না।’

তাপস বলল, ‘আমার জন্মস্থান মানে?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘ওই যে, যেখানে সব লাইন দিয়ে দাঁড়ায়।’

তাপসের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। বাকি রাস্তাটা তাপস যখনই খাপ খুলতে গেল, দিব্যেন্দু প্রতিবারই বাক্যাঘাতে তাকে তছনছ করে দিল। কামরুল পর্যন্ত বলে ফেলল, ‘বিরাট উন্নতি তো? প্রমোশনের জন্য নাকি?’

দিব্যেন্দু কাউকেই পাত্তা দিল না। তাপসকে পরপর দু’দিন কোণঠাসা করে দেওয়া গেছে। বিরাট ব্যাপার।

ট্রেন দাঁড়াতে সাইকেল নিতে দৌড়ল সে। মফস্‌সলে সন্ধ্যা নেমেছে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে বোধহয়। রাস্তাঘাট ভেজা। হলদে আলোয় পিচের রাস্তায় সাইকেল চালাচ্ছে দিব্যেন্দু। মনে একটা আনন্দ হচ্ছে। শ্বশুর শাশুড়ি আছে। ওরা থাকলে রুমা আর কাউকে ফোন করতে পারবে না! ভাবতেই ঠোঁটের কোণে হাসি চলে আসছে তার। আজ বেগ আসেনি। চপের দোকানের সামনে সাইকেল দাঁড় করাল সে। গরম গরম বেগুনি ভাজছে। জলপাইয়ের চপ। ভেজিটেবল চপ। ডিমের চপও আছে। একটা আস্ত ডিম দেয় এ দোকানে। সে প্রত্যেকের জন্য দুটো করে ভেজিটেবল চপ আর ডিমের চপ নিল। দোকানদার বিটনুন ছড়িয়ে দিচ্ছে চপের উপরে। শসা পেঁয়াজ কুঁচো করে কাটা। সেটাও দিয়ে দিল। হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে সাইকেলটা চালিয়ে খানিকটা যাবার পর হঠাৎ করে একটা কুকুর এসে পড়ল চাকায়। দিব্যেন্দু সাইকেল থেকে পড়ে গেল। রাস্তার কাঁদায় চপ মাখামাখি খাচ্ছে। চারপাশে কেউ নেই। ব্যথা করছে পায়ে। দাঁতে দাঁত চেপে দিব্যেন্দু সাইকেল নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কুকুরটা দূর থেকে তাকে করুণ চোখে দেখছে। জামা ঠিক করে আবার সাইকেলে উঠল সে। ধীরে ধীরে সাইকেল নিয়ে বাড়িতে এল। সামনের ঘরে শ্বশুর বসে আছে। দিব্যেন্দু শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে হেসে বাথরুমে ঢুকে গেল। স্নান সেরে বেরোতে রুমা বলল, ‘মুড়ি দেব?’

দিব্যেন্দু ঘরে যেতে যেতে বলল, ‘একবার এসো।’

রুমা তার পেছন পেছন ঘরে ঢুকল। দিব্যেন্দু রুমার চুলের মুঠি ধরে চাপা গলায় বলল, ‘রাস্তায় কুকুর চলে এসেছিল। তোর পোষা?’

রুমার কাছে রাস্তার কয়েকটা কুকুর এসে খায়। উচ্ছিষ্ট খাবারগুলো রুমা খাওয়ায়। দিব্যেন্দুর হঠাৎ নেমে আসা আক্রমণে সে হতচকিত হয়ে বলল, ‘আমি জানি না।’

দিব্যেন্দু রুমার গলা টিপে ধরে বলল, ‘তুইই পাঠিয়েছিলিস। আমি জানি।’

রুমা দিব্যেন্দুর হাত ধরল। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। দিব্যেন্দু রুমার গলা ছেড়ে দিল। রুমা কাশতে কাশতে বলল, ‘ওভাবে কুকুর পাঠানো যায় নাকি?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘সব যায়। তুই সব পারিস। যা বাজার থেকে চপ নিয়ে আয়। আটটা ভেজিটেবিল, আটটা ডিম।’

রুমা ঘাড় নেড়ে বলল, ‘টাকা দাও।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘টাকা নেই। তুই কীভাবে আনবি, তুই জানিস।’

রুমা কিছুক্ষণ বিহ্বল চোখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

১৮

অন্যান্য দিন রাত একটার পর আর তার বিশেষ কাজ থাকে না। নিজের ঝুপড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সুখেন। খাওয়া বলতে চাল ডাল ফুটিয়ে নেওয়া। কিছুদিন আগে পেটের সমস্যা হয়েছিল। হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়েছিল গিয়ে। ডাক্তারবাবু স্পষ্ট বলে দিয়েছেন তেল খেলে মরতে হবে। তারপর থেকে সুখেন নিজেই রান্না করে, যত রাত হোক।

এ দিন সুখেন একটার পর পাপিয়ার ঘরে বেল বাজাল। পাপিয়া বেরিয়ে এসে বিরক্ত গলায় বলল, ‘কাস্টোমার নেই। ঘুমাব ভাবলাম। তোর কী হল? কাউকে এনেছিস?’

সুখেন ইতস্তত করে বলল, ‘একটু চা খাওয়াবি?’

পাপিয়া অবাক হয়ে বলল, ‘কী হয়েছে তোর? এত রাতে চা খাবি?’

সুখেন দাঁত বের করল, ‘কী করব বল? ভালো লাগছে না। কেমন গলা ব্যথা করছে।’

পাপিয়া বলল, ‘আয়।’

ছোট একটা ঘুপসি ঘর। এত কিছুর মধ্যেও পাপিয়া ঘরটা কেমন সাজিয়ে রেখেছে। ঘরের মধ্যে আবার এক কোণে ঠাকুরও আছে। এই ঘরেই বাইরের লোক আসে। পাপিয়া স্টোভে চা বসিয়েছে। বলল, ‘আদা দিলে ভালো হতো। যা দাম। কী যে করিস? ওষুধ খাবি?’

সুখেনের হঠাৎ করে কেমন কান্না পেয়ে গেল। মা-র কথা মনে পড়ে গেল। এই জায়গাতেও ওরা নিজের পৃথিবী তৈরি করে নিয়েছে। এটাই তাদের জীবন। এভাবেই তারা সারাজীবন কাটিয়ে দেবে। অথচ এই জায়গাতেও মেয়েটা তার গলা ব্যথার জন্য আদা দেওয়ার কথা ভাবল। গলা ধরে এল হঠাৎ করেই। পাপিয়া যাতে সেটা বুঝতে না পারে, তাড়াতাড়ি একটু কেশে নিয়ে বলল, ‘সকালে একটা লোক এসে শমিতার ঘরে গেছিল। শমিতা আমাকে কিছুই বলতে চাইল না। কিন্তু জানিস তো, আমার মনে হচ্ছে ডাল মে কুছ কালা হয়। কত কমবয়সি মেয়ে এ পাড়ায় ঢুকে যাচ্ছে।’

পাপিয়া বলল, ‘তুই বেশি ভাবিস না বাবা। ওদের অনেক ক্ষমতা। কী দরকার আছে এসব নিয়ে বেশি ভাবার? কাউকে কিছু বলেছিস নাকি?’

সুখেন মাথা নাড়ল, ‘না। বলিনি। কিন্তু ওই মেয়েগুলোকে দেখলে মায়া হয়। কাদের কাদের সব নিয়ে আসছে। শমিতা মোটা টাকা পাচ্ছে।’

পাপিয়া বলল, ‘পাক। তোকে ভাবতে হবে না। ভাবিস না। বোকামি করিস না। ওরা একবার কিছু বুঝে গেলে তোর বিপদ আছে। এ জায়গা ছাড়তে হবে।’

সুখেন বলল, ‘কী করব বল এ জায়গায় থেকে? কী লাভ হয়? কী করছি আমি? কীভাবে পেট ভরছি। সবাই দালাল বলে ডাকে।’

চা হয়ে গেছিল। পাপিয়া চায়ের কাপ এনে তার হাতে দিয়ে বলল, ‘বেশ করেছিস দালালি করেছিস। তুই দালালি না করলে আমরা কী করে খেতাম? আমরাও তো তোর জন্যই বেঁচে আছি। কে কী বলল, তা শোনার দরকার নেই।’

বড় গাড়িটা এসে দাঁড়াল। জানলা দিয়ে সেটা দেখে সুখেন বলল, ‘ওই দেখ। কতগুলো মেয়ে ঢুকছে। দেখছিস?’

পাপিয়া বলল, ‘তোকে না বলেছি এগুলো নিয়ে ভাববি না?’

সুখেন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘কিছুই ভাবছি না। আমার আর ভাবতে ভালোও লাগছে না। সেই লোকটাকে ঠিক লাগল না বলেই মনে কেমন খটকা লাগছে।’

পাপিয়া বলল, ‘তার জন্য পুলিশ আছে। দেশে আইন-কানুন আছে। তোকে সেসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তুই তোর কাজ করে যা।’

সেই লোকটাকে দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘ওই দেখ। ওই লোকটাও এসে গেছে। বড় কোনও ব্যাপার আছে বলে মনে হচ্ছে।’

পাপিয়া কড়া গলায় বলল, ‘তুই কোথাও যাবি না। চা খা বসে বসে।’

সুখেন বলল, ‘তুই একবার গিয়ে দেখে আয় না মেয়েগুলোকে নিয়ে কার ঘরে ঢোকাচ্ছে? শমিতার ওখানে তো এত জায়গা নেই।’

পাপিয়া তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘বড় জ্বালাতন করিস তুই। ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। আমি যতক্ষণ না ফিরছি, তুই কিন্তু এখান থেকে নড়বি না। তুই এ ঘরের বাইরে গেলে ওরা কেন, আমিই তোর বারোটা বাজিয়ে দেব।’

সুখেন হাসল, ‘ঠিক আছে। তুই গিয়ে খোঁজ নিয়ে আয়।’

পাপিয়া বাইরেটা দেখে সন্তর্পণে বেরোল। কিছুক্ষণ পরে এসে বলল, ‘হ্যাঁ। তুই ঠিকই বলেছিলিস। শমিতার ঘরেই গেছে। আরেকটা ব্যাপার হল, আর কয়েকটা মেয়ে শমিতার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, বাজারের গলিটা দিয়ে ওদের নিয়ে গেল।’

সুখেন বলল, ‘তার মানে দেওয়া-নেওয়া চলছে। কী ব্যাপার বল তো?’

পাপিয়া কড়া গলায় বলল, ‘তোর চা খাওয়া হয়েছে?’

সুখেন বলল, ‘হ্যাঁ। হয়েছে।’

পাপিয়া বলল, ‘নিজের ঝুপড়িতে গিয়ে ঘুমো। আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবর রাখতে হবে না। যা।

সুখেন হাসল, ‘ঠিক আছে, যাচ্ছি রে বাবা যাচ্ছি।’

১৯

একটা সময় তো তাদের কাছেই টাকা চাইতে যেত। কিন্তু এত বড় হয়ে কি আর টাকা চাওয়া যায়? রুমা টাকা চাইতে পারেনি। প্রবল যন্ত্রণা হচ্ছিল মাথায়। ছোট্ট একটা ব্যাগে একশো টাকা রাখা ছিল। কবে যেন টাকাটা রেখেছিল সে। আপদকালীন টাকা।

পালানোর জন্য রাখা। দিব্যেন্দু তাকে একটা টাকাও দেয় না। রুমা কোনওদিন দিব্যেন্দুর পকেট থেকে টাকা নেয়নি। সন্ধে নেমেছে। রুমা যেন ঘোরের মধ্যে চপের দোকানে গেল। চপ নিয়ে ফিরে এসে দিব্যেন্দুকে দিল।

প্যাকেটটা দেখেই দিব্যেন্দু বলল, ‘দেখলি? ঠ্যাকায় পড়লে সব ব্যবস্থা হয়ে যায়। যা কুচো কুচো করে শশা কাট। পেঁয়াজ কাট। মুড়ি দিয়ে চপ দিয়ে দে।’

রুমা রান্নাঘরে গিয়ে শশা কাটতে শুরু করল। আগে চোখ থেকে জল বেরোত। এখন সেটাও বেরোচ্ছে না। সুন্দর করে মুড়ি মেখে দিব্যেন্দুকে দিল। দিব্যেন্দু রাগ দেখাল, ‘আগে বাবা-মাকে দে।’

রুমা তাই দিল। সব কিছু দিয়ে ঠাকুরঘরে গিয়ে ফোন অন করল। লোকটার নাম্বারে ফোন করল। রিং হতেই ধরল লোকটা, ‘হ্যাঁ, ডিসিশন হল?’

রুমা বলল, ‘আমি কোথায় থাকি, কী করে বুঝবেন?’

‘আমাকে হোয়াটস অ্যাপে লোকেশন পাঠান। হোয়াটস অ্যাপে গিয়ে...’

‘পারি। কিন্তু আমার নেট নেই।’

‘ভরিয়ে দিচ্ছি। লোকেশন পাঠান। বাকিটা দেখছি।’

ফোন কেটে গেল। রুমার ঘাম হচ্ছিল। দিব্যেন্দু জানতে পারলে সত্যি সত্যি তাকে পুঁতে দেবে। কিন্তু আর না। আর পারা যাচ্ছে না। অনেক হয়েছে। এবার এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।

নেট প্যাকের এসএমএস এল।

রুমা সঙ্গে সঙ্গে হোয়াটস অ্যাপ খুলে লোকটাকে লোকেশন পাঠিয়ে দিল। ফোন ভাইব্রেট করে উঠল, ফোন ধরতেই লোকটা বলল, ‘দু’ঘণ্টা লাগবে। রাত এগারোটার পর বাড়ির বাইরে একটা কালো গাড়ি দাঁড়াবে। উঠে চলে আসুন।’

রুমা বলল, ‘শুনুন শুনুন।’

‘আপনি চলে আসুন। না আসতে চাইলে আসবেন না। গাড়িটা দশ মিনিট দাঁড়াবে। দেখুন কী করবেন।’

ফোন কেটে গেল। রুমা ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিল।

‘কী হল? কোথায় গেলে?’

দিব্যেন্দু চিৎকার করছে। রুমা ঘরে ঢুকল, ‘বল।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘রাতে কী রান্না আছে?’

রুমা বলল, ‘রুটি মাংস।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘মাংস কে আনল?’

রুমা বলল, ‘বাবা।’

দিব্যেন্দু খুশি হল, ‘গুড। আয়, কোলে আয়।’

রুমা দরজার দিকে তাকাল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘কী হয়েছে? এসো সোনা। আমাদের বাড়িতে তো আমরা যা খুশি করতেই পারি।’

রুমা আরেকবার দরজার দিকে তাকিয়ে দিব্যেন্দুর কাছে গেল।

দিব্যেন্দু কানে কানে বলল, ‘ডাক্তার দেখাবি। তোর মাকে বলে দিয়েছি। বাচ্চা চাই আমার।’

রুমা ঘাড় নাড়ল।

দিব্যেন্দু হাতে চিমটি কাটল। ঘাড়ে চিমটি কাটল। রুমা কিছু বলল না। চুপ করে বসে রইল। ঘরের মধ্যে হঠাৎ রুমার মা ঢুকল। তাদের দেখামাত্র জিভ বের করে বাইরে বেরিয়ে গেল। রুমা ছিটকে গিয়ে বলল, ‘এবাবা।’

দিব্যেন্দু শক্ত করে রুমার হাত ধরে বলল, ‘আমার বাড়ি। আমি যা খুশি করব। এখানে বোস।’

রুমা মাটিতে মিশে যেতে যেতে বসল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘মা-বাবা কাল চলে যাবে। তারপর আবার শুরু করবি তুই?’

রুমা বলল, ‘আমি কিছু করি না।’

দিব্যেন্দু রুমার পেট খামচে ধরল, ‘আবার মিথ্যে কথা?’

রুমার ব্যথা লাগছিল। দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল। দিব্যেন্দু হঠাৎ পেট থেকে হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘যা। রুটি কর।’

রুমা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মা রান্নাঘরে ছিল। তাকে দেখে বলল, ‘কী লজ্জার ব্যাপার হয়ে গেল? আমারই দোষ। জামাই আবার কী মনে করবে?’

রুমা মা’র দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে আটার প্যাকেট বের করল।

রুমার মা বলল, ‘ডাক্তারটা কাল আমরা যাওয়ার আগে দেখিয়ে নে। দেখা যাক কী বলে?’

রুমা কিছু বলল না। চুপ করে রান্না করল। সবাইকে খেতে দিল।

রাত হল। দিব্যেন্দু ঘুমিয়ে পড়ল। বাকিরাও ঘুমিয়েছে। সে পা টিপে টিপে বাইরে বেরিয়ে দেখল একটা কালো গাড়ি সত্যি সত্যিই এসে দাঁড়িয়ে আছে।

রুমা দ্বিতীয় কোনও কথা ভাবল না। হাঁটতে হাঁটতে এক বস্ত্রে গাড়িটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা খুলে গেল।

সে গাড়িতে উঠে বসতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

২০

‘বিখ্যাত হতে চাওয়ার শর্টকাট আছে। কেউ কেউ বিখ্যাত হতে গিয়ে খানকি...’

কথাটা মুখে চলে এসেছিল। বলার আগে চুপ করে গেল অরিত্র। আরেকটু হলে বলে ফেলছিল।

এণাক্ষী রেগে গেল, ‘কী? কী বলতে চাইছ তুমি?’

অরিত্র বলল, ‘কিছু না। তুমি যদি ওই পার্টিতে যেতে চাও, তাহলে যাও। আমাকে বলছ কেন?’

এণাক্ষী বলল, ‘তোমাকে বলব না? ঠিক তো? তুমি চাও আমি যাব না। সরাসরি বলে দিলেই পারো!’

অরিত্র বলল, ‘আমার তো তোমার চালচলন কোনটাই ভালো লাগে না। কোনটা কোনটা বলতে হবে? আমি যদি বলি তুমি এই ছোটখাটো রোলের জন্য এসব জায়গায় যেও না, তুমি যাওয়া বন্ধ করবে?’

এণাক্ষী বলল, ‘তোমাকে তো বলেছি। এগুলো পি-আরের জন্য ভীষণই দরকারি। আমি কি কারো সঙ্গে শুতে যাচ্ছি?’

অরিত্র এণাক্ষীর দিকে তাকাল। এণাক্ষী ভীষণ রেগে গেছে। নাকের নীচে ঘাম জমেছে। সে বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাইছি না এখন। আমার মিটিং আছে। প্রিপারেশন দরকার। তুমি যেখানে যেতে চাও, যেতে পারো।’

এণাক্ষী বলল, ‘মানে? তুমি আমাকে বললে আমার চালচলন তোমার ভালো লাগে না। তারপর কী শুনতে চাইছ? আমি চুপ করে বসে থাকব? শান্তি চুক্তি করব?’

অরিত্র এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখো, তুমি বলেছিলে অভিমন্যু তোমাকে দিয়ে ওর সিনেমায় একটা ছোট পার্ট করাতে চায়। ফাইন। আমি তখন অত ভাবিনি। রাজি হয়ে গেছিলাম। তারপর বললে তোমার পারফরম্যান্স দেখে ওরা একটা সিরিয়ালে নেবে। তাও মেনে নিলাম। ওদের সাকসেস পার্টিতে মাঝরাতে মাতাল হয়ে প্রোডিউসারকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেছ, তাও বুঝলাম। কিন্তু আমি না, আর পারছি না। আমার সমস্যা হচ্ছে।’

এণাক্ষী চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওহ্‌, তোমার জ্বলছে, তাই তো? আনন্দ দেশাই আমাকে প্রমিসিং বলেছে বলে জ্বলছে?’

অরিত্র বলল, ‘ওরকম প্রমিসিং বলে হোটেলের ঘরে নিয়ে যাওয়ার পরে এরাই আর তোমার মধ্যে প্রমিসিং কিছু খুঁজে পাবে না। মাইরি বলছি। মিলিয়ে নিও।’

এণাক্ষী কানে আঙুল দিল, ‘ছি ছি ছি। ছিঃ। আমি তো তোমাকে অন্যরকম ভাবতাম। ভাবতাম তুমি উদার। শেষে তুমিও বাকিদের মতো? বউকে বেঁধে রাখতে চাও?’

অরিত্র বলল, ‘ভালোবাসি বলে বললাম। চোখের সামনে আমার বউকে কেউ লাইনে নামিয়ে দেবে, দেখতে পারব? আমি তো দেখতে পাচ্ছি দিন দিন তুমি কী হয়ে যাচ্ছ? বলব না?’

এণাক্ষী অরিত্রর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘এনাফ। এই কথাগুলোর পরে আমার আর এ বাড়িতে থাকার তো কোনও মানেই হয় না। আমি আজই চলে যাব। ইন ফ্যাক্ট, এখনই চলে যাব।’

অরিত্র কিছু বলল না। ট্যাবে চোখ রাখল।

এণাক্ষী চিৎকার করল, ‘কী হল? তোমার কিছু যায় আসে না?’

অরিত্র বলল, ‘তুমি তোমার পথ বেছে নিয়েছ। আশা করি ভবিষ্যতে ভালো থাকবে। যদি এভাবেই চালাতে চাও, আমার সঙ্গে থাকবে, আবার কাজ পাওয়ার জন্য এর ওর তার সঙ্গে আজেবাজে জায়গায় পার্টি করবে, তাহলে আমি আপত্তি করব। চোখের সামনে তোমার ইয়ে মারা যাবে, সেটা আমি দেখতে পারব না। তুমি যেতে চাইলে যেতে পারো।’

এণাক্ষী রাগী চোখে কিছুক্ষণ অরিত্রর দিকে তাকিয়ে ব্যাগ নিয়ে এলো। আলমারি খুলে তার শাড়ি, গয়না ব্যাগে তুলতে শুরু করল। ‘তুমি আজকে আমায় যা অপমান করলে, এটা আমার মনে থাকবে।’

অরিত্র বলল, ‘থাকবে না। তুমি যা শুরু করেছ, তাতে এসব ছোটখাটো ব্যাপার মনে থাকবে না। উদার হওয়া এক ব্যাপার। চোখের সামনে সব কিছু দেখে চুপ থাকা আরেক। আমি পারলাম না উদার হতে। কী করব?’

এণাক্ষীর চোখ থেকে জল পড়ছিল। সে ব্যাগে সব জিনিস ভরে ঠিক করে ব্যাগ গোছাতে পারছিল না। অরিত্র বলল, ‘তুমি এখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে চলে যাও। ঠিকানা দিও কার বাড়িতে উঠেছ। তার বাড়িতে ব্যাগ পাঠিয়ে দেব? ফাইন?’

এণাক্ষী মেঝেয় বসে পড়ল। বলল, ‘এরকম করে বলছ কেন?’

অরিত্র এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না।

২১

ইদানীং বেশ গরম পড়েছে। ঘাম হয়। দিব্যেন্দুর অবশ্য সে কারণে ঘুমে কোনও অসুবিধা হয় না। ঘুমের ঘোরেই সে মাঝরাতে উঠে বাথরুমে যায়। এসে আবার শুয়ে পড়ে।

গরমটা বেশিই পড়েছিল। বেশি ঘাম হলে রুমাকে হাত পাখা দিয়ে হাওয়া করতে বলে। সিলিং ফ্যান চলবে, অন্যদিকে রুমা তাকে হাত পাখা দিয়ে সারারাত হাওয়া দিয়ে যাবে। রাতে রুমার আগেকার দিনের পাঙ্খাবরদারদের মতো কাজ থাকে।

ঘুমের ঘোরেই দিব্যেন্দু ডাকল, ‘হাওয়া দে।’

সাধারণত অন্যান্য দিন এটুকু বললেই হাওয়া দেওয়া শুরু হয়ে যায়। হাওয়া না পেয়ে দিব্যেন্দু বিরক্তিসহকারে হাত দিয়ে রুমাকে ঠেলতে গেল, ‘কীরে মাগী, হাওয়া দে...’

কিন্তু লাভ হল না। তার হাত হাওয়ায় ধাক্কা মারল।

দিব্যেন্দুর মাথায় রক্ত উঠে গেল, ‘কীরে, তোকে ডাকছি তুই সাড়া দিচ্ছিস না যে?’ বলে উঠে বসে দেখল তার পাশে রুমা নেই।

দিব্যেন্দু খাট থেকে নেমে বাথরুমে গেল। দরজা খুলে দেখল রুমা নেই। অবাক হল সে। তাহলে কি ঠাকুরঘরে? এত রাতে?

ঠাকুরঘরের দরজা ঠেলে দেখল, নাহ্‌। রুমা নেই।

সে চিৎকার শুরু করল, ‘রুমা! অ্যাই রুমা!’

রুমার বাবা-মার ঘুম ভেঙে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল তারা। রুমার মা ভীত গলায় বলল, ‘কী হল বাবা?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘রুমা কোথায়? আপনাদের ঘরে?’

রুমার মা বলল, ‘না তো! আমাদের ঘরে নেই তো!’

দিব্যেন্দু চোখ ছোট ছোট করে বলল, ‘সত্যি করে বলুন। যদি আপনাদের ঘরে খুঁজে পাই, তাহলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে।’

রুমার মা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘তুমিই দেখে এসো বাবা।’

দিব্যেন্দু কঠিন চোখে রুমার বাবা-মার দিকে তাকিয়ে ওদের ঘরে গেল। না রুমা নেই।

বসার ঘরেও নেই। এবার দিব্যেন্দু দৌড়ে বাইরের ঘরের দরজার কাছে গেল। দরজা খোলা...রাস্তায় টিউবের আলো জ্বলছে।

দিব্যেন্দু কোমরে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। রুমার মা-বাবা বাইরের ঘরে এলো। রুমার মা ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘কী হল বাবা?’ দিব্যেন্দু নিজের দু’গালে চড় মারতে শুরু করল, ‘কী হল? কী হবে? আমি যা ভাবছিলাম তাই হয়েছে! মেয়ে পালিয়েছে! পালিয়েছে আপনাদের মেয়ে! আমি জানতাম, আমি ঠিক জানতাম, কারো না কারো সঙ্গে কিছু একটা চলছে। বলছি না...আমি ঠিক জানতাম। দেখেছেন? আমি যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই হয়েছে। আপনাদের মেয়ে পালিয়েছে। আমার সোনার কানের দুল, আট হাজার টাকা দাম, শালা ওটাও নিয়ে গেছে।’

রুমার মা কেঁদে উঠল। রুমার বাবা বলল, ‘তুমি কী জানো? মানে কারো সঙ্গে কিছু ছিল নাকি?’

দিব্যেন্দু দুজনের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বলল, ‘জানবো? আমি জেনে কী করব? ঘুমিয়ে পড়ুন। আবার কী? ঘুমিয়ে পড়ুন...না। ঘুমিয়ে কী করবেন? আপনার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল এ বাড়িতে। সেই পালিয়েছে। এ বাড়িতে তো আপনাদের জায়গা হবে না। বেরিয়ে যান।’

রুমার মা কাঁদতে-কাঁদতেই হাঁ করে জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বেরিয়ে যাব?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ, ব্যাগ কোথায় আপনাদের? দাঁড়ান, এখনই ব্যাগ দিচ্ছি।’

দাপাতে দাপাতে দিব্যেন্দু ঘরের ভেতরে গেল। রুমার বাবা মা-র ব্যাগ টানতে টানতে বাড়ির বাইরে এনে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলল, ‘এই তো, এই যে ব্যাগ। যান, ফুটে যান। এখন ক’টা বাজে? রাত দুটো তো? রাতে রাস্তায় থাকুন, সকালে বেরিয়ে যাবেন।’

রুমার মা বলল, ‘বাবা, মাথাটা ঠান্ডা কর। তোমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। তুমি জল খাও।’

দিব্যেন্দু চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই খানকি মাগী, আমি কী খাব তুই শিখিয়ে দিবি? তুই শেখাবি? তুই খানকি, তোর চোদ্দগুষ্টি খানকি, বেরো, ফোট এখান থেকে।’

দিব্যেন্দুর চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা বেরিয়ে এল।

রুমার বাবা খালি গায়ে লুঙ্গি পরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। দিব্যেন্দু ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল।

২২

‘তুমুল ঝগড়া পছন্দ কর না তুমি? করো, আমার সঙ্গে তুমুল ঝগড়া করো। তুমি কী চাও সেটা বলো।’

এণাক্ষী বলল।

তার মাথা দপ দপ করছে। শরীর খারাপ লাগছে।

অরিত্র তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ফালতু ঝগড়া করে সময় নষ্ট করার থেকে ভালো আমরা কথাই আর বললাম না। তুমি যেটা করতে চাও, যেভাবে করতে চাও, সেটা করো।’

এণাক্ষী বলল, ‘আমি চলে গেলে তুমি বাধা দেবে না?’

অরিত্র মাথা নাড়ল, ‘না। একদিন না একদিন তুমি যেতেই। আমি জানতাম।’

এণাক্ষী রেগে গেল, ‘তুমি জানতে? তোমার জন্য আমার এত স্যাক্রিফাইস, এত সব কিছু, সব মিনিংলেস হয়ে গেল? তুমি নিজে তো জীবনে কিছু করতে পারলে না, আমি করছি, সুযোগ পাচ্ছি দেখে তুমি রেগে যাচ্ছ? হিংসে করছ? এত ইগো তোমার?’

অরিত্র বলল, ‘তুমি তাই মনে করলে তাই। তুমি যেটা ভাববে, ঠিক তাই। শুধু এটুকু বলে রাখি, তোমার সঙ্গে কথা বলার, তোমার সঙ্গে দিন-রাত ঝগড়া করার, আমার প্রবৃত্তি হচ্ছে না।’

এণাক্ষী বলল, ‘ও। আমাকে ঘেন্না করছ, তাই তো?’

অরিত্র হাসল, ‘এখন করছি না। কিন্তু যে পথে এগোচ্ছ, খুব শিগগিরি ঘেন্না করার মতো জায়গায় যেতে হবে।’

এণাক্ষী কপাল চেপে কিছুক্ষণ বসে রইল। ফ্যানটা চলছে একঘেয়ে সুরে। জানলা দিয়ে রাস্তার গাড়ির শব্দ আসছে।

সে এবার উঠে যতটা সম্ভব ঠান্ডা মাথায় তার ব্যাগ গুছিয়ে নিল। ক্যাব পাওয়া যাচ্ছে এখনও। বুক করে নিল। অরিত্র টিভি চালিয়েছে। তার দিকে তাকাচ্ছেও না। এণাক্ষী আলমারির চাবিগুলো টেবিলের ওপর রেখে ব্যাগ ঠেলতে ঠেলতে বেরোল।

বেরোনোর মুখে অরিত্র বলল, ‘প্রোটেকশন ইউজ করে নিও। যার তার সঙ্গে শুয়ে পড়াই যায়, তবে আজেবাজে অনেক রোগ হতে পারে। সেটা দেখে নিও।’

এণাক্ষী দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘তোমারটা তো ছোট। ওইটুকু জিনিস নিয়ে বড় বড় কথা বোলো না। মানায় না।’

অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ। এখন বড় পাবে। তার সন্ধানেই তো যাচ্ছ। মুখে পেছনে কানে নাকে, যেখানে যেখানে আছে, সবখানে গুঁজে বসে থেকো।’

এণাক্ষীর কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছিল। সে আর দাঁড়াল না। ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে লিফটে এল। দীপ্যমানকে ফোন করতে হবে। এক রাতের জন্য অন্তত একটা ঘর লাগবে। তার বাড়ি শিলিগুড়িতে। এত রাতে কী করে যাবে? আরেকটা কাজ করলেও হয়। সে তো ঘর থেকে বেরিয়েই এসেছে।

অরিত্র যে পার্টিতে যেতে বারণ করেছিল, সেখানে গেলেই হয়। সেটাই ভালো।

ক্যাব এসে গেছিল। সে পার্টির হোটেলটা ড্রপ লোকেশন দিল।

ক্যাবে উঠে বসে তার ব্যালকনিটা দেখল একবার। ওই তো, তার নিজের যত্ন করে লাগানো টবগুলো, দিব্যি দেখা যাচ্ছে। অরিত্র তো একবার ব্যালকনিতে আসতে পারত!

ঘরের বাইরে রাতের কলকাতা অন্যরকম। ঘরের নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার বাইরে একটা শহর, যেখানে সবাই তার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে। সবাই তাকে ছিঁড়ে খেতে চায়। অরিত্র তো ওই পার্টিগুলোতে ছিল। ওর থাকা আর না থাকায় অনেকখানি তফাত। এখন অরিত্র নেই। সে একা যাচ্ছে। কী করবে সে?

হোটেলের বাইরে তাকে নামিয়ে ক্যাব চলে গেল। এণাক্ষী ব্যাগটা নিয়েই হোটেলের ভেতর ঢুকল।

সুবীর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। এণাক্ষীকে দেখে বলল, ‘একী ম্যাডাম? আপনি ব্যাগ নিয়ে? কোন জায়গা থেকে এলেন?’

এণাক্ষী হাসার চেষ্টা করল, ‘একটু বাইরে গেছিলাম। ব্যাগটা কোথায় রাখা যায়?’

সুবীর বলল, ‘আমাকে দিন। আমি রাখছি। আপনি এন্ট্রি নিয়ে নিন।’

এণাক্ষীর হাত থেকে ব্যাগ নিল সুবীর। এণাক্ষী পার্টিতে ঢুকল। ঢিমে মিউজিক চলছে। একদিকে কয়েকজন মাতাল গল্প করছে। সবার এতক্ষণে দল বানানো হয়েই গেছে। সে কোন দলে গিয়ে বসবে? কাউকেই চিনতে পারছে না সে। সুবীরও বা কোথায় গেল?

ঢোকার পর থেকেই এণাক্ষীর একটা অস্বস্তি শুরু হল। মনে হচ্ছিল একজোড়া চোখ যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। লোকটা তার দিকেই এগিয়ে এল, ‘ম্যাম, ব্যাগ নিয়ে হোটেলে এলেন দেখলাম। দাম্পত্য কলহ?’

এণাক্ষী লোকটার দিকে তাকাল। চিনতে পারল না। দামি স্যুট। দামি চশমা। খুবই হ্যান্ডসাম, যেন চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী একজন লোক। সে বলল, ‘আপনি...’

‘যোগেন্দ্র শর্মা।’ লোকটা হাত এগোল।

এণাক্ষী লোকটার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল।

যোগেন্দ্র বলল, ‘নতুন ইনভেস্টর। ডুবে যাওয়া ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাতে এসেছি বলতে পারেন। আপনি বললেন না, ব্যাগ নিয়ে এসেছেন কেন? বসুন না।’

যোগেন্দ্র সোফায় বসাল তাকে যত্ন করে। ড্রিঙ্ক দিল।

এণাক্ষী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘ওই, বুঝতেই পারছেন, মিডল ক্লাস ফ্যামিলি ক্রাইসিস। কী আর বলব।’ একবারে সে হাতের গ্লাসটা শেষ করে দিল।

যোগেন্দ্র জিভে চুকচুক শব্দ করে বলল, ‘এটাই তো প্রবলেম ম্যাডাম। বাঙালির মিডল এজ মেন্টালিটি। সব জায়গায় একই রকম।’

এণাক্ষী চারদিকে তাকাল, বলল, ‘আচ্ছা, আমি এখানে কাউকেই চিনতে পারছি না কেন?’

যোগেন্দ্র বলল, ‘আপনি বোধহয় ভুল রুমে ঢুকেছেন। এটা আরেকটা পার্টি।’ এণাক্ষী অবাক হয়ে যোগেন্দ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মানে? এ বাবা। তাহলে আমি...’

উঠতে গেল সে। মাথাটা ঘুরে গেল।

যোগেন্দ্র ধরে নিল তাকে।

এণাক্ষীর চারপাশটা কেমন ঝাপসা হয়ে গেল।

২৩

অরিত্রর সমস্যা হল, সে বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারে না। ভীষণ রাগ করবে, তুমুল চিৎকার করবে, ঝগড়া করবে, বিলো দ্য বেল্ট আঘাত করবে, তারপর এক সময় তার রাগ কমে আসবে। তখন লজ্জা লাগবে।

রাত এগারোটা নাগাদ তার মনে হল এণাক্ষীকে একা ছাড়া ঠিক হয়নি। মেয়েটা একা একা চলে গেল। খারাপ লাগছিল। ফোন করল। ফোন অফ বলছে। অরিত্র তৈরি হয়ে নিল। এণাক্ষী কোন হোটেলে আছে সে জানে। পার্কিং-এ এসে গাড়ি স্টার্ট দিল সে।

বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে মাথায়। এটুকু সে নিজেও জানে এণাক্ষী খারাপ কিছু করার মেয়ে না। কিন্তু কথা বলার সময় কখন যে সবরকম সভ্যতা ভদ্রতা ভুলে যায়, নিজেও জানে না। যখন বুঝতে পারে, তখন দেরি হয়ে যায়।

এণাক্ষী এত দিন তার সঙ্গে ছিল, এটাই অনেক। অন্য কেউ হলে তাও থাকতো না। সবাই তার মতো অসভ্য মানুষকে সহ্য করে না।

রাস্তা ফাঁকাই আছে। গাড়ি হোটেলের পার্কিং-এ রেখে অরিত্র রিসেপশনে ঢুকে দেখল সুবীর পায়চারি করছে। অরিত্র সুবীরের দিকে এগিয়ে গিয়ে অপ্রস্তুত গলায় বলল, ‘এণাক্ষীকে ডেকে দেবে? ফোনে পাচ্ছি না।’

সুবীর বিহ্বল কণ্ঠে বলল, ‘আরে, কী বলি তোমায়, এখানে আসার সময় একটা বড় ব্যাগ নিয়ে এসেছিল। আমাকে বলল রেখে দিতে। আমি ব্যাগ রেখে আসার পর থেকে ওকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমিও ফোন করেছি, ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।’

অরিত্র অবাক হল, ‘মানে? পাওয়া যাচ্ছে না মানে কী?’

সুবীর বলল, ‘চল। তুমি ভেতরে গিয়ে দেখো।’

অরিত্রকে নিয়ে সুবীর ব্যাঙ্কোয়েটে গেল। ঠিকই। কোথাও এণাক্ষী নেই।

অরিত্র কয়েক সেকেন্ড মাথা নিচু করে সুবীরকে বলল, ‘হোটেলে কোনও রুমে যায়নি তো?’

সুবীর বলল, ‘এসব কী বলছ তুমি? ও তোমার ওয়াইফ। ওর নামে এসব বলছ?’

অরিত্র লজ্জিত হয়ে বলল, ‘আমি বলছি না। আমি বোঝার চেষ্টা করছি ও অন্য কোথাও গেছে নাকি।’

সুবীর বলল, ‘আরে, তা বলে এরকম বোল না। এণাক্ষী খুবই ডিসেন্ট মেয়ে। তুমি তো ওর সঙ্গে অনেক পার্টিতে গেছ, কখনও মনে হয়েছে ও এরকম কিছু করতে পারে।’

অরিত্র সুবীরের হাত ধরে বলল, ‘প্লিজ কিছু মনে কোরো না। আমি কী করব বুঝতে না পেরে তোমাকে এভাবে বলে ফেলেছি। একটু দেখো না ও কোথায় গেছে।’

সুবীর বলল, ‘লনে দেখি, পুলে, গেমস কর্নারে, সবক’টা জায়গাতেই খুঁজি চল।’

তারা সবখানেই খুঁজল। এণাক্ষীকে কোথাও পাওয়া গেল না।

সুবীর চিন্তিত গলায় বলল, ‘আরেকটা ব্যাপার হতে পারে। পাশের হলে আরেকটা পার্টি ছিল। ওটায় ঢুকে যেতে পারে।’

অরিত্র বলল, ‘চল। তাই চল।’

দুজনে বেরিয়ে হোটেলের অন্য পার্টি রুমের এন্ট্রান্সে গেল। দুজন বাউন্সার দাঁড়িয়ে ছিল। সুবীর বলল, ‘এক্সকিউজ মি, আমাদের এক পরিচিত সম্ভবত আপনাদের পার্টিতে ভুল করে ঢুকে গেছে। একটু দেখবেন? বা আমরা কি ভেতরে ঢুকতে পারি?’

একজন বলল, ‘দেখছি।’

ভেতরে ঢুকে গেল সে। কিছুক্ষণ পর বাইরে বেরিয়ে এসে বলল, ‘না। এখানে আপনি যে নাম বলেছেন, সে নামে কেউ নেই।’

সুবীর বলল, ‘আমাদের একবার ঢুকতে দেওয়া যাবে?’

দুজনেই মাথা নাড়ল, ‘না। এটা হাই প্রোফাইল জোন। আন অথরাইজড কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।’

অরিত্র চিৎকার করে উঠল, ‘কী বলছেন আপনি? একজনকে খুঁজে পাচ্ছি না আর আপনি আন অথরাইজড মাড়াচ্ছেন?’

সুবীর অরিত্রর হাত ধরল, ‘প্লিজ প্লিজ। শোন অরিত্র। রাগারাগি কোরো না। আমার সঙ্গে এসো। আমি কথা বলছি। সিসিটিভি ফুটেজ আছে। সেখান থেকেই দেখে নেওয়া যাবে।’

অরিত্র বলল, ‘সেটা তুমি এতক্ষণ দেখোনি কেন?’

সুবীর বলল, ‘আরে, আমার এত গেস্টকে সামলাতে হচ্ছে। মাথাতেই আসেনি।’

অরিত্র বলল, ‘চলো। ব্যবস্থা করো। নইলে পুলিশকে ডাকতে হবে। একীরে বাবা, তোমাদের কোনও দায়িত্ব নেই? ফোনটা অবধি অফ।’

সুবীর দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘তোমার ওয়াইফ তো মাইনর না অরিত্র, তাই না? তাছাড়া সে ব্যাগ নিয়ে কেন এসেছিল, সেটাও তো জানি না। আমাকে সময় দাও। আমি ফুটেজ দেখার ব্যবস্থা করছি।’

অরিত্র রাগী চোখে সুবীরের দিকে তাকিয়ে রইল।

২৪

‘পালাতে পারলেন তাহলে?’

লোকটা গাড়ি চালাচ্ছে। রুমা পেছনের সিটে বসেছে।

লোকটার মুখ ঠিক করে দেখা যাচ্ছে না। কণ্ঠস্বরে উষ্ণতা।

রুমা বলল, ‘হ্যাঁ। পেরেছি। বাড়িতে খুব অশান্তি হবে।’

‘তা তো হবেই। তারপরে ভুলেও যাবে।’

রুমা মাথা নিচু করল। ঠিকই তো। তাকে মনে রাখবে কেন? সে কী ছিল? একটা চাকর ছাড়া?

‘আমি কোথায় যাচ্ছি?’ সে জিগ্যেস করল।

লোকটা বলল, ‘আপনি যেমন বললেন, আপনাকে যা জ্বালাতন করেছে, তাতে সাত-আট দিন একটা নিরাপদ আস্তানায় বিশ্রাম করুন। তারপর না হয় দেখা যাবে।’

রুমা বলল, ‘এমনি এমনি বিশ্রাম করব?’

লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ। এমনি এমনি। কিচ্ছু করতে হবে না। খাবেন, আর ঘুমোবেন।’

‘তারপর? তারপর আমায় কী করতে হবে?’

লোকটা বলল, ‘তারপর দেখব আপনাকে দিয়ে কোনও কাজ করানো যায়। আসলে ব্যাপারটা কী বলুন তো, আমাদের কাজে মানুষের প্রয়োজন। এই যে ভারতবর্ষ, এই দেশটার সব থেকে বড় অ্যাডভান্টেজ কী জানেন? মানুষ। অথচ আমরা এই অ্যাডভান্টেজটাই নিতে পারছি না। উল্টে সেটা ডিসঅ্যাডভান্টেজ হয়ে গেল। কত ছোট দেশ, যার জনসংখ্যা আমাদের সিকিভাগেরও কম, আমাদের শাসন করে চলে গেল। আমরা গোলামি ছাড়া কিছু শিখলাম না। এটা কি ঠিক হল? আচ্ছা, আপনার কি ভয় লাগছে?’

লোকটার কথা বলার ক্ষমতা আকর্ষণীয়। রুমার একটুও ভয় লাগছে না। আনন্দ লাগছে। স্কুল ছুটি হবার পর ছোটবেলায় যেমন আনন্দ লাগত, তেমন আনন্দ লাগছে।

সেটাই বলল সে, ‘না, ভয় লাগছে না।’

লোকটা বলল, ‘দুর্ভাগ্যজনক। একটা অদ্ভুত ব্যাপার শুনুন। আমি যতজনকে এভাবে নিয়ে এসেছি আমাদের কাছে, তাদের নব্বই শতাংশ মহিলাই এই উত্তর দিয়েছেন। তাদের ভয় লাগছে না। মানুষ কতটা যন্ত্রণায় থাকলে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজনের সঙ্গে ঘর ছাড়ার পরেও ভয় পায় না।’

রুমা বলল, ‘আমাকে আপনি প্রত্যুষদার কাছে নিয়ে যেতে পারবেন?’

লোকটা বলল, ‘আমি খোঁজ নিয়েছি। টেলিকম কোম্পানিতে দেওয়া কাগজপত্র থেকেই খোঁজ নিয়েছি। আপনি যাকে খুঁজছেন, তার কোনও হদিশ এখনও পাওয়া যায়নি। পেলেই আপনাকে জানাব।

রুমা কিছু বলল না। লোকটা বলল, ‘আপনার সিটের পাশে কেক রাখা আছে। খেতে পারেন। ভালো লাগবে। এত ভালো কেক আমি অনেকদিন খাইনি।’

রুমা বলল, ‘কেক খাব না। আমাকে একটু জল খাওয়াতে পারবেন?’

লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, আমার সিটের পেছনের পকেটে একটা ছোট জলের বোতল আছে।’

রুমা বোতলটা নিয়ে অনেকটা জল খেয়ে নিল।

রাতের রাস্তায় কেমন মসৃণভাবে গাড়িটা চলছে। কত দাম হবে গাড়িটার কে জানে।

লোকটা গান চালিয়েছে। ভারি সুন্দর একটা ইংরেজি গান। গানটা বুঝছে না সে। অথচ শুনতে ভালো লাগছে। লোকটাও সুর দিচ্ছে মাঝে মাঝে।

দিব্যেন্দু গান শুনত না। কেমন অদ্ভুত টাইপের বেরসিক একটা লোক ছিল। গান ভালোবাসে না যারা তারা মানুষ খুন করতে পারে। সে গান গাইত। দিব্যেন্দু শুনে নাক কুঁচকে বলেছিল, ওসব পোষায় না। কী অদ্ভুত তাচ্ছিল্য। কোথাও কোনও অনুষ্ঠানে কেউ গান গাইলে দিব্যেন্দু কথা বলে যেত। এরকম অনেকে আছে। কেউ গান গাইলে কথা বলে। রুমার প্রথম প্রথম খারাপ লাগত। তারপর সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্যান্য বিষয়গুলিও এমনভাবে যুক্ত হতে শুরু করল, যে আর অন্য কোনও অনুভূতিও আসত না। দেখা গেল সে গান শুনছে, দিব্যেন্দু কানে কানে বলে দিল, ‘কী রে খানকি মাগী, ভালো লাগছে, না? মনে মনে ভাবছিস লোকটার সঙ্গে শুলে কেমন হয়? তাই না?’

লজ্জায় লাল হয়ে যেত সে। চারদিকে ভয়ে ভয়ে তাকাত, কেউ কিছু শুনছে না তো? মাটিতে মিশে গেছে কতবার। বেঁচে থাকাটাকেই শাস্তি ভেবে গেছে।

গাড়িতে গানটা কী অদ্ভুত ঘুমপাড়ানি। কতদিন পর এত আরাম লাগছে!

কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, নিজেই জানে না...

২৫

‘রুমা নেই। অফিস যেতে হবে। অফিস না গিয়ে কি ঘরে বসে বসে ছিঁড়ব নাকি?’

বিড়বিড় করতে লাগল দিব্যেন্দু। ঘুম থেকে উঠলে রুমা চা করে দেয়। রুমার বাবা-মাকে বের করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। অন্য কেউ হলে ঘুম আসত না। দিব্যেন্দু অন্য ধাতুতে গড়া। তার কিছু যায় আসে না।

ঘুম ভাঙার পর চিৎকার করল, ‘রুমা।’

কেউ সাড়া দিল না। উঠে বিড়বিড় করতে শুরু করল।

বাইরে বেরিয়ে দেখল পাড়ার লোকজন দাঁড়িয়ে আছে গেটের সামনে। সে বিশেষ পাত্তা দিল না। রুমার বাবা-মা নিশ্চয়ই কাউকে নালিশ করেনি। ফার্স্ট ট্রেনে ফিরে গেছে। ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজল সে। বাথরুমে গিয়ে তৈরি হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আলমারি খুলে জামা-প্যান্ট বের করল।

রুমা গুছিয়ে রাখে বলে সব জামাকাপড় মেঝেতে ফেলল দিব্যেন্দু। ফিরলে রুমাকে সব গোছাতে হবে। রান্নাঘরে গিয়ে বাসন কোসন মেঝেতে ফেলে দিল। বসার ঘরে রুমা সোফার উপর কাপড় রেখেছিল। সব সরিয়ে দিয়ে ঘরের দিকে হিংস্রপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলল, ‘আয় এবার। সব তোকে দিয়ে পরিষ্কার করাব। এলেই বুঝবি কেমন লাগে। বাঁচিয়ে রাখব না তোকে, কুপিয়ে মারব। আয় একবার।’

তৈরি হতে সময় লাগল। মোজা খুঁজে পাচ্ছিল না। আগের দিনের ফেলে রাখা মোজা পরেই বেরোতে হল। অন্যান্য দিন আটটা পঁচিশে বেরোয়। সাইকেলে উঠে ঝড়ের গতিতে স্টেশনের দিকে যেতে থাকে। এদিন একইভাবে বেরিয়ে খানিকটা যাওয়ার পর তার মনে পড়ল তালা দিতে হবে। বাড়িতে কেউ নেই। আবার ফিরে তালা দিয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেখল রুমার বাবা-মা দাঁড়িয়ে আছে। ওহ্‌। এরা তাহলে ফার্স্ট ট্রেনে ফিরে যায়নি। কোথায় গেছিল তাহলে? দিব্যেন্দু বেশি ভাবতে গেল না। তাকে দেখে দুজনেই সিঁটিয়ে গেল। দিব্যেন্দু জোর পায়ে ওদের কাছে গিয়ে বলল, ‘কোথাকার কোন বেশ্যাকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলি। নিশ্চয়ই বাবু পেয়ে গেছে একটা। ফ্যামিলিতে সবাই কী এরকমই?’

রুমার মা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘কী আর বলবো বাবা তোমায়, তুমি সোনার টুকরো ছেলে। আমার মেয়েটাই খারাপ। কোথায় কী করে এসেছে আমি জানি না। যদি কোনও খোঁজ পাই, তোমায় জানাবো।’

ট্রেন ঢুকছিল। দিব্যেন্দু দুজনকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ট্রেনের দিকে দৌড়ল। রুমার বাবা-মা বিহ্বল চোখে দেখল দিব্যেন্দু ট্রেনে উঠে পড়েছে।

তাপসও একই সঙ্গে উঠল। বসার পরে বলল, ‘শ্বশুর-শাশুড়ি না তোর? স্টেশনে ছাড়তে এসেছে নাকি। মাইরি বলছি, বাঙালদের জামাই আদরের তুলনা নেই।’

দিব্যেন্দু শান্ত গলায় বলল, ‘আমার বউ পালিয়েছে।’

তাপস আর কামরুল তার দিকে হাঁ করে তাকাল।

দিব্যেন্দু হড়বড় করে বলে চলল, ‘প্রেম ছিল কোথাও একটা। প্রেম করত মনে হয়। সকালে পালিয়ে গেছে। শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছিল। ওদের রাতে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। তারপর থেকে কোথায় গেছিল জানি না। স্টেশনে এসে দেখি, এখানেই বসে আছে।’

কামরুল বলল, ‘ধুস, ইয়ার্কি মারছ।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘তাস দাও। ইয়ার্কি মারার কিছু নেই এখানে। বউ পালিয়ে গেছে বলে ইয়ার্কি মারব নাকি? এটা কি ঘটিদের মাংস রান্না? অকারণে চিনি দিয়ে দেব?’

তাপস রাগল না। বলল, ‘এ ভাই, তুই অফিস যাচ্ছিস? থানায় কমপ্লেইন করিসনি?’

ট্রেন চলছে বনবাদাড় পেরিয়ে। একটা ছোট খাল পেরোল। কামরায় প্রবল ভিড়ের মধ্যে এক আমলকি বিক্রেতা উঠেছে। বিভিন্ন গলার স্বরে আমলকির গুণাগুণ বোঝাচ্ছে।

দিব্যেন্দু বলল, ‘বউ পালিয়েছে, তাতে কমপ্লেইন করার কী হল? তোমার বউ পালায়নি কখনও?’

তাপস বলল, ‘ওরে, এভাবে পালালে মেয়েরা আর ফেরে না।’

দিব্যেন্দু রাগী চোখে তাপসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঠিক ফিরবে। চিন্তার কিছু নেই।’

তাপস বলল, ‘ছি ছি ছি...কী লজ্জার। তুই বুঝতে পারছিস কী লজ্জার?’

দিব্যেন্দু তাপসের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘লজ্জার না? লজ্জার? দেখাচ্ছি।’

তাসগুলো শাফল করছিল কামরুল। তার হাত থেকে সব তাস নিয়ে জানলা দিয়ে ফেলে দিল দিব্যেন্দু। উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে লাগল, ‘লজ্জার? শালা লজ্জার? লজ্জার কী আছে?’

লোকজনকে ঠেলতে শুরু করে একটু একটু করে এগোতে শুরু করল সে। তাপস ডাকল, ‘এই দিব্যেন্দু, কী করছিস? কোথায় যাচ্ছিস?’

চলন্ত ট্রেনে দিব্যেন্দু সবাইকে ঠেলে ঠুলে দরজার কাছে গিয়ে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিল। তাপস আর কামরুল শক্ত করে ধরে ফেলল। দিব্যেন্দু একই কথা বিড় বিড় করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেল, ‘লজ্জার? লজ্জার কী আছে? লজ্জার কিছু নেই। বউ পালিয়েছে তো কী হয়েছে? পালাতেই পারে। লজ্জার কিছু নেই। কিছু নেই লজ্জার...’

২৬

কেমন শান্ত একটা বিছানা। এসি চলছে একবারে কম তাপমাত্রায়।

ঠান্ডা হয়ে আছে চারদিক।

কতদিন পরে এত ভালো ঘুম হল। কত যুগ সে ঘুমোয়নি। রাতে এমনিতেও ঘুম হতো না। কোনও রাতে তাকে দিব্যেন্দুর পাঙ্খাপুলার হতে হয়েছে। কোনও রাতে একটু ঘুমিয়েছে হয়তো, পিঠে লাথি খেয়ে উঠে পড়তে হয়েছে।

তীব্র ব্যথা থাকত সারা শরীরে।

তার পরিবর্তে এত সুন্দর ঘুম, ভাবাই যায় না। বেশ কয়েকবার উঠতে গিয়েও ওঠেনি সে। অনেকক্ষণ পরে যখন উঠে বসল, কাচের কাছে গিয়ে দেখল, জানলার বাইরে একটা সুন্দর শহর দেখা যাচ্ছে। কোন শহর এটা? কলকাতা?

রুমের ফোন বাজছে। রুমা ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’

‘ঘুম হল? নাকি আরেকটু ঘুমোবেন?’

রুমা হাসল, ‘জানি না। অনেক দিন পরে ভালো ঘুমোলাম।’

‘খুব ভালো। খিদে পেয়েছে?’

খিদের কথায় টের পেল, সে বুঝতে পারেনি এতক্ষণ। পেটটা সত্যিই খালি লাগছে। বলল, ‘হ্যাঁ। ঠিক বলেছেন। খিদে পেয়েছে।’

‘আপনি প্রায় চোদ্দো ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন। খিদে তো পাবেই। দরজা খুলে বেরিয়ে আসুন। করিডোরটা যেখানে শেষ হবে, সেখানেই খাবার ব্যবস্থা আছে।’

ফোন রেখে রুমা ঘর থেকে বেরোল। একটা লম্বা করিডোর। হাঁটতে শুরু করল সে। লোকটা ঠিকই বলেছে। একটা ঘরে চারটে টেবিল পাতা। একটা টেবিলে একজন মেয়ে বসে আছে। রুমা ঘরে ঢুকতে মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এটা কোন জায়গা?’

রুমা বলল, ‘জানি না তো। আপনি জানেন?’

মেয়েটা মাথা নাড়ল, ‘না। জানি না। ঘুম ভাঙার পর আমাকে এখানে খেতে আসতে বলা হল।’

মেয়েটা হাত তুলে ব্যুফে টেবল দেখাল। বিভিন্ন রকম খাবার সাজানো আছে। ভাত, মাংস, মাছ। রুমা সেদিকে একবার তাকিয়ে বলল, ‘আপনি খাবেন না?’

মেয়েটা বিমর্ষকণ্ঠে বলল, ‘আমার বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে। খুব ঝগড়া করে বেরিয়েছি। তবু...’

রুমা বলল, ‘কী নাম আপনার?’

মেয়েটা বলল, ‘এণাক্ষী।’

রুমা বলল, ‘খেয়ে নিন। আপনি বলুন, কী কী আনবো, নিয়ে আসছি।’

এণাক্ষী বিহ্বল চোখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।’

রুমা একটা প্লেটে ভাত, ডাল, একটু পনির নিয়ে এসে এণাক্ষীর সামনে রেখে বলল, ‘খেয়ে নিন। খালি পেটে থাকা ঠিক না। আমারও খুব খিদে পেয়েছে। বাড়িতে থাকলে এত খিদে পেত না। কিন্তু এখানে খুব খিদে পেয়েছে। আমার মনে হচ্ছে আমি কোথাও বেড়াতে এসেছি। খুব মজা লাগছে।’

এণাক্ষী অবাক চোখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার ভয় লাগছে না? এরা তো আমাদের আইসিসের কাছে বেচে দিতে পারে? আরও ভয়ংকর কত কিছু করতে পারে। তাও ভয় লাগছে না?’

রুমা ভাত ডাল নিয়ে এসে এণাক্ষীর সামনে বসে খেতে শুরু করল, ‘না। লাগছে না। আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখান থেকে বেরোলে সব নরকই ভালো লাগে।’

এণাক্ষী মাথা নিচু করল, ‘আমার বর হঠাৎ পাল্টে গেল। আমাকে যা ইচ্ছে বলতে শুরু করল। কিন্তু কোনওদিন আমার গায়ে হাত তোলেনি। কত কিছু কিনে দিত!’

ডালটা ভারি সুন্দর হয়েছে। রুমা আরও ভাত আর ডাল নিয়ে এসে বসল, ‘তাহলে আপনি ওদের কথায় রাজি হয়ে চলে এলেন কেন?’

এণাক্ষী বলল, ‘আমি রাজি হইনি কিছুতেই। কোন এক পার্টিতে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি এদের ছাড়ব না। আমি বাড়ি যাব। তখন কত চিৎকার করলাম, কিছুতেই শুনল না। শুধু বলে গেল খেয়ে নিন। খালি পেটে থাকবেন না। আশ্চর্য!’

রুমা খেতে খেতে বলল, ‘আমার বর আমাকে গল্প করত। ইসলামিক স্টেটে মেয়েরা কী ভয়াবহ অবস্থায় থাকে। তার তুলনায় নাকি আমি ভালো আছি। আমার এখন কোনও ভয়ই লাগছে না। বিশ্বাস করুন।’

এণাক্ষী বলল, ‘আপনার বরের জন্য মন খারাপ লাগছে না?’

রুমা হাসি মুখে বলল, ‘একেবারে না।’

এণাক্ষী মনমরা হয়ে বলল, ‘আমার লাগছে। লোকটা কেমন পাল্টে গেল।’

রুমা বলল, ‘খেয়ে নিন না। তারপর মন খারাপ করবেন না হয়।’

এণাক্ষী খেল না। চুপ করে বসে রইল।

২৭

একা একা দিন কাটানো বড়ই বিরক্তিকর। বাপিদার কড়া নির্দেশ আছে, বাড়ির ভেতরে কাউকে ঢোকানো যাবে না। এদিকে পূর্ণর দিন কাটতে চায় না। টিভিতে কী আর দেখবে? চ্যানেল বেশিবার পাল্টাতে গেলেও ভয় লাগে, পাছে রিমোট খারাপ হয়ে যায়। তখন আবার বাপিদা বকা ঝকা করবে।

সিসিটিভির ছেলেগুলো এখনও আসেনি। বাপিদা বলেছে এবার অন্য জায়গা থেকে ছেলেপিলে আসবে।

ছাদে বসে কিছুক্ষণ পাড়ার লোকজনকে দেখল পূর্ণ। এখন গরম কাল। শীতের মতো কেউ আর নরম রোদে বসে থাকে না। সবাই গরমে ফ্যান বা এসি চালিয়ে ঘরে বসে থাকে। পূর্ণর গরম লাগে না। এসিও লাগে না। গরিবের এসি না চালানোই ভালো। যখন কাজ থাকবে না, তখন বড় কষ্ট হবে। বদ অভ্যাসগুলো মানুষকে শেষ করে দেয়।

ওই নাম্বারটা বাপিদাকে দেওয়ার পর থেকে আর ফোন বাজেনি। পূর্ণর ইচ্ছে হল একবার ওই মহিলার সঙ্গে কথা বলবে। বাপিদা নাম্বার নিয়ে কী করল, জানতে হবে। ফোন করল সে।

ফোন সুইচড অফ বলছে। ধুস।

পূর্ণর হঠাৎ ঠাকুরঘরের কথা মনে পড়ল। প্রথমে জিভ কাটল সে। ছি-ছি। লোকের বাড়িতে আবার উঁকি ঝুঁকি মারবে?

পরক্ষণে মনে হল, কী আছে? একবার দেখে আসাই যায়। দেখে আসার মধ্যে তো কোনও পাপ নেই। বাপিদার বাড়ির সব কিছুই সে দেখেছে। ঠাকুরঘরের আলমারিটা দেখলে কী হয়েছে?

পূর্ণ কিছুক্ষণ ছাদে পায়চারি করে ঠাকুরঘরে গেল। ড্রয়ার থেকে লুকনো চাবিটা বের করে আলমারি খুলল। বাপরে! এগুলো কী? কতগুলো ছোট ছোট বাক্স। কোনদিন দেখেওনি সে। আজব! বের করতে গিয়ে একবারে নীচের খোপে চোখ গেল। ওরে বাবা, কতগুলো টাকার বান্ডিল। এত টাকা রেখে গেছে? টাকাগুলো হাতে নিয়ে দেখল। ও হরি! এ তো দু’হাজার টাকার নোট। এগুলো তো সব বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে। সেদিনই পালের দোকানে দাঁড়িয়ে খবর দেখছিল। বাপিদা জানে না? এ তো বলাও যাবে না। বললে জেনে যাবে সে আলমারি খুলেছিল। কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে পূর্ণ একটা বান্ডিল বের করে রেখে দিল। এত সমুদ্র! এর থেকে একটা বান্ডিল না পাওয়া গেলে কী আর হবে? সুন্দর করে আলমারিটা বন্ধ করে চাবিটা আগের জায়গায় রেখে দিল সে।

দু’হাজার টাকার নোট! বাপরে! কতগুলো আছে এখানে? গুনতে শুরু করল পূর্ণ। একশোটা। একশোটা দু’হাজার টাকার নোট মানে? ওরে বাবা রে! দু’লাখ টাকা? এত টাকা কোনদিন সে একসঙ্গে দেখেনি। অথচ কেমন অবলীলায় বাপিদা রেখে দিয়েছে। এরাই হল বড়লোক। আর তার মতো লোকেরা সব ছোটলোক। এরা মালিকপক্ষ হবে না তো কে হবে?

ফোন বাজছিল। পূর্ণ দেখল, বাপিদা। সঙ্গে সঙ্গে ধরল, বাপিদা বিরক্ত গলায় বলল, ‘তুমি আবার ওই নাম্বারে ফোন করছ কেন?’

পূর্ণ বলল, ‘কোন নাম্বারে?’

বাপিদা বলল, ‘ওই যে মেয়ের নাম্বারটা আমায় দিয়েছিলে?’

পূর্ণ অবাক গলায় বলল, ‘সে কী? তুমি সেটা কী করে জানলে?’

বাপিদা বলল, ‘ও জানা যায়। জার্মানিতে অনেকরকম ব্যবস্থা আছে। আমি জেনে যেতে পারি। তুমি অকারণ ওই নাম্বারটায় ফোন করছ।’

পূর্ণ ভয় পেল। বাপিদা বেশ রেগে গেছে। সে বলল, ‘ঠিক আছে। আমি ফোন করব না আর। হাত পড়ে গেছিল।’

বাপিদা বলল, ‘সে হাত পড়েছে না পা পড়েছে, আমার জানার দরকার নেই। তুমি আর ফোন করবে না।’

পূর্ণ বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা। আমি আর ফোন করব না।’

বাপিদা বলল, ‘তুমি কোন ঘরে এখন?’

পূর্ণ বলল, ‘ছাদে। আচ্ছা...’

টাকার কথাটা বলতে গিয়ে চেপে গেল পূর্ণ।

২৮

এণাক্ষী খুব কম খেল।

রুমা তার উল্টোটা। কতদিন পরে দিব্যেন্দুর চিন্তা না করে খেতে পারছে!

খাওয়া শেষ হবার পরে হলের কোণের বেসিনে মুখ ধুতে না ধুতেই শাড়ি পরিহিত এক মহিলা প্রবেশ করল।

এণাক্ষী সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল, ‘আপনি আমাকে নিয়ে এসেছেন?’

মহিলাটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বললেন, ‘না। আমি আপনাকে নিয়ে আসিনি। আমি স্নিগ্ধা। আপনাদের মেন্টর বলতে পারেন।’

এণাক্ষী নাক মুখ কুঁচকে বলল, ‘মেন্টর? এখানে কি কোনও গেম চলছে নাকি?’

স্নিগ্ধা হাসল, ‘আপনারা দুজনেই খুব কঠিন একটা ফেজে ছিলেন। আপনাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানে নিশ্চয়ই আপনারা বসে বসে খেতে চাইবেন না? আমাদের লক্ষ্য আপনাদের স্বনির্ভর করে তোলা। আপনারা রোজগার করতে পারবেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন। সেজন্যই আমি এখানে এসেছি।’

রুমা স্নিগ্ধার কথা কিছুই বুঝছিল না। এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিছু বুঝতে পারছেন?’

এণাক্ষী বলল, ‘না। কী করতে হবে আমাকে?’

স্নিগ্ধা হাসল, ‘বিভিন্ন রকম কাজ আছে। আমরা কয়েকটা পরীক্ষা করব, সাইকোমেট্রিক টেস্ট হবে। এগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নেবো, আপনাদের কোন কাজে লাগানো হবে।’

এণাক্ষী রেগে গেল, ‘আমি কারো কেনা গোলাম না। আমাকে অজ্ঞান করে, আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে এখানে আনা হয়েছে। আমাকে আটকে রাখলে ফল ভালো হবে না।’

স্নিগ্ধা ট্যাব বের করে কয়েক সেকেন্ড সেটা নাড়াচাড়া করে বলল, ‘আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে কাজ করতে দিতে চান না। আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। খুব ভালো করে জানেন আপনার বাড়ি থেকে আপনার ফিরে যাওয়াটা মেনে নেবে না। তাহলে আপনি এই সময়ে কী করতেন?’

এণাক্ষী বলল, ‘দ্যাটস নান অফ ইয়োর বিজনেস। আমাকে ফেরানোর ব্যবস্থা করুন।’

স্নিগ্ধা কয়েক সেকেন্ড এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে আপনি ট্রেনিং নিতে, আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী নন?’

এণাক্ষী মাথা নাড়ল, ‘না।’

স্নিগ্ধা বলল, ‘বেশ। আপনি আপনার ঘরে চলে যান। আপনাকে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

এণাক্ষী বলল, ‘আমার একটা ফোন লাগবে।’

স্নিগ্ধা বলল, ‘রুমে আপনার খাটের ওপরেই ফোন রাখা হয়েছে। আপনি ফোন করতে পারেন।’

এণাক্ষী ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

স্নিগ্ধা রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনিও কি ফিরতে চান?’

রুমা মাথা নাড়ল, ‘একেবারেই না। আমি ফিরে যেতে আসিনি। কী করতে হবে আমাকে?’

স্নিগ্ধা বলল, ‘আপনার মধ্যে বেশ কয়েকটা ন্যাচারাল ট্যালেন্ট আছে। আপনি কী করতে পারেন, আপনি নিজেই জানেন না।’

রুমা অবাক হল, ‘কী করতে পারি?’

স্নিগ্ধা বলল, ‘আপনি পুনর্জন্ম পেয়েছেন রুমা। কিন্তু আপনি কি আমরা যা বলবো, সেগুলো মেনে নিতে পারবেন?’

রুমা বলল, ‘আমি তো জানি না কী করে বাকি জীবনটা চলবে। যিনি ফোন করেছিলেন, তার ভরসাতেই বাড়ি ছেড়ে এসেছিলাম। কী করতে চান বলুন।’

স্নিগ্ধা রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার পায়ে এখনও ক্ষত আছে। আপনি এখনও ঠিক করে হাঁটতে পারছেন না। আপনাকে কয়েকটা ওষুধ দেওয়া হয়েছে। আপনার রুমে রাখা হয়েছে। আপনি প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধগুলো খেতে পারবেন?’

রুমা বলল, ‘হ্যাঁ।’

স্নিগ্ধা বলল, ‘আপনি চাইলে আপনাকে সময়মতো মনে করিয়ে দেওয়া হবে।’

রুমা মুগ্ধ হল। এত যত্ন? ভাবা যাচ্ছে না! সে বলল, ‘আমাকে একটু বলুন না আমাকে কী করতে হবে? খারাপ কোনও কাজ না তো?’

স্নিগ্ধা বলল, ‘খারাপ কাজ বলতে কী বোঝেন?’

রুমা একটু না ভেবে বলল, ‘শরীর বিক্রির ব্যবসা। আমি এই ভয়টাই পাচ্ছি। আপনারা কি এরকম কিছু করাবেন?’

স্নিগ্ধা হাসল, ‘পৃথিবী এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে রুমা। শুধু মাত্র ওই আদিম ব্যবসাটা ছাড়াও অনেক কাজ আছে।’

রুমা বলল, ‘কীরকম?’

স্নিগ্ধা বলল, ‘সব একদিনে শিখে নেবেন?’

রুমা বলল, ‘আমার টেনশনটা তো দূর করুন।’

স্নিগ্ধা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। এণাক্ষী এসে চিৎকার করে বলল, ‘ফোন যাচ্ছে না। কী ফোন দিয়েছেন?’

২৯

সাহেব ডেকে পাঠিয়েছে।

দিব্যেন্দু সাহেবের চেম্বারে গিয়ে নক করল।

‘কাম ইন।’

দিব্যেন্দু ঘরে ঢুকতে সাহেব বলল, ‘কী হয়েছে তোমার? শুনলাম ফ্যামিলি প্রবলেম?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘একটা প্রবলেম হয়েছে। আমার বউকে পাচ্ছি না। মনে হয় পালিয়ে গেছে।’

সাহেব চোখ কপালে তুলে বলল, ‘পাচ্ছ না? কী করে করলে? আমি তো রোজ দেখতে চাই ঘুম থেকে উঠে যে আমার বউ নেই। কিন্তু পারছি কই?’

দিব্যেন্দু বুঝল না সাহেব ইয়ার্কি মারছে।

সে বলল, ‘এমন কিছু কঠিন ব্যাপার না। মাঝে মাঝে মারবেন। ধরুন একদিন পায়ে হাতুড়ি মারলেন, একদিন গরম ইস্ত্রি হাতে লাগিয়ে দিলেন, মাঝে মাঝেই চড়-থাপ্পড় মারলেন...’

সাহেব হো-হো করে হেসে উঠে বলল, ‘উফ্‌, তুমি নিজের দুঃসময়েও এরকম মজার কথা বলতে পারো, আই মাস্ট অ্যাডমিট, ইউ আর এ গুড স্পোর্ট।’

দিব্যেন্দু অবাক হয়ে সাহেবের দিকে তাকাল।

সাহেব বলল, ‘তুমি একটা কাজ কর, আজকের দিনটা অফিস করতে হবে না। আমি তোমাকে ফুল পেইড ছুটি দিচ্ছি। ঘুরে আস কোনও জায়গা থেকে। নাকি বাইরে ঘুরতে যাবে? আমি ব্যবস্থা করে দেব?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘না স্যার। তার কোনও দরকার নেই।’

সাহেব বলল, ‘আলবাত দরকার আছে। একজন ইয়ং ম্যান এত ভেঙে পড়লে কী করে হবে? যাও, যাও। তোমায় ছুটি দিলাম। ঘুরে এসো। যেদিন খুশি জয়েন কর। আমি কিছু বলব না।’

সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে দিব্যেন্দু নিজের টেবিলে এল। সুদেব এসে পিঠ চাপড়ে দিল, ‘এ ভাই। কী হয়েছে?’

দিব্যেন্দু ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘কিছু না। একটু বেরোতে হবে।’

সুদেব বলল, ‘ডাউন লাগছে তোকে। একটা জায়গায় যাবি?’

দিব্যেন্দু সুদেবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই তো জানিস আমার বউ...’

সুদেব বলল, ‘বউ? ক’টা বউ চাস?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কোথায়?’

সুদেব বলল, ‘আমার একজন আছে। চলে যা। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। নাম্বার নে।’

দিব্যেন্দু নাম্বার নিয়ে বেরোল। অফিসের বাইরেই হলদে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকে। তার বলা ঠিকানা শুনে ট্যাক্সিওয়ালা ভিউয়িং মিরর দিয়ে তাকে দেখে নিল।

দিব্যেন্দু পাত্তা দিল না। মাথা কাজ করছে না। কেন যে সে সুইসাইড করতে গেছিল!

এ বছর বর্ষা নেই। ঘোর গ্রীষ্ম শহরটাকে রোদ যেন পুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে ঘাম। অফিসে এসির মধ্যে থাকলেই ভালো হতো।

ট্যাক্সিওয়ালা নামিয়ে দিয়ে গেল রাস্তার মোড়ে। দিব্যেন্দু সুদেবের দেওয়া নাম্বারে ফোন করল। ফোন রিং হয়ে গেল। কেউ ধরল না।

সুখেন চায়ের দোকানে বসে ছিল। দিব্যেন্দুকে ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় দেখে এগিয়ে এল, ‘কোথাও যাবেন নাকি স্যার?’

দিব্যেন্দু সুখেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমায় অফিসের একজন বলল একজনের কাছে যেতে। সেখানে একটা কাজ ছিল আর কী।’

সুখেন চোখ ছোট করল, ‘কার কাছে বলুন তো? কী নাম?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘শমিতা।’

সুখেন অবাক চোখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনারও ওখানে কাজ?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কেন? আর কার কার আছে ওখানে কাজ?’

সুখেন সামলে নিয়ে বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন। আপনি কি আমাকে টাকা দেবেন বাকিদের মতো?’

দিব্যেন্দু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ‘আমার টাকা বেশি নেই।’

সুখেন বলল, ‘ঠিক আছে। আসুন।’

সুখেন হাঁটতে শুরু করল। তার পেছন পেছন দিব্যেন্দু। কিছুটা যাবার পর একটা ঘরের দরজা দেখিয়ে বলল, ‘যান।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘থ্যাংকস।’

সুখেন বলল, ‘লোকে পাঁচশো দেয়। আপনি পঞ্চাশ টাকা তো দিন।’

দিব্যেন্দু পকেট হাতড়ে একটা পাঁচ টাকার কয়েন বের করল। সুখেন সেটা নিয়ে বলল, ‘তাই দিন। চা খাওয়া যাবে একটা। কতরকম লোক আসছে আজকাল।’

সুখেন গেল না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।

দিব্যেন্দু কলিং বেল টিপল। দরজা খুলল।

শমিতা দিব্যেন্দুকে দেখে বলল, ‘কী চাই?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আপনি কি শমিতা? সুদেব নাম্বার দিয়েছে। ফোন করেছিলাম। ধরছিলেন না।’

শমিতা দরজা ছেড়ে দিল, ‘আসুন।’

দিব্যেন্দু ঢুকে গেল। শমিতা সুখেনকে দেখে মুখ ঝামটা দিল, ‘কীরে? দাঁড়িয়ে আছিস কেন?’

সুখেন বলল, ‘আমি নিয়ে এলাম তো। কাট দিবি।’

শমিতা বলল, ‘ফোট। আমার লোক আছে। সেই পাঠিয়েছে।’

সুখেন হতাশ মুখে দাঁড়িয়ে রইল।

শমিতা দরজা বন্ধ করে দিল।

দিব্যেন্দু চারদিক দেখছে। কেমন তেল চিটচিটে জায়গাটা। তার ঘরের মতো না। শমিতা বলল, ‘কত টাকা?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘পাঁচশো। বউ পাওয়া যাবে?’

শমিতা খিল খিল করে হেসে বলল, ‘এখানে সবাই বউ। যা, ওই ঘরটায় যা।’

একটা ঘর দেখিয়ে দিল শমিতা।

দিব্যেন্দু চারদিক দেখতে দেখতে ঘরটায় ঢুকল।

রুমার বয়সি একটা মেয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে সাজছে। তাকে দেখে বলল, ‘সকাল সকাল ইচ্ছে হল? হেবি রস তো তোর?’

দিব্যেন্দু পকেট থেকে হাতুড়িটা বের করে হাতে নিল।

এই মেয়েটা কি রুমার মতো হবে?

৩০

রাত দুটো।

নিউজ চ্যানেল চলছে। রেকর্ডেড প্রোগ্রাম দেখাচ্ছে।

টিভিতে ডিপার্টমেন্টের বদনাম হচ্ছে। তিলজলা থানার ওসি নীল বাগচী চা খাচ্ছিল। একজন বেশ চিৎকার করছেন। নীলের খারাপ লাগে না। সে মজা পায়। ভালো কথা শুনলেই বরং অবাক লাগে।

দরজা ঠেলে অরিত্র ঢুকল, ‘আমি বেশ কিছুক্ষণ বাইরে বসে আছি। একটু আর্জেন্ট ছিল।’

নীল বলল, ‘ওহ, হ্যাঁ, আমাকে বলেছিল। এক্সট্রিমলি সরি। বসুন প্লিজ।’

অরিত্রকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। সে বলল, ‘আমি একটা বিপদে পড়ে এসেছি স্যার। আমার ওয়াইফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্লু বেঙ্গল হোটেলে পার্টি ছিল। ওখানে যাবার পর থেকে ফোনে পাইনি। হোটেলে পৌঁছনোর পর দেখা গেল যে পার্টিতে যাওয়ার কথা ছিল, সেটায় যায়নি। সিসিটিভি দেখতে চাওয়ায় জানা গেল ক্যামেরা খারাপ আছে। আমি কী করব?’

নীল বলল, ‘মিসিং ডায়েরি করুন। ডিটেলস দিয়ে যান। আমি দেখছি কী করা যায়।’

অরিত্র বলল, ‘হোটেল বলছে সিসিটিভি খারাপ। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। একটা কিছু করে জানা যায় না? জোর করে? ওরা মিথ্যে বলতে পারে তো?’

নীল জলের গ্লাস এগিয়ে দিল, ‘আপনি বসুন। জল খান। একটু শান্ত হন। আমি দেখছি।’

অরিত্র বলল, ‘বসতে পারছি না। শান্ত হব কী করে বলুন তো? কাদের না কাদের পাল্লায় পড়েছে, কেউ যদি কিছু করে ফেলে?’

নীল বলল, ‘প্লিজ বসুন।’

অরিত্র বসল। একবারে গ্লাসের পুরো জল শেষ করে বলল, ‘কতগুলো ইরেসপন্সিবল লোক। আমি বার বার বলেছিলাম যেও না। কে শুনবে কথা? এবার কী হবে?’

নীল বলল, ‘শুরু থেকে বলুন। আপনার ওয়াইফের নাম কী?’

অরিত্র বলল, ‘এণাক্ষী। মায়ের শপথ সিরিয়ালে ছিল। সিরিয়াল দেখলে অনেকেই চিনতে পারবে। আমার সঙ্গে কয়েকদিন ধরে মনোমালিন্য চলছে। আমি একরকম রাগ করেই ওকে বলেছিলাম সংসার থেকে চলে গেলে আমার কোনও সমস্যা নেই। ও ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে হোটেলে গেছিল পার্টিতে জয়েন করতে। আমার পরে অনুতাপ হয়। আমি ওকে খুঁজতে হোটেলে গিয়ে দেখি একজন অরগানাইজারকে ও ওর ব্যাগটা দিয়ে দেয়। তারপর ওর পার্টিতে ঢোকার কথা ছিল। কিন্তু আর ঢোকেনি বা ওকে কেউ দেখেনি। আমি যখন হোটেলে গিয়ে বললাম আমাকে সিসিটিভি দেখাতে, বলছে ক্যামেরা খারাপ।’

নীল বলল, ‘ছবি দেখান।’

অরিত্র ফোন বের করে নীলকে ছবি দেখাল। নীল ছবি দেখেই বলল, ‘এইতো, এনাকে তো আমি চিনি। আমার স্ত্রী সিরিয়াল দেখেন। ও যখন দেখে আমিও দেখেছি। ইনি নিখোঁজ?’

অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ।’

নীল বেল বাজাল। কনস্টেবল আলম এল। অরিত্র বলল, ‘ওর কাছ থেকে ডিটেলস নিয়ে একটা মিসিং ডায়েরি করান।’

অরিত্র বলল, ‘আর কিছু করার নেই?’

নীল বলল, ‘আপনি ছবিটা আমাকে হোয়াটস অ্যাপ করুন।’

অরিত্র বলল, ‘আর হোটেল?’

নীল চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেটা ঠিকই বলেছেন। আচ্ছা আগে ডায়েরিটা করুন। তারপর যাব।’

অরিত্র বলল, ‘ঠিক আছে।’

নীল ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে দিল।

মিসিং ডায়েরি করার পরে নীল অরিত্রকে বলল, ‘চলুন। যাওয়া যাক।’

রাতের কলকাতা। রাস্তা একবারে ফাঁকা। নীল বলল, ‘আপনি ফোন করতে পারতেন। এতটা এলেন কেন?’

অরিত্র বলল, ‘আমার মাথা কাজ করছে না। আমি কী করব কিছু বুঝতে পারছি না। এত রাতে...বুঝতে পারছেন তো?’

নীল বলল, ‘পার্টি কি এখনও চলছে?’

অরিত্র বলল, ‘না মনে হয়। তখনই অনেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সুবীরের থাকার কথা। বলেছিল দেখছে।’

হোটেলের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়াল। সুবীর বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। অরিত্র ডাকল, ‘সুবীর।’

সুবীর এগিয়ে এল। চিন্তিতমুখে বলল, ‘কোনও খবর পেলে?’

অরিত্র মাথা নাড়ল, ‘না। কিচ্ছু পাইনি।’

নীল বলল, ‘আপনার কাছে ব্যাগ দিয়ে গেছিলেন?’

সুবীর বলল, ‘হ্যাঁ।’

নীল বলল, ‘চলুন দেখি।’

রিসেপশনে পৌঁছে নীল রিসেপশনিস্টকে বলল, ‘সিসিটিভি কবে থেকে খারাপ?’

রিসেপশনিস্ট অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বুঝল অরিত্র নীলকে নিয়ে এসেছে। বলল, ‘দু-দিন হয়ে গেল। আমরা টেকনিশিয়ানকে খবর দিয়েছি। কাল অ্যাটেন্ড করবে বলেছে।’

নীল বলল, ‘ব্যাপারটার কিন্তু ইনভেস্টিগেশন হবে। আপনি জড়িত থাকলে ফাঁসবেন। আপনি ঠিক বলছেন তো?’

রিসেপশনিস্ট বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আমাদের সিস্টেম লগে সব লেখা থাকে।’

নীল বলল, ‘লগ দেখান।’

রিসেপশনিস্ট বলল, ‘আপনি এপারে চলে আসুন স্যার। সিস্টেমেই আপডেট হয়েছে দেখাচ্ছি। লগ দেখলেই বুঝতে পারবেন এখানে কোনওরকম ম্যানিপুলেশন করা অসম্ভব।’

নীল বলল, ‘আরেকটা পার্টি হচ্ছিল কাদের?’

রিসেপশনিস্ট বলল, ‘প্রাইভেট পার্টি।’

নীল বলল, ‘ডিটেলস দিন।’

অরিত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছে। তার হঠাৎ করে খুব অসুস্থ লাগতে শুরু করেছে...

৩১

মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছিল সুখেন। দুপুর দেড়টা বাজে।

চা খেতে ইচ্ছে করছিল। এই সময় ভাত খাবার কথা। দিনের বেলায় চা খেয়েই কাটিয়ে দেয় সে।

চা খেলে খিদে চাপা দেওয়া যায়। নইলে কে আবার দুপুরে ঝুপড়িতে গিয়ে রান্না চাপাতে যাবে?

বিল্লু জোর পায়ে দোকানের দিকে আসছে। রাস্তার ওপার থেকেই ডাক ছাড়ল, ‘এই সুখেন, এদিকে আয়।’

সুখেন বলল, ‘কী হয়েছে?’

বিল্লু বলল, ‘আয় না।’

সুখেন দু’দিক দেখে রাস্তা পেরোল। বিল্লু বলল, ‘শমিতা ডাকছে।’

সুখেন বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’

বিল্লু মুখ টিপে হাসল, ‘চল দেখতে পাবি কী হয়েছে।’

সুখেন বিরক্ত হল, ‘দূর, কী হয়েছে বলবি তো। এখানে রাখঢাকের কী আছে? আমি কি তোর কুটুম নাকি?’

বিল্লু বলল, ‘তুই একটা লোক নিয়ে এসেছিলি না?’

সুখেন বলল, ‘আমি নিয়ে যাইনি। লোকটা শমিতার খোঁজ করছিল।’

বিল্লু মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ বে। সে মাল কী করেছে জানিস?’

সুখেন দাঁড়িয়ে পড়ল, ‘কী করেছে?’

বিল্লু বলল, ‘পারুলের পায়ে হাতুড়ি মেরে দিয়েছে।’

সুখেন স্তম্ভিত হয়ে বলল, ‘সে কি? চল চল।’

দৌড়তে শুরু করল সুখেন। বর্ষার সময় বর্ষা না হয়ে রোদ থাকলে বিচ্ছিরি গরম পড়ে যায়। দৌড়তে-দৌড়তেই সুখেন বুঝতে পারছিল কাহিল হয়ে গেছে। শমিতার ঘরের সামনে গিয়ে সে কাশতে শুরু করল। দরজা খোলাই ছিল।

বাড়ির ভেতর ঢুকে দেখল দিব্যেন্দুকে বারান্দায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। দিব্যেন্দু গম্ভীর মুখে মেঝেয় বসে আছে। পারুল চিৎকার করছে, ‘ওরে বাবা রে, মারে, মরে যাব!’

শমিতা তাকে দেখে ছুটে এল, ‘কীরে, ইচ্ছে করে এই পয়মালটাকে নিয়ে এসেছিলি নাকি?’

সুখেন দেখল দিব্যেন্দু টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছে। সে দিব্যেন্দুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ‘এটা কী হল দাদা?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি মেয়েটার মধ্যে আমার বউকে খুঁজছিলাম। আমার বউ পালিয়েছে রাতে। ওকে হাতুড়ি দিয়ে মারতাম, একেও মেরেছি।’

শমিতার হাতে ঝাঁটা ছিল। সে মনে হয় এর আগেও দিব্যেন্দুকে দু-চার বাড়ি দিয়েছে। এ কথাটা শুনে ঝাঁটা পেটা শুরু করে দিল। দিব্যেন্দু নির্বিকারভাবে বসে বসে মার খেতে লাগল।

সুখেন হাত তুলল, ‘মারতে হবে না। আমার মনে হয় একে পার্টির ছেলেদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। লোকটা পাগল। ছিট আছে।’

দিব্যেন্দু জ্বলে উঠল, ‘তোর বাবার ছিট আছে শুয়োরের বাচ্চা।’

শমিতা আঙুল তুলল দিব্যেন্দুর দিকে, ‘শোন, আমি এখনও কাউকে বলিনি। যদি বলি না, তোর কপালে দুঃখ আছে। আমাদের মেয়েটাকে মেরেছিস তুই। এখানকার লোক জানতে পারলে তোর কপালে বিরাট দুঃখ আছে। ডাকবো দেখবি?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘ডাকো। আমার আর কী? বউ পালিয়েছে। মারলে মারবে।’

শমিতা কাঁদো কাঁদো মুখে সুখেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী করব?’

সুখেন বলল, ‘আমার মনে হয় বউ পালিয়ে গেছে বলে লোকটার কোনও সমস্যা হয়েছে। বসিয়ে রাখ এখন। না না, তা না, এটাকে ঘরে আটকে রাখা যাক। এই চল তো।’ দিব্যেন্দুর হাত ধরে টানল সুখেন। দিব্যেন্দু বাধা দিল না। সুখেনের সঙ্গে হাঁটতে থাকল। একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে দিব্যেন্দুকে বাইরে থেকে আটকে দিল সে।

শমিতা কপালে হাত দিয়ে বলল, ‘এক একটা এসে জোটেও। পারুলকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’

সুখেন বলল, ‘আমিই নিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু একে কী করবি?’

শমিতা বলল, ‘টাকা পয়সা কী আছে দেখি। থাকলে ছেড়ে দেব। নইলে পার্টির লোকেদের হাতে দিয়ে দেব। জেলের হাওয়া খেয়ে আসুক।’

সুখেন বলল, ‘এসেই মেরে দিল?’

শমিতা বলল, ‘হ্যাঁ। আমি ঢোকালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি পারুল চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। আমি ভাবলাম গাঁতিয়ে লাগাচ্ছে। পারুলের চিৎকার দেখি থামেই না। তারপর দরজা খুলে পারুল বেরিয়ে এল।’

সুখেন বলল, ‘বাকি মেয়েগুলো কোথায়?’

শমিতা হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘ওরা বেরিয়েছে।’

সুখেন অবাক হয়ে বলল, ‘সবাই?’

শমিতা বলল, ‘হ্যাঁ।’

সুখেন পারুলের দিকে তাকালো, ‘চল রে। তোকে নেয়নি কেউ, তোর কপালই খারাপ যা দেখছি।’

শমিতা হাত তুলল, ‘থাক। তোকে যেতে হবে না। আমি দেখছি কী করা যায়।’

৩২

‘আপনাকে একটা ভিডিও দেখাব রুমা। দেখবেন?’

খেয়ে ওঠার পর কখন যে ঘুম চলে এসেছিল, বুঝতে পারেনি রুমা। ঘুম ভেঙে দেখল সে একটা সোফায় বসে আছে। তার সামনে একজন ভদ্রলোক পায়চারি করছেন।

সে বলল, ‘আপনি কে?’

লোকটা হাসল, ‘ভুলে গেলেন? আমিই আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলাম তো।’

রুমা বলল, ‘ওহ্‌। আপনি? আপনাকেই আমি ফোন করেছিলাম? আপনিই নিয়ে এসেছিলেন?’

লোকটা মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। আমিই এনেছিলাম।’

রুমা বলল, ‘আচ্ছা আমার সঙ্গে যাকে এনেছিলেন, তার কী হল? সে বাড়ি যেতে চাইছিল যে?’

লোকটা হাসিমুখেই বলল, ‘আমরা দেখছি ব্যাপারটা। কী করা যায়, ঠিক করা হবে।’

রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘মানে? কী করা হবে?’

লোকটা বলল, ‘সেটা পরে আপনি জানতে পারবেন। তার আগে যেটা বলছিলাম, ভিডিও দেখবেন? অলমোস্ট রিসেন্ট ভিডিও।’

রুমা বলল, ‘দেখান।’

লোকটা একটা ট্যাব তার দিকে এগিয়ে দিল। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দিব্যেন্দু একটা ঘরে ঢুকে আচমকা একটা মেয়ের পায়ে হাতুড়ি মেরে দিয়েছে। রুমা শিউরে উঠল। আরেকটু হলেই তার হাত থেকে ট্যাবটা পড়ে যাচ্ছিল। সে কোনও মতে বলল, ‘এটা কোথায়?’

লোকটা বলল, ‘রেড লাইট এরিয়ায়। ইনিই আপনার হাজব্যান্ড তো?’

রুমা দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে ছিল। কোনমতে বলল, ‘হ্যাঁ।’

লোকটা বলল, ‘বুঝতে পারছি কোন নরক থেকে আপনাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়েছে। এবার বাকি জীবনটা আপনি কী চান, তা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।’

রুমা বলল, ‘কী চাই মানে?’

লোকটা বলল, ‘আমাদের জীবন এক একটা সময় এমন একটা জায়গায় চলে যায়, যেখান থেকে আমরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারি না। আমরা নিজেরাই বুঝতে পারি না, বেঁচে থেকে আমাদের কী লাভ।’

রুমা মাথা নিচু করল, ‘হ্যাঁ, আমার সব সময় মনে হতো, মরে গেলেই ভালো হতো।’

লোকটা বলল, ‘আপনি কিন্তু মরে যাননি। আপনি বেঁচে আছেন। আপনি একটা নতুন জীবন পেয়েছেন। প্রতিদিনের নরক যন্ত্রণার হাত থেকে বেঁচে গেছেন। আপনি নিশ্চয়ই সেই জীবনে আর ফিরে যেতে চান না?’

রুমা মাথা নাড়ল, ‘চাই না।’

লোকটা বলল, ‘আপনি আপনার বাবার বাড়ি ফিরতে চান?’

রুমা বলল, ‘আমার সে রাস্তা বন্ধ। ওরা কিছুতেই আর আমাকে ফেরত নেবে না। আমার থেকে ভালো কেউ জানে না সেটা।’

লোকটা বলল, ‘আমি আপনাকে একটা অফার দেব রুমা। আপনি যদি চান, কাজটা করবেন না, আমি জোর করব না। কিন্তু আপনার মতো মেয়েরা, যারা জীবনে এতটা সহ্য করে এসেছে, তারা অনেক কাজ করতে পারে। এমন কাজ করতে পারে, যেটা কেউ ভাবতেও পারবে না।’

রুমা বিহ্বল চোখে তাকাল, ‘আমি যে কিছু জানি না। আমি কী করে কোনও কাজ করব?’

লোকটা বলল, ‘জানবেন। একদিনে কিছু হবে না। তার জন্য সময় লাগবে। আমরা আপনাকে তৈরি করব।’

রুমা বলল, ‘কী কাজ?’

লোকটা তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বলল, ‘সেটা এখনই বলব না। আপনার ট্রেনিং শুরু হবে কাল থেকে। দেখুন, আপনি কীভাবে সেটা গ্রহণ করেন। তারপর আমরা আরেকবার কথা বলব না হয়। ঠিক আছে?’

রুমা বলল, ‘ট্রেনিং হবে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমাকে কি আমার শরীর বেচতে হবে?’

লোকটা বলল, ‘শরীর? শরীর কী? এতদিন তুমি কী করেছ শরীর দিয়ে?’

লোকটার যেন একটা অদ্ভুত সম্মোহিনী ক্ষমতা আছে। লোকটা যেন তার মাথায় ঢুকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তার মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলছে যেন। আপনি থেকে তুমিতে চলে গেছে, রুমা বুঝতেও পারল না।

রুমা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তা বলে...’

লোকটা বলল, ‘তোমার কাছে যা আছে, তা সবার কাছে থাকে না। তুমি নিজেই জানো না, তুমি কী করতে পারো। আমরা কেউই জানি না। তুমি আমার কথা শুনে চলো, শুনে দেখ আমি যা বলছি। শুনবে?’

রুমা মাথা নাড়ল, ‘শুনব। আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আমার আর কিছু করারও নেই।’

লোকটা এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত দিল, ‘আমি জানি তুমি পারবে। তোমাকে পারতেই হবে।’

রুমা বলল, ‘আমাকে মেরে ফেলবে না তো কেউ?’

লোকটা হাসল, ‘আমরা সবাই একদিন মরে যাই রুমা। তার আগে বেঁচে থাকার মতো বাঁচা দরকার। তাই না?’

৩৩

‘টাকা ভালো না খারাপ?’

‘জানি না। ভালোই হবে। টাকা ছাড়া তো কিছু হয় না।’

‘আর অতিরিক্ত টাকা?’

‘সেটা একটা কথা। আমাদের পাড়ায় একটা বাড়ি ছিল। রোজ সকালে উঠে সে বাড়িতে খেলতে যেতাম। চার-পাঁচটা ভাই। একটা উনুন ছিল। রান্না হচ্ছে। সকালে ডাল আর রুটি করত। আমাকেও দিত। দেখতাম সবাই মিলে খাচ্ছে। সাদামাটা খাবার, তাই কী ভালো লাগত খেতে। দিনে দিনে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। রান্নাঘর আলাদা হয়ে গেল। সবাই আলাদা থাকে। সবার টাকা আছে। ভালো আছে কি তারা?’

দুটো লোক কথা বলছে নুরুলের চায়ের দোকানে। পূর্ণ চুপ করে বসে আছে। তার পকেটে এক তাড়া দু’হাজার টাকার নোট। এত টাকা সে কোনও কালে একসঙ্গে দেখেনি। কী করবে এই টাকাটা নিয়ে বুঝতে পারছে না।

আকাশ কালো করেই আছে। একটু আগে ঝির ঝির বৃষ্টি হয়েছে। এখন বন্ধ আছে। আবার শুরু হবে হয়তো।

টাকাটা পাবার পর থেকে বাপিদার ফোনের ভয়টাও কমেছে তার। টাকার জন্যই তো বাপিদার বাড়িতে থাকতে গেছিল সে। সেই টাকাটাই পেয়ে গেলে আর চিন্তার কী আছে?

উদাস মুখে বিড়ি ধরাল সে। লোক দুটো চলে গেলে নুরুল বলল, ‘কীরে পুন্ন, টাকা দিবি না? তোর অনেক বাকি হয়ে আছে রে।’

পূর্ণ বলল, ‘কত বাকি? হিসেব করেছিস?’

নুরুল ডায়েরি বের করল। চোখ ছোট ছোট করে সেদিকে দেখে বলল, ‘দেড়শো টাকা।’

নুরুল ভালো মানুষ। কোনও দিন টাকার জন্য চা দেওয়া বন্ধ করেনি। পূর্ণ বলল, ‘আজকেই দিয়ে দেব বন্ধু। তুই ভালো বন্ধু। আমার দুঃখের দিনে আমাকে খাইয়েছিস। কত দিন না খেয়ে ছিলাম, তুই ডিম টোস্ট করে খাইয়েছিস। তোকে টাকা না দিয়ে কোথায় যাব রে ভাই?’

নুরুল খুশি হল, ‘কী হয়েছে রে তোর? এত ভালো ভালো কথা বলছিস কেন?’

পূর্ণ উঠে নুরুলের কাছে গিয়ে বলল, ‘টাকা পেয়েছি ভাই। কোত্থেকে পেয়েছি, জিগ্যেস করিস না। তবে পেয়েছি। সমস্যা হল, টাকাগুলো দু’হাজারের নোটে আছে। পালটাবো কী করে?’

নুরুল চারদিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাপির বাড়িতে?’

পূর্ণ মাথা উপর নিচ করল।

নুরুল বলল, ‘লোকের টাকা। চোর অপবাদ দেবে যে?’

পূর্ণ বলল, ‘সারারাত ভেবেছি। কত লোকের অগাধ টাকা। আর আমাদের মতো লোকের কিছু নেই। যাদের অগাধ টাকা, তাদের থেকে একটু নিলে তারা কি দেখতে পাবে? সব তো নেবো না। একটু নেবো। তুই তোর মতো করে দোকান দাঁড় করাবি। আমায় খাওয়াবি। আমার তো বউ নেই। সংসার নেই। আমাকে একটু খাওয়াতে পারবি না সারাজীবন? দেখ না, টাকাগুলো যদি কিছু করা যায়?’

নুরুল বলল, ‘কত টাকা?’

পূর্ণ বলল, ‘দু’লাখ।’

নুরুল হেসে ফেলল, ‘দু’লাখ? ওতে আজকালকার দিনে কিছু হয় নাকি? তুইও একটা পাগল। দিয়ে দিস। আমার ব্যাঙ্কেই ঢুকিয়ে দিয়ে আসব। তারপর তোকে পাঁচশোর নোট দিয়ে দেব না হয়।’

পূর্ণ চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সে কী রে ভাই? দু’লাখ টাকায় কিছু হয় না?’

নুরুল বলল, ‘এই যে দোকানটা দিয়েছি, এর জন্য পার্টির লোকেদের মাসে সাত হাজার টাকা করে দিতে হয়। বুঝতে পারিস? সাত হাজার টাকা। মাসে সাত হাজার। বছরে চুরাশি হাজার টাকা। তার উপর আছে বাজার সমিতির বিশ্বকর্মা পুজো, কালি পুজো, দুর্গা পুজোর চাঁদা। আরও কত চাঁদা আছে। শেতলা পুজো হবে, গণেশ পুজো হবে, একটার পর একটা কিছু না কিছু চলতেই থাকবে। বছরে এক লাখ টাকা তো তোলা দিতেই চলে যায়। আর দু’লাখ। ধুস।’

পূর্ণ বলল, ‘টাকার কোনও দাম নেই?’

নুরুল বলল, ‘নেই। সত্যি নেই। দু’লাখে সারাজীবন চলবে না। হ্যাঁ, তুই একলা মানুষ। সাত-আট বছর রোগ-ভোগ না থাকলে খাবার টাকা উঠবে। এটুকুই।’

পূর্ণ পকেট থেকে নোটের তাড়া বের করে নুরুলের হাতে দিয়ে বলল, ‘রাখ তবে। এটা দিয়ে যা করার করতে হবে।’

নুরুল সন্তর্পণে চারদিকে তাকিয়ে টাকাগুলো তাড়াতাড়ি নিজের বাক্সে রাখল। তারপর একটা নোট বের করে দেখে নিয়ে বলল, ‘টাকাটা জাল মনে হচ্ছে রে।’

পূর্ণ চমকে উঠল, ‘সে কী?’

৩৪

একটা মাছি ঘুর ঘুর করছে চোখের সামনে। দিব্যেন্দুর অস্বস্তি হচ্ছে। মাছিটা ঘুরে ঘুরে আসছে। চোখের নীচে ব্যথা করছে। প্রবল ব্যথা। মাথাটা ঘোরাচ্ছে।

সুখেন তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিড়ি টানছে। দিব্যেন্দুর জ্ঞান ফিরেছে দেখে বলল, ‘ভাই কি পুরো মেন্টাল? না হাফ?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘মানে?’

সুখেন বলল, ‘আমি তো জানি এ পাড়ায় লোকে লাগাতে আসে। হাতুড়ি মারতে আসে, তা তো প্রথম দেখলাম। সমস্যা কী জীবনে?’

দিব্যেন্দু লাল চোখে সুখেনের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। কী বলবে বুঝতে পারল না। রাত হয়েছে। মোড়ের মাথায় অনেকেরই আনাগোনা বেড়েছে। সুখেনের যেতে ইচ্ছে করছিল না। এরকম চিজ রোজ রোজ আসে না। একে পুরোপুরি মাপতে না পারলে পরে নিজেকেই দোষারোপ করতে হবে।

সুখেন বলল, ‘তোমার কপাল ভালো। বেঁচে থাকাটাই এ যুগে চ্যালেঞ্জ। তুমি বেঁচে আছ, এত কিছু করে, হালকা ক্যাল্যানি খেয়ে, এর থেকে ভালো তো আর কিছু হতে পারে না। বাড়িতে কে কে আছে?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কেউ নেই। বউ ছিল। পালিয়েছে।’

সুখেন বলল, ‘বউকে এভাবে ক্যালাতে?’

দিব্যেন্দু মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ।’

সুখেন পকেট থেকে টুথপিক বের করে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, ‘তুমি লিজেন্ড আদমি আছ। বউকে মনে পড়ছিল বলে পারুলকে হাতুড়ি মেরে দিয়েছ। আমার মনে হচ্ছে তোমার মগজের সব স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেছে। ঠিক মনে হচ্ছে তো মামা?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি বাড়ি যাব।’

সুখেন বলল, ‘সে তো যাবে। এখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে। রাতটা কাটিয়ে যেও। যা খেয়েছ, একা একা তো ফিরতে পারবে না। চল দেখি, আমার ঝুপড়িতে।’ দিব্যেন্দু কোনওমতে উঠতে গিয়ে পড়ে গেল। সুখেন তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে দিব্যেন্দুকে ধরল, ‘এখন একজনের কাঁধে চল। আরেকটু হলে চারজনের কাঁধে যেতে হতো।’

দিব্যেন্দু যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে সুখেনের ঝুপড়িতে ঢুকল। সুখেন বলল, ‘কার্ডবোর্ডের উপর শুয়ে পড়।’

মেঝেতে কার্ডবোর্ড পাতা ছিল। দিব্যেন্দু তার উপরে শুয়ে পড়ল। সুখেন বলল, ‘ভাত বসাচ্ছি। খেয়ে নাও কোনমতে। কাল সকালে দেখা যাবে কী করব।’

দিব্যেন্দু উল্টে শুয়ে আছে। সুখেন চাল চাপাল। বলল, ‘তোমার পকেটে যে টাকা ছিল, ওরা সব নিয়ে নিয়েছে। ভালো লোকের ঘরে গিয়ে পাঙ্গা নিয়েছ। শমিতা হল এখানকার ডন। আর তুমি তার ঘরের মেয়ের পায়েই মেরে দিয়েছো। এর থেকে ট্রেনের সামনে গিয়ে ঝাঁপ দিতে। কম ঝামেলায় হয়ে যেত।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। সবাই মিলে আটকে দিল।’

সুখেন বড় বড় চোখ করে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বটে? বউয়ের দুঃখে এত কষ্ট হচ্ছে?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘একবার সামনে পাই, মাথায় ইট মেরে মেরে শেষ করব! কত বড় সাহস! বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে! কোন নাগরের সঙ্গে পালিয়েছে কে জানে। যখন খুঁজে পাবো, দুটোকে একসঙ্গে মারব।’

দিব্যেন্দু এমনভাবে কথা বলছে, যেন কোনও বিষাক্ত সাপ ফোঁস ফোঁস করছে। সুখেন শিস দিয়ে উঠল, ‘বাঃ গুরু, তোমার হবে। তুমি হেবি ভিলেন হবে।’

দিব্যেন্দু নিজের মনে বলে চলল, ‘শালি পালিয়ে গেল। ভেবেছে পালিয়ে বাঁচতে পারবে। দাঁড়া না, আমি তোকে ঠিক খুঁজে বের করব। তারপর কীভাবে বিষ ঝাড়ব, তুই নিজে দেখতে পাবি।’

সুখেনের ফোন বাজছিল। সুখেন দেখল শমিতা ফোন করছে। সে ফোন নিয়ে বাইরে গেল। শমিতা থমথমে গলায় বলল, ‘মালটাকে তুই নাকি নিয়ে গেছিস?’

সুখেন বলল, ‘কেন?’

শমিতা বলল, ‘কোথায় নিয়ে গেছিস?’

সুখেন অম্লানবদনে মিথ্যে বলে দিল, ‘ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে এলাম তো। কেন?’

শমিতা চিৎকার করে উঠল, ‘উফ্‌, আমাকে জিগ্যেস করবি না?’

সুখেন বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’

শমিতা বলল, ‘মালটাকে খুঁজতে লোক পাঠিয়েছে।’

সুখেন বলল, ‘কে পাঠিয়েছে?’

শমিতা বলল, ‘সেটা তুই জেনে কী করবি? কোথাকার ঠিকানা বলেছিল?’

সুখেন বলল, ‘মানিকতলা শুনলাম।’

ফোন কেটে গেল। সুখেন ঘরের ভেতরে ঢুকে বলল, ‘তোমার তো হেবি ডিমান্ড গুরু। খোঁজে লোকও চলে এসেছে।’

দিব্যেন্দু সুখেনের কথার পাত্তাও দিল না। নিজের মনে বিড়বিড় করে যেতে লাগল।

৩৫

‘জাল নোট! জার্মানিতে থেকে বাপি জাল নোটের কারবার করে নাকি রে?’ হতভম্ব গলায় বলল নুরুল।

পূর্ণর মাথা ভোঁ-ভোঁ করছিল। সে বলল, ‘আমি জানি না। কেমন কপাল আমার। ভাবলাম কদিন একটু শান্তিতে থাকতে পারব, তাও গেল।’

নুরুল বলল, ‘তুই সব টাকা যেমন ছিল, তেমন রেখে দে। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করে তো লাভ নেই। খামোখা বদনামের ভাগীদার হবিই বা কেন?’

পূর্ণ মাথা নাড়ল, ‘ঠিকই বলেছিস। দিয়ে আসি।’

নুরুলের থেকে টাকাগুলো নিয়ে আবার পকেটে ঢুকিয়ে চুপ করে বসল পূর্ণ। চায়ের খদ্দের এসে গেছে। নুরুল ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পূর্ণ উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল।

নুরুল ডাকল, ‘এই পুন্ন, চা খেয়ে যা আরেক কাপ। আমি খাওয়াচ্ছি।’

পূর্ণ ম্লান মুখে তাকাল। নুরুল বলল, ‘আয় আয়। বোস।’

পূর্ণ চুপ করে বসে চা হাতে নিয়ে বসল। এলাকা জমজমাট। মেলা হবে। মাঠে বাঁশ পড়ছে। গাড়ি আসছে। ঘোর বর্ষায় মেলা চলবে। ভিড় করে আসবে লোকে। কাঁদায় আছাড়ি পিছাড়ি খাবে। তবু লোকের মেলা দেখার পুরকিই আলাদা।

খদ্দের চলে গেলে নুরুল বলল, ‘টাকাগুলো ঘরে রেখে দিয়েছিল কেন রে?’

পূর্ণ বলল, ‘কে জানে। কী করতে রেখেছে।’

বাক্সর মতো আরও কী সব দেখেছে, কিছু বলল না পূর্ণ।

নুরুল বলল, ‘কাউকে বলার দরকার নেই। শুধু তুই ফাঁসিস না।’

পূর্ণ বলল, ‘কাজ ছেড়ে দেব। এখানে কাজ করব না।’

নুরুল বলল, ‘তা কেন? কে খাওয়াবে তোকে? মাস গেলে কিছু টাকা তো পাবি।’

পূর্ণ বলল, ‘সেগুলো জাল হয় যদি?’

নুরুল বলল, ‘হবে না। আমার মনে হয় না সেগুলো জাল হবে।’

মন মরা হয়ে কিছুক্ষণ বসে চা শেষ করে পূর্ণ উঠে পড়ল।

এলাকায় টোটো গিজগিজ করছে। আগে রিক্সা চলত। ভ্যান চলত। এখন টোটো চলে। প্রথমদিকে টোটো ভাড়া এত ছিল না। ইদানীং প্রচুর বেড়ে গেছে। তার সঙ্গে টোটোচালকদের রোয়াবও বেড়েছে।

পূর্ণ একজনকে জিগ্যেস করল, কত নেবে। বলে সত্তর টাকা। আগে কুড়ি টাকা নিত। সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। নুরুল ঠিকই বলছিল। দু’লাখ টাকায় কিছু হয় না। এক দিকে ভালোই হয়েছে।

ফোন রিং হচ্ছে। বাপিদা ফোন করছে। ধরল সে, ‘বল।’

বাপিদা বলল, ‘ক্যামেরার লোক বাড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তুমি কোথায়?’

পূর্ণ বলল, ‘বাজারে এসেছিলাম। যাচ্ছি। কুড়ি মিনিট পরে আসতে বল।’

বাপিদা রেগে গেল, ‘তোমাকে না বলেছিলাম, বাড়ি ফাঁকা রাখবে না। কেন আমাদের ওখানে সব্জিওয়ালা যায় না?’

পূর্ণ উত্তর দিল না। চুপ করে রইল।

বাপিদা বলল, ‘কী হল? চুপ করে আছ কেন?’

পূর্ণ বলল, ‘খুব গরম পড়েছে। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি তো। চলে যাচ্ছি।’

বাপিদা বলল, ‘যাও। আর মই টইগুলো দেখে নিও। এবারে যেন ভেঙে না পড়ে। আমি না থাকলে কিছুই হয় না দেখছি।’

পূর্ণ বলল, ‘দেখব দেখব। চিন্তা কোরো না। দরকার হলে আমি মই ধরে রাখব। চিন্তার কোনও কারণ নেই।’

বাপিদা বলল, ‘আজকের মধ্যে সব কাজ যেন হয়ে যায়। আর ঠাকুরঘরেও একটা ক্যামেরা লাগাতে বলবে। ঠিক আছে?’

পূর্ণ থমকে গেল, ‘ঠাকুরঘরে?’

বাপিদা বলল, ‘হ্যাঁ। বাথরুম ছাড়া সব ঘরেই লাগানো থাক। আমি তাহলে এখান থেকে সব দেখে রাখতে পারব। তুমিও যখন ইচ্ছে বাজার যেতে পারবে। চিন্তার কিছু থাকবে না।’

পূর্ণ বলল, ‘ঠিক আছে। বলে দেব।’ ফোন কেটে দিল বাপিদা।

পকেটে টাকাগুলো যেন মরে পড়ে আছে। অথচ বাজার যাবার পথে তার পকেট কেমন গরম মনে হচ্ছিল। বুকটাও উত্তেজনায় জোরে জোরে ধুকপুক করছিল। ব্যাজার মুখে পূর্ণ হাঁটতে থাকল।

৩৬

‘লগ ঠিকই আছে। এদের ক্যামেরা খারাপ।’

চিন্তিত মুখে বলল নীল।

অরিত্র বলল, ‘তাহলে কী হবে?’

নীল বলল, ‘আমি আপনার স্ত্রীর ফোনটা ট্রেস করতে দিয়েছি। দেখা যাক, কিছু পাওয়া যায় নাকি। তার আগে আপনি বলুন, ওর আচরণে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?’

অরিত্র নীলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাকে তো বলেছি ওর সিরিয়াল করা নিয়ে একটা ঝামেলা চলছিল।’

নীল বলল, ‘বলেছেন?’

অরিত্র বলল, ‘বলিনি? জানি না, মনে করতে পারছি না। তাহলে এখন বলি, ওর এই সিরিয়াল করা, রাত করে বাড়ি ফেরা, লেট নাইট পার্টি করা, এসব নিয়ে আমার আপত্তি আমি জানিয়েছিলাম। রাগ করেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। কিন্তু তা বলে এত তাড়াতাড়ি ব্যাগ রেখে কোথাও চলে যাওয়ার মেয়ে ও নয়। আমি নিশ্চিত এণাক্ষী কোনও সমস্যায় পড়েছে।’

নীল মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে, সেকেন্ড ব্যাঙ্কোয়েটের প্রাইভেট পার্টির আরও ডিটেলস আমি বের করার চেষ্টা করছি। যেখানে যেখানে যা যা জানানোর, আমি তাও জানিয়ে দিচ্ছি। আপনি বাড়ি চলে যান। রেস্ট করুন। এখানে সেখানে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়ে তো কোনও লাভ হবে না, তাই না?’

অরিত্র অন্য দিকে তাকাল। বলল, ‘বুঝতে পারছি সবটাই। কিন্তু ওর কোনও ক্ষতি হলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। ও খানিকটা ঝোঁকের মাথাতেই...’

নীল অরিত্রর কাঁধে হাত রাখল, ‘আরে এরকম তো হয়। আমারও হয়। স্বামী-স্ত্রী ঝগড়া তো করবেই। তাছাড়া, ব্যাপারটা তো এমন না যে আপনি ওয়াইফকে বাড়িতে খুন করে এসে এখানে একটা সিন তৈরি করছেন। সুবীরবাবু আপনার ওয়াইফকে দেখেছে। তাই আপনি সেদিক থেকে সেফ।’

অরিত্র চমকে নীলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মানে! এ আবার কী কথা বলছেন?’

নীল বলল, ‘এরকম ভাবে রিয়্যাক্ট করার কিছু হয়নি। তদন্তে নামলে সবদিক যাচাই করে দেখতে হয়। সবার আগে আপনার সব রকম অভিযোগ থেকে ফ্রি হওয়া দরকার। আপনারা যেখানে থাকেন, সেখানের এন্ট্রান্স বা এক্সিটে সিসিটিভি আছে তো?’

অরিত্র বলল, ‘আছে। তা বলে আপনি আমাকেই...’

নীল বলল, ‘ঠিক আছে। ওই ফুটেজ এটা প্রমাণ করে দেবে যে স্ত্রীর নিখোঁজে আপনার ডিরেক্ট কোনও হাত নেই। দ্যাটস ফাইন। ওর কোনও শত্রু? কারো সঙ্গে ঝামেলা?’

অরিত্র বলল, ‘না। আমার অন্তত জানা নেই। তবে লাস্ট কয়েক মাসে ওর অনেক নতুন লোকজনের সঙ্গে পরিচিতি হয়। তারা কে কী করেছে, তাদের সঙ্গে কী রিলেশন ছিল, কী কথা হতো, আমি কিচ্ছু জানি না।’

নীল বলল, ‘দু-তিন দিন সময় দিন, এর মধ্যে না ফিরলে সব জেনে যাব আমরা। আপনাকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আপনি বাড়ি যান। উনি যদি বাড়ি চলে আসেন, আমাকে জানাবেন, নাম্বারটা নিয়ে নিন।’

নীল নাম্বার বলল। অরিত্র কাঁপা কাঁপা হাতে নাম্বার সেভ করে নিল।

নীল অরিত্রকে দেখে বলল, ‘শুনুন, আমার মনে হয় না এত রাতে এই টেন্সড অবস্থায় আপনার ড্রাইভ করে যাওয়া ঠিক হবে। আপনার গাড়ি তো থানাতেই থাকল, আপনাকে বরং আমি নামিয়ে দিয়ে আসি। কাল গাড়িটা নিয়ে যাবেন।’

অরিত্র আপত্তি করল, ‘না অফিসার, তার দরকার নেই।’

নীল বলল, ‘দরকার আছে। আপনি বেশ আন্সটেবল হয়ে গেছেন। বেশি চিন্তা করে ফেলছেন। অত ভাবার কিছু হয়নি। চলুন।’

অরিত্রকে একপ্রকার জোর করেই নীল জিপে তুলল। গাড়ি স্টার্ট হতেই বলল, ‘আপনাদের স্বামী-স্ত্রী মনোমালিন্য হচ্ছিল, সে কথা এই শুটিং পার্টিরা জানে?’

অরিত্র বলল, ‘জানে। হয়তো জানে না। আমি ঠিক বলতে পারব না। অনেক মেয়ের বাড়িতেই ঝামেলা হয়। লাইনটা তো সুবিধার না।’

নীল বলল, ‘এরকম ধারণা কেন হল আপনার?’

অরিত্র বলল, ‘অন্য লোক এসে আপনার বউয়ের হাত ধরবে, তার কোমরে হাত রেখে নাচবে, সবসময় ভালো লাগে আপনার? আমি অত উদার হতে পারিনি, কী করব?’

নীল হেসে ফেলল।

৩৭

রুমা খাটে শুয়ে টিভি দেখছে। কী যে আরাম লাগছে! এসি চলছে। ঘরটা ঠান্ডা হয়ে আছে। ঘরের ভেতর কত কিছু আছে। টি ব্যাগ আছে, চিনি আছে, দুধ আছে, কফি আছে। গরম জল করার ইলেকট্রিক কেটলি আছে। দিব্যেন্দু একবার এরকম টি ব্যাগ নিয়ে এসেছিল। তাকে গরম জল করে দিতে বলত। নিজে চা বানিয়ে খেত। রুমার ইচ্ছে করত টি ব্যাগের চা খেতে, লজ্জায় বলতে পারেনি কখনও। তাছাড়া বললে যদি আজেবাজে কথা বলত, কিংবা গায়ে হাত তুলত! ‘শখ? শখ হয়েছে? শখ বের করে দেব, জুতোর তলায় থাকবি হারামজাদি!’

আরাম লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে দিনের পর দিন সে শুয়ে থাকে। একটা সময় সে সারাদিন শিউরে উঠত। সর্বক্ষণ মনে হতো, এই বোধহয় দিব্যেন্দু এসে গায়ে হাত দেবে। রুমা একবার স্টেশনে চলে গেছিল। অনেকক্ষণ চুপ করে স্টেশনে বসে থাকার পর বাড়ি ফিরে এসেছিল। মনে হয়েছিল, কোথায় যাবে? তার কোথাও যাবার তো নেই।

বেল বাজল। উঠে দরজা খুলল রুমা। এণাক্ষী ফ্যাকাসে মুখে তার ঘরে ঢুকল।

রুমা বলল, ‘কী হয়েছে?’

এণাক্ষী বলল, ‘এটা সুবিধার জায়গা মনে হচ্ছে না। আমি কিছুতেই অরিত্রকে ফোনে পাচ্ছি না। এরা ভালো লোক না।’

রুমা বলল, ‘আপনি বসুন। এরকম অস্থির হয়ে যাবেন না।’

এণাক্ষী বলল, ‘বসব? বসব মানে? এখানে আমাকে আটকে রাখবে আর আমি বসে থাকব?’

রুমা বলল, ‘তাহলে কী করবেন? কিছু কি করার আছে?’

এণাক্ষী সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ওদের দলে আছেন, তাই না?’

রুমা বলল, ‘আমি নিজেই জানি না, কার দলে আছি। কিন্তু এখানে আমি ভালো আছি। আমি বাড়ি যাব না।’

এণাক্ষী বলল, ‘আমি কী করব? আমাকে বাড়ি যেতে হবে।’

রুমা বলল, ‘আপনি দেখুন না কী হয়। আমার তো ভয়ের কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না।’

রুমের দরজা খুলে দুজন মহিলা ঢুকল। এণাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাকে বলা হয়েছিল নিজের রুমে থাকতে। আপনি বেরিয়েছেন কেন?’

এণাক্ষী রেগে গেল, ‘কেন? আমি কি জেলখানায় আছি?’

দুজন মহিলার কেউ আর কোনও কথা বলল না। একজন এগিয়ে এসে এণাক্ষীর হাত ধরে টান মারল। এণাক্ষী আর্তনাদ করে উঠল, ‘এ কী? এসব কী অসভ্যতা হচ্ছে?’

রুমা বলল, ‘ওকে ছাড়ুন। ধরে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?’

দুজনের কেউই উত্তর দিল না। এণাক্ষীকে টেনে ঘর থেকে নিয়ে রুমার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। রুমার ফোন বেজে উঠল।

রুমা সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’

‘তুমি ভেতর থেকে রুম লক করে রাখো। যে কেউ তোমার রুমে ঢুকে পড়লে সেটা কি তোমার নিরাপত্তার জন্য ভালো হবে?’

রুমা বলল, ‘কিন্তু উনি তো আমার ক্ষতি করতে আসেননি?’

‘সেটা তুমি জানো? কেউ কি জানে কার কী উদ্দেশ্য? কতক্ষণের আলাপ তোমাদের?’

রুমা চুপ করে রইল।

‘রুম লক করে দাও। এখনই। আর আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে। কাল থেকে তোমার স্পেশাল ট্রেনিং আছে।’

‘কী ট্রেনিং?’ রুমা আগ্রহী কণ্ঠে জিগ্যেস করল।

উত্তর এল না। ফোন কেটে গেল।

রুমা উঠে দরজা বন্ধ করল। সে ঠিক করেছে, এরা যেই হোক, যেমন লোকই হোক, যা বলবে, সে তাই মেনে চলবে।

টিভি বন্ধ করে দিল সে। চোখ বুজল।

বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল এর আগে। এখন আর ঘুম এল না। এপাশ ওপাশ করতে লাগল। আবার টিভি চালাল। একটাই চ্যানেল চলছে। বাংলা সিরিয়াল হয়ে চলেছে। কিছুক্ষণ সে আগ্রহ নিয়ে দেখল।

উঠে চা বানিয়ে খেল। জানলার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। রাস্তা দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। একটা দোকান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু দোকানের নামটা যে ভাষায় লেখা, সেটা চিনতে পারল না।

৩৮

এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রুমা।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল ঘরের মধ্যে কারো অস্তিত্ব আছে। রুমার স্পষ্ট মনে পড়ল সে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করেছিল। অবশ্য ঘরে ছিটকিনি নেই। তার রুমের চাবি অন্য কারো কাছে থাকলে সে ঘরে ঢুকতে পারবে।

রুমা ভয়ে ভয়ে বলল, ‘কে?’

কেউ কোনও সাড়া দিল না। রুমা উঠে বসল। খাট থেকে নামতে যেতেই কেউ তার মুখে হাত দিল। রুমা ছাড়াতে চেষ্টা করল, পারল না।

তাকে জড়িয়ে ধরে খাটে শুইয়ে দিল।

রুমা অশক্ত নয়। দিব্যেন্দুর মার খেয়ে খেয়ে তার সহ্যক্ষমতা এতদিনে বেশ ভালোই হয়ে গেছে। খাটে পড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সে সরে গেল।

রুমা চিৎকার করল, ‘কে?’

তাড়াতাড়ি হাতড়ে সুইচগুলো খুঁজতে যাচ্ছিল, এমন সময় আরেকজন এসে তাকে খাটে ফেলে হাত-পা বেঁধে দিল। রুমা চিৎকার করায় তার মুখে কাপড় দিয়ে দিল।

আলো জ্বলে উঠল। রুমা দেখল সকালের লোকটা আর ডাইনিং হলের ম্যাডাম দাঁড়িয়ে আছেন। ম্যাডাম রুমার মুখের কাপড় সরিয়ে দিল। রুমা আর্তনাদ করে উঠল, ‘এগুলো কী?’

লোকটা রুমার হাতের দড়ি খুলে দিতে দিতে বলল, ‘অসহায় লাগছিল না? মনে হচ্ছিল না সব শেষ হয়ে যাচ্ছে?’

রুমা জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছিল। বলল, ‘এগুলো কী ধরনের অসভ্যতা?’

লোকটা বলল, ‘অসভ্যতা না। এটা পার্ট অফ ট্রেনিং।’

রুমা বলল, ‘কীসের ট্রেনিং?’

লোকটা বলল, ‘সব সময় সচেতন থাকার। যেকোনও সময় আঘাত আসতে পারে। প্রস্তুত না থাকলে কী হতে পারতো?’

রুমা বলল, ‘তা বলে এভাবে? কী করতে হবে আমাকে যে এরকম সচেতন থাকতে হবে?’

লোকটা সোফায় বসে বলল, ‘আমাদের হয়ে কাজ করতে হবে। করবে?’

রুমার বুকের ধুকপুকুনি কমছিল না। বলল, ‘কী এমন কাজ যাতে রাতে ঘরে লোক ঢুকে যাবে?’

লোকটা পায়ের উপর পা রেখে বলল, ‘তোমাকে যে কাজ করতে হবে, সে কাজকে বলা হয় হানি ট্র্যাপ। হানি ট্র্যাপের নাম শুনেছ?’

রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘মানে?’

লোকটা বলল, ‘বাঘ মারার জন্য হরিণকে বেঁধে রাখা হয়। বাঘ সেই হরিণের গন্ধ পেয়ে তাকে মারতে আসে। শিকারি অপেক্ষা করে মাচায়। শিকারির কাজ হয় বাঘকে ওই সময়ে মেরে ফেলা। তোমাকে হরিণ হতে হবে।’

রুমা বড় বড় চোখ করে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল।

লোকটা বলল, ‘বাঘের আঁচড়ে হরিণ আহত হয়, মরেও যেতে পারে। কিন্তু সে মরে গিয়ে একটা গোটা গ্রাম বা শহরকে বাঁচিয়ে দিয়ে যায়। কাজে প্রচুর রিস্ক। কিন্তু সফল হতে পারলে তার থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না। তুমি সুন্দরী, তোমার অনেক দূর যাওয়ার ক্ষমতা আছে। তোমার হাজব্যান্ড তোমাকে প্রচুর যন্ত্রণা দিয়েছে। আমরা সুযোগ দিচ্ছি। তুমি কি এ সুযোগ নিতে প্রস্তুত?’

রুমা মাথা নিচু করল। কয়েক সেকেন্ড পর মাথা তুলে বলল, ‘তার মানে আমাকে শরীর বেচতে হবে। তাই তো?’

লোকটা মাথা নাড়ল, ‘শরীরকে শরীরের মতো দেখলে তাই মানে দাঁড়ায় বইকি। তুমি যার সঙ্গে সংসার করছিলে, সেখানেও কি একরকম শরীর বেচতে হয়নি?’

রুমা বলল, ‘এই জন্যই আমাকে এত দয়া করে নিয়ে এসেছিলেন, খেতে দিয়েছিলেন, এত ভালোভাবে রেখেছেন, তাই তো?’

লোকটা বলল, ‘খানিকটা তাই। আবার খানিকটা না। তোমাকে আমি অপশন দেব।’

রুমা কৌতূহলী হল, ‘কী অপশন?’

লোকটা বলল, ‘তোমাকে আমরা একটা হোমে পুনর্বাসন দিতে পারি। সারাদিন ওখানে হাতের কাজ করবে, একটা নিশ্চিন্ত জীবন পাবে। নিজের মতো করে থাকতে পারবে। অথবা, আরেকটা জীবন দিতে পারি, যেখানে তুমি নিজের জীবনের বিনিময়ে অসংখ্য মানুষের কাজে আসতে পারবে।’

রুমা বলল, ‘আমি হোমে যাব। এই কাজ করব না। এভাবে একেকজন এসে শরীর নিয়ে জ্ঞান দেবে, আমি শুনব না। কিছুতেই না।’

লোকটা হাসি মুখে রুমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাল সকালেই তোমাকে একটা ভালো সরকারি হোমে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। ভালো থেকো রুমা।’

রুমা অবাক হয়ে বলল, ‘এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেলেন? কোনও জোর করলেন না?’

লোকটা বলল, ‘কাজটা জোরের নয়। তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তোমাকে এই কাজে নামাব না।’

রুমা বলল, ‘আর ওই মহিলাকে? যাকে আটকে রেখে দিয়েছেন?’

লোকটা বলল, ‘বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এতক্ষণে রওনা হয়ে গেছেন।’

রুমা বলল, ‘বিশ্বাস করছি না। এখন আমার আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে না।’

লোকটা উঠে দাঁড়াল, ‘তুমি হোমে যেতে চাইছ রুমা। আমার কথায় বিশ্বাস কর আর না কর, তাতে কিছু যায় এসে না। ভালো থেকো। আমি আসি।’

ম্যাডামকে নিয়ে লোকটা বেরিয়ে গেল। রুমা হতভম্ব হয়ে বসে রইল।

৩৯

ভাত খেয়ে দিব্যেন্দু কার্ড বোর্ডের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এত ক্লান্ত ছিল, একবারও ঘুম ভাঙেনি।

সুখেন ডেকে দিল, ‘ওঠো। মামা ওঠো। ঘুমিয়ে থাকলে হবে না। পালাও।’

দিব্যেন্দু ধড়মড় করে উঠে বসল, ‘কেন? কী হয়েছে?’

সুখেন বলল, ‘এখানকার লোকজন তোমায় খুঁজছে মানে খবর আছে। এখন ভোর হচ্ছে। এখানে রাত শুরু হবে। এরা এখন ঘুমোবে। তুমি কেটে পড়। নইলে তোমায় কোথায় নিয়ে কী চুলকে দেবে কেউ জানে না। লুকা সাঁতরাকে তো চেনো না।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘লুকা সাঁতরা কে?’

সুখেন বলল, ‘আছে একজন। চুলকানি পাবলিক। ঠিক ঠাক চুলকে দিলে সারাজীবন পৃথিবীর সব চুলকানির মলম লাগালেও সে ব্যথা কমবে না। চল। তুমি ঢ্যামনা হতে পারো, কিন্তু চোখের সামনে একটা লোকের মার গাঁড়া যাবে, সেটা আমি দেখতে পারব না। চল চল।’

দিব্যেন্দুকে টানতে টানতে ঝুপড়ি থেকে বের করল সুখেন। দিব্যেন্দু ক্ষীণ গলায় বলল, ‘আমার হাগা পেয়েছে।’

সুখেন বলল, ‘উফ! কী ঝামেলা! যাও, ওই রাস্তার হাই ড্রেনে গিয়ে ঝেড়ে আসো। কেউ নেই এখন। যাও যাও।’

দিব্যেন্দু কাতর চোখে তাকাল। সুখেন বলল, ‘কিছু করার নেই, আমরাও এভাবেই করি। সব ইতর লোক এখানে। যাও মামা।’

সুখেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানতে লাগল।

দিব্যেন্দু মিনিট পাঁচেক পরে ধুঁকতে ধুঁকতে এল। সুখেন বলল, ‘হাত ধুয়েছ?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘সাবান কোথায়?’

সুখেন বলল, ‘ফাইভ স্টারে এয়েচো মামা? মাটিতে হাত মুছে কলে হাত ধোও।’

দিব্যেন্দু সুখেনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে তাই করল। সুখেন বলল, ‘আজিব চিজ মাইরি একটা। হাতুড়ি মেরে বেড়ায়। চল।’

সুখেন হাঁটতে শুরু করল। দিব্যেন্দু সুখেনের পেছন পেছন হাঁটছিল। কিছুক্ষণ পরে বড় রাস্তায় উঠে সুখেন সন্তর্পণে চারদিকে তাকাল। বলল, ‘নাহ্‌। ঠিক আছে। এস। বাস স্ট্যান্ডে বোস। বাস এলে চলে যাবে।’

দিব্যেন্দু বাস স্ট্যান্ডে বসল। সুখেন বলল, ‘চলে যেতে পারবে তো?’

দিব্যেন্দু বিড় বিড় করে বলল, ‘টাকা নেই। সব নিয়ে নিয়েছে।’

সুখেন বিরক্ত মুখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করতে যাচ্ছিল, এমন সময় একটা টাটা সুমো এসে দাঁড়াল। সুখেন সুমোটার দিকে তাকিয়েই, ‘মাড়িয়েছে’ বলে তেড়ে দৌড় মারল। দিব্যেন্দু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল। গাড়ির দিকে তাকাল। দুজন ষণ্ডা লোক গাড়ি থেকে নেমে কলার ধরে কুকুরের মতো করে দিব্যেন্দুকে গাড়িতে তুলল। দিব্যেন্দু চিঁচিঁ করে বলল, ‘ছেড়ে দাও আমাকে। আমি কিছু করিনি। ছেড়ে দাও।’

সুখেন দৌড়ে খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। গাড়ির ভেতর থেকে একজন চিৎকার করল, ‘তুই কাল ঢপ মারলি তো? তোকে দাদা বুঝে নেবে।’

সুখেন কান ধরল। গাড়ি স্টার্ট দিল। দিব্যেন্দু চিৎকার করল, ‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? পুলিশ! পুলিশ।’

মাথায় একটা গাট্টা পড়ল তার, ‘চিল্লাবি না। চিল্লালে মটকা গরম হয়ে যায়। তোকে ভালো জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কোথায়? কিডনি বেচবেন? চোখ বেচবেন? আমার কিডনি ঠিক নেই, বিশ্বাস করুন। দিনে অনেকবার হিসি পায়।’

গাড়ির ভেতরে সব লোক হো হো করে হেসে উঠল। একজন তার গাল টিপে দিয়ে বলল, ‘সোনা আমার, মানিক আমার। তোমায় কেন বেচবো? তোমার বিচি খুলে নিয়ে আমরা মারবেল খেলব। একদম চিন্তা কোরো না সোনা। তোমাকে তোমার মামা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমার মামা-মামি সব মরে গেছে। মাইরি বলছি, বিশ্বাস করুন।’

গাড়ির ভেতর সবাই জোরে জোরে হাসতে শুরু করল।

কেউ কেউ দিব্যেন্দুর চুল টানতে লাগল, কেউ আবার গাল টিপে দিল। কেউ হঠাৎ করে দিব্যেন্দুর গালে চুমু খেল। দিব্যেন্দু চিৎকার করতে লাগল, ‘এটা ভালো হচ্ছে না কিন্তু। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায়?’

একজন বলল, ‘গরিলা দিয়ে তোমায় মাড়াবো বাওয়া।’

দিব্যেন্দু ভয়ে সিঁটিয়ে গাড়ির মধ্যে বসে রইল।

৪০

জিভ পুড়ে গেছে। গরম চা খাবার অভ্যাস না থাকলে এটা স্বাভাবিক ঘটনা।

লুকা বিচ্ছিরি মুখ করে বসে আছে। রোজ মদ খায়। আজ সকালে উঠে ইচ্ছে হল চা খাবে। গরম চা জিভে পড়তেই পুড়ে গেল।

এত বিরক্ত লাগছে। লুকার ঠাকুরদা দাবি করেছিল জব চার্নকের আসার আগে তারাই কলকাতার মালিক ছিল। জমিদার ছিল নাকি! মামলা ঠুকে দিয়েছিল। সে মামলা গ্রাহ্য হয়নি। ‘আদালতের সময় নষ্ট করবেন না’ বলে খুব রেগে গিয়েছিলেন জাজ।

লুকার ঠাকুরদা ভদ্রলোক এমনিতেই খ্যাপা ছিলেন। এই ঘটনার পর পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলেন। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে কিছুদিন ট্রাফিক কন্ট্রোলের চেষ্টা করেছিলেন। মাঝে মাঝে নেতাজির সঙ্গেও কথা বলতেন, ‘আমাদের চেষ্টা করতেই হবে, ইম্ফল কতদূর? আসছি আমি নেতাজি, তোমার সঙ্গে ঘোড়ায় আমিও চড়ব।’

শেষমেশ স্ট্যাচুর ঘোড়ায় চড়তে পারেননি। পুলিশ তাড়া দিয়েছিল।

লুকা ঠাকুরদাকে ভারি ভালোবাসত। কিন্তু বাবাকে যদি বলত, ‘আমি ঠাকুরদার মতো হব’, তাহলে বাবা গম্ভীর হয়ে বলত, ‘চুপ কর, বলদ।’

লুকা বলত, ‘বলদ কী বাবা?’

বাবা বলত, ‘যারা কিছু বোঝে না, তাদের বলদ বলে।’

লুকার ভোকাবুলারিতে শব্দটা যুক্ত হল। স্কুলে কী করে যেন সে শিক্ষককে বোঝাতে পারছিল না নখ কেন কেটে আসেনি, প্রার্থনার সময়ে বলেই দিল, ‘আপনি একটা বলদ।’

তখন এখনকার নিয়ম ছিল না। স্কুলে শিক্ষকদের হাতে গবাদি পশু মারার মতো লাঠি মজুত থাকত। একটা গোটা লাঠি তার পিঠে পড়েছিল।

লুকা তখন থেকেই ঠিক করে নিয়েছিল,

১) সে আর পড়াশুনা করবে না,

২) যে শিক্ষকের জন্য পড়াশুনা ছাড়ল, তাকে দেখে নেবে।

লুকা চুরি শিখল, ছিনতাই শিখল, ছিনতাই দলের নেতা হল। বহুদিন তক্কে তক্কে ছিল, একদিন সুযোগ এল। সেই পিটি টিচারকে রাস্তায় ধরল। গম্ভীর মুখে বলল, ‘আপনি জানেন আমি সেদিন কেন নখ কাটিনি?’

সেই টিচার লুকাকে চিনতে পারেননি। অবাক গলায় বললেন, ‘কে আপনি?’

লুকা বলল, ‘একটা পেয়ারার ডাল ভেঙেছিলেন। স্যাটাভ্যাঙা কেলিয়েছিলেন, মনে আছে? লোকেশ সাঁতরা। ভুলে গেলেন নাকি নামটা?’

ভদ্রলোক ফ্যাকাসে চোখে লুকার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘মনে পড়েছে। তা বাবা তুমি কী করবে?’

লুকা বলল, ‘আমি গত কয়েকদিন ধরে আপনাকে দেখছি। বেশ কয়েকদিন।’

ভদ্রলোক আরও ঘাবড়ে গেলেন, ‘কেন? আমি কী করেছি?’

লুকা বলল, ‘কিছুই করেননি। তখন ছোট ছিলাম। ভাবতাম বড় হয়ে আপনাকে পেলে একই রকম ক্যালাবো। তারপর বুঝলাম টিচারদের মারতে নেই। তাই ঠিক করেছি আপনাকে ক্যালাবো না। আপনি যান। যেখানে যাচ্ছিলেন, যান।’

ভদ্রলোক কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে লুকা তাকে ছেড়ে দিয়েছে। তিনি ঘাবড়ে পালাতে গিয়ে দুবার হোঁচট খেলেন। লুকা হাত নেড়ে আবার ডাকল, ‘শুনুন স্যার।’

ভদ্রলোক আবার ভিতু মুখে এলেন।

লুকা দাঁত বের করল, ‘ভাগ্যিস কেলিয়েছিলেন। পড়ালেখা করলে আপনাদের মতো ডরপোক তৈরি হতাম যাদের এটুকু ধক নেই বলার যে মেরেছিলাম, বেশ করেছিলাম। এখন আমি মোস্ট ওয়ান্টেড। তেরোটা মার্ডার কেসের আসামি। ভাবতে পারেন! যাকগে, যান। আপনি আমার টিচার। তাই ছেড়ে দিলাম। ফুটুন।’

ভদ্রলোক দাঁড়ালেন না। পড়িমরি করে পালিয়ে গেলেন। লুকা ফিক ফিক করে হাসতে লাগল। আজকেও লুকা হাসছিল। দিব্যেন্দুকে দেখে। ভেঙে পড়া, চোখের তলায় কালি পড়া একজন ছাপোষা কেরানি। হাতুড়ি মেরে দিয়েছে নাকি।

লুকা বলল, ‘কীরে? কী করেছিস তুই?’

দিব্যেন্দু সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

লুকা ধমক দিল, ‘এক চড় মারব খানকির ছেলে। উত্তর দিচ্ছিস না কেন?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কী করেছি মানে, ওই হাতুড়ি মেরে দিয়েছি।’

লুকা বলল, ‘কেন মেরেছিস?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘বউয়ের কথা মনে পড়ছিল।’

লুকা বলল, ‘বউয়ের কথা মনে পড়ছিল বলে হাতুড়ি মেরে দিবি? বউকেও মারতিস?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘হ্যাঁ। বউ তাই পালিয়েছে।’

লুকা ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘আজব চিড়িয়া তো। গুন্ডামি করবি?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘পারি না স্যার। আমি ক্লার্ক।’

লুকা দলের বাকিদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল, ‘কচুরি নিয়ে আয়। এটাকে খাওয়া। ক্লার্ক গিরি বের করছি মাদারচো...র।’

দিব্যেন্দু নড়ল না। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘যা করবেন করে ফেলুন। আমার আবার পায়খানা পেয়েছে। এখানেই করে দেব নইলে। আমার পেট ভালো না। প্যান্টে হলে আমার সাইজের প্যান্ট পাবেন?’

লুকা হো হো করে হেসে উঠল, ‘এ কে বে? শান্তিগোপাল?’

৪১

বাড়ি এসেও অরিত্র ঘুমোতে পারছে না। অস্বস্তি হচ্ছে। আজে বাজে কথা মনে আসছে।

এণাক্ষীর ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন করে দেখল। আগেও করেছে। একই কথা বলে যাচ্ছে।

নীলকে ফোন করল। নীল ফোন ধরে বলল, ‘আপনাকেই ফোন করতে যাচ্ছিলাম।’

অরিত্র আশান্বিত হল, ‘খবর পাওয়া গেছে?’

নীল বলল, ‘হোটেলের সামনের রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজটা পাওয়া গেছে। আপনার স্ত্রী যে হোটেলে ঢুকেছেন ব্যাগ নিয়ে সেটা দেখা যাচ্ছে।’

অরিত্র বলল, ‘আর বেরোনোটা?’

নীল বলল, ‘বেরনোটা দেখা যায়নি। কারো সঙ্গে বেরিয়েছে, সেটাও দেখা যায়নি। এর একটা মানে হতে পারে, আপনার স্ত্রী হোটেলেই আছেন।’

অরিত্র বলল, ‘তাহলে?’

নীল বলল, ‘আপনি কি শিওর যে আপনার স্ত্রীর অন্য কারো সঙ্গে কোনও অ্যাফেয়ার ছিল না?’

অরিত্র রেগে গেল, ‘মানে?’

নীল বলল, ‘দেখুন, আপনি রেগে যাবেন না, কিন্তু ইনভেস্টিগেশনের জন্য আমাদের সব কথাই জানা দরকার। হতে পারে আপনি জানেন না। হতে পারে আপনার অগোচরেই আপনার স্ত্রী কারো সঙ্গে কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এবার তিনি নিজের কন্সেন্টে যদি অন্য কারো ঘরে থাকেন, তবে আমি কেন, আমার বাপেরও অসাধ্য আপনার স্ত্রীকে খুঁজে বের করা।’

অরিত্র থমকে গেল, ‘আমি...আমি জানি না। আমি বিশ্বাস করি না এণাক্ষী এরকম কোনও সম্পর্কে জড়িয়েছে।’

নীল বলল, ‘আমরা কেউই বিশ্বাস করি না। প্রত্যেকেই আমরা আমাদের পার্টনারকে প্রচুর বিশ্বাস করি। সম্পর্কে ওটাই তো সব থেকে বড় কথা। কিন্তু এর পরেও কিছু জায়গা থাকে। আপনি বুঝতে পারছেন আমি কী বলছি?’

অরিত্র গম্ভীর হল, ‘হ্যাঁ। আমি বুঝতে পারছি, আপনি কী বলছেন। যদি এরকম প্রমাণ থাকে, তাহলে সেটাও আপনি আমাকে বলে দিতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না। সত্যিটাকে তো মেনে নিতেই হবে। জোর করে কিছু আটকে রাখা যায় না।’

নীল বলল, ‘আমরা সবরকম সম্ভাবনাই যাচাই করে দেখছি। আমার কাছে প্রমাণ কিছু নেই। তাও আপনাকে বলে রাখলাম।’

অরিত্র বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ অফিসার।’

নীল বলল, ‘টেক কেয়ার।’

অরিত্র চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইল। এণাক্ষীকে সন্দেহ করার মতো সত্যিই কি কিছু ঘটেনি? তা তো না। এণাক্ষী তার কথা শোনেনি, নিজের মতো চলেছে। তার সামনেই প্রোডিউসারের গলা জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেছে। যে মেয়েটা বরের সামনে এরকম করতে পারে, বরের সঙ্গে ঝগড়া করার পর তার প্রতিশোধ নিতে তো আরও অনেক কিছুই করতে পারে। রিভেঞ্জ সেক্স শব্দটা নিয়ে তো এককালে তারাই কত মজা করেছে।

মাথাটা দপ দপ করছিল। মাথায় অদ্ভুত সব ছবি আসতে শুরু করেছে। এণাক্ষী তাকে ছেড়ে অন্য কারো সঙ্গে চলে গেছে, তার সঙ্গে শুয়েছে, একটা অচেনা অজানা হাত তার শরীর জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বমি পেয়ে গেল তার। বাথরুমে গিয়ে হড়-হড় করে বমি করে দিল।

নীল একটা ইঙ্গিত দিয়েছে। এণাক্ষী তার মানে হোটেলের মধ্যেই আছে। বেরোতে গেলে তো লোকের সামনে দিয়েই বেরোতে হবে।

অরিত্র দেরি করল না। তৈরি হয়ে আবার গাড়ি নিয়ে বেরোল। এখন সকাল হয়েছে। রাস্তাঘাটে যথেষ্ট ভিড়। জ্যাম আছে। চিংড়িহাটা ক্রস করার সময় সে ঠান্ডা মাথাতেই বেরোচ্ছিল, হঠাৎ করে একটা সুমো তাকে পেছন থেকে মেরে দিল।

অরিত্র গাড়ি থেকে নামল। সুমোর ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে?’

ড্রাইভার বলল, ‘সামনে গিয়ে বাঁ দিকে দাঁড় করান। সেটল করে নিচ্ছি।’

অরিত্রর মাথায় রক্ত উঠে গেল, ‘সেটল করবি, কী সেটল করবি? তোর বাবার চাকর নাকি?’

দরজা খুলে ড্রাইভারের কলার ধরল সে। মুহূর্তের মধ্যে ভিড় জমে গেল। ড্রাইভারও ছাড়ল না। হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। জামা ছিঁড়ল, মুখ থেকে রক্ত বেরোতে শুরু করল।

অরিত্র থামল না। মারপিট চালিয়ে গেল। তার সব দুশ্চিন্তা, রাগ ড্রাইভারের উপর ঝাড়তে শুরু করল...

৪২

সিসিটিভি লাগানোর আগেই টাকাগুলো জায়গা মতো রেখে দিয়েছিল পূর্ণ। ক্যামেরা লাগানো শুরু হয়েছে আবার। তার টানা হচ্ছে।

পূর্ণ মন খারাপ করে বসে ছিল। পোড়া কপাল তার। টাকাগুলো পেলে কিছুটা ভালো থাকা যেতো। মানুষের জীবনে টাকার থেকে দরকারি আর কিছু নেই। সম্পর্ক টিকে থাকে এর জন্যই। ভালোবাসা অবধি জানলা দিয়ে পালায় যদি টাকা না থাকে। সে কী পেল? টাকাগুলোই নাকি নকল। নকল মানুষে ভর্তি পৃথিবীতে টাকা আসল লাগে নাকি!

ফোন বাজছে। বাপিদা। পূর্ণ ধরল, ‘বলো।’

বাপিদা বলল, ‘ক্যামেরা লেগে গেছে?’

পূর্ণ বলল, ‘লাগাচ্ছে। অত হড়বড় করলে হয় নাকি? আমি তো আছি, দেখছি। চিন্তা কোরো না।’

বাপিদা বলল, ‘হয়ে গেলে আমাকে ফোন করবে। এখান থেকে কী করে দেখতে হবে আমি জেনে নেব। আজ থেকে কিন্তু তোমাকে আমি এখান থেকেই দেখতে পাবো।’

পূর্ণ বলল, ‘দেখো। কী আছে তাতে? তোমার বাড়ি কি আমি খেয়ে ফেলব?’

বাপিদা হাসল, ‘তা না। তোমার কাজও হালকা হয়ে যাবে। ক্যামেরা লেগে গেলে তোমাকে কি আর সারাক্ষণ থাকতে হবে?’

পূর্ণ প্রমাদ গুনল। মানে, কী বলতে চাইছে?

সে বলল, ‘চাকরি ছাড়িয়ে দেবে?’

বাপিদা বলল, ‘সারাক্ষণ তো আর লাগবে না। ক্যামেরা থেকেই আমি সব দেখে নেবো। তুমি অন্য কাজ করতে পারবে।’

পূর্ণ বলল, ‘আমার অন্য কাজ নেই। কোথাও কোনও কাজ করি না বলেই এখানে থাকতে এসেছি।’

বাপিদা বলল, ‘ঠিক আছে। আমি দেখছি কী করা যায়।’

পূর্ণ বলল, ‘না, তুমি ঠিক করে বল। আমাকে কি কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে?’

বাপিদা বলল, ‘আহা, তা বলেছি নাকি? আমি শুধু বলতে চাইছি, ক্যামেরা লেগে গেলে তোমার উপর থেকে চাপটা কমে যাবে। এদিক সেদিক যেতে আর কোনও বাধা রইল না।’

মাথা দপদপ করছিল। ওই ছোট ছোট ক্যামেরাগুলো এত সহজে তার চাকরি খেয়ে ফেলল? পৃথিবীটার চারদিকেই এভাবে চাকরি খাবার মেশিন লেগে যাচ্ছে। মানুষের কোনও দাম থাকছে না। মেশিনই সব কাজ করে দেবে।

মুখে বলল, ‘ঠিক আছে। আমি দেখে রাখছি। হয়ে গেলে ফোন করব।’

ক্যামেরা লাগাতে দেড় ঘণ্টা লাগল। কোনও ব্যাপারই না। ইন্টারনেট কানেকশন করিয়ে রাউটার লাগিয়ে বাপিদাকে ফোন করে সব বুঝিয়ে দেওয়া হল।

ছেলেগুলো চলে যাওয়ার পর পূর্ণর অস্বস্তি হওয়া শুরু করল। ভারি মুশকিল হল তো। সে উঠবে, বসবে, ঘরের মধ্যে হাঁটাচলা করবে, সবই বাপিদা দূর থেকে বসে দেখতে পাবে? কেউ যদি সব সময় তার উপর চোখ রেখে চলে, তাহলে তো সমস্যা। তখন ভয় পাচ্ছিল চাকরি চলে যাবার, এখন মনে হচ্ছে চাকরি গেলেই ভালো হতো।

সন্ধে হল। পূর্ণ বসার ঘরের মেঝেতে চুপ করে শুয়ে ছিল। মেজাজ ঠিক লাগছিল না, এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। আবার বাপিদা। ফোন ধরে বিরক্ত গলায় বলল, ‘বলো।’

বাপিদা বলল, ‘ঠাকুরঘরের আলমারিটা অন্য দিকে ঘোরানো দেখলাম? কী হয়েছে?’

পূর্ণ বলল, ‘আমি ঘরটা পরিষ্কার করে দিলাম। ঠাকুরের জায়গা, সেখানে নোংরা হয়ে থাকলে কি ভালো দেখায়?’

বাপিদা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে কড়া গলায় বলল, ‘তোমাকে আমি ওই ঘরে যেতে বারণ করেছিলাম। তুমি ভুলে গেছ মনে হয়।’

পূর্ণ বলল, ‘ভুলব কেন? ঠাকুর দেবতার ব্যাপার, অপরিষ্কার নোংরা ঘরে তাদের রেখে দেওয়া কি ঠিক? তুমিই বল?’

বাপিদা বলল, ‘ঠিক আছে। আর ঢোকার দরকার নেই। আলমারি খুলেছিলে নাকি আবার?’

পূর্ণ বলল, ‘না বাপু। তুমি বলেছো তার পরে আবার কে খুলবে?’

বাপিদা স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘একদম খোলার দরকার নেই। তুমি ওই একটা ঘরেই থাকো। ঠাকুরঘরে ঝাড়পোঁছ করার কিছু নেই। আমি দেখে নেব এখান থেকে।’

ফোন কেটে গেল। পূর্ণ ক্যামেরার দিকে তাকাল। কী যে অদ্ভুত জিনিস তৈরি হয়ে গেছে। মানুষও অন্তর্যামী হয়ে গেল যন্ত্রের সাহায্যে!

৪৩

সে কি শহরে, না শহরের বাইরে? ঠিক কোন জায়গায় আছে সে? একসঙ্গে কতগুলো আবছা ছবি মাথার মধ্যে কেউ যেন বসিয়ে দিচ্ছে। আবার পরপর কতগুলো ছবি সোয়াইপ করার মতো ডান দিক থেকে বাঁ-দিকে চলে যাচ্ছে। কিছুতেই রুমার ঘোর কাটছে না। জানলার বাইরে দেখার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কখন যে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে নিজেই জানে না।

রাস্তা দিয়ে গাড়িটা চলছে বেশ জোরে।

বেশ খানিকক্ষণ পরে একপ্রকার জোর করেই চোখ খুলল সে। তার পাশে লোকটা বসে আছে। রুমা বলল, ‘কোথায় যাচ্ছি?’

লোকটা বলল, ‘হোমে। তুমি হোমে থাকতে চেয়েছিলে। তোমাকে পুনর্বাসন দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। আশা করি, বাকি জীবনটা তুমি সেখানেই থাকবে।’

রুমা বলল, ‘আমার সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে কেন? আমাকে কি কোনও ওষুধ দিয়েছেন?’

লোকটা বলল, ‘একটু গোপনীয়তার ব্যাপার তো থাকেই। চিন্তা কোরো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি ঠিক হয়ে যাবে।’

রুমা চুপ করে গেল। শরীর ঠিক লাগছে না।

একটা সময় গাড়ি থামল। লোকটা বলল, ‘এসে গেছি।’

গাড়ি থেকে নামল রুমা।

চারতলা একটা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে লোকটা বলল, ‘এস।’

রুমার মাথা গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে ঘুরে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর সামলে নিয়ে লোকটার পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল।

বিল্ডিংয়ের দেয়ালে বিভিন্ন প্রকল্পের বিজ্ঞাপন দেওয়া। রুমাকে অফিস ঘরে নিয়ে বসানো হল। লোকটা একটা কাগজ দিয়ে বলল, ‘ফর্মটা ফিল আপ কর।’

ফর্মটা দেখতে গিয়ে হঠাৎ করে অফিস ঘরের জানলার বাইরে চোখ পড়ল রুমার। এক যুবক হাঁটছে। হাঁটার ভঙ্গিটা ভীষণ চেনা তার। অফিস থেকে ফিরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এভাবেই পায়চারি করত বারান্দায়। কিছুক্ষণ পরেই তার হাতে উঠে আসত কখনও পর্দা টাঙানোর রড, কখনও বা প্রাইমারি স্কুলের কাঠের স্কেল, কখনও তবলার হাতুড়ি। এখানে দিব্যেন্দু কী করছে?

সে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।

লোকটা বলল, ‘কী হয়েছে?’

রুমা সভয়ে বলল, ‘আমাকে গাড়িতে নিয়ে চলুন।’

লোকটা বলল, ‘কেন? কী হয়েছে?’

রুমা বলল, ‘প্লিজ, চলুন।’

লোকটা বলল, ‘বেশ, চলো।’

আবার দৌড়তে দৌড়তে গাড়িতে এসে বসল রুমা। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছিল। লোকটা জলের বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে? এবার বলা যাবে?’

রুমা বলল, ‘এখানে আমার হাজব্যান্ড আছে। ও কী করছে এখানে?’

লোকটা বলল, ‘এখানে? তুমি শিওর?’

রুমা বলল, ‘হ্যাঁ, আমি শিওর। আমি ওকে দেখতে পেয়েছি। এটা তো লেডিস হোম। ও এখানে কী করছে?’

লোকটা বলল, ‘হবে কিছু একটা। আমি তো এই হোমটাই চিনি। তোমাকে এখানেই পুনর্বাসন দেওয়া যেত। একটু অপেক্ষা করবে?’

রুমা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি আমাকে যে কাজ বলেছিলেন, সেখানেও তো আমার হাজব্যান্ডের সামনে পড়ে যাবার সুযোগ থাকবে? থাকবে না?’

লোকটা বলল, ‘না থাকার চান্সটাই বেশি। তুমি হাই সোসাইটিতে যাবে যেখানে তোমার হাজব্যান্ড কোনওভাবেই পৌঁছতে পারবে না। যদি বা কোনওভাবে পৌঁছে যায়ও, তাহলেও তুমি তখন এতটাই শক্তিশালী হবে, তোমার হাজব্যান্ড কোনওরকম অসভ্যতা করার আগে তুমি প্রতিরোধ করতে পারবে।’

রুমা জোরে জোরে শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আপনি ইচ্ছে করে আমার হাজব্যান্ডকে এখানে নিয়ে এসেছেন যাতে আমি আপনাদের কাজটা করি, তাই তো? আপনারা তো ওকে খুব ভালো করেই চিনে গেছেন। কোনভাবে ওকে এখানে নিয়ে এসেছেন।’

লোকটা খুশি হল, ‘ভেরি গুড রুমা। এর মানে হল তোমার বুদ্ধি আছে। এটুকু বুদ্ধি কিন্তু খুব কম কিছু না। পরিস্থিতির চাপ মানুষের বুদ্ধির বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়ে আবার অন্য এক পরিস্থিতিই সে বুদ্ধি বের করে আনতে পারে। তোমার বুদ্ধি আছে। এই কাজে তুমি সফল হবে। আমি নিশ্চিত।’

রুমা লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল শুধু। আর কোনও কথা বলল না...।

৪৪

মাথা ধরে আছে। কিছুই ভালো লাগছে না। সারাক্ষণ মনে হচ্ছে একটা গোটা মানবজনম কেমন বৃথা হয়ে গেল তার। একটা লোক ক্যামেরা দিয়ে সারাদিন তাকে দেখবে? এটা কেমন ব্যাপার? সে খাবে দাবে ঘুরবে, সব দেখবে? রাগ হচ্ছিল। তালা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে নুরুলের দোকানে বসল পূর্ণ। দোকান ফাঁকাই ছিল। নুরুল বলল, ‘কীরে পুন্ন, কী হল?’

পূর্ণ বলল, ‘ভাল্লাগছে না। ক্যামেরা লাগিয়ে দিয়েছে। আমাকে তাড়িয়েও দেবে বোধহয়।’

নুরুল বলল, ‘কী আর করবি! এখন ক্যামেরার সময়। কিছু তো করার নেই। আচ্ছা, বাপিদা ওই টাকাগুলো দিয়ে কী করে বলত?’

পূর্ণ বলল, ‘জানি না। বিদেশে থাকে, জাল নোট কি বিদেশে চলে?’

নুরুল চিন্তিত মুখে বলল, ‘সেই তো। ভালো ছেলে, কোত্থেকে এসব পেল কে জানে।’

পূর্ণর ফোন বেজে উঠল। বিরক্ত গলায় পূর্ণ বলল, ‘দেখলি তো? বেরোতে পারলাম না, ফোন করতে শুরু করে দিয়েছে।’

নুরুল বলল, ‘ধর ধর। কী আর করবি?’

পূর্ণ ফোন কেটে দিল, ‘থাক। ধরব না। আমি আর কাজ করব না। অন্য কোথাও কিছু পাওয়া যায় নাকি দেখি।’

নুরুল বলল, ‘খুব রেগে গেছিস দেখছি।’

পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ। রাগ তো হবেই। এত কষ্ট করে কাজ করলাম, কেমন ভাগিয়ে দেওয়ার ছক কষছে দেখতে পারছিস না?’

ফোনটা আবার বাজতে শুরু করেছে। পূর্ণ বলল, ‘ধুস, জ্বালিয়ে খেলো তো!’ ধরল, ‘হ্যালো।’

বাপিদা বলল, ‘কী হল? আবার বেরিয়েছ নাকি?’

পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ। নুরুলের দোকানে এসেছি চা খেতে। তুমিই তো বললে ক্যামেরা লেগে গেলে আর চিন্তা নেই, তাই বেরিয়েছি।’

বাপিদা বলল, ‘ক্যামেরা লেগে গেল মানে যখন খুশি বেরিয়ে যাবে? তোমাকে কী বলা হয়েছিল? যখন খুশি বেরোনো যাবে না, সেটা বলেছিলাম তো?’

পূর্ণ রেগে গেল, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ। দাসখত দিয়ে রেখেছি নাকি?’

বাপিদা বলল, ‘দাসখতই দিয়েছ। কাজের শুরুতেই আমি বলেছিলাম কাজটা এরকম হবে। সব জেনেবুঝে এরকম করছ তুমি। মাইনে নেবে না? নাকি সেটাও চাও না?’

পূর্ণ বলল, ‘ছাড়ো ছাড়ো। টাকার গরম দেখিও না। নকল নোট নিয়ে চলো, ভেবে বসে আছ কেউ কিছুই জানে না।’

নুরুল অবাক হয়ে পূর্ণর দিকে তাকিয়ে ঠোটে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘কী বলছিস কী? চুপ কর!’

ও প্রান্ত একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘এসব কথা কি বাজারে বলে বেড়াচ্ছ?’

পূর্ণ বোকা মানুষ। সে বুঝেছে কথাটা বলে ভুল হয়ে গেছে। সেটাকে ম্যানেজ করতে গিয়ে বলল, ‘কোন সব কথা? এখানে কথার কী আছে? আমি আর নুরুল জানি। আর কেউ জানে না।’

বাপিদা বলল, ‘ঠিক আছে। এসব নোট খেলনা হিসেবে রাখা হয়েছিল, তুমি আবার আলমারি খুলে সেটা নিয়ে এদিক-সেদিক বলে বেড়াচ্ছ?’

পূর্ণ বলল, ‘এদিক সেদিক বলিনি। আমরা দুজনেই জানি।’

ফোনটা কেটে গেল।

নুরুল ফ্যাকাসে মুখে বলল, ‘এটা তুই কী করলি? এ কথা কেউ বলে? এবার জেনে গেল তুই আলমারি খুলেছিলিস’!

পূর্ণ উঠে দাঁড়াল, ‘আমি যাই বরং। কী বলিস?’

নুরল বলল, ‘যা। কী যে করিস। এ চাকরিটা বোধ হয় তোর গেল।’

পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ। ব্যাগটা নিয়ে আসি।’

পূর্ণ হাঁটতে শুরু করল। মন খারাপ হয়ে গেছে। এটাই তার সমস্যা। রাগের মাথায় কী বলে, নিজেই জানে না। আরেকবার কি বাপিদাকে ফোন করবে? নাকি করবে না?

হাঁটতে হাঁটতে বাজার পেরিয়েছে সবে, এমন সময় একটা পটকা ফাটার আওয়াজ কানে এল। পূর্ণ বিড়বিড় করতে লাগল, ‘লোকের এত আনন্দ যে কোত্থেকে আসে, কে জানে!’

ব্যাগটা নিতে হবে, মাথার মধ্যে ঢুকে ছিল, রাস্তায় জোর পায়ে হাঁটতে শুরু করেছে, এমন সময় দেখল পিন্টু জোরে সাইকেল চালিয়ে আসছে। পূর্ণ অবাক হয়ে বলল, ‘কীরে, এত তাড়া কীসের?’

পিন্টু চিৎকার করে বলল, ‘ভরা বাজারে নুরুলদাকে কারা জানি গুলি করে পালিয়েছে।’

৪৫

কামরায় উঠে চুপ করে বসে আছে দিব্যেন্দু। মাথা ধরে আছে। তাপসদা নেই, কামরুল নেই। কেউ নেই। এই ট্রেনে সে কাউকে চেনে না।

লুকা তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে একটা হোমে নামিয়ে দিল। বলল, ‘মামু, তুমি এখানে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াও। তারপর তোমার ছুটি।’

দিব্যেন্দু তাই করল। হঠাৎ করে একজন এসে তাকে বলল, ‘চলো, তোমায় স্টেশনে ছেড়ে দিয়ে আসি।’

তাই করল। শেয়ালদায় নামিয়ে দিয়ে গেল। পকেটে হাজার টাকা গুঁজেও দিয়েছে। দিব্যেন্দুর নিজের ভাগ্যকে বিশ্বাস হচ্ছিল না।

সে বেঁচে আছে? বেঁচে থাকার তো কথা না!

একই ট্রেনে পরিচিত মানুষজন না থাকলে কেমন অপরিচিত লাগে। যে ট্রেনে সে এতদিন ধরে যায়, সেই ট্রেনেই সে আছে, শুধু অন্য সময়ে, অন্য লোকজনের সঙ্গে। ওই তো, কোণে চারজন তাস পিটোচ্ছে, কিন্তু তাদের সে চেনে না।

এই সময়টা অফিস টাইম না। ভিড়ও নেই। জানলার কাছে বসে আছে। হাওয়া এসে ঝাপড় মারছে কেমন! একটু বৃষ্টিও হয়ে গেল বিধাননগর পেরনোর পর। জল এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল।

একটার পর একটা স্টেশন পেরোচ্ছে। হকার উঠছে। দিব্যেন্দু চুপ করে বসে আছে। সবাইকে দেখে যাচ্ছে শুধু।

এই ট্রেনটা বনগাঁ অবধি গিয়ে আবার ফিরবে। শেয়ালদায় গিয়ে আবার বনগাঁ যাবে। এই করতে থাকবে কারশেডে যাওয়ার আগে অবধি। লোক উঠতেই থাকে। ট্রেন যতই বাড়ুক, এখানে ভিড় কখনও কমে না। কামরা বাড়লেও ভিড় কমে না। তাপসদা বলে বাংলাদেশের লোকেরাও কাঁটাতার পেরিয়ে এসে বনগাঁ থেকে ট্রেনে উঠে পড়ে। সীমান্ত থেকে কলকাতা যাবার শর্টেস্ট রুট। শেয়ালদায় পুলিশ থাকে, আর পি এফ থাকে। বোকারা শেয়ালদায় নামে। চালাক লোকজন বিধাননগর বা দমদমেই নেমে যায়। তারপর ভিড়ে মিশে গেলেই হল। এভাবেই অনুপ্রবেশকারীরা এসে মিশে যাচ্ছে এ-দেশে।

তার স্টেশনে এসে ট্রেন দাঁড়াল। দিব্যেন্দু ট্রেন থেকে নামল। সাইকেল স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল নিল। ধীরেসুস্থে প্যাডেল করা শুরু করল।

বাড়ির সামনে এসে সাইকেল রেখে ঘরে ঢুকল।

কেউ নেই কোথাও। সে আলমারির জিনিস মেঝেয় ফেলে রেখে গেছিল। সব জিনিস সেভাবেই পড়ে আছে। কেমন একটা অদ্ভুত হাহাকারের মতো ব্যাপার হচ্ছে। যে মেয়েটার উপর সব হতাশা ঝাড়ত, সেই মেয়েটাই নেই। কেমন বিচ্ছিরি ব্যাপার! সোফায় চুপ করে বসে কিছুক্ষণ টিভি দেখল। গা হাত পা ব্যথা শুরু হল আবার।

কলিং বেল বাজছে। দিব্যেন্দু বিরক্ত মুখে উঠে দরজা খুলল। বলভদ্র দাঁড়িয়ে আছেন। দিব্যেন্দুকে দেখে বললেন, ‘কী একটা খবর শুনলাম! তোমার চোখে কালো দাগ কীসের?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আসুন।’

বলভদ্র ঘরের ভিতর ঢুকে চোখ কপালে তুললেন, ‘এসব কী?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘বউ পালিয়েছে। কী করব? ভাবলাম ওর নামে ইনসিউরেন্স করব। তার আগেই পালিয়ে গেল।’

বলভদ্র বললেন, ‘পালিয়ে গেল? বেশি মারতে নাকি?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘খুব বেশি কিছু না তো!’

বলভদ্র জোরে জোরে মাথা নাড়ালেন, ‘না। বেশি মারতে। মারার মাপ আছে। ঠিক ঠাক মারতে পারলে পালাবে না। ডোজ বেশি হয়ে গেলে পালায়। ঠিক আছে, কিছুদিন যাক, আরেকটা বিয়ে কর। কমবয়সি। সেটাকে কী করবে, আমি বলে দেব। ওভাবে ডোজ বাড়াতে নেই। লোক জানবে কেন? আর্ট তো ওতেই।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি আর বিয়ে করব না।’

বলভদ্র বললেন, ‘ওরকম সবাই বলে। একা থাকা সম্ভব নাকি? কেউ তো থাকবে যে খিদমত খাটবে। যা বলবে তাই করবে। রান্না করবে, ঘর ঝাঁট দেবে, ঘর মুছে দেবে, পুজো দেবে আবার রাতে বিছানা গরম করবে। কাজের মেয়ে থেকে রাঁধুনি হয়ে বেশ্যা, সব এক প্যাকেজ। বুঝলে না?’

দিব্যেন্দু শক্ত হয়ে বলল, ‘আমি বিয়ে করব না, বললাম তো। মাগী চলে গেলে অনেক ঝামেলা। আমি অত ঝামেলা নিয়ে পারব না।’

বলভদ্র শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘তাহলে আর কী? একটা ইনসিউরেন্স করে নাও।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘নমিনি কে হবে? আপনার বাবা?’

বলভদ্র বললেন, ‘রেগে গেলে কেন? কী হয়েছে?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কিছু না। আপনি যান তো। ভালো লাগছে না।’

৪৬

—আপনিই অরিত্রবাবু?

—হ্যাঁ।

অফিসার তীক্ষ্ণ চোখে অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘শুনলাম কাল রাতে আপনি অনেকটা সিন ক্রিয়েট করেছেন।’

অরিত্র অফিসারের দিকে তাকিয়ে আছে। রাস্তায় ঝামেলা করেছে সে। প্রথমে পুলিশ এসে তাকে স্থানীয় থানায় নিয়ে গেছিল।

বেশ খানিকক্ষণ তাকে বসিয়ে রেখে অন্য একটা ইনভেস্টিগেশন সেন্টারে তুলে নিয়ে এসেছে। অরিত্রর মাথা এতটাই ঘেঁটে আছে, সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না যে তাকে কোথায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

অফিসার বলল, ‘করেছেন তো ঝামেলা? কাল রাতে?’

অরিত্র বলল, ‘ইচ্ছে করে তো করিনি। আমার ওয়াইফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিলজলা থানায় গিয়ে মিসিং ডায়েরি করেছি। হোটেলে গেছি। এটাকে ঝামেলা বলে কি?’

অফিসার বলল, ‘বলে। আমার কাছে রিপোর্ট আছে। আপনার চালচলন, কথাবার্তা অন্য সন্দেহ তৈরি করছে। আপনি সেটা বুঝতে পারছেন?’

অরিত্র অবাক হয়ে বলল, ‘কী সন্দেহ তৈরি করছে?’

অফিসার বলল, ‘হতে পারে আপনি কোনও কন্ট্রাক্ট কিলার দিয়ে আপনার স্ত্রীকে খুন করেছেন।’

অরিত্রর মাথা ঘুরে গেল। সে চিৎকার করতে শুরু করল, ‘এ সব কী বলছেন আপনি? আমি আমার স্ত্রীকে খুন করতে যাব কেন?’

অফিসার শান্ত গলায় বলল, ‘এফেক্ট অফ ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স। এরকম হতেই পারে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কখনও কখনও সন্দেহ এতটাই বেড়ে যায় যে হাজব্যান্ড ওয়াইফকে খুন করে ফেলে। বাইরে নাটক করতে গিয়ে অনেকটা বেশি হয়ে যায়, সেটা হাজব্যান্ড বুঝতে পারে না।’

অরিত্র বলল, ‘আপনি এরকম আজে বাজে কথা বলে যাচ্ছেন কেন? আমি কেন এণাক্ষীকে খুন করতে যাব? এক মিনিট, এক মিনিট। খুন হয়েছে মানে কী? কী বলতে চাইছেন?’

অফিসার বলল, ‘আমরা সব অপশন যাচাই করে দেখছি। হতেই পারে আপনি কোথাও গুম করে রেখেছেন ওকে। রাস্তাঘাটে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা লাগিয়ে ফেলছেন যাতে আপনার উপরে কোনও সন্দেহের তির না আসে।’

অরিত্র মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করল, ‘শুনুন অফিসার। আপনার কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে আপনি আমাকে হেকল করতে চাইছেন। আমার স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কোথায় একটা ঠিকঠাক ইনভেস্টিগেশন করে ওকে খুঁজে বের করবেন, তা না, আপনি উল্টোপাল্টা অ্যালিগেশন করে যাচ্ছেন। তিলজলা থানার অফিসার নীল কিন্তু জানেন আমার হোয়ার অ্যাবাউটস। আমাকে অযথা অ্যাটাক না করে সেই এনার্জি এণাক্ষীকে খুঁজতে ব্যবহার করলে ভালো হতো না?’

একটা বাল্ব জ্বলছে। অফিসার উঠে বাল্বের সুইচটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘সব রকম সন্দেহ আপনার উপরে আসছে। আপনি বুঝতে পারছেন না। ঠিক আছে, আপনি বাড়ি যান।’

অরিত্র বলল, ‘কোনরকম সন্দেহই আমার উপরে আসছে না। আপনারা জোর করে আমার উপর কোনও কিছু প্ল্যান্ট করার তালে আছেন। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি।’

অফিসার অরিত্রর দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করে বলল, ‘আপনি বাড়ি চলে যান। আপনার গাড়িটা আটক হবে। পরে দেখছি কী করা যায়।’

অরিত্র বলল, ‘আপনারা সিসিটিভিতে দেখেননি? আমার কোনও দোষই ছিল না। খামোখা আমার গাড়িটা আটকে রাখছেন কেন? আমার স্ত্রীকে খুঁজতে গাড়িটা দরকার ছিল। প্লিজ গাড়িটা ছেড়ে দিন।’

অফিসার বলল, ‘বললাম তো, আমরা সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনার যা অবস্থা, আমরা আপনাকে গাড়ি চালাতে দিতে পারি না। দেখছি কী করা যায়।’

অরিত্র বলল, ‘আর এণাক্ষী? ওর কোনও খবর পাওয়া গেছে?’

অফিসার অরিত্রর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি শিওর, জানেন না আপনার স্ত্রী কোথায়?’

অরিত্র বলল, ‘আমাকে বার বার একই প্রশ্ন করে যাচ্ছেন কেন বলুন তো?’

অফিসার বলল, ‘আপনি এখন ভদ্রভাবে বাড়ি চলে যান। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত সক্রিয়তা বিপদের কারণ হতে পারে।’

কথাটা বলে অফিসার হাসল। অরিত্র অবাক চোখে অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইল। অতিরিক্ত সক্রিয়তা মানে?

৪৭

খারাপ সময় এলে কি মাথার উপর শকুন ঘুরে বেড়ায়? কাক চিলে তার শরীর নেবে বলে ঝগড়া শুরু করে? এরকমই তো শুনেছিল ছোটবেলায়।

কোত্থেকে একটা পাখি এসে মাথার উপরে ঘুরছে। বাজারসুদ্ধ লোক নুরুলের দোকানের দিকে দৌড়চ্ছে। পূর্ণ হতবাক হয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।

ফোন বাজছে। পূর্ণ ফোন ধরল, ‘হ্যাঁ।’

বাপিদা বলল, ‘বাড়ি যাচ্ছ?’

পূর্ণ বলল, ‘আরে বাড়ি যাব কী, নুরুলকে কে খুন করে দিয়েছে!’

বাপিদা হাসল, ‘তাই নাকি?’

পূর্ণ বলল, ‘হাসছ তুমি? এটা হাসার বিষয়? তুমি এখানে থাকতে না? নুরুলকে চেনো না তুমি? জানো না ওর পরিবার আছে?’

বাপিদা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আমার জানার দরকার নেই। আমি শুধু এটুকু জানি, তুমি যদি ওই টাকার ব্যাপার আর কাউকে বলো, তার অবস্থাও নুরুলের মতো হবে। তুমি কি সেটা চাও?’

পূর্ণ হতভম্ব হয়ে বলল, ‘মানে? তুমি করিয়েছ?’

বাপিদা বলল, ‘বাড়ি যাও। অনেক কাজ আছে। বাজারে দাঁড়িয়ে থেক না। ইমন পেইন্টের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছ, যাও। ফিরে যাও।’

পূর্ণ বলল, ‘তুমি দেখতে পাচ্ছ কী করে?’

বাপিদা বলল, ‘ইচ্ছে করলে সব দেখা যায়। যা বলছি করো।’

ফোন কেটে গেল। পূর্ণ বোকাসোকা মানুষ। বেশি বুদ্ধি তার কোনকালেই ছিল না। কিন্তু বাপিদার কথা শুনে সে ভয় পেয়ে গেল। চেনা জানা মানুষটা কেমন যেন অচেনা হয়ে গেছে।

টোটো যাচ্ছিল একটা। পূর্ণ তাতেই উঠে বাপিদার বাড়ির ঠিকানা বলল। টোটোওয়ালা বলল, ‘নুরুলদা মার্ডার হয়েছে, শুনেছেন?’

পূর্ণ বিড়বিড় করে বলল, ‘হ্যাঁ, শুনেছি বাপু। তুমি তাড়াতাড়ি চলো। বাড়িতে অনেক কাজ।’

টোটোওয়ালা বক বক করে যেতে লাগল, ‘ভাবা যায় না, এসব এলাকায় এককালে একটাও বাইরের লোক আসত না। আর এখন নাকি কে বাইকে করে এসে খুন করে দিয়ে গেল! কী অবস্থা বুঝতে পারছেন? আর সে কী টিপ! কুত্তামারা টিপ যাকে বলে। কপালের মাঝ বরাবর গুলি করে দিয়ে গেছে। ভালো মানুষ ছিল। কারো সাতে পাঁচে থাকত না। সেই লোকের এই হাল করে দিয়ে গেছে। ভাবা যাচ্ছে না।’

পূর্ণ বলল, ‘কী আর করা। সবার নিজের নিজের কপাল।’

বাড়ির সামনে নেমে পড়ল পূর্ণ। তালা খুলে ঘরের ভেতর গিয়ে তালা বন্ধ করে ঢুকে পড়ল।

বুক ঢিব ঢিব করছে। ফোন বাজল আবার। সে ফোন ধরতেই বাপিদা বলল, ‘তোমাকে বোকা ভাবতাম। তুমি তো তেমন বোকা না। আলমারি খোলার জন্য যথেষ্ট বুদ্ধি দরকার। সেটা যখন পেরেছ, তাহলে আমার অন্য কাজগুলোও করতে পারবে। এক কাজ করো। আমার বেডরুমে দেখো একটা ব্যাগ আছে। টাকাগুলো ওই ব্যাগে ভরে নাও। একটা ঠিকানা পাঠাচ্ছি। দিনের আলো থাকতে বেরিয়ে গিয়ে ব্যাগটা ওই ঠিকানায় দিয়ে এস। পারবে?’

পূর্ণর ঘাম হচ্ছিল। সে কোনমতে বলল, ‘আমার বুক ধড়ফড় করছে বাপিদা। নুরুলকে তুমি মেরে দিলে? নুরুল আমার বন্ধু ছিল।’

বাপিদা বলল, ‘মানুষ মরল বাঁচল, তাতে কিছু যায় আসে না। এই যে তুমি না খেতে পেয়ে ঘুরে বেড়াতে, তোমার বন্ধু কি তোমায় খাইয়ে দিত? নিজেই ভেবে দেখো। এই পৃথিবীতে কেউ কারো না। একেক জন, একেক রকম। তুমি তোমার মতো। নুরুল নুরুলের মতো। আমার কথা শুনে কাজ করো, তোমাকে না খেয়ে থাকতে হবে না। তোমাকে বোকা ভাবাটা আমার ঠিক হয়নি। আগে জানতে পারলে নুরুলের প্রাণটা বাঁচত এই যা। ব্যাগে টাকাগুলো ভরে নাও। উলুবেড়িয়া গেছ কোনওদিন?’

পূর্ণ বলল, ‘না।’

বাপিদা বলল, ‘হাওড়া গিয়ে ওখান থেকে মেচেদার দিকের লোকাল ট্রেন ধরবে। উলুবেড়িয়া নেমে রিকশা নিয়ে আমার পাঠানো ঠিকানা বলবে, নিয়ে যাবে। কাজ করো। খাবারের চিন্তা করতে হবে না।’

পূর্ণর বমি পাচ্ছিল। সে ফোন কেটে দিল।

৪৮

হোটেলের রুমে ফিরে এসেছে সে। টিভি দেখছে স্থির হয়ে বসে। আবেগ শূন্য হয়ে গেছে সে। কী হবে ভেবে?

যত ভাববে, তত সমস্যা বাড়বে।

দিব্যেন্দু যখন প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে মারত, প্রথম প্রথম অনেক ভেবেছে। পরে দেখেছে, আসলে ওসব ভেবেটেবে কিছু হয় না। যা হবার, তা হয়েই যায়।

হোমে দিব্যেন্দুকে দেখার পর হৃদস্পন্দন থমকে গেছিল তার। মনে হচ্ছিল যেকোনও সময় হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে। কী ভয়ংকর একটা মুহূর্ত। আবার সে লোকটার মুখোমুখি! পৃথিবীতে কি দিব্যেন্দুর থেকেও ভয়ংকর কেউ হতে পারে? না বোধহয়।

দিব্যেন্দু অফিস থেকে ফিরে জুতো খুলতে খুলতে বলত, ‘আফগানিস্তানের গল্প শুনলাম। ওখানে বউরা যদি বরের কথা না শোনে, মাথায় পাথর ঠুকেই মেরে দেয়। বুঝতে পারছ, কী ভয়ংকর ব্যাপার? তার তুলনায় আমি কী? কিচ্ছু না। আমি তো আসলে ভালোবাসি তোমায়। এই যে মারি, মারার পরে কি আমার কষ্ট হয় না? কিন্তু কী করব? বউকে সিধে রাখতে হলে মারতে হয়।’

রুমা চুপ করে বসে থাকত। কী আর বলবে? বাড়ির লোক যদি সাপোর্ট না দেয়, তাহলে সব রকম পরিস্থিতি সহ্য করতে হয়। একবার কী মনে হল, মাঝরাতে হঠাৎ করে ঠেলে তুলে দিয়ে বলল, ‘একটা কাজ করো। বাড়ির বাইরের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাক। দেখা যাক কী হয়।’

রুমা কোনও প্রতিবাদ করেনি। চুপচাপ গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।

দিব্যেন্দু জানলা থেকে চুপ করে বসে তাকে দেখছিল। রুমা কাঁদেনি। পাড়ার কুকুরগুলো এসে একবার তাকে ঘিরে ডেকে চলে গেল। রুমা ভয় পায়নি। ভয়গুলো এভাবেই জয় করতে হতো।

কিছুক্ষণ পর দিব্যেন্দু তাকে ডাকল। সে আবার ঘরের ভেতর এল। দরজা বন্ধ করতে করতে শুনল দিব্যেন্দু বলছে, ‘রাস্তায় দাঁড়ান অভ্যাস আছে তার মানে। দাঁড়িয়েছিলি নাকি কোনদিন?’

রুমা সে কথারও প্রতিবাদ করেনি।

প্রতিবাদ করার ইতিহাস মনে আছে তার। ব্লেড দিয়ে এমন ভাবে হাত চিরে দেবে, অসহ্য যন্ত্রণা হয়। একবার কাটা জায়গায় নুন দিয়ে দিয়েছিল। ব্যথায় সে চিৎকার করছে, দিব্যেন্দু এসে মুখে হাত দিয়ে বলেছে, ‘গলা নামিয়ে চিৎকার কর শুয়োরের বাচ্চা, পাশের বাড়ির লোক জেগে যাবে।’

কলিং বেল বাজল। রুমার হুঁশ ফিরল।

সে দরজা খুলল।

লোকটা বলল, ‘আসব?’

রুমা কিছু না বলে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল।

লোকটা ঘরের ভেতর ঢুকে বলল, ‘তুমি আমার উপর রাগ করে আছ। রাগ করে থেকো না। রাগ কোনও কিছুর সলিউশন হতে পারে না। আজ না হোক, কাল তোমার হাজব্যান্ড ওই হোমের ঠিকানা ঠিকই পেয়ে যেত। তারপর কী হতো ভেবে দেখেছ?’

রুমা পাথুরে মুখে বলল, ‘ভাবতে চাই না। আমাকে কী করতে হবে, সেটা বলুন।’

লোকটা বলল, ‘তোমার ট্রেনিংটা হোক। তারপর তুমি ঠিক করে নিও।’

রুমা বলল, ‘আপনি বলেছিলেন হানি ট্র্যাপ করাবেন। শেষ অবধি ওটাই করতে হবে তো?’

লোকটার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। বলল, ‘ব্রাভো। তোমার মেমোরি তো খুব শার্প। এই কাজে মেমোরি শার্প হওয়া মাস্ট। একটা কোনও কথা শুনলে, কোনও কোড, কোনও ফোন নাম্বার, মনে রাখতে হবে। তুমি টুয়েলভ অবধি পড়েছ, তারপর পড়া হয়নি। বাড়ির লোক জোর করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল। ছেলেটার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার প্রয়োজন বোধ করেনি।’

রুমা বলল, ‘চেক করলে কি জানা যেত ছেলেটা ওভাবে মারে?’

লোকটা বলল, ‘তুমি শক্তিশালী হলে মারতে পারত না। ধর তোমাকে মারতে এল, তুমি এমন একটা প্যাঁচ দিলে, উল্টে পড়ে গেল। কোনওদিন প্রতিরোধ করনি। করলে এত খারাপ অবস্থা হতো না।’

রুমা বলল, ‘করার কথা মনে হয়নি। বাড়িতে পাঠিয়ে দিলে রাখত না।’

লোকটা বলল, ‘ঠিক রাখত। এই ধরনের সাইকোপ্যাথরা শক্তের ভক্ত। নরমের যম। তুমি কি কাল থেকে ট্রেনিং শুরু করতে প্রস্তুত?’

রুমা বলল, ‘আপনি যা বলবেন।’

লোকটা বলল, ‘তুমি এখনও ভাবছ তোমাকে জোর করা হচ্ছে, তাই না?’

রুমা ম্লান হাসল, ‘সবাই একটা কথাই বলে। আমার ভালোর জন্যই নাকি করা হচ্ছে। বাবা-মা বলল ভালোর জন্য বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ও বলল ভালোর জন্য মারা হচ্ছে। কোনটা খারাপ, সেটাই ভাবছি।’

লোকটা বলল, ‘বেঁচে থাকতে চাও তো এত কিছুর পরেও? সেটার থেকে ভালো আর কী হতে পারে?’

রুমা উত্তর দিল না।

৪৯

রাত গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে।

গলির সামনে ভিড় বাড়ছে একটু একটু করে। যেন কোনও উৎসব চলছে। কত রকম মানুষ আসে, একেক জনের একেক রকম চাহিদা। প্রথম প্রথম সবাই ভয়ে ভয়ে থাকে। এক দিন, দু-দিন করতে করতে যখন অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তাদের শরীরে আত্মবিশ্বাস ঝকঝক করতে থাকে।

সুখেনের দুটো কাস্টমার হয়েছে। পকেটে দুশো টাকা এসেছে। সে চায়ের দোকানে গিয়ে বসল।

আরেকটু রাত হলে আরও মজা হয়। সুখেন আসলে রাতের প্রতীক্ষাই করে দিনভর। রাত হলে সে বেঁচে থাকার রসদ পায়।

লুকা সাঁতরার গাড়ি গলির সামনে আসতেই সুখেন উঠে পড়ল। লুকা দিব্যেন্দুকে তুলেছিল। কী কেস জানতে হবে।

লুকা গাড়ি থেকে নামতেই একটু দূরত্ব রেখে সে চিৎকার করল, ‘দাদা, প্যাকেজটা কী করলেন?’

লুকা সিগারেট টানছিল। সুখেনকে দেখামাত্র হাতছানি দিয়ে ডাকল। সুখেন কান ধরল, ‘মারবে দাদা।’

লুকা বলল, ‘চাইলে অনেক আগেই উড়িয়ে দিতে পারতাম। এদিকে আয়।’

সুখেন ধীর পায়ে লাজুক মুখে লুকার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

লুকা সুখেনের কান ধরে জোরে মুলে দিল, ‘তোর নাকি পাখনা গজিয়েছে?’

সুখেনের লাগছিল। তাও চিঁচিঁ করে বলল, ‘দাদা, তোমরাই তো রাখবে, তোমরাই তো মারবে। আমি ভাবলাম লোকটাকে যদি হাপিশ করে দাও। এমনি তো দোষ কিছু করেনি। হাতুড়িটা নাকি ওর মুদ্রাদোষ।’

এক রাস্তা লোকের সামনে লুকা তাকে লাথি মারল। পরপর কয়েকটা চড় মেরে বলল, ‘আমার কথা না শুনে নিজের বুদ্ধি খাটাতে গেলে এরপরে ধাপার মাঠে তোর লাশ পাওয়া যাবে। আমার কথার নড়চড় হয় না।’

কান মাথা ঝিঁঝি করছে। যে কাজ সে করে, তাতে অপমান বলে কোনও শব্দ হয় না। তাও সুখেনের খারাপ লাগছিল। সে বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে দাদা। আর হবে না।’

লুকা বলল, ‘ভুল বলে কিছু হয় না। তুই পুরোনো শুয়োর বলে তোকে হালকার উপরে ছাড়লাম আজ। আমার ছেলেদের তুই বলেছিলি রাতেই ওকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়েছিস। কিন্তু তুই তা করিসনি। নিজের কাছে রেখেছিলি। তুই কী ভেবেছিলি, এসব করবি আর কিছু হবে না?’

সুখেন বলল, ‘দাদা, মালটাকে আমি একটু দেখতে চেয়েছিলাম। মানে এরকম তো দেখিনি, তুমি কি দেখেছ? বেশ্যাপাড়ায় এসে পায়ে হাতুড়ি মারে, দেখব না?’

লুকা জ্বলন্ত চোখে সুখেনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সাতদিন এলাকায় ঢুকবি না। তোকে সাতদিনের জন্য এখান থেকে বের করা হল। ফের যদি তোকে এলাকায় দেখেছি, তাহলে তুই খবর হয়ে যাবি।’

সুখেন কাঁদার নাটক করল, ‘এরকম করে বললে কী করে হবে দাদা? আমি কী খাব? না খেতে পেয়ে মরবো তো। তোমার দয়ার শরীর। ছেড়ে দাও।’

লুকা মাথা নাড়ল, ‘তোর অনেক বাড় বেড়েছে সুখেন। আমি অনেক দিন ধরেই দেখছি। তুই যদি ভেবে থাকিস কেউ কিছু বোঝে না, তাহলে তুই মূর্খের স্বর্গে বাস করছিস। আমি যা বলেছি, তাই হবে। সাতদিন তোকে যেন না দেখি। যদি দেখতে পাই, তোর খবর আছে।’

সুখেন কান ধরল। আরেকটা গাড়ি এসে গলির মুখে দাঁড়াল।

লুকা ইশারা করল। সুখেন দেখল গাড়ি থেকে একটা বউ নামল। দেখে বোঝা যাচ্ছে, মেয়েটা হকচকিয়ে গেছে। ভয় পাচ্ছে। একবারে ভদ্রবাড়ির মেয়ে দেখলেই বোঝা যায়।

লুকা মেয়েটাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সুখেন ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল। বোঝা যাচ্ছে মেয়েটাকে নিয়ে লুকার কোনও প্ল্যান আছে। গলির ভেতরে ঢুকে জোর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে শমিতার ঘর থেকে নিরাপদ দূরত্বে একটা ঘরের ছাদে উঠে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে বসে রইল।

ঠিক যা ভেবেছিল তাই।

মেয়েটাকে নিয়ে শমিতার ঘরে ঢুকল লুকা।

সুখেন ভ্রু কুঁচকে চিন্তা করতে লাগল, কী করে শমিতার ঘরের ভেতর ঢোকা যায়।

৫০

রাত দেড়টা। লুকা সাঁতরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। ফোন বাজতে শুরু করল তার, দেখল সুখেন ফোন করছে। ধরল, ‘বল।’

সুখেন যতটা সম্ভব গলাটা কান্না কান্না করে বলতে শুরু করল, ‘দাদা, তোমার তো দয়ার শরীর। গ্রামের বাড়িতে আমার বুড়ি মা থাকে, মা-র টিবি হয়েছে। টাকা পাঠাতে হয় দাদা। তুমি যদি এখন এরকম শাস্তি দাও, তাহলে কী করে হবে?’

লুকা বলল, ‘তুই কোথায়?’

সুখেন বলল, ‘পাশের বস্তিতে বসে আছি দাদা। কী করব, কী খাব, বুঝতে পারছি না।’

লুকা বলল, ‘বুঝেছি। আমার গাড়ির কাছে আয়।’

সুখেন ভয়ে ভয়ে বলল, ‘মারবে না তো দাদা?’

লুকা বলল, ‘না। মারব না। আয়।’

ফোন কেটে দিল লুকা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুখেন কাঁচুমাচু মুখে এসে হাজির হল।

লুকা সন্দিগ্ধ গলায় বলল, ‘কাছেপিঠেই ছিলিস। তাই না?’

সুখেন বলল, ‘তোমাকেই দেখছিলাম। কী করব বল দাদা? তুমি যা শাস্তি দিয়েছে, আমি যে কী করব, তাই ভালো করে বুঝে উঠতে পারছি না।’

লুকা বলল, ‘বুঝে উঠতে পারছিস না? তুই জানিস না কী করেছিস?’

সুখেন লুকার পা জড়িয়ে ধরল, ‘ভুল করেছি দাদা। মাফ করে দাও।’

লুকা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। উঠে দাঁড়া। রাস্তার মাঝখানে ন্যাকামি করবি না।’

সুখেন উঠল না, ‘না দাদা। তুমি যতক্ষণ না মাফ করবে, আমি উঠব না।’

লুকা বলল, ‘হয়েছে রে বাপ, হয়েছে, মাফ করলাম। এবার ওঠ।’

সুখেন উঠে দাঁড়াল।

লুকা বলল, ‘বল এবার। তোর মা সত্যিই অসুস্থ?’

সুখেন বলল, ‘খবর নিয়ে দেখো। তোমাকে মিথ্যে বলব আমি? তোমার যা নেটওয়ার্ক, আমি জানি না?’

লুকা তৃপ্তির হাসি হেসে বলল, ‘হেবি রেগে গেছিলাম আমি। ভাবছিলাম তোর লাশ নামিয়ে দিই। এত পাখা গজিয়েছিল তোর?’

সুখেন বলল, ‘দেখো দাদা, আর হবে না। তুমি বললে মালটাকে আমিই খুঁজে গুলি করে দিয়ে আসব।’

লুকা হাত নাড়ল, ‘না না। তার দরকার হবে না। মালটাকে ছেড়েও দিয়েছি।’

সুখেন আকাশ থেকে পড়ল, ‘সে কী গো দাদা? ছেড়ে দিয়েছ মানে কী?’

লুকা বলল, ‘হ্যাঁ। কী করব? অর্ডার ছিল। কাজ হয়ে গেছে, ছেড়ে দিয়েছি।’

সুখেন বলল, ‘কী অর্ডার ছিল?’

লুকা রেগে গেল, ‘জুতো খাস কেন বুঝতে পারিস? যা তোর জানার দরকার নেই, সেটা জানতে যাবি কেন তুই?’

সুখেন কান ধরল, ‘আবার ভুল করে ফেলেছি দাদা।’

লুকা বলল, ‘ঠিক আছে। আমাদের লাইনে অনেক ব্যাপার থাকে। তোর সেটা জানা উচিত। কথাবার্তা এমন বলিস যেন কিছুই বুঝিস না!’

সুখেন বলল, ‘ওই মালটার জন্য তুমি আমাকে মারতে যাচ্ছিলে দাদা, একটু তো জানতে ইচ্ছে হয়ই, ও কিছু না। ছেড়ে যখন দিয়েছ, তখন থাক। তোমার কথা বলো, শুনি।’

লুকা আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘আমি কি গল্পদাদু রে শালা?’

সুখেন বলল, ‘এ মা, তা কেন? ভালোমন্দের কথা কি বলতে ইচ্ছে করে না তোমার সঙ্গে? তুমি হলে আমাদের সবার দাদা।’

লুকা বলল, ‘তা ঠিক। আজ বিজনদার সঙ্গে দেখা হল। এই মার্কেটেও বিজনদা পার্টি ছাড়েনি। একটা কথা মনে রাখবি সুখেন, এই যুগে যারা এখনও দাঁতে দাঁত চেপে আদর্শের লড়াই করে যাচ্ছে, তাদের মারার জন্য যদি কোনও শুওরের বাচ্চা লুকা সাঁতরাকে টাকা দেয়, লুকা তার খাল খিচে নেবে।’

সুখেন বলল, ‘বিজনদাকে মারার জন্য টাকা দিয়েছে নাকি?’

লুকা মাথা নাড়ল, ‘না না, তা না। যদি দেয়, তাহলে কী করব তাই বললাম। বিজনদার সঙ্গে কথা বললে ভালো লাগে। আমায় অনেক জ্ঞান দিল, ভালো হয়ে যা এই সব। আমি বললাম, আমি তো ভালোই। বিজনদা আমার পিঠে চাবড় মারল। বলে মানুষের জন্য ভালো কিছু কর। তুই বল সুখেন, আমি কি ভালো কাজ করি না? এই তো এখানের মেয়েদের জন্য কত কিছু করি।’

সুখেন খুক খুক করে কেশে বলল, ‘তা তুমি করো। তুমিই এখানের ভগবান।’

লুকার ফোন বেজে উঠল। সুখেন দেখল লুকা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘তুই এখন যা। আমার কাজ আছে।’

সুখেন বলল, ‘কোথায় যাব দাদা?’

লুকা জোর পায়ে হাঁটতে শুরু করল, ‘জাহান্নামে যা।’

লুকা গলিতে ঢুকেছে। সুখেন দূরত্ব রেখে হাঁটতে শুরু করল।

লুকা একরকম দৌড়ে শমিতার ঘরের দিকে গেল। সুখেন দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা ঝুঁকি নিতে হবে। মরলে মরবে। কিন্তু কৌতূহলে মরে যাওয়ার থেকে এমনি মরে যাওয়া ভালো।

শমিতার ঘরের পিছনে গলি শেষ হয়ে গেছে। সুখেন ‘জয় মা’ বলে পাইপ বেয়ে ছাদের উপরে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে ছাদের উপর থেকে ভেতরের বারান্দায় উঁকি মারল। যে মেয়েকে এনেছিল, সে মেয়েটা চিৎকার করে কাঁদছে, ‘আমি এখানে থাকব না, আমায় ছেড়ে দিন।’

এতটা কষ্ট করে উপরে উঠে সুখেনের বুক হাপরের মতো ওঠা নামা করছিল। পাশের বিল্ডিং থেকে তাকে দেখতে পাবার প্রবল ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সুখেন নামল না। ছাদের উপর থেকে আবার উঁকি মারল। মেয়েটাকে শমিতার দুজন মেয়ে জোর করে ধরে হাতে ইনজেকশন দিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মেয়েটা অচৈতন্য হয়ে গেল।

প্রবল উত্তেজনার মুহূর্তে সুখেন শিস দিয়ে ফেলে। এবার দিতে গিয়েও বহু কষ্টে নিজেকে আটকাল। ধরা পড়লে এবার আর লুকা ছেড়ে দেবে না তাকে!

৫১

ব্যাগটা যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। হাওড়ার বাসে উঠে পায়ের তলায় ব্যাগটাকে রেখেছে সে। মাঝে মাঝেই প্রবল কান্না পাচ্ছে। নুরুলের কথা মনে পড়ছে। এভাবে মেরে দিল বাপিদা?

নকল টাকাগুলো ব্যাগে রেখে বাপিদার বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে বাপিদা ফোন করল আরেকবার, ‘সাবধানে যাবে। কেউ যেন বুঝতে না পারে, ব্যাগে কী আছে। বুঝেছ?’

পূর্ণ বলল, ‘হ্যাঁ, বুঝেছি।’

বাপিদা বলল, ‘পুলিশ যেন না বোঝে।’

পূর্ণ বলল, ‘এই টাকা তোমার কাছে এল কী করে বাপিদা? অত দূরে বসে এখানে এত টাকা?’

বাপিদা বিরক্ত গলায় বলল, ‘যা বলেছি, সেটা করো। এত প্রশ্ন জিগ্যেস করে কোনও লাভ নেই। দিনের আলো থাকতে থাকতে বেরিয়ে যাও।’

ফোন কেটে গেল। বাস স্ট্যান্ডে গিয়েও পূর্ণ শুনতে পেল সবাই নুরুলের ব্যাপারেই কথা বলছে। কাল বন্ধ ডাকা হয়েছে। এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে বলে মিছিল হবে বিকেলে।

হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে ব্যাগ কাঁধে নিয়েই পূর্ণ ট্রেনের টিকেট কাটল। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে এসেছে। এর মধ্যে অনেকে উঠেও পড়েছে। তাও সিট পাওয়া গেল। পূর্ণ পায়ের তলায় ব্যাগ রেখে বসল। সামনের লোকটা নিবিষ্ট মনে খবরের কাগজ পড়ছে। পূর্ণর বুক ধড়ফড় করছে। স্টেশনে অনেক পুলিশ ছিল। একবার যদি তারা তাকে ধরে ফেলত, তাহলে কী হতো?

সাঁতরাগাছিতে একটা লোক উঠল। ট্রেনে ভিড় নেই, অথচ লোকটা তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। পূর্ণর ফোন বাজতে শুরু করেছে। পূর্ণ ফোন ধরল, বাপিদা বলল, ‘তোমাকে উলুবেড়িয়া অবধি যেতে হবে না। পরের স্টেশনে নেমে যাও। তোমার সামনে যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, সে ব্যাগ নিয়ে যাবে।’

পূর্ণ লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখল। মাঝবয়সি লোক। গাট্টাগোট্টা চেহারা। সে সঙ্গে সঙ্গে সিট থেকে উঠে লোকটাকে বলল, ‘বসুন।’

লোকটা বসল। পূর্ণ গেটের কাছে এসে দাঁড়াল। অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছিল তার। আশেপাশের লোকগুলো কিছু বুঝল নাকি কে জানে। ট্রেন ফুলেশ্বর স্টেশনে দাঁড়িয়েছে। পূর্ণ তড়িঘড়ি নেমে গিয়ে ফেরার টিকিট কাটল। ফোন বাজছে আবার। পূর্ণ ফোন ধরল। বাপিদা বলল, ‘এখনই ট্রেনে উঠো না। একটা ব্যাগ দেবে। নিয়ে ফিরবে।’

পূর্ণ বলল, ‘আবার? রাত হয়ে যাবে তো?’

বাপিদা বলল, ‘হোক। কাজ করছ। সময় লাগলে লাগুক। এক নাম্বার প্ল্যাটফর্মের একদম শেষ বেঞ্চ, যেটা হাওড়ার দিকে মুখ করে আছে, সেটায় গিয়ে বোস। কারো সঙ্গে কথা বলবে না।’

পূর্ণ বলল, ‘আমায় যদি পুলিশ ধরে? আমি কী করব তখন?’

বাপিদা বলল, ‘কেন ধরবে? তুমি কি কিছু করেছ যে ধরবে?’

পূর্ণ ঘামছিল। বলল, ‘আমি জানি না। তুমি এগুলো কী করছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

বাপিদা বলল, ‘বোঝার জন্য তোমায় টাকা দেওয়া হবে না।’

পূর্ণ বলল, ‘আমার টাকা লাগবে না। আমাকে ছেড়ে দাও।’

বাপিদা বলল, ‘ছেড়ে দিতাম, যদি তুমি চুরিটা না করতে যেতে। তোমাকে তো সৎ ভাবতাম। তোমার মধ্যেও লোভ আছে তার মানে। লোভের জন্য এটুকু তো করতেই পারো, তাই না? প্রথম প্রথম একটু ভয় লাগবে। তারপর আর লাগবে না। চিন্তা কোরো না। যা বলছি করো। ভালো টাকা পাবে।’

পূর্ণ বলল, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আর করব না। আমাকে ছেড়ে দাও।’

বাপিদা বলল, ‘বললাম তো তোমায়, যেটা বলছি করো। নইলে নুরুলের মতো দশা করব।’

পূর্ণ বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা। যাচ্ছি।’

ফোন কেটে দিল বাপিদা।

পূর্ণর অসুস্থ লাগছিল। সে কোনমতে হাঁটতে হাঁটতে ওভারব্রিজ পেরিয়ে বাপিদার বলা বেঞ্চে গিয়ে বসল। বেঞ্চ ফাঁকাই ছিল। অন্ধকার নেমে এসেছে চারপাশে।

‘কোথায় যাবেন?’

তার সামনে একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে, পূর্ণ বুঝতে পারেনি। চমকে তাকাল।

পূর্ণ বলল, ‘হাওড়া যাব।’

‘টাকাগুলো নকল কেন?’

পূর্ণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে লোকটার দিকে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যে তাকে চারজন ঘিরে ধরল।

৫২

পূর্ব কথা

বাজারের হোটেলে অনেকদিন খাওয়া হয় না। একটা দোকান থেকে ডিম আর ময়দার গন্ধ ভেসে আসছে। এগরোল ভাজছে।

দিব্যেন্দু দোকানের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। যে লোকটা এগরোল ভাজছে, সে জিগ্যেস করল, ‘কী দেব?’

দিব্যেন্দু দাঁত বের করল, ‘দেখছি।’

লোকটা অবাক গলায় বলল, ‘কী দেখছেন?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘এগরোল ভাজছেন, সেটা দেখছি।’

লোকটা বিরক্ত গলায় বলল, ‘নিলে নিন, নইলে সরে যান। ভিড় করবেন না। এমনিতেই ভ্লগারদের জ্বালায় অস্থির। দু-দিন পর পর কেউ না কেউ এসে বলে ভিডিও করব, তোমার প্রচার হবে, খেয়ে নেবো, টাকা দেব না। পরে দেখা যায় দশটা সাবস্ক্রাইবার তার। অনেক মুরগি হয়েছি। আর হব না বাপ। আপনিও কি ভ্লগার নাকি?’

দিব্যেন্দু মাথা নাড়ল, ‘না না। আমি কিছু না। আচ্ছা আমাকে একটা রোল দিন।’

‘ডবল ডিম না সিঙ্গল ডিম?’

‘ডবল।’

‘লঙ্কা দেব?’

‘দিন।’

লোকটা অভ্যস্ত হাতে ডিম ভাঙল। এখন একটু নুন দিয়ে চামচ দিয়ে নাড়াচ্ছে। দিব্যেন্দু মুগ্ধ হয়ে দেখছে।

পেঁয়াজ কাটা আছে। ডিম ভাজার উপর পরোটা দিয়ে এদিক-ওদিক ভেজে নিয়ে এবার রোলের উপর পেঁয়াজ সাজানোর পালা। দিব্যেন্দু বলল, ‘বাদাম আছে?’

লোকটা বিরক্ত গলায় বলল, ‘বাদাম কে দেয়?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি খাই। বাদাম দিন না।’

লোকটা বলল, ‘বাদাম নেই।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘আমি বাদাম কিনে আনছি।’

লোকটা তাড়াতাড়ি রোলটা বানিয়ে দিব্যেন্দুর হাতে দিয়ে বলল, ‘টাকা দিন, দিয়ে ফুটুন। বাড়িতে গিয়ে বাদাম দিয়ে নিন।’

দিব্যেন্দু টাকা দিয়ে রোলটা নিয়ে বাড়িতে এল।

‘রুমা।’

রুমা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল।

দিব্যেন্দু বলল, ‘বাদাম দে তো।’

তুই সম্বোধন শুনেই রুমা বুঝেছে দিব্যেন্দুর মেজাজ ঠিক নেই। সে বলল, ‘দেখছি।’

রান্নাঘরে গেল। না। বাদাম নেই।

দিব্যেন্দু বাইরের ঘরে দাপাচ্ছে।

রুমা বেরিয়ে বলল, ‘আমি বাদাম নিয়ে আসছি। নেই।’

দিব্যেন্দু রোলটা ছুঁড়ে মারল রুমার গায়ে, ‘শুধু বাইরে গিয়ে লোকের গায়ে ঢলানোর ইচ্ছা না?’

রুমা কাঁপতে শুরু করেছে। দিব্যেন্দু রোলটা মেঝে থেকে তুলে বলল, ‘তুই খা। খা।’

খেতে না চাইলেও গোটা রোলটা রুমার মুখের মধ্যে জোর করে পুরে দিল দিব্যেন্দু। রুমা খেতে পারল না। বমি করে দিল। দিব্যেন্দু চুলের মুঠি ধরে বলল, ‘ষাট টাকা তোর বাপ দেবে রে মাগী? তোর বাপ দেবে?’

বর্তমান সময়

দোকানটার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দিব্যেন্দু। বুকের কাছটায় ব্যথা করছে। বেশ্যাপাড়ার গুন্ডাগুলো বহুত পিটিয়েছে। এ ব্যথা বেশ কিছুদিন থাকবে।

রোলের লোকটা তাকে দেখে বলল, ‘কী বাদাম দাদা? বাদাম দেব?’

দিব্যেন্দু হাসল, ‘আছে?’

লোকটা বলল, ‘এনেছি। আপনার মতো দু-চার পিস আছে, বলে বাদাম ভালো লাগে।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘দাও।’

লোকটা বাদাম ভাজছে। বাদামটা একটু একটু করে কালো হচ্ছে। দেখতে দিব্যি লাগছে। দিব্যেন্দু মুগ্ধ হয়ে দেখছে। পেঁয়াজ শসার সঙ্গে বাদামও দেওয়া হবে। তার উপরে সস। এখানে দামি সস দেয় না। কুমড়োর সস দেয় মনে হয়। লাল, হলুদ, খয়েরি সসের বন্যা। যা দেবে দিক। খিদে পেয়েছে। খেতে হবে। বাড়িতে রুমা নেই। রান্না নেই। বাইরেই খেতে হবে। আগে রোল খাবে। তারপর ফুচকা খাওয়া যেতে পারে। তারপর ঘুগনি।

ঘুগনির মধ্যে একটা গোটা সেদ্ধ ডিম ভেঙে দেয়। নরম কুসুমটা ছড়িয়ে পড়ে। আলাদা ব্যাপার থাকে তাতে। ভাবতেই জিভে জল চলে এল।

মানিব্যাগ কিনতে হয়েছে। এটিএম থেকে শুধু পাঁচশো বেরিয়েছে। দিব্যেন্দু সেটা দিল। দোকানদার বিরক্ত গলায় বলল, ‘খুচরো দিন।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘খুচরো নেই।’

লোকটা রেগে গিয়ে বলল, ‘তাহলে রাস্তা দেখুন।’

দিব্যেন্দুর মাথা গরম হচ্ছে। এখন রাগ ঝাড়ার জন্য রুমা নেই। কার উপর ঝাড়বে?

দোকান থেকে সরে গেল সে। টাকা খুচরো করতে হবে।

উফ্‌, কী ঝামেলা! রক্ত উঠছে মাথায় একটু একটু করে।

একটা গাড়ি দাঁড়াল বাজারের মধ্যে। ‘এই এদিকে।’

একী! সেই গুন্ডাগুলো না? উফ্‌! তাকে ডাকছে আবার! রাগ এবার ভয়ে পরিণত হচ্ছে।

৫৩

গাড়ির ভেতরে হালকা মিষ্টি একটা মদের গন্ধ ভাসছে। দিব্যেন্দু ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আমাকে আবার এখন কী করতে হবে?’

দিব্যেন্দুর পাশে যে বসেছিল, সে দিব্যেন্দুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘তোমার বান্টু টেস্ট হবে কাকা।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘মানে?’

‘মানে আবার কী? তোমারটা কী পজিশনে আছে, ঠিক করে দাঁড়ায় নাকি, ফাংশান করে নাকি, দেখতে হবে না?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘এসব কী? আমার খিদে পেয়েছে?’

‘এই কে আছিস, একে কিছু খাইয়ে দে।’

গাড়ি দাঁড়াল একটা ধাবায়। তুমুল ঝাল দিয়ে একটা মাটন তড়কা দেওয়া হল। খেতে দারুণ লাগছিল। দিব্যেন্দু উশ আস করে সাতটা রুটি খেয়ে নিল।

‘উরিব্বাস। মামা তো ভালোই খেতে পারো।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘খিদে পেয়েছিল। আপনারা খাবেন না।’

‘না না। খাব না। তুমি খাও। পাঁঠা বলির আগে পাঁঠাকে খাওয়ায়, দেখো না?’

দিব্যেন্দু বলল, ‘মানে?’

‘মানে বুঝতে হবে না। খাও।’

খেয়ে নিল। আবার পান দেওয়া হল তাকে।

গাড়িতে উঠে ঘুমও পেয়ে গেল দিব্যি। একটা ছেলের কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েও পড়ল সে।

ঘুম ভাঙতে দেখল আবার সেই পাড়ায় গলির মুখে চলে এসেছে। ছেলেগুলো তাকে বলল, ‘চলো। ভেতরে চলো।’

চারদিকে তাকাল দিব্যেন্দু। এখন অনেক রাত হয়েছে। বাইরে তেমন কেউ নেই। ছেলেগুলোর সঙ্গে তাকে শমিতার ঘরে নিয়ে গিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল।

লুকা তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তারপর? কেমন লাগল আবার আসতে?’

দিব্যেন্দু ভয়ে ভয়ে বলল, ‘আমাকে কেন আনা হয়েছে?’

লুকা বলল, ‘ওই ঘরে ঢোকো। বুঝে যাবে।’ দরজায় তেল চিট চিট করছে। একটা বেলফুল দিব্যেন্দুর হাতে দিল লুকা। ‘যাও যাও।’

দিব্যেন্দু দরজা ঠেলে ঢুকল।

পরমুহূর্তেই চমকে উঠল।

খাটে রুমা শুয়ে আছে। চোখে মুখে কত মেক আপ। সে ফিসফিস করে বলল, ‘শালা। পুরো বেশ্যার মতোই লাগছে তো।’ মাথায় রক্ত উঠতে বেশিক্ষণ লাগল না, ‘এই মাগী, ওঠ, এই।’ রুমার কাঁধ ধরে জোরে ঝাঁকাতে শুরু করল সে।

রুমার ঘুম ভেঙে গেছিল। দিব্যেন্দুকে দেখে সে শিউরে উঠল। দিব্যেন্দু চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘দেখেছিস তো মাগী, আমি জানতাম, এটাই তোর আসল জায়গা। তুই এই জায়গায় আসবি বলেই জন্মেছিলি।’

রুমার মনে হচ্ছে সে কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছে। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না তার সামনে আবার দিব্যেন্দু ফিরে এসেছে। দরজা ঠেলে লুকা ঢুকল। দিব্যেন্দুর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘যাও সোনা, তুমি অন্য ঘরে যাও।’

দিব্যেন্দু একঝটকায় লুকার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার বউ, আমি বুঝব!’

লুকা সপাটে একটা চড় কষালো, ‘যা বলছি, তাই করবি শুয়োরের বাচ্চা। চল ফোট। এর মধ্যেই সব ভুলে মেরে দিয়েছিস?’

জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল। দিব্যেন্দু সিঁটিয়ে গেল। লুকা চিৎকার করল, ‘যা।’

দিব্যেন্দু সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল। রুমা কাঁপছিল। লুকা বলল, ‘আমাকে বলা হয়েছে আপনার সামনে এই লোকটাকে নিয়ে আসতে। আমি কারো ইন্সট্রাকশন শুনে কাজটা করেছি। আমি জানি এই লোকটা একটা ব্র্যান্ডেড শুয়োর।’

রুমা কাঁদছিল। বলল, ‘আমার সঙ্গে আপনারা এরকম করছেন কেন?’

লুকা বলল, ‘আমি জানি না। বিশ্বাস করুন। আমি কেয়ার টেকার মাত্র। আপনি যেতে চাইলে চলে যেতে পারেন। কিন্তু হাতে সময় বড় কম। পনেরো দিনের মধ্যে শমিতার কাছ থেকে আপনাকে এ পাড়ার হাল-হকিকত, খদ্দেরের সঙ্গে ডিল করার কায়দা, সব শিখতে হবে। তারপর ওরা আপনাকে নিয়ে যাবে। সেখানে কী করবে তাও জানি না। আপনি আজ চলে গেলে হয়তো ওরা আবার এই জানোয়ারটার সঙ্গে ঘর করতে পাঠিয়ে দেবে। সেটা কি ভালো হবে?’

রুমা বলল, ‘কী পাপ করেছিলাম আমি? কী করে আমি এরকম একটা খারাপ মেয়ে হয়ে যাব?’

লুকা মাথা নিচু করল, ‘জানি না দিদি। এটুকু জানি, যারা আপনাকে এগুলো করতে বলছে, এই ট্রেনিং নিতে বলছে, তারা ছোটখাটো কেউ না। লুকার মতো লোকও তাদের কথা শুনতে বাধ্য।’

রুমা বলল, ‘আমাকে বেশ্যা বানিয়ে দিল ওরা?’

লুকা বলল, ‘এটার উত্তর আমি দিতে পারব না বিশ্বাস করুন।’

রুমা চুপচাপ কেঁদে যেতে লাগল।

৫৪

জানলা দিয়ে বাইরের রাস্তায় তাকিয়ে আছে অরিত্র। একটার পর একটা গাড়ি যাচ্ছে। মাথার মধ্যে অসহ্য যন্ত্রণা।

তার দোষেই এণাক্ষী হারিয়ে গেল। তার জন্যই। কেন সে ওকে একা ছেড়ে দিল সেদিন?

ইনভেস্টিগেশন সেন্টার থেকে তাকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়েছে, সব জায়গায় এ বিষয়ে আলোচনা না করতে। পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে এণাক্ষীকে খুঁজে বের করতে। আজেবাজে লোককে বললে নাকি খুঁজে পাওয়ার চান্স কমে যাবে। অরিত্র এটাই বুঝতে পারছে না। এরকম আবার হয় নাকি? একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর তার কথা কাউকে বলা যাবে না?

ফোনটা বাজতে শুরু করল। অরিত্র দেখল নীল ফোন করছে। ধরল সে, ‘হ্যাঁ, বলুন।’

নীল বলল, ‘আপনাকে একটা কথা বলার জন্য ফোন করলাম। মনে হয় এই কথাটা আপনাকে জানানো দরকার।’

অরিত্র বলল, ‘প্লিজ বলুন।’

নীল বলল, ‘ম্যাডামের ফোনের লাস্ট লোকেশন হোটেলেই পাওয়া গেছিল। তারপরে সিম নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা চিন্তার।’

অরিত্র উদ্বিগ্ন গলায় বলল, ‘তাহলে ও নিজের ইচ্ছেয় কোথাও যায়নি, সেটা তো প্রমাণ হল? যেভাবে ওর ক্যারেকটার অ্যাসাসিনেট করা হচ্ছে, সেটা তো আর হবে না। তাই না?’

নীল বলল, ‘আপনি রেগে যাচ্ছেন। এই সময়টা মাথা ঠান্ডা রাখা উচিত।’

অরিত্র বলল, ‘এই সময়টা আপনার এলে কী করতেন আপনি? ঘরে বসে থাকতে পারতেন?’

নীল বলল, ‘আমরা দেখছি তো। আপনি ভাববেন না। আরও এক্সটেনসিভ সার্চ অপারেশন শুরু করা হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি একটা না একটা খবর পাওয়া যাবে।’

কলিং বেল বেজে উঠল। অরিত্র বলল, ‘ধরুন একটু। কে এল দেখি।’

দরজা খুলল অরিত্র। দরজা খুলে স্তব্ধ হয়ে গেল। এণাক্ষী দাঁড়িয়ে আছে! তার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল, ‘তুমি?’

এণাক্ষী যেন অনেকক্ষণ ঘুমোচ্ছিল। তার দিকে ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে রইল।

অরিত্র তড়িঘড়ি এণাক্ষীকে হাত ধরে সোফায় বসিয়ে ফোনটা তুলল, ‘হ্যালো...অফিসার।’

নীল বলল, ‘হ্যাঁ। আমি ধরে আছি। কী হয়েছে?’

অরিত্র বলল, ‘এণাক্ষী ফিরে এসেছে।’

নীল বলল, ‘বাঃ। ভালো খবর। আমি কি একবার আসতে পারি?’

অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই। প্লিজ আসুন। আমি ওয়েট করে আছি।’

তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। হাতে চিমটি কেটে দেখল। এণাক্ষীকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘কোথায় গেছিলে তুমি? আমি কত খুঁজেছি জানো তোমাকে? পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।’

এণাক্ষী করুণ গলায় বলল, ‘আমার কিছু মনে নেই।’

অরিত্র বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি খাটে শোবে চলো। আমার মনে হয় তোমার রেস্ট নেওয়া দরকার।’

এণাক্ষী বলল, ‘আমি খারাপ মেয়ে নই। বিশ্বাস করো। আমি পার্টিতে কারো সঙ্গে খারাপ কিছু করতে যাইনি।’

অরিত্র লজ্জা পেল, ‘এভাবে না প্লিজ। তুমি শোও। এস।’

এণাক্ষীকে ধরে বেডরুমে নিয়ে গিয়ে খাটে বসাল অরিত্র। এণাক্ষী একা একা বিড়বিড় করতে লাগল, ‘ওরা আমাকে অনেক চাপ দিয়েছে। ফোন করতে দেয়নি। আমি বার বার তোমাকে ফোন করতে চেয়েছি, ফোনে পাইনি। আমি...কে নিয়ে গেছিল আমায়...’

অরিত্র বিস্মিত হয়ে বলল, ‘কে নিয়ে গেছিল?’

এণাক্ষী অরিত্রর দিকে তাকিয়ে কেঁদে দিল, ‘জানি না। আমি বুঝতে পারছি না।’

অরিত্র বলল, ‘কে দিয়ে গেল তোমায়?’

এণাক্ষী মাথা নাড়ল, ‘জানি না। আমাকে ফ্ল্যাটের নীচে নামিয়ে দিয়ে গেল। তার আগে আমি মনে হয় ঘুমোচ্ছিলাম। আমি জানি না।’

অরিত্র এণাক্ষীকে শুইয়ে বাইরে গিয়ে নীলকে ফোন করে সব বলল। নীল বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে ম্যাডামের একটা মেডিকাল টেস্ট করাতে হবে।’

অরিত্র বলল, ‘আবার মেডিকাল টেস্ট কেন?’

নীল বলল, ‘অনেকগুলো কারণ হতে পারে। হতে পারে যারা নিয়ে গেছিল তারা বেআইনি অরগ্যান ব্যবসায়ী। কিংবা বদ মতলব ছিল। আপনি ওকে নিয়ে...ওহ আপনার গাড়িটা এখন নেই তো। ঠিক আছে। আমি আসছি। আপনি তৈরি থাকুন।’

অরিত্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইল।

৫৫

ঝাপসা একটা রাত কাটছে যেন। এমন একটা রাত, যার জন্য কোনওদিন সে প্রস্তুতি নেয়নি।

প্রস্তুতি তো সে রাতটারও নেওয়া ছিল না। সবার সঙ্গে মিষ্টভাষী, ভদ্র সভ্য ছেলেটা যখন ফুলসজ্জার রাতে ঢুকেছিল।

খুব ভালোভাবে বলেছিল, ‘তুমি খুব ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়।’

কোনও অসভ্যতা না, কোনও কিচ্ছু না।

সে চমৎকৃত হয়েছিল। প্রত্যুষদা না থাক, কেউ একজন অন্তত এল, যে তার খেয়াল রাখবে। প্রথম রাতের কথা সে ভুলতে পারবে না কোনদিন। সেই ভদ্র সভ্য মানুষটাই ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে গেল রাক্ষসে। এমন এক ভয়াবহ রাক্ষস, যার ছায়া পড়লেও সে চমকে উঠত। আতঙ্কিত হতো। ভয়ে কাঁপত। যে তাকে বিন্দুমাত্র ভালো থাকতে দেয়নি। প্রতিটা সময় কখনও গায়ে হাত তুলেছে, কখনও তীব্র লাঞ্ছনা দিয়েছে।

রুমা বসে আছে ঘরের মধ্যে। তেল চিটচিটে একটা বিছানার চাদর। দেওয়ালে মা কালীর ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার। এই জায়গাটাতেও ঈশ্বর আছেন? আছেন হয়তো। শমিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

রুমা শমিতার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এখানে কীরকম ট্রেনিং হবে?’

শমিতা পান খাচ্ছিল। হেসে বলল, ‘খদ্দের সামলানোর ট্রেনিং দেব। খদ্দের সামলাতে পারবি না?’

রুমা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। শমিতা জানলা খুলে পানের পিক ফেলে বলল, ‘তোর মরদটা কি পাগল?’

রুমা বলল, ‘ওরকমই।’

শমিতা বলল, ‘পুলিশে বলিসনি?’

রুমা শূন্য চোখে তাকাল, ‘কী করতাম? থাকব কোথায়?’

শমিতা বলল, ‘তাও ঠিক। আমাদের সবার তো ওই একটাই চিন্তা থাকে। থাকব কোথায়? আমাদের এখানে কতজন আছে, তোর মতোই অবস্থা। কাউকে কাউকে শ্বশুরবাড়ি থেকেই বেচে দিয়েছিল। আমাদের এখানে এসে উঠেছে। ওই যে পারুল, তোর বর যার পায়ে হাতুড়ি মেরেছে, তাকে তার বাপ বেচে দিয়েছিল।’

রুমা মাথা নিচু করে বসে নিজের পায়ের নখ দেখছিল। বলল, ‘আমার বাবা-মা তো ভদ্রবাড়ির লোক। তারাও আসলে আমাকে বেচেছে। কিন্তু সেটা বাইরের লোক বুঝতে পারবে না। বেড়াল তাড়িয়েছিল তারা আমার বিয়ে দিয়ে। বিয়ে দেওয়াটাই সব।’

শমিতা বলল, ‘তুই জানিস, তোকে শেখানোর জন্য আমি হোটেলেও যেতে পারতাম। তোকে এখানে পাঠিয়েছে কেন?’

রুমা ঘেন্নায় সিঁটিয়ে যাচ্ছিল, ‘আমি কারো সঙ্গে কিছু করতে পারব না। আমাকে ছেড়ে দাও।’

শমিতা রুমার পাশে এসে বসল। কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘সব সময় ওই পাগলের সঙ্গে থেকেছিস। তোকে মেরেছে। আমি যা শেখাচ্ছি, ভালো করে শেখ, তোকে কেউ মারতে আসবে না। সবাই ভালোবাসবে। আমি কি তোকে বলেছি এই রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, চানাচুরওয়ালার সঙ্গে শুতে হবে? কখন বলিনি। তোর কাছে অনেক বড় বড় লোক আসবে রে। তাদের অনেক চাহিদা। আমি কি অত শেখাতে পারব? সে শেখানোর অন্য লোক আছে। আমি তোকে একটা জিনিস শেখাব। সেটা কী বলত?’

রুমা বলল, ‘কী?’

শমিতা বলল, ‘লজ্জা কাটাতে শেখাব। লজ্জা পেলে হবে? তোর কাছে সব থেকে বড় অস্ত্র আছে। এমন এক অস্ত্র, যেটা থাকলে একটা পুরুষ মানুষ তার সব কিছু তোর পায়ে লুটিয়ে দিতে পারবে। আমি যা শেখাব, তুই শুধু তাই শেখ। নইলে ওই শুয়োরটার সঙ্গে ঘর করবি নাকি রে মাগী? কী হবে ওই ভাবে বেঁচে?’

রুমা বলল, ‘কোন জীবন ভালো?’

শমিতা বলল, ‘আমি জানি না। আমার জানার দরকার নেই। কিন্তু তোকে জানতে হবে। তোর সে রূপ আছে। তোকে শিখতে হবে। দেখ, ঘর থেকে বেরো। তোর বরকে বসিয়ে রেখেছে একটা ঘরে। ওর বাড়িতে গিয়ে ঠিক করে তো ভাতও পাবি না। পরিবর্তে জুতো, লাঠি সব খাবি। নিজেই বল, গিয়ে কি কোনও লাভ হবে?’

রুমা জোরে শ্বাস নিয়ে সোজা হয়ে বসল। বলল, ‘তোমরা যা বলবে, আমি করতে রাজি আছি। তবে আমার একটা শর্ত আছে।’

শমিতা বলল, ‘বল।’

কিছুক্ষণ পর বারান্দায় দিব্যেন্দুকে টেনে নিয়ে আসা হল।

দিব্যেন্দু অবাক গলায় বলল, ‘কী হল?’

লুকা সিগারেট টানছিল। বলল, ‘বোস। হাঁটু গেড়ে বোস।’

দিব্যেন্দু বলল, ‘কেন?’

লুকা বলল, ‘দানা খাবি কি? কপালের মাঝ বরাবর দেব, একদম ছবি হয়ে যাবি। যা বলছি কর। বোস।’

দিব্যেন্দু বসল। রুমা শমিতার ঘর থেকে বেরোল। তার চোখে আগুন জ্বলছে।

লুকা চেয়ারে বসে বলল, ‘শুরু কর।’

দিব্যেন্দু অবাক হয়ে রুমাকে দেখছে। রুমা দিব্যেন্দুর স্থির চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। দিব্যেন্দু বলল, ‘কী হল? কী দেখছ?’

রুমা এগোতে শুরু করল দিব্যেন্দুর দিকে।

তার হাতে দিব্যেন্দুর সেই হাতুড়ি...!

৫৬

তিন মাস পরের কথা

বৃষ্টি পড়ছে। পুরাতন ঢাকার গলি দিয়ে একটি মেয়ে বোরখা পরে হেঁটে যাচ্ছে। বৃষ্টি থামছে না। বেড়ে চলছে। কালো আকাশে মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ চমক দেখা যাচ্ছে।

মেয়েটার কানে কয়েকটা কথা ভেসে আসছে, ‘মনে রাখবে, এমন একটা দেশে যাচ্ছ, যেখানে মেয়েদের জীবনের কোন মূল্য নেই। একবারে এটাই বাস্তব সত্যি। চরম পুরুষতান্ত্রিক দেশ। ছেলেদের কোনও দোষ নেই। ভিক্টিম ব্লেমিং হয় রেপের পরে। আমাদের দেশেও হয়। কিন্তু ও দেশে সব সীমা পরিসীমার উপরে গিয়ে হয় যা হওয়ার। বুঝতে পারছ, কী বলছি আমি?’

মেয়েটা দাঁড়িয়ে গেল। রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা সিএনজি চালকের একজোড়া চোখ তার উপর নজর রাখছে। সামান্য উৎকণ্ঠা দেখা দিল মেয়েটার মধ্যে? সেকেন্ড পাঁচেক দাঁড়িয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল সে।

গলিটা যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, সেই দরজায় টোকা মারল।

দরজা খুলে গেল। লোকটার ঠোঁটের কাছটা কাটা। তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী দরকার?’

মেয়েটা বলল, ‘মজিদ ভাই পাঠাইসে। বলল সাদিক সাহেবরে সালাম দিবি।’

লোকটা তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে বাইরের দিকে দেখল। সিএনজিটা এখন আর নেই। গলিতেও বৃষ্টির জন্য ভিড় কম। লোকটা বলল, ‘ভিতরে আসেন।’

মেয়েটা ভেতরে ঢুকল। লোকটা তাকে একটা ছোট ঘরে বসাল। ছোট টিভি চলছে একটা। ঘরে আর কেউ নেই।

ফোন বের করে লোকটা ঘরের বাইরে চলে গেল। মেয়েটা চুপ করে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর লোকটা এসে বলল, ‘ভাই আসছে। আপনাকে খেতে দিতে বলল।’

মেয়েটা কাঁদতে শুরু করল, ‘এটা কোন জায়গা? আমার ভয় লাগছে।’

কান্নাটা ইচ্ছাকৃত। এমনই নির্দেশ আছে। বোঝাতে হবে যে সে অথৈ জলে পড়ে গেছে। লোকটা বলল, ‘ভাই আসছে তো। জরিনা! এই জরিনা!’

একজন সতেরো আঠেরো বছর বয়সি মেয়ে ঘরে ঢুকল। লোকটা জরিনাকে বলল, ‘খেয়াল রাখ। ভাই আসবে আজ।’

লোকটা বেরিয়ে গেল।

জরিনা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বোরখা তোল আপা।’

মেয়েটা বোরখা তুলল।

জরিনা গালে হাত দিয়ে বলল, ‘মাশাল্লাহ, আপনে খুব সুন্দর।’

মেয়েটা কাঁদছে। জরিনা বলল, ‘কাঁদেন না আপা। এখানে থাকবেন। খাবেন, দাবেন, ঘুমাইবেন। চিন্তা নাই। আফনের নাম কী?’

মেয়েটা বলল, ‘সাকিনা। ঘরের লোক আরব গেছে। এখন শুনি বেঁচে নাই। মজিদ ভাই বলল সাদিক সাহেবের লগে দেখা করতে।’

জরিনা গলা নামিয়ে বলল, ‘দেখা করতে কইছে? তুমি জানো দেখা করার মানে কী?’

সাকিনা বিহ্বল হবার অভিনয় করল, ‘মানে কী?’

জরিনা ফিক ফিক করে হাসতে শুরু করল। সাকিনাকে ঠেলল কনুই দিয়ে ‘তোমারে শোয়াইবে। বোঝ না?’

বাইরে একজনের চিৎকার শোনা গেল, ‘কই তোরা? কীরে জরিনা?’

জরিনা তড়িঘড়ি বাইরে গেল। কয়েক সেকেন্ড পরে একজন সুখী সুখী চেহারার লোক ঘরের ভিতর প্রবেশ করল।

সাকিনা বোরখা পরে ছিল। লোকটা গম্ভীর গলায় বলল, ‘মজিদ পাঠাইছে তোমায়?’

সাকিনা কাঁদতে শুরু করল।

লোকটা বিব্রত হল, ‘আহা কান্দো ক্যান? আমার কাছে আইসা পড়সো যখন, তখন তোমার চিন্তা নাই। দেখি, বোরখা তোল।’

সাকিনা বোরখা তুলল। লোকটা ফিসফিস করে বলল, ‘মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ। তোমার তো চিন্তার কিছু নাই। আমি আছি তো। আমার কাছে আইছো যখন, তখন তুমি চিন্তামুক্ত। তুমি থাকবা আমার কাছে? টেকা দিমু নে। তার চিন্তা করতে লাগবো না, মজিদ যখন পাঠাইছে, তখন তো চিন্তার কিছুই নাই। এই নাও, এই নাও, টেকা নাও।’

পকেট থেকে টাকার গোছা বের করে সাকিনার কোলে ছুঁড়ে মারল লোকটা।

সাকিনাকে শক্ত থাকতে হবে। আসল পরীক্ষা শুরু হবে এখন।

‘জরিনা, ও জরিনা...’ সাদিক বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ হাঁক ডাক করে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করল।

‘দেখি, সব খুলে ফেলাও দেখি, আমি আছি যখন, তোমার কুনো চিন্তা নাই। রানী কইরা রাখব তোমায়...’

রুমা একটু থমকে গেল। সাদিক ধৈর্য ধরতে পারল না। নিজেই এগিয়ে এসে রুমার বোরখা খুলতে শুরু করল...

৫৭

টাকা। ভারতীয় টাকা না। বাংলাদেশী টাকা। তাও কম হবে না ভারতীয় মুদ্রায়। বেশ কয়েকটা নোটের বান্ডিল তার নগ্ন শরীরের উপর রেখে চলে গেছে সাদিক। রাত দেড়টা বাজে। রুমা আর শাড়ি পরেনি। চুপ করে শুয়ে আছে। এখানে থাকার জন্যই তো এত ট্রেনিং। এত কিছু। কত ভাবে তাকে বোঝানো হল, নিজেই ভুলে গেছিল সে।

শেষমেশ সাদিক তাকে ছুঁল। অভ্যস্ত শরীর। শরীর বিদ্রোহ করলেও সে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেছে। খুব একটা অসুবিধা হবেই বা কেন? এরকমই তো হয় অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। একটা অচেনা অজানা লোক এসে জামা কাপড় খুলিয়ে মেয়েটার সঙ্গে শারীরিক মিলনে লিপ্ত হয়।

সাদিকের বউ হবে না সে। এই বাড়িতে একজন রক্ষিতার মতো থাকবে। বাড়িটা সাদিকের হারেমের মতন। তার সঙ্গে যারা কাজ করে, তাদের আমোদ প্রমোদের জন্য এই বাড়িটা রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে যে কারো সঙ্গে শুয়ে পড়তে হবে।

পাখি পড়ানোর মতো করে রুমাকে বোঝানো হয়েছিল। অসুবিধা হবার কথা নয়। রুমা বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে বাথরুমে গিয়ে কল চালিয়ে বমি করল যাতে তার বমির শব্দ বাইরে না যায়। একটা ময়লা শাড়ি ছিল। সেটা পরেই বাথরুম থেকে বেরোল।

ঘরের দরজায় জরিনা এসে দাঁড়াল, ‘সাহেব বলে গেছে এটাই তোমার ঘর। তুমি এখানে থাকবা।’

রুমা বলল, ‘তুই এখানে কতদিন আছিস?’

জরিনা বলল, ‘ছোট থেকেই। আমার মা সাহেবের কাছে থাকত। তারপর কী হইসিল জানি না।’

রুমা বলল, ‘সাহেবের কাছে যাস না তুই?’

জরিনা দাঁত বের করল, ‘না। উনি আমারে নেন না।’

রুমা বলল, ‘আর কে থাকে এখানে?’

জরিনা বলল, ‘থাকে আরও। তারা তোমার মতো না। তোমার নাম হবে। আমি বলে দিলাম। মিলায়ে নিও।’

রুমার মাথাটা দপ দপ করছে। জরিনা বলল, ‘তুমি ঘুমায়ে পড়। কাল সকালে তোমারে সবার সঙ্গে আলাপ করাব।’

রুমা বলল, ‘কেন? বাকিরা কোথায়?’

জরিনা বলল, ‘সব আছে। একদিনে সব জানবা নাকি? এই তো ছোট একটা খানকি বাড়ি, তার বিষয়ে জানতে বেশিক্ষণ লাগব না। তুমি ঘুমাও। এখানে কুনো সমেস্যা নাই। ভালো থাকবা।’

রুমা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে। তুই যা।’

জরিনা বলল, ‘দরজা বন্ধ কইরা দাও। এখানের পোলাগুলান ভালা না। তুমি দরজা খুইলা রাখবা, ঘরের ভিতর ঢুইকা যাইব।’

রুমার সেই ঘটনাটা মনে পড়ল। সে ঘুমোচ্ছিল হোটেলের ঘরে, আর ওই লোকটা ঢুকে এসেছিল। রুমা বলল, ‘তুই আমার লগে ঘুমা।’

জরিনা রাজি হল। দরজা বন্ধ করে রুমার পাশে শুয়ে পড়ল।

রুমা চুপ করে শুয়ে রইল। তার ঘুম পাচ্ছে না। মাথার মধ্যে কত কিছু ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তার। নতুন পরিচয়, কোথায় থাকত, সব কিছু পাখি পড়ার মতো করে পড়তে হয়েছে। সাদিকের একটাই দোষ, মেয়ে মানুষের। সাদিকের একমাত্র মেয়ে সাপ্লায়ার মজিদ। তাকে মজিদের মাধ্যমে এখানে পাঠানো হয়েছে। সামনে কী আছে, কে জানে! শেষ রাতে ঘুম এল।

চোখ খুলে দেখল জরিনা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কোত্থেকে একটা হিন্দি গান ভেসে আসছে। রাতে এল, সাদিকের শয্যাসঙ্গিনী হয়ে গেল, এর বাইরে কিছুই তো সে চেনে না।

জরিনাকে তুলবে? না থাক। ঘুমাক। এইটুকু মেয়ে। অযথা বিরক্ত করে লাভ নেই। খাট থেকে উঠে চুপ করে বসে থাকবে সে।

অদ্ভুত কিছু নির্দেশ আছে। সাদিক যা করছে, তাকে করতে দিতে হবে। সময় এলে তারপর কী করতে হবে বলে দেওয়া হবে। কতদিন তাকে এই নরকে পড়ে থাকতে হবে?

ভাবতে পারছে না কিছুই। দিব্যেন্দুর মুখটা ভেসে উঠল মনের মধ্যে।

সেই ভয়টা আবার ফিরছে। সিঁটিয়ে দেওয়া, কুঁকড়ে দেওয়া ভয়টা...

৫৮

‘রাবণের কাছ থেকে সীতা ফিরে এল। তারপর রাম কী করেছিলেন?’

অরিত্র টিভি দেখছিল। এণাক্ষী হঠাৎ কথাটা বলে উঠল।

অরিত্র ভ্রু কুঁচকাল, ‘মানে? এরকম বললে কেন?’

এণাক্ষী বলল, ‘তোমার মনে সারাক্ষণ ধরে এই কথাটাই ঘুরপাক খাচ্ছে না? ওই দিনগুলোতে আমি কী করেছি?’

অরিত্র বলল, ‘তোমার মেডিকাল রিপোর্ট বলছে তুমি একদম ঠিক আছ। আমি অকারণ অন্য কথা ভাবতে যাবই বা কেন?’

এণাক্ষী শ্বাস ছাড়ল, ‘মনে হল। সারাক্ষণই মনে হয় আমার।’

অরিত্র বলল, ‘কী মনে হয়?’

এণাক্ষী বলল, ‘মনে হয়, আমি তোমায় ঠকিয়েছি।’

অরিত্র বলল, ‘চুপ করো তো। কিচ্ছু ঠকাওনি। চাইলে তুমি শ্যুটেও যেতে পারো। আমি আটকাবো না।’

এণাক্ষী বলল, ‘এরকম ব্যাপার? এত স্বাধীন?’

অরিত্র বলল, ‘হ্যাঁ। এরকমই ব্যাপার এবং ঠিক এতটাই স্বাধীন। চিন্তার কিছু নেই। চিন্তা করিও না। তুমি আজেবাজে ভেবো না। তিন মাস কেটে গেল। এবার মূল স্রোতে ফেরো। নইলে কাউন্সেলিং করাতে চাইলে করাও। থাক, তুমি তো কোনদিন চাইবে না, আমিই দেখছি।’

এণাক্ষী বলে উঠল, ‘না না, তার দরকার নেই। অনেক টাকা নিয়ে নেয়। দরকার নেই।’

অরিত্র বলল, ‘টাকাটা বড় কথা না। তোমার সুস্থ থাকাটা বড় কথা।’

এণাক্ষী অরিত্রর কাছে ঘেঁষে বসল, ‘তুমি খুব চিন্তায় পড়ে গেছিলে, বলো?’

অরিত্র বলল, ‘ভীষণ। আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। যেটা কোনওদিন করি না, তাও করে ফেললাম। মারপিট। ভাবতে পারছ?’

এণাক্ষী চোখ বড় বড় করে বলল, ‘সত্যি। আমি ভাবতে পারছি না। কী সব করে বসেছ। এত ভালোবাস আমায়?’

অরিত্র হাসল, ‘একদম। তোমায় ছাড়া আমি পাগল হয়ে যাব।’

এণাক্ষী বলল, ‘তারপর তো আমি মরলে আরেকটা বিয়ে করতে। তখন বলতে পাগলে কী না বলে।’

অরিত্র এণাক্ষীকে জড়িয়ে ধরল, ‘না। কোনদিন বলব না। চল কোথাও ঘুরে আসি। কাছে পিঠে। কোনও শপিং মলে। যাবে? সারাদিন ল্যাপটপে কাজ করে মাথাটা জ্যাম হয়ে গেছে।’

এণাক্ষী বলল, ‘চল। আমি রেডি হয়েনি তাহলে। তুমিও একটা ভালো জামা পরো। রাতে বাইরে খাব।’

অরিত্র উঠল, ‘একদম। চল।’

দুজনে বেরোল কিছুক্ষণ পরে। দুজনকেই ঝকঝকে লাগছে। অরিত্রর পাশে এণাক্ষী বসল। ড্রাইভ করতে করতে অরিত্র বলল, ‘আমার আজকাল সব স্বপ্ন মনে হয়। তোমার ফিরে আসাটা আমি এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারি না। আমার মনে হয়েছিল আর কোনদিন তোমাকে ফিরে পাব না। ছি ছি, কী যা-তা বলেছিলাম।’

এণাক্ষী বলল, ‘থাক। বার বার আমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে না। আমি কত লাকি যে তোমাকে পেয়েছিলাম। অত ঝগড়ার পরে আমার জন্য ছুটে এসেছিলে।’

অরিত্রর চোখে জল। রাতের মোহময়ী শহরে কিছুক্ষণ পর অরিত্র এক শপিং মলে পার্ক করল। মাইনাস টু ফ্লোরে তারা দাঁড়িয়ে আছে লিফটের জন্য। লিফট এসে দাঁড়াল। একজন স্যুট পরিহিত ভদ্রলোক লিফট থেকে বেরোলেন। লিফটে তারা দুজন উঠল। লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। পারফিউমের গন্ধটা নাকে যাওয়া মাত্র এণাক্ষী নাক কুঁচকে ছিল। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বলল, ‘তাই ভাবছি এই গন্ধটা আমি কোথায় পেয়েছি। মনে পড়েছে।’

অরিত্র চমকে উঠল, ‘কী মনে পড়েছে?’

এণাক্ষী বলল, ‘এই যে লোকটা নেমে গেল লিফট থেকে, এই লোকটাই ছিল সেদিন। শিগগিরি চল বেসমেন্টে। শিগগিরি।’

লিফট উপরে যাচ্ছিল। অরিত্র মাইনাস টু দিল। থার্ড ফ্লোর থেকে ঘুরে আবার নীচে নামতে বেশ খানিকটা সময় চলে গেল। মাইনাস টুতে লিফট নামতেই এণাক্ষী সঙ্গে সঙ্গে নেমে গিয়ে দৌড়ে চারদিকে দেখল। নাহ্‌, কোথাও কেউ নেই। পারকিং ফ্লোরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে দৌড়ে গেল এণাক্ষী। পাগলের মতো খুঁজতে লাগল। কাউকে দেখতে পেল না।

অরিত্র কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এণাক্ষী বেশ কিছুক্ষণ খুঁজে অরিত্রর কাছে এসে অরিত্রর হাত ধরে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘লোকটা ছিল। এই লোকটাই সেদিন তুলে নিয়ে গেছিল।’

অরিত্রর চোখে পড়ল তার গাড়ির উইন্ডশিল্ডে একটা কাগজ সেঁটে রয়েছে। এগিয়ে গিয়ে কাগজটা হস্তগত করল সে, তাতে লেখা, ‘এণাক্ষী ম্যাম, ভাগ্যিস আপনার হাজব্যান্ড আপনাকে ভালোবাসেন...ভালো থাকবেন। হ্যাভ এ ব্লাস্ট। ভবিষ্যতে আর কোনদিন আমাদের দেখা হবে না...।’

৫৯

ঝাঁ চকচকে আধুনিক একটা বিল্ডিং। সতেরো তলা। প্রতিটা ফ্লোরে সিসিটিভি ক্যামেরা। প্রতিটা ঘরে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা। এসি। মেডিকাল ফেসিলিটি। নিউট্রিশনিস্ট নির্দেশিত খাবার। পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা ডিপোজিট। প্রতি মাসে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা।

লোকটা রিসেপশনে বসে শুনছে, সুবেশ সেলসম্যান এন আর আই ছেলে আর তার বউকে বৃদ্ধাশ্রমের সুযোগ-সুবিধা বোঝাচ্ছে। এন আর আইকে বলছে, ‘স্যার, আপনি একবারে নিশ্চিন্ত থাকুন। এই ডিপোজিটটা আপনার বাবা এক্সপায়ার করার সঙ্গে সঙ্গে আপনার অ্যাকাউন্টে ব্যাক করবে। আমরা সে চুক্তিও করে নেব। এই প্রশ্নটা বার বার আমাদের করে আপনি বিব্রত করবেন না প্লিজ।’

রিসেপশনে বসে থাকা লোকটা সেলসম্যানকে ইশারায় ডাকল। সেলসম্যান লোকটার কাছে গিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’

লোকটা বলল, ‘বিপ্র পালিত। সাতশো সতেরো। অ্যাক্সেস কী দিন। আপনাদের রিসেপশনিস্ট অনেকক্ষণ তার সিটে নেই। এরপর আমি কমপ্লেইন করতে বাধ্য হব।’

সেলসম্যান বলল, ‘শিওর স্যার। আমি একবার বিপ্রবাবুর সঙ্গে কথা বলেনি?’

লোকটা ঘাড় নাড়ল, ‘শিওর।’

সেলসম্যান বলল, ‘আপনার নামটা স্যার?’

লোকটা বলল, ‘বলুন ওর বন্ধু সুমিত এসেছে পাটায়া থেকে।’

সেলসম্যান বলল, ‘ওকে স্যার।’

সেলসম্যান বিপ্রকে ফোন করল। কথা বলে লোকটার হাতে অ্যাক্সেস কী এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘লিফট ডান দিকে স্যার। ভালো থাকবেন।’

লোকটা সেলসম্যানকে আর পাত্তাও দিল না। অ্যাক্সেস কী নিয়ে লিফটে উঠল। লিফটে অ্যাক্সেস কী-টা স্ক্যান করাতে হয়। স্ক্যান করানোর পর সাত টিপলে লিফট চলতে শুরু করল। সাত নম্বর ফ্লোরে লিফট দাঁড়িয়ে গেল। লোকটা লিফট থেকে নেমে সাতশো সতেরো নাম্বারের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপল। সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল। লোকটা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এসি চলছে। বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে ঘর।

বিপ্র বলল, ‘চা চলবে স্যার?’

লোকটা বলল, ‘শিওর।’

বিপ্র ইলেকট্রিক কেটলে গরম জল বসাল।

লোকটা বলল, ‘এরকম সুন্দর বৃদ্ধাশ্রম থাকতে লোকে বাড়িতে থাকবে কেন? ফাইভ স্টার হোটেলকে এর কাছে শিশু মনে হচ্ছে। ছেলেমেয়ের কাছে কে থাকবে? সারাজীবন চাকরি করে টাকা জমিয়ে এখানে চলে এলেই তো হয়।’

বিপ্র হাসল, ‘হ্যাঁ স্যার। ঠিকই বলেছেন।’

লোকটা বলল, ‘আমরা তোমার জন্য এত গাদা গাদা টাকা খরচ করে এখানে রেখেছি, তোমায় বাড়ি করে দিয়েছি। পরিবর্তে তুমি কী করেছ বিপ্র, যদি একটু বলো।’

বিপ্রর মুখ শুকিয়ে গেল, ‘স্যার, আপনারা যেভাবে বলছেন, আমি সেভাবেই তো সব করছি। অ্যাসেট বাংলাদেশ চলে গেছে। তার নিখুঁত কভার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সাদিকের দালালকে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে, যা যা বলেছেন, তাই তো করেছি।’

লোকটা রিমোট নিয়ে টিভির চ্যানেল পাল্টে বলল, ‘টেল মি অ্যাবাউট অমল।’

বিপ্র বলল, ‘অমল বেশ কয়েকদিন রিপোর্ট করেনি। সাদিকের সঙ্গে ওর মেলামেশা বেড়েছে।’

লোকটা শিস দিয়ে উঠল, ‘গুড। মেলামেশা বাড়বে, সেটা আমি চাই। ওকে সেজন্যই ওখানে পাঠানো হয়েছে।’

বিপ্র বলল, ‘সাদিকের কাজ করতে সাদিকের দেওয়া ফেক আইডি নিয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, বাহরিনের মতো দেশগুলোতে যাওয়ার কথা কি বলা হয়েছিল?’

লোকটা টেবিলের উপর চায়ের কাপ রাখল, ‘তার কারণ কী দেখিয়েছে?’

বিপ্র বলল, ‘বলেছে সাদিকের বিশ্বাস অর্জন করতে চায়। এটা করলে কী ধরনের বিশ্বাস অর্জন হবে? আমার তো ভয় লাগছে এর ফলে অমলের কভারটাই না নষ্ট হয়ে যায়। তখন কী হবে?’

লোকটা বলল, ‘ওকে। টেল অমল টু কন্ট্যাক্ট রুমা। পারবে?’

বিপ্র বলল, ‘মেসেজ পাঠাচ্ছি। দেখা যাক কী রিপ্লাই করে।’

লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আর রুমার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করতে না পারলে অমলকে বলে দাও, বাংলাদেশের সব কাজ বন্ধ করে ইমিডিয়েটলি দিল্লিতে রিপোর্ট করতে। ওকে ওখানে কিছু করতে হবে না।’

বিপ্র খুশি হল, ‘আমি সেটাই বলতে চাইছিলাম স্যার।’

লোকটা বলল, ‘পেটে এক আর মুখে এক রাখবে না। তোমাকে এখানে এত টাকা দিয়ে ইয়ার্কি মারতে রাখা হয়নি।’

বিপ্র অপ্রতিভ হয়ে বলল, ‘স্যার, তাতে আপনিই আমার উপর রেগে যেতে পারতেন। আপনি কী ডিসিশন নেবেন, সেটা আমার বলে দেওয়া ঠিক হবে না।’

লোকটা চিন্তিত মুখে বলল, ‘অ্যান্ড, বাই দ্য ওয়ে, পূর্ণ নাম না লোকটার? কোথায় আছে এখন?’

৬০

অদ্ভুতভাবে পরদিন আর সাদিক এল না। রুমা অবাক হলেও কিছু বলল না। জরিনা এসে ঘুরঘুর করে। মেয়েটাকে দেখে বড় মায়া হয়। এইটুকু মেয়ে। সাদিক যদি ওর বাপও হয়, ওর মেয়েকে এখানে রেখে দিল? এরা কেমন ধরনের মানুষ? নাকি এরা দিব্যেন্দুর মতোই মানুষ? নাকি তার থেকেও খারাপ?

দরজার কাছে এসে জরিনা দাঁড়িয়ে আছে। রুমা বলল, ‘কী বলবি? ঘরে আয়।’

জরিনা ঘরে ঢুকে বলল, ‘কিছু খাবা?’

রুমা বলল, ‘খেয়েছি তো। আর খাব না।’

জরিনা বলল, ‘কিছু খাইলে বলো।’

রুমা বলল, ‘বলব। সবাই কোথায় এখন?’

জরিনা বলল, ‘বাজার গেছে।’

রুমা অবাক হল, ‘মেয়েরাও?’

জরিনা হাসল, ‘এখানে তুমি ছাড়া কেউ থাকে না তো। রাতে মেয়ে নিয়ে আসে। ধান্দা করে চলে যায়। এইখানে কয়টা ঘর আছে শুধু সাহেবের।’

রুমা বলল, ‘এখানে শুধু সাহেব আসে?’

জরিনা ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ। আরও আসে। চেনা জানা লোক। তোমার আগে এখানে একজন ছিল। তাকে হঠাৎ করে পাওয়া যাচ্ছে না।’

রুমা বলল, ‘কে ছিল?’

জরিনা বলল, ‘আমিনা আপু। সাহেব এলে আমিনা আপুর কাছে থাকত।’

রুমা বলল, ‘কী হয়েছিল তার?’

জরিনা অদ্ভুতভাবে রুমার দিকে তাকিয়ে হাসল।

রুমা অবাক হল, ‘কীরে? কী হয়েছিল বলবি না?’

জরিনা বলল, ‘কক্সবাজারে নিয়া গেছিল। তারপর আর তারে খুঁজে পাওয়া যায় নাই। সাহেবের অনেক খেয়াল।’

রুমা বলল, ‘কী খেয়াল?’

জরিনা কথা বন্ধ করে টিভি চালিয়ে দিল। রুমা বলল, ‘কীরে? কী খেয়াল বলবি তো?’

কলিং বেল বাজল। জরিনা অবাক হয়ে বলল, ‘সকালে সাহেব আসল নাকি? ও আল্লা! দেখি।’

জরিনা বেরিয়ে গেল। মিনিট খানেক পর এসে বলল, ‘রুমান ভাই আসছেন। আমাকে বাজারে যেতে বলসেন। তুমি কথা বলবা? সাহেবের বন্ধু?’

রুমা কিছু বলার আগেই রুমান ঘরে ঢুকে জরিনাকে ধমক দিল, ‘তুই যা। যা বলছি নিয়া আয়। দেরি করবি না।’

জরিনা ভীত মুখে রুমার দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল। রুমান চেয়ারে বসল। রুমা তাকাল। শমিতা শিখিয়েছিল। বেশ্যাবাড়ি সাধারণ ঘরবাড়ির মতো না। এখানে কেউ বলে ঘরে ঢোকে না। এভাবেই হুট হাট করে ঢুকে যাবে।

‘আমাকে আপনার খোঁজ খবর নিতে পাঠানো হয়েছে।’

রুমানের মুখে হঠাৎ কলকাতার বাংলা শুনে অবাক হয়ে গেল রুমা। রুমান বলল, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করার ইন্সট্রাকশন আছে। আগের মেয়েটাকে আমরাই গুম করেছি। আপনার এন্ট্রান্সের জন্য।’

রুমান উঠে পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখে এসে বলল, ‘কোনও রেকর্ডিং ডিভাইস ইউজ করবেন না। ফোন রাখবেন না। সাদিক যা বলবে, সব মাথায় রাখবেন।’

রুমানের দিকে চুপ করে চেয়ে থেকে রুমা বলল, ‘আমাকেও সাদিক ওরকম করে দেবে? গুম করে দেবে? মেরে দেবে?’

রুমান বলল, ‘পারবে না।’

রুমা বলল, ‘এত শিওর হচ্ছেন কী করে?’

রুমান বলল, ‘হচ্ছি। শিওর হবার কারণ আছে বলেই বলছি।’

রুমা বলল, ‘আর আমার ফেরার পথ?’

রুমান বলল, ‘সেটা আপনি ঠিক করবেন। আমি বলব না। পারবেন?’

রুমা চুপ করে বসে থেকে বলল, ‘আপনি করবেন? না আমাকেই করতে হবে?’

রুমান বলল, ‘আমি ব্যবস্থা করব।’

রুমা বলল, ‘নইলে মরতে হবে। তাইতো?’

রুমান উঠে দাঁড়াল, ‘দেখা যাবে। বেঁচে থেকে কী করবেন? কোন লোক বেঁচে থেকে কিছু করতে পেরেছে? আমিই বা বেঁচে থেকে কী করতে পারলাম? এখন যাই। জরিনা এসে যাবে যেকোনও সময়। সাদিক যেন সন্দেহ না করে।’

রুমা বলল, ‘আপনার কলকাতায় বাড়ি?’

রুমান বেরোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল, ‘ভুলে গেছি কোথায় বাড়ি।’

৬১

দিল্লি

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। তুষার বই পড়ছিলেন। গল্পের বই।

আশরফ খান দরজায় নক করলেন, ‘আসব স্যার?’

তুষার বললেন, ‘এসো।’

খান চেম্বারে প্রবেশ করে বললেন, ‘কী বই পড়ছেন?’

তুষার হাসলেন, ‘নভেল। আরে তুমি বসো। খবর বলো।’

খান বললেন, ‘মিজান আহমেদ সম্ভবত নেক্সট উইকে সাদিকের কাছে যাচ্ছে। আমাদের কাছে সেরকমই খবর আছে।’

তুষার বললেন, ‘খবরটা কি ঢাকা থেকে এল?’

খান বললেন, ‘না। দুবাই থেকে। আলি জানালো। ঢাকার ইন্টেল জাস্ট কোনও রিপোর্ট করছে না। কবে কী করবে কিচ্ছু বলছে না।’

তুষার ভ্রু কুঁচকালেন, ‘কেন? ঢাকার কী হয়েছে?’

খান বললেন, ‘কিছুক্ষণ আগেও রিপোর্ট করল, বলল সব ঠিকঠাক। তাহলে আলির খবর আলাদা হল কী করে? ঢাকা জানছে না, দুবাই জেনে যাচ্ছে...সামথিং ইজ ফিশি।’

তুষার বললেন, ‘মিজান মুজফফরাবাদ থেকে বেরোবে। সায়ক এই খবরটা দিয়েছিল। কিন্তু ওর নেক্সট ডেসটিনেশন কী, সেটা ও জানতে পারেনি। এবার জিগস পাজলের একটা মিস্ট্রি সলভ হল।’

খান চিন্তিত মুখে বললেন, ‘আই এস আই আবার অ্যাক্টিভ হয়ে গেছে স্যার। ঢাকা একটা বড় কনসার্ন হয়ে যাচ্ছে। এখানে যদি সরকার পাল্টায়, তাহলে...’

তুষার বললেন, ‘অবভিয়াসলি। তবে ডেমোক্রেসিতে সরকার পাল্টাতেই পারে। তার জন্য আমাদের বসে থাকলে চলবে না। আমরা কীসের জন্য বসে থাকব? এগুলো তো আমাদের কন্ট্রোলে নেই। আরেকটা ব্যাপারও আছে। জনমত উপেক্ষা করে কোনও দেশে যদি অহেতুক জনস্বার্থ বিরোধী সরকার চলে, সে দেশের আইনশৃঙ্খলা আরও বেশি করে প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। আই এস আই তখন সেখানে নিশ্চিন্তে অপারেট করবে।’

খান বললেন, ‘তাও ঠিক।’

তুষার বললেন, ‘ঢাকার সেল অ্যাক্টিভ কর। মিজানের অ্যাক্টিভিটির পুরোটা চাই আমার। মিজান এখন কোথায়? দুবাইতেই আছে?’

খান বললেন, ‘হ্যাঁ। খুব কেনাকাটা করছে। প্রচুর সোনা কিনেছে।’

তুষার বললেন, ‘সোনা মানে? গয়না না বার?’

খান বললেন, ‘দুটোই। বার বেশি। সেভেন্টি থার্টি রেশিও। মানে...’

তুষার খানকে শেষ করতে দিলেন না, ‘এভাবে ফান্ড পাঠাবে নাকি? তা মনে হয় না। দুবাই থেকে ঢাকায় ফান্ডিং এর জন্য মিজান সোনার বার কিনে নিয়ে যাবে না। অন্য কিছু করবে।’

খান বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘কী হবে?’

তুষার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বইটা টেবিলের উপরে রেখে ইন্টারকমে পীযূষকে ফোন করলেন, ‘একবার এসো তো।’

পীযূষ এসে বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার।’

তুষার বললেন, ‘লাস্ট সাত দিনের ক্রিপ্টো রেট কী আছে?’

পীযূষ বললেন, ‘ডাউনের দিকে। ক্রিপ্টোর এক্সচেঞ্জ কম আছে।’

তুষার বললেন, ‘ডার্ক ওয়েবে?’

পীযূষ বললেন, ‘কেউ কেউ এখন গোল্ড প্রেফার করছে। ক্রিপ্টো অনেকেই নিচ্ছে না।’

তুষার বললেন, ‘সলিড গোল্ড?’

পীযূষ বললেন, ‘সাউথ এশিয়ান কান্ট্রিগুলোতে সলিড গোল্ডই বেশি প্রেফারেন্স পাচ্ছে।’

তুষার বললেন, ‘হঠাৎ গোল্ডের দিকে ঝুঁকছে কেন সব?’

পীযূষ বললেন, ‘ইন্ডিয়ান মার্কেটে ট্যাক্সের জন্য ক্রিপ্টোর এক্সচেঞ্জ কমেছে। এখনও ইন্ডিয়া-ই এখানকার ইকোনমি কন্ট্রোল করে। সেটা একটা কারণ অবশ্যই।’

তুষার বললেন, ‘আরও কী কী কারণ হতে পারে একটা সার্ভে করে আমাকে জানাও। সামথিং ইজ ভেরি ফিশি।’

খান পীযূষকে বললেন, ‘ঢাকার ডার্ক ওয়েব থেকে কিছু পাওয়া গেছে লাস্ট সাত দিনে?’

পীযূষ বললেন, ‘ওদিকে আর্মস ডিলিং বেড়েছে। সেটা লাস্ট সাত আট মাসে এমনিতেও বেড়েই আছে। ইলেকশন আছে বলে বাড়তে পারে।’

খান তুষারের দিকে তাকালেন, ‘স্যার, আমি কি ঢাকা যাব?’

তুষার মাথা নেড়ে বললেন, ‘না। এখনই না। আমি আরও চার পাঁচ দিন দেখব। ঢাকার ইন্টেল থেকে কিছু খবর না পেলে তারপর বলছি। অবিনাশ কী বলছে বল তো? ঠিক করে রিপোর্ট করছে না কেন? আবার বিগড়েছে নাকি?’

পীযূষ বললেন, ‘অবিনাশ এখন কলকাতায়। আজকেই লোকেশন আপডেট পেয়েছি।’

তুষার বললেন, ‘সে কী? আমায় বলেনি কেন?’

পীযূষ বললেন, ‘আমি তো ভেবেছি আপনাকে বলেছে।’

তুষার বললেন, ‘না। আমি সেটাই জানতে চাই। কন্ট্যাক্ট করো। আমার সমস্ত আপডেট চাই।’

পীযূষ বললেন, ‘ওকে স্যার।’

পীযূষ চেম্বার থেকে বেরোতেই তুষার গম্ভীরমুখে বললেন, ‘খান, অবিনাশের কাজকর্ম মনিটরিং করার সময় এসেছে। আমার কাছে ওর ব্যাপারে বেশ কয়েকটা রিপোর্ট আছে। তার ইনভেস্টিগেশন শুরু হবে। আমার মনে হয় ইস্টার্ন ইন্ডিয়াতে তোমায় অনেক বেশি ভিজিল্যান্ট হতে হবে।’

খান বললেন, ‘ঠিক আছে স্যার। আমি দেখে নিচ্ছি।’

তুষার চিন্তিত মুখে বসে রইলেন।

৬২

সবসময় ভয় নিয়ে বেঁচে থাকতে কেমন লাগে? তা সে জানে। দিব্যেন্দু যখন অফিস থেকে ফিরত। যেদিন খুব ভয় পেত, দেখা যেত সেদিন কিছুই করল না। যেদিন শুরুটা হালকাভাবে হল, সেদিনই দেখা গেল হঠাৎ করে গায়ে হাত তুলতে শুরু করে দিত।

জরিনার সঙ্গে গল্প করছিল সে। রাত দশটা বেজেছে। ভাবছিল আর হয়তো কেউ আসবে না, ভাবতে না ভাবতেই কলিং বেল বেজে উঠল। জরিনা বলল, ‘সাহেব আসছে মনে হয়।’

রুমা বলল, ‘দেখ।’

জরিনা উঠে দরজা খুলল। ঠিকই ধরেছে সে। সাদিক ঢুকল। রুমাকে দেখে বলল, ‘কেমন লাগে তোমার এখানে সাকিনা কুমারী?’

রুমা বলল, ‘আসেন।’

সাদিক দরজা বন্ধ করল।

খাটের উপর উঠে বসে অভ্যস্ত হাতে তাকে জড়িয়ে ধরল। যেন কতদিনের চেনা। রুমার শরীরে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘তুমি বড়ই সুন্দর। বেশ্যা না হইলে তোমারে বাসায় নিয়া তুলতাম।’

রুমা সাদিকের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপনি আমার কাছে আসেন, এটাই আমার বাসা।’

সাদিক বলল, ‘বাঃ, তুমি ভারি সুন্দর কথা কও। কে শিখাইসে তোমারে কথা কওন?’

রুমা বলল, ‘শিখাইবার লাগে নাই। আমি এমনিই কই।’

সাদিক আলো নিভিয়ে দিল। প্রথম দিন তাড়া ছিল। এদিন ধীরে ধীরে রুমাকে বিবস্ত্র করল। রুমাও সঙ্গত করল। তাকে সাদিককে খুশি রাখতে হবে। তার জন্য যা করার, সব করতে হবে।

সাদিক দিব্যেন্দুর মতো নয়। সে শৌখিন মানুষ। রুমার ভালো লাগছিল। নিজেই মরমে মরে যাচ্ছিল সেই জন্য। এই ক্রিমিনালটাকে তার ভালো লাগছে শুধু শরীরের জন্য? তাহলে কি শরীরই সব?

স্খলনের পর রুমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল সাদিক। আবেগপূর্ণ গলায় বলল, ‘তুমি ভালো। খুবই ভালো সাকিনা কুমারী। তোমার জন্য আমি গয়না আনব।’

রুমা আগ্রহী ভাব আনল গলায়, ‘কোন গয়না আনবেন?’

সাদিক বলল, ‘তোমারে এখন কমু না। নিয়া আসুম।’

রুমা বলল, ‘আনবেন।’

সাদিক বলল, ‘আমার এক মেহমান আসব। আমি ভাবসিলাম তোমারে নিয়া যাব তার কাছে। কিন্তু আমার তোমারে ছাড়তে ইচ্ছা করে না। মেহমানের জন্য আমি মাইয়া ভাড়া কইরা আনুম। তুমি আমার রানি হবা।’

রুমার হার্টবিট মিস হল। তবু সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল, ‘মেহমান? কোন মেহমান?’

সাদিক জোরে হাসল, ‘সবে তো আইলা। কত মেহমান আসব এখানে। দেইখা শেষ করতে পারবা না।’

রুমা গলায় ন্যাকামি আনল, ‘এখন আমি নূতন আইসি, তাই আমারে নিয়া আফনের এত আনন্দ। আমি পুরানা হইলেই আফনি আমারে সবাইরে বিলায়ে দিবেন।’

সাদিক রুমার গাল ধরে নাড়ল, ‘না না। তুমি দেখবা।’

সাদিকের ফোন বেজে উঠল। সাদিক সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। ফোন ধরে বলল, ‘বলো...জি, জি...আইতাসি, বাজারে আইসিলাম...আসি।’

ফোন রেখে বলল, ‘বাসার ডাক আইসে।’

রুমা বলল, ‘ভাবি?’

সাদিক হেসে উঠল, ‘ভাবি কও কেন? আমি কি তোমার ভাই হই?’

রুমা বলল, ‘তাহলে কী কমু?’

সাদিক বলল, ‘ভাইবা কমু।’ আলো জ্বালল সে। ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে রুমার হাতের দিকে চোখ পড়তে দাঁড়িয়ে গেল। কালশিটে দাগ আছে হাতে। সিগারেট খেতে গিয়ে দিব্যেন্দু ছ্যাকা দিয়েছিল।

বলল, ‘কোন শুয়ারের বাচ্চার কাম এইডা?’

রুমা সাদিকের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘মইরা গেছে সেইডা।’

সাদিক বলল, ‘তোমারটা?’

রুমা ঘাড় নাড়ল।

সাদিক বলল, ‘তোমারে যে জ্বালাইবে, তুমি শুধু আমারে কইবা। তারপর আমি বুঝুম। বুঝলা?’

রুমা খিলখিল করে হাসল। এই হাসিটা শমিতা শিখিয়ে বলেছিল, এটা নাকি খানকি হাসি। সে খানকি হয়েছে। এরকম হাসি হাসতে হয়। কী অদ্ভুত একটা কথা। কোনও মানে হয়? ভেবেছিল কোনদিনও এই হাসিটা হাসবে না। সাদিকের কথা শুনে সে হাসিটাই হাসল। তার জন্য নাকি একজন পুরুষ লড়বে। তার জন্য? কী অদ্ভুত!

৬৩

‘মাথুর, ঘুমিও না। নামতে হবে।’

অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর কলকাতায় প্লেন ল্যান্ড করবে। মাথুর ঘুম ভেঙে সোজা হয়ে বসলেন।

খান বললেন, ‘কী স্বপ্ন দেখছিলে?’

মাথুর ফিক ফিক করে হেসে বললেন, ‘অদ্ভুত একটা স্বপ্ন। বললে বিশ্বাস করবে না তুমি।’

খান বললেন, ‘সেটা কী বলে ফেলো। তার জন্য সাসপেন্স ক্রিয়েট করার কিছু নেই।’

মাথুর বললেন, ‘আরাবিয়ান নাইটস পড়েছ?’

খান বললেন, ‘স্যার তো এখন ওটাই পড়ছেন। তুমি ওই বইটার স্বপ্ন দেখলে?’

মাথুর বললেন, ‘ইয়েস। ওই বইটার স্বপ্ন দেখলাম। আরাবিয়ান নাইটসে রানিদের দুই বোনের নাম কী ছিল?’

খান মনে করার চেষ্টা করলেন। করতে পারলেন না। বললেন, ‘ভুলে গেছি।’

মাথুর বললেন, ‘শাহারজাদি, আর দিনারজাদি। শাহারজাদি রাজা শাহরিয়রকে বিয়ে করবেন। রাজা হিংস্র। দেশের সব মেয়েকে বিয়ে করে খুন করে ফেলছে। বাকি মেয়েদের বাঁচাতে শাহারজাদি রাজাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।’

খান বললেন, ‘রাইট। তা তুমি কী স্বপ্ন দেখলে? তুমিই কি সেই রাজা হয়ে গেছ নাকি? নাকি তুমি রানি হয়ে গেছো?’

মাথুর বললেন, ‘আমি দেখলাম এরা সব দিল্লিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাজা হুমায়ুন টুম্বে বসে রানির কাছে গল্প শুনছে। জাস্ট ইমাজিন!’

খান হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমি এটা স্বপ্ন দেখলে? মানে ভালো কোনও স্বপ্ন দেখতে পারলে না?’

মাথুর বললেন, ‘ভালো স্বপ্ন মানে কলকাতার বিরিয়ানি? সেটা তো গিয়ে নিজের হাতেই চাখব। ওটা নিয়ে ভেবো না।’

প্লেন অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। খান সোজা হয়ে বসলেন, ‘ঠিক আছে খেও। অবিনাশকে আগে খুঁজি।’

মাথুর বিরক্ত মুখে বললেন, ‘ওই এক পাবলিক। তোমাদের সব পেয়ারের লোক। ওকে আমার কোনওকালেই পোষায় না।’

খান বললেন, ‘পেয়ারের লোক? আমার তো না। তাহলে তুমি স্যারের কথা বলছ।’

মাথুর বললেন, ‘স্যার ওকে পছন্দ করেন বলে মনে হয় না। তবে...’

মাথুর আর কিছু বললেন না।

খান বললেন, ‘তবেটা কী?’

মাথুর বললেন, ‘পরে বলছি। পৌঁছই।’

খান বললেন, ‘ওকে।’

ল্যান্ডিং, লাগেজ কালেকশন সব মিলিয়ে আধ ঘণ্টা লাগল। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে দুজনে ক্যাব নিলেন। ড্রাইভারকে হোটেলের ঠিকানা বলে জানলার বাইরে তাকালেন খান, ‘অ্যামেজিং সিটি। যতবার আসি, এত ভালো লাগে।’

মাথুর বললেন, ‘অ্যামেজিং বিরিয়ানি, সেটা বলো। আমার দিল্লির বিরিয়ানি কিন্তু কলকাতার মতো লাগে না যাই বলো। এখানকার বিরিয়ানিতে যে আলুর ব্যাপারটা, সেটা অদ্ভুত।’

খান বললেন, ‘তুমি কি ভ্লগার হওয়ার প্ল্যান করছ রিটায়ারমেন্টের পরে?’

মাথুর বললেন, ‘সেরকমই।’

খান ফোন বের করে অবিনাশের নাম্বারে ফোন করলেন। তারপর মাথা নাড়লেন, ‘নট রিচেবল। ওকে ফোনে পাওয়া যাবে না।’

মাথুর শিস দিচ্ছিলেন। বললেন, ‘ঠিক আছে। ও কলকাতা চেনে তো আমরাও চিনি। চিন্তার কিছু নেই।’

খান চোখ বন্ধ করলেন, বললেন, ‘হোটেলে গিয়ে স্নান করতে হবে। স্নান করা হয়নি।’

মাথুর বললেন, ‘আগে খেয়ে নিলে হতো না?’

খান মাথা নাড়লেন, ‘মোটেই না। দয়া করে এই রিকোয়েস্টটা কোরো না। আগে চেক ইন করি।’

মাথুর ঘড়ি দেখলেন, ‘ঠিক আছে। খিদে যত বাড়বে, তত ভালো।’

খান ফোনটা আবার হাতে নিয়ে অবিনাশকে মেসেজ করলেন, ‘অনলাইন হলে ফোন করবেন। আর্জেন্ট।’

মাথুর সেটা দেখে আবার শিস দিলেন, ‘লাভ হবে না। সম্ভবত এই সিমটা পাল্টেছে। ভাই, গাড়ি দাঁড় করিয়ে দাও। এখানে নেমে যাব।’

খান বললেন, ‘লাগেজ?’

মাথুর ড্রাইভারকে বললেন, ‘হোটেলের ঠিকানা দিয়েছি। লাগেজ হোটেলে নিয়ে গিয়ে জমা করে দিন।’

ড্রাইভার গাইগুই করছিল। মাথুর একটা কার্ড এগিয়ে দিলেন, ‘দিয়ে আসুন। কাজ আছে।’

ড্রাইভার আর কিছু বলল না। গাড়ি চলে গেল। খান বিরক্ত গলায় বললেন, ‘তোমার জন্য আমি স্নান করতে পারলাম না। কী করবে এখন?’

মাথুর নাম্বার ডায়াল করলেন। ও প্রান্ত ফোন ধরতে বললেন, ‘বিলাল? লোকেশন পাঠাচ্ছি। বাইকটা নিয়ে এসো। একটা ইঁদুর ধরতে যেতে হবে। দুজন দুটো বাইক নিয়ে আসবে। ফাইন।’

ফোন কেটে দিলেন মাথুর। খান বললেন, ‘সিরিয়াসলি? বাইক লাগবে? বলিউডের হিরো তুমি?’

মাথুর বললেন, ‘তুমিই তো বলো ইঁদুর যেখানে লুকোয় সেখানে চার চাকা যায় না। আবার আমাকে হিরোগিরির কথা বলছ?’

খান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। ফোন বেজে উঠল। দেখলেন, অবিনাশ ফোন করছে...।

৬৪

মানুষের একটা জায়গায় থাকতে থাকতে অভ্যাস হয়ে যায়। তারও হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে বাকি জীবনটা এখানে কাটলেও খারাপ হতো না। কী আর হবে? বাজে কোনও রোগে মরে যাবে? তাই হবে! এর বেশি তো আর কিছু হবে না। তার যা জীবন, তাতে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার মধ্যে খুব বেশি তফাত নেই। একটা সুতোর উপর দিয়ে হাঁটার মতো বেঁচে থাকাটা।

শুয়ে ছিল রুমা। সকাল হয়েছে। জরিনা একগাদা পরোটা নিয়ে এল, ‘খাবা না?’

রুমা বলল, ‘এতগুলো পরোটা কে খাবে?’

জরিনা বলল, ‘খাও না। সাহেব টেকা দিয়া গেছে।’

রুমা পরোটা ভেঙে খেল। বাইরে থেকে একটা কোকিলের ডাক শোনা গেল। জরিনা হেসে ফেলল, ‘দেখস? এই সময় কোকিল ডাকে নাকি। কুনো শয়তান পুলার কাণ্ড।’

রুমাও হাসল। কয়েক সেকেন্ড পরোটাটা একটু একটু করে খেয়ে বলল, ‘আমি একটু বাজার যামু। কাজ আছে।’

জরিনা বলল, ‘লোক আছে তো। তোমার যাওনের কী দরকার?’

রুমা বলল, ‘ভালো লাগে বল, সারাদিন এক ঘরে! বোরখা পরে যাচ্ছি। তুই কাউকে বলিস না।’

জরিনা করুণ চোখে তাকিয়ে বলল, ‘সাহেব জানলে আমারে মাইরা ফেলাইবানে।’

রুমা জরিনার হাত ধরল, ‘তুই দরজায় খেয়াল রাখ। আমি তাড়াতাড়ি আসছি।’

জরিনা বলল, ‘যাও। ঘুইরা আসো।’

রুমা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল। ঘরের ছেলেগুলো ছিল না। জরিনা বাইরেটা দেখে এসে বলল, ‘যাও, ফাঁকা আছে। দেরি করবা না কিন্তু। আমি দেখতাসি।’

রুমা ধীরেসুস্থে বেরোল। গলির বাইরে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট কানাগলিতে পৌঁছল। বাজারের মুখে একজন অন্ধ ভিখারি দাঁড়িয়ে আছে। রীতিমতো চিৎকার করে ভিক্ষা করছে সে। রুমা তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মেহমান এলে আমাকে নিয়ে যাবে না। ভাড়াটে নেবে বলছে।’

‘সে কী? কী হবে?’ চিৎকার করতে করতেই হঠাৎ চুপ করে ভিখারি ফিসফিস করে কথাগুলো বলল।

রুমা বলল, ‘কী হবে জানি না। আমি খবরটা দেওয়ার, দিয়ে দিলাম। এভাবে বেরনো রিস্ক আছে। সাদিক জানতে পারলে মেরে দেবে।’

‘ঠিক আছে। যাও।’

ভিখারি আবার চিৎকার করতে শুরু করল। রুমা চারদিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে গেল। জরিনা চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। রুমাকে ঢুকতে দেখে তার ধড়ে প্রাণ এল, ‘শিগগিরি ঢুইকা যাও।’

রুমা ঘরে ঢুকে বোরখা খুলে বসল।

জরিনা বলল, ‘ভালো লাগে না, কও?’

রুমা বলল, ‘হ্যাঁ। ভালো লাগে।’

জরিনা বলল, ‘আমি একদিন পালাইয়া যাব। আমারে যাইতেই হইব।’

রুমা জরিনার দিকে তাকাল। ঠিকই তো। মেয়েটা এই নরকে পচে মরবে কেন? সে ঘাড় নাড়ল, ‘যাস। তোর যেদিন ইচ্ছে হবে পালিয়ে যাস।’

জরিনা বলল, ‘সাহেবরে চেনো তুমি? খুইজা পাইলে কী করবে জানো?’

রুমা বলল, ‘তোরে কিছু করবে না মনে হয়।’

জরিনা ঠান্ডা গলায় বলল, ‘মদ খাইয়া আইসা মারে আমারে। তুমি কও কিছু করবে না। তুমি সাহেবরে চেনো নাই। তুমি নতুন না এখন? তাই কিছু কয় না। পুরান হইলে তোমারেও ছাড়বে না।’

রুমা শিউরে উঠল। তাকে ছাড়বে না? সাদিকের ভেতরেও কি তবে দিব্যেন্দু জেগে উঠবে? প্রতিটা পুরুষের মধ্যেই কি দিব্যেন্দু আছে? সব কিছু হাতের বাইরে চলে গেলেই সেই পুরুষ জেগে ওঠে বুঝি? সে বলল, ‘ঠিক আছে। ভাবিস না। যখন হবে, তখন দেখা যাবে।’

জরিনা বলল, ‘আমার খুব ঘোরার শখ জানো। আমার বন্ধু আছে সুপ্তা। ও ইন্ডিয়া গেছিল। কলকাতায়। খুব মজা করসিল। আমি কলকাতা যামু।’

রুমা বলল, ‘যাবি। আমরা দুজনেই যামু।’

জরিনা রুমাকে জড়িয়ে ধরল হঠাৎ করে, ‘তুমি খুব ভালো। আমার আম্মুর মতো।’

রুমা কেঁদে ফেলল। এ কান্নাটা অনেকদিন ধরে জমে ছিল। জরিনার এই জড়িয়ে ধরাটুকুর জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল...।

৬৫

তার কপাল ভালো লুকা সাঁতরা তাকে তাড়িয়ে দেয়নি। হাতে-পায়ে পড়ে সুখেন তার শাস্তিটা মকুব করিয়েছে।

এলাকায় লুকার আনাগোনা আগের থেকে অনেক বেড়েছে। শমিতার ঘরে মাঝে মাঝে কাউকে না কাউকে নিয়ে আসে লুকা। সুখেন দূর থেকে দেখে আর বিড়ি ফোঁকে। লুকার ব্যাপারে যত দূরে থাকা যায়, তত মঙ্গল।

সব বড় বড় লোক ওর হাতের মধ্যে। ক্ষমতা পেয়ে গেলে সাধারণ মানুষ অবধি নিজেকে কী না কী ভাবতে পারে। সেখানে লুকা সাঁতরা তো এখন একটা বিরাট ব্যাপার! খুব বড় একটা নাম। গত তিন বছর ধরে নিজের পুজোও শুরু করেছে লুকা। সব দলের লোক আসে। এহেন ক্ষমতা যার আছে তার কাছে কেউ যায়? পাগল নাকি?

রাত বারোটা। লুকা বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছে। সুখেন প্রথমে ভেবেছিল খেজুর করবে, পরক্ষণেই দাঁড়িয়ে গেছে। লুকা এখন আর উঠতি না। প্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালী। তার মতো লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে শমিতার ঘর পাহারা দেবে, এর থেকে বড় ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।

শহরটা ধীরে ধীরে কঠিন ঠাই হয়ে যাচ্ছে ভেবে সুখেন বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিল।

হঠাৎ দেখল একটা জিপ গাড়ি এসে দাঁড়াল। একজন লম্বা ঝকঝকে চেহারার লোক, আরেকজন একটু মোটাসোটা কিন্তু বেশ শক্তপোক্ত লোক লুকার দিকে এগিয়ে এল। সুখেন ধীর পায়ে লুকার গাড়ির পেছনে গিয়ে আড়ি পাতল।

একজন হিন্দিতে বলল, ‘অবিনাশ কোথায় আছে?’

লুকা পাত্তা দিল না। উত্তর না দিয়ে সিগারেট খেতে লাগল।

তিন চার সেকেন্ডের ব্যাপার!

গোটা এলাকা, সুখেন এবং অবশ্যই লুকাকে চমকে দিয়ে একটা বিরাশি সিক্কার চড় এসে লুকার গালে পড়ল।

উত্তেজনায় সুখেন আর লুকিয়ে থাকতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে দেখল লুকা রাস্তায় রীতিমতো গড়াগড়ি খাচ্ছে। লম্বা লোকটা স্পষ্ট বাংলায় বলছে, ‘বাপেরও বাপ থাকে জানিস তো? আমরা তোদের সে বাপ। প্রশ্ন করছি, আর উত্তর দিচ্ছিস না? এত সাহস হয় কী করে? মাথুর, বেল্ট খুলবে নাকি?’

মাথুর বলল, ‘না, দাঁড়াও।’

মাথুর এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে বসে পড়ে রাস্তায় পড়ে থাকা লুকার কলার ধরল, ‘উত্তরটা দে।’

খবর হয়ে গেছিল বস্তির মধ্যে। লুকার চ্যালারা কারো না কারো ঘরে ব্যস্ত ছিল। খবর হাওয়ায় পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগে না। পড়িমরি করে সব দৌড়ে এল। ফুলকো লুচি তাওয়া থেকে নামানোর পর ফুটো করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যেমন নেতিয়ে যায়, সুখেন দেখল লুকা সেভাবে নেতিয়ে গেছে। দুজনের দিকে সভয়ে তাকাচ্ছে। তার চ্যালারা ছুটে আসতে গেছিল, সভয়ে লুকা তাদের হাত তুলে বাধা দিয়ে বলল, ‘ভাগ শালা। কেউ আসবি না। যা যা, পালা।’

লুকার চ্যালারা বুঝতে পারছে না, লুকা এত ভয় পেয়ে গেছে কেন।

খান বলল, ‘কী বে, বলবি অবিনাশ কোথায় আছে?’

লুকা উঠে বসল রাস্তার উপর। দু’কানে হাত দিয়ে বলল, ‘বিশ্বাস করুন স্যার, আমি কোনও দোষ করিনি। আমি তো আমার কাজ করছি।’

খান লুকার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘অবিনাশ কোথায় আছে বল। বিকেল থেকে ঘুরছি। আর তো পারা যাচ্ছে না।’

লুকাও ফিসফিস করে বলল, ‘ট্যাংরায় আছে স্যার। ফারুকের কাছে।’

মাথুর বললেন, ‘আজ থাকবে তো?’

লুকা বলল, ‘আমায় নিয়ে চলুন। আমি দেখছি। আপনারা গেলে পালাতে পারে। আমি বুঝেছি আপনারা কারা স্যার। আমায় নিয়ে চলুন।’

সুখেন ভালো করে লুকার প্যান্ট দেখল। প্যান্টেই ছোটটা হয়ে গেছে কি না বুঝতে পারল না। খান আর মাথুর লুকার কলার ধরে গাড়িতে তুলে মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে চলে গেল। লুকার গাড়ি, আধ খাওয়া সিগারেট...সবই রাস্তায় পড়ে রইল।

সুখেন সিগারেটটা তুলে জামায় মুছে আগুন ধরাল।

লুকার মূল চ্যালা পাতা হতভম্ব মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। সুখেন তার কাছে গিয়ে দাঁত বের করল, ‘চিরকাল শুনে এসেছি বাপেরও বাপ থাকে। আজ সত্যি নিজের চোখে দেখলাম রে ভাই।’

পাতা বলল, ‘এরা কারা সুখেনদা?’

সুখেন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, ‘বুঝতে পারলি না?’

পাতা বলল, ‘না।’

সুখেন ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘মাঝে মাঝে ভগাদা তার ভক্তদের ডাকে এক আধ দিন সাড়া দেয়। লজ্জাও তো আছে বল। সব সময় কি বড়দের দেখলে চলে? আজ হয়তো সেরকমই একটা দিন। ভগাদা চোখ তুলে চেয়েছে। দেখ, সেরকম হলে তোকেও নিয়ে যেতে পারে।’

সুখেনের কথায় ভীষণ ভয় পেয়ে পাতা তৎক্ষণাৎ সে জায়গা ছেড়ে পালিয়ে গেল...।

৬৬

কখনও কখনও এমন ঝড় আসে, আগে থেকে কোনও পূর্বাভাস থাকে না। সাইক্লোন না, বা বড় কোনও ঝড় না। হুট করে হওয়া এমন একটা কালবৈশাখী, যেটা সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে চলে যায়। এমনই একটা ঝড় হল। রুমা আগে থেকে বুঝতেও পারেনি।

সন্ধেবেলা চুপ করে শুয়ে ছিল। জরিনা বাইরে গেছে। হঠাৎ দরজা খুলে ছেলেটা ঢুকল।

ছেলেটাকে রুমা দেখেছে এই ঘরে ঘোরাফেরা করে, নাম শুনেছে আনিস, কিন্তু কথা হয়নি।

দরজা যে বন্ধ করে রাখতে হয়, সেটা একবারেই খেয়াল ছিল না তার। ছেলেটা দরজা খুলে ঢুকেই বন্ধ করে দিল।

রুমা সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে বলল, ‘এ কী? বাইর হও।’

ছেলেটা দাঁত বের করল, ‘ওই দ্যাহ, খানকির আবার শরম।’

রুমা চিৎকার করল, ‘বেরোও।’

বাইরে গান চলছে জোরে। ছেলেটা হেসে লুঙ্গি খুলে ফেলে ঝাঁপিয়ে এসে তাকে ধরল, ‘তাড়াতাড়ি ছাইড়া দিমু নে।’

রুমা ঠ্যালা দিয়ে ছেলেটাকে ফেলে দিল। ছেলেটা প্রস্তুত ছিল না, ভেবেছিল রুমা বাধা দেবে না। খেপে গিয়ে জামার পকেট থেকে একগাদা টাকা বের করে রুমার মুখে ছুঁড়ে ফেলে বলল, ‘ল। টেকা ল।’

রুমা ছিটকিনি খুলে বাইরে চলে গেল। ছেলেটা ল্যাংটো অবস্থাতেই বাইরে গিয়ে রুমার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে যেতে লাগল, ‘মাগীর শরম লাগে? খানকির শরম, চ তোর কেমন শরম দেখুম।’ বারান্দা ফাঁকা দেখে নিয়ে রুমা খুব আলতো করে ছেলেটার হাত ধরে ঘুরিয়ে ফুট তিনেক দূরে ছিটকে ফেলে দিল। ছেলেটা বারান্দায় গিয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড তার দিকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়াল। রুমা বলল, ‘ভাল্লাগসে?’

আনিস রাগে উন্মাদ হয়ে গেল। দ্বিগুণ বেগে পাগলা ষাঁড়ের মতো ছুটে এল রুমার দিকে। রুমা আনিসের মাথাটা ধরে সজোরে দেওয়ালে ঠুকে দিল।

মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে গেল আনিস, ‘তোরে আমি দেইখা নিমু।’

ক্রমাগত তড়পাতে শুরু করল ছেলেটা।

রুমা সায়া থেকে একটা ছোট ছুরি বের করে আনিসের গলায় আড়াআড়ি চালিয়ে দিল।

আনিস একবারেই প্রস্তুত ছিল না। গলায় হাত দিয়ে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে শুরু করল সে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তার দেহটা প্রাণহীন হয়ে গেল। রুমা পুরোটা দেখলোও না। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ছুরিটা লুকিয়ে ফেলল। উল্টোদিকের ঘর থেকে একটা মেয়ে বেরোল। আনিসকে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করা শুরু করল।

চিৎকার শুনে বাইরে বেরিয়ে রুমাও কাঁদতে শুরু করল। অন্য ছেলেগুলো বাইরে ছিল। তারা চিৎকার শুনে ভেতরে ঢুকে আনিসকে পড়ে থাকতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। রুমা আতঙ্কিত মুখে বলল, ‘সাহেবরে ফোন দাও। এইডা কী কইরা হইল?’

ছেলেগুলো হতচকিত হয়ে গেছে। যে মেয়েটা কাঁদছিল, তার মুখে হাত দিয়ে তাকে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। একটা ছেলে হাত তুলে রুমাকে বলল, ‘ঢুইকা যান। সাহেবরে বলতাসি। একদম চিল্লাইবেন না। এখানে পুলিশ আইলে হইব না। সাহেব আসুক, যা হইবে দেখা যাইব।’

সাদিককে ফোন করা হল। সাদিক কাছেই ছিল। চলে এল। হতভম্ব হয়ে আনিসকে পড়ে থাকতে দেখে জিগ্যেস করল, ‘কে করেছে?’

একটা ছেলে জানাল আনিস তাদের সঙ্গে গল্প করতে করতে ভেতরে গেছিল। তারপর কী হয়েছে কেউ জানেন না। সাদিক সন্দিগ্ধ গলায় বলল, ‘তোরা জুয়া খেলছস, তারপর তোরাই ওরে মারছস। ভাবছস আমি বুঝি নাই, তাই না?’

‘না বস। আমরা মারি নাই। খোদার কসম লাগে।’

সাদিক বলল, ‘কিলিয়ার কর। ফেলায় আয় বডি। আমার আর কিছু জানার দরকার নাই। জ্বালাইবি না আমারে আর।’

রুমার দরজায় নক করল সাদিক।

রুমা দরজা খুলল। সে আগেই আনিসের দেওয়া টাকা লুকিয়ে ঘর পরিষ্কার করে ফেলেছিল। সাদিকের দিকে তাকিয়ে ভীত গলায় বলল, ‘এসব কী হইল?’

সাদিক দরজা বন্ধ করে বলল, ‘এখানে এই তো হয় জান। তোমার চিন্তার কিছু নাই। আমি আছি তো।’

রুমা সাদিকের বুকে মাথা দিয়ে প্রবল ভাবে কাঁদতে শুরু করল, ‘আমার খুব ডর লাগতাছে।’

সাদিক রুমার কাপড় খুলতে শুরু করল। আদুরে গলায় বলল, ‘ডর কী তোমার? আমি তো আছি। খানকির পোলারা নিজেরা নিজেরা খুনাখুনি কইরাই মরবে। এর আগেও এরা একটারে মারসে জুয়ার আসরে। তোমার চিন্তা নাই। তুমি আসো।’

রুমা শুয়ে পড়ল খাটে। সাদিককে শরীরে নেবার পালা শুরু হল...।

৬৭

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। খান জানলার বাইরে তাকিয়ে বললেন, ‘অবিনাশের ফোনটা তুই ইউজ করছিস কেন?’

লুকা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘আমি কী করে জানবো বলুন তো ও কোথায় কী করে এসেছে? আমাকে ফোনটা দিয়ে বলেছিল ইউজ কর। দুবাই থেকে এনেছি।’

খান বললেন, ‘দুবাই থেকে এনেছে? ওকে। গুড ইনপুট। এখানে কী চলছে?’

লুকা বলল, ‘সেটা স্যার আপনারা অবিনাশকেই জিগ্যেস করে নিন।’

মাথুর বললেন, ‘কেন? তোর কি কথা বলতে প্রবলেম আছে?’

লুকা বলল, ‘স্যার আপনারা তো জানেন এই কাজগুলো আমি কারো নির্দেশে করি। নিজে থেকে কিছু করি না। আমরা ট্যাংরা এসে গেছি।’

মাথুর বললেন, ‘একটু এদিক ওদিক দেখি। তারপর দেখছি তোদের এই ব্যবসার লালবাতি কীভাবে জ্বালাতে হয়। চল। অবিনাশকে ফোন কর।’

খান গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। লুকা অবিনাশকে ফোন করল।

কথা বলে ফোন রেখে বলল, ‘চলুন। নিয়ে যাচ্ছি। আমাকে স্যার ছেড়ে দেবেন প্লিজ।’

খান বললেন, ‘চল। তারপর দেখছি।’

ঘুপচি একটা ঘর। বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। লুকা চাবি খুলে দিল।

দরজা খুলে দেখা গেল অবিনাশ খাটে শুয়ে ফোনে গেম খেলছিল। সে ভাবতেই পারেনি দুজনে চলে আসবে। অবিনাশ পালালো না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

খান লুকার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাইরে অপেক্ষা কর।’

লুকা বাইরে চলে গেল।

খান ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে চেয়ার টেনে বসে বলল, ‘খাটে বোস।’

অবিনাশ খাটে বসল। মাথুর আরেকটা চেয়ার টেনে বসলেন।

খান বললেন, ‘কী হয়েছে তোর? ফোন লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে, কোনও রিপোর্ট করছিস না, আমরা কিছুই জানতে পারছি না, কী হয়েছে ঠিক?’

অবিনাশ মাথা নিচু করে বসে ছিল। মাথুর বললেন, ‘চড়-চাপড় মারতে হবে কথা বলানোর জন্য?’

অবিনাশ ফ্যাকাসে মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোড সেভেন।’

খান আর মাথুর দুজনেই চমকে উঠলেন। খান বললেন, ‘সিরিয়াসলি?’

অবিনাশ বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আমার কিছু করার নেই। যা ইন্সট্রাকশন আছে, সেভাবেই চলতে হচ্ছে।’

খান মাথুরের দিকে তাকালেন। মাথুর বললেন, ‘আমাদের কাছে এ ব্যাপারে কোনও মেসেজ আসেনি। আমরা কী করে বুঝব, তুই সত্যি কথা বলছিস?’

অবিনাশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে পকেট থেকে একটা ছেঁড়া পাঁচশো টাকার নোট এগিয়ে দিল। খান নোটটা নিয়ে ভালো করে দেখে মাথুরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন।

মাথুর উঠে দাঁড়ালেন, ‘তাহলে তো আমাদের আর কিছু করার নেই।’

খান বললেন, ‘খামোখা এতটা পথ এলাম। আগে জানতে পারলে কলকাতা আসতে হতো না।’

অবিনাশ বললেন, ‘স্যার, আমাকে কি আর...’

খান বললেন, ‘আমরা তোকে আর কিছু বলব না। চল, তুই যেভাবে কাজ করছিস, করে যা।’

দুজনে অবিনাশের ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে লুকা উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। খান বললেন, ‘তুই নিজের ব্যবস্থা করে নে ফেরার, আমাদের কাজ হয়ে গেছে।’

লুকা ঘাড় নাড়ল, ‘ঠিক আছে স্যার।’

দুজনেই গাড়িতে উঠে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। খানিকক্ষণ যাওয়ার পর খান ড্রাইভারকে বললেন, ‘আপনি গাড়িটা দাঁড় করিয়ে বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসুন। আমাদের কথা আছে কিছু।’

ড্রাইভার তাই করল। গাড়ি ফাঁকা হতে খান বললেন, ‘কোড সেভেন কলকাতায় অ্যাক্টিভেট হল আর তুষার স্যার জানেন না, এটা হতে পারে?’

মাথুর বললেন, ‘হতে পারে। একটা আলোচনা চলছিল। বাংলাদেশ আর পাকিস্তান টেরিটরি আলাদা আলাদা দুটো এজেন্সি দেখবে। প্যারালাল অর্গানাইজেশন শুরু হয়েছে। বাধ্যতামূলক নয় যে আমাদের জানতেই হবে। ফোন কর।’

খান মাথা নাড়লেন, ‘করছি। রাত দুটো বাজলেও কিছু করার নেই। জানিয়ে রাখি।’

ফোন করলেন খান। তুষার ঘুমন্ত গলায় ফোন ধরে বললেন, ‘বলো।’

খান বললেন, ‘কোড সেভেন অ্যাক্টিভেট হয়েছে স্যার। আমরা জানতাম না। আপনিও হয়তো জানতেন না।’

তুষার বললেন, ‘আধ ঘণ্টা আগে জেনেছি। মিনিস্ট্রির অ্যাপ্রুভালও এসে গেছিল। আমাদের প্যারালাল অর্গানাইজেশন যারা ওদের মতো করে বাংলাদেশে কাজ করবে, আর আমরা তার অনেক কিছুই জানতে পারব না। হতে পারে বাংলাদেশে এখন যা হচ্ছে, সেটা ওরা জানে, আমরা জানি না। আমাদের জানার প্রয়োজন আছে নাকি সেটাও দেখতে হবে।’

খান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘তাহলে কি আমাদের টেরিটরি ভাগ হয়ে গেল স্যার? আমাদের আর বাংলাদেশ দেখতে হবে না?’

তুষার বললেন, ‘লিটারালি তাই দাঁড়ায়। তোমরা ফিরে এসো। কাল অফিসে কথা হচ্ছে। গুড নাইট।’

ফোন কেটে গেল।

খান চিন্তিত গলায় বললেন, ‘বাংলাদেশে তাহলে কারা অপারেট করছে, কী করছে, এর কিছুই আর আমরা জানতে পারব না। বুঝলে?’

মাথুর বিষণ্ণ গলায় বললেন, ‘এত ছুটোছুটিতে আমার আর এবার কলকাতার বিরিয়ানি খাওয়া হল না। বাদ দাও, চলো, ফিরি।’

খান জানলা থেকে গলা বের করে ড্রাইভারকে ডাকলেন, ‘চলে আসুন। এয়ারপোর্ট।’

গাড়ি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিল...।

অধ্যায় ১ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%