শয়তানের সন্তান

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এক

আমার নাম রুদ্র। রুদ্রনাথ এক্কা। জোসেফ রুদ্রনাথ এক্কা। বয়স একুশ।

এক্কা না হয়ে টেক্কা হলেও কোনো তফাত হতো না। আসলে হওয়া উচিত ছিল ফক্কা। তার কারণ আমি একজন বাস্টার্ড, যাকে বাংলায় বলে বেজন্মা। বেজন্মাদের বাপের পদবি জানা থাকে না; আমারও ছিল না। ব্যাপটাইজ করার সময় আমাদের হোমের রেক্টর, ফাদার স্যামুয়েল, বরাবরের মতন যা-হোক একটা খ্রিস্টান নাম আর মদেশিয়া পদবি দিয়ে আমাকে দেগে দিয়েছিলেন।

যেটাকে 'হোম' বলছি, সেটা আসলে অরফ্যানেজ, মানে অনাথ আশ্রম। রঘুপুরের এই অরফ্যানেজটা চালায় পুরুলিয়ার লুথেরান মিশন। আমার মতন যারা এখানে মানুষ হয়, তাদের জন্ম আশেপাশের বেশ্যাপাড়ায়। কোনো বেশ্যা যদি কচি-বাচ্চা রেখে মারা যায়, তাহলে সেখানকার দালাল বা মাসিরাই বাচ্চাটাকে অনাথ-আশ্রমে জমা করে দিয়ে যায়। তাছাড়া আর কী-ই বা করবে? তবে বাচ্চাটা যদি ছেলে হয় তাহলেই অরফ্যানেজ অবধি পৌঁছয়। মেয়ে হলে মাসিরা নিজেদের কাছে রেখে দেয়। বড় হলে লাইনে নামায়।

আপনাদের কাছে এসব কথা শকিং লাগছে কিনা জানি না, আমার লাগে না। কারণ জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এরকমই দেখছি, শুনছি। যে-বয়সে মানুষের মনে লজ্জা-ঘৃণা পাপ-পুণ্যের ধারণা জন্মায় তার ঢের আগে থেকেই আমরা মানে হোমের ছেলেরা জানি যে, আমাদের মায়েরা লছিপুরের ঢালে শরীর বেচত এবং আমাদের বাপের ঠিক নেই। ফলে তার জন্যে আমরা লজ্জা বা ঘেন্না পেতে শিখিনি।

জ্ঞান হওয়ার পর থেকে রঘুপুরের অরফ্যানেজটাকেই আমার ঘরবাড়ি বলে জানতাম। রেক্টর স্যামুয়েল মণ্ডল, মনিটর মাইকেলদা, ক্যান্টিনের জুলিয়া ওঁরাও সকলেই ছিলেন কনভার্টেড ক্রিশ্চিয়ান। সকলেই এই আশেপাশের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া কিম্বা বর্ধমান জেলার আদি বাসিন্দা। দারুন হাসিখুশি, শিক্ষিত, সুন্দর মানুষজন সব। তেমনই সুন্দর ক্যাম্পাস ছিল আমাদের। অজস্র শাল সেগুন ইউক্যালিপটাস-গাছে ভরা বাগানের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল স্কুল, লাইব্রেরি, ডিসপেন্সারি আর বয়েজ হোস্টেল। ছোট একটা চার্চও ছিল একদিকে।

পাশেই আলাদা একটা কম্পাউন্ডের মধ্যে ছিল নার্সারি-সেকসন। ওখানে সদ্যোজাত বাচ্চা থেকে ছ'বছর বয়স অবধি ছেলেরা থাকত। আমিও জীবনের প্রথম ছ'টা বছর ওখানেই কাটিয়েছিলাম।

রোববার কিম্বা পরবের দিনগুলোতে নার্সারির গেটে দেশি-বিদেশি গাড়ি এসে দাঁড়াত। আমাদের পেট্রনদের গাড়ি। ওদের অনুদানেই মিশন চলে। বেশিরভাগই সাদা চামড়ার সাহেব-মেম। জাপানিও ছিলেন বেশ কয়েকজন। এদেশিয়ও ছিলেন—তবে তাঁরা সংখ্যায় কম। পেট্রনরা নার্সারির বাচ্চাদের জন্যে জামা-কাপড়, খেলনা, টফি-লজেন্স আর ফ্রুটস নিয়ে আসতেন। তাঁরা চলে যাওয়ার পরে জুলিয়াদিদির হাত থেকে আমরা বড়রাও খাবারের ভাগ পেতাম।

এই যে সবটাই পাস্ট টেন্সে লিখছি, তার কারণ, আমি তিন বছর আগেই ওই হোম থেকে বেরিয়ে এসেছি।

'তিন-বছর আগে' মানে তখন আমার আঠেরো-বছর বয়স। ক'দিন পরে হায়ার-সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেব আর তারপরেই হোম থেকে কলকাতায় চলে যাবো—এইরকমই ঠিক ছিল। আঠেরো-বছর বয়সের পর আর রঘুপুরের হোমে কাউকে রাখা হয় না—কলকাতায় লুথেরান ওয়ার্ল সার্ভিসের যে কলেজ আছে সেখানে পড়াশোনা করতে পাঠানো হয়। যাদের হাতের কাজ কিম্বা মেশিনপত্রের দিকে ঝোঁক আছে তাদের জন্যে সেরকম ট্রেনিং-এর ব্যবস্থাও ওরাই করে দেন। তারপর যাও, নিজে চরে খাও। সিস্টেমটা এরকমই।

কিন্তু পরীক্ষা দেওয়া হল না। তার আগেই আমার কুষ্ঠরোগ ধরা পড়ল। সেই ধরা পড়ার গল্পটাও বেশ মজার। সেটা ছিল শীতকাল। তীব্র ঠান্ডা পড়েছিল সেবার। তারমধ্যেই সন্ধেবেলায় খেলার মাঠ থেকে ফিরে পায়ে জল ঢালছিলাম। পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন আমাদের রেক্টর, ফাদার স্যামুয়েল। কিছুক্ষণ দেখার পর উনি জিগ্যেস করলেন, তোমার শীত করছে না রুদ্র? খালি পায়ে এইভাবে মগের পর মগ জল ঢেলে চলেছ যে।

আমি বললাম, না তো। মনে হচ্ছে জলটা পায়ে লাগছেই না।

স্যামুয়েল স্যারের ভুরুদুটো কুঁচকে গেল। উনি কাছে এসে আমার কপালে হাত ছোঁয়ালেন। বললেন, হুঁ, বেশ টেম্পারেচার রয়েছে, অথচ পায়ে ঠান্ডা জল লেগে শীত করছে না। এতো অবাক ব্যাপার। তুমি সিক রুমে চলে যাও। আমি লিখে দিচ্ছি।

সেই শুরু। তারপর তো ব্লাড-টেস্ট। কনফারমেশন। হোম থেকেই আমাকে তড়িঘড়ি শর্বরী মোড়ের কুষ্ঠ আশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হল। অনাথ আশ্রম থেকে কুষ্ঠ আশ্রম। কপালটা ভাবুন একবার!

পুরোপুরি কপালের ব্যাপার নাও হতে পারে। কারুর কারুর শরীরে কুষ্ঠরোগের জীবাণু বহু-বছর ঘুমিয়ে থাকার পরে মাথাচাড়া দেয়। ভেবেছিলাম, যে-মায়ের কাছ থেকে আদর পাইনি, তার কাছ থেকেই হয়তো কুষ্ঠের জীবাণুটা পেয়েছি; আঠেরোবছর লেগেছে তাদের জেগে উঠতে।

ভুল ভেবেছিলাম। ওটা ছিল আসলে এক অভিশাপ। গল্পটা পুরোটা শুনলে বুঝতে পারবেন।

শর্বরী মোড়ের লেপ্রসী-সেন্টারে ডক্টর শিপ্রা ঘোষের আন্ডারে টানা দু-বছর চিকিৎসা হল আমার। রোগমুক্ত হলাম। শরীরের অন্য কোথাও রোগ ছড়ালো না, কিন্তু ওই যে পায়ের পাতা দুটোয় প্রথম অ্যাটাক করেছিল, ও দুটো বাঁচানো গেল না।

দুটো পায়ের দশটা আঙুল গুটিয়ে ছোট্ট হয়ে গেল।

শিপ্রাদি ডাক্তার হিসেবে যত ভালো, দিদি হিসেবে তার চেয়েও ভালো। কি যে ভালোবেসে ফেলেছিলেন আমায় সে বলবার নয়। মাঝে-মাঝেই ইয়ার্কি মেরে বলতেন, তোর এই ফিল্মস্টারের মতন চেহারাটা যে বাঁচাতে পারলাম রুদ্র, এটাই আমার ক্রেডিট।

আসলে আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যেই ওসব বলতেন, কারণ যতই আমার গায়ের রঙ ফরসা হোক, নাক মুখ কাটা কাটা হোক, হাইট হোক ছ'ফুট—পায়ে তো আঙুল নেই। লেপ্রসি-সেন্টার থেকে কিনে দেওয়া মোটা চামড়ার গোল-গোল জুতো পরে টলমল করে হাঁটি। একটা ল্যাংড়া ছেলেকে ফিল্মস্টারের সঙ্গে তুলনা করার আর কী কারণ থাকতে পারে?

ঠিক দু-বছরের মাথায় বুঝতে পারলাম, আমাকে যত শীঘ্র সম্ভব ওই লেপ্রসি-সেন্টার থেকে পালাতে হবে। আমি আর চেক-আপের রিস্ক নিতে পারব না। আমার শরীরে এমন কিছু একটা ঘটে চলেছে যেটা কাউকে জানানোর মতন নয়। ডাক্তারকেও নয়। শিপ্রাদিকে বললাম, আমি তো সেরে গেছি। এবার আমাকে ছেড়ে দিন।

শিপ্রাদি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, চলে যাবি? তা যেতেই পারিস। সত্যিকথা বলতে কি আমিও সেরকমই ভাবছিলাম। তা, কোথায় যাবি কিছু ঠিক করেছিস?

আমি বললাম, ফাদার স্যামুয়েলকে একবার ফোন করে দেখবেন?

শিপ্রাদির মুখটা করুণ হয়ে গেল। উনি বললেন, করেছিলাম। ওঁরা তোকে ফিরিয়ে নেবে না। তোর নামে এককালীন কিছু সাহায্য পাঠিয়ে দিয়েছেন। দু-লাখ টাকা। বলেছেন, ওই টাকায় যেন তোর রিহ্যাবিলিটেশনের ব্যবস্থা করে দিই। ভাগ্য ভালো বলতে হবে, সবেমাত্র গত সপ্তাহেই সেরকম একটা ব্যবস্থা হয়েছে। আচ্ছা, তুই কি বিরাজ কাপালি বলে কাউকে চিনতিস?

আমি ঘাড় নাড়লাম। সত্যিই অমন অদ্ভুত নামের কাউকে আমি চিনতাম না।

শিপ্রাদি বললেন, আশ্চর্য তো! উনি কিন্তু তোর ব্যাপারে খুব ইন্টারেস্টেড। একদম বিশেষ করে তোর ব্যাপারেই। প্রথমে রঘুপুর অরফ্যানেজে তোর খোঁজ করেছিলেন। তারপর সেখান থেকে ট্রেস করতে-করতে এখানে পৌঁছেছেন। উনি আসেননি শুনলাম উনি ক্রিপলড। চলাফেরা করতে পারেন না। ওঁর ম্যানেজার এসেছিলেন। তিনি বললেন, মিস্টার কাপালি তোকে নিজের কোম্পানিতে কাজ দিতে চান।

শিপ্রাদিকে বললাম, আপনি জিগ্যেস করলেন না, হঠাৎ আমাকেই কেন?

শিপ্রাদি বললেন, জিগ্যেস করিনি কে বলল তোকে? করেছিলাম। তাতে ম্যানেজারমশাই বললেন, মিস্টার কাপালি এরকম অনেক দুঃস্থ ছেলেকেই পুনর্বাসন দিয়ে থাকেন। তবে কাজটা এমন যে, শুধু অনাথ হলেই হবে না। তাদের একইসঙ্গে লম্বা চওড়াও হতে হবে। তুই যেহেতু এই দুটো শর্তই পূরণ করছিস তাই...

আমি শিপ্রাদির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললাম, আমাকে ওরা দেখল কোথায়?

শিপ্রাদি এইবার একটু রেগে গেলেন। বললেন, কেন? তুই কি পর্দার আড়ালে থাকিস নাকি? ম্যানেজারবাবু নিশ্চয় কখনো রঘুপুরের হোমের বাগানে তোকে বাঁদরামি করতে দেখেছিলেন। তখনই ফাদার স্যামুয়েলের কাছে তোর খোঁজখবর নিয়েছিলেন। হতে পারে না এরকম?

আমি ভয়ে ভয়ে ঘাড় হেলালাম—হতেই পারে। বুঝতে পারছিলাম, আপাতত যেটুকু খড়কুটো পাই, তাই আঁকড়ে ধরে আমার এখান থেকে বেরিয়ে পড়া উচিত। তাই শিপ্রাদিকে জিগ্যেস করলাম, আর কি বললেন পাটালি স্যারের ম্যানেজার?

পাটালি নয়, কাপালি। বললেন, আমি পারমিসন দিলে ওরা তোকে নিয়ে যাবে। ওদের কোম্পানিতে কাজ দেবে; থাকার জায়গা-টায়গা নিয়েও চিন্তা করতে হবে না। মানে এককথায় যাকে বলে 'রিহ্যাবিলেট' করে দেবেন তোকে।

তারপর শিপ্রাদি আমাকে জিগ্যেস করলেন, যাবি, কাপালি স্যারের ওখানে?

বললাম, অবশ্যই যাব। কিন্তু কোথায় যেতে হবে? আর যাবই বা কীভাবে?

শিপ্রাদি বললেন, সে ওদের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। আমি বললেই ওরা তোকে এখান থেকে নিয়ে যাবে। যেতে হবে কলকাতায়। তাহলে আমি ওদের খবর পাঠাচ্ছি, কেমন? সামনের সোমবারে তোর রিলিজ লিখে দেব।

আজকেই সেই সোমবার। ভোর ছ'টার মধ্যে ব্যাগ-ট্যাগ, কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে কুষ্ঠাশ্রম থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে এসে দেখলাম পুরো পৃথিবীটাই যেন একটা উপাসনালয় হয়ে রয়েছে। ফুলের গন্ধ, সোনালি রোদ, পাখির গান। যেন একটু আগেই ঈশ্বর এখান দিয়ে হেঁটে গেছেন। এত কনফিডেন্স পেলাম, কী বলব।

পুরোনো আমলের একটা ফিয়াট গাড়ি নিয়ে গেটের বাইরে বিরাজ কাপালির ড্রাইভার আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। যিশুর নাম নিয়ে রওনা হয়ে পড়লাম। শুনতে পেলাম শিপ্রাদি পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলছেন, ওষুধগুলো কিন্তু নিয়ম করে খাবি রুদ্র। সেরে গেছিস ভেবে বন্ধ করবি না। চোখে জল চলে এল। আবারও মনে হল, ঈশ্বর এই কুষ্ঠাশ্রমের ক্যাম্পাসের মধ্যেই থাকেন। ঈশ্বর নন, ঈশ্বরী।

চেনা জায়গা ছাড়িয়ে যেতেই কিন্তু আমার সব কনফিডেন্স উবে গিয়ে মনের ভেতরে একটা উদ্বেগ কাজ করতে শুরু করল। উদ্বেগটা ওই চাকরি নিয়েই। কেমন চাকরি—আমি সামলাতে পারব কিনা—সেসব কিছুই তো এখনো জানলাম না। ড্রাইভার-সাহেবের সঙ্গে একটু খেজুর করে কথা বার করবার চেষ্টা করলাম, লাভ হল না। ভদ্রলোক খেজুরের আঁটির চেয়েও কঠিন। তবে গাড়ি যখন আসানসোলের কাছাকাছি পৌঁছেছে তখন ড্রাইভার-সাহেবের মোবাইলটা বেজে উঠল, উনি স্টিয়ারিং-এ একটা হাত রেখেই কলটা রিসিভ করলেন। দু-একবার হ্যাঁ স্যার, না স্যার বলে পেছনদিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ধরুন। স্যার আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।

ফোনটা কানে নিয়ে বললাম, হ্যালো।

রুদ্র বলছ? আমি বিরাজ কাপালি বলছি ভাই।

গলার স্বরটা অসম্ভব স্নিগ্ধ। আর তেমনি আন্তরিক। শুনেই মন ভালো হয়ে গেল। বললাম, বলুন স্যার।

কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো? আমি প্রশান্তকে বলে রেখেছি, তোমরা আসানসোলে ব্রেকফাস্ট করে নেবে। আর ও তোমাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেটা আমারই একটা প্রোজেক্ট। ওখানে তোমার থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছি। আজ সারাদিন বিশ্রাম নাও। আমি পরে তোমার সঙ্গে দেখা করে কাজের কথা বলে নেব, কেমন?

আচ্ছা স্যার।

ওখানে যারা রয়েছে, তারা অ্যাকচুয়ালি আউটসাইডার। কিছুদিনের জন্যে ওদের থাকতে দিয়েছি। তবে ওরা মানুষ ভালো। তবু বলছি, ওদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা কোরো না। পরে তোমাকে ডিটেলে সব বলব।

আচ্ছা স্যার।

উনি বললেন, মুশকিল হচ্ছে, ওই পুরো এরিয়াটায় মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া যায় না। তাই এখনই কথা বলে নিলাম। আচ্ছা রাখছি তাহলে? চলো, বেস্ট অফ লাক।

থ্যাঙ্কিউ স্যার।

আমি ফোনটা প্রশান্তবাবুর হাতে ফিরিয়ে দিলাম। ওঁর ওইটুকু কথাতেই একটু আগের সেই উদ্বেগ পুরোটাই কেটে গেল। বেশ ফুরফুরে মন নিয়ে আসানসোল-বাইপাসের ধারে একটা পাঞ্জাবি ধাবায় আচার দিয়ে আলুর পরোটা আর মালাই চা খেলাম। তারপর আবার জার্নি শুরু করে, শেষমেষ দুপুর একটা নাগাদ আমাদের গন্তব্যে পৌঁছলাম।

গাড়ি থেকে নেমে কিন্তু পুরো ভ্যাবলা বনে গেলাম। এই তো কুড়ি-মিনিট আগে ভিড়ে-ঠাসা শেয়ালদা স্টেশন পার হলাম। তারপর রাস্তার ধারের সাইনবোর্ডগুলো দেখে মনে হয়েছিল বেলেঘাটা বলে একটা জায়গার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। সেটাও খুবই জমজমাট জায়গা ছিল। কিন্তু তারপর একটা খালের পাশ দিয়ে দু-একটা মোড় নিতেই এ কোন আশ্চর্য জায়গায় এসে পড়লাম! শিয়ালদা স্টেশনের এত কাছে এরকম নির্জন একটা জায়গা থাকতে পারে!

রাস্তাটার একদিকে উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা টানা লম্বা একটা জমি। তার মাঝখানে একটা বন্ধ কারখানা। অন্যদিকেও একটা পাঁচিল, তবে সেটা নীচু আর জায়গায়-জায়গায় ভাঙা। নীচু পাঁচিলটার ওদিকে অনেকখানি এবড়োখেবড়ো জমি পেরিয়ে ব্যারাকবাড়ির মতন কয়েকটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল। ওগুলো কী তা তখনো জানতাম না। পরে জেনেছি, ট্যাংরা স্লটার-হাউস, মানে কসাইখানা।

তার মানে ব্যাপারটা যা দাঁড়ালো, একটাই নির্জন রাস্তা—তার একপাশে একটা বন্ধ কারখানা আর অন্যপাশে কসাইখানার পেছনদিকের পোড়ো জমি। পুরো রাস্তাটায় বাড়িঘর দোকানপাট এসব কিছুই নেই। রাস্তাটাও ভাঙাচোরা। দেখেই বোঝা যায়, বহুদিন পিচ পড়েনি।

ড্রাইভার প্রশান্তবাবু ওই বন্ধ কারখানাটার গেটের সামনে গাড়ি পার্ক করেছিলেন।

দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কারখানাটা বহু পুরোনো। একটাই বিশাল শেড, তার পাতলা ইটের দেয়াল, আর্চ করা টালির ছাদ। দেয়ালের গা থেকে পলেস্তারার বারোআনাই খসে পড়েছে। স্কাইলাইটের কাচগুলোরও একই দশা। ছাদের মাঝ-বরাবর একটা ইটের চিমনি। ওরকম ইটের চিমনি বোধহয় একশো বছর আগে তৈরি করা হতো।

নেমে পড়ুন। ভেতরে গাড়ি ঢুকবে না। বাকিটা পায়ে হেঁটে চলে যান।

প্রশান্তবাবুর কথায় চমকে উঠলাম। উনি কি ওই পরিত্যক্ত কারখানাটার মধ্যে ঢোকার কথা বলছেন? হ্যাঁ, তাই তো। আঙুল তুলে ওইদিকেই তো দেখাচ্ছেন দেখছি।

অগত্যা হাতে ব্যাগ ঝুলিয়ে গাড়ি থেকে নেমে, কারখানার গেটের দিকে হাঁটা লাগালাম। প্রশান্তবাবু গাড়ি নিয়ে চলে যাবার আগে বেশ কয়েকবার হর্ন বাজিয়ে দিয়ে গেলেন। বুঝলাম, ওটা আমার আগমন বার্তা। কাদের উদ্দেশে কে জানে।

কাছে গিয়ে দেখলাম, পুরো কম্পাউন্ডটাকে ঘিরে দু-মানুষ সমান উঁচু একটা পাঁচিল, যেটাকে রিসেন্টলি মেরামত করা হয়েছে। চুন-সুরকির পাশাপাশি সিমেন্টের পলেস্তারাই তার প্রমাণ। পাঁচিলের মাথায় কাঁটাতারের বেড়া। স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি ফটকের পাল্লা-দুটোও নতুন। অর্থাৎ একটা বহু পুরোনো কারখানা ঘিরে নতুন করে সিকিউরিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কে জানে কেন!

ফটকের পাল্লাদুটো চেন-তালা দিয়ে এমন করেই বাঁধা ছিল যে, একজন মানুষ ফাঁক দিয়ে গলে ভেতরে ঢুকতে পারে।

আমি পাল্লার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

কারখানা-বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছিয়ে ঘাড় তুলে ওপরদিকে তাকালাম। দেখলাম ছাদের কার্নিশের নীচে পঙ্খের কারুকার্য করে রোমান হরফে লেখা আছে 'BAVERIA PORCELAIN INDUSTRY—1949'।

পোর্সেলিন! মানে চিনেমাটি? মনে-মনে কপাল চাপড়ালাম। শেষকালে কাপ-ডিশ বানাতে হবে? মুখে কিছু বললাম না অবশ্য। জানতাম, ভিক্ষের ঝোলায় দেরাদুন রাইস পড়ল না মিনিকিট দেখতে নেই।

কারখানা-ঘরের দরজাটা এতক্ষণ বন্ধ ছিল। সামনে গিয়ে দাঁড়ানো-মাত্রই দরজা খুলে দুজন মানুষ বাইরে বেরিয়ে এল—একজন মেয়ে, একজন মরদ। মেয়েটির গড়ন ছিপছিপে, গায়ের রঙ শ্যামলা। দেখে মনে হল ত্রিশের আশেপাশে বয়স হবে। গাছকোমর বেঁধে শাড়ি পরেছিল। সিঁথিতে সিঁদুর ছিল না। বড়-বড় চোখে মেয়েটা আমাকে দেখছিল আর ঝকমকে দাঁতের আলো ছড়িয়ে হাসছিল।

পুরুষটির বয়স চল্লিশের কিছুটা ওপরে। হাইট বেশি নয়, কিন্তু চেহারাটা সলিড। শরীরের প্রতিটি পেশি যেন আলাদা করে গুনে নেওয়া যায়। আর তেমনি রোমশ। পিঠ বুক তো ছেড়েই দিলাম, কাঁধ থেকে থেকে বাহুর ওপরের অংশটা অবধি ঘন লোমে ঢাকা। মাথার কাঁচাপাকা চুল কদমছাট করে ছাটা। গায়ে জামা ছিল না, শুধু একটা নীল লুঙ্গি হাফ করে জড়ানো ছিল কোমরে।

মেয়েটা হাসতে-হাসতেই বলল, এসো রুদ্র। আমার নাম হাসি মণ্ডল। তুমি হাসিদি বলে ডেকো। আর এ হচ্ছে পঙ্কজদা। পঙ্কজ মিদ্যা।

হাসিদি? নামটা শুনেই আমার মনে হল, এটা ওর আসল নাম নয়। ওর হাসিমুখ দেখেই লোকে নিশ্চয় ওর নাম দিয়েছে হাসি।

আমাকে চমকে দিয়ে পঙ্কজ নামের লোকটি মুখ দিয়ে একটা গোঙানির মতন আওয়াজ করল। বুঝলাম, বেচারা বোবা; তবে কানে নিশ্চয় শুনতে পায়।

হাসিদি আর পঙ্কজদার সঙ্গে পায়ে-পায়ে দরজা পার হয়ে কারখানার ভেতরে ঢুকলাম। আমি ভেতরে ঢোকামাত্রই ওরা রাক্ষুসে দরজার পাল্লাদুটোকে চেপে বন্ধ করে দিল। আমার অন্তরাত্মা বলে উঠল, তোমার জীবনটা এই এক্ষুনি পালটে গেল হে রুদ্রনাথ। ভালোর দিকে পালটাল না মন্দের দিকে, বলতে পারব না। তবে পালটাল।

দুই

দিনেরবেলা বলে তখন ঘরের সিলিং থেকে ঝোলানো বালবগুলো নেভানো ছিল। ছাদের দুটো স্কাইলাইট ছাড়া বাইরের আলো ঢোকার আর কোনো রাস্তা ছিল না, তাই বেলা একটার সময়েও সন্ধেবেলার মতন ছায়া জমে ছিল ঘরটার মধ্যে।

সেই ছায়ায় চোখ সয়ে আসার পরে বিশাল এবং আয়তাকার ঘরটাকে ভালো করে দেখতে পেলাম। পায়ের নীচে পাথরের ইট দিয়ে বাঁধানো মেঝে। বিশ-ফুট উঁচুতে উল্টোনো জাহাজের খোলের মতন অবতল সিলিং, যার গা থেকে লোহার চেনে একসারি ল্যাম্পশেড ঝুলছে। ল্যাম্পশেডের পাশাপাশি ঝুলছে কম্বলের মতন পুরু ঝুলকালির চাদর। মেঝের মাঝ বরাবর খড়খড়ে অমসৃণ কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো, লম্বা একটা টেবিল। চওড়ায় সেটা হবে প্রায় পাঁচ ফুট। টেবিলের নিচে ওইরকমই পালিশ-ছাড়া কাঠের তৈরি লো-বেঞ্চ। টেবিলের ওপরে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে লোহার বড়-বড় চিমটে, কাঁচি আর ব্লো-পাইপ। বুঝতে অসুবিধে হয় না, ওটা ওয়ার্কিং-টেবল। ওই বেঞ্চে বসেই কারিগরেরা কাজ করেন...কিম্বা করতেন।

দূরের দেওয়ালে লোহার পাল্লা দিয়ে যে আলমারি-সাইজের ফোকরটা ঢাকা দেওয়া রয়েছে সেটা নিঃসন্দেহে একটা ফার্নেস—কারণ, চারপাশের দেয়ালের পাথরের লাইনিং পুড়ে কালো হয়ে গেছে।

তার মানে এতক্ষণ যেটাকে বন্ধ কারখানা ভাবছিলাম, সেটা পুরোপুরি বন্ধ নয়। কিছু কাজকর্ম এখনো হয় এখানে!

সবচেয়ে বেশি চোখ টানল ঘরটার চার-দেয়ালের গায়ে সারিসারি কাঠের র‌্যাকের ওপরে সাজিয়ে-রাখা চিনেমাটির বাসনপত্র আর ভাস্কর্য। ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির প্রোডাক্টই হবে নিশ্চয় ওগুলো। প্রশ্ন হচ্ছে কবেকার প্রোডাক্ট?

কাছাকাছি যে র‌্যাকটা ছিল, সেটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। র‌্যাকটার ওপরে স্তূপ করে সাজানো ছিল নানান সাইজের নানান শেপের পোর্সেলিনের প্লেট। সামনে যে প্লেটটা ছিল সেটার গায়ে আলতো করে একবার আঙুল বুলিয়ে আনলাম। আমার আঙুলের ডগায় উঠে এল পুরু ধুলোর সর। তার মানে আমার সন্দেহটা ঠিক। এগুলো বহুদিন না ভুল বললাম, বহুবছর ধরে এখানে পড়ে আছে।

এখন তাহলে কী তৈরি হয় এখানে? কী বানায় হাসিদি আর পঙ্কজদা? অবশ্য কাপালি স্যার তো বললেন, ওরা আউটসাইডার। সেক্ষেত্রে ওরা কারখানার কাজে হাত লাগাবে না সেটাই স্বাভাবিক।

বোধহয় আমার কোঁচকানো ভুরুদুটো দেখেই হাসিদি আবার হেসে উঠল। বলল, ভাই, কারখানা-ঘর পরে একসময় ভালো করে দেখিয়ে দেব তোমায়। এখন চান খাওয়া সেরে নেবে চল। সেই কোন সকালে বেরিয়েছ। এই পঙ্কজদা, রুদ্রকে ওর ঘর দেখিয়ে দাও।

পঙ্কজদা মুখে গোঁ-গোঁ আওয়াজ করে আর হাত-মুখ নেড়ে ওর পেছন-পেছন যাওয়ার জন্যে আমাকে ডাকল। ইশারাতেই বুঝিয়ে দিল, যেহেতু আমি খোঁড়া, তাই আমাকে সাবধানে পা ফেলতে হবে, না-হলে মেঝের উঁচু-নীচু পাথরের ইটে ঠোক্কর খেয়ে পড়ে যাব। ও নিজে অবশ্য দিব্যি তুড়িলাফ মেরে চোখের পলকে ঘরটার পেছনের দেয়ালে আরেকটা যে দরজা ছিল, সেটা দিয়ে বেরিয়ে গেল।

ওর পেছন-পেছন আমিও সেই দরজা পেরিয়ে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা একটা বিশাল উঠোনের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। মনে হল অন্তত দুটো টেনিস-কোর্ট অনায়াসে ওই উঠোনটার মধ্যে এঁটে যাবে।

ফাঁকা উঠোন। তার শেষ-প্রান্তে দু-খানা লম্বাটে একতলা বাড়ি। বাড়িদুটোর দেওয়ালে সাদা চুনকাম, লাল টালির ছাদ। মাঝখানে কুঁয়োতলা আর ছোট একটা ফুলের বাগান। বাঁ-দিকের বাড়িটার বারান্দার গায়ে সার-সার চারখানা ঘর। দু-প্রান্তের দুটো ঘরের দরজা খোলা, মাঝের ঘরদুটোর দরজা তালাবন্ধ। পঙ্কজদাকে ফলো করে, খোলা ঘরদুটোর মধ্যে একটায় ঢুকে পড়লাম।

দিব্যি ঘরখানা। চারটে বড় বড় জানলা। পঙ্কজদা জানলাগুলো খুলে দিতেই লাল সিমেন্টের মেঝের ওপরে রোদ্দুরের চারটে চৌখুপি খুলে গেল আর তাদের বুকে বাগানের পেঁপে পাতার ইকড়ি-মিকড়ি ছায়া নাচতে শুরু করল। ঘরটার একপাশে নতুন বেডকাভারে ঢাকা তক্তপোশের বিছানা। তা ছাড়াও টেবিল-চেয়ার, দেয়াল-আয়না আর একটা ছোট আলমারিও ছিল। বুঝতে অসুবিধে হল না, সবটাই কাপালি স্যারের নির্দেশে হয়েছে।

পঙ্কজদা ইশারায় বুঝিয়ে দিল, অন্য প্রান্তের খোলা ঘরটায় ও নিজে থাকে।

আমি জিগ্যেস করলাম, আর হাসিদি?

পঙ্কজদা আঙুল তুলে বাগানের ওপাশের বাড়িটার দিকে দ্যাখাল।

মনে-মনে বললাম, এই পাঁচিলঘেরা স্বর্গের বাগানে কি শুধু অ্যাডাম আর ইভই থাকে নাকি? এরা দুজন কি স্বামী-স্ত্রী? না তো। হাসিদি তো ওকে 'পঙ্কজদা' বলে ডাকছে।

ভাগ্যিস মনে-মনে বলেছিলাম, কারণ, কখন যে হাসিদি আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে ছিল খেয়ালই করিনি। হাসিদি বলল, রুদ্র! চান করার জন্যে কিন্তু ও বাড়িতে যেতে হবে। এ-বাড়ির দালানের শেষ-মাথায় একটা বাথরুম আছে ঠিকই, তবে ওখানে চৌবাচ্চা নেই।

আমি ঘাড় হেলালাম। হাসিদি আবার বলল, আমাদের রান্নাঘর, খাবার ঘর, এই কাচ-কারখানার স্টোররুম, সব ওই বাড়িতে। আরো দুটো ঘর আছে—একটা আমি থাকি আর অন্যটায় বিশাখা।

বিশাখা?

সে আছে একজন। খাবার সময় তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। এখন তুমি চল, চান করে নেবে।

বললাম, যাও। আমি আসছি। তারপর একটু ইতস্তত করে যে-প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল, সেটা করেই ফেললাম। বললাম, ইয়ে...বিশাখা কি পঙ্কজদার বউ?

হাসিদির এবারের হাসিটা আর অতটা সোজাসাপটা লাগল না। কেমন যেন বাঁকা হেসে বলল, তাহলে দুজনে দু-বাড়িতে থাকে? তোমার বিয়ে হয়নি, তাই না?

মনে-মনে জিভ কাটলাম। প্রশ্নটা বোকার মতন হয়ে গেছে সত্যি।

হাসিদি একটু চাপা-গলায় বলল, কেউ কারুর বর নয়। কেউ কারুর বউ নই। তারপরেই যে-কথাটা বলল, সেটার জন্যে একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। বলল, যে খারাপ চিন্তাটা করছ সেটা মাথা থেকে সরিয়ে ফেল। কারণ পঙ্কজদা পুরুষমানুষ নয়।

আমি বিছানার ওপরে ব্যাগটা রেখে গামছা, পাজামা এইসব বার করছিলাম। হাসিদির শেষ কথাটা শুনে ওই অবস্থাতেই স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। হাসিদি সেটা খেয়াল করল কিনা জানি না, আর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের বাড়ির দিকে চলে গেল। কিন্তু আমার মাথার মধ্যে ওর শেষ কথাটা রাগি-ভিমরুলের মতন পাক খেতে লাগল—পঙ্কজদা পুরুষমানুষ নয়...পঙ্কজদা পুরুষমানুষ নয়।

আমার মাথা থেকে একটা খারাপ-চিন্তা সরাতে গিয়ে হাসিদি আরো খারাপ একটা চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। হাসিদি কেমন করে বুঝল পঙ্কজদা পুরুষমানুষ নয়? বোঝার চেষ্টা করেছিল নিশ্চয়ই। নাকি, অন্য কারুর কাছ থেকে শুনেছে? কিন্তু কার কাছ থেকেই বা শুনবে? বিরাজ কাপালির মতন একজন বড়মাপের মানুষ কি এইসব নিয়ে আলোচনা করবেন?

ঘাড় ঘুরিয়ে খোলা-দরজার ভেতর দিয়ে দালানের দিকে তাকালাম। দেখলাম, আমার দিকে পিছন ফিরে, বুকের ওপরে দু-হাত জড়ো করে পঙ্কজদা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি পেছনদিক থেকে ওর বাদামি লোমে ঢাকা চওড়া কাঁধ পিঠ আর কোমর দেখতে পাচ্ছিলাম।

যাই হোক, শরীরটা খুব ক্লান্ত ছিল বলেই বোধহয় ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির নৈতিক পরিবেশ নিয়ে আর ভাবতে ভালো লাগছিল না। চটপট স্নান সেরে খাবার ঘরে গিয়ে বসলাম।

আমি ঘরে ঢোকামাত্রই পঙ্কজদা আর হাসিদি দুজনেই অবাক হয়ে আমার পায়ের দিকে তাকাল। হাসিদি বলল, একি! তুমি পাজামার সঙ্গে জুতো পরে আছ কেন? একজোড়া চটি পরলে আরাম লাগত না?

আমি ক্লিষ্ট হেসে বললাম, পারি না গো দিদি। চটি পরে হাঁটতে পারি না।

পঙ্কজদা ইশারায় প্রশ্ন করল, সবসময় জুতো পরে থাকো?

আমি বললাম, হ্যাঁ, চব্বিশঘণ্টা। শোয়ার সময়েও। ডাক্তারবাবু সেরকমই বলেছেন। তবে তোমরা ভয় পেও না। আমার শরীরে আর রোগ নেই। ইনফেকশন ছড়াব না।

হাসিদি তাড়াতাড়ি বলল, না না। ভয় পাইনি। কাপালি স্যার আমাদের সব বলেছেন। আমি তোমার আরামের কথা ভেবে বলছিলাম আর কি। যাই হোক, বসে পড়ো।

রান্না করা ভাত ডাল তরকারি আর মাছের পাত্রগুলো টেবিলের মাঝখানে নামানো ছিল। আমি, হাসিদি আর পঙ্কজদা যখন যে যার নিজের থালায় ভাত তুলে নিচ্ছি, তখনই পাশের কিচেন থেকে একটা মেয়ে হাতে একটা প্লেটে স্রেফ একটু ফ্যানেভাত নিয়ে বেরিয়ে এল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে অল্প হেসে, টেবলে নয়, মেঝের এককোনায় উবু হয়ে বসল। একগ্রাস ভাত মুখে পুরে আবার তাকাল আমার দিকে। সেই-দৃষ্টিতে কেমন অদ্ভুত এক মায়া ছিল। মনে হচ্ছিল ও যেন দৃষ্টি দিয়েই আমাকে আদর করছে।

হাসিদি বলল, রুদ্র, এই হচ্ছে বিশাখা।

বুঝতে পারছিলাম অন্যায় হচ্ছে, তবু আমি বিশাখার দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম। বিশাখাও আমাকে দেখছিল। এমনভাবে দেখছিল যেন বহুদিন পরে কোনো আপনজনকে দেখছে।

আমার মুগ্ধ হওয়ার মধ্যে অন্যায় কিছু ছিল না। বিশাখাকে এককথায় বলা যায় পরমা-সুন্দরী। আমারই মতন বয়স হবে ওর; কিম্বা দু-একবছর বেশি। দুধে-আলতা গায়ের রঙ, দেবীপ্রতিমার মতন গড়ন। মাথাভর্তি কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল পিঠ ছাপিয়ে কোমর অবধি নেমে এসেছে। সবথেকে আশ্চর্য ওর চোখদুটো। টানা-টানা দুই চোখের পাতা যেন ভারী হয়ে চোখের মাঝখান অবধি নেমে এসেছে, আর তাই মণিদুটো কখনোই পুরোটা দেখা যায় না। একেই বোধহয় 'মদালসা আঁখি' বলে—দেখলে মনে হয় যেন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন।

একটা সাদারঙের কোরা কাপড় দিয়ে গলা থেকে পা অবধি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছিল মেয়েটা। শুধু কনুই থেকে হাতদুটো বাইরে বেরিয়েছিল। শাড়ি পরার অমন ধরণ আমি কখনো দেখিনি।

ঘোর কাটিয়ে ওকে জিগ্যেস করলাম, তোমার বাড়ি কোথায়, বিশাখা?

বিশাখা ভাতের থালার দিকে মুখ নামিয়ে উত্তর দিল, শিয়ালদায়।

বললাম, তুমি ওরকম সাদা ভাত খাচ্ছ কেন? শরীর খারাপ? নাকি ব্রতআচ্চা আছে?

বিশাখা উত্তর তো দিলই না, বরং আমাকে চরম অপ্রস্তুত করে, ভাতের থালা নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল। বোধহয় নিজের ঘরে বসেই খাওয়া শেষ করবে।

আমি কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। তারপর হাসিদির দিকে তাকালাম। দেখলাম ও মুখ নীচু করে বসে আছে। একটু বাদে ও মুখ তুলে খুব আন্তরিকভাবে বলল, কিছু মনে কোরো না রুদ্র। বিশাখা ওইরকমই। হঠাৎ হঠাৎ ওর মুড চেঞ্জ হয়।

শান্ত হওয়ার বদলে আমার মাথার ভেতরটা রাগে কিরকির করে উঠল। বললাম, কেন? অ্যাবনর্মাল নাকি?

হাসিদি বলল, না। অ্যাবনর্মাল নয়। তোমাকে পরে বলব।

কথাটা শুনেই মাথার মধ্যে কী যেন একটা হয়ে গেল। আমি হাতের থালাবাটিগুলো ঝড়াং করে টেবিলের ওপরে নামিয়ে রেখে হাসিদির দিকে ঝুঁকে পড়ে চিৎকার করে বললাম, এর মানে কী বলো তো। কী হচ্ছে এখানে? এটা ঢপের কারখানা; এখানে কিচ্ছু তৈরি হয় না। আর তোমাদের মধ্যে একজন বোবা, একজন খেপি। ওই কাওয়ালি না কি যেন লোকটা, ও কি এখানে পাগলাগারদ বানাচ্ছে নাকি?

পঙ্কজদা এতক্ষণ চুপ করে খেয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎই সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে, বাঁ-হাতের চেটো দিয়ে আমার বুকে আলতো করে একটা ঠেলা মারলো। এত জোর ছিল সেই সামান্য ঠেলাটুকুর মধ্যে যে, আমি এই ছ'ফুটিয়া শরীর নিয়েও টলমল করে চার-হাত পিছিয়ে গেলাম।

হাসিদি পঙ্কজদার দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠল, আঃ! কী হচ্ছে কী পঙ্কজদা? পঙ্কজদা ততক্ষণে আবার খাওয়ায় মন দিয়েছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছিল কিছুই হয়নি।

হাসিদি এবার আমার দিকে তাকিয়ে শান্তগলায় বলল, কাল তো কাপালি স্যারের সঙ্গে তোমার দেখা হবেই। উনি বলে গেছেন তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন। যা জানার তাঁর কাছ থেকেই জেনে নিও। তবে একটা জিনিস জেনে রাখো, আমি, পঙ্কজদা বা বিশাখা হয়তো আর দশজন লোকের মতন নই। কিন্তু তার মানেই আমরা অ্যাবনর্মাল নই।

তখনকার মতন কথাগুলো বিশ্বাস করে নেওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। ভাবলাম, সত্যিই যদি কাপালি স্যারের সঙ্গে দেখা হয় তাহলে আর এদের চাপ দিই কেন। তাঁর সঙ্গেই হেস্তনেস্ত করা যাবে। তখনই ঠিক করব এখানে থাকব কি থাকব না।

কিচেনের সিঙ্ক থেকে বাসনগুলো ধুয়ে নিয়ে আবার যখন ডাইনিং-রুমে ফিরলাম, তখনো হাসিদি আর পঙ্কজদার খাওয়া শেষ হয়নি। আমি ওদের সঙ্গে আর একটাও কথা না বলে, আমার জন্যে নির্দিষ্ট ঘরটায় ঢুকে ভেতর থেকে খিল তুলে দিলাম। তারপর বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে আজ ভোর থেকে যা-যা ঘটে চলেছিল সেগুলোকে মাথার মধ্যে সাজাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। খুব ক্লান্ত ছিলাম বলেই একটু বাদেই দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে এল।

সেই ঘুম ভাঙল একেবারে সন্ধে ছ'টায়। তাড়াহুড়ো করে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলাম, হাসিদি আর পঙ্কজদা রান্নাঘরের সামনের বারান্দায় চুপ করে বসে আছে। আমাকে দেখে হাসিদি বলল, এসো রুদ্র, বসো। চা খাও।

হাসিদি আমার হাতে কাগজের কাপ ধরিয়ে দিল। পঙ্কজদা রান্নাঘর থেকে কেটলিতে চা গরম করে এনে কাপে ঢেলে দিল। তারপর বাগানের গাছে জল দিতে উঠে গেল। কিন্তু আমার চোখ খুঁজছিল বিশাখাকে। ওকে কোথাও দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিছুক্ষণ দোনামোনা করে হাসিদিকে জিগ্যেস করেই ফেললাম, সেই অহঙ্কারী মেয়েটা কোথায়?

হাসিদি আমার কথা শুনে হেসে ফেলল। বলল, এখনও রাগ পুষে রেখেছ ওর ওপরে? আশ্চর্য ছেলে তো তুমি! ও যে কতটা অসহায়, সেটা নিজের চোখে দেখলে বুঝতে পারবে। যাও, দেখে এসো।

কোথায় যাব? আমি জিগ্যেস করলাম।

হাসিদি বলল, আসবার সময় খেয়াল করেছ নিশ্চয়, কারখানা-ঘরের বাইরের জমিটায় কয়েকটা বড় গাছ আছে। ওখানেই বিশাখাকে পেয়ে যাবে।

এমনিতে যেতাম না। একজন প্রায় অপরিচিত মেয়ের সম্বন্ধে অত কৌতূহল দেখাবই বা কেন? কিন্তু ওই যে, হাসিদি বলল, ও কতটা অসহায় বুঝতে পারবে, ওই কথাটা মনে হল বিশেষ ইঙ্গিতপূর্ণ। মনে হল, ও আমাকে যাওয়ার জন্য ইনসিস্ট করছে। আমি চায়ের কাপটা ময়লার বালতির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, উঠোন পেরিয়ে কারখানা-ঘরের মধ্যে ঢুকলাম।

দুপুরে যখন প্রথমবার ঢুকেছিলাম এই ঘরে, তখন যতটুকু আলো ছিল, এখন তাও নেই। আকাশের আলো নিভে গেছে বলে স্কাইলাইটের আলো নেই। সুইচবোর্ড কোথায় জানি না। সঙ্গে একটা টর্চ নিয়ে আসার কথা বলা উচিত ছিল হাসিদির।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটাই যে, ঘরটায় কোনোরকমের আলো না থাকলেও আমি সবকিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। ওয়ার্কিং-টেবলের পায়া, দেওয়ালের র‌্যাকে সাজিয়ে রাখা পুরোনো পোর্সেলিনের বাসনকোসন আর মূর্তি, এমনকী আমার পায়ের কাছে পাথরের মেঝের ওপরে পড়ে-থাকা একটা মরা আরশোলা অবধি। একবার সন্দেহ হল, কোনো অজ্ঞাত কারণে বেড়ালের মতন অন্ধকারে দেখবার ক্ষমতা পেয়ে গেলাম না তো? তারপরেই বুঝতে পারলাম, তা নয়। আসলে এই ঘরের প্রত্যেকটা জিনিস থেকে ফসফরাসের মতন খুব হালকা একটা আভা বেরোচ্ছে।

কিছুক্ষণ লাগলো সেই ঘোর কাটিয়ে উঠতে। তারপর সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাইরের বাগানে। দেখলাম হাসিদি কিছু ভুল বলেনি। ঢুকবার সময় অন্যান্য চিন্তায় খেয়াল করিনি, কিন্তু সত্যিই বিশাল কারখানা-ঘরটাকে ঘিরে ইতস্তত নানারকমের গাছের জটলা রয়েছে। ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের মধ্যে গাছগুলোকে ভূতের মতন দেখতে লাগছিল। মাঝে মাঝে একটা দমকা হাওয়া আসছিল রাস্তার উল্টোদিকের ওই পোড়ো জমিটার দিক থেকে—সঙ্গে নিয়ে আসছিল পচা মাংসের গন্ধ, পরে যেটাকে জেনেছি ট্যাংরা স্লটার-হাউসের আবর্জনার গন্ধ বলে।

কিন্তু এসবের মধ্যে বিশাখা কোথায়? বিশাখাকে খুঁজে না পেলে জানব কেমন করে কী রহস্য লুকিয়ে আছে ওই মেয়েটার মধ্যে?

হঠাৎই দেখলাম, খুব উঁচু একটা গাছের গুঁড়ির কাছে ঊর্ধ্বমুখে একটা নেড়িকুকুর বসে আছে। ব্যাটা খুব নিবিষ্টমনে ঘাড় উঁচু করে কী যেন দেখছিল। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে একবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে করুণস্বরে ডেকে উঠল। বেচারা যে-কোনো কারণে ভীষণ ভয় পেয়েছে, সেটা ওর মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম। মনে হল ভয়ের চোটে অল্প-অল্প কাঁপছে। আমি কুকুরটার দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে গাছটার মগডালের দিকে তাকালাম।

ওটা বোধহয় অর্জুনগাছই হবে। মসৃণ সাদা বাকল। খুব উঁচু, তবে ডালপালার ঝাড় কিম্বা পাতার গোছা তেমন ঘন নয়। বাগানের জমিতে অন্ধকার নেমে এলেও গাছটার মাথার কাছে তখনো একটু সূর্যাস্তের আলো লেগে ছিল। সেই আলোয় দেখলাম একটা খুব সরু ডালের ওপরে বিশাখা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আমার প্রথমেই মনে হল এ বিশাখা নয়। ভূত। না-হলে যে সরু ডালে একটা কাক অবধি বসার আগে দুবার ভাববে, সেই সরু ডালের ওপরে ও কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? তাও আবার দু-হাত ছেড়ে? নেড়িকুকুরটা আবার চাপা কান্নার মতন আওয়াজ করে ডেকে উঠল।

হঠাৎই আমার বুকের রক্ত হিম করে দিয়ে বিশাখা ওই গাছের মগডাল থেকে সড়সড় করে নীচে নেমে এল।

ওর নেমে-আসার ধরনটা ছিল অদ্ভুত। কীভাবে বোঝাব জানি না। যেভাবে মোমবাতির গা বেয়ে গলন্ত মোমের ফোঁটা গড়িয়ে নামে, সেইভাবেই চোখের পলকে গাছের গুঁড়ি বেয়ে নেমে এলো বিশাখা। আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি, সেই সময়টুকুতে ওর আকৃতি কোনো মানবীর মতন ছিল না। ওর মুখ, ঘাড়, বুক, পেট সব মিলেমিশে একটা বিশাল মোমের ফোঁটার মতনই গোল হয়ে গিয়েছিল। তবে মাটিতে পড়ামাত্রই সেই বিন্দুটা আবার বিশাখা হয়ে উঠে দাঁড়াল। আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল।

কুকুরটা পেটের মধ্যে ল্যাজ ঢুকিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে কোথায় যে পালিয়ে গেল, বুঝতে পারলাম না। আমি কোনোরকমে তোতলাতে তোতলাতে বিশাখাকে বললাম, তুমি তুমি ওখানে কেমন করে? মানে এটা তো বিপজ্জনক মানে, পড়েও তো যেতে পারতে।

বিশাখা আমার কথার কোনো জবাব তো দিলই না। উলটে একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল। হঠাৎই আমার কাছে এগিয়ে এসে নিজের গালটা আমার গালে কিছুক্ষণ ঠেকিয়ে রেখে আবার পায়ে-পায়ে পিছিয়ে গেল। কি ঠান্ডা ওর গালটা। একেবারে বরফের মতন ঠান্ডা। তাছাড়া ওর গা থেকে একটা সুগন্ধ ভেসে আসছিল। গন্ধটা খুব চেনা। কিন্তু এতই তীব্র যে, আমার নাক জ্বালা করছিল।

এই হঠাৎ আদরে আমি স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। আমি হুঁশ ফিরে পাবার আগেই বিশাখা কারখানা ঘরের দরজার দিকে হাঁটা লাগাল। সেই চলে যাওয়ার মধ্যেও কোনোরকম ব্যস্ততা ছিল না। মনে হচ্ছিল ও যেন ঘুমের মধ্যে হাঁটছে।

হাসিদি বলেছিল, দেখে এসো বিশাখাকে। বুঝতে পারবে ও কত অসহায়।

আমি দেখলাম। কিন্তু ওর অসহায়তাটা যে কোথায় এখনো বুঝতে পারলাম না। মনে হল, আবার হাসিদির কাছেই ফিরে যাই। এইমাত্র যা দেখলাম আর বিশাখা যা করল সবটাই ওকে বলে জিগ্যেস করি, এসবের মানে কী? কিন্তু তার দরকার পড়ল না।

তিন

দরকার যে পড়ল না, তার কারণ, কারখানা-ঘরের দিকে যখন কিছুটা এগিয়ে গেছি, ঠিক তখনই বাইরের রাস্তা থেকে কেউ ডাকল—রুদ্র!

মহিলার গলা। অবাক হয়ে দেখলাম, কারখানার গেটের বাইরে হাসিদি দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ও এদিকে এলো কেমন করে! এই কারখানার যা প্ল্যান, তাতে ব্যারাকবাড়ি এবং তার লাগোয়া উঠোন থেকে বাইরে বেরোতে গেলে কারখানার ভেতর দিয়েই বেরোতে হবে। দ্বিতীয় কোনো রাস্তা তো নেই। আর আমি তো দাঁড়িয়ে রয়েছি কারখানা-ঘরের দরজার সামনেই। ওই দরজা দিয়ে তো হাসিদি বেরোয়নি। মনকে বোঝালাম, অন্য কোনো রাস্তা আছে নিশ্চয়ই, উঠোনের পাঁচিলের গায়ে কোনো ছোট গেট, যার ভেতর দিয়ে বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়া যায়।

আমার চোখে চোখ পড়তেই হাসিদি বলল, সব দেখেছি। বিশাখার পাগলামি ভাবছ তো? না। বিষয়টা তার চেয়ে অনেক গভীর। যাই হোক, এখন ওকে নিজের মতন থাকতে দাও। তুমি বরং আমার সঙ্গে চলো। সন্ধেটা খুব সুন্দর, একটু হেঁটে আসি।

একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম—বিশাখা ইতোমধ্যেই কারখানা-ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিয়েছে। আমি চেন-তালার ফাঁক দিয়ে গলে হাসিদির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

তখনো চৈত্রমাস শেষ হয়নি। আগের দিন বিকেলে একটা ছোটখাটো কালবৈশাখীও হয়ে গিয়েছিল। তাই সন্ধের পর বাতাসে ঠান্ডার আমেজ ছিল। আকাশের গায়ে শহর কলকাতার আলোর দীপ্তি, তাছাড়া আর কোথাও মহানগরীর কোনো চিহ্নমাত্র দেখতে পাচ্ছিলাম না। অবশ্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর একটা ভারী কিছু মাটির ওপরে আছড়ে পড়ার শব্দ ভেসে আসছিল। জিগ্যেস করলাম, কীসের আওয়াজ?

হাসিদি বলল, ক্রেন-হ্যামার। বাইপাশের ওদিকে মেট্রোরেলের কাজ হচ্ছে তো। এখান থেকে সোজাসুজি গেলে বেশি দূরে নয়, কিন্তু সেভাবে কেউ যেতে পারবে না। মাঝখানে ওই ট্যাংরা স্লটার-হাউস আছে, কবরখানা আছে। তোমাদের গাড়ি আজ দুপুরে যেভাবে পাক খেতে-খেতে এসেছে, ওইভাবেই যেতে হবে। এই রাস্তাটার নাম জানো?

আমি ঘাড় নাড়লাম।

কবরডাঙা রোড। তবে লোকজন বলে 'গোরে বিবি কি মহল্লা'। গোরে বিবি মানে 'সাদা চামড়ার স্ত্রীলোক'। তার কথা নিশ্চয় কাপালি স্যার বলবেন তোমাকে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ পাশাপাশি হাঁটলাম। তারপর যেন আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়েই হাসিদি বলল, জায়গাটা বেশ অদ্ভুত, তাই না? একবারও মনে হয়, কলকাতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছ?

আমি ঘাড় নাড়লাম। সত্যিই মনে হয় না।

একদিকে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির টানা পাঁচিল। অন্যদিকে ট্যাংরা স্লটার-হাউসের একইরকম পাঁচিলঘেরা মাঠ। মাঝখানে চাঁদের আলোয় ঘুমোচ্ছে গোরে বিবি কি মহল্লা। যতদূর চোখ যায় কোনো বাড়ি নেই, দোকান নেই। দুপাশে আকন্দ আর বনচাঁড়ালের ঝোপ। ওরকমই একটা ঝোপের গায়ে জাত-সাপের খোলশ ঝুলতে দেখলাম। দুটো বেজি ব্যস্তসমস্ত ভাবে আমাদের সামনে দিয়েই রাস্তা পেরিয়ে গেল।

বললাম, কলকাতায় কত গরিবলোক নেড়িকুকুরদের সঙ্গে মারপিট করে রাস্তার ধারে পড়ে থাকে। তারা কেউ কবরডাঙা রোডে থাকতে আসে না কেন?

হাসিদি বলল, জায়গাটার বদনাম তো আজকের নয়। এদিককার লোকজন প্রায় সত্তর বছর ধরে কবরডাঙাকে ভুতুড়ে জায়গা বলে জানে। রাস্তাটার দু-প্রান্তে দুটো বস্তি আছে। একটা তো নিশ্চয় আজ দুপুরে এখানে আসবার পথেই দেখেছ—যেটা পামার বাজারের দিকে পড়ে। অন্যটা ট্যাংরা সাইডে। এখানে কেউ আসবার চেষ্টা করলে বস্তির লোকেরাই তাকে আটকে দেয়। শুনেছি, নকশাল-পিরিয়ডে পুলিশ এখানে লাশ গুম করবার জন্যে ঢুকতে চেয়েছিল। পুলিশকেও ওরা ঢুকতে দেয়নি।

বললাম, তুমি এত কিছু জানলে কেমন করে?

হাসিদি বলল, জানবো না কেন? আমি যে ওই পামার বাজার বস্তিরই মেয়ে। আমার দাদু এই কারখানায় কাজ করেছেন।

কাচ কারখানায়?

না। তখন এটা ছিল ওষুধের কারখানা। সেটার মালিক ছিলেন কাপালি স্যারের দাদু। তারপর ওই বাড়িতেই চিনেমাটির বাসন বানাবার কারখানা তৈরি হল। কাপালি স্যারের দাদু ছিলেন সেই কারখানারও পার্টনার, তবে তখন আর বস্তির লোকেরা কাজ পায়নি। বাইরে থেকে কাজের লোক এসেছিল।

হাঁটতে-হাঁটতে আমরা দুজনে একটা অদ্ভুত জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলাম। মানে, আমার কাছে অদ্ভুত হাসিদির কাছে নিশ্চয় নয়। ঠিক ওই জায়গাটাতে কসাইখানার পাঁচিলটা হঠাৎই রাস্তা থেকে কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিল। ফলে রাস্তার ধারে একটা খালি জমির টুকরো বেরিয়েছিল। হাসিদি আমার হাতে টান দিয়ে রাস্তা ছেড়ে ওই জমিটার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।

ততক্ষণে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছিল, তাই ওখানে পৌঁছনোর আগে অবধি বুঝতে পারিনি যে, ওটা সাধারণ ঘাসজমি নয়। পুরোনো আমলের পাতলা-ইট দিয়ে বাঁধানো একটা চত্বর। চত্বরটার মাঝখানে ভাঙাচোরা বেদির মতন একটা স্ট্রাকচার। হাসিদি একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, এসো রুদ্র। এখানেই বসি।

তাই বসলাম।

আমাদের পেছনে একটা ঝাঁকড়া গাছের ডালে কী যেন একটা রাতপাখি মাঝে মাঝে ডানা ঝটপট করে উঠছিল। সেই শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না কোথাও।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পরে হঠাৎই হাসিদি একদম বিনা-ভূমিকায় বলল, এই পৃথিবীর ভেতরে আরেকটা পৃথিবী মিশে রয়েছে, বুঝলে। সরবতের মধ্যে যেভাবে চিনি মিশে থাকে, সেইভাবে। কেউ কেউ মাঝে মাঝে সেই অন্য পৃথিবীটায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে। সবাই নয়। হয়তো এক কোটি মানুষের মধ্যে একজন। যারা পারে তারাও সবসময়েও পারে না। কখনো-কখনো পারে। তখন তাকে দেখে এই পৃথিবীর লোকেরা ভাবে অদ্ভুত অ্যাবনর্মাল ভৌতিক।

কিন্তু মোটেই ওসব কিছু নয়। শুধু চলার ভঙ্গির তফাতের জন্যে কি কাউকে অ্যাবনর্মাল কিম্বা ভৌতিক বলা যায়? এই যে তোমাকে সারাক্ষণ পায়ে গোল জুতো পরে হাঁটতে হয়, তার জন্যে কি তোমাকে অ্যাবনর্মাল বলা উচিত? এটাই তো এখন তোমার স্বাভাবিক চলন, তাই না?

জিগ্যেস করলাম, তোমরা কি ওরকম?

হাসিদি ওপরে নীচে মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ ভাই। আমরা তিনজনেই ওরকম। আমি এখনো তোমার সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানি না। কাপালি স্যার বলেননি আমাদের। বলবেনও না। উনি আমাদের পছন্দ করেন না। শুধু আমাদের প্রভুর ভয়ে আমাদের এখানে থাকতে দিয়েছেন। তবে আমি নিশ্চিত, তোমার মধ্যেও কিছু ক্ষমতা রয়েছে। তুমিও নিশ্চয় কখনো-কখনো সেই অন্য পৃথিবীতে পা রাখতে পারো। না-হলে কাপালি স্যার নিজে তোমাকে এই কাচ কারখানায় নিয়ে আসতেন না।

মিথ্যে করে বললাম, না, আমি ওসব কিছুই পারি না। আমি খুব সাধারণ একটা ছেলে। এই একটা পৃথিবীই আমার কাছে টু মাচ; অন্য পৃথিবীর ভার আমি বইতে পারব না। কিন্তু তোমরা কেমন একটু বলবে। কী পারো তোমরা?

হাসিদি বলল, পঙ্কজদা আর বিশাখা সম্বন্ধে আমি যেটুকু জানি বলছি। এই কারখানায় আসবার আগে তো আমরা কেউ কাউকে চিনতাম না। তাই ওদের গোটা জীবনের কথা জানি না।

কারখানাটা মাঝখানে অনেক বছর বন্ধ হয়ে পড়েছিল জানো তো? দু-বছর আগে কাপালি স্যার এটাকে সারিয়ে-সুরিয়ে বাসযোগ্য করে তুলেছেন। তারও অনেক পরে, এই ধরো একমাস আগে আমরা এসেছি। আমরা এসেছি আমাদের প্রভুর নির্দেশে। তাঁকে খুব কম লোক চেনে, কিন্তু এখানে তাঁর আসন আছে।

কোথায়? আমি চমকে চারপাশে তাকালাম।

হাসিদি বলল, সবখানেই। এই পুরো গোরে বিবি কি মহল্লাতেই তাঁর অধিষ্ঠান। তিনিই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন। অবশ্য আমরা একসঙ্গে আসিনি দফায় দফায় এসেছি। আমাদের মধ্যে প্রথম এখানে এসেছিল পঙ্কজদা।

পঙ্কজদা যে বোবা তা তো দেখেছ। সেটা কথা নয়। বোবা তো অনেকই থাকে, কিন্তু পঙ্কজদা অন্যরকমের বোবা। ও একটা কী বলব...মাইকের মতন। মাইকের তো নিজের স্বর থাকে না, যন্ত্রটাকে হাতে নিয়ে যে কথা বলে তার গলাই মাইকের মধ্যে দিয়ে শোনা যায়।

অবাক হয়ে বললাম, কে কথা বলে পঙ্কজদার গলায়?

হাসিদি উত্তর দিল, যারা মারা গেছে, তারা। যে-আত্মারা সেই মুহূর্তে কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে, তারা পঙ্কজদাকে দেখলে লোভ সামলাতে পারে না। ওর মধ্যে দিয়ে তারা জীবিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে চলে আসে।

পঙ্কজদার বাড়ি ছিল সুন্দরবনের কোন একটা গ্রামে। বছর দুয়েক আগে কোটালের বানের তোড়ে ওর স্ত্রী আর দুই ছেলে ঘরের চাল চাপা পড়ে মারা যায়। ও ঠিক সেই-মুহূর্তে গোয়াল থেকে গরুগুলোকে ছেড়ে দেওয়ার জন্যে বেরিয়েছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল। তারপর থেকেই ও বোবা হয়ে যায়।

ওর গ্রামের লোকেরা প্রথমে ভেবেছিল, বোধহয় শোকে পাথর হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মাসখানেক কেটে যাওয়ার পরে পঙ্কজদা যখন অন্যান্য কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে করতে শুরু করল অথচ কথা বলল না, তখন সবাই বুঝল ও সত্যিকারেই বোবা হয়ে গেছে। ক্যানিং হাসপাতালে ডাক্তার-টাক্তার দেখিয়েছিল, লাভ হয়নি।

তারপর ক্রমশ ওই ব্যাপারটা সামনে এল। শুধু পুরুষদের নয়, কখনো মেয়েদের গলায়, কখনো বাচ্চাদের গলায় কথা বলে উঠতে লাগল পঙ্কজদা। অথচ ও কস্মিনকালেও যে হরবোলা ছিল না সেটা গ্রামের লোকেরা জানত।

হাসিদিকে ওর কথার মধ্যেই থামিয়ে প্রশ্ন করলাম, যেসব মৃতেরা ওর গলায় কথা বলত তারা কি ওর গ্রামেরই মানুষ?

উঁহু। ঘাড় নাড়লো হাসিদি। তাহলে তো একটা সন্দেহের জায়গা থাকত যে, পঙ্কজদা ওর চেনা লোকেদের গলার স্বর নকল করছে। কিন্তু অনেকসময় এমন কেউ এসে ওর গলার মধ্যে দিয়ে কথা বলে যেত যে হয়তো আগের দিনই অচেনা জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে বাঘের পাল্লায় পড়ে মরেছে। কিম্বা কিম্বা দূরের কোনো হাসপাতালে বাচ্চা হতে গিয়ে...আর পঙ্কজদা কেন, ওর গ্রামের কেউই তাদের নাম অবধি আগে কখনো শোনেনি। পঙ্কজদার গলায় তারা নিজেরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে যাওয়ার পরে সেই পরিচয় ধরে খোঁজ করতে গিয়ে ওর প্রতিবেশীরা জেনেছে, কোথাও ভুল নেই সত্যিই ক'দিন আগে অবধি অমন একজন মানুষ এই পৃথিবীতে ছিল।

তারপর? আমি জিগ্যেস করলাম।

তারপর যা হওয়া স্বাভাবিক, তাই হল। পঙ্কজ মিদ্যাকে তার গ্রামের লোকের ভয় পেতে শুরু করল। ওদের গ্রামে যত অকালমৃত্যু, যত দুর্ঘটনা, সবকিছুর জন্যে তারা এবার পঙ্কজদাকেই দোষারোপ করা শুরু হল। প্রথমে আড়ালে, তারপর সামনাসামনি। গালাগাল ক্রমশ মারধরে পৌঁছে গেল।

এদিকে বাস্তু-বাড়িটা ছাড়া ওই গ্রামে পঙ্কজদার আর বিশেষ কিছু ছিল না। বউ-ছেলেরা মারা যাওয়ার পর থেকে সেই ভিটেটাকেও অসহ্য বোধ হত। তাই পঙ্কজদা একদিন পালালো। কোথায় যাবে, কী করবে জানত না। জাস্ট ক্যানিং থেকে ট্রেনে উঠে শিয়ালদা স্টেশনে নেমেছিল। তবে শিয়ালদায় নামার পর ওকে যেন কেউ হাত ধরে এখানে, এই কারখানায় টেনে নিয়ে এসেছিল। কাপালি স্যার ওকে তাড়াননি। কারখানায় একজন কেয়ারটেকারেরও দরকার ছিল।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসিদি বলল, বিশাখাও নিজে থেকেই এখানে এসেছিল। তবে ওর হাঁটাচলা তো দেখেছ। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হাঁটে, তাই না? সেইজন্যেই ও পঙ্কজদাকে ডাক দিয়েছিল ওকে নিয়ে আসার জন্যে।

পঙ্কজদা ওকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে এসেছিল। সেই দৃশ্য আমি দেখেছি। কারণ আমি তার ক'দিন আগেই এখানে চলে এসেছিলাম।

এরকমই এক সন্ধেবেলায় পঙ্কজদার গলা দিয়ে একটা কমবয়েসি মেয়ের আকুল কান্না শুনে চমকে উঠেছিলাম। আমি নিজে এক অলীক রাজ্যের বাসিন্দা, রুদ্র। তবু সেদিন ওই দশাসই লোকটার গলায় সেই কান্না শুনে আমিও কেঁপে উঠেছিলাম। মেয়েটা কাঁদছিল আর বলছিল, আমি কিচ্ছু চিনতে পারছি না। আমাকে নিয়ে যাও। আমার খুব ভয় করছে। বাঁচাও আমাকে।

পঙ্কজদা সম্মোহিতের মতন কারখানা থেকে বেরিয়ে গেল।

তুমি দৃশ্যটা কল্পনা কর রুদ্র! একটা মেয়ের ডাক শুনে পঙ্কজদা তাকে উদ্ধার করতে চলেছে, যে-ডাকটা আসছে ওর নিজের গলার ভেতর থেকে। এর প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে পঙ্কজদা একটা মেয়েকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে উঠোনে পা রাখল।

সেই প্রথমদিনেও বিশাখার পরনে এইরকমই কোরা কাপড় জড়ানো ছিল। তবে কাপড়টা ছিল জলে কাদায় মাখামাখি। শুধু কাপড় নয়, ওর গোটা শরীর। আমি পঙ্কজদাকে বললাম, মেয়েটাকে কারখানা-ঘরের মধ্যে শুইয়ে দাও আর জল গরম করে নিয়ে এসো। একটা আব্রুর ব্যাপার আছে তো। আমাদের ওই ছোট্ট বাথরুমের মধ্যে একটা অচৈতন্য মেয়ের সব কাপড়-চোপড় খুলে ধোয়া-মোছা করানো সম্ভব নয়।

পরদিন ওর জন্যে পামার বাজার থেকে আরো বেশ কিছুটা সাদা মার্কিন কাপড়ের থান আর কয়েক শিশি অগুরু কিনে আনলাম। ততক্ষণে বুঝে গেছি, ও দুটি জিনিস ছাড়া ওর চলবে না। একটু আগে যখন বিশাখা তোমার গালে গাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন অগুরুর গন্ধ পাওনি?

তখন মনে করতে পারিনি। হাসিদির কথায় সুগন্ধীর নামটা মনে পড়ল। ঘাড় নেড়ে জানালাম, হ্যাঁ। পেয়েছিলাম।

তারপর বুঝলে রুদ্র, সেদিন যখন বিশাখার গা মুছিয়ে দিচ্ছি, তখনই প্রথম ওই বন্ধ-ফার্নেসের মধ্যে নিজে থেকে আগুন জ্বলে উঠতে দেখেছিলাম। সেদিনই তিনি প্রথমবারের জন্য আমাদের কাছে তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ রেখেছিলেন।

আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, বারবার কার কথা বলছ বলো তো?

হাসিদি বলল, পরে বলব। আগে কাপালি স্যারের কাছ থেকে ঘুরে এসো। এখন বললে বুঝতে পারবে না।

আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললাম, মনে হচ্ছে সবটাই বানিয়ে-বানিয়ে বলছ।

হাসিদি রাগল না। শান্তভাবেই প্রশ্ন করল, কেন?

তুমিই একটু আগে বলেছিলে, শুধু মৃত-মানুষদের আত্মারাই পঙ্কজদার মুখ দিয়ে কথা বলে। কিন্তু বিশাখা তো একটা জলজ্যান্ত মেয়ে। বানিয়ে বলতে গিয়ে তুমি নিজের গল্প নিজেই গুলিয়ে ফেলেছ।

হাসিদি মুচকি হেসে বলল, আর বিশাখা যদি জ্যান্ত মেয়ে না হয়? পঙ্কজদা সেদিন যখন ওকে পাঁজাকোলা করে ধরে কারখানায় ঢুকেছিল, তখন আমি কিন্তু ওর মধ্যে কোনো প্রাণের লক্ষণ দেখিনি। জানো তো, মরার পরে কিছুক্ষণ মানুষ বুঝতে পারে না যে, সে মারা গেছে। সেইজন্যেই বিশাখার আত্মা বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছিল। এর মধ্যে কোনো ভুল নেই।

আমি হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম।

হাসিদি বলল, বিশাখা এমনিতে মরাই। শুধু ওর শরীরটা মরেনি। মরবে না। ও জোম্বি হয়ে গেছে। দুপুরে বিশাখাকে ওর ফ্যানেভাত খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেছিলে না? ও প্রতিদিনই তাই খায়। জোম্বিরা নুন খেতে পারে না। ওর মাসিক হয় না। সেই যে কোরা কাপড় আর অগুরু দিয়ে ওর মৃতদেহকে ঢাকা হয়েছিল, সে দুটো জিনিসের মায়াও ছাড়তে পারে না। এরকম আরো অনেক রহস্য আছে মেয়েটার মধ্যে। আমাদের তিনজনের মধ্যে ওকেই মনে হয় প্রভু সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। কী জানি, হয়তো মরে গেছে বলেই।

মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল। ভাবছিলাম, খুব ভিড়ের মধ্যে দিয়ে যখন আমরা হেঁটে যাই, তখন যাদের সঙ্গে ধাক্কা লাগে, তারা সকলেই কি স্বাভাবিক মানুষ? যদি তাদের মধ্যে একজন পঙ্কজ মিদ্যা থাকে কিম্বা একজন বিশাখা? শুধু ওদের কথাই বা ভাবছি কেন? আমি নিজে কী? আমাকে দেখে কেউ বুঝতে পারবে, দু-পায়ে চামড়ার গোল-গোল জুতো পরে যে ছ'ফুটিয়া ছেলেটা সামনে দিয়ে চলে গেল, তার মাথার ভেতরে সারাক্ষণ একটা শুঁয়োপোকা গুটি বুনে চলেছে?

সেই রাতচরা পাখিটা হঠাৎ আমাকে প্রচণ্ড চমকে দিয়ে পেছনের গাছটা ছেড়ে কসাইখানার দিকে উড়ে গেল। যাবার সময় আমার চিন্তার সুতোটাও কেটে দিয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসিদিকে জিগ্যেস করলাম, আর তুমি? তোমার কোনো করিশমা নেই?

হাসিদি একটু ঢং করে বলল, থাকলেই বা বলব কেন? তুমি বলেছ তোমার করিশমার কথা? যেদিন তুমি বলবে সেদিন আমিও বলব। চলো এখন উঠি।

বেশ, তাই বোলো।

আমরা উঠে পড়লাম। পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে পৌঁছে গেলাম কারখানার গেটে। গেটটা যখন খুলছিলাম তখন হাসিদি আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, ও নেই।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কারখানার দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। সবুজ ফসফোরেসেন্সের ভেতর দিয়ে হেঁটে পেছনের দরজা, সেই দরজা খুলে আবার উঠোন, ব্যারাকবাড়ি। অবাক হয়ে দেখলাম, হাসিদি রান্নাঘরে গ্যাস-উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে রুটি সেঁকছে। আমাকে দেখে বলল, বাবা! অনেক দূর চলে গেছিলে মনে হচ্ছে।

আমি বললাম, মানে! তুমি জানো না কোথায় গিয়েছিলাম? সত্যিই ভালো অ্যাকটিং করতে পারো। আচ্ছা, তুমি কোনদিক দিয়ে ঢুকছ বেরোচ্ছ বলো তো।

হাসিদি চাটুটা উনুন থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে-আস্তে বলল, এখানে ঢোকা-বেরোনোর একটাই রাস্তা। তুমি কি আমাকে বাইরে দেখলে?

আমি অবাক হয়ে বললাম, কী যা-তা বলছ? মাথা খারাপ হল তোমার? কার সঙ্গে এতক্ষণ বসেছিলাম? কে আমাকে পঙ্কজদা আর বিশাখার গল্প শোনাল? ভূতে?

হাসিদি আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, না, ভূত কেন হবে? আমিই। আমিই ছিলাম তোমার সঙ্গে। আসলে এই পৃথিবীতে দুজন হাসি মণ্ডল আছে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হয় না। তবে অন্য অনেকেই একইসময়ে দু-জায়গায় দুজনকে দেখেছে। আজ যেমন তুমি দেখলে।

আমার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল। একটা চেয়ারের ব্যাকরেস্ট আঁকড়ে ধরে বললাম, ও কি তাহলে আসল হাসিদি নয়?

কে জানে! হাসিদি থমথমে মুখে বলল, হয়তো আমিই আসল হাসি মন্ডল নই।

চার

দুপুরে ঘুম আসাটা যত সহজ হয়েছিল, রাতে হল ঠিক তার বিপরীত। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। আসলে দুপুরে তো শরীর অনেকটাই বিশ্রাম পেয়ে গিয়েছিল। তার ওপরে এরকম অদ্ভুত জায়গা, অদ্ভুত সব ঘটনা। হাসিদির আশ্চর্য বিবৃতি। সবমিলিয়ে রগের শিরাগুলো দপদপ করতে শুরু করেছিল।

আমি জানি, দশটা-পাঁচটা অফিস করেন যে ভদ্রমহোদয় ভদ্রমহোদয়াগণ, কিম্বা কলেজে পড়ে যে যুবক-যুবতীরা, কিম্বা দোকানে খাতা লেখে এরকম কোনো মানুষ—আজ সারাদিন যে-অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমি গেলাম, সেরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে—হয় চিৎকার করত, না-হলে পুলিশ ডাকত। কিছুই না করলে অন্তত এই জায়গাটা ছেড়ে পালাত। কিন্তু আমি ওসব কিছুই করতে পারব না। আমি অপেক্ষা করব, কারণ আমি জানি, এই সবই সত্যি। বিশাখার মৃত্যু সত্যি। হাসিদির জোড়া-অস্তিত্ব সত্যি। পঙ্কজদার ভেতরে মৃত আত্মার সঞ্চারও সত্যি।

মাথার ভেতরে যে পোকাটা ঘুরে-ঘুরে এতদিন ধরে গুটি বুনছিল, তার কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। পরিষ্কার বুঝতে পারছি, এই মুহূর্তে যদি আমার খুলিটা একটা কৌটোর ঢাকনার মতন খুলে ফেলা যায়, তাহলে দেখা যাবে পুরো খুপরিটা জুড়ে একজন গুড়িসুড়ি মেরে শুয়ে আছে। সে কে? জানি না। হয়তো আমার মৃত্যু।

অনেকক্ষণ বিছানার ওপরে ছটফট করতে-করতে অবশেষে রাত দেড়টা কি দুটো নাগাদ হালকা তন্দ্রার মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে বেশিক্ষণের জন্যে নয়। এক রক্ত হিম করা আওয়াজে ছিটকে বিছানার ওপরে উঠে বসলাম।

ওটা কোন প্রাণীর চিৎকার ভেসে এল আমার বন্ধ জানলার বাইরে, উঠোনের দিক থেকে?

কুকুর নয়। কুকুরের ডাকের মধ্যে অমন অশুভ ইঙ্গিত, অমন মৃত্যুর আতঙ্ক মিশে থাকে না।

বিছানা থেকে উঠে পা টিপে-টিপে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ঘরের আলোটা জ্বালতেই পারতাম, কিন্তু জ্বালিনি। মনে হয়েছিল, জন্তুটা যদি আলো দেখে পালিয়ে যায়। আমি ওটাকে স্বচক্ষে দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জানলার পাল্লা সামান্য ফাঁক করে যে-দৃশ্য দেখলাম, তেমন দৃশ্যের কথা কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।

পূর্ণিমার রাত ছিল সেটা। কাপড়-কাচা গোলা সাবানের মতন হড়হড়ে আর হলুদ একটা চাঁদ উঠেছিল আকাশে। সেই মরা-চাঁদের ঘোলাটে আলোয় উঠোনটাকে তখন আরো বড় মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল উঠোন নয়, একটা পাহাড়ি-উপত্যকা। কারখানা-ঘরের চিমনির মুখে আগুনের আভা হিলহিল করে কাঁপছিল। তার মানে ফার্নেসে নতুন করে আগুন জ্বলে উঠেছে। কীভাবে?

জ্যোৎস্না আর আগুনের আভায় মাখামাখি সেই উঠোনের ঠিক মাঝখানে দুহাতে দুটো আগুনের মালসা নিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচ করছিল এক নগ্ন নারী; কালো কাজল দিয়ে আঁকা তার শরীর। আমি সেই নারী-শরীরের প্রতিটি বক্ররেখা, প্রতিটি উত্তল-অবতল, এমনকি তার বামস্তনের বৃন্তের নীচে একটা নীল জড়ুল অবধি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম।

সম্মোহিত হয়ে পড়েছিলাম, কারণ পুরো দৃশ্যটার মধ্যেই এক আদিম জাদু ছিল। ওই উঠোন কি দু-হাজার একুশ সালের কলকাতার কোনো বাড়ির উঠোন নাকি হিমযুগের কোনো গুহামুখ? ওই আগুন কি কোনো কারখানার ফার্নেসের আগুন না গুহাবাসীদের অগ্নিকুন্ডের? আর ওই নগ্নিকা—ও তো আজকের কেউ নয়ই! হতেই পারে না। ওর ওই নগ্নতা, ওর ওই দু-হাতে আগুনের মালসা নিয়ে ঘুরে-ঘুরে নাচ—ওই নাচ আজকের পৃথিবীর নয়।

পূর্ণিমার রাতে হাসি মণ্ডল এক গুহামানবী হয়ে গিয়েছিল।

যেন আমার চিন্তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই হঠাৎ আমার ঘরের সামনের সেই টানা দালানেরই অন্য প্রান্ত থেকে আবার সেই ক্ষুধার্ত নেকড়ে ডাক ভেসে এল—ওওও ওউ ওউ ওউ। উ উয়া। উ উয়া। উ উয়া।

আবারও আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। মানুষের কৌতূহল অদম্য! তাই জানলার পাল্লাদুটো আরো একটু ফাঁক করে চোখদুটো গরাদের ফাঁকে প্রায় সেঁটে দিয়ে কোনোরকমে দালানের ওই কোণটাকে নজরের মধ্যে নিয়ে এলাম। দেখলাম সেখানে দাঁড়িয়ে পঙ্কজ মিদ্যা একমনে হাসিদির নাচ দেখছে। আমি তাকিয়ে থাকতে-থাকতেই বোবা মানুষটা আবার চাঁদের দিকে মুখ তুলে নেকড়েবাঘের গলায় চিৎকার করে উঠল—উউউ হাহাহা। হাহাহা হাহাহা উউউ।

পরক্ষণেই দালান থেকে উঠোনে ঝাঁপিয়ে পড়ল পঙ্কজ মিদ্যা। চার হাতে- পায়ে দৌড়ে গেল হাসিদির দিকে। অবিকল এক নেকড়ের মতোই ওকে ঘিরে লাফাতে শুরু করল। বহুদিন পরে প্রভু ঘরে ফিরলে তাকে ঘিরে পোষা কুকুরগুলোও ঠিক এইভাবে নাচতে দেখেছি। এটা নেকড়ের উল্লাস।

হঠাৎই হাসিদির সেই কথাটার মানে পরিষ্কার হয়ে গেল আমার কাছে। ও বলেছিল না, পঙ্কজদা পুরুষমানুষই নয়? সত্যিই তো নয়। মানুষই নয় পঙ্কজ মিদ্যা, তার আবার নারী আর পুরুষ। ও একটা নেকড়েবাঘ।

আরেকজনকেও এবার দেখতে পেলাম। বিশাখা। ব্যারাকবাড়ি থেকে নয়, অবাক হয়ে দেখলাম ভিজে কাপড়ে কারখানা ঘরের পেছনের দরজাটা খুলে বিশাখা বেরিয়ে এল। তারপর নৃত্যরতা হাসিদিকে মাঝখানে রেখে বিশাখা আর সেই নেকড়েটা গোল হয়ে ঘুরতে শুরু করল।

মাঝখানে একবার বিশাখা মুঠো থেকে কী যেন একটা গুঁড়ো পদার্থ হাসিদির হাতে ধরে-থাকা আগুনের মালসাটার মধ্যে ছুঁড়ে দেওয়া মাত্র গলগল করে সবজেটে ধোঁয়া বেরিয়ে এসে আমার চোখের সামনের সমস্ত দৃশ্য আবছা করে দিল। কী কটু গন্ধ সেই ধোঁয়ায়! মনে হল শ্বাসনালি পুড়ে যাচ্ছে। অথচ ওদের তিনজনকে দেখে মনে হচ্ছিল গন্ধ-টন্ধ কিছু টেরই পাচ্ছে না।

আমি পারলাম না, আমার অত সহ্যশক্তি নেই। জানলার পাল্লাদুটো বন্ধ করে দিয়ে ছুটে গেলাম ঘরের কোনায়, যেখানে জলের কুঁজো আর গ্লাস রাখা ছিল। ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেলাম। কিছুটা জল হাতের চেটোয় নিয়ে ঘাড়ে মুখে থাবড়ালাম। একটু আরাম পাওয়ার পর ভাবলাম, আরেকবার জানলা খুলে দেখি। মনে আশা ছিল, হয়তো দেখব উঠোন ফাঁকা; এতক্ষণ যা দেখেছি সবই ছিল আমার চোখের ভুল।

ভুল ভেবেছিলাম। যা দেখে গিয়েছিলাম, তার চেয়ে আরো বীভৎস দৃশ্য অপেক্ষা করছিল আমার জন্যে। জানলার পাল্লাদুটো আবার অল্প একটু ফাঁক করে তার মধ্যে চোখ লাগাতেই দেখতে পেলাম, হাসিদি তার নাচ থামিয়ে, চার-হাত-পায়ে ভর দিয়ে, মাটির ওপরেই হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে। মাথা ঝুঁকিয়ে দিয়েছে নীচে। রাশি-রাশি চুলের আড়ালে ওর শরীরের ওপরের অংশটা ঢাকা পড়ে গেছে।

ওর ঝুঁকে পড়া মাথার সামনে বিশাখা যে-জিনিসটাকে দুদিকে টান দিয়ে ধরে রেখেছিল, সেটাকে একটা প্রাণী বলে চিনতেই পারতাম না, যদি না হতভাগ্য কালো বেড়ালটা একবার ওর গলার ওপরে বিশাখার হাতের মুঠির চাপ আলগা হওয়ামাত্রই মরণ-যন্ত্রণায় কঁকিয়ে কেঁদে না উঠত। পরক্ষণেই হাসিদি এক ঝটকায় মুখটা ওপরে তুলে বেড়ালটার কন্ঠনালিতে দাঁত বসিয়ে দিল। নেতিয়ে পড়া বেড়ালটাকে ওর মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে বিশাখা নিখুঁত লক্ষে কারখানা-ঘরের দরজার দিকে ছুড়ে দিল আর সেই-মুহূর্তেই বন্ধ-দরজাটা আবার খুলে গেল।

ঘরের ভেতরে আগুন জ্বলছিল বলে দরজাটাকে দেখাচ্ছিল অন্ধকার দেয়ালের গায়ে একটা আগুনরঙের আয়তক্ষেত্রের মতন।

আগুনের সেই চৌকো ফ্রেমের মাঝখানে কয়েকমুহূর্তের জন্যে একজনকে দেখতে পেলাম। এক বিশাল পুরুষশরীর—ষাঁড়ের মতন মাথা। আগুনের আভার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন বলে তাঁকে কালো পাথরের মূর্তির মতন দেখাচ্ছিল। বিশাল দুই বাহু সামনে বাড়িয়ে তিনি মরা বেড়ালটাকে লুফে নিয়ে আবার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন। তাঁর পেছন-পেছন ঢুকে পড়ল বিশাখা, হাসিদি আর সেই নেকড়ে বাঘটা যাকে কিছুক্ষণ আগে অবধি আমি পঙ্কজ মিদ্যা বলে জানতাম। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

কাচ কারখানার পুরো কম্পাউন্ডটা এখন অস্বাভাবিক শান্ত। একটা ঝিঁঝিপোকা অবধি ডাকছে না কোথাও। আমি জানলাটা বন্ধ করে বিছানার ওপরে লুটিয়ে পড়লাম। এখন একটু ঘুম দরকার আমার—গভীর ঘুম। না-হলে রক্তের চাপে মাথার ভেতরের শিরা-উপশিরা সব ছিঁড়ে যাবে।

ব্যাগ হাতড়ে একটা বাদামি কাচের শিশি বার করে এনে ভেতর থেকে কয়েকটা সাদা ট্যাবলেট হাতের তালুতে ঢেলে নিলাম। যখন খুব যন্ত্রণা বাড়ত, তখন...একমাত্র তখনই লেপ্রসি-সেন্টারের ডাক্তারবাবু এই ট্যাবলেটটা আমাকে খাওয়াতেন। একসঙ্গে দুটো ট্যাবলেট মুখে পুড়ে জল দিয়ে গিলে ফেললাম। মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে আমার চোখ বুজে এল। এটা খেলে প্রতিবারই তাই হয়।

সেই ঘুম ভাঙল বেলা দশটায়। ওরা কেউ আমাকে ডাকেনি, নিজে থেকেই ভাঙল। কিছুক্ষণ চৌকির কিনারায় মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইলাম। যন্ত্রণায় মাথা ফেটে যাচ্ছিল। কাল রাতে একসঙ্গে দুটো ট্যাবলেট খেয়ে নেওয়ার এফেক্ট? তাই হবে। কিছুক্ষণ ওইভাবে বসে থাকার পর নিজের মনেই বললাম, না। যা দেখেছি সব ভুল। ওসব কিছুই ঘটেনি। আমি দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম।

কুঁয়োতলায় গিয়ে এক-বালতি ঠান্ডা জল তুলে মাথাটা ধুয়ে নিলাম। একটু আরাম হল। গামছা দিয়ে মাথাটা মুছতে-মুছতেই বুঝতে পারলাম, আমার পেছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। তাকিয়ে দেখলাম, ঠিকই। হাসিদি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে। খুব সাবধানী চোখে আমার কাজকর্ম লক্ষ করছিল।

আমি তীব্রদৃষ্টিতে হাসিদিকে আপাদমস্তক জরিপ করলাম। ঠিক এই উঠোনেই কয়েকঘণ্টা আগে ওকে নগ্ন হয়ে ঘুরতে দেখেছিলাম।

দেখেছিলাম কি? সত্যিই দেখেছিলাম? নাকি সবটাই আমার অন্তর্গত অভিশাপের ফসল—হ্যালুসিনেসন। এই প্রশ্নটার উত্তর আমার জানা দরকার এবং এখনই দরকার। জানবার একটাই উপায় আছে।

একবার চারিদিকে চেয়ে দেখে নিলাম, হাসিদি ছাড়া আর কাউকে সামনা-সামনি দেখা যাচ্ছে না। হাসিদি বোধহয় আমার মনের কথা বুঝে থাকবে—বলল, ওরা এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। আমিই শুধু তোমার ঘুম ভাঙার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। তুমি চান করবার সময়েও পায়ের জুতো খোলো না রুদ্র?

প্রায় চিৎকার করেই বললাম, না। খুলি না। কতবার বলব?

হাসিদি একটুও ভয় পেল না। বরং ওর চোখ দেখে মনে হল, ও বলতে চাইছে, এসো জোসেফ রুদ্রনাথ এক্কা। দেখে নাও, যা তুমি দেখতে চাইছ। সন্দেহমুক্ত হও।

আমি কুঁয়োতলা থেকে প্রায় দৌড়ে গিয়েই ওর হাত চেপে ধরলাম। তারপর এক হেঁচকা টানে ওকে ঢুকিয়ে নিলাম কলঘরের মধ্যে। ও একটু 'উঃ' শব্দ অবধি করল না। অদ্ভুত শান্ত-চোখে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ওর কুর্তার বোতামগুলো দ্রুত হাতে খুলতে শুরু করলাম। আমার মাথা ঝুঁকে পড়েছিল হাসিদির বুকের ওপরে আর আমার ভিজে মাথা থেকে ঝরে পড়া জলের ফোঁটায় ওর কুর্তার বুকের কাছটা ভিজে যাচ্ছিল।

তাড়াহুড়োয় আমি একটা বোতাম ছিঁড়ে ফেললাম। হাসিদি আমার হাতটা ঠেলে দিয়ে গম্ভীরমুখে বলল, সরো। আমি খুলছি।

নিজের হাতেই কুর্তাটা খুলে ফেলল হাসিদি। দেখলাম গোলাপিরঙের সস্তার প্যাডেড ব্রায়ের নীচে ওর শিশুমুঠি দুই স্তন। ওই ছোট স্তনকে বড় করে দ্যাখানোর ইচ্ছেটা দেখে আমার আবার মনে হল, না, এ নয়। এ তো পামার বাজার বস্তির সামান্য একটা মেয়ে। দু-হাতে দুটো আগুনের মালসা নিয়ে উঠোন জুড়ে উদ্দাম-নৃত্য এর দ্বারা সম্ভবই নয়। তবু নিশ্চিত হবার জন্যে আমি দু-হাতের মুঠোয় ওর ব্রায়ের কাপদুটোকে খামচে ধরে ওপরে তুলে দিলাম আর তুলে দিয়েই বুঝতে পারলাম, এই সেই অলৌকিক নর্তকী। কারণ, ওর বামস্তনের নীচে এই তো সেই নীল জড়ুল।

এতক্ষণ যে মনের জোরটা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেই জোরটা হঠাৎই আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমার পা দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। বুঝতে পারলাম, কাল রাতে যা দেখেছি, যা শুনেছি, তার কিছুই আমার কল্পনা নয়; যেমন কল্পনা নয় আমার মাথার ভেতরে গুঁড়িসুঁড়ি মেরে বসে থাকা সেই প্রাণীটি কিম্বা কাল রাতে কারখানা-ঘরে পেছনের দরজা খুলে একমুহূর্তের জন্যে যে দেখা দিয়েছিল, সেই বৃষমানুষ।

আমি অসহায়ের মতন চৌবাচ্চার পাড়েই বসে পড়লাম।

হাসিদি আমার দিকে পিছন ফিরে ওর অন্তর্বাস ঠিক করে নিল। কুর্তাটা আবার পরে নিয়ে, আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ভয় পেও না, রুদ্র। আমি, পঙ্কজদা, বিশাখা, আমরা সবাই খুব সাধারণ মানুষ। আমাদের ভয় পাবার কিছু নেই। বরং আমরাই চারিদিকের স্বাভাবিক মানুষদের ভয়ে মরতে-মরতে, পালাতে-পালাতে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছি। লুসিফার আমাদের তার আশ্রয়ে ডেকে নিয়েছেন। চলো, খাবার ঘরে গিয়ে বসি।

খাবার ঘরের টেবিলের দুপাশে দুটো চেয়ার টেনে আমি আর হাসিদি বসলাম। হাসিদি আমাকে জলখাবার সাজিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু আমার খেতে ইচ্ছে করছিল না। হাসিদি কিছুক্ষণ চুপ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, বুঝতে পারছি, তুমি কাল রাতে আমাদের সাবাথ দেখেছ।

'সাবাথ'! শব্দটা এই প্রথমবার শুনলাম, তাই মানে বুঝলাম না।

আমি যে বুঝতে পারিনি সেটা হাসিদি বুঝতে পারল। বলল, সাবাথ মানে লুসিফারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার দিন। বছরে দুবার এমন দিন আসে। কাল ছিল তার মধ্যে একটা।

মনে মনে ভাবলাম, কাপালি স্যার কি জানেন, তার কারখানার মধ্যে এই বহিরাগত নারী-পুরুষগুলি কী করে চলেছে? কিছুই কি জানেন না? না জানলে হঠাৎ আমাকে এখানে নিয়ে আসার কারণ কী? আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি এই তিন উড়ুক্কু ঝরাপাতার দলে আমিও আরেক ঝরাপাতা। যে-অপার্থিব বাতাস ওদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সেই একই হাওয়া আমার শরীরে বুনে দিয়ে গিয়েছিল কুষ্ঠ রোগের বীজ। আমার মুখ দিয়ে নিজের মনেই বেরিয়ে এল একটা শব্দ—বেচারা।

কাকে বলছ? জিগ্যেস করল হাসিদি।

বললাম, তোমাকে। না, তোমাদের।

তারপর একটু ভেবে বললাম, নিজেকেও বলছি।

পাঁচ

সেদিনই রাত সাড়ে আটটা নাগাদ আমি, পঙ্কজদা আর হাসিদি রাতের খাবার খেতে বসেছিলাম। বিশাখা যে কেন শুধু দুটো শুকনো রুটি নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল, তার ব্যাখ্যা আর কোনোদিন কারুর কাছে চাইবার দরকার পড়বে না আমার। পুরো খাওয়ার সময়টায় কেউ কোনো কথা বললাম না। কেউ কারুর মুখের দিকে তাকালাম না। শুধু খাওয়া শেষ হওয়ার মুখে একবার নিজের মনেই বলে ফেললাম, আজ বোধহয় আর কাপালি স্যার দেখা করবেন না। ভুলে গেছেন মনে হয়।

হাসিদি বলল, উঁহু। উনি কিছু ভোলেন না। ক'টা বাজল? পৌনে-ন'টা? এবার প্রশান্তদা চলে আসবেন। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।

হাসিদি ভুল বলেনি। খাওয়া শেষ হয়েছে কি হয়নি, বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের আওয়াজ পেলাম। বেরোনোর আগে হাসিদিকে জিগ্যেস করলাম, তোমরা কি শুয়ে পড়বে? তাহলে আমি ঢুকব কেমন করে?

হাসিদি বলল, কেউ শোব না। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুরে এসো।

দুপুরে যে-রাস্তা ধরে গোরে বিবি কি মহল্লার কাচ কারখানায় পৌঁছেছিলাম, সেই রাস্তা ধরেই আবার ফিরে চললাম। সেই পামার বাজার বস্তি, বেলেঘাটা খাল। শিয়ালদা স্টেশন চত্বর পেরিয়ে প্রাচী সিনেমার সামনে থেকে গাড়ি বাঁদিকে বাঁক নিল। রাস্তাটার নাম সার্পেন্টাইন-লেন।

'সার্পেন্টাইন' মানে যে 'সর্পিল' সেটা জানতাম। দেখলাম নামটা সার্থক। এত রাতেও কোলেবাজারে ব্যাপক ভিড়। সেই ভিড় কাটিয়ে ঠিক সাপের মতোই এঁকেবেঁকে চলল আমাদের ফিয়াট গাড়ি। নেড়িকুকুর, ঝাঁকামুটে, ঠেলাগাড়ি এবং পথশিশুদের বাঁচিয়ে প্রশান্তবাবু যেভাবে গাড়িটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তা শুধু একজন লোকাল-ড্রাইভারের পক্ষেই সম্ভব। বাইরের ড্রাইভার হলে এতক্ষণে দশবার ভিড়িয়ে দিত।

গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সার্পেন্টাইন লেনের রাতের চেহারা দেখছিলাম। আশ্চর্য রাস্তা। আশ্চর্য তার দুদিকের পাড়াগুলো। চলতে-চলতে একসময় মনে হল, কোনো অলৌকিক উপায়ে অন্তত পঞ্চাশ-বছর পিছিয়ে গিয়েছি। কোথায় ঝলমলে ত্রিফলা-আলো আর কোথায়ই বা রোল-পরোটা, সালোয়ার-কামিজ কিম্বা মোবাইল-ফোনের দোকান?

অনেকখানি তফাতে তফাতে একটা করে মিটমিটে ল্যাম্পপোস্ট। পুরোনো আমলের দোতলা তিনতলা বাড়িগুলো গায়ে-গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে; তাদের দেয়ালে শ্যাওলার সবুজ ছোপ। রেন-ওয়াটার পাইপের খাঁজে বড়-বড় বট অশথের গাছ গজিয়ে উঠেছে। দোকান বলতে শুধু দু-একটা মুদিখানা। তিনটে ধোপাখানা দেখলাম—যেখানে কয়লার উনুনের আঁচে বসিয়ে ধোপারা আদ্যিকালের লোহার ইস্ত্রি গরম করছিল। এমনকী কতবছর বাদে সত্যিকারে একটা পাথুরে কয়লার গোলা অবধি দেখতে পেলাম।

মিনিট দশেক গড়িয়ে-গড়িয়ে গাড়ি চলল। রাস্তা পেরোলাম বোধহয় সাকুল্যে পাঁচশোমিটার, তার বেশি নয়। তারপরেই সার্পেন্টাইন লেনের গা থেকে বেরিয়ে যাওয়া আরেকটা কানা-গলির মুখে গাড়ি পার্ক করলেন প্রশান্তবাবু। গাড়ি থেকে নেমে আমার দিকে ফিরে তাকালেন।

আগেই বলেছি, কথাবার্তায় পঙ্কজদার সঙ্গে ভদ্রলোকের মিল আছে। পঙ্কজদা তবু গোঁ-গাঁ আওয়াজ করে, ইনি একেবারেই সাইলেন্ট-পিকচার। এখনও মুখে কিছু না বলে, ইশারায় ওঁকে ফলো করতে বললেন। ল্যাম্পপোস্টের ম্লান আলোয় দেখতে পেলাম, মোড়ের বাড়িটার ইট বার করা দেওয়ালের গায়ে কবেকার পুরোনো একটা নীল এনামেল করা টিনের ফালির ওপরে সাদা রঙের বাঙলা হরফে লেখা আছে 'কবিরাজ-বাড়ি বাই লেন'।

প্রশান্তবাবু গলিটার মধ্যে ঢুকে পড়লেন। আমি ওঁকে অনুসরণ করলাম। বেশি নয়, মিনিট দুয়েক হাঁটার পরেই পৌঁছে গেলাম একটা দোতলা বাড়ির সদর দরজায়। বাড়িটা বহু পুরোনো। দেখলে বোঝা যায়, এককালে বেশ পয়সা খরচা করে বানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন একেবারেই জরাজীর্ণ দশা। রাস্তার দিকে চওড়া থামের ওপরে ঢালাই লোহার অপূর্ব কারুকার্য করা রেলিং দিয়ে ঘেরা ঝুলবারান্দা; কিন্তু সেই রেলিং জায়গায় জায়গায় হাওয়া হয়ে গেছে। নারকোল দড়ির টানা দিয়ে ফাঁকগুলো বোজানো হয়েছে। সদর দরজার দুটো পাল্লাই দু-দিকে কেতরে পড়েছে। সদর পেরিয়ে ভিতরে উঠোন। চৌকো উঠোনটাকে ঘিরে তিনদিকে ঘর। চতুর্থদিকে ঠাকুরদালান। দেয়ালের গায়ে একটা একশো-ওয়াটের বালব ঝুলছিল, কিন্তু বিশাল উঠোনের সর্বত্র আলো ফেলার পক্ষে সেটা নেহাতই কমজোরি। তাই উঠোনের এখানে-ওখানে ঘন ছায়া জমে।

একপলক দেখে মনে হল, বাড়িটার দুটো তলা মিলিয়ে অন্তত দশ-বারোটা ঘর রয়েছে। কিন্তু আলো জ্বলছে সাকুল্যে দুটো ঘরে। একটা একতলায় আর অন্যটা দোতলায়। বাকি ঘরগুলো আর ঠাকুরদালান অন্ধকারে ডুবে আছে।

একতলার ঘরটার খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে চোখ চলে যেতেই স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি। ঘরটা বেশ বড়। দেয়ালে ক্যাটকেটে সবুজ এলাচ রঙের পোঁচ। এখানে-ওখানে রঙের চলটা খসে পড়েছে। দেয়াল থেকে খোলা তারে দুটো টিউবলাইট ঝুলছিল। অতি রদ্দি একটা সিলিং-ফ্যানও ঘুরছিল নিশ্চয় ভেতরে; তার কটকট শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

দেখলাম, ঘরটার এককোনায় কাঠের টুলের ওপরে কুড়ি-লিটারের একটা মিনারেল-ওয়াটারের জার আর কয়েকটা প্লাস্টিকের গ্লাস রাখা আছে। দেয়ালে টান দিয়ে বেঁধে-রাখা একটা নাইলনের দড়িতে ঝুলছে মেয়েদের জামাকাপড়...অন্তর্বাস ইত্যাদি। কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার ছাড়া ঘরটায় আসবাব বলতে আর কিছু ছিল না, তবে মেঝেতে একটা টানা বিছানা পাতা ছিল। সেই বিছানার জন্যে ব্যবহৃত টুটাফুটা ফোমের গদি আর ময়লা সাদা চাদরগুলো নিঃসন্দেহে পাড়ার ডেকরেটরের সম্পত্তি। মফসসলের দিকে বরযাত্রীদের একরাত থাকার জন্যে ঠিক এইরকম ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।

তবে এই ঘরে বরযাত্রী ছিল না। তার বদলে মেঝের বিছানার ওপরে দুটি সাদা চামড়ার মেয়ে অলসভঙ্গিতে শুয়ে সেলফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। আরেকজন ফরেনার, সে-ও এক উদ্ভিন্ন যুবতী, একটা চেয়ারে বসে ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিল। গ্রীষ্মকালে আমাদের রঘুপুরের অনাথ-আশ্রমের বাইরে যেরকম পোশাকে মেমসাহেবদের গাড়ি থেকে নামতে দেখেছি, এই মেয়েগুলির পরনেও ঠিক সেইরকম খোলামেলা পোশাক। শর্টস আর গেঞ্জির বাইরে ওদের সুপুষ্ট স্তন আর উরু অনেকটাই বেরিয়েছিল।

আমি দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতেই উঠোনের এককোণের কলঘরের টিনের দরজা খুলে ঠিক ওইরকমই আরেকটি মেমসাহেব বেরিয়ে এল। চান করেই বেরোল নিশ্চয়ই। তার সোনালি চুল থেকে টপটপ করে জল ঝরছিল। কোনোরকমে একটা বড় তোয়ালে দিয়ে গলার নীচ থেকে হাঁটুর ওপর অবধি শরীরকে ঢেকে রেখেছিল মেয়েটি। আমার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে সেও ওই হলঘরের মধ্যেই ঢুকে গেল। ঢুকেই খোলা দরজাটা চেপে বন্ধ করে দিল। আর কিছু দেখতে পেলাম না।

প্রশান্তবাবুর দিকে সপ্রশ্ন চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করলাম, এরা?

প্রশান্তবাবু সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, পেশেন্ট।

আমি আরেকটু ব্যাখ্যা আশা করছিলাম। এত স্বাস্থ্যবতী মেয়েরা কোন অসুখে আক্রান্ত হল? ডাক্তারই বা কে? কিন্তু প্রশান্তবাবু আমার প্রশ্নাতুর ভঙ্গিকে উপেক্ষা করে বললেন, চলুন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।

দালানের এককোনা থেকে ক্ষয়ে-যাওয়া একটা ইটের সিঁড়ি ওপরে উঠে গিয়েছিল। সেই সিঁড়ি ধরে প্রশান্তবাবু আমাকে নিয়ে সটান উঠে গেলেন বাড়ির দোতলায়। দোতলার সেই একমাত্র আলো-জ্বলা ঘরটার দরজায় একটা ভারী পর্দা ঝুলছিল। প্রশান্তবাবু বাইরে থেকে গলা তুলে বললেন, স্যার, রুদ্রবাবু এসেছেন।

ভেতর থেকে উত্তর এল, বেশ। তুমি কিন্তু ওয়েট কোরো প্রশান্ত। রুদ্রকে আবার ফিরিয়ে দিয়ে আসতে হবে।

আচ্ছা স্যার।

প্রশান্তবাবু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলেন।

ঘরের ভেতর থেকে ডাক এল—এসো রুদ্র। ভেতরে এসো।

এই সেই স্নিগ্ধ স্বর, যা গতকাল সকালে ফোনের ভেতর দিয়ে শুনেছিলাম। কাছ থেকে শুনে বুঝলাম, ওঁর কথার মধ্যে আরেকটা জিনিস মিশে আছে, যার নাম আভিজাত্য।

পর্দা সরিয়ে ঘরের ভেতরে মুখ বাড়ালাম। বললাম, আমার জুতো খুলতে অসুবিধে আছে। আপনি কি জুতো অ্যালাও করেন?

তোমার জন্যে করলাম। সঙ্কোচ কোরো না। চলে এসো।

পা থেকে বুক অবধি চাদর ঢাকা দিয়ে যিনি বিছানায় শুয়ে আছেন, যিনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন, তিনিই নিশ্চয়ই বিরাজ কাপালি, আমার মালিক। আমার উচিত ছিল তাঁর দিকেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু সেটা সম্ভব হল না।

হল না যে, তার কারণ, কিছু পুরোনো আমলের আসবাব আর শিল্প- সামগ্রী। সিনেমার পর্দায় জমিদারবাড়ির সেট ছাড়া চর্মচক্ষে সেসব জিনিস কখনো দেখিনি, এখন দেখলাম। কাপালি স্যার যে খাটটায় শুয়েছিলেন সেটা কোন কাঠে তৈরি কে জানে! কিন্তু পাকা খেজুরের মতন চকচকে খয়েরি তার রঙ, গায়ে ভীষণ সূক্ষ্ম গোলাপ আর আঙুরলতার কারুকার্য।

তিনটে বিশাল আলমারি ভর্তি মার্বেল, চিনেমাটি আর রুপোর পুতুল। একটা কর্নার-টেবলের ওপরে প্রায় সাত-আটটা নানান মাপের টেবল ক্লক তো ছিলই, তাছাড়াও অন্য এক কোণে দাঁড়িয়েছিল মানুষ সমান উঁচু একটা গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। চার দেয়ালে চারটে অয়েল-পেইন্টিং। ইওরোপের নিসর্গদৃশ্য। বলে দিতে হয় না যে, ইওরোপিয়ান গ্র্যান্ড-মাস্টারদেরই আঁকা।

একটা ব্যাপার পরিষ্কার বুঝতে পারলাম—এইমুহূর্তে এই ঘরে যত অ্যান্টিক ফার্নিচার আর কিউরিও রয়েছে, একসময়ে তার অন্তত দ্বিগুণ ছিল।

এদিকে-ওদিকে ছড়ানো কাঠের পেডেস্টালগুলোর ওপরে মার্বেলের মূর্তি থাকার কথা ছিল। নেই।

দেয়ালের গায়ে বেশ কিছু জায়গার রঙ তুলনামূলকভাবে কম ফিকে হয়েছে দেখছি। ওই জায়গাগুলোতে নিশ্চয়ই আরো অয়েল-পেন্টিং টাঙানো ছিল।

সব মিলিয়ে ঘরটাকে দেখে আমার একটা দাবা-বোর্ডের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল, যে-বোর্ডে খেলা প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে। তখন যেমন বোর্ডের ওপরে বত্রিশটা ঘুঁটির মধ্যে সাতটা কি আটটা ঘুঁটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, সেইরকমই করুণ এবং ছন্নছাড়া অবস্থায় পড়ে ওই ঘরের অবশিষ্ট কিউরিওগুলো।

তবু কোলে-বাজারের পচা কপিপাতা আর পেচ্ছাপখানার নরকের মধ্যে দাঁড়িয়ে-থাকা একটা ভাঙা-বাড়ির দোতলার ঘরে হঠাৎ করেই এতগুলো অপূর্ব জিনিস দেখে থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। ঘোর কাটিয়ে কাপালি স্যারের দিকে ফিরে তাকাতে সময় লাগল।

উনি ঠোঁটের কোণে কৌতুকের হাসি নিয়ে আমাকে লক্ষ্য করছিলেন। চোখে চোখ পড়তেই বিছানার পাশে একটা গদি-আঁটা চেয়ারের দিকে চোখের ইশারা করে বললেন, বোসো। আমার কাছে এসে বোসো। কথা বলতে সুবিধে হবে। অনেক কথাই আজ শুনতে হবে তোমাকে। একটু থেমে বললেন, তোমাকে আমার বড় প্রয়োজন রুদ্র।

আমি কিউরিওগুলোর দিকে ইশারা করে বললাম, এ সব আপনার?

উনি বললেন, না। আমার বাবা কিনেছিলেন। বিশ্বনাথ কাপালি। তাঁর কিউরিওর নেশা ছিল। বলব। তাঁর কথাও বলব তোমাকে।

এবার ওঁকে ভালো করে দেখলাম। দুটো মোটা বালিশের ওপরে হেলান দিয়ে তিনি আধশোয়া হয়ে বসেছিলেন। লেসের ফ্রিল বসানো বালিশের ওয়ারগুলো দুধের মতন সাদা। যে চাদরটা দিয়ে পা থেকে বুক অবধি ঢেকে রেখেছেন সেটা ঠিক কোন ধরনের রেশম দিয়ে বোনা বলতে পারব না, তবে চাদরটার জমি থেকে পালিশ করা হাতির দাঁতের আভা ছড়াচ্ছিল। কিন্তু...

কিন্তু সেই চাদরে পোকায় কাটার দাগ।

কত বয়স হবে কাপালি স্যারের? সত্তরের আশেপাশে বলেই মনে হল। মাথায় এখনো ঘন চুল, তবে তার আশিভাগই পাকা। গায়ের রঙের সঙ্গে ওই রেশমের চাদরের রঙ প্রায় মিশে গেছে। মানুষটি অত্যধিক লম্বা। মনে হল হাইট ছ'ফুটের কিছু বেশিই হবে। ধারালো নাক, পাতলা ঠোঁট। পরিষ্কার করে কামানো দাড়িগোঁফ। তবে ওঁর চোখদুটোই আমাকে সবথেকে বেশি টানছিল। কোনো বাঙালির চোখের তারায় এমন রঙ আমি আগে দেখিনি। অবিকল যেন দুটো মধুর ফেঁটা। শুদ্ধভাষায় বোধহয় এই রঙটাকেই পিঙ্গল বলা হয়।

মনে-মনে বললাম, আপনি স্যার সন্দেহাতীতভাবে রূপবান এবং রাজসিক। কিন্তু আপনার রাজসিকতায় ক্ষয় লেগেছে। এই ঘরটার মতনই, আপনার ভেতর থেকেও অতীতের অনেক মূর্তি, অনেক ছবি হারিয়ে গেছে। আপনি পূর্বপুরুষের সম্পত্তি বিক্রি করে দিন চালাচ্ছেন।

উনি স্নেহময় কণ্ঠে জিগ্যেস করলেন, খাওয়াদাওয়ার অসুবিধে হয়নি তো? থাকার জায়গা পছন্দ হয়েছে?

আমি বললাম, না। কোনো অসুবিধে হয়নি। তবে...

ঠিক কীভাবে বলব ভেবে পেলাম না। শেষকালে মরিয়া হয়ে যেভাবে মনের মধ্যে কথাগুলো আসছিল, সেইভাবেই বলে ফেললাম—তবে ওখানে যারা রয়েছে তারা কেউ স্বাভাবিক নয়। আপনার কারখানাটাও একটা লোক দেখানো কারবার। ওখানে কোনো প্রোডাকশন হয় না। আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?

ভেবেছিলাম উনি রেগে উঠবেন। কিন্তু একদমই রাগলেন না। খুব শান্ত-গলায় উত্তর দিলেন, তুমি নিজেও কি সেই অর্থে স্বাভাবিক, রুদ্রনাথ এক্কা! সত্যি করে বলো তো আমাকে। স্বাভাবিক তুমি?

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

উনি বললেন, আমার কাছে লুকোতে যেও না। আমি সব জানি। না জানলে অত দূর থেকে তোমাকে নিয়ে আসতাম না।

আমি কোনোরকমে আমতা আমতা করে বললাম, আপনি আপনি কী জানেন? কেমন করে জানলেন?

যদি বলি আমাকে একজন অপদেবতা এসে বলে গেছে, বিশ্বাস করবে? তুমি তো মিশনের ছাত্র। খ্রিস্টধর্মের নিরাকার ঈশ্বরের কথা শিখে বড় হয়েছ। পৌত্তলিকদের আদিম দেবতার কথা বললে তো তুমি বিশ্বাস করবে না।

আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম।

পরিষ্কার দেখলাম, বিরাজ কাপালি একটু কেঁপে উঠলেন। বললেন, মাথার কাছের জানলাটা একটু বন্ধ করে দাও তো। আর রিডিং-ল্যাম্পটার সুইচ রয়েছে ওই জানলাটার ঠিক পাশেই। ওটাও একেবারে জ্বেলে দিয়ে এসো।

দুটো কাজই সেরে আবার চেয়ারে এসে বসলাম। বিরাজ কাপালি বললেন, হাসি মণ্ডল নামে মেয়েটি তোমাকে কিছু বলেছে? ওই কারখানায় কারুর প্রেজেন্সের কথা?

আমি ঘাড় নাড়িয়ে বোঝালাম, হ্যাঁ।

ওখানে কিছু দেখেছ?

আমি আবার ইঙ্গিতেই বোঝালাম, হ্যাঁ।

উনি অল্প হেসে বললেন, বুঝতে পারছি, সেইজন্যেই তুমি খুব জোরালো প্রতিবাদ করতে পারছ না। তুমি ইতোমধ্যেই আমার কারখানার মধ্যে সেই অপদেবতার উপস্থিতি টের পেয়েছ। তারপর হাত বাড়িয়ে বেডসাইড-টেবলের ওপর থেকে একটা চামড়ায় বাঁধানো বই তুলে নিয়ে বললেন, তুমি জানতে চেয়েছিলে ওই কারখানায় কী হয়। আমি তোমাকে এখানে আনলাম কেন।

বললাম, তার সঙ্গে আরেকটা যোগ করে নিন। নীচের ঘরের ওই ফরেনার মেয়েগুলো কারা? ওরা নাকি পেশেন্ট! কীসের পেশেন্ট? কার পেশেন্ট?

বিরাজ কাপালি হাতের বইটার খোলা পাতা থেকে মুখ তুলে বললেন, আমি কে, আমি কী করছি, ওই মেয়েগুলো কারা এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে তোমাকে একটু পুরোনো কথা শুনতে হবে, রুদ্রনাথ। তোমার যেমন জানার ইচ্ছে, আমারও ইচ্ছে আছে তোমাকে সমস্তটা বলার। কারণ, আমার মন বলছে, গত সত্তর-পঁচাত্তর বছর ধরে আমার পূর্বপুরুষের জমিতে বসে সেই অপদেবতা যে-খেলাটা খেলে চলেছেন, সেই খেলাটা তোমাকে দিয়েই শেষ হবে।

এই অবধি বলে বিরাজ কাপালি হাতের বইটা আমার দিকে ঘুরিয়ে ফরফর করে কয়েকটা পাতা উলটে দেখালেন। দেখলাম, এতক্ষণ যেটাকে বই বলে ভাবছিলাম সেটা আসলে একটা ডায়েরি। খুদে-খুদে হাতের লেখায় পাতাগুলো ভর্তি। উনি বললেন, এরকম পাঁচটা ডায়েরি আছে। সবক'টাই আমার দাদুর ডায়েরি। এছাড়াও আরো কিছু কাগজপত্র আছে। তার থেকে আমি কাপালি-পরিবারের, আরো স্পেসিফিকালি বলতে গেলে ওই কাচ কারখানার একটা ইতিহাস গড়ে তুলেছি; যদিও সেটা সম্পূর্ণ নয়। তোমাকে আমি সেই ইতিহাসটা শোনাই। তুমি মন দিয়ে শোনো। মনে হয় সব প্রশ্নেরই উত্তর পেয়ে যাবে।

ছয়

কাপালিদের আদি নিবাস ছিল বাঁকুড়ার জটাকেশী গ্রামে। সেখানে তাঁদের বংশগত কবিরাজি চিকিৎসার ব্যবসা ছিল। ভেষজ-চিকিৎসায় খুব নামডাক ছিল তাঁদের। বংশের উজ্জ্বলতম সন্তান ছিলেন সোমেশ্বর কাপালি, যিনি ছিলেন আমার পিতামহ। সোমেশ্বরের যখন মাত্র বাইশবছর বয়স তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর যা প্রতিভা তাতে বাঁকুড়ার এক অজ পাড়াগাঁয় পড়ে থাকা তাঁকে মানায় না।

সোমেশ্বরের পিতৃদেব, মানে আমার প্রপিতামহ সবেমাত্র তার আগের বছরেই দেহ রেখেছিলেন। মা মারা গিয়েছিলেন শৈশবেই। কাজেই তাঁর কোনো পিছুটান ছিল না। আরো খ্যাতি এবং আরো অর্থের স্বপ্ন চোখে নিয়ে সোমেশ্বর জটাকেশী গ্রামের বাড়ি-জমি সব বিক্রি করে দিয়ে কলকাতায় চলে এলেন। সেটা ছিল ইংরিজি উনিশশো-একুশ সাল। কলকাতায় এসে সোমেশ্বর, মানে আমার দাদু, সার্পেন্টাইন লেনে ছ-কাঠা জমি কিনে এই বাড়িটা বানালেন এবং সেই বাড়িরই একতলায় খুলে বসলেন তাঁর কবিরাজি চিকিৎসালয়।

বছর দশেকের মধ্যেই তিনি কবিরাজি চিকিৎসায় অঢেল অর্থ উপার্জন করলেন। না, ভুল বললাম। সোমেশ্বর কাপালি চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রথম পাঁচবছর। তারপরে উনি শুরু করেন পেটেন্ট-মেডিসিনের ব্যাবসা আর তাতেই লক্ষ্মীলাভ করেন।

আমি জিগ্যেস করলাম, পেটেন্ট-মেডিসিন মানে?

কাপালি স্যার বললেন, একেকরকম জটিল-রোগের জন্যে একেকরকম ওষুধ, যেগুলো ডাক্তার না দেখিয়েই খাওয়া যায়। মনে রেখো, সেটা টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরির প্রথমদিক। এখনকার মতন চারিদিকে তখন এত অ্যালোপ্যাথি ওষুধের দোকান ছিল না। এত ডাক্তারও ছিল না। শহরে তবু যা দু-চারজন ছিলেন, গ্রাম-মফসসলে তো বদ্যি আর হোমিওপ্যাথই ছিল ভরসা।

কাজেই সোমেশ্বর কাপালির গোপন ফর্মুলায় তৈরি অর্শের মলম অর্শমেধ, বাত-বেদনার মালিশ অশ্বিনী-তৈল কিম্বা স্ত্রীরোগের মহৌষধ অশোকা-বড়ি ভালোই বিক্রি হত। পাড়ার মুদিখানা থেকে লোকাল ট্রেনের কামরা, গ্রামের মেলা থেকে ট্রামের গুমটি সবখানে পাওয়া যেত জটাকেশী ফার্মেসির প্রোডাক্ট। তবে তাঁকে সত্যিকারের লাখোপতি করে দিয়েছিল তাঁরই আবিষ্কৃত ম্যালেরিয়ার মিক্সচার ম্যালাহারি।

জটাকেশী-ফার্মেসি!

হ্যাঁ, ওটাই ছিল আমার পিতামহের ব্যবসার ট্রেডনেম। খারাপ নয়, বলো। জটাকেশী নামটার মধ্যে শুধু তো তাঁর ছেড়ে-আসা ভিটের স্মৃতি ছিল না; একটা দৈবক্ষমতার গন্ধও ছিল। অসুস্থ মানুষের মনে ওটা চিরকালই বাড়তি ভরসা নিয়ে আসে।

যাইহোক, এইভাবেই কলকাতায় তাঁর পনেরোটা বছর কেটে গেল। এল উনিশশো ছত্রিশ সাল। উনিশশো ছত্রিশ বললে তোমার কি কিছু মনে পড়ে, রুদ্র?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলছেন কি?

গুড। হ্যাঁ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। শুরু হল সেই যুদ্ধ। হিসেবমতন সোমেশ্বরের বয়স তখন সাঁইত্রিশ। বিবাহিত। চারটি সন্তানের জনক। প্রথম তিনটি কন্যা। কনিষ্ঠ পুত্র বিশ্বনাথ কাপালি, অর্থাৎ আমার বাবার বয়স তখন মাত্র ছ'বছর।

তুমি নিশ্চয়ই জানো, যুদ্ধের বাজারে সবকিছুরই দাম হয়েছিল আকাশছোঁয়া। সেই সুযোগে বহু ব্যবসায়ী ধুলোমুঠিকে সোনামুঠি করে ফেলেছিল। কিন্তু সেই বাজারেও মার খেয়ে গেলেন আমার দাদু। কেন বলো তো? যে আটবছর যুদ্ধ চলেছিল তার মধ্যেই সারা দেশে হু-হু করে অ্যালোপ্যাথি-ডাক্তারখানা আর হাসপাতাল গজিয়ে উঠেছিল।

প্রথমে সৈনিকদের প্রয়োজনেই সেসব তৈরি হয়েছিল। তবে দেখতে-দেখতে সেসব সুবিধে সাধারণ মানুষদের নাগালেও পৌঁছিয়ে গেল। তার অনেক আগেই ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে কুইনাইন এসে গিয়েছিল বাজারে। ফলে দাদুর লক্ষ্মী সেই ম্যালাহারি মিক্সচারের বিক্রিও তলানিতে নেমে গিয়েছিল।

উনিশশো-সাতচল্লিশে জটাকেশী ফার্মেসির ঘাড়ে নিয়তির শেষ কোপটা পড়ল। দাদুর তৈরি ওইসব পেটেন্ট-মেডিসিনের বারোআনাই বিক্রি হত পূর্ববঙ্গের গ্রামগঞ্জে, যে-কারণে কলকাতার মতনই ঢাকাতেও কোম্পানির ফ্যাক্টরি এবং অফিস ছিল। দেশভাগের ফলে সেটা হয়ে গেল পূর্ব পাকিস্তান। দাদু হারালেন তাঁর আসল বাজার।

ডায়েরিগুলো পড়েছি বলেই বলতে পারছি, সেইসময়ে দাদুর অবস্থা হয়ে গিয়েছিল পাগলের মতন।

তখনো ছোটপিসির বিয়ে দেওয়া বাকি। ওদিকে আমার বাবা তখনো নাবালক। কলকাতার কারখানায় পনেরোজন কারিগর ছাড়াও অন্তত পঞ্চাশজন মাইনে-করা ক্যানভাসার ছিল, যারা স্টেশনে-বাজারে জটাকেশীর ওষুধ বিক্রি করে বেড়াত। এতগুলো মানুষের বেতন দেবেন কোথা থেকে সেই চিন্তাতেই দাদুর তখন রাতে ঘুম হত না।

তোমাকে বলা হয়নি, ওই যে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রি, ওইটেই তখন ছিল জটাকেশীর ওষুধের কারখানা।

ওইসময়েই, মানে উনিশশো-আটচল্লিশ সালে একদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।

তখন সন্ধে সাতটা কি আটটা হবে। কারখানার কর্মচারীরা তার অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে। কিছু কাঁচামাল আসার কথা ছিল। সেগুলো আসতে দেরি হচ্ছিল বলে দাদু আর দাদুর কোম্পানির ম্যানেজার রমেনবাবু কারখানা ছাড়তে পারছিলেন না। শেষ অবধি সেই জড়িবুটি চালান এসে পৌঁছল সন্ধে সাতটায়। দাদু কারখানার দরজায় তালা দিয়ে বেলেঘাটা রোডের দিকে হাঁটা দিলেন। রমেনবাবুর বাড়ি উল্টোদিকে। তিনি সেদিকে চলে গেলেন।

কারখানার গেট ছেড়ে দাদু বোধহয় দশ-পাও এগোননি, বেলেঘাটার দিক থেকেই একটা ট্যাক্সি এসে দাদুর গা ঘেঁষে থামল। দরজা খুলে নেমে এলেন এক সাহেব আর মেমসাহেব। দাদুর সামনে দাঁড়িয়ে সাহেব প্রশ্ন করলেন, মিস্টার কাপালি?

ইয়েস।

আপনার সঙ্গে একটু ব্যবসা সংক্রান্ত কথা ছিল।

দাদু তো আকাশ থেকে পড়লেন। চূড়ান্ত অবাক হয়ে বললেন, ব্যবসা! সাদা চামড়ার লোকেরা তো এখন ইন্ডিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে ব্রিটেনে ফিরে যাচ্ছে। আপনারা নতুন করে কোন ব্যবসার কথা ভাবছেন শুনি?

সাহেব বললেন, বলছি সব। আগে একটু ভেতরে গিয়ে বসি, চলুন।

অগত্যা দাদু আবার কারখানার দরজার তালা খুলে সাহেব এবং মেমকে নিয়ে নিজের অফিসঘরে গিয়ে বসলেন। অফিসঘরের আলো জ্বালার পরে এতক্ষণে তিনি দুই আগন্তুককেই ভালো করে দেখতে পেলেন।

সাহেবটির চেহারা অদ্ভুত। একেকজন লোক থাকে যাদের দেখলেই মনটা বিরক্তিতে ভরে ওঠে—এ ঠিক সেইরকমের লোক। শ্বেতাঙ্গ ঠিকই, কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় বহুদিন ধরে রোদে পুড়েছেন। তার ফলে গায়ের চামড়াতেই যে শুধু বাদামি রঙ ধরেছে তাই নয়, সারা মুখেও অজস্র আঁকিবুঁকি দাগ পড়েছে। টিয়াপাখির মতন বাঁকানো নাক। কুতকুতে দুটো চোখের মণির রঙ ঘোলাটে। সর্বোপরি ঝুলে-পড়া ঠোঁট আর হাতের আঙুলের কাঁপুনি দেখে একজন চিকিৎসক হিসেবে সোমেশ্বর কাপালির বুঝতে বাকি রইল না যে, বৃদ্ধটি চূড়ান্ত মদ্যপ।

হ্যাঁ, বৃদ্ধ। সাহেবটির বয়স তখনই সত্তরের কম ছিল না।

দাদুর চোখে তার পোশাক-আশাকও অদ্ভুত ঠেকেছিল। নোংরা একটা সাদা আলখাল্লা পরেছিলেন তিনি। মাথায় গোল বাটির মতন ক্যাপ। সব মিলিয়ে যাজকের পোশাক। গলার সঙ্গে চেনে বাঁধা একটা ধাতুর ক্রুশ তাঁর বুকের ওপরে ঝুলছিল, কিন্তু ঝুলছিল উলটো-মুখে—অর্থাৎ মাঝের ডাঁটিটার ছোট দিকটার মুখ নীচের দিকে ছিল। এর অর্থ দাদু সেদিন বোঝেননি।

ডেভিল-ওয়রশিপার? আমি জিগ্যেস করলাম।

একদম। শয়তানের উপাসক। স্টিফেন মেয়ার ছিলেন তাই। স্টিফেন মেয়ার ছিল তাঁর নাম। যাজক স্টিফেন মেয়ার। জানা গেল, তিনি দীর্ঘকাল মেঘালয়ের উপজাতিদের মধ্যে ধর্মপ্রচারের কাজ করেছেন; কিন্তু ইদানিং আদিবাসীদের মধ্যেও হানাহানি বড্ড বেড়ে গেছে। স্টিফেন আর আগের মতন শান্তিতে কাজ করতে পারছেন না। তাই যাজকের বৃত্তি ত্যাগ করে ব্যবসায় নামবেন বলে ঠিক করেছেন।

মেয়ার-সাহেবের রোদে-পোড়া চামড়ার কারণ বোঝা গেল। মেঘালয়ের পাহাড়ি রোদ।

এবার দাদু তাকালেন মেমসাহেবের দিকে। তিনি যুবতী এবং পরমা সুন্দরী। সোনালি চুল, নীল চোখ এবং দীর্ঘাঙ্গী। নাম বললেন ইভা স্টাইনবেক।

মেমসাহেবের নামটা শুনেই দাদুর খটকা লাগল। জিগ্যেস করলেন, আপনি কি জার্মান?

চিবুকটা সামান্য উঁচু করে সগর্বে সেই শ্বেতাঙ্গিনী উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। জার্মান এবং আর্য।

বেশ মন দিয়ে বিরাজ কাপালির কথকতা শুনছিলাম। পুরোনো দিনের গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে? কিন্তু হঠাৎ তিনি গল্প থামিয়ে এমন একটা প্রশ্ন করে বসলেন যে, আরেকটু হলে ভির্মি খাচ্ছিলাম। বললেন, আচ্ছা রুদ্র। তুমি লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের নাম শুনেছ?

বললাম, সে তো একজাতের মুরগি।

আঃ। কানে কম শোনো নাকি? একটু বিরক্ত হয়ে ঘাড় নাড়লেন বিরাজ কাপালি, লেগহর্ন নয়, লেগহর্ন নয়—। লেবেনসবর্ন। এল ই বি ই এন এস—লেবেন্স। বি ও আর এন—বর্ন। অরিজিনালি জার্মান শব্দ। বাংলায় অনুবাদ করলে মানে দাঁড়াবে প্রাণ-ঝরনা।

এতক্ষণ উনি যা বলে যাচ্ছিলেন তার সঙ্গে প্রাণ-ঝরনার কী সম্পর্ক বুঝতে পারলাম না! শুকনো-মুখে বললাম, ও। আচ্ছা।

বিরাজ কাপালি আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, মোটেই আচ্ছা নয়। নাৎসি বীভৎসতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ছিল ওই লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই কালো দিনগুলোয় স্কুৎজস্টাফ বা সংক্ষেপে এস এস বাহিনীর নাম শুনলে সারা ইওরোপের মানুষের বুকের রক্ত হিম হয়ে যেত। হিটলারের বুলডগ বাহিনীও বলতে পারো এস এসকে।

সেই প্যারামিলিটারি ফোর্সের চিফ ছিলেন হাইনরিখ হিমলার। ওইসময়ে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের পরেই সবচেয়ে পাওয়ারফুল লোক ছিলেন তিনি। আস্ত অমানুষ। ইহুদি-নিধন যজ্ঞ বা হলোকস্টের পেছনে তাঁর যে শয়তানি-বুদ্ধি ভরা মাথা কাজ করেছিল, সেই একই মাথা থেকে বেরিয়েছিল লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের ছক। আর এই দুষ্কর্মে হিমলারের সহযোগী ছিলেন এক নীতিজ্ঞানহীন চিকিৎসক—ডক্টর গ্রেগর এবনার। এরা দুজনে মিলে খাঁটি আর্য-সন্তান প্রসব করানোর এক প্রোজেক্ট তৈরি করেন। তারই নাম লেবেনসবর্ন-প্রোগ্রাম।

সেই সময়ে জার্মানিতে হিটলারের অন্ধ ভক্তের সংখ্যা তো কম ছিল না। তাদের মধ্যে শুধু পুরুষই ছিল না, নারীও ছিল অনেক। তাদের মধ্যে থেকেই বেছে নেওয়া হত অবিবাহিতা যুবতী ভলান্টিয়ারদের। দেখে নেওয়া হতো তাদের পেডিগ্রি। দেখা হতো তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোনো অনার্য রক্ত, বিশেষত ইহুদি-রক্ত মিশেছিল কিনা। আর শারীরিক লক্ষণ হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া হত তাদের, যাদের চোখের মণি নীল, চুল সোনালি আর যারা দীর্ঘাঙ্গী।

এইবার আমি নড়েচড়ে বসলাম। একটু আগে বিরাজ কাপালি ইভা স্টাইনবেকের যে ডেসক্রিপসন দিলেন, তার সঙ্গে লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের ভলান্টিয়ারদের চেহারা বেশ মিলে যাচ্ছে তো!

তারপর? আমি প্রশ্ন করলাম।

তারপর এস এস বাহিনীর অফিসারদের মধ্যে যাদের ওই একই রকমের এরিয়ান পেডিগ্রি থাকত তাদের সঙ্গে মেয়েগুলিকে রাত কাটাতে হত। মাসের উর্বর রাতগুলো, বলাই বাহুল্য। সেসব হিসেব-নিকেশ করে দেওয়ার জন্যে প্রতিটি লেবেনসবর্ন-হোমে কোয়ালিফায়েড ডাক্তার থাকত।

এতই অবাক হলাম যে, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, আপনি সত্যি বলছেন?

মিথ্যেকথা বলে আমার লাভ? গুগল ঘেঁটে চেক করে নিতে পারো। তারপরে শোনো। এস এস অফিসার আর হিটলারের অনুগত মেয়েগুলির মধ্যে পরিচয়হীন প্রেমহীন সঙ্গম ঘটত। তারা কেউ কারুর পরিচয় জানত না। জানার দরকারই বা কী? হিমলারের প্ল্যান অনুযায়ী তারা তো সন্তান উৎপাদনের মেশিন ছাড়া আর কিছু ছিল না।

সঙ্গমের ফলে মেয়েগুলি গর্ভবতী হত। সন্তানের জন্ম দিত। সেই সন্তানগুলিকে লেবেনসবর্ন নার্সারিতে রেখে মেয়েগুলি ফিরে যেত যার যার বাড়িতে। পুরো ব্যাপারটাই রাখা হত গোপন। সত্যিকথা বলতে কি লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের পুরো ব্যাপারটাই সভ্যসমাজের গোচরে এসেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, জার্মানির পরাজয়ের পরে।

সে যাইহোক, ওইসময়ে, মানে উনিশশো ছত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছড়িয়ে পড়ছিল। শুধু জার্মানিতেই নয়, ইওরোপের অন্যান্য যে দেশগুলো জার্মানি কব্জা করেছিল, যেখানকার মেয়েদের দেখে হিমলারের মনে হয়েছিল এদের মধ্যে আর্য লক্ষণ রয়েছে, সেখানেও শেকড় গেঁড়েছিল লেবেনসবর্নের বিষবৃক্ষ। বুঝতেই পারছ, সেসব দেশে তো আর হিটলারের অনুরাগী মেয়ে পাওয়া যেত না। কাজেই সেখানে যেটা হত সেটা অর্গানাইজড-রেপ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর্য সন্তান পাওয়ার জন্যে পোল্যান্ড কিম্বা নরওয়ের মতন দেশগুলোতে কত কুমারী মেয়েকে যে এস এস অফিসারদের সঙ্গে রাত কাটাতে হয়েছে তার গোনাগুন্তি নেই।

বাচ্চাগুলোর কী হত? আমি প্রশ্ন করলাম।

এমনিতে লেবেনসবর্ন-চাইল্ডরা ওইসময়ে পৃথিবীর অন্যান্য বাচ্চাদের চেয়ে একশোগুণ ভালো জীবন কাটিয়েছিল। রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে তারা প্রচুর খাবার পেত, ওষুধ পেত। নাৎসি-ধরনে শিক্ষাও পেত অনেকখানি। শুধু বাপ-মায়ের পরিচয়টুকু তারা জানতে পেত না। বাচ্চাগুলো হয়ে যেত নাৎসি-সরকারের সম্পত্তি।

হিমলারের আশা ছিল, ওই বাচ্চাগুলো বড় হলে নাৎসি ভাবধারায় নিবেদিতপ্রাণ এক বিপুলসংখ্যক যুবক যোদ্ধাকে পাওয়া যাবে। একইসঙ্গে পৃথিবীর বুকে গড়ে উঠবে খাঁটি আর্য এক জনসম্প্রদায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পরে যখন লেবেনসবর্নের লুকোনো নথিপত্র নুরেমবুর্গ ট্রায়ালে পেশ হল, তখন দেখা গেল ওই ন'-দশ বছরেই কুড়িহাজার অবৈধ সন্তানের জন্ম হয়েছিল। তার মধ্যে শুধু জার্মানি আর নরওয়ের লেবেনসবর্ন ক্যাম্পগুলোতেই জন্ম নিয়েছিল পনেরো হাজার শিশু।

কাপালি স্যারের কথা শুনতে-শুনতে মনে হচ্ছিল, খুব কুৎসিত একটা রূপকথা শুনছি। তবে যে-প্রশ্নটা অনেকক্ষণ ধরেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেটা আর না করে থাকতে পারলাম না। বললাম, আপনি বোধহয় ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির পত্তনির ইতিহাস বলছিলেন। তার সঙ্গে লেবেনসবর্ন-প্রোগ্রামের সম্পর্ক কী?

কাপালি স্যার বললেন, আছে। আরো কিছুটা না শুনলে বুঝতে পারবে না। যেদিন স্টিফেন মেয়ার আর ইভা স্টাইনবেক দাদুর সঙ্গে দেখা করতে এলেন, সেদিন আমার দাদুও সম্পর্কটা বুঝতে পারেননি। অবশ্য কেমন করেই বা বুঝবেন? ইভা যদিও চিবুক তুলে অহঙ্কারী-ভঙ্গিতে বলেছিলেন, আমি জার্মান এবং আর্য, কিন্তু এটা তো বলেননি যে তিনি ছিলেন লেবেনসবর্ন-প্রোগ্রামের একজন নিবেদিতপ্রাণ ভলান্টিয়ার। যখন বলেছিলেন, দাদু যখন তাঁর ডায়েরিতে ওই শব্দটার উল্লেখ করেছেন, ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে।

তবে হ্যাঁ। ইভা যে ঠিক কোন উদ্দেশ্যে ঈশপের উটের স্টাইলে দাদুর কারখানায় মাথা ঢুকিয়েছিল, সেটা জানলে দাদু নির্ঘাৎ ওদের সেইমুহূর্তেই বার করে দিতেন। কিন্তু কী আর করা যাবে।

বললাম, কারখানায় মাথা ঢুকিয়েছিল মানে?

মানে খুব সহজ। ধুঁকতে-থাকা জটাকেশী ফার্মেসির ওই বাড়িতেই একটা পোর্সেলিনের বাসনপত্র আর ছোট-ছোট মূর্তি তৈরি করার কারখানা গড়ার প্রস্তাব দিয়েছিন ওরা। মনে রেখো রুদ্র, এসব প্রায় পঁচাত্তর-বছর আগের কথা। তখনো এই ট্যাংরা-তিলজলা অঞ্চলকে প্রপার ক্যালকাটা বলে ধরা হত না। তাই ওদের প্রস্তাব শুনে দাদু প্রথমেই ভাবলেন, ওঁরা এই জমিটাতেই কারখানা বানাতে চাইছে কেন? তাছাড়া 'সিক-ইন্ডাস্ট্রি' হলেও জটাকেশীতে তো তখনো প্রোডাকশন চলছিল।

তার উত্তরে স্টিফেনসাহেব একটা ভারি অদ্ভুত কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, গোটা ইওরোপের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর পোর্সেলিনের বাসন যেখানে বানানো হয় জার্মানির সেই অঞ্চলটার নাম ব্যাভেরিয়া। আর সেই ব্যাভেরিয়ার সবচেয়ে খানদানি কারিগর-বংশের মেয়ে হচ্ছেন ইভা স্টাইনবেক।

ইভার কাছে রয়েছে দুধের মতন সাদা, শিশুর চোখের মতন নীল, কচি কুসুমপাতার মতন লাল এবং আরো একশোরকম রঙ আর ডিজাইনের বাসন বানানোর কারিগরি বিদ্যা। সেই আশ্চর্য পোর্সেলিন বানাতে ঠিক কোন-কোন মালমশলা যে লাগে, তা গত আড়াইশো বছর ধরে স্টাইনবেক পরিবারের ট্রেড-সিক্রেট। সেসব উপাদানের কথা ইভা তার বিজনেস-পার্টনার স্টিফেনকেও কোনোদিন বলেননি, দাদু তো কোন ছাড়। তবে তার মধ্যে একটা উপাদান হচ্ছে ব্লাড-চারকোল রক্ত থেকে তৈরি করা অঙ্গার। এবং সেটা লাগে প্রচুর পরিমাণে।

দাদুকে আর বেশি বুঝিয়ে বলতে হয়নি। কবরডাঙা রোডের একপাশে ওই কসাইখানাটা তো তার অনেক আগে থেকেই ছিল, যদিও সেটা ছিল কসাইখানার পেছনদিক। এদিক দিয়ে কেউই যাতায়াত করত না। তবে রাস্তার ধারের নালি দিয়ে দিনের মধ্যে চারবার জলের মতন হুড়হুড় করে বয়ে যেত জবাই করা পশুর রক্ত।

নালিটা ছিল দাদুর কারখানার একেবারে গা ঘেঁষে। ইচ্ছে করলে পুরো রক্তস্রোতটাকেই কারখানার ভেতরে এনে ফেলা যায়। ইভা বললেন, সেইজন্যেই এই জমিটা তার এত পছন্দ। দাদুকে ওই জমির জন্যে তিনি যা দাম দিতে চাইলেন, সেটা অবিশ্বাস্য রকমের বেশি এবং সোমেশ্বর কাপালির মতন একজন ডুবন্ত ব্যবসায়ীর পক্ষে দারুণ লোভনীয়।

তবু দাদু তখনই ওঁদের কোনো কথা না দিয়ে একসপ্তাহ সময় চাইলেন এবং পুরো সপ্তাহটা জুড়ে তিনি বম্বে, কলকাতা আর মাদ্রাজের নানান পাইকিরি বাজারে নানারকমের খোঁজখবর নিলেন। সেই সময়টা স্টিফেন আর ইভা রডন-স্ট্রিটের একটা হোটেলে শান্তভাবে অপেক্ষা করলেন। একসপ্তাহ বাদে সোমেশ্বর ওদের জানালেন যে, তিনি জমি বিক্রি করতে রাজি, তবে পুরো দামের কিছুটা তিনি নেবেন ক্যাশে আর বাকিটার জন্যে তাকে কোম্পানির একজন পার্টনার করে নিতে হবে।

কেন? এরকম ডিসিসন নিলেন কেন? আমি জিগ্যেস করলাম।

বিরাজ কাপালি বললেন, আসলে দাদু এরমধ্যে খোঁজ নিয়ে দেখেছিলেন যে, স্বাধীনতার পরে ভারতের বাজারে আর ইওরোপ-আমেরিকা থেকে আগের মতন অবাধে পোর্সেলিন আমদানি হচ্ছে না। অথচ দেশে নব্য ধনীদের সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে চলেছিল। খুলছে নতুন-নতুন পাঁচতারা-তিনতারা সব হোটেল আর দামি রেস্তোঁরা। সব মিলিয়ে দাদু বুঝতে পেরেছিলেন, সময়টা এমন যে, ভালো-কোয়ালিটির পোর্সেলিনের বাসন বাজারে পড়তে পাবে না! সেইজন্যেই তিনি চেয়েছিলেন পার্টনারশিপ।

ইভা আর স্টিফেন দাদুকে আটকাবার অনেক চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দাদু ছিলেন নাছোড়। অগত্যা তাঁরা দাদুকে ওই জমি-বাড়ির পরিবর্তে তিন-লক্ষ টাকা আর কোম্পানির শতকরা কুড়িভাগের অংশীদারি দিতে বাধ্য হলেন।

কবরডাঙার ওই কারখানা-ঘরের খোলশটুকুই শুধু রইল। বন্ধ হয়ে গেল জটাকেশী ফার্মেসি। ছাঁটাই হয়ে গেল পুরোনো লোকজন। বিদেশি পার্টনাররা কারখানার বাইরের দিকে তেমন কিছু পরিবর্তন করলেন না, শুধু পঙ্খের কাজ করে ওই যে কোম্পানির নাম, ওটাকে খোদাই করে দিলেন আর একটা স্লুইস-গেটের ভেতর দিয়ে কারখানার ভিতরে রক্ত নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন।

কারখানা-ঘরের ভিতরের খোল-নলচে সবই বদলে গেল। দাদুই খুঁজেপেতে হাওড়ার কোন গ্রাম থেকে তিনজন কারিগরকে নিয়ে এলেন। লোকগুলোর দেশিয় পদ্ধতিতে চিনেমাটির বাসন তৈরির অভিজ্ঞতা ছিল। তবে হেড-মিস্ত্রি ছিলেন ওরা দুজন—স্টিফেন আর ইভা। দাদু কখনোই কারখানা-ঘরের ভেতরে পা রাখেননি। কারণটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। যেখানে নিজের ওষুধের কারখানা ছিল, সেখানে অন্য কাজ হতে দেখলে মন খারাপ হতে বাধ্য।

তবে স্টিফেন আর ইভার তাতে কিছু আটকাল না। বিদেশ থেকে আনানো হল চায়না-ক্লে, ফেলসপার আর আরো কী কী যেন সব কাঁচামাল। রানিগঞ্জ থেকে ট্রাকে করে এল ফার্নেসের জন্যে বিশেষ কোয়ালিটির কয়লা। শেষমেষ উনিশশো-উনপঞ্চাশ সালের অক্টোবর-মাসে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির ফার্নেসে প্রথমবারের মতন আগুন জ্বলল।

কাপালি স্যার হাত বাড়িয়ে একটা ডায়েরি তুলে নিলেন। দেখলাম, ডায়েরিটার অনেকগুলো পাতার ভাঁজে বুকমার্ক দেয়া আছে। একটা পাতা খুলে তিনি ঝুঁকে পড়লেন। চোখ কুঁচকে কিছুক্ষণ লেখার ওপরে চোখ বুলিয়ে বললেন, উনিশশো পঞ্চাশের সাতই জানুয়ারি। দাদু লিখছেন, প্রথম ত্রৈমাসিকে বিক্রির পরিমাণ খুশি হওয়ার মতন। লভ্যাংশ হিসেবে আমি পেয়েছি কুড়িহাজার তিনশো একুশ টাকা। মনে হচ্ছে ভাগ্যের চাকা আবার ঘুরছে। ছোটমেয়ের জন্যে আমোদপুর থেকে একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে। ভাবছি কথাবার্তা পাকা করে নেব। দেনা-পাওনার জন্যে আটকাবে না।

আবার কয়েকটা পাতা উলটে অন্য একটা পাতায় এসে স্থির হল তাঁর হাত। বললেন, ওই বছরেরই অক্টোবর মাস। সতেরো তারিখ। দাদু লিখছেন, গত তিনদিন শরীর এবং মনের ওপর দিয়ে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। চোদ্দো তারিখ রাতে স্টিফেন মেয়ারের মৃত্যু হয়েছে। অপঘাতে মৃত্যু। এবং বীভৎস মৃত্যু। বেচারা ব্লো-পাইপ দিয়ে গলন্ত কাঁচের বুদ্বুদে ফুঁ দিয়ে ফুলদানি বানাচ্ছিল। কীভাবে কে জানে, সেই পেতলের ব্লো-পাইপ ওর টাকরা ফুঁড়ে মাথায় ঢুকে গিয়েছিল।

সময়টা ছিল গভীর রাত, সেইসময়ে ওদের ফাউন্ড্রির মধ্যে আর কেউ ছিল না। কাজেই কী করে যে এমন ঘটনা ঘটল সেটা কেউ বলতে পারছে না। ডাক্তারের অনুমান, কাজ করতে-করতেই স্টিফেনের একটা মাইল্ড হার্ট-অ্যাটাক হয়ে থাকবে, যার ফলে ওর মাথা ঝুঁকে পড়েছিল সামনে! ব্লো-পাইপের পেছন দিকটা মুখের তালু ফুঁড়ে ওপরে উঠে গিয়েছিল। আমাদের কংগ্রেসি কাউন্সিলরের দয়ায় থানা-পুলিশের ঝামেলা এড়ানো গিয়েছে।

ইভাকে জিগ্যেস করেছিলাম, স্টিফেনের মৃতদেহ ওর দেশে পাঠানোর দরকার আছে কিনা। তাতে ইভা অদ্ভুত একটা কথা বললেন। এই প্রথম ওর কাছ থেকে জানলাম, স্টিফেন আদতে ছিলেন রুমানিয়ার জিপসি সম্প্রদায়ের লোক। ওঁর না আছে ঘর, না আছে সংসার। একটা সময় অবধি আমি ভাবতাম, স্টিফেন বুঝি ইভার অসমবয়সি প্রেমিক। ইভাকে ব্যবসার পয়সাকড়ি ওই জোগাচ্ছে। কিন্তু গত কয়েকদিনে বুঝলাম, মোটেই তা নয়। ইভার সঙ্গে নাকি ওঁর সম্পর্কটা ছিল গুরু-শিষ্যার।

শুনে চমকালাম। স্টিফেন আবার ইভাকে কী শেখাতেন? যেদিন ওদের সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়েছিল, মনে আছে, সেদিন স্টিফেনই আমাকে বলেছিল, পোর্সেলিন বানানোর 'নো-হাও' সব ইভা জানে। সে-সব স্টাইনবেক পরিবারের বংশগত গোপন বিদ্যা; বাইরের কেউ জানবে না।

তাহলে?

ইভাকে জিগ্যেস করলাম, গুরু-শিষ্যা কথাটার মানে কী। প্রশ্নটা শুনে ইভা স্পষ্টতই অপ্রস্তুত হলেন। আমতা-আমতা করে বললেন, না, মানে ওই ইয়ে আর কি। কোনো শিল্পসামগ্রীই কি আর একটা কালচারের মধ্যে আটকে থাকে? নানান কালচারের মিশ্রণ থাকে তার মধ্যে। ও আমাকে শেখাত রুমানিয়ার ট্র্যাডিশনাল পোড়ামাটির বাসনপত্রের ডিজাইন।

ডায়েরি থেকে মুখ তুলে কাপালি স্যার বললেন, সে যাই হোক, স্টিফেনের মৃত্যুতেই গল্প শেষ হল না। পরের বছর, মানে উনিশশো-একান্নর দোসরা মার্চ, ওই ছোট্ট কারখানাটার চৌহদ্দির মধ্যে আরো এক দুর্ঘটনা ঘটে গেল।

সেই-যে হাওড়া থেকে সোমেশ্বর কাপালি তিনজন কারিগরকে নিয়ে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেল। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, আগের রাতে তিনজন লেবার একই ঘরে ঘুমিয়েছিল। তারপর, তখন গভীর রাত, ওই যে-লোকটা পাগল হয়ে গিয়েছিল, সেই লোকটা বাকি দুজনকে ঠেলা মেরে জাগানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাকি দুজনের চোখে তখন গাঢ় ঘুম। ওরা ওঠেনি। শুধু আবছা মনে আছে, লোকটা বলেছিল, কারখানা-ঘরে একটা কিছু হচ্ছে। সে দেখতে চলল।

সেই ছিল লোকটার শেষ কথা। পরদিন ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে বাকি দুজন কারিগর দ্যাখে তাদের সেই সঙ্গী কারখানা-ঘরের দরজায় বসে আছে। কখনো হাসছে, কখনো কাঁদছে। আবার কখনো প্রবল আতঙ্কে চিৎকার করে উঠছে। তাকে গ্রামের বাড়িতে ফেরত দিয়ে আসা হল। বাকি দুজন মিস্ত্রি কারখানায় থেকে গেল।

কিন্তু সে মাত্র দুদিনের জন্যে। দুদিন পরেই, তখন সবে ভোরের আলো ফুটেছে, সেই দুজন মিস্ত্রি আমাদের এই সার্পেন্টাইন-লেনের বাড়িতে এসে দাদুর পায়ের কাছে মাটিতে থেবড়ে বসে পড়ল। হাঁউমাঁউ করে তারা যা বলল, তার সার কথা, কারখানা-ঘরে ভূত আছে। দাদু অবাক হয়ে বললেন, সে আবার কী! ওরা বলল, ওদের সেই সঙ্গী পাগল হয়ে যাওয়ার পর থেকে গত দু-রাত ওরা সজাগ হয়ে শুচ্ছে। সেইজন্যেই ওরা দেখতে পেয়েছে কারখানা-ঘরে গভীর রাতেও ফার্নেস জ্বলে। হঠাৎই পচা গন্ধে ভরে যায় চারপাশ আর হিংস্র কোনো জানোয়ারের গরগরানির মতন আওয়াজ আসে ওদিক থেকে। তাছাড়া...

ওরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে থেমে গেল।

দাদু ছাড়বার পাত্র নন। কড়া-গলায় বললেন, থামলে কেন? তাছাড়া কী?

তাছাড়া—ওরা আমতা-আমতা করে বলল, আমাদের চোখের ভুল হতে পারে—আপনি আমাদের নাম করে এই কথাটা কাউকে বলবেন না কোবরেজমশাই—মনে হয় দু-রাতেই যেন ইভা মেমসাহেবকে কারখানা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি। একদম নাঙ্গা উদোম।

চোখের ভুল যে নয় সে কথা বোঝার মতন বুদ্ধি দাদুর ছিল। দুটো সুস্থ-সবল লোকের চোখ তো আর একইরকম ভুল দেখতে পারে না। দাদু ওদের বললেন, তোরা মেমসাহেবকে কিছু বললি না? এতদূর দৌড়ে চলে এলি?

বলব কেমন করে? কোন ভাষায় বলব? মেমসাহেব বাংলা-হিন্দি কিছুই জানেন না। স্টিফেনসাহেব ভাঙা ভাঙা হিন্দি জানতেন। তিনিই আমাদের কাজকর্ম বুঝিয়ে দিতেন। তাছাড়া মেমসাহেব তো বেলা বারোটা অবধি ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমোন। আপনি জানতেন না?

না, ইভার এই অভ্যেসের কথা দাদু সত্যিই জানতেন না। তিনি কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে বললেন, তা তোরা এখন কী করবি?

ওদের মধ্যে একজন গেঁজের মধ্যে থেকে একটা বড় চাবির গোছা বার করে দাদুর পায়ের কাছে নামিয়ে দিয়ে বলল, আপনিই আমাদের চাকরি দিয়েছিলেন, তাই আপনার কাছেই ইস্তফা দিয়ে গেলাম। আমাদের থাকার জায়গা আর কারখানা ঘরের চাবি এই রইল। আপনি রাখুন। পরে মেমসাহেবকে দিয়ে দেবেন। আমরা দেশে ফিরে গেলাম। এই মাসের পাঁচদিনের মজুরি পরে কখনো এসে নিয়ে যাব না হয়।

দাদু দেখলেন, ওরা সত্যিই ঝোলা গুছিয়েই বার হয়েছে। দাদু ওদের হাতে পাঁচদিনের মজুরি ধরিয়ে দেওয়া মাত্র ওরা হ্যারিসন রোডের দিকে পা চালাল। একবার ঘুরেও তাকাল না।

সাত

গল্প জমে গিয়েছিল। আমি জিগ্যেস করলাম, তারপর?

লোকদুটো চলে যাওয়ার পর চটপট স্নান-আহ্নিক সেরে দাদু কারখানার দিকে রওনা হয়ে গেলেন। পকেটে কারখানার চাবির গোছা।

বাঁ-দিকের ব্যারাক বাড়িটায় ইভা আর স্টিফেন থাকতেন। স্টিফেনের মৃত্যুর পর তখন ইভা একাই থাকেন। ব্যারাক বাড়ির দিকে যেতে গিয়েও দাদু থেমে গেলেন। কারণ, ভেতরদিক থেকে এঁটে বন্ধ করা দরজা-জানলাগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল, ইভা তখনো ঘুম থেকে ওঠেননি। দাদু ঘড়ি দেখলেন—বারোটা বাজতে তখনো কয়েক মিনিট দেরি ছিল। তিনি ভাবলেন, থাক। আর কিছুক্ষণ বাদে উনি হয়তো নিজেই উঠে পড়বেন। তখনই না হয় কথা বলব। আপাতত কারখানাটা একটু দেখে আসা যাক।

তোমাকে আগেই বলেছি, কারখানার প্রোডাকশনের ব্যাপারে দাদু কোনোদিন মাথা ঘামাননি। সত্যি কথা বলতে কি ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির তিনি ছিলেন স্লিপিং-পার্টনার।

কিন্তু সেই-দিনটার কথা ছিল স্বতন্ত্র। স্টিফেন মারা গেছেন, কারিগরেরাও কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেল। ইভার অবস্থা তিনি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছিলেন। মাত্র বছরখানেক আগেই যে প্রাণোচ্ছল এবং আত্মবিশ্বাসী যুবতী তাঁর সঙ্গে কারখানা কেনার 'ডিল' করেছিলেন, তিনি কি আর আগের মতন আছেন?

সোমেশ্বর কাপালির বয়স তখন বাহান্ন। দুনিয়াদারি অনেকটাই দেখে নিয়েছেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এখনো যদি তিনি ব্যাভেরিয়া ইন্ডাস্ট্রির ব্যাপারে মনোযোগ না দেন তাহলে তাঁর শেষ বয়সের অবলম্বন এই ব্যবসাটাও ডুববে।

এইসব চিন্তা করতে-করতেই সোমেশ্বর কাপালি সেদিন, পাঁচই মার্চ উনিশশো-একান্ন, বেলা বারোটার সময়, জীবনে প্রথমবারের জন্যে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানা-ঘরের দরজার গা-তালা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। তারপর বাড়ি ফিরে তিনি সেদিন যা-যা করেছিলেন, যা-যা দেখেছিলেন, সবটাই পরিষ্কার করে ডায়েরিতে লিখে রাখলেন।

কারখানা-ঘরের ভেতরে সেদিনও কোনো বৈদ্যুতিক আলো জ্বলেনি। তবু হালকা সবুজ একটা আভায় পুরো ঘরটাই ভরে ছিল। সোমেশ্বর কাপালি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন, ঘরটায় তিনি ছাড়াও আরেকজন কেউ রয়েছেন। না, কাউকে দেখতে পাননি। কোনো শব্দও শোনেননি। তবু তাঁর মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাঁর ওপরে নজর রাখছে।

বেশ কিছুক্ষণ বেঞ্চের নীচে, ফার্নেসের ভেতরে উঁকিঝুঁকি মারার পরেও বুঝতে পারলেন না যে, সে রয়েছে কোথায়! শুধু যে দেখছিল তাই নয়, সোমেশ্বর কাপালি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, সেই অদৃশ্য অস্তিত্ব ক্রমাগত তাঁর কানে বলে চলছিল, আর বেশি এগিও না সোমেশ্বর। তুমি এখানে অবাঞ্ছিত। ভালো চাও তো এইমুহূর্তে এখান থেকে বেরিয়ে যাও।

বেরিয়েই আসছিলেন সোমেশ্বর কাপালি।তার আগেই একটা ভারি অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল তাঁর। যতদিন কারখানা-ঘরে জটাকেশী ফার্মেসির ওষুধপত্র তৈরি হত, ততদিন জিনিসটা ওখানে ছিল না। সেটা আর কিছুই নয়, ফার্নেসের কাছাকাছি মেঝের ওপরে একটা চৌবাচ্চা। হঠাৎ করে দেখলে বোঝা যায় না যে, ওখানে চৌবাচ্চাটা রয়েছে। কারণ, ঠিক ম্যানহোলের ঢাকনার মতন একটা গোলাকার ঢালাই-লোহার ঢাকনা দিয়ে চৌবাচ্চাটার মুখ এঁটে বন্ধ করা ছিল।

সোমেশ্বর পাশ দিয়ে যেতে-যেতেই কী মনে হতে ঢাকনাটার আংটা ধরে একটা টান দিয়ে সেটাকে খুলে ফেললেন, আর খোলামাত্রই বীভৎস পচা গন্ধে তিনি প্রায় জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। অলৌকিক সবুজ আলো সেই চৌবাচ্চার ভেতরেও নেচে বেড়াচ্ছিল! সেইজন্যেই তিনি দেখতে পেলেন চৌবাচ্চাভর্তি রক্ত। তিনি বুঝতে পারলেন, কসাইখানা থেকে পশুর রক্ত এনে এই মেঝের নীচের চেম্বারেই জমানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন ইভা আর স্টিফেন।

সোমেশ্বরের চোখের সামনেই সেই রক্তের চৌবাচ্চার মধ্যে একটা ঢেউ উঠল। পুকুরের মধ্যে বড় কোনো মাছ ঘাই মেরে জলের নীচে ডুবে গেলে তার মাথার ওপরের জলটুকু যেমন একমুহূর্তের জন্যে ফুলে ওঠে, ঠিক সেইরকম। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, ওই রক্তের সঞ্চয়ের মধ্যে বাস করছে বৃহদায়তন কোনো জীব। সেটা যে কী, তা নিয়ে তদন্ত করার সাহস তাঁর ছিল না।

তিনি তড়িঘড়ি ম্যানহোলের ঢাকনাটা নামিয়ে দিয়ে কারখানা-ঘরের ভেতর থেকে আবার উঠোনে বেরিয়ে এলেন। উঠোন পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন বাঁ-দিকের ব্যারাক বাড়ির দালানে। হ্যাঁ রুদ্র, যে-বাড়িটায় এখন তোমার থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তোমাকে তো একটু আগেই বললাম, সত্তর বছর আগে ওই চারটে ঘরের মধ্যেই কোনো একটায় থাকতেন ইভা স্টাইনবেক। স্টিফেন মেয়ার মারা যাওয়ার পরে তিনি একাই থাকতেন।

শূন্য কারখানা। শূন্য উঠোন। এবং ব্যারাক বাড়ি দুটোতেও তখন থাকার কথা একমাত্র ইভার। সোমেশ্বর একবার কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটায় সময় দেখলেন। সাড়ে বারোটা। তিনি চিন্তা করলেন, ডাকব কি ইভাকে? পায়ে-পায়ে ইভার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেনও তিনি।

কিন্তু দরজায় নক করার আগেই তাঁর কানে এল ইভার গলা। একঘেয়ে সুরে এবং অচেনা-ভাষায় ইভা কিছু বলে যাচ্ছিলেন। সোমেশ্বরের মনে হয়েছিল সুরটা সাপুড়ে-বাঁশির সুরের মতন—যার মধ্যে একইসঙ্গে আদিমতা এবং সম্মোহন মিশে ছিল। সেই গান কিছুক্ষণ শুনলেই মন অবশ হয়ে যায়; অন্তত সোমেশ্বর কাপালির সেদিন তাই হয়েছিল।

ইভা কি মন্ত্র পড়ছেন? কোনোরকম প্রার্থনায় ব্যস্ত রয়েছেন? এইসময় তাঁকে ডাকা কি ঠিক হবে? কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না সোমেশ্বর।

ঠিক তখনই তাঁর চোখে পড়ল, ঘরের একটা জানলার পাল্লা অল্প একটু খোলা রয়েছে। হয়তো ছিটকিনি আলগা থাকায় জানলাটা সামান্য ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। ইভা কী করছেন দেখার জন্যে সোমেশ্বর সেই ফাঁকটায় চোখ লাগালেন! যা দেখলেন তা কোনো জীবিত মানুষের দেখার কথা নয়!

আমি একটু অধৈর্য হয়েই কাপালি স্যারকে জিগ্যেস করলাম, কী দেখলেন?

দেখলেন, ইভা স্টাইনবেক মেঝের ওপরে হাঁটু মুড়ে বসে আছেন। দালানের দিকেই মুখ ফিরিয়ে বসেছিলেন, তাই দাদু তাঁকে সামনের দিক থেকে দেখেছিলেন। গায়ে একটা সুতোও ছিল না মহিলার—সম্পূর্ণ নগ্ন। আধো অন্ধকার ঘরটার মধ্যে সেই শ্বেতাঙ্গিনীকে দেখে মনে হচ্ছিল একটা মোমের মূর্তি। সোনালি চুলের রাশি পিঠের ওপরে লুটোচ্ছিল। চোখদুটো আধবোজা। তিনি ওই অবস্থাতেই দুর্বোধ্য ভাষায় একটানা মন্ত্র পড়ে যাচ্ছিলেন।

দাদু লিখছেন—ইভার তলপেটের দিকে একপলক তাকিয়েই বুঝতে পারলাম যে, তিনি গর্ভবতী। আমি একজন চিকিৎসক। গর্ভলক্ষণ চিনতে আমার ভুল হয় না। অন্তত পাঁচমাসের গর্ভভার বহন করছেন তিনি।

আর যা দেখলাম তা আমার সমস্ত অভিজ্ঞতা এবং সমস্ত অধ্যায়নের অতীত। চিকিৎসা-শাস্ত্র অথবা শরীরবিদ্যার কোনো গ্রন্থে এমন কোনো লক্ষণের কথা আমি পড়িনি। দেখলাম, ইভার স্বাভাবিক দুই স্তনের মাঝখানে, ওঁর সম্পূর্ণ স্তনসন্ধি জুড়ে তৃতীয় একটি স্তন। বাকি দুটি স্তনের মতই সেটি পরিপূর্ণ, নিটোল এবং অপরূপ।

আমার পা কাঁপতে শুরু করল। আমার মনে হল ওই তৃতীয় স্তনটির শীর্ষে যা আছে, তা সাধারণ বৃন্ত নয়—চোখ। অদ্ভুত এক সম্মোহক-দৃষ্টিতে সেই চোখটি আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। এমনই সেই সম্মোহনের টান যে, প্রবল উচ্ছা সত্তেও আমি সেই জানলার সামনে থেকে এক-ইঞ্চিও নড়তে পারলাম না।

ঠিক তখনই মন্ত্রপাঠ থামিয়ে ইভা আমার দিকে তাকালেন। বিন্দুমাত্র অবাক হলেন না, সঙ্কুচিতও নয়। যেন সত্যিই ওই স্তনের চোখ দিয়েই তিনি আমাকে অনেক আগেই দেখে নিয়েছিলেন। তিনি বললেন, প্লিজ কাম ইন মিস্টার কাপালি। আই নিড ইউ। আই নিড ইয়োর হেল্প ব্যাডলি। অফকোর্স ইউ উইল বি রিওয়ার্ডেড ফর ইট।

এরপর দাদু লিখছেন, ইভা আমাকে সমস্ত কথা খুলে বলেছেন। লেবেনসবর্ন-প্রোগ্রামের কথা শুনে আমি তো হতভম্ব। উনি এখন এই কারখানায় সেই প্রোগ্রাম চালিয়ে যেতে চান। উনি যে-পথে হাঁটছেন সেই পথে হাঁটার জন্যে জার্মানিতে নাকি অসংখ্য মেয়ে অপেক্ষা করে রয়েছে। সেই মেয়েদের পেছনে আবার রয়েছে নাৎসিদের গোপন সংগঠন। যুদ্ধ শেষ হলেও তারা শেষ হয়নি। সংগঠনের ধনকুবের সদস্যেরা আমাকে সোনা দিয়ে মুড়ে দেবে, শুধু যদি ইভা স্টাইনবেকের সঙ্গে থাকি।

শুধু মুখের কথা নয়, ইভা আমাকে আজকেই একটা বিশাল হিরের ব্রোচ দিয়েছে, যেটার দাম কয়েক লক্ষ টাকা হবে। আমি ওকে বলেছি, আমার বাড়ি-জমির বিলি-বন্দোবস্ত করে কয়েকদিন বাদেই আমি ফিরে আসছি। কারণ, আমি জানি এই আগুন নিয়ে খেলায় আমি যেমন বড়লোক হতে পারি, তেমনি আমার প্রাণটাও চলে যেতে পারে। আমার পরিবারকে তো আর পথে বসিয়ে যেতে পারি না।

এই ঘোষণা দিয়েই সোমেশ্বর কাপালি তাঁর ডায়েরির লেখা শেষ করেছিলেন। ডায়েরির শেষ এন্ট্রি বলতে যা বোঝায়, তা হল এই। তবে বাবার কাছে শুনেছি, পরের দিনই তিনি আবার ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানায় ফিরে গিয়েছিলেন। তারপর আবার বারবার। এবং তার মাসখানেক পরেই সার্পেন্টাইন-লেনের পাট চুকিয়ে ওই কারখানার ব্যারাক বাড়িতেই থাকতে শুরু করেছিলেন। একবছরের কিছু বেশি সময় তিনি ওখানেই ছিলেন।

বিরাজ কাপালি কথা শেষ করে পর-পর দু-গ্লাস জল খেলেন। তারপর ডায়েরিগুলো গোছা করে তুলে বেডসাইড টেবলে নামিয়ে রাখলেন।

ফ্রেঞ্চ-উইন্ডোর কাচের বাইরে শিয়ালদার স্টেশনবাড়ির চুড়োগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। কান পাতলে শুনতে পাচ্ছিলাম, ফ্লাই-ওভারের ওপর দিয়ে ছুটে চলা ট্রামের চাকার ঘর্ঘর শব্দ। সবই কত সহজ, কত স্বাভাবিক।

কিন্তু এও জানি যে, মাত্র কুড়ি-মিনিটের দূরত্বে অন্ধকারে ডুবে আছে গোরে বিবি কি মহল্লা। সেখানে সন্ধের অন্ধকারে গাছের ওপরে ফুলের মতন ফুটে থাকে সুন্দর এক মৃত-মেয়ে—বিশাখা। সেখানে দ্বৈতসত্তা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় হাসি মণ্ডল।

এসব তো আমার নিজের চোখেই দেখা।

আর যা দেখিনি, তার কথা এখন শোনালেন বিরাজ কাপালি। তিনি বললেন ইভা স্টাইনবেকের তৃতীয় স্তনের কথা।

প্রকৃতির রাজ্যে মানবীর তৃতীয় স্তনের মতন কিছু কি হয়? নাকি, ওই স্তনও সেই সমান্তরাল পৃথিবী থেকে কালো হাওয়ায় ভর করে ভেসে এসেছিল?

কোলের ওপরে নামিয়ে-রাখা একটা ছোট রুমাল দিয়ে ঠোঁটের কোনগুলো মুছে নিয়ে বিরাজ কাপালি আবার কথা শুরু করলেন। তাঁর মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম, তিনি আজ এই রাতের মধ্যেই আমাকে সব কিছু বলে যেতে চাইছেন। যেন তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই।

তিনি বলে চললেন...

সেই উনিশশো-একান্নর মার্চমাসে পাকাপাকিভাবে গৃহত্যাগের আগে দাদু তাঁর সমস্ত সম্পত্তি চার ছেলেমেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। স্থাবর-সম্পত্তি বলতে ছিল সার্পেন্টাইন-লেনের এই বাড়ি আর দমদমের কাছে ন'বিঘে জমি। দমদমের জমি তিনি তিন মেয়ে-জামাইয়ের নামে লিখে দিয়েছিলেন। বাবাকে দিয়ে গিয়েছিলেন এই বাড়ি, তবে বলে গিয়েছিলেন, সেটা তিনি পাবেন ঠাকুমা মারা যাওয়ার পরে। বাবা তাই পেয়েছিলেন। তার জন্যে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। দাদুর গৃহত্যাগের লজ্জা সহ্য করতে না পেরেই সম্ভবত, ঠাকুমা ঠিক তার পরেপরেই মারা যান।

এই বাড়ি ছাড়াও তিনি আমার বাবা বিশ্বনাথ কাপালিকে একটা বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন। শুনেছি পরিমাণটা ছিল ন'লক্ষ। এত টাকা পেয়ে বাবা তো অবাক। কারণ, ব্যাভারিয়া ইন্ডাস্ট্রি যে খুব ভালো চলছে না সেটা তিনি জানতেন। তাহলে সোমেশ্বর কাপালি এতগুলো টাকা পেলেন কোথা থেকে? ছেলের প্রশ্নের উত্তরে দাদু বলেছিলেন, এনিমি প্রপার্টি ট্র্যান্সফারের ফলে তিনি সবেমাত্র ঢাকার কারখানা আর জমি বাবদ পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ওই টাকা পেয়েছেন। তবে মনে হয় কথাটা মিথ্যে। আসলে তিনি হিরের ব্রোচ বিক্রি করে পেয়েছিলেন ওই টাকা।

এই ডায়েরিগুলো দাদু সঙ্গে করে কবরডাঙার কারখানায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বহুদিন সেখানেই পড়েছিল। কাজেই আরও অনেক রহস্যের মতন ওই ন'লক্ষ টাকার রহস্যও আমার বাবার কাছে রহস্যই থেকে গিয়েছিল, যতদিন না তিনি নিজে ওই কারখানায় ঢুকে তত্ত্বতালাশ করে এগুলো হাতে পেয়েছিলেন।

যাই হোক, দাদু চেয়েছিলেন, ওই টাকায় বাবা নিজের ব্যবসা শুরু করুন। কিন্তু তা হয়নি। বাবা সারাজীবনে আর কোনো কাজই করেননি; বাবুয়ানি করেছেন। তবে সুরা, নারী বা ঘোড়দৌড়ের তামসিক বাবুয়ানি নয়। তাঁর ছিল সাত্ত্বিক নেশা। বইয়ের নেশা। পেন্টিং আর ভাস্কর্যের নেশা। দামি-দামি সুগন্ধী আর দেশি-বিদেশি পাখি পোষার নেশা। এইসবের পেছনেই তিনি অকাতরে ওই টাকা উড়িয়েছেন।

বাবার কথা পরে বলছি। আগে দাদুর কথা বলে নিই।

ওই যে বললাম, দাদু সার্পেন্টাইন-লেনের এই বাড়ির পাট চুকিয়ে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির ব্যারাকবাড়িতেই থাকতে শুরু করেছিলেন, কথাটা এতটুকু মিথ্যে নয়। প্রথম-প্রথম বাবা এবং আমার তিন পিসেমশাই অনেকভাবে তাঁকে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কিছুতেই সেই কাজে সফল হননি।

তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবা এবং পিসেমশাইদের সেই চেষ্টায় ভাঁটা পড়েছিল।

স্বাভাবিক। টাকাকড়ি আর সম্পত্তির বিলিবন্দোবস্ত করে দিলে সংসারে একজন প্রৌঢ়ের আর কী দাম থাকে? আছেন তিনি নিজের মতন, থাকুন না। বরং পাড়ায় ফিরলেই তাঁর পরিবারকে আরো অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হত। এমনিতেই 'সোমেশ্বর কবিরাজ বুড়োবয়সে একটি মেম-মাগির পাল্লায় পড়েছে'—এটাই ছিল তখন বৈঠকখানা বাজারের সবচেয়ে মুখরোচক কেচ্ছা। লোকটা চোখের আড়ালে থাকলে সেই কেচ্ছা থিতিয়ে আসবে, এরকমটাই সকলে ভেবেছিলেন।

খুব একটা ভুলও ভাবেননি। কারণ দেখা গেল সত্যিই, বছর ঘুরবার আগেই লোকজন সোমেশ্বর কাপালির কেচ্ছা ভুলে নতুন-নতুন বিষয়ে মেতে উঠল। পিসি আর পিসেমশাইদের এ-বাড়িতে আসা-যাওয়া কমতে-কমতে একরকম বন্ধই হয়ে গেল। বাবা তাঁর পড়ে-পাওয়া বড়লোকি নিয়ে মেতে রইলেন। ঠাম্মা বুকে পাথর বেঁধে এককোণে পড়ে থাকতে-থাকতেই একদিন হঠাৎ করে স্বর্গে চলে গেলেন আর আমার মা, তখন নতুনবউ, মনের সুখে একেশ্বরীর মতন সংসার করতে লাগলেন।

সেই-দাদু তাঁর নিজের বাড়িতে আবার ফিরে এলেন উনিশশো বাহান্নর জুলাই মাসে। অর্থাৎ পাক্কা একবছর চারমাস বাদে।

সেদিন সকাল থেকেই নাকি প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। এমন-যে জমজমাট কোলে-মার্কেট, সেই বাজারেও সেদিন জনমানুষ ছিল না। রাস্তায় এক কোমর জল। ট্রাম-বাস বন্ধ। তার মধ্যেই আমার মা শুনলেন, সদর দরজায় কে যেন কড়া খটখটাচ্ছে।

দরজা খুলে মা দেখলেন শ্বশুরমশাই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কিম্বা শ্বশুরমশাইয়ের প্রেত—অন্তত আমার মা সেরকমই ভেবেছিলেন। রক্তহীন ফ্যাকাশে চেহারা। তার ওপরে শরীরের ওপর দিয়ে ক্রমাগত বৃষ্টির জল বয়ে যাওয়ার ফলে গোটা গায়ের চামড়া যেন হেজে গিয়েছে। ধুতি আর পাঞ্জাবি গায়ের সঙ্গে লেপটে গেছে। দাদু সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টলছিলেন। মা দরজা খোলা মাত্রই দাদুর প্রাণহীন শরীরটা ওইখানেই লুটিয়ে পড়েছিল।

পুরো দৃশ্যটা মাথার মধ্যে থিতোতে একটু সময় লাগল। খুব স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল। কাপালি স্যারকে জিগ্যেস করলাম, মাঝের একবছর চারমাস আপনার দাদু কী করেছিলেন? ইভা স্টাইনবেকের বা তার সন্তানের কী হয়েছিল? কারখানাটারই বা কী হল তারপরে?

বিরাজ কাপালি বললেন, তোমার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। কারণ দাদু যখন মারা যান, তখন আমার বয়স মাত্র একবছর। কাজেই আমার স্মৃতিতে কিছুই ধরা নেই। আর বাবা-মা কখনো আমার সামনে সেসব কথা আলোচনা করেননি। মনে হয়, ওই কারখানায় বসবাসের সময়টুকুতে দাদু আর ইভা কী করেছিলেন না করেছিলেন তা বাবা কিম্বা মাও জানতেন না। এখানে বসে ওদের পক্ষে জানা সম্ভবও ছিল না।

ইভা স্টাইনবেকের কী হয়েছিল জিগ্যেস করছ? তিনি মারা গিয়েছিলেন। কীভাবে মারা গিয়েছিলেন কেউই সঠিক বলতে পারে না। তবে ওই কবরডাঙা রোডের ধারেই একজায়গায় তাঁর কবর আছে। আমার দাদুই বস্তির লোকেদের কাজে লাগিয়ে ওই কবর বানিয়েছিলেন।

মনে পড়ল সেদিনই সন্ধেবেলায় হাসিদি আমাকে একটা ইটে বাঁধানো বেদির কাছে নিয়ে গিয়েছিল। ওখানেই আমরা বসেছিলাম। তখন অবশ্য ওটাকে কবর বলে বুঝতে পারিনি।

কাপালি স্যার বলে চলেছিলেন—যারা কবর বানানোয় হাত লাগিয়েছিল, তাদের মধ্যে দু-একজন এখনো বেঁচে আছে। ট্যাংরা বস্তিতে সেরকম একজনের খোঁজ পেয়েছিলাম, নাম নাসিরুদ্দিন মিস্ত্রি। এখন তার বয়স প্রায় নব্বই-বছর, স্মৃতি অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে। তবু তার কথা শুনে মনে হল, দাদু যেদিন মারা গিয়েছিলেন, তার আগের দিনই মারা গিয়েছিলেন ইভা স্টাইনবেক। ইভাকে সমাধি দিয়ে দাদু শূন্য কারখানা থেকে নিজের সংসারে ফিরতে চেয়েছিলেন। পারলেন না। দরজার বাইরেই মারা গেলেন।

ইভার পেটের সন্তানটিও নিশ্চয় মারা গিয়েছিল। জন্মের আগে না পরে, জানি না। হয়তো আগেই।

বস্তির বাসিন্দাদের কাছে শুনবে, ইভা স্টাইনবেক এখনো ওই রাস্তায় ঘোরাফেরা করেন। মাঝরাতে ওই কবরের ওপরে তাঁকে বসে থাকতে দেখা যায়। সেই থেকেই লোকের মুখে-মুখে রাস্তাটার নাম হয়ে গেছে গোরে বিবি রোড।

আর কারখানার কথা জিগ্যেস করছ? ওই অভিশপ্ত কারখানার যা হবার কথা, তাই হয়েছিল। গত সত্তর-বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। মজার কথা কী জানো, কলকাতার যে কুখ্যাত চোরেরা সুযোগ পেলে রেলগাড়ির কামরা অবধি পিস পিস করে খুলে নিয়ে গিয়ে বেচে দেয়, তারাও কখনো গোরে বিবি কি মহল্লার ওই কারখানার একটা ইটেও হাত দিতে সাহস পায়নি।

সত্তর-বছরের মধ্যে একবারই মাত্র সেই সাহস দেখিয়েছিলেন আমার বাবা—বিশ্বনাথ কাপালি। আমার তখন সতেরো বছর বয়স। তখনো স্কুলে যাতায়াত করতে পারতাম। জানতাম না, আর কয়েক-বছর বাদেই এই অসুখে পঙ্গু হয়ে যাব...

কথা বলতে-বলতে হঠাৎই তিনি থেমে গেলেন। চোখের দৃষ্টিতে শূন্যতা ঘনিয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম, নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবছেন। বাধ্য হয়ে বললাম, কী হয়েছিল?

কীসের কী হয়েছিল? চমকে উঠলেন বিরাজ কাপালি।

বললাম, আপনার সতেরো বছর বয়সে কী হয়েছিল?

হ্যাঁ। আমার যেহেতু তখন সতেরো বছর বয়স, কাজেই অনেককিছুই মনে আছে। বাবা-মার কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারতাম, চরম আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। দাদুর দান করে-যাওয়া টাকা তলানিতে ঠেকেছে। ন্যাচরালি, বাবার তখন মনে পড়েছিল গোরে বিবি মহল্লার কারখানাটার কথা। নিজে ব্যবসা চালাবার কথা ভাবেননি, কারণ সেটা তিনি পারতেন না। অভিজ্ঞতা ছিল না। জমিটা বিক্রি করার কথাই ভেবেছিলেন।

মনে আছে, বাবা প্রসঙ্গটা উত্থাপন করা মাত্র মা প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিছুতেই তিনি বাবাকে ওই ভুতুড়ে জায়গায় যেতে দিতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু বাবা শোনেননি মায়ের কথা। তিনি দালাল-টালাল নিয়ে ওদিকে যাতায়াত শুরু করেছিলেন। কিন্তু তারপরে হঠাৎই তিনি খুব ভয় পেয়ে গেলেন।

ভয় পেয়ে গেলেন! কেন? কিছু দেখেছিলেন?

কিছু দেখেছিলেন কিনা জানি না। তবে ওই কারখানা-ঘরেই তিনি এই ডায়েরিগুলো ছাড়াও আরো কয়েকটা জিনিস খুঁজে পেয়েছিলেন। আর এইসব পড়ে আর দেখেই তিনি প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।

আট

কাপালি স্যারের ঘরের দেওয়ালের সবকটা ঘড়ি, মায় ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে-থাকা গ্র্যান্ডফাদার-ক্লকটা অবধি ঠিক এইসময়ে একসঙ্গে বেজে উঠল। দশটা বাজল। কথায়-কথায় যে কখন প্রায় একঘণ্টা কেটে গেছে বুঝতেই পারিনি। তবে অসুবিধে নেই। কলকাতা শহরে এই এপ্রিল মাসে রাত দশটা মানে সন্ধে। তাছাড়া আমাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে প্রশান্তবাবু রয়েছেন।

ঘণ্টার আওয়াজ থামার পরে কাপালি স্যার বললেন, আমাদের কথা আর খুব বেশি বাকি নেই। তবু সংক্ষেপেই বলছি।

যে জিনিসগুলো বাবাকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল, আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো এতই সাধারণ যে বলবার কথা নয়। একজন মানুষ রাস্তায় এগুলোকে পড়ে থাকতে দেখলে হয়তো পাশ কাটিয়ে চলে যেত। কিন্তু বাবা ছিলেন অ্যান্টিক-কালেক্টর। তিনি সেগুলোকে শয়তান-সাধনার উপকরণ বলে চিনতে পেরেছিলেন। ওই তুমি যাকে একটু আগে বললে ডেভিল-ওয়রশিপ।

বলেন কী! কাপালি স্যারের কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম।

হ্যাঁ। জিনিসগুলোর প্রকৃত পরিচয় জানলে তুমি বুঝতে পারবে বাবার আতঙ্কিত হওয়ার কারণ। সেটাই তোমাকে আগে বলি।

তুমি জানো নিশ্চয়ই, আফ্রিকা এবং ইওরোপে শয়তানের আরাধনা বা ডেভিল-ওয়রশিপের ইতিহাস আজকের নয়। খ্রিস্টধর্মের থেকেও প্রাচীন তার ইতিহাস এবং ওরা স্বীকার করুক বা নাই করুক, আজ অবধি কখনোই সেই সাধনায় ছেদ পড়েনি। বরং আমেরিকাতেও দিব্যি ছড়িয়ে পড়েছে।

নানান কালচারের মানুষদের কাছে শয়তানের নানারকম নাম। মিশরে ডেভিল-ওয়ারশিপারদের কাছে তিনি ছিলেন বেড়ালমুখো বাস্টেট। ব্যাবিলন কিম্বা সিরিয়ায় বৃষদেবতা ব্যাল। গ্রিসে অজ-মানব প্যান। আর লুসিফার কিম্বা বিলজিবাবের উল্লেখ তো বাইবেলের মধ্যেই রয়ে গেছে।

এই দেবতাদের মধ্যে একটা জায়গায় মিল রয়েছে। স্যাটানই হোক কিম্বা প্যান, বাস্টেট কিম্বা ব্যাল, তারা কেউ কাল্পনিক অস্তিত্ব নন। পদ্ধতি মেনে ডাকলে তাঁরা এই ধুলোমাটির পৃথিবীতে সশরীরে নেমে আসেন। ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন। এমনকী নারীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সন্তানও দেন তাদের।

আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, এই শয়তান-আরাধনার পদ্ধতি আর উপকরণগুলোও সারা পৃথিবীতেই প্রায় এক। হয়তো শয়তানও আসলে একজনই, পৃথিবীর নানান কোণে তাকে নানান নামে ডাকা হয়।

ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানায় বাবা এরকমই এক সেট উপকরণ খুঁজে পেয়েছিলেন। একজন অ্যান্টিক কালেকটার হিসেবে সারা পৃথিবীর ফোক-আর্টের সঙ্গেই বাবার পরিচয় ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেগুলোর অরিজিন রুমানিয়ার কোনো জায়গায়।

আমি বললাম, তার মানে স্টিফেন মেয়ার এগুলো নিয়ে এসেছিলেন?

একদম ঠিক। দাদুর এই ডায়েরিগুলো আমার বাবা যে পড়েননি তা তো হতে পারে না। কাজেই বাবাও জানতেন স্টিফেন মেয়ার রুমানিয়ার জিপসি সম্প্রদায়ের মানুষ। মেঘালয়ের যাজকের পরিচয়টা একটা ব্লাফ। আসলে তিনি ছিলেন ডেভিল-ওয়রশিপার। তবে ভারতে যে অনেকদিন ধরে ঘুরছিলেন সেটা সত্যি। মনে হয় নিজের সাধনার জন্যে একটা মনোমতন জায়গা আর একজন সহচরী খুঁজছিলেন। কবরডাঙার কারখানা তাঁকে দিয়েছিল প্রথমটা আর ইভা দ্বিতীয়টা।

অবশ্য ইভার নিজেরও একটা অ্যাজেন্ডা ছিল। হ্যাঁ, ওই লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম নিয়েই। ডিটেলসটা একটু পরে বলছি।

যাই হোক, মূল কথা হল ইভা আর স্টিফেন দুজনে মিলে এই কবরডাঙার নির্জন মাঠে সেই শয়তান নামানোর বিদ্যা হাতে-কলমে কাজে লাগিয়েছিলেন।

হয়তো আমার চোখে অবিশ্বাসের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। তাই কিছুক্ষণ দোনামোনা করে বিরাজ কাপালি বললেন, আচ্ছা, জিনিসগুলো তোমাকে দেখাই। আমার মাথার কাছের আলমারিটা খোলো। দ্যাখো, নীচের তাকে একটা বড় কাঠের বাক্স আছে, ওটা নিয়ে এসো।

বাক্সটা বার করে নিয়ে এলাম। কাপালি স্যারের নির্দেশমতন সেটা ওঁর কোলের ওপরে নামিয়ে রাখলাম। উনি চাদরের মধ্যে থেকে হাত বার করে বাক্সটার ডালা খুলে, তার ভেতর থেকে একে-একে বার করলেন একটা পোড়ামাটির ঘট, একটা বাঁশের চলটা দিয়ে বানানো ছুরি আর তাঁতে বোনা খুব রংচঙে একটা কাপড়ের টুকরো।

সেগুলোকে বিছানার চাদরের ওপরে সাজিয়ে রেখে বিরাজ কাপালি নিজের মনেই বললেন, আমি নিজেও রিসেন্টলি রুমানিয়ার ফোক-আর্টের অ্যালবামের সঙ্গে এগুলোকে মিলিয়ে দেখেছি। ছুরি আর পাত্রের এই গড়ন, কাপড়ের মোটিফ সবই মিলে যাচ্ছে। বাবা কিছু ভুল বলেননি। এবং জেনে রাখো, সারা পৃথিবীতেই ঠিক এই জিনিসগুলোই ডেভিল ওয়ারশিপের কাজে ব্যবহৃত হয়। অঞ্চলভেদে শুধু তাদের উপাদান বদলে যায়। গ্রিসের কোনো দ্বীপে হয়তো এই ঘটিটা তৈরি হত ব্রোঞ্জ দিয়ে। আবার মিশরে হয়তো এই উলেন কাপড়ের বদলে সুতির কাপড় ব্যবহৃত হত। কিন্তু জিনিসগুলোর চরিত্র একই থাকত।

বললাম, চরিত্র মানে?

কাপালি স্যার হেসে বললেন, চরিত্র মানে যা চোখে দেখা যায় না। যেমন, চোখে দেখে তুমি বুঝতে পারবে না যে, এই ঘটিটার মধ্যে একটা প্ল্যাসেন্টা ছিল—যাকে বাংলায় বলা হয় নাড়ি কিম্বা ফুল। যে নাড়ির মধ্যে দিয়ে গর্ভের ভ্রূণের সঙ্গে মায়ের রক্তের যোগ থাকে। শিশুর জন্মের পরে ফুলটাকে এইধরনের ঘটিতে করে মাটির নীচে পুঁতে রাখা হয়। এটাকেও মাটির নীচ থেকেই চুরি করে তুলে আনা হয়েছে।

এই যে বাঁশের ছুরি! এটাও ব্যবহার করা হয় বাচ্চার নাড়ি কাটার কাজে। আর এই কাপড়টা আসলে মৃত শিশুর দেহ আচ্ছাদনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আমার বাবা এগুলোর আসল চরিত্র জানতেন।

বললাম, এই উপকরণগুলো হাতে পেলেই যে কেউ শয়তানকে ডেকে আনতে পারবে?

কাপালি স্যার বললেন, উঁহু! একেবারেই না। তারও বিশদ পদ্ধতি আছে এবং বাবা সত্যিকারে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তখনই, যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানা ঘরের ভেতরে সেই পদ্ধতি মেনে শয়তান নামানোর পালা শেষ হয়ে গেছে।

দ্যাখো, সেই পদ্ধতি যে কেমন, তা আমি অত ডিটেলে বলতে পারব না। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে বাবার মুখে শোনা কিছু কথা—তার সব তো আমার মনে নেই। তবে যেটা মনে আছে, সেটা হল, ডেভিল, ডেমন কিম্বা শয়তান যাই বলো, তাকে নিয়ে আসার জন্যে প্রথমে নরকের সঙ্গে পৃথিবীকে একটা ঘরের মধ্যে দিয়ে জুড়ে দিতে হয়। যেমন মাটির নীচে যে-জল, সেই জলের কাছে পৌঁছতে গেলে একটা কুঁয়ো খুঁড়তে হয়, সেইরকমই। শয়তান-উপাসকদের কাছে এই কুঁয়োটা একটা ঘর। নরকের সঙ্গে সেটা যুক্ত। শয়তানকে ডাকলে তিনি সেই ঘরে আবির্ভূত হন।

ঘরটাকে এমন হতে হবে, যে-ঘরের বাতাসে অনেক মানুষের আতঙ্ক আর শোক জমে পাথর হয়ে আছে। রুমানিয়ার জিপসিরা সাধারণত মড়কে উজার হয়ে যাওয়া কোনো গ্রামের একটা তাঁতঘর বেছে নিত। তাঁতঘর বোঝো তো? কাপড় বুনবার তাঁতযন্ত্র বসানো থাকে যে ঘরে। ওরা সেই ঘরটাকেই নানান গুহ্য প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে শয়তানের ঘরে রূপান্তরিত করত।

কাপালি স্যারের কথা শুনতে-শুনতে আমার মাথার মধ্যে একটা ছবি আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। বললাম, তাঁতঘরের বদলে পোর্সেলিনের কারখানা হলে হবে?

কাপালি স্যার অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, হবে নয়, বললামই তো, হয়েছিল। তবে তার জন্যে স্টিফেন মেয়ারের মৃত্যুর প্রয়োজন ছিল না।

তাহলে যে আপনি বললেন, সেই ঘরে অনেক মানুষের আতঙ্ক আর শোক জমে থাকতে হবে। স্টিফেন মেয়ার ছাড়া আর কেউ তো...

কাপালি স্যার বললেন, আর কেউ ওই কারখানায় মারা যায়নি, তাই তো? তা হয়তো যায়নি, কিন্তু তবুও বহু নিরীহ মানুষের দীর্ঘশ্বাস ওই ঘরে তখনো ছিল এবং এখনো জমে রয়েছে।

কীভাবে?

এইভাবে—!

বিরাজ কাপালি সেই কাঠের বাক্সটার ভেতর থেকে খুব সাবধানে একটা নরম কাপড়ের মোড়ক বার করে আনলেন। তারপর মোড়কটা খুলে একটা পোর্সেলিনের প্লেট বার করে কোলের ওপরে রেখে আমাকে বললেন, কাছে এসো। ভালো করে দ্যাখো। রক্তের দাগ দেখতে পাচ্ছ?

আমি ওঁর কোলের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে দেখলাম, সত্যিই, সাদা প্লেটটার গায়ে কোনো তরল শুকিয়ে জমাট বেঁধে রয়েছে। কালচে রঙ দেখে সেটাকে রক্তের দাগ বলেই মনে হল। আমি চোখে প্রশ্ন নিয়ে কাপালি স্যারের দিকে তাকালাম। উনি বললেন, এরকম রাশি-রাশি পোর্সেলিনের প্লেট আর মিনিয়েচার স্ট্যাচু তুমি নিশ্চয়ই ওখানে দেখেছ; মানে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানা-ঘরের র‌্যাকে। এর প্রত্যেকটির সঙ্গে মৃত-মানুষের দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে।

কেন? আমি জিগ্যেস করলাম।

হলোকস্টের সময় জার্মান গেস্টাপো-বাহিনী যখন দলে-দলে ইহুদিদের ধরে কনসেনট্রেসন-ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সেই হতভাগ্য ইহুদি-পরিবারগুলোর ঘর থেকে যত বাসন-কোসন আর আসবাবপত্র তুলে নিয়ে গিয়েছিল ইভা স্টাইনবেকের মতন এস এস বাহিনীর কর্মীরা। ম্যুনিখ শহরের বড়-বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে নিলামে বিক্রি করা হত সেই ইহুদিদের সম্পত্তি। এখনো তুমি গুগল সার্চ করলে সেরকম নিলামখানার ছবি দেখতে পাবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে ভারতে পালিয়ে আসার সময় ইভা স্টাইনবেক বাক্স ভর্তি করে ওরকম ইহুদি ক্রকারির স্তূপ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি জানতেন, ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির ফার্নেসে একটি-দুটি করে এই কাচের বাসন আহুতি দিতে হবে। তাতেই শয়তানের টনক নড়বে। তিনি সহজে দেখা দেবেন।

জিগ্যেস করলাম, এইভাবে ইভা স্টাইনবেক আর স্টিফেন মেয়ার দুজনে মিলে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানাটাকেই শয়তানের ঘর বানিয়ে তুলেছিলেন?

হ্যাঁ। প্রথম থেকেই সেটাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ওসব ব্লাড চারকোল ফারকোল সবই বাজে কথা। কসাইখানার ওই রক্ত, এই কাচের বাসন, ওই ফার্নেস—সবই ছিল শয়তানের ঘর বানানোর প্রক্রিয়া।

ওদের উদ্দেশ্য কী ছিল?

তক্ষুনি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিরাজ কাপালি আবারও বাক্সের ভেতর থেকে একটা নরম কাপড়ের মোড়ক বার করে আনলেন। বাক্সটা খালি হয়ে গেল। তিনি মোড়কটা খুলে বার করে আনলেন একটা দশ ইঞ্চি মাপের স্কাল্পচার। জিনিসটা দেখে মনে হল, কোনো পশুর হাড় খোদাই করে সেটাকে তৈরি করা হয়েছে। এবার আমাকে আর কাছে যেতে হল না। এতই নিখুঁত ছিল সেই ভাস্কর্য যে, আমি নিজের জায়গায় বসেই তার সমস্ত ডিটেলস পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম।

মোট তিনটে ফিগার ছিল মূর্তিটার মধ্যে।

একদম পেছনে এক বৃষ-মানুষ। তার পেশিবহুল হাত, পা এবং দেহকান্ড সবকিছুই মানুষের মতো। শুধু ঘাড়ের ওপরে মাথাটা মানুষের নয়, ষাঁড়ের। যেন বিজয়গর্বে মাথাটা সামান্য পেছনে হেলিয়ে রেখেছে সেই মহাষন্ড। তার দুই উরুর মাঝখানে প্রকট অতিদীর্ঘ লিঙ্গটিও মানুষের নয়, ষাঁড়ের। আর দুই পায়ে পাতার বদলে চেরা-ক্ষুর।

বৃষমানুষের সামনে একটা পাথরের ওপরে বসে রয়েছে এক নারী। এক জননী। তার কোলে শুয়ে রয়েছে এই ভাস্কর্যের তৃতীয় মূর্তিটি—যা এক সদ্যোজাত শিশুর মূর্তি। নারীটি পরম মমতায় তাকিয়ে রয়েছে কোলের শিশুটির দিকে। শিশুটিকে সে স্তন্যদান করছে।

এই স্কাল্পচারটা পৃথিবীর আর সমস্ত স্কাল্পচার থেকে আলাদা শুধু ওই স্তনের কারণে। নারীটির বুকে তিনটি স্তন। শিশুটি মাঝের স্তন থেকে দুগ্ধপান করছে।

আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। নিজের অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, 'ওহ মাই গড।'

বিরাজ কাপালি বললেন, এইসব মূর্তির উপস্থিতিতে গডের নাম কোরো না হে জোসেফ রুদ্রনাথ। এরা গডের প্রতিদ্বন্দ্বী। শয়তান পরিবারের সদস্য এরা।

বললাম, কিন্তু কেন? কেন স্যার?

কী 'কেন'? তৃতীয় স্তন? শোনো। ডেভিল, ডেমন, প্যান, বাস্টেট কিম্বা ব্যাল—এদের সঙ্গে জড়িত যত মিথ—সবক'টাতেই এই তৃতীয় স্তনের কথা আছে। নারীর স্বাভাবিক যে-দুটি স্তন, সে তো ঈশ্বরের দান। স্বাভাবিক মানবশিশুদের জন্যে ওই স্তনদুটি ঈশ্বরের করুণাধারার পাত্র। কিন্তু শয়তান তার নিজের ঔরসজাত সন্তানের জন্যে ঈশ্বরের অনুগ্রহ নেবে কেন? তাই শয়তানের সঙ্গে মিলনের ফলে কোনো নারী গর্ভবতী হলে, তার বুকে গজিয়ে ওঠে ওই তৃতীয় স্তন। যেমন গজিয়ে উঠেছিল...

তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়ে আমি বলে উঠলাম, ইভা স্টাইনবেকের বুকে।

এগজ্যাক্টলি।

তারপর আপনার বাবা কী করলেন?

তিনি এই জিনিসগুলো বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। মাকে যখন বিশদে সবকিছু বুঝিয়ে বলছিলেন, তখন আমার কানেও কিছু কথা এসেছিল। খুব একটা মনোযোগ দিইনি। তবে বাবার একটা কথা মনে গেঁথে আছে। বাবা বলেছিলেন, ঈশ্বরের নামে খুব নিরাপদে রাজনীতি করা যায়। দুনিয়া জুড়ে পুরুত মোল্লা, পাদ্রী আর রাষ্ট্রনায়করা তার প্রমাণ রেখে চলেছে। কিন্তু শয়তানকে যে রাজনীতির কাজে লাগানো যায় না, সেটা বুঝতে নাৎসি-মেয়ে ইভা স্টাইনবেকের একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে সে তো মরলোই, মাঝখান থেকে প্রাণ গেল আমার বেচারা বাবার। উনি সোমেশ্বর কাপালির কথা বলছিলেন, বুঝতেই পারছ।

বাবা নিজে যেটা বুঝতে পারেননি সেটা হল, শয়তানের-জমি বিক্রিও করা যায় না। ওই ঘটনার ক'দিন পরেই বাবা এক ডিমোলিশন-ফার্মকে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিনের কারখানা দেখিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পরের সপ্তাহেই ওই বিল্ডিং ডিমোলিশ করার কথা হয়েছিল। কিন্তু তিনিও আর বাড়িতে ঢুকতে পারলেন না। যে-কানাগলিটা ধরে এই বাড়িতে তুমি আজ ঢুকলে, ওই গলির একটু ভেতরেই তিনি উপুড় হয়ে পড়েছিলেন।

খুন?

হ্যাঁ, খুন।

কে করল? কেনই বা করল?

কাপালি স্যার বললেন, লোকে বলে নকশালেরা। পুলিশও একই অনুমানে কেসটা ক্লোজ করে দিয়েছিল। সালটা উনিশশো উনসত্তর। কাজেই অবিশ্বাস করার কিছু নেই, যদিও বাবার মতন অরাজনৈতিক লোক কেনই বা নকশালদের টার্গেট হবেন তা বোঝা কঠিন। তাছাড়া বাবার ডেডবডির পাশে যে-ছুরিটা পড়েছিল, যেটা দিয়ে বাবার গলার নলি কেটে ফেলা হয়েছিল, সেটা ঠিক এইরকম একটা ছুরি। বাঁশের চোঁচ দিয়ে বানানো। কলকাতার নকশাল-যুবকেরা রুমানিয়ার জিপসি-ছুরি দিয়ে অপারেশন করছে, এটা কি তোমার বিশ্বাসযোগ্য লাগছে?

সে যাইহোক, মোদ্দা কথা হল, বাবার মার্ডার নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য হল না। তখন সকাল-বিকেল কলকাতায় লাশ পড়ছে। তার মধ্যেই আরেকটা লাশ হয়ে মিশে গেলেন বিশ্বনাথ কাপালি।

ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির কারখানার তো আগে থেকেই ভূতুড়ে বাড়ি দুর্নাম ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পরে সেই দুর্নামের মাত্রা চড়ল। উনিশশো উনসত্তরের পর আবার পঞ্চাশ-বছর সেই কারখানা ফাঁকা পড়ে রইল, কেউ ওখানে পা দিল না। তারপর আজ থেকে দু-বছর আগে আবার আমি গেলাম ওখানে। মানে যেতে বাধ্য হলাম। অনেকটাই আমার বাবা যে-কারণে গিয়েছিলেন সেই একই কারণে—অর্থসংকটে।

তারপর একটু ইতস্তত করে বিরাজ কাপালি বললেন, না। মিথ্যে বলব না। অর্থসংকটে নয়, অর্থলোভে।

লোভটা দেখাল, ওই নীচের ঘরে যে বিদেশিনীদের দেখলে, তারা। দু-বছর আগে থেকে ওরাই যাতায়াত শুরু করল এখানে, আমার কাছে। ওদের একটাই অনুরোধ। ডেমনের সঙ্গে সঙ্গমের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

সে কী! ওরা কারা? আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম।

'নিও-নাৎসি'। সোজা কথায় নতুন নাৎসি। গোপনে-গোপনে ওরা আবার ছড়িয়ে পড়ছে জার্মানির আনাচে-কানাচে। কিন্তু ওদের দর্শনটা পুরোনো। সেই হিমলারের দর্শন—জার্মান নারীদের গর্ভে জন্ম নেবে এমন সব সন্তান যাদের রক্তে কোনো নীচ জাতির ভেজাল থাকবে না। ইহুদিদের নয়, অনার্যদের নয়। অতএব আদিম দেবতা বা ডেমনের সন্তান চাই ওদের। সেই আশা নিয়েই ওরা এখানে, সার্পেন্টাইন-লেনের এই কানাগলিতে খুব গোপনে যাতায়াত করছে। তার বদলে ওরা আমাকে যে পয়সাটা কবুল করছে, সেটা অবিশ্বাস্য। আমার এই-মুহূর্তে পয়সার খুব দরকার। সম্পত্তি বেচে খাচ্ছি।

কিন্তু ওরা আপনার কারখানার সঙ্গে শয়তানের যোগসূত্রের কথা জানল কেমন করে?

কেন? ইভা স্টাইনবেক যে সংগঠনের সদস্যা ছিলেন ওরাও তো তারই সদস্যা। ওরাও তো লেবেনসবর্ন-গার্লস। ইভা স্টাইনবেক কোন উদ্দেশ্যে ভারতের কোথায়-কোথায় ঘুরেছিলেন তার কিছু নথি তো ওদের হাতে পৌঁছবেই।

ইভা নাকি সেই সত্তরবছর আগে শয়তানের সঙ্গে সফল মিলনের পরে আনন্দে পাগল হয়ে ওদের সেই গোপন-সংগঠনের সর্বময় কর্তাকে চিঠি লিখেছিল—আমি আমার স্বপ্নের খুব কাছে এসে পৌঁছেছি। সবচেয়ে আশ্চর্য কী জানো রুদ্র, এই মেয়েগুলো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে ইভা আর স্টিফেনের সাধন-প্রক্রিয়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। প্রথম যখন আমার সঙ্গে দেখা করেছিল, তখন ওরা খুব কনফিডেন্টলি বলেছিল, শুধু ব্যাভেরিয়া ইন্ডাস্ট্রির ঘরটা পেলে বাকি কাজটা ওরা নিজেরাই করে ফেলতে পারবে।

ইভা স্টাইনবেক আর সোমেশ্বর কাপালির অপঘাত মৃত্যুর কথা আপনি ওদের বলেননি? বলেননি আপনার বাবার মৃত্যুর কথা?

সব বলেছি। কিন্তু ওরা নাছোড়। ফ্যানাটিকদের সাইকোলজি এরকমই হয়।

তারপর?

এখনো অবধি ওরা সাফল্য পায়নি। ওরা বলছে, ডেমন নাকি ওদের দেখাও দিয়েছেন। কিন্তু তিনি খুঁজছেন তাঁর আগের সন্তানকে। তাকে না পেলে তিনি আর নতুন সন্তান দিতে রাজি নন।

কিন্তু তাকে আপনারা পাবেন কোথায়? সেই বাচ্চা তো মারাই গেছে মনে হয়।

বিরাজ কাপালি কাঠের বাক্সের মধ্যে জিনিসগুলো একে একে গুছিয়ে তুলে রাখতে-রাখতে বললেন, জানি না। ওদের বক্তব্য, সে বেঁচে আছে। ডেমন নিজেই তাকে নিয়ে আসবেন।

আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো। ওদের আপনি ওই কারখানায় রেখেছেন কেন? ওই হাসি, পঙ্কজ, বিশাখাদের?

বিরাজ কাপালি বললেন, ওরা এমনিই চলে আসে রুদ্র। যখন সোমেশ্বর কাপালি আর ইভা স্টাইনবেক ওই কারখানায় ছিলেন, তখনও এরকম অদ্ভুত কিছু নারী-পুরুষ সেখানে এসেছিল। আমার ধারণা, এই পৃথিবীতে কিছু-কিছু মানুষের ওপরে খুব স্বাভাবিকভাবেই শয়তানের প্রভাব এসে পড়ে। তাদের মধ্যে কিছু-কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দেখা যায়। আলো দেখলে যেমন মথেরা আপনা থেকেই সেদিকে ছুটে যায় ওরাও সেইভাবেই ওই কারখানায় চলে আসছে। আমি ওদের তাড়াইনি। আছে থাক। যদি ওদের অস্তিত্ব শয়তানের মনঃপূত হয়, যদি ওদের জন্যে তার এখানে আসার টান বাড়ে, তাহলে ক্ষতি কী?

আমাকে কেন নিয়ে এলেন? আমিও কি বিশাখা, পঙ্কজ আর হাসিদির দলে? শয়তানে পাওয়া ছেলে?

না না! কখনোই নয়। এর উত্তরও আমি তোমাকে দেব। তবে আজ নয়। এগারোই এপ্রিল। আর ঠিক পাঁচদিন পরে। সেদিন শুকতারা মানে শুক্রগ্রহ পৃথিবীর খুব কাছে আসছে। ভোরের আকাশে এক জ্যোতিষ্কের ঔজ্জ্বল্যে সেদিন ফুটে উঠবে সেই তারা। তুমি জানো কিনা জানি না, খ্রিস্টধর্ম যাকে শয়তান বলে দেগে দিয়েছে, সেই ঈশ্বরবিরোধী লুসিফার আসলে শুকতারার সন্তান। তিনি ভোরের দেবদূত। আমি নিজেও জানতাম না। ওরাই আমাকে বলল—ওরা মানে ওই এমা, হানা, সোফিয়া, লীনারা। সেদিনই ওরা আবার লুসিফারের কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করবে। ওদের ধারণা সেদিন ওরা সফল হবেই। সেদিনই তোমাকে আমি বলব, তোমাকে কেন এখানে এনেছি।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, বেশ। তাই হবে। এই ক'দিন কি আমাকে ওখানেই থাকতে হবে স্যার? না, মানে ভাবছিলাম যদি এদিকে একটা হোটেল-টোটেলে মাঝের এই ক'টাদিন কাটিয়ে দিই। নিজের টাকাতেই থাকব, আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।

বৃদ্ধ কাপালি স্যার হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে বললেন, না রুদ্র, প্লিজ। ওখানেই থাকো। তোমার ওখানে থাকাটা খুব জরুরি।

আচ্ছা বেশ। তবে ওই অবধিই। তারপরে আর থাকব কিনা সেটা বলতে পারছি না।

শেষ অবধি রাত বারোটা নাগাদ প্রশান্তবাবুর গাড়িতে কাচ কারখানায় পৌঁছেছিলাম। ওরা জেগেই ছিল। ক্লান্ত লাগছিল খুব। সেটা যতটা না শরীরের ক্লান্তি, তার চেয়ে বেশি মনের। কোনোরকমে দুটো রুটি পেটে চালান করে, নিজের ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম।

নয়

তারপর আরো তিনটে দিন কেটে গেছে। কারখানা আর ব্যারাকবাড়ির পরিবেশটা উত্তরোত্তর কেমন যেন গুমোট হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনটা যে আমার কল্পনা নয়, সেটা ওদের তিনজনকে দেখলে বুঝতে পারি। যেমন, কয়েকদিন আগে হাসিদি হঠাৎ আমাকে বলল, সবকিছু কেমন যেন বদলে যাচ্ছে, তাই না?

আমি বললাম, মানে?

ও বলল, কিছুদিন আগে অবধিও মনে হত আমার শরীর-মনের মালিক আমি নিজে। এখন মনে হয় কে যেন ভেতর থেকে আমার দখল নিয়ে নিচ্ছে।

হাসিদির কথা শুনে আমি চট করে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পঙ্কজদা আর বিশাখার দিকে তাকালাম। সেটা হাসিদির চোখ এড়ালো না। হাসিদি আজকাল খুব কমই হাসে। তবু তখন একবার হেসে উঠল। হাসতে-হাসতেই বলল, হ্যাঁ, ওরাও। ওরা আমাকে বলেছে, মনে হচ্ছে যেন কেউ খুব কাছে...একেবারে বুকের ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে। তোমারও কি এরকমই মনে হচ্ছে, রুদ্র?

আমি বললাম, আমার ভেতরে একজন তো অনেক আগেই থেকে রয়েছেন। তবে হ্যাঁ। ইদানিং তাঁকে খুব স্পষ্ট করে টের পাই।

কাল থেকে মাঝে-মাঝে শুধু কাচ কারখানার মাথার ওপরের আকাশে বারুদ-রঙের মেঘ জমা হচ্ছে। পঙ্কজদার শরীরের ঘন বাদামি লোমের ভেতরে চিরচির শব্দ করে স্ট্যাটিক-ইলেকট্রিসিটির নীল আগুন দৌড়োদৌড়ি করে। বোবা মানুষটা অসহায়ের মতন আকাশে মুখ তুলে আর্তনাদ করে ওঠে—ওওওউউউ ওহ ওহ ওহ!

সুন্দরী বিশাখা মাথা নীচু পা ওপরে করে বিশাল টিকটিকির মতন কুঁয়োর দেয়াল বেয়ে সরসর করে নীচে নেমে যায়। একটু বাদে আবার ঠিক টিকটিকির মতই দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে আসে। তখন ওর সর্বাঙ্গ ভিজে সপসপ করে। ওর চুল থেকে, ওর সাদা কাপড়ের থান থেকে মোটা হয়ে জলের ধারা ঝরে পড়ে। সেই অবস্থাতেই ও কারখানা-ঘরের দরজা ঠেকে ভেতরে ঢুকে যায়।

কেন যায়, কার কাছে যায়, কে জানে। তবে তখনকার মতন মেঘ কাটে। শুধু কারখানা-চত্বরের মধ্যে স্থায়ী একটা গুমোট ভাব থেকেই যায়। ঝড়ের আগে যেমন গুমোট হয়ে থাকে, ঠিক সেইরকম।

দুদিন আগেও পালাবার কথা ভেবেছি। কাল থেকে আর তাও ভাবতে পারছি না। মনে হয় ওরাও পারে না। পারলে পালাতো।

ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির এই ভাঙাচোরা বাড়িটাকে মনে হচ্ছে একটা বিরাট মাকড়শা। বিশ্বনাথ কাপালি মারা যাওয়ার পরেও, গত পঞ্চাশ বছর ধরে মাকড়শাটা গোরে বিবির রোডের একধারে, এই পোড়ো জমির মাঝখানে বসে, বিষাক্ত জাল বুনে যাচ্ছিল। তারপর সেই জালে জড়িয়ে টেনে এনেছে বিরাজ কাপালি, হাসিদি, পঙ্কজ, আর বিশাখাকে। ওই জার্মান মহিলাদের। এবং শেষমেষ আমাকেও—এই রুদ্রনাথ দত্তকে। এরপর সে কী করবে? আমাদের রক্ত শুষে খাবে?

শেষমেষ সেই দিনটা এল। শুক্রবার, এগারোই এপ্রিল। রাত বারোটা। কাপালি স্যার খবর পাঠিয়েছিলেন, ওই মহিলারা আসবেন। ঠিক বারোটার সময় কারখানার গেটের বাইরে একটা কালো স্টেশন-ওয়াগন এসে দাঁড়াল। ওদের নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা আর দাঁড়াল না, দ্রুত উধাও হয়ে গেল।

কারখানা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, কালো গাউন, কালো লেসের ভেল দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে চারটে মেয়ে বাগানের রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। ওদের মধ্যে সামনের মেয়ে দুটি একটা হুইল-চেয়ার ঠেলে নিয়ে আসছে। চেয়ারটায় বসে আছেন বিরাজ কাপালি। আমি পঙ্কজদা আর হাসিদি ওদের অনুসরণ করে কারখানা ঘরে ঢুকলাম। আজ সন্ধে থেকেই ফার্নেসের আগুন দ্বিগুণ তেজে জ্বলছে। এখন শুনলাম, মেঝের নীচের রক্তের চৌবাচ্চার ভেতর থেকে জোরালো একটা ঘাই মারার শব্দ।

চারটে মেয়েই ঝটকা মেরে যে যার মুখের ভেল সরিয়ে দিল। দেখলাম ওদের নীল চোখের মণি প্রাইমাস স্টোভের শিখার মতন উজ্জ্বল। ওদের ঠোঁট রক্তরাঙা আর উদ্ধত চিবুকে একইসঙ্গে আগুনের কমলা আলো আর ইহুদি-ক্রকারির সবুজ ফসফোরেসেন্সের আলো দাপাদাপি করে বেড়াচ্ছে।

ঘরের ঠিক মাঝখানে কাপালি স্যারের হুইল চেয়ারটাকে খুব সাবধানে দাঁড় করিয়ে রেখে এমা, হানা, সোফিয়া, লীনারা একটু সরে দাঁড়াল। এতক্ষণে কাপালি স্যারকে ভালো করে দেখতে পেলাম। উনিও আজ একটা লম্বা ঝুলের কালো পাঞ্জাবি পরে এসেছেন। কোলের ওপরে পাতা রয়েছে একটা গাঢ় লাল চাদর। সেটা পায়ের পাতাদুটোকে ঢাকা দিয়ে মাটি অবধি লুটিয়ে পড়েছে। তফাতের মধ্যে আজ ওঁর গলায় একটা মোটা সোনার চেন—যেটা হয়তো সোফিয়াদের উপহার। সব মিলিয়ে সেদিন সার্পেন্টাইন লেনের বাড়িতে বিরাজ কাপালির চেহারা আর কথাবার্তার মধ্যে যে ক্লিষ্ট ভাব লক্ষ্য করেছিলাম, আজ তার কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। মানুষটিকে একটা পালিশ করা পেতলের মূর্তির মতন ঝকমকে লাগছিল।

দেখলাম, উনি সেই কাঠের বাক্সটা নিয়ে এসেছেন। দু-হাতে আলতো করে ওটাকে কোলের ওপরে ধরে রেখেছেন।

হঠাৎই কাপালি স্যার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন হাসিদি আর পঙ্কজদা ওঁর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উনি খুব রূঢ় গলায় বললেন, গেট আউট। বেরিয়ে যাও এখান থেকে। না ডাকলে ঢুকবে না।

ওরা দুজন মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেল।

আমিও ওদের পেছন-পেছন বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। কাপালি স্যার খুব অবাক হয়ে বললেন, একি রুদ্রনাথ। তুমি কোথায় যাচ্ছ? তুমি তো আজকের যজ্ঞের ঋত্বিক। এসো, আমার পাশে এই বেঞ্চটায় বসো। ন্যুড মেয়েদের দেখতে ভালো লাগে না তোমার? দ্যাখো, এই জার্মান ছুঁড়িগুলোর জিনিসপত্র অসাধারণ।

এমা, লীনা, সোফিয়ারা ইতোমধ্যে কাপালি স্যারের কাছ থেকে সেই বাক্সটা নিয়ে ভেতরের জিনিসগুলোকে ফার্নেসের সামনে মেঝের ওপরে সাজিয়ে ফেলেছিল। সেই ঘট, সেই ছুরি আর আসন। তাছাড়াও আরো অনেক কিছুই ছিল ওদের সঙ্গে। তার মধ্যে যেটা সবচেয়ে চোখ টানছিল, সেটা হল একটা তারের বাজনা। মেলায় যেরকম মাটির বেহালা কিনতে পাওয়া যায়, তারই একটা বড় সংস্করণ। সেটার তারে কয়েকবার টান দিল সোফিয়া বলে মেয়েটা। কান্নার মতন একটা আওয়াজ উঠল।

একটা কাচের বোতল থেকে ঘন সবুজ একটা আরক ওরা গলায় ঢেলে নিল। তারপর মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে যে যার গাউন খুলে ফেলল। গাউনের নীচে কোনো অন্তর্বাস ছিল না। কাপালি স্যারের শ্বাস টানার শব্দ পেলাম।

নারীশরীর সম্বন্ধে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবু ওদের সরল তলপেট আর স্তনের গড়ন দেখে মনে হল ওরা কেউই আগে কখনো সন্তান ধারণ করেনি।

ওরা চারজনেই সুন্দরী। অসম্ভব সুন্দরী। ওদের অলিভ তেলের মতন সোনালি ত্বকে আগুনের আভা খেলা করে বেড়াচ্ছিল। আবছা অন্ধকারের মধ্যেও ভুট্টার কেশরের মতন ঝলমল করছিল ওদের যোনিকেশ। তবু আমার মনে কাম জাগছিল না। উল্টে প্রচণ্ড ঘৃণা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এরা সুযোগ পেলে একজন কালো মানুষকে নীলনদীর জলে কুমিরের মুখে ফেলে দিয়ে মজা দেখতে পারে।

অবশ্য, খুব বেশিক্ষণ এসব ভাবতে পারলাম না। কারণ, এরমধ্যে ওরা চারজন নাচতে শুরু করেছিল। ওদের মধ্যে তিনজন মেঝেয় সাজিয়ে রাখা উপকরণগুলোকে ঘিরে গোল হয়ে ধীর লয়ে ঘুরে ঘুরে নাচছিল। আর চতুর্থজন সেই বেহালার মতন যন্ত্রটায় সুর তুলছিল।

আস্তে আস্তে ওদের নাচের গতি বাড়তে শুরু করল। একটা সময় এলো, যখন ওদের আর আলাদা করে দেখতে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল তিনটে দীঘল ইউক্যালিপটাস ঝড়ের মুখে দোল খাচ্ছে। ঠিক তখনই ফার্নেসের দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল। কী এক অদ্ভুতভাষায় রিনরিনে গলায় ওরা জয়ধ্বনি করে উঠল। কিন্তু ওদের নাচ থামল না। শুধু যে-মেয়েটি এতক্ষণ বেহালার মতন যন্ত্রটা বাজাচ্ছিল, সে বাজনাটা মাটিতে নামিয়ে রেখে তাক থেকে একপাঁজা চিনেমাটির প্লেট তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিল ফার্নেসের ভেতরে। কাচ ভাঙার ঝনঝন শব্দকে ছাপিয়ে আগুনের শিখার ভেতর থেকে তৃপ্তির নিশ্বাসের মতন একটা শব্দ ভেসে এল।

আরো কিছুটা সময় চলে গেল। একবার স্কাই-লাইটের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে কাগডিমে রঙ লেগেছে আর...আর একটা মাত্র বিশাল তারা সেই স্কাইলাইটের ভেতর দিয়ে এই কারখানা ঘরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। শুকতারাই, কিন্তু আমার হাতের মুঠির মতন বড়।

ঠিক তখনই লেলিহান আগুনের শিখার আড়ালে একটা গ্র্যানাইট রঙের মূর্তির আদল ফুটে উঠল। দু-হাত দিয়ে আগুনের পর্দা সরিয়ে ফার্নেসের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল বৃষমানুষ!

ওরা আবার জয়ধ্বনি করে উঠল এবং এবার নাচের পরিবর্তে যেটা শুরু করল সেটাকে এককথায় বলা যায় কামুক অঙ্গভঙ্গি। ফার্নেসের সামনের মেঝেয় শুয়ে বসে ওরা নানানভাবে নিজেদের স্তন উরু এবং যোনিকে মেলে ধরছিল সেই বৃষপুরুষের সামনে।

কিছুক্ষণ আগে অবধি ওরা একটা গান গাইছিল। ভারি দোলা লাগানো একটা সুর। হঠাৎ সেই গানের পর্দাও উচ্চগ্রাম থেকে অশ্লীল এক ফিসফিসানিতে নেমে এল। ভাষা না বুঝলেও, ওদের অঙ্গভঙ্গির কারণে সেই গানের অর্থ বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না!—এসো। আমাকে তোমার প্রবল শিশ্ন দিয়ে বিদ্ধ করো। দেববীর্য উৎক্ষিপ্ত হোক আমার জরায়ুমুখে।

অনেক দূর থেকে মেঘের ডাক ভেসে এলে যেমন শোনায়, ফার্নেসের গভীর কোনো তলদেশ থেকে ঠিক সেইরকম একটা গর্জন ভেসে এল। চার নাৎসি তনয়ার মুখে ফুটে উঠল পরিষ্কার হতাশা। ওরা একসঙ্গেই ফিরে তাকাল কাপালি স্যারের মুখের দিকে। ওদের মধ্যে একজন ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে বলল, হি ইজ এগেইন আস্কিং ফর হিজ সন।

কাপালি স্যার জোর গলায় উত্তর দিলেন, ইয়েস, ইট হ্যাজ বিন অলরেডি অ্যারেঞ্জড।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, রুদ্রনাথ! জুতোটা খোলো। তারপর ফার্নেসের দিকে হেঁটে যাও।

আমি?

হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি। তোমাকে বলেছিলাম না, আজ বলব কেন তোমাকে পুরুলিয়া থেকে এখানে নিয়ে এসেছি। তুমি ওই শয়তানের বাচ্চা। তোমাকে আমি অর্ধেক সত্য বলেছিলাম। দু-বছর আগে নয়, আমি এখানে প্রথম এসেছিলাম আজ থেকে বাইশ বছর আগে। আমার সঙ্গে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছিলাম, আমাদের পাড়ারই গরিব ঘরের মেয়ে। অসামান্য সুন্দরী এবং ভার্জিন।

অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে ওকে রাজি করিয়েছিলাম। তবে ও সবটা জানত না। আসলে আমি দেখতে চেয়েছিলাম, ইভা স্টাইনবেক যেটা করতে পেরেছিলেন, সেটা তখনো সম্ভব কিনা। সম্ভব হয়েছিল। তুমি জন্ম নিয়েছিলে। কিন্তু তারপরেই মেয়েটি মারা গেল। মনে হয় সেটাই নিয়ম। শয়তানের বাচ্চার জন্ম দেওয়ার পরে মায়েরা বেশিদিন বাঁচে না। বড়জোর একবছর, যতদিন বাচ্চা দুগ্ধপোষ্য থাকে। তারপর সে মারা যায়।

আমি, হ্যাঁ, আমিই তোমাকে শর্বরী মোড়ের অনাথ আশ্রমে রেখে এসেছিলাম। জানতাম, একদিন না একদিন তোমাকে কাজে লাগবে।

আমার কাছে কাপালি স্যারের কথাগুলো একটুও নতুন ঠেকছিল না। মাথার ভেতরে সেই গুটিপোকাটা গত তিনদিন ধরে এইসবই আমার কানে ফিসফিস করে বলে গেছে। তাই বরফ গলায় বললাম, আমাকে আবার এর মধ্যে টানছেন কেন? আপনি নিজেই তো যেতে পারেন।

মানে! উনি চমকে উঠলেন।

মানে হচ্ছে—

বলতে বলতে একঝটকায় বিরাজ কাপালির কোলের ওপর থেকে লাল চাদরটা টেনে ফার্নেসের দিকে ছুড়ে দিলাম। হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতেই সেটা আগুনের তাপে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। তার মধ্যে আমি লাথি মেরে ওঁর দু-পায়ের দুটো জুতো খুলে ফেলে দিয়েছি। জ্বলন্ত চাদরটা তখনো হাওয়ায় ভাসছিল। সেই আলোয় আমরা সকলেই দেখতে পেলাম কাপালি স্যারের দুই পায়ের কোনোটাতেই আঙুল নেই। পায়ের পাতাও না। তার জায়গায় রয়েছে অবিকল ষাঁড়ের খুরের মতন দুটো চ্যাটালো খুর।

চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, অনেক কিছুই বলেননি আমাকে। লুকিয়ে গিয়েছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার হল, ইভা স্টাইনবেকের গর্ভে ওই বৃষদেবতার ঔরসে আপনারই জন্ম হয়েছিল। আপনিই ইভার সেই হারানো ছেলে, যার সম্বন্ধে আপনি নিজেই সেদিন বলেছিলেন, 'হয়তো মারা গেছে'। আসলে ইভা স্টাইনবেক মারা যাওয়ার পরে সোমেশ্বর কাপালি আপনাকে বুকে আঁকড়ে ধরে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সার্পেন্টাইন লেনের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন। তারপর নিজের পুত্রবধূর হাতে আপনাকে তুলে দিয়েই মারা যান। আপনি যাদের বাবা-মা বলছেন, তারা কেউ আপনার জন্মদাতা নন, পালক বাবা-মা।

কথা বলতে-বলতেই আমি আমার নিজের পায়ের জুতোদুটোও খুলে একপাশে ছুড়ে ফেলে দিলাম। মুহূর্তে যে দৃশ্য বেরিয়ে এল, সে আমি জানি। দেখলেই মনে হয়, পাগল হয়ে যাব। তবু আজ অনেকদিন বাদে ফের দেখতে হল।

আসলে, সেই যে আঙুলগুলো কুষ্ঠ হয়ে খসে গেছিল, তারপর থেকে আমার চামড়ার জুতোর আড়ালে ক্রমশ পায়ের পাতাদুটোও বদলে গেল। রক্তমাংসের পাতাই রইল না পায়ে। তার বদলে গজিয়ে উঠেছিল হাড়সর্বস্ব দুটো খুর। ঠিক ওই কাপালি স্যারের মতন। আমরা দুজনেই তো আসলে শয়তানের বাচ্চা।

কাউকে বলিনি এতদিন, কাউকে দ্যাখাইনি। তবু এই খুরদুটো এখন আমাকে দেখতেই হবে। দেখাতে হবে ওদের—ওই নিও-নাৎসি মেয়েগুলোকে।

হ্যাঁ, ওরা দেখছে। আমি নিশ্চিন্তে খুরওলা পা দুটো ওয়ার্কিং বেঞ্চের ওপরে তুলে আরাম করে বসি। ওরা চারজনেই ছেড়ে ফেলা গাউনগুলো তুলে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে। এবার এগিয়ে আসছে।

হঠাৎই ওদের মধ্যে একজন, সোফিয়াই বোধহয় ওর নাম, কথথেকে একটা রিভলভার বার করে কাপালি স্যারের কপালে সাঁটিয়ে ভাঙা ইংরেজিতে চেঁচিয়ে উঠল—ইউ স্কাউন্ড্রেল! ইউ নেভার টোল্ড আস অ্যাবাউট দিস কার্স।

আমি হাসলাম। আমি জানতাম কাপালি স্যার এই খুঁতো পায়ের কথা ওদের বলবেন না। বললে ওরা তো এত পয়সা ঢালতে রাজিই হত না। তাই এখন ওঁর মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

এবার মেয়েগুলো আমার পায়ের দিকে তাকাল। বলল, অ্যান্ড হি ইজ অলসো আ কার্সড ওয়ান।

আমি বললাম, ইয়েস ডার্লিং, এভরি চাইল্ড ইউ বিগেট হিয়ার উইল আলটিমেটলি আর্ন টু হুভস, ফ্রি অফ কস্ট। এখান থেকে যে বাচ্চাই পেটে ধরো, শেষ অবধি সে পায়ে দুটো খুর পাবেই পাবে, একেবারে বিনিপয়সায়। বাট ডোন্ট ইউ থিঙ্ক দে উড মেক আ ফাইন নিও-নাৎসি রেজিমেন্ট?

সত্যি, দৃশ্যটা কল্পনা করে আমার নিজেরই বেদম হাসি পাচ্ছিল। সারি সারি যুবক অটোমেটিক মেশিনগান এবং আরো নানান ভয়ানক অস্ত্র নিয়ে রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা প্রত্যেকেই আমার আর কাপালি স্যারের মতনই শয়তানের সন্তান—এককথায় বেজন্মা। আমাদের মতনই রূপবান এবং বুদ্ধিমান—অভিজাত আর্য।

কম্যান্ডার হুকুম দিলেন, মার্চ। যুবকরা একবার ইউনিফর্মের বুকে আঁকা স্বস্তিকা চিহ্নে হাত বুলিয়ে নিল। তারপর পা ফেলল—লেফট রাইট লেফট! লেফট রাইট লেফট!

ব্যস! তারপরেই এলোমেলো কিছু খটখট আওয়াজ। পাথরের সঙ্গে জোড়া জোড়া খুরের সংঘাত। খিস্তি খেউড় হট্টগোল। একে-একে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়তে শুরু করল।

কারণ তারা আমার এবং বিরাজ কাপালির মতোই খোঁড়া।

নিজের কল্পনাতে নিজেই কিছুক্ষণের জন্যে ডুবে গিয়েছিলাম। হঠাৎ কপালের ওপরে ঠান্ডা মেটালের চাপে সম্বিৎ ফিরল। সোফিয়া তার রিভলভারটা ঘুরিয়ে আমার কপালে চেপে ধরেছে। মেয়েটার চোখে খুনের ঝলক। ও দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, মিশন অ্যাবান্ডনড। ডেভিলকে আমরা আর কোনোদিনই ডাকবো না। আমরা চলে যাব। তবে তার আগে তোমাদের লাশ দুটো ওই বাইরের মাঠে ফেলে দিয়ে যাব। নাও মুভ!

আমি উঠে দাঁড়ালাম। এমা, হানা, লীনারা সেই কাঠের বাক্স আর শয়তান-পুজোর উপকরণগুলো টান মেরে ফার্নেসের ভেতরে ছুঁড়ে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে আগুনের আড়াল থেকে ভেসে এল সেই মন্দ্র মেঘগর্জন অথবা খ্যাপা ষাঁড়ের ডাক। তিনি চাইছেন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হোক। আমাদের ধুলোমাটির পৃথিবীতে পা রাখতে চাইছেন। কিন্তু চার জার্মান যুবতী সেই গর্জনের তোয়াক্কা করল না।

তবে ওরা তোয়াক্কা না করলেও অন্য কেউ করল।

আচমকা কারখানা ঘরের পেছনের দরজাটা খুলে গেল। একটা বিদ্যুৎ রেখা! শব্দহীন ছায়াশরীর নিয়ে ফার্নেসের মধ্যে লাফিয়ে পড়েছে একটা নেকড়ে বাঘ। তার শরীর নিমেষে জ্বলে উঠল। নেকড়েটা একটাও শব্দ করল না। জ্বলতে জ্বলতে ফার্নেসের মুখে শুয়ে পড়ল। মাংস পোড়ার গন্ধ উঠল।

নেকড়ে-পোড়া ছাইয়ের ওপরে একটা পা পড়ল। আমার মতোই খুরওলা পা। যার পা, তার বাকি শরীর তখনো আগুনের আড়ালে।

প্রায় নেকড়ের মতনই বিদ্যুৎবেগে ছুটে এসে আগুনের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল হাসিদি। আবারও তৈরি হল একটা ছাইয়ের স্তূপ! বাতাসে ভেসে এল কিছুটা পোড়া মাংসের গন্ধ।

ভয়ংকর দেবতার দ্বিতীয় পা-টা এসে পড়ল হাসিদির ভস্মাবশেষের ওপরে। এখন তার বিশাল শরীরের অর্ধেকটা দেখা যাচ্ছে। পেশল দুই পা, রোমশ তলপেট আর সরু কোমর।

ওই জার্মান মেয়েগুলোর মধ্যে কে একটা গোঙানির গলায় বলে উঠল, হায় ভগবান! ও যে বেরিয়ে আসছে।

আমি আর বিরাজ কাপালি তো বটেই, মেয়েরা সকলেই তখন তাকিয়ে রয়েছে খোলা দরজাটার দিকে। আর কি কেউ রয়েছে ওর ছাইয়ের সিঁড়ি সম্পূর্ণ করার জন্যে?

এইসময় ওদের সম্বিৎ ফিরে এল। চারটে মেয়েই একসঙ্গে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে উঠোনের দরজাটা বন্ধ করে, ভেতর থেকে খিল তুলে দিল। তারপরে দুজনে এসে ধরল কাপালি স্যারের হুইল চেয়ারের দুটো হাতল। ঠেলে নিয়ে যেতে শুরু করল সামনের দরজার দিকে। সোফিয়া আমার পিঠে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, মুভ মুভ মুভ। ডোন্ট স্টপ! থামলেই গুলি করব।

হোঁচট খেতে খেতে দরজার দিকে এগোচ্ছি। ওরা জিতে যাবে? একবার শুধু ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে গ্রানাইটের খোদাই করা মূর্তির মতন দুটো পা স্থির হয়ে রয়েছে। কোমরের ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছে আর একটা সিঁড়ি পেলেই সে বাইরে বেরিয়ে আসবে। কিন্তু ওকে আনবে কে?

দশ

একটা কর্কশ আওয়াজে কানে তালা ধরে গেল। প্রথমে কেউ বুঝতে পারিনি শব্দটা কোথা থেকে এল। সবাই হতবুদ্ধির মতন তাকাচ্ছি। তারপরে একসঙ্গেই সবাই বুঝলাম।

মেঝের ওপরে বসানো ম্যানহোলের ঢাকনাটা বিশাল এক বিস্ফোরণে ছাদের দিকে উড়ে গেল। রক্তের চৌবাচ্চা থেকে প্রথমে উঠে এল একটা মাথা। একঢাল কালো চুলে ভরা একটা নিটোল মুণ্ডু! তারপর শুভ্র সুন্দর দুটো কাঁধ...বাহু...নগ্ন পিঠ। সাটিন-মসৃণ ত্বকের ওপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছিল পশুরক্তের ধারা।

পরক্ষণে চৌবাচ্চার কিনারায় তার নগ্ন-শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়াল বিশাখা। একবার পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাল আমার মুখের দিকে।

না না—এ তো বিশাখা নয়। আমার মা! আমার মৃতা মা।

এই মুহূর্তে আমার চেয়ে সুখী এই পৃথিবীতে আর কে আছে? আমার ডানদিকে আমার জনক—ডেভিল। আমার বাঁ-দিকে আমার মা। তার বুকে ওই যে পরিপূর্ণ তিনটি স্তন! ওই মাঝের স্তনটির দুধ পান করে আমি জীবনের প্রথম একটা বছর বেঁচে ছিলাম, যতদিন না বিরাজ কাপালি আমাকে পুরুলিয়ার অরফ্যানেজে রেখে দিয়ে এসেছিলেন।

দু-এক মুহূর্তমাত্র। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, কত যুগ ধরে যেন মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তারপর খুব নিশ্চিত-ভঙ্গিতে আমার মা আগুনের ভেতরে ঢুকে গেল। বাইশ বছর আগে যে মৃতদেহের সৎকার হয়নি, বাইশ বছরে যে-মৃতদেহের বয়স বাড়েনি, আজ, এইমুহূর্তে তার দাহকার্য সম্পন্ন হল।

তারপর যে ঠিক কী হল, বুঝিয়ে বলতে পারব না। চেতন-অচেতনের মাঝামাঝি এক অবস্থায় আমি দেখলাম ফার্নেস থেকে এক কালো আগুনের শিখার মতন বেরিয়ে এল সেই বৃষমানুষ। মুহূর্তে একহাজার চিনেমাটির প্লেট ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল মেঝের ওপরে। স্প্রিন্টারের মতন ছুটে যাওয়া অসংখ্য কাচের টুকরোর আঘাতে যুবতী-শরীরগুলি মুহূর্তের মধ্যে রক্তের আঁকিবুঁকি রেখায় ভরে গেল।

ওরা কি তখন আর্তনাদ করছিল? জানি না। জানা সম্ভব নয়। কারণ, পশুমানুষের ক্রুদ্ধ নিশ্বাস সেই মুহূর্তে ব্যাভেরিয়া পোর্সেলিন ইন্ডাস্ট্রির অত বড় ঘরটাকে ঝাঁকিয়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সেই শব্দকে ছাপিয়ে আর কিচ্ছু শোনা যাচ্ছিল না।

শুধু সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম! অবর্ণনীয়! বীভৎস!

দেখতে পাচ্ছিলাম, সোফিয়ার পিঠ দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বেরিয়ে গেছে বৃষমানুষের একটা শিং। তার ডানহাতে তখনো রিভলভারটা ধরা। অবিশ্বাসী চোখে তখনো বিস্ময়। তাঁর মরতে তখনো কয়েক সেকেন্ড দেরি।

পরমুহূর্তেই ওর সঙ্গীর ঘাড়-মটকানো শরীরটা দেয়ালে আছড়ে পড়ল। বাকি দুজনকে যখন সে ধারালো খুরের নীচে থেঁতলে দিচ্ছিল, তখন আমি আর তাকিয়ে থাকতে পারিনি, আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলেছিলাম।

একটু বাদে যখন চোখ খুললাম, তখন স্কাইলাইট দিয়ে ঘরের ভেতরে আলো এসে পড়েছে। আমাদের জনক, বৃষমানুষ, ফিরে গেছেন ফার্নেসের ভিতরে। সেখানে ধিকধিক করে অল্প একটু আগুন জ্বলছে যার বেশিরভাগটাই জ্বলছে হাসিদি, পঙ্কজদা আর আর আমার মায়ের অবশিষ্ট রক্তমাংসের ইন্ধনে। জার্মান মেয়েগুলোর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ এখানে-ওখানে নিথর পড়ে আছে। কাচ কারখানার ঘরটাকে দেখে মনে হচ্ছিল, বন্ধ ঘরটার মধ্যে একটা বিরাট বোমা ফেটেছিল।

বিরাজ কাপালি আমার পাশেই তাঁর হুইল-চেয়ারে নেতিয়ে পড়ে ছিলেন। আমাকে চোখ খুলতে দেখে ক্ষীণ গলায় বললেন, আমরা কি এই যাত্রায় বেঁচে গেলাম, রুদ্র?

আমার মাথার ভেতরের পোকাটা আমাকে যা বলেছিল, আমি ওঁকে তাই বললাম। বললাম, তিনি আমাদের ফিরে পেতেই চেয়েছিলেন। বাঁচা-মরা জানি না। ওঁর সঙ্গে আমাদের চলে যেতে হবে। ওই দেখুন, তিনি আমাদের টানছেন। নানা, হুইল-চেয়ারের হাতল চেপে ধরে কোনও লাভ নেই। আমাদের যেতেই হবে।

ভ্যাক্যুম-ক্লিনার যেভাবে ধুলোবালিকে টানে, ফার্নেসের ভেতর থেকে সেইভাবে এক প্রবল শূন্যতা আমাদের ধরে টান দিল। সেই টানে আমরা দুজন চারাগাছের মতন উপড়ে গেলাম।

তারপর থেকেই আমার চারিদিকে স্বর্গ নরক, পাপ পুণ্য, জন্ম মৃত্যু কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। ছুটে চলেছি মহাশূন্যের অনন্ত অন্ধকারে।

অধ্যায় ১ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%