ঈশ্বর ও মানুষের মেলবন্ধন : ধর্ম

মানুষ ও ভগবানের মধ্যে ধর্মই মেলবন্ধন ঘটাবে—এমনটিই কাম্য। কিন্তু ধর্ম যখন ঈশ্বর ও ঈশ্বরপ্রেমকে উপেক্ষা করে তার রূপ ও রীতি, মত ও পথ, আচার ও অনুষ্ঠান প্রভৃতির উপরই গুরুত্ব আরোপ করে, তখন ধর্মই মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে মিলনের প্রতিবন্ধকরূপে দেখা দেয়৷

অতি অল্পসংখ্যক মানুষ, এমনকি যারা প্রবলভাবে নিজেদের ধার্মিক বলে প্রতিপন্ন করতে চায় তারাও, সত্যি বলতে কি, ঈশ্বরকে যে ঈশ্বরের জন্যই পূজা করে তা নয়। অধিকাংশ মানুষই কোন বিশেষ ধর্মকে গ্রহণ করে তার আভিজাত্যের মহিমায় মুগ্ধ হয়ে অথবা প্রত্যাশিত সুখ ও সমৃদ্ধির কামনায়। ধর্ম তাদের কাছে নিছক শিরোভূষণ মাত্র। ধর্ম তাদের শিরে স্থাপিত তপ্ত শিখা তো নয়ই, হৃদয়ের বেদনাময় আর্তিও নয়। মুষ্টিমেয় কিছুমানুষ কেবল সত্য-সত্যই ভগবানের জন্য ব্যাকুল এবং তাঁকে লাভের জন্য নির্জনে অশ্রুপাত করে থাকে।

সংসারী ধার্মিক লোকের স্বভাব বর্ণনা করতে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন—তীর্থক্ষেত্রে গিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে প্রথমে দেবদর্শন পূজা ইত্যাদি না করেই বাইরে চাল পয়সা ভিক্ষা দিতেই তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাতেই খুব ধর্ম করা হলো মনে করে সন্তুষ্ট থাকে, অথবা লোককে দেখিয়ে ভাল কাজের অনুষ্ঠান করে আত্মগরিমা লাভ করে। দাতা হতে কেউ তাদের বাধা দিচ্ছে না, কিন্তু কথা হচ্ছে, প্রধান উদ্দেশ্য—দেবতার দর্শন ও পূজা নিবেদন অন্তে আর যা কিছু করা।

অপর এক জায়গায় শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন,

এইজগৎহলোঈশ্বরেরঐশ্বর্য।মানুষতাঁরঐশ্বর্যদেখেইসবকিছুভুলেযায়।যিনিএইঐশ্বর্যসৃষ্টিকরেছেনসেইঈশ্বরকেতারাচায়না।সবারদৃষ্টি ‘কামিনী-কাঞ্চনের’দিকেই।”

এমনকি ধার্মিকতা, যার হরেক রূপ ও প্রকাশ বর্তমান, সর্বদাই যে আধ্যাত্মিকতাগুণে সমৃদ্ধ তা নয়।

শিখ গুরু গোবিন্দ সিংহ ও জনৈক ধনী শিষ্য সম্পর্কে একটি কাহিনী প্রচলিত আছেঃ

“একদা সন্ধ্যাকালে গুরু গোবিন্দ সিংহ যমুনার তীরে ধ্যান ও প্রার্থনায় মগ্ন ছিলেন। এমন সময়ে তাঁর এক ধনী শিষ্য রঘুনাথ, সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁর চরণ বন্দনা করে পরম ভক্তিভরে নিবেদন করল, “প্রভু, আপনার প্রতি আমার ভক্তির নিদর্শনস্বরূপ এই ক্ষুদ্র উপহারটি আপনি গ্রহণ করুন।’ এই বলে ভক্তটি একজোড়া রত্নখচিত বহুমূল্য বালা তাঁর পদপ্রান্তে রাখল। গুরু গ্রহণ করলেন উপহার এবং যেন তাঁর আনন্দ প্রকাশ করবার ছলনায় একটি বালা নিয়ে লোফালুফি করতে লাগলেন। হঠাৎ যেন তাঁর হাত ফসকে সেটি নদীগর্ভে নিমজ্জিত হলো।

– “শিষ্য রঘুনাথ মনে করল বুঝি বা দুর্ঘটনাক্রমেই বালাটি হস্তচ্যুত হয়ে পড়েছে। কাল বিলম্ব না করে সেটি উদ্ধার করতে মুহূর্তমধ্যে সে নদীতে ঝাঁপ দিল এবং জলের তলায় তার অন্বেষণে ব্যাপৃত হলো। আর গুরু গোবিন্দ সিংহ নদীতীরে পূর্বের ন্যায় ধ্যানমগ্ন হয়ে রইলেন। বালা উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে অধিক রাত্রে রঘুনাথ ফিরে এল হতাশ হয়ে। নতমস্তকে অপরাধী কণ্ঠে সে গুরুকে বলল, ‘প্রভু, আমি দুঃখিত, বালা উদ্ধার করতে সক্ষম হইনি। তবে আপনি যদি দয়া করে আমাকে দেখিয়ে দেন ঠিক কোন্ স্থানটিতে সেটি পড়েছে, তাহলে আমি নিশ্চিত তা পুনরায় খুঁজে পেতে সক্ষম হব।’

“শিষ্যের মনের ভিতরকার অবস্থাটি গুরু পরিষ্কারই দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বালাটি হাতে নিয়ে নদীর বুকে ছুঁড়ে ফেলে স্থান নির্দেশ করে বললেন, ওহে রঘুনাথ, প্রথম বালাটি ঠিক ঐ জায়গায়ই পড়েছিল।’

“গুরুর এরূপ ইচ্ছাকৃত কাণ্ড দেখে রঘুনাথ হতবুদ্ধি ও আশ্চর্য হলো। তাঁর দ্বিতীয় বালাটিও জলের বুকে ছুঁড়ে ফেলার মধ্যে বিশেষ শিক্ষাপ্রদ যে অর্থ আছে তা তার বোধগম্য হলো না। কিছুক্ষণ পর গুরুজী আসন হতে উঠে শিষ্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে গাঢ় স্নেহে বললেন, ‘রঘুনাথ, আমি ইচ্ছে করেই অলঙ্কার দুটি নদীতে নিক্ষেপ করে স্বস্তিবোধ করছি। দেখলাম, তোমার মন অতি প্রবলভাবে ঐ বস্তু দুটির উপর আসক্ত এবং এই আসক্তিই তোমার এবং আমার মধ্যে এক বাধার সৃষ্টি করে রেখেছিল। ধনের অহঙ্কার তুমি পরিত্যাগ কর, রঘুনাথ । ‘রঘুনাথ উপলব্ধি করল তার দুর্বলতা। গুরুপদে নতজানু হয়ে সে স্বীকার করল তার অপরাধ। অতঃপর সে এক নতুন মানুষে পরিবর্তিত হলো।”

কতই না আয়াস ও আয়োজন করে স্বেচ্ছায় আমরা ঈশ্বর ও আমাদের মধ্যে একটা ব্যবধান সৃষ্টি করে রাখি। আমাদের জীবনের একটা বৃহত্তম অংশ ধর্মকর্মের অনুশীলন করেও ঈশ্বর থেকে আমাদের দূরত্বটা ঠিক একই রকম থেকে গেছে, আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি এতটুকুও হয়নি—এমনটি হওয়াও খুবই সম্ভব। ধর্মকে যতদিন আমরা একটা আভরণের মতো, অলঙ্কারের মতো, ময়ূরপুচ্ছের শোভার মতো ধারণ করে থাকব, শুধু লোক দেখানো ধার্মিকতার ছাপ বহন করব ততদিন ঈশ্বর আমাদের থেকে দূরে দূরেই থাকবেন, শুধুমাত্র এই কারণে যে, আমরা, তখন পর্যন্ত তাকে চাইনি। যখন সত্যই আমরা তাঁর অভাব বোধ করি তখন আমাদের ধর্মধ্বজিতার সূক্ষ্মতম পর্দাটিও খসে যায়। মাথার উপর জ্বলন্ত অঙ্গার থাকলে মানুষ যেমন জলের অন্বেষণে ছুটে বেড়ায়, ঈশ্বরে ব্যাকুলতা জাগলে তেমনি মানুষ নিমজ্জিত হবার জন্য তৎপর হয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%