পুরস্কার নয়, পুরস্কারদাতাকে চাই

শ্রীশ্রীমায়ের নিকট একদা জনৈক স্ত্রীভক্ত তার কোন প্রিয়জনের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে দুঃখ প্রকাশ করেছিল। শ্রীমা তাকে বলেছিলেন, “দেখ মা, মানুষকে ভালবাসলে দুঃখ পেতেই হবে। ভাল যদি বাসতেই হয় তবে একমাত্র ভগবানকেই ভালবেসো। তাঁকে ভালবাসলে আর কোন দুঃখই নেই।”

তাঁর এই উপদেশের জ্বলন্ত সত্যতা সম্পর্কে আমাদের মধ্যে অনেকেরই হয় তো অভিজ্ঞতা আছে। তবুও হয়তো আমরা উদ্বিগ্ন হতে পারি ওই ভেবে, ‘তবে কি স্বামী, পুত্র, স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধব প্রভৃতি যারা আমাদের একান্ত প্রিয়জন তাদের আমরা ভালোবাসব না?’ তাদের ভালবাসতে কোন নিষেধ নেই, কিন্তু মায়ের কথার তাৎপর্য হলো এই যে, প্রত্যেককেই ভালবাস, কিন্তু ভালবাস তাদের হৃদয়ে যে ভগবান রয়েছেন, তাঁকে। ভগবানের প্রতি ভালবাসা হেতুই যেন আমরা তাদের ভালবাসি, তাহলে আমাদের আর কোন দুঃখ থাকবে না। কিন্তু যদি আমরা ঈশ্বরকে ভুলে অনাত্ম স্থূল দেহটিকেই ভালবাসি — যা আত্মা নয় তার ছায়ামাত্র, তাহলে আমাদের দুঃখের কোন অবধি থাকবে না। ভালবাসার নামে মানুষ এ সংসারে কত দুঃখই না ভোগ করে চলেছে, যে ভালবাসা অন্যভাবে নির্মল আনন্দের উৎস হতে পারত! সর্বপ্রথম মানুষ যদি তাঁর সকল ভালবাসাকে কল্যাণকর বিষয়ের দিকে চালিত করতে জানত, তাহলে তারা ভগবানের জন্য অন্তরে ব্যাকুলতা বোধ করতে সমর্থ হতো। সেইজন্যই তো যীশু বলেছেন,

সৰ্বপ্ৰথমঈশ্বরেরস্বর্গরাজ্যএবংতারপবিত্রতালাভেরজন্যযত্নশীলহও,অপরযাকিছুসমস্তইঅতঃপরপ্রাপ্তহবে।”

শ্রীকৃষ্ণের প্রতি মধুর ভাবের উপাসিকা গোপী শ্ৰীমতি রাধা বলেছিলেন,

কৃষ্ণসবারমুখেরকথা।কিন্তু,সই,সেআমারপ্রাণেরব্যাথা।”

ভগবান যেন আমাদের কাছে কেবল শব্দসমষ্টি মাত্রই না হন, তাঁকে যেন আমাদের হৃদয়ের জ্বলন্ত অগ্নিশিখাসম বোধ করি। ঈশ্বর বিরহ যখন অন্তরে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে, যখন মানুষ ভগবান ছাড়া আর কিছুই চায় না, তখন সে পরিণত হয় এক অন্য মানুষে। ভগবানের জন্য সে উন্মাদ হয়, এ জগতের মূল্য তার কাছে হয় অর্থহীন, জাগতিক কামনা-বাসনা হয় তুচ্ছ। জাগতিক আনন্দ-হাসি-উচ্ছ্বাস তার রুচিতে বিস্বাদ বোধ হয়। তার ভাব-ভাষা, গতি-প্রকৃতি সমস্তই রূপান্তরিত হয়ে যায়। প্রতিটি নিমেষ কাটে তার আশা-নিরাশা ও সাফল্য-ব্যর্থতার দ্বন্দ্বে। ঈশ্বর বিরহে তার কাছে জীবন হয় অর্থহীন, বেঁচে থাকাটা হয় পরম যন্ত্রণাময়! কিন্তু সেই সঙ্গে জীবনের প্রতি এক গভীর মমতাও সে বোধ করে, কারণ তার প্রিয়তম কোন ক্ষণে এসে যে দেখা দেবেন, কে জানে? তাঁর মধুর নাম শোনার আগ্রহে তার কর্ণ থাকে তৃষিত, তার চক্ষু হয় নিমেষহীন তাঁকে দর্শনের প্রত্যাশায়।

প্রিয়তম ঈশ্বরের জন্য এরূপ প্রবল বিরহ যাতনায় অধীর হয়ে কৃষ্ণ প্রিয়া মীরা জানিয়েছেন তাঁর হৃদয় নিঙড়ানো আকুতি মিশানো প্রার্থনা :

প্ৰিয় !
তব দর্শন আশে
আজও ঘুরি পথে
ব্যর্থ মনোরথে ! ভূষিত এ প্ৰাণ
করে আনচান
বিন্দুসম কৃষ্ণপ্রেম তরে ! প্রজ্বলিত দীপ সম
কৃশ এই তনু মম
দিবানিশি জ্বলে প্রিয় তরে ;
প্রেম ইন্ধন তায়
সুগন্ধি তৈল প্ৰায়
সালিতা কাতর হৃদয় !
বিরহ যাতনা প্রভু
কত বা সহিব আর
দাও দরশন প্রিয়তম !
মীরা কহে কাতরে
কৃপা কর অভাগীরে
তব পূত অঙ্গ পরশে।

সেই একই আকুতি নিয়ে ঈশ্বরের মাতৃরূপ কালীর নিকট জানিয়েছেন তাঁর মর্মবেদনা, ভারতবর্ষের আর এক মরমিয়া সাধক কবি রামপ্রসাদ। ঈশ্বরের জন্য ব্যাকুল হলে অন্তরে কিরূপ তীব্র দাহ প্রজ্বলিত হয় তার কিঞ্চিৎ আভাস তিনি দিয়েছেন তাঁর স্বরচিত দিব্য সঙ্গীতের মাধ্যমেঃ

মা মা বলে আর ডাকবো না ।
ও মা, দিয়েছ দিতেছ কত যন্ত্ৰণা৷
ছিলেম গৃহবাসী, বানালে সন্ন্যাসী,
আর কি ক্ষমতা রাখ এলোকেশী ;
ঘরে ঘরে যাবো, ভিক্ষা মেগে খাবো,
মা বলে আর কোলে যাব না ৷৷
ডাকি বারে বারে মা মা বলিয়ে,
মা কি রয়েছ চক্ষু-কর্ণ-খেয়ে,
মা বিদ্যমানে, এ দুঃখ সন্তানে,
মা মলে কি আর ছেলে বাঁচে না।।
ভণে রামপ্রসাদ মায়ের কি এ সূত্র,
মা হয়ে হলি মা সন্তানের শত্রু,
দিবানিশি ভাবি আর কি করিবি,
দিবি দিবি পুন জঠর-যন্ত্রণা ৷৷

ঈশ্বরের জন্য এরূপ প্রবল ব্যাকুলতায় বিদীর্ণ হয়ে আত্মহারা শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁরা সকল শারীরিক প্রয়োজন ভুলেছিলেন। সূর্য অস্ত গিয়ে সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলে, সাধারণের অবোধ্য কোন এক অধীর বেদনায় দিশেহারা হয়ে তিনি মাটিতে মুখ ঘষে রক্তাক্ত হতে হতে আকুল ক্রন্দনে আকাশ মথিত করতেন, “আর একটা দিন চলে গেল, মা গো, আজও তুই দেখা দিলিনি?” সেই আর্তি প্রকাশ পেয়েছিল সেন্ট ক্যাথেরিন অভ জেনোয়ার ক্রন্দনেঃ

হেপ্রিয়তম,তোমারপ্রেরিতকোনকিছুরপ্রতিইআমারআগ্রহনেই।আমিচাইকেবলতোমাকেএবংতোমাকেই।”

সেই মৌলিক প্রয়োজনের চেতনার তাগিদেই রাবেয়া বলেছেনঃ

ইহজগতেরযাকিছুউপহারতুমিদিতেচাওআমাকে,প্রভু,তুমিতাদাওতোমারশত্রুদের ;পরজগতেযাকিছুদিতেচাও,তাদাওতোমারবন্ধুদের।”

তারপর, কি মধুর ব্যঞ্জনায় বলেছেন,

হেপ্ৰিয়তম,ভূমিইআমারপক্ষেযথেষ্ট।”

সেই একই ভাবের আবেশে প্লাটিনাসের উক্তিঃ

আত্মাচায়তারসঙ্গেসংশ্লিষ্টআরযাকিছু,সেসবহতেবিযুক্তহতে।”

পারাস্যদেশীয় সাধক কবি জালাউদ্দীন রুমি অনুরূপ মানসিকতায় বলেছেনঃ

তার (সাধকের)দৃষ্টিউপহারেরপ্রতিনয়,তারদৃষ্টিনিবদ্ধহয়তারউপহারদাতারপ্রতি।”

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ঈশ্বর-ভক্তের জীবন আলোচনা করলে এই সত্যটি প্রমাণিত হয় যে, ভক্ত যখন ভগবানের জন্য প্রকৃত ব্যাকুলতা অনুভব করে, তখন তার সমগ্র সত্তা অগ্নির লেলিহান শিখার ন্যায় একমাত্র তাঁরই স্পর্শলাভের জন্য আকুল হয়ে ঈশ্বরাভিমুখী হয়।

এমনকি এরূপ মহাজীবনের স্মরণ-মননেও চিত্তশুদ্ধি হয়। ঈশ্বরের নিকট আমরা যেন সদাই এই প্রার্থনাই করি যে তিনি তাঁর অসীম করুণায় আমাদের মন-বুদ্ধিকে এরূপে অনুপ্রাণিত করুন, যেন তারা তাঁর প্রয়োজন বোধ করে এবং সকল কিছুর ঊর্ধ্বে তাঁকেই পেতে চায়। জগতের সকল ঐশ্বর্যের মধ্যে বাস করে এবং জাগতিক সকল কিছু পেয়েও যেন আমাদের তাঁকেই লাভ করার বাসনা জাগে ; তিনি যেন আমাদের হৃদয়ে তাঁকে পাবার জন্য সেই তীব্র বেদনার সৃষ্টি করেন, যার প্রেরণায় আজ অথবা কাল, মাস অথবা বছর অন্তে, অথবা অন্তিম লগ্নে অন্তরে ও বাহিরে তাঁর দর্শন লাভ করে যেন আমাদের জীবন ধন্য করতে পারি।

***

অধ্যায় ৮ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%