রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
কে বলবে এই বাঙালি লেখকের বয়স ১৪১ হল এই বইটি প্রকাশের দিনই,১৫ সেপ্টেম্বর। পনেরো বছরের বড় যে—হিমালয়ের পাদদেশে, সব হিমপ্রবাহ, ঝড়ঝাপ্টা, উচ্চচতার অভিমান ও দাপট, শীতল বৈরস্য ও অনীপ্সা ও দূরায়ত দ্যোতমানতা সহ্য করেও, চালিয়ে গেলেন লেখালিখি, সেই অনতিক্রম্য রবীন্দ্রনাথেরও আভাস বা আঁচড় পড়েনি তাঁর লেখায়। বাঙালির মনে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ভারি আদরের একলা নিতাই।
এত বছরের এক পুরনো লেখক, তবু আজও ঈর্ষণীয়ভাবে মর্মস্পর্শী তার ভাষা ও ভাবনার হৃদয়পট! ২০১৭—তে আমরা একেবারেই ভিন্ন গ্রহের মানুষ। এতটাই পরিবর্তিত পরিবেশ, পরিবহ, পরিদর্শন, পরিধান। শরৎচন্দ্র যে—অর্থে বাঙালি, সেই অর্থে খুব কম বাঙালিই রয়েছেন আজ আমাদের প্রাত্যহিক পরিধিতে। তবু কেন তাঁর গল্পের, বিশেষ করে তাঁর অধিকাংশ নারী চরিত্রের বেদনাবহ্নি, সেই ব্যথার অন্তর্মাধুর্য আজও আমাদের সান্দ্র করে? এখনও কেন তিনি কী মানুষ শরৎ কী লেখক শরৎ, অবিশ্বাস্য প্রিয়তার শিখরে?
এক বাঙালি লেখক। গরিব এবং প্রায় প্রান্তিক। গান লেখেননি। গুরু হননি। আশ্রিত হননি আচার্যঅহমিকায়। পুরোহিত হননি সমাজের। ঋত্বিক হননি কোনও বিশেষ মননবাদ বা আধ্যাত্মিকতার। যাচনা করেননি গোষ্ঠীর তোষণ ও সমর্থন। নিজের জন্য রচনা করেননি কোনও বেদি, মন্দির, পূজন। কোনও হিড়িক বা কাল্টকর্ষণ। প্রায় কখনওই পাননি কৃতধী, চিন্তাবিদ, 'মেহগিনি'—বাঙালির উন্নাসিক অর্হণ। আর নিজের ভ্রষ্টতা, স্খলন, পাপের জন্য কখনও প্রয়োজন বোধ করেননি প্রচারিত অগ্নিশুদ্ধির।
এহেন বাঙালির লেখা, এত বছরের পথ ও পরিবর্তন পেরিয়ে, এখনও কেন, কোন অজ্ঞেয় শৌভিকতার সৌজন্যে, ছোঁয় অধিকাংশ বাঙালির মন?
শুধু কি তার ভাষা?
তাঁর গল্পের সহজ অকৃত্রিম হৃদয়কথা?
তাঁর চরিত্রায়নের চৈত্তিক আবেদন?
না কি সহজ বিশ্লেষণের অতীত কোনও রহস্যময় রসায়ন?
শরতের গল্প, যে—গল্পে তাঁর জীবন ও লেখা সূক্ষ্ম বুননে বিতত, শরৎ ঋতুর মতোই:
পিছনে ঝরিছে ঝরো ঝরো জল, গুরু গুরু দেয়া ডাকে,
মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণ ছিন্ন মেঘের ফাঁকে।
এই রূপ বিশ্লেষণের চেষ্টা অব্যর্থ ব্যর্থতায় শেষ হবেই। একটিই পথ খোলা। প্রশ্নাতীত মুগ্ধতার।
বাপ মতিলাল সম্পর্কে লিখলেন শরৎচন্দ্র: 'পিতার নিকট হইতে অস্থির স্বভাব ও গভীর সাহিত্যানুরাগ ব্যতীত আমি উত্তরাধিকার সূত্রে আর কিছুই পাইনি।'
মতিলালের সাহিত্যপ্রীতি কীভাবে এল শরতের মধ্যে? অনায়াস নম্যতা, সাবলীল ও স্বাভাবিক বিনয় থেকে শরৎ জানালেন সে কথা: 'পিতার দ্বিতীয় গুণের ফলে জীবনভরে আমি কেবল স্বপ্ন দেখেই গেলাম।'
ব্যস। এইটুকু। একটি কথাও বললেন না তাঁর নিজের সাহিত্যচর্চাপ্রসঙ্গে। ইঙ্গিত পর্যন্ত দিলেন না তাঁর বিপুল সাফল্যের! বরং বাবার সম্পর্কে জানিয়ে গেলেন এই কথাটি: 'আমার পিতার পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক কবিতা—এক কথায় সাহিত্যের সকল বিভাগেই তিনি হাত দিয়েছিলেন।' তারপর ছোট্ট একটি উক্তি যা চোখে জল আনে: 'কিন্তু কোনওটাই শেষ করতে পারেননি।'
মতিলাল ছিলেন বাউন্ডুলেমি—তাড়িত মানুষ। কোনও চাকরিতে মন বসাতে পারেননি। পাঁচ ছেলেমেয়ের বাপ হয়েও সংসারের দায়দায়িত্ব বন্ধনকে রেখেছিলেন তাঁর স্বভাবের পদ্মপাতায় জলবিন্দুর মতো। স্ত্রী ভুবনমোহিনী তাঁর সঙ্গে সংসার করেও সংসারে বাঁধতে পারেননি তাঁকে। কিন্তু কোনও নালিশ ছিল না বাউন্ডুলে স্বামীকে নিয়ে। কোনও কলহ ছিল না এই বেহিসেবি, কল্পনাপ্রবণ, একই সঙ্গে মগ্ন ও অস্থির মানুষটির সঙ্গে। কারণ ভুবনমোহিনী শরৎচন্দ্রের অধিকাংশ নারী চরিত্রের মতো ভারি মিষ্টি স্বভাবের। নীরবে সহ্য করেছেন দারিদ্রের যন্ত্রণা। চ্যুত হননি কখনও স্বামীভক্তি থেকে। বেশিদিন বাঁচেননি। কিশোর শরৎকে রেখে হঠাৎই চলে গেলেন।
শরৎ তাঁর বাউন্ডুলে স্বভাবটি পেলেন বাবা মতিলালের কাছ থেকে। পিতৃদত্ত এই গুণ তাঁকে ঘরছাড়া করল। 'আমি অল্প বয়সেই সারা ভারত ঘুরে এলাম', জানাচ্ছেন শরৎ।
মায়ের মৃত্যুর পর শরৎ হঠাৎ নিরুদ্দেশ। চাপা স্বভাব তো। নিজের কষ্টের কথা কাউকে জানাতেন না। পালিয়ে বাঁচতেন। সেবার প্রচণ্ড শীত। শরৎ কোথায় কেউ জানে না। মতিলালের গায়ে কোনও শীতের কাপড় নেই। তাঁকে প্রশ্ন করা হল, শীতে গায়ে কাপড় দাওনি কেন? তিনি বললেন, নেই যে।
—শরৎ কোথায়?
—কী জানি কোথায় চলে গেছে। ঝগড়া করল। তারপর চলে গেল।
—কোনও কাজকর্ম, রোজগার?
—না, নেই।
—চলে কী করে?
মতিলাল শুধু হাঁ করে তাকিয়ে। কোনও উত্তর নেই তাঁর ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে।
—শরৎ কিছু দেয়—টেয় না?
—না, আমারই মতো সংসার সম্বন্ধে উদাসীন। ধরি মাছ, না ছুঁই পানি।
—শাসন করো না কেন?
—স্বভাব বদলায় না। দেখেছি ওর মধ্যে আনন্দের অভাব নেই। তাতেই ভাল থাকি আমি।
—কুলোয় কী করে তোমাদের?
—ভিক্ষে করি। যেদিন যেমন মেলে। বলেন মতিলাল। তিনি মৃদু হাসেন। তাঁর সমস্ত ব্যথা যেন আলো হয়ে ওঠে সেই হাসিতে।
নিজের ছেলেবেলার কথা লিখতে গিয়ে শরৎ কত সহজে বললেন সত্যি কথা! কোনও ধানাই—পানাই নেই। কোনও রাখ—ঢাক নেই। হয়তো রবীন্দ্রনাথকে ঈষৎ খোঁচা আছে: 'পাড়াগাঁয়ে মাছ ধরে, ডোঙা ঠেলে, নৌকা বেয়ে দিন কাটে। বৈচিত্র্যের লোভে মাঝে মাঝে যাত্রার দলে সাগরেদি করি, তার আনন্দ ও আরাম যখন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন গামছা কাঁধে নিরুদ্দেশ যাত্রায় বার হই। ঠিক বিশ্বকবির কাব্যের নিরুদ্দেশ যাত্রা নয়, একটু আলাদা। সেটা শেষ হলে আবার একদিন ক্ষতবিক্ষত পায়ে নির্জীব দেহে ঘরে ফিরে আসি। আদর অভ্যর্থনার পালা শেষ হলে, অভিভাবকেরা পুনরায় বিদ্যালয়ে চালান করে দেন।'
সন্ধে হতে না হতেই শরৎকে পড়তে বসতে হয়। সে নিতান্ত বালক। বড় হচ্ছে ভাগলপুরে মামার বাড়িতে। বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে বিছানো হয়েছে ফরাস। জ্বলছে রেড়ির তেলের মোটা সলতে। সেই আলোয় বাচ্চচারা একসঙ্গে চিৎকার করে পড়ছে। বাইরের বারান্দায় দাদামশাই খাটে গা এলিয়ে নাতিদের পড়া শুনছেন। কোনও প্রয়োজনে তিনি অন্যত্র গেলেই শরৎ ইংরেজি বলে:
ক্যাট ইজ আউট
লেট মাউস প্লে।
শরৎ খুব কম বয়স থেকেই নেশা করতে শুরু করলেন। একটি গোপন ডেরায় রাখলেন নেশার সরঞ্জাম। ধরলেন একই সঙ্গে তামাকের নেশা। আফিং। আর মদ। নিজেই বললেন অকপটে, মানুষ যেটাকে ভয় করে, ভয়ে যা করতে যায় না, অনেক সময় গোঁয়ার্তুমি করে আমি তা করেছি।
তারপর এই মারাত্মক দুঃসাহসী স্বীকারোক্তি: 'এটা পারলুম না, এমন গ্লানি না মনে জাগে এবং নেশা মানুষ যত রকম করে থাকে, তার কোনওটা বাদ দিইনি।'
শরৎচন্দ্রকে এখানে কোনও বাঙালি লেখক বলে আর মনে হয় না। কোথাও ভণ্ডামির চতুর চাল নেই। আমার মনে পড়ছে অলডাস হাক্সলির 'স্বর্গ ও নরকের দরজা' গ্রন্থটিতে হাক্সলির নেশার স্বীকারোক্তি ও নিরীক্ষা বিষয়ে দীর্ঘ লেখা। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে পারি, আমি হলিউড—এর পাহাড়ে হাক্সলির বাড়িতে গিয়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি ড্রাগ নিয়ে হাক্সলির এক্সপেরিমেন্ট এবং তাঁর লেখায় নেশার প্রভাবের কথা জানতে। সেই বৃদ্ধা আমার হাক্সলি—চেতনাকে একটি বিকেল ও সন্ধে জুড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রতিভাসিত পারমিতায়। লরা হাক্সলির কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তিনি পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার আগে একটি চিঠিতে তাঁকে জানিয়েও ছিলাম আমার করজোড় কৃতার্থতা।
নিজের মদ খাওয়া নিয়ে কুণ্ঠাহীন শরৎ। যে 'দেবদাস' নিয়ে আজও আমরা গদগদ সেই 'দেবদাস' প্রসঙ্গে লিখলেন তিনি : 'ওই বইটা একেবারে মাতাল হইয়া বোতল—বোতল খাইয়া লেখা।' আর এক জায়গায় লিখলেন, 'শুধু যে ওটা আমার মাতাল হয়ে লেখা তাই নয়, ওটার জন্যে আমি নিজেও লজ্জিত।'
তা মদ্যপ হিসেবে কেমন খ্যাতি অর্জন করেছিলেন চরিত্রহীন শরৎচন্দ্র? শরৎচন্দ্র নিজেই বলছেন চায়ের আড্ডায়, 'সেদিন এক অদ্ভুত মেয়ে এসেছিল আমার কাছে। এসেই আমায় বলল, অনেকদিন ধরে ইচ্ছে আপনার সঙ্গে দেখা করার।'
—তা আসনি কেন? শরতের প্রশ্ন।
—আত্মীয় বন্ধু যাকে বলি, সেই বলে, তুমি ভদ্রঘরের মেয়ে, তুমি যাবে শরৎবাবুর সঙ্গে দেখা করতে? তোমার সাহস তো কম নয়, বলে সেই অদ্ভুত যুবতী।
—তাহলে আজকেই বা এলে কেন? জানতে চান শরৎ।
—এই কথাটা আপনার কাছ থেকে জানতে, আপনি কি সত্যিই এমন, কোনও যুবতী আপনার কাছে আসতে পারে না?
এই প্রশ্নের উত্তরে শরৎচন্দ্র বললেন, এ কথা ঠিক, এক সময়ে আমি দিন—রাতের মধ্যে কখনওই প্রকৃতিস্থ থাকতাম না। সর্বদাই মদের নেশায় চুর। তবুও বলতে পারি, অপ্রকৃতিস্থ অবস্থাতেও কোনও নারীর অমর্যাদা আমি করিনি। নেশার চূড়ান্ত করেছি। অনেক অস্থানে কুস্থানে গিয়েছি। কিন্তু সে সব জায়গাতেও সকলেই আমাকে শ্রদ্ধা করত। একটি কথা না জানিয়ে পারছি না, এ হেন শরতের একটি হরিনামের দল ছিল।
শরৎচন্দ্রের বিয়ের ব্যাপারটা বেশ ঝাপসা। তিনি সহবাস করেছেন একাধিক রমণীর সঙ্গে। কিন্তু বিয়ে করেছেন কি? তিনি নিজেই বলেছেন, আমি যে বিয়ে করতে পারি, সেটাই কেউ বিশ্বাস করে না। আমার বিয়ে করা বউ। তবু বলে, রক্ষিতার সঙ্গে আছি।
কী এসে যায়, তিনি কাকে বিয়ে করেছেন, কাকে করেননি। বদলে বদলে গেছে তাঁর ভালবাসার মেয়ে। চিরদিনের বাউন্ডুলে। নোঙর ফেলা তাঁর স্বভাবে নেই।
তখন তিনি যুবক। আছেন রেঙ্গুনে। যে—বাড়িতে থাকেন সে বাড়ির তলায় এক মিস্ত্রির বাস। স্ত্রী মারা গিয়েছে। বাপ আর তার কিশোরী মেয়ে। লোকটার চরিত্র ভাল নয়। বাড়িতে প্রতি রাতে মাতাল, নেশাখোরদের আড্ডা। রাত পর্যন্ত চলে।
মেয়েটাকে ওই মাতাল বাপ আর নেশাখোরদের ফরমাশ খাটতে হয়। একদিন রাতে বাড়ি ফিরে শরৎ দেখল তার ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। অনেক ঠেলাঠেলির পর ওই নিচের তলার মিস্ত্রির মেয়ে দরজা খুলল। সে কান্নায় ভেঙে পড়েছে। তার বাপ না কি টাকা নিয়ে ওই মাতালদের মধ্যে এক বুড়োর কাছে তাকে বিক্রি করে দিচ্ছে।
শরৎ মেয়েটিকে রাতের মতো আশ্রয় দিলেন। পরের দিন সকালে সরাসরি তার মিস্ত্রি বাপকে জিজ্ঞেস করলেন যা শুনছি মেয়েটির মুখে, তা সত্য কি না। মিস্ত্রি বলে, ওই লোকটার পয়সা আছে, ছুঁড়িটা ভাত—কাপড়ের কষ্ট পাবে না।
—তা বলে একটা বুড়োর হাতে মেয়েটাকে তুলে দেবে? বলেন শরৎ।
—তা যদি বলো বাবু, ব্যাটা ছেলের আবার বয়েস কী? তারপর বলে, তুমিই বা মেয়েটাকে নিয়ে আমার জাতকুল রক্ষা করো না কেন? এক রাত তো রাখলে নিজের কাছে। বাকি জীবনটাও রাখো তা হলে।
শরৎচন্দ্র তাই করেন। কিন্তু বেশিদিন বাঁচেনি এই মেয়ে। কিছুদিনের মধ্যেই প্লেগে মারা গেল। শরৎচন্দ্র আরও এক নারীর সঙ্গে ঘর বাঁধেন। নাম হিরণ্ময়ী।
'চরিত্রহীন'—এর কিরণময়ীতে কি তারই ছায়া?
তারই আবছা স্বাক্ষর?
রবীন্দ্রনাথ কি শরৎচন্দ্রকে ঈর্ষা করতেন? কেন ঈর্ষা করবেন শরৎচন্দ্রকে? কোথায় অভিজাত রবীন্দ্রনাথ। আর কোথায় ভিখারি শরৎ। রবীন্দ্রনাথ খ্যাতিতে আন্তর্জাতিক। আর শরৎ নেহাৎই বাঙালির লেখক। তবু কেন এমন অবিশ্বাস্য বেস্টসেলার শরৎ?
১৯২১ সাল। শুরু হয়েছে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন। দেশবন্ধুর ডাকে শরৎ যোগ দিয়েছেন কংগ্রেসে। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সদস্য। শরৎচন্দ্র চান রবীন্দ্রনাথ অসহযোগ আন্দোলন সমর্থন করুন।
রবীন্দ্রনাথ তখন ইউরোপে। তিনি ফিরে আসার পর শরৎ দেখা করলেন তাঁর সঙ্গে। বললেন, অসহযোগ আন্দোলন সমর্থন করে আপনি শান্তিনিকেতন আশ্রমে খদ্দর ও চরকা শুরু করুন। রবীন্দ্রনাথ প্রত্যাখান করলেন শরতের এই প্রস্তাব। শরৎচন্দ্র চলে এলেন অভিমান করে।
শরৎচন্দ্রের 'ষোড়শী' হাতে পেলেন রবীন্দ্রনাথ। 'ষোড়শী'—র জনপ্রিয়তা তখন অবিশ্বাস্য। 'ষোড়শী' পড়ে শরৎকে লিখলেন রবীন্দ্রনাথ: তুমি উপস্থিত কালের কাছ থেকে দাম আদায় করে খুশি থাকতে পারো। কিন্তু সকল কালের জন্য কী রেখে যাবে? যে—কাহিনীর মধ্যে আমাদের পাড়াগাঁয়ের সত্যকার ভৈরবী আত্মপ্রকাশ করতে পারত সে এই কাহিনি নয়। সৃষ্টিকর্তারূপে তোমার কর্তব্য ছিল, এই ভৈরবীকে একান্ত সত্য করা, লোকরঞ্জনকর আধুনিক কালের চলতি 'সেন্টিমেন্ট' মিশ্রিত কাহিনি রচনা করা নয়।
শরৎচন্দ্র লিখলেন 'পথের দাবী'। বইটি বাজেয়াপ্ত হল। শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে পাঠালেন সেই বই। তাঁর ইচ্ছে বইটি বাজেয়াপ্ত করার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ করুন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ তো করলেনই না, বরং শরৎকে চিঠি লিখে জানালেন, বইটি পড়ে তিনি অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছেন।
এই চিঠি পেয়ে শরৎ লিখলেন পথের দাবী—র প্রকাশক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে : শ্রীযুক্ত রবিবাবুর চিঠি পেয়েছি। তাঁর অভিমত মোটের উপর এই যে, বইখানি পড়লে ইংরেজ গভর্নমেন্টের প্রতি পাঠকের মন অপ্রসন্ন হয়ে ওঠে। এবং তাঁর অভিজ্ঞতা এই যে, স্বদেশে বিদেশে যত রাজশক্তি আছে, ইংরেজের মতো ক্ষমাশীল আর কেউ নয়।
শরৎ রবীন্দ্রনাথের থেকে পনেরো বছরের ছোট। চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথের তিন বছর আগে, ১৯৩৮—এ। বয়স ৬২। ক্যানসার। ভর্তি ছিলেন কলকাতার পার্ক নার্সিংহোমে। বড্ড অভিমান নিয়ে চলে গেলেন শরৎ। না কি গলায় আফিং ঢেলে ত্বরান্বিত করলেন অনিবার্য আসন্ন মৃত্যু?
গোপালচন্দ্র রায় বলেছেন, তাঁর 'শরৎচন্দ্র' বইয়ে, নার্সিংহোমে আফিং কী করে পাবেন শরৎ?
শরৎচন্দ্রের পক্ষে নার্সিংহোমে বিষ জোগাড় করার মতো সহজ কাজ ছিল না বলেই মনে হয়।
তাঁর প্রান্ত জীবনে আফিং জোগানোর জন্য ছিল না কি কোনও অব্যর্থ ইন্দ্রনাথ?
শরৎ চাইলে ইন্দ্র যে বাঘের দুধও নিজে জোগাড় করে আনতে পারত। পৌঁছে দিত নার্সিংহোমেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন