রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
পুরুষটির বয়েস সবে চল্লিশ। সে কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে? এরই মধ্যে তার ভবঘুরে জীবনে ক্ষয় ধরে গেল? কেন তার মনে হচ্ছে, সে পৌঁছে গিয়েছে জীবনের অপরাহ্ণে?
সে কিছু বলতে চায়। নিজের জীবন সম্পর্কে শেষকথা বলার এখুনি যেন সময় হল। সে তাড়িতভাবে লিখল একটি সাদা পাতার উপর খসখস করে : আত্মীয় অনাত্মীয় সকলের মুখে শুধু একটা একটানা 'ছি—ছি' শুনিয়া নিজেও নিজের জীবনটাকে একটা মস্ত 'ছি—ছি—ছি' ছাড়া আর কিছুই ভাবিতে পারি নাই।
নষ্ট পুরুষটি এ পর্যন্ত লিখে থেমে যায়। তার মনে একটি সংশয় ও প্রশ্ন জাগে। সে নিজের কাছেই জানতে চায়, কেমন করে আমার জীবনের শুরুতেই এই সুদীর্ঘ 'ছি—ছি'—র ভূমিকা চিহ্নিত হয়ে গেল? আচ্ছা, এই 'ছি—ছি'—টা যত বড় করে সবাই দেখিয়েছে, ঠিক তত বড়ই ছিল কি?
আর সত্যিই যদি একদিন আমার জীবনের স্মৃতি—বিস্মৃতির কাহিনির কথা লিখতে বসি, সেটা কি হয়ে উঠবে শুধু ছি—ছি—র মালা গাঁথা?
এবার সেই নষ্ট পুরুষ সরাসরি ভগবানের সঙ্গে একটা ডায়ালগে যায়।
চেষ্টা করে একটা বোঝাপড়ায় আসার তার ভাগ্যবিধাতার সঙ্গে।
সে ভগবানের কাছে জানতে চায়, তুমি কি দিয়েছিলে আমাকে ভাল ছেলে হওয়ার সুযোগ?
দিয়েছিলে কি আমাকে 'একজামিন' পাশ করার সুবিধে?
দাওনি ভগবান, এসব তুমি দাওনি আমাকে। আমাকে তো তুমিই নষ্ট করেছ একেবারে গোড়ায়।
ভগবান, তুমি না দিয়েছ আমাকে গাড়ি—পালকি চড়ে লোক—লশকর সমভিব্যাহারে আরামে—বিলাসে পূর্বপুরুষের অর্থে জীবন কাটানোর সুযোগ।
আবার না দিয়েছ লেখাপড়া করে সমাজে ভদ্রলোক হওয়ার সৌভাগ্য।
কী বললে ভগবান? আমাকে বেশ খানিকটা বুদ্ধি দিয়েছিলে! হ্যাঁ ঈশ্বর, বুদ্ধি তুমি আমাকে দিয়েছ ঠিকই! নাহলে নিঃসহায় অবস্থায়, কত ঝড়—ঝঞ্ঝার মধ্যে, প্রতিকূলতার মধ্যে বেঁচে থাকলাম কীভাবে?
কিন্তু তোমাকে এ কথাটাও জানিয়ে রাখি ভগবান, তুমি আমাকে যে বুদ্ধি দিয়েছ, বিষয়ী লোকেরা তাকে 'সুবুদ্ধি' বলে না। আমার প্রবৃত্তি বড় অসংগত, বড় খাপছাড়া ভগবান। তাই আমার কামনা—বাসনা—তৃষ্ণাও বেয়াড়া ধরনের।
ভগবান, এই কারণেই সুধী ব্যক্তিরা আমাকে ভাল চোখে দেখে না। সেই ছোটবেলা থেকেই আমি তাদের চোখে মন্দ ছেলে।
আমি যে নষ্ট হয়েছি, তা আর পাঁচজন মানুষের অনাদরে, অবহেলায়। আমার অভিমান আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছে মন্দের আকর্ষণে। সেই কারণেই আমি ভবঘুরে।
ভগবান, তোমার কাছে কিছু লুকনোর জো নেই। তোমাকে অকপটেই বলছি, আমার অপযশের ঝুলি কাঁধে ফেলে আমি মাঝে মাঝেই সরে পড়তে চাই, যাতে সুদীর্ঘ দিন আর আমার কোনও উদ্দেশই পাওয়া না যায়। এইভাবেই আমি ভবঘুরে হয়ে গেলাম।
বছর চল্লিশের নষ্ট পুরুষটি আবার থামল। অনেকক্ষণ ভাবল। তার নষ্টামির শুরু কবে থেকে? মনে কি পড়ে তার সেই বিশেষ দিন ও ক্ষণ? একটি মুখ ভেসে ওঠে তার মনের মধ্যে।
তার এক বন্ধুর মুখ। এই বন্ধুই তো তাকে দেখাল নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথ।
তবু সে ইন্দ্রনাথকে ভালবাসে। আজও। কেন কিছুতেই সে ইন্দ্রনাথকে খারাপ ভাবতে পারে না? কেন তার মনে হয়, ইন্দ্রনাথ নষ্ট হয়েও আসলে নষ্ট হয়নি?
সে অনেক ভালমানুষের চেয়েও ভাল! অন্যরকম ভাল! ভালত্বের সেই অচেনা আঁচ সে পেয়েছে ইন্দ্রের মধ্যে।
নষ্ট পুরুষটির মনে পড়ে অনেক বছর আগের কথা। সে গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। সবে সন্ধে হয়েছে। দোকানে দোকানে আলো জ্বলে উঠেছে। জ্বলে উঠেছে পথের উপর মিউনিসিপ্যালিটির কেরোসিন ল্যাম্প।
হঠাৎ ইন্দ্র তার জামার পকেট থেকে একমুঠো শুকনো পাতা বের করল। নষ্ট পুরুষটির মনে পড়ে, সে অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, কী এ?
—সিদ্ধি, উত্তর দিয়েছিল ইন্দ্রনাথ। চিবো, চিবিয়ে গিলে ফ্যাল। বেশ নেশা হবে।
—আমি ওসব খাইনে।
—আরে খাসনি তো কী? এখন খা। দ্যাখ কেমন ভাল লাগে।
—না রে, খাব না।
—আচ্ছা তাহলে সিগারেট খা। বলেই ইন্দ্র পকেট থেকে গোটা দুই সিগারেট ও দেশলাই বের করে একটা বন্ধুকে দিয়ে অন্যটা নিজে ধরাল। ততক্ষণে সে সিদ্ধির পাতা মুখে ফেলে চিবিয়ে গিলেও ফেলেছে।
নষ্ট পুরুষটির মনে পড়ে, ইন্দ্রনাথের সেই সিগারেট খাওয়ার দৃশ্য। কত বছর আগের কথা। তবু মনের মধ্যে ছবিটা আঁকা থেকে গিয়েছে। ইন্দ্রনাথ তার দুই করতল বিচিত্র উপায়ে জড়ো করে সিগারেটটাকে কলকের মতো ধরে টানতে লাগল।
বাপ রে, সে কী টান! একটানে সিগারেটের আগুন মাথা থেকে হুস করে তলায় নেমে এল। ওইভাবে সিগারেট টানতে টানতেই স্বচ্ছন্দে মনের উপর প্রগাঢ় ছাপ মেরে ইন্দ্রনাথ রাস্তা পেরিয়ে অনেক লোকজনের সামনে দিয়েই চলে গেল।
কোনওরকম কুণ্ঠা—লাজলজ্জা—ভয় কিছু নেই তার। নষ্ট পুরুষটি ভাবে, এই বোধহয় তার নষ্ট হওয়ার প্রথম লগ্ন।
আর এক রাত। নষ্ট পুরুষ তখন সবে কিশোর। সে ভেসে চলেছে, ইন্দ্রর সঙ্গে একই নৌকোয়। দুর্ভেদ্য অন্ধকার। সামনে—পিছনে প্রসারিত বিপুল উদ্দাম জলস্রোত।
—কোথায় যাচ্ছি রে?
—জানলে তো বলব! উত্তর দেয় ইন্দ্র।
—তুই তো হাল ধরে আছিস।
—হাল ধরলেই সব কিছু জানতে হবে?
—তোর ভয় করছে না?
—সাঁতার জানলে আবার কীসের ভয়?
—কিন্তু এই গাঢ় অন্ধকার, এই ভয়ংকর স্রোত, এখানে সাঁতার জানা—না—জানায় তফাত কী রে ইন্দ্র?
—ওপারে জলের পাড় ভাঙার শব্দ শুনছিস? উত্তরে বলে ইন্দ্র।
—কত বড় পাড়?
—একটা পাড় ভেঙে পড়লে ডিঙিসুদ্ধ আমরা সব গুঁড়িয়ে যাব। তুই দাঁড় টানতে পারিস?
—পারি।
—তবে টান, বলে ইন্দ্র।
সহসা নৌকোটা কাত হয়েই সোজা হল। নষ্ট পুরুষটির মনে পড়ে, অন্ধকারে সে একা। ইন্দ্র নেই।
—ইন্দ্র!
—আমি নিচে।
—নিচে কেন?
—ডিঙি টেনে বের করতে হবে।
—টেনে কোথায় বের করবি?
—ও গঙ্গায়। খানিকটা যেতে পারলেই বড় গাঙে পড়ব।
হঠাৎ চারপাশের গাছগুলো খুব নড়ছে আর জলের মধ্যে ছপাৎ ছপাৎ শব্দ হচ্ছে।
—কীসের শব্দ রে ইন্দ্র?
—ও কিছু না। গাছগুলোয় সাপ জড়িয়ে আছে, তাড়া পেয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
—কী সাপ ভাই?
—সবরকম আছে। ঢোঁড়া, বোড়া, গোখরো, করেত, জলে ভেসে এসে গাছে জড়িয়ে আছে। কোথায় বা যাবে বল? দেখছিস নে চারধারে ডাঙা নেই যে!
—আমার ভয় করছে।
—ভয় কীসের রে? মরতে তো একদিন হবেই।
চল্লিশ বছরের নষ্ট পুরুষ বুঝতে পেরেছে, নষ্ট হতে হতেই বোঝে সে, 'ভীতু' হলে 'নষ্ট' হওয়া যায় না।
দুর্জয় সাহস ছাড়া নষ্ট হওয়া অসম্ভব।
আমি সাহসী বলেই, ভয় পাইনি চরিত্রহীন হতে। ভবঘুরে হতে। আপাদমস্তক নষ্ট হতে।
সুবুদ্ধির জোরে আর যাই হোক, হওয়া যায় না শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়!
ভাগ্যিস, ভগবান তুমি দিয়েছিলে ইন্দ্রনাথের মতো বন্ধু কিশোরবেলায়। নষ্ট হওয়ার সাহস সে—ই তো প্রথম দিয়েছিল। কত সহজ হয়ে গেল নষ্টামি।
বছর চল্লিশের নষ্ট পুরুষ শরৎচন্দ্রের মনে দেখা দিল একেবারে এক নতুন দৃষ্টিকোণ।
সে রাধাকৃষ্ণকে তার নিজের দলে ভিড়িয়ে নিল। কিশোর বয়সে রাধাকৃষ্ণ যা করেছিল পরস্পরের সঙ্গে, সে—ই অবৈধ ঘনিষ্ঠতা, অসামাজিক সম্পর্ক, লুকিয়েচুরিয়ে ওই শরীরী মাতামাতি— এর চেয়ে বেদম 'নষ্টামি' আর কী হতে পারে?
শরৎচন্দ্রের মনে দেখা দিয়েছে এই প্রশ্ন।
এবং সেই প্রশ্ন থেকেই উঠে এল রাধাকৃষ্ণের নষ্টামিকে দেখার একটি বিশেষ ভঙ্গি।
লিখে ফেলা যায় কি এই ভাবনা? সারা জীবন ধরে অনেক বোষ্টুম—বোষ্টুমি তো দেখলুম, দিন—রাত কাটালুম তাদের আখড়ায়, তাদের মধ্যে রাধা—কেষ্টর নামে কম নষ্টামি, ছেনালি তো দেখিনি! তা লিখলেই দোষ হবে?
না, না, শুধু কি দোষ? শুধু কি সামাজিক ছি—ছি? নষ্টামির একটা মিষ্টি দিকও তো আছে। তারই মধ্যে যে ধরা পড়ে অকৃত্রিম হৃদয়বৃত্তির মাধুর্য।
মধ্যবয়সি মানুষটি পিছন পানে তাকাল। মন চলে গেল বহু বছর আগে ফেলে আসা কৈশোরে। তার অমনি ভাবনার আকাশ থেকে খসে পড়ল আকস্মিক সোনার পালকের মতো একটি লাইন: মানুষের কিশোর বয়সটার মতো এমন মহাবিস্ময়কর বস্তু বোধ করি সংসারে আর নেই।
কেন নেই? লিখে দিলেই হল নেই? বোঝাও, অল্প কথায় বুঝিয়ে দাও, কেন নেই।
আশ্চর্য লেখার ক্ষমতা এই নষ্ট মানুষটির। সে নিজে কি বোঝে তার নিজের কৈশোরের সব কাজ? সব প্রবণতা? সব সংশয়, প্রত্যয়, ইচ্ছে আর ভয়? না তো!
তা—ই সে লিখল, কৈশোরে মানুষের মানসিক গতিবিধি বড়ই দুর্জ্ঞেয়। আর এই অজ্ঞেয়তার সূত্র ধরেই তার মনের মধ্যে এল বৃন্দাবন, এল রাধাকৃষ্ণের মন, তাদের সম্পর্কের বিষয়টি।
শুধু কি নষ্টামি? না কি তার চেয়ে অনেক বড় কিছু, বেশি কিছু?
মধ্যবয়সি পুরুষটি যা লেখে, সব উঠে আসে তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে। সে রাধাকৃষ্ণকে ভাবল তার জীবন থেকে প্রাপ্ত দৃষ্টিকোণ থেকেই। কোনওরকম ভক্তি, ধর্ম— এসব সে পাত্তাই দিল না।
সে সত্যিই নষ্ট পুরুষ! নিজে নষ্ট না হলে এমন সহজ সাহসে লেখা যায় আদি নষ্টামির কথা?
সে তরতর করে লিখে ফেলল, শ্রীবৃন্দাবনের দু'টি কিশোর—কিশোরীর কৈশোরলীলা চিরদিনই রহস্যে আবৃত।
কেন রহস্যে আবৃত?
নিজেকে সে প্রশ্ন করে পেল এই উত্তর: বুদ্ধি দিয়ে তাকে ধরতে পারা যায় না। তাই কেউ বলে ভাল, কেউ মন্দ। কেউ রীতির বা নীতির দোহাই পাড়ে।
এবার সে বেশ কিছুক্ষণ থামে। এবারে তাকে ভিতরের কথাটা বলতেই হবে। আসল কথাটা হল, কী হবে সারাক্ষণ কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ তার বিচার করে? কিন্তু সাহস আছে তার কথাটি লিখে জানানোর? সে সত্যিই লিখল, কেউ কেউ সাহস দেখাতে পারে তর্কাতর্কির মধ্যে না গিয়ে সমস্ত গণ্ডি মাড়িয়ে, ডিঙিয়ে বের হয়ে যাওয়ার!
কোথায় বের হয়ে যায় তারা?
সমাজের বাইরে।
তারপর?
ওই মাঝবয়সি অসাধারণ লোকটি লিখল, যারা বেরিয়ে গেল, সেই সব নষ্ট পুরুষ আর নারীরাই তো মজল, পাগল হল, নেচে—কেঁদে—গান গেয়ে সব একাকার করে দিয়ে সংসারটাকে যেন একটা পাগলাগারদ বানিয়ে ছাড়ল।
লোকটি এতখানি লিখে ভাবল, কিন্তু 'শেষ কথা' তো এটা নয়। শেষ কথাটি যে বলতেই হবে। সে নিজের জীবন—অভিজ্ঞতায় ডুব দেয়। আর সে যত গভীরে যায় বুঝতে পারে ততই নিশ্চিতভাবে, তার নিজের জীবনে সকল রসের উৎস তো তার নষ্টামি। তার অন্যায়। তার পাপ।
সে তখন দ্বিধাহীন সাহসে জানাল, যারা মন্দ বলে সর্বদা গাল দিচ্ছে, তারা যখন শোনে অন্যায় আর পাপ থেকে উঠে আসা গান, শোনে অবৈধ প্রণয়ের কাব্য, পদাবলি— তখন তারাও বলে এমন রসের উৎস আর কোথাও নেই। বৈধ সম্পর্কে রস আর কতটুকু? ক'দিনই বা থাকে সেই রস?
যত রস সব পাপে। পুণ্য বড় শীতল ও নীরস। শরৎচন্দ্র না লিখে পারল না, যারা সংসারটাকে পাগলাগারদ বানাল, তারাই গাইল এমন গান, যে গান আর কোথাও শুনবেন না।
কিন্তু এত কাণ্ড যাদের জন্য ঘটল, সেই যে বৃন্দাবনের নষ্ট কিশোর—কিশোরী, তাদের কথা তো ভুলে গেলে চলবে না! তাদের ওই সামাজিক অন্যায় ও পাপের জন্যই, তাদের ওই অবৈধ নিবিড়তার জন্যই তারা চিরদিনের পুরাতন, অথচ চিরনতুন।
শরৎচন্দ্রকে লিখতেই হবে, যে কথা তার মনে প্লাবনের মতো দুর্বার হয়ে এসে পড়ল: ওই দুই কিশোর—কিশোরীর অপরূপ সম্পর্কের কাছে, তাদের প্রণয়লীলার কাছে বেদান্ত ক্ষুদ্র। প্রবল বারিশের কাছে বারিবিন্দু যেমন তুচ্ছ— তেমনই তুচ্ছ এই প্রেমজ লীলার কাছে, এই অবৈধ প্রবণতার কাছে আধ্যাত্মিক মুক্তি।
কিন্তু এ যে অন্যায়। এ যে পাপ। এই পাপের পরিণতি কোথায়?
শরৎচন্দ্র ছোট্ট উত্তরটি জানাল এইভাবে: কে কবে অন্ত খুঁজে পেয়েছে?
শরৎচন্দ্রের মনে পড়ে, তার মাথার উপর অন্তহীন রাতের আকাশ। তার সামনে অন্তহীন অচেনা বালির পাড়। সত্যিই কি অন্ত পাওয়া যায়? এই পাপচিন্তা তার কিশোর—মনেই তো জেগেছিল।
এই নিঃসঙ্গ বালির চরে তাকে একলা ফেলে রেখে ইন্দ্র গেল কোথায়? যাওয়ার সময় শুধু বলে গেল, ভয়ের কিছু নেই, কুকুরের ডাক শুনতে পাচ্ছিস না, ওধারেই জেলেদের বাড়ি।
শরতের মনে পড়ে অনেক মাছ ধরেছে তারা। সেসব মাছ অন্ধকারেই কোথাও রেখে অদৃশ্য হল ইন্দ্র। তারপর আবার এক দৌড়ে ফিরেও এল।
—শোন, একটা কথা তোকে বলতে ভুলে গেছি। তাই ফিরে এলুম। কেউ যদি মাছ চাইতে আসে, খবরদার দিসনে। খবরদার বলে দিচ্ছি।
—ঠিক আছে, দেব না।
—ঠিক আমার মতো হয়ে যদি কেউ আসে তবু দিবিনে। বলবি মুখে তোর ছাই দেব। ইচ্ছে হয় নিজে তুলে নিয়ে যা। হাতে করে দিতে যাসনি যেন। ঠিক আমি হলেও না। খবরদার!
—কেন ভাই?
—ফিরে এসে বলব।
—বলি বাড়িতে কি একেবারে আউট হয়ে গেছ না কি? ঘেন্না—পিত্তি—লজ্জা—শরম আর কিছু দেহতে নেই? কখনও তো এমন ছিলে না! এত অধঃপথে তুমি যেতে পারো, কেউ তো কোনওদিন ভাবেনি। একটা বাইউলিকে সঙ্গে করে রাতদুপুরে...।
মাঝখানে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গিয়েছে। শরৎচন্দ্র কৈশোর থেকে যৌবনে উপনীত। সে রাতদুপুরে সত্যিই এক সুন্দরীর ঘরে! এবং সেই সুন্দরীর মুখেই শরৎকে শুনতে হচ্ছে চরিত্র নিয়ে এই খোঁটা!
কে এই মেয়ে? কেনই বা শরৎ তার ঘরে?
শরৎ তার গান শুনে, রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছে। কিন্তু আগ বাড়িয়ে সে মিশতে চায়নি। বরং রূপসীর কাছ থেকে সারাদিন সে দূরেই থেকেছে।
মেয়েটিই তাকে ডেকে পাঠিয়েছে রাতদুপুরে। তারপর এই গঞ্জনা! এমন কিছু দোষ করেনি শরৎ।
বরং মেয়েটিই তাকে একটু বেশি সোহাগের কথা বলছিল। যেন কতদিনের আপনজন শরৎ!
তখন শরৎ বলল, অতই যখন ভাবছ আমার জন্য, চলো আমার সঙ্গে।
তারপরেই রূপসীর এই ছি ছি!
কোথায় কী করে দেখা হল তরুণ শরৎচন্দ্রের এই রূপবতীর সঙ্গে? সে এক গল্প বটে।
এক রাজার ছেলের নিমন্ত্রণ এল শরতের কাছে। ছেলেবেলার বন্ধু। তারপর বহুদিনের ছাড়াছাড়ি। ইতিমধ্যে সেই বাল্যবন্ধুর হাতে এসে পড়ল অনেক জমানো টাকা।
বন্ধুটি শরৎকে ভোলেনি। তাকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে শিকার পার্টিতে গিয়ে উপস্থিত হতে।
কারণ, রাইফেল চালাতে নাকি শরতের জুড়ি নেই, এ কথা সেই ধনী বন্ধুটির কানে গিয়েছে!
শরৎ এই নিমন্ত্রণে গেল। রাজারাজড়ার নিমন্ত্রণ বলে কথা। স্টেশন থেকে আরও দশ—বারো ক্রোশ পথ। তাকে নিয়ে যেতে এসেছে হাতি। হাতির পিঠে শরৎ যখন পৌঁছল বন্ধুর কাছে, তখন রাত হয়ে গিয়েছে।
সেখানে গিয়ে দেখে গোটা পাঁচেক তাঁবু পড়েছে। তার মধ্যে একটি রাজার ছেলের খাস কামরা। সেখানে ইতিমধ্যেই সংগীতের বৈঠক বসেছে।
শরৎচন্দ্র ঢুকতেই আদরের আতিশয্য। রাজপুত্র থেকে বন্ধুবান্ধব— সবাই বিশেষভাবে আপ্যায়ন করল।
—আজ যে বাইজির গানের আসর বসেছে শরৎ, তাকে পাটনা থেকে নিয়ে এসেছি। অনেক টাকার শর্তে দু'—সপ্তার জন্য আসতে রাজি হয়েছে, বলল রাজকুমার।
শরৎ তাকায় বাইজির দিকে। বাইজি শরৎচন্দ্রকে দেখে মৃদু হাসে। মনে মনে শরৎ তারিফ করে বন্ধুর বিবেচনা ও বিচক্ষণতার। বাইজি যে সুশ্রী, তাতে সন্দেহ নেই।
শরৎ ঢুকতেই সে গান থামিয়েছে। কিন্তু যেটুকু গান কানে গিয়েছে, তাতে বুঝতে অসুবিধে হয়নি, সে বিশেষ সুকণ্ঠীও।
—শরৎ, তুমি আমাদের বিশেষ অতিথি। এবার তুমিই গান ফরমায়েশ করো।
শরতের মনে হল, রাজপুত্রের এই কথায় বাইজিটি প্রফুল্ল হয়ে উঠল। এই নিরেটদের মাঝখানে এতক্ষণে একজন সমঝদার পেয়েই হয়তো বাইজি খুশি।
বাইজি গান শুরু করল। যেন তাঁবুর মধ্যে আর কেউ নেই। গভীর রাত পর্যন্ত বাইজি এমনভাবে গান শোনাল যে শরতের মনে কোনও সন্দেহ রইল না, বাইজি যেন তার জন্যই সমস্ত সৌন্দর্য ও কণ্ঠমাধুর্য উজাড় করে দিল।
বাইজি কি আর কখনও কাউকে সমস্ত প্রাণ দিয়ে এমনভাবে গান শুনিয়েছে?
মুগ্ধ শরৎচন্দ্র মনে মনে এই প্রশ্নটি না করে পারল না। যদিও গান শেষ হলে সে মুখে শুধুমাত্র বলল, 'বেশ'!
শরৎ কিঞ্চিৎ আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল বাইজি সেলাম করল না। কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করল।
শরতের বুঝতে বাকি রইল না, সে প্রণাম তারই উদ্দেশে।
তখন দলের অধিকাংশই মদে চুর। বাইজিও নিজের তাঁবুতে ফেরার জন্য তোড়জোড় করছে।
শরৎচন্দ্র বাইজির কাছে গিয়ে বলল, আমার বড় সৌভাগ্য, তোমার গান দু'—সপ্তা ধরে প্রত্যহ শুনতে পাব।
—টাকা নিয়েছি, আমাকে তো গাইতেই হবে। কিন্তু আপনি এই পনেরো—ষোলো দিন ধরে এই লোকটার মোসাহেবি করবেন? যান, কালই বাড়ি চলে যান।
শরৎকে অবাক করে বাইজি একথা বলল পরিষ্কার বাংলায়।
পরের দিন রাত। শরৎ নিজের তাঁবুতে চিত হয়ে শুয়ে সিগারেট খাচ্ছে। এমন সময় একজন সেখানে এল।
—কে তুমি? শরৎ প্রশ্ন করে।
—বাইজির খানসামা, বলে লোকটি।
—হঠাৎ এত রাতে?
—বাইজি একবার সাক্ষাৎ করতে চান।
—কেন?
—জানিনে।
—তুমি কি বাঙালি?
—আজ্ঞে হ্যাঁ। জাতে নাপিত। নাম, রতন।
—বাইজি কি হিন্দু?
—নইলে থাকব কেন বাবু? হেসে বলে রতন।
—তবে যে শুনলাম 'পিয়ারিবাই'!
রতন চুপ করে থাকে। শরৎ অনেকক্ষণ চুপ। তারপর বলল, কোথায় যেতে হবে?
—আজ্ঞে, বাইজির কামরায়।
—তবে চলো।
রতন শরৎকে বাইজির তাঁবুর দরজা দেখিয়ে দিয়ে নিজে সরে এল। শরৎ ভিতরে গিয়ে দেখল, বাইজি ঘরে একা। তারই জন্য প্রতীক্ষা করছে।
একখণ্ড মূল্যবান কার্পেটের উপর গরদের শাড়ি পরে সে বসে আছে। ভিজে এলোচুল পিঠের উপর ছড়ানো।
এত রাতে সে যেন স্নান সেরে পুজোর জন্য পবিত্র হয়েছে!
বাইজির হাতের কাছে পানের সাজ—সরঞ্জাম। সামনে গুড়গুড়িতে তামাক সাজা।
শরৎকে দেখামাত্র বাইজি উঠে দাঁড়াল। সামনেই একটি আসন দেখিয়ে বলল, বোসো। তোমার সামনে আর তামাক খাব না। ওরে রতন, গুড়গুড়িটা নিয়ে যা। ও কী! দাঁড়িয়ে রইলে কেন, বোসো না!
শরৎ বসে। বাইজি বলে, অন্য জায়গায় যা করো, তা করো, জেনেশুনে তো বাইজির এঁটো গুড়গুড়িটা তোমাকে দিতে পারি না। চুরুট আনিয়ে দেব?
—না না, থাক, পকেটেই আছে।
—আছে! তাহলে ঠান্ডা হয়ে একটু বোসো তো। ঢের কথা আছে।
একান্ত অল্প বয়স থেকেই নষ্ট মেয়েমানুষ কম দেখেনি শরৎ। কুলটাদের স্বাদ—গন্ধই আলাদা।
ওদের বোলচালে, ঠাট—ঠমকে ভ্রষ্টামি ঠিক জানান দেয়।
শরতের কিন্তু মনে হয়, পিয়ারি যে একজন অচেনা পুরুষকে ঘরে ডেকে এত রাত্তিরে সহজ ঘনিষ্ঠতা দেখানোর চেষ্টা করছে, যেন কতদিনের চেনা— এই আচরণ কিন্তু বাইজির 'ছেনালি' নয়।
কিন্তু তাতে শরতের মনে পিয়ারি সম্বন্ধে খটকাটা আরও বড় হয়ে দেখা দেয়।
কে এই পিয়ারি? শরৎ ঠাহর করতে পারে না।
—তুমি কি সত্যি শ্মশানে যাবে? জানতে চায় পিয়ারি।
—হ্যাঁ, তা তো একদম ঠিক করেই ফেলেছি।
—শনিবারের এই ঘোর অন্ধকার অমাবস্যায় তুমি শ্মশানে যাবে?
পিয়ারির কণ্ঠে গভীর উদ্বেগ। সে যে অযথা নাটক করছে না, বুঝতে পারে শরৎ।
—দ্যাখো পিয়ারিবাই, শ্মশানে আমাকে যেতেই হবে। আমি বাজি লড়েছি। ওসব ভূত—প্রেতে আমি ভয়টয় পাই না। এখন না গেলে সবাই আমাকে ভিতু বলে ঠাট্টা করবে।
—তুমি তো শুনলে ওই মহাশ্মশানে এক ভৈরবী তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে প্রতি রাতে নরমুণ্ডের গেণ্ডুয়া খেলে। মানুষের কাটা মাথা নিয়ে নাচে। সেখানে গেলে ভৈরবীর হাতে মাথা কাটা পড়বে তোমার।
এই বলতে বলতে পিয়ারি হঠাৎ কেঁদে ফেলল। একেবারে ঝরঝর করে কান্না। কুলটার ন্যাকা কান্না নয়।
শরৎ বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে। যাকে চিনি না, জানি না, সে আমার বিপদের কথা ভেবে এমন কাঁদছে কেন? এই উৎকট হিতাকাঙ্ক্ষার কোনও মানে খুঁজে পায় না শরৎ।
—তুমি কি কোনও দিন শান্ত, সুবোধ হবে না? একইরকম চালচুলোহীন, একগুঁয়ে চিরকালটা থাকবে?
শরৎ অবাক হয়ে তাকায় পিয়ারির দিকে। কে এই সুন্দরী? এই ঘনিষ্ঠতার সাহস সে কোথা থেকে পেল?
এই ঘনিষ্ঠতার মধ্যে কোথাও নেই এতটুকু ভ্রষ্টামির ইঙ্গিত। যা আছে, তা তো মেয়েটির ভালবাসা! শরতের মুখে কথা নেই। সে সত্যিই বিস্মিত।
—যাও দিকি কেমন করে যাবে? আমিও তাহলে সঙ্গে যাব।
শরৎ এবার মজা পায়। ভিতরের মেয়েটা ধরা পড়ে গিয়েছে এতক্ষণে। আর কোনও আড়াল নেই।
নাহলে অ্যাতো রাত্তিরে একজন অচেনা পুরুষকে কোনও সোমত্ত মেয়ে বলতে পারে, আমিও সঙ্গে যাব!
শরৎ দুম করে বলে দেয়, বেশ, চলো।
অমনি বাইজি গেল খেপে!
চিৎকার করে উঠল, বলি, ঘেন্না—পিত্তি, লজ্জা—শরম আর কিছু দেহতে নেই! তুমি যে সত্যিই এত অধঃপথে কোনও দিন যেতে পারো, আমি তা ভাবতে পারিনি। একটা বাইজিকে নিয়ে দুপুররাত্তিরে ভূত দেখতে যাবে? নিন্দের ভয়ও গেছে?
শরৎ এবার আর থাকতে পারে না। সে বাইজির দিকে তাকিয়ে বলে, পিয়ারি, তুমিও নিজের কথা ভাবো। তুমি নিজেও কি ভাবতে পেরেছিলে এত নীচে নামবে?
শরৎ দেখল, পিয়ারির মুখে শরতের মেঘলা জ্যোৎস্নার মতো ক্ষণস্থায়ী এক সহজ হাসি।
তার মনে হয়, পিয়ারিবাই অপ্সরার মতো সুন্দরী। যেন ধরা—ছোঁয়ার বাইরে।
শরতের ভারি ইচ্ছে করে নষ্ট মেয়েটাকে একটু ছুঁয়ে দেখতে। পিয়ারি নিশ্চয় অন্যরকম।
অন্য কুলটাদের মতো চড়া রঙের স্বভাব নয় তার। ছুঁলেই নিশ্চয় বোঝা যাবে পিয়ারিবাইয়ের ভিতরটা কেমন।
—আমার তুমি কী জানো? বলো তো দেখি, আমি কে? মৃদু ভীতস্বরে বলে পিয়ারি।
—কে আবার? তুমি পিয়ারিবাই।
—আহা! সে তো সবাই জানে।
শরৎ এবার একটা ছোট্ট চালাকি করে পিয়ারিবাইয়ের সঙ্গে। বলে, সবাই যা জানে, তা আমি জানি। আবার সবাই যা জানে না, তা—ও জানি।
—তাই বুঝি? তা জানাও দিকি কী জানো আমার সম্পর্কে, যা আর কেউ জানে না।
—জানলে তুমি খুশি হবে না সুন্দরী।
—কী করে জানলে?
—তাহলে তো তুমি নিজেই জানাতে। তুমি যখন ইচ্ছে করে নিজের পরিচয় আমার কাছে লুকিয়েছ তখন আমার মুখ থেকেও কোনও কথা আশা কোরো না।
পিয়ারি শরতের চোখে চোখ রাখে। সেই চোখের আশ্চর্য মায়া শরৎকে কেমন যেন আচ্ছন্ন করে ফেলে।
শরৎ বিহ্বলতার মধ্যেই বলে, তোমার আত্মপ্রকাশের আর সময় নেই পিয়ারি, আমি চললুম।
যদি যেতে না দিই, জোর করে যেতে পারবে? পিয়ারি আকস্মিক আবেগে শরৎকে নিজের বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে।
—পিয়ারির বন্ধন থেকে শরৎ বেরিয়ে আসার বৃথা চেষ্টা করে। বলে, কিন্তু যেতেই বা দেবে না কেন? ছাড়ো আমাকে।
—না, ছাড়ব না, কিছুতেই ছাড়ব না। যেতে চাইলেই যেতে দেব কেন? নিজের লোককে আটকে রাখার জোর আমার আছে।
—নিজের লোক! এ পৃথিবীতে নিজের বলতে আমার কেউ নেই পিয়ারি!
—মাইরি, আমি এবার চেঁচিয়ে হাট বসাব বলে দিচ্চিচ। সবাই এসে জড়ো হবে। মাঝরাত্তিরে একটা কেলেঙ্কারি হবে গো! তা তুমি কত বড় নষ্ট পুরুষ তখন দেখব। সামলাতে পারবে তো?
পিয়ারির ওই রণমূর্তি দেখে আর চড়া সুর শুনে শরতের বেশ হাসি পেল। পিয়ারি হাটে হাঁড়ি ভাঙার ভয় দেখাচ্ছে কাকে? শরতের না আছে পাপের ভয়, না আছে লোকনিন্দের ভয়।
জাত বাউন্ডুলে সে। বলল, আর আমার ভূত—প্রেত দেখতে শ্মশানে যাওয়ার দরকার নেই সুন্দরী। আমার সমুখেই তো একটা আস্ত ভূতের দেখা পেয়েছি। যে দরকার হলে আমার ঘাড় মটকে রক্ত খাবে।
পিয়ারি শরতের কথায় অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। তার চোখ দু'টি জলে ভরে যায়। ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ে শরতের বুকে।
—তুমি ঠিকই বলেছ, আমি না মরেও 'ভূত' হয়েছি। বলে পিয়ারি।
শরৎ পিয়ারির মুখটি দু'হাতে ধরে নিজের মুখের দিকে তোলে। পিয়ারি তাকিয়ে শরতের দিকে।
সে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, নিজের মরণ আমি নিজে রটাইনি শরৎবাবু। মা রটিয়েছিল। মামাকে দিয়ে।
কাশীতে আমি ওলাওঠা রোগে মরেছি, মা একথা গ্রামে ফিরে প্রচার করেছিল। এই মিথ্যে প্রচারে মা'কে সাহায্য করেছিল আমার মামা।
কথাটা বলে পিয়ারি তার দাঁত দিয়ে ঠোঁটটা শক্ত করে কামড়ে ধরল। শরতের মনে হল, পিয়ারিকে সে আগেও কোথাও কথা বলতে বলতে রাগ বা আবেগ চাপতে এইভাবে অধর কামড়ে ধরতে দেখেছে।
আর অমনি চকিতে তার স্মৃতি চলে গেল অনেক পিছনে।
শরৎ তখন কিশোর মাত্র। সে পড়ে মনসা পণ্ডিতের পাঠশালে। তারই গ্রামের মেয়ে সুরলক্ষ্মী আর রাজলক্ষ্মী। দুই বোন। রাজলক্ষ্মী বারো—তেরো। আর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত। পিলেরোগী রাজ তার ধামার মতো পেট আর কাঠির মতো হাত—পা নিয়ে আট কি নয়। এদের বাপ ছিল কুলীন ব্রাহ্মণ।
গরিব কিশোরী—যুবতীদের বিয়ে করে উদ্ধার করাই ছিল এই কুলীন ব্রাহ্মণের কাজ। সামাজিক হিতসাধনের জন্য তার গ্রামে খ্যাতিও হয়েছিল কিছু।
সে একদিন এক ডাগর গরিব মেয়েকে বিয়ে করে দিলে তাড়িয়ে সুরলক্ষ্মী ও রাজলক্ষ্মীর মা'কে।
শরতের স্পষ্ট মনে পড়ল, কীভাবে সে ছোট্ট অসহায় দুর্বল রাজকে প্রায় প্রত্যহ চড়চাপড় মেরে পাঠিয়ে দিত বঁইচির বনে। রাজ বঁইচির বন থেকে শরতের জন্য নিয়ে আসত বেছে বেছে পাকা বঁইচি।
শরতের মনের মধ্যে ভেসে ওঠে একটা ছবি। মারের ভয়ে সেই ছোট্ট রুগণ মেয়েটি রোজ যায় বঁইচির বনে। রোজ শরতের জন্য নিয়ে আসে পাকা পাকা বঁইচি।
শুধু যেমন—তেমন করে নিয়ে আসে না। পাকা বঁইচির মালা গেঁথে নিয়ে এসে পরিয়ে দেয় শরতের গলায়।
যেদিন পায় না পাকা বঁইচি, সেদিন শরতের হাতে মার খেয়ে গোঁজ হয়ে বসে থাকে।
তবু কোনওদিন তো বলে না, রোজ রোজ পাকা ফল বন থেকে খুঁজে আনা কত কঠিন। শুধু দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ায়।
শরৎ কাছে যায় পিয়ারির। তাকে স্পর্শ করে। মুখটি তুলে ধরে নিজের চোখের সামনে। কয়েকটি হ্যারিকেনের আলোয় সেই মুখের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শরৎ।
বিধাতা পিয়ারির মুখটি যেন অতি যত্নে তুলি দিয়ে এঁকেছেন। কোনও খুঁত নেই কোথাও।
—রাজ! শরতের মুখ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসে শব্দটা!
—চিনতে পেরেছ তাহলে? শরতের চোখে চোখ রাখে পিয়ারি।
—কিন্তু তোমার যে বিয়ে হয়েছিল রাজ!
—সে বিয়ে যে কেমন বিয়ে তুমি তো জানো শরৎদা!
'শরৎদা'!
কতদিন পরে পিয়ারির মুখে সেই ভুলে—যাওয়া রাজলক্ষ্মীর 'শরৎদা'! শরতের বুকের ভিতর হঠাৎ কী যেন একটা ছলাৎ করে উঠল। সে কিছু বলল না। পিয়ারির চোখ থেকে চোখ নামিয়ে নিল।
—তোমার নিশ্চয় মনে আছে শরৎদা এক রান্নার বামুনঠাকুরের সঙ্গে মামা আমাদের দুই বোনের বিয়ে দিয়ে আমাদের দায়—দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়েছিল। সেই কুলীনের পো সত্তর টাকা পণ নিয়ে আমাদের দু'বোনকে একসঙ্গে বিয়ে করে পার করল। তারপর কুলীন জামাই সেই যে পালাল তার আর দেখা পাওয়া গেল না।
—এ পর্যন্ত আমি জানি, রাজ। কিন্তু তারপর কী হল? আমি তখন গ্রামছাড়া। আর কোনও খোঁজখবরই রাখতে পারিনি।
—রাখোনি যখন, কী হবে এখন জেনে?
—তবু জানতে ইচ্ছে করে রাজ।
—বছর দেড়েক পরে দিদিটা মরল। মামা আর মা আমাকে নিয়ে কাশী গেল। সেখানে আমি তাদের আজ্ঞায় মরে বাঁচলুম।
শরৎ অবাক হয়ে তাকায় পিয়ারির দিকে।
—অবাক হচ্ছ শরৎদা? শুধু অবাক? না কি একটু দুঃখও পাচ্ছো একথা ভেবে, আহা, কাঁটার বনে রোজ রোজ বঁইচি তুলিয়ে একদিন এই মেয়েটাকে কত কষ্টই দিয়েছিলুম!
শরৎ কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না।
নিজেকে অপরাধী মনে হয় তার।
ভিতর থেকে একটা ছি ছি বেরিয়ে আসে নিজের প্রতি।
—শরৎদা, কী মনে হয় জানো? বলে পিয়ারি।
শরৎ কিছু বলতে যায়। পিয়ারি তাকে থামিয়ে বলে, তবু বলি, এই প্রেম আমার ঈশ্বরদত্ত ধন। যখন সংসারের ভাল—মন্দ জ্ঞান পর্যন্ত হয়নি, তখনকার। আজকের নয়।
পিয়ারিবাই! ডাকে শরৎ।
—রাজ থেকে আবার হঠাৎ পিয়ারিবাই কেন? তা, ওই নামেই ডাকো তাহলে! আমার আরও অপমান সইবে গো শরৎদা।
শরৎ যেন শুনতেই পায় না পিয়ারির কথা। সে ধীরে ধীরে বলে, শোনো পিয়ারিবাই, আমি বিস্মিত হচ্ছি একটা কথা ভেবে। কী বিরাট অচিন্ত্যনীয় ব্যাপার নারীর মন!
—যাক, এতদিনে বুঝেছ তাহলে! তো, কোন মেয়ে বোঝাল তোমাকে শরৎদা?
—তুমি পিয়ারি, তুমি। তুমিই বুঝিয়েছ।
—আমি! কী করে গো?
—কবে যে সেই পিলেরোগা মেয়েটা তার ধামার মতো পেট আর কাঠির মতো হাত—পা নিয়ে আমাকে প্রথম ভালবেসেছিল! আর তার বঁইচি ফলের মালা দিয়ে তার দরিদ্র পূজা নীরবে সম্পন্ন করল, আমি তো টেরও পাইনি!
—মেয়েমানুষের ভালবাসা পুরুষ আর কবে টের পায় শরৎদা?
—দ্যাখো পিয়ারিবাই, নভেল—নাটকে বাল্যপ্রণয়ের কথা অনেক পড়েছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটি প্রশ্ন আছে তোমার কাছে বাইজি!
আর কত অপমান করবে আমাকে বারবার বাইজি বলে! বেশ, কী জানতে চাও বলো! উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
—যে বস্তুটিকে তুমি তোমার 'ঈশ্বরদত্ত ধন' বলে সগর্বে প্রচার করতেও কুণ্ঠিত নও, বলো পিয়ারিবাই, তোমার এই ঘৃণিত জীবনের কত না প্রণয়—অভিনয়ের মধ্যে কোনখানে কীভাবে সেই বস্তুটিকে তুমি জীবিত রেখেছ এতদিন? কোথা থেকে তার খাদ্যসংগ্রহ করেছ? কোন পথে তোমার সেই প্রেমকে এত বছর ধরে তুমি লালন—পালন করেছ?
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে পিয়ারি। তারপর বলে, এ প্রশ্নের উত্তর তোমার শুনে কোনও লাভ নেই। তুমি পুরুষমানুষ। এক নষ্ট মেয়েমানুষ তার প্রেমকে সকল নষ্টামির মধ্যেও কীভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারে সেই অসাধ্যসাধন তুমি কোনওদিন বুঝতে পারবে না।
পিয়ারি তাকায়। সে দেখে, শরৎ কাঁদছে। কী গভীর বেদনার স্পর্শময় কান্না। সে সরে আসে শরতের বুকের কাছে।
শরৎ পিয়ারিকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়।
—রাজ! শুধু এই চাপা সজল ডাকটুকু। আর কিছু বলতে পারে না শরৎ!
—এবার চলো। বলে পিয়ারি।
—কোথায় রাজ?
—আমার সঙ্গে। পাটনায়। একাই থাকি। তুমিও থাকবে আমার সঙ্গে।
ট্রেনঘুম আর বাড়িতে নিজের বিছানায় ঘুম— এক কখনও হয় না। ভবঘুরে, চালচুলোহীন শরৎচন্দ্র জানে, তার এই উপলব্ধি নিরেট সত্য। কোথাও ফাঁক নেই। ফাঁকি নেই।
রেলগাড়ির শব্দ ও দোলার মধ্যে একটা নেশা আছে। সেই দোলা, শব্দ, ইঞ্জিনের বাঁশি, মাঝে মাঝে ধোঁয়ার গন্ধ, সবকিছু মিলেমিশে তৈরি করে একটা গাঢ় আচ্ছন্নতা। ঠিক ঘুম নয় কিন্তু।
তবে আজ রাত্তিরের এই আচ্ছন্নতা, কেমন যেন একটা আবেশ, ব্যাখ্যার অতীত এক ভাললাগা— এই প্রথম ট্রেনযাত্রায় এই স্বাদ পেল শরৎ!
এরকম অনুভব তো আগে কখনও জড়ায়নি তাকে, অন্য কোনও রেলযাত্রায়!
কেন এমন হচ্ছে এই প্রথম?
রেলগাড়ির শব্দ শরতের এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। গহন আবেশের মধ্যে শরৎ চোখ বুজে শুনছে, ট্রেনের চাকা অন্ধকার রাতের বাতাসে বারবার ছড়িয়ে দিচ্ছে একটি নাম— পিয়ারি। পিয়ারি।
শরৎ আচ্ছন্নতার মধ্যেই শব্দটাকে অন্যভাবে ভাবার, অন্য কথা বলাবার চেষ্টা করে।
কিন্তু ভারি নছোড় তো ওই পিয়ারি নাম! কিছুতেই রেলগাড়ির চলার শব্দ থেকে নামটাকে ছাড়াতে পারে না শরৎ!
ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় শরতের অনুভব যেন আরও ঘন হয়ে ওঠে। রেলের চাকার সঙ্গে সেও বলতে থাকে পিয়ারি। পিয়ারি। পিয়ারি।
বেপরোয়া গতিতে, অন্ধকারের বুক চিরে এই মেয়েটা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! কেনই বা যাচ্ছে সে? কিন্তু কী করে সে থামাবে এই অমোঘ টান? এই অবাধ্য যাত্রা? একটা নষ্ট মেয়েমানুষের সঙ্গে কোথায় শেষ হবে তার এই পথ? এই পরোয়াহীন অসামাজিক জীবনের পরিণতিই বা কী হতে পারে?
শরতের আচ্ছন্নতা যেন এক ধাক্কায় চুরমার হয়ে যায়! সে পাশ ফেরে। তার চোখ পড়ে সামনের বাঙ্কে।
রাজলক্ষ্মী ঘুমচ্ছে। এমন ঘুম কি সে রোজ ঘুময়?
শরৎ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে গভীর নিদ্রাচ্ছন্ন সেই রূপের দিকে।
আজ বিকেল পর্যন্ত এই লবঙ্গলতার উপর বেদনার কী ঝড়ঝাপটাই না গিয়েছে! যতক্ষণ না শরৎ রাজি হয়েছে তার সঙ্গে পাটনা যেতে, ততক্ষণ রাজলক্ষ্মীর শুধু একটিই কান্নাভেজা চাহিদা, চলো না গো, একটিবার চলো না আমার সঙ্গে পাটনায়। তোমাকে সেবা করার সুযোগ দাও আমাকে। তোমাকে সেবা না করতে পারলে কোন পথে হবে বলো আমার পাপমুক্তি?
—আমার মতো নষ্ট পুরুষকে সেবা করলে তোমার ইহকাল—পরকাল দুই যাবে রাজলক্ষ্মী।
—ইহকালে আমার আর কী বাকি আছে বলো শরৎদা? আমার এই রূপ—যৌবন তো কোনও মঙ্গলের কাজে লাগল না। শুধু পাপ আর পাপীকেই টানল।
পরকালের তোয়াক্কা করি না আমি। তোমাকে কাছে পেলে তোমার সেবাতেই বাকি জীবনটুকু কাটাব। তার মধ্যেই আমার তৃপ্তি। আমার মুক্তি।
—কিন্তু পিয়ারি, আমি যে বর্মা চলে যাব ঠিক করেছি। আমার এই বিশৃঙ্খল, শতছিন্ন, ভ্রষ্ট জীবনের গ্রন্থি সব আলগা হয়ে গিয়েছে পিয়ারি। ওগুলোকে তুমি আর যত্নআত্তি করে গুছিয়ে তোলার চেষ্টা কোরো না। নিজেই আরও বেদনা পাবে।
—বর্মা চলে যাবে? একা! অত দূরের দেশে আমি তোমাকে কিছুতেই একা যেতে দেব না। যদি যাবেই, আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলো।
—তা হয় না পিয়ারি। তোমাকে কোন পরিচয়ে সঙ্গে নিয়ে যাব বলো? তবে কথা দিচ্ছি, যখনই ডাকবে, ফিরে আসব।
—এই পাপিষ্ঠার হয়ে তুমি চিরকাল থাকবে? কেন শরৎদা? তার চেয়ে বরং আমিই তোমার যোগ্য পাত্রী জোগাড় করে দেব। আমাকে শুধু একটু সময় দাও। তার হাতে তোমাকে তুলে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হই। নাহলে আমার যে মরেও শান্তি নেই শরৎদা।
—রাজলক্ষ্মী, আমার যোগ্য পাত্রী তুমি কোথাও খুঁজে পাবে না, বলে শরৎ।
রাজলক্ষ্মী তার পদ্মপাতার মতো চোখ দু'টি মেলে তাকায়। সেই চোখে একইসঙ্গে বেদনা ও ভাললাগা!
—বেশ, বর্মা যাওয়ার আগে পাটনাতেই তোমার কাছে কিছুদিন থিতু হই তাহলে!
সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে শরৎ।
পাটনার দিকে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে ট্রেন। ভোরবেলা পাটনা পৌঁছনোর কথা।
জানলা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। সেই সঙ্গে জানলার বাইরে একটা মস্ত বড় চাঁদও ছুটছে ট্রেনটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।
কামরার মধ্যে আর কোনও আলো নেই। চাঁদের আবছা ঠান্ডা তিরতিরে আলো ছাড়া।
চাঁদের আভা পড়েছে রাজলক্ষ্মীর নিদ্রাগহন ছিপছিপে শরীরের উপর। সেই মায়ার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে শরৎ।
মায়ার গায়ে হাত রাখতে ইচ্ছে করে তার। ইচ্ছে করে ওই নিদ্রাচ্ছন্ন স্বপ্নের গায়ে চাঁদের আলোর সঙ্গে মিশে লুটিয়ে থাকতে।
রেলের ঝাঁকুনিতে আলগা হয়ে গিয়েছে রাজলক্ষ্মীর আঁচল। ছায়া ছায়া কী নরম, নিটোল রেখার গোপন, গহন ওঠা—নামা! কী অফুরন্ত রহস্য!
আদ্দেক খোলা। আদ্দেক ঢাকা। প্রকাশ—অপ্রকাশের কী অপূর্ব খেলা চলছে।
শরৎ ধীরে ধীরে কাছে যায় রাজলক্ষ্মীর। সে আলতো স্পর্শের আদর রাখে প্রকাশ—অপ্রকাশের মায়াবাস্তবের উপর।
স্পর্শের এই আনন্দ আগে কখনও কোথাও তো পাইনি! মনে হয় শরতের।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। শরতের মধ্যে জেগে ওঠে অন্য এক মানুষ।
কয়েকটি কথা সেই মানুষটি লিখে ফেলতে চায় তখুনি। তখুনি না লিখলে যে মরে যাব আমি, মনে হয় সেই মানুষটির।
কিন্তু এই অন্ধকারে, কাগজ—কলম ছাড়া লিখবই বা কেমন করে?
এমন তীব্র ইচ্ছা জাগলে কাগজ—কলম ছাড়াই অন্ধকারেও লেখা যায় বইকি।
শরতের মধ্যে হঠাৎ জাগ্রত সেই মানুষটি যেন মনের গায়েই লিখে ফেলে:
মাথা নাড়িয়ে বললাম, তুমি মিথ্যে চেষ্টা কোরো না রাজলক্ষ্মী,আমার উপযুক্ত মেয়ে তুমি কোনওদিন খুঁজে বার করতে পারবে না।
রাজলক্ষ্মী অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থেকে হঠাৎ বলে উঠল, আচ্ছা, সে না হয় নাই পারব। কিন্তু তুমি বর্মায় যাবে, আমাকে সঙ্গে নেবে?
তার প্রস্তাব শুনে হাসলাম, বললাম, আমার সঙ্গে যেতে তোমার সাহস হবে?
পিয়ারি আমার মুখের প্রতি তীক্ষ্ন দৃষ্টিপাত করে বলল, সাহস! এ কি একটা শক্ত কথা বলে তুমি মনে কর?
এ কথার জবাব দিতে পারলাম না। খোলা জানলার বাইরে অন্ধকারে চেয়ে চুপ করে বসে থাকলাম।
এ পর্যন্ত মনে মনে অনর্গল লিখে ফেলে থামে শরৎ। এই লেখা, এ তো আত্মজীবনী!
এমন আত্মকথন বাঙালি পড়বে? গ্রহণ করতে পারবে? একটি বাঙালি মেয়ে এক পুরুষ—বন্ধুর সঙ্গে পাড়ি দেবে বর্মা মুলুকে!
কোনও বাঙালি মেয়ের পক্ষে এমন কথা ভাবা সম্ভব?
কিন্তু পিয়ারি তো নষ্ট মেয়ে। তার মুখে কিছুই আটকায় না। তবে এই বাইজি, এই বেশ্যা, এই কুলটাকে না জানলে কি লিখতে পারতুম এমন আত্মজীবনী? ভাবে শরৎ।
তারপর মনে মনে বলে, বাঙালি এ জীবন চায়। পায় না। তার সাহসে কুলায় না।
রবীন্দ্রনাথ এ জীবন জানেন না। কোনও দিন তা—ই লিখতে পারবেন না এই পাপের লেখা।
এত সরল সাহসে পাপের কথা বলা সহজ নয়। বাঙালি এই লেখা গোগ্রাসে পড়বে। নিন্দে করবে, তবু পড়বে।
শরতের মুখে হাসি ফোটে। অন্ধকার কামরায় সে আরও একবার স্পর্শ করে রাজলক্ষ্মীর তনুলতা।
আমি নিশ্চিত, পাপের জয় হবে, আমি রবি ঠাকুরকে জনপ্রিয়তায় হারিয়ে দেব— বলে সে গভীর প্রত্যয় থেকে, নীরব উচ্চচারণে।
রেলগাড়ি প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে মোড় নিল। প্রকট শব্দে লাইন চেঞ্জ করল গাড়ি। শরৎ দেখল, শব্দের ঝটকায় পিয়ারির ঘুম ভেঙেছে। সে তাকিয়ে আছে শরতের পানে।
শরৎ অবাক হল। ট্রেন পথ বদলানোর ফলে চাঁদটা যেন জানলা থেকে কিছুটা সরে গিয়েছে। কামরার মধ্যে ছায়া ছায়া ভাবটা আরও ঘন হয়েছে।
সেই ছায়ার মধ্যে পিয়ারিকে একটা সুন্দর সাপের মতো মন হল শরতের।
সাপটার কোনও বিষদাঁত নেই। বিষের জায়গায় আছে মধু।
সাপটাকে গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে হল শরতের।
চিরকাল তোমার ওই এক রোগ? বলল পিয়ারি। তার বুকের কাপড় বিস্রস্ত।
এই অপরূপ চ্যুতির প্রতি কী ঘরোয়া উদাসীনতা পিয়ারির, লক্ষ করে শরৎ।
মেয়েদের এই একটা ব্যাপার! ভালবাসার মানুষটির সামনে তারা সব ভূষণই কী সহজে খুলে রাখে। লজ্জাও!
পিয়ারির উথলে ওঠা শরীর, ছায়াঘন ছুটন্ত ট্রেনের মধ্যে থইথই গতিতে ছুটে চলেছে মনে হয় শরতের।
কিন্তু সেই ভাবটিকে মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে শরৎ প্রশ্ন করে, আমার কোন রোগের কথা বলছ রাজ?
—ওই যে মাঝেমধ্যে আমার দিকে ওইভাবে তাকিয়ে থাকো!
শরৎ লজ্জায় পড়ে যায়। পিয়ারি ধরে ফেলেছে! চেষ্টা করেও শরৎ লুকোতে পারেনি তাকে।
—কী দ্যাখো বলো তো? যেন আজ নতুন দেখছ! কখনওসখনও এমন মনে হয় আমার।
—রোজ তো দেখি না। তাই পুরনো হয় না বোধ হয়।
—রোজ দেখতে কে তোমাকে মাথার দিব্যি দিয়ে বারণ করেছে শুনি?
—প্রত্যহের নজর অনেক কিছু নষ্ট করে রাজ। তাই তো ভবঘুরের মতো পালিয়ে বেড়াই। সবসময় মনে হয় অন্য কোথাও। অন্য কোনওখানে।
—ঘরে বউ থাকলে পারতে?
—নেই যখন সে কথা ভেবে লাভও নেই।
—এবার নোঙর ফেলো শরৎদা। মেয়েমানুষের যত্নে—ভালবাসায় পুরুষের জীবন সার্থক হয়। তুমি কী হারাচ্ছ, তা তুমি নিজেও জানো না।
—যা পাইনি তা হারালে কী হারাতাম, সে কথা ভাবতে চাইনে। যা পেয়েছি তা হারাতে চাইনে।
—তাহলে তার সঙ্গেই থাকছ না কেন?
—হারানোর ভয়ে। বিচ্ছেদেই প্রেম থাকে রাজ। ভালবাসার মানুষটির সঙ্গে দূরত্বেই ভালবাসা বেঁচে থাকে। প্রেমের অন্য নাম তৃষ্ণা ও অতৃপ্তি।
—শরৎদা, চলে তো গিয়েছিলে সন্ন্যাসী হয়ে। তা, পারলে থাকতে?
—পারিনি রাজ, সন্ন্যাসী হয়ে হাঙ্গামাই বাধিয়েছিলুম।
—যাক, মনে আছে তাহলে।
—মনে থাকবে না কেন? অ্যাতো যে বড় বড় কথা বললুম অ্যাতোক্ষণ, থাকত কোথায় এসব আমি মরে গেলে?
—দেখি তুমি পড়ে আছ মাটির উপর ছেঁড়া কাঁথায়। অঘোর অচৈতন্য!
—রাজ, ভড়ংটা কিন্তু কম ছিল না। মাথায় ধুলো—কাদার জট। সর্বাঙ্গে রুদ্রাক্ষ বাঁধা। হাতে আবার দু'গাছা পিতলের বালা। খুব হেসেছিলে তো? হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করে শরৎ।
—মা গো মা, হাসতে যাব কেন? কেঁদে বাঁচিনে। কী জ্বর তোমার! সেটা তো ভড়ং নয় গো। বুকের কাপড়টা কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে উঠে বসে পিয়ারি।
—তোমার সেবা—যত্নেই সেরে উঠলুম।
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে দু'জনে। নিশুতি রাতে কোনও একটা স্টেশনে ট্রেনটা থেমেছে। শরৎ হঠাৎ উঠে পড়ে।
—যাচ্ছ কোথায় এই রাত্তিরবেলা?
—স্টেশনটা একটু দেখে আসি।
—চুপ করে বোসো তো। তোমাকে বিধাতা বোধহয় ছটফটানি দিয়েই বানিয়েছেন গো!
শরৎ হালকাভাবে বলে, রাতের স্টেশন, পথের ধারে পড়ে থাকা ছোট্ট স্টেশন, অনেক রাত্তিরে, নির্জন, একা, বেশ লাগে আমার। তাই একটু...। বলতে বলতে ট্রেন ছেড়ে দিল।
—দেখলে তো, কী হত নেমে? নামতে আর উঠতে।
শরৎ বসে পড়ে পিয়ারির পাশে। পিয়ারি আলতো করে মাথাটি রাখে শরতের কাঁধে। জড়িয়ে ধরে। তার অন্তরের উজানটি শরতের সমস্ত শরীরে উষ্ণ স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
—মাইরি, মাইরি বলছি শরৎদা, কী শুভক্ষণেই দু'জনের চার—চক্ষুর দেখা হয়েছিল। যে দুঃখটা তুমি আমাকে দিলে, অ্যাতো দুঃখ কেউ কাউকে কখনও দেয়নি। দেবেও না।
শরৎ কিছু বলে না। আত্মপক্ষ সমর্থন করে সে হয়তো দু—চার কথা বলতে পারত। কিন্তু কী লাভ? বড্ড অপলকা শোনাবে সেসব কথা।
রাজ যে কষ্টের কথা বলছে, সেই কষ্ট তো সে জীবন দিয়ে বুঝেছে। এ তো সাজানো, মেকি কথা নয়।
—শরৎদা, ডাকে পিয়ারি।
শরৎ তাকায়। রাজলক্ষ্মীর চোখের উপর থেকে চুলগুলিকে সরিয়ে দেয়। তারপর তার কোমর জড়িয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নেয়। কিন্তু কিছু বলে না।
—শরৎদা, তুমি যে আমার কাছে থাকতে চাও না, সে কি আমি 'বাইজি' বলে? অন্য পুরুষ আমাকে ভোগ করে, তাই?
—রাজ, তুমি তো আমার কাছে 'শরীর' নও। তোমার মন আর শরীর আমি কিছুতে আলাদা করতে পারি না। তোমার রূপ, তোমার মন প্রেমেরই প্রকাশ। অন্তত আমার কাছে।
—তাহলে আমার বাড়িতে, আমার সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে তোমার বাধা কোথায়?
—বাধা আমার স্বভাব। এক জায়গায় মন টেকে না।
—এক জায়গায়? না, এক মেয়েমানুষে মন বসে না?
—এ কথা ঠিক রাজ, নারীর বিচিত্র রূপ আমি দেখেছি। ভালবাসাও পেয়েছি। কিন্তু পথের ধন পথেই ফেলে এসেছি। লিপ্ত হওয়া আমার স্বভাবে নেই।
—কিন্তু আমি যে চাই আমার ভালবাসার মানুষটির সঙ্গে একছাদের নিচে থাকতে। দু'বেলা কাটিয়ে যেতে। পারবে না এইটুকু দিতে?
শরৎ কোনও উত্তর দেয় না।
রাজলক্ষ্মী শরতের গায়ে গা এলিয়ে দিয়ে বলে, তোমার মনে একটা খটকা আছে, আমি জানি শরৎদা। অন্য পুরুষমানুষের সঙ্গে এখানে তোমার কোনও তফাত নেই। বেশ্যার সঙ্গে সংসার করার মতো আহাম্মক পুরুষ তুমি নও শরৎদা। তা তুমি যতই উদাসীন হও না কেন।
—রাজ, পেটের দায়ে তুমি যা করেছ, তাতে তো কোনও অন্যায়, কোনও পাপ নেই। তুমি গাইতে পারো, নাচতে পারো, সুন্দর কথা বলতে পারো। তার সঙ্গে তোমার রূপ। সেটা বিধাতার দান। তা তুমি নষ্ট করোনি। তুমি কত মানুষকে আনন্দ দিয়েছ। তারা তোমাকে অর্থ দিয়েছে। এর মধ্যে পাপ কোথায়?
—আছে, আছে। পাপ আছে গো! কত সংসার ভেঙেছি আমি। কত ঘরের বউকে কষ্ট দিয়েছি। কত পুরুষকে জ্বালিয়ে—পুড়িয়ে শেষ করেছি। শুধু ভালবেসেছি তোমাকে শরৎদা। অন্য কোনও পুরুষ আমার ভালবাসা পায়নি। জাত ছেনালের মতো ভালবাসার অভিনয় করে চলেছি। এটা 'পাপ' নয়?
—সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাও?
—হ্যাঁ। চাই। চাই। চাই।
—কী করে?
—সারা দিন—রাত শুধু তোমার সেবা করে। তোমাকে ভালবেসে।
—তোমার 'বাবু'—রা তোমাকে ছাড়বে কেন পিয়ারিবাই?
—তাদের কাছ থেকে নিজেকে আমি অনেক গুটিয়ে নিয়েছি। বাকিটুকু ছাড়তে আমাকে বিশেষ বেগ পেতে হবে না।
—চলবে কী করে তোমার?
—শরৎদা, কোনওকালেই আমার চাহিদা বেশি নয়। যেটুকু অর্থ জমেছে, তাতে তোমার—আমার বেশ চলে যাবে।
—তোমার এমন কষ্টের টাকায় আমার বাকি জীবন চলবে, এ কেমন কথা রাজ?
—বেশ তো, লেখক হিসেবে এখন তোমার নামডাক হচ্ছে। রবিবাবুর চেয়েও না কি তোমার গপ্প বেশি বিক্রি! তোমার খরচ নাহয় তুমিই দেবে। তাতে অন্তত তোমার মানে লাগবে না।
—রাজ, তুমি যেভাবে দেখছ, ব্যাপারটা কিন্তু তত সহজ নয়।
—সহজ, সহজ, খুব সহজ। আমরা দু'জন দু'জনকে ভালবাসি। তাই একসঙ্গে থাকব। ব্যস! ল্যাঠা চুকে গেল!
—তাহলে তাই রাজ। ভোর হতে চলল। আর ঘণ্টা দু'য়েকের মধ্যেই তোমার পাটনার বাড়িতে পৌঁছে যাব। রেখে দিও আমাকে সেখানেই বাকি জীবনের জন্য। শুধুই তোমার করে।
শরৎচন্দ্র পাটনায়। পিয়ারির বাড়িতে। ক'দিন কেটে গিয়েছে। শরতের মন্দ লাগছে না। পিয়ারি বাইজি, স্বৈরিণী, উপস্ত্রী, যাই হোক না কেন, এই প্রথম শরৎ জড়িয়ে যাচ্ছে সংসারের মায়াজালে। পিয়ারি যখন ঘরে আসে চা—শরবত নিয়ে, নিজেই নিয়ে আসে সে, কে বলবে সে এক জনপদবধূ!
—পিয়ারি, এভাবে বেঁধে ফেলো না আমাকে। তুমি নিজের কষ্টকে নিজেই ডেকে আনছ।
—পালাবে ভাবছ? তা কেন করবে গো? আমি তো তোমাকে বলছি না, বিয়ে করে আমাকে তুমি 'স্ত্রী'—র মর্যাদা দাও। আমাকে 'রক্ষিতা' করেই রেখে দাও না কেন! তোমাকে শুধু সেবা করার সুযোগটুকু দাও।
—তোমাকে 'রক্ষিতা' করে রেখে দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই পিয়ারিবাই।
—তাহলে ভালবেসে রেখে দাও।
—প্রত্যহের নৈকট্যে প্রেম নষ্ট হয় রাজ। একথা তোমাকে আগেও বলেছি। তাছাড়া, আমি ঠিক সংসার করার মানুষ নই। এত যত্ন আমার ধাতে সইবে না।
—আমার কিন্তু বেশ লাগছে। এই যে একটি মানুষকে নিয়ে আমার এই নতুন জীবন, ভারি শান্তি পাচ্ছি, সার্থক হলুম মনে হচ্ছে।
—আমার কিন্তু অত ভাল লাগছে না রাজ।
—কেন? শরতের পাশেই খাটের উপর হেলান দিয়ে বসে পিয়ারি।
—কারণ, ক্রমশ মনের মধ্যে একটা অপরাধবোধ, একটা খটকা জাগছে।
—কীসের অপরাধবোধ? শরতের হাতের উপর হাত রাখে পিয়ারি।
—তোমার কাছ থেকে নিচ্ছি অনেক। দিচ্ছি না কিছুই।
—দিচ্ছ কি দিচ্ছ না, সে তো আমি বুঝব।
—আমার বর্মা যাওয়াটা ক'দিনের জন্য পিছিয়ে গিয়েছে মাত্র। কিন্তু যেতে তো আমাকে হবেই রাজ। তাই বলি, মায়া বাড়িও না। আমাকে আটকে রাখার চেষ্টা কোরো না।
—তোমাকে আটকে রাখার সাধ্য আমার নেই শরৎদা। কীসের জোরে রেখে দেব তোমাকে নিজের কাছে? বাইজির ভালবাসার জোরে? কোন পুরুষমানুষ নষ্ট মেয়েমানুষের ভালবাসায় বিশ্বাস করে বলো!
—আমিও 'নষ্ট পুরুষ' রাজ।
—সোনার আংটির আবার বাঁকা—সোজা! পুরুষমানুষের চরিত্রে কোনও দোষ লাগে না শরৎদা। আর, মেয়েমানুষ নষ্ট হলে তার আর সংসারে ফেরার পথ আমাদের সমাজ রাখেনি গো। তুমিও কি পারবে আমাকে বিশ্বাস করে ঘর বাঁধতে?
—রাজ, আমাকে ভুল বুঝো না। যদি কারও সঙ্গে ঘর করি আমি কখনও, তাহলে তোমার কাছেই আসব, তোমার সংসারের কোণেই আশ্রয় চাইব। কিন্তু এক জায়গায় আমার মন বসে না যে!
—সব মনটাই কি তোমার লেখাকে দিয়েছ? তাই আর কারও কাছে মন লাগছে না?
—রাজলক্ষ্মী, আমি আদ্দেক মন লেখাকে দিয়েছি, আর আদ্দেক পথকে। পথে পথেই ছড়িয়ে আছে আমার লেখার চরিত্র, গল্প, আনন্দ, বেদনা, সন্ধান ও প্রাপ্তি।
—সেজন্যেই তো ভয় হয় আমার।
—কীসের ভয়?
—যদি ওই পথেই কোথাও পেয়ে যাও এমন কাউকে যাকে ভালবাসলে, যার সঙ্গে সত্যিই নোঙর ফেললে শেষ পর্যন্ত।
—বা রে, তুমিই তো বলেছ, আমার জন্য যোগ্য পাত্রী জোগাড় করে দিয়ে তুমি নিশ্চিন্ত হতে চাও, তাহলে...?
—শরৎদা, কেমন লেখক তুমি? মেয়েদের মন বোঝো না?
পাটনায় রাজলক্ষ্মীর বাড়িটি মাড়োয়ারি পাড়ায়। পাড়ার সকলেই ধনী। চারিধারে অল্পশিক্ষিত, শৌখিন মানুষের ভিড়।
শরৎ রাজলক্ষ্মীর বাড়িটি অন্দরমহল দেখে অবাক হয়।
যে ধরনের ঘর—দোর সে এতদিন দেখেছে, তাদের সঙ্গে কোনও সাদৃশ্য নেই।
সেসব বাড়িতে যেখানে চোখ পড়ে, সেখানেই বাহুল্য। কত দেয়ালগিরি, আয়না, ছবি, ঝাড়লণ্ঠন, আলমারি, গ্লাসকেস, মহার্ঘ টেবিল—চেয়ার, কার্পেট। দম বন্ধ হয়ে আসে।
রাজলক্ষ্মীর বাড়িতে বাহুল্য বলতে কিছুই নেই। প্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত কিছুই চোখে পড়ল না শরতের।
এ বাড়ির কোনও কিছুই গৃহস্বামিনীর অভিরুচিকে অতিক্রম করে না অন্য কাউকে তাক লাগানোর জন্য। একটি বস্তুও অযথা জায়গা জুড়ে বসে নেই।
সবথেকে যা অবাক করল শরৎকে, বাইজির বাড়ি অথচ গান—বাজনার কোনও আয়োজন কোথাও নেই!
একটি ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় শরৎ। থমকে যায় তার পা। দোতলার কোণের ঘর। ভিতরে চোখ যেতেই শরৎ বোঝে, এটি বাইজির নিজের শয়নমন্দির।
কিন্তু তার ধারণার সঙ্গে একেবারে মেলে না। সাদা পাথরের মেঝে। দেওয়ালগুলি দুধের মতো সাদা। ঝকঝক করছে।
বড় ঘরের একপাশে একটি ছোট তক্তাপোশ। বিছানাটি পরিপাটি করে পাতা। কাঠের আলনায় খানকয়েক শাড়ি। পেছনে একটা লোহার আলমারি। ব্যস! আর কিচ্ছু নেই।
শরৎ ঢুকতে গিয়েও পারে না। জুতো চৌকাঠের বাইরে খুলে তারপর ঘরে ঢোকে।
ঘরে কেউ নেই। জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। জানলার সামনে একটা মস্ত নিমগাছ। ঝিরঝিরে বাতাসে কাঁপছে। সেদিকে তাকিয়ে শরৎ একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
হঠাৎ গুনগুন গানের শব্দে শরৎ পিছন ফিরে তাকায়। গান গাইতে গাইতে পিয়ারি ঢুকেছে ঘরে।
গানের কথাগুলি অবাক হয়ে শোনে শরৎ:
আমি নিশিদিন তোমায় ভালবাসি,
তুমি অবসর মতো বাসিয়ো।
নিশিদিন হেথায় বসে আছি,
তোমার যখন মনে পড়ে আসিয়ো।
শরৎকে দেখে গান থামায় না পিয়ারি। ভারি মিষ্টি গলায় সে গেয়েই চলে, গাইতে গাইতে শরতের দিকে এগিয়ে আসে :
যদি দূরে পড়ি তাহে ক্ষতি কী—
মোর স্মৃতি মন হতে নাশিয়ো।।
গান শেষ করল পিয়ারি, শরতের চোখে চোখ রেখে, তার বুক ঘেঁষে দাঁড়িয়ে।
গঙ্গায় স্নান সেরে সদ্য ফিরেছে সে। শরৎ দেখে, পিয়ারি নিজের ঘরে ভিজে কাপড় ছাড়তে এসেছে।
শরৎকে দেখে সে এতটুকু লজ্জা পায় না। সে যেন এই ভালবাসার পুরুষটির অনেক দিনের ঘরনি।
শরৎ পিয়ারির কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে, এ গান তো তোমার গলায় আগে কখনও শুনিনি পিয়ারি। কে বেঁধেছে এমন গান?
—এ গান রবিবাবুর। কথা, সুর, সব তাঁর। আহা, এমন কবির সঙ্গে একবার যদি দ্যাখা হত!
শরতের বুকের ভিতরটা হঠাৎ বেদনায় টনটন করে ওঠে। হয়তো বছর পনেরোর বড় হবে আমার থেকে, না জানি কত কম বয়সেই এমন গান লিখে ফেলেছে লোকটা!
যে এমন গান লিখতে পারে, তাতে এমন সুর বসাতে পারে, তাকে জনপ্রিয়তায় হারাব কী করে!
রবিবাবুর গানকে টেক্কা দেওয়ার কোনও উপায় নেই।
—তুমি দেখেছ রবি ঠাকুরকে?
জিজ্ঞেস করে পিয়ারি।
—দেখেছি, সংক্ষেপে বলে শরৎ।
—শুনেছি খুব রূপবান তিনি, দেখলে আর চোখ ফেরানো যায় না।
—বড্ড ভদ্দরলোকের মতো দেখতে।
পিয়ারি অবাক হয়ে তাকায় শরতের দিকে। তারপর বলে, ধুর! কথার কী ছিরি!
তারপর প্রায় দৌড়ে চলে যায় আলনাটার কাছে। সেখান থেকে গরদের একটি শাড়ি হাতে নিয়ে বলে, তুমি একটু বোসো, আমি ওঘর থেকে কাপড় ছেড়ে আসছি।
পিয়ারি কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এল। ভারি খুশি দেখাচ্ছে তাকে। গরদের শাড়িটি তার রূপে যেন জোয়ার এনেছে।
সে ঘরে ঢুকেই শরৎকে বলল, আমার ঘরে কী চুরি করতে এসেছিলে বলো তো? আমাকে নয় তো?
—আমি কি এতই অকৃতজ্ঞ রাজ? তুমি আমার এত করলে, আর আমি তোমাকেই চুরি করতে আসব! আমি অত লোভী নই। বলল শরৎ।
মুহূর্তে পিয়ারির মুখ ফ্যাকাসে ও বিষণ্ণ হয়ে গেল। শরৎ বুঝতে পারল সে পিয়ারিকে ব্যথা দিয়ে ফেলেছে। তার কষ্ট হল। সে বলল, নিজের জিনিস কেউ কি চুরি করতে আসে?
কিন্তু পিয়ারির সেই প্রফুল্লতা আর ফিরে এলো না। সে কিছুক্ষণ পরে ঘরের বাইরে চলে গেল।
শরৎও ফিরে এল নিজের ঘরে। সারাদিন পিয়ারি সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত রইল। শরতের সঙ্গে দেখা করার সময় পেল না।
সমস্ত রাত শরতের চোখে ঘুম নেই। সে জেগেই আছে। মাঝে মধ্যে একটু তন্দ্রার ভাব আসছে।
হঠাৎ সে দেখল অনেক রাতে পিয়ারি নিঃশব্দে তার ঘরে এল। টেবিলের উপর থেকে আলোটা সরিয়ে রাখল।
ঘর আরও অন্ধকার। সামনের জানলাটা খোলা। ঠান্ডা বাতাস আসছে।
পাছে শরতের ঠান্ডা লাগে, সে জানলাটা বন্ধ করল। তারপর বিছানার পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
শরৎ নিদ্রার ভান করে পড়ে আছে। পিয়ারি ধীরে ধীরে মশারি তুলে শরতের কপালে হাত রাখল।
সেই স্পর্শে কী গভীর মায়া, কী অসহায় বেদনা, মনে হল শরতের।
তার ইচ্ছে হল, হাতটি ধরে বলে, আমি তোমায় ছেড়ে কোথাও যাব না রাজলক্ষ্মী। কিন্তু সে ঘুমের ভান করে পড়েই থাকল।
মশারিটি গুঁজে উঠে দাঁড়াল পিয়ারি। তারপর নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
শরৎ মনে মনে বলল, কালই ভোরবেলা চলে যেতে হবে। এ বাড়িতে আর একদণ্ডও নয়। নিজের উপর আর আমার এতটুকু বিশ্বাস নেই।
আমি ভেঙে পড়ছি। তাসের বাড়ির মতো ভেঙে পড়ছি। রাজলক্ষ্মীর জন্যই রাজলক্ষ্মীকে ছেড়ে যেতে হবে।
শরৎ তড়িঘড়ি পিয়ারির কাছ থেকে চলে এল বটে। বর্মা যাওয়ার অজুহাতে তার এই তাড়াহুড়ো। কিন্তু সে বর্মা গেল না। অথচ কেন কীসের জন্য সে পিছিয়ে দিল তার এই স্বনির্বাসন, নিজেও জানে না।
শুধু অন্তরের গভীরে অনুভব করে, এক অস্পষ্ট বন্ধন তাকে ধরে রেখেছে। যেতে দিচ্ছে না।
এই বন্ধনের মধ্যে নিহিত একটি ব্যথা আছে। শরতের মনে হয়, এই অস্পষ্ট বেদনাটুকু তার প্রয়োজন।
তার ভাল লাগছে এই ব্যথা। তার মনের মধ্যে ইচ্ছে জাগছে— এই দুঃখবোধের নির্যাসটি নিংড়ে নিয়ে সেটিকে করে তোলে তার লেখার বিষয়।
কিন্তু কোথায় পাবে সে এই অস্পষ্ট বেদনাকে ব্যক্ত করার ভাষা? সে কেন রবিবাবুর মতো গান লিখতে পারে না? কেন লিখতে পারে না তাঁর মতো প্রেমের কবিতা?
কত কম বয়সে, তেইশ—চব্বিশ বয়সেই হয়তো, রবিবাবু লিখে ফেললেন হৃদয়—যাতনাকে নিয়ে কী অপূর্ব গান!
শরৎ গুনগুন করে গাইতে থাকে, 'একে একে সব আশা ঝ'রে ঝ'রে প'ড়ে যায়, সহে না যাতনা।'
শরতের গানের গলাটি ভারি মিষ্টি। সে মনে মনে বলে, কী অসামান্য প্রতিভা! এমন গান বাংলা ভাষায় আগে কখনও কেউ তো লেখেনি। ভবিষ্যতেও কেউ পারবে না এমন গান লিখে এমন সুর দিতে!
বাংলা সাহিত্যে আমরা যা কিছু লিখে যাচ্ছি, লোকে তা ক্রমে ভুলতে থাকবে। কিন্তু বাঙালি এই গান কোনও দিন ভুলবে না। গানের জন্যই রবিবাবু চিরদিন থেকে যাবেন।
শরৎ লেখার টেবিলে বসে। পিয়ারিকে একটা চিঠি লিখলে বোধহয় মনের ভার নামবে।
লিখতে গিয়ে তার কলম সরে না। বেশ ক'মাস হয়ে গিয়েছে সে চলে এসেছে।
পৌঁছ—সংবাদ দিয়ে সে দু'লাইন লিখেছিল বটে। কিন্তু তারপর আর কোনও যোগাযোগ করেনি। পিয়ারির কাছ থেকেও একটি লাইন আসেনি।
অনেক কথা বলার আছে। কিন্তু সেসব কথা কি চিঠিতে লেখা যায়?
তাছাড়া, বর্মা চলে যাওয়ার আগে আর একবার পিয়ারির সঙ্গে দেখা হওয়াটা খুব জরুরি।
কিন্তু বর্মা যাওয়ার আগে পৃথিবীতে শুধু এই মানুষটির সঙ্গেই দেখা করার কেন প্রয়োজন?
শরৎ কলম রেখে লেখার টেবিলের সামনেই প্রসারিত আকাশের দিকে তাকায়।
কী উদাসীন নির্লিপ্ত অথচ জানলায়—আটকে—যাওয়া ওই দুপুরের আকাশ! কিছুতেই পালাতে পারছে না!
রাজলক্ষ্মী আমার ওই ছোট্ট একটুকরো ঘরোয়া জানলা। তাকে ছেড়ে যাওয়া সহজ নয়। সে আমাকে কিছুতেই ভেসে যেতে দেবে না!
এই মেয়েই তাহলে আমার একমাত্র পিছুটান?
শরৎ উঠে পড়ে লেখার টেবিল থেকে। আজই তাকে পাটনা রওনা হতে হবে।
শরৎ এইমাত্র পৌঁছেছে পাটনায় পিয়ারির বাড়ির সদর দরজায়। একটি পরিবর্তন চোখে পড়েছে তার।
দরজায় দু'জন উর্দিপরা দারোয়ান। এরা তো আগে ছিল না। শরতের মনে হল, তার শ্রীহীন অপরিচিত চেহারাটি দারোয়ান দু'টির তেমন ভাল লাগেনি।
তাদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সোজা উপরে চলে যেতে সংকোচ বোধ হল শরতের।
কোথায় গেল সেই বুড়ো দারোয়ান? ক'মাসের মধ্যে দারোয়ান বদলানোর কী প্রয়োজন হল?
ঠিক এই সময়েই শরৎ দেখল সিঁড়ি দিয়ে ছুটে নামছে পুরাতন ভৃত্য রতন। রতন শরৎকে দেখে অবাক।
—আপনি? কখন এলেন!
—এই তো, হঠাৎ—ই।
—তা দাঁড়িয়ে কেন? উপরে যান।
—তোমার মা ঠাকরুণ...
—তিনি উপরে। সামনেই আছেন।
শরৎ ভরসা পায়। তার সংকোচ দূর হয়। সে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসে।
সামনেই বারান্দা! বারান্দায় পৌঁছনোমাত্র সে আমোদ—আহ্লাদের শব্দ পায়!
একাধিক পুরুষের কণ্ঠস্বর! শরতের সংকোচ আবার ফিরে আসে।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। বারান্দার পাশে এই ঘরটি তো সে কখনও খোলা দেখেনি!
আজ উন্মুক্ত দরজা! আমোদ—আহ্লাদের শব্দ, হাসিঠাট্টা সব ওই ঘর থেকেই আসছে।
শরতের মনে পড়ে, একদিন পিয়ারিকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, এই ঘরটা সব সময়ে বন্ধ কেন?
পিয়ারি হেসে বলেছিল, ওটা বাড়তি ঘর। ওর মধ্যে সব অপ্রয়োজনীয় জিনিসের ভিড়।
শরৎ ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। এবং ভারি বিস্মিত হয়। ঘরটি মজলিশের জন্য বিশেষভাবে সাজানো।
সমস্ত ঘরজুড়ে কার্পেট। তার উপর একটি বিস্তারিত আরামের বিছানা। শুভ্র জাজিম ধপধপ করছে।
সেই বিছানার ওপর জনকয়েক ভদ্রলোক তাকিয়া বাগিয়ে বসে শরতের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে।
তারা বাঙালির মতো ধুতি—পিরান পরেছে বটে, কিন্তু তাদের মাথায় মসলিনের টুপি দেখে শরৎ আন্দাজ করতে পারে, এরা বিহারি।
শরতের দৃষ্টি যায় এক মুসলমান তবলচির দিকে। সে তবলা দু'টিতে হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে গান—বাজনার জন্যে তৈরি করছে।
তবলচির কাছেই বসে আছে পিয়ারিবাই নিজে। তার গায়ে মুজরার পোশাক। সারা অঙ্গে ঝলমলে অলংকার।
শরৎকে দেখামাত্র পিয়ারির মুখ সম্পূর্ণ রক্তশূন্য। ফ্যাকাশে। প্রাণের কোনও চিহ্ন নেই সেই মুখে।
—শরৎবাবু! হঠাৎ না বলে! কবে এসেছেন পাটনায়? কথাগুলি অপ্রস্তুতভাবে বলল পিয়ারি।
—এখুনি এলাম। সোজা স্টেশন থেকে।
—উঠেছেন কোথায়? প্রশ্নটা ফস করে বেরিয়ে গেল পিয়ারির মুখ থেকে। শরৎ সরাসরি স্টেশন থেকে আসছে জানার পরেও!
পিয়ারি পরক্ষণেই কথা পাল্টে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল, আসুন, এঁদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
যে ভদ্রলোকটি মধ্যমণি, তিনি বললেন, আইয়ে বাবুজি, বৈঠিয়ে।
মুখের হাসিটি বলে দিচ্ছে, শরতের সঙ্গে পিয়ারির সম্পর্ক তিনি বুঝতে পেরেছেন।
শরৎ জুতো খোলার জন্য মুখ নীচু করল। হাতে তার সময় বেশি নেই।
এইটুকু সময়ের মধ্যে তাকে তৈরি হয়ে নিতে হবে মনে মনে।
ভিতরে তার যা—ই থাক, বাইরে যেন প্রকাশ না পায়। চোখের চাউনি, মুখের কথা, আচরণের কোনও ফাঁক—ফোকর দিয়ে অভিমান বা ক্ষোভের একটা বিন্দুও না বেরিয়ে আসে।
সে সত্যিই নিজেকে পুরোপুরি সামলে নিয়েই ভিতরে যায়। বসতে—বসতে পিয়ারিকে বলে, করেছ কী বাইজি, আজ যে একেবারে রূপের সমুদ্র বইয়ে দিয়েছ!
শরতের মুখে বাইজির রূপের প্রশংসায় বিহারিবাবুদের আহ্লাদ ডগমগ করে ওঠে।
যজ্ঞের যজমান যিনি, তিনি বলেন, তাহলে বাইজি, এবার একটা গান ধরো।
ততক্ষণে রতন বরফ নিয়ে ঘরে ঢোকে। পিয়ারির দিকে পানপাত্র এগিয়ে দিয়ে মধ্যমণিটি বলেন, ঢালো বাইজি, ফুর্তি শুরু হোক।
শরৎ দেখে পিয়ারির কান পর্যন্ত রাঙিয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে এই রাঙিয়ে ওঠা লজ্জায় নয়। রাগে।
শরৎ অবস্থা বুঝে বলে, আমার হঠাৎ এসে পড়ার জন্য আপনাদের আমোদ—আহ্লাদে হয়তো বিঘ্ন ঘটল। আমি দুঃখিত। গান—বাজনা যেমন চলছিল, চলুক।
বাবুটি অমনি বললেন, পিয়ারিবিবি, এই বাঙালিবাবুর জন্য একটা এসপেশাল গীত হোক।
পিয়ারি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে উত্তেজিত হয়ে হারমোনিয়ামটাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল, সন্ধের পরে হবে। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাবুরা মদ্যপান শুরু করে সন্ধেবেলার বাইজি আর ফুর্তির জন্য তৈরি হতে লাগলেন।
শরৎ নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই বারান্দায় রতনকে দেখল। রতন বুঝি তারই অপেক্ষায়। বলল, আসুন, ভিতরে আসুন।
রতনের পিছন পিছন শরৎ পিয়ারির শয়নঘরে ঢুকল। পিয়ারি খাটের এক কোণে গম্ভীরভাবে বসে।
—মা, বাবুর বিছানা কোথায় করব? জিজ্ঞেস করে রতন।
—আর কি ঘর নেই রতন? আমাকে প্রশ্ন করছিস কেন? যা এখান থেকে।
রতন ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রতন বেরিয়ে যেতেই পিয়ারি কিছুটা বিরক্তভাবে জিজ্ঞেস করল, এমন হঠাৎ চলে এলে যে?
—অনেক দিন না দেখে কেমন যেন আকুল হয়ে উঠেছিলুম বাইজি, শরৎ কিছুতেই এবার তার ক্ষোভ বা অভিমান আড়াল করতে পারল না।
—থাকবে তো? জানতে চায় পিয়ারি।
—থাকতে বললে থাকব।
—তোমার অসুবিধে হবে কিন্তু।
—কীসের অসুবিধে?
—যে ঘরটায় তুমি শুতে, সে ঘর এখন বাবুর।
—আমি তোমার নিচের ঘরে শোবো।
—সে কী! তুমি অ্যাত বড় লেখক। তোমার মানে লাগবে না?
—মান—অভিমান বলতে আমার কিছু নেই পিয়ারি।
—পরমহংস হয়ে গেলে কবে থেকে? পিয়ারির কণ্ঠে রাগ এবং বিদ্রুপ।
—আমি বাড়ি থেকে বেরনোর সময় কোথায় খাব, কোথায় শোব, এসব চিন্তা ফেলে আসি। এইটুকু জানি স্টেশনে পড়ে থাকার চেয়ে তোমার আশ্রয় অনেক ভাল।
—এত অপমান করছি, সহ্য করছ কী করে? শরৎদা, আমি হলে গাছতলায় পড়ে থাকতুম।
শরৎ দেখে পিয়ারি তার দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাঁদছে।
পিয়ারির কান্না যে একেবারে ভিতর থেকে উথলে বেরিয়ে আসছে, সে কিছুতেই সামলাতে পারছে না, শরতের এ কথা বুঝতে অসুবিধে হয় না।
শরৎ এগিয়ে যায় তার কাছে। দু'কাঁধের উপর হাত রেখে তাকে টেনে নেয় বুকের মধ্যে।
পাখি যেমন ঝুপ করে নেমে আসে বাসায়, ক্লান্ত উড়ান থামায় ডানা মুড়ে, ঠিক তেমনই পিয়ারির দুঃখ ও ক্লান্তি নেমে আসে শরতের বুকে নিশ্চিত, নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে।
শরৎ বলে, আমার কি কোনও মন নেই যে আমি বুঝব না, তুমি কত কষ্ট চেপে আমাকে নিচের ঘরে শুতে বলছ? বুঝি পিয়ারি, সব বুঝি আমি, কত অসহায় তুমি, কেন তুমি আজকের রাত্তিরটা তোমার বাবুকে দিতে তুমি বাধ্য। সাধ্য থাকলে আগেরবারের মতো উপর তলায় তোমার ঘরের পাশেই আমার শোওয়ার ব্যবস্থা করতে।
কোনও উত্তর দেয় না পিয়ারি। তার সব অপমান, অসহায়তা যেন কাঁদতে কাঁদতে শরতের বুকের বাসায় ঘুমিয়ে পড়ে।
পিয়ারি, আমি কিচ্ছু মনে করব না, তুমি রতনকে ডেকে পাঠাও। সে আমাকে নিচের ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে আসুক। বিছানার জন্য চিন্তা কোরো না। আমি কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়ব।
পিয়ারি অনেকক্ষণ কোনও কথা বলে না। শরতের বুকের মধ্যে সে যেন তার সমস্ত বেদনাকে নীরবে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চায়।
তারপর হঠাৎ শরতের দিকে মুখ তুলে বলে, আমাকে একটা সত্যি কথা বলবে?
—কী জানতে চাও, না শুনে বলি কী করে?
—তোমার হঠাৎ পাটনায় আসার কারণটা কী?
—আমি বর্মায় যাচ্ছি। হয়তো আর কখনও দেখা হবে না রাজ। অন্তত অনেক দিন যে হবে না, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। যাওয়ার আগে তাই একবার তোমাকে দেখতে এলুম। না এসে পারিনি পিয়ারি, কথাটা সত্যি।
শরতের কথা শেষ হতেই ঘরের দরজায় রতন এসে বলল, মা, আসতে পারি?
—এসো রতন।
—মা, আপনি যেমন বলেছেন, বাবুর বিছানা করে দিয়েছি।
পিয়ারি রতনকে বলল, তুই তাহলে বাবুকে সঙ্গে করে নিয়ে যা।
রতনকে আজ্ঞা করে সে তাকায় শরতের দিকে।
শরৎ পিয়ারির চোখে চোখ রাখে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেভাবেই নিশ্চল থাকে।
তারপর রতনের পিছন পিছন বেরিয়ে সে নিচে নামার সিঁড়ির দিকে যায়।
—ওদিকে নয় বাবু। এদিকে আসুন— বলে অন্দরমহলের দিকে ইশারা করে রতন।
—ওদিকে!
আশ্চর্য হয় শরৎ। ওদিকে তো আজ পাটনার বাবুর ঘর। পিয়ারির ঘরের পাশেই।
যে ঘরে আগেরবার ক'টা দিন কাটিয়ে গিয়েছে শরৎ। রতন বোধহয় ভুল করছে।
—আমার ঘর তো নিচে রতন!
—আপনার বিছানা নিচের ঘরে! কী যে বলেন বাবু! আমার অ্যাতো দূর আস্পদ্ধা হয়নি যে আপনাকে নিচের ঘরে বিছানা করে দেব। মা ঠাকরুণ তাহলে আমাকে আর আস্ত রাখবেন না।
—কিন্তু তোর মা ঠাকরুণ তো নিজেই আমাকে বলেছেন, উপরে পাটনার বাবু শোবেন।
—তা, তেনার জায়গায় থাকুন না তিনি। আপনার তাতে কী? আপনি আসুন তো আমার সঙ্গে।
শরৎ কেমন যেন বিহ্বল। সে রতনের পিছন পিছন যায়। রতন তাকে নিয়ে যায় রাজের শয়নঘরে!
—এ কী করছিস রতন! এই ঘরে!
—হ্যাঁ বাবু। মা ঠাকরুণের তাই তো আদেশ। এদিক—ওদিক হবার জো নেই।
—তাহলে তোর মা শোবেন কোথায়! ফস করে প্রশ্ন করে ফেলে শরৎ।
প্রশ্নটা না করলেই হত। এইভাবে রতনকে আঘাত করার মধ্যে যে নির্মমতা আছে, কেন সামলাতে পারল না সে?
রতন কী করে বলবে, মা ঠাকরুণ তো আজ পাটনার বাবুকে সারারাত গান শোনাবেন!
—মা ঠাকরুণ শোবেন নিচের ঘরে। সহজ—সরল কণ্ঠে উত্তর দেয় রতন।
উত্তরটা যে একেবারে খাঁটি, কোনও সন্দেহ নেই তাতে। শরৎ ভবঘুরে মানুষ। কোথাও আটকে থাকা তার ধাতে নেই। মায়া, মমতা, ব্যথা সব সে নিজের ভিতর চেপে রাখতে পারে। তার চোখে সহজে জল আসে না।
হঠাৎ রতনের কথায় তার চোখ জলে ভরে যাচ্ছে কেন? সে ঝাপসা চোখে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়।
এ কী! এ তো রাজলক্ষ্মীর দেড় হাত চওড়া তক্তাপোশ নয়! বিছানাও তো বদলে গিয়েছে!
শরৎ দেখে, জানলার ধারে, সেই নিমগাছটার সামনে পাতা হয়েছে একটা মস্ত খাট। তার উপর পুরু গদি বিছিয়েছে রতন!
—এ যে রাজশয্যা রে, বলে বিহ্বল শরৎ।
রতন মুচকি হেসে তাকায়।
—তোর সত্যি কোনও ভুল হচ্ছে না তো? শরৎ আরও একবার নিশ্চিত হতে চায়।
—না বাবু।
শরৎ দেখে আয়োজনে কোনও ত্রুটি নেই।
খাটের শিয়রে একটি পাথরের টেবিল। তার উপর জ্বলছে মৃদু সেজের আলো।
টেবিলের উপর কয়েকখানি বাংলা বই। একটি বইয়ের উপর বিশেষ নজর পড়ে শরতের। রবিবাবুর 'কড়ি ও কোমল'।
বইখানি হাতে তুলে নেয় শরৎ। পাতা ওল্টায়।
সেজের মৃদু আলোয় তার চোখের সামনে ভেসে আসে:
নিমেষের মাঝে চুমো খেয়ে
মুহূর্তে ফুরাবে চুমো খাওয়া।
বেলা নাই শেষ করিবারে
অসম্পূর্ণ প্রেমের মন্ত্রণা—
সুখস্বপ্ন পলকে ফুরায়,
তারপরে জাগ্রত যন্ত্রণা।
বাংলা ভাষায় এমন লেখা কি হয়েছে? না বোধহয়, বলে শরতের মন।
অনুবাদ নয় তো? হলেই বা কী! কত কম বয়সের লেখা। অথচ 'চুমো' শব্দটাকে কী সহজ সাহসে ব্যবহার করেছেন কবি! আমি কি পারতুম?
পারিনি তো! 'চুম্বন'—এই আটকে আছি।
শরৎ আরও একবার পড়ে এই লাইনটি : 'অসম্পূর্ণ প্রেমের মন্ত্রণা।'
কী আশ্চর্য প্রতিভা থাকলে এমন লাইন লেখা যায়!
এই যে আমি পিয়ারির কাছে এলাম, একরাত কাটিয়ে চলে যাব, যা কিছু হতে পারত, হওয়া সম্ভব ছিল, তবু তা ঘটল না, এই সবকিছুই কি নয় অসম্পূর্ণ প্রেমের মন্ত্রণা!
শরৎ 'কড়ি ও কোমল' রেখে দেয় সেজের তলায়, পাথরের টেবিলে। আর তখনই তার নজর পড়ে বইগুলির পাশে, একটু ছায়া ছায়া জায়গায়, একটা বাটির মধ্যে কতকগুলি বেলফুল।
ঘরে ঢুকেই শরৎ বেলফুলের গন্ধ পেয়েছিল। এতক্ষণে সেই সুবাসের উৎসটি সে নিরীক্ষণ করে।
শরৎ বুঝতে পারে এসব কিছুর অন্তর কথাটি। ঘরের কোনও কিছুই ভৃত্য রতনের ভাবনা থেকে নয়।
যে তাকে সমস্ত অন্তর দিয়ে ভালবাসে, এই ঘরে সমস্ত পরিবেশটি তারই প্রণয়ের রচনা।
শরতের সমস্ত হৃদয় অনুভব করল, বিছানার চাদরটি পর্যন্ত রাজলক্ষ্মী নিজের হাতে পেতে রেখে গিয়েছে।
এ তো শুধু চাদর নয়। তার সমস্ত বিছানা জুড়ে সযত্নে পাতা পিয়ারির হৃদয়।
ছি, ছি, কী অন্যায় করেছি আমি! পিয়ারিকে কত না সন্দেহ করেছি। তার কাছে আমার ছোট মনের পরিচয় দিয়ে ফেলেছি আমি। তার প্রতি প্রকাশ করে ফেলেছি আমার অশ্রদ্ধা।
আমার ঈর্ষাই আমাকে বাধ্য করেছে পিয়ারিকে আঘাত করতে। গভীর অনুতাপে কষ্ট পায় শরৎ। অন্যায়বোধ ছুঁচের মতো বিঁধতে থাকে তাকে।
পিয়ারি কি একটিবার আসবে না তার ঘরে? তাকে যে অনেক কথা বলার আছে।
শরৎ দেখে রতন নিঃশব্দে কখন ঘর থেকে চলে গিয়েছে। সে ভেবেছিল, রতনকে দিয়ে পিয়ারিকে সে ডেকে পাঠাবে।
শরৎ শুয়ে পড়ে। তার মন বলে পিয়ারি একটিবার আসবেই।
তারও নিশ্চয় কিছু কথা বলার আছে।
শরৎ সত্যিই ক্লান্ত। সে ঘুমতে চায় না। তবু তন্দ্রায় জড়িয়ে যায় চোখ।
হঠাৎ তন্দ্রা ভাঙতে সে দেখে, তার গায়ের উপর একটি হাত রেখে পাশে পিয়ারি বসে আছে।
শরৎকে ঘুম থেকে উঠতে দেখেই পিয়ারি বলে, তুমি কি জানো বর্মায় গেলে মানুষ আর ফেরে না?
—পিয়ারি, ফিরতেই যে হবে এমন কারও মাথার দিব্যি আছে বলেও তো জানিনে।
—আছে শরৎদা, আছে। ভালবাসার তুমি কতটুকু বোঝো? লেখক হয়েছ, কিন্তু কতটুকু বোঝো মেয়েমানুষের মন?
এ বড় কঠিন প্রশ্ন! অন্তত শরতের তাই মনে হল। সে ধীরে ধীরে উঠে বসে।
একটু ভেবে বলে, রাজ, সকলের মনের কথা তো সত্যিই জানিনে। আর মেয়েমানুষের মন বোঝা সহজ নয়, তাও জানি। তবে রাজ একজনের মনের কথা আমি জানি। তার মাথার দিব্যি আমি অবহেলা করব না। যদি কোনও দিন ফিরে আসি বর্মা থেকে, তার জন্যেই আসব।
পিয়ারি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর শরতের একটি হাত সে বুকের মধ্যে নিবিড়ভাবে চেপে বলল, এবার হঠাৎ পাটনায় এসে তুমি আরও একবার প্রমাণ পেলে, আমি নষ্ট মেয়ে। তবু আমার মাথার দিব্যির দাম দিতে তুমি শুধু আমারই জন্যে ফিরে আসবে? আমাকে তোমার পদে পদে সন্দেহ হয়, না?
সারা রাত শরৎ ঘুমতে পারেনি। তার সমস্ত ভিতর বলছে পিয়ারির থেকে চলে যেতে, অথচ কোনও বাধা নেই তো থাকতে! সে থেকে যেতেই পারে। একথা ঠিক, পিয়ারি বাইজি। রাতারাতি তো সে তার পুরো জীবনটা স্লেটের গায়ে লেখার মতো বদলে দিতে পারবে না।
বদলে দিলেও কিছু কিছু খড়ির দাগ থেকেই যাবে।
শরৎ নিজের মধ্যে আবার সেই পুরনো বেদনা অনুভব করে। সে বোঝায় নিজেকে, পিয়ারির সঙ্গে থাকতে গেলে তার জীবনে অন্য পুরুষের আনাগোনা যদি মেনে নিতেই হয়, সেইটুকু মনের জোর কি তার নেই?
সে বিছানা ছেড়ে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। কী আশ্চর্য এক পূর্ণচাঁদ উঠেছে!
শরৎ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সেই মায়ার দিকে। কখন যে সে নিজের মধ্যে ডুব দিয়েছে, জানতেও পারেনি।
সে নিজের মধ্যে দেখতে পায় একটি দীপের শিখা। তার মনে হয়— সেই আগুন, সেই সোনারবরন দীপ্তি অনেক বেশি সত্য আকাশজোড়া চাঁদের মায়ার চেয়ে।
নিজের অন্তর্গঢ় সেই ভাস্বরতায় শরৎ উপলব্ধি করে এমন এক বৈভব— অনস্বীকার্য যার প্রৈতি।
কীসের এই শক্তি? প্রশ্ন করে সে নিজেকে।
তার মন উত্তর দেয় নিঃসংকোচে। শক্তি প্রেমের। শক্তি শ্রদ্ধার। পিয়ারি বাইজি, তার জীবনে অন্য পুরুষ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শরতের প্রতি তার প্রেমে তো কোনও খাদ নেই।
নিখাদ, নিষ্পাপ, নিঃস্বার্থ এই প্রণয়। যে মানুষটির মধ্যে এমন ভালবাসা তার নষ্ট—জীবনের মধ্যেও নষ্ট হয়নি, তাকে না ভালবেসে, না শ্রদ্ধা করে কী করে থাকবে শরৎ? সে জানলার ধার থেকে সরে আসে। বিছানায় বসে অনেকক্ষণ ভাবে।
ক্রমশ সিদ্ধান্ত নেওয়া তার পক্ষে সহজ হয়ে যায়।
কাল ভোরবেলাই সে পাটনা ছেড়ে চলে যাবে।
একটিই কারণ : সে পিয়ারিকে ভালবাসে। আর ভালবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে একান্ত প্রয়োজন দূরত্বের। পিয়ারির সঙ্গে ঘর করলে অন্তরের দীপশিখাটি হারিয়ে ফেলতে পারে ওই স্বর্ণজ্যোতি।
প্রাত্যহিকতার ম্লানিমাকে ভয় পায় শরৎ।
সে বাউন্ডুলে। সে ঘরছাড়া। সে উদাসীন। সে উদভ্রান্ত। সে রোমান্টিক। সে তো পিয়ারিকে হাত বাড়ালেই পেতে পারে।
কিন্তু হাত বাড়ালেই যাকে ধরা যায়, শরৎ তো ধরতে চায় না তাকে।
প্রেম তো পাওয়া নয়।
প্রেম তো ছেড়ে যাওয়া।
বিচ্ছেদের ব্যথাই প্রেমের সবচেয়ে বড় দান।
হঠাৎ তার মনে আসে একটি গান। কীর্তনের সুরে সে গাইতে শুরু করে—
আমি জেনে শুনে তবু ভুলে আছি, দিবস কাটে বৃথায় হে।
আমি যেতে চাই তব পথপানে, ওহে কত বাধা পায় পায় হে।
(তোমার অমৃতপথে, যে পথে তোমার আলো জ্বলে সেই
অভয়পথে।)
চারি দিকে হেরো ঘিরেছে কারা শত বাঁধনে জড়ায় হে।
আমি ছাড়াতে চাহি, ছাড়ে না কেন গো— ডুবায়ে রাখে মায়ায় হে।
শরৎ কেমন যেন ভাবের ঘোরে। একটু গলা ছেড়েই সে গাইছে। একেবারে পাশেই তো রাজলক্ষ্মীর ঘর। সে—ও ঘুময়নি। শরতের কীর্তন কানে যেতে সে মৃদু পায়ে এল শরতের ঘরে। শরৎ তাকে দেখেই গান থামায়।
—কোন বৈষ্ণবী শেখাল গো এমন মধুর কীর্তন?
বিষণ্ণ হেসে জিজ্ঞেস করে পিয়ারি। শরতের পাশে গিয়ে বসে বিছানায়।
—পিয়ারি, কোনও বৈষ্ণবী শেখায়নি গো এই কীর্তন।
—তবে?
—এই কীর্তন রবিবাবুর লেখা। তাঁরই সুর দেওয়া। কত কম বয়সে তিনি এমন গান লিখছেন কী করে, তাই ভাবি! আমার মনের কথা পিয়ারি। আমি বলতে পারিনে। বলে দিচ্ছেন তিনি।
—কী তোমার মনের কথা শরৎদা?
—সে কথাটিই রবিবাবু জানিয়েছেন তাঁর এই গানে :
দাও ভেঙে দাও এ ভবের সুখ, কাজ নেই এই
খেলায় হে।
শরৎ আর পিয়ারি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে।
পিয়ারি জানলার ধারে উঠে যায়। শরতের দিকে পিছন ফিরে সে মৃদুকণ্ঠে বলে, তুমি তাহলে আমাকে ছেড়ে যাচ্ছ, এই তো?
শরৎ কোনও উত্তর দেয় না।
—তোমার এই সিদ্ধান্তের কোনও নড়চড় হবে না। আমি জানি।
শরৎ তখনও চুপ।
—একজন বাইজির সঙ্গে সংসার করার সাহস তোমার নেই শরৎদা, তা সে হতভাগিনী তোমাকে যতই ভালবাসুক না কেন। আমি ভেবেছিলুম, তুমি বোধহয় আমার দেখা অন্য পুরুষের মতো নও। ওরা আমার কাছে আসে ফুর্তি করতে। কিন্তু সংসার করে সতীলক্ষ্মীদের সঙ্গে। কিন্তু তা তারা করুক গে! আমি তো তাদের প্রাণ দিয়ে ভালবাসিনে।
—তুমি আমাকে ভুল বুঝছ পিয়ারি। এইটুকু শুধু বোঝার চেষ্টা করো, আমি চাই না, তোমার—আমার বন্ধনের গায়ে প্রাত্যহিক সংসারের ঝুল—কালি লাগুক।
—মানে! অবাক হয়ে তাকায় পিয়ারি।
—মানে, খুব সোজা পিয়ারি। তোমাকে খুব ভালবাসি। তোমার সবটুকুকে, তোমার সমস্ত জীবনকে যদি আমি শ্রদ্ধা করতে না পারতুম পিয়ারি, তোমার প্রতি আমার এই ভালবাসা বেঁচে থাকত না।
—কাছে থাকলে সেই শ্রদ্ধা নষ্ট হবে? যেমন হল এবার পাটনায় হঠাৎ চলে এসে?
—পিয়ারি, তোমার জীবনের সবটুকু জেনেও এই কথাটি আমার বুঝতে ভুল হয়নি, শুধু আমাকেই তুমি আজীবন ভালবেসেছ। আমিই তোমার প্রথম ভালবাসা। এতদিন সব কিছুর মধ্যেও সেটিকে তুমি মরতে দাওনি।
—তাই আমাকেই তুমি শাস্তি দিতে চাও আমার কাছ থেকে চলে গিয়ে?
—পিয়ারি, একদিন তুমি বুঝবে, এই মানুষটি তোমারই থেকে গেছে। কোথাও সে যায়নি। এই সত্যটুকু একমাত্র দূরত্বই তোমাকে জানাতে পারে।
—বর্মা যে অনেক দূরের পথ শরৎদা।
শরৎ নীরব থাকে।
পিয়ারি শরতের কাছে এসে আবার তার পাশটিতে বসে পড়ে। শরৎ অনুভব করে পিয়ারির মনের কষ্ট।
সে দুর্বল হয়ে পড়বে না তো? পারবে তো তার বর্মা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকতে?
—আর হয়তো তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না। একটা ভিক্ষে দেবে? পিয়ারি শরৎকে আঁকড়ে ধরে বলে।
—সাধ্য থাকলে নিশ্চয় দেব।
—শরৎদা, তোমার এই বাউন্ডুলে, লক্ষ্মীছাড়া, ভবঘুরে জীবন কীভাবে কোথায় শেষ হবে, জানিনে। শুধু মেয়েমানুষের মন দিয়ে এইটুকু বুঝেছি, তুমি কোনওদিন কোথাও থিতু হবে না। পথে পথেই একদিন শেষ হবে তুমি।
—তা মন্দ কী! আমি তো আর ধনীর দুলাল নই পিয়ারি যে পালঙ্কের আরামে দিন কাটিয়ে সাহিত্য রচনা করব। আমার লেখার প্রেরণা অনিশ্চিত পথচলা। পথেই কুড়িয়ে পাই লেখার রসদ। কত কাহিনি। কত চরিত্র। কত ঘটনা। সব ওই পথে পথেই তো ছড়িয়ে আছে।
অত বুঝিনে শরৎদা। বুঝতে চাইওনে—। শুধু বুঝি, তোমার জীবনের যে ধরন তাতে কখন কোথায় যে তুমি...
পিয়ারি আর বলতে পারে না। কষ্ট তার টুঁটি চেপে ধরে। সে অনেক চেষ্টায় কোনওরকমে বলে, তুমি যেখানেই থাকো সেই সময় একটা খবর দেবে তো?
পিয়ারি অন্ধকার ঘরে শরতের বুকে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
তারপর ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়।
বাকি রাতটুকু শরতের জেগেই কাটে।
ভোরবেলায় রতন এসে খবর দেয়, গাড়ি এসে গেছে বাবু।
শরৎ গাড়িতে উঠে বসে।
পিয়ারি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। তার ঘুম ভাঙানোর দরকার নেই।
কিন্তু এ কী! পিয়ারি যে দুয়ারে ছুটে এসে দাঁড়াল!
—শরৎদা, না—ই গেলে অত দূরে। থাক গে, যেও না। কলকাতায় যাচ্ছ যাও। ঘুরে এসো তাড়াতাড়ি।
শরৎ চোখ নামিয়ে নেয়।
পিয়ারি কাঁদছে। সেই কান্না ছুরির মতো। শরতের বুকের শিরা ফালাফালা করে দিল।
গাড়োয়ান ঘোড়ার পিঠে চাবুক মেরে গাড়ি ছেড়ে দেয়।
শরৎ পিছন ফিরে তাকায় না।
কলকাতার কয়লাঘাট।
ভোরবেলা।
ঠেলাঠেলি ভিড়ের মধ্যে শরৎচন্দ্র।
সঙ্গে একটা লোহার তোরঙ্গ। আর পাতলা বিছানা।
কলকাতার কয়লাঘাটে ভোরবেলা কেমন ভিড় তার একটা আন্দাজ পাওয়া যায় শরতের লেখাতেই—
গাড়িতে আসিতে আসিতেই দেখিয়াছিলাম, জেটি ও বড় রাস্তার অন্তর্বর্তী সমস্ত ভূখণ্ডটাই নানা রঙের পদার্থে বোঝাই হইয়া আছে। লাল কালো পাঁশুটে গেরুয়া— একটু কুয়াসা করিয়াও ছিল— মনে হইল একপাল বাছুর বোধহয় বাঁধা আছে, চালান যাইবে।
না, এই পর্যন্ত পড়ে ভিড়ের আকারটা তেমন ঠাওর হয় না। শরৎ এরপর একটি মাত্র লাইন লিখে বুঝিয়ে দিয়েছে—
কাছে আসিয়া ঠাহর করিয়া দেখি, চালান যাইবে বটে, কিন্তু বাছুর নয়— মানুষ।
শরৎ ডেকের যাত্রী। গরিব মানুষের ভিড়ে তার জন্য কোনও নির্দিষ্ট জায়গা নেই। নিজের জায়গা নিজে খুঁজে নিতে হবে। তারপর ঝড়—বৃষ্টি, রোদ্দুর মাথায় করে ডেকেই কাটাতে হবে রাত—দিন।
তা শরৎ চলল কোথায়?
শরতের ঘাড়ে বর্মার ভূত চেপেছে।
সে কয়লাঘাট থেকে পাড়ি দিচ্ছে রেঙ্গুন।
তবে জাহাজের পাত্তা নেই। জাহাজ যে কখন আসবে তার খোঁজ শরৎ বারবার নিচ্ছে।
একই উত্তর : জাহাজ কখন ঘাটে ভিড়বে সে কথা একমাত্র জাহাজই জানে! কিন্তু তাহলে ভোরবেলা তাকে আসতে বলা হয়েছে কেন?
কেনই বা কাকভোর থেকে ঘাটে এত মানুষের ভিড়?
শরৎ অচিরে উত্তর পায় এক কুলির কাছে।
—ডগদরি হোগা।
—ডগদরি! সেটা কী?
একধাক্কায় কুলি সামনের দিকে ছিটকে গেল।
ছিটকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে শরতের প্রশ্নের উত্তরটিও দিয়ে গেল—'পিলেগকা ডগদরি।'
শরতের বুঝতে সামান্য দেরি হলেও সে বুঝতে পারে। প্লেগের ডাক্তারি। কলকাতায় তো প্লেগের মহামারী চলছে।
অনেকেই প্লেগের ভয়ে বর্মা পালাচ্ছে। তখনও বর্মায় প্লেগ দেখা দেয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই বর্মায় প্লেগ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
ততক্ষণে ঘাটে সাহেব ডাক্তারের আবির্ভাব হয়েছে। সঙ্গে তার এক পালোয়ান পেয়াদা।
প্লেগে দেহের নানা অংশ ফুলে ওঠে।
সাহেব ডাক্তার যাত্রীদের আবৃত গোপন অঙ্গই বেশি টেপাটেপি করতে লাগল।
কেউ কোনও টুঁ শব্দটি করছে না। কোনও প্রতিবাদ নেই। সাহেবের পিছনে কেন পালোয়ান পেয়াদা, শরতের বুঝতে দেরি হল না। কেউ প্রতিবাদের টুঁ শব্দটি করলেই পালোয়ান!
সাহেব গোপন অঙ্গের টেপাটিপি চালিয়েই যাচ্ছে। লাইন দিয়ে প্রতিবাদহীনভাবে দাঁড়িয়ে কাবুলি, পাঞ্জাবি, মাদ্রাজি, মারাঠি, বাঙালি, চিনে, বিহারি, উৎকলবাসী।
টেপাটিপির পরে কেউ ফেল, কেউ পাস। যারা ফেল করেছে তাদের আপাতত বর্মা যাওয়া হচ্ছে না।
পরে সাহেব ডাক্তারকে খুশি করতে পারলে...।
এক সময়ে শরতের দিকেও হাত বাড়াল সেই সাহেব ডাক্তার। বাকিটুকু তার মুখেই শোনা যাক: যথাসময়ে চোখ বুজে সর্বাঙ্গ কুঁকড়ে এক রকম মরিয়া হয়েই ডাক্তারের কাছে আত্মসমর্পণ করলুম। এবং পাস হয়েও গেলুম।
—আপনি ব্রাহ্মণ!
শুনে লোকটি গদগদ। সেও শরতের মতো ডেকযাত্রী। শরৎকে নমস্কার করে বলে, আমি রেঙ্গুনের বিখ্যাত নন্দ মিস্ত্রি।
নন্দর পাশে এক বিগতযৌবনা স্থূলাঙ্গী।
শরতের দৃষ্টি যায় সেদিকে।
এতক্ষণ সেই বিগতযৌবনা শরতের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। শরতের চোখে চোখ পড়তেও সে চোখ নামাল না।
—বাবুমশাই, ইটি আমার পরি...
নন্দর কথা শেষ হল না।
ভাটার মতো চোখ নিয়ে স্থূলাঙ্গী বলল, কী আমার সাত পাকের সোয়ামি যে আমি তার পরিবার! আবার সাবধান করে দিচ্ছি মিস্তিরি। যার—তার কাছে আমার বদনাম কোরো না মিথ্যে বলে।
নন্দ মিস্ত্রি খুব বেশি যে অপ্রস্তুত, তা নয়।
মুখ শোনায় সে অভ্যস্ত, বুঝতে পারে শরৎ।
—রাগ করিস কেন টগর? বিশ বচ্ছর একসঙ্গে আছি। তবু পরিবার বলতে দিবি না!
টগর এবার ভীষণ রেগে গেল।
সে এতক্ষণ বসে ছিল। এবার উঠে দাঁড়াল।
—বিশ বছর একসাথে আছি তো কী? মিস্তিরির পো, তুই আমাকে জাত খোয়াতে বলছিস? আমি হলুম গিয়ে কৈবত্তের পরিবার। তুই জানিস না, আমি জাতবোষ্টমের মেয়ে!
—রাখ তোর জাতবোষ্টম টগর। থাকিস না আমার সঙ্গে?
—শোন, শোন, তোর সঙ্গে বিশ বচ্ছর আছি সত্যি। কিন্তু তোকে একদিনের জন্যেও হেঁসেলে ঢুকতে দিয়েছি?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না মিস্ত্রি।
সে অসহায়ভাবে তাকায় শরতের দিকে।
—ওর দিকে তাকাচ্ছিস কী রে মিনসে! কলকাতার বাবুর আর বুঝতে বাকি নেই।
এবার শরতের চোখে চোখ রাখে টগর। বলে, টগর বোষ্টমি মরে যাবে। তবু জাত—ধম্ম খোয়াবে না।
নন্দ শরতের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে, দেখলেন বাবু, এখনও জাতের দেমাক এদের!
শরৎ কথা না বাড়িয়ে দূরে কোথাও নিজের জায়গাটি খুঁজে বিশ্রাম করতে গেল।
পরের দিন সকাল হতেই তার মনে পড়ল নন্দ মিস্ত্রি আর টগরের কথা। কেমন রাত কেটেছে তাদের? একবার খোঁজ নিয়ে আসা যাক।
—কেমন রাত কাটালে মিস্ত্রিমশাই? জিজ্ঞেস করে শরৎ।
—তা বেশ, বলে নন্দ মিস্ত্রি।
—বেশ! তুমি বলছ বেশ রাত কাটল? কী কাণ্ডই হয়ে গেল! কী লজ্জা কী লজ্জা! বলল টগর।
—কী কাণ্ড হল আবার? জানতে চায় উদ্বিগ্ন শরৎ।
—কলকাতার গলির মোড়ে সাড়ে বত্তিরিশ ভাজা বিক্রি দেখেছেন? দেখে থাকলে কাল রাত্তিরে আমাদের অবস্থাটা বুঝতে পারতেন, বলে টগর।
শরৎ বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করে।
মিস্ত্রি শরতের কল্পনাকে সাহায্য করে।
—ঠোঙার নিচে গোটা তিন টোকা মেরে ওই ভাজা চাল—ডাল— মটর—কড়াই—ছোলা—বরবটি—মুসুরি—খেঁশারি যেমন একাকার করে দেয়, তেমনই কাল রাত্তিরে মিশে গেলুম সব।
শরৎ এবার জানতে চায়, তা, রাত্তিরবেলা টোকাটা মারল কে?
টগর চোখের ইশারায় বোঝায়, ওই হতচ্ছাড়া কাবুলি দু'টো। তারপর কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, ভাগ্যিস আমি জাতবোষ্টমি, তাই জাত যায়নি। যা গিয়েছে কাল আমার উপর দিয়ে। অন্য মেয়ে হলে জাত নিয়ে আর ফিরতে হত না। আমার তো শুধু বিছানার উপর দিয়েই গেল।
—বিছানার কী হল? শরৎ প্রশ্ন করে।
—কী আর হবে! রস পড়েছে। কলকাতা থেকে রসগোল্লা এনেছিলুম। হাঁড়ি ফেটে রস। বিছানার উপর দিয়েই গেল আর কী বাবু, বলে মিস্ত্রি।
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শরৎকে টানে। বিশেষ করে নারী—পুরুষের সম্পর্ক। নেশার মতো পেয়ে বসে। সে জানতে চায় সব সম্পর্কের সবরকম গতিবিধি। সম্পর্কের রং, চরিত্তির, লুকোনো শরীর, ভালবাসার ঢাকনার তলায় ঘৃণার চোরাস্রোত— তাকে জানতে হবে যতটা সম্ভব।
প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যে নতুন নতুন গল্প। এই গল্প সে জানতে চায়, পড়তে চায়, লিখতে চায়।
নন্দ মিস্ত্রি আর টগরের সম্পর্ক তার কাছে খুলে দিচ্ছে নতুন এক গল্প। দু'টি মানুষ বিশ বছর আছে একসঙ্গে। বিয়ে করেনি। তবু আছে।
সারাক্ষণ খিটিমিটি, তবু কেউ কাউকে ছেড়ে যাচ্ছে না।
এও বুঝি এক প্রেমের গল্প! বেশ অন্যরকম। তবু প্রেমের গল্পই। মনে হয় শরতের।
—তা, বিছানাটা তো রস পড়ে নষ্ট হল, রসগোল্লার হাঁড়িটার কী দশা?
শরৎ এই মোক্ষম প্রশ্নটি নন্দ আর টগরকে না করে পারল না। সে চায় গল্পটা আরও কিছু দূর গড়িয়ে যাক।
বিছানার রস আরও একটু ঢুকুক গল্পটার মধ্যে। রসিক শরতের কাছে এ তো জীবনের রস।
টগর শরতের প্রশ্নের কোনও উত্তর দেওয়ার চেষ্টাও করল না। তার মেজাজ সপ্তমে, বোঝাই যাচ্ছে।
নন্দ সবদিক সামলে বলল, এই দেখুন বাবু, ওই ভাঙা হাঁড়ির কিছুটা, আর এই দেখুন, বিছানায় রসের দাগ। যা বোঝার বুঝে নিন।
শরৎ তাকায় টগরের মুখের দিকে। সেখানে রাজ্যের বিরক্তি, রাগ, ঘেন্না। তবু একটা স্বস্তিও যে নেই, তা নয়।
বিছানাটা গিয়েছে যাক। তবু সে এখনও 'অক্ষত জাতবোষ্টমি'। জাত খোয়ায়নি কাবুলি দু'টোর কাছে।
—রসগোল্লা গেল কোথায়? শরতের জানার আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। খোঁচাতেও পারে সে!
এবারও উত্তর দেয় নন্দ। সেই জবাবে টগরের উদ্দেশে কটাক্ষ, তাতে সন্দেহ নেই শরতের।
—রসগোল্লার কথা যত কম জানতে চাইবেন, ততই মঙ্গল! সেগুলোর সত্যি কী হল, বলতে পারিনে।
—ব্যস! রসগোল্লার গল্প এখানেই শেষ! শরতের কণ্ঠে কৌতুক।
—এর বেশি কিছু জানতে চান তো ওই দু'টো হারামজাদাকে জিজ্ঞেস করুন।
কথাটা বলে নন্দ মিস্ত্রি তাকায় দূরে বসে থাকা কাবুলি দু'টোর দিকে।
শরৎ বেশ মজা পাচ্ছে। মিস্ত্রি আর টগরের সম্পর্কের আরও ভিতরে ঢুকতে চায় সে। লেখার রসদ পাচ্ছে, তাই তার কৌতূহল।
—রসগোল্লা নিয়ে আর হেদিও না। চিঁড়ে আছে তো সঙ্গে? প্রশ্ন করে শরৎ।
—সে ভাবনা অবিশ্যি কাবুলি দু'টো ভেবেছে। ওদের তাই নেমকহারাম বলতে পারব না, বলল নন্দ।
—কাবুলিরা রসের দাম দিয়ে গিয়েছে বলছ! শরৎ বিস্মিত।
—ওরা রস লুটেছে। কিন্তু দেশের মোটা রুটি বেঁধে দিয়ে গিয়েছে, বলে নন্দ।
এবার টগরের দিকে তাকিয়ে বলে, ও জিনিস ফেলিস নে টগর। তুলে রাখ। তোর মালসাভোগ, বুঝলি?
মিস্ত্রির কথায় হো হো করে হেসে উঠল শরৎ। নষ্টামির মালসাভোগ তার বিশেষ পছন্দ।
রসের গল্প এমন তারিয়ে তারিয়ে বলছে নন্দ মিস্ত্রি, হাসি তো পাবেই।
কিন্তু হাসির মাথায় মুহূর্তে বজ্রপাত হল। টগর তার চরিত্তির নিয়ে নন্দর টিপ্পনি সহ্য করতে না পেরে সটান দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, মিস্তিরি, আমার জাত তুলে তোর কথা আর সহ্য হচ্ছে না। তোকে বলে দিচ্ছি, এভাবে আমাকে খোঁটা দিলে ফল ভাল হবে না।
ডেকের সবাই তখন টগরের দিকে তাকিয়ে। কাবুলি দু'টোও আড়চোখে দেখে অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে।
তারা বোধহয় আন্দাজ করতে পারে, গত রাত্রের জের!
টগর গলা আরও একপর্দা চড়িয়ে বলে, বিছানা নষ্ট করে ব্যাটারা রুটি বেঁধে মূল্য দিয়ে গিয়েছে! আর তুই বলছিস মোচলমানের ওই রুটি আমার মালসাভোগ! মুখে আগুন তোর! ওই রুটি তুই তুলে রাখ। বাপের পিণ্ডি দিস। ভেবে দ্যাখ মিস্ত্রি, বিছানা গেল আমার। আর তোর বাপের পিণ্ডি হল!
এবার নন্দকে দেখে কে! সে রীতিমতো বাঘের বাচ্চচা। উঠে দাঁড়ায়। টগরের চুলের মুঠি ধরে। গলা ফাটিয়ে বলে, হারামজাদি! আমার বাপ তুলছিস!
এবার শরতের চোখের সামনে এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটল।
টগর চিৎকার করে বলল, তুই আমার জাত তুলিসনি এতক্ষণ? ওরে, আমি টগরবোষ্টমি। কাবুলিদের কাছে জাত—ধম্ম খোয়াইনি। কাল রাত্তিরে তুই হারামজাদা আমাকে রক্ষে করার কোনও চেষ্টাই করিসনি। আর আজকে আমাকে কাবুলির মালসাভোগ বলছিস! বলেই নন্দর হাতে এক প্রকাণ্ড কামড় বসাল টগর।
নন্দ যন্ত্রণায় কাতর চিৎকার করে উঠল। চারিদিকে ভিড় জমে গেল।
কেউ কেউ উচ্চচকণ্ঠে বাহবা দিচ্ছে। কেউ কেউ ছি ছি করছে। শরৎ কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে।
তারপর ভাবল, এখন কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
এক বুড়ো খালাসির সঙ্গে শরতের ভাব হয়েছে। সে বলল, কর্তা, আর ডেকের উপরে থেকোনি। নিচে যাও।
—চৌধুরির পো, নিচে ওই টগর বোষ্টমি আর নন্দ মিস্ত্রি বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। ওখানে যেতে প্রবৃত্তি হচ্ছে না, বলে শরৎ।
—তা না হোক। তবু নিচের ডেকে নেমে যাও গো।
—কেন বলছ নেমে যাওয়ার কথা?
—কাপ্তান কইছে ছাইক্লোন হোতি পারে।
মিনিট পনেরোর মধ্যে উপরের ডেকের দৃশ্য দ্রুত বদলে গেল।
ডেকের যাত্রীদের জোর করে খালাসিরা হোল্ডের মধ্যে নামিয়ে দিতে লাগল। শরতের তোরঙ্গ—বিছানাও খালাসিরা নিচে চালান করে দিল।
শরৎ কিন্তু তোরঙ্গ—বিছানার পিছন পিছন গেল না। এখানেই সে বেশিরভাগ মানুষের থেকে আলাদা।
তোরঙ্গ—বিছানা তার বটে। কিন্তু সে কোনও কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে থাকতে চায় না।
সে জাত বাউন্ডুলে! তার নিচে না যাওয়ার আর একটা কারণ হল, অধিকাংশ গরিব যাত্রীর সঙ্গে সে জাহাজের খোলের মধ্যে বন্দি হতে চায় না।
যে হতভাগারা দশ টাকার বেশি ভাড়া দিতে পারেনি, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা।
তাদের খোলের গর্তের মধ্যে পুরে মুখ এঁটে দেওয়া হচ্ছে।
শরৎ এই হতভাগাদেরই একজন। কিন্তু সে পরোয়াহীন। মরতেও ভয় নেই তার!
সে উপরের ডেকেই থেকে যেতে চায়। সবার চোখের আড়ালে।
সাইক্লোন বস্তুটি সমুদ্রে কেন, ডাঙাতেও সে দেখেনি, বড় ইচ্ছে তার সাইক্লোন দেখে।
সাইক্লোনের কেমন রূপ? কতখানি অমঙ্গল ঘটানোর শক্তি সে ধারণ করে?
এই দু'টি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর চায় শরতের মন। তার জন্য জাহাজের ডেকে, সমুদ্রের উপর, সে জীবন দিয়েও দাম দিতে রাজি।
সে উপরের ডেকে একটা অন্ধকার আড়াল খুঁজে পেয়েছে।
ডেকে আর কেউ নেই। সবাই নেমে গিয়েছে জাহাজের খোলের নিরাপদ দমবন্ধ আশ্রয়ে।
ক্রমে ঘনিয়ে উঠছে মেঘ। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে বাড়ছে বাতাসের শক্তি। সমুদ্র ফেনিয়ে উঠছে চারিদিকে।
উপরের ডেকে অন্ধকার আড়ালে শরৎ ভিজছে বৃষ্টিতে। সাইক্লোনের অপেক্ষায়।
ধীরে ধীরে বাড়ছে বৃষ্টি।
বাড়ছে বাতাস।
বাড়ছে অন্ধকার।
বাড়ছে ঢেউয়ের আকৃতি।
বাড়ছে জাহাজের দোলন।
তাহলে এই হল সাইক্লোন! এর জন্য এত ভয়! শরৎ মনে মনে হাসে।
এমন সময় সমস্ত বুকের ভিতরটা তার কেঁপে উঠল!
জাহাজের বাঁশি। এমন ভয়ঙ্কর বাঁশি সে আগে শোনেনি।
সে উপর দিকে তাকিয়ে দেখে, এ কী! আকাশটা এমন হয়ে গেল কেন!
সেই অন্ধকার কালো—ঘন মেঘ গেল কোথায়?
সমস্ত আকাশ প্রায় মেঘহীন! হালকা!
প্রবল বাতাসে উড়ে যাচ্ছে পুরো আকাশটাই!
পরক্ষণে এক বিকট শব্দ। সেই শব্দ যেন ছুটে এল সমুদ্রের ধার থেকে। কিংবা অনন্ত জলরাশির অন্তর থেকেই!
পৃথিবীতে এমন কোনও শব্দ নেই— যার সঙ্গে তুলনা হতে পারে সেই অলৌকিক শব্দের, শরৎ নিশ্চিত।
সাইক্লোন বস্তুটি সমুদ্রের উপর যে কী রূপ ধারণ করে কী ভয়ংকর কাণ্ড ঘটাতে পারে, তা শরৎ সমস্ত রাত হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। রাত বারোটার মধ্যে ঝড়—বৃষ্টি থেমে গেল বটে, কিন্তু সমুদ্রের রাগ সহজে পড়ল না।
মিস্ত্রি আর টগর কেমন আছে? বেঁচে আছে তো? শরৎ স্বচক্ষে দেখার জন্য সকালের আলো ফুটতেই নিচে নেমে এসেছে।
নিচে নেমে শরৎ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এ কাবুলির ঠোক্কর নয়— যে—ঠোক্করে মিস্ত্রি, টগর আর কাবুলি সব সাড়ে বত্রিশভাজার মতো মিশে গিয়েছিল। এবং মুসলমানের সঙ্গে ওইভাবে একাকার হয়েও 'জাতবোষ্টমি' টগর নিজের জাত খুইয়ে বসেনি।
ভোরের আলোয় কোথায় মিস্ত্রি, কোথায় টগর?
শরতের মনে হচ্ছে, মেয়েরা শিলের উপর নোড়া দিয়ে যেমন করে বাটনা বাটে, গতরাতের সাইক্লোন ঠিক সেইভাবে তিন—চারশো লোককে সারারাত ধরে বাটনা বেটেছে!
বমি এবং আরও দু'টি কাজ করে এরা ডেক ভাসিয়ে দিয়েছে। দুর্গন্ধে টেকা দায়।
মেথর ও খালাসিদের দিয়ে ডাক্তার জাহাজ সাফ করাচ্ছে।
এদের মধ্যে শরৎকে বেশ তাজা দেখে ডাক্তার অবাক।
—কীভাবে এমন ফুটফুটে হয়ে রয়েছেন মশাই? কোনও হ্যামকট্যামক পেয়ে ঝুলে ছিলেন না কি? জানতে চায় বিস্মিত ডাক্তার।
—হ্যামক কোথায় পাব? পেয়েছিলুম একটা ভেড়ার খাঁচা। তারই আড়ালে আশ্রয় নিয়ে মন্দ কাটেনি রাতটা।
যাই হোক, এখন দুপুর। শরতের খিদে পেয়েছে। এবং সে উপরের ডেকের উপর বসে ব্রহ্মাণ্ডের সকল খাদ্যবস্তুর চিন্তা করছে।
সে বিন্দুমাত্র জানেও না, অচিরেই তার জীবনে এক অনন্য নারীর উদয় হবে। তার নারীভাগ্য ঈর্ষণীয়।
—বাবুমশাই, একটি বাঙালি মেয়েলোক আপনাকে ডাকতেচে, শরৎকে বলল এক মুসলমান যাত্রী।
শরৎ নিশ্চিত, টগর ছাড়া আর কেউ নয়, বলল, গিয়ে জানাও, ঘণ্টাখানেক পরে আসছি।
—ঘণ্টাখানেক অনেক দেরি হয়ে যাবে বাবুমশাই।
—কীসের দেরি! বিরক্ত শরৎ।
—বাবুমশাই, ওই মেয়েলোক বড় কাতর হয়ে আপনাকে ডাকতেচে।
শরতের খটকা লাগে। টগরকে কোনও অবস্থাতেই 'কাতর' ভাবতে পারে না সে।
—মেয়েলোকটির সঙ্গে পুরুষমানুষটি কেমন বলো তো?
মিস্ত্রির বর্ণনা পেলেই মেয়েমানুষটি যে 'টগর', সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
—আজ্ঞে, তেনাকে নিয়েই তো সমস্যা। তেনার খুব ব্যামো।
এই অবস্থায় মিস্ত্রির ব্যামো হতেই পারে। এবং একমাত্র মিস্ত্রির অসুখেই কিঞ্চিৎ হয়তো কাতর হতেও পারে টগর।
অতএব শরৎ আর বিলম্ব না করে, খিদে—তেষ্টা ভুলে, নিচের ডেকে যায়।
কিন্তু কোথায় টগর আর তার মিস্ত্রি!
মুসলমানটি শরৎকে নিয়ে এল এক বাইশ—তেইশ বছরের বাঙালি মেয়ের কাছে।
এ ক'দিন একে তো চোখে পড়েনি!
ডেকের এক কোণে, কতকগুলো কাছি বিড়ের মতো করে রাখা আছে। তারই ধারে একটা ময়লা, জীর্ণ শতরঞ্চির পাশে বসে আছে এই বাঙালি তরুণী।
আর শতরঞ্চির উপর চোখ বুজে মড়ার মতো পড়ে আছে এক অতিক্ষীণ যুবক। তারই অসুখ।
শরৎ কাছে যেতে মেয়েটি মাথার কাপড় টানল বটে, তবে বুদ্ধিদীপ্ত কপাল এবং সুন্দর মুখটি যেন সে ইচ্ছে করেই খুলে রাখল।
শরৎ দেখল, তার সিঁথিতে ডগডগে সিঁদুর। তার সুন্দর হাতটিতে নোয়া—শাঁখা। শরীরে কোথাও একটুকরো গয়না নেই। মেয়েটি পরে আছে নিতান্ত সাধাসিধে রাঙাপেড়ে শাড়ি।
একঝলক তাকিয়ে বেশ লাগল শরতের। কেমন যেন অন্যরকম।
হয়তো খুব সুন্দর নয়। 'অত্যন্ত সুন্দরী মেয়ে' বলতে বাঙালি যা বোঝে, তা হয়তো নয়।
কিন্তু মেয়েটির চোখে—মুখে—কপালে বুদ্ধির আলো। মেয়েটির অর্থের অভাব যতই প্রকট, তার ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ততই সাবলীল।
এই যুবতী অবহেলা করার জিনিস নয়, শরৎ তাকে পলকে দেখেই নিশ্চিত।
—আপনার সঙ্গে তো ডাক্তারবাবুর আলাপ আছে বলেই মনে হয়। একবার তাকে ডেকে আনতে পারবেন?
শরতের সঙ্গে কোনওরকম আলাপ নেই। এই তাকে প্রথম দেখল তরুণী।
তবু কী সহজে কথাগুলো বলতে পারল এক অপরিচিত পুরুষকে! শরৎ সত্যি অবাক।
—আলাপ আজই হয়েছে। তবে মনে হল ডাক্তার লোকটি বেশ। কিন্তু কী বলব তাকে? সমস্যাটা ঠিক কী?
শরৎ এবার তাকায় ক্ষীণকায় যুবকটির দিকে। শরতের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, পুরুষটি যুবতীর স্বামী।
—বাড়ি থেকেই তো তোমার একটু পেটের গোলমাল ছিল, তাই না? তরুণী যুবকটির মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে মৃদুকণ্ঠে জানতে চাইল।
শরতের ভুল ভাঙে। সে মুহূর্তে বুঝতে পারে, এই যুবক ও তরুণী স্বামী—স্ত্রী নয়। অন্তত, তারা একসঙ্গে থাকে না।
যুবক কোনও কথা বলল না। ইশারায় বোঝাল, তার পেটের অসুখ ছিলই।
তরুণী বলল, পেটের অসুখ দেশেতেই হয়েছিল। এখন দেখছি খুব জ্বর। ডাক্তার না দেখালেই নয়।
শরৎ অবিলম্বে ডাক্তার ডেকে আনে। ডাক্তার নিচে এসে রোগীকে পরীক্ষা করে। ওষুধ দেয়। তারপর শরতের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে বলে, আসুন আমার ঘরে। দু'টো গল্পগাছা করা যাক।
ডাক্তারের ঘর। চা খেতে খেতে গল্প হচ্ছে।
—আপনি ওদের মধ্যে জুটলেন কী করে? হঠাৎ প্রশ্ন করে ডাক্তার।
—স্ত্রীলোকটি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। উত্তর দেয় ঈষৎ চমকে ওঠা শরৎ।
ডাক্তারের কণ্ঠস্বরে এমন একটা ইঙ্গিত আছে, যা তাকে সামান্য ধাক্কা দিয়েছে।
—বিয়েটিয়ে করেছেন না কি? ডাক্তার ঢুকে পড়ে শরতের ব্যক্তিগত জীবনে।
—না, বলে শরৎ। সে কথা বাড়াতে চায় না।
—এখনও বিয়ে করেননি? বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন?
—ওই আর কী, আবার যত দূর সম্ভব এড়িয়ে যায় শরৎ।
—তা, বেশ! তবে সম্পূর্ণ নারীবর্জিত জীবন, এটা বিশ্বাস করতে পারছিনে, হেসে বলে ডাক্তার।
রাজলক্ষ্মীর কথা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়াই ভাল। শরৎ তাই করে। সে কোনও উত্তরই দেয় না।
শরতের উত্তরের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ডাক্তার। তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, তাহলে জুটে পড়ুন। নেহাত মন্দ হবে না। সঙ্গের লোকটার অবস্থা তো দেখলেন। ওই তো ক্ষীণ চেহারা! লক্ষণ দেখে তো মনে হয়, টাইফয়েড। বেশিদিন টিকবে বলে মনে হচ্ছে না। মেয়েটাকে নজরে নজরে রাখুন। দিব্য জিনিস। আর কোনও ব্যাটা না ভিড়ে যায় যেন। তবে একটা জরুরি কথা জানার চেষ্টা করুন, জুটে পড়ার আগে।
—এসব কী কথা? কী বলছেন আপনি? শরতের কণ্ঠে তিক্ততা।
—ঠিকই বলছি মশাই। মেয়েটার নজর পড়েছে আপনার ওপর। জাহাজে এত মানুষ থাকতে আপনাকে দিয়ে ডাক্তার ডাকল কেন?
—তাতে কী?
—তাতে অনেক কিছু। আপনি বেশ শক্তপোক্ত পুরুষ। এবং সঙ্গে কোনও মেয়েলোক নেই। বুঝছেন না? যাই হোক, আপনাকে একটা ব্যাপার এখুনি জানতে হবে।
—কোন ব্যাপার?
—ওই ছোঁড়াটা মেয়েটাকে বের করে এনেছে, না মেয়েটা ছোঁড়াটাকে?
ডাক্তারবাবুর এই প্রশ্নে মুহূর্তে শরতের মনটা বিষিয়ে গেল। আর একটা মুহূর্ত ডাক্তারের সান্নিধ্যে তার কাটাতে ইচ্ছে হল না। সে উঠতে যাচ্ছে, ডাক্তার বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হয়ে বলল, আরে, বসুন না মশাই, দু'চারটে রসের কথা না বলে একা একা সমুদ্রে ভেসে বেড়াই কী করে বলুন তো?
—রসের কথায় আমার আপত্তি নেই, কিন্তু কোনও কিছুই না জেনে ওই স্ত্রীলোকটিকে এইভাবে অপমান করা আমার রুচিতে লাগল। এই ধরনের রসের কথা আমার ঠিক ভাল লাগে না ডাক্তারবাবু, বলে শরৎ।
—আরে মশাই, আপনার অভিজ্ঞতা নিতান্তই কম। নারী—পুরুষের সম্পর্কের কতটুকু বোঝেন আপনি?
শরৎ অবাক হয়ে তাকায় ডাক্তারের দিকে। তার বিস্ময়ে মিশে যায় বিরক্তি।
ডাক্তার বুঝতে পারে, কথাটা শরতের পছন্দ হয়নি। বলে, এই জাহাজে যদি দু'চারটে ট্রিপ মারেন, বুঝবেন কেন বললুম কথাটা। প্রত্যেক ট্রিপেই দেখবেন, একটা না একটা আছেই। পরকীয়ার পাপ নিয়ে জোড়ায় জোড়ায় চলেছে বর্মা মুলুকে।
—বলেন কী! হঠাৎ বলে ফেলে শরৎ।
—তাহলে আর বলছি কী! বর্মায় গিয়ে নিজের চোখেই দেখবেন। অল্পবয়সি বিধবা আর সধবায় ভরে গিয়েছে মশাই। ছোঁড়াগুলোর সঙ্গে পালিয়ে আসে। কেউ স্বামী—স্ত্রী নয়। তবু একসঙ্গে থাকে। কেউ কেউ ওইভাবেই টিকে যায়। তবে বেশির ভাগ স্ত্রীলোকই শেষ পর্যন্ত পেটের দায়ে পুরনো ব্যবসার দিকেই পা বাড়ায়। তা' আপনি তো বিয়ে—থা করেননি। বর্মা তো আপনার স্বর্গ মশাই। মনের মতো কাউকে জুটিয়ে নিতে দেরি হবে না আপনার।
শরতের মুখে কথা সরে না। সে চুপ করে থাকে।
শরৎকে নীরব দেখে ডাক্তার বলে, আপনার ভালর জন্যই বললুম। নিচের ডেকের ওই মেয়ে মানুষটার দিকে নজর রাখুন। লোকটা কিন্তু বেশিদিন বাঁচবে না। তারপর মেয়েটাকে নিয়ে ছেঁড়াছিঁড়ি শুরু হবে। আপনি সোমত্ত পুরুষ। পারবেন মশাই, আপনি পারবেন। কাজে লাগান। বেচারিকে সুখ দিন। আপনার ভাল চাই বলেই এত কথা বললুম। তবে মেয়েটার পরিচয়টা আগে জানা দরকার। কত ঘাটের জল খাওয়া মাগি, সেটাও তো জানতে হবে।
সবকথা খোলসা করার পর ডাক্তারকে বেশ খুশি দেখায়। শরৎ মৃদুভাবে বলে, উঠলুম। একটু নিচের ডেকে যাই।
—অবশ্যই অবশ্যই। লোকটা কখন টেঁসে যাবে, কেউ বলতে পারে না। নজর রাখুন মশাই।
মনের মধ্যে একটা ঘিনঘিনে ভাব নিয়ে শরৎ নিচে এসে দেখে, নন্দ মিস্ত্রি আর টগর ফলাহারের ব্যবস্থা করছে।
মিস্ত্রির সঙ্গে শরতের চোখাচোখি হতেই সে প্রশ্ন করল, ওই মেয়েমানুষটা কে জানতে পারলেন?
সঙ্গে সঙ্গে টগর একেবারে ফোঁস করে উঠল, ওই মেয়েটার জন্য যে ভেবে ভেবে একেবারে হদ্দ হয়ে গ্যালে! মিনসের এই বয়েসে শখ কম নয়।
শরতের দিকে তাকিয়ে মিস্ত্রি বলল, দেখুন দেখুন, মাগির কী ছোট মন! একটা বাঙালি সোমত্ত মেয়ে রেঙ্গুনে যাচ্ছে, তা তার ভাল—মন্দের খবর নেব না?
মিস্ত্রির কথায় প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত টগর। সে শরৎকে বলল, দেখুন মশাই, এই টগর বোষ্টমির শরীরে ওর মতো গণ্ডা গণ্ডা মিস্ত্রি পার হয়ে গেল। ওর তো এখনও গলা টিপলে দুধ বেরয়! আমার চোখকে ধুলো দেবে নন্দ মিস্তিরি! যেই গিয়েছি জল আনতে, অমনি তুই ছুটে গেলি মাগিটার কাছে? কেন গিয়েছিলি তুই, আমি বুঝি না ভেবেছিস? ফের যদি যাস মিস্তিরি, তোর একদিন কি আমারই একদিন।
নন্দ কোথা থেকে এমন অবিশ্বাস্য সাহস পেল কে জানে! সে একেবারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বলল, শোন মাগি, তোর আমি পোষা বাঁদর না কি? তুই আমাকে শিকল দিয়ে যেদিকে টানবি সেদিকে যাব? আমার ইচ্ছে হলে আবার গিয়ে বেচারাকে দেখে আসব। আহা রে, কী অবস্থা!
মিস্ত্রিকে টগর এতটা বেপরোয়া হতে আগে দেখেনি! সে হতভম্ব হয়ে চুপ করে গেল।
শরৎ দেখল এদের মধ্যে আর থাকাটা ঠিক হবে না। সে নীরবে নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
তার মনে একটি ছোট্ট ভাবনা ক্রমে দানা বেঁধে উঠেছে। এইভাবে তাহলে টগর আর মিস্ত্রি গত বিশ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছে! টগর আজ কোনও প্রতিবাদ না করে চুপ করে গেল কেন?
নিশ্চয়ই অনেক পোড়খাওয়া মেয়েমানুষ সে। সারকথা অ্যাদ্দিনে বুঝেছে। কথাটা কী?
কথাটা হল, যেখানে সত্যিকার বন্ধন নেই, সেখানে হয়তো এইভাবেই রাত—দিন জোর করে দখল রাখতে হয়। কিন্তু রাখা যায় না, তা—ও বোঝে পোড় খাওয়া টগর।
কত পুরুষ এসেছে—গিয়েছে এই বিগতযৌবনা বোষ্টমির জীবনে। তার ভয়, মিস্ত্রিও না আলগা হয়ে খসে পড়ে। তাই হয়তো সে বেপরোয়া মিস্ত্রিকে আর উসকে দিল না।
শরতের মন হঠাৎ চলে গেল সেই নাম না জানা সুন্দরী যুবতীর কাছে। যার প্রতি ডাক্তার এমন কুৎসিত কটাক্ষ করল, যার প্রতি টগরের এমন বিদ্বেষ— কে সে?
কী তার পরিচয়?
কেনই বা রেঙ্গুনে যাচ্ছে সে?
জানতে চায় শরৎ। তাহলে কী...।
অনাম্নী অঙ্গনার ডাক এল অনেক রাতে।
এত রাতে কী দরকার হল? নিশ্চয় ওই লোকটির অবস্থা তেমন সুবিধের নয়।
শরৎ তাড়াতাড়ি নিচের ডেকে যায়। মেয়েটি সপ্রতিভভাবে বলে, আসুন শরৎবাবু, বসুন। আপনাকে কিছু কথা বলার আছে। আমি জানি, আমার কী পরিচয়, আমার সঙ্গের মানুষটিই বা কে, এসব জানার জন্য অনেকের মনেই কৌতূহল জেগেছে। সেটা কিছু অন্যায় নয়। তবে সবাইকে সব কথা বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আপনার কাছে কিছু লুকোতে চাই না।
শরতের ভাল লাগে বাঙালি মেয়ের এই অকুণ্ঠ আলাপ। অপ্রত্যাশিত। অবিশ্বাস্য। তাই এত ভাল।
আরও একটি ব্যাপার শরতের বেশ লাগে। মেয়েটি খোঁজখবর নিয়ে তার নামটি জেনে নিয়েছে।
সে বলে, দেখুন তো, আপনি বেশ আমার নামটি জেনে ফেলেছেন, অথচ...
—আমার নাম অভয়া। আর আমার সঙ্গের মানুষটির নাম রোহিণী। রোহিণী সিংহ। আমি উত্তর—রাঢ়ী কায়স্থ। আমার বাড়ি বালুচরের কাছে। আর রোহিণীবাবু আমার গ্রামসম্পর্কে ভাই। একটা সুখবর হল, ডাক্তারবাবুর চিকিৎসা ভাল। রোহিণীবাবু অনেকটাই সেরে উঠেছেন।
মেয়েটির প্রতি ডাক্তার ও টগর শরতের মনটাকে একেবার বিষিয়ে দিয়েছিল। তাই মনের মধ্যে একটা কঠোরভাব নিয়েই শরৎ অভয়ার কথা শুনতে আরম্ভ করল।
কিন্তু সে বুঝতে পারছে, অভয়ার বশ করার ক্ষমতাটি কম নয়। শরতের যে রীতিমতো ভাল লাগছে তাকে!
—তা, গ্রামসম্পর্কের অসুস্থ ভাইকে নিয়ে হঠাৎ বর্মা যাচ্ছেন কেন? কী এমন কাজ সেখানে? জানতে চায় শরৎ।
—সে কথা জানাতেই এত রাতে আপনাকে ডেকে পাঠালুম। জানি কষ্ট দিচ্ছি। তবু আপনার সাহায্যের বড় প্রয়োজন।
—আমি কী করতে পারি বলুন।
—একটা প্রতিশ্রুতি দেবেন?
—প্রতিশ্রুতি! শরতের বুকের ভিতর ঈষৎ কম্পন। কী প্রতিশ্রুতি চাইবে এই কুণ্ঠাহীন বাঙালি মেয়ে?
—আপনি প্রতিশ্রুতি দিন, আমার নিরুদ্দেশ স্বামীকে আপনি খুঁজে দেবেন।
শরৎ এতটাই বিস্মিত যে সে হতবাক।
অভয়া বলে, আট বছর আগের ঘটনা। আমার স্বামী বর্মায় চাকরি করতে গেল। বছর দুই চিঠিপত্রে যোগাযোগ রেখেছিল। গত ছ'—বছর আর কোনও যোগাযোগ নেই। চিঠি দিয়ে কোনও উত্তর পাইনি। সে কোথায়, বেঁচে আছে কি না, আমি জানি না।
—আপনার স্বামীর আত্মীয়—স্বজনদের কাছে খোঁজ—খবর নেননি? জানতে চায় শরৎ।
—তেমন কেউ নেই। মা ছিলেন। তিনিও মাসখানেক আগে মারা গিয়েছেন। বাপের বাড়িতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই রোহিণীদাদাকে রাজি করে বর্মা যাচ্ছি, যদি স্বামীর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়।
—আপনার স্বামী কী কাজ করতেন?
—বর্মা রেলওয়েতে চাকরি পেয়ে চলে যান।
—থাকতেন কোথায়?
—রেঙ্গুনেই থাকতেন। একটা জরুরি কথা আপনাকে বলা হয়নি।
—কোন জরুরি কথা?
—আমার চিঠির কোনও উত্তর পাইনি বটে, কিন্তু গত ছ'বছর আমার কোনও চিঠি ফিরেও আসেনি।
শরৎ একটু হেসে বলল, তাহলে একটা সুখবর দিই। আপনার স্বামী বেঁচে আছেন।
—প্রতিশ্রুতি দিন আপনি আমার স্বামীকে খুঁজে দেবেন।
—খুঁজে দিতে পারব কি না জানিনা অভয়া। কিন্তু সঙ্গে থাকব।
আমি আপনার সঙ্গে থাকবো, শরৎ এই—কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই অভয়া খপ করে তার হাতটা চেপে ধরল।
এত সহজে একটি সোমত্ত বাঙালি মেয়ে একজন পরপুরুষের হাত চেপে ধরতে পারে!
কিন্তু তবু কেন তেমন খটকা লাগল না শরতের। কেন মনে হল না, মেয়েটার চরিত্তির—টরিত্তির বলতে সত্যি কিছু নেই।
পুরুষকে কাজে লাগবার আদিবিদ্যে সে ভালই রপ্ত করেছে বটে।
অভয়ার এই আকস্মিক স্পর্শটুকু বেশ লাগল শরতের। মনে হল সে যেন অনেকদিনের চেনা।
হঠাৎ রাজলক্ষ্মীর কথা মনে এল তার। রাজলক্ষ্মী কি পারত এত সহজে, এমন স্বাভাবিকভাবে শরতের হাতের উপর হাত রাখতে?
—আপনি কী ভাবচেন আমি জানি, বলল অভয়া।
সত্যি বিস্মিত শরৎ। মেয়েটি যে বুদ্ধিমতী, সন্দেহ নেই। সম্পূর্ণ অপরিচিত যুবা পুরুষের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়ার কায়দাটি ভালই রপ্ত করেছে।
—কী ভাবছি বলে মনে হয় আপনার?
—যে—কথা পুরুষের মনে হল, সে—ভয় কি মেয়েমানুষের মনে আসবে না? বলে অভয়া।
—কী বলতে চাইছেন?
—যা ভাবছেন আপনি। আমি সতীন নিয়ে ঘর করতে পারব কি না?
শরতের মনের হাজার মাইলের মধ্যেও আসতে পারেনি অভয়া। সে কিন্তু অভয়াকে তার ভাবনার আভাসটুকুও দিল না। দিতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়। রাজলক্ষ্মীর প্রসঙ্গও এসে পড়বে। কী প্রয়োজন? কথায় কথা বাড়ে।
অভয়ার তর সইল না শরতের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করার। বলল, ভয় নেই শরৎবাবু। আমি সতীনের সঙ্গে ঘর করতে রাজি।
—বেশ, তা তো হল, তবে....
শরৎকে কথা শেষ করতে দিল না অভয়া। বলল, ভাবছেন আমার সতীন যদি রাজি না হয়.... শরৎবাবু, বুঝছেন তো, রোহিণীদাদা বড্ড ভালমানুষ। এ ব্যাপারে সে কোনও সাহায্য আমাকে করতে পারবে না। আমার এই বিপদে আপনিই একমাত্র ভরসা।
শরৎ তাকিয়ে দেখে অভয়ার সুন্দর চোখ দুটি কান্নায় ভরে গেছে।
শরতের বুকের ভেতরটা বেশ হালকা লাগল। সে অভয়ার মধ্যে দুটি জিনিস দেখতে পেয়েছে, বুঝতে পেরেছে।
এক, অভয়া ঘনিষ্ঠতার মুহূর্তেও নিস্পৃহ। সে শরতের হাতের উপর হাত রেখেও দূরত্বের ভাবটি বজায় রাখতে পেরেছে। কোনওভাবে না জড়িয়ে পড়ে, সেই বিষয়ে বেশ সচেতন। দুই, সে পুরুষের মতো, সংকোচহীনভাবে এগিয়ে যেতে পারে, কোনও কাজে তার আড়ষ্টতা নেই।
অভয়াকে ছুঁতে ইচ্ছে হল শরতের। রাজলক্ষ্মীর কথা তার মনে উদয় হল না, এমন নয়।
কিন্তু কোনও অপরাধবোধ ছাড়াই সে হাত রাখল অভয়ার হাতে।
অভয়া হাত সরিয়ে নিল না। কোনওরকম সংকোচও নেই তার মধ্যে।
শরৎ বলল, আমি আপনাকে সাহায্য করার সব রকম চেষ্টা করব। কিন্তু চেষ্টা করলেই যে সফল হব, তা ধরে নেবেন না।
অভয়া তাকায় শরতের দিকে। বলে, আমার গা ছুঁয়ে বললেন কিন্তু, সাহায্য করবেন।
শরৎ হেসে ফেলে। বলে, আপনার গা ছুঁয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভাঙলে, আপনি মরবেন, আমার কী তাতে?
বলেই শরৎ বুঝল, রসিকতাটা বড় নিষ্ঠুর হয়ে গেল বোধহয়। অভয়া কিন্তু হেসে বলল, জানি, আমার মরা—বাঁচায় আপনার কিছু এসে যায় না, তা সত্ত্বেও সাহায্য করবেন তো?
—কথা দিয়ে কথা রাখাটা আমার বদস্বভাব। তবে এসব বিষয়ে বাইরের লোক দিয়ে কাজ হওয়া কঠিন। শেষে আমার অকাজ না আপনাকেই সামলাতে হয়।
—আপনি আর যাই হোক, অকাজের লোক নন। এইটুকু বোঝার মতো বোধবুদ্ধি আমার আছে শরৎবাবু।
রেঙ্গুনে পৌঁছতে আর বিশেষ দেরি নেই। পরের দিন ভোরবেলাতেই জাহাজের ঘাটে লাগবার কথা।
অভয়ের কথা শেষ হতে না হতেই চারিদিকে রব উঠল। কেরেন্টিন। কেরেন্টিন।
যাত্রীদের মধ্যে শুরু হল দৌড়ঝাঁপ। এবং ছড়িয়ে পড়ল ত্রাস। ক্রমশ জানা গেল, 'কেরেন্টিন' শব্দটি আসলে ‘quarantine’। পাছে ভারত থেকে প্লেগ বর্মাতেও ছড়িয়ে পড়ে, সে—ব্যাপারে বর্মার সরকার অত্যন্ত সাবধান।
সুতরাং জাহাজ থেকে নেমেই ডেকের গরিব ভারতীয় যাত্রীরা সরাসরি শহরে ঢুকতে পারবে না।
তাদের বর্মায় প্রবেশ করার জন্য হেলথ অফিসারের ছাড়পত্র জোগাড় করতে হবে।
যতদিন না তারা ছাড়পত্র পাচ্ছে, ততদিন তাদের থাকতে হবে শহর থেকে আট—দশ মাইল দূরে।
সেখানে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে খানিকটা জায়গা আলাদা করা হয়েছে। অনেকগুলো কুঁড়েঘরও তৈরি হয়েছে।
সেখানে জাহাজের গরিব যাত্রীদের নির্বিচারে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
দশদিনের মধ্যে যদি তাদের কারও মধ্যে প্লেগের লক্ষণ না দেখা দেয়, তবেই তারা শহরে যেতে পারবে।
ইতিমধ্যে ডাক্তারবাবুটি ডাক দেয় শরৎকে। বলে, শুনুন মশাই, ওই কোয়ারেনটাইনের কষ্ট আপনি সহ্য করতে পারবেন না। কসাইখানার গরু—ছাগল—ভেড়াকেও এত কষ্ট পেতে হয় না। তবে ছোটলোকেরা কোনওরকমে সহ্য করে।
—এই অন্যায়ের তো একটা বিহিত হওয়া দরকার, বলে শরৎ।
—অন্যায়ই বা বলি কী করে বলুন? কলকাতায় তো প্লেগ ভয়ংকর আকার নিয়েছে। সাবধান তো হতেই হবে। তবে আপনি যাতে কষ্ট না পান, সে ব্যবস্থা আমি করব। কিন্তু মায়া করে ওই মাগি আর তার পুরুষটাকে আবার সঙ্গে নেবার চেষ্টা করবেন না। ওর ঢলানিপনা আমার একেবারে ভাল লাগছে না মশাই। শরতের মনটা ডাক্তারের প্রতি আবার বিষিয়ে ওঠে। কিন্তু সে কোনওভাবে তার মনের ভাব জানতে দেয় না ডাক্তারকে।
পরের দিন। বেলা এগারোটা হবে। একটা স্টিমার এসে ভিড়ল জাহাজের গায়ে।
ওখান থেকেই যাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হবে সেই ভয়ঙ্কর জায়গায়।
রেঙ্গুন থেকে মাইল দশেক দূরে। জিনিসপত্র বাঁধাছাদার ধুম পড়ে গেল। হই—হই। চেঁচামেচি। ঠেলাঠেলি।
ডেকের যাত্রীদেরই শুধু নিয়ে যাওয়া হবে। যারা দশ টাকার বেশি ভাড়া দিতে পারেনি। শরৎ তো সেই ডেক যাত্রীদের একজন।
অথচ তার কোনও তাড়াহুড়ো, ভয়ডর নেই। নেই তার চোখেমুখে অনিশ্চয়তার চিহ্ন। ডাক্তারবাবুর লোক এসে এইমাত্র জানিয়ে গেছে, তার জন্যে 'ব্যবস্থা' হয়েছে।
তাকে স্টিমারে করে সেই ভয়ঙ্কর জায়গায় অন্তত দশদিনের জন্যে যেতে হবে না!
—কী ব্যাপার আপনার? নিশ্চিন্তে বসে আছেন যে! জিনিসপত্তর গুছিয়ে নেবেন না? অভয়া এসে দাঁড়ায় শরতের সামনে।
—আমার জন্যে অন্য ব্যবস্থা হয়েছে। একেবারে শহরে গিয়েই নামব।
—না, তা হতে পারে না। এখুনি জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিন। আমাকে ছেড়ে আপনি কোথাও যেতে পারবেন না।
—তা কী করে হয়? আমার কোয়ারেনটিনে যাবার প্রয়োজন নেই। আমি সরাসরি শহরে যাবার ছাড়পত্র পেয়েছি।
—ছিঁড়ে ফেলুন ওই ছাড়পত্র। আপনি আমাকে একলা ফেলে চলে যাবেন! যদি সত্যিই যান, আমি কিন্তু জলে ঝাঁপ দেব।
শরতের মনে সন্দেহ নেই, কথাটা সত্যি। সে যদি অভয়াকে ছেড়ে যায়, অভয়া সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এই বিদেশবিভুঁয়ে শরৎ ছাড়া অভয়া বাঁচতে পারবে না। তার চেয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়াই ভাল।
শরৎ বুঝল তার পালাবার পথ নেই। অভয়ার দায়িত্ব তাকে নিতেই হবে।
বিধাতার অদৃশ্য হাত তাদের কিছুদিনের জন্যে অন্তত এক সুতোয় গেঁথে দিচ্ছে।
—উঠুন উঠুন। আমার সঙ্গে নীচে চলুন। আপনি না থাকলে অসুস্থ রোহিণীদাদাকে নিয়ে আমি একা মেয়েমানুষ একেবারে অচেনা অজানা বিদেশে সামলাবো কী করে?
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার আগে এমন বিপদ যে হতে পারে, সেকথা ভাবেননি কেন? আর এখন সব দায়দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন? শরৎ মনে—মনে ভাবল বটে একথা। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারল না।
সে সত্যিই নীরবে নিজের জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিয়ে স্টিমারে উঠে পড়ে তারপর অভয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
অভয়া শরতের হাত ধরে স্টিমারে ঢুকে পড়ে। তারপর রোহিণীকে স্টিমারে উঠতে সাহায্য করে শরৎ।
—আরে শরৎবাবু, তাড়াতাড়ি নেমে পড়ুন। স্টিমার যে এখুনি ছেড়ে দেবে। আপনি উঠতে গেলেন কেন? ডাক্তার চিৎকার করে জাহাজের ডেক থেকে।
—আপনার সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু। কিন্তু ওঁর হুকুম যে মানতেই হল, অভয়ার হাতটি ধরে বলে শরৎ।
ডাক্তারের মুখে একটা কুৎসিত ঈর্ষার হাসি ফুটে ওঠে।
সে চিৎকার করে বলে, ছেনালিতে ভুলে গেলেন?
মাথার উপর গনগনে সূর্য। পায়ের নীচে ধু ধু বালির আগুন। শরৎ হাঁটছে।
কোথায় কোনও অচেনা পরিবেশে এই হাঁটার শেষ হবে সে জানে না।
তার এক কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছে অভয়া। অন্য কাঁধে হাল ছেড়ে এলিয়ে পড়েছে রোহিণী।
মালপত্রের বোঝা কিছুটা শরতের হাতে। কিছুটার ভার নিয়েছে অভয়া।
শরতের মন বিরক্তি ও বিতৃষ্ণায় ভরে গেছে। তার এই অবস্থার জন্যে সে নিজেই দায়ী।
বিপদে পড়েছে এক সুন্দরী নারী। তাকে সাহায্য করার লোভ কেন সামলাতে পারল না শরৎ?
এ তো তার চরিত্রের দুর্বলতা। অভয়া যদি সুন্দরী তরুণী না হত? যদি তার ব্যক্তিত্বের আকর্ষণের সঙ্গে না মিশে থাকত সারাক্ষণ ঝলমলে স্পষ্ট ব্যবহার, তাহলে কি শরতের মনে এমন পরোপকারের ভাবটি জাগতো?
শরৎ নিজেকে ধিক্কার দেয় তার এই বিশুদ্ধ গাধামির জন্যে। তারপর ভাবে, শুধুই কি আমি ত্রিসংসারে নিরেটতম গর্দভ? হাড়হাবাতে বোকা? না না, তা কেন?
সে নিজের কাছে মনে মনে স্বীকার করে, অভয়ার ব্যবহারে, খোলামেলা সাহসী স্বভাবে সে পেয়েছে নষ্টামির আভাস, ইঙ্গিত, ইশারা!
সে নিজে নষ্টপুরুষ। নারী অভিজ্ঞতা তার কম নয়। বাইজি, বেশ্যার সঙ্গ সে পেয়েছে।
যত পেয়েছে, তার লোভ বেড়েছে। নষ্ট মেয়েদের আঁচ অন্য রকম। ও জিনিস গায়ে লাগা মাত্র মন ছ্যাঁক করে ওঠে।
তাঁর মনে পড়ে রাজলক্ষ্মীকে। কী করছে সে? নিশ্চয়, ঠাকুর ঘরে বসে পুজো করছে না। কোনও ধনী বাবুর সেবায় সারারাত নিজেকে সমর্পণ করে এখন হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে রাজলক্ষ্মী।
রাজলক্ষ্মীর ঘুমন্ত চেহারাটা তার মনের মধ্যে ফুটে ওঠে। থই—থই করছে তার আঁচলসরা রূপ!
নষ্ট মেয়েদের নিদ্রায় ভিন্ন জাতের এলোমেলোমি। সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও অজানতে দান করে পুরুষকে!
এমন নিদারুণ বিপর্যয়ের মধ্যেও এই ভাবটি মনের মধ্যে এল কী করে! শরৎ অবাক হয়।
—কী হল? কী ভাবছেন?
অভয়ার প্রশ্নে শরৎ তাকায় তার দিকে।
কী আশ্চর্য! কোথায় অভয়া লজ্জার কৃতজ্ঞতার মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। করুণা ভিক্ষা করবে। তা না করে সে হাসছে!
এমন বেপরোয়াভাবে লজ্জাহীন কোনও নারী হতে পারে?
—আমি জানি কী ভাবছেন। ভাবছেন, আমার পাল্লায় পড়ে খুব ঠকেছেন। এই তো সবে শুরু শরৎবাবু। এবার কোন নরকে নিয়ে যাই দেখুন।
শরতের মুখে কথা নেই। তার শুধু মনে হয়, এই পল্লিবাসিনী তার অন্য কোনও চেনা মেয়ের মতো নয়।
—শুনুন শরৎবাবু, আপনি সত্যি কিন্তু খুব ঠকেননি। আপনি অনায়াসে আমাদের ফেলে ওই ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু গেলেন না। এরই নাম দান। এতবড় দান করার সুযোগ জীবনে খুব বেশি আসে না। সে—সুযোগ গ্রহণ করে আপনি ঠকেছেন ভাববেন না। আমার সঙ্গে নরকবাস আপনার খারাপ নাও লাগতে পারে। আপাতত জিনিসপত্তরের বোঝা নামান। সব ফেলে আমার হাতটা ধরুন তো। এরপর যা করবার আমি করবো।
কিছুক্ষণ হল শরৎ, অভয়া, রোহিণী সম্ভাব্য প্লেগ রোগীদের জন্যে রেঙ্গুন শহর থেকে দূরে যে আলাদা ব্যবস্থা হয়েছে, সেখানে পৌঁছেছে। রোহিণীকে ঘাড় থেকে নামিয়ে শরৎ শরীরে—মনে ভেঙে পড়ল। তার দাঁড়াবার শক্তি নেই।
অভয়া তার ছোট্ট বাক্সটি থেকে গুটি কয়েক টাকা বার করে বলল, আমার অনেক কাজ। আমি চললেম। প্রথমেই একটা ভাল ঘর জোগাড় করতে হবে। তারপর আমাদের জিনিসপত্তরগুলো ওই মরুভূমি থেকে নিয়ে আসতে হবে। তারপর রান্না করে আপনাদের দুজনের মুখে কিছু দিতে পারলে আমার ছুটি।
—অভয়া, তা হয় না, অ্যাতো কাজ, অ্যাতো জোগাড় তুমি একা পারবে না। আমিও হাত লাগাচ্ছি, চলো।
এই প্রথম শরৎ তুমি বলল অভয়াকে। মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল। শরৎ নিজেকে শোধরাবার চেষ্টা করল না।
—না শরৎবাবু, আমার মাথা খাও, উঠোনা। রোহিণীকে সারা পথ তুমি বয়ে এনেছ। তোমার হাল কী হয়েছে বুঝিনে ভাবছো?
কী সহজ স্বাভাবিকতায় শরৎ—কে 'তুমি' ফেরত দিল অভয়া! শরৎ হাত বাড়ায় অভয়ার দিকে।
অভয়া এগিয়ে আসে শরতের কাছে। তার মাথায় মুহূর্তের জন্যে হাত রাখে। ক্ষণিক স্পর্শের প্রণয়। অভয়া দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
এই মেয়েটি কি সত্যিই তার স্বামীকে খুঁজতে এসেছে? না কি এই সংবাদটি তার নিশ্চিতভাবে পাওয়া আরও জরুরি, যে তার স্বামী মৃত। এবং সে মুক্ত।
রোহিণীর সঙ্গে অভয়ার কেমন সম্পর্ক? রোহিণী সিংহ তার গ্রামের ছেলে। ভাইয়ের মতো। ব্যস, এইটুকু। সে অমনি রাজি হয়ে গেল অভয়ার সঙ্গে রেঙ্গুনে চলে আসতে?
তারপর?
ধরা যাক, অভয়ার স্বামীকে খুঁজে পাওয়া গেল না। অভয়াকে নিয়ে সে দেশে ফিরতে পারবে?
সমাজে অভয়ার স্থান কোথায় হবে, ভাবতে শিউরে ওঠে শরতের মন।
অভয়ার স্বামী মৃত, এই সংবাদ, সত্য হোক, মিথ্যা হোক, তা প্রচার করে বিধবা অভয়াকে বিয়ে করে হয়তো সংসার করার একটা পথ খুঁজে পাবে রোহিণী।
কিন্তু অভয়া রাজি হবে? যদি কোনওদিন ফিরে আসে তার স্বামী?
কিন্তু কেন এসব ভাবছে শরৎ? তার কী? দেশে তার ভাত জুটছে না। সে রেঙ্গুন এসেছে যে—কোনও রকমের একটা চাকরি জোটাতে। লেখালিখি করে হয়তো কিঞ্চিৎ নাম হয়। কিন্তু তাতে তো দুবেলা ডাল—ভাত জোটে না।
রাজলক্ষ্মীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে শরৎ তার সঙ্গে পাটনাতে সংসার পাততেই পারত। দুজনের চলে যেত। লেখালিখি করে ক্রমে ক্রমে হয়তো কিছু উপার্জনও হত।
কিন্তু শরতের আত্মসম্মানবোধ বাধা দিল। রাজলক্ষ্মী কোনপথে, কত নিত্য অপমান আর আত্মপীড়ার মধ্যে উপার্জন করে, শরৎ জেনেছে। সেই টাকায় খেয়েপরে সে বেঁচে থাকবে?
এর চেয়ে মৃত্যু ভাল। তাকে রেঙ্গুনে একটা চাকরি জোগাড় করতেই হবে।
হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এসে পড়ল তার জীবনে অভয়া? অভয়ার সঙ্গে কোনওভাবে জড়িয়ে পড়লে চলবে না।
কারও সঙ্গে জড়াতেই যদি হয়, তাহলে কী দোষ করল রাজলক্ষ্মী? শরতের প্রতি তার প্রেমে তো কোনও খাদ নেই। বালিকা বয়েস থেকে রাজলক্ষ্মী নীরবে ভালবেসে এসেছে শরৎ—কে।
পিয়ারি বাইজি হয়েও সেই প্রেম সে বাঁচিয়ে রেখেছে। বাবুদের দেহ দিয়েছে। কিন্তু সেই জোর করে দেওয়ার মধ্যে এতটুকু ভাল লাগাও থাকেনি। ভালবাসা তো দূরের কথা।
অভয়ার সান্নিধ্য রাজলক্ষ্মীর প্রেমকে অপমান করছে, শরৎ নিজেকে বোঝাতে চায়।
হঠাৎ তার মনে হয়, অভয়া আসলে তার স্বামীকে খুঁজতে আসেনি। সে খুঁজতে এসেছে স্বামীর মৃত্যুসংবাদ।
সে নিশ্চিত হতে চায়, স্বামীটি বেঁচে নেই। এমনকী রোহিণী সেরে উঠুক, বেঁচে থাকুক, তা—ও অভয়া চায় না। সে কামনা করছে রোহিণীরও মৃত্যু।
সে তো শরৎ—কে পেয়ে গেছে। আর রোহিণী সিংহকে প্রয়োজন নেই তার।
অভয়ার ওই ক্ষণিক স্পর্শটুকু এতখানিই জানিয়ে গেছে শরৎ—কে। অভয়ার বন্ধন থেকে তার বেরবার পথ নেই। সত্যিই কি বেরতে চায় শরৎ?
—আসুন, আপনাদের ঘর তৈরি হয়েছে বাবু, খবর দিল এক চাপরাসি।
রোহিণীকে সঙ্গে নিয়ে শরৎ পৌঁছল তাদের নতুন ঘরে।
—দ্যাখো তো, পছন্দ হয়েছে তো? নেহাৎ নরক নয়, কী বলো শরৎবাবু? হেসে জিজ্ঞেস করে অভয়া।
স্নান সেরে ভারি টাটকা দেখাচ্ছে তাকে। ছিপছিপে কোমরে আঁচল জড়িয়ে সে ঘর ঝাঁট দিচ্ছে।
ইতিমধ্যে সব জিনিসপত্র পরিপাটি করে গোছানো!
ঘরের মাঝখানে দুটি খাটিয়া। খাটিয়ায় দুটি পরিচ্ছন্ন বিছানা তৈরি।
—খাটিয়ায় তোমার আর রোহিণীদাদার ব্যবস্থা। আমি মেঝেতে মাদুর কম্বলে কাজ চালিয়ে নেব। এখন রোহিণীদাদাকে শুইয়ে তুমি মাথায় দু—ঘটি জল ঢেলে এসো। এবেলার মতো চারটি ডালে—চালের ব্যবস্থা করছি, বলে অভয়া।
শরৎ তাকায়। অভয়ার দু—চোখ খুশিতে ভরে গেছে। কী আলোকময় দৃষ্টিপাত! এরই নাম প্রণয়। এরই নাম রতি। শরৎ জানে নারীর এই রূপ। এই রূপ তাকে বিহ্বল করে।
বাঙালি মেয়ের কাছে শরতের শেখার শেষ নেই। সে নিশ্চিত, লেখকই হতে পারত না, যদি না ভাগ্য তাকে বারবার নিয়ে যেত বঙ্গবালার সান্নিধ্যে, যদি না তাকে জড়িয়ে দিত বাঙালি মেয়ের সঙ্গে নানাবিধ সম্পর্কের ওঠাপড়ায়, উষ্ণতায়।
প্রতিটি বাঙালি মেয়ের জীবন কী গহন বেদনায় বিন্যস্ত! তার নাম কখনও রাজলক্ষ্মী, কখনও পিয়ারিবাই, কখনও অভয়া, কখনও টগর।
শরৎ এই ব্যথার হৃদয়কথা বোঝে। সে নিজের মধ্যে শুষে দিতে পারে বাঙালি নারীর মনের নির্যাস।
বাঙালি মেয়েই তাকে লেখক করেছে, শরৎ শতকণ্ঠে স্বীকার করে তার ঋণ।
ভাগ্যিস সে অভিজাত লেখকদের মতো চরিত্রধুয়ে খায়নি। সমাজের তলানির বাঙালি রমণীকে জানতে সে চরিত্র খুইয়েছে খোলামকুচির মতো। চরিত্রহীন শরৎচন্দ্রের মনে কোথাও নেই এতটুকু পাপবোধ, চিলতে শোচনা।
কথাটা ভেবে সে মনে মনে হাসে। কিঞ্চিৎ অহংকারও ঝিলিক মারে মনে।
আর ঠিক এই মুহূর্তে অভয়ার একটা কথা তার মনে পড়ে। ঘরে কেউ নেই। সে আর অভয়া। বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে সন্ধের দিকে।
সারাদিন নিরলস খাটুনির পর অভয়ার সারা শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ক্লান্তি। ক্লান্তিও যে এমন স্নিগ্ধ, সুন্দর হতে পারে, অভয়ার দিকে তাকিয়ে সেই প্রথম বুঝতে পারল শরৎ।
অভয়া তাকায় শরতের পানে। তার চোখে চোখ রাখে। নামিয়ে নেয় না দৃষ্টি।
আর কোনও মেয়ে এইভাবে শরতের মনের কথা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেনি। এমনকী রাজলক্ষ্মীও নয়।
অহেতুক দ্বিধা, কুণ্ঠা, লজ্জা তাদের পেয়ে বসে।রাজলক্ষ্মী বাইজি। তবু সে পিয়ারিবাইয়ের মধ্যে বাঙালি মেয়ের এই শরম, এই ব্রীড়াকে নাশ করতে পারেনি।
পুরুষের চোখে সংকোচহীন দৃষ্টিপাতের সাবলীল সাহস শরৎ অভয়া ছাড়া আর কোনও মেয়ের মধ্যে এখনও দেখেনি।
শরৎকে দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে অভয়া । সে কি জানে না, সরে গেছে তার বুকের আঁচল? সে কি জানে না, বাঁ ধারের আঁচলের সামান্য স্রংসন খুলে দিয়েছে তার লবঙ্গলতা শরীরের নমন, তার গভীর নাভিকূপের নিরুপমতা?
অভয়ার শরীরে কোথাও নেই এতটুকু বাড়তি মেদ।
তবু তার ক্ষীণকটি কার্পণ্য করেনি ত্রিবলীর ইন্দ্রিয়ময়তা ফুটিয়ে তুলতে।
শরৎ লক্ষ করে, অভয়ার শরীর বাড়তি মেদ বর্জন করেও তাকে করেছে নিতম্বিনী। অভাব রাখেনি তার দুটি রূপের পরিপূর্ণ পুষ্টিতেও।
অভয়া এসে দাঁড়ায় শরতের শরীর—ছোঁয়া—কাছে। শরতের মনে হয়, এক মারাত্মক মোহ তাকে গ্রাস করছে।
মনে হয়, এই মোহের মধ্যে সব ভুলে ডুবতে পারলে, সার্থক হবে তার জীবন।
অভয়া জড়িয়ে ধরে শরৎকে। তার বুকে মাথা রাখে। শরতের মনে হয়, পৃথিবীর ভিতর থেকে ছলাৎ করে উঠে এল গরম তরল আগুন।
কিন্তু শরৎ বিস্মিত হয় অভয়ার কথায়। সে বলে অন্য এক 'মারাত্মক মোহের' কথাই!
শরৎ অভয়াকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে তার মনের ডায়রিতে টুকে রাখে অভয়ার এই কথাগুলি : শরৎবাবু, দুঃখভোগ করার মধ্যে একটা মারাত্মক মোহ আছে। মানুষ তার বহু যুগের জীবনযাত্রার পথে এইটুকু সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছে যে, কোনও বড় ফলই বড় রকম দুঃখবোধ ছাড়া পাওয়া যায় না। জীবনে এত দুঃখ পেয়েও কোন বিশ্বাসে বেঁচে আছি জানো? আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, জীবনের মানদণ্ডে একদিকে যতো বেশি দুঃখের ভার বাড়বে, অন্যদিকে একদিন আনন্দের ভারও জড়ো হবে।
এরপর অভয়া শরতের বুক থেকে মাথা তুলে নেয়। কিছুটা যেন বেরিয়ে আসে পারস্পরিক নিবিড়তা থেকে।
শরতের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসে। বলে, ভেবো না, আমি তোমার এই মুহূর্তের বাসনা বুঝতে পারছিনে। আমার ইচ্ছেও তোমার ইচ্ছে থেকে খুব দূরের নয়। কিন্তু স্বাভাবিক প্রবৃত্তির স্বেচ্ছা বর্জনের মধ্যেই যে সুখ গো। যে—সুখ দুঃখমুক্ত। যে—সুখ চিরদিনের।
শরৎ তীব্রভাবে প্রেমে পড়ে বটে। কিন্তু তার বাউণ্ডুলে স্বভাব তার নিস্পৃহা, তার উদাসীনতা এবং নিজেকে কষ্ট দেওয়ার নিরন্তর ক্ষমতা তাকে কোনও সম্পর্কে লিপ্ত হতে দেয় না।
অভয়া যখন তার রোহিণীদাদার সঙ্গে আলাদা ঠিকানায় থাকবার সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে গেল, শরতের বুকের শিরা ছিঁড়ে গেল বটে। কিন্তু সে ওদের নতুন বাসায়, নতুন ঘরকন্নার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে নিজে উঠল শহরের অন্য দিকে দাদাঠাকুরের হোটেলে।
সেই দিনই রাত্তিরে শরৎ তার নোটবুকে লিখে রাখল, আমার মনের মধ্যে যে অভয়া ও তার রোহিণীদাদার সম্পর্কের ব্যাপারে কোনও গ্লানি নেই, তা বলতে পারছি না। কিন্তু এই অপবিত্র চিন্তাটাকে বিদায় করতে আমার বেশি সময় লাগল না।
রেঙ্গুনের রাজপথে বেরিয়ে পড়লুম আশ্রয়হীনভাবে। একটি আশ্রয় খুঁজে বার করার জন্য হাঁটছি তো হাঁটছি। তখনই অভয়া আর রোহিণী সম্বন্ধে মনে হল, কোনও দুটি বিশেষ বয়সের নরনারীকে কোনও একটা বিশেষ অবস্থার মধ্যে দেখতে পাওয়া মাত্রই একটা বিশেষ সম্বন্ধ কল্পনা করা খুব বড় ভ্রান্তিও তো হতে পারে।
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা তো সেই কথাই শিখিয়েছে। সুতরাং আপাতত ভবিষ্যতের জটিল ভাবনা ভবিষ্যতের হাতেই ছেড়ে দিলুম।
এখন আমার সবচেয়ে বড় কাজ নিজের ভার নিজের কাঁধে তুলে একটা আশ্রয় ও একটা চাকরি জোগাড় করা।
আশ্রয় তো জুটল। দাদাঠাকুরের হোটেল। চাকরি পাওয়াটা যে অত সহজ হবে না, সেটা শরৎ জানে।
আশ্চর্য! অভয়ার জন্য মনকেমন সে কিছুতেই সামলাতে পারছে না। শরৎ ভাবে, অভয়া আর রোহিণীদাদা এখন একই ঘরে।
তার মনে পড়ে কদিন আগে তার সঙ্গে অভয়ার নিবিড় কয়েকটি মুহূর্ত। সে অনুভব করে অভয়ার সারা শরীরের ছিপছিপে প্রবাহ। তার ঘন উত্তাপ। তার নরম গলন। বুকের উপর তার গভীর সমর্পণ!
শরৎ কষ্ট পায়। চাপা ঈর্ষার দহন তাকে পোড়াচ্ছে। তারপর ক্রমশ মনে হয়, এই দহন, এই জ্বালা, এই বেদনার মধ্যে কোথাও যেন সূক্ষ্মভাবে মিশে আছে মাধুর্য!
যে পেল, সে কতটুকুই বা পেল!
যে পেল না, সে কত বেশি পেল না!
জিতলুম তো আমিই! আমাকেই জিতিয়ে দিল অভয়া।
অভয়া, আমার প্রণয়ে মিশে রইল চিরদিনের স্মরণ, স্বীকার, ঋণ, মনে—মনে বলে শরৎ।
পনের—ষোলো দিন কেটে গেছে। শহরের এক প্রান্তে শরৎ। অন্য প্রান্তে অভয়া আর তার রোহিণীদাদা।
শরতের সারাদিন কাটে চাকরির ব্যর্থ উমেদারিতে। রাত্তিরে বাড়ি ফিরে মনে হয়, শরীরে আর এক ফোঁটাও শক্তি অবশিষ্ট নেই।
নিঃসঙ্গ ব্যর্থতাবোধ গ্রাস করছে শরৎ—কে। এক ছুটির দিনে সে আর অভয়াকে না দেখে থাকতে পারল না।
দুপুরবেলা রেঙ্গুনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে গেল সে, একটিবার অভয়াকে দেখতে। কেমন আছে সে?
অভয়াদের বাড়িতে পৌঁছেই শরৎ দেখল, রোহিণী বসে আছে বাইরের বারান্দায়। মুখ তার আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো।
—আরে, শরৎবাবু যে! ভাল তো?
—হ্যাঁ। আপনারা?
—ভিতরে যান।
—আপনাদের খবর সব ভাল তো? আবার প্রশ্ন করে শরৎ।
—ভিতরে যান না। যার জন্যে এসেছেন, তিনি ঘরেই আছেন।
—তা যাচ্ছি। আপনিও আসুন।
—আমার বাইরেই ভাল। এখানেই দু—দণ্ড হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। শরৎ হঠাৎ দেখল, কপাটের আড়াল থেকে উঁকি মারছে অভয়ার মুখ। সে ইশারা করছে শরৎ—কে ভেতরে যাওয়ার জন্য।
শরৎ যেন সেই ইশারা বোঝেই নি, এমনি ভান করে বলল, চলুন না রোহিণীদা, ভিতরে গিয়ে একটু গল্প করি।
—আর গল্প! এখন মরতে পারলে বাঁচি।
শরৎ এবার ভেতরের দিকে পা বাড়ায়।
অভয়া এখনও দাঁড়িয়ে আধখোলা দরজার পাশে।
সে মৃদু হাসে।
তারপর ডাক দেয় কাছে যাওয়ার, চোখের ইশারায়।
—একটা চাকরি পেয়েছি শেষপর্যন্ত, অভয়াকে বলে শরৎ।
—তাই! কোথায় চাকরি হল?
—এক সেগুন কাঠের ব্যবসায়ী আমার আবেদনের প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন, শরৎ বলে ঈষৎ হাসিমুখে।
—ভগবান তাঁর মঙ্গল করুন, বলে অভয়া।
—শুধু তাই নয় অভয়া। কদিনের মধ্যে আমার উন্নতিও হয়েছে।
—এরই মধ্যে উন্নতিও হয়ে গেল? বলছো কী গো!
—হ্যাঁ, তাই। টেবিল বদলেছে। সেই সঙ্গে বেতনও বেড়েছে।
—দায়িত্বও বেড়েছে বলো।
—তা আর বলতে। বনাত—মোড়া টেবিল পাব, অথচ দায়িত্ব বাড়বে না?
—যতোই দায়—দায়িত্ব বাড়ুক, অভয়ার কাছে তোমার প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলে চলবে না।
একথা বলে অভয়া দ্রুত পায়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এল। তার হাতে খাম। সে খামটি শরতের হাতে দিল।
শরৎ খামের ভিতর থেকে যে চিঠিটি বার করল সেটি এসেছে বর্মা রেল কোম্পানির অফিস থেকে। চিঠি এসেছে অভয়ার চিঠির উত্তরে।
বড়সাহেব জানাচ্ছেন, অভয়ার স্বামী বছর দুয়েক আগে এক গুরুতর অপরাধের জন্য রেল কোম্পানির চাকরি খুইয়েছে। সে এখন কোথায় আছে, তার হদিশ তাঁরা জানেন না। চিঠিটা পড়ে শরৎ অভয়ার মুখের দিকে তাকায়।
—আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি বলে দাও, কী করা উচিত?
—আমি কী বলব!
—তোমাকেই বলতে হবে। আমাকে পরামর্শ দেবার মতো মানুষ আর তো কেউ নেই।
—কেন? রোহিণীবাবু?
—ও একটি কথাও বলছে না।
—তুমি কি দেশে ফিরে যেতে চাও?
—তুমি বললে যাব। কিন্তু দেশে আমার কেউ নেই।
—আর রোহিণীবাবু।
—ওর ফিরে যাবার মুখ নেই।
—তা তো বুঝলাম। কিন্তু তিনি তোমার সব দায়িত্ব নিতে পারবেন তো?
শরৎ দেখল, অভয়ার চোখ ছলছল করছে। সে বলল, পরের মন, কী করে অতটা বুঝি বলতো?
—তোমরা যখন একসঙ্গে দেশ ছাড়লে, সে কি একেবারে বোঝাপড়া ছাড়াই?
—আমি যা করেছি, তার জন্য শুধু আমিই দায়ী। সব দায়দায়িত্ব আমার। রোহিণীদাদাকে কোনওভাবেই দুষতে মন চায় না।
শরৎ কিছুটা বিহ্বল হয়ে তাকায় অভয়ার মুখের দিকে। অভয়া চোখ নামিয়ে নেয়। তারপর মৃদু স্বরে বলে, শরৎদা, একবার তবু শেষ চেষ্টা করে দেখব, আমার স্বামীর খোঁজ পাই কি না।
—স্বামীর খোঁজ পেলে রোহিণীবাবুকে ছেড়ে তাঁর কাছেই চলে যাবে তো? অবিশ্যি তিনি যদি তোমাকে ঘরে তুলতে চান।
অভয়া কিছু বলে না। শরৎ বলে, এবার তবে চলি অভয়া। আমার বিশ্বাস, তোমার স্বামী বেঁচে আছেন, তাঁর খোঁজও পাওয়া যাবে।
শরৎ অভয়াদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দেয় অভয়া।
কিছুদূর গিয়েই শরতের মনে পড়ে, সে ছড়িটা অভয়ার ঘরে ফেলে এসেছে।
সে ফিরে আসে।
এ কী দেখছে সে!
অভয়া যেন তীরবিদ্ধ হরিণী।
ঘরের সামনে আছাড় খেয়ে অব্যক্ত যন্ত্রণায় ছটফট করছে। উপুড় হয়ে এমন প্রাণ বিসর্জন দেওয়া কান্না কাঁদতে আর কোনও রমণীকে শরৎ কখনও দেখেনি।
সে একবার ভাবে অভয়াকে জড়িয়ে ধরে বুকে তুলে নেয়। বলে, আমি আজ থেকে তোমার সকল ভার নিলেম অভয়া।
কিন্তু সে যা করে, ঠিক উল্টো।
সে বজ্রাহতের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর নীরবে ফিরে যায়।
অভয়া ঠিক সেইভাবে কাঁদতেই থাকে। জানতেও পারেনা, তার অনন্ত বেদনার এক সাক্ষী থেকে গেল।
শরৎ কি ক্রমে অভয়াকে ভালবেসে ফেলছে? সে কিরাজলক্ষ্মীকে ভুলে গেল?
তা কেন হবে?
দুটি মেয়েকে কি একসঙ্গে ভালবাসা যায় না?রাজলক্ষ্মী তার মনের একটি দিক নিক।
অন্য দিকটি না হয় অভয়ারই হোক।
মানুষের মনের গতিবিধি অঙ্কের নিয়মে নির্ধারিত হয় না। মন যে কোন খেলা কখন খেলবে তা মনই জানে না।
অন্তত শরতের মন শরতের মেঘের মতোই। হালকা বাতাসে আর অপার উদাসীনতায় উড়ে চলে।
এক প্রেম থেকে অন্য প্রেমে। ছেড়ে যাওয়া, চলে যাওয়ার মধ্যেই এই উড়ানের সার্থকতা। আর তো কোনও উদ্দেশ্য নেই।
শরৎ ইদানীং পাশ্চাত্যের যৌনবিজ্ঞান ছাত্রের মতো নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করছে। পড়ছে ফ্রয়েড। পড়ছে হ্যাভলক এলিস। নারী—পুরুষ সম্পর্কের নতুন নতুন জানলা খুলে যাচ্ছে তার সামনে।
অজানা গভীরতা আসছে তার সম্পর্ক—চেতনায়। বদলে যাচ্ছে তার ন্যায়—অন্যায়, পাপ—পুণ্যের বোধ।
সামাজিক বন্ধনের বাইরে নারী—পুরুষের সম্পর্ক সে বুঝতে পারছে নতুন অনুভব, বোধ ও প্রভাবের আলোয়।
সে তৈরি হচ্ছে লেখক হিসেবেও।
হঠাৎ তার মনে হয়, রাজলক্ষ্মীকে অভয়ার কথা না জানিয়ে সে অন্যায় করছে। কীসের অপরাধবোধ অভয়াকে নিয়ে? কেন সে জানাতে পারবে না রাজকে অভয়ার কথা? অভয়ার সন্ধান ও সংকটের কথা?
তাঁর স্বামীকে খুঁজে পেতে চায় অভয়া। কিন্তু সত্যিই যদি খুঁজে পায়, সে কি সত্যিই মন থেকে স্বামীর কাছে ফিরে যেতে পারবে? রোহিণীকে ভুলে থাকতে পারবে, আজীবন?
অভয়ার পক্ষে সন্ধানের চেয়েও যে বড় সংকট ফিরে পাওয়া, যা সে খুঁজতে এসেছে এতদূরে!
আর শরৎ নিজে, সে—ও কি চায় অভয়া সত্যিই খুঁজে পাক তার হারানো স্বামী? ফিরে যাক তার কাছে? গভীর বেদনা কি বাজবে না তার হৃদয়েও? এই কথাটি সে জানাতে পারবে তো রাজলক্ষ্মীকে?
তবু শরৎ চিঠি লিখল রাজলক্ষ্মীকে এই মর্মে ও ভাষায়: একজন ভদ্র নারীর নিদারুণ বেদনার গোপন ইতিহাস আর একজন রমণীর কাছে প্রকাশ করা যে আমার কর্তব্য, সে সম্বন্ধে আমার মনে আর কোনও দ্বিধা ও সংশয় নেই।
রাজলক্ষ্মী তোমাকে অভয়ার সমস্যা ও পরম সংকটের কথা জানাচ্ছি এই আশায় যে, তুমিই পারবে তাকে সঠিক বোধ থেকে সেই হিতোপদেশ দিতে, যা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আমি জানি রাজ, তোমার মনে আমার সঙ্গে অভয়ার সম্পর্ক নিয়ে কোন—কোন প্রশ্ন জাগতে পারে। আমি এও জানি, তুমি নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে সঠিক উত্তরগুলিও পেয়ে যাবে। তোমার প্রতি সেটাই আমার একান্ত আস্থা ও ভরসার জায়গা।
এই পত্রের দিন তিন—চার পরের ঘটনা। অফিসে শরতের হাতে একটি চিঠি এল। চিঠিতে জানানো হয়েছে যে, তাদের অফিসের একজন কেরানিকে সাহেব অফিসার বরখাস্ত করেছে। কেরানির অপরাধ, সে কাঠ চুরি করেছে। শরৎ এই অপরাধীর নাম পড়েই বুঝল, এই মক্কেলই অভয়ার স্বামী।
কিছুক্ষণের মধ্যেই চুরির অপরাধে চাকরি—খোয়ানো বাঙালিটির আবির্ভাব হল শরতের সামনে।
তাকে দেখা মাত্র শরতের সর্বাঙ্গ ঘিনঘিন করে উঠল।
তার পরনে হ্যাট—কোট। কিন্তু কী নোংরা, কী নোংরা! আর জীর্ণও বটে।
মুখমণ্ডল গোঁফ—দাড়িতে ঢাকা। তবে সেই সমাচ্ছন্নতার মধ্যেও চোখে পড়ে মানুষটির নীচেকার ঠোঁট। দেড় ইঞ্চি পুরু হয়ে ঝুলে আছে। এ ছাড়া পানের রস গড়িয়ে পড়ছে দুই কস দিয়ে।
এই প্রাণীটিকে দেখা মাত্র শরতের মনে একটি প্রশ্নের উদয় হল— এই মোষটা বর্মার কোন জঙ্গল থেকে অকস্মাৎ বেরিয়ে এল?
তারপর শরতের সমস্ত মনটা কষ্টে চিৎকার করে উঠল। এই মোষটার কাছে অভয়া ফিরে যাবে শুধুমাত্র সমাজের কথা ভেবে?
একদিন তাদের হিন্দু ধর্মমতে বিয়ে হয়েছিল বলে?
পতি নারীর দেবতা, তার ইহকাল—পরকাল, একথা শুনে শুনে শরতের কান পচেছে। মনে শ্যাওলা জমেছে।
তা ভাবলে এই মূর্তিমান ইতরটার পাশে অভয়া?
ভাবতেও ঘেন্না হয় যে!
অভয়া সুন্দরী। অভয়া মার্জিত রুচির রমণী। ভারি লাবণ্যময়ী। সামনে বসে থাকা ইতর প্রাণীটির পাশে অভয়াকে কিছুতেই ভাবতে পারল না শরৎ।
তার সমস্ত মন বলল, অসম্ভব!
—যখন আপনার রেলের চাকরি গেল, তখন ক'দিন বা বসে থাকতে হয়েছিল আপনাকে? সেখানে তো চুরির অপরাধেই গিয়েছিল চাকরি। তারপর আমাদের কোম্পানিতেও সেই চুরি। শরতের কথায় লোকটা প্রথমে থতমত। তারপর বলল, জানেন তো মশাই, ফ্যামিলি ম্যান, অনেকগুলি বাচ্চচাকাচ্চচা।
—বর্মার মেয়ে বিয়ে করেছেন না কি?
—সাহেব রিপোর্টে লিখেছে বুঝি? শালার রাগ দেখেছেন আমার ওপর?
—বিয়ে করেছেন, বেশ করেছেন। তাতে দোষ কী?
—যা বলেছেন মশাই। আমি তো লুকিয়ে কিছু করিনি। আরে মশাই পুরুষ মানুষ। অতো ঢাক—ঢাক কীসের? আর দেশেও তো কেউ কোথাও নেই। চাকরি যখন এখানেই করব, বিয়ে করে সংসার এখানেই পেতেছি। আপনি আমার অবস্থাটা সঠিক বুঝেছেন মশাই।
—দেশে সত্যিই আপনার কেউ নেই? নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে শরৎ।
—থাকলে কী আর বর্মায় চাকরি নিয়ে একা চলে আসতুম মশাই?
—অভয়াকে চেনেন? মনে পড়ছে নামটা? হঠাৎ আশ্চর্য কঠিন কণ্ঠে প্রশ্ন করে শরৎ।
লোকটা চমকে ওঠে। চুপ করে থাকে। তারপর প্রশ্ন করে, আপনি তাকে জানলেন কী করে?
—ধরুন সে আপনার খোঁজ নিয়ে খাওয়া—পরার জন্য অফিসে দরখাস্ত করেছে।
—ও তাই বলুন, লোকটা যেন ধড়ে প্রাণ পায়।
—অভয়া আপনার স্ত্রী তো?
—সে তো বহু বছর আগের কথা। গঙ্গায় কত জল বয়ে গেল।
—এখন আপনার স্ত্রী নয়?
—ছি ছি। একটা নষ্ট মেয়েমানুষ। আমার স্ত্রী বলতে ঘেন্না হয়।
—তার অপরাধ?
—বললাম তো, নষ্ট মাগি। আর বেশি বলতে বলবেন না। ফ্যামিলি সিক্রেট মশাই। নিজের দুঃখ নিজেই বহন করছি। ওই নষ্ট মেয়েমানুষটার কেচ্ছার জন্যেই আমাকে দেশত্যাগী হতে হয়েছে। এরপর ইতর লোকটি চুপ। শরৎ—ও নীরব। কিছুক্ষণ পরে লোকটি হঠাৎ প্রশ্ন করল, আচ্ছা, হারামজাদাটাকে অফিসে টেনে এনে বেশ করে কড়কে দিতে পারেন না?
—কোন হারামজাদার কথা বলছেন, জানতে চায় শরৎ।
—ওই যে সাহেবটা। যে—মিছিমিছি কাঠচুরির অপরাধে আমাকে সাসপেন্ড করেছে?
—তার চেয়ে বরং আপনি অন্য কোথাও চাকরির চেষ্টা করুন, বলে শরৎ।
শরতের কণ্ঠে অপ্রত্যাশিত কাঠিন্য। লোকটা পাথর হয়ে গেল। তারপর শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, তার মানে? আমার জন্যে কিছুই করতে পারবেন না!
—আপনাকে ডিসমিস করার নোটিস আমিই দেব, বলে শরৎ।
লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকল। তারপর হাউমাউ করে কেঁদে শরতের পায়ে পড়ল। আর বলতে লাগল, বাঙালি হয়ে বাঙালিকে মারবেন না বাবু। ছেলেপুলে নিয়ে মারা যাব। সেই মহিষের কান্না শুনে কেরানি, দারোয়ান, পিওন চারধার থেকে ছুটে এল।
শরৎ ঠান্ডাভাবে বলল, এইভাবে কান্নাকাটি করে লাভ নেই। একটা কথা ভালভাবে শুনুন ও বুঝবার চেষ্টা করুন। অভয়া আপনার খোঁজেই বর্মায় এসেছে। আমি বলছি না, দুশ্চরিত্র স্ত্রীকে আপনাকে গ্রহণ করতেই হবে। কিন্তু একটি শর্তেই আপনার চাকরি থাকতে পারে।
—কী শর্ত? লোকটি যেন আশার আলো দেখতে পায়।
—যদি অভয়ার কাছ থেকে চিঠি আনতে পারেন যে আপনার মুখ থেকে সব কথা শুনেও সে আপনাকে মাপ করেছে, তাহলে আপনার চাকরি বজায় রাখার চেষ্টা করব। আর তা না পারলে ধরে নিন আপনার চাকরি গেছে।
লোকটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে।
শরৎ বলল, কাল এই সময়ে আসবেন। আপনাকে অভয়ার ঠিকানা বলে দেব।
সেই সন্ধেতেই শরৎ দেখা করল অভয়ার সঙ্গে। সব কথা তাকে জানাল।
তারপর জিজ্ঞেস করল, সব কথা জানার পর তুমি তাকে মাপ করতে পারবে অভয়া?
অভয়া কোনও কথা বলতে পারল না।
সে নিঃশব্দে কাঁদছে।
শুধু ঘাড় নেড়ে জানাল, সে ক্ষমা করতে পারবে।
—তোমাকে নিয়ে যেতে চাইলে যাবে? শরতের গলা কেঁপে উঠল।
অভয়া আবার ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
—অভয়া, বর্মার মেয়েদের তুমি জানো। তা সত্ত্বেও সতীনের ঘর করার সাহস রাখো?
—সাহস! না গেলে আর আমার কী উপায় শরৎদা? তুমিই বলো। নেবে তুমি আমার ভার?
অভয়ার স্বামী দিন চারেক পরে শরতের অফিসে এসে শরতের টেবিলের উপর রাখল অভয়ার চিঠি।
অভয়া মাপ করেছে, সব কথা জানবার পর।
এই চিঠির প্রতিটি শব্দের মধ্যে শরৎ শুনতে পায় অভয়ার কান্না। তার আর্তনাদ।
সে বলে, আপনি কাজ করুন মন দিয়ে। বড়সাহেব আপনাকে ক্ষমা করেছে।
ইতর প্রাণীটির মুখে হাসি ফুটে ওঠে। সে বলে, বড়সাহেবের কথা ভাবছিনে। আপনি ক্ষমা করলেই আমি বর্তে যাব মশাই। বাঙালি হয়ে বাঙালির দুঃখ আপনিই বুঝেছেন।
—আপনারা সুখী হোন, এই প্রার্থনা করি, বলে শরৎ।
—শুনুন মশাই, সত্যি কথাটা বলি। আমি আমার স্ত্রীর নামে যে অপবাদ দিয়েছিলুম, তা সর্বৈব মিথ্যে। শুধু নিজের লজ্জা ঢাকতেই তাকে অপবাদ দিয়েছিলুম। আমার স্ত্রীর মতোসতীলক্ষ্মী কোথায় পাবেন? আমি চিরকালই তা তাকে প্রাণের অধিক ভালবাসি। তবে এখানে যে আবার বিয়ে করে একটা উপসর্গ জুটিয়েছি, তা উপায় ছিল না বলে। প্রাণের ভয়েই এখানকার মেয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু ঘরের লক্ষ্মীকে যখন ঘরে তুলতে যাচ্ছি, তখন সেই বেটিকে দূর করতে বেশিক্ষণ লাগবে না।
—কিন্তু আপনার ছেলেপুলে?
—তাদের কথা রাখুন মশাই। বেটাদের যেমন ছিরিছাঁদ! পিটিয়ে বিদেয় করব।
—অভয়াকে কি আজ রাত্রেই নিয়ে যাবেন?
—কী বলছেন মশাই! বিলক্ষণ নিয়ে যাব। যতদিন তাকে চোখে দেখিনি ততদিন কোনওরকমে না হয় ছিলুম। কিন্তু দেখার পর আর তর সইছে না।
বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। অভয়া স্বামীগৃহে কেমন আছে, এই ভাবনা থেকে মনটাকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে শরৎ।
কিন্তু এই কাজটি করা তার পক্ষে বড়ই কঠিন। অভয়ার কথা ভাবলেই তার বুকের উপর একটা পাথর চেপে বসে।
অথচ অভয়ার কথা সে মন থেকে সরিয়ে দিতেও পারে না। এক নিঃসঙ্গ নিরুপায় নারীর বেদনা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
অভয়াকে ছেড়ে রোহিণীবাবুই বা কেমন আছে? সে কি দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে?
অফিসের ছুটি হওয়ার পর শরৎ একদিন ঠিক করল, আজ সে অভয়াদের বাড়ি যাবেই।
নিজের চোখে দেখে আসাই ভাল। অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। এবং হয়তো কিছুটা শান্তিও পাওয়া যাবে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে প্রায় রাত। অভয়াদের বাড়িতে পৌঁছল শরৎ। দরজা বন্ধ। মনে হল, বাড়িতে বুঝি কেউ নেই।
কিন্তু দরজা তো ভিতর থেকে বন্ধ। দরজায় টোকা দিল শরৎ।
দরজা খুলল অভয়া!
—তুমি! কবে এলে? প্রশ্ন করে বিস্মিত শরৎ।
রোহিণীর বাড়ি তো অভয়ার বাপের বাড়ি নয় যে সেখানে স্বামীগৃহ থেকে ফিরে আসার অনুমতি জুটেছে অভয়ার! তাহলে?
—ঘরে এসো, শরৎ—কে আরও অবাক করে বলে অভয়া।
শরৎ অভয়ার পিছন—পিছন তার ঘরে যায়।
—পরশু ফিরে এসেছি। নিশ্চয় জানতে চাও, কেন ফিরে এসেছি?
শরৎ কোনও কথা বলতে পারে না।
অভয়া ধীরে ধীরে গায়ের জামাটি খুলে ফেলে। সরিয়ে দেয় শাড়ির আবরণ।
হ্যারিকেনের আলোয় সে তার দক্ষিণ বাহুটি সম্পূর্ণ অনাবৃত করে।
তার নিটোল সুন্দর বাহুটি বেতের আঘাতে—আঘাতে শতচ্ছিন্ন হয়ে গেছে!
শরৎ শিউরে ওঠে।
—কে তোমাকে এইভাবে আঘাত করেছে অভয়া?
অভয়া হেসে বলল, আমার সর্বাঙ্গের চামড়ার এই অবস্থা। সব তোমাকে দেখাতে পারলুম না শরৎদা। সেই অধিকার তো তুমি আমাকে দাওনি। তবে ফিরে আসার কারণ শুধু এই অত্যাচারই নয়। এ তো আমার সতীধর্মের সামান্য একটু পুরস্কার। তিনি আমার স্বামী। আমি তাঁর বিবাহিতা স্ত্রী। এ তো তারই চিহ্ন। আমার অপরাধ কী জানো শরৎদা।
—কী?
—আমি স্বামীর অনুমতি ছাড়া এতদূরে তাঁর কাছে এসে তাঁর শান্তিভঙ্গ করেছি। মেয়েমানুষের এই স্পর্ধা পুরুষমানুষ সইতে পারে না। এ ছাড়া আরও গুরুতর অপরাধ, কেন রোহিণীর সঙ্গে এসেছি। তারপর একগাছা বেত তুলে নিয়ে আমার স্বামী আমার অপরাধের জবাব দিয়ে আমার সর্বাঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে আমাকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। শরৎদা, এবার তুমি আমাকে বিচার করো। আমার কী করার আছে, কোথায় যাব বলে দাও তুমি।
—অভয়া, রোহিণী কোথায়?
—ফিরতে দেরি হবে। দু—পয়সা রোজগারের জন্যে সারাক্ষণ খেটে মরছে।
—রোহিণী তোমাকে ভালবাসে অভয়া।
—আমার মতো নষ্ট মেয়েমানুষের প্রতি তার ভালবাসা ক'দিন থাকবে বলতে পার?
—কার প্রতি কোন ভালবাসা কতদিন থাকবে, একথা বলা যায় না কি?
শরৎ এগিয়ে যায় অভয়ার খুব কাছে। তার মুখটি নিজের মুখের কাছে নিয়ে আসে।
অভয়ার কি জ্বর হয়েছে? তার নিশ্বাস এত গরম কেন?
অভয়ার অনাবৃত বাহুটি শরৎ আলতোভাবে স্পর্শ করে।
ব্যথায় শিউরে ওঠে অভয়া।
—ব্যথা লাগল?
—ভাল লাগল।
—রাজলক্ষ্মীর কথা তোমাকে বলেছি। সব কথা বলিনি। কিন্তু অনেক কথাই বলেছি। পুরুষের ছি ছি তার সমস্ত জীবনটাকে ছি ছি করে দিয়েছে। তবু সেই অসতী তার সমস্ত পাপের মধ্যে একটি পুরুষের প্রতি তার প্রেমকে আজীবন বাঁচিয়ে রেখেছে।
—সেই পুরুষ নিশ্চয় তুমি? তাই তো?
শরৎ অভয়ার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলল, আমি রাজকে একটি চিঠি লিখে তোমার সমস্যা, তোমার সংকটের কথা জানিয়ে ছিলুম। তার উত্তরে সে একটি চিঠি লিখেছে। এই নাও সেই চিঠি। হয়তো এই চিঠি তোমাকে বেঁচে থাকার পথ দেখাবে। শরৎ চিঠিটি দেয় অভয়ার হাতে।
অভয়া হ্যারিকেনের আলোয় পড়ে:
শরৎদা, তোমার মুখে যদি অভয়া আমার নাম শুনে থাকেন, আমার অনুরোধ একবার তাঁকে বোলো যে রাজলক্ষ্মী তাঁকে সহস্রকোটি নমস্কার জানিয়েছে। অভয়াকে চোখে দেখিনি। কিন্তু তাঁর অন্তরে যে সততার, যে তেজের আগুনটি জ্বলছে, তাঁর আঁচ আমি তোমার চিঠিতে পেয়েছি। তাই বলি তাঁর কর্মের বিচার একটু সাবধানে কোরো। আমাদের মতো সাধারণ স্ত্রীলোকের বাটখারা নিয়ে তাঁর পাপপুণ্যের ওজন তাড়াতাড়ি করে ফেল না।
চিঠির এই অংশটি পড়ে অভয়া কিছুতেই তার কান্না রাখতে পারল না। সে শরৎ—কে জড়িয়ে ধরে বলল, শরৎদা, ফিরে যাও।
—কোথায়?
—তোমার রাজলক্ষ্মীর কাছে।
—কেন অভয়া?
—তোমাকে তাঁর বড় প্রয়োজন।
সেই রাত্রে বাড়ি ফিরে রাজলক্ষ্মীকে এক লাইনের একটি চিঠি লিখল শরৎ।
'রাজ, আমি ফিরে আসছি। তোমাকে আমার বড় প্রয়োজন।'
তারপর তার ডায়রিটি বার করল ড্রয়ার থেকে। সবে একটি উপন্যাস শুরু করেছে সে।
কী নাম দেবে উপন্যাসটির?
কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিল না।
আজ রাত্রে কী সহজে নামটি ঝরে পড়ল শরতের কলম থেকে!
চরিত্রহীন
আর এক নারীর কথা যে না বললেই নয়। তবে তার কথা উপসংহারে কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে পরে আসছি।
আপাতত এই মেয়ে শরতের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। শরতের সঙ্গে তার প্রথম দেখা। সন্ধের আলোয়। বৈষ্ণবদের এক আখড়ার সামনে।
আখড়ার পাশ দিয়ে বহে চলেছে স্বল্পতোয়া নদী।
নদীর স্বচ্ছ কালো জলে চাঁদের ও সন্ধ্যাতারার আলো ঝিলমিল করছে।
দূরে কীর্তন ও খোল—করতালের শব্দ।
মেয়েটির বয়স তিরিশের বেশি নয়।
গায়ের রঙ শ্যামল।
শরীরের গড়ন ছিপছিপে। আঁটসাট।
সাজগোজের তেমন কোনও বালাই নেই।
হাতে কয়েকগাছি পেতলের চুড়ি। চুল গেরো দেওয়া। পিঠের উপর ঝুলছে। গলায় তুলসীর মালা। হাতে তুলসীর জপমালা। ভারি সুশ্রী দেখতে। চোখ আটকে—রাখা মাধুরী সর্বাঙ্গে।
শরতের মনে হল, কোথায় যেন দেখেছি এই মেয়েকে! কিন্তু কোথায়? মনে পড়ছে না তো!
—কী গোঁসাই, চেনা চেনা লাগছে অথচ চিনতে পারছ না তো?
শরৎ—কে অবাক করে বলে সেই মধুর মেয়ে। কী করে বুঝল সে শরতের মনের কথা?
—কোথায় যেন দেখেছি, অথচ কোথায় ঠিক মনে করতে পারছি নে, বলে শরৎ।
—আমি মনে করিয়ে দিই। বৃন্দাবনে আমাদের দেখা হয়েছে, বলে সুন্দরী।
—বৃন্দাবনে! কিন্তু বৃন্দাবনে তো কখনও যাইনি।
—গ্যাছো, গোঁসাই, গ্যাছো। সেখানে বনফুলের মালা গেঁথে আমার গলায় কতবার পরিয়েছ। অনেককালের কথা। সব ভুলে গেলে? একথা বলে ঠোঁট চেপে মৃদু হাসল সেই মেয়ে।
শরৎ কী জবাব দেবে ভেবে পায় না।
—রাত হয়ে আসছে গোঁসাই। এই জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকো না। ভেতরে চলো।
—জঙ্গলের পথে অনেক দূর যেতে হবে। কাল বরং আসবো।
—কমললতার জাল ছিঁড়ে অথচ সহজে চলে যাবে গোঁসাই?
বোষ্টমির নাম কমললতা! সার্থক নাম, ভাবে শরৎ।
কমললতা বলে, ভেতরে এসো, সবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই।
শরৎ বলে, বৈরাগীগিরি আমার নতুন নয় কমললতা। বড় মধুর করে 'কমললতা' নামটি উচ্চচারণ করে শরৎ।
কমললতার চোখে হাসি ফুটে ওঠে। সে বলে, বৈরাগীগিরি ধাতে সয় না বুঝি?
—বেশিদিন কিছুই ধাতে সয় না আমার, বলে শরৎ।
—তা বেশ। তোমার কমই ভাল। এখন তো ভেতরে এসো।
—তবে চলো, বলে শরৎ।
শরৎ কোনওদিন ভুলতে পারল না কমললতার সঙ্গে তার প্রথম আলাপের এই সন্ধে। কমললতাকেও কি কোনওদিন ভুলতে পারল সে? তাকে চিরদিনের করে রেখে গেল সে তার সাহিত্যে।
সেই কমললতাকে কেন নিয়ে এলুম উপসংহারে? এই অপরূপার মধুর রসে, হয়তো করুণ রসেও, এই উপন্যাসের শেষ হোক, এই আমার অভিপ্রায়। তা—ই!
অনেক রাত হয়েছে। শরৎ বাড়ি গেল না। আখড়াতেই রাত কাটাল। কমললতা বলল, চলো গোঁসাই, তোমার ঘরখানি দেখিয়ে দিই। শরতের ভারি পছন্দ হল সেই ঘর।
একধারে ছোট্ট তক্তপোশে পরিপাটি বিছানা। বিছানার পাশে জলচৌকির উপর কয়েকটি বই। আর একথালা বকুল ফুল।
শরতের মনে পড়ে রাজলক্ষ্মীর বাড়িতে তার ঘরটি। সেখানেও খাটের পাশে চৌকির উপর বই আর ফুল রেখেছিল রাজলক্ষ্মী।
কমললতা এসে দাঁড়াল ঘরের ভিতর। এ—ঘরে শরৎ আর কমললতা ছাড়া আর কেউ নেই।
কমললতার মুখের দিকে তাকায় শরৎ। হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় সেই মুখ দেখে শরতের মনে হয়, এই অপরিচিত বৈষ্ণবীর মুখের মতো সুন্দর মুখ সে সংসারে কখনও দেখেনি!
কমললতা বলল, একটু বিশ্রাম করে নাও, পরে আবার আসবো।
—ওগো নতুন গোঁসাই! এই অপরিচিত ডাকে চমকে জেগে ওঠে শরৎ। বলে, কে?
—তোমার সন্ধেবেলার বন্ধু। কাল সন্ধেবেলা তো প্রথম দেখা। এরই মধ্যে ভুলে গেলে?
শরৎ দেখল ঘরের দরজায় কমললতা।
শরতের ডাকে কমললতা ভেতরে এল। এসে দাঁড়াল বিছানার পাশে।
—কী ভাবছো বলো তো, বলে কমললতা।
—ভাবছি তোমার কথা।
—কী সৌভাগ্য আমার! তাহলে বললে কেন, কোন সুদূর বর্মাদেশে চাকরি করতে যাবে?
—আমার তো জমিজমা নেই। গুরু হয়ে ভক্তের দলও গড়তে পারিনি। দেশে চাকরি জোটাতেও পারিনি। খাব কী?
—ঠাকুর দেবেন তোমার খাবার। এখানেই থেকে যাও গোঁসাই। কোথাও যেতে হবে না।
—তোমার দেশ কোথায় কমললতা?
—গাছতলায় ঘর। পথে পথে দেশ।
—তাহলে মঠে থাকো কেন?
—অনেকদিন পথে পথে ঘুরেছি। সঙ্গী পাই তো আবার পথে বেরিয়ে পড়ি।
—তোমার সঙ্গীর অভাব হবে না কমললতা। যাকে ডাকবে সেই সঙ্গী হবে।
শরতের কথায় কমললতা হেসে বলে, তোমাকেই ডাকছি নতুন গোঁসাই। রাজি?
—রাজি, বলে শরৎ।
—কাল পঞ্চমী। শুভদিন। চলো। বেরিয়ে পড়ি। কালই। ভাল না লাগলে ফিরে যেও। পথের পাশেই থাকবে রেল লাইন। বাধা দেব না।
ঠিক এই সময়ে হঠাৎ কোনও জরুরি কাজে কমললতার ডাক এল। সে চলে গেল।
একা—একা শরৎ করে কী? সে আশ্রমের বাইরে এল। তখুনি এক রোগা খর্বাকৃতি মানুষ, যার ভুরু দুটি গোঁফের মতো মোটা, শরতের সামনে এসে জিজ্ঞেস করল, আপনি এই আখড়ায় কবে এলেন?
—কাল বিকেলে, বলে শরৎ।
—রাত্রে এখানেই ছিলেন তাহলে?
—হ্যাঁ। আর কোথায়?
—আপনি তো বোষ্টম নন মশাই। আখড়ার মধ্যে কে আপনাকে থাকতে দিল? নিশ্চয় ওই কমলিলতাটা।
—হ্যাঁ, তাই, বলে বিরক্ত শরৎ।
—এখন নাম নিয়েছে কমললতা। ওর আসল নাম ঊষা। সিলেটের মেয়ে। আমিও সিলেটের মানুষ। শুনবেন ওর স্বভাব—চরিত্তিরের কথা?
—কমললতার সঙ্গে আপনার কি কোনও সম্পর্ক আছে? পাল্টা প্রশ্ন করে শরৎ।
—ও আমার পরিবার মশাই। ওর বাপ নিজে আমাদের কণ্ঠিবদল করিয়েছে। তার সাক্ষী আছে।
—আপনারা কী জাত? শরতের কণ্ঠে রাগ।
—দ্বাদশ—তিলি।
—আর কমললতা?
—ও মাগি শুঁড়ি। ওদের জলে আমরা পা ধুইনে। ওকে একবার ডেকে দিন তো।
—আখড়ায় সবাই যেতে পারে। আপনি নিজে গিয়ে ডাকুন, বলে শরৎ।
অনেক রাত। শরৎ ঘরে একা। অন্ধকারে। তার মন ভাল নেই। কমললতা সেই যে হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, আর তো এল না। এত রাত। এখন কী আর আসবে?
শরৎ খেতে পর্যন্ত যায়নি। কেউ তাকে ডাকেও নি।
—কী গো! হঠাৎ অন্ধকারে কমললতার মধুর কণ্ঠ।
শরৎ উত্তর দেয় না। সে নীরবে বসে থাকে। অন্ধকারের মধ্যে এগিয়ে আসে কমললতা। তার মাথায় হাত রাখে।
কমললতা এই প্রথম স্পর্শ করল শরৎকে। বলল, কী গো নতুন গোঁসাই। খুব রাগ হয়েছে আমার ওপর?
—হ্যাঁ, রাগ তো হয়েইছে।
—ওই লোকটা তোমাকে কী বলছিল?
—তুমি দেখেছ! বলছিল, ও তোমার স্বামী।
—আমার স্বভাব—চরিত্তির নিয়ে কিছু বলতে চায়নি?
—চেয়েছিল। আমার শোনার প্রবৃত্তি হয়নি।
—আর আমার জাত?
—বলেছে।
—তাহলে তো সবই জেনেছ নতুন গোঁসাই। তবু আমার মুখ থেকেই শোনো আমার ছেলেবেলার ইতিহাস। হয়তো সব কথা জানার পর আমাকে তোমার ঘেন্না হবে। তবু বলছি, শোনো।
—না কমললতা। শুনতে আমার ইচ্ছে করছে না। শুনে কী হবে বলো? তোমাকে আমার ভারি ভাল লেগেছে। সেই ভাললাগা যদি নষ্ট হয়ে যায়। কী লাভ? ভাবছি এই ভাললাগাটুকু বুকের মধ্যে নিয়ে কাল ভোরবেলাই চলে যাব।
—আমি ভাবছি কাল তোমাকে যেতে দেব না নতুন গোঁসাই, শরৎ—কে অবাক করে বলে কমললতা।
—তাহলে কবে যেতে দেবে? কমললতার অধিকারবোধকে যেন মেনে নিয়েই জানতে চায় শরৎ।
—যেতে তোমাকে কোনওদিনই দেব না নতুন গোঁসাই, বলে কমললতা। তাঁর কণ্ঠস্বরের মাধুর্য মুগ্ধ করে শরৎকে।
কমললতা অন্ধকারে বিছানার কাছে এগিয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে মশারির চারপাশ দেখে। মশারি ভালোই গোঁজা আছে, বলে সে। তারপর আদেশের সুরে বলে, অনেক রাত। এবার ঘুমিয়ে পড়তো।
মশারি খুলে বেরিয়ে আসে শরৎ। কমললতার দুটি হাত ধরে সে দাঁড়ায় অন্ধকারে। কমললতা বাধা দেয় না। দুজনে অনেকক্ষণ নীরব। তাদের অন্ধকার স্পর্শ যেন ক্রমে কথা হয়ে ওঠে।
—নতুনগোঁসাই, কাল সন্ধেবেলা তুমি এসেছ। সেই আমাদের প্রথম দেখা।
আর আজ আমার চেয়ে বেশি কেউ তোমাকে এ—সংসারে ভালবাসে না। এই অন্ধকারে তোমাকে ছুঁয়ে এই কথাটি জানিয়ে গেলেম।
শরৎ কমললতাকে বুকে টেনে নিতে যায়।
কমললতা ঈষৎ যেন শক্ত হয়ে যায়। শরৎ বুঝতে পারে। অন্ধকারে সে কমললতার গাল দুটি ধরে।
তার আঙুল স্পর্শ করে কমললতার চোখের জল।
কমললতা বলে, আমি জানি, তুমি থাকতে আসনি। থাকবেও না। দু—একদিন পরেই চলে যাবে। আমি যে কতদিনে কী করে এই ব্যথা সামলাবো তাই ভাবছি নতুনগোঁসাই। কেন যে এলে! কেন যে দেখা হল!
কিছুক্ষণ পরে কমললতা বলল, আমাকে ছাড়ো নতুনগোঁসাই। অনেক রাত হল। এবার যাই।
—যেতে দিলে তো যাবে কমললতা। তুমি আমাকে চিরদিনের জন্যে আটকাতে চাইছ আর আমি তোমাকে দু—দণ্ডের জন্যে আটকাতে পারি না?
—কী দরকার আমাকে তোমার?
—এই অন্ধকারেই তোমার জীবনের ইতিহাস শুনতে চাই কমললতা। অন্ধকারের গল্প অন্ধকারেই সারা হোক। ভোরের আলোয় সে—গল্প আর মনে রাখব না।
—তাহলে গোড়া থেকেই শুরু করি, বলে কমললতা।
—তাই করো।
—চেষ্টা করছি বলতে। কিন্তু মেয়ে মানুষ তো। হয়তো সব কথা খুলে বলতে পারব না। তুমি বুঝে নিও নতুনগোঁসাই। তুমি পারবে বুঝতে। তুমি সেই পুরুষ, যার মন আছে। এ আমি দু—দিনেই বুঝতে পেরেছি।
—কমল, কালই আমি চলে যাব। এই সিদ্ধান্তে আমি অটল থাকবই। মন হালকা করার জন্যে যদি বলতে চাও তোমার কথা, বলো। তবে, একটা কথা। আর হয়তো কোনওদিনই আমাদের দেখা হবে না। তোমার গল্প শোনার আগে এই কথাটি তোমাকে জানাই, তোমাকেও আমি ভালবেসেছি কমললতা। আর আমার সেই প্রেম তোমার পদস্খলনের বিবরণে কোনওদিন নষ্ট হবে না।
—যদি ভালই বেসেছ নতুনগোঁসাই তাহলে তোমার কমললতাকে ছেড়ে যাবে কেন?
—প্রণয় বেঁচে থাকে ছেড়ে যাওয়ার মধ্যে, চলে যাওয়ার পথে—পথে। চিরদিনের বেষ্টনে প্রেম হাঁফিয়ে ওঠে কমল। তার দম বন্ধ হয়ে যায়। কমললতা কোনও উত্তর দেয় না। অন্ধকারে তার কান্নার অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পায় শরৎ।
কান্না সামলে কমললতা শুরু করল তার জীবনের ইতিহাস। সে বলল, আমার আরও দুটি ছোট ভাই আছে। কিন্তু বাপ—মায়ের আমিই একমাত্র মেয়ে। আমার বাড়ি শ্রীহট্টে। কিন্তু বাবার ব্যবসা ছিল কলকাতায়। তাই আমি কলকাতাতেই বড় হয়েছি। ছোটোবেলায় বাবা—মা কলকাতাতেই আমার বিয়ে দিল। সতেরো বছর বয়েসে বিধবা হয়ে তাদের কাছে ফিরে এলুম।
যার সঙ্গে আজ তোমার দেখা হয়েছে, যে আমার ইহকালের— পরকালের নরকযন্ত্রণা, তার নাম মন্মথ। ও ছিল আমাদের সরকার। আমাদের বাড়িতেই থাকত।
মন্মথর একটি পিতৃহীন ভাইপোও আমাদের বাসায় থাকত। বাবা তাকে খরচ দিয়ে কলেজে পড়াত। যতীন আমার থেকে বয়েসে সামান্য ছোট ছিল। আমাকে খুব ভালবাসতো। দিদি বলে ভক্তি করত।
নতুনগোঁসাই, আমার পেটে সন্তান এল। যুবতী বিধবার পেটে বাচ্চচা, ভাবতে পার? সমাজে বাবা—মা আর মুখ দেখাতে পারবে? মন্মথ নিজের অন্যায় ঢাকার জন্যে সমস্ত দোষটা যতীনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিল।
যতীনকে ডাকা হল। সে শুনে হতবুদ্ধি হয়ে গেল।
কিন্তু মন্মথ গর্জন করে বলতে লাগল, পাজি শয়তান নচ্ছার নেমকহারাম, যে—লোক তোকে ভাত কাপড় দিয়ে কলেজে পড়াচ্ছে, বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে, তুই তারই মেয়ের এতবড় সর্বনাশ করলি? পুরো পরিবারকে নরকের মুখ দেখালি?
যতীন ক্রমাগত বলতে লাগল, আমি এই পাপ কাজ করিনি জ্যাঠামশাই।
মন্মথ গর্জন করে বলল, ঊষা নিজের মুখে বলেছে, তুই ওর সন্তানের বাপ, আর তুই বলছিস, না করিনি?
দিদি সত্যি বলেছে? কাঁদতে—কাঁদতে বারবার জিজ্ঞেস করে যতীন।
মন্মথ বলতে থাকে, তুই ছাড়া আবার কে? জিজ্ঞেস কর বাড়ির মালিককে।
বাবাও মন্মথর কথা মতো বলল, যতীনের সন্তানই আমার পেটে। মন্মথ যে দিনের পর দিন আমার শরীর ভোগ করেছে, সেকথা বাবা জেনেও না জানার ভান করল। যতীন আর প্রতিবাদ করতে পারল না।
পরেরদিন সকালে তাকে পাওয়া গেল আমাদের আস্তাবলের এক কোণে। গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে।
দিন কয়েকের মধ্যে যতীনের জ্যাঠা, ওই মন্মথ, বাবার কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা নিয়ে আমার পেটে যতীনের সন্তানের বাপ হতে রাজি হল। আমাদের বিয়ে হল। কিন্তু নতুনগোঁসাই, আমি এই বিয়ে মানতে পারিনি। মন্মথ বিয়ের পরে আমাকে কোনওভাবেই পায়নি। আমার শরীর—মন আজও যতীনের জন্যে অশৌচ করে চলেছে।
—তোমার সেই সন্তান?
—মরা ছেলে ভূমিষ্ঠ হল। তাকে গঙ্গার জলে বিসর্জন দিলুম। বাবাকে বললুম, মাকে ফিরে গিয়ে বলো, মরা ছেলের জন্ম দিতে গিয়ে ঊষাও মরেছে। মা দুঃখ পাবে কিন্তু আমার মতো মেয়ের বেঁচে থাকা তার কাছে আরও দুঃখের হবে।
কমললতা তার গল্প, জীবনের ইতিহাস এইভাবেই শেষ করল বোধহয়। অন্ধকারের মধ্যে সে নিবিড় ও নিশ্চুপ।
অনেকক্ষণ পরে বলল, একটা কথা ভারি জানতে ইচ্ছে করছে।
—কী কথা কমল?
—এ বয়েসে সত্যি কখনও কাউকে ভালবাসনি?
—তোমার কি মনে হয় কমললতা? কাউকে ভালবাসিনি, তা কি হতে পারে?
—আমার তো মনে হয়, ভাল তুমি বাসনি। তোমার মনটা আসলে বৈরাগীর মন। উদাসীনের মন। বাঁধনের মধ্যে যেতে চাওনি কখনও।
—কমল, তোমার কথাটি যদি আমার কোনও ভালবাসার মানুষের কাছে কখনও পৌঁছয়, অনর্থ বাধবে।
—সত্যিই যদি নতুনগোঁসাই তোমার ভালবাসার মানুষ কোথাও থাকে, সে আমার কথা বিশ্বাসই করবে না। তোমার মধুমাখানো ফাঁকিকেই সে সারাজীবন ভালবাসা বলে বিশ্বাস করবে।
শরৎ অন্ধকারের মধ্যে বলল, তবে আর দুঃখ কীসের? তার কাছে তো সেই ফাঁকিই সত্যি হয়ে থেকে গেল।
—তোমার এই অহংকার, এই বড়াই আমার সয় না গোঁসাই।
—কোথায় দেখলে আমার অহংকার, আমার বড়াই? তোমার কাছে তো অন্তত আমি কোনওভাবেই অহংকার দেখাইনি।
—তোমার সকল অহংকার তোমার ওই উদাসীন বৈরাগী মনে। তোমার মনের চেয়ে বেশি অহংকারী জগতে আর কিছু আছে নাকি নতুনগোঁসাই?
—দুটো দিনের মধ্যে আমাকে তুমি এতটাই জেনে ফেলেছ কমল?
—জেনেছি তোমাকে ভালবেসেছি বলে।
—ভালবেসেছ, এ কি সত্যি কমললতা?
—সত্যি।
—তাহলে তোমার কীর্তন, জপতপ, রাতদিনের ঠাকুরসেবা, সেসব যাবে কোথায়?
—নতুনগোঁসাই তোমার প্রতি আমার ভালবাসা এইসব কিছুকে আরও সার্থক করে তুলবে। চলো না, সব ফেলে দুজনে পথে পথে বেরিয়ে পড়ি। পারবে না?
—তা হয় না কমল। আমি কালই চলে যাচ্ছি। আমরা এক পথের, এক বিশ্বাসের যাত্রী নই। আমাদের পথ ও প্রত্যয় ভিন্ন।
—তুমি সত্যিই কাল চলে যাবে?
—হ্যাঁ, কমললতা, সত্যিই চলে যাব।
কমললতা উঠে আসে নিঃশব্দে, অন্ধকারে শরতের পায়ে হাত রাখে। বলে, তাহলে তুমি ভগবানের পাদপদ্মে আমাকে সঁপে দিয়ে যাও। আমার জন্যে আর কোনওদিন ভেব না, মন খারাপ কোরো না।
শরৎ কমললতাকে তার পা থেকে তুলে বুকের মধ্যে নিয়ে আসে।
কমললতা শরতের বুকে বুক গুঁজে কান্নার মধ্যে অস্পষ্ট উচ্চচারণে বলে, নতুনগোঁসাই, আমি জানি, তুমি একদিন আবার এই আখড়ায় ফিরে আসবেই। কিন্তু সেদিন তুমি আর এখানে তোমার কমললতাকে পাবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন