আগুনখাকি

জয়দীপ চক্রবর্তী

মেলার মাঠ থেকে খানিক তফাতে যে ঝাঁকড়া পাকুড়গাছটা, তার তলায় দাঁড়াতে বলেছিল গুরুপদ। বলেছিল, যতীনদাকে একটু দূরের চায়ের দোকানটা থেকে ডেকে নিয়ে এইখানেই আসবে সে। যতীনদা তেমনটাই বলে রেখেছে তাকে।

গুরুপদ চোখের আড়াল হতেই বুকের নীচে একটু ভয় ভয় ভাব এল। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এই প্রথম একা একা কাজে যাওয়ার বন্দোবস্ত হচ্ছে আজ। তার জন্যে। কিন্তু আর কোনো উপায়ও তো ছিল না সোনালির সামনে। সংসারে মার খেতে খেতে মানুষের পিঠ যখন দেওয়ালে ঠেকে যায়, সামনে একটা খড়কুটো পেলেও সে চেষ্টা করে তাই আঁকড়ে ধরে যদি নতুন করে বেঁচে ওঠা যায়। কী যে এক সর্বনাশা রোগ এল পৃথিবীতে, মানুষের জীবন যত না নিল, তার চেয়ে বেশি নিল গরিব মানুষের কাজ। মারণ রোগটা আসার আগে গুরুপদ কলকাতার একটা প্রেসে কাজ করত। ভোরবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছটা আটের আপ লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল ধরত জয়নগর স্টেশন থেকে। তারপর শিয়ালদা স্টেশনে নেমে হাঁটা পথ। সোনালিকে উঠতে হত কাকভোরে। উনুন ধরিয়ে ওই অত সকালেই এক মুঠো ফুটিয়ে দিত গুরুপদকে। গুরুপদ বারণ করত মাঝেমধ্যেই। সোনালিকে আদর করে বলত, এই সকালে উঠে ভাত চাপানোর হ্যাঙ্গামা কেন কর? এত সকালে কি খাওয়া যায় ভালো করে? তাছাড়া দুজনেরই তো মাত্র পেট। এই সকালে রান্না করা ভাত তুমি বেলায় খাবে যখন, তখন তো ওটা শুকিয়ে চাল হয়ে যাবে। তার চেয়ে রাতে একমুঠো বেশি নিয়ে জল দিয়ে রেখে দিলেই তো পারো...'

'মরণ—' মুখ ঝামটা দিয়ে বলে সোনালি, 'কথা শোনো একবার। তিনি সারাদিনের মতন বেরোবেন বাড়ি থেকে। তার আগে নাকি আগের রাতের বাসি জল দেওয়া ভাত মুখে তুলবেন। কেন আমি কি মরে গেছি?'

'আহা মরার কথা বলো কেন?' সোনালির মুখে হাত চাপা দেয় গুরুপদ, 'অত সকালে ঘুম থেকে উঠে উনুন ধরানো, রান্না চাপানো, শরীরের কষ্টটাও তো আছে নাকি?'

'আদিখ্যেতা কোরো না তো বাপু', সোনালি বলে, 'শরীরটাকে কি সাজিয়ে গুছিয়ে তাকে তুলে রাখব?'

'রাখলেই না হয়', গরম ভাত মুখে তুলে তার দিকে চেয়ে চোখ টেপে গুরুপদ, 'আমি রাতে এসে তাক থেকে পেড়ে যত্নআত্তি করব প্রাণ ভরে...'

'খুব শখ না?' বলে হাসে সোনালি। তার ফরসা মুখে লালচে আভা খেলে যায়।

গুরুপদর প্রেসের কাজে খুব যে রোজগার হত তা হয়তো নয়, কিন্তু কোনোক্রমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এই ফুটোফাটা সংসারটা চলে যেত। আর ছিল সুখ। সোনালি বোঝে, তার মরদটা মানুষ বড় ভালো। আর তাকে ভালোওবাসে লোকটা পাগলের মতো। মেয়েমানুষের আর কী চাই!

গুরুপদ বেরনোর সময় টিফিনকৌটো আর জলের বোতল এগিয়ে দেয় সোনালি, 'সময় করে কাজের ফাঁকে খেয়ে নিও।'

'কী দিলে আজ?'

'চাল ভেজেছিলুম কাল। তাই এক কোটো দিয়ে দিলুম। সঙ্গে আলাদা একটা পাত্তরে শসা দিয়েছি। আমাদের খেতের...'

'তোমার বড্ড পরিশ্রম হয় সোনালি সারাটা দিন', আবার বলে গুরুপদ।

'ছাই হয়', সোনালি হাসে, 'তুমি বেরিয়ে গেলে আর কীই বা কাজ আছে আমার? একটা ছেলেপুলে হলে তাও কথা ছিল। তার পিছনে সময় যেত খানিক।'

গুরুপদ মুখ নিচু করে। সোনালির সঙ্গে তার বিয়ে বছর দুই হল। বিয়ের মাস তিনেক পর থেকেই সোনালি বলে চলেছে, 'এবার একটা বাচ্চা কাচ্চার চেষ্টা করি চলো।'

'এত তাড়াহুড়োর কী আছে?' গুরুপদ তার শরীর নিয়ে খেলতে খেলতে বলেছিল, 'দু-চার বছর একটু ঝাড়া হাত পায়ে থাকি। যৌবনটা উপভোগ করি খানিক...'

'ও আবার কী অসভ্যের মতো কথা?' সোনালি তাকে খানিক ঠেলে দিয়ে বলে, 'আমি কি তোমার বাঁধা মেয়েমানুষ নাকি যে আমার শরীর নিয়ে উপভোগ করবে? বিয়ে করা তো ছেলেপুলে জন্ম দেবার প্রয়োজনেই?'

'এসব সেকেলে কথা কোত্থেকে শিখলে বলো তো?' গুরুপদ হেসে ফেলে। সোনালির সঙ্গে তার বয়েসের তফাতটা একটু বেশিই। এই শ্রাবণে সে তিরিশে পড়েছে। আর সোনালি আঠেরো পেরিয়ে উনিশ। গুরুপদর মনে পড়ে যাচ্ছিল, বিয়ের সময় ওদের বাড়ি থেকে পই পই করে বলে দিয়েছিল, কেউ মেয়ের বয়েস জিজ্ঞেস করলে যেন অন্তত আঠেরো বছর বলে সে। তার কম বলে ফেললেই বিপদ। গুরুপদ অতশত বোঝে না। কম বয়েসে বাপ মা মরলে পেটের চিন্তা ছাড়া অন্য বিষয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানো যায়ও না। শেষে কাত্তিকজেঠুই গম্ভীর মুখ করে বললেন, 'ব্যাপারটা বুঝলি না?'

'আজ্ঞে না।' দু-দিকে মাথা নাড়ে গুরুপদ।

'আঠেরো বছরের কম বয়েসি মেয়ে বিয়ে করেছিস জানলে পুলিশ এসে যে তোকে তুলে নিয়ে যাবে রে হতচ্ছাড়া।' তখন ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল গুরুপদর। মনেও পড়ল, সম্বন্ধের সময় গলির মাথায় পানের দোকানের নগেনদা বলেছিল, মেয়ের বয়েসটা সামান্য কম হচ্ছে বটে, তবে মেয়েটা জেনুইন। এ পাত্রী হাতছাড়া করিসনি গুরুপদ।' নগেনদাই সম্বন্ধটা এনেছিল। গুরুপদ একা মানুষ। বিয়ে থা করার ব্যাপারে তেমন গা ছিল না তার। এই কাত্তিকজেঠু আর নগেনদাই বলতে গেলে সোনালির সঙ্গে তার হাতে হাতে মিলিয়ে দিল জোরজবরদস্তি করে। তা এখন অবিশ্যি মনে মনে তাদের ধন্যবাদই দেয় গুরুপদ। সোনালি মেয়েটা সত্যিই বড় ভালো।

সোনালি গুরুপদর বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলছিল, 'আমার ঠাকুমা বলেছে, মেয়েরা হল গিয়ে ফলগাছের মতো। তাদের পোতাই হয় ফল পাবার আশায়। কাজেই ছেলেপিলে নেবার ক্ষেত্রে বয়েস এক্কেবারে বাড়তে দিবি না দিদি...'

'ওসব কথার কোনো মানেই হয় না', গুরুপদ সোনালিকে জড়িয়ে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল, 'আমি কলকাতায় কাজে যাই। কত লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়। কত জ্ঞানগম্যি তাঁদের। কত্ত পড়াশুনো। তাঁরা প্রত্যেকেই বলেন, মেয়েদের ছোট বয়েসে মা হওয়া ভালো নয়। ওতে তাদের শরীর নষ্ট হয়...'

'ইশ, তুমি কি সকলকে আমাদের এইসব কথা বলে বেড়াও নাকি?' লজ্জায় ছটফটিয়ে উঠে বলে সোনালি।

'ধুস, তা আবার কেউ বলে নাকি?' খানিক অপ্রস্তুত গলায় বলে গুরুপদ, 'ওই নানান কথাবার্তায় প্রসঙ্গ উঠে আসে আর কী...'

দীর্ঘ লকডাউনে গুরুপদর প্রেসের কাজটা গেছে। এখন একটা সাইকেল ভ্যানে সবজি চাপিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বিক্রি করে গুরুপদ। পরিশ্রম হয় খুব। ভোর থাকতে লোকাল পাইকিরি মার্কেট থেকে মাল তোলা। তারপর খর রৌদ্র মাথায় করে মানুষের দরজায় ঘুরে সেই মাল বিক্কিরি করে বেড়ানো। এই কমাসে তার গায়ের রং পুড়ে বাদামি হয়ে গেছে। তবে এই পরিশ্রমটুকুর জোরেই স্বাচ্ছন্দ না থাকলেও সংসারটা টিঁকে আছে এখনও।

বিছানায় শুয়ে প্রায় রোজই গুরুপদ বুঝতে পারে, সোনালি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। গুরুপদ কত বোঝায় তাকে, 'দিন ঠিক ফিরবে আবার। জমানা কি একই রকম থাকে কখনও? তাছাড়া সংসার তো চলে যাচ্ছে।' কিন্তু সোনালির সেই এক কথা, 'নিজের চেহারাটার দিকে তাকিয়ে দেখ তুমি? কী হাল হয়েছে এই কদিনে...'

'ঠিকই তো আছি', গুরুপদ হাসে।

'মোটেই ঠিক নেই', সোনালি ভেজা গলায় বলে, গা পুড়ে বাদামি হয়েছে, চোখের নীচে কালি...'

'কষ্ট তো করতেই হবে, নইলে চলবে কী করে?' গুরুপদ সোনালির শরীরের ওপরে চাপে, 'এইবার একটা ছেলেপুলে নিয়ে নেব ভাবছি...'

'একদম নয়, কক্ষনও নয়', সোনালি গুরুপদকে কিছুতেই ঢুকতে দেয় না তার শরীরের মধ্যে, 'আমি একটা কাজ নেব ঠিক করেছি।'

'তুমি কাজ নেবে?' গুরুপদ অবাক হয়ে বলে, 'কী কাজ?'

'রান্নার কাজ। বারুইপুরে।'

'তার মানে তো ট্রেনে করে যেতে হবে রোজ।'

'তা হবে', সোনালি নরম গলায় বলে, 'বেশি দূর তো নয়। বড় জোর মিনিট চল্লিশ। উনি বলেছেন, বাড়িটা স্টেশনের গায়েই। স্বামী স্ত্রী আর একটা বাচ্চা নিয়ে ছোট্ট পরিবার। সকাল আটটায় ঢুকতে হবে। দাদা বউদি দশটায় বের হয়। তার আগে রান্না করে দিতে হবে। ওরা বেরিয়ে গেলে বাচ্চাটাকে দেখাশুনো করা। খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া, ব্যস। বিকেলে পাঁচটা সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই দাদা বউদি ফিরে আসে। ওরা ফিরে এলেই আমার ছুটি। সাত হাজার টাকা মাইনে দেবে বলছে। সঙ্গে ট্রেনের মান্থলি।'

'সাত হা-জা-র? শুধু সকালের ওইটুকু রান্নার জন্যে?' গুরুপদ অবিশ্বাসের সঙ্গেই বলে।

'সঙ্গে ওই যে ছেলে দেখার কাজটাও রয়েছে', সোনালি খলবল করে বলে, 'সারাদিন থাকতে হবে। টাকা তো বেশি দেবেই। ওই সময় আমি তো চাইলে আরও পাঁচ বাড়িতে রান্নার কাজ করে রোজগার করতে পারতুম...'

'এত সব বুদ্ধির কথা কে শেখালো বলো তো তোমায়? ওই বাবুটাই?'

'হুঁ।'

গুরুপদ চুপ করে রইল একটুক্ষণ। সাত হাজার টাকা কম নয়। মাসে মাসে টাকাটা হাতে পেলে সংসারে যে খানিক সুরাহা হয়, এ তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। তবু ব্যাপারটা বুঝে নেবার জন্যে সে জিজ্ঞেস করল সোনালিকে, 'লোকটাকে চিনলে কী করে?'

'পরশু মোড়ের মাথার দোকানে গিয়েছিলুম চিনি কেনার জন্যে। ফিরচি যখন, নগেনদাদার দোকানের পাশটি থেকে বেরিয়ে এল লোকটা। আমার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এই বাড়ি পর্যন্তই এল প্রায়। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল...'

'কী জিজ্ঞেস করছিল?'

'তোমার কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিল। বলছিল, দিনকাল বড্ড খারাপ। কত লোকের যে কাজ চলে যাচ্ছে চারদিকে। তোমার প্রশংসা করছিল খুব। তোমার নাম করে বলল অমুকের মতো সৎ আর ভালো মানুষ পাওয়া মুশকিল আজকের দিনে...'

গুরুপদর লোকটাকে নিয়ে কৌতূহল বাড়ছিল। সোনালিকে জিজ্ঞেস করল সে, 'লোকটার নাম জিজ্ঞেস করেছিলে?'

'হুঁ।'

'কী নাম?'

'যতীন হালদার। পুবপাড়ার দিকে বাড়ি।'

গুরুপদ অনেক ভেবেও পুবপাড়ায় যতীন হালদার বলে কাউকে মনে করতে পারল না।

সোনালি উচ্ছ্বসিত গলায় বলে চলল, 'যতীনদাদা লোকটি ভারি ভালো গো...'

'কী করে বুঝলে?'

'গল্প করতে করতে আমাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে বললে, গুরুপদ থাকলে ঘরে ঢুকে এক কাপ চা খেয়ে যেতুম। কিন্তু তুমি একলা মেয়েমানুষ বাড়িতে থাকো, তাই ঢুকব না। তখনই কথায় কথায় বলল, গুরুপদর কাজটা তো নেই বললে। তা তোমাদের তো বড় দুর্দিন চলছে তাহলে হে। গুরুপদরও বড় কষ্ট যাচ্ছে। এই গরমে রোদ্দুরে ভ্যানে করে সবজি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘোরা কি কম মেহনতের কথা? আমি তখন বললুম, আপনার তো অনেক জায়গায় যাতায়াত বলছিলেন। চেনাশুনোও বিস্তর। আপনার ভাইকে একটা কাজ দেখে দিন না। তা তখন সে লোক বলল, গুরুপদর জন্যে কবে কী করতে পারব জানি না, তবে তোমার জন্যে এক্ষুনি একটা কাজের সন্ধান দিতে পারি আমি...'

'তারপর এই কাজের কথা বলল?'

'হ্যাঁ।'

'তুমি কি রাজি হয়ে গেছ নাকি?'

'আমি বলেছি তোমার সঙ্গে কথা বলে জানাব।'

'তাও ভালো', গুরুপদ গম্ভীর গলায় বলে।

'অমন করে বলছ কেন গো?'

'দিনকাল ভালো নয় সোনালি', গুরুপদ মাথা নাড়ে, 'মেয়েদের যে কত রকমের বিপদ পথেঘাটে। চোখ কান খোলা রেখে চলতে না পারলেই সাপের মুখে গিয়ে পড়তে হবে একেবারে।'

সোনালি হেসে ফেলে। গুরুপদ রোববার করে কাজে বেরোয় না। সেদিন খাওয়াদাওয়ার পর একেকদিন দুজনে মিলে সাপলুডো খেলে বিছানার ওপরে পা ছড়িয়ে বসে। তাই সাপের মুখে পড়ার বিপদটা বুঝতে পারল সে। কিন্তু গুরুপদকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় সে বলল, 'তুমি সঙ্গে থেকো। দেখবে সাপের মুখে না পড়ে ঠিক একদিন মইয়ের নীচে পৌঁছে যাব আমরা দুজনে।'

'সত্যি যদি তেমনটা হয় ভালো', বলে থামে গুরুপদ। তারপর বলে, 'কবে খবর নিতে আসবে কিছু বলেছে লোকটা?'

'বলেছে তোমার সঙ্গে কথা বলে নেবে।'

'আমার সঙ্গে?' অবাক হয়ে বলে গুরুপদ।

'হ্যাঁ', সোনালি ওপর নিচ মাথা নাড়ে, 'বলল, এমন একটা সিদ্ধান্ত বাড়ির পুরুষমানুষের অনুমতি ছাড়া তো নেওয়া যায় না। কাজেই আমি গুরুপদর সঙ্গে কথা বলে নিয়ে তবে কাজবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেব তোমার।'

'কবে, কোথায় দেখা করবে আমার সঙ্গে, কিছু বলেছে?'

'উঁহু।'

আজ রোদ খুব চড়া। ভ্যানে করে মাল টেনে নিয়ে যেতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল গুরুপদর। বিক্রিবাটাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ভ্যানটাকে একটা গাছের নীচে রেখে পাশে চায়ের দোকানের বেঞ্চে এসে বসে গুরুপদ। এই দোকানের বংশীদা তার অনেক দিনের চেনা। এদিকে এলে তাই এই দোকানে কিছুক্ষণ বসে চা খেয়ে জিরিয়ে নেয় গুরুপদ। বংশীর খদ্দেরের চাপ না থাকলে সুখ দুঃখের গল্পগাছাও হয় খানিক।

আজ বংশীর চাপ আছে দেখে ওর সঙ্গে অন্য কথা না বলে দোকানের প্লাস্টিকের বেঞ্চে রাখা নোংরা জলের জাগটা থেকেই সে খানিক জল খায় ঢক ঢক করে। তারপর চেঁচিয়ে বলে, 'বংশীদা, একটা লাল চা দিও। সঙ্গে দুটো বিস্কুট।'

'চা দুটোই বলে দাও হে গুরুপদ', গলাটা শুনে চমকে তাকিয়ে গুরুপদ লোকটাকে দেখতে পেল। প্যান্টের ওপরে হাফ হাতা জামা। চোখে চশমা, হাতের কবজিতে ঘড়ি। গ্রাম, মফসসলে ভদ্দরলোকেদের যেমন চেহারা হয়, এ লোকটাও তেমনই। চেহারায় বাড়তি বিশেষত্ব খুব একটা কিছু নেই।

'কী হে, আমাকে মনে করতে পারছ না বুঝি?' গুরুপদকে তার দিকে অমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে লোকটা হাসল।

'হ্যাঁ, মানে...' গুরুপদ কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না।

লোকটাই বংশীকে বলল, 'দুটো দিও চা। আর পয়সা আমিই দেবখন। গুরুপদর থেকে নিও না যেন। কতদিন পরে পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল। আমিই না হয় চা খাইয়ে দিই আজ। ওর বাড়ির চা অবিশ্যি আমার পাওনাই আছে। সোনালি আমাকে নেমন্তন্ন দিয়েই রেখেছে।'

ঝট করে মাথায় এসে গেল নামটা। গুরুপদ অবাক হয়ে বলল, 'আপনিই যতীন হালদার? আপনার কথা সোনালি বলছিল বটে...'

'বদনাম করছিল নাকি?' যতীন হো হো করে হেসে ওঠে।

'না, না, কী যে বলেন', গুরুপদ লজ্জা পায়, 'আপনি আমাদের এত বড় উপকার করতে চেয়েছেন নিজে থেকে...'

'উপকার কিছু নয়', বংশীর থেকে হাত বাড়িয়ে চায়ের গ্লাসটা নিয়ে চুমুক মারে যতীন, 'সোনালির সঙ্গে কথা হচ্ছিল। শুনলাম তোমার কাজটা আর নেই। আর আমার হাতেও একটা কাজ রয়েছে। মানে ওঁরা বলছিলেন একটা ভালো লোক দেখে দিতে। তুমি আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষ। তাই ভাবলাম...'

'কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়টা ঠিক কোথায় হয়েছিল বলুন তো?'

'আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি হে গুরুপদ', গুরুপদর দিকে তাকিয়ে যতীন মাথা নাড়ে, 'মাত্রই বছর চারেক হবে দেখা হয়নি তোমার সঙ্গে সামনাসামনি। সম্প্রতি এক দু'বার অবিশ্যি হাটে বাজারে সোনালির সঙ্গে তোমাকে দেখেছি, তবে কথাবার্তা হয়নি...'

'গুরুপদ যতীনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ উজ্জ্বল চোখে বলে ওঠে, 'মনে পড়েছে। ট্রেনে একই কম্পার্টমেন্টে যেতেন আপনি। আমাদের পাশের খোপে বসতেন। তাস খেলার গ্রুপটার সঙ্গে। কিন্তু তখন আপনার মুখে বড় বড় দাড়ি গোঁফ ছিল।'

'যাক। মনে পড়েছে তাহলে। এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হলাম', যতীন হেসে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে গুরুপদর দিকে বাড়িয়ে দেয়, 'চায়ের পরে চলবে নাকি একখানা?'

'আজ্ঞে না', হাসে গুরুপদ, 'আগে বিড়ি খেতাম বটে, কিন্তু সোনালির গন্ধটা সহ্য হয় না বলে ছেড়ে দিয়েছি।'

'সোনালিকে বড্ড ভালোবাসো তুমি, তাই না?'

'তা বাসি', গুরুপদ হাসে, 'সোনালি মেয়েটা বড় ভালো। তাকে না ভালোবেসে পারা যায় না।'

'বেশ, বেশ। নিজের বরের কাছ থেকে এমন দরাজ সার্টিফিকেট মেয়েরা চট করে পায় না', গুরুপদর কাঁধে চাপড় মেরে বলে যতীন, 'মেয়েটার সঙ্গে কথা বলে আমারও তেমনটাই মনে হয়েছে। আর সেইজন্যেই কাজটার কথা বলা। যে বাড়ির জন্যে বলছি, সে বাড়ির সঙ্গে আমার বড় কাছের সম্পর্ক। আমাকে বিশ্বাসও করে খুব। আর বুঝলে ভায়া, এই চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস জিনিসটি খুব গোলমেলে। মনের মধ্যে এমন একটা বাড়তি দায়িত্ববোধ করে দেয়...

যতীন হালদার লোকটার সঙ্গে কথা বলে বেশ ভালো লাগছিল গুরুপদর। মানুষটা মন্দ হতেই পারে না। বরং এমন মানুষ এ যুগে পাওয়াই যায় না বড় একটা।

যতীন বলল, 'তা তোমার কী মত বলো। সোনালিকে কি কাজটা করার জন্যে ছাড়বে?'

'আমি ছাড়লেও যাদের বাড়ির কাজ তাঁদের যদি তাকে পছন্দ না হয়...'

'ওটা আমার ওপরেই ছাড়লে না হয়', যতীন আশ্বাস দেয় তাকে, 'তাছাড়া তুমিই তো একটু আগে বললে, সোনালি এমন মেয়ে যে তাকে ভালো না বেসে পারাই যায় না...'

'সে তাকে আপনি তো নিজে চোখে দেখেছেন। আমি কি বাড়িয়ে বলছি বলুন?'

'এক্কেবারেই নয়', যতীন মাথা নেড়ে গুরুপদর কথায় সায় দেয়, আরে সেইজন্যেই তো এক কথায় সোনালিকে ওই বাড়িতে কাজটায় ঢোকানোর কথা বলেছি। ভেবে দেখ, এই বাজারে অতগুলো টাকা। হাতের লক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলা উচিত কাজ হবে না হে—'

কথাটা গুরুপদরও মনে হচ্ছিল। বারুইপুর এমন কিছু বেশি দূর নয়। আর কাজে খাটনিটাও কম। এক হাতে খানিক মাথা চুলকে সে বলল, 'আমি রাজি যতীনদা।'

'বেশ', যতীন জুত করে আর একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বলে, 'ওদের সঙ্গে কথা বলে একদিন সন্ধেবেলা সোনালিকে নিয়ে গিয়ে আলাপ পরিচয় করিয়ে কাজে বহাল করিয়ে দিয়ে আসি তাহলে।'

'সন্ধেবেলা কেন? ফিরতে ফিরতে তো রাত হয়ে যাবে তাহলে।'

'ওঁরা কাজকম্ম সেরে ফিরবেন তবে না কথা।'

'রোববার কথা বলা যেতে পারে। বেশ দিনে দিনে হয়ে যাবে তাহলে।'

'তুমি বড্ড সাধাসিধে মানুষ হে গুরুপদ', যতীন হাসে, 'পয়সাঅলা লোকের ব্যাপার। সারা সপ্তা কাজ করেন। রোববার কি বাড়ি বসে কাটান তাঁরা? এখানে ওখানে আসা যাওয়া তো লেগেই আছে...'

'ঠিক আছে, যা ভালো বোঝেন...' আর কথা বাড়ায় না গুরুপদ।

'এই যে এসে গেছি। চলো সোনালি', যতীনের গলার আওয়াজ পেয়ে ফিরে তাকিয়েই ভুরু কুঁচকে ওঠে সোনালির, 'তিনি কই?'

'কে গুরুপদ?' যতীন লঘু গলায় বলে, 'সে সঙ্গে না থাকলে তুমি আমার সঙ্গে যাবে না বুঝি? এত করার পরেও আমার ওপরে বিশ্বাস এল না তোমার সোনালি! তাহলে বলতেই হচ্ছে, মিথ্যেই তুমি দাদা বলে ডাকো আমাকে।'

'তা নয় দাদা', লাজুক মুখে বলে সোনালি, 'তবে মানুষটা তো আপনাকেই ডাকতে গেলেন ওদিকে। তাই তাঁকে আপনার সঙ্গে না দেখতে পেয়ে...'

'তোমাদের দুটিকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি হে', যতীন সোনালির দিকে চেয়ে দরাজ হাসে, 'ঈশ্বর একেবারে রাজযোটক বানিয়ে এ পৃথিবীতে এনেছিলেন তোমাদের কত্তা গিন্নিকে...'

'কেন?'

'বাবা রে বাবা, তাকে যে কী কষ্ট করে গাড়িতে তুলেছি! তোমাকে ছাড়া কিছুতেই সে উঠবে না গাড়িতে। যত বলি, ওই তো সে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে থেকে তুলে নিচ্ছি তাকে। কিছুতে কি কথা শোনে? শেষে জোরজবরদস্তি গাড়িতে তুলেছি তাকে। নাও, এখন চলো দেখি, নইলে তাকে আর বেশিক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। গাড়ির দরজা খুলে এই বুঝি সে নীচে ঝাঁপ দিল।'

সোনালি হেসে ফেলল। মনে মনে ভালোই লাগছিল তার গুরুপদর কথা শুনতে। যতীনের দিকে চেয়ে সে জিগ্যেস করল, 'গাড়ি কই?'

'ওই তো', এক দিকে হাত বাড়িয়ে দেখায় যতীন।

সন্ধে নেমে গেছে। অন্ধকার হয়ে এসেছে চারদিক। যতীনের আঙুল-ইশারা অনুসরণ করে সোনালি দেখতে পেল গাড়িটাকে। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল সে, 'আমরা ট্যাক্সি করে যাব?'

'ট্যাক্সি নয় বোকা। প্রাইভেট গাড়ি। দাদা বউদির। তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছে।'

'ওদের অনেক টাকা, না দাদা?'

'অনেক', বলেই সোনালিকে তাড়া লাগায় যতীন, 'পা চালাও। দেরি হয়ে যাচ্ছে।'

গাড়ির কাছে পৌঁছেই এক টানে দরজা খুলে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সোনালিকে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল যতীন। তারপর নিজে উঠে তার পাশে বসেই ড্রাইভারকে বলল, 'চলো। জলদি।'

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ি চলতে শুরু করল। আতঙ্কিত সোনালি চিৎকার করে উঠল, 'সে কই?'

'তাকে আমাদের দরকার নেই আর', খুব ঠান্ডা গলায় বলল যতীন। জানালার কাচ দিয়ে মুখ বের করে চিৎকার করতে গিয়ে সোনালি দেখল গাড়ির সব কাচ বন্ধ। গাড়ির ভিতরটা ঠান্ডা, তবু সোনালি ঘামছে এখন। গুরুপদ কোথায়? তাকে পাকুড় গাছের নীচে দেখতে না পেয়ে কী করছে এখন মানুষটা? সোনালি হাঁউমাউ করে কেঁদে ফেলল, 'আমাকে নামিয়ে দিন দাদা। কেন আমার এত বড় সর্বনাশ করতে চাইছেন আপনি? আমরা তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি দাদা?' খুব ঠান্ডা গলাতে যতীন বলল, 'আমাদের বিজনেসে আমরা কোনো মেয়ের দাদা হতে পারি না সোনালি। তুমি চুপ করে বোসো।'

'না,' আবারও চিৎকার করে সোনালি। আর তখনই যতীনের ডান হাতটা তার পিছন দিক দিয়ে শরীর বেড় দিয়ে তার নাকের সামনে উঠে আসে। একটা মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ। মাথা ঝিম ঝিম করে ওঠে সোনালির। ঘুমিয়ে পড়ে সে।

গাড়িটা বড় রাস্তা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত সরু একটা রাস্তা ধরল। রাস্তাটা নির্জন। দু পাশেই গাছপালা, ঘন ঝোপ। থকথকে অন্ধকার।

যতীন বলল, 'এই রাস্তায় ঢুকলি অনন্ত?'

'এই পথটাই তো সেফ দাদা। লোকজনের আনাগোনার সম্ভাবনা নেই আজ। আমরা নিশ্চিন্তে আগুনখাকি, গোঁড়ের হাট পেরিয়ে একদম ধরাছোঁয়ার বাইরে বেরিয়ে যাব।'

'আগুনখাকি?' যতীন অবাক হয়ে বলে।

'এ অঞ্চলে এতদিন ঘোরাফেরা করলেন, জায়গাটার নাম শোনেননি দাদা?'

'না তো!' মাথা নাড়ে যতীন, 'নামটা শুনলেই কেমন যেন অস্বস্তি হয় মনের মধ্যে। অমন নাম কেন, বলতে পার অনন্ত?'

'তা তো জানি না', তবে দাদা ওই নামের একটা শ্মশান পড়বে আমাদের যাওয়ার পথেই। রাস্তার এক্কেবারে পাশেই শ্মশানটা। ভিতরে ঢুকে দেখিনি, তবে বাইরে থেকে বেশ সাজানো গুছনো। লোকজন শ্মশানটাকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে...'

'কেন?'

'আগুনখাকি নাকি বড় ভয়ংকর। তাঁর কোপে পড়ার ভয় এই এলাকার সব্বার।'

'তিনি কি কোনো দেবী টেবি নাকি?'

'হবে হয়তো', অনন্ত হাসে, 'গ্রামে গঞ্জে এমন কত যে দেব দেবী বানিয়ে রেখেছে অশিক্ষিত লোকজনেরা, গুনে তো শেষ করা যায় না', বলতে বলতেই ঘ্যাঁচ করে ব্রেক চাপে অনন্ত।

অনন্ত আচমকা ব্রেক কষায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে সামনের সিটে মাথাটা ঠুকে গেল যতীনের। কপালের ডান দিকটা ভালোই লেগেছে। বিরক্ত হয়ে সে জিগ্যেস করল, 'কী হল?'

'সামনে দেখুন।'

হেড লাইটের আলোয় তখনই মেয়েটাকে চোখে পড়ল যতীনের। মেয়ে না বলে বউ বলাই ভালো। পরনে ডুরে শাড়ি। এক হাত দিয়ে মাথার ঘোমটাটাকে ধরে রেখে আর এক হাত এখনও প্রাণপণে নাড়িয়ে যতীনদের থামতে ইশারা করে যাচ্ছে সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।

সরু রাস্তা। তার মাঝ-মধ্যিখানে এমন ভাবে দাঁড়িয়েছিল সে, গাড়ি না দাঁড় করিয়ে উপায় ছিল না। অনন্ত সামনের জানালার এক দিকের কাচ অল্প নামিয়ে হেঁকে জিগ্যেস করল, 'কী ব্যাপার, মরতে রাস্তার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছিলে নাকি?'

'না না, গাড়িটাকে দাঁড় করাতে', সে ভয় পাওয়া কাঁপা গলায় বলে।

'ব্রেক চাপতে আর একটু দেরি হলেই তো গাড়ির নীচে চলে যেতে তুমি', অনন্ত ধমক লাগায় তাকে, 'অমন করে কেউ গাড়ি থামায়?'

'উপায় নেই যে বাবু', মেয়েটা মাথা নিচু করে, 'রাতে এদিকে কি গাড়ি আসে বাবু সহজে? আর যদি বা ভুল করে কেউ আসে, এখানে তারা কিছুতেই গাড়ি দাঁড় করাতে চায় না।'

'কেন?'

'সামনে যে আগুনখাকির শ্মশান।'

'তাতে কী?'

'সে যে বড় ভয়ানক জায়গা, আপনারা জানেন না?'

'আমরা জানি কিনা সেটা বড় কথা নয়, কিন্তু তুমি তো জানো। তাহলে জেনেশুনে তুমি এদিকে এসেছিলে কী করতে?'

'বাধ্য হয়ে বাবু। নীমপীঠ যেতে হয়েছিল। ফেরার পথে রাত হয়ে গেল। গাড়ি পাচ্ছি না কিছুতেই। ওই জন্যেই তো মরিয়া হয়ে আপনাদের থামানোর চেষ্টা করছিলুম। যদি ওই শ্মশানের এলাকাটা একটু গাড়ি করে পার করে দেন...'

'কত দূর জায়গাটা?'

'এই তো সামনেই। খানিক গেলেই। এই ধরুন, গাড়িতে মিনিট দশ পনেরো...'

'কী করব?' অনন্ত ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে যতীনকে।

'তুলে নে', হাসে যতীন, 'ভগবান যখন দেন এমন দু-হাত উজাড় করেই দেন রে অনন্ত। একটা মেয়েছেলে জোটাতেই কালঘাম ছুটে যায়, এ দেখি একটার সঙ্গে আর একটা ফ্রি হয়ে গেল। লক্ষ্মী একেবারে যেচে আমাদের পকেটে ঢুকতে চাইছেন রে আজ...'

'তালে তুলে নিই', বলে সামনের দরজা খুলতে যায় অনন্ত।

'সামনে বসাচ্ছিস যে বড়?' যতীন খিক খিক করে হাসে, 'স্টিয়ারিং ঘোরানোর অছিলায় কনুই মারবি নিশ্চিত?'

অনন্ত হাসে, 'যার যেমন মন। আমি চাইলাম যাতে পেছনের মেয়েটার দিকে চট করে নজর না পড়ে...'

দরজা খুলে দেয় অনন্ত, 'উঠে এসো।'

মেয়েটা গাড়িতে ঢুকে বসতেই একটা কটূ গন্ধ এসে নাকে লাগে যতীনের। কেমন যেন পোড়া পোড়া গন্ধ। মনের ভুল কি?

গাড়ি চলতে শুরু করে। গন্ধটা তীব্র হচ্ছে। গাড়ির মধ্যের উত্তাপ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে যেন।

'এ সি চলছে না?' জিগ্যেস করে যতীন।'

'চলছে তো।' অবাক হয়ে বলল অনন্ত।

ক্রমশ অবশ হয়ে যাচ্ছে ভিতরটা। দম বন্ধ হয়ে আসছে। পোড়া কাঠের সঙ্গে মানুষের চামড়া, মাংস পোড়ার গন্ধ মিশে যাচ্ছে যেন। হাত বাড়িয়ে জানলা খুলতে যায় যতীন। জানালাগুলো লক করা। হাঁপিয়ে উঠে চেঁচিয়ে ওঠে যতীন, 'অনন্ত জানলার লক খোলো। শিগগির।'

দু-বার দোল খেয়ে, খানিক টাল খেতে খেতে কংক্রিটের বাঁধানো রাস্তার ধারের একটা গাছের গায়ে ধাক্কা মেরে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ল। অনন্ত বলল, 'যতীনদা, সর্বনাশ হয়েছে।'

'কী হল?'

'ইঞ্জিনের গোলমাল।'

'মাথায় ঘোমটা দেওয়া মেয়েটা এতক্ষণ নিরুদ্বেগ বসে কী একটা যেন গান গাইছিল গুন গুন করে। এইবার খিল খিল করে হেসে উঠল সে। সেই হাসি শুনে বুক কেঁপে উঠল অনন্ত আর যতীনের। দ্রুত গাড়ির দরজা খুলে নীচে নামল দুজন। গাড়ির ইঞ্জিন থেকে প্রচণ্ড উত্তাপে গল গল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে তখন। সেদিকে তাকিয়ে অনন্ত বলল, 'কী হবে? আগুন ধরে যাবে যে এক্ষুনি।'

'একটু জল পাওয়া গেলে হয়তো...' ভয় পাওয়া গলায় বলে যতীন।

'ওই তো শ্মশান', মেয়েটা খিলখিল করে হেসে ওঠে আবার, 'ঢুকে যাও। মড়া পোড়ানোর চিতার পিছনে শান বাঁধানো ঘাট আছে। মস্ত পুকুর। ভরা জল। মড়া পুড়িয়ে চলে যাবার সময় চিতায় জল ঢালা ফুটো কলসিও পেয়ে যাবে। দুজনে মিলে বইলে জল কম হবে না। ইঞ্জিনটা ঠান্ডা হতেও পারে...'

সেই বিচ্ছিরি মাংস পোড়া গন্ধটা আবার তীব্র হচ্ছে। সেই গন্ধ পেয়েই কিনা কে জানে, কোথা থেকে এক পাল শেয়াল ডেকে উঠল হুক্কা হুয়া করে।

মেয়েটা এইবার আদেশের সুরে হুংকার দিয়ে উঠল, 'যাও, ঢোকো ভিতরে।'

নির্জন রাস্তার ওপরে, গাছের মাথায় শ্মশানে ঢোকার তোরণের ওপরে জ্যোৎস্না লুটিয়ে পড়েছে। আজ পূর্ণিমা ছিল বোধহয়। আগুনখাকির শ্মশানে ঢোকার মুখে তোরণের দিকে চেয়ে গা শিউরে উঠল যতীন আর অনন্তর। তোরণের দুই থামের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা সিংহর মূর্তিদুটো আজ যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে তাদের লেজদুটো ডান দিক বাঁ দিক দুলছে। ওদের দুজনকে দেখে জিভ চাটছে তারা লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে। মাঝখানে সুঠাম চেহারার শিবমূর্তি। তিনিও যেন আজ রুদ্র। চোখে আগুন ঠিকরোচ্ছে তাঁরও। ভয় পেয়ে গিয়ে তোরণ পেরিয়ে দৌড়ে শ্মশানের ভিতরে ঢুকে গেল অনন্ত আর যতীন।

শ্মশান চত্বর চাঁদের আলোয় ভাসছে আজ। এই নির্জন গ্রামের মধ্যে হলে কী হবে, পুরো শ্মশানটাই অসম্ভব ঝকঝকে। টালি দিয়ে বাঁধানো চত্বরের ওপরে মৃতদেহ স্নান করানোর উঁচু বেদি। তার উলটোদিকে কাঠের চিতা সাজানোর জন্যে অনেকখানি জায়গা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। চিতা সাজানোর জায়গাটার দিকে চোখ পড়তেই বুকের মধ্যেটা ধড়াস করে উঠল অনন্ত আর যতীনের। একদল কম বয়েসি মেয়ে সেখানে নিঃশব্দে চিতা সাজাচ্ছে। দু'খানা। চারদিকে তাকিয়ে কোনো মৃতদেহই দেখতে পেল না তারা।

যতীন ভয় পাওয়া গলায় জিগ্যেস করল, 'এরা কারা বল তো?'

'জানি না দাদা।'

'সঙ্গে কোনো পুরুষমানুষ নেই। কাদের জন্যে চিতা সাজাচ্ছে এরা?'

'তোদের জন্যে।' হিলহিলে কণ্ঠস্বরটা শুনে চমকে পিছন ফিরতেই মেয়েটাকে দেখতে পেল ওরা। সেই মেয়েটা, যাকে রাস্তা থেকে গাড়িতে তুলেছিল অনন্ত। মেয়েটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।

মেয়েটার মাথার ঘোমটা সরে গেছে এখন। জ্যোৎস্না এসে পড়েছে তার খোলা মুখের ওপর। মেয়েটা আর একটু কাছে এগিয়ে আসতেই আর্ত চিৎকার করে উঠল অনন্ত, 'যতীনদা পালাও—'

মেয়েটার মুখের এক দিক পুড়ে কাঠকয়লার মতো কালো হয়ে আছে। মাংসবিহীন করোটি বেরিয়ে পড়েছে সেই পোড়া মুখের আড়াল থেকে।

অনন্ত আর যতীনের দিকে তাকিয়ে হি হি হি হি হাসিতে আকাশ ভরিয়ে দিল সে। তারপর দুই শীর্ণ হাত আকাশের দিকে তুলে আকুল আহ্বান জানিয়ে কাদের যেন ডাকতে লাগল, 'ওরে আয়, ওরে আয়, ওরে আয়...'

চিতার ওপারের পুকুর সংলগ্ন যে আগাছা ঘেরা মাঠ, সেখানে আধো আলো আধো অন্ধকারে যেন তোলপাড় শুরু হল মুহূর্তের মধ্যে। জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে মাথা উঁচু করে থাকা সমাধিফলকগুলো থেকে ছায়া ছায়া মূর্তি ধরে কারা যেন বেরিয়ে এসে ঘিরে ফেলল অনন্ত আর যতীনকে। ক্রমশ পৃথিবীর বাতাসে, পৃথিবীর জ্যোৎস্নায় তারা জমাট বেঁধে এক একজন নারী মূর্তিতে পালটে গেল। আকাশের দিকে হাত উঁচিয়ে থাকা নারীমূর্তির সামনে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে ফিসফিসে অথচ স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, 'আমাদের প্রতি কী আদেশ সখী আগুনখাকি?'

'আজ আমাদের ভারি আনন্দের দিন।'

'কেন সখী?'

'আজ আমাদের জেগে ওঠার দিনে মনের মতো দুই বলি পেয়েছি। এদের জীবন্ত শরীর আগুনে পুড়িয়ে সেই ধোঁয়া গায়ে মেখে নিজেদের জ্বালা জুড়বো আজ আমরা...'

'জ্বালা জুড়োবে, জ্বালা জুড়োবে, জ্বালা জুড়োবে...' মহোল্লাসে হই হই করে উঠল সক্কলে।

'চিতায় তোলার আগে এখন ভালো করে স্নান করা দেখি এদের, ঠিক যেমনটি একসময় আমাদের স্নান করিয়েছিল পুরুষেরা, এই শ্মশানে সহমরণে পাঠাবে বলে।'

'দিচ্ছি দিচ্ছি', উৎসাহে খলবল করে উঠল আগুনখাকির সহচরীরা। তারপর কলসি করে শান বাঁধানো ঘাট থেকে জল আনতে ছুটল তারা।

'না, না , না—' দুজন পুরুষ মানুষের তীব্র আর্তনাদে শ্মশানভূমি কেঁপে উঠল যেন। কিন্তু ছায়া ছায়া নারীমূর্তিরা ভ্রুক্ষেপই করল না। দুজনকে অনায়াসে শূন্যে তুলে নিয়ে স্নানের বেদিতে শুইয়ে দিল তারা। তাদের স্নান করানোও সম্পন্ন হল। শরীর অবশ হয়ে এসেছিল যতীন, অনন্ত দুজনেরই। নড়বার শক্তি পাচ্ছিল না তারা একটুও। সেই নারীরা তাদের জড়বৎ শরীর চিতায় তুলে দিল খিলখিল করে হাসতে হাসতে।

ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল যতীন, 'কেন মারতে চাইছ মা আমাদের? আমরা তো তোমাদের সঙ্গে কোনো অন্যায় করিনি?'

'মা?' হা হা অট্টহাসিতে শরীর কাঁপতে লাগল সেই নারীদের, 'একটু আগে এই মাতৃজ্ঞান কোথায় ছিল বাছা তোদের?'

'আর হবে না কক্ষনও। কথা দিচ্ছি। এ কাজ এই দু-হাত দিয়ে হবে না আর কক্ষনও', যতীন, অনন্ত চিতার ওপরে শুয়ে ছটফট করতে করতে বলে।

'বিশ্বাস করি না। তোদের মতো নষ্ট পুরুষরা চিরকাল সুযোগ পেলেই জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছিস আমাদের। সেকালেও, একালেও...'

'আমরা তেমন অন্যায় করিনি তো কখনও?'

'করিসনি?'

'না?'

'ও, তোরা ভাবিস আগুনে পোড়াই শুধু পোড়া? যে মেয়েগুলোকে ফুসলে ঘর থেকে বের করে বেচে দিস, তারা যে জীবনভর দেহে মনে পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে সর্বক্ষণ, সে পোড়া পোড়া নয়?

শ্মশানের মাঝখানে স্থির, অচঞ্চল দাঁড়িয়ে আদেশ দিল আগুনখাকি নামের সেই মেয়ে, 'নে এবার আগুন দে চিতায়।' প্রতি শ্রাবণী পূর্ণিমায়, যখনই বেঁচে উঠব আমরা, অসহায় নারীদের হয়ে এইভাবেই প্রতিশোধ নেব আমরা আবহমান কাল ধরে। যেখানেই লুকিয়ে থাকুক শয়তানের দল, তাদের আমরা খুঁজে খুঁজে ঠিক বের করব। তারপর এখানে যদি টেনে না আনতেও পারি, আমাদের শরীরের আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেব তাদের।'

আগুনখাকির নির্জন শ্মশানে মানুষের অগোচরে একজোড়া চিতা জ্বলে উঠল দাউ দাউ করে।

যতীনকে কোত্থাও দেখতে না পেয়ে পাকুড় গাছের কাছে ফিরে এসে গুরুপদ দেখল, সোনালি নেই। অসহায় লাগছিল তার। কোথায় গেল সোনালি? তাকে কিছু না বলে যতীনের সঙ্গে একাই চলে যাবে, এমন মেয়ে তো সে নয়! তাহলে তার আসতে দেরি দেখে সে কি বাড়ি ফিরে গেল? দ্রুত বাড়ির পথ ধরল গুরুপদ। এখান থেকে তার বাড়ি কম পথ নয়। ফিরে সে অবাক হয়ে দেখল, সোনালি একলা বসে আছে দাওয়ায়। কেমন যেন ফ্যালফেলে দৃষ্টি। উসকোখুসকো চেহারা। গায়ে ধুম জ্বর।

সোনালির জ্বর ছেড়েছিল দিন সাতেক পর। তার মধ্যেই সোনালির মুখে এক অদ্ভুত গল্প শুনেছিল গুরুপদ। যতীনের শয়তানির গল্প। নাকে রুমাল চেপে ধরে সোনালিকে ঘুম পাড়িয়ে দেবার গল্প। শুধু কী করে ওইটুকু সময়ের মধ্যে সে বাড়ি পৌঁছেছিল, সে কথা কিছুতেই স্মরণ করতে পারেনি সোনালি। একটা কথাই শুধু মনে আছে তার, যেন স্বপ্নের মধ্যে এক ঘোমটায় মুখ ঢাকা অচেনা নারী এসে হাত ধরেছিল তার। বরফের মতো ঠান্ডা সেই হাত। আর তার গা গড়িয়ে যেন একটা পোড়া গন্ধ পাক খাচ্ছিল বাতাসে...

তারও অনেক পরে আগুনখাকির গল্প শুনেছিল গুরুপদ। সে গপ্প দু আড়াইশো বছরের পুরোনো। দত্ত বাড়ির বউ ছিল সে। এলাকার অনেক হতভাগ্য মেয়ের মতোই তাকেও সতীদাহের জন্যে আনা হয়েছিল ওই শ্মশানে। চিতায় জ্বলতে জ্বলতেই উঠে দাঁড়িয়ে কাঠের বোঝা সরিয়ে, এক দৌড়ে পিছনের পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই সদ্য স্বামীহারা। সাঁতরে অন্য পারে উঠে সে সম্ভবত ধর্মোন্মাদ খুনিদের হাত থেকে পালিয়ে যেতেও পেরে ছিল শেষপর্যন্ত। অন্তত তার লাশ কেউ দেখেনি বলে তেমনটাই মনে করা হয়েছিল দত্ত বাড়িতে। সবাই বলে, তিনি এখন দেবী। আগুনখাকি শ্মশান তাঁর লীলাভূমি। ফি বছর শ্রাবণী পূর্ণিমার রাতে তিনি ওই শ্মশানে আসেন। সতী হওয়া সখীদের সঙ্গে নিয়ে কঠিন সাজা দেন নারী অবমাননাকারী পুরুষদের।

আগুনখাকির শ্মশান সারা বছরই ভরদুপুর আর সন্ধের পরে শুনশান। বেঁচে থাকা মানুষের জন্যে নিষিদ্ধ। আর শ্রাবণী পূর্ণিমার দিন? ও শ্মশানের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করে না কেউ...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%