প্রথম রিপু

জয়দীপ চক্রবর্তী

চতুর্দশীর রাত্রি থমথম করছে। কাল অমাবস্যা। নির্জন শ্মশানভূমিতে সাধারণ মানুষের চিহ্নমাত্র নেই। কিছুক্ষণ আগে কাঠের চুল্লিতে শবদাহ শেষ করে আজকের শেষ শবযাত্রীর দল ফিরে গেছে। একটু দূরেই শিশুদের সমাধিক্ষেত্র। পাঁচ বছরের কম বয়েসি শিশু মারা গেলে দাহ হয় না। এই শ্মশানের মাটিতেই সমাধি দেওয়া হয় তাদের। এই এখানকার রীতি। গরিবগুর্বো মানুষ অনেক সময় দাহের কাঠ কিনতে না পেরে প্রাপ্তবয়স্ক মৃতদেহদেরও মুখাগ্নিটুকুমাত্র করে সমাধি দিয়ে যায় এখানে। সেইসব সমাধির আশেপাশে রাত নামলেই শেয়ালেরা ঘুরঘুর করে। মাটি খুঁড়ে মৃতদেহ টেনে তোলার চেষ্টা করে। অর্ধগলিত শবমাংস খায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে। পচা মাংসের গন্ধ ওড়ে বাতাসে। আসে কুকুরের দলও। শেয়ালের দলের সঙ্গে মাটি খুঁড়ে বের করা কচি কচি হাত পায়ের দখল নিয়ে ঝগড়া বাধে। তাদের ক্রুদ্ধ গর্জনে ভয়ংকর শ্মশানভূমি আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে। নেহাত প্রয়োজন ছাড়া এ শ্মশানে আসবে এমন বুকের পাটা কার? শবযাত্রীরা রাত ঘন হলে এই শ্মশান অভিমুখে আসেই না। অপেক্ষা করে ভোরের আলো ফোটার জন্যে।

আজ শ্মশানের আকাশ যেন থম মেরে আছে। গাছের পাতারাও স্থির, গম্ভীর। যে ঘটনা ঘটতে চলেছে তার ভয়াবহতা আঁচ করে নড়াচড়া করতে ভুলেই গেছে তারা। মধ্যরাত পার হতেই একদল শেয়াল আর্ত কণ্ঠে ডেকে উঠল। পেঁচা ডেকে উঠল ঝুপসি গাছের কোটর থেকে। শ্মশানের প্রাচীন গাছের ডালে বসা বকের ছানারা ডেকে উঠল একসঙ্গে। সে ডাক শুনলে অতি সাহসী মানুষের বুকও যেন কেঁপে ওঠে। মনে হয় এক দঙ্গল শিশু যেন এক সুরে কেঁদে উঠেছে শ্মশানের নীরবতা ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়ে।

দুটি মানুষ অন্ধকারে স্থির হয়ে বসে ছিল এতক্ষণ। এইবার তাদের একজন আসনের ওপরে উঠে দাঁড়াল। জলদগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল অপর জনকে, 'এইবার সময় হয়েছে। তুমি কি প্রস্তুত দিবাকর?'

'হ্যাঁ গুরুদেব', মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় অপরজন।

'আরও একবার সাবধান করছি তোমাকে। এই সাধনা কিন্তু অতি কঠিন। রিপুতাড়িত হলেই ঘোর বিপদ। একবারের জন্যেও যদি ইন্দ্রিয়-পরবশ হয়ে পড়ো, তাহলেই সর্বনাশ। মোহিনীরূপী প্রেত তোমার সর্বস্ব গ্রাস করতে একটুও দ্বিধা করবে না কিন্তু দিবাকর।'

'জানি গুরুদেব। আমি নিশ্চিত সতর্ক থাকব।'

'আর একবার বারণ করছি আমি তোমাকে', গুরুদেব একটা মাটির পুতুল হাতে তুলে নিলেন। পুতুলটি অভিশপ্ত, দিবাকর জানে। বহু প্রেতসিদ্ধ সাধক পূর্বে এই পুতুলের সাহায্যেই মারণ উচাটন সিদ্ধি প্রয়োগ করে এসেছেন এই শ্মশানে। সাধনপথের অন্তরায় যাঁরাই হয়েছেন, এই পুতুলের শরীরে শলাকা প্রবেশ করিয়ে মন্ত্রশক্তির প্রভাবে তাঁরা তাদের প্রাণসংহার করেছেন। তারপর সেই মৃত শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসা প্রেতদের বশীভূত করে কাজে লাগিয়েছেন নিজেদের ইচ্ছেমতো। গুরুদেব রামসাঁতাল বার বার বলেছেন দিবাকরকে, তাঁরা সিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এ কাজ অন্যায়ই ছিল। সাধনালব্ধ সিদ্ধি মানুষের ক্ষতির কাজে লাগান যাঁরা, তাঁদের পতন অনিবার্য। মানুষের মঙ্গলের কাজে না লাগিয়ে শক্তির অপব্যবহারের ক্ষমা নেই। সেই পাপে এই পুতুলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমা হয়েছে হাজার দীর্ঘশ্বাস। আজ রামসাঁতাল দিবাকরকে বিশেষ সাধনায় বসিয়েছেন সেইসব অতৃপ্ত, পাপগ্রস্ত আত্মাদের মুক্তির পথ প্রশস্ত করার শক্তি উপার্জনের জন্য। কিন্তু এই সাধন অতি দুরূহ। পদে পদে বাধা আসবে। আসবে প্রলোভন।

তন্ত্রসিদ্ধ মহাগুরু রামসাঁতাল বলে চললেন, 'এই ক্রিয়ায় সামান্য ভুল হলেও ক্ষমা নেই। আমিও তখন আর বাঁচাতে পারব না তোমাকে দিবাকর। অভিশপ্ত এক প্রেত-শরীর নিয়ে তোমাকেও তখন ওই মৃত্তিকানির্মিত পুতুলটিকে আশ্রয় করেই থাকতে হবে। সারাদিন পুতুলের মধ্যে বন্দি থেকে সন্ধ্যার পর ছায়া-শরীর নিয়ে বেরিয়ে এসে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরতে হবে তোমাকে। নিজের রক্ত-মাংসের এই শরীরটিতে প্রবেশের দ্বার খুঁজে পাবে না তখন তুমি আর...'

দিবাকর মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

সাধক রামসাঁতাল হিমশীতল কণ্ঠে বলে চললেন, জৈব তাড়নার নিবৃত্তি হবে না তখনও। পাগলের মতো অন্য মানুষের শরীর খুঁজে বেড়াতে হবে তখন তোমায়।'

'জানি গুরুদেব।'

'সেও এক পরীক্ষা। প্রাণপণে জৈবতাড়নাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করতে হবে। সূক্ষ্মশরীরকে জ্যোতিস্বরূপ চেতনায় স্থির করে শুক্লকর্মের চিন্তা করে যেতে হবে নিরন্তর। যদি সে কাজে সফল হও, তাহলে আমি তোমার লুপ্ত শরীরটির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারব। কিন্তু যদি তা না পারো...' কথা শেষ না করেই দিবাকরের চোখের ওপরে চোখ রাখলেন সিদ্ধযোগী রামসাঁতাল। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, 'তোমার এই পার্থিব শরীরকে চিরকালের মতো শেষ করে ফেলতে হবে আমাকে। চিরকালের জন্যে। তোমার আত্মাটিকেও তখন দাসত্ব করতে হবে। মুক্তি পাবে না তুমি দিবাকর...'

'তাও জানি।' মৃদু কণ্ঠে বলে দিবাকর।

'সব জেনেও এই সাধনায় এগোতে চাও?'

'হ্যাঁ গুরুদেব।'

'তবে এসো। আমি আসন প্রস্তুত করেছি', দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন গুরু রামসাঁতাল, 'তুমি সেই আসনকে তিনবার প্রদক্ষিণ করো। তারপর পরণের বস্ত্র তোমার চিতাসনের ঈশান কোণে নির্মিত অপর চিতাটির অগ্নিতে নিক্ষেপ করে উত্তরমুখে বসো নগ্ন হয়ে।

দিবাকর গুরু আজ্ঞা পালন করল।

তিনি কপালপাত্রে কারণ ঢেলে দিবাকরের সামনে রাখলেন, 'কারণবারিতে তিনবার তান্ত্রিক আচমন করো ভক্তিভরে।'

দিবাকর বুকের কাছে দু'-হাত জড়ো করে বিশেষ যন্ত্রের ওপরে নির্মিত চিতাটিকে প্রদক্ষিণ করল তিনবার। তারপর গুরু স্মরণ করে বীরাসনে বসে পড়ল সেই চিতার ওপরে, নির্দিষ্ট আসনে।

তার গুরুদেব শ্মশানের অপর প্রান্তের এক সমাধি খুঁড়ে নির্দিষ্ট চিহ্নযুক্ত শবটিকে তুলে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে এলেন শিষ্যের কাছে। শবটি অপঘাতে মৃত এক সধবা রমণীর।

মৃতদেহটিতে পচন ধরে গেছে। শবদেহ থেকে মাংস খসে খসে পড়ছিল। দুর্গন্ধ উঠছে সেই শবের সমস্ত শরীর থেকে। তবু তাঁর মুখে বিকারমাত্র দেখা গেল না। ধীর পায়ে হেঁটে এসে তিনি থামলেন দিবাকরের সামনে। শবকে মাটিতে নামিয়ে তার গায়ে লেগে থাকা বস্ত্রখণ্ডটিকে সরিয়ে তিনি তাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করলেন। মাটির কলসিতে রাখা গঙ্গাজলে স্নান করালেন সেই দেহটিকে। তারপর দু-হাতে তাকে তুলে নিয়ে পরম যত্নে আড়াআড়ি শুইয়ে দিলেন দিবাকরের কোলের ওপরে।

দিবাকরের সারা শরীর একবার কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল সে। ভয় পেলে চলবে না। আজ সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলে অনন্ত শক্তির অধিকারী হবে সে। চাইকি সেই শক্তিবলে নিজের গুরুকেও ছাপিয়ে যেতে পারে সে। মনে মনে এই লোভ তার বহু দিনের। এইসব গুপ্ত সিদ্ধির অধিকারী হতে পারলে মানুষকে দাস বানিয়ে রাখা যায়। বিদেহী আত্মাদেরও। আর তখন পৃথিবীর ঐশ্বর্য নিজের জিম্মায় নিয়ে আসা কোনো ব্যাপারই থাকে না। দিবাকরের দু-চোখে লোভ ঝিকমিকিয়ে ওঠে।

গুরুদেব রামসাঁতাল আবার বললেন, 'দিবাকর, আমি চাইনি এ সাধনায় ব্রতী হও তুমি। কিন্তু তুমি এতবার জোর করেছ আমার কাছে... আমি ধরে নিচ্ছি নিয়তিই তোমাকে দিয়ে এই আবদার করিয়েছে বার বার। যাই হোক, আমার কাজ আপাতত শেষ। বাকি কাজটুকু এবারে একাই সমাধা করতে হবে তোমাকে। মনে রেখ, জাগ্রত মন্ত্রের প্রভাবে একটু পরেই এই শবে প্রাণসঞ্চার হবে। তখন অসীম শক্তি নিয়ে এই নারী জেগে উঠবে। আর জেগে উঠেই তোমার ওপরে মোহজাল বিস্তার করতে চাইবে সে। খবরদার, তার মায়ায় ভুলো না। যে মুহূর্তে এই নারীশরীরে প্রাণসঞ্চার হবে, তাকে মাতৃমূর্তি ভেবে প্রণাম কোরো তুমি। কামনার দৃষ্টিতে ভুলেও তাকিও না এর দিকে।'

'আচ্ছা', দিবাকর মাথা নীচু করে, 'আমাকে আশীর্বাদ করুন গুরুদেব।'

'নিয়তিকে আমরা কেউ লঙ্ঘন করতে পারি না দিবাকর', গুরুদেব মৃদু হাসলেন, 'তবু প্রার্থনা করি, মা তোমার মনকে আজ যেন স্থির রাখেন।'

ধীর পায়ে চিতার কাছ থেকে সরে গেলেন তিনি। পিছনে ফিরলেন না একবারও। ক্রমশ দিবাকরের দৃষ্টির বাইরে, অন্ধকারে মিশে গেলেন গুরু রামসাঁতাল।

দিবাকর জোরে শ্বাস নিল। চোখ বন্ধ করে নিজের মনকে নিয়ে এল আজ্ঞাচক্রে। সমস্ত চেতনা একটি সূচাগ্র পরিমাণ বিন্দুতে স্থির করল সে। আর তখনই সেই বিন্দুতে জ্বলে উঠল আলো। তীব্র অথচ স্নিগ্ধ সেই আলো। সেই আলোবিন্দুর মধ্যে জেগে উঠল একাক্ষর মহামন্ত্রটি। এমনই হবার কথা। গুরুদেব তেমনটাই বলেছিলেন। মনে মনে খুশি হল দিবাকর। সে সঠিক পথেই এগোচ্ছে। দিবাকর প্রাণপণ জপ করতে লাগল সেই মন্ত্র। ক্রমশ দেহবোধ লুপ্ত হল তার। সময় বয়ে যেতে লাগল। দিবাকর প্রবহমান সেই সময়ের হিসেব রাখতে পারল না।

কতক্ষণ কাটল এভাবে কে জানে! রাত ক্রমশ নতুন একটি দিনের দিকে ঢলে পড়তে আরম্ভ করল। একপাল শেয়াল ডেকে উঠল তারস্বরে। কুকুরের দল কেঁদে উঠল আকাশের দিকে মুখ তুলে। দিবাকরের কোলের ওপরে শুয়ে থাকা শব হঠাৎই নড়েচড়ে উঠল। মূলাধার থেকে সহস্রার পর্যন্ত যেন বিদ্যুতের একটি শিখা ছুটে গেল। চোখ খুলে ফেলল দিবাকর। তার পাশে গুরুদেব যে চিতাগ্নি প্রস্তুত করেছিলেন, তা থেকে লালচে আলো এসে পড়েছে। সেই আলোয় তার চিতাসন রক্তিম হয়ে উঠেছে। সেই মায়াবী আলোয় দিবাকরের নগ্ন দীর্ঘ সুঠাম শরীর মাখামাখি হয়ে আছে তখন। দিবাকর চোখ নামালো নীচের দিকে। দেখল, তার ক্রোড়ে শায়িত শব চোখ মেলে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অদ্ভুত মায়া সেই চোখে। আর আদিম এক আমন্ত্রণ। গলিত শবের দুর্গন্ধ মুছে গিয়ে রমণীর দেহ থেকে এখন সুগন্ধ উড়ছে। তার দেহবল্লরী যেন বসন্তের কুসুমরাজির মতোই ফুটে উঠেছে। দুই স্তন দুই পূর্ণচন্দ্র হয়ে ফুটে উঠেছে দেহাকাশে। ক্ষীণ কটি, গুরু নিতম্ব, গভীর নাভি, পাতলা ঠোঁট, নারীমূর্তিতে কোথাও যেন কোনো খুঁত নেই।

দিবাকর নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করল। না, এর রূপের মোহে ভুললে চলবে না। এখনও কয়েক সহস্র জপ বাকি। দিবাকর আবার চোখ বুজিয়ে ফেলল। মনকে স্থির করার চেষ্টা করল ভ্রু মধ্যে। কিন্তু সে বুঝতে পারল, মন স্থির করা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে এখন তার পক্ষে। ভ্রু মধ্যে একাক্ষর মহামন্ত্রের বদলে জেগে উঠেছে নগ্ন নারী। তার ভরাট স্তন, রহস্যময় যোনি। দিবাকর ঘামতে শুরু করল। তার অঙ্কশায়িত সেই নারী ধীরে ধীরে উঠে বসল এইবার। দীর্ঘ, কোমল দুই হাতে কণ্ঠ আঁকড়ে ধরল দিবাকরের। তার মুখ দিবাকরের মুখের ওপরে এসে পৌঁচেছে। তার উষ্ণ নিশ্বাস এসে পড়ছে কপালে। দিবাকরের বুকের ওপরে চেপে বসেছে তার নরম দুই স্তন। দিবাকর সেই স্পর্শ উপেক্ষা করতে গিয়েও সফল হচ্ছে না কিছুতেই। নারী সাপের মতো নিজের শরীর দিয়ে পেঁচিয়ে ধরতে লাগল দিবাকরকে। দিবাকর বুঝল, প্রতিরোধ ভেঙে যাচ্ছে। শরীর জেগে উঠছে তার। নারীর কামার্ত স্তনবৃন্তদুটি দৃঢ় হয়ে উঠেছে। সেই বৃন্তের ছোঁয়া লাগছে তার বুকে, তার পেটে। দিবাকর তার নিম্নাঙ্গের উত্থান টের পেয়ে ছটফটিয়ে উঠল। গুরুবাক্য বিস্মৃত হল সে। প্রায় মোহাবিষ্টের মতো দিবাকর নারীর স্তনযুগল স্পর্শ করল দু-হাত দিয়ে।

নারীর ঠোঁটে হাসির ঝিলিক খেলে গেল। দু-হাতে দিবাকরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে নিজের দিকে আকর্ষণ করল প্রাণপণে। দিবাকর বাধা দিল না। সেই নারী খিলখিল করে হেসে উঠল। নিজের ওষ্ঠ প্রতিস্থাপন করল দিবাকরের ওষ্ঠে। তারপর নিজের দুই পা প্রসারিত করল দিবাকরের কোমরের দুই প্রান্ত দিয়ে। সম্মোহিতের মতো দিবাকর নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে তার পৌরুষ প্রোথিত করল সেই নারীমধ্যে।

দূর থেকে একবার যেন এক পরিচিত কণ্ঠের চিৎকার কানে আসে দিবাকরের, 'না, না, না...'

দূরে গাছে পেঁচা ডেকে ওঠে। ছটফটিয়ে ডানা ঝাপটে ওঠে আশেপাশের গাছে ঘুমিয়ে থাকা পাখিরা। হাহাকারের মতো শব্দ করে এক ঝলক হাওয়া দৌড়ে চলে যায় শ্মশানের ধুলো উড়িয়ে।

দিবাকর সে সব গ্রাহ্য করে না। নেশাগ্রস্তের মতো সে নিজেকে বিলিয়ে দেয় সেই নারীর রতিবিলাসে।

তৈলধারার মতো অবাধে বয়ে যায় সময়। দিবাকর ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে সেই নারীর অনন্ত গহ্বরে। তার শরীর হারিয়ে গেল, মন্ত্র হারিয়ে গেল। মোহময়ী সেই নারীতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে গেল দিবাকর।

রাত শেষ হয়ে এল। সূর্যের প্রথম কিরণ পৃথিবী স্পর্শ করবে আর একটু পরেই। পূর্ব রাতের রহস্যময়ী নারী দিবাকরকে ছেড়ে টলমলো পায়ে ফিরে চলল নিজের সমাধির দিকে। চোখে মুখে অদ্ভুত তৃপ্তি তার। তার হাতে ধরা সেই পুতুল। সমাধির সামনে এসে পুতুলটিকে একবার চুম্বন করল সে। তারপর ধীরে ধীরে নামিয়ে রাখল শ্মশানের মাটির ওপরে। তার মুখে ছলকে উঠল রহস্যময় হাসি। নারী একবার মুখ তুলে চাইল আকাশের দিকে। তার শরীর ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে আসছিল। এইবার সেই ছায়া ছায়া শরীর ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। দিবাকরের স্থির, নিশ্চল, জড় শরীর পড়ে রইল চিতার ওপরে। তার নগ্ন শরীর জুড়ে জেগে রইল রাত্রিব্যাপী দংশনের দাগ।

রামসাঁতাল লঘু পায়ে এসে দাঁড়ালেন শ্মশানমধ্যে। খুব ক্লান্ত লাগছিল তাঁকে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। দিবাকর হেরে গেল। তার অসংযত কাম আর লোভ হারিয়ে দিল তাকে। এমন ভয়ই পেয়েছিলেন যোগী রামসাঁতাল। আর সেইজন্যেই এই গুহ্য সাধনা থেকে তিনি বার বার নিবৃত্ত করতে চেয়েছিলেন দিবাকরকে। কিন্তু কিছুতেই কথা শুনল না সে। দু দিকে মাথা নাড়লেন রামসাঁতাল। মৃদু হাসি ফুটল তাঁর ঠোঁটে। জন্মান্তরীণ সংস্কার আর কর্মকে অতিক্রম করা কিছুতেই সম্ভব নয়।

শিষ্যের শরীর কাঁধে নিয়ে দ্রুত শ্মশানভূমির নির্দিষ্ট স্থানে পড়ে থাকা একটি নিম্বকাষ্ঠের দিকে এগিয়ে চললেন তিনি। গোপন স্থানে মন্ত্রতরঙ্গের মধ্যে সুরক্ষিত রাখতে হবে এখন এই শরীর। কত দিনের জন্যে কে জানে! পুতুলটিকেও কাঁধের ঝুলিতে ভরলেন। প্রতি পূর্ণিমায় দিবাকর মায়াশরীর নিয়ে বেরিয়ে আসবে এই পুতুল থেকে আর কামনায় পাগল হয়ে জীবিত মানুষের শরীর খুঁজতে থাকবে হন্যে হয়ে। কোন হতভাগ্য যে নিজে থেকে তাকে ঘরে নিয়ে তুলবে কে জানে! রামসাঁতাল হতাশায় মাথা নাড়তে লাগলেন ঘন ঘন। যুগ যুগ ধরে এখন তাঁকে পাহারায় থাকতে হবে। মানুষের শরীর না পেলে দিবাকরের অতৃপ্ত বাসনার নিবৃত্তি নেই। কিন্তু সে বাসনা নিবৃত্ত করতে ভাবি কালের কারও বলিদানের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না এই ক্ষেত্রে...

মনে মনে যে স্থান নির্বাচন করেছেন, তা এ স্থান থেকে বহু দূরে অবস্থিত। তাতে অবশ্য তাঁর অসুবিধে নেই। সেই কোন সুদূর অতীতে পাদুকা সাধন সম্পূর্ণ করেছেন তিনি। সেই সাধনশক্তিতে মুহূর্ত কালের মধ্যে শত যোজন অতিক্রম করতে পারেন তিনি। রামসাঁতাল নিম্বকাষ্ঠটির সম্মুখে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে প্রণাম করলেন। তারপর সেই কাষ্ঠখণ্ডে পাদস্পর্শ করে অনুচ্চ কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগলেন,

'গচ্ছ গচ্ছ দ্রুতং গচ্ছ পাদুকে বরবর্ণিনি।

মৎপাদ স্পর্শমাত্রেণ গচ্ছ ত্বং শতযোজনম।' ...

নির্দিষ্ট গন্তব্যে এক বৃহৎ বটবৃক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালেন যোগী রামসাঁতাল। সেই স্থানে আরও বহু বটবৃক্ষ। কিন্তু এই বটবৃক্ষটি এতই প্রাচীন যে তার মূল কাণ্ড শনাক্ত করা দুরূহ। অসংখ্য ঝুরির মাঝে এক বড়সড় ফোকর খুঁজে নিয়ে পুতুলটি তার মধ্যে লুকিয়ে রাখলেন তিনি। স্থানটি নিরাপদ। আশা করা যায় লোকচক্ষুর অন্তরালেই থাকবে পুতুলটি।

কাজ সমাধা করে বটবৃক্ষের অনতিদূরের দিঘিতে অবগাহন স্নান করলেন রামসাঁতাল। তখন পুব আকাশে আলো ফুটে উঠেছে। নতুন দিনের প্রথম সূর্যরশ্মিকে প্রণাম জানালেন তিনি ভক্তিভরে। তারপরে স্থান পরিত্যাগ করলেন লোক চলাচল শুরু হওয়ার আগে আগেই।

মহেশপুরের দোলের মেলায় যাব শুনেই অরিন্দম একেবারে আঁতকে উঠল। চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল,

'হঠাৎ মহেশপুরের মেলায় যাওয়ার কী দরকার পড়ল তোর?'

'শুনেছি ওখানে নাকি আশেপাশের অনেক এলাকার শিল্পী পুতুল বিক্রি করতে আসে। তুই তো জানিস, প্রান্তিক শিল্পীদের হাতে গড়া পুতুল জমানো আমার বহুদিনের পুরোনো নেশা। কাজে কাজেই...'

'পুতুল কিনতেই চাইছিস যখন, মজিলপুর যা। ওখানকার পুতুল তো বিখ্যাত...'

'মজিলপুরের বাবু পুতুল এবং টেপা পুতুল দুইই আমার কাছে আছে', অরিন্দমকে থামিয়ে দিয়ে আমি বলি, 'আমি নতুন কিছু চাইছি...'

'স্রেফ পুতুল কিনতে অত দূর!' অরিন্দম চোখ নাচিয়ে বলে, 'সত্যিই যাবি তো, নাকি ইয়ার্কি মারছিস?'

'ইয়ার্কি মারব কেন?' আমি অবাক হয়ে বলি, 'মহেশপুর কি ভিন গ্রহের কোনো জায়গা নাকি?'

'খুব কাছেও নয় কিন্তু। আর মেলাটা মেইনলি রাতেই বসে।'

'তাতে কী?' আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলি, 'একটু বেশি রাত হলেও অসুবিধে তো কিছু নেই। শেষ ট্রেন লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে দশটার পরে ছাড়ে, খোঁজ নিয়েছি। তার মধ্যে মথুরাপুর স্টেশনে ঠিকই পৌঁছে যাব।'

'দেখ যা ভালো বুঝিস', বলে একটু থামল অরিন্দম। তারপর বলল, 'একটা ফোন নম্বর দিচ্ছি, রেখে দে। নম্বরটা আমার খুড়তুতো ভাই-এর। ওর নাম সুনন্দ। সুনন্দ নিয়োগী। একান্তই যদি শেষ ট্রেন মিস করিস, ওকে ফোন করতে হেজিটেট করবি না। আমাদের গ্রামের বাড়িটা মথুরাপুর স্টেশনের প্রায় গায়েই। আমার বাবা বহুদিন গ্রাম ছেড়ে চলে এলেও কাকারা এখনও ওখানেই রয়েছে। রাতে খাওয়া থাকার কোনো অসুবিধে তোর হবে না।'

'ঠিক আছে, দরকার হলে যোগাযোগ করে নেব', আমি অরিন্দমের দিকে চেয়ে আলগা হাসলাম।

'তবে আমি বলব, বেশিক্ষণ ওখানে না থাকাই ভালো। জায়গাটা গোলমেলে। নানারকম কথা শুনি জায়গাটা সম্পর্কে।' আমার কাঁধে হাত রেখে আবার বলল অরিন্দম।

'কী রকম কথা শুনিস?' আমি আগ্রহ দেখিয়ে বলি।

'থাক', বলেই চুপ করে গেল অরিন্দম। তারপর একটুক্ষণ থেমে থেকে বলল, 'মেলায় অপরিচিত কেউ কিছু খেতে দিলে খাস না। আর সন্ধের পর বুড়ো বটতলার দিকটা পারলে অ্যাভয়েড করিস।'

'কেন?' আবারও জিজ্ঞেস করলাম আমি কৌতূহলী হয়ে।

'সব 'কেন'-র উত্তর অমন ফস করে দিয়ে দেওয়া যায় না সুকান্ত', অরিন্দম বিরক্ত হয়ে বলে, 'একান্তই যদি মহেশপুর মেলায় যাস, দয়া করে আমার এই পরামর্শদুটো মনে রাখিস।'

মথুরাপুর স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে যখন কারবালা মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম, সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। হালকা হাওয়া বইছিল গাছের পাতাদের কাঁপিয়ে দিয়ে। কলকাতায় বোঝা যায় না, কিন্তু এখানে হাওয়ায় এখনও ঠান্ডার আলগা শিরশিরানি লেগে রয়েছে। আমার ভালোই লাগছিল। এখান থেকে দুটো রাস্তা দুদিকে চলে গেছে। একটা রাস্তা গেছে ডায়মন্ডহারবারের দিকে, অন্যটা লক্ষ্মীকান্তপুর। একটা টোটো নিয়ে আমি দ্বিতীয় রাস্তা ধরে মহেশপুর পাড়ি দিলাম। গাড়িতে আমি একাই। আসলে অন্য প্যাসেঞ্জারের জন্যে অপেক্ষা না করে গাড়িটা ভাড়া করে নিয়েছি নিজের জন্যে। এতে সময় বাঁচবে। টোটো যে চালাচ্ছিল তার বয়েস বেশি নয়। মেরেকেটে পঁচিশ ছাব্বিশ হবে। নাম জিজ্ঞেস করতে বলল, 'আমার নাম বিশ্বজিৎ। তবে সবাই এখানে আমাকে বিশু বলেই ডাকে। আপনিও আমাকে বিশু বলবেন দাদা।'

'বেশ', হাসলাম আমি। ছেলেটাকে আমার খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। খুব আলাপি। স্বভাবটাও মিষ্টি।

যে পথে যাচ্ছি সে পথের দু'দিকেই সবুজের সমারোহ। কত যে গাছপালা। সব গাছ আমার চেনা নেই। এখন বসন্ত। অনেক গাছেই রংবেরঙের ফুল ফুটে আছে। এ অঞ্চলে পলিউশনের বালাই নেই। মনে হচ্ছিল, আমার চেনা দেশটার মধ্যে এ যেন অন্য আর একটা দেশ। বেশ অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎই বিশু গাড়ি থামিয়ে বলল, 'এসে গেছি দাদা। এইবার নামতে হবে আপনাকে। ওই যে দোলের ঢিপি। ওখানেই মেলা বসে ফি বছর দোলের দিনে। একটু এগোলেই দেখতে পাবেন, ঢিপির সামনের মাঠ আর বড় বড় বটগাছগুলোর নীচে হরেক জিনিসের দোকান বসেছে।'

টোটোর ভাড়া মিটিয়ে মেলার মাঠের দিকে পা বাড়াতে যেতেই বিশু হঠাৎ ডাকল আমায়। আমি পিছু ফিরতেই একটু অপ্রস্তুত গলায় বলল, 'দাদা, কিছু মনে করবেন না। পিছু ডাকলাম আপনাকে।'

'না না বলো', আমি এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রাখলাম ওর।

'দাদা, একটা কথা বলি। দয়া করে কথাটা হালকাভাবে নেবেন না। আসলে আপনি তো শহরের মানুষ। অনেক কিছুই হয়ত বিশ্বাস করেন না। তবু...'

'কী কথা?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

'সন্ধের পরে মেলার ওদিকটা যাবেন না', বিশু দূরের একটা পেল্লায় বটগাছের দিকে আঙুল তুলে দেখালো।

'কেন? ওদিকে কী?' আবার জিজ্ঞেস করলাম।

'জায়গাটা ভালো নয় দাদা', বিশু মাথা ঝাঁকালো, 'কী একটা অভিশাপ আছে ও গাছতলার আশেপাশের অঞ্চলে। বাপ ঠাকুরদার আমল থেকেই দেখে আসছি সূর্য ডোবার পর ওদিকটা কেউ মাড়ায় না। সবাই বলে, রামসাঁতাল বাবার এমনই নাকি নির্দেশ।'

'রামসাঁতাল বাবা? তিনি আবার কোন বাবা হে?' আমি একটু মজা করেই বলি।

বিশ্বজিৎ ভয় পেয়ে গিয়ে দু-হাত জোড় করে কপালে ঠেকালো, 'তাঁর নাম নিয়ে মজা করবেন না দাদা, সর্বনাশ হয়ে যাবে। বংশ বংশ ধরে এ অঞ্চলে আমরা সক্কলে তাঁর নাম জানি। রামসাঁতালবাবা মস্ত সাধক ছিলেন। ডিহি মেদনমল্ল ও সুন্দরবনের বিস্তৃত অংশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল তাঁর সাধনক্ষেত্র। মানুষের মঙ্গলের জন্যে কত চমৎকারিত্বই যে দেখিয়েছেন তিনি তার ইয়ত্তা নেই। এসব অঞ্চলে লোকের মুখে মুখে ফেরে সেসব গল্প। তন্ত্র-মন্ত্র প্রয়োগ করে দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে পারতেন তিনি। এখনও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বহু মানুষ বিপদে পড়লে কায় মন বাক্যে তাঁকে স্মরণ করেন...'

'কিন্তু ওদিকটা যেতে তিনি কেন নিষেধ করেছিলেন সে বিষয়ে শুনেছ কিছু?' বিশুকে কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম।

'না দাদা। তবে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, এ অঞ্চলের গুণিন টুনিনরাও ও এলাকাটা এড়িয়ে চলে। তারাও বলে, ওখানকার বাতাস নাকি বড় ভারী। সেখানে তাদের মন্ত্রও নাকি কেটে যায়। কাজ করে না...' বলতে বলতেই গাড়ির মুখ ঘোরালো বিশু, 'আসি দাদা। সাবধানে থাকবেন।'

'এসো', বিশুকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে আমিও নিজের পথে এগোলাম।

কয়েক পা হেঁটে এগিয়ে মূল মেলার জায়গাটায় এসে পড়লাম। প্রায় দু-তিনতলা বাড়ির সমান উঁচু একটা ঢিপি। তার ওপরে ঠাকুর বসানো রয়েছে। ঢিপির পিছন দিকের মাটির বুকে ধাপ কেটে কেটে সিঁড়ি বানানো রয়েছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে মানুষজন ওপরে উঠছে পুজো দিতে। অনেকখানি জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দোকান বসেছে। চপ-ফুলুরি, কাচের চুড়ি, গজা-বাদাম-জিলিপি, গ্রামের মেলায় যা যা পাওয়া যায় সবই রয়েছে এখানে। আর আছে প্রচুর পুতুলের দোকান। মাটির ওপরে প্লাস্টিক বিছিয়ে বিক্রি হচ্ছে সেইসব পুতুল। আলো নিভে আসছে দ্রুত। পাখিরা চিৎকার করতে করতে বাসায় ফিরে আসছে। মেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দোকানগুলোয় কেরোসিনের টেঁপি জ্বলে উঠতে শুরু করল এক এক করে।

মেলার মাঠে অন্ধকারের আস্তরণ পড়তে শুরু হওয়া মাত্রই উঁচু উঁচু বটগাছগুলোর ডাল পাতার আড়াল থেকে টরে টরে টরে টক কো, টক কো, টক কো শব্দে তক্ষকের দল ডেকে উঠল। তক্ষকের ডাক আগেও আমি শুনেছি, কিন্তু আজ কেন যেন ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকের মধ্যে।

ইলেকট্রিক আলো নেই। কেরোসিন বাতির অনুজ্বল আলোয় দোকানগুলো কেমন যেন রহস্যময় হয়ে উঠেছে। যেখানে ঠাকুর বসানো হয়েছে, সেই ঢিপির মাথায় হ্যাজাক জ্বালানো হয়েছে গোটা দুয়েক। সে আলো নীচের মস্ত চত্বরটাকে আলোকিত করার পক্ষে আদৌ যথেষ্ট নয়।

মেলার মাঠের কাছাকাছিই বিশাল বিশাল দিঘি রয়েছে খান কয়েক। সেদিক থেকে ঠান্ডা জোলো হাওয়া আসছিল। মস্ত মস্ত বটগাছগুলোর দিকে তাকালে গা ছমছম করে উঠছে অকারণ। এই প্রথম আমার মনে হল, অরিন্দমের কথা শুনে এখানে না এলেই বোধহয় ভালো হত। আমি দ্রুত পুতুলের দোকানগুলো ঘুরে দেখে নিচ্ছিলাম। বার বার মনে হচ্ছিল, পছন্দসই পুতুল পেয়ে গেলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেনাকাটা সেরে এখান থেকে ফিরে যাওয়াই মঙ্গল।

যে পুতুলগুলো চোখে পড়ল সেগুলোর মধ্যে নতুন খুব একটা কিছু পেলাম না। এরকম পুতুল আমার সংগ্রহে আছে। এর মধ্যেই একজনের কাছে শোলার তৈরি কয়েকটা রাসপুতুল পছন্দ হয়ে গেল। এখানকার এই শোলার পুতুল ভারতবিখ্যাত। রাসপূর্ণিমার সময় এই পুতুল দিয়ে সাজানোর রীতি আছে বলেই এদের অমন নাম। দরদাম করে খান তিনেক রাসপুতুল কিনে ফেললাম। তারপর সেগুলো সাবধানে ব্যাগে ভরে মেলার বাইরে পা বাড়ালাম। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলাম সন্ধে সাড়ে সাতটা। একটা টোটো বা রিকশা ভ্যান পেয়ে গেলে মথুরাপুর স্টেশন থেকে ট্রেন পেতে আমার অসুবিধা হবার কথা নয়।

মেলার চত্বরটুকু পেরোতেই কেরোসিন বাতির আলোটুকু মুছে গেল। আকাশে পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ। রাস্তা দেখতে অসুবিধে হচ্ছিল না। হঠাৎই একটা বেজায় ঝাঁকড়া বটগাছের কাছাকাছি পৌঁছতেই, গাছের আড়াল থেকে একটা লোক বেরিয়ে এসে আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। কৌতূহলবশত লোকটার কাছে গেলাম আমি। চাঁদের আলোয় যেটুকু দেখলাম, লোকটার মাঝবয়েস। উলোঝুলো চুল-দাড়ি। খালি গা। পরনে একটা খাটো ধুতি লুঙির মতো করে পরা। লোকটার এমনিতে সাধারণ চেহারা। কিন্তু তার চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে আমার কেমন যেন অস্বস্তি হতে শুরু করল। কোটরে ঢোকা, তবু অসম্ভব জ্বলজ্বলে তার চোখ।

লোকটা আমার দিকে চেয়ে নিঃশব্দে হাসল, 'এ অঞ্চলে নতুন বুঝি?'

'হ্যাঁ', আমি ওপর নীচ মাথা নাড়লাম।

'মেলা দেখতে এয়েচেন?'

'হ্যাঁ', আবার বলি আমি। লোকটাকে এড়িয়ে যেতেই চাইছিলাম। কেন কে জানে, তার সঙ্গে বেশি কথা বলতে আমার ইচ্ছে করছিল না।

লোকটা আবার হাসল। বাতাসের মতো মিহি হাসি। তারপর বলল, 'বাবুর খুব পুতুলের শখ দেখছিলাম। ঘুরে ঘুরে পুতুল খুঁজছিলেন এ দোকান সে দোকান...'

আমি চুপ করে রইলাম।

'মনের মতো পুতুল কি পেলেন?'

লোকটার নাছোড় ভাব দেখে বাধ্য হয়েই বললাম, 'না তেমন কিছু পেলাম না। এত দূরে এসে একেবারে খালি হাতে ফিরে যাব? তাই ক'টা রাসপুতুল কিনে নিলাম।'

'আমার কাছে একটা পুতুল আছে, একবার দেখবেন নাকি?' লোকটা আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল, 'এমন পুতুল আপনি কিন্তু কোত্থাও পাবেন না—'

'কী পুতুল?'

'আসুন আমার সঙ্গে, দেখাচ্ছি', বলেই লোকটা সামনের দিকে হাঁটা লাগাল। আমি প্রথমটা একটু থমকে দাঁড়ালাম। লোকটা সেই নিষিদ্ধ এলাকাটার দিকেই এগিয়ে চলেছে যে! হ্যাঁ, ওই দিকেই তো সেই সবচেয়ে মোটা বটগাছটা। বিশাল এলাকা জুড়ে পাতায় পাতায় অন্ধকার বিছিয়ে রেখেছে গাছটা। বটগাছের অসংখ্য মোটা মোটা ঝুরি ডাল থেকে নেমে এসে ঢুকে গেছে মাটির গভীরে।

আমাকে থামতে দেখে লোকটা পিছন ফিরল। আলগা হেসে বলল, 'কই, আসুন।'

আমি একটু ইতস্তত করেও লোকটার পিছু নিলাম। সব গ্রামেই কিছু অদ্ভুত প্রচলিত গল্প থাকে। আর সেই গল্পগুলোকে জড়িয়ে থাকে মানুষের দীর্ঘযাপিত অন্ধবিশ্বাস। সত্যকে আড়াল করে সেইসব গল্পই মানুষের মনকে অধিকার করে থাকে যুগের পরে যুগ। সেসব কুসংস্কারকে বেশি আমল দিলে সামনে এগনো যায় না। কাজেই টোটোচালকের সাবধানবাণীকে তেমন গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন বোধ করলাম না। আমি জানি, তার কথা মানতে গেলে আমার আসল কাজটিই পণ্ড হবে। লোকটা একটা অন্যরকম পুতুল দেখানোর কথা বলছে। যে পুতুলটা অন্য সব পুতুলের চেয়ে আলাদা। পুতুলটা দেখার জন্যে আমার লোভ হচ্ছিল খুব। সত্যি বলতে কী, আমার আর তর সইছিল না। তেমন রেয়ার কিছু একটা পেয়ে গেলে এত দূরে আসার জন্যে আর কোনো আক্ষেপ থাকবে না।

বেশ কিছুটা হেঁটে গিয়ে লোকটা সেই মস্ত বটগাছটার কাছে গিয়েই থামল। জায়গাটা অসম্ভব নির্জন। কাছেপিঠে মানুষজনের চিহ্ন নেই। খানিক তফাতে মস্ত একটা দিঘি। চাঁদের আলো পড়ে ঝিলমিল করছে দিঘির জল। আমি অবাক হয়ে বললাম, 'আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন? এখানে তো কোনো দোকান নেই! আপনার পুতুল কোথায়?'

'এই যে এইখানে', বলে বটগাছের পায়ের কাছে নেমে আসা মস্ত ঝুরিগুলোর খাঁজের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সে কী একটা বের করে আনল। তারপর আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 'দেখুন তো পছন্দ হয় কিনা?'

মাটির পুতুলটা আপাতভাবে বিশেষত্বহীন। ফুট খানেক লম্বা এক পুরুষের মূর্তি। কাদার তালের ওপরে হাতের তালু ও আঙুল দিয়ে টিপে টিপে বানানো এমন পুতুল আগেও দেখেছি। কিন্তু এই পুতুলটা হাতে নিয়েই চমকে উঠলাম আমি। মনের ভুল কিনা জানি না, কিন্তু পুতুলটাকে স্পর্শ করেই আমার মনে হল, কোনো রক্ত-মাংসে গড়া মানুষের শরীর স্পর্শ করলাম। পুতুলটা যেন তেমনই নরম, তেমনই উষ্ণ।

লোকটা খিক খিক করে হেসে উঠল, 'বাবু কেমন যেন চমকে উঠলেন মনে হল?'

'কই না তো', অস্বস্তি লুকিয়ে বললাম। ততক্ষণে মনস্থির করে ফেলেছি, পুতুলটা আমি বাড়ি নিয়ে খাব। চাঁদের ক্ষীণ আলোয় পুতুলটাকে খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। বাড়ি নিয়ে গিয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা দরকার পুতুলটাকে।

'পুতুলটা তাইলে নিচ্চেন তো বাবু?' লোকটার দু-চোখ ঝলমলিয়ে উঠল।

'কত দাম দিতে হবে?' আমি সরু চোখে তাকাই লোকটার দিকে, 'এমন কিছু আহামরি কিন্তু নয় পুতুলটা। খুব বেশি দর হাঁকালে আমি দিতে পারব না, আগেই বলে দিচ্ছি।'

'ছি ছি বাবু', লোকটা এক হাত জিভ বের করে ফেলল, 'আপনি অদ্দুর থেকে এয়েচেন আমাদের গেরামে পুতুল কিনতি। আপনাকে কখনও ঠকাতে পারি?'

'কত দিতে হবে?' আমি ঘড়ি দেখি। দেরি হয়ে যাচ্ছে। এইবার যে করেই হোক রওনা হতে হবে আমায়।

'কত আর দেবেন', লোকটা অদ্ভুতভাবে হাসে, 'ষোলো আনা দিন বাবু।'

'অ্যাঁ?' আমি বেজায় অবাক হয়ে বলি, 'ষোলো আনা? মানে—'

'হ্যাঁ, এক টাকা', লোকটা আমার দিকে তার শীর্ণ, লম্বা ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয়, 'আপাতত এতেই আমার হবে।'

আমি ইতস্তত করছি দেখে দ্রুত পুতুলটা আমার হাতে গছিয়ে দেয় সে। তারপর তাড়া লাগায়, 'কই দিন।'

নির্ঘাৎ পাগল, এই ভেবে পকেট থেকে এক টাকার একটা কয়েন বের করে তার হাতে দিতেই হন হন করে হাঁটা লাগাল লোকটা। তারপর মুহূর্তের মধ্যে, ক্রমশ ঘন হতে থাকা রাতের আলো-আঁধারির মধ্যে হারিয়ে গেল।

আমি পুতুলটা নিয়ে ফেরার পথ ধরতে যেতেই মনে হল কে যেন আমাকে অনুসরণ করছে লঘু পায়ে। আমি ফিরে তাকালাম, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না।

মথুরাপুর স্টেশনে পৌঁছতে রাত হল ঠিকই, কিন্তু ট্রেন পেতে অসুবিধা হল না। এই লাইনে এ এক মস্ত সুবিধা। অনেক রাত পর্যন্ত আপ ডাউন দু' দিকেই গাড়ি পাওয়া যায়। এই সময় আপ ট্রেন ফাঁকাই থাকে। সাধারণত বিকেলের পর থেকে যা ভিড় হয় তা কলকাতা থেকে ফিরতি ট্রেনে। আজ ছুটির দিন। তায় এত রাত। ট্রেনে উঠে দেখলাম, কম্পার্টমেন্টে যাত্রী হাতে গোনা। আমি দেখেশুনে জানালার ধারের একটা সিটে বসে পড়লাম। আমার উলটোদিকে একজন বয়স্ক মানুষ বসে ছিলেন। খুবই সাধারণ চেহারা। পরনে ধপধপে সাদা ধুতি-ফতুয়া। কপালে সরু এবং লম্বাটে একটা সিঁদূরের টিপ। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। ফতুয়ার ফাঁক দিয়েই তাঁর গলায় একটা মালা চোখে পড়ছিল। মালাটা কীসের বুঝতে পারছিলাম না। দানাগুলো মসৃণ এবং গোলাকার। কালচে লাল রং। আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক বলে উঠলেন, 'মালাটা পদ্মবীজের। বড় জাগ্রত এই মালা। আমার গুরুদেব আমাকে দিয়েছিলেন এটা নিজের গলা থেকে খুলে। এ মালা কথা বলে।'

আমি একটু লজ্জাই পেয়ে গেলাম। অমন হাঁ করে মালাটার দিকে তাকিয়ে থাকা উচিত হয়নি। ভদ্রলোক আমার দিকে চেয়ে খুব স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, 'আপনার জন্যেই এই ট্রেনে, এই কামরায় উঠে বসে আছি।'

'মানে?' আমি চমকে উঠে বললাম, 'আপনি জানতেন আমি এই গাড়ির এই কম্পার্টমেন্টে ফিরব। আর ট্রেনে উঠে ঠিক এই সিটটাতেই এসে বসব?'

'তা জানতাম বই কি', তিনি হাসলেন। তাঁর হাসিটা বড় সুন্দর। মন ভালো করে দেওয়া।

'কী করে জানলেন?'

'জানা যায়।'

আমি মজা করেই বললাম, 'আপনি কি আমায় ফলো টলো করছিলেন নাকি?'

ভদ্রলোক আমার কথাটাকে এড়িয়ে গিয়ে খুব সিরিয়াস মুখ করে বললেন, 'সামনে আপনার বড় বিপদ। খুব বিপদ। আর বলতে গেলে আপনি যেচেই এই বিপদটা সঙ্গে নিয়ে চলেছেন। আমি বাধ্য হয়ে আপনাকে সতর্ক করতে এলাম।'

'মানে?' আমি অবাক হয়ে বললাম, 'আপনি কি জ্যোতিষি নাকি? আমার কপাল টপাল দেখেই বুঝে ফেললেন আমার বিপদ?'

'একটা পুতুলের জন্যে নিজের ষোলো আনা দিয়ে বসলেন বোকার মতন?' এবারেও আমার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে প্রায় ধমকেই উঠলেন তিনি, 'একবার ভেবেও দেখলেন না, এই বাজারে মাত্র ষোলো আনার বিনিময়ে একজন অপরিচিত মানুষ কেন একটা পুতুল গছিয়ে দিতে চাইল আপনাকে?'

'কী বলতে চাইছেন বলুন তো?' আমি এইবার গম্ভীর হয়ে বললাম।

'আজ মহেশপুরের মেলা থেকে যে পুতুলটা কিনেছেন, সেটা বাড়ি নিয়ে যাওয়া আপনার উচিত হবে না।'

'কেন?'

'আমার হাতে সময় খুব কম। সব কথা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। আর বললেও আপনি হয়তো তা বিশ্বাস করবেন না। আমি শুধু এইটুকুই বলছি, যেচে যদি ওই পুতুল নিজের ঘরের চৌকাঠ অতিক্রম করান, তাহলে ঘোর বিপদে পড়বেন আপনি।'

'কী রকম বিপদ?'

'বললে কি বুঝবেন?'

'আহা শুনিই না।'

'মনে রাখবেন, এ পুতুলের মালিককে নিজের ষোলো আনা সঁপে দিয়েছেন আপনি। সে এখন আপনাকে তার নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী ব্যবহার করার চেষ্টা করবে।'

'ধ্যাত, তা আবার হয় নাকি?'

'এ জগতে কত কিছুই যে হয়, তার কতটুকুর খোঁজ রাখেন আপনি? কাজেই এসব নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে বসার সময় বা অভিরুচি কিছুই নেই আমার। মহেশপুরের মেলা থেকে যখন ফিরছিলেন, তখনই আপনার দিকে নজর পড়ে আমার। আর নজর পড়তেই বুঝতে পারি, এত যুগ ধরে যে সর্বনাশ ঠেকিয়ে রেখেছিলাম কোনোক্রমে, তা এইবার সত্যি হতে চলেছে।'

'মানে?'

'আপনি মানুষটা ভালো। আগাপাছতলা ভাবেন না বড় একটা। তাই বিপদটা আপনারই হল। আপনি বুঝতেও পারছেন না, কী অভিশাপ আপনি বাড়ি বয়ে নিয়ে চলেছেন আজ। এ বিপদে আমি ছাড়া আর কেউই বোধহয় রক্ষা করতে পারবে না আপনাকে।'

'রক্ষা পাবার জন্যে আপাতত কী করতে বলছেন আমায়? কোনো আংটি টাংটি নাকি যাগযজ্ঞ?' গলায় একটু শ্লেষ মিশিয়ে বলি।

'সেসব কিচ্ছুটিই নয়। শুধু ওই পুতুলটা আমাকে দিয়ে দিন। ও জিনিস আপনি সহ্য করতে পারবেন না। পুতুলটা বাড়ি নিয়ে গেলে সপরিবার শেষ হয়ে যাবেন আপনি।'

এতক্ষণে পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হল আমার কাছে। বুঝলাম, আসলে ভুলিয়ে ভালিয়ে পুতুলটা হাতানোই ভদ্রলোকের উদ্দেশ্য। মনে মনে আনন্দই হল আমার। মহেশপুরের মেলায় আসা বিফলে যায়নি। নিশ্চিত পুতুলটার বিশেষত্ব আছে। না হলে এত চাহিদা হবে কেন এটার! আমি ভদ্রলোকের মুখের দিকে চেয়ে হো হো করে হেসে ফেললাম, 'ভূত, ভগবান, অলৌকিক, টলৌকিক আমি বিশ্বাস করি না মশাই। শুধুমুধু আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। আপনি যাই বলুন, এই পুতুল আমি হাতছাড়া করছি না।'

ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। স্থির চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন আমার কপালের দিকে। বিড় বিড় করে অদ্ভুত সুরে কী সব বললেন খানিক আপন মনে। তারপর নিজের ঝোলা ব্যাগ থেকে তাঁর গলার মালাটারই মতো দু-ছড়া মালা আমার কোলে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, 'কাল প্রতিপদ। কৃষ্ণপক্ষের শুরু। আপনারা স্বামী স্ত্রী অবশ্যই মনে করে পরে নেবেন মালাদুটো। সূর্যাস্তের আগেই। শুক্লপক্ষ শুরু না হলে কিছুতেই মালাদুটো খুলবেন না গলা থেকে।'

আমি তাঁর কথায় খুব যে গুরুত্ব দিলাম তা নয়, কিন্তু মালাদুটো ব্যাগে ভরে নিলাম।

ট্রেন বহড়ু স্টেশনে ঢুকছিল। ভদ্রলোক ট্রেনের দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, 'কাল প্রতিপদ থেকেই ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করবে সে। আগামী চতুর্দশীতে শক্তির শিখরে উঠবে সে। যা কিছু করার তার আগেই সেরে ফেলতে হবে। তার পূর্ণশক্তির সামনে এই মালাও তখন আর বাঁচাতে পারবে না আপনাদের। ঈশ্বর করুন, সে বিপদ যেন আপনাদের জীবনে না আসে। কিন্তু দৈব দুর্বিপাকে পরিস্থিতির যদি অবনতি ঘাটে, সেই চরম বিপদের আগে আমাকে স্মরণ করবেন প্রয়োজন পড়লেই। সেই স্মরণে সত্যিই যদি জোর থাকে, তাহলে আবার দেখা হবে আমাদের...'

ভদ্রলোক আর একবারও আমার দিকে ফিরে তাকালেন না। নেমে গেলেন। আমি জানালা দিয়ে অনেক চেষ্টা করেও প্ল্যাটফর্মে দেখতে পেলাম না তাঁকে।

ভদ্রলোক যেন ঠিক কর্পূরের মতোই একেবারে উবে গেলেন।

বাড়ি ফিরে বেল টিপতেই রিনি দরজা খুলে দিল। আমার দিকে চেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বলল, 'যাক, সময়মতো ফিরতে পারলে তাহলে। সেই যে বেরোলে, মানুষ একটা ফোনও তো করে?' পাশের ঘরে আমাদের পোষা পাগ রণ শুয়ে ছিল মেঝের ওপরে। আমার গলার আওয়াজ পেয়েই দৌড়ে এ ঘরে এসে লেজ নেড়ে, লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে আহ্লাদ প্রকাশ করতে শুরু করল।

'টাওয়ার পেয়েছি নাকি যে ফোন করব তোমাকে?' রিনিকে খানিক ম্যানেজ করে রণের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দিলাম একটু। তারপর ব্যাগের মধ্যে থেকে পুতুলগুলো বের করে এক এক করে সাজিয়ে রাখতে শুরু করলাম ড্রয়িং রুমের কাচের আলমারিতে। রণ জুল জুল করে দেখছিল আমার দিকে। রাসপুতুলগুলো আলমারিতে তোলার সময় দিব্বি লেজ নাড়ছিল সে আমার পাশে লক্ষ্মী হয়ে দাঁড়িয়ে। কিন্তু অন্য পুতুলটা ব্যাগ থেকে বের করতেই রণ যেন এক্কেবারে বদলে গেল। গলা দিয়ে অদ্ভুত একটা আওয়াজ বের করতে করতে ঘরময় উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটোছুটি করতে লাগল সে। রিনি চিৎকার করে উঠল, 'রণ, কী হচ্ছে কী? বি কোয়ায়েট।'

রণ শান্ত তো হলই না, উলটে লাফিয়ে উঠে প্রাণপণে আমার হাত থেকে পুতুলটা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করতে লাগল। আমি তাকে শান্ত করার বহু চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে যেন পাগল হয়ে গেছে একেবারে। বাধ্য হয়ে এক ধমক লাগালাম ওকে। রণ আমার কাছ থেকে সরে গেল বটে, কিন্তু ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে পুতুলটার দিকে চেয়ে এক নাগাড়ে ডেকেই চলল। বাধ্য হয়েই রিনিকে বললাম, 'ওকে অন্য ঘরে নিয়ে যাও।'

রণ খুবই শান্ত। আমাদের কথার অবাধ্য হয় না কখনও। কিন্তু রিনির সাজ ওকে পাশের ঘরে সরাতে গিয়ে একেবারে ঘাম ছুটে গেল। রণ কিছুতেই আমাদের কাছ থেকে সরে যেতে চাইছিল না।

সারাদিন ঘুরে ঘুরে কেটেছে। মহেশপুরের দূরত্বও কম নয়। আমার বেশ ক্লান্ত লাগছিল। রিনিকে বললাম, 'আজ আর বেশিক্ষণ জেগে থাকার ধক নেই। তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়তে হবে। কাল অফিস থেকে ফিরে পুতুলটাকে ভালো করে দেখে টেখে নেওয়া যাবে।

'সেই ভালো', রিনিও সায় দিল আমার কথায়।

সপ্তাখানেক নিরুপদ্রবেই কেটে গেল। রাতে রণের খানিক চিৎকার চেঁচামেচিটুকু বাদ দিলে। গত দিন দুই রাতে বার কয়েক ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মনে হল ডাইনিং-এ খুট খুট করে কে যেন হাঁটছে। ইঁদুর টিদুর হতে পারে ভেবে খুব একটা আমল দিলাম না। দ্বিতীয় দিন সকালে উঠে অবাক হয়ে দেখলাম, নতুন কেনা পুতুলটা আলমারি থেকে বের করে বসার ঘরের সোফায় রাখা রয়েছে আড় করে। রিনিকে জিজ্ঞেস করলাম পুতুলটাকে বের করেছিল কিনা। ও বলল, 'না।'

পুতুলটা সোফা থেকে তুলে আবার আলমারিতে রাখছিলাম যখন, দেখলাম রণ দূরে দাঁড়িয়ে কেমন যেন ছটফট করছে আর মুখ দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করছে। সে রাতে রণের তীব্র চিৎকারে ঘুমই হল না আমাদের। বেশ কয়েকবার উঠে গিয়ে ওকে থামাবার চেষ্টা করলাম আমি, রিনি দুজনেই। কিন্তু রণ আমাদের কোনো কথাই শুনল না। ওর চোখ মুখ দেখে মনে হল কোনো কারণে ভয় পেয়েছে খুব। অথচ আমাদের চোখে অস্বাভাবিক কিছুই ধরা পড়ল না।

পরদিন অফিস থেকে একটু আগেই ফিরলাম। তখন সন্ধে হব হব করছে। অন্যদিন আমি ঘরে ফিরলেই রণ ঝাঁপিয়ে আমার কোলে উঠে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ কেন কে জানে, সে আমার ধারে কাছেই ঘেঁষল না। দূরে দাঁড়িয়ে গর গর গর গর করে আওয়াজ করেই চলল একটানা।

রাতে রণ খেলো না ভালো করে। বার বার সে ছুটে যাচ্ছিল কাচের আলমারির কাছে। রণ অদ্ভুত আওয়াজ করছে মুখ থেকে। মাঝে মাঝেই এমন বিপজ্জনকভাবে লাফিয়ে উঠছে, যে কোনো সময় আলমারির নীচের তাকের কাচটা ভেঙে পড়তে পারে ওর গায়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে। আমি রিনিকে বললাম, 'রাতে পুতুলটাকে এখানে রাখা রিস্কি হয়ে যাবে রিনি। রণ ওর ওপরে কেন যে অমন খাপ্পা হয়ে উঠল কে জানে! পুতুলটাকে বরং আমাদের শোবার ঘরেই রেখে দিই।'

রিনি কোনো উত্তর দিল না। ওর চোখে মুখে তীব্র বিরক্তি।

আমি ডাইনিং টেবল থেকে উঠে আলমারি থেকে পুতুলটাকে বের করে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলাম। আমাদের বিছানার পাশে রিনির ড্রেসিং টেবল। তারই এক ধারে যত্ন করে রাখলাম পুতুলটাকে। এখান থেকে আর যাই হোক পড়ে গিয়ে ভাঙার সম্ভাবনা নেই পুতুলটার। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে একটা পত্রিকার পাতায় চোখ বুলোচ্ছিলাম। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে খানিক পড়াশোনা করা আমার পুরোনো অভ্যাস। এই সময়টায় রিনি ড্রেসিং টেবলের সামনে বসে রোজ রূপচর্চা করে। হাতে, পায়ে ক্রিম মাখে। বুকের খাঁজে সুগন্ধী ঢালে। রোজ আমি যখন রিনির পাশে গিয়ে শুই, তার গায়ের গন্ধ আমাকে যেন জড়িয়ে রাখে। তাকে আদর করার সময় সেই সুগন্ধ আমার শরীরের সঙ্গে মিশে যায়।

রিনি আজও ঘুমোতে যাওয়ার আগে যথারীতি ড্রেসিং টেবলের সামনে। একটু আগেই তাকে দেখে এসেছি আমি। ঘরের অনুজ্জ্বল বিজলি-বাতির স্নিগ্ধ আলোয় একটা হালকা ফিনফিনে গোলাপি রঙের নাইটি পরে আয়নার সামনে বসে ছিল রিনি। নাইটির স্বচ্ছ আবরণের ওপাশে তার শরীরের স্পষ্ট চড়াই-উতরাই। আমি পিছন থেকে তাকে দু-হাতে আলগা জড়িয়ে নিয়ে বলছিলাম, 'সত্য যুগের মুনি ঋষি হলেও আজ তোমাকে দেখে ধ্যান ভঙ্গ হয়ে যেত রিনি। আমি কলির সামান্য মানুষ কী করে সংযত থাকব! তাড়াতাড়ি করো।'

'অসভ্যতা কোরো না, যাও' বলে রিনি আমার হাত সরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সে খুশিই হয়েছিল আমি জানি। আমি তার ঘরের আলো নেভার অপেক্ষায় ছিলাম। জানি তারপরেই সে ডাক দেবে আমাকে। কিন্তু হঠাৎই ঘরের মধ্যে থেকে আতঙ্কিত রিনি তীব্র চিৎকার করে উঠল, 'সুকান্ত, সুকান্ত, শিগগির এসো—'

আমি দৌড়ে গেলাম তার কাছে। জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে রিনি?'

রিনি ঠকঠক করে কাঁপছিল। তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। আমি ঘরে ঢুকতেই সে আমার বুকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার বুকের দ্রুত ওঠা-নামা আমার শরীরে অনুভব করতে পারছিলাম আমি। আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, 'কী হয়েছে রিনি? এমন করছ কেন তুমি?'

রিনি দু-হাতে আমাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে কাঁপা, ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, 'ওই পুতুলটাকে এক্ষুনি তুমি আমাদের বাড়ি থেকে বিদায় করো সুকান্ত...'

'পুতুলটা?' আমি অবাক হয়ে ড্রেসিং টেবলের দিকে তাকালাম। পুতুলটাকে যেখানে রেখে গিয়েছিলাম, সেখানেই রয়েছে একইরকম ভাবে।

'হ্যাঁ, পুতুলটা', রিনি আমার বুকের মধ্যে যেন ঢুকে পড়তে চাইছে একেবারে, 'ও পুতুলটা সাধারণ পুতুল নয় সুকান্ত। ওই পুতুলটা জীবন্ত।'

'যাঃ, কী বলছ তুমি? তা আবার হয় নাকি?' আমি রিনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলি, 'নিশ্চয়ই কোথাও একটা ভুল হচ্ছে তোমার।'

'কোনো ভুল হচ্ছে না আমার', রিনি আতঙ্কিত গলায় বলে, 'পুতুলটা একটু আগে এক্কেবারে যেন বদলে গিয়েছিল। বিচ্ছিরি ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। যে কোনো মেয়েই সে দৃষ্টি চেনে। এত লালসা সেই চাউনিতে... দুটো চোখ দিয়ে ও যেন আমার সারা শরীরটা চেটেপুটে খেয়ে ফেলছিল। আর সেই সময় এমন কুৎসিত একটা হাসি লেগেছিল ওর মুখে...'

'আর ভয় নেই। এখন তোমার কাছে আমি এসে গেছি তো', রিনিকে জড়িয়ে ধরে বিছানার দিকে এগোই আমি। রিনির সারাটা শরীর তখনও তির তির করে কাঁপছে। খুব মৃদু, স্খলিত স্বরে সে আবার বলল, 'ওই পুতুলটাকে ফেলে দিয়ে এসো প্লিজ। ওকে এ বাড়িতে রেখ না।'

আমি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, 'এখন এত রাতে কোথায় ফেলতে যাব ওটাকে! সকাল হোক। তারপর ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে ঠিক একটা উপায় বের করা যাবেখন।'

'ওকে তাহলে এই ঘর থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যাও। ওর ওই হ্যাংলা, অসভ্য চোখদুটোর সামনে আমি কিছুতেই তোমার সঙ্গে...' রিনির ফরসা মুখে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ল।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। রিনি এমন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে, এই মুহূর্তে যুক্তি দিয়ে ওকে কিছু বোঝাতে যাওয়া নিরর্থক। আমি দু-হাতে পুতুলটাকে তুলে নিয়ে বসার ঘরের টি টেবলের ওপরে রেখে এলাম। তারপর রিনির দিকে চেয়ে হেসে বললাম, 'ঠিক আছে তো এইবার?'

রিনি কোনো উত্তর দিল না।

বিছানায় রিনি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেই ঘুমিয়ে পড়ল। আমার ঘুম আসছিল না। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল মনের মধ্যে। একবার মনে হল, ড্রয়িং রুমে একটা হালকা ঠক শব্দ হল। দু-এক মুহূর্ত চুপচাপ। তারপরেই স্পষ্ট শুনলাম, কে যেন আলগা পায়ে হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে সেই ঘরে। রণকে রাতে বেঁধে রাখা হয় না কোনোদিনই। আজ রেখেছিলাম। খানিক আগে পুতুলটাকে দেখার পর যেমন অস্বাভিক আচরণ করছিল সে, পুতুলটা শোবার ঘরের বাইরে রেখে আসার সময় তাকে ছেড়ে রেখে আসতে ভরসা পাইনি। পুতুলটার ওপরে যে আক্রোশ দেখেছি তার, সুযোগ পেলেই নিশ্চিত রণ ওটাকে ভেঙ্গেচুরে একসা করবে। হঠাৎই রণের চাপা গলার ডাক শুনলাম কয়েকবার। তারপর সব চুপ। একবার ভাবলাম উঠে গিয়ে দেখে আসি। তারপর মনে হল, রিনির হাত সরিয়ে বিছানা থেকে উঠতে গেলেই ঘুম ভেঙে যাবে ওর। মেয়েটাকে অযথা জাগিয়ে লাভ নেই। আমি চোখ বুজিয়ে শুয়ে থাকলাম চুপটি করে। পুতুলটা বাড়িতে আনার পর থেকে যে সব কাণ্ড ঘটে গেল একটার পর একটা, সেগুলোকে মন থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করতে লাগলাম প্রাণপণে। আজ সারাদিনে যথেষ্ট ধকল গেছে। শরীর ক্লান্ত ছিল। একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম আমি।

রাতে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। সেই লোকটা, মহেশপুরে যে আমাকে পুতুলটা দিয়েছিল, এসে দাঁড়িয়েছে আমার মাথার পাশে। মশারির বাইরে। আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি এখানে এলেন কীভাবে?'

আমার দিকে চেয়ে লোকটা নিঃশব্দে হেসে উঠল। তারপর অদ্ভুত খ্যানখেনে গলায় থেমে থেমে বলে উঠল, 'সে কী বাবু, আপনি নিজেই তো আমায় নে এলেন মেলার মাঠ থেকে।'

'আমি?' অবাক হয়ে বলে উঠলাম।

'আপনিই তো', লোকটার কোটরের মধ্যে ঢুকে যাওয়া চোখদুটো চকচক করে উঠল, 'ভুলে গেলেন এর মধ্যে! আপনি সঙ্গে করে না আনলে আপনাদের এই সাজানো সংসারের মধ্যে ঢুকে পড়ার সাধ্যই ছিল না আমার।'

লোকটার কণ্ঠস্বরে এমন একটা কিছু ছিল যে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। একটা অজানা আতঙ্ক ক্রমশ হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ছে আমার ভিতরে, বেশ বুঝতে পারছিলাম আমি। শুকনো খটখটে গলায় আমি জিজ্ঞেস করলাম তাকে, 'কী চান আপনি?'

'আপনার ওই শরীলটা।'

'মানে?' চমকে উঠে বলি।

'হ্যাঁ বাবু, আপনার ওই শরীলটার ওপরে বড্ড লোভ আমার', লোকটা আবার বলল, 'আমার যে বড্ড খিদে বাবু। এই খিদে নিয়ে কতদিন ছটফট করে মরছি। শুধু একটা রক্ত-মাংসের শরীরের অভাবে...'

'মানে?' লোকটার কথার মাঝমধ্যিখানেই বলে উঠি আমি।

'দিনেরবেলাটুকু চাই না, কিন্তু সন্ধের পর থেকে আপনার দেহটি আমাকে দিয়ে দিন বাবু', বলতে বলতেই রিনির দিকে একবার চাইল লোকটা। তার সেই দৃষ্টি দেখে আমি চমকে উঠলাম। কুঁকড়ে গেলাম ভয়ে। লোকটা আমার উত্তরের প্রতীক্ষা করল না। বাতাসে ভাসতে ভাসতে, তার ভারহীন শরীরটা মশারি ভেদ করে প্রায় আমার শরীরের ওপরে এসে পড়ল। আমি প্রাণপণে 'না, না—' বলে চিৎকার করে উঠতে গিয়ে দেখলাম কে যেন ততক্ষণে আমার গলাটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। তারপরে কী যে হল কিছুই আর মনে করতে পারলাম না। অঘোর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেলাম আমি।

রিনি যখন আমাকে গায়ে ঠেলা মেরে ঘুম থেকে জাগাল, তখনও দু-চোখে রাজ্যের ঘুম জড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছিল সারা রাত যেন ঘুমোইনি আমি। ঘরের দেওয়াল ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলাম নটা বেজে গেছে। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। ইশ, এত বেলা হয়ে গেছে! আজ আর অফিস যাওয়া হবে না। রিনিকে বললাম, 'আর একটু আগে ডেকে দিতে পারলে না? শুধু শুধু অফিসটা কামাই হয়ে গেল আজ।'

রিনি কথার উত্তর দিল না। সরাসরি তাকালও না আমার দিকে।

আমি বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমে গেলাম। চোখ মুখ ধুয়ে এসে বসলাম ড্রয়িং রুমে। মাথাটা ভার হয়ে আছে। শরীরে অদ্ভুত অবসাদ। দুর্বল লাগছে খুব।

রিনি চায়ের কাপটা ঠক করে সামনে বসিয়ে রেখে গেল।

আমি চায়ে লম্বা চুমুক দিলাম। বুঝতে পারছিলাম, পুতুলটাকে নিয়ে রিনির অস্বস্তি এখনও কমেনি। ওটাকে বাড়ি থেকে বিদায় না করা ইস্তক রিনিকে সামলানো কঠিন। রিনি রান্নাঘরে রান্না করছে এখন। তার ফরসা পিঠ আমার দিকে। আমি লঘু পায়ে তার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে নাইটির ওপরে থাকা রিনির পিঠের অনাবৃত অংশে। ঘাড়ের ওপরে থাকা কুচো চুল লেপ্টে আছে সেই ঘামের ওপরে। খুব সুন্দর দেখাচ্ছে রিনিকে। আমি আলতো করে ঠোঁট রাখতে গেলাম রিনির ভেজা ঘাড়ের ওপরে। আর তখনই আমার নজরে পড়ল আঁচড়ের দাগগুলো। বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'রিনি, তোমার ঘাড়ের ওপরে এগুলো কীসের দাগ?'

রিনি চমকে তাকাল আমার দিকে। আমি দেখলাম তার গলার ওপরেও হালকা ক্ষত। স্পষ্ট কামড়ের চিহ্ন। ও দাঁতে দাঁত পিষে বলল, 'তুমি জানো না এগুলো কীসের দাগ?'

'আমি? না তো?' অবাক হয়ে বললাম।

রিনির নাকের পাটা ফুলে উঠছে। আমার দিকে চেয়ে ক্ষোভে ফুঁসে উঠল সে, 'কাল রাতে কী হয়েছিল তোমার? বিয়ের এতদিন পরে অমন আদেখলের মতো আমাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাওয়ার কী দরকার পড়েছিল বলো তো? ক্ষুধার্ত পশুর মতো আমার শরীরটাকে সারা রাত ধরে আঁচড়ে কামড়ে দলে মুচড়ে কী এমন নতুন সুখ পেলে কাল সুকান্ত?'

আমার মাথার মধ্যে সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। রিনির কথা একটুও বোধগম্য হচ্ছিল না আমার। আমি ধীরে ধীরে সরে এলাম তার কাছ থেকে। সোফার ওপরে বসে পড়লাম। রণ দৌড়ে এল আমার কাছে। আমার পায়ের পাতা আর হাঁটুর কাছে শুঁকল দু-তিন বার। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল একটুক্ষণ স্থির হয়ে। তারপর এক দৌড়ে আমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে মুখ দিয়ে একটা অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বের করতে লাগল সে। আমি আড়চোখে একবার পুতুলটার দিকে চাইলাম। কাল যেমন রেখে গিয়েছিলাম, ঠিক তেমনি ভাবেই রয়েছে সেটা। কী মনে করে আমি পুতুলটা হাতে তুলে নিলাম। দু-হাতে শক্ত করে ধরে পুতুলটাকে চোখের আরও সামনে নিয়ে এলাম আমি। আর তখনই বিষয়টা নজরে এল আমার। কাল রাতে পুতুলটার চোখ মুখ যতটা খসখসে লাগছিল, আজ তেমন লাগছে না তো! পুতুলটাকে বেশ চকচকে দেখাচ্ছে আজ। মসৃণ। এমন মনে হচ্ছে কেন? এ কি আমার চোখের ভুল? কথাটা মনে আসতেই আর একবার তাকালাম পুতুলটার দিকে। আর তাকিয়েই চমকে উঠলাম আমি। স্পষ্ট দেখলাম, পুতুলটা স্থির চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি। ক্রুর, শয়তানের চিহ্ন লেগে আছে সেই হাসিতে। এতটাই ভয় পেয়ে গেলাম, হাত থেকে পুতুলটা পড়েই যাচ্ছিল। কোনোক্রমে সামলালাম। নামিয়ে সেটাকে আগের জায়গায় রাখলাম আবার। বুঝতে পারছি, কাল রাতে রিনি খুব মিথ্যে বলেনি। পুতুলটা সাধারণ পুতুল নয়। নিজের ওপরে বিশ্বাস হারিয়ে যেতে শুরু করল। মনে হল, সত্যি সত্যিই হয়তো ভয়ংকর একটা অশুভ শক্তি লুকিয়ে রয়েছে ওর ভিতরে। নইলে ওই পুতুলটা মহেশপুর থেকে সংগ্রহ করার দিন থেকেই এমন অদ্ভুত অদ্ভুত সব ঘটনা কেন ঘটে চলেছে? দ্রুত মনস্থির করে ফেললাম আমি।

বাইরে কর্পোরেশনের জঞ্জাল নেওয়ার গাড়ি এসেছে। জমাদার বাঁশি বাজাচ্ছে তীব্র স্বরে। রিনি ডাস্টবিনটা তুলে নিয়ে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরোচ্ছিল। আমিও তড়িঘড়ি পুতুলটাকে হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম, 'আমিও আসছি রিনি। জমাদারকে একটু দাঁড়াতে বলো। এই জঞ্জালটাকেও আর এক মুহূর্ত রাখার দরকার নেই আমাদের বাড়িতে।' রিনি আমার দিকে একবার ফিরে তাকাল। তার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল। খানিক তৃপ্তিও।

পুতুলটাকে জঞ্জালের গাড়িতে ফেলে দিয়ে এসে বেশ স্বস্তি বোধ করছিলাম। মনে হচ্ছিল কাল রাতভর বোধহয় একটা দুঃস্বপ্নই দেখেছিলাম এ পরিবারের সবাই মিলে। রণকে এতক্ষণ পর আবার স্বাভাবিক লাগছে। আগের মতোই ঘরময় ছুটে ছুটে আনন্দ প্রকাশ করছিল সে। আমার আর রিনির কাছে এসে পায়ে মুখ ঘষে আদর জানাচ্ছিল বার বার। রিনি তখনও আমার দিকে তাকাচ্ছিল না।

আমি তার কাছে গিয়ে জোর করে তার মুখ ঘোরালাম আমার দিকে। বললাম, 'রিনি, তুমি মিথ্যে ভুল বুঝছ আমায়।'

'মিথ্যে?' রিনি আমার বুকের ওপরে ঘুঁষি মারতে মারতে কান্নায় ভেঙে পড়ল, 'কাল রাতে তুমি আমাকে সিম্পলি রেপ করেছ... এত নৃশংস কী করে হতে পারলে তুমি? তোমার শরীরের নীচে পিষে যেতে যেতে একটা সময় মনে হচ্ছিল, আমি বোধহয় মরেই যাব। দম হালকা হয়ে আসছিল আমার ক্রমাগত...'

কী বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম রিনির দিকে। আমার চোখের সেই বোবা চাউনি রিনিকে আরও ক্ষেপিয়ে দিল। সে আমার হাত ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে গেল শোবার ঘরে। রণ হাঁ করে তাকিয়েছিল প্রথমটা আমাদের দিকে। রিনি আমাকে টেনে আনছে যখন, সেও ছুটে ছুটে আসছিল আমাদের পিছন পিছন। রিনি শোবার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে রণকে আটকাল। তারপর নাইটিটা খুলে বিছানার ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে নগ্ন দাঁড়াল আমার সামনে। রাগে ফুঁসে উঠে বলল, 'নিজের চোখেই দেখ কী অবস্থা করেছ আমার।'

তার সারা শরীর কাঁপছিল। রাগে, কষ্টে, ঘেন্নায়।

রিনিকে অনেকইবার দেখেছি আমি। তবু দিনেরবেলা উজ্জ্বল আলোর মধ্যে আমার সামনে এমন করে তাকে আগে কখনও দাঁড়াতে দেখিনি। আমার লজ্জা করছিল। তবু আমি রিনির অনাবৃত শরীরের দিকে মুখ তুলে চাইলাম। আর তাকিয়েই বিস্ময়ে এবং বেদনায় শিউরে উঠলাম। রিনির ঈষৎ আনত, লাজুক খরগোশের মতো ফরসা ও নরম বুকদুটি নখ এবং দাঁতের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। তলপেটে স্পষ্ট কালশিটের দাগ।

আমাকে তার দিকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে রিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, 'আমি সিম্পলি ভাবতেই পারছি না এখনও। এমনভাবে কাল আমাকে পিষে ফেলতে চেয়েছ সারাক্ষণ, এখনও ভালো করে হাঁটতে পর্যন্ত পারছি না।'

বিছানার ওপরে পড়ে থাকা রিনির রাত পোশাকটা তুলে নিয়ে ওর গায়ে আলতো করে ঢাকা দিলাম আমি। আমার গলা বুজে আসছিল। অনেক কষ্টে বললাম, 'প্লিজ, আমার ক'টা কথা তুমি শোনো রিনি। বিশ্বাস করো, কাল আমি আমার মধ্যে ছিলাম না। আমার শরীর, আমার চেতনা সমস্ত কিছু বেদখল হয়ে গিয়েছিল।'

'মানে?' সরু চোখে আমার দিকে চাইল রিনি। তার দু-চোখে স্পষ্ট অবিশ্বাস।

আমি অপরাধীর মতো মাথা নীচু করলাম। বললাম, 'তুমি ঠিকই বলেছিলে। তোমার কথা কাল আমার শোনা উচিত ছিল...'

'কোন কথা?' আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে রিনি।

আমি থেমে থেমে বললাম, 'তোমার আন্দাজে ভুল ছিল না। আমিই বুঝতে না পেরে ঠকে গেছি রিনি। বোকার মতো নতুন ধরনের পুতুল সংগ্রহের নেশায় পড়ে গিয়ে অভিশাপ কিনে এনেছি মহেশপুরের মেলা থেকে। ওই পুতুলটা সত্যিই স্বাভাবিক নয় রিণি।'

রিনি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।

আমি কাল সন্ধেয় মহেশপুরের মেলায় সেই আশ্চর্য লোকটার সঙ্গে দেখা হওয়া থেকে শুরু করে রাতে দেখা অদ্ভুত স্বপ্নের কথা খুলে বললাম রিনিকে। বললাম, 'বিশ্বাস করো রিনি, স্বপ্নে সেই লোকটা আমার শরীরের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার পর সারা রাত আমি ঘুমিয়েই কাটিয়েছি। আর কিচ্ছুটি সত্যিই মনে নেই আমার...'

রিনির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কাঁপা গলায় সে বলল, 'তার মানে তোমার ওটা স্বপ্ন ছিল না সুকান্ত। শয়তানটা সত্যি সত্যিই কাল রাতে ঢুকে পড়েছিল তোমার শরীরের মধ্যে। তোমার শরীরকে আশ্রয় করে আসলে সারা রাত ধরে সে-ই ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে আমার শরীর...'

দু'-হাত দিয়ে আমাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল রিনি। আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করল, 'কী হবে তাহলে এখন সুকান্ত?'

'আবার কী হবে?' আমি রিনির কপালে চুমু খেলাম, 'সে পুতুল তো আমি খানিক আগেই বিদায় করে দিয়ে এসেছি। এতক্ষণে শয়তান পুতুলটা কর্পোরেশনের জঞ্জালের গাড়িতে চেপে হয়তো ময়লাপোতার আবর্জনার স্তূপে চাপা পড়ে গেছে।'

'আমার তবুও ভয় করছে।'

'আর কীসের ভয়?'

'ও কি এত সহজে ছেড়ে দেবে? যদি আমাদের ক্ষতি করার জন্যে ও আবার ফিরে আসে?'

ভয় আমারও যে করছিল না তা নয়। তবু, মূলত রিনিকে সান্ত্বনা দেবার জন্যেই আমি বললাম, 'ওসব ভেবে আজকের এই দিনটাকে নষ্ট করার আর কোনো মানেই হয় না রিনি। সেই যখন অফিস যাওয়া হলই না, চলো আজ দিনটা আমরা দুজনে মিলে চুটিয়ে ঘুরে টুরে আসি বাইরে থেকে।'

'কোথায় যাবে?'

'কত দিন হলে গিয়ে সিনেমা দেখিনি দুজনে। চলো না যাই আজ?'

'আর রান্নাবান্না?' বলল বটে, কিন্তু আমার প্রস্তাবে রিনির গলায় উৎসাহ চাপা থাকল না।

'বাইরে কোথাও খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা সেরে নেওয়া যাবেখন।'

'সত্যি যাবে?'

'হুঁ', আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম, 'কী খাবে, চাইনিজ? নাকি অন্য কিছু?'

'যা হোক একটা কিছু হলেই হল', রিনি বলল, 'রণ-এর জন্যে কিছু খাবার বানিয়ে ফেলি দাঁড়াও। ওর বন্দোবস্তটুকু না করে তো আর বেরোনো যাবে না।'

'যা করবে চটপট করে ফেলো', মোবাইলে মুভির টিকিট বুক করতে করতে রিনিকে তাড়া দিলাম আমি, 'হাতে বেশি সময় নেই কিন্তু। আগে লাঞ্চ করব কোথাও। তারপর হলে ঢুকে পড়ব।'

রণ আমাদের কথায় কী বুঝল কে জানে! হঠাৎই দেখি আমার কাছে এসে পায়ে নিজের গা ঘষতে ঘষতে সে কুঁই কুঁই আওয়াজ করতে লাগল। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। গায়ে হাত বুলিয়ে দিলাম আদর করে। রণ বোবা, মায়াবী দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর এক ছুটে একবার আমাদের শোবার ঘরে গিয়েই আবার লাফিয়ে চলে এল আমার কাছে। বাইরের দরজার কাছে ছুটে গিয়েও সরে এল ভয় পেয়ে। আমি ওর কাণ্ডকারখানা মন দিয়ে দেখছিলাম। রণ-এর আচরণ কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। ও আজ যেন বড্ড বেশি অস্থির হয়ে আছে। ওর এই অস্থিরতা কীসের জন্যে? রণ কি তাহলে এমন কিছু আঁচ করছে, যা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না?

জাতীয় সংগীত শেষ হতেই হলটা অন্ধকার হয়ে গেল। পরদায় তামাক বিরোধী বিজ্ঞাপন শুরু হয়েছে। রিনি এক হাতে আমার হাত জড়িয়ে ধরল। মাথা রাখল আমার কাঁধের ওপরে। অন্য সময় হলে হয়তো কাঁধ থেকে ওকে মাথা সরিয়ে নিতে বলতাম। আমি জানি, রিনি এমন করে বসা মানেই পিছনের রো-তে বসা মানুষজনের কেউ কেউ সিনেমা ছেড়ে হাঁ করে আমাদেরই গিলতে শুরু করবে এক্ষুনি। মফসসলের এই মানসিকতার একটুও পরিবর্তন হয়নি এত দিনেও। আজ অবিশ্যি রিনিকে কিছুই বললাম না আমি। ওর ওপর দিয়ে বিচ্ছিরি ঝড় বয়ে গেছে কাল রাত থেকে। ঝড় আমার ওপর দিয়েও বইছে। কিন্তু ঘটনার অভিঘাত নিশ্চিত রিনির ওপরে অনেকই বেশি। আমি ওকে থিতু হবার সুযোগ দিতে চাইছিলাম।

সিনেমাটা বেশ ভালো। টান টান গল্প। অভিনয়ও চমৎকার। ক্রমশই আমি ছবিটার মধ্যে ঢুকে পড়ছিলাম। কিন্তু হঠাৎই আমার মনঃসংযোগে চিড় ধরল। বুঝলাম, একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে মনের মধ্যে। শরীরেও। মনে হল কে জানি আমার ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আর যেই কথাটা মনে হল, ঠিক তখনই ঘাড়ের কাছে কার যেন একটা নিশ্বাস পড়ল। চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না। মনের ভুল ভেবে আবার পরদার দিকে তাকাতেই মনে হল কে যেন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এত ভয় পেয়ে গেলাম, শিরদাঁড়ার মধ্যে রক্ত যেন ছলাৎ করে উঠল। হৃৎস্পন্দন দ্রুততর হল আমার। আমি ভূত, ভগবান কিছুতেই তেমন বিশ্বাস করিনি কোনো কালেই। তবু আজ আমার মন ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেল। কী বিভীষিকা দেখে ফেলব, এই দুশ্চিন্তায় ঘাড় ঘোরাতে পর্যন্ত সাহস পাচ্ছিলাম না।

রিনি ফিসফিস করে বলল, 'কী হয়েছে? অমন ছটফট করছ কেন তখন থেকে?'

আমার বিশ্রী অনুভূতির কথা রিনিকে জানাব কিনা মনস্থির করতে পারছিলাম না। তখনই খুব চাপা অথচ স্পষ্ট হাসির শব্দে ফিরে তাকাতেই সিনেমা হলের আধো আলো, আধো অন্ধকারের মধ্যে লোকটাকে দেখতে পেলাম আমি। দু সারি চেয়ারের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল। তার নিষ্পলক দৃষ্টি আমার আর রিনির ওপরে। সেই দৃষ্টি একেবারে গনগনে আগুনের মতো। শুধু দৃষ্টি দিয়েই আমাদের দুজনকে যেন পুড়িয়ে ছাই করে দিতে চাইছে সে নিঃশব্দে। আতঙ্কে রিনির হাতটাকে শক্ত করে চেপে ধরলাম আমি। চাপটা বড্ড বেশিই জোর হয়েছিল নিশ্চিত। রিনি চাপা স্বরে 'উঃ' বলে কঁকিয়ে উঠল।

আমি শিউরে উঠে কাঁপা গলায় বলে উঠলাম, 'রিনি, সেই লোকটা এখানেও ধাওয়া করে এসেছে।'

'কোন লোকটা?' রিনি ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে।

'মহেশপুরের মেলার সেই লোকটা', আমি আর্ত কণ্ঠে বলি, 'অন্ধকার হলেই লোকটা আমার মধ্যে ঢুকে পড়ে আমার শরীরটাকে দখল করে ফেলতে চাইছে রিনি। কাল যেমন করেছিল। আজও নিশ্চিত সেই মতলবে এখানে পৌঁছে গেছে ও। তুমি পালিয়ে যাও। আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাও রিনি। নইলে আবার আমার শরীরে আশ্রয় নিয়ে কুৎসিত লোকটা তোমাকে ছিঁড়ে খেতে চাইবে...' আতঙ্কে আমার গলা কেঁপে গেল।

পিছন থেকে কে যেন অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, 'তখন থেকে কী শুরু করেছেন বলুন তো মশাই। গ্যাঁটের পয়সা খরচা করে টিকিট কেটে সিনেমা দেখতে এসেছি। সেটাই নিরুপদ্রবে দেখতে দিন প্লিজ। আপনাদের নাটকটা নাহয় অন্য কোনো সময় দেখা যাবে।'

রিনি আমার মুখে হাত চাপা দিল। খুব নীচু গলায়, আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল 'কী হচ্ছে সুকান্ত! দেখছ না, সকলে ট্রোল করতে শুরু করেছে। চুপ করো প্লিজ। কথা বোলো না। কেন শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ? কেউ নেই এখানে। কই আমি তো কাউকে দেখতে পাচ্ছি না...'

'সত্যিই কেউ নেই? সেই রোগাটে, খোঁচা খোঁচা দাড়িঅলা লোকটাকে সত্যিই দেখতে পাচ্ছ না তুমি?' আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।

'না, তুমি দেখ আর একবার। সত্যিই কেউ নেই এখানে।' রিনি আবার বলল।

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে এবারে লোকটাকে সত্যিই দেখতে পেলাম না। কিন্তু মনের মধ্যে থেকে অস্বস্তিটা কিছুতেই গেল না।

সিনেমা শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল। পশ্চিম আকাশে লাল রং ছড়িয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছিল। স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে। পাখিরা ঘরে ফিরছিল মাথার ওপর দিয়ে ঝাঁক বেঁধে উড়তে উড়তে। রিনি আমার হাত ধরে ছিল আলতো করে। হঠাৎ সে বলে উঠল, 'তোমার হাতটা এমন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কেন বলো তো?'

আমি কোনো জবাব দিলাম না। বুঝতে পারছিলাম, সন্ধে যত ঘন হচ্ছে, আমার বুকের মধ্যে একটা আতঙ্ক চেপে বসছে ভারী হয়ে।

রিনি আমার মুখের দিকে তাকাল। নরম গলায় বলল, 'তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?'

আমি ভয় লুকনোর চেষ্টা না করে বললাম, 'আমার খুব ভয় করছে রিনি।'

'কোনো ভয় নেই', রিনি আমাকে সাহস দেবার চেষ্টা করল, 'ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, আমাদের সাহসের সঙ্গে তা মোকাবিলা করতে হবে সুকান্ত। অযথা ভয় পেয়ে কুঁকড়ে গিয়ে যুদ্ধের আগেই হেরে বসে থাকলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না...'

বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছতেই একটা বিচ্ছিরি পচা এবং আঁশটে গন্ধ নাকে এল। আচমকাই একটা শিরশিরে হাওয়া বইতে শুরু করল আমাদের দুজনকে ঘিরে। রিনি থমকে দাঁড়াল। রুমালটাকে শক্ত করে নাকে চেপে ধরতে ধরতে বলল, 'পচা গন্ধটা কোত্থেকে আসছে বলো তো?'

'বুঝতে পারছি না', আমি বললাম। গন্ধটা ক্রমশই জোরালো হচ্ছিল। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে গন্ধটাও যেন এগিয়ে চলেছে আমাদের বাড়ির দিকে। আমি তড়িঘড়ি গেটের তালা খুললাম। বাড়িতে ঢোকার মূল দরজার তালাটাও খুলে ফেললাম দ্রুত হাতে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই ডাক দিলাম, 'রণ, রণ—'

রণ-এর সাড়াশব্দ পেলাম না। রিনি বলে উঠল, 'ওর নিশ্চিত অভিমান হয়েছে। এতক্ষণ বেচারাকে একা রেখে আমরা বাইরে ঘুরে এলাম। এমন তো করি না সাধারণত...'

আমি অভ্যস্ত হাতে সুইচ বোর্ডে নির্দিষ্ট সুইচ টিপে ঘরের আলোগুলো জ্বেলে দিলাম।

ডাইনিং-এ রণ ছিল না। আমার অদ্ভুত লাগছিল। এমন কিছুতেই হবার কথা নয়। আমাদের সাড়া পেয়েও রণ ছুটে আসছে না, সাড়া দিচ্ছে না, এ হতেই পারে না। একটা অজানা বিপদের আশঙ্কা আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে শুরু করল। একটু আগে রাস্তায় পাওয়া সেই বিচ্ছিরি আঁশটে গন্ধটা যেন ঝাঁপিয়ে ঢুকে পড়ল এইবার ঘরের মধ্যে। সমস্ত ডাইনিং জুড়ে গন্ধটা পাক খাচ্ছে। আমি ঘরের জানালাগুলো খুলে দিতে গেলাম। আর তখনই রিনির ভয়ার্ত চিৎকার কানে এল ভিতরের ঘর থেকে।

দৌড়ে ওর কাছে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, রিনি থরথর করে কাঁপছিল। এমন ভয়ংকর দৃশ্য চোখের সামনে দেখে আমিও কথা বলতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল দু-হাত দিয়ে আমার গলাটাকে কে যেন শক্ত করে চেপে ধরেছে। আমাদের শোবার ঘরের মেঝের ওপরে রণ-এর মৃত শরীরটা স্থির হয়ে পড়ে রয়েছে। তার হাঁ মুখ থেকে রক্তের স্রোত বেরিয়ে ঘরের মেঝের ওপরে জমে আছে। মাছি ভনভন করছে তার ওপরে। রণ-এর খোলা চোখদুটোয় এখনও ভয় লেপটে আছে। আর তার সেই মৃত শরীরের ওপরে উপুড় হয়ে পড়ে আছে সেই পুতুলটা, আজই সকালে যেটাকে আমি নিজে হাতে কর্পোরেশনের ময়লার গাড়িতে ফেলে এসেছিলাম আবর্জনার স্তূপের মধ্যে।

কাল রাত থেকে ক্রমাগত ভয় পেতে পেতে এইবার ভয়টা বোধহয় সয়ে এল খানিক। বুঝলাম ভয় সরে গিয়ে আমার মনের মধ্যে ক্রমশ তীব্র রাগ আর প্রতিহিংসা জেগে উঠছে এইবার। ওই পুতুলটাকে কিছুতেই আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমাদের দুজনের মনেই আর সংশয় ছিল না, রণকে এমন করে খুন করেছে এই পুতুলটাই।

রিনি আমার বুকের ওপরে মাথা দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। রণকে এইভাবে মরে যেতে দেখা তার পক্ষে কতটা বেদনার আমি বুঝি। নরম হাতে তার মাথাটাকে বুকের ওপর থেকে সরিয়ে আমি খোলা দরজা দিয়ে বাইরের ঘরে পা বাড়াতে যেতেই সে আমার হাত টেনে ধরল। ভয় পাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় যাচ্ছ?'

আমি কঠিন গলায় বললাম, 'এর শেষ দেখতে চাই আমি রিনি।'

'কী করবে তুমি?' পুতুলটার দিকে চেয়ে বলল রিনি, 'কোন ক্ষমতা নিয়ে লড়বে তুমি ওর সঙ্গে? রণ-এরই মতো, আমাদেরও এইভাবেই শেষ করে দেবে ও। আমাদের কাউকেই বাঁচতে দেবে না ওই শয়তান পুতুলটা।' রিনির চোখেও পুতুলটার প্রতি তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠল।

'এবারে আর ফেলে দেওয়া নয়', মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম আমি, 'একেবারে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেলব আমি পুতুলটাকে। সিঁড়ির নীচে একটা ভারী হাতুড়ি আছে। ওটা নিয়ে আসতে দাও আমাকে...'

'কিন্তু রণ? ও কি ওই ভাবেই পড়ে থাকবে এখানে সারা রাত?' রিনি ভিজে গলায় জিজ্ঞেস করল।

বাইরে রাত নেমেছে। কী যে করব মাথায় আসছিল না কিছু। পিছনের বাগানে রণকে সমাধি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরটার অবস্থা যা, আজ রাতে এই ঘরে শোওয়া মুশকিল। ঘরের মেঝে রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। আঁশটে গন্ধ লেগে আছে বাতাসে। আর ওই পুতুলটা...

মনে হল, যা করার কাল ভোরের আলো ফোটার পরেই করা ভালো। রিনিকে এ কথাটা বলতে যাব, দেখি সে তখন আমার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এক হাত দিয়ে চেপে ধরেছে আমার ডান বাহু। আমি ওর দিকে ঘুরতেই সারা শরীর জুড়ে একটা বেজায় ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। পুতুলটা রণের শরীর ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। পুতুলটাকে অসম্ভব উজ্জ্বল দেখতে লাগছে। তার জীবন্ত দুটো চোখে যেন আগুনের ঝিলিক। আর পুতুলটার মুখের চারদিকে লেপ্টে আছে কালচে লাল রঙ। রঙ, নাকি রক্ত? রণকে শুধু মেরেই ফেলেনি শয়তানটা, তার রক্তও শুষে খেয়েছে হিংস্র শ্বাপদের মতো।

রিনি আমার হাত ধরে টান মারল, 'সুকান্ত, একটুও দেরি নয়। চলো, এক্ষুনি আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে...'

'কিন্তু যাবটা কোথায়?' অসহায়ের মতো বলে উঠি।

'পরে ভাবা যাবে', রিনি আমাকে টেনে নিয়ে এল ঘরের বাইরে। দ্রুত হাতে দরজা বন্ধ করল শোওয়ার ঘরের। তারপর জোরে টান মেরে দরজাটা লক করে দিল। রিনি উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছিল। বেডরুমের মধ্যে একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। দরজাটা কে যেন ভিতর থেকে আঁচড়াচ্ছে। একটা চাপা খিকখিকে হাসির আওয়াজ ভেসে এল ঘরের ভিতর থেকে। এই হাসি আমি চিনি। সেই লোকটা। রিনির চোখমুখ দেখেই বুঝলাম হাসির আওয়াজ তার কানেও পৌঁচেছে।

রিনি জিজ্ঞাসু চোখে আমার দিকে তাকাতেই শুকিয়ে যাওয়া গলায় বললাম, 'সে এসে গেছে রিনি। অন্ধকার গাঢ় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেও জেগে উঠেছে পূর্ণ শক্তিতে। নিশ্চিত আবার আমার শরীরের দখল নিতে চাইছে মহেশপুরের সেই লোকটা।'

'দরজা তো বন্ধ', ভয় পাওয়া গলায় সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করল রিনি।

আমি ম্লান হাসলাম, 'কাল রাতেও দরজা তো বন্ধই ছিল...'

রিনির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল, 'কী হবে তাহলে সুকান্ত?'

'জানি না', দু দিকে মাথা নাড়লাম।

রিনি ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল, 'আমি পারব না সুকান্ত। আজও যদি তোমার শরীরটাকে ধার করে আমার ওপরে লাফিয়ে পড়ে ও, আমি বোধহয় মরেই যাব। কাল এমনভাবে আমার বুকদুটোকে মুচড়োচ্ছিল, মনে হচ্ছিল শরীর থেকে আমার বুকদুটো ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। এখনও ব্যথায় টাটিয়ে আছে আমার বুক, পাঁজর, উরু...'

আমি চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম। দরজা-বন্ধ শোবার ঘরের মেঝের ওপরে একটানা আওয়াজ উঠছে খুট, খুট, খুট... পুতুলটা ঘরময় হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। সেই আওয়াজে দরজাটা কাঁপছিল। যেন সে-ও ভয় পাচ্ছে এই অপার্থিব আওয়াজে।

রিনি বলল, 'চলো, পালিয়ে যাই।'

'কোথায় পালাবে?'

'যে কোনো জায়গায়। এই বাড়ির বাইরে।'

'সেখানেও কি লোকটা আমাদের ছেড়ে দেবে ভেবেছ? ও ঠিক আমাদের ধাওয়া করে পৌঁছে যাবে সেখানে।'

'তা যদি পৌঁছেও যায়, পাবলিক প্লেসে আমাকে মোলেস্ট করতে তো পারবে না...'

রিনির কথাটা যুক্তিযুক্তই লাগল আমার। মানুষের ভিড়ে যদি মিশে থাকতে পারি, আপাতত হয়তো বিপদমুক্ত থাকতে পারব আমরা। কিন্তু যখন রাত আরও বাড়বে? কথাটা রিনিকে বলতে সে একটুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আমার মুখের দিকে।

আমি বললাম, 'তার চেয়ে একটা কাজ করি বরং।'

'কী?'

'তুমি কয়েক দিন তোমার মা বাবার কাছে থেকে যাও। আমার কাছ থেকে দূরে থাকলেই এই মুহূর্তে নিরাপদ তুমি।'

'আর তুমি?'

'আমি?' বলে খানিক ভাবলাম। তারপর ধীরে ধীরে বললাম, 'আমাকে তো এখানে থাকতেই হবে রিনি। আমার সামনে এখন অনেক কাজ...'

রিনি আমার বুকের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঘুঁষি মারতে মারতে বলল, 'আমাকে কী ভাবো তুমি? আমি কি এমনই স্বার্থপর? এই বিপদে তোমাকে একলা ফেলে রেখে চলে যাব আমি?'

রিনির কথার উত্তর দিতে গিয়েও থমকে গেলাম আমি। পুতুলটা দরজার ঠিক ওপারে এসে থেমেছে। দরজার ল্যাচ কী-টা একটু একটু নড়ছে। হালকা কুড় কুড় করে আওয়াজ হচ্ছে দরজার হাতলে। বুঝলাম দরজাটা যে কোনো সময় খুলে যাবে এইবার।

রিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠল, 'এখনও দাঁড়িয়ে রইলে কেন, চলো। নইলে এক্ষুনি দরজা খুলে এই ঘরে চলে আসবে ও।

'চলো', বলতে গিয়েও থমকে গেলাম আমি। ট্রেনের সেই ভদ্রলোকের দেওয়া মালাদুটোর কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ। সেদিন লোকটার কথায় আদৌ গুরুত্ব দিইনি। তাঁর দেওয়া মালার কথাও তাই মনে ছিল না। এমনকি রিনিকেও তাঁর কথা বলা হয়নি এই ক'দিনে।

'রিনি তাড়া দিল, 'কী হল, চলো—'

'এক মিনিট', বলে আমার হাত থেকে রিনির হাত ছাড়িয়ে নিলাম আমি। মালাদুটো এখনও সেদিন মহেশপুরে যে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে গিয়েছিলাম, তার মধ্যেই রয়ে গেছে। আমি দ্রুত ব্যাগটা বের করে আনলাম ডাইনিং রুমে রাখা আলমারির নীচের তাকের দরজা খুলে।

কট করে একটা আওয়াজ। শোয়ার ঘরের দরজার লক খুলে গেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, স্থির, মৃত দৃষ্টি নিয়ে পুতুলটা আমারই দিকে এগিয়ে আসছে খুট খুট খুট খুট...

আমি প্রাণপণে ব্যাগের মধ্যে হাতড়াচ্ছিলাম। মালাদুটো কোথায়, কোন খোপে যে রেখেছিলাম!

পুতুলটা আমার থেকে হাত দুই আড়াই তফাতে এসে থমকে দাঁড়াল। সেই বিচ্ছিরি খিক খিক হাসিটা ছড়িয়ে পড়ছে আবার ঘরের মধ্যে। সেই পচা আঁশটে গন্ধটাও।

স্পষ্ট দেখলাম, পুতুলের মধ্যে থেকে আবছা ছায়াটে শরীরে সেই লোকটা বেরিয়ে আসছে। ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলছে, 'বড় খিদে, বড় খিদে। শরীরে শরীর মেলানোর বড় তেষ্টা আমার। আপনার শরীলটা আবার আমাকে দিন বাবু রাতটুকুর জন্যে।'

রিনির মুখ ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। কোনোক্রমে সে ডাক দিল আমায়, 'চলে এসো সুকান্ত। চলো এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে মানুষের ভিড়ে মিশে যাই আমরা...'

আমি মালাদুটোকে খুঁজে পাচ্ছি না কিছুতেই।

লোকটা দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে মিশে যেতে চাইছে আমার সঙ্গে। বুঝতে পারছি, আমার হাত পা অবশ হয়ে আসছে ক্রমাগত। ঠিক তখনই আচম্বিতে মালাদুটো হাতে ঠেকল আমার।

আমি এক টানে মালাদুটো বের করে আনলাম। লোকটাও আচমকাই থমকে দাঁড়াল। তার চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল দপ করে। খ্যানখেনে গলায় সে চিৎকার করে উঠল, 'এই মালা কে দিয়েছে আপনাকে? খবরদার, ওই মালা কিছুতেই পরবেন না আপনি। ও মালা পরলে এ বাড়ি-ঘর তছনছ করে ফেলব। শেষ করে ফেলব আমি আপনাদের...'

তার হুংকারে কান না দিয়ে আমি মালাটা পরে ফেললাম। রিনির দিকে আর একটা মালা ছুঁড়ে দিয়ে বললাম, 'পরে ফেলো। চটপট।'

'এটা আবার কী?' মালাটা লুফে নিয়ে থতমত খেয়ে গিয়ে বলল রিনি।

'কী তা আমিও জানি না', আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, 'কিন্তু এই মুহূর্তে এই খড়কুটোটুকুই আঁকড়ে ধরা ছাড়া আর উপায় নেই আমাদের।'

আমার দিকে এক মুহূর্ত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রিনি। তারপর মালাটা গলায় পরে ফেলল সে।

সঙ্গে সঙ্গে ঘরের মধ্যে যেন প্রলয় ঘটে গেল।

লোকটা আমাকে ছেড়ে রিনির দিকে এগোচ্ছিল প্রাণপণে। রিনি মালাটা পরে ফেলতেই তার পা দুটো যেন আটকে গেল মাটির সঙ্গে। আক্রোশে ফেটে পড়ল সে। তার দু-চোখে আগুন জ্বলে উঠল একেবারে। পুরো শরীরটাই যেন পালটে যেতে শুরু করল তার। শরীরের মাংস খসে পড়তে লাগল আমার চোখের সামনে। দু-চোখের গহবরে ফুটে উঠল হাহাকারের মতো শূন্যতা। অস্থিসার দু-হাত আমার গলার দিকে বাড়িয়ে দিল সে, কিন্তু স্পর্শ করতে পারল না আমাকে। যেন কোন অদৃশ্য বেড়ায় বাধা পেয়ে সে হাত প্রতিহত হল। আরও রেগে গেল লোকটা। উদ্ভ্রান্তের মতো এইবার সে হাত বাড়াল রিনির দিকে। রিনি হাঁ করে দেখছিল। তার চোখ বিস্ফারিত। আতঙ্কে সে এবারে শিউরে উঠল। চিৎকার করে উঠল, 'না, না, না—'

হাতের কাছে একটা চিনেমাটির ফুলদানি ছিল। খুব শখ করে কিনেছিলাম ওটা হস্তশিল্প মেলা থেকে। সেইটাকেই হাতে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারলাম আমি লোকটার দিকে।

ফুলদানিটা তার কপালে গিয়ে আছড়ে পড়ল। মাংসহীন করোটিতে ঠক করে শব্দ হল। কিন্তু লোকটা ভ্রুক্ষেপ করল না। রিনির বুক লক্ষ করে হাত বাড়িয়ে দিল সে। রিনি সরে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল। এবারেও রিনির শরীর থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরে গিয়েই থেমে গেল তার হাত। মালাদুটো পরে নেবার পরেই আমাদের চারপাশে যেন একটা অদৃশ্য পাঁচিল উঠেছে বুঝতে পারলাম। শয়তানটা সেই প্রাচীর অতিক্রম করতে পারছে না কিছুতেই। আমাদের ছুঁতে যতই ব্যর্থ হচ্ছে, ততই ফুঁসছে সে। পুতুলটা ঘরের মেঝের ওপরে দাঁড়িয়েছিল চুপ করে। তার চোখে বোবা চাউনি। ভাবলাম ওটাকে আছাড় মেরে টুকরো টুকরো করে দিই। কিন্তু পুতুলটাকে ধরতে যেতেই দেখলাম ওর গায়ে নিজে থেকেই চিড় ধরছে। নীচু হয়ে দেখতে যেতেই পুতুলের গায়ের সেই সরু ফাটল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসে আমার মুখে লাগল। পুতুলটার মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছিলাম। কী ঘটতে চলেছে বুঝতে না পেরে রিনিকে তাড়া দিয়ে বললাম, 'আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়। চলো, ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি শিগগির...'

ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতেই শুনতে পেলাম লোকটা সাপের মতো হিসহিসিয়ে উঠল, 'ওই মালা ক'দিন রক্ষা করবে? আর দু-চারটে দিনই তো? তারপর? কে বাঁচাবে আপনাদের? আপনার ওই শরীর আমি কেড়ে নেব চিরকালের মতো।'

আমি চলে যেতে যেতেও ঘুরে দাঁড়ালাম। চিৎকার করে উঠলাম, 'আমি কী ক্ষতি করেছিলাম তোমার? কেন তুমি আমার সংসারটাকে তছনছ করে দিচ্ছ এইভাবে?'

আমার কথা শুনে হা হা হা হা করে অট্টহাসি হেসে উঠল সেই পিশাচ। তার হাসির শব্দে কেঁপে উঠল সমস্ত দরজা জানালা। রিনির দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, 'এই নারীশরীরটাকে আপনি ভোগ করছেন এইটেই তো আপনার সবচেয়ে বড় অপরাধ...'

'অপরাধ? কীসের অপরাধ?' আমি অবাক হয়ে বলি, 'রিনি আমার স্ত্রী—'

আবারও বিকট শব্দে হেসে উঠল লোকটা। সেই হাসির শব্দে বুকের ভিতর পর্যন্ত কেঁপে উঠল আমার। হুংকার দিয়ে উঠল সে, 'এই নারীর শরীরের ওপরে একমাত্র অধিকার আমারই। আমিই তাকে জাগিয়েছি। সেও জাগিয়েছিল আমাকে...'

আমার মাথা কাজ করছিল না। তার কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না আমি।

রিনি আমার হাত ধরে টান দিল, 'আর দাঁড়িয়ে থেকো না। চলো—'

অরিন্দম বসেছিল চুপ করে। আমি আর রিনিও। তারকজেঠু গম্ভীর মুখে পায়চারি করছিলেন। কাল রাতেই এসে পৌঁছেছিলাম অরিন্দমের কাছে। সব শুনে মারাত্মক ধমক দিয়েছে অরিন্দম। আমি কেন তাকে শুরুতেই সব কথা খুলে বলিনি, সেই অপরাধে আমাকে বেশ খানিকক্ষণ তেড়ে গাল পাড়ল সে। প্রবল আশঙ্কার সঙ্গে বলল, 'বার বার বারণ করেছিলাম তোকে। বলেছিলাম, বুড়ো বটগাছের কাছে যাবি না। সেই গেলি। এখন কী সর্বনাশের দোরগোড়ায় এসে যে দাঁড়িয়েছিস, সে কেবল ভগবানই জানেন।'

'কী হবে এখন অরিন্দমদা?' রিনি বিপন্ন গলায় জিজ্ঞেস করেছিল।

'একটু ভাবতে দাও', অরিন্দম খানিক সময় নিয়েছিল। তারপর উঠে গিয়ে ফোন করেছিল দু-তিনজনকে। আমি অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম। তাড়া দিচ্ছিলাম ওকে, 'কী রে কিছু তো বল। কী উপায় এখন? আমাদের তো বাঁচতে হবে নাকি?'

অরিন্দমই বলেছিল, 'চতুর্দশী আসতে আর মাত্র দিন কয়েকই বাকি। ট্রেনের সেই লোকটার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে যা করার আমাদের আগামী দু-তিন দিনের মধ্যেই করতে হবে।'

'হুঁ', মাথা নাড়লাম আমি।

'নষ্ট করার মতো একটা মুহূর্তও আমাদের হাতে নেই এখন', অরিন্দম বলল, 'কালই মথুরাপুর চল। আমাদের গ্রামের বাড়িতে। জ্যাঠামশাইয়ের কাছে।'

'তারপর?'

'তার পরের পদক্ষেপ কী হবে তা জ্যাঠামশাই-ই ঠিক করবেন। তাঁর ওপরেই পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো ছেড়ে দে।'

'তিনি কি এই বিপদ থেকে উদ্ধারের পথ দেখাতে পারবেন আমাদের?' রিনি উদবেগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল।

'আমি জানি না', অরিন্দম দু' দিকে মাথা নাড়ল, 'তবে ছোটবেলা থেকে দেখেছি, বাড়িতে এই ধরনের কোনো বিপদ আপদ এলে তিনিই পুজো আচ্চা হোম যজ্ঞ করে পরিস্থিতি সামাল দিতেন। এমনকী আশেপাশের গাঁ গঞ্জের লোক এখনও তাঁর কাছেই আসে অশরীরী উপদ্রবের হাত থেকে রক্ষা পেতে।'

'তিনি কি তান্ত্রিক?' আমি উৎসাহ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করি।

'তিনি সাধক', অরিন্দম বলে, 'সে সাধনার পথ যোগ নাকি তন্ত্র তা আমাদের জানা নেই। এ বিষয়ে কখনও কিচ্ছুটি মুখ ফুটে বলেন না তিনি। রোজ সন্ধের সময় নিজের ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে ঘণ্টা দুই তিন নিজের মধ্যে থাকেন তিনি, এটুকুই দেখেছি বরাবর। ওই সময় তিনি কী করেন তা আমাদের জানা নেই...'

'আশ্চর্য!' আমি বললাম, 'তোদের কৌতূহল হত না?'

'খুবই হত, কিন্তু ওই সময়টুকুতে তাঁকে বিরক্ত করার ব্যাপারে কড়া নিষেধ ছিল। এমনকী বাড়িতে চরম বিপদ ঘটে গেলেও ওই সময়টিতে তাঁকে যেন কেউ না ডাকে, এই নির্দেশই দিয়ে রেখেছেন তিনি। সে নির্দেশ অমান্য করার সাহস কারও হয়নি কখনও।'

'তিনি তো নিশ্চিত তাহলে অনেক শক্তিরই অধিকারী অরিন্দমদা', রিনির গলায় খানিক ভরসা এখন।

'জানি না রিনি', অরিন্দম উদাস ভঙ্গিতে বলল, 'আমরা চিরকাল তাঁকে ভয় পেয়েছি। জানার চেষ্টা করিনি তাঁকে কোনোদিন। আমাদের গ্রামের বাড়িতে কালীমন্দির আছে। কোন পূর্বপুরুষ যে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জানি না। বংশপরম্পরায় আমরাই সেবা করে আসছি সেই দেবীমূর্তিকে। শুনেছি তারকজেঠু বিশেষ বিশেষ তিথিতে সমস্ত রাত একা সেই মন্দিরে কাটান। মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে তখন। বাড়ির অন্য কারও প্রবেশের অধিকার থাকে না মন্দিরে। মা, ঠাকুরমার কাছে শুনেছি, দুরুদুরু বুকে ঘরের মধ্যে জেগে বসে থেকে সেইসব তিথিতে তাঁরা নানানরকম আওয়াজ শুনতে পেতেন মন্দিরের দিক থেকে। কখনো কখনো মনে হত বাড়ির চারপাশে কারা যেন সব কথা কইছে চাপা গলায়...'

রাতে ঘুম আসছিল না। রিনিও আমাকে আঁকড়ে ধরে শুয়ে ছিল। অরিন্দমের বাড়িটাকেও কিছুতেই আর নিরাপদ ভাবতে পারছিলাম না। আমাদের ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখেছিলাম ভিতর থেকে। তবু মনে হচ্ছিল যে কোনো সময় লোকটা ঢুকে পড়তে পারে ঘরের মধ্যে। মধ্যরাতে একবার মনে হল ঘরের বন্ধ জানালার ওপাশে পাল্লার ওপরে কীসে যেন আঁচড়াচ্ছে। পাল্লায় খটখট করে আওয়াজও হল কিছুক্ষণ। দরজার বাইরে সেই পুতুলটারই মতো কে যেন কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়াল হালকা খুট খুট শব্দে। আমি গলার মালাটাকে চেপে ধরে থাকলাম। রিনিকেও বললাম তাই করতে। এ বিষয়ে এখন আমি নিশ্চিত, এই মালাটাই আপাতত আমাদের রক্ষাকবচ। যিনি সেদিন এগুলো দিয়েছিলেন তাঁর কথা শুনে পুতুলটা কেন যে দিয়ে দিইনি তখন সে কথা ভেবে আফশোস করছিলাম মনে মনে।

রিনি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি ঠিক আছ তো?'

'আছি।'

'আমার তোমার দিকে তাকাতে ভয় করছে।'

'কেন?'

'মনে হচ্ছে তুমি তুমিই তো? নাকি সেই লোকটা...'

আমি রিনিকে নিজের কাছে টেনে নিতে গেলাম। রিনি ছিটকে সরে গেল। আমি জোর করলাম না। ওর মনের অবস্থা বেশ বুঝতে পারছিলাম। বড্ড অসহায় লাগছে নিজেকে। এতদিন বাংলা তিথি ফিথি নিয়ে মাথা ঘামাইনি কক্ষনও। এখন মনে মনে হিসেব করতে লাগলাম, কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী আসতে আর কতদিন বাকি।

জানি না, কী লেখা আছে কপালে। ট্রেনের সেই লোকটার সৌম্য মুখখানা মনে পড়ছিল। মনে মনে বললাম, 'আপনিই একমাত্র বাঁচাতে পারেন আমাদের। কিন্তু আপনাকে তো চিনিই না আমি। কোথায় দেখা পাব আপনার?'

বুঝতে পারছিলাম, মস্ত ভুল করেছি সেদিন। এতটাই উপেক্ষা করেছিলাম তাঁকে যে তাঁর নামটা পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে নিইনি। বিছানায় শুয়ে ঘুম আসছিল না। আমি জানি, রিনিও জেগে আছে। এক মনে আমি সেই অচেনা ত্রাণকারকের সৌম্য মুখের ধ্যান করতে লাগলাম। মনে মনে আকুল হয়ে বলতে লাগলাম, 'আপনি সেদিন বলেছিলেন, এক মনে যদি ডাকি, আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে। প্লিজ, তাই যেন হয়। আপনি নিশ্চিত বুঝতে পারছেন, ভীষণ বিপদ এখন আমাদের। আর এই বিপদ থেকে তারকজেঠু নয়, আমার বিশ্বাস একমাত্র আপনিই বাঁচাতে পারেন আমাদের।'

ভোর হতে না হতেই দরজায় টোকা দিয়েছিল অরিন্দম। বলেছিল, 'যত তাড়াতাড়ি পারিস তৈরি হয়ে নে।'

একদম ভোরের ট্রেনেই আমরা এসে পৌঁচেছি মথুরাপুর। তারকজেঠু সব শুনলেন গম্ভীর মুখ করে। তারপর বললেন, 'সত্যিই খুব বিপদ তোমাদের সুকান্ত। সন্ধের পরে মহেশপুরের বুড়োবটতলা খুবই রহস্যময়। এখনও। সেই ছোট্টবেলা থেকেই এসব কথা শুনে আসছি আমরা।'

'এখন উপায়?' অরিন্দমই জিজ্ঞেস করল তাঁকে আমার হয়ে।

'ভাবছি', বলে পায়চারি করতে শুরু করেছিলেন তারকজেঠু।

এতক্ষণে তারকজেঠু থামলেন। ধীর পায়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে স্থির চোখে আমার দিকে চাইলেন তিনি, 'আচ্ছা সুকান্ত, সেদিন ট্রেনে যিনি তোমাকে মিট করেছিলেন, তাঁর নাম তো জানা হয়নি বললে।'

'আজ্ঞে হ্যাঁ', আমি মাথা নীচু করে বললাম।

'তাঁর চেহারাটা মনে আছে?'

'আছে।'

'পরনে রক্তবস্ত্র ছিল?'

'উঁহু।'

'গলায় কী ছিল, রুদ্রাক্ষ?'

'না। পদ্মবীজ না কী যেন একটা নাম বলেছিলেন।'

'পদ্মবীজ?' তারকজেঠুর ভ্রু কুঁচকে গেল, 'তোমার গলায় পরা মালারই মতো ছিল দানাগুলো?'

'উঁহু। আরও বড় ছিল আর গাঢ় লাল এবং মসৃণ।' আমি বললাম।

'তাঁর হাইট কেমন ছিল?'

'মাঝারি। এমনিতে খুবই আনইম্প্রেসিভ চেহারা। কিন্তু তাঁর চোখদুটো মারাত্মক উজ্জ্বল। তাকিয়ে থাকা যায় না। আর হাসিটা ভারী স্নিগ্ধ। মন ভালো করে দেওয়া হাসি...'

'আর কিছু?'

'বহড়ুতে তিনি ট্রেনের দরজার দিকে এগোলেন। কিন্তু...'

'কিন্তু?'

'আমি তাঁকে নামতে দেখিনি। এমনকী প্ল্যাটফর্মেও তাঁকে দেখতে পাইনি আর। তিনি যেন হঠাৎ করেই হাওয়ার সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন...'

তারকজেঠুর মুখ এমনিতেই গম্ভীর। তা এইবার আরও গম্ভীর হয়ে উঠল, 'সুকান্ত, আমি যা গেস করছি তা যদি সত্যি হয় তাহলে এ বিপদ থেকে বাঁচতে গেলে আমাদের তাঁর শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া বোধহয় উপায় নেই।'

'কিন্তু তাঁকে পাব কোথায় জেঠু?'

'সে সন্ধান তিনিই হয়তো দেবেন আমাদের', বলে এক মুহূর্ত থামলেন তিনি। তারপর বললেন, 'সুকান্ত, সেই পুতুলটার নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারো আমাকে?'

'আমার ফোনে ছবি আছে পুতুলটার', বলেই আমার মোবাইল আনলক করে গ্যালারিতে গিয়ে ছবিটা বের করলাম আমি। তারপর মোবাইলটা বাড়িয়ে দিলাম তারকজেঠুর দিকে। ছবিটা দেখতে দেখতে ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে উঠলেন তিনি। আপন মনে বলে উঠলেন, 'সর্বনাশ, সর্বনাশ।'

আমি, অরিন্দম, রিনি তিন জনেই তাকিয়ে ছিলাম তাঁর মুখের দিকে। তিনি খুব হতাশ ভঙ্গিতে বললেন, 'না বুঝে বড় সর্বনেশে জিনিস নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে তুলেছ সুকান্ত। শুধু তাই নয়, সেই শয়তানের কথার ফাঁদে পড়ে নিজের সর্বসত্তাও দিয়ে ফেলেছ তাকে। রাতের অন্ধকারে যে তোমার কাছে ষোলো আনা চায়, সে যে শুধু অর্থমূল্য চাইছে না, এ সামান্য কথাটুকু তোমার বোঝা উচিত ছিল', তারকজেঠু অসহায় ভঙ্গিতে মাথা দোলালেন, 'তোমাদের বিনাশ আটকানো কঠিন। খুবই কঠিন। যে পুতুলের ছবিটি দেখালে, সেটি তন্ত্রের অতি গুহ্য ক্রিয়ায় ব্যবহৃত একটি যন্ত্র। আপাতভাবে পুতুল মনে হলেও এ যন্ত্রটি আসলে তমোগুণী প্রেতের স্থূল আবরণ। এই আবরণ পূর্ণ চৈতন্যময়। এবং জীবিত। এই পুতুলকে তুমি বিকল্প শরীরও বলতে পারো। অসীম তার শক্তি।'

আমি হাঁ করে তাঁর কথা শুনছিলাম। রিনিও। কয়েকদিন আগেও এইসব আজগুবি কথা শুনলে হেসেই উড়িয়ে দিতাম আমি। কিন্তু আজ আমার তারকজেঠুর কথা শুনে শরীরে যেন ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। তবু নিজেকে সান্ত্বনা দেবার ঢঙেই বললাম আমি, 'যাক আপাতত সে পুতুল থেকে আমরা অনেকখানিই দূরে চলে এসেছি। অন্তত এখানে আমরা নিরাপদ।'

'মোটেই না', তারকজেঠু আমার মুখের কথা প্রায় কেড়ে নিয়েই বললেন, 'বাড়ি থেকে এখানে চলে এসেছ বলে একটুও নিরাপদ ভেব না নিজেদের। সে অতৃপ্ত শক্তি যে কোনো সময় এখানে এসে হাজির হবে। আমার ধারণা, দিনের আলোটুকু নেভার জন্যে অপেক্ষা করছে সে এখন...'

আমার মনে যেটুকু সাহস ছিল, এই কথা শুনে সে সাহসটুকুও দপ করে নিভে গেল। রিনি আমার হাত আঁকড়ে ধরল প্রাণপণে। আমিই কিছুই বুঝতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম তারকজেঠুর দিকে। উদ্ভ্রান্তের মতো জিজ্ঞেস করলাম, 'এখন উপায়?'

'উপায় যে ঠিক কী তা আমিও জানি না সুকান্ত', জেঠু মাথা দু' দিকে নাড়লেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে আদেশ দিলেন, 'আপাতত এই মুহূর্তে পুতুলের ছবিটি মুছে ফেল তোমার ফোন থেকে।'

আমি তাই করলাম। কেন তিনি এমন কথা বলছেন তা জানতেও চাইলাম না একবারও।

তারকজেঠু একবার আকাশের দিকে চাইলেন। কালীমন্দিরের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর বুক খালি করা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'আজ রাত এগারোটা তেতাল্লিশে কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর শুরু। সেই সময় মায়ের মন্দিরে ক্রিয়ায় বসব আমি। তোমরা দুজন সে সময় আমার সঙ্গে থেকো। চেষ্টা করে দেখব, এ বিপদে কতটা সাহায্য করতে পারি তোমাদের।'

রিনির দিকে চেয়ে দেখলাম তার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে আছে। আমার নিজেরও অজানা আশঙ্কায় বুক দুরদুর করছিল। কিন্তু ডুবন্ত মানুষ যেমন খড়কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে, তেমনভাবেই তারকজেঠুর প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে দিলাম। বললাম, 'আপনি যেমনটা বলবেন, তাই হবে। আপনিই এখন আমাদের একমাত্র ভরসা জেঠু। বাঁচালে কেবল আপনিই বাঁচাতে পারেন আমাদের।'

তিনি ম্লান হাসলেন, 'আমার শক্তি সীমিত সুকান্ত। সেই শক্তি সম্বল করে এই বিপদ আটকাতে পারব কিনা জানি না। তবে আমি চেষ্টা করব।'

কৃষ্ণা দশমীর রাত ক্রমশ একাদশী তিথির দিকে ঢলে পড়েছে। নিকষ অন্ধকার রাত আজ যেন বড় বেশিই নিস্তব্ধ। তিনি নির্জন শ্মশানভূমির মাঝখানে একা। অন্ধকার রাত্রির গায়ে জেগে থাকা অসংখ্য নক্ষত্ররাজির দিকে নিষ্পলক চেয়ে আছেন। বিগত কয়েকদিন যাবৎ যা ঘটে চলেছে এবং যা ঘটতে চলেছে নিকট ভবিষ্যতে, তার সমস্তটাই গোচরে রয়েছে তাঁর। সেই কোন সুদূর অতীত থেকে বর্তমানের এই যে কালখণ্ড, তার প্রতিটি পল, প্রতিটি দণ্ডই তাঁর দৃষ্টিপথের অধীন। অসীম সাধনশক্তিতে অনন্ত আগামীকেও চাইলে জানতে পারেন তন্ত্রাচার্য রামসাঁতাল। আজ এই রাত্রে সেই অর্জিত জ্ঞানের জন্যে আফসোস হচ্ছে তাঁর। মনে হচ্ছে অতিরিক্ত দেখা আর অতিরিক্ত জানার ভার বইতে বইতে তিনি আজ ক্লান্ত। দীর্ঘ জীবনের অন্তে এইবার কিছুকাল তাঁর একান্ত বিশ্রামের প্রয়োজন। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সাধক। নিজের মনে মনেই উচ্চারণ করলেন, আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো অত্যল্প আয়ু আর ক্ষণিকের স্মৃতি নিয়ে পৃথিবীতে দেহধারণ করাই বোধহয় স্বস্তিদায়ক। তিনি আত্মতত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী। সুখ, দুঃখ, জীবন, মৃত্যু, কোনো কিছুই তাঁর মনে ছায়াপাত করবে না এই স্বাভাবিক। তবু আজ মনের গভীরে কেমন যেন বেদনা বাজছে। মানব শরীর ধারণ করে থাকার এই বোধহয় রীতি। দেহ, মনের নিজস্ব ধর্মকে সম্পূর্ণ অতিক্রম করা যায় না। তাছাড়া দিবাকর তাঁর শিষ্য। শিষ্য তো সন্তানেরই সমতুল। তার প্রতি স্নেহ থাকার মধ্যে তাই অন্যায় নেই। কিন্তু দিবাকরের প্রতি তাঁর গভীর স্নেহ কি খানিক অন্ধ স্নেহ ছিল না? তা না হলে সে সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয় জেনেও সেই মহাশক্তি অর্জনের ক্রিয়া কেন দিতে গিয়েছিলেন তাকে? তিনি তো জানতেন, প্রথম রিপুর ওপরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না এলে সে ক্রিয়ায় সিদ্ধিলাভ করা অসম্ভব। তবে? তবে?

আত্মবিশ্লেষণ করতে গিয়ে চমকে উঠলেন রামসাঁতাল। তিনি নিজেই কি পূর্ণশুদ্ধচিত্ত ছিলেন সেই বিপর্যয়ের দিনটিতে? ঘন ঘন দু'দিকে মাথা নাড়াতে লাগলেন তিনি। এ কথা ঠিক, দিবাকর ওই গুহ্যবিদ্যা লাভের জন্যে নিরন্তর প্রার্থনা করেছে তাঁর কাছে। তবু চাইলে তিনি তাকে নিরস্ত করতে পারতেন। তীব্র তিরস্কারও করতে পারতেন তাকে। তিনি ইচ্ছে করেই সেদিন তা করেননি। দিবাকরের মনের মধ্যে গুরুকে অতিক্রম করে যাওয়ার যে অন্যায় বাসনা এবং নারীসঙ্গের জন্যে তীব্র কামনার ছায়া ভেসে উঠেছিল, তা স্পষ্টতই তাঁকে বিরক্ত এবং ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল। মনে মনে আসলে তিনি শাস্তি দিতেই চেয়েছিলেন দিবাকরকে। বোঝেননি সেই শাস্তির ফলস্বরূপ সময়ের ভিন্নতর স্রোতে, ভিন্ন দেহে পৌঁছেও এক নারী এমনভাবে বিপন্ন হতে পারে কোনো দিন। তার এই যে বিপন্নতা, সে দায় কিছুতেই তো এড়াতে পারেন না তিনি। তাকে রক্ষা করার জন্য যে পথটি খোলা আছে এখন, সে পথ তাঁর প্রিয় শিষ্যকে আর কখনও তার পুরোনো শরীরটিকে আশ্রয় করে জড়জীবনে ফিরতে দেবে না, তিনি জানেন। তবু কঠিন সেই সিদ্ধান্তকেই ঈশ্বরেচ্ছা ভেবে নিলেন আচার্য রামসাঁতাল। চোখ বন্ধ করলেন তিনি। জ্ঞাননেত্র প্রসারিত করলেন। দেখতে পেলেন, তারকমোহন ক্রিয়ায় বসেছেন ইষ্টদেবীর সম্মখে। সঙ্গে সেই দম্পতি। রামসাঁতাল জানেন, দিবাকরকে প্রতিহত করা ওই মানুষটির শক্তি ও সামর্থ্যের বাইরে। সময় ফুরিয়ে আসছে। ছেলেটি এবং মেয়েটির চরম সর্বনাশ আসন্ন। যা করার, এখনই করা দরকার। আর তা করতে পারেন একমাত্র তিনিই। দ্রুত মনস্থির করে ফেললেন রামসাঁতাল।

রামসাঁতাল ধীর পায়ে শ্মশানের অপর প্রান্তে পৌঁছলেন। সেই ঘটনার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। পৃথিবী বদলে গেছে অনেকখানি। এই শ্মশানভূমিও আগের মতো নেই। অনেক ভাঙা গড়া পেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়েছে এ স্থল। আগের সে ভয়াবহতা নেই। লোক চলাচল বেড়েছে। আলো বাতির আধিক্যও বেড়েছে ইদানীং। তবু পুরোনো নিদর্শনগুলি রয়ে গেছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সন্ধানী ও অভিজ্ঞ চোখ সঠিক চিহ্নগুলিকে ঠিক খুঁজে পেয়ে যায় একটু চেষ্টা করলেই। কাজেই সাধক রামসাঁতালের নির্দিষ্ট সেই সমাধিভূমি খুঁজে বের করতে অসুবিধা হল না একটুও।

চিহ্নিত জায়গাটিতে এসে থামলেন রামসাঁতাল। এ স্থলটিকে বরাবরই বেঁধে রেখেছেন তিনি মন্ত্রতরঙ্গের সাহায্যে। এ সমাধিক্ষেত্র তাই এতকাল ধরে সাধারণের অগম্যই থেকে গেছে। তিনি জানতেন, সে রাত্রে যে মায়ার বন্ধনে নিজেকে জড়িয়েছে দিবাকর, সে বন্ধন থেকে তার মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। রমনের স্পৃহা পাগলের মতো ছুটিয়ে বেড়াবে তাকে এই নারীর সন্ধানে। আর যতই এই মায়াশরীর ভোগ করার জন্য নেশাগ্রস্ত হবে সে, ততই আরও, আরও পতন হবে তার। দিবাকরের জন্যে করুণায় আর্দ্র হয়ে গেল গুরু রামসাঁতালের হৃদয়। হতভাগ্য দিবাকর জানতেও পারল না, নারীসহবাসকালে শুক্রবহির্গমন সময়ে যে সুখ, তদপেক্ষা কোটি কোটি গুণ সুখানুভূতি অপেক্ষা করে ছিল তার জন্যে। প্রথম রিপু থেকে মুক্ত হয়ে সে যদি ক্রিয়া সম্পূর্ণ করার কাজে প্রয়াস পেত, আপন জিহ্বাগ্র দ্বারা তালুকুহর রোধ করতে পারত সঠিক প্রক্রিয়ায়, তাহলেই শিব এবং শক্তির শৃঙ্গাররসপূর্ণ বিহার থেকে উৎপন্ন কুলামৃত আস্বাদনের সুযোগ পেত দিবাকর। দেহমধ্যস্থ কুণ্ডলিনীকে বারংবার সে সুধারস পান করিয়ে পুনর্বার কুলস্থানে আনা, এই প্রক্রিয়া রপ্ত করা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। ব্যস, তারপরেই জন্ম-মৃত্যুর আবর্ত থেকে চিরকালের মতো মুক্ত হয়ে যেত দিবাকর। অথচ সে পারল না। পূর্বজন্মের সংস্কার তাকে পিছনে টেনে নিয়ে গেল।

শিষ্যকে বাঁচাতেই সে নারীর প্রেতশরীরকে সে রাতেই মুক্তি দিয়েছিলেন তিনি। জন্ম-মৃত্যুর সদা ঘূর্ণায়মান চক্রে নিক্ষেপ করেছিলেন তাকে। নব নব জন্মে সুকর্ম দ্বারা শুক্ল প্রারব্ধ সঞ্চয়ের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তার সামনে। ভেবেছিলেন কখনও যদি যন্ত্র থেকে বেরিয়ে ছায়াশরীর নিয়ে এই জগতের সামনে এসে দাঁড়ায়ও দিবাকর, ভিন্ন শরীরে থাকলে সে রমণীকে চেনা সম্ভব হবে না তার পক্ষে। দিবাকরের অন্নময় শরীরও যথাসম্ভব নিরাপদ স্থানে রক্ষা করেছিলেন তিনি। আশা ছিল, একদিন সে শরীরের পুনঃসংস্কার করবেন তিনি। অভিশাপগ্রস্ত শিষ্যকে মুক্তি দিয়ে ফিরিয়ে দেবেন তার জড়শরীর। নতুন করে সাধনায় বসাবেন তাকে আবার পূর্বশরীরেই। পূর্বসাধনার নিরবচ্ছিন্ন ধারাটিকে বজায় রেখে। নারীশরীর যে শুধু সম্ভোগের নয়, তা যে প্রকৃতপক্ষে পূজনীয়, এই সত্যে সে তখন পৌঁছবেই, এই আশাই করেছিলেন তিনি। সাবধানতাস্বরূপ নবজন্মের চক্রে ফিরিয়ে দেবার সময় সে নারীর পূর্বচৈতন্য এখানেই সযত্নে রক্ষা করেছেন তিনি এতকাল। ভেবেছিলেন, যে জীবন থেকে তাকে মুক্তি দিয়েছেন, সে জীবনের স্মৃতি ও সাধনা আড়ালে থাকাই নিরাপদ তার এবং দিবাকর দুজনের পক্ষেই। কিন্তু ঈশ্বরের অভিপ্রায় বোঝা তাঁর পক্ষেও দুরূহ। তা নইলে এই এতকাল পরে দিবাকর সেই বটবৃক্ষের গুপ্ত আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পূর্ণিমা রাতে ঠিক ওই নারীর স্বামীর সন্ধান পায় কী করে? আর সেই মূঢ় ব্যক্তিটি নিজের সর্বস্বত্ব বিনা শর্তে দিবাকরের কাছে সঁপে দিয়ে তাকে স্বগৃহে বহন করেই বা আনে কেন! এ তো কেবল কাকতালীয় ঘটনা নয়। দৈবনির্ঘণ্ট ছাড়া এ যোগাযোগ কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না।

শ্মশানের এই প্রান্তটি প্রায় পরিত্যক্ত। বহু প্রাচীন কিছু সমাধিফলক আগাছার ভিড়ে হারিয়েই গেছে প্রায়। আশেপাশে বিষধর সাপেদের আস্তানা। তাদের থেকে অবশ্য কোনো ক্ষতির আশঙ্কা নেই গুরু রামসাঁতালের। নিঃশঙ্কচিত্তে এক অতি প্রাচীন সমাধির সামনে মাটির ওপরে বসলেন তিনি। কৃষ্ণতিল আর শ্বেত সর্ষপ বৃত্তাকারে ছড়িয়ে দিলেন নিজের চতুস্পার্শে। তারপর ডান হাত সম্মুখে প্রসারিত করে জলদগম্ভীর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগলেন অদ্ভুত এক সুরে। দূরে কোথাও শেয়ালেরা ভয়ার্ত স্বরে চিৎকার করে উঠল। উঁচু গাছের ডালে মাথা নীচু করে ঝুলে এই অদ্ভুত দৃশ্য চুপ করে দেখছিল এক ঝাঁক বাদুড়। হঠাৎই তারা একসঙ্গে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে গাছ থেকে উড়ে এসে রামসাঁতালের মাথার ওপরে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করল। এই রাতেও কর্কশ কণ্ঠে কাক ডেকে উঠল। রামসাঁতাল শিউরে উঠলেন। সর্বনাশের আর বুঝি দেরি নেই।

রামসাঁতাল দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করেই ছিলেন। এইবার বামহস্তও চিৎ করে সম্মুখে প্রসারিত করলেন। মেঘমন্দ্র স্বরে ডেকে উঠলেন, 'মা, মাগো মা আমার, এইবার ঘুম থেকে জেগে ওঠো মা। পূর্ণশক্তিতে জেগে উঠে তোমার উত্তরশরীরকে রক্ষা করো তুমি...'

প্রাচীন সমাধিমধ্যে আলোড়ন উঠল। ঘূর্ণি বাতাস লাফিয়ে এসে নেচে বেড়াতে শুরু করল সমাধির ওপরে। সমাধির ওপরে থাকা মাটি, গাছপালা সেই ঝোড়ো হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল ডান দিক, বাঁ দিক...

রামসাঁতাল বলেই চলেছেন, 'মা আমার, এসো, এসো, এসো—'

'চড়াক' করে আওয়াজ হল একটা। সমাধির ওপরের আবরণ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। সেই ফাটল দিয়ে বহুদিন ধরে পাতালে বন্দি থাকা আশ্চর্য এক আলোর রেখা লাফিয়ে বেরিয়ে এল বাইরের পৃথিবীতে। সেই আলো রামসাঁতালের সামনে পাক খেতে খেতে ক্রমশ জমাট বাঁধতে লাগল। প্রথমে আবছা, স্বচ্ছ এক অবয়ব তৈরি করল সেই পুঞ্জীভূত আলোকণিকা। তারপর সেই ছায়াশরীর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে পরমাসুন্দরী এক নগ্ন নারীমূর্তিতে রূপান্তরিত হল।

সেই নারী দু-হাত বাড়িয়ে রামসাঁতালকে আহ্বান জানাল, 'আমার এত বছরের ঘুম ভাঙিয়েছ যখন, এসো আমাকে তৃপ্ত করো। আলিঙ্গন করো আমাকে...'

রামসাঁতাল মৃদু হাসলেন, 'এ জীবনে পরীক্ষা কি শেষ হবে না মা?'

নারী অট্টাহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই ভয়ানক হাসির দমকে তার সারা শরীর দুলতে শুরু করল। নারীর মাথার চুল উড়তে লাগল আকাশে। উড়তে উড়তে কালো মেঘের মতো সমস্ত আকাশ ছেয়ে ফেলতে লাগল। দুই স্তন ক্রমশ শিথিল হয়ে এমন ভাবে দুলতে লাগল যেন খসে পড়বে শরীর থেকে। সুন্দরী ক্রমশ লোলচর্ম, শুষ্ক অস্থিযুক্ত ভয়ংকরীতে পরিণত হলেন। রামসাঁতাল তখনও অচঞ্চল। স্থির।

রিপুজয়ী রামসাঁতাল আসনে বসলেন। নিজের শরীরকে বস্ত্রমুক্ত করলেন প্রথমে। তারপর অবিচলিত ও শুদ্ধচিত্তে রক্তপুষ্প ও বিশেষ উপচারে তাঁর পুজো সম্পন্ন করলেন ভক্তিভরে।

ভয়ংকরী তুষ্ট হলেন। তাঁর শরীরের নারীচিহ্নগুলি ক্রমশ অপ্রকট হল।

রামসাঁতাল তাঁকে প্রণাম করে পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লেন। সেই দেবীর স্তবপাঠ সমাপ্ত করে করজোড়ে প্রার্থনা জানালেন, 'মা, আমার শিষ্য দিবাকরের জড়শরীর আজ গ্রহণ করো তুমি। এ শরীর দীর্ঘদিন রক্ষা করেছিলাম আমি। কিন্তু প্রথম রিপুর কাছে আবারও আত্মসমর্পণ করেছে সে। এ শরীরে ভবিষ্যতে আর তার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এইবার তাকে আমি মুক্তি দিতে চাই। এ জন্মের সাধনা হারিয়ে নতুন জন্মে আবার শুরু করুক সে প্রথম থেকে। আমি তার সেই নবজন্মের অপেক্ষায় থাকব। গুরু হিসেবে তার সঙ্গে আমার যে জন্ম জন্মান্তরের বাঁধন তাকে অস্বীকার করব না আমি, কথা দিচ্ছি। নতুন করে তাকে আবার গড়ে নেবার চেষ্টা করব আমি অন্য কোনো কালখণ্ডে।'

রামসাঁতালের কথা শেষ হওয়ামাত্র ভিন্ন তরঙ্গপ্রবাহে সংরক্ষিত দিবাকরের অন্নগত জড়শরীরটি প্রকট হল সেই শ্মশানভূমিতে।

শ্মশানমধ্যে দ্রুত একটি চিতা প্রস্তুত করলেন রামসাঁতাল। মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে সাতবার প্রদক্ষিণ করলেন সেই চিতাটিকে। দু-হাতে দিবাকরের শরীর তুলে নিয়ে উপুড় করে শুইয়ে দিলেন চিতার ওপরে। তারপর সেই উজ্জ্বল দেবীমূর্তির দিকে চেয়ে দু-হাত জোড় করে বললেন, 'এসো। গ্রহণ করো।'

নারী শরীর ক্রমশ রক্তবর্ণ ধারণ করল। সেই রক্তবর্ণ থেকে তৈরি হল দাউ দাউ আগুন। রামসাঁতাল সজ্জিত চিতা থেকে একটি কাষ্ঠখণ্ড টেনে নিয়ে সেই কাষ্ঠখণ্ডের সাহায্যে শ্মশানের নৈর্ঋত কোণে ষড়ভুজাকৃতি যন্ত্র নির্মাণ করলেন। যন্ত্রের মধ্যস্থলে আঁকলেন ষোড়ষদলযুক্ত পদ্ম। পদ্মের প্রতিটি পাপড়িতে কুশাগ্র দিয়ে একাক্ষর মন্ত্র লিখে সেই মন্ত্রকে পুজো করলেন অতসী পুষ্প এবং রক্ত চন্দন দিয়ে। বেলকাঁটা দিয়ে নিজের বুক চিরে উষ্ণ রক্ত দিয়ে আহুতি প্রদান করলেন সেই পদ্মদলের ওপরে। অনন্তর সেই যন্ত্রের ওপরে অগ্নিরূপিণী দেবীকে আবাহন করে সেই অগ্নিতেই গুহ্যমন্ত্রে দেবীর হোম সমাপন করলেন তিনি।

এ পর্যন্ত নির্বিঘ্নেই ক্রিয়া সম্পন্ন করলেন রামসাঁতাল। আকাশের দিকে মুখ তুলে রাত্রির নক্ষত্ররাজির দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন যোগী। ক্রমশ মুখমণ্ডল গম্ভীর হয়ে উঠল তাঁর। আর সময় নেই। শেষ কাজটুকু এই মুহূর্তে সমাধা হওয়া চাই। ওই ক্ষুধার্ত অগ্নিকে সন্তুষ্ট করার শেষ উপচার হাতের নাগালেই। এইবার সঠিক মন্ত্রে সেই উপচার নিবেদন করা চাই। যজ্ঞবেদি থেকে অগ্নিকে আবাহন করে চিতায় নিক্ষেপ করলেন রামসাঁতাল। নিস্তব্ধ শ্মশানভূমিতে মুহূর্তের মধ্যে যেন ঝড় বয়ে গেল। ভয়ংকর গণের দল টলতে টলতে এসে দাঁড়াল চিতার সম্মুখে। অশরীরী শ্মশানরক্ষীরা তাদের বিকট চেহারা নিয়ে মহোল্লাসে নেচে নেচে বেড়াতে আরম্ভ করল প্রজ্জ্বলিত চিতাটিকে ঘিরে ঘিরে।

রামসাঁতাল দক্ষিণহস্ত ঊর্ধ্বে প্রসারিত করে বললেন, 'স্বস্তি, স্বস্তি, স্বস্তি। হে আমার প্রিয়, তোমার এই ভ্রষ্ট, কামক্লিষ্ট, দাস শরীর পবিত্র অগ্নি গ্রাস করুক আজ...'

সেই মুহূর্তেই হাহাকারের মতো একটা শব্দ উঠল শ্মশানজুড়ে, 'না, না, না...'

গাঢ় লাল বস্ত্র, কপালে রক্ততিলক, গলায় রুদ্রাক্ষমালিকা— তারকজেঠুকে কেমন যেন অচেনা লাগছিল আমার। কালীমন্দিরে একটাই তেলের প্রদীপ জ্বলছে আজ। সেই ফ্যাকাসে আলোয় লোলজিহ্বা মুণ্ডমালিনী দেবীমূর্তিকে আরও ভয়ংকর লাগছে। আমার গা ছমছম করছিল। মাত্র কয়েকদিন আগেই ভূত-প্রেত-ভগবান কিছুতেই বিশ্বাস করতাম না। ভর দুপুরই হোক কী মাঝরাত্তির, যে কোনো জায়গায় একলা চলে যেতে একটুও বুক কাঁপত না আমার। অথচ সেই আমিই মনে মনে কেমন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে আছি এখন। রিনির দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার অবস্থাও তথৈবচ। অরিন্দম আমাদের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল। তারকজেঠু রাজি হলেন না কিছুতেই।

আমি নিজেও আমতা আমতা করে বলেছিলাম, 'জেঠু, অরিন্দম থাকুকই না আমাদের সঙ্গে। ও সঙ্গে থাকলে আমরা একটু ভরসা পেতাম...'

তারকজেঠু রীতিমতো ধমক দিয়ে উঠেছিলেন, 'আমরা কি পিকনিক করতে যাচ্ছি নাকি যে বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে নিয়ে গিয়ে বসতে হবে? দেখ সুকান্ত, যে কারণে আজ আমরা ক্রিয়ায় বসব তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমি নিজেই জানি না, কী বিপদ অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্যে। সামান্য ভুলচুক হলে তোমার, বউমার এমনকী আমারও প্রাণসংশয় হতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। এটা ছেলেমানুষি করার ক্ষেত্র নয়।'

আমি মনে মনে সংকুচিত হয়ে গিয়েছিলাম একেবারে।

গ্রামাঞ্চলের রাত্রি আমাদের শহুরে এলাকার মতো নয়। এখানে রাত আরও অন্ধকার, আরও রহস্যময়ী। বড় রাস্তায় বিজলি বাতি আছে ঠিকই, কিন্তু গ্রামের ভিতর দিকে এখনও মানুষের তৈরি কৃত্রিম আলো প্রকৃতির অন্ধকারকে ঢাকতে পারে না। অরিন্দমদের পৈতৃক বাড়িটি মূল রাস্তা থেকে খানিক ভিতরে। বাড়ির চারদিকেই গাছপালা বাগান থাকায় দূর রাস্তার আলো এসে পৌঁছয় না এখানে। বাড়ির আলো আজ নেভানো। জেঠুর তেমনটাই নির্দেশ। আমরা তিনজন ছাড়া বাকি সক্কলে ঘরের মধ্যে, রুদ্ধদ্বার। তাদের দরজা খুলে বাইরে বেরোতে মানা।

তারকজেঠু আসনে বসেছেন একটু আগে। আজ বিশেষ পূজার উপকরণ নিজে হাতে জোগাড় করেছেন তিনি সারাদিন ধরে ঘুরে ঘুরে। সকাল থেকে নিরম্বু উপবাসে আছেন মানুষটি, তবু তাঁকে দেখে ক্লান্ত মনে হল না একটুও। ডান হাতের অনামিকা দিয়ে তাঁর বাঁ পাশে দুটি বৃত্ত আঁকলেন তিনি। ধীরে ধীরে তিনবার ফুঁ দিলেন সেই বৃত্তের ওপরে। মুখ নীচু করে বৃত্তদুটির ওপরে ঝুঁকে পড়ে কী সব বললেন বিড়বিড় করে। তারপর আমাদের সেই বৃত্তদুটির ওপরে বসতে বললেন হাতের ইশারায়। আমরা স্থির হয়ে বসে পড়লাম। হাতের আঁজলায় খানিক মন্ত্রপূত জল নিয়ে তিনি ছিটিয়ে দিলেন আমাদের মাথায়, গায়ে। গম্ভীর স্বরে বললেন, 'চোখের সামনে যাই ঘটুক, কিছুতেই উঠে পড়বে না আসন ছেড়ে। মনে থাকবে?'

আমরা দুজনেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম।

তিনি বৈদিক আচমন করে দেহশুদ্ধি করলেন। শিরদাঁড়া সোজা করে বসে দেবীমূর্তির দিকে চেয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর মন্দ্র কণ্ঠে 'ওঁ হ্রীঁ খ্রীঁ হ্রীঁ ছ্রীঁ হ্রীঁ ঠ্রীঁ ফ্রীঁ হ্রীঁ' মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে রক্তপুষ্পের মালা পরালেন দেবীর গলায়। তারপর তামার যজ্ঞকুণ্ডে হোমাগ্নি প্রস্তুত করে রক্তকরবী ফুলের সঙ্গে ঘি এবং মধু মিশিয়ে হোম করতে আরম্ভ করলেন।

ঘরে ধূপ ধুনো জ্বলছিল আগে থেকেই। সেই গন্ধের সঙ্গে হোমের গন্ধ মিলেমিশে গিয়ে আমাদের ঘিরে ধরছিল। সেই অদ্ভুত গন্ধে আমার কেমন যেন ঘোর লেগে যাচ্ছিল। প্রদীপের ক্ষীণ আলো ক্ষীণতর হচ্ছে তখন ধোঁয়ার আবরণের আড়ালে পড়ে গিয়ে। তারকজেঠু অদ্ভুত এক সুরে কী সব অজানা মন্ত্র উচ্চারণ করে যাচ্ছেন একটানা আর মাঝেমধ্যেই হোমের আগুনে গুঁড়ো করা ধুনোর মতো কী একটা ছুঁড়ে মারছেন। হঠাৎ যজ্ঞকুণ্ডের মধ্যে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকা আগুন দপ করে লাফিয়ে উঠল।

তারকজেঠু মন্ত্রোচ্চারণ বন্ধ করলেন। সেই প্রজ্জ্বলিত অগ্নির দিকে স্থির চোখে চেয়ে রইলেন একটুক্ষণ। তারপর থেমে থেমে বলে উঠলেন, 'এসেছ তুমি?'

কোনো উত্তর পাওয়া গেল না অপর দিক থেকে। আগুনের দপদপানির শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই ঘরে। আমি নিজের বুকের ধুক ধুক আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। পাশে বসা রিনির নিশ্বাসের শব্দও কানে আসছে আমার।

তারক জেঠু আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি এলে? যদি এসেই থাকো তাহলে সংকেত দাও আমাদের।'

নীরব রাত্রি বয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তকে যেন ঘণ্টা মনে হচ্ছে আমার। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম রিনি একবার হাত মুঠো করছে, পরক্ষণেই সে মুঠো খুলে ফেলছে আবার। তার এই আচরণ আমি চিনি। ভয় আর উদবেগ চেপে রাখতে পারছে না রিনি।

তারকজেঠু চিৎকার করে উঠলেন, 'কে তুমি? আমার আদেশকে গ্রাহ্যই করছ না যে! তুমি কি জানো না, চাইলেই তোমাকে আমার দাস বানিয়ে রাখতে পারি আমি?'

তারকজেঠুর কথা শেষ হওয়ামাত্রই মন্দিরের বাইরে যেন তাণ্ডব শুরু হল এইবার। আকাশে একটুও মেঘ ছিল না আমরা ঘরে ঢোকার আগে। অথচ বাইরে আকাশে গুড় গুড় করে মেঘ ডেকে উঠল। তারপরেই শন শন শব্দে ছুটে এল হু হু হাওয়া। সেই হাওয়ার তাণ্ডবে কালীঘরের দরজা জানালা সব কাঁপতে লাগল। হঠাৎই জানালার একটা কপাট হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। সেই খোলা জানালা দিয়ে ঝড়ের এক ঝাপটা এসে ঘরের মধ্যে জ্বলতে থাকা প্রদীপটাকে যেন এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিল।

এই গভীর রাত্রে কিছুতেই এমন হবার কথা নয়, তবু এক দঙ্গল কালো কুচকুচে কাক ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে বিশ্রী কা কা শব্দে ডেকে উঠল জানালার গরাদের বাইরে। এক ঝাঁক চামচিকে খোলা জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে ফর ফর করে উড়ছিল। তারকজেঠু বিহ্বল চোখে দেখছিলেন সবকিছু। হোমের আগুনের লালচে আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখে। অসহায় ভয়ার্ত কণ্ঠে তিনি বিড়বিড় করে উঠলেন, 'মা, এ কী হল? এমন তো হবার কথা ছিল না? আমার ক্রিয়ায় কি তবে ত্রুটি ছিল?'

তারকজেঠু আরও কী সব বলছিলেন, কিন্তু সেসব কথা আমার কানে ঢুকছিল না আর। কালীঘরের দরজার বাইরের বারান্দায় আমি তখন অন্য একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি। এই শব্দও আমার চেনা। ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল। রিনির দিকে ফিরলাম। দেখলাম সেও উৎকর্ণ হয়ে সেই একই শব্দ শুনছে ভয়ার্ত মুখে। আমি তার দিকে চাইতেই ফ্যাসফেসে গলায় বলে উঠল রিনি, 'সুকান্ত শুনতে পাচ্ছ?'

'পাচ্ছি', বললাম আমি ফিসফিস করে।

'ও পৌঁছে গেছে এখানে।'

'হুঁ।'

'কী হবে এখন?'

'জানি না।'

'চলো পালিয়ে যাই', রিনি কেঁদেই ফেলল।

'কোথায় পালাবে রিনি?' আমি হতাশ হয়ে বললাম, 'বাইরে ঝড় উঠেছে। তাছাড়া এ কথা তো বুঝতেই পারছ, পৃথিবীর যেখানে গিয়েই লুকোই না আমরা, অভিশপ্ত পুতুলটা ঠিক খুঁজে বের করে ফেলবে আমাদের...'

তারকজেঠু আমাদের দিকে চাইলেন। মেঘের গর্জনের মতো হুংকার দিয়ে উঠলেন, 'নিজেদের বৃত্তের বাইরে বেরোবে না। যাই ঘটুক, মাথা ঠান্ডা রাখো আর মনে মনে তাঁকে স্মরণ করো। আমার স্থির বিশ্বাস, আমি যা ভেবেছিলাম, তাই সত্যি।' স্বয়ং সিদ্ধাচার্য বাবা রামসাঁতালই অভয় দিয়েছিলেন সেদিন তোমাকে ট্রেনের কামরায়...'

'রামসাঁতাল?' অবাক হয়ে আমি বলি, 'তাঁর নাম সেদিন মহেশপুরের মেলায় যাওয়ার সময় টোটো চালক বিশুও বলেছিল। কিন্তু তিনি কি...'

'সংশয় প্রকাশ কোরো না সুকান্ত', তারকজেঠু ধমকে উঠলেন, 'তাঁর শক্তি অনন্ত। তাঁর সাহায্য ছাড়া এ মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আমি আমার শিক্ষা সাধনা অনুযায়ী যতটুকু ঠেকানো যায়...'

তারকজেঠুর কথা শেষ হল না। কালীঘরের বন্ধ দরজার শালকাঠের খিলটা আপনা থেকেই খুলে গিয়ে ছিটকে পড়ল বিকট শব্দ করে। দরজাদুটো এক ধাক্কায় বাইরে থেকে হাট করে খুলে দিল কে। তারপরেই সেই খোলা দরজা দিয়ে দুলতে দুলতে খুট খুট খুট খুট শব্দে ঘরে ঢুকে পড়ল পুতুলটা। তারপর খুবই নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে ঘরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল হোমকুণ্ডের অপর প্রান্তে। হোমকুণ্ড থেকে একটা কাঠ টেনে নিয়ে আবার প্রদীপের আলো জ্বালিয়েছেন ততক্ষণে তারকজেঠু। পুতুলটা ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়তেই বাইরে ঝোড়ো হাওয়ার তীব্র শনশন আওয়াজ থেমে গেল। আচমকাই শব্দহীন হয়ে সমস্ত প্রকৃতি যেন থম থম করতে লাগল আবার। তারকজেঠু খানিক থতমত খাওয়া গলায় বললেন, 'আমার মন্ত্র কেটে কী করে ঢুকলি এখানে শয়তান?'

পুতুলটা গা দুলিয়ে হা হা হা হা করে বিকট অট্টহাসি হেসে উঠল। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে উঠল, 'মন্ত্রের অহংকার? গুপ্তবিদ্যার কিছুই তো আয়ত্ত হয়নি সারাজীবনে? তাই দিয়ে তুই আটকাবি আমাকে?' পুতুলটার শরীরের মধ্যে থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে প্রায় ছাদ পর্যন্ত পৌঁছল। তারপর সেই ধোঁয়া পুঞ্জীভূত হয়ে তৈরি করল এক পুরুষ শরীর। ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত তার। পরনে কটিবস্ত্র। ক্ষয়াটে চেহারায় অসম্ভব উজ্জ্বল দুই চোখ। সেই আগুনে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। এই শরীর আমি চিনি। সেই লোকটা। ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম আমি।

তারকজেঠু হোমকুণ্ড থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠ টেনে নিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, 'কে তুই?'

লোকটা আবার হেসে উঠল, 'তোমার সব মন্ত্র মুহূর্তে কেটে ফেলতে পারি। এমনকী এই মুহূর্তে তোমাকে আমার বশীভূত করে আমার দাস বানিয়ে ফেলতে পারি। তুমি আমার শক্তি জানো না। আমি তন্ত্রাচার্য রামসাঁতালের শিষ্য দিবাকর...'

'আপনিই সেই?' তারকজেঠুর দু-চোখ বিস্ফারিত, বাপ-পিতামহর মুখে এক অদ্ভুত কাহিনি শুনেছিলাম...'

'হ্যাঁ, আমিই', দিবাকরের চোখে আগুন জ্বলে উঠল, 'দীর্ঘকাল ওই পুতুলের মধ্যে বন্দি থেকে সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছি আমি। একটা শরীর। মানুষের শরীর। কিন্তু নিজে থেকে কেউ আমাকে তার সর্বস্বত্ব দান না করলে সে শরীরে অধিকার পাওয়ার উপায় ছিল না আমার। এই ব্যক্তি আমাকে তার ষোলো আনা দিয়ে সেই অধিকার দিয়েছিল।'

'কিন্তু আপনি ছল করেছিলেন আমার সঙ্গে', চিৎকার করে উঠি আমি, 'আপনি পুতুলের দাম হিসেবে...'

'ছল! কীসের ছল?' চিৎকার করে উঠল সে, 'আমার নিজের নারীকে তুই ভোগ করছিস স্ত্রী হিসেবে। তোর অপরাধের শাস্তি এখনও দিইনি এই তোর সৌভাগ্য।'

'কী বাজে কথা বলছেন আপনি?' রিনি বলে উঠল, 'আমি আপনাকে চিনিই না। দেখিইনি কোনোদিন। আপনি শুধু শয়তান নন, অত্যন্ত নোংরা এবং কদর্য...'

'খবরদার', হুংকার দিয়ে উঠল সে, 'আমার ব্রহ্মচর্য হরণ করেছিলে তুমি। তুমিই আমাকে নারীশরীরের স্বাদ দিয়েছিলে লোভ দেখিয়ে। তারপর রমনক্লান্ত আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছিলে সে রাত্রে। আর সেই অপরাধেই আমার গুরু...'

আমার মাথার মধ্যে সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। একবার রিনি আর একবার সেই লোকটার দিকে তাকাচ্ছিলাম আমি। তারকজেঠুও হতভম্ব।

লোকটা হঠাৎই দু-হাত বাড়িয়ে তার দশ আঙুলে অদ্ভুত কিছু মুদ্রা সৃষ্টি করল হোমকুণ্ডের আগুন আড়াল করে। তারপর বলল, ওই মালা আর তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না। ও মালা আজই, এই যজ্ঞকুণ্ডে বিসর্জন দেব আমি।'

'কিছুতেই না' আমি আমার গলার মালাটাকে সর্বশক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে ট্রেনের সেই মানুষটির উদ্দেশে আকুল প্রার্থনা জানাতে শুরু করলাম। এক মনে বলতে শুরু করলাম, 'আপনি কে আমি জানি না। হয়তো আপনি সত্যিই সেই মহাশক্তিধর। অতীত থেকে উঠে এসেছিলেন আমাকে সাহায্য করতে। হে শক্তিমান, আজ এই চরম বিপদে আপনি আমাদের রক্ষা করুন...'

'অনেক সহ্য করেছি। আর নয়। মারণবিদ্যা প্রয়োগ করে তোকে আজই সংহার করব আমি', লোকটা জ্বলন্ত হোমকুণ্ডের মধ্যে হাত ঢুকিয়েই খানিক ছাই তুলে নিয়ে মন্ত্র পড়তে শুরু করল আমার দিকে চেয়ে। মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগল আমার। হাত পা অবশ হয়ে আসতে লাগল। আর ঠিক তখনই কালীঘরের মধ্যে এক শুভ্র জ্যোতির্মণ্ডল জেগে উঠল। অদ্ভুত সেই জ্যোতি। কোটি সূর্যের মতো দীপ্ত অথচ স্নিগ্ধ সেই আলো। আর সেই আলোকছটার মধ্যেই হঠাৎ ভেসে উঠল সেই সৌম্যমূর্তি। আপ লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালের কামরায় বসে যিনি অভয় দিয়েছিলেন আমাকে, মন থেকে তাঁকে ডাকলে দেখা তাঁর সঙ্গে আমার হবেই। আমি অবাক চোখে চেয়ে রইলাম তাঁর দিকে। তিনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন না একবারও। ক্রুদ্ধ চোখে তিনি চাইলেন দিবাকরের দিকে। তারপর নিজের ডান হাতটি তুললেন আকাশের দিকে। ভরাট গলায় বলে উঠলেন,

'শক্তৌ মনুষ্যবুদ্ধিস্তু যঃ করোতি বরাননে।

ন তস্য মন্ত্রসিদ্ধিঃ স্যাদ্বিপরীতং ফলং লভেৎ।।'

দিবাকর চকিতে ঘুরে তাকালো তাঁর দিকে। আর সেই সৌম্যমূর্তি ক্রুদ্ধস্বরে ঘোষণা করলেন, 'নারীরূপা শক্তিকে কেবলই সাধারণ নারী বলে ভুল করে এসেছ তুমি দিবাকর। এই মুহূর্তে তোমার সমস্ত মন্ত্রশক্তি হরণ করলাম আমি।'

বাইরে বিকট শব্দে বাজ পড়ল একখানা। সাদা আলোর বৃত্ত নিভে গেল। সেই মহাপুরুষও অন্তর্হিত হলেন চক্ষের পলকে।

দিবাকর থমকে দাঁড়াল। বন্ধ করল মন্ত্রোচ্চারণ। আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের দু-চোখ বন্ধ করল দু-এক মুহূর্তের জন্য। তারপরেই দেখলাম তীব্র বেদনা আর হতাশার ছায়া এসে জমল তার মুখে। হাতের ছাই হোমকুণ্ডের মধ্যেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বেদনায় আকুল হয়ে চিৎকার করে উঠল সে, 'না, না, না—'

পুতুলশরীর পড়ে রইল। দিবাকরের শরীর ভেঙে গুঁড়ো হয়ে বাতাসে ভেসে তীব্র বেগে বেরিয়ে গেল খোলা দরজা দিয়ে।

পুতুলটা ভয়ংকরভাবে কাঁপছিল। যেন যন্ত্রণায় ছটফট করছে সে। তার শরীরটা ক্রমশ কালো হয়ে যেতে লাগল। একসময় আমাদের চোখের সামনেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল পুতুলটা। মানুষের মাংস আর চুল পোড়া গন্ধে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

তারকজেঠু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, 'সুকান্ত, আমরা বেঁচে গেলাম এ যাত্রা।'

'মানে?' আমি একটু সন্দেহ নিয়েই বলি, 'লোকটা তো আবার ফিরে আসতে পারে।'

'না বোধহয়', তিনি হাসলেন, 'এই পুতুলটাই ছিল তার বিকল্প শরীর। সারা দিনের আশ্রয়। তার খোলসও বলতে পারো। যেমন আমাদের খোলস এই দেহটা। মনে রেখো সুকান্ত, তুমি ষোলো আনা দিয়েছিলে ওই পুতুলেরই বিনিময়ে। সে পুতুলের সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে তোমার সর্বস্ব সঁপে দেওয়ার অঙ্গীকারও শেষ হল...'

রিনি বলল, 'আপনার জন্যেই জেঠু...'

'উঁহু, উঁহু', তারকজেঠু প্রতিবাদ করে উঠলেন, 'ভুলেও ও কথা উচ্চারণ কোরো না মা। দিবাকরের মতো শক্তিশালী সাধককে প্রতিহত করার শক্তি কোথায় আমার?'

'ও সাধক না প্রেত?' আমি বিস্মিত হয়ে বলি।

'সাধক তো বটেই', তারকজেঠু বললেন, 'তাদের সম্পর্কে সবটা তো জানা যায় না। তবে প্রচলিত লোককথা আর বিশ্বাস থেকে যে তথ্যটুকু পাওয়া যায় তাতে শুনেছি, প্রিয় শিষ্য দিবাকরকে ডাকিনীতন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন রামসাঁতাল। কিন্তু নির্জন শ্মশানে কঠিন সাধনায় সে সাধনাভ্রষ্ট হয়। সে ঘটনার পর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার গুরুও অন্তর্হিত হন সে রাত্রের পর। তাদের মৃত্যু হয়েছে এমন কথা কেউ মানে না। সকলের বিশ্বাস, মরলে তাদের প্রাণহীন শরীর কারও না কারও চোখে পড়ত নিশ্চিত। তাছাড়া বড় বড় গুনিনরা বলেন, মাঝেমধ্যে কঠিন সময়ে রামসাঁতালবাবা মানুষকে কৃপা করতে আসেন। এখনও। যেমন তোমার জন্যে ছুটে এসেছেন তিনি', তারকজেঠু দু-হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন।'

'আশ্চর্য। এত যুগ পরেও? এ কি সম্ভব?'

'এ জগতে অসম্ভব বলে কোনো শব্দ নেই সুকান্ত।'

'কিন্তু আমার যে একটি জিজ্ঞাসা থেকে গেল জেঠু,' রিনি মুখ নীচু করে বলল।

'কী মা?' নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে খুব স্নেহের সঙ্গে বললেন জেঠু।

'ও যে আমার নামে একটা বিচ্ছিরি মিথ্যে কথা বলে গেল। সুকান্ত যদি সে কথাটাকে বিশ্বাস করে নিয়ে আমাকে মনে মনে ঘেন্না করতে শুরু করে?'

তারকজেঠুর হাতের ইশারায় আমরাও আমাদের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি খোলা আকাশের নীচে। ঝকঝকে আকাশে অগণন নক্ষত্রের ভিড়। সেই দূর নক্ষত্রের আলো কোটি কোটি মাইল অতিক্রম করে এসে নরম হাতে আমাদের গা মাথা ছুঁয়ে দিচ্ছে। সেই মৃদু, ঠান্ডা আলোয় ভিজতে ভিজতে তারকজেঠু হেসে বললেন, 'এ পৃথিবী বড় রহস্যময় মা। সে রহস্যের নাগাল পাওয়া আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে তো সম্ভব নয়। তাই সব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজতে যাওয়াই ভালো।'

তারপর তিনি তাকালেন আমার দিকে। আমার মাথায় হাত রেখে স্নেহের সঙ্গে বললেন, 'সুকান্ত, পুব আকাশের দিকে চেয়ে দেখ, আঁধার ফিকে হয়ে এসেছে। একটু পরে সূর্য উঠবে। আবার নতুন একটা দিন শুরু হবে। আলোর দিন। সেই নতুন আলোয় পিছনে ফেলে আসা অন্ধকারের কথা ভুলে যাওয়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ।'

'হ্যাঁ জেঠু। ঠিকই বলেছেন।' তাঁর কথায় সায় দিয়ে আমি বলি।

১০

দিবাকরের ছায়াশরীর প্রাণপণ ছুটে আসছিল চিতার ওপরে শুইয়ে রাখা তার জড়শরীরের অভিমুখে। রামসাঁতাল সেই ছায়াশরীরের দিকে ক্ষণমাত্র দৃকপাত করেই আবার ফিরে তাকালেন চিতার দিকে। সেই চিতায় দাউ দাউ আগুন জ্বলে উঠেছে। প্রভাতের সূর্যের মতো গনগনে লাল সেই আগুনের রঙ। রামসাঁতাল নিশ্চিন্তির নিশ্বাস ছাড়লেন। আর ভয় নেই। এইবার সেই নিরপরাধী দম্পতি নিরাপদ।

দিবাকরের ছায়া শরীরটি দুলতে দুলতে এসে দাঁড়াল তার গুরুর সম্মুখে। চিতার আগুন লেলিহান শিখায় দিবাকরের জড়শরীর গ্রাস করতে শুরু করেছে ততক্ষণে। রামসাঁতাল সেইদিকে নির্নিমেষ তাকিয়েছিলেন। বাতাসে চুলপোড়া গন্ধ উড়ছে। মানুষের চামড়া পোড়া গন্ধও মিশে যাচ্ছে তার সঙ্গে। হাহাকার করে উঠল দিবাকর, 'এ আপনি কী করলেন গুরুদেব?'

রামসাঁতাল ধীরে ধীরে ফিরলেন তার দিকে। স্নেহসিক্ত গলায় বললেন, 'গুরুর কর্তব্য করেছি দিবাকর।'

দিবাকরকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। মাথা ঝুঁকে পড়েছে তার স্বচ্ছ বুকের ওপরে। ক্লান্ত কণ্ঠস্বরে সে বলে উঠল, 'গুরুদেব, এই শরীরটিকেই সর্বশক্তি দিয়ে খুঁজেছি আমি এতদিন। কিন্তু আপনি এমনই গুহ্য স্থানে সংরক্ষিত করেছিলেন এই শরীর, যে আমি তার নাগাল পাইনি।'

'তুমি যাতে সে শরীরের সন্ধান না পাও সেই-ই আমার অভিপ্রায় ছিল।'

'অবশেষে বাধ্য হয়েই অন্য শরীর আশ্রয় করে নিজের অতৃপ্তি মেটানোর উপায় বের করেছিলাম আমি...'

'জানি', স্থির শীতল কণ্ঠে বললেন রামসাঁতাল।

'আপনিই সেই শরীরকে রক্ষাকবচ দিয়ে সুরক্ষিত করেছিলেন...'

'হ্যাঁ।'

'কিন্তু কেন? কেন বার বার আপনি আমাকে রক্ত মাংসের শরীর থেকে বিযুক্ত করছেন আচার্য?' দিবাকরের প্রশ্নে বিষাদ চাপা থাকল না।

'শরীরের জন্যে তোমার এই যে তুমুল তৃষ্ণা, সে তো কেবলই রিপু চরিতার্থ করার জন্যেই দিবাকর। তুমি ভুলে গিয়েছিলে, যোগীর শরীর জগতের মঙ্গলের জন্যে উৎসর্গীকৃত। আত্মসুখ আমাদের বিষ্ঠাবৎ পরিত্যাগ করতে হয় দিবাকর। যুগ যুগ ধরে এই আমাদের সাধনা...'

'আমি চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারিনি। কামের কাছে বশীভূত হয়েছিলাম। আমি তাকে জয় করতে পারিনি', দিবাকর চেষ্টা করেও তার ছায়াশরীরকে ঘনীভূত করতে পারছে না আর।

রামসাঁতাল হাসলেন, 'কামকে জয় করা যায় না। মনের আবর্তে শীতঘুমে থাকা সর্পের মতোই কুণ্ডলী পাকিয়ে অনুকূল পরিস্থিতির জন্যে অপেক্ষা করে সে। অসাবধানী সাধক তার বাসনার উত্তাপে সেই মহাসর্পকে জাগিয়ে তোলে ভুল করে। আর একবার তাকে জাগিয়ে তুললেই তার দংশনও অনিবার্য। তোমার ক্ষেত্রে তাই-ই হয়েছে দিবাকর। রমণীর আবিষ্টশক্তিতে অণুপ্রাণিত হয়ে সাধনভ্রষ্ট হয়েছ তুমি। ফলস্বরূপ পিশাচের ন্যায় কালযাপন করতে হয়েছে তোমাকে সুদীর্ঘকাল...'

'আমার জড়শরীর এবং বিকল্পশরীর দুইই তো পঞ্চভূতে বিলীন হল। রইল শুধু আমার কারণশরীর আর সেই শরীরে সঞ্চিত কর্মমল। এক্ষণে আমার প্রতি কী আদেশ আপনার গুরুদেব?'

'তোমাকে পুনর্বার জন্ম নিতে হবে দিবাকর। নতুন শরীরে এ জন্মের ভুলের প্রায়শ্চিত্য করতে হবে তোমাকে।'

'কীভাবে?'

'যে রমণীকে কাম্য হিসেবে দেখতে চেয়েছ তুমি, যাকে ভোগ করতে চেয়েছ আশ্লেষে, সেই রমণীকেই জননী রূপে পরিচর্যা করতে হবে আগামী জন্মে। যে নারীর মায়াশরীর দেখে বিমোহিত হয়েছিলে একদিন, সেই নারীর গর্ভেই প্রেরণ করতে চাইছি আমি তোমাকে। এ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই।'

দিবাকর গুরুর দিকে তাকিয়ে থাকে বিমূঢ় ভঙ্গিতে।

রামসাঁতাল বলে চললেন, 'সে নারী জন্মে জন্মে মায়াবিস্তার করেছে তোমার ওপরে। কখনও সজ্ঞানে, আবার কখনও অজ্ঞাতসারে। সে মায়ার বাঁধন ছিন্ন করার এটিই একমাত্র কৌশল বৎস। একমাত্র শিশুর কাছেই নারীর সমস্ত মায়ার কৌশল ব্যর্থ। রমণী যতই সুন্দরী ও রসবতী হোক না কেন, তার নিজের শিশুর কাছে যে সে চিরকাল দাসী দিবাকর। তাই নিশ্চিন্তে তার ক্রোড়ে গমন করো এইবার। আমি আগামী জন্মেও সঙ্গে থাকব তোমার, চিন্তা কোরো না। মনে রেখ, গুরু শিষ্যের বন্ধন কালনিরপেক্ষ। সে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না কোনোদিন...'

দিবাকর সামনে মাথা ঝোঁকালো। দু-হাত জড়ো করে প্রণাম জানাল গুরু রামসাঁতালকে। তার শরীর ক্রমশ স্বচ্ছতর হতে হতে একেবারে মিলিয়ে গেল।

রাতের অন্ধকার সরে গিয়ে পুব আকাশে আলো ফুটছে তখন। পাখিরা জেগে উঠে হইচই করতে করতে বেরিয়ে পড়ছে রাতের আশ্রয় ছেড়ে। এইবার দল বেঁধে আকাশে উড়বে তারা। তাদের ডানায় ডানায় ছড়িয়ে পড়বে নতুন দিনের আলো। রামসাঁতাল মৃদু হাসলেন। এখানকার কাজ শেষ হল। এইবার যেতে হবে। নতুন করে সব কাজ শুরু করতে হবে আবার।

অধ্যায় ৪ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%