অভিজিৎ সেনগুপ্ত

ভারি অদ্ভুত দেখতে লোকটাকে৷ মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল উঁচিয়ে আছে৷ বেতের ছড়ির মতো সরু লিকলিকে চেহারা৷ খালি গা, পরনে নীল লুঙ্গি৷ হাতে একটা সরু লাঠি, তার মাথায় একটা ছুঁচলো লোহার ফলা৷ পিঠে একটা ঝোলা, ঝোলার ভিতর কী আছে কে জানে? সমুদ্রের খাঁড়ি যেখানে অনেকটা ভিতরে ঢুকে গেছে, গোড়ালি সমান জলের নীচে ঝকমক করছে সোনালি রঙের বালি, সেখানে ঝুঁকে পড়ে একমনে কী দেখছিল লোকটা৷ আর কিছুটা দূরে একটা ঝাঁকড়া ঝাউ গাছের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে লোকটাকে দেখছিল তাতাই৷
বাবা-মার সঙ্গে ছুটিতে কয়েক দিনের জন্য সুন্দরবনে বেড়াতে এসেছে সে৷
তাতাইয়ের গত জন্মদিনে বাবা তাকে একটা কম্পাস উপহার দিয়েছেন৷ দেখতে ঠিক গোল পকেট-ঘড়ির মতো৷ চকচকে পিতলের ঢাকনা৷ ভিতরে একটা সোনালি রঙের লোহার কাঁটা তার একটা মাথা লাল রং করা৷ আজব কাণ্ড! ঘড়িটা যেদিকেই ঘোরাও না কেন, লাল মাথাটা সবসময়ে উত্তরদিক দেখাবে৷ তাতাই ভাবে, এ কী করে সম্ভব? লোহার কাঁটাটা কী করে বোঝে কোনটা উত্তরদিক? ওঁর প্রাণ আছে নাকি? শীতের রাতে বাবার কাছে গা ঘেঁষে বসে গল্প শুনেছে তাতাই -দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র বা মরুভূমি যেখানে কোথাও কোনো দিকচিহ্নমাত্র নেই কিংবা গভীর জঙ্গল যেখানে সূর্যের আলো অবধি ঢুকতে পারে না সেখানে ক্যাপ্টেন কুক বা লিভিংস্টোনের মতো অভিযাত্রীরা দিক ঠিক করার জন্য এই যন্ত্রই ব্যবহার করে৷ তাতাইও যেহেতু অবশ্যই একদিন ওদের মতোই অভিযানে বেরিয়ে পড়বে তাই এই কম্পাস সে সবসময়ে সঙ্গে সঙ্গে রাখে৷ আপাতত তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস বাবার দেওয়া এই কম্পাস৷ ঘুমোবার সময়েও সে শিয়রে কম্পাস রেখে ঘুমোয়৷ না হলে তার নিশ্চিন্ত ঘুম হয় না৷
কাল অনেক রাতে ওরা এসে পৌঁছেছিল সমুদ্রের পারে এই কাঠের বাংলোয়৷ চারপাশে অন্ধকার ঝাউ গাছ সমুদ্রের হাওয়া লেগে শোঁ শোঁ শব্দ করছে-মাথার উপরে তারাগুলি দেওয়ালি রাতের ফুলঝুরির মতো কী উজ্জ্বল৷ তার আলো এসে যেন পড়েছে মাটিতে৷ তারা যে চাঁদের মতোই প্রায় জ্যোৎস্না দিতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারত না তাতাই৷ ঝাউ গাছে হাওয়া বাধার শনশন শব্দ ছাপিয়ে দূর থেকে কেমন একটা গম্ভীর আওয়াজ ভেসে আসছিল-যেরকম শব্দ আগে কখনো শোনেনি তাতাই৷
তাতাই জিজ্ঞেস করে-ওটা কীসের শব্দ বাবা?
তাতাইয়ের বাবা, উমাকান্ত জামাকাপড় ছেড়ে গামছায় মুখ মুছতে মুছতে বলেন-ও তো সমুদ্রের শব্দ৷ সামনের এই ঝাউ বনটা পেরোলেই সমুদ্র৷ মোটে এক মিনিটের রাস্তা৷ আজ খুব হাওয়া৷ তা ছাড়া পূর্ণিমার ভরা কোটাল বলে বড়ো বড়ো ঢেউ পাড়ে ভাঙছে, তাই এত শব্দ৷
সমুদ্র মোটে এক মিনিটের রাস্তা এখান থেকে, যে সমুদ্র আজ অবধি চোখেই দেখেনি সে, শুধু বইয়েই যার বর্ণনা পড়েছে৷ তাতাইয়ের আর তর সয় না৷ উমাকান্তের হাত ধরে টানে-চলো চলো বাবা, সমুদ্র দেখব৷
উমাকান্ত বলেন-যাব রে বাবা, যাব৷ সমুদ্র দেখতেই তো আসা এখানে৷ তবে এখন এই অন্ধকারে নয়৷ অন্ধকারে কিচ্ছু দেখাও যাবে না৷ কাল সকাল হলেই সবাই মিলে যাব সমুদ্র দেখতে৷
অগত্যা চুপ করে যেতে হয় তাতাইকে৷ কিন্তু সমস্ত রাত সমুদ্রের শব্দে চোখে আর তার ঘুম আসতে চায় না৷ মাঝরাতে এত বাড়ে সেই শব্দ যে মনে হয় সমুদ্র যেন একেবারে তাদের বাংলোর সামনে এসে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে৷ কখন রাত পোহাবে ভাবতে ভাবতেই শেষ রাতের দিকে চোখে ঘুম এসে যায় তার৷
ভোরের আলো চোখে এসে পড়তেই আর এক মুহূর্ত দেরি করে না তাতাই৷ বাবা যে সমুদ্রের পারে এসে কী করে এমন অঘোর ঘুম ঘুমোয় মাথায় ঢোকে না তাতাইয়ের৷ নাঃ, বাবার জন্য মোটেই অপেক্ষা করতে পারবে না সে৷ গায়ে একটা জামা গলিয়ে আর কম্পাসটা পকেটে নিয়ে তাতাই একাই বেরিয়ে পড়ে সমুদ্র দেখতে৷
বাংলোর কাছে ঝাউ বনটা একছুটে পার হয়ে যেতেই বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া তাতাইয়ের৷ সামনে তার এ কী দৃশ্য! আকাশের নীল মেঘ যেন মাটিতে নেমে এসেছে৷ সেই মেঘের গায়ে সাদা পাখির ঝাঁক৷ এই কি তাহলে সমুদ্রের ঢেউয়ের ফেনা? আকাশ মাটি জল এভাবে একাকার হয়ে যাওয়া-এরই নাম তবে সমুদ্র?
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তাতাই৷ এই নীল জল সাদা ঢেউ পেরিয়েই একদিন ক্যাপ্টেন কুকের মতো সে পাড়ি জমাবে অনেক দূরে, কলম্বাসের মতো আবিষ্কার করবে কোনো এক নতুন দেশ, যে দেশে কোনো মানুষ এখনও অবধি পা রাখেনি৷ পৃথিবীতে এরকম অজানা দেশ কি আর একটাও নেই? পথ হারাবার ভয় তো আর নেই তার, পকেটে তো তার কম্পাস আছে!
সমুদ্রের জল এঁকেবেঁকে ঢুকে গেছে অনেক ভিতরে৷ সোনালি বালির উপর নীল জল-ঝাউ গাছের ছায়া কাঁপছে তাতে৷ সেখানেই সেই আশ্চর্য লোকটার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তার৷ বালির উপর উবু হয়ে বসে কী যেন করছিল সে৷
ঝাউ গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে সামনে একটু এগোতেই হঠাৎ লোকটা কেমন গম্ভীর গলায় হাঁক পাড়ে-ওখানি দাঁড়ায়ি থাকো খোকা, আর একদম এগুবেনি৷
খুব রাগ হয় তাতাইয়ের৷ ও কোথায় যাবে, কি যাবে না তা লোকটা ঠিক করে দেওয়ার কে?
কিন্তু লোকটা আর ওর দিকে নজর দেয় না৷ বালির উপর ঝুঁকে পড়ে কী দেখতেই থাকে৷ বুকের মধ্যে রাগটা পুষে রেখেই তাতাই এবার খুব গম্ভীর ভারিক্কি গলায় জিজ্ঞেস করে-তোমার নাম কী শুনি?
-আমার নাম ভীম হাতি৷
এত মজার লাগে নামটা শুনে তাতাইয়ের, মনে হয় সে হো-হো করে হেসে উঠবে৷ এই লিকলিকে খ্যাংরা কাঠির মতো চেহারা- এর নাম ভীম হাতি? এক ভীমে রক্ষা নেই তায় আবার হাতি?
কিন্তু তাতাই হাসে না৷ সে এখন যথেষ্ট বড়ো হয়ে গেছে! সামান্য কারণে ছেলেমানুষের মতো হাসা তাকে মানায় না৷
বেশ গম্ভীরভাবে তাতাই বলে-বেশ মজার নামটা তোমার৷ কিন্তু তুমি কর কী?
আমি কাঁকড়া, কাছিম, মাছ এসব ধরি, মুখ না ফিরিয়েই লোকটা বলে৷
তাতাই অবাক৷ -ওই লাঠি দিয়ে তুমি কচ্ছপ ধর কী করে?
লোকটা এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে হঠাৎ হাতের লাঠিটা দিয়ে বালির উপর ঠুকতে থাকে৷ ঠক করে একটা শব্দ হওয়ামাত্রই বেড়াল যেমন মাটি আঁচড়ায়, হাতের লাঠিটা ফেলে দিয়ে লোকটা তেমনি দশ আঙুলে বালি আঁচড়াতে থাকে৷ লোকটা ঠিক কী করছে বুঝে ওঠার আগেই তাতাই দেখে ওর হাতে বিরাট একটা কাছিম৷ বালি থেকে বের করে এনেছে সে৷ ছাড়া পাওয়ার মরিয়া চেষ্টায় কাছিমটা পা ছুড়ছিল৷ লোকটা ওকে চিত করে শুইয়ে দিল বালিতে৷ চিত হয়ে শুয়ে আকাশের দিকে পা ছুড়তে লাগল কাছিমটা৷
লোকটা ম্যাজিক জানে নাকি? শুকনো বালির ভিতর থেকে এরকম একটা জ্বলজ্যান্ত প্রাণী বেরিয়ে এল কী করে? নাহ যত লিকলিকেই হোক লোকটার উপর এখন বেশ একটু ভক্তিই হচ্ছিল তাতাইয়ের৷ বালি থেকে কাছিম বের করে আনতে পারে ক-টা লোক? তার বাবা, কাকা, ইশকুলের অঙ্ক স্যার কত কিছু জানে, কিন্তু বালি থেকে কচ্ছপ বের করে আনতে পারবে তারা?
তাতাই আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করে-ভীমকাকু, কচ্ছপ কি বালিতে হয়?

ভীম হেসে বলে-আম যেমনি গুটি থেকে বেরোয় কাছিমও তেমনি হয় ডিম থেকে৷ মা কাছিম সমুদ্র থেকে পারে আসে তারপর বালির উপর পছন্দমতো জায়গা খুঁজে সেখানে এসে ডিম পাড়ে৷ সেই ডিম ফুটে বাচ্চা কাছিম বেরোয়৷
তাতাই হাঁ করে শোনে৷
ভীম উঠে দাঁড়িয়ে কাছিমটাকে ঝোলায় পুরে বলে-যাই, কুমিরাগণ্ডা খালে যাব এবার৷ কুমিরাগণ্ডা আর সপ্তমুখীর মুখে অনেক কাছিম আসে ডিম পাড়তে৷ কিন্তু আমরা ডিম ফুটে বাচ্চা না বেরোনো অবধি মা কাছিমকে ধরি না৷ সেরকম ধরলে তো কাছিমের বংশই ধ্বংস হয়ে যাবে৷
লোকটা চলে যাচ্ছে দেখে কেমন মন খারাপ হয়ে যায় তাতাইয়ের৷ বলে-তুমি চলে যাচ্ছ? কাল আসবে না এখানে৷
-না খোকা, কাল যাব বার-গাঙে ইলিশ মাছ ধরতে৷ এখন তো ইলিশ ধরার সময়৷ দেখছ না জলের রং কী সুন্দর নীলচে সবুজ৷ একে বলে হালি জল৷ এই জলেই ইলিশের ঝালা আসে নদীতে ডিম ছাড়তি৷
কী আশ্চর্য! লোকটা কত কিছু জানে৷ এমন কথা তো তার বাবা, কাকা, বাংলা স্যার, অঙ্কের স্যার এমনকী হেডস্যার অবধি জানে না৷ তাদের মুখে তো কখনো শোনেনি একথা যে, জলের রং দেখে বোঝা যায় সে জলে ইলিশের ঝাঁক আছে কি না৷
তাতাই বলে-সমুদ্রে তোমরা যাও কী করে?
বালির উপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা একটা নৌকো দেখিয়ে বলে ভীম-ওই যে দিখছ, ওকে বলে ছোট নৌকা৷ আমরা পাঁচ-ছ-জন ওই নৌকায় পাল তুলি দিয়ি হু-হু করি চলি যাই বার-গাঙে ইলিশ মাছ ধরতি৷
একটু থেমে লোকটা একটা ঝাউয়ের ভাঙা গুঁড়ির উপর বসে পড়ে বলে-এখান থেকতি এক ভাঁটার পথ গেলি হাঁড়িভাঙার চর৷ কেউ থাকেনি সেঠি৷ শুধু লাল কাঁকড়া, সাপ আর ইয়া বড়ো বড়ো ধেড়ে ইঁদুর৷ জল ওঠি তুঁতের মতো সবুজ৷ ওঠি গেঁয়ো আর গরান খুঁটির আলনা বানায়ি তাতে সারা শীতকাল মাছ শুকাই আমরা৷
বালির উপর বসে পড়ে চুপ করে ভীম হাতির গল্প শোনে তাতাই৷ যেন রূপকথার গল্প শুনছে৷
ভীম বলে-একবার এরকম মাছ ধরতি গেছি হাঁড়িভাঙার চরে৷ কোনো দিকে ড্যাঙা দেখতি পাওয়া যাচ্ছেনি, হঠাৎ আকাশ কালো করি কী মেঘ৷ তারপর শুরু হলা ঝড়৷ হাওয়ার দাপটে গাঙের জল পাক খেয়ি সোজা উঠি গেলা আকাশে৷ হাতির শুঁড়ের মতো দেখতি লাগে বলে আমরা মাঝিরা একে বলি হাতিশুঁড় যা আকাশ অবধি উঠে ভেঙি পড়ি যায়৷ হাতিশুঁড় ভেঙি আমাদের মাথার উপর পড়লনি৷ পড়লি নৌকা টুকরা টুকরা হয়ি যেত৷ নৌকা ভাঙলনি বটি কিন্তু হাওয়ার ধাক্কায় পাল-টাল সব ছিঁড়ি ফর্দাফাই হয়ি গেলা৷ চারপাশে পাহাড়ের মতো উঁচা উঁচা ঢেউ৷ কোথাও ড্যাঙার চিহ্নমাত্র নেই৷ আমাদের নৌকা কোথায় ভেসি যাচ্ছে আমরা কেউ জানি না৷ দু-দিন পর গাং যখন শান্ত হোলা তখন জানি না আমরা কোথায়৷ আমাদের নৌকায় খাবার তো দূরের কথা গলা ভিজাবার মতো একটু জলও কউঠি নাই৷ দু-দিন দু-রাত এভাবে ভেসি চললাম৷ নৌকায় আমরা মোটে চারজন প্রাণী৷ মাঝে মাঝে দু-একটা শুশুক জল থেকে উঠেই আবার ডিগবাজি খেয়ি জলে ঢুকি যাচ্ছে এছাড়া কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন নাই৷
তাতাই চুপ করে শুনছে এক অজানা মানুষের এই অদ্ভুত ভাষায় বলা অজানা এক গ্রহের গল্প৷
একটু চুপ থেকে ভীম হাতি বলে-আমাদের নৌকা ভেসি চলিছে তো ভেসিই চলিছে৷ আমরা দাঁড়ও আর বাইছিনি কেননা আমরা তো জানিই না কোনদিকে যাবু আমরা৷ গাঙের স্রোত যেদিকি নিয়ি যাচ্ছে আমাদের সেদিকিই যাচ্ছি৷ মাথার উপর সূর্যটা যেন আগুনের গোলা৷ ক্রমশ যেন সিটা নিচি নেমি আসছে৷ গাঙের নোনা জল থেকতি গরম ভাপ উঠতিছে৷ নোনা জল মুখে দিলি বমি উঠি আসে৷ শেষে নৌকার খোলের মধ্যি নোংরা কালো যে বৃষ্টির জল জমি আছে তাই সেঁউতিতে তুলে নিয়ে আমরা শুকনো গলা ভিজাচ্ছি৷ কিন্তু গলা ভিজালি কী হবে? কোথাও তো একটা দানাও নাই যা মুখে তুলব৷ ঝাঁ-ঝাঁ রোদ্দুরে খিদে আর তেষ্টায় মড়ার মতো নৌকার খোলে আমরা পড়ি রয়িঠি৷ আর কী জানো খোকা, শুয়ি শুয়ি অদ্ভুত সব খোয়াব দেখছি৷ খোয়াব দেখছি যেন ড্যাঙায় পৌঁছে গেছি৷ সে এক অদ্ভুত দেশ৷ গাছে গাছে লাল টকটকে ফল পেকি রয়িঠে৷ কী মিষ্ঠি তার গন্ধ৷ মানুষগুলা যেন পাখির মতো, উড়ি উড়ি খাচ্ছে সে ফল৷ হঠাৎ ঝকমকে জরির পোশাক পরা একটা লোক কোত্থেকতি এসি আমাদের বুইললে -চলো, রাজার বাড়ি তুমাদের নেমন্তন্ন৷ বুইললাম-ভালো খাওয়াবে তো রাজা? অনেকদিন পেটে কিছু পড়েনি৷ আমরা কিন্তু সোনা-রুপা কিছু খাবুনি, খালি সাদা চালের ভাত৷ কতদিন ভাত খাই নাই৷
লোকটা বুইলল-হঁ হঁ, তাই খাবে৷ আজ তো শুধু তুমাদিগের জন্যই খাওয়ার ব্যবস্থা৷
লোকটার পিছন পিছন গিয়ি দিখলাম-বিরাট খাওয়ার ব্যবস্থা৷ সারি সারি সোনার আর রুপার থালা আর তাতি সাজানো পোলাও, কালিয়া, মিঠাই, মণ্ডা৷ কিন্তু সেসব মুক্তা পান্না নীলা দিয়ি তৈরি৷ আমি চিৎকার করি বুইললাম-ইসব খাবুনি৷ ভাত কই? আমি ভাত ছাড়া কিচ্ছু খাবুনি৷
লোকটা আঙুল দিয়ি দেখাল-উই তো ভাত৷
দিখলাম একটা সবুজ কলাপাতার উপর অনেকটা সাদা ঝুরঝুরে ভাত৷ যেন শাদা শিউলি ফুল ফুটি আছে৷
ছুইটে চলি গেলাম কলাপাতার কাছে ভাত খাবু বলে, হঠাৎ দেখি রাজার কোতোয়াল কোত্থেকতি হাজির-হাতে রামদা৷ বুইলল, ধর ধর উদের৷ রাজার সব ভাত খেয়ি নিল৷
মাথার উপর রামদা তুলিছে কোতোয়াল৷ আমি চিৎকার করি উঠেছি-একটু ভাত খেতি দাও, একটু ভাত-কোতোয়াল কোনো কথা শুনবেনি, মাথার উপর রামদা তুলি সে আঁ আঁ করি চিৎকার করতি ঘুম ভেঙি দেখি একটা সাদা গাং-পায়রা মাথার উপর চক্কর মারতি মারতি আঁ আঁ করি ডাকিঠে৷ কিচ্ছু দেখা যাচ্ছেনি৷ চারপাশে শুধু ঘন কুয়াশা৷
আমি সব ভুলি গিয়ি চিৎকার করি উঠলাম-গাং-পায়রা, গাং-পায়রা৷ আর কুনো ভয় নাই৷ উঠো উঠো, তুমরা৷
মোটা দানার হলুদ ঝুরঝুরে বালির উপর লেপটে বসে ভীম হাতির গল্প শুনছিল তাতাই৷ বালির উপর কী সুন্দর ঝকঝকে সবুজ কলমিলতার মতো একরকম লতার ঘন আস্তরণ৷ বেগুনি রঙের থোকা থোকা ফুল তাতে৷ বোধ হয় খুব মধু আছে ওই ফুলে৷ হলুদ ডোরাকাটা কালো রঙের অনেক ভিমরুল উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলের উপরে৷ সামনে বালির চরা সমুদ্রের সদ্য জোয়ারের জলে ভেজা৷ অগুন্তি ছোটো ছোটো কাঁকড়ার গর্ত তাতে৷ ঝাঁকে ঝাঁকে সিঁদুরে লাল রঙের কাঁকড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই চরায়, যেন থোকা থোকা রঙিন ফুল৷ যেই কোনো কারণে একটু ভয় পেয়েছে অমনি ছুটতে ছুটতে সামনে যে গর্ত পাচ্ছে তাতেই ঢুকে পড়ছে৷ যাদের সেখানে জায়গা হচ্ছে না তারা ছুটে যাচ্ছে পাশের গর্তে৷ তাতাইয়ের বেশ মজা লাগে দেখতে৷ ওদের পাড়ার স্পোর্টসে মিউজিক্যাল চেয়ারের যে খেলা হয় অনেকটা যেন সেরকম৷ কে আগে কোন গর্ত দখল করে নিতে পারে তারই প্রতিযোগিতা৷ একটা কাঁকড়া না বুঝে কখন ওর গা বেয়ে উঠেছে, তাতাই টের পেয়ে ভয়ে চিৎকার করে গা ঝাড়া দিতেই কাঁকড়াটা বালিতে পড়েই আট ঠ্যাঙে পড়ি কি মরি করে ছোটে বালির উপর দিয়ে সবচেয়ে কাছের গর্তের খোঁজে৷ ভঙ্গিটা তার এত মজার যে এবার তাতাই না হেসে পারে না৷
ভীম হাতি তার গল্প থামিয়ে তাতাইয়ের দিকে তাকিয়ে কেমন নরম গলায় বলে-ভয় পেয়োনি খোকা, ওরা খুব ভালো, শান্ত স্বভাবের প্রাণী খোকা, কাউকে কিছু করে না৷
তাতাই অবাক হয়ে দেখে কী নরম গলায় কাঁকড়াগুলো সম্বন্ধে বলছে ভীমকাকু৷ যেন ওরা ভীমকাকুর খুব কাছের লোক৷
তাতাই একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল৷ হুঁশ ফিরে পেয়ে বলে-ভীমকাকু তুমি গাং-পায়রার কথা বলছিলে কেন? গাং-পায়রা দেখলে কী হয়?
ভীম হাতি হাতের লাঠি আর কাছিমসুদ্ধু কাঁধের ঝোলাটা বালির উপর রেখে যেন ভালো করে গল্পটা এবার বলবে বলে থেবড়ে বসে পড়ে৷ মনে হয় যেন এতদিনে তার জীবনের গল্প শোনার এক শ্রোতাকে সে খুঁজে পেয়েছে৷
ভীম হাতি বলে-গাং-পায়রা ড্যাঙার কাছে জাহাজ বা মাছধরার নৌকার উপর চক্কর মারতি থাকে৷ জাহাজ থেকতি যেসব খাবার, মাছ ধরার নৌকা থেকতি যেসব মাছ ফেলি দেয় তাই খায় ওরা৷ তাই গাং-পায়রা দেখতি পাওয়া মানে কাছাকাছি কোথাও ড্যাঙা থাকতি পারে৷ এই জন্যই গাং-পায়রা মারার কোনো নিয়ম নাই৷ গাং-পায়রা না থাকলি ডুবে যাওয়া নৌকা বা জাহাজকে ড্যাঙার হদিশ জানাবে কে?

তারপর শোনো৷ আমার গায়ে জোর নাই তবু আমি আপ্রাণ চিৎকার করলাম-ড্যাঙা! ড্যাঙা! কউঠি কেউ আছে?
আমাদের ছোট নৌকার ছোকরা দাঁড়ি নকুলের কানে ড্যাঙা কথাটা ঝেতিই ও টলতি টলতি উঠি দাঁড়াল৷ হঠাৎ খোল থেকতি একটা দাঁড় উঠায়ি নিয়ি ঝপাং ঝপাং মারতি লাগলা জলে৷ বিড়বিড় করে কইতি লাগলা এভাবে মরবুনি আমরা, মরতি হয় ড্যাঙায় গিয়ি মরবু৷ আমি ড্যাঙায় যাবু৷
আমি বুইললাম-চারপাশে কুয়াশা, ড্যাঙা কোনদিকি তাই তো জানি না৷ দাঁড় মেরি তুমি কোনদিকি যাবা?
নকুল পাগলের মতো চেঁচায়ি বুইলল-আমি ওসব কিছু জানি না৷ যদি ড্যাঙায় না ঝেতি পারি তো নরকে যাবু৷ এভাবে মরবুনি৷
বুইঝলাম নকুলের এ মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার আগের লক্ষণ৷
হঠাৎ এক কাণ্ড হল৷ দাঁড়ের ছপ ছপ শব্দে ভয় পায়ি এক ঝাঁক রুপুলি পারশে মাছ জল থেকতি লাফ দিয়ি নৌকার খোলে পড়ি ছটফট করতি লাগল৷ সঙ্গেসঙ্গে আমরাও সবাই লাফ দিয়ি পড়লাম নৌকার খোলে সেই মাছ খাবু বলি৷
তাতাই বলে-এ ম্যা! সেই কাঁচা মাছ?
ভীম বলে-কাঁচা নয় খোকা, আমাদের পেটে তখন আগুন জ্বইলছে৷ তার মধ্যি ঝা পইড়বে তাই সিদ্ধ হয়ি যাবি৷
গাঙের জল এত লোনা যে মুখে দেওয়া যায় না৷ সেই জলেই কাঁচা পারশে মাছ ভিজায়ি আমরা খেলাম৷ মাছের আঁশটে গন্ধে মনে হচ্ছিল গলা ঠেলি সব উঠি আসবে৷ তাও নাক চেপি খেতি লাগলাম আমরা৷ তখন কিছু হলনি বটে কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যেন শুরু হলা ভেদবমি৷ বমির সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছিল যেন কইলজাটাই উইঠে আসবে৷
মাছের ভাগ পাবে বইলে বোধ হয় গাং-পায়রাগুলি মাথার উপর চক্কর মারছিল, না পেয়ি তারা আবার কউঠি উড়ি চলি গেলা৷
তাতাই হাঁ করে শুনছিল ভীম হাতির গল্প আর অবাক চোখে দেখছিল তাকে৷ এই নিতান্ত নিরীহ মতো দেখতে লোকটা সত্যই ওই ঘোর বিপদের মধ্যে পড়েছিল!
তাতাই বলে-তুমি যা বলছ ভীমকাকু সব সত্যি?
ভীম হাতি একথার সরাসরি উত্তর না দিয়ে ঝোলার ভিতর থেকে কিছুটা লাল মুড়ি আর এখো গুড় বের করে৷ গুড় আর মুড়ি মুখে ফেলে দিয়ে বলে, খাবে নাকি খোকা? ভালো মিষ্টি মুড়ি৷
তাতাই লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়৷ মুড়ি খেতে খেতে ভীম খুব গম্ভীরভাবে বলে-কী জিজ্ঞেস করলে? যা বুইললাম এতক্ষণ তা সত্যি কি না? সত্যি বলেই তো খোকা এখন এই মুড়ি খায়িঠি৷
কথাটার অর্থ তাতাইয়ের মাথায় ঠিক ঢোকে না৷ ঝড়ে নৌকো ডুবে যাওয়ার সঙ্গে মুড়ি খাওয়ার কী সম্পর্ক?
মুড়ি চিবুতে চিবুতে ভীম বলে-আমার কথাটা ঠিক বুইঝলে না, না খোকা?
তাতাই মাথা নাড়িয়ে বোঝায় সে সত্যি বোঝেনি৷
ভীম বলে-যারা বার-গাঙে দিনের পর দিন আমাদের মতো নৌকা নিয়ি কূলকিনারাহীন ভেসি বেরোয়নি তারা বুইঝবেনি আমার কথার অর্থ৷ তোমাকে আমি যখন ভীষণ খিদের গল্প বুইলছি মনে হালা আমার পেটের ভিতর যেন আবার সেই খিদের আগুন দাউদাউ জ্বলতি শুরু কইঠে৷ ঝোলার মধ্যে মুড়ি রেইখি দিয়িছি৷ সেই খিদের কথা মনে পড়লেই ঝোলা থেকতি মুড়ি নিয়ি খাই৷ আগুনটা তাতে একটু নেভে৷
খিদের কথা মনে পড়লেই খিদে পায় এরকম অদ্ভুত কথা আগে কখনো শোনেনি তাতাই৷
একটা কী পোকা সবুজ লতার জঙ্গলে কট কট করে ডেকে উঠল৷ আর একটা কী পাখি মাথার উপর চক্কর মেরে খালি ডেকেই চলেছে৷ কাঠের বাংলো থেকে বেরিয়ে ঝাউ বন পেরিয়ে সমুদ্রের দিকে আসার সময়ে একটা পাখি চোখে পড়েছিল তাতাইয়ের৷ ছাই ছাই রঙের দেখতে পাখিটা৷ গায়ে দাগ৷ ঝাউ বনের মধ্যে বোধ হয় পোকা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিল৷ তাতাইয়ের পায়ের সাড়া পেয়েই কেমন বলের মতো গুটিয়ে মাটির উপর কিছুক্ষণ গড়িয়ে গিয়েই হঠাৎ ডানা খুলেই হাউই বাজির মতো সোঁ সোঁ করে উপরে উঠে গেল৷ পাখিটার অদ্ভুত ভাবভঙ্গি দেখে প্রায় হেসে ফেলেছিল তাতাই৷ আকাশে উঠেই মাথার উপর চক্কর মারতে লাগল ট্যাঁ ট্যাঁ করে ডাকতে ডাকতে৷ এটা নিশ্চয়ই সেই পাখিটাই৷
আকাশের কোন কোণে পাখিটা ডাকছে তা খুঁজতে যেতেই ভীম হাতি বলে-ওটা বামুনবাদশা পাখি খোকা, ভয়ের কিছু দেখলেই এভাবে ডাকে ওরা৷ আমাদের এখানি এভাবে বসি থাকতি দেখি বোধ হয় ভয় পেয়িঠে ও৷
তাতাই মনে মনে হাসে৷ আশ্চর্য ভিতু পাখি তো, ওকে দেখেও ভয়!
সমুদ্রের সাদা জল যেখানে আকাশের সাদা রঙের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে সেদিকে কেমন উদাস চোখে তাকিয়ে ছিল ভীম৷ তাতাই ভাবে, কী দেখছে ভীম ওই দূরের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে যাকে ও বলে বার-গাং? ও কী দেখছে সেই ধু-ধু জল যার অতলে মাছ ধরার নৌকার সঙ্গে তলিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তার-কথা ছিল হাঙর আর কামঠের দাঁতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার৷ কোনোক্রমে সে বেঁচে ফিরেছে সেখান থেকে৷ সমুদ্রের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে ঘন বনকলমির জঙ্গলে ফুটে থাকা বেগুনি ফুলের দিকে তাকিয়ে বলে-না খোকা, ড্যাঙা পেতাম কি না জানি না৷ কিন্তু চোখ মেইলে তাকায়ি থাকার ক্ষমতা আর ছিলনি আমাদের৷ চোখ বুজতিই আবার সেই সব আকাশপাতাল খোয়াব মাথার মধ্যি৷ এক রাজার রাজত্ব থেকতি পালায়ি আসতি হয়েছিল আমাদের৷ এবার দেইখলাম আর এক রাজার বাড়ি৷ চোখ মেলি দেখি ধবধবে সাদা এক রাজপ্রাসাদ৷ কত অগুন্তি দরজা জানালা তার৷ বারান্দায় মুখ বাড়ায়ি রাজার অজস্র সিপাই সান্ত্রি পাইক বরকন্দাজ৷ তারা সবাই যেন বুইলছে খাতি দাও, খাতি দাও ওদের৷ একটু কমলালেবুর রস দিয়ি জিভ ভিজায়ি দাও ওদের৷ আমি ভাবলাম এই রাজার বাড়িতেও কি তাহলে খাওয়ার নেমন্তন্ন আমাদের? এঠিও কি পান্নার ছেঁচকি আর পোখরাজের ঘণ্ট খাওয়াবে? আমি চেঁচায়ি বুইললাম-আমি রাজার খাবার খাবুনি৷ আমি ভাত খাবু, পান্তা ভাত৷
শিয়রের কাছ থেকতি কে যেন বুইলল-না খেতি পেয়ি মাথা খারাপ হয়ি গেছে ওর৷ একটু চিনির জল দাও ওকে৷ কে একজন আমার মুখে সত্যি একটু জল দিল৷ কেমন নোনতা মিষ্টি স্বাদ৷ কতদিন যেন জল খাইনি, জিভে এরকম অমৃতের মতো মিষ্টি স্বাদ পাইনি আগে কখনো৷ আরামে কেমন চোখ জড়ায়ি এল ঘুমে৷ যখন জেগি উঠলাম দেখি পাইক বরকন্দাজ তো নয়, নীল-সাদা রঙের জামাপ্যান্ট পরা সব মানুষ ঘুরিঠে আশেপাশে৷ আমার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ি কী দেইখছে৷
একজন বুইললে-নৌকো ঝড়ে পড়েছিল বুঝি? খুব বেঁচে গেছ৷ তোমরা তো মানুষ বয়াও পেরিয়ে চলে গিয়েছিলে৷ আমাদের চোখে না পড়লে কোথায় ভেসে চলে যেতে তা কেউ জানে না৷
তাতাই কেবলই অবাক হচ্ছে৷ বয়া কী সে জানে৷ কলকাতার গঙ্গায় সে হাওড়া ব্রিজের নীচে গোল পিপের মতো বয়া ভাসতে দেখেছে৷ নৌকো বাঁধা থাকে তাতে৷ কিন্তু মানুষ বয়া আবার কী?
তাতাই বলে-মানুষ বয়া কী ভীমকাকু?
গাঙের অনেক ভিতরে থাকে মানুষ বয়া৷ এমনি বয়া দেখেছ তো খোকা? এ তার চেয়ে অনেক বড়ো৷ এ বয়া বিরাট ঘরের মতো, তার ভিতরে পালা করি মানুষ থাকে৷ জাহাজকে পথ দেখায় তারা৷ মানুষ থাকে বলি একে বলে মানুষ বয়া৷ এ বয়া পেরিয়ি গেলে ধু-ধু গাং, মানুষ তো নাই, কোনো পাখপাখালিও নাই৷ খালি সোঁ সোঁ হাওয়া আর উথালপাথাল ঢেউ৷
নীল পোশাক পরা একজন লোককে জিজ্ঞাসা করলাম-আমি এখন কউঠি তালি? কোন রাজার বাড়ি?
লোকটা বুইললে-রাজার বাড়ি নয়, তুমি এখন জাহাজে৷ আমরা জাহাজ থেকে দেখলাম তোমাদের নৌকো ভেসে যাচ্ছে আর তোমরা পড়ে আছ নৌকোর খোলে৷ যখন নৌকো থেকে তুললাম তোমাদের, তখন তোমার হুঁশ ছিল বটে কিন্তু তা না থাকারই সমান৷ তুমি পাগলের মতো বিড়বিড় করছিলে কিন্তু চোখে কোনো নজর ছিল না৷ জাহাজে ডাক্তার আছে৷ তিনি তোমাকে চিনি লবণের জল আর ওষুধ দেওয়ার পর তুমি এখন চোখ মেলে তাকিয়েছ৷
তাতাই জানে লবণজল মানে স্যালাইন৷ ওর দাদুর একবার প্রায় কলেরার মতো হয়েছিল৷ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর দাদুকে ডাক্তার স্যালাইন দিয়েছিল৷ তাতাইকে তখন বাবা বুঝিয়েছিলেন শরীরে জল আর খাদ্য একদম কমে গেলে বাইরে থেকে এভাবে লবণ দিতে হয়৷ স্যালাইন দেওয়ার পর দাদুর শরীরে কী খিঁচুনি৷ ডাক্তার বললেন-হোক খিঁচুনি৷ একটু পরে কমে যাবে খিঁচুনি কিন্তু স্যালাইন বন্ধ করলে নিশ্চিত মৃত্যু৷
ভীমকাকুর তাহলে দাদুর মতোই অবস্থা হয়েছিল? দূরে ধু-ধু জলের দিকে তাকিয়ে বুকের মধ্যে কেমন শিরশির করে তাতাইয়ের৷ এখন শীতকাল৷ সমুদ্র পুকুরের মতো শান্ত৷ ঝড়-বৃষ্টি হলে এই শান্ত সমুদ্রই এরকম ভয়ংকর মরণফাঁদের মতো হয়ে উঠতে পারে?
ভীম হাতি বলল-আমি জিজ্ঞাসা কইরলাম নীল পোশাক-পরা লোকটাকে, জাহাজ এখন কউঠি আছে? লোকটা বুইলল-জাহাজ এখন সাগর দ্বীপের একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে, জোয়ার হলি ছোটো জাহাজ আসবে৷ পথ দেখিয়ি নিয়ি যাবে হলদিয়া বন্দরে৷
তাতাইয়ের খুব মজা লাগে শুনতে৷ হলদিয়া বন্দরের কথা তো সে ভূগোল বইয়ে পড়েছে৷ সেই হলদিয়া বন্দর সত্যি সত্যি কোথাও আছে তাহলে? তানজানিয়ার দার-এস-সালাম, ইংল্যান্ডের লিভারপুল, আমেরিকার নিউইয়র্ক বন্দরের মতো হলদিয়া বন্দরেও তো জাহাজ নিয়ে যাওয়ার কতদিনের ইচ্ছা তার৷ কম্পাসটা মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে ভাবে তাতাই-একদিন না একদিন নিশ্চয়ই বেরিয়ে পড়বে সে-আবিষ্কার করতে নতুন নদী, নতুন আগ্নেয়গিরি, নতুন গ্লেসিয়ার, আর এই কম্পাসটাই হবে তার সব চাইতে বড়ো বন্ধু, যে কখনোই দিগভ্রষ্ট হতে দেবে না তার জাহাজকে৷
ভীমাকাকুর গল্প গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো৷ কিন্তু একটা প্রশ্ন তার মনে জাগছিল যার উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছিল না৷ তাতাই বলে-আচ্ছা কাকু, তোমরা তো ডাঙা খুঁজে পাওনি তাহলে সেই গাংপায়রা এল কোত্থেকে?
একটা শুকনো ঝাউয়ের ডাল দিয়ে বালির উপর আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বলে ভীম-এই কথাটা আমার মাথায়ও এসিছিল৷ জাহাজের ডাক্তার যখন দেখতি এল আমি বুইললাম-আশেপাশে কোনো ড্যাঙা আছে কি না কিংবা ছোটখাটো চরা? ডাক্তার বুইলল যে আমাদের যেখান থেকতি তুলি আনা হয়িঠে সেঠি নাকি ড্যাঙার চিহ্নমাত্র নাই, সেঠি মহাসমুদ্র, জলের রং তুঁতে গোলার মতো নীল৷ সেঠি শুধু মৌজা (ঢেউ), যেদিকি চাও শুধু মৌজা৷
তাতাই বোঝে, যে অদ্ভুত ভাষায় কথা বলছে ভীমকাকু তাতে মৌজার মানে নিশ্চয়ই ঢেউ৷ অর্থাৎ যেদিকে চোখ যায় শুধু ঢেউ৷
ডাক্তারের কথা শুনি আমি বুইললাম-ড্যাঙা নাই তো ড্যাঙার পাখি গাংপায়রা মাথার উপর চক্কর মেরি ডাকিথিলা কেন?
ডাক্তার বুইললেন-ও তোমার চোখের ভুল, যা মনে ভাবছিলে তাই চোখের সামনে দেখছিলে৷ তাই তোমার সত্যি বলে মনে হচ্ছিল৷ খিদে তেষ্টা ভয়ে দুশ্চিন্তায় এরকম হতে পারে৷ এ বড়ো সাংঘাতিক মনের অবস্থা, এ-অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকলে মানুষ পাগলও হয়ে যেতে পারে৷
একটু থেমে বলে ভীম হাতি-আমাদের মধ্যি যে কচি ছোকরা সেই নকুল দাঁড়ি, যার কথা বুইললাম তোমাকে, সে কিন্তু খানিকটা পাগলপানাই হয়ি গিয়িঠে৷ এখনও মাঝরাতে একটু হাওয়ার শব্দ হলিয়ি তড়াক কইরে বিছানা থেকতি লাফায়ি উইঠে চিৎকার করতি থাকে-পালাও, পালাও সব-হাতিশুঁড় হাতিশুঁড়-৷ পাগল বলি এখন সে কোথাও আর কাজ পায় না৷ তার বউটা তাকে ঝিগিরি কইরে খাওয়ায়৷
একটু চুপ থেকে লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে ভীম বলে-বড়ো কষ্টের জীবন আমাদের খোকা৷
ভীম হাতি চুপ করলে মনে হয় আশেপাশের সব কিছু কেমন চুপ করে গেছে৷ কোথাও আর কোনো শব্দ নেই৷ বামুনবাদশা পাখিটা ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে কখন চুপ করে গেছে, শুধু কলমিলতার জঙ্গলে সেই পোকাটা ডাকছে কট কট শব্দ করে আর ঝাউ বনের মধ্য দিয়ে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে শোঁ শোঁ শব্দ করে৷
তাতাই বলে-কাকু, এতই যখন বিপদ তখন মাঝসমুদ্রে যাও কেন মাছ ধরতে?
ভীম হাতি কেমন ম্লান হেসে বলে-না গেলে যে আরও বড়ো বিপদ খোকা৷ খাবু কী? আর কোনো কাজ তো জানা নেই আমাদের৷ শুধু মাছ ধরতিই জানি৷
চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে ভীম, যেখানে একটা চিল ট্যাঁ ট্যাঁ করে পাক খেতে খেতে ডাকছে৷
ভীমের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে তাতাই৷ কত বয়স বোঝা যায় না ভীমকাকুর৷ জুতোর সুকতলার মতো গালের চামড়া কেমন শুকনো আর যে রোদ-ঝড়-জল-বৃষ্টির মধ্যে তাকে মাছ ধরতে হয় নদীতে সমুদ্রে তার দাগ যেন তার সারা মুখে৷ কিন্তু ভীম হাতির চোখ দুটো কী শান্ত৷ বাচ্চা ছেলের মতো কেমন অসহায় ভাব তার চোখে৷ তার যেন আর বয়স বাড়েনি৷ অনেক বই পড়েছে তাতাই৷ এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, শহুরে মানুষের থেকে অনেক দূরে গাছপালা নদীখাঁড়ি সমুদ্রের মধ্যে থাকার ফলে তার বয়স যেন আর বাড়েনি৷ বয়স বাড়ে তো শুধু মানুষের৷ এই ঝাউ বন, কলমির জঙ্গল, বালির চর, মাথার উপর চক্কর মারা বামুনবাদশা পাখি এদের কি আর বয়স বাড়ে?
হঠাৎ তাতাইয়ের বুকের মধ্যে যে কী করে ওঠে তা সে কাউকে বোঝাতে পারবে না৷ চোখ দেখে বুঝতে পারেনি তাতাই কিন্তু হাত-পায়ের দিকে তাকিয়ে বুঝতে অসুবিধে হল না, ভীমকাকুর বয়স আসলে প্রায় তার দাদুর মতোই৷ দাদুর মতোই ফাটা কোঁচকানো ওর হাত-পায়ের চামড়া৷ এই বয়সে তো আরামে বিশ্রাম নেওয়ার কথা৷ যেমন দাদু এখন আর কোনো কাজ করে না৷ সারাদিন আরামকেদারায় বসে বই আর খবরের কাগজ পড়ে৷ টি.ভি. দেখে, মাঝে মাঝে তাতাইকে গল্প শোনায়, নানা দেশ-বিদেশের গল্প৷ বিকেলে মাঝে মাঝে তাতাইয়ের হাত ধরে টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে পার্কের বেঞ্চে গিয়ে বসে, সেখানে দাদুর অনেক বন্ধুবান্ধব, তাদের সঙ্গে জমিয়ে গল্প করে৷ দাদু বুড়ো মানুষ বলে তার কত আদরযত্ন বাড়িতে৷
কিন্তু ভীমকাকুর এসব কিছুই নেই, ভীমকাকুর টি.ভি. নেই, আরামকেদারা নেই, বই নেই, পার্ক নেই-ভীমকাকুর সামনে শুধু ধু-ধু জল আর জল, যাকে ভীমকাকু বলে বার-গাং৷ এই বুড়ো বয়সে ভীমকাকুকে যেতেই হবে সেখানে মাছ ধরতে আর তেমন ঝড়ে পড়লে ভেসেও যেতে হবে উত্তাল সুমদ্রে যার কোনো কূলকিনারা নেই, দাঁড় বেয়ে কোনদিকে যেতে হবে তাও জানা নেই, কেননা তার হাতে কোনো কম্পাস নেই, কেউ কম্পাস কিনে দেয়নি ভীমকাকুকে৷
হঠাৎ তাতাই বুঝতে পারে ভীমকাকুর জন্য তার মনে এমন এক অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছে যার ঠিক নাম তার জানা নেই৷ ভীমকাকুর জন্য কিছু করতে পারলে যেন তার বুকের এই কষ্টটা কমতো কিন্তু সে তো বাচ্চা ছেলে, কীই বা করার আছে তার?
হঠাৎ মাথায় একটা ভাবনা খেলে যায় তাতাইয়ের৷ পকেট থেকে কম্পাসটা বের করে বলে-এটা তুমি নাও ভীমকাকু, তোমাকে দিয়ে দিলাম৷
ভীম হাতি কিছু বুঝতে না পেরে বলে-এটা তো ঘড়ি খোকা, আমরা মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, ঘড়ি দিয়ি কী করব? আমাদের ঘড়ি লাগেনি খোকা, সূর্য দেখি আমরা সময় ঠিক বুঝতি পারি৷
তাতাই বলে-আর সূর্য যদি মেঘে ঢাকা থাকে তাহলে?
ভীম বলে-তাও বুঝতি পারি খোকা, জোয়ার-ভাঁটা দেখি, কখন বামুনবাদশা পাখি ডেকে ওঠে তাই শুনি৷ এক পো জোয়ারে ডাকে বামুনবাদশা পাখি৷
তাতাই বলে-এটা ঘড়ি নয় ভীমকাকু, এটা কম্পাস৷
ভীম হাতি কেমন সন্দিগ্ধ স্বরে বলে, কী হয় ও দিয়ি?
-বার-গাঙে গিয়ে যদি আবার ঝড়ে পড়, মেঘে সূর্য ঢাকা পড়লে যদি দিক ঠিক না করতে পার তখন এই কম্পাস তোমাকে বলে দেবে কোনটা উত্তর আর কোনটা দক্ষিণ দিক৷ ভূগোল বইয়ে আছে কাকু, বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিকে সুন্দরবনের ডাঙা, দক্ষিণদিকে ধু-ধু সমুদ্র একেবারে দক্ষিণ মেরু অবধি৷ এই কম্পাস হাতে থাকলে বোঝা যাবে কোনটা দক্ষিণ দিক৷ মাথা খারাপ না হলে সেদিকে যাবে বলে কেউ আর দাঁড় বাইবে না৷ এই নাও, হাতে নিয়ে দেখো একবার৷
তাতাই প্রায় জোর করেই কম্পাসটা গুঁজে দেয় গিরগিটির চামড়ার মতো ভীমের শুকনো খড়খড়ে হাতে৷
বাচ্চা ছেলে যেমন হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নতুন খেলনা দেখে তেমনি কম্পাসটা দেখতে থাকে ভীম হাতি৷
তাতাই খুব নরম গলায় বলে-নিয়ে নাও ওটা ভীমকাকু, এটা সঙ্গে থাকলে আর কোনো ভয় নেই, যদি প্রলয়ও হয় তাহলেও তুমি দিক হারাবে না৷ কোনদিকে ডাঙা জানতে পারবে৷
হঠাৎ ভীম হাতি কেমন অস্থির ভাবে কম্পাসটা জোর করে তাতাইয়ের হাতে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করে বলে -না, না৷ আমরা অসভ্য গেঁয়ো মানুষ৷ এসব দিয়ি আমার কী হবে? তোমার জিনিস তুমি নিয়ি নাও৷

তাতাই মাথা ঝাঁকিয়ে বলে -না, না, এটা তোমার৷ আমি তোমাকে দিয়ে দিয়েছি৷ একবার কোনো জিনিস দিয়ে দিলে আমি তা ফেরত নিই না৷
কথাটা বলেই তাতাই পাঁই পাঁই করে সামনে ছুটতে থাকে পাছে কম্পাসটা ভীমকাকু জোরজবরদস্তি করে ফেরত দিয়ে দেয় তাকে৷ বালির ঢিবি আর কলমিলতার ঝোপের মধ্য দিয়ে ছুটতে থাকে তাতাই আর মাঝে মাঝে পিছন ফিরে দেখে সেই মজার দৃশ্য৷ রোগা ঢ্যাঙা একটু বুড়ো মানুষ কাঁধে একটা লম্বা বাঁশের লাঠি আর থলির মধ্যে একটা কচ্ছপ নিয়ে অবাক চোখে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে কম্পাসটা আর হাত নাড়িয়ে ডেকেই চলেছে তাতাইকে৷
তাতাইও ছুটে চলেছে সামনে৷ এ যাবৎ তার জীবনের সবচেয়ে মহামূল্যবান জিনিসটা সম্পূর্ণ অজানা অচেনা একজন মানুষকে এইমাত্র দিয়ে এল সে৷ কিন্তু একটুও দুঃখ হল না তার জন্য৷ বরং আনন্দে ভরে যাচ্ছিল মনটা৷ এই কম্পাসটা নিয়ে একদিন কলম্বাসের মতো বেরিয়ে পড়ে একটা নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করবে সে ভেবেছিল কিন্তু কেউ জানে না এইমাত্র সে এমন একটা নতুন দেশ আবিষ্কার করল যা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন