অভিজিৎ সেনগুপ্ত

কুমিরাগণ্ডা খালটা বার-গাঙে পড়ার মুখে বাঁ-দিকে যে বাঁক নিয়েছে সেই বাঁকে বিরাট একখানা গাব গাছ ছিল পুরোনো আমলের৷ গাঁয়ের খুব প্রাচীন মানুষেরা দেখেছে সেই গাছটা৷ সেই গাবের কষ দিয়ে আগে জাল মজবুত করা হত বলে, গাঁয়ের নামই হয়ে গেছে কষতলা৷ সুন্দরবনের একেবারে গা ঘেঁষেই গ্রামটা৷
জেলেদের ছেলে নকুল৷ সুন্দরবনের আর সব জেলেদের মতো নকুলরাও খুব গরিব৷ সারাদিন রোদে বৃষ্টিতে হাড়ভাঙা খেটে তবে পান্তা নুন জোটে ওদের৷ একটা 'ছোট' (এক ধরনের মাছ ধরার নৌকো) নিয়ে নকুলের বাবা ও আর ক-জন জেলে কাক-ডাকা ভোরে বেরিয়ে যায় বার-গাঙে মাছ ধরতে-ফিরে আসে হাঁড়িভাঙা চরের পেছনে সূর্য ডুবে গেলে৷ ছোটটা অবশ্য ওদের নয়-এ তল্লাটের খুব বড়ো মহাজন সন্তোষ দাসের৷ ওরা সন্তোষ দাসের মাইনে করা লোক৷
সন্ধ্যে বেলা ছোট এসে পাড়ে লাগতেই নকুল ছুটতে ছুটতে সেখানে যায়৷ ওর খুব মজা লাগে দেখতে জালের ভেতর আটকে পড়া কত রকমের সামুদ্রিক প্রাণী৷ নাইলনের নীল জালটা ফুলে একেবারে ঢোল হয়ে আছে৷ মেদ চ্যালা কই ভোলা ইত্যাদি রকমারি মাছ তো আছেই-আর আছে বিরাট কাঁটাওয়ালা কাঁকড়া, করাতমুখো হাঙর, পাথরের চাঁইয়ের মতো ইয়া বড়ো কচ্ছপ, এমনকী গাঙের সাপও৷ অদ্ভুত দেখতে সাপগুলি৷ লেজটা চ্যাপটা-মাছের মতো, সাঁতার কাটার সুবিধের জন্য৷ নকুল শুনেছে ভয়ানক বিষাক্ত৷ কিন্তু স্বভাবে কুঁড়ে বলে নাকি কাউকে কামড়ায় না৷ গাঙের সাপের কামড়ে কেউ কখনো মারা গেছে বলে নকুল শোনেনি আজ অবধি৷ আরও কত বিচিত্র রহস্যময় প্রাণী আছে গাঙের কালো জলে কে জানে?
নকুলের পীড়াপীড়িতে একবার ওর বাবা ওকে নিয়ে গিয়েছিল বার-গাঙে৷ হাঁড়িভাঙা চরের কাছে৷ ইলিশ মাছ ধরবে বলে ছাঁদিজাল পেতে দুটো রাত ওরা কাটিয়েছিল সেই ছোট নৌকায় খোলা আকাশের নীচে৷ যতদূর চোখ চলে খালি কালো নীল জল৷ চারিদিকে সাদা ঢেউগুলো কেশর ফোলানো সিংহের মতো গর্জন করে ধেয়ে ধেয়ে আসছে ওদের দিকে৷ নকুল কিন্তু মোটেই ভয় পায়নি৷ ওর মজাই লাগছিল ঢেউগুলোর কাণ্ডকারখানা দেখে! হালে বসা লক্ষ্মণ মাঝিকে জিজ্ঞেস করেছিল, লক্ষ্মণদাদা, হাঁড়িভাঙা চরের ওদিকে যাওয়া যায় না?
মাথা খারাপ? -হাতের কলকেয় একখানা জোর টান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলে লক্ষ্মণ, দেখছ না কী ঢেউ? ওইখানেই তো পৃথিমীর শেষ৷
পৃথিবীর শেষ?-অবাক হয়ে বলে নকুল৷
-হুঁ৷ লোকে তো তাই বলে৷
নকুল অবাক হয়ে সামনে চেয়ে থাকে৷ পৃথিবীর শেষ! লক্ষ্মণদাদা যখন বলেছে তখন তাই৷ লক্ষ্মণদাদার মতো পুরোনো মাঝি তো আশেপাশের বিশ-পঁচিশখানা গাঁয়ের মধ্যে কেউ নেই৷ সুন্দরবনের সব নদীনালা তো ওর হাতের রেখার মতো চেনা৷ কিন্তু পৃথিবীর শেষই যদি হবে তাহলে ওর ওপারে কী আছে? ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে নকুলের৷
সপ্তমুখীর পারে বালির চড়ায় একটা উলটোনো নৌকোর ওপর বসে এইসব কথাই ভাবছিল নকুল৷ সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার নেমে আসছে জলের ওপরে৷ গাং থেকে এখনও ফিরল না কেন বাবা?
ভীমকাকুর ছেলে হরেন কাছে এসে বলল, ভূতের মতো বসে রইচিস কেন রে নকুল? ভাসা জিনিস খুঁজবিনি?
-উঁ৷ খুঁজব৷ যা আমি যাচ্ছি-
জোনাকির মতো আলো ঘুরছে গাঙের অন্ধকারে৷ হাতে লম্ফ হারিকেন নিয়ে এ-গাঁয়ের ও-গাঁয়ের ছেলে-বুড়োরা গাঙের পারে ঘুরে ঘুরে ভাসা জিনিস কুড়োচ্ছে৷ প্রতিটি কোটালেই ওরা এসে জড়ো হয় বড়ো গাঙের পারে৷ বেশ একটা নেশার মতো৷ বড়ো গাং থেকে কত মজার মজার জিনিসই যে জোয়ারে ভেসে আসে সপ্তমুখীর পশ্চিম দিকের চড়ায়৷
গত চৈত্র মাসের কোটালে ওদের গ্রামের প্রজাপতি কুইতি পেয়ে গেল মস্ত বড়ো এক টিন৷ তার গায়ে কী সুন্দর সব রঙিন নকশা কাটা৷ কী থাকতে পারে টিনের মধ্যে? বাড়ি নিয়ে গিয়ে টিন খুলতেই প্রজাপতির চক্ষু ছানাবড়া৷ টিনভরতি থরে থরে সাজানো রসগোল্লা৷ আনন্দে চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসার দশা প্রজাপতির৷ অত্যন্ত গরিব লোক সে৷ একসঙ্গে এতগুলো রসগোল্লা জীবনে দেখেইনি৷ এক সপ্তাহ ধরে প্রজাপতি আর তার বাড়ির লোকেরা পিঁপড়ের মতো খুঁটে খুঁটে খেয়েছিল সেই রসগোল্লা৷ গাঁয়ের আর একজন জেলে কার্তিক জানা-গত বছর সাঁড়াসাঁড়ির কোটালে ভাসা জিনিস কুড়োতে গিয়ে দেখে একটা বেঁটে গরান গাছের নীচে পেটমোটা একটা রবারের থলি পড়ে আছে৷ মুখটা সিল করা৷ ছুরি দিয়ে মুখটা খুলে দেখে থলি-ভরতি এলাচ, লবঙ্গ আর দারচিনি-গন্ধে ভুরভুর করছে৷ কাকদ্বীপের বাজারে এলাচ, লবঙ্গ, বিক্রি করে কার্তিক জানা ক-টা দিন বেশ গায়ে সেন্ট মেখে নবাবি করে বেরিয়েছিল৷ ভীমকাকু একবার পেয়েছিল আশ্চর্য একটা জিনিস-রাজসিংহাসনের মতো সূদৃশ্য একটা পেতলের গিল্টি করা চেয়ার৷ বকখালি খাঁড়ির মুখে ভাসছিল৷ ভীমকাকু কিন্তু সেটা বিক্রি করেনি৷ বাড়িতে রেখে দিয়েছে৷ সারাদিন জাল টানার পর সন্ধ্যে বেলা হাত-পায়ের কাদা ধুয়ে ফেলে সেই চেয়ারের ওপর পরম সুখে রাজার মতো গ্যাঁট হয়ে বসে ভীমকাকু ভুড়ুক ভুড়ুক শব্দে হুঁকো টানে৷
গাঁয়ের বড়োদের মুখে শুনেছে নকুল হাঁড়িভাঙা চরের ওপাশ দিয়ে যে সমস্ত জাহাজ যায় সে সমস্ত জাহাজ থেকেই নাকি এসব জিনিস ভেসে আসে৷ জাহাজের লোকেরা তাহলি খালি রসগোল্লা খেয়েই থাকে নাকি! নকুল কখনো জাহাজ দেখেনি৷ গাঁয়ের অনেকেই অবশ্য দেখেনি৷ লক্ষ্মণদাদা একবার নাকি দেখেছিল৷ হাঁড়িভাঙা চরের এক-পো ভাঁটা দূর দিয়ে যাচ্ছিল৷ দেখে তাজ্জব লক্ষ্মণদাদা৷ জলের ওপর দিয়ে যেন একখানা গোটা রাজপ্রাসাদ ভেসে যাচ্ছে৷ তা তারা রসগোল্লা খাবে তাতে আর আশ্চর্য কী৷ নকুলের খুব ইচ্ছে একবার জাহাজে করে দেখে আসে পৃথিবীর শেষটা কীরকম৷ নৌকো থেকে লাফ দিয়ে নেমে জলের ধারে যাবে নকুল-হঠাৎ অন্ধকারে ঢেউয়ের গর্জন ছাপিয়ে একটা ভারী গম্ভীর শব্দ-ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং৷ যেন পাতালের নীচ থেকে উঠে আসছে আওয়াজটা৷
নকুল থমকে দাঁড়িয়ে দেখল-জোনাকির আলোগুলো এধার-ওধার ছোটাছুটি করতে করতে এক জায়গায় এসে জড়ো হল৷ জল ছেড়ে পাড়ের দিকে ছুটতে ছুটতে আসছে তারা৷ ভরত পাইক সবার আগে লন্ঠন হাতে৷ পিছে পিছে আর সবাই৷ লন্ঠনের লাল আলোয় ভরতের ভয়-মাখানো মুখটা দেখে নকুলের গা-টাও কেমন ছমছম করে ওঠে৷ অশরীরী ভূত-প্রেত-পিশাচ ছাড়া ভরত পাইক দুনিয়ার আর কোনো কিছুকেই পরোয়া করে না৷ সেই ভরত পাইকের মুখেও ভয়! সত্যি কি তাহলে ভূতপ্রেতেরই শব্দ ওটা?
নকুল নিশ্বাস বন্ধ করে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ভরতকাকু?
সেই শব্দটা৷ -ঠোঁটে আঙুল রেখে ফিসফিস করে বলল ভরতকাকু, শিগগির বাড়ি চল৷ ভালো ঠেকছে না৷ আওয়াজটা বড়ো জোর হচ্ছে৷
দলের সবচেয়ে বুড়ো মানুষ সহদেব জেলে সবার উদ্দেশে বলল, বাড়ির বাইরে কেউ থাকবে না আজ৷ বয়স তো কম হল না বাপু-এরকম জিনিস তো আগে দেখিনি৷
সবাই মিলে গাঁয়ের দিকে ছুটতে থাকে৷ সপ্তমুখীর মুখে অন্ধকার জঙ্গল থেকে শব্দটা ক্রমাগত ভেসে আসছে-ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং৷
ব্যাপারটা ঘটেছিল মাস খানেক আগের পূর্ণিমার কোটালে৷ ধবধবে সাদা ফুলবাতাসার মতো চাঁদ উঠেছিল সেদিন গাঙের ওপরে৷ এত জ্যোৎস্না যে কলাপাতার গায়ের শিরাগুলি অবধি দেখা যায়৷ ভরত পাইকের হঠাৎ বেমক্কা শখ হল সে জ্যোৎস্না রাতে সপ্তমুখীর খাড়িতে মাছ ধরবে৷ যেই মনে হওয়া খ্যাপলা জাল কাঁধে ফেলে রওনা হয়ে গেল সে৷ গাঁয়ের সবাই জানে ওদিকের খাঁড়িগুলোয় ভেটকি আর ভাঙন ওঠে খুব কিন্তু তবুও বুনো শুয়োরের দারুণ উপদ্রব বলে জেলেরা বিশেষ ঘেঁষে না ওদিকে৷ তার ওপরে বছর পাঁচেক আগে ওখানে একটা হেঁতালের ঝোপে বরেন গিরির কঙ্কাল দেখতে পাওয়ার পর থেকে যে দু-একজনও বা কালেভদ্রে আসত তারাও আর আসে না৷ কিন্তু ভরতের ঘাড়ে যেন ভূত চেপেছিল৷ তিন দিন ধরে সে খাল-বিল চষে একটাও মাছ পায়নি৷ আজ তাকে মাছ ধরতেই হবে৷ যে করেই হোক৷ রোখ চেপে গেছে তার৷
সপ্তমুখীর খাঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছোতেই কিন্তু ভরতের সব সাহস কর্পূরের মতো উবে গেল৷ কী ভৌতিক জ্যোৎস্না চারদিকে- একটা বামুনবাদশা পাখি ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দে আকাশে লাফিয়ে উঠেই আবার হেঁতালের জঙ্গলে ডুবে গেল৷ ভয় পেলেই ওরা ডাকে ওরকম৷ কীসের ভয় পেয়েছে পাখিটা? বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠল৷ তারপর সেই ধবধবে জ্যোৎস্নায় হঠাৎ সামনে হেঁতাল জঙ্গলের সরু সয়ালটার (জন্তুজানোয়ারের চলার সরু রাস্তা) দিকে চোখ পড়তেই ভরত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল৷ সয়াল ফুঁড়ে উঠেছে কালো একটা খুপড়ি ঘর আর তার মাথায় সাদা কাপড় পরা একটা লোক৷ দৃশ্যটা এত অসম্ভব যে ভরত খানিকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকল৷ এই বিজনবিভুঁই জঙ্গলে রাতারাতি ঘর তুলতে আসবে কে! স্বপ্ন দেখছে না তো সে? হঠাৎ মনে পড়ে গেল পাঁচ বছর আগে ওই হেঁতাল গাছের কাছেই না কাঁকড়া ধরতে এসে বরেন গিরির কঙ্কালটা আবিষ্কার করেছিল সে! তাহলে কি-
হঠাৎ জম্বুদ্বীপ থেকে একটা দমকা হাওয়া পাক খেয়ে উঠে গেঁয়ো গরানের পাতা কাঁপিয়ে উত্তরে কালীর থানের দিকে চলে গেল৷ সঙ্গেসঙ্গে খুপরি ঘরটার পেটের ভেতর থেকে আওয়াজ উঠল ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং৷ ভরতের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল৷ ওই আওয়াজটার অর্থ একটাই৷ এরপরও যে ভরত মাথা ঠিক রেখে সোজা কষতলামুখো দৌড়োতে পেরেছিল এতেই বোঝা যায় কী দুরন্ত সাহস ভরতের৷ অন্য কেউ হলে ওখানেই ভিরমি খেয়ে পড়ে যেত৷ জাল কাঁধে বালির চড়ার ওপর দিয়ে প্রায় মাইল খানেক ছুটে সে বিশু পড়ুয়ার বাড়ির কাছে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল৷ আর সে রাতেই গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে গেল বরেন গিরির প্রেতাত্মা সপ্তমুখীর মুখে এসে ডেরা বেঁধেছে৷ গ্রামের যে দু-একজন লোক প্রথমটায় সন্দেহ প্রকাশ করেছিল তাদেরও সন্দেহভঞ্জন হল যখন রাতের জমাট স্তব্ধতাকে ফালা ফালা করে চিরে ফেলা সেই শব্দটা তারা স্বকর্ণে শুনতে পেল৷ ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং৷ পাঁচ বছর আগে বরেন গিরি একটা ঘণ্টা বাঁধা লাঠি হাতে যখন গ্রামের রাস্তায় হেঁটে বেড়াত তখন এইরকম শব্দ হত৷ এতদিন পর বরেন গিরির আত্মা কি তবে সপ্তমুখীর মুখে ফিরে এসে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে?
এরপরই যতসব অদ্ভুত অলক্ষুণে ঘটনা ঘটতে থাকল গ্রামে৷ কষতলার মেয়ে-বউরা দঙ্গল বেঁধে গিয়েছিল কালীর থানের জঙ্গলে নুন তৈরির মাটি চেঁচে ঝুড়ি বোঝাই করতে৷ পাউডারের মতো মিহি সাদাটে মাটি আছে সেখানটায়-জোয়ারের জলে বয়ে আসা নুন জমতে জমতে মাটি সেখানে এত লবণাক্ত যে এক গুছি ঘাসও জন্মাতে পারে না-ঘন জঙ্গলের চুলের মধ্যে সমতল জায়গাটা দেখায় যেন টাকের মতো৷ ওই মাটি জলে ধুয়ে জাল দিয়ে নুন বানায় গ্রামের লোকেরা৷
তা ওরা যখন ঢুকল জঙ্গলে তখন দুপুর বারোটা আন্দাজ হবে-ঠাঠা রোদ৷ কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই-হঠাৎ একপাল শেয়াল একসঙ্গে কেঁদে উঠল জঙ্গলের মধ্যে হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া-হুক্কা হুয়া-আ আ কান্নার শব্দটা ঢেউয়ের মতো মিলিয়ে গিয়েছিল তমলুক চড়ার ওপর দিয়ে৷
আতঙ্কে মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল ওদের৷ সাত-আট বছর আগে এমনি একদিন ভরদুপুরে শেয়ালের পাল কেঁদে উঠেছিল হরিপুর গ্রামে আর সে বছরই সর্বনাশা ওলাওঠায় উজাড় হয়ে যেতে বসেছিল গ্রাম৷ নুনমাটি তোলা মাথায় থাকল ওদের৷ পড়ি কি মরি করে ছুটতে ছুটতে এসে খবর দিল গ্রামে যে দিনে-দুপুরে কালীর থানে শেয়ালের কান্না শোনা গেছে৷ ভয়ে সবার বুক কেঁপে উঠল৷ একটা মহা বিপদ ঘনিয়ে আসছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ কিন্তু বিপদটা কীসের তা কে বলে দেবে?
ঠিক এর হপ্তা খানেক পরেই আর একটা কাণ্ড৷ ক-দিন ধরেই আকাশ মেঘলা-ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে৷ বেলা তিনটে-চারটে নাগাদ হঠাৎ কষতলার মানুষরা চমকে উঠল একটা আকাশ-কাঁপানো শব্দে৷ যেন হাজারখানা কামান একযোগে গর্জন করছে কোথাও৷ ভূমিকম্প নাকি? যে যার মতো ছুটে বাড়ির বাইরে চলে এল৷ বাইরে আসতেই ওরা এমন এক দৃশ্য দেখল যা জীবনে কখনো দেখেনি৷ পাতিচুনিয়ার বাঁধের ওপরের বুড়ো গেঁয়ো গরান গাছগুলিকে ঝুঁটি ধরে শূন্যে তুলে কোন মহা বলশালী দৈত্য আকাশে তাদের নিয়ে লোফালুফি খেলছে৷ মাটি থেকে আকাশ অবধি খাড়া হয়ে উঠেছে একটা অতিকায় শঙ্খচূড়ের ফণা আর সেই ফণার ভেতরে শুকনো পাতার মত পাক খাচ্ছে ঘরের চাল, দরমার বেড়া, হাঁড়ি-কুঁড়ি, থালা-বাটি আরও কত কী৷ গর্জন করতে করতে ফণাটা চেনা-গাঙের দিকে মিলিয়ে গেল৷
হুঁশ ফিরে পেয়ে কষতলার লোকেরা পাতিচুনিয়ার দিকে ছুটল৷ গিয়ে দেখে গোটা গ্রামটাই যেন কোন ভোজবাজিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে৷ যেন পাগলা হাতির দঙ্গল দলে পিষে গোটা গ্রামটাকেই মিশিয়ে দিয়েছে মাটির সঙ্গে৷ কান্নার রোল পড়ে গেল সমস্ত গ্রামে৷
সেই ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে গ্রামের লোকেরা বলাবলি করতে লাগল এরকম ভয়ানক হাতিশুঁড় তারা জীবনে দেখেনি৷ সুন্দরবনের লোকেদের বিশ্বাস, দুষ্ট আত্মার কাণ্ডকারখানা এগুলো৷ তারা যখন এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যায় তখন হাওয়া এরকম পাক খায়৷ এই আত্মাটা যে বরেন গিরির তাতে আর সন্দেহ কী? সপ্তমুখীর মুখে বরেন গিরি ডেরা বাঁধার পর থেকেই তো এইসব অলক্ষুণে কাণ্ডগুলি ঘটেই চলেছে৷
বরেন গিরির মৃত্যু হয়েছিল বছর পাঁচেক আগে৷ কষতলার লোকদের পরিষ্কার মনে পড়ে তার মারা যাওয়ার নিদারুণ ঘটনাটা৷
বরেন ছিল এ তল্লাটের সব সেরা মাঝি৷ ভীষণ ঝড়ের মুখে তার মতো নৌকায় হাল ধরার হিম্মত ছিল না গাঁয়ের আর কারও৷ সেরকমই পাকা জেলে ছিল সে৷ গাঙে জলের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারত কোথায় ইলিশের 'ঝালা' (ঝাঁক) যাচ্ছে৷ বার-গাঙ থেকে যখন মাছ ধরে ফিরত বরেন, নীল নাইলনের জাল ভরে থাকত সাদা মেঘের মতো ইলিশে৷ আর কোনো জেলের জালেই অত মাছ উঠত না৷ শুধু মাছ নয় গর্ত থেকে ভয়ানক বিষাক্ত 'তোপ' (কেউটে সাপ) ধরাতেও ওস্তাদ ছিল সে৷ গর্ত দেখেই বলে দিতে পারত সেখানে সাপ আছে কি না-থাকলে কী সাপ৷ ভয়ডর কাকে বলে জানত না বরেন৷ সুন্দরবনের হিংস্র বাঘ, সাপ, কুমির, এসব যেন তার কাছে নস্যি৷ বিপদে-আপদে ডাক পড়ত ওর৷ মজারও ছিল লোকটা৷ হাতে একটা গরানের চাঁচাছোলা ডাল নিয়ে ঘুরত-তার মাথায় বাঁধা ঘণ্টা৷ হাঁটলে টুং টাং টুং টাং শব্দ হত৷ গ্রামের লোকে জানত বরেন গিরি টহল দিচ্ছে রাস্তায়৷ বুকে বল ভরসা পেত তারা৷ ওই একটা ভারি মজার শখ ছিল বরেন গিরির৷
সেই বরেন গিরি এভাবে বেঘোরে প্রাণটা দেবে কে জানত? সেটা ছিল আশ্বিন মাস৷ পুজোর ক-দিন আগে৷ ক-দিন ধরেই আকাশ মেঘলা সঙ্গে এলোমেলো দমকা হাওয়া৷ বরেন ও আরও কয়েক দঙ্গল জেলে গেছে বার-গাঙে ইলিশ মাছ ধরতে৷ হাঁড়িভাঙা চরের কাছাকাছি পৌঁছে ওরা লম্বা ঝাউয়ের খুঁটি গভীর জলের নীচে পুঁতে তার সঙ্গে ছাঁদি জাল আটকে দিল৷ ইলিশের ঝাঁক ওখান দিয়ে গেলেই ওই জালের ফাঁসে আটকা পড়বে৷ হাঁড়িভাঙা চরে জাল পাতবার পরদিন থেকেই আকাশের গতিক খারাপ হতে শুরু করল৷ জেলেরা ঘন ঘন আকাশের দিকে তাকাতে লাগল৷ এই অকূল সমুদ্রে ঝড়ের মুখে পড়লে বাঁচার কোনো আশাই নেই৷ হাওয়ার বেগ কিন্তু ক্রমশই বাড়তে লাগল আর সেই হাওয়ায় ডানা মেলে বিরাট বিরাট কালো ইগলের মতো মেঘ দশ দিক থেকে উড়ে আসতে লাগল৷ বেগতিক দেখে মাঝিরা খুঁটি থেকে জাল খুলে নিয়ে রওনা দিল গাঁয়ের দিকে৷ কষতলা এখান থেকে দেড় ভাঁটার রাস্তা৷ আপ্রাণ দাঁড় টেনে, যে করেই হোক ঝড়ের মুখে পড়ার আগেই কোনো খাঁড়ি-টাড়িতে নৌকো ঢুকিয়ে দিতে হবে৷ দু-একজন সাহসী মাঝি যারা ভেবেছিল মাছ ধরতে থেকে যাবে, আকাশের ক্রমশই ভয়ংকর চেহারা দেখে তারাও নোঙর তুলে পালাল শেষ অবধি৷ থেকে গেল শুধু বরেন আর তার দলের কয়েকটি নৌকো৷ বরেনই যেতে দিল না তাদের৷ সুন্দরবনের জেলেদের আবার ঝড়ে ভয় কীসের? অত ভয় থাকলে মাছ ধরতে না এসে বাড়িতে বসে থাকলেই হয়৷
সেই রাতেই ঝড় শুরু হল৷ এরকম মারাত্মক ঝড় সুন্দরবনের জেলেরাও দেখেনি কখনো আগে৷ সেই সঙ্গে বৃষ্টি৷ যেন মহাপ্রলয় হচ্ছে কোথাও৷ আকাশটা ভেঙে গলে গাঙের জলে মিশে যাচ্ছে৷ চারপাশে শুধু লক্ষ লক্ষ অজগরের মতো ঢেউয়ের ক্রুদ্ধ ক্ষুধার্ত গর্জন৷ এই ঢেউয়ে নৌকো বাঁধা থাকলে ঢেউয়ের বাড়িতেই গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে৷ বেগতিক দেখে শেষে বরেন হুকুম দিল নৌকো খুলে দিতে৷ জেলেরা খুঁটি থেকে নৌকো খুলে সেই হিংস্র ঢেউয়ের হাতে ছেড়ে দিল নিজেদের৷ কিন্তু বরেনের নৌকো কিছুতেই খোলা গেল না আর৷ খুঁটির জালের ফাঁসে নৌকোটা বেকায়দায় আটকে গেছে৷ মুহূর্তে একটা হিমালয়ের মতো উঁচু ঢেউ ভীষণ রাগে আঁ-আঁ চিৎকার করতে করতে সপাটে এসে ভেঙে পড়ল বরেন গিরির নৌকোর ওপরেই৷ বোধ হয় তার এই স্পর্ধার জন্য তাকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে৷ সবার চোখের সামনেই টুকরো টুকরো হয়ে গেল নৌকোটা৷ নৌকোর মানুষগুলো সভয়ে দেখল উত্তাল সাদা ফেনার মধ্যে একটা ছোট্ট পোকার মতো বরেন হাবুডুবু খাচ্ছে৷ হাত শূন্যে তুলে কী বলার চেষ্টা করছে আপ্রাণ শক্তিতে, কিন্তু ঢেউ আর বাতাসের ভীষণ গর্জনে তা শোনা যাচ্ছে না৷ কারুর সাধ্যও নেই যে বরেনের দিকে এগোবে, তাকে উদ্ধার করবে-হাওয়া আর প্রচণ্ড স্রোতের টানে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ভেসে যাচ্ছিল তারা৷ দেখতে দেখতে তুমুল বৃষ্টির আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল বরেন৷ তারপর কী ঘটল কেউ জানে না৷

পরদিন বৃষ্টি থামল৷ শরতের আকাশ পরিষ্কার নীল৷ কে বলবে গতকালই ওরকম ভয়ানক দুর্যোগ গেছে৷ জেলেরা কষতলা ফিরে এল৷ এক রাত্রির আতঙ্কে তাদের মুখ-চোখ দেখাচ্ছে ভীষণ৷ ফিরল না শুধু জলের পোকা বরেন৷ গাঁয়ের লোকেরা ধরেই নিল বরেন মারা গেছে৷ যত পাকা সাঁতারুই হোক না কেন বরেন, ওই তুমুল তুফানের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা কোনো ডাঙার জীবের পক্ষে কি সম্ভবপর? তবুও গাঁয়ের অনেকেই বিশ্বাসই করতে পারছিল না বরেনের মতো লোক সত্যি সত্যি গাঙে ডুবে কখনো মারা যেতে পারে৷ এরই দিন দশেক পর সপ্তমুখীর মুখে মাছ ধরতে গিয়ে ভরত পাইক দেখল গেঁয়ো গাছের নীচে একটা সাদা কঙ্কাল চিত হয়ে পড়ে আছে৷ কঙ্কালটা বরেনের ছাড়া আর কার হতে পারে? কিন্তু বরেনের স্ত্রী কিছুতেই মানতে চায় না তার স্বামী জলে ডুবে মারা গেছে৷ বরেনের শ্রাদ্ধশান্তি হবে কী করে তাহলে? অপঘাতে মারা যাওয়া বরেনের আত্মা ঘুরে বেড়াবে গ্রামময়? শেষে নিরুপায় হয়ে কষতলার লোকেরা দল বেঁধে গেল সুরা গিরির কাছে৷ সুরা গিরি এ তল্লাটের ডাকসাইটে গুণিন৷ গাঁয়ের লোক সবাই ভয় করে তাকে৷
সুরা গিরি সব শুনে-টুনে একটা মাটির সরায় মন্ত্রপূত জল ঢালল৷ তারপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই জলের দিকে৷ গাঁয়ের লোকেরা নিশ্বাস বন্ধ করে দেখছে কি হয়৷
খানিকবাদে সুরা গিরি চিৎকার করে উঠল, দেখ, তোরা দেখতে পাচ্ছিস? গাঁয়ের লোকেরা ঝুঁকে পড়ল সরার ওপর৷ টলটলে জল৷ কী দেখার আছে এতে? এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে৷ সুরা গিরি বলল, দেখতে পাচ্ছিস না? ওই দেখ বরেন হাবুডুবু খাচ্ছে জলে ওই, ওই সাঁতার কাটছে ওই-যাঃ-সব শেষ৷
কী অদ্ভুত চোখ-মুখের ভঙ্গি সুরা গিরির৷ ভয়ে সবার গা শিউরে উঠেছে৷ কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুরা গিরি গম্ভীর স্বরে বলল, যা তোরা, বরেন নেই৷ শ্রাদ্ধশান্তি কর গিয়ে ওর৷ দেখিস অপঘাতে মারা গেছে-আত্মা যেন কষ্ট না পায় ওর৷
নিঃশব্দে ফিরে এল সবাই৷
পরদিনই গাঁয়ের পুরুত ডাকিয়ে শ্রাদ্ধশান্তি করা হল৷ গাঁয়ের লোকেরা চাঁদা তুলে ব্রাহ্মণভোজন করাল৷ বরেন গিরির বউ কেঁদে কেঁদে লোকের বাড়ি ঘুরে ঘুরে ক-দিন কাজ করল কিন্তু গাঁ-গেরামে লোকে কতদিন আর কাজ দেবে তাকে৷ বর্ষায় মাঠের কাজ নেই৷ ভিখ মাঙার অবস্থা বরেনের বউয়ের৷ শেষে হঠাৎ একদিন কাউকে না বলে কয়ে বরেনের বউ পাঁচ বছরের ছেলে হারুর হাত ধরে কোথায় যে চলে গেল-কেউ জানে না৷ বরেন গিরির ছিটেবেড়ার ঘরটা কুমিরাগণ্ডা খালের পারে রোদবৃষ্টিতে ভিজেপুড়ে শেষে একটা উইয়ের ঢিবির মতো দাঁড়িয়ে রইল৷ বাড়িটার কাছে বড়ো কেউ একটা ঘেঁষত না৷ চামচিকে আর ইঁদুরের একটা আড্ডা হল সেটা৷
সবাই জানত বরেন গিরি অপঘাতে মারা গেলেও তার আত্মা শান্তি পেয়েছে৷ লোকে বরেন গিরির মারা যাওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল প্রায়৷ কিন্তু পাঁচ বছর পর তার অতৃপ্ত আত্মা জেগে উঠে সপ্তমুখীর পাড়ে আবার পায়চারি শুরু করবে কে ভাবতে পেরেছিল?
ভরত পাইক আর সহদেব মাঝির পেছনে ছুটতে ছুটতে নকুল ও বাকি আর সকলে কুমিরাগণ্ডার বাঁকের কাছাকাছি পৌঁছোতেই কানে এল একটা আকাশ-ফাটানো আর্ত চিৎকার৷ ভয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল নকুল তারপর অন্ধকারে নজর চালিয়ে দেখল বাঁকের মুখে ঝাঁকড়া একটা তেঁতুল গাছের নীচে অনেক মানুষের জটলা৷ হ্যারিকেনের আলোয় লম্বা লম্বা ছায়া পড়েছে তাদের খালের জলে৷ কী হয়েছে ওখানে? ভয় করলেও দারুণ কৌতূহল হচ্ছিল নকুলের-ভিড়ের কাছে গিয়ে ভেতরে উঁকি মারতেই ভীষণ চমকে উঠল নকুল৷ নকুল দেখল লক্ষ্মীপিসি মাটির ওপর উবু হয়ে পড়ে আছে৷ ঝাঁটাকাটা চুল-গায়ের জামাকাপড় এলোমেলো-ধুলো কাদা মাখা সারা গায়ে-৷ শুয়ে শুয়ে যেন জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে প্রলাপ বকছে লক্ষ্মীপিসি-মাঝে মাঝে হঠাৎ ছিলাছেঁড়া ধনুকের মতো খাড়া উঠে বসে হা-হা করে অট্টহাসি হেসে উঠছে৷ হাসির দমকে সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে৷ কিন্তু নকুলের বেশ মনে হচ্ছিল হাসির মতো শুনতে লাগলেও ওটা আর যাই হোক হাসি নয়৷ গোল গোল চোখে লক্ষ্মীপিসি চাইছে ভিড়ের মানুষগুলির দিকে কিন্তু সে চাউনির কোনো অর্থ নেই৷
নকুলের বুকের ভেতর শিরশির করে উঠল৷ কী হয়েছে লক্ষ্মীপিসির?
পাশে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে লক্ষ্মীপিসির দাদা-রামকাকু৷ নকুলদের বাড়ির পাশেই রামকাকুদের বাড়ি৷
রামকাকু নরম গলায় বলছে, ওরকম করছিস কেন লক্ষ্মী? কী হয়েছে তোর?
লক্ষ্মীপিসি ফ্যালফ্যাল করে রামকাকুর দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ আঙুল তুলে চিৎকার করে উঠল, ওই, ওই যে আসছে আবার এদিকে৷
পাগলের মতো দাঁড়িয়ে উঠে সামনে ছুট লাগাবার উপক্রম করতেই রামকাকু ধরে ফেলল ওকে৷
-কে আসছে রে লক্ষ্মী? কে?
-তোমরা দেখতে পাচ্ছনি কে? বরেন গিরি? উই যে আসছে৷ উই যে-
হঠাৎ ধক ধক করে কাঁপতে কাঁপতে মাটির ওপর ঠাস করে পড়েই হাত-পা সিঁটিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল লক্ষ্মীপিসি৷
ভিড়ের মানুষরা হতভম্বের মতো তাকিয়ে আছে৷ এ সময়ে যে মেয়েটার মাথায় অন্তত কয়েক বালতি জল ঢালা উচিত তাও ওরা ভুলে গেছে ভয়ে আতঙ্কে৷
ভরত পাইক শুধু বিড়বিড় করে বলল, আমি বলিনি বরেন এসে ডেরা বেঁধেছে সপ্তমুখীতে-এ সবই তার কাজ-রাম রাম রাম রাম-
ছয়
লক্ষ্মী জানাকে ভূতে ধরেছে শুনে অন্ধকার তেঁতুল গাছটার নীচে গোটা কষতলাই যেন ভেঙে পড়ল৷ খালের জলে গেঁয়ো গরানের ঝোপে হারিকেনের আলো আর অন্ধকারের জড়াজড়ি৷
রাম জানার মুখ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনল গাঁয়ের লোকেরা৷
লক্ষ্মীর ট্যাংরা মাছ খাওয়ার খুব শখ৷ খালের জলে বিকেল বেলা কেঁচো গেঁথে দন (বড়শি) পেতে রেখে এসেছিল৷ সন্ধ্যে বেলা গিয়েছিল দন তুলতে৷ তাড়াতাড়ি চুল বাঁধতেও খেয়াল ছিল না৷ চুল ছাড়া দেওয়াই ছিল তার৷ শীতের সন্ধ্যে, ঝুপ করে অন্ধকার নেমে আসছে৷ লক্ষ্মী দন তুলে ফিরবে, হঠাৎ শোনে ফিসফিস করে কে ডাকছে, এই লক্ষ্মী, শোন না, এই লক্ষ্মী৷
ভর সন্ধ্যে বেলাটায় কে ডাকছে ওকে এমনি করে?
লক্ষ্মী তাকিয়ে দেখে হেঁতালের ঝোপের আড়ালে একটা কালো মূর্তি হাতছানি দিয়ে ডাকছে৷ লক্ষ্মী ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে যেতে মূর্তিটি তার কাছে এগিয়ে এল৷ সন্ধ্যার অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেল লক্ষ্মী অবিকল বরেন গিরিই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে৷
মা-রে-বলে একটা মরণ-চিৎকার করে লক্ষ্মী দন-টন ফেলে রেসের ঘোড়ার মতো ছুটে বাড়িতে পৌঁছে দাদাকে সমস্ত ঘটনাটা বলেই কাটা গাছের মতো ফিট হয়ে পড়ে গেল মাটিতে৷ তারপর থেকেই এই অবস্থা লক্ষ্মীর৷ বুঝতে বাকি রইল না কারুর বরেন গিরির ভূতই ঘাড়ে চেপেছে লক্ষ্মীর৷ ভর সন্ধ্যেয় চুল ছাড়া দিয়ে বেরোলে তো ধরবেই ভূতে৷
তেঁতুল গাছের নীচে ছোটোখাটো একটা মিটিং বসল গাঁয়ের মাতব্বরদের৷ শেষে ঠিক হল হরিপুর গ্রামের সুরা গিরিকে খবর দেওয়া হবে৷ সে এসে ভূত ছাড়াবে লক্ষ্মীর৷
কিন্তু কে যাবে খবর দিতে? হরিপুর অনেকটা দূর৷ অন্ধকারে কেউই আর এক-পা বাড়াতে রাজি নয়৷ শেষে ভরতই বুক ঠুকে বলল, আমি যাব৷ তার সাহস দেখে ধন্য ধন্য করে গাঁয়ের লোকেরা৷
সুরা গিরি যখন এসে পৌঁছোল তখন অন্ধকার হয়ে গেছে৷ খালের ধারে গেঁয়ো গরান গাছগুলো যেন ভয়ে গায়ের লোম খাড়া করে দাঁড়িয়ে আছে৷
বিরাট দশাসই চেহারা সুরা গিরির৷ করমচার মতো লাল টকটকে চোখ-মাথার চুল যেন হেঁতালের ঝোপ৷ গলায় রুদ্রাক্ষের মালা-কাঁধে একটা গেরুয়া থলি-হাতে চাঁচাছোলা হেঁতালের লাঠি৷ দেখলেই বুকের মধ্যে কেমন গুরগুর করে ওঠে৷ এ তল্লাটের সব মানুষ যেমনি ভক্তি করে ওকে তেমনি ভয় পায়৷ গ্রামের সবাই জানে সুরা গিরি খাঁটি পিশাচসিদ্ধ গুণিন৷ যত বেয়াড়া ভূত পিশাচই হোক না কেন সুরার হেঁতালের লাঠির ভয়ে সবাই কাঁটা৷ প্রতি অমাবস্যার রাতেই নাকি সুরা গিরি হরিপুরের শ্মশানে গিয়ে অবিকল বুনো শুয়োরের মতো দাঁত দিয়ে তুলসী গাছের গোড়ায় মাটি খুড়ে গর্ত করে৷ তারপর সেই গর্তে মাথা ঢুকিয়ে দিয়ে তুলসী গাছের শিকড় দাঁত দিয়ে কেটে আনে৷ সেই শিকড়ই নাকি সুরা গিরির ভুত ঝাড়বার মোক্ষম দাওয়াই৷ গ্রামের অনেকেই নাকি নিজের চোখে দেখেছে মাথা গর্তে ঢুকিয়ে পা ওপরে তুলে তুলসী গাছের শিকড় দাঁতে কাটছে সুরা গিরি৷ আঁতকে উঠে তারা পালিয়ে এসেছে৷
লক্ষ্মীর কাছে এসে কোমরে দু-হাত দিয়ে দাঁড়াল সুরা গিরি৷ হারিকেনের অল্প আলোয় তাকে ভীষণ লাগছিল দেখতে৷ সুরা গিরি মেঘ ডাকার মতো গলায় গর্জন করে উঠল, জানিস ইবলিশের বাচ্চা, আমি কে? দেখেছিস এটা? -সুরা গিরি হাতের লাঠিটা তুলে ধরল কোমরের ওপরে৷
লক্ষ্মীর মুখ ভয়ে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেছে৷ দু-হাত মাথার ওপরে তুলে কুকুরের বাচ্চার মতো কুঁকড়ে গিয়ে বলল, মেরো না আমাকে, মেরো না৷
হুঁ৷ হুঁশ হয়েছে তাহলে সুরা গিরিকে দেখে অ্যাঁ? তা বেশ, তোকে মারব না বরেন, -ভালোয় ভালোয় এক্ষুনি চলে যা, কথা দিচ্ছি নতুন করে ভালো ব্রাহ্মণ ডেকে তোর শ্রাদ্ধশান্তি করাব-যা চলে যা-
তেঁতুল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে নকুল ভয়ে ভয়ে সব দেখছে৷ ও বুঝতে পারছে না সুরা গিরি লক্ষ্মীপিসিকে বরেন বলে ডাকছে কেন৷
লক্ষ্মী কেঁদে উঠে বলল, আমি বরেন নই গো, আমি লক্ষ্মী৷
আলবত তুই বরেন-মেঘস্বরে গর্জন করে উঠল সুরা, সুরা গিরির সঙ্গে ন্যাকরাবাজি? দেখাচ্ছি তোকে মজাটা শয়তান-
ঝোলা থেকে কী একটা গুঁড়োমতো বের করে ফুঁ দিল সুরা গিরি তারপর ছুড়ে মারল লক্ষ্মীর ড্যাবডেবে চোখের দিকে৷ চোখ চেপে লক্ষ্মী ঃউ করে বসে পড়ার সঙ্গেসঙ্গে হাতের লাঠিটা সপাং করে চালাল সুরা গিরি সোজা লক্ষ্মীর পিঠ লক্ষ করে৷ সপাং সপাং সপাং বাতাস কেটে লাঠিটা পড়ছে লক্ষ্মীর পিঠে৷
-মেরো না গো আমাকে মেরো না-
-যা, তাহলে এক্ষুনি চলে যা৷
গ্রামের লোক বিস্ময়ে আতঙ্কে হাঁ করে দেখছে৷ নকুল ভয়ে প্রায় চোখ বুজে ফেলে৷
যন্ত্রণায় মাটির ওপর গড়াগড়ি খেতে খেতে বলে লক্ষ্মী, মেরো না গো মেরো না, আমি যাচ্ছি৷
বেশ, কী করে বুঝব তুই গেছিস? এই নে, এটা মুখে করে চলে যা-পায়ের ছেঁড়া চটিজোড়া লক্ষ্মীর মুখের সামনে ছুড়ে মারে সুরা গিরি৷
নকুল অবাক হয়ে দেখছে লক্ষ্মীপিসি চটিজোড়ার দিকে মুখ এগিয়ে আনছে৷ তাহলে সত্যিই বরেন গিরি ভর করেছে লক্ষ্মীপিসিকে৷ নকুল শুনেছে ভূত যখন চলে যায় কিছু মুখে করে নিয়ে চলে যায়৷
লক্ষ্মীপিসি সেই বিচ্ছিরি ধুলোকাদা মাখা চটিজোড়ার কাছে মুখ এনেই হঠাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে, আমি বরেন নই, আমি লক্ষ্মী-জুতো মুখে নিতে পারবনি আমি৷
তোর বাপ পারবে৷ পারবি কি না দেখাচ্ছি তোকে-সুরা গিরি একেবারে মাথার ওপর লাঠি তোলে৷
লক্ষ্মীপিসির চোখের তারা দুটো যেন ভয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে৷ হঠাৎ ঝোপের পেছন থেকে কে গম্ভীর ভরাট গলায় বলে ওঠে-খবরদার, মারবেনি ওকে৷ নামাও লাঠি বলছি৷
গ্রামের লোক অবাক৷ কার এত সাহস সুরা গিরির মুখের ওপর কথা বলে-অন্ধকারে লোকটার চেহারা স্পষ্ট দেখাও যাচ্ছে না৷ অল্প একটু জ্যোৎস্না এসে পড়েছে ওর মুখের ওপরে৷
সুরা গিরি কয়েক সেকেন্ড একেবারে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপরই বাঘের মতো হাঁকড়ে ওঠে, কে রে ওখানে, বেরিয়ে আয় হারামজাদা৷ বরেনের বাপ তুই?
আসছি-গম্ভীর গলায় জবাব আসে৷ ঝোপ থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে আসে মূর্তিটা৷ অদ্ভুত পকেটওয়ালা একটা নীল জামা নীল প্যান্ট পরা কিন্তু মুখটা ভালো দেখা যাচ্ছে না৷ ভরত পাইক একটা লন্ঠন তুলে নিয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলে, মস্ত মাতব্বর যে, দেখি বাপু তোমার বদনখানা-গুণিন ঠাকুরের মুখের ওপর কথা বলছ৷
ভরত লন্ঠনটা উঁচু করে তুলে ধরতেই লন্ঠনের আলোয় নকুল পরিষ্কার দেখতে পায় বরেন গিরিকে৷ নিষ্পলক চোখে সে তাকিয়ে আছে ভরতের দিকে৷
মা গো-বলে লন্ঠনটা মাটিতে ফেলে দিয়েই ভরত পেছন ফিরে পাগলের মতো ছুটতে থাকে৷ মাটিতে পড়ে লন্ঠনটা নিভে যাওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই তেঁতুল গাছের নীচে ঝিঙেবিচির মতো কালো ঘুরঘুট্টি অন্ধকার৷ চাকে ঘা-খাওয়া মৌমাছির মতো ছেলেবুড়ো যে যেদিকে পারছে ছুটছে৷ এমনকী লক্ষ্মীও মাটি থেকে সোজা স্প্রিংয়ের পুতুলের মতো লাফিয়ে উঠেই-বাবা রে খেয়ে ফেললে রে-বলেই সোজা বাঁধের ওপর দিয়ে দে দৌড়৷ চটি ফেলে সুরা গিরিও লম্বা ঠ্যাঙে ছোটে তার পেছন পেছন৷ চোখের পলকে তেঁতুলতলা শ্মশানের মতো খাঁ-খাঁ ফাঁকা৷ পালাতে পারেনি শুধু নকুল৷ ওর পেছনেই ছিল হেঁতালের ঝোপটা-পালাতে গিয়ে নকুল হুমড়ি খেয়ে পড়ে ঝোপটার ওপরে৷ হেঁতালের কাঁটায় কাপড় জড়িয়ে একাকার৷ কোনোরকমে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই দেখে একেবারে সামনেই দাঁড়িয়ে বরেন গিরি৷ পালাবার আর রাস্তা নেই৷ ভয়ে নকুলের জ্ঞানগম্যি লোপ পেয়ে গেছে৷ ক্ষুধার্ত অজগরের দৃষ্টির সামনে সম্মোহিত হরিণের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে নকুল৷ বরেন গিরি পায়ে পায়ে সামনে এগিয়ে আসছে৷ নকুল ভয়ে বিড়বিড় করতে থাকে-রাম রাম রাম রাম৷ নকুল বাবার মুখে শুনেছে রাম নাম নিলে ভূতপেতনি কাছে ঘেঁষতে সাহস পায় না৷

নকুলের দিকে তাকিয়ে আকাশ কাঁপিয়ে হো-হো করে হেসে ওঠে বরেনি গিরি৷ হাসির শব্দে তেঁতুল গাছ থেকে ঝটপট শব্দে উড়ে পালায় কয়েকটা বাদুড়৷
হাসতে হাসতে বলে বরেন গিরি, ভেবেছ আমি ভূত অ্যাঁ? ভূতের কখনো ছায়া পড়ে? ওই দেখ আমার ছায়া৷
আকাশে হালকা নীল শিঙের মতো বাঁকা একটা চাঁদ৷ অল্প একটু জ্যোৎস্না হয়েছে তাতে৷ নকুল দেখল গেঁয়ো গরান গাছের পাশাপাশি বরেন গিরিরও ছায়া৷ বরেন গিরি সত্যি সত্যি ভূত নয় তাহলে?
বুকে সাহস এনে নকুল জিজ্ঞেস করে-তাহলে তুমি সত্যিই আসল বরেনকাকু?
-হ্যাঁ৷ আমি মরিনি৷ সবাই দেখছি খুব ভয় পেয়ে গেছে আমাকে দেখে, ওদের গিয়ে বলো-আমি ভূত নই৷
নকুলের তবুও কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না বরেন গিরি বেঁচে আছে৷ পাঁচ বছর ধরে সে গ্রামের সবার কাছেই শুনে এসেছে যে বরেন গিরি মারা গেছে৷
হঠাৎ কী মনে পড়ে যাওয়ার মতো বরেন গিরি প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলল, দাঁড়াও একটা জিনিস দিচ্ছি তোমাকে৷
সুন্দর ঝকঝকে নীল-সাদা রাংতায় মোড়া একটা ছোট্ট মোড়ক নকুলের দিকে বাড়িয়ে বলল, এই নাও, একে বলে ক্যাডবেরি, ইতালি বলে একটা দেশ আছে সেখান থেকে আনা৷ খুব ভালো খেতে৷
নকুলের গা শিরশির করছিল৷ ক্যাডবেরির নাম সে কখনো শোনেনি৷ সেটা কীরকম খেতে? খুব লোভ হচ্ছে কিন্তু হাত বাড়াতেও ভয় করছে৷ যদি সত্যি সত্যি বরেন গিরি মরে গিয়ে থাকে৷ ছায়াটা যদি তার চোখের ভুল হয়!
বরেন বলল, কই ধরো৷
নকুল খুব ভয়ে ভয়ে হাত বাড়াতে বরেন গিরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভেবেছিলাম পাঁচ বছর পর ছেলেটাকে এসে দেখব-তার জন্য এক বাক্স ক্যাডবেরি নিয়ে এসেছিলাম৷ কিন্তু কোথায় কে-নাও তুমিই নাও৷
বরেন গিরির হাত থেকে রাংতার মোড়কটা নিতে গিয়ে ওর হাতে নকুলের হাত ঠেকে যায়৷ কই, ঠান্ডা নয়তো হাতটা! মানুষের হাতের মতোই গরম৷ নকুল শুনেছে ভূতেদের গা বরফের মতো ঠান্ডা হয়, রক্ত থাকে না বলে৷ এবার আর কোনো সন্দেহ নেই নকুলের, বরেনকাকু সত্যি সত্যি বেঁচে আছে৷ এ ভূত নয়, জ্যান্ত বরেনকাকু৷
বরেন গিরি বলল, এবার বাড়ি যাও নকুল৷ কালকে আবার এসো, তোমাকে আরও ক্যাডবেরি দেব৷ কে খাবে এত ক্যাডবেরি?
তুমি কোথায় থাকবে কাকু?-বরেন গিরির জন্য হঠাৎ যেন মন কেমন করে ওঠে নকুলের৷
-আমি? আমি ওই ঘরটাতেই থাকব৷-একটু চুপ থেকে বরেন গিরি জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা নকুল তোমার কাকিমা আর হারু কোথায় গেছে বলতে পার?
না৷-নকুল মাথা নাড়ে, কেউ জানে না কাকু, অনেকদিন আগে তারা এ গাঁ ছেড়ে চলে গেছে৷ তারা তো জানত না যে তুমি ফিরে আসবে৷ সবাই জানত তুমি বারগাঙে ডুবে মারা গেছ৷
অনেকদিন-বিড়বিড় করে বলে বরেন গিরি, আর তারা ফিরবে না তাহলে?
অনেকক্ষণ কেমন ঝিম মেরে থাকে বরেন গিরি তারপর একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলে, আমি যাই তাহলে নকুল৷ তুমি কাল সকালে এসো আমার কাছে৷
বাঁধের ওপর দিয়ে লম্বা পা ফেলে বরেন গিরি গেঁয়ো আর পশরের জঙ্গলের পেছনে অদৃশ্য হয়ে যায়৷
নকুলের বাড়ি বিশালাক্ষী মন্দিরের কাছাকাছি৷ বিশালাক্ষী সুন্দরবনের মানুষদের সুখ আর সমৃদ্ধির দেবী৷ কেউ কোনো বিপদে-আপদে পড়লে দেবী বিশালাক্ষীর মন্দিরে গিয়ে হত্যা দেয়, পুজো করে৷ মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছোতে নকুল শুনল প্রচণ্ড শব্দে শাঁখ আর কাঁসর বাজছে৷ গাঁয়ের সব লোক ভয়ে বিশালাক্ষীর মন্দিরে জড়ো হয়ে শাঁখ আর কাঁসর বাজাচ্ছে বরেনকে গ্রাম থেকে দূর করার জন্য৷ সুরা গিরিও আছে সেখানে৷ তার চটি জোড়া খোয়া গেছে৷ বাঁধের ওপর দিয়ে দিগবিদিক শূন্য হয়ে ছুটতে ছুটতে হেঁতালের গোড়ায় আঙুলে চোট খেয়েছে কিন্তু সুরা গিরির ভাবখানা এমন যেন কিছুই হয়নি৷ বুক ফুলিয়ে বলছে সবাইকে, সুরা গিরি থাকতে কোনো ভয় নেই তোমাদের, দেখো না, বরেন গিরি ভয়ে কোথায় পালিয়েছে৷
লাল কটমটে চোখে চারিদিকে তাকিয়ে একবার হা-হা করে হাসল সুরা গিরি৷ নকুল সেখানে পৌঁছোতেই নকুলের মা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে নকুলকে, নকুল রে, তুই বেঁচে আছিস বাবা?
হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল নকুলের মা৷
সুরা গিরি ধমকের সুরে বলেঃ আ, কাঁদছ কেন শুনি? বলিনি আমি থাকতে বরেনের বাপের সাধ্য নেই কারও কোনো অনিষ্ট করতে পারে৷
নকুল রেগে বলল, বরেনকাকু মোটেই ভূত নয়৷
লাল গোল গোল চোখে নকুলের দিকে তাকাল সুরা গিরি যে পারলে ভস্ম করে ফেলে৷
-খুব ডেঁপো ছেলে দেখছি, তুমি কী করে জানলে ভূত নয়? এইটুকুন ছেলে গাঁজা-ভাং খাওয়ার অভ্যেস আছে নাকি?
-কক্ষনো বরেনকাকু ভূত নয়, বরেনকাকুর ছায়া আছে৷ -বেপরোয়া ভাবে বলে নকুল৷
সহদেব মাঝি ভয়ে ভয়ে বলে, বরেন তাহলে সত্যি মারা যায়নি?
সুরা গিরি গর্জন করে ওঠে, মারা গেছে কি যায়নি সেটা আমি বুঝব৷ তোমরা সবাই গুণিন হয়ে গেলে দেখছি অ্যাঁ? তাহলে আমার দরকার কী? আমি চলে যাই-থাকো তোমরা একা ...
ভিড়ের মধ্যে একটা ভয় আর আশঙ্কার গুঞ্জন ওঠে৷ সহদেব হাত জোড় করে বলে, না ঠাকুর, আমরা সেকথা বলিনি-আমরা মুখ্যুসুখ্যু মানুষ৷
তবে, -একটু নরম গলায় বলে সুরা গিরি, কাজেই যা বলছি শোনো৷ ভূত দানো নিয়ে খেলা করাটা তো ঠিক নয়৷ যে যার ঘরে চলে যাও এখন৷ আমি ভূত বন্ধের মন্ত্র পড়ে দিচ্ছি-বরেন গিরির সাধ্য নেই আজ রাতে গাঁয়ে ঢোকে৷ কাল সকালে আবার দেখা যাবে৷
নয়
পরদিন ফরসা হতে-না-হতেই বিছানা ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠল নকুল৷ বাঁধের ওপর দিয়ে ছুটে বরেন গিরির পোড়ো কুঁড়ে ঘরটার কাছে পৌঁছে দেখে বরেনকাকু চুপ করে ভাঙা দাওয়ার ওপর বসে আছে গালে হাত দিয়ে৷ নকুলকে বরেন গিরি ঘরের ভেতর নিয়ে গিয়ে বসাল৷ ঘরটার একেবারে জরাজীর্ণ অবস্থা, মেঝেতে ছড়ানো ইঁদুরের গর্ত আর ঘরের ভেতরের ভারী বাতাসে ইঁদুরের গায়ের কেমন একটা বোঁটকা ভ্যাপসা গন্ধ৷ কালকের রাতের নীল শার্ট আর প্যান্টটাই পরে আছে বরেনকাকু৷ জামার বুক পকেটে কী অদ্ভুত সুন্দর একটা নকশা৷ নীল ঢেউ, তার ওপরে ভাসছে সোনালি একটা নৌকো৷ না, নৌকো নয়৷ ওটা নিশ্চয়ই জাহাজ৷
-কী দেখছ? খুব পছন্দ হয়েছে ছবিটা?
নকুল লজ্জা পেয়ে হাসে৷
-তুমি যখন বড়ো হয়ে জাহাজে চাকরি করবে তুমিও পাবে এরকম জামা৷
জাহাজ?-নকুলের বুকের মধ্যে যেন ঘণ্টা বাজে, তুমি জাহাজে চাকরি কর বরেনকাকু?
বিশ্বাস হচ্ছে না? -বরেন গিরি মিটিমিটি হাসে নকুলের দিকে চেয়ে৷
তা নয়,-নকুল জাহাজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলে, জাহাজের সব লোক নাকি খালি রসগোল্লা আর বিস্কুট খেয়ে থাকে৷ তাই বরেনকাকু? ভরতদা সেদিন বলছিল৷
নকুলের কথায় হা- হা করে আকাশ কাঁপিয়ে হেসে ওঠে বরেন গিরি৷ তারপর বলে, শুধু রসগোল্লা? আরও কত ভালো ভালো খাবার আছে দুনিয়ায়-মাছের আচার, ঝিনুকের তরকারি, বাবুই পাখির বাসার ঝোল-আরও হরেক দেশের হরেক মজার খাবার-দুনিয়াটা কত বড়ো৷
সত্যি!-নকুল ভীষণ অবাক হয়ে যায় খাবারের এরকম অদ্ভুত ফর্দ শুনে৷ নকুলের মাথার মধ্যে যেন নীল সমুদ্রের ঢেউ ভাঙছে৷ সেই যে একবার বার-গাঙে মাছ ধরতে গিয়েছিল নকুল বাবার সঙ্গে তখন দেখেছিল হাঁড়িভাঙা চরের ওদিকে জলের রং কী গাঢ় নীল-সাদা গাংচিল উড়ে বেড়াচ্ছে৷ সহদেবকাকুর কাছে শুনেছে হাঁড়িভাঙা চরের ওদিক দিয়েই নাকি সব জাহাজ যায়৷ ওদিকেই আছে এরকম অদ্ভুত সব দেশ? নকুল সমুদ্রের স্বপ্নে যেন একেবারে বুঁদ হয়ে যায়-মগ্ন গলায় বলে, তুমি কী করে জাহাজে চাকরি পেলে বরেনকাকু?
জাহাজে চাকরি পাওয়া? সে তো খুব সোজা৷-বরেন মিটিমিটি হাসে৷
সত্যি৷-নকুলের বিশ্বাস হয় না৷
-সত্যি না তো কী? শোনো তাহলে কী করে জাহাজে কাজ পেলাম আমি৷
তারপর পাঁচ বছর আগের একটা গল্প বলে যায় বরেন গিরি৷ গেঁয়ো গরানের পাতার ফাঁকে শোঁ শোঁ শব্দে গাঙের হাওয়া বইছে৷ একটা বামুনবাদশা পাখি মাথার ওপরে টিরিক টিরিক শব্দে ডাকছে-কোথাও কেউ নেই৷ চুপ করে বরেন গিরির গল্প শোনে নকুল৷
পাঁচ বছর আগের সেই ভয়ানক আশ্বিনের ঝড়ে বরেন গিরির নৌকোটা ছাঁদি জালের সঙ্গে আটকে গিয়েছিল৷ তারপর পাহাড়-প্রমাণ দুটো ঢেউয়ের বাড়িতে নৌকোটা দুটো টুকরো হয়ে যায়৷ বরেন গিরি ছিটকে গিয়ে পড়ে উত্তাল সমুদ্রে৷ তারপর কোনোরকমে একটা কাঠের তক্তা আঁকড়ে ধরে ভাসতে থাকে৷ বরেন গিরির মনে হচ্ছিল অনন্তকাল ধরে সে যেন ভাসছে ওই কাঠের তক্তায়৷ তারপর একসময় ক্লান্তিতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল সে৷ যখন জ্ঞান ফিরল দেখল ঝড় থেমে গেছে৷ একটুকরো মেঘ নেই আকাশে৷ আগুনের গোলার মতো বিরাট সূর্য ধকধক করে জ্বলছে মাথার ওপরে৷ বরেন গিরির চারপাশে শুধু ভাঙা কাচের ধারের মতো স্বচ্ছ নীল জল৷ এত পরিষ্কার সে জল যেন পাতাল অবধি দেখা যায়৷ সেই অসীম জলের রাজ্যে বরেন একা-ভীষণভাবে একা৷ একটা পাখি অবধি নেই আকাশে৷ তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে কিন্তু জিভে ছোঁয়ানো যায় না জল এত নোনতা৷ কোথায় ভেসে চলেছে বরেন জানে না৷ ওই কি তবে পৃথিবীর শেষ? ক-দিন ক-রাত এরকম ভেসে চলেছিল বরেন কোনো হিসেব নেই৷ পেট এফোঁড়-ওফোঁড় করে বর্শার ফলার মতো একটা ব্যথা-কীরকম একটা বমি বমি ভাব যেন অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসবে৷ বমি করলও একবার বরেন তারপর অন্ধকার-সব অন্ধকার৷ জ্ঞান হারিয়ে ফেলল বরেন৷
জ্ঞান ফিরল অনেক মানুষের গলার স্বরে৷ ঃআ, মানুষের গলার স্বর এত মিষ্টি সে কি জানত৷ আবছা ঘোরের মধ্যে বরেনের মনে হল সে যেন কষতলার বাড়িটায় বিকেল বেলা ঘুমিয়ে পড়েছে-হারু এসে ডাকছে তাকে৷ কোনোরকমে চোখ মেলে বরেন দেখল কষতলার কুঁড়েঘর নয়, সে একটা বিরাট সুন্দর ঘরের মধ্যে শুয়ে আছে৷ কতকগুলি অদ্ভুত দেখতে মানুষ মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখছে তাকে৷ নিজেদের মধ্যে তাকিয়ে তারা হাসছে৷ লোকগুলোর মাথায় লম্বা লম্বা লাল চুল, দুধের মতো সাদা ধবধবে গায়ের রং-সমুদ্রের জলের মতো নীল চোখ৷ বরেনের দিকে তাকিয়ে ওরা একটা অদ্ভুত ভাষায় কী জিজ্ঞেস করল বরেন বুঝতে পারল না৷ ডিমের সঙ্গে মিশিয়ে কী একটা ওষুধ ওরা বরেনকে খেতে দিল৷ খেয়ে কিছুটা চাঙ্গা হয়ে উঠল বরেন৷ উঠে বসে চারিদিকে তাকিয়ে বরেন আন্দাজ করল সে একটা বিরাট অট্টালিকার মধ্যে বসে আছে৷ একেই কি জাহাজ বলে, যে জাহাজের কথা তারা এতদিন শুনে এসেছে৷ জাহাজের পাটাতনের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুধের মতো সাদা লোকগুলি অদ্ভুত সুরে শিস দিচ্ছিল, গান গাইছিল আর বরেনের দিকে তাকিয়ে হাসছিল৷ মাঝে মাঝে এসে কথা বলার চেষ্টা করছিল বরেনের সঙ্গে৷ কিন্তু কেউ কারুর ভাষা বুঝতে পারছিল না৷ ভাষা না বুঝতে পারলেও অঙ্গভঙ্গি করে ওরা নিজেদের মধ্যে কথা চালিয়ে যাচ্ছিল কোনোরকমে৷
বরেন প্রাণে বেঁচে গেল কিন্তু কষতলায় আর ফেরা হল না৷ জাহাজটা বিদেশি মালের জাহাজ৷ পৃথিবীর বিভিন্ন বন্দরে বন্দরে মাল ওঠানো-নামানো করতে করতে দেখতে দেখতে হুশ করে ছ-টা মাস পেরিয়ে গেল৷ বরেন ইতিমধ্যে জাহাজের নাবিকদের ভাষা কিছুটা রপ্তও করে নিয়েছে৷ জাহাজের চিফ মেট রান্নাঘরে কাজ দিয়েছে বরেনকে৷ বরেন খুব খুশি কাজ পেয়ে৷ একবার একটা কাঁকড়ার ঝোল রেঁধে খাওয়াল বরেন, খেয়ে সবার সে কী তারিফ৷ চিফ মেট বলল, তোমাকে আর ছাড়ছি না, মিস্টার গিরি৷ তুমি আমাদের জাহাজেই থেকে যাও৷
কষতলার সামান্য গরিব জেলে বরেন-সে আজ মিস্টার গিরি৷ নিজের ভাগ্যকে বরেন নিজেই যেন বিশ্বাস করতে পারে না৷ এদিকে সমুদ্রে যেন ক্রমে নেশার মতো পেয়ে বসেছে বরেনকে৷ সমুদ্র ছাড়া আর কিছু ভালো লাগে না৷ কত অদ্ভুত সব দেশ দেখল বরেন-কত আশ্চর্য সব দ্বীপ৷ ঝড়ে রোদে জ্যোৎস্নায় সমুদ্রের কত বিচিত্র রূপ ...কত উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক...কত লেগুন... খাঁড়ি...সূর্যাস্তের রঙিন আলোয় প্রবাল দ্বীপের অপরূপ শোভা৷ সবচেয়ে যা তাজ্জব তা হল বিভিন্ন দেশের মানুষের বিভিন্ন চালচলন হাবভাব কথাবার্তা৷ ভাবলে বরেনের হাসি পায়৷ এই সেদিনও তো সে জানত হাঁড়িভাঙা চরের ওদিকেই পৃথিবীর শেষ৷ কষতলার সব জেলেরা তো তাই-ই জানত অথচ পৃথিবীটা এত-এত বড়ো৷ দেখতে দেখতে পাঁচ-পাঁচটা বছর যেন চোখের পলকে পেরিয়ে গেল৷ সমস্ত জীবনটাই হয়তো এভাবে পেরিয়ে যেত যদি না ইতিমধ্যে তাদের জাহাজ সাগরদ্বীপের মুখে এসে নোঙর করত-কলকাতা পোর্টে মাল খালাশ করার জন্য৷ হাঁড়িভাঙা চরের কাছ দিয়ে যাচ্ছে যখন জাহাজটা বরেনের বুকের মধ্যে কেমন হু-হু করে উঠল৷ পাঁচ বছর আগে এখানেই তার নৌকোডুবি হয়েছিল৷ কোথায় গেল পাঁচ বছর আগের সেই জীবনটা! বউ আর ছেলে হারুর কথা মনে আসতেই চোখে জল এসে গেল বরেনের৷ এতদিন বরেন কোন প্রাণে বেমালুম ভুলে ছিল ওদের? বরেন পাগল হয়ে গেল একবার অন্তত কষতলায় গিয়ে হারুকে দেখে আসতে৷ কত বড়ো হয়েছে ছেলেটা? কেমন আছে হারু আর হারুর মা?
চিফ মেটের অনুমতি নিয়ে একটা জেলে ডিঙি নিয়ে সে রওনা দিল কষতলার দিকে৷ পৌঁছোতে পৌঁছোতে সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ নিঃশব্দে সে বাঁধের ওপর দিয়ে হেঁটে তার কুঁড়েঘরে পৌঁছে দেখল-সেটা ভূতের বাড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ কেউ কোথাও নেই৷ বেরিয়ে আসতে আসতেই লক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা ৷ লক্ষ্মীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিল বরেন৷ সে তো আর জানত না যে সুরা গিরি তাকে পাঁচ বছর আগেই মৃত বলে ঘোষণা করেছে৷ সুরা গিরি পিশাচসিদ্ধ গুণিন৷ তার কথা কে অবিশ্বাস করবে গ্রামে? তার পরের ঘটনা তো সবই নকুল জানে৷
বরেন গল্প শেষ করল তার৷ বাঁধের ওপর ঝাউপাতার অবিশ্রান্ত ফিসফাস শব্দ৷ একটা বাটাং পাখির ট্রি-ট্রির ডাক৷ এছাড়া কোথাও আর কোনো শব্দ নেই৷ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নকুল জিজ্ঞেস করল, এবার তুমি কী করবে কাকু?
আকাশের অনেক উঁচুতে কয়েকটা চিল উড়ছিল৷ সেদিকে তাকিয়ে বরেন বলল, আমার তো আর কেউ নেই নকুল৷ হারু আর ওর মাকে গ্রামের কেউ দেখল না-সেই দুঃখে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল ওরা৷ আমি একা কী করব এখানে-আমি ফিরে যাব সমুদ্রে৷
নকুলের কান্না পাচ্ছিল৷ বলল, কেন চলে যাবে বরেনকাকু? কত ভালো লোক তো আছে গাঁয়ে৷ থাকো না তুমি এখানে৷
না, নকুল-একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে বরেন গিরি, সমুদ্রে একবার যারা গেছে ডাঙায় আর তাদের ভালো লাগবে না৷
নকুল কী একটা কথা বলতে যাচ্ছিল হঠাৎ শুনল বাইরে অনেক মানুষের গলা৷ বরেন গিরির নাম ধরে কে ডাকছে৷ জানলার পেছনে লুকিয়ে নকুল দেখে সুরা গিরি দাঁড়িয়ে খানিকটা দূরে-সুরা গিরির কাঁধের পেছনে উঁকি মারছে গাঁয়ের আরও বেশ কিছু মাতব্বর লোক৷ ছোটোখাটো একটা ভিড়ই জমে উঠেছে সেখানে৷ বরেন গিরি বাইরের দাওয়ায় এসে যেই দাঁড়িয়েছে অমনি ভিড়ের মধ্যে একটা ভয়ের সাড়া পড়ে গেল৷ যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে৷ দিনের আলোতেও বরেন গিরিকে দেখে ওদের বিশ্বাস হচ্ছিল না যে সে সত্যি বেঁচে আছে৷ নকুলকে ওরা দেখতে পায়নি কেউ৷
সুরা গিরি চিৎকার করে বলল, কেউ পালাবে না৷ আমি থাকতে কারুর কোনো ভয় নেই৷
সুরা গিরির ধমক খেয়ে থতমত লোকগুলি আবার পায়ে পায়ে সুরা গিরির পেছনে এসে দাঁড়ায়৷ সুরা গিরির হুকুম অমান্য করার সাহস গ্রামে কারো নেই৷
সুরা গিরিকে দেখাচ্ছেও অতি ভীষণ৷ লকলকে আগুনের শিখার মতো ঝাঁকড়া চুল-হাতে লাঠি-ছোটো ছোটো চোখ দুটো সাপের মতো ক্রূর আর হিংস্র৷ একদৃষ্টিতে দেখছে বরেনকে৷ যেন কালকের অপমানের প্রতিশোধ নিতে এসেছে৷ লক্ষ্মীর দাদা রাম জানা কিন্তু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল তখন থেকে বরেনকে৷ এবার সে সুরা গিরির দিকে তাকিয়ে সন্দেহের সুরে বলল-এ তো বরেন গিরিই ঠাকুর, তবে তুমি যে বলেছিলে বরেন মারা গেছে?
যায়নি? বরেন মারা যায়নি? দেখবি? -কেমন সাপের মতো হিসহিসে গলায় বলল সুরা গিরি৷ তারপর চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল বরেনকে, তুই কে ঠিক করে বল৷
-আমি বরেন গিরি৷ পাঁচু গিরির ছেলে৷ আমাকে চেন না ঠাকুর?
-তুই ঠিক জানিস তুই বরেন গিরি?
-তুমি যদি ঠিক জান তুমি সুরা গিরি তাহলে আমিও বরেন গিরি৷
বরেন গিরির জবাব শুনে ভয়ে পাথর হয়ে যায় যেন উপস্থিত সবাই৷ সুরা গিরির মুখের ওপর এরকম জবাব যে দিতে পারে, সে কি মানুষ না অন্য কিছু?

অপঘাতে মারা যাওয়ার আগে বরেন নিজেও কখনো এরকমভাবে কথা বলতে সাহস পেত সুরা গিরির সঙ্গে?
রাগে সুরা গিরির চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোয়৷
-তবে রে শয়তান! এত আস্পদ্ধা তোর? এই নে ধর৷ খা, খা, লখখাইরে খা৷
ব্যাপারটা কী হচ্ছে বুঝতে-না-বুঝতেই নকুল দেখল কাঁধের ঝোলা থেকে একটা ছোটো কাপড়ের পুঁটলি বের করেই সুরা গিরি বরেনের দিকে ছুড়ে মারল সেটা৷ ধপ করে পড়ল পুঁটলিটা মেঝের ওপরে৷ যেন ভারী নরম রবারের মতো কোনো জিনিস আছে পুঁটলিটার মধ্যে৷ বরেন গিরি এক হাত লাফ দিয়ে দেওয়ালের দিকে সরে গেল আর সেই মুহূর্তেই প্রায় চার হাত লম্বা কালো মিশমিশে আল-কেউটের ছোবল বিদ্যুতগতিতে এসে পড়ল বরেনের পায়ের কাছে৷ একটুর জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে সে৷ নকুল ভয়ে পাথর হয়ে দেখছে-দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বরেনকাকুর-এক ইঞ্চিও আর সরবার জায়গা নেই, সামনে স্থির খাড়া দাঁড়িয়ে আছে সাক্ষাৎ যম৷ সাপটার হয়তো ধারণা হয়েছে বরেনই ওকে ব্যথা দিয়েছে তাই বরেনকেই ও তাগ করেছে৷
সুরা গিরি খলখল করে হেসে বলল, বরেন তো বাঁ-হাতে জ্যান্ত তোপ (কেউটে) সাপ ধরত-হাঃ হাঃ, ধর দেখি একে-কেমন বরেন তুই-হাঃ হাঃ, খা খা লখখাইরে খা৷
হিংস্র উল্লাসে সুরা গিরি যেন নাচতে থাকে৷
সাপটার বিষদাঁতই যে এখনও অবধি ভাঙা হয়নি তা নকুল ওর ভীষণ তেজ দেখেই অনুমান করতে পারছিল৷ প্রতি পাঁচ-ছ সেকেন্ড পর পরই সে একেকটা করে ছোবল মারছিল বরেনকে লক্ষ করে৷ তার সামনে একমাত্র জীবন্ত বস্তু ওই বরেন৷ তাকে সে শেষ না করে আজ যেন নিবৃত্ত হবে না৷ বরেনকে জব্দ করার জন্যই কি সুরা গিরি সাপটাকে একেবারে আনকোরা মাঠের আল থেকে ধরে নিয়ে এসেছে?
অবাক হয়ে নকুল দেখল প্রচণ্ড ভয়ে বরেন গিরির মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে৷ হাত দুটো কাঁপছে৷ নকুল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না৷ সাপকে বরেন গিরির ভয়? যে বরেন গিরি গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারত কোন গর্তে কী সাপ আছে-সত্যি তাহলে বরেন গিরি নয় ও?
বরেন নিতান্ত মোহগ্রস্তের মতো এতক্ষণ দু-হাত নাড়াচ্ছিল সাপের মুখের সামনে-ছোবল মারার সঙ্গেসঙ্গেই যন্ত্রের মতো হাত সরিয়ে নিচ্ছিল৷ বারে বারে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে হতে মরিয়া হয়ে উঠেছে জানোয়ারটা৷ কালো পুঁতির মতো চোখ দুটো জ্বলছে ভীষণ প্রতিহিংসায়৷ হঠাৎ প্রায় লেজের ওপর খাড়া দাঁড়িয়ে উঠে স্প্রিংয়ের ধারালো ছুরির মতো এক হাত এগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনে আর বরেন তৎক্ষণাৎ 'বাবারে' বলে বিকট চিৎকার করে এক লাফে প্রায় সেই কালান্তক যমের মাথা ডিঙিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল বাইরে৷ সাপটারও বোধ হয় পরিশ্রম হয়ে গিয়েছিল খুব৷ মাথাটা নীচু করে সে একটা ইঁদুরের গর্ত পেয়ে তৎক্ষণাৎ সেঁধিয়ে গেল তাতে৷
সুরা গিরি হা-হা করে হেসে উঠে একটা বিশ্রী গালাগালি দিয়ে বলল, তবে তুই নাকি বরেন? অ্যাঁ জোচ্চোর, বদমাশ কোথাকার, সুরা গিরির সঙ্গে চালাকি?
বরেন গিরি কিছুক্ষণ একেবারে চুপচাপ৷ তারপর সুরা গিরির দিকে আঙুল তুলে আর সবাইকে কেমন ধরা ধরা গলায় বলল, ওর কথা শুনো না তোমরা, বিশ্বাস করো ভাইসব আমি বরেন গিরি৷ আমি মরিনি৷ পাঁচ বছর ধরে আমি গাঙে গাঙে ঘুরে বেড়াচ্ছি- ড্যাঙার সাপ ধরতে আমি ভুলে গেছি৷ ড্যাঙার সাপ ভীষণ হিংস্র, নিষ্ঠুর-ড্যাঙার মানুষদের মতো৷ বার-গাঙেও সাপ আছে- গোখরোর চেয়েও বেশি তাদের বিষ, কিন্তু তারা শামুকের মতো শান্ত৷ কাউকে তারা কামড়ায় না৷ এতদিন গাঙে গাঙে থেকে আমি ড্যাঙার স্বভাবচরিত্তির সব ভুলে গেছি৷ বিশ্বাস করো তোমরা৷
বরেন গিরি চুপ করার সঙ্গেসঙ্গে মনে হল সব কিছুই যেন চুপ করে গেছে৷ সব নিস্তব্ধ নিঝুম৷ শুধু অনেক দূরে একটা চিলের ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ৷ গ্রামের লোকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল বরেনের বক্তৃতা৷ নীল জামা নীল প্যান্টে যেমন অদ্ভুত লাগছিল বরেনকে দেখতে, তেমনি অদ্ভুত ওর কথাগুলি শুনতে৷ কষতলার কোনো মানুষকে এরকম কথা বলতে শোনেনি তারা৷
বুড়ো সহদেব মাঝি সরল সাধাসিধে লোক৷ সে এগিয়ে এসে বলল, তোমার কথাগুলি শুনতে বেশ ভালো, কিন্তু সুরা ঠাকুর পাঁচ সন আগে জলসরার ছায়া দেখে বলে দিয়েছে তুমি মারা গেছ বাপু৷ একবার মরলে কি আর কেউ জ্যান্ত হতে পারে?
সুরা গিরি সাপের মতো হিস হিস শব্দে বলল, সুরা গিরিকে মিথ্যাবাদী বলা? গাঁয়ের লোকেরা তোকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে জানিস?
ভরত পাইক এবার খুব সাহস করে সামনে এগিয়ে এসে বলল, তুমি যদি সত্যিকারের বরেনই হবে তাহলে সপ্তমুখীর মুখে ঘণ্টাটা কে বাজাচ্ছে শুনি বাপু? ওরকম ঘণ্টা তো বরেনই বাজাত৷
এবার বরেন খুব মনোযোগ দিয়ে ভরতের কথা শুনল, তারপর হঠাৎ এত জোরে হেসে উঠল, যে এক ঝাঁক বক ভয় পেয়ে ঝটপট শব্দে গেঁয়ো গাছের মাথা ছেড়ে উড়ে পালাল৷ হা-হা-হা করে সে কী হাসি৷ পেট চেপে ধরে হাসছে তো হাসছে বরেন, ঘণ্টা কে বাজাচ্ছে জাননি? চলো আমার সঙ্গে-আমি দেখিয়ে দিচ্ছি৷
বলেই বরেন এক লাফে বাঁধের মাথায় উঠে তরতর করে এগোতে লাগল সপ্তমুখীর দিকে৷
সহদেব, ভরত কিংবা বাকি যারা তারা বুঝতে পারছিল না কী করবে৷ যাবে কি না বরেনের পিছু পিছু৷ সুরা গিরি গম্ভীর গলায় বলল-কেউ যাবে না ওর পিছে-খারাপ কোনো মতলব আছে ওর৷
হঠাৎ এবার সামনে এগিয়ে এল রাম জানা৷ হাত তুলে ডাক দেয়, চলো ভাই চলো, আমরা দেখব কী আছে ওখানে৷ কারুর কথা শুনব না আমরা৷
বলেই রাম জানা দ্রুত পা চালায় বরেনের পিছু পিছু৷
সহদেব বলে-চলো তাহলে, রাম যখন যাচ্ছে আমাদেরই বা ভয় কী?
পায়ে পায়ে সবাই এগোয় সপ্তমুখীর দিকে৷
সুরা গিরি দাঁড়িয়ে থাকে একা৷ স্থির৷ পাথরের মূর্তির মতো৷
টানা একটা ঝাউয়ের জঙ্গল পেরিয়েই সামনে ছোটো একটা খাঁড়ি৷ আশপাশে ছড়ানো ছিটানো গেঁয়ো-গরানের ঝোপ৷ এখানেই জ্যোৎস্না রাতে খুপরিটা দেখেছিল ভরত পাইক মাস খানেক আগে৷ কোথায় খুপরি? দিনের স্পষ্ট আলোয় সামনে দেখা যাচ্ছে একটা দেড় মানুষ উঁচু লোহার তেকোণা বাক্সের মতো জিনিস৷ অনেকটা বালিতে গেঁথে আছে৷ এটাকেই তবে জ্যোৎস্নার আলোয় খুপরি বলে ভুল করেছিল ভরত?
ওরা ভয়ে ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে রইল৷ বরেন সোজা এগিয়ে গিয়ে ঢুকে পড়ল বাক্সটার মধ্যে৷ নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে সবাই৷ কেউই বুঝতে পারছে না এরকম অদ্ভুত দেখতে বাক্সটা কীসের, এলই বা কোত্থেকে এখানে? সুন্দরবনের জঙ্গলের একরকমের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আছে, সেই নিস্তব্ধতা চুরমার করে হঠাৎ সেই অলৌকিক শব্দটা আবার বেজে উঠল-ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং৷ পরমুহূর্তেই দু-হাত মাথার ওপর তুলে বরেন বেরিয়ে এল বাক্সটার ভেতর থেকে৷ তার হাতে কী একটা ভারী জিনিস সকালের রোদে ঝকমক করছে৷ খুব কষ্ট করে যেন বরেন বয়ে নিয়ে আসছে সেটাকে৷
এই নাও, বরেন গিরির ভূত-আপ্রাণ চেষ্টায় বালির ওপর ছুড়ে মারল জিনিসটা বরেন গিরি৷ বিরাট ভারী পেতলের ঘণ্টাটা ঘং-অং শব্দ করে গেঁথে গেল বালিতে৷
হা-হা-হা৷ হাসতে হাসতে বলে বরেন গিরি, জান এটা কী?
পুতুলের মতো ঘাড় নাড়ে সবাই৷ ঘণ্টা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু কীসের ঘণ্টা?
জাননি? একে বলে ঘণ্টাবয়া৷ জানবে কী করে?-পেট চেপে হাসে বরেন, সব তো এঁদো ডোবার পুঁটি৷ হাঁড়িভাঙা চরের ওদিকে তো কেউ যাওনি৷ সেখানে জল এত নীল পাতাল অবধি দেখা যায়৷ পাহাড় সমান এক-একখানা মৌজা (ঢেউ)৷ সেখানে বাঁধা থাকে এই ঘণ্টাবয়া৷ ঢং ঢং ঢং ঢং৷ জাহাজকে পথ দেখায়৷ তা আশ্বিনের ঝড়ে নোঙর ছিঁড়ে ঘণ্টাবয়া ভেসে এল পারে-তোমরা ভাবলে বরেন গিরির ভূত ঘণ্টা বাজাচ্ছে-হা-হা-হা৷
হাঁ করে গ্রামের সবাই এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে৷ লজ্জায় কেউ চোখ তুলে তাকাতে পারছে না৷ ছি-ছি, সুরা গিরি এত বোকা বানিয়ে দিয়েছে ওদের৷
রাম অনুতপ্ত স্বরে বলল, মাপ করো বরেন ভাই, বড়ো অন্যায় হয়ে গেছে৷ তুমি থেকে যাও গাঁয়ে৷ আমরা সবাই মিলে চাঁদা তুলে তোমার ঘর ঠিক করে দেব৷
না ভাই৷ গাঁয়ে কে আছে আমার? কেউ নেই৷ কাল সকালেই আমি বার-গাঙে ফিরে যাব৷ সেখানে ছাড়া আর কোথাও আমার যাওয়ার জায়গা নেই৷ যাও, ফিরে যাও তোমরা৷-কেমন নিজের মনে কথাগুলি বলল বরেন তারপর কোনো দিকে আর দৃকপাত না করে বাঁধের ওপর উঠে কালীর থানের দিকে সোজা হাঁটা দিল৷ আকাশের গায়ে তার লম্বা মূর্তিটা ছোটো হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল৷
দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাঁয়ের মানুষেরা ঝাউবনের রাস্তা দিয়ে ফেরার পথে দেখল সুরা গিরি ঠায় একটা ঝাউ গাছের নীচে তখনও দাঁড়িয়ে আছে৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যেন কী ভাবছে৷ কোনোদিকে হুঁশ নেই তার৷
নিঃশব্দে সুরা গিরির পাশ দিয়ে চলে গেল ওরা৷ রাম জানা শুধু বিড়বিড় করে নিজের মনে বলল, ভণ্ড কোথাকার৷
পরদিন সাতসকালে একটা নিঃশব্দ ছায়ামূর্তি কষতলা খাঁড়ির দিকে হাঁটছিল৷ ছায়ামূর্তি আর কেউ নয়, বরেন গিরি৷ খাঁড়ির মুখে একটা জেলেডিঙি বাঁধা আছে৷ ডিঙিটা বেয়ে সে পাতিবুনিয়া চড়ার পাশ দিয়ে সাগরের মুখে গিয়ে পৌঁছোবে-সেখানে স্যান্ডবারে বরেনের জাহাজ নোঙর করা আছে৷ চিরদিনের মতো নিজের গ্রাম কষতলা ছেড়ে চলে যাবে বরেন, আর ফিরবে না৷ কিন্তু বরেন টের পায়নি তাকে নিঃশব্দে অনুসরণ করছে আর একটা ছায়ামূর্তি৷ ছায়ামূর্তি আর কেউ নয়-নকুল৷ উত্তেজনায় নকুলের ছোট্ট হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক ধুকপুক করছে৷ বরেনকাকুর নৌকোটা কোথায় বাঁধা থাকবে জানা আছে নকুলের৷ বরেনকাকুই কাল বলেছিল তাকে৷ যে করেই হোক বরেনকাকুর আগে গিয়ে তাকে পৌঁছোতে হবে সেখানে তারপর পাটাতনের তক্তা সরিয়ে লুকিয়ে থাকবে তার নীচে বরেনকাকুর অজান্তে৷ বরেনকাকুর নৌকো জাহাজের গায়ে লাগলে নকুলও সেই সঙ্গে উঠে পড়বে জাহাজে৷ মাঝগাঙে তো আর বরেনকাকু জলে ফেলে দিতে পারবে না তাকে৷ তারপর বরেনকাকু যেমনি করে জাহাজে কাজ নিয়েছে, সেও তেমনি করে কাজ নেবে আর বরেনকাকুর মতো ঘুরে বেড়াবে সমস্ত পৃথিবী, টিনের রসগোল্লা, বাবুই পাখির বাসার ঝোল খাবে, ডেকচেয়ারে বসে দেখবে উড়ুক্কু মাছের ঝাঁক, অজানা প্রবালদ্বীপের পিছনে অস্ত যাচ্ছে বিরাট মাকালফলের মতো লাল সূর্য৷ ঃউ, সমুদ্র যাওয়ার স্বপ্ন তার কতদিনের!
পাখপাখালির ডাকার আগেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে নকুল৷ তারপর কাউকে কিছু না জানিয়ে নিঃশব্দে পিছু নিয়েছে বরেনের৷ ঝাউবনে ঢোকার আগেই বাঁ-হাতে একটা সরু সয়াল আছে৷ সেটায় ঢুকলে বরেনকাকুর আগে গিয়ে সে নৌকোয় পৌঁছোতে পারবে৷ বড্ড বেশি হেঁতালকাঁটা আর শুয়োরের উপদ্রব ওদিকটায় কিন্তু নকুল এখন আর কোনো কিছুতে গ্রাহ্য করে না৷ বরেনকাকুর আগে তাকে নৌকোতে পৌঁছোতেই হবে৷
সয়ালে ঢুকতে যাবে নকুল হঠাৎ শুকনো পাতায় খসখস শব্দ৷ শুয়োর? পাশে ফিরে তাকাতেই দেখে লম্বা হিলহিলে একটা ছায়া ঝাউবনের ভেতর থেকে বেরিয়ে সন্তর্পণে চারদিকে তাকাল তারপর শিকারি বেড়ালের মতো পিছু নিল বরেনকাকুর৷ আবছা অন্ধকারেও ওকে চিনতে ভুল হল না নকুলের৷ সুরা গিরি৷ হাতে হেঁতালের লাঠি৷ সুরা গিরি নকুলকে দেখতে পায়নি৷ গা ছমছম করে নকুলের৷ এমনিভাবে লোকটা পিছু নিয়েছে বরেনকাকুর-কী মতলব ওর? চেঁচিয়ে সাবধান করে দেবে নাকি বরেনকাকুকে?
বরেন গিরি খুব দ্রুত হাঁটছে৷ বরেনের পিছু পিছু সুরা গিরি৷ সবার পেছনে নকুল৷ সব কিছু ভুলে নকুল এখন সুরা গিরির ওপর নজর রাখছে৷ বরেন নৌকোয় উঠতে যাবে তখন সুরা একেবারে ওর সামনে এসে দাঁড়াল৷
বরেন গিরি চমকে ওঠে, সুরা ঠাকুর তুমি! এখানে কী চাও? আবার সাপ ছেড়ে দিতে এসেছ বুঝি আমার গায়ে?
সুরা গিরি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ বরেনের দু-হাত জড়িয়ে ধরে কেমন ধরা গলায় বলে, আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও বরেন, কষতলায় আর আমি থাকব না৷

বরেন অবাক হয়ে বলে, কেন সুরা ঠাকুর?
-কষতলায় আর কে মানবে আমাকে? সবাই ভাববে আমি মিথ্যাবাদী, ঠক, জোচ্চোর৷ যারা ভয় করত তারা এখন আমাকে দেখে হাসবে৷ এরকমভাবে আমি কী করে থাকব? আমাকে সমুদ্রে নিয়ে যাও বরেনভাই৷ সেখানে কেউ চিনবে না আমাকে, বলো, আমাকে নিয়ে যাবে?
একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনছিল নকুল৷ ওর মনে হল সুরা গিরি যেন কাঁদছে৷
নৌকাটা পা দিয়ে জলের দিকে ঠেলে দিতে দিতে বলল বরেন, তা হয় না ঠাকুর, সমুদ্রে যাব বললেই কি যাওয়া যায়? আমি দুঃখিত ঠাকুর, আমার জন্য তোমার এই সর্বনাশ হয়েছে-যাক কী আর করবে-এরপর ভালোভাবে থেকো-লোকদের আর বোকা বানিয়ো না, লোকরাও তোমাকে ভালোবাসবে৷ চলি ঠাকুর, আর কখনো হয়তো আমাদের দেখা হবে না৷
পাড় থেকে ঝুঁকে পড়া গরান গাছের গুঁড়িতে পা দিয়ে এক ঠেলা দিতেই নৌকোটা তরতর করে খালের মাঝখানে এগিয়ে গেল রাজহাঁসের মতো৷
সুরা কান্না মেশানো গলায় মরিয়া চিৎকার করে উঠল, আমাকে নিয়ে যাও বরেন ভাই৷ শোনো, নৌকো বাঁধো৷
নৌকোটা ভাঁটার টানে সোজা এগিয়ে চলল খাঁড়ির মোহনার দিকে৷ বরেন হাত নাড়াচ্ছে৷ সুরা গিরি হাতের লাঠিটা বালির ওপর ছুড়ে ফেলে হাঁটুতে মুখ গুঁজে একেবারে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল৷
নকুল গাছের পেছনে বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে দেখছে৷ অদ্ভুত একটা অনুভূতিতে ছোট্ট বুকের মধ্যে কেমন করছে তার৷ তারও কি তবে আর কখনো সমুদ্রে যাওয়া হবে না? একবার ইচ্ছে হল গলা ফাটিয়ে ডাকে-ব-রে-ন-কা-কু-কিন্তু গলায় কী যেন দলা পাকিয়ে গেছে তার৷ আওয়াজ বেরোচ্ছে না৷
প্রচণ্ড ভাঁটার টানে দেখতে দেখতে নৌকোটা একটা স্বপ্নের মতো যেন বাঁকের পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ পেতলের ঘণ্টাটা শুধু সপ্তমুখীর মুখে সমানে গাঙের ঝোড়ো হাওয়ায় বেজে চলেছে ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং ঘুং৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন