শিশির বিশ্বাস

লড়াইতে শেষ পর্যন্ত হারতেই হল জিজোকে। এমনটা যে হবে, তা গত পরশু এখানে পা দিয়েই বুঝেছিল। তবে একেবারে নকআউট হতে হবে ভাবেনি। মাত্র চার রাউন্ডের মাথায় প্রতিপক্ষের আচমকা পাঞ্চ পাঁজরে আছড়ে পড়তেই টলে পড়ে গিয়েছিল রিং-এর উপর। সামলে উঠে দাঁড়াবার আগেই রেফারি হাত তুলে নকআউট জানিয়ে দিতেই ঢং-ঢং করে বেজে উঠল ঘণ্টা। চারপাশে কয়েকশো দর্শক চিৎকার করে লাফালাফি জুড়ে দিল।
আসলে মোটা টাকার টিকিট কেটে প্রতিদ্বন্দ্বী রুস্তম সিং-এর জয় দেখতেই এসেছে ওরা। গতকাল ইম্ফল-এ পা দিয়েই দেখেছে সারা শহর জুড়ে বড়ো বড়ো ব্যানার। দুনিয়া কাঁপানো বক্সার রুস্তম সিং-এর জয়গান। চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে দুনিয়ার বক্সার আর রেসলারদের। হারাতে পারলেই হাতে-হাতে দশ লাখ টাকা ইনাম। রুস্তম সিং ওই দুটোতেই নাকি দুনিয়ার সেরা।
খানিকটা আঁচ তখনই পেয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে ব্যানারে লোকটার ছবিটা দেখে। বছর কয়েক আগে সাই ক্যাম্প থেকে ডোপিং করার দায়ে বাতিল হয়েছিল ইমতিয়াজ আলি নামে এক বক্সার। ওয়েবসাইটে তখন লোকটার ছবি বের হয়েছিল। সেই লোকটাই নাম ভঁড়িয়ে নেমে পড়েছে রোজগারের নতুন পথে। ও নিজেও হয়ত খুব ব্যতিক্রম নয়।
এ.আই.বি.এ অর্থাৎ ইন্টারন্যাশন্যাল অ্যামেচার বক্সিং অ্যাসোসিয়েশন তাদের হেড কোয়ার্টার জেনেভায় নতুনদের জন্য এক ট্রেনিংয়ের আয়োজন করেছে। বক্সিংয়ের সর্বোচ্চ সংস্থা এই এ.আই.বি.এ। ওদের ওখানে টেনিং মানে দুনিয়ার সেরা কোচ আর সেরা উঠতিদের সঙ্গে লড়াইয়ের সুযোগ।
ওয়েবসাইটে খবরটা চোখে পড়তেই তৎক্ষণাৎ বায়োডেটা দিয়ে আবেদন করেছিল। ডাক পাবে আশা করেনি। কিন্তু সেটাই হয়েছে। ফাইনাল সিলেকশনের আগে ওখানে গিয়ে টেস্ট দিতে হবে। কলকাতা থেকে জেনেভায় যাওয়া, কয়েকটা দিন থাকার খরচ, অনেক টাকার ব্যাপার।
অন্য কেউ হলে হয়ত তখনই থেমে যেত। কিন্তু অন্য ধাতুতে গড়া জিজো হাল ছাড়েনি। সেই সময়েই ওয়েবসাইটে খবরটা নজরে পড়ে গিয়েছিল। ইম্ফল থেকে রুস্তম সিং নামে এক বক্সার কাম রেসলার চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে দুনিয়ার সেরাদের। হারাতে পারলেই নগদ দশ লাখ টাকা পুরস্কার। সেই সঙ্গে লড়াইতে নামার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা। এছাড়া যাওয়া-আসার প্লেনের টিকিট, হোটেল খরচ। সুযোগটা হাতছাড়া করেনি ও। ই-মেল করে সঙ্গে সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিল যথাস্থানে। দিন সাতেকের মধ্যেই এসে গিয়েছিল প্লেনের টিকিট আর কিছু হাতখরচ।
খোঁজ খবর না নিয়ে এভাবে চলে আসাটা যে ঠিক হয়নি, ইম্ফলে পা দিয়ে এরপর বুঝতে বাকি থাকেনি জিজোর। আসলে টাকার চিন্তায় ও আর তলিয়ে ভাবেনি। রুস্তম সিংয়ের মতো অনেকেই আজকাল রোজগারের এই নতুন পথটা বেছে নিয়েছে। দেশের নানা শহরে আসর জমায় এরা। গাল-ভরা বিজ্ঞাপনে ভরিয়ে দেয় শহর। স্থানীয় খবরের কাগজেও বিজ্ঞাপন যায়। উৎসাহী দর্শক কম হয় না। প্রায় সাজানো লড়াইয়ের শেষে জিত হয় রুস্তম সিংদের। উপস্থিত দর্শকরাও তাই চায়।
লড়াইয়ের আসর বসে প্রতি দু’একদিন অন্তর। অনেক সময় হয়ত নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীও মেলে না। তখন মুখোশ পরিয়ে একই প্রতিদ্বন্দ্বীকে বিভিন্ন নামে দিনের পর দিন নামানো হয়। দর্শক বুঝতেও পারে না।
ইম্ফলের মতো ছোটো শহরই শুধু নয়, কখনো বড়ো শহরেও এমন আসর বসে। বছর কয়েক আগে খোদ মুম্বাইতেও অতীত দিনের এক বিখ্যাত কুস্তিগিরকে এই কাজে দেখেছে। সতরাং ব্যাপারটা একেবারে অজানা নয়।
খানিকটা নিরাশ হলেও লড়াইয়ের আসরে অবশ্য চেষ্টার ত্রুটি করেনি। সতর্ক ছিল একেবারে গোড়া থেকেই। তবে যেহেতু প্রদর্শনী লড়াই, দর্শকদের মনোরঞ্জনের ব্যাপারটাও রয়েছে। এই ধরণের আসরে না হলেও প্রদর্শনী লড়াইতে ও আগেও নেমেছে। গোড়ায় দু’এক রাউন্ড লড়াই গড়াতে দেওয়াই নিয়ম। দর্শকরা খুশি হয়। কর্তৃপক্ষর তরফেও বলে দেওয়া হয়েছিল ব্যাপারটা। শুরুর দুটো রাউন্ড তাই তেমন গা ঘামায়নি। ঘামায়নি প্রতিদ্বন্দ্বী রুস্তম সিং-ও। শুধু লম্ফঝম্ফ করে গেছে। তাতে উপস্থিত দর্শকদের ভিতর উত্তেজনা ছড়িয়েছে ভালই। ছুটে আসছে নানা মন্তব্য। সবই প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে। সবাই রুস্তম সিংয়ের জয় দেখতে চায়।
ওই সময় একটা চমৎকার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল জিজো। হঠাৎ এগিয়ে এসে দ্রুত গোটা কয়েক জ্যাব করেছিল রুস্তম সিং। সস্তা হাততালি পেয়েছিল ভালই। অতি উৎসাহে মুখের গার্ড তখন একেবারেই ঠিক ছিল না। হাতের সেরা অস্ত্র দুর্দান্ত এক আপার কাটেই তখন শেষ করে দেওয়া যেত লোকটাকে। কিন্তু দর্শক এবং উদ্যোক্তাদের কথা ভেবে দমন করেছিল।
এরপর সময় কাটাবার জন্যই সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে নেচে-নেচে চক্কর কেটে যাচ্ছিল রুস্তম সিংয়ের চারপাশে। তারই মাঝে হঠাৎ ভিতরে ঢুকে এক-আধটা জ্যাব নয়তো কেতাবি কম্বিনেশন পাঞ্চ। রুস্তম সিং হঠাৎ তেড়ে এলে চমৎকার পায়ের কাজে সরে যাচ্ছিল। ওকে লক্ষ করে দর্শকরা টিটকিরি প্রতিদ্বন্দ্বী রুস্তম সিংকে ভালই উৎসাহ যোগাচ্ছিল। তাতেই খানিকটা বাড়তি উদ্যমে হঠাৎ তেড়ে এল লোকটা। আসলে দর্শকদের মনোরঞ্জনের ব্যাপারটা মাথায় রাখতেই হয় তাকে। কাছে এসেই আচমকা ডান হাতে দুর্দান্ত একটা হুক করল। সজাগ ছিল জিজো। চমৎকার ফুটওয়ার্কে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারলেও সামলে ওঠার আগেই দ্রুত ওয়ান টু থ্রি কম্বিনেশন পাণ্ড চালাল রুস্তম সিং। তিনটে পাঞ্চের দুটো আছড়ে পড়ল ওর পাঁজরের উপর। একটা চোয়ালের নীচে।
আচমকা আঘাতে টলে পড়ে যাচ্ছিল জিজো। তবে শেষ পর্যন্ত সামলে নিতে পারল। এই প্রথম ও টের পেলে প্রতিদ্বন্দ্বী নেহাত হেলাফেলার নয়। লড়াইটা জানে। কিন্তু লড়াইটা সে-ও তো জানে কিছু। ভিতরের তাগিদটা তাই হঠাৎ যেন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
সুযোগও এসে গেল। রুস্তম সিংয়ের লড়াই দেখে সারা অডিয়েন্স তখন গরম হয়ে উঠেছে। ভেসে আসছে নানা মন্তব্য। উৎসাহে রুস্তম সিং হঠাৎ বার কয়েক লাফিয়ে স্টেজ-শো করে এগিয়ে এল আবার। দ্রুত দুটো জ্যাব করেই জোরালো একটা পাঞ্চ।
কোমর থেকে শরীরটা বাঁদিকে বাকিয়ে সহজেই পাঞ্চটা এড়াল জিজো। আর তখনই লক্ষ করল, রুস্তম সিংয়ের মুখের গার্ড অনেকটাই আলগা। মুহূর্তে ওর ডান হাতের মুঠো রামধনুর মতো ঝলসে উঠল।
সতর্ক রস্তম সিং শেষ মুহূর্তে মারটা এড়াবার চেষ্টা করেছিল। তবে পুরোটা পারেনি। দুর্দান্ত আপার কাটটা চোয়াল ঘেঁষে জমে গিয়েছিল নাকের উপর। মারটা রাউন্ডের গোড়ায় হলে যথেষ্ট সমস্যায় পড়ত রুস্তম সিং। রক্ত চোঁয়াতে শুরু করেছিল নাক দিয়ে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে রাউন্ড শেষ হবার ঘণ্টা পড়ে যেতে সামলে নিতে পেরেছিল। নকআউটের ব্যাপারটা ঘটে গেল তার পরের রাউন্ডেই।
তবে আরো ভয়ানক ব্যাপার হয়েছিল পরের দিন। সকালে ঘরে ব্রেকফাস্ট দিতে এসে বয় ছেলেটি জানিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, বিশেষ দরকারে হোটেলের ম্যানেজার তার সঙ্গে কথা বলতে চায়। ব্রেকফাস্ট সেরে তাই আর দেরি করেনি জিজো। নীচে নেমে কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা করেছিল ম্যানেজারের সঙ্গে।
ম্যানেজার স্থানীয় মৈতেই সম্প্রদায়ের মানুষ। কপালে তিলকের ফোঁটা। ধর্মে এরা বৈষ্ণব। দিন তিনেক হল জিজো রয়েছে এই হোটেলে। দেখা হয়েছে অনেকবার। ও ঘরে ঢুকতেই বসতে ইঙ্গিত করে বললেন, “সরি মি. বক্সার, সাতসকালে একটা খারাপ খবর আপনাকে দিতে হচ্ছে। রুস্তম সিং এন্ড কোম্পানির লোকাল অর্গানাইজার মি.আও গত রাতে আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন, ওঁরা আপনার সঙ্গে আগের চুক্তি একতরফা বাতিল করে দিয়েছেন। আপনাকে আর দরকার নেই ওদের।”
এমনটা হতে পারে, খানিকটা আগেই অনুমান করেছিল জিজো। কিন্তু সেটা তো সরাসরি ওকে জানালেই পারত। হোটেলের ম্যানেজারকে জানাবার দরকার কী, বুঝতে পারল না। সামান্য নীরবতার পর বলল, “ওদের কাছে লড়াই বাবদ পঞ্চাশ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে আমার। সে ব্যাপারে কিছু বলেছে?”
ম্যানেজার মৃদু হাসলেন এবার। “তাহলে আর চুক্তি বাতিলের কথা বলছে কেন? না মি.বক্সার, যতদূর জানি, ওরা আর কিছুই আপনাকে দেবে না। তবু আপনি কিছুটা হলেও লাকি,” একটু থামলেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, “মি.বক্সার, এরা মাসখানেক হল ইম্ফলে আসর বসিয়েছে। এমন আগেও হয়েছে কয়েকবার। এমনকি হোটেল ভাড়া পর্যন্ত মেটায়নি। এখন তাই আমরা সাত দিনের ভাড়া অ্যাডভান্স নিয়ে নিই। আপনাকে তাই অন্তত হোটেল ভাড়াটা মেটাতে হচ্ছে না। সেই হিসেবে দিনতিনেক আরো থাকতে পারেন।”
অযথা জিজো আর কথা বাড়ায়নি। ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে। অর্গানাইজার মি. আও ছাড়াও আরো কয়েকজনের ফোন নম্বর ছিল। কোনও লাভ হবে না বুঝেও ফোন করেছিল তাদের। কিন্তু ডায়াল করে ধরা গেল না কাউকেই। নো রিপ্লাই। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ঝামেলা এড়াতে সহজ পথটাই বেছে নিয়েছে ওপক্ষ।
ফেরার ভাড়াটাও এবার নিজের পকেট থেকে দিতে হবে। সকালে কলকাতার ফ্লাইট রয়েছে। টিকিটের জন্য হোটেলের ম্যানেজারকে ফোন করবে কিনা ভাবছে, দরজার বাইরে নক করল কেউ। উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই একজন অপরিচিত ভদ্রলোক ওর অনুমতির অপেক্ষা না করেই দ্রুত ঢুকে পড়লেন ভিতরে। বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে। পরনে কেতাদূরস্ত কোটপ্যান্ট। কপালে তিলকের ফোঁটা।
ভিতরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে চমৎকার ইংরেজিতে বললেন, “গুড মর্নিং স্যার। আমি মি. শিবরামন। নির্ভেজাল তামিল হলেও এই নর্থ-ইস্টে রয়েছি বাপ-কাকার আমল থেকে। সে যাই হোক, গতকাল আপনার লড়াই কিন্তু দারুণ হয়েছে। কনগ্রাচুলেশন।”
শুধু এই কারণে ভদ্রলোক যে আসেননি, তা বুঝতে পারছিল জিজো। বসতে ইঙ্গিত করে সাবধানে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। তবে তাতে কিছু লাভ হয়নি। তার উপর আজ সকালে যে খবর.”
“জানি।” কথা শেষ হবার আগেই হাত তুলে ওকে থামিয়ে মি. শিবরামন বললেন, “গত রাতেই ব্যাপারটা অনুমান করেছিলাম। আপনি হয়ত জানেন না, আপনার ওই আপারকাট-এ রুস্তম সিংয়ের নাকের হাড়ে চিড় ধরেছে। তা সত্যেও পরের রাউন্ডে নেমেছিল স্রেফ আপনাকে নকআউট করার ওই নাটকটুকুর জন্য। আসল ঘটনা হল, আগামী দিন পনেরোর আগে আর রিংয়ে নামার উপায় নেই। রোজগারও বন্ধ। অবশ্য এমনিতেও আপনার প্রাপ্য পেতেন কিনা সন্দেহ। শহরে মাসখানেক ধরে এদের এই প্রোগ্রাম চলছে। গতকাল আপনি নিজের চেখেই তো দেখেছেন, এমন বিরাট কিছু দর্শক হয় না। কী আর রোজগার? আপনার আরো খোঁজখবর নিয়ে আসা উচিত ছিল।”
আগন্তুক যে অনেক কিছুই জানে, তা বুঝতে পারছিল জিজো। কিছু একটা উদ্দেশ্য নিয়ে যে ওর কাছে হাজির হয়েছে, তাও বুঝতে পারছিল। ও মাথা নাড়ল, “তা ঠিক। তবে টাকাটার খুব দরকার ছিল আমার। তাই আর দেরি করতে পারিনি। তবে আমি ফাইটার। স্পোর্টসম্যান। হার-জিৎ আমাদের সঙ্গী। তাই এই ব্ল্যাক-স্পট ভুলে যেতে সময় লাগবে না। থ্যাঙ্ক ইউ।”
“গুড।” এতক্ষণে নড়ে উঠলেন ভদ্রলোক। গলা ঝেড়ে নিয়ে চাপা গলায় বললেন, “স্যার, বুঝতেই পারছেন, শুধু এই কারণে সাতসকালে আপনার এখানে আসিনি। অন্য কারণও আছে। একটা কাজ করে দিতে হবে আপনাকে। যদি সমাধা করতে পারেন ওরা যে টাকার অফার দিয়ে আপনাকে এনেছিল তার তিনগুণেরও বেশি পেয়ে যাবেন। আর আপনাকে যেটুকু দেখেছি তাতে আমার ধারণা, কাজটা আপনি পারবেন।” বলতে বলতে ক্রমশ ঘন হয়ে এল মানুষটির গলা।
কাজটা যে খুব সহজ নয়, সেটা ওই টাকার অঙ্কেই বুঝতে পারছিল। কিন্তু কোন উত্তর করল না জিজো। আগন্তুক সাগ্রহে তাকিয়েছিলেন ওর দিকে। সাড়া না পেয়ে বললেন, “অযথা সময় নষ্ট করা বোধহয় ঠিক হবে না। তাই বলেই ফেলি।” কথা শেষ করে সামান্য ঢোঁক গিললেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, “স্যার, জন্মসূত্রে তামিল হলেও এই নর্থ-ইস্টের মানুষ আমরা। আর একটু পরিষ্কার করে বললে, আমার গ্র্যান্ডফাদার এদিকে এসেছিলেন বর্মা মানে আজকের মায়ানমার থেকে। সেই ১৯৬০ সালে।”
এই এতক্ষণে সামান্য নড়ে বসল জিজো। ব্রিটিশ আমলে বর্মায় অনেক বাঙালিও বাস করত, শুনেছে ও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বর্মায় জাপানি বোমা পড়তে শুরু করলে ঝাঁকে ঝাঁকে বাঙালি প্রাণ হাতে করে হাঁটাপথে ফিরে এসেছিল এদেশে। কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “জাপানি বোমার সময়তেও ছিলেন ওদেশে!”
“হ্যাঁ স্যার। আমার গ্র্যান্ডফাদার জাপানি হামলার সময় রেঙ্গুন ছাড়েননি। আর পালিয়ে যাবেনই বা কোথায়? নামেই আমরা তামিল। দেশে তো কিছুই ছিল না। তা দেখুন, শেষ পর্যন্ত বর্মা ছাড়তেই হল তাঁকে। ১৯৬০ সালে বর্মার সামরিক সরকার নতুন আইন চালু করতে ছেড়ে আসতেই হল। তবে ওই যে বললাম, বর্মা ছাড়তে হলেও মাদ্রাজ-এ (বর্তমান তামিলনাড়ু) আর ফিরে যাননি। সেটল করেছিলেন এই নর্থ-ইস্টেই।”
সামান্য দম নেবার জন্য থামলেন ভদ্রলোক। ততক্ষণে জিজো অনেকটাই কৌতুহলী হয়ে উঠেছে। ও শুনেছে, শুধু বর্মা কেন, এক সময় বাঙালি দাপিয়ে বেড়িয়েছে সারা ভারত জুড়ে। সুদূর লাহোর, পেশোয়ার থেকে শুরু করে ভারতের নানা রাজ্যে তখন প্রচুর বাঙালির বাস ছিল। আজ সব পালিয়ে এসে মুখ ঢেকেছে কলকাতায়। ও বলল, “তাহলে এই ইম্ফলে সেটল হয়েছিলেন তিনি?”
“না স্যার, ইম্ফলে নয়। মোরেতে।”
“মোরে! সেটা কোথায়?” জিজো নামটা কখনো শুনেছে বলে মনে করতে পারল না।
“ইম্ফল থেকে গাড়িতে প্রায় ঘণ্টাচারেকের পথ। ইন্দো-বর্মা রোডর উপর ছোটো এক সীমান্ত শহর। মোরে পার হলেই বর্মা, অর্থাৎ আজকের মায়ানমার। আসলে স্যার, আমার গ্রান্ড ফাদার তার ব্যবসায়িক বুদ্ধি দিয়ে বুঝেছিলেন, ছোটো হলেও দারুণ ফিউচার আছে জায়গাটার। ব্রিটিশের তৈরি ইন্দো-বার্মা সড়ক এই মোরের উপর দিয়েই চলে গেছে। বর্মায়। সেই রেঙ্গুন পর্যন্ত। স্থলপথে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের এক মাত্র রাস্তা। শুধু আমার গ্র্যান্ডফাদারই নয়, সেই সময় বর্মা থেকে আরো অনেক তামিল এসে সেটল হয়েছিলেন ওখানে।
“তা দেখুন স্যার, তাঁদের সেই অনুমান মিথ্যে হয়নি। আজও বর্মায় সেই সামরিক শাসন। তবু এই মোরে দিয়ে প্রতি দিন কত টাকার ব্যাবসা হয় জানেন? প্রায় দশ কোটি টাকার। আর সেই ব্যাবসার অনেকটাই আমাদের তামিলদের হাতে।”
“কিন্তু আমাকে কী করতে হবে?” শিবরামন থামতেই প্রশ্ন করল জিজো। ওর সেই মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো অনেকটাই উজ্জ্বল হয়ে উঠল ভদ্রলোকের।
“সেই কথাই তো বলছি স্যার। মোরের এই যে বিশাল ব্যাবসা, এক সময় এর পুরোটাই ছিল আমাদের হাতে। পরে কিছু নাগা এবং মণিপুরিও এসে যোগ দিয়েছে। কিন্তু তারা নয়, সমস্যা নিয়েএল কুকি টেররিস্টরা। ওরা ব্যাবসা নয়, চায় তোলা আদায়। এক-এক দফায় কত টাকা, সে ভাবতেও পারবেন না। আর যেহেতু নাগা এবং মণিপুরিরা স্থানীয় মানুষ, তাই পুরো চাপটাই এসে পড়ল আমাদের তামিলদের উপর।
“তা সেসব মেনে নিয়েই চলছিল। এর মধ্যেই আর এক ব্যাপার,” থামলেন ভদ্রলোক। সামান্য বিরতি দিয়ে বললেন, “স্যার, দিন কয়েক আগে আমার ভাইপো শ্রীধরন কিডন্যাপ হয়েছে ওদের হাতে। মুক্তিপণ বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছে। সন্দেহ নেই, অনেক খোঁজখবর করেই কাজে
নেমেছে ওরা। আসলে আমার নিজের ছেলে নেই। ওই শ্রীধরনই বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী। দাবির টাকা মিটিয়ে দিয়ে ভাইপোকে ছাড়িয়ে নিতেই পারতাম। বাড়ির অনেকেরও সেই মত। কিন্তু।”
বলতে-বলতে গলাটা সামান্য যেন কেঁপে গেল ভদ্রলোকের। তবে মুহূর্তে সামলে নিয়ে ফের শুরু করলেন, “কিন্তু বুঝতেই পারছেন, শুরুতেই ওদের কাছে নতিস্বীকার করলে অদূর ভবিষ্যতে মোরের তামিল ব্যবসায়ীদের আরো বড়ো বিপদে পড়তে হবে। তাই ঝুঁকি থাকলেও একটা হেস্তনেস্ত করতে চাই।”
থামলেন ভদ্রলোক। জিজো বলল, “কিন্তু এ ব্যাপারে আপনাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি?” সন্তর্পণে চারপাশে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন শিবরামন। তারপর দরজার দিকে আলতো করে একবার চোখ ফেলে সামান্য উঁচু গলায় বললেন, বাইরে কে দাঁড়িয়ে?”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ক্যাঁচ করে দরজা সামান্য ফাঁক হল। ভিতরে উঁকি মারলহোটেলের ছোকরা বেয়ারার হাসিমুখ, “স্যার, ম্যানেজার সাহেব বলে পাঠালেন, চা লাগবে কিনা।”
জিজো বলল, “এখন নয়। ঠিক আধঘণ্টা পরে দু’কাপ চা আর স্ন্যাকস পাঠিয়ে দিও।”

মাথা নেড়ে ছোকরা দরজা ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেল। কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর শিবরামন গলা নামিয়ে বললেন, “মুক্তিপণের দাবি আসার পরে গত ক’দিন দর-দাম চলতে থাকলেও গোপনে খোঁজ-খবর শুরু করেছিলাম। আর যেহেতু এই অঞ্চলে আমাদের প্রভাব প্রতিপত্তি কম নয়, তাই খবর মিলতেও দেরি হয়নি। গতকাল বিকেলেই খবর এসেছে, তামুর কাছেই কোথাও শ্রীধরনকে আটকে রেখেছে ওরা। সঙ্গে সর্বক্ষণের প্রহরী রয়েছে জনাকয়েক। তো সেখান থেকে তাকে ছাড়িয়ে আনতে একজন বাউন্সার অর্থাৎ মাসলম্যান দরকার। আর আমাদের মনে হয়েছে, এই মুহূর্তে এ-ব্যাপারে দক্ষ মানুষ হাতের কাছে আপনি ছাড়া কেউ নেই।”
জিজো এমনটাই অনুমান করেছিল। এক মুহূর্ত কী চিন্তা করে বলল, “কিন্তু তামু জায়গাটা কোথায়। নামটা কখনো শুনেছি বলেও মনে হয় না।”
“না শোনাই স্বাভাবিক স্যার।” অল্প হাসলেন শিবরামন,
“জায়গাটা মোরের কাছেই। মাত্র মাইলপাঁচেক দূরে। কিন্তু ভারতের ভিতরে নয়। মায়ানমারে।”
“মায়ানমার!” ভদ্রলোক থামতে ছোট্ট করে জিজো বলল।
“হ্যাঁ স্যার, জায়গাটা মায়ানমারে। তবে ওখানে যেতে পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত বর্ডার সবার জন্য খোলা।”
“ঠিক আছে।” সামান্য মাথা নেড়ে জিজো বলল, “কাজটা নিচ্ছি আমি।”
“ধন্যবাদ স্যার।” শিবরামনের বুক থেকে একটু স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল। কিন্তু স্যার আসল কথাটা বলা হয়নি। মানে টাকার ব্যাপারটা। ওরা মুক্তিপণ বাবদ চার কোটি টাকা চেয়েছে। আমরা ঠিক করেছি, কাজ সমাধা করতে পারলে আপনাকে তিরিশ লাখ দেব। আসলে শুধু আপনাকেই নয়, আরো অনেককেই পেমেন্ট করতে হবে। খোঁজখবর বাবদ ইতিমধ্যে ভালই খরচ হয়ে গেছে। তবু যদি কিছু বলার থাকে নিঃসঙ্কোচে বলতে পারেন।”
উত্তরে সামনে মানুষটির উপর আলতো করে একবার চোখ বুলিয়ে নিল ও। সে চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে বাকি রইল না, চাইলে এখুনি ওই অঙ্কটা ডবল করে নেওয়া যায়। কিন্তু একজন উঠতি বক্সারের কাছে এখনই অত টাকা অনেক ক্ষতি করে দিতে পারে। তবে আসল ব্যাপার হল, তিরিশ লাখ কেন, তিন লাখেও হয়ত রাজি হয়ে যেত। যেত অন্য কারণে। সুদূর মণিপুরে বসে তামিলনাড়ুর মানুষ শিবরামনের এই কর্মকাণ্ডে সামান্য হলেও সামিল হবার জন্য। কিন্তু সে কথা বলা যায় না। ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে অল্প মাথা নেড়ে মৃদু হাসল ও।
মোটা অঙ্কের টাকা অ্যাডভান্স করে মিঃ শিবরামন চলে গিয়েছিলেন তারপর। ঠিক ছিল, কবে জিজোকে রওনা হতে হবে, পরের দিনই জানিয়ে দেবেন। কিন্তু পরের দিন তো বটেই, আরো একটা দিন কেটে গেল, কোনো সাড়াই পাওয়া গেল না ওদিক থেকে। স্বভাবতই চিন্তায় পড়ে গেল জিজো। যোগাযোগের জন্য কোনো ফোন নম্বর বা ঠিকানা উনি দিয়ে যাননি।
তবে ইম্ফল এমন কিছু বড়ো শহর নয়। মোরে তো খুবই ছোটো। চেষ্টা করলে শিবরামনের মতো মানুষের হদিশ পাওয়া এমন কিছু নয়। কিন্তু সেটা করতে যাওয়া যে একেবারেই ঠিক হবে না, শিবরামননের ইচ্ছেও নয়, সেটা সেদিন ওঁর কথাতেই টের পেয়েছে।
কিন্তু হাতে কাজ নিয়ে এভাবে বসে থাকা ওর একেবারেই পছন্দ নয়। তাই স্থির করল, জায়গাটা যখন খুব দূরে নয়, একবার মোরে থেকে ঘুরে আসা যায়।
মনস্থির করে পরের দিন ভোরেই জিজো কাংলাপার্কের স্ট্যাণ্ডে চলে এল। কাংলাপার্কের এই স্ট্যান্ড থেকে মণিপুরের নানা রুটে ভাড়ার গাড়ি চলে। সারাদিন সারি সারি বোলেরো আর টাটা সুমো যাত্রীর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে।
কিন্তু এই সকালে স্ট্যাণ্ড প্রায় ফাঁকা। গোটা তিনেক টাটা সুমো শুধু দাড়িয়ে রয়েছে যাত্রীর অপেক্ষায়। প্রায় খালি গাড়ি। এগিয়ে যেতেই এক ড্রাইভার ভাঙা ইংরেজি আর হিন্দি মিশিয়ে বলল, “কাম অন স্যার। মোরে যানা হ্যায় তো আ যাইয়ে। আভি ছোড়েগি।”
গাড়ির ভিতর জনা দুই যাত্রী বসে আছে। সবাই স্থানীয় মানুষ। জিজো উঠে বসল। মিনিট তিনের মধ্যে আরো জনা কয়েক যাত্রী জুটে যেতেই ড্রাইভার ছেড়ে দিল গাড়ি।
পাহাড় আর সমতল নিয়ে মণিপুর। কিন্তু এই ইম্ফল আর তার চারপাশে অনেক দূর পর্যন্ত সমতলভূমি। মসৃণ সড়কের দু'ধারে চোখ জুড়ানো ফসল-ভরা সবুজ মাঠ। ধানখেতই বেশি। এই সকালে মণিপুরি মেয়ে-পুরুষেরা মাঠের কাজে নেমে পড়েছে।
পথের অদূরে বড়ো এক পুকুরে পদ্মফুল ফুটেছে। ছোটো এক ডিঙি চড়ে লুঙি-পরা একটি মেয়ে ফুল তুলছে। মণিপুরি ওই লুঙিকে এদিকে বলে ‘ফানেক’, ঊর্ধ্বাঙ্গের জামাটিকে ‘ইনাপি।’ গত কয়েকদিনে এসব জেনেছে জিজো। আসলে কোথাও গেলে এই জানার কৌতুহল ওর বরাবর।
চলন্ত গাড়িতে বসে এসব দেখতে তাই বেশ লাগছিল। অনেক দূরে ধোঁয়ার মতো হালকা পাহাড়ের রেখা। তার মাথায় সূর্য এই ভোরে অনেক নরম। সেই আলোয় দু'ধারের মাঠ, গাছপালা, হালকা-পাতলা জঙ্গল, জলা এই সকালে ঝকমক করছে।
ওইনাম পর্যন্ত চলল এই সমতলভূমি। তারপরে শুরু হল ছোটো-ছোটো টিলা আর জঙ্গল। ড্রাইভার ছেলেটির বয়স বেশি নয়। বড়জোর বছর তিরিশ। বেশ আমুদে। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আপন মনে গুনগুন করে হিন্দি সিনেমার সুর ভাঁজছিল। হঠাৎ গেয়ে উঠল, “জীবনমে একবার আ যা মণিপুর.”
পুরোনো হিন্দি সিনেমার গান। তবে সেখানে মণিপুর নেই। আছে সিঙ্গাপুর শহরের নাম। জিজো ডাইভারের পাশের সিটে বসেছিল। ফিক্ করে হেসে ফেলল। ড্রাইভার ছেলেটির চোখ এড়াল না। ঘাড় ফিরিয়ে ভাঙা হিন্দি-ইংরেজি মিশিয়ে বলল, “কেন স্যার ঠিক হয়নি?”
ছেলেটির নাম ব্রজেন্দ্র মৈতেই। কথার ফাঁকে জিজো ওর নামটা আগেই জেনে নিয়েছিল। হেসে বলল, “দারুণ হয়েছে ব্রজেন্দ্র। এক্সেলেন্ট।”
কিন্তু ব্রজেন্দ্র বিশেষ খুশি হল না। বলল, “ওটা স্যার কথার কথা। আমাদের এই রাজ্যে বর্তমানে যা অবস্থা, শখ করে কে আর বেড়াতে আসবে বলুন? গোলমাল লেগেই রয়েছে। মোরের এই রুটে গাড়ি প্রায়ই বন্ধ থাকে। খুব মুশকিল হয় তখন।”
ব্যাপারটা জিজো শুনেছে। এই পথের অনেকটাই পাহাড়ের ভিতর দিয়ে। লুঠপাট, ডাকাতির মতো ঘটনা লেগেই থাকে। তারপর রয়েছে জঙ্গিদের সমস্যা। বর্তমানে আসাম রাইফেলস-এর পাহারা বসেছে। তাতে ব্যাপারটা কিছু কমেছে এই মাত্র।
কথার ফাঁকে এসে পড়ল পালেল বাজার। পালেল সমতল হলেও অদূরে পাহাড়ের সারি। বস্তুত পাহাড়ের মাঝে শেষ সমতলভূমি এই পালেল। পথে মানুষ তেমন বেশি নয়। তবু দু'ধারে শুধু চা-জলখাবারের দোকান। ভাতের হোটেল।
গাড়ি থামল পুলিস চেকপোস্টের সামনে। নিয়মমাফিক প্রত্যেক গাড়িতে তল্লাশি হয় এখানে। সেটা সারা হয়ে গেল মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই। ব্রজেন্দ্র জিজোকে বলল, “চাইলে কিছু খেয়ে নিতে পারেন স্যার। এরপর অনেকটা পাহাড়ি পথ।”
পথে আরো কয়েকজন যাত্রী ওঠায় গাড়িতে এখন ঠাসা ভিড়। তাদের সবাই নেমে পড়েছে ইতিমধ্যে। জিজোও নেমে পড়ল। পথের পাশে খাবারের দোকানে মানুষের জটলা। চায়ের কাপ হাতে গলা ভিজিয়ে নিচ্ছে অনেকেই।
বেরোবার সময় এক কাপ চা ছাড়া এ পর্যন্ত পেটে আর কিছু পড়েনি। চায়ের সঙ্গে অন্য কিছুও চাই। সামনে ‘বসন্ত হোটেল’ নাম লেখা বড়সড় এক বোর্ড। ও সেদিকে যাবে কিনা ভাবছিল। ইতিমধ্যে ব্রজেন্দ্রও নেমে এসেছে গাড়ি থেকে। হঠাৎ বলল, “পংডেন খাবেন স্যার? এদিকের স্পেশাল জিনিস।”
“সেটা কী?”
উত্তরে মুচকি হাসল ব্রজেন্দ্র। কথা না বলে এগিয়ে গেল পথের ধারে এক ফুটের দোকানে। বাঁক থেকে বড়ো আকারের দুটো ঝুড়ি নামিয়ে মাঝ বয়সি এক নাগা মহিলা সবে পসরা সাজাতে শুরু করেছে। জিজো তাকিয়ে দেখল ঝুড়ি ভরতি শুধু ফুটখানেক করে লম্বা আধপোড়া কাঁচা বাঁশের টুকরো।
অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল সে। ব্রজেন্দ্র বলল, “স্যার, এই হল পংডেন। কাঁচা বাশের খোলের ভিতর চাল, সবজির টুকরো আর মশলা পুরে আগুনে পুড়িয়ে রান্না করা ভাত। এ জিনিস মোরেতেও পাবেন। তবে পালেলের এই ‘জেমি’র হাতে তৈরি পংডেনের তুলনা নেই। এ’পথের নিয়মিত যাত্রী আর গাড়ি ড্রাইভারদের অনেকেই ওর বাঁধা খদ্দের। তাই ফুরিয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্যে।”
কথা যে মিথ্যে নয়, তা টের পেল জিজো। মহিলা দোকান সাজিয়ে ওঠার আগেই কয়েকজন খদ্দের ভিড় করেছে সামনে।
পাতার থালায় পংডেন দিয়ে সকালের জলযোগ মন্দ হল না। কাঁচা বাঁশের গন্ধযুক্ত ছোটো লাঠির মতো এক টুকরো ধোঁয়া-ওঠা আঠালো ভাত। সঙ্গে লঙ্কার আচার। শুঁটকিমাছের কী একটা পদও রয়েছে। অনেকে নিচ্ছে। তবে জিজোর ভরসা হল না।
দাঁড়িয়ে খাওয়া শেষ করে তখন হাত মুছতে শুরু করেছে, হঠাৎ সামনে বসন্ত হোটেলের দিক থেকে দুটো মানুষ হনহন ওকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। সাধারণ কেউ হলে হয়ত পড়েই যেত। কিন্তু জিজো সামলে নিতে পারল। বিরক্ত হয়ে ওদের দিকে তাকাতে যাবে, নজরে পড়ল ওর বাঁহাতের গোটানো শার্টের হাতায় গোঁজা ছোটো এক চিরকুট। কৌতুহলে সেটা তুলে নিয়ে চোখ বোলাল। ইংরেজিতে গোটা-গোটা হরফে লেখা, “ডেঞ্জার, বি কেয়ারফুল।”
পড়া শেষ করে জিজো ঘাড় ফেরাল। পালেল চেকপোস্টে এই সকালে ভিড় এমন কিছু বেশি নয়। কিন্তু লোক দু’জনকে আর দেখতে পেল না। এই সামান্য সময়ের মধ্যে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
পালেল থেকে গাড়ি ছাড়ার অল্প পরেই শুরু হল উঁচু-নীচু পাহাড়ি পথ। পথের দুপাশে ঝোপঝাড়, জঙ্গল। বড়ো আকারের গাছের ভিড়। দু’একটা পাহাড়ি গ্রাম। নীচের দিকে তাকালে দূরে ছবির মতো সমতলভূমি।
রোদের তেজ ইতিমধ্যে কিছু বেড়েছে। তবু পথ বেশ ফাঁকা। দু’একটা গাড়ি উল্টো দিক থেকে এসে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। পথের পাশে কোথাও জওয়ানরা কার্বাইন হাতে দাঁড়িয়ে।
গাড়ি যত উপরে উঠছে সকালের বাতাস যেন আরো মনোরম। এ পথের সবচেয়ে উঁচুতে টেংনুপাল। বাতাসে হিমেল পরশ আরো বাড়তে জিজো টের পাচ্ছিল, টেংনুপাল আসতে সম্ভবত আর দেরি নেই। এমন সময় এক টার্নিংয়ের কাছে আচমকা ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল গাড়ি। পথের মাঝে বড়ো এক বোল্ডার পড়ে রয়েছে। সম্ভবত অল্প আগে উপর থেকে গড়িয়ে এসেছে। পাহাড়ি পথে এমন প্রায়ই হয়।
গাড়ি থামিয়ে ব্রজেন্দ্র নেমে পড়েছে ইতিমধ্যে। অত বড়ো বোল্ডার একা তার পক্ষে সরানো সহজ হবে না বুঝে জিজোও নেমে এগিয়ে গেল। দু’জন সবে সেই বোল্ডারে হাত লাগিয়েছে, পথের পাশে গাছপালার আড়াল থেকে বের হয়ে এল জনাকয়েক মানুষ। একজনের হাতে কার্বাইন। দু’জনের হাতে শক্তিশালী এম-৯ পিস্তল। মুহূর্তের মধ্যে তারা ঘিরে ফেলল গাড়ি। কড়া গলায় কিছু বলতে গাড়ির ভিতরের মানুষগুলো সন্ত্রস্ত হয়ে হাত তুলে নেমে এল।
জিজো ব্রজেন্দ্রর সঙ্গে তখন বোল্ডার সরাতে ব্যস্ত। ব্যাপারটা যখন হৃদয়ঙ্গম হল ততক্ষণে কার্বাইন হাতে লোকটা এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। হতাশ ব্রজেন্দ্র হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে।

খানিক আগে পালেলের ব্যাপারটা মনে পড়তেই জিজোর বুঝতে বাকি রইল না, আগ্নেয়াস্ত্র হাতে লোকগুলোর লক্ষ্য সে। অন্য কেউ নয়। ব্যাপারটা মাথায় আসতেই গোড়ায় খানিকটা দমে গিয়েছিল ও। হঠাৎ মাথার পোকাটা নড়ে উঠল। এত সহজে হার স্বীকার করবে না। ঠিক এমন না হলেও রিংয়ে দাঁড়িয়ে অনেক সঙ্কটমুহূর্তের মোকাবিলা সে করেছে। মনস্থির করে ফেলতে তাই সময় লাগল না।
কার্বাইন উঁচিয়ে লোকটা তখন অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে বোল্ডারটা ও জোরে গড়িয়ে দিল তার দিকে। ঢাল পথ বেয়ে বোল্ডারটা গড়িয়ে গিয়ে পড়ল তার উপর। সামলাতে না পেরে পড়ে গেল লোকটা। জিজো ছুটে গিয়ে প্রচণ্ড এক লাথি মারল তার হাতের আগ্নেয়াস্ত্রে। মুহূর্তে সেটা ছিটকে গেল পথের ধারে ঘন ঝোপের ভিতর।
ততক্ষণে বোল্ডারটা আরো গড়িয়ে গিয়ে পড়েছে গাড়ির পাশে জটলার উপর। আর্তনাদ করে মানুষগুলো ছিটকে পড়েছে পথের উপর। সময় নষ্ট না করে জিজো ছুটে গিয়ে পিস্তল হাতে দুই দুষ্কৃতির উপর একই সঙ্গে হাত চালাল। সেই আঘাতে দু’জনের হাতের অস্ত্রই দূরে ছিটকে পড়ল।
আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর ব্যবস্থা করে জিজো এবার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। ওই সময় উলটো দিকে পথের বাঁকে তীব্র সাইরেনের আওয়াজ।
এই পথে এ-ধরনের উৎপাত প্রায়ই ঘটে থাকে। ব্রজেন্দ্রনিজেও শিকার হয়েছে বারকয়েক। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। ব্যাপারটা তখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাকিয়েছিল হাঁ করে। হঠাৎ ওই সাইরেনের শব্দে সংবিৎ ফিরে পেল। ছুটে এসে জিজোকে বলল, “আর চিন্তা নেই স্যার। আর্মির গাড়ি।
ব্রজেন্দ্র কথা শেষ হতে না হতেই পথের বাঁকের ওদিক থেকে আসাম রাইফেলস-এরএক টহলদার গাড়ি সামনে এসে ব্রেক কষল। ভিতর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে একজন বলল, “এনি প্রবলেম?”
পথের পাশেই জঙ্গল। আর্মির গাড়ির আওয়াজ পেয়ে ততক্ষণে আক্রমণকারী লোকগুলো দ্রুত জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়েছে। এমনকি গাড়িতে বাকি যারা ছিল তারাও। ব্রজেন্দ্র উত্তর দেবার আগেই জিজো বলল, “তেমন কিছু নয় স্যার। পথের মাঝে একটা বোল্ডার পড়েছিল। ক্লিয়ার করার জন্য থামতে হয়েছে।”
আর্মির গাড়ি অপেক্ষা না করে চলে গেল। ব্রজেন্দ্র বলল, “গাড়িতে উঠে পড়ুন স্যার। দেরি করবেন না।”
ব্রজেন্দ্র ভুল বলেনি। তবু জিজো সামান্য দ্বিধান্বিত, “কিন্তু বাকি প্যাসেঞ্জাররা?”
“ওদের কথা ভাবতে হবে না স্যার। এদিকের সাধারণ মানুষ আর্মির লোকদের খুব ভয় পায়। তাই গা ঢাকা দিয়েছে। এই অবস্থায় এখানে দেরি করা একেবারেই ঠিক হবে না।”
কথা না বাড়িয়ে জিজো উঠে পড়তেই ব্রজেন্দ্র মুহুর্তে গাড়ি ছেড়ে দিল। এরপর টেংনুপাল-এর আর্মি চেকপোস্টে সামান্য সময় ছাড়া গাড়ি কোথাও আর থামেনি।
টেংনুপাল ছেড়ে আসতেই শুরু হল উতরাই পথ। পাহাড় থেকে নামার পালা এবার। ক্রমে পাহাড়ি পথ শেষ হয়ে এল একসময়। সড়কের দু'পাশে ফের সেই সমতলভূমি। ছড়ানো দু'একটা ছোটো টিলা। চাষের খেত। অল্প পরেই সামনে পথ জুড়ে এক তোরণ। উপরে লেখা, “ওয়েলকাম টু মোরে।”
হাসিখুশি ব্রজেন্দ্র সেই ঘটনার পর একেবারেই বদলে গেছে। একটি কথাও বলেনি। গাড়ি হয়ত আর দু’পাঁচ মিনিটের মধ্যে মোরে পৌঁছে যাবে। হয়ত ওর সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে না। জিজো বলল, “ব্রজেন্দ্র, পথে যা ঘটল তাতে পরে তোমার কোনো সমস্যা হবে না তো?”
কয়েক মুহূর্ত কী চিন্তা করল ব্রজেন্দ্র। তারপর বলল, “তেমন মনে হয় না স্যার। আর হলেও সামলে নিতে পারব। বরং চিন্তা হচ্ছে আপনার জন্য। পথের মাঝে যারা হামলা করেছিল, ওদের কাউকে চেনেন?”
“না তো!” অবাক হল জিজো, “মাত্র দিনকয়েক হল মণিপুরে এসেছি। ইম্ফলের বাইরে এই প্রথম। কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্নের কারণ?”
“ন-না। তেমন কিছু নয় স্যার।” গোড়ায় সামান্য থতমত খেয়ে গেলেও মুহূর্তে সামলে নিল ব্রজেন্দ্র। “আপনি নতুন, তাই বললাম।”
“ব্রজেন্দ্র, তুমি কিছু চেপে যাচ্ছ মনে হচ্ছে।”
“স্যার,” সামান্য ইতস্তত করল ব্রজেন্দ্র, “মনে হচ্ছে, ওদের টার্গেট ছিলেন আপনি। একটু সাবধান থাকবেন স্যার। তার উপর ওরা থাড়ু।”
“থাড়ু! সেটা কী?” অবাক হল জিজো।
“কুকি সম্প্রদায়ের মানুষ এদিকে থাড়ু নামে পরিচিত। এদিকে ওরাই সংখ্যায় বেশি। একমাত্র বর্মিদেরই কিছু সমীহ করে। তেমন ঘাঁটায় না।”
কথা শেষ করে ব্রজেন্দ্র ওর দিকে তাকালেও জিজো আর প্রশ্ন করল না। ততক্ষণে অনেক কিছুই ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। দিন তিনেক আগে ইম্ফলের হোটেলে মিঃ শিবরামন এদের কথাই বলেছিলেন। বেচারা ব্রজেন্দ্রকে তাই আর ব্যস্ত করল না।
একটু পরেই গাড়ি শহরে ঢুকে পড়ল। গ্রামের গন্ধ মেশান ছোটো শহর মোরে। পাহাড় পার হয়ে এলেও সমতল। পথে মানুষের ভিড় যথেষ্ট। দু’পাশে শুধু দোকানের সারি। পাকা বাড়ির সঙ্গে কাঠের বাড়িও রয়েছে।
পথের উপর মেয়েরা সওদা নিয়ে বসে আছে। তাদের মুখের আদল, কথার ধরনে সীমান্তের ওপার থেকে আসা বর্মি বলে মনে হচ্ছিল। পাশে ব্রজেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করতে যাবে, হঠাৎ এক ব্যাপার ঘটল। পথে একেই মানুষের ভিড়। মাল বোঝাই এক ট্রাক সামনে পড়তে ব্রেক কষেছিল ব্রজেন্দ্র। গাড়ির ইঞ্জিন কী কারণে থেমে গেল। ট্রাক বেরিয়ে যেতে ফের স্টার্ট দিলেও গাড়ি স্টার্ট নিল না। মৃদু আওয়াজ করে নিশ্চুপ হয়ে গেল। আরো বার কয়েক চেষ্টার পরে ব্রজেন্দ্র হতাশ গলায় বলল, “সরি স্যার, মনে হচ্ছে গাড়ি গ্যারেজে নিতে হবে। আপনাকে কী রিকশা ডেকে দেব?”
স্ট্যান্ডের কাছে তখন পৌঁছে গেছে গাড়ি। এই অবস্থায় রিকশা নেবার প্রশ্ন ওঠে না। জিজো অল্প ঘাড় নাড়ল, “তার দরকার হবে না ভাই। একা মানুষ। একটা ব্যবস্থা করে নেব।”
ব্রজেন্দ্র আপত্তি করল না। কাঁচুমাচু মুখে বলল, “সরি স্যার, আপনাকে হোটেলে পৌঁছে দিতে পারলাম না। ব্যাড লাক।”
সামান্য হাত নেড়ে ওকে আশ্বস্ত করে জিজো সামনে বাজারের দিকে এগিয়ে গেল। সেই দিনের পর শিবরামনের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। ও যে ইম্ফল ছেড়ে মোরে’তে চলে এসেছে, সেটাও জানানো যায়নি। তবে পালেলে সেই চিরকুট প্রাপ্তির পরে মনে হয়েছে, ওটা নিয়ে আপাতত মাথা না ঘামালেও চলবে। জিজো কাছেই পথের উপর ছোটো এক হোটেল পেয়ে ঢুকে পড়ল। তবে একেবারেই দেরি করল না সেখানে। মালপত্র রেখে বেরিয়ে পড়ল একটু পরেই। হাতে আপাতত কাজ যখন নেই, একটু ঘুরে আসা যেতে পারে।
বেলা বাড়তে শহরের পথে ভিড়ও ইতিমধ্যে বেড়েছে। দোকানে কেনাকাটার বিরাম নেই। তার মধ্যে সহজেই চোখ টানে কাঠের ফার্নিচারের দোকানগুলো। ভিতরে সাজানো হরেক রকমের আসবাবপত্র। এমন কী দরজা-জানালা পর্যন্ত। সবই দুর্মূল্য বর্মা টিক তথা সেগুন কাঠের।
মায়ানমারে সেগুন কাঠ রপ্তানি নিষেধ। কিন্তু আসবাবপত্র নয়। তাই ওপার থেকে ট্রাক ভরতি হয়ে আসে সেগুন কাঠের জিনিসপত্র। বেশিরভাগই অসম্পূর্ণ অবস্থায়। এখানে সম্পূর্ণ হয় সেগুলো। দোকানে মিস্ত্রির দল সেই কাজে ব্যস্ত। কাজ সম্পূর্ণ হলেই ফের ট্রাকে চেপে চলে যায় দেশের দূরদূরান্তে।
ওপার থেকে ট্রাক ভরতি শুধু ফার্নিচার নয়, তলায় চাপা দিয়ে চলে আসে সেগুনের মোটা বিম। এপারে এনে ফেলতে পারলেই সোনা। মোরে তাই নিতান্ত ছোটো এক শহর হলেও জমজমাট একটা ব্যাবসা কেন্দ্র।
ব্যস্ত পথের উপর সারি দিয়ে ট্রাক দাঁড়িয়ে। মালপত্রের বড়ো বড়ো গাঁটরি সাজান হচ্ছে। সবই ওপার থেকে আসা। এবার ইম্ফল হয়ে চলে যাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পথের পাশে লুঙি-পরা বর্মি মেয়েরা মালপত্র সাজিয়ে বসে আছে। অনেকের কপালেই চন্দনের মতো প্রলেপ। তাদের পসরায় বিদেশি সস্তা মালপত্রই শুধু নয়। রয়েছে ওপার থেকে আনা কাঁচা আনাজ, জ্যান্ত মাছ। বিক্রিবাটার ফাঁকে আরামে বর্মি চুরুট টানছে কেউ। দেশের মধ্যেই এ যেন এক বিদেশ।
জিজোর হঠাৎ মনে হল, হাতে সময় যখন আছে, এই ফাঁকে একবার সীমানার ওপার থেকে ঘুরে আসা যায়। সেদিন শিবরামনের কাছেই শুনেছিল, বিকেল চারটেয় সীমান্তের গেট বন্ধ হয়। ফিরে আসতে হয় তার আগেই। সে ছাড়া অতিরিক্ত আরো কিছু খবর সে পরে অন্যভাবেও জোগাড় করেছে।
সময় নষ্ট না করে ও স্ট্যান্ডে অপেক্ষমাণ এক অটোর দিকে এগিয়ে গেল। আর্জি শুনে অটোওয়ালা বলল, “কোথায় যাবেন স্যার? নামফ্লং, না তামু পর্যন্ত?”
অটোওয়ালার ওই কথায় জিজো সামান্য নড়ে উঠল। নামফ্লং সীমান্ত পার হয়ে ওপারে অল্প দূরে এক বাজার। সবকিছুই পাওয়া যায়। তাই অনেকে ওখানেই কেনাকাটা করে থাকে। এক মুহূর্ত চিন্তা করে জিজো বলল, “তামু। তবে ‘আই ডি’ কার্ড নেই। ওটার ব্যবস্থা করতে হবে।”
গেট পার হবার জন্য এন্ট্রি ফি-র সঙ্গে একটা ‘আইডি’ কার্ড লাগে। অটোওয়ালা সেকথা শুনে বলল, “হয়ে যাবে স্যার। একস্ট্রা একশো টাকা লাগবে।”
অনেক বেশি চাইছে। সীমান্ত পার হবার জন্য এন্ট্রি ফি-র সঙ্গে এখানে যে ‘আইডি’ কার্ড ব্যবহার হয়, তা আসলে এদিকের কোনো চার্চ, মন্দির বা পরিচিত সংস্থার প্যাডে বা রবার স্ট্যাম্প দেওয়া এক টুকরো মামুলি কাগজ। জোগাড় করা কষ্টসাধ্য নয়। কিন্তু জিজো তাতেই রাজি হয়ে গেল। ওকে অটোতে তুলে লোকটা খানিক এগিয়ে এক চার্চের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বলল, “আইডি কার্ডের জন্য একবার চার্চে যেতে হবে। টাকাটা এখনই চাই। আর একটা কাগজে নাম ঠিকানা লিখে দিন।”
জিজো পার্স খুলে একটা একশো টাকার নোট তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “সঙ্গে যেতে পারি?”
জিজো ভেবেছিল, হয়ত আপত্তি আসবে। কিন্তু তেমন কিছু হল না। অটোওয়ালা বরং খুশি হয়ে বলল, “তবে চলুন স্যার। সঙ্গে পার্টি থাকলে ফাদার বেশি ঝামেলা করে না।”
ফাদারের বয়স বেশি নয়। স্থানীয় কুকি উপজাতির মানুষ। অটোওয়ালার সঙ্গে মিনিটখানেক বাক্যালাপের পর ফাদার ওকে দু'চারটে প্রশ্ন করলেন। তারপর চার্চের প্যাডে কয়েক লাইন লিখে এগিয়ে দিলেন ওর দিকে। সীমান্তের ওপারে যাওয়ার ছাড়পত্র।
সব মিনিটপাঁচেকের মধ্যেই মিটে গেল। চার্চ থেকে বেরিয়ে দু’জন ফিরে এল রাস্তায় দাঁড়ানো অটোর কাছে। জিজো বসতে যাবে, তাকিয়ে দেখল পিছনের সিটে ভাঁজ করা ছোটো এক চিরকুট পড়ে আছে। অটোওয়ালা গাড়ি স্টার্ট করতেই ও আলগোছে সেটা তুলে নিয়ে সন্তর্পণে খুলে ফেলল। ইংরেজিতে লেখা, অপারেশন টি-ওয়ান। গো অ্যাহেড।
জিজো বিশেষজ্ঞ নয়। তবু ক্যাপিটাল হরফে লেখা সেই অক্ষরগুলোর দিকে তাকিয়ে বেশ বুঝতে পারল, পালেল চেকপোস্টের কাছে যে চিরকুট ওর আস্তিনের ভঁজে খুঁজে দেওয়া হয়েছিল, সেটাও এই একই হাতের লেখা।
মোরে শহরের চৌহদ্দি পার হয়ে খানিক এগোতেই ছোটো এক নদীর উপর ব্রিজ পার হলেই মায়ানমার। ব্রিজ পার হয়ে সওয়ারি নিয়ে চলেছে সাইকেল আর মাল-বোঝাই ভ্যান-রিকশা, অটো। পার হয়ে এলেই দুই দেশের ফারাক বোঝা যায় পথের পাশে সেগুন গাছের ভিড় দেখে। পথে মানুষের ভিড়ও কিছু কম। মিনিট কুড়ির মধ্যে জিজো তামু পৌঁছে গেল।
মোরের মতো তামুও প্রায় সমতল। তবে অনেক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দু’পাশে ঝকঝকে বাড়ি, দোকান-ঘর। ঝকঝকে রাস্তায় চলেছে জাপানি টয়োটা।
এখানেও বর্মি মেয়েরা পথের ধারে পসরা সাজিয়ে বসে আছে। তবে কাঁচা বাজারের সামগ্রী নয়। চিন আর থাইল্যান্ডে তৈরি হরেক ইলেক্ট্রনিক গুড়স, রেডিমেড পোশাক।
কেনাকাটা সবই প্রায় ভারতীয় টাকায়। বর্মি মুদ্রা ‘চ্যাট’ও চলছে। তবে তুলনায় কম। কেনাকাটা শুধু দোকানেই নয়, চলছে বাড়ির ভিতরেও।
কিন্তু কেনাকাটা জিজোর উদ্দেশ্য নয়। তাই ঘুরে-ঘুরে দেখছিল। ওই সময় হঠাৎই এক দোকানের দিকে চোখ পড়তে সে থমকে গেল। খুব বড়ো না হলেও বেশ সাজানো গোছানো দোকান। দু’জন কর্মচারি কাস্টমার সামলাচ্ছে। অন্যপাশে ক্যাশবাক্সের কাছে বসে মাঝবয়েসি এক বর্মি ভদ্রলোক। সম্ভবত দোকানের মালিক। তাঁর পিছনের দেয়ালে তাজা ফুলের মালা পরানো দামি ফ্রেমে বাঁধানো একটা ফটো। চেয়ারে বসা একজন অভিজাত চেহারার বয়স্ক পুরুষ। গায়ে হাফহাতা শার্টের উপর হাতাকাটা কোট চাপানো। পরণে নিপাট ধুতি। মোজার উপর ভারি বুট জুতো। সেকালের নির্ভেজাল বঙ্গসন্তান।
দারুণ কৌতূহলে জিজো দোকানে ঢুকে ক্যাশবাক্সের কাছে বসা মানুষটির কাছে গিয়ে হাত তুলে বলল, “নমস্কার স্যার। একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
প্রত্যুত্তরে ভদ্রলোক সামনের দিকে এক পলক তাকিয়ে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে বসতে ইঙ্গিত করে পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন, “স্যার, আর ইউ বেঙ্গলি? ফ্রম ক্যালকাটা?”
এতটা আশা করেনি জিজো। মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ স্যার।”
“বাবু পবনদেব চৌধুরী বা তাঁর পরিবারের কাউকে চেনেন? নাম শুনেছেন?”
“ন-না স্যার। সামান্য থতমত খেলেও সামলে নিল জিজো। কিন্তু কেন বলুন তো? দেয়ালের ওই ছবিটি কি ওনার?”
“ঠিক তাই স্যার। উনি আমার বাবা উ সেনের মালিক ছিলেন। অবশ্য আমি দেখিনি। তখন জন্মই হয়নি আমার। বাবার কাছে শুনেছি।”
“এই দোকান কি বাবু পবনদেব চৌধুরী করেছিলেন?”
“না স্যার। সেই ১৯৪২ সালে ইন্দোবর্মা সড়ক তৈরি হয়েগেলেও এই তামু বা ওপারে মোরে তখন নিতান্তই ছোটো দুটো গ্রাম। তাছাড়া...”
ওইসময়ক্যাশ জমা করতে এক কাস্টমার আসায় উনিকথা থামিয়ে তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ততক্ষণে জিজো গল্পের গন্ধ পেয়ে গেছে। এই মুহূর্তে হাতে কাজ নেই। আর বক্সার হলেও পুরোনো দিনের গল্পে ওর আগ্রহ বরাবর। সেদিন মিঃ শিবরামনের কাছে কিছুটা শোনার পরে কৌতূহলে নেট খুলে ইতিমধ্যে আরো অনেক তথ্যই জানতে পেরেছে।
বর্মার রাজধানি রেঙুনে জাপান প্রথম বোমা ফেলেছিল ১৯৪১ সালের ২৩শে ডিসেম্বর বেলা দশটা নাগাদ। শুধু বোমা নয়, মেশিনগান থেকে অবিরাম গুলিবৃষ্টি। প্রায় আধঘণ্টার লাগাতার আক্রমণে ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল রেঙুন শহর। ভেঙে পড়েছিল বহু ঘরবাড়ি। মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল প্রচুর।
সেই ভয়ানক ধাক্কা রেঙ্গুন আর সামলাতে পারেনি। কারণও ছিল। রেঙুন শহরের প্রশাসন, পরিবহন প্রভৃতি দপ্তরের অধিকাংশ পদস্থ কর্মচারীই ছিল বাইরের মানুষ। মূলত বাঙালি। আতঙ্কে তারা তখন দিশেহারা। ইতিমধ্যে শহরে শুরু হয়ে গেছে লুঠতরাজ। নানা ভয়ানক গুজব। ব্রিটিশ সরকার চেষ্টা করেও সেই অবস্থা সামলে উঠতে পারেনি। প্রাণ বাঁচাতে ইতিমধ্যে অনেকেই ছুটেছে টাঙ্গুর দিকে।
টাঙ্গু ছোটো শহর। হয়ত কিছু নিরাপদ। বিকেলের আগেই ট্রেনে অসম্ভব ভিড়। জাহাজে তিল ধারণের স্থান নেই। সবাই পালাতে চায়। দেশে একটা খবর পাঠাতে টেলিগ্রাফ অফিসের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও কাজ হয় না। কর্মচারীর অভাবে লাইন মাঝে মাঝেই বিকল।
এই অবস্থায় ২৫ তারিখ ফের বোমা পড়ল শহরে। ষোলকলা পূর্ণ হল যেন।এর উপর দিনকয়েকের মধ্যে খবর এল মৌলমিন, এমনকী পেগুও জাপানিদের দখলে চলে গেছে। সেদিক থেকে সমানে উদ্বাস্তুর ঢল।
এরপর যেদিন খবর পাওয়া গেল বোমা পড়েছে টাঙ্গুতেও, জাপানিরা পেগু হয়ে ন্যাংলবিন পৌঁছে গেছে, বর্মার বাবু তথা বঙ্গভাষীরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে ফেলতে শুরু করলেন।
এর পিছনে কারণ ছিল আরো একটা। প্রশাসন, পরিবহন প্রভৃতি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারী হবার সুবাদে তাঁরা স্থানীয় সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব একটা ভাল ব্যবহার করতেন না। ফলে বর্মি শ্রমজীবী মানুষের কিছু ক্ষোভ ছিলই। এবার ডামাডোলের ভিতর তার কিছু অবাঞ্ছিত প্রতিফলন দেখা দিতে শুরু করল। বর্মায় বাঙালিদের তখন প্রকৃতই এক সসেমিরা অবস্থা।
ইতিমধ্যে হাতের কাজ সারা হতে ভদ্রলোক বললেন, “সে অনেক কথা স্যার। আমার বাবা অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কোনো খোঁজ পাননি। আপনার মতো কোনো বাঙালি টুরিস্ট পেলে তাই জিজ্ঞাসা করা অভ্যাস হয়ে গেছে। কিছু মনে করবেন না।”
“না-না, তা কেন!” গল্পের গন্ধে জিজো ফের নড়ে উঠল। “বুঝতে পারছি বাবু পবনদেব চৌধুরীর অনেক কথা আপনার মাথায় জমে রয়েছে। সম্ভব হলে বলুন না। কলকাতায় ফিরে খোঁজ নেব।”
“তাহলে শুনুন স্যার,” কিছু উজ্জ্বল হয়ে উঠল মানুষটির চোখদুটো, “সেই ১৯৪২ সালে যখন উনি বর্মা ছেড়ে যান, রেঙুন আর মিনজানে তখন ওঁর বিরাট ব্যাবসা। প্রচুর টাকার মালিক। আমার বাবা তখন তাঁর সামান্যই এক কর্মচারী।
“এদেশ ছেড়ে যাবেন, এমন ইচ্ছা একেবারেই ছিল না। আমার বাবা, এমনকি অন্য বর্মি কর্মচারীরাও মানা করেছিলেন। উনি সম্মতও হয়েছিলেন। কিন্তু পরিবার-পরিজনদের ইচ্ছেয় শেষে মত পালটালেন।
“রেঙুনে বোমা পড়তে উনি পরিবার নিয়ে চলে এসেছিলেন মিনজানে। কালেয়া পর্যন্ত যাবার জন্য বড়ো এক নৌকো ভাড়া করা হল। আমার বাবা কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ওনার সঙ্গে ছিলেন।
“দীর্ঘ, প্রায় পনেরো দিনের পথ। পথে ডাকাতের উপদ্রব। তবে ওনার দুটো বন্দুক ছিল। দলবল নিয়ে বাবাও তৈরি ছিলেন। ফলে নানা বাধাবিপত্তি এলেও সমস্যা হয়নি। এরপর কালেয়া থেকে গরুর গাড়ি। কুলিদের মাথায় মালপত্র চাপিয়ে কিছু হাঁটা পথ। শেষে একদিন ওঁরা এই তামুতে পৌঁছোলেন। সীমানার ওপারে ছোটো আর একটা গ্রাম মোরে। দীর্ঘ পথ পার হয়ে ভারত সীমান্তে পৌঁছে ওরা সবাই তখন প্রায় হাঁফ ছেড়েছেন। মুখে খুশির হাসি। বাবাকে ডেকে বললেন, ‘উ, এবার ফিরে যাও তোমরা।’ ”
“বাবা প্রথমে রাজি হননি। বলেছিলেন, তা হয় না বাবু। ডিমাপুর পৌঁছে একেবারে ট্রেনে তুলে দিয়ে তবে ফিরব।”
“উনি রাজি হলেন না। বললেন, তা হয় না উ। তোমরা বর্মি। ওদিকের সারা পথে উদ্বাস্তুর স্রোত। সমস্যা হতে পারে।”
“কথাটা মিথ্যে নয়। বাবা তাই আর আপত্তি করেননি।
এরপরেই উনি অন্য কথা পাড়লেন।
“বাবু পবনদেব চৌধুরী প্রকৃত ব্যবসায়ী মানুষ ছিলেন। ইন্দোবর্মা সড়কে পাশাপাশি দুটো সীমান্ত গ্রাম দেখেই বুঝেছিলেন, দারুণ ভবিষ্যৎ রয়েছে জায়গাটার। বাবাকে একান্তে বললেন, ‘উ, কিছু টাকা দিচ্ছি তোমাকে। অবস্থা শান্ত হলে এই তামুতে কিছু জায়গা-জমি কিনে নিও। আমার মন বলছে, আগামী দিনে এই ছোটো গ্রামের ভোল পালটে যাবে। তোমার ব্যাবসায়ীক বুদ্ধি আছে। ঠিক জমিয়ে নিতে পারবে। টাকাটা একেবারে নিঃস্বার্থ ভাবে দিচ্ছি, এমন নয়। তেমন বুঝলে পরিবার রেখে আমি হয়ত আবার ফিরে আসব। রেঙুন, মিজানের সঙ্গে এই তামুতেও কারবার শুরু করব। তখন তোমার সাহায্যের দরকার পড়বে।’ ”
“স্যার,” অল্প থেমেভদ্রলোক বললেন, “এরপর যে অঙ্কের টাকা তিনি বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, চোখে দেখা দূরে থাক, স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবতে পারেননি। মানুষটির পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিলেন।
“বাবা তামুতে ফিরে এসেছিলেন এর প্রায় বছর পনেরো বাদে। ততদিনে দেশের অবস্থা কিছুটা হলেও থিতু হয়েছে। এখানে এই ব্যাবসা তার বছর কয়েক পরে। গোড়ায় শুরু করেছিলেন সেগুন কাঠ চালান। তারপর আইন করে সেগুন চালান বন্ধ হয়ে যেতে শুরু হল সেগুনকাঠের ফার্ণিচার এক্সপোর্ট। সেই ব্যাবসা এখনো রয়েছে স্যার। সঙ্গে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ইলেক্ট্রনিক গুডস আর এই গারমেন্টের দোকান। এক্সপোর্ট আর ইমপোর্ট দুটোই।”
এদের ব্যাবসা যে যথেষ্টই বিস্তৃত, জিজো বুঝতে পারছিল। ভদ্রলোক সামান্য থামতেই বলল, “বাবু পবনদেব চৌধুরী আর ফিরে আসেননি বোধ হয়?”
“সেই কথাই তো বলতে বসেছি স্যার। না, উনি আরফিরে আসেননি। বাবা তাঁর খোঁজ নেবার জন্য চেষ্টা কম করেননি। কলকাতায় নিজে যেতে পারেননি ঠিকই। কিন্তু লোক পাঠিয়ে চেষ্টা করেছেন অনেক। শুধু তামু নয়, ওদিকে মোরেতেও বাবা ওনার জন্য কিছু জমি কিনে রেখেছিলেন। এমনকী মৃত্যুশয্যাতেও আমাকে বার কয়েক বলে গেছেন তাঁর কথা। তাই আপনাদের মতো কাউকে পেলেই সেই প্রসঙ্গ তুলি।”
কলকাতা বড়ো শহর। কিন্তু চেষ্টা করলে একজন মানুষ বা তাঁর পরিবারে খোঁজ মিলবে না, এমন নয়। জিজো বলল, “হয়ত কলকাতা নয়, অন্য কোনো শহরে ঠাঁই নিয়েছিলেন তিনি।”
“হতে পারে স্যার। তবে...”
কিছু বলতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেলেন ভদ্রলোক। জিজো তাগাদা দিতে ভদ্রলোক কিছুক্ষণ মৌন থেকে শেষে বললেন, “বাবার তাগিদে আমি নিজেও চেষ্টা কম করিনি। একাধিকবার ডিমাপুর পর্যন্ত গিয়েছি। কথা বলেছি বহু মানুষের সঙ্গে। তাতেই এক ঘটনার কথা কানে এসেছিল। বড়ো মর্মান্তিক।”
“কী ঘটনা?” প্রায় রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করল জিজো।
“স্যার,” অস্ফুট কণ্ঠে ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, “একটা কথা বলি। সেই ভয়ানক সময়ে বর্মা ছেড়ে পালানো উদ্বাস্তু মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন ভারতে ঢোকার পরে। হাঁটা পথে বর্মার ভিতরে প্রায় সবটাই ছিল সমতল। গরুর গাড়ি নয়তো জলপথে নৌকো জোগাড় করা গেছে।
“কিন্তু ভারতের দিকে প্রায় পুরোটাই পাহাড়ি অঞ্চল। ভয়ানক চড়াই আর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পথ। পরিশ্রান্ত মানুষগুলো খাওয়ার জল নেই, পাহাড়ি বনজঙ্গলের পথে পর্যাপ্ত কুলি নেই। অসুস্থ হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ মারা গেছে। রাতের অন্ধকারে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে শেয়াল আর নেকড়ে ছিঁড়ে খেয়েছে। দেখার লোক নেই। এছাড়া ছিল লুঠেরার দল। টেংনপালের কাছে এক বৃদ্ধ গাঁওবুড়োর কাছে শুনেছিলাম, সেই সময় এক উদ্বাস্তু পরিবার রাতে লুঠেরাদের হামলার মুখে পড়েছিল। পরিবারের কর্তার কাছে বন্দুক ছিল। তিনি বন্দুক চালাতে শুরু করেন। লুঠেরাদের কয়েকজন মারা যায়।
“তখন ফিরে গেলেও লুঠেরার দল এরপর দলে ভারি হয়ে আবার ফিরে এসেছিল। পরিবারের সবাইকে খুন করে জিনিসপত্র লুঠ করে নিয়ে গিয়েছিল। পথের পাশে পড়ে ছিল মৃতদেহগুলো। সৎকারও হয়নি। সামান্য যেটুকু জানতে পেয়েছিলাম, তাতে মনে হয়েছিল, বাবু পবনদেব চৌধুরীর পরিবার ছিল ওটি। অবশ্য বাবাকে সেকথা কোনো দিনই বলতে পারিনি। তিনি বেঁচে থাকতে বলিনি অন্য কাউকেও।”
ক্রমে ভারি হয়ে আসছিল ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর। থামলেন উনি, চট করে জিজোর মুখেও কথা জোগাল না। ওই সময় কাউন্টারের টেলিফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। ভদ্রলোক স্বাভাবিকভাবেই টেলিফোন তুলেছিলেন। কিন্তু অল্প সময় পরেই তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল। হঠাৎ গর্জে উঠে প্রায় ঝড় তুললেন ওপ্রান্তের মানুষটিকে উদ্দেশ্য করে। তার বিন্দুবিসর্গও জিজো বুঝতে পারল না। প্রায় মিনিট দুয়েক টানা চিৎকারের পরে ভদ্রলোক যখন টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন, থমথম করছে মুখ। বিন্দু বিন্দু ঘাম। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছতে মুছতে বললেন, “স্যার, আপনি তামুতে বেশিক্ষণ আর থাকবেন না।”
“কেন স্যার? কী হয়েছে?”
“বুঝতে পারলাম না। এসব জায়গায় ব্যাবসা করতে হলে কিছু অন্য যোগাযোগ রাখতেই হয় আমাদের। তাদেরই একজন হঠাৎ ফোন করেছিল। আপনি আর দেরি না করে মোরে ফিরে যান। আমি সঙ্গে লোক দিচ্ছি। সে অটোয় আপনাকে পৌঁছে দেবে। আর একটা কথা, ওখানে পৌঁছেও একটু সাবধানে থাকবেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইম্ফলে ফিরে গেলেই ভাল হয়।”
জিজো এবার প্রমাদ গুণল। ভদ্রলোক ভেঙে না বললেও সন্দেহ নেই, ফোনে কিছু একটা নির্দেশ ওনাকে দেওয়া হয়েছে। তাতে যথেষ্টই উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। ও তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল। “তার দরকার নেই স্যার। আমি নিজেই চলে যেতে পারব। আপনি একেবারেই ভাববেন না।”
বিন্দুমাত্র উত্তেজনাবিহীন জিজোর সেই কথায় ভদ্রলোক তাকিয়ে রইলেন ওর দিকে। অভিজ্ঞ চোখে কিছুক্ষণ জরিপ করে নিয়ে বললেন, “স্যার, আমার নাম মো সেন। যদি কোনো সমস্যা হয়, আমার কথা বলবেন। আমি বলে দিয়েছি ওদের। মনে হয়, কাজ হবে।”
ঘাড় নেড়ে জিজো দ্রুত দোকান থেকে বের হয়ে এল। আজ সকাল থেকে অনেক কিছুই প্রায় হেঁয়ালির মত। যে মানুষটির কাজ নিয়ে ও এখানে পা দিয়েছে সেই শিবরামন এখনও অধরা। তবে সন্দেহ নেই, তার লোকজন ওকে নজরে রাখছে। ব্যাপারটা কিছু রহস্যময় বইকি।
তবে দোকানের মালিক মো সেনকে যিনি ফোন করেছিলেন, তিনি শিবরামনের লোক না হবারই সম্ভাবনা। তেমন হলে তারা মো সেনকে ফোন করত না। যেভাবে আগের দু’বার ওর কাছে চিরকুট পৌঁছে দিয়েছে সেইভাবেই নির্দেশ পাঠাত।
ভাবতে গিয়ে খানিক আগে ড্রাইভার ব্রজেন্দ্রর কথা মনে পড়ে গেল। এদিকে থাড়, অর্থাৎ কুকিরা একমাত্র বর্মিদেরই কিছু সমীহ করে। সহজে ঘাঁটায় না। ব্যাপারটা মনে পড়তে রহস্যটা যেন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেল ওর কাছে। শুধু শিবরামনের লোক নয়, ওর উপর নজর রেখে চলেছে অন্যপক্ষও।
মনস্থির করে জিজো পরবর্তী কয়েক মিনিট শহরের পথে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘোরাফেরা করে বেড়াল। কয়েকটা দোকানে ঢুকে জিনিসপত্রের দরদাম করেও কিছু সময় কাটলো। তারপরেই বুঝতে পারল, ওর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়নি। একটা মানুষ খানিক দূর থেকে নজর রাখছে ওর উপর। তবে লোকটা কোন পক্ষের, বা আরো কেউ ওর উপর নজর রাখছে কিনা অনেক চেষ্টা করেও বুঝে উঠতে পারল না। জিজোর মাথায় হঠাৎ এক মতলব খেলে গেল।
যথেষ্ট বলিষ্ঠ চেহারার লোকটা স্থানীয় মানুষ। সঙ্গে হয়ত অস্ত্রও রয়েছে। আর সন্দেহ নেই, সেটা আগ্নেয়াস্ত্র। এ-সব অঞ্চলে ওটা মুড়ি-মিছরির মতোই মেলে। পা ফেলতে হবে যথেষ্ট হিসেব করে। এই ব্যস্তসমস্ত পথে সেটা সম্ভব নয়।
মুহূর্তে মনস্থির করে ফেলল ও। ইতিমধ্যে জিজো লক্ষ করেছে, তামু শহরের এই ঝাঁ-চকচকে জৌলুস শুধুই মূল সড়কের দু'ধারে। বাস স্ট্যান্ড থেকে বাস ছুটছে কালেয়া, মান্দালয় প্রভৃতি শহরে। পাশেই ঝকঝকে ব্যাঙ্ক। অথচ যে কোনো গলিপথ ধরে সামান্য এগোলেই মোরের সঙ্গে তেমন পার্থক্য নেই। সেই পুরোনো আমলের বিবর্ণ বাড়ি। বেশিরভাগই কাঠের। নয়তো ঝুপড়ি গোছের। এছাড়া গাছপালায় ভরা ফাঁকা জমি। চাষের খেত। পথে লোকজনও কম।
জিজো চট করে তেমন এক গলিপথে ঢুকে পড়ল। মিনিট খানেক এগোতেই প্রায় ফাঁকা হয়ে এল পথ। দু’ধারে গাছপালার ভিতর সেগুন গাছের সংখ্যাই বেশি। তারই আড়ালে ফাঁকায় দু’একটা ঘর-বাড়ি। খানিক দূরে একটেরেতে ছোটো এক কাঠের বাড়ি। সামনে বারান্দায় এক বয়স্ক বর্মি মহিলা কিছু জামা-কাপড়ের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। অন্য কেউ নেই। ও এগিয়ে গেল সেদিকে। ওকে দেখে আগ্রহে উঠে দাঁড়াল মহিলা। ভাঙা ইংরেজি আর হিন্দি মিশিয়ে বলল,“আসুন বাবু, ভাল থাই গারমেন্ট পাবেন। অনেক সস্তায়।”
তামুতে থাইল্যান্ড আর চায়নায় তৈরি জিনিসপত্রই বেশি। তুলনায় থাইল্যান্ডে তৈরি জিনিসের দাম বেশি। কোয়ালিটিও ভাল। কিন্তু এক নজরে জিনিসগুলো দেখে তেমন মনে হল না জিজোর। তবে তা নিয়ে ওর মাথাব্যাথা নেই। একটা টুল টেনে বসে পড়ল। অভিজ্ঞ মহিলা ওর মুখের ভাব দেখে বুঝে ফেলল ব্যাপারটা। হেসে বলল, “বাবু, আরো ভাল জিনিসও আছে আমার কাছে। দেখবেন?”
উত্তরে জিজো মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই মহিলা ভিতরে চলে গেল। জিজো এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করছিল। গলিতে ঢোকার পর ও আড়চোখে দেখে নিয়েছে, সেই লোকটাও অনুসরণ করেছে ওকে। মহিলা ভিতরে চলে যেতেই মাথা ঘোরাল। আর তৎক্ষণাৎ একটা ঠান্ডা ধাতব স্পর্শ ওর শিরদাঁড়ার উপর এসে ঠেকল। স্পর্শটা যে রিভলবারের নল, বুঝতে বিলম্ব হল না।
দেরি হয়ে গেছে অনেক। লোকটা ইতিমধ্যেই যে নিঃশব্দে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, টের পায়নি। এ অবস্থায় লোকটার হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। তাই চুপ করে রইল। ইতিমধ্যে দোকানের মহিলা ভিতর থেকে একটা কাপড়ের গাঁটরি হাতে বেরিয়ে এসেছে। লোকটা তাকে হিমশীতল গলায় স্থানীয় ভাষায় কিছু বলল। সেই কথায় মহিলার দু’চোখের তারায় মুহূর্তে অন্ধকার নেমে এল। দ্রুত ভিতরে ঢুকে সশব্দে বন্ধ করে দিল দরজা। লোকটা এবার ইঙ্গিতে জিজোকে উঠে দাঁড়াতে নির্দেশ দিল। বিনাবাক্যে জিজো টুল ছেড়ে উঠতেই লোকটা ওর পিঠে রিভলবারের নল জোরে চেপে দিয়ে চলতে ইঙ্গিত করল।
বারান্দা থেকে নেমে লোকটা ওকে সামনে রাস্তার দিকে না নিয়ে বাড়ির পিছনে চলে এল। এদিকটা একেবারেই ফাঁকা। বাড়িটার পিছনে খানিকটা আগাছা-ভরা ফাঁকা জমি। তারপর একটা অসম্পূর্ণ ইঁটের বাড়ি। খানিকটা তৈরি হয়ে পড়ে আছে। সরু একটা পায়ে চলা পথ ধরে লোকটা খুব দ্রুত ওকে সেই বাড়ির পিছনে নিয়ে এল।
লোকটার কী উদ্দেশ্য, জিজো অনুমান করতে পারল না। তবে বুঝতে পারছিল, সড়ক ছেড়ে এই গলিপথে ঢুকতে লোকটারই সুবিধা হয়েছে। তার নিজের মতলব খাটেনি। এপর্যন্ত লোকটা ওর সঙ্গে কোনো কথা বলেনি।
অসম্পূর্ণ বাড়ির আড়ালে এসে লোকটা হাতের অস্ত্র উঁচিয়ে ওর মুখোমুখি হল। জিজো এই প্রথম দেখতে পেল অস্ত্রটা। রিভলভার নয়। শক্তিশালী এম-৯ পিস্তল। লোকটা সেই অস্ত্র উঁচিয়ে ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভাঙা ইংরেজি আর হিন্দি মিশিয়ে হাত তুলে দাঁড়াতে বলল। জিজো হাত তুলে দাঁড়াতে সন্তর্পণে সামান্য এগিয়ে এসে ওর দুটো পকেট, কোমরের চারপাশে হাত বুলিয়ে দেখল। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে ওকে দু’হাত পিছনে নিতে আদেশ করল। এতক্ষণ বিনাবাক্যে নির্দেশ মেনে চললেও এই প্রথম ইতস্তত করল জিজো। সন্দেহ নেই, লোকটা এবার ওর দু’হাত পিছমোড়া করে বাধতে চায়। সন্দেহ যে অমূলক নয়, বুঝতে সময় লাগল না। লোকটা ইতিমধ্যে পকেট থেকে হালকা একটা হাতকড়া বের করে ফেলেছে। ক্লিপ লাগানো এ-ধরণের হাতকড়া খুব সহজেই হাতে এঁটে দেওয়া যায়। অথচ যথেষ্টই মজবুত।
মনস্থির করে জিজো এবার গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দেখে লোকটা কড়া গলায় হঠাৎ হুঙ্কার দিয়ে উঠল। মুহূর্তের জন্য তার হাতের আগ্নেয়াস্ত্রের নল লক্ষ্য থেকে সামান্য সরে যেতেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে জিজো দেরি করল না। চোখের পলকে ডান হাতের দুর্দান্ত একটা জ্যাব আছড়ে পড়ল লোকটার ডান হাতের মুঠির উপর। বক্সিংয়ে জ্যাব তেমন মারাত্মক মার নয়। তবু যে হামেশাই ব্যবহার হয়, তার কারণ, খুব সহজেই প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর প্রয়োগ করা যায়। তেমন প্রস্তুতি ছাড়াই। প্রতিদ্বন্দ্বী এড়াবার সুযোগ পায় না।
এক্ষেত্রেও অন্যথা হল না। জিজোর হাতের সেই কেতাবি মার প্রতিপক্ষ সামলাতে পারল না। হাতের আগ্নেয়াস্ত্র দূরে ছিটকে পড়ল।
প্রাথমিক আঘাত সামলে নিয়ে লোকটা হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল জিজোর উপর। কিন্তু সময় পেল না। তার আগেই জিজোর বাঁ হাতের একটা জোরালো পাঞ্চ তার সোলার প্লেক্সাসের উপর আছড়ে পড়ল। সেই আঘাতে লোকটার শরীর আচমকা স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে উঠল উঁচুতে। তারপর অসাড় দেহটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
লড়াইয়ের রিংয়ে এই পাঞ্চে অনেককেই নকআউট করেছে ও। তাই সুযোগ পেতেই আর দ্বিধা করেনি। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ যত শক্ত-সমর্থই হোক, বক্সার নয়। মার খেয়ে লোকটা ওইভাবে পড়ে যেতে তাই কপালে সামান্য চিন্তার ভাঁজ পড়ল জিজোর। কিন্তু সময় নেই। এখনই সরে পড়া দরকার। তবু কী ভেবে সামান্য নীচু হয়ে ও ঝুঁকে পড়ল লোকটার উপর। আর তৎক্ষণাৎ মাথার পিছনে প্রচণ্ড আঘাতে দু’চোখ জুড়ে গভীর অন্ধকার নেমে এল। জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়েপড়ল মুহূর্তে।
বক্সিংয়ে প্রতিপক্ষের আঘাতে অনেকসময় ধরাশায়ী হতেহয়। আঘাত মাথায় হলে মুহূর্তে সব অন্ধকার হয়ে আসে। তবে সেই অবস্থা কাটতে একজন বক্সারের বেশি সময় লাগে না। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে আসে। চারপাশের জোরালো আলো। দর্শকদের চিৎকার, রেফারির কাউন্টিং কানে বাজতে শুরু করে। তবু আঘাত মারাত্মক হলে হার স্বীকার করে নিতে হয়। নকআউট। একজন বক্সারের কাছে সেই হার একেবারেই কাম্য নয়।
তাই এই অবস্থায় যা দরকার, জিজো তাই করল। চারপাশ পরিষ্কার হতে শুরু করতেই চোখ মেলে মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল বারকয়েক। অভিজ্ঞতায় দেখেছে, এই টোটকায় শরীরের সাড় দ্রুত ফিরে আসে। চারপাশের আলো, দর্শকদের চিৎকার আরো পরিষ্কার হতে থাকে।
কিন্তু আজ তেমন হল না। চারপাশ সেই আগের মতোই অন্ধকার। ভাবতে গিয়ে মুহুর্তে মনে পড়ল সব। ততক্ষণে মাথাটা আরো সাফ হয়েছে। উঠে বসতে গিয়ে বুঝল, দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। ছোটো এক আধো অন্ধকার ঘরের মেঝেতে পড়ে রয়েছে।
প্রথমে মনে হয়েছিল রাত। তারপর ঘরের বন্ধ দরজা-জানলার দিকে তাকিয়ে বুঝল, ঘরে যেটুকু আলো আসছে, তা বাইরে থেকেই। জ্ঞান হারিয়ে কতক্ষণ এভাবে পড়ে আছে, জিজো বুঝে উঠতে পারল না। যারা ওকে এখানে এনেছে, তাদেরই বা কী উদ্দেশ্য?
জিজোর মনে হল, এই অবস্থায় পড়ে থাকা মানে শুধুই সময় নষ্ট। তেষ্টাও পেয়েছে। ও গলা সামান্য ঝেড়ে নিয়ে বলল, “কেউ আছেন? একটু জল।”
কয়েক মুহূর্ত কোনো সাড়া নেই। জিজো আবার ডাকবে কিনা ভাবছে, খুট করে দরজা খুলে গেল। অন্ধকার ঘরে বাইরে থেকে সামান্য আলো এসে পড়ল। সেই আলো দেখে জিজো বুঝল, এখন পড়ন্ত বিকেল। অর্থাৎ বেশ কিছুক্ষণ ও এই অবস্থায় পড়ে আছে।
বক্সিংয়ের রিংয়ে এমন কখনো হয়নি। মাথা এখনো বেশ ভারি। ব্যথায় টনটন করছে। ইতিমধ্যে দরজায় দাঁড়ানো লোকটা নিজেদের ভাষায় সামান্য উঁচু গলায় ওদিকে কাউকে কিছু বলে ঘরের আলোটা জ্বেলে দিল।
একটু পরেই জুতোর ভারি আওয়াজ তুলে জলপাই রঙের ইউনিফর্ম পরা মাঝ বয়েসি একটা মানুষ ঘরে ঢুকল। মাথায় ক্যাপ, বুকে আঁটা পেতলের ব্যাজ। তাতে লেখা, কামখেন কারেং। কমান্ডার। পিছনে প্রায় একই পোশাকে আর একজন। তবে দেখেই বোঝা যায়, দ্বিতীয় ব্যক্তিটি পদমর্যাদায় কিছু খাট। বুকে ব্যাজ নেই। বয়সও কম। ওরা সামনে এসে দাঁড়াতেই জিজো বলল, “আপনাদের সেই লোকটি কেমন আছে স্যার?”
এমনটা আশা করেনি ওরা। প্রথম ব্যক্তিটি তীক্ষ দৃষ্টিতে ওকে খানিক লক্ষ্য করার পরে চলনসই ইংরেজিতে খরখরে গলায় বলল, “সে খবরে কী দরকার?”
“আছে স্যার।” ঠান্ডা গলায় জিজোর উত্তর, “আমি বক্সার। লড়াইয়ে অবশ্যই জিততে চাই। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীর ক্ষতি হোক, চাই না।”
“আমরা থাড়ু,” গর্বিত কণ্ঠে জবাব এল, “অত সহজে হার মানি না। তবে থাংবি কিছু কাবু হয়ে পড়েছে। চাঙ্গা হতে দিন দুই লাগবে আরো। কিন্তু তা নিয়ে তোমার মাথা ঘামাবার দরকার নেই। বরং নিজের কথা ভাবো।”
লোকটার খরখরে গলা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। সামান্য থেমে বলল, “বক্সিং তো ভালই জানো বাপু! তা হতচ্ছাড়া শিবরামনের কথায় হঠাৎ এই কাজে এলে কেন?”
“শিবরামনের কাজ তো আমি নিইনি,” নির্লিপ্ত গলা জিজোর, “দু’দিনের জন্য বেড়াতে এসেছি এদিকে। পরশু সকালেই ফিরে যাবার কথা।”
“নাওনি!” লোকটা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর খেঁকিয়ে উঠল, “মিথ্যে কথা।”
“সে আপনার মর্জি।” একই রকম ঠান্ডা গলা জিজোর, “কিন্তু ভেবে দেখুন, একজন বক্সার এসব কাজে নাক গলাবে কেন? হ্যা, শিবরামন অফারটা নিয়ে এসেছিল। আমি রাজি হইনি।”
প্রথম ব্যক্তি কমান্ডার কামখেন কারেংই জিাজোর সঙ্গে কথা বলছিল। এবার ঘাড় ফিরিয়ে পাশে দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে নীচু গলায় কিছু আলোচনা করল। তারপর জিজোর দিকে ফিরে বলল, “তুমি মোরে পৌঁছে ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করনি, তা ঠিক। কিন্তু তাই যদি হবে, তাহলে শিবরামনের লোক তোমাকে অযথা এসকর্ট দিয়ে আনতে যাবে কেন? তুমি মিথ্যে বলছ।”
“এসকর্ট!” জিজো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
কমান্ডার জিজোর মুখের দিকে নিঃশব্দে খানিক তাকিয়ে রইল। সম্ভবত জরিপ করে নিল ওকে। “হ্যাঁ, এসকর্ট। গাড়িতে যারা ছিল, তাদের কয়েকজন শিবরামনের লোক। তুমি জানতে না?”
লোকটার ওই কথায় জিজো এবার নড়ে উঠল। সকাল থেকে একের পর এক ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো এবার যেন মিলে যাচ্ছে। “ও বলল, না জানতাম না। আপনার কাছে শোনার আগে একবারের জন্য মনেও হয়নি। তবে শোনার পরে এখন বুঝতে পারছি, পথের মাঝে আপনারাই হানা দিয়েছিলেন গাড়িতে।”
“ঠিকই বুঝেছ। মাথা নাড়ল কমান্ডার। তাদের দু’জন এখন মারাত্মকরকম জখম হয়ে ডাক্তারের জিম্মায়। তুমি ভয়ানক লোক হে! শিবরামনের কথায় রাজি হওনি যখন, ফিরে গেলেই তো পারতে। মরতে এদিকে এলে কেন?”
জিজো উত্তর দিল না। তাকিয়ে রইল হাঁ করে। সামান্য থেমে লোকটা বলল, “তোমার কথা সত্যি হলেও কিন্তু ছাড়া পাচ্ছ না।”
“কিন্তু আমাকে যে পরশু বিকেলে মুম্বাইয়ের ফ্লাইট ধরতেই হবে। টিকিট কাটা রয়েছে।” উদ্বিগ্ন স্বরে জিজো বলল।
“বাজে কথা ছাড়ো।” ঝাঁঝালো কণ্ঠে উত্তর এল, “বরং কাজের কথা শোনো। তোমার মতো একজন বিপজ্জনক মানুষকে এই অবস্থায় ছাড়া যায় না। তাই ব্যাপারটা না মেটা পর্যন্ত আমাদের হেফাজতেই থাকতে হবে তোমাকে।”
জিজো কোনো উত্তর দিল না। দ্রুত কতকগুলো ভাবনা ওর মাথায় তখন পাক খেয়ে চলেছে। সন্দেহ নেই, কমান্ডার ওর কথা কিছুটা হলেও বিশ্বাস করেছে। এই অবস্থায় ওদের কথা মেনে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ওকে নীরব দেখে কমান্ডার বলল, “তবে তোমাকে এভাবে এই ঘরে আটকে রাখার ইচ্ছাও আমাদের নেই। অবশ্য যদি কথা দাও, ফের গোলমাল করবে না তবেই।”
জিজো বুঝতে পারছিল, তামুতেই কোথাও রাখা হয়েছে ওকে। এই ছোটো শহরে এ’ভাবে কাউকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য আটকে রাখায় সমস্যা আছে। এরা তাই ওকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে চায়। আর তাতে যদি ওর সম্মতি থাকে, তবে অনেক সহজ হয়ে যায় কাজটা। সন্দেহ নেই, প্রস্তাবটা সেই কারণে।
ও রাজি হয়ে বলল, “স্যার, আমি বক্সার। যা করেছি, নিজেকে বাঁচাবার জন্যই করেছি। আপনাদের কোনো ক্ষতি হয়ে থাকলে সে দায় আমার নয়। কথা দিচ্ছি, অকারণে কোনো সমস্যা আমার তরফ থেকে হবে না।”
জিজো থামতে কমান্ডার মিনিট খানেক স্থির চোখে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর পাশে দাঁড়ানো দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে নীচু গলায় কিছু পরামর্শ করে দু’জন বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। দরজা বাইরে থেকে ফের বন্ধ হয়ে গেল।
আজ সকাল থেকে কিছুই হিসেবমতো হয়নি। একা ঘরে একরাশ ভাবনা জিজোর মাথায় ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছিল। শিবরামন কেন ওর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেনি, বুঝতে পারছে এখন। তবে ওর উপর যে নজর রয়েছে, অটোয় রেখে যাওয়া চিরকুট তার প্রমাণ। চিরকুটের ‘টি’ অক্ষর সম্ভবত তামু শহরকেই বোঝাচ্ছে। সেদিন শিবরামনও তামু শহরের কথাই বলেছিল। ওখানেই নাকি আটকে রাখা হয়েছে শ্রীধরনকে।
কিন্তু ‘টি-ওয়ান’? ওই নামে কি কোনো বাড়ি বা অঞ্চল আছে তামুতে? তাই যদি হয়, তাহলে প্রতিপক্ষ কিছুতেই ওকে তামুতে রাখতে চাইবে না। অন্য কোথাও সরিয়ে দেবেই। সেদিন হোটেলে সাক্ষাতের সময় শিবরামন জানিয়েছিলেন, বিভিন্ন সোর্স ব্যবহার করে ভাইপোকে উদ্ধারের জন্য ইতিমধ্যে তিনি ভালই জাল বিস্তার করেছেন। এজন্য খরচও করেছেন দেদার। সন্দেহ নেই, ও যে এখন প্রতিপক্ষের হাতে বন্দি, সেটা আর অজানা নেই শিবরামনের। অনুমানগুলো কতটা সঠিক তা বুঝে নেওয়ার এটাই ছিল সুযোগ। সেটা বৃথা যায়নি।
ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও এবার আলোটা নেভানো হয়নি। ঘাড়ের পিছনটা এখনও টনটন করছে। সেটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে আগামী পদক্ষেপগুলো ভেবে নিচ্ছিল জিজো। খানিকটা স্বস্তি বোধ করছিল। আসলে সামনে সমস্যা এসে পড়লে এই ব্যাপারটা হয় ওর ভিতরে। এটা শিখেছিল বক্সিং জীবনে ওর প্রথম স্যার আফতাব আলির কাছে। উনি বলতেন, ‘রিংয়ের উপর প্রতিপক্ষের মারটা খেতে শেখো হে। প্রতিপক্ষের আঘাতটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে শেখো। তাহলেই পালটা মার দিতে পারবে।”
জিজো ভোলেনি সেকথা। পরবর্তী জীবনে বুঝেছে, শুধু বক্সিংয়ের রিংয়ে নয়, জীবনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে ওটাই শেষ কথা।
একা ঘরে বসে সেই সব রোমন্থন করছিল জিজো। ওই সময় দরজা খুলে যে ঘরে ঢুকল, সে একটু আগের সেই দ্বিতীয় ব্যক্তি। হাতে জলের বোতল। প্যাকেটে মোড়া কিছু খাবার। লোকটা ওর সামনে জিনিসগুলো নামিয়ে দিয়ে বলল, “আমি জালেন হাও। সবাই জালেন বলেই ডাকে। কমান্ডারের নির্দেশে আগামী কয়েক দিন তোমার সঙ্গে থাকতে হবে আমাকে। তাই পরিচয়টা দিয়ে রাখলাম। খাবারটা খেয়ে নাও।”
খানিক আগে ভালই তেষ্টা পেয়েছিল জিজোর। কিন্তু সেটা ভুলেই গিয়েছিল তারপর। এখন হুঁশ হল, শুধু তেষ্টাই নয়, খিদেও পেয়েছে। সেই সকালে পালেলে পংডেন দিয়ে প্রাতরাশের পরে পেটে তেমন কিছুই পড়েনি। মোরে থেকে বেরোবার সময় ভেবেছিল, খাওয়ার পাট তামুতেই সেরে নেবে। কিন্তু সে সময় আর মেলেনি। বাইরে তাকিয়ে বুঝল, সন্ধে নেমে গেছে। ইতিমধ্যে জালেন ওর হ্যান্ডকাফ খুলে দিয়েছে। ও কথা না বাড়িয়ে খাবারের প্যাকেটটা খুলে ফেলল।
ভিতরে চটচটে ভাত আর কী একটা সবজি। পালেলের পংডেনের মতো নয়। আর ঠান্ডা হবার কারণে বিস্বাদও বটে। তবে পেট ভরাতে খেয়ে ফেলল সবটাই।
হাতে একটা ভারি এম-৯ পিস্তল নিয়ে জালেন সন্তর্পণে লক্ষ্য রাখছিল ওর উপর। খাওয়া শেষ হলে বলল, “এবার বেরোতে হবে। পালাবার চেষ্টা বা অন্য কিছু করার চেষ্টা করবে না। অযথা প্রাণটা যাবে। আর একটা কথা,” জালেন হাও অল্প থামল। সামান্য ইতস্তত করে আরো কাছে এগিয়ে এল, “মো সেন লোকটা তোমার পরিচিত নাকি? দোকানে বসে অত কী কথা হচ্ছিল?”
মো সেন বললেও জিজো এ-পর্যন্ত একবারও তাঁর কথা এদের কাছে তোলেনি। জালেন হাওয়ের মুখে হঠাৎ নামটা শুনে ভিতরে কিছু স্বস্তি বোধ করলেও মুখে বিন্দুমাত্র প্রকাশ পেলেনা। সামান্য নীরবতার পরে চোখ তুলে সংক্ষেপে খুলে বলল সব কথা। ও থামতে জালেন হাও সামান্য মাথা নাড়ল।
“তোমার কপালটা দেখছি বেশ ভাল হে!”
“কেন স্যার?”
“সকালে পালেলের কাছে পাহাড়ে সেই ঘটনার পরে কম্যান্ডার তো তোমাকে শেষ করে দেবেন ঠিক করেছিলেন। নেহাৎ মো সেন হঠাৎ নাক না গলালে এতক্ষণ হয়ত ফিনিশ হয়েও যেতে। অবশ্য তাই বলে নিজেকে আবার তালেবর ভেবে ফেল না।”
“না-না। তা হবে কেন স্যার,” সামান্য নড়ে উঠে জিজো সামনে জালেন হাওয়ের দিকে তাকাল, “সামান্য মানুষ আমি। রিংয়ে বক্সিং লড়ে পেট চালাই। নেহাত টাকার টানাটানি চলছে। তাই তেমন খোঁজ না নিয়েই রুস্তম সিংয়ের ডাকে ইম্ফলে চলে এসেছিলাম। তা ভালই শিক্ষা হয়েছে। এক পয়সাও জোটেনি। ভাবলাম গাঁটের পয়সা খরচ করে যখন ফিরতেই হবে, এদিকটা একবার ঘুরে যাই। আর তো হবে না। এমন বিপদে পড়তে হবে ভাবিনি।”
কথা বলতে বলতে জিজো আগ্রহে তাকিয়ে ছিল সামনে মানুষটির দিকে। কিন্তু জালেন হাওয়ের মুখে বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করল না। পাথরের মতো ভাবলেশহীন।ও থামতেই বাক্যব্যয় না করে দরজার কাছে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে কাউকে স্থানীয় ভাষায় কিছু বলল। তারপর ইঙ্গিতে ওকে উঠে দরজার দিকে এগোতে নির্দেশ করল।
ও উঠে দাঁড়িয়ে চলতে শুরু করেতেই জালেন ওর পাশে ঘেঁষে এল। হাতের পিস্তলের নলটা মুহূর্তে জিজোর পিঠে শিরদাঁড়ার উপর। জিজো অবশ্য তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে এগিয়ে চলল আগের মতোই। পিছনে পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে চলল জালেন।
বাইরে বেরিয়ে সরু এক গলি। জিজো ভেবেছিল সঙ্গে আরো কেউ থাকবে। কিন্তু তেমন কাউকে দেখতে পেল না। সরু গলিপথ ফেলে একটু পরেই ওরা অপেক্ষাকৃত বড়ো এক রাস্তায় এসে পৌঁছোল। পথে কম পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। দু’ধারে ছাড়া-ছাড়া কিছু ঘর-বাড়ি। বাড়ির নীচে দোকান। বোর্ডে ইংরেজির সঙ্গে বর্মি হরফ দেখে বুঝতে পারল, তার অনুমান সঠিক। তামুতেই রয়েছে সে। দোকানের ঝাঁপ অবশ্য বন্ধ। বিকেল চারটেয় সীমান্তের গেট বন্ধ হয়ে যায়। তামুর কেনাকাটাও বন্ধ হয়ে যায় তারপর। তবে পথে মানুষ রয়েছে। জালেন যেভাবে ওর পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে তাল মিলিয়ে হাঁটছে, তাতে রাতের এই আবছা আলোয় ব্যাপারটা বোঝা সম্ভব নয়। জিজোর মনে হল, পথচারীদের কেউ হয়ত জালেনেরই লোক। কাছে না এসে দূর থেকে নজর রাখছে।
এভাবে মিনিটকয়েক চলার পর প্রায় নিঃশব্দে একটা বোলেরো গাড়ি ওদের পাশে এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে নেমে এল একজন। দরজার পাশে দাড়িয়ে জিজোকে গাড়িতে উঠতে বলল। জিজো উঠে বসল গাড়িতে। পিছনে জালেন আর সেই লোকটাও উঠে পড়ল। তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে গেল দরজা। গাড়ি ফের চলতে শুরু করল।
ভিতরে আলো নেভানো। তবু বাইরে থেকে আসা মৃদু আলোয় জিজো লক্ষ করল, জালেন আর ড্রাইভার ছাড়াও গাড়িতে আরো জনা তিনেক মানুষ রয়েছে। পরনে একই জলপাই রঙের পোশাক। একজনের হাতে কার্বাইন। জালনের পিস্তল অবশ্য যথাস্থানে ঠেকে রয়েছে।
গোড়ায় জিজো ভেবেছিল, লোকগুলো সম্ভবত ওকে কাছেই কোথাও নিয়ে চলেছে। তাই যথাসম্ভব লক্ষ রাখছিল বাইরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি উঠে এল তামুর মূল সড়কের উপর। কিন্তু মিনিট কুড়ি মূল সড়ক ধরে চলার পরে গাড়ি একসময় নেমে এল কাঁচা রাস্তায়। পথের দু’দিকে ঝোপঝাড়, ফাঁকা জমি, চাষের খেত।
এবড়ো-খেবড়ো পথে প্রায় লাফাতে লাফাতে গাড়ি চলল। কিছুক্ষণের মধ্যে বাইরে অন্ধকার ক্রমশ আরো ঘন হয়ে আসতে লাগল। তাই দেখে জিজো বুঝতে পারল, গাড়ি এবার চলেছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। ক্রমে ঘন হচ্ছে জঙ্গল। রাস্তা খারাপ হবার কারণে ঝাঁকুনিও বাড়ছে। জিজো এরপর মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেলে সিটে হেলান দিয়ে নিঃসাড়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ব্যাপারটা অভ্যাস আছে। লড়াইয়ের আগে সময় পেলে অনেক সময়ই ও এভাবে অল্প কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়। অভিজ্ঞতায় দেখেছে, তাতে ভিতরে অযথা জমে ওঠা টেনশনটা চলে যায়। চাঙা হয়ে ওঠে শরীর।
আচমকা বড়ো এক ঝাঁকুনিতে জিজোর সেই ঘুম যখন ভাঙল, গাড়ি তখন থেমে রয়েছে। হেডলাইট নেভানো। অন্ধকারে গাড়ির ভিতরে মানুষগুলো চাপা গলায় কথা বলছে। জিজো অনুমান করল, সম্ভবত আধ ঘণ্টার বেশি ও ঘুমোয়নি। এই অল্প সময়ে হঠাৎ কী হল, বুঝে উঠতে পারল না। পাশে জালেনকে জিজ্ঞাসা করল ব্যাপারটা। উত্তরে জালেন বলল, “সামনে মাইন পোঁতা রয়েছে। গাড়ি আর যাবে না।”
জিজো বলল, “তবে কি নামতে হবে?”
জালেন অন্ধকারেই গাড়ির অন্যদের সঙ্গে কী আলোচনা করল। তারপর ওকে বলল, “এখনই দরকার নেই। আমরা নেমে দেখে আসছি ব্যাপারটা। তারপর ঠিক করব। ততক্ষণ যেমন রয়েছ, তেমন বসে থাকো। পালাবার চেষ্টা করলে বিপদে পড়বে।”
কথা শেষ করে উঠে দাঁড়াল জালেন। উঠল অন্যরাও। ঠিক তখন কে যেন অন্ধকারে জিজোর ঘাড়ে ছোট্ট একটা চিমটি কাটল। ইঙ্গিতপূর্ণ।
আজ সকাল থেকে একের পর এক যা ঘটে চলেছে, তা চমকপ্রদ বললে বোধহয় কমই বলা হবে। অন্য কেউ হলে কী হত, বলা যায় না। কিন্তু অন্য ধাতুতে গড়া জিজোর বেশ লাগছিল। গাড়িতে জালেন হাও আর ড্রাইভার ছাড়াও আরো জনা পাঁচেক মানুষ ছিল। তাদের কে এমন করল, অন্ধকারে বুঝেতে না পারলেও মাথার ভিতর অন্য এক সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে গেল। তবে কি এদের মধ্যে কেউ ‘ডাবল ডিলার’? শিবরামনের হয়েও কাজ করছে?
সকালে থেকে ঘটে চলা একের পর এক সূত্র জুড়তে গিয়ে ওর মনে হল, ধারণাটা অমূলক নয়। সেই দিনের পর শিবরামন ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি ঠিকই, কিন্তু ওর প্রতি যে লক্ষ রেখে চলেছে, কমান্ডার কামখেন কারেং-এর কথাতেই বোঝা গেছে। তাহলে কি এই গাড়িতেও শিবরামনের কেউ রয়েছে? ইঙ্গিতে কিছু জানিয়ে গেল ওকে?
সেদিন অল্প সময়ের জন্য হোটেলের ঘরে মানুষটার কথায় অনুপ্রাণিত হয়েছিল সন্দেহ নেই। নইলে উটকো এই কাজে কোনোমতেই ভিড়ত না। কিন্তু আজ সকাল থেকে একের পর এক যা ঘটে চলেছে, তা বিস্মিত হবার পক্ষে যথেষ্ট। কপালে তিলক কাটা সাদামাটা চেহারার মানুষটির হাত সন্দেহ নেই, অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। অপহৃত ভাইপোকে উদ্ধারের জন্য কাজে নেমেছে ভালভাবে চারপাশ গুছিয়ে নিয়েই। ভাবতে গিয়ে ভিতরটা যেন অনেকটাই চাঙা হয়ে উঠল।
ইতিমধ্যে সবাই নেমে গেছে গাড়ি থেকে। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে নিজেদের মধ্যে কী আলোচনা করছে। ও নিঃশব্দে উঠে দরজার উলটো দিকের একটা জানলার কাচ আলতো করে ঠেলে সরিয়ে দিল। বাইরে ঘন অন্ধকার। প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বোঝা যায়, জায়গাটা অরণ্য-অঞ্চল।
বাইরে জালেন আর তার সঙ্গীরা তখনও নিজেদের মধ্যে কথা বলে চলেছে। একজন সামনে এগিয়ে টর্চের আলোয় কী দেখছে। ও নিঃশব্দে গাড়ির খোলা জানলা গলে সাবধানে বাইরে লাফিয়ে নামল। শুকনো ঝরা পাতায় পা পড়লে ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তেমন কিছু হল না। ঘন অন্ধকারের ভিতর প্রায় হাতড়ে হাতড়েই এগিয়ে চলল ও। পকেটে ছোটো এল.ই.ডি টর্চ রয়েছে। কিন্তু জ্বালতে ভরসা হল না।
ক্রমে অন্ধকারে চোখ দুটো কিছুটা সয়ে আসতে বুঝতে পারল, যতটা ভেবেছিল, জঙ্গল তত গভীর নয়। সেগুন জাতীয় বড়ো গাছ থাকলেও হালকা-পাতলা ঝোপঝাড়ই বেশি। পায়ের তলায় কোথাও উঁচু-নীচু পাথুরে জমি। অন্ধকারে চোখ কিছুটা অভ্যস্ত হতে যথাসম্ভব দ্রুত পা চালাল জিজো। যতটা সম্ভব দূরে যেতে পারলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম।
কিন্তু মিনিট কুড়ি চলার পরেই পিছনে খানিক দূরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ। অন্ধকার ফুঁড়ে টর্চের জোরালো আলো কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে।
এই হালকা জঙ্গলে নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা যথেষ্টই। জিজো ঝুঁকি নিল না। পাশেই হালকা ঘাসজমির মাঝে ছোটো-বড়ো গোটা কয়েক উইয়ের ঢিপি। বড়ো ঢিপিটা প্রায় ফুট তিনেক উঁচু। ও সেই ঢিপির আড়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নীচু হয়ে বসে পড়ল।
অল্প সময়ের মধ্যেই আলোগুলো কাছে এসে পড়ল। জালেন হাও আর গাড়ির অন্যরা টর্চ হাতে খুঁজছে ওকে। তীব্র আলো ক্রমাগত আশপাশের ঝোপঝাড়ের উপরে ঘুরছে। জিজোর ট্রাউজার ব্রাউন কালারের হলেও সার্টে সাদা স্ট্রাইপ রয়েছে। ও মুহূর্তে গায়ের জামাটা খুলে ঢিপির গায়ে আরো লেপটে গেল। ভাগ্যিস, কোনো ঝোপের আড়ালে লুকোবার চেষ্টা করেনি! টর্চের আলোগুলো যেভাবে সেগুলোর উপর ঘুরছে, তাতে সহজেই ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল।
জালেনের দল এগিয়ে গেল একটু পরেই। জিজো সেখানেই গা-ঢাকা দিয়ে পড়ে রইল। ভোর হল একসময়। ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে এল চারপাশ। রাতে জালেন ও তার সঙ্গীদের আর দেখা যায়নি। তবে অনেক রাতে গাড়ির আওয়াজ শোনা গেছে। এ অবস্থায় সবাই ফিরে গেছে, মনে হয় না। নিশ্চয় কেউ রয়ে গেছে ওর খোঁজে। তাই আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়ল জিজো।
জঙ্গল তেমন গভীর নয়। সেগুন গাছের আধিক্য দেখেঅনুমান করা যায়, জায়গাটা মায়ানমার। এই হালকা পাতলা জঙ্গলে কারো নজর এড়ানো বেশিক্ষণ সম্ভব নয়। তার উপর মায়ানমারে সামরিক শাসন। তাদের হাতে ধরা পড়লে আরো মুশকিল।
জায়গাটা সীমান্তের কাছে কিনা বুঝতে পারছিল না জিজো। তবে সেই অনুমানে ও দ্রুত পশ্চিম দিকে পা চালাল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভারতে ঢুকে পড়া দরকার। শুধু একটাই সুবিধে, জায়গাটা মোরে বা তামুর মতো সমতল নয়। পাহাড়ের খুব কাছে। উঁচু-নীচু পথ। পাথুরে ঢিপি। প্রয়োজনে আত্মগোপন করা যায়।
প্রায় ঘণ্টাখানেক এভাবে চলার পরে জিজো বুঝতে পারল, এবার চড়াই ভাঙতে হচ্ছে। জঙ্গলও ক্রমশ ঘন হচ্ছে। তবে ভিতরে হালকা পায়ে চলা পথ দেখে বোঝা যায়, মানুষের আনাগোনা রয়েছে। অবশ্য এ-পর্যন্ত কোনো মানুষের দেখা মেলেনি। ইতিমধ্যে বেলা বেড়েছে। গাছপালার ফাঁকে আলোর তেজ বাড়ছে।
এই সময় দূরে মানুষের আওয়াজ কানে আসতে জিজো সতর্ক হয়ে উঠল। একসঙ্গে অনেকে কথা বলছে। কিছু নিয়ে কথা কাটাকাটি চলছে। এক মুহূর্ত চিন্তা করে জিজো পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে।
অনুমান মিথ্যে নয়। খানিক দূরে নীচে পাহাড়ের ঢালে জনা দশেক মানুষের জটলা। তাদের দুজনের পরনে জালেন হাওদের মতো জলপাই রঙের পোশাক। শক্ত-সমর্থ চেহারা। কড়া গলায় অন্যদের কিছু বলছে। তবে অন্য পক্ষও কম যায় না। জিনস আর নীল টি-শার্ট’পরা। একজনের পোশাক ভদ্রস্থ হলেও বাকিদের জামা-কাপড় একেবারেই সাদামাটা, দেহাতি মানুষ। পরনে আধময়লা ব্যাগি-প্যান্ট আর টি-শার্ট। কয়েকজনের তো খালি গা। তিনজনের কাঁধে দেহাতি বন্দুক ঝুলছে। কড়া গলায় পাল্টা জবাব দিচ্ছিল তারাও। বরং নীল শার্ট কিছু নরম গলায় প্রতিপক্ষের দু’জনকে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছিল।
তর্কাতর্কির মাঝে তিন দেহাতি বন্দুকধারী হঠাৎ ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে কাঁধের বন্দুক উঁচিয়ে তেড়ে গেল প্রতিপক্ষ দু’জনের দিকে। জলপাই পোশাকের দু’জন সম্ভবত এতটা আশা করেনি। অন্য পক্ষের এই রুদ্রমূর্তি দেখে কেমন গুটিয়ে গেল তারা। তারপর গজগজ করতে করতে স্থানত্যাগ করল। বাকিরা যতক্ষণ সম্ভব শ্যেনদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। একজন খুশিতে বন্দুক তুলে আকাশে ফায়ার করল। বিকট আওয়াজে গমগম করে উঠল চারপাশ। জয়ের আনন্দে হইহই করে উঠল সবাই। তারপর চলতে শুরু করল।
আড়াল থেকে পুরো ব্যাপারটা লক্ষ করছিল জিজো। গত কয়েক ঘণ্টার অভিজ্ঞতায় বুঝেছে, জলপাই পোশাকের লোক দু’জন জঙ্গি গোষ্ঠীর মানুষ। সীমান্তের এসব অঞ্চলে ওদের দাপট যথেষ্ট। অথচ যেভাবে ওদের দুজনকে হটিয়ে দেওয়া হল, তাতে অন্যপক্ষও যে কিছুমাত্র কম নয়, বুঝতে বিলম্ব হয় না। তবে কি ওরাও অন্য কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীর? হতেই পারে। তবে ওদের পোশাক পরিচ্ছদ দেখে জিজোর তেমন মনে হল না। ও নিঃশব্দে তাদের পিছু নিল।
প্রায় মিনিট কুড়ি এ-ভাবে চলার পর একটা ব্যাপার ঘটল। জিজো এ-পর্যন্ত যে ধরা দেয়নি তার কারণ, কীভাবে ব্যাপারটা ওদের বোঝাবে, বুঝে উঠতে পারছিল না। ভাষাগত সমস্যাটাই ওকে ভাবাচ্ছিল বেশি। কিন্তু হঠাৎই সামনের মানুষগুলো কেমন সতর্ক হয়ে উঠল। পিছনদিকে ফিরে বন্দুক উঁচিয়ে দু’জন চিৎকার করে কী বলল। সেই চিৎকারের অর্থ বুঝতে না পারলেও জিজোর মনে হল, ওর উপস্থিতি টের পেয়ে গেছে ওরা। ভেবেছে, সেই জঙ্গি দু’জন হয়ত ফের পিছু নিয়েছে ওদের। কিন্তু কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। কয়েক সেকেন্ড কাটল এভাবে। তারপরই নীল শার্ট পরা মানুষটি পরিষ্কার ইংরেজিতে বলল, “কে ওখানে? বেরিয়ে এস শিগগির।”
এরপর আর দেরি করল না জিজো। অদূরে এক পাথরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল ও। হাত তুলে বেরিয়ে এল সেখান থেকে। ইংরেজিতেই বলল, “আমি ইন্ডিয়ান। তামুতে বেড়াতে এসেছিলাম। কিছু লোক আমাকে জোর করে তুলে এনেছে। গত রাতে সুযোগ পেয়ে পালিয়ে এলেও এখন জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেছি। আপনাদের সাহায্য চাই।”
ইতিমধ্যে তিনটে বন্দুক ওকে লক্ষ্য করে স্থির হয়ে রয়েছে। নীল টি-শার্ট তীক্ষ দৃষ্টিতে লক্ষ করছিল ওকে। বলল, “কী নাম আপনার?”
“জিজো।”
প্রতিপক্ষের তীক্ষ দৃষ্টি কিছুটা যেন স্বাভাবিক হল। কিন্তু কোনো কথা না বলে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তাই দেখে জিজো বলল, “হ্যাঁ, ওই নামেই আমি বক্সিং বেল্টে পরিচিত।”
“তাই বলুন। নীল টি-শার্টের চোখ দুটো এতক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে এল। আপনাকে দেখে ঠিকই অনুমান করেছিলাম। ইম্ফলে ক’দিন আগে রুস্তম সিংয়ের সঙ্গে আপনিই তো লড়েছিলেন?”
“হ্যাঁ।” জিজো বলল, “হেরে গিয়েছিলাম অবশ্য।”
“না।” প্রবলভাবে ঘাড় নাড়ল ও’পক্ষ, “ওরা জোচ্চুরি করে হারিয়েছে আপনাকে। আমি চিরন সিং। মণিপুরি মৈতেই সম্প্রদায়ের মানুষ। বৈষ্ণব হলেও লড়াই আমাদের রক্তে। রুস্তম সিংয়ের লড়াই দেখতে তাই ভিড় করে অনেকেই। কিন্তু এবার ওর ফাঁকিটা ধরা পড়ে গেছে। খুব শিগগির পাততাড়ি গোটাতে হবে।”
চিরন সিং নামের সেই নীল টি-শার্ট যতক্ষণ কথা বলছিল, ওর সঙ্গীরা কৌতুহলে হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। ও থামতেই সমস্বরে কিছু বলল। চিরন সিং স্থানীয় ভাষায় তাদের ব্যাপারটা জানাতে সবাই দু’হাত তুলে উৎসাহে চেঁচিয়ে উঠল। তাদের কথা জিজো বুঝতে না পারলেও ভিতরে জমে থাকা উদ্বেগটা নেমে গেল অনেকটাই। ইতিমধ্যে সঙ্গীদের নিয়ে চিরন সিং কাছে এগিয়ে এসেছে। জিজোর পিঠে হাত রেখে বলল, “বুঝতে পারছি, জঙ্গি লোকগুলো একটু আগে আপনার খোঁজই করছিল। তবে সেজন্য ঘাবড়াবেন না। আমার এই সঙ্গীরাও থাড়ু গোষ্ঠীর মানুষ। এদিকেই বাস। ওদের তেমন পরোয়া করে না।”
পরোয়া যে করে না, সেটা খানিক আগে জিজো নিজের চোখেই দেখেছে। ও সাবধানে বলল, “মি. সিং আপনি নিশ্চয় কোনো দরকারে এসেছেন। হয়ত সমস্যা ঘটাচ্ছি আপনার।”
“ন.না।” মাথা ঝাঁকাল চিরন সিং। “একেবারেই নয়। আসলে সুযোগ পেলেই এদিকের বনে-জঙ্গলে ট্রেকিং করি আমি। নেশা বলতে পারেন। বিদেশ-বিভুঁই। বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর উপদ্রব। তার উপর মায়ানমারে সামরিক শাসন। ধরা পড়লে সারা জীবন জেলের ঘানি। তাই বিপদের সম্ভাবনা খুবই। কিন্তু তাতেই আনন্দ। আমার এই সঙ্গীরা থাড়ু। ওদের কেউ মণিপুরের, কেউ মায়ানমারের মানুষ। এসব অঞ্চল চেনে হাতের তালুর মতোই।”
সহজ-সরল পাহাড়ি মানুষ চিরন সিংয়ের এই সঙ্গীরা। কারো বয়সই কুড়ি-বাইশের বেশি নয়। দু’জন তো একেবারেই কিশোর। ওদের কেউ যে তেমন স্বচ্ছল পরিবারে নয়, তা ওদের সাদামাটা পোশাকেই বোঝা যায়। তবে ভীষণ হাসিখুশি আর আমুদে। চলতে চলতেই নানা কথা, হাসি-ঠাট্টা চলছে। সবই নিজেদের ভাষায়। জিজো বুঝতে পারছিল না কিছুই। ওদের সঙ্গে কথা বলারও উপায় নেই। কেউই একবিন্দু হিন্দি বা ইংরেজি বোঝে না। চলতে চলতে যা কিছু কথা, সবই হচ্ছিল চিরন সিংয়ের সঙ্গে।
জিজো বুঝতে পারছিল, ওরা ক্রমশ পাহাড়ের আরো ভিতরের দিকে চলেছে। তবে জঙ্গল ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছে। চড়াই পথের দু'ধারে শুধু পাথুরে জমি আর বিশাল আকারে বোল্ডার। তারই ফাঁকে গজিয়ে উঠেছে ঝোপঝাড়। বড়-বড়ো ঘাস। একটু অসাবধান হলেই তার ধারাল পাতায় হাত-পা ছড়ে যায়। তারই ভিতর দিব্যি হইহই করে চলেছে সবাই।
অভ্যাস না থাকায় সমস্যা হচ্ছিল জিজোর। এর সঙ্গে রয়েছে খুদে একরকম রক্তখেকো পোকার ঝাঁক। কখন যে উড়ে এসে গায়ে বসে রক্ত খেতে থাকে, টের পাওয়া যায় না। যখন হুঁশ হয়, তখন আক্রান্ত স্থান ভয়ানক চুলকোতে শুরু করে। ফুলে ওঠে।
অনেকটা উঠে আসার পরে একসময় শুরু হল উতরাই।
সে পথ কোথাও এতটাই খাড়াই যে, পাশের বোল্ডার বা লতা-পাতা আঁকড়ে চলতে হয়। চিরন সিংয়ের সঙ্গীদের খালি পা। তারা নেমে যাচ্ছিল অক্লেশে। বেগতিক বুঝলে জিজো আর চিরন সিংকে ধরে সাহায্য করছিল।
এভাবে অনেকটা নামার পর ওরা এসে পৌঁছোল এক পাহাড়ি নদীর ধারে। অদ্ভুত গড়ন জায়গাটার। সরু পাহাড়ি নদী। জল থাকলেও স্রোত প্রায় নেই। বাতাস যেন থম মেরে রয়েছে। তাই জল। আরো স্থির। দেখেই বোঝা যায়, চারপাশে পাহাড়ের মাঝে গভীর খাদে আটকে রয়েছে জল। দু’দিকে হালকা জঙ্গলে ভরা খাড়াই পাথুরে পাহাড়। সব মিলিয়ে অদ্ভুত। চিরন সিং এখানে আগে আসেনি। চারপাশে খানিক চোখ বুলিয়ে নিয়ে খুশিতে দু’হাত তুলে চিয়ার করল। হইহই করে উঠল অন্যরাও। তারপর চিরন সিংকে কিছু বলল। উত্তরে চিরন সিং ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে জিজো চিরন সিংয়ের কাছে জানতে চাইতে সে বলল, “বেলা কম হয়নি। ওরা দুপুরের রান্না-খাওয়া এখানে সেরে নিতে চাইছে। প্রস্তাবটা মন্দ নয়, কি বলুন?”
জিজোর এতক্ষণে খেয়াল হল, সত্যিই খিদে পেয়েছে। খিদের দোষ নেই। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর ছাড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু এই বিজন অরণ্যের মাঝে কীভাবে রান্না হবে, বুঝতে পারল না। তিন জনের কাধে ছোটো বোঁচকা। এছাড়া বুলেটের ব্যাগ। তৈজসপত্র তেমন কিছুই নেই।
কিন্তু রান্নার তোড়জোড় শুরু হতে বুঝল, এদের রান্নার জন্য ও’সবের দরকার হয় না। একজনের বোঁচকা থেকে চাল বের হল। গামছায় বেঁধে সেই চাল ভিজিয়ে নেওয়া হল নদীর জলে। কয়েকজন দা হাতে জঙ্গলের দিকে গিয়েছিল। খানিক বাদে ফিরে এল এক বোঝা কাঠ আর হাত খানেক লম্বা করে কাটা কয়েক টুকরো মোটা কাঁচা বাঁশ নিয়ে। সেই বাঁশের টুকরো দেখে ব্যাপারটা বুঝতে বিলম্ব হল না জিজোর। বাস্তবেও হল তাই। ভিজে চালগুলো বাঁশের টুকরোর খোলা মুখ দিয়ে ভরে দেওয়া হল ভিতরে। কয়েকটা কচি বাঁশের কোঁড়ও আনা হয়েছে। টুকরো করে সে’গুলোও দেওয়া হল চালের সঙ্গে। তারপর সব এক জায়গায় সাজিয়ে চারপাশে কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বেলে দেওয়া হল। জিজো দেখেই বুঝল গতকাল পালেলে যা দিয়ে দিনের খাওয়া সেরেছিল সেই পংডেন রান্না হচ্ছে এখানেও।
ইতিমধ্যে আর এক ব্যাপার। একজন ঝুলি থেকে খ্যাপলা জাল বের করে জাল ফেলতে শুরু করেছে। কয়েক খেপে ধরা পড়ল কিছু মাছ। একেবারে ছোটোগুলো ছেড়ে দিয়ে বাকি মাছ কেটে পরিষ্কার করে নুন আর লঙ্কার গুঁড়ো মেখে কলার পাতায় মুড়ে তিনটে পুঁটলি করা হল। ততক্ষণে চাল ভর্তি বাঁশের টুকরোগুলো পুড়তে শুরু করেছে। কাঁচা বাঁশ আর ভাতের অন্য এক সুগন্ধ টের পাওয়া যাচ্ছে। ওরা কিছু জ্বলন্ত কাঠকয়লা আলাদা করে কলার পাতায় মোড়া মাছগুলো গুঁজে দিল ভিতরে।
একটু পরেই কলার পাতা পেতে খেতে বসল ওরা। কাঁচা বাশেঁর গন্ধমাখা ধোঁয়া ওরা আঠালো ভাত ‘পংডেন’ আর টাটকা মাছের ঝাল-ঝাল পাতুড়ি। জিজো ঘুরেছে অনেক। অভিজ্ঞতা কম নয়। কিন্তু আজকের এই অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। মনে থাকার মতো।
খেতে-খেতে চিরন সিং আর তার সঙ্গীরা অনর্গল কথা বলে চলেছে। মজার কথাই বেশি। জিজো কিছুই প্রায় বুঝতে পারছিল না। কিন্তু উপভোগ করছিল। অবশ্য চিরন সিং কখনো ব্যাপারটা দু’চার কথায় বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওকে।
খাওয়া তখন শেষ পর্যায়ে। হঠাৎ জিজোর সঙ্গীরা প্রায় এক সঙ্গে খাওয়া থামিয়ে স্থির হয়ে গেল। তারপর একসঙ্গে সব কয়টা চোখ ঘুরে গেল কাছেই পাহাড়ের উঁচুতে বড়ো এক ঝোপের দিকে। জিজো বক্সার। বিপদের গন্ধ চিনে নেওয়ার ক্ষমতা সহজাত। আজ সকালে ওর উপস্থিতি টের পেতে এমনই করেছিল চিরন সিংয়ের সঙ্গীরা। ওর বাঁ পাশে চিরন সিং সঙ্গীদের হঠাৎ এই ব্যবহারে কেমন হতচকিত। মুহূর্তে তাকে ঠেলে দিয়ে জিজো চেঁচিয়ে উঠল, “পালাও।”
আর তারপরেই ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো লাফিয়ে উঠল নিজে। পাশেই বড়ো এক পাথরের আড়ালে গুঁজে দিল শরীরটাকে। আর সে-মুহূর্তেই এক ঝাঁক বুলেট এসে আছড়ে পড়ল ওরা দু’জন যে জায়গায় বসে খাচ্ছিল, সেখানে। ঠেলে সরিয়ে দিতে চিরন সিং গড়িয়ে গিয়েছিল খানিক দূরে। ওই অবস্থায় পাশেই এক পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করল। আড়াল থেকে তাকে সতর্ক করে ফের চেঁচিয়ে উঠল জিজো, “মিঃ সিং, ওদের লক্ষ আমরা দু’জন। সাবধান।”
জিজোর অনুমান মিথ্যে নয়। চিরন সিংয়ের সঙ্গীদের লক্ষ করে কোনো ফায়ার হল না। যদিও ততক্ষণে তারা আড়াল নিয়ে হাতের বন্দুক উঁচিয়ে ধরেছে। একজনের বন্দুক থেকে গুলিও ছুটল। কিন্তু ওদিক থেকে কোনো সাড়া এল না।
এদিক থেকে চেঁচিয়ে উঠে একজন কী বলল। উত্তর এল ওদিক থেকে। এভাবে দু’পক্ষের কথা চলতে লাগল। তার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারছিল না জিজো। ও অদূরে চিরন সিংয়ের কাছে জানতে চাইল ব্যাপারটা। উত্তরে চিরন সিং বলল, “ওরা আমাদের দুজনকে হাতে পেতে চাইছে। বিশেষ করে তুমি। কিন্তু আমার সঙ্গীরা রাজি নয়। তাই নিয়ে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। ভয় দেখাচ্ছে, ওদের হাতে এ.কে-৪৭ আছে। দেশি বন্দুক নিয়ে লড়াই দিতে চাইলে মরতে হবে। থাড়ু বলে রেহাই পাবে না কেউ।”
জিজো আর কথা বলল না। দু’পক্ষের কথা কাটাকাটি তখন ক্রমশ উঁচুতে চড়ছে। স্থানত্যাগ করার এটাই সুযোগ। ও চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। নদীর ধার বরাবর খাড়া পাহাড়। প্রতিপক্ষ আত্মগোপন করে রয়েছে তারই মাথায়। ওদের সঙ্গে যুঝতে হলে উঠতেই হবে উপরে। পথ একটাই। খানিক দূরে বৃষ্টির জলে ক্রমাগত পাথর ক্ষয়ে অবিন্যস্ত সিঁড়ির ধাপের মতো তৈরি হয়েছে। সমস্যা হল, নদীর ধারে জায়গাটা একেবারেই ন্যাড়া। সহজেই প্রতিপক্ষের নজরে পড়ে যাবার সম্ভাবনা। তবে ফুট পনেরো উঠে যেতে পারলে সামান্য ঝোপঝাড়, গাছপালা রয়েছে। আড়ালে গা-ঢাকা দেবার সুবিধা আছে।
মতলব ছকে নিয়ে জিজো পুঁড়ি মেরে পাথর আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে সন্তর্পণে এগিয়ে গেল লক্ষ্যের দিকে। তারপর কাছে পৌছে সেই ন্যাড়া পাহাড়ের ধাপ ভেঙে উঠতে শুরু করল। ওদিকে দু’পক্ষের তখনও কথা কাটাকাটি চলছে। কেউ তাই লক্ষ করেনি ওকে।
কিন্তু শেষরক্ষা হল না। একেবারে শেষ মুহূর্তে ওদিক থেকে এক ঝাঁক গুলি ছুটে এল। ধুলো উড়িয়ে আছড়ে পড়ল খুব কাছেই।
জিজো বুঝল, ধরা পড়ে গেছে ও। সময় নেই। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ও লাফ মারল এবার। ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো দেহটা ছিটকে উঠে হুমড়ি খেয়ে পড়ল হাত কয়েক দূরে এক কাঁটাঝোপের ভিতর। মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে সেই অবস্থায় ঝোপ ঠেলে এগিয়ে ও গেল। একঝাঁক গুলি এসে আছড়ে পড়ল সেই ঝোপের উপর। ততক্ষণে জিজো কাঁটাঝোপ ঠেলে এগিয়ে গেছে আরো ভিতরে।
গুলিবৃষ্টি এরপর হঠাৎই থেমে গেল। উপরে একাধিক পায়ের শব্দ। জিজো বুঝতে পারল, গুলিবৃষ্টি থামিয়ে লোকগুলো এবার খুঁজতে শুরু করছে ওকে। তীক্ষ্ণ কাঁটায় শরীর ক্ষতবিক্ষত। কয়েকটা কাঁটা ভেঙে বিঁধেও রয়েছে। কিন্তু ও সে-সব গ্রাহ্য করল না। প্রায় নিঃশব্দে ঝোপঝাড়ের আড়ালে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এগিয়ে চলল উপরের দিকে।
ভারি জুতোর শব্দগুলো ক্রমশ এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। তার মধ্যে একজোড়া পায়ের আওয়াজ খুব কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেল। জিজো আর না এগিয়ে নিঃশব্দে একটা পাথরের আড়ালে বসে চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চোখ ঘোরাল। অনুমান সঠিক। অদূরে ঘন গাছপাতার আড়ালে জলপাই পোশাকে শক্ত চেহারার এক জঙ্গি হাতের রাইফেল উঁচিয়ে সন্তর্পণে চারপাশে চোখ ঘোরাচ্ছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। পাথরের আড়ালে থাকায় লোকটা তখনও দেখতে পায়নি ওকে।
দু’জনের মধ্যে মাত্র হাত দশেকের তফাত। জিজো দেরি না করে নিঃশব্দে একটা ছোটো পাথর তুলে ছুঁড়ে দিল লোকটার অদূরে। রাইফেল হাতে লোকটা মুহুর্তে সেদিকে ঘুরে ট্রিগার টিপল। নিস্তব্ধ বনভুমি কঁপিয়ে একঝাঁক গুলি ছুটল। আর সেই সময়টুকুর মধ্যে চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় জিজো পৌঁছে গেল লোকটার পিছনে।
মানুষটা মাথা ঘোরাবার সময়টুকুও পেল না। তার আগেই জিজোর ডান হাতের একটা জোরালো পাঞ্চ আছড়ে পড়ল তার বাঁ দিকের কানের উপর। মানুষটার অসাড় দেহটা মুহূর্তে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। কানের ভিতর থেকে ফিনকি দিয়ে গড়িয়ে পড়ল সরু রক্তের ধারা।
মানুষটার মুখের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল জিজো। তামুর সেই কমান্ডার কামখেন কারেং। মনটা খারাপ হয়ে গেল ওর। আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রতিপক্ষকে সামান্যতম সুযোগ দেবার উপায় ছিল না। তাই প্রবল উত্তেজনায় পাঞ্চে অতিরিক্ত জোর দিয়ে ফেলেছিল। শক্ত-সমর্থ চেহারা হলেও কামখেন কারেং বক্সার নয়। সেই মার সামলাতে পারেনি। মানুষটা কোনোদিনই আর উঠে দাঁড়াবে না।
জিজো ওর শিথিল হাতের মুঠো থেকে আগ্নেয়াস্ত্রটা তুলে নিল। এ.কে-৪৭। আকার-আকৃতি এমন কিছু আহামরি নয়। তেমন ভারিও নয়। কিন্তু কাজের। তাই সারা পৃথিবীতে এক নম্বর পছন্দের অস্ত্র। ম্যাগাজিন লাগানই রয়েছে। ট্রিগারে চাপ দিলেই ছুটবে ঝাঁকে-ঝাঁকে গুলি। লক্ষ্যবস্তু ঝাঁঝরা করে দেবে মুহূর্তে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, এমন একটা অস্ত্র হাতে থাকতেও কমান্ডার কামখেন কারেং বাঁচাতে পারেনি নিজেকে।
হাতের অস্ত্রটা জঙ্গলের মাথা টপকে ও ছুঁড়ে দিল নীচে নদীর জলে। চিরন সিং ও তার সঙ্গীরা তখনও যথাস্থানে দাঁড়িয়ে। দু’পক্ষের কথা চালাচালি থেমে গেলেও কেউ স্থানত্যাগ করেনি। উপরে জঙ্গলের ভিতর হঠাৎ গুলির শব্দ শুনে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে। ওই সময় ঝকঝকে আগ্নেয়াস্ত্রটা সশব্দে নদীর জলে পড়ে ডুবে গেল। দেখে উল্লাসে চিৎকার করে উঠল ওরা।
ওদিকে উপরে তখন এই কাহিনির অন্তিম পর্ব শুরু হয়ে গেছে। অস্ত্রটা নদীতে ছুঁড়ে দিয়ে জিজো আর এক মুহুর্ত দেরি করেনি সেখানে। কাছেই আর এক জোড়া পায়ের শব্দ কানে আসতে একটু আগে যে পাথরের আড়ালে আত্মগোপন করেছিল, নিঃশব্দে ফের তার আড়ালেই গা-ঢাকা দিয়েছে।
একটু পরেই জিজো লক্ষ করল গাছ-পাতার আড়ালে পা টিপে এগিয়ে আসছে একই জলপাই রঙের পোশাক-পরা একটা মানুষ। হাতে সেই এ.কে-৪৭। লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু চলার ধরণ, আকার-আকৃতি দেখে তাকে চিনতে বিলম্ব হল না জিজোর। জালেন হাও। সন্তর্পণে পা টিপে এগিয়ে চলেছে কমান্ডার কামখেন কারেং-এর পড়ে থাকা দেহটার দিকে।
একসময় কাছে গিয়ে দেহটার উপর ঝুঁকে পড়ল জালেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই সোজা হয়ে দাড়িয়ে চারপাশে ঘাড় ঘোরাল। তীক্ষ্ণ চোখ দুটো চারপার যেন ফালাফালা করতে লাগল। শেষে জিজো যে পাথরের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়েছিল সেখানে চোখ দুটো এসে থেমে গেল। হাতে উদ্যত অস্ত্রের মুখ ধীরে ধীরে নেমে গেল নীচের দিকে। পাথরের আড়াল থেকে জিজো উঠে দাঁড়াল এবার। কয়েক সেকেন্ড কারো মুখেই কথা নেই। শেষে নীরবতা ভঙ্গ করে জিজোই কথা বলল, “গুড আফটারনুন কমান্ডার।”
“গুড আফটারনুন।” ঠান্ডা গলায় উত্তর এল ওদিক থেকে।
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। গতকাল গাড়ির ভিতর অন্ধকারে চিমটি কেটে ইঙ্গিতটা করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। মানুষটা যে আপনি, একটু আগে পর্যন্ত বুঝতে পারিনি।”
“তাই নাকি!” জালেন হাওয়ের মুখ ভাবলেশহীন,“জলজ্যান্ত মিথ্যে কথাও বেশ গুছিয়ে বলতে পারো দেখছি! গবেট কামখেন কারেং তোমার ওই কথায় ভুলেই প্রাণটা খোয়াল।”
“তা হয়ত হবে স্যার। তবে কামখেন কারেং শুধু আমাকে নয়, চিনতে পারেনি তাঁর নিজের দলের মানুষকেও।”
প্রত্যুত্তরে জালেন হাওয়ের মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের হল না। ভাবলেশহীন। সেদিকে তাকিয়ে জিজো এবার প্রসঙ্গ পালটাল, “ওকে স্যার। তাহলে ‘অপারেশন টি-ওয়ান’ কি শেষ হল?”
“ওটা তোমার কাজ। আমার ব্যাপার নয়।” মানুষটা এইপ্রথম অল্প হাসল। আচ্ছা চলি। গুড বাই। বুটের আওয়াজ তুলে জালেন হাও স্থান ত্যাগ করল এরপর। হারিয়ে গেল অরণ্যের গভীরে।
আরো কিছুক্ষণ যথাস্থানে দাঁড়িয়ে রইল জিজো। সেই সময় নীচে নদীর দিক থেকে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল চিরন সিংয়ের সঙ্গীরা। কিছু বলল। উত্তরে জিজো উপর থেকে পালটা আওয়াজ দিল। নীচে চিরন সিং চেঁচিয়ে বলল, “ওরা চলে গেছে মি. জিজো। আপনি ঠিক আছেন তো?”
“হ্যাঁ, একদম,” জিজো বলল, “আপনারা উপরে উঠে আসুন।”
একটু পরেই পাহাড় ভেঙে উঠে এল সবাই। জিজো অপেক্ষা করছিল। চিরন সিং কাছে আসতে বলল, “মি. সিং, এদিকে কোনো টানেল বা ওই রকম কিছু আছে?”
“আছে।” চিরন সিং বলল, “চমৎকার এক টানেল। একদম ন্যাচারাল। পাহাড়ের গভীরে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। স্থানীয় নাম একটা আছে। তবে জিওলজিক্যাল দপ্তরের টোপো চার্টে ওটা মার্কিং করা আছে ‘টি-ওয়ান’ নামে।”
“একবার যেতে হবে ওখানে।” জিজো বলল।
“কিন্ত।” চিরন সিং সামান্য ইতস্তত করে বলল, “আমার সঙ্গীদের কাছেই শুনেছি, ওখানে জঙ্গিদের আনাগোনা কয়েকদিন খুব বেড়ে গেছে। যাওয়া ঠিক হবে কী? একটু আগে যা ঘটল! ভাগ্য ভাল যে, কারো কোনো ক্ষতি হয়নি।”
চিরন সিং ইতস্তত করছে দেখে জিজো বলল, “মি. সিং, একটা প্রশ্ন করছি। আপনি এই যে ট্রেকিং করে বেড়ান, খরচ নিজেই চালান?”
“তাছাড়া আর উপায় কী?” চিরন সিং অল্প হাসল, “তবে এবার হঠাৎই একজন স্পনসর পেয়েছি। মোটা টাকা ডোনেট করেছেন তিনি। আমার সঙ্গীরাও তাই খুব খুশি এবার।”
“তিনি কি মোরের মি. শিবরামন?”
“হ্যাঁ,” চিরন সিংয়ের চোখে একরাশ বিস্ময়,“কি-কিন্তু আপনি কেমন করে জানলেন?”
“আগে জানতাম না,” জিজো অল্প মাথা নাড়ল, “এখন অনুমান করছি মাত্র। আর তাই আমাদের যেতেই হবে সেখানে। এটুকু বলতে পারি, জঙ্গিদের তরফ থেকে কোনো সমস্যা আজকে আর হবে না।”
চিরন সিং আর আপত্তি করল না। পাহাড়ের উপর জঙ্গল-পথে খানিক চলার পর ওরা ফের একসময় নেমে এল সেই নদীর ধারে। দেখেই বোঝা যায় জায়গাটা নদী পারাপার করার ঘাট। এক পাশে ছোটো এক বাঁশের ভেলা। চিরন সিংয়ের সঙ্গীরা জানাল, ভেলায় চেপে নদী ধরে আধ মাইলের মতো গেলেই সেই টানেলে পৌছে যাওয়া যায়। কিন্তু স্রেফ গোটা কয়েক লম্বা বাঁশ দড়ি দিয়ে বেঁধে তৈরি ভেলায় একসঙ্গে দু’জনের বেশি ওঠার উপায় নেই। তাই জিজো আর চিরন সিংকে ভেলায় নদী পার করিয়ে বাকিরা সাঁতরেই নদী পার হল। ওপারে পাহাড়-জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কিছুক্ষণ চলার পর একসময় যেখানে পৌঁছোল, পাহাড় তেমন খাড়া নয়। অনেকটাই ঢালু হয়ে নেমে গেছে নদীর দিকে। সেই পাহাড়ের গায়ে নদী থেকে ফুট কুড়ি উপরে বড়ো এক গুহামুখ। সহজে পৌঁছোবার জন্য পাহাড় কেটে সিঁড়ির মতো ধাপ কাটা।
এ পর্যন্ত চিরন সিংয়ের সঙ্গীরা সামনে পথ দেখিয়ে নিয়ে এলেও গুহার কাছে পৌঁছে নিজেদের মধ্যে কী আলোচনা করে চিরন সিংকে কিছু বলতে সে জিজোকে ব্যাপারটা জানাল, ইদানীং জঙ্গিরা কাউকেই টানেলের কাছে আসতে দেয়নি। আজ যদিও ধারেকাছে ওদের কেউ নেই, তবু ওরা ভিতরে যেতে চাইছে না।
জিজো বিচলিত না হয়ে বলল, “তাতে অসুবিধা নেই। আপনারা এখানে সামান্য অপেক্ষা করুন। আমি একাই যাচ্ছি।”

জিজোর সেই মুখের দিকে তাকিয়ে চিরন সিং বলল, “চলুন, আমিও সঙ্গে যাই।” জিজো আপত্তি করল না। দু’জন পাহাড়ের গায়ে কাটা সিঁড়ির ধাপ ভেঙে এগিয়ে গেল টানেলের দিকে।
টানেলের মুখ তেমন বড়ো না হলেও ভিতরে কোথাও কোথাও যথেষ্টই প্রশস্ত। জলপ্রবাহে তৈরি প্রাকৃতিক গুহার নিয়মই এই। যেখানে পাথর নরম সেখানে ক্ষয় বেশি। যেখানে পাথর অপেক্ষাকৃত কঠিন, সেখানে ক্ষয় কম। এখন অবশ্য নদীর জলধারা অনেক নীচে নেমে যাওয়ায় জলপ্রবাহ আর নেই। শুকনো খটখটে। শুধু টানেলটা রয়ে গেছে।
জিজো ততক্ষণে পকেট থেকে ছোটো এল.ই.ডি টর্চটা বের করে জ্বেলে ফেলেছে। সেই আলোয় ওরা দেখতে পেল ভিতরে মানুষের স্পর্শ নানা জায়গায়। ব্যবহৃত জামাকাপড়, আধপোড়া সিগারেটের টুকরো, স্লিপিং ব্যাগ, এম্পটি কার্ট্রিজ। বুঝতে অসুবিধা হয় না জঙ্গিরা খানিক আগেও ছিল এখানে। কোনো কারণে হঠাই স্থানত্যাগ করে গেছে।
আরো খানিক ভিতরে ঢুকতেই ঈপ্সিত বস্তুর সন্ধান পাওয়া গেল। অন্ধকারে পড়ে আছে একটা মানুষ। বছর কুড়ি বয়স। মাদক বা কোনো ওষুধ প্রয়োগে বেহুঁশ করে রাখা হয়েছে। মানুষটার উপর এক ঝলক টর্চের আলো ফেলে জিজো পাশে চিরন সিংকে বলল, “উনি কে জানেন?”
“কে?”
“আপনার এই ট্রেকিংয়ের স্পনসর মি. শিবরামনের ভাইপো শ্রীধরন। দিন কয়েক আগে জঙ্গিরা ওকে কিডন্যাপ করে এনেছে।”
একদিন পরের কথা। রাতে ইম্ফলে ফিরে জিজো হোটেলের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎ বেল বাজতে দরজা খুলে দেখে হোটেলের ম্যানেজার নিজেই দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে। হাতেদুটো সিলমোহর করা খাম। ও দরজা খুলতেই বললেন, “গুড ইভনিং স্যার। দুটো খাম এসেছে আপনার নামে। নির্দেশমতো আমি নিজেই পৌঁছে দিয়ে গেলাম।”
খাম দুটো হস্তান্তর করে উনি বিদায় নিতে জিজো দরজা বন্ধ করে খাম দুটো খুলে ফেলল। একটায় নির্দিষ্ট থেকে অনেক বেশি অঙ্কের একটা চেক। অন্যটায় কয়েক লাইনের একটা ফ্যাক্স।
স্যার,
যে কারণে সেই দিনের পর আর আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি, সেই একই কারণে আজও দেখা করতে পারলাম না। নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন, আমি যে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, সাহায্য চেয়েছি, তা জঙ্গীদের কাছে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। হোটেলের বেয়ারা সেদিন দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনে ফেলেছিল আমাদের কথা। অপ্রস্তুত ছেলেটির মুখ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তাই আপনার সঙ্গে পরে আর দেখা বা অন্য কারো মারফৎ যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তেমন করলে আমার পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারত। বিপদ হত আপনারও। তামুতে কামখেন কারেং আপনাকে অত সহজে ছাড় দিত না। তবে যোগাযোগ না করলেও আপনাকে যেটুকু চিনেছিলাম, তাতে বিশ্বাস ছিল, যথাসময়ে সঠিক কাজই করবেন। আমার সেই ভাবনায় যে কিছুমাত্র ভুল ছিল না, তা প্রমাণ করেছেন আপনি। আপনার জন্য অন্য সব ব্যবস্থাই করা ছিল। শুধু এসকর্ট দেওয়াই নয়, আপনি হয়ত বুঝতে পারেননি, গাড়ির ড্রাইভার ব্রজেন্দ্রকেও বলা ছিল। কাংলাপার্কের স্ট্যন্ডে সেদিন আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিল ও। প্রয়োজন হতে পারে বুঝে ট্রেকিংয়ে পাঠিয়েছিলাম চিরণ সিংকেও। বলা বাহুল্য, এদের কেউই আসল ব্যাপারটা জানত না।
আর নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন, জঙ্গিদের দলে নেতৃত্ব নিয়ে কিছু গোলমাল ছিল। সেটাই কাজে লাগিয়েছিলাম। ডেপুটি কমান্ডার জালেন হাওকে দলে টানতে তাই বেগ পেতে হয়নি। তবু আপনার কৃতিত্ব একবিন্দু খাটো হবার নয়। পালেলের সেই ঘটনার পরে জালেন হাও কিছু চিন্তায় পড়েছিল। কিন্তু তামুর বড়ো ব্যবসায়ী মো সেনের সঙ্গে হঠাৎ পরিচয় খুবই সাহায্য করেছে আপনাকে। ভদ্রলোকের সঙ্গে অতক্ষণ কথা বলতে দেখে দলের লোকেরা খবর দিয়েছিল কামখেন কারেংকে। সে নিজেই তারপর ফোন করেছিল মো সেনকে। ভদ্রলোকের কথায় তারপর আর আপনাকে প্রাণে মেরে ফেলতে সাহস করেনি। এরপর যেভাবে কাজটা সমাধান করেছেন, তাতে মামুলি ধন্যবাদ যথেষ্ট নয়। তাই চুক্তির অতিরিক্ত আরো কিছু আপনার প্রাপ্য।
সবশেষে বলি, আপনি বক্সার তো বটেই। আরো বড়ো পরিচয় ফাইটার। এগিয়ে চলুন। এই দুনিয়ায় শেষ পর্যন্ত ওদেরই জয় হয়। ধন্যবাদ।
চিঠির নীচে কোনো নাম নেই। কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয় না, সেটা কার পাঠানো। পড়া শেষ হতে জিজো বিড়বিড় করে বলল, “স্যার, আরো বড়ো ফাইটার আপনি নিজে। সুদূর তামিলনাড়ুর মানুষ হয়েও যেভাবে এই মোরেতে মাটি কামড়ে লড়াই করে চলেছেন, তার কৃতিত্ব আরো বেশি। আরো বড়ো ধন্যবাদ আপনার প্রাপ্য।”
----------------------------
কাহিনির বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কোথাও ব্যতিক্রম মনে হলে তা নিতান্তই কাকতালীয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন