টাঙ্গুর অরণ্যে

শিশির বিশ্বাস

ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে যেতেই সুরেশের হাতটা তড়িৎ গতিতে চলে গেল বালিশের নীচে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনের দিকে। টাঙ্গুর এই সেগুন জঙ্গলে আসার আগে বোম্বাই বর্মা টিম্বার কোম্পানির রেঙ্গুন অফিসের বড়ো কর্তা ম্যাকডোনাল্ড সাহেব ওর হাতে আগ্নেয়াস্ত্রটা দিয়ে বলেছিলেন, “ঘুমের মধ্যেও অন্তত একটা কান খোলা রেখ হে ছোকরা।” সাহেব আরো কিছু বলেছিলেন। এক বঙ্গসন্তানের কাছে তা সুখকর নয়। চাপা আওয়াজটা তাই কানকে ফাঁকি দিতে পারেনি। ট্রিগারে আঙুল রেখে অতি সন্তর্পণে তাঁবুর দরজার দিকে ঘাড় ফেরাল ও। পর্দার ফাঁক দিয়ে হালকা আলোর আভাস। শেষ রাতে চারপাশ সবে পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এই সময় বাইরে কোনো গাছে একটা পাখির গলা সাধা শুরু হয়। অনেকদিন সেই আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলে বেশ লাগে শুনতে। নাথপুরে বাড়ির কথা কখনো মনে পড়ে যায়। ওদের ঘরের পাশে কদম গাছের ডালেও এই সময় একটা দোয়েল মাঝে মধ্যেই এমন শিস দিত। আজ পাখিটা নেই। চারপাশটা ভয়ানক নিস্তব্ধ। ঝিম মেরে আছে বাতাস। সম্ভবত বৃষ্টি নেমেছে কোথাও। বাতাসে সেই আভাস। সঙ্গে অন্য এক অনুভূতি। মাত্র মাস কয়েক হল টাঙ্গুর এই সেগুন জঙ্গলের সঙ্গে পরিচয়। কিন্তু অভিজ্ঞতা বেড়েছে ঢের বেশি। নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে পায়ে-পায়ে তাঁবুর পর্দা সরিয়ে বাইরে উঁকি মারল। রাতের পরিষ্কার আকাশে হালকা মেঘের আস্তরণ পড়তে শুরু করেছে। খানিক দূরে কুলিদের টেন্ট। পাশেই মাহুত-সর্দার মাং ফো হানের আস্তানা। অত লম্বা নাম উচ্চারণে অসুবিধে বলে ক্যাম্পের সবাই ওকে ‘সিন হেতিন’ বলে ডাকে। মাহুত সর্দার এখানে সিন হেতিন। সেটাই আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে হেতিন। গোড়ায় সুরেশও ওকে ওই নামে ডাকত। তবে এখন আর হেতিন নয়, ‘আকো’ অর্থাৎ দাদা বলে। পোড় খাওয়া অনেক দিনের অভিজ্ঞ মানুষ এই হেতিন। এই কয়েক মাসে অনেক কিছু শিখেছে ওর কাছে। বর্মার এই জঙ্গলে সেগুলো মেনে চলতে না পারলে বিপদ প্রতি পদক্ষেপে। চাপা আওয়াজটা ঘুমের মধ্যে একবারই শুনতে পেয়েছিল। তারপর আর সাড়া পায়নি। তবু হাতের অস্ত্র উঁচিয়ে পায়ে-পায়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। জঙ্গলে ভোর হবার আগের এই সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

টাঙ্গুর ঘন অরণ্যের মাঝে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে সিতাং নদী। দু’ধারে পাহাড় বেয়ে নেমেছে অসংখ্য ধারা। তাদের একটা যেখানে সমতলে পড়ে ঘোড়ার খুরের মতো বাঁক নিয়ে সিংয়ের দিকে বয়ে গেছে তারই অদূরে বোম্বাই বর্মা টিম্বার কোম্পানির এই চার নম্বর ক্যাম্প। চারপাশ কেটে সামান্য সাফ করা হলেও অদূরেই ঘন জঙ্গল। আধো অন্ধকারে চারপাশে সাবধানে চোখ বুলিয়ে তেমন কিছুই নজরে পড়ল না। সাবধানে বড়ো একটা শ্বাস টানল। হেতিনের কাছেই শিখেছে, জঙ্গলে শুধু চোখ-কান নয়, নাকের ভূমিকাও যথেষ্ট। জঙ্গলে প্রতিটি প্রাণীর গায়ের গন্ধ আলাদা। সময় ভেদে সে গন্ধ পালটেও যায়। জানা থাকলে গন্ধেও বুঝে নেওয়া যায় অনেক কিছু। কিন্তু চেষ্টা করেও আজ তেমন কিছু আভাস পেল না। কিন্তু হাল ছাড়ল না। মাত্র এই ক’মাসে কতটুকুই আর শিখেছে! সুরেশের সন্দেহটা তাই যায় না। চোখ দুটো চারপাশ ফালাফালা করে ঘুরতে থাকে। আর তখনই নজরে পড়ে অদূরে গাছপালার ফাঁকে ছোটোমত কিছু নড়ছে।

আধো অন্ধকারে চোখ দুটো ততক্ষণে সয়ে এসেছে। মুহূর্তে সারা শরীর কেঁপে ওঠে ওর। মস্ত এক বাঘের লেজের ডগা। সারা শরীর মাটিতে ঘাস-পাতার ভিতর মিশিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে রয়েছে প্রাণীটা। লেজের ডগাটাই শুধু তিরতির করে নড়ছে। ওদের নাথপুরের বাড়িতে একটা বেড়াল ছিল। শিকারের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ার আগে এভাবেই নড়ত তার লেজটা। তাই বাঘের লক্ষ্যটিকে দেখতে না পেলেও বুঝতে অসুবিধা হল না সুরেশের। গতকাল ফাঁদ পেতে মগ কুলিরা বড়ো একটা শূকর ধরেছে। গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি একটা খোয়াড়ে সেটাকে আটকে রাখা হয়েছে। প্রাণীটার লক্ষ সেই খোঁয়াড়। শিকারের গন্ধে এগিয়ে এলেও বাধা পেয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। বুঝে নিতে চাইছে ব্যাপারটা। লেজের ডগাটাই নড়ছে তিরতির করে। এত কাছে প্রাণীটা, অথচ গন্ধ পায়নি কিছুমাত্র! ভাবতে গিয়ে রহস্যটা টের পেল সুরেশ। ভোরের বাতাস বইছে উলটো দিক থেকে। শেখার কত কিছুই যে বাকি আছে এখনো! কিন্তু অনুকুল বাতাসে ওর গন্ধও কি পায়নি প্রাণীটা! নিশ্চয় পেয়েছে। কিন্তু বনের রাজা পরোয়া করেনি। আর নয়ত শিকারের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে বাকি কোনো কিছুতেই আর হুঁশ থাকে না ওদের।

এভাবে এক রয়াল টাইগার সুরেশ আগে কখনো দেখেনি। গায়ের দুর্দান্ত হলুদ রং, কালো ডোরা শেষ রাতের আধো অন্ধকারেও যেন ঝলসে উঠছে। হাতের অস্ত্রটার দিকে সামান্য তাকাল সুরেশ। ১৮৭০ এর আনকোরা পিস্তল। যথেষ্টই শক্তিশালী। কিন্তু অরণ্যে এ অস্ত্র নিছক আত্মরক্ষার জন্য। তার বেশি নয়। ভাবতে গিয়ে হঠাৎ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। ভাগ্যিস, ক্যাম্পের ছোটো সাহেব পিটার নেই। ও ক্যাম্পে জয়েন করার পরে সেই যে ছুটি নিয়ে ক্যাম্প ছেড়েছে, আর ফেরেনি। থাকলে সর্বক্ষণের সঙ্গী ‘ওয়েস্টলে রিচার্ড’ রাইফেলটা এতক্ষণে কাজে লাগিয়ে ফেলত। এমন বড়ো আকারের বাঘের চামড়ার ভালই দাম রেঙ্গুনের বাজারে। যুদ্ধের পরে রেঙ্গুন এখন অনেকটাই থিতু। বিলেত থেকে নানা কাজে তো বটেই, ইদানীং বেড়াতেও আসছে অনেকে। এসব জিনিস পেলেই লুফে নেয় তারা। ভাল দাম পাওয়া যায়। করিতকর্মা পিটারের অতিরিক্ত রোজগার তাই মন্দ ছিল না।

সাতপাঁচ ভাবতে-ভাবতে সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল সুরেশ। হুঁশ হতে দেখল ইতিমধ্যে কখন উঠে দাড়িয়েছে বাঘটা। বুঝে ফেলেছে, শিকার নাগালের বাইরে। মুহূর্তে সতর্ক হল ও। পিছন থেকে হলেও বেশ বুঝতে পারে, প্রাণীটা যতটা হতাশ তার থেকে বেশি বিরক্ত। ধীরেসুস্থে প্রাণীটা ঘাড় ফেরাল এবার। চাপা গর্জনে তীক্ষ্ণ দাঁতের ফাঁক দিয়ে লালা ছিটকে বেরোল। কিন্তু সে কয়েক মুহূর্তের জন্য। বনের রাজা ওই সামান্য সময়ের মধ্যেই বুঝি পরিমাপ করে নিল সামনের নতুন শিকারটিকে। তারপর ঘাড় ফিরিয়ে গজেন্দ্র গমনে পা ফেলে মিলিয়ে গেল বনের আড়ালে।।

একইভাবে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সুরেশ। চারপাশে সন্তর্পণে বার কয়েক চোখ বুলিয়ে নিয়ে দু’হাতে ধরা অস্ত্রসহ হাতটা ধীরে-ধীরে নামিয়ে নিল। বুক থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেমে এল। নিজের বিপদের কথা ভেবে নয়, শেষ পর্যন্ত কোনো অঘটন ঘটেনি বলে ব্যবহার করতে হয়নি অস্ত্রটা। আসলে হিংস্র ক্ষুধার্ত প্রাণীটার চোখের বার্তা পড়ে নিতে কিছুমাত্র ভুল হয়নি ওর। তবে বিচলিতও হয়নি। দু’হাতের মুঠোয় ধরা স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনের মুখটা এক চুলও সরেনি প্রাণীটার চোখের উপর থেকে। হাতের আগ্নেয়াস্ত্রে প্রাণীটাকে ঠেকাতে হলে ওটাই সবচেয়ে সহজ জায়গা। তেমন অবস্থায় লক্ষ্য যে ব্যর্থ হত না, সেই বিশ্বাস ছিল। তাই বিচলিত হয়নি। আসলে এই স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন চালনায় ওর হাতে খড়ি সেই চার বছর আগে নাথপুরের পাশে নীলকুঠির সাহেবের হাতে। ওর উৎসাহ দেখে সাহেব হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন পিস্তল আর রাইফেল ছোঁড়ার কৌশল। উৎসাহ ছিল কুঠির মেমসাহেবেরও।

একরকম হঠাৎ হয়ে গিয়েছিল সেই যোগাযোগটা। কয়েক বন্ধু মিলে সেদিন গিয়েছিল পোড়ো বিলের ওদিকে ছিপ ফেলে মাছ ধরতে। নাম পোড়োবিল, আসলেও তাই। চারপাশে ঘন কশাড় জঙ্গল। বুনো ঝোপঝাড়। গুলবাঘ তো বটেই, কখনো নাকি কেঁদো বাঘের দেখাও পাওয়া যায়। বিলে ভাল মাছ থাকলেও কেউ তাই যায় না ওদিকে। তবে এসব ওদের বন্ধুদের কাছে কোনোদিনই ধর্তব্যের মধ্যে ছিল না। সেদিন বিকেলে মাছ ধরে ফেরার সময় ও কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কাছেই অনেক মানুষের হইহই চিৎকার। ঘোড়ার আওয়াজ। তাতেই বুঝল, নীলকুঠির সাহেবদের কেউ শিকারে বের হয়েছে। তবে তা নিয়ে তেমন মাথা ঘামায়নি। নীলকুঠির সাহেবদের অনেকেই মাঝে-মধ্যে এদিকে শিকারে আসে। সঙ্গে অনেক সময় জঙ্গল খেদাবার লোক থাকে। লাঠিসোটা নিয়ে তারা কশাড় বনের ভিতর থেকে বুনো শূকর তাড়া করে আনে। কাছে এলে গুলি করে মারে সাহেবরা। তাই গা করেনি। নিজের মনেই হাঁটছিল। ভয়ানক ব্যাপারটা ঘটে গেল ওই সময়। কশাড় জঙ্গল এদিকে তেমন ঘন নয়। হঠাৎ কাছেই হুড়মুড় আওয়াজে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে ঝোপঝাড় ভেঙে ছুটে আসছে ভয়ানক এক দাঁতালো শূকর। তাড়া খেয়ে ছুটে পালাচ্ছিল প্রাণীটা। হঠাৎ ফাঁকায় ওকে দেখে ঘাড় ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর নিমেষে তেড়ে এল।

শূকরটা হঠাৎ ওইভাবে দাড়িয়ে পড়তেই ভাবগতিক বুঝে নিয়েছিল সুরেশ। ছুটে পাড় পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বুঝে মুহুর্তে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। হাতে পাকা কঞ্চির গোটা তিনেক মজবুত ছিপ। তিরবেগে প্রাণীটা এগিয়ে আসতেই দু’হাতে সেগুলো মুঠো করে ধরে সপাটে বসিয়ে দিল। আঘাতে ছিটকে পড়ল প্রাণীটা। বিশাল আকারের দাঁতালো শূকর। ওই আঘাতে কিছু হবার নয়। মুহূর্তে সামলে নিয়ে ভীষণ ক্রোধে দ্বিগুণ বেগে ধেয়ে এল আবার। সুরেশের হাতের অস্ত্র ফের একই ভাবে নেমে এল তার উপর। পর-পর বার কয়েক। দারুণ আঘাতে খানিক কাবু হয়ে পড়লেও শুয়োরটা এক সময় ফেলে দিল ওকে। কিন্তু ভয়ানক কিছু ঘটার আগেই সামলে নিয়ে দু’পায়ের দুর্দান্ত এক লাথিতে প্রাণীটাকে অনেকটাই সরিয়ে দিতে পেরেছিল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ছিপের গোটা কয়েক জোরালো আঘাতে পেড়ে ফেলল মাটিতে। নিস্তেজ প্রাণীটার তখন প্রাণটুকু বের হতে বাকি। সুরেশ নিজেও ইতিমধ্যে অল্প-বিস্তর আহত। তবে সেজন্য পরোয়া না করে হাত-পা ঝেড়ে ফেরার পথ ধরবে, হঠাৎ খেয়াল হল কাছেই ঘোড়ার পিঠে বসে নীলকুঠির বড়ো সাহেব। ও তাকাতেই সাহেব লাফিয়ে নামল ঘোড়া থেকে। সামনে এসে পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “ওয়েল ডান বয়। ওয়েল ডান।”

“ও কিছু নয় সাহেব। আগেও এমন হয়েছিল একবার। তবে এটা আকারে আরো বড়ো। তাই বেগ দিয়েছে।”

“কিছু নয় মানে!” অবাক হয়ে বড়ো সাহেব বললেন, “তুমি খেয়াল করনি, লড়াইয়ের মাঝেই আমি হাজির হয়েছিলাম এখানে। প্রায় হাতাহাতি লড়াই। তাই আর গুলি করতে পারিনি। শূকরটা আমার লোকেরাই তাড়া করেছিল। গড ব্লেস যে, কিছু হয়নি তোমার।”

সাহেব এরপর ওর কোনো কথায় কান দেয়নি। ততক্ষণে দলের লোকজন পৌঁছে গেছে। শূকরটা তাদের জিম্মায় দিয়ে প্রাথমিক পরিচর্যার জন্য ঘোড়ায় তুলে ওকে নিয়ে গিয়েছিলেন নীলকুঠিতে। শুধু সাহেব নয়, সব শুনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন কুঠির মেমসাহেবও।

নীলকুঠি ওদের গ্রাম থেকে বেশি দূরে নয়। কিন্তু তেমন দায়ে না পড়লে ওদিকে কেউ ঘেঁষে না। নিষেধ ছোটোদেরও। সুরেশও তাই ওদিকে আগে যায়নি। সাহেবদের সম্বন্ধে নানা নিন্দা-মন্দই শুনেছে। এই প্রথম টের পেল, অনেক ভাল দিকও আছে বিলেতের এই মানুষগুলোর। কালো চামড়ার নেটিভ বাড়ির ছেলে সুরেশকে নীলকুঠির সেই সাহেব এরপর হাতে ধরে শিখিয়ে দিয়েছিলেন রাইফেল আর পিস্তল চালাবার কায়দা-কানুন। এই স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনেই ওর পিস্তল চালবার হাতেখড়ি। কতদিন নীলকুঠির মাঠে সাহেবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্র্যাকটিস করেছে। নিশানা ভুল হবার কথা নয়। তবে সেটা ছিল পুরোনো মডেলের। এটা একেবারেই হালের। ১৮৭৪-এর মডেল থ্রি। শুধু সাহেবই নয়, মেমসাহেব তো ওকে ভালোবাসতেন নিজের ছেলের মতই। মুখে-মুখে ইংরেজি ওই মেমসাহেবের কাছেই শিখেছিল। পরে বড়ো কাজে এসেছিল ওটা। মেমসাহেব তো একসময় ঠিক করেই ফেলেছিলেন ওকে বিলেতে নিয়ে যাবেন। ভরতি করে দেবেন নামি স্কুলে। বুকের মাঝে জমে থাকা স্বপ্নটা এই মেমসাহেবই উশকে দিয়ে গিয়েছিলেন।

প্রতি বছর শীতের শেষে পোড়ো বিলের বুনো হাঁসের ঝাঁক যখন ফের ভিনদেশে পাড়ি দিতে শুরু করত, সেদিকে তাকিয়ে ভিতরে এক অন্য অনুভূতি টের পেত ও। দূরদূরান্তের ডাক। কিন্তু বলতে পারেনি কাউকেই। বাবা কলকাতায় চাকরি করতেন। একাই থাকতেন সেখানে। খুব ইচ্ছে ছিল, বাবাকে রাজি করিয়ে কলকাতার স্কুলে পড়তে যাবে। তারই মধ্যে নীলকুঠির মেমসাহেবের প্রস্তাব। নেচে উঠেছিল মনটা। কিন্তু এদেশের মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা অনেক। নাথপুর গ্রামের নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব পরিবার ওরা। সেই বাড়ির ছেলে নীলকুঠির সাহেবের সঙ্গে বিলেত যাবে শুনেই রে-রে করে উঠল সবাই। মাঝখান থেকে শাসনের বিধিনিষেধে বন্ধ হয়ে গেল নীলকুঠিতে যাওয়াও। তবে ও দমেনি তাতে। সুযোগ পেলেই ছুটে যেত নীলকুঠিতে। এর কিছুদিন পরেই সাহেব কুঠি বেচে দিয়ে দেশে চলে গেলেন। আর দেখা হয়নি। সেদিন বিলেত যেতে পারলে জীবনটা হয়ত অন্য রকমও হতে পারত। স্রেফ জাহাজের ভাড়া জোটাতে না পারার কারণে আজ বিলেতের বদলে ওকে পাড়ি জমাতে হয়েছে বর্মায়। কাজ নিতে হয়েছে টাঙ্গুর এই জঙ্গলে। নতুন এক জীবন। নতুন অভিজ্ঞতা। সুরেশ এখন জানে, জীবনে ফেলা যায় না কিছুই। প্রতিটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতা জমা হয়ে থাকে।

তাঁবুতে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়লেও সুরেশের চোখে আর ঘুম আসেনি। শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে কখন ভোর হয়ে গেছে। হঠাৎ খেয়াল হল তাঁবুর বাইরে হেতিন উত্তেজিত গলায় ডাকছে ওকে। বিছানা ছেড়ে দ্রুত বাইরে আসতেই ওকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল হেতিনের।

“চিন-বা, গত রাত্তিরে ভয়ানক বিপদ গেছে ক্যাম্পে। ভয়ানক বিপদ হতে পারত আপনার।” বড়ো একটা নিঃশ্বাস ফেলে প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলল হেতিন।

হেতিন ক্যাম্পে সবচেয়ে পুরোনো মানুষ। ওকে এমন উত্তেজিত কখনো দেখা যায়নি। তবু অবাক হল না সুরেশ। কারণ হেতিন এরপর কী বলবে, বুঝতে পারছিল। অভিজ্ঞ মানুষ হেতিন সকালে বাইরে এসে ঠিক টের পেয়ে গেছে। আসলে গত রাতে যে বাঘটা ক্যাম্পে হানা দিয়েছিল সেটা সাধারণ বাঘ নয়। নরখাদক। ক্যাম্পে আসার পরে বাঘটার কথা অনেকের মুখেই শুনেছে সুরেশ। মাস ছয়েক আগে ক্যাম্পের পাঁচ পাঁচটি মানুষ নরখাদকটার পেটে গিয়েছে। একসময় ক্যাম্প প্রায় উঠে যাবার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও মারা যায়নি। এমনিতে হয়ত চিনতে পারত না। কিন্তু নদী পার হয়ে আসার কারণে ভিজে পায়ের ছাপ দেখে অন্ধকারেও বাঘটার সামনের ডান পায়ের থাবার ক্ষতচিহ্ন বুঝতে অসুবিধা হয়নি। সন্দেহ নেই, ছ’মাস আগে কোনো দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল বাঘটা। হারিয়ে ফেলেছিল বন্যপ্রাণী শিকারের স্বাভাবিক ক্ষমতা। সহজ শিকার নরমাংসের খোঁজে তাই হানা দিত ক্যাম্পে। কিন্তু গত রাতে বাঘটাকে দেখে কিছুমাত্র অসুস্থ মনে হয়নি। তাই এখন আর নরখাদক নয়। গত রাতে ক্যাম্পে তেমন উদ্দেশ্য নিয়েও আসেনি। প্রাণীটা ফিরে যাবার আগে ভয়ানক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল বটে। তবে তা শিকার কাছে পেয়েও না মেলার আক্ষেপে। কিন্তু সেকথা হেতিনকে বোঝানো যাবে না। সুরেশ বেশ জানে, ওর প্রতি যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে মানুষটার। মাস কয়েক আগে সুরেশ রেঙ্গুন অফিসে জয়েন করার পরে বড়ো কর্তা ম্যাকডোনাল্ড সাহেব নিজেই ওকে ক্যাম্পে নিয়ে এসেছিলেন। হেতিনকে ডেকে সুরেশের সঙ্গে মোলাকাত করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “ছোটো সাহেব ছুটিতে গেলে আপাতত ইনিই ক্যাম্পের দেখভাল করবেন।”

সাহেবের কথায় হাঁ করে খানিক ওর দিকে তাকিয়ে থেকে হেতিন বলেছিল, “এ কাকে নিয়ে এলেন মালিক! ভাল করে গোঁফও গজায়নি! একেবারেই ছেলেমানুষ! ”

কাজের মানুষ হেতিনকে ম্যাকডোনাল্ড সাহেবও খাতির করে। হেসে বলেছিলেন, “আমারও তাই মনে হয়। তবে তুমি যখন রয়েছ, শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে পারবে।”

আসলে হেতিন না জানলেও সুরেশ বেশ জানে সেই সময় ওকে না নিয়ে উপায় ছিল না সাহেবের। ক্যাম্পের ছোটো সাহেব হ্যারি চাকরি ছেড়ে পালিয়েছে। যাকে পাঠানো হয়েছে সেই পিটারও নতুন। সামলে উঠতে পারছে না। ছুটির দরখাস্ত পাঠিয়েছে। সাহেবের তাই শিরে সংক্রান্তি। ভাবার সময় কোথায়? তবে সাহেবের কথা ফেলেনি হেতিন। এই ক’মাসে প্রায় হাতে ধরে ওকে শিখিয়েছে টাঙ্গুর এই পাহাড়-জঙ্গল। সিতাং নদীর ঝিমিয়ে থাকা জলস্রোতের নানা রহস্য, গাছপালা, পশুপাখি। হেতিনের দুশ্চিন্তা তাই স্বাভাবিক। কিন্তু কীভাবে কথাটা পাড়বে ভেবে উঠতে পারল না। কিন্তু হেতিন অপেক্ষা করল না। উত্তেজিত গলায় বলল, “চিন-বা, গত রাতে ‘ওমাং’ হানা দিয়েছিল ক্যাম্পে। আপনার তাঁবুর চারপাশে পাক দিয়ে গেছে। ভগবান বুদ্ধের অসীম কৃপায় রক্ষা পেয়ে গেছেন!”

‘ওমাং!’ হেতিনের মুখে হঠাৎ ওই নামটা শুনে যতটা চমকাবার ততটাই চমকাল সুরেশ। মুহূর্তে দু’চোখের দৃষ্টি আছড়ে পড়ল নীচে মাটির উপর। বেশ কয়েকদিন বৃষ্টি হয়নি। মাটি শুকিয়ে প্রায় কাঠ হয়ে রয়েছে। সেই শক্ত মাটিতেও প্রাণীটার পায়ের ছাপ বুঝে নিতে ভুল হল না। অথচ রাতে একবারও খেয়াল করেনি। আসলে তাঁবু থেকে বের হয়ে গোড়াতেই বাঘটা নজর পড়ে যেতে অন্যদিকে লক্ষ্য দেয়নি। সম্ভবত ওমাং বাঘটার আগেই এখানে এসেছিল। এমনও হতে পারে, হঠাৎ বাঘটা এসে পড়াতেই সে স্থান ত্যাগ করে গেছে।

ওমাং বিশাল এক দাঁতালো রোগ হাতি। টাঙ্গুর টিম্বার ক্যাম্পের বিভীষিকা, আতঙ্ক। এ পর্যন্ত এদিকে সেগুন ক্যাম্পের অনেকেই মারা পড়েছে ওর আক্রমণে। তার সর্বশেষ সংযোজন বোম্বাই বর্মা টিম্বার কোম্পানির এই চার নম্বর ক্যাম্পের বড়ো সাহেব রবার্ট ডগলাস। মাস কয়েক আগে এমনই এক রাতে খুনে হাতিটা হামলা করেছিল ডগলাসের তাঁবুতে। জেগে ওঠার আগেই সাহেবকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে পায়ের তলায় ফেলে পিষে দিয়েছিল। ক্যাম্পের ছোটো সাহেব হ্যারি এরপর আর দেরি করেনি। পালিয়েছিল ক্যাম্প ছেড়ে। ক্যাম্প প্রায় উঠে যাবার অবস্থা। তড়িঘড়ি পাঠানো হয়েছিল পিটারকে। কিন্তু সেও মাসখানেকের মধ্যেই ছুটির জন্য রেঙ্গুনের অফিসে তাগাদা শুরু করেছে। চাকরি নেবার সময় এসবের কিছুই ম্যাকডোনাল্ড সাহেব ওকে জানায়নি। এমনকি পিটারও ক্যাম্পের সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছিল, কেউ যাতে ব্যাপারটা ওর কাছে না ভাঙে। আসলে ওর ভয় ছিল, তাহলে তার ছুটির অনুমতি আসার আগেই সুরেশ ক্যাম্প ছেড়ে পালাবে।

সুরেশ অবশ্য ব্যাপারটা জানতে পেরে গিয়েছিল দিন কয়েকের মধ্যেই। এও জেনেছিল, রবার্ট ডগলাসকে পিষে মারার পরে এক রাতে খুনে ওমাং হ্যারির তাঁবুতেও হানা দিয়েছিল। সেরাতে বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছিল হ্যারি। তারপর একটা দিনও দেরি না করে ক্যাম্প ছেড়ে পিটটান দিয়েছিল। ওমাং এর পরে এক রাতে পিটারের তাঁবুতেও হানা দিতে এসেছিল। কিন্তু কুলিরা হঠাৎ দেখে ফেলায় সবাই হইচই শুরু করতে অন্ধকারে গা ঢাকা দেয়। অসম্ভব ধূর্ত হাতি এই ওমাং। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব নিজে অনেক চেষ্টা করেও মারতে পারেননি। দিনের বেলা হাতিটা ক্যাম্পের কুলি-মজুরদের উপরেও অতর্কিতে আক্রমণ করেছে অনেকবার। তবে কেউ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে পাহারায় থাকলে কখনো কাছে ঘেঁষেনি। ধূর্ত প্রাণীটা সাহেবদের হাতের এই আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষমতা বিলক্ষণ জানে। দিনের বেলা এড়িয়ে চলে তাদের। হানা দেয় রাতের অন্ধকারে। অথচ এই ওমাং একসময় এই চার নম্বর ক্যাম্পের সেরা হাতি ছিল। অত বড়ো হাতি এদিকের কোনো ক্যাম্পেই ছিল না। বিশাল আকারের গাছের গুঁড়ি শূঁড়ে তুলে অক্লেশে বয়ে নিয়ে যেতে পারত। ক্যাম্পের সাহেবরা তার পিঠে চড়ে প্রায়ই শিকারে বের হতেন। দুর্দান্ত হাতিটা মাহুতের ইঙ্গিত মাত্রই পৌঁছে যেত আক্রমণ-উদ্ধত ক্ষিপ্ত বাঘের খুব কাছে। অল্পবিস্তর আহত হলেও পরোয়া করেনি। আদর করে সবাই তাই ওকে ‘ওমাং’ অর্থাৎ ‘রাজা’ নাম দিয়েছিল।

সেই ওমাং হঠাৎই রোগ হয়ে গেল। পোষা পুরুষ হাতির মস্তি হয় কখনো। তখন হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে ওঠে ওরা। মাহুতকেও অনেক সময় চিনতে পারে না। তবে তা মাত্র দিন কয়েকের জন্য। ওমাং-এর এমন আগেও হয়েছে। কিন্তু সেবার অন্যরকম হয়ে গেল। আগের দিন প্রকাণ্ড এক সেগুন গাছের গুঁড়ি কেটে নামানো হয়েছে। এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি পথে সেটাকে নদীর ঘাটে নেবার জন্য ওমাংকেই দরকার। কাজটা দু’চারদিন পরেও করা যেত। কিন্তু ডগলাস সাহেবের হুকুম হল দেরি করা চলবে না। মাহুত তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে কাজে লাগাবার চেষ্টা করেছিল। ফল হয়েছিল মারাত্মক। খেপে উঠে ওমাং হঠাৎ মাহুতকে শূঁড়ে পেঁচিয়ে থেঁতলে দিয়েছিল দেহটা। ভয়ানক ব্যাপার দেখে ছুটে এসেছিল ক্যাম্পের অনেকে, তাতে ফল হয়েছিল আরো মারাত্মক। আরো তিন জনের একই দশা ঘটিয়ে ওমাং ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল এরপর।

মস্তিদশা কেটে যাবার পরে এসব হাতি সাধারণত নিজেই ফিরে আসে। ওমাংয়ের ক্ষেত্রে তা হয়নি। অনেক সময় তাদের পোষা কুনকি হাতি দিয়েও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়। কিন্তু সেদিনের সেই ঘটনার পরে কোনো মাহুতই রাজি হয়নি।

জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া এসব হাতি কোনো বুনো হাতির দলে ভিড়তে পারে না। গায়ে মানুষের গন্ধ থাকায় অন্য হাতিরা তাকে দলে নেয় না। শেষ পর্যন্ত ভয়ানক রোগ হাতিতে পরিণত হয় তারা। এধরনের রোগ হাতির ভয়ানক আক্রোশ থাকে মানুষের উপর। ওমাংও ব্যতিক্রম হয়নি। ফলস্বরূপ ওমাং এখন টিম্বার ক্যাম্পের আতঙ্ক।

সুরেশ এখানে আসার পরে ওমাংয়ের কথা অনেকবার শুনেছে। কিন্তু প্রাণীটিকে চোখে দেখেনি। আজ হেতিনের ওই কথায় গোড়ায় কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিতে সময় লাগল না। হেতিনের উদ্বেগ স্বাভাবিক। কিন্তু সুরেশ জানে, বিপদের কথা নিয়ে বেশি মাথা ঘামালে বিপদ কমে যায় না। প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলল, “আকো, মনে হচ্ছে ওমাংয়ের চিন্তায় অন্য ব্যাপারটা খেয়াল হয়নি তোমার।”

“কী চিন-বা?” থতমত খেয়ে হেতিন বলল।

“রাতে উত্তরের পাহাড়ে বৃষ্টি হয়েছে। চটপট তৈরি হয়ে নাও। অনেক কাজ এখন।”

টাঙ্গুর গভীর অরণ্য সিতাং নদীর জলে পুষ্ট। বলা যায়, এই লগ ক্যাম্পেরও প্রাণ। সিতাং বড়ো নদী। কিন্তু অরণ্যে ছড়িয়ে থাকা সেগুনের গুঁড়ি সিতাংয়ের মূল স্রোতে পৌছে দিতে ভরসা পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোটো নদীগুলো। পাহাড়ে বৃষ্টি হলেই তার জল বেড়ে ওঠে। দু-চার দিনের মধ্যেই আবার নেমে যায়। তার আগেই ভাসিয়ে দেওয়া হয় কেটে রাখা বড়ো-বড়ো সেগুনের গুঁড়ি। সিতাংয়ের স্রোতে সেই গুঁড়ি ভেসে যায় পেগুর দিকে।

সুরেশের কথায় হঠাৎ যেন হুঁশ ফিরল হেতিনের। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। বাতাসে সামান্য হলেও হিমেল ভাব। তাছাড়া রাতের দিকে দূরে পেগু পাহাড়ের উত্তরে ঘন-ঘন বিদ্যুতের চমক নজর এড়ায়নি। কিন্তু তারপরে খুনে হাতি ওমাংয়ের ব্যাপারটা নজরে আসতে ভুলেই গিয়েছিল। টাঙ্গুর এই পাহাড়-জঙ্গলে বাতাসের হালচাল লক্ষ করে কীভাবে পাহাড়ের উত্তরে বৃষ্টি হয়েছে কিনা টের পেতে হয়, সেসব হেতিনই শিখিয়েছে সুরেশকে। মাত্র কদিনে ভালই রপ্ত করেছে! কথা না বাড়িয়ে শুধু বলল, আমার কিন্তু চিন্তা হচ্ছে চিন-বা। কয়টা দিন একটু সাবধানে থাকবেন। উত্তরে সুরেশ বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল। মাত্র এই পনেরো বছর বয়সেই ও বেশ বুঝে ফেলেছে, পৃথিবীটা বড়ো অনেক। অনেক ভাষা, অনেক রকম মানুষ, অনেক আচার-ব্যবহার। কিন্তু ভিতরে সবাই এক। কোনো ফারাক নেই। আসলে এই মাটি থেকেই তো জন্ম সবার। ওদের নাথপুরের মাটির সেই গন্ধ, এই বর্মার জঙ্গলেও একই রকম। ভিনদেশি মানুষ এই হেতিনের ভিতর নিজের বাবাকে কতদিন খুঁজে পেয়েছে।

বাবাও ঠিক এইভাবেই একদিন বলেছিলেন। সবে তখন কলকাতায় এসেছে। বাবার চাকরি কলকাতার সার্ভেয়ার জেনারেল অফিসে। আগে একাই থাকতেন। একটু বড়ো হতে সুরেশের তাগাদায় ওকে কলকাতায় নিয়ে এসে ভরতি করে দিয়েছিলেন লন্ডন মিশনারি ইনস্টিটিউশনে। কতই বা তখন বয়স। সবে বারোয় পা দিয়েছে। সহপাঠী বেশিরভাগই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। নাথপুরের বৈষ্ণববাড়ির ছেলে হয়েও তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি। বরং অনেক ব্যাপারেই টপকে গিয়েছিল তাদের। পছন্দের জনাকয়েক বন্ধুকে নিয়ে দলও গড়ে ফেলেছিল। স্কুল পালিয়ে কতদিন বেড়িয়েছে কলকাতার রাস্তায়। সবচেয়ে বেশি টানত কলকাতার গঙ্গা। ওদের নাথপুরেও একটা নদী ছিল, ইছামতী। ক্ষীণ ধারায় বয়ে চলা সেই নদীর সঙ্গে কোনো তুলনাই চলে না কলকাতার গঙ্গার। কী বিশাল এই নদী! সাগর পারের নানা দেশ থেকে বড়ো-বড়ো জাহাজ এই নদী বেয়ে ভেসে আসে কলকাতার ঘাটে। গায়ে বড়ো বড়ো হরফে নাম লেখা এম ভি অ্যাটলাস, এম ভি ম্যানচেস্টার, আরো কত। সেদিকে চোখ পড়লে বুকের ভিতর অজান্তেই দোলা দিয়ে উঠত। বছরখানেকের মধ্যেই ঘটেছিল ব্যাপারটা। এপ্রিলের বিকেল। ওরা জনাকয়েক বন্ধু গঙ্গার ঘাটে আড্ডা জমিয়েছে। মতলবটা প্রথম মাথায় এসেছিল ডাকাবুকো জন, জন আব্রাহামের। বয়সে ওর চাইতে বছর চারেকের বড়ো। খানিক আগে এক মাঝি ঘাটে নৌকো বেঁধে কী কাজে গেছে।

জোয়ারের টানে ছোটো নৌকোটা দুলছে। সেদিকে তাকিয়ে জন হঠাৎ প্রস্তাব করল, বেকার ঘাটে বসে সময় নষ্ট না করে খানিক নৌকোয় ঘুরে এলে বেশ হয়। শুনে উৎসাহে মুহূর্তে লাফিয়ে উঠেছিল সুরেশ। একেবারে মনের কথা। কিন্তু আপত্তি করল বাকি দুজন। কারণ ছিল। এপ্রিল মাসের বিকেল। আকাশে কেমন একটা ঝিম ধরা ভাব। ঈশান কোণে ছোটো এক টুকরো কালো মেঘ উঁকি মারছে। লক্ষণ ভাল নয়। সন্দেহ নেই, ওই কারণেই মস্ত গঙ্গায় মাঝিদের নৌকো আজ প্রায় নেই বললেই চলে।

কিন্তু সুরেশের উৎসাহ তাতেই যেন বেড়ে গিয়েছিল। এর আগে বন্ধুদের সঙ্গে বার দুয়েক গঙ্গা সাঁতরে এপার ওপার করা হয়ে গেছে। আজ গঙ্গায় নৌকো বাইতে এর চাইতে ভাল দিন আর কী হতে পারে! সুতরাং ওদের বাদ দিয়েই জনের সঙ্গে ঘাটে বাঁধা সেই নৌকোয় চেপে বসেছিল।

ভয়ানক ঘটনাটা ঘটেছিল এর খানিক পরেই। নৌকো বেয়ে ওরা তখন প্রায় মাঝ নদীতে। ইতিমধ্যে কখন যে ঈশান কোণের সেই মেঘ দ্রুত বেড়ে উঠেছে, বুঝতেই পারেনি। খেয়াল হল, যখন চারপাশ অন্ধকার করে খ্যাপা ষাঁড়ের মতো আচমকাই ধেয়ে এল কালবৈশাখী ঝড়। জোয়ারে ঢেউয়ের দাপট তো ছিলই। আচমকাই তা বেড়ে প্রায় একমানুষ উঁচু হয়ে আছড়ে পড়ল ওদের নৌকোয়। উথাল-পাথাল ঢেউয়ে নৌকো মোচার খোলার মতো টালমাটাল হয়ে দুলতে লাগল।ততক্ষণে জনের জারিজুরি খতম। হাতের দাঁড় ফেলে দু’হাত তুলে তারস্বরে ‘হেল্প-হেল্প’ বলে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে। কিন্তু ঝড়ের তাণ্ডবে সেই চিৎকার কার কানেই বা পৌঁছোবে! আর পৌঁছোলেই বা কী? বর্ষার ইছামতী নদীতে সুরেশের নৌকো বাইচের অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু এমন কখনো হয়নি। ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। দমকা বাতাসের তাণ্ডব। আর কী ভীষণ টান জলের! নৌকো ঠিক রাখাই মুশকিল।

তবু জন অমন ঘাবড়ে না গেলে হয়ত শেষ রক্ষা হত। কিন্তু একা বেশিক্ষণ সামলাতে পারেনি। নৌকো উলটে গিয়েছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই। ওর চোখের সামনেই হাত-পা ছুঁড়তে-ছুঁড়তে ভেসে গিয়েছিল জন।

চোখের সামনে ডাকাবুকো জনের ওই পরিণতি দেখেও ঘাবড়ায়নি সুরেশ। সাঁতারটা সে ভালই জানে। কিন্তু ভয়ানক এই ঢেউয়ের দাপটে তা যে কাজে আসবে না, বুঝতে বাকি থাকেনি। তাই সে ওপথে যায়নি। শুধু চেষ্টা করেছিল শরীরটা ভাসিয়ে রাখতে। আর ভেসে উঠলেই যতটা সম্ভব বাতাস টেনে নিয়েছে বুক ভরে। শেষ দিকে কেমন আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল শরীর। তেমন জ্ঞানও ছিল না। ঝড় থেমে যাওয়ার পরে পানিহাটির কাছে এক ফরাসি জাহাজ দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেছিল ওকে। প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল।

বাবা বদরাগী মানুষ। ভয়ে বাড়ি ফিরতেও সাহস হয়নি। খবর পেয়ে তিনিই ছুটে এসেছিলেন। বুকে জড়িয়ে ধরে কঠিন মানুষটা কেঁদে ফেলেছিলেন সেদিন। বলেছিলেন, এ নাথপুর নয় সুরেশ। তোকে নিয়ে তাই চিন্তা হয় খুব। কিছু হলে দেশে তোর মাকে কী বলে সান্ত্বনা দিতাম?

ব্যাপারটা সহজে মেটেনি। জনের মৃত্যুর দায় বন্ধুরা চাপিয়েছিল নেটিভ সুরেশের ঘাড়েই। জনের বাবা পুলিশ দপ্তরে কাজ করে। ব্যাপারটা ঘোরাল হয়ে উঠতে বাবা ঠিক করে ফেলেছিলেন, ছেলেকে স্কুল ছাড়িয়ে নাথপুরে পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু সামলে দিয়েছিলেন স্কুলের প্রিন্সিপাল অ্যাস্টন সাহেব। সদ্য গ্রাম থেকে আসা স্কুল পালানো এই ডানপিটে ছাত্রটিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন তিনি। বলা যায়, তারই চেষ্টায় ব্যাপারটা বেশিদূর গড়াতে পারেনি। সুরেশকেও ছাড়তে হয়নি কলকাতা।

এই গঙ্গার ঘাটেই ঘটেছিল আরো একটা ব্যাপার। সেদিন বিকেলে গঙ্গার ধারে এক কেওড়া গাছের গোড়ায় ইটের চাতালে বসে দুই বন্ধু গল্প করছিল। অদূরে মস্ত এক জাহাজ এম ভি লিভারপুল। গত দিন কয়েক ধরেই জাহাজটা নোঙর করে রয়েছে ওখানে। আজই লম্বা চিমনি দিয়ে জোরালো ধোঁয়া বের হতে দেখে বুঝতে পারছিল, চুল্লিতে নতুন কয়লা দেওয়া শুরু হয়েছে। আজই ছেড়ে যাবে। চলে যাবে অন্য কোনো বন্দর, অন্য কোনো দেশে। নয়তো বিলেতে নিজের শহরে। বন্ধুর সঙ্গে গল্পের ফাঁকে বারবার ওর চোখ চলে যাচ্ছিল সেই দিকে। ভিতরটা চঞ্চল হয়ে উঠছিল। কতদিন এই ঘাটে বসে ভিনদেশের ওই জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে বুকের ভিতর অজানা অচেনা সেই দুরান্তের ডাক টের পেয়েছে। মনে হয়েছে, এখনই একটা টিকিট কেটে চেপে বসে। কিন্তু বাস্তবে ফিরে আসতেও সময় লাগেনি। ভালই জানে, তা হবার নয়। বাবা বা বাড়ির কেউ রাজি হবেন না। পাশে বসে বন্ধু বকবক করে যাচ্ছিল, কিন্তু তার অনেক কিছুই ওর কানে ঢুকছিল না। ওই সময় এক ব্যাপার ঘটল। গটমট করে এক গোরা সাহেব হঠাৎ হাজির হল সেখানে। গাছতলায় বাধানো চাতাল জুড়ে ওদের বসে থাকতে দেখে খেঁকিয়ে

উঠল, “হেই ব্লাডি নিগার, গেট আউট ফ্রম হিয়ার। ভাগো।”

সন্দেহ নেই, গোরা লোকটা ওদের হটিয়ে দিয়ে বসতে চায় এখানে। কিন্তু লোকটার কথার ধরনে সুরেশের মাথায় হঠাৎ যেন খুন চড়ে গেল। মুহুর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। এমনটা হতে পারে, অন্যপক্ষ ভাবতে পারেনি। বাধা দেবার আগেই ঝড়ের বেগে আছড়ে পড়া সুরেশের মোক্ষম ঘুসিতে তার সামনের দুটো দাঁত উড়ে গিয়েছিল।

এই ব্যাপারটাও সহজে মেটেনি। শক্তিতে না পেরে আর্থার নামে সেই গোরা এরপর কোর্টে নালিশ ঠুকেছিল। সমন বের হয়েছিল ওর নামে। মজার ব্যাপার, ওর সেই বন্ধুটিই এজলাসে আর্থারের হয়ে সাক্ষী দিয়েছিল। কিন্তু এবারও বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন সেই অ্যাস্টন সাহেব। স্যারের ঋণ ও ভুলতে পারবে না।

পাহাড়ে বৃষ্টি হলে ক্যাম্পের কাজ বাড়ে। বর্মার জঙ্গলে টিম্বার ক্যাম্পের এই নিয়ম। শত-শত বছর ধরে বেড়ে ওঠা পেগু পাহাড়ের এই ঘন জঙ্গল প্রায় দুর্ভেদ্য বলা যায়। মাইলের পর মাইল শুধু নানা জাতের বিশাল গাছ, লতাপাতা আর বাঁশঝাড়। দিনের বেলাতেও অনেক স্থানে আলোর দেখা মেলে না। শুধুই অন্ধকার। হিংস্র বন্যপ্রাণীর লীলাভূমি। সামান্য বৃষ্টি হলেই হিলহিলিয়ে জেগে ওঠে রক্তখেকো জোঁকের দল। বিপদ প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু পেগু পাহাড়ের এই অরণ্যেই রয়েছে দুনিয়ার সেরা জাতের সেগুন গাছ। বার্মা টিক। সেই সেগুন কাঠের টানেই জঙ্গলের গভীরে ‘বোম্বাই বর্মা টিম্বার কোম্পানি’র এই ক্যাম্প।

ম্যাকডোনাল্ড সাহেব বেশিরভাগ সময় রেঙ্গুনের অফিসে থাকলেও কড়া নজর এই ক্যাম্পের দিকে। পাহাড়ে বৃষ্টির কারণে সিতাং নদীর জল বেড়েছে খবর হলেই ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে আসেন পেগুতে। সেখানেও ক্যাম্প রয়েছে। পেগু পাহাড় থেকে অনেক ছোটোছোটো নদী বের হয়ে সিতাংয়ে মিশেছে। অন্য সময় সেসব নদীতে তেমন জল না থাকলেও পাহাড়ে জোরালো বৃষ্টি হলেই ফুলে ওঠে। তখন টাঙ্গুর জঙ্গলের ক্যাম্প থেকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় কেটে রাখা বড়ো-বড়ো সেগুনের গুঁড়ি । সিতাংয়ের স্রোতে সেই গুঁড়ি ভেসে যায় পেগুর কাছে মোতাং খাঁড়ির দিকে। সেখানে গুঁড়িগুলো তুলে গরুর গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে আসা হয় পেগুতে। তারপর নদীপথে চলে আসে রেঙ্গুন। শেষে জাহাজে চেপে ইরাবতী বেয়ে চলে যায় সাগরের দিকে দেশ বিদেশে। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব তাই হাঁ করে থাকেন, পেগুতে কত সেগুন গুঁড়ি জমা হল সেই খোঁজে। খুনে হাতি ওমাংয়ের ব্যাপার নিয়ে এখন তাই সময় নষ্ট করার উপায় নেই।

সুরেশের তাড়ায় হঠাৎ যেন হুঁশ ফেরে সবার। নিমেষে সচল হয়ে ওঠে ক্যাম্পের মানুষগুলো।

সুরেশের অনুমান অভ্রান্ত। উত্তরের পাহাড়ে রাতে ভালই বৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ি নদীর জল বাড়ছে। জঙ্গলে টিম্বার ক্যাম্পের মানুষ হাঁ করে থাকে এই সময়ের জন্য। যদিও তাদের কাজে কামাই নেই একটি দিনের জন্যও। জঙ্গলে কোম্পানির বর্তমান ইজারার মেয়াদ তিন বছর। সুতরাং এই সময়ের মধ্যে যত গাছ কাটা যায় ততই লাভ। তাই বিশ্রাম নেই। সকাল থেকেই কর্মীদের লেগে পড়তে হয় কাজে। পঞ্চাশ-ষাট-একশো বছরের পুরোনো বিশাল আকারের গাছগুলো কেটে নামানো সহজ নয়। দীর্ঘ করাতের দুই প্রান্তে দু’জন করে চারজন মগ করাতি গাছের গুঁড়িতে ঘ্যাস-ঘ্যাস করে করাত টানে। সেই করাত টানারও অনেক নিয়ম আছে।

বিশাল আকারের গাছগুলো একসময় মড়মড় শব্দে ভেঙে পড়ে। এরপর ডালপালা ছেঁটে বিভিন্ন আকারের গুঁড়িগুলোকে সাইজ করতে হয়। সেও অনেক মেহনত। সবশেষে কুনকি হাতি কাজে লাগিয়ে পাহাড়ি পথে টেনে আনা হয় নদীর ধারে। তারপর কবে নদীর জল বাড়বে সেই অপেক্ষায় চেয়ে থাকা। কখনো নদীর ধারে স্থানে স্থানে গাছের গুঁড়ির পাহাড় জমে যায়। নদীতে জল বাড়লে তাই ক্যাম্পের মানুষের এক মুহূর্ত বিশ্রাম নেই। বিশ্রাম নেই ক্যাম্পের গোটা ছয়েক হাতির। মাহুতের নির্দেশমতো শুঁড়ে পেঁচিয়ে একটা একটা করে গাছের গুঁড়ি তারা গড়িয়ে দেয় জলে। প্রবল স্রোতে সেগুলো ভেসে যায় সিতাং নদী হয়ে পেগুর কাছে মোতাং খাড়ির দিকে।

কাজটা সহজ নয়। কাজের মধ্যেই নদীর জলের দিকে সতর্ক নজর রাখতে হয়। ছোটো পাহাড়ি নদী। কখনো হঠাৎ ধেয়ে আসে ‘হড়পা’ জাতের জোরালো বান। হুঁশিয়ার না থাকলে বিপদ। সুরেশ শুনেছে, বছর দুই আগে এক হড়পা বানে এই ক্যাম্পের জনা কয়েক কর্মীই শুধু নয়, একটা কুনকি হাতিও ভেসে গিয়েছিল। কাউকেই বাঁচানো যায়নি।

সময় নষ্ট না করে কিছুক্ষণের মধ্যে কাজ শুরু হয় ঝড়ের গতিতে। তিন জোড়া কুনকি হাতি মাহুতের নির্দেশে বিভিন্ন আকারের গুঁড়িগুলো সাবধানে নদীতে গড়িয়ে দিতে থাকে। দলের বাকিরা সেই কাজে সাহায্য করে তাদের। এই দিনে সামান্য তদারকি ছাড়া সুরেশেরই কোনো কাজ থাকে না।

প্রহ্লাদ ভট্টাচার্য যতদিন ছিল, এই দিনটা বেশ গল্পে কাটত। মানুষটাকে ইদানীং খুব মিস করে সুরেশ। লগ ক্যাম্পে ওই ছিল দ্বিতীয় বাঙালি। ভাটপাড়ার ভট্টাচার্য বংশের ছেলে বলে চাপা অহঙ্কার ছিল। লেখাপড়া জানা বাবু বলে ক্যাম্পের অন্যরাও খাতির করে ‘মিও থুজি’ অর্থাৎ বড়ো মানুষ বলে ডাকত। স্বাভাবিক কারণেই দু’জনের মেলামেশা ছিল বেশি।

ভাটপাড়ার মানুষটি কী কারণে পৈতৃক পেশা ছেড়ে এই দূর দেশে পাড়ি দিয়েছিল, তা জানতে পারেনি সুরেশ। সেভাবে জানতেও চায়নি। আসলে তাহলে হয়ত নিজের কথাও চলে আসত। আর বুকের ভিতর জমিয়ে রাখা ফেলে আসা সেই দিনগুলোর কথা দেশ ছেড়ে আসার পরে বলেনি কাউকেই। ইচ্ছেও নেই।

একদিন এক ব্যাপার হয়েছিল। সেদিন কথাবার্তার ফাঁকে প্রহ্লাদ ভট্টাচার্য হঠাৎ ওর হাতের রেখার উপর সামান্য চোখ বুলিয়ে শেষে মুখের দিকে হাঁ করে খানিক তাকিয়ে থেকে বলেছিল, “বাপু, তুমি তো দেখছি সামান্য মানুষ নও!”

“ক-কেন?” হঠাৎ ওই কথায় হকচকিয়ে গিয়েছিল সুরেশ।

“তোমার রবির স্থানে তারা চিহ্ন রয়েছে। অনেক দূর পৌঁছবে। এ চাকরি তোমার জন্য নয়। ম্যাকডোনাল্ড সাহেবকে পথে বসিয়ে দিনকয়েকের মধ্যে পালাবে এখান থেকে।”

প্রহ্লাদ ভট্টাচার্যের ওই শেষের কথায় হেসে ফেলেছিল সুরেশ। সেদিনের কথাটা মনে পড়তে অজান্তে আজও হেসে ফেলল। প্রহ্লাদ ভট্টাচার্যের জানার কথা নয়, ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের কৃপায় টিম্বার ক্যাম্পের এই কাজ পেয়ে সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। নইলে আশ্রয়হীন রেঙ্গুনের রাস্তায় এতদিনে মৃত্যু ছিল অবধারিত।

ক্যাম্পের এই কাজে যোগ দিয়ে সম্মানও কম জোটেনি। ক্যাম্পের ছোটো সাহেব পিটার ছুটি নিয়ে সেই যে দেশে গেছে, আর ফেরেনি। ফিরবে না, তা হলফ করেই বলা যায়। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব নতুন কাউকে এখনো পাঠাতেও পারেনি। তাই অলিখিত ভাবে সব দায়িত্ব এখন তারই উপর। কাজ ছাড়ার প্রশ্নই আসে না। বরং উলটোটাই হয়েছে। সেই ঘটনার মাস কয়েকের মধ্যে খোদ প্রহ্লাদ ভট্টাচার্যই ক্যাম্প ছেড়ে গেছে। দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে সেই যে রেঙ্গুন গিয়েছিল, আর ফিরে আসেনি।

প্রহ্লাদ ভট্টাচার্য ক্যাম্প ছেড়ে যেতে সুরেশের কাজ বেড়েছে। বিভিন্ন আকারের সেগুনগুঁড়িগুলো সাইজ করে কাটার পরে তাতে নম্বর বসাতে হয়। পাশে সংক্ষেপে গুঁড়ির মাপ, তারিখ প্রভৃতিও খোদাই করা হয়। কোন গুঁড়িতে কত নম্বর বসবে তা ঠিক করার কাজ ছিল মিও আর থুজি প্রহ্লাদ ভট্টাচার্যের। সেই নম্বর জাবদা এক লগবুকের যথাস্থানে লিখে পাশে লেখা হয় তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। তারপর কোনো এক সময় আলাদা এক খাতায় তুলে রাখা হয়। মাঝে মাঝে পিওন এসে লগবুকের সেই কপি নিয়ে যায় টাঙ্গুর অফিসে। তারপর সেখান থেকে পেগুর বড়ো অফিস। সিতাংয়ের স্রোতে ভেসে আসা গুঁড়ি পেগুতে সংগ্রহ হবার পরে সেই লগ বুকের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। প্রহ্লাদ ভট্টাচার্য চলে যাবার পরে লগ বুক লেখার কাজ সুরেশের উপরই বর্তেছে। তাতে সুবিধাই হয়েছে বরং। সময়টা কেটে যায়। যখন তেমন কাজ থাকে না আপন মনে ঘুরে বেড়ায় পাহাড় জঙ্গলের ভিতর। বেশ লাগে। প্রহ্লাদ ভট্টাচার্যের সেই কথা মনে পড়লে তাই কখনো সে অজান্তেই হেসে ফেলে।

দুপুরের গুমোট ভাবটা ক্রমশ কাটতে শুরু করেছে। এই ভয়ানক সেগুন জঙ্গলের ভিতরে অনেক জায়গাতেই আকাশের দেখা মেলে না। তবু অভ্যাসবশতই সুরেশ আকাশের দিকে তাকাল। ঘন সেগুন আর বেড়ে ওঠা নানা জাতের লতাপাতার ফাঁকে বোঝা গেল না তেমন। তবু মনে হল, কাছেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাতাসে তারই অনুভূতি। আশপাশে পাতার আড়ালে দু’একটা ব্যাং ডাকতে শুরু করেছে। অদ্ভুত স্বভাব এই ব্যাঙগুলোর। পড়ে-থাকা জমাট পাতার আড়ালে কোথায় যে লুকিয়ে থাকে দেখাও যায় না। বৃষ্টি নামার সময় হলেই দু’একটা করে বেরিয়ে আসতে থাকে। কোরাস শুরু হয়। কী করে যেন ওরা টের পেয়ে যায় ব্যাপারটা। শুধু ওরাই বা কেন? সেগুন জঙ্গলের প্রতিটি প্রাণীরই যেন কিছু না কিছু অন্য জাতের ক্ষমতা রয়েছে। ইদানীং ব্যাপারটা বেশ বুঝতে পারে। আসলে অল্প দিনের ভিতর এই জঙ্গল কেমন নেশার মতো পেয়ে বসেছে। পেগুর এই জঙ্গল, গাছ, লতাপাতা, পাহাড়, নদী, আকাশ হাতে ধরে হেতিনই শিখিয়েছে ওকে। তবু কত কিছুই যে বাকি রয়ে গেছে! এখনো সুযোগ পেলেই বের হয়ে পড়ে ওর সঙ্গে।

আজ হেতিন ব্যস্ত। সুরেশেরই এই দিনে তেমন কাজ থাকে না। তবু আজকের ব্যাপারটা কিছু অন্যরকম। রোগ হাতি ওমাং গত রাতেই ক্যাম্পে হানা দিয়ে গেছে। তাই কাছেই আগুন জ্বালানো হয়েছে। সবাই কিছু সতর্ক। দায়িত্বটা সুরেশেরই বেশি। সকাল থেকে ব্যস্তও ছিল সেই কাজে। কিন্তু বেলা বাড়তে আর ভাল লাগছিল না। পায়ে পায়ে কখন যে ঢুকে পড়েছে অদূরে জঙ্গলে ভিতর, খেয়াল নেই। যখন হুঁশ হল, তখন অনেকটাই ঢুকে পড়েছে ভিতরে। মাথার উপর আকাশ ঢাকা পড়ে গেছে ডালপাতার আড়ালে। তার উপর বর্ষায় বেড়ে ওঠা লতা-পাতার জটলা। পায়ের নীচে কতকালের পুরোনো পচা পাতার স্তর। এই বর্ষায় জল পেয়ে কতক জায়গা তাই ভিজে প্যাচপেচে। উদ্দেশ্যহীন ভাবে খানিক ঘোরাঘুরির পরে একসময় ও একটা গাছের নীচে হেলান দিয়ে বসে পড়ল।

কতক্ষণ এইভাবে ছিল খেয়াল নেই সুরেশের। হঠাৎ মৃদু শব্দে চোখ তুলতে নজরে এল, অদূরে একটা গাছের ওধারে দাঁড়িয়ে বিশাল আকারের এক দাঁতাল হাতি আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ খরখরে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। অত বড়ো প্রাণীটা নিঃশব্দে কখন এত কাছে চলে এসেছে, বুঝতেই পারেনি। টাঙ্গুর এই অরণ্যের প্রাণীরা এইভাবে নিঃশব্দে চলতেই অভ্যস্ত। কিন্তু অল্প দিন হলেও এই জঙ্গলে সুরেশের অভিজ্ঞতাও কম নয়। এভাবে কতদিন ও একা জঙ্গলে বসে কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এমন কখনো হয়নি। অতি ছোটো আকারের প্রাণীও কাছে এসে পড়লে ঠিক টের পেয়ে গেছে। এমন এই প্রথম। তাও এত বড়ো আকারের একটা দাঁতালো হাতি।

টাঙ্গুর এই জঙ্গলে বুনো হাতির সামনে আগেও পড়েছে। কিন্তু তাতে কখনো বিপদের গন্ধ পায়নি। জঙ্গলের হাতি দল বেঁধে আপন মনে নিজের পথে চলে গেছে। ফিরেও তাকায়নি।

কিন্তু আজ আগন্তুক প্রাণীটির দিকে তাকিয়ে বুকটা হঠাই কেঁপে উঠল। টিম্বার ক্যাম্পের আতঙ্ক রোগ হাতি সেই ওমাং নয়তো! ক্যাম্পের বড়ো সাহেব সহ অনেকগুলো মানুষের মৃত্যুর কারণ যে প্রাণীটি। মুহূর্তে সুরেশের হাত চলে গেল কোমরে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসনের দিকে। আর সেই মুহূর্তে মৃদু আওয়াজে গর্জে উঠল প্রাণীটা। শুঁড় আর কান দুটো নড়ে উঠল।

অদূরে উপস্থিত প্রাণীটির সেই হুঁশিয়ারি বুঝতে ভুল হল না সুরেশের। হাতিটা যে দূরত্বে দাড়িয়ে, তাতে পিস্তল বের করে গুলি করার সময় মিলবে কিনা সন্দেহ। তার আগেই শুঁড়ে পেঁচিয়ে আছড়ে ফেলবে। নয়তো তীক্ষ্ণ দাঁতে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে। তাছাড়া বেশ জানে, ভয় দেখানো ছাড়া এত বড়ো আকারের একটা হাতিকে পিস্তলের গুলিতে কিছু করা সম্ভব নয়। বিপদের অস্তিত্ব হঠাৎ টের পেলে ভিতরটা হিম হয়ে আসে বটে, কিন্তু মাথা ঠিক রাখতে পারলে সামলে নেওয়া যায়।সুরেশের হঠাৎ মনে হল, হয়ত অকারণে ভয় পাচ্ছে। যেভাবে নিঃশব্দে প্রাণীটা এত কাছে এসে হাজির হয়েছে, ইচ্ছে করলেই তো এতক্ষণে শেষ করে দিতে পারত! দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত না।

সুরেশ মুহুর্তে পিস্তল থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাল সামনে প্রাণীটির দিকে। আগন্তুক একই রকম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কান দুটো অল্প দুলছে। তবে দু’চোখের দৃষ্টি এখন অনেকটাই শান্ত। কৌতূহলে পর্যবেক্ষণ করছে সামনের মানুষটিকে। পেগুর এই সেগুন জঙ্গলে অল্প দিন হলেও প্রাণীটির সেই দৃষ্টি যেন অনেকটাই পড়ে ফেলতে পারল সুরেশ। কৌতূহলে সেও একই ভাবে তাকিয়ে রইল প্রাণীটির দিকে।

এভাবে কতক্ষণ সেই গাছের তলায় বসে ছিল, খেয়াল নেই সুরেশের। প্রাণীটা কিছুক্ষণ পরেই স্থানত্যাগ করে গেছে। অযথাই ঘাবড়ে গিয়েছিল ও। সম্ভবত দলছুট রোগ বা সেগুন ক্যাম্পের আতঙ্ক সেই ওমাং নয়। হাতিটা চলে যাবার পরেও তাই সেখানেই বসেছিল। ভিতরে অন্য একটা অনুভূতি টের পাচ্ছিল সে। পেগুর এই অরণ্য, অনেক দূরে ফেলে আসা নাথপুর, কলকাতা শহর, সব যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। হয়ত ওইভাবে সারা দিনটাই কাটিয়ে দিতে পারত। হঠাৎ মানুষের সাড়া পেয়ে সংবিৎ ফিরে এল। পাশে দাড়িয়ে হেতিন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ডাকছে ওকে, “চিন-বা, এভাবে একা বসে আছেন এখানে! সেই থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি! ”

“কেন আকো?” মুহূর্তে উঠে দাঁড়াল সুরেশ, “কোনো সমস্যা হয়েছে?”

“তা কেন?” সুরেশের কথায় থতমত খেয়ে হেতিন বলল, “কাজে কোনো সমস্যা হয়নি। নদীর জল আরো বেড়েছে। জমা হওয়া লগের বেশিটাই জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আপনার দেখা নেই বলেই তো খুঁজতে বের হয়েছি। খাওয়ার সময়ও হয়ে গেছে। তাছাড়া একা এই জঙ্গলে এভাবে চলা একেবারেই ঠিক নয় চিন-বা। বিপদ...”

বলতে বলতে হেতিন হঠাৎ থেমে গেল। অদূরে সেই গাছের দিকে খানিক তাকিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল সেদিকে। নীচু হয়ে ভিজে মাটির দিকে সামান্য চোখ ফেলেই সোজা হয়ে আতঙ্কিত চোখে চারপাশে বার কয়েক ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “কী ভয়ানক ব্যাপার চিন-বা। অল্প আগে ওমাং এখানে এসেছিল। দেখতে পাননি?”

হেতিনের ওই কথায় সুরেশের তেমন ভাবান্তর হল না। শান্ত গলায় বলল, “কই, না তো! তোমার ভুল হচ্ছে বোধ হয়।”

“না চিন-বা, কিছুমাত্র ভুল হয়নি আমার। ওমাং আমাদের ক্যাম্পেরই হাতি ছিল। ওর পায়ের ছাপ দেখলেই চিনতে পারি। ভগবান বুদ্ধের দেশের মানুষ আপনি। তিনিই আজ রক্ষা করেছেন আপনাকে। নইলে কী যে হত! হায় হায়!”

সুরেশ দেখতে পেল দারুণ উদ্বেগে মানুষটির দু’চোখে তারায় নেমে এসেছে ঘন অন্ধকার। কপালের ভাঁজে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কলকাতায় বাবার মুখেও এমন কতদিন দেখেছে। ভেবেছে, আর কখনো এমন করবে না। কিন্তু বৃথাই গেছে সব। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “অযথা চিন্তা কোরো না আকো। আমি তো ঠিকই আছি। চল ফেরা যাক।”

ফেরার সময় প্রায় নিঃশব্দে পথ চলছিল হেতিন। সুরেশ তাকিয়ে দেখল, মানুষটার মুখে উদ্বেগের ছায়া তখনো কিছুমাত্র কমেনি। বিষয়টা লঘু করার জন্য বলল, “আকো, আজ মোহেঙ্গা খাওয়াবার কথা ছিল। মনে আছে তো?”

প্রচুর ঝাল আর চালের গুঁড়ো দিয়ে রান্না ঘন মাছের ঝোলকে এদেশে বলে মোহেঙ্গা। ক্যাম্পের সবার পছন্দের জিনিস। কড়া ঝালের দরুন সুরেশের গোড়ায় বেশ সমস্যা হত। এখন রপ্ত হয়ে গেছে। অন্য সময় হলে হেতিন উৎসাহে উত্তর দিত। আজ অল্প মাথা নাড়ল শুধু। তারপর বলল, “একটু হুঁশিয়ার হয়ে চলুন চিন-বা। ওমাং কাছেই রয়েছে।”

হেতিনের মাথা থেকে ব্যাপারটা নামানো যায়নি। সেটাই স্বাভাবিক। সুরেশও বলেনি সব কথা। তাতে বেচারার ভাবনা আরো বাড়বে হয়ত। পিস্তলটা বের করে হাতে তৈরি রেখে হেতিনের সঙ্গে এগিয়ে চললেও ওর মাথাতেও তখন সমানে পাক খেয়ে চলেছে ব্যাপারটা। দাঁতালটা তাহলে খুনে রোগ-হাতি ওমাং! টিম্বার ক্যাম্পের বড়ো কর্তা ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছে যে প্রাণীটা! ডগলাস সাহেবের মৃত্যুর কারণ! টাঙ্গুর টিম্বার ক্যাম্পের আতঙ্ক! অথচ আজ তেমন তো একবারও মনে হয়নি! অভিজ্ঞ হেতিন হাতিটার পায়ের ছাপ দেখে চিনতে ভুল করেছে, এমনটা মনে হয় না। দুনিয়ার কত কিছুই যে জানতে বাকি আছে এখনো। বুকের ভিতরে নড়ে ওঠা সেই সুদূরের ডাকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজে সস্তার একটা ডেক টিকিট কেটে চলে এসেছিল রেঙ্গুনে ।

শুধু তাই নয়। রেঙ্গুনে এসেও হয়ত এই পেগু পাহাড়ের জঙ্গলে আসা হত না। সেও এক অদ্ভুত ব্যাপার। নির্জন বনপথে হেতিনের সঙ্গে চলতে চলতে সেই ভয়ানক সন্ধের কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল।

মাত্রই মাস কয়েক আগের কথা। সবে রেঙ্গুন এসে পৌঁছেছে। ভেবেছিল এখানে এলেই একটা কাজ মিলবে। কিন্তু সেই ধারণা যে ভুল, বুঝতে বিলম্ব হয়নি। প্রায় অকূল পাথারে পড়ে গিয়েছিল। পকেটে সামান্য যা ছিল, জাহাজেই খরচ হয়ে গেছে। ভেবেছিল, রেঙ্গুনে প্রবাসী বাঙালি যখন রয়েছে, কিছু সাহায্য পাওয়া যাবে।

কিন্তু কিছুই হয়নি। একে তো এদিকে বাঙালির সংখ্যা তেমন বেশি নয়। যাদের দেখা পেয়েছে, তাদের কাছ থেকে ভাল-মন্দ কিছু উপদেশ ছাড়া আর কিছু জোটেনি। ব্যাপার বুঝে সুরেশও আর তাদের কাছ মাড়ায়নি।

গোড়ায় কয়েকটা দিন প্রায় জল খেয়ে কাটাতে হয়েছে। দিন কয়েক রাস্তায় কাটাবার পরে ঠাই হয়েছিল এক প্যাগোডার ধর্মশালায়। সন্ধের পরে রেঙ্গুনের পথ মোটেই নিরাপদ নয়। তাই প্যাগোডার ধর্মশালায় আশ্রয় পেয়ে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। দু’বেলা ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য ভিক্ষে ছাড়া আর সবই করতে হয়েছে।

ভাষাটাও বড়ো সমস্যা ছিল। এদিকের সাধারণ মানুষ এক বর্ণ ইংরেজি বোঝে না। তাই ওর মধ্যেই কাজ চালাবার মতো কিছু বর্মি শব্দ রপ্ত করতে হয়েছে। চলছে একটা কাজের সন্ধান। ইতিমধ্যে আর এক ব্যাপার। ধর্মশালায় একটানা বেশিদিন থাকার নিয়ম নেই। সেখান থেকে উঠে যাবার তাগাদা আসছে। তার মধ্যেই ঘটল ব্যাপারটা।

দিনটা ছিল অমাবস্যা। এই দিনে ভরা জোয়ারে ইরাবতী নদীতে মাছের পরিমাণ বাড়ে। জেলেরাও এই দিনের অপেক্ষায় থাকে। গত কয়েক দিন ধরে সুরেশ ইরাবতীর এক জেলে-নৌকোয় দাঁড় বাওয়া, জাল টানার কাজ করছিল। সেদিনও গিয়েছিল নৌকোয়। ভরা জোয়ারের কারণে অন্য মাছের সঙ্গে বড়ো আকারের ইলিশও ধরা পড়ছিল। ওই মাছের টানেই জেলের দল ফিরতে বেশ দেরি করে ফেলল। তারপর মহাজনের জিম্মায় সেই মাছ পৌঁছে দিতেও সময় লাগল অনেকটা। সুরেশের হাতে যখন মজুরির পয়সা এল, তখন অনেকক্ষণ সন্ধে পার হয়ে গেছে। তার উপর ফেরার পথে রাতের খাওয়া সারতেও কিছুটা সময় গেল। বাজারের কাছে ‘মা চেন’ নামে মাঝবয়েসি এক মহিলার ছোটো এক খাবারের ঠেক আছে। মহিলা একা হাতেই চালায়। তাই দামও কিছু কম। সুরেশ এখানেই দু’বেলার খাওয়াটা সেরে নেয়।

মালকিন মা চেন তাই ওর ভালই চেনা। সেদিন খাওয়া সেরে দাম মিটিয়ে যখন উঠতে যাবে, মা চেন হঠাৎ বলল, “চিন-বা, আজ বড্ড দেরি করে ফেলেছ! অন্ধকারে একা এতটা পথ যাবে, এক কাজ করো।”

মহিলার কথায় সুরেশ তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতে তিনি দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে মোটা একটা চ্যালা কাঠ এনে সুরেশের হাতে গুঁজে দিল। মুগুরের মতো মোটা হাত দুয়েক লম্বা যথেষ্ট ভারী সেগুন ডালের সেই চ্যালা কাঠ পরের দিন আবার ফেরত আনতে হবে চিন্তা করে সুরেশ ইতস্তত করে বলেছিল, “থাক না মা। ঠিক চলে যেতে পারব। মিছেই ভাবছ তুমি।” মা চেন সুরেশের কথায় কান না দিয়ে বলেছিল, “চিন-বা, তা হোক। তবু সঙ্গে রাখো। ওটা তোমাকে আর ফেরত আনতে হবে না।”

মা চেন কি অন্তর্যামী! নাকি সব দেশের মায়েরাই এক? মা চেনের ওই চ্যালা কাঠ সেদিন প্রাণ বাঁচিয়েছিল ওর। সাংঘাতিক সেই সন্ধের কথা ইতিমধ্যে অনেকটা ধুসর হয়ে এলেও মুছে যাবার নয়।

মোটা চ্যালা কাঠের টুকরোটা হাতে নিয়ে সেই রাতে দ্রুতই পথ চলছিল ও। সন্ধের পরে রেঙ্গুন শহরের অন্ধকার পথঘাট তখন লুটেরা দুর্বৃত্তদের হাতে চলে যায়। স্বভাবে এই দুর্বৃত্তের দল কতকটা গ্রাম বাংলার ঠ্যাঙাড়ের মতো। খুন করতে কিছুমাত্র হাত কাঁপে না। নেহাত দায়ে না পড়লে কেউ এই সময় পথে বের হয় না। আর বের হলেও দল বেঁধে সশস্ত্র অবস্থায়।

সুরেশের সে অবস্থা নেই। তার উপর অমাবস্যার অন্ধকার। আশার কথা একটাই, আকাশ মেঘমুক্ত হবার কারণে অন্ধকার একেবারে নিশ্ছিদ্র নয়। তাই চারপাশে যথাসম্ভব সতর্ক দৃষ্টি রেখে পথ চলছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। জনমানবহীন পথে হঠাৎ পিছনে হালকা পদশব্দে মুহূর্তে ঘাড় ফেরাতেই একটা ধারালো দা চকিতে ওর মাথা ঘেঁষে বেরিয়ে গেল।

সুরেশ দেখতে পেল, খানিক দূরে অন্ধকারে দাড়িয়ে দুজন শক্ত-সমর্থ চেহারার মগ। রেঙ্গুনে এই মগ জাতির মানুষ সাধারণ বর্মিদের মতো নয়। অত্যন্ত উদ্ধত প্রকৃতির। সন্ধের পরে রেঙ্গুনের পথে দুর্বৃত্তদের বেশিরভাগই এই মগ জাতির মানুষ। সন্দেহ নেই, পথের পাশে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল। তাই নজরে পড়েনি। সুযোগ আসতেই পিছন থেকে দা ছুঁড়ে মেরেছে। লক্ষ্যভ্রষ্ট না হলে এতক্ষণ ওর দেহ দু’টুকরো হয়ে যেত।

সুরেশ দেখল অন্য দুষ্কৃতির হাতেও একই রকম ধারালো দা। ভেবেছিল, সেও হয়ত হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে মারবে। সেইভাবে প্রস্তুত হচ্ছিল। কিন্তু লোকটা অন্ধকারে আর দা ছুঁড়ে মারার ঝুঁকি নিল না। অস্ত্র হাতে রে-রে করে ছুটে এল।

কিন্তু প্রতিপক্ষটিকে চিনতে কিছু ভুল হয়েছিল তার। তাই আরাধ্য কাজ শেষ করার সময় পেল না। ততক্ষণে মা চেন-এর দেওয়া সেই মুগুরের মতো চ্যালা কাঠ হাতে সুরেশও প্রস্তুত। লোকটা কাছে আসতেই সেটা সপাটে চালিয়ে দিল তার মাথা লক্ষ্য করে।

বিপদ আঁচ করে লোকটা শেষ মুহূর্তে মাথা সরিয়ে নিতে পারলেও নিষ্কৃতি পেল না। সুরেশের হাতের চ্যালা কাঠ লক্ষ্যচ্যুত হয়ে আছড়ে পড়ল তার ঘাড়ের উপর। দারুণ আঘাতে লোকটার নিঃসাড় দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার সঙ্গীও ছুটে আসছিল পিছনে। দেখতে পেয়ে সুরেশ হাতের চ্যালা কাঠ ফের উঁচিয়ে ধরতে যাবে, অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় লোকটা প্রতিপক্ষের চ্যালা কাঠ দু’হাতে ধরে হ্যাঁচকা টান মারল। সুরেশ এজন্য প্রস্তুত না থাকায় সামলাতে পারল না।

বিপদে সুরেশের মাথা বরাবরই চমৎকার কাজ করে। সেবার গ্রামের কাছে কশাড় জঙ্গলে এই জন্যই আচমকা বুনো শূকরের সামনে পড়েও তাকে কবজা করতে পেরেছিল। আজও ব্যতিক্রম হল না। হাতিয়ার হস্তচ্যুত হতে যাচ্ছে বুঝেই সেটা ছেড়ে মুহুর্তে লোকটার তলপেটে মোক্ষম এক লাথি কষিয়ে দিল। আচমকা আঘাতে মাটিতে পড়ে গেল লোকটা। হাতের চ্যালাকাঠও ছিটকে গেল।

ছোটোখাটো চেহারা হলেও লোকটা যে যথেষ্ট শক্তিশালী, ইতিমধ্যে বুঝে ফেলেছে সুরেশ। লাথির আঘাতে পড়ে গেলেও সামলে উঠতে সময় লাগবে না। ফের কাঠের টুকরোটার দখল নিতে পারলে সুবিধা হত। কিন্তু সেটা যেভাবে ছিটকে পড়েছে, অন্ধকারে খুঁজতে সময় দরকার। অগত্যা সুরেশ খালি হাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। প্রতিপক্ষ ইতিমধ্যে অনেকটাই সামলে নিতে পেরেছে। সুরেশ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই সে দু’হাতে তাকে জাপটে ধরল।

সুরেশের অন্য মতলব ছিল। ভেবেছিল লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুষ্ট্যাঘাতে পেড়ে ফেলবে। কিন্তু লোকটা আচমকা ওইভাবে জড়িয়ে ধরায় তা সম্ভব হল না। অগত্যা সেও জড়িয়ে ধরল তাকে। দেখতে দেখতে দু’জনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল মরণপণ মল্লযুদ্ধ। প্রতিপক্ষ এ ব্যাপারে যথেষ্টই অভিজ্ঞ। পেটে আঘাত সত্ত্বেও একটু পরেই সুরেশকে মাটিতে ফেলে তার উপর চেপে বসল।

অ্যাস্টন সাহেবের স্কুলে সপ্তাহে এক দিন করে একজন বক্সিং শেখাতে আসতেন। অন্য এক দিন আসতেন একজন রেসলার। ছেলেদের তিনি রেসলিং বা কুস্তির তালিম দিতেন। তবে বক্সিংয়ের ক্লাসটাই পছন্দের ছিল সুরেশের। সারা সপ্তাহ হাঁ করে থাকত এই দিনটির জন। ফাঁকি দেয়নি। অল্পদিনের মধ্যেই শিখে নিতে পেরেছিল বক্সিংয়ের কিছু কৌশল। কী করে পাঞ্চে জোর আনতে হয়। হুক বা মামুলি এক জ্যাবে কী করে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ঘায়েল করে ফেলা যায়, বেশ রপ্ত করে ফেলেছিল। আর এই কারণেই সেদিন কলকাতার গঙ্গার ঘাটে সেই গোরা সাহেবের সামনের দুটো দাঁত মাত্র এক ঘুসিতে উড়িয়ে দিতে পেরেছিল।

আজ রাতের অন্ধকারে মগ দুর্বৃত্তর সঙ্গে লড়তে গিয়ে অনুভব করল, রেসলিংয়ের ক্লাসটা ফাঁকি না দিলে আজ কাজে লাগত।

কিন্তু প্রাণ বাঁচাতে কিছুতেই হারা চলবে না। একটু আগে যে কায়দায় প্রতিদ্বন্দ্বী ওকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল, ঠিক সেইভাবে সুরেশ প্রাণপণ শক্তিতে লোকটাকে ফের দুই হাতে জাপটে ধরল। পরের কয়েক মিনিট এইভাবে লড়াই চলল দু’জনের। কখনো সুরেশ দুষ্কৃতিকে নীচে ফেলে দিচ্ছে তো পরের মুহুর্তেই অন্য পক্ষ তাকে চিৎ করে ফেলছে।

লোকটার দৈহিক শক্তি অনেক বেশি। জয় পাওয়া কঠিন। গোড়ায় সুরেশ একটু দমে গেলেও একসময় বুঝতে পারল, একটু আগে তলপেটের লাথির আঘাত লোকটা এখনো সামলে উঠতে পারেনি। লড়াই করার সময় ব্যথায় মাঝে-মধ্যেই কঁকিয়ে উঠছে। ব্যাপারটা অনুধাবন করতেই হারানো মনোবলটা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এল সুরেশের। খুনেটা তাড়াতাড়ি লড়াই শেষ করতে চাইছে। কোনোমতেই সেটা ঘটতে দেওয়া চলবে না।

লড়াইটা হয়ত এভাবে আরো কিছুক্ষণ চলত। কিন্তু হঠাৎই একটা ব্যাপার ঘটল। দু’জনের লড়াইয়ের মাঝে অন্ধকারে খুব কাছেই হঠাৎ মানুষের আওয়াজ। কেউ চিৎকার করে বলল, “Who are there? Stop it.”

আচমকা সেই চিৎকারে পরিস্থিতি মুহূর্তে পালটে গেল। পথ চলতি কোনো ইংরেজ ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছে বুঝে সুরেশ উত্তর দিতে যাবে, প্রতিদ্বন্দ্বী সেই সুযোগে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অন্ধকারে ছুটে পালাল। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল সুরেশ। তাকিয়ে দেখল খানিক দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে একজন ইউরোপিয়ান। হাতের পিস্তল উঁচিয়ে লক্ষ রাখছে ওর উপর।

পরিশ্রান্ত সুরেশ তখনও সেভাবে দম ছাড়ার অবকাশ পায়নি। তবু পরিস্থিতি বুঝে হাত তুলে হাঁফাতে হাঁফাতে সংক্ষেপে খুলে বলল ব্যাপারটা।

সুরেশের কথা শেষ হতেই আগন্তুক দ্রুত এগিয়ে এল ওর দিকে। অন্ধকারে যথাসম্ভব ওকে পর্যবেক্ষণ করে বলল, “বয়, চিনতে পারছ আমাকে?”

ততক্ষণে সুরেশও চিনতে পেরেছে তাকে। কিন্তু কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। এই এত দূরে মানুষটির সঙ্গে এভাবে দেখা হবে, ভাবাও যায় না। যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলল, “বোধ হয়।”

“ইয়েস বয়। আমিই সেই আর্থার,” আগন্তুক ফোকলা দাঁতে সামান্য হাসল।

মানুষটি গঙ্গার ঘাটের সেই আর্থার।বছরখানেক আগে এক বিকেলে ঘুসি মেরে এই মানুষটিরই সামনের দুটো দাঁত উড়িয়ে দিয়েছিল।

অন্ধকারে অর্থার যেমন ওকে চিনতে পেরেছে, তেমন ওরও ভুল হয়নি। তবু গোড়ায় যেন বিশ্বাস হতে চাইছিল না। যে মানুষটির সঙ্গে বিবাদ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল, আজ তার জন্যই ভয়ানক এক বিপদ থেকে রেহাই মিলল। সুরেশ কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে বলল, “সরি স্যার, সেদিন উত্তেজনার বসে ঘটে গিয়েছিল ব্যাপারটা। আবার মাফ চাইছি। কিন্তু এখানে কবে এলেন?”

“আরে ছাড়ো ওসব”, সুরেশের কথা উড়িয়ে দিল আর্থার, “আমি ইংরেজ। আমার কাছে কলকাতাও যা রেঙ্গুনও তাই। কাজ নিয়ে মাস কয়েক হল এসেছি। কিন্তু তুমি?”

“স্যার, কোথাও থিতু হওয়া বোধ হয় আমার ধাতে নেই।” সুরেশ ম্লান হাসল, “বাবা-মাকে তো আগেই ছেড়ে এসেছি। অ্যাস্টন সাহেবের কাছেও বেশি দিন মন টেকেনি। রেঙ্গুনেএসেছিলাম একটা কাজের খোঁজে।

“পেয়েছ?”

উত্তরে মাথা নাড়ল সুরেশ।

হাতে ধরা পিস্তলটা কোমরে খুঁজে আর্থার এক মুহূর্ত কী চিন্তা করল। তারপর বলল, “বয়, বেশ বুঝতে পারছি, আর পাঁচজন ইন্ডিয়ানের মতো নও তুমি। মামলা করতে এজলাসে এসে যেদিন জানতে পারলাম, তোমার বয়স মাত্রই চৌদ্দ বছর সেদিন নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যাই হোক, একটা কাজের সন্ধান এই মুহূর্তে দিতে পারি। মনে হয় কাজটাতোমার উপযুক্ত হবে। করবে?”

বলা বাহুল্য, সুরেশের তখন যা অবস্থা, তাতে যেমন তেমন একটা কাজ পেলেও বেঁচে যায়। কিছু না ভেবেই মাথা হেলিয়ে বলল, “করব স্যার।”

পৃথিবীতে কত অদ্ভুত ব্যাপারই না ঘটে যায়! যে রাতে সুরেশ প্রায় মৃত্যুর দোর গোড়ায় গিয়ে পৌঁছেছিল, সেই রাতেই পেগু টিম্বার ক্যাম্পের চাকরিটা জুটে গেল।

অদ্ভুত এই ইংরেজ জাত। কোনো কাজই কালকের জন্য ফেলে রাখা ওদের ধাতে নেই। আর্থার সেই রাতেই ওকে এনে হাজির করেছিল ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের বাংলোয়। ঘরে ফিরে সাহেব তখন সবে পানীয় নিয়ে বসেছেন। সব শুনে মুহূর্তে পানীয়র সরঞ্জাম সরিয়ে রেখে ওকে নিয়ে পড়েছিলেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সাহেব সেদিন বাজিয়ে দেখেছিলেন ওকে। সামান্য ইতস্তত করছিলেন ওর বয়স নিয়ে। চাকরিপ্রার্থীর বয়স মাত্রই যে পনেরো বছর!

আর্থার আশ্বাস দিয়ে বলেছিল, “বয়স পনেরো হলেও ছেলেটা কাজে পঁচিশকেও হার মানিয়ে দেবে, এটুকু বলতে পারি স্যার। ভরসা রাখতে পারেন।”

ম্যাকডোনাল্ড সাহেব এরপর আর আপত্তি করেননি। সুরেশ পরে ভেবে দেখেছে, আসলে সাহেবের তখন শিরে সংক্রান্তি। রোগ হাতি ওমাংয়ের তাণ্ডবে চার নম্বর টিম্বার ক্যাম্প প্রায় বন্ধ হবার অবস্থা। তাই ঝুঁকি নিতেই হয়েছিল তাকে।

দিন কয়েক কেটে গেছে তারপর। সুরেশ যথা সময়ে ক্যাম্পের লগ বুকের হিসেব পাঠিয়ে দিয়েছে টাঙ্গুর অফিসে। সেখান থেকে রিপোর্ট চলে যাবে পেগুর অফিসে। প্রতিটি সেগুন গুঁড়ির বিস্তারিত হিসেব লেখা রয়েছে। তাতে। সিতাং নদীতে ঠিকমতো স্রোত থাকলে আর কয়েকদিনের মধ্যে সেগুলো পেগুর কাছে পৌছে যাবে। সেখানে গুঁড়িগুলো তুলে নেওয়া হবে জল থেকে। তারপর বড়ো বড়ো নৌকোয় চাপিয়ে সমুদ্রের খাড়ি-পথে নিয়ে আসা হবে রেঙ্গুন বন্দরে।

তবে সে তো রেঙ্গুনে কোম্পানির যারা রয়েছে, তাদের কাজ। সুরেশের নয়। এমনকী জঙ্গলের এই ক্যাম্পের বিরাট কিছু দায়িত্ব ওকে দেওয়া হয়েছে, তাও নয়। ডগলাস সাহেব মারা যাবার পরে সেই দায়িত্ব কাউকেই আর দেওয়া হয়নি। ছোটো সাহেব হ্যারি ক্যাম্প ছেড়ে যাবার পরে সেই জায়গায় পাঠানো হয়েছিল পিটারকে।

সেই অর্থে সুরেশ ক্যাম্পের ছোটো বা বড়ো কোনো সাহেবই নয়। টিম্বার ক্যাম্পের এই পদগুলো সাদা চামড়ার লোকেদের জন্যই বরাদ্দ। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব নিশ্চয় পিটার বা ডগলাস সাহেবের জায়গায় নতুন কাউকে খুঁজছেন।

ব্যাপারটা নিয়ে হেতিন মাঝে-মধ্যেই অনুযোগ করে ওর কাছে। বলে, “চিন-বা, বড়ো কর্তার কাছে এবার একটা রাইফেল চেয়ে পাঠান।”

হেতিনের চিন্তা অকারণে নয়। এই দুঃসময়ে ক্যাম্পে তেমন কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই। যাবার সময় পিটার ক্যাম্পের ওয়েস্টলে রিচার্ড রাইফেলটা সঙ্গে নিয়ে গেছে। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব সেটা আর পাঠায়নি ক্যাম্পে। বর্তমানে সুরেশের ভরসা ওই স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন। ওই অস্ত্র দিয়ে ওমাংয়ের মোকাবিলা করা যায় না।

সুরেশ কিন্তু এখনো ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের কাছে তেমন কোনো আর্জি পাঠায়নি। হেতিন অনুযোগ করলেই ভরসা দিয়ে বলে, “একটা রাইফেল পেলেই কি নিশ্চিন্ত হতে পারবে? ডগলাস সাহেবের কাছেও তো রাইফেল ছিল। তবু তো সেই সময় ক্যাম্পের তিনজন কুলি ওমাংয়ের আক্রমণে মরেছে। পাঁচজন বাঘের পেটে গেছে। সাহেব নিজেও বাঁচতে পারেনি। মনে করে দেখ, গত কয়েক মাসে তেমন কিছুই কিন্তু হয়নি।”

“সে ভগবান বুদ্ধের কৃপা চিন-বা”, ভক্তিভরে দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে হেতিন ব্যক্ত করে, “ভগবান বুদ্ধের দেশের মানুষ আপনি। সেদিন তিনিই রক্ষা করেছেন। প্রার্থনা করুন, যেন আমাদেরও রক্ষা করেন তিনি।”

সুরেশ আশ্বাস দিয়ে বলে, “আকো, ভগবান বুদ্ধ ক্যাম্পের সবাইকেই রক্ষা করবেন। আর একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ? আকাশে মেঘের আনাগোনা বাড়ছে। মনে হয় কয়েকদিনের মধ্যে পাহাড়ে বৃষ্টি নামবে। তার আগে আরো লগ রেডিকরা চাই।”

সুরেশের তৎপরতায় তাই ক্যাম্পে বিশ্রাম নেই। নদীর ঘাটে জমা করা লগ খালাসের পরে ফের নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে কাজ। প্রতিদিন কাটা হচ্ছে নতুন নতুন গাছ। লগ তৈরি হবার পরে হাতি দিয়ে সেগুলো টেনে আনা হচ্ছে। নতুন গাছের গুঁড়ি জমা হচ্ছে নদীর ঘাটে।

কিন্তু পেগু পাহাড়ের এই ঘন অরণ্যের ভিতর টিম্বার ক্যাম্প চাইলেই কি আর নিরাপদে চলে? সেদিন দিনভর কাজের পরে ক্যাম্পের সবাই যে যার তাঁবুতে শুয়ে পড়েছে। কিন্তু সুরেশের চোখে ঘুম নেই। ইদানীং সুরেশের নির্দেশে প্রতি রাতে ক্যাম্পের মাঝে কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়। তাতে কিছুটা হলেও চারপাশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তাঁবুর পর্দা তুলে রাতের অনেকটা সময় সুরেশ সেই দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেয়। পেগুর এই জঙ্গলে ওর অভিজ্ঞতা মাত্রই কয়েক মাসের। তাই শুধু অভিজ্ঞতা দিয়ে সব হয়নি। অনেক কিছুই বুঝে নিতে হয়েছে।

দিনকয়েক আগে মগ কুলিরা ফাঁদ পেতে ফের একটা বড়ো শূকর ধরেছে। আটকে রাখা হয়েছে ক্যাম্পের খোঁয়াড়ে। সেই দিনের ঘটনার পরে সুরেশের কাছে ব্যাপারটা নিরাপদ মনে হয়নি। শিকারের গন্ধে বাঘটা ফের হানা দিতে পারে ক্যাম্পে। ও সেই দিনই হেতিনকে বলেছিল, শূকরটা খোঁয়াড়ে না রেখে তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করে ফেলতে। উত্তরে হেতিন বলেছিল, “তা হবার নয় চিন-বা। সামনে মগ কুলিদের একটা পরব আছে। সেই দিনই ওটার ব্যবস্থা হবে। তার আগে নয়।”

শুনে সুরেশের কপালে গোটা কয়েক ভাঁজ পড়েছিল। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে হেতিন কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় বলেছিল, “কেন চিন-বা? কিছু সমস্যা হয়েছে?”

হেতিনের উদ্বেগ বাড়বে বলে সেই রাতের বাঘের ব্যাপারটা সুরেশ আর বলেনি কাউকে। সেদিনও হেতিনের কথায় সামান্য মাথা নেড়ে এড়িয়ে গিয়েছে।

সাধারণ বর্মিদের থেকে এই মগেরা স্বভাবে অনেকটাই আলাদা। ভীষণ সাহসী আর পরিশ্রমী হলেও ভয়ানক একরোখা। টিম্বার ক্যাম্পের কুলিদের বেশির ভাগই এই মগ জাতির মানুষ। সারাদিন হইহই করে কাজ করে। কিন্তু বিগড়ে গেলেই মুশকিল। কাজ পাবার জন্য তাই কিছুটা তোয়াজ করে চলতে হয়। বেশ জানে, হেতিনের সাধ্য নয়, ওদের রাজি করানো। তাই ইদানীং রাতের অনেকটা সময় জেগেই কাটায়।

টাঙ্গুর এই সেগুন অরণ্যের গভীরে নিশুতি রাতের সেই রূপের প্রকৃতি আর এক রকম। অদূরে পাহাড়ী নদীর অবিশ্রান্ত কলকল। ঝিঁঝিঁর কোরাস। তারই ভিতর কখনো রাত-জাগা পাখির কর্কশ রব। বনভূমি হঠাৎ যেন কেঁপে ওঠে তখন।

রাতের এই রূপ পালটে যায় সামান্য বৃষ্টি হলেই। শুরু হয়ে যায় ব্যাঙের কোরাস। একা তাঁবুর ভিতর বসে তখন কত কথাই মনে পড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে মায়ের মুখটা। গ্রামের বন্ধুদের কথা। সেই হইহই করে বেড়ে ওঠা জীবন। পাখির ছানা পাড়তে গাছে উঠে একবার কী ভয়ানক কাণ্ডই না হয়েছিল! শ্মশানের কাছে মস্ত এক শিরীষ গাছের কোটরে টিয়া বাসা করেছিল। বন্ধুরা খবর আনতেই একদিন গাছে উঠেছিল ছানা পাড়তে।

কাছের এক ডালে উঠে সবে টিয়ার বাসার কাছে এগিয়েছে, হঠাৎ খেয়াল হল পাখির ছানার দাবিদার শুধু সে নয়, আর একজনও হাজির হয়ে গেছে কোটরের কাছে। ডালে পেঁচিয়ে রয়েছে মস্ত এক গোখরো সাপ! হয়ত ইতিমধ্যে ঢুকেই পড়ত কোটরের ভিতর। কিন্তু কাছেই মানুষের সাড়া পেয়ে ফণা তুলে স্থির হয়ে রয়েছে।

নীচে বন্ধুরাও ততক্ষণে দেখে ফেলেছে সাপটাকে। চিৎকার করে নেমে আসতে বলছে। হয়ত নেমেই আসত। কিন্তু টিয়ার ছানা সাপটার পেটে যাবে ভাবতেই মাথায় হঠাৎ খুন চড়ে গেল। ওদের নাথপুরের গোয়াল থেকে এক সাপুড়েকে একবার সাপ ধরতে দেখেছিল। ফণা তুলে ক্রমাগত ফোঁস- ফোঁস করে গজরাচ্ছিল সাপটা। ছোবল মারার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ভয় না পেয়ে সাপুড়ে তার বা হাতটা সাপটার সামনে অল্প নাড়ছিল। সাপটার লক্ষ্য ছিল সেই হাতের দিকে। তারই মধ্যে সাপুড়ে খুব ধীরে তার ডান হাতটা উঁচুতে তুলে সাপের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সাপটার সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ ছিল না। অনেকটা কাছে হাত নিয়ে সাপুড়ে এরপর প্রায় ছোঁ দিয়ে ফণা সমেত সাপটার গলা চেপে ধরেছিল। কিছুই আর তখন করার ছিল না সাপটার। ডালের এই সাপটা এখনো তেমন বিপজ্জনক হয়ে ওঠেনি। মাথা ঠান্ডা রেখে খুব ধীরে হাতটা একটু একটু করে এগিয়ে সুরেশ সেই একই কায়দায় ছোঁ মেরে ধরে ফেলেছিল সাপটার মাথা। তারপরেই শিরশির করে উঠেছিল সারা শরীর। মুঠোর ভিতর প্রাণীটার দেহ কী ভীষণ ঠান্ডা! গা ঘুলিয়ে উঠলেও বাস্তববোধ হারায়নি। সাপটা ততক্ষণে ওর হাত পেঁচিয়ে ধরেছে। দেরি না। করে সুরেশ পকেট থেকে ছুরি বের করে নিমেষে সাপটার মাথা দু’টুকরো করে ফেলেছিল।

সেদিনের অভিজ্ঞতা দ্বিতীয়বার ঝালিয়ে নিয়েছিল টাঙ্গুর অরণ্যের এই লগ ক্যাম্পে। ওর এই তাঁবুর ভিতরেই। সবে তখন লগ ক্যাম্পে এসেছে। এক বিকেলে কাজ থেকে ফিরে তাঁবুতে ঢুকে দেখে বড়ো আকারের এক বিষাক্ত ভাইপার দিব্যি ওর বিছানার উপর কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে। দিবানিদ্রায় মগ্ন সাপটাকে করায়ত্ত করতে সেদিন অবশ্য বেগ পেতে হয়নি। তারপর অন্যদের নজর এড়িয়ে সন্তর্পণে দূরে ছুঁড়ে দিয়েছিল। মগ কুলিদের নজরে পড়লে বেচারার রেহাই ছিল না সেদিন। আগুনে আধপোড়া করে খেয়ে ফেলত।

এভাবে কখন যে ভোর হয়ে যায়, হুঁশ থাকে না সুরেশের। কোনো রাতে ঘুমে জড়িয়ে আসে চোখ, উঠে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে তখন। সেই রাতেও ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কুলিদের চিৎকার, হইচই-এর শব্দে ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখল, বাইরে শেষ রাতের হালকা আলো ফুটতে শুরু করেছে। তাঁবুর ভিতর হেতিন উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও চোখ মেলতেই ভয়ার্ত গলায় বলল, “চিন-বা, রাতে তাঁবুর পর্দা খোলা রেখে এভাবে শুয়ে আছেন! নরখাদক সেই বাঘটা অনেক দিন পরে হানা দিয়েছিল ক্যাম্পে! ”

ধড়মড়িয়ে উঠে বসে সুরেশ বলল, “আকো, কারও কিছু হয়নি তো?”

“হয়েছে চিন-বা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হতে পারত আপনার। ভগবান বুদ্ধ আজও রক্ষা করেছেন আপনাকে!” বলতে বলতে হেতিন দু’হাত কপালে ছোঁয়াল।

উদ্বিগ্ন সুরেশ উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে ততক্ষণে তাঁবু থেকে বেরিয়ে পড়েছে। ক্যাম্পের মাঝে আহত এক মগ কুলিকে ঘিরে সবাই পরিচর্যায় ব্যস্ত। বাঘের থাবার আঘাতে বুকের কাছে বড়ো একটা ক্ষত।

দু’চার কথায় যা জানতে পারল, তাতে ওর বুক থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হয়ে এল। হেতিন যাই বলুক, ওর বুঝতে এতটুকু ভুল হয়নি, শেষ রাতে বাঘটা ক্যাম্পে হানা দিয়েছিল খোঁয়াড়ের শূকরটার জন্যই। খাঁচা ভেঙে বের করে যখন সরে পড়তে যাবে, শব্দ শুনে কুলিদের কয়েকজন জেগে উঠেছিল। হইহই করে ছুটে গিয়েছিল সবাই। তাড়া খেয়ে বাঘটা এরপর শিকার ফেলে পালালেও যাবার আগে একজনকে আহত করে গেছে। ভাগ্য ভাল, লোকটার আঘাত গুরুতর হলেও ঠিকমতো চিকিৎসা পেলে ভাল হয়ে যাবে।

এমন ঘটনা লগ ক্যাম্পে অনেক দিন ঘটেনি। সবার মুখে সকাল থেকেই তাই নিয়ে আলোচনা। আজ ক্যাম্পে কাজ হবার সম্ভাবনা কম। সুরেশ হেতিনকে বলল, “আকো, আহত মানুষটাকে জঙ্গলের ক্যাম্পে না রেখে টাঙ্গুর অফিসে পাঠিয়ে দিতে চাইছি। ওখানে চিকিৎসা অনেক ভাল হবে।”

সুরেশের কথায় হেতিন ভয়ানক অবাক হয়ে বলল, “এ তো ভাল কথা চিন-বা! কিন্তু তা কি সম্ভব হবে? এসব ব্যাপারে চিকিৎসা যা হবার, এযাবৎ ক্যাম্পেই হয়ে আসছে। কেউ ভাল হয়ে ওঠে। কেউ হয় না। কোম্পানির কর্তারা গোসা হবেন না তো?”

হেতিনের আশঙ্কা স্বাভাবিক। পাঠাতে হবে হাতির পিঠে। সকালে পাঠালে সেই হাতির ফিরে আসতে রাত হয়ে যাবে। পরের দিন বিশ্রাম দিতে হবে। কাজের ক্ষতি। তার উপর বাড়তি দায়িত্ব ঘাড়ে পড়লে টাঙ্গুর অফিসের কর্তা রিচার্ডসন সাহেব কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হবেন অবশ্যই। ব্যাপারটা সুরেশেরও অজানা নয়। ও সামান্য হেসে বলল, “তা হোক আকো। তবু যা বলছি, সেই ব্যবস্থাই করো।”

সেদিন সুরেশের ওই কাজে ক্যাম্পের কুলি-কর্মচারীরা যে খুব খুশি হয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। তার ফলও মিলেছিল। ক্যাম্পের কাজের গতি বেড়ে গিয়েছিল কয়েক গুণ। হেতিন নিজেও পরে স্বীকার করেছিল ব্যাপারটা। ইতিমধ্যে টাঙ্গুর অফিস থেকেও খবর এসেছে, চিকিৎসায় আহত লোকটা অনেকটা সেরে উঠছে। সেই খবরে খুশি হয়ে হেতিন বলেছিল, “কাজটা বড়ো ভাল করেছেন চিন-বা। ক্যাম্পের পক্ষেও খুব ভাল হয়েছে। এত উৎসাহে মগ কুলিদের এই ক্যাম্পে কোনো দিন কাজ করতে দেখিনি। অথচ সেই ঘটনার দিন ওরা একরকম ঠিক করেই ফেলেছিল, কাজে না বেরিয়ে আধমরা শুকরটা মেরে ভোজের আসর বসাবে।”

সেদিন হেতিন না বললেও সুরেশ নিজেও কিছুটা অনুমান করতে পেরেছিল। আধমরা শূকরটা পরবের দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই ভোজের আসর হয়ত আজই বসবে। অর্থাৎ কাজের দফারফা। কিন্তু পরে দেখেছিল, শূকর মেরে ভোজের ব্যবস্থা হলেও কাজে ফাঁকি দেয়নি কেউ।

হাতির কাজ সব দিন থাকে না। মগ করাতিরা দলে দলে ভাগ হয়ে দিনভর ঘ্যাস-ঘ্যাস শব্দে গাছ কেটে নামায়। ডালপালা সাফ করে গুঁড়িগুলো সাইজ করে। এর পরের কাজ হেতিন আর তার দলবলের। বিশাল আকারের গুঁড়িগুলো ক্যাম্পের হাতিদের দিয়ে বয়ে আনা হয় যথাস্থানে। এজন্য হাতির দৈহিক শক্তিই যথেষ্ট নয়, প্রতি মুহুর্তে দরকার মাহুতের নির্দেশ। সেই নির্দেশ অনুসারে হাতি কখনো শুঁড় আর গজদাঁতের সাহায্যে, কখনো বা ঠেলে গুঁড়িগুলো গড়িয়ে বা টেনে নিয়ে যায়।

সেদিন হেতিনের তেমন কাজ নেই। সুরেশ বলল, “আকো, এবার ক্যাম্প বোধ হয় সরাবার সময় হয়েছে। তাই না?”

উত্তরে হেতিন খানিকটা অবাক হয়ে সুরেশের দিকে তাকাল। বিষয়টা ওর মাথাতেও কদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু ক্যাম্পের এই ডামাডোলের কারণে আর বলা হয়ে ওঠেনি।

জঙ্গলের টিম্বার ক্যাম্প এক জায়গায় বেশি দিন থাকে না। কাটার উপযুক্ত গাছ কমে এলেই ক্যাম্প চলে যায় অন্য কোথাও। টাঙ্গুর অরণ্যে বোম্বাই বর্মা টিম্বার কোম্পানির এই চার নম্বর ক্যাম্প গত কয়েক মাস ধরে রয়েছে একই জায়গায়। সুরেশ আসার আগে থেকেই। পুরোনো সাহেবরা থাকলে এতদিন জায়গা বদল হয়ে যেত। তাই সুরেশের মুখে প্রস্তাবটা শুনে হেতিন কিছু অবাক হয়ে বলল, সে তো নিশ্চয় চিন-বা। কাটার মতো গাছ এখানে এখন বেশি নেই। পরিমাণ বাড়াতে হলে ক্যাম্প সরানো দরকার। কিন্তু সে তো সহজ ব্যাপার নয়!

হেতিনের ভাবনার কারণ আছে। প্রথমত নতুন জায়গা বাছার কাজটা সহজ নয়। অনেক অভিজ্ঞতার দরকার। জঙ্গলের এমন জায়গা বাছতে হবে, যেখানে কাটার উপযুক্ত ভাল মানের পর্যাপ্ত গাছ রয়েছে। অথচ নদীর কাছে। দরকার ক্যাম্প করার মতো উপযুক্ত জমি। আনুষঙ্গিক সুবিধা। বাড়তি কুলি। কোম্পানির বড়ো কর্তাদের অনুমতি।

সুরেশ বলল, “আকো, এজন্য জঙ্গলে ঘুরে কয়েকটা জায়গা আমি বেছেও ফেলেছি। কিন্তু অভিজ্ঞ চোখে যাচাই হওয়া দরকার। তাই তোমাকে দেখিয়ে নিতে চাই। এরপর বাকি কাজগুলো আমি সামলে নিতে পারব।”

তৈরি হয়ে দু’জন বের হয়ে পড়েছিল এরপর। প্রায় সারা দিনটা হাতির পিঠে দু’জন পাক খেয়ে বেড়িয়েছিল অরণ্যের গভীরে। হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা টাঙ্গুর এই অরণ্যে শুধু তো সেগুন নয়, রয়েছে শত বৃক্ষ, বেড়ে ওঠা লতাপাতা। এই দুপুরেও তার অনেক স্থানে আলো ঢুকতে পারে না। সেখানে ঘন ছায়া জমাট বেঁধে প্রায় অন্ধকার। তারই ফাঁকফোকর দিয়ে হাতি নিয়ে সাবধানে এগিয়ে চলে হেতিন। যত এগোয়, ততই অবাক হয়। শেষে বিস্ময়ে এক সময় বলেই ফেলে, “চিন-বা, এদিকে একা এসেছিলেন আপনি! হায় ভগবান! ”

হেতিনের কথায় সুরেশ হেসে বলে, “কেন আকো?”

“কেন কী বলছেন? উত্তেজিত হেতিন একবার তাকায় ওর দিকে। বলে, “ভগবান বুদ্ধ আপনার সঙ্গে আছেন নিশ্চয়! কখনো বিপদ হয়নি?”

উত্তরে সামান্য মাথা নাড়ে সুরেশ। ওষ্ঠপ্রান্তে সামান্য রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। কথা বলে না। অভিজ্ঞ হেতিনের অনুমান মিথ্যে নয়। বিপদের মুখে পড়েছে অনেকবার। বুনো হাতি তো বটেই, একবার রয়াল টাইগারের সামনেও পড়ে গিয়েছিল। তবে সেগুলো নয়, প্রকৃত বিপদের মুখোমুখি হয়েছিল মাত্র দু’বার। একবার এক ভালুক হঠাৎ ক্ষিপ্ত হয়ে ছুটে এসেছিল। কোমরে গোঁজা স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসন পিস্তলটা সেদিন খুব কাজে দিয়েছিল। পালাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পর-পর দুটো গুলি ছুঁড়েছিল। দুটোই পিস্তলের নল সামান্য উপরে তুলে প্রাণীটাকে ভয় দেখাবার জন্য। বেশ বুঝতে পেরেছিল, এত বড়ো আকারের ভালুকটাকে পিস্তলের গুলিতে সেভাবে ঘায়েল করা হয়ত সম্ভব হবে না। তাই প্রথমে তাকে ভয় দেখাবার চেষ্টাই করেছিল। কাজ হয়েছিল তাতেই। আওয়াজে বেজায় ঘাবড়ে গিয়ে থেমে গিয়েছিল প্রাণীটা। তারপর পিছন ফিরে ছুটে পালিয়েছিল। দ্বিতীয়বার পড়ে গিয়েছিল ফুট পনেরো লম্বা এক কিং কোবরার সামনে। জঙ্গলের সর্পরাজ ওকে লক্ষ করে হঠাই ফুঁসে উঠেছিল সেদিন। তবে অগ্নেয়াস্ত্র নয়, সেদিন কাজে লেগেছিল গ্রামের বাড়ির সেই অভিজ্ঞতা। না কোনো বিপদ ঘটেনি। কিন্তু হেতিনের কাছে ভাঙল না কিছুই।

ক্যাম্পের জন্য বাছাই করা প্রতিটি জায়গাই সেদিন অনুমোদন করেছিল হেতিন। কাটার উপযুক্ত প্রচুর টিক প্রতিটি স্থানেই যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে। নদীও কাছে। শেষে দু’জন পরামর্শ করে বর্তমান ক্যাম্পের সবচেয়ে কাছের জায়গাটাই পরবর্তী ক্যাম্পের জন্য ঠিক করে যখন ফেরার পথ ধরল, বিকেলের আলো দ্রুত পড়ে আসতে শুরু করেছে।

দিন কয়েক ধরে আকাশ ভারি। মেঘের আনাগোনা। রাতের দিকে কখনো দূরে পাহাড়ের মাথা থেকে আলোর ঝলকানি চোখে পড়ে। বাতাসে ঠান্ডা আমেজ পাওয়া যায়। এমন হলে আগে হেতিনই জানিয়ে দিয়ে যেত ব্যাপারটা। এখন সুরেশ নিজেই বুঝতে পারে, দূরের পাহাড়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। নদীর জলও বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু নদীতে লগ নামানোর কাজ তারপরে আর হয়নি।

অভিজ্ঞ মানুষ হেতিনের সঙ্গে পরামর্শ করে সুরেশ এখন লগ তৈরিতে বেশি জোর দিয়েছে। অল্পদিনের মধ্যে এদিকেও বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। নদীর জল আরো ফুলে উঠবে। স্রোতে লগ ভাসিয়ে দেবার কাজ অনেক সহজ হবে তখন। তাই সারাদিন জোর কদমে গাছ কাটার কাজ চলছে। হাতির সাহায্যে বয়ে আনা হচ্ছে নদীর ঘাটে।

এরই মধ্যে সুরেশ ক্যাম্প স্থানান্তরের জন্য চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিয়েছে টাঙ্গুর অফিসে। সেখান থেকে চিঠি চলে যাবে রেঙ্গুনে ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের কাছে।কয়েকদিনের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল এদিকেও। টিম্বার ক্যাম্পের কর্তারা সাধারণত হাঁ করে থাকেন, কবে পাহাড়ে বৃষ্টি হবে, নদীর জল বাড়বে, সেই আশায়। কিন্তু বর্ষা নামলে ক্যাম্পের মানুষের মাথায় হাত পড়ে যায়। টাঙ্গুর অরণ্যের এই ক্যাম্পে বর্ষা এক ভয়ানক ব্যাপার। টানা চলতেই থাকে কয়েকদিন। পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে নামে অবিশ্রান্ত জলধারা। চারদিক জলে থইথই। ক্যাম্পের কাজ বন্ধ। বাড়ে জোঁকের উপদ্রব। রেহাই নেই তাঁবুতে বসেও। বিষধর সাপ আকছার চলে আসে।

চার নম্বর ক্যাম্পের সবার কয়েকটা দিন কাটল তাঁবুতেই। শেষে যেদিন আকাশে রোদ দেখা দিল, সুরেশ হেতিনকে নিয়ে ঘাটে এসে দেখে, জলে থইথই করছে নদী। পাড়ের দু’দিকের অনেকটাই ভেসে গেছে। জলের তোড়ে জমা করা লগের বেশির ভাগই ভেসে গেছে। ও বলল, “আকো, পাহাড়ে বৃষ্টি থেমে গেছে মনে হয়।”

গত রাত থেকে বৃষ্টি নেই। দূরে পাহাড়ের দিকে বিদ্যুতের চমক আর দেখা যায়নি। পাহাড়ের ওদিকে বৃষ্টি হচ্ছে কিনা, ওই বিদ্যুতের চমক দেখেই যে অনুমান করা যায়, সেই খুঁটিনাটি সুরেশকে হেতিনই শিখিয়েছে। হেতিন বলল, “একদম তাই চিন-বা। নদীর জল আগামীকাল কিছুটা কমে যাবে। তখন বাকি লগগুলো জলে ভাসিয়ে দিলে খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে পেগুতে।”

সুরেশও তাই ভেবে রেখেছিল। আগামীকাল নদীর পাড়ের জল অনেকটাই নেমে যাবে। কাদা থাকলেও হাতিদের তেমন সমস্যা হবে না। বরং ক্ষেত্রবিশেষে কিছু সুবিধাও পাওয়া যাবে। এরপর জল বেশি নেমে গেলে সমস্যা বাড়বে।

রাতে আর বৃষ্টি হয়নি। তাই পরের দিন যথারীতি হাত দেওয়া হয়েছে কাজে। সশব্দে একের পর এক গুঁড়ি নদীর জলে গড়িয়ে পড়ছে। স্রোতের টানে দ্রুত ভেসে যাচ্ছে দক্ষিণে।

ক’দিন টানা বৃষ্টির পরেও দুপুরের রোদ আজ যথেষ্টই চড়া। ঘাটের অদূরে মস্ত এক শিরীষ গাছ। চড়া রোদেও চমৎকার ছায়া তার তলায়। সুরেশ সেই গাছের ছায়ায় বসে কাজ পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ দূরে নজর পড়তেই চমকে উঠল। গোড়ায় মনে হয়েছিল বোঝার ভুল হয়ত। কিন্তু ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে বুঝল, তা নয়। নদীর ঘাটের অদূরে জঙ্গলের ধারে দাড়িয়ে বিরাট আকারের এক দাঁতালো হাতি। স্থির হয়ে তাকিয়ে রয়েছে ঘাটের দিকে। নিঃশব্দে কুলিদের কাজ লক্ষ করছে। প্রাণীটা আর কেউ নয়। চার নম্বর ক্যাম্প থেকে পালানো রোগ হাতি ওমাং। টাঙ্গুর প্রতিটি টিম্বার ক্যাম্পের আতঙ্ক।

অল্প দিন আগে জঙ্গলের ভিতর হাতিটা অদূরে দাঁড়িয়ে ঠিক এই ভাবেই তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। নদীর ঘাটে কাজে ব্যস্ত কুলি আর মাহুতের দল এখনো দেখতে পায়নি ওকে। ব্যাপারটা ওদের নজরে পড়লে কী ঘটবে, ভাবতে গিয়ে সুরেশের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নীচের দিকে নামতে শুরু করল। অজান্তেই বিপদের মুখে হেতিনের মতো ভগবান বুদ্ধের স্মরণ নিয়ে তার কাছে প্রার্থনা শুরু করল, ওমাং যেন সেদিনের মতো ফিরে যায়। ব্যাপারটা কারো যেন নজরে না পড়ে।

কিন্তু সুরেশের সেই প্রার্থনা ভগবানের কানে পৌঁছোবার আগেই ব্যাপারটা ঘটে গেল। হঠাৎই একজন কুলির নজরেপড়ে যেতেই সে চিৎকার জুড়ে দিল, “ওমাং! ওমাং!”

দেখতে দেখতে শোরগোল পড়ে গেল চারপাশে। কাজ থামিয়ে অন্যরাও তারস্বরে চিৎকার শুরু করল। কয়েকজন হাতের লগি উঁচুতে ধরে নাড়তে লাগল।

সুরেশ বুঝতে পারছিল, জল গড়িয়ে গেছে অনেক দূর। বিপদে ওর মাথা বরাবরই চমৎকার কাজ করে। কিন্তু আজ প্রায় উদ্দেশ্যহীনভাবে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটল ঘাটের দিকে। এতক্ষণ ওমাং স্থির হয়ে যথাস্থানে দাঁড়িয়েছিল। এবার দ্রুত নদীর ঘাটের দিকে এগোতে লাগল।

তারপরেই ঘটে গেল ভয়ানক ব্যাপারটা। অদূরে ছোটো এক চালার নীচে দুপুরের রান্নার কাজ চলছিল। তদারক করছিল এক কুলি। ওমাংকে এগিয়ে আসতে দেখে উনুন থেকে জ্বলন্ত এক চ্যালা কাঠ নিয়ে হইহই চিৎকারে এগিয়ে গেল।

অত বড়ো শরীর নিয়ে হাতি যে কী দ্রুত ছুটতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। জ্বলন্ত চ্যালা কাঠ নিয়ে লোকটাকে ছুটে আসতে দেখেই হঠাৎ যেন খেপে গেল ওমাং। এতক্ষণ বেশ ধীর গতিতেই আসছিল। এবার ভয়ানক গর্জনে গুঁড় উঁচিয়ে বেগে ধেয়ে এল মানুষটার দিকে। বাধা দেবার আগেই তাকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে তুলে ফেলল শূন্যে। আতঙ্কিত মানুষটির হাত থেকে জ্বলন্ত কাঠ শিথিল হয়ে খসে পড়ল।

চোখের সামনে ভয়ানক ওই দৃশ্য দেখে বাকিদের সারা শরীর ততক্ষণে প্রায় হিম হয়ে গেছে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে সবাই।

সুরেশ তখনও অকুস্থলে পৌঁছোতে পারেনি। উপায় না দেখে ছুটতে ছুটতেই কোমর থেকে পিস্তলটা টেনে নিয়ে সিলিন্ডারের ছয়টা গুলিই ফাঁকা করে দিল। ওই অবস্থায় হাতিটাকে গুলি করলে বিপদ যে আরো বাড়বে, সেটা মাথায় ছিল। তাই গুলি চালিয়েছিল শূন্যে। কিন্তু তাতেই কাজ হল। হঠাৎ আগ্নেয়াস্ত্রের আওয়াজে থমকে গেল প্রাণীটা। শূঁড়ে প্যাঁচানো মানুষটাকে ফেলে দিয়ে জঙ্গলের দিকে ছুটে পালাল।

একে ভেজা কাদামাটি তার উপর কাছেই পড়ার কারণে তেমন লাগেনি লোকটার। সামান্য পরিচর্যার পরেই উঠে দাঁড়াল। হাঁফ ছেড়ে হেতিন বলল, “চিন-বা, আজ যা করলেন তাতে শুধু ধন্যবাদ যথেষ্ট নয়। হলফ করে বলতে পারি, এরপর ক্যাম্পের সবাই আপনাকে মাথায় করে রাখবে।”

উত্তরে অল্প হাসল সুরেশ। ততক্ষণে অনেক কথা জমে উঠেছে। বলতে পারত, ওমাং এখন আর রোগ হাতি নয় আকো। তোমরা সবাই অমন চেঁচামেচি না করলে, হয়ত ফিরেই যেত। আর মানুষটাকে আমি বাঁচাইনি। ওকে মেরে ফেলার ইচ্ছে থাকলে ওমাং সহজেই পারত। বিশ্বাস করো, ও এখন ক্যাম্পে ফিরে আসতে চায়। ফের আগের মতোই ক্যাম্পের অন্য হাতিদের সঙ্গে কাজ করতে চায়। হয়ত হেতিনকে বলতেও পারত সেই কথা। কিন্তু বেশ জানে ক্যাম্পের বড়ো সাহেবের হত্যাকারী ওমাংকে কোম্পানির কর্তারা কখনই বেঁচে থাকার সুযোগ দেবে না। তাই চুপ করেই রইল।

রেঙ্গুন থেকে টাঙ্গু, দূরত্ব কম নয়। ঘোড়ায় প্রায় চার দিনের পথ। তাও পেগু পার হলেই শুধু পাহাড় আর জঙ্গল। তার ভিতর দিয়ে বিপদসঙ্কুল উঁচু-নীচু পায়ে চলা পথ। বোম্বাই বর্মা টিম্বার কোম্পানির রেঙ্গুন অফিসের বড়ো কর্তা ম্যাকডোনাল্ড সাহেব অবশ্য এসবের পরোয়া করেন না। কোম্পানির স্বার্থে মাঝে-মধ্যেই চলে আসেন টাঙ্গুর অফিসে। বিভিন্ন টিম্বার ক্যাম্প ঘুরে দেখেন।

বড়োকর্তার জন্য সব ব্যবস্থাই রয়েছে সেখানে। এই প্রথম কিছু ব্যতিক্রম ঘটে গেল। সেদিন বিকেলে কোনো খবর ছাড়াই তিনি হঠাৎ উপস্থিত হলেন চার নম্বর ক্যাম্পে। সুরেশ তখন তাঁবুতে। সাহেব ভিতরে ঢুকে প্রায় জড়িয়ে ধরলেন তাকে। তারপর করমর্দন করে বললেন, “ওয়েল ডান বয়। ওয়েল ডান।”

বড়ো কর্তা ম্যাকডোনাল্ড সাহেবের উচ্ছ্বাস অকারণে নয়। অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি পরিমাণ টিক লগ টাঙ্গুর চার নম্বর ক্যাম্প থেকে আগে কখনো পাওয়া যায়নি। তাও এই ভয়ানক অবস্থার মধ্যে। রহস্যের মূলে যে নতুন নেটিভ ছোকরার তৎপরতা, বুঝতে বিলম্ব হয়নি তার। টাঙ্গুর এই চার নম্বর ক্যাম্প নিয়ে অনেকদিন ধরেই বড়ো চিন্তায় ছিলেন তিনি। পিটার কাজ ছেড়ে চলে যাবার পর অনেক চেষ্টা করেও দ্বিতীয় কাউকে জোগাড় করতে পারেননি। একবার তো ভেবে ফেলেছিলেন, চার নম্বর ক্যাম্প আপাতত বন্ধ করে দেবেন। তার মধ্যেই পেগু থেকে খবর পেলেন, চার নম্বর ক্যাম্প থেকে পাঠানো রেকর্ড পরিমাণ লগ এই দফায় রিসিভ হয়েছে সেখানে। খবরটা শুনে গোড়ায় প্রায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

বিলেতের এই সাহেবদের গুণ হল, তাঁরা কাজের মূল্য দিতে জানেন। খবরটা পেয়ে তখনই মনস্থির করে ফেলেছিলেন। তারই মধ্যে টাঙ্গুর অফিস থেকে সুরেশের পাঠানো চিঠি হাতে এসে পৌঁছোয়। এরপর আর দেরি করেননি তিনি। পরের দিন একজন মাত্র সঙ্গী নিয়ে ঘোড়ায় রওনা হয়ে পড়েছেন টাঙ্গুর চার নম্বর ক্যাম্পের দিকে।

সাহেবকে এভাবে বিনা নোটিশে ক্যাম্পে হাজির হতে দেখে টাঙ্গুর চার নম্বর ক্যাম্পে প্রায় আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিল সবাই।

সাহেবের এত উচ্ছ্বাসের কারণ গোড়ায় সুরেশও তেমন বুঝতে পারেনি। একটু থতমতই খেয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পেরে সাহেব বললেন, “দারুণ, দারুণ কাজ করেছ হে ছেলে! চার নম্বর ক্যাম্প থেকে এত আউটপুট আগে কখনো পাইনি আমরা। তাই কনগ্রাচুলেশন জানাতে এলাম। আবার বলি, ওয়েল ডান, দারুণ কাজ করেছ।”

উত্তরে সরেশ সামান্য মাথা নেড়ে প্রত্যুত্তর দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু সাহেব সেজন্য অপেক্ষা না করে বললেন, “শোন হে ছেলে। তোমার পাঠানো চিঠিও পেয়েছি আমি। ভেরি গুড। কিন্তু ম্যানইটার আর রোগ এলিফ্যান্টের ব্যাপারে কিছুই লেখনি। তবে টাঙ্গুর অফিস থেকে সবই শুনেছি। যাই হোক, চিন্তা করো না।”

ক্যাম্পের পুরোনো মানুষ যারা, আপাত-গম্ভীর ম্যাকডোনাল্ড সাহেবকে এভাবে কেউ দেখেনি। কিন্তু তাদের বিস্ময়ের কিছু বাকি ছিল তখনও। একটু পরেই তিনি হেতিন সহ ক্যাম্পের অন্যদের ডেকে খবরটা জানিয়ে দিলেন। সুরেশকেই তিনি চার নম্বর ক্যাম্পের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করছেন। বাড়ছে তার মাইনেও। এখন থেকে তিনিই এই ক্যাম্পের বড়ো সাহেব।

ক্যাম্পের কর্মীদের কাছে এর চাইতে ভাল খবর আর হয় না। সবচেয়ে খুশি হেতিন। মাত্রই মাসকয়েক আগের কথা। চার নম্বর ক্যাম্পের তখন টালমাটাল অবস্থা। প্রাণ বাঁচাতে ক্যাম্পের জনা কয়েক কর্মী পালিয়ে গেছে। ছোটো সাহেব পিটার ছুটির জন্য রেঙ্গুনের অফিসে সমানে তাগাদা দিয়ে চলেছে। ক্যাম্পের সবাই তখন জেনেও গেছে, ছুটির অনুমতি হলে সাহেব আর ক্যাম্পে ফিরবে না। সেই সময় সদ্য গোঁফ ওঠা কিশোর বয়সি ছেলেটিকে সাহেব যেদিন ক্যাম্পে এনে হাজির করলেন, একটু নিরাশই হয়েছিল। এই অল্প সময়ের মধ্যে সেই ছেলে এতদূর পৌঁছোবে, ভাবতেও পারেনি সেদিন।

ওদের পছন্দ করা জায়গাতেই ক্যাম্প শিফটিংয়ের অর্ডার করে গেছেন ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। অল্প দিনের মধ্যেই টাঙ্গুর অফিস থেকে প্রয়োজনীয় লোকজন আর মালপত্র এসে পড়বে। ক্যাম্পে তাই কতকটা ছুটির মেজাজ। খুশির আরো কারণ, ক্যাম্পে ম্যাকডোনাল্ড সাহেব দু’দিন ছিলেন। তার মধ্যে নরখাদক বাঘটাকে নিকেশ করে গেছেন। ক্যাম্পের অদূরে শূকরের টোপ দিয়ে সুরেশকে নিয়ে মাচায় ওঁত পেতে ছিলেন। সফল দ্বিতীয় রাতেই। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ওমাংকে কবজা করতে পারেননি। ধূর্ত প্রাণীটা ধারে কাছে এর মধ্যে আর আসেনি।

তবে ওমাংয়ের জন্য ক্যাম্পের কর্মীদের দুশ্চিন্তা এখন অনেকটাই কম। চার নম্বর ক্যাম্পের নবনিযুক্ত প্রধান সুরেশের জন্য ম্যাকডোনাল্ড সাহেব এবার পয়েন্ট ৪০৫ উইনচেস্টার বরাদ্দ করে গেছেন। সেই সঙ্গে নির্দেশ, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওমাংকে নিকেশ করে দিতে হবে। সুতরাং ওমাংয়ের ব্যবস্থা হতে যে বেশি দেরি নেই, সেই ব্যাপারে নিশ্চিন্ত সবাই।

কিন্তু এসবের পরে যে মানুষটির সবচেয়ে খুশি হবার কথা সেই সুরেশের মুখে কদিন ধরে জমে রয়েছে আষাঢ়ের মেঘ। রুটিন মতো নিজের কাজ করে চলেছে ঠিকই, কিন্তু আগের সেই উৎসাহ উদ্দীপনা যেন হারিয়ে গেছে। কথা বলাও কমে গেছে অনেক।

ব্যাপারটা নজর এড়ায়নি হেতিনের। কিন্তু কী বলবে ভেবে পায়নি। হাজার হোক, মানুষটি এখন ক্যাম্পের বড়ো সাহেব! হয়ত অন্য কিছু ভেবে বসবে!

জঙ্গলে গাছ কাটার থেকেও বেশি কঠিন সেগুলো যথাস্থানে বয়ে নিয়ে যাওয়া। তাই জঙ্গলের অনেক জায়গায় টিক লগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। আনা হয়ে ওঠে না। এভাবে জঙ্গলের ভিতর যত্রতত্র জমা থাকে সেগুলো। ক্যাম্প গুটিয়ে নেবার সময় হতে তাই নজর পড়েছে সেগুলোর উপর। ক্যাম্পের ছয়টা হাতির কাজ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। বেড়েছে মাহুত আর কুলিদের কাজও। সেদিন সেই কাজই চলছিল। কাছে দাঁড়িয়ে নজর রাখছিল সুরেশ। কোমরে পিস্তলের সঙ্গে পিঠে ঝুলছে নতুন মডেলের উইনচেস্টার।

পিটার সাহেবের ওয়েস্টলে রিচার্ড থেকেও অস্ত্রটা যে অনেক বেশি শক্তিশালী সেটা কদিন আগেই টের পেয়েছে। শূকরের টোপ খেতে আসা বাঘটাকে মাচা থেকে এই উইনচেস্টার দিয়েই গুলি করেছিলেন ম্যাকডোনাল্ড সাহেব। লক্ষ্য তেমন স্থির ছিল না। গুলি লেগেছিল বাঘটার পেটে শিরদাঁড়ার কাছে। সফট নোজড হান্টিং বুলেট। শিকারের দেহে প্রবেশ করার পরে এই বুলেটের মাথা ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে যায়। তাই আঘাতের তীব্রতা অনেক বেশি।

ছিটকে পড়ে প্রাণীটা আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি। মাটিতে পড়ে ছটফট করছিল। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব অবশ্য স্বীকার করেছিলেন ব্যাপারটা। মাচায় সুরেশকেও নিয়েছিলেন সেদিন। দ্বিতীয় গুলি না করে রাইফেলটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “হল না ম্যান। টার্গেট সামান্য হলেও ফসকে গেল। বাঘ শিকার করতে হলে প্রথম গুলিটা মাথা নয়তো হার্টে বেঁধা দরকার। মনে রাখবে, অন্যথায় বিপদ হতে পারে।”

সাহেব কী চাইছেন, বুঝতে ভুল হয়নি সুরেশের। উইনচেস্টার আগে ব্যবহার করেনি ও। তবে নীলকুঠির সাহেবের হল্যান্ড অ্যান্ড হল্যান্ড রাইফেলে মকশো করেছে। সাহেব নিজে হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন। বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে নিঃশব্দে সাহেবের হাত থেকে অস্ত্রটা তুলে নিয়েছিল। ভিতরে অন্য একটা তাগিদও ছিল। আহত প্রাণীটার মৃত্যু-যন্ত্রণা তখন ভীষণ কষ্ট দিচ্ছিল ওকে। বাঘের প্রাণশক্তি সামান্য নয়। ওই ভয়ানক আহত অবস্থাতেও প্রাণীটা ক্রমাগত নড়াচড়া করছিল। মাথা একেবারেই স্থির থাকছিল না। তবু প্রথম গুলিতেই মাথা ফুঁড়ে দিতে পেরেছিল। যন্ত্রণার অবসান হয়েছিল প্রাণীটার।।

দেখে ম্যাকডোনাল্ড সাহেব ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিলেন, “ওয়েল ডান ম্যান। পারবে তুমি। রোগ হাতিটাকে নিকেশ করার কাজটা তোমাকেই দিয়ে গেলাম। রাইফেলটা তোমার জন্যই এনেছি। আশা করছি খুব শিগগির খবরটা পাব।”

ম্যাকডোনাল্ড সাহেব এরপর আর সময় নষ্ট করেননি। প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে পরের দিন ভোরেই ফিরে গিয়েছিলেন। সেই থেকে উইনচেস্টারটা কাঁধে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। সঙ্গে পাউচ ভরতি সেই সফট নোজড হান্টিং বুলেট।

হিংস্র বন্যপ্রাণী নিধনে এই কার্তুজের কোনো বিকল্প নেই ঠিকই। কিন্তু অন্য সমস্যা আছে। ম্যাকডোনাল্ড সাহেব সেটা বলেননি ওকে। হয়ত ভুলে গেছেন। কিন্তু সুরেশ জানে। নীলকুঠির সাহেবের কাছেই শুনেছিল, সফট নোজড বুলেট দিয়ে কখনো বড়ো আকারের হাতির মাথায় গুলি করতে নেই। অগ্রভাগ নরম হবার কারণে এই বুলেট হাতির শক্ত খুলি অনেক সময় ভেদ করতে পারে না। তখন বিপদ হয়ে যায়। কিন্তু সেজন্য এখন আর কিছু যায় আসে না। তাছাড়া ওমাংকে এর মধ্যে ক্যাম্পের কাছে আর দেখা যায়নি। তবু সাহেবের নির্দেশ পালন করতেই হয়।

সুরেশ রাইফেল কাঁধে কাজ পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ খেয়াল করল অদূরেই হেতিন দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বলতে চায় ওকে। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারছে না। কদিন ধরে এই এক ব্যাপার হয়েছে।

প্রধানের পদে উন্নীত হতে ক্যাম্পের সবার কাছে ওর সম্মান অনেক গুণ বেড়ে গেছে। কাছের মানুষ হেতিনও পালটে গেছে। ওকে ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুরেশ বলল, “কিছু বলবে আকো?”

উত্তরে মাথা নুইয়ে হেতিন দূর থেকেই বলল, “হ্যা চিন-বা।”

সুরেশ জানে, হেতিন আর কাছে আসবে না। ও নিজেই তাই এগিয়ে গেল, “কী কথা হেতিন?”

“চিন-বা,” সামান্য ইতস্তত করে হেতিন বলল, “কদিন ধরে আপনার মনটা একেবারেই ভাল নেই। কিছু ভুল হয়েছে আমাদের?”

“তা কেন?” অবাক হল সুরেশ, “ভুল হলে বড়োকর্তা ক্যাম্পের কাজে কখনো এত খুশি হয়? তাছাড়া আমার মন খারাপ, কে বলল?”

“কেউ বলেনি চিন-বা,” হেতিন সামান্য হাত কচলাল, “আপনার মুখ দেখেই বুঝতে পারি।”

সুরেশ হেতিনের মুখের দিকে ফের একবার তাকাল। প্রায় ছয় মাস আগে যেদিন প্রথম ক্যাম্পে আসে, সেই প্রথম দিনেই ওকে কাছে টেনে নিয়েছিল এই মানুষটি। জঙ্গল চিনতে শিখিয়েছিল। মানুষটাকে তাই ফাঁকি দেওয়া যায়নি।

কেউ জানে না, ম্যাকডোনাল্ড সাহেব চলে যাবার পরে একটা রাতও ও ঘুমোতে পারেনি। কাউকে বলতেও পারেনি কিছু। বলা সহজ নয়। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে টাঙ্গুর এই সেগুন জঙ্গল, মাটি, আকাশ, ক্যাম্পের মানুষগুলো বড়ো কাছের হয়ে গিয়েছে!

হেতিনের ওই কথায় হঠাৎ যেন একটু আশার আলো দেখতে পেল। নরম গলায় বলল, “আকো, ওমাংকে নিয়ে ভেব না। বড়োকর্তা যখন নির্দেশ দিয়ে গেছেন, ওই দায়িত্ব আমার। তবে একটা কথা, মন দিয়ে কাজ করবে সবাই। ক্যাম্পের কাজ যেন এভাবেই চলে। এখানে তুমিই সবচেয়ে পুরোনো আর অভিজ্ঞ মানুষ। তোমার কথা সবাই মানবে।”

“এই কথা!” প্রায় যেন হাঁফ ছাড়ল হেতিন, “ওসব নিয়ে একটুও চিন্তা করবেন না চিন-বা। আপনার সম্মান এই ক্যাম্পের কেউ নষ্ট হতে দেবে না।”

“আর একটা কথা”, হেতিন থামতেই সুরেশ বলল, “দু’চার দিনের মধ্যেই টাঙ্গু থেকে অতিরিক্ত কুলিমজুর চলে আসবে। সঙ্গে একজন বাবুও আসবে। তাকে নিয়ে ক্যাম্প শিফটিংয়ের ব্যাপারটা সামলাবার দায়িত্ব তোমার উপরে রইল। পারবে তো?”

“পারব চিন-বা।” সরল মনে মাথা নাড়ল হেতিন।

এক দিন পরের কথা। নদীতে জল বাড়তে শুরু করায় কুলির দল ভোরভোরই চলে গেছে নদীর ঘাটে। অন্য দিন একই সঙ্গে প্রস্তুত হয়ে সুরেশও রওনা হয়ে পড়ে। কিন্তু আজ আর তাঁবু থেকেও বের হয়নি। চিন-বা ঘুমিয়ে আছে ভেবে কেউ আর বিরক্ত করেনি ওকে।

ক্যাম্পের ছয়টা হাতিকে তৈরি করে সবাই বের হয়ে যেতে ক্যাম্প আবার আগের মতো নিস্তব্ধ, শুনশান। পাশে কদম গাছের ডালে জোড়া শালিখের কিচিরমিচির শুরুর সময় হল। কদিন এই ভোরের দিকে নিয়ম করে পাখি দুটো ডালে এসে বসে। কিছুক্ষণ আসর জমায়। খুব ভোরে বের হবার দরকার না পড়লে সুরেশ এই সময় বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ ওদের ডাক শুনে কাটিয়ে দেয়। বেশ বোঝে, কিছু নিয়ে আলাপ চলছে দু’জনের। বুঝতে পারে না কিছুই। তাতেই আনন্দ।

কিন্তু আজ পাখি দুটোর ডাক শুরু হতেই উঠে পড়ল সুরেশ। বাইরে দাঁড়িয়ে নদীর দিক থেকে ছুটে আসা ভোরের হিমেল বাতাস গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। অজান্তেই চোখের কোলে দু’ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। ব্যাপারটা খেয়াল হতেই হাতের চেটোয় চোখ মুছে ব্যস্ত হয়ে উঠল ও। হাতে সময় বেশি নেই। অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। তাঁবুর ভিতরে ঢুকে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে নিল সুরেশ। রাতে বালিশের তলায় রাখা গত কয়েক মাসের সঙ্গী স্মিথ অ্যান্ড ওয়েস্টনটা যথাস্থানে রয়েছে। পাশেই নতুন উইনচেস্টার রাইফেল।

সেদিকে চোখ পড়তে বুক থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বের হয়ে এল। ভাগ্যিস, ম্যাকডোনাল্ড সাহেব চলে যাবার পরে এ-পর্যন্ত কাজে লাগেনি ওটা!

আগ্নেয়াস্ত্র দুটোর উপর শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নিয়ে সুরেশ বাইরে বেরিয়ে দ্রুত পেই-এর পথে চলতে শুরু করল। তবে পথ ধরে নয়। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। এদিকে প্রায় সবাই চেনে ওকে। দৈবাৎ কারও নজরে পড়ে গেলে হাজার কৈফিয়ত দিতে হবে। অনেক ঝামেলা।

ব্যাপার রয়েছে আরো একটা। সেটাও সেরে ফেলতে হবে। নইলে চার নম্বর ক্যাম্পের সমস্যা মিটবে না। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঘন্টাখানেকের মতো এগোতেই নাকের পাটা দুটো হঠাৎই ফুলে উঠল সুরেশের। বড়ো করে কয়েকটা শ্বাস টানল। তারপর মুখে আঙুল দিয়ে শাঁখের মতো বার কয়েক আওয়াজ করল। খানিক অপেক্ষা করার পরেই গাছপালার ভিতর দিয়ে প্রায় নিঃশব্দে বিশাল একটা দাঁতালো হাতি ওর কাছে এসে শুঁড় দোলাতে লাগল।

কেউ টের পায়নি, টাঙ্গুর টিম্বার ক্যাম্পের ত্রাস ওমাংয়ের সঙ্গে জঙ্গলের ভিতর ইতিমধ্যে বার কয়েক দেখা হয়েছে ওর। তাই বেশ জানত, ঠিকই খুঁজে পাবে। কাছে এসে হাতিটা শুঁড় দোলাতে শুরু করতেই সুরেশ ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “ওমাং, পেই-এর দিকে যাচ্ছি, পৌঁছে দিতে হবে।”

উত্তরে হাতিটা দু’বার কান ঝাপটাল। তারপর বাঁ পা ভাঁজ করে সামান্য তুলে ধরল। সুরেশ মুহূর্তে ওমাংয়ের সেই পায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠে বসল পিঠের উপর। দেরি না করে ওমাং জঙ্গলের ভিতর পথ করে দ্রুত চলতে শুরু করল।

টাঙ্গুর মাইল দশেক আগে ছোটো এক গ্রাম ওটুইন। সেখান থেকে পেগু পাহাড় টপকে আড়াআড়ি সরু এক পায়ে চলা পথ চলে গেছে পশ্চিমে পেই-এর দিকে। ঘন জঙ্গলের ভিতর সেই পাহাড়ি পথের অনেকটা অংশ ভয়ানক দুর্গম। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ তেমন ব্যবহার করে না। সেই পথটাই এবার পাড়ি দিতে হবে সুরেশকে। অনেকটা দূর। দুটো দিন তো লাগবেই। ওমাংয়ের জন্য ওটা এখন খুব দরকার। টাঙ্গুর টিম্বার ক্যাম্পের কেউ আর খোঁজ পাবে না ওর। এযাত্রায় রক্ষা পেয়ে যাবে।

ক্যাম্পের চাকরিটা ছাড়তে হল হয়ত। কিন্তু নতুন একটা চাকরি ঠিক জুটিয়ে নিতে পারবে। পেই ইরাবতীর তীরে ছোটো এক শহর। সেখান থেকে কোনো বোট ধরে ফিরে যাবে রেঙ্গুন। তারপর জাহাজে অন্য কোনো দেশে। পৃথিবীটা অনেক বড়ো। কিন্তু এখন জানতে বাকি নেই, সব দেশের মাটি, মানুষ এক। কোনো ফারাক নেই। সুরেশ হঠাৎ অনুভব করে যে কারণে হঠাৎই একদিন কলকাতা ছেড়েছিল, ভিতরে সেই অনুভূতি ফের টের পাওয়া যাচ্ছে। চলো অন্য কোথাও। অন্য কোনো দেশে।

[গল্পের শেষে: উনবিংশ শতকের শেষ পর্বে ভেতো বাঙালির ঘরে এক বিস্ময়কর চরিত্র সুরেশ বিশ্বাস। বাবার হাতে ধরে নদিয়ার এক গণ্ডগ্রাম থেকে প্রথমে কলকাতায়। তারপর মাত্র পনেরো বছর বয়সে পালিয়ে বর্মা তথা আজকের মায়ানমারে পাড়ি। তবে বেশিদিন থাকা হয়নি সেখানে। বছর ঘোরার আগেই ফের এদেশের মাদ্রাজ শহরে। তারপর ইংল্যান্ড। কপর্দকহীন মানুষটি একসময় দিন কাটিয়েছেন লন্ডন শহরের ফুটপাতে। সামান্য হকারি দিয়ে শুরু করে শেষে সুযোগ এক সার্কাস দলে। এরপর মানুষটিকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। অতি অল্প দিনের মধ্যে সার্কাস দলের রিং মাস্টার। বনের হিংস্র পশুদের বশ করার এক অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা ছিল মানুষটির। সেই ক্ষমতাবলে হয়ে উঠেছিলেন সেদেশের নামি অ্যানিমাল ট্রেনার। সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল তার খ্যাতি। ইউরোপের প্রধান পাঁচটি ভাষায় তিনি কথা বলতে পারতেন মাতৃভাষার দক্ষতায়। সাবলীল ছিলেন আরো কয়েকটি ভাষায়। এরপর ডাক পেলেন জার্মানির এক বড়ো কোম্পানি থেকে। অর্থ, সম্মান কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। কিন্তু সব ফেলে একদিন হঠাৎ পাড়ি জমালেন ব্রাজিলে। প্রথমে অ্যানিম্যাল ট্রেনার। তারপর সেই কাজ ছেড়ে যোগ দিলেন সেদেশের সামরিক বিভাগে। সামান্য কর্পোরাল থেকে ধাপে ধাপে উন্নতি করে পৌঁছে গিয়েছিলেন কর্নেল পদে। তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হল, ব্রাজিলের সামরিক বাহিনীতে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ শল্যচিকিৎসক। মানুষটির জীবনকাহিনি তাই বোধহয় কাল্পনিক গল্প উপন্যাসকেও হার মানায়।]

অধ্যায় ১ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%