সৈকত মুখোপাধ্যায়

আজকাল রবিবার ছাড়া বুধোদার সঙ্গে দেখা হয় না। ওর অ্যান্টিক গুডসের ব্যবসা, যার নাম 'মহারাজা কালেকশনস', সাঙ্ঘাতিক জমে গিয়েছে। সপ্তাহের বাকি ছটা দিন বুধোদা ওই ব্যবসার কাজে সকাল থেকে সন্ধে অবধি ব্যস্ত তো থাকেই; বাড়ি ফেরার পরেও হয় ল্যাপটপের স্ক্রিনে নয় বইয়ের পাতায় ডুবে যায়। বুঝতে অসুবিধে হয় না, কোনো না কোনো অ্যান্টিকের বিষয়েই পড়াশোনা করছে।
রবিবার সকালের দিকটা আবার ওর ভিজিটরদের জন্য বরাদ্দ। তাদের মধ্যে কেউ অ্যান্টিক বিক্রি করতে আসেন, কেউ আসেন কিনতে। তবে ওই সময়টায় হেমকুঞ্জের বৈঠকখানায় আমি হাজির থাকলে বুধোদা খুশিই হয়। ও নিশ্চয় বুঝতে পারে, ওর সামনে বসে নানা ধরনের অ্যান্টিকের কথা শুনতে-শুনতে আমারও অ্যান্টিক সম্বন্ধে একটা আগ্রহ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। নিজের ভালোলাগাটা অন্য কারুর সঙ্গে শেয়ার করে নিতে কোন মানুষেরই বা ভালো না লাগে?
আজ ওরকমই একটা রোববার। বেলা দশটা নাগাদ ক্যাজুয়ালি একবার হেমকুঞ্জের একতলার বিশাল বৈঠকখানায় ঢুকে পড়েছিলাম। দেখলাম, বুধোদা আর একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক মুখোমুখি বসে কথা বলছেন। ভদ্রলোকের মাথাভর্তি ধবধবে সাদা চুল, মুখের চামড়ায় ভাঁজ আর কুঁজো হয়ে-যাওয়া লম্বা শরীরটা দেখলে বোঝা যায়, বয়স আশির একটু ওপরের দিকেই হবে। উনি ধুতির ওপরে একটা বাদামি-রঙের ফ্ল্যানেলের পাঞ্জাবি পরেছিলেন যার কলারের পেছনদিকটায় বেশ খানিকটা কাপড় ফাটা। তাছাড়া পাঞ্জাবির রঙের সঙ্গে একেবারেই বেমানান ফটফটে সাদা বোতামগুলো সস্তা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি। বুধোদাদের বৈঠকখানার বাইরে যে চটিদুটো খোলা ছিল সেগুলোর হালও ভালো নয়। বুঝতেই পারছিলাম, সাধারণত যেসব কোটিপতি অ্যান্টিক-সংগ্রাহকেরা বুধোদার সঙ্গে দেখা করতে আসেন ইনি তাদের দলে নন। এনার আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ। অতএব ধরেই নিলাম, ইনি বিক্রেতাদের দলে।
সেটা মনে হওয়ার আরেকটা কারণ, ভদ্রলোকের চেহারায় এমন একটা আভিজাত্য রয়েছে, বয়সের ভারেও যেটা পুরোপুরি চাপা পড়েনি। হতে পারে ইনি এককালের জমিদার-নন্দন, এখন আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে বলে বাড়ির রুপোর বাসন, ঝাড়বাতি কিম্বা পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া পুরোনো কয়েন বুধোদার কাছে বিক্রি করতে এসেছেন।
বুধোদা আমাকে হাতের ইশারায় বসতে বলল। আমি বুধোদার পাশে গিয়ে বসলাম। ভদ্রলোক চোখে প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে বুধোদার দিকে চাইলেন। বুধোদা বলল, আমার পাড়াতুতো ভাই, মাল্যবান মিত্র। ডাকনাম রুবিক। আপনি ওর সামনেই সব কথা বলতে পারেন। আমাদের এই অ্যান্টিকের লাইনে যেরকম সিক্রেসি মেইনটেইন করতে হয়, সেটার সঙ্গে রুবিক ছোটবেলা থেকেই পরিচিত; কোনো কথাই পাঁচকান করবে না।
ভদ্রলোক বললেন, নিশ্চিন্ত হলাম। দেখুন মিস্টার মজুমদার, আমার বিরাশিবছর বয়স। জীবনে আপস অ্যান্ড ডাউনস কম দেখিনি। নিজেকে যথেষ্ট স্টেডি বলেই মনে করি। কিন্তু এই গত দশদিনের ঘটনায় আমার নার্ভগুলো বেশ ইয়ে হয়ে গেছে। চারিপাশের কাউকেই আর সন্দেহের ঊর্ধ্বে বলে মনে করতে পারছি না।
বুধোদা আমার দিকে ফিরে বলল, রুবিক, ইনি হচ্ছেন মিস্টার প্রতাপ রক্ষিত। উনি অ্যান্টিক নিয়ে কিছু সমস্যায় পড়েছেন। আমাকে গতকাল ফোন করেছিলেন, আমি বলেছিলাম আজ আসতে। এইমাত্রই উনি এসে পৌঁছলেন আর পেছন-পেছন তুইও ঘরে ঢুকলি। ভালোই হল। পুরো ব্যাপারটা প্রথম থেকেই শুনতে পাবি। বলুন মিস্টার রক্ষিত।
প্রতাপবাবু দুহাতের তালুর মধ্যে মুখটা ঢেকে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। নিশ্চয় তার মধ্যেই কী বলবেন তা একটু গুছিয়ে নিলেন। তারপর একটানা বলে চললেন—
আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানেন, মিস্টার মজুমদার? সমস্যার উৎসটা আমি জানি না। শুধু বুঝতে পারছি আমার ঘরে একটা দামি জিনিস রয়েছে। আর সেইটা হাতানোর জন্যে সুবিনয় আমাকে চাপ দিচ্ছে। দাঁড়ান। তার আগে আমি কে আর সুবিনয়-ই বা কে, সেটা বলে নিই।
আমার পুরো নাম প্রতাপরঞ্জন রক্ষিত। চিৎপুরের নাখোদা মসজিদের পেছনে একটা গলি, নাম তাহের আলি লেন, ওখানেই আমার পৈতৃক বাড়ি। বাবার নাম ঈশ্বর প্রিয়রঞ্জন রক্ষিত। ওনার আরেকটা নাম ছিল—'স্টেজ নেম'। প্রিন্স রাজন।
দাঁড়ান, দাঁড়ান। প্রতাপবাবুকে কথার মধ্যে থামিয়ে দিয়ে বুধোদা সোফা থেকে প্রায় উঠেই দাঁড়াল। বলল, প্রিন্স রাজন মানে ম্যাজিশিয়ান প্রিন্স রাজন? আপনি তাঁর ছেলে?
বুধোদার চোখদুটো গোল-গোল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার চেয়েও বেশি গোল-গোল চোখ করে প্রতাপবাবু বললেন, আপনি আমার বাবার নাম শুনেছেন? আমি তো ভাবতাম আমি ছাড়া আর কারুর ওই নামটা মনে নেই।
বুধোদা একটু কিন্তু-কিন্তু করে বলল, আমিও কিন্তু নামটা বাদ দিলে ওনার সম্বন্ধে আর খুব বেশি কিছু জানি না। ক্রিস্টোফারের 'ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি অফ ম্যাজিকে' প্রিন্স রাজনের সম্বন্ধে অল্প কিছু কথা পড়েছিলাম। বোধহয় নাইনটিন-থার্টিজের মাঝামাঝি বোম্বে আর কলকাতায় কয়েকটা শো করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। তখন ওনার বয়স খুবই কম। তারপর শো করার জন্যে ইউরোপ গিয়েছিলেন। তারপর যে কী হয়েছিল মনে পড়ছে না।
প্রতাপ রক্ষিত আরও কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে বুধোদার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। বোধহয় বুঝতে পারছিলেন, বুধোদা ভারতীয় জাদুবিদ্যার ইতিহাসটা গুলে খেয়েছে। আমি অবশ্য অবাক হইনি। কারণ আমি জানতাম, বুধোদার আটটা বইয়ের আলমারির আটচল্লিশটা তাকের মধ্যে চারটে তাক ভরে রয়েছে ম্যাজিক সংক্রান্ত নানারকমের বই, পত্রপত্রিকা আর ম্যাজিশিয়ানদের জীবনীতে।
আসলে সভ্যতার শুরু থেকে যে-ক'টা বিষয়ে মানুষ নিজের রুচি আর বুদ্ধির চরমসীমা দেখিয়েছে, তার সবক'টা নিয়েই বোধিসত্ব মজুমদারের কিছুটা পড়াশোনা রয়েছে। তার মধ্যে যেমন পেইন্টিং রয়েছে, স্কাল্পচার রয়েছে, লিটরেচার রয়েছে তেমনি আবার রন্ধনশিল্প রয়েছে। ম্যাজিকও রয়েছে।
বুধোদা অ্যান্টিকের খোঁজে ইতিহাস পড়ে না। ইতিহাসকে খুঁজে বেড়ায় অ্যান্টিকের মধ্যে। এইখানেই বুধোদার সঙ্গে অন্য সব অ্যান্টিক-হান্টারের তফাত।
হেমকুঞ্জের হেল্পিং-হ্যান্ড কানাইদা আমাদের তিনজনকেই চা দিয়ে গিয়েছিল। প্রতাপবাবু চায়ে একটা চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন, মিস্টার মজুমদার, আপনার স্মৃতিশক্তি অসামান্য। আপনি বললেন, বাবা ইউরোপে শো করতে যাওয়ার পরে কী হয়েছিল সেটা আপনার মনে পড়ছে না। আসলে মনে পড়ার মতন কিছু নেই। তারপরে আর কিছুই হয়নি। বাবা জার্মানি থেকে ফেরেননি। ওখানেই উনি মারা গিয়েছিলেন।
বুধোদা অবাক হয়ে বলল, মারা গিয়েছিলেন! জার্মানির মাটিতে?
একদম তাই। আমার বয়স তখন দু-বছর। কাজেই সেই সময়ের স্মৃতি বলতে কিছুই নেই। বড় হওয়ার পরে মায়ের মুখে যা শুনেছি আপনাকে বলছি।
সালটা ছিল উনিশশো-আটত্রিশ। বাবার তখন মাত্র আঠাশবছর বয়স। বাবা জার্মানি গেলেন, খেলা দেখাতে। সঙ্গে সামান্য সাজসরঞ্জাম আর মাত্র একজন সহকারী। তার বেশি কিছু নিয়ে যেতে গেলে যে জাহাজভাড়া দিতে হত, সেটাও তখন বাবার কাছে ছিল না।
বাবার প্ল্যান ছিল, প্রথমে ওখানকার কোনো ইম্প্রেশারিওকে খেলা দেখিয়ে বশ করবেন। তারপর হল ভাড়া করা, সাজসরঞ্জাম জোগাড় করা ইত্যাদি বাকি কাজগুলো সেই ইম্প্রেশারিওই করবে।
বুধোদা বলল, প্ল্যানটা খুব একটা খারাপ ছিল না। ওইসময়ে ইওরোপ আর আমেরিকায় ছোট-বড় সমস্ত শো-ম্যানকেই ইম্প্রেশারিওর মাধ্যমে শো করতে হত। শিল্পী শুধু স্টেজে উঠে নিজের খেলাটুকু দেখাবেন, সে নাচ হোক, মূকাভিনয় হোক, কিম্বা ম্যাজিক। আর বাকি যত ঝক্কি—হলভাড়া থেকে বিজ্ঞাপন, টিকিট বিক্রি—সবকিছু সামলাবে ওই মাঝের লোকটা, যার নাম ইম্প্রেশারিও। এটাই ছিল দস্তুর। যাই হোক, তারপর?
প্রতাপবাবু বললেন, বাবার কপাল ভালো ছিল। প্রথমেই উনি মিউনিখের একনম্বর ইম্প্রেশারিও মার্টিন জিগলারের সুনজরে পড়ে গেলেন। তবে সেটা এমনি এমনি নয়। বাবা ছিলেন অসামান্য কনজিওরার। মঞ্চ, সাজসরঞ্জাম, লোকলস্কর কিছুই লাগত না। হাতের কাছে যা পাওয়া যেত, সে একটা কয়েনই হোক কিম্বা এক প্যাকেট তাস, তাই দিয়েই বাবা মানুষকে তাক লাগিয়ে দিতে পারতেন।
আমি বুধোদাকে ফিসফিস করে জিগ্যেস করলাম, কনজিওরার মানে কী গো?
বুধোদা বলল, ম্যাজিক এই আর্টটাকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়। এক, ইলিউশন। অনেকে বাংলায় বলেন 'মঞ্চমায়া'। যেমন ধর, করাত দিয়ে জ্যান্ত মেয়েকে কেটে দুভাগ করে আবার জোড়া লাগিয়ে দেওয়ার খেলাটা কিম্বা শূন্যে মানুষ ভাসিয়ে রাখার খেলা। ইলিউশনের খেলা দেখাতে গেলে লুকোনো যন্ত্রপাতি, বড় স্টেজ, সহকারী-টহকারীর প্রয়োজন হয়।
আর দুই, কনজিওরিং অ্যাক্ট, মানে সোজা বাংলায় হাতসাফাই। একঘর লোকের মাঝখানে বসে চোখের পলকে কোনো জিনিসকে ভ্যানিশ করে দেওয়া কিম্বা উল্টো-পথে হাওয়া থেকে যাহোক কিছু মুঠোয় ধরে ফেলা— এগুলো ইলিউশনের ট্রিক। এই খেলাগুলো দেখানোর জন্যে বছরের-পর-বছর সাধনা ছাড়া আর কিছু লাগে না।
প্রতাপবাবু বলে উঠলেন, বাবার এই সাধনাটা ছিল। একটা মজার ব্যাপার শুনবেন? জামার আস্তিনের ভেতরে লুকিয়ে-রাখা পায়রা কিম্বা তাস চোখের পলক ফেলার আগে হাতের মুঠোয় বার করার খেলাটা অনেক ম্যাজিশিয়ানই দেখিয়ে থাকেন। কিন্তু মায়ের মুখে শুনেছি, বাবার একটা প্রিয় খেলা ছিল খালি চোঙার মধ্যে থেকে দুটো ছোট-ছোট ছেলেমেয়েকে বার করে দ্যাখানো। বুঝতেই পারছেন, ছেলেমেয়ে দুটোকে বাবা নিজের ম্যাজিশিয়ানের আলখাল্লার মধ্যেই লুকিয়ে রাখতেন। হলভর্তি লোকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে দুটো বাচ্চাকে ওইভাবে আলখাল্লার ভেতর থেকে খালি চোঙার মধ্যে চালান করতে গেলে কতটা স্কিল লাগে ভাবতে পারছেন?
সত্যিই অভাবনীয়। বুধোদা বলল।
সবকিছুতেই ওনার এই সাধনা আর দক্ষতা ছিল। মিউনিখে থাকাকালীন মাত্র চার-পাঁচমাসের মধ্যেই জার্মান ভাষাটা এমনভাবেই শিখে নিয়েছিলেন যে, ওনার কথা শুনলে কেউ বুঝতে পারত না একজন অ-জার্মান কথা বলছেন।
যাই হোক, বাবার জার্মানি যাওয়ার গল্পটা আগে শেষ করি। মিউনিখে পৌঁছে বাবা একরকম জোরজার করেই মার্টিন জিগলারকে নিজের কিছু খেলা দেখিয়েছিলেন। জিগলার ছিলেন শো-বিজনেসের জহুরি। খেলাগুলো দেখেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এ ছেলে অনেক দূরে যাবে। তিনি বাবাকে মিউনিখের একটা ছোট হলে একমাস শো-এর ব্যবস্থা করে দিলেন।
একমাস পেরিয়ে দু-মাস হল, দু-মাস পেরিয়ে তিনমাস। শো-এর পর শো হাউসফুল চলতে লাগল। ভারতীয় জাদুকর প্রিন্স রাজনের নাম মিউনিখ ছাড়িয়ে গোটা জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়ছিল। সেইসময় বাবা নিয়মিত মা-কে চিঠি লিখতেন। চিঠিগুলো এখনও আমার কাছে রয়েছে। প্রতিটা চিঠিতেই বাবা একটা কথা লিখতেন। তিনি খেলাগুলোকে আরো উন্নত করার চেষ্টা করছেন। যা অর্থ উপার্জন করছেন তার একটা বড় অংশই খরচ করছেন ম্যাজিকের নতুন-নতুন সাজসরঞ্জাম, নতুন স্ক্রিন, মিউজিক, লাইটিং আর অ্যাসিস্ট্যান্টদের পেছনে। প্রত্যেকটা খেলাকে ভারতীয় পুরাণের কোনো না কোনো গল্পের সঙ্গে গেঁথে দিচ্ছেন—যাতে খেলাগুলো ইউরোপিয়ান দর্শকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
প্রায় প্রতিটি চিঠির শেষেই ক্ষমাপ্রার্থনার সুরে লিখতেন—উমা, সেইজন্যেই এমাসেও তোমাদের খুব বেশি টাকা পাঠাতে পারলাম না। জানি, তোমার আর খোকার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতের মুখ চেয়ে এই কষ্ট সহ্য করো। আমি শিগগিরি দেশে ফিরব। কিন্তু যখন ফিরব তখন আর খালি হাতে ফিরব না। এমন ম্যাজিক নিয়েই ফিরব যাতে আমাকে আর কখনো পেছন ফিরে তাকাতে না হয়।
উনিশশো উনচল্লিশের শুরুতে বাবা খুব খুশি হয়ে মা-কে লিখলেন, মিউনিখের সবচেয়ে বড় হলে টানা তিনমাস শোয়ের জন্যে কন্ট্রাক্ট সই করলাম। মনে হয় এরপর শুধুই এগিয়ে যাওয়ার পালা।
বিধাতা সেই চিঠি পড়ে বোধহয় লুকিয়ে হেসেছিলেন। কারণ ঠিক তার পরে-পরেই শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
যুদ্ধের আগুনে জার্মানি জ্বলতে শুরু করল। বাবা ব্রিটিশ-ভারতের নাগরিক, হিটলারের শত্রুপক্ষ। স্বাভাবিকভাবেই নাৎসি-সরকারের রোষে পড়লেন। ম্যাজিক-শো শিকেয় উঠল। বাবাকে প্রাণ বাঁচানোর জন্যে লুকিয়ে পড়তে হল।
কোথায় লুকিয়ে ছিলেন জানেন? সেই ইম্প্রেশারিও মার্টিন জিগলারের গ্রামের বাড়িতে। উনি যে বাবাকে কী চোখে দেখেছিলেন জানি না। ছেলের মতন ভালোবাসতেন ওনাকে। এমনকী বললে বিশ্বাস করবেন না, স্টেজে ইলিউশনের ম্যাজিক দেখানোর জন্যে যেসব দামি দামি যন্ত্রপাতি, সাজ-সরঞ্জাম লাগে, তার মধ্যে অনেকগুলোই উনি নিজের সংগ্রহ থেকে বাবাকে ব্যবহারের জন্যে দিয়ে দিয়েছিলেন। এক ফ্র্যাঙ্কও ভাড়া নেননি তার জন্যে।
বুধোদা জিগ্যেস করল, এসব কথাও কি আপনার বাবা ওনার চিঠিতে লিখেছিলেন নাকি?
অবশ্যই না, বললেন প্রতাপ রক্ষিত। প্রতিটি চিঠিই তখন ওয়ার-ডিপার্টমেন্ট থেকে খুলে পড়া হত। চিঠিতে নয়। এসব কথা আমি শুনেছি মায়ের মুখে আর মা শুনেছিলেন তারাপদ মুস্তাফির মুখে।
তারাপদ মুস্তাফি কে?
তারাপদ মুস্তাফি ছিলেন বাবার সেই একমাত্র সহকারী, যাকে সঙ্গে নিয়ে বাবা বিদেশে গিয়েছিলেন। তারাপদকাকা ছিলেন বাবার চেয়েও বয়সে দশবছরের ছোট। তার মানে, ওনার বয়স ছিল তখন মাত্র আঠেরো। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড-ওয়ার শেষ হওয়ার পরে তারাপদকাকা দেশে ফিরে এসেছিলেন। ওনার আর বাবার পালিয়ে বেড়ানোর দিনগুলোর কথা তখনই মা জানতে পেরেছিলেন। বাবার মৃত্যুর কথাও।
প্রতাপবাবু একবার কথা থামিয়ে এক-চুমুকে বাকি চা-টুকু শেষ করে, কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। তারপর ভারী গলায় বললেন, বাবার মৃত্যুর পেছনেও একটা মহৎ কারণ ছিল, জানেন মিস্টার মজুমদার? সে কথা ভাবলে ছেলে হিসেবে গর্ব হয়। হয়েছিল কি, ওই গ্রামের যুবকদের মধ্যেই ছিল নাৎসি-দলের কিছু সমর্থক। তারা ধরে ফেলেছিল যে, মার্টিন জিগলার একজন রাষ্ট্রদ্রোহী। শুধু যে বাবা আর তারাপদকাকাকেই উনি লুকিয়ে রেখেছিলেন তা তো নয়। ওনার পরিচিত দুটো ইহুদি ফ্যামিলিকে ওনার ওই গ্রামের বাড়ির মাটির নীচের সেলারে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তা না হলে নাৎসিদের হাতে তারা খুন হয়ে যেত।
জিগলাররা ছিল ওই গ্রামের জমিদার। তাই বুঝতে পেরেও প্রথমদিকটায় গ্রামের ছেলেগুলো কিছু করার সাহস দেখায়নি। কিন্তু সারা জার্মানিতেই যখন ইহুদি-নিধন যজ্ঞ শুরু হয়ে গেল, তখন তাদের আর থামায় কে? তখন শাস্তির ভয় তো আর ছিলই না, উল্টে দুটো ইহুদি ফ্যামিলি আর দুজন ইন্ডিয়ানকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে পুরস্কারও মিলে যেতে পারত। ফলে যা হবার তাই হল। একদিন গভীর রাতে জিগলারের সেই খামারবাড়ির কাঠের দরজায় দুমদাম লাথি পড়ল।
সেলারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোর বুঝতে অসুবিধে হল না, কারা এসেছে। মৃত্যুভয়ে কেঁপে উঠল আটজন ইহুদি নারীপুরুষ, যার মধ্যে চারজন শিশু। বাবা, তারাপদকাকা আর ওই দুটি ইহুদি-পরিবারের আটজন ছাড়া তখন খামার-বাড়িতে আর কেউ ছিল না।
বাবা দরজায় লাথির আওয়াজ শুনে তারাপদকাকাকে বললেন, আমি দরজা খুলছি।
তারাপদকাকা বাবার হাত চেপে ধরে বললেন, তারপর? ওরা তো আমাদের সবাইকে খুন করবে।
বাবা বললেন, না, করতে পারবে না। সে দায়িত্ব আমার। ওরা অন্তত আধঘণ্টার মধ্যে এই বাড়িতে ঢুকবে না। তোমার দায়িত্ব, সেই আধঘণ্টার মধ্যে বাকি সবাইকে নিয়ে পালানো। এরকম পরিস্থিতির কথা ভেবেই মিস্টার জিগলার ওই পপলারগাছের জঙ্গলের মধ্যে ছাউনির নীচে একটা গাড়িকে রেখে গেছেন জানো নিশ্চয়?
তারাপদকাকা ভয়ার্তমুখে বললেন, জানি। কিন্তু আপনি?
একমুহূর্ত চুপ করে থেকে বাবা উত্তর দিলেন, যদি বেঁচে থাকি তোমাদের সঙ্গে পরে আবার দেখা হবে তারাপদ। এই বলে বাবা দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
দরজা খোলামাত্র বাবার মুখের ওপর একটা ঘুষি এসে পড়ল। সঙ্গে প্রশ্ন—শিগগিরি বল, নোংরা জানোয়ার জিগলারটা কোথায়?
ওরা নিশ্চয় বাবার উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করত না। নিজেরাই বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখে নিত সব। সেলারটাও তল্লাশির হাত থেকে বাদ যেত না। কিন্তু তার দরকার পড়ল না। মূল খামারবাড়ির লাগোয়া যে মালির ঘরটা ছিল, সেখান থেকে পরিষ্কার জার্মান ভাষায় মার্টিন জিগলারের উত্তর ভেসে এলো, ওকে মেরো না। ক্ষমতা থাকলে এই ঘরের ভেতর থেকে আমাকে নিয়ে যাও।
নাৎসি যুবকেরা সংখ্যায় ছিল চারজন। জিগলারের গলার আওয়াজ পাওয়ামাত্র খ্যাপা কুকুরের মতন চারজনেই দৌড়ে চলে গেল ওই ঘরটার দিকে। পেছন পেছন বাবা। ওরা যখন হাতের টর্চের আলো ফেলে ঘরের ভেতরটা দেখবার চেষ্টা করছে, তখন আরেকবার সেই ঘরের ভেতর থেকে জিগলারের গলার আওয়াজ ভেসে এলো—আঃ! আলোটা নেভাও। চোখে লাগছে।
ছেলে চারটে আর অপেক্ষা না করে লাঠি ছোরা উঁচিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঢোকার পরেই তারা একসঙ্গে দুটো জিনিস বুঝতে পারল। এক, ঘরের ভেতরে কেউ নেই। ঘরটা শূন্য। আর দুই, ওদের পেছনে মালির ঘরের ভারী দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে থেকে হ্যাচবোল্ট টেনে দেওয়ার শব্দটাও ওরা পরিষ্কার শুনতে পেল।
শব্দটা তারাপদকাকাও শুনেছিলেন। তিনি তখন সেই ইহুদি পরিবারদুটির সদস্যদের নিয়ে মাঠ ভেঙে দৌড়ে যাচ্ছিলেন পপলার-বনের দিকে। দৌড়তে দৌড়তেই শুনলেন ছেলেগুলোর ক্রুদ্ধ গালিগালাজ। দরজায় ধাক্কা মারার শব্দ। এই অবধি ঠিকই ছিল। তারাপদকাকা মনে-মনে বাবার বুদ্ধির তারিফ করছিলেন কারণ, একমাত্র তিনিই জানতেন, বাবা ছিলেন একজন অসামান্য ভেন্ট্রিলোকুইস্ট। ঠোঁট না নাড়িয়ে তিনি যে কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, সেই কথাগুলোই মালির ঘরের দিক থেকে ফিরে এসেছিল। ছেলেগুলো ভেবেছিল মার্টিন জিগলার কথা বলছেন। ভাবতেই পারেনি, আসল মার্টিন জিগলার তখন বসে আছেন সত্তর-মাইল দূরে, মিউনিখের একটা গোপন আস্তানায়।
গন্ডগোলটা হল এর ঠিক পরেই। তারাপদকাকা দেখলেন বাবা পালাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। উনি তারাপদকাকাদের সঙ্গ ধরার জন্যে দৌড়তেও শুরু করেছিলেন। কিন্তু ঠিক তখনই মালির ঘরের ভেতর থেকে একটা গুলির আওয়াজ ভেসে এল। ওই ছেলেগুলোর মধ্যে কারুর কাছে শটগান ধরনের কিছু একটা ছিল। মানুষ মারার জন্যে নয়, দরজার লকটা ভাঙবার জন্যেই নিশ্চয় সেই শটগানটা দিয়ে ওরা ভেতর থেকে গুলি চালিয়েছিল। কিন্তু এমনই কপাল, সেই গুলি লাগল সরাসরি বাবার মাথায়। তারাপদকাকার চোখের সামনে বাবা লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। উনি বাবাকে সরিয়ে আনার জন্যে সেদিকে দৌড়ে যেতে গিয়েও থেমে গেলেন। কারণ, ততক্ষণে উনি দেখতে পেয়েছেন মালির ঘরের দরজার হ্যাচবোল্ট, যেটা বাবা বাইরে থেকে টেনে দিয়েছিলেন, সেটা প্রায় খুলে এসেছে।
বাবা মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু বাবার জন্যেই সেই দুই ইহুদি পরিবার আর তারাপদকাকা সেদিন নাৎসিদের হাত এড়িয়ে পালাতে পেরেছিলেন। তারাপদকাকা দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছিলেন আরও প্রায় একবছর পরে। তার মুখেই মা বাবার মৃত্যু-সংবাদ পেয়েছিলেন। মা তার পরেও আরও অনেকবছর বেঁচেছিলেন। ভালো ছবি আঁকতেন, তাই একটা মেয়েদের স্কুলে ড্রইং টিচারের চাকরি পেয়েছিলেন। সেই চাকরির সামান্য মাইনেতেই আমাকে পড়াশোনা শিখিয়ে বড় করেছিলেন।
এই অবধি বলে প্রতাপবাবু হঠাৎই চুপ করে গেলেন। আমি আর বুধোদাও চুপ করে বসে রইলাম। আমরা দুজনেই নিশ্চয় এক অসাধারণ প্রতিভার অকালমৃত্যুর কথা ভাবছিলাম। কিছুক্ষণ পরে বুধোদা বলল, আপনি আমাকে বলেছিলেন অ্যান্টিক নিয়ে আপনার কিছু সমস্যা হচ্ছে। সেটা কীরকম যদি একটু বলেন।
প্রতাপবাবু বললেন, সমস্যাটার পেছনে যে কোনো অ্যান্টিক-গুডস থাকতে পারে এটা আমার আন্দাজ মাত্র। নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দিতে পারব না। তবে যুক্তি বলছে সেরকমই কিছু হবে।
দেখুন মিস্টার মজুমদার, আমার সন্তানাদি নেই। চারবছর আগে আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে এই পৃথিবীতে আমি একদম নিঃসঙ্গ। এদিকে বয়স হচ্ছে। ক্রমশ একটার পর একটা অসুখ মাথা চাড়া দিচ্ছে। এই অবস্থায় ওই দোতলা বাড়িটায় একা বাস করা খুবই অসুবিধাজনক। একটা বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু ঠিক দিশা পাচ্ছিলাম না। এমন সময় মাস ছয়েক আগে সুবিনয় একটা প্রস্তাব নিয়ে এল।
বুধোদা বলল, সুবিনয় নামটা আপনি আগেও দুয়েকবার বলেছিলেন। ইনি কে? আপনার বন্ধু?
হুঃ, বন্ধু! ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য মেশানো একটা মুখভঙ্গি করলেন প্রতাপবাবু। ওটা একটা লোফার, শয়তান। আমি চিরকাল শিক্ষকতা করেছি। অজস্র ছোট-ছোট ছেলেমেয়েকে কুসংস্কার আর ধর্মীয় ধাপ্পাবাজির এগেইনস্টে হাঁটতে শিখিয়েছি। আর সুবিনয়ের জীবিকাই ওই—কুসংস্কার আর ধাপ্পাবাজি ভাঙিয়ে খাওয়া।
তার মানে?
মানে ছেলেটা তান্ত্রিকের ভেখ ধরে লোক ঠকিয়ে খায়। নেহাত তারাপদকাকার নাতি, মন্টুর ছেলে, তাই সেদিন ওকে বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছিলাম। নাহলে দরজা থেকেই বলে দিতাম, তুমি আমার বাড়িতে ঢুকো না।
বুধোদা বলল, ও! সুবিনয়বাবু তাহলে তারাপদ মুস্তাফির নাতি? সুবিনয় মুস্তাফি? ঠিক ঠিক। যাতায়াতের পথে হাতিবাগানের মোড়ে ওনার ছবিওলা একটা ব্যানার দেখেছি—ঘাড় অবধি বাবরি চুল, লাল আলখাল্লা, কপালে রক্তচন্দনের তিলক। নামের আগে তন্ত্রাচার্য না কি যেন একটা উপাধিও লাগানো আছে, তাই না?
একদম ঠিক। উনিই সেই অবতার। বললেন প্রতাপ রক্ষিত।
বুধোদা জিগ্যেস করল, ব্যবসাটা কি বংশগত?
প্রবলবেগে দু-হাত নেড়ে আপত্তি জানালেন প্রতাপবাবু। বললেন, একেবারেই না। তারাপদকাকা ভারতে ফিরে এসে ম্যাজিককেই জীবিকা করে নিয়েছিলেন। সারা জীবন মেলায় আর ছোটখাটো অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখিয়েই কাটিয়েছেন। তেমন বড় ম্যাজিশিয়ান হতে পারেননি, কারণ ওনার মধ্যে সেই প্রতিভা ছিল না। কিন্তু মানুষটা ছিলেন আদ্যোপান্ত সৎ। প্রত্যেক শোয়ের আগে মাইকে ঘোষণা করে দিতেন—এখন যে খেলাগুলো আপনারা দেখতে চলেছেন, সেগুলো হয় হাতসাফাইয়ের নয় যন্ত্রপাতির কৌশল। এগুলোর মধ্যে অলৌকিক কিছুই নেই।
আমিও ছোটবেলায় ওনার অনেক শো দেখেছি। খুব ভালোবাসতেন আমাকে। মা-এর স্ট্রাগল-এর দিনগুলোতে তারাপদকাকাই ছিলেন মায়ের সবচেয়ে বড় সহায়।
তারাপদকাকার ছেলে সমীরণ, মানে মন্টু ছিল আমার ছোটবেলার খেলার সঙ্গী। ছোটবেলাই বা বলি কেন? যতদিন ও বেঁচেছিল ততদিনই আমাদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল। মন্টু তারাপদকাকার কাছেই ম্যাজিক শিখেছিল কিন্তু সেটাকে প্রফেশন হিসেবে নেয়নি। ও পড়াশোনায় ভালো ছিল। বেশ কমবয়সেই চাকরির পরীক্ষা দিয়ে ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে গিয়েছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, মন্টু মাত্র পঞ্চান্ন বছর বয়সে একটা বাস-অ্যাকসিডেন্টে মারা গেল। এই সুবিনয়ের বয়স তখন পঁচিশ। একেবারেই অকর্মা ভ্যাগাবন্ড। হায়ারসেকেন্ডারিটা অবধি পাশ করতে পারেনি। বাবার কাছে কিছু বেসিক হাতসাফাইয়ের খেলা শিখেছিল। কিন্তু সেগুলোকে ও চুরি-চামারি করতে কাজে লাগাত।
কীরকম? বুধোদা দেখলাম প্রতাপবাবুর গল্পে বেশ ইন্টারেস্ট পেয়ে গেছে। আমিও পাইনি বললে মিথ্যে বলা হবে।
প্রতাপবাবু আমাদের উৎসাহ দেখে খুশি হলেন। বললেন, ধরুন ও কোনো সরল কিন্তু লোভি লোককে পাকড়াও করে তাকে পকেটের টাকা ডবল করে দেখাল। বাবুঘাটের বাস-স্ট্যান্ডে যেখান থেকে উড়িষ্যা-বিহারের বাসগুলো ছাড়ে, সেখানে আজও আপনি ওরকম লোকেদের দেখা পাবেন। ওইসব জায়গাগুলোই ছিল সুবিনয়ের অপারেশনের ঘাঁটি। আপনার তো ম্যাজিক নিয়ে পড়াশোনা আছে। বুঝতেই পারছেন, সত্যিকারে কোনো টাকাই ডবল হত না। যেটা হত, সুবিনয়ের হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখা টাকা মিশে যেত সেই বোকা লোকটির টাকার সঙ্গে। এইভাবে লোকটাকে ইমপ্রেস করে, তারপর ও একটা বড়সড় অঙ্কের টাকা তার কাছ থেকে ডবল করবে বলে চেয়ে নিত।
এবং চোখের পলকে ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতেন, তাই তো?
একদম ঠিক। তারপর ধরুন কোনো দোকানের শোকেস থেকে দামি জিনিস উঠিয়ে নেওয়া—যাকে বলে 'শপ-লিফটিং'। সেই ধরনের চুরিতেও ওর বাবার কাছ থেকে শেখা কনজিওরিং-এর ট্রিকগুলো কাজে লাগত।
তবে পুলিশের নজর এড়িয়ে এসব দুষ্কর্ম তো বেশিদিন চালানো যায় না। চল্লিশ বছর বয়স হবার আগেই সুবিনয় বারতিনেক জেল খেটে এল। ওইসময়েই ও আমাদের পাড়া থেকে পাত্তাড়ি গুটিয়েছিল। তারাপদকাকার বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে কোথায় যে চলে গেল, বেশ কয়েকবছর জানতেও পারিনি। তারপর ঠিক তিনদিন আগে, মানে গত পাঁচই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎ করেই সুবিনয় আমার বাড়িতে এল। দেখলাম শুঁয়োপোকা ভোল পালটে প্রজাপতি হয়ে গিয়েছে।
'বাড়িতে এল' বলাটা অন্যায় হচ্ছে। বলা উচিত 'বাড়িতে পদার্পণ করল'।
এমন বিশাল একটা গাড়িতে চেপে সুবিনয় এল, যেটা আমাদের গলিতে ঢুকতেই পারল না, গলির মুখে দাঁড়িয়ে রইল। সুবিনয়ের গায়ে লাল সিল্কের আলখাল্লা, গলায় মোটা সোনার চেন। দশ আঙুলে পনেরোটা আংটি। চারটি মস্তান ওকে চারদিক দিয়ে আগলে নিয়ে আমার বসার ঘর অবধি পৌঁছে দিয়ে গেল। তারপরেও তারা চলে গেল না। দরজার বাইরে শিকারি কুকুরের মতন খাপ পেতে বসে রইল। সুবিনয়ের যে এত সিকিউরিটির প্রয়োজনটা হয় কিসে সেটা তখন বুঝতে পারিনি। পরে বুঝেছি।
যাই হোক, আমার বন্ধুপুত্র একটা হাত কোনোরকমে কপালে ছুঁইয়ে আমাকে নমস্কার করল। তারপর কিছুক্ষণ একথা-সেকথার পর বলল, কাকাবাবু, ঘরদোরের চেহারা দেখে বুঝতে পারছি, কষ্টের মধ্যে আছেন। এক কাজ করুন, এই বাড়িটা আমাকে বিক্রি করে দিন। এরকম একটা দোতলা বাড়ি মেইনটেইন করারও তো খরচ আছে। যা দাম আপনাকে দেব তাতে আপনি খুব ভালো লোকালিটিতে একটা ফ্ল্যাট তো কিনতে পারবেনই, তারপরেও আপনার হাতে আরও অনেকগুলো টাকা থেকে যাবে।
স্বাভাবিকভাবেই যে-প্রশ্নটা মনে এল সেটাই ওকে করলাম। বললাম, সুবিনয়, তোমার যদি ছোটবেলার পাড়ায় ফিরে আসতেই মন চায় তাহলে তোমার নিজের পুরোনো বাড়িটাই আবার কিনে নিচ্ছ না কেন?
সুবিনয় একটু থতমত খেয়ে বলল, ওদের পুরোনো বাড়িটা বড্ড ছোট। তাছাড়া বাস্তুশাস্ত্র মতে আমার বাড়িটাই নাকি ওর তন্ত্র-সাধনার পক্ষে উপযুক্ত।
সত্যিকথাই বলছি মিস্টার মজুমদার, সুবিনয়ের প্রস্তাবটা আমার বেশ মনে ধরেছিল। সত্যিই, দাদুর আমলের বাড়িটার পেছনে আমার রেগুলার অনেক টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া অতবড় বাড়িটায় আমার স্ত্রীয়ের স্মৃতি জড়িয়ে একা-একা পড়ে থাকার একটা মানসিক কষ্টও যে রয়েছে, সেটাতো বোঝেন। তাই আমি ওর প্রস্তাবে প্রায় রাজিই হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরেই ও যে কথাটা বলল, সেটা চমকে যাওয়ার মতন। ও বলল, কাকাবাবু, বাড়িটা কিন্তু আমি কিনবো সমস্ত পুরোনো ফার্নিচার আর অন্যান্য পুরোনো জিনিসপত্র সমেত। আপনি জামাকাপড়, গয়নাগাটি আর কাগজপত্র নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু আর কিছু না।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছি দেখে ও তাড়াহুড়ো করে বলল, তার জন্যে নিশ্চয় আমি আপনাকে আলাদা দাম দেব। যা বাজারদর তার থেকে বেশিই দেব। আপনি ঠকবেন না।
আমি ওকে বেশ কয়েকবার জিগ্যেস করলাম, এরকম অদ্ভুত ইচ্ছের কারণটা কী। এমন কী রয়েছে আমার সস্তা আর ভাঙাচোরা জিনিসপত্রের মধ্যে যাতে ও সেগুলো অত দাম দিয়ে কিনতে চাইছে? সুবিনয় স্পষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে আবার সেই বাস্তুশাস্ত্র আর হাবিজাবি নিয়ে পড়ল। বাড়িটাকে নাকি বদলানো চলবে না। ও বলল, উনিশে সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার শুভদিন আছে। সেদিনই ও বিক্রির কাগজে সই করাতে আসবে। আমাকে টাকাপয়সা দিয়ে বাড়ির দলিলটাও সেদিনই নিয়ে যাবে।
বুধোদা কিছুক্ষণ দুই-হাতের মধ্যে থুতনি রেখে কী যেন চিন্তা করল। তারপর বলল, আপনি আমাকে কী করতে বলছেন মিস্টার রক্ষিত?
প্রতাপবাবু একটু সঙ্কোচের সঙ্গে বললেন, যেটা করতে অনুরোধ করছি, সেটা আপনাকে বলা মানায় কিনা জানি না। কিন্তু আমার আর কোনো উপায় নেই। দেখুন, সুবিনয়ের কথাবার্তা শুনে আমার সন্দেহ হচ্ছে, আমার বাড়িতে এমন কিছু জিনিস রয়েছে যেটা খুব দামি। তা না হলে সুবিনয় অমন প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে আসত না।
বুধোদা বলল, তা নাও হতে পারে। সত্যিই হয়তো এটা সুবিনয়বাবুর একটা খেয়াল। অযোগ্য লোকের হাতে হঠাৎ পয়সা এসে গেলে তাদের মাথায় এরকম নানান বদখেয়াল চাপে।
প্রতাপবাবু বললেন, কিন্তু বাস্তু-টাস্তু টাইপের কোনো কুসংস্কারের ব্যাপার হলে কি আর কাগজপত্র গয়নাগাটির মতন জিনিসগুলোকে ছাড় দিত? বলত, সবকিছুই রেখে যান।
বুধোদা একটু চিন্তা করে বলল, সেটা ঠিক।
আমি আর থাকতে না পেরে জিগ্যেস করলাম, আচ্ছা বুধোদা, একটা কথা বলো তো। যে জিনিসের কথা প্রতাপদাদু জানেন না, সে জিনিসের কথা সুবিনয়বাবু কেমন করে জানবেন?
বুধোদা বলল, এটার একটাই ব্যাখ্যা হয়। সুবিনয় মুস্তাফি জেনেছেন তার দাদু, মানে তারাপদ মুস্তাফির কাছ থেকে। দাদুর মুখের কথায় নয়, তার কোনো লেখা থেকে। হয়তো তারাপদ মুস্তাফির ডায়েরি খুঁজে পেয়েছেন। পেয়েছেন রিসেন্টলি, সেইজন্যেই কাজে নামতে এতদিন সময় লেগে গেল।
আমি বললাম, আরেকটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকছে না। যদি সুবিনয়বাবু জেনেই থাকেন প্রতাপদাদুর বাড়িতে সেরকম দুর্মূল্য কোনো জিনিস রয়েছে, তাহলে সরাসরি সেটুকুই কিনতে চাইছেন না কেন? একটা জিনিসের জন্যে পুরো বাড়িটাই কিনতে চাওয়া একটু বাড়াবাড়ি নয়?
বুধোদা বলল, জিনিসটা যে ওনার হস্তগত হয়েছে, মুস্তাফিমশাই সেটা সারা দুনিয়াকে জানাতে চান না। আর তার প্রথম স্টেপ হচ্ছে স্বয়ং মালিক, মানে প্রতাপবাবুকেই জিনিসটার পরিচয় বুঝতে না দেওয়া। অ্যান্টিকের ব্যবসায় এটা খুব কমন প্র্যাকটিশ। একটা জিনিস অধিকার করে তারপর চুপচাপ বসে থাকা। জিনিসটার সম্বন্ধে মানুষের আগ্রহ বাড়তে বাড়তে আকাশ ছুঁলে তখন সেটাকে বিক্রির জন্যে বার করা। পুরোনো পেইন্টিং-এর ক্ষেত্রে এটা প্রায়ই হয়। তুই জানিস ভ্যান গগের একটা পেইন্টিং রয়েছে। ভালো অবস্থাতেই রয়েছে। কিন্তু কার কাছে রয়েছে তুই অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারবি না, যতক্ষণ না ওয়ান-ফাইন-মর্নিং ক্রিস্টি কিম্বা সদবীর নিলামখানায় সেই ছবিটা নিলামে উঠছে।
প্রতাপবাবু যেভাবে খুশি-খুশি মুখে ঘাড় নাড়ছিলেন, তাতে বুঝতে পারলাম, বুধোদার ব্যাখ্যাগুলো ওনার বেশ মনঃপুত হয়েছে।
বুধোদা হঠাৎ প্রতাপবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, আপনার বাড়িতে সেরকম কোনো পুরোনো জিনিস রয়েছে কি, যার একটা অ্যান্টিক-ভ্যালু থাকতে পারে?
একশো বছরের পুরোনো বাড়ি। কিছু পুরোনো জিনিস তো থাকবেই। তবে সোনা হিরে আইভরির মতন কিছুই নেই। আমার পূর্বপুরুষেরাও অত্যন্ত সাধারণ লোক ছিলেন।
বুধোদা বলল, তা হোক। যা আছে আপনি এক-এক করে সেগুলোর নাম বলে যান, আমি শুনি। রুবিক, তুইও মন দিয়ে শোন।
প্রতাপবাবু একটু চোখ বুজে ভাবলেন। তারপর বললেন, কয়েকটা জিনিস রয়েছে যেগুলোকে বলা যায় আমার দাদুর স্মৃতিচিহ্ন—একটা ভাঙা এসরাজ আর একটা গড়গড়া। পকেটঘড়ি। ফাউন্টেন পেন। ঠাকুমার কিছু সোনার গয়না...কিন্তু না। সুবিনয় তো গয়না নিতে চায়নি। আচ্ছা যে-জিনিসগুলোর কথা বললাম, সেগুলোর কি কোনো অ্যান্টিক ভ্যালু রয়েছে মিস্টার মজুমদার?
রয়েছে, তবে খুবই সামান্য। ওর জন্যে সুবিনয় মুস্তাফি আপনার বাড়ি কিনতে চাইবে না।
বাবার কথা তো আপনাকে বললামই। যে মানুষটা মাত্র আঠাশ বছর বয়সে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন, আর ফিরতে পারেননি, সংসারে তার আর ক'টা জিনিস থাকবে? একটা খাট, আলনা, আর একটা কাঠের আলমারি। একটা ফিলিপস কোম্পানির রেডিয়ো রয়েছে, খোদ হল্যান্ডে তৈরি। এখনো দিব্যি গান শোনা যায়। এসব জিনিস আমি জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখছি।
আর কিছু?
প্রতাপবাবু একটু চিন্তা করে বললেন, ও হ্যাঁ। জার্মানি যাওয়ার সময় ম্যাজিক দেখানোর যে-সরঞ্জামগুলো বাবা নিয়ে যাননি, সেগুলো একটা বড় ট্রাঙ্কের মধ্যে রাখা আছে। মায়ের ভয়ঙ্কর আপত্তি ছিল ওগুলোতে হাত দেওয়ার ব্যাপারে। আসলে মায়ের ধারণা ছিল, বাবার অকালমৃত্যুর জন্যে দায়ী ওই ম্যাজিক। কাজেই আমাকে যথাসাধ্য ম্যাজিকের সঙ্গে যোগ রয়েছে এরকম সবকিছুর থেকে মা আড়াল করে রাখতেন। এমনকী তারাপদকাকাকেও বারণ করে দিয়েছিলেন বাবার ম্যাজিক নিয়ে কোনো কথা আমার সামনে যেন না বলেন। আমি মায়ের ইচ্ছে মেনে নিয়েছিলাম। কখনো ম্যাজিক দেখাইনি, তাই ওসব জিনিস ব্যবহারও করিনি। তবে বাক্সটায় কী-কী রয়েছে জানি। তাসের প্যাকেট, সিল্কের রুমাল, প্রমাণ-সাইজের লুডোর ছক্কা, ফেদার-ডাস্টার। কিছু পুরোনো রুপোর কয়েন রয়েছে। ম্যাজিক দেখাতেই কাজে লাগত নিশ্চয়।
বুধোদা বলল, শুনে তো মনে হচ্ছে না এগুলোর মধ্যেও কোনো অ্যান্টিক থাকতে পারে। আচ্ছা, আপনার বাবার লেখা কোনো ডায়েরি কিম্বা চিঠিপত্র আছে কি, যেগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো অজানা কনস্পিরেসির ওপর আলো ফেলতে পারে?
প্রতাপবাবু বললেন, কিছু চিঠির কথা তো আপনাকে আগেই বলেছিলাম। তবে প্রথমত চিঠিগুলো নিতান্তই ঘরোয়া—একজন স্ত্রীকে লেখা তার প্রবাসী স্বামীর চিঠি। আর দ্বিতীয়ত, সুবিনয় কিন্তু কাগজপত্র চায়নি। গয়নাগাটিও নয়। চিঠি বা ডায়েরি তো আমি নিয়েই যেতে পারি।
আর আপনার কেনা জিনিসপত্রের মধ্যে সেরকম কিছু...?
প্রতাপবাবু শুকনোমুখে বললেন, একজন সামান্য স্কুলমাস্টারের কেনা সস্তার টিভি, বেতের চেয়ার, কাচের ফুলদানি বা পাখির খাঁচার কী-ই বা অ্যান্টিক-ভ্যালু থাকতে পারে বলুন। না মিস্টার মজুমদার, আমি নিশ্চিত, ওগুলোর জন্যে সুবিনয় আমার বাড়িতে হানা দেয়নি।
বুধোদা সোফা ছেড়ে উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ওখান থেকেই প্রতাপবাবুর উদ্দেশে বলল, সুবিনয় মুস্তাফি আপনার বাড়িতে এসেছিলেন পাঁচই সেপ্টেম্বর। উনি আবার আসবেন উনিশে সেপ্টেম্বর। মিস্টার রক্ষিত! সোম থেকে শনি আমার প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে কাটে। আমি যদি সামনের রবিবার মানে পনেরোই সেপ্টেম্বর বিকেলের দিকে একবার আপনার বাড়িতে যাই, আপত্তি আছে?
না-না, কী যে বলেন! আপত্তি থাকবে কেন? আপনি আমার উপকার করতেই আসছেন তো। আপনি আসবেন, একশোবার আসবেন। রুবিকভাইকেও সঙ্গে নিয়ে আসবেন। আমি সাধারণত বাড়ি থেকে বেরোই-টেরোই না। তবু কাছাকাছি এসে একটা ফোন করে দেবেন। আমার ঠিকানাটা...।
রুবিক, ওনার ঠিকানাটা তোর মোবাইলে সেভ করে রাখ। আর আমার গাড়িটা নিয়ে ওনাকে একটু উত্তরপাড়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আয়।
আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। বুধোদা পেছন থেকে প্রতাপবাবুকে ডেকে বলল, মিস্টার রক্ষিত, আপনি একা থাকেন। যদি দেখেন সুবিনয় মুস্তাফির চ্যালাচামুন্ডারা আপনার কোনো অসুবিধে সৃষ্টি করছে তাহলে আমাকে একবার ফোন করবেন। বড়বাজার থানার ওসি সুজন সরকারের সঙ্গে আমার খুব ভালো আলাপ রয়েছে। আমি ওদের থামানোর ব্যবস্থা করব।
হঠাৎ করেই প্রতাপদাদু এতক্ষণের 'আপনি-আজ্ঞে' ভুলে বুধোদার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন, বেঁচে থাকো বাবা। আমি বুঝতে পারছি, তুমি যা করছ এই অসহায় বৃদ্ধের মুখ চেয়েই করছ। না-হলে তোমার কী দায় পড়েছিল বলো। বেঁচে থাকো।
উনি চশমা খুলে পাঞ্জাবির খুঁটে চোখ মুছছিলেন। বুধোদা শান্তগলায় বলল, দায় একটা আছে বইকি মিস্টার রক্ষিত। একজন বিস্মৃত শিল্পীর প্রতি, একজন বড় মাপের মানুষের প্রতি উত্তরসূরীর দায়। সামনের রবিবার আমি তো শুধু আপনার বাড়িই যাচ্ছি না। যাচ্ছি প্রিন্স রাজনের বাড়ি।
হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে চুয়াল্লিশ-নম্বর বাসটা মহাত্মা গান্ধী রোডের মুখে ঢুকতে না ঢুকতেই বুধোদা তাড়াহুড়ো করে নেমে পড়ল। অগত্যা পেছন পেছন আমিও নামলাম। বাসটা চলছিল, তবে শামুকের চেয়ে একটু আস্তে; তাই নামতে অসুবিধে হয়নি।
পেছন থেকে ডাক দিয়ে বুধোদাকে জিগ্যেস করলাম, কী হল? প্রতাপদাদুর বাড়ি তো নাখোদা মসজিদের কাছাকাছি। তাহলে চিৎপুরের মোড়ে নামলেই তো ভালো হত।
বুধোদা গম্ভীরমুখে বলল, কয়েকটা জরুরি জিনিস কিনতে হবে। সেগুলো আবার এখানে ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। এই বলে প্রথমে দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে পাঁচশোগ্রাম মিহিদানা সীতাভোগ কিনল। তারপর রাস্তা পেরিয়ে উলটোদিকের ফুটপাথে যাদব-ব্রাদার্স থেকে লম্বা প্যাঁড়া কিনল সাড়ে-সাতশো।
মিষ্টির প্যাকেটগুলো আমার ব্যাকপ্যাকের মধ্যে ঢোকাতে ঢোকাতে বুধোদা বলল, বাবার মুখে শুনেছি, প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় বাবাকে প্রায়ই দাদুর জন্যে এইদুটো মিষ্টি কিনে নিয়ে যেতে হত। দাদুও নাকি তাঁর ছাত্র-অবস্থাতেই মিহিদানা আর লম্বা প্যাঁড়ার প্রেমে পড়েছিলেন। তাহলেই ভেবে দ্যাখ, দোকানগুলোর বয়স কত।
এই বলে বুধোদা একটা প্যাঁড়া আমার মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে আরেকটা নিজের গালে চালান করে দিয়ে বলল, এত বছরেও না বদলেছে দোকানগুলোর চেহারা না বদলেছে মিষ্টির স্বাদ।
ক্ষীর, পেস্তাকুচি আর এলাচ-গুঁড়োর স্বাদে ভরপুর প্যাঁড়া চিবোতে- চিবোতে বললাম, তাহলে এগুলোও অ্যান্টিক, বলো বুধোদা।
আলবাৎ। উল্টোদিক থেকে ছুটে-আসা একটা ঝাঁকামুটেকে অদ্ভুত কায়দায় ডজ করে বুধোদা বলল, ভেবে দেখতে গেলে বড়বাজার জায়গাটা নিজেই একটা আস্ত অ্যান্টিক। তুই দুদিকের বাড়িঘরগুলো একটু খেয়াল করে দ্যাখ। কোনোটাই কি একশোবছরের কম পুরোনো বলে মনে হচ্ছে? জানলার মাথায় আর্চ, বারান্দায় রট আয়রনের রেলিং, দেয়ালে পঙ্খের কারুকাজ আর খড়খড়ি-বসানো কাঠের জানলা—এসব সৌন্দর্য কি আর এখনকার বাড়িঘরে খুঁজে পাবি? এমনকী...একটু সরে আয়, নাহলে ট্রামের ধাক্কা খাবি...এমনকী বাড়িগুলোর গায়ে যে ভাঙাচোরা টিনের সাইনবোর্ডগুলো দেখছিস, খুঁজলে ওর মধ্যেও বেশ কয়েকটার গায়ে ইতিহাসের গন্ধ পাবি। চোঙাওলা গ্রামাফোন আর ইকমিক কুকারের বিজ্ঞাপন তো আমি নিজেই এখানকার বাড়ির দেয়ালে ঝুলতে দেখেছি।
কথা বলতে বলতে আমরা দুজনে মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে চিৎপুরের মোড়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম। এবার ডানদিকে বাঁক নিয়ে চিৎপুর রোড মানে রবীন্দ্র সরণি ধরে নাখোদা মসজিদের দিকে এগোলাম। রবিবারের দুপুর, তাই তবুও একটু মানুষের মতন হাঁটতে পারছিলাম। অফিসের দিনে এসব জায়গায় পেছন থেকে গোঁত্তা আর সামনে থেকে ধাক্কা না খেয়ে দু-পাও হাঁটা যায় না।
তাহের আলি লেনে পৌঁছনোর মধ্যে বুধোদা মাত্র একবারই থেমেছিল। চিৎপুর রোডের সারিসারি আতরের দোকানগুলোর মধ্যে যেটা সবচেয়ে বড় আর পুরোনো সেটার সামনে। বুধোদাকে দেখে মেহেদিরঙে দাড়ি ছোপানো মালিক যেভাবে তড়িঘড়ি গদি ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তাতে বুঝলাম বুধোদার সঙ্গে ওনার বেশ খাতির রয়েছে। ওনার সঙ্গে ফিসফিস করে কিছু কথাবার্তা সেরে নিয়ে বুধোদা আবার হাঁটতে শুরু করল। নিজের মনেই বলল, শুনলে অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু এই তোজাম্মেলভাইয়ের কাছে এখনো নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের আমলের কয়েক শিশি আতর রয়ে গেছে। ওর পূর্বপুরুষেরাই মেটিয়াবুরুজে নবাবকে আতর সাপ্লাই দিত কিনা।
জিগ্যেস করলাম, সেই আতরও নিশ্চয় অ্যান্টিক?
বুধোদা বলল, অবশ্যই। আতরের কথা বাদ দে। বেলজিয়ান-ক্রিস্টালে তৈরি আতরের শিশিগুলোরই এক-একটার দাম এখন লাখ টাকার ওপর।
হাওড়া থেকে বাসে ওঠার সময়েই প্রতাপবাবুকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, আমরা আসছি। উনি দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন। আমাদের আসতে দেখে নীচে নেমে সদর দরজা খুলে দিলেন এবং ভারি যত্ন করে ঘরদোর ঘুরিয়ে দেখালেন।
বাড়িটা দোতলা হলেও একটু সরু-টাইপের। তাই ঘর বেশি নেই। ওপরে দুটো আর নীচে একটা—মোট তিনটে। নীচে একটা ঘর কম হওয়ার কারণ, ওখান থেকেই বাথরুম আর রান্নাঘরের জায়গা বার করতে হয়েছে। প্রতাপদাদু বললেন, দোতলার ঘরদুটো ব্যবহার করে না। হাঁটুর ব্যথা নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। খাওয়া-শোওয়া, লোকজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করা—সবকিছুই ওই একতলার ঘরটায়।
একতলার ঘরটা বেশ বড়। আসবাবপত্র দেখে বুঝলাম, ওটাই একসঙ্গে ওনার স্টাডি, ড্রইংরুম এবং বেডরুম। ওই ঘরেই বইয়ের আলমারি, ওই ঘরেই অতিথিদের বসার জন্যে সস্তার সোফাসেট আবার ওই ঘরেই রয়েছে একটা বড় খাট, আলনা এবং কাঠের আলমারি।
আমরা সোফাসেটে বসলাম। ওনার কাজের মাসি চা দিয়ে গেলেন। সঙ্গে অত্যন্ত মুখরোচক গাঠিয়া আর ধোকলা, যেগুলো মুখে দিয়েই বুধোদা বলল, কটন স্ট্রিটের গুজরাটি খাবারের দোকানের প্রোডাক্ট। প্রতাপদাদুর মুখের হতভম্ব হাসিটা দেখে বুঝলাম, বুধোদা ভুল বলেনি।
চা খাওয়া শেষ হলে বুধোদা ভারি মন দিয়ে এবং অনেক সময় নিয়ে একটা একটা করে পুরো বাড়ির সমস্ত জিনিস খুঁটিয়ে দেখল। প্রতাপবাবুর দাদুর গড়গড়া থেকে ওনার বাবার ম্যাজিকের বাক্স অবধি সবকিছু। তারপর দেখল ওনার বাবার আমলের ফার্নিচারগুলো—ওই খাট, আলনা, আর কাঠের আলমারিটা। বুধোদা খাটের গদি তুলে, আলনার নীচের ডালা সরিয়ে, আলমারির ডবল-পাল্লা খুলে তন্ন তন্ন করে সব দেখল। সবই খুব সাদামাটা জিনিস। না আছে কোনো কারুকার্য, না আছে পালিশের বাহার। আলমারিটার ভেতরে তাক অবধি নেই। যেন একটা লম্বা বাক্সকে মাটির ওপরে খাড়া করে রাখা হয়েছে। তার মধ্যেই প্রতাপদাদুর অল্প কিছু জামাকাপড় রাখা আছে। তবে জিনিসগুলো শক্তপোক্ত নিশ্চয়ই। না-হলে এতদিন ধরে প্রতাপবাবু ব্যবহার করছেন কেমন করে?
বুধোদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, নাঃ। বুঝলাম না, এসব নিয়ে তন্ত্রাচার্যের কোন উপকারটা হবে। আপনার বাড়িতে গোপন কুঠুরির মধ্যে গুপ্তধন-টন নেই আশা করি। অবশ্য তা যদি থাকতও, তাহলে তো শুধু বাড়িটুকু কিনলেই সুবিনয় মুস্তাফি সেটা পেয়ে যেতেন।
প্রতাপবাবু বললেন, যাই হোক। তোমার মতন একজন এক্সপার্ট সবকিছু দেখে গেল, এবার আমি নিশ্চিন্ত। সামনের বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলায় সুবিনয় আসছে। ওর সঙ্গে কথাবার্তা পাকা করে ফেলব তাহলে।
বুধোদা বলল, তাই করুন। নতুন বাড়িতে সেটল করার পর একবার ফোন করবেন। আমরা গিয়ে আপনার বাবার সম্বন্ধে আরো গল্প শুনে আসব। আজ আসি।
একমিনিট। প্রতাপদাদু কর্নার-টেবল থেকে একটা শক্তপোক্ত পীজবোর্ডের বাক্স এনে বুধোদার হাতে ধরিয়ে দিলেন। বললেন, তুমি আমার জন্যে যা করলে তার জন্যে একটা দক্ষিণা তো তোমার পাওনা হয়। এটা রাখো।
বুধোদা বাক্সটা হাতে নিয়ে বলল, এটা কী?
দ্যাখো না। খুলে দ্যাখো।
বুধোদা প্যাকেটটা খুলতেই বেরিয়ে এল একটা স্টিলের হাতকড়া, যাকে ইংরিজিতে বলা হয় হ্যান্ডকাফ। একটা মোটা লোহার চেনের দুদিকে দুটো কড়া লাগানো। প্রত্যেকটা কড়ার কব্জার গায়ে চাবির ফুটো দেখলে বোঝা যায়, কব্জা খুলে হাতের মধ্যে কড়াটা পরিয়ে চাবি এঁটে দিলে আর ওই কড়া হাত থেকে খুলবার উপায় থাকবে না।
বুধোদা আর আমি দুজনেই অবাক হয়ে হাতকড়াটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখছিলাম। ভালোমতন বুঝতে না পেরে বুধোদা চোখে প্রশ্ন নিয়ে প্রতাপদাদুর মুখের দিকে তাকাল। প্রতাপদাদু বললেন, ঠিকই করে রেখেছিলাম, বাবার ম্যাজিক দেখানোর উপকরণগুলোর মধ্যে থেকে তোমাকে একটা কিছু দেব। কিন্তু তাস, রুমাল কিম্বা পালকের ঝাড়নগুলোর অবস্থা তো নিজের চোখেই দেখলে। ওগুলো কি আর কাউকে দেবার মতন অবস্থায় রয়েছে? এটা নেহাত স্টিলের তৈরি, তাই এতদিনেও টসকায়নি।
এটা দিয়ে উনি ম্যাজিক দেখাতেন?
হ্যাঁ, বাবার একটা বিখ্যাত খেলা ছিল এই হাতকড়ার বাঁধন থেকে মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে মুক্ত করে বেরিয়ে আসা। কেমন করে করতেন জানি না, কিন্তু শুনেছি, এই হাতকড়া দিয়ে দর্শকরাই ওনার হাতদুটো একটা থামের সঙ্গে বেঁধে দিত। বলাই বাহুল্য, চাবিটাও দর্শকদের কাছেই থেকে যেত। তার আগে বাবার সারা শরীর সার্চ করে দেখে নেওয়া হত, কোথাও লুকোনো চাবি-টাবি রয়েছে কিনা। তারপর বাবাকে একটা সাধারণ পর্দা দিয়ে ঢেকে দেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই বাবা পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসতেন। হাতের হাতকড়া তখন আর ওনার হাতে নেই। তুমি ম্যাজিক ভালোবাসো, ম্যাজিশিয়ানদের শ্রদ্ধা করো। তোমার কাছে নিশ্চয় এর একটা মূল্য থাকবে।
বুধোদাকে এরকম বিহ্বল হয়ে পড়তে কমই দেখেছি। হাতকড়াটাকে একবার কপালে ছুঁইয়ে আবার বাক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। তারপর আর একটাও কথা না বলে নেমে গেল রাস্তায়।
ভেবেছিলাম, প্রতাপরঞ্জন রক্ষিতের কাহিনি এখানেই শেষ হয়ে গেল। একজন বৃদ্ধের মনে কিছু সংশয় দেখা দিয়েছিল। বুধোদা সেই সংশয় কাটিয়ে দিয়ে এসেছে। বুঝিনি, কাহিনির শেষ নয়, একটা পরিচ্ছেদ কেবল শেষ হল। পরের পরিচ্ছেদের পাতা উলটোবে আর ঠিক পাঁচমিনিট বাদে—আমি আর বুধোদা তাহের আলি লেন থেকে যে-মুহূর্তে আবার চিৎপুর রোডে পা দেব।
তাহের আলি লেন আর চিৎপুর রোডের জংশনে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন স্বয়ং সুবিনয় মুস্তাফি—তন্ত্রাচার্য। গাড়িটা প্রথমে দেখতে পাইনি, একটু দূরে পার্ক করানো ছিল। এমনকী উনিই যে সুবিনয় মুস্তাফি, নিজে থেকে এগিয়ে এসে পরিচয় না দিলে সেটাও বুঝতে পারতাম না। কারণ, ওনার পরনে সেদিন মোটেই রক্তাম্বর-টক্তাম্বর ছিল না। একটা সাদা সাফারি-স্যুট পরেছিলেন আর চোখে ছিল ধোঁয়াটে সানগ্লাস। তবে ঘাড় অবধি বাবরি চুল, গলার সোনার চেন আর হাতের আংটি-টাংটিগুলো প্রতাপদাদুর ডেসক্রিপশনের সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। ভদ্রলোক এগিয়ে এসে দু-হাত জোড় করে বুধোদাকে নমস্কার করে বললেন, নমস্কার মিস্টার মজুমদার। অধমের নাম সুবিনয় মুস্তাফি। আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল। সময় হবে?
বুধোদা ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল, আমাকে চিনলেন কেমন করে?
ভদ্রলোক বললেন, গত রবিবার আমার একটি কর্মচারী প্রতাপরঞ্জনবাবুর পেছন-পেছন আপনার উত্তরপাড়ার বাড়ি অবধি পৌঁছে গিয়েছিল। আপনি বিখ্যাত মানুষ, তাই আপনার পরিচয় জানাটা তার পক্ষে তেমন কঠিন হয়নি।
আমি তো কোন ছাড়, বুধোদা অবধি লোকটার স্পর্ধা দেখে একটু থমকে গেল। আমি বুধোদার সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে গত কয়েকবছরে বহু ক্রিমিনাল দেখেছি। খুনজখমও কম দেখিনি। কিন্তু আজ কলকাতার আলো ঝলমলে, ভিড়ে ঠাসা রাস্তায় এই সুবিনয় নামের ছোটোখাটো চেহারার লোকটাকে দেখে আর তার কথা শুনে মনের মধ্যে এমন একটা ভয় ছড়িয়ে পড়ছিল, যেমনটা আমার আগে কখনো হয়নি। অবশ্য আতঙ্ক জিনিসটা সবসময় আকার-আকৃতি থেকে আসে না। একটা ছোট মাকড়শা দেখলেও তো তার বিষের কথা ভেবে ভয় করে। বুঝতে পারছিলাম, আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে-থাকা এই লোকটা মাকড়শার মতনই বিষাক্ত এবং বিপজ্জনক।
বুধোদা কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে মুস্তাফির মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে নজর নামিয়ে আনল রিস্টওয়াচের দিকে। তারপর আবার ওনার দিকে তাকিয়ে বলল, মিনিট পাঁচেক সময় আছে হাতে। যা বলবার বলে ফেলুন।
এখানে দাঁড়িয়ে কথা না বলে যদি আমার গাড়িতে গিয়ে বসি? অসুবিধে হবে?
প্রয়োজন নেই। যা বলবার এখানেই বলুন।
আশাকরি আপনি তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। আত্মা কিম্বা পরলোকেও না।
একদম ঠিক ধরেছেন। কোনো ধরনের অলৌকিকেই বিশ্বাস নেই আমার। ব্যাপারটা আপনার পক্ষে একটু অসুবিধেজনক বুঝতে পারছি। কিন্তু কিছু করার নেই।
সুবিনয় মুস্তাফি একটা ছোট দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। হাতের পাতাদুটোও ওলটালেন। তবে, মুখের মিচকে-হাসিটা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এসব হতাশার ভঙ্গি-টঙ্গি আসলে অভিনয় ছাড়া কিছু নয়। উনি বললেন, না, বোধিসত্ত্ববাবু! আমার পক্ষে অসুবিধেজনক নয়। অসুবিধেজনক আপনাদের পক্ষে। কাকাবাবুকে অন্যরকমের কোনো পরামর্শ দেবেন না। ওই বাড়িটা আমি কিনব।
এটা কি থ্রেটনিং?—বুধোদার চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে উঠল।
আজ্ঞে না। এটাই বাস্তব। আমার ইচ্ছেয় বাধা দিলে আপনাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। কারণ আমার ইচ্ছেগুলো ঠিক আমার ইচ্ছে নয়। ওগুলো এক অতিজাগতিক পরিকল্পনার অংশ। সেই পরিকল্পনার মধ্যে ওনার ওই উত্তরমুখী বাড়িটাও রয়েছে, যেটা তৈরি হয়েছিল এমন একটা জমিতে যেখানে তিনশোবছর আগে একটা কবরখানা ছিল। ওর চেয়ে ভালো সাধনপীঠ আর হয় না।
বুধোদা কিছুক্ষণ সুবিনয়বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর অসম্ভব ঠান্ডা-গলায় বলল, আমি ওনাকে এইমাত্র বাড়িটা বিক্রি করার পরামর্শই দিয়ে এসেছিলাম। আপনি এইভাবে আমাকে থ্রেট করতে না এলেই ভালো করতেন। কারণ এতে হল কি, আমার মনে নতুন করে একটা সন্দেহের বীজ ঢুকে গেল। সেই বীজ থেকে গাছ গজালে আপনার সমস্ত অতিজাগতিক পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যাবে। চল রুবিক!
বুধোদার পাশাপাশি প্রায় কুড়ি-পা হেঁটে যাওয়ার পর একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। দেখলাম ঠিক মাকড়শার মতনই চকচকে চোখে সুবিনয় মুস্তাফি আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
ক্যাফে-কফি-ডে'র শোভাবাজার আউটলেটে বসেছিলাম আমি আর বুধোদা। এক রাউন্ড করে ক্যাপুচিনো শেষ করে ফেলেছি। এক প্যাকেট কুকিজও শেষ। অন্যমনস্কভাবে মেনুকার্ডটা ওলটাতে ওলটাতে ভাবছিলাম, আর কী নেওয়া যায়। কিছু না নিয়ে এতক্ষণ বসে থাকাটা খারাপ দেখায় তো।
বুধোদা এতক্ষণ জর্জ বেস্টের ড্রিবলিং-স্কিল নিয়ে কী যেন বলছিল। আমি সেরকম মন দিচ্ছি না দেখে থেমেও গিয়েছিল। হঠাৎ বলল, রুবিক! ছাতিমগাছটায় কত ফুল ফুটেছে দ্যাখ। পাতা দেখা যাচ্ছে না।
সিসিডির সামনের রাস্তা দিয়ে সন্ধ্যার জনস্রোত হাতিবাগানের দিকে চলে যাচ্ছিল। পুজো আসছে। বাজারও জমে উঠছে। সেই ভিড়টিড় টপকে বুধোদার নজর চলে গেছে রাস্তার উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে-থাকা বিশাল ছাতিমগাছটার দিকে।
বুধোদা এটা পারে। মনকে খুব সহজেই একটা চিন্তা থেকে অন্য চিন্তায় সরিয়ে নেওয়ার কাজটা ও বরাবরই ভীষণ ভালো পারে। ওর নিজের কথায় 'সুইচ-অন, সুইচ-অফ'।
ছাতিমের ল্যাটিন নাম জানিস?—বুধোদা জিগ্যেস করল।
এই রে, না তো।
Alstonia scholaris। ওরকম হাঁ করে তাকিয়ে থাকিস না। বটানিতে আমারও জ্ঞান শূন্য। তবে দুয়েকটা নাম মনে থেকে যায় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পটার জন্যে। এই ছাতিমের কথাই ধর। কোনো এককালে গাছটার নরম কাঠ দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ড আর পেনসিল তৈরি করা হত। সেসব জিনিস আবার পণ্ডিত মানে স্কলারদের কাজে লাগত। আর তার থেকেই স্কলারিস। বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে ছাত্রছাত্রীদের এখনো ছাতিমপাতার মানপত্র দেওয়া হয় জানিস তো? তার অবশ্য কারণ অন্য।
আমি বললাম, বাবা! আমি তো ভাবতাম সায়েন্টিফিক-নেমের মধ্যে শুধু আবিষ্কর্তার নাম থাকে। ইতিহাসও থাকে তাহলে?
নিশ্চয়। যেমন ধর কুর্চি। এত সুন্দর গাছ, এত সুন্দর ফুল। বাংলা নামটাও এত মিষ্টি। কিন্তু ল্যাটিন নাম Holarrhena antidysenterica। নামটার গায়ে কেমন ওষুধ-ওষুধ গন্ধ লেগে আছে না? কী আর করা যাবে? গাছটার ছাল থেকে যে সত্যিই ডিসেন্ট্রির মানে রক্তআমাশার ওষুধ তৈরি হয়।
বুধোদার ভাঁড়ারে অনেক বিষয়েই এরকম অনেক গল্প আছে, কিন্তু মোটেই সেগুলো বলতে চায় না। ওর ধারণা তাতে পণ্ডিতি ফলানো হয়ে যায় এবং ও যেহেতু পণ্ডিত নয়, কাজেই সেটা ওকে মানায় না। তবু আজকে যে বুধোদা নিজে থেকেই নানান বিষয়ে এত কথা বলে যাচ্ছে, তার কারণটা দিব্যি বুঝতে পারছিলাম। ও আমাকে অন্যমনস্ক রাখতে চাইছে। চাইছে দীপার দিক থেকে আমার মনটাকে সরিয়ে নিয়ে আসতে।
দীপা মানে সপ্তদ্বীপা রায়। নিবেদিতা গার্লস স্কুলের ক্লাস-নাইনে পড়া পুঁচকে একটা মেয়ে, কিন্তু হাবভাব দেখলে মনে হয় মাস্টার্স-ডিগ্রি করে ফেলেছে। মেয়েটাকে কেন যে বুধোদা এত তোল্লাই দেয় সেটা ঠিক বুঝি না। আমাকে শুনিয়ে-শুনিয়ে প্রায়ই বলে মেয়েটা খুব কারেজিয়াস, খুব বুদ্ধি। আমি একদিন আর থাকতে না পেরে জিগ্যেস করেছিলাম, সপ্তদ্বীপার বুদ্ধি-টুদ্ধি কি আমার চেয়ে বেশি? তাতে বুধোদা বাঁকা হেসে বলেছিল, মা ব্র&য়াৎ অপ্রিয়ম সত্যম। যে সত্যি কথা শুনতে ভালো লাগে না, সেই সত্যিকথা বলতে নেই।
রেগেমেগে জবাব দিইনি। তবে ভাবছিলাম সেই লোহুরঙের ডাইনির ঘটনার পরে বুধোদা দীপার আর কোন কেরামতি দেখল যে, এতবড় কথাটা বলে ফেলল? আমি ওর কত অভিযানের কত দিনের সঙ্গী। ওর একটুও বাধল না আমাকে এভাবে ডাউন দিতে?
তাই গত রবিবার চিৎপুর থেকে ফেরার পথে যখন বুধোদা বলল, সুবিনয় মুস্তাফির তন্ত্রের আসরের চেহারাটা একবার দেখে আসতে পারলে ভালো হত, তখন আমিই বলেছিলাম, তুমি-আমি তো সেই কাজটা পারব না বুধোদা, সুবিনয়বাবু চিনে ফেলবেন। তা তোমার সেই সাহসী মেয়েটিকেই বলো না একবার ঘুরে আসতে।
বুধোদা যে আমার কথায় এমন পটাং করে রাজি হয়ে যাবে সেটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। পারলে বলতাম না। কিন্তু বুধোদা তখনই আমার পিঠ-টিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া। এইজন্যেই তোকে এত ভালোবাসি রুবিক। সত্যি, দীপা যদি হাতিবাগানের আশ্রমে ঢুকে পড়ে, ওকে কেউ খেয়ালও করবে না। ভাববে উপস্থিত ভক্তদের কারুর সঙ্গে এসেছে। ঠিক আছে, চল, এখনই একবার ওর বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। তোর কাছে দীপার ফোন নম্বর আছে?
এই প্রশ্নটাও বিশুদ্ধ লেগ-পুলিং। বুধোদা খুব ভালো করেই জানে, আমার কাছে দীপার সেলফোনের নম্বর আছে। মাঝেমাঝে আমাদের কথাবার্তাও হয়।
কথা না বাড়িয়ে ফোন নম্বরটা বুধোদাকে দিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা আসছি এইটুকু জানিয়ে দিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে কুড়িমিনিটের মধ্যে পৌঁছেও গিয়েছিলাম দীপাদের বাগবাজারের বাড়িতে। দীপা আর ওর বাবা-মা, মানে মণিদীপা কাকিমা আর সুদীপকাকুও খুব আগ্রহ নিয়ে বুধোদার মুখে প্রতাপ রক্ষিতের বিপদের কথা শুনলেন এবং দেখে অবাক হলাম, মেয়ে তো বটেই, বাবা-মাও অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেয়ে নেচে উঠলেন। আজব লোকজন হয় সত্যি।
সে যাইহোক, আমাদের অরিজিনাল প্ল্যানটা একটু বদলাল। ঠিক হল, দীপা একা যাবে না, মণিকাকিমাও সঙ্গে যাবেন। তাতে ব্যাপারটা আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। ওনারা বলবেন, সুদীপকাকু মিজোরামে চাকরি করতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছেন। ছমাসের ওপর তাঁর কোনো খোঁজই পাওয়া যাচ্ছে না। এখন তন্ত্রাচার্য যদি তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন একটু বলে দেন।
দীপাদের ড্রইংরুমে বসেই মণিকাকিমা নেট সার্চ করে সুবিনয় মুস্তাফির সেক্রেটারির নম্বর বার করলেন এবং আমাদের সামনেই খুব আকুল গলায় সেক্রেটারিকে সেই বানানো বিপদের কথা বলে মঙ্গলবার সন্ধেয় একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়ে নিলেন। প্রতি মঙ্গলবার সুবিনয় মুস্তাফি ওনার পুজোর ঘরে প্রেত নামান। তারপর ওনার পোষা ভূতেরাই মানুষের নানান সমস্যার সমাধান করে দেয়। এসব কথা হাতিবাগান মোড়ের ব্যানারে বড়-বড় করে লেখা আছে।
অবশ্য সেক্রেটারি এটাও বলে দিয়েছিলেন যে, অ্যাপয়েন্টমেন্টটা তখনই কনফার্মড হবে, যখন ওদের অ্যাকাউন্টে দীপার মা একহাজার টাকা ট্রান্সফার করবেন। মণিকাকিমার ডিকশনারিতে দেখলাম, 'পরে' বলে কোনো শব্দ নেই। টাকাটাও তখনই সুবিনয় মুস্তাফির অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, রুবিক, তোকে দিনকে-দিন কী সুন্দর দেখতে হচ্ছে রে। গার্লফ্রেন্ডরা তোকে ছেড়ে থাকতে পারে?
দীপা অগ্নিদৃষ্টিতে একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
আজই সেই মঙ্গলবার।
এখন আমি আর বুধোদা ক্যাফে-কফি-ডের ভেতরে বসে অপেক্ষা করছি, দীপার কাছ থেকে সেই ভূত নামানোর গল্প শুনব বলে। কিন্তু মিথ্যে বলব না, আমার বেশ চিন্তা হচ্ছে। কেবলই মনে পড়ছে, এর আগে প্রতাপবাবুকে ফলো করে সুবিনয় মুস্তাফির স্পাই উত্তরপাড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। কে বলতে পারে, গত রবিবার সেরকমই কোনো স্পাই আমাদের ফলো করে দীপাদের বাড়ি পৌঁছেছিল কিনা। তাহলে তো দীপা আর ওর মা'র পরিচয় তন্ত্রাচার্যের কাছে আর গোপন নেই। ওদের অ্যাটাক করে বসবেন না তো সুবিনয় মুস্তাফি?
তবে আর বেশিক্ষণ চিন্তা করতে হল না। সবেমাত্র বুধোদা কাউন্টারে গিয়ে বলেছে দুটো 'ডেভিলস-ওন' দেবেন, অমনি কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন মণিকাকিমা আর দীপা। বুধোদা দুটোর জায়গায় চারটে ডেভিলস ওনের অর্ডার দিয়ে টেবিলে ফিরে এল।
দীপা আর মণিকাকিমা আমাদের মুখোমুখি বসলেন। কফি আসার আগেই দুজনে যেভাবে একচুমুকে জলের গ্লাস শেষ করলেন, যেভাবে দোপাট্টা দিয়ে কপালের ঘাম মুছলেন আর থমথমে মুখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাতে আমার আর বুধোদার বুঝতে অসুবিধে হল না যে, ওনাদের অভিজ্ঞতাটা সহজ হয়নি।
বুধোদা নরম স্বরে জিগ্যেস করল, কী হল কাকিমা? কোনো ট্রাবলের মধ্যে পড়েছিলেন নাকি?
উঁহু। কাকিমা ঘাড় নাড়লেন। কিন্তু যা দেখলাম, সেটা এখনো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি কোনোদিন অলৌকিকে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু একে যদি অলৌকিক না বলি, তাহলে আর কীভাবে ব্যাখ্যা করব?
কাকে অলৌকিক বলছেন, একটু বলবেন।
কাকিমা যেন স্বপ্নের মধ্যে কথা বলছেন এইভাবে বলে গেলেন—
ঘরটা প্রায় অন্ধকার ছিল, বুঝলে বোধিসত্ব। শুধু একটা লাল নাইট ল্যাম্প জ্বলছিল। একটা গোল টেবিল ঘিরে পাঁচটা কাঠের চেয়ার, এছাড়া ঘরটার মধ্যে আর কোনো আসবাব ছিল না। ভিজিটর ছিলাম আমরা সাতজন। আমাকে আর দীপাকে বাদ দিলে মহিলা-পুরুষ মিলিয়ে আরও পাঁচজন ছিলেন। টুকটাক কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে বুঝতে পারলাম, সকলেই এমন সব সমস্যা নিয়ে এসেছেন এমনিতে যার সমাধান খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কারুর সন্তানের দুরারোগ্য অসুখ, কারুর মামলা-মোকদ্দমায় জমিবাড়ি সব বেহাত হয়ে গেছে, কারুর বা আবার ব্যবসা ডুবে গেছে। মানে এককথায় সকলেই হতাশ মানুষ।
আমরা সাতজন ছাড়া ওই ঘরে ছিলেন কেবল সুবিনয়বাবু আর ওনার মিডিয়াম—যার ওপরে প্রেত ভর করবে।
মিডিয়াম মেয়েটাকে দেখলেই কেমন যেন গা শিরশির করে ওঠে। মেয়েটা খুব রোগা, ফ্যাকাশে গায়ের রং। চোখদুটো আধবোজা। দেখলে মনে হয় ও নিজেই যেন একটা মৃতদেহ।
সিয়াঁসের কথা এর আগে অনেক গল্প-উপন্যাসে পড়েছি। কাজেই আত্মাকে আহ্বান করার জোগাড়যন্ত্র খুব একটা অচেনা লাগছিল না। আমাদের মধ্যে চারজনকে উনি ডেকে নিলেন টেবিলের পাশে বসার জন্যে। সেই চারজনের মধ্যে আমিও ছিলাম, আমি নিজেই এগিয়ে গিয়েছিলাম। এত কাছ থেকে বুজরুকি দেখবার চান্সটা কেন মিস করব, বলো।
আমরা চারজন আর সুবিনয়বাবু নিজে—টেবিলের চারিদিকে সাজিয়ে রাখা পাঁচটা চেয়ার এতেই ভরে গেল। সুবিনয় মুস্তাফি আমাদের দেখিয়ে একটা রাইটিং-প্যাড টেবিলের ওপরে রেখে দিলেন। প্যাডটার পাতাগুলো যে সাদাই ছিল তাতে সন্দেহ নেই। আমি নিজের হাতে উলটেপালটে দেখে নিয়েছিলাম। প্যাডটার পাশে একটা পেনসিলও রাখলেন। আমি জিগ্যেস করলাম, আপনার মিডিয়াম এখানে বসবেন না? সুবিনয় মুস্তাফি বললেন, না। আমার সিয়াঁসে মিডিয়াম নিজের হাতে উত্তর লেখে না। উত্তর লেখে অদৃশ্য হাত। আত্মা শুধু ওই লেখালেখির কাজটুকু করার জন্যে মিডিয়ামের শরীর থেকে এক্টোপ্লাজম টেনে নেয়।
সত্যিই মিডিয়াম মেয়েটি ঘরের অন্য একটা কোনায় গিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে রইল। একগোছা ধূপ জ্বালিয়ে দিয়ে সুবিনয় মুস্তাফি কিছুক্ষণ দুর্বোধ্য ভাষায় কীসব মন্ত্রটন্ত্র পড়লেন। তারপর আমাদের বললেন মন দিয়ে একটা নরকরোটির কথা ভাবতে, মানে মানুষের মাথার খুলির কথা। ওনার পোষা সেই ভূতের চেহারাটা নাকি সেইরকমই। কাজেই নরকরোটিকে ডাকলেই সে চলে আসবে।
এই অবধি সব ঠিকই ছিল, বুঝলে বোধিসত্ত্ব। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পর থেকেই শুরু হল নানান অদ্ভুত কাণ্ড। প্রথমেই মনে হল আমাদের খুব কাছে দাঁড়িয়ে, কে যেন বিড়বিড় করে কীসব বলে যাচ্ছে। অথচ দীপারা বসেছিল অনেক দূরে। ওদের মধ্যে কেউই যে চেয়ার ছেড়ে ওঠেনি সেটা প্ল্যানচেটের টেবিলে বসেই দেখতে পাচ্ছিলাম। মিডিয়াম-মেয়েটিও আমাদের দিকে পিছন ফিরে তার নিজের জায়গাতেই বসেছিল। তাহলে কে টেবিলটার চারিদিকে ঘুরে ঘুরে কথা বলছিল?
এর পরেই আমরা সবাই আঁতকে উঠলাম, কারণ দেখলাম পেনসিলটা নিজে থেকেই খাড়া হয়ে উঠেছে। নিজে থেকেই প্যাডের পাতার বাঁদিক থেকে ডানদিক, ওপর থেকে নীচে ঘোরাফেরা করে লিখে চলেছে। একটা করে পাতা ভরে গেলে, সুবিনয়বাবু সঙ্গে-সঙ্গেই পরের পাতাটা খুলে দিচ্ছেন...
এইখানে বুধোদা হঠাৎ কাকিমার কথার স্রোতে বাধা দিয়ে বলল, আপনি কাগজের ওপরে পেনসিলের শিষ ঘসার 'খসখস' শব্দটা পরিষ্কার শুনতে পেয়েছিলেন, তাই না?
কাকিমা অবাক হয়ে বললেন, হ্যাঁ, মানে পেয়েছিলাম তো। পাওয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?
ঠিক। আপনি বলে যান, তারপর কী হল।
কাকিমা ভুরু কুঁচকে বললেন, জানি না তুমি কী সন্দেহ করছ। তবে একটা কথা সত্যের খাতিরে বলতেই হচ্ছে—সুবিনয় মুস্তাফির দুটো হাতই কিন্তু টেবিলের ওপরে উপুড় করে পাতা ছিল, ঠিক আমাদেরই মতন। ও ব্যাপারটা আমি খেয়াল রেখেছিলাম।
যাই হোক, প্রায় পনেরোমিনিট ধরে সেই পাগল-পেনসিল প্যাডের পাতার ওপরে দৌড়োদৌড়ি করে তারপর একসময় আছড়ে পড়ল মেঝের ওপরে। সুবিনয় মুস্তাফি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের আলো জ্বেলে আমাদের সবার গায়ে-মাথায় শান্তিজল ছিটিয়ে দিলেন। তারপর প্যাডটা খুলে ধরলেন আমাদের সামনে।
সপ্তদ্বীপা ডেভিলস ওনের গ্লাসটা মুখ থেকে নামিয়ে বলল, তখন কিন্তু আমাদেরও উনি ডেকে নিয়েছিলেন। আমরাও দেখলাম—একটু আগে যে প্যাডের প্রতিটা পাতা ছিল দুধের মতন সাদা, সেই পাতাগুলোই বাংলা অক্ষরে ভরে গিয়েছে। একের পর এক ছ'জন ভিজিটরের ছ'রকম প্রবলেমের সলিউশন লেখা ছিল। তবে...কথাটা শেষ না করেই দীপা মুখে হাত চাপা দিয়ে হেসে ফেলল।
বুধোদা মজা-পাওয়া মুখ করে বলল, কী হল রে? এত হাসছিস কেন?
আমাদের জন্যে পোষা ভূত কী লিখে গিয়েছিল জানো? লিখেছিল, বাবাকে নর্থ-ইস্টের টেররিস্টরা কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে। উনি যাতে ভালোয়-ভালোয় ফিরে আসেন তার জন্যে তন্ত্রাচার্যকে দিয়ে একটা যজ্ঞ করাতে হবে।
কাকিমা বললেন, যজ্ঞের আর দরকার পড়বে না মনে হয়। ওই দেখো, কিডন্যাপড লোকটা এখানে এসে হাজির হয়েছে।
সত্যিই কাচের স্যুইং-ডোর ঠেলে সিসিডির ভেতরে ঢুকে এলেন সুদীপকাকু, মানে দীপার বাবা। ওনার জন্যে ক্যাপুচিনো এল। দীপা খুব চটপট সুবিনয় মুস্তাফির ভূত-নামানোর আসরের পুরো গল্পটা বাবাকে শুনিয়ে দিল। এবার আমরা সবাই বুধোদার দিকে তাকালাম। কাকিমা বললেন, বোধিসত্ত্ব! পুরোটাই যে ধাপ্পাবাজি সে তো বুঝতেই পারছি। না-হলে সেই সর্বজ্ঞ-প্রেত এটুকু জানতো না যে, তোমার কাকাবাবু সুস্থশরীরে কলকাতায় রয়েছেন? কিন্তু সুবিনয় মুস্তাফি প্ল্যানচেটের আসরের ঘটনাগুলো ঘটাল কেমন করে?
বুধোদা বলল, এটা বুজরুকির একটা ক্ল্যাসিক উদাহরণ। একটা কথা জানেন তো? সারা পৃথিবীতেই ম্যাজিকের শুরুটা কিন্তু এই সুবিনয় মুস্তাফির মতন ধাপ্পাবাজদের হাতেই হয়েছিল। তারা কখনো ছিল মন্দিরের পুরোহিত, কখনো রাস্তার ধারের বাজিকর আবার কখনো ভূত-নামানোর ওঝা। সাধারণ ম্যাজিকের খেলাকে এরা বলত দৈবী ঘটনা। ভক্তদের কাছে নিজেদের প্রোজেক্ট করত অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে। সাধারণ মানুষ চিরকালই অলৌকিকে বিশ্বাস করতে ভালোবাসে। ভাবে, পুরোহিত, ওঝা কিম্বা বাজিকরের আশ্চর্য ক্ষমতা তাদের সবরকম বিপদের হাত থেকে উদ্ধার করবে। এই সুযোগটাই ভণ্ড-সাধুরা যুগ-যুগ ধরে নিয়ে আসছিল। বেশ নির্বিঘ্নেই রাজ্যপাট চালাচ্ছিল তারা।
মুশকিলটা বাধল এই ধরুন নাইনটিনথ সেঞ্চুরির মাঝামাঝি থেকে। ওইসময়েই আমেরিকা, ইওরোপ আর চীনে একইসঙ্গে একঝাঁক প্রতিভাবান ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিককে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন। মন্দির কিম্বা রাস্তার ধারের গাছতলা থেকে ম্যাজিককে তুলে আনলেন স্টেজের ওপর। তারা বললেন না যে, তারা যা দেখাচ্ছেন সেগুলো কোনো অলৌকিক ঘটনা। তারা নিজেদের অতিজাগতিক শক্তির অধিকারী বলেও দাবি করলেন না। বরং খেলা দেখাতে উঠে তারা জোর গলায় ঘোষণা করতে শুরু করলেন, যা দেখাচ্ছি তা জাগলারি, জিমনাস্টিক কিম্বা নাচগানের মতনই একটা আর্ট। আপনারা এর পেছনে লুকিয়ে থাকা বুদ্ধি আর সাধনাকে উপভোগ করুন, আর কিছু নয়।
ন্যাচারালি, এই ম্যাজিশিয়ানদের সঙ্গে ভণ্ড সাধুদের লড়াই বাঁধল। সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারে, কিন্তু ম্যাজিশিয়ানদের চোখে তো আর ভণ্ডামি লুকিয়ে রাখা যায় না। তাই ইওরোপ আর আমেরিকায় বহু নামজাদা যাদুকর, ম্যাজিক দেখানোর পাশাপাশি, এইসব ভণ্ডদের মুখোশ খুলে দেওয়ার কাজে নেমে পড়লেন। সময়টা, ওই-যে একটু আগেই বললাম, আঠেরোশো পঞ্চাশ সালের কাছাকাছি।
ওইসময়ে আমেরিকায় আর বিশেষ করে ইংল্যান্ডে 'স্পিরিচুয়ালিস্ট' নামে একদল ভণ্ড খুব লোক ঠকিয়ে খাচ্ছিল। ঠিক এই সুবিনয় মুস্তাফির মতন ওরাও প্রচার করত, ওরা মৃতমানুষের আত্মাকে ডেকে আনতে পারে। সেই আত্মাকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারে নানান অসম্ভব কাজ। আর কাজই বা করাতে হবে কেন? শুধু মাত্র মৃত প্রিয়জনের গলাটুকু একবার শোনার জন্যে, একবার তার নিজের হাতের লেখায় সে পরলোকে গিয়ে কেমন আছে জানার জন্যেই তো কত মানুষ হাপিত্যেশ করে বসে থাকে। তারা দলে-দলে গিয়ে ভিড় জমাত ওই স্পিরিচুয়ালিস্টদের প্রেত নামানোর আসরে। মুগ্ধ এবং আতঙ্কিত চোখে দেখত অদৃশ্য আত্মা কেমন করে টেবিলে টোকা মেরে সাংকেতিক ভাষায় প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, কেমন করে আপনা থেকেই বেজে উঠছে ঘরের কোনায় রাখা হারমোনিয়াম কিম্বা এই আপনারা যেমন দেখলেন, সাদা খাতায় ভূতুড়ে-পেনসিল লিখে দিয়ে যাচ্ছে প্রশ্নের উত্তর।
এরকমই এক স্বঘোষিত মিডিয়াম ছিলেন এক ধুরন্ধর আমেরিকান মহিলা, নাম মিসেস ডিস-ডেবার। আঠেরোশো সত্তর সাল থেকে তার অপকর্মের শুরু। প্রথমে কেনটাকি, তারপর বালটিমোরে হিপনোটিস্ট সেজে অনেক লোককে ঠকালেন। সেখানকার লোকে যখন তার স্বরূপ বুঝে গেল তখন ডিস-ডেবার পালালেন নিউইয়র্কে এবং কী সৌভাগ্য তার, পেয়ে গেলেন এক শাঁসাল শিকার। এক কোটিপতি নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ—নাম লুথার মার্শ।
প্রথমে কিছুদিন মিসেস ডিস-ডেবার লুথারের কাছে বিগত যুগের নামজাদা সব চিত্রশিল্পীদের আঁকা ছবি বিক্রি করলেন। রাফায়েল, মিকেলেঞ্জেলো এনাদের আত্মারা এসে বন্ধ আলমারির ভেতরে রেখে দেওয়া ক্যানভাসের ওপরে ছবি এঁকে দিয়ে গেলেন। বিনিময়ে ওই আলমারির ভেতর থেকেই মার্শের টাকার থলি নিয়ে গেলেন শিল্পীরা। লুথার মার্শ তো বিশ্ববরেণ্য শিল্পীদের আঁকা ছবি পেয়ে মহা খুশি; তা হোক না তাঁদের মৃত্যুর পরে আঁকা।
বুঝতেই পারছেন আত্মাদের নিয়ে যাওয়া সব টাকাই জমা পড়ল ডিস-ডেবারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
ডিস-ডেবারের লোভ বেড়ে গেল। তিনি এবার একদিন প্ল্যানচেটে লুথার মার্শের মৃত মেয়েকে ডেকে আনলেন। বহুকাল আগে মৃত সেই মেয়ে করুণগলায় বাবাকে বলল, বাবা! তোমার সমস্ত টাকাপয়সা আর বাড়িগাড়ি তুমি ডেবারমাসির নামে লিখে দাও। প্লিজ।
লুথার মার্শ তো হারানো মেয়ের এই আবদারে একেবারে আপ্লুত। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি। কিন্তু দেখা গেল মার্শের আত্মীয়স্বজন অত্যন্ত পাজি। তারা ডিস-ডেবারের নামে নিউইয়র্কের কোর্টে চিটিংবাজির কেস ঠুকে দিল। তারা বলল, ডিস-ডেবার জোচ্চোর। ওসব প্ল্যানচেট- ট্যানচেট সব ডাঁহা মিথ্যে। সেই মিথ্যেটা প্রমাণ করার জন্যে তারা কোর্টে হাজির করল তখনকার বিখ্যাত জাদুকর কার্ল হার্টজকে। কার্ল হার্টজ ভরা কোর্টরুমের মধ্যে দিনেদুপুরে ডিস-ডেবার যা-যা করেছিলেন সব করে দেখিয়ে দিলেন। শুধু দেখিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না, সবাইকে বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন, কোন অলৌকিকের পেছনে কোন লৌকিক কায়দা রয়েছে।
কার্ল হার্টজ পরে নিজেই এই ঘটনার কথা লিখেছিলেন আর সেই লেখাটা আমি পড়েছিলাম। আপনাদের কথা শুনে বুঝলাম, দেড়শোবছর বাদে এই কলকাতাতে বসে সুবিনয় মুস্তাফি অবিকল ডিস-ডেবারের কায়দায় মানুষ ঠকাচ্ছেন।
শোনো দীপা! যেরকম সাদা প্যাড টেবিলের ওপরে রাখা ছিল, অবিকল সেরকম একটা প্যাডের কাগজে আগে থাকতেই ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর-টুত্তর লিখে সুবিনয়বাবু নিজের সিল্কের আলখাল্লার ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সিয়াঁসের শেষ দিকে কোনো একটা সময়ে টুক করে সাদা প্যাডের সঙ্গে লেখা-প্যাড বদলাবদলি করে নেওয়াটা, যে লোক ম্যাজিকের অ-আ-ক-খ জানে, তার কাছে কিছুই কঠিন নয়। আর আমার দৃঢ় ধারণা, পেনসিলটার ডগার কাছে লোহা কিম্বা নিকেলের টুকরো লুকোনো ছিল। চুম্বকটা ছিল টেবিলের নীচে, সুবিনয়বাবুর হাঁটুর ওপরে। হাঁটু নাড়িয়ে উনি পেনসিলকে নাড়াচ্ছিলেন।
মণিকাকিমা বললেন, কিন্তু পেনসিল দিয়ে যদি কিছু লেখাই না হয়, তাহলে ওরকম খসখস শব্দ হবে?
হবে। কেমন করে হবে সেটা দেড়শো বছর আগে কার্ল হার্টজ নিউইয়র্কের কোর্টরুমে দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। উনিও সেদিন কোর্টের মধ্যে ঠিক এইভাবে আত্মাকে দিয়ে প্যাডের কাগজে প্রশ্নের উত্তর লিখিয়েছিলেন। সেদিনও সকলে আপনার মতনই লেখার খসখস আওয়াজ পেয়েছিল। হার্টজ পরে দেখিয়েছিলেন, ওনার ডানহাতের মাঝের আঙুলের একটা নখ অনেকটা বড় আর সেই নখটার মাঝখান বরাবর লম্বালম্বি চেরা। যতক্ষণ জাদুকর হার্টজ ওই চেরা নখটা টেবিলে ঘসেছেন ততক্ষণই ঠিক পেনসিলের শিস ঘসার মতন শব্দ উঠেছে। ডিস-ডেবার এবং তার মতন স্পিরিচুয়ালিস্টরা এইভাবেই আত্মাকে দিয়ে উত্তর লেখাত।
আজ সুবিনয় মুস্তাফিও ঠিক একই কায়দায় আত্মা নামিয়েছেন। আর ওই যে আপনাদের চারপাশে ফিসফিসে গলার আওয়াজের কথা বলছিলেন, আমার বিশ্বাস ওটাও ভেনট্রিলোকুইজমের কায়দা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুবিনয় মুস্তাফি তার বাবার কাছ থেকে ম্যাজিকের এই বেসিক কয়েকটা বিদ্যে তো শিখেইছিলেন।
আমরা সবাই মন দিয়ে বুধোদার কথা শুনছিলাম। এবার বুধোদা কথা শেষ করে ঘড়ির দিকে তাকাল। বলল, মনে হয় আমাদের ওঠা উচিত।
সুদীপকাকু বললেন, কিন্তু বোধিসত্ত্ব, ব্যাপারটা তাহলে কী দাঁড়াল? আজ দীপা আর ওর মা যা দেখে এল তাতে সুবিনয় মুস্তাফিকে একটা নীচু গ্রেডের জোচ্চোরের বেশি তো কিছু মনে হচ্ছে না। ওনার দাদু, মানে তারাপদবাবুর ডায়েরি বা চিঠিপত্রের মধ্যে যদি এমন কোনো একটা জিনিসের কথা থেকেও থাকে, তাহলেও সেটাকে অ্যান্টিক বলে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা কি লোকটার আছে?
বুধোদা বলল, আপনি ঠিকই বলেছেন কাকু। আরও একটা কথা আছে। রাম শ্যাম যদুর হাতে অ্যান্টিক চলে এলেও তারা কিন্তু সেটার দাম কত হতে পারে আন্দাজ করতে পারে না। এ তো আর সোনা কিম্বা হিরে নয় যে, গ্রাম কিম্বা ক্যারাটে ওজন করলেই দাম বেরিয়ে যাবে। সেইজন্যেই ভাবছি, জিনিসটার অ্যান্টিক-ভ্যালু ছাড়া অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য আছে কিনা, যেটা একমাত্র সুবিনয় মুস্তাফির কাছেই দামি। তাই যদি হয়, তাহলে আমার পক্ষে সেটা ধরা মুশকিল।
সুদীপকাকু বললেন, কিন্তু তাহের আলি লেনের ওই বাড়িতে সেরকম কিছু যে আছে সে ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত, তাই তো?
হ্যাঁ। এখনো অবধি সুবিনয় মুস্তাফি যে-পরিমাণ উদ্যোগ নিয়েছেন—যেভাবে ওনার স্পাই প্রতাপবাবুকে উত্তরপাড়া অবধি ধাওয়া করেছে, যেভাবে উনি নিজে আমাকে হুমকি দিতে চলে এসেছেন, তাতে অন্যরকম কিছু ভাববার স্কোপ কোথায়?
তাহলে তুমি প্রতাপবাবুকে বাড়িটা বিক্রি করতে বারণ করছ না কেন?
বুধোদা বলল, কেমন করে বারণ করি বলুন। কিসের ভিত্তিতে বারণ করব? ঘিঞ্জিগলির মধ্যে ওই ছোট্ট পুরোনো বাড়িটার জন্যে সুবিনয় মুস্তাফি ওনাকে যে দাম দিচ্ছেন তা আর কে ওনাকে দেবে? আমি কি পারব সেরকম কোনো বিকল্প খরিদ্দার জোগাড় করে দিতে?
আমরা পাঁচজনেই আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সিসিডি থেকে বেরিয়ে এলাম। সুদীপকাকুর কোয়ালিসটা দোকানের সামনেই পার্ক করা ছিল। দীপা বলল, বাবা, আমরা রুবিকদাদাদের ডানলপ মোড় অবধি নামিয়ে দিয়ে বাগবাজারে ব্যাক করতে পারি তো।
সুদীপকাকু কড়াচোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি না বললেও আমি তাই করতাম।
ওর মুখটা চুন হয়ে গেল। আমি লুকিয়ে-লুকিয়ে দীপার হাতটা মুঠোর মধ্যে ধরে ফিসফিস করে বললাম, ডোন্ট মাইন্ড। বাবারা একটু বকাঝকা করেই থাকেন—এই বলে সামনের সিটের দিকে এগোতে যাচ্ছি, দীপা আমার হাতে টান দিয়ে ততোধিক ফিসফিস করে বলল, ব্যাকসিটে আমার পাশে বসবে চলো। বোকচন্দর।
ঠিক দুদিন বাদে বৃহস্পতিবার বিকেলে হঠাৎ বুধোদার ফোন—বাড়িতে আছিস?
বললাম, হ্যাঁ। একটু আগেই স্কুল থেকে ফিরলাম। তুমি কোথায়?
আমিও বাড়িতে।
কেন? মহারাজা কালেকশনস বন্ধ নাকি আজ?
বুধোদা কেমন একটা ক্যাজুয়াল গলায় বলল, নাআআঃ। বন্ধ হবে কেন? এমনিই একটু ছুটি নিলাম। বাড়িতে বসে পড়াশোনা করছিলাম। এখন ভাবছি একটু বেরোব। তুই যাবি?
পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, ও টেনশনে আছে আর সেটাকে চাপা দেওয়ার জন্যেই একটু বেশি স্বাভাবিক গলায় কথা বলছে। ফোনে এর বেশি আর কিছু বার করা যাবে না। চেয়ারের হাতল থেকে জিনস আর টি-শার্টটা তুলে নিয়ে বললাম, একটু ওয়েট করো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।
আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে জিটি রোড ক্রস করলেই বুধোদাদের একশো-সতেরো বছরের পুরোনো প্রাসাদের মতন বাড়ি, যার নাম হেমকুঞ্জ। ছোটবেলা থেকে ওই বাড়িতেই আমাদের খেলাধুলো, আমাদের রবীন্দ্রজয়ন্তী, নাটক, দুর্গাপুজো সব। বাড়িটাকে কোনোদিন নিজেদেরই আরেকটা বাড়ি ছাড়া অন্য কিছু ভাবিনি। আমি হেমকুঞ্জের সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে পা দিতেই জ্যাঠাইমার মুখোমুখি পড়ে গেলাম। একতলার রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ঘোরানো রোয়াক ধরে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন, তোদের ব্যাপারটা কীরে রুবিক? আবার নতুন কোনো ঝামেলায় জড়িয়েছিস মনে হচ্ছে। বুধো আজ সারাদিন গোমড়ামুখে বাড়িতে বসে রইল কেন?
আমি বললাম, ধুৎ, কী যে বলো না। ঝামেলায় জড়াবার বয়স আছে নাকি আমাদের?
না, একেবারে বুড়ো হয়ে গেছিস। যাই হোক, গোকুলপিঠে ভাজছি। না খেয়ে কোত্থাও বেরোবি না। বুধোকেও বলে দিস।
দোতলায় বুধোদার ঘরে ঢুকে জ্যাঠাইমার নির্দেশটাই প্রথমে বুধোদার কানে তুললাম। বলা যায় না তাড়াহুড়ো করে বেরিয়েও পড়তে পারে আর তখন গরম গরম গোকুলপিঠেগুলো মিস করব। বুধোদা দেখলাম সত্যিই বেরোবার জন্যে রেডি হয়েই বসেছিল। আমার কথা শুনে বলল, মা যে কী করে না। এখনও সন্ধে হয়নি, জলখাবার খাওয়ার কী দরকার? তারপর আশিবছরের পুরোনো কুক অ্যান্ড কেলভির দেয়ালঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, একটু বসেই যাই তাহলে। সেরকম কোনো ব্যাপার নয় যে, সময়ের মধ্যেই পৌঁছতে হবে। এই বলে বিশাল পালঙ্কের একদিকে বালিশে হেলান দিয়ে ওর মার্কামারা দ-এর মতন ভঙ্গিতে বসে পড়ল।
আমিও পেল্লায় খাটটার অন্যদিকটায় লাফ মেরে উঠে বসে বললাম, কোথায় যাবে বুধোদা?
বুধোদা বলল, মনটা কেমন খুঁতখুঁত করছে বুঝলি। আজকেই তো প্রতাপবাবুর বাড়িতে সুবিনয় মুস্তাফির আসার কথা। খালি মনে হচ্ছে সব মিটে যাওয়ার আগে আরেকবার যদি ওনার বাড়ির চারদিকে চোখ বোলাতে পারতাম। হয়তো ধরতে পারতাম, কোন জিনিসটার জন্যে সুবিনয় মুস্তাফি এরকম পাগল হয়ে গেছে। তাই তাহের আলি লেনেই আরেকবার যাব ভাবছি।
এই বলে বুধোদা খাটের ওপর থেকে একটা ইংরিজি ম্যাগাজিনের বহু পুরোনো কপি তুলে নিয়ে তার মধ্যে ডুবে গেল। ম্যাগাজিনটার মলাট-টুকুই শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম। নাম 'ম্যাজিশিয়ান'। লন্ডনের গ্যামাজ কোম্পানি থেকে প্রকাশিত। প্রকাশের তারিখটাও মলাটের ওপর বেশ বড় করে লেখা ছিল জানুয়ারি ১৯৩২।
ম্যাজিশিয়ান পত্রিকার বেশ কয়েকটা কপি ছাড়াও আরও কয়েকটা পুরোনো ম্যাগাজিন আর ম্যাজিকের সাজসরঞ্জামের ক্যাটালগ খাটের ওপরে ছড়ানো ছিল। বুঝতে পারছিলাম, আলমারির তাক থেকে নামিয়ে এগুলোর মধ্যেই বুধোদা সারাদিন ডুবে ছিল। জিগ্যেস না করে পারলাম না, বইগুলোর মধ্যে কিছু খুঁজছিলে নাকি বুধোদা?
বুধোদার কথাবার্তার মধ্যে মাঝে-মাঝে বেশ কবিত্ব এসে যায়, বিশেষ করে যখন আলোচ্য বিষয়টা ওর পছন্দসই হয়। এখনই যেমন, আমার সাদামাটা প্রশ্নটার উত্তরে ও হাতের ম্যাগাজিনটা নামিয়ে রেখে মাথার পেছনে দুটো হাত দিয়ে উদাস গলায় বলল, খুঁজছিলাম একটা হারিয়ে যাওয়া সময়কে।
মানে!
এমন একটা সময়, যখন ইওরোপ আমেরিকার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই এই পরাধীন ভারতবর্ষেও উঠে এসেছিলেন একঝাঁক তরুণ জাদুকর। তখন তো আর খেলার ভিডিয়ো তুলে রাখা সম্ভব ছিল না। তবু নানান পত্রপত্রিকায় তাঁদের আশ্চর্য সব খেলার কথা যখন পড়ি, তখন ভাবি কি অসাধারণ প্রতিভা ছিল তাঁদের।
ইন্ডিয়ান ম্যাজিক-ইন্ডাস্ট্রির ভগীরথ যদি কাউকে বলতেই হয় তাহলে বলতে হবে জাদুসম্রাট গণপতি চক্রবর্তীর কথা। উনিশশো তেরো সালে যেদিন প্রিয়নাথ বসুর 'বোসেস সার্কাস' ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজের ম্যাজিকের দল বানিয়ে উনি খেলা দেখাতে শুরু করলেন, সেই দিনই বদলে গেল ভারতীয় ম্যাজিকের ভবিষ্যৎ। তার আগে অবধি ম্যাজিক বলতে এদেশের লোক বুঝত রাস্তার ধারে কিম্বা মেলার গাছতলায় বেদে আর মাদারিদের খেলা। প্রফেসর গণপতিই প্রথম বিশাল স্টেজে প্রচুর সাজসরঞ্জাম, মিউজিক আর লাইটের সাহায্যে চোখধাঁধানো সব ইলিউশন-ট্রিক দেখাতে শুরু করলেন। তাঁর হাত ধরেই আমাদের ম্যাজিক জাতে উঠল।
গণপতির ঠিক পরের দুই দিকপাল জাদুকরের নাম রিপেন বোস অর্থাৎ রাজা বোস আর যতীন্দ্রনাথ রায় ওরফে 'রয় দা মিস্টিক'। ওনাদের দুজনেরই জন্ম আঠেরোশো একানব্বই সালে। দুজনেই ছিলেন অসাধারণ শো-ম্যান। গণপতির কাজকে রাজা বোস আর 'রয় দা মিস্টিক' আরও অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
বুঝতেই পারছিস, প্রিন্স রাজন যখন কলকাতায় খেলা দেখাতে শুরু করেছিলেন তখন জমি অনেকটাই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এখানকার দর্শক ততদিনে টিকিট কেটে রঙ্গমঞ্চে বসে ম্যাজিক দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। দর্শদের মধ্যে অবশ্য সাদা চামড়ার লোকজনই থাকত বেশি। তাদের জন্যেই তখন বাঙালি জাদুকরদের কোটপ্যান্ট পরে ম্যাজিক দেখাতে হত। তাদের জন্যেই 'স্টেজ-নেম' নিতে হত—এমন একটা নাম যেটা সাহেব-মেমদের অ্যাট্রাক্ট করে। তাই যতীন্দ্রনাথ রায় হয়ে গিয়েছিলেন 'রয় দা মিস্টিক'। অশোক রায় খেলা দেখাতেন 'ওসাক রে' নামে। ওনাদের দেখানো রাস্তাতেই প্রিয়রঞ্জন বদলে গিয়ে হয়েছিল 'প্রিন্স রাজন'।
তবে প্রিন্স রাজন একটা ব্যাপারে ছিলেন পায়োনিয়র। এদেশের ম্যাজিশিয়ানদের মধ্যে উনিই প্রথম শো-এর মধ্যে থেকে 'প্যাটারিং' বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন করতেই হল—প্যাটারিং কী বুধোদা?
বুধোদা বলল, দেখবি ম্যাজিশিয়ানরা খেলা দেখানোর সময় অনর্গল কথা বলে যান। এমনি-এমনি বলেন না। ওই কথার রসে যতক্ষণে দর্শকেরা মজে থাকে, তার মধ্যেই ম্যাজিশিয়ান তাঁর প্রয়োজনীয় হাতসাফাইগুলো সেরে ফেলেন। জামার আস্তিনের মধ্যে লুকিয়ে যায় তাস। চেয়ারের পেছন থেকে উঠে আসে পায়রা। কাজেই বুঝতেই পারছিস, প্যাটারিং বাদ দিয়ে খেলা দেখানো মানে নিজের কাজটাকে আরও কঠিন করে ফেলা। নিজের সামনে নিজেই একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া। প্রিন্স রাজন ম্যাজিক দেখাতেন নিঃশব্দে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বুধোদা বোধহয় ম্যাজিকের সেই নবজাগরণের কথাই ভাবল। তারপর বলল, আরেকজনের সম্বন্ধেও কিছু তথ্য খুঁজছিলাম বুঝলি।
কার সম্বন্ধে?
মার্টিন জিগলার। প্রিন্স রাজনের সেই জার্মান ইম্প্রেসারিও। এই ইংরিজি ম্যাগাজিনগুলো আলমারি থেকে বার করেছিলাম ওইজন্যেই।
কিছু পেলে?
অনেকটাই পেলাম। একটা বেশ মজার জিনিস জানলাম, বুঝলি? একজন বড় মনের মানুষ হিসেবে ওনার পরিচিতিটা হয়েছিল জীবনের শেষদিকে, ওই সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড-ওয়ারের পরে যখন লোকে জানতে পারল যে, কত ইহুদি-পরিবারকে নিজের ইনফ্লুয়েন্স কাজে লাগিয়ে উনি বাঁচিয়েছেন, তখন। কিন্তু উনি প্রথম খ্যাতি পেয়েছিলেন অন্য একটা কারণে। যুদ্ধ বাঁধতে তখনো প্রায় পঁয়ত্রিশবছর বাকি। উনিশশো-চার সালেই সারা পৃথিবীর ম্যাজিশিয়ান মহলে ওনার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল হ্যারি হুডিনির ম্যানেজার হিসেবে। হ্যারি হুডিনির নাম শুনেছিস তো?
আমি রেগেমেগে বললাম, এতটা আন্ডার-এস্টিমেট কোরো না বুধোদা। The king of handcuffs—the man who walked through the wall। কোনো সিন্দুক, কোনো বাক্স, কোনো তালাচাবি দিয়ে যাকে আটকে রাখা যেত না সেই হুডিনির নাম জানব না?
বুধোদা আবার একটা গা-জ্বালানো হাসি হেসে বলল, আহা, চটছিস কেন? এতবছর ধরে আমার শাগরেদি করছিস—জানাটাই তো স্বাভাবিক। যাই হোক, সেই হুডিনির সঙ্গে যে জার্মানির স্বৈরাচারী কাইজার-সরকারের একটা মামলা হয়েছিল আর সেই মামলায় যে হুডিনিই জিতেছিলেন সেটা জানিস না নিশ্চয়।
না জানি না। ভাবো, এতবছর তোমার শাগরেদি করেও কত কিছু জানি না।
জ্যাঠাইমা একটা বড় থালায় এতগুলো গোকুলপিঠে নিয়ে ঘরে ঢুকে আমাদের মাঝখানে থালাটা নামিয়ে রেখে বললেন, সবক'টা খাবি, তবে বেরোবি। একটাও যেন পড়ে না থাকে। বুধোদা নিজে একটা পিঠে মুখে পুরে নিয়ে বলল, মেজাজ গরম করিস না। তার চেয়ে গরম পিঠে খা।
শোন, তার আগেই তো হুডিনি বেশ কয়েকবার আমেরিকার নানান জেলখানায় পুলিশের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাতকড়া ছাড়িয়ে বেরিয়ে এসেছেন। এবার উনিশশো-দুই সালে তিনি গেলেন ইংল্যান্ডে। লন্ডনের আলহামরা-থিয়েটারে শো করা ছিল তখন যে-কোনো শিল্পীর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন চোখে নিয়েই তরুণ হুডিনি দেখা করলেন আলহামরা থিয়েটারের মালিক ডান্ডাস স্লেটারের সঙ্গে।
তা, স্লেটার সাহেব হুডিনি নামের আমেরিকান ছেলেটিকে পরিষ্কার বলে দিলেন ওসব শিকাগো-পুলিশের হাতকড়া নিয়ে কী ম্যাজিক দেখিয়েছ তা আমার জানার দরকার নেই। আমাদের স্কটল্যান্ড-ইয়ার্ডের হাতকড়া থেকে যদি বেরিয়ে আসতে পারো, তাহলে তোমাকে আলহামরা থিয়েটারে ম্যাজিক দেখাতে দেব। হুডিনি তো তক্ষুনি রাজি। তিনি স্লেটারসাহেবের সঙ্গে গিয়ে হাজির হলেন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে আর ইয়ার্ডের তখনকার সুপারিন্টেন্ডেন্ট মেলভিল করলেন কি, কথা বলতেই বলতেই হঠাৎ হুডিনির হাতদুটো একটা রেগুলেশন-হ্যান্ডকাফ দিয়ে একটা থামের দুদিকে আটকে দিয়ে স্লেটারসাহেবকে বললেন, চলুন। আমরা চা-টা খেয়ে আসি। ঘণ্টাখানেক বাদে এসে ছোকরার হাতকড়া খুলে দেব।
স্কটল্যান্ড-ইয়ার্ডের করিডর ধরে দুজনে সবে কয়েক পা হেঁটেছেন, হঠাৎ শোনেন পেছন থেকে হুডিনি ডাকছেন—আরে, একটু দাঁড়ান। আমিও তো যাব আপনাদের সঙ্গে।
মেলভিল আর শ্লেটার অবাক হয়ে দেখেন, হুডিনি হাসতে হাসতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। হাতে মেলভিলকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যে খোলা হাতকড়াটাও আনতে ভোলেননি। বুঝতেই পারছিস, এরপরে আলহামরা থিয়েটারে ম্যাজিক দেখাতে হুডিনির আর কোনো অসুবিধে হয়নি। এসব ঘটনা খবরের কাগজে ছাপা হওয়ার পরে হুডিনির জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁল।
কিন্তু এর দু-বছর পরে হুডিনি যখন জার্মানির কোলন শহরের সেন্ট্রাল-থিয়েটারে শো করছেন তখন কাইজার জামানার মহা শক্তিশালী পুলিশ অফিসার ভের্নার গ্রাফ নিউজপেপারে একটা প্রবন্ধ লিখে প্রমাণ করতে চাইলেন, হুডিনি একজন ধাপ্পাবাজ। তার যা-কিছু জারিজুরি সবই স্টেজের ওপরে, নিজের জন্যে স্পেশালি তৈরি করানো হাতকড়া, তালা আর সিন্দুক নিয়ে। হুডিনি তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকলেন এবং কোর্টের মধ্যে দাঁড়িয়ে গ্রাফের লাগানো হ্যান্ডকাফ থেকে অনায়াসে হাত বার করে বেরিয়ে এলেন। মামলাটা হুডিনি জিতলেন তো বটেই, এই জিৎ তাঁকে গোটা জার্মানিতে বিখ্যাত করে দিল।
তবে এখন এই ম্যাগাজিনগুলো পড়ে বুঝছি, জার্মানির বুকে বসে পুলিশ অফিসার গ্রাফের এগেইনস্টে ওই মামলা করতেই পারতেন না হুডিনি, যদি-না তাঁর ম্যানেজার হিসেবে সেদিন পাশে থাকতেন আরেকজন অসীমসাহসী মানুষ—মার্টিন জিগলার। এরপরে যতদিন হুডিনি জীবিত ছিলেন, মানে উনিশশো ছাব্বিশ সাল অবধি, জিগলার আর হুডিনির বন্ধুত্ব অটুট ছিল।
আমি একটু চিন্তা করে বললাম, দ্যাখো বুধোদা। যে-মানুষ হুডিনিকে অত কাছ থেকে দেখেছেন, তিনি আবার প্রিন্স রাজনকেও আপন করে নিচ্ছেন। তার মানে প্রিন্স রাজনও তো নিশ্চয় প্রতিভাবান ছিলেন, তাই না?
এগজ্যাক্টলি, সেটাই ভাবছিলাম। অকালে প্রাণটা না হারালে ভারতীয় যাদুবিদ্যা নিশ্চয় আরেকজন গণপতি চক্রবর্তীকে পেত। এসকেপ-আর্টের আর এক ভগবানকে।
পিঠে-টিঠে শেষ করে আমাদের বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেল। সেদিনের মতন ট্রেনে-বাসে নয়, বুধোদা আজ নিজের গাড়ি নিয়েই বেরিয়েছিল। তাতেও কি স্বস্তি আছে? বিটি রোডে উঠে দেখি মারাত্মক জ্যাম। আমরা অবশ্য বেরোবার সময়েই প্রতাপদাদুকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমরা আসছি। সুবিনয় মুস্তাফিকে বাড়ির দলিল-টলিল যা হ্যান্ডওভার করার উনি যেন আমরা পৌঁছনোর পরেই করেন।
আরো কিছু পরে এম জি রোড ধরে চিৎপুরের মোড়ে যখন পৌঁছেছি তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে-সাতটা। সবেমাত্র বুধোদা বলেছে, এবার প্রতাপদাদুকে একটা ফোন করে বলে দেওয়া উচিত আমরা পৌঁছে গেছি, তখনই একদম কাকতালীয়ভাবে বুধোদার মোবাইলে প্রতাপদাদুর কল ঢুকল। ড্রাইভ করার সময় বুধোদার মোবাইল স্পিকার-মোডে দেওয়া থাকে, তাই আমিও দিব্যি পরিষ্কার ওদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিলাম। প্রতাপদাদু ভীষণ উত্তেজিত গলায় বললেন, সাংঘাতিক ব্যাপার বোধিসত্ত্ব। সুবিনয়টা কতবড় শয়তান তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না।
কেন? কী হল?
আমি ধরে ফেলেছি। একেবারে হাতেনাতে ধরে ফেলেছি। এই জিনিস যে জন্ম থেকে আমার চোখের সামনে পড়ে রয়েছে সেটা মা না বললে আমি বুঝব কেমন করে? ওঃ, শয়তান শয়...
প্রতাপদাদুর গলা থেকে হঠাৎ একটা বিশ্রী ঘড়ঘড়ে শব্দ বেরোতে শুরু করল। বড়জোর আধমিনিট। তারপরে হঠাৎই আওয়াজটা থেমে গেল। বুধোদা চিৎকার করে উঠল—হ্যালো! প্রতাপবাবু, শুনতে পাচ্ছেন? হ্যালো! কী হল আপনার?
তারপর ফোনটাকে ড্যাশবোর্ডের ওপরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বুধোদা বাকি দুশোমিটার রাস্তায় যেভাবে গাড়িটাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল, নেহাত পাগল না হলে ওই রাস্তায় ওভাবে কেউ গাড়ি চালায় না। আমি মাঝখানে একবার শুধু জিগ্যেস করেছিলাম, কী হল বুধোদা? বুধোদা দাঁতে দাঁত চিপে বলল, যদি ভুল না করে থাকি, ওই ঘড়ঘড়ানিটা প্রতাপবাবুর শেষ নিশ্বাস।
প্রতাপবাবুর ফোন আসার ঠিক দু-মিনিটের মধ্যে আমি আর বুধোদা গাড়ির দুদিকের দুটো দরজা খুলে ওনার বাড়ির সামনে নেমে পড়লাম। আমি কলিং-বেলের সুইচটা প্রাণপণে চেপে ধরেছিলাম। বুধোদা পেছন থেকে অধৈর্যভাবে এক-ঝটকায় আমার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, আঃ। দরজাটা ভেজানো রয়েছে দেখতে পাচ্ছিস না? সত্যিই সদর-দরজাটা আলতো করে ভেজানো ছিল। আমরা ওটা ঠেলে ভেতরের দালানে পা দিলাম। সামনেই প্রতাপদাদুর সেই ড্রইং কাম বেডরুম। আগের দিন এই ভেতরের দরজাটা খোলা থাকতেই দেখেছিলাম। কিন্তু আজ দেখলাম দরজাটা বন্ধ। বুধোদা দুবার নক করে উত্তর পেল না। তখন দরজায় ঠেলা মারল।
দরজাটা খুলল না।
বুধোদা আবার ঠেলা দিল, এবার বেশ জোরে। একইসঙ্গে উঁচু-গলায় ডাকল প্রতাপবাবু! প্রতাপবাবু! শুনতে পাচ্ছেন? আমি বোধিসত্ত্ব। দরজা খুলুন।
তবুও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না।
আমি আর বুধোদা একবার চোখে চোখে কথা বলে নিয়েই একসঙ্গে শোলডার-চার্জ করলাম—একবার, দু-বার, তিনবার। চতুর্থবারের ধাক্কায় ভেতর থেকে লাগানো ছিটকিনি মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়তে-পড়তেও সামলে নিলাম। দেখলাম ঘরের মেঝের ওপরে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছেন প্রতাপরঞ্জন রক্ষিত। বিস্ফারিত দুটো চোখের দৃষ্টি যেভাবে ঘরের সিলিং-এর দিকে স্থির হয়ে রয়েছে তাতে বুঝতে অসুবিধে হল না যে, উনি মারা গেছেন।
বুধোদা বলে উঠল ওঃ মাই গড! রুবিক, ঘরের ভেতরে ঢুকিস না। দেখি সুজন ডিউটিতে রয়েছে কিনা। তাহলে কাজটা সহজ হয়।
বড়বাজার থানার ওসি সুজন সরকার বুধোদার কলেজের জুনিয়র। তাছাড়া গত দুবছরের মধ্যে দুটো অ্যান্টি-স্মাগলিং-এর কেসে বুধোদার থেকে অনেক সাহায্যও পেয়েছেন। কপাল ভালো, সুজনদা ডিউটিতে ছিলেন। বুধোদার ফোন পাওয়ার পাঁচমিনিটের মধ্যে দলবল নিয়ে চলে এলেন।
রহস্যটা জমাট বাঁধল ঠিক এর পরেই। কারণ আমরা পুলিশের সঙ্গে ঘরে ঢোকার পরে কয়েকটা জিনিস বোঝা গেল।
এক, প্রতাপদাদু খুন হয়েছেন। ওনার ব্রহ্মতালুর ওপরে কেউ সপাটে কোনো ভারী জিনিস দিয়ে মেরেছে। যেটা দিয়ে মারা হয়েছে সেটাও ওনার ডেডবডির পাশেই পড়েছিল—একটা পেতলের ফুলদানি। আগেরদিন ফুলদানিটাকে সেন্টার টেবিলের ওপরে দেখেছিলাম।
দুই, ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল কিন্তু ঘরের ভেতরে প্রতাপদাদু ছাড়া দ্বিতীয় কেউ ছিল না।
তিন, ওই ঘর থেকে পালানোর কোনো রাস্তা নেই। একটামাত্র জানলা, সেটা খোলা ছিল ঠিকই, কিন্তু জানালার গ্রিল অক্ষত ছিল। ওই ঘন বুনোটের লোহার গ্রিলের ভেতর দিয়ে একটা বাঁদরের পক্ষেও বাইরে বেরোনো অসম্ভব।
সুজনদা আর তার সঙ্গে যে কনস্টেবল ছিলেন ওনারা দুজনে তো বটেই, আমি আর বুধোদাও সঙ্গে-সঙ্গেই ভেবে নিয়েছিলাম এর একটাই অর্থ হয়। খুনি ওই ঘরের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে। সুজনদার সার্ভিস-রিভলভারের সেফটি-ক্যাচ খোলার ক্লিক শব্দটা পরিষ্কার শুনতে পেলাম। উনি খুব কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, বোধিসত্ত্বদা, তুমি আর রুবিক একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াও। ইট মে বি ডেঞ্জারাস। কোণঠাসা ক্রিমিনাল তো। আমি দেখে নিচ্ছি।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আমি আর বুধোদা পুরো সার্চিং-অপারেশনটাই দেখতে পেলাম। ওইটুকু একটা ঘর, কতক্ষণই বা লাগে খুঁজে দেখতে। সুজনদা একে একে খাটের তলা, সোফা আর দেয়ালের মাঝের অংশটা, প্রত্যেকটা আসবাবের পেছনদিক এমনকী কাঠের আলমারিটা অবধি খুলে দেখল। কাউকেই পাওয়া গেল না।
ওনারা দুজনেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। কোনো পুলিশের মুখে এমন হতভম্ব ভাব আমি আগে কখনো দেখিনি। আমি নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। তবে দেখতে পেলে নিশ্চয় নিজের মুখটাও ওইরকমই লাগত। শুধু বুধোদা দেখলাম ভুরু কুঁচকে কী যেন ভেবেই চলেছে।
বাড়ির বাইরে রাস্তা থেকে কিছুক্ষণ ধরেই একটা গোলমালের শব্দ ভেসে আসছিল। অনেক মানুষের উত্তেজিত গলার আওয়াজ। এরকম জায়গায়, কোনো বাড়ির বাইরে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ালে, কিছু মানুষ জড়ো হয়ে যাবে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু এতটা চেঁচামেচি স্বাভাবিক নয়। শুধু আমাদেরই নয়, সুজনদারও নিশ্চয় কিছু অস্বাভাবিক লেগেছিল। উনি সবেমাত্র কী হয়েছে দেখার জন্যে সদর দরজার দিকে দু-পা এগিয়েছেন, হঠাৎই প্রায় দশ-বারোজন লোক, যাদের দেখলে আশেপাশের কুলি, মুটে কিম্বা দোকানদার বলেই মনে হয়, ঠেলাঠেলি করে ভেতরে ঢুকে আমাদের ঘিরে ধরল। প্রায় সকলেই বাংলা-হিন্দি মেশানো ভাষায় উত্তেজিত গলায় চিৎকার করে বলতে লাগল, শিগগির বাইরে চলুন। দেখুন আপনাদের গাড়ি একটা বাচ্চাকে কেমন ধাক্কা মেরেছে। পুলিশ বলে কি মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি? ইত্যাদি।
কথাটা ওরা ভুল বলেনি। গাড়িটা ঠিক বড়বাজার থানার না হলেও ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের বটে। সুজনদার ফোন পেয়েই ওনারা প্রতাপবাবুর বাড়িতে আসছিলেন। একটা বাচ্চাকেও যে আরেকটু হলেই চাপা দিচ্ছিলেন সেটাও ঠিক। তবে কপাল ভালো, একটু কাটাছড়ার ওপর দিয়েই বাচ্চাটা বেঁচে গেছে। ফরেনসিকের গাড়ির ড্রাইভার জনতার গলার ওপরে গলা তুলে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, তাঁর কোনো দোষ নেই। তিনি পরিষ্কার দেখেছেন একটা লোক ধাক্কা মেরে বাচ্চাটাকে তাঁর গাড়ির সামনে ফেলে দিয়েই কোথায় পালাল। সুজনদা আর বুধোদা মিলে উত্তেজিত ড্রাইভার আর ক্ষিপ্ত জনতাকে কোনোরকমে আলাদা করে আবার শান্তি ফেরাল। ফরেনসিকের লোকজন ঘরের ভেতরে ঢুকে তাদের স্যাম্পেল সংগ্রহের কাজ শুরু করলেন। সবকিছু শেষ হওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্স এল। প্রতাপদাদুকে ওরা পোস্টমর্টেমের জন্যে নিয়ে যাবে।
আমি আর বুধোদা উলটোদিকের একটা বাড়ির রকে বসেছিলাম। কিছুই ভালো লাগছিল না। মাত্র দুদিনের আলাপেই প্রতাপদাদুকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। অদ্ভুত একটা আত্মসম্মানবোধ দেখেছিলাম ওনার মধ্যে। আজ সেই প্রাণবন্ত মানুষটাকেই ওরা স্ট্রেচারে শুইয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বুধোদাও দু-হাতের মধ্যে মুখ ঢেকে চুপ করে বসেছিল। সুজনদা এতক্ষণ ওদিকে ব্যস্ত ছিলেন। এবার আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, বোধিসত্ত্বদা, রাত হয়েছে। তোমরা এবারে রওনা হয়ে যাও। তবে বুঝতেই পারছ, কাল থেকেই তোমাদের দুজনকে কয়েকবার পুলিশ স্টেশনে আসতে হবে। আসলে তোমরাই তো প্রথম মার্ডার সিনে পৌঁছেছিলে।
বুধোদা ম্লান হেসে বলল, বুঝতে পারছি। আমাদের দুজনকে সন্দেহের বাইরে রাখতে গেলে মেনে নিতে হয় খুনটা ভূতে করে গেছে। বন্ধ ঘরের মধ্যে আর কে প্রতাপবাবুর মাথায় ফুলদানির বাড়ি মারবে? ফরেনসিকের ওনারা কী বলছেন—কোনো ফিঙ্গার প্রিন্ট-টিন্ট...?
সুজনদা হাত উলটে বললেন, অ্যাপারেন্টলি নাথিং। এমনকী ফুলদানিটাকেও মনে হচ্ছে রুমাল-টুমাল জড়িয়ে তুলেছিল। তবে আগে ওদের কাছ থেকে ফাইনাল-রিপোর্ট পাই, তারপর তোমাকে জানাব। আচ্ছা গুডনাইট।
হেমকুঞ্জের সামনে যখন পৌঁছলাম, তখন রাত প্রায় একটা। গাড়িটাকে কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকিয়ে বুধোদা বলল, কাল আর বেরোব না বুঝলি, এক যদি সুজন না ডাকে। তুই সময় পেলে আসিস।
পরের দিন স্কুলে থেকেই চলে গেলাম বুধোদার বাড়ি। তখনও ভালো করে সন্ধে হয়নি। দেখলাম বুধোদা ওর ঘরের ফ্রেঞ্চ-উইন্ডোর সামনে একটা বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একদৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো কিছু পড়ছে না কিম্বা কোনো অ্যান্টিক নিয়ে নাড়াচাড়া করছে না—স্রেফ ভাঁজ-করা দু-হাতের ওপর মাথা হেলিয়ে দিয়ে বসে আছে। বুধোদাকে এই অবস্থায় শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারলাম না। আমার পায়ের আওয়াজ পেয়ে বুধোদা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বলল, বোস!
আমি খাটের ওপরে বসে বললাম, কিছু বুঝতে পারলে বুধোদা?
উঁহু। সারাদিন ওই একটা বিষয় নিয়েই চিন্তা করে যাচ্ছি। কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না। ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তুই আমি মিলেই তো দরজাটা ধাক্কা দিয়ে ভাঙলাম। যখন ভেঙেছি তখন অলরেডি প্রতাপবাবু ওয়াজ ডেড—সে ব্যাপারেও সন্দেহ নেই। নিজের মাথায় কেউ নিজে অত জোরে স্ট্রাইক করতে পারে না, এটা ফরেনসিকের বেসিক প্রিন্সিপল। অত জোরে মারার জন্যে হাতটাকে যতদূর থেকে নামিয়ে আনতে হয়, নিজে নিজেকে মারলে ততটা জায়গা পাওয়া যায় না। তাহলে এটা আত্মহত্যাও নয়। অথচ...
আমি কথাটা শেষ করলাম—অথচ ঘরের মধ্যে আর কেউ ছিল না।
ঠিক। ঘরের মধ্যে কেউ ছিল না। এবং যেহেতু পুলিশ-কোর্ট- ইনভেস্টিগেশনের দুনিয়ায় অলৌকিকের কোনো জায়গা নেই, কাজেই এর একমাত্র লৌকিক ব্যাখ্যা যা হতে পারে, সেটাই হবে। খুনটা তুই আর আমি মিলেই করেছি। একজন ঘরের ভেতরে দরজায় ছিটকিনি লাগিয়ে প্রতাপবাবুর মাথায় ফুলদানির বাড়ি মেরেছে আর তারপরে অন্যজন বাইরে থেকে ধাক্কা মেরে ছিটকিনি ভেঙেছে।
অবশ্য অমন জটিল পদ্ধতিতে খুন করলাম কেন, আমাদের মোটিভ কী, কেন আমরা পালিয়ে না গিয়ে পুলিশ ডাকলাম—এসব প্রশ্ন একটা সময়ে উঠবে। কিন্তু সেসব নিয়ে এখন ভাবছি না। এখন শুধু একটা প্রশ্নই আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। ওই নিরীহ বৃদ্ধকে মারল কে? কেন? অ্যান্ড অ্যাবাভ অল—কীভাবে?
আমার সামনেই খাটের ওপরে প্রতাপবাবুর উপহার সেই হাতকড়াটা পড়েছিল। কথা বলতে বলতে আমি অন্যমনস্কভাবেই সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম।
বুধোদা নিজের মনেই বলে যাচ্ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরে ন্যাচরালি একজনের নামই মনে আসে। সুবিনয় মুস্তাফি। তোর মনে আছে রুবিক, প্রতাপবাবু কেমন উত্তেজিতভাবে চিৎকার করে উঠেছিলেন—সুবিনয়টা কতবড় শয়তান তুমি ভাবতে পারো? ধরে ফেলেছি, আমি হাতেনাতে ধরে ফেলেছি। মনে হয় সুবিনয় মুস্তাফি তখন ওনার সামনেই বসেছিলেন। হাতের নাগাল থেকে দাঁও ফসকে যাচ্ছে দেখে সুবিনয় মুস্তাফির মতন চরিত্রের পক্ষে প্রতাপবাবুকে তক্ষুনি খুন করে ফেলাটাও কিছুই আশ্চর্য নয়। শুধু ওই একটা পয়েন্টেই ওনার দিকে আঙুল তোলা যাবে না—খুনের জায়গায় উনি ছিলেন না। কেউই ছিল না।
আমি মন দিয়েই বুধোদার কথাগুলো শুনছিলাম, কিন্তু হঠাৎই আমার চোখ পড়ে গেল হাতকড়াটার ভেতরের দিকে খোদাই করা দুটো রোমান অক্ষরের দিকে। পাশাপাশি দুটো এইচ। দুটো কড়ারই ভেতরের দিকে, মানে যে-অংশটা কব্জির সঙ্গে ঠেকে থাকে, সেই জায়গাটায় স্টিলের ওপরে বেশ গভীরভাবে খোদাই করা রয়েছে এইচ অক্ষরটা, পাশাপাশি দুবার।
আমার কেন জানি না মনে হল এটা গুরুত্বপূর্ণ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এইচ এইচ। প্রিন্স রাজনের ইনিশিয়াল নয়। এমনকী প্রিয়রঞ্জন রক্ষিতেরও নয়। ম্যাজিকের দুনিয়ায় এইচ এইচ একজনই—হ্যারি হুডিনি।
থ্যাঙ্কইউ রুবিক। বুধোদা ওর জিম-ব্যাগের মধ্যে হাতকড়াটা ঢুকিয়ে নিয়ে বলল, চল!
এখন! কোথায়?
বড়বাজার থানা। একটুও নষ্ট করার মতন সময় নেই। আরে, ঘাবড়াচ্ছিস কেন? কাকিমাকে আমি ফোন করে বলে দিচ্ছি, তোকে নিয়ে বেরোচ্ছি। ফিরতে রাত হবে।
তারপর ঠিক সাতমিনিটের মধ্যে বুধোদা ওর গাড়িটাকে বিবেকানন্দ ব্রিজের ওপরে উঠিয়ে ফেলল। ব্রিজ পেরোতে-পেরোতে বুধোদা পাশ ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, প্রতাপবাবুর বাড়িতে হ্যারি হুডিনির হাতকড়া থাকার মানে কী জানিস? হুডিনির আরও সরঞ্জাম থাকার সম্ভাবনা। আর তার মানে কী জানিস?
আমি বললাম, অ্যান্টিক।
'অ্যান্টিক' তো অবশ্যই। কিন্তু তার থেকে বেশি আরও কিছু। আরও অনেক কিছু। এই বলে সেই যে বুধোদা মুখে কুলুপ আঁটল, আর কিছুতেই ওর মুখ খোলাতে পারলাম না।
মুখ খুলল একেবারে বড়বাজার থানার ওসির ঘরে ঢুকে। সুজনদা একটু গাঁইগুঁই করছিলেন। বুধোদাকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন, সিল ভেঙে আবার প্রতাপ রক্ষিতের ঘরে ঢোকার মধ্যে প্রচুর অফিসিয়াল হুজ্জুতি আছে। কিন্তু বুধোদা নাছোড়বান্দা। একবার...আর মাত্র একবার ওকে ঘরটা দেখতে দিতেই হবে। ও নিশ্চিত, ভূতুড়ে খুনির রহস্য এবারে ও ঠিক বার করে ফেলতে পারবে। কিছুটা বাধ্য হয়েই সুজনদা বগলে ফাইল নিয়ে আমাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠে বসলেন।
প্রতাপদাদুর বাড়ির দরজায় লাগানো পুলিশের তালা খোলা হল। একতলার যে-ঘরটায় উনি খুন হয়েছিলেন, সেই ঘরের দরজার সিলও ভাঙা হল। আলো জ্বেলে আমরা সেই ঘরে ঢুকলাম। ভেবেছিলাম, বুধোদা আবার সবকিছু তন্ন তন্ন করে দেখবে। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে ও সটান সেই কাঠের বড় আলমারিটার পাল্লা দুটো খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারপর আমাদের আরও অবাক করে দিয়ে পাল্লাদুটো ভেতর থেকে ভেজিয়ে দিল।
সুজনদা অসন্তুষ্ট গলায় ডাকলেন—বোধিসত্ত্বদা...এই বোধিসত্ত্বদা! এসব কী করছ? মাথাখারাপ হয়ে গেল নাকি তোমার?
শুধু ডাক দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না বড়বাজার থানার ওসি। সটান গিয়ে পাল্লাদুটো টেনে খুলে ফেললেন এবং যেন মুখের ওপরে একটা ধাক্কা খেয়ে সঙ্গে-সঙ্গেই দু-পা পিছিয়ে এলেন। আলমারির ভেতরে বুধোদা ছিল না। আলমারি ফাঁকা। আমিও যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম। তবে বেশিক্ষণ আমাদের ওই অবস্থায় না রেখে বুধোদা বেরিয়ে এলো আলমারির পেছনদিক দিয়ে। একগাল হেসে বলল, আয়! দেখে যা।
দেখলাম। সাধারণ কাঠের আলমারির পেছনে লুকোনো একটা আংটা, যেটায় টান দিলেই একটা তক্তা সরে গিয়ে পেছনে একটা চোরাকুঠুরি বেরিয়ে পড়ছে। ছোটখাটো চেহারার একজন মানুষ সেখানে কোনোরকমে গুঁড়িশুঁড়ি মেরে বসে থাকতে পারে। সেই চোরাকুঠুরির পেছনের দেয়ালেও একইরকমের একটা আংটা—যেটার সাহায্যে আরেকটা কাঠের টুকরো সরিয়ে বুধোদা একটু আগে বেরিয়ে এসেছিল।
এরপর বুধোদা যেটা দেখাল সেটার জন্যে ওর সেলফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালতে হল। ফ্ল্যাশের জোরালো আলোয় আমি আর সুজনদা দেখলাম, পাল্লার ভেতরদিকে কাঠের গায়ে খোদাই করা আছে দুটো রোমান অক্ষর—এইচ এইচ।
এই হল ব্যাপার। বিজয়ীর হাসি হেসে বলল বুধোদা।
কী হল ব্যাপার? আমি বললাম।
কী ব্যাপার বোধিসত্ত্বদা? সুজনদা জিগ্যেস করলেন।
বুধোদা ঘরের এককোণে রাখা সোফাসেটটার ওপরে গা এলিয়ে দিয়ে বলল, আয় এখানে বোস। সুজন, তুমিও বোসো। তবে তার আগে তোমার হাবিলদারকে একটু হাঁক দিয়ে বলে দাও, নাখোদা মসজিদের কোনার চায়ের দোকানটা থেকে কেটলিতে করে মালাইদার চা নিয়ে আসতে, আর মাটির ভাঁড়। টেনশনে গলাটা শুকিয়ে গিয়েছে।
হবে না টেনশন? খালি ভাবছি, এই বয়সে কি ভূতপ্রেত কিম্বা বাণ-মারায় বিশ্বাস করতে হবে? এই ছিল কপালে? ভাগ্যিস রুবিক হ্যান্ডকাফটার ওপরে হ্যারি হুডিনির নামের ইনিশিয়াল দেখতে পেল। নাহলে এখনো অন্ধকারেই হাতড়ে মরতাম।
ওইটি দেখার সঙ্গে-সঙ্গেই বুঝতে পারলাম, জার্মানি থেকে তারাপদ মুস্তাফি প্রিন্স রাজনের কিছু স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে এসেছিলেন। কেমন স্মৃতিচিহ্ন? যুদ্ধের পরের সেই ভয়ঙ্কর আকালের দিনেও কেন অত খরচ করে জার্মানি থেকে তিনি সেগুলোকে নিয়ে এসেছিলেন?
এর একটাই উত্তর হয়। জিনিসগুলো শুধুই প্রিন্স রাজনের স্মৃতিচিহ্ন ছিল না। সেগুলোর গায়ে লেগেছিল আরেক প্রতিভার স্পর্শ। হ্যারি হুডিনির।
এর আগে প্রতাপবাবুই কথায়-কথায় আমাদের বলেছিলেন, মার্টিন জিগলার প্রিয়রঞ্জনবাবুকে এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলেন যে, তিনি নিজের সংগ্রহের অনেক ম্যাজিকের সরঞ্জাম বিনাপয়সায় প্রিয়রঞ্জনকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন।
হ্যান্ডকাফটা যে স্বয়ং হুডিনির সেটা বুঝতে পারামাত্রই মনে হল, তাহলে কি মার্টিন জিগলারের 'নিজের সংগ্রহ' মানে তার প্রিয় বন্ধু হুডিনির এরকম আরও কিছু স্মৃতিচিহ্ন আছে? তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন এত বছর আগলে রাখার পরে এবার সেগুলো কোনো যোগ্য মানুষকে দিয়ে দেওয়া উচিত, কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে তাঁর নিজের বেঁচে থাকাটাই অনিশ্চিত। এমন একজনের হাতে ওগুলো তুলে দেওয়া উচিত, যে সেগুলোকে হুডিনির মতন দক্ষতাতেই ব্যবহার করতে পারবে। নিশ্চয় তাই।
কেবল ব্যবহার করতে নয়, তিনি প্রিন্স রাজনকে হুডিনির ম্যাজিকের কিছু সরঞ্জাম বরাবরের মতন দিয়ে দিয়েছিলেন; গিফট করেছিলেন প্রিন্স রাজনকে। প্রিয়রঞ্জনের সহচর তারাপদ মুস্তাফি জানতেন কোন সরঞ্জামগুলো হুডিনির নিজের উদ্ভাবিত সরঞ্জাম। তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সেগুলোকে ভারতে ফিরিয়ে আনলেন। তুলে দিলেন প্রিয়রঞ্জন রক্ষিতের বিধবা পত্নীর হাতে।
তখন প্রিয়রঞ্জনবাবুর একমাত্র সন্তানের বয়স দুই। সে এসবের কিছুই জানল না। প্রতাপবাবুর কাছেই শুনেছি যে ওনার মা ম্যাজিকের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এরকম কোনো জিনিসে ওনাকে হাত ছোঁয়াতে দিতেন না। তার ভয় ছিল পাছে প্রতাপবাবুকেও ম্যাজিকের নেশা পেয়ে বসে। কাজেই প্রতাপবাবুর কোনোদিনই জানা হয়নি যে, তার ঘরের মধ্যেই রয়ে গেছে কিছু দুর্লভ অ্যান্টিক—হুডিনির ম্যাজিকের প্রপস।
জানতে পারলেন সুবিনয় মুস্তাফি। কেমন করে সেটা আন্দাজ করতে পারি। হয়তো দাদুর কোনো পুরোনো ডায়েরি কিম্বা নোটস তার হাতে পড়ে গিয়েছিল। শুধু যে এমন কিছু দামি জিনিস তাহের আলি লেনের বাড়িটায় পড়ে আছে এটুকুই তিনি জানেননি, প্রতিটি জিনিসের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাও নিশ্চয় তিনি সেই নোটস কিম্বা ডায়েরি থেকে পেয়েছিলেন। তার মধ্যে একটা জিনিসের বর্ণনা তাকে লোভে পাগল করে তুলল। সেটা হচ্ছে একটা কাঠের আলমারি।
বুঝলে সুজন, হুডিনির এই ম্যাজিকটার কথা তুমি অনেক ম্যাজিকের বইয়ে কিম্বা পত্রপত্রিকায় এখনো দেখতে পাবে। দর্শকদের চোখের সামনে হুডিনিকে একটা কাঠের আলমারির মধ্যে পুরে আলমারির দরজায় তালা দিয়ে দেওয়া হল। আলমারিটা তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করেছেন সবাই। চাবিও রইল দর্শকদের কাছেই। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেখা গেল আলমারির গায়ের তালা যেমনকার তেমনই রয়েছে কিন্তু হুডিনি দর্শক-আসনের মাঝের রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছেন স্টেজের দিকে।
নেহাত আমার কাছে আমেরিকার মধ্যে সেরা ম্যাজিকের সরঞ্জাম যারা বানায় সেই গ্যামাজ কোম্পানির পুরোনো কিছু ক্যাটালগ ছিল। তাই আমি এই আলমারিটা থেকে বেরোনোর গোপন রাস্তা বার করতে পারলাম। নাহলে কারুর সাধ্য নেই খোদ হুডিনির নিজের ডিজাইনে তৈরি করা এই আলমারির গোপন চেম্বার খুঁজে বার করে।
সুবিনয় মুস্তাফিও খুঁজে পেয়েছিলেন। হয়তো তারাপদ মুস্তাফির ডায়েরিতে ওই কায়দাটার কথাও লেখা ছিল, সেইজন্যেই পেয়েছিলেন। তাছাড়া 'ম্যাজিক' এই আর্টটা তো তার অচেনা নয়। খুঁজে পেয়েছিলেন বলেই প্রতাপবাবুর মাথায় ফুলদানির বাড়ি মারার পরের মুহূর্তেই যখন দরজায় রুবিকের হাতের চাপে কলিং-বেল বেজে উঠল তখন তিনি উপায় না দেখে ওই আলমারির মধ্যে ঢুকে পড়লেন।
তারপর যা হল সেটা আমার আন্দাজ। তবে মনে হয় তোমরা ইনভেস্টিগেট করলে দেখবে আন্দাজে ভুল নেই। ওই আলমারির মধ্যে বসেই সুবিনয় মুস্তাফি মোবাইলের মেসেজে তার চ্যালাচামুন্ডাদের নির্দেশ দেন, যেভাবেই হোক বাইরে একটা গোলমাল বাঁধিয়ে ঘরে ঢুকে পড়তে। তার চ্যালারা একটা বাচ্চা ছেলেকে ঠেলা দিয়ে ফরেনসিকের গাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে নিখুঁতভাবে গোলমালটা বাঁধিয়ে দেয়। আমরা যে-কয়েক সেকেন্ড ওই 'মব'-এর মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম, তার মধ্যেই সুবিনয় মুস্তাফি আলমারি থেকে বেরিয়ে এই ঘর ছেড়ে পালান।
সুজনদা বুধোদার কথা শুনতে শুনতে উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। শুনলাম তিনি ফোনে থানার সেকেন্ড-অফিসারকে একটা টিম রেডি করতে বলছেন। গন্তব্য হাতিবাগান। আমরা প্রতাপবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। দরজাটা আবার সিল করতে করতে সুজনদা জিগ্যেস করলেন, বোধিসত্ত্বদা, স্কাউন্ড্রেলটা প্রতাপ রক্ষিতকে খুন করল কেন?
বুধোদা বলল, সুবিনয়বাবু ওই আলমারিটাকে মরিয়ার মতন চেয়েছিলেন— অ্যান্টিক হিসেবে নয়—ওনার জোচ্চুরির ব্যবসার মূলধন হিসেবে। ভাবতে পারছ, ওনার প্ল্যানচেটের আসরের মিডিয়ামকে যদি ওই আলমারির মধ্যে বন্ধ করে রাখা হয় আর সেখান থেকে সূক্ষ্ম-দেহে বেরিয়ে এসে যদি সে প্রশ্নের উত্তর লিখে দিয়ে যায়, তাহলে কেমন মারকাটারি বিজনেস হবে? অতি উৎসাহেই হয়তো সুবিনয় মুস্তাফি খেয়াল করেননি যে, তিনি যখন আলমারির লুকোনো চেম্বারটা খুলে দেখছেন তখনই বাইরে থেকে ঘরে ঢুকে পড়েছেন প্রতাপ রক্ষিত। ফোনে চিৎকার করে আমাদের বলতে শুরু করেছেন সব কথা।
মরিয়া সুবিনয়বাবু প্রথমে ঘরের দরজা বন্ধ করে ওনাকে আটকানোর চেষ্টা করেন। তারপরে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ওনাকে মেরে ফেলেন। নিশ্চয় দলিলটা তার আগেই সই করানো হয়ে গিয়েছিল। কাজেই এরপর প্রতাপবাবু খুন হলেও তার অসুবিধে ছিল না। অসুবিধে হল শুধু আমরা দু-মিনিটের মধ্যে এখানে পৌঁছে যাওয়ায়।
সুজনদা জিপে উঠতে উঠতে বললেন, চিন্তা কোরো না বোধিসত্ত্বদা। ওই লুকোনো চেম্বারের ফরেনসিক এগজামিনেশনে নিশ্চয় সুবিনয় মুস্তাফির কিছু না কিছু চিহ্ন আমরা পাবই। তারপরে ওর জবানবন্দি নেওয়ার সুযোগ তো রইলই। সুবিনয় মুস্তাফির হাতে এবার যে হাতকড়াটা পরাব, সেটা ও খুলতে পারবে না। কারণ ও হুডিনি নয়...শিল্পী নয়। ও একটা খুনি। ওর ম্যাজিক 'খুনি ম্যাজিক'।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন