সৈকত মুখোপাধ্যায়

গত রোববার দুপুরে বুধোদার বাড়ি গিয়েছিলাম। বুধোদার অ্যান্টিকের শোরুম 'মহারাজা কালেকশনস' রোববার বন্ধ থাকে, তাই ওই একটা দিনই ওর সঙ্গে একটু গল্প-টল্প করার সুযোগ পাই।
উত্তরপাড়ার জি.টি. রোডের একধারে বুধোদাদের একশো-সতেরো বছরের পুরনো প্রাসাদের মতন বাড়ি—নাম হেমকুঞ্জ। আর জি.টি. রোড পেরিয়ে উলটোদিকে দু-মিনিট হাঁটলেই আমাদের বাড়ি। হেমকুঞ্জের সকলকেই আমি জ্ঞান হওয়ার পর থেকে আত্মীয় বলেই জানি। তবে তাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে ভাব বুধোদা, মানে বোধিসত্ত্ব মজুমদারের সঙ্গে।
সেদিন ঘরে ঢুকতেই বুধোদা আমাকে পুনের দীনকর কেলকার মিউজিয়ামের একটা ক্যাটালগ দেখতে দিয়ে বলল, এটা দ্যাখ রুবিক। বুঝতে পারবি একশো কি দুশো বছর আগে প্রতিদিনের কাজের জিনিসগুলোকেও মানুষ কত সুন্দর করে বানাতো। আর কেলকার মিউজিয়ামে এসব জিনিসের যা কালেকশনস আছে সেরকম আর কোথাও নেই।
সত্যিই তাই। যতই বইটার একটা একটা করে পাতা ওলটাচ্ছিলাম ততই আমার চোখ গোল গোল হয়ে যাচ্ছিল।
চুলের চিরুনি থেকে পায়ের চটি, কুটনো কোটার বঁটি থেকে মানুষ কাটার তলোয়ার—সব কিছুতেই যেন শিল্পীর কল্পনার ছোঁয়া। কয়েকটা জাঁতির ছবি ছিল— সুপুরি কাটার জাঁতি। তার কোনোটার শেপ মাছের মতন, কোনোটা বাঘের মতন, আর সবচেয়ে সুন্দর যেটা সেটা একটা উড়ন্ত পরি।
আমার পড়া হয়ে যাবার পর বইটা আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বুধোদা দুঃখ করে বলল, শিল্পবিপ্লবের পর থেকে এই হাতের ছোঁয়াটাই হারিয়ে গেছেরে রুবিক। এখন বড় বড় মেশিনে এক মাপের, এক ডিজাইনের, কোটি কোটি আইটেম তৈরি হয়। তার মধ্যে কোথায় শিল্প আর কোথায় কল্পনা?
তরপর মুচকি হেসে যোগ করল—অবশ্য তাতে বোধিসত্ত্ব মজুমদারের মঙ্গলই হয়েছে। এখন পাওয়া যায় না বলেই তো এগুলো অ্যান্টিক। আর অ্যান্টিক বেচেই তো তোর বুধোদার পেট চলে।
পেট চলার কথাটা ডাঁহা মিথ্যে। বুধোদাদের পৈতৃক যে ট্র্যান্সপোর্টের বিজনেস আছে সেটার ভয়ঙ্কর নামডাক। 'মহারাজা কালেকশনস' না থাকলেও ও দিব্যি রাজার হালে থাকতে পারত। আসলে ওর নিজের মধ্যেই ইতিহাস, শিল্প এইসবের প্রতি একটা প্রবল টান রয়েছে আর সেই টান থেকেই ও অ্যান্টিকের বিজনেস শুরু করেছে। আমি বেশ বুঝতে পারি, ব্যবসায় লাভ-ক্ষতির ব্যাপারটা ও একদমই পাত্তা দেয় না। কোনো জিনিস মনে ধরলে দিব্যি সেটাকে বিক্রি না করে নিজের আলমারিতে তুলে রেখে দেয়।
আমাদের কথার মধ্যেই একবার যেন একতলা থেকে ডোর-বেলের আবছা আওয়াজ পেলাম।
মজুমদার ফ্যামিলির বহুদিনের হেল্পিং-হ্যান্ড কানাইদা সারাক্ষণ নীচেই থাকে। লোকজন এলে ও-ই দরজা খুলে বাইরের ঘরে বসায়, তারপর যার সঙ্গে প্রয়োজন তাকে ডেকে দেয়। সেদিনের সেই ভিজিটরের প্রয়োজনটা ছিল বুধোদার সঙ্গেই। কানাইদা ওপরে উঠে এসে খবর দিল—ছোড়দা, এক বাবু তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।
বুধোদা আশি বছরের পুরনো কুক অ্যান্ড কেলভির দেয়ালঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, ভদ্রলোক তো দেখছি ভয়ঙ্কর পাঙচুয়াল। পাঁচটায় আসবেন বলেছিলেন। একেবারে অন দা ডট পাঁচটাতেই এসেছেন।
আমি বললাম, কোন ভদ্রলোক?
শোভাবাজারের সুধাবিন্দু বসাক। বিজনেসম্যান। সকালে ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েছিলেন। চল, নিচে গিয়ে শুনি ওনার কী বক্তব্য।
বাইরের ঘরে সোফায় যিনি বসেছিলেন তার বয়স পঞ্চাশের বেশ কিছুটা নিচেই হবে। ছোটখাটো চেহারা, গায়ের রং ফর্সা, মাথার সামনের দিক থেকে চুল পাতলা হয়ে টাক পড়ে গিয়েছে। একটু বোঁচা নাক আর ফোলা গালের জন্যে মুখটা বাচ্চা বাচ্চা লাগে—যাকে বলে 'বেবি-ফেস'। যে অ্যাশ কালারের ব্লেজারটা পরে ছিলেন সেটার কথা ছেড়েই দিলাম। চশমা, মোবাইল থেকে শুরু করে পকেটের পেন, সবকটাই দেখলাম ভয়ঙ্কর নামজাদা ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট। ইচ্ছে করছিল একবার দরজার বাইরে উঁকি মেরে দেখে আসি, ছেড়ে রাখা জুতোদুটো কোন কোম্পানির। কিন্তু এদিকে কথা শুরু হয়ে গেল বলে সেটা আর করা গেল না। বুধোদা ঘরে ঢুকতেই ভদ্রলোক সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শেক হ্যান্ড করার জন্যে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, মিস্টার মজুমদার? আমিই সুধাবিন্দু বসাক। আপনাকে ফোন করেছিলাম।
বুধোদা ওনার হাতটা দুবার ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, বসুন বসুন। বলুন কী করতে পারি।
ভদ্রলোক বললেন, দেখুন মিস্টার মজুমদার, আমাদের ফ্যামিলিটাও আপনাদের মতনই পুরনো। ইন-ফ্যাক্ট, আপনাদের এই বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের শোভাবাজারের বাড়িটার কথাই মনে পড়ছিল। আমাদের বাড়ির নামটা অবশ্য একটু বিলিতি ঘেঁষা, 'হ্যাপি নুক'। আর সেটা স্বাভাবিক। আমার দাদুর দাদু মন্মথনাথ বসাক ইংরেজদের সঙ্গে ওঠাবসা করেই বড়লোক হয়েছিলেন। নুনের গোলা, মশলা, সোনা-রুপো এরকম নানারকম ব্যবসা ছিল তাঁর। বাড়িটা তিনিই বানিয়েছিলেন, নামটাও তারই দেওয়া।
মন্মথনাথের ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ বসাক তাঁর বাবার সাম্রাজ্যকে আরো এক্সটেন্ড করেন। ইন দা ইয়ার এইট্টিন নাইনটি ওয়ান তিনি ডুয়ার্সে একটা চা-বাগানের পত্তন করেন যেটা ওয়ান অফ দা ওলডেস্ট ইন দিস স্টেট। ভাবতে পারেন, সেই পরাধীন দেশে তিনি চা-বাগান চালানোর জন্যে মাইনে দিয়ে সাহেব ম্যানেজার রেখেছিলেন? কুকড়াঝোরা টি-এস্টেট আমাদের ফ্যামিলির সবচেয়ে দামি প্রপার্টি ছিল একসময়।
ছিল বলছেন কেন? এখন নেই? বুধোদা জিগ্যেস করল।
সুধাবিন্দু বসাক একটু দুঃখিত গলায় বললেন, নাঃ। চালাতে পারলাম না। একা পড়ে গেলাম। আসলে কী হয়েছে জানেন? আমার কাজিনরা সব বিগ-শট। ভীষণ পন্ডিত। নাম বললে অনেককেই চিনতে পারবেন। তারা কেউ ইউরোপে, কেউ আমেরিকায় সেটল করে গেছে। চা-বাগান নিয়ে তারা লিস্ট বদারড। কিছু বলতে গেলেই বলে, বিক্রি করে দে। তাছাড়া আমি নিজেও রিসেন্টলি ডানকুনিতে একটা বিস্কিট ফ্যাক্টরি খুলেছি। সেটার পেছনে আমাকে দিনে আঠেরো ঘণ্টা খাটতে হচ্ছে। কুকড়াঝোরায় যাব কখন?
আমরা কেউ দেখাশোনা করতে পারি না বলেই চা-বাগানটা হিউজ লস করছিল। এভাবে কোনও কোম্পানি চালানো যায় না।
কানাইদা চা দিয়ে গিয়েছিল। সেই চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়েই সুধাবিন্দুবাবুর মুখটা যাকে বলে 'প্রসন্ন' হয়ে উঠল, আর সেটা কেন তাও আমি জানি। হেমকুঞ্জে আড়াইহাজার টাকা কেজির মকাইবাড়ি চা ছাড়া অন্য কিছু ঢোকে না আর সুধাবিন্দুবাবু তো চায়ের জগতেরই লোক। চায়ের জাত-টা চিনতে পেরেছেন।
ধবধবে সাদা রুমালে ঠোঁটদুটো আলতো করে মুছে নিয়ে সুধাবিন্দুবাবু আবার কথা শুরু করলেন।
হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও অবিশ্যি বাগান বিক্রির ব্যাপারটা ফাইনাল করে ফেলেছি। কারণ, সত্যি কথা বলতে কি প্রপার্টি-টা বিক্রি হলে আমি নিজেও আমার শেয়ার হিসেবে একটা হ্যান্ডসাম অ্যামাউন্ট পেয়ে যাব, আর সেই টাকাটা আমার বিস্কিট-ফ্যাক্টরিতে খুব কাজে লাগবে। আগামি মাসেই দিল্লির একটা ফার্ম কুকড়াঝোরার পজেশন নেবে। ওরা ওখানে পোট্যাটো চীপসের কারখানা বানাবে বলে শুনেছি।
বুধোদা এতক্ষণ চুপ করে ওনার কথা শুনছিল। এবার একটু অধৈর্য গলায় বলল, মিস্টার বসাক। আমি একজন অ্যান্টিক-ডিলার। এইসব বাড়িজমি কেনা বেচার ব্যাপারে আমার এক্সপিরিয়েন্স শূন্য। আমি ঠিক কীভাবে আপনাকে হেল্প করব সেটা বুঝতে পারছি না।
জানি জানি মিস্টার মজুমদার। আমার প্রয়োজনটাও অ্যান্টিক নিয়েই। আসলে একটু ব্যাকগ্রাউন্ডটা না বলে নিলে...। যাই হোক, এবার কাজের কথায় আসি।
কুকড়াঝোরায় চা-বাগানের মধ্যেই আমাদের একটা প্রায় একশো বছরের পুরনো বাংলো রয়েছে। ম্যানেজারের বাংলো। আর আগেকার দিনে চা-বাগানের ম্যানেজাররা কীরকম ল্যাভিসলি জীবন কাটাত জানেন নিশ্চয়? কাজেই সেই বাংলোয় বেশ কিছু পুরনো আমলের রুপো আর পোর্সেলিনের বাসন, আয়না, ফুলদানি, ইওরোপিয়ান ফার্নিচার রয়েছে। এমনকী কিছু অয়েল-পেন্টিংও রয়েছে যেগুলো আমার সেই ঠাকুর্দার পিতৃদেব নিজে ইংল্যান্ড না হল্যান্ড কোথা থেকে যেন কিনে এনেছিলেন।
যাদের কাছে বাগান বিক্রি করছি তাদের হাতে তো আর ওগুলো তুলে দেব না। কাজেই সত্যিকারেই কোন জিনিসগুলোকে অ্যান্টিকের মর্যাদা দেওয়া যায় আর কাদের কাছেই বা সেগুলো বিক্রি করা যায়, সেসব আপনাকেই একটু ঠিক করে দিতে হবে। এই ধরুন প্রথমেই তো সবকিছুর ডেসক্রিপশন দিয়ে একটা ক্যাটালগ বানানো উচিত, না কি? তারপর কোন জিনিসটার কীরকম দাম হতে পারে...।
অ্যান্টিকের প্রসঙ্গ আসতেই বুধোদা দেখলাম ওর দাড়ির মধ্যে আঙুল চালাতে শুরু করেছে। বাইরে থেকে ওর উত্তেজনা বুঝবার এটাই একমাত্র ইন্ডিকেশন। উত্তেজনার কারণটাও আমার পক্ষে অন্তত বোঝা কঠিন নয়। অবুঝ লোকেদের হাতে কিম্বা রোদে বৃষ্টিতে কখন যে কোন অ্যান্টিক নষ্ট হয়ে যায় বলা কঠিন। আর অ্যান্টিক এমনই জিনিস যা দ্বিতীয়বার তৈরি করা যায় না। যা হারায় তা হারিয়েই যায়।
এইতো, কদিন আগেই বীরভূমের এক পড়তি জমিদারবাড়ির সব জিনিসপত্তর বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে শুনে বুধোদা গাড়ি নিয়ে ওখানে দৌড়েছিল। কিন্তু ফিরে এল চূড়ান্ত হতাশ হয়ে। বলল, রুবিক! যদি আর এক ঘণ্টা আগেও পৌঁছতে পারতাম রে!
কী ব্যাপার? না, ফার্নিচার-টার্নিচারের মতন চেনা জিনিস ভালো দামেই বিক্রি হয়েছে। কিন্তু নাইটিন সিক্সটিজের কিছু গ্রামাফোন-রেকর্ড আবর্জনা মনে করে জমিদারমশাইয়ের বংশধরেরা স্রেফ ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলেন। বুধোদা তখনো ওখানে পৌঁছয়নি। সেই সব ডিস্ক বুধোদা আর উদ্ধার করতে পারেনি।
তারপরেও অনেকদিন অবধি বুধোদাকে দেখেছি কাজের মধ্যে বার বার অন্যমনস্ক হয়ে যেতে। খালি বলত, কে জানে কার গান ছিল ওই ডিস্কগুলোতে!
সেইজন্যেই বুধোদা যখন মিস্টার বসাকের প্রস্তাবে এক কথায় বলে দিল যে ও রাজি, তখন সুধাবিন্দু বসাক একটু অবাক হলেও আমি হইনি।
বুধোদা তারপর বলল, এর জন্যে অবশ্য আমাকে কুকড়াঝোরায় গিয়ে থাকতে হবে। কতদিন, সেটা তো এখনই বলা সম্ভব নয়। গিয়ে বুঝতে পারব।
নিশ্চয় নিশ্চয়। যতদিন প্রয়োজন হয় থাকুন না। আই উইল অ্যারেঞ্জ ফর এভরিথিং অ্যান্ড অফকোর্স উই শ্যাল পে ইউ ফর ইওর সার্ভিস।—কৃতজ্ঞতায় হাত কচলাতে কচলাতে বললেন সুধাবিন্দুবাবু।
এরপরেই সুধাবিন্দুবাবু যেটা বললেন, সেটা শুনে আমি বিষম খেলাম। উনি বললেন, রুবিকের যদি স্কুল ছুটি থাকে তাহলে ওকেও নিয়ে যান। ও আপনাকে সাহায্যও করতে পারবে আবার একটু বনে পাহাড়ে বেড়ানোও হয়ে যাবে।
বুধোদা অবধি ভারি অবাক হয়ে বলল, আপনি রুবিককে চেনেন নাকি?
চিনব না? ভালো নাম মাল্যবান মিত্র। উত্তরপাড়া গভর্মেন্ট স্কুল, ক্লাস ইলেভেন। স্কুল ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন আবার পাহাড়ে চড়াও শিখেছে।
আরিব্বাস। রুবিকের লেখাগুলো পড়েছেন মনে হচ্ছে?
ইয়েস স্যার। সবকটা। ব্যবসা করতে করতে যখন মাথা ঝিমঝিম করে তখন আমি অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পড়ে মাথা ছাড়াই। তার মধ্যে আপনাদের গুলোও আছে।
বুঝলাম, ভদ্রলোকের ফেস-কাটিং-এই শুধু বেবি নেই, মনের ভেতরেও একটা বেবি মাঝে মাঝে হাত-পা ছোড়ে।
সুধাবিন্দুবাবুর কথাই রইল। সত্যিই আমার স্কুলে ছুটি চলছিল। কাজেই আমিও যে কুকড়াঝোরায় যাব সেটা ফাইনাল হয়ে গেল। অবশ্য তার জন্যে বুধোদাকে একবার আমার মায়ের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে নিতে হল।
সুধাবিন্দুবাবুর সঙ্গে কথা বলে তখনই ঠিক হল, বৃহস্পতিবার আমি আর বুধোদা দুপুরের ফ্লাইটে বাগডোগরা হয়ে কুকড়াঝোরা পৌঁছব। আগেকার দিন হলে বাগডোগরায় বাগানের নিজস্ব গাড়ি থাকত। তবে এখন আর টি-গার্ডেনই নেই তো গাড়ি কোথা থেকে থাকবে? যাই হোক, সুধাবিন্দুবাবুই ফোন-টোন করে শিলিগুড়ি থেকে আমাদের কুকড়াঝোরা যাওয়ার ভাড়া-গাড়ির বন্দোবস্ত করে দিলেন।
ঘর থেকে বেরোবার সময় উনি আমার পিঠে হাত রেখে বলে গেলেন, কুকড়াঝোরা এক অদ্ভুত জায়গা, বুঝলে রুবিক। অনেক ভূতুড়ে গল্প চালু আছে জায়গাটা নিয়ে। আমি তো ওখানে তোমার মতন বয়স থেকেই যাচ্ছি। সত্যি কথা বলছি, বাগানের ভেতরে থাকতে আমার বেশ গা ছমছম করত। তুমি তো অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসো। দ্যাখো, হয়তো সেরকম কিছু এক্সপেরিয়েন্স জুটেও যেতে পারে।
ওনার শেষ কথাটা যে এভাবে সত্যি হয়ে যাবে সেটা তখন ভাবতে পারিনি।
শিলিগুড়ি থেকে পাঙ্খাবাড়ি হয়ে যে রাস্তাটা কার্শিয়ং-এর দিকে চলে গেছে তারই মাঝ বরাবর একটা সরু ফ্যাকড়া বেরিয়ে পুবদিকের পাহাড়ের ঢাল ধরে উঠতে শুরু করেছে। ওটাই কুকড়াঝোরা যাওয়ার রাস্তা। প্রথম দু-তিন কিলোমিটারের মধ্যে দুয়েকটা পাহাড়ি গ্রাম আর চা-বাগান দেখেছিলাম। তারপর থেকেই দু-পাশে শুধু ঘন শাল আর বাঁশের জঙ্গল।
পনেরো কিলোমিটারের মাথায় হঠাৎই দুপাশের সেই জঙ্গলের চেহারা বদলে গেল। বড় বড় গাছের জায়গায় দেখা গেল ঘন ঝোপঝাড়। আমাদের ড্রাইভার কমল গুরুং দু-দিকে হাত দেখিয়ে বললেন, এইখানেই পাহাড়ের ঢাল জুড়ে কুকড়াঝোরার চা বাগান ছিল স্যার। এখন চায়ের গাছগুলোকে মেরে ফেলে জঙ্গল গজিয়ে উঠেছে। আর পাঁচ বছরের মধ্যে চারপাশের বাঁশবনের থেকে জায়গাটাকে আর আলাদা করতে পারবেন না। আর ওই দেখুন, টি-এস্টেটের ঘরবাড়ি।
কমল গুরুং যেদিকে আঙুল তুলে দ্যাখালেন, সেদিকে তাকিয়ে দেখি সত্যিই, জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে বেশ কয়েকটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। আমাদের গাড়ি আর একটু এগোতেই রাস্তা থেকে নীচে দেখতে পেলাম বিরাট একটা টিনের শেড। শেডটার গায়ে এখনো সাদা রঙে ইংরিজিতে লেখা কুকড়াঝোরা শব্দটার কয়েকটা অক্ষর পড়া যাচ্ছে। ড্রাইভারসাহেব বললেন, এটাই ছিল ফ্যাক্টরি। এখানেই কাঁচা চা-পাতা থেকে চা তৈরি হত।
আর দুটো বাঁক ঘুরেই আমরা কুকড়াঝোরা চা বাগানের মরচে ধরা লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। নুড়ি পাথরের রাস্তা, যাকে বলে 'গ্র্যাভেল রোড'। বর্ষায় নুড়ি ধুয়ে গিয়ে মাটি বেরিয়ে পড়েছে। সেই জলকাদা আর গর্তে ভরা রাস্তা দিয়ে খুব সাবধানে গাড়ি চালিয়ে কমল গুরুং যে বাংলোটার সামনে গাড়ি পার্ক করালেন সেরকম বিশাল বাংলো আমি সিনেমার বাইরে আর কোথাও দেখিনি। পাইন-কাঠের দেয়াল আর টালির ছাদ। চারিদিক ঘিরে চওড়া বারান্দা। চা-বাগানের এই চরম দুর্দশার দিনেও কে যেন অনেক যত্নে বাংলোর সামনে একটুকরো ফুলের বাগান বাঁচিয়ে রেখেছে।
গাড়ি থেকে নামতেই আমাদের যে রিসিভ করল, তার নাম ডাম্পি মাহাতো। এর কথা সুধাবিন্দুবাবু আমাদের বলে রেখেছিলেন। ডাম্পি মাহাতো এই বাংলোর কেয়ার-টেকার কাম কুক কাম সিকিউরিটি অফিসার। পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়স হবে। এই শীতেও প্যান্টের ওপরে শুধু একটা খাকি ফুল-শার্ট, যার পকেটের ওপর কুকড়াঝোরা টি-এস্টেটের সুতোয় বোনা নামটা এখনো চেষ্টা করলে পড়া যায়।
ডাম্পিভাইয়ের পাথরে খোদাই করা চেহারা। ঝলমলে হাসি আর বড় বড় চোখদুটো দেখলেই বোঝা যায় ভীষণ সৎ আর সরল। সুধাবিন্দুবাবু সেদিন কথায় কথায় বলেছিলেন, মাহাতো-রা নাকি গত একশো বছর ধরে এই কুকড়াঝোরার নুন খেয়েছে। এখানে ওদের চার-পুরুষের বাস। তাই ডাম্পির হাতে বাংলোর সমস্ত সম্পত্তি একশোভাগ নিরাপদ।
ডাম্পিভাই শিলিগুড়ির মিশনারি স্কুলে লেখাপড়া করেছে। চমৎকার ইংরিজি আর বাংলা বলতে পারে।
আমরা পৌঁছনোর পনেরো মিনিটের মধ্যে ডাম্পিভাই কাঠের উনুন জ্বেলে হাত-পা ধোয়ার জল গরম করে দিল। গিজার কাজ করবে না, কারণ কুকড়াঝোরায় গত ছ'মাস ধরে বিদ্যুত নেই। টি-গার্ডেনের যে নিজস্ব সাপ্লাই-লাইন সেটা নাকি ট্র্যান্সফর্মার সমেত গত বর্ষায় ভেঙে পড়েছে। পয়সার অভাবে আর সারানো হয়নি।
আলোর জন্যে বাংলোর মধ্যে তিনটে বড় বড় ব্যাটারি-ল্যাম্প আছে। তাছাড়া প্রত্যেক দেয়ালে দেয়ালগিরি আর হ্যারিকেনও রয়েছে। কিন্তু ল্যাপটপ, মোবাইল কিম্বা বুধোদার ক্যামেরার ব্যাটারিগুলোতেও চার্জ দেওয়া যাবে না। সুবিধে হচ্ছে, এখানে টাওয়ারের অবস্থা এতই করুণ যে, মোবাইল কিম্বা ল্যাপটপ খুব বেশি ইউজড হবে বলেও মনে হয় না।
এইসব অসুবিধের কথা জেনেই আমরা কুকড়াঝোরায় এসেছি। বুধোদা বলে, অ্যান্টিক কখনো এয়ার-কন্ডিশনড সুপারমার্কেটে সাজানো থাকে না। যারা অ্যান্টিক-হান্টার তাদের কষ্ট করার মানসিক প্রস্তুতি থাকা উচিত। আর আমাদের তা রয়েছেও। যখন কালো অর্কিডের খোঁজে নাগাল্যান্ডের জঙ্গলে গিয়েছিলাম তখন তো জঙ্গলের মধ্যে হ্যামক টাঙিয়ে শুতে হয়েছিল। তার তুলনায় কুকড়াঝোরা তো স্বর্গ।
চা-টা খেয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়েই বুধোদা বলল, চল রুবিক, বেরোবো।
আমি বললাম, কোথায় যাবে?
বুধোদা বলল, সে কী রে! কাজ শুরু করতে হবে না? অ্যান্টিক খোঁজার কাজ?
আমি বললাম, সুধাবিন্দুবাবু তো বললেন, সেসব এই বাংলোর মধ্যেই রয়েছে।
বুধোদা হান্টার-শ্যুটা পায়ে গলাতে গলাতে বলল, সে তো রইলই। যখন খুশি দেখা যাবে। কিন্তু তার মানে কি বাইরে কিছু থাকবে না? ধর, ছোটবেলায় কলকাতার রাস্তার ধারে কিছু লোহার বাথ-টাবের মতন জিনিস দেখতাম। পরে জেনেছি ওগুলো ছিল ঘোড়াদের জল খাবার জায়গা। যখন ঘোড়ায় টানা ট্রাম ছিল তখনকার স্মৃতিচিহ্ন, এখন অ্যান্টিক। এই চা-বাগানেও সেরকম কিছু পড়ে থাকতে পারে তো!
বড্ড শীত করছিল। তাই গাঁইগুঁই করে বললাম, দেড়শো বছর আগের জিনিস কি আর পড়ে থাকে?
বুধোদা বলল, বড় বড় শহরে হয়তো থাকে না, কারণ, সেখানে পরিবর্তনটা বড্ড জোরকদমে হয়। কিন্তু কুকড়াঝোরার চেহারা দেখে কি তোর মনে হচ্ছে, এখানে সময় অতটা বদলেছে? চল, ওঠ!
বুধোদার কথাটা ঠিক। কে বলবে মাত্র আড়াই-ঘণ্টার দূরত্বে শিলিগুড়ি বলে একটা আধুনিক শহর রয়েছে? এখানে কাঠের বাংলো, নুড়িপাথরের রাস্তা, কপিকল লাগানো পাতকুঁয়ো আর হ্যারিকেনের আলো দেখে মনে হচ্ছিল আঠেরোশো একানব্বই-এর পর খুব বেশি সময় কাটে নি।
ডাম্পির অজস্র কাজের সঙ্গে আরো একটা কাজ জুড়ে গেল। এবার ও হল আমাদের গাইড। এক হাতে একটা বড় টর্চ আর অন্য হাতে একটা লাঠি নিয়ে ও আমাদের সঙ্গে রাস্তায় পা দিল। তবে তার আগে বাংলোর মেন দরজায় বড় একটা তালা ঝুলিয়ে দিতে ভুলল না।
আমরা দুজন ডাম্পির পেছন পেছন এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে হাঁটছিলাম। রাস্তা বলতে কিছুই আর প্রায় অবশিষ্ট নেই। যে বুনোগাছ আর লতাগুলো এই তিনবছরের মধ্যে চা-গাছগুলোকে মেরে ফেলেছে তারাই মাঝে মাঝে রাস্তার ওপরেও উঠে এসেছে। তাই হাঁটতে হচ্ছিল খুব সাবধানে।
এখানে এসে থেকেই দেখছি আকাশ মেঘলা। পাগলের গায়ে জড়িয়ে রাখা ছেঁড়া কম্বলের মতন তার রং। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছিল। জলের ওপর কালির ফোঁটার মতন দ্রুত অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ছিল চারিদিকে।
অন্ধকার আরো একটু জমাট বাঁধতেই ডাম্পিভাই খুঁত-খুঁত করতে শুরু করল। কেবলই বলছিল, চলুন, বাংলোয় ফিরি। কাল সকালে আবার আপনাদের বাকিটা দেখিয়ে দেব। চলুন।
বুধোদা একটু বিরক্ত হয়েই বলল, বাংলোয় বসে থাকার জন্যে তো আমরা আসিনি ডাম্পি, একটা কাজ নিয়ে এসেছি। কেন? তোমার আরেকটু থাকতে অসুবিধে কোথায়? হাতে টর্চ রয়েছে তো।
বুধোদার ধমক খেয়ে ডাম্পি চুপ করে গেল।
চলতে চলতে আমরা চা-বাগানের কুলিবস্তির মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিলাম। সুধাবিন্দু বসাক বলেছিলেন, যখন চা বাগান তৈরি হয়, তখন এই কুলি-বস্তিতে এক হাজারের ওপর শ্রমিক বাস করত। পাঁচবছর আগে যখন চা-বাগান বন্ধ হয়, তখন সংখ্যাটা কমে দাঁড়িয়েছিল দুশোয়। আর এই মুহূর্তে, ডাম্পিভাই জানাল, সব মিলিয়ে কুড়িজন কর্মচারী ফ্যামিলি নিয়ে রয়েছেন। তারা হয় পাহারাদার নয় তো সাফাইকর্মী। আমাদের দুপাশে সারসার একতলা বাড়ি। এই বাড়িগুলোকেই একটু আগে দূর থেকে দেখেছিলাম। কাছে এসে দেখলাম, বেশিরভাগই ফাঁকা। কেউ থাকে না ওইসমস্ত কোয়ার্টারে। জানলা দরজার পাল্লা খসে পড়েছে। কোনো কোনো বাড়ির ছাদের টালির চাল ধসে পড়েছে মেঝের ওপর। আমাদের পায়ের আওয়াজ পেয়ে কী যেন একটা জন্তু ওরকমই একটা ভাঙা ঘরের দরজা দিয়ে বেরিয়ে একদম আমাদের সামনে দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। চমকে উঠেছিলাম। বুধোদা বলল, শেয়াল।
ওর মধ্যেই কয়েকটা ঘরে আলো জ্বলছিল। বাচ্চাদের গলার আওয়াজও পাচ্ছিলাম। সেরকম একটা ঘরের দিকে আঙুল তুলে ডাম্পিভাই বলল, ওই দেখুন স্যার। ওটাই আমার ঘর। বউ আর তিনবছরের একটা ছেলে আছে। চলুন একবার আমার ঘরে।
বুধোদা ডাম্পির পিঠে হাত রেখে বলল, পরে আসব। আমরা তো এখন কয়েকদিন এখানেই থাকছি।
মিনিট সাত আট চলার পরে কুলি-বস্তির সীমানা পেরিয়ে আমরা আবার ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে গেলাম। এখন আমাদের বাঁ-দিকে যে বিল্ডিংটা দেখা যাচ্ছে সেটাও আমরা আসবার পথে দেখেছি। চা পাতা প্রসেস করার কারখানা। করুগেটেড টিনের ভাঙা শেড, হেলে পড়া চিমনি আর গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা কয়েকটা ভাঙা ট্রাক্টর দেখলেই বোঝা যায় কারখানার ভেতরে বহুদিন মানুযের পা পড়েনি।
এরপরেই রাস্তাটা ইউ-টার্ন নিয়ে একটা ছোট টিলার মাথায় উঠতে শুরু করল। এখানে বোধহয় কোনোকালেই চা গাছ লাগানো হয়নি। যে জঙ্গল দেখলাম, তা অন্য জায়গার মতন নতুন গজিয়ে ওঠা জঙ্গল নয়। একেবারে আদিম সব পাইনগাছের এক বন নিরেট দেয়াল হয়ে রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই অবধি পৌঁছিয়ে আমার আর এগোতে ইচ্ছে করছিল না। বুধোদাও দেখলাম সরু পাকদন্ডি রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
ডাম্পি আবার বলল, চলুন স্যার। ফিরি।—ওর গলায় স্পষ্ট ভয়।
বুধোদা বলল, কেন? কী আছে ওদিকে?
ওদিকে স্যার...ওদিকে...ওই টিলার মাথায় পুরোনো চার্চ আর গোরস্থান। একশোবছর আগে ওই চার্চ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দিনের বেলাতেও ওদিকে যাই না স্যার।
কেন? চার্চ বন্ধ হয়ে গেল কেন?—জিগ্যেস করল বুধোদা।
ডাম্পি চুপ।
ওদিকে যাও না কেন?—বুধোদা আবার জিগ্যেস করল।
ইতিমধ্যে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর তার সঙ্গে ছুরির ফলার মতন ঠান্ডা হাওয়া। আমি জ্যাকেটের হুডটা মাথার ওপর তুলে দিলাম। ডাম্পি বলল, প্লিজ স্যার। সে সব কথা এখানে দাঁড়িয়ে বলা যাবে না। বাংলোয় চলুন, বলছি।
বুধোদা আমার আর ডাম্পির মুখের দিকে তাকিয়ে বোধহয় বুঝল আর জোর করাটা ঠিক হবে না। তাই বলল, আচ্ছা চল।
বাংলোর দরজায় পৌঁছেছি কি পৌঁছইনি, টিপটিপ বৃষ্টিটা ঝমঝমিয়ে নামল। আমরা তাড়াতাড়ি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
বাংলোয় ইলেকট্রিসিটি নেই, কুকড়াঝোরায় মোবাইলের টাওয়ার নেই। কিন্তু যা আছে, তাকে রাজকীয় বললেও বোধহয় কম বলা হবে। বুধোদা একটা একটা করে জিনিসের দিকে তাকাচ্ছিল আর তার ঠিকুজি কুলুজি সব বলে চলেছিল। বাথরুমের মগ-বালতি, টাওয়েল-ন্যাপকিন আর বিছানার লেপ-তোশক বাদে কোনও জিনিসটারই বয়স দেখলাম আশি বছরের কম নয়। এমনকী দেয়ালে যে দেয়ালগিরি গুলো আলো দিচ্ছিল সেগুলোও নাকি ব্রিটিশ আমলের।
বুধোদা শেষমেষ একটা সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল, এ একটা রত্নভান্ডার, বুঝলি রুবিক। জিনিসগুলো এতদিন ধরে যে এইভাবে মেইনটেইন করেছেন, তার জন্যে বসাকদের ধন্যবাদ দিতেই হয়। সত্যিকারের শিক্ষিত কোনও কালেকটারের হাতে পড়লে এগুলো আরো অনেকদিন ভালো থাকবে, আর সেটার ব্যবস্থা আমাদেরই করতে হবে। কাল সকাল থেকে ক্যাটালগ বানানোর কাজে নেমে পড়ব, কেমন? কই হে ডাম্পি, তোমার চিকেন কদ্দুর? গন্ধ যা ছেড়েছে তাতে তো আর ধৈর্য ধরা যাচ্ছে না।
বলতে না বলতেই ডাম্পিভাই হলঘরের ডিনার-টেবলে খানা লাগিয়ে দিল। বারোজন বসার মতন বিলিতি ওক কাঠের টেবিলে আপাতত আমরা মাত্র দুজন। খাবার বলতে গরম গরম হাতরুটি, অড়হড় ডাল, কাঠের আঁচে রান্না করা দেশি মুরগির কারি আর স্যালাড। ডাম্পিভাই খাবার সার্ভ করবার আগেই বুধোদা দেখলাম চট করে একবার চিনেমাটির প্লেটটা উলটে দেখে নিল। তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, কোনোদিন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম, নাইনটিন হান্ড্রেড অ্যান্ড টেনের জার্মান পোর্সেলিনে রুটি খাবো!
আমি পাশ থেকে বললাম, এটা কি তাই?
অফকোর্স তাই। তোর নিজের প্লেটটা উলটে দ্যাখ, একটা হেলমেট আর তির ধনুকের লোগো আছে। যারা তৈরি করেছিল সেই কোম্পানির লোগো। কিন্তু তাদের নাম কিম্বা ইনিশিয়ালটুকু নেই। কেন নেই জানিস?
বুধোদার কথা শুনে শ্বেতপদ্মের পাপড়ির মতন হালকা আর সাদা ডিনার-প্লেটটা উলটে একবার লোগোটা দেখে নিলাম। তারপর সেটাকে সাবধানে নামিয়ে রেখে জিগ্যেস করলাম, কেন?
বিশ্বযুদ্ধের আগে, তখন জার্মানদের সঙ্গে ইংরেজ আর ফরাসিদের ভীষণ শত্রুতা। ইংল্যান্ড কিম্বা ফ্রান্সের লোক যদি জানতে পারে জিনিসটা জার্মানিতে তৈরি তাহলে তারা সে জিনিস কিনবেই না। তাই তখনকার জার্মান ম্যানুফাকচারাররা বাসনপত্রের পেছনে শুধু নিজেদের লোগোটুকু দিয়েই ছেড়ে দিত। এই হেলমেট আর তির-ধনুক যেমন ব্যাভেরিয়ার মিটারটাইখ কোম্পানির লোগো। এগুলোকে বলা হয় 'পোর্সেলিন মার্ক'। যে কোনো অ্যান্টিক পোর্সেলিনের বাসন কিনতে গেলে আগে এই পোর্সেলিন মার্কটা যাচাই করে নিতে হয়।
জিগ্যেস করলাম, এরকম কত পোর্সেলিন মার্ক আছে?
বুধোদা বলল, আমেরিকা, ইওরোপ, চায়না, জাপান সব মিলিয়ে কয়েক হাজার হবে।
সব তোমার মুখস্থ?
ধুত পাগল! তাই আবার হয় না কি? তবে বড় বড় কোম্পানিগুলোর লোগো চিনি। বাকিগুলোর জন্যে ক্যাটালগ আছে।
সাড়ে আটটার মধ্যে আমাদের খাওয়া দাওয়া সারা হয়ে গেল। রান্নাঘর গুছিয়ে ডাম্পি বলল, স্যার, আমি তাহলে ঘরে ফিরে যাচ্ছি। কাল সকাল সাড়ে-ছটায় আপনাদের বেড-টি দিয়ে ডেকে দেব। আমার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে।
বুধোদা বলল, দাঁড়াও দাঁড়াও। না, দাঁড়াবে কেন? এখানে আমার পাশে এসে বস। তারপর বল, কেন তোমাদের চার্চ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কেনই বা ওই টিলাটার পায়ের কাছ থেকে পালিয়ে এলে? কিসের ভয়?
ডাম্পি চারিদিকে একবার তাকাল, যেন কেউ ওর কথা শুনছে কিনা সেটা দেখে নিল। তারপর একটা ছোট মোড়া টেনে নিয়ে বসে বলল, ওই টিলার সঙ্গে একটা গল্প জড়িয়ে আছে স্যার। বড় ভয়ঙ্কর গল্প। সেই গল্প আমি আমার বাবার কাছে শুনেছি। তিনি আবার শুনেছিলেন তার বাপ-দাদাদের কাছ থেকে।
সেটা উনিশশো সাল। এই কুকড়াঝোরার চা-বাগান তখন সবে জমে উঠেছে। লেবারদের সাহেবরা 'কুলি' বলতেন। চা-বাগানে কুলি লাগবে অনেক। কোথা থেকে পাওয়া যাবে অত কুলি?
আপনারা শিক্ষিত লোক স্যার। নিশ্চয় জানেন, তখন শুধু কুকড়াঝোরায় নয়, ডুয়ার্স, আসাম, রংপুরের সমস্ত চা-বাগানেই দালাল লাগিয়ে কুলি ধরে আনা হত। সেই দালালরা মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড়, ছোটনাগপুর, ঝাড়খন্ড কিম্বা বিহার থেকে দলে দলে আদিবাসী মেয়ে-পুরুষদের নানান লোভ দেখিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে এসে চা-বাগানের চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকিয়ে দিত। তারপর শুরু হত তাদের ক্রীতদাসের জীবন। আমার পূর্বপুরুষরাও সেইভাবেই ছোটনাগপুর থেকে এই বাগানে এসেছিলেন।
চা-শ্রমিকদের মজুরি ছিল কম। খাটুনি ছিল হাড়ভাঙা। তার ওপর নিয়ম মতে তাদের যা মজুরি পাওনা হয়, তার থেকেও বাগানের বাবু, মানে ক্লার্ক আর কুলি-সর্দাররা অনেক পয়সা কেটে নিত। অশিক্ষিত লোকগুলো টাকাপয়সার হিসেব ভালো বুঝত না।
এখানেই তাদের যন্ত্রণার শেষ নয়। ছিল কলেরা, ম্যালেরিয়ার মতন সাঙ্ঘাতিক সব এপিডেমিক। অসুখবিসুখে যখন চোখের সামনে মা দেখত বাচ্চাকে মারা যেতে কিম্বা বোন ভাইকে, তখন তাদের প্রাণটা পালাই পালাই করত। তারা ভাবত, এই নরকের মতন কুলি-মহল্লা ছেড়ে আবার শাল-মহুয়ার জঙ্গলে ঘেরা নিজেদের গ্রামগুলোয় ফিরে যায়।
কিন্তু ফিরতে চাইলেই তো আর ফেরা যেত না।
বুধোদা বলল, জানি। নিজেদের দেশ থেকে তারা এত দূরে এসে পড়ত যে আর ফেরার রাস্তা চিনতে পারত না। তাছাড়া চারিদিকে তাদের কড়া পাহারা ছিল। তবু তার মধ্যেই কেউ কেউ পালিয়ে যাবার চেষ্টা করত।
ডাম্পিভাই বলল, ওই যে একশো বছর আগে কুকড়াঝোরার পুরোনো চার্চ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার পিছনেও এরকমই এক পালানোর ঘটনা ছিল স্যার। পালাচ্ছিল সুবেশ তির্কে বলে সাতাশ-আঠাশ বছরের একটা আদিবাসী ছেলে। তার দেশ ছিল মধ্যপ্রদেশের কোন একটা গ্রামে।
সবেমাত্র তার ক'দিন আগেই সুবেশের গ্রাম থেকে নতুন একটা দল চা-বাগানে চাকরির লোভে কুকড়াঝোরায় এসে পৌঁছেছিল। তাদের মুখেই সুবেশ শুনল, তার ছোট মেয়েটার খুব অসুখ। সুবেশ চা-বাগানের সর্দার থেকে শুরু করে সাহেব ম্যানেজার, সবার হাতে পায়ে ধরল কয়েকদিনের ছুটির জন্যে। বলল, সে একবার মেয়েকে দেখেই আবার ফিরে আসবে। কিন্তু তখন ছিল পাতা তোলার পিক-সিজন। সুবেশের ছুটি মঞ্জুর হল না।
সুবেশ রাতের অন্ধকারে পালাতে গিয়ে পাহারাদারদের নজরে পড়ে গেল।
একজন কুলি পালালে এমনিতে বাগানের কাজের খুব একটা ক্ষতি হত না। কিন্তু তখনকার ম্যানেজার গ্যাবন উইলিয়াম লোকটা ছিল খুবই শয়তান। সে বলত, আজকে যদি একজন পালাতে পারে, তাহলে কালকে দশজন পালাবার চেষ্টা করবে। তার পরদিন একশোজন। এইভাবে বাগান ফাঁকা হয়ে যাবে। তাই উইলিয়াম সাহেব নিজেই বন্দুক নিয়ে সুবেশের পেছনে ধাওয়া করলেন।
তাড়া খেয়ে সুবেশ দৌড়েছিল ওই টিলাটার দিকে, যেদিক থেকে একটু আগে আমরা ঘুরে এলাম। ওটা কোনোরকমে পেরোতে পারলেই সে জঙ্গলের আড়াল পেয়ে যেত। ওদিকটায় কিরকম ঘন পাইনের বন দেখে এলেন তো। সেই আড়াল ধরে সে পৌঁছে যেতে পারত কোনো একটা রেল-স্টেশনে।
সেই দিনটাও ছিল আজকের মতনই মেঘলা আর অন্ধকার। ঠিক এইরকমই তোড়ে বৃষ্টি পড়ছিল আর তার সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। যারা সুবেশের পিছু নিয়েছিল তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারল সুবেশকে ধরা কঠিন হবে। ওই অন্ধকারের আড়াল নিয়ে, জঙ্গলের ছেলে সুবেশ জঙ্গলে মিশে গিয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
উইলিয়াম সাহেবের হাতে শুধু বন্দুকই ছিল না, তার সঙ্গে ছিল বাঘের মতন বিশাল একটা কুকুর। সেটাকে উনি বিলেত থেকে নিয়ে এসেছিলেন। একেবারে আসল কিলার-ডগ—খুনে কুকুর। সেই কুকুরটাই গন্ধ শুঁকে শুঁকে সুবেশকে খুঁজে বার করে, তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
হয়তো ইচ্ছে করলে উইলিয়াম সাহেব তখনও সুবেশকে বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু তিনি চাইলেন বাগানের বাকি কুলিদের বুঝিয়ে দিতে যে, পালানোর চেষ্টা করলে কী হতে পারে। তার একটা ইশারায় কুকুরটা সুবেশকে টুঁটি কামড়ে মেরে ফেলল।
অন্য আরো অনেক আদিবাসী শ্রমিকদের মতন সুবেশকেও বাগানে চাকরি নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খৃস্টান করে দেওয়া হয়েছিল। খৃস্টান কুলিদের জন্যে টিলার মাথায় ছোট একটা চার্চও বানানো হয়েছিল। সাহেব-মেমরা অবশ্য যতদিন এখানে ছিলেন কার্শিয়াং-এর গির্জাতেই যেতেন। কালোদের সঙ্গে এক গির্জা তারা শেয়ার করবেন কেন? সুবেশের মৃতদেহ ওই চার্চের গোরস্থানেই কবর দেওয়া হল।
তারপর? আমি জিগ্যেস করলাম।
তারপর সুবেশ নেকড়ে-মানুষ হয়ে গেল।
অ্যাঁ! আমি আর বুধোদা দুজনেই আঁতকে উঠলাম। ভাবলাম ভুল শুনেছি বোধহয়। তাই আবার জিগ্যেস করলাম—সুবেশ কী হয়ে গেল?
নেকড়ে-মানুষ স্যার। কবর দেওয়ার পরেও সুবেশ গোর থেকে বেরিয়ে আসত। তবে মানুষ নয়, বিরাট একটা কালো নেকড়ের চেহারায়।
বেরিয়ে আসছে যে সেটা কেমন করে বোঝা গেল?—বুধোদার গলায় পরিষ্কার ব্যঙ্গের সুর।
ডাম্পিভাই কিন্তু সেই ব্যঙ্গ গায়ে মাখল না। সিরিয়াস গলায় বলে চলল—সুবেশ মারা যাওয়ার পরে পরপর তিনজন মারা পড়ল স্যার। প্রথমে মরল উইলিয়াম সাহেবের সেই কুকুরটা। কুকুরটা ম্যানেজারের বাংলোর, মানে আমাদের এই বাংলোর পেছনের বারান্দায় শুয়েছিল। সকালে দেখা গেল, বারান্দার ওই জায়গাটায় অনেকটা রক্ত পড়ে আছে, কুকুর নেই। আর হ্যাঁ, একটা রক্তমাখা থাবার ছাপ চলে গেছে চার্চের দিকে। সেটা কুকুরের থাবা নয় স্যার। কুকুরের থাবা কখনো অত বড় হয় না।
উইলিয়াম সাহেব রাগে পাগল হয়ে গেলেন। তখনই রাইফেল নিয়ে ছুটলেন চার্চের দিকে, একা। গেলেন তো গেলেন, আর তার দেখা নেই। বিকেল অবধি যখন সাহেব ফিরলেন না, তখন অন্য দুজন সাহেব কয়েকজন কুলিকে সঙ্গে নিয়ে উইলিয়াম সাহেবকে খুঁজবার জন্যে ওইদিকে গেলেন।
তারপর? বুধোদার গলায় দেখলাম আর ব্যঙ্গের সুর নেই। আমারও গা-টা কেমন যেন শিরশির করছিল।
ডাম্পিভাই বলে চলল — সার্চ-পার্টি উইলিয়াম সাহেব আর তার কুকুরকে একই জায়গায় খুঁজে পেল। জায়গাটা ছিল সুবেশ তির্কের কবরের খুব কাছেই একটা ঝোপের আড়ালে। কুকরটার শরীরের বিশেষ কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। পুরোটাই প্রায় নেকড়ে-মানুষের পেটে চলে গিয়েছিল। উইলিয়াম সাহেবের মৃতদেহটা ঠিক পাশেই পড়েছিল। ওনার গলায় ছিল চারটে দাঁতের গভীর দাগ আর বুক থেকে পেট অবধি নখের আঁচড়ে ফালা ফালা হয়ে গিয়েছিল।
বুধোদা জিগ্যেস করল, ওনার মাংস নেকড়ে-মানুষ খায়নি?
প্রশ্নটা আমার কানে বড্ড রুড শোনাল। একজন মৃত মানুষের সম্বন্ধে বুধোদা এমন প্রশ্ন করে কীভাবে?
ডাম্পিভাইয়ের ভুরু দুটোও দেখলাম কুঁচকে গেল। বলল, যদ্দুর জানি, না।
বুধোদার অবশ্য ওসব দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। একগুঁয়ের মতন পরের প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল—আর তিন নম্বর?
তিন-নম্বর ভিকটিম সেই পাহারাদার, যে প্রথম সুবেশ পালিয়ে গেছে বলে হল্লা বাঁধিয়েছিল। উইলিয়াম সাহেব খুন হওয়ার মাস দুয়েক বাদে এক রাতে সে টহল দিতে দিতে ওই চার্চের রাস্তায় গিয়ে পড়েছিল। নেকড়ে-মানুষ তার গলাটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল।
ওই ঘটনার পর থেকেই বাগানের অনেকে সেই নেকড়েকে দেখেছে। তারা বলেছিল, ওটা এই পৃথিবীর কোনো নেকড়ে ছিল না। ওরকম বিরাট শরীর, কুচকুচে কালো লোম আর সবুজ আগুনের মতন চোখ কোনো রক্তমাংসের নেকড়ের হয় না। ওটা প্রেত-নেকড়ে স্যার। সুবেশ তির্কের দুঃখী আত্মা নেকড়ে হয়ে প্রতিশোধ নেবার জন্যে ঘুরে বেড়াত।
বুধোদা জিগ্যেস করল, এসব ঘটনার কোনো এনকোয়ারি হয়নি?
পুলিশ-এনকোয়ারি হয়েছিল। কিন্তু বন্যপ্রাণীর আক্রমণ বলেই কেস গুলো ক্লোজ করে দেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। পুলিশ বলতেই পারে বন্যপ্রাণীর আক্রমণ। কিন্তু স্যার, বাগানের লেবার-রা সে কথা মানবে কেন? তারা অনেকেই যে সেই নেকড়ে-মানুষকে দেখেছে।
তারপর?
কুলিদের অনেককেই ধরে ধরে খৃষ্টান বানিয়েছিল সাহেব পাদ্রিরা। তাদের জন্যেই চা-বাগানের সাহেবরা ওই টিলার মাথায় গির্জা বানিয়ে দিয়েছিল। ওখানেই লেবাররা প্রেয়ার করত। মারা গেলে ওখানকার কবরখানাতেই তাদের গোর দেওয়া হত। কিন্তু সুবেশ মারা যাওয়ার দু-মাসের মধ্যে যখন এমন হরিবল তিনটে ঘটনা ঘটে গেল, তখন লেবার-রা বেঁকে বসল—বলল, প্রাণ গেলেও তারা আর ওই গির্জায় যাবে না। কারণ, ওইখানেই ছিল সুবেশের কবর আর সেই কবর থেকেই নাকি বেরিয়ে আসত নেকড়ে-মানুষ।
তাদের জন্যে তখন তৈরি করা হল নতুন চার্চ আর কবরখানা। তারপর থেকেই টিলার মাথায় ওই পুরনো চার্চ খালি পড়ে রয়েছে। একশো বছরের বেশি হয়ে গেল। কিন্তু স্যার, সুবেশের আত্মা ওই পুরনো চার্চ ছেড়ে কোথাও যায়নি।
বুধোদা বলল, শেষ কবে দেখা গেছে সেই প্রেত-নেকড়েকে?
ডাম্পি মাহাতো বলল, একশো বছরেরও বেশি সময় সে ঘুমিয়ে ছিল। আমার জন্ম এই কুকড়াঝোরায়। আমার বাবারও জন্ম এখানে। আমরা কেউ তাকে দেখিনি। অন্য কেউ দেখেছে বলে শুনিওনি। সত্যি কথা বলতে কি, আমরা জ্বালানি কাঠ কুড়োতে কিম্বা ফল পাড়তে ওই চার্চের জমিতে প্রায়ই যেতাম। কিন্তু আজ একশো-পনেরোবছর বাদে আবার তার ঘুম ভেঙেছে।
বুধোদা বলল, কার? নেকড়ে-মানুষের?
হ্যাঁ স্যার। মাস্টারসাব তাকে নিজের চোখে দেখেছেন।
মাস্টারসাব মানে?
তিনিও আমার মতন এই চা-বাগানের লেবারেরই ছেলে। তবে আমার চাইতে অনেক উঁচু মাপের মানুষ। আর্মির অফিসার ছিলেন। রিটায়ার করার পর আবার এখানে ফিরে এসেছেন। সেও প্রায় বিশবছর হয়ে গেল। খুব ভালো লোক স্যার, খুব মহান লোক। উনি না থাকলে আমাদের ছেলেমেয়েগুলো লেখাপড়া শিখত না। উনি ছোট বাচ্চাগুলোকে লেখাপড়া শেখান। একটু বড় হলে উনিই ওদের বাইরে হস্টেলে রেখে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেন। আমাদের তো অত লেখাপড়া শেখাবার মতন টাকাপয়সা নেই।
মাস্টারসাব বলেছেন যে, নেকড়ে-মানুষ আবার ফিরে এসেছে?
হ্যাঁ, স্যার। উনি নিজের চোখে দেখেছেন। উনি তো প্রায়ই ওই গির্জায় গিয়ে বসে থাকেন। তখনই দেখেছেন বিশাল একটা নেকড়ে বিদ্যুতের মতন এক কবরের আড়াল থেকে আরেক কবরের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
বুধোদা গম্ভীর গলায় বলল, কেমন করে জানলে ওটা প্রেত নেকড়ে? সত্যিকারের নেকড়েবাঘও তো হতে পারে।
ডাম্পি বলল, আমাদের এদিকের জঙ্গলে নেকড়ে পাওয়া যায় না স্যার। কখনো শুনিনি নেকড়েবাঘের কথা।
ওয়াইল্ড-লাইফ নিয়ে বুধোদার পড়াশোনা কম নয়। ও বলল, তা ঠিক। ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গলে নেকড়ে থাকে না। ওরা থাকে কাশ্মীর তিব্বতের মালভূমি কিম্বা মরুভূমিতে।
ডাম্পি বলল, আর তাছাড়া স্যার, আজ সকালেই একটা খবর শুনে আমরা আরো ভয় পেয়ে গিয়েছি।
কী খবর?
গতকাল রাতে পাশের ডরোথি টি-গার্ডেনের কুলিবস্তি থেকে একটা ছ'মাসের বাচ্চা চুরি গিয়েছে। এরকম আগে কখনো হয়নি। বাচ্চাটাকে যে দাওয়ায় শোয়ানো ছিল, তার আশেপাশে থাবার দাগ দেখা গেছে।
বুধোদা এতক্ষণ সামনে ঝুঁকে পড়ে ডাম্পিভাইয়ের কথা শুনছিল। এবার সোফায় গাটা এলিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করল, তোমরা তাহলে এখন কী করবে ডাম্পি?
কী আর করব স্যার? এমনিতেই মাস্টারসাবের মুখ থেকে ওইকথা শোনার পরে আমরা যে কুড়ি-ঘর লোক এখানে আছি তারা ওই টিলার দিকে যেতাম না। এখন থেকে বেশি রাত হয়ে গেলে এই কুলিমহল্লার রাস্তাতেও বেরোবো না।
কিছুক্ষণ কী নিয়ে যেন ভাবনাচিন্তা করার পর বুধোদা হঠাৎ বলল, ডাম্পি, একটা কথা আমাকে বল তো। ওই গির্জায় কোনো দামি জিনিস আছে?
ডাম্পি হেসে ফেলল। বলল, একি সাহেবদের গির্জা স্যার, যে ঝাড়বাতি, রুপোর মোমদান, কার্পেট আর অয়েল-পেন্টিং থাকবে? আদিবাসী কুলিদের জন্যে যেমন তেমন করে একটা চূড়োওলা বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাবার কাছে শুনেছি, কাঠের বেঞ্চ অবধি ছিল না। আমাদের পূর্বপুরুষেরা ছেঁড়া মাদুরের ওপর বসে প্রেয়ার করতেন।
তারপরেই ডাম্পি হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভারি ব্যস্ত হয়ে বলল, না স্যার, আমি এবার যাই। অনেক রাত হয়ে গেল। বুঝতেই পারছেন, একা হেঁটে যেতে ভয় লাগে।
ডাম্পি মাহাতো কুলি-ব্যারাকে নিজের বাড়িতে শুতে চলে গেল, কিন্তু তার বলে যাওয়া কথাগুলো যেন বাংলোর মধ্যে কুয়াশার মতন পাক খেয়ে বেড়াতে লাগল। একটা অস্বস্তি আমাদের দুজনেরই মনের ওপরে চেপে বসেছিল। বুঝতে পারছিলাম সেটার জন্যে এই কুকড়াঝোরার পরিবেশও অনেকটা দায়ী। এত গভীর অন্ধকার, এত নিস্তব্ধতা আমি শেষ কবে দেখেছি মনে পড়ছিল না। এমন পরিবেশে সবই মনে হয় সম্ভব। আর প্রেত-নেকড়ের ব্যাপারটা গল্প হতে পারে, কিন্তু সুবেশ তির্কের ভয়ঙ্কর মৃত্যু তো গল্প নয়। অমন কত সুবেশের দীর্ঘনিশ্বাস এই কুকড়াঝোরার হাওয়ায় মিশে আছে কে জানে!
ডাম্পিভাই চলে যাওয়ার পর আমি খুব মন দিয়ে বাংলোর সবক'টা জানলা দরজা ভেতর থেকে ভালো করে বন্ধ করা হয়েছে কিনা চেক করে এলাম। দুটো ঘর, ডাইনিং-হল, কিচেন সব মিলিয়ে জানলার সংখ্যা বারোটা, তবে দরজা মাত্র দুটো। একটা সামনের দিকে, আরেকটা পেছনে, রান্নাঘরের দেয়ালে।
সামনের দরজাটা ভালো করে লাগিয়ে আমি দেখতে গেলাম পেছনেরটাও লাগানো আছে কিনা। জানতাম না যে, ডাম্পিভাই দুটো দেশি-মুরগির পায়ে দড়ি বেঁধে রান্নাঘরের এক কোণায় শুইয়ে রেখে গেছে। আমাকে ল্যাম্প নিয়ে ঢুকতে দেখে মুরগিদুটো আচমকাই এমন কঁক কঁক শব্দ করে ডানা ঝাপটাতে শুরু করল যে ভয়ে আমার বুকটা ধক করে উঠেছিল। ব্যাপারটা বোঝার পরে নিজের মনেই একটু হাসলাম। একটা সামান্য গল্প যে মানুষের নার্ভের ওপর কতটা চাপ ফেলতে পারে তার প্রমাণ এই মুরগির ডাকে আমার চমকে ওঠা।
যাই হোক, মুরগিদুটোকে পাশ কাটিয়ে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। এই দরজাটা যাতায়াতের জন্যে ব্যবহার করার দরকার পড়ে না। শুধু ডাম্পিভাইকেই দেখেছি রান্না করার সময় ওই দরজা দিয়ে কখনো কখনো কুঁয়োতলা থেকে জল আনতে যেতে। হ্যাঁ, ওদিক দিয়েই একটা বারান্দা পেরিয়ে কুঁয়োতলায় যাওয়া যায়। ওটাই সেই বারান্দা, যেখান থেকে উইলিয়াম সাহেবের পেয়ারের কুকুরকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল প্রেত-নেকড়ে।
কী মনে হতে আমি দরজাটা খুলে একবার বাইরে মুখ বাড়ালাম। আকাশে ঘন-ঘন বিদ্যুত চমকাচ্ছিল। সেই আলোয় দেখলাম কুঁয়োতলার ওপাশ থেকেই শুরু হয়ে গেছে জঙ্গল। মাঝখানে শুধু একটা কাঁটাতারের বেড়া, যেটা আবার জায়গায় জায়গায় ভেঙে পড়েছে। আমি তাড়াতাড়ি দরজার খিলটা ভালো করে আটকে দিয়ে আবার ঘরে ফিরে এলাম।
বুধোদা দেখলাম বেশি কথাবার্তা বলছে না। কিছুক্ষণ ল্যাম্পের আলোয় একটা বই খুলে বসে রইল। বোধহয় মন বসছিল না, তাই একটু বাদে একটা মস্ত হাই তুলে শুয়েও পড়ল। আমাকে বলল, তুইও আর রাত না করে শুয়ে পড় রুবিক। কাল বরং ভোর ভোর উঠে পড়ব।
একটা ঘরেই পাশাপাশি দুটো খাট। মাঝখানে কিছুটা গ্যাপ। আমি কেরোসিন-ল্যাম্পের ফ্লেম টা কমিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
আমাদের ঠিক পায়ের কাছের দেয়ালে বেশ কয়েকটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফোটোগ্রাফ মাউন্ট করে রাখা ছিল। কিছুক্ষণ আগে অন্যান্য জিনিসের মতন এই ফোটোগুলোকেও আমি আর বুধোদা খুঁটিয়ে দেখেছিলাম। সবই একশো বছর আগের কুকড়াঝোরার সিন-সিনারি। একটা ছবিতে দেখেছিলাম, বিরাট একটা উঠোনের মতন জায়গায় সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে চা-বাগানের হতদরিদ্র কুলির দল। বুধোদা আমাকে বুঝিয়ে বলেছিল, তখন প্রতিদিন সকালে কুলিদের গুনতি হত। তাতেই ধরা পড়ে যেত কেউ পালাল কিনা। একদম জেলখানার স্টাইল। ওটা সেই কুলি-গুনতির ছবি।
তখন যে ছবিটাকে সব চেয়ে কম গুরুত্ব দিয়েছিলাম, সেই ছবিটাই এখন আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছিল না। একটা কুকুরের ছবি। ভোঁতা মুখ, কুঁতকুঁতে চোখ। লেজটা দেখলে মনে হয় যেন কেউ কাঁচি দিয়ে গোড়া থেকে কেটে দিয়েছে। এটাই নিশ্চয় গ্যাবন উইলিয়ামের সেই খুনে কুকুর যেটাকে তিনি পালিয়ে যাওয়া কুলিদের ধরে আনতে কাজে লাগাতেন। ওই দাঁতগুলোই নিশ্চয় সুবেশ তির্কে নামে এক সাতাশ বছরের ছেলের গলায় বসে গিয়েছিল।
সঙ্গে সঙ্গে অন্য একটা কথাও ভাবছিলাম। এরকম ভয়ঙ্কর একটা কুকুরকে যে রাতারাতি নিঃশব্দে লোপাট করে দিতে পারে সে কে? সে কি সত্যিই প্রেত?
এইসব চিন্তা মাথার মধ্যে নিয়েই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয়তো সেইজন্যেই আমার স্বপ্নের মধ্যে ফিরে এল প্রেত-নেকড়ে। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম, বিশাল একটা কালো রঙের জন্তু আমাকে তাড়া করেছে। আমি দৌড়তে দৌড়তে কোনোরকমে একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে খিল তুলে দিলাম, কিন্তু সেই জন্তুটা আমাকে ছাড়ল না। সে বন্ধ দরজার ওপর লাফিয়ে পড়ল। জন্তুটা দরজা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছিল। কাঠের পাল্লার ওপর তার নখের আওয়াজে আমি কেঁপে উঠছিলাম।
ঠিক তখনই আমার ঘুম ভেঙে গেল। ল্যাম্পটা নিভে গিয়েছিল। অন্ধকার ছাদের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নটার কথাই ভাবছিলাম, এমন সময় একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম। কাঠের ওপর নখ দিয়ে আঁচড়ালে যে খরখর শব্দটা হয়, সেই শব্দ। এবার আর স্বপ্ন নয়, সত্যিই কোনো জন্তু বাংলোর পেছনের দরজাটা আঁচড়াচ্ছে। খুব বড় কোনো জানোয়ারই হবে, কারণ এতটা দূরত্ব পেরিয়েও সেই শব্দ আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে যেন একটা চাপা গর্জনও শুনলাম। আমি ডাকলাম—বুধোদা, বুধোদা।
বুধোদার ঘুম ভীষণ পাতলা আর একবার ঘুম ভাঙলে ওর পুরোপুরি সজাগ হয়ে যেতে এক সেকেন্ডও সময় লাগে না। আমি তৃতীয়বার ডাকবার আগেই ও উত্তর দিল—শুনেছি। ঘাবড়াস না।
তারপরেই ও চট করে হাত বাড়িয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে রিভলবারটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে আমিও। তখনও সেই দরজা আঁচড়ানোর শব্দটা হচ্ছিল। বাইরে ডিনার টেবিলের ওপর ডাম্পিভাই পাঁচ-সেলের একটা টর্চ রেখে গিয়েছিল। সেটা হাতে নিয়ে যতক্ষণে আমি আর বুধোদা কিচেনের মধ্যে দিয়ে পেছনের দরজায় গিয়ে পৌঁছলাম ততক্ষণে আঁচড়ানোর শব্দ থেমে গেছে। দরজার পাশেই একটা বড় কাচের জানলা ছিল। তার সার্সির ভেতর দিয়ে বুধোদা বাইরে টর্চের আলো ফেলল, কিন্তু কিছুই দেখা গেল না। বুধোদা বলল, মনে হয় কুকুর। এঁটোকাঁটার গন্ধে দরজা আঁচড়াচ্ছিল।
আমি বললাম, কুকুরের দরজা আঁচড়ানোর শব্দ কি এত জোরে হয় বুধোদা? তাছাড়া আমি একটা গর্জন শুনেছি।
বুধোদা বলল, চল তাহলে বাইরে গিয়ে দেখি। ভয় নেই, আমি তৈরি আছি। একহাতে রিভলভারটা তাক করে রেখে অন্য হাত দিয়ে চট করে দরজাটা খুলে বুধোদা বাইরে বেরিয়ে দাঁড়াল। পেছনে আমি।
জন্তুটাকে দেখতে পেলাম না, কিন্তু সে যে এসেছিল তার প্রমাণ আমাদের সামনেই ছিল।
দেখতে পেলাম, শক্ত কাঠের পাল্লার ওপর গভীর হয়ে কেটে বসেছে সারি সারি নখের দাগ আর ভিজে মাটির ওপর দিয়ে জঙ্গলের দিকে ফিরে গেছে একসারি থাবার ছাপ।
আমি আর বুধোদা মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। কোনো কুকুরের থাবা যে অত বড় হয় না সেটা দুজনেই বুঝতে পারছিলাম।
ভালো করে দরজাটা বন্ধ করে আমরা আবার ঘরে ফিরে এলাম।
তারপর স্বাভাবিকভাবেই আর ঘুমোতে পারিনি। বাকি রাতটা মুখোমুখি দুটো চেয়ারে দুজনে চুপ করে বসেছিলাম। বুধোদার মনের মধ্যে কী হচ্ছিল বলতে পারব না, কিন্তু আমি যেন প্রত্যেক জানলার কাছে একটা কালো নেকড়ের হিংস্র মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। যে কোনোদিক থেকে সামান্য শব্দ ভেসে আসলেই মনে হচ্ছিল সেই প্রাণীটা আমাদের এই জরাজীর্ণ বাংলোর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকবার চেষ্টা করছে।
একটুবাদেই আবার মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছিল। তাতে অবশ্য এক দিয়ে ভালোই হয়েছিল। বাইরের ওইসব ভয় দেখানো শব্দ আর দৃশ্য সেই বৃষ্টির তোড়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
বৃষ্টি যখন থামল, তখন ঘড়িতে ভোর ছটা।
বৃষ্টি থামতেই বুধোদা হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, নাঃ, এইভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাটা কোনও কাজের কথা নয়। রুবিক, গেট রেডি। এই বলে টুথব্রাস নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। আমি জিগ্যেস করারও সময় পেলাম না কিসের জন্যে রেডি হব।
আমরা তৈরি হয়ে বাংলো থেকে বেরোনোর আগেই ডাম্পি মাহাতো এসে উপস্থিত হল। মনে পড়ল, ও কাল রাতেই কথা দিয়ে গিয়েছিল, সাড়ে ছ'টায় এসে আমাদের ডেকে দেবে। আমাদের এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে দেখে ও একটু অবাক হল ঠিকই, কিন্তু বুঝতে পারল না যে, এর পেছনে অন্য কোনো গল্প আছে। আমরাও ওকে কিছু বললাম না। বুধোদা আগেই বলে রেখেছিল, প্যানিক ছড়িয়ে লাভ নেই।
আমরা বেরোবো শুনে ডাম্পিভাই আমাদের চা আর জলখাবার না খাইয়ে ছাড়ল না। তাতে আরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট মতন সময় গেল। শেষ অবধি যখন আমরা বাংলোর বাইরে পা রাখলাম তখন ঘড়িতে সাড়ে সাতটা।
বাইরে বেরিয়ে বুধোদা সোজা-রাস্তায় না গিয়ে বাংলোটাকে একটা চক্কর দিয়ে পেছনের বাগানে চলে এল। আমরা পেছনের দরজাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম মাটির ওপরে কাল রাতের সেই থাবার ছাপগুলো আর নেই। বৃষ্টিতে সব ধুয়ে গিয়েছে। বুধোদা বলল, ভালোই হয়েছে। আশা করি নখের দাগগুলোও ডাম্পি দেখতে পাবে না। কারণ, ও দরজা খোলে বা বন্ধ করে রান্নাঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে। সেদিকে কোনো দাগ নেই।
আমরা আবার বাংলোর সামনের রাস্তায় ফিরে এলাম। সেখান থেকে বুধোদা হাঁটা লাগাল সোজা সামনের দিকে।
এইবার বুধোদাকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম—আমরা কোথায় যাচ্ছি বুধোদা?
পুরনো চার্চে। বুধোদা গম্ভীর মুখে জবাব দিল।
আমাকে কেউ কোনোদিন ভীতু বলেনি। বরং ডাকাবুকো বলেই চিরকাল আমার বদনাম। ইচ্ছে করেই আমি অনেক বিপজ্জনক কাজে জড়িয়ে পড়েছি —তার কোনোটা একা, কোনোটা বুধোদার সঙ্গে। কিন্তু আজ বুধোদার এই কথা শুনে আমার বুকটা ছাঁৎ করে উঠল।
ভয়টা বোধহয় আমার মুখেও ফুটে উঠেছিল। বুধোদা একবার আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ওর রিভলভারটা বার করে আমাকে দেখাল। তারপর আবার সেটা যথাস্থানে রেখে দিয়ে বলল, কাঠের দরজার গায়ে যে জন্তুর নখের আঁচড় পড়ে, তার নিশ্চয় শরীর আছে। অশরীরী সে নয়। আর শরীর যদি থাকে, সেই শরীরে বুলেটও বিঁধবে। ঠিক কিনা বল?
বুধোদার ওইরকম ডোন্ট-পরোয়া হাবভাব দেখে একটু সাহস পেলাম। তাছাড়া স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার বাংলোটার মধ্যে বসে থাকতে থাকতে মনটা কেমন যেন ডিপ্রেসড হয়ে গিয়েছিল। এই রোদ ঝলমলে পাখি-ডাকা সকালে রাস্তায় বেরিয়ে সেটা অনেকটাই কেটে গেল। চার্চের রাস্তার চড়াই ধরে কিছুটা উঠতেই বাঁদিকে দেখতে পেলাম অনেক দূরে নীল আকাশের গায়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা-রেঞ্জ ঝলমল করছে।
প্রায় পাঁচশো-ফিট মতন চড়াই ভাঙার পরে রাস্তার দুপাশের পাইনবন একটু হালকা হয়ে এল। তার জায়গায় শুরু হল ঘাসজমি। ফুট চারেক উঁচু একটা পাঁচিল সেই জমিকে ঘিরে রেখেছিল। বুধোদা বলল, চার্চের এলাকা শুরু হল, বুঝলি।
পাঁচিলটা বেশি উঁচু নয়, তার ওপরে অনেক জায়গাতেই ভেঙে পড়েছে। তাই চলতে-চলতেই আমরা কম্পাউন্ডের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছিলাম। যা দেখছিলাম, তাতে মনটা বেশ দমে যাচ্ছিল। পাহাড়ের ঢালে এদিকে-ওদিকে বেশ কয়েকটা একতলা বাড়ি। হয়তো এক সময় চার্চের যাজক এবং কর্মচারীদের বসবাসের জন্যেই সেগুলো বানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন তার কোনোটাই আর আস্ত নেই। কাচভাঙা জানলাগুলোর ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল এই দিনের বেলাতেও বাড়িগুলোর মধ্যে অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে। দেয়ালে বড় বড় গাছ গজিয়ে গেছে। ছাদের টালিও খসে পড়েছে বেশিরভাগ জায়গায়। আর এই সব কিছুর ওপরে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় কয়েকটা ওক-গাছ। তাদের ডালে অসংখ্য বাদুড় মাথা নীচু করে ঝুলে আছে।
বুধোদা নিজের মনেই মন্তব্য করল, সন্ধের পর জায়গাটার চেহারা কেমন হবে ভাবতে পারছিস?
আর ঠিক দুটো বাঁক পেরোনোর পরেই গির্জাটাকে দেখতে পেলাম। টিলার একদম চূড়ায় অনেকটা সমতল জমির ওপরে গির্জাটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাদের বাঁ-পাশে পাঁচিলের গায়ে একটা মরচে পড়া লোহার গেট দেখতে পেলাম। গেট পেরিয়েই পাহাড়ের গা দিয়ে পাথরের সিঁড়ি উঠে গেছে। বেশি নয়, তিরিশ চল্লিশটা ধাপ হবে। সেই সিঁড়ি ধরে আমরা পৌঁছে গেলাম গির্জার বারান্দায়।
বড় বড় থামওলা বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে চারপাশের একটা অদ্ভুত সুন্দর প্যানোরামিক ভিউ পাচ্ছিলাম। উঁচু-নীচু পাহাড় ঢেউয়ের মতন চলে গেছে দূরের স্নো-রেঞ্জ অবধি। আমাদের পায়ের নীচে কুকড়াঝোরা টি-এস্টেটের প্রায় জনশূন্য বস্তি আর কারখানা। ম্যানেজারের বাংলোটা দাঁড়িয়ে রয়েছে একেবারে উত্তর প্রান্তে। তার পরেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। দক্ষিণদিকে তাকালে ছোট ছোট গ্রাম আর নতুন চা-বাগানগুলোকে দেখা যাচ্ছে, যেগুলো আমরা আসবার পথে পেরিয়ে এসেছিলাম। ওরই মধ্যে কোনো একটা হয়তো ডরোথি টি-গার্ডেন, যেখান থেকে নেকড়ে-মানুষ বাচ্চা তুলে নিয়ে গেছে।
বারান্দা ছেড়ে চার্চের ভেতরে ঢুকবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতেই বুকটা ছাঁৎ করে উঠল।
দরজার দু-দিকের পাল্লায় দুটো হাত রেখে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। মানুষটা খুব রোগা আর তেমনই লম্বা। গায়ের রং কুচকুচে কালো। মাথায় কাকের বাসার মতন এলোমেলো চুল, তার পুরোটাই ধবধবে সাদা। গায়ে একটা পুরোনো রং-চটা খাঁকি রঙের সোয়েটার আর ঝলঝলে ফুলপ্যান্ট। উনি এক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
বুধোদাই প্রথম সামলে উঠল। ভদ্রলোকের দিকে দু-পা এগিয়ে গিয়ে বলল, আমার নাম বোধিসত্ত্ব মজুমদার। আমরা মিস্টার সুধাবিন্দু বসাকের একটা কাজ নিয়ে এখানে এসেছি।
ভদ্রলোকের মুখে একটা আলতো হাসি ফুটে উঠল। তিনি আমাদের দিকে দু-পা এগিয়ে এলেন। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম, ওনার বয়সের ভার, ওনার স্যাবি জামাকাপড় সবকিছু ভেদ করে একটা জিনিস ফুটে বেরোচ্ছিল, যেটাকে বোধহয় এককথায় বলে আভিজাত্য। ভীষণ মায়া মাখানো ওনার চোখের দৃষ্টি, আর তেমনই সুন্দর ওনার হাসি।
নমস্কার। আমি জোসেফ। জোসেফ সুবিমল। নামটা কি আপনাদের কানে একটু অদ্ভুত ঠেকছে? আসলে আমার দাদু কুলি হিসেবে এই বাগানে কাজ করতে এসে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। সেই থেকে আমাদের সবারই নামের প্রথমে একটা খৃস্টান নাম জুড়ে যায়। এখানকার লোকে অবশ্য আমার ফার্স্ট-নেম, মিডল-নেম, সার-নেম—সবই ভুলে মেরে দিয়েছে।
তারপরেই ভদ্রলোক বেশ ধাক্কা দেওয়ার মতন একটা কথা বললেন। বললেন,আপনাদের কাজটা কী? এই কপালপোড়া কুকড়াঝোরার সৎকার?
মানে? বুধোদার ভুরুদুটো দেখলাম কুঁচকে গেছে।
মানে বুঝলেন না? বাগানটা তো পাঁচবছর আগেই মরে গেছে। এখন তার শরীরের যেখানে যা পুরনো গয়নাগাটি রয়েছে সেগুলোকে খুলে নিতে হবে না? তারপরে তো তাকে কবর দেওয়া যাবে।
মিস্টার জোসেফের কথাগুলোর অর্থ বেশ তেঁতো, কিন্তু সেগুলো উনি বললেন মিষ্টি হাসিটা মুখে নিয়েই আর সেইজন্যেই খুব একটা রাগ করতে পারলাম না। বুধোদাও দেখলাম হেসে ফেলল। বলল, মোক্ষম ধরেছেন। গয়না খুলতেই এসেছি বটে। তবে আমরা খুলে না নিলে জিনিসগুলো যে নষ্ট হবে, এটা তো মানেন?
মিস্টার জোসেফ মুখে কিছু না বলে হাসতে হাসতে ওপর-নীচে ঘাড় নাড়লেন।
বুধোদা বলল, আমরা কী কাজে এসেছি, সেটা আপনি কেমন করে জানলেন?
কেন? ডাম্পির কাছ থেকে। ও-ই আমাকে ক'দিন আগে বলেছিল, মাস্টারসাব, কলকাতা থেকে দুজন অফসার আসছেন। বাংলার পুরানা সামানের তালাশ নেবেন।
আরেঃ! ওনার কথা শুনে আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম। বুধোদা বলল, আপনিই মাস্টারসাব? এখানকার গরীব ছেলেমেয়েগুলোকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন? প্রণাম আপনাকে।
আমরা দুজনেই হাতজোড় করে ওনাকে নমস্কার করলাম। উনি ভারি সঙ্কুচিত মুখে বললেন, না না। আমার পড়ানোর যোগ্যতা কোথায়? ওই যতদিন ওরা ছোট থাকে ততদিন একটু অঙ্ক, ইংরিজি, ইতিহাস, ভূগোল এইসব শেখাবার চেষ্টা করি আর কি।
জিগ্যেস করলাম, আপনি কতদিন ধরে এই কাজ করছেন?
উনি বললেন, ছিলাম আর্মির অফিসার। রিটায়ার করার পর কুকড়াঝোরায় চলে এলাম। সে প্রায় বিশবছর আগের কথা। তখন থেকেই এই বাগানের ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছি।
বুধোদা বলল— একটা কথা জিগ্যেস করি, কিছু মনে করবেন না যেন। কুকড়াঝোরায় ফিরে এলেন কেন? শহরে তো অনেক আরামে থাকতে পারতেন।
জোসেফ সুবিমল উত্তর দিলেন, নাড়ির টান। এখানেই তো আমি জন্মেছিলাম। অবশ্য দশ বছর বয়স হতে না হতেই আমার বাবা আমাকে কার্সিয়ঙের বোর্ডিং-স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তা না হলে হয়তো চা গাছ লাগিয়ে আর চায়ের পেটি বয়েই জীবন কাটত, যেমন ভাবে আমার বাপ দাদুর জীবন কেটেছিল। রিটায়ারমেন্টের পরে মনে হল, কুকড়াঝোরার এখনকার ছেলেমেয়েগুলোকে তো অন্তত একটু অন্যভাবে তৈরি করা যায়।
পেরেছেন?
পেরেছি।—বুক ফুলিয়ে বললেন মিস্টার জোসেফ সুবিমল। গত কুড়ি বছরে অনেকগুলো ছেলেমেয়েকে আমার ওই কুলিবস্তির ঘরে বসে প্রাইমারি এডুকেশন দিয়েছি। তারপর হায়ার-এডুকেশনের জন্যে নিজের খরচায় তাদের পাঠিয়েছি দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি, এমনকি আপনাদের কলকাতাতেও। আমার ছাত্রদের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার আছে, ডাক্তার আছে। টিচারও রয়েছে অন্তত পাঁচজন।
আমি আর বুধোদা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। একজন এক্স আর্মি-অফিসারের সঙ্গে জোসেফ সুবিমলের পোশাক-আশাকের মলিনতা ঠিক মেলাতে পারছিলাম না। এখন কারণটা বুঝতে পারলাম। পেনশনের সব টাকা এবং সম্ভবত জমানো টাকা-পয়সা সবই উনি খরচ করেছেন এখানকার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর কাজে। ওনাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে ইচ্ছে করছিল।
মিস্টার জোসেফ বললেন, চলুন, ভেতরে চলুন। এই গির্জায় অবশ্য আপনার মনের মতন কিছুই পাবেন না। একে তো এটা তৈরি হয়েছিল কুলিদের উপাসনা করার জায়গা হিসেবে। তার ওপর যেটুকু যা ফার্নিচার-টার্নিচার ছিল, সব নতুন গির্জা তৈরি হবার পর সেখানেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফাঁকা বাড়িটা সাপ আর শেয়ালের রাজত্ব হয়ে পড়েছিল একশো বছর। আমি এখানে ফিরবার পর নিজের হাতে সাফসুতরো করতে শুরু করেছি, সেইজন্যেই আপনারা আজ ভেতরে পা রাখতে পারছেন।
ভেতরে ঢুকে দেখলাম, সত্যিই তাই। প্রেয়ার-হলের ভেতরে কয়েকটা পুরনো কাঠের ফার্নিচার ছাড়া আর কিছুই নেই। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করার পর মিস্টার জোসেফ বললেন, চলুন, বাইরে যাই।
হ্যাঁ, চলুন। আমি আর বুধোদা মিস্টার জোসেফের পেছন পেছন বাইরে বেরিয়ে এলাম। বুধোদা হঠাৎ বলল, এইরে, ক্যামেরা-ব্যাগটা ভেতরে ফেলে এসেছি। রুবিক, তোরা একটু দাঁড়া। আমি চট করে ব্যাগটা নিয়ে আসি।
আমি আর মিস্টার জোসেফ দাঁড়িয়ে রইলাম। বুধোদা ক্যামেরা-ব্যাগ নিয়ে ফিরে এল।
মিস্টার জোসেফ বললেন, একটু দাঁড়ান। এই দরজাটায় তালা লাগিয়ে দিই। তারপরে আপনাদের সঙ্গেই আমি ফিরব।
আপনি এখন কোথায় যাবেন? বুধোদা ওনাকে জিগ্যেস করল।
আমি? আমি তো আমার ঘরে ফিরব। কটা বাজে বলুন তো? নটা বেজে গিয়েছে, তাইনা? তাহলে তো আমার স্টুডেন্টদের আসার সময় হয়ে গেছে।
মিস্টার জোসেফ চার্চের দরজায় তালা লাগিয়ে ফিরে এলেন। বললেন, চলুন।
আমরা তিনজন একসঙ্গেই চার্চের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম।
ঘাসজমির ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে, যে প্রশ্নটা অনেকক্ষণ থেকেই আমার মাথায় ঘুরছিল, সেই প্রশ্নটাই বুধোদা ওনাকে করে বসল। মিস্টার জোসেফ, এই পরিত্যক্ত চার্চে আপনি কী করতে আসেন?
মিস্টার জোসেফ অদ্ভুত দৃষ্টিতে বুধোদার দিকে তাকালেন। বললেন, জেরা করছেন?
বুধোদা হেসে বলল, জেরা করব কেন? আমি কি পুলিশ না ডিটেকটিভ? জাস্ট কৌতূহল। আপনার ইচ্ছে হলে উত্তর দেবেন, না হলে দেবেন না।
মিস্টার জোসেফ মাথা নিচু করলেন। মনে হল, বুধোদার সঙ্গে ওভাবে কথা বলার জন্যে উনি লজ্জিত। সত্যিই তাই। একটু বাদেই উনি বললেন, স্যরি মিস্টার মজুমদার। আসলে আমি কেন গির্জায় এসেছিলাম, কেন প্রতিদিন গির্জায় আসি, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে যে প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হয়, সেটা আমার কাছে খুব একটা সুখকর নয়।
বুধোদা কোনও কথা না বলে ওনার মুখের দিকে তাকাল। আমরা দুজনেই বুঝতে পারছিলাম, উনি আরো কিছু বলবেন। তবে যা বললেন তার জন্যে তৈরি ছিলাম না।
মিস্টার জোসেফ বললেন, প্রতিদিনের মতন আজও আমি এসেছিলাম আমার দাদুর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে। ওই কবরের সামনে দাঁড়িয়ে আমি গত পনেরো দিনের প্রত্যেকটা দিন 'অলমাইটি'র কাছে একটাই প্রার্থণা করে যাচ্ছি—প্রভু! আমার গ্র্যান্ডফাদারের আত্মাকে তুমি শয়তানের কবল থেকে ফিরিয়ে আন। তাঁকে মুক্তি দাও। একজন সরল আদিবাসীর আত্মা মৃত্যুর একশো পনেরো বছর পরেও নেকড়ে হয়ে দৌড়ে বেড়াবে, এটা মানা যায়? বলুন?
বুধোদা আর আমি দুজনেই চলা থামিয়ে মিস্টার জোসেফের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মিস্টার জোসেফও দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। ওনার সুন্দর মুখটা কোনো এক চাপা কষ্টে ভেঙেচুরে যাচ্ছিল। বুধোদা একটু বাদে খুব নিচু গলায় বলল, তার মানে আপনার পুরো নাম...।
জোসেফ সুবিমল তির্কে। দাদুর নাম হেনরি সুবেশ তির্কে। দাদুকে খুন করার পর অন্য লেবারদের চাপে আমার বাবাকে ওরা দেশ থেকে ডেকে এনে চাকরি দিয়েছিল। বাকিটা আপনি নিশ্চয়ই ডাম্পির মুখ থেকে শুনেছেন?
বুধোদা বলল, শুনেছি। কিন্তু বিশ্বাস করিনি। মনে হয়েছে আজগুবি গল্প।
আজগুবি গল্প নয় মিস্টার মজুমদার। সত্যিই গ্যাবন উইলিয়াম কিম্বা তার পাহারাদারকে একটা নেকড়েবাঘই মেরেছিল। উইলিয়াম সাহেবের কুকুরকেও নিশ্চয়ই সেই প্রেত-নেকড়েই তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এসব তো বাগানের সবাই জানে। অল দিজ আর রেকর্ডেড। আপনি মিস্টার বসাক কে জিগ্যেস করলেও জানতে পারবেন।
বুধোদা বলল, বেশ। মানলাম, মৃত্যুর পরে আপনার দাদু প্রেত-নেকড়ে হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু গত একশো-পনেরো বছরে তাকে তো আর দেখা যায়নি। তার মানে তাঁর আত্মার সৎগতি হয়ে গিয়েছে।
নো নো নো নো নো! পাগলের মতন সাদা চুলে ভরা মাথাটা দুদিকে ঝাঁকাতে শুরু করলেন মিস্টার জোসেফ সুবিমল তির্কে। আই হ্যাভ সিন হিম...আই হ্যাভ সিন দ্যাট বিস্ট। ইট ওয়জ ওনলি আ ফোর্টনাইট এগো।
মানে! আপনি পনেরোদিন আগে সেই প্রেত-নেকড়েকে দেখেছেন! বুধোদা বলল।
হ্যাঁ, দেখেছি। কাল রাতেও দেখেছি, ওনার কবর থেকে বেরিয়ে এসে সেই বিশাল কালো জন্তুটা বিদ্যুতের মতন ছুটে গেল ডরোথি চা-বাগানের দিকে। তারপর কী হয়েছে শুনেছেন নিশ্চয়?
চারিদিকে আলো। গাছে গাছে পাখি ডাকছে। তবু আমার শিরদাড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। মনে পড়ল, গতরাতে বাংলোর পেছনের দরজায় সেই আঁচড়ের শব্দ। সেই থাবার ছাপ। কুকড়াঝোরার প্রেত-নেকড়ে কি সত্যিই তাহলে ফিরে এসেছে? কেন? এতবছর বাদে আবার কেন তার ঘুম ভাঙল?
যেন আমার মনের প্রশ্ন বুঝতে পেরেই মিস্টার জোসেফ বললেন, হি ইজ একসাইটেড ফর সাম রিজনস। আমি মোট তিনবার সেই ছায়াশ্বাপদকে দেখেছি। প্রত্যেকবারই মনে হয়েছে সে যেন কি এক অস্থিরতায় ছটফট করে বেড়াচ্ছে। মিস্টার মজুমদার, আপনি কি জানেন, কুকড়াঝোরার চা-বাগানের নতুন মালিকেরা এই চার্চের জমি নিয়ে কী করবে? হয়তো এই সব ভেঙেপড়া ঘরবাড়ির জায়গায় নতুন ঘরবাড়ি উঠবে। নতুন রাস্তা হবে, গাড়ি ছুটবে। ঘুমিয়েপড়া প্রেত-নেকড়ে কি বুঝতে পেরেছে, এক ভয়ঙ্কর অশান্তির দিন আসছে? সেইজন্যেই কি সে বিচলিত?
কথা বলতে বলতে আমরা চার্চের বাউন্ডারি-ওয়ালের গায়ে বসানো সেই মরচেধরা লোহার গেটটার সামনে চলে এসেছিলাম। গেটের বাইরেই রাস্তা, আর রাস্তার উলটোদিকেই আরেকটা পাঁচিলঘেরা জমি। ওটা যে কিসের জমি সেটা কাউকে বলে দিতে হয় না। পুরো জায়গাটা জুড়েই সবুজ ঘাসের ওপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সারি সারি পাথরের ক্রশ। ওটা কবরখানা।
বুধোদা রাস্তা পেরিয়ে ওই জমিটায় ঢুকবার মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বলল, মিস্টার জোসেফ, আমার একটা অনুরোধ আছে। একবার আপনার দাদুর কবরের কাছে আমাদের নিয়ে চলুন।
কেন?
এমনিই। শুধু একবার কবরটাকে দেখব। বিশ্বাস করুন, আপনার বিশ্বাসের অসম্মান করব না। দূর থেকে একবার দেখেই চলে আসব।
না, সম্ভব নয়।
যে মানুষ কিছুক্ষণ আগেই অমন হাসিমুখে কথা বলছিলেন, সেই মুখই যে মুহূর্তের মধ্যে এমন কঠিন হয়ে যেতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না।
মিস্টার জোসেফ! এবার বুধোদার মুখও কঠিন। আপনি জানেন আমরা এই বাগানের মালিকের গেস্ট। ইচ্ছে করলে এই কম্পাউন্ডের মধ্যে যে কোনও জায়গায় আমরা যেতে পারি। তার জন্যে আপনার পারমিশন লাগবে না।
বুধোদার কথা শুনেই মিস্টার জোসেফ এগিয়ে এসে ওর হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বললেন, পারেন, নিশ্চয়ই পারেন। কিন্তু প্রভু যীশুর দোহাই, যাবেন না। তাতে আপনাদেরই ক্ষতি হবে।
কিসের ক্ষতি, মিস্টার জোসেফ? এই দিনের বেলায়, পরিষ্কার মাঠের মধ্যে...এখানে কি সেই প্রেত-নেকড়ে উঠে আসবে? এটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের কল্পনা হয়ে যাচ্ছে না?
মিস্টার জোসেফ বললেন, একটু বুঝবার চেষ্টা করুন। হয়তো আমি ওনার বংশধর বলেই আমাকে উনি সহ্য করেন, কিন্তু আপনারা এসেছেন বাগান বিক্রির কাজে হেল্প করতে। আপনাদের উনি ছেড়ে দেবেন না। দ্যাট বিস্ট উইল অ্যাটাক ইউ...অ্যাটাক ইউ ফর সিওর।
উনি ভয়ার্ত চোখে চার্চের দিকে তাকালেন। ওনার দৃষ্টিকে অনুসরণ করে আমিও ওইদিকে তাকালাম। অজস্র আলোর মধ্যেও চার্চের বারান্দা, জানলা, ঘণ্টাঘর আর চুড়োর ঘড়ির গর্তে চাপ-চাপ অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে। মনে হচ্ছিল, ওই অন্ধকারের আড়াল থেকে একজোড়া সবুজ চোখ আমাদের লক্ষ্য করছে। বুধোদাও দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আমার মতনই ও একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল চার্চের দিকে।
একটু পরে বুধোদা বলল, চলুন তাহলে। কী আর করা যাবে? আমাকে বলল, চল রুবিক। মাস্টারসাব যখন আমাদের ওনার দাদুর কবর দেখতে দেবেন না, তখন ওনার ইসকুলটাই দেখে আসি।
বুধোদার এই কথায় ওদের দুজনের মধ্যে যে টেনশনটা তৈরি হয়েছিল, সেটা কেটে গেল। মিস্টার জোসেফ একগাল হেসে বললেন, তাই চলুন। আপনি দেখবেন, বারোটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, খেতে না পাওয়া চেহারা, চুলে তেল নেই, জামার বোতাম অর্ধেক ছেঁড়া। তবু ওদের চোখগুলো কি ব্রাইট। সত্যি মিস্টার মজুমদার, এই লাস্ট ব্যাচটাকে অন্তত ক্লাস টেন অবধি হস্টেলে রেখে পড়ানোর খরচা যদি কোথাও থেকে পেতাম, তাহলে আমি নিশ্চিন্তে মরতে পারতাম।
বুধোদা বলল, মিস্টার বসাকদের বললেন না কেন, ওদের জন্যে কিছু ব্যবস্থা করতে?
বলেছিলাম। ওনারা রাজি হননি। স্বাভাবিক। কুকড়াঝোরা তো আর লাভের ব্যবসা নয়। এখানে কেন এইসব ওয়েলফেয়ারের কাজে ওনারা পয়সা নষ্ট করবেন?
ফেরবার সময় উতরাইয়ে নামছিলাম, তাই দশ মিনিটের মধ্যে কুলিবস্তির কাছে পৌঁছে গেলাম। আট-ন বছরের কয়েকটা ছেলেমেয়ে মিস্টার জোসেফের কোয়ার্টারের বন্ধ-দরজার সামনে ভীড় জমিয়ে একটা টালি-র টুকরো ছুঁড়ে ছুঁড়ে চু-কিতকিতের মতন কী একটা খেলা খেলছিল। আমাদের দেখেই ওরা শান্ত হয়ে একদিকে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর একসঙ্গে সুর করে বলল, নমস্তে মাস্টারজী, নমস্তে আঙ্কল, নমস্তে ভাইয়া।
এত মিষ্টি লাগল বাচ্চাগুলোর এই সুরেলা সম্ভাষণ যে, কী বলব! মিস্টার জোসেফ ঘরের দরজার তালা খোলা মাত্র ওরা লাইন দিয়ে ঘরে ঢুকে মেঝের ওপর বসে পড়ল। মিস্টার জোসেফ একটা বছর তিনেকের বাচ্চাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, ইনি কে জানেন? ইনি হলেন মিস্টার গাপ্পি মাহাতো। ডাম্পি মাহাতোর ছেলে। এ ব্যাটা পড়াশোনা করে না, কিন্তু সারাদিন আমার ঘরেই পড়ে থাকে। খুব গুন্ডা, ঘরদোর পুরো তছনছ করে দেয়। খুব ইনটেলিজেন্ট কিন্তু। বাবু, একটু আঙ্কলদের ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশীপটা শুনিয়ে দাও তো।
ডাম্পি মাহাতোর ছেলে গাপ্পি সঙ্গে সঙ্গে আধো আধো উচ্চারণে আমাদের ব্যা ব্যা ব্ল্যাকশীপ শুনিয়ে দিল। এত লাভলি বাচ্চাটা, আমি মাস্টারসাবের কাছ থেকে ওকে নিজের কোলে নিয়ে নিলাম। তারপর বললাম, বাবার কাছে যাবি?
গাপ্পি এত বড় করে ঘাড় হেলাল। বাবার কাছে যাওয়ার নামে কোন বাচ্চাই বা আপত্তি করে? ডাম্পিভাইয়ে বউও আমাদের সঙ্গে আলাপ করার জন্যে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। সেও বলল, নিয়ে যান তো দাদা। সকাল থেকে এত জ্বালাচ্ছে, আমাকে ঘরের কোনও কাজ করতে দিচ্ছে না। ওকে ওর বাবার কাছেই দিয়ে দিন।
বুধোদা বলল, তুই তাহলে বাংলোয় ফিরে যা রুবিক। আমি একটু কম্পাউন্ডের বাইরে বেরিয়ে দেখি, মোবাইলের সিগনাল পাওয়া যায় কিনা। মিস্টার বসাকের সঙ্গে কয়েকটা ব্যাপারে কথা বলা দরকার।
আমি গাপ্পিকে কোলে নিয়ে বাংলোর দিকে রওনা হলাম। গাপ্পি বেশ আমার কোলে চেপে চলছিল। পাখি, বাঁদর, মেঘ, পাহাড় যা দেখাচ্ছিলাম তাই বড় বড় চোখ করে দেখছিল আর নিজের মনে বকবক করছিল। কিন্তু একটু বাদেই ছটফট করতে শুরু করল। বললাম, কী হল রে?
লাগছে।
লাগছে! কোথায়?
গাপ্পি নিজের কোমরের দিকটা দ্যাখাল। সত্যিই কি যেন একটা শক্ত মতন জিনিস আমার বুকেও বিঁধছিল। ওকে কোল থেকে নামিয়ে ওর হাফপ্যান্টের পকেটের মধ্যে হাত চালিয়ে দিলাম। দেখলাম একটা গোল মেটালের চাকতি। দেখে মনে হল পেতলের তৈরি। ওপরের কিনারা বরাবর ইংরিজিতে 'কুকড়াঝোরা টি-গার্ডেন' কথাটা লেখা রয়েছে। মাঝখানে একটা ফুটো। দেখে মনে হল ডাম্পিভাইয়ের ইউনিফর্মের বুকে লাগিয়ে রাখার ব্যাজ। বিচ্ছু ছেলেটা বাবার ব্যাজ পকেটে পুরে নিয়ে চলে এসেছে। ওইটাই ওর কোমরে বিঁধছিল।
আমি চাকতিটা নিজের প্যান্টের পকেটে রেখে আবার ওকে কোলে তুলে নিলাম। বাংলোয় ফিরে এটা ডাম্পিভাইকে দিয়ে দেব।
বাকি রাস্তাটা গাপ্পি বেশ সুন্দর চলে এল। আর কোনো ঝামেলা করল না।
দুপুরে ডাম্পিভাই আর গাপ্পিও আমাদের সঙ্গেই লাঞ্চ করল। তারপর ডাম্পিভাই ছেলেকে কোয়ার্টারে রেখে আসতে গেল। বুধোদা ওকে বলে দিয়েছিল, তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে, অনেক কাজ আছে। ডাম্পিভাই ফিরে এল ঠিক আড়াইটের সময়। তারপরেই আমরা কাজে নেমে পড়লাম। যে কাজে এখানে আসা, সেই কাজে। অর্থাৎ অ্যান্টিকগুলোকে দেখে, তাদের ঠিকুজি-কুলুজি লিখে, সম্ভাব্য দাম ফেলে, একটা ক্যাটালগ বানানো।
সে এক বিশাল কাজ। ডাম্পিভাই একটা একটা করে লফট, ক্যাবিনেট কিম্বা সিন্দুক খুলছে আর তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে একেক রকমের জিনিস। কোনো ক্যাবিনেটের ভিতরে বন্দুক-রাইফেল আর রিভলবারের সারি। কোনো সিন্দুকের ভেতরে রুপো আর পোর্সেলিনের বাসনপত্র। ঘড়িই ছিল অন্তত দশ রকমের—সিঁড়ির কোণায় রাখা বিশাল আকারের গ্র্যান্ডফাদার-ক্লক, দেয়ালে টাঙানো কুকু-ক্লক ছাড়াও একটা কাবার্ডের মধ্যে থেকে পাওয়া গেল কাচের ছোট্ট বেল-জার দিয়ে ঢাকা একটা অদ্ভুত সুন্দর ঘড়ি, যেটার ডায়ালের সামনে বল-ড্যান্সের ভঙ্গিতে এক সাহেব-পুতুল আর এক মেম-পুতুল দাঁড়িয়েছিল। বুধোদা খুব সাবধানে ঘড়িটায় দম দেওয়া মাত্র একশো বছরের পুরনো সেই টেবিল-ক্লকের ভেতরে পুতুলদুটো ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করল।
ব্যাপার-স্যাপার দেখে বুধোদা মন্তব্য করল, এখানে যা আছে তাই দিয়ে একটা নতুন মিউজিয়াম খুলে ফেলা যায়।
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বুধোদার ল্যাপটপে এখনো অবধি যে কটা অ্যান্টিক পাওয়া গেছে তার একটা লিস্ট টাইপ করে ফেললাম। তারপরে কী করব ভাবছিলাম। বাংলোর মধ্যে একটা আলমারিতে কয়েকটা পুরনো বই ছিল। তার মধ্যে যেমন সেই বৃটিশ আমলের বই ছিল, তেমনি হাল আমলের বাঙালি ম্যানেজারদের পছন্দের বইও কয়েকটা ছিল। সেরকমই একটা বই নিয়ে পাতা ওলটাতে শুরু করলাম। কিন্তু একটু বাদেই এমন হাই উঠতে শুরু করল যে, কী বলব!
পাশের বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখি বুধোদা একটা বেশ মোটা খাতার মতন কী যেন খুলে খুব মন দিয়ে পড়ছে। ওর পাশে পড়ে রয়েছে ক্যামেরা- ব্যাগটা।
ব্যাপারটা কেমন হল? বুধোদা ক্যামেরা-ব্যাগের মধ্যে থেকে ওই খাতাটা বার করেছে নাকি? আমার চোখ থেকে তক্ষুণি ঘুম ছুটে গেল। আমি এক লাফে মেঝে টপকে চলে গেলাম বুধোদার খাটে। বুধোদা একবার শুধু ভুরু কুঁচকে বলল, ওঃ রুবিক, এরকম হনুমানগিরি করিস না। তারপর আবার ডুবে গেল পুরনো খাতাটার মধ্যে।
আমি বললাম, বুধোদা, তুমি আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না। তার মানে যখন ক্যামেরা-ব্যাগ আনতে ফিরে গিয়েছিলে, তখনই তুমি চার্চ থেকে এই খাতাটা তুলে এনেছিলে। এটা কী? একটু দ্যাখাও আমাকে।
বুধোদা খাতাটা আমার হাতে আলতো করে তুলে দিয়ে বলল, খুব সাবধানে পাতা ওলটাস। একশো বছরের পুরনো জিনিস তো, পাতাগুলো পাপড়ের মতন ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। তাও তো এটা চামড়ায় বাঁধানো আর রাখাও ছিল খুব যত্ন করে। তাই নষ্ট হয়নি।
খাতাটা হাতে নিয়ে জিগ্যেস করলাম, এটা কী বুধোদা?
বুধোদা বলল, একে বলা হয় parish register। একটা চার্চের আন্ডারে যতটা এরিয়া থাকে তাকে বলা হয় প্যারিস, আর সেই প্যারিসের মধ্যে যত ব্যাপটিজম, ম্যারেজ কিম্বা বেরিয়াল সব কিছুর ডিটেইলস হাতে লিখে রাখা হয় এই প্যারিস রেজিস্টারে। এটা কুকড়াঝোরার পুরনো চার্চের প্যারিস রেজিস্টার। কেন যে নতুন চার্চে এটা নিয়ে যাওয়া হয়নি তা বলতে পারব না। কোনো কুসংস্কার কাজ করেছিল হয়তো।
তোমার চোখে পড়ল কেমন করে?
বুধোদা মিচকি হেসে বলল, ছোটবেলা থেকে বার্ড-ওয়াচিং করতে করতে চোখদুটোই এমন হয়ে গেছে, বুঝলি? কোন ঝোপের আড়ালে কোন পাখি লুকিয়ে বসে আছে, ঠিক চোখে পড়ে যায়। তোদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতেই যেমন দেখলাম, প্রেয়ার হলের এক কোণায় একটা আলমারির মতন ফার্নিচার রাখা আছে। পাল্লার বদলে সেটার গায়ে দু-সারিতে চারটে চারটে করে মোট আটটা ড্রয়ার। তার মধ্যে সাতটা ড্রয়ারের মেটালের হ্যান্ডেলে কালচে ছোপ আর একটা হ্যান্ডেল বেশ চকচকে। বুঝলাম, ওটা রেগুলার খোলা-বন্ধ করা হয়।
তারপর?
তারপর আর কী? ক্যামেরা-ব্যাগ খোঁজার নাম করে ওখানে ফিরে গেলাম। চকচকে হ্যান্ডেলটা ধরে টান দিলাম।
তারপর?
দেখলাম, যা ভেবেছি তাই। লক করা আছে।
সর্বনাশ! তুমি কী করলে?
সেটা আর জিগ্যেস করিস না।
জিগ্যেস করার সত্যি খুব একটা দরকারও ছিল না। আমি জানতাম পুরনো তালাচাবিও অ্যান্টিকের মধ্যে পড়ে, আর তাই ওসব জিনিসও বুধোদা হাতে নিয়ে প্রচুর নাড়াঘাটা করেছে।
আমি রেজিস্টারের পাতাগুলো খুব সাবধানে ওলটাতে শুরু করলাম। প্রথম এন্ট্রি র আঠেরোশো নিরানব্বইয়ের পঁচিশে ডিসেম্বর। লেখাটায় চোখ বুলিয়ে বুঝলাম, ওইদিনেই চার্চের উদ্বোধন হয়। যারা মধ্যরাতের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল তাদের নাম লেখা রয়েছে। একটা নামের দিকে চোখ আটকে গেল। হেনরি সুবেশ তির্কে।
এর পরের পাতাগুলোয় পরের ছমাসে ওই চার্চে যে কটা অনুষ্ঠান হয়েছিল তার ডিটেইলস। তার মধ্যে যেমন ব্যাপটিজম ছিল তেমনই বিয়ের অনুষ্ঠানও ছিল। ওই ছমাসে মৃত্যুও দেখলাম কম হয়নি। মোট আঠেরোজন খ্রিস্টান কুলিকে চার্চের জমিতে সমাধি দেওয়া হয়েছিল। তাদের নাম, বাবার নাম, বয়স সবই লেখা ছিল প্যারিস রেজিস্টারের পাতায়। বয়সগুলো দেখতে দেখতে আমার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে যাচ্ছিল। কুড়ি, বাইশ, পঁয়ত্রিশ। বোঝাই যাচ্ছিল কি নারকীয় পরিবেশের মধ্যে বেচারাদের কাজ করতে হত। তা নাহলে এমন অকালে চলে যেতে হয়?
শেষ এন্ট্রি রটায় পৌঁছে আবার অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। সেই পাতায় লেখা ছিল হেনরি সুবেশ তির্কের সৎকারের বিবরণ।
বুধোদা নিশ্চয় আমার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। বলল, কী দেখছিস? সুবেশ তির্কের বেরিয়ালের এন্ট্রি র?
আমি ঘাড় নাড়লাম।
মন দিয়ে পড়। একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে পাবি। দ্যাখ, লেখা আছে —অন্যান্য কুলিদের দাবী মেনে হেনরি জোসেফ তির্কেকে ঠিক যে অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, সেই অবস্থাতেই সমাধিস্থ করা হল। তার মানে মৃত্যুর সময় সুবেশের গলায় যদি একটা তাবিজ থাকে, ওর হাতে যদি একটা আংটি থাকে, কিম্বা ওর ট্রাউজারের পকেটে যদি কয়েকটা খুচরো পয়সা থাকে, সেই সবকিছুই এখনো ওই কবরের মধ্যেই রয়েছে।
তা থাকতে পারে। সেটাকে যে বুধোদা অদ্ভুত ব্যাপার বলল কেন বুঝলাম না। বরং অন্য একটা কথা বুধোদার মুখ থেকে শুনতে ইচ্ছে করছিল। খাতাটাকে মুড়ে রেখে বললাম, বুধোদা, সত্যি করে বলো তো—নেকড়ে-মানুষের ঘটনাটাকে তুমি গল্প হিসেবেই দেখছ?
নিশ্চয়।
কেন?
কারণ, এই পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা ভয়ঙ্কর ইওরোপিয়ান গন্ধ রয়েছে। কেউ যদি বলে আরামবাগে একটা পুকুরের পাড়ে একটা আপেল গাছ দেখলাম, তাহলে তার মধ্যে যেমন বানানো গল্পের গন্ধ পাওয়া যায়, এই ঘটনাটার মধ্যেও আমি সেইরকম গন্ধ পাচ্ছি।
জিগ্যেস করলাম, তুমি কি werewolf-এর কথা বলছ?
একদম ঠিক। ভেবে দ্যাখ, ফিফটিনথ সেঞ্চুরির কুসংস্কারাচ্ছন্ন ইওরোপে একটা বিশ্বাসের জন্ম হল। কী বিশ্বাস? না, কোনো-কোনো মানুষ নিজেকে নেকড়েবাঘে বদলে ফেলতে পারে। তারাই হল ওয়ারউলফ বা নেকড়ে-মানুষ। এই বিশ্বাসের সঙ্গে ন্যাচরালি যোগ হল যতরকমের বীভৎসতা। নেকড়ে-মানুষ নাকি অন্য মানুষকে মেরে খেয়ে ফেলে। তারা বাচ্চা চুরি করে।
তারপর চারশো বছর ধরে সেই অন্ধবিশ্বাস গোটা ইওরোপে পাক খেতে লাগল। একটা সময় যেমন 'উইচ', মানে ডাইনি সন্দেহে জ্যান্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা হত সেইরকমভাবেই ওয়ারউলফ সন্দেহেও মানুষকে পুড়িয়ে মারা হতে লাগল।
এবার তুই বল রুবিক, ইওরোপ থেকে অনেক দূরে এই যে ডুয়ার্সের জঙ্গল, যেখানে বাস্তবে নেকড়ের কোনো অস্তিত্বই নেই, সেখানে সেই ইওরোপের ওয়ারউলফের গল্প কোথা থেকে ঢুকে পড়ল? এর আগে আমাদের এখানকার কোনো রূপকথা, কোনো মিথ, কোনো ফোক-লোরে ওয়ারউলফের কোনও রেফারেন্স পেয়েছিস?
আমার মাথায় কাল থেকেই একটা গল্প ঘুরপাক খাচ্ছিল। বললাম, বুধোদা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু এরকম একটা ঘটনার কথা লিখে রেখে গেছেন।
আরণ্যকে কি? আবছা মনে পড়ছে।
হ্যাঁ। বনের মধ্যে পাতার কুঁড়েঘরে একটা ছেলে আর তার বাবা থাকত। বাবা দেখত রাতের অন্ধকারে মাঝে-মাঝেই একটা মেয়ে চুপিচুপি ছেলের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। একদিন বাবা ওই মেয়েটাকে হাতেনাতে ধরবার জন্যে ছেলের ঘরে ঢুকে পড়ল, কিন্তু কোনো মেয়েকে দেখতে পেল না। শুধু একটা সাদা কুকুর ছেলেটার বিছানার নীচ থেকে বেরিয়ে ঘরের দরজা পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। পরে ছেলেটা নিজেও দেখেছিল একটা সাদা কুকুরকে তার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু বাইরে বেরিয়েই কুকুরটা হয়ে গিয়েছিল একটা মেয়ে।
বুধোদা আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, মনে পড়েছে। তার কিছুদিন পরে ওই চালাঘর থেকে একটু দূরে ছেলেটার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেল। বিস্ফারিত চোখ, যেন ভয়ঙ্কর একটা কিছু দেখে তার প্রাণটা শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু রুবিক, খেয়াল কর, ওই গল্পেও কিন্তু নেকড়ে ছিল না; ছিল কুকুর। আর সেটাই তো স্বাভাবিক। আরণ্যকের যে পটভূমি, গয়া- ভাগলপুরের জঙ্গল, নেকড়ে জন্তুটা তো সেখানেও সুলভ নয়।
তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে জানিস? কুকড়াঝোরায় যখন একটা কুকুর আর দুজন মানুষ পরপর অ্যানিমাল অ্যাটাকে মারা পড়ল, তখন চা-বাগানের সাহেবরাই তার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিল সুবেশ তির্কের অপমৃত্যুর ব্যাপারটা। তাদের মাথা থেকেই প্রথম বেরিয়েছিল সুবেশ তির্কের ওয়ারউলফ হয়ে যাওয়ার গল্প। সেই আমলে যারা বৃটেন থেকে ইন্ডিয়ায় চাকরি করতে আসত, তারাও তো আর খুব একটা উঁচুদরের লোক ছিল না। বেশিরভাগই ছিল অশিক্ষিত এবং এখানকার আদিবাসীদের মতনই সুপারস্টিশাস। গায়ের চামড়াটাই যা ছিল সাদা।
তারপর সাহেবদের মুখে সেই গল্প শুনতে শুনতে এখানকার আদিবাসী কুলিদের মধ্যে একটা মাস-হিস্টিরিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা ছায়ার মধ্যে প্রেত-নেকড়ে দেখতে শুরু করেছিল। আর নতুন কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি বলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হিস্টিরিয়া থিতিয়ে গিয়েছিল।
বুধোদার কথাগুলো নিয়ে চিন্তা করতে করতেই কখন চোখ জুড়ে গিয়েছিল জানি না, হঠাৎ বুধোদার ডাকেই ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলতেই বুধোদা বলল, রুবিক, আমি একটু ঘুরে আসছি। তুই দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে শুয়ে পড়। আমি ফিরে এসে ওই পায়ের কাছের জানলাটায় ঠকঠক আওয়াজ করলে দরজা খুলে দিবি।
মোবাইলের স্ক্রিনে দেখলাম রাত বারোটা বাজে। আমি অবাক হয়ে উঠে বসলাম। বললাম, তার মানে? তুমি এত রাতে কোথায় যাবে?
বুধোদা বলল, সুবেশ তির্কের কবর দেখতে।
এখন!
তা ছাড়া আর উপায় নেই। সন্ধের দিকে একবার বেরিয়ে দেখেছি, মিস্টার জোসেফ চার্চের রাস্তায় বাঘের মতন ওঁত পেতে বসে আছেন। ওনাকে এড়িয়ে যেতে হলে রাতের বেলাতেই যেতে হবে।
কিন্তু কেন? আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম।
আমার কথার উত্তর না দিয়ে বুধোদা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আমি পেছন থেকে দৌড়ে গিয়ে বুধোদার হাত টেনে ধরলাম। বললাম, দাঁড়াও। আমিও যাব। তোমাকে আমি একা ছাড়ব না।
বুধোদা আমাকে হাড়ে হাড়ে চেনে। জানে, একবার যখন বলেছি তখন আমি যাবই। তাই বেশি আপত্তি না করে বলল, তাহলে ভালো করে গরম-জামা পরে নে। তোর একটা নীল রঙের উইন্ড-চিটার আছে না? ওইটা সবকিছুর ওপরে চাপিয়ে নিস। অন্ধকারে মিশে থাকতে সুবিধে হবে। ও নিজেও দেখলাম একটা ডার্ক-কালারের রেন-কোট গায়ে চাপিয়েছে। আমি আর বললাম না, সত্যিকারেই যদি প্রেত-নেকড়ের সঙ্গে দেখা হয় তাহলে এইসব ক্যামুফ্লাজ আদৌ কাজে দেবে না। কারণ, যে কোনো প্রেতাত্মাই অন্ধকারে ভালো দেখতে পায়।
বাংলোর দরজায় তালা ঝুলিয়ে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। বাইরে বেরিয়ে দেখলাম একটা অদ্ভুত ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে আর সেই হাওয়ায় গা ভাসিয়ে অসংখ্য কালো মেঘের টুকরো চাঁদের সামনে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। পালা করে জ্যোৎস্না আর অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চারপাশের পাহাড় বন আর টি-এস্টেটের ঘরবাড়ি।
চার্চের কম্পাউন্ডে পৌঁছনোর পর আমরা দুজনেই চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। খুব তাড়াতাড়ি জ্যোৎস্না আর অন্ধকার জায়গা বদল করছিল বলেই বোধহয় একটা সাইকোডেলিক এফেক্ট তৈরি হয়েছিল, আর সেইজন্যেই মনে হচ্ছিল আমাদের চারপাশে যত নিষ্প্রাণ বস্তু সবই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ভাঙা গির্জা, ভাঙা ঘরবাড়ি আর সারি সারি কবরের ক্রশ—সবকিছুই যেন নড়েচড়ে উঠছিল।
সত্যিকারে যা নড়ছিল, তা হল ওক-গাছের ডালপালা আর বাদুড়ের ঝাঁক। কয়েকটা বাদুড় প্রায় আমাদের মুখে ঝাপটা মেরেই উড়ে গেল আর তাতেই আমাদের ঘোর কেটে গেল। বুধোদা ফিসফিস করে বলল, চল রুবিক। দেরি করে লাভ নেই। কবরটা খুঁজে বার করি।
চার্চের উলটোদিকে সেই কবরখানাটা আমরা সকালেই দেখে গিয়েছিলাম। লোহার গেটটায় তালা দেওয়া ছিল। কাজেই আমাদের পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকতে হল।
এতক্ষণ অবধি বুধোদার হাতের টর্চ জ্বলছিল। ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ও টর্চটা নিভিয়ে দিল। তার মানে ও এক্সপেক্ট করছে ভেতরে কেউ থাকতে পারে, যে টর্চের আলো দেখে আমাদের উপস্থিতি বুঝতে পারবে।
কার কথা ভাবছে ও? মিস্টার জোসেফের কথা কি?
কোনো কালে এই কবরখানার ভিতরে লুডোর বোর্ডের মতন আড়াআড়ি আর লম্বালম্বি রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল। মাঝখানের ফাঁকা জমিগুলো আস্তে আস্তে কবরে ভরে উঠবে, এমনই হয়তো ভেবেছিলেন তখনকার মালিকেরা। কিন্তু বাস্তবে যে তা হয়নি সে তো আমরা জানিই। মাত্র আঠেরো জন কুলিকে এখানে গোর দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে শেষজনের নাম ছিল হেনরি সুবেশ তির্কে। আর তারপরেই ছড়িয়ে পড়েছিল নেকড়ে-মানুষের আতঙ্ক। আর কোনও কবর এখানে গড়ে ওঠেনি।
যুক্তি বলছিল একদম শেষ সারির কোনো একটা কবরেই হেনরি সুবেশের নাম লেখা থাকবে। মিনিট দশেক লাগল সেই কবরটাকে খুঁজে বার করতে। সাদামাটা ইঁটের স্ট্রাকচারটাকে একটা মস্ত বড় সিন্দুকের মতন দেখতে লাগছিল। আমার বুকের মধ্যে হৃদপিণ্ডটা এত জোরে ধ্বকধ্বক আওয়াজ করছিল যে, ভয় হচ্ছিল বুধোদা না সেই শব্দ শুনতে পায়।
কবরটা লম্বায় চওড়ায় আট-ফুট বাই ছ-ফুট হবে। উঁচু প্রায় আমার বুকের সমান। অনেক জায়গাতেই ইঁট খসে গিয়ে বড় বড় গর্ত হয়ে গিয়েছে। মনে হল, একটা নেকড়ে অনায়াসেই ওইসব গর্তের কোনো একটার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
ঠিক সেই সময়েই পর পর এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটল যেগুলো আমি কোনও দিন ভুলব না।
প্রথমেই একটা বড় মেঘ এসে চাঁদটাকে আবার ঢেকে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক গভীর অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল। বুধোদা হয়তো তার আগেই কিছু একটা দেখেছিল। ও টর্চটা জ্বালিয়ে আমাদের পায়ের কাছে মাটিতে আলো ফেলল। যা দেখলাম তাতে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। আগের রাতের বৃষ্টিতে তখনো মাটি নরম ছিল।
দেখলাম, সেই নরম মাটির ওপরে কিছু মানুষের পায়ের ছাপ।
আর কিছু থাবার ছাপ। ঠিক যেরকম থাবার ছাপ দুদিন আগে দেখেছিলাম বাংলোর পেছনের দরজায়।
স্বীকার করতে লজ্জা নেই, আমি ভয় পেয়েছিলাম। সেরকম ভয় আমি জীবনে কখনো পাইনি। বুধোদার মধ্যে অবশ্য ভয়ের কোনও লক্ষণ দেখলাম না। ও টর্চটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর মন দিয়ে থাবার ছাপগুলোকে দেখতে শুরু করল।
কিন্তু ঠিক তখনই কবরের ভেতর থেকে এমন একটা আওয়াজ ভেসে এল যে, বুধোদা অবধি লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। আমি তো ততক্ষণে বেশ কয়েক পা পিছিয়ে গেছি। এই প্রথম দেখলাম, বুধোদার মুখেও ভয়ের ছাপ। ওর চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। আমার মতন ও-ও কান পেতে শুনছে, কবরের ভেতর থেকে ভেসে আসা সদ্যোজাত বাচ্চার কান্নার আওয়াজ। ওঁয়া ওঁয়া করে খুব দুর্বল গলায় একটা বাচ্চা কাঁদছে। কোনো ভুল নেই, কান্নাটা ভেসে আসছে ওই কবরের ভেতর থেকেই। বুধোদা আমার হাতে একটা টান মেরে বলল, রুবিক, কুইক। এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা চলবে না। চল পালাই।
এর আগে বুধোদার কোনও প্রস্তাব আমার কানে এত মধুর লাগেনি। বুধোদার কথা শেষ হবার আগেই আমি উলটোদিকে ঘুরে দৌড় মারলাম। দু-চারবার পড়তে পড়তে বেঁচে গেলাম। কাঁটার খোঁচায় হাত পা ছড়ে গেল। তবে তখন ওসব কিছুই খেয়াল ছিল না। শুধু ভাবছিলাম কতক্ষণে এই টিলা থেকে নামতে পারি।
বাউন্ডারি-ওয়াল টপকে যখন বাইরে বেরিয়ে এসেছি, তখন বুধোদা পেছন থেকে ডাকল—রুবিক!
আমি দৌড় থামিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম।
রুবিক, ওদিকে দ্যাখ।
বুধোদা ঠিক কোনদিকে দেখাচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না, তাই একটু সময় লাগল। তবে শেষ অবধি দেখতে পেলাম। আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখান থেকে কবরখানার পেছনদিকের পাঁচিলটা অনেক দূর। তবু যেহেতু তখন মেঘ সরে গিয়েছিল, কিছুক্ষণের জন্যে জ্যোৎস্নায় ভেসে গিয়েছিল চারিদিক, তাই একমুহূর্তের জন্যে দেখতে পেলাম, পাঁচিলের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এক চতুষ্পদ প্রাণীর সিল্যুয়েট।
আমি ভালো করে দেখার আগেই প্রাণীটা পাঁচিলের ওপর থেকে কবরখানার ভেতরে লাফিয়ে পড়ল।
আমরা এখন কী করব বুধোদা?
কী ব্যাপারে করার কথা বলছিস?
ওয়ারউলফ। নেকড়ে-মানুষ। কুকড়াঝোরায় যে ওয়ারউলফ রয়েছে এ ব্যাপারে তো আর সন্দেহ নেই? আমরা কি এখনই কলকাতায় ফিরে যাব? জানাব সবাইকে?
খেপেছিস? এই বলে বুধোদা আবার নিজের কাজে ডুবে গেল। কাজ বলতে—একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নীচে ধরে কয়েকটা পুরনো ফাউন্টেন পেনকে আগাপাস্তলা পরীক্ষা করা।
কাল আমি অনেক রাত অবধি ঘুমোতে পারিনি, কিন্তু বুধোদার অদ্ভুত ক্ষমতা বলতে হবে, পুরনো চার্চ থেকে ফিরে আসার আধঘন্টার মধ্যে নিশ্চিন্তে নাক ডাকাতে শুরু করেছিল। এমনকি ওকে দেখে এও মনে হচ্ছিল যে, গত দুদিনে ওর মনের মধ্যে যে অস্থিরতা ছিল, নেকড়ে-মানুষকে স্বচক্ষে দেখার পরে সেটা যেন অনেকটা কমে গেছে।
আজ সকালে ও ঘুম থকে উঠেও পড়েছে অনেক তাড়াতাড়ি। আমি চোখ মেলার পর থেকেই দেখছি, ও জানলার পাশের চেয়ারটায় বসে একমনে ওই ফাউন্টেন পেনগুলোকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে যাচ্ছে। মনে হয় মেকারের নাম খুঁজে পাচ্ছে না।
আমাকে বিছানা ছেড়ে উঠতে দেখে এমন হাসি হাসি মুখে গুড-মর্নিং বলল, যেন কাল রাতে আমরা মরতে মরতে বেঁচে যাইনি। যেন সুবেশ তির্কের কবরের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা নেকড়ের থাবার ছাপগুলো নিজেদের চোখে দেখিনি। আর সব কিছু যদি ভুলেও যায়, ও কেমন করে ভুলে যাচ্ছে ওই কচি বাচ্চাটার কান্নার আওয়াজ? আমি তো এক মুহূর্তের জন্যেও ভুলতে পারছি না।
থাকতে না পেরে আমি ওই কথাটা জিগ্যেস করলাম—আমরা এখন কী করব বুধোদা? আর তাতে ওর ওই এক লাইনের উত্তর—খেপেছিস?
এর পরেও যদি না খেপে যাই তাহলে কখন খেপব? রেগেমেগে টুথব্রাশে হেয়ার-জেল লাগিয়ে ডাইনিং-রুমের বেসিনের দিকে চলে যাচ্ছিলাম। বুধোদাই পিছন থেকে ডেকে ভুলটা শুধরে দিল। তারপর বলল, মুখ ধোয়া হয়ে গেলে ড্রেসটা চেঞ্জ করে নিস। ওয়ারউলফ ধরতে বেরোব।
আমি ঠিক করেছি, ওকে আর কোনো ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করব না। নিজে থেকে যেটুকু বলার বলবে। তাই মুখ ধুয়ে এসে দেয়ালের ব্র্যাকেট থেকে আমার ছ'পকেট ওলা কার্গো-প্যান্টটা নামিয়ে চেঞ্জরুমের দিকে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ প্যান্টটার একটা পকেট থেকে ঝনাৎ করে মেঝের ওপরে কী যেন পড়ল। তাকিয়ে দেখি সেই মেটালের চাকতিটা, যেটা গাপ্পির পকেট থেকে নিয়ে নিজের পকেটে রেখেছিলাম। একটু খারাপ লাগল। সেদিন জিনিসটা ডাম্পিভাইয়ের হাতে ফিরিয়ে দিতে ভুলে গেলাম কেমন করে? তারপর ভাবলাম, দামি জিনিস তো কিছু নয়। আজ দিয়ে দিলেই হবে।
চাকতিটা গড়াতে গড়াতে গিয়ে একেবারে বুধোদার পায়ের কাছে কেতরে পড়ল। ও বোধহয় ভেবেছিল আমার পকেট থেকে কয়েন-টয়েন কিছু পড়ে গেছে, তাই ওটাকে হাতে তুলে নিয়ে ক্যাজুয়ালি আমাকে ফিরিয়ে দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই ওর চোখ পড়ল আসল জিনিসটার ওপর আর সঙ্গে সঙ্গেই ভূত দেখার মতন লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। এক সেকেন্ডের জন্যেও ওটার দিক থেকে চোখ না সরিয়ে আমাকে জিগ্যেস করল, এটা তুই কোত্থেকে পেলি রুবিক?
আমি ওর রিঅ্যাকশন দেখে তো অবাক। আমতা আমতা করে বললাম গাপ্পির পকেট থেকে কিভাবে ওটাকে সরিয়ে রেখেছিলাম।
বুধোদা আরো পাঁচ সেকেন্ড পরে চাকতিটার দিক থেকে চোখ তুলে আমাকে বলল, ভগবান কেন সব সময় শেষ সমাধানটা তোর হাত দিয়েই পাঠায় বল তো রুবিক? আমি কী অপরাধ করেছি? এরপর থেকে তো আমি একা কোনো রহস্যের পেছনে দৌড়নোর সাহসই পাব না।
এটাও ওর এক ধরনের ইয়ার্কি কিনা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তবু ওর বাড়িয়ে ধরা হাত থেকে চাকতিটা নিয়ে আরেকবার ভালো করে দেখলাম। জিনিসটার সাইজ আমাদের স্কুলের ব্যাজের মতন। এমনিতেই ম্যাড়মেড়ে রং, তার ওপরে সবুজ কলঙ্কের ছোপ পড়ে আরো বিচ্ছিরি হয়ে গেছে। সোনা বা রুপোর তৈরি নয় এটুকু নিশ্চিত। বোধহয় পেতল-টেতল হবে।
এইটা দিয়ে দ্যাখ—এই বলে বুধোদা ম্যাগনিফাইং-গ্লাসটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। সেটা দিয়ে দেখলাম, চাকতির ঠিক মাঝখানের ফুটোটার বাঁ-পাশে ইংরিজিতে ½ সংখ্যাটা এনগ্রেভ করা রয়েছে। আর ডানদিকে শুধু একটা সাল—১৮৯৯। কোনো দেশের নাম নেই। কোনো লোগো নেই। কাজেই এটা যে কয়েন নয় সেটা বোঝা যাচ্ছে। ম্যাগনিফাইং-গ্লাস আর মেটালের চাকতি, দুটোই বুধোদার হাতে ফেরত দিয়ে বললাম, হুঁ, দেখলাম। এবার বলো রহস্য সমাধানের কথা কী বলছিলে? এই চাকতিটা দিয়ে রহস্য সমাধান হবে?
বুধোদা চেয়ার থেকে চলে এল খাটে। বেশ গুছিয়ে বাবু হয়ে বসল। তারপর বলল, হবে কিরে? হয়ে গেছে। খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। মন দিয়ে শোন।
মনে কর, তুই এই কুকড়াঝোরাতেই বসে আছিস, কিন্তু টাইম-মেশিনে চড়ে পেছিয়ে গেছিস আরো প্রায় একশো পঁচিশ বছর। নারী-পুরুষ মিলিয়ে একহাজার চা-শ্রমিক বাগানে কাজ করছে। কাজ তো এক রকমের নয়। মাটি কাটা, গাছ বসানো, জল দেওয়া, গাছ ছাঁটা, পাতা তোলা থেকে শুরু করে সেই পাতা কারখানায় নিয়ে গিয়ে প্রসেসিং করা অবধি হাজার রকমের কাজ। কোনো লেবার পায় সারাদিনের কাজ, কেউ পায় আধবেলার, কেউ বারো আনা দিনের। সেই অনুযায়ী তাদের প্রতিদিন মজুরি মেলে। সেই মজুরিকে বলা হত 'হাজরি'। পুরোদিন কাজ করলে ফুল হাজরি, অর্ধেক দিন কাজ করলে হাফ হাজরি, আবার দিনের বারো আনা কাজ করলে থ্রি কোয়ার্টার হাজরি। সাধারনত সপ্তাহের শেষে সাতদিনের কাজের হিসেব এক করে তাদের পেমেন্ট দেওয়া হত।
কিন্তু এক সপ্তাহের শেষে হাজরি মেটাতে গিয়ে বাগানের মালিকরা অনেকগুলো সমস্যায় পড়ল। প্রথমত, লেবাররা অত অঙ্ক জানে না। সাতদিনের মধ্যে কে কবে কত কাজ করেছে আর তার জন্যে কত পাওনা হয়, অত জটিল হিসেব তাদের মাথায় ঢুকত না। আর মাথায় ঢুকত না বলেই ভাবত মালিকরা তাদের ঠকিয়ে নিচ্ছে। সেই থেকে শুরু হত অশান্তি।
দিনের দিন হাজরি মিটিয়ে দিলে এই সমস্যার একটা সুরাহা হয়তো হত। কিন্তু তাতে দেখা দিত একটা নতুন সমস্যা। তখন তো কাগজের নোটের অত প্রচলন ছিল না। প্রতিদিন হাজারের ওপর কুলিকে কয়েন দিয়ে পাওনা মেটাতে গেলে যত কয়েন লাগবে তা জোগাড় করা ছিল অসম্ভব।
এই সমস্যার সমাধান করার জন্যে চা-বাগানের মালিকেরা ইন দা ইয়ার এইটটিন হান্ড্রেড অ্যান্ড সেভেনটি-টু একটা ইউনিক জিনিস চালু করল। তার নাম ''Tea garden token''।এইমাত্র যে জিনিসটা তোর পকেট থেকে মেঝের ওপর পড়ল, ওটা কুকড়াঝোরা চা বাগানের হাফ হাজরির টোকেন। দেখলি না মাঝখানে হাফের সাইন?
টোকেনগুলো তৈরি হত সস্তার মেটাল দিয়ে। বানাত অবশ্য কোনো না কোনো সরকারি টাঁকশাল। বানানো হত নানারকম শেপে। ধর, কোনো বাগান ফুল হাজরির জন্যে বানাল চৌকোনা, হাফ হাজরির জন্যে গোল আর থ্রি কোয়ার্টার হাজরির জন্যে তিনকোনা টোকেন। কুলিরা টাকা আনা পাইয়ের হিসেব না বুঝলেও, কোন হাজরির জন্যে কোন শেপের টোকেন সেটা সহজেই বুঝে নিত। দিনের শেষে হাতে গরম পেমেন্ট পেয়ে তারাও খুশি হত আর বাগান-মালিকও থাকত নিশ্চিন্ত।
আমি বুধোদার কথার স্রোতে বাধা দিয়ে বললাম, কিন্তু বুধোদা, টাকার বদলে টোকেন নিয়ে লাভটা কী হত? টোকেন দিয়ে তো আর কেনাকাটা করা যেত না।
বুধোদা বলল, কে বলল করা যেত না? প্রত্যেকটা বাগান ছিল এক একটা আলাদা আলাদা শহরের মতন। একটা বাগানকে ঘিরে যত দোকানদার, ধোপা, নাপিত, ডাক্তার-বদ্যি সকলেই পয়সার বদলে ওই টোকেন অ্যাকসেপ্ট করত। তারা জানত কোন টোকেনের দাম আসলে কত পয়সা। সেই অনুযায়ী তারা লেবারদের সেই দামের জিনিস দিয়ে দিত। আবার সপ্তাহের শেষে জমা হওয়া সমস্ত টোকেন বাগান-মালিককে ফেরত দিয়ে সত্যিকারের পয়সা নিয়ে নিত।
তবে এ ছাড়াও টোকেন চালু করার পেছনে মালিকদের একটা দারুন শয়তানি বুদ্ধি কাজ করেছিল। কী বল তো?
আমি মাথা চুলকোচ্ছি দেখে বুধোদা বলল, পারবি না। কারণ তুই অত শয়তান নোস। টোকেন দেখিয়ে বাগানের মধ্যে তুই অনেক কিছুই কিনতে পারবি, কিন্তু বাগান থেকে বেরিয়ে ট্রেনের টিকিট কাটতে পারবি? বাসের টিকিট কাটতে পারবি? আর না পারলে...
আমার মাথায় ততক্ষণে ব্যাপারটা ঢুকে গেছে। বললাম, না পারলে আমি বাগান থেকে পালাতেও পারব না, তাই তো?
গুড, ভেরি গুড।
আমি জিগ্যেস করলাম, এখন টি-গার্ডেন টোকেন চালু নেই তো?
উঁহু। অনেকদিন আগেই উঠে গেছে। যখন থেকে টাকা আনা পাইয়ের গন্ডগোলের হিসেব উঠে গেল তখন থেকে বাজারে আর খুচরোর অভাবও রইল না। হিসেবপত্রও অনেক সরল হয়ে গেল। সেটা এই ধর নাইনটিন ফিফটিজের প্রথম দিকে। ব্যাস টোকেনের দিনও ফুরোল। তার মানে পৃথিবীর ছোট্ট একটা কোণে, অল্প কিছু সময়ের জন্যে টি-গার্ডেন টোকেন নামে এই চাকতিগুলো চালু ছিল।
তারপর কী হল?
তারপর? ভাঙাচোরা গাড়ি যেমন লোহার দামে বিক্রি করে দেওয়া হয়, তেমনি লেবাররা যার কাছে যত টোকেন ছিল সব গলিয়ে ভেতরের মেটালটুকু বিক্রি করে দিল। টি-গার্ডেন টোকেন রয়ে গেল অল্প কয়েকজন চা-বাগানের সাহেবের লেখা স্মৃতিকথায় আর আরো অল্প দুয়েকজন অ্যান্টিক হান্টারের পার্সোনাল কালেকশনে।
বুধোদা! আমি খাট থেকে লাফিয়ে মেঝেতে নেমে দাঁড়ালাম। বুধোদার সামনে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করলাম, এই টোকেন এখন অ্যান্টিক?
বুধোদা গম্ভীর মুখে বলল, শুধু অ্যান্টিক নয়। ভীষণ দুষ্প্রাপ্য এবং সেইজন্যেই ভীষণ দুর্মূল্য এক অ্যান্টিক। এইরকম এক-একটা টোকেনের দাম এখন খুব কম করে তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা। আমি বুধোদার হাত থেকে টোকেনটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরেয়ে দেখছিলাম। এত দুর্লভ এই সামান্য জিনিসটা! এত দাম এর! কিন্তু...। যে কথাটা বুঝতেই পারছিলাম না সেটাই বুধোদাকে জিগ্যেস করলাম। বুধোদা, গাপ্পির পকেটে টি-গার্ডেন টোকেন কোথা থেকে এল? তাহলে কি ডাম্পিভাইকে যতটা অনেস্ট মনে করেছিলাম ও অতটা অনেস্ট নয়? ও কি এই বাংলো থেকে টোকেনগুলো চুরি করে নিজের ঘরে রেখে দিয়েছে?
উঁহু। বুধোদা মাথা নাড়ল। সাহেবদের বাংলোয় কেন টোকেন থাকবে? জিনিসটা তো কাজে লাগত কুলিদের পেমেন্ট মেটানোর জন্যে।
তাহলে?
বুধোদা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সামনের দরজায় দুমদাম ধাক্কা আর ডাম্পিভাইয়ের চিৎকার। স্যার স্যার! ভাইয়া ভাইয়া! জলদি দরবাজা খুলিয়ে স্যার।
আমি আর বুধোদা দুজনেই বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলাম। দৌড়লাম সামনের দরজাটার দিকে। ওই দরজাটাই ডাম্পিভাই প্রাণপণে পেটাচ্ছিল। যেতে যেতেই একবার ডাইনিং-হলের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ছ'টা বাজতে তখনো দশমিনিট বাকি আছে। তার মানে ভালো করে সকাল হতে এখনো প্রায় দু-ঘন্টা দেরি। এই বিদঘুটে সময়ে এমন কোন ঘটনা ঘটল যার জন্যে ডাম্পিভাইকে তার কোয়ার্টার থেকে ছুটে আসতে হল?
বুধোদা দরজাটা খুলতেই ডাম্পি মাহাতো প্রায় হুমড়ি খেয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল। ওর জামাকাপড়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।
প্রথমে ভেবেছিলাম ও নিজেই কোনোভাবে মারাত্মক চোট পেয়েছে, কিন্তু ওর কথাতেই ভুল ভাঙল। ডাম্পি অসহায়ের মতন বুধোদার হাতদুটো জড়িয়ে ধরে বলল, মজুমদারসাব, মাস্টারসাবকে বাঁচান। নেকড়ে-মানুষ ওকে বহোত বুরা তারিকাসে জখম করেছে। এত খুন বেরোচ্ছে, এত খুন বেরোচ্ছে, যে কী বলব?
বুধোদার ব্যাগে সব সময়েই একটা ফার্স্ট-এইড-কিট থাকে, কারণ, ওই ব্যাগ নিয়ে ও যেমন অ্যান্টিক খুঁজতে বেরোয়, তেমনি আবার বিপজ্জনক সব পাহাড়ে জঙ্গলে ট্রেকিং করতেও বেরোয়। সেটা ওর দ্বিতীয় নেশা। তৃতীয় নেশা বার্ড-ওয়াচিং।
যাই হোক, সেই কিট টা হাতে নিয়ে বুধোদা দৌড়ল ডাম্পির কোয়ার্টারের দিকে। পেছন পেছন আমি আর ডাম্পি। যেতে যেতেই ডাম্পির মুখে যেটুকু শুনলাম, তাতে বুঝতে পারলাম, একটু আগে তার কোয়ার্টারের দরজায় নক করেছিলেন মিস্টার জোসেফ। দরজা খুলতেই রক্তাক্ত মিস্টার জোসেফ মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ে জ্ঞান হারান। জ্ঞান হারানোর আগে তিনি শুধু বলতে পেরেছিলেন, প্রভূ যীশু আমার লোভের শাস্তি দিলেন ডাম্পি। আমাকে মিথ্যে কথা বলার শাস্তি দিলেন।
আমরা যখন পৌঁছলাম তখনও মিস্টার জোসেফ চিৎ হয়ে ঘরের মেঝের ওপরে পড়ে আছেন। দেখে শিউরে উঠলাম—ওনার বাঁদিকের গালটায় দুটো বড় গর্ত, যেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে নেমেছে বুকে। ওগুলো যে কোনো শ্বাপদের শ্বদন্তের দাগ তা আর বলে দিতে হয় না। তাছাড়া পেট থেকে থাই অবধি জামাপ্যান্ট ফালা ফালা হয়ে ছিঁড়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে চামড়ার ওপরে একসারি রক্তরেখা।
বুধোদা হাঁটু মুড়ে ওনার পাশে বসে পড়ল। ফার্স এইড কিটটা খুলতে খুলতে আপনমনেই মন্তব্য করল—কপাল ভালো, কামড়টা গলায় বসাতে পারেনি। তাহলে আর কিছু করার থাকত না।
কে কামড় বসাতে পারেনি? নেকড়ে-মানুষ? জানি, এখন এই প্রশ্ন করা যাবে না।
বুধোদা একটা লোশন ঢেলে মিস্টার জোসেফের ক্ষতস্থানগুলো ধুইয়ে দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধতে শুরু করেছিল। একটা অ্যান্টি-টিটেনাস ইঞ্জেকশনও দিল। কিন্তু তারপর অসহায়ের মতন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, রুবিক, এ ফার্স্ট এইডের কাজ নয় রে। এনাকে ইমিডিয়েটলি কোনও বড় হাসপাতালে ট্র্যান্সফার করতে হবে। কিন্তু সে তো সেই শিলিগুড়িতে। ডাম্পি, ওনাকে শিলিগুড়ি নিয়ে যাব কেমন করে? গাড়ি কোথায়?
পিছন দিক থেকে কেউ বললেন, ও দায়িত্বটা আমার ওপর ছেড়ে দিন মিস্টার মজুমদার।
মুখ ঘুরিয়ে দেখলাম দরজার সামনে সুধাবিন্দু বসাক দাঁড়িয়ে আছেন। বুধোদা অবাক গলায় বলল, আপনি যে বললেন দুপুরের ফ্লাইটে আসবেন।
সুধাবিন্দুবাবু উত্তর দিলেন, ফোনে আপনার সব কথা শুনে অতক্ষণ ওয়েট করতে পারলাম না। ইনকাম ট্যাক্সের কাজটা গতকাল সকাল এগারোটার মধ্যে মিটে গেল। তখনই তৎকালে শতাব্দীর টিকিট কেটে রওনা হয়ে গেলাম। রাত সাড়ে দশটায় পৌঁছলাম এন.জে.পি। অত রাতে তো আর গাড়ি পাবো না, তাই রাতটা কোনোরকমে শিলিগুড়ির একটা হোটেলে কাটিয়ে, ভোর না হতেই চলে এসেছি। এসেছি অবশ্য ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাড়িতে। এই অর্ণব, ভেতরে এস।
লম্বা দোহারা চেহারার এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন। এতক্ষণ উনি ঘরের ভিতরের দৃশ্য দেখতে পান নি। এবার সুধাবিন্দুবাবুর ডাকে সাড়া দিয়ে ঘরের মধ্যে পা দিয়েই 'ওহ' বলে একটা আওয়াজ করে উঠলেন। বোঝাই যায় সেটা মিস্টার জোসেফের অবস্থা দেখে ওনার ইনস্ট্যান্ট রিঅ্যাকশন। সুধাবিন্দুবাবু বললেন, মিস্টার মজুমদার, ইনি আমার ঘনিষ্ট বন্ধু অর্ণব বসু। এখানকার ডি.এফ.ও.। ওর সঙ্গে ফরেস্টের লোকজন রয়েছে। আপনি যা যা ইকুইপমেন্টস আনতে বলেছিলেন সব নিয়ে এসেছি।
অর্ণব বসু বললেন, সুধা, আমি বলি কি, একটা গাড়ি আর আমার দুজন লোক দিয়ে এই ভদ্রলোককে আগে নর্থবেঙ্গল মেডিকাল কলেজে অ্যাডমিশন করিয়ে দিই। ওখানকার সুপারের সঙ্গে আমার ভালোই আলাপ আছে। ফোনে বলে দিচ্ছি। সেরা চিকিৎসাটাই হবে। কিন্তু আর দেরি হলে এনার ক্ষতি হতে পারে।
বুধোদার মুখ দেখে বুঝতে পারলাম, অর্ণববাবুর কথাটা ওর পছন্দ হয়েছে। পরের পনেরো মিনিটের মধ্যে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা এস. ইউ. ভি. মিস্টার জোসেফকে নিয়ে জলপাইগুড়ি রওনা হয়ে গেল আর অন্য দুটো গাড়ি কুলিবস্তির সামনে থেকে ধীরগতিতে এগিয়ে চলল চার্চের রাস্তায়। বেশ কিছুটা চড়াই ভেঙে ওঠার পর, ঠিক যখন দূরে গির্জার চুড়োটা দেখা গেল, তখনই সামনের গাড়িটা থেমে গেল। অর্ণববাবু হাত দেখিয়ে আমাদের গাড়িটাকেও থামালেন। এরপরেই শুরু হল আমাদের ফুট-মার্চ।
আমরা বলতে আমি আর বুধোদা তো আছিই। সঙ্গে আছেন সুধাবিন্দুবাবু আর অর্ণববাবু। আর রয়েছে ডাম্পিভাই। তা বাদে চারজন ফরেস্ট গার্ড। অবাক হয়ে দেখলাম, তাদের একজনের হাতে একটা বন্দুক আর বাকি তিনজন কাঁধে করে একটা নাইলনের জাল বয়ে নিয়ে চলেছে। বুধোদা অর্ণববাবুকে জিগ্যেস করল,বন্দুকটা কি ঘুমপাড়ানি গুলি ছুঁড়বার জন্যে?
অর্নববাবু বললেন, নিশ্চয়। তাও যদি প্রয়োজন হয়, তবেই।
একটু বাদে অর্ণববাবু বললেন, মিস্টার মজুমদার আপনিই লিড করুন। আপনিই সবথেকে ভালো জানেন কোথায় যেতে হবে। সুধাবিন্দুবাবুও সেই কথায় সায় দিলেন। আমি আর বুধোদা এগিয়ে গেলাম, অন্যরা আমাদের ফলো করতে শুরু করল।
বুধোদা আমাদের কবরখানার গেটের সামনে নিয়ে এসে পিছন ফিরে তাকাল। ডাম্পি তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে পকেট থেকে চাবি বার করে গেটের তালাটা খুলে দিল ঠিকই, কিন্তু তারপরেই প্রায় দৌড়েই অনেকটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল। পরিষ্কার বুঝতে পারলাম, এই মুহূর্তে ওর কবরখানার ভিতরে ঢুকবার একটুও ইচ্ছে নেই।
বুধোদা আমাদের দলটাকে হেনরি সুবেশের কবরটার কাছে নিয়ে এল। আমি ভাবছিলাম, বোধহয় আট ঘন্টাও কাটেনি, আমি আর বুধোদা ঠিক এই জায়গাটায় দাঁড়িয়েছিলাম। রাতের সেই পরিবেশ এখন আর নেই। কিন্তু অন্য অনেক কিছুই এক অবস্থায় রয়েছে। আমাদের হাতের ইশারায় একটু দূরে দাঁড়াতে বলে অর্ণববাবু আর সেই বন্দুকধারী ফরেস্ট-গার্ড সেইরকমই একটা জিনিস ভালো করে দেখবার জন্যে এগিয়ে গেলেন। থাবার ছাপ।
অর্ণববাবু হাঁটু মুড়ে বসে কিছুক্ষণ ছাপগুলোকে দেখলেন। তারপর বুধোদার দিকে ফিরে হাসিমুখে বললেন, ইউ আর রাইট, মিস্টার মজুমদার। লেপার্ড। অ্যান্ড সি দেয়ার। পাগ-মার্ক অফ হার কাবস। অর্ণববাবু মাটির যেদিকে দেখালেন সেদিকে তাকিয়ে দেখি বেড়ালের থাবার মতন ছোট্ট ছোট্ট আরো কয়েকটা থাবার ছাপ।
অ্যান্ড দেয়ার দে গো। এবার অর্নববাবু আঙুল তুলে দেখালেন কবরখানার পিছনদিকে, যেখান থেকে টিলার ঢালু গা প্রায় দুহাজার ফিট নীচে একটা জঙ্গলে ঢাকা খাদে গিয়ে মিশেছে।
সেই ঢালু পাহাড় বেয়ে নেমে যাচ্ছে একটা চিতাবাঘ। তার চলা-ফেরার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সকালের নরম আলোয় তার হলুদ রেশমি চামড়া সোনার মতন ঝলমল করছে। আর সেই মা-চিতাবাঘের পেছন পেছন নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করতে করতে, কখনো আবার মায়ের লেজটাকে নিয়ে খেলা করতে করতে দৌড়চ্ছে দুটো বাচ্চা।
আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম সবার চোখে খুশি। সবার চোখে মুগ্ধতা। এমনকি ডাম্পিও কখন যেন আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সেও হাসছিল।
খোলা ঘাসজমিটা পেরিয়ে চিতাবাঘটা আর তার বাচ্চাদুটো প্রায় জঙ্গলের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। জঙ্গলে ঢুকে পড়বার আগে মা বাঘটা হঠাৎ কী মনে করে একবার রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘাড় ফিরিয়ে আমাদের দিকে তাকাল। বাচ্চা দুটোও ঘুরে দাঁড়াল আমাদের দিকে মুখ করে। যেন ওরা তিনজনেই বিদায় জানাল কুকড়াঝোরাকে। তারপর ঢুকে গেল ঘন জঙ্গলের মধ্যে।
অর্নববাবু বললেন, চলুন মিস্টার মজুমদার, চল সুধাবিন্দু। আমাদের এখানে আর কাজ নেই। আগামী এক-বছরের মধ্যে অন্তত ও আর এখানে ফিরে আসবে না।
সুধাবিন্দুবাবু তাকালেন বুধোদার দিকে। জিগ্যেস করলেন, মিস্টার মজুমদার? আপনি গুপ্তধনের কথা কী যেন বলছিলেন?
হ্যাঁ, সেই কাজটুকুই বাকি। একটু দাঁড়ান। ডাম্পি, তোমাকে যা আনতে বলেছিলাম এনেছ।
ডাম্পি মুখে কিছু না বলে ওর কাঁধের ঝোলা থেকে একটা ছোট শাবল বার করে দ্যাখাল। বুধোদা বলল, ভেরি গুড। কাজে লেগে যাও তাহলে।
ডাম্পি বুকের ওপর ক্রশ এঁকে হেনরি সুবেশের কবরের ইঁটের গাঁথনির ফাঁকে শাবল চালাল। পুরনো ঝুরঝুরে গাঁথনি শাবলের দু-তিন কোপেই অনেকটা ভেঙে পড়ল। ভেতরে দিব্যি বড়সড় একটা ঘরের মতন জায়গা। বোঁটকা গন্ধ, কিছু হাড়গোড়। আমাদের ম্যাডাম চিতার সংসার পাতার চিহ্ন।
যা দেখবার ভয়ে সিঁটিয়ে ছিলাম সেরকম কিছুই চোখে পড়ল না। না কফিনের কাঠ, না মানুষের কঙ্কাল। একশো-পনেরো বছর বিরাট লম্বা সময়। তার মধ্যে সব কিছুই মাটিতে মিশে গেছে।
ডাম্পি এবার হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। একটা ছোট বেলচা বার করে আস্তে আস্তে কবরের মধ্যে জমে থাকা ধুলো সরাতে শুরু করল। বুধোদা ওর পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। হঠাৎই বুধোদা চেঁচিয়ে উঠল—ওই তো!
ম্যানেজারের বাংলোয় ডিনার-টেবিলকে ঘিরে সাজিয়ে রাখা চেয়ারগুলোয় আমরা চারজন বসে আছি। আমি, বুধোদা, সুধাবিন্দু বসাক আর অর্ণব বসু। আমাদের প্রত্যেকের সামনে ব্যাভেরিয়ার মিটারটাইখ কোম্পানির শ্বেতশুভ্র প্লেট। দেখে মনে হতে পারে, এখনো প্লেটগুলোয় খাবার সার্ভ করা হয়নি, কিন্তু আসলে তা নয়। আমরা ব্রেকফাস্টটা এমনই চেটেপুটে খেয়েছি যে, ওরকম মনে হচ্ছে। একে তো সেই ভোরবেলা থেকে দৌড়োদৌড়ি করে প্রত্যেকেরই খিদে পেয়েছিল প্রচন্ড। উপরন্তু একটু আগে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ওয়ারলেস সেটে মেসেজ এসেছে, মিস্টার জোসেফের কোনো চোটটাই খুব একটা গভীর নয়। ওনার আপাতত কোনো বিপদ নেই। উপরন্তু ডাম্পির মনের ভেতরে জমে থাকা ভয়ের মেঘ কেটে গেছিল বলেই কিনা কে জানে, আজকে ওর বানানো এগ-স্ক্র্যামবল আর হ্যাম স্যান্ডউইচের টেস্ট হয়েছিল একেবারে বিন্দাস।
এইমাত্র আমাদের কফি সার্ভ করে ডাম্পিভাই নিজেও একটা কাপ হাতে নিয়ে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। বুঝতে পারছি, বুধোদার মুখে নেকড়ে-মানুষ রহস্যের ভেতরের কথা শুনবার আগ্রহটা আমাদের থেকে ওর কম নয়।
আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বুধোদা বোধহয় বুঝতে পারল, আর অপেক্ষা করানো ঠিক নয়। তাই কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করল—
মিস্টার বসাক, আপনি আমাদের উত্তরপাড়ার বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় রুবিককে বলেছিলেন কুকড়াঝোরাকে নিয়ে নানা রকমের ভুতুড়ে গল্প চালু আছে। ব্যাপারটাকে খুব একটা পাত্তা দিইনি। ভুতুড়ে গল্প এক জিনিস আর নিজের চোখে ভূত দেখা আরেক।
তাই যখন প্রথমদিনই ডাম্পি আমাদের জানাল এই বাগানে নেকড়ে-মানুষ ঘোরাঘুরি করছে তখন একটা বড় ধাক্কা খেলাম।
ডাম্পির মুখে একশো-পনেরো বছর আগে সুবেশ তির্কের ভয়ঙ্কর মৃত্যুর কথা শুনলাম। শুনলাম নেকড়ে-মানুষের কবলে গ্যাবন উইলিয়াম, তার পাহারাদার আর তার কুকুরের মৃত্যুর ঘটনাও।
আমাদের ভাগ্য ভালো, প্রায় একশো-পনেরো বছর পরেও ঘটনাগুলোর ডিটেইলস হারিয়ে যায়নি। কোথাও কোনো লিখিত নথি নেই। এক পুরুষের কাছ থেকে তার পরের পুরুষ শুনেছে। তার কাছ থেকে তার পরের পুরুষ। তবু সেই সময়ে ঠিক যা হয়েছিল, তাই-ই আমরা আজও জানতে পারছি। এই হচ্ছে ফোকলোরের মজা। যাই হোক, এরকমই একটা ডিটেইলস শুনে প্রথম আমার মনে হল হয়তো পুরোটাই গাঁজাখুরি গল্প নয়। নেকড়ে-মানুষের অলৌকিক গল্পের মধ্যে কোথাও হয়তো একটা বাস্তব ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
সেই ডিটেইলসটা কী জানেন? নেকড়ে-মানুষ উইলিয়াম সাহেবের কুকুরটার মাংস ছিঁড়ে খেয়েছিল, কিন্তু উইলিয়াম সাহেবের গা থেকে এক টুকরো মাংসও খায়নি। তাকে শুধু মেরেই খান্ত হয়েছিল।
একসেলেন্ট!—মন্তব্যটা করলেন অর্ণববাবু। তাকিয়ে দেখলাম উনি হাসি হাসি মুখে ঘাড় নাড়ছেন। আবার বললেন, রিয়েলি একসেলেন্ট!
সুধাবিন্দুবাবু বললেন, দিস ইজ আনফেয়ার অর্ণব। তুমি আর মিস্টার মজুমদার এর মধ্যে কী সূত্র খুঁজে পেলে জানি না, কিন্তু আমি আর রুবিক তো পুরো অন্ধকারে।
অর্ণবববাবু বললেন, লেট মি এক্সপ্লেইন। যে কোনো জন্তুরই কিছু স্বাভাবিক শিকার থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'Natural prey'। যে সব লেপার্ড মানুষের ঘরবাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, তাদের 'ন্যাচারাল প্রে' কুকুর। কিন্তু মানুষ তার 'ন্যাচারাল প্রে' নয়। করবেট সাহেবের লেখাগুলো পড়লে বুঝবে, কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি না পড়লে চিতাবাঘ কখনো খাওয়ার জন্যে মানুষ মারে না। অন্য কারণে মারতে পারে।
বুধোদা বলল, ঠিক তাই। তখনই আমার প্রথম মনে হয়েছিল চিতাবাঘের কথা। এর থেকেই আরো একটা চিন্তা মাথায় এল। একশো-পনেরো বছর আগে চারিদিকে নিশ্চয় জঙ্গল আরো বেশি ছিল। এই সব এলাকায় বুনোশুয়োর, খরগোশ, হরিণের মতন শিকার দুর্লভ ছিল না। তবু সেই চিতাটাকে চা-বাগানে ঢুকে কুকুরটাকে মারতে হল কেন?
এর একটাই উত্তর— চিতাটা এই চা-বাগানেই ঘাঁটি গেঁড়েছিল আর এই চা-বাগান ছেড়ে, আরো প্রিসাইজলি বলতে গেলে ওই চার্চের চৌহদ্দি ছেড়ে দূরে কোথাও যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।
চিতার মতন এমন একটা জন্তু, যে এমনিতে কয়েক স্কোয়ার-মাইল এরিয়া নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সে কখন এরকম ছোট জায়গায় বন্দী হয়ে পড়ে? এনি গেস?
বুধোদা আমার আর সুধাবিন্দুবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
অর্ণববাবু দেখলাম আবার সেইরকম অ্যাপ্রিসিয়েসনের হাসি হাসছেন, কিন্তু আমাদের শুকনো মুখে মাথা নাড়তেই হল।
বুধোদাই উত্তরটা দিয়ে দিল। বলল, যখন সে সবে মা হয়। যখন তার লুকিয়ে রাখা আস্তানায় ছোট ছোট বাচ্চা থাকে।
মাই গড! সুধাবিন্দুবাবু প্রায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার মানে সেই চিতাটা এই চা বাগানে এসে বাচ্চা দিয়েছিল? দাঁড়ান দাঁড়ান! এখন বুঝতে পারছি উইলিয়াম সাহেবকেই বা কেন জন্তুটা ওরকম ফেরোসাসলি অ্যাটাক করেছিল। উইলিয়াম সাহেব তার কুকুরকে খুঁজতে খুঁজতে নিশ্চয় ওর ডেরার খুব কাছাকাছি পৌঁছিয়ে গিয়েছিলেন। হয়তো চিতার বাচ্চাগুলো ওনার সামনে পড়ে গিয়েছিল আর...।
এগজ্যাক্টলি! সুধাবিন্দুবাবুর মুখের কথা শেষ হবার আগেই অর্ণববাবু সায় দিলেন। পিওর অ্যানিমাল ইনস্টিঙকট। এমনিতে লেপার্ড মানুষ দেখলে দূরে সরে যায়। কিন্তু সঙ্গে বাচ্চা থাকলে সে কিছুতেই পালাবে না। সে অ্যাটাক করবে। একশো-পনেরো বছর আগে এই চা-বাগানে ঠিক তাই হয়েছিল। মিস্টার মজুমদারের ডিডাকশনে কোনো ভুল নেই।
বুধোদা কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, ওই উনিশশো সাল নাগাদ ইওরোপের লোকের মনে ওয়ারউলফের ভয়টা আজকের থেকে অনেক বেশি গভীর ছিল। সুবেশ তির্কে কে উইলিয়াম সাহেব একরকম খুনই করেছিলেন। এইরকম সব ক্ষেত্রেই তো প্রতিশোধ নেবার জন্যে ওয়ারউলফের জন্ম হয়। কুকড়াঝোরা টি-এস্টেটের হাতে গোনা কয়েকজন ইওরোপিয়ান কর্মচারী ভাবল, এখানেও বোধহয় তাই হয়েছে। তারাই রটিয়ে দিল, সুবেশ তির্কে ওয়ারউলফ হয়ে গেছে।
একটা কথা জিগ্যেস করব?—আমি আর না পেরে বলে উঠলাম।
বল। বুধোদা বলল।
জঙ্গলে এত জায়গা থাকতে চিতাবাঘটা ওই চার্চের জমিতে বাচ্চা দিতে এসেছিল কেন?
এটাও ন্যাচারাল ইনস্টিঙকট। চিতাবাঘ তো বেড়ালজাতীয় প্রাণী। বেড়ালের বাচ্চাকে যেমন হুলোয় মেরে ফেলে, তেমনই চিতার বাচ্চাকেও পুরুষ চিতা মেরে ফেলে। তাই মা-চিতা অনেক সময়েই জঙ্গল থেকে দূরে কোনো নিরিবিলি জায়গায় বাচ্চা দেয়। জঙ্গলে ফেরে বাচ্চারা কিছুটা বড় হয়ে গেলে তারপর।
বুঝলাম। তারপর বল।
তখনকার নেকড়ে-মানুষের আসল রূপ ডাম্পির গল্প শুনতে শুনতেই আন্দাজ করেছিলাম। ভাবছিলাম, এখনকার নেকড়ে-মানুষটি কে? এমন কপাল, তার পরিচয় পাবার জন্যেও বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। সেদিনই ভোর রাতে আমাদের এই বাংলোর পেছনের দরজায় নেকড়ে-মানুষ হানা দিল।
আমি বুধোদার বলার ভঙ্গিতে হাসি চাপতে পারলাম না। বললাম, বুধোদা, আসলে তো টুইনস কে নিয়ে কুইন এসেছিলেন, একটু আগে যিনি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেলেন?
বিলকুল। বলল বুধোদা। বাচ্চাগুলোকে আজ যেমন দেখলাম, তাতে মনে হল, ওদেরও মায়ের দুধ ছেড়ে মাংস খাবার বয়স হয়ে গেছে। তাই তো অর্ণববাবু?
অর্ণববাবু বললেন, হ্যাঁ, মাস চারেকের বাচ্চা।
তাহলেই ভাব? নিজের প্লাস দুটো বাচ্চার খাবার। কুইন জোটাবে কোত্থেকে? তাই ঠ্যাঙে দড়ি-বাঁধা দেশি মুরগির গন্ধে তিনি আমাদের কিচেনে হানা দিয়েছিলেন। আর তার পাগ-মার্ক দেখে আমাদের রুবিকবাবুর একেবারে প্যান্টে...।
চুপ চুপ চুপ! আমি টেবিল ডিঙিয়ে বুধোদার ঘাড়ে গিয়ে পড়লাম।
আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আর কিছু বলছি না। বুধোদা হাত তুলে আমাকে ঠেকাল। তারপর বলল, চুপ করে শোন। আসল রহস্য এরপরেই শুরু হচ্ছে। সেটা হচ্ছে মিস্টার জোসেফ সুবিমল তির্কের মিথ্যে গুজব ছড়ানোর রহস্য।
মিস্টার জোসেফ যে রক্তের টানে এই কুকড়াঝোরায় ফিরে এসেছেন সে কথা মিথ্যে নয়। মিস্টার জোসেফ যে সেই টানেই পুরোনো গির্জা নিজের হাতে সাফ করেছেন তাও মিথ্যে নয়। এমনকী সেই টানেই যে তিনি হেনরি সুবেশ তির্কের সমাধির সামনে প্রত্যেকদিন গিয়ে দাঁড়াতেন সে কথাটাকেও মিথ্যে ভাবার কোনও কারণ নেই। ওনারই খালি পায়ের ছাপ আমরা কাল সুবেশ তির্কের কবরের সামনে দেখেছি। তিনি উদার, তিনি মহৎ। তিনি এই চা-বাগানের গরিব ছেলেমেয়েদের নিজের পয়সায় লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার ব্রত নিয়েছেন। তাহলে তিনি কেন চিতাবাঘকে নেকড়ে-মানুষ বলে প্রচার করছেন?
অর্ণববাবু বললেন, একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। কাল সুধাবিন্দুর মুখ থেকে ডরোথি টি-গার্ডেনে বাচ্চা হারানোর কথা শুনেই ওখানে লোক পাঠিয়েছিলাম। অল বোগাস। ওখানে এরকম কোনো ইনসিডেন্ট হয়নি। ওটাও মাস্টারসাবের বানানো গল্প।
বুধোদা বলল, সেরকমই আন্দাজ করেছিলাম। যাই হোক, মাস্টারসাবের মোটিভটা বুঝবার জন্যে পেছনদিক থেকে ভাবতে শুরু করলাম। তাহলে কি তিনি কোনো কারণে এই চা-বাগানের মানুষজনকে ওই চার্চের দিকে যেতে দিতে চাইছিলেন না?
কিন্তু কেন? ওখানে কি তিনি এমন কোনো সম্পদের সন্ধান পেয়েছেন যা অন্য কারুর চোখে পড়ে গেলে তার ক্ষতি হবে? যদি তাই হয়, তাহলে দুটো প্রশ্ন। কী সেই গুপ্তধন? আর সেই গুপ্তধন তিনি ওখানে ফেলে রেখেছেন কেন?
কাল দিনের বেলায় চার্চে গিয়ে এর কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না। পেলাম শুধু পুরনো চার্চের প্যারিস-রেজিস্টার। সেখানে বলা আছে হেনরি সুবেশ তির্কের মৃতদেহের সঙ্গে তার সমস্ত পার্থিব সম্পত্তি কবর দেওয়া হল। কী এমন পার্থিব সম্পত্তি থাকতে পারে একজন চা-বাগানের কুলির কাছে? বুঝতে পারছিলাম না।
কাল রাতের বেলায় কবরখানায় হানা দিয়েও কোনো লাভ হল না। নতুন কোনো তথ্য পেলাম না। শুধু চিতাবাঘিনী যে একেবারে সুবেশ তির্কের কবরের মধ্যেই বাচ্চা দিয়েছে এইটুকু সিওর হলাম। লাভের মধ্যে রুবিকের আরেকটু হলে চিতাবাঘের বাচ্চার কান্না শুনে আর সেই কান্না শুনে ছুটে আসা চিতা-মায়ের সিল্যুয়েট দেখে হার্ট-অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছিল।
বুধোদাআআ! আমি আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম। এবার সুধাবিন্দুবাবুই আমার হাত ধরে বসালেন। বললেন, রুবিক, তুমি সত্যিই খুব সাহসি ছেলে। আমি মিস্টার মজুমদারের কাছে সব শুনেছি। ওই পরিবেশে অমন দৃশ্য দেখলে তোমার বয়সি অনেক ছেলেই সত্যিকারেই অজ্ঞান হয়ে যেত।
বুধোদা বলল, সত্যিই তাই। আমিও ভয় পেয়েছিলাম। তবে সেটা লেপার্ড-অ্যাটাকের ভয়। যাই হোক, যা বলছিলাম। তারপর আজ সকালেই রুবিকের পকেট থেকে গড়িয়ে পড়ল টি-গার্ডেন টোকেন। সে গল্প তো আপনাদের কাছে ইতিমধ্যেই করেছি।
ওই টোকেনটা দেখেই মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। মনে হল, কি বোকা আমি! এতবছর ধরে অ্যান্টিক নিয়ে চর্চা করছি, আর এই সামান্য ব্যাপারটা মাথায় এল না যে, হেনরি সুবেশ তির্কের পার্থিব সম্পত্তির মধ্যে তার জমানো টি-গার্ডেন টোকেনগুলো থাকতে পারে? সেদিন যা ছিল এক চা-বাগানের কুলির সামান্য সঞ্চয়, যে সঞ্চয় নিয়ে সে পাড়ি দিতে গিয়েছিল ডুয়ার্স থেকে নিজের দেশে, সেই টোকেনগুলোই তো আজ অমূল্য অ্যান্টিক।
আমার মনে হয়, চার্চে ঘোরাঘুরি করার সময় প্যারিস রেজিস্টারটা কোনোভাবে মিস্টার জোসেফের চোখে পড়ে যায়। যে কথা আমার মাথায় আসেনি, চা-বাগানের ছেলে হওয়ার জন্যে সে কথা মিস্টার জোসেফের সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় এসেছিল। তারপর তিনি বাজারদর যাচাই করার জন্যে সুবেশ তির্কের কবরের ইঁট আলগা করে ভিতর থেকে কোনোরকমে এক-দুটো টোকেন বার করেছিলেন আর সেরকম একটা টোকেনই খেলা করতে করতে কোনোরকমে গাপ্পির হাতে পড়ে যায়। সেখান থেকে চলে আসে রুবিকের পকেটে।
কিন্তু এমনই তাঁর কপাল, ঠিক সেই সময়েই একশো-পনেরো বছর আগে যা ঘটেছিল তারই রিপিট-টেলিকাস্ট শুরু হল। মা-চিতা বাচ্চা দেওয়ার জন্যে ওই কবরটাকেই আবার বেছে নিল আর তার ফলে অন্তত চারমাসের জন্যে ওই কবরের দিকে যাওয়াই তাঁর বন্ধ হয়ে গেল।
অপেক্ষা করতে তার অসুবিধে ছিল না, যদি না ইতিমধ্যে বাগান বিক্রির তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। এর মধ্যে বাগানের লোকেদের ওদিকে আসা-যাওয়া আটকানোর জন্যে মিস্টার জোসেফ সেই নেকড়ের মিথকেই আবার অস্ত্র করলেন। তাতে কাজ হল। ডাম্পি এবং তার সহকর্মীরা ওই টিলাকে এড়িয়ে যেতে শুরু করল। কিন্তু উটকো আপদের মতন ঠিক তখনই আমি আর রুবিক এসে পৌঁছলাম।
কাল সকালে আমরা চার্চ থেকে ফিরে আসার পরে কোনও এক সময়ে মিস্টার জোসেফ নিশ্চয় আবার ওখানে ফিরে গিয়েছিলেন। দেখেছিলেন, প্যারিস রেজিস্টার হাওয়া এবং সঙ্গে-সঙ্গেই বুঝতে পেরেছিলেন আর সময় নেই। মরিয়া হয়ে মিস্টার জোসেফ আজ সকালে আক্ষরিক অর্থে বাঘের গুহায় পা দিলেন।
উনি যদি আর একটা দিন সময় পেতেন তাহলে একেবারে বিনা বাধায় ওগুলো হস্তগত করতে পারতেন। কারণ, একটু আগে আমরা নিজেদের চোখেই দেখলাম বনের পশু বনে ফিরে গেল। বাচ্চারা বড় হয়ে গেছে, মা-চিতার আর এখানে থাকবার দরকার নেই। তবে একেই বোধহয় বলে ভাগ্য। সেই সময়টা মিস্টার জোসেফ পেলেন না।
আমাদের মাঝখানে টেবিলের ওপর একটা রুমালের মধ্যে রাখা ছিল প্রায় পঞ্চাশটা বিভিন্ন ডিনোমিনেশনের টি-গার্ডেন টোকেন। সুবেশ তির্কের সঞ্চয়। আমাদের সবার চোখ ঘুরে গেল ছোট ছোট মেটালের চাকতি দিয়ে তৈরি ওই স্তূপটার দিকে। অনেকক্ষণ কেউই কোনো কথা বলতে পারলাম না। তারপর বুধোদাই সবার আগে নিস্তব্ধতা ভেঙে বলল, মিস্টার বসাক, একটা রিকোয়েস্ট আছে।
বলুন মিস্টার মজুমদার।
আপনার টি-গার্ডেনের ভেতর থেকে এই টোকেনগুলো পাওয়া গেছে। এখনকার বাজারে এর দাম খুব কম করে হলেও পনেরো লক্ষ টাকা। এই টাকাটা আপনার মতন একজন ব্যবসায়ীর পক্ষে কিছুই নয়, কিন্তু মিস্টার জোসেফের কাছে অনেক। আমার অনুরোধ এগুলো বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে তা আপনি মিস্টার জোসেফের হাতেই তুলে দিন।
সুধাবিন্দুবাবু অবাক চোখে বুধোদার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বুধোদা আবার যখন কথা বলল তখন দেখলাম ওর গলাটা একটু ভারী শোনাচ্ছে। বুধোদা বলে চলল—মিস্টার জোসেফ জান বাজি রেখে এগুলোকে উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন, নিজের জন্যে নয়। এই বাগানের ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েগুলোর জন্যে। গত কুড়ি বছরে উনি নিজের সমস্ত সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছিলেন ওদের পড়াশোনা শেখানোর কাজে। আর কোথাও থেকে পয়সা জোগাড় করতে না পেরেই উনি এই মৃতের সঞ্চয়ে হাত দিয়েছিলেন। হয়তো ধর্ম কিম্বা সমাজের চোখে এটা খুবই ঘৃণিত কাজ, কিন্তু মানবিকতার দিক থেকে যদি দেখি?
অর্ণববাবু বললেন, একটু ইন্টারফেয়ার করছি। সুধা, তুমি আর একটা ব্যাপার ভেবে দ্যাখ। একজন গরিব কুলির জমানো টাকা একশো-পনেরো বছর বাদে সেই চা-বাগানেরই লেবারদের ছেলেমেয়ের পড়াশোনার কাজে লাগবে, তাও আবার তার নিজেরই বংশধরের হাত দিয়ে—এর চেয়ে জাস্টিফায়েড আর কী হতে পারে? আমার মনে হয় সুবেশ তির্কের আত্মা যদি কোথাও থেকে থাকে, সে-ও এটাই চাইবে।
সুধাবিন্দুবাবু বললেন, এগ্রিড। তোমাদের কথা মেনে নিলাম। শুধু সুবেশ তির্কের আত্মা কেন, দীনদরিদ্রের প্রভূ যীশাস ক্রাইস্টও নিশ্চয় এতে খুশি হবেন।
ডাম্পিভাই জানলার কাছ থেকে এগিয়ে এসে বুকে ক্রশ এঁকে বলল 'আমেন'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন