নিকষছায়া

সৌভিক চক্রবর্তী

পূর্বকথা


গত চার বছরে এক দিনও হিন্দু হস্টেলে লোডশেডিং হয়নি। কিন্তু আজ সেই যে দুপুর আড়াইটে নাগাদ কারেন্ট গেছে, এখন রাত বারোটা দশ, আসেনি। পল্লবরা চার জন ছাদে বসেছিল। চার জন বলতে, পল্লব, অমিয়, সুপ্রতিম আর সঞ্জয়। আকাশে একফালি চাঁদ। একফালি চাঁদ খারাপ জিনিস, আলো তো হয়ই না, উল্টে অন্ধকার ঘনিয়ে তোলে। সেই আলো আঁধারিতে টানা ছাদের মাঝে মাঝে জলের ট্যাঙ্কগুলোকে কেমন যেন ভূতুড়ে লাগছে। রাস্তার পাশেই একটা বিরাট ছাতিম গাছ। দু'টো ডাল ছাদের ওপরে নুয়ে পড়েছে প্রায়। থেকে থেকেই উত্তুরে হাওয়ায় পাতাগুলো কেঁপে উঠছে। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে অমিয় বলল, 'এই ওয়েদারে ভূতের গল্প না হলে জমে না। তোরা কেউ ভূত দেখেছিস কখনও?'

সুপ্রতিম বলল, 'ভূত কেউ দেখে না। যারা বলে দেখেছে তারা গাঁজাখুরি গল্প দেয়।'

'তুই এ ভাবে বলতে পারিস না। পৃথিবীর বহু জ্ঞানীগুণী মানুষ ভূত ব্যাপারটাকে মান্যতা দিয়েছেন।'

'ছাড় তো। কেউ কোনও প্রমাণ দিতে পেরেছে?'

'সব কিছুর ও রকম প্রমাণ হয় না কি?'

'প্রমাণ ছাড়া কোনও কিছুর অস্তিত্ব বিজ্ঞান স্বীকার করে না।'

এই ভাবে অমিয় আর সুপ্রতিমের তর্ক যখন প্রায় জমে উঠেছে, হঠাৎই সঞ্জয় চাপা গলায় ধমকে উঠল, 'তোরা চুপ করবি?'

সঞ্জয়ের বলার মধ্যে কী যেন একটা ছিল। ওরা চুপ করে গেল। সঞ্জয় বলল, 'ভূত আছে কি নেই আমি জানি না। তবে কিছু একটা আছেই। আমি তাদের দেখেছি। দেখেছি বলা ভুল, এখনও মাঝে মাঝে দেখি। আর সে ভাবে বলতে গেলে আমি এক বছর তাদের সঙ্গে কাটিয়েছি।'

সঞ্জয় অদ্ভুত ছেলে। পল্লবরা শুনেছে, অনেক ছোটবেলায় ওর মা বাবা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। তার পরে ও বড় হয়েছে একটা অনাথ আশ্রমে। সেখান থেকে শুধু নিজের চেষ্টায় আজ ও ফিজিক্সে ফার্স ক্লাস ফার্স। তাই ওর প্রতি সবারই একটা সমীহ আছে। তা ছাড়া আজ পর্যন্ত সঞ্জয়কে কেউ কখনও অবান্তর কথা বলতে শোনেনি।

ওদের চুপ করে থাকতে দেখে সঞ্জয় বলল, 'আমি কিন্তু মিথ্যে কথা বলছি না। তোরা শুনতে চাস ব্যাপারটা?'

বেশ শীত করছে। ওরা গা ঘেঁষে বসল। হিন্দু হস্টেলের খোলা ছাদে বসে একফালি চাঁদের আলোয় সঞ্জয় তার সেই 'কিছু একটা'র গল্প শুরু করল

''লোকটাকে প্রথম বার দেখেছিলাম, তখন আমার দশ বছর বয়স। আমাদের গাড়িটা খাদে পড়ে গেছিল। মা, বাবা আর গাড়ির ড্রাইভার তিন জনেই স্পট ডেড। আশ্চর্যজনক ভাবে আমি অক্ষত ছিলাম। শুধু কপালের বাঁ দিকটা কেটে গেছিল। রক্ত গড়াচ্ছিল। মায়ের দেহটা আটকে ছিল একটা গাছ আর একটা পাথরের মাঝখানে। তখনও তো আমি জানি না, মা বাবা কেউই আর বেঁচে নেই। আমি হামাগুড়ি দিয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছি, তখনই দেখলাম, মা যে পাথরটার মাঝে আটকে পড়েছে তার ওপরে বসে লোকটা পা দোলাচ্ছে। খালি গা, ধুতির মতো কিছু একটা কোমরে জড়ানো। লোকটা বিচ্ছিরি মোটা, এত বড় ভুঁড়ি। গায়ে বনমানুষের মতো লোম। মাথায় কিন্তু একটাও চুল নেই। চকচকে টাক। এই পর্যন্ত তাও ঠিক ছিল, কিন্তু লোকটা আমার দিকে তাকাতেই আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম। লোকটার নাক আর কান বলতে কিছু নেই। এমনকী কান আর নাকের জায়গায় কোনও ফুটো অবধি নেই। চোখ আছে কিন্তু সে দু'টো এতই ছোট যে না থাকার সামিল।

অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। দেখলাম সে পুরো ফোকলা। একটাও দাঁত নেই। তার পরে অবিকল মেয়েদের মতো গলায় সে আমাকে বলল, 'রাগ করো না খোকা। আমি হুকুমের চাকর।'

আমি বললাম, 'কার হুকুম?'

উত্তর না দিয়ে সে খিলখিল করে হেসে উঠল আর একটা তীব্র পচা গন্ধে আমার সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে গেল। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

লোকটার সঙ্গে ফের আমার দেখা হল, মাস দেড়েক পরে। আমি তখন আমার কাকার কাছে আছি। সে দিন রবিবার। স্কুল ছুটি। আমি আর কাকার মেয়ে জিনিয়া দোতলার ঘরে বসে খেলছি, হঠাৎ শুনলাম, নীচে কাকা খুব চেঁচামেচি করছে। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখি, উঠোনে একটা লোক হাঁটু মুড়ে বসে আছে আর কাকা হাত উঁচিয়ে বলছে, 'বেরিয়ে যাও। এখনই বেরিয়ে যাও।'

লোকটার মাথায় উস্কোখুস্কো চুল। গায়ে একটা রংচটা ফতুয়া, হাঁটু পর্যন্ত ধুতি। কাঁধে একটা গামছা। খালি পা, পা ভর্তি ধুলো। কাকার রুদ্রমূর্তি দেখে সে উঠে দাঁড়াল তার পরে কাঁধের গামছাটা দিয়ে মুখ মুছে বলল, 'চন্দন, টাকার গরমে ফুটছ তাই না? নিতে যখন এসেছি ভাগ্নাকে নিয়েই ফিরব।'

কাকা বলল, 'শোনো, তোমার মতো ইতরের সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই না। তুমি যদি না যাও তা হলে পাড়ার ছেলেদের ডেকে আমি তোমাকে মার খাওয়াবো।'

এ কথা শুনে লোকটা বিশ্রি ভাবে হেসে উঠল। তার পরে উঠোনে পা ঠুকে ঠুকে বলল, 'এই ভাবে গোঁড়াল দিয়ে তোমার গুমোর ভাঙব। তুমি এখনও লোকনাথ চক্কোত্তিকে চেনোনি। গোঁড়াল কাকে বলে জানো? পায়ের গোড়ালি দিয়ে যে লাথি মারা হয় তাকে বলে গোঁড়াল। আজ আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু ঠিক দু'হপ্তা পরে আসব। সে দিন মামা-ভাগ্না নাচতে নাচতে ঘরে যাবে।'

লোকটা হনহন করে হাঁটা দিল। গেট পেরনোর আগে একদলা থুতু ফেলে গেল উঠোনে। তখনই পচা গন্ধে আমার গা গুলিয়ে উঠল। পেছন ফিরে দেখলাম, খাটের ওপরে বসে পা দোলাচ্ছে সেই বেঁটে কুৎসিত লোকটা। মেয়েদের মতো রিনরিনে গলায় সে আমাকে বলল, 'মামার সঙ্গে যাইলা না কেন খোকা? মামায় তোমারে কত্তো ভাল পায়।'

আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। বললাম, 'কে তুমি?'

'আমার নাম গেনু। তোমার মামায় আমার মালিক। মামারে প্রণাম করলা না খোকা? মামায় কত্তো ব্যথা পাইল। দু'হপ্তা পরে মামায় তোমারে নিয়া যাইব।'''

একটা রাতচরা পাখি ডাকতে ডাকতে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙা ভবনের ভেতরে ঢুকে গেল। জোর চমকে উঠল সবাই। সঞ্জয় বলল, ''জল আছে?''

পল্লব জলের বোতলটা বাড়িয়ে দিল। জল খেয়ে সঞ্জয় বলল, ''আমার কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। আজ বরং থাক। পরে কখনও গল্পটা বলব তোদের।''

অমিয় বলল, ''না না। প্লিজ শেষ কর। দারুণ জমে উঠেছে।''

পল্লব আর সুপ্রতিমও সায় দিল অমিয়র কথায়। সঞ্জয় ফের বলতে শুরু করল

''আমার যে একটা মামা আছে তা আমি জানতাম না। রাতে খেতে বসে কাকার কাছে শুনলাম, আমার মায়েরা দু'ভাই-বোন। মামা বড়, মা ছোট। কিন্তু অল্প বয়সেই মামা খারাপ ছেলেদের পাল্লায় পড়ে বখে যায়। নেশাভাঙ করতে শুরু করে। তার ওপরে শুরু করে তন্ত্র সাধনা। এক দিন পাশের বাড়ি থেকে একটা দু'বছরের বাচ্চা চুরি করে মামা শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছিল বলি দিতে। পাড়ার লোকেরা তাকে ধরে ফেলে এবং বেধড়ক পেটায়। দাদুও মামাকে ত্যজ্যপুত্র করেন। এই ঘটনার পর থেকেই মামা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। এর মধ্যে মায়ের বিয়ে হয়েছে। দাদু-দিদা মারা গেছেন। আমিও অনেকটা বড় হয়ে গেছি। দীর্ঘ পনেরো-কুড়ি বছর মামার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমাদের অ্যাক্সিডেন্টের মাস খানেক আগে মামা না কি এক দিন হঠাৎ এসে হাজির হয়েছিল বাবার অফিসে। বাবা সে দিন তাকে তাড়িয়ে দেয়। তবে তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল বাবা কাউকে বলেনি। কাকা মাথা নেড়ে কাকিমাকে বলেছিল, 'সঞ্জুর মামাটা একটা জিনিস। ভাবছি পুলিসে একটা খবর দিয়ে রাখব।'

দিন তিনেক পরেই বাথরুমে পিছলে পড়ে কাকিমার পা ভাঙল। সবাই মিলে যখন ধরাধরি করে কাকিমাকে অ্যাম্বুল্যান্সে তুলছে, আমি দেখলাম, অ্যাম্বুল্যান্সের ছাদে বসে পা দোলাচ্ছে গেনু। আমাকে দেখে ফোকলা মুখে হেসে বলল, 'মালাইচাক্কিটা ঘুরায়ে দিছি। ও আর জীবনে সোজা হইয়া খাড়াইতে পারব না। মামায় আসব তোমারে নিতে। মামার লগে যাইবা কিন্তু খোকা।'

আমি ছুট্টে ঘরে ঢুকে গেলাম। বালিশে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি, জিনিয়া এসে বলল, 'কাঁদিস না দাদাভাই। মা ঠিক হয়ে যাবে।'

আমি জিনিয়াকে বলতে পারলাম না যে আমি কাকিমার জন্যে কাঁদছি না। আমি কাঁদছি ভয়ে। খুব ভয় পেলেও মানুষ কাঁদে।

ঠিক চোদ্দ দিনের মাথায় মামা এল। কাকার বাড়িতে তখন হুলুস্থূল কাণ্ড। জিনিয়ার একশো পাঁচ জ্বর। সে কাশছে। কাশির সঙ্গে উঠে আসছে কাঁচা রক্ত। এমন সময়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে মামা হাঁক দিল, 'চন্দন, ভাগ্নারে এ বারে ছাড়। অনেকটা পথ যেতে হবে তো না কি।'

ততক্ষণে আমি বুঝতে পেরে গেছি, আমাকে যেতেই হবে মামার সঙ্গে। এই লোকটার বিরাট ক্ষমতা। তবুও বোকার মতো ছুটে গেলাম দোতলায়। মনে হল, যদি খাটের নীচে লুকিয়ে থাকি তা হলে হয়তো মামা আমাকে খুঁজে পাবে না। কিন্তু খাটের তলায় ঢুকতে যাব, দেখি বসে আছে গেনু। সে বলল, 'খোকা আস। লুকাছুপি খেলি।'

পছন্দের দু'-একটা জিনিস স্কুলব্যাগে ভরে নীচে নেমে এলাম। বললাম, 'মামা চলুন।'

আমাকে দেখের মামার চোখমুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সে চেঁচিয়ে বলল, 'কই গেলে চন্দন? দেখে যাও, ভাগ্না নিজেই আসছে মামার কাছে। আটকাতে পারলা না তো?'

জিনিয়াকে কোলে নিয়ে কাকা বেরিয়ে এল। কাকার চোখে জল। মামা বলল, 'চিন্তা কোর না। তোমার মেয়ে ভাল হয়ে যাবে। ভাগ্নাকে পেয়ে গেছি, আর আমার কিছু চাই না।'

আমার হাত ধরে মামা রওনা দিল।''

ফস করে একটা দেশলাই জ্বলে উঠল। সুপ্রতিম সিগারেট ধরিয়েছে। অমিয় চাপা গলায় বলল, ''ও রকম হঠাৎ করে দেশলাই জ্বালালি কেন? একটু বলেকয়ে জ্বালাবি তো, জোর চমকে উঠেছিলাম।''

সুপ্রতিম বলল, ''কেন, গল্প শুনে তুই ভয় পাচ্ছিস না কি?''

অমিয় পাল্টা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। পল্লব থামিয়ে দিল। সঞ্জয়কে বলল, ''তার পরে কী হল? তুই মামার সঙ্গে গেলি?''

''হ্যাঁ। গেলাম।''

''কোথায় নিয়ে গেল তোকে?''

''কোথায় আবার? মামা যেখানে থাকত সেখানে।''

''কোন জায়গা সেটা?''

''ট্রেনে করে বর্ধমান স্টেশনে নামলাম। তার পরে মাঠ-ঘাট, বন-বাদাড় পেরিয়ে দেড় দিন শুধু হেঁটেছি। রাতেও থামতে দেয়নি মামা। আমার পা ব্যথা করলে কাঁধে তুলে নিয়েছে। পথে খেয়েছি শুধু মুড়ি আর জল। এই ভাবে দেড় দিন পরে সন্ধেবেলা একটা খালের ধারে আমরা থামলাম। মামা বলল, 'ভাগ্না, এসে গেছি। ওই যে খালের পারে আলো দেখছ, ওই হল শ্মশান। কীসের আলো বলো তো? তুমি তো শহরে থাকতে, তুমি জানবা না। ও হল গিয়ে চিতা? চিতা বুঝলা তো? মড়া পোড়ায় যাতে। ওই শ্মশানে আমার ঘর। আমি আর তোমার মামি থাকি। এ বার থেকে তুমিও থাকবা। কোনও অসুবিধা হলে আমারে বলবা। এ বারে চলো, সাঁকো পেরতে হবে।'

সাঁকোর সামনে এসে আমি থমকে গেলাম। একটা মাত্র বাঁশ পাতা আর পাশে ধরার জন্যে আড়াআড়ি আর একটা বাঁশ। তার ওপর দিয়েই মামা তরতর করে ও পারে চলে গেল। আমি পার হতে পারছি না দেখে অবাক হয়ে বলল, 'ভয় লাগছে না কি ভাগ্না? আমি এই বুড়ো বয়সে চলে এলাম আর তুমি পারলা না? যাকগে তুমি দাঁড়াও। আমি গেনুরে পাঠাচ্ছি।'

আমি বললাম, 'না না। গেনুকে পাঠাবেন না। আমি পারব। আমি যাচ্ছি।'

চিতার আগুনের আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে মামা খলখল করে হেসে উঠল, 'গেনুরে ভয় পাও কেন? ভয় পাবা না। আমি গেনুরে পুষি। সে তোমার কোনও ক্ষতি করবে না। যাই হোক চলে আস। তোমার মামি অপেক্ষা করছে।'

কোনও মতে প্রাণ হাতে করে আমি সাঁকো পার হলাম। মামা আমার হাত ধরে হাঁটা লাগাল। হাঁটতে হাঁটতে বলল, 'আমি কী কাজ করি তুমি জান?'

'না মামা জানি না।'

'এইটা তো তোমারে জানতে হবে। লোকে যখন জিজ্ঞেস করবে, মামায় কী করে, তখন তো হাবলার মতো দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। তুমি যদি বলতে না পার, লোকে বলবে বাপ-মায় কোনও শিক্ষা দেয়নি। তুমি কি চাও লোকে তোমারে ভোদা বাচ্চা বলুক?'

'না মামা।'

'তা হলে শোনো, আমি হলাম ডোম। ডোম কারে বলে জান?'

'হ্যাঁ, যারা মড়া পোড়ায়।'

'ঠিক বলেছ। ভেরি গুড। ভেরি গুড। তবে ডোমগিরি আমার পেশা। নেশায় আমি তান্ত্রিক। তন্ত্র সাধনা করি। কিছু কিছু শক্তি লাভ করেছি। সময় মতো তোমারে বলব। একটা কথা জেনে রাখো, ডোমগিরি কিন্তু কোনও মহৎ পেশা না। তবে এইটায় তুমি লজ্জা পাবা না। বাপ-মায়ের পেশায় সন্তানের লজ্জা পাওয়া উচিৎ না। বুঝলা?'

'হ্যাঁ মামা।'

কথা বলতে বলতেই আমরা একটা ঝুপড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। মামা উঁচু গলায় ডাক দিল, 'রমা, রমা। বাইরে আস। ভাগ্নারে নিয়ে আসছি। ছেলেটা জোর ক্লান্ত। ওরে জল দাও, খাবার দাও।'

ঝুপড়ির বাইরে একটা তুলসীমঞ্চ। সেখানে একটা প্রদীপ জ্বলছে। তা ছাড়া আর কোথাও কোনও আলো নেই। ঝুপড়ির ভেতরটাও নিকষ অন্ধকার। এমন থকথকে, চটচটে, গাঢ় অন্ধকার আমি জীবনে দেখিনি। আমার মনে হচ্ছিল, গায়ে লাগলে এই অন্ধকার বুঝি আর কখনও উঠবে না। আমি আলোর কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালাম। তখনই ঝুপড়ির ভেতরে একটা মৃদু আলো জ্বলে উঠল। একটা ভাঙা লন্ঠন হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলেন এক কৃশকায়, দীর্ঘাঙ্গী মহিলা। তাঁর মাথায় ঘোমটা। এত রোগা মানুষ আমি আজ অবধি দেখিনি। তিনি লন্ঠনটা মাটিতে নামিয়ে দাঁড়ালেন। মামা বলল, 'তোমার মামি। যাও প্রণাম কর। বড়দের প্রণাম করতে হয়। তুমি আমারেও প্রণাম করনি। আগে আমারে কর, পরে মামিরে।'

আমি মামার পা ছুঁলাম। তার পরে মামির পায়ে হাত দিতে যাব, 'তিনি আমাকে দু'হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে বললেন, ষাট ষাট। বড় হও বাপ। রাজা হও।'

সেই কালিপড়া লন্ঠনের আবছা আলোতে আমি শিউরে উঠে দেখলাম, মামির মুখে বেশির ভাগ দাঁতই নেই। এ দিক ও দিক কয়েকটা দাঁত এলোমেলো ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা যেন সেই মুখগহ্বরের শূন্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে শতগুণে।''

''রাতে আমি আর মামা পাশাপাশি খেতে বসলাম। সামনেই হাতপাখা হাতে মামি। আয়োজন সামান্য। ভাত, ডাল, কুচো মাছ ভাজা আর ডুমুরের ঝোল। এই খাবার আমার গলা দিয়ে নামছিল না, তবু মুখ বুজে খেতে লাগলাম। শহরের আলো ছেড়ে এই অন্ধকার শ্মশানের মধ্যে বসে আমার কান্না পাচ্ছিল। কিন্তু আমি কাঁদিনি। শেষ দু'দিনে বুঝে গেছিলাম, যদিও এখনও এই মামা লোকটা আমার সঙ্গে কোনও খারাপ ব্যবহার করেনি কিন্তু এ যা বলবে মুখ বুজে শুনতে হবে। নয়তো কপালে দুঃখ আছে। তবে এত হাঙ্গামা করে লোকটা আমাকে এই বিরান জায়গায় কেন নিয়ে এল সেটা আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

খাওয়াদাওয়া মিটতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। মামিকে একটা ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে দিল মামা। আমার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে মামা বলল, 'ভাগ্না আস। এই দাওয়ায় বসি। তোমারে কটা কথা বলে রাখি এই বেলা।'

আমি আর মামা পাশাপাশি বসলাম। সামনে টিমটিম করে লন্ঠন জ্বলছে। মৃদু একটা হাওয়া দিচ্ছে। গাছের পাতায় কেমন যেন সরসর শব্দ উঠছে। মাঝে মাঝেই হাওয়া বাড়ছে আর চিমসে একটা গন্ধ ধাক্কা মারছে নাকে। বুঝলাম, গন্ধটা আসছে শ্মশান থেকে। মাংস আর চামড়া পোড়া গন্ধ। মামা শক্ত করে আমার হাতটা ধরে বলল, 'তোমার মামিরে তালাবন্ধ করলাম দেখে অবাক হয়েছ তাই না?'

'হ্যাঁ মামা।'

'তোমার মামির আসলে মাথার ঠিক নাই। রাতের বেলা উটকো চিল্লামিল্লি করে। গেনুরে দেখে ভয় পায়। অনেক বার বুঝিয়েছি, গেনুরে ভয় পাওয়ার কিছু নাই। আমার হুকুম ছাড়া সে নড়ে না। তবু কথা শোনে না। তাই রাত হলে তোমার মামিরে বন্ধ রাখি। সকালে খুলে দি। দিনের বেলা ঠিক থাকে। ঘরের কাজকর্ম করে, কিন্তু রাত হলেই গণ্ডগোল। রাতে যদি তোমার মামি চেঁচায় ভয় পাবা না। আমি যদি না থাকি, দরজার পাশে একটা লম্বা লাঠি রাখা আছে। জানলা দিয়ে লাঠিটা ঢুকায়ে দু'টো বাড়ি দেবা, ঠান্ডা মেরে যাবে। বুঝলা?'

আমি অবাক হয়ে শুনছি। বলে কী লোকটা? লাঠি ঢুকিয়ে মামিকে মারব! এমন আবার হয় না কি? আমাকে চুপ থাকতে দেখে মামা বলল, 'তোমার এখানে কোনও ভয় নাই। নিজের মতো থাকবা। খাবা-দাবা, ঘুরবা, খালে নাইবা, খেলাধুলো করবা ব্যস। এক বছর পরে তোমার ছুটি। পালানোর কথা ভুলেও ভাবনা না কেমন? শ্মশানের বাইরে গেলেই গেনু তোমারে ধরবে। গেনু রেগে গেলে কী করে জান?'

'কী করে?'

'চুষে চুষে মাংস খায়। তখন খুব ব্যথা লাগে। গেনুরে পোষ মানানোর আগে সে আমার দু'টো আঙ্গুল খেয়ে ফেলেছিল। এই দ্যাখো।'

দেখলাম, মামার বাঁ হাতের অনামিকা আর কড়ে আঙুলটা কাপড় জড়ানো। এটা আমি আগে খেয়াল করিনি। মামা কাপড় সরিয়ে দেখাল। ও দু'টোকে আঙুল বলে মনেই হয় না, মনে হয় যেন দু'টো শুকনো কাঠি হাতের সঙ্গে লেগে আছে। আমি আর থাকতে পারলাম না। ভয়ে কেঁদে ফেললাম। কাঁদতে কাঁদতেই বললাম, 'আমাকে কেন নিয়ে এলেন? আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিন মামা।'

আঙুলে কাপড় জড়িয়ে মামা বলল, 'কাঁদবা না। একদম কাঁদবা না। কান্নাকাটি মেয়েমানুষের কাজ। তুমি কি মেয়ে? যদি মেয়ে হও তা হলে ওই গামছা নিয়ে ঘোমটা দাও মামির মতো। কান্না বন্ধ।'

হঠাৎ ভয় কেটে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। আমি আচমকাই মামার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ঘাড়ের কাছটা কামড়ে ধরলাম। কিন্তু আমি কি আর মামার সঙ্গে পারি? এক ঝটকায় মাটিতে ফেলে মামা আমার বুকের ওপরে পা দিয়ে দাঁড়াল। হিসহিস করে বলল, 'ভাগ্না অসভ্যতা করবা না। অসভ্যতা করলে দাঁত ফেলে দেব। তোমার মামিরে দেখলা তো? দাঁত নাই। সে যখন এমন ছিটপিটায় আমি নোড়া দিয়ে তার দাঁত ভেঙ্গে দিই। তুমি কি কম বয়সে মামির মতো ফোকলা হতে চাও? যদি না চাও চুপচাপ শুয়ে পড় ঘরে ঢুকে।'

আমায় ফেলে মামা ঘরে ঢুকে গেল। আমি উঠোনেই পড়ে রইলাম সারারাত। অসহ্য মাথা যন্ত্রণায় ঘুম ভাঙল, দেখলাম, আমি বিছানার ওপরে শুয়ে। মাথার কাছেই বসে আছে মামি। আমি ধড়মড় করে উঠে বসতে গেলাম। মামি আমাকে ধরে শুইয়ে দিলেন। আমার কপালে হাত রেখে বললেন, 'উঠো না। তোমার জ্বর। আমি ওষুধ দিয়েছি। সেরে যাবে। আর একটা কথা, ভয় পেয়ো না। আমি আছি।'

সেই নির্বান্ধব শ্মশানে, গত দু'দিনের অস্বাভাবিক ঘটনাপ্রবাহের পরে মামির কথাগুলো আমায় যেন হঠাৎই অনেকটা আশ্রয় দিল। মনে হল, বেঁচে থাকার জন্যে মামিই আমার শেষ ভরসা। আমি শক্ত করে মামির হাতটা চেপে ধরলাম। আমার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফেঁটা জল। রোগা হাতে সেই জল মুছিয়ে মামি বললেন, 'তোমাকে এখান থেকে বার করার দায়িত্ব আমার। তবে ধৈর্য ধরতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। তুমি যত ভয় পাবে, তত হেরে যাবে।'''

এই পর্যন্ত বলে সঞ্জয় থামল। এক ঢেঁক জল খেয়ে বলল, 'কটা বাজে?'

পল্লব বলল, 'দেড়টা।'

সঞ্জয় বলল, 'কারেন্ট কি আজ আর আসবে না?'

'কে জানে! আচ্ছা তার পরে কী হল বল?'

''আর কী, তার পরে এক বছর ধরে আমি প্রতিদিন পালানোর সুযোগ খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু যত বারই শ্মশানের বাইরে এসে দাঁড়াই, একটা তীব্র পচা গন্ধ গা গুলিয়ে ওঠে। বুঝতে পারি, আমি গেনুর নজরবন্দি। চুপচাপ ফিরে যাই ঘরে। মামা সারাদিন কী করে কে জানে, বাড়িতে থাকে না। অনেক রাতে ফেরে। মামার সঙ্গে আমার দেখা হয় না বললেই চলে। আমিও চাই না মামার সঙ্গে আমার দেখা হোক। তাই মামা আসার আগেই আমি ঘুমিয়ে পড়ি। তত দিনে মাস চারেক কেটে গেছে, ওখানেই আছি। এক দিন কিছুতেই ঘুম আসছে না। এ পাশ ও পাশ করছি। গলার আওয়াজে বুঝলাম মামা ফিরে এসেছে।

মামা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে আমাকে টান মেরে বিছানা থেকে তুলে দিল। আমি চমকে উঠে বললাম, 'কী হল মামা?'

আমার হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে এসে ভাঙা লন্ঠনটা তুলে মামা আমাকে দেখতে লাগল। তার পরে মামির দিকে তাকিয়ে বলল, 'এ রোগা হয়ে যাচ্ছে কেন রমা? তুমি এরে ঠিক মতো খেতে দাও না?'

মামি বলল, 'খেতে দেব না কেন? কিন্তু রোজ রোজ শাক ভাত খেতে পারে ও? কোনও দিন খেয়েছে এ সব?'

'কোনও দিন খায়নি বলে এখন খেতে পারবে না, এ কেমন কথা? অবস্থা বুঝে চলতে হয়। আর খেতে না চাইলে জোর করে গলায় পা দিয়ে খাওয়াবা। রোগা হলে তো আমার চলবে না।'

'কী বলো তুমি? গলায় পা দিয়ে খাওয়াবো?'

'হ্যাঁ তাই খাওয়াবা।'

মামি চাপা গলায় বলল, 'শোনো ও সব পিচাশগিরি তুমি নিজে করো। আমাকে এর মধ্যে খবরদার টানবে না বলে দিলাম। আমি পারব না।'

'পারবা না? ঠিক তো?'

'না বললাম তো।'

মামা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, 'যাও ভাগ্না ঘরে যাও।'

আমি ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকে এলাম। ফুঁ দিয়ে বাইরের লন্ঠনটা নিভিয়ে দিল মামা। বিছানায় শুয়ে কুঁকড়ে শুনলাম, মামি চাপা গলায় কাঁদছে। টানা একঘেয়ে সেই কান্না শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরের দিন সকালে দেখলাম, মামির আরও একটা দাঁত কমে গেছে। আরও বেড়েছে মুখগহ্বরের শূন্যতা।''

সবাই একসঙ্গে শিউরে উঠল। অমিয় বলল, 'তোর মামাটা কি জানোয়ার?'

সঞ্জয় বলল, 'হ্যাঁ। জানোয়ার বললেও কম বলা হয়।'

পল্লব বলল, 'আচ্ছা, এত কাণ্ড করে তোকে আটকে রাখার কারণ কী ছিল?'

''মামা আমাকে বলি দিতে চেয়েছিল। তোদের মনে আছে, মামা বলেছিল, এক বছর পরে আমার ছুটি? আসলে সিদ্ধিলাভের জন্যে মামার একটা এগারো বছরের সুলক্ষণযুক্ত বাচ্চা দরকার ছিল। তাকে বলি দিতে পারলেই না কি অসীম ক্ষমতা করায়ত্ত হতো মামার। গেনুর থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী কিছুরা তার পোষ মানত। এর আগে মামা পাঁচ আর সাত বছরের দু'টো বাচ্চাকে বলি দিয়েছিল। সেই হতভাগ্য দু'জন আমার দুই মামাতো ভাই বোন।''

অমিয় শক্ত করে পল্লবের হাত চেপে ধরে বলল, 'চুপ কর সঞ্জয়। আর শুনতে ভাল লাগছে না।'

সঞ্জয় বলল, 'ভাল লাগার কথাও নয়। চল নীচে যাই।'

পল্লব বলল, 'যাচ্ছি, এক মিনিট। তুই কী ভাবে পালিয়ে বাঁচলি শুধু সেটুকু বল। খুব কৌতূহল হচ্ছে।'

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সঞ্জয়, ''আমার জন্মদিন ১২ মে। সে দিন আমি দশ পূর্ণ করে এগারোয় পা দেব। ১১ তারিখ ভোরবেলায় মামা আমাকে তুলে কনকনে ঠান্ডা জলে স্নান করাল। তার পরে হাতে কী সব লাল সুতো বেঁধে সাদা একটা ধুতি পরিয়ে দিয়ে বলল, 'ভাগ্না, মধ্যরাতে পুজোয় বসব। তুমি থাকবা আমার সঙ্গে। তার পরে তোমার ছুটি। আর আটকে রাখব না। মামার ওপরে রাগ করেছ না ভাগ্না? রাগ করবা না। মামার আদর হল দুই মায়ের আদরের সমান। দেখ না, মামা বলতে দুই বার মা বলতে হয়। শোনো এই স্নান করায়ে দিলাম, সোনা ছেলে হয়ে বসে থাকবা সারাদিন। ধুলোবালি ঘাঁটবা না। আমি রাতে তোমারে নিতে আসব। গেনু রইল, তোমার খেয়াল রাখবে।'

সে দিন সকালবেলাতেই মামিকে তালা দিয়ে মামা বেরিয়ে গেল। আমি ধুতি পরে বসে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে দেখলাম, খাটের তলা থেকে গেনু উঁকি মেরে ফোকলা মুখে হাসছে।

বসে আছি তো আছিই। সূর্য মাথার ওপরে উঠে পড়ল। একটু বোধ হয় ঝিমুনি লেগেছে, কে যেন আমায় ঠেলা দিল। দেখি মামি দাঁড়িয়ে। আমি বললাম, 'তুমি কী ভাবে বাইরে এলে মামি?'

মামি বললেন, 'কথা বলার সময় নেই। পা চালাও।'

'কোথায় যাব মামি?'

'চলো না। গেলেই বুঝবে। এখানে বসে থাকলে তোমায় বাঁচাতে পারব না। তোমার মামা তোমায় বলি দেবে আজ রাতে।'

'বলি!'

'হ্যাঁ, যেতে যেতে সব বলব। চলো।'

আমি আর মামি সবে ঘর থেকে বেরিয়েছি, গেনু সামনে এসে দাঁড়াল। মামিকে বলল, 'এইটা ঠিক করলেন না মা। কত্তায় কুপিত হইবেন।'

মামি বলল, 'যা না, তোর কত্তাকে গিয়ে নালিশ কর। দেখি তোদের ক্ষমতা।'

আমার হাত ধরে মামি দ্রুত এগিয়ে চললেন। গেনু পেছন পেছন আসতে লাগল। সে একটাই কথা বলছিল, 'কত্তা এখন আসনে বসা, আমি খবর দিতে পারছি না। খুব ক্ষতি হবে মা। খোকা তুমি নেমকহারমি করলা কেন? মামায় তোমারে কত্তো ভাল পায়। সে কত্তো ব্যথা পাইবে বলো?'

মামির হাত ধরে আমি যেন ভাসতে ভাসতে যাচ্ছিলাম। চারদিকটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ দেখলাম, একটা থানার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মামি বলল, 'এতক্ষণ তোমাকে যা যা বললাম, ভেতরে গিয়ে পুলিশকে সব বলবে। তুমি যে ঘরে শুতে তার মেঝেতে তোমার ভাই-বোনের কঙ্কাল পোঁতা আছে। শুধু দেহটা পাবে। মাথা দু'টো নেই। ও দু'টো তোমার মামা খালে ফেলে দিয়েছিল। মাগুর মাছে খেয়ে ফেলেছে। পুলিশ তোমার কথা বিশ্বাস করবে। তবে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। তোমার মামা এখন সমাধিতে, সে উঠে পড়ার আগেই তাকে ধরতে হবে। সে বসে আছে শ্মশানের পশ্চিম প্রান্তে নিম গাছের তলায়। ভয় পাবে না। আমি থাকব তোমার সঙ্গে। কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না।''

সুপ্রতিম বলল, 'পুলিশ তোর কথা শুনল?'

সঞ্জয় বলল, 'হ্যাঁ। এক দল পুলিশ গিয়ে ঘরের মেঝে থেকে দু'টো মাথাবিহীন কঙ্কাল উদ্ধার করল। অন্য আর এক দল তখন মামাকে হাতকড়া পরিয়ে উঠোনে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে। যাওয়ার আগে মামিকে যে ঘরে তালা দিয়ে রেখে গেছিল, সেই ঘরের দিকে তাকিয়ে মামা হঠাৎ অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল শুরু করল। পুলিশ সে ঘরের তালা ভাঙতেই আমি দেখলাম...'

'কী দেখলি?'

'দেখলাম, গলায় শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে মামি ঝুলছে।'

প্রেসিডেন্সি কলেজের পেছনের গেটে একটা কুকুর হঠাৎই কেঁদে উঠল। সঞ্জয় বলল, 'আমি আর কাকার কাছে ফিরে যাইনি। পুলিশ আমাকে একটা হোমে রেখে দেয়। গেনু এখনও আসে। আজও ও আমার ক্ষতি করতে চায়। কিন্তু বারবার করেই মামি সাবধান করে দেয় আমাকে।'

সুপ্রতিম হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল।

বাকিরা অবাক হল। পল্লব বলল, 'কী হল?'

সঞ্জয়ের পিঠে একটা চাপড় মেরে সুপ্রতিম বলল, 'ভাই তুই গল্প লেখ। তোর হবে। জীবনের দু'টো ঘণ্টা তোর গাঁজা শুনে নষ্ট করলাম।'

সঞ্জয় আহত গলায় বলল, 'আমি তো তোকে বিশ্বাস করতে বলিনি। তোরা শুনতে চাইলি তাই বললাম। এখন প্লিজ এটা নিয়ে মজা করিস না।'

সুপ্রতিম উঠে দাঁড়িয়ে ছাদের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, 'ক্ষমা কর সঞ্জয়। যে যাই বলুক আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, তুই মিথ্যে কথা বলছিস।'

এ কথার উত্তরে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ভাবে কাঁপা গলায় সঞ্জয় বলল, 'প্রতিম, এখানে এসে সবার সঙ্গে বোস। ওখানে একা দাঁড়িয়ে থাকিস না।'

'কেন দাঁড়ালে কী হবে? এটা কী গল্পের আফটার এফেক্ট দিচ্ছিস?'

'তর্ক করিস না। প্লিজ আয়। মামি তোকে চলে আসতে বলছে।'

'মামি?'।, হো হো করে হেসে উঠল সুপ্রতিম, 'তোর মামি আমাকে চলে আসতে বলছে? সঞ্জয় তুই ভাই খলিফা। বাকিরা সবাই তোর গল্পে বিশ্বাস করেছে। এ বার প্লিজ থাম নয়তো...'

কথা শেষ করার আগেই সুপ্রতিম এক পা পিছিয়ে গেল। তার পরে আচমকাই কেউ যেন এক ধাক্কায় তাকে ছাদ থেকে ফেলে দিল। কাঁপতে কাঁপতে ওরা ধপ করে একটা শব্দ পেল। সুপ্রতিম নীচে পড়ল। আর তখনই একটা তীব্র পচা গন্ধে হড়হড় করে বমি করে দিল পল্লব।

খাবারের প্লেটটা এক ঝটকায় খানিকটা ঠেলে সরিয়ে বারাসাত থানার এস আই অমিয় বোস বললেন, এগুলো রুটি না গন্ডারের চামড়া? ছিঁড়তে গিয়ে আঙুল খুলে যাচ্ছে।

এ এস আই দীপক পাল হেসে বললেন, এ কথা শুনলে তারক কিন্তু লজ্জায় গলায় দড়ি দেবে স্যার। ওর এমন বদনাম আজ অবধি কেউ করেনি। দোষটা রুটির নয়। সময়ের। ঘড়ি দেখেছেন? দেড়টা বাজে। ন'টার সময় খাবার দিয়ে গেছে। এতক্ষণ সময় পেলে তো বাখরখানিও শক্ত হয়ে যাবে স্যার।

বিরক্তির ভাবটা কেটে গেল অমিয়র। সত্যিই তো, বেচারা তারকের আর দোষ কী? রাত দেড়টায় কোন ভদ্রলোকের ছেলে ডিনার করে! অবশ্য পুলিশের চাকরিতে সবই সম্ভব। একটা ফালতু পারিবারিক ঝগড়ার কেস মেটাতে এত রাত হয়ে গেল।

থানার উল্টো ফুটে তারকের রুটি তড়কার দোকান। খাবার ভালই বানায় ছেলেটা। নাইট ডিউটি থাকলে এখান থেকেই রুটি, তড়কা, ওমলেট আনিয়ে নেন অমিয়। কোনও কোনও দিন হরিতলার মোড়ের একটা দোকান থেকে বিরিয়ানি। তবে রাতে ভাত খেলে চোখ জড়িয়ে আসে তাই অমিয় রুটিটাই প্রেফার করেন। তাঁর মতে নাইট হোক বা ডে, ডিউটিটা ডিউটির মতোই করা উচিত। তাই গভীর রাতে যখন থানার অফিস ঘরের নানা প্রান্ত থেকে মৃদু ও জোরাল নাসিকাধ্বনি শোনা যায় তখনও সটান বসে থাকেন অমিয়। কখনও কানে ইয়ারফোন গুঁজে বই পড়েন। কখনও বা পুরনো কেসের ফাইলপত্তর খুলে নোটস নিতে থাকেন। নাইট ডিউটিতেও ঠায় জেগে থাকেন বলে সহকর্মীদের মধ্যে খানিক অসন্তোষ আছে অমিয়কে নিয়ে। অমিয় সেটা জানেন আর মনে মনে হাসেন। ল্যাজকাটা শেয়ালের দল ল্যাজওয়ালা শেয়াল দেখলেই ভড়কায়। এ দুনিয়ার নিয়ম। অমিয় ও সবে পাত্তা দেন না। তবে হ্যাঁ, আরও একজন আছেন যাঁকে নাইট ডিউটিতে আজ অবধি দু'চোখের পাতা এক করতে দেখেননি অমিয়। এ এস আই দীপক পাল। অমিয়ই বরং দু'একবার বলেছেন, শুয়ে পড়ুন না পালদা। দরকার হলে আমি তুলে দেব।

উত্তরে এক হাত জিভ কেটে দীপক পাল বলেছেন, ছি ছি স্যার! ডিউটি করতে এসে শোবো কী? অস্থানে কুস্থানে শুতে গেলে পয়সা খরচ করতে হয়। সরকার বাহাদুর নিশ্চয়ই আমায় সে জন্য পয়সা দেন না। বদ রসিকতা করলাম, কিছু মনে করলেন না তো? আসলে আমরা বাঙাল তো স্যার, যতটা নিই ততটা উসুল করে দেওয়ার চেষ্টা করি।

দীপক পাল মানুষটিকে ভারী ভাল লাগে অমিয়র। সোজাসাপটা লোক, কোনও প্যাঁচঘোঁচ নেই। সারাক্ষণ হাসিমুখে ঘুরে বেড়ান এবং সততার জন্য ডিপার্টমেন্টে রীতিমতো বদনাম আছে। অত্যন্ত সচেতনভাবে দীপক পাল দুটি জিনিস খান না। মদ এবং ঘুষ। হাসতে হাসতেই বলেন, ঘুষ খাই না বলে অনেকের অনেক অসুবিধে হয় আমি বুঝি। কিন্তু কী জানেন তো স্যার, ঘুষের পয়সা ফুস।

অমিয় জিগ্যেস করেছিলেন, কোনও দিন ঘুষ নেননি?

দীপক পাল বলেছিলেন, আপনাকে আমি ভালবাসি। আপনি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। আপনাকে মিথ্যে বলব না। এক বার খেয়েছিলাম জানেন। তা ধরুন আজ থেকে বছর পনেরো আগের কথা।

এত আগের কথা মনে আছে এখনও?

থাকবে না? যা কাণ্ড হয়েছিল! আমার মেয়ে মিতুল তখন ছোট। সামনেই পাঁচ বছরের জন্মদিন। খুব ইচ্ছে ছিল ঘটা করে ওর জন্মদিন করব। অত দিন আগে কেমন মাইনে পেতাম বুঝতেই তো পারছেন স্যার। টাকা পয়সার টানাটানি লেগেই থাকত। তা সে সময় হেলাবটতলার কাছে একটা গাঁজা ভর্তি লরি ধরলাম। নগদ তিরিশ হাজার টাকা হাতে গুঁজে দিল হেল্পার ছেলেটা। লোভ সামলাতে পারলাম না।

অমিয় হাসে, তার পর? হল মেয়ের জন্মদিন?

দীর্ঘশ্বাস ফেলেন দীপক পাল, আর জন্মদিন! জন্মদিনের দিন দুয়েক আগে মিতুলের গালে একটা ফুসকুড়ি হল। বাচ্চা মেয়ে, না বুঝে গেলে দিল ফুসকুড়িটা। বিশ্বাস করবেন না স্যার, সেই যে মুখ থেকে ফোলা শুরু হল এই ডান দিকের বগল অবধি ফুলে ঢোল। সেই সঙ্গে তাড়সে জ্বর। মেয়ে আমার মর মর। হাসপাতালে ভর্তি করতে হল শেষমেশ। বারো দিন পর মেয়ে সুস্থ হল কিন্তু আমার ষাট হাজার টাকা খসে গেল। সেই থেকে ভয় পেয়ে গেছি স্যার। আমি কর্মফলে খুব বিশ্বাস করি। এ জন্মের পাপ এ জন্মেই চুকিয়ে যেতে হয়। তাই ও সব থেকে দূরে থাকি।

মনটা ভাল হয়ে গেছিল অমিয়র। বারাসাত থানায় বদলি হয়ে এসে যদি কিছু প্রাপ্তি হয়ে থাকে তা হলে এই মানুষটা। বলেছিলেন, আপনাকে কত বার বলেছি আমাকে স্যার স্যার করবেন না? নাম ধরে ডাকবেন।

ফের জিভ কেটেছিলেন দীপক পাল, ছি ছি। তা কী করে হয়? আপনি যে আমার বস।

তা হলে এই যে বললেন, ছোট ভাইয়ের মতো ভালবাসি।

সে তো বাসিই। আপনি আমার থেকে অন্তত বিশ বছরের ছোট।

ভাইকে কেউ স্যার বলে?

একটু হেসে দীপক পাল বলেছিলেন, স্যার, আমার বাবা আমার মাকে মিঠু বলে ডাকতেন। আমিও তাই শুনে শুনে চিরকাল মাকে মিঠু ডেকে এসেছি। আমার মুখে মা ডাক শোনার সৌভাগ্য হয়নি আমার মায়ের। কিন্তু তা বলে কি মাকে আমি কম ভালবেসেছি? ও সব ডাকে কিছু এসে যায় না স্যার। তা ছাড়া ডেকোরাম মেনটেইন করাই ভাল। আমি আপনাকে নাম ধরে ডাকতেই পারি কিন্তু তাতে অনেকের চোখ টাটাবে। ২৮ বছর ধরে এই থানায় আছি, সবচেয়ে নিচু পোস্টে ঢুকেছিলাম। সেখান থেকে আজ এ এস আই। ওরা আমার একটাও ঘাস ছিঁড়তে পারবে না। কিন্তু আপনার পেছনে কাঠি দেবে।

গম্ভীর হয়ে অমিয় বলেছিলেন, বেশ। যেটা আপনার ইচ্ছে। তবে একটা কথা আপনাকে স্পষ্ট বলে দিতে চাই।

অমিয়র বলার ধরনে একটু থতিয়ে গেছিলেন দীপক পাল। বুঝতে পারছিলেন না অমিয় বিরক্ত হয়েছেন কি না। ইতস্তত করে বলেছিলেন, কী কথা স্যার?

আমাকে নাম ধরে ডাকতে না পারেন অসুবিধে নেই কিন্তু আমার সামনে বাল আর পোঁদকে নাম ধরেই ডাকুন। ঘাস আর পেছন বলে ম্যানেজ দিতে হবে না।

হো হো করে হেসে উঠেছিলেন দীপক পাল। বলেছিলেন, ষোড়ষ বর্ষ প্রাপ্তেষু পুত্র মিত্র বদাচরেত। সেখানে আপনি তো ছোট ভাই। চলুন আপনাকে সিগারেট খাওয়াই।

সেই থেকে দীপক পাল হয়ে গেছিলেন অমিয়র পালদা। অমিয়র সরিয়ে দেওয়া প্লেটটা তুলে টেবিলের নীচে রাখতে রাখতে দীপক পাল বললেন, উঠুন স্যার।

অমিয় হাঁ হাঁ করে উঠলেন, আরে! আপনি আমার এঁটো প্লেটে হাত দিলেন কেন?

ধুর। ছাড়ুন ও সব। উঠুন। টুপি পরুন।

অমিয় অবাক, কেন? বেরবেন না কি?

দীপক পাল বললেন, আপনার তো খাওয়া হল না। আমারও খিদে খিদে পাচ্ছে। চলুন, জেলা হাসপাতালের সামনে থেকে ঘুরে আসি। ওখানে গরম গরম ডিম টোস্ট আর ঘুগনি পাওয়া যাবে। ফাঁকতলে একটা টহলও দেওয়া হয়ে যাবে।

চলুন তবে।

থানার বাইরে বেরিয়ে এলেন অমিয় আর দীপক পাল। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক। রাতের দিকে বাতাসে হিম পড়ে। দীপক পাল পাতলা একটা উইন্ডচিটার গায়ে দিয়েছেন। অমিয়কে বললেন, গায়ে হালকা কিছু একটা দিলে পারতেন।

নাহ। ঠিক আছে। আমি চালাই?

চালান।

দরজা খুলে ড্রাইভারের সিটে উঠে বসেন অমিয়। জিপ চালাতে ভারী ভাল লাগে তাঁর। ছোট থেকেই জিপের প্রতি তাঁর অদ্ভুত কৌতূহল ছিল। মনে হতো, আর সব গাড়ির থেকে এই গাড়িটা আলাদা। কী যেন একটা টান আছে। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় দেখেছিলেন, মেইন বিল্ডিং-এর শেষ দিকে হেয়ার স্কুলের মাঠের লোহার বেড়ার গায়ে একটা পুরনো জিপ দাঁড় করানো থাকত। শুনেছিলেন, ওটা জিওলজি ডিপার্টমেন্টের জিপ। বহুদিন অব্যবহারে নষ্ট হয়ে গেছে। এক বার সেই পুরনো জিপে উঠতে গিয়েই বোলতার কামড় খেয়েছিলেন। ভেতরে বোলতার চাক হয়েছিল। আজ স্টিয়ারিংয়ে হাত দিয়েই সে কথা মনে পড়ে হাসি পেয়ে গেল অমিয়র।

দীপক পাল বলে উঠলেন, পুরনো কথা মনে পড়ছে বুঝি?

ক্লাচ ছেড়ে এক্সিলারেটর দাবিয়ে গাড়িটা খানিকটা এগিয়ে দিয়ে অবাক হয়ে তাকালেন অমিয়, কী করে বুঝলেন?

মৃদু হাসলেন দীপক পাল, ও বোঝা যায় স্যার। পুরনো কথা মনে পড়ে ঠোঁটের কোণে যে আলতো হাসি জাগে তা থেকে সুন্দর গন্ধ বেরোয়। নস্টালজিয়ার মায়াবী একটা গন্ধ আছে, পুরনো বইয়ের মতো। সিন্দুকে রাখা ঠাকমার শাড়ির মতো।

ভারী সুন্দর বললেন তো পালদা। ঠিক বলেছেন, নস্টালজিয়ার একটা মায়াবী গন্ধ আছে।

রাস্তার দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে যান অমিয়। বারাসাতের রাস্তাগুলি সুন্দর। সোডিয়ামের হলুদ আলোয় প্রোজ্বল। তাঁর মনে পড়ে যায় প্রেসিডেন্সি কলেজের কথা। কলেজেও সন্ধেবেলাগুলো ছিল এমন হলুদ আলোয় ধোওয়া। ছিল কোয়াড্র্যোঙ্গেলে আড্ডা, ছিল হিন্দু হস্টেলের ছাদে রাত জেগে গান, গল্প। সঞ্জয়, পল্লব আর সুপ্রতিমের সাথে ভাগ করে বেঁচে থাকা। কোথায় হারিয়ে গেল সে সব দিন! একটা বিচ্ছিরি ভুল বোঝাবুঝি এতটাই দূরত্ব তৈরি করে দিল যে আজ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অবধি নেই।

স্যার, সামনে থেকে ডান দিকে।

চমক ভাঙল দীপক পালের কথায়। দীপক পাল বললেন, অলরেডি দু'টো রাস্তা ছেড়ে দিয়েছেন। এ বার ডান দিক না নিলে অনেকটা ঘুরে আসতে হবে।

একটু লজ্জা পেলেন অমিয়। পুরোনো দিনের কথা ভাবতে গিয়ে রাস্তা গুলিয়ে ফেলা মোটেই কাজের কথা নয়। ফিফথ গিয়ারে ফেলে গাড়ির স্পিড তুলে দেন সত্তরে। হু হু করে জিপটা ছুটতে থাকে রাতের ফাঁকা রাস্তা ধরে।

কিন্তু কিছুটা গিয়েই স্পিড কমাতে বাধ্য হলেন অমিয়। জেলা হাসপাতালের গেটের কাছে জটলাটা এত দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে। ভুরু কুঁচকে গেল অমিয়র, কী ব্যাপার বলুন তো পালদা? এত ভিড় কীসের?

দীপক পাল বললেন, আজকাল তো পেশেন্ট মরলেই ডাক্তারদের ধরে প্যাঁদায়। সে রকম কিছু না তো? চলুন গিয়ে দেখি। ওহ হো! হাঙ্গামা করার আর সময় পেলি না বাপ!

পুলিশের উর্দি দেখেই ভিড়টা একটু পাতলা হয়ে এল। সরুন, সরুন বলে হাঁক পেড়ে ভিড়ের নিউক্লিয়াসে ঢুকে পড়লেন অমিয় আর দীপক পাল। ভিড়ের মাঝখানে মাটিতে উবু হয়ে বসে আছে একটা লোক। ভয়ে সে থরথর করে কাঁপছে। চোখ দুটো করমচার মতো লাল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, রীতিমতো নেশা করেছে। জামাটা কাঁধের কাছে ছেঁড়া দেখে এটাও বোঝা যাচ্ছে, ইতিমধ্যে পাবলিকের চড় থাপ্পড় খেয়েছে। হাসপাতালের দু'চার জন গার্ডও ছিল ভিড়ের মধ্যে। দীপক পাল তাদেরই জিগ্যেস করলেন, ব্যাপারটা কী?

তারা কিছু বলার আগেই ছিটকে এগিয়ে এল একটা রোগা মতো লোক। কান্না আর রাগ একসাথে গলায় আটকে গেলে যেমন আওয়াজ বেরনোর কথা তেমন গলায় লোকটা হাঁউমাউ করে বলে উঠল, আমার বোনের বডি সরিয়েছে এই জানোয়ারটা।

অনেক হইহল্লা চেঁচামেচির পর যা বোঝা গেল তাতে বেশ একটু অবাক হলেন অমিয়। যে লোকটিকে পাবলিক চড় থাপ্পড় দিয়েছে তার নাম বিশে। সে হাসপাতাল মর্গের ডোম। অভিযোগটা তার বিরুদ্ধেই। ঘটনাটা হল, আজ রাত আটটা নাগাদ নমিতা বিশ্বাস নামে একটি বছর চব্বিশের মেয়ে এক্সপায়ার করে। মেয়েটি গতকাল বিষ খেয়েছিল। চার ঘণ্টা পর তার বডি পোস্টমর্টেমের জন্য হাসপাতালের মর্গেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ দিন পোস্টমর্টেমের জন্য এই একটিই বডি এসেছিল মর্গে। সে বডি টেবিলে রেখেছিল এই বিশে ডোম। কিন্তু ডাক্তার গিয়ে দেখেন, টেবিলে বডি নেই আর বিশে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তার মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরচ্ছে। অনেক খুঁজেও বডিটা পাওয়া যায়নি এবং বিশে অসংলগ্ন কথা বলছে। বাড়ির লোকের সন্দেহ, বিশেই বডিটা পাচার করেছে। তাই তাকে ধরে থানাতেই নিয়ে যাচ্ছিল তারা।

বিশের সামনে গিয়ে ধমকে ওঠেন দীপক পাল, এই বিশে, বডিটা কোথায় সত্যি করে বল।

কেঁদে উঠে মাটিতে আছড়ে পড়ে বিশে। কাঁদতে কাঁদতেই বলে, আজ বারো বচ্ছর আমি এই লাইনে স্যার। জীবনে কোনও দিন বডি নিয়ে ধুনচুন করিনি। বিশ্বাস না হয় স্যার, ম্যাডামদের জিগ্যেস করে দেখবেন। আমি কিছু করিনি স্যার। ও বডি পিচাশে নিয়ে গেছে।

চমকে ওঠেন অমিয়। এক ধমক দেন দীপক পাল, মদের ঘোরে কী আলফাল বকছিস?

ফের কাঁদে বিশে, মদের ঘোরে আমি ভুল দেখব না স্যার। আমি পাঁচ বছর বয়েস থেকে মদ খাই। সত্যি ও বডি পিচাশে নিয়ে গেছে। আমি আর এই মর্গে কাজ করব না স্যার। আমাকে বাঁচান।

আবার একটা ধমক দিতে যাচ্ছিলেন দীপক পাল। হাতের চাপে তাঁকে নিরস্ত করে বিশের সামনে মাটিতে উবু হয়ে বসেন অমিয়। শান্ত গলায় বলেন, না কেঁদে ঠিক করে বলো তো কী হয়েছে?

পুলিশের শান্ত গলায় ভাল কাজ হয়। চোখ মুছে উঠে বসে বিশে। হাত বাড়িয়ে বলে, একটু জল দেবেন স্যার?

জল খেয়ে ধাতস্থ হয়ে বিশে বলল, বডি কাটার কথা ছিল দেড়টা নাগাদ। আমি তার একটু আগেই ঢুকি। গিয়ে দেখি ভিতরটা অন্ধকার। আমার ধন্দ লেগেছিল স্যার। বাইরে তো আলো জ্বলছে। তা হলে? দেশলাই জ্বালাতেই আমি চমকে উঠলাম। আবছা আলোয় দেখলাম, একটা খুব মোটা আর খুব বেঁটে লোক বডিটা কাঁধে করে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম, এই হারামির বাচ্চা! তখনই লোকটা আমার দিকে ঘুরে তাকাল স্যার, এই অবধি বলেই যেন ভয়ে শিউরে উঠল বিশে।

অমিয় বলেন, কী হল? থামলে কেন? বলো।

বিশে বলল, লোকটা আমার দিকে তাকাতেই আমি দেখলাম লোকটা টেকো। নাক আর কান বলতে কিছু নেই। চোখদুটো এত ছোট যে দেখাই যায় না। আর লোকটা পুরো ফোকলা। একটাও দাঁত নেই স্যার। অনেকক্ষণ থেকেই একটা পচা গন্ধ পাচ্ছিলাম। আমি আজ বিশ বচ্ছর পচা মড়া ঘাঁটছি। পচা গন্ধ আমার গা সওয়া। কিন্তু এই গন্ধটা যেন জাহান্নাম থেকে উঠে আসছিল বিশ্বাস করুন। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম আর তখনই মেয়েছেলের মতো রিনরিনে গলায় লোকটা আমায় বলল, বিরক্ত করিস না। দেহখান আমার লাগবে।

এইটুকু বলেই ফের জ্ঞান হারাল বিশে। ধড়াস করে উল্টে পড়ল রাস্তার ওপর।

ভোর চারটের সময় ফোন বেজে উঠলে কার না মাথা গরম হয়! চোখ না খুলেই হাতড়ে হাতড়ে ফোনটাকে সাইলেন্ট করে দিল পল্লব। রাত আড়াইটে অবধি লেখালিখি করে সবে শুতে গেছে সে। সদর দরজা পেরিয়ে ঘুম এখন এসে বসেছে বৈঠকখানায়। পাখার হাওয়ায় শুকিয়ে নিচ্ছে ঘাম। তৃপ্তির চুমুক দিচ্ছে আমপান্নার সরবতে। এর পর স্নান সেরে খেতে বসবে। এ অবস্থায় ফোন বাজা মানে ঘুমের হাত থেকে আমপান্নার সরবত কেড়ে নেওয়া। কিন্তু যে বেরসিক ভোর চারটেয় ফোন করতে পারে তার কোনও ভরসা নেই। আর একবার ফোন করলেই দফা শেষ। ঘুম অপমানিত হয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। তাই পল্লব সিদ্ধান্ত নিল, ফোনটা সুইচড অফ করে দিতে হবে। কোনও মতে চোখ খুলে সবে পাওয়ার বাটনটায় হাত রেখেছে ঠিক তখনই দ্বিতীয় বার বেজে উঠল ফোন আর স্ক্রিনে নামটা দেখে অবাক হয়ে গেল পল্লব। সঞ্জয় এই অসময়ে! আগের বারের ফোনটাও কি তবে সঞ্জয়ই করেছিল? কিন্তু কেন? সঞ্জয় আজ পর্যন্ত পল্লবের দেখা সবচেয়ে রেসপনসিবল মানুষ। সে তো জানে, পল্লব গভীর রাত অবধি লেখালিখি করে। তবে কি সঞ্জয়ের কোনও বিপদ হল? ঘুম উড়ে গেল চোখ থেকে। চিন্তিত গলায় পল্লব ফোন ধরল, হ্যালো, কী হয়েছে? এনিথিং রং?

সঞ্জয় বরাবরের ধীরস্থির মানুষ। কম কথা বলত বলে হিন্দু হস্টেলের বোর্ডাররা তাকে মৌনীবাবা বলে ক্ষ্যাপাত। সেই সঞ্জয়ের গলাতেই আজ খানিক ছটফটানি। সে বলল, তুই কোথায়?

পল্লব অবাক হল, কোথায় মানে? বাড়িতে। এত ভোরে তো আর শুটিং শুরু হয় না।

সঞ্জয় যেন একটু নিশ্চিন্ত হল, যাক। আমি আবার ভাবছিলাম যদি তুই আউটডোরে গিয়ে থাকিস মুশকিল হবে।

আমার আউটডোরে যাওয়ার সাথে তোর কী?

অনেক কিছু। আমি এখন দমদম এয়ারপোর্টে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তোর বাড়ি আসছি।

চমকে উঠল পল্লব, দমদম এয়ারপোর্টে মানে? হপ্তাখানেক আগেও যখন কথা হল তুই তো আসার ব্যাপারে কিছু বলিসনি। কী ব্যাপার বল তো?

তুই উঠে ফ্রেশ হ। এসে সব বলছি, ফোন রেখে দিল সঞ্জয়।

এ বার যেন আরও বেশি করে চিন্তায় পড়ে গেল পল্লব। সঞ্জয় মুম্বইতে থাকে। মুম্বই আইআইটি-তে ফিজিক্স পড়ায়। একাবোকা মানুষ। কলেজের বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে শুধু পল্লবের সাথেই তার যোগাযোগ আছে। পল্লব বহু বার বলেছে, ছুটিছাটায় আমার এখান থেকে ঘুরে যা। কিছু না হোক অন্তত পুজোর সময় ক' দিন এসে থাক। সঞ্জয় রাজি হয়নি। গত চার বছরে পল্লবই বরং বার ছয়েক ঘুরে এসেছে সঞ্জয়ের কাছ থেকে। আরও দু'বার শুটিং-এর কাজে মুম্বই যেতে হয়েছিল সেই দু'বারও প্রোডাকশন হাউজের দেওয়া হোটেলে না থেকে সঞ্জয়ের কাছে উঠেছিল পল্লব। কিন্তু হাজার উপরোধেও এম.এস.সি শেষ করার পর আর কলকাতায় আসেনি সঞ্জয়। তাই হঠাৎ করে কিছু না জানিয়ে সঞ্জয়ের কলকাতায় আসা ব্যাপারটা যতটা বিস্ময়কর তার চেয়েও বেশি চমকপ্রদ।

সঞ্জয়কে দেখেই চমকে উঠল পল্লব। গত সপ্তাহেই ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। সেই সঞ্জয়ের সাথে এই সঞ্জয়ের আকাশপাতাল পার্থক্য। মাথার চুলগুলো উস্কোখুস্কো। চোখ দু'টোয় রাত জাগার গভীর ক্লান্তি। ঠোঁট ফেটে গেছে কিন্তু তাতে ক্রিম লাগানো হয়নি আর মুখখানা অদ্ভুত রকমের ফ্যাকাশে। কেউ যেন ব্লটিং পেপার দিয়ে মুখের সমস্ত লাবণ্য শুষে নিয়েছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, শেষ কয়েকটা দিন এমন কোনও বিষয় সঞ্জয়কে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে যা মোটেই অভিপ্রেত নয়। পল্লব কিছু বলার আগেই সঞ্জয় বলল, অনেক কথা আছে। সব বলব বলেই এসেছি। কিন্তু তার আগে একটু ঘুমোব। আমি তিন রাত ঘুমোইনি। আর শোন, আমি যখন ঘুমোব তুই আমার কাছে কাছে থাকিস তো। বেশি দূরে যাবি না। আমাকে চোখের আড়াল করবি না, কেমন?

সঞ্জয়ের কথায় পল্লবের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। এক একটা কথা শুনতে খুব সাধারণ কিন্তু তার অভিঘাত অনেকখানি। সে কাঁপা গলায় বলল, এ ভাবে বলছিস কেন তুই? কী হয়েছে সত্যি করে বল তো।

সঞ্জয় বলল, একা থাকতে আমার ভয় করে। তাও যতক্ষণ জেগে আছি ঠিক আছে কিন্তু চোখ বুজলেই ভয়টা আমার শরীরের মধ্যে ঢুকে পড়ে পল্লব। সমস্ত শিরা উপশিরা জুড়ে একটা বিশাল কালো ভল্লুকের মতো থপথপ করে ঘুরে বেড়ায় সেই ভয়। আমি তার পদধ্বনি শুনি বুকের ভেতর। যেন সে আমার হৃৎপিণ্ডের দিকে এগিয়ে আসছে ক্রমাগত। এ ভাবে ঘুম হয় বল? তাই তোর চোখের সামনে আমি একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চাই।

বড় অসহায় লাগে সঞ্জয়ের গলাটা। পল্লব অস্থির হয়ে পড়ে মনে মনে। সঞ্জয় শক্ত ধাতের ছেলে। জীবনে অনেক ওঠাপড়া দেখেছে। সাধারণ মানুষের জীবনে যে ধরনের অভিজ্ঞতা হওয়া সম্ভব তার থেকে অনেক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা রয়েছে সঞ্জয়ের। তা হলে কীসে এমন ভয় পেল সে যা তাকে চোখ বুজতে দিচ্ছে না! তবু অস্থিরতা চেপে পল্লব বলল, বেশ। হাত পা ধুয়ে আয়। আমি চা বসাচ্ছি। চা খেয়ে ঘুমোবি। আমি তো আছি। তোর কোনও চিন্তা নেই।

চা খেতে খেতেই ঢুলে পড়ছিল সঞ্জয়। পল্লব বলল, ঘরে গিয়ে শুবি চল।

বিছানায় শুয়ে পল্লবের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে সঞ্জয় বলল, তিন দিন পর মনে হচ্ছে আজ ঘুমটা হবে বুঝলি? আমি ঘুমোচ্ছি দেখে উঠে চলে যাবি না তো ভাই? না তোকে বিশ্বাস নেই। আমার হাত ধরে রাখ।

শিশু যে ভাবে মায়ের হাত আঁকড়ে ঘুমোয় ঠিক সে ভাবে পল্লবের হাতটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে চোখ বুজল সঞ্জয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর নিশ্বাস পড়তে শুরু করল তার। আর ঠায় বসে থেকে একটাই কথা ভাবতে লাগল পল্লব, এ কোন আদিম নিকষছায়া যার শীতলতায় এমন কুৎসিত ভাবে শুকিয়ে মরে আত্মবিশ্বাস!

কষের দাঁত বরাবর গালের ফাঁকে খৈনিটা গুঁজে দিয়ে সমীর বলল, যাই বলো গুরু, বড়লোকেরা কিন্তু আসলে হেবি গরীব। মাথাফাতা হেবি ঝাক মেরে ঢেকে রেখেছে কিন্তু পোঁদে কাপড় নেই। যার পোঁদ উদলা তার আর কী আছে বলো?

টাকি রোড ধরে মাঝারি গতিতে ছুটছে গাড়িটা। এ গাড়ির পোশাকি নাম স্বর্গরথ। মৃতদেহকে শ্মশান অবধি পৌঁছে দেওয়াই এ গাড়ির কাজ। গাড়িটা আজ খুব করে সাজানো হয়েছে। মোটা মোটা রজঃনীগন্ধার মালা। এত্ত রজঃনীগন্ধার স্টিক। গাদা খানেক ধূপকাঠি জ্বলছে। উল্টোদিকে হাওয়া তবু সে সুবাস নাকে এসে লাগছে মতিউরের। প্রথম প্রথম এই সব ফুল, অগুরু, সেন্ট আর ধূপকাঠির মিশ্র গন্ধে মতিউরের গা গুলোত। কিন্তু এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। বরং আজকাল এ গন্ধটা ভালই লাগে তার। কোনও কোনও পার্টি থাকে বিরাট চিন্দি। ধূপকাঠিতেও পয়সা বাঁচাতে চায়। এক প্যাকেট ধূপকাঠিতে কাজ সারে। মতিউর তখন নিজেই আরও দু'প্যাকেট ধূপ এনে জ্বালিয়ে দেয়। আহা রে, শেষবেলায় যাচ্ছে, একটু ভাল করে যাক। বাবার একটা কথা খুব মনে পড়ে মতিউরের। বাবা হাসপাতালের ফোর্থ ক্লাস স্টাফ ছিল। রোগীদের গু, মুত, কফ, রক্ত, পুঁজ পরিষ্কার করত। কিন্তু কোনও দিন মানুষটার মধ্যে কোনও গ্লানি দেখেনি মতিউর। বাবা মনে করত, রোগীর সেবা করা পুণ্যের কাজ। বলত, জিন্দেগি হ্যায় তো গন্দগি হ্যায়। যতক্ষণ বেঁচে আছ ততক্ষণই তো মল-মূত্র, কফ, ক্যাথিটার, বেডপ্যান। মরে গেলে আর কিচ্ছু নেই। মুর্দার সব কিছুই সাফসুতরা। মৃতদেহের জন্য আছে শুধু কাফন আর সুগন্ধী।

তাই মতিউর চায় না, কারও শেষ যাত্রায় সুগন্ধীর অভাব হোক। গত সাত বছর ধরে সে স্বর্গরথই চালাচ্ছে। নিজেকে সে ড্রাইভার বলে না। বলে, সারথি। সমীর আজ বছর তিনেক তার সাথে। মতিউর একদিন বলেছিল, হ্যাঁ রে, সমীর, ড্রাইভারের তো হেল্পার থাকে কিন্তু আমি তো ড্রাইভার নই। রথের সারথি। তা হলে তুই আমার কী?

মাথা চুলকে সমীর বলেছিল, কী বলি বলো তো গুরু? একটা নাম মাথায় আসছে বটে কিন্তু প্রবলেম আছে।

কী প্রবলেম?

আমার তো আর বুকটুক নেই, থাকলে আমি হতাম তোমার ডরোথি। আমাদের পাড়ায় এই নামে একটা খ্রিষ্টান মেয়েছেলে আছে গুরু। হেবি ডবকা। কাতলা মাছের মতো চেহারা। তুমি সারথি, আমি তোমার ডরোথি।

নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেসে উঠেছিল সমীর। চোখ পাকিয়েছিল মতিউর, বাজে কথা বলতে মানা করেছি না তোকে?

জিভ কেটে সমীর বলেছিল, চেষ্টা করি গুরু। মাইরি বলছি। কিন্তু মুখ থেকে আপসেই বেরিয়ে যায়। আসলে জন্মের পর থেকে খিস্তি শুনছি তো। ওটাই আমার মাতৃভাষা।

মানুষের উচিত তার মাতৃভাষা নিয়ে গর্বিত হওয়া। কিন্তু সমীরের সে সুবিধে নেই। এ ভাষাটি বড়ই শ্রুতিকটু। অনেক বলেও মতিউর শোধরাতে পারেনি সমীরকে। তবে হ্যাঁ, এটা মানতেই হবে, এই ক' বছরে সমীর আগের থেকে অনেক পাল্টে গেছে।

বছর চারেক আগে খুব অদ্ভুত ভাবে সমীরের সাথে দেখা হয়েছিল মতিউরের। এ রকমই একটা রাতে শ্মশানে বডি নামিয়ে একাই ফিরছিল মতিউর। হেল্পার ছেলেটা তখন ছুটি নিয়ে দেশে গেছে। ময়না ক্রস করার পরই রাস্তার ওপর একটা বাম্পার। গাড়ি স্লো করতেই বেশ ভারী কিছু একটা আছড়ে পড়ল গাড়ির পেছন দিকে আর তখনই পাশের পরিত্যক্ত কারখানাটার ভেতর থেকে হইহই করে ছুটে বেরল কয়েকটা ছেলে। চেঁচাতে লাগল, ধর, ধর। ছেলেগুলোর হাবভাব ভাল ঠেকল না মতিউরের। স্পিড বাড়িয়ে হু হু করে পেরিয়ে এল জায়গাটা। থামল এসে একেবারে কলোনি মোড়ে। খুব ভারী কিছু ছুঁড়েছে গাড়িটায় লুচ্চাগুলো। ভেঙেচুরে গেছে নির্ঘাৎ। নেমে গাড়ির পেছনটা দেখতে গিয়ে চমকে উঠল মতিউর। এত অবাক সে বহুকাল হয়নি। হাতে পায়ে ধরে গাড়ির পেছন দিকের রড আঁকড়ে ঝুলছে একটা ছেলে। খালি গা, পরনে ছেঁড়া জিন্সের প্যান্ট। ডান দিকে বগলের নীচ থেকে কোমরের ওপর অবধি একটা টানা লম্বা গভীর ক্ষত। সেখান থেকে এত রক্ত বেরিয়েছে যে ছেলেটার সারা গা প্রায় লাল হয়ে আছে। এখনও রক্তপাত হয়ে চলেছে। অমন অদ্ভুত ভাবে ঝুলতে দেখে মতিউর প্রথমটা ভেবেছিল ছেলেটা বুঝি মরে গেছে। কিন্তু কাছে যেতেই চোখ খুলল ছেলেটা। ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে যা বলল তাতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মতিউর। ছেলেটা বলল, দেখছিস কী শুওরের নাতি? হাসপাতালে নিয়ে চল।

'কই মাছের প্রাণ' কথাটা বইতে পড়েছিল মতিউর। সমীরকে দেখে সম্যক অর্থটা বুঝতে পারল সে। সমীরের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠেছিলেন বারাসাত জেলা হাসপাতালের এমার্জেন্সির ডাক্তাররা। যে ধারাল অস্ত্রটা দিয়ে সমীরকে আঘাত করা হয়েছে তার ফলাটা প্রায় দু'ইঞ্চি ভেতর অবধি গেছে এবং সেই টানে সমীরের অন্ত্রের ডানদিকটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। গভীর আঘাত লেগেছে কিডনিতেও। মতিউরের সাথে সাথে ডাক্তাররাও অবাক হয়েছিলেন, এই পেশেন্ট এখনও বেঁচে আছে আছে কী করে! শুধু তাই নয়, পেশেন্টের সেন্স আছে। ডাক্তাররা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সমীরের সামনে। কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তাঁদের সম্বিত ফিরেছিল সমীরেরই মাতৃভাষায়, দেখছিস কী? নতুন বউয়ের থোবড়া না কি বে! অপারেশন কর!

হাসপাতালে নিয়ে আসা থেকে অপারেশন, সবকটা পদক্ষেপই সমীর বলে দিয়েছিল পর পর। তার ভাষা শুনে ওই অবস্থাতেও হেসে ফেলেছিলেন এক ডাক্তার। বলেছিলেন, কই মাছের প্রাণ! এ ব্যাটা বেঁচে যাবে।

বেঁচে গেছিল সমীর। বারো দিন যমে মানুষে টানাটানির পর এবং চার মাস বিছানায় শুয়ে থাকার পর এক দিন উঠে দাঁড়িয়েছিল সে। খুঁজে খুঁজে মতিউরের বাড়ি চলে এসেছিল এবং মতিউরের হাত ধরে বলেছিল, আমি তোমার কেনা গোলাম গুরু। শুধু তুমি না, আরও একজন আছে। যে ম্যাডাম আমার অপারেশন করেছিল, তুমি তো জানো, তিতাস ম্যাডাম। তোমরা দুজনে আমায় নতুন জন্ম দিয়েছ শালা। তোমরা আমার বাপ মা।

সেই থেকেই মতিউরের সাথে থেকে গেল সমীর। প্রচণ্ড রগচটা, অকুতোভয়, মুখে অশ্রাব্য গালিগালাজ... এর আড়ালে সমীরের আর একটা চেহারা লুকিয়েছিল। সেই মানুষটা অকাতরে প্রাণ দিতে পারে ভালবাসার মানুষের জন্য। কৃতজ্ঞতা শব্দটা হয়তো বানান করতে পারবে না সমীর কিন্তু তার প্রতিটি রোমকূপ দিয়ে এর অর্থ অনুধাবন করেছে সে। লুকিয়ে থাকা এই সমীরকে আবিষ্কার করেছিল মতিউর এবং বাজে অভ্যেসগুলো সংশোধনের চেষ্টা করেছিল। হ্যাঁ, ফল হয়েছে। সমীর আগে রোজ দেড় লিটার মদ খেত। এখন হপ্তায় দু'এক দিন। তাও মতিউরের অনুমতি নিয়ে। আগে কথায় কথায় হাত চালাত সমীর। এখন সেটা বন্ধ হয়েছে। তবে ওই যে, মাতৃভাষা-মাতৃদুগ্ধ। সেটা ত্যাগ করতে পারেনি।

তা আজও সমীরের মুখে পোঁদ উদলা কথাটা শুনে হাসি পেয়ে গেল মতিউরের। হাসি চেপে সে বলল, হঠাৎ এ কথা বললি কেন? কী দেখে মনে হল তোর বড়লোকেরা হেবি গরিব?

সমীর বলল, আরে বুঝতে পারলে না? এই যে লোকটা মরেছে সে যে হেবি বড়লোক তা নিয়ে তোমার সন্দেহ আছে? কেমন আলিশান বাড়ি! বাড়ির লোকেরা যে দু'টো গাড়িতে করে যাচ্ছে সে দু'টোও তো ঘ্যামা। কিন্তু দেখো, বডির সাথে একটাও বাড়ির লোক উঠল না। আমরা মড়া পোড়াতে যাই তাসাফাসা বাজিয়ে। যত চেনাশোনা সবাই চলে আসে। সবাই কাঁদে। আমরা গরিব হতে পারি কিন্তু কেউ মরে গেলে তাকে এ ভাবে একা ছেড়ে দিই না। সে জন্যই বলছি, বড়লোকেরা আসলে গরিব-এর অধম। ওদের কাছে সম্পক্কের ভ্যালু নেই। কারও সাথে কারও আঠা নেই।

চুপ করে থাকে মতিউর। এ কথার উত্তর নেই। সমীর যা বলছে তা সে সমর্থন করে না কিন্তু এটাও সত্যি বড়লোকেদের সবটাই কেমন চাপা চাপা। কান্না বা ভালবাসা কি অত মেপেজুপে হয়! সত্যিই এটা ঠিক না, বাড়ির একটা লোক অন্তত গাড়িতে উঠতে পারত। খইয়ের প্যাকেটটা অবধি সমীরের হাতে ধরিয়ে দিল। সমীর বলল, কী হল গুরু? চুপ করে গেলে যে! কথাটা ভুল বললাম?

মতিউর কিছু বলতে যাবে তার আগেই গন্ধটা পেয়ে গা গুলিয়ে উঠল তার। কোথা থেকে যেন একটা তীব্র পচা গন্ধ আসছে! মুখটা ঘেন্নায় কুঁচকে সমীর বলল, পাচ্ছ গুরু?

মতিউর মাথা নাড়ল, আশেপাশে কিছু পচেছে।

ধ্যাত। বিশটা মড়া একসাথে পচলে এমন গন্ধ বেরোয়। মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে। ছিঃ। কাচ তুলে দিচ্ছি।

রাস্তাটা সোজা গিয়ে ডান দিকে বাঁক নিয়েছে। রাস্তার আলো জ্বলছে না। যেটুকু দেখা যাচ্ছে সে হেডলাইটের আলোয়। বাঁক নিয়েই চমকে উঠল মতিউর। আলো যত দূরে গেলে তার পৌরুষ হারিয়ে যায় ঠিক ততটা দূরেই রাস্তার ওপর কী যেন একটা পড়ে রয়েছে। আবছা আলোয় দেখে মনে হচ্ছে একটা বড় বস্তা। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক মেরে গাড়ি থামিয়ে দিল মতিউর, ওটা কী বল তো সমীর?

নাকে হাত চেপে সমীর বলল, বুঝতে পারছি না। বস্তাফস্তা হবে। গন্ধটা মনে হচ্ছে ওটা থেকেই আসছে। দাঁড়াও তো দেখি।

দরজা খুলে নামতে যেতেই খপ করে সমীরের হাত চেপে ধরল মতিউর, খবরদার নামবি না।

হেসে উঠল সমীর, এত ভয় পাও কেন বলো তো? কিচ্ছু হবে না।

সমীরের অভয়বাণীতে কাজ হল না। ভুরু কুঁচকেই রইল মতিউরের। বলল, ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না রে। হঠাৎ করে কেউ মাঝরাস্তায় এমন বস্তা বসিয়ে রেখে যাবে কেন!

আরে বাবা, হয়তো কোনও লরিফরি থেকে মাল পড়ে গেছে। যাদের বাড়ির বডি তাদের দু'টো গাড়ি তো আমাদের আগে আগেই ছিল। তারাও বেরিয়ে গেছে। তেমন কিছু হলে জ্যাম হয়ে যেত। যাক গে, বলছ যখন নামছি না, তুমি সাইড কাটিয়ে বেরিয়ে যাও।

ফের স্টার্ট দিল মতিউর। ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগল গাড়িটাকে। যত এগোচ্ছে গন্ধটা বাড়ছে। নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না ভাল করে। গন্ধটা যেন বাতাসের গলা টিপে ধরেছে। কিছুটা এগোতেই নড়ে উঠল বস্তাটা এবং হেডলাইটের আলোয় মতিউর আর সমীর এমন কিছু দেখল যা তারা আগে কখনও দেখেনি। ওরা বুঝতে পারল, যেটাকে এতক্ষণ ওরা বস্তা ভেবে ভুল করছিল সেটা একটা লোক। যেমন বেঁটে, তেমনই মোটা। লোকটার পরনে ধুতির মতো কী একটা জড়ানো। মাথায় একটাও চুল নেই। বেশ অনেকটা কাছে চলে এসেছিল গাড়িটা। আচমকাই হেডলাইটটা দপদপ করতে লাগল। সেই বিক্ষিপ্ত আলোর মধ্যে লোকটা ঘুরে দাঁড়াল ওদের দিকে। তীব্র পচা গন্ধটা একশোগুণ হয়ে ঝাপটা মারল ওদের নাকে আর ওরা দেখল, লোকটার নাক, কান বলতে কিচ্ছু নেই। আর এত ছোট চোখ যে চোখ আছে বলে বোঝাই যেত না যদি না তার মধ্যে স্থির হয়ে জ্বলে থাকত পাঁশুটে সবুজ রঙের মণি দু'টো। এমন অদ্ভুত ভয়ানক কদাকার মানুষ জীবনে দেখেনি সমীর। সে বলেই ফেলল, এই শালা দানবটা কি মানুষ!

লোকটা ততক্ষণে থপথপ করে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে গাড়ির দিকে। বহু কাল এমন ভয় পায়নি মতিউর। ভয়টা যেন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাচ্ছিল। সে চাইছিল ভয় না পেতে। একটা অদ্ভুত দর্শন লোক দেখে এত ভয় পাবারই বা কী আছে! কিন্তু সে বাধ্য হচ্ছিল ভয় পেতে। ভয় পাওয়া ছাড়া যেন দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই। যেন এই মুহূর্তে একমাত্র সত্য দমবন্ধ করে দেওয়া ভয়। সমীরের মতো অকুতোভয় মানুষও কেমন যেন চুপ করে গেছে। ইতিমধ্যে লোকটা এগিয়ে এসেছে গাড়ির আরও কাছে। হঠাৎ অদ্ভুত একটা কাণ্ড করল মতিউর। প্রাণপণে চেপে ধরল অ্যাক্সিলারেটর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়িটা সশব্দে আছড়ে পড়ল লোকটার ওপর। কিন্তু কী আশ্চর্য! কোনও সংঘর্ষ হল না! লোকটা যেন স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে!

থরথর করে কাঁপতে লাগল মতিউর। অস্ফুটে বলতে লাগল, গেল কোথায় লোকটা? গেল কোথায়? মানুষ কখনও মিলিয়ে যায় না কি!

তখনই একটা রিনরিনে মেয়ে গলা বলে উঠল, মিলাইনি। আছি তো।

এক সাথে চমকে উঠল মতিউর আর সমীর। গাড়ির মধ্যে মেয়ে এল কোথা থেকে! কয়েক মুহূর্তের জন্য পচা গন্ধটা উধাও হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার সেটা ফিরে এসেছে তীব্রতম ভাবে। প্রচণ্ড ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল মতিউর, কে? কে কথা বলল?

ঠিক তার কানের কাছে সেই মেয়ে গলাটা বলে উঠল, আমি। আমি গেনু।

চমকে উঠে পেছন ফিরতেই ভয়ে জমে গেল মতিউর। সেই কদাকার লোকটা বসে আছে সিটের পেছনে। মেয়েদের মতো গলায় খিলখিল করে হাসছে আর... আর একটাও দাঁত নেই লোকটার। মুখগহ্বরের মধ্যে অসীম অনন্ত অন্ধকার। সেখান থেকেই উঠে আসছে নরকের দুর্গন্ধ। কেমন যেন স্থবির হয়ে গেল মতিউর। ঘটনার অভিঘাতে স্তব্ধ হয়ে গেল সমীরও। সে অনেক কিছু দেখেছে এই জীবনে কিন্তু এমন অবিশ্বাস্য কিছু দেখেনি। লোকটা আবার মেয়েদের মতো গলায় বলল, গেনুরে চাপা দিবার পারবা না। গেনুর মরণ নাই।

মতিউরের শিথিল হাত থেকে স্টিয়ারিং খসে গেছে কখন তার খেয়ালও নেই। সাড় ফিরল যখন গাড়িটা প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মারল রাস্তার ধারের একটা গাছে। কয়েক মুহূর্তের তীব্র যন্ত্রণা। তার পর সব অন্ধকার। সমীর বুঝতে পারল, গাড়ির ড্যাশবোর্ডটা তার বুকের ওপর চেপে বসেছে। পাঁজরের হাড়গুলো মটমট করে ভেঙে যাচ্ছে। সে শব্দ পাচ্ছে সমীর। কিন্তু বেদনাবোধকে অগ্রাহ্য করে একটাই কথা তার মাথায় ঘুরতে লাগল, মরে গেলে চলবে না। কিছুতেই না।

. . .

থানার বাথরুম থেকেই ফোনের রিং শুনতে পেয়েছিলেন অমিয়। পুরনো দিনের ল্যান্ডফোন। পাড়া জাগিয়ে বাজে। যখন বেরিয়ে এলেন, ফোনের পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দীপক পাল। অমিয় বললেন, কী ব্যাপার পালদা?

গলা ঝেড়ে দীপক পাল বললেন, টাকি রোডে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে স্যার। আপনাকে যেতে হবে আমার সাথে।

অবাক হলেন অমিয়, সাধারণ এক্সিডেন্ট কেস দীপক পাল একাই সামলে নেন। অমিয়কে ইন্টারফেয়ার করতে হয় না। তা হলে আজ কী বড় কিছু! প্রশ্নসূচক চোখে তাকাতেই দীপক পাল বললেন, পাতি এক্সিডেন্ট হল আপনাকে বলতাম না স্যার। ডেডবডি নিয়ে যাওয়ার গাড়ি, গাছে ধাক্কা মেরেছে। ড্রাইভারটা স্পট ডেড। গাছের একটা ডাল চোখ ফুঁড়ে মাথার ঘিলু নিয়ে বেরিয়ে গেছে। হেল্পারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মনে হয় না বাঁচবে। তবে...

থেমে গেলেন দীপক পাল। অমিয় বললেন, তবে?

ডেডবডিটা মিসিং স্যার।

টানা আঠেরো ঘণ্টা ঘুমিয়েছে সঞ্জয়। সকাল ছটা নাগাদ ঘুমিয়েছিল, উঠল রাত বারোটায়। উঠেই বলল, খুব খিদে পেয়েছে। খেতে দে পল্লব।

ঘুম থেকে ওঠার পর সঞ্জয়কে অনেকটা ফ্রেশ লাগছে। পল্লব বলল, খাবার রেডি আছে। বসে পড়।

খেতে খেতেই সঞ্জয় বলল, খুব জ্বালাচ্ছি, না রে?

বাজে বকিস না। মাছের ঝোলটা আমি রেঁধেছি। ভাল হয়েছে?

খুউব। কত দিন পর তোর হাতের রান্না খেলাম। মনে আছে হোস্টেলে থাকতে তুই রান্না করতিস?

মনে থাকবে না? ওই তো আমার রান্নায় হাতেখড়ি।

ওহ সেই ঝিঙে আলুর ঝোলটা। ওটা পেলে আমি এখনও এক থালা ভাত খেয়ে নিতে পারি।

খাওয়াব। কদিন তো আছিস। মাঝে মাঝে রাঁধব। রান্না করতে তো আমার ভালই লাগে কিন্তু একার জন্য আর হয়ে ওঠে না।

একটু থমকে গেল সঞ্জয়, তিতাস আর একেবারেই আসে না?

হেসে ফেলল পল্লব, আর ক'বার এই প্রশ্নটা করবি সঞ্জয়? যখনই কথা হয় ঠিক এক বার না এক বার এটা জিগ্যেস করিস। কত বার বলব, তিন বছর হয়ে গেল তিতাসের সাথে আমার আর যোগাযোগ নেই?

হুম, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সঞ্জয়।

সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে পল্লব বলল, আমি জানি কেন তুই বারবার এই প্রশ্নটা করিস। তুই যতই চাস, তিতাস আর ফিরবে না। আমাদের দু'জনের প্রায়োরিটিগুলো আলাদা। এই ভাল হয়েছে।

তুই চাস না তিতাস ফিরে আসুক?

এক একটা প্রশ্ন থাকে যার উত্তর নিশ্চিত ভাবে মানুষের জানা কিন্তু মানুষ কিছুতেই সে উত্তরটা দিয়ে উঠতে পারে না। তখন সে প্রশ্নকর্তাকে মিথ্যে বলে। সবার আগে নিজেকে মিথ্যে বলে। এ ক্ষেত্রেও তাই হল। একটু চুপ করে থেকে পল্লব বলল, জানি না। বাদ দে এ সব। পুরনো কথা ডিপ টিউবওয়েলের মতো। জলের পাইপ গভীর থেকে আরও গভীরে যেতে থাকে। একবার শুরু হলে আর শেষ হবে না সঞ্জয়। তুই খাওয়া শেষ কর। কী জন্য এ ভাবে তড়িঘড়ি ছুটে এলি, কীসে ভয় পাচ্ছিস সবটা আমায় খুলে বল।

এক মুহূর্তের জন্য সঞ্জয়ের চোখে সেই অস্থিরতা ফুটে উঠল। তার পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, হ্যাঁ। বলব বলেই তো আসা।

সেপ্টেম্বর মাস। রাতের দিকে একটু গা শিরশির করে। ফ্যানের রেগুলেটর এক ঘাট কমিয়ে সিগারেট ধরিয়ে সঞ্জয়ের মুখোমুখি বসল পল্লব। ঘরে একটা অল্প পাওয়ারের আলো জ্বলছে। সঞ্জয় বলল, বড় আলোটা জ্বেলে দে তো। আজকাল একটু অন্ধকার হলেই কেমন গা ছমছম করে!

কথা না বাড়িয়ে আলো জ্বেলে দিল পল্লব, এ বার ঠিক আছে?

সঞ্জয় বলল, হ্যাঁ। আর তুই আছিস তো। অতটাও অসুবিধে হচ্ছে না। একা থাকলেই বেশি ভয় করে।

পল্লব বলল, ভয় করে সেটা আমি আগেও শুনেছি। কিন্তু কেন ভয় করে? তোর মতো ছেলে কেন এত ভয় পাচ্ছে সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না।

সেকেন্ড পাঁচেক নীরবতার পর সঞ্জয় বলল, গেনু আর আসে না পল্লব। প্রায় এক মাস হয়ে গেল আমি আর গেনুর উপস্থিতি টের পাইনি।

কথাটা হজম করতে একটু সময় লাগল পল্লবের। তার পরেই সে লাফিয়ে উঠল, এ তো ভাল খবর সঞ্জয়। খুব ভাল খবর। এত ভাল খবর আমি বাপের জন্মে শুনিনি। এমন খবর পেলে পার্টি করতে হয়, গরিবকে অকাতরে বিলিয়ে দিতে হয়, প্রেমিকাকে অবধি বলে ফেলা যায়, যা সিমরন জি লে আপনি জিন্দেগি... সেখানে তুই ভয় পাচ্ছিস? ভয়ে শুকিয়ে যাচ্ছিস! তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?

একটানা এতগুলো কথা বলে দম নিল পল্লব। অবশ্য পল্লবের এই উচ্ছ্বাসের কারণ খুব সঙ্গত। গেনু নামটির সাথে ওদের চার বন্ধুর ভয়াবহ এক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে এক দিন রাতে হিন্দু হস্টেলের ছাদে তর্ক জমে উঠেছিল অমিয় আর সুপ্রতিমের মধ্যে। তর্কের বিষয় ছিল ভূত আছে কি নেই। তখনই সঞ্জয় ওদের থামিয়ে দিয়ে নিজের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল। বলেছিল, তার মামা তাকে বলি দেওয়ার জন্য নিয়ে গেছিল বর্ধমানের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানেই তাকে সর্বক্ষণের জন্য নজরবন্দি করে রেখেছিল এই গেনু। শেষমেশ সঞ্জয়ের মামি নিজের প্রাণ বলি দিয়ে সঞ্জয়কে উদ্ধার করেন মামা ও গেনুর কবল থেকে। হিন্দু হস্টেলের ছাদে বসে মরা চাঁদের আলোয় এ ঘটনা শুনতে শুনতে শিউরে উঠেছিল পল্লবরা। গল্প শেষ করে সঞ্জয় বলেছিল, গেনু না কি আজও আসে এবং ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করে কিন্তু প্রতিবারই মামি ওকে সাবধান করে দেয়। অমিয় এবং পল্লব এ কথা বিশ্বাস করলেও বিশ্বাস করতে চায়নি সুপ্রতিম। সে গোটা ঘটনাটাকেই সঞ্জয়ের মনগড়া বলে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তখনই ঘটেছিল সেই ভয়াবহ হৃদয়বিদারক ঘটনাটা। সুপ্রতিম কথাগুলো বলছিল ছাদের আলসের কাছে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ কাঁপা গলায় সঞ্জয় বলেছিল, ছাদের ধার থেকে সরে আয় প্রতিম। মামি তোকে সরে আসতে বলছে।

যথারীতি সে কথায় কান দেয়নি সুপ্রতিম এবং পরক্ষণেই অদৃশ্য কিছুর ধাক্কায় ছিটকে পড়েছিল ছাদ থেকে। অসহায় হয়ে বসে পল্লবরা সে দিন সুপ্রতিমের পতনের শব্দ শুনেছিল আর একটা তীব্র পচা গন্ধে বমি করে দিয়েছিল পল্লব। স্থবির ভাবটা কাটিয়ে উঠে সঞ্জয় ফিসফিস করে বলেছিল, গেনু।

তার পর ছুটে নেমে গেছিল নীচে।

পল্লব আর অমিয় যখন নীচে এসে পৌঁছেছিল ততক্ষণে সুপ্রতিমের দেহ ঘিরে ভিড় করেছে হিন্দু হস্টেলের ছেলেরা। বড় ভয়ানকভাবে পড়েছিল সুপ্রতিম। একটা পিলারের কিছুটা অংশ ঢালাই হওয়ার পর সেখান থেকে লোহার রড বেরিয়েছিল। সেগুলোই সুপ্রতিমের গলা আর বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সুপ্রতিম বেঁচে নেই তবু সবাই মিলে টেনে হিঁচড়ে বডিটা তুলে নিয়ে গেছিল মেডিক্যাল কলেজে। ডাক্তার জানিয়েছিলেন, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে। শোকের ছায়া নেমে এসেছিল হিন্দু হস্টেলে। সঞ্জয় একদম চুপ করে গেছিল। মনে মনে সুপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য সে নিজেকেই দায়ী করছিল। কিন্তু তার পর যে আঘাতটা এসেছিল সেটা একেবারে অপ্রত্যাশিত। আনন্যাচারাল ডেথের তদন্ত করতে পুলিশ এসেছিল হস্টেলে। সেখানেই পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছিল অমিয়। বলেছিল, সঞ্জয়ের পোষা ভূত সুপ্রতিমকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে।

যদিও ভূতের কথা পুলিশ বিশ্বাস করেনি কিন্তু সঞ্জয়কে নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছিল বিস্তর। অমিয় সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে শুনে মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল পল্লবের। ছুটে গেছিল অমিয়র রুমে। কিন্তু অমিয় দরজা খোলেনি।

সুপ্রতিম ছিল অমিয়র প্রিয়তম বন্ধু কিন্তু তাই বলে সে সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে নালিশ জানাবে এটা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি পল্লব। ভাবতে পারেনি সঞ্জয়ও কিন্তু সে নিজেকে ডিফেন্ড করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। পুলিশকে বলেছিল, অমিয় ঠিক বলছে। সুপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী।

সঞ্জয়ের কনফেশনের পর পল্লবের সাক্ষ্যকে পাত্তাই দিতে চায়নি পুলিশ। তারা কেস গোটানোর জন্য মুখিয়ে ছিল। শেষপর্যন্ত হস্তক্ষেপ করে প্রেসিডেন্সির টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন। সঞ্জয় বরাবরই শিক্ষকদের প্রিয়পাত্র ছিল। প্রতিভাবান ছাত্রটির এহেন পরিণতি মেনে নিতে পারেননি তাঁরা। তাঁরা পল্লবের সাক্ষ্যকেই মান্যতা দিয়েছিলেন এবং প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী সংসদের সদস্য দু'জন বাঘা ক্রিমিনাল ল-ইয়ার এগিয়ে এসেছিলেন অনুজ সতীর্থকে বাঁচাতে।

বেকসুর খালাস পেয়েছিল সঞ্জয় কিন্তু অমিয়র ঘটনাটা তার মনে তীব্র রেখাপাত করেছিল। সে বরাবরের চাপা স্বভাবের মানুষ কিন্তু পল্লব বুঝতে পেরেছিল সঞ্জয়ের মনে অমিয়র প্রতি এক দুর্লঙ্ঘ্য অভিমানের পাহাড় জমে উঠেছে। অমিয় যদি এসে কথা বলত তা হলে হয়তো মিটেও যেতে পারত ব্যাপারটা। কিন্তু অমিয় আসেনি। সে হস্টেল ছেড়ে তার এক মাসির বাড়িতে চলে গিয়েছিল এবং যোগাযোগ রাখা বন্ধ করে দিয়েছিল। অমিয়র সাবজেক্ট ছিল পলিটিক্যাল সায়েন্স। অন্য বিল্ডিংয়ে ক্লাস হতো। ফলে দেখা হবার বিশেষ সম্ভাবনা ছিল না। তাও দু'এক বার ক্যাম্পাসে দেখা হয়েছিল, কিন্তু মুখ নীচু করে দ্রুত পায়ে ওদের এড়িয়ে গেছিল অমিয়। পল্লব বুঝতে পেরেছিল, রাগ নয়, অমিয়র এই পালিয়ে বেড়ানো ওর অপরাধবোধের তাড়নায়। সঞ্জয়কে তো ও-ও ভালবাসত।

কথায় বলে টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার। সময়ের সাথে সাথে পুরনো ক্ষত শুকিয়ে আসে। কিন্তু সেই হিলিং প্রসেসের মধ্যেই অজান্তে দুটো মানুষের মধ্যে অনেকটা দূরত্ব বেড়ে যায়। সে পথ পেরিয়ে ফের কাছে আসা সহজ কথা নয়। তাই ভেঙে যাওয়া বন্ধুত্ব আর জোড়া লাগল না। মাস্টার্স শেষ করে সঞ্জয় আর কলকাতায় থাকতে চাইল না। পিএইচডি করতে আইআইটি চলে গেল। আর পল্লব ঢুকে পড়ল একটা খবরের কাগজের চাকরিতে। আজ প্রায় সাত-আট বছর অমিয়র সঙ্গে ওদের দুজনের কোনও যোগাযোগ নেই।

তার পরেও কিন্তু সঞ্জয়কে ছাড়েনি গেনু। মাঝে মাঝেই সঞ্জয় তার উপস্থিতি টের পেত এবং যথারীতি মামি তাকে সাবধান করে দিত। সঞ্জয় বলত, গেনুর হাত থেকে আমার মুক্তি নেই।

সেই গেনু আজ এক মাস হল আসছে না, এর থেকে ভাল খবর আর কী হতে পারে!

পল্লবের উচ্ছ্বাস দেখে সঞ্জয় ম্লান হেসে বলল, এখনও বদলালি না পল্লব। পুরোটা না শুনেই হইহই করতে শুরু করেছিস!

অপ্রতিভ হল পল্লব। এ তার বরাবরের সমস্যা। সে শুরুতেই রিঅ্যাক্ট করে ফেলে। সে জন্য অনেক সমস্যা পোহাতে হয়েছে তাকে। তিতাসও তাকে ছেড়ে চলে গেছে এই বদভ্যাসের জন্যই। লজ্জিত গলায় সে বলল, আসলে এত একসাইটিং ছিল খবরটা তাই সামলাতে পারিনি।

একটু জল খেয়ে সঞ্জয় বলল, আমি তো আজ থেকে এ সব দেখছি না, আর তুই জানিস আমি এমনি ভয় পাওয়ার ছেলে নই। দেখ, গেনু যে সবসময় আসত তা নয়। কিন্তু কখনও একটানা এত দিন আসেনি এমনটা হয়নি।

আচ্ছা, তোর মামি এসেছিলেন?

গম্ভীর হয়ে গেল সঞ্জয়। আবার একটু জল খেল। মুখটা মুছে বলল, এসেছিল। আর সেখানেই তো সমস্যা।

পল্লব অবাক হয়ে গেল, মানে? মামি তো তোর ভাল চান। উনি এলে কী সমস্যা?

সমস্যা আছে পল্লব। নয়তো বলব কেন! এত দিন গেনু না এলে মামি আসত না। মামি আমাকে সবসময় গেনুর থেকে প্রটেক্ট করে এসেছে। কিন্তু তিন দিন আগে ঘটনাটা ঘটল। আমার স্পষ্ট মনে আছে রাতটা।

বলতে গিয়ে যেন শিউরে উঠল সঞ্জয়। দু'হাতে মুখ ঢেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পল্লব উঠে গিয়ে সঞ্জয়ের পাশে বসল, ঠিক আছিস ভাই?

মাথা নাড়ল সঞ্জয়। তার পর মুখ থেকে হাত সরিয়ে বলল, তুই তো জানিস আমি আর্লি রাইজার। চেষ্টা করি বাই সাড়ে এগারোটা ঘুমিয়ে পড়তে। কিন্তু পরের দিন ছেলেমেয়েদের একটা ক্লাস টেস্ট নেব বলেছিলাম। তারই কোয়েশ্চেন পেপার সেট করছিলাম রাত জেগে। আমি টেবিলে বসে ল্যাপটপে কাজ করছি। শুধু টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। এসি চলছিল। ফ্যান বন্ধ। এসির একটা মৃদু গুঞ্জন আর ল্যাপটপের কি-তে মাঝে মাঝে আমার আঙুলের খুটখাট, এ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। তুই তো দেখেছিস আমার ফ্ল্যাটটা বড় রাস্তা থেকে অনেকটাই ভিতরে তাই গাড়ির শব্দ আসে না। আর অত রাতে এমনিও গাড়ি কম চলে। নীচে পাহারাওলা বাঁশি বাজায় আধ ঘণ্টা অন্তর। পর পর তিন বার সে বাঁশি বাজাল। আমি চমকে মুখ তুলে মোবাইলের ঘড়িতে দেখলাম দেড়টা বাজে। ভাবছি শুতে যাব তখনই শব্দটা পেলাম। খস খস করে একটা শব্দ হচ্ছে ঘরের মধ্যে। বেশি করে মাড় দেওয়া কাপড় পরে হাঁটাচলা করলে যেমন শব্দ হয় তেমন। সঙ্গে খুব মৃদু চুড়ির টুংটাং। আমি বুঝতে পারলাম মামি এসেছে। কিন্তু মুহূর্তে আমার সব কটা ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল, মামি কেন এসেছে? তবে কি গেনু আসছে! এত দিন গেনু আসেনি দেখে আমি যে একটু একটু নিশ্চিন্ত হতে শুরু করেছিলাম, আমার সে সুখ কি ফুরোল! চমকে উঠে দাঁড়াতে যাব তার আগেই কাঁধের কাছে শীতল স্পর্শ পেলাম। আমার মাথার মধ্যে ফিসফিস করে ধ্বনিত হল মামির কণ্ঠস্বর। মামি যেন হাঁফাচ্ছে। হাঁফাতে হাঁফাতে মামি বলল, আমাকে ক্ষমা কোরো। গেনুর শক্তি বাড়বে। আমি হয়তো তাকে আর আটকাতে পারব না। আমাকে টানছে। আমি আর লড়াই করতে পারছি না। সে যা চাইছে তা যদি হয় সর্বনাশ হবে। সব ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রলয় আসবে।

আমি ছিটকে উঠে দাঁড়ালাম চেয়ার থেকে। চিৎকার করে বললাম, কে টানছে তোমায়? কার সাথে লড়াই করতে পারছ না? গেনুর সাথে।

মামি উত্তর দিতে গেল কিন্তু তার আগেই কেউ যেন তার মুখ চেপে ধরল। আমার মাথার মধ্যে ধ্বনিত হতে লাগল মামির গোঙানি। অব্যক্ত এক যন্ত্রণায় মামি যেন ছটফট করছে। ধীরে ধীরে সেই গোঙানি রূপান্তরিত হল কান্নায়। টানা একঘেয়ে ঘুনঘুনে এক কান্না। আমি কী করব তখন বুঝতে পারছি না। পাগলের মতো চিৎকার করছি, মামি, তুমি কোথায়? কী হয়েছে তোমার? কিন্তু উত্তর পাচ্ছি না। মাথার ভিতর শুধু সেই কান্নার শব্দ। তার পর হঠাৎ...

আচমকা চুপ করে গেল সঞ্জয়। পল্লব ছটফট করে উঠল, থামলি কেন? হঠাত কী?

নিজেকে গুছিয়ে নিতে একটু সময় নিল সঞ্জয়। বলল, একটা শিসের শব্দ শুনলাম জানিস!

শিস?

হ্যাঁ? অদ্ভুত একটা সুরে কেউ যেন শিস দিচ্ছে। আমার মাথার ভিতর ঢুকে যাচ্ছিল শব্দটা আর ক্রমশই সেটা মামির কান্নার আওয়াজকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল। এক সময় মামির কান্নার শব্দ থেমে গেল। শিসটাও থেমে গেল। এ বার কয়েকটা বিক্ষিপ্ত শব্দ। যেন কিছু একটা হেঁচড়ে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ক্যাঁচ করে একটা দরজা খুলে গেল। তার পর আচমকাই একটা মেয়ে প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে উঠল।

সোফার ওপর এলিয়ে পড়ল সঞ্জয়। দরদর করে সে ঘামছে। পল্লব বুঝতে পারল, কথাগুলো বলতে অনেকটা ভয় জয় করতে হয়েছে সঞ্জয়কে। এ তারই ক্লান্তি। দ্রুত উঠে ফ্যানটা বাড়িয়ে দিল পল্লব। সঞ্জয়ের হাত চেপে ধরে চুপ করে বসে রইল। বেশ কিচ্ছুক্ষণ পর সঞ্জয় বলে উঠল, সে দিনের পর থেকে যখনই চোখ বুজতে যাই মাথার মধ্যে শব্দগুলো বাজতে শুরু করে। সেই কান্না, সেই শিস, মেয়েটার চিৎকার। খুব ভয় করে পল্লব। কিছুতেই ঘুমোতে পারি না। আমি বুঝতে পারছিলাম, একা থাকলে পাগল হয়ে যাব তাই তোর কাছে চলে এলাম।

পল্লব বলল, তোকে এখন আর যেতেও হবে না। কিন্তু এই শব্দগুলোর মানে কী? আর তোর মামি যে বলেছিলেন, গেনুর শক্তি বাড়বে, প্রলয় হবে, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

আমিও পারছি না আর সেই জন্যই তো ভয় করছে। আমি চোখের সামনে মৃত্যুকে দেখেছি, নিজেকে নিয়ে ভয় পাই না কিন্তু কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে এই বিপদ আমার একার নয়। এই বিপদ সমষ্টিগত। আমাদের সবার সাথে ভয়ানক কিছু ঘটতে চলেছে কিন্তু সেটা কী তার কোনও আন্দাজ পাচ্ছি না।

ঠিকই বলেছিস তুই। তোর মামি যখন তোকে সাবধান করে দিয়েছে তার মানে কিছু তো একটা হবেই। কিন্তু সেই কিছুর সাথে আমরা ফাইট করব কী করে?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সঞ্জয় বলল, জানি না পল্লব। এ বিপদের চরিত্র সম্পর্কে তো আমরা কিছু জানি না। তাই যতক্ষণ না সে বিপদ আমাদের কারও ওপর আছড়ে পড়ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা কী বল তো, হয়তো এই বিপদের সামনে আমাদের অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণই করতে হবে কারণ আমরা তো মানুষ। মানুষের সাধ্য কী সে গেনুর সাথে লড়বে? বহুদিন আগে একবার রাগের চোটে এত বড় একটা আধলা তুলে ছুড়ে মেরেছিলাম গেনুর দিকে। নেহাতই ছেলেবুদ্ধি, আধলা ইটে কি গেনুর কিছু হয়! তবু মেরেছিলাম। দশ বছরের আমার কাছে সেটাই ছিল সবথেকে জোরাল অস্ত্র। আধলাটা গেনুর গায়ে লাগেইনি। যেন বাতাস কেটে দূরে গিয়ে পড়েছিল। হাসতে হাসতে মেয়েদের মতো রিনরিনে গলায় গেনু একটা কথা বলেছিল। কথাটা আজও আমার কানে বাজে।

তীব্র কৌতূহল নিয়ে পল্লব তাকিয়ে রইল সঞ্জয়ের দিকে, কী কথা?

গেনুরে মারবার পারবা না। গেনুর মরণ নাই।

একটু আগেই বড়সাহেবের কাছে ধাতানি খেয়েছেন। মেজাজটা খিচড়ে আছে অমিয়র। বড়সাহেব আবার তাঁর বড়সাহেবের কাছে ধাতানি খেয়েছেন। আসলে ধাতানি ব্যাপারটাই ওপর থেকে নীচের দিকে নামে এবং যত নীচে নামে তার তেজ তত বাড়তে থাকে। অমিয়র উচিত ছিল তাঁর অধস্তন দীপক পালকে ধাতানি দেওয়া। কিন্তু অমিয় সেটা করেননি। কারণ কবে গভীর রাতে কার বডি কোথা থেকে হাপিস হয়ে যাবে সেটা কারও পক্ষেই আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। যদিও এটাই এখন বারসাত থানার মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা হাসপাতাল থেকে যে বডি হাপিস হয়েছিল তা নিয়ে খুব একটা জলঘোলা হয়নি। কিন্তু পরের বডিটা ছিল এক জন প্রভাবশালী ব্যক্তির। আর প্রভাবশালীরা কখনওই লোকাল থানাকে ভরসা করতে পারেন না। তাঁরা সরাসরি ওপর মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ফলে গতকাল রাতেই ওসি সাহেব এস পি সাহেবের ফোন পেয়েছেন এবং সকাল হতে না হতেই অমিয়কে ছুটে আসতে হয়েছে জেলা হাসপাতালে। স্বর্গরথের হেল্পার সমীর দলুই এখন এখানেই ভর্তি। পরশু রাতে যখন ছেলেটাকে এখানে নিয়ে আসা হয় তখন তার অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। অমিয় জানেন, ছেলেটি এখন কোনও মতেই এজাহার দিতে পারবে না তবু কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। অবশ্য অমিয় যে এই বডি উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকে হালকা ভাবে দেখছেন তা নয়। বরং বিশে ডোমের মুখে যা শুনেছিলেন তাতে তিনি রীতিমতো চিন্তিত। কারণ বিশের সাক্ষ্য তাঁর একটি পুরনো স্মৃতি এবং একই সঙ্গে একটি গোপন ক্ষতকে খুঁচিয়ে তুলেছে। কপালের রগদুটো চেপে ধরে তাই চুপ করে বসেছিলেন অমিয়। একটি মহিলা কণ্ঠ কানে এল, পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। আপনি আসতে পারেন।

মুখ তুলে তাকাতেই যেন হাজার ভোল্টের শক খেলেন অমিয়। দরজার সোজাসুজি দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা ডাক্তার। তিনিই এইমাত্র পেশেন্টের জ্ঞান ফেরার খবর দিয়েছেন। ছিটকে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন অমিয়, বিস্ময়ে বলে উঠলেন, তিতাস তুই!

একই রকম বিস্মিত হয়েছিলেন মহিলা ডাক্তারটি। ধীরে ধীরে সে বিস্ময় কেটে তাঁর মুখে ফুটে উঠল পরিচিত হাসি, ইয়েস। দিস ইজ ডক্টর তিতাস সেন। আই হোপ আই অ্যাম স্পিকিং উইথ মিস্টার অমিয় বোস, এস আই, বারাসাত থানা? অবশ্য আমার কাছে অন্য একটা পরিচয় বেশি গ্রহণযোগ্য। অমিয় বোস, ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল সায়েন্স, প্রেসিডেন্সি কলেজ?

অমিয় এক গাল হেসে ঘাড় নাড়লেন আর সেই মুহূর্তে ওখানে উপস্থিত দু'চারটি পেশেন্ট পার্টি, দু'জন নার্স, এক জন ওয়ার্ড বয় অবাক হয়ে দেখল, তুখোড় শল্য চিকিৎসক তিতাস ম্যাডাম প্রায় উড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন পুলিশ অফিসারটিকে এবং দীপক পাল পাল অবাক হয়ে দেখলেন, তাঁর বস এই আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর কোনও চেষ্টাই করছেন না।

আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে প্রথম কথাটা অমিয়ই বলল, আমি আগেই দেখেছি পেশেন্ট ডক্টর তিতাস সেনের আন্ডারে আছে কিন্তু বিশ্বাস কর, সেই তিতাস যে এই তিতাস আমি ভাবতেও পারিনি।

তিতাস বলল, আমাকেও বলা হয়েছিল বারাসাত থানার এস আই অমিয় বোস পেশেন্টের এজাহার নিতে আসবেন। শুনেই মাথাটা গরম হয়ে গেছিল জানিস? ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনের পেশেন্ট তার আবার এজাহার কি? কিন্তু সেই অমিয় যে এই অমিয় আমিও তো ভাবতে পারিনি।

অমিয় চিন্তিত হয়ে পড়ল, পেশেন্টের কন্ডিশন ক্রিটিক্যাল। এই যে বললি জ্ঞান ফিরেছে?

তিতাস হাসল, ওমনি জেরা শুরু করে দিলি তো? হ্যাঁ, জ্ঞান ফিরেছে। তুই এজাহার নিতে পারবি। অবশ্য যা অবস্থায় এসেছিল অন্য কেউ হলে কবে রেসপন্স করত বলা মুশকিল কিন্তু এই পেশেন্টের সাথে আর পাঁচ জনের ফারাক আছে। পেশেন্টের নাম কইমাছ সমীর। মৃত্যুকে পাঞ্জায় হারিয়ে দেওয়াতে ওর খুব হাতযশ।

অবাক হয়ে অমিয় বলল, মানে?

মানে তোকে পরে বোঝাব। আগে ক্যাফেটেরিয়ায় চল। এক কাপ কফি খাব একসাথে। তার পর অন্য কথা।

এখন কফি খাব? আগে কাজের কথাটা সেরে নিলে হতো না?

আমায় কাজ দেখাস না। ছেলেটাকে আর একটু রেস্ট নিতে দে, ধমকে উঠল তিতাস।

এ বারও অবাক হয়ে দীপক পাল দেখলেন, মহিলা ডাক্তারটির কথায় বাধ্য ছাত্রের মতো ঘাড় নাড়লেন তাঁর বস এবং বললেন, আসুন পালদা। তবে এক কাপ কফিই খাওয়া যাক।

কফি খাওয়া সেরে বিল মিটিয়ে তিতাস বলল, তোরা আয়। আমি সমীরকে রেডি করছি।

করিডোর দিয়ে হাঁটছিলেন অমিয় আর দীপক পাল। দীপক পাল বললেন, একটা কথা বলব স্যার?

না তাকিয়েই অমিয় উত্তর দিলেন, যা ভাবছেন তা নয়। ইনি আমার এক বন্ধুর প্রেমিকা। তাও প্রাক্তন।

ওই যে পল্লব বলে একবার যার কথা উঠল তিনিই কি?

হ্যাঁ।

ওহ! উনি তো বললেনই তিন বছর পল্লববাবুর সাথে যোগাযোগ নেই।

হুম।

আর একটা কথা বলব স্যার?

ঘুরে তাকালেন অমিয়। দীপক পাল একটু ইতস্তত করে বললেন, ছাত্রাবস্থায় এই ম্যাডামের প্রতি আপনার একটু দুর্বলতা ছিল তাই না স্যার?

মুহূর্তে লজ্জিত হলেন অমিয়। এত বছর পরেও অধস্তন সহকর্মীর অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়ে গেছে তিতাসের প্রতি তার প্রচ্ছন্ন অনুরাগ। হ্যাঁ, অস্বীকার করবে কী করে অমিয়, তিতাসকে তার ভাল লাগত না? বরং একটু বেশি রকমই ভাল লাগত। কলেজ ফেস্টে আলাপ হয়েছিল তাদের।

সে বার প্রেসিডেন্সির ফেস্ট মিলিউয়ের দায়িত্বে ছিল অমিয়দের ব্যাচ। অমিয়, সুপ্রতিম, পল্লব একে বারে জান প্রাণ দিয়ে খাটছে তখন। এ বারের মিলিউকে গত দশ বছরের সেরা মিলিউ করে তুলতেই হবে। চার দিন ধরে মিলিউ চলে। চার দিনের শো স্টপার ফাইনাল হয়ে গেছে। প্রীতি পটেলের মণিপুরি ফায়ার ড্যান্স, চন্দ্রবিন্দু, কবীর সুমন আর ইন্ডিয়ান ওশান। এ ছাড়াও রয়েছে আরও নানাবিধ ইভেন্ট। এরই মধ্যে একটা ইভেন্ট ছিল 'ব্যান্ডম্যানিয়া' নামে যেখানে বাইরের কলেজের ব্যান্ডরা পারফর্ম করত। সেই ইভেন্টে মেডিক্যাল কলেজের একটা ব্যান্ড নিজেদের নাম এন্ট্রি করিয়েছিল সে বার। ব্যান্ডের নাম 'লোকায়ত'। মেডিক্যাল কলেজ এবং 'লোকায়ত' নাম শুনেই ফ্যাক করে হেসে উঠেছিল পল্লব। বলেছিল, ডাক্তার এবং ফোক গান! ভারী অদ্ভুত কম্বিনেশন তো। এরা কী গান গাইবে আমি এখনই বলে দিতে পারি।

সুপ্রতিম বলেছিল, বল কী গাইবে?

চেনা গানের সুর ধার করে করে পল্লব প্যারোডি গেয়ে উঠেছিল, 'আগে জানলে... আগে জানলে তোর ডাক্তারখানায় আসতাম না।'

হেসে উঠেছিল সবাই। এমনকী সদাগম্ভীর সঞ্জয়ের ঠোঁটের কোণেও দেখা দিয়েছিল হাসির রেখা। কিন্তু এই হাসাহাসি হাশহাশ ফিসফিসে পরিণত হয়েছিল 'লোকায়ত' স্টেজে ওঠার পর। ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যান ব্যান্ডানা পরা একটা ছিপছিপে সুন্দর শ্যামলা মেয়ে দরাজ গলায় গান ধরেছিল, 'কী ঘর বান্ধিমু আমি শূন্যের মাঝার/লোকে বলে/ও বলে রে/ঘরবাড়ি ভালা না আমার...'

বাংলার মাটির সুরের তালে তালে সে দিন প্রেসিডেন্সিকে নাচিয়ে ছেড়েছিল 'লোকায়ত'। যথারীতি প্রথম পুরস্কার তারাই জিতেছিল। আর একই সাথে ব্যান্ডানা পরা মেয়েটি জিতে নিয়েছিল অনেকের হৃদয়। সেই তালিকায় অমিয় এবং পল্লবও ছিল। তার পর থেকে অনেকেই বিকেলবেলা ভিড় করত মেডিক্যাল কলেজের ক্যান্টিনে। নানারকম ভাবে তিতাসের চোখে পুরুষশ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করত। কিন্তু কী জানি কী করে শুধু মাত্র গোটা চারেক কবিতা লিখেই তিতাসকে একেবারে বধ করে ফেলেছিল পল্লব। তার পর থেকে বহু প্রেমিকের হৃদয় মাড়িয়ে পল্লবের হাত ধরে কলেজ স্ট্রিটের রাস্তায় লঘু মরালীর মতো ভেসে বেড়াত তিতাস সেন।

না এ নিয়ে আক্ষেপ ছিল না অমিয়র। সে জানত, সুন্দরী শিক্ষিত মেয়েরা কবিতায় বশীভূত হয়। সংবিধানের ধারা মুখস্থ বলে তাদের মন জয় করা যায় না। কিন্তু আশ্চর্য পরিচ্ছন্ন মনের মেয়ে তিতাস। অমিয় তাকে পছন্দ করে এবং পল্লব-অমিয় অভিন্নহৃদয় বন্ধু জানার পরেও সে কখনও কোনও গ্লানিবোধ করায়নি অমিয়কে বরং বন্ধুত্বের নিবিড় মর্যাদা দিয়েছিল। সুপ্রতিমের ঘটনাটা ঘটার পরে অমিয় যখন সঞ্জয় আর পল্লবের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় তখন থেকে তিতাসের সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পল্লব আর তিতাসের প্রেমটা ওদের বন্ধুমহলে দারুণভাবে সেলিব্রেটেড ছিল তাই যোগাযোগ না থাকলেও অমিয় কানাঘুষোয় জানতে পেরেছিল তিতাস আর পল্লবের ব্রেক আপ হয়ে গেছে। আজ এতদিন পর তিতাসের মুখোমুখি হয়ে তার সেই পুরনো অপরাধবোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। ভারী অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল সে। কিন্তু বুদ্ধিমতী তিতাস একবারও সুপ্রতিম কিংবা সঞ্জয়ের প্রসঙ্গই উত্থাপন করেনি।

প্রাথমিক লজ্জার ভাবটা কাটিয়ে অমিয় দীপক পালকে বললেন, বাব্বা! আপনার তো দারুণ নজর পালদা। এইটুকুতেই বুঝে ফেললেন যে ছাত্রাবস্থায় ম্যাডামের প্রতি আমার দুর্বলতা ছিল?

মৃদু হাসলেন দীপক পাল, মুর্শিদেরা কী বলেন জানেন স্যার? প্রেমের লক্ষণ হচ্ছে প্রকাশ। প্রেমের একটা অদ্ভুত জ্যোতি আছে। একটা উত্তাপ আছে। আপনি যতই ঢেকে চেপে রাখুন ও ঠিক বোঝা যাবেই যাবে। তবে আজ আমার একটা ভুল ভাঙল। আপনাকে এদ্দিন মনে হতো নীরস। আজ দেখছি, নাহ, ঠিকই আছে।

হেসে ফেললেন অমিয়। কথা বলতে বলতে তাঁরা আইসিইউ-এর কাছে চলে এসেছেন। এক জন নার্স ডাকল, স্যার, আপনারা আসুন। ম্যাডাম ডাকছেন।

কাচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন অমিয়রা। সমীর দলুইয়ের বেডটা পর্দা দিয়ে আলাদা করা আছে। তিতাস চাপা গলায় বলল, ওকে বেশি একসাইটেড করিস না কেমন?

মাথা নাড়ল অমিয়। চাপা গলাতেই জিগ্যেস করল, ইনজুরিটা কী?

কী নয়? কত? পাঁজরের দুটো হাড় ভেঙেছে আর মাথায় চোট পেয়েছে। ১৪টা সেলাই পড়েছে। অদ্ভুত জীবনীশক্তি এই ছেলের। তোরা কথা বলে নে। আমি একটা রাউন্ড দিয়ে আসি।

সমীরের গল্পটা কফি খেতে খেতেই শুনেছিলেন অমিয়। তাই ওঁদের দেখে শুয়ে শুয়েই সমীর যখন বাঁ হাত তুলে কপালে ঠেকাল অমিয় অবাক হলেন না। একটা টুল টেনে পাশে বসে বললেন, এখন কি একটু ভাল আছ?

সমীর বলল, তিতাস ম্যাডাম ছুঁয়ে দিয়েছেন। আমার আর কিচ্ছু হবে না। তা ছাড়া আমাকে জলদি ফিটও হতে হবে স্যার। ওই মালটা ম্যাজিশিয়ান হোক, ভূত হোক, পিচাশ হোক আমি কেয়ার করি না। ওর জন্য গুরুর এই হাল হয়েছে, ওর পুটকি জ্যাম না করে তো আমি ঘুমোতে পারব না। ওর স্যাটা যদি আমি না ভেঙেছি আমার নাম সমীর দলুই না। আমি এক বাপের বাচ্চা না। আমার মা তবে খুচরো নিত স্যার।

সমীর আরও কিছু বলত হয়তো কিন্তু তার আগেই দীপক পাল ত্রস্ত হয়ে বলে উঠলেন, থাক থাক আর বলতে হবে না। বুঝেছি। তা কী হয়েছিল একটু খুলে বলো তো।

আইসিইউ থেকে যখন বেরিয়ে এলেন অমিয়র মুখ থমথম করছে। দীপক পালের কপালেও ভ্রুকুটি। দীপক পাল বললেন, দুটো কেসেই এই মোটা আর বেঁটে লোকটার কথা শুনলাম। আর দুজনের বয়ানই অবিশ্বাস্য। ধরে নিলাম, বিশে ডোম মদের ঘোরে ভুলভাল দেখেছে কিন্তু সমীর তো মদ খায়নি সে দিন। রিপোর্টেও দেখা গেছে ব্লাডে অ্যালকোহল নেই। তা হলে?

উত্তর দিলেন না অমিয়। তিনি এতক্ষণে বুঝতে পেরে গেছেন, তিনি যা সন্দেহ করছিলেন তাই। বিশে বা সমীর কেউই ভুল দেখেনি। যদিও ভুল দেখলেই ভাল হতো।

. . .

গম্ভীর মুখে থানায় ঢুকতেই একটা রোগা মতো লোক ছুটে এসে পা জড়িয়ে ধরল, স্যার আপনি মাইবাপ। একবার আমার কথাটা শোনেন।

ছুটে এসে কনস্টেবলরা ছাড়িয়ে নিল তাকে। একজন সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিল লোকটার গালে, ছুটে গিয়ে জাপটে ধরলি যে! স্যার কী তোর শ্বশুর?

হাঁ হাঁ করে উঠলেন অমিয়, আহা মারছেন কেন? ওনাকে আমার ঘরে নিয়ে আসুন। পালদা আপনিও আসুন।

লোকটা কিছুতেই চেয়ারে বসতে রাজি নয়। সে অমিয়দের পায়ের কাছেই উবু হয়ে বসল হাত জোড় করে। নাম তার চরণ। সে বিশে ডোমের আপন পিসতুতো দাদা। জীবিকায় সেও ডোম। শ্মশানে মড়া পোড়ায়। সে শুনেছে, এই সারের জন্যই বিশের জেল হতে হতে হয়নি তাই সে আজ ছুটে এসেছে। ভোরবেলায় এমন একটা কান্ড হয়েছে যা সারকে না বললেই নয়। ঘটনাটা হল, গতকাল শেষ রাতের দিকে একটা বডি আসে শ্মশানে। আজকাল ইলেকট্রিক চুল্লি হয়ে গেছে তাই ঝামেলা অনেক কম। চুল্লি গরম হলে বডি ঢুকিয়ে দাও ব্যাস। চল্লিশ মিনিট পর কাম তামাম। পার্টির হাতে নাইকুণ্ডলী তুলে দিয়ে বকশিস নিয়ে ছুটি। তা আজ বডি ঢোকানোর পরে পরেই খুব পচা একটা গন্ধ উঠেছিল আচমকা। তার পর আবার গন্ধটা মিলিয়েও যায়। তা যাই হোক, তখন সেই নিয়ে মাথা ঘামায়নি চরণ। কিন্তু চমকে উঠেছিল চুল্লি থেকে ছাই বার করার সময়। নাইকুণ্ডলী নেই!

অবাক হলেন অমিয়, মানে?

চরণ বলল, আজ্ঞে স্যার চুল্লির ভিতর বডি ছিল না। যা ছাই হয়েছিল তা ওই কাঠের চাটাই পোড়া ছাই।

দীপক পাল ধমকে উঠলেন, ছাই দেখে তুমি বুঝে গেলে ওটা মানুষ পোড়া না চাটাই পোড়া?

চোখ কপালে তুলে চরণ বলল, কী বলেন সার? বুঝব না? চল্লিশ বচ্ছর ধরে এই কাজ করছি। ছাই দেখে বলে দেব মানুষ পুড়েছে না বেড়াল।

দীপক পাল বললেন, কিন্তু তা কী করে সম্ভব? চুল্লি তো তুমি নিজে বন্ধ করেছিলে।

হ্যাঁ সার। নিজে হাতে বন্ধ করেছি।

তা হলে?

সেটাই তো প্রশ্ন সার। ওই চুল্লির মধ্যে থেকেই বডি গায়েব হয়ে গেছে। বিশে ওই পচা গন্ধের কথা বলেছিল। তাই সকাল হতেই আমি ছুটে এসেছি সার। এমন আজব ঘটনা আমি আমার বাপের কালে দেখিনি।

চরণ হয়তো আরও কিছু বলত কিন্তু তার আগেই গম্ভীর মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন অমিয়। পিছু পিছু বেরিয়ে এলেন দীপক পালও। অমিয় ততক্ষণে ফোনে কথা বলতে শুরু করেছেন, হ্যালো তিতাস, অমিয় বলছি... আসলে জরুরি কাজ ছিল তাই দেখা না করেই চলে এলাম... না না, আমি আবার যাব... বলছি শোন না, একটা দরকার ছিল। বলছি, পল্লবের নম্বর আছে তোর কাছে... আচ্ছা মেসেজ করে দিস... থ্যাঙ্ক ইউ। রাখছি এখন।

দীপক পাল অবাক হয়ে বললেন, পল্লববাবুর নম্বর কী হবে স্যার? এই কেসের সাথে ওনার যোগাযোগ আছে না কি?

অমিয় বললেন, না, তবে যার সাথে যোগাযোগ আছে তার সাথে একমাত্র পল্লবেরই যোগাযোগ আছে।

দীপক পাল চিন্তিত গলায় বললেন, কী ব্যাপার বলুন তো স্যার, আপনাকে অতিরিক্ত চিন্তিত লাগছে। কেসটার ব্যাপারে কিছু ধরতে পারলেন? এমন আজগুবি কেস তো আমি আর কেরিয়ারে দেখিনি।

ক্লান্ত শোনাল অমিয়র কণ্ঠস্বর। বললেন, পেরেছি পালদা আর সেই জন্যই চিন্তিত। ভয়ানক অসম একটা লড়াইতে নামতে চলেছি আমরা।

পল্লব বলল, নিউটাউনের রাস্তাটা ধরে নিচ্ছি। ১২ কিলোমিটার বেশি ঘোরা হয় তবে এই বিকেলবেলা জ্যাম কম থাকবে আর রাস্তাটাও সুন্দর।

সঞ্জয় বলল, যেটা ভাল হয় কর। কিন্তু দেরি হয়ে যাবে না তো? অমিয় যে বলেছিল দেরি না করতে।

পল্লব একটুক্ষণ তাকিয়ে রইল সঞ্জয়ের দিকে তার পর বলল, আমি মানুষটা ভাল। কিন্তু তুই আমার চেয়েও ভাল।

সেটা কথা না পল্লব। আমি তো তোকে শুরু থেকেই বলছি, বিপদটা আমার একার নয়। এ বিপদ অনেকের। বাই চান্স অমিয় সেটায় জড়িয়ে পড়েছে। আর আমি তো কোনও ইঙ্গিতই পাচ্ছিলাম না যে বিপদটা কোন দিক দিয়ে আসতে পারে। সেটার যখন একটা সূত্র পাওয়া গেছে তখন আর পুরনো কথা মনে রেখে সেটাকে অগ্রাহ্য করা মূর্খামি হতো। তা ছাড়া অমিয় তো আমাদের বন্ধু। আমি আজও ওকে ভালবাসি। যতই রাগ করিস না কেন, আমি জানি তুইও বাসিস।

উত্তর দিল না পল্লব। গাড়িটাকে ঠেলে দিল ফিফথ গিয়ারে। নিউটাউনের প্রশস্ত রাস্তায় হু হু করে ছুটতে লাগল পল্লবের নতুন স্যান্ট্রোটা।

অমিয়র ফোনটা এসেছিল এগারোটা নাগাদ। গত রাতে সঞ্জয়ের ঘুমোতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। অনেক কষ্টে ঘুম এসেছিল ভোরের দিকে। পল্লবও জেগে ছিল সঞ্জয় না ঘুমনো অবধি। ফলে আজ উঠতে একটু বেলা হয়েছিল। বেলা করেই তাই ব্রেকফাস্ট করছিল দু'জনে। তখনই বেজে উঠেছিল পল্লবের ফোনটা। আননোন নম্বর দেখে প্রথম বার ধরেনি পল্লব। মিনিট পাঁচেক বাদে সেই একই নম্বর থেকে আবার ফোন। এ বার ফোনটা রিসিভ করেছিল পল্লব, হ্যালো, কে বলছেন?

উল্টোদিক থেকে উত্তর এসেছিল, পল্লব, আমি অমিয় বলছি।

প্রায় তিরিশ সেকেন্ড চুপ করে থেকেছিল পল্লব। তার পর কঠিন গলায় বলে উঠেছিল, সরি রং নাম্বার।

ফোনটা কেটে দিতে যাবে, ও পার থেকে ভেসে এসেছিল অমিয়র আর্তি, পল্লব প্লিজ, ফোনটা কেটে দিস না। পল্লব। আমি জানি এটাই তোর নম্বর। আমি তিতাসের কাছ থেকে তোর নম্বরটা জোগাড় করেছি।

তিতাস নামটা শুনে থমকে গেছিল পল্লব। মানুষের মনস্তত্ব বড়ই জটিল। একই সাথে একাধিক অনুভূতির খেলা চলে তার অবচেতনে। অমিয়র গলা শুনে যেমন অতীত থেকে একরাশ অভিমান আর রাগ উঠে এসে ফোন কেটে দিতে চেয়েছিল তেমনই তিতাস নামটা শুনে অন্য এক সম্ভাবনায় পুলকিত হয়ে উঠেছিল পল্লবের হৃদয়। অমিয় তিতাসের থেকে তার নম্বর পেয়েছে! তার মানে তিতাসের সঙ্গে অমিয়র যোগাযোগ আছে। অমিয়র সূত্র ধরে তবে কি এক বার হলেও তিতাসের দেখা পাওয়া যাবে? তিন বছর বড় কম সময় নয় কিন্তু একটা মানুষকে ভুলে যাওয়ার পক্ষে খুবই কম। আসলে মনে রাখা যত সোজা, ভুলে যাওয়া তত সোজা নয়। পল্লবের সমস্ত সত্তা জুড়ে আজও তিতাস অমলিন। এখনও বিকেলবেলা পশ্চিমের জানলাটার কাছে দাঁড়ালেই পল্লবের মনে হয়, তিতাস তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে। এখুনি পেলব করতলে চেপে ধরবে তার চোখ। তিতাসের চুলের সুবাসে মেদুর হয়ে উঠবে হলুদ বিকেল। চোখ থেকে হাত সরিয়ে পল্লব ঘুরে তাকাবে তিতাসের দিকে। কনে দেখা আলোয় তিতাসকে মনে হবে যেন বিকাশবাবুর অয়েল পেইন্টিং। ঘোর লেগে যাবে পল্লবের চোখে। তিতাস বলবে, কী দেখিস অমন করে?

পল্লব ফিসফিস করে বলবে, দিস ইজ নট রিয়ালিটি। এই কনে দেখা আলোয় তুই আমার সামনে এলেই আমার সব গুলিয়ে যায়। তখন আর তুই আমার ডাইমেনশনে বিলং করিস না। রিয়াল আর সাবরিয়ালের মধ্যে কেমন যেন ভেসে বেড়াস তুই।

উপমাতীত এক আশ্চর্য সুন্দর হাসি ফুটে উঠবে তিতাসের দু'চোখে। লঘু কণ্ঠে সে বলবে, তাই বুঝি?

তার পরই সে এগিয়ে আসবে পল্লবের দিকে। দু'হাতে খুলে দেবে পল্লবের শার্টের প্রথম চারটি বোতাম। উন্মুক্ত করে দেবে পল্লবের বুক। তার ডান হাত পল্লবের নাভি ছুঁয়ে ক্রমশ নেমে যাবে গভীরে আর অসহায় পল্লবের বাম স্তনবৃন্তটি কামড়ে ধরে সে বলে উঠবে, দিস ইজ রিয়ালিটি।

এর পরে যদি পল্লব মরে গিয়ে থাকে তবে কি তাকে দোষ দেওয়া যায়!

এই সমস্ত মৃত্যুগুলোই একত্রিত হয়ে পল্লবকে ফোনটা কাটতে দিল না। পল্লব বলে উঠল, ফোন করেছিস কেন?

জেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে স্বর্গরথের অ্যাক্সিডেন্ট এবং চরণ ডোমের মুখে শোনা চুল্লির ভিতর থেকে বডি উধাও হয়ে যাওয়া অবধি সবটাই পল্লবকে খুলে বলেছিল অমিয়। তিতাসের সঙ্গে তার কী ভাবে দেখা হয়ে গেছে তাও বলেছিল এবং সব কিছুর পর বলেছিল, আমার মন বলছে, এগুলো সব গেনুর কীর্তি। সঞ্জয়ের সঙ্গে একটু যোগাযোগ করিয়ে দিবি?

গলাটা ফের কঠিন হয়ে গেছিল পল্লবের, কেন? তোর কী ধারণা সঞ্জয় গেনুকে দিয়ে এগুলো করাচ্ছে?

ফোনটা আসার পরেই পল্লবের অভিব্যক্তির বদল দেখে ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল সঞ্জয় কিন্তু কোনও প্রশ্ন করেনি। এ বার একই সঙ্গে তার আর গেনুর নাম উচ্চারিত হতে দেখে বিস্ময়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল সে। হাতের ইশারায় তাকে বসতে বলেছিল পল্লব। ততক্ষণে ওপার থেকে অমিয় কাতর গলায় বলে উঠেছিল, না না। তুই আমাকে ভুল বুঝছিস পল্লব। আমি কি পাগল যে ভাবব সঞ্জয় এগুলো করাচ্ছে?

সে বার যখন ভাবতে পেরেছিলি, এ বার না ভাবার কী আছে? নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ ঝরে পড়েছিল পল্লবের গলায়।

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর অমিয় বলেছিল, ভুল করেছিলাম পল্লব। সে অপরাধবোধ আজও আমি বয়ে বেড়াচ্ছি। হয়তো এটাই সঞ্জয়ের কাছে আমার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ।

একটু ভেবে পল্লব বলেছিল, তোর কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে অমিয় বাট ক্যান আই ট্রাস্ট ইউ? তুই তো পুলিশ, এই কেসগুলোর সঙ্গে মিশিয়ে তুই সেই পুরনো কেস খুঁচিয়ে তুলবি না তার কী গ্যারান্টি আছে?

আবার খানিকটা সময় নিয়েছিল অমিয়। পুরনো বন্ধুর কশাঘাতে রক্তক্ষরণ সামলাতে যতটা সময় নেওয়া উচিত, ততটা সময় নিয়েই বলেছিল, প্রথমত ওই কেসে সঞ্জয় বেকসুর খালাস পেয়ে গেছিল। আদালতে প্রমাণিত হয়েছিল ওটা দুর্ঘটনা। দ্বিতীয়ত

কথা কেটে পল্লব বলেছিল, না না, ও সব আমায় শোনাতে আসিস না। পুলিশ সব পারে। আমি স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি অমিয়, সঞ্জয়কে নিয়ে কোনও রকম টানাটানি কিন্তু আমি বরদাস্ত করব না।

বড় করুণ শোনাচ্ছিল অমিয়র গলাটা। সে বলেছিল, আমাকে একটা চান্স দিয়েই দেখ না।

বেশ। আমি সঞ্জয়ের সাথে কথা বলে তোকে জানাচ্ছি।

ফোন রেখে সঞ্জয়ের দিকে ঘুরে বসেছিল পল্লব। অবিশ্বাসের গলায় সঞ্জয় বলেছিল, এত দিন পরে অমিয়? কেন? আর সেই সব পুরনো কথা এখন তা ছাড়া গেনু এর মধ্যে কোথা থেকে এল? গেনু কী করেছে?

অমিয়র থেকে যা শুনেছিল তার সবটাই সঞ্জয়কে খুলে বলেছিল পল্লব। তার পর বলেছিল, এবার তোর ডিসিশন। তুই কি এ সবের মধ্যে জড়াতে চাস?

এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি সঞ্জয়। পুরোটা মন দিয়ে শুনছিল। এ বার উত্তেজিত গলায় বলে উঠেছিল, জড়াতে চাই মানে? আমি অলরেডি জড়িয়ে গেছি পল্লব। আমার মন বলছে, গেনুর না আসা, মামির কান্না, ওই শিস, মেয়েটির চিৎকার এবং এই একের পর এক মৃতদেহ উধাও হয়ে যাওয়া এগুলোর মধ্যে একটা না একটা যোগসূত্র আছে। মামি বলেছিল না ভয়ানক বিপদ আসতে চলেছে। ওই যোগসূত্রটা খুঁজে পাওয়া গেলে হয়তো এই বিপদ আটকানো যাবে। তুই অমিয়কে ফোন কর। বল, আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই। আমাকে সবটা আরও ডিটেলে জানতে হবে।

সঞ্জয় এখানেই আছে শুনে অমিয় বলেছিল, আজ সন্ধে ছ'টা নাগাদ তোরা বারাসাতে আসতে পারবি? আমি তার মধ্যে সব কাজ সেরে রাখব। রাতে আমার এখানেই থেকে যাস।

পল্লব বলেছিল, থাকতে পারব কি না জানি না, তবে আসব। দেখা হচ্ছে।

বেশ। দেরি করিস না কেমন?

আজকাল এয়ারপোর্ট এক নম্বর গেটের কাছে বেশ জ্যাম হয়। ভিআইপি রোড এখানে যশোর রোডের সঙ্গে মিশেছে তাই গাড়িঘোড়ার চাপটা সব সময়ই বেশি থাকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সঞ্জয় বলল, অন টাইম আছি তাই না?

পল্লব বলল, হ্যাঁ। এখন তো পাঁচটা কুড়ি। জ্যামে না পড়লে ছ'টার আগেই বারাসাত থানায় ঢুকে যাব। যশোর রোড ধরে তো বেশিক্ষণ না।

জ্যামটা সবে ছেড়েছে। টুকটুক করে এগোচ্ছে গাড়িগুলো। এমন সময় বেজে উঠল পল্লবের ফোন। এতক্ষণে অমিয়র নম্বরটা সেভ করে নিয়েছে পল্লব। গাড়ির ব্লুটুথে ফোন কানেক্ট করাই ছিল। স্পিকার অন করে বলল, বল। আমরা এয়ারপোর্ট ক্রস করলাম।

অমিয় বলল, শোন না, আমি একটু ফেঁসে গেছি। এখুনি ওসি সাহেব বললেন ডিএম-এর সঙ্গে একটা মিটিং আছে। আমায় সেটা অ্যাটেন্ড করতে হবে।

মানে? আমরা কি তবে ফিরে যাব?

আরে না না। ঘণ্টাখানেকের মিটিং। আমি বাই সাতটা ফিরে আসব। ততক্ষণ প্লিজ একটু ওয়েট করিস। আমি এ এস আই দীপক পালকে বলে যাচ্ছি। উনি তোদের রিসিভ করবেন। চিন্তা করিস না, পালদা খুবই ভাল মানুষ। ওনাকে বলেছি, তোরা আমার বন্ধু। তোদের কোনও অসুবিধে হবে না। আমি অ্যাসাপ চলে আসব। প্লিজ কিছু মনে করিস না।

না না ঠিক আছে। তুই আয়। আমরা থাকব।

সোজা থানাতেই আসিস কিন্তু। পালদা তোদের জন্য ওয়েট করছেন।

ওকে।

প্রথম দর্শনেই দীপক পালকে ভারী পছন্দ হয়ে গেল ওদের দু'জনের। দীপক পাল বললেন, থানার মধ্যে ওয়েট করে লাভ নেই। থানা হল চোর ছ্যাঁচোড়দের জায়গা। ওখানে ভদ্রলোকেদের মানায় না। তার চেয়ে চলুন, পাশেই বারাসাত স্টেডিয়াম। ফুরফুর করে হাওয়া দেবে। ওখানেই চা খেতে খেতে স্যারের জন্য অপেক্ষা করা যাবে। আর হ্যাঁ শুনুন, আপনাদের বন্ধু আমাকে পালদা বলে ডাকেন। আপনারাও তাই ডাকবেন। কেমন?

পল্লব হেসে বলল, বেশ। তবে তাই হোক।

গাড়িটা থানার মধ্যে পার্ক করে রেখে ওরা তিন জন মিলে এগিয়ে চলল স্টেডিয়ামের দিকে। দীপক পাল বলতেই দারোয়ান গেট খুলে দিল। লম্বা সেলাম ঠুকল। পল্লবদের দেখিয়ে দীপক পাল দায়োয়ানকে বললেন, মেজোবাবুর কলেজের বন্ধু। কলকাতা থেকে এসেছেন। সামনের চায়ের দোকানে বলে এসো তো ভাল করে তিনটে স্পেশাল চা বানাতে।

দারোয়ান ছুটল চায়ের কথা বলতে। পায়ের নীচে সবুজ গালিচার মতো ঘাস। সে দিকে দেখিয়ে দীপক পাল বললেন, ঘাসে বসতে আপত্তি নেই তো?

চোখাচোখি হল পল্লব আর সঞ্জয়ের। মৃদু হেসে পল্লব বলল, একটা সময় দিনের বেশির ভাগটাই এই ঘাসের ওপর বসে কেটে যেত। বিশেষ করে শীতকালগুলো। দশটা নাগাদ কলেজে ঢুকে সেই যে প্রেসিডেন্সির মাঠে রোদে পিঠ পেতে বসতাম, শিকড় গজিয়ে যেত। শেষমেশ রাত আটটা নাগাদ পাপ্পুদার তাড়া খেয়ে হস্টেল ফিরতাম।

ঘাসের ওপর বসতে বসতে দীপক পাল বললেন, স্যারের কাছে আপনাদের কলেজের অনেক গল্প শুনেছি। এক বার কলেজের কথা শুরু হলে স্যার আর থামতেই চান না। আপনাদের চার জনের কথাও অনেক শুনেছি। তা সুপ্রতিমবাবু এলেন না?

চমকে উঠল পল্লব আর সঞ্জয়। তার পর দীপক পালের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে পল্লব বলল, না। ও আসতে পারেনি।

অমিয় যে গল্পগুলো দীপক পালকে বলেছে সেই গল্পের সময়কাল আজ থেকে দশ বারো বছর আগের। দীপক পালের কাছে তাই প্রেসিডেন্সি কলেজ সেই সময়েই থমকে আছে। তখনও তো হিন্দু হস্টেলের ছাদে পল্লব, অমিয়, সঞ্জয় আর সুপ্রতিম নিয়মিত আড্ডা দিচ্ছে। কোয়াডে জমে উঠছে তর্ক, ক্যান্টিন ভেসে যাচ্ছে সুমনের গানে। কত আঙুল জড়িয়ে যাচ্ছে কত আঙুলের সাথে। কত না বলা বাণীর ব্যাকুলতা নিয়ে বেজে উঠছে গিটার আর হারমোনিকা। সুপ্রতিম তখন মেন বিল্ডিং এন্ড থেকে ছয় মেরে পার করে দিচ্ছে ডিরোজিও হলের ছাদ।

অমিয় হয়তো ইচ্ছে করেই সবটা বলেনি দীপক পালকে। ওরাও ভুলটা ভাঙাল না। কিছু কিছু ভুল না ভাঙানোই থাক।

চা নিয়ে এল একটা বাচ্চা ছেলে। ছেলেটা খুবই ছোট। বয়স খুব জোর সাত কি আট। খুব রোগা কিন্তু ভারী সুন্দর মুখখানা। মায়াভরা বড়বড় দু'টো চোখ। ছেলেটাকে দেখেই রেগে গেলেন দীপক পাল। বললেন, এরা আবার বাচ্চাদের দিয়ে খাটাচ্ছে! দাঁড়ান তো, গেলাস ফেরত দেওয়ার সময় আচ্ছা করে ঝাড়ব। যা তুই চলে যা। বলবি, আমরা গেলাস ফেরত দিয়ে দেব। তখনই দাম দিয়ে দেব।

কথা না বাড়িয়ে বাচ্চাটা চলে গেল। বাচ্চাটার গমনপথের দিকে তাকিয়ে আনমনা গলায় সঞ্জয় বলে উঠল, এই চাইল্ড লেবার ব্যাপারটাই খুব গোলমেলে।

দীপক পাল বললেন, সত্যিই তাই। বাচ্চাটার কপাল খারাপ। গরিব দেশে জন্মেছে, তাই ইশকুলে না গিয়ে আমাদের চা দিতে হচ্ছে। মালিকের সাথে কথা বলব। দেখি যদি বাচ্চাটার কিছু একটা গতি করতে পারি।

পল্লব অবাক হল, কী গতি করবেন?

দীপক পাল হাসলেন, ওই আর কী? ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দেব। এখানে যা টাকা পায় সেটা ওর মা বাপের হাতে দিয়ে দেব মাসে মাসে। তা হলেই আর পড়াতে আপত্তি করবে না।

অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল পল্লব আর সঞ্জয়। পল্লব বলল, অদ্ভুত মানুষ তো আপনি! কিন্তু এমন করে ক' জনের জন্য করবেন?

একটু হাসলেন দীপক পাল, যতটুকু আমার সামর্থ্য। একটা পয়েন্টের পরে তো আর পেরে উঠব না, তখন হাত জোড় করে বলব, মাপ কর বাপ। তোরটায় এসে আটকে গেছি। আসলে কী বলুন তো, আমার খালি মনে হয় আমার মেয়ে মিতুল সেও যদি এমন গরিব ঘরে জন্মাত তারও তো এই অবস্থা হতো। তাই না?

সঞ্জয় বলল, অনেকটা শ্রদ্ধা বেড়ে গেল আপনার ওপর। আজকালকার দিনে ক'জন ভাবে এমন করে?

উৎকণ্ঠিত হলেন দীপক পাল, আরে না না। ও সব কিছু না, তার পর হেসে বললেন, আমি খুব কর্মফলে বিশ্বাস করি জানেন তো? আমি বিশ্বাস করি, এ জন্মের কর্মফল এ জন্মেই চুকিয়ে যেতে হয়। তাই ভাল কিছু করার চেষ্টা করি যাতে কেস না খাই।

পল্লব কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই দীপক পালের ফোন বেজে উঠল। দীপক পাল বললেন, মনে হয়ে স্যারের হয়ে গেছে। বুঝলেন?

কিন্তু ফোনটা বার করেই নেতিবাচক মাথা নাড়লেন তিনি, স্যার নয়। হোম মিনিস্টার।

থানার এ এস আই-এর কাছে হোম মিনিস্টারের ফোন! ব্যাপারটা বুঝতে দু'সেকেন্ড সময় লাগল ওদের। তার পর হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটের কোণায়। ফোন ধরে দীপক পাল বললেন, বলো গিন্নি।

একতরফা কথা শুনতে পাচ্ছিল ওরা। দীপক পাল বলছিলেন, আরে ফেরেনি তো কী? ফিরে আসবে। এত চিন্তা করো কেন? উঠতি বয়েসের মেয়ে একটু এদিক ওদিক যাবে না। ঠিক আছে রাখো তুমি। আমি দেখছি।

পল্লব বলল, কী ব্যাপার পালদা? এনিথিং রং?

দীপক পাল বললেন, আরে না না। আমার গিন্নি অতিরিক্ত টেনশন করে। ছ'টা বেজে গেছে, মেয়ে কেন এখনও ফেরেনি তাই নিয়ে চিন্তিত। পাঁচটায় কলেজ ছুটি হয়। হয়তো একটু গল্পগুজব করছে। আসলে ফোনটা বন্ধ দেখে ভড়কে গেছে। চলুন তো, একবার কলেজ থেকে ঢুঁ মেরে আসি। এই তো সামনেই। বারাসাত গভর্নমেন্ট কলেজ।

চায়ের ফাঁকা গেলাসগুলো হাতে নিয়ে ওরা বেরিয়ে এল স্টেডিয়াম থেকে। স্টেডিয়ামের উল্টোদিকেই চায়ের দোকানটা। ওদেরকে খালি গেলাস হাতে আসতে দেখে মালিক একেবারে হাঁ হাঁ করে এগিয়ে এল, আপনারা কেন খালি গ্লাস নিয়ে এলেন স্যার? ওখানেই রেখে দিতেন।

হ্যাঁ, বাচ্চাটাকে আবার খাটাতিস, কথা শেষ করতে দিলেন না দীপক পাল।

দোকানের মালিক যেন আকাশ থেকে পড়ল, বাচ্চা! বাচ্চা কোথায় পেলেন স্যার?

ধমকে উঠলেন দীপক পাল, ন্যাকা সাজছিস না কি? কার হাত দিয়ে চা পাঠিয়েছিলি তুই?

কেন স্যার? আমার হেল্পার ভানুর হাতে। ওই তো চা দিয়ে আসে। কিন্তু ভানু তো বাচ্চা নয়। দামড়া মাল।

খুবই অবাক হল ওরা। দীপক পাল চোখ সরু করে বললেন, তোর দোকানে একটা সাত আট বছরের মিষ্টি মতো ছেলে কাজ করে না?

দু'হাতে কান ধরল দোকানের মালিক, মায়ের দিব্যি স্যার। থানার উল্টোদিকে দোকান করে বাচ্চা লেবার রাখব? আমার কি মাথাফাতা খারাপ?

একটু থমকে গেলেন দীপক পাল। তার পর বললেন, তা হলে তোর ওই হেল্পারটাই গুপি করেছে। সে আবার হেল্পার রেখেছে। হেল্পারের হেল্পার। লুঙ্গির বুকপকেট। ডাক ব্যাটাকে।

মালিক বলল, স্যার, ওকে তো একটু আগে ছুটি দিয়ে দিলাম। মায়ের অসুখ বলছিল। কাল তো আসবে স্যার। আমি নিজে কান ধরে ওকে আপনার সামনে হাজির করব। যদি ও এ কাজ করে থাকে ওকে দিয়ে আপনার জুতো চাটাব স্যার।

ঠিক আছে। কাল ওকে নিয়ে আসবি। আসুন। এ দিকে কলেজ।

পথ দেখিয়ে ওদের কলেজের সামনে নিয়ে এলেন দীপক পাল কিন্তু এসেই চমকে উঠল ওরা। কলেজ একেবারে শুনশান। গেট বন্ধ ভিতর থেকে। বাইরে থেকে যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে ভেতরে কোনও ছাত্রছাত্রী নেই।

আপন মনেই বলে উঠলেন দীপক পাল, কী হল ব্যাপারটা? তার পর দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন গেটের কাছে। মোটা লোহার শেকলের সঙ্গে তালা আটকানো। সেটা ধরে ঝাঁকিয়ে ডাক দিলেন, সিকিওরিটি। সিকিওরিটি।

সিকিওরিটি এজেন্সির পোশাক পরা একজন মাঝবয়সি গার্ড তড়িঘড়ি এগিয়ে এল ভেতর থেকে, কী ব্যাপার স্যার?

এখনই কলেজ এমন শুনশান কেন? পাঁচটায় তো ছুটি হয়। ছেলেপুলে কই?

গার্ড বলল, কলেজের একজন প্রাক্তন প্রিন্সিপাল মারা গেছেন স্যার। কলেজ তো আজ দেড়টায় ছুটি হয়ে গেছে।

পল্লব আর সঞ্জয় দেখল, মুহূর্তের মধ্যে একরাশ টেনশন এসে ভর করল দীপক পালের সদাহাস্যময় মুখটায়। রীতিমতো বিপন্ন গলায় তিনি বলে উঠলেন, সে কী! তা হলে মিতুল কোথায় গেল!

সুদেবকে লোকটার সন্ধান দিয়েছিল ধনা। ধনা পাতাখোর। নেশার ঝোঁকে ঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র ফুঁকে দিয়েছে। এখন নেশা করার জন্য ধনাকে তাই চুরি করতে হয়। চুরি করতে করতে সে অনেক অন্ধিসন্ধি জেনে ফেলেছে। শ্মশানে, কবরে ঘুরে ঘুরে অনেক তান্ত্রিকমান্ত্রিকের সাথেও তার হেভি জান-পহেচান হয়ে গেছে। সে জন্যই ধনার শরণ নিয়েছিল সুদেব। কারণ সে জানত, গায়ের জোরে তন্ময়ের সাথে পারবে না। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত তন্ময়ের কোনও ক্ষতি করতে পারছে ততক্ষণ ঘুম হবে না সুদেবের।

সুদেব তোতলা। একটু না, ভয়ানক রকমের তোতলা। নিজের নামটা অবধি একবারে পুরোটা বলতে পারে না। কখনও সু-তে তার জিভ আটকে যায়, কখনও বা দে-তে। আর এমন জেদি নাছোড়বান্দা জিভ যে কিছুতেই তাকে টাকরা থেকে টেনে নামানো যায় না। এ নিয়ে সবাই তাকে খেপায়। সুদেব ভেবেছিল, স্কুলের পরে তাকে আর এই অপমান সহ্য করতে হবে না, কিন্তু কলেজে উঠেও অবস্থার কিছু হেরফের হল না। বরং এই অপমান আর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে গেল। কলেজের সহপাঠীরা তো একটা মক ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করেছিল যেখানে সুদেবের জন্য দোভাষী নিয়োগ করা হচ্ছিল। আসলে সুদেবকে নকল করে কে কতটা তোতলাতে পারে এ তারই একটা কদর্য খেলা। তাও মানিয়ে নিয়েছিল সুদেব কিন্তু গত শুক্রবার যে ঘটনাটা ঘটল তার পর থেকেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এর শেষ দেখে তবে ছাড়বে।

সুদেব বারাসাত গভর্নমেন্ট কলেজে হিস্টরি অনার্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তাদের ক্লাসের মৌপিয়াকে তার বরাবর ভাল লাগে। তা ক' দিন ধরেই ফিলজফি ডিপার্টমেন্টের একটা ছেলে তন্ময়, মৌপিয়ার সঙ্গে খুব ঘুরঘুর করছে দেখে সুদেব আর সময় নষ্ট করতে চায়নি। তার ওপর এই তন্ময় আবার ইউনিয়নের পান্ডা। বুলেট চালিয়ে কলেজ আসে। তাই মৌপিয়া একেবারে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আগে সে এক বার নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে চেয়েছিল। শুক্রবার টিফিনের সময় এক তোড়া লাল গোলাপ হাতে হাজির হয়েছিল মৌপিয়ার সামনে। মৌপিয়া প্রথমে একটু থমকে গেছিল তার পর হাসির রেখা ফুটে উঠেছিল তার ঠোঁটের কোণে। সে বলেছিল, তুই আমাকে ভালবাসিস সুদেব?

মৌপিয়া তার উপহার প্রত্যাখ্যান করেনি, উল্টে নিজে থেকে ভালবাসার কথা বলেছে! কৃতার্থ হয়ে গেছিল সুদেব। জোরে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল। মৌপিয়া বলেছিল তরল গলায়, তা হলে আমাকে এক বার আই লাভ ইউ বল।

সুদেব বলতেই চেয়েছিল। বুকের ভেতর থেকে আই লাভ ইউ বলতে চেয়েছিল, কিন্তু মোক্ষম সময়ে বিট্রে করল তার চিরকালের শত্রু জিভটা। আই-টা সে চমৎকার ভাবে বলে ফেলল। কিন্তু সেই যে লা-তে জিভ টাকরায় আটকাল আর নীচে নামল না। মৌপিয়ার বন্ধুরা তখন খিলখিলিয়ে হাসছে।

চোখে জল এসে গেছিল সুদেবের, মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কেন? সে তোতলা বলে কি তার ভালবাসার অধিকার নেই! মাথা নিচু করে সেখান থেকে সরে এসেছিল। চুপচাপ গিয়ে বসেছিল মাঠের এক কোণে। মনে মনে ভাবছিল, এমন জিভ রাখার চেয়ে কেটে ফেলা ভাল। তখনই দলবল নিয়ে হাজির হয়েছিল তন্ময়। কলার ধরে এক ঝটকায় সুদেবকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তন্ময় বলেছিল, আমার গার্লফ্রেন্ডের দিকে নজর দিচ্ছিস কুত্তার বাচ্চা?

সুদেব কিছু একটা বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তার আগেই তন্ময়ের ঘুষি খেয়ে উল্টে পড়েছিল কাদার মধ্যে। সেই অবস্থাতেই তার পিঠের ওপর পা চাপিয়ে তন্ময় বলেছিল, ফের যদি কোনও দিন আমার গার্লফ্রেন্ডের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছিস তোর চোখ আমি গেলে দেব শালা হাফটিকিট তোতলা। ফোট শালা।

পাঁজরার ওপর কষিয়ে একটা লাথি মেরে দলবল নিয়ে চলে গেছিল তন্ময়। কাদার ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থেকেই সুদেব অনুভব করেছিল, মুখের ভিতরটা নোনতা লাগছে। চিরকালের শত্রু জিভটা দিয়ে সেই রক্ত চেটে নিতে নিতে সুদেব প্রতিজ্ঞা করেছিল, এর শোধ সে নেবেই। তাই ধনাকে গিয়ে বলেছিল, আমাকে এমন কারও একটা সন্ধান দে যে মারণ, উচাটন, বশীকরণ এই সব জানে।

ধনা অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, খেয়েছে! তাই দিয়ে তুই কী করবি?

সুদেব বলেছিল, তোর তাতে কী? তুই জানিস কি না বল।

এই বলে ধনার হাতে একটা পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিয়েছিল সুদেব। ধনার চোখটা চকচক করে উঠেছিল। টাকাটার গন্ধ শুঁকে বলেছিল, বারাসাত স্টেশনের পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মের একদম শেষে জঙ্গল মতো একটা জায়গা আছে না? ওখানে মাঝেমাঝে একটা বুড়োমতো ভিখিরি বসে থাকে দেখবি...

আমার ভিখিরি চাই না। তান্ত্রিক চাই, ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল সুদেব।

আরও বেশি ঝাঁঝিয়ে উঠে ধনা বলেছিল, আগে সবটা শোন ভাই। তার পর তো তো করবি।

চুপ করে গেছিল সুদেব। পাতাখোর ধনা অবধি তাকে তোতলা বলে অপমান করছে! কিন্তু এখন দরকারটা তার। চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় নেই। অন্য সময় হলে ঠাটিয়ে চড়িয়ে দিত ধনাকে। টাকাটা ভাঁজ করে পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে ধনা বলেছিল, ওই বুড়োটা আসলে ভিখিরি নয়। তান্ত্রিক। হেবি পাওয়ার।

তুই কী করে জানলি? সন্দিগ্ধ গলায় প্রশ্ন করেছিল সুদেব।

ভক্তি বিগলিত চোখে ধনা বলেছিল, সে যা দৃশ্য দেখেছিলাম ভাই! জিন্দেগিতে ভুলব না। হপ্তা দু'য়েক আগের কথা। বেশ রাত তখন। আমি স্টেশনের বাথরুমের দুটো কল খুলে পাঁচ নম্বর দিয়ে বেরিয়ে আসছি হঠাৎ কানে এল কুত্তার চিৎকার। একটু এগিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম, একটা বুড়ো মতো ভিখিরি টাইপের লোক দাঁড়িয়ে আছে আর তার সামনে তিন খানা সড়ালে কুত্তা হেবি ভোক মারছে। পারলে বুড়োটাকে এই খেয়ে নেয়। ভাই বিশ্বাস করবি না, বুড়োটা কিচ্ছু করল না, ছুটল না, ঢিল মারল না, শুধু এক নজরে কুত্তাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। আস্তে আস্তে কুত্তাগুলো চিল্লানো বন্ধ করে দিল। একটা কুত্তা এগিয়ে এসে পোষা বেড়ালের মতো মাথা ঘষতে লাগল বুড়োটার পায়ে।

ফের ধনাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছিল সুদেব, এতে অবাক হওয়ার কী আছে? যারা কুকুর ভালবাসে তাদের সামনে এমনিতেই কুকুরেরা শান্ত হয়ে যায়। পোষ মেনে যায়। কুকুররা খুব বোঝে কে ভাল আর কে খারাপ।

তরমুজের বিচির মতো কালো দাঁত বার করে হেসে উঠেছিল ধনা, সে কথা আমিও জানি রে বোকাচোদা। কিন্তু তাই যদি হতো এতক্ষণ ধরে গল্পটা তোকে বলতাম না। প্রথমে আমিও ভেবেছিলাম, কুত্তাটা পোষ মেনে বুড়োটার পায়ের কাছে এগিয়ে এসেছে। বুঝেছে, বুড়োটা খারাপ নয়। কিন্তু তার পর বুড়োটা কী করেছিল জানিস? কুকুরটার পাশে উবু হয়ে বসে পড়েছিল। মাথা নাড়তে নাড়তে বলছিল, চিল্লাফাল্লা আমার ভাল লাগে না, আর বলতে বলতে কুত্তাটার মুখের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে এক টানে ছিঁড়ে বার করে এনেছিল জিভটা। বাকি কুত্তা দু'টো তখন লেজ গুটিয়ে কী দৌড়!

ধনা হাসছিল কিন্তু ভয়ে শিউরে উঠেছিল সুদেব, এ তো পুরো সাইকো!

ধনা বলেছিল, না রে পাগলা। সাইকো না। হেবি বড় তান্ত্রিক। অমন ভিখিরি সেজে থাকে। আমি তো কাণ্ডটা দেখে সোজা পায়ে পড়ে গেছিলাম। কুত্তাদের ওপর আমার হেভি রাগ। রাতের বেলা যখন তখন পোঁদের গোড়ায় এসে ভৌ ভৌ করে। আমার কাছে গাঁজা ছিল, বাবাকে সেজে দিলাম। বাবা বলল, একটা দরকারে ক'দিন এখানে থাকবে। কাউকে বলতে বারণ করেছিল। কিন্তু তুই আমার বন্ধু। তার ওপর মাল্লু দিলি। বাবার কাছে হত্যে দে। লাক ভাল থাকলে বাবার ফেভার পেয়ে যাবি। ওই সব বশীকরণ না হাতের ময়লা।

প্রথমটায় একটু ভয়ই পেয়েছিল সুদেব কিন্তু পরে ভেবে দেখেছিল, তারও জিভে প্রবলেম এটা ঠিক কিন্তু সে তো মোটেই চেঁচায় না। বরং সে ভাল করে কথা বলতেই পারে না। আশা করা যায় তার জিভটা অক্ষতই থাকবে। সাইকেল নিয়ে গুটিগুটি স্টেশনের দিকে রওনা দিয়েছিল সে।

পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষের দিকটা বড় বড় গাছে ঝুপসি হয়ে আছে। রেল কারখানার বাতিল যন্ত্রপাতি এখানেই ডাই করে রাখা হয়। জায়গাটা একটেরে। বেশি কেউ একটা আসে না এখানে। ওখানেই লোকটাকে দেখতে পেয়েছিল সুদেব। ধনা যেমন বুড়ো বলেছিল মোটেই ততটা বুড়ো নয়। মাথার চুলগুলো সাদা হয়েছে বটে কিন্তু শরীরে ভাঙন ধরেনি। শক্তপোক্ত গাঁটওয়ালা হাত পা। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। মাথা নিচু করে বসে কী যেন বিড়বিড় করছিল। এই লোকটা যে অত বড় তান্ত্রিক এ কথা বিশ্বাস হয়নি সুদেবের। পাতাখোর ধনা নির্ঘাত উল্টোপাল্টা বলে টাকাটা গাপ করেছে। কিন্তু সাইকেলটা স্ট্যান্ড করে রেখে দু'পা এগোতেই চকিতে চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়েছিল লোকটা আর তাতেই অন্তরাত্মা অবধি শুকিয়ে গেছিল সুদেবের। মানুষের চোখে যে অমন ঘেন্না থাকতে পারে সুদেব তা কল্পনাই করতে পারে না। ওই হিমশীতল দৃষ্টি যেন সারা দুনিয়ার প্রতি উগরে দিচ্ছিল একরাশ বমি। থতোমতো খেয়ে পিছিয়ে এসেছিল সুদেব। তার বেশ ভয় ভয় করছিল। ফিরে যাবে কি না ভাবছে এমন সময় লোকটা বলে উঠেছিল, কী? ছেলেটাকে একেবারে মেরে ফেলতে চাস?

এত আশ্চর্য বহুকাল হয়নি সুদেব। লোকটা তার মনের গোপন কথা পড়ে ফেলেছে! ছুটে গিয়ে লোকটার সামনে হাতজোড় করে বসে বলেছিল, বাবা আপনি সিদ্ধপুরুষ। আমাকে দয়া করুন।

এ ক'টা কথা বলতে যথারীতি অনেকটা কসরত করতে হয়েছিল সুদেবকে। তার অবস্থা দেখে লোকটা ফ্যাক করে হেসে ফেলেছিল, তোতলাবি তো কথাটা বলবি কখন? তার পরেই আচমকা চুলের মুঠি ধরেছিল সুদেবের। ভয়ে কেঁপে উঠেছিল সুদেব। তার মনে পড়ে গেছিল কুকুরের জিভ ছেঁড়ার ঘটনাটা। সে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠেছিল, ছেড়ে দিন। ছেড়ে দিন আমায়। আমি কিছু করিনি। আমি বাড়ি যাব।

কিন্তু চেঁচাতে চেঁচাতেই সুদেব অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিল, সে আর একটুও তোতলাচ্ছে না। বেয়াড়া জিভটা আটকায়নি এক বারও। স্তব্ধ বিস্ময়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে ছিল সুদেব। হেসে বলেছিল লোকটা, এখন আর আটকাবে না।

লোকটার পায়ে মাথা খুঁড়তে খুঁড়তে সুদেব বলেছিল, আপনি আমায় ঠিক করে দিলেন বাবা? আমায় সারিয়ে দিলেন?

তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে লোকটা বলেছিল, এখনও দিইনি। যতক্ষণ আমার সাথে কথা বলবি তোর কথা আটকাবে না। এখান থেকে চলে গেলে আবার শুরু হবে তোতলামি। তবে হ্যাঁ, আমার একটা কাজ করে দিলে তোকে পুরোপুরি সারিয়ে দেব আর তোর প্রতিশোধ নেবারও ব্যবস্থা করে দেব।

উঠে বসেছিল সুদেব, বলুন বাবা। যা করতে বলবেন আমি করব।

চোখ সরু করে লোকটা বলেছিল, তোর বয়েস কত?

আজ্ঞে বাবা কুড়ি।

হুম। তোর বয়সি একটা মেয়ের সন্ধান এনে দে আমায়, যার এ বারের মাসিকটা সদ্য শুরু হয়েছে।

এমন অদ্ভুত কথা জীবনে শোনেনি সুদেব। এর থেকে তো চাঁদ এনে দেওয়া সহজ ছিল। কোন মেয়ের সদ্য পিরিয়ডস শুরু হয়েছে সে জানবে কী করে? এমনিতেই মেয়েরা তাকে পাত্তা দেয় না। সাধারণ কথাই বলে না। সেখানে পিরিয়ডস! হাঁ করে তাকিয়েছিল সে লোকটার দিকে।

সুদেবের চোখে চোখ রেখে লোকটা বলেছিল, পারবা না পারবা না?

অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে সুদেব বলেছিল, বাবা আপনি সিদ্ধপুরুষ। এ সামান্য কাজের জন্য আমায় কেন বলছেন?

গম্ভীর হয়ে লোকটা বলেছিল, মেয়েদের যখন মাসিক চলে তখন তারা আদ্যাশক্তি মহামায়ার আশীব্বাদ লাভ করে। তাদের কাছে আমি যেতে পারব না। কারণ আমার বিপরীত শক্তি। কিন্তু তুই শক্তিহীন, তুই যেতে পারবি। আর গিয়ে মেয়েটার শরীরে এটা বেঁধে দিবি।

ঝোলা থেকে লাল সুতো জড়ানো একটা কালো শুকনো শিকড়ের টুকরো বের করেছিল লোকটা। সেটা সুদেবের হাতে দিয়ে বলেছিল, আর তাতেই মেয়েটা অশুচি হয়ে যাবে। মহামায়ার আশীব্বাদ কাজ করবে না। এটুকুই তোর কাজ। বাকিটা আমি বুঝে নেব।

সুদেবের তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। একে তো জানতে হবে কোন মেয়ের সদ্য পিরিয়ডস শুরু হয়েছে, তার ওপর তার শরীরে এই শিকড় বেঁধে দিতে হবে। সুদেব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল খবরের কাগজের হেডিং, 'গণপিটুনিতে মৃত কলেজ ছাত্র'। প্রতিশোধ নেওয়ার বাসনা ত্যাগ করে শিকড়টা ফিরিয়ে দিয়ে চলে আসবে বলে সবে মনস্থির করেছে সুদেব, তখনই ভয়ঙ্কর কথাটা বলেছিল লোকটা। বলেছিল, তোর হাতে দুই দিন সময় আছে। যদি আমার এ কাজটা করে দিস তোর সব মনোবাসনা পূর্ণ করব। আর যদি কাজটা না করতে পারিস বা কাউরে এ নিয়ে কিছু বলিস তোর জিভটা ছিঁড়ে ফেলব। চিরকালের মতো বোবা হয়ে যাবি।

ভূতগ্রস্তের মতো স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসেছিল সুদেব। সে বুঝতে পারছিল, খুব বড় একটা ফাঁদে পড়ে গেছে কিন্তু এই জাল কেটে বেরবার সাধ্য তার নেই। পাশাপাশি আর একটা সম্ভাবনাও তাকে লোভী করে তুলছিল, এই কাজের বিনিময়ে যদি সারাজীবনের মতো তার তোতলামি সেরে যায় তা হলে এটুকু রিস্ক তাকে নিতেই হবে। এতে সে সুস্থও হবে এবং এই লোকটার হাত থেকেও মুক্তি পাওয়া যাবে। শেষমেশ লোভটাই জয়ী হল। সুদেব ঠিক করে ফেলল, যে করে হোক এমন একটা মেয়ের খোঁজ পেতেই হবে। কিন্তু মেয়েটাকে নিয়ে কী করবে লোকটা? যা খুশি করুকগে। সেটা সুদেবের মাথা ব্যথা নয়। আগে তো নিজের প্রাণটা। পরে অন্য কিছু।

এই সব ভাবতে ভাবতেই সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল সুদেব। পাড়ার মুখেই বাবার সাথে দেখা। হাতে দুশো টাকা ধরিয়ে বাবা বলল, তোর মায়ের প্রেশারের ওষুধটা ফুরিয়েছে। আমি তাস খেলতে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম ফেরার পথে নিয়ে যাব। কিন্তু যদি দোকান বন্ধ হয়ে যায়! তুই তো বাড়ি ফিরছিস, ওষুধটা নিয়ে যা তো।

ওষুধ কিনে টাকা মেটাচ্ছে সুদেব তখনই পাশের কাউন্টারে এসে দাঁড়াল মেয়েটা। শ্যামশ্রী, ডাকনাম মিতুল। এ পাড়াতেই থাকে। সুদেবদের ডিপার্টমেন্টেই পড়ে। বাবা পুলিশ বলে হেবি ঘ্যাম। এক পাড়ায় থাকে অথচ কোনও দিন সুদেবের সাথে কথা বলেনি। সে দিন যখন মৌপিয়া তাকে হেনস্থা করছিল, এ মেয়েটাও দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসেছিল। সব দেখেছে সুদেব। কিছুই তার নজর এড়ায়নি।

খুচরো ফেরত নিয়ে সবে পেছন ফিরেছে সুদেব তখনই মিতুলের কথাটা কানে এল। মিতুল চাপা গলাতেই বলেছে, তবু কান এড়ায়নি তার। মিতুল প্যাড কিনতে এসেছে। এক মুহূর্তের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করে ফেলেছিল সুদেব।

আজ কলেজে গিয়েই নিচু হয়ে পেন কুড়োনোর অছিলায় মিতুলের ব্যাগের একটা খোপে ভরে দিয়েছিল লাল সুতো বাঁধা শিকড়ের টুকরোটা। তার পর আর সে কিছু জানে না। কলেজ হাফ ছুটি হওয়ার পর সে স্টেশনে গেছিল কিন্তু গিয়ে লোকটাকে আর খুঁজে পায়নি। সে জানেও না, এই শিকড়ের সাথে মিতুলের বাড়ি না ফেরার কোনও সম্পর্ক আছে কি না!

থানায় বসে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিল সুদেব। এ বার চোখ মুছে বলল, একটু জল দেবেন স্যার?

ইন্টারোগেশন রুমে একটা চেয়ারে বসেছিল সুদেব। তার মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসেছিল অমিয়। পেছনে দাঁড়িয়েছিল পল্লব আর সঞ্জয়। একটু দূরে অন্য একটা চেয়ারে দু'হাতে মুখ ঢেকে বসেছিলেন দীপক পাল। সুদেবের কথাটা শুনে অমিয় উঠে দাঁড়াল। পুলিশি গাম্ভীর্যে বলে উঠল, নষ্ট করার মতো সময় নেই পালদা। গেট আপ। পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ফোর্স পাঠিয়ে দেখুন ওই লোকটাকে পান কি না। যদিও পাওয়া যাবে না বলেই মনে হচ্ছে তবু এই মুহূর্তে আমি কোনও লুপহোল ছেড়ে যেতে চাই না। আর ওই ধনাকে আমার চাই। বাই ওয়ান আওয়ার। ক্লিয়ার?

দীপক পাল উঠে দাঁড়ালেন। টুপিটা ঠিক করে স্যালুট ঠুকে বললেন, ইয়েস স্যার, আর ছুটে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বিপন্ন বাবা থেকে এই মুহূর্তে তিনি দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন পুলিশ অফিসারে রূপান্তরিত হয়েছেন। তখনই আবার কাঁদতে কাঁদতে সুদেব বলল, আমাকে বাঁচান স্যার। ওই লোকটা আমার জিভ ছিঁড়ে নেবে বলেছে।

অমিয় ঘুরে তাকাল সুদেবের দিকে। তার পরেই প্রচণ্ড এক চড়ে তাকে উল্টে ফেলে দিল চেয়ার থেকে।

রাত ন'টা বেজে যেতেও মিতুল যখন ফিরল না তখনই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল অমিয়। এর আগেই মিতুলের ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে দেখা গেছিল সেটা দুপুর তিনটে নাগাদ কাজিপাড়ার কাছাকাছি একটা জায়গায় গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। সবাই ছুটেছিল সেখানে। একটা বড় আমবাগান। তন্নতন্ন করে খুঁজেও মিতুলের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অসহায় হয়ে পড়েছিলেন দীপক পাল। তাকে সামলাচ্ছিল পল্লব আর সঞ্জয়। তখনই অমিয় বলেছিল, এক্ষুনি মিতুলের সব ক্লাসমেটকে থানায় নিয়ে আসুন পালদা। মহিলা পুলিশ নিয়ে যাবেন। আমার মেয়েদেরও চাই। কাউকে বাদ দেবেন না আর কারও বাবা-মাকে আসতে দেবেন না। বলবেন, কথা বলা হয়ে গেলে আমরাই ওদের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব। আমি ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলে এস পি সাহেবের থেকে স্পেশাল অর্ডার পাস করাচ্ছি। আপনি রেডি হোন।

থানার বাইরে ভিড় করেছিল পঞ্চাশ জন উদ্বিগ্ন ছেলেমেয়ে। তাদের এক এক করে জেরা করা শুরু করেছিল অমিয়। জেরা বলা ভুল, সোজা থ্রেট করছিল তাদের। পদ্ধতিটায় কাজ হল সে তো দেখাই যাচ্ছে। এখনও জনা পনেরো ছেলেমেয়ে বাকি, তার আগেই ভয় পেয়ে সুদেব সবটা বলে দিয়েছে।

অমিয়র ঘরে বসে ছিল ওরা তিন জন। দীপক পাল ফোর্স নিয়ে ধনার খোঁজে বেরিয়েছেন। ইতিমধ্যেই বারাসাত থানায় আরও একটা মৃতদেহ উধাওয়ের অভিযোগ জমা পড়েছে। এ বারে বডিটা গায়েব হয়েছে একটা বেসরকারি নার্সিং হোম থেকে। ওসি সাহেব নিজেই গেছেন সেখানে। দু'হাতে মাথা চেপে ধরে অমিয় বলল, মনে হচ্ছে এ বার পাগল হয়ে যাব। এক দিকে এই বডি উধাও। তার মধ্যে আবার মিতুলের হারিয়ে যাওয়া! কে ওই লোকটা? সে কি মিতুলকেই টার্গেট করেছিল?

পল্লব বলল, কিন্তু এই সুদেব বলে ছেলেটা যদি সব সত্যি বলে থাকে তা হলে তো মিতুল লোকটার টার্গেট নয়। যে কোনও মেয়ে হলেই চলত, যার সদ্য পিরিয়ডস শুরু হয়েছে।

টেবিলের ওপর ঘুষি মেরে অমিয় বলল, শালা পিরিয়ডসের সাথে কিডন্যাপের কী সম্পর্ক? আর যদি কেউ কিডন্যাপই করে থাকবে এতক্ষণেও একটা ফোন টোন এল না? না রে! আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।

এতক্ষণ আনমনা হয়ে সঞ্জয় কী যেন ভাবছিল। আচমকা বলে উঠল, এক বার সুদেবের কাছে চল তো। ওকে একটা কথা জিজ্ঞেস করার আছে।

অবাক হল পল্লব, কী কথা?

চল না। তাড়াতাড়ি কর।

সুদেবকে একটা আলাদা সেলে রাখা হয়েছে। অমিয়দের দেখেই আঁতকে উঠল সে। ভয়ে দেওয়ালের কোণে সেঁটে গেল। থরথর করে কাঁপছে ছেলেটা। অমিয় বলল, ভয় নেই। আর মারব না, সঞ্জয়কে দেখিয়ে বলল, ইনি যা জানতে চাইছেন উত্তর দাও।

সঞ্জয়ের মধ্যে কেমন যেন একটা অস্থিরতা কাজ করছে। সে এগিয়ে গিয়ে সুদেবকে বলল, ভাল করে মনে করে দেখো তো, লোকটা যখন কথা বলছিল তখন করবে, খাবে, যাবে এই শব্দগুলোকে কি করবা, খাবা, যাবা এমন করে বলছিল? তা ছাড়া আমরা যখন 'করবে' শব্দটা উচ্চারণ করি তখন উচ্চারণটা হয় 'কোরবে'। কিন্তু এই লোকটা কি 'করবে' উচ্চারণ করছিল?

একটু ভেবেই সুদেব হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল, হ্যাঁ স্যার। কথায় একটা টান আছে লোকটার।

অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল অমিয় আর পল্লব। সঞ্জয়ের অস্থিরতাটা যেন আরও বেড়েছে। সে আবার বলল, তুমি তো লোকটাকে কাছ থেকে ভাল করে দেখেছিলে?

সুদেব মাথা নাড়ল, হ্যাঁ স্যার।

লোকটার একটা হাতের দুটো আঙুল কি ন্যাকড়া দিয়ে জড়ানো ছিল?

বিস্ফারিত চোখে সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে রইল সুদেব। তার উত্তরের অপেক্ষা না করেই সঞ্জয় পেছন ফিরল। অমিয়কে বলল, যা বোঝার বুঝে গেছি। আজ থেকে একুশ বছর আগে নিজের দুই ছেলেমেয়েকে খুনের দায়ে লোকনাথ চক্রবর্তী নামে একটা লোকের চোদ্দো বছরের জেল হয়। খোঁজ নিতে পারবি লোকটা জেল থেকে বেরিয়ে কী কী করেছে? কোথায় গেছে? মৃতদেহ উধাও আর মিতুলের হারিয়ে যাওয়া কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এ দুইয়ের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ আছে। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল, গেনু নিজে থেকে কিছু করতে পারে না। সে হুকুমের চাকর মাত্র।

তীব্র বিস্ময়ে পল্লব বলল, লোকনাথ চক্রবর্তী?

ঘাড় নাড়ল সঞ্জয়, ঠিক ধরেছিস। আমার সেই মামা। যে আমায় বলি দেবে বলে নিয়ে গিয়েছিল।

মানুষ অজ্ঞান হয় হঠাৎ করে কিন্তু জ্ঞান ফিরে আসার প্রক্রিয়াটির মধ্যে একটা মন্দ মন্দ ছন্দ আছে। নিঝুম বোধহীনতা থেকে অনুভূতিমালার দিকে যাত্রাটি মন্থর। যে ভাবে সন্ধে হলে পাহাড়ের ঢালে একটি দু'টি করে আলো জ্বলে ওঠে ঠিক সে ভাবেই একটু একটু করে জ্ঞান ফিরে আসছিল মিতুলের। প্রথমেই তার ভয়ানক তৃষ্ণাবোধ হল। গলাটা যেন মরুভূমির মতো খটখট করছে। তার পর সে অনুভব করল তার পায়ের আঙুলে ঝিঁঝিঁ ধরে গেছে। সে পা নাড়াতে চাইছে কিন্তু পারছে না। তার পরেই এই বর্ণময় জগতকে দেখবার প্রবল বাসনা হল তার। খুলে গেল বন্ধ হয়ে থাকা আঁখিপল্লব দু'টি আর আশাভঙ্গের যন্ত্রণায় এক তীব্র ঝাঁকুনি খেল সে। আলোর প্রত্যাশা করেছিল মিতুল। কিন্তু সে দেখল তার সামনে এখন নিঃসীম, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। এই অন্ধকারটাই মিতুলকে চুলের মুঠি ধরে আধো অচেতনতা থেকে চেতন করে তুলল আর সম্পূর্ণ চেতনা ফিরে আসতেই যে অনুভূতিটি মিতুলের সমস্ত চৈতন্য গ্রাস করল, তার নাম ভয়। এক লহমায় মনে পড়ে গেল জ্ঞান হারাবার আগেই মুহূর্ত পর্যন্ত প্রত্যেকটি ঘটনাক্রম। এখনও মিতুলের মনে হতে লাগল, তার সঙ্গে যা ঘটেছে তা সত্যি নয়। এ আসলে দুঃস্বপ্ন। এখুনি ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে নিজের বিছানায় উঠে বসবে সে আর দরজা ঠেলে উঁকি দেবে একটা হাসিমুখ। সদ্য নাইট ডিউটি শেষ করে ফিরে আসা একটা পুলিশ তাকে বলবে, তোর মা এখনও ওঠেনি। এক কাপ করে চা হয়ে যাক না কি মিতুলবাবা?

দিনটা কিন্তু ভালই শুরু হয়েছিল মিতুলের। ফার্স্ট পিরিয়ডে ক্লাস টেস্টের খাতা বেরল, তাতে সে টপ করেছে। বন্ধুরা তাই নিয়ে খাওয়া, খাওয়া করে খুব লাফালাফি করছিল। তাই ক্লাস শেষ হতেই ক্যান্টিনে গিয়ে বন্ধুদের ফিস চপ আর কোল্ড ড্রিঙ্কস খাইয়েছিল মিতুল। ক্লাসে ফিরেই খেয়াল করেছিল তার ঠিক পেছনের বেঞ্চটাতেই বসে আছে সুদেব। বড় মায়া হয়েছিল মিতুলের, আহা রে! সে দিন ছেলেটা বড়ই হেনস্থা হয়েছে। মৌপিয়া একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল। অবশ্য সেও হেসে ফেলেছিল কাণ্ডটা দেখে কিন্তু এখন হঠাৎ করেই সুদেবের জন্য কষ্ট হতে লাগল তার। সে ঠিক করে ফেলেছিল, ছুটির পরেই সুদেবের কাছে ক্ষমা চাইবে। তারা একই পাড়ায় থাকে, একই সাবজেক্টে অনার্স তবু কোনও দিন কথা হয়নি। ক্ষমা চাইতে গিয়ে কথা বলাও হয়ে যাবে।

সেই পিরিয়ডেই ঘোষণা হল প্রাক্তন প্রিন্সিপাল মারা গেছেন বলে কলেজ হাফ ছুটি হয়ে যাবে। অপ্রত্যাশিত ছুটি পেলে কে না খুশি হয়? মিতুলও হয়েছিল। ভেবেছিল, ফেরার পথে থানায় বাবার সঙ্গে দেখা করে যাবে। অসময়ে মিতুলকে দেখে নিশ্চয়ই চমকে উঠবে বাবা। কিন্তু তার পরেই আচমকা মাথাটা ধরে গেল। কোথাও কিছু নেই, মাথার মধ্যে একটা চাপ ধরা ভাব। কাল রাত থেকে পিরিয়ডস শুরু হয়েছে। পেটে ব্যথাটাও যেন হঠাৎ করে বেড়ে গেল। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল মিতুলের। ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট এইড বক্স থেকে একটা স্যারিডনও খেল কিন্তু মাথা ব্যথাটা কিছুতেই ছাড়ল না।

দু'আঙুলে কপালের রগ ধরে চুপ করে বসে ছিল মিতুল, তখনই কে যেন বলে উঠেছিল, আয়। আয়।

চমকে উঠেছিল মিতুল। কে ডাকল এমন করে? আশে পাশে সবাই তো যে যার মতো ব্যস্ত! তখনই আবার ডাকটা শুনতে পেয়েছিল মিতুল এবং বুঝতে পেরেছিল, আশপাশ থেকে নয়। ডাকটা আসছে তার মাথার মধ্যে থেকেই। মাথার মধ্যে থেকেই কে যেন তাকে ডাকছে। অদ্ভুত সুরেলা গলায় আকুল হয়ে বলছে, আয়। আয়।

এমন ভাবে যদি কেউ ডাকে তার কাছে কি না গিয়ে পারা যায়? ঘোরগ্রস্তের মতো কলেজ থেকে বেরিয়ে এসেছিল মিতুল। ভুলে গেছিল, সুদেবের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা। ভুলে গেছিল বাবার সঙ্গে দেখা করার কথা। মিতুল খেয়ালও করেনি তাকে দেখে ভুরু কুঁচকে উঠেছিল এক জনের। বলরাম দাদু। তাদের কলেজের গেটের বাইরে সে ফল বিক্রি করে। বলরাম দাদু দু'বার শ্যামশ্রী বলে ডেকেওছিল। কিন্তু শুনতে পায়নি মিতুল। পাবে কি করে? তখন যে তার মাথার মধ্যে একটানা বেজে চলেছে, আয়। আয়।

হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা রাস্তা চলে এসেছিল মিতুল। সে যদি নিজের মধ্যে থাকত তা হলে বুঝতে পারত কাজিপাড়া ছাড়িয়ে আরও ভিতরে চলে এসেছে সে। এখানকার পথঘাট কিছুই তার চেনা নয়। কিন্তু মিতুল তো কিছুই দেখছিল না। অমোঘ সেই ডাক তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তার নিয়তির দিকে।

ঘোর কেটেছিল পেছন থেকে জামায় টান পড়ায়। চমকে তাকিয়ে দেখেছিল, তার জামা ধরে টানছে একটা বছর সাত আটেকের বাচ্চা ছেলে। বড় বড় সুন্দর দু'টি চোখে একরাশ আকুতি নিয়ে ছেলেটা বলে উঠেছিল, যেও না দিদি। যেও না। বাড়ি যাও। ফিরে যাও।

কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের মধ্যে ফিরে এসেছিল মিতুল, তাই তো! বাড়ি না গিয়ে এ কোথায় চলে এসেছে সে? কেন এসেছে? কোন জায়গা এটা? নিঝুম দুপুরে চারপাশ জনমানবহীন। মাঝে মাঝে শুধু একটা কুবো পাখি ডেকে উঠছে। খুব ভয় পেয়ে প্রথমেই বাবার কথা মনে পড়েছিল মিতুলের। দ্রুত হাতে ব্যাগ খুলেছিল সে। বাবাকে ফোন করতে হবে এখুনি। তার সাথে কী হচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু ফোন বার করতে গিয়েই হাত উঠে এসেছিল অদ্ভুত জিনিসটা। একটা শুকনো মতো কালো শিকড়ের টুকরো। তাতে লাল সুতো বাঁধা। আর সেটা হাতে নিতেই মাথার ভিতর ফিরে এসেছিল ডাকটা এবং আগের থেকে সহস্রগুণ তীব্র হয়ে। ফের আত্মবিস্মৃত হয়েছিল মিতুল এবং শিকড়টা মুঠো করে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছিল সামনের আমবাগানটার দিকে। শুধু যেতে যেতে এক বার পেছন ফিরে দেখেছিল, বড় করুণ মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে মিষ্টি মতো ছেলেটা।

বড় বড় গাছ চারিপাশে। দিনের বেলাতেও প্রায় অন্ধকার হয়ে আছে জায়গাটা। শুকনো পাতায় ঢেকে আছে মাটি। ইতিউতি দু'একটা সাপের খোলস। সেই সব মাড়িয়েই আরও ভিতরে ঢুকে যাচ্ছিল মিতুল। মিতুল যাচ্ছিল বলা ভুল, ডাকটা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় একটা তীব্র পচা গন্ধে গা গুলিয়ে উঠেছিল মিতুলের আর তখনই একটা কমবয়সি মেয়েগলা তাকে ডেকে উঠেছিল, খুকি, এ দিকে।

ঘুরে তাকিয়েই বজ্রাহত হয়ে গেছিল মিতুল। এমন ভয়ানক কদাকার জীব সে আগে কখনও দেখেনি। মানুষের মতো অথচ সেই না মানুষটা ফোকলা মুখে খলখল করে হেসে উঠে বাচ্চা মেয়ের মতো রিনরিনে গলায় বলেছিল, ডরাও না কি খুকি? ডর কীসের? আমি গেনু। কত্তার হুকুমের চাকর। কত্তায় তোমার পথ চেয়ে বসে আছে। আসো। এই দিকে।

কালো, বাজপাখির নখের মতো বাঁকানো নখওয়ালা আঙুল তুলে সে নির্দেশ করেছিল একটা দিকে। মিতুল অবাক হয়ে দেখেছিল, সে হাতে মাত্র তিনটে আঙুল। এর পর আর কিছু মনে নেই তার।

প্রাথমিক ভয়টা কাটিয়ে উঠে মিতুল বোঝার চেষ্টা করছিল সে এখন কোথায় আছে! এমন কালিগোলা অন্ধকার যে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। তবু সময়ের সাথে সাথে সবই সয়ে আসে। অন্ধকারও। একটু পরেই মিতুল বুঝতে পারল, একটা টানা লম্বা ঘরের এক কোণায় পড়ে আছে সে। ঘরটায় কিছু বড় বড় মেশিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এ দিক, সে দিক। মিতুলের মনে হল, এটা কোনও পরিত্যক্ত কারখানা। তবে একটা ব্যাপারে মিতুল ভারী অবাক হল, যেই তাকে এখানে ধরে আনুক বেঁধে রাখেনি! এমনকী ব্যাগটাও তার পাশেই পড়ে আছে!

খুব বিপদের সময় মানুষের মাথা আশ্চর্য রকমের ঠান্ডা হয়ে যায়। মিতুল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল, যে করে হোক তাকে এখান থেকে পালাতে হবে। যে বা যারা তাকে তাকে এখানে ধরে এনেছে তারা কনফিডেন্ট যে মিতুল এখান থেকে পালাতে পারবে না, তাই তাকে বেঁধে রাখেনি। কিন্তু এই চান্সটাই নিতে হবে মিতুলকে। এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই। এ দিক ও দিক দেখে সবে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে যাবে মিতুল তখনই ঘড়ঘড় শব্দ করে খুলে গেল ঘরের একটা প্রান্তের শাটার। সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে একটা লোক। আলো তার পেছনে, ফলে লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু লম্বা ছায়াটা এসে পড়েছে মিতুলের পায়ের কাছে। তীব্র ভয়ে জবুথবু হয়ে গেলেও এটা দেখে মিতুল আশ্বস্ত হল যে এই লোকটা আর যাই হোক ওই কদাকার জীবটি নয়। কারণ সে ছিল যেমন বেঁটে আর তেমন মোটা।

সুইচ টিপে ঘরের ভিতরের একটা আলো জ্বালিয়ে দিল লোকটা। ধোঁয়াটে বাল্বের আবছা আলোয় মিতুল দেখল, সে ঠিকই আন্দাজ করেছিল। এটা একটা পরিত্যক্ত কারখানাই বটে। মাকড়সার জালের পরিমাণ দেখে বোঝা যাচ্ছে, বহুদিন এখানে মানুষের আনাগোনা নেই। একই সাথে মিতুল লোকটাকেও দেখতে পেল। দোহারা চেহারার একটা বয়স্ক লোক। দু'হাতে তার দু'খানা ঘটি। লোকটাকে দেখে মোটেই খুব একটা ভয়ঙ্কর কিছু মনে হল না মিতুলের। সবটা সাহস একত্রিত করে সে চেঁচিয়ে উঠল, কেন ধরে এনেছেন আমায়? কী চান আপনারা?

অদ্ভুত ব্যাপার, খুব নরম গলায় লোকটা বলল, সব বলব মা। বলব বলেই তো এলাম। তোমার ভয় নাই। জল আনছি। জল খেয়ে শান্ত হয়ে বোসো।

লোকটার বলার ধরণে একটু আশ্বস্ত হল মিতুল। মা বলে যে ডাকে সে কি কখনও ক্ষতি করতে পারে! তবু লোকটার আনা জলটা নিতে মিতুল ঠিক সাহস পেল না। তাকে ইতস্তত করতে দেখে লোকটা হেসে বলল, ভাবছ কিছু মিশানো আছে কি না? তাই তো? না মা, কিচ্ছু মিশানো নাই। অবশ্য আমার মুখের কথায় তুমি প্রত্যয় যাবা কেন? আমি তো অচেনা মানুষ। অচেনা মানুষের কথায় বিশ্বাস কী? কিন্তু সত্যি এ জল ভাল। এই দেখো, আমি খাচ্ছি, বলে ঘটি থেকে খানিকটা জল খেল লোকটা। তার পর ঘটিটা এগিয়ে ধরল মিতুলের দিকে।

প্রবল তেষ্টায় মিতুলের বুক ফেটে যাচ্ছিল এতক্ষণ। বুভুক্ষুর মতো সবটা জল খেয়ে ফেলল সে। লোকটা সুন্দর করে হাসল, এতক্ষণে একটু শান্তি পেলে না গো মা? নাও, এই বার একটু সুস্থির হয়ে বোসো। তোমায় ক'টা কথা বলার আছে বলে নিই। আবারও বলছি, ভয় পাবা না। আমি তোমার বাপের মতো।

লোকটার কথা শুনতে শুনতে যেন একটু স্বস্তি বোধ করছিল মিতুল। মনে হচ্ছিল, যতটা ভয় সে পাচ্ছিল ততটা ভয় পাওয়ার দরকার নেই। এ লোকটা নিশ্চয়ই তাকে সাহায্য করবে।

বেশ ভারী পেতলের ঘটি। ঘটিটা মাটিতে নামিয়ে রেখে ধীরে ধীরে দেওয়াল ঘেঁষে বসে পড়ল মিতুল। লোকটার হাতে অন্য যে ঘটিটা ছিল সেটা লাল শালু জড়ানো। সেটা কোলে নিয়েই মাটিতে থেবড়ে বসে পড়ল লোকটা। বলল, মা গো, আমি তন্ত্র সাধনা করি। যারে বলে তান্ত্রিক। না না, বলি দেব বলে তোমারে ধরে আনিনি। তান্ত্রিক মাত্রই বলি দেয় এ ভুল কথা। লোকের বদ রটনা। তোমার সাথে আমার অন্য একটা দরকার আছে। সবটা খুলে বললেই তুমি বুঝবা। তুমি শুনছ তো আমার কথা?

মিতুল ঘাড় নাড়ল। লোকটা বলল, বেশ। মন দিয়ে শোনো। অনেক বছর আগে আমার সাধনায় এক বার বাধা পড়ে। কে বাধা দিয়েছিল জানো? আমার নিজের ইস্ত্রি আর আমার আপন ভাগ্না। কথায় বলে, যম-জামাই-ভাগ্না/তিন নয় আপনা... এক্কেবারে খাঁটি কথা মা। তারে আমি কত ভালবাসতাম। নিজের কাছে এনে রেখেছিলাম, কিন্তু সে আমারে ঠকিয়েছিল। আর ইস্ত্রির কথা তো বাদই দাও। সে না কি ছিল আমার ধর্মপত্নী! আমারে ঠকাতে তার একটুও বাধেনি। তাদের জন্য আমার জেল হয়ে যায়। চোদ্দো বছরের জেল। আমি যখন সমাধিতে ছিলাম পুলিশ আমারে ধরে। সমাধিতে থাকার সময় কী হয় জানো মা, তখন সব শক্তি ত্যাগ করে আধার শূন্য করতে হয়। আধারের আকার বাড়িয়ে নতুন করে বেশি শক্তি আহরণ করতে হয়। মানে ধরো একটা কৌটায় মুড়ি আছে। মুড়িগুলা বাইরে রেখে তুমি কৌটাটাকে আর একটু বড় করে বানিয়ে নিলে। এ বার তাতে বেশি মুড়ি ধরবে তাই না মা? বাজে উদাহরণ দিলাম, রাগ কোরো না। আমি তো অত লেখাপড়া করিনি। ভাল কথা বলতে পারি না। তা যাই হোক, আধার শূন্য ছিল বলে পুলিশ আমারে ধরতে পেরেছিল, নয়তো আমারে ধরা মানুষের কম্ম না। কিন্তু ওই আমার খারাপ দিন শুরু হল। সমাধিস্থ অবস্থায় তুলে এনেছিল বলে আমি শক্তিহীন হয়ে গেলাম। নতুন করে শক্তি পেতে সাধনা করার দরকার। কিন্তু জেলের মধ্যে বসে তো আর সাধনা করা যায় না। সাধনা করতে উপকরণ লাগে। এদিকে আমার মন হাঁসফাঁস করে। বাদক কি তার বাজনা ছাড়া থাকতে পারে বলো? এই করে করে বারো বছর সাজা ভোগ করে ফেললাম। কিন্তু আর পারছিলাম না গো মা। তার মধ্যে চন্দ্রগ্রহণের দিন এগিয়ে আসছিল। সাধনার জন্য বড় উপযুক্ত সেই দিন। নিজেরে আর সামলাতে পারলাম না। একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললাম। আরও চোদ্দো বছর সাজার মেয়াদ বেড়ে গেল বিচারে। তা সারাজীবন কী জেলে পচে মরব? সাধনা করব না? তাই মাসখানেক আগে আমি জেল ভেঙে পালিয়ে এসেছি। এসেই খানিক সাধনা করে কিছুটা শক্তি ফিরে পেলাম। গেনুরে আবার নিজের কাছে টেনে আনলাম। এত দিন বেচারা পুরনো হুকুম তামিল করার জন্য ঘুরে ঘুরে মরছিল।

এই অবধি বলে একটু দম নিল লোকটা। বিস্ফারিত চোখে মিতুল বলে উঠল, গেনু! গেনু মানে সেই...

কথা কেটে লোকটা বলল, ঠিক ধরেছ। যে তোমারে নিয়ে আসছে এখানে।

ভয়ে কেঁদে ফেলল মিতুল, আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ। আমি তো আপনার কোনও ক্ষতি করিনি। আমি বাড়ি যাব।

ব্যস্ত হয়ে উঠল লোকটা, আরে ওই দেখো! আবার কাঁদে! কেঁদো না মা। কেঁদো না। গেনুরে ভয় পাইছ তাই না? আসলে ও তো পিচাশ। তাই অমন বদসুরত দেখতে। কিন্তু ও তোমার কোনও ক্ষতি করবে না। আমার হুকুম ছাড়া গেনু এক পা নড়ে না। আমি যতক্ষণ আছি তোমার ভয় নাই গো মা। এই বুড়ো বাপটার ওপর একটু ভরসা রাখো।

নরম হাতে মিতুলের চোখের জল মুছিয়ে দিল লোকটা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে মিতুল একই কথা বলে উঠল আবার, আমায় ছেড়ে দিন। আমি বাড়ি যাব। আমার মা বাবা খুব চিন্তা করছে আমার জন্য। কাঁদছে।

একটু হেসে লোকটা বলল, সে তো বটেই মা। সন্তান যে কী জিনিস সে বাপ মায়েই বোঝে। তোমারও সন্তান হবে। তুমিও বুঝবে। ছেড়ে দেব মা। তোমারে আমি ধরে রাখব না। তিনটা দিন। মাত্র তিনটা দিন তুমি এখানে থাকো। তার পর তোমার ছুটি। দেখো মা, জেলে থেকে থেকে আমার অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। আমার হাতে বেশি সময় নাই। তাই শক্তিলাভের জন্য আমারে এক কঠিন সাধনা করতে হচ্ছে। আর চার দিন পরে আমার সাধনা শেষ। তোমারও ছুটি। এই চারটা দিন তুমি এই বুড়ো বাপটারে একটু সাহায্য করো মা।

ভয়ের সাথে যুঝতে যুঝতে এবং ভিতর থেকে উঠে আসা কান্নাটাকে সামলাতে সামলাতে মিতুল কোনও মতে বলল, কিন্তু আমি কী ভাবে সাহায্য করব আপনাকে?

পরম তৃপ্তিতে হেসে উঠল লোকটা, এই তো লক্ষ্মী মা আমার। কেমন সুন্দর কথা শুনলে তুমি। নাও এই ঘটিটা ধরো।

মিতুলের হাতে লাল শালু জড়ানো ঘটিটা ধরিয়ে দিয়ে এর পর লোকটা যা বলল তাতে লজ্জায়, ঘেন্নায়, ভয়ে, বিবমিষায় কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল মিতুল। লোকটা বলল, তোমার তো মাসিক চলছে মা, এই ঘটিতে খানিকটা মাসিকের রক্ত দাও।

এমন অসম্ভব, অবাস্তব, ঘৃণ্য কথা যে কেউ বলতে পারে মিতুল কল্পনাও করতে পারে না। বিশেষ করে যে লোকটা এতক্ষণ তাকে মা বলে সম্বোধন করেছে, নিজেকে বাবার মতো বলেছে সে কেমন করে বলতে পারে এমন কদর্য কথা! এই অপমানে তীব্র রাগে জ্বলে উঠল মিতুলের অন্তরের শাশ্বত নারীসত্তাটি। সেই রাগেই প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে মিতুল যেন কতকটা রিফ্লেক্সেই চিৎকার করে উঠল, না!

আচমকা দপ করে জ্বলে উঠল লোকটার চোখ দু'টো। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে সে বলল, কী বললি? তুই আমায় না বললি? লোকনাথ চক্কোত্তির মুখের ওপর না? গোঁড়াল দিয়ে আজ তোর গুমোর ভাঙব বেবুশ্যে মাগি।

এ কী ভয়ানক রূপান্তর! যে এতক্ষণ মা বলছিল তার মুখে এখন এই অশ্লীল সম্বোধন! মিতুলের ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে সাবধান করে দিল, বিপদ আসতে চলেছে। যতটা বিপদ সে কল্পনা করেছিল তার চেয়েও বেশি। পায়ে পায়ে পিছিয়ে যেতে লাগল মিতুল।

জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে লোকটা আবার বলল, ভালয় ভালয় দিবি না গেনুকে ডাকব? সে এসে তোরে ন্যাংটো করলে তোর ভাল লাগবে?

প্রচণ্ড ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল মিতুল, না না, এমনটি করবেন না। আমায় ছেড়ে দিন। প্লিজ। প্লিজ আমি হাতজোড় করছি।

ধ্যাত্তেরি নটী মাগি। বলছি সময় কম। এ কেঁদেকেটে যাত্রা করছে, বলেই মিতুলের গালে সজোরে একটা চড় মারল লোকটা। টাল সামলাতে না পেরে মিতুল ছিটকে পড়ল। মাথাটা ঠকাস করে ঠুকে গেল দেওয়ালে। এক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে চারপাশটা ঝাপসা হয়ে গেল মিতুলের। সে এলিয়ে পড়ল মাটিতে।

মেয়েদের মাথার মধ্যে একটা বিশেষ সাইরেন আছে। শরীরের আশেপাশে কোনও পুরুষের অবাঞ্ছিত উপস্থিতি টের পেলেই সাইরেনটা বাজতে শুরু করে। সেই সাইরেনটাই ঘন ঘন বাজতে থেকে মিতুলকে আবার খানিকটা সজাগ করে তুলল। আচ্ছন্ন হয়ে থেকেও মিতুল বুঝতে পারল, লোকটা উবু হয়ে বসে তার জামা তুলে প্যান্টটা খোলার চেষ্টা করছে। ভাগ্যিস এ প্যান্টের বোতামগুলো কোমরের পাশের দিকে। নয়তো এতক্ষণে...

আচমকা দেখতে পেল মিতুল, জল খাওয়ার ফাঁকা ঘটিটা রয়েছে তার ডান হাতের একেবারে নাগালের মধ্যে। এক মুহূর্ত দেরি না করে গায়ের সবটা শক্তি এক জায়গায় এনে মিতুল ভারী ঘটিটা সজোরে লোকটার মাথায় বসিয়ে দিল।

ঢং করে একটা ভোঁতা শব্দ হল আর অস্ফুট আর্তনাদ করে লোকটা লুটিয়ে পড়ল মিতুলেরই গায়ের ওপর। দু'হাতে ভারী শরীরটা ঠেলে সরিয়ে মিতুল উঠে পড়ল। মাথা আর ডান দিকের কান বরাবর একটা অসহ্য ব্যথা। কিন্তু সেটাকে অগ্রাহ্য করে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে শাটার তোলা জায়গাটা দিয়ে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এল সে। চার দিকে ভাঙাচোরা লোহা লক্কড় আর বড় বড় গাছ। দূরে দূরে এক একটা সোডিয়ামের আলো জ্বলছে, তাতে যেন আরও বেশি করে অন্ধকার ঘনিয়ে উঠেছে। মিতুল জানে না, সে কোন দিকে যাবে, তবু আলো লক্ষ্য করে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল। তার মন বলতে লাগল, আলোর কাছে গেলেই মুক্তি। ছুটতে ছুটতে বড় কোনও গাড়ির হর্ন শুনতে পেল মিতুল। তার মানে, কাছেই বড় রাস্তা। পা আর চলছিল না, তবু এই ভাবনাটাই যেন মিতুলের শরীরে নতুন উদ্যম এনে দিল। আরও জোরে ছুটতে লাগল সে।

সামনের রাস্তাটা দু'দিকে বেঁকে গেছে। এক মুহূর্ত থমকে ডান দিকের রাস্তাটা ধরল মিতুল আর একটু গিয়েই বুঝল, সে ভুল করেনি। ওই তো, কারখানার গেট দেখা যাচ্ছে। ছোট গেটটা আবার খোলা। মুক্তির আনন্দ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল মিতুলকে। কিন্তু গেটের কাছে যেতে না যেতেই চেতনা অসাড় করে দেওয়া পচা গন্ধটা ঝাপটা মারল তার নাকে। এ গন্ধ মিতুল চেনে। পাথরের মতো ভারী হয়ে গেল তার পা দুটো। নিদারুণ অনিবার্যতায় সে যন্ত্রের মতো পেছন ফিরে তাকাল আর দেখল একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গেনু। মেয়েদের মতো রিনরিনে গলায় সে বলল, সবাই কত্তারে ধোঁকা দেয়। তোমরা সবাই এত নিমকহারাম কেন খুকি?

রাত শেষ হতে আর বড়জোর ঘণ্টা তিনেক। বারাসাত বাস টার্মিনাসে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছে বাসগুলো। সাড়ে চারটে বাজতে না বাজতেই তাদের ঠেলেঠুলে তুলে দেবে ড্রাইভাররা। চোখ কচলে কোনও মতে ফের রাস্তায় নামতে হবে তাদের। পেটের খোলে যাত্রী তুলে ছুটতে হবে দিগ্বিদিক।

বাসগুলোর পাশ দিয়েই বেড়ালের মতো চুপিসাড়ে গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছিল ধনা। তার ডান হাতে একটা বড় আধলা ইট। বাঁ হাতে একটা চাকা খোলার জ্যাক। জ্যাকটা সলিড লোহার। বেশ ভারী। জ্যাকটা বাসের গায়ে লেগে টং শব্দ হল। মুহূর্তে সচকিত হয়ে উঠল ধনা। বাঁ হাতটা সামলে নিল। সে কিছুতেই নিজের উপস্থিতি টের পেতে দিতে চায় না। অতর্কিতে হামলা করতে চায় সে।

কুকুর দু'টোকে দেখার পর থেকেই মাথায় রক্ত উঠে গেছিল তার। এক বছরের কাছাকাছি হয়ে গেল তার কপালে কোনও মেয়ে জোটেনি আর হারামির বাচ্চারা তার চোখের সামনেই যাতা করছে! এখন মানুষ হয়ে গেছে শালারা।

নিজের একটা মেয়েছেলের আশা ধনা করে না। পয়সা দিয়ে যে সোনাগাছি যাবে সে অওকাতও তার নেই। কারণ যেটুকু যা রোজগার নেশার পেছনেই চলে যায়। কিন্তু রাস্তার ধারে পড়ে থাকা ভিখিরি বা পাগলিগুলোকেও তো সে পেতে পারত! তাও তার কপালে নেই। আসলে এই মার্কেটে সবার ভাতার সেট করা আছে। এই তো দিন সাতেক আগের কথা। চাঁপাডালির কাছে একটা বাচ্চা মতো পাগলিকে হেবি চোখে লেগেছিল। তাকে তাকে থেকে একদিন রাতের বেলা সবে মুখটা চেপে ধরেছে কোত্থেকে তিনটে ছেলে এসে হাজির! তার পর সে কী মার ধনাকে। কেলিয়েকুলিয়ে ছেলেগুলো পাগলিটাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে কাট্টি মারল! নিজের ওপর ঘেন্না ধরে গেছিল ধনার। একে তো তার কপাল ফাটা, তার মধ্যে ছেলেগুলো পেছনটাও ফাটিয়ে দিয়ে গেল!

তাই আজ সবটা রাগ কুত্তা দু'টোর ওপরেই উগরে দিল ধনা। বাসের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সজোরে আধলাটা ছুঁড়ে দিল। ধনার হাতের টিপ ভাল। কুত্তা দু'টোর পাছা যেখানে এক জায়গায় হয়ে আছে সেখানে গিয়ে জমে গেল আধলাটা। চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল সারমেয় দু'টির। জিভ আটকে গেল দাঁতের ফাঁকে। তার পরেই মরণ আর্তনাদ করে উঠল তারা। জৈব তাড়নায় তারা পালিয়ে যেতে চাইল কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে এই মুহূর্তে তারা পরস্পরের সাথে সংলগ্ন। এই বন্ধন ছিন্ন হতে সময় লাগবে। আর সেই সময়টুকুরই পূর্ণ সদব্যবহার করল ধনা। জ্যাকটা ডান হাতে নিয়ে সর্ব শক্তিতে একে একে বসিয়ে দিল কুত্তা দু'টোর মাজায়। সংলগ্ন অবস্থাতেই সারমেয় দু'টি নেতিয়ে পড়ল। নারীটি একেবারে চুপ করে গেল। পুরুষটি তখনও বাঁচার জন্য কাতর আর্তনাদ করছে।

মনটা ভারী খুশি হয়ে গেল ধনার। এতক্ষণে একটা কাজের কাজ হয়েছে। মাটিতে থুতু ফেলে সে সারমেয় দু'টির উদ্দেশ্যে বলল, পথেঘাটে নষ্টামি তো? জন্মের শোধ ঘুচিয়ে দেব।

এই বলে সবে সে জ্যাকটা তুলেছে ছেলে কুত্তাটার মাথায় বসাবে বলে তখনই পেছন থেকে চাপা গলায় কে যেন বলে উঠল, ধনা পালা।

চমকে পেছন ফিরতেই ধনা দেখল পল্টন দাঁড়িয়ে আছে। পল্টন নেশার দোস্ত। ধনা কিছু বলার আগেই পল্টন হুড়মুড় করে বলে উঠল, তোকে পুলিশ খুঁজছে। ফোর্স নিয়ে বেরিয়েছে। কলোনি মোড় আর হরিতলা পুরো ছানবিন করে ফেলেছে। যাকে পাচ্ছে র‍্যাম্পার্ট ক্যালাচ্ছে। এখন এ দিকেই আসছে।

অবাক হয়ে গেছিল ধনা, পুলিশ কেন খুঁজতে যাবে তাকে? সে তো তেমন কিছু করেনি!

পাছায় একটা লাথি মেরে পল্টন বলল, আবে ভাবছিস কি? ধরতে পারলে কিন্তু পেছন ফাটিয়ে দেবে। ডুব দে জলদি।

জ্যাকটা ছুঁড়ে ফেলে দৌড় লাগাল ধনা। কোনও ভাবেই পুলিশের হাতে ধরা দেওয়া যাবে না। পুলিশ কোনও কথা শোনার আগেই পেছনে রুল গুঁজে দেয়। দিন সাতেক আগেই ধোলাই হয়েছে। এখনও গায়ের ব্যথা ভাল ভাল করে মরেনি। তার ওপর আর পুলিশের ডান্ডা খেলে দেখতে হবে না। কিন্তু কোথায় যাবে ধনা? পল্টন যা বলল, তাতে সব কটা ঠেকেই মামারা আজ ঢুঁ মারবে। অন্য কোথাও লুকোতে হবে। ভাবতে ভাবতেই বিদ্যুচ্চমকের মতো মাথায় এসে গেছিল জায়গাটার কথা। বাবার আস্তানায় যেতে হবে। দিন কয়েক আগেই বাবাকে গাঁজা দিতে গেছিল। তখনই বাবা বলেছিল, জায়গাটা না কি মন্ত্রপড়া আছে। চোখের সামনেই অথচ কোনও মানুষ দেখতে পাবে না। বাবা ধনাকে ভালবাসে তাই কী ভাবে আসতে হবে বলে দিয়েছিল। লুকনোর জন্য এর থেকে ভাল জায়গা আর কী হতে পারে? ধনা তাই একেবারে দম ছাড়ল কারখানার গেটে গিয়ে। এ বারে নিশ্চিন্ত।

আগে এ কারখানাটায় ধনারা খুব আসত। সন্ধের পর থেকেই হেবি হাওয়া দেয়। ধুনকিটা জমে ভাল। বছর চারেক আগে এখানেই একটা ঝাম হয়ে গেছিল। সমীর দলুই বলে একটা ছেলেকে চুপিয়ে দিয়েছিল নেশার দোস্তরা। মালটা মরেনি। তার পরেই পুলিশ এসে ঠেক ফেক ভেঙে দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকে এদিকে আর খুব একটা আসা হতো না।

হাঁটতে হাঁটতে মেশিন রুমের দিকে এগোচ্ছিল ধনা। এখানেই বাবার সাধনার জায়গা। বাবার সব ভাল কিন্তু গায়ে হেবি বাদুড়পচা গ্যাস। চান ফান করে না বোধ হয়। আর বাবা আস্তানা গাড়ার পর থেকে এই জায়গাটাতেও সারাক্ষণ কেমন একটা চিমসে পচা গন্ধ চাপ বেঁধে থাকে। সে থাকুক গে, ধনা তো আর এখানে সংসার পাততে যাচ্ছে না। দিন দু'য়েক ঘাপটি মেরে পড়ে থেকে আবার পাতলা হয়ে যাবে। কিন্তু বাবার সামনে গিয়েই চমকে উঠল ধনা। বাবার মাথা ফেটে গেছে। উবু হয়ে বসে সেখানেই গাঁদা গাছের পাতা লাগাচ্ছে বাবা। পাশে একটা লাল শালু জড়ানো ঘটি। তার মধ্যে কালো জলের মতো কী যেন একটা রয়েছে, ধনা ঠিক ঠাহর করতে পারল না। সে ডেকে উঠল, বাবা!

চোখ তুলে তাকাল লোকনাথ চক্রবর্তী। এতক্ষণ সে ধনাকে খেয়াল করেনি। ভুরু কুঁচকে বলল, তুই এখানে?

হাত জোড় করে ধনা বলল, বাবা, আপনার জন্য মনটা টানছিল। ভাবলাম একটা ছিলিম সেজে দিয়ে আসি। আমিও প্রসাদ পাব। তাই চলে এলাম। কিন্তু মাথা ফাটল কী করে বাবা?

গাঁজার কথা শুনে খুশি হল লোকনাথ। খিক খিক করে হেসে বলল, ঢ্যামনাপোকায় হুল দিয়েছে।

ভক হয়ে গেল ধনা। এমন পোকার নাম সে বাপের জন্মে শোনেনি। অবাক হয়ে বলল, সে কেমন পোকা বাবা?

লোকনাথ বলল, ও আছে। বাদ দে। ভাল করে সাজ দেখি।

বাবার পায়ের কাছেই বসে পড়ল ধনা। তবে পোকার ব্যাপারটা একেবারে বাদও দিতে পারল না। যে পোকার হুলে অমন মাথা ফাটে সে পোকা এলিতেলি নয়। বিরাট তালেবর।

কলকেটায় আগুন দিয়ে প্রণাম করে বাবার মুখের কাছে এগিয়ে ধরল ধনা। বুক ভরে দম নিল লোকনাথ। তার পর চিমনির মতো গলগল করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, নাহ, তেজ থাকা ভাল। মা তেজি হলে বাচ্চাও তেজি হয়।

ফের অবাক হল ধনা। বাবা যে আজ কী বলছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু বেশি প্রশ্ন করলে যদি আবার রেগে গিয়ে তাড়িয়ে দেয়, তা হলেই কেলো। তাই চুপ করেই রইল।

মাত্র চার টানে অত বড় ছিলিমটা প্রায় শেষ করে ধনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে লোকনাথ বলল, এ বার সামনে থেকে যা। আমায় একা থাকতে দে। আমি সাধনায় বসব। আজ এমনিতেই বড় দেরি হয়ে গেছে।

কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ উঠে এল ধনা। এ কারখানার সবটা তার চেনা। কোথাও একটা গ্যারেজ হয়ে গেলেই হবে। আনমনে কারখানার আরও ভিতরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সে। পুলিশকে বোকা বানাতে পেরে মনটা খুশ হয়ে গেছে। গুনগুন করে একটা গানও ধরে ফেলল, রাত আকেলি হ্যায়...

হঠাৎ কাছেপিঠেই কে যেন গুঙিয়ে উঠল চাপা গলায়। চমকে গান বন্ধ করে দিল ধনা। মানুষের গলা মনে হল! কিন্তু এখানে আর মানুষ আসবে কোত্থেকে? আওয়াজটা এলই বা কোন দিক থেকে? অন্ধকারে একটা গাছের সাথে মিশে কান খাড়া করে রইল ধনা। মিনিট খানেক সব চুপচাপ। শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। হয়তো ভুল শুনেছে ভেবে সবে এগোতে যাবে তখনই আবার মানুষের গলা পেল ধনা। একটা মেয়ে গুঙিয়ে উঠল, আহ! মা গো!

গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল ধনার। এত রাতে এই বিরান জায়গায় মেয়েছেলের গলা! তবে কি বাবা কোনও মেয়ে এনে রেখেছে এখানে? আগের দিন যখন এল তখন তো কোনও মেয়ের চিহ্ন দেখেনি! অবশ্য আগের দিন সে এ দিকটায় আসেওনি। প্রথমটা সে ভাবল, ঝামেলায় গিয়ে লাভ নেই। চুপচাপ সরে পড়াই ভাল। কিন্তু অদম্য কৌতূহল তাকে সরে পড়তে দিল না বরং সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল গোডাউনের দিকে। শব্দটা ওখান থেকেই আসছে। দেওয়ালে কান পাতল সে। নাহ কোনও ভুল নেই। সত্যিই ভেতরে একটা মেয়ে থেকে থেকে কাতরে উঠছে। আসপাশটা দেখে নিয়ে সুট করে গোডাউনের পেছন দিকে চলে গেল ধনা। তার পর দেওয়ালের খাঁজে খাঁজে পা রেখে উঠে গেল ওপরে। ছাউনি আর দেওয়ালের মাঝে অনেকটা ফাঁক। সেই ফাঁক দিয়ে শরীরটা গলিয়ে দিল ভিতরে। তার পর ফের দেওয়াল বেয়ে নেমে এল গোডাউনের মেঝেতে।

ভিতরটা অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না যদিও, তবু একটা জ্যান্ত মানুষের উপস্থিতি টের পাচ্ছিল ধনা। এক কোণে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে চোখটা সইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল সে। ততক্ষণে মেয়েটা আরও দু'বার মা গো বলে উঠেছে। ধীরে ধীরে ধনা বুঝতে পারল, ঘরের এক কোণে মেয়েটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে। নড়াচড়া করছে না, শুধু মাঝে মাঝে আওয়াজ করছে। আরও কিছুক্ষণ অন্ধকারে সেঁটে দাঁড়িয়ে রইল ধনা। দেখতে চাইল, মেয়েটা উঠে বসে কি না! কিন্তু উঠে বসা তো দূর, মেয়েটা পাশও ফিরল না। ওই একই ভাবে পড়ে রইল। হাজারখানা প্রশ্ন ধনার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল, কে এই মেয়েটা? এ ভাবে পড়ে আছে কেন এখানে? বাবা যদি মেয়েটাকে নিয়ে আসবে তবে মেয়েটা বাবার কাছে নেই কেন?

আচমকাই সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল ধনার কাছে। বাবার কথাটা মনে পড়ে গেল, 'ঢ্যামনাপোকায় হুল দিয়েছে।' আচ্ছা! তার মানে এই মেয়েটার সাথে ধস্তাধস্তি করতে গিয়েই বাবার মাথা ফেটেছে। আপন মনেই হেসে উঠল ধনা, বাবার সব শুকিয়ে কিসমিস হয়ে গেল তবু রস মরল না! উল্টে গাতন দিয়ে দিয়েছে মেয়েটা। তার পর বোধ হয় বাবা কেলিয়েছে তাই এমন লাতন হয়ে পড়ে আছে। হাতড়ে হাতড়ে সুইচ খুঁজে আলো জ্বালিয়ে দিল ধনা আর আলো আসতেই সে যেন হাজার ভোল্টের শক খেয়ে ছিটকে গেল! এ কী দেখছে সে! নিজের চোখ দু'টোকে বিশ্বাস করতে পারল না ধনা। এক বার ভাল করে চোখ কচলে নিল। নাহ, ঠিকই দেখছে। মেয়েটার গায়ে জামা আছে কিন্তু কোমর থেকে পুরো উদোম। বাল্বের আবছা আলোতেও শরীরটা চকচক করছে। এ তো কোনও এলিতেলি মেয়ে না! এ যে ভদ্দঘরের ডাঁসা পেয়ারা! এ মাল বাবা কোথায় পেল? শব্দ না করে মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল ধনা কিন্তু আর একটু কাছে যেতেই থমকে গেল সে। মেয়েটার পায়ের ফাঁক দিয়ে রক্তের একটা লাইন গড়িয়ে চলে গেছে ঘরের অন্য দিকটায়। তবে কি বাবা এর মধ্যেই যা করার করে দিয়েছে? মরুকগে যাক। বাবার প্রসাদ পেতে তার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু অন্য একটা দ্বিধায় পড়ে গেল ধনা। এই নিয়ে কোনও ঝাম হবে না তো? বাবার পারমিশন ছাড়া খেলে বাবা আবার শাপটাপ দিয়ে দেয় যদি? ধনা যে একটু ভয় পাচ্ছিল না তা নয় কিন্তু মাখনের মতো চকচকে দাবনা দু'টো তাকে টানছিল।

নিজের সাথেই খানিকক্ষণ যুঝল ধনা তার পর সটান প্যান্ট খুলে ফেলে এক টানে মেয়েটাকে সোজা করে দিল। উফ! মাগিটার মুখখানাও তো হেবি মিষ্টি। মনে মনে নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিল সে। ভাগ্যিস আজ পুলিশ তাকে খুঁজছিল। চিরকাল ভদ্রঘরের মেয়েদের ওপর ধনার লোভ, কিন্তু ওপরওলা যে এ ভাবে ছপ্পর ফুঁড়ে দেবে সে ভাবতেও পারেনি।

ধনা যে উল্টে দিয়েছে তাতেও মেয়েটার কোনও সাড় নেই। সেই মাঝে মাঝে শুধু আহ, উহ, মা গো... এই সব করে চলেছে। সাড় না আসাই ভাল। চুপচাপ কাজ সেজে নেওয়া যাবে। দেরি না করে মেয়েটার জামা খুলতে শুরু করল ধনা। চোলি কে পিছে যে কী মাল ছুপিয়ে আছে ভাবতেই সে আরও গরম খেয়ে গেল। কিন্তু ধ্যাত্তেরি! এ জামাটা তো খোলাই যাচ্ছে না! কী ভাবে আটকেছে কে জানে! নষ্ট করার মতো সময় নেই ধনার হাতে। জামা ছেড়ে মেয়েটার দু'পায়ের মাঝে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল সে। যেটা খোলা আছে আগে সেটার হিসেব নেওয়া যাক। পরেরটা পরে হবে।

মেয়েটার পা দু'টো তুলে সবে কাঁধের ওপর সেট করেছে ধনা, তখনই গন্ধটা পেল। একশোটা মড়া একসাথে পচলেও বুঝি এত বিকট গন্ধ হয় না! পেটের ভিতর থেকে পাক দিয়ে উঠল ধনার। মেয়েটাকে ছেড়ে এক লাফে একটু সরে গিয়ে ওয়াক তুলে খানিকটা বমি করে দিল! কোত্থেকে এল এই বিকট গন্ধটা? ভাবতে ভাবতে বাঁ হাতের চেটোয় মুখটা মুছে ঘুরে দাঁড়াতেই ভয়ে অবশ হয়ে গেল ধনা। তার ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মতো চেহারার এক অদ্ভুত ভয়াবহ কদাকার জীব। ধকধক করে জ্বলছে তার পাঁশুটে সবুজ রঙের মণি দু'টো। তার কাছ থেকেই আসছে এই দম বন্ধ করা পচা গন্ধটা। বাঁকানো নখওয়ালা আঙুল তুলে তীক্ষ্ন নারীকণ্ঠে সে বলে উঠল, পুজো না হতেই ভোগে হাত দিস তুই? কত্তায় তোরে স্নেহ করে আর তার এই দাম দিলি? কুত্তার মতো মরবি তুই। যন্ত্রণার মরণ হবে তোর।

ভয়ে চিৎকারটুকুও করতে পারল না ধনা। শুধু অনুভব করল তার পা বেয়ে গড়িয়ে নামছে প্রস্রাব।

. . .

ধনার গলায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকনাথ। গলার ওপর পায়ের চাপ বাড়াচ্ছে ক্রমাগত আর মরে যেতে যেতে ধনার চোখের সামনে ভেসে উঠছে যন্ত্রণাকাতর দু'টি কুকুরের মুখ। কিছুক্ষণ আগে জ্যাক দিয়ে মেরে সে যাদের মাজা ভেঙে দিয়ে এসেছে।

গজরাচ্ছিল লোকনাথ, পথের কুকুর, কৃমিকীট। এত সাহস তোর! এত সাহস!

গেনু ডাকল, ছাড়ি দেন কত্তা। মরে গেছে।

ধনার নিথর দেহটার দিকে তীব্র ঘৃণার চোখে তাকিয়ে এক দলা থুতু ফেলল লোকনাথ। তার পর গাছতলায় বসে গামছা দিয়ে ঘাম মুছে বলল, কাল তোর খাটনি কমল গেনু। কাল আর মরা খুঁজতে যেতে হবে না। এই মরাটাই কাজে লাগিয়ে দেব। একটু জল দে তো।

থপথপ করে একটা ঘটি হাতে লোকনাথের সামনে এসে দাঁড়াল গেনু। এক নিঃশ্বাসে সবটা জল খেয়ে লোকনাথ বলল, মানুষের ওপর ঘেন্না ধরে গেল বুঝলি গেনু? এরা বড্ড নিমকহারাম। তুমি যতই এদের ভাল করতে যাবা এরা তোমায় পেছন থেকে ছুরি মারবে। না রে, তার চেয়ে তুই অনেক ভাল। অনেক ভাল। তুই কোনও দিন আমার বিশ্বাস ভাঙিসনি। আমি যত দিন জেলে ছিলাম আমার শেষ হুকুম তামিল করার জন্য ঘুরে বেরিয়েছিস। আমার বউ তোরে খুব জ্বালিয়েছে আমি জানি। সেই জন্যই তো শক্তি ফিরে পেয়ে ও শালীকে সবার আগে বন্দি করেছি। আর তোরে কেউ জ্বালাবে না। অনেক করেছিস তুই আমার জন্য।

ফোকলা মুখে মিহি গলায় গেনু বলল, আপনি আমার মালিক। আমি আপনার হুকুমের চাকর। আপনার জন্য আমার তো করা লাগবই কত্তা।

লোকনাথ স্নেহের হাসি হাসল, কিন্তু তোরেও তো এর একটা প্রতিদান দিতে হয়। কখনও তো তোরে কিছু দিই নাই। তবে এ বার দেব।

গেনু অবাক হল, কী দেবেন কত্তা?

বাচ্চাদের মতো মাথা নেড়ে হাততালি দিয়ে খুশিয়াল গলায় লোকনাথ বলে উঠল, মিতুল নামে পুতুলটি। মিতুল নামে পুতুলটি।

১০

হি ইজ আ মনস্টার।

ঘেন্নায় মুখ কুঁচকে কথাগুলো বলে ফাইলটা টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল অমিয়।

কৌতূহলী চোখে তাকাল পল্লব আর সঞ্জয়। দীপক পালের চোখ দু'টো টকটকে লাল। অনেকখানি জল চোখের কোলে এসে থমকে থাকলে তবেই এমন রক্তাভা জন্ম নেয়। সেই লাল চোখ তুলে দীপক পাল জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখলেন স্যার?

মাথা নেড়ে বিষণ্ণ গলায় অমিয় বলল, গতিক সুবিধের ঠেকছে না পালদা। মিতুলের ভারী বিপদ।

এক বার যেন কেঁপে উঠলেন দীপক পাল। চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরে নিজেকে সামলে বললেন, একটু খুলে বলুন স্যার।

সঞ্জয় বলল, হ্যাঁ অমিয়। কী দেখলি প্লিজ সবটা বল। আমি যতদূর জানি মামার চোদ্দো বছরের মেয়াদ হয়েছিল। কিন্তু হিসেব মতো সে মেয়াদ তো আজ থেকে বছর সাতেক আগে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। তা এত দিন পরেই যদি উদয় হল তা হলে মাঝের সাত বছর লোকটা ছিল কোথায়?

জেলে।

এক সাথে চমকে উঠল পল্লব আর সঞ্জয়। সঞ্জয় অবাক হয়ে বলল, জেলে? তবে কি আবার কোনও ক্রাইম?

অমিয় মাথা নাড়ল, খুন। প্রথম বার সাজা পাওয়ার মেয়াদ শেষ হতে যখন আর দু'বছর বাকি তখন আর একটা খুন করে পাষণ্ডটা আর সেটা জেল প্রেমিসেসের মধ্যেই। তাতে সাজার মেয়াদ আরও চোদ্দো বছর বেড়ে যায়।

সঞ্জয় বলল, তা হলে তো লোকটার এখন জেলে থাকার কথা।

হ্যাঁ। কিন্তু মাস দুয়েক আগে লোকটা জেলের দু'জন গার্ডকে আহত করে পালানোর চেষ্টা করে এবং পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী এনকাউন্টারে তার মৃত্যু হয়।

কিন্তু সেটা তো ভুল রিপোর্ট, উত্তেজিত হয়ে উঠল সঞ্জয়।

অমিয় বলল, হ্যাঁ ভুল তো। কিন্তু অমন একটা নটোরিয়াস ক্রিমিনাল নাকের ডগা দিয়ে পালিয়ে গেল এটা জানাজানি হওয়া কি পুলিশের পক্ষে খুব সম্মানের? তার চেয়ে এনকাউন্টার শব্দটা অনেক বেশি বীরত্বব্যঞ্জক নয় কি?

কথাটা শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল অমিয়। পল্লব বলে উঠল, কিন্তু লোকটা পরের খুনটা করেছিল কেন? যাকে মেরেছিল তার সাথে কোনও রাইভালরি ছিল?

না রে। ও সব কিছু না।

তবে?

উত্তর না দিয়ে দীপক পালের দিকে তাকাল অমিয়। দীপক পালও একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন অমিয়র দিকে। তার পর বললেন, আমার সামনে কথাটা বলতে অস্বস্তি বোধ করছেন তাই না স্যার? ভাববেন না, বলুন। মিতুলের হারিয়ে যাওয়াটা যখন মেনে নিতে পেরেছি তখন এটাও মানতে পারব। মিতুলকে তো খুঁজে পেতে হবে। হয়তো এর মধ্যেই কোনও সূত্র লুকিয়ে আছে।

বলেছিলেন বটে, কিন্তু মেনে নেওয়াটা সহজ হল না দীপক পালের পক্ষে। অমিয়র কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন তিনি। তার পর এই প্রথম বার ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। পাগলের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে তিনি বলতে থাকলেন, এ হতে পারে না স্যার। মিতুলের দেহের ওপর বসে কেউ শবসাধনা করবে এ হতে পারে না। একটা রাত পার হয়ে গেল স্যার। ওই লোকটা এতক্ষণে মিতুলকে কথাটা শেষ করতে পারলেন না দীপক পাল। তাঁর হেঁচকি উঠতে শুরু করল। কিন্তু দীপক পাল তখনও জানতেন না তাঁর আদরের মিতুলের সাথে যা হতে চলেছে তার থেকে মৃত্যু অনেক কম যন্ত্রণাদায়ক, অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য!

তিন বন্ধু মিলে যখন দীপক পালকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল এক কনস্টেবল। দরজায় দু'টো টোকা দিয়ে বলল, স্যার পালবাবুর মেয়ের কলেজের বাইরে যে ফলওয়ালা বসে সে দেখা করতে চায়। বলছে, পালবাবুর মেয়ের ব্যাপারে কিছু জানে।

কথাটা শুনেই সোজা হয়ে বসলেন দীপক পাল। হেঁচকি তুলতে তুলতেই অমিয়কে বললেন, স্যার, যিনি ফল বিক্রি করেন তাঁকে আমি যাতায়াতের পথে অনেক বার দেখেছি। ভদ্রলোককে ডাকব ভিতরে?

চরম বিপদেও ডেকোরাম ভোলেননি পুলিশ কর্মচারীটি। তিনি জানেন, মিতুলের অন্তর্ধান কেসের চার্জে আছেন তাঁর বস এস আই অমিয় বোস। বসের অনুমতি ছাড়া কারও জবানবন্দি তিনি নিতে পারেন না। দীপক পালের কথার উত্তর না দিয়ে অমিয় সোজা কনস্টেবলটিকে বলল, ভিতরে পাঠিয়ে দিন।

মন্থর পদক্ষেপে যিনি ভেতরে ঢুকে এলেন তাঁকে ফলওয়ালা কম, পুরোহিত বেশি মনে হয়। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। শান্ত সৌম্য দোহারা চেহারা। সাদা চুল। এক মুখ সাদা দাড়ি। পরনে সাদা ধুতি আর সাদা ফতুয়া। তাঁকে চেয়ার এগিয়ে দিলেন দীপক পাল, বসুন।

চেয়ারে বসে হাত জোড় করে ভদ্রলোক বললেন, নমস্কার। আমার নাম বলরাম চট্টোপাধ্যায়। আমি দিনের বেলা গভর্নমেন্ট কলেজের গেটে ফল বিক্রি করি আর সন্ধেবেলায় বারো হাত কালীমন্দিরে পুজো করি। আমি মায়ের নিত্যসেবক।

পল্লব আর সঞ্জয়ের চোখাচোখি হল। পল্লবের জানতে ইচ্ছে করছিল, জীবিকার এমন অদ্ভুত কম্বিনেশনের কারণ কী? কিন্তু সেটা জিজ্ঞেস করার আর সুযোগ পেল না। তার আগেই অমিয় মূল প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ল, কখন জানতেন পারলেন মিতুলকে পাওয়া যাচ্ছে না?

বলরাম বললেন, আজ কলেজে এসে। তবে শ্যামশ্রী দিদিভাইয়েরর ডাকনাম যে মিতুল তা আমি জানতাম না। আমি শুনেছিলাম, ওর বাবা বারাসাত থানায় পোস্টেড। তাই ছুটে এসেছি। ওর বাবার সাথে একটি বার দেখা করা যায়?

দীপক পাল কিছু বলার আগেই চোখের ইশারায় তাঁকে থামিয়ে দিয়ে অমিয় বললেন, আমি এ কেসের চার্জে আছি। আপনি যা বলার আমাকে বলুন।

ম্লান হেসে বলরাম বললেন, আপনাকে বলতেও আমার কোনও আপত্তি নেই। তবে আমি যা বলব তা হয়তো আপনি বিশ্বাস করবেন না।

আমি বিশ্বাস করব না অথচ মিতুলের বাবা করবেন?

আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন, অসুখ যখন খুব বাড়াবাড়ি হয় তখন ঘোর নাস্তিকও চরণামৃত নিতে আসে। তাবিজ, কবজ পরে নিরাময়ের চেষ্টা করে। উনি তো বাবা, যে কোনও উপায়ে মেয়েকে ফিরে পেতে চাইবেন। তাই আমার কথা বিশ্বাস করবেন।

বেশ। আপনি বলুন কী বলতে চান। তার পর ভেবে দেখা যাবে আপনার কথা বিশ্বাসযোগ্য কি না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলরাম বললেন, গুরুর আশীর্বাদে আমি সামান্য কিছু ক্ষমতা আয়ত্ত করেছিলাম। কিন্তু চর্চার অভাবে সে সব ধরে রাখতে পারিনি। তবু মাঝে মাঝে পুরনো বিদ্যা চলকে ওঠে। গতকালও তাই হয়েছিল। শ্যামশ্রী যখন কলেজ থেকে বেরচ্ছিল তখন ওকে অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাশে লাগছিল। মনে হচ্ছিল কিছু যেন ওকে টানছে। যেন একটা অশুভ ছায়া ওর শরীরের ওপর লেপটে ছিল সূক্ষ্ম রেশমি কাপড়ের মতো। আমি বার দুয়েক ওকে ডেকেওছিলাম কিন্তু ও শুনতে পায়নি। তার পর ভেবেছিলাম, হয়তো আমার ভুল হয়েছে। কিন্তু আজ যখন এসে শুনলাম, ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তখনই বুঝলাম আমি ভুল দেখিনি। বড় আফসোস হচ্ছে আমার। কেন যে চর্চা ছেড়ে দিলাম? যদি চর্চা থাকত তা হলে হয়তো আমি মনের ভুল ভেবে ঘটনাটাকে উড়িয়ে দিতাম না। বিপদটা আটকাতে পারতাম। বড় লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে শ্যামশ্রী।

নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না দীপক পাল। হাত জোড় করে বলে উঠলেন, ঠাকুরমশাই, আমি শ্যামশ্রীর বাবা। একটা কথা বলবেন শুধু? আমার মেয়েটা বেঁচে আছে তো?

চমকে উঠলেন বলরাম। উঠে দাঁড়িয়ে দীপক পালের হাত ধরে বললেন, ছি ছি। এমন অলুক্ষুণে কথা বলছেন কেন? মায়ের ওপর বিশ্বাস রাখুন। কিচ্ছু হবে না শ্যামশ্রীর।

ধরা গলায় দীপক পাল বললেন, বিশ্বাস রাখতেই চাই ঠাকুরমশাই। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে চাই আমার মেয়েটার কিচ্ছু হয়নি। ও সুস্থ আছে, ভাল আছে। আমি বিশ্বাস করতে চাইছি ও আবার ফিরে আসবে। আমায় বাবা বলে ডাকবে কিন্তু মন মানছে না। আমরা জানতে পেরেছি, যে লোকটা ওকে ধরে নিয়ে গেছে সে একজন তান্ত্রিক। শবসাধনা করে। একটা গোটা রাত কেটে গেছে ঠাকুরমশাই। আমার মেয়েটাকে এতক্ষণে সে মেরে ফেলেনি তো?

আর্ত কণ্ঠে বলরাম বলে উঠলেন, না না। এ সম্ভব নয়। এ অসম্ভব।

অমিয় এতক্ষণ চুপ ছিল। এ বার একটু ইতস্তত করে বলে উঠল, আপনি এত কনফিডেন্টলি কী করে বলছেন?

দৃঢ় কণ্ঠে বলরাম বললেন, বলছি, তার কারণ আমি জানি এত তাড়াতাড়ি শ্যামশ্রীর মৃত্যু নেই।

যেন মাঝসমুদ্রে একখানি কুটো দেখতে পেয়েছেন দীপক পাল। ব্যগ্র ভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কী ভাবে ঠাকুরমশাই? কী ভাবে জানলেন আপনি?

ম্লান হাসলেন বলরাম, এ আমার অভ্যেস বলতে পারেন। আমার কাছে যারা ফল কিনতে আসে নেহাতই কৌতূহলের বশে আমি তাদের হাতের রেখাগুলি লক্ষ্য করি। তাদের কিছু বলি না, এমনিই দেখি। আমি শ্যামশ্রীর হাতও দেখেছি। ওর আয়ুরেখা তো এত ক্ষুদ্র নয়!

পল্লব বলে উঠল, আপনি হাত দেখতে পারেন?

মৃদু ঘাড় নাড়লেন বলরাম। তার পর দীপক পালের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার মেয়ে যে বিপদের মধ্যে আছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই কিন্তু আমি আপনাকে বলছি, আপনার মেয়ে বেঁচে আছে।

বৃদ্ধের দু'হাত জড়িয়ে ধরলেন দীপক পাল, আপনার কথা যেন সত্যি হয় ঠাকুরমশাই। একটাই অনুরোধ, এতটা যখন উপকার করলেন আর একটু করুন। আমার মেয়েটাকে কী ভাবে খুঁজে পাব একটু বলে দিন। আমরা গোটা এলাকা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি কিন্তু কিচ্ছু পাইনি। এমনকী কোনও সূত্র অবধি পাইনি। ধনা বলে এক পাতাখোরের সাথে ওই তান্ত্রিকের খানিক জানাশোনা ছিল কিন্তু ওই ধনা ছেলেটিও যেন কাল রাত থেকে উবে গেছে। কিছু একটা ব্যবস্থা করুন ঠাকুরমশাই।

মাথা নাড়লেন বলরাম। অসহায় গলায় বলে উঠলেন, আমার যদি সে ক্ষমতা থাকত আপনাকে বলতে হতো না। কিন্তু আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়নি। এ পথের অন্ধিসন্ধি আমি জানি না। আর যে শ্যামশ্রীকে লুকিয়ে রেখেছে সে কোনও সাধারণ তান্ত্রিক নয় বলেই মনে হচ্ছে। আমার সাধ্য নেই তার অবস্থান নির্ণয় করি। তবে অমিয়রা চার জন একসাথে বলে উঠল, তবে?

তাদের চিন্তিত মুখের ওপর এক বার দৃষ্টি বুলিয়ে বলরাম বললেন, এক জন আছেন। যিনি চাইলেই আপনাদের সাহায্য করতে পারেন। তবে চাইবেন কি না আমি জানি না।

অমিয় বলল, কে তিনি?

আমার গুরু নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। তিনি এই গভর্নমেন্ট কলেজেরই সংস্কৃতর অধ্যাপক ছিলেন। পঁচিশ বছর হল রিটায়ার করেছেন। সমস্ত প্রাচীন শাস্ত্র তাঁর নখদর্পণে। নিজেও তন্ত্রসিদ্ধ। বহু গোপন ও জটিল তন্ত্রসাধনা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান তাঁর। আমি যেটুকু যা ক্ষমতা পেয়েছিলাম তাঁরই কৃপায়। কিন্তু আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে রাতারাতি এ সমস্ত চর্চা বন্ধ করে দেন তিনি। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে মারতে উঠতেন। অনেক সাধ্যসাধনা করেও তাঁকে টলাতে পারিনি। তার পর আরও গুরু ধরেছিলাম কিন্তু মন বসাতে পারিনি। মন থেকে একবার যে গুরুর কাছে নাড়া বাঁধা হয় তিনি ছাড়া অন্য কারও কাছে মন্ত্রদীক্ষা হয় না। ধীরে ধীরে আমারও চর্চা কমে গেল। সব ভুলে গেলাম।

ব্যাকুল গলায় দীপক পাল বললেন, মিতুলের এমন বিপদ শুনলেও কি তিনি সাহায্য করবেন না?

মাথা নাড়লেন বলরাম, জানি না। একটা সময় পর্যন্ত অনেকেই অনেক সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে যেত কিন্তু সবাইকেই ফিরিয়ে দিতেন, বলতেন, ও আমি ছেড়ে দিয়েছি।

দীপক পাল বললেন, আচ্ছা, আপনি যদি অনুরোধ করেন তাতেও রাজি হবেন না?

আঁতকে উঠলেন বলরাম, আমি? না না। আমার কথা ভুলেও বলবেন না। যদি জানতে পারেন আমি আপনাদের এ সব বলেছি আমাকে জুতোপেটা করবেন। আর হয়তো মুখই দেখবেন না কোনও দিন।

অশীতিপর এক বৃদ্ধ মধ্য ষাটের আর এক বৃদ্ধকে জুতোপেটা করছেন, দৃশ্যটা ভাবতেই হাসি পেয়ে গেল পল্লবের। হাসি এক অদ্ভুত চিত্তবৃত্তি। খুব গম্ভীর সময়েও সোডার মতো ভুসভুসিয়ে উঠে আসে। হয়তো হেসেই ফেলত পল্লব কিন্তু সঞ্জয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সামলে নিল নিজেকে। কলেজের এই বন্ধুটিকে হাতের তালুর মতো চেনে সঞ্জয়। কোন কথায় পল্লব কী করতে পারে সে সম্পর্কে তার স্পষ্ট ধারণা আছে। তাই জুতোপেটা শব্দটা শুনেই সে কঠিন চোখে তাকিয়েছিল পল্লবের দিকে।

সামান্য নীরবতার পর দীপক পাল বলে উঠলেন, তা হলে এখন উপায় ঠাকুরমশাই?

বলরাম বললেন, মায়ের ওপর বিশ্বাস রাখুন। আপনারা ভাদুড়ি স্যারের সঙ্গে দেখা করুন। দক্ষিণপাড়ায় ঢুকে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই ওনার বাড়ি দেখিয়ে দেবে। সবটা খুলে বলুন ওনাকে। অনুরোধ করুন। হতেও তো পারে উনি রাজি হয়ে গেলেন। এখন এই একমাত্র উপায়।

টেবিল থেকে টুপিটা তুলে নিল অমিয়। বলল, ঠিক বলেছেন। উই হ্যাভ নো আদার অপশন। উই হ্যাভ টু কনভিন্স দ্যাট ওল্ড ফেলো। পালদা চলুন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ বলরামবাবু।

হাত জোড় করে বলরাম বললেন, কী হল আমাকে জানাবেন দয়া করে। শ্যামশ্রীর জন্য আমিও বড় চিন্তায় আছি।

থানার জিপে করেই ওরা চার জনে রওনা দিল নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ির বাড়ির উদ্দেশে। গাড়িটা চালাচ্ছে অমিয়। পল্লব তার পাশে। পেছনের সিটে সঞ্জয় আর দীপক পাল। কেউ কোনও কথা বলছে না। অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চার জনকেই। এ যেন এক অনিশ্চিত বিষণ্ণ ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা। নীরবতা ভেঙে প্রথম কথাটা বলে উঠল সঞ্জয়, একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না বুঝলি অমিয়?

রাস্তার দিকে চোখ রেখেই অমিয় বলল, কী?

মামা তো থাকত বর্ধমানের একটা প্রত্যন্ত গ্রামে। আমার স্পষ্ট মনে আছে আমরা বর্ধমান স্টেশনে নেমেছিলাম। তার পর আমাকে কাঁধে নিয়ে মামা টানা দেড় দিন হেঁটেছিল। শ্মশানের পাশে মাটির বাড়িটার কথাও আমার স্পষ্ট মনে আছে। তা হলে মামা বারাসাতে কী করছে? এত জায়গা থাকতে বারাসাত কেন?

ঘুরে তাকাল পল্লব, সত্যিই তো। এটা তো একটা ভাবার মতো কথা। গেনু এসে একটার পর একটা ডেডবডি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তার পর মিতুলকে ধরে নিয়ে গেল লোকটা। কিছু তো একটা মতলব আছেই কিন্তু সেটার সাথে বারাসাতের কী লিঙ্ক?

মাথা নাড়ল সঞ্জয়, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। তবে কিছু না কিছু একটা যোগসূত্র তো আছেই। লোকনাথ চক্রবর্তী এমনি এমনি কিছু করার লোক না।

আচমকাই ধক করে জ্বলে উঠল দীপক পালের চোখ দু'টো। সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, ভাই যদি এ লোকটার সাথে আমার দেখা হয় আর তখন আপনি যদি আমার সাথে থাকেন অন্যদিকে তাকিয়ে থাকবেন কেমন? আমি এই লোকটার কলজেটা উপড়ে নেব। যতই হোক আপনার মামা। এ দৃশ্যটা দেখা আপনার উচিত হবে না।

রিয়ার ভিউ মিররে অবাক হয়ে দীপক পালের দিকে তাকিয়ে রইল অমিয়।

. . .

সাদা রঙের তিন তলা বাড়ি। বাড়ির সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে বাগান। মরশুমি ফুল লাগানো হয়েছে। জবা, শিউলি, গন্ধরাজ ইত্যাদি গুল্মজাতীয় গাছও আছে কয়েকটা। গোলাপি আর বেগনি রঙের বোগেনভিলিয়ার ঝাড় উঠে গেছে গেটের দু'পাশ দিয়ে। সেই ফুলেই ঢাকা পড়েছে গেটের খানিকটা অংশ। তার ফাঁক দিয়ে ভাল করে নজর চালালে চোখে পড়ে বাড়ির নাম, শ্রীরঞ্জনী।

গেটে তালা দেওয়া নেই। মোরাম বিছানো পথ ধরে ওরা চার জনে এগিয়ে এল মূল বাড়ির দিকে। কলিং বেল বাজাতেই বছর ত্রিশের একটি মেয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। অমিয় আর দীপক পালের পোশাক দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কাকে চান?

অমিয় হাত জোড় করে বলল, নমস্কার। নীরেন্দ্রনাথ স্যার আছেন?

মেয়েটি একটু অবাক হল, হ্যাঁ। দাদু আছেন কিন্তু আপনাদের কি আসার কথা ছিল?

অমিয় বলল, না। আসলে খুব দরকারে আচমকাই আসতে হয়েছে আমাদের।

কিন্তু দাদু তো এ ভাবে কারও সঙ্গে দেখা করেন না।

দীপক পাল দু'পা এগিয়ে বলে উঠলেন, আমরা জানি। বিশ্বাস করুন, ওনাকে এভাবে বিরক্ত করতেও চাইনি। কিন্তু আমাদের কাছে আর কোনও উপায় ছিল না। আমার মেয়েকে কাল রাত থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা জানতে পেরেছি এটা কোনও তান্ত্রিকের কাজ। লোকটা খুব খারাপ। আমার মেয়েটা বড় বিপদে আছে। আপনি প্লিজ ওনার সাথে একটু দেখা করার ব্যবস্থা করে দিন।

দীপক পালের আকুলতা মেয়েটিকে স্পর্শ করল বোধ হয়। কোল্যাপসিবল গেটটা খুলে দিয়ে বলল, ভিতরে এসে বসুন। আমি দাদুকে বলে দেখছি।

মেয়েটি ভিতরে চলে গেল। মিনিট তিনেক পর ফিরে এসে বলল, আসুন। দাদু স্টাডিতে আছেন।

স্টাডি রুমের দরজাটা দেখিয়ে দিয়ে ফের ভিতরে চলে গেল মেয়েটি। কপালে হাত ঠেকিয়ে দীপক পাল চাপা গলায় অমিয়কে বললেন, দেখা করতে যখন রাজি হয়েছেন তখন আশা করি খালি হাতে ফিরতে হবে না। তাই না স্যার?

অমিয় বলল, তাই তো মনে হচ্ছে। চলুন দেখা যাক।

ঘরটায় ঢুকেই থমকে গেল পল্লব। নিজের লাইব্রেরিটা নিয়ে তার মনে এত দিন বেশ একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল। কিন্তু এই ঘরটায় ঢুকেই তা নিমেষে ধূলিসাত হয়ে গেল। কোনও ব্যক্তি মানুষের সংগ্রহে যে এত বই থাকতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। কুড়ি বাই কুড়ি ফুটের চৌকোনা ঘরটা জুড়ে সিলিং পর্যন্ত উঁচু প্রচুর আলমারি। তাদের প্রতিটা তাক বইয়ে ঠাসা। আলমারিতে জায়গা হয়নি বলে মেঝেতে কাঠের পাটাতন পেতে তার ওপরেও স্তূপীকৃত বই রাখা। প্রেসিডেন্সি কলেজের আর্টস লাইব্রেরির সামনের ঘরেও বুঝি এত বই নেই! একটাই জানলা খোলা। সেই জানলা দিয়ে আলো আসছে আর তাতেই দেখা যাচ্ছে, এই বইয়ের সমুদ্রের মাঝে ইজিচেয়ারে বসে আছেন অশীতিপর মানুষটি। তাঁর হাতেও একটি বই।

কিছু কিছু মানুষ থাকে যাদের সামনে এলে নিজে থেকেই মাথা নত হয়ে আসে। ইনিও তেমনই। পঁচাশি বছর বয়স কিন্তু এখনও যেন ঋজু শালবৃক্ষটি। ভারী পাওয়ারের চশমার আড়ালে উজ্জ্বল চোখ দু'টি তাঁর গভীর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করছে। তবে ইজিচেয়ারের পাশে দাঁড় করানো দু'টি ক্রাচ দেখে বোঝা যায়, বাকি শরীরে কেরামতি দেখাতে না পেরে বার্ধক্য পা দুটিকে জখম করে দিয়ে গেছে। অমিয়দের দেখে গম্ভীর গলায় তিনি বলে উঠলেন, কী ব্যাপার? সকাল সকাল পুলিশের লোক আমার বাড়িতে কেন?

চার জনে চোখাচোখি হল। ওরা বুঝতে পারল মেয়েটি দাদুকে সবটা বলেনি। দীপক পাল হাত জোড় করে বললেন, স্যার, বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি।

ভুরু কুঁচকে গেল নীরেন্দ্রনাথের। বললেন, সে কী কথা! মানুষ বিপদে পড়লে ডাক্তার, উকিল আর পুলিশের কাছে যায়। আমি সামান্য মাস্টার। পুলিশ বিপদে পড়ে আমার কাছে আসবে কেন?

কেউ কিছু বলার আগেই পল্লব ফস করে বলে বসল, সামান্য মাস্টার হতে যাবেন কেন স্যার? আপনি তো একজন তন্ত্রসিদ্ধ সাধক।

দুম করে হাতের বইটা বন্ধ করে ইজি চেয়ারের ওপরেই সোজা হয়ে বসলেন নীরেন্দ্রনাথ। সঞ্জয় বুঝতে পারল, যে তীর বেরিয়ে গেছে তাকে আর ফেরানো যাবে না। তবু সে একটা চেষ্টা করতে গেল। দ্রুত বলে উঠল, তা না স্যার। আসলে...

থামুন, রীতিমতো গর্জন করে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়। বিরক্তি ঝরে পড়ছে তাঁর সমস্ত শরীর দিয়ে। সেই বিরক্তিই যেন কতগুলো কথা হয়ে তাঁর কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল, কে বলেছে আপনাদের আমি তন্ত্রসিদ্ধ? মারণ, উচাটন আর বশীকরণ এই তিনটে শব্দ ছাড়া আর কী জানেন তন্ত্র সম্পর্কে? কী ভেবেছেন, তন্ত্র মানে ভূতের রোজা? আপনারা বিপদে পড়বেন আর আমি এখানে বসে ঘটি চেলে তার সমাধান বার করে দেব? তন্ত্র ছেলের হাতের মোয়া নয়। খোলামকুচি নয়। কঠিনতম সাধনা ও অভ্যাসে এ বিদ্যা আয়ত্ত করতে হয়। আমার সাধনাও নেই। অভ্যাসও নেই। আমি কিচ্ছু জানি না তন্ত্রের। চলে যান আপনারা।

কেঁদে উঠে বৃদ্ধের পায়ের কাছে আছড়ে পড়লেন দীপক পাল, আমাদের ফিরিয়ে দেবেন না স্যার। আপনি ছাড়া এ বিপদ থেকে আমাদের আর কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। দয়া করুন স্যার। দয়া করুন।

দীপক পালের বুকফাটা কান্নায় বুঝি পাথরও গলে যেত কিন্তু বৃদ্ধের মন গলল না। বাঁ হাত তুলে দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে ক্রুদ্ধ দুর্বাসার মতো বলে উঠলেন, আর একটাও কথা না। এই মুহূর্তে আমার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে না গেলে আমি সর্বান্তকরণে আপনাদের অকল্যাণ কামনা করব। তন্ত্র না জানি, আমি আনখশির সাত্ত্বিক মানুষ। জীবনে সজ্ঞানে কোনও অন্যায় করিনি। আমার শান্তি বিঘ্নিত হলে আমার অভিশাপ তীব্রতর হবে।

স্তম্ভিত হয়ে গেল ওরা চার জন। ব্রহ্মতেজ বোধ হয় একেই বলে। বৃদ্ধের সাথে আর একটিও কথা বলার সাহস হল না কারও। দীপক পালের জামার হাতায় টান দিয়ে অমিয় চাপা গলায় বলে উঠল, চলে আসুন পালদা। এখানে কথা বাড়িয়ে লাভ হবে না।

১১

স্বভাবগম্ভীর কোনও মানুষকে যখন শিশুসুলভ অস্থিরতা আচ্ছন্ন করে তখন তা দেখতে ভারী মজাদার লাগে। যদিও পরিস্থিতি একেবারে মজার নয় তবু পল্লবের একটি ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা আছে। সে খুব জটিল অবস্থার মধ্যেও হাসি ও মজার উপাদান খুঁজে নিতে পারে এবং আশেপাশের লোকজন যখন টেনশনে পাগল তখন সে একা একা ফিকফিক করে হাসতে পারে। এই জন্য সে ছেলেবেলা থেকে ঝাড় খেয়ে আসছে কিন্তু কিছুতেই নিজেকে শোধরাতে পারেনি। অবশ্য শোধরানোর চেষ্টা করেছে বলে মনেও হয় না। সঞ্জয় একবার বলেছিল, সবকিছু নিয়ে এত ক্যাজুয়াল কেন তুই পল্লব? সিরিয়াসনেস বলে কি কোনও বস্তু নেই তোর মধ্যে? সবসময় খিল্লি করতেই হবে?

উত্তরে গম্ভীর হয়ে পল্লব বলেছিল, তুই ওই গানটা শুনেছিস?

কোন গানটা?

ওই যে, 'তিনটি মন্ত্র নিয়ে যাদের জীবন/সত্যম, শিবম, সুন্দরম/দুঃখের পৃথিবীটা তাদের কাছে এক আনন্দআশ্রম।'

তুই বলতে চাইছিস সত্য, শিব আর সুন্দর তোর জীবনের মূলমন্ত্র?

একেবারেই না। আমার জীবনের তিনটে অন্য মন্ত্র আছে। হাজি, হাট্টা আর হামাজম। তিনটি মন্ত্র নিয়ে যাদের জীবন/হাজি, হাট্টা আর হামাজম/দুঃখের পৃথিবীটা তাদের কাছে এক ফানন্দআশ্রম।

সঞ্জয় আকাশ থেকে পড়েছিল, মানে? মানে কী এ সবের?

রীতিমতো দার্শনিকের মতো ভঙ্গিতে পল্লব বলেছিল, দেখ আনন্দ খুব মানডেন। তার থেকে ফান ইজ ফার বেটার। তাই ফানন্দআশ্রম। আর হাজি, হাট্টা, হামাজম মানে হাসি, ঠাট্টা আর তামাশা।

ভেবলে গিয়ে সঞ্জয় বলেছিল, তা নরমালি বললেই হয়। অমন বিকৃত করার কী আছে?

ফিক করে হেসে পল্লব বলেছিল, এমনি। জাস্ট ফর ফান।

সেই দিনের পর থেকে সঞ্জয়ও হাল ছেড়ে দিয়েছিল। এখন পল্লব হাসছে নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়িকে দেখে। ভাদুড়ি মশায় বসে আছেন বারাসাত হাসপাতালে তিতাসের চেম্বারে আর অস্থির বাচ্চাদের মতো একবার কলম তুলে প্যাডে দাগ কাটছেন, পরক্ষণেই সেটা রেখে দিয়ে পেপারওয়েটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছেন। তার পরেই আবার সেটা মুঠোয় নিয়ে আকুল হয়ে তাকাচ্ছেন দরজার দিকে। পল্লব বুঝতে পারছে, বৃদ্ধের মনের মধ্যে অসম্ভব এক টেনশন কাজ করছে। এই চঞ্চলতা তারই বহিঃপ্রকাশ। তবু, হাসিটাকে বাগে আনতে পারছে না সে।

অবশ্য টেনশন হওয়াই স্বাভাবিক। আচমকা যে ঘটনাটা ঘটল তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। পল্লবরা তো রীতিমতো ঘাবড়েই গেছিল। সবচেয়ে বেশি ঘাবড়ে গেছিলেন ভাদুড়ি মশায় নিজে। সে অবস্থায় হাল ধরেছিলেন দীপক পাল।

ভাদুড়ি মশায়ের তিরস্কার শুনে, ফিরে যাবে বলে ওরা তখন সবে স্টাডির দরজার কাছে এসেছে তখনই ভিতরের একটা ঘর থেকে হুড়মুড় করে কিছু পড়ার জোর শব্দ হল। চমকে উঠল সবাই। শব্দটা ভাদুড়ি মশায়ও পেয়েছেন। চিন্তিত স্বরে তিনি জোর গলায় ডেকে উঠলেন, দিদিভাই? দিদিভাই?

কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। পল্লবদের তখন ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা। বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাবে না ভেতরের ঘরে গিয়ে দেখবে কী হল, বুঝতে পারছে না। সাধারণ বুদ্ধি বলছে, গিয়ে দেখা উচিত কিন্তু পরক্ষণেই একটু আগে দেখা ভাদুড়ি মশায়ের ক্রুদ্ধ মুখটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে।

ভাদুড়ি মশায় আরও দু'বার ডাকলেন। সাড়া না পেয়ে উঠতে গেলেন ইজিচেয়ার থেকে। তাড়াহুড়োয় একটা ক্রাচ পড়ে গেল মাটিতে। এ বার ছুটে গেল অমিয়। ক্রাচটা তুলে দিল বৃদ্ধের হাতে। ক্রাচ নিয়ে যতটা দ্রুত হাঁটা সম্ভব ততটাই দ্রুত ভিতরের ঘরের দিকে চললেন ভাদুড়ি মশায়। চোখাচোখি করে ওরা চার জনও পিছু নিল তাঁর। ভিতরের ঘরের দরজার সামনে পৌঁছেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন বৃদ্ধ। গলা চিরে বেরিয়ে এল করুণ আর্তনাদ, দিদিভাই!

বৃদ্ধের ঘাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে যা দেখল তাতে তাতে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল ওরা চার জন। একটু আগেই যে মেয়েটি ওদের ভিতরে আসতে দিয়েছিল সে উপুড় হয়ে পড়ে আছে মাটিতে। পড়ে থাকার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি সম্পূর্ণ অচেতন। পাশেই মাটিতে ভেঙে ছড়িয়ে আছে একটি চিনেমাটির ফ্লাওয়ার ভাস। বোঝা যাচ্ছে, ছুটে আসতে গিয়ে ওই ফ্লাওয়ার ভাসেই ধাক্কা খেয়ে মেয়েটি পড়ে গেছে। সে জন্যই অমন বিকট শব্দ হয়েছিল। অসহায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বৃদ্ধ। বুঝি বা মনে মনে অকেজো পা দু'টিকে অভিসম্পাত করছিলেন। তখনই এগিয়ে এসেছিলেন দীপক পাল, স্যার, একটু সরে দাঁড়ান প্লিজ। আমাকে ভিতরে যেতে দিন।

কথা না বাড়িয়ে সরে দাঁড়িয়েছিলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটেছিল। তৎপর হাতে মেয়েটিকে সোজা করে শুইয়ে নাড়ি টিপে ধরেছিলেন দীপক পাল। কয়েক সেকেন্ড পরে বলে উঠেছিলেন, নাড়ি পাচ্ছি না। হসপিটালাইজড করতে হবে।

ভাদুড়ি মশায়ের কথা থেকে জানা গেছিল, এই মুহূর্তে বাড়িতে তিনি আর তাঁর নাতনি ছাড়া আর কেউ নেই। কাজের লোকটিও অসুস্থ বলে আসেনি। ফোন করলে ড্রাইভার চলে আসবে তবে তাতে অনেকটা সময় লাগবে। সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় তিনি বলেছিলেন, আমার লাইব্রেরিতে টেবিলের ওপর একটা ডায়েরি আছে। ওতে ফোন নম্বর লেখা থাকে। ওখান থেকে নম্বর নিয়ে একটু অ্যাম্বুল্যান্সে ফোন করবেন? পাড়ার ক্লাবেই একটা অ্যাম্বুল্যান্স আছে।

ফোন করা হয়েছিল এবং জানা গেছিল, কিছুক্ষণ আগেই অ্যাম্বুল্যান্সটি অন্য এক জন রোগী নিয়ে রওনা দিয়ে দিয়েছে। অসহায় বৃদ্ধ বলেছিলেন, ওর চোখেমুখে একটু জল দেবেন কেউ?

মেয়েটির হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দীপক পাল বলেছিলেন, জল দিয়ে লাভ হবে না স্যার। যদি অনুমতি করেন একটা কথা বলব?

চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়েছিলেন ভাদুড়ি মশায়। দীপক পাল বলেছিলেন, আমাদের সঙ্গে গাড়ি আছে। আমরা কি ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারি?

আশার আলো ফুটে উঠেছিল এই মুহূর্তে চিন্তিত কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে তীক্ষ্ন দুটি চোখে। বৃদ্ধ বলেছিলেন, চলুন। কিন্তু আমাকেও আপনাদের সঙ্গে নিন।

অমিয়র দিকে তাকিয়ে দীপক পাল বলেছিলেন, স্যার, আপনি তিতাস ম্যাডামকে ফোন করে ব্যাপারটা বলে দিন। আপাতত আমি আর আপনি, স্যার আর ওনার নাতনিকে নিয়ে হাসপাতাল চলে যাচ্ছি। সঞ্জয়বাবু আর পল্লববাবু একটা ট্যাক্সি ধরে চলে আসুন।

তিতাস নামটা শুনে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছিল পল্লব। এই নামটা শুনেই না সে দিন সে অমিয়র ফোন কেটে দেয়নি। মনের গোপনে একটা আশা নিয়েই তো সে বারাসাত এসেছিল। কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় আর তিতাস প্রসঙ্গে কথা হয়ে ওঠেনি। পল্লব বুঝতে পারল, তিতাস এখন বারাসাত হাসপাতালে পোস্টেড।

সঞ্জয়ের ডাকে ঘোর কেটেছিল পল্লবের। ছুটে গিয়েছিল মেয়েটিকে তুলতে। অমিয় ততক্ষণে তিতাসকে ফোন করে দিয়েছে।

বৃদ্ধের কোলে মাথা আর অমিয়র কোলে পা রেখে পেছনের সিটে শুয়েছিল মেয়েটি আর দীপক পাল হু হু করে জিপ ছুটিয়েছিলেন বারাসাত হাসপাতালের দিকে।

আসতে না আসতেই মেয়েটিকে আইসিইউ-তে ভর্তি করে দিয়েছে তিতাস। এখন তিতাস মেয়েটিকে পরীক্ষা করছে আর ওরা অপেক্ষা করছে তিতাসের চেম্বারে। এখানে আসার পর ভাদুড়ি মশায়ের কাছ থেকেই জানা গিয়েছে তাঁর নাতনির নাম অপালা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যানশিয়েন্ট ইন্ডিয়ান লিটারেচর নিয়ে পোস্ট ডক্টরাল করছে। রিসার্চের কাজেই আট মাসের জন্য দেশে এসেছে। অপালার দাদা সৌমেন্দ্রনাথ অর্থাৎ ভাদুড়ি মশায়ের নাতি আবার থাকেন জাপানে। সেখানে তিনি জাপানি ছেলেমেয়েদের 'নো', 'কাবুকি' ইত্যাদি নানা ধরনের জাপানি নাটকের ফর্ম পড়ান। সম্প্রতি ভাদুড়ি মশায়ের পুত্র ও পুত্রবধূ ছেলের সাথে দেখা করতে জাপান গেছেন তাই আপাতত বাড়িতে দাদু আর নাতনি।

তা তিতাসের চেম্বারে বসে ভাদুড়ি মশায় বাচ্চাদের মতো চঞ্চল হয়ে পড়েছিলেন আর তাই দেখে পল্লব ফিকফিক করে হাসছিল, এমন সময় দৌড়ে এল তিতাস। ভাদুড়ি মশায়ের কাছে গিয়ে বলল, আর ভয় নেই স্যার। আপনার নাতনি রেসপন্স করেছে। জ্ঞানও ফিরে এসেছে। তবে একটু ট্রমার মধ্যে আছে। কিছুটা সময় দিন, আমি আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দিচ্ছি।

এতক্ষণ পর স্বস্তির একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বৃদ্ধের গলা দিয়ে। ক্রাচ দু'টোর সাহায্যে খানিকটা সময় নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তার পর তিতাসের মাথায় হাত রেখে স্মিত হেসে বললেন, রাজরাজেশ্বরী হও।

তিতাসও তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করল আর উঠতেই দেখতে পেল, একটু দূরে দাঁড়িয়ে তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রয়েছে পল্লব। পল্লব এখানে কী করছে! যদিও তিন বছর পর এই প্রথম দেখা তবু তিতাসের চোখ এড়াল না, এই তিন বছরে বেশ খানিকটা মোটা হয়েছে পল্লব। চশমার ফ্রেমটা বদলেছে আর বরাবরের মতো জামাটায় ইস্ত্রি নেই। পকেটের কাছটা বিশ্রি ভাবে কুঁচকে আছে। বিস্ময় কাটতে না কাটতেই কে যেন এসে কাঁধে হাত রাখল। ঘুরে তাকিয়ে তিতাস দেখল, সঞ্জয় দাঁড়িয়ে রয়েছে ঠিক তার পেছনে। বাক্যস্ফূর্তি হতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল তিতাসের। তার পরই সে ভাদুড়ি মশায়ের দিকে ফিরে হাত জোড় করে বলল, আমাকে মাপ করবেন স্যার।

বলেই, সঞ্জঅঅঅঅয় বলে একটা চিৎকার দিয়ে সঞ্জয়ের গলা ধরে ঝুলে পড়ল প্রায়। আলিঙ্গন শেষ হতে দু'হাতে মুখ ঢেকে বলে উঠল, ওহ মাই গড! এত বছর পর তোরা সবাই এক সাথে এখানে! আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। কখন এসেছিস তোরা?

সঞ্জয় বলল, কাল বিকেলে।

কাল বিকেলে এসেছিস আর এই শয়তান, সরি স্যার, বদমাইশ অমিয়টা আমায় কিচ্ছু বলেনি!

অমিয় এগিয়ে এল, বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না তিতাস। আমরা সবাই খুব বিপদের মধ্যে আছি।

থমকে গেল তিতাস, বিপদ? কী হয়েছে?

অমিয় বলল, শান্ত হয়ে বোস। সব বলছি।

যৌবনের এই উচ্ছ্বলতা দেখে মৃদু মৃদু হাসছিলেন ভাদুড়ি মশায়। কিন্তু বিপদের কথা শুনে তাঁর কপালেও ভাঁজ পড়ল আবার। হয়তো মনে পড়ে গেল, একটু আগে এদেরই তিনি বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ এরা না থাকলে অপালার অনেক বড় ক্ষতি হতে পারত। গম্ভীর গলায় তিনি বলে উঠলেন, যদি আপত্তি না থাকে বিষয়টা আমার সামনে বলা যায়?

অমিয় বলল, পালদা, আমি বলি?

তিতাসের চেম্বারেই টেবিল ঘিরে বসে আছে ওরা ছ' জন। মাথা নাড়লেন দীপক পাল, হ্যাঁ স্যার। আমি এমনিও গুছিয়ে সবটা বলে উঠতে পারব না।

ঘাড় নেড়ে ভাদুড়ি মশায়ের দিকে তাকিয়ে দীপক পালকে দেখিয়ে অমিয় বলল, স্যার, ইনি বারাসাত থানার এ এস আই দীপক পাল। গত কাল দুপুর থেকে পালদা'র মেয়ে মিতুলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দেড়টা পৌনে দু'টো নাগাদ কলেজ থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি।

সে কী! চমকে উঠল তিতাস, তার পর?

তার পর আমরা আমাদের সাধ্য মতো ইনভেস্টিগেট করেছি। সম্ভাব্য সব জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি কিন্তু মিতুলকে পাইনি। রাতের দিকে ওর ক্লাসের ছেলেমেয়েদের জেরা করে আমরা একটা অদ্ভুত ইনফরমেশন পাই আর সেটা থেকেই শিওর হই যে এটা আর পাঁচটা কিডন্যাপিং-এর কেস থেকে আলাদা।

ভাদুড়ি মশায় বললেন, কী ইনফরমেশন?

অমিয় বলল, বলছি স্যার। তবে তার আগে আপনাকে অন্য কয়েকটা ঘটনার কথাও বলতে হবে। আমরা প্রমাণ পেয়েছি ওই ঘটনাগুলোর সাথে মিতুলের হারিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট যোগাযোগ আছে।

তোমরা এত কিছু প্রমাণ পেয়েছ অথচ মেয়েটাকে খুঁজে পাচ্ছ না?

এই প্রথম ভাদুড়ি মশায় আপনি ছেড়ে তুমি বলে উঠলেন। পল্লবের সাথে চোখাচোখি করতে গিয়ে সঞ্জয় দেখল, পল্লবের এ সব দিকে মন নেই। সে হাঁ করে তিতাসের দিকে তাকিয়ে আছে। ইচ্ছে করে কোণা চেপে বসেছে, যাতে তিতাস দেখতে না পায়। অমিয় বলল, না স্যার। সেই জন্যই তো আপনার কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। একমাত্র আপনিই পারেন এ বিপদ থেকে উদ্ধার করতে।

এ কথার উত্তর না দিয়ে ভাদুড়ি মশায় বললেন, বলে যাও।

নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল অমিয়। যেমন ভাবে কলেজে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার আগে গুছিয়ে নিত, অনেকটা সে ভাবেই। অনেক দিন পর আজ আবার কোনও অধ্যাপকের মুখোমুখি পরীক্ষায় বসতে হয়েছে। আর এ যে সে পরীক্ষা নয়। পাশ করার ওপর নির্ভর করছে মিতুলের ভাগ্য। অমিয় বলতে শুরু করল, স্যার গত কয়েক দিন ধরেই বারাসাত ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। মৃতদেহ উধাও হয়ে যাচ্ছে।

যেন সামান্য একটু নড়েচড়ে বসলেন ভাদুড়ি মশায়। উত্তেজিত গলায় তিতাস বলে উঠল, রাইট, আমাদের হাসপাতালের মর্গ থেকেও একটা বডি উধাও হয়েছে। তার পর এই সমীরের কেসটাও তো সেম।

অমিয় বলল, হ্যাঁ। ও দু'টো বটেই ওর পরে আরও দু'টো বডি জাস্ট ভ্যানিস হয়ে গেছে। এই নিয়ে চারটে। এক জন ডোমের বয়ান অনুসারে একটা বডি তো জ্বলন্ত চুল্লির মধ্যে থেকেও উধাও হয়েছে।

গলা ঝাড়লেন ভাদুড়ি মশায়, ডোমের বয়ান কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

অমিয় বলল, বিশ্বাসযোগ্য একটা কারণেই স্যার, যারা যারা এই বডি ভ্যানিশের সময় কাছাকাছি ছিল তারা প্রত্যেকেই একটা কমন ব্যাপার লক্ষ্য করেছে। সেটা হল তীব্র পচা গন্ধ।

আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল অমিয়। তাকে থামিয়ে দিয়ে সঞ্জয় স্বভাববিরুদ্ধা ভাবে বলে উঠল, এত ঘুরিয়ে না বলে আসল কথাটা বল না। স্যার, এই প্রত্যেকটি মৃতদেহ উধাও হয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে একটি পিশাচ আর এই পিশাচটি যার হুকুমে চলে সেই তান্ত্রিকই মিতুলকে কিডন্যাপ করেছে। আপনার সামনে বলতে আমার বাধোবাধো ঠেকছে তবু না বললে তো উপায় নেই তাই বলছি, এই তান্ত্রিকের এমন একটি মেয়ের দরকার ছিল যার এ মাসের পিরিয়ডস সদ্য শুরু হয়েছে। আর দুর্ভাগ্যক্রমে সেই মেয়েটি মিতুল।

চাপা টেনশন ধ্বনিত হল ভাদুড়ি মশায়ের গলায়, ঠিক বলছ তুমি? এত নিশ্চিত কী করে হচ্ছ যে

কথা কেটে সঞ্জয় ক্লান্ত হতাশ গলায় বলল, হচ্ছি, কারণ যে লোকটা এই সব করছে সে আমার নিজের মামা। তার নাম লোকনাথ চক্রবর্তী।

পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে কাউকে গুলি করলে যেমন বিস্ময় আর যন্ত্রণা একসাথে অনুভূত হয়, অবিকল তেমন ভাবে বিস্মিত ও যন্ত্রণাকাতর হয়ে উঠল ভাদুড়ি মশায়ের মুখখানি। ব্যথিত কণ্ঠে অস্ফুটে তিনি বলে উঠলেন, সর্বনাশ!

ভাদুড়ি মশায়ের এই অসহায়তা মুহূর্তে চারিয়ে গেল বাকি পাঁচ জনের মধ্যে। ভয়ার্ত কণ্ঠে দীপক পাল বলে উঠলেন, এমন ভাবে সর্বনাশ বললেন কেন স্যার? আমায় মেয়েটা কি তবে

বুজে এল দীপক পালের গলা। অস্থির মাথা নেড়ে বৃদ্ধ বলে উঠলেন, জানি না। আমি জানি না। যা সন্দেহ করছি তা যদি সত্যি হয় তা হলে বরং তোমার মেয়ের মৃত্যুকামনা করো। আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, লোকনাথের সাধনা সম্পন্ন হওয়ার আগেই যেন তোমার মেয়ের মৃত্যু হয়। নয়তো এ অত্যাচার সে সইতে পারবে না।

অসম্ভব এই কথায় কাঁদতেও ভুলে যান দীপক পাল। স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে বাকিরাও। শুধু বৃদ্ধের চোখ দিয়ে গড়িয়ে নামে এক ফোঁটা জল। কঠিন হয়ে ওঠে চোয়াল। দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠেন, পাষণ্ড!

নীরবতা ভেঙে সঞ্জয় বলে ওঠে, আপনি আমার মামাকে চেনেন?

ভাদুড়ি মশায় কিছু বলতে যাবেন তার আগেই দরজায় এসে দাঁড়ায় একটি জুনিয়র ডাক্তার। তিতাসের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, ম্যাম। পেশেন্ট এখন স্টেবল। ওনার দাদুর সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।

বৃদ্ধকে হাত ধরে দাঁড় করায় তিতাস। বলে, আসুন স্যার। আগে নাতনির সাথে দেখা করে নিন।

ক্রাচ ঠুকে ঠুকে তিতাসের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে যান ভাদুড়ি মশায়। তাঁর গমন পথের দিকে তাকিয়ে পরাজিত মানুষের মতো দীপক পাল বলে ওঠেন, উনি মিতুলের মৃত্যুকামনা কেন করতে বললেন স্যার? কী সন্দেহ করছেন উনি? কীসের অত্যাচার? ওই লোকটা কী করতে চায় মিতুলকে নিয়ে?

এ উত্তর জানা নেই কারও। শুধু অজানা এক আশঙ্কা বুকের মধ্যে জাল বুনে চলেছে মাকড়সার মতো। যেন ধীরে ধীরে সে শিকারের দিকে এগোচ্ছে। শিকারটি সব দেখতে পাচ্ছে কিন্তু লালারসে বন্দী অবস্থায় আসন্ন যন্ত্রণার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কী বা করার থাকে! চুপ করে রইল ওরা তিন জন।

ও দিকে নাতনির সঙ্গে দেখা করে ভুরুটা যেন আরও বেশি কুঁচকে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। এমনিতেই লোকনাথের নাম শোনার পর থেকে তীব্র এক অস্বস্তি কাজ করছে তাঁর মধ্যে। এই লোকনাথের জন্যই আজ থেকে তিরিশ বছর আগে তিনি তন্ত্র চর্চা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেই লোকনাথ আবার ফিরে এসেছে এবং সে যা করতে চলেছে তা ভয়াবহ। যদিও মেয়েটির বাবার সামনে তিনি সন্দেহ শব্দটা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু আসলে তাঁর মনে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি সবটা বুঝতে পেরেছেন। তিনি জানেন লোকনাথ কী করতে চলেছে। এই ভূ-ভারতে ওই বিশেষ এবং ভয়ানক সাধনার কৌশলটি জানতেন শুধু তিনি আর জানে লোকনাথ। এমনিতেই মিতুল নামে মেয়েটিকে কী ভাবে রক্ষা করবেন তার কোনও উপায়ই খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি, তার মধ্যে অপালা যা বলল তা তাঁকে আরও বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। অপালার বয়ান অনুসারে, সে ঘরে বসে ল্যাপটপ খুলে পড়ছিল আর একটা খাতায় নোটস নিচ্ছিল। হঠাৎ একটা বছর পাঁচ-ছয়েকের বাচ্চা মেয়ে তার কলমটা তুলে নিয়ে দৌড় দেয়। প্রথমটা সে খুব অবাক হয়েছিল, তাদের বাড়িতে তো অমন কোনও মেয়ে নেই! তবে কি বাইরে থেকে কেউ ঢুকে পড়েছে! তার পরই সে মেয়েটাকে ধরতে ছুটে যায় এবং ফ্লাওয়ার ভাসে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। অজ্ঞান হওয়ার আগের মুহূর্তে সে দেখতে পায় মেয়েটি তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি বলে ওঠে, রাগ কোরো না দিদি। ব্যাস, এর পর আর কিছু মনে নেই তার।

ভাদুড়ি মশাই নিশ্চিত, তাঁর বাড়িতে অমন কোনও মেয়ে ঢোকেনি। কারণ গেটের তালা খুলেই অচেতন অপালাকে জিপে তোলা হয়েছিল। তবে কোথা থেকে এল মেয়েটি? ভাবতে ভাবতেই শিউরে ওঠেন তিনি, এ কি তবে লোকনাথেরই কোনও ছল? এত বছর পর সে ফিরে এসেছে গুরুর ওপর প্রতিশোধ নিতে?

১২

দু'হাতে কপালের রগ ধরে বসেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। ওরা সকলে উৎসুক হয়ে তাকিয়েছিল তাঁর দিকে কিন্তু কেউই কিছু বলার সাহস পাচ্ছিল না। অপেক্ষা করছিল কখন বৃদ্ধ নিজে থেকে কিছু বলে ওঠেন। নাতনিকে দেখে এসে তিতাসের চেম্বারে ফিরে সেই যে কপাল ধরে বসেছেন তার পর দশ মিনিট কেটে গেছে এক বারও মুখ তোলেননি। পল্লব দু'এক বার কথা বলে ওঠার চেষ্টা করেছিল কিন্তু সঞ্জয়ের চিমটি খেয়ে চুপ করে যেতে বাধ্য হয়েছে। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর মুখ তুলে বললেন, আপনাদের কারও কাছে একটা সিগারেট হবে?

হকচকিয়ে গেল সবাই। বৃদ্ধের কাছ থেকে এ কথাটা কেউই আশা করেনি। সঞ্জয় ছাড়া এখানে সকলেই স্মোকার কিন্তু ভাদুড়ি মশায়ের ব্যক্তিত্বের সামনে সবার মনেই যেন সেই প্রথম প্রথম সিগারেট খেতে গিয়ে ধরা পড়ার লজ্জা ঘনিয়ে উঠল। ওদের অস্বস্তি বুঝে বৃদ্ধ বললেন, লজ্জার কিছু নেই। থাকলে দাও। বিশ বছর হল ধূমপান ছেড়েছি কিন্তু আজ মনটা একেবারে বশে নেই। স্নায়ুগুলো চঞ্চল। সবটা গুছিয়ে বলতে গেলে একটু ধাতস্থ হতে হবে।

উঠে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ভাদুড়ি মশায়ের দিকে এগিয়ে দিল পল্লব। সিগারেটটা ঠোঁটের ফাঁকে রাখলেন তিনি। কিন্তু লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিতে যেতেই বাধা পেল পল্লব। হাত তুলে থামিয়ে তিনি বললেন, আমাকে দাও। মুখাগ্নি একেবারে শেষ দিনে হওয়াই অভিপ্রেত।

অপ্রতিভ হয়ে লাইটারটা ভাদুড়ি মশায়ের হাতে দিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়ল পল্লব। সঞ্জয় চাপা গলায় বলল, সব জায়গায় পাঁয়তারা মারলে চলে না।

চাপা গলায় উত্তর দিল পল্লব, হু। বুড়োটি বাস্তুঘুঘু।

সঞ্জয় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই ভাদুড়ি মশাই বলে উঠলেন, আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা, লোকনাথ আমার কাছে এসেছিল।

টানটান হয়ে বসল ওরা পাঁচ জন। ওদের মুখের দিকে এক বার চোখ বুলিয়ে ভাদুড়ি মশায় বলতে শুরু করলেন, লোকনাথ তখন যুবক। কত বয়স হবে ওর, বড়জোড় পঁচিশ কি ছাব্বিশ। কোথা থেকে যে ও আমার সন্ধান পেয়েছিল আমি জানি না, এক দিন সকালে কলেজ যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেরচ্ছি, এসে সটান পায়ের কাছে শুয়ে পড়ল। বলল, চরণে আশ্রয় দিন গুরুদেব।

সে সময় অনেকেই নানা বিপদে আপদে আমার কাছে আসত। আমি ভেবেছিলাম, তেমনই কেউ হবে। বললাম, এখন না। বিকেলে এসে দেখা কোরো।

কথা না বাড়িয়ে ও চলে গেল। সারাদিনে নানা কাজে আমি ভুলেও গেছিলাম কিন্তু বিকেলে যখন বাড়ি ফিরছি দেখি গেটের এক পাশে ও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মনে পড়ে গেল, ওকে বিকেলে দেখা করতে বলেছিলাম। বাড়ি ঢুকে জামাকাপড় বদলে ওকে ডেকে পাঠালাম লাইব্রেরি ঘরে। কিছুতেই চেয়ারে বসাতে পারলাম না ওকে। হাত জোড় করে মাটিতে পায়ের কাছে বসল। নিজের পরিচয় দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তা কী সমস্যা তোমার?

লোকনাথ বলল, সমস্যা নাই গুরুদেব। আমি আপনার শিষ্য হতে চাই। আপনার কাছে মন্ত্র নিতে চাই।

শুনেই আমি বিরক্ত হলাম। এমন অনেকেই আমার কাছে আসত তখন। এসে, দীক্ষা দিন, বলে ঝোলাঝুলি করত। এদের সকলেরই ধারণা তন্ত্র একটি অত্যন্ত সোজা ব্যাপার। দু'-চার দিন অভ্যেস করলেই না কি মস্ত তান্ত্রিক হওয়া যায়! লোকনাথকেও তাদের দলেই ফেলেছিলাম আমি এবং যথারীতি তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু লোকনাথ হাল ছাড়ার পাত্র ছিল না। সে দিনের পর থেকে ও রোজ সকালে আমার কলেজ যাওয়ার সময় এবং বিকেলে ফেরার সময় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকত। প্রথম প্রথম আমার মজাই লেগেছিল। এটা নতুন কিছু না। কমবেশি সবার মনেই ধারণা থাকে যে গুরু প্রথম বারেই কাউকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন না। শিষ্যের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে চান। আমিও আট মাস অপেক্ষা করার পর আমার গুরু আমার প্রতি সদয় হয়েছিলেন। তা আমি ভেবেছিলাম, লোকনাথও বাকিদের মতো এই ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে দিতে মাসখানেকের মধ্যেই ক্লান্ত হয়ে রণে ভঙ্গ দেবে। কিন্তু লোকনাথ যে আমাকে এতটা ভুল প্রমাণ করবে আমি তখনও ভাবতে পারিনি। গুরুকৃপা পাওয়ার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেছি বলে আমার মনে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল। সে গর্ব ভেঙে দিয়েছিল লোকনাথ। এক মাস নয়, দু'মাস নয়, টানা এক বছর ধরে প্রতিদিন লোকনাথ দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তার ধারে। শেষমেশ রণে ভঙ্গ দিয়েছিলাম আমি। এক দিন রিক্সা থামিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিলাম, এসো।

সেই আমার কাছে লোকনাথের শিক্ষা শুরু হল। দীক্ষা আমি আগেও কয়েক জনকে দিয়েছি কিন্তু লোকনাথের মতো তুখোড় ছাত্র আমি আমার সমগ্র শিক্ষকজীবনে আর একটিও পাইনি। লোকনাথ আমার দেখা উজ্জ্বলতম ছাত্র।

এই অবধি বলে চুপ করলেন ভাদুড়ি মশায়। সঞ্জয়ের নিজের কলেজ বেলার কথা মনে পড়ে গেল। তার চরম বিপদের দিনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষকেরাই। আদর্শ শিক্ষকেরা বুঝি বা এমনই হন। ছাত্র যতই খারাপ হোক না কেন, সে প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এমন ভাবেই স্নেহসিক্ত হয়ে আসে তাঁদের কণ্ঠ। তিতাস বলে উঠল, তার পর?

গলা ঝেড়ে ভাদুড়ি মশায় বললেন, লোকনাথের মতো শিষ্য পেয়ে আমিও উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলাম। যা জানতাম সবটা হাতে ধরে শিখিয়েছিলাম। লোকনাথের নিষ্ঠা ছিল দেখার মতো। ও আমার বাড়িতেই থাকত। আর পাঁচ জন যারা তন্ত্র নিয়ে চর্চা করতে চাইত তাদের সঙ্গে লোকনাথের একটা মূলগত পার্থক্য ছিল। তোমাদের একটা প্রশ্ন করি। তন্ত্র কী বলো তো?

আচমকা এই প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল ওরা। পুরনো কথা বলতে বলতে বৃদ্ধ যে আচমকা প্রশ্ন করে বসবেন তা কেউই আন্দাজ করতে পারেনি। ওদের বাঁচিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ নিজেই উত্তরটা দিয়ে দিলেন। বললেন, পদার্থ বিদ্যার প্রায়োগিক দিক যেমন অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স তেমনই তন্ত্র হল মন্ত্রের প্রায়োগিক দিক। তা এই প্রয়োগের দু'টি দিকই রয়েছে। শুভ এবং অশুভ। যে কোনও শক্তিকেই ভাল এবং খারাপ দু'ভাবেই ব্যবহার করা সম্ভব। সাধারণ নিম্নমেধার তান্ত্রিকেরা শক্তির অশুভ দিকটা নিয়েই মাতামাতি করে। আর তাতে ষটকর্ম অর্থাৎ মারণ, উচাটন, বশীকরণ ইত্যাদি সামান্য কিছু শক্তি আয়ত্ত করে। উচ্চমার্গের সাধনার কিছুই জানে না তারা। লোকনাথের কিন্তু ঝোঁক ছিল উচ্চমার্গের সাধনার দিকে। ও কখনও তাড়াহুড়ো করত না। থিয়োরি না বুঝলে যে ভাল প্র্যাকটিক্যাল করা যায় না, লোকনাথ সেটা জানত। কিন্তু তখনও আমি বুঝিনি এ সবই ছিল লোকনাথের ছল। এগুলো ও করত আমাকে খুশি করার জন্য। আমার বিশ্বাস অর্জনের জন্য। আর মূর্খ আমি ওকে বিশ্বাসও করেছিলাম। ওকে নিরাপদ ভেবে ওর সামনে খুলে দিয়েছিলাম গোপনতম এবং ভয়াবহ এক জগতের দরজা। আমি জানতাম না, লোকনাথ এটারই অপেক্ষায় ছিল এত দিন।

বড় করুণ শোনাল ভাদুড়ি মশায়ের গলা। যেন মিতুলের এই ঘটনার জন্য পরোক্ষে নিজেকেই দায়ী করলেন বৃদ্ধ। ইতস্তত করে তিতাস বলল, একটু বুঝিয়ে বলবেন স্যার?

মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। ক্লান্ত স্বরে বললেন, বলতে তো হবেই মা। যে বিষবৃক্ষের বীজ আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগে রোপণ করেছিলাম, আজ তাতে ফল ধরেছে। এ দায় আমি অস্বীকার করব কেমন করে?

কিছু বলতে যাচ্ছিল অমিয়। হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন ভাদুড়ি মশায়, সান্ত্বনা দিও না আমাকে। গত তিরিশ বছর ধরে এই ভয় আমি গোপনে পুষে রেখেছিলাম। আমি জানতাম এক দিন না একদিন এ অনিষ্ঠ হবেই। শুধু আশা করেছিলাম, তা ঘটবে আমার অগোচরে। কিন্তু নিয়তি কেন বধ্যতে। সেই জড়িয়ে গেলাম আমি। লোকনাথকে বিশ্বাস করে যে ভুল আমি করেছিলাম, তার মাশুল তো আমায় দিতেই হতো। যাক গে, যা বলছিলাম, দেখো আমি কোনও দিনই তন্ত্র সাধক হতে চাইনি। আমি সর্বান্তকরণে একজন শিক্ষক। পড়াশোনা করতে গিয়ে আমার তন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ জন্মায় এবং আমি বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছিলাম। কপালগুণে গুরু আমার ওপর কৃপা করেছিলেন। তা ভারতীয় তন্ত্র সম্পর্কে জানতে জানতেই আমার অন্যান্য দেশের তন্ত্র সম্পর্কেও কৌতূহল জন্মায় এবং আমি খুঁজতে শুরু করি। খুঁজতে খুঁজতে অবাক হয়ে দেখি, পৃথিবীর নানা দেশে তন্ত্রের নানা রকমফের। সে সব আমি সংগ্রহ করতে শুরু করি। দু'টি জাবদা খাতা তৈরি করি। তার একটিতে আমি সেই সব বিদেশি তন্ত্র চর্চার শুভ প্রয়োগগুলি লিখে রাখতে শুরু করি এবং আর একটি খাতায় লিখতে থাকি অশুভ প্রয়োগগুলির কথা। বড় ভয়ানক সেই সব পদ্ধতি এবং তার চেয়েও ভয়ানক তার ফল। এই দু'টি খাতাই আমি লোকনাথকে পড়তে দিয়েছিলাম। আমি নেহাতই অ্যাকাডেমিক কৌতূহল থেকে সেই সব লিখে রাখতাম কিন্তু লোকনাথের ছিল বিপরীত বুদ্ধি। ও আমাকে লুকিয়ে সেই সব গোপন এবং ভয়াবহ পদ্ধতিগুলি অভ্যাস করতে শুরু করে। এক দিন ধরা পড়ে যায়। ওর চোখ দেখে আমি বুঝতে পারি ও মানুষ বলি দিয়েছে। সেই দিন লোকনাথকে চড় মেরেছিলাম আমি। পুলিশ ডেকে ওকে ধরিয়ে দিয়েছিলাম। মানুষ চিনি না বলে নিজের ওপর ভয়ানক ঘেন্না হয়েছিল আমার। কিন্তু সে বার বিচারে কিছু প্রমাণ হয়নি বলে লোকনাথ ছাড়া পেয়ে যায়। ছাড়া পেয়ে ও আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। গেট থেকেই ওকে দূর করে দিয়েছিলাম আমি। বলেছিলাম, তোর মতো নরাধমের মুখ দেখতে চাই না।

যাওয়ার আগে লোকনাথ আমায় শাসিয়ে গেছিল। বলেছিল, আমি যা করেছিলাম তা যদি আপনার অন্যায় মনে হতো তা হলে নিজে হাতে জুতোপেটা করতেন আমায়। পুলিশে দিলেন কেন? এ কাজটা আপনি ঠিক করেননি গুরুদেব। বিরাট ভুল করেছেন। আপনারে এর মাশুল দিতে হবে।

রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমি সে দিন বলেছিলাম, হ্যাঁ হ্যাঁ, তোর যা করার আছে করে নিস। নিম্ন মার্গের পাঁচপেঁচি তান্ত্রিক ভয় দেখাচ্ছে কি না নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়িকে!

তখনও জানতাম না, লোকনাথ ফাঁকা আওয়াজ করেনি। প্রমাণ পেলাম দিন কয়েক পর। লিখতে বসে দেখলাম, যে খাতায় বিদেশি তন্ত্রের অশুভ প্রয়োগগুলি লিখে রাখতাম তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক সাধনাগুলি যে সব পাতায় লেখা ছিল, পাতাগুলি কেউ নিপুণ হাতে কেটে নিয়েছে খাতা থেকে! আমার এত দিনের পরিশ্রম চুরি হয়েছে। বলা ভাল, আমি যে মারণাস্ত্র বানিয়েছি স্নেহান্ধ হয়ে তাই তুলে দিয়েছি হিংস্র, দুর্দমনীয় এক যুদ্ধবাজের হাতে। সেই দিনের পর থেকে আমি সব ছেড়ে দিই। আবার কে কবে এসে নিষ্ঠা দেখাবে, মন গলে যাবে আমার! হাতে করে আর কোনও ফ্রাঙ্কেনস্টাইন তৈরি করতে পারব না আমি।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে থামলেন ভাদুড়ি মশায়। অস্বাভাবিক এক নিস্তব্ধতা গোটা ঘর জুড়ে। বুঝি বা পিন পড়লেও তার শব্দ শোনা যাবে। নীরবতা ভেঙে কথা বলে উঠল সঞ্জয়, এত জায়গা থাকতে মামা কেন বারাসাতে এসে এ সব শুরু করল এতক্ষণে তার উত্তর পাওয়া গেল।

ঘাড় নাড়লেন ভাদুড়ি মশায়, ঠিক বলেছ। লোকনাথ অসীম ক্ষমতা পেতে চায় এবং সেটা পেতে চায় আমারই নাকের ডগায় বসে। আমাকে দেখিয়ে দিতে চায়, আমি ওকে তাড়িয়ে দিলেও ওর সাধনায় কোনও বাধা পড়েনি। এবং আমার বিশ্বাস কি জানো, লোকনাথ যে ভয়ানক সাধনাটি করছে তাতে সিদ্ধি লাভ করলে ও সবার আগে আমার ওপরেই প্রতিশোধ নেবে।

পল্লব বলল, কিন্তু স্যার, একটা কথা বলুন, আপনার ওপর যদি প্রতিশোধ নেওয়ারই থাকত তা হলে এত দিন কি লোকটা চুপ করে বসে থাকত? ওর তো একটা পিশাচ আছেই যে ওর কথায় ওঠে বসে। তাকে দিয়ে কি

উঁহু, পারত না, বলে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়, ওর পিশাচটি নিম্ন শ্রেণির। গুরুবাক্য থেকে আমি আজ অবধি বিচ্যুত হইনি। গুরুকৃপায় এ আধারেও তো কিছু শক্তি আছে। ওই পিশাচ আমার কিছু করতে পারবে না কিন্তু লোকনাথ যে সাধনা করছে তাতে যদি ও সফল হয় আমিও আর নিজেকে বাঁচাতে পারব না। মহাশক্তিধর হয়ে উঠবে ও। সব ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রলয় আসবে।

মামির কথাগুলো যেন সঞ্জয়ের কানে বাজতে থাকে। মামিও ঠিক এই কথাগুলোই বলেছিল। বলেছিল, 'আমাকে টানছে। আমি আর লড়াই করতে পারছি না। সে যা চাইছে তা যদি হয় সর্বনাশ হবে। সব ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রলয় আসবে।' তার মানে মামাই মামিকে বন্দি করেছে! সেই জন্যই মামি সে দিন ওই কথাগুলো বলেছিল! কিন্তু কীসের সাধনা করছে মামা? তার জন্য মিতুলকে কেন দরকার তার?

প্রশ্নগুলো ভাদুড়ি মশায়কেই করল সঞ্জয়। একটু চুপ থেকে ভাদুড়ি মশায় বললেন, তোমাদের মধ্যে কারও ওই পিশাচটিকে দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে?

সঞ্জয় ঘাড় নাড়ল, আমার হয়েছে স্যার।

ভাদুড়ি মশায় বললেন, কেমন দেখতে তাকে? খুব বেঁটে আর মোটা? মাথায় টাক? মেয়েদের মতো গলায় কথা বলে?

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল ওরা। অস্ফুটে সঞ্জয় বলল, আপনি গেনুকে জানেন?

ম্লান হাসলেন বৃদ্ধ, ও! লোকনাথ বুঝি তার নাম রেখেছে গেনু?

আবারও অবাক হওয়ার পালা। সঞ্জয় বলল, ওর নাম গেনু নয়?

বৃদ্ধ বললেন, দেখো, ভূত, প্রেত, পিশাচ, হাঁকিনী, ডাকিনী এরা সবই এক এক ধরনের শক্তি যা আমাদের অনুভবযোগ্য এই চতুর্মাত্রিক জগতের বাইরে অবস্থান করে। বিশেষ সাধনার বলে এবং কখনও কখনও বিশেষ কার্যকারণ সম্পর্কে এরা আমাদের জগতে আসে। এরা প্রত্যেকেই এক একটা স্পিসিজ। লোকে ভালবেসে যেমন পোষা কুকুরের নাম দেয়, ঠিক তেমনই লোকনাথ তার পোষা পিশাচের নাম দিয়েছে। নিজের ভাষায় মনের ভাব ব্যক্ত করতে শিখিয়েছে। তবে এই পিশাচটির উল্লেখ কোনও ভারতীয় তন্ত্রে নেই কারণ লোকনাথ যে সাধনায় প্রথমে এই পিশাচটিকে বশ করেছিল তা কঙ্গোর এক আদিম উপজাতির তন্ত্র এবং ওই উপজাতিটি বামন, ডোয়ার্ফ। সে জন্যই গেনুকে অমন দেখতে।

বিস্ময়াভূত হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল ওরা। পল্লব বলে উঠল, কঙ্গো? আফ্রিকা? ওই লোকটা আফ্রিকার তন্ত্র সাধনা করছে?

ঘাড় নাড়লেন ভাদুড়ি মশায়। বললেন, এখন সে ওই বিশেষ সাধনাটির শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর দু'টি পদ্ধতি। দু'টিই মর্মান্তিক। প্রথম পদ্ধতির সাধনায় লোকনাথ কোনও কারণবশতঃ ব্যর্থ হয়েছে তাই এই চরম পন্থা। যা বলতে চলেছি সহ্য করতে পারবে তো?

দীপক পালের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলেন ভাদুড়ি মশায়। ফ্যাকাশে মুখে ঘাড় নাড়লেন দীপক পাল, সহ্য করা ছাড়া আর কি কোনও উপায় আছে স্যার? আপনি বলুন। আমি জানতে চাই ওই লোকটা মিতুলকে নিয়ে কী করতে চায়?

দীপক পালের মনের কথা যেন পড়তে পারলেন বৃদ্ধ। মাথা নেড়ে বললেন, তুমি যা ভাবছ তা নয়। লোকনাথ তোমার মেয়ের দিকে মোটেই কামনার দৃষ্টিতে তাকাবে না। ওকে অশালীন ভাবে স্পর্শও করবে না কারণ ও তোমার মেয়েকে এখন কন্যারূপে দেখছে।

তা হলে ওই লোকটার থেকে মিতুলের কীসের ভয়? তা হলে কেন আপনি বলছেন, মিতুলের সাথে যা হতে চলেছে তার থেকে মৃত্যুও শ্রেয়! তার মানে ও তো মিতুলকে মারবে না! তবে? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না স্যার, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না, কেঁদে ফেললেন দীপক পাল।

হতাশ গলায় বৃদ্ধ বললেন, বুঝতে পারছ না তার কারণ ওই বীভৎসতা কল্পনা করার শক্তি ঈশ্বর মানুষকে দেননি। তার জন্য লোকনাথের মতো দানব হতে হয়। এ সাধনা সাত দিন ধরে চলে। সপ্তম দিনটি হতেই হবে বিশেষ কোনও তিথি। আজ যদি মৃতদেহ উধাও হতে শুরু হওয়ার পঞ্চম দিন হয় তা হলে আর দু'দিন পরেই সেই বিশেষ তিথিটি আসবে এবং তোমরা জানো কি না জানি না, আর দু'দিন পরেই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।

চমকে উঠল ওরা, তাই তো। এ কথাটা তো আগে মাথায় আসেনি। সত্যিই দু'দিন পর সূর্যগ্রহণ এবং খবরে বলছে, এমন সূর্যগ্রহণ না কি চব্বিশ বছর পর হচ্ছে। পরেরটি হবে আরও বত্রিশ বছর পর।

ভাদুড়ি মশায় বললেন, যে কোনও তন্ত্র সাধকের কাছে এমন তিথি লোভনীয়। কারণ এ মাহেন্দ্রক্ষণ কালেভদ্রে আসে। তাই জন্যই লোকনাথ সাধনার জন্য এই বিশেষ সময়টি বেছে নিয়েছে। এ পদ্ধতিতে প্রতি দিন একটি একটি করে শবের ওপর বসে সাধনা করতে হয়। সাধনার চতুর্থ দিন থেকে শেষ চার দিন ওই শবের মুখে মদের বদলে দিতে হয় কুমারী মেয়ের রজঃ এবং সপ্তম দিনে আসে সেই ভয়াবহ ক্ষণ যখন সাধক তার সমস্ত শক্তি পোষা পিশাচের মধ্যে সমর্পিত করে ও পিশাচটিকে পুত্ররূপে কল্পনা করে। অসহায় মেয়েটির সঙ্গে তার বিবাহ দেয়। রজঃস্বলা মেয়েটিকে বলপূর্বক রমণ করে সেই পিশাচ এবং তৎক্ষণাৎ মেয়েটির গর্ভসঞ্চার হয়। কয়েক দণ্ডের মধ্যে মেয়েটি জন্ম দেয় আর একটি পিশাচের যার শক্তির তুলনা হতে পারে শুধুমাত্র ঈশ্বরের সঙ্গে। এবং অবশ্যই সেই পিশাচটিও সাধকের আজ্ঞাবহ। তার পর, পিশাচ জন্ম দেওয়ার অভিশাপে ধীরে ধীরে মেয়েটির দেহ পচতে শুরু করে। অসহ্য যন্ত্রণায় মেয়েটি ছটফট করতে থাকে কিন্তু মৃত্যু আসে না। মৃত্যুও যেন মুখ ফিরিয়ে নেয় অভিশপ্ত মেয়েটির থেকে। এই যন্ত্রণা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং শেষপর্যন্ত তাকে এ নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয় মাংসভোজী পরজীবী কীটের দল।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করলেন ভাদুড়ি মশায়। বজ্রাহত হয়ে বসে রইল ওরা পাঁচ জন। এমন অসম্ভব, অবাস্তব, হাড় হিম করা কথা ওরা কেউ কখনও শোনেনি। শুনবে বলে ভাবেওনি। ভাদুড়ি মশায়ের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা অজ্ঞান হয়ে চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন দীপক পাল।

ভাদুড়ি মশায়ের হাত ধরে বাচ্চাদের মতো কাঁদছিলেন দীপক পাল আর অমিয় তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, কাঁদবেন না পালদা। আপনি তো বলেন এ জন্মের কর্মফল এ জন্মেই মিটিয়ে যেতে হয়। কখনও তো খারাপ কিছু করেননি আপনি। আপনার সঙ্গে এ হতে পারে না। এ হতে পারে না পালদা। আপনি শান্ত হোন।

কিন্তু শান্ত করা যাচ্ছিল না দীপক পালকে। এমন অসহায় ভাবে কখনও কাউকে কাঁদতে দেখেনি পল্লব। সেই কান্না চারিয়ে যাচ্ছিল সকলের মধ্যে। সবার চোখ দিয়েই কখন যে জল গড়াতে আরম্ভ করেছে কেউই খেয়াল করেনি। কাঁদছিল পল্লবও। চোখ মুছে সে বলল, কিন্তু এর তো নিশ্চয়ই কোনও প্রতিকার আছে স্যার। সেটা কী?

জোরে জোরে মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ, না নেই। একবার এ সাধনা শুরু হলে কোনও প্রতিকার নেই। প্রথমত লোকনাথ কোথায় সাধনা করছে একমাত্র সে বলে না দিলে জায়গাটা কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, যদি খুঁজে পাওয়া যায়ও, সাধনা শুরু হয়ে যাওয়ার পর কোনও রজঃস্বলা নারী ছাড়া মেয়েটির কাছে আর কেউ যেতে পারবে না। তৃতীয়ত, পিশাচটি সর্বক্ষণ মেয়েটিকে পাহারা দিচ্ছে, তার নজর এড়িয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করা কার্যত অসম্ভব। তবে একমাত্র একটি ভাবেই এ সাধনা অসিদ্ধ হতে পারে যদি সময়ের আগেই মেয়েটির রজঃ বন্ধ হয়ে যায়। পিশাচটি যখন মেয়েটিকে রমণ করতে যাবে তখন যদি মেয়েটির রক্তপাত না হয় তা হলে সে মেয়েটিতে প্রবিষ্ট হতে পারবে না।

কিন্তু তা কী করে সম্ভব? মিতুলের পিরিয়ডস তো সবে শুরু হয়ে হয়েছে। অন্তত ছ'দিন তা চলবে। তার আগে কথা শেষ করতে পারল না অমিয়, ভাদুড়ি মশায় বলে উঠলেন, সে জন্যই তো বললাম প্রতিকার নেই। এক মাত্র অলৌকিক কিছু না হলে মিতুলকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। আমারই চোখের সামনে আমারই তৈরি করা দানব আমার নাতনির চেয়েও ছোট একটি অসহায় মেয়েকে এমন যন্ত্রণা দেবে অথচ আমি কিচ্ছু করতে পারব না! হা ঈশ্বর! এই লিখেছিলে তুমি আমার অদৃষ্টে!

অসহায় ভাবে মাথা নাড়তে লাগলেন ভাদুড়ি মশায়। কান্নায় গলা বুজে এল তাঁর। কিন্তু তিতাস তাকিয়েছিল অন্য দিকে। তার মাথার মধ্যে একটাই কথা ঘুরছিল, যদি জায়গাটা খুঁজে পাওয়া যায়ও, সাধনা শুরু হয়ে যাওয়ার পর কোনও রজঃস্বলা নারী ছাড়া মেয়েটির কাছে আর কেউ যেতে পারবে না। যদিও ভাবনাটি অসম্ভব তবু ভাবছিল তিতাস। কিন্তু নাহ! হতাশ হল সে। মিতুলকে বাঁচানোর জন্য হাতে মাত্র দু'দিন সময় আছে। তার পিরিয়ডসের ডেট আসতে এখনও চার দিন দেরি।

১৩

হাসপাতালের একটা অদ্ভুত গন্ধ থাকে। ডেটল, ফিনাইল, ওষুধ, রক্ত, হাগা, মোতা সব মিলিয়ে একটা বিচ্ছিরি চিমসে গন্ধ। মাথাফাতা ধরে যায়। তাও কেবিনে আছে বলে জায়গাটা অনেক পরিষ্কার, যদি জেনারেলে ফেলে রাখত তা হলে আর দেখতে হতো না। আগে এ সবে প্রবলেম হতো না। কত রাত নেশা করে নিজের বমির ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু গত চার বছর ধরে গুরুর সাথে থাকতে থাকতে অভ্যেস বদলাচ্ছিল। গুরু হেবি সাফসুতরো মানুষ। সব সময় কাচা জামা প্যান্ট পরতো, সেন্ট মাখত। বলত, ভাল গন্ধ মন ভাল রাখে।

গুরুর কথা মনে পড়ে চোখটা ভিজে উঠল সমীরের। সমীরকে অনাথ করে দিয়ে অকালে চলে গেল মানুষটা। গুরু আর তিতাস দিদি, মোটে এই দু'টো মানুষই তো ছিল জীবনে। তাও এক জনকে নিয়ে নিল ওই দানবের বাচ্চাটা। ঝপ করে মাথায় রক্ত উঠে গেল সমীরের। মনে মনে বলল, মা কসম, ওই দানব-এর বুকের রক্ত যদি না খেয়েছি তো আমার নাম সমীর দলুই না।

বলতে বলতে, পাশ ফিরে শুতে গিয়েই আরও বেশি করে ঝাঁট জ্বলে গেল সমীরের। এমন ধলতার ব্যান্ডেজ যে পাশ অবধি ফেরা যায় না। তিতাস দিদির বলিহারি। মোটে দুটো পাঁজরার হাড় ভেঙেছে আর মাথায় চোদ্দোটা সেলাই পড়েছে তার জন্য আটকে রেখে দিয়েছে! এই ভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে মেজাজ আরও বিগড়ে যাচ্ছে। একটু আগে তো একটা নার্সের সাথে হেবি ঝামেলা হয়ে গেল। ওয়ার্ড বয়টাকে ঘুষ দিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট আনিয়েছিল। সবে ধরিয়ে দু'টো সুখটান দিয়েছে, নার্সটা এসে হুজ্জুতি বাধিয়ে দিল। আরে ভাল মুখে বললেই হতো। আরও গোটা চারেক টান দিয়ে সে ফেলেই দিত সিগারেটটা, তা না কী হম্বিতম্বি, এখুনি ফেলো। এটা হাসপাতাল, পাড়ার ক্লাব না।

আরে ব্যাটা, সে কী জানে না, এটা পাড়ার ক্লাব না? পাড়ার ক্লাব হলে কি তিতাস দিদি দু'বেলা ক্যারাম পিটতে আসে? যত আবোদা মার্কা কথা বার্তা! তাও বেশি কথা না বাড়িয়ে সমীর সিগারেটটা ফেলেই দিয়েছিল। কিন্তু সে মাল চুপ করলে তো! ভ্যাজর ভ্যাজর করেই যাচ্ছিল! লাস্টে যেতে যেতে বলেছিল, তিতাস ম্যাডামের সবেতে বেশিবেশি। এই সব নেশাখোরদের এত তোল্লাই দেওয়ার কী আছে কে জানে বাবা!

ব্যাস, সমীরের 'আতা মাজি সটকলি!' গুরুর মুখ চেয়ে এত কষ্ট করে নেশা ছেড়েছে সে আর সেই নেশা নিয়েই অপবাদ! মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছিল, হ্যাঁ, আমি নেশাখোর আর তুমি সাধু!

আর যায় কোথায়? সে মেয়েটা কেঁদেকেটে পুরো যাত্রাপালা বসিয়ে দিল। হেড নার্স এসে শাসিয়ে গেছে, তিতাস ম্যাডাম এসে সব বলে দেবে। সেই নিয়ে খানিক চাপে আছে সমীর। তিতাস দিদির মুড সে কিছুতেই ধরতে পারে না। এই হাসিখুশি তো এই গম্ভীর! আর যখন কাউকে ঝাড়ে একেবারে পাছায় বিছুটি পাতা ডলে দেয়! সমীর বুঝতে পারছে, খিস্তিটা মারা উচিত হয়নি কিন্তু গুলি তো বেরিয়ে গেছে বন্দুক থেকে। সবচেয়ে ভাল হতো যদি হাসপাতাল থেকে পালাতে পারত। তা হলে হপ্তাখানেক তিতাস দিদিকে মুখ দেখাতে হতো না। তদ্দিনে নিশ্চয়ই দিদি শান্ত হয়ে যেত। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না সমীর তখনই কে যেন দাদা, বলে ডেকে উঠল।

ঘাড় ঘুরিয়ে সমীর অবাক। বেডের বাঁ দিকে দাঁড়িয়ে আছে একটা রোগাপাতলা বাচ্চা ছেলে। সাত-আট বছর বয়স হবে। চোখ দু'টো বড় বড় আর মুখখানা হেবি মিষ্টি। অবাক হয়ে গেল সমীর! এই হাফটিকিটটা এখানে কোত্থেকে এল? সে তো দরজার দিকে মুখ করেই শুয়েছিল। ঢুকতে তো দেখেনি! তা হলে? অবশ্য অন্যমনস্ক ছিল, তাই হয়তো খেয়াল করেনি। নিশ্চয়ই কোনও পেশেন্ট পার্টির সাথে এসে ভুল করে ঢুকে পড়েছে। সে হেসে বলল, কে তুই? নাম কী?

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ভারী অদ্ভুত একটা কথা বলল ছেলেটা। বলল, গেনুর ওপর তোমার খুব রাগ তাই না?

ভেবলে গেল সমীর, গেনু? গেনুটা কে? অনেকের ওপরেই তার রাগ আছে কিন্তু তার মধ্যে গেনু বলে তো কাউকে মনে পড়ছে না। শুয়ে শুয়েই সে বলল, কার কথা বলছিস তুই? কে গেনু?

ছেলেটা বলল, তুমি গেনুকে চেনো। নামটা জানতে না। ওই যে গো, যার জন্য মতিউর দাদা মরে গেল। ওই পিশাচটার নামই তো গেনু।

শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে সমীরের মুখে এসে জমা হল। উত্তেজনায় ফুলে উঠল কপালের শিরাগুলো। ছিটকে সোজা হয়ে বসল সে। খেয়ালও করল না এই ঝটকায় কপালের দু'টো কাঁচা সেলাই পট পট করে খুলে গেল। রক্ত গড়াতে শুরু করল কান ঘেঁষে। আবার মনে পড়ে গেল গুরুর মুখটা। হাসিখুশি চোখ দু'টোর একটা ভেদ ঢুকে আছে গাছের হারামি ডাল। শীতল চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে সমীর বলল, তুই জানিস কোথায় থাকে ওই দানবটা?

ঘাড় নাড়ল ছেলেটা, জানি।

কেন জানি না, ছেলেটাকে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হল সমীরের। মনে হল, একমাত্র এই ছেলেটাই তাকে ওই গেনু নামের জানোয়ারটা অবধি পৌঁছে দিতে পারবে। প্রতিশোধের কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারবে। সে জিজ্ঞেস করল, আমাকে নিয়ে যেতে পারবি সেখানে?

পারব।

চল তবে।

টান মেরে হাত থেকে স্যালাইনের নলটা খুলে বেড থেকে উঠে দাঁড়াল সমীর। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল হাতের শিরা থেকে। জায়গাটা মুখ দিয়ে চেপে ধরল সে। রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই বুকের ডান দিকটা টনটনিয়ে উঠল ব্যথায়। অন্য কেউ হলে সে ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে যেত কিন্তু কইমাছ সমীর নাম তো তার এমনি এমনি হয়নি! এ দিক, ও দিক তাকিয়ে পা টেনে টেনে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল সে। কারও চোখে পড়ার আগেই বেরিয়ে আসতে পারল মেল ওয়ার্ড থেকে। আটটা-সাড়ে আটটা বাজে, তবু বেশ ভিড় হাসপাতালে। ভিড় আর অন্ধকার, এ দু'টোই গা ঢাকা দেওয়ার জন্য ভাল জিনিস। দিনের বেলা হলে এত সহজে সে বেরিয়ে আসতে পারত না। তবে একটা কথা সমীর ভাবছিল, খালি হাতে যাওয়াটা কতটা ঠিক হবে? আর যাই হোক দানবটা এলিতেলি না!

বেচারা সমীর! যদি রাগে আর ভালবাসায় অন্ধ না হতো, যদি তার সামান্যতম যুক্তিবোধও কাজ করত তা হলে বুঝতে পারত, অবাস্তব একটা লড়াই লড়তে যাচ্ছে সে। কারণ মতিউরের ভয়ানক মৃত্যু তো তার চোখের সামনেই ঘটেছিল। তবু কিছু কিছু মানুষ এমনই সৃষ্টিছাড়া হয়, আর হয় বলেই হয়তো তারা হারিয়ে গিয়েও থেকে যায় চিরকাল। মনে মনে।

আশপাশটা দেখছিল সমীর। তার চোখ এমন কিছু খুঁজছিল যা খুব ভারী নয়, সহজে বহনযোগ্য অথচ অস্ত্র হিসেবে মারাত্মক। ছেলেটা যেন তার মনের কথা পড়ে ফেলল, একটা দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওইটা নাও না।

ঘাড় ঘুরিয়ে সমীর দেখল, একটা পুরনো লোহার ট্যাপ কল। বোঝা যাচ্ছে, বহুদিন ধরে এটার ব্যবহার হয় না। জং ধরে গেছে। কেউ দেখছে কি না দেখে নিয়ে এগিয়ে গেল সমীর। গায়ের জোর লাগিয়ে কয়েক বার ঝাঁকি দিতেই কলের মাথা সমেত রডটা গোড়া থেকে উপড়ে এল। খুশি হয়ে গেল সমীর। পুরনো দিনগুলো চলকে উঠল রক্তের মধ্যে। বাহ! এই তো দিব্যি হয়েছে অস্তরটা। জায়গামতো জমাতে পারলে দানব হোক আর পিচাশ হোক, খবর আছে। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, হেবি জিনিস দেখালি বাচ্চা। তোরও বুঝি গেনুর ওপর রাগ?

মাথা নাড়ল ছেলেটা, ওরা আমার মাকে আটকে রেখেছে।

থমকে গেল সমীর। তার পর বলল, কুছ পরোয়া নেহি। আগে নিয়ে তো চল আমায়। তার পর বাকিটা বুঝে নেব।

ছেলেটার পিছু পিছু হাসপাতালের গেট দিয়ে বেরিয়ে এল সমীর। কিন্তু বেরতেই সতর্ক হয়ে গেল সে। সুট করে একটা চায়ের দোকানের আড়ালে ঢুকে গেল। দূর থেকে একটা গাড়ি আসছে। গাড়িটাকে চিনতে পেরেছে সমীর। তিতাস দিদির গাড়ি। এই সময় তিতাস দিদি হাসপাতালে আসছে কেন? গিয়ে নিশ্চয়ই এক বার না এক বার তাকে খুঁজবে আর সে পালিয়েছে শুনলে তুলকালাম করবে। খুঁজে আনতে লোকও পাঠিয়ে দিতে পারে। সময় নেই হাতে। ঝটপট এই চত্বর থেকে পাতলা হয়ে যেতে হবে। তিতাস দিদির গাড়িটা ভিতরে ঢুকে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করল সমীর তার পর আড়াল থেকে বেরিয়েই বাচ্চাটাকে বলল, জলদি চল হাফটিকিট।

বাচ্চাটার সাথে কথা বলতে বলতেই দ্রুত হাঁটছিল সমীর। শুধু রাস্তার কিছু লোক অবাক হয়ে দেখল, বুকে মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা একটা চোয়াড়ে টাইপের ছেলে একা একা কথা বলতে বলতে খোঁড়াতে খোঁড়াতে হেঁটে চলেছে রাস্তা দিয়ে। এক জন মাঝবয়সি মহিলা তো তাঁর সঙ্গিনীকে বলেই ফেললেন, আহা রে! এতটুকু বয়েসেই পাগল হয়ে গেছে ছেলেটা!

. . .

মনটা ভাল নেই তিতাসের। ভাদুড়ি মশায়ের সাথে কথা হওয়ার পর একটা গোটা দিন কেটে গেছে। আজ রাত পোহালেই কাল সূর্যগ্রহণ। অনেক কিছু এক্সপেক্ট করেছিল তিতাস কিন্তু কিছুই হয়নি। ওরা যে তিমিরে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। মিতুলকে উদ্ধার করার কোনও আশা দেখা যাচ্ছে না। দীপক পালের স্ত্রীর মধ্যে সামান্য পাগলামির লক্ষণ দেখা দিয়েছে। যদিও এ সব তন্ত্র সাধনার ব্যাপারে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি তবু মিতুলের জন্য অস্বাভাবিক দুঃশ্চিন্তা তাঁর মানসিক স্থিতি নষ্ট করে দিয়েছে খানিকটা। সকাল থেকে তিনি ভাত বেড়ে বসে আছেন এবং বারে বারে জিগ্যেস করছেন মিতুল কখন ফিরবে? দীপক পালের বোন এসে এখন রয়েছেন তাঁদের বাড়িতে। তিনিই ফোনে এ সব বলছিলেন দীপক পালকে। ওরা পাঁচ জন এতক্ষণ অমিয়র ফ্ল্যাটে বসে ছিল। একটু আগেই ওখান থেকে বেরিয়েছে তিতাস। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করল না তাই হাসপাতালে চলে এসেছে। ইমার্জেন্সিতে গিয়ে বসে থাকবে। কাজের মধ্যে থাকলে কষ্টটা কম হবে।

অনেক দিন পরে আজ পল্লবের সঙ্গে কথা হল। আজ অফ ডে, তাই সকাল থেকে বাড়িতেই ছিল তিতাস। দুপুরে অমিয় ফোন করে বলেছিল, বিকেলের দিকে এক বার আসতে পারবি? ওরা তো এখানেই আছে। আমি পালদাকেও ডেকে নিচ্ছি। যদি আলোচনা করে কোনও রাস্তা পাওয়া যায়!

বেরতে গিয়েও থমকে গেছিল তিতাস। ফিরে এসেছিল আয়নার কাছে। সাদামাটা জামাটা ছেড়ে একটা ভাল কুর্তি পরে নিয়েছিল। ঘন করে কাজল দিয়েছিল চোখে আর এত দিন পর আলমারি খুলে বার করে এনেছিল একটা বিশেষ পারফিউম। এটা তাকে পল্লবের দেওয়া শেষ উপহার। পল্লব শুধু এই পারফিউমটাই গিফট করত তাকে।

তিতাস বলত, এটা তো খুব কমন পারফিউম। বারবার এটাই দিস কেন বল তো আমায়?

পল্লব বলত, কমন বলেই তো দিই। এটা আমার একটা এক্সপেরিমেন্ট।

এক্সপেরিমেন্ট?

হ্যাঁ। আমি লক্ষ্য করেছি, তুই গায়ে দিলেই এই পারফিউমটার গন্ধ অন্য রকমের হয়ে যায়। কেমন যেন নেশা ধরানো ঝিমিঝিমে একটা গন্ধ। অন্য কেউ মাখলে সেটা হয়ই না।

হাসত তিতাস, বলত, আমি তো খুব বড় বংশের মেয়ে। তাই আমার ফেরোমনে পারিজাত ফুলের সুবাস। দু'য়ে মিলেমিশে অমনটা হয়।

তার পরেই যথারীতি তাকে পেড়ে ফেলত পল্লব আর শুঁকতে শুরু করত। চুমু খেত না, আদর করত না, শুধু পাগলের মতো সারা শরীরে নাক ডুবিয়ে গন্ধ নিত। তিতাস মুখে বলত ঠিকই, আগের জন্মে তুই কুকুর ছিলি, কিন্তু ভিতরে ভিতরে অসহ্য রকমের উত্তেজিত হয়ে উঠত সে আর একটা সময় পর পল্লবকে ঠেলে ফেলে দিয়ে চড়ে বসত তার ওপর। ক্যানাইন দু'টো দিয়ে কানের কাছটা কামড়ে ধরে বলত, বলেছি না, আমায় জাগাবি না? মর এ বার!

প্রথম দু'টো বছর রাগ আর অভিমানে দিব্যি কেটে গেছিল। কিন্তু ইদানীং বড় ফাঁকা লাগত তিতাসের। পল্লবের পরে সে যে আর পুরুষসঙ্গ করেনি তা নয়, কিন্তু সবাইকেই যেন বড্ড অগভীর লাগে। ওই শোয়াশুয়ি অবধিই ভাল কিন্তু তার পর ভীষণ ভীষণ একঘেয়ে। পল্লবের অনেক দোষ ছিল কিন্তু সে একঘেয়ে ছিল না। কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে পল্লবের কাছ থেকে কখনওই কোনও সলিউশন পাওয়া যেত না কিন্তু সে এমন উদ্ভট আইডিয়া দিত যে খুব টেনশনেও হাসি পেয়ে যেত। আর কিছু পারুক না পারুক পল্লব হাসতে পারত। হাসাতে পারত। রমণের একেবারে চরম মুহূর্তে নির্গত হতে হতে একমাত্র পল্লবই বলতে পারত, শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে/মুখের পরে, বুকের পরে।

শেষ দিকে কয়েক বার ভেবেওছিল পল্লবকে ফোন করবে কিন্তু করে উঠতে পারেনি। তাই এত দিন পর পল্লবকে দেখে সে যে অজান্তেই দুর্বল হয়ে পড়েছে, তিতাস সেটা বুঝতে পারল পারফিউমটা মাখার পর। লজ্জা পেয়েছিল খুব। এই ছেলেমানুষিটা না করলেই হতো। পল্লবের কুকুরের নাক। ঠিক গন্ধ পাবে। যদি ভাবে তিতাস সিগন্যাল দিচ্ছে? থমকে গিয়েই মনকে প্রবোধ দিয়েছিল তিতাস, ভাবলে ভাববে। এটা তো একধরনের সিগন্যাল বটেই।

কয়েক মুহূর্তের জন্য পল্লবের কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনা হয়ে গেছিল তিতাস কিন্তু তার পরেই ফের বুকের ওপর চেপে বসেছিল মিতুলের জন্য ভয়। ভাদুড়ি মশায়ের কাছ থেকে সবটা জানার পর থেকেই তিতাসের মাথায় একটা অন্য অঙ্ক ঘুরছিল। ভাদুড়ি মশায় অনেকগুলি যুক্তি এবং তার প্রতিযুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছিলেন কেন মিতুলকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। কিন্তু কোনও কিছু অসম্ভব বলেই কি হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতে হবে? তিতাসের এক মাস্টারমশাই একটা কথা খুব বলতেন। তিনি বলতেন, 'এই যে এত পড়ছ, এতে যে চাকরি পাবে তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু না পড়লে যে পাবে না সেটা নিশ্চিত।' অর্থাৎ চেষ্টা করেও যে মিতুলকে উদ্ধার করা যাবে তার কোনও গ্যারান্টি নেই কিন্তু চেষ্টা না করলে মিতুল যে ওই পিশাচটির দ্বারা ধর্ষিত হবে এটা গ্যারান্টেড। তাই নিজের মতো করে কাউকে না জানিয়ে একটা চেষ্টা করেছিল তিতাস। ভালই হয়েছে কাউকে জানায়নি। কারণ, ডুমস ডে'র সময় এগিয়ে এসেছে অনেকটাই কিন্তু তার চেষ্টায় এখনও কোনও ফল হয়নি।

চেম্বারে ঢুকে ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে অনেকটা জল খেল তিতাস। বোতলের ঢাকনাটা আটকাচ্ছে, এক জন নার্স দরজায় উঁকি দিল, আসব ম্যাম?

আসুন। কী ব্যাপার?

আজ তো আপনার অফ ডে, তবু আপনি এসেছেন খুব ভাল হয়েছে।

কেন বলুন তো?

আসলে ম্যাম, সমীর দলুই আছে না, ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। আপনারই তো পেশেন্ট।

মানে? হোয়াট দ্য হেল! গলাটা দু'পর্দা চড়ে গেল তিতাসের, পেশেন্ট কেবিনের বাইরে যায় কী করে? আপনারা কী করছিলেন?

অধোবদন হয়ে নার্সটা বলল, আসলে ম্যাম ও তো আপনি ছাড়া কারও কথা শোনে না। আজকেই বিকেলে নমিতাদিকে গালাগালি দিয়েছে। আপনাকে জানিয়ে গেলাম, ও নিশ্চয়ই আশেপাশে আছে। ফিরে এলে একটু বলে দেবেন আমাদের সাথে যেন কোঅপারেট করে।

ঠিক আছে। আপনি যান। ও কেবিনে ফিরলে আমাকে খবর দেবেন।

ওকে ম্যাম, ঘাড় নাড়িয়ে নার্সটি চলে গেল। ধপ করে বসে পড়ল তিতাস, এই সমীরটা বড্ড অবাধ্য। আজ একটু ধমকাতে হবে ওকে। ভাবতে ভাবতে সবে একটু বেঁকে মোবাইলটা পকেট থেকে বার করতে যাবে অস্বস্তিটা টের পেল তিতাস আর তখনই একটা বাচ্চা মেয়ের গলা পেল সে, ও গো, শুনছ?

ঘাড় ঘুরিয়ে তিতাস অবাক। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে। বছর পাঁচেক বয়স হবে। কী মিষ্টি গোল্লামতো দেখতে! মনটা ভাল হয়ে গেল তিতাসের। ইচ্ছে করল, গাল দু'টো চটকে মেখে খেয়ে নেয় এক্ষুনি। বোধ হয় কোনও সিনিয়র ডাক্তার বা নার্সের মেয়ে। বাবা বা মায়ের সাথে বেড়ুবেড়ু করতে এসেছে। নয়তো এই সময় তো এখানে কোনও বাচ্চার আসার কথা নয়। চেয়ার থেকে উঠে তিতাস এগিয়ে গেল মেয়েটার কাছে, হাত নেড়ে ছেলেমানুষি গলায় বলল, হ্যাঁ গো শুনছি। বলো। কী নাম তোমার?

উত্তর না দিয়ে মেয়েটা এমন একটা কথা বলল, স্তম্ভিত হয়ে গেল তিতাস। মেয়েটা বলল, তুমি মিতুলদিদির কাছে যেতে চাইছ তাই না?

বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে তিতাস বলল, কে তুমি? মিতুল কোথায় আছে তুমি জানো?

ঘাড় নাড়ল মেয়েটা। আধো গলায় বলল, জানি গো। তাই তো তোমায় বলছি, তুমি যাবে?

বিদ্যুচ্চমকের মতো তিতাসের মনে পড়ে গেল, ভাদুড়ি মশায়ের নাতনি অপালাও একটা বছর পাঁচেকের বাচ্চা মেয়ের কথা বলেছিল। সে বলল, তুমিই কি তবে...

মেয়েটা যেন তিতাসের মনের কথা পড়তে পারল। কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল, তা যদি না করতাম বুড়ো দাদু কি তোমাদের কিছু বলত? আর দেরি কোরো না গো চলো। যা ভাবছ করে ফেলো। আগে আমার সাথে গিয়ে জায়গাটা চিনে এসো তার পর বাকিদের নিয়ে যেও।

শিশুটির মুখের মধ্যে অপার্থিব একটা জ্যোতি। সে জ্যোতি যেন ভরসা দিচ্ছে তিতাসকে। কী হচ্ছে তিতাস ঠিক বুঝতে পারছে না কিন্তু এই মুহুর্তে মেয়েটাকে তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। ভাদুড়ি মশায়ের একটা কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছিলেন, অলৌকিক কিছু না হলে মিতুলকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তবে কি এ বার সেই অলৌকিক কিছুই ঘটতে চলেছে? চেষ্টায় ফল হবে তার মানে? সমীরের সাথে পরে কথা বললেও চলবে। দেরি না করে জলের বোতলটা ঢুকিয়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল তিতাস। মেয়েটাকে বলল, চলো।

খুব জোরে গাড়ি চালাচ্ছে তিতাস। যদিও সে মেয়েটাকে আর দেখতে পাচ্ছে না তবু অনুভব করতে পারছে মেয়েটা তার সাথে সাথেই আছে। তার মাথার মধ্যে থেকেই সেই আধো আধো গলা তাকে রাস্তা বলে দিচ্ছে। হেলাবটতলা পেরিয়ে তিতাসের গাড়ি এখন ছুটেছে ময়নার দিকে। সামনেই একটা বাম্পার। মাথার মধ্যে সেই শিশুকণ্ঠ বলে উঠল, এখানে থামো।

গাড়ি থামাল তিতাস। হেড লাইট জ্বালিয়েই নেমে এল গাড়ি থেকে। রাস্তায় একটাও আলো জ্বলছে না। রাস্তার দু'দিকেই জঙ্গল। তার ওপর ঘন কুয়াশা। গা ছমছম করে উঠল তিতাসের। আবার মেয়েটাকে দেখতে পাচ্ছে সে। তার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে মেয়েটা। ডান দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ওখানে একটা কারখানা আছে আর কারখানার গোডাউনের মধ্যেই আছে মিতুলদিদি।

অবাক হয়ে গেল তিতাস, কারখানা কোথায়? এ তো জঙ্গল! পর মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল ভাদুড়ি মশায়ের কথা, লোকনাথ যেখানে সাধনা করছে একমাত্র সে দেখিয়ে না দিলে কোনও সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই জায়গা খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। এই শিশুটি কে তা মিতুল জানে না কিন্তু সে যে অসাধারণ তা নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই। মেয়েটা বলল, সামনের আম গাছটা দেখতে পাচ্ছ? ওটাকে ঘিরে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে তিন বার পাক দিতে হবে তা হলেই তুমি কারখানাটা দেখতে পাবে। আমার সাথে এসো।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো বাচ্চাটার সাথে এগিয়ে গেল তিতাস। আমগাছটার বাঁ দিক থেকে ডান দিকে পাক দিতে শুরু করল এবং তৃতীয় পাক শেষ হওয়া মাত্র তার চোখের সামনে থেকে কুয়াশার পর্দাটা সরে গিয়ে একটা কারখানার অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠল। কারখানার গেটটা খোলা। লোকনাথ চক্রবর্তী মায়াজালের বেশি সিকিওরিটির কোনও ব্যবস্থা রাখেনি। কিন্তু এক পা এগিয়েই থমকে গেল তিতাস। এতক্ষণ ধরে যে সাহস সে দেখাচ্ছিল তা কর্পূরের মতো উবে গিয়ে তাকে জাপটে ধরল তীব্র শ্বাসরোধকারী এক ভয়। মনে পড়ে গেল ভাদুড়ি মশায়ের তৃতীয় সাবধানবাণীটি, মেয়েটিকে সর্বক্ষণ পাহারা দিচ্ছে ওই পিশাচ। তার নজর এড়িয়ে মেয়েটির কাছ পর্যন্ত যাওয়া কার্যত অসম্ভব। যদিও তিতাস কোনও দিন গেনুকে দেখেনি তবু শুনে শুনে তার মনে কঙ্গোর আদিম বামন উপজাতির পিশাচটির যে ছবি আঁকা আছে তা বীভৎস। হঠাতই একটা সম্ভাবনা তাকে আরও অসাড় করে তুলল। সে শুনেছে, গেনু বাচ্চা মেয়েদের মতো গলায় কথা বলে। তাকে এই অবধি নিয়ে আসা বাচ্চা মেয়েটাই গেনু নয় তো? চমকে মেয়েটার দিকে তাকাল তিতাস। পাকা বুড়িদের মতো মাথায় হাত দিয়ে সে বলে উঠল, ওহ হো! তুমি তো জ্বালালে দেখছি। গেনু রূপ বদলাতে পারে না গো। আমি গেনু নই।

বড় লজ্জিত হল তিতাস কিন্তু ভয়টা তাকে ছাড়ল না। সে ফ্যাকাশে গলায় বলল, কিন্তু গেনু তো পাহারা দিচ্ছে। মিতুলের কাছ অবধি যাব কী করে?

মেয়েটা বলল, গেনুকে আটকানোর ব্যবস্থা করছে আমার দাদা। সে এক জনকে নিয়ে এসেছে। কিন্তু বেশিক্ষণ পারবে না। তার মধ্যেই দেখে নাও মিতুল দিদি কোথায় আছে। না দেখলে সবাইকে নিয়ে আসবে কেমন করে? সময় নেই গো, সময় নেই।

কাঁপা গলায় তিতাস বলল, আর লোকনাথ বলে লোকটা? সে কোথায়?

কেমন যেন কঠিন শোনাল সেই শিশুকণ্ঠ, সে তো সাধনা করেই গেল! সাধনায় বসেছে। এখন এ দিকে আসবে না।

মেয়েটা এগোতে লাগল কারখানার গেটের দিকে। এই মুহূর্তে তিতাসের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে পুরোপুরি। আর ভাবার মতো শক্তি নেই তার। যা হয় হবে। যন্ত্রের মতো মেয়েটার পিছুপিছু যেতে শুরু করল তিতাস। কারখানার ভিতরে ঢুকে বাঁ দিকের রাস্তা ধরল মেয়েটা। চারপাশে বড় বড় গাছ। মাঝে মাঝে লোহা লক্কড়ের জঙ্গল। দূরে দূরে একটা দু'টো সোডিয়ামের আলো জ্বলছে। সেই আবছা আলোয় হোঁচট খেতে খেতে এগোতে লাগল তিতাস। কিছুটা গিয়ে মেয়েটা থামল। অদূরেই একটা করোগেটেড টিনের ছাউনি দেওয়া লম্বাটে গোছের ঘর দেখিয়ে বলল, ওখানেই আছে মিতুলদিদি। দেওয়াল বেয়ে ওপরে উঠে ভিতরে নেমে যাও।

চমকে তাকাল তিতাস, তুমি যাবে না?

করুণ মুখে মেয়েটা বলল, না গো। আমরা শুধু দেখিয়ে দিতে পারি। তার বেশি পারি না। আমাদের মাকে আটকে রেখেছে না? মা থাকলে এত কাণ্ড হতেই দিত না।

একটা রাতচরা পাখি ডাকতে ডাকতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। তিতাসকে আর প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে মেয়েটা ত্রস্ত গলায় বলে উঠল, যাও গো যাও। গেনু ক্ষেপে উঠেছে ওদিকে। আমি টের পাচ্ছি। তাড়াতাড়ি করো।

দ্রুত পায়ে গোডাউনের দিকে এগিয়ে গেল তিতাস। দেওয়ালের ইট বেরিয়ে আছে। সেগুলো বেয়ে উঠে যেতে খুব একটা অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কোমরে একটা ব্যথা হচ্ছে। সেটাকে পাত্তা না দিয়ে দেওয়াল বাইতে শুরু করল তিতাস। তার পর ছাউনির ফাঁক গলে লাফ দিল ভিতরে। মোবাইলের টর্চ জ্বালাল। ওই তো... ওই তো মিতুল... তাকে দেখতে পেয়েছে। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে মেয়েটা। তিতাস বলে উঠল, ভয় নেই মিতুল। আমি তোমার বাবার বন্ধু।

তিতাস জানতেও পারল না, গোডাউন থেকে কিছুটা দূরেই এখন গেনুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে একটা অবাধ্য ছেলে। যার নাম কইমাছ সমীর।

. . .

কারখানাটা দেখেই চমকে উঠেছিল সমীর, আরে এ তো সেই কারখানাটা! যেখানে বছর চারেক আগে কাতান দিয়ে তার বুক পেট চিরে দিয়েছিল চারটে ছেলে। কেউ জানে না, এমনকী গুরুকেও সে কোনও দিন বলেনি, এই কারখানার মাটিতেই সে নিজে হাতে পুঁতে রেখেছে ওই চার জনের লাশ। সমীর জানে না, পিচাশের লাশ ফেলা যায় কি না! তবু সে চেষ্টা করবে। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, তুই ঠিক জানিস তো গেনু এখানেই আছে?

ঘাড় নেড়ে ছেলেটা বলেছিল, সোজা হেঁটে যাও ভিতরের দিকে। গেনু নিজেই তোমাকে খুঁজে নেবে।

ছেলেটার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসেছিল সমীর, থ্যাঙ্ক ইউ হাফটিকিট। যদি ফিরে আসি তোকে দাদাবৌদির বিরিয়ানি খাওয়াব।

পা টেনে টেনে কারখানার গেটের দিকে এগিয়ে গেছিল সমীর। এ কারখানার অন্ধিসন্ধি তার হাতের তালুর মতো চেনা। সোজা এগিয়ে গেলে মেশিনঘর। ওখান থেকে বাঁ দিকে টার্ন নিলে গোডাউন। কল বসানো লোহার রডটা শক্ত করে চেপে ধরে হাঁটছিল সে। অপেক্ষা করছিল সেই পচা গন্ধটার জন্য।

কিছুটা এগোতেই একটা রাতচরা পাখি ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে আর তখনই গন্ধটা পেল সমীর। মনে মনে বলল, এসে গেছে গন্ধমারানির পুত।

দু'পায়ের ফাঁকে রডটা চেপে ধরে পকেট থেকে রুমালটা বার করে সমীর নাক মুখ ঢেকে নিল। গুরুর সাথে থেকে থেকে সেন্টের গন্ধের আদত হয়ে গেছে। এই ঝাঁটের গন্ধে প্রবলেম হবে। রুমালটা বেঁধে মুখ তুলতেই সমীর দেখতে পেল, কিছুটা দূরেই একটা গাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছে গেনু। রুমাল দিয়ে মুখ ঢাকা না থাকলে গেনু দেখতে পেত, সমীরের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে মুচকি হাসি।

মেয়েদের মতো রিনরিনে গলায় গেনু বলল, কে তুই? ঢুকলি কী করে এখানে?

এর পর যা ঘটল তা গেনুর অভিজ্ঞতায় ছিল না। এত দিন পর্যন্ত সবাই তাকে দেখে ভয় পেয়েছে। হাড় হিম করা ভয়। এই প্রথম কেউ ভয় পেল না। উল্টে তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে উঠল, চিনলি না আমায়? তোর বাপ রে কুত্তার বাচ্চা।

তীব্র হিংসায় গেনুর গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেল। পাঁশুটে সবুজ রঙের মণি দু'টো জ্বলে উঠল ধ্বকধ্বক করে। তীব্র কণ্ঠে সে বলে উঠল, তোর মরণের ভয় নাই?

আবারও অবাক হল গেনু। খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ছেলেটা বলল, না বে মাদারচোদ। আজ তোর হিসেব নিতে এসেছি।

বলেই, কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চিতা বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় লাফিয়ে উঠে কল সমেত রডটা সে আমূল বিঁধিয়ে দিল গেনুর দন্তহীন মুখগহবরে। রডটা মুখ দিয়ে ঢুকে গলা ফুঁড়ে পেছন দিক দিয়ে খানিকটা বেরিয়ে রইল। মুখের কাছে ঝুলে রইল কলটা। কোনও সাধারণ মানুষ তাকে আঘাত করতে পারে এটা বিশ্বাস করতে গেনুর যতটুকু সময় লাগল তার মধ্যেই সমীর বলে উঠল, গুরুর চোখ নিয়েছিলি, তোর মুখ নিলাম।

তার পর প্রচণ্ড এক চড় মারল গেনুর কানের জায়গাটায়। মট করে একটা শব্দ হল। একটা তীব্র বেদনা ছড়িয়ে পড়ল সমীরের সারা শরীর জুড়ে। সমীর বুঝতে পারল, তার হাতটা কনুইয়ের কাছ থেকে ভেঙে ঝুলছে একটা লতানে গাছের মতো। হাঁটু দিয়ে গেনুর পেটে লাথিটা মারতে চাইল সে। কিন্তু লাথিটা গেনুর গায়ে লাগল না। শূন্যে কেটে গেল। টাল সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ল সমীর। বোধ হয় কটা দাঁত ভেঙে গেল। থু থু করে রক্তমাখা দাঁতগুলো বাইরে ফেলে কোনও মতে উঠে দাঁড়াল সমীর। যদিও চোখের দৃষ্টি ঝাপসা তবু ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখল, গেনু এখন তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। হাত দিয়ে রডটা টেনে শরীরের বাইরে বার করে আনল গেনু। দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল সেটা। ধাতব কিছুতে ধাক্কা খেয়ে টং করে একটা তীক্ষ্ন শব্দ হল আর শব্দের রেশ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বাঁকানো কালো নখ দিয়ে সমীরের শরীরটা দু'আধখানা করে চিরে ফেলল সে। দু'টো টুকরো আলাদা হয়ে পড়ে রইল দু'দিকে।

খিলখিল করে হেসে উঠল গেনু আর তার পর দীর্ঘ কালো খসখসে জিভটা দিয়ে চেটে নিল ছিটকে এসে মুখে লাগা সমীরের রক্ত।

১৪

সমীরের দু'টুকরো হয়ে যাওয়া দেহটার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে লোকনাথ।

মাটিতে থইথই করছে রক্ত। সাপের মতো কিলবিলে হয়ে পড়ে রয়েছে সুদীর্ঘ অন্ত্র। বাঁকানো নখ দিয়ে টেনে টেনে সেগুলোকেই এক জায়গায় করছিল গেনু। কখনও নখে বিঁধিয়েই মুখে পুরে দিচ্ছিল তুলনামূলক ছোট টুকরোগুলিকে। আবেশে বুঝে আসছিল ক্ষুদ্র হিংস্র চোখ দু'টি। গম্ভীর গলায় লোকনাথ ডেকে উঠল, গেনু।

প্রভুর ডাকে মুহূর্তে সচকিত হয়ে উঠল পোষ্য পিশাচটি। টাটকা, তাজা মানুষের অন্ত্রের মতো সুস্বাদু খাদ্যের টান অগ্রাহ্য করেও উঠে এল। থপথপ করে এসে দাঁড়াল লোকনাথের পাশে, কত্তা।

সন্দিগ্ধ গলায় লোকনাথ বলল, এ কী করে এখানে ঢুকেছিল জানিস?

গেনু বলল, না কত্তা। আমি তো মেয়েটারে পাহারা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম এ আগায়ে আসছে।

গম্ভীর গলায় শুধু একটা হুঁ, বলল লোকনাথ কিন্তু তার মনের মধ্যে ঘনিয়ে উঠতে লাগল সংশয়। মন্ত্র পড়ে এ জায়গাটার বাঁধন দিয়েছিল সে। কোনও মানুষের পক্ষে তো এমনি এমনি এ জায়গায় ঢুকে আসা সম্ভব না। এ রাস্তা জানত একমাত্র ধনা কিন্তু তাকেও তো মেরে ফেলেছে সে। তা হলে? এ অসম্ভব সম্ভব হল কী করে? অস্থির হয়ে উঠল লোকনাথ। ক্রুদ্ধ শার্দূলের মতো পায়চারি করতে লাগল হাত দু'টোকে পেছনে ভাঁজ করে। প্রভুর চঞ্চলতা দেখে একটু অবাক হল গেনু কিন্তু যেচে প্রশ্ন করার হুকুম নেই। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল প্রভুর পরবর্তী প্রশ্ন বা আদেশের অপেক্ষায়। যদিও বারে বারে চোখ চলে যাচ্ছে টাটকা অন্ত্রগুলির দিকে। তবু লোভ সংবরণ করল সে। এমন সময় লোকনাথ আবার বলে উঠল, শুধু এ একাই এসেছিল না সঙ্গে আর কেউ ছিল?

আহত হল গেনু। তার ওপর কি কত্তার ভরসা নাই? ঈষৎ অভিমানী গলায় সে বলল, যদি আর কেউ আসত তারেও তো এখানেই দেখতে পেতেন কত্তা। এ ভাবে রক্তে মাটি ভিজায়ে আপনার পায়ের কাছে পড়ে থাকত।

মাথা নাড়ল লোকনাথ, তা বটে। ছেলেটি কী ভাবে ঢুকেছে গেনু জানে না কিন্তু বিনা অনুমতিতে প্রভুর সাধনক্ষেত্রে প্রবেশ করার সমুচিত শাস্তি সে দিয়েছে এই মানবসন্তানটিকে। একটা গাছের নীচে ধপ করে বসে পড়ল লোকনাথ। মাথা নেড়ে বলল, মনটা বড্ড অস্থির করছে রে গেনু। রাত পোহালেই সূর্যগ্রহণ। সাধনার চরম ক্ষণ। যত বার এ সাধনা আমি করতে গেছি তত বার বাধা পেয়েছি। এ বারই সব ঠিক ঠিক হচ্ছিল কিন্তু শেষ বেলায় ফের এক ফোঁটা চোনা পড়ে গেল।

প্রভু তাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলেছেন। এ বার আর উত্তর দিতে বাধা নেই। গেনু বলল, এর হিসাব তো চুকায়ে দিছি কত্তা। তবে আর চিন্তা কী?

দুই হাঁটুর ওপর থুতনি রেখে লোকনাথ বলল, সব হিসেব কি আর এত সহজে চোকে রে? এ ছেলে নিজে থেকে এখানে ঢোকেনি। আমার মন বলছে, এর পেছনে অন্য কোনও ঘটনা কাজ করছে। আমার তো শত্তুরের অভাব নাই। এখানেই এক বুড়ো ভাম আছে। আমার গুরু। ঠিক করেছিলাম সাধনা শেষ হলে গুরুদক্ষিণাটা দিয়ে আসব। সে কোনও কলকাঠি নাড়ল না তো? কিন্তু নাহ! আমি তো খবর নিয়েই এসেছি, বহুদিন হল সে রক্তাম্বর পরা ছেড়ে দিয়েছে। এ সবের সাথে তার আর কোনও যোগাযোগ নাই। তবে? তবে আমার পেছুতে লাগল কোন আবাগির ব্যাটা?

কথাটা বলে ফেলেই স্তব্ধ হয়ে গেল লোকনাথ। চোখ দু'টো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যেন কোনও দিশা দেখতে পেয়েছে। তার পরেই আচমকা হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই নিজের মাথায় চড় মেরে বলল, কী বোকা আমি, কী বোকা! এমন নিরেট মাথা যার তার মাথায় যেন কাক শালিকে হাগে। আবাগির ব্যাটার কথা ভাবতে ভাবতে আবাগিটার কথাই তো ভুলে গেছি। আমার সবচেয়ে বড় শত্তুর। আমার বউ। ধম্মপত্নী।

লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকনাথ। একটু আগের শিথিলতা মুছে গিয়ে তার শরীরী ভাষা এখন ইস্পাতকঠিন, শাণিত। প্রতিহিংসায় কম্পিত। গলায় এক রাশ ঘেন্না ঢেলে বলল, চিরকাল জ্বালিয়ে খেলে মাগি। ও হল জাত সাপ। ওরে ঢিল দেওয়া আমার উচিত হয়নি। সে বারও ঘরে বন্ধ করে রেখেছিলাম। আমার যাত্রা ভঙ্গ করতে নিজের গলায় ফাঁস দিতে অবধি দু'বার ভাবেনি। এ বারও বন্ধ করেছি, তার মধ্যে থেকেই আমার বিরুদ্ধে কাঠি করতে শুরু করেছে। আজ ও মাগির এক দিন কী আমার এক দিন।

রাগে কাঁপতে কাঁপতে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে চলল লোকনাথ। টাটকা অন্ত্রগুলির দিকে এক বার মনমরা হয়ে তাকিয়ে শেষমেশ প্রভুকেই অনুসরণ করল পিশাচটি। একটা গুমটি মতো ঘরের সামনে এসে লোকনাথ থামল। এক লাথি মেরে খুলে দিল ঘরের দরজা। ঘরের মধ্যে থরে থরে সাজানো পুজোর নানা উপকরণ। একটা ছোট মাটির জালায় হাত ঢুকিয়ে তুলে নিল এক মুঠো কালো সর্ষে। তুলে নিল চারটি তির কাঠি। সুতোর আন্ডিল থেকে ছিঁড়ে নিল খানিকটা লাল সুতো। তার পর এগিয়ে গেল ঘরের কোণে রাখা একটা কাঠের বাক্সের দিকে। বাক্সের ডালা খুলে বার করে আনল লম্বা হলদেটে শুকনো লাঠির মতো একটা জিনিস। লম্বায় জিনিসটা বড় জোর এক হাত। ডাক্তারি ছাত্ররা দেখলে বুঝতে পারত ওটা কোনও লাঠি নয়, মানুষের পায়ের একটা হাড়। যার পোশাকি নাম 'ফিবুলা'। খুব ভাল চোখ যাদের তারা হয়তো বলে দিতে পারত, এ হাড় কোনও পুরুষের নয়, নারীর। তবে এ হাড় দেখে কেউই যেটা বুঝতে পারত না সেটা হল, এ হাড়টি সংগ্রহ করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কর্কট রাশিতে জন্ম, সাত মাসের গর্ভবতী মেয়েকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার পর অপেক্ষা করতে হয়েছে যত দিন না দেহটি কঙ্কালে পরিণত হয়। তার পর আষাঢ় মাসের অমাবস্যার রাতে গিয়ে কালো বেড়ালের থাবার সাহায্যে কবর খুঁড়ে তুলে আনতে হয়েছে কঙ্কালটি এবং বিশেষ পদ্ধতিতে শোধন করার পর তবেই এ হাড়টি খুলে নেওয়া হয়েছে। দেখতে নিরীহ এই হাড়টি আসলে অতীব শক্তিধর একটি আয়ুধ। কিন্তু এ জিনিস বড়ই দুর্লভ। প্রায় কেউ জানেই না এমন জিনিস হয় বলে। লোকনাথও কি জানত যদি না ভাদুড়ি বুড়ো বিশ্বাস করে তার খাতাগুলো লোকনাথের হাতে তুলে দিত! সুদূর পর্তুগালের একটি গোপন সঙ্ঘ শয়তানকে নিজেদের সন্তান রূপে কল্পনা করে। তাদেরই তন্ত্রে ব্যবহৃত হয় এই 'বিশেষ' ফিবুলা।

জিনিসগুলো নিয়ে ঘর থেকে বাইরেটায় বেরিয়ে এল লোকনাথ। প্রথমেই হাড়টি দিয়ে মাটিতে একটা বর্গক্ষেত্র আঁকল। তার চার কোণে পুতে দিল চারটি তির কাঠি। লাল সুতো বেঁধে দিল তাদের সাথে। যেন একটা ঘেরাটোপ তৈরি করল সে। বর্গক্ষেত্রের মাঝখানে ছিটিয়ে দিল মুঠো করে আনা কালো সর্ষে। তার পর বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল বিজাতীয় এক মন্ত্র। ঠিক তিন বার মন্ত্রটা আওড়াল লোকনাথ তার পর এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। সরু, ফাঁপা হাড়টির একটা দিক বাঁশির মতো করে ধরল মুখের সামনে। ফুঁ দিল তাতে। শিসের মতো অথচ অদ্ভুত সুরেলা এক আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল বায়ুমণ্ডলে। সে সুর জোরাল নয় কিন্তু তার মধ্যে যেন জমা হয়ে আছে শত সহস্র যুগের হাহাকার। সেই বুকফাটা আকুতিতে স্তব্ধ হয়ে যেতে লাগল সমস্ত চরাচর। হাড় বাজাতে বাজাতে সাপের ফনার মতো দুলতে লাগল লোকনাথ এবং এক সময় দেখা গেল বর্গক্ষেত্রের চার কোণের চারটি তির কাঠিতে কাঁপন ধরেছে। ছড়িয়ে থাকা সর্যেগুলো যেন সেই সুরের মোহে ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে আসছে পরস্পরের প্রতি। এক সময় সেগুলি এক জায়গায় এসে জড়ো হল আর তাতে দপ করে জ্বলে উঠল প্রোজ্জ্বল, দ্যুতিময় নীলাভ সবুজ এক শিখা। সুরের সাথে সাথে শিখাটিও যেন কাঁপছে। যন্ত্রণায় দীর্ণ হচ্ছে। ধীরে ধীরে সেই শিখাটিই একটি অবয়ব ধারণ করতে শুরু করল এবং কিছুক্ষণ পর দেখা গেল বর্গক্ষেত্রটির মাঝে হাঁটু মুড়ে বসে আছে এক শীর্ণকায়া দীর্ঘাঙ্গী। খোলা চুল ছড়িয়ে আছে পিঠের ওপর। জলে ভরা দুই চোখে তীব্র ঘৃণা নিয়ে সে তাকিয়ে আছে লোকনাথের দিকে। থেকে থেকে ফুঁপিয়ে উঠছে সে আর কান্নার কম্পনে ঠোঁট দু'টি ঈষৎ ফাঁক হলে দেখা যাচ্ছে, মাত্র কয়েকটি দাঁত অযত্নলালিত ভাঙা বেড়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে এ দিক, ও দিক। তারা যেন মুখ গহ্বরের শূন্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে শতগুনে।

১৫

ধড়মড় করে উঠে বসল সঞ্জয়। সে দরদর করে ঘামছে। ক্লান্তিতে কিছুক্ষণের জন্য চোখ লেগে এসেছিল তার। চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। চিৎকার করে উঠল সে, পল্লব। পল্লব।

পাশের ঘর থেকেই দুড়দাড় করে দৌড়ে এল পল্লব আর অমিয়। সঞ্জয়কে দেখে দু'জনেই ঘাবড়ে গেল ওরা। সঞ্জয়ের চোখ বিস্ফারিত। থরথর করে কাঁপছে সে। ছুটে এসে তাকে জাপটে ধরল পল্লব, কী হয়েছে? সঞ্জয়? এই সঞ্জয়।

কাঁপা গলায় সঞ্জয় বলল, আমি ওই শিসটা শুনলাম পল্লব। তোকে বলেছিলাম না, একটা শিসের শব্দ শুনছিলাম। সেইটা। মামির কান্নার আওয়াজও শুনেছি।

পল্লব বলল, কখন শুনলি?

এইমাত্র। তাতেই ঘুম ভেঙে গেল। ভয় পেয়ে তোকে ডেকে উঠলাম। মামি কি আমায় কিছু বলতে চায়? কিন্তু সেটা কী? তার সাথে কি মিতুলকে উদ্ধারের কোনও সম্পর্ক আছে? এ দিকে সময় তো ফুরিয়ে আসছে। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই গ্রহণ লাগবে। কী হচ্ছে আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না পল্লব।

দু'হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল সঞ্জয়। স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে আছে অমিয়। চোখের ইশারায় তাকে জলের বোতলটা আনতে বলল পল্লব। অমিয় সবে দু'পা এগিয়েছে তখনই বেজে উঠল কলিং বেল। ভুরু কুঁচকে গেল অমিয়র, রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। এখন আবার কে এল?

পল্লব বলল, আমি জল আনছি। তুই দরজাটা খোল।

দরজা খুলেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল অমিয়। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তিতাস। উস্কোখুস্কো চুল। চুলে মাকড়সার জাল। হাতে পায়ে ধুলো। হাঁফাচ্ছে। হাপরের মতো ওঠা নামা করছে তার বুক। তীব্র বিস্ময়ে অমিয় বলে উঠল, এ তোর কী অবস্থা তিতাস?

অমিয়র গলা পেয়ে ততক্ষণে ছুটে এসেছে পল্লব আর সঞ্জয়। তিতাসের অবস্থা দেখে ওরাও একই রকম বিস্মিত। দরজাটা বন্ধ করে দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়াল তিতাস। কিছু না বলতেই ঢাকনা খুলে জলের বোতলটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরল পল্লব। এক নিঃশ্বাসে অনেকটা জল খেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিতাস বলল, মিতুল কোথায় আছে আমি জানি। জায়গাটা দেখে এসেছি। সেখান থেকেই আসছি।

কিছু কথা থাকে খুবই সহজ। কিন্তু হজম করতে অনেক সময় লাগে। এ কথাটাও সে জাতের কথা। কেমন যেন ভেবলে গিয়ে তিতাসের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল ওরা।

হাতে দু'বার মৃদু তালি দিল তিতাস, হেই গাইজ!

সাড় ফিরে এল ওদের। পল্লব অনেক কিছু বলার চেষ্টা করল কিন্তু যা বলতে চাইছিল তার কিছুই বলে উঠতে পারল না। তার বদলে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, তুই... তুই একা কেন গেছিলি? তোর যদি কিছু হয়ে যেত!

এক মুহূর্তের জন্য পল্লবের চোখে চোখ রাখল তিতাস। তবে সে কিছু বলার আগেই সঞ্জয় বলে উঠল, কিন্তু তুই গেলি কী করে?

তিতাস বলল, একবারে বলছি। রেডি হ তোরা। আমাদের ভাদুড়ি স্যারের বাড়ি যেতে হবে। এক্ষুনি।

না চাইতেই পল্লব ককিয়ে উঠল, এখন? এত রাতে? বুড়ো হেবি টেটিয়া। এখন গেলে বাপের নাম ভুলিয়ে দেবে।

অসভ্যের মতো কথা বলবি না পল্লব। আমরা ওনার বাড়িতে বুজ পার্টি করতে যাচ্ছি না। আর উনি মিতুলের ব্যাপারে যথেষ্ট কনসার্ন। পালদাকে ফোন কর অমিয়। সোজা স্যারের বাড়ি আসতে বল। জলদি কর। উই আর রানিং আউট অব টাইম।

পল্লব দেখল, তিন বছরে অভ্যেস খুব একটা বদলায় না। তিতাসের ধমক খেয়ে সে এত দিন পরেও নার্ভাস হয়ে গেল এবং রেডি হতে গিয়ে টি-শার্টটা উল্টো করে পরে ফেলল। এটাও হয়তো সে খেয়াল করত না যদি না গাড়িতে তিতাস ফিসফিস করে বলে উঠত, টি-শার্টটা উল্টো পরেছিস।

হেডলাইটে রাতের অন্ধকার চিরে হু হু করে ছুটতে লাগল গাড়িটা।

১৬

দাঁতে দাঁত চেপে লোকনাথ বলল, সত্যি করে বল তুই কী কল করেছিস? কী করে এ জায়গার সন্ধান পেল ছেলেটা?

ফুঁপিয়ে ওঠা কান্না ছাপিয়ে ভেসে এল তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠ। লোকনাথের চোখে চোখ রেখে সেই দীর্ঘাঙ্গী বলল, বলব না।

রাগে বিকৃত হয়ে এল লোকনাথের গলা, বলবি না তো? তুই হলি চিরকেলে নষ্টা মেয়েছেলে। তোর সাথে ভাল মুখে কথা বলাটাই আমার ভুল হয়েছে। এখনও তুই লোকনাথ চক্কোত্তিকে চিনিসনি। তুই বলবি না তোর বাপ বলবে।

বলেই সেই সরু হাড়টা দিয়ে বাতাসের ওপরেই সজোরে প্রহার করল লোকনাথ। আগুনরঙা হয়ে সেই প্রহার ফুটে উঠল দীর্ঘাঙ্গীর শরীরে। কাতর আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল সে। বাতাসের ওপর মুহুর্মুহু আঘাত করতে থাকল লোকনাথ আর চিৎকার করতে লাগল, বল। ওই ছেলেটাকে কে পথ দেখিয়েছে বল। তোরে বলতেই হবে আজ।

মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে গেল লোকনাথ তবু সেই দীর্ঘাঙ্গীর মুখ দিয়ে আর্তনাদ ছাড়া আর একটিও শব্দ বার করতে পারল না সে। হাড়টা ছুড়ে ফেলে দিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে মাটির ওপরেই শুয়ে পড়ল লোকনাথ। হাঁ করে দম নিতে লাগল। শরীরময় অজস্র আগুনরঙা ক্ষত নিয়ে ধুঁকতে লাগল লোকনাথের মৃত স্ত্রী। সঞ্জয়ের মৃত মামি। আড় চোখে সে দিকে দিকে দেখল লোকনাথ তার পর শুয়ে শুয়েই হঠাৎ নরম গলায় বলে উঠল, তোমার বড় জেদ রমা। কোনও দিন আমার একটা কথা ঠিক মতো শুনলা না। আরে বাবা আমি তোমার পতি। কথায় বলে পতি পরমগুরু। তা আমারে সেই সম্মান তুমি কোনও দিন দিলা না। মরার আগে অবধি এ দুঃখ আমার যাবে না। আমি চিরকাল ভাল মুখে তোমায় বুঝায়েছি, তুমি শোনোনি। শেষকালে আমি কঠিন হতে বাধ্য হয়েছি। আজও সেই এক ঘটনা ঘটালে। কথায় আছে, স্বভাব যায় না মলে। তা তুমি দেখি সে কথা একেবারে সত্যি করে দিলে। মরেও তোমার স্বভাব বদলাল না, উঠে বসল লোকনাথ, দেখো রমা, ঠিক যখন করেছি তোমার পেট থেকে কথা বার করব তখন তো আমি করবই। আসলে কী বলো তো রমা, তুমি যতই নিজেরে চালাক ভাবো অতটা চালাক তুমি না। আরে বাবা, চিরকাল তো আমি তোমার ওপরে চড়েছি। তুমি তো আর আমার ওপরে চড়োনি। তোমার দুব্বল জায়গাগুলো আমি জানি। এই অন্তরটিপুনিটা দিতে চাইছিলাম না। সেই বাধ্য করলে। গেনু।

থপথপ করে এসে দাঁড়াল মূর্তিমান শয়তানটি। প্রভুর এই নরম গলাটা গেনু চেনে। সে জানে এর পরেই প্রভু এমন একটা কিছু বলবেন যা ভয়ানক। এই সব সময় ভারী ভাল লাগে তার। মিহি গলায় সে বলল, হুকুম করেন কত্তা।

উদাস গলায় লোকনাথ বলল, তোর কত্তামারে তো আমি কিছুই দিতে পারিনি তাই ভেবেছিলাম তার শেষ ইচ্ছেটা আমি রাখব। কিন্তু রাখতে পারলাম না।

চকিতে মুখ তুলে তাকাল দীর্ঘাঙ্গী। ঘৃণার পাশাপাশি সে দৃষ্টিতে এখন আশঙ্কা। কান এঁটো করা হাসি হাসল লোকনাথ, ঠিক ধরেছ রমা। ছেলেমেয়ে হারানোর পর ওরেই তো সবচেয়ে ভালবেসেছিলে তুমি।

কাতর আর্তনাদ করে উঠল রমা, না! না!

গর্জে উঠল লোকনাথ, চুপ শঅলী। যা গেনু, আমার ভাগ্নার মাথাটা ছিঁড়ে নিয়ে আয়। কত্তামারে নৈবেদ্য দে। আমার জেদের ঠাকুর। কত জেদ ঠাকুরের। ঠাকুররে নৈবেদ্য দিতে হবে না? তবে হ্যাঁ, কলিজাটা তুই খেয়ে নিস।

১৭

বেল বাজাতে দরজা খুলে দিল অপালা। অবাক হয়ে বলল, আপনারা! এত রাতে!

তিতাস বলল, স্যারের সাথে খুব দরকার। স্যার কি শুয়ে পড়েছেন?

জানি না। আসুন।

অপালার বলার ধরনে থমকে গেল ওরা। তিতাস বলল, জানি না মানে?

ভেতরে আসুন। বলছি।

বসার ঘরে উৎসুক হয়ে অপালার মুখের দিকে তাকিয়েছিল ওরা। অপালা বলল, দাদুর কী হয়েছে আমি বুঝতে পারছি না। সেই যে আমাকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরল তার পর থেকেই অসম্ভব রকমের অস্থির হয়ে গেছে। আমায় কিছু বলছে না কিন্তু ভেতরে ভেতরে সারাক্ষণ যে একটা ছটফটানি চলছে আমি বুঝতে পারছি। এত বয়েস হয়েছে। এখন তো এই সব একসাইটমেন্ট ঠিক না। আজ ভোরবেলা মানে খুব ভোরবেলা, ধরুন চারটে নাগাদ আমাকে তুলে দিল। দেখি তখনই স্নান করা হয়ে গেছে। আমি বললাম, এত সকালে স্নান করেছ কেন তুমি? গিজার চালিয়েছিলে?

উত্তর দিল না। বলল, আমি লাইব্রেরি ঘরে যাচ্ছি। কিছু কাজ আছে। আমি নিজে থেকে না বেরনো অবধি আমায় ডাকবে না।

আমি বললাম, ডাকব না মানে? খেতেও ডাকব না?

দাদু বলল, আমি খাব না। আজ আমার উপোস। তোমার চিন্তা হতে পারে তাই বলে দিলাম, যখন বেরনোর আমি নিজে থেকে বেরব। তার আগে ডু নট ডিস্টার্ব। এই বলে ক্রাচ খটখটিয়ে চলে গেল। আমি পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল। সেই সোয়া চারটে নাগাদ লাইব্রেরি ঘরে ঢুকেছে, এখন রাত সোয়া বারোটা। দেখতেই তো পাচ্ছেন বেরোয়নি। টোয়েন্টি আওয়ারস, নট আ ম্যাটার অব জোক। আমি ডাকতেও পারছি না। কথা না শুনলে বাচ্চাদের মতো রেগে যায়। কী যে হচ্ছে আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। মা বাবার সাথেও কনসাল্ট করতে পারছি না। অত দূরে আছে। ওখানে বসে টেনশন করবে। আপনারা এলেন, আপনাদের বলে একটু হালকা হলাম। বাট আপনারাই বা এমন টেন্সড কেন? কী হয়েছে আমাকে একটু বলবেন?

পরস্পরের সাথে চোখ চাওয়াচায়ি করল ওরা। তিতাস কিছু বলতে যাবে তখনই খুট করে একটা শব্দ হল। ছিটকিনি খুললে যেমন শব্দ হয় তেমন। শব্দটা এসেছে লাইব্রেরি ঘরের দিক থেকেই। এক সাথে সবার চোখ গিয়ে পড়ল সেই ঘরের দরজায়। ধীরে ধীরে খুলে গেল দরজাটা আর তীব্র বিস্ময়ে উঠে দাঁড়াল ওরা সবাই। দরজায় এসে যিনি দাঁড়িয়েছেন তিনি নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়িই বটে কিন্তু এ কোন ভাদুড়ি মশায়? চিরাচরিত ধুতি পাঞ্জাবির বদলে পরনে রক্তাম্বর। মাথাতেও পাগড়ির মতো করে জড়ানো একটি লাল উত্তরীয়। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা এবং ভস্মাচ্ছাদিত কপালে রক্তিম ত্রিপুণ্ড্র। চোখ দু'টো অস্বাভাবিক রকমের জ্বলজ্বল করছে। সমস্ত দেহ থেকে যেন ফুটে বেরচ্ছে সাধনালব্ধ বিভূতি।

সবার আগে ছুটে গেল অপালা। উদ্বিগ্ন গলায় বলল, এ সব কী দাদু? তুমি... তুমি ঠিক আছ তো?

স্নেহ ঝরে পড়ল যোগী পুরুষের কণ্ঠস্বর থেকে, হ্যাঁ দিদিভাই। আমায় নিয়ে চিন্তা কোরো না। এই ছেলেমেয়েগুলো বড় বিপদে পড়েছে। তাই ওদের সাহায্য করার চেষ্টা করছি মাত্র। জানি না, পারব কি না, তবু ভাবলাম, এক বার চেষ্টা করেই দেখা যাক। অন্তর থেকে ডাক পেলাম জানো? গুরু যেন কানে কানে বলে উঠলেন, অলৌকিক হবে নীরেন। লেগে পড়ে থাক, অলৌকিক হবে।

এগিয়ে এসে ভাদুড়ি মশায়ের জীর্ণ পা দু'টি স্পর্শ করল ওরা পাঁচ জন। মাথায় হাত রাখলেন বৃদ্ধ। মুখ তুলে তিতাস বলল, অলৌকিক ঘটনা সত্যি ঘটতে শুরু করেছে স্যার। আমি দেখে এসেছি মিতুল কোথায় আছে।

চমকে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়, সে কী করে সম্ভব?

তিতাস বলল, আমিও জানি না। কিন্তু একটা বাচ্চা মেয়ে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছিল। কারখানাটা ময়নার কাছে।

বিস্ময় বাড়ল ভাদুড়ি মশায়ের, বাচ্চা মেয়ে?

হ্যাঁ স্যার। অপালা যাকে দেখেছিল সেই। সে চাইছে মিতুলকে উদ্ধার করা হোক। তাই অপালাকে অজ্ঞান করে আমাদের আপনার কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল। এবার সে আমাকে জায়গাটা চিনিয়ে দিয়েছে এবং সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার আমি গেনুকে দেখতে পাইনি। মেয়েটি বলছিল, কেউ একটা গেনুকে আটকে রাখবে এবং লোকনাথ বলে লোকটা সাধনায় ব্যস্ত। সে এখন এদিকে আসবে না। আমার মনে হয় স্যার, আমরা যদি এখনই ওখানে যেতে পারি তা হলে হয়তো মিতুলকে উদ্ধার করতে পারব।

চুপ করে রইলেন ভাদুড়ি মশায়। সবচেয়ে অবাক হয়েছে অপালা। কী হচ্ছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না, তবে এটুকু বুঝতে পারছে পরিস্থিতি ঘোরাল। হাত জোড় করে দীপক পাল বললেন, তিতাস ম্যডামের কাছে সব শোনার পর আপনাকে দেখেও অনেকটা বল ভরসা পেয়েছি। অমত করবেন না স্যার, যদি মেয়েটাকে বাঁচাতে পারি!

কী যেন ভাবলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর বলে উঠলেন, তাই চলো। যদিও আমার মন বলছে এত সহজ নয়, তবু তিতাস যখন মিতুল অবধি পৌঁছতে পেরেছে হয়তো পরের অসম্ভবগুলিও সম্ভব হবে। গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরুদেব মহেশ্বর।

অস্থির অপালাকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে এলেন ভাদুড়ি মশায়। দরজা খুলে দিল তিতাস। ক্রাচ সামলে গাড়িতে ওঠা বড়ই কঠিন কাজ। তাঁকে উঠতে সাহায্য করছিল সঞ্জয়। হঠাৎই একটা তীব্র পচা গন্ধে আশঙ্কায় কুঁকড়ে গেল চারপাশের বাতাস। ভাদুড়ি মশায়ের হাত ছেড়ে মুখ তুলল বিস্মিত সঞ্জয়। এ গন্ধ তার চেনা। অস্ফুট আতঙ্কে সে বলে উঠল, গেনু!

১৮

একটা খড়কে কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে লোকনাথ বলল, কী রমা? এই বার শান্তি?

দু'চোখ ভরা ঘেন্না নিয়ে লোকনাথের দিকে তাকিয়ে আছে সেই দীর্ঘাঙ্গী। তীব্র বিবমিষায় সে বলে উঠল তুমি কি মানুষ?

হেসে উঠল লোকনাথ, এত দিন পর তুমি আমারে এই প্রশ্ন করছ? মানুষ হলে কি আমি নিজের হাতে দুই ছেলেমেয়েরে বলি দিতে পারতাম? পারতাম না। আমি মানুষ নই রমা। আমি সাধক। সাধকের মায়া, দয়া, স্নেহ, প্রেম কিচ্ছু থাকতে নাই। তার পাখির চোখ হল তার সিদ্ধি। হতাশ গলায় বলল, তোমার কি মনে হয় আমার কোনও দিন ভাল মানুষ হতে ইচ্ছে করেনি? ইচ্ছে করেনি ছেলেমেয়েরে কোলে কাঁখে করে রথের মেলায় নিয়ে যাই? পাঁপড় ভাজা আর জিলিপি কিনে দিই? অনেক বার ইচ্ছে করেছে। কিন্তু আমি পারিনি। আটকে গেছি। আমি যে পথভ্রষ্ট হতে পারব না রমা। আমি সত্যবদ্ধ। এই সিদ্ধিই আমার মোক্ষ, সিদ্ধিই আমার পিছুটান। এ যন্ত্রণা তুমি বুঝবা না।

জ্বলন্ত দৃষ্টি ক্রমে করুণ হয়ে এল দীর্ঘাঙ্গীর। কণ্ঠে ফুটে উঠল কাতরতা। সে হাত জোড় করে বলল, হয়তো আমি বুঝব না, কিন্তু দোহাই তোমার, তুমি আর কাউকে নতুন করে যন্ত্রণা দিও না। সঞ্জয়কে মেরো না। গেনুকে তুমি ফিরিয়ে নাও।

কাতরতা লোকনাথের কণ্ঠেও। জীবন মৃত্যুর দুই পারে দাঁড়িয়ে আশ্চর্য এক দাম্পত্য সংলাপ রচিত হচ্ছে এই লোহালক্কড়ের জঙ্গলে। এই গোপন সাধনক্ষেত্রে। লোকনাথ বলল, ভাগ্নার তো কোনও ক্ষতি আমি করতে চাইনি। যদি চাইতাম, তা হলে শক্তি ফিরে পেয়ে যখন আমি গেনুরে ফের নিজের কাছে আনলাম তখনই তো তারে মারতে পারতাম। আমি শক্তিহীন ছিলাম বলে এত দিন তুমি ভাগ্নারে গেনুর হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছ। এ বার তো পারতে না। তাও কি আমি কিছু করেছিলাম বলো? সে তো দিব্যি ছিল। তোমার অধিক ভালবাসাই তার মরণের কারণ হল।

কেঁদে উঠল রমা, না না, এমন বোলো না তুমি। এত পাপ যে ধর্মে সইবে না।

ম্লান একটা হাসি ফুটে উঠল লোকনাথের ঠোঁটের কোণায়। ক্লান্ত গলায় বলল, পাপ? পাপের ভয় শুরুর দিকে খুব পেতাম জানো? কিন্তু পুণ্যের যেমন মোহ আছে, পাপেরও আছে। এক বার মন শক্ত করে পাপ কাজ করে ফেললে রক্তে নেশা লেগে যায়। ফের পাপ করতে ইচ্ছে করে। এ যেন এক মন্দির থেকে আর এক মন্দিরে ছুটে যাওয়া। আর একের পর এক পাপ করতে করতে মানুষ এক সময় পাপী থাকে না। সে নিজেই একটা আস্ত পাপ হয়ে ওঠে। যাক গে, বেঁচে থাকতে আমি তোমারে সুখী করতে পারিনি। এখন মরার পরেও তোমায় দাগা দিতে আমার খারাপ লাগছে। এখনও সময় আছে রমা, তুমি কি বলবে কী করে ওই ছেলেটা এখানে ঢুকেছিল? যদি সত্যি সত্যি বলে দাও আমি গেনুরে ডেকে নেব। সে ভাগ্নারে কিছু করবে না। পরের মেয়ের কথা ভেবে নিজের জনের ক্ষতি কোরো না।

উজ্জ্বল হয়ে উঠল রমার দুই চোখ। সে বলে উঠল, বলব। তার আগে তোমায় একটা কথা দিতে হবে। কথা দাও এই ফুটফুটে মেয়েটাকে তুমি বলি দেবে না।

কয়েক মুহূর্ত রমার দিকে তাকিয়ে রইল লোকনাথ। তার পর হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, হা রে কপাল! তুমি ভাবছ আমি এই মেয়েটারে বলি দেব? আর সেই জন্য তুমি মেয়েটারে বাঁচাতে আমার পেছুতে লেগেছ! ওহ রমা! এদ্দিন তান্ত্রিকের ঘর করেও তুমি মুখ্যুই রয়ে গেলে। ওরে বাবা ও সব বলি টলি দিতে লাগে নিম্নমার্গের সাধনায়। ও সাধনা আমি কবেই ত্যাগ করেছি। এ মেয়েটারে বলি দেব বলে আমি আনিনি গো। ওর থেকে আমার মাসিকের রক্ত দরকার ছিল, সে আমি পেয়েও গেছি। কাল আমার সাধনা শেষ। তার পর ও মেয়ের সাথে আমার আর কোনও সম্পক্ক নাই।

মিথ্যে কথা। মিথ্যে বলছ তুমি, চিৎকার করে উঠল রমা, আমি জানি তুমি ওই মেয়েটাকে বলি দেবে বলেই ধরে এনেছ। কিচ্ছু ভুলিনি আমি। অনেক দিন আগে তুমি আমায় বলেছিলে, তুমি এমন এক সাধনা করছ যাতে গেনুর থেকেও শক্তিশালী পিশাচ তোমার বশ হবে। তার জন্য তিনটে বলি দরকার ছিল। দুই ছেলেমেয়েকে বলি দেবার পর আর তুমি কাউকে বলি দিতে পারোনি। আমি তোমায় দিতে দিইনি। তুমি জানতে এ বারেও আমি তোমায় বাধা দেব তাই আগেভাগেই আমায় বন্দী করেছ তুমি। তুমি যাই বলো না কেন, আমি জানি, এই মেয়েই তোমার সেই তৃতীয় বলি। এই মেয়েকে বলি দিলেই তুমি ভয়ঙ্কর শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সে প্রলয় আমি আসতে দেব না। আর কাউকে বলি হতে দেব না আমি। কিছুতেই না।

তীব্র উত্তেজনায় হাফাতে লাগল রমা। তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল লোকনাথ। তার পর ঈষৎ অভিমানী কণ্ঠে বলল, বিশ্বাস করছ না তো? আমার মনের মধ্যে ঢোকার শক্তি তোমার নাই। যদি থাকত তা হলে দেখতে পেতে, সত্যি ও মেয়েটারে বলি দেওয়ার কথা আমি ভাবছি না। সাধনার নানা পথ হয় রমা। যে সাধনা অত বছর আগে মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে তা কি আর এখন সম্ভব? এ সম্পূর্ণ অন্য পদ্ধতি। আচ্ছা, একটা কথা বলো, যদি বলি দেবারই হতো তা হলে কি আমি ওরে অমন গুদামে ফেলে রাখলাম? বলির পাঁটাকে তো ফুল মালা দিয়ে সাজাতে হয়। তেমন কোনও সাজ তোমার চোখে পড়ছে কি? আরও অভিমানে ঘন হল লোকনাথের গলা, রমা, চিরটাকাল আমারে তুমি ভুল বুঝে এলে। চিরটাকাল।

স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল রমা। স্বামীকে যদিও এতটুকু বিশ্বাস করে না তবু এই কথাটা ফেলে দিতে পারল না সে। এর আগে লোকনাথ যাদের যাদের বলি দিয়েছে বা দিতে চেয়েছে তাদের প্রত্যেকের প্রতি সে অসম্ভব যত্নবান ছিল। কিন্তু এই মেয়েটার প্রতি লোকনাথের অবহেলা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি রমার। দ্বন্দে জীর্ণ হতে লাগল সে, সত্যিই কি তবে সাধনার পথ বদলে ফেলেছে লোকনাথ? যে ভয় সে এত দিন পাচ্ছিল সে ভয় তবে অমূলক? তবে কি সে মিছিমিছিই সঞ্জয়ের মনের মধ্যে দুঃস্বপ্নের বীজ বুনে দিয়ে এল?

এত কী ভাবছ রমা? ভাবাভাবির সময় নাই। দেখো, সত্যি বলতে, ভাগ্নাকে যদি তুমি বাঁচাতে চাও এই মুহূর্তে আমার কথা শোনা ছাড়া তোমার সামনে কি আর কোনও রাস্তা আছে বলো? নাই তো? তা সত্ত্বেও কিন্তু আমি তোমারে সবটা বুঝায়ে বলেছি। এ বার চটপট আমার প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দাও। গেনু হয়তো এতক্ষণে পৌঁছে গেছে। তারে না ফেরালে সব্বোনাশ কিন্তু হবেই।

শিউরে উঠল রমা। সত্যিই, সঞ্জয়কে বাঁচাতে গেলে এই লোকটার কথা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। দোলাচলে ভুগতে ভুগতেই সে আরও একবার আশ্বস্ত হতে চাইল। বলল, সত্যি তুমি ফিরিয়ে নেবে তো গেনুকে?

নেব রে বাবা, নেব। এ বার চটপট বলো তো, ছেলেটা কী করে ঢুকেছিল এখানে? তুমি তো বন্দি। কোন ফিকিরে ওকে গোপন পথ দেখায়েছিলে?

আমি দেখাইনি।

তবে?

তোমার ছেলে দেখিয়েছিল।

বজ্রাঘাতে দগ্ধ তালগাছের মতো কেঁপে উঠল লোকনাথ। মৃতের মতো নিস্পন্দ হয়ে সে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার পর তার চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে নামল এক ফোঁটা জল। ধরা গলায় সে বলে উঠল, শেষমেশ বাপের বিরুদ্ধে ছেলেরে ওসকালে রমা! ছি ছি ছি! এক বারও এ দিকটা আমার মাথায় আসেনি! তাদের কথা আমি ভুলেই গেছিলাম! আমি ভাবতেও পারিনি ওই ছোট বাচ্চাটাকে দিয়ে তুমি এই ঘেন্নার কাজটা করাবে! ছেলেরে উসকেছ, এ বার মেয়েরেও হয়তো ওসকাবে!

চোখ মুছতে মুছতে লোকনাথ এগিয়ে চলল জায়গাটা ছেড়ে। হাহাকার করে উঠল রমা, কোথায় যাচ্ছ তুমি? গেনুকে কখন ফেরাবে? আমি তো সব বললাম তোমায়। এ বার গেনুকে ডাকো।

উত্তর না দিয়ে লোকনাথ ফের ঢুকে গেল গুমটি ঘরটার ভিতরে। যখন বেরিয়ে এল তখন তার হাতে তিরকাঠি, লাল সুতো আর কালো সর্ষে। একইরকম ভাবে মাটিতে আঁকল বর্গক্ষেত্র। তিরকাঠি পুঁতে, তাতে লাল সুতো বেঁধে তৈরি করল নতুন একটা ঘেরাটোপ। তার মধ্যে ছড়িয়ে দিল কালো সর্ষে। ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল রমা, কী করছ তুমি? কী করছ?

চকিতে ঘুরে হাতের সেই হাড় দিয়ে বাতাসের ওপর সজোরে প্রহার করল লোকনাথ। আগুনরঙা ক্ষত কেটে বসে গেল রমার ঠিক মুখের ওপর। আর্তনাদ করে সে ছিটকে পড়ল মাটিতে। তার ব্যাকুল নিষেধ অগ্রাহ্য করেই লোকনাথ সেই মন্ত্রপাঠের পর হাড় বাজাতে শুরু করল। পুনরাবৃত্তি হল ঘটনার এবং দু'টি প্রোজ্জ্বল দ্যুতিময় নীলাভ সবুজ শিখার মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে অবয়ব ধারণ করল একটি একটি বালক এবং একটি বালিকা। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে তারা।

উন্মাদিনীর মতো চিৎকার করতে লাগল রমা, কেন ধরে আনলে ওদের? ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও বলছি।

হিংস্র বাঘের মতো ঘুরে তাকাল লোকনাথ। বাতাসের ওপর ফের আঘাত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে বলে উঠল, কসবীর কসবী। ছেলেমেয়েরে বাপের বিরুদ্ধে ভড়কে আবার কথা! আর কোনও ছাড় নেই তোদের। এ বার এমন অবস্থা করব তোদের তিনটের উড়ে বেড়ানো জন্মের শোধ শেষ। সূক্ষ্ম দেহ ধারণ করেছিস বলে খুব রস জমেছে না খাঁজে খাঁজে? স্থূল দেহে বাঁধব তোদের। দেখি কেমন করে আর কাউরে রাস্তা দেখাস।

কোনও উত্তরের অপেক্ষা না করেই হাড়টা ফের মুখে তুলে নিল লোকনাথ। এ বার সেখান থেকে বেরিয়ে এল অন্য এক সুর। কান্না নয়, এ বার ক্রোধ। পুঞ্জীভূত সেই রোষ যেন কেটে বসে যেতে লাগল বাতাসের স্তরে স্তরে। ধীরে ধীরে কম্পন দেখা গেল ছেলেমেয়ে দু'টির শরীরে। ফের তারা পরিণত হল সেই নীলাভ সবুজ শিখায় এবং হাড়টা ফেলে দিয়ে লোকনাথ এগিয়ে গেল সে দিকে। আচমকাই দু'হাত দিয়ে খপ করে চেপে ধরল শিখা দু'টি। যখন হাত তুলে আনল দেখা গেল তার দু'হাতে দু'টি শালিক পাখি ছটফট করছে। সেই গুমটি ঘরে ঢুকে লোকনাথ দু'টি ফাঁকা মাটির জালার মধ্যে ভরে ফেলল পাখি দু'টিকে। বন্ধ করে দিল জালার মুখ। এর পর রমার সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল সে। হিসহিসে গলায় বলল, দেখলি তোর ছেলেমেয়েরে কী করলাম? এ বার তোর পালা। রাস্তা দেখানোর পথ চিরকালের মতো বন্ধ।

কেঁদে উঠল রমা, আমাকে যা খুশি করো কিন্তু এ বার তো গেনুকে ফেরাও।

প্রেতের মতো খলখল করে হেসে উঠল লোকনাথ, গেনু হল ধনুক থেকে ছিটকে বেরনো তির। গেনু যখন কাউরে মারতে যায় তখন তারে ফেরায় কার সাধ্যি!

প্রতারিত হওয়ার যন্ত্রণায় স্তব্ধ হয়ে গেল রমা।

১৯

সাবধান! গেনু আমাদের আশেপাশেই আছে, চিৎকার করে উঠল সঞ্জয়।

তীব্র পচা গন্ধটা সবাই পেয়েছিল ওরা। আশঙ্কার মেঘ জমেছিল সবার মনেই। কিন্তু সঞ্জয়ের চিৎকার স্পষ্ট জানিয়ে দিল, ঝড় এসে গেছে।

ভয়ে হিম হয়ে ইতস্তত দাঁড়িয়ে রইল কয়েকটা মানুষ। তারা বুঝতে পারছে, খুব কাছে এসে ওঁত পেতে বসে আছে মৃত্যু। এখন কোন দিক দিয়ে কার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে শুধু তারই অপেক্ষা। অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই।

খুব বমি পাচ্ছে পল্লবের। পেটের ভিতর পাক দিয়ে উঠে আসছে গলার কাছে। কিন্তু ভয়ে বুঝি শিথিল হয়ে গেছে গোটা শরীরটাই। বমি হচ্ছে না। এমন সময় তার চোখ আটকে গেল কিছুটা দূরে। রাতের অন্ধকারে জ্বলছে দু'টো পাঁশুটে সবুজ রঙের মণি। ঘড়ঘড়ে গলায় সে বলে উঠল, ওই... ওই যে।

চমকে তাকাল সবাই। রাস্তার ঠিক ও পারেই দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিমান বিভীষিকা। গেনু। কয়েক কদম এগিয়ে এল সে। পিশাচটির চলাফেরায় এখন আর সেই ঢিলেঢালা থপথপে ভাবটা নেই। সে এগিয়ে আসছে শিকারি শ্বাপদের নিস্তব্ধ হিংস্রতায়। মেয়েদের মতো রিনরিনে গলায় সে বলে উঠল, কেমন আছ ভাগ্না?

ইট চাপা দেওয়া ঘাসের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল সঞ্জয়। বিড়বিড় করে বলতে লাগল, আমি জানতাম ও আসবে। আমায় মারতে আসবে। মামি নেই, এই তো সুযোগ।

গেনু বলল, ভয় পাইছ বুঝি? ভয় নাই, ব্যথা লাগব না তোমার। মামায় তোমার মুন্ডু চায়। এক টানে ছিঁড়ে নেব। তুমি বুঝতেও পারবা না। বন্ধুদের বিদায় বলে চলে আসো ভাগ্না। এই বারে আর মামারে দুঃখ দিও না। আসো।

বাঁকানো নখের তিনটে আঙুলওয়ালা হাতটা বাড়িয়ে ধরল গেনু। ঠিক যে ভাবে প্রিয়জন হাত বাড়িয়ে দেয় আর এক প্রিয়জনের দিকে। মাথা ঘুরতে লাগল সঞ্জয়ের। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল হিমশীতল চাদরের মতো মৃত্যুভয় ঢেকে দিচ্ছে তার সমস্ত চেতনা। অজ্ঞান হয়ে যাবে সে, ঠিক তখনই তার কানে এল একটা বজ্রনির্ঘোষ, সবাই আমার পেছনে এসে দাঁড়াও।

ক্রাচ ঠুকে ঠুকে সামনে এগিয়ে এলেন ভাদুড়ি মশায়। ফের গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সবাই আমার পেছনে এসো।

শিশু যে ভাবে মায়ের কোলে আশ্রয় খোঁজে, ঠিক সে ভাবেই ওরা ছুটে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ভাদুড়ি মশায়ের পেছনে। অর্ধ অচেতন সঞ্জয়কে ধরে নিয়ে এল অমিয় আর দীপক পাল। গেনুর চোখে চোখ রেখে দাঁড়ালেন অশীতিপর যোগীপুরুষ। থমকে গেল গেনু। আজ তার সাথে একের পর এক এমন ঘটনা ঘটছে যা আগে কখনও ঘটেনি। একটু আগেই একটা মানুষ তার হায়ে হাত তুলেছে। এখন আবার আর একটা মানুষ তার পথ আটকে দাঁড়াল। কী হচ্ছে এ সব! অন্ধ রাগে জ্বলে উঠল তার সর্বাঙ্গ। তীক্ষ্ন গলায় সে বলল, ভাল চাস তো পথ ছাড়। তোদের কারও সাথে আমার কিছু নাই। ভাগ্নারে নিতে আসছি। নিয়ে চলে যাব। আমায় বাধা দিলে সব ক'টা মরবি।

ব্যঙ্গ ঝিকিয়ে উঠল বৃদ্ধের কণ্ঠে, তাই না কি? নিম্নশ্রেণির পিশাচের এত ক্ষমতা যে সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে হুমকি দেয়?

হুঙ্কার দিল গেনু, কে তুই? কে?

গমগম করে উঠল বৃদ্ধের কণ্ঠ, আমি? আমি তোর প্রভুর গুরু। আমার নাম শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। যদি আজ অবধি এক মুহূর্তের জন্য গুরুবাক্য থেকে বিচ্যুত না হয়ে থাকি, যদি শাস্ত্রের গভীরে ঢুকে থাকি, যদি আমার সাধনায় ফাঁকি না থাকে তবে তিরিশ বছরের অনভ্যাসও আমি কুড়ি ঘণ্টায় জয় করতে পারি। তোর মতো পিশাচের সাধ্য নেই আমার ইচ্ছেকে অতিক্রম করে। আমি ইচ্ছা করছি, তুই ফিরে যা। ফিরে যা তোর প্রভুর কাছে আর গিয়ে বল, তার আস্তানার খোঁজ আমি জানি। আমি আসছি। এই অশুভ সাধনায় আমি কিছুতেই তাকে সিদ্ধ হতে দেব না।

এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল গেনু তার পরেই ঝড়ের মতো উড়ে এল ভাদুড়ি মশায়ের দিকে। এতক্ষণ শ্বাস বন্ধ করে এই কথোপকথন শুনছিল ওরা। এ বার প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় আর্তনাদ করে উঠে চোখ বুজল।

কোথাও কোনও শব্দ নেই। নীরব নিস্পন্দ গোটা চরাচর। ঝিঁঝিঁ পোকারাও যেন আজ ডাকতে ভুলে গেছে। এই নীরবতা অসহনীয়। চোখ খুলল তিতাস আর চোখ খুলেই যা দেখল তাতে অবাক হতেও ভুলে গেল সে। ভাদুড়ি মশায়ের থেকে ঠিক ছ' ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে আছে গেনু। প্রবল চেষ্টা করছে সে এই সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতে কিন্তু পারছে না। যেন এক অদৃশ্য পাঁচিল রচিত হয়েছে তার আর ভাদুড়ি মশায়ের মাঝখানে। পরিশ্রমের প্রাবল্য ফুটে উঠেছে গেনুর কদাকার মুখে। তাতে আরও ভয়াবহ লাগছে তাকে। ভাদুড়ি মশায় কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু ক্রাচের হাতলে ধরা তাঁর মুঠো দু'টি দেখে বোঝা যাচ্ছে, পরিশ্রম তাঁরও নেহাত কম হচ্ছে না। টানটান হয়ে ফুলে উঠেছে শীর্ণ হাতের শিরাগুলি। ত্বক ভেদ করে যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে তারা। এই নিস্তব্ধ লড়াই আরও কিছুক্ষণ চলল, তার পর আচমকাই অদৃশ্য হয়ে গেল গেনু।

মুঠো দু'টো শিথিল হয়ে এল বৃদ্ধের। হাত থেকে খসে গেল ক্রাচ দু'টি। মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগেই তাঁকে দু'দিক থেকে ধরে ফেলল তিতাস আর পল্লব।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ধাতস্থ হয়ে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়। বলে উঠলেন, আমার শরীর নিয়ে ভেবো না। চলো। আর দেরি করে লাভ নেই। পিশাচের সাথে এই সম্মুখ সমরে মনে বল পেয়েছি আমি। তিতাস যখন জায়গাটা চেনেই, আজ রাতেই আমরা উদ্ধার করার চেষ্টা করব মিতুলকে। একের পর এক অসম্ভব আজ সম্ভব হচ্ছে যখন তখন হয়তো বিফল হব না আমরা।

দু'টো গাড়ি ছুটে চলল ময়নার দিকে।

২০

কী নাম বললি তুই আবার বল, চিৎকার করে উঠল লোকনাথ।

অধোবদনে গেনু বলল, নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি।

সজোরে হাতের হাড়টা গেনুর কাঁধে বিঁধিয়ে দিল লোকনাথ। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল গেনু। তার বুকের ওপর পা তুলে অন্ধ আক্রোশে লোকনাথ বলল, একটা লোক আজ থেকে তিরিশ বছর আগে সাধনা ছেড়েছে আর তারে ভয় পেয়ে ফিরে এলি! তুই তো মেয়েছেলেরও অধম, রাগে গেনুর বুকে একটা লাথি বসিয়ে দিল লোকনাথ।

কিন্তু তাতেও সে শান্ত হতে পারল না। দু'হাতে চুলের মুঠি ধরে পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে লাগল এ দিক, ও দিক। গাছের গায়ে মাথা ঠুকতে লাগল, কেন আমি শেষ করিনি ওই বুড়োরে? কেন?

আচমকা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ল লোকনাথ। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, সবাই আমার শত্তুর। নিজের বউ শত্তুর, ছেলেমেয়ে শত্তুর, গুরু শত্তুর। সবাই শত্তুর। গুখেগোর ব্যাটা আমি। আমি বেজন্মা, সজোরে চড় মারতে শুরু করল নিজের দুই গালে।

প্রভুর যন্ত্রণা দেখে বড় অসহায় হয়ে পড়ল গেনু। প্রভুর এই চেহারা আজ অবধি সে কখনও দেখেনি। নিয়ম ভেঙে অনুনয় করে উঠল, আমায় শেষ করে দ্যান কত্তা কিন্তু আপনি শান্ত হোন। শান্ত হোন, পায়ে পড়ি আপনার। আমি খালি হাতে ফিরতাম না কত্তা। আজ অবধি কি ফিরেছি? কিন্তু ওই বুড়ো ভয়ানক। সে যে আপনার শক্তিরেও টেক্কা দেয় পারলে। সে বলেছে, এই জায়গার খোঁজ জানে। সে আসছে এখানে। কিছুতেই আপনারে সিদ্ধি পেতে দেবে না।

গেনুর কথায় কান্না থেমে গেল লোকনাথের। চকিতে ঘুরে বসল গেনুর দিকে। বাঁ হাতের চেটোয় চোখের জল মুছে বলল, কী বলেছে? সে এই জায়গা চেনে? এখানে আসছে?

মাথা নাড়ল গেনু, হ্যাঁ কত্তা।

কোনও কথা না বলে উঠে দাঁড়াল লোকনাথ। ধুলো ঝাড়ল ধুতি থেকে। গেনুর কাঁধ থেকে খুলে নিল বিঁধিয়ে রাখা হাড়টা। তার পর ফিক করে হাসল গেনুর দিকে তাকিয়ে। তরল কণ্ঠে বলল, সিদ্ধি পেতে দেব না, বললেই হল? ও বুড়ো হয়েছে। ভীমরতি ধরেছে। তাই এ সব আলফাল বকছে। ও সব নিয়ে ভাবিস না গেনু। আসতে চাইছে তো? আসুক। আমার নামও লোকনাথ চক্কোত্তি। নে ওঠ।

যারপরনাই অবাক হল গেনু। প্রভুর এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণটা সে কিছুতেই অনুধাবন করতে পারল না।

. . .

তিতাস বলে উঠল, সামনে একটা বাম্পার আছে। ওখানেই দাঁড়াতে হবে আমাদের।

পর পর দুটো গাড়ি চলেছে। সামনের গাড়িতে তিতাস। সে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। পেছনের গাড়িটা অনুসরণ করছে সামনের গাড়িটাকে।

বাম্পারের সামনে এসে থেমে গেল দুটো গাড়ি। একে একে সবাই নেমে এল গাড়ি থেকে। সবার মধ্যেই কাজ করছে একটা মিশ্র অনুভূতি। আশঙ্কা এবং উত্তেজনা মিলেমিশে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক মানসিক দোলাচল। শুধু ভাদুড়ি মশায়কে দেখে বোঝা যাচ্ছে না তাঁর মনের মধ্যে কী চলছে। ব্যগ্র হয়ে তিতাসের দিকে এগিয়ে এলেন দীপক পাল, জায়গাটা কোথায় ম্যাডাম? এখানে তো দু'দিকেই জঙ্গল! মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশায় তিনি অস্থির।

ওই যে আমগাছটা, ওই গাছটাকে ঘিরে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে তিন বার পাক দিলেই আসল জায়গাটা দেখা যাবে। লোকনাথ মায়া করে রেখে বলে দেখা যাচ্ছে না। আসুন পালদা। স্যার আসুন, গাছটার দিকে এগিয়ে গেল তিতাস।

তিন বার পাক দিতেই ওদের চোখের সামনে থেকে সরে গেল কুয়াশার পর্দা। দৃশ্যমান হল কারখানার গেট। তিতাস বলল, ওর মধ্যেই একটা গোডাউন মতো জায়গায় মিতুল আছে। ঢুকে বাঁ দিক দিয়ে যেতে হবে।

দুম করে ভিতরে ঢুকে যাওয়া উচিত হবে কি হবে না, আর গেলেও লোকনাথ এবং গেনুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য কতখানি সাবধানতা নেওয়ার প্রয়োজন সে সব নিয়ে কোনও কথা হওয়ার আগেই তিরের মতো কারখানার গেটের দিকে ছুটে গেলেন দীপক পাল।

প্রাথমিক হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে অমিয় চিৎকার করে উঠল, পালদা!

কিন্তু দীপক পাল ততক্ষণে ঢুকে গেছেন কারখানার ভিতরে। তাঁকে আর দেখা যাচ্ছে না। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে চোখাচোখি হল পল্লব আর অমিয়র। ওরা দু'জনেও ছুটল গেটের দিকে। যেতে যেতে চিৎকার করে অমিয় বলল, তিতাস, তুই আর সঞ্জয় স্যারকে নিয়ে আয়।

. . .

গুদাম ঘরের সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওরা সবাই। শুধু গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন দীপক পাল। গোটা কারখানা জুড়েই এ দিক ও দিক ছড়িয়ে রয়েছে মনুষ্য বসবাসের ছাপ। পড়ে রয়েছে পুজোর নানা উপকরণ এবং যজ্ঞভস্ম। কিন্তু মিতুল, লোকনাথ বা গেনুর চিহ্নমাত্র নেই। হতাশ কণ্ঠে ভাদুড়ি মশায় বলে উঠলেন, বলেছিলাম না, এত সহজ হবে না। লোকনাথ আমাদের বোকা বানিয়েছে। সাধনার জন্য যেটুকু দরকার ঠিক সেটুকু নিয়ে পালিয়েছে। নতুন আস্তানায় নির্বিঘ্নে সাধনা সম্পন্ন করবে কাল সূর্যগ্রহণের অন্তিম লগ্নে।

দীর্ঘশ্বাস যেন হাহাকার হয়ে বেরিয়ে এল বৃদ্ধের কণ্ঠ থেকে। নিজেকে শক্ত করে পরাজয়ের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে ঘুরে দাঁড়াল তিতাস। বলল, চিন্তা করবেন না স্যার। লোকনাথ পালাতে পারবে না। আমার বিশ্বাস, সেই বাচ্চা মেয়েটি আবার আসবে। সে আমাদের পৌঁছে দেবে লোকনাথ অবধি।

বেচারা তিতাস! সে জানে না, ওই বাচ্চা মেয়েটির আসার সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়েছে লোকনাথ। চরম কৌতুকে সে এখন দুলে দুলে হাসছে তার নতুন সাধনক্ষেত্রে বসে।

২১

ঘুম এক অদ্ভুত জিনিস। প্রচণ্ড রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মানুষের ঘুম পায়। আসলে মানুষ তো ঘুমায় না, ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে শরীরের কলকব্জাগুলো। তখন অজান্তেই বুজে আসে চোখের পাতা। মিতুলেরও তাই হয়েছিল। বসে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতে পারেনি। ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। চোখ মেলে মিতুল দেখল, বাইরে ভোরের আলো। ঘরের দরজাটা খোলা। সে দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল মিতুল। যত দূরে চোখ যায় থইথই করছে কাকচক্ষু জল। থেকে থেকে ভেসে আসছে ভেজা বাতাস। এক ঝলকের জন্য হলেও মনটা ভাল হয়ে গেল তার। সে বুঝতে পারল না কোথায় এনে ফেলা হয়েছে তাকে।

গত রাতে পিশাচটা যখন আচমকা এসে কাঁধে তুলে নিয়েছিল, ভয় পেয়েছিল মিতুল, কিন্তু জ্ঞান হারায়নি। শেষ কয়েকটা দিন তাকে অনেক শক্ত করে দিয়েছে ভিতর থেকে। আসলে ঠিক শক্ত না। মানুষ কখন ভয় পায়? যখন সে বোঝে বর্তমান পরিস্থিতি তার অনাগত ভবিষ্যৎকে তছনছ করে দিতে পারে, তখন। কিন্তু মিতুল তো এখন সবটাই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। সে বুঝে গেছে, এই ফাঁদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনও রাস্তা নেই। ওই লোকনাথ নামে লোকটা যদি তাকে ছাড়ে তবেই সে মুক্তি পাবে। তার আগে নয়। যদিও ওই লোকটার কথা অনুযায়ী আজই তার ছুটি কিন্তু যতক্ষণ না সে এখান থেকে বেরতে পাচ্ছে ততক্ষণ কিছুই বিশ্বাস নেই। তবে একটাই আশার কথা, এই ক' দিনে প্রথম দিনের মারধোরের পর লোকটা তাকে আর কোনও অত্যাচার করেনি। এক বার করে এসে শুধু ঘটি বাড়িয়ে দিয়েছে, মিতুলও দ্বিরুক্তি না করে দিয়ে দিয়েছে সে যা চায়। হয়তো মরতেই হবে, তার আগে কী লাভ শুধুশুধু মার খেয়ে? তবে কাল রাতে পিশাচটা যে কেন তড়িঘড়ি তাকে কাঁধে তুলে কারখানা থেকে সরিয়ে নিয়ে এল মিতুল বুঝতে পারেনি। অবশ্য বুঝেই বা সে কী করত! তাকে এই ঘরের ভিতর ফেলে রেখে পিশাচটা বেরিয়ে গেছিল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসেছিল কিছু জিনিসপত্র নিয়ে। মেয়েদের মতো রিনরিনে গলায় বলেছিল, এই সব কত্তার দরকারি জিনিস। হাত দিবা না। কেমন?

উত্তর দেয়নি মিতুল। শুধু এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসেছিল আর বসে থাকতে থাকতেই কখন যে ঘুম নেমেছে টের পায়নি। হঠাৎ খুব কাছেই যেন শালিক পাখি ডেকে উঠল। কিন্তু ডাক শুনে পাখিটা যে শালিকই কী করে বুঝল মিতুল? কারণ, বাবা। ছোটবেলা থেকেই এই খেলাটা বড্ড প্রিয় মিতুলের। যখন তখন সে বাবার গলা ধরে ঝুলে পড়ত আর বলত, ও বাবা, বাবা। শালিক পাখির ডাক ডাকো।

মিতুলের বাবা মোটেই হরবোলা নন। তিনি জীবনে একটি মাত্র পাখির ডাকই নকল করতে শিখেছেন আর তা হল শালিক পাখি। ছোটবেলায় তাঁর একটা পোষা শালিক ছিল। মিতুলের আবদারে তিনিও সুর করে ডেকে উঠতেন, ভ্রুচি পাপিয়া, ভ্রুচি পাপিয়া, ড্রড়.. ড্রড়.. ড্রড়.. ড্রড।

তাই শুনে হাততালি দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠত মিতুল। বাবার কথা মনে পড়ে খুব কান্না পেল মিতুলের। আর হয়তো বাড়ি ফেরা হবে না। বাবা মায়ের সাথে আর কোনও দিন দেখা হবে না। ওরা এখন কী করছে কে জানে! নিশ্চয়ই ওরাও মিতুলের কথা ভেবে কাঁদছে।

আবারও কাছেই কোথাও একটা শালিক ডেকে উঠল। কিন্তু কান্নার দমকে আর সে দিকে নজর দিতে পারল না মিতুল।

কাঁদছ কেন? বাপ মায়ের জন্য মন কেমন করছে বুঝি?

গলাটা পেয়েই চমকে তাকাল মিতুল। দেখল, দরজায় দাঁড়িয়ে লোকনাথ। সে হেসে বলল, কেঁদো না। বলেছি তো, আজ তোমার ছুটি। একটু পরেই গ্রহণ লাগবে। আমি সাধনায় বসব। সাধনা শেষ, গল্পও শেষ। নাও, মিতুলের দিকে একটা লাল পাড় সাদা শাড়ি ছুঁড়ে দিল সে, দেখতেই পাচ্ছ সামনে কত জল। যাও চান করে ওই নোংরা জামাকাপড়গুলো খুলে শাড়িটা পরে নাও।

চান, এই শব্দটাই যেন মিতুলকে আরাম দিল ভিতর থেকে। কত দিন হয়ে গেল স্নান করেনি সে। লোকনাথ বলল, আর হ্যাঁ, রক্ত আটকানোর জন্য পট্টি বাঁধার দরকার নেই বুঝেছ? ওটা খুলে রেখো।

চান করতে পারবে ভেবে যেটুকু স্বস্তি পেয়েছিল মিতুল, লোকটার এ কথায় আবার ফিরে এল ঘিনঘিনে ভাবটা। চরম বিপদের মধ্যেও মেয়েলি পরিচ্ছন্নতার অভ্যেস থেকে বেরতে পারেনি সে। ব্যাগটাকে কাছ ছাড়া করেনি কিছুতেই। ওর মধ্যেই তো ছিল স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেটটা। যত বার সে ন্যাপকিন বদলাত তত বার নিজের যৌবনকে ধিক্কার দিত। এই পিরিয়ডসটাই তো কাল। এর জন্যই তো লোকটা তাকে ধরে এনেছে।

তাড়া দিল লোকনাথ, আর বসে থেকো না। ওঠো। বেশি সময় নাই। চান করে পাড়েই শাড়িটা বদলে নেবে। ওখান থেকে গেনু তোমারে সোজা সাধনার জায়গায় নিয়ে আসবে।

চলে গেল লোকনাথ। লোকটার কথা খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করল যে সাধনা শেষ হলেই ছুটি পাবে কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতায় সে ভরসা পেল না। যে লোক কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে 'মা' সম্বোধনকে 'নটী মাগি'-তে নামিয়ে আনতে পারে তাকে আর যাই হোক বিশ্বাস করা যায় না। শাড়িটা বুকের কাছে জড়ো করে উঠে দাঁড়াল মিতুল। ঘর থেকে বেরতে যাবে আবার শালিক পাখির ডাক। থমকে গেল মিতুল। তার মনে হল, আওয়াজটা ঘরের মধ্যে থেকেই আসছে। আওয়াজটা খুব জোরাল নয়, কিন্তু স্পষ্ট। চারপাশে তাকিয়ে অবাক হল মিতুল। কোনও শালিক তো নেই! তা হলে? তবে কি সে ভুল শুনল?

তখনই আবার ডেকে উঠল শালিক। এ বার আর একটা নয়। বেশ কয়েকটা একসঙ্গে। শব্দের উৎস অনুসরণ করে মিতুলের চোখ আটকে গেল ঘরের এক কোণায়। সেখানে কিছু খড় গাদা করে রাখা আর তার ওপরেই রয়েছে কিছু পুজোর উপকরণ, জবার মালা, একটা কাঠের বাক্স আর কয়েকটা মাটির জালা। মনে হচ্ছে যেন ওই জালাগুলোর ভিতর থেকেই আওয়াজটা আসছে! কাল রাতে পিশাচটা ওখানেই জিনিসপত্রগুলো রেখে মিতুলকে হাত দিতে বারণ করে গিয়েছিল। অন্ধকার ছিল বলে পিশাচটা কী রেখে গেছে মিতুল তখন দেখতে পায়নি।

অদ্ভুত মানবচরিত্র। নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি আকর্ষণ তার চিরকালীন। তাই পিশাচের সাবধানবাণী মাথায় থাকা সত্ত্বেও মিতুল কিছুতেই কৌতূহল দমন করতে পারল না। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল জালাগুলোর কাছে। এক বার দরজার দিকে তাকিয়েই সে দ্রুত হাতে খুলে ফেলল একটা জালার মুখ। কিন্তু না, এ জালায় তো তেল রয়েছে। পরের জালাটার ঢাকনা খুলল সে। হতাশ হল। এটার মধ্যে কালো সর্ষে। আবার ডেকে উঠল শালিক। এ বার আর জালা চিনতে ভুল হল না মিতুলের। সে বুঝতে পারল লোকটা এই জালাগুলোর মধ্যেই পাখি ধরে রেখেছে। একটা না, অন্তত গোটা দু'-তিনেক পাখি তো আছেই। জালাগুলোর মধ্যে থেকে এক ধরনের স্পন্দন অনুভব করছে সে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল মিতুলের। আচমকাই পাখিগুলোর জন্য যে বিবশ হয়ে পড়ল। নিজের সাথে বড় মিল খুঁজে পেল পাখিগুলোর। সেও বন্দী, এই পাখিগুলোও বন্দী। তাকে হয়তো কেউ উদ্ধার করতে আসবে না, হয়তো সে মুক্তি পাবে না কিন্তু চাইলেই তো সে এই পাখিগুলিকে মুক্তি দিতে পারে। দ্রুত হাতে জালার ঢাকনা খুলতে গেল মিতুল আর তখনই তীব্র পচা গন্ধটা পেল। যে মুহূর্তে সে ছিটকে দরজার সামনে এল সেই মুহূর্তেই দরজায় এসে দাঁড়াল কদাকার পিশাচটি। রিনরিনে গলায় বলল, এখনও চানে যাও নাই? এবার কিন্তু কত্তায় কুপিত হবেন। যাও যাও।

নিরাশ দৃষ্টিতে জালাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিতুল বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মুক্তি দেব বললেই দেওয়া যায় না। মুক্তি বড় সহজ জিনিস নয়। শুধু একটা ব্যাপার কেউ খেয়াল করল না, মিতুলের হাতের টানে একটি জালা সামান্য কাত হয়ে গেছে। একটুখানি সরে গেছে মুখ ঢাকা দেওয়ার সরাটা।

স্নান হয়ে গেছে মিতুলের। ভেজা চুল ছড়িয়ে আছে পিঠের ওপর। ক্লান্তিতে, দুঃশ্চিন্তায় চোখ দু'টো একটু কোটরাগত হয়েছে বটে কিন্তু তাতে মালিন্য আসেনি এতটুকু। মুখখানা টলটল করছে সদ্য ফোটা শিউলি ফুলের মতো। লাল পাড় সাদা শাড়িতে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে তাকে। গেনুর যদি প্রেমিকের চোখ থাকত, তা হলে হয়তো সেও বাহবা দিত এই চিন্ময়ীকে। গেনুর সাথে হেঁটে আসছিল মিতুল। যে দিকে তাকাও সে দিকেই জল। শুধু এক দিকে অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে রাস্তার সীমানা। মিতুল বুঝতে পারল, এটা কোনও ভেড়ি এলাকা। দেখতে পেল, দূরে একটা গাছের তলায় লোকনাথ দাঁড়িয়ে আছে। নানা কিছু ছড়ানো ছেটানো আছে গাছের তলায়। এত দূর থেকে সে সব কী বুঝতে পারল না মিতুল। তবে হঠাৎ দেখতে পেল আগুন জ্বলছে। দিনের আলোয় এত দূর থেকে আগুনের শিখা অমন স্পষ্ট হল কী করে! তখনই মিতুল খেয়াল করল, দিনের আলো মরে আসছে। তার দখল নিচ্ছে অকাল আঁধার। পাখিরা ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে ত্রস্ত হয়ে। গ্রহণ লেগেছে সূর্যে। হঠাৎ যেন পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠল। কয়েক মূহর্ত সময় লাগল ধাতস্থ হতে, তার পরেই মিতুল বুঝতে পারল মৃদু এক কম্পন জেগেছে পৃথিবীর বুকে। ভূমিকম্প হচ্ছে। আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল লোকনাথ। গলা ছেড়ে বলে উঠল, গেনু রে, একে গ্রহণ তায় ভূমিকম্প। সব লক্ষণ মিলে যাচ্ছে। আজ তো আমারই দিন। সিদ্ধি হবে, সিদ্ধি। আমার কত বছরের পরিশ্রম আজ সফল হবে। অবশেষে আমি কথা রাখতে পারব। আয় আয়, পা চালিয়ে আয় তোরা। আর দেরি করিস না।

ওই কয়েক মুহূর্তই। তার পরেই থেমে গেল কম্পন। পিশাচটির সাথে সাথে দ্রুত এগোল মিতুলও। কিন্তু গাছতলার কাছাকাছি যেতেই ভয়ে শিউরে উঠল সে। কাঠকুটো দিয়ে একটা যজ্ঞবেদী বানানো হয়েছে। তার পাশে ছড়িয়ে আছে সাধনার নানা উপকরণ। কিন্তু যজ্ঞবেদীর পাশে ওটা কী শোয়ানো? কীসের ওপর এক পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে লোকনাথ? কী ওটা? দু'হাতে মুখ ঢেকে আর্তনাদ করে উঠল মিতুল। তার দিকেই মুখ ফিরিয়ে রয়েছে একটি সদ্যোজাত শিশুর শব। চোখ, নাক, ঠোঁট এখনও কিছুই স্পষ্ট হয়নি, তার আগেই মৃত্যু এসেছে অতর্কিতে। হয়তো মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত সে অনুভব করতে পেরেছিল তার কাছে নতুন এই পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ। তার পরেই তাকে ফিরে যেতে হয়েছে অন্য এক অন্ধকারে। মাতৃজঠরের মতো এ অন্ধকারে মঙ্গলময় আশ্বাসবাণী নেই, রয়েছে কেবল শীতল নৈরাশ্য।

লোকনাথ বলে উঠল, ভয় পেলে না কি মা? কী করব বলো? বাচ্চাকাচ্চা নিয়েই তো কারবার তাই এ সাধনায় শেষ দিন একটা কচি বাচ্চার মড়া লাগে। না না আমি মারিনি। খামোখা মারতে যাব কেন? এ দেশে এত এত মানুষ। পোকামাকড়ের মতো জন্মায় আবার পোকামাকড়ের মতো মরে। এ দেশে একটা মরা বাচ্চা জোগাড় করা খুব কি কঠিন বলো তো? তবে বাচ্চার মড়ার ওপর বসা খুব ঝকমারি। যুৎ করে বসা যায় না। আর এই গেঁড়াটার ওপর বেশি চাপ দিলে তো প্যাটা গেলে যাবে। তাই একখান হাঁটু তুলে বসব আর কী!

খল খল করে হাসতে লাগল লোকনাথ। মিতুলের মনে হল, হয়তো পিশাচটির মধ্যেও এই লোকটির চেয়ে বেশি মনুষ্যত্ব আছে। অসহায় হয়ে যজ্ঞবেদীর এক পাশে বসে পড়ল সে। এক বার মিতুলের দিকে তাকিয়ে মৃত শিশুটির গায়ে হাঁটু চাপিয়ে বসে পড়ল লোকনাথ। দু'হাতের এক বিশেষ মুদ্রা করে চোখ বুজল। পিশাচটি দাঁড়িয়ে রইল অনুগত পোষ্যের মতো।

বিড়বিড় করে মন্ত্র আওড়াতে শুরু করল লোকনাথ আর থেকে থেকে কীসের যেন শুকনো গুঁড়ো ছিটিয়ে দিতে লাগল আগুনে। বিশ্রি কটু গন্ধে ভরে গেল চারপাশ। মিতুল চোখ তুলে দেখল, ধীরে ধীরে সূর্যের শেষ বলয়টুকুও মুছে গেল আকাশের বুক থেকে। ঘনাল গাঢ় কৃষ্ণরঙ। পূর্ণগ্রাস। অজানা এক আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠল মিতুল আর তখনই চোখ খুলল লোকনাথ। টকটকে লাল দুই চোখ। গম্ভীর গলায় বলে উঠল, আমার বাক্স থেকে হাড়ের কাঁকই নিয়ে আয় গেনু। মেয়ের খোপা বেঁধে দে। গলায় মালা পরা। সব নিজে হাতে করবি হতভাগা।

আজ্ঞে কত্তা, থপথপ করে সেই ঘরের দিকে এগিয়ে গেল পিশাচটি যেখানে মিতুল এতক্ষণ ছিল।

ভয়টা ফিরে আসছিল। আবার ভয় পাচ্ছিল মিতুল। কী করতে চাইছে লোকটা? কেন ওই কদাকার পিশাচ তার চুল বেঁধে দেবে? কেন তার গলায় মালা পরাবে? এ কাজগুলি তো লোকটা নিজেও করতে পারত। তা হলে ওই 'সব নিজে করবি হতভাগা' কথাটার মানে কী? তার এই প্রসাধনের সঙ্গে কি পিশাচটির কোনও সম্পর্ক আছে? কাঁপা গলায় সে বলে উঠল, এ সব করতে বলছেন কেন? কী করবেন আমায় নিয়ে?

লোকনাথ উত্তর দিতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই ঝড়ের মতো এসে উপস্থিত হল পিশাচটি। হাতে তার কাঁকই এবং জবা ফুলের মালা কিন্তু উত্তেজনায় সে থরথর করে কাঁপছে। তার অবস্থা দেখে চমকে উঠল লোকনাথ। সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই পিশাচটি কাতরে উঠল, সব্বোনাশ হয়েছে কত্তা। একটা পাখি উড়ে গেছে।

ছিটকে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল লোকনাথ। শবের গায়ে পা ঠেকিয়ে রাখল। কিন্তু এই প্রশমিত উত্তেজনা ক্রোধ হয়ে ফুটে বেরল তার সর্বাঙ্গ দিয়ে। যজ্ঞের একটা জ্বলন্ত কাঠ তুলে সে ছুঁড়ে মারল গেনুর দিকে। হুঙ্কার দিয়ে উঠল, কী করে উড়ে যায়? তোরে সাবধানে রাখতে বলেছিলাম তো।

ভয়ে কাঁপছে পিশাচটি, সে হাত জোড় করে বলল, রেখেছিলাম কত্তা। মুখ চাপা দিয়ে খড়ের ওপর চাপায়ে রেখেছিলাম। আমার দোষ নাই। ভূমিকম্পে একটা জালা উল্টে গেছে কোনও ভাবে। আপনি পাখিটারে ধরেন কত্তা, নয়তো সে আবার ওই বুড়োটারে পথ দেখায়ে নিয়ে আসবে।

চুপ গুয়োর ব্যাটা, ফের একটা জ্বলন্ত কাঠ ছুঁড়ে মারল লোকনাথ, তুই আমায় বলে দিবি আমি কী করব? এখন আমি আসন ছেড়ে উঠে পাখি ধরতে যাব? সাধনাটা মাটি করে দেব? জানিস না একবার আসনে বসলে সাধনা শেষ না হওয়া অবধি ওঠা যায় না? ও পাখিরে এখন আর ধরা যাবে না। ওদের আসতে সময় লাগবে। তার মধ্যে আমারে যা করার করে ফেলতে হবে। ভোদার মতো মুখ না বানিয়ে কাজে লেগে পড়। খোঁপা বাঁধ। আরে বাঁধ না হারামজাদা।

ভয়ে ভয়ে গেনু হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল মিতুলের পেছনে। কাঁকই দিয়ে আঁচড়ে দিতে শুরু করল তার ভেজা চুল। চোখ বন্ধ করে ফেলল মিতুল। প্রাণপণে চেষ্টা করল কোনও ভাল দৃশ্যের কথা ভাবতে। একটা পাহাড়, একটা নদী, অন্ততপক্ষে সুন্দর একটা ফুল! একটি পিশাচ তার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। তার কাঁধে, গালে এসে পড়ছে পিশাচের দুর্গন্ধময় শ্বাসরোধকারী নিঃশ্বাস! এমন অবিশ্বাস্য ভয়ঙ্কর একটা ঘটনা যে তার সাথে ঘটছে মিতুল যেন বিশ্বাস করতে চাইছিল না। অসহ্য এই বাস্তব থেকে পালিয়ে যেতে চাইছিল অনেক দূরে, যতটা দূরে গেলে একে দুঃস্বপ্ন বলে মনে হয়। কিন্তু মিতুল পারল না। তার মাথার মধ্যে ঘনিয়ে উঠল অন্য একটা চিন্তা, সে বুঝতে পারল না, পাখি উড়ে গেছে বলে এত রেগে গেল কেন লোকটা?

. . .

নজর রাখবার জন্য মোবাইল ফোনের টাওয়ার খুব ভাল জায়গা। এতটা উঁচুতে বসলে অনেকটা দূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। ডাকবাংলো মোড়ের কাছাকাছি এমনই একটি মোবাইল ফোনের টাওয়ারের শীর্ষে বসেছিল পেচকটি। একই দিনে দু'বার রাত্রি সচরাচর আসে না। আজ দিনটি শিকারের জন্য প্রশস্ত। সে অপেক্ষা করছিল কখন একটি শিকার তার আওতার মধ্যে আসবে এবং ঘাতক নখে তাকে বিঁধে ফেলবে সে। ফিরে যাবে বাসায়। বুভুক্ষু সন্তানেরা তার পথ চেয়ে বসে আছে। আচমকা সে দেখতে পেল, বেশ কিছুটা নীচ দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো উড়ে আসছে একটি বাচ্চা শালিক পাখি। যেন তার বড্ড তাড়া। যেন এক্ষুনি গন্তব্যে পৌঁছতে না পারলে ভারী বিপদ হয়ে যাবে। মনে মনে হাসল পক্ষীচূড়ামণি, আজ আর গন্তব্যে পৌঁছনো হল না শালিক শিশুটির। দুই ডানা প্রসারিত করে দিল সে। অন্ধকারে ঝিকিয়ে উঠল তার স্ফটিকস্বচ্ছ দুই চোখ। মাথাটা সে একবার ঘুরিয়ে বৃত্তাকারে। তার পর আকাশে একটি পাক খেয়ে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর মতো নেমে আসতে লাগল নীচের দিকে।

২২

লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলির মতো শালিক পাখিটা আছড়ে পড়ল পল্লবের গাড়ির জানলায় তার পর খসে পড়ল মাটিতে। হতাশায় দিগ্বিদিক মুখরিত করে ডেকে উঠল একটা ধূসর পেঁচা আর উড়ে গিয়ে বসল উঁচু একটি গাছের ডালে।

ওরা ছড়িয়েছিটিয়ে বসেছিল বারাসাত থানার বাইরেই। নিরাশা গ্রাস করেছিল সবাইকেই। শুধু তিতাস প্রাণপণে বিশ্বাস করে যাচ্ছিল সেই মেয়েটি আসবে। তিতাস বিশ্বাস করছিল সেই প্রবাদটায়, মর্নিং শোজ দ্য ডে। প্রথম অসম্ভবকে সম্ভব করে সে তো মিতুলের কাছ পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল। এই গোটা লড়াইকে যদি একটা দিন হিসেবে কল্পনা করা হয় তা হলে দিনের শুরুটা তো যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। তা হলে কেন দিনের শেষে প্রত্যাশা পূরণ হবে না?

কেউই কারও সাথে কোনও কথা বলছিল না। শুধু দীপক পাল মাঝে মাঝেই ছুটে আসছিলেন ভাদুড়ি মশায়ের কাছে আর ঘড়ি দেখিয়ে জিগ্যেস করছিলেন, স্যার গ্রহণ আরও ঘণ্টা দুয়েক চলবে বলুন? দু'ঘণ্টা মানে তো অনেকটাই সময়। তার মধ্যে কোনও একটা ব্যবস্থা হবে না?

উত্তর দিতে পারছিলেন না ভাদুড়ি মশায়। শুধু শেষ বার প্রশ্নের সময় দীপক পালের হাত ধরে বলেছিলেন, এসো, আমার কাছে এসে বোসো।

বাইরের বড় বেঞ্চটায় ভাদুড়ি মশায়ের পাশে বসে পড়েছিলেন দীপক পাল। দু'হাতে মুখ ঢেকে নীরবে কাঁদছিলেন আর তাঁর পিঠে স্নেহশীল পিতার মতো আদরহাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন বৃদ্ধ। অস্ফুটে বলছিলেন, নিয়তি কেন বধ্যতে! তবু একটাই সান্ত্বনা, নিয়তির সাথে এই অসম লড়াইয়ে তুমি পালিয়ে আসোনি। লড়াই করেছ। কেঁদো না দীপক। কন্যাকে নিয়ে সুখস্মৃতি রোমন্থন করো। তোমার অন্তরের পরিপূর্ণতা স্পর্শ করুক তোমার কন্যাকেও। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করো, তার শেষ মুহূর্তটি যেন...

কথা শেষ করতে পারলেন না বৃদ্ধ, তার আগেই জলে ভরা দুই চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকালেন দীপক পাল। সে দৃষ্টির একটাই অর্থ হয়, মিথ্যে স্তোক দেবেন না দয়া করে। থমকালেন ভাদুড়ি মশায়। তিনিও জানেন, যতই প্রার্থনা করুন মিতুলের শেষ মুহূর্তটি কিছুতেই আনন্দময় হতে পারে না।

ঠিক এই সময় শালিক পাখিটি আছড়ে পড়ল পল্লবের গাড়ির কাচে। ঘটনাটা সবার আগে লক্ষ্য করেছিল পল্লব। সে চেঁচিয়ে উঠল, যাহ! পাখিটা বোধহয় গেল।

পল্লবের দৃষ্টি অনুসরণ করে তিতাস ছুটে গেল গাড়ির কাছে আর দেখল, মাটিতে পড়ে ছটফট করছে একটা শালিক পাখি। পাখিটা প্রাণপণে চেষ্টা করছে উঠে দাঁড়াতে কিন্তু কিছুতেই পারছে না। বারে বারে মুখ থুবড়ে পড়ছে মাটিতে। মনটা ভারী খারাপ হয়ে গেল তিতাসের। দু'হাতের পাতায় পাখিটাকে মাটি থেকে তুলে নিতে গিয়ে সে বুঝতে পারল, পাখিটার একটা ডানা ভেঙে গেছে। পাখিটাকে বুকের কাছে নিয়ে ফিরে আসতে আসতে বলল, অমিয়, একটু তুলো পাওয়া যাবে রে? খুব চোট পেয়েছে পাখিটা।

তুলো ভিজিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে পাখিটাকে জল খাওয়াচ্ছিল তিতাস। এতক্ষণে যেন সামান্য ধাতস্থ হয়েছে পাখিটা। আচমকা সে এমন একটা কাণ্ড করল, সবাই থতোমতো খেয়ে গেল। তিতাসের কোল থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল সে আর ভাঙা ডানায় শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে গোঁত্তা খেতে খেতে একেবারে সঞ্জয়ের গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল।

এ কী! এ কী! বলে একটু সরেই বসেছিল সঞ্জয় কিন্তু তার পরেই অবাক হয়ে দেখল, পাখিটা ছোট্ট ঠোঁট দিয়ে তার প্যান্টের একটা কোণা ধরে টানছে। সেই টান স্বাভাবিক নয়। তার মধ্যে যেন একটা কাতরতা রয়েছে। রয়েছে এক ব্যাকুল আহ্বান। সবাই অবাক হয়ে পাখিটাকে দেখছিল। অমিয় বলল, পাখিটার মধ্যে কেমন একটা ছটফটানি কাজ করছে দেখেছিস তিতাস? যেন কিছু একটা বলতে চাইছে তাই না?

কিছু কিছু মানুষের আক্কেল দাঁত ওঠে নব্বই বছর বয়েসে। পল্লবও সেই জাতের মানুষ। স্থান কাল বিবেচনা না করেই বেফাঁস বলে ফেলল, লাভ নেই। কত মেয়ে এমন টানাটানি করে সঞ্জয়কে ওর জায়গা থেকে নড়াতে পারেনি, সেখানে এ তো একটা শালিক পাখি।

তিতাস জানে, পল্লবকে বলে কোনও লাভ নেই। পল্লবের কিডনিতে এক বার টিউমার হয়ে সেটা ফেটে গেছিল। মরমর অবস্থা। তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ট্রলির ওপর আচ্ছন্নের মতো শুয়েছিল পল্লব। এক জন নার্স তার পাশে স্যালাইনের বোতল ধরে ধরে হাঁটছিলেন। সঙ্গে তিতাস, সঞ্জয়রাও ছিল। হঠাৎ তিতাস দেখেছিল, সেই আচ্ছন্ন অবস্থাতেও নার্সের দিকে তাকিয়ে পল্লব মিটিমিটি হাসছে। সুস্থ হয়ে ফেরার পর সে পল্লবকে জিজ্ঞেস করেছিল, অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে তুই হাসছিলি কেন? যা বলেছিল, শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিল তিতাস। ফিক করে হেসে পল্লব বলেছিল, আরে ওই নার্স দিদিটার কত বড় গোঁফ। চাইলে তা দেওয়া যাবে। তুই খেয়াল করিসনি?

রেগে উঠে তিতাস বলেছিল, প্রথমত, তখন তুই মরে যাচ্ছিলি। এ সব দেখার মতো আমার মানসিক অবস্থা ছিল না। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের কথা যেন আর না কোনও দিন না শুনি। এ কী ধরনের অসভ্যতা!

এমন অনেক ভর্ৎসনা তিতাস করেছে পল্লবকে। লাভ হবে না জেনেও করেছে। আজও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই ধমকে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়, চুপ করো। এটা ইয়ার্কির সময় নয়।

বেচারা ভাদুড়ি মশায়! উনি তো আর পল্লবকে তেমন ভাল করে চেনেন না। যদি চিনতেন, এ কথাটা বলার জন্য ভারী লজ্জা পেতেন। তবে পল্লব কিন্তু বেশ চুপসে গেল বৃদ্ধের ধমক খেয়ে। বেঞ্চ থেকে উঠে ক্রাচ ঠুকে ভাদুড়ি মশায় এগিয়ে এলেন সঞ্জয়ের দিকে। তীক্ষ্ন চোখে তাকিয়ে রইলেন পাখিটার দিকে। পাখিটার কাণ্ড দেখে পল্লব তো হকচকিয়ে গেছিলই। এ বার বৃদ্ধের কাণ্ড দেখে আরও চমকে গেল। বৃদ্ধ বললেন, তিতাস, পাখিটাকে তুলে ধরো তো আমার চোখের কাছে।

বিনা বাক্যব্যয়ে পাখিটাকে দু'হাতে তুলে নিল তিতাস। এক দৃষ্টে তিতাসের করতলে তিরতির করে কাঁপতে থাকা পাখিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়ি মশায়। ততক্ষণে সবাই ঘিরে ধরেছে বৃদ্ধকে। কিন্তু একটা সাধারণ পাখির মধ্যে বৃদ্ধ এত মন দিয়ে কী দেখছেন কেউই বুঝতে পারছে না আর প্রশ্ন করার সাহসও পাচ্ছে না। অস্বস্তিকর নীরবতা, শুধু বিনবিনে এক আশঙ্কা যেন মনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে নাছোড়বান্দা মশার মতো।

গলা ঝাড়লেন ভাদুড়ি মশায়। চোখ তুলে বললেন, ঠিক বলেছ অমিয়। পাখিটা কিছু বলতে চায় কিন্তু ওকে মেরে ফেলতে হবে।

বৃদ্ধের এই অদ্ভুত কথায় স্তম্ভিত হয়ে গেল ওরা সকলে। তিতাস আঁতকে উঠল, কী বলছেন স্যার? মেরে ফেলতে হবে মানে?

পাখিটার দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ বললেন, আমি অনুভব করছি, এ কোনও সাধারণ পাখি নয়। পাখির স্থূল শরীরে বন্দী হয়ে আছে কোনও আত্মা যে আমাদের কিছু বলতে চাইছে।

মিতুলের খোঁজ দিতে চাইছে কি? চমকে উঠে বলল তিতাস।

হতে পারে। হতেই পারে। এ হয়তো সেই মেয়েটিই, তুমি যার প্রত্যাশা করছিলে।

উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওদের চোখ। ভাদুড়ি মশাই বললেন, কিন্তু এ অবস্থায় ও তো কিছুই বলতে পারবে না। যদি পথ দেখাতেও চায়, ভাঙা ডানা নিয়ে সেও অসম্ভব। তাই ওকে মুক্তি দিতে হবে এই স্থূল শরীর থেকে। ক্ষতিকারক পোকামাকড় ছাড়া আমি আজ অবধি কিছু মারিনি। এ কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। তোমাদের মধ্যেই কাউকে এর দায়িত্ব নিতে হবে।

ওরা যে সকলেই মিতুলকে বাঁচাতে চায় এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই কিন্তু পাখিটাকে মারার কথায় অদ্ভুত এক দ্বিধা এসে ঘিরে ধরল ওদের। হয়তো যা করতে বলা হচ্ছে তা মঙ্গলের জন্যই তবু সজ্ঞানে, সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে একটা ডানা ভাঙা শালিক পাখিকে মেরে ফেলাটা খুব সহজ কাজ বলে মনে হল না এই পাঁচটি মানব সন্তানের। আচমকা গা ঝাড়া দিয়ে এগিয়ে এলেন দীপক পাল। হাত বাড়িয়ে তিতাসকে বললেন, আমাকে দিন।

এই বোধ হয় ঠিক হল। নিজের কন্যাকে বাঁচানোর জন্য অন্য কাউকে প্রাণী হত্যার পাপ থেকে মুক্তি দিলেন দীপক পাল। ছোট্ট নরম তুলতুলে একটা শরীর। বুকের পালকে লেগে আছে জীবনের ওম। ইতিমধ্যেই একটি ডানা ভেঙে সে যন্ত্রণাকাতর। দু'আঙুলে শক্ত করে গলার কাছটা চেপে ধরলেই প্রাণবায়ু বেরিয়ে যেতে কয়েক সেকেন্ডের বেশি লাগার কথা নয়। তবু মিনিটের পর মিনিট কাটিয়ে দিচ্ছিলেন দীপক পাল। প্রাণপণে চেষ্টা করছিলেন পাখিটার গলা টিপে ধরতে কিন্তু পারছিলেন না। থরথর করে কাঁপছিল তাঁর সমস্ত শরীর। অসহায় দু'টি চোখ যেন ফেটে পড়ছিল যন্ত্রণায়। বাকিরা দমবন্ধ করে তাকিয়ে তাঁর দিকে। কিন্তু পারলেন না দীপক পাল। কেঁদে ফেললেন। হাহাকার করে বলে উঠলেন, যতই যাই হোক। এ তো খুন স্যার। আমি পারব না খুন করতে। তাতে আমার মিতুলের আরও ক্ষতি হবে। ও আরও কষ্ট পাবে।

বেঞ্চের ওপর পাখিটাকে নামিয়ে রেখে ছুটে চলে গেলেন কিছুটা দূরে। তার পর ভেঙে পড়লেন কান্নায়। তাঁর অবরুদ্ধ কণ্ঠ থেকে একটাই কথা বেরিয়ে আসতে লাগল বারে বারে, মিতুল! মিতুল!

অসহায় পিতাকে কী ভাষায় সান্ত্বনা দিতে হয় তা ওদের কারোরই জানা নেই। তবু ওরা ঘিরে ধরল দীপক পালকে। হতাশ হয়ে এক বার পাখিটার দিকে তাকিয়ে ভাদুড়ি মশায়ও এগিয়ে গেলেন ওদের দিকে। এক মুহূর্তের জন্য অরক্ষিত হয়ে পড়ল পাখিটি। আর ওই এক মুহূর্তেই দূরবর্তী গাছের ডাল থেকে ধেয়ে এল একটি ধূসর বিদ্যুৎ এবং তীক্ষ্ন নখে শালিক শিশুটিকে বিঁধিয়ে উড়ে গেল দূরে।

. . .

সঞ্জয় বলল, সামনে থেকে বাঁ দিকে। মধ্যমগ্রাম চৌমাথার সিগন্যাল ভেঙে পুলিশের জিপটা ঢুকে পড়ল বাদু রোডে। গাড়িটা রয়েছে ফোর্থ গিয়ারে। হর্ন থেকে হাত সরাচ্ছেন না দীপক পাল। গিয়ারও নামাচ্ছেন না। ভৈরব গতিতে ছুটে আসা জিপটা দেখে ভয়ে পথ ছেড়ে দিচ্ছে অন্য গাড়িগুলো। রাস্তার ধারে নেমে যেতে যেতে কেউ কেউ গালাগালও দিয়ে উঠছে জিপটাকে। কিন্তু তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই দীপক পালের। তিনি একবগগার মতো চালাচ্ছেন। কারণ মিতুলকে বাঁচানোর জন্য হাতে আর মাত্র আধ ঘণ্টা সময় আছে। আধ ঘণ্টা পরেই ছেড়ে যাবে গ্রহণ। তাঁকে টানা রাস্তার নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে সঞ্জয়। আসলে সঞ্জয় বলছে না, সঞ্জয়ের মাথার মধ্যে বসে রাস্তা বলে দিচ্ছে একটা সাত আট বছরের মিষ্টিমতো ছেলে। যাকে সঞ্জয় প্রথম দেখেছিল, বারাসাত স্টেডিয়ামে। এতক্ষণে ছেলেটি আর মেয়েটির যোগসূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছে সে।

২৩

দাউদাউ করে জ্বলছিল যজ্ঞের আগুন আর সে দিকে তাকিয়ে জড়ভরতের মতো বসেছিল মিতুল। এতক্ষণে সে বুঝতে পেরে গেছে, এই লোকনাথ বলে লোকটা তাকে মিথ্যে বলেছিল। না, হয়তো মিথ্যে বলেনি, কিন্তু তার বলার মধ্যে যে ব্যঞ্জনা ছিল তাকে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছিল মিতুল। লোকটা বলেছিল, আজ মিতুলের ছুটি। কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় মিতুল বুঝতে পেরেছে, এ ছুটি সে ছুটি নয়। তাকে নিয়ে অন্য কোনও পরিকল্পনা আছে লোকটার আর সেটা এই ভয়াবহ পিশাচটার সাথে জড়িত। নয়তো এতক্ষণ ধরে পিশাচটা কেন তার পাশে বসে হাত ধরে থাকবে!

চুল আঁচড়ে, খোঁপা বেঁধে তার গলায় একটা জবার মালা পরিয়ে দিয়েছিল পিশাচটা। তার পরই লোকনাথ তাকে কাছে ডেকে নিচু গলায় কী যেন বলেছিল। জবার মালা পরিয়ে দিয়েছিল গলায়। খুব আনন্দিত হয়ে পিশাচটা থপথপ করতে করতে এসে এসে বসে পড়েছিল মিতুলের ঠিক পাশে। রিনরিনে গলায় বলেছিল, হাতখান দাও খুকি।

সম্মতির অপেক্ষা না করে তার ভয়ালদর্শন তিন আঙুলওয়ালা খসখসে হাতের মধ্যে তুলে নিয়েছিল মিতুলের ছোট্ট করতল। সেই থেকে এক বারের জন্যেও মিতুলের হাত ছাড়েনি পিশাচটা। মাঝেমাঝেই সে মিতুলের দিকে তাকিয়ে ফোকলা মুখে মুচকি হেসে উঠছে আর কালো বাঁকানো নখ দিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে মিতুলের হাতের পাতায়। আর পারছে না মিতুল। সে প্রাণপণে চেতনা হারাতে চাইছে। একমাত্র চেতনা হারালেই হয়তো এই অদ্ভুত গা ঘিনঘিনে ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া যেত, কিন্তু ওই যে, মুক্তি অত সোজা ব্যাপার নয়। জ্ঞান হারাচ্ছে না মিতুল তবে সে বুঝতে পারছে সময়ের সাথে সাথে নিষ্ঠুর এক জড়তা গ্রাস করছে তাকে। চাইলেও সে আর হাত পা নাড়াতে পারছে না। যেন একটা অদৃশ্য বাঁধন পাকে পাকে জড়িয়ে ফেলছে তাকে কিলবিলে সরীসৃপের মতো।

সামনেই মৃত শিশুটির গায়ে হাঁটু তুলে দিয়ে এক মনে মন্ত্র পড়ে চলেছে লোকনাথ আর মাঝে মাঝেই ঘটি থেকে গাঢ় কালচে লাল তরল ঢেলে দিচ্ছে শবের মুখে। শবের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে সেই ঈষৎ আঠালো পদার্থটি। মিতুল জানে সেটা কী! সে ভাবছে, এই ঘেন্নার দৃশ্য দেখার চেয়ে মরে যাওয়াও ভাল ছিল কিন্তু মুহূর্তেই হাতের পাতায় পিশাচের নখের স্পর্শ পেয়ে বুঝতে পারছে, জীবন বা মৃত্যু কোনওটাই আর তার হাতে নেই। সে ওই লোকনাথ নামের লোকটার পুতুল মাত্র। সে যেমন নাচাবে তেমনই নাচতে হবে মিতুলকে।

আচমকা মন্ত্রপাঠ বন্ধ করে দিল লোকনাথ। দপ করে খুলে ফেলল বন্ধ দুই চোখ। শিউরে উঠল মিতুল। পৃথিবীর যাবতীয় হিংসা যেন এসে পুঞ্জীভূত হয়েছে ওই দুই চোখের মণিতে। ভেড়ির জোলো হাওয়ায় আগুনের লাল আভা মদ্যপ নর্তকীর মতো ছন্দভ্রষ্ট হচ্ছে লোকনাথের শরীর জুড়ে। মূর্তিমান শয়তানের মতো দেখাচ্ছে তাকে। উঠে দাঁড়াল সে। চিমটে দিয়ে ঘটিটা বাড়িয়ে ধরল আগুনের ওপর। এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল সেই দিকে। ক্রমে ধোঁয়া বেরতে আরম্ভ করল ঘটির মুখ থেকে। ঘটির ভিতর টগবগ করে ফুটতে লাগল মিতুলের রক্তধৌত অনিষিক্ত ডিম্বাণুরা। লোহিততপ্ত হয়ে উঠল পেতলের ঘটিটা। উজ্জ্বল লাল আভা বিকিরণ করতে শুরু করল পেতলের স্বাভাবিক সোনাটে রং। ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল লোকনাথের ঠোঁটের কোণে। নরম গলায় সে বলল, গেনু, গলার মালাটা এ বার মেয়ের সাথে বদলাবদলি কর।

জড়তা শরীরকে গ্রাস করলেও চেতনাকে গ্রাস করতে পারেনি। অন্তর থেকে কেঁপে উঠল মিতুল, মালা বদলের তো একটাই অর্থ হয়।

কিছুই করতে হল না মিতুলকে। পিশাচটি নিজেই মালা দু'টো বদলাবদলি করে নিল।

লোকনাথের মধ্যে একটা অস্থির উত্তেজনা। সে বলল, বাহ! একটা কাজ হয়ে গেল। ছেলের বিয়ে দিয়ে দিলাম। কাছে আয় গেনু। কাছে আয়।

প্রভুর ডাকে উঠে পড়ল অনুগত পিশাচটি। থপথপ করে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল প্রভুর সামনে। ঘটিটাকে সেই আগুনের মধ্যে ধরে রেখেই লোকনাথ বলল, সাধনার ঠিক শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি। এই বার আমি আমার সমস্ত শক্তি তোর মধ্যে সমর্পণ করে ক্ষীণশক্তি হয়ে যাব। তুই আমার ছেলে। তোর মধ্যে দিয়েই আমার শক্তি জন্ম দেবে ভবিষ্যতের। শুধু তার আসার অপেক্ষা। সে এলেই আবার আমি ফিরে পাব আমার শক্তি আর তখন আমি, তুই আর সে মিলে হয়ে উঠব ভগবানের সমান। বাকি কাজটা কিন্তু তোকেই করতে হবে গেনু। মনে আছে তো যা বলেছি? পারবি তো?

আবেগে যেন গলা বুজে এল পিশাচটির। প্রভু তার ওপর এত বড় কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। সে ধন্য। অস্ফুটে বলে উঠল, পারব কত্তা। পারব।

গর্জন করে উঠল লোকনাথ, পারতে তোকে হবেই, আর তার পরেই বাঁ হাত সোজা করে আকাশের দিকে তুলে দিল সে। তর্জনী, অনামিকা আর কনিষ্ঠা দিয়ে তৈরি করল বিচিত্র এক মুদ্রা। অত্যন্ত দ্রুত এক বিজাতীয় মন্ত্র আওড়াতে শুরু করল।

সেই মন্ত্রোচ্চারণ যেন যেন ছুটে গেল দিকচক্রবাল পার হয়ে। দূর দূরান্ত থেকে ডেকে আনতে লাগল বজ্রগর্ভ মেঘেদের। যজ্ঞকুণ্ডের ওপর কালো আকাশে ষড়যন্ত্রকারীর মতো জমা হতে লাগল তারা। শুরু হল ঘনঘন বজ্রপাত। দিগন্ত মথিত করে ধেয়ে এল তীব্র ঝোড়ো হাওয়া। ফুঁসে উঠল জল, দুলে উঠল মাটি, প্রাণভয়ে আর্তনাদ করতে লাগল পক্ষীকুল। আসন্ন প্রলয়ের সঙ্কেত জাগল দিকে দিকে। বিচিত্র সেই মুদ্রা ত্যাগ করে বাঁ হাতের পাঁচটি আঙুল খুলে দিল লোকনাথ। যেন মুঠো করে আকাশ থেকে পেড়ে আনতে চাইছে কিছু। একটা সময় তীব্র বেগে সেই হাত সে নামিয়ে আনল যজ্ঞবেদীর দিকে। সেই হাতের টানেই যেন মেঘের পেট থেকে বিদ্যুতের একটা শিখা আছড়ে পড়ল যজ্ঞের আগুনে আর তখনই... তখনই ডান হাতের সেই লোহিততপ্ত ঘটি থেকে ফুটন্ত রক্ত লোকনাথ ঢেলে দিল গেনুর মাথায়।

গলা চিরে তীক্ষ্ন জান্তব এক আর্তনাদ করে উঠল গেনু। এমনই সেই আর্তনাদ যা ভয়ের বীজ বুনে দেয় মজ্জায় মজ্জায়। শিরা ধমনী জুড়ে বইতে শুরু করে ভয়ের স্রোত। সারা শরীর জুড়ে বসন্তের দাগের মতো দগদগে হয়ে ফুটে বেরয় ভয়। ঝাপসা চোখে মিতুল দেখল, গেনুর শরীরটা গলে যাচ্ছে একটু একটু করে আর সেই জায়গায় ঘনিয়ে উঠছে ঘন কালো এক নিকষছায়া। গলিত পিচের মতো গাঢ় চটচটে এক অন্ধকার চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে গেনুকে। আকাশের দিকে দু'হাত ছড়িয়ে প্রেতের মতো হাসছে লোকনাথ। একটা সময় সেই অন্ধকারের বৃত্ত রচনা সমাপ্ত হল। যজ্ঞবেদীর ঠিক পাশে শূন্যে দুলতে লাগল অতিকায় পিউপার মতো তরঙ্গিত এক অন্ধকার। ধীর পায়ে সেই অন্ধকারের পিণ্ডের দিকে এগিয়ে এল লোকনাথ। একঘেয়ে সুর করে ডাকতে লাগল, গেনু আয়। গেনু আয়। গেনু আয়।

সেই ডাকের সাথে সাথে কম্পন বাড়তে লাগল পিণ্ডটিতে। কী যেন এক মহামারী ছটফট করছে পিণ্ডের অভ্যন্তরে। আচমকা সেই পিণ্ড চিরে বেরিয়ে এল একটা সুদীর্ঘ বাঁকানো কালো নখ। আর তার পরেই আরও কয়েকটি নখ ভিতর থেকে ফালা ফালা করে দিল সেই অন্ধকার এবং তার মধ্যে থেকে যে বেরিয়ে এল তাকে দেখে আতঙ্কে পাথর গেল মিতুল। এ যে গেনু তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই কিন্তু প্রভুর সমস্ত শক্তি আত্মস্থ করে সে হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ। আকারে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ এবং পরনের ধুতির মতো কাপড়টি আর নেই। সে এখন সম্পূর্ণ নগ্ন। বিশাল বিকৃত লিঙ্গটি প্রাণঘাতী মারণাস্ত্রের মতো উত্থিত হয়ে রয়েছে ঠিক মিতুলের দিকে।

নতুন খেলনা পেলে শিশুরা যেমন খুশি হয়ে ওঠে ঠিক তেমন খুশি হয়ে উঠেছে লোকনাথ। উত্তেজনায় অস্থির সে। যেন আর তর সইছে না। এক ঝলক আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, যা গেনু যা। আর সময় নাই।

রিনরিনে স্বরে এক জান্তব শব্দ করে আগুনের সিল্যুয়েটে অতিকায় এক ভল্লুকের মতো পিশাচটি এগিয়ে আসতে থাকল মিতুলের দিকে। পূর্বতন গেনু কদাকার হলেও তার আচরণের মধ্যে সামান্য সরসতা ছিল কিন্তু এই গেনু যেন শুধুই রিরংসার প্রতিমূর্তি। অন্য সময় হলে হয়তো মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও এই ভয়ঙ্করের সামনে থেকে মিতুল পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত কিন্তু এখন যে তার সে ক্ষমতাও নেই। তার শরীরের দখল নিয়েছে লোকনাথের বশীকরণ। মিতুলের সামনে এসে দু'পা ফাঁক করে দাঁড়াল গেনু। একটিও কথা খরচ না করে এক টানে সরিয়ে দিল মিতুলের বুকের কাপড়। উন্মুক্ত হয়ে গেল শুভ্র শঙ্খের মতো মিতুলের দু'টি স্তন। পর মুহূর্তেই নখে বিঁধিয়ে ফড়ফড় করে সে ছিঁড়ে ফেলল মিতুলের পরনের কাপড়টি। দমকা বাতাসে দূরে উড়ে গেল অসহায় মেয়ের সমস্ত আব্রু। সে দিকে তাকিয়ে গেনুর পাঁশুটে সবুজ রঙের ঘাতক চোখে হিংসা ছাপিয়ে ফুটে বেরল কাম। পিচ্ছিল হয়ে উঠল বিশাল বিকৃত লিঙ্গাগ্রটি। মিতুলের সমস্ত চৈতন্যকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিতে লাগল এই কদর্য দৃশ্যটি। চোখ বুজতে চাইল মিতুল। কিন্তু হায়, চোখের পাতাও তার বশে নেই। তাকে চেয়ে দেখতেই হবে সব কিছু। সাক্ষী থাকতে হবে অকল্পনীয় এক ধর্ষণের, যেখানে ধর্ষিতা হবে সে নিজে।

চিৎকার করে উঠল লোকনাথ, নে গেনু। মেয়েটারে নে। গ্রহণ ছেড়ে আসছে। গ্রহণ থাকতে থাকতে তোরে ওর গর্ভসঞ্চার করতে হবে।

লোকনাথের দিকে একবার ঘুরে তাকাল গেনু। তার পর সামনে ফিরে নখের ধাক্কায় মিতুলকে শুইয়ে দিল। ঝুঁকে ফাঁক করে দিল তার দুই পা। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল দুই পায়ের মাঝখানে। আসন্ন এক অসহ্য যন্ত্রণার কথা ভেবে দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিটি পল অনুপল অপেক্ষা করতে লাগল মিতুল। সে অনুভব করতে পারল বিশাল বিকৃত লিঙ্গটি এগিয়ে আসছে তার দিকে। কিন্তু গেনুর লিঙ্গ মিতুলকে স্পর্শ করা মাত্রই আশ্চর্য এক ঘটনা ঘটল। অদৃশ্য কোনও এক শক্তির ধাক্কায় গেনু ছিটকে পড়ল লোকনাথের পায়ের কাছে! যেন কেউ ঘেটি ধরে দূরে ছুঁড়ে দিল কুকুরছানাকে।

গেনু যতটা না বিস্মিত হল তার থেকেও বেশি বিস্মিত হল লোকনাথ। এমন তো হওয়ার কথা নয়! যদি ওই শালিক পাখি নীরেন ভাদুড়িকে পথ দেখিয়ে এখানে নিয়ে চলেও আসে তারও ক্ষমতা নেই এই গেনুকে আটকানোর। তবে কি তার সাধনায় কোনও ত্রুটি রয়ে গেল? কিন্তু না, সব কিছু তো সে নিয়ম মতো করেছে। তার শক্তি সঞ্চারিত করেছে গেনুর মধ্যে। তাতে তো কোনও বাধা আসেনি। তা হলে এখন কী হল? কেন মেয়েটিতে প্রবিষ্ট হতে পারল না গেনু? উন্মাদের মতো সে ছুটে গেল মিতুলের দিকে আর একটু নজর করেই বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইল সে। যে দিক থেকে বিপদের কোনও কল্পনাই করেনি সে, বিপদ এসেছে ঠিক সেই দিক থেকেই। অন্তত ঘণ্টাখানেক আগেই মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে মেয়েটির। বিন্দুমাত্র রক্তপাত হচ্ছে না। আর রক্তপাত না হলে গেনুর ক্ষমতাই নেই সে মেয়েটিতে প্রবিষ্ট হয়। সাধনার শেষ ধাপের না মেলা হিসেবটিই অদৃশ্য শক্তি হয়ে গেনুকে ছিটকে ফেলে দিয়েছে দূরে। পণ্ড হয়ে গেছে লোকনাথের সাধনা।

দু'হাতে নিজের চুল খামচে ধরল লোকনাথ। তার পর মিতুলের বুকে বসিয়ে দিল একটা লাথি। চিৎকার করে উঠল, চার দিনের মাথায় মাসিক বন্ধ হয়ে যায় কোন কসবীর? কোন রক্ষুসী তুই? কোন ডাইনি? কেন আমার সব আশায় জল ঢেলে দিলি? কেন পণ্ড করে দিলি আমার এত বছরের পরিশ্রম?

চুলের মুঠি ধরে মিতুলকে একটার পর একটা চড় মারতে শুরু করল লোকনাথ। একটা করে চড় মারছে আর কেঁদে উঠছে। অবিশ্রান্ত গালিগালাজ করছে। মিতুলের তুলতুলে গাল দু'টো লাল টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। সেখানে বসে গেছে পাঁচ আঙুলের ছাপ। ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে। আচমকা তাকে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল লোকনাথ। ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, গেনুরে দিয়ে না, তোরে মারব আমি। কুকুরের মতো পিটিয়ে পিটিয়ে মারব। শেষ করে দিল, আমার সব শেষ করে দিল বেবুশ্যে মাগি।

বলতে বলতেই ছুটে গিয়ে যজ্ঞকুণ্ড থেকে তুলে নিল একটা বেশ মোটা জ্বলন্ত কাঠ। সেটা হাতে নিয়ে ঘুরে তাকাল মিতুলের দিকে। হঠাতই মিতুল অনুভব করল, তার হাতে পায়ে সাড় ফিরে আসছে আবার। কোনওক্রমে দু'হাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল সে। তাকে নড়াচড়া করতে দেখেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠল বিশাল পিশাচটি। হুকুমের প্রত্যশায় রিনরিনে গলায় বলে উঠল, কত্তা?

সে দিকে না তাকিয়েই লোকনাথ বলল, তুই না। আমি। আমি মারব মেয়েটাকে। আর বাকি সব কটারে শেষ করবি তুই। কী ভেবেছে এরা? আমি হেরে যাব? হেরে যাওয়ার পাত্তর নয় লোকনাথ চক্কোত্তি। আবার সাধনা করব আমি। আরও কঠিন সাধনা। আমার কথা না রেখে আমি মরব না।

খুনী চোখে তাকিয়ে কাঠ হাতে সে এগিয়ে যেতে লাগল মিতুলের দিকে। ঠিক তখনই হেড লাইটের তীব্র আলোয় ধাঁধিয়ে গেল লোকনাথের চোখ। হাত দিয়ে চোখ আড়াল করতে করতে সে বুঝতে পারল তীব্র গতিতে একটা গাড়ি এগিয়ে আসছে তার দিকে। নড়ার অবকাশ পেল না লোকনাথ, তার আগেই সর্বশক্তিতে অ্যাক্সিলারেটর চেপে ধরলেন দীপক পাল। একটা জোর ঝাঁকুনি অনুভূত হল গাড়ির ভিতর। ঝড়ের মুখে কুটোর মতো উড়ে গেল লোকনাথের দেহটা। ছিটকে প্রায় বিশ ফুট দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ল মাটিতে। এক বার কেঁপে উঠে তার পর স্থির হয়ে গেল।

মিতুল, বলে ডেকে উঠল একটা চেনা গলা। এতক্ষণ পর নিশ্চিন্তে জ্ঞান হারাল মিতুল। ছুটে গিয়ে দু'হাতে তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল তিতাস। রাহুর পূর্ণগ্রাস থেকে সামান্য মুক্তি পেয়ে ঝিকিয়ে উঠল সূর্যের বলয়টি। কিন্তু হঠাতই তীক্ষ্ন জান্তব এক চিৎকারে কেঁপে উঠল চারপাশ। ওরা দেখল কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছে বিভীষিকা। আতঙ্কে বাক্যস্ফূর্তি হল না কারও। গেনুর এই বীভৎস রূপ ওদের কাছেও নতুন। ওরা জানতেও পারল না, গেনুর মাথার মধ্যে তখন ঘুরে চলেছে একটাই কথা। প্রভুর শেষ আদেশ, 'আমি মারব মেয়েটারে। আর বাকি সব কটারে শেষ করবি তুই।'

গেনুর আনুগত্য প্রশ্নাতীত। সে শুধু হুকুম তামিল করতে জানে। প্রভু হয়তো নেই কিন্তু তাঁর আদেশ তো আছে। আদেশের ততক্ষণ মৃত্যু হয় না, যতক্ষণ না তা পালন করা হয়। অনিবার্য মৃত্যুর মতো সে এগিয়ে আসতে লাগল ওদের দিকে। সেই মুহূর্তে এক জনের কথাই মনে পড়ল ওদের। কাতর গলায় তিতাস বলে উঠল, স্যার, বাঁচান।

কিন্তু কোনও সাড়া এল না ভাদুড়ি মশায়ের দিক থেকে। ঘটনার আকস্মিকতায় বাকিরা জিপ থেকে নেমে এলেও বৃদ্ধকে নামানো হয়নি। জিপের কাছে ছুটে গিয়েও থমকে গেল পল্লব আর অমিয়। পেছনের সিটে চোখ বুজে নিস্পন্দ হয়ে বসে আছেন ভাদুড়ি মশায়। এতটাই নিস্পন্দ সেই বসার ভঙ্গি যে তাতে প্রাণ আছে কি না তাও বোঝা যাচ্ছে না। অমিয় ব্যাকুল হয়ে ডাকল, স্যার, চোখ খুলুন স্যার।

চোখ খুললেন না ভাদুড়ি মশায়। ওদের ব্যাকুল আহ্বান বিন্দুমাত্র কাঁপন ধরাতে পারল না বৃদ্ধের নিস্পন্দতায়। ও দিকে তীব্র শ্বাসরোধকারী পূতিগন্ধময় পিশাচটি ক্রমেই এগিয়ে আসছে। তার চলাফেরায় কোনও দ্রুততা নেই। সাফল্যের সম্ভাবনায় সে নিশ্চিত। তার এই গতিপথে সবার আগে রয়েছে তিতাস। মিতুলকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে রয়েছে সে। তার পর একে একে সঞ্জয়, দীপক পাল, অমিয়, পল্লব এবং সবশেষে ভাদুড়ি মশায়। মিতুলকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তিতাস। অচেতন কিশোরীটির থেকেই যেন সাহস পেতে চাইছে সে। গেনু এসে দাঁড়াল তার সামনে। রাহুগ্রাস থেকে আর একটু মুক্তি পেয়েছে সূর্য। সেই সামান্য আলোতেও চকচক করে উঠল গেনুর বাঁকানো করাল নখর আর তখনই গন্ধটা পেল তিতাস। তীব্র পচা গন্ধের মধ্যেও এক ঝলক জীবনের মতো তার নাকে ঝাপটা মারল কোনও পারফিউমের সুবাস। কিন্তু সেই গন্ধেই যেন বিপদের ইঙ্গিত পেল গেনু। তিতাসকে ছেড়ে শিকারী শ্বাপদের দ্রুততায় ঘুরে গেল পেছন দিকে। ওরা দেখল, বেশ কিছুটা দূর থেকে গেনুর দিকে হেঁটে আসছে একটা ছায়ামূর্তি। গন্ধটা যেন তার কাছ থেকেই আসছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না তবু সেই ছায়ামূর্তিকে যেন খুব চেনা লাগল দীপক পালের। অস্ফুটে কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই খেয়াল করলেন, চার পাশ থেকেই গেনুর দিকে এগিয়ে আসছে আরও কয়েকটি ছায়ামূর্তি। বিস্মিত হল বাকিরাও। একটু আগেই তো জনমানবহীন ছিল ছিল জায়গাটা। তা হলে, কোত্থেকে এল এরা? এরা কারা? আরও অবাক হল গেনুর অস্থিরতা দেখে। গেনু যেন ভয় পেয়েছে। অপ্রত্যাশিত কিছুর আশঙ্কায় সে যেন দিশেহারা। ধীরে ধীরে সেই দশ-বারোটি ছায়ামূর্তি গেনুর নিকটবর্তী হল। এ দৃশ্য সম্পূর্ণ বিবশ করে ফেলেছে অমিয়দের। তারা নিথর হয়ে দেখল, গেনু যেন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এক পা পিছোল গেনু। কিন্তু আর এক পা পিছনোর আগেই সেই ছায়াদের দল থেকে তিরের মতো ছুটে এল একটি ছায়া এবং আছড়ে পড়ল গেনুর ওপর। তার দেখাদেখি বাকি ছায়াগুলিও তীব্র গতিতে এসে ঘিরে নিল গেনুকে। ছায়ার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল গেনুর সমস্ত অবয়ব। কয়েক মুহূর্তের একটা আন্দোলন তার পরেই গেনুর গলা থেকে নির্গত তীব্র এক আর্তনাদ কানে তালা ধরিয়ে দিল ওদের। বিহ্বল হয়ে, সেই ছায়া শরীরের ফাঁক দিয়ে যেটুকু দেখা যাচ্ছিল, তাতেই ওরা দেখল, গেনুর শরীরটা ক্রমে বেঁকে দুমড়ে মুচড়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে। আর ততই বেড়ে চলেছে সেই তীব্র তীক্ষ্ন যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ। এক সময় সেই আর্তনাদের রেশ ফেলে রেখে ছোট হতে হতে একেবারে মিলিয়ে গেল গেনুর অবয়ব আর স্পষ্ট হতে শুরু করল ছায়া শরীরগুলি। শোনা যেতে লাগল তাদের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ। সন্ধে হলে চায়ের দোকানে যেমন গুঞ্জনের জন্ম হয় তেমন একটা গুঞ্জন উঠে এল সেই ভিড়ের মধ্যে থেকে। যেন নিজেদের মধ্যে কোনও কথা বলছে তারা। কী বলছে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। তবে বলছে। তার মধ্যেই সেই গুঞ্জন ছাপিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল একটি কণ্ঠ, মায়ের কসম খেয়েছিলাম গুরু। এই দানবের খুন না চুষলে আমার ঘুম হবে না। দিয়েছি স্যাটা ভেঙে।

চমকে উঠল তিতাস। এ কণ্ঠস্বর যে তার খুব চেনা। কিন্তু সে এখানে এল কী করে? চিৎকার করে উঠল তিতাস, সমীর, সমীর।

উত্তর দিল না কেউ। স্পষ্ট হয়ে ওঠা সেই ছায়ার দল তখন আবার একযোগে হাঁটতে শুরু করেছে দিগন্তের দিকে। ক্রমে মিলিয়ে যাচ্ছে তাদের স্পষ্টতা। যেতে যেতে এক জন শুধু ফিরে তাকাল। ঠোঁটের কোণে তার মৃদু হাসি। সেই অস্পষ্টতাতেও এ হাসি চিনতে ভুল হল না কারও। প্রিয় বন্ধুর স্মৃতি সততই সমুজ্জ্বল। কিশোরবেলার মনখারাপের মতো টাটকা ক্ষত আর কী আছে পৃথিবীতে? তার মতো করে কাঁদাতে আর কে পারে! অজান্তেই চোখ ভিজে উঠল অমিয়র। অস্ফুটে বলে উঠল সে, প্রতিম!

পল্লব, সঞ্জয় আর তিতাস ঝাপসা চোখে দেখল, ঘোর লাগা মানুষের মতো অমিয় এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয়তম বন্ধুর দিকে। ছায়া হয়ে মিলিয়ে যেতে যেতে সুপ্রতিম বলে উঠল, আসিস না অমিয়। এখানে আসিস না।

রাহুগ্রাস থেকে পুরোপুরি মুক্তি পেল সূর্য। আলোয় ধুয়ে গেল চরাচর। পাখিরা ফের ডেকে উঠল। এ ডাকে আর আশঙ্কা নেই, রয়েছে মুক্তির আনন্দ। শুধু চোখের জলে ভাসতে ভাসতে অমিয়, সঞ্জয়, পল্লব আর তিতাস তাকিয়ে রইল দিগন্তের দিকে। একটু আগেই যেখানে মিলিয়ে গেছে ফেলে আসা প্রেসিডেন্সি কলেজ, হিন্দু হস্টেল, কলেজ স্ট্রিট আর যৌবনের সমস্ত উদ্যাপন।

এতক্ষণে চোখ মেলে তাকালেন ভাদুড়ি মশায়। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলেন সিটের ওপর। এক দিন যারা গেনুর শিকার হয়েছিল, আজ তারাই গেনুর অন্তিম দশার কারণ হল। মৃত আত্মাকে জাগানো এবং তাকে দিয়ে কোনও বিশেষ কাজ করানো বড় সহজ ব্যাপার নয়। এ অতি উচ্চমার্গের সাধনা। অখণ্ড মনঃসংযোগ প্রয়োজন হয়। আত্মাদের আহ্বান কালে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হয় পৃথিবী থেকে। জীবনীশক্তি ফুরিয়ে আসে তাতে। মিতুলের মুখখানা একবার দেখতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু আর পেরে উঠলেন না ভাদুড়ি মশায়। ঘুম নামল তাঁর দু'চোখ জুড়ে আর ঘুমনোর ঠিক আগে তিনি দেখতে পেলেন, কিছুটা দূরেই এক কৃশকায়া দীর্ঘাঙ্গী রমণীর দুই হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুটি ফুটফুটে ছেলেমেয়ে। খুশিতে ঝলমল করছে তাদের চোখগুলো।

মিতুলের মাথাটা কোলে নিয়ে গাড়িতে বসেছিল তিতাস। মিতুলের জ্ঞান ফিরে এসেছে কিন্তু এখনও সে আছন্ন অবস্থায় রয়েছে। অনেকক্ষণ আগেই কাপড় দিয়ে জড়িয়ে নেওয়া হয়েছে তাকে। মেয়ের পা দু'টো কোলে নিয়ে শক্ত করে ধরে বসেছিলেন দীপক পাল। কোনও কথা বলছিলেন না। শুধু নীরবে কাঁদছিলেন, আর তিতাস ভাবছিল সেই বাচ্চা মেয়ের কথাটা। সে বলেছিল, গেনুকে কেউ একটা আটকানোর ব্যবস্থা করছে। সে রাতে তা হলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে সমীর ওই কারখানাতেই গেছিল! নিজেকে ধিক্কার দিল তিতাস, কেন তখন মাথায় আসেনি সমীরের নামটা? তার তো ভাবা উচিত ছিল, হেরে যাব জেনেও মৃত্যুর সঙ্গে যারা পাঞ্জা লড়তে পারে তাদের প্রত্যেকের একটাই নাম হয়, আর সেটা, কইমাছ সমীর!

২৪

ভাদুড়ি মশায়ের লাইব্রেরি ঘরে বসে ছিল ওরা। ওরা বলতে অমিয়, সঞ্জয়, পল্লব, তিতাস আর দীপক পাল। মিতুল এখন আগের থেকে ভাল আছে। যদিও ট্রমাটা পুরোপুরি কাটেনি তবে আশা করা যাচ্ছে আর কিছু দিনের মধ্যেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে। বারো হাত কালী মন্দিরের পূজারী এবং কলেজ গেটের ফলওয়ালা বলরাম চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, মিতুলের এখনই মৃত্যু নেই, তার আয়ুরেখা দীর্ঘ, সে কথা মিলে গেছে। মিতুল ফিরে আসার আনন্দে প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে বেশ খানিকটা টাকা তুলে পঞ্চাশটা অনাথ বাচ্চার পড়াশোনার জন্য একটা ট্রাস্টে দান করেছেন দীপক পাল। পল্লব চোখ কপালে তুলে বলেছিল, এতগুলো টাকা দিয়ে দিলেন পালদা? এত অশিক্ষিত এ দেশে, আর দু'টো বাচ্চা বেশি অশিক্ষিত থাকলে কী এমন ক্ষতি হতো?

পল্লবের কথায় হা হা করে হেসে উঠেছিলেন দীপক পাল। বলেছিলেন, সবটাই দিয়ে দিতাম বুঝলেন? কিন্তু মিতুলের বিয়ের কথা ভেবে আটকে গেলাম।

এই সব কিছু নিয়েই কথা হচ্ছিল, চায়ের ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল অপালা, ভাদুড়ি মশায়ের স্কলার নাতনি। বসে পড়ে বলল, প্লিজ হেল্প ইয়োরসেলফ। এ বার আমার একটা প্রশ্ন আছে।

সবাই ঘুরে তাকাল অপালার দিকে। অপালা বলল, দেখুন, দাদুর কাছে আমি সবটাই শুনেছি। আপনাদের এই টিমওয়ার্কটাকে আমার লাল সেলাম। কিন্তু তার পরেও আমার একটা খটকা থেকে গেছে। দাদু বলছেন বটে অলৌকিক কিন্তু অলৌকিকেরও তো একটা লজিক্যাল ব্যাখ্যা থাকতে হবে। আমি অ্যাকাডেমিশিয়ন, তাই স্বভাব দোষে সেই ব্যাখ্যাটাই খুঁজে চলেছি।

সঞ্জয় বলল, কোন লজিকটা মিলছে না বলুন?

চায়ে চুমুক দিয়ে অপালা বলল, সবচেয়ে বড় লজিকটাই তো মিলছে না। মিতুল যখন ওই লোকনাথ বলে লোকটার কবলে ছিল এবং মায়া করে লোকটা জায়গাটা সবার চোখের আড়ালে রেখে দিয়েছিল তখন মিতুলের কাছে পৌঁছনোর প্রথম শর্তটা কী ছিল? দাদুই বলেছেন আমায়, কোনও রজঃস্বলা নারী, যার পিরিয়ডস চলছে একমাত্র তিনিই যেতে পারবেন মিতুলের কাছাকাছি। আমরা সবাই জানি, তিতাস ওই বাচ্চা মেয়েটির দেখানো পথে মিতুলের কাছে গিয়েছিলেন কিন্তু...

তাকে থামিয়ে দিয়ে অমিয় বলে উঠল, এতে কিন্তুর কী আছে? তখন হয়তো তিতাসের...

এ বার অমিয়কে থামিয়ে দিল অপালা, পিরিয়ডস চলছিল না।

থমকে গেল সবাই। একমাত্র তিতাসের মুখ অভিব্যক্তিহীন। অপালা বলে চলল, এত লোক থাকতে বাচ্চা মেয়েটি কেন শুধু তিতাসকেই পথ দেখিয়েছিল? কারণ সে জানত, একমাত্র তিতাসই মিতুলের কাছে যেতে পারবে। কিন্তু তার জন্য তো সবার আগে তিতাসের পিরিয়ডসটা স্টার্ট হতে হবে। যে রাতে তিতাস মিতুলের কাছে গেছিলেন, তখনও তো তাঁর পিরিয়ডস শুরু হতে তিন দিন দেরি। কী তিতাস? আমি কী ভুল বলছি?

এ বার অপার বিস্ময় জেগে উঠল তিতাসের চোখে। সেই বিস্ময় ধরা পড়ল তার কণ্ঠেও। সে বলে উঠল, ইয়েস। ইউ আর রাইট। বাট হাউ ডু ইউ নো?

অপালা বলল, আপনার মনে আছে, আমায় ডিসচার্জ দেওয়ার আগে আমি আপনার চেম্বারে গেছিলাম। আপনি আমায় কয়েকটা ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছিলেন?

হ্যাঁ মনে আছে।

সে দিনই আপনার টেবিলে একটা ক্যালেন্ডার দেখেছিলাম যেখানে প্রতিটা মাসে একটা করে ডেট গোল দাগ দেওয়া আছে। সেপ্টেম্বর অবধি দেওয়া ছিল। অক্টোবর থেকে ফাঁকা। এটা সেপ্টেম্বর মাস। একটু মন দিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, আগের মাসের ডেটের থেকে পরের ডেটটা ঠিক আঠাশ দিন পরে। কোনও মাসে যদি সেই ডেটটা একটু এগিয়ে বা পিছিয়ে এসেছে, পরের মাসের ডেটটাও কিন্তু সেই হিসেবেই আঠাশ দিন এগিয়ে বা পিছিয়ে এসেছে, বাকিদের দিকে তাকিয়ে অপালা বলল, ফলে আমার বুঝতে অসুবিধে হয়নি কেন ডেটগুলোয় গোল করে রেখেছেন তিতাস। আমরা যারা ওয়ার্কিং উওম্যান, অনেক সময় কাজের চাপে এই ডেটটা মিস করে যাই। তখন অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। তাই চোখের সামনে ডেটটা লিখে রাখলে সুবিধে।

প্রশংসার গলায় তিতাস বলে উঠল, আপনার তো মারাত্মক চোখ!

নাতনির প্রশংসায় গর্বিত হলেন বৃদ্ধ। বলে উঠলেন, ও ছোট থেকেই ও রকম। সব কিছু একেবারে খুঁটিয়ে দেখে।

অপালা বলল, বাদ দাও এ সব। আমরা পয়েন্ট থেকে সরে যাচ্ছি। আমার প্রশ্ন হল, যদি তিন দিন পরেই পিরিয়ডস হবে তা হলে সে রাতে তিতাস কী করে মিতুলের কাছে গেলেন? আমি এটাকে কিছুতেই অলৌকিক বলে মানতে পারছি না।

সবাই এক সাথে কৌতূহলী চোখে ঘুরে তাকাল তিতাসের দিকে। সত্যিই তো, এ ভাবিয়ে তোলার মতোই প্রশ্ন! ভাদুড়ি মশায়ের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে তিতাস বলল, আপনি ঠিক বলছেন অপালা। নরমাল পিরিয়ডসের ডেট আমার সে দিন থেকে তিন দিন পরেই ছিল বটে কিন্তু স্যারের কাছ থেকে সবটা জানবার পরে আমি সে দিনই দু'টো ওষুধ খাই যাতে আমার পিরিয়ডসটা এগিয়ে আনা যায়। অলৌকিকেরও ব্যাখ্যা হয়। আমার পিরিয়ডস স্টার্ট হওয়া মাত্রই আমি বাচ্চা মেয়েটির দেখা পেয়েছিলাম। তার আগে অবধি কোনও অলৌকিক ঘটেনি।

অবাক হয়ে তিতাসের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইল সবাই। তিতাস ফের বলল, আসলে আমি চাইছিলাম যাতে অলৌকিক কিছু হয়। অলৌকিক ঘটাবার ক্ষমতা তো আমার হাতে নেই তাই যেটুকু হাতে ছিল ট্রাই করেছিলাম।

অপালা বলে উঠল, মাই গুডনেস! ইউ আর সাচ আ ওয়ান্ডারফুল উওম্যান বাট পিরিয়ডস এগিয়ে আনার ওষুধ হয়? আমি তো জানতাম বিফোর টাইম পিরিয়ডস স্টপ করানোর ওষুধ আছে।

হাসল তিতাস, দুটোই আছে। পরেরটা আমি সে রাত্রেই মিতুলকে খাইয়ে দিয়ে এসেছিলাম। অনেক সময় এগুলো মিসও হয় বাট আই হ্যাড নো আদার অপশন। মিতুলকে নিয়ে আমি একা ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারতাম না।

কয়েক মুহূর্ত তিতাসের দিকে তাকিয়ে রইল অপালা। তার পর উঠে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। উচ্ছ্বাসে বলে উঠল, কোনও অলৌকিক না। কিচ্ছু না। মিতুলকে বাঁচিয়েছেন আপনি। ইউ সেভড দ্যাট পুওর গার্ল। আই লাভ ইউ তিতাস। আমি ছেলে হলে আই উড লাভ টু ম্যারি ইউ।

লজ্জায় মাথা নিচু করল তিতাস। মুগ্ধ হয়ে সে দিকে তাকিয়ে রইল পল্লব। লজ্জা পেলে এমনিতেই মেয়েদের পরীর মতো দেখায়, সেখানে তো সুন্দরী বলে তিতাসের নামডাক আছেই। পল্লব ঠিক করে ফেলল, আজ সে একেবারে হাঁটু ভেঙে বসে তিতাসের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবে। এমন রমণীরত্ন মাঝে মাঝে যে চিড়বিড়িয়ে উঠবে সেটাই তো স্বাভাবিক। না না, তিন বছর আগে রাগ করাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি। এখনই কিছু একটা বলবে ভাবছিল সে কিন্তু তার আগেই অপালা বলে উঠল, তা হলে দাদু, এ বার মানলে তো সবটাই অলৌকিক নয়?

না, মানলাম না। মাথা নেড়ে বলে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়।

এখনও মানলে না? হতাশ শোনাল অপালার গলা।

হাসলেন বৃদ্ধ। বললেন, দিদিভাই, এ জগতের সবচেয়ে বড় অলৌকিক হল মানুষের ইনটেলিজেন্স। বুদ্ধিমত্তা। সেটা ছিল বলেই না বিজ্ঞানকে ধরা গেল হাতের মুঠোয় আর এ ভাবে তার প্রয়োগ সম্ভব হল। অসম্ভব বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছ তুমি তিতাস। আর এ জিনিস একদিনে তৈরি হয় না। তার জন্যেও লাগে নিবিড় সাধনা আর অভ্যাস। কী বলেছিলাম মনে আছে তো? মন্ত্রের প্রায়োগিক দিকই হল তন্ত্র। তুমি যে মহাতান্ত্রিক। এসো মা, আশীর্বাদ করি, সুখী হও। সৌভাগ্যবতী হও।

তিতাসের দিকে দু'হাত বাড়িয়ে দিলেন শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি, প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, সংস্কৃত বিভাগ, বারাসাত গভর্নমেন্ট কলেজ।

. . .

ভাদুড়ি মশায়ের বাড়ি থেকে বেরতে বেরতে দীপক পাল ওদের বললেন, এক বার আমার বাড়ি থেকে ঘুরে যাবেন না কি আপনারা? মিতুল খুশি হবে আপনাদের দেখলে।

পল্লবের মনে হল, অমিয় যেন একটু আগ বাড়িয়েই বলে উঠল, যাব তো। আপনারা এগোন, আমি আসছি।

এ নিয়ে বেশ কয়েক বার দীপক পালদের বাড়ি গেছে ওরা। পল্লব খেয়াল করেছে, ও বাড়িতে গেলেই অমিয় তার বুলেটটা নিয়ে যায়। মিতুলও বেশ ঘন চোখে তাকায় অমিয়র দিকে। সে আলতো গলায় অমিয়কে বলল, অমিয়, ব্যাপারটা বাল্য বিবাহ হয়ে যাবে না তো রে?

কড়া চোখে পল্লবের দিকে তাকাল অমিয়। তার পর হেসে ফেলল। নিচু গলায় বলল, ম্যাচিওর মেয়েরা কবিতা পছন্দ করে আর বাচ্চা মেয়েরা বাইক এবং ফিগার। কোনদিন শক্তি, সুনীল, ভাস্কর চক্রবর্তী পড়তে শুরু করবে তার আগে বাবা ঝামেলা মিটিয়ে ফেলি। পরে না হয় আমিও কবিতা পড়ে নেব।

ফিক করে হেসে ফেলল পল্লব। সে ভাবছে, মিতুলের সাথে অমিয়র বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরেও কি দীপক পাল অমিয়কে স্যার বা আপনি করে বলবেন? শ্বশুর জামাইকে আপনি আজ্ঞে করলে মোটেই সেটা ভাল দেখাবে না।

২৫

পল্লবের ফ্ল্যাটে তিতাসের প্রিয় জানালাটার কাছে বসেছিল তিতাস আর পল্লব। একদম প্রপার কোলকাতায় হলেও পল্লবের ফ্ল্যাটের চারপাশটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। অনেক গাছপালা আর কিছু দূরে দূরে কয়েকটা পুরনো বাড়ি। সরকার থেকে দয়া করে এখানে এখনও সাদা ফ্যাটফ্যাটে আলো লাগিয়ে দেয়নি, তাই সোডিয়ামের হলুদ আলোয় নরম রোম্যান্টিক হয়ে ওঠে সন্ধেগুলো। তিতাসের গায়ে গা ঘেঁষেই বসেছিল পল্লব। তিতাস বলল, তুই সারাক্ষণ এমন গায়ে উঠিস কেন বল তো? সরে বোস না।

মোটেই সরে বসল না পল্লব। আরও একটু ঘেঁষে গিয়ে বলল, তুই এই সব ধুন্ধুমার ওষুধের কথা জানলি কী করে বল তো?

ইডিয়টের মতো কথা বলিস না পল্লব। আমি ডাক্তার। তা ছাড়া, মেয়েরা ও সব জানে।

তুই আগে কখনও খেয়েছিস এ সব ওষুধ?

হ্যাঁ, এক বার খেয়েছিলাম।

কবে?

যে বার প্রথম আমি আর তুই কালিম্পং গেলাম সে বার। সে বার ওই সময়টাতেই পিরিয়ডসের ডেট পড়েছিল। ওষুধ খেয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

চমকে সোজা হয়ে বসল পল্লব। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তিতাসের দিকে।

তিতাসের চোখে খেলে গেল কৌতুকের ঝিলিক। সে বলল, ঠিক ভাবছিস। আসলে, তোমাকে দুঃখিত করা আমার জীবনধর্ম নয়...

কথা শেষ করতে পারল না তিতাস। চুমু খাওয়ার সময় কথা বলা যায় না।

সমাপ্ত

পরিশিষ্টঃ

(মিতুল উদ্ধারের দু'বছর পর)

বুবু আজ দারুণ খুশি। তার খুব শখ ছিল একটা বেড়ালছানা পোষার। কিন্তু সে মোটে ক্লাস টু-তে পড়ে বলে কেউ তার কথায় কান দিচ্ছিল না। শেষমেশ এক জন তার কথা শুনেছে এবং সত্যি সত্যি একটা ফারের বল বেড়ালছানা এনে দিয়েছে। তার বুদ্ধিতেই গ্যারাজের পেছনে যে জায়গাটা আছে সেখানেই বেড়ালছানাটাকে রেখেছে বুবু। একটু দুধও খাইয়ে এসেছে। যে এত বড় শখ মিটিয়েছে তাকে তো কিছু দিতে হয়। তাই একটা বড় চকোলেট নিয়ে বুবু বলল, নাও গো দাদু।

যাকে বুবু দাদু বলছে সে ওদের বাড়ির জমাদার। কোমরে চোট লেগেছিল বলে সোজা হয়ে চলতে পারে না। জমাদার দাদু বলল, এ সব চাই না দিদিভাই। অন্য একটা জিনিস চাইব। দেবে?

কী গো দাদু?

বলছি। আগে বলো কাউরে বলবা না। তোমার বেড়ালের দিব্যি। যদি বলো বেড়ালটা কিন্তু...

না না, কাউক্কে বলব না। বলো না তোমার কী চাই?

তোমার মাথা থেকে তিনটে চুল চাই। দেবে?

হি হি করে হেসে উঠল বুবু, এটা একটা চাওয়ার মতো জিনিস হল? নাও নাও। তবে আমার লাগবে না তো?

না দিদিভাই, এই বলে বুবুর মাথা থেকে নরম হাতে তিনটে চুল তুলে নিল বুবুদের জমাদার। তার পর এক গাল হেসে বলল, যাও দিদিভাই। এ বার তোমার ছুটি।

অধ্যায় ৩ / ৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%