পর্ণশবরীর শাপ

সৌভিক চক্রবর্তী

পূর্বকথা :

পাকদণ্ডী বেয়ে দ্রুত নেমে আসছিল লাকপা শেরপা আর চিৎকার করে ডাকছিল, বৈজন্থী, এ বৈজন্থী।

তার সেই ডাক প্রতিধ্বনিত হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছিল ঘন কুয়াশায়, কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছিল না। এই বৈজন্থীকে নিয়ে ভারী মুসিবতে পড়ে গিয়েছে লাকপা। আরে বাবা স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া হয়, আবার মিটেও যায়। তাই বলে কি রাগ করে এত রাতে কেউ বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে! তাও যদি বৈজন্থী পাহাড়ের মেয়ে হতো! বৈজন্থীর বাড়ি কার্শিয়াং-এ। কার্শিয়াংকে পাহাড় বলে মনে করে না লাকপারা। বলে, ও তো শহর। ওখানের সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আট হাজার ফুট ওপরে, সেঞ্চল ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির মধ্যে অবস্থিত চটকপুরের জীবনযাত্রার কোনও মিল নেই। এখানে জীবন অনেক বেশি নির্মম। বছরের বেশিরভাগ সময়েই তাপমাত্রা ছয় থেকে আট ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করে। নভেম্বর পেরতে না পেরতেই তা নেমে যায় শূন্যের নীচে। দমবন্ধ করে দেওয়া ঘন কুয়াশা এবং হাড়মজ্জা জমিয়ে দেওয়া ঝোড়ো হাওয়ার সাথে সাথে যোগ হয় তুষারপাত। আর কপাল আরও খারাপ থাকলে গ্রামে হানা দেয় পাহাড়ি চিতা। অতর্কিতে তুলে নিয়ে যায় গবাদিপশু এবং কখনও কখনও মানুষও। তাই এই নভেম্বরের রাতে রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া মানে সাধ করে মৃত্যুকে ডেকে আনা। তাও যদি বৈজন্থী পাহাড়ের মেয়ে হত!

পাকদণ্ডী বেয়ে দ্রুত নেমে আসছিল লাকপা আর ভাবছিল, কোথায় যেতে পারে বৈজন্থী? আজ পূর্ণিমা। গোল থালার মতো একটা চাঁদ উঠেছে। কিন্তু এমন কুয়াশা যে দু'হাত দূরেও স্পষ্ট কিছু দেখা যাচ্ছে না। লাকপার কাছে একটা টর্চ আছে বটে কিন্তু সেটা সে পকেটেই রেখে দিয়েছে। এই কুয়াশায় গাড়ির হেডলাইট অবধি কাজ করে না, সেখানে টর্চ কি করবে? লাকপা মনে করার চেষ্টা করছিল, আজ অবধি এই জঙ্গলের কোন কোন জায়গায় সে বৈজন্থীকে নিয়ে গেছে? আচমকা কথাটা মনে পড়ে গেছিল লাকপার। দশেরার দিন ঘুরতে যাওয়ার বায়না করেছিল বৈজন্থী। তাকে নিয়ে নীচের লেকের ধারে গিয়েছিল লাকপা। জলে পা ডুবিয়ে বসেছিল দু'জনে। বৈজন্থী বলেছিল, এই জায়গাটা তার খুব ভাল লেগেছে। লাকপা যখন আর তাকে মহব্বত করবে না তখন সে এখানে ঝোপড়ি বেঁধে থাকবে। নির্ঘাত ওখানেই গেছে বৈজন্থী। সামনের রাস্তাটা সোজা চলে গেছে। সেটা ছেড়ে বাঁ দিকে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল লাকপা। ঢোকার আগে গাছ থেকে শক্ত একটা ডাল ভেঙে নিল। বনবরা মানে বুনোশুয়োর সামনে পড়লে খেদাতে পারবে। কিন্তু লাকপা যেটা খেয়াল করল না সেটা হল, একটা উঁচু পাইন গাছের ডালে একদলা অন্ধকার নিঃশব্দে নড়ে উঠল। নিশ্চিত মৃত্যুর মতো দু'টো সবুজ রঙের চোখ জরিপ করতে লাগল লাকপাকে।

অনেক দিন পর শিকার এ ভাবে নিজে থেকে ধরা দিয়েছে। ভারি খুশিয়াল হয়ে উঠেছিল লেপার্ডটি। নিঃসাড়ে নেমে এসেছিল মাটিতে এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে পিছু নিতে শুরু করেছিল শিকারের। যদিও তার চলাফেরা অতর্কিত মৃত্যুর মতোই শব্দহীন তবু আজ একটা অতিরিক্ত সুবিধা হয়েছে। কুয়াশার জন্য গাছ থেকে টুপ টুপ করে জল ঝরছে ক্রমাগত। যদি বা সামান্য শব্দ শিকারকে সচকিত করে তুলতে পারত কিন্তু এই জলের আওয়াজে তা আর শিকারের কান পর্যন্ত পৌঁছবে না। পেশীগুলিকে টানটান করে নিচ্ছিল লেপার্ডটি। এ বারই সেই চরমক্ষণ। এক লাফে উঠে পড়তে হবে শিকারের ঘাড়ে এবং তীক্ষ্ন শ্বদন্ত দিয়ে ছিন্ন করে দিতে হবে শিকারের শ্বাসনালী। তার পর চোয়ালের চাপে ভেঙে দিতে হবে ঘাড়। কিন্তু লাফ দেওয়ার আগের মুহূর্তেই থমকে গেল সে। বিস্ফারিত হয়ে গেল তার দুই চোখ। সে এমন কিছু দেখেছে বা অনুভব করেছে যা তার মধ্যে বুনে দিয়েছে তীব্র ভয়। একটা বেড়াল ছানার মতোই গুটিয়ে এতটুকু হয়ে গেল লেপার্ডটি আর তার পরেই লেজ গুটিয়ে উর্ধশ্বাসে ছুট দিল উল্টো দিকে।

একটা খড়মড় শব্দ পেয়ে পেছন দিকে ফিরে তাকাল লাকপা কিন্তু কিছু দেখতে পেল না। যাকগে যাক, এখন পেছনে দেখার সময় নেই। দু'হাতে ঝোপঝাড় সরিয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেল সে আর যেতেই অনুভব করল, জঙ্গলের চরিত্র যেন বেশ খানিকটা বদলে গেছে এখানে। ছেলেবেলা থেকে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে লাকপা। সে জানে, জঙ্গলের একটা নিজস্ব শব্দ আছে। কিন্তু ঠিক এই জায়গাটায় কোনও শব্দ নেই। কোনও শব্দ নেই মানে কোনও শব্দ নেই। যেন কেউ বিরক্ত হবে বলে ডাকা বন্ধ করে দিয়েছে ঝিঁঝিঁ পোকারা, গাছের পাতাগুলিও যেন প্রাণপণে সামলে রেখেছে পতনোন্মুখ জলবিন্দুগুলিকে। বলে বোঝাতে পারবে না কিন্তু হঠাৎ করে যেন ভারী অস্বস্তি হতে লাগল লাকপার। তার এত দিনকার শিক্ষা তাকে বলল, এ জায়গায় এমন কিছু ঘটছে বা ঘটতে চলেছে যা তার অভিজ্ঞতায় নেই। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে ফিসফিস করে বলল, ফিরে যা লাকপা। ভাল চাস তো ফিরে যা।

কিন্তু বৈজন্থীকে খুঁজে না পেয়ে সে ফিরবে কেমন করে? সবটুকু সাহস বুকের মধ্যে এক জায়গায় করে লাঠিটা বাগিয়ে ধরে আরও কয়েক পা সামনে এগিয়ে গেল লাকপা আর তার সমগ্র চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে গেল আশ্চর্য এক সুগন্ধে! যেন হাজার হাজার ফুল ফুটেছে একসাথে! পাহাড়ি ফুলে এমনিতেই রং বেশি, গন্ধ কম। সেখানে এমন তীব্র শ্বাসরোধকারী সুগন্ধ কল্পনাও করা যায় না। এ সুগন্ধ লাকপার অচেনা। হাড় কাঁপানো ঠান্ডার সাথে সাথে বিনবিনে একটা ভয় তার শিরদাঁড়া বরাবর উঠে আসতে লাগল ওপর দিকে। ভয়টা চারিয়ে যাতে লাগল লাকপার মাথার ভিতর। লাকপা বুঝতে পারছে না, তার এত ভয় করছে কেন? সে প্রাণপণে ভয় না পেতে চাইছে কিন্তু অলঙ্ঘ্য নিয়তির মতো ভয়টা সরীসৃপের মতো পাকে পাকে সাপটে ধরছে তাকে। উত্তেজনায় পাগলের মতো লাফাচ্ছে লাকপার হৃৎপিণ্ড। সে শব্দ ছাড়া চরাচরে আর কোনও শব্দ নেই। এমন নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা একমাত্র মৃত্যুর সঙ্গেই তুলনীয়।

আচমকা লাকপা খেয়াল করল, কুয়াশা যেন বেশ খানিক পাতলা হয়ে এসেছে। পূর্ণচন্দ্রের আলো প্রবেশ করেছে জঙ্গলের অভ্যন্তরে। ওই তো খানিক দূরে চিকচিক করছে লেকের জল। আর লেকের জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে, ও কে? বৈজন্থী না? কুয়াশা পাতলা হয়ে এলেও এতটাও পাতলা হয়ে আসেনি যে এত দূর থেকে বৈজন্থীকে স্পষ্ট দেখতে পাবে লাকপা। সে শুধু একটি নারীর অবয়ব দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু এত রাতে বৈজন্থী ছাড়া আর কোন মেয়েমানুষ বসে থাকবে লেকের জলে পা ডুবিয়ে! এমন অভিমানী পাগলি বৈজন্থী ছাড়া আর আছেটা কে? কী যে করে না মেয়েটা! মাথার মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা ভয়টাকে খানিক অগ্রাহ্য করেই লেকের দিকে এগিয়ে গেল লাকপা এবং ডেকে উঠল, বৈজন্থী।

লাকপার ডাক শুনে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে তাকাল নারীটি এবং সেই মুহূর্তে লাকপার চেতনা জুড়ে ভয়ের বিস্ফোরণ হল। নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল সে। পাথরের মূর্তির মতো তাকিয়ে রইল সেই নারীর দিকে। চোখের পাতা ফেলতেও ভুলে গেল। ধীরে ধীরে লাকপার কাছে এগিয়ে এল সেই নারী। বিরক্তিতে কুঞ্চিত হয়ে রয়েছে তার ভ্রূগুলি। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে একটি হাত তুলে একটি আঙুল দিয়ে সে স্পর্শ করল লাকপার দুই ভুরুর মাঝখানে। কাটা কলাগাছের মতো ঝপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল লাকপা।

একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল তীক্ষ্ন স্বরে। সেই ডাক হাহাকারের মতো ছড়িয়ে গেল পাহাড়ের কোণায় কোণায়। ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল শিশুরা।

দ্রুত হাতে জামার বোতাম লাগাচ্ছিল অমিয়। এখন ভোর চারটে। আর আধ ঘণ্টার মধ্যে একটা ইনোভা হাজির হবে তার বাড়ির সামনে। কনস্টেবল তনুময় রাহা গাড়িটা চালিয়ে তাকে নিয়ে যাবে শিলিগুড়ি। ডিপার্টমেন্টের কয়েকটা জরুরি ফাইল পৌঁছে দিতে হবে সেখানে। ইদানীং এ সব কাজ মেইলেই হয় কিন্তু এই ফাইলগুলোর কিছু বিশেষত্ব আছে। তাই এসপি সাহেব নিজে অমিয়কে অনুরোধ করেছেন ফাইলগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ঊর্ধ্বতনের অনুরোধ আদেশের শামিল সে কথা এ ক' বছরে ভালই বুঝেছে অমিয়। তাই দ্বিরুক্তি না করে রাজি হয়ে গেছিল সে। কিন্তু মনটা খুঁতখুঁত করছে অন্য কারণে।

গতকাল সন্ধ্যায় সুভাষ ময়দানে বসে বাদাম ভাজা খেতে খেতে মিতুলকে শিলিগুড়ি যাওয়ার খবরটা দিয়েছিল অমিয়। আঙুলে করে নুনঝাল টাকরায় ঠেকিয়ে চকাস করে শব্দ করে উঠেছিল মিতুল। তার পর অমিয়র দিকে ডাগর চোখ দু'টি তুলে বলেছিল, আমায় নিয়ে চলো।

একটা বেমক্কা বাদাম অমিয়র গলায় আটকে গেছিল দুম করে। সেটাকে কোনও রকমে ম্যানেজ করে ভিতরে ঠেলে দিয়ে চোখ বড়বড় করে অমিয় বলে উঠেছিল, পাগল না কি?

অমিয়র এই বিস্মিত অভিব্যক্তিকে হেলায় উড়িয়ে মিতুল উদাসীন ভাবে বলেছিল, এমন অবাক হওয়ায় কি আছে? মানুষে কি তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে বেড়াতে যায় না?

ধাক্কাটা সামলে অমিয় বলেছিল, কিন্তু আমি তো অফিসের কাজে যাচ্ছি মিতুল। সেখানে তোমায় সাথে করে নিয়ে গেলে লোকে কী বলবে?

আগের থেকে আরও উদাসীন মিতুল, লোকের বলাবলিতে কি অত পাত্তা দিলে চলে? সারা বারাসাত জানে তুমি আমার বয়ফ্রেন্ড। তাই তো ছেলে ছোকরারা আমায় বিরক্ত করার সাহস পায় না। আগে যাও দু'চার জন মেসেঞ্জারে মেসেজ করত, ইদানীং তো সে সবও বন্ধ হয়ে গেছে। তাতে অবশ্য আমার ভালই হয়েছে। যাক সে কথা, এসপি সাহেব তো তোমায় ভালবাসেন। তাঁকে বলো, তুমি আমায় নিয়ে যাবে। এমনিতেও তো আজ গিয়ে আজ ফিরতে না। রাত্তিরটা একসাথে হোটেলে থেকে যাব। পর দিন ফিরে আসব।

এ বার আর বিষম খাওয়াটা আটকাতে পারেনি অমিয়। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে, জল খাইয়ে, পিঠে হাত বুলিয়ে মিতুলই সামলেছিল ব্যাপারটা। তার পর অমিয় একটু ধাতস্থ হতে সরু চোখে তাকিয়ে বলেছিল, দেখতেই হাট্টাকাট্টা। আসলে তো ভিতুর ডিম। আমার চব্বিশ বছর বয়স হয়ে গেছে। আমি আর বাচ্চা নই হ্যাঁ?

বলে, দুমদুম করে পা ফেলে এগিয়ে গেছিল মিতুল। অমিয় ছুটেছিল পেছনে, এই মিতুল, শোনো। দাঁড়াও।

ঘুরে তাকিয়েছিল মিতুল। একটা আঙুল সোজা অমিয়র দিকে তুলে হুমকি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেছিল, খবরদার পিছুপিছু আসবি না। যা তুই। ভিতু ছেলে আমার একদম ভাল্লাগে না।

তার পর মিতুল যে মুখ ফিরিয়ে ফিক করে হেসে নিয়েছিল সেটা অমিয় দেখতে পায়নি তাই মিতুল চলে যাওয়ার পরে ওখানেই কিছুক্ষণ লাতন হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। মিতুল তাকে তুইতোকারি করল! তার চেয়েও বড় কথা তার পৌরুষ নিয়ে খোঁটা দিল! মিতুল তো এমন ছিল না আগে। এ সব তিতাসের সঙ্গে মেশার ফল। ওই মাথাটা খাচ্ছে মিতুলের। কিন্তু তিতাসের সাথে বাওয়াল দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। আর এখন তো দেখতে পাচ্ছে মিতুলও তাকে এ পাশ ও পাশ ধুয়ে দিচ্ছে! নিজেকে ভারী অসহায় লাগছিল অমিয়র। বুলেটটাকে মনে হচ্ছিল সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল।

কাল রাত থেকে মিতুলের সাথে আর কথা হয়নি। মিতুল তার ফোন ধরেনি এবং মেসেজেরও রিপ্লাই করেনি। অমিয় চেয়েছিল, ঝামেলাটা মিটিয়ে তার পর যেতে কিন্তু উপায় নেই। যা করার ফিরে এসেই করতে হবে। কয়েকটা দরকারি জিনিস ট্রলিতে ঢুকিয়ে নিচ্ছিল অমিয়, এমন সময় কানে এল গাড়ির হর্ন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হল অমিয়। চারটে কুড়ি বাজে। সময়ের আগে ডিপার্টমেন্টের গাড়ি এসে হাজির! এ তো ভাবাই যাচ্ছে না। বলতে না বলতেই ফের দু'বার হর্ন। বাপরে বাপ! ডিসিপ্লিনের একেবারে হদ্দমুদ্দ। তনুময়ের এই কীর্তি জানতে পারলে বেঙ্গল পুলিশ ব্যারাকপুরে ওর মূর্তিও বসিয়ে দিতে পারে। ট্রলিটা নিয়ে নীচে নেমে এল অমিয় কিন্তু ভারী অবাক হল গাড়িটাকে দেখে! বেদে যেমন সাপের হাঁচি চেনে, তেমনই গাড়ি দেখে তার ঠিকুজি কুষ্ঠি বলে দিতে পারে অমিয়। আসার কথা ছিল একটা সাদা ইনোভার। তার বদলে এসে হাজির হয়েছে একটা নতুন ঝকঝকে লাল কালোয় মেশানো মাহিন্দ্রা থার! অমিয়র বুকের ভিতরটা গুরগুর করে উঠল। এমন একটা জিপ গাড়ি তার চিরকালের স্বপ্ন। ডিপার্টমেন্ট আজকাল এমপ্লয়ির ব্যক্তিগত পছন্দের দিকেও খেয়াল রাখছে না কি? মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিল অমিয়, গাড়িটা সে নিজে চালাবে। ছাব্বিশশো সিসির গাড়ি, হাইওয়েতে পড়লে জাস্ট উড়ে বেরিয়ে যাবে। দ্রুত ড্রাইভিং সিটের দিকে এগিয়ে গেল অমিয় কিন্তু তাকে অবাক করে দরজা খুলে নেমে এল পল্লব। হাঁ করে খানিকটা বাতাস গিলে ফেলল অমিয় তার পর গলাটলা ঝেড়ে বলল, তুই এখন? আর এ গাড়িটা কার?

খুব কায়দার একটা হাসি দিল পল্লব, যারই হোক, আপাতত আমি চালাচ্ছি এটাই বড় কথা। বাই দ্য ওয়ে, উঠে পড়।

আকাশ থেকে পড়ল অমিয়, উঠে পড় মানে?

উঠে পড় মানে উঠে পড়। তুই তো শিলিগুড়ি যাবি? আমরাও ও দিকেই যাচ্ছি। তোকে নামিয়ে দেব।

তেরিয়া হয়ে উঠল অমিয়, ইয়ার্কি হচ্ছে না কি? আমি কি আনোয়ার শাহ যাব যে লর্ডসের মোড় যাওয়ার পথে আমায় নামিয়ে দিবি? আর আমি শিলিগুড়ি যাচ্ছি তোকে কে বলল?

ওকে বলেনি, আমায় বলেছে। মিতুল, বলতে বলতে গাড়ি থেকে নেমে এল তিতাস। সে দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল অমিয়। কী বলা উচিত বুঝে উঠতে পারল না। তিতাস ফের বলল, কী হল? অমন ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছিস কেন? সত্যি আমরা ও দিকেই যাচ্ছি। তোকে নামিয়ে দেব।

ও দিকে যাচ্ছিস মানে? কোথায় যাচ্ছিস? নিজের গলাটাকে কেমন যেন বোকাবোকা লাগল অমিয়র।

তিতাস হেসে বলল, আমরা যাচ্ছি দার্জিলিং। মিতুল কাল ফোন করে বলল, তুই না কি ওকে ঘুরতে নিয়ে যেতে চাস না। আমি তখন বললাম, অমিয় নিয়ে যেতে চায় না তো কুছ পরোয়া নেহি। আমি আর পল্লব তো আছি। আমরা তোকে নিয়ে যাব। তাই জন্য আজ একদম ভোরভোর বেরিয়ে পড়েছি। মিতুলকে ওর বাড়ি থেকে তুলে নিয়েছি, তার পর ভাবলাম তোকেও ড্রপ করে দিই। হাজার হোক তুই বন্ধু মানুষ।

বহুকাল এত অবাক হয়নি অমিয়। সে দেখল, গাড়ির পেছনের জানলা খুলে উঁকি দিচ্ছে মিতুলের দুষ্টুমি ভরা মুখ। চোখ দু'টো ঝিকিয়ে উঠছে কৌতুকে। সে দৃষ্টির একটাই অর্থ হয়, 'আমি আর বাচ্চা নই হ্যাঁ?'

. . .

এত দিনের লেগাসি অক্ষুণ্ণ রেখে নির্ধারিত সময়ের পঞ্চাশ মিনিট পর মানে পাঁচটা পনেরোয় ঘুমজড়ানো গলায় ফোন করল কনস্টেবল তনুময় রাহা। বলল, স্যার, আপনার বাড়ির নীচে চলে এসেছি।

অমিয় বলল, ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো। আমি চাকদা ক্রস করে এসেছি। ধন্যবাদ।

ফোনটা কেটে ড্যাসবোর্ডের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। ভোরের হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার চুল। স্টিরিওর ভলিউম বাড়িয়ে দিল তিতাস। একটা দরাজ গলা গেয়ে উঠল, 'দিল তো আখির দিল হ্যায় না/মিঠি সি মুশকিল হ্যায় না/পিয়া পিয়া পিয়া না পিয়া/জিয়া জিয়া জিয়া না জিয়া...'

কিছু কিছু গান তৈরিই হয়েছে লং ড্রাইভের জন্য।

পল্লব বলেছিল, চুপ কর। তুই বিরাট ছ'ফুটিয়া বুলেটবাজ হতে পারিস কিন্তু গাড়িটা আমি তোর থেকে ভাল চালাই।

অমিয় বলেছিল, সে অনেক দিন ধরে চালাচ্ছিস বলে। রেগুলার চালাচ্ছিস বলে। আমি যদি রেগুলার চালাতাম

আরে রাখ রাখ। কী হলে কী হতো ও সব কথার কোনও ভ্যালু নেই। আমি নিয়ে যাচ্ছি চুপ করে বোস।

বাইপাসে গাড়ি চালানো আর পাহাড়ে গাড়ি চালানোর ডিফারেন্স আছে। আমার পাহাড়ি রাস্তায় চালানোর ট্রেনিং আছে হ্যাঁ?

ও রে আমার তেনজিং নোরগে।

বোঝাই যাচ্ছে কে গাড়ি চালাবে তাই নিয়ে ঝামেলা বেঁধেছিল। শেষপর্যন্ত মধ্যস্থতা করেছিল তিতাস। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, দার্জিলিং থেকে সোনাদা অবধি চালাবে অমিয় আর সোনাদা থেকে চটকপুর অবধি পল্লব।

গাড়ি রওনা দিয়েছিল। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে পল্লব গুনগুন করে গান গাইছিল, 'টুং, সোনাদা, ঘুম পেরিয়ে/আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে/যখনতখন পৌঁছে যাওয়া যায়', আর মাঝে মাঝে অমিয়কে জ্ঞান দিচ্ছিল, আরে ডাউনওয়ার্ডস যাচ্ছিস থার্ড গিয়ারে? ব্রেক পুড়ে যাবে তো! নাহ আজ আর যাওয়া হল না।

অমিয় উত্তর দেয়নি এবং ব্রেকও পোড়েনি। নির্বিঘ্নেই সোনাদা অবধি পৌঁছে গেছিল ওরা। ড্রাইভারের সিট পল্লবকে ছেড়ে নেমে এসেছিল অমিয়। অমিতাভ বচ্চনের মতো রাজকীয় ভঙ্গিতে স্টিয়ারিং ধরেছিল পল্লব এবং প্রথম বাঁক ঘুরতে না ঘুরতেই একটা পাথুরে গাড্ডায় ফেলে পেছনের চাকার অ্যাক্সেল বেঁকিয়ে দিয়েছিল।

সোনাদা থেকে মেকানিক ধরে আনতে হয়েছে এবং এখন গাড়ি মেরামতি চলছে। অমিয়রা তিন জন দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধারে আর কিছুটা দূরে একটা উঁচু পাথরের ওপর বসে উদাস মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে পল্লব। সে নানা যুক্তি দিতে গেছিল কিন্তু কেউ তার সে যুক্তিতে কর্ণপাত করেনি এবং তাকে নিয়ে ব্যাপক হাসাহাসি করেছে। তার পর থেকেই পল্লবের মধ্যে এই বৈরাগ্য দেখা দিয়েছে।

তিতাস বলল, এর পরে আর নেটওয়ার্ক পাব না। বাড়িতে একটা ফোন করে দিই বুঝলি?

ফোন হাতে তিতাস একটু এগিয়ে যেতেই অমিয়র দিকে তাকাল মিতুল। অমিয় একটা চামড়ার জ্যাকেট পরে আছে। গতকাল দার্জিলিং-এর মহাকাল মার্কেট থেকে অমিয়র জন্য গরম জামা কেনা হয়েছে। অমিয় তো শিলিগুড়ি যাবে বলে প্যাকিং করেছিল। ফলে তার কাছে গরম জামাকাপড় কিছুই ছিল না। এই সময় চটকপুরে বেজায় ঠান্ডা পড়ে। তাই তিতাসই ওদের নিয়ে বেরিয়েছিল শপিং করতে। এই জ্যাকেটটা মিতুল কিনে দিয়েছে অমিয়কে। পল্লবদাদা আর তিতাসদিদিকেও একটা করে সুন্দর সোয়েটার কিনে দিয়েছে সে। পল্লবদাদাটা পাগল। ম্যালে প্রায় যত লোক ছিল সব্বাইকে ডেকে ডেকে বলেছে, ইয়ে দেখিয়ে, ইয়ে সোয়েটার মেরা বোন মতলব বহিন খরিদকে দিয়া। গিফট গিফট।

মিতুল জানে অমিয় খুব খুশি হয়েছে জ্যাকেটটা পেয়ে কিন্তু মুখে প্রকাশ করছে না। মিতুল অবশ্য এই গাম্ভীর্যের কারণটা বুঝে গেছে। শিলিগুড়িতে অমিয়র কাজ মেটার পর দার্জিলিংয়ে পৌঁছে ওরা গিয়ে উঠেছিল তিতাসের চেনা হোটেলে। তিতাস আগে থেকেই জানিয়ে রেখেছিল, ওরা চার জন আসবে। রিসেপশনে দাঁড়িয়ে দু'টো ঘরের বুকিং চেয়েছিল তিতাস। হাঁ হাঁ করে উঠেছিল মিতুল, কেন কেন দু'টো ঘর কী হবে?

তিতাস অবাক হয়ে বলেছিল, দু'টো ঘরই তো লাগবে। একটায় আমি আর পল্লব থাকব। আর একটায় তুই তোর বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে থাকবি।

ঘাড় গোঁজ করে মিতুল বলেছিল, না।

না মানে?

হয় একটা ডর্ম নাও। সবাই একসাথে থাকব নয়তো আমি তোমার সাথে থাকব। ও আর পল্লবদাদা এক ঘরে থাকুক।

তিতাস কিছু বলতে যাওয়ার আগে পল্লব বলে উঠেছিল, আই হ্যাভ নো ইস্যু। বারো বছর পরে আমার কাছে তিতাসও যা অমিয়ও তাই। ভাই ভাই।

পল্লবের বোকামিতে বিরক্ত হয়েছিল তিতাস। ধমকে উঠেছিল, সব ব্যাপারে কথা বলিস কেন তুই? দু'টো ঘরই নেওয়া হবে আর তুই চুপচাপ বাধ্য ছেলের মতো আমার সঙ্গে থাকবি।

অমিয় মিনমিন করে বলেছিল, না না আমি আর পল্লবই তো ঠিক আছি।

ফের কিছু বলতে যাচ্ছিল তিতাস তার আগেই তার হাত দু'টো চেপে ধরেছিল মিতুল। কাতর গলায় বলেছিল, প্লিজ, একটু বোঝো।

এর পর মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে পল্লবের পিছু পিছু একটা ঘরে ঢুকে গেছিল অমিয়। সেই থেকেই গম্ভীর হয়ে আছে সে। মিতুলের সঙ্গে খুব প্রয়োজন ছাড়া কথা বলছে না।

পল্লব এখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে। কিছুটা দূরে তিতাস ফোনে কথা বলছে। অমিয়র জ্যাকেটের হাতা ধরে আলতো টান দিল মিতুল। ঘুরে তাকাল অমিয়। তার মুখ দেখে ফিক করে হেসে ফেলল মিতুল। বলল, কী হয়েছে? মুখটা অমন প্যাঁচার মতো করে আছ কেন?

গলাটাকে যথাসম্ভব ব্যারিটোনে রেখে অমিয় বলল, সেটা তোমায় না ভাবলেও চলবে।

ফের হাসল মিতুল, তাই বুঝি? ভাবার আরও লোক আছে তা হলে?

এ বার মিতুলের চোখে চোখ রেখে তাকাল অমিয়, একদম বাজে কথা বলবে না। তোমার মাথার ঠিক নেই।

যাহ বাবা! আমি কী করলাম?

এত হুজ্জুত করে আমাকে নিয়ে এলে তার পর তিতাস যখন দু'টো ঘর বুক করতে চাইল তখন বাগড়া দিলে কেন?

কয়েক মুহূর্ত অমিয়র দিকে হাসিমাখা চোখে তাকিয়ে রইল মিতুল। তার পর আচমকা অমিয়র নাকটা নেড়ে দিয়ে বলল, অত খায় না রে হেংলুরাম। চটকপুরে গিয়েও তিতাসদিদির সাথেই থাকব।

প্রচণ্ড ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল অমিয় আর হাসতে হাসতে মিতুল এগিয়ে গেল তিতাসের কাছে। মনে মনে শিউরে উঠল অমিয়, এ মেয়ের গতিক সুবিধের ঠেকছে না। নির্ঘাৎ তিতাসের পাল্লায় পড়ে শক্তি, সুনীল, ভাস্কর চক্কোত্তি পড়া শুরু করেছে। কবিগুলো মহা বদ। শুধু বদ না, খচ্চর। বাচ্চা মেয়েদের না পাকিয়ে এদের শান্তি নেই। মিতুলের ওপর খুব রাগ হতে শুরু করল অমিয়র কিন্তু রাগের ফাঁক দিয়ে অন্য একটা অনুভূতি আচমকাই আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে। আশ্চর্য হয়ে অমিয় অনুভব করল, মিতুলের রহস্যময়তা এই ঠান্ডার দেশেও তাকে উষ্ণ করে তুলছে ভেতরে ভেতরে। প্যান্টের জিপারটা বেশ আঁট হয়ে উঠেছে দেখে লজ্জায় লাল হয়ে গেল অমিয়।

. . .

গাড়িটা যখন ঠিক হল ততক্ষণে সূর্য হেলে পড়েছে। সাড়ে চারটে বাজছে। অমিয় বলেছিল, আমার মনে হয় আমাদের সোনাদাতেই কোথাও থেকে যাওয়া উচিত। এখান থেকে চটকপুর পৌঁছতে ঘণ্টা দু'-আড়াই তো লাগবেই। রাতের বেলা এই রাস্তায় গাড়ি চালানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

তিতাস বলেছিল, আমারও তাই মনে হয়। এক দিন হোমস্টের টাকা নষ্ট হবে। সে হোক। কাল সকালেই যাব। আমাদের তো ফেরার তাড়া নেই।

কিন্তু বেঁকে বসেছিল পল্লব। বাচ্চাদের মতো জেদ করতে শুরু করেছিল, হয় সে এখনই যাবে নয়তো আর যাবেই না। ওরা ঘুরলে ঘুরুক, কাল সকালে শিলিগুড়ি থেকে বাস ধরে সে ফিরে যাবে কলকাতা।

নরমে গরমে তিতাস বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু লাভ হয়নি। তিতাস বুঝেছিল, গাড়ি চালানো নিয়ে প্যাঁক দেওয়ায় পল্লবের তার কেটে গেছে আর তারকাটা পল্লব ষাঁড়ের মতো জেদি, শরৎবাবুর গল্পের নায়িকার মতো অভিমানী এবং গাধার চেয়েও বুদ্ধিহীন। অগত্যা গাড়ি উঠতে শুরু করেছিল এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি রাস্তা ধরে।

পাহাড়ের বুকে সন্ধে নামে ঝুপ করে। তাই মিনিট পনেরো গাড়ি চলতে না চলতেই আঁধার ঘনিয়ে এসেছিল প্রাচীন সব মহাবৃক্ষের পাতার ভাঁজে ভাঁজে। কেউ যেন মিহি রেশমি চাদরের মতো করে বিছিয়ে দিচ্ছিল কুয়াশা। ঝিঁঝিঁর ডাকের সাথে পাল্লা দিয়ে সে কুয়াশা ঘনতর হয়ে উঠছিল ক্রমশ। তাকে ভেদ করে দিশা দেখাতে দম বেরিয়ে যাচ্ছিল হেডলাইটের। ফগলাইটগুলোও জ্বালিয়ে দিয়েছিল পল্লব কিন্তু তাতেও বিশেষ সুবিধে হচ্ছিল না। তিতাস বেশ বুঝতে পারছিল, ভারী মাইনাস পাওয়ারের চশমা চোখে নিয়ে এই রাস্তায় গাড়ি চালাতে পল্লবের প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। সে বলে উঠেছিল, অনেক বাহাদুরি হয়েছে। অমিয়কে চালাতে দে।

কথা বাড়ায়নি পল্লব। চুপচাপ নেমে এসেছিল ড্রাইভিং সিট থেকে। ফের যেন অনির্দেশ্যের দিকে চলতে শুরু করেছিল গাড়িটা। সবাই চুপ করে বসেছিল। কেউ কোনও কথা বলছিল না। সিগারেট খাওয়ারও উপায় নেই। কাচ নামালেই হাড় জমিয়ে দিচ্ছে ঠান্ডা। গোটা পাহাড়টাই কেমন যেন জবুথবু হয়ে গেছে হঠাৎ করে। ঘণ্টা দু'য়েক এ ভাবেই চলল কিন্তু একটা চড়াইতে ওঠার পর ওরা যা দেখল তাতে ওদের সব্বার মন ভাল হয়ে গেল একসাথে। এতক্ষণ গোমড়া হয়ে থাকা পল্লবও বলে উঠল, ওহ মাই গড!

জঙ্গলের মধ্যে একটা ছড়ানো জায়গা। একটা রাস্তা চলে গেছে সোজা আর একটা বাঁ দিকে। ঠিক এই জায়গাটাতে এসেই যেন কেউ এক টানে ছিঁড়ে দিয়েছে কুয়াশার একঘেয়ে চাদর। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। বাঁ দিকের জঙ্গল ঢালু হয়ে নেমে গেছে নীচের দিকে তাই দৃষ্টিসীমা উন্মুক্ত হয়েছে দিগন্তে। সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। চাঁদের আলো পিছলে যাচ্ছে তার মোমের শরীরে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওরা চার জন নেমে এল গাড়ি থেকে। এ দৃশ্য পৃথিবীর নয়। এমন দৃশ্যকে বর্ণনা করার জন্যই অপার্থিব শব্দটির জন্ম হয়েছে। বিভোর হয়ে নগাধিরাজ হিমালয়ের দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। এই অসহ্য সৌন্দর্য কেমন যেন ঘোর লাগিয়ে দিল ওদের চোখে। মায়াকাজল পরিয়ে দিল আঁখিপল্লবে। হারিয়ে গেল সময়জ্ঞান। তাই ওরা কেউ খেয়াল করল না, জঙ্গলের সমস্ত শব্দ কমে আসছে ধীরে ধীরে। যেন কারও আগমনের ইঙ্গিতে নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছে এই আদিম অভয়ারণ্য। গাছের পাতাগুলি যেন ফিসফিস করে বলছে, চুপ! চুপ! সে আসছে। সে মোটে কোলাহল পছন্দ করে না। সে আসছে। সে আসছে চুপ! চুপ!

তার পর আচমকাই সম্পূর্ণ শব্দহীন হয়ে গেল বিস্তীর্ণ অরণ্যবনানী।

সৌন্দর্যের একটা অমোঘ আগ্রাসন রয়েছে। সেই টানেই ওরা যে আরও কতক্ষণ ওখানেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকত তার ঠিক নেই, কিন্তু ওদের সাড় ফিরে এল একটা আচম্বিত চিৎকারে। সেই নিস্তব্ধ পাহাড়ি জঙ্গলে চিৎকারটি এতটাই বিসদৃশ ও অসঙ্গতিপূর্ণ যে প্রথমটায় ওদের কানে তালা ধরে গেল আর পরমুহূর্তে একসাথে চমকে উঠল ওরা। মিতুল তো ভয় পেয়ে তিতাসের হাত খামচে ধরল। ঘুরে তাকিয়ে ওরা অবাক হয়ে গেল। এক পাহাড়ি যুবক দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছুটা দূরেই। তার জামাকাপড় শতছিন্ন এবং ময়লা। গালে অনেক দিনের না কামানো দাড়ি। মাথার চুলে জট পড়েছে অবহেলায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের তার চোখ দু'টি। সে দৃষ্টিতে যেন এসে ভিড় করেছে সারা পৃথিবীর ভয়। সেই হাত নেড়ে নেড়ে চিৎকার করছে, ভাগো, ভাগো। জান পেয়ারি তো জলদি ভাগো। ও আ রহি হ্যায়। ও আ রহি হ্যায়।

বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে অমিয় জিজ্ঞেস করল, কৌন হ্যায় আপ?

উত্তর দিল না যুবকটি। বিড়বিড় করে একটাই কথা বলতে লাগল, ভাগো ভাগো। ও আ রহি হ্যায়। তার পর এ দিক ও দিক তাকিয়ে কিছু যেন শোঁকার চেষ্টা করল। কিছুর একটা গন্ধ পেয়েছে সে। ভয়ে কুঁকড়ে থাকা চোখ দু'টি বিস্ফারিত হয়ে গেল এবং প্রাণভয়ে ভীত একটা খরগোশ বাচ্চার মতোই দৌড়ে মিলিয়ে গেল জঙ্গলের বাঁকে। যেমন অতর্কিতে এসেছিল তেমন ভাবেই চলে গেল সে। কিন্তু ফেলে রেখে গেল একটা গা শিরশিরে অনুভূতি, অভূতপূর্ব এই সৌন্দর্যের মধ্যে বেশ কিছুটা ভীতিউদ্রেককারী অস্বস্তি। তখনই কাঞ্চনজঙ্ঘার মাখনরঙা চুড়োটাও ঢেকে দিল বেশ বড় এক খণ্ড কালো মেঘ। তিতাসের হাতটা শক্ত করে ধরে ফ্যাসফ্যাসে গলায় মিতুল বলে উঠল, কে ও? আর কার আসার কথা বলছে? কে আসছে?

মিতুলকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করল তিতাস, তবু নিজের গলাটাই বড্ড নড়বড়ে শোনাল তার কাছে, কে আবার আসবে? আমার তো মনে হয় ওনার মাথা খারাপ। না রে পল্লব?

পল্লবও একটু থমকে গেছে। থেমে থেমেই বলল, তাই তো মনে হয়। না, এখানে দাঁড়িয়ে থাকাটা আর ঠিক নয়। চল এগোই। চারদিকটা হঠাৎ কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে খেয়াল করেছিস?

গম্ভীর ভাবে মাথা নাড়ল অমিয়, হুম। দিস ইজ ভেরি আনইউজুয়াল। জঙ্গল ভীষণ লাইভলি একটা এনটিটি কিন্তু পার্টিকুলার এই জায়গাটায় যেন কোনও প্রাণ নেই। কমপ্লিট লাইফলেস। যখন এসেছিলাম তখনও কিন্তু এমন ছিল না।

পল্লব বলল, হ্যাঁ সেই জন্যই তো বলছি চল। কেন জানি না মনে হচ্ছে সামথিং ইজ হ্যাপেনিং। কিছু একটা ঘটছে আমাদের অগোচরে।

এই বলে পল্লব গাড়ির দিকে এগোতেই অমিয় বলে উঠল, দাঁড়া পল্লব। একটা গ্লিচ আছে। মনে হচ্ছে রাস্তা হারিয়েছি।

চমকে উঠল বাকিরা। কিন্তু কেউ কিছু বলার আগেই অমিয় দু'হাত তুলে অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, সরি সরি, মাই ব্যাড। রাস্তা হারাইনি। গুলিয়েছি। ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। আসলে আমার যতদূর মনে আছে, এখান থেকে একটা রাস্তা যায় লেকের দিকে আর একটা রাস্তা চটকপুর। এখানে কোন রাস্তাটা আমি ডিসাইড করতে পারছি না। চল পল্লব, চট করে একটু এগিয়ে দেখে আসি। একটু গেলেই আমি বুঝে যাব।

প্রায় আর্তনাদ করে উঠল মিতুল, গিয়ে দেখে আসবে মানে?

অমিয় এগিয়ে এল মিতুলের কাছে। কাঁধে হাত রেখে বলল, ভয় পেয়ো না মিতুল। ওই পাগলাটে লোকটা এসে আমাদের কনফিডেন্সে হালকা চিড় ধরিয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু ও সব কিচ্ছু না। কী সুন্দর চাঁদের আলো আছে। জাস্ট এই একটু ওপরে গেলেই আমি বুঝে যাব কোনটা ঠিক রাস্তা। তুমি আর তিতাস দাঁড়াও। আমরা যাব আর আসব। গাড়ির ইঞ্জিন, হেডলাইট সব অন করে যাচ্ছি। এই আওয়াজে কোনও বন্য জন্তুও কাছে আসবে না। নাথিং টু ওরি। পল্লব, কাম অন, রাস্তার পাশের একটা গাছের ডাল ভেঙে হাতে নিয়ে নিল অমিয়। হাঁটতে শুরু করল সামনের দিকে।

পল্লবের মোটেই এই মুহূর্তে ভাস্কো ডা গামা হতে ইচ্ছে করছিল না। সে বলল, গাড়িটা নিয়েই চল না। হেঁটে যাওয়ার কী দরকার?

অমিয় বলল, আরে বোকাটা! এখানে সরু রাস্তা, গিয়ে যদি দেখি ভুল রাস্তায় এসেছি, গাড়ি ঘোরাতে পারব না। প্রমিস, বেশি হাঁটাব না। একটু গেলেই আমি বুঝতে পারব।

শিওর?

শিওর।

চল তবে, ব্যাজার মুখে হাঁটা দিল পল্লব।

ওরা দু'জন চলে যেতেই জায়গাটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শব্দ বলতে শুধু গাড়ির ইঞ্জিনটা গরগর করছে। তিতাস বলল, বাইরে ঠান্ডা লাগছে। আয় মিতুল, ভিতরে গিয়ে বসি।

গাড়ির দরজাটা খুলতে গিয়েই থমকে গেল তিতাস। এক ঝলক তীব্র সুগন্ধ এসে ঝাপটা মারল নাকে। চমকে ফিরে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল মিতুলও গন্ধটা পেয়েছে। বিস্ময়ে বড়বড় হয়ে গেছে তার দুই চোখ। সে বলল, কী সুন্দর গন্ধ দেখেছ তিতাসদিদি?

সত্যিই এ সুগন্ধের চরিত্র মনোমুগ্ধকর। তীব্র অথচ মাথা ধরিয়ে দেয় না। অদ্ভুত একটা বন্য ছন্দ যেন লুকিয়ে আছে এই গন্ধের পরতে পরতে। তিতাস বলল, কোত্থেকে আসছে বল দেখি গন্ধটা?

মিতুল বলল, বুঝতে পারছি না। তবে খুব কাছ থেকেই আসছে।

হুম। মনে হচ্ছে যেন অনেক ফুল একসঙ্গে ফুটেছে! এতক্ষণ তো ছিল না গন্ধটা!

সেটাই তো! এমন হঠাৎ করে ফুল ফোটে না কি?

তিতাস হেসে বলল, ফুটতেই পারে। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানো হোরাশিও? জানিস তো মিতুল, ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি জ্যোৎস্না রাতে না কি নানা অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড হয়। মনে হচ্ছে এখানেও তেমন কিছু হচ্ছে। আয় তো দেখি, গন্ধটা আসছে কোত্থেকে?

বেশ ঘাবড়ে গেল মিতুল, থাক না তিতাসদিদি। কী দরকার?

আরে বোকা, শুধু দরকার দিয়ে দুনিয়া চললে তো মিটেই যেত। আয় আয়। কিচ্ছু হবে না। অমিয় ঠিক বলেছে। ওই মাথাপাগলা লোকটা আচমকা এসে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। এখন আবার আমার কনফিডেন্স ফিরে এসেছে। ওরা ফিরতে ফিরতে আমরা দেখে চলে আসব। এই চাঁদের আলোয়, পাহাড়ের বুকে তুই আর আমি যদি একটা নতুন অর্কিড আবিষ্কার করে ফেলি কেমন দুর্দান্ত ব্যাপার হবে ভাবতে পারছিস?, অনিচ্ছুক মিতুলের হাত ধরে সুগন্ধের উৎস সন্ধানে হাঁটা লাগাল তিতাস।

কিছুটা গিয়েই কিন্তু মিতুলের বেশ ভাল লাগতে শুরু করল। গন্ধটার মধ্যে একটা নেশা নেশা ব্যাপার আছে। মনে হয়, গন্ধটা কেমন যেন আদর হয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে শরীর জুড়ে।

চাঁদের আলোয় এত তেজ হয় মিতুলের জানা ছিল না। সব যেন একেবারে ঝকঝক করছে। কে বলবে একটু আগে কুয়াশায় দু'হাত দূরের জিনিসও ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না? কিন্তু কিছুটা গিয়েই ওরা বুঝতে পারল, গন্ধটা কোনও একটা বিশেষ জায়গা থেকে আসছে না। যেন চারপাশে বাতাসের মধ্যে থেকেই এই গন্ধের জন্ম হচ্ছে। নয়তো সারাক্ষণ গন্ধটা এমন করে ঘিরে থাকছে কী ভাবে? হতাশ হয়ে ফিরে আসতে যাবে তখনই মিতুলের চোখ আটকে গেল একটা পাথুরে দেওয়ালে। বাকি আর কিছুর থেকে এই দেওয়ালটা যেন অতিরিক্ত চকচক করছে! দেওয়ালটা শ্যাওলায় ঢাকা কিন্তু একটা জায়গায় ত্রিভুজাকৃতি একটা খাঁজ তৈরি হয়েছে। অনেকটা যেমন পুরোনো দিনের বাড়িতে কুলুঙ্গি থাকত, তেমন। তিতাসের হাত ধরে টানল মিতুল, দেখো তিতাসদিদি।

মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে ত্রিকোণ খাঁজটার দিকে এগিয়ে গেল তিতাস। ভাল করে দেখে বলল, মনে হচ্ছে এখানে কোনও একটা মূর্তি খোদাই করা আছে কিন্তু শ্যাওলায় ঢেকে গেছে সবটা। তোর কাছে রুমাল আছে মিতুল?

রুমালটা তিতাসের হাতে না দিয়ে মিতুল নিজেই ঘষে ঘষে শ্যাওলা তুলতে শুরু করল। ওরা কেউ জানতেও পারল না তখনই অনতিদূরেই জঙ্গলের গভীরে পাতায় পাতায় জাগল তীব্র এক আলোড়ন। অমঙ্গলের আশঙ্কায় সঙ্কুচিত হয়ে উঠল পক্ষীকুল। তীব্র ভয়ে কন্দরে গিয়ে লুকোল বন্যজন্তুরা আর সেই মুহূর্তে বিশাল এক মহাবৃক্ষের বুক চিরে বেরিয়ে এল এক আলোকিত নারীর অবয়ব। আর এ দিকেও সেই সময় রুমাল দিয়ে সমস্ত শ্যাওলা ঘষে তুলে ফেলল মিতুল। ওরা অবাক হয়ে দেখল, পাথরের গায়ে খোদিত এক দেবীমূর্তি যা ওদের সম্পূর্ণ অচেনা। তিতাস হয়তো আরও একটু মন দিয়ে দেখতে চাইছিল কিন্তু দূর থেকে ভেসে এল পল্লব আর অমিয়র উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, তিতাস, মিতুল... কোথায় তোরা? মিতুল... তিতাস...

সময় নষ্ট না করে ওরা দ্রুত এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে। মিতুল ফেলে রেখে গেল তার শ্যাওলায় নোংরা হয়ে যাওয়া রুমালটি।

. . .

সাড়ে সাতটা নাগাদ ওরা এসে পৌঁছল চটকপুরের হোমস্টে-তে। এ বারও সেই এক ব্যবস্থা। একটা ঘরে তিতাস আর মিতুল। অন্য ঘরে অমিয় আর পল্লব। অমিয়র দিকে একটা চোরা চাহনি দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল মিতুল। জুতো-মোজা ছেড়ে মিতুলই আগে ফ্রেশ হয়ে নিল। তার পর তিতাস ঢুকল বাথরুমে। মিতুল ভাবল, তিতাসদিদি বেরতে বেরতে আনপ্যাক করে নেওয়া যাক। কিন্তু চেয়ারের ওপর ট্রলিটা তুলে ঢাকনাটা খুলতেই ভয়ে, বিস্ময়ে জমে পাথর হয়ে গেল সে। চোখ দু'টো অবিশ্বাসে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল বাইরের দিকে। ফুলে উঠল নাকের পাটা। হৃদপিণ্ডটা যেন আটকে গেল গলার কাছে। ট্রলির মধ্যে সে যা দেখছে তা অসম্ভব, অবাস্তব। না না, এ কী করে হতে পারে?

ট্রলির ভিতর সমস্ত জামাকাপড়ের ওপরে নিশ্চিন্তে শুয়ে রয়েছে শ্যাওলা মাখা একটি রুমাল। মিতুল একশো শতাংশ নিশ্চিত, এই রুমালটিই সে কিছুক্ষণ আগে ফেলে এসেছে সেই ত্রিকোণ খাঁজের নীচে।

ঝাল ঝাল দিশি মুরগির ঝোল আর হাতেগড়া গরম রুটির মতো উপাদেয় খাদ্য খুব কমই আছে পৃথিবীতে। বাকিরা সবাই খুব তৃপ্তি করে খেলেও মিতুল কিন্তু একফোঁটা স্বাদ পাচ্ছিল না। অস্থির এক আশঙ্কা যেন তার সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলোকেই ভোঁতা করে দিয়েছে। মিতুল কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, ফেলে দেওয়া রুমালটা কী ভাবে চলে এল তার ট্রলির মধ্যে? তবে কি কোনও বিপদ হতে চলেছে? কিন্তু এই আশঙ্কার কথা সে কাউকে বলেনি। এমনকী তিতাসদিদিকেও না। সে চায় না, সবার বেড়ানোটা মাটি হয়ে যাক।

কী রে মিতুল? মুরগিটার জন্য মন খারাপ করছে? পল্লবের কথায় চমকে তাকাল মিতুল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কই না তো।

তা হলে অমন খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিস কেন? রান্না তো দিব্যি হয়েছে।

উৎকণ্ঠিত হয়ে তিতাস বলল, কী হয়েছে? খেতে ইচ্ছে করছে না? শরীর খারাপ লাগছে?

অমিয় বলল, ওর বোধ হয় গন্ধ লাগছে বুঝলি? মাটন, দিশি মুরগি এগুলো ঠিক ও খেতে পারে না। একটা ডিম ভেজে দিতে বলব?

সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে দেখে ভারী লজ্জা পেল মিতুল। জোর করে রুমালের ভাবনাটা দূর করে খাওয়াতে মন দিল সে। ভাদুড়িদাদু একটা কথা খুব বলেন। তিনি বলেন, 'যেটা তোমার কন্ট্রোলের বাইরে সেটা নিয়ে ভেবে মাথা খারাপ কোরো না। যখন যেটা হবে দেখা যাবে। অবস্থা বুঝে পরিস্থিতির সাথে লড়াই করতে হবে।' আপাতত সেটা ভেবেই নিজেকে শক্ত করল মিতুল।

খাওয়া শেষ করেই যে যার কম্বলের তলায় ঢুকে গিয়েছিল ওরা। সেই ভোর তিনটে থেকে দৌড়াদৌড়ি চলছে। এক মুহূর্তের জন্য বিশ্রাম হয়নি। ঘুম জড়িয়ে আসছিল ওদের সকলেরই চোখের পাতায়। কম্বল মুড়ি দিয়ে তিতাসদিদির সঙ্গে দু'চারটে কথা বলতে বলতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে মিতুল খেয়াল করেনি। ঘুম ভাঙল যখন, তখন অনেক রাত। বালিশের পাশে রাখা মোবাইলের ঘড়িতে মিতুল দেখল রাত প্রায় সোয়া দুটো। একটু একটু হিসি পাচ্ছে বটে কিন্তু এই শীতের রাতে জল ঘাঁটতে হবে ভাবলেই গায়ে জ্বর আসছে। মটকা মেরে পড়ে রইল মিতুল।

একদম গায়ে গায়ে দু'টো ঘর নেওয়া হয়েছে। ঘর দু'টোর একই সেট-আপ। দরজা দিয়ে ঢুকে ডান দিকে বাথরুম। বাঁ দিকে একটা খাট। খাটের গায়েই জানলা। এই খাটের একদম সোজাসুজি উল্টো দিকে আরও একটা খাট। সে খাটও জানলার গায়েই। ও দিকেও একটা দরজা আছে বটে কিন্তু সেটা দিয়ে বেরনো যায় না। বাইরে থেকে বন্ধ। ঘরের মাঝখানে দেওয়াল ঘেঁষে টেবিল আর চেয়ার পাতা। ছিমছাম ব্যবস্থাপনা। হোম-স্টের মালিক পেমা শেরপা জানিয়েছিল, দু'টো ঘরেই যে দরজা দিয়ে ঢুকতে হয় সে দিকের জানলা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তাই তিতাসদিদির কাছে আবদার করে এই খাটটা চেয়ে নিয়েছিল মিতুল।

সন্ধেবেলায় একবার চন্দ্রালোকিত নগাধিরাজকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। মিতুলের ভারী লোভ হল। কনুইতে ভর দিয়ে সে জানলার পর্দা সরিয়ে দিল খানিকটা। নাহ, দেখা যাচ্ছে না। বড্ড কুয়াশা। তবে একেবারে হতাশও হল না মিতুল, এই চাঁদের আলোয় কুয়াশামাখা ঘুমন্ত পাহাড় তার অন্তরকে হঠাৎই দ্রব করে দিল। মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় বইতে পড়া সেই বিশাল কচ্ছপটার কথা। যার পিঠে এমন করেই গজিয়ে উঠেছিল একটা আস্ত পৃথিবী। মিতুলের মনে হচ্ছিল, সবটাই বুঝি স্বপ্ন। এক্ষুনি সেই বুড়ো কচ্ছপটা ঘুম ভেঙে চলতে শুরু করবে আর চোখের সামনে এই কুয়াশাঘেরা পাইন বনটাও চলতে শুরু করবে ধীরে ধীরে। হাঁ করে বাইরের দিকে তাকিয়েছিল সে। বাইরে 'ওম মণিপদ্মে হুম' লেখা তিব্বতি পতাকা টাঙানো। সেগুলোর ওড়াউড়ি দেখে বোঝা যাচ্ছে, বেশ হাওয়া দিচ্ছে বাইরে। হঠাৎই অমিয়র কথা মনে পড়তে লাগল মিতুলের। মানুষটা ঘুমোচ্ছে পাশের ঘরে। আহা রে! বেচারা মনখারাপ করেছে। খুব চেয়েছিল, মিতুলের সঙ্গে এক ঘরে থাকতে। তা মিতুলও কি চায়নি? কিন্তু লজ্জাশরম বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। যত যাই হয়ে যাক, পল্লবদাদা আর তিতাসদিদির সামনে সে কিছুতেই মানুষটাকে নিয়ে ঘরে দরজা দিতে পারবে না। তাতে যদি মানুষটা তাকে ভুল বোঝে তো সে ভুল ভাঙানোর উপায় মিতুলের জানা আছে। আধশোয়া হয়ে এ সব ভাবতে ভাবতেই জানলা থেকে চোখ সরিয়ে ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়েছিল মিতুল, হঠাৎই তার কানে এল একটা বিজাতীয় শব্দ। কম্বলের ওমের মধ্যে থেকেও মুহূর্তে খাড়া হয়ে গেল মিতুলের গায়ের রোম! কোন ফাঁক দিয়ে যেন কম্বলের ভিতরে ঢুকে পড়ল পাহাড়ের সমস্ত ঝোড়ো হাওয়া! জমিয়ে দিল হাড়মজ্জা। দাঁতে দাঁত লেগে গেল নিমেষে। নিজেকে প্রাণপণে সামলাতে সামলাতে মিতুল বুঝতে পারল, ঠান্ডায় নয়, তার শরীর আচমকা বিদ্রোহ করে উঠেছে ভয়ে। একটা মেয়েগলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর শব্দটা আসছে মিতুল যে জানলা দিয়ে এতক্ষণ পাহাড়ের দিকে তাকিয়েছিল, ঠিক তার বাইরে থেকে। ভয় পেলেও মানুষের প্রতিবর্ত ক্রিয়া কাজ করে। সেই তাগিদেই শব্দটা কানে আসা মাত্র মিতুল জানলার বাইরে তাকাল কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। যত দূরে চোখ যায় কোনও জনমনিষ্যি নেই। অথচ কান্নার শব্দটা ভীষণ রকম জ্যান্ত। হাত, পা অসাড় হয়ে গেলেও চেতনা এখনও কাজ করছে। মিতুল বুঝতে পারল, যে কাঁদছে সে বসে আছে জানলাটার নীচের দেওয়ালে। তাই তাকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু এই গভীর রাতে, প্রবল শীতে কোন মেয়ে জানলার নীচের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে কাঁদবে? কেন কাঁদবে? আর সে এলই বা কখন? সে তো ঠায় বাইরের দিকে তাকিয়ে বসেছিল। এক মুহূর্তের জন্য চোখ সরিয়ে সে সিলিং-এর দিকে তাকিয়েছিল। ওইটুকু সময়ের মধ্যে কারও পক্ষেই তো এসে বসে পড়া সম্ভব না। তবে কি যে এসেছে বুকে হেঁটে এসেছে? মানুষ কি বুকে হাঁটে?

একটু অপেক্ষা করল মিতুল, তার শোনার ভুল নয় তো? নাহ, শোনায় কোনও ভুল নেই। ওই তো সে কাঁদছে। ফুঁপিয়ে চলেছে একঘেয়ে একটানা সুরে। যেন সারা পৃথিবীর বিষাদ মিশে আছে সেই কান্নায়।

মনস্থির করে ফেলল মিতুল, তিতাসদিদিকে ডাকতে হবে। গভীর নিশুতি রাতে অবাঞ্ছিত এই কান্না তার বুকের মধ্যে যে ভয়ের পশম বুনতে শুরু করেছে তার সাথে একা লড়াই করার মতো ক্ষমতা তার নেই। কোনও শব্দ না করে বিছানার ওপর উঠে বসল মিতুল। জানলাটা ফের পর্দা দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কোনও চেষ্টাই করল না। তার যে ঘুম ভেঙে গেছে বাইরে যে আছে তাকে কোনও ভাবেই জানাতে চায় না মিতুল। ধীরে ধীরে গা থেকে সরিয়ে দিল কম্বল। মাটিতে পা রাখল কিন্তু কী যেন একটা ঠেকল পায়ে। কাচের জানলা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় মিতুল দেখল, তার পায়ের নীচে পড়ে আছে সেই শ্যাওলামাখা রুমাল। যেটা সে খেতে যাওয়ার আগে টিস্যু পেপারে মুড়ে ফেলে দিয়েছিল বাথরুমের ডাস্টবিনে!

মিতুল বুঝতে পারল, পরিস্থিতি হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে এবং কী ভাবে এই পরিস্থিতির সাথে লড়তে হয় সে সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই তার। ভয়টা ক্রমশ তার পা বেয়ে উঠে আসতে লাগল। ছড়িয়ে পড়তে লাগল রক্তস্রোতের মধ্যে আর ঠিক তখনই 'দুপ' করে একটা শব্দ হল। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের বিরতি, তার পর ফের 'দুপ', এবং তার পর আবার। গা'টা কেমন যেন গোলাতে লাগল মিতুলের। ভাবনার পারম্পর্যও গুলিয়ে যেতে লাগল একটু একটু করে। ও দিকে কান্না কিন্তু থামেনি, শুধু এই অতিরিক্ত শব্দটা যোগ হয়েছে। কেউ যেন কাঁদতে কাঁদতে মাথা ঠুকছে জানলার নীচের দেওয়ালে আর একটা জায়গায় ঠুকছে না। পর পর তিন জায়গায় ঠুকছে আর তাই এমন শব্দ হচ্ছে, 'দুপ' 'দুপ' 'দুপ'।

স্থানুর মতো বসে রইল মিতুল। উঠে তিতাসকে ডাকতে যাওয়া তো দূর, পা দু'টোকে ফের খাটে তুলে নেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে সে। কতক্ষণ যে সে ও ভাবে বসেছিল মিতুল জানে না। সাড় ফিরল তিতাসের চিৎকারে।

মিতুল, বলে চিৎকার করে ধড়মড় করে খাটের ওপর উঠে বসেছে তিতাস। তার চোখমুখে তীব্র অবিশ্বাস এবং আতঙ্ক মিলেমিশে আছে। আর সেই অনুভূতি এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছে তিতাসকে যে মাঝরাতে মিতুল কেন এ ভাবে বসে আছে সে প্রশ্ন তার মাথায় এল না। সে উদ্বিগ্ন গলায় বলে উঠল, মিতুল, একটা মেয়ে যেন কাঁদছে আর মাথা ঠুকছে! এই আমার দিকের জানলাটার ঠিক বাইরে!

ফ্যাসফ্যাসে গলায় মিতুল বলে উঠল, তিতাসদিদি, আমার দিকে জানলার বাইরেও একই জিনিস হচ্ছে!

স্তব্ধ হয়ে গেল তিতাস। কান্না এবং সেই 'দুপ' 'দুপ' 'দুপ' আওয়াজ এখন ঘরের দু'দিক দিয়েই আসছে। যেন একই সময়ে এক জনই দু'দিকে অবস্থান করছে। নয়তো এমন অত্যাশ্চর্য তালমিল সম্ভব না। তিতাস বুঝল, মিতুল ভয় পেয়েছে। কিন্তু সে কী করে সান্ত্বনা দেবে মিতুলকে? সে তো নিজেও আতঙ্কিত। তবু নিজের মনকে শক্ত করল তিতাস। সে বড়। তার অনেক দায়িত্ব। মিতুলকে সাহস দিতে হবে। দরকারে পল্লব আর অমিয়কে ডেকে তুলতে হবে। জানতে হবে এই অদ্ভুত ঘটনার কার্যকারণ। খাট থেকে নামতে চাইল তিতাস আর তখনই সে খেয়াল করল, কান্নার শব্দ জায়গাবদল করছে। শুধু তিতাস না, মিতুলও খেয়াল করেছে। দু'জনেই কাঠ হয়ে বসে শুনল, সেই ফুঁপিয়ে ওঠা একঘেয়ে কান্না জানলার নীচ বরাবর এগিয়ে আসছে দরজার দিকে এবং একটা সময় পর তা যেন দুই দরজার তলা দিয়ে দু'দিক থেকেই গড়িয়ে গড়িয়ে ঢুকে পড়তে লাগল ঘরের মধ্যে। ঘনিয়ে উঠতে লাগল ঘরের মেঝে জুড়ে।

আর একটুর অপেক্ষা। তার পরেই আতঙ্কের নাভিমূল থেকে উঠে আসা সেই ক্রন্দন বুঝি ছুঁয়ে ফেলবে ওদের পায়ের পাতা।

খুব বিপদের সময়েও কখনও কখনও মানুষের মাথা আশ্চর্য রকম ঠান্ডা হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রেও তাই হল। আচমকা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তিতাস এবং ঘরের সব আলো জ্বেলে দিল আর দু'টো ঘরের মাঝে যে কাঠের দেওয়াল তাতে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠল, পল্লব... অমিয়।

তিতাসের ডাক এবং ওই জোরাল শব্দের মধ্যে যে তীব্র আকুতি ছিল তা অমিয় আর পল্লবের সুষুপ্তিকে ছিঁড়ে ফেলতে বিন্দুমাত্র সময় নেয়নি। এক সাথেই ঘুম ভেঙে গেল দু'জনের। এক মুহূর্তের জন্য দু'জন দু'জনের দিকে তাকাল, গায়ের কম্বল ছুঁড়ে ফেলে বেরিয়ে এল বাইরে।

পল্লব আর অমিয় এসে দাঁড়াতে দরজাটা খুলে দিয়েছিল তিতাসই। তার পর বসে পড়েছিল মিতুলকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে। মিতুল তখনও একটা ছোট্ট পাখির মতো কাঁপছে। তার সারা মুখ রক্তশূন্য।

পল্লব আর অমিয় একসঙ্গেই উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করল, কী হয়েছে? তোরা এমন করছিস কেন?

তিতাস কিছু বলার আগেই মিতুল কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল, বাইরে একটা মেয়ে কাঁদছিল আর দেওয়ালে মাথা ঠুকছিল। এক দিকে না। দু'দিকের দেওয়ালেই। আর কান্নাটা যেন দরজার তলা দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ঢুকে আসছিল ঘরে।

একটু থমকে গেল পল্লব। নরম গলায় বলল, স্বপ্ন দেখেছিস মিতুল?

প্রতিবাদ করে উঠল তিতাস, না পল্লব, স্বপ্ন নয়। আমরা দু'জনেই স্পষ্ট শুনেছি। ফিল করেছি। দু'জনে তো একসাথে ভুল শুনব না। তাই না?

কিন্তু এত রাতে কে কাঁদবে এখানে বসে? আর আমরা তো বাইরে কারও চিহ্ন দেখলাম না। আমাদের দেখে সে লজ্জা পেল না কি? শুধু মেয়ের সামনে কাঁদে, ছেলেদের দেখলে পালিয়ে যায় এ আবার কেমন কাঁদিয়ে?

কাতর চোখে পল্লবের দিকে তাকাল মিতুল। যেন বলতে চাইছে, মজা করছ পল্লবদাদা? আমাদের কষ্ট হচ্ছে আর তুমি হাসছ?

সারল্যমাখা এই দুই চোখের সামনে গুটিয়ে গেল পল্লব। বয়ান পাল্টে বলল, না, হতেই পারে। এমন অনেক কিছুই হয় যার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। আসলে...

কথা কেটে অমিয় বলল, বাদ দে এ সব। আমার মনে হয়, সবাই মিলে একবার বাইরে থেকে ঘুরে আসি চল। চারপাশটা দেখলে হয়তো কিছু বুঝতে পারব।

আঁতকে উঠল মিতুল, না, না। আমি যাব না। আমি যাব না।

এগিয়ে এল অমিয়। পরমাত্মীয়ের মতো হাতখানি রাখল মিতুলের ঠিক মাথার ওপর। সে হাতে মিশে আছে অনেকখানি ভরসা। মুখ তুলে তাকাল মিতুল। নরম গলায় অমিয় বলল, ভয় কি মিতুল? আমরা সবাই তো আছি। এসো, বাইরে এসো। আমি বলছি বাইরে এলে তোমার ভয়টা কেটে যাবে।

সবাই মিলে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল ওরা। কুয়াশাটা এখন যেন একটু কেটেছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা না গেলেও চাঁদের আলোয় অদূর উপত্যকার ঘুমন্ত পাইনবনানী দিব্যি দৃশ্যমান। বেশ হাওয়া দিচ্ছে। সে শৈত্য কেটে বসে যাচ্ছে খোলা চামড়ায়। যত দূর চোখ যায় কেউ কোত্থাও নেই। শুধু রূপোলী রেনু মেখে পিঠ পেতে শুয়ে আছে নীরব বনভূমি। অমিয় বলল, দেখেছ তো মিতুল কিচ্ছু নেই? আর ভয় পেয়ো না।

নিজেকে শক্ত করে তিতাসও হাত রাখল মিতুলের পিঠে, ঘাবড়াস না। অনেক সময় অমন হয়।

এ বার আর চুপ করে থাকল না মিতুল। বলে ফেলল, কিন্তু রুমালটা!

চমকে উঠল সবাই। তিতাস বলল, রুমাল মানে?

কাঁপা গলায় মিতুল বলল, যে রুমাল দিয়ে ওই মূর্তির শ্যাওলা ঘষে তুলেছিলাম, সেই রুমালটা ফিরে ফিরে আসছে তিতাসদিদি।

অবাক হল তিতাস, মানে?

মানে, রুমালটা আমি ওই ত্রিকোণ খাঁজটার নীচে ফেলে এসেছিলাম। ঘরে এসে দেখলাম, সেটা আমার ট্রলির মধ্যে। তার পর আমি ওটাকে টিস্যু পেপারে মুড়ে বাথরুমের ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওটা আবার ঘরের মধ্যে চলে এসেছিল।

হতবাক হয়ে গেল অমিয় আর পল্লব। মূর্তি, রুমাল, ত্রিকোণ খাঁজ এই ব্যাপারগুলো ওদের অজানা। তিতাসের দিকে তাকিয়ে পল্লব বলল, মূর্তি মানে? কীসের মূর্তি?

তিতাস বলল, তোদের বলা হয়নি। তোরা যখন রাস্তা খুঁজতে গেছিলি তখন আমি আর মিতুল হঠাৎ করে ফুলের গন্ধ পাই।

ফুলের গন্ধ?

হ্যাঁ রে। অদ্ভুত একটা গন্ধ। আমাদের ছাতিম ফুলের চেয়েও তীব্র অথচ অতটাও জোরাল নয়। মানে এমন গন্ধ আমি আগে কখনও পাইনি। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কোনও পাহাড়ি অর্কিড থেকে গন্ধটা আসছে। ওটাই খুঁজতে গিয়ে আমরা একটা দেওয়াল খুঁজে পাই যেটার এক পাশে কুলুঙ্গির মতো একটা তেকোণা খাঁজ করা আছে। কিন্তু অনেক দিন কেউ ও দিকে যায় না বলে হয়তো শ্যাওলা পড়েছে দেওয়াল জুড়ে। মিতুলের রুমাল দিয়ে সেই জায়গাটা পরিষ্কার করতেই দেখি পাথরে খোদাই করা একটা দেবীমূর্তি।

কোন দেবী?

সে আমি জানি না। অচেনা। তার পরই তোরা ডাকলি আর আমরা চলে এলাম।

মিতুল বলে উঠল, আর আমি শিওর ওখানেই রুমালটা ফেলে এসেছিলাম।

অমিয় বলল, এখন কোথায় রুমালটা?

মিতুল বলল, শেষ বার দেখেছি, খাটের সামনে মেঝেতে পড়ে আছে।

মিতুলের হাত ধরল অমিয়, চলো তো দেখি। ব্যাপারটা সন্দেহজনক লাগছে।

কথাটা বলে সবে ঘরের দিকে পা বাড়িয়েছে অমিয়, ঠিক তখনই গন্ধটা পেল ওরা। অমিয় আর পল্লবের কাছে গন্ধটা নতুন হলেও মিতুল আর তিতাসের যথেষ্ট পরিচয় আছে এই গন্ধের সঙ্গে। অস্ফুটে বলে উঠল তিতাস, এ তো সেই ফুলের গন্ধটা! এখানে কী করে এল!

ততক্ষণে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে পল্লব আর অমিয়। ওরাও এই অত্যাশ্চর্য গন্ধের উৎস সন্ধানে চারদিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ তিতাসদের ঘরের জানলাটার নীচে চোখ আটকে গেল পল্লবের। কী যেন লেগে রয়েছে জানলার নীচের দেওয়ালে। চাঁদের আলোয় চকচক করে উঠছে। সে বলল, ওগুলো কী?

পল্লবের কথায় সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষিত হল সে দিকে। পায়ে পায়ে জানলার কাছে এগিয়ে গেল ওরা। কিন্তু মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বেলে যা দেখল তাতে অন্তরাত্মা অবধি শিউরে উঠল ওদের। জানলার ঠিক নীচে দেওয়ালের গায়ে তিন জায়গায় পাশাপাশি সমান দূরত্বে লেগে রয়েছে টাটকা রক্ত! সে রক্ত গড়িয়ে নামছে দেওয়াল বেয়ে। তিতাসের কানে বেজে উঠল সেই 'দুপ' 'দুপ' 'দুপ'। কেউ যেন দেওয়ালে ঠুকে ঠুকে ফাটিয়ে ফেলেছে মাথা!

এই গভীর, নিশুতি, হিমেল হাওয়ার রাতে বিস্মিত, আতঙ্কিত ও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল চারটি প্রাণী। কী হচ্ছে বা কেন হচ্ছে সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই তাদের। তারা বুঝতেও পারছে না, কোন অজান্তে আদিম এক অভিশাপ গ্রাস করেছে তাদের দুই সঙ্গীকে। স্থাণুর মতোই দাঁড়িয়েছিল ওরা। আচমকাই এক ঝটকায় অমিয়র হাত ছাড়িয়ে ছুটে ঘরে ঢুকে পড়ল মিতুল। আকস্মিকতার প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে অমিয় চিৎকার করে উঠল, মিতুল, তার পর এক লাফে সেও গিয়ে ঢুকল ঘরে।

পল্লব আর তিতাস ঘাবড়ে গেছিল। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে পল্লব বলল, কী হল ব্যাপারটা?

কাঁপা গলায় তিতাস বলল, বুঝতে পারছি না। আয় দেখি।

ঘরে ঢুকে স্তম্ভিত হয়ে গেল পল্লব আর তিতাস। এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে ওদের চোখের সামনে। প্রচণ্ড ভয়ে বিস্ফারিত চোখে মিতুল পায়ে পায়ে পিছিয়ে যাচ্ছে দেওয়ালের দিকে আর তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে অমিয়। মিতুল তার হাত দু'টো জড়ো করে রেখেছে বুকের কাছে। যেন সে নগ্ন এবং প্রাণপণে নিজের আব্রু রক্ষার চেষ্টা করছে। তার আতঙ্কিত দৃষ্টি বলে দিচ্ছে সে অমিয়কে ভয় পাচ্ছে। ভাঙা ফ্যাসফ্যাসে গলায় সে বলছে, তাকিয়ো না। তাকিয়ো না আমার দিকে। আমার লজ্জা করছে। খুব লজ্জা করছে।

আরও দু'পা এগিয়ে গেল অমিয়। ঈষৎ কঠিন গলায় বলে উঠল, কী পাগলামি হচ্ছে মিতুল? কেন এমন করছ? এই তো আমি। এসো। আমার কাছে এসো।

হাত বাড়িয়ে দিল অমিয়, কিন্তু সেই স্পর্শ থেকে বাঁচতেই মিতুল যেন লাফিয়ে উঠে গেল খাটের ওপর। এক কোণে সিঁটিয়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, না না। চলে যাও। চলে যাও। আমার লজ্জা করছে।

চিৎকার করতে করতেই মিতুলের চোখ পড়ল দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা পল্লব আর তিতাসের ওপর। তাতে যেন সে আরও গুটিয়ে গেল। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে দু'হাতে মুখ ঢাকল, কেন এমন করছ তোমরা? কেন সবাই মিলে দেখছ আমায়? বলছি তো আমার লজ্জা করছে।

হতাশ মুখে ফিরে তাকাল অমিয়, এ কী বিপদ হল বল তো পল্লব? ও এমন করছে কেন? ওর কী হয়েছে আমি তো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। লজ্জা করছে মানেটা কী?

তিতাস বলল, তুই সরে আয়। আমি দেখছি।

খাটের এক কোণে কম্বলগুলোকে বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে থরথর করে কাঁপছিল মিতুল আর তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল তিতাস। কিন্তু খাটের কাছে গিয়ে আচমকা থমকে দাঁড়াল সে। পেছন ঘুরল এবং অমিয় আর পল্লবকে দেখে রীতিমতো আঁতকে উঠল। নিমেষে বদলে গেল তার চাহনি। অস্থির হয়ে উঠল আঁখিতারা দু'টি। তাতে এসে জড়ো হল রাজ্যের সংশয়। থরথর করে কেঁপে উঠল তিতাস। তার পর আব্রু রক্ষার মতো করে হাত দু'টো বুকের কাছে জড়ো করে অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল, দেখিস না। দেখিস না তোরা। আমার লজ্জা করছে। খুব লজ্জা করছে।

সকাল সাড়ে পাঁচটা। ঘুম ভাঙলেও তখনও বিছানা ছেড়ে উঠিতে পারেনি বারাসাত। আড়ামোড়া ভাঙছে। এমন সময় 'শ্রীরঞ্জনী' অর্থাৎ শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ির বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল একটি পুলিশের জিপ। জিপ থেকে নেমে এলেন বারাসাত থানার এএসআই দীপক পাল। অত্যন্ত দ্রুত পদক্ষেপে তিনি ঢুকে গেলেন বাড়ির ভিতর।

ঠিক কুড়ি মিনিট পর জিপটা যখন ফিরতি পথ ধরল তখন পেছনের সিটে দীপক পালের পাশে বসে আছেন ভাদুড়ি মশায়। চিন্তায় কুঁচকে আছে তাঁর ভ্রূযুগল। গম্ভীর গলায় তিনি বললেন, অমিয় তোমায় শুধু এটুকুই বলেছে?

দীপক পালের মধ্যেও একটা অস্থিরতা কাজ করছে। তিনি বললেন, হ্যাঁ স্যার। আর ওঁরা দু'জনেই খুব লজ্জিত আপনাকে এই বিড়ম্বনায় ফেলার জন্য।

মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। বললেন, আমার বিড়ম্বনাটা বড় কথা নয় দীপক। যে বিপদ লৌকিক তার চরিত্র আঁচ করা যায় কিন্তু যে বিপদ অলৌকিক তার শিকড় অবধি না পৌঁছলে সমাধানের আন্দাজ পাওয়া যায় না। আমাদের পৌঁছতে তো বেশ কিছুটা সময় লাগবে, আমার ভয় করছে, তার মধ্যে না নতুন কোনও বিপদ ঘটে। তিতাসের মতো শক্তিমতী মেয়ের হঠাৎ করে এই লজ্জা পাওয়া আমার মোটে ভাল ঠেকছে না।

ভাদুড়ি মশায় শুধু তিতাসের কথা বললেন কারণ খবরটা তিনি শুনেছেন দীপক পালের মুখ থেকে আর দীপক পাল মিতুলের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। অমিয় ইচ্ছে করেই তাঁকে জানায়নি। ভাদুড়ি মশায়কে নিয়ে তিনিই এতটা পথ আসবেন। তিনি যদি মেয়ের চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন তা হলে মুশকিল।

ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ অমিয়র ফোনটা এসেছিল। পুলিশের চাকরিতে ফোন বন্ধ বা সাইলেন্ট করে ঘুমনো যায় না। অন্তত দীপক পাল ঘুমোন না। তাই ফোন বাজতেই ধড়মড় করে উঠে বসেছিলেন। স্ক্রিনে অমিয়র নামটা দেখে তাঁর বুকটা ধড়াস করে উঠেছিল। আজ ভোরেই তো পল্লব আর তিতাস এসে মিতুলকে নিয়ে গেল। অমিয় যে ওদের সঙ্গে যাবে সেটা তখনই বলেছিল তিতাস। এখন তো ওদের চটকপুরের হোম-স্টেতে জমিয়ে ঘুম দেওয়ার কথা। তা হলে? বিপদ আশঙ্কা করে কাঁপা হাতেই ফোন ধরেছিলেন দীপক পাল। ও দিকে থেকে উদভ্রান্তের মতো গলায় অমিয় বলেছিল, অনেক কষ্ট করে টাওয়ার পেয়ে আপনাকে ফোন করেছি পালদা। যখন তখন ফোন কেটে যেতে পারে। আমি যা বলছি মন দিয়ে শুনুন। এখানে অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে আর আচমকাই আমাদের সবাইকে লজ্জা পেতে শুরু করেছে তিতাস।

ঘাবড়ে গেছিলেন দীপক পাল, লজ্জা পাচ্ছে? মানে?

মানে আমাদের দেখলে ও লজ্জায় গুটিয়ে যাচ্ছে। বলে বোঝাতে পারব না, ব্যাপারটা মারাত্মক রকমের অস্বাভাবিক। আমার আর পল্লবের বিশ্বাস এর পেছনে কোনও অলৌকিক শক্তির হাত আছে। আমাদের ক্ষমতা নেই এর সঙ্গে লড়াই করার। আপনি যে ভাবে হোক ভাদুড়ি স্যারকে কনভিন্স করে এখানে নিয়ে আসুন।

আশ্চর্য হয়েছিলেন দীপক পাল। বিস্ময়ে বলে ফেলেছিলেন, ভাদুড়ি স্যারকে নিয়ে চটকপুর? ওই রাস্তায় স্যার যাবেন কেমন করে?

বিপন্ন শুনিয়েছিল অমিয়র গলা, জানি না পালদা। যে ভাবে সম্ভব একটা কিছু ব্যবস্থা করুন। আমাদের বড় বিপদ।

ফোন কেটে গিয়েছিল। আর দেরি করেননি দীপক পাল। দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর মন বলছিল, তিতাসের বিপদ শুনলে ভাদুড়ি মশায়ও চুপ করে বসে থাকতে পারবেন না। তাই গুছিয়ে নিয়েছিলেন এক সেট গরম জামাকাপড় আর ভাদুড়ি মশায়ের অনুমতি ছাড়াই বাগডোগরার দু'টো টিকিট কেটে ফেলেছিলেন। দমদম থেকে সে ফ্লাইট ছাড়বে সকাল সাড়ে আটটায়।

অমিয় যতটুকু বলেছিল সবটাই ভাদুড়ি মশায়কে বলেছিলেন দীপক পাল। প্লেনের টিকিটের কথাও বলেছিলেন। তার পর বলেছিলেন, কিন্তু আমি বুঝে উঠতে পারছি না স্যার, ওই রাস্তায় আপনি যাবেন কেমন করে?

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর গভীর প্রজ্ঞার সাক্ষ্যবাহী, অতীব উজ্জ্বল, গভীরতম চোখ দু'টি দীপক পালের মুখে নিবদ্ধ করে বলে উঠেছিলেন, মনের জোরে।, হাঁক দিয়েছিলেন, বৌমা, আমার ক'টা গরম জামাকাপড় গুছিয়ে দাও।

. . .

হোম-স্টের সামনে যখন সুমোটা এসে পৌঁছল তখন দুপুর একটা। আকাশ মেঘে ঢাকা। রোদের চিহ্নমাত্র নেই। কুয়াশায় আচ্ছন্ন চারপাশ। হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনের টাওয়ার খোঁজার চেষ্টা করছিল অমিয়। সুমোটা এসে দাঁড়াতেই ছুটে এল। সুমোর ভিতরে উঁকি দিয়ে চিৎকার করে ডাকল, পল্লব।

বাইরে বেরিয়ে এল পল্লবও। দু'জনের কাঁধে ভর দিয়ে সুমো থেকে নেমে দাঁড়ালেন ভাদুড়ি মশায়। দীপক পাল এগিয়ে দিলেন তাঁর ক্রাচ দু'টি। ভারী অপরাধবোধ হল পল্লব আর অমিয়র। ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছেন বৃদ্ধ। ঘন কুয়াশায় নিঃশ্বাস নিতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে তাঁর। তবু নেমেই তিনি প্রথম যে কথাটি বললেন সেটি হল, তিতাস কোথায়? আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলো।

ভাদুড়ি মশায় আর দীপক পালের জন্য দু'টি আলাদা ঘর আগে থেকেই বুক করে রেখেছিল পল্লব। সে বলল, নিয়ে যাব স্যার কিন্তু তার আগে আপনি একটু বিশ্রাম নিন। সবটা শুনে নিন।

রাস্তার ধকলে বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন ভাদুড়ি মশায়। তাই বোধ হয় বিশ্রামের কথায় আপত্তি করলেন না।

ফায়ারপ্লেসের পাশে বসে খানিকটা ধাতস্থ হলেন বৃদ্ধ। গরম কফি এনে দিলেন হোম-স্টের মালিক পেমা শেরপা। যদিও তাঁকে কিছুই খুলে বলেনি পল্লব বা অমিয় তবু তিনি আন্দাজ করতে পারছেন কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। কারণ সকাল থেকে মেয়ে দু'টো এক বারের জন্যেও ঘরের বাইরে বেরোয়নি। ব্রেকফাস্টও খায়নি। অতিরিক্ত কৌতূহল দেখানো তাঁর স্বভাব নয়, তাই কফির কাপগুলো নামিয়ে রেখে তিনি বেরিয়ে গেলেন। তবে একটা ব্যাপার রীতিমতো তাঁর পিলে চমকে দিয়েছে। গত দশ বছর ধরে চটকপুরে হোম-স্টে চালাচ্ছেন তিনি, কোনও দিন এত বয়স্ক কাউকে সমতল থেকে আসতে দেখেননি। তাও আবার ক্রাচ নিয়ে! মনে মনে এই বুড়াবাবার মনের জোরকে সেলাম ঠুকলেন তিনি। হায় পেমা শেরমা, তিনি যদি এই বুড়াবাবাকে চিনতেন তা হলে হয়তো এত অবাক হতেন না।

কফিতে চুমুক দিয়ে দীপক পাল বললেন, মিতুলকে দেখছি না। সে কোথায়?

চোখাচোখি হল পল্লব আর অমিয়র। যেন এই প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করেছিল ওরা। পল্লব বলল, আপনি চিন্তা করবেন বলে ইচ্ছে করেই আপনাকে জানাইনি পালদা, একা তিতাসের নয়। মিতুলেরও এই একই সমস্যা হচ্ছে। সেও আমাদের দেখে লজ্জা পাচ্ছে।

যুগপৎ চমকে উঠলেন দীপক পাল ও ভাদুড়ি মশায়। বৃদ্ধের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল আর্তস্বর, সে কী!

ছিলা ছেঁড়া ধনুকের মতো সোজা হয়ে দাঁড়ালেন দীপক পাল। বললেন, কোথায় আমার মেয়ে? আমাকে নিয়ে চলুন ওর কাছে।

ঘর থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিলেন দীপক পাল, অমিয় তাঁর হাত চেপে ধরল, একটা অনুরোধ করব পালদা?

অমিয়র চোখে চোখ রাখলেন দীপক পাল। এই মুহূর্তে তিনি আর অমিয়র অধস্তন না। তিনি সেই মেয়েটির বাবা, অমিয় যার পাণিপ্রার্থী। যেন সামান্য গুটিয়ে গেল অমিয়, তবু বলল, প্লিজ যাবেন না পালদা। এই অবস্থায় আপনি হয়তো মিতুলকে সহ্য করতে পারবেন না।

উত্তর দিলেন না দীপক পাল। কঠিন গলায় শুধু বললেন, মিতুল কোথায়?

এক মুহূর্ত তাঁর দিকে চেয়ে রইল অমিয়। তার পর মাথা নীচু করে বলল, আসুন।

তবে এর পর যা ঘটল তার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউই। তিতাস আর মিতুলকে এক ঘরেই রাখা হয়েছিল। বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল পল্লব। গাড়ির রেঞ্চ দিয়ে ভিতরের ছিটকিনিটা আগেই উপড়ে ফেলেছিল অমিয়, যাতে ওরা কেউ ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে না দিতে পারে। ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ই খানিক চমকে উঠল পল্লব, জানলার পর্দাগুলো টানা! একটু আগেও সে যখন ভাদুড়ি মশায়কে গাড়ি থেকে নামাতে গেছিল তখনও তো পর্দা খোলা ছিল। বাইরে থেকেও দেখা যাচ্ছিল তিতাস আর মিতুলকে। দু'জনেই গুটিসুটি মেরে দু'টো খাটের ওপর বসেছিল। বোধহীনতার সঙ্গে আতঙ্ক মিলেমিশে ছিল তাদের দৃষ্টিতে। কেউ তো নড়াচড়া করছিল না। তা হলে এখন পর্দা টেনে দিল কে? তিতাস না মিতুল? পল্লবের মনে কেমন যেন কু ডেকে উঠল কিন্তু সাবধান করার আগেই দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়ল অমিয় আর অতর্কিতে দরজার পাশ থেকে বেরিয়ে এসে জল ভরা ভারী স্টিলের জগটা অমিয়র মুখ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল মিতুল।

দুর্দান্ত অ্যাথলিট অমিয়। রিফ্লেক্স অ্যাকশনে চকিতে নামিয়ে নিল মাথা আর জগটা এসে আছড়ে পড়ল অমিয়র ঠিক পেছনে থাকা দীপক পালের মুখে।

ওফ, শব্দ করে দু'হাতে মুখ ঢাকলেন দীপক পাল। স্তম্ভিত পল্লব দেখল তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে দরদর করে বেরিয়ে আসছে রক্ত। ঠিক তখনই তীব্র রিরংসায় অমিয়র গায়ে একদলা থুথু ছিটিয়ে দিল তিতাস। ভাঙা বীভৎস গলায় বলে উঠল, কেন আসিস তোরা? বলেছি না লজ্জা করে!

নাকের ওপরে বেশ খানিকটা কেটে গেছে দীপক পালের। সেখানে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিচ্ছিলেন পেমা শেরপা আর অমিয়র হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধছিল পল্লব।

রক্তাক্ত দীপক পালকে ধরে কোনও মতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছিল পল্লব। ও দিকে তিতাস তখন হাতের সামনে যা পাচ্ছে ছুঁড়ে মারছে অমিয়র দিকে আর খাটের নীচে ঢুকে গিয়ে সবটা জুলজুল করে দেখছে মিতুল। অমিয় প্রাণপণে তিতাসের আঘাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিল, তিতাস, কী করছিস তুই? শান্ত হ... প্লিজ শান্ত হ।

শান্ত হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। উল্টে আগ্রাসন বাড়ছিল তিতাসের। চোখের মণি দু'টো ঘুরছিল এ দিক, ও দিক। ফুলে উঠেছিল নাকের পাটা। ফেনা জমেছিল ঠোঁটের কোণে। অমিয়কে মারার জন্য এক সময় সে একটা কাচের গ্লাস তুলে নিয়েছিল হাতে। কিন্তু গ্লাসটা ছোঁড়ার আগেই খপ করে তার হাত ধরে ফেলেছিল অমিয়। অমিয়র শক্ত পাঞ্জার মধ্যে কিছুক্ষণ ছটফট করেছিল তিতাস তার পর একটা সময় বন্য কুক্কুরীর মতো কামড় বসিয়ে দিয়েছিল অমিয়র হাতে। ছিটকে সরে গিয়েছিল অমিয় আর সেই সুযোগে তিতাস ছুটে ঢুকে গিয়েছিল মিতুলের পাশে। খাটের তলায়। সেখান থেকেই টানা বলে যাচ্ছিল, যা! যা! চলে যা! যা বলছি!

ব্যান্ডেজ বাঁধা শেষ হতে ভাদুড়ি মশায় বললেন, এখন একটু সুস্থ বোধ করছ দীপক?

মাথা নাড়লেন দীপক পাল, হ্যাঁ স্যার।

কিন্তু বড় ক্লান্ত শোনাল তাঁর গলা। শারীরিক যন্ত্রণাকে হয়তো তিনি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন কিন্তু মিতুলকে যে অবস্থায় তিনি দেখেছেন তা তাঁর মনে ঘনিয়ে তুলেছে অপরিসীম বেদনা। যার আরোগ্য এই মুহূর্তে কারও কাছে নেই। অস্থির গলায় তিনি বললেন, এ বার কী হবে স্যার?

দীপক পালের পিঠে হাত রাখলেন বৃদ্ধ, ধৈর্য ধরো দীপক। আগে আমাকে সবটা শুনতে দাও। পল্লব, শুরু থেকে কী হয়েছে সবটা বলো। কোনও তুচ্ছতম ঘটনাও বাদ দেবে না। আমার মন বলছে, তোমাদের কার্যকলাপের মধ্যেই এ অমঙ্গলের উৎস লুকিয়ে আছে। বলো।

চেয়ার টেনে ভাদুড়ি মশায়ের মুখোমুখি বসল পল্লব। তার পর বলতে শুরু করল। সোনাদায় গাড়ি খারাপ হওয়া থেকে রাস্তা গুলিয়ে ফেলা, অপ্রকৃতিস্থ সেই পাহাড়ি যুবকের আগমন, তার পর গভীর রাতে তিতাসের ঘুম থেকে ডেকে তোলা, আশ্চর্য সেই ফুলের গন্ধ, তিতাস ও মিতুলের দেবীমূর্তি দর্শন, ফেলে দেওয়া রুমাল ফিরে ফিরে আসা এবং দেওয়ালে তিন জায়গায় তাজা রক্তের দাগ... কিছুই বাদ দিল না পল্লব।

পল্লবের কথা চলাকালীন একটিও শব্দ খরচ করেননি ভাদুড়ি মশায়। মাথা নীচু করে দু'হাতে কপালের রগ ধরে নিশ্চুপে শুনছিলেন। পল্লব চুপ করতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ তুলে তাকালেন তিনি। চিন্তার মেঘ ঘনিয়েছে তাঁর কপালে। আরও গম্ভীর হয়ে গেছে মুখ। মৃদু গলায় অমিয় বলল, কিছু বুঝতে পারলেন স্যার?

মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ। বললেন, মনে হয় পেরেছি। পর্ণশবরী। কিন্তু এ যে অসম্ভব।

অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল অমিয়রা। কাতর গলায় পল্লব বলল, কী বললেন একটু বুঝিয়ে বলবেন স্যার?

ভাদুড়ি মশায় হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, এখনও দিনের আলো আছে। যে জায়গায় তোমরা রাস্তা গুলিয়ে ফেলেছিলে, সেখানে আমায় এক বার নিয়ে যেতে পারবে?

উঠে দাঁড়াল অমিয়, পারব স্যার। আসুন, হাত বাড়িয়ে দিল সে ভাদুড়ি মশায়ের দিকে।

গর্জন করে লাল-কালো জিপটা ছুটে চলল পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে। গাড়িটা চালাচ্ছে অমিয়। পাশে দীপক পাল। পেছনের সিটে পল্লবের সঙ্গে ভাদুড়ি মশায়। একটু ইতস্তত করে পল্লব বলল, একটা কথা বলব স্যার?

বলো।

আপনি তখন পর্ণশরবী না কি যেন...

পর্ণশরবী নয়, পর্ণশবরী। দেবী পর্ণশবরী, কথা কেটে বলে উঠলেন ভাদুড়িমশায়, যদিও আদিতে হিন্দু দেবী কিন্তু পরবর্তীতে বৌদ্ধধর্মে অন্তর্ভুক্তি ঘটে। বৌদ্ধতন্ত্র মতে দেবী তারার একুশটি রূপের কুড়িতম প্রকাশ এই পর্ণশবরী। দেবীর তিনটি মস্তক, ছয়টি হাত। ডান দিকের প্রথম হাতে ধরে থাকেন বজ্র, দ্বিতীয় হাতে কুঠার এবং তৃতীয় হাতে একটি তীর। বাম দিকের প্রথম হাতে দড়ির ফাঁদ, দ্বিতীয় হাতে ফুলে-ফলে শোভিত একটি পাখা এবং তৃতীয় হাতে ধনুক। দেবী জঙ্গলের অধিষ্ঠাত্রী, একই সাথে নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যাধি ও আরোগ্যকে।

সামান্য পেছন ঘুরে বসলেন দীপক পাল। যদিও অমিয় গাড়ি চালাচ্ছে তবু যে তার কান এ দিকেই সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। পল্লব বলল, কিন্তু তার সাথে তিতাস বা মিতুলের...

ফের মাঝপথে থামিয়ে দিলেন ভাদুড়ি মশায়, সম্পর্ক আছে বলেই মনে হচ্ছে কিন্তু একটা বড় খটকা রয়েছে।

কী খটকা স্যার?

দেখো পল্লব, তোমাদের কথা শুনে যা বুঝেছি তার থেকে আমি আন্দাজ করছি দেবী তিতাস আর মিতুলের ওপর কুপিতা হয়েছেন কিন্তু দেবী অত্যন্ত শান্তস্বভাবা, মায়ার আধার। তাঁর এ অদ্ভুত ক্রোধের কারণ আমি ধরতে পারছি না। আর তার চেয়েও বড় কথা, তিতাস বা মিতুলের পক্ষে তো দেবীকে জাগানো সম্ভব নয়, কিন্তু তিনি যে জেগেছেন এ নিশ্চিত। কে জাগাল তাঁকে? আমার মন বলছে এর সব উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ওই ত্রিকোণাকার খাঁজটিতেই। তাই সবার আগে আমাদের ওই জায়গাটা খুঁজে পেতে হবে।

খুব বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না, অমিয় দেখতে পেয়ে গেল সেই শ্যাওলাধরা দেওয়াল, যার মধ্যে কুলুঙ্গির মতো খাঁজ কাঁটা রয়েছে। মূল রাস্তা থেকে কিছুটা নেমে গিয়েছে জঙ্গল। তার পর আবার পাহাড়ি একটা ঢাল উঠে গেছে ওপর দিকে। সেখানেই দেওয়ালটা। মূল পথের খুব কাছে হলেও জায়গাটা আসলে লোকচক্ষুর অন্তরালে।

ভাদুড়ি মশায়কে ধরে ধরে ওরা নামিয়ে আনল সেখানে। ভুরু কুঁচকে তিনি তাকিয়ে রইলেন পাথরে খোদিত দেবী মূর্তির দিকে। খুব মন দিয়ে দেখছিল পল্লব। অদ্ভুত মূর্তিটা! দেখলেই কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। হঠাৎই খাঁজের নীচের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়, ও কী?

সঙ্গে সঙ্গে ওরাও তাকাল সে দিকে। শ্যাওলার ওপর কালচে মতো কী যেন লেগে রয়েছে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে। ঝুঁকে এগিয়ে গেল অমিয়, তার পর আঙুল ঘষে বলে উঠল, স্যার, এ তো রক্ত। শুকিয়ে গেছে।

রক্ত শব্দটা যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল ভাদুড়ি মশায়ের মধ্যে। থরথর করে কেঁপে উঠলেন তিনি। ফ্যাকাশে হয়ে গেল তাঁর মুখ। অস্ফুটে বলে উঠলেন, সর্বনাশ!

তাঁর বলার মধ্যে এমন এক হতাশা মিশে ছিল যা নিমেষে চারিয়ে গেল বাকি তিন জনের মধ্যে। উৎকণ্ঠিত গলায় অমিয় বলে উঠল, কী হল স্যার? এমন করে সর্বনাশ বললেন কেন?

বড় ক্লান্ত শোনাল ভাদুড়ি মশায়ের গলা, যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই। অতি ভয়ানক এক তন্ত্রের সাহায্যে কেউ দেবীকে জাগিয়েছে। দেবীকে অশান্ত করে তুলেছে এবং দেবীর রুদ্ররূপের প্রকাশ ঘটিয়েছে। দেবী এখন বিরাজ করছেন এই অরণ্যে। চাঁদ উঠলেই কোনও এক প্রাচীন মহাবৃক্ষের বুক চিরে বেরিয়ে আসবেন তিনি এবং অস্থির হয়ে বিচরণ করবেন এই সমগ্র অঞ্চলজুড়ে। ওই যে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত দেখছ তা বলির রক্ত। নরবলি।

শব্দটা যেন গেঁথে গেল ওদের মাথার মধ্যে। তীব্র আতঙ্কে অমিয়র হাত চেপে ধরে পল্লব বলে উঠল, নরবলি?

ক্লান্ত মাথা নাড়লেন ভাদুড়ি মশায়, হ্যাঁ পল্লব। নরবলি।

অবাক হয়ে ভাদুড়ি মশায়ের দিকে তাকিয়ে রইল ওরা। চোখের পাতা ফেলতেও যেন ভুলে গেল বুঝি বা! একটু সময় নিয়ে ভাদুড়ি মশায় বললেন, আমার স্থির বিশ্বাস, এই অঞ্চলেই এমন কেউ আছে যে তন্ত্রে পারদর্শী আর ব্যক্তিগত কোনও স্বার্থ চরিতার্থ করতে তীব্র প্রতিশোধস্পৃহায় সেই দেবীকে জাগিয়েছে। কোনও নিরপরাধকে বলি দিয়েছে ঠিক এইখানে। সে ব্যাধিগ্রস্ত করতে চায় এই পাহাড়ি জনপদকে। বিপদ শুধু মিতুল বা তিতাসের নয়, গোটা চটকপুরই এখন একটা মারণ বোমার ওপর বসে রয়েছে যার সলতেতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই।

কিন্তু স্যার, মিতুল বা তিতাস কী এমন করেছিল যার জন্য ওদের এই অবস্থা হল? ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন দীপক পাল।

দেবীকে উত্যক্ত করেছিল। ফুলের যে তীব্র সুবাস মিতুল এবং তিতাস পেয়েছিল, তা ছিল আসলে দেবীর সাবধানবাণী। তিনি ইঙ্গিত দিয়ে বলতে চেয়েছিলেন, 'আমায় বিরক্ত কোরো না। চলে যাও।' কিন্তু তীব্র কৌতূহল ওদের টেনে এনেছিল এই অবধি এবং তার পরেই সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসেছিল ওরা।

ভুল? বলে উঠল অমিয়?

হ্যাঁ ভুল। রুমাল দিয়ে ওরা ঘষে তুলে ফেলেছিল দেবীমূর্তির শ্যাওলা, যা তাঁর স্বাভাবিক আবরণ। দৈবী মুহূর্তে ওরা প্রত্যক্ষ করেছিল দেবীর নগ্নতা। দেবী লজ্জা পেয়েছিলেন আর তাই দেবী ওদের মনে বুনে দিয়েছেন পৃথিবীর আদিমতম লজ্জাবোধ। দেবীর শাপে ওরা ব্যাধিগ্রস্ত। এ ব্যাধি মানসিক।

স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ওরা। তার পর এই সময়ে যে প্রশ্নটি উঠে আসার কথা ছিল ঠিক সেই প্রশ্নটিই করল পল্লব। কাঁপা গলায় বলল, এই অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায় কি স্যার?

সামান্য ভেবে ভাদুড়ি মশায় বললেন, উপায় একটাই, যে জাগিয়েছে তাকেই আবার দেবীকে ঘুম পাড়াতে হবে। চিন্ময়ীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে মৃন্ময়ী রূপে।

এ তো অদ্ভুত একটা প্রোবাবিলিটির কথা হয়ে গেল স্যার, দ্রুত বলে উঠল অমিয়, এর মধ্যে তো অনেকগুলো ইফস অ্যান্ড বাটস রয়েছে।

রয়েছে তো, কেটে কেটে বললেন ভাদুড়ি মশায়। প্রথমত যে দেবীকে জাগিয়েছে তাকে শণাক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত তাকে রাজি করাতে হবে তন্ত্র প্রয়োগের জন্য।

আর চুপ করে থাকতে পারল না পল্লব। বলে উঠল, এ ভাবে হয় না কি? সে যদি রাজি না হয় আর সবচেয়ে বড় কথা কে এই কাজ করেছে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে নিশ্চয়তা কি? সেক্ষেত্রে অন্য কী উপায় আছে স্যার?

পাইনবনের ফাঁকে ফাঁকে তখন ফুরিয়ে আসছে দিনের আলো। পাখিরা দল বেঁধে ফিরে যাচ্ছে বাসায়। সারা দিন ধরে কর্মচঞ্চল পৃথিবী প্রস্তুত হচ্ছে বিশ্রামের জন্য। এই অবসন্ন বৃদ্ধ পৃথিবীর পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে আরও অনেক বেশি ক্লান্তি বোধ করলেন শ্রী নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি। পল্লবের এ প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারবেন না। এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না। দিতে নেই। কারণ, অতি প্রাচীন এবং গূঢ় এই তন্ত্রমতে দেবীকে যে জাগিয়েছে সে যদি দেবীকে ঘুম না পাড়ায় তা হলে মাত্র আর একটি ভাবেই দেবীকে নিদ্রামগ্ন করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে প্রয়োজন আরও একটি নরবলি।

অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে তিতাস আর মিতুলের। গত রাতের পর থেকে একদানা খাবার খাওয়ানো যায়নি কাউকে। দু'জনেই গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে রয়েছে খাটের তলায়। কাউকে ঘরে ঢুকতে দেখলেই কাঁদছে নয়তো হিংস্র হয়ে উঠছে। দু'জনেরই সমস্ত স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। খাটের নীচেই মলমূত্র ত্যাগ করছে তারা। বোঝা যাচ্ছে, বদ্ধ উন্মাদ হতে তাদের আর খুব বেশি দেরি নেই।

নিজের ঘরে সিলিং-এর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিলেন ভাদুড়ি মশায়। দীপক পাল, পল্লব আর অমিয় চুপচাপ বসেছিল ছড়িয়েছিটিয়ে। ওরা জানে, এই মুহূর্তে ওদের কিছুই করার নেই। তিতাসের কথা ভাবতে ভাবতে বারবার চোখে জল এসে যাচ্ছিল পল্লবের। কত উৎসাহ নিয়ে এই বেড়াতে আসার প্ল্যানটা করেছিল তিতাস আর সেই কি না এখন শাপগ্রস্ত! আর মিতুল? অমন ফুটফুটে প্রাণচঞ্চল মেয়েটা! কেন ওর সাথেই বারবার হয় এমন সব বিপদ?

বাইরে চুপ করে থাকলেও আসলে ভেতরে ভেতরে খুবই অস্থির হয়ে উঠছিল পল্লব। সেই যে ফিরেছেন তার পর থেকে আর একটা কথা বলেননি ভাদুড়ি মশায়। সে একটা দ্বিতীয় পন্থার খোঁজ জানতে চেয়েছিল, সেটাও বলেননি। এসে থেকে শুধু আকাশপাতাল ভেবে চলেছেন। এ দিকে হোম-স্টের মালিক পেমা শেরপা সবটা জেনে গেছে। সে জানিয়ে দিয়েছে, এ ভাবে অসুস্থ মানুষ নিয়ে এখানে থাকা যাবে না। আগামীকাল সকাল দশটার মধ্যে চেক আউট করে নিতে হবে। তার মানে হাতে আছে আর মাত্র আঠেরো ঘণ্টা। তার মধ্যেই তিতাস আর মিতুলকে সুস্থ হতে হবে, নয়তো ওদের নিয়ে যে পদ্ধতিতে এখান থেকে বেরতে হবে, সেটা তিতাস কিংবা মিতুলের সাথে কিছুতেই হতে দিতে পারবে না পল্লব। আর বসে থাকতে পারল না সে। ডেকে উঠল, স্যার।

উঁ, বলে তার দিকে ফিরে তাকালেন ভাদুড়ি মশায়।

অস্থির পল্লব বলল, কাল সকালের মধ্যে হোম-স্টে ছেড়ে দিতে হবে। তার মধ্যে সুস্থ না হলে তিতাস আর মিতুলকে নিয়ে কী ভাবে যাব আমরা?

কাল আমরা যেতে পারব না। আমার আরও কিছুটা সময় দরকার, গলা ঝেড়ে বললেন ভাদুড়ি মশায়, অমিয়, তুমি ওই পেমা বলে ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে আরও এক দিনের বুকিং বাড়িয়ে নাও। সোজা কথায় রাজি না হলে তোমার পদাধিকার প্রয়োগ কোরো। যদিও আমি এ সবের তীব্র বিরোধী কিন্তু এই মুহূর্তে এটাই আপদ্ধর্ম। এতে দোষ নেই। আর তোমার কথা বলা হলে ওকে নিয়ে আমার কাছে এসো। ওর থেকে কিছু খোঁজখবর নিতে হবে।

মিনিট পনেরো পর যখন পেমাকে নিয়ে দীপক পাল আর অমিয় এ ঘরে ঢুকল, মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, সে রীতিমতো বিরক্ত। ঘরে ঢুকেই অমিয় বলল, স্যার, পেমা আমাদের আরও এক দিনের বুকিং বাড়িয়ে দিয়েছে তবে ও বলেছে পরশু চলে যেতেই হবে।

বিরক্ত গলায় পেমা বলল, হাঁ সাব। পরশো মেরা নয়া বুকিং হ্যায়। টুরিস্ট আয়েগা।

গম্ভীর গলায় ভাদুড়ি মশায় বললেন, বেশ। পরশুই তোমার ঘর ছেড়ে দেব আমরা কিন্তু তার আগে তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। তুমি দেখতেই পাচ্ছ আমরা কেমন বিপদে পড়েছি। এ অবস্থায় তোমার সাহায্য না পেলে আমাদের চলবে না। তুমি বোসো।

একটা চেয়ার টেনে বসল পেমা। বলল, বোলিয়ে, কেয়া জাননা চাহতে হ্যায়?

একটুক্ষণ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়ি মশায়। তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে যেন তার ভেতরটা পড়ে নিতে চাইছেন। ভাদুড়ি মশায়ের এই দৃষ্টির সামনে পেমা যেন খানিকটা জড়োসড়ো হয়ে গেল। বলল, আপ পুছিয়ে না বুড়াবাবা। হাম আপলোগোকা হেল্প করেগা।

এ বার পেমার গলায় সেই আগের বিরক্তি উধাও। বরং অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ শোনাল তার কণ্ঠস্বর। ভাদুড়ি মশায় বললেন, আচ্ছা, সম্প্রতি মানে ধরো মাসখানেকের মধ্যে তোমাদের এখানে কোনও অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে? মানে কেউ অসুস্থ হয়েছে? সে অসুস্থতা শারীরিক বা মানসিক দু'রকমই হতে পারে। তবে আমি কিন্তু স্বাভাবিক অসুস্থতার কথা বলছি না। আমি বলছি এমন কিছু যা স্বাভাবিক নয়, আনন্যাচারাল। তুমি বুঝতে পারছ তো আমি কী বলছি?

পেমা বলল, হাঁ সমঝ লিয়া। ইধার বহোত বাঙ্গালি টুরিস্ট আতা হ্যায়। হামে বাঙলা আতা হ্যায় থোড়াথোড়া।

পল্লব বলল, বাহ, খুব ভাল। বাংলা ভাষার গর্বে আমার বুক ফুলে উঠেছে। কিন্তু তুমি আগে স্যারের কথার উত্তর দাও। কেউ এখানে রিসেন্টলি অসুস্থ হয়েছে?

মাথা নেড়ে পেমা বলল, নাহি তো। ইধার থোড়া থোড়া সর্দি, বুখার হোতা হ্যায় লেকিন কোই আনন্যাচারাল কুচ নেহি হুয়া।

একটু যেন হতাশ হলেন ভাদুড়ি মশায়। বললেন, কেউ অসুস্থ হয়নি?

নাহি বুড়াবাবা। ইয়ে ছোটা জাগা হ্যায়। অগর হোতা তো মুঝে পতা হোতা। ফিরভি আপ চাহেঙ্গে তো অউর কিসিসে পুছ সকতে হ্যায়। বগল মে হি মেরা ভাই কা হোম-স্টে হ্যায়। আপ উসসে পুছতাচ কর লিজিয়ে।

মাথা নাড়লেন ভাদুড়ি মশায়, নাহ। তাতে লাভ কী হবে? আচ্ছা পেমা একটা কথা বলো, তোমাদের এই গ্রামে এমন কেউ আছে যে তন্ত্র নিয়ে কাজকর্ম করে? তুমি জানো তো তন্ত্র কি?

উৎসাহিত হল পেমা, হাঁ হাঁ, ও তো সব কো মালুম হ্যায়। তন্ত্রা তো ব্ল্যাক ম্যাজিক হোতা হ্যায় না বুড়াবাবা?

অন্য সময় হলে হয়তো তন্ত্রের এই অপমানে জ্বলে উঠতেন ভাদুড়ি মশায় কিন্তু এই মুহূর্তে চুপ করে রইলেন। এটা পেমা শেরপাকে তন্ত্র বোঝানোর সময় নয়। দু'দিকে মাথা নেড়ে তিনি বললেন, ব্ল্যাক ম্যাজিক আর তন্ত্রয় অনেক পার্থক্য আছে পেমা। সে যাই হোক, এমন কাউকে চেনো যে এ সব করে?

একটু ভেবে পেমা বলল, দেখিয়ে বুড়াবাবা, ইধার দো গাঁও হ্যায়। আপার অউর লোয়ার চটকপুর। ইধার হিন্দু অউর বুদ্ধিস্ট দোনো হি রহেতা হ্যায়। হিন্দু থোড়া জ্যাদা হ্যায় লেকিন বুদ্ধিস্ট ভি হ্যায়। সব আপনা আপনা পূজা করতা হ্যায়। কোই কিসিকো তন নেহি করতা। লেকিন ও ব্ল্যাক ম্যাজিক ফ্যাজিক ইধার নাহি হোতা।

হুম, বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভাদুড়ি মশায়।

পেমা বলল, অউর কুছ পুছনা চাহতে হ্যায় আপ?

ভাদুড়ি মশায় নেতিবাচক মাথা নাড়লেন। বিদায় নিয়ে চলে গেল পেমা। যাওয়ার আগে মনে করিয়ে দিতে ভুলল না, পরশু সকাল দশটার মধ্যে ঘর ছেড়ে দিতে হবে।

অসহায় গলায় অমিয় বলল, এ বার তা হলে কী হবে স্যার? কিছুই তো জানা গেল না। আর আমরা লোকাল লোক নই, আমাদের পক্ষে তো কাউকে খুঁজে বার করা অসম্ভব।

উত্তর দিলেন না ভাদুড়ি মশায়। যত সময় গড়াচ্ছে ভেতরে ভেতরে ভীত হয়ে উঠছেন তিনি। তিতাস আর মিতুলের যা অবস্থা দেখেছেন, অত্যন্ত দ্রুত ওদের আরোগ্য না হলে ওরা চিরতরে উন্মাদ হয়ে যাবে। সেই অবস্থা থেকে কোনও উপায়েই আর ওদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাই ওদের সুস্থ করতে গেলে সেই মানুষটাকে খুঁজে পেতে হবে যে দেবীকে জাগিয়েছে। কিন্তু কে সে? পেমা তো বলছে এই অঞ্চলে এমন কেউ নেই যে তন্ত্রচর্চা করে। নাহ, পেমাকে এই প্রশ্ন করা ভুল হয়েছে। কেউ যদি এই ধরনের গোপন, গূঢ় সাধনা করে সে তো আর লোক জানিয়ে করবে না। তা হলে উপায়? দ্বিতীয় এবং শেষ যে রাস্তাটি খোলা রয়েছে সেটি এতটাই অসম্ভব ও অবাস্তব যে তা না থাকার শামিল। নরবলির কথাটা মাথায় আসতেই ফের বড় অসহায় বোধ করলেন ভাদুড়ি মশায়। শেষ কবে এমন বিপদে পড়েছেন মনে করতে পারলেন না। পরিস্থিতি ক্রমশই হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে তা তিনি দিব্যি বুঝতে পারছেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তোমরা ঘরে যাও। আমাকে একটু একা থাকতে দাও। এ ভাবে হবে না। আমাকে অন্য পথের সন্ধান করতে হবে।

ওই ভয়াবহ পন্থাটি ছাড়া অন্য পথ যে নেই তা তিনি খুব ভাল করে জানেন কিন্তু সন্তানসম দীপক পাল এবং তাঁর নাতনির বয়সি পল্লব আর অমিয়কে কেমন করে বলবেন সে কথা? না না, ও পথের কথা চিন্তা করেও লাভ নেই। ধ্যানে বসতে হবে। গুরুকে স্মরণ করতে হবে। যদি এ অসম্ভব সম্ভব হয়, গুরুর ইচ্ছেতেই হবে। সবই গুরুকৃপা।

মাথা নীচু করে পরাজিত সৈনিকের মতো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় পল্লবরা। ওদের গমনপথের দিকে অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকেন বৃদ্ধ। তার পর চোখ বোজেন। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি সদাহাস্যময় মানুষের চেহারা। বেঁটেখাটো মানুষটির পরনে সাদা ফতুয়া, হেঁটো ধুতি। ধূলিমলিন খালি পা। একমুখ অযত্নলালিত দাড়িগোঁফ। কপালের ওপর এসে পড়া চুল আর সেই আশ্চর্য দৃষ্টি। অমন ভালবাসা নিয়ে তাকাতে শুধু মায়েরাই পারে। শ্রী রামদাস চট্টোপাধ্যায়। কানে বাজে গুরুর কণ্ঠস্বর, 'লেগেপড়ে থাক নীরেন। অলৌকিক হবেই। শুধু লেগেপড়ে থাক।'

গলা ধরে আসে ভাদুড়ি মশায়ের। হাত জোড় করে বলেন, কৃপা করো প্রভু। পথ দেখাও। বড় কষ্ট পাচ্ছে মেয়ে দু'টো। ওরা যে বড় ছেলেমানুষ।

. . .

তিতাসদের ঘরের বাইরের বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে আছে অমিয় আর পল্লব। কেউই কোনও কথা বলছে না শুধু পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে একের পর এক সিগারেট। তিতাসদের ঘর অন্ধকার। কিছুক্ষণ আগে ঘরে ঢুকে লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছিল অমিয়। এখন এসে দেখছে, সে আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফের আলো জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না অমিয়র। কী হবে জ্বালিয়ে? তিতাস আর মিতুল ক্রমেই অন্ধকারের দিকে এগিয়ে চলেছে। অন্ধকারই এখন ওদের কাছে আরামদায়ক। এ সব ভাবতে ভাবতে সিগারেটটা যে কখন ফুরিয়ে এসেছে অমিয় খেয়াল করেনি। আঙুলে ছ্যাঁকা লাগতেই সেটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে ঘষে নিভিয়ে দিল সে আর মুখ তুলতেই চমকে উঠল। কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে এক মহিলা। এই মহিলাকে অমিয় এর আগে কয়েক বার দেখেছে। ইনি পেমার স্ত্রী। গলা খাঁকরে অমিয় বলল, কুছ বোলনা চাহতে হ্যায় আপ?

মহিলা মাথা নাড়লেন, কিন্তু হ্যাঁ বা না কী বললেন ঠিক বোঝা গেল না। ইতিমধ্যে পল্লবও ঘুরে তাকিয়েছে। মহিলা নীচু গলায় বললেন, সাব, আপলোগোকা চায়ে, পকোড়া।

উদাসীন গলায় অমিয় বলল, আপ অন্দর রখ দিজিয়ে।

মাথা নেড়ে দ্রুত এক বার পেছন দিকে তাকালেন মহিলা তার পর দ্রুত পায়ে ঢুকে গেলেন অমিয়দের ঘরের মধ্যে। হতাশ গলায় পল্লব বলল, আর চা! কী কুক্ষণে যে এখানে এসেছিলাম এখন তাই ভাবছি। কী হবে রে অমিয়? আমার তো মাথা কাজ করছে না।

উত্তর দিল না অমিয়। সরু চোখে সে তাকিয়ে আছে নিজেদের ঘরের দিকে। চাপা গলায় বলল, চা আর পকোড়া রাখতে কতক্ষণ সময় লাগে? ওই মহিলা এখনও বেরল না কেন বল তো ঘর থেকে? আয় তো দেখি।

দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে এগোল অমিয়। পেছনে অমিয়। দরজাটা ভেতর থেকে ভেজানো। জানলার ফাঁক দিয়ে যেটুকু দেখা যাচ্ছে ঘর অন্ধকার। একটুর জন্য হলেও বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল অমিয়র। তবু হাত বাড়িয়ে সে ঠেলে খুলে দিল দরজা আর দিতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেই মহিলা। যেন তিনি অমিয়দের জন্যই অপেক্ষা করছেন। বাইরের আবছা আলোয় বড়ই অদ্ভুত দেখাচ্ছে তাঁকে। ঘাবড়ে যাওয়া গলায় অমিয় বলল, কেয়া? কেয়া চাহিয়ে আপকো?

অমিয়র দিকে দু'পা এগিয়ে এলেন মহিলা তার পর খুব নীচু গলায় প্রায় ফিসফিস করে বললেন, পেমা ঝুট বোল রাহা হ্যায় সাব।

রাত একটা। খুব মৃদু শব্দ করে নড়ে উঠল দরজাটা। টানটান হয়ে বসেছিল অমিয়। এক লাফে দরজাটা খুলে দিল সে আর ত্রস্ত পায়ে ঘরে ঢুকে এলেন সেই মহিলা, পেমা শেরপার স্ত্রী। মাথা থেকে চাদরের ঘোমটাটা সরিয়ে দিলেন তিনি। উত্তেজনায় রীতিমতো কাঁপছেন। ভাদুড়ি মশায় বললেন, বোসো মা। জল খাবে?

মাথা নাড়লেন তিনি, নাহি বুড়াবাবা। জ্যাদা টাইম নেহি হ্যায়। পেমা সো রাহা হ্যায়, কভি ভি উঠ জায়েগা।

'পেমা ঝুট বোল রাহা হ্যায় সাব', কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেছিল অমিয়। তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এই মহিলা ফের ফিসফিস করে বলেছিলেন, আভি ম্যায় যা রাহা হু, লেকিন রাত কো আউঙ্গি। আপলোগ সোনা মত।

তার পর দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেছিলেন ঘর ছেড়ে। ঘাবড়ে যাওয়া গলায় অমিয় বলেছিল, কী হচ্ছে বল তো পল্লব? হঠাৎ এই মহিলা আমাদের সাথে কথা বলতে চাইছেন কেন? আর পেমা ঝুট বলছে মানে? কী মিথ্যে বলছে ও?

সেটা তো এই মহিলার বয়ান না শুনলে বোঝা যাবে না, গম্ভীর মুখে বলেছিল পল্লব, সময় নষ্ট করে লাভ নেই অমিয়, স্যারের কাছে চল। কে বলতে পারে এই মহিলাই হয়তো আমাদের কোনও লিড দেবেন।

সবটা শুনে যেন খানিক প্রফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন ভাদুড়ি মশায়। স্মিত হাসি দেখা গিয়েছিল ঠোঁটের কোণে। বলেছিলেন, মেঘ অত্যন্ত বেশি ঘনীভূত হয়ে উঠলে সে যেমন আর জলকণাদের ধরে রাখতে পারে না তেমনই বিপদও অত্যন্ত বেশি করে ঘনিয়ে উঠলে তার মধ্যে থেকেই উদ্ধারের পথ উঁকি দেয়। আমার মন বলছে, এই মেয়েটি আমাদের দিশা দেখাবে। সে কখন আসবে কিছু বলেছে?

না স্যার। তা বলেনি।

তা হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

সেই শুরু হয়েছিল অপেক্ষা আর তার অবসান হল এইমাত্র। ভাদুড়ি মশায় বললেন, তোমার নাম কী মা?

ডুপচেন বুড়াবাবা।

বাহ! কিন্তু ডুপচেন, এই ভাবে ছটফট করলে তো তুমি কথা বলতে পারবে না। তার জন্য তো তোমায় শান্ত হয়ে বসতে হবে।

ডুপচেন বসলেন না। তাঁর শরীরীভাষা বলে দিচ্ছে, তিনি অনেক কিছু বলতে চান কিন্তু এই ভাবে যে স্বামীকে লুকিয়ে এসেছেন তা তাঁর মধ্যে একটা ভয়ের জন্ম দিয়েছে। সেই ভয়টাকে তিনি অতিক্রম করতে পারছেন না। সেটা বুঝেই যেন দীপক পাল বলে উঠলেন, আপ চ্যান সে বৈঠিয়ে। ম্যায় বাহার যা রাহা হু। অগর আপকে ঘর মে লাইট জ্বলা তো ম্যায় আপকো বতাউঙ্গা। ঠিক হ্যায়?

একটু যেন স্বস্তি পেলেন ডুপচেন। হাত জোড় করে বললেন, বহোত মেহেরবানি সাব।

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন দীপক পাল। সেই গভীর দৃষ্টিতে ডুপচেনের দিকে তাকিয়ে ভাদুড়ি মশায় বললেন, এ বার বলো, পেমা কী লুকোচ্ছে আমাদের থেকে?

নিজেকে যেন একটু গুছিয়ে নিলেন ডুপচেন। তার পর বললেন, বুড়াবাবা, পেমা যো বোল রাহা হ্যায় না রিসেন্টলি কিসিকা আনন্যাচারাল বিমারি নাহি হুয়া উও ঝুট হ্যায়। মেরা ভাই লাকপা, উও এক দিন অচানক পাগল হো গয়া, বলতে বলতে গলা ধরে এলে ডুপচেনের।

চমকে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়। অস্ফুটে বললেন, পাগল হয়ে গেছে?

চোখ মুছে ডুপচেন বললেন, হাঁ বুড়াবাবা। আভি তো উও জঙ্গল মে হি রহেতা হ্যায়। ইধার নাহি আতা। বহোত আচ্ছা লড়কা থা লাকপা।

অবাক হয়ে অমিয় বলল, কিন্তু এই কথাটা লুকনোর কী আছে?

ডুপচেন বললেন, ইধার সারে লোগো কা হোম-স্টে কা বিজনেস হ্যায় সাব। ইন লোগোকো লাগতা হ্যায়, অগর টুরিস্ট লোগোকো পতা চলা কি কোই অচানক পাগল হো গয়া ফির উও লোগ নেহি আয়েঙ্গে। ম্যায়নে কিতনি বার বোলি, লাকপা কো ডক্টর দিখাও, কোই শুনতা হি নেহি মেরি বাত। এক দিন উও বেচারা ইধার চলা আয়া থা। সবনে মিলকে উসে পিটা। ভাগা দিয়া, ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন ডুপচেন। হাত জোড় করে বললেন, আপলোগোকে সাথ যো দো দিদি হ্যায় উন দোনো কি ভি তো সেম প্রবলেম হুয়ি। আপ তো উন দোনো কি ইলাজ করেঙ্গে না বুড়াবাবা? লাকপা কো ভি ইলাজ কর দিজিয়ে না।

ডুপচেনের কান্নায় চোখ ছলছল করে উঠল পল্লবের। ডুপচেনের হাত দু'টো ধরে ভাদুড়ি মশায় বললেন, মা গো, আরোগ্য দেওয়ার ক্ষমতা যদি আমার থাকত তা হলে আমাদের সঙ্গের মেয়ে দু'টিকে আমি ইতিমধ্যেই সারিয়ে তুলতাম। আমি চেষ্টা করছি। তোমার ভাইয়ের জন্যও চেষ্টা করব। তার আগে খুলে বলো তো যে দিন থেকে তোমার ভাইয়ের এই অবস্থা সে দিন ঠিক কী কী হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তরে ডুপচেন যা বললেন তাতে কাহিনির সূত্রপাত আড়াই বছর আগে। সেই সময় লাকপার সঙ্গে একটি নেপালি মেয়ের বিয়ে হয়। তার নাম সীতা। কিন্তু বিয়ের কিছু দিনের মধ্যেই সীতার শরীরে শ্বেতির মতো এক ধরনের চর্মরোগ দেখা দেয়। দার্জিলিং এমনকী শিলগুড়িতে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েও কোনও লাভ হয় না। সীতার শরীরে সাদা ছোপের পরিমাণ বাড়তে থাকে। সবাই ভয় পেয়ে যায় যে রোগটা ছোঁয়াচে এবং সীতাকে এক দিন জোর করে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। লাকপা চুপ করে থাকে। কারণ ইতিমধ্যেই বৈজন্থী বলে একটা মেয়ের সাথে তার প্রেম হয়ে গেছিল। সীতা চলে যাওয়ার কিছু দিন পরে লাকপা বৈজন্থীকে বিয়ে করে। গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর সীতা দার্জিলিংয়ে চলে যায় এবং সেখানের একটা তিব্বতি আর্টের দোকানে চাকরি নেয়। চটকপুরের অনেকেই মাঝে মাঝে কর্মসূত্রে দার্জিলিং যায়। তাদেরই কেউ কেউ সীতাকে সেই দোকানে কাজ করতে দেখেছে। কিন্তু সীতা কারও সাথে কথা বলেনি। মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। তা এই ভাবেই দিন চলছিল। কালের নিয়মে সীতার কথা ভুলে গিয়েছিল চটকপুর। লাকপাও খুশি ছিল বৈজন্থীকে নিয়ে। এমন সময় মাস খানেক আগে এক দিন সন্ধেবেলায় বৈজন্থী তাদের ভাঁড়ার ঘর খুলে দেখে ভেতরে সীতা বসে আছে! প্রচণ্ড চিৎকার জুড়ে দেয় বৈজন্থী। কিন্তু সীতা জোর গলায় বলতে থাকে, সে নিজে আসেনি। লাকপাই তাকে এনেছে এবং এখানে লুকিয়ে রেখেছে। বলেছে, বৈজন্থী ঘুমোলে এখান থেকে বার করবে। আর শুধু আজ বলে নয়, গত তিন মাস ধরে সে নিয়মিত আসছে। এসে ভাঁড়ার ঘরে লুকিয়ে থাকে। রাত বাড়লে লাকপা তার সাথে সোহাগ করে তার পর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে সে সোনাদা থেকে গাড়ি ধরে দার্জিলিং ফিরে যায়। লাকপা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সীতার কথা এবং তাকে ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বৈজন্থী লাকপার কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। সেই থেকে তাদের ঝগড়া চলতে থাকে এবং তিন দিন পর তা বিরাট আকার ধারণ করে। রাগ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় বৈজন্থী। তাকে খুঁজতে বেরোয় লাকপা এবং সারা রাত কেটে গেলেও সে বা বৈজন্থী কেউ ফেরে না। পরের দিন সকালে দলবল নিয়ে জঙ্গলে যাওয়া হয়। সেখানেই লেকের ধারে উন্মাদ লাকপাকে খুঁজে পায় গ্রামের লোক। কিন্তু বৈজন্থীর কোনও চিহ্ন পাওয়া যায় না। মানুষটা যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে! গ্রামের লোক কিন্তু খোঁজখবর না করে ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের একটাই ভয়, এই সব খবর বাইরে ছড়িয়ে পড়লে এখানে আর টুরিস্ট আসবে না। হোম-স্টে চালিয়েই এখানের মানুষ সারাবছরের উপার্জন করে। তাদের ভয়টা ডুপচেন বোঝেন, তবু লাকপা তো তাঁর নিজের ভাই। কিছুতেই লাকপার এই পরিণতি তিনি মেনে নিতে পারেন না। তাঁর মন বলে, লাকপার পাগল হয়ে যাওয়া এবং বৈজন্থীর হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে।

চাদরের খুঁট দিয়ে ফের চোখ মোছেন ডুপচেন। ততক্ষণে কিন্তু ডুপচেনের কথা শুনে ভাদুড়ি মশায়ের ভুরু কুঁচকে গেছে। তিনি বললেন, আচ্ছা, ওই সীতা মেয়েটি কেমন ছিল?

ডুপচেন বললেন, আচ্ছা হি তো থা বুড়াবাবা। জিস দিন সবনে উসে গাঁও সে নিকাল দিয়া, বহোত রো রহি থি। জানে কে বাদ দো সাল তক উও ইধার নাহি আয়ি, লেকিন উস দিন কিউ আয়ি থি মুঝে নাহি পতা।

এমনটা কী হতে পারে যে লাকপাই ওকে নিয়ে এসেছিল?

নেহি নেহি। কভি নেহি, প্রায় শিউরে ওঠেন ডুপচেন, লাকপা নে বৈজন্থী কো বহোত পেয়ার করতা থা। লেকিন সীতা উও অজীব সা ঝুট কিউ বোলি থি মুঝে আভি তক সমঝ মে নাহি আয়ি।

কেমন যেন সবটা ঘেঁটে যাচ্ছিল অমিয় আর পল্লবের। এত নতুন চরিত্রের সমাহারে ওদের কী কার্যোদ্ধার হবে কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না ওরা। আর সত্যি বলতে এটা এমন কিছু মারাত্মক তথ্য নয় যা পেমা গোপন করেছিল। ব্যবসা চালাতে গেলে এটুকু সাবধানতা তো নিতেই হবে। তবে ওরা হতাশ হলেও ভাদুড়ি মশায়ের উত্তেজনা কিন্তু উত্তরোত্তর বাড়ছিল। ব্যগ্র গলায় তিনি বললেন, আচ্ছা, এই লাকপার বাড়িটা কত দূর?

ডুপচেন বললেন, ইধার হি, বগল মে।

কাল সকালে আমাকে সেখানে এক বার নিয়ে যেতে পারবে মা?

মাথা নাড়লেন ডুপচেন, কিউ নেহি? সুবাহ পাঁচ বাজে পেমা পানি লেনে নীচে জায়েগা তব ম্যায় আপলোগোকো লে কে যাউঙ্গি। আব মুঝে জানা হোগা বুড়াবাবা।

ডুপচেনের মাথায় হাত রাখলেন ভাদুড়ি মশায়, যাও মা। কাল সকালে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব। তুমি যে বিপদের ঝুঁকি নিয়েও আমায় সবটা খুলে বললে, সে জন্য আমি সারাজীবন তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

হাত জোড় করে চলে গেলেন ডুপচেন। প্রায় ছুটে এসে ঘরে ঢুকলেন দীপক পাল। উদ্গ্রীব হয়ে বললেন, কী স্যার? কথা বলে কিছু লাভ হল?

মাথা নাড়লেন ভাদুড়ি মশায়। বললেন, মনে হচ্ছে একটা আলোর দিশা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাকে এক বার লাকপার বাড়ির চারদিকটা ঘুরে দেখতে হবে। যদি আমার অনুমান ঠিক হয় তা হলে লাকপার বাড়ির আশেপাশেই আমি তন্ত্রসাধনার উপকরণ খুঁজে পাব। আমার মন বলছে, ওখানেই লুকিয়ে আছে সমাধানের সূত্র।

কোনও কথা বললেন না দীপক পাল। শুধু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন বৃদ্ধের হাত দু'টি। তাঁর চোখ ছলছল করছে। তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল পল্লব আর অমিয়। অসহায় তিনটে মানুষ বহুক্ষণ পরে কোনও আশার কথা শুনেছে। প্রাণপণে সেটাকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছিল তারা।

. . .

অত্যন্ত দ্রুত শুরু হল পরের দিন সকালটা। ভোর পাঁচটা বাজতে না বাজতেই অমিয়রা গিয়ে হাজির হল লাকপার বাড়ি। বেরিয়ে এল লাকপার দুই দাদা। ডুপচেন তাদের কানে কানে কী যেন বলল তাতে তারাই ভাদুড়ি মশায়কে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল বাড়িটা। তীব্র সন্ধানী চোখে বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চি জরিপ করে নিচ্ছিলেন ভাদুড়ি মশায় কিন্তু বাড়িতে কিছু পাওয়া গেল না। বাড়ি থেকে বেরিয়েই চোখে পড়ল একটা ছোট্ট টিনের ঘর। যেন খেলনাবাড়ি। বড়জোর একটা মানুষ আঁটতে পারে তার ভেতরে। ভাদুড়ি মশায়ের প্রশ্নের উত্তরে ডুপচেন জানালেন, ওটা সীতার তৈরি ঠাকুরঘর। লাকপারা হিন্দু কিন্তু সীতা ছিল বৌদ্ধ। তাই সে আলাদা করে নিজের ঠাকুরঘর বানিয়েছিল। সীতা চলে গেছে কিন্তু ঠাকুরঘর রয়ে গেছে। ঠাকুর দেবতার ব্যাপার বলে কেউ আর ঘরটা ভাঙেনি। শুনেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল ভাদুড়ি মশায়ের চোখ দু'টো। তিনি দেখতে চাইলেন সেই ঘর। তালা খোলা হল। ঘরের মধ্যে সাধারণ একটা কাঠের সিংহাসন। তাতে অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি। পুজোর উপকরণ ছড়িয়েছিটিয়ে আছে কিন্তু দেখেই বোঝা যায় বহু দিন এ ঘরে কেউ ঢোকে না। সেই ঘরটাও খুঁটিয়ে দেখলেন ভাদুড়ি মশায় কিন্তু সেখানেও কিছু পাওয়া গেল না। হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন এমন সময় দীপক পাল বললেন, আচ্ছা স্যার, পল্লববাবুর কাছে শুনলাম ওই সীতা নামের মেয়েটি না কি ভাঁড়ার ঘরে লুকিয়েছিল। তা সেই ঘরটা একবার দেখবেন না?

থমকে গেলেন ভাদুড়ি মশায়, ঠিক বলেছ। ওই ঘরটার কথা আমার মনে ছিল না।

খোলা হল ভাঁড়ার ঘরের দরজা। চাল, ডাল, নুন, আলুর বস্তায় ভর্তি। দিনের বেলাতেও আলো ঢোকে না। সুইচ টিপতে জ্বলে উঠল অনুজ্বল এক বাল্ব। সেই ধোঁয়াটে আলোয় বড় অদ্ভুত দেখাচ্ছিল ঘরটাকে। দীপক পালের কাছ থেকে টর্চ নিয়ে প্রতিটা কোণা তন্ন তন্ন করে খুঁজছিলেন ভাদুড়ি মশায়। তাঁর নির্দেশে কখনও কখনও কোনও বস্তা সরিয়ে দিচ্ছিলেন দীপক পাল এবং লাকপার এক দাদা।

এক মাস আগের এক সন্ধেয় সীতা এই ঘরে লুকিয়ে বসেছিল। তার পর অনেক মানুষের পা পড়েছে এই ঘরে। যা কিছু চিহ্ন ছিল সে কি এই এক মাসে মুছে যায়নি? দেখতে দেখতে এটাই ভাবছিল অমিয়। তখনই কিছু একটা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ভাদুড়ি মশায়।

এক দিকের দেওয়ালে সারি দিয়ে রাখা তেলের টিন। তারই ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সিঁদুরের দাগ, একটা নক্সার কোণা। দ্রুত হাতে তেলের টিনগুলো সরিয়ে ফেললেন দীপক পাল এবং টর্চের আলোয় উদ্ভাসিত হল সিঁদুর দিয়ে আঁকা একটা অদ্ভুত জ্যামিতিক নক্সা। নক্সাটা ভাল করে দেখল পল্লব, একটা বর্গক্ষেত্রের পেটের মধ্যে দিয়ে কোনাকুনি আর একটা বর্গক্ষেত্র আঁকা হয়েছে। তাতে যে ত্রিভুজগুলি তৈরি হয়েছে তাদের পেটের মধ্যে আবার একটা করে বর্গক্ষেত্র। তাদের মাথাগুলি বেরিয়ে আছে বাইরে। মূল বর্গক্ষেত্রের পেটের মাঝে দুটো ত্রিভুজ উল্টো হয়ে পরস্পরকে ছেদ করেছে। তাতে যে নিউক্লিয়াসের মতো জায়গাটি তৈরি হয়েছে সেখানে আঁকা একটি বৃত্ত এবং তার মধ্যে আঁকা ছোট ছোট তিনটি ত্রিভুজ। কিন্তু সবকটা ত্রিভুজই উল্টো। এমন অদ্ভুত নক্সার কী মানে কিছুই বুঝতে পারল না পল্লব কিন্তু নক্সাটা দেখা মাত্রই অস্থির হয়ে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়। কয়েক মুহূর্ত নির্নিমেষে সেই নক্সার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি এবং এক রাশ হতাশা ঝরে পড়ল তাঁর কণ্ঠ থেকে। বলে উঠলেন, হা ঈশ্বর।

চমকে উঠল উপস্থিত সকলে। এগিয়ে গেল অমিয়, কী হল স্যার?

ক্লান্ত গলায় ভাদুড়ি মশায় বললেন, যা সন্দেহ করেছিলাম তাই। আমার যা দেখার দেখা হয়ে গেছে। বাইরে চলো।

বাইরে এসে অমিয়রা তিন জন ঘিরে ধরল ভাদুড়ি মশায়কে। পল্লব বলল, কী বুঝলেন একটু খুলে বলুন স্যার। আর দেওয়ালে আঁকা ওই নক্সার মানে কি?

ভাদুড়ি মশায় বললেন, নক্সা নয় পল্লব। ও একটি অতি জটিল যন্ত্র।

যন্ত্র? হাঁ হয়ে গেলেন দীপক পাল, যন্ত্র মানে তো মেশিন।

স্নেহের হাসি হাসলেন ভাদুড়ি মশায়। পিঠে হাত রেখে বললেন, এ যন্ত্র সে যন্ত্র নয় দীপক। খুব ছোট আর সহজ করে বলতে গেলে যখন দেব-দেবীর মূর্তি কল্পিত হয়নি তখন এই যন্ত্রেই দেব-দেবীর পুজো করা হতো। এই যে আজ আমরা মা কালীর যে মূর্তি দেখি ষোড়শ শতাব্দীর আগে কিন্তু এ মূর্তি ছিল না। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ মায়ের মূর্তি কল্পনা করেন। তার আগে যন্ত্রেই মায়ের পুজো হতো। আর শুধু তাই নয়, এখনও মূর্তি থাকলেও পুজোর সময় তাম্রতাটে যন্ত্র আঁকা হয়।

অমিয় বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি দেখেছি। কালী পুজোর সময় একটা তামার পাত্রে সিঁদুর লেপে বেল পাতার ডাঁটি দিয়ে এমন আঁকা হয়।

ঠিক বলেছ। ওই হল যন্ত্র। এখানেও দেওয়ালে একটা যন্ত্র আঁকা হয়েছে।

পল্লব বলল, তার মানে কি এই যন্ত্রেই দেব বা দেবী অবস্থান করেন?

হ্যাঁ। কিন্তু সমগ্র যন্ত্রেই অভীষ্ট দেব বা দেবীর অবস্থিতি নয়। যন্ত্র হল আসলে দেব বা দেবীর নগরী। মানে ধরো, তুমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে চাও। গিয়েই তো তুমি দুম করে তাঁর ঘরে চলে যেতে পারবে না। প্রথমে তোমাকে গেটের সিকিওরিটি পেরতে হবে। তার পর যেতে হবে উপাচার্যের অফিসে। সেখানে গিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তবে তুমি তাঁর সাথে দেখা করতে পারবে। তাই তো? যে কোনও যন্ত্রও ঠিক তেমন। শক্তিযন্ত্র অনুসারে যদি বলি, সাধারণভাবে এর বাইরের অংশকে বলা হয় 'দ্বার'। তার পরের অংশটির নাম 'ভুপুর'। তার পর রয়েছে 'দল' এবং ওই যে ভিতরে গোল অংশটি মানে যেটি যন্ত্রের নিউক্লিয়াস সেটির নাম 'কর্ণিকা'। ওরই মধ্যে মধ্যবিন্দুতে দেব বা দেবীর অবস্থান। এই যন্ত্রেই দেবী পর্ণশবীরর পূজা করা হয়েছে আর সবচেয়ে ভয়ের কথা কী জানো, ওই যে ভিতরের তিনটি ত্রিভুজ উল্টে রয়েছে।

অবাক হল পল্লব, কেন স্যার? ত্রিভুজ উল্টে থাকার সাথে ভয়ের কী সম্পর্ক?

বেশ হাওয়া দিচ্ছে। হাত দিয়ে গলার মাফলারটা একটু টেনে দিলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর বললেন, তোমাদের মনে আছে আমি বলেছিলাম, দেবী পর্ণশবরী শান্তস্বভাবা, মায়ার আধার? তাঁর এ ক্রোধের কারণ আশ্চর্যজনক?

মাথা নাড়ল পল্লব, মনে আছে।

ওই তিনটে উল্টোনো ত্রিভুজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর রহস্য। ত্রিভুজ সোজা থাকা মানে দেবীর শান্ত, প্রসন্ন রূপের পুজো করা কিন্তু উল্টোনো ত্রিভুজ মানে আহ্বান করা দেবীর সংহারক শক্তিকে। এই ভাঁড়ার ঘর থেকেই গোপন তন্ত্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল এবং যার প্রভাব পড়েছিল লাকপা ও তার স্ত্রী বৈজন্থীর ওপর। যদি খুব ভুল না করে থাকি, সীতা তন্ত্রসিদ্ধা। সে ফিরে এসেছিল প্রতিশোধ নিতে। যে ব্যাধির দোহাই দিয়ে তাকে এক দিন এই গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই গ্রাম সংলগ্ন অঞ্চলেই সে জাগিয়ে দিয়ে গেছিল ব্যাধির দেবীকে। সে জানত, এক বার দেবীর রুদ্ররূপকে জাগিয়ে দিতে পারলে তিন পক্ষকালের মধ্যে ব্যাধিগ্রস্ত হবে সংলগ্ন অঞ্চল। এক মাস পার হয়েছে, হাতে রয়েছে আর পনেরো দিন। দেবীকে যদি ফের নিদ্রায় পাঠানো না যায় তা হলে পনেরো দিনের মধ্যেই কোনও না ভয়ানক ছোঁয়াচে ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে চটকপুর এবং গ্রামটি উজাড় হয়ে যাবে।

স্তম্ভিত হয়ে গেল ওরা তিন জন। দীপক পাল অস্ফুটে বলে উঠলেন, সর্বনাশ!

অমিয় বলে উঠল, কিন্তু স্যার তা হলে লাকপা, তিতাস আর মিতুলের সাথে এমন হল কেন? আপনি তো বলছেন, আসল ঘটনাটা ঘটবে আরও পনেরো দিন পর।

সে তো আমি আগেই বলেছি অমিয়। দৈবী মুহূর্তে ওরা দেবীকে বিরক্ত করেছিল। এটা মিতুল, তিতাস বা লাকপা শুধু নয়, যে কারও সাথেই হতে পারত। এই চন্দ্রালোকিত বনভূমিতে যেই ঢুকবে তারই এই বিপদ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ দেবী এখানে ভীষণ ভাবে জাগরুক।

বুঝলাম। আর বৈজন্থী? তার কী হল, প্রশ্ন করল পল্লব।

থমকে গেলেন ভাদুড়ি মশায়। রুমাল দিয়ে চশমার কাচ মুছলেন অল্প সময় ধরে। তার পর চশমাটা পরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সম্ভবত সে মারা গেছে। তাকেই বলি দেওয়া হয়েছে পাথরে খোদিত ওই জাগ্রত দেবী মূর্তির সামনে। লাকপার এই ভাঁড়ার ঘরের ভিতরে যে গূঢ় তন্ত্রাচার শুরু হয়েছে তা শেষ হয়েছে ওই ত্রিকোণাকার খাঁজের সামনে গিয়ে।

শিউরে উঠল সকলে। অমিয় বলল, কিন্তু স্যার, সীতার পক্ষে কি বৈজন্থীকে বলি দেওয়া সম্ভব? বৈজন্থী বাধা দেবে না? একা একটা মেয়ের পক্ষের আর একটা একেবারে মেরে ফেলাটা কিন্তু খুবই অস্বাভাবিক।

যদি বৈজন্থী ঘোরগ্রস্ত থাকে তা হলে অসম্ভব নয়। ডুপচেন যে বলছে বৈজন্থী রাগ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছিল, আমার সেটা মনে হয় না। আমার মনে হয় সেই সময় থেকেই বৈজন্থীর ওপর কাজ শুরু করেছিল এই তন্ত্র যা অবধ্য নিয়তির মতো তিন দিন পর বৈজন্থীকে টেনে নিয়ে গেছিল ওই মূর্তি অবধি। সীতা জানত বৈজন্থী আসবে। আর তার চেয়েও বড় কথা, তুমি কী করে জানছ সীতা একাই ছিল? তার কোনও সহকারী ছিল না?

চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল অমিয়। তার পর ধীরে ধীরে বলল, স্যার আপনি শিওর তো সীতাই এই কাজ করেছে?

পল্লব দেখল, সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য হলেও বৃদ্ধের দু'চোখে ঝিকিয়ে উঠল ক্রোধ। কিন্তু অপরিমিত সংযমে মুহূর্তে সে ক্রোধ বশীভূত করলেন বৃদ্ধ। তার পর অমিয়র চোখে চোখ রেখে গম্ভীর গলায় বললেন, নিশ্চিত কী করে হব অমিয়? আমি তো ঘটনাস্থলে ছিলাম না। আমি যা বলছি সবই আমার অনুমান। তবে একটা কথা আমি তোমায় বলতে পারি, গুরুকৃপায় আজ অবধি আমার সমস্ত অনুমানই অভ্রান্ত হয়েছে।

ভাদুড়ি মশায়ের অভিমানের জায়গাটা ধরতে পারল অমিয়। হাত জোড় করে বলল, ক্ষমা করবেন স্যার। আমি ও ভাবে সংশয় প্রকাশ করতে চাইনি। দয়া করে ভুল বুঝবেন না আমায়। আমাদের বলুন, এ বার কী করণীয়?

অমিয়র পিঠে হাত রাখলেন ভাদুড়ি মশায়, অস্থির হোয়ো না। আমি রাগ করিনি। আমি বলি কি ডুপচেনের কাছ থেকে দোকানের নামটা জেনে নিয়ে এই মুহূর্তে তুমি আর দীপক দার্জিলিং চলে যাও। গিয়ে সীতাকে নিয়ে এসো। মহিলা পুলিশ নিয়ে নাও সঙ্গে। কিন্তু যে কোনও মূল্যে সীতাকে আমার চাই। এক বার যদি তাকে নিয়ে আসতে পারো তা হলে সে অনিচ্ছুক হলেও আমি তাকে বিপরীত তন্ত্রাচারে বাধ্য করতে পারব বলে আশা রাখি আর তা হলেই এ বিপদের অবসান হবে।

হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠল অমিয়দের মুখে। পুলিশি তৎপরতায় দীপক পাল বলে উঠলেন, চলুন স্যার। সোনাদা পৌঁছে গেলে টাওয়ার পেয়ে যাব। আপনাদের কলেজের এক সিনিয়ার এখন মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে আছেন বলেছিলেন না? তাঁর সাথে কথা বলে নেবেন।

জিপ ছুটল দার্জিলিংয়ের উদ্দেশে। কাচের জানলায় মুখ ঠেকিয়ে খাটের নীচে শুয়ে থাকা তিতাস আর মিতুলকে দেখতে দেখতে ফিসফিস করে পল্লব বলল, আজকের রাতটুকু তিতাস। তার পর আবার গান গাইবি তুই।

পল্লবের চোখের জলে আর্দ হল জানলার কাচ।

. . .

সোয়া ছ'টা নাগাদ অমিয়রা রওনা দিয়েছিল। তার পর থেকে শুধুই ঘর-বার করে গেছে পল্লব। এক মুহূর্তের জন্যও স্থির হয়ে বসতে পারেনি। দুপুর তিনটে নাগাদ নীচের বাঁকে গাড়ির হর্ণ শোনা গেল। তিন লাফে ভাদুড়ি মশায়ের ঘরে ঢুকে গেল পল্লব, স্যার ওরা আসছে।

জিপটা এসে দাঁড়াল হোম-স্টের সামনে। পৃথিবীর যাবতীয় হতাশা মুখে নিয়ে জিপ থেকে নেমে এলেন দীপক পাল আর অমিয়। অস্থির পল্লব বলে উঠল, সীতা? সীতা কোথায়?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমিয় বলল, সীতা দার্জিলিং-এর ওই দোকানে কাজ করত ঠিকই। কিন্তু আজ থেকে দেড় বছর আগে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সঙ্গে সে চলে যায়। আর ফিরে আসেনি। সীতা যেখানে থাকত সেখানেও খোঁজ নিয়েছিলাম আমরা। কেউ কিছু বলতে পারেনি। দোকানে সীতার যে ভোটার আই-ডির ফোটোকপি ছিল সেটা লোকাল থানায় জমা দিয়ে এসেছি আমরা। ওঁরা আশ্বাস দিয়েছেন, আজ থেকেই সীতাকে খুঁজবেন। তবে পুলিশে চাকরির সুবাদে আমি জানি এ কাজ হয়তো অসম্ভব নয় কিন্তু দুঃসাধ্য। এই বিপুল জনঅরণ্যে শুধুমাত্র ভোটার আই-ডির সূত্র ধরে একটা মানুষকে খুঁজে বার করতে কত সময় লাগবে কেউ জানে না। এর চেয়ে খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা সহজ।

সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন দীপক পাল। ধপ করে বসে পড়ল পল্লব। তীরে এসে যে এ ভাবে তরী ডুবতে পারে তা তার ধারণায় ছিল না। ধারণায় ছিল না অমিয়দেরও। সকলের চেহারাতেই হাল ছেড়ে দেওয়ার ভাবটি স্পষ্ট। তারাও গা এলিয়ে দিল হোম-স্টের সামনে পেতে রাখা চেয়ারগুলোয়। শুধু একা ঋজু শালগাছটির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন ভাদুড়ি মশায়। শক্ত হয়ে উঠল তাঁর চোয়াল। কাউকে না বললেও এ ঘটনার জন্য মনে মনে প্রস্তুতই ছিলেন তিনি। তাই এতক্ষণ ধরে শুধু গুরুকেই স্মরণ করে গেছেন। শেষ পন্থাটি অবলম্বন করার কথা ভাবলেই হাজার দ্বিধা এসে ঘিরে ধরছিল তাঁকে। কিন্তু গুরুই কাটিয়ে দিয়েছেন সে দ্বিধা। মনে পড়ে গিয়েছে সেই দিনটির কথা।

গুরু মৃত্যুশয্যায়। তাঁকে ঘিরে কীর্তন গান হচ্ছে। কান্নাকাটি মোটে পছন্দ করতেন না সদাহাস্যময় মানুষটি তাই বুকে পাথর রেখে সকলে কান্না চেপে আছে। খবর পেয়ে বারাসাত থেকে ছুটে গিয়েছিলেন ভাদুড়ি মশায়। তিনি গিয়ে দাঁড়াতেই চোখ মেলে চেয়েছিলেন শ্রী রামদাস চট্টোপাধ্যায়। অস্ফুটে বলেছিলেন, নীরেন এসেচে। নীরেন। ওকে আমার কাছে পাঠা।

মাথার কাছে বসে হাওয়া করছিল দুই গুরুভাই। তাদেরই এক জন উঠে এসে বলেছিল, যা নীরেন। গুরুদেব তোকে ডাকছেন।

গুরুর পাশে বসে তাঁর শীর্ণ হাত দু'টি নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন ভাদুড়ি মশায়। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিলেন রামদাস ঠাকুর। চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না ভাদুড়ি মশায়। তবু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বলেছিলেন, এত তাড়াতাড়ি না গেলেই কি চলছিল না?

অপার স্নেহে হেসেছিলেন রামদাস ঠাকুর। বলেছিলেন, তাড়াতাড়ি কি রে পাগলা? অনেক দিন বেঁচে নিয়েচি। আর কত জল, হাওয়া, অন্ন ধ্বংস করব এ পৃথিবীর? বেশি দিন বাঁচলে দর পড়ে যায় বুঝলি? একটা সময় আসবে যখন মনের মধ্যে ডাক শুনতে পাবি। তখন যেন আর আঁকড়ে থাকিস না বাপ।

আজ সেই ডাক শুনতে পাচ্ছেন ভাদুড়ি মশায়। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। নরবলিতে একটা মানুষই তো লাগে।

১০

কোন দিগন্তরেখায় বসে লাটাই গোটানোর মতো একটু একটু করে দিনের আলো গুটিয়ে নিচ্ছে কেউ আর তার বদলে বিছিয়ে দিচ্ছে অন্ধকারের সুতোয় বোনা বিষণ্ণ এক চাদর। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে উঁকি দিচ্ছে ভাঙা চাঁদ। এখনও সে ম্রিয়মাণ। যেটুকু আলো সে দিচ্ছে সেটুকুও হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন এই পাইন বনের জমাট কুয়াশায়। গাছের পাতা থেকে জল ঝরে পড়ছে টুপটুপ করে আর তাকে সঙ্গত করছে অবিশ্রান্ত ঝিঁঝিঁর ডাক। কিন্তু অরণ্যের এই আদিম সিম্ফনির তাল কেটে গেল বিজাতীয় একটি শব্দে। পাহাড়ি ঢালের কাছে এসে দাঁড়াল একটি জিপ। জিপ থেকে নেমে এল অমিয়, পল্লব আর দীপক পাল। তারা ধরাধরি করে নামিয়ে আনল ভাদুড়ি মশায়কে। তাঁর পরনে রক্তাম্বর। মাথায় জড়ানো লাল উত্তরীয়। গায়ে একটি চাদর। ইশারা করা মাত্র সে চাদর সরিয়ে দিলেন দীপক পাল। দেখা গেল বৃদ্ধ নগ্নগাত্র। প্রবল পাহাড়ি ঠান্ডায় এক বার যেন কেঁপে উঠলেন তিনি কিন্তু পরক্ষণেই অসীম মানসিক জোরে সে শৈত্যকে উপেক্ষা করলেন। হাত বাড়িয়ে দিলেন অমিয়র দিকে। অমিয় তাঁর হাতে তুলে দিল একটি কাপড়ের ঝোলাব্যাগ। সেটি নিজের কাঁধে গলিয়ে নিলেন দীর্ঘকায় বৃদ্ধ। তার পর এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে।

ত্রিকোণ খাঁজটির সামনে তখন জমাট অন্ধকার। ঝোলা থেকে পাঁচটি মোমবাতি বার করে তিনি এগিয়ে দিলেন অমিয়র দিকে। পাহাড়ি দেওয়ালের নীচে পরপর মোমবাতিগুলোকে সাজিয়ে রাখল অমিয়, তার পর আগুন ধরাল তাতে। জঙ্গলের অন্ধকারে মোমবাতির শিখা কেমন যেন বিভ্রম সৃষ্টি করল নিমেষে। গাছের ছায়া কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল পাথরে খোদিত সেই দেবীমূর্তির ওপরে। যেন জ্বলজ্বল করে উঠল দেবীর পাথরের চোখ। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে সে দিকে তাকিয়ে থেকে ভাদুড়ি মশায় বললেন, এ বার তোমরা ফিরে যাও। এখন আমি দীর্ঘ সময় ধরে পুজো করব। দেবীর তুষ্টিবিধানের চেষ্টা করব। যদি সব ঠিক থাকে আমার বিশ্বাস আজ মধ্য রাতের পর থেকেই তিতাস এবং মিতুলের আচরণের পরিবর্তন দেখা যাবে। যাও, ওদের কাছে কাছে থাকো।

অমিয় বলে উঠল, কিন্তু স্যার আপনাকে এখানে এ ভাবে একা ফেলে...

হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন ভাদুড়ি মশায়। বললেন, আমি একা নই অমিয়। আদিম এই অরণ্যের সমস্ত জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ সকলে আমার সঙ্গে আছে আর আছেন দেবী পর্ণশবরী স্বয়ং। চাঁদ তার জৌলুস অর্জন করলেই দেবী আবির্ভূতা হবেন। তোমরা থাকলে নতুন কোনও বিপদ হতে পারে। সে আমি সামলাতে পারব না।

মিনতি করে উঠলেন দীপক পাল, আমরা একটাও কথা বলব না স্যার। আচ্ছা সবাই থাকছি না, স্যার আর পল্লববাবু ফিরে যান, আমি থাকি? আমি ওই গাছের আড়ালে লুকিয়ে বসে থাকব। আপনার যদি কোনও সাহায্য দরকার হয়।

দরকার হবে না। আমার কথা শোনো দীপক। যে কোনও মূল্যে দেবীকে আজ নিদ্রামগ্ন করাতেই হবে আমায়। বড় কঠিন এ পূজাপদ্ধতি। তোমাদের উপস্থিতি আমার মনঃসংযোগে বিঘ্ন ঘটাবে। আমার অনুরোধ, অবাধ্য হোয়ো না।

মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল অমিয়রা। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহের হাসি হেসে ভাদুড়ি মশায় বললেন, আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আশা রাখি, সব মঙ্গল হবে। কাল সকালে আমায় নিতে এসো কেমন? আমি বাড়ি ফিরতে চাই।

এ কথা বলে ওদের দিকে পেছন করে ঘুরে গেলেন বৃদ্ধ। ঝোলা থেকে পুজোর উপকরণ বার করে সাজিয়ে রাখতে শুরু করলেন।

এর পর আর কথা চলে না। তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরে যেতে বাধ্য হল তিন জন। জিপটা ফের রওনা দিল হোম-স্টের দিকে। ওরা সকলেই জানে, পারলে ভাদুড়ি মশায়ই পারবেন তিতাস আর মিতুলকে সুস্থ করে তুলতে তবু এই বিজন অরণ্যে বৃদ্ধকে একা ছেড়ে আসতে কারোরই মন সায় দিচ্ছিল না। বড় বেশি গম্ভীর হয়ে গাড়ি চালাচ্ছিল অমিয়। তার চেয়েও বেশি গম্ভীর হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন দীপক পাল। পল্লব বলল, চিন্তা করবেন না পালদা। আমরা আমাদের মতো করে ভাবছি কিন্তু ভাদুড়ি স্যারের ভাবনার সাথে আমাদের ভাবনা মেলে না। উনি অন্য লিগের মানুষ। ওনার ওপর বিশ্বাস রাখুন। উনি সব সামলে নেবেন। সব ঠিক হয়ে যাবে। কাল সকালে আমরা সবাই মিলে খুব গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরব।

মৃত মানুষের মতো অভিব্যক্তিহীন চোখ তুলে পল্লবের দিকে তাকালেন দীপক পাল। এত বড় আশার কথাটা পল্লবের নিজের কানেও কেমন যেন প্রহসনের মতো শোনাল।

. . .

ক্রাচ দু'টো পাশে রেখে মাটিতে বসে পড়লেন ভাদুড়ি মশায়। এ ভাবে বসতে বড় কষ্ট হয় কিন্তু উপায় কী? দেবীকে তুষ্ট করতে গেলে যে কৃচ্ছ্রসাধন করতেই হবে। তা ছাড়া আর একটু পরেই তো সব ব্যথা বেদনার ঊর্ধ্বে উঠে যাবেন। আজ নিজের মুখোমুখি হতে গিয়ে বড় আশ্চর্য হয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, নিজেকে তিনি যতটা শক্ত ভাবেন ততটা শক্ত তিনি নন। সাধকের নির্লিপ্তি নেই তাঁর। সংসারের মায়ায় জড়িয়ে পড়েছেন তিনি। যত বার মরার কথা ভাবছিলেন তত বার নাতনি অপালার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। ভেসে উঠছিল পুত্র, পুত্রবধূ, নাতি সৌমেন্দ্রনাথের মুখ। শুধু এই নিকটাত্মীয়েরাই নয়, অবাক হয়ে তিনি ভাবছিলেন, কোন অজান্তে তাঁর মনের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে কয়েকটা অনাত্মীয় ছেলেমেয়ে। তিতাস, মিতুল, অমিয়, পল্লব, সঞ্জয়, দীপক... সব্বার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল খুব করে। মনে হচ্ছিল, মরে গেলে আর তো এদের সঙ্গে দেখা হবে না। দুপুরের নরম রোদে পিঠ পেতে এরা আর কেউ গল্প শুনবে না তাঁর থেকে। আর নিয়তির এমনই পরিহাস, এদের কাউকে না জানিয়েই তাঁকে চলে যেতে হবে। খুব কষ্ট হচ্ছিল। চোখে জল এসে গেছিল। সেই নোনা জল ঠোঁট ছুঁতেই চমকে উঠেছিলেন তিনি। খুব ধিক্কার দিয়েছিলেন নিজেকে। তার পরেই গুরুর শরণ নিয়েছিলেন। নাহ! এখন আর কোনও দ্বিধা নেই। দ্বন্দ নেই। লক্ষ্যে অবিচল তিনি। পৃথিবীর কোনও শক্তি আজ তাঁকে তাঁর সংকল্প থেকে নড়াতে পারবে না। এখন তিনি সংসারবদ্ধ জীব নীরেন্দ্রনাথ ভাদুড়ি নন। এখন তিনি রামদাস ঠাকুরের প্রিয়তম শিষ্য নীরেন। গুরু বলতেন, 'লেগেপড়ে থাক নীরেন। অলৌকিক হবেই। শুধু লেগেপড়ে থাক।' তিনি জানেন, তাঁর এ পুজো সফল হলে সত্যি আবার আলৌকিক হবে। যে ভাবে ব্যাধিগ্রস্ত হয়েছিল তিতাস, মিতুল বা লাকপা, সেই একই ভাবে তাদের স্পর্শ করবে আরোগ্যের জিয়নকাঠি।

ব্যাগ থেকে বার করে আনেন তামার পাত্র। তার ওপরে সিঁদুর লেপে এঁকে ফেলেন দেবীর যন্ত্রটি। মাটির তালের ওপর স্থাপন করেন ঘট। তার ওপর সাজিয়ে দেন গাছের পাতা এবং সব শেষে ব্যাগ থেকে বার করে আনেন একটি ধারাল ছুরি। ছুরিটা তিনি চুপিচুপি চেয়ে নিয়েছেন ডুপচেনের থেকে। তাঁকে দেওয়ার আগে ভাল করে ছুরিটায় ধার দিয়েছে ডুপচেন। আসার আগে ডুপচেনের মাথায় হাত রেখে বসে এসেছেন, চিন্তা কোরো না মা। আশা রাখি তোমার ভাই সুস্থ হয়ে যাবে।

মন্ত্র পড়ে ছুরিটি শোধন করে নিলেন ভাদুড়ি মশায়। যে কোনও অস্ত্রে বলি দেওয়া যায় না। অস্ত্রটিকেও অধিকারী হয়ে উঠতে হয়। সিঁদুরচর্চিত করে ছুরিটি তিনি রেখে দিলেন দেবীর পায়ের তলায়। এক বার মুখ তুলে তাকালেন আকাশের দিকে। গত্তি লেগেছে চাঁদের গায়ে। কুয়াশার জাল ভেদ করে চাঁদের নরম আলো ছড়িয়ে পড়ছে এই পার্বত্য অরণ্যভূমিতে। তিনি জানেন, ক্ষেত্র প্রস্তুত। এর পর যে কোনও সময় থেমে যাবে অরণ্যের স্বাভাবিক কোলাহল। বাতাস মদির হয়ে উঠবে অচেনা এক সুগন্ধে আর তার কিছুক্ষণ পরেই আবির্ভূতা হবেন দেবী। তার ঠিক আগে কম্পন জাগবে বৃক্ষরাজির শিকড়ে শিকড়ে, আলোড়িত হবে ভূমি। ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে উৎসর্গ করতে হবে বলি, এক্ষেত্রে নিজেকে।

চোখ বুজে মনে মনে মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন ভাদুড়ি মশায়। একই সঙ্গে চলতে লাগল দুই হাতের নানাবিধ মুদ্রা। অঞ্জলি অর্পণ করলেন দেবীর চরণকমলে। এ ভাবেই কতটা সময় কেটেছে তাঁর খেয়াল নেই, হঠাৎই অনুভব করলেন, ধীরে ধীরে কমে আসছে জঙ্গলের শব্দ। চোখ খুলে টানটান হয়ে বসলেন তিনি। ওই তো, দেবীর আগমণবার্তা সূচিত হচ্ছে। অতলস্পর্শী এই নিস্তব্ধতা ভয়াবহ, শ্বাসরোধকারী। দেখতে দেখতে সম্পূর্ণ শব্দহীন হয়ে গেল গোটা চরাচর। আর ঠিক তখনই এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভাদুড়ি মশায়ের চেতনা আচ্ছন্ন করে দিল স্বর্গীয় এক সুগন্ধ। বিহ্বলতা ঝেড়ে ফেলে নিজেকে শক্ত করলেন তিনি। যদিও এই অপার্থিব সুবাসে মানুষের মন বেপথু হওয়াই স্বাভাবিক কিন্তু এই মুহূর্তে মনঃসংযোগে সামান্য চিড়ও বিপদ ঘটিয়ে দিতে পারে। বৃথা হয়ে যেতে পারে এতক্ষণের পরিশ্রম। ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় দেবীর পায়ের কাছ থেকে নামিয়ে আনলেন ছুরিটি। ডান হাতে শক্ত করে চেপে ধরলেন সেটিকে। চোখের কাছে তুলে এক বার ভাল করে দেখে নিলেন বাম হাতের মণিবন্ধ। শক্ত করলেন বাম মুঠি। ওই তো জেগে উঠেছে ধমনী এবং শিরা। তার ওপর আলতো ছোঁয়ালেন ছুরিটি। ভুল করার কোনও অবকাশ নেই। বলিতে ত্রুটি অমার্জনীয়। এক টানেই ছিন্ন করতে হবে মণিবন্ধ। রক্তার্ঘ্য দিতে হবে দেবীকে।

অস্ফুটে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন ভাদুড়ি মশায়। দেবীর কাছে বলি উৎসর্গ করার মন্ত্র। এক সময় সমাপ্ত হল মন্ত্রপাঠ। ঘট থেকে জল নিয়ে তিন বার ছিটিয়ে দিলেন সিঁদুরচর্চিত ছুরিটির ওপর। বাকি সব সমাপন। এ বার শুধু বলি হলেই দেবী পুনরায় নিদ্রামগ্ন হবেন এবং তার আগে তুলে নেবেন তাঁর অভিশাপ। একটি প্রাণের বিনিময়ে সুস্থ হবে তিনটি মানুষ এবং আসন্ন বিপদের হাত থেকে বেঁচে যাবে একটি গোটা জনপদ। এ কথা ভাবতেই মনটা বড় ভাল হয়ে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। ডান হাতে ছুরি চেপে ধরে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন সেই মৃদু কম্পনের। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই কম্পন অনুভব করা সম্ভব নয়। কিন্তু এক জন সাধক তা বুঝতে পারবেন। মনুষ্যেতর প্রাণীরা এমন অনেক কিছু টের পায় যা মানুষ পায় না। যেমন ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাতের আগে দল বেঁধে পশু-পাখি-কীটপতঙ্গ সংলগ্ন এলাকা ছেড়ে পালায়। মানুষ লোভী। সে প্রকৃতিকে শুধুই ব্যবহার করে। বদলে ফিরিয়ে দেয় না কিছুই। তাই প্রকৃতি মানুষকে এই সব ক্ষমতা দেয়নি। কিন্তু সাধনা মানুষকে নির্লোভ করে তাই সাধনায় ফাঁকি না থাকলে এমন কিছু শক্তি আয়ত্ব করতে পারে মানুষও।

ভাবতে ভাবতেই ভাদুড়ি মশায় অনুভব করলেন মাটির বুকে আলোড়ন জেগেছে। গাছের শিকড়ে শিকড়ে শুরু হয়েছে ফিসফিসানি, আসছে, সে আসছে! এই বার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। টানটান হয়ে উঠল ভাদুড়ি মশায়ের সমস্ত পেশি। আভূমি নত হয়ে প্রণাম করলেন দেবীকে। অস্ফুটে বলে উঠলেন, বলি নাও মা। বলি নাও। ব্যাধিমুক্ত করো এ পৃথিবী, আরোগ্য আনো। আরোগ্য।

মুষ্ঠিবদ্ধ বাম হাত উল্টো করে সামনে এগিয়ে দিলেন সামনে। কম্পন বাড়ছে ক্রমাগত। ডান হাতের ছুরি তুলে ধরলেন আড়াআড়িভাবে। এই বার... কিন্তু কব্জির ওপর ছুরির আঘাত নেমে আসার আগেই কে যেন পেছন থেকে চেপে ধরল তাঁর হাত এবং সবলে ছুরিটা ছিনিয়ে নিল হাত থেকে!

ছিটকে পেছন ঘুরতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ভাদুড়ি মশায়। ছুরি হাতে তাঁর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে পল্লব। বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে উঠেই কঠিন গলায় বললেন, এ কী! তুমি এখানে কী করছ? আমি তো তোমাদের চলে যেতে বলেছিলাম।

উত্তর দিল না পল্লব। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ভাদুড়ি মশায়ের দিকে। তার চোখ দু'টো যেন ছলছল করছে। ধরা গলায় সে বলে উঠল, দিস ইজ নট ডান স্যার। আপনি যা করতে যাচ্ছিলেন সেটা ঠিক না।

গর্জে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়, মূর্খ। আমি ঠিক না ভুল সেটা তুমি ঠিক করে দেবে? ছুরিটা ফেরত দাও। এটা ছেলেখেলা করার সময় না।

আমিও তো সেটাই বলতে চাই স্যার। আমাদের ফিরিয়ে দিয়ে আপনি যেটা করছেন সেটাও ছেলেখেলা। এ ভাবে আপনি কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

থমকে গেলেন ভাদুড়ি মশায়, পল্লব এ কথা জানল কেমন করে? তবে কি ও ফলো করছিল?

একই রকম ধরা গলায় পল্লব বলল, কী ভাবছেন স্যার? আমি জানলাম কী করে? আসলে আমার সন্দেহ হয়েছিল। আমি যখন দেবীকে ঘুম পাড়ানোর দ্বিতীয় কোনও পন্থা আছে কি না জানতে চেয়েছিলাম আপনি উত্তর দেননি। তখন থেকেই আমার মন বলছিল, এমন কোনও একটা রাস্তা আছে যা আপনি আমাদের সামনে বলতে চান না। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল আমার মাথার মধ্যে। উত্তর পেলাম আজ সকালে। অমিয়রা যখন সীতাকে খুঁজতে গেছিল আমি আপনার ঘরে গিয়েছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে। গিয়ে দেখলাম, আপনি চোখ বুজে কাঁদছেন। আমি বুঝতে পারলাম আপনি খুব বড় কোনও স্টেপ নিতে চলেছেন। তখন থেকে আমি আপনাকে ফলো করা শুরু করলাম। তার পর একটা সময় ফোনে টাওয়ার পেয়ে আপনি অপালাকে ফোন করলেন এবং নানা অসংলগ্ন কথা বলতে থাকলেন। যে ধরনের কথা আপনার মুখে মানায় না। অত্যন্ত বেশি ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলেন আপনি। তখনই আমার সন্দেহ আরও বাড়ে আর সেই সন্দেহ বদ্ধমূল হল যখন আপনি ডুপচেনের কাছ থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে ছুরি চাইতে গেলেন। আমিও দু'য়ে দু'য়ে চার করে ফেললাম।

থমকে গেলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, তুমি একা এসেছ?

হ্যাঁ স্যার। অমিয় জানে মাইগ্রেনের ওষুধ খেয়ে আমি আপনার ঘরে ঘুমোচ্ছি। ভোরের আগে ও আমায় ডাকবে না। কিন্তু স্যার, এসে যখন পড়েছি আপনাকে এ সর্বনাশ আমি কিছুতেই করতে দেব না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ভাদুড়ি মশায়। তারপর নিজেকে শক্ত করে বললেন, ছেলেমানুষি কোরো না পল্লব। এ ছাড়া তিতাস বা মিতুলকে সুস্থ করার দ্বিতীয় কোনও রাস্তা নেই। আমি বলি উৎসর্গ করার মন্ত্র পাঠ করে ফেলেছি। বলি না দিলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। হাতে সময় নেই। আমি বেশ বুঝতে পারছি, যে কোনও মুহূর্তে দেবী আবির্ভূতা হবেন। ছুরিটা আমায় দাও।

হাত বাড়ালেন ভাদুড়ি মশায়। দু'পা পিছিয়ে গিয়ে জেদি গলায় পল্লব বলল, না।

চমকে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়। তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। গর্জন করে উঠলেন, তুমি আমার মুখে মুখে তর্ক করছ?

কঠিন গলায় পল্লব বলল, করছি। আমি ডিশিসন নিয়ে ফেলেছি, আপনাকে মরতে দেব না।

পল্লবের চোখ দু'টো কেমন যেন ঘোলাটে লাগল ভাদুড়ি মশায়ের কাছে। তিনি বুঝতে পারলেন, ছেলেটা প্রকৃতিস্থ নেই। আবেগের বিস্ফোরণ ছেলেটার স্বাভাবিক বুদ্ধিলোপ ঘটিয়েছে। এখন ওর ওপর জোর খাটিয়ে লাভ হবে না। ভাল মুখে ওর হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে নিতে হবে। নরম গলায় ভাদুড়ি মশায় বললেন, আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি পল্লব। কিন্তু এ ছাড়া যে আর কোনও উপায় নেই। আমার কথা শোনো দয়া করে। আমায় দিয়ে দাও ছুরিটা। বিশ্বাস করো বলি না হলে অনর্থ হবে।

সেই ঘোলাটে ছলছল চোখে কয়েক মুহূর্ত ভাদুড়ি মশায়ের দিকে তাকিয়ে রইল পল্লব। মনে মনে উৎসাহিত হলেন বৃদ্ধ। মনে হচ্ছে, অনুরোধে কাজ দিয়েছে। ফের হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি কিন্তু তাঁকে অবাক করে ছুরি ধরা হাতটা নিজের দিকে গুটিয়ে নিল পল্লব। অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটের কোণে। ঘোর লাগা গলায় সে বলল, কে বলেছে বলি হবে না? বলি হবে তো। আপনি বলি উৎসর্গের মন্ত্র পড়ে ফেলেছেন, এ বার যে কেউ বলি হলেই তো হল।

শিউরে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়। বিপদ যে এ দিক থেকে আসতে পারে তা তিনি কল্পনাও করেননি। কাতর গলায় আর্তনাদ করে উঠলেন, পাগলামি কোরো না পল্লব। নিজেকে এ সবের মধ্যে টেনে এনো না। আমার বয়স হয়েছে। আমি অনেক দিন বেঁচে নিয়েছি। আমি মরলে কারও কোনও ক্ষতি হবে না।

চুপ করুন, চিৎকার করে উঠল পল্লব, কে বলেছে ক্ষতি হবে না? আপনি চলে গেলে কত মানুষ ভরসাহারা হয়ে যাবে আপনি বুঝতে পারছেন? আপনি অন্য লিগের মানুষ স্যার। আপনার মতো মানুষ আমি আজ অবধি একটাও দেখিনি। বহু মানুষের মঙ্গলের জন্য আপনার বেঁচে থাকাটা দরকার।

অবাক হয়ে ভাদুড়ি মশায় দেখলেন, পল্লবের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে কান্নার দমকে। কাঁদতে কাঁদতেই পল্লব বলল, দেখুন স্যার, বলি যখন দিতেই হবে তখন তো আমাদের মধ্যে থেকেই কাউকে বেছে নিতে হবে তাই না? আপনি তো আর কাপালিক না যে একটা পাহাড়ি বাচ্চাকে ধরে বলি দিয়ে দেবেন! তাই সেই হিসেবে যদি দেখি, আপনি কাকে কাকে বলি দিতে পারেন? নিজেকে, আমাকে, অমিয়কে আর পালদাকে। তিতাস আর মিতুল তো অসুস্থ। আচ্ছা, ওদেরও লিস্টে রাখছি আমি। এ বার দেখা যাক, কে মরলে সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে? আগেই বলেছি, মানুষের মঙ্গলের জন্য আপনার বেঁচে থাকা দরকার। আপনি বাদ। আপনি জাস্ট বাদ। বুঝেছেন?

থুতু ছিটকে এল পল্লবের মুখ থেকে। ফুলে উঠল নাকের পাটা। সে থরথর করে কাঁপছে। চিৎকার করে আবার বলল, এর পর অমিয় আর পালদা। ওরা দু'জনেই পুলিশ। সোসাইটির প্রতি ওদের অনেক কনট্রিবিউশন আছে। ওরা দু'জনেও বাদ। ক্লিয়ার স্যার? তার পর তিতাস। ও তো ডাক্তার। ও মানুষকে প্রাণ দেয়। ওকে তো বেঁচে থাকতেই হবে। সো তিতাস আউট হয়ে গেল এই লিস্ট থেকে। অকাট্য যুক্তি আমার। আপনি কাটতে পারবেন না আমায়, হাসি আর কান্নায় বেপথু পল্লবের স্বাভাবিক চিত্তবৃত্তি। ভাদুড়ি মশায়ের দিকে এগিয়ে এল সে। নীচু গলায় বলল, এ বার মিতুল। ওর তো মরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বাচ্চা একটা মেয়ে। এখনও কিছুই দেখেনি এ দুনিয়ার। তা ছাড়া ও আমাকে দাদা বলে ডাকে। আমাকে সোয়েটার কিনে দিয়েছে জানেন? আমি তো ওকে মরতে দিতে পারব না স্যার। তা হলে হারাধনের দশটি ছেলের মধ্যে পড়ে রইল কে? এই আমি শ্রী শ্রীযুক্ত শ্রীল পল্লব চক্রবর্তী। কী করেছি আমি এত দিনে? এই সোসাইটিতে আমার কী কন্ট্রিবিউশন? কিস্যু না। নাথিং। কলেজে থাকতে আমি রাজনীতি করতাম জানেন স্যার? স্বপ্ন দেখতাম সাম্যবাদের। স্বপ্ন দেখতাম, যৌথখামার হবে। দুনিয়ার সব গরিব মানুষের ঘরে গন্ধ ছুটবে গরম ভাতের। কেউ অভুক্ত থাকবে না। পুঁজিবাদের মুখে সপাটে লাথি মেরে আমরা নিয়ে আসব রক্তরাঙা ভোর। আর একটা ১৯১৭ আসবে। আসবে নভেম্বর বিপ্লব। কিন্তু তার পর আমি কী করেছি? আপনি নিশ্চয়ই জানেন স্যার, বিপ্লবের পথ চিরকাল গার্হস্থ্যের দিকে বেঁকে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমি লোভী। পুঁজিবাদ আমায় গিলে খেয়েছে। আমি গাড়ি কিনেছি। নতুন মডেলের গাড়ি দেখলে আমার জিভ দিয়ে লালা পড়ে। এসির হাওয়া ছাড়া আমার ঘুম আসে না। আমি সত্যভ্রষ্ট হয়েছি স্যার। আমি বিপ্লবকে ধোঁকা দিয়েছি। আই অ্যাম আ ট্রেটার। আর ট্রেটারদের শাস্তি কি জানেন? তাদের মার্কেটপ্লেসে বেঁধে পাথর ছুঁড়ে মারা হয়। সেই হিসেবে আমার তো মৃত্যুই প্রাপ্য। তাই আমাকে প্লিজ বাধা দেবেন না। লেট মি গো। লেট মি গো...

ছুরিটা উঁচু করে তুলে ধরল পল্লব। ভাদুড়ি মশায় অনুভব করলেন, কম্পন এই মুহূর্তে তীব্রতম। আর সময় নেই। চোখের সামনে পৌত্রসম এক যুবককে মরতে দিতে পারেন না তিনি। বাঁ হাতের ক্রাচটা দিয়ে তিনি সজোরে মারলেন পল্লবের পায়ে। এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না পল্লব। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। ভাদুড়ি মশায়ের পক্ষে যতটা দ্রুত যাওয়া সম্ভব তিনি এগিয়ে গেলেন ছুরিটা কেড়ে নিতে। কিন্তু এক পাক গড়িয়ে তাঁর নাগালের বাইরে চলে এল পল্লব এবং হাঁটুর ওপর বসে ছুরিটা আড়াআড়ি চালিয়ে চালিয়ে দিল নিজের কব্জিতে। রক্ত ছিটকে গিয়ে লাগল পাথরের দেবীমূর্তিতে আর তখনই তীব্র এক আলোর উদ্ভাসন হল। মহাবৃক্ষের বুক চিরে আবির্ভূতা হলেন দেবী। তাঁর তিন আননে নয়টি চক্ষু। ছয়টি হস্ত। চুল উড়ছে সাপের ফণার মতো। অপার্থিব সুবাসে শ্বাসরোধ হয়ে এল। সেই আলোকসামান্য তেজোদ্দীপ্ত উপস্থিতি সহ্য করতে পারলেন না ভাদুড়ি মশায় বা পল্লব কেউই। ছিটকে পড়লেন পাথরের দেওয়ালে। পল্লবের হাত থেকে খসে গেল ছুরি। তার পর ধীরে ধীরে সব অন্ধকার হয়ে এল।

১১

হোম-স্টের ঘরে বসে অমিয়র কাছে সবটা শুনছিলেন ভাদুড়ি মশায়। ভোরবেলা পল্লবকে বিছানায় না দেখে অমিয় শিউরে ওঠে। দীপক পালকে ডাকতে যাবে, তার আগেই মিতুলদের ঘর থেকে দরজা ধাক্কানোর আওয়াজে সে থমকে যায়। ছুটে যায় সে দিকে। ঘরের মধ্যে থেকে তিতাস তখন পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছে, এটা নিশ্চয়ই গাধা পল্লবটার কাজ। নইলে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করার বুদ্ধি আর কার হবে? এই পল্লব, অমিয়... দরজা খোল।

তিতাসের গলাটা ভারী স্বাভাবিক লাগে অমিয়র। সে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে অবাক হয়ে যায়। দেখে, তিতাস জামাকাপড় পরে রেডি আর মিতুল দাঁত মাজছে। ঘরের মধ্যে মলমূত্রের বিন্দুমাত্র গন্ধ নেই। যেন সবটা স্বাভাবিক। সদ্য ঘুম থেকে উঠেছে তিতাস আর মিতুল। ততক্ষণে ছুটে এসেছেন দীপক পালও। তাঁকে আর অমিয়কে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে তিতাস বলে ওঠে, কী হয়েছে? অমন হাঁ করে কী দেখছেন আপনারা? হোয়াটস রং উইথ ইউ অমিয়?

আর থাকতে পারেন না দীপক পাল। ছুটে গিয়ে মিতুলকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেন। অমিয়র চোখেও তখন জল। তিতাসের হাত দু'টো ধরে বলে, তিতাস, আই কান্ট বিলিভ দিস। ভাদুড়ি স্যার আবার একটা মিরাকল করেছেন!

অবাক হয়ে যায় তিতাস আর মিতুল। তাদের সবটা খুলে বলে অমিয় এবং ভাদুড়ি মশায় যে কাল রাতেই জঙ্গলে গেছেন সে কথা জানায়। তা ছাড়া পল্লবকে খুঁজে না পাওয়ার খবরটা দিতেও ভোলে না। তক্ষুনি জঙ্গলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওরা চার জন। সেই পাহাড়ি ঢালের কাছে এসে ওরা অবাক হয়ে দেখে, দেবীমূর্তি ফের শ্যাওলায় ঢেকে গেছে এবং ত্রিকোণ খাঁজের নীচে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন ভাদুড়ি মশায় আর পল্লব। ওদের ডাকে দু'জনেই চোখ মেলে তাকায়। দু'জনের চোখেই থতিয়ে যাওয়া ভাব।

তার পরেরটুকু তো ভাদুড়ি মশায় নিজেই জানেন। জ্ঞান ফিরে পেয়েই তিনি প্রথম যে কথাটি বলেন, সেটি হল, পল্লব!

ঘুরে তাকিয়ে পল্লবকে দেখে শিহরিত হন তিনি এবং কেঁদে ফেলেন। অস্ফুটে বলতে থাকেন, জয় মা। জয় মা। অলৌকিক হয়েছে তিতাস। অলৌকিক হয়েছে। আমি না, তোমাদের সব্বাইকে এবং এই চটকপুরকে বাঁচিয়ে দিয়েছে পল্লব।

নিজের কব্জিটা অমিয় আর তিতাসকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাচ্ছিল পল্লব। সেখানে ক্ষত তো দূর, সামান্য আঁচড়েরও দাগ নেই। বিস্মিত তিতাস বলল, কিন্তু স্যার এটা কী ভাবে সম্ভব হল একটু বলুন প্লিজ।

একটু চুপ করে থেকে ভাদুড়ি মশায় বলে উঠলেন, ঠিক কী ভাবে হল আমি বলতে পারব না তিতাস। দেবীর লীলা বুঝি সামান্য মানুষের সাধ্য কী? যা বলছি, সবই আমার অনুমান। দেখো, বলি শব্দটার মধ্যে তো বলের ধারণা নিহিত আছে। বলিপ্রদত্ত জীবটিকে মারবার জন্য বলপ্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই বলের বিষয়টাই ছিল না। আমি সজ্ঞানে নিজেকে উৎসর্গ করব ঠিক করেছিলাম। তার পর পল্লব যখন এল সেও স্বেচ্ছায় নিজেকে বলি দিতে চাইল। দু'জন মানুষের এই ঐকান্তিক আত্মত্যাগের ইচ্ছে একটি বলির প্রারব্ধকে ছাপিয়ে গেল। প্রারব্ধ মানে হল কৃতকর্মের দরুন অর্জিত ফল। তাই দেবী কোনও বলিই নিলেন না। উল্টে কাঙ্ক্ষিত বর দান করলেন আমায়। সুস্থ হয়ে উঠলে তোমরা। আমার স্থির বিশ্বাস ডুপচেনের ভাই লাকপাও সুস্থ হয়ে গেছে। সে খুব শিগগিরই ফিরে আসবে। আর শুধু তাই নয়, প্রীত হয়ে আমার এত বছরের ব্যাধিগ্রস্ত পা দু'টিকেও পুরোপুরি ঠিক করে দিলেন আরোগ্যের দেবী! দূর করে দিলেন আমার অনেকখানি জরা। বিশ্বাস করো, মনে হচ্ছে যেন আমার কুড়ি বছর বয়স কমে গেছে।

হ্যাঁ, ফেরার পথে হেঁটেই জিপে উঠেছেন ভাদুড়ি মশায়। তাঁর ক্রাচ দু'টি পড়ে আছে ওই পাহাড়ি দেওয়ালের কাছে। এই মিরাকলটা দেখে সবাই এমন ভেবলে আছে যে পল্লব বলার সুযোগ পায়নি, বহু দিন ধরে সে গলার একটা সমস্যায় ভুগছিল। সব সময় মনে হতো গলায় আঁশের মতো কী যেন আটকে আছে। সেটার আর চিহ্নমাত্র নেই। তারও নিজেকে বেশ ফুরফুরে লাগছে।

. . .

ছয় মাস পর...

ভাদুড়ি মশায়দের পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। সেখানে একটা নাটক করবে ছেলেমেয়েরা। নাটকটা পল্লবের লেখা এবং ডিরেকশন দিচ্ছে সেই। তবে শুধু ছেলেমেয়েরাই নয়, এ নাটকে অমিয়, মিতুল, সঞ্জয় আর অপালা অভিনয় করছে। অপালা বিদেশ থেকে ফিরেছে এবং জোর করে সঞ্জয়কে ছুটি নিতে বাধ্য করেছে। তিতাস নিয়েছে স্টেজ ডিজাইনের দায়িত্ব আর দীপক পাল হয়েছেন ম্যানেজার। সন্ধের টিফিন, চা, ড্রেসারের সাথে আলোচনা, মাল ডেলিভারি এ সবগুলো তিনিই দেখছেন। এ ক' দিন একটা প্রবন্ধ লিখছিলেন বলে রিহার্সাল দেখার সময় পাননি ভাদুড়ি মশায়। আজ রিহার্সাল দেখতে বসেছেন। পল্লব এখনও এসে পৌঁছয়নি, কিন্তু কুশীলবরা পার্ট মুখস্থ বলছে। পল্লব খুব কড়া ডিরেক্টর। প্রম্পট করার ঘোরতর বিরোধী সে। তাই পার্ট মুখস্থ না হলে সে রেগে যায়। নাটকটা শুনতে বেশ ভালই লাগছে ভাদুড়ি মশায়ের। খাসা লেখে ছেলেটা। ছেলেটার হাতে লেখা আছে। লেগেপড়ে থাকলে উন্নতি করবে। এখন নাটক ক্লাইম্যাক্সে দাঁড়িয়ে আছে। নায়ক আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে আর তাকে বাধা দিচ্ছে তার এক মাস্টারমশাই। অমিয় নায়কের চরিত্রে অভিনয় করছে। সংলাপ বলে উঠল সে, ''তা হলে হারাধনের দশটি ছেলের মধ্যে পড়ে রইল কে? এই আমি শ্রী শ্রীযুক্ত শ্রীল বিধান সরকার। কী করেছি আমি এত দিনে? এই সোসাইটিতে আমার কী কন্ট্রিবিউশন? কিস্যু না। নাথিং। কলেজে থাকতে আমি রাজনীতি করতাম জানেন স্যার? স্বপ্ন দেখতাম সাম্যবাদের। স্বপ্ন দেখতাম, যৌথখামার হবে। দুনিয়ার সব গরিব মানুষের ঘরে গন্ধ ছুটবে গরম ভাতের। কেউ অভুক্ত থাকবে না। পুঁজিবাদের মুখে সপাটে লাথি মেরে আমরা নিয়ে আসব রক্তরাঙা ভোর। আর একটা ১৯১৭ আসবে। আসবে নভেম্বর বিপ্লব। কিন্তু তার পর আমি কী করেছি? আপনি নিশ্চয়ই জানেন স্যার, বিপ্লবের পথ চিরকাল গার্হস্থ্যের দিকে বেঁকে যায়। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। আমি লোভী। পুঁজিবাদ আমায় গিলে খেয়েছে। আমি গাড়ি কিনেছি। নতুন মডেলের গাড়ি দেখলে আমার জিভ দিয়ে লালা পড়ে। এসির হাওয়া ছাড়া আমার ঘুম আসে না। আমি সত্যভ্রষ্ট হয়েছি স্যার। আমি বিপ্লবকে ধোঁকা দিয়েছি। আই অ্যাম আ ট্রেটার। আর ট্রেটারদের শাস্তি কি জানেন? তাদের মার্কেটপ্লেসে বেঁধে পাথর ছুঁড়ে মারা হয়। সেই হিসেবে আমার তো মৃত্যুই প্রাপ্য। তাই আমাকে প্লিজ বাধা দেবেন না। লেট মি গো। লেট মি গো...''

মুহূর্তে ভুরু কুঁচকে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। এ কথাগুলো যে তাঁর ভারী চেনা। বিদ্যুচ্চমকের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দৃশ্য। চন্দ্রালোকিত বনভূমিতে দাঁড়িয়ে পল্লব পাগলের মতো করছে। কখনও কাঁদছে, কখনও হাসছে। আর ঠিক এই কথাগুলোই বলছে! মনটা খারাপ হয়ে গেল ভাদুড়ি মশায়ের। আহা রে! ছেলেটার মনের মধ্যে জমাট বেঁধে আছে এই দুঃখের পাহাড়। তাই নাটকের সংলাপেও এ কথাগুলো লিখেছে সে। কিন্তু একটা জায়গায় খটকা লাগল ভাদুড়ি মশায়ের। সে দিন ঘোরের মধ্যে বলা কথাগুলো হুবহু এক কী করে লিখল পল্লব? সে সময় তার স্বাভাবিক বুদ্ধি লোপ পেয়েছিল, ফলে সে কী বলেছিল তা তো তার পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে থাকার কথা নয়। তা হলে? তিতাসকে জিজ্ঞেস করলেন, এ নাটকটা কি পল্লব পাহাড় থেকে ফিরে এসে লিখেছে?

তিতাস বলল, না তো স্যার। এ ওর কলেজে থাকতে লেখা নাটক। জানেন, দারুণ হিট করেছিল নাটকটা? আমরা কত শো করেছিলাম। এই বিধান সরকারের চরিত্রে পল্লব নিজেই অভিনয় করত। ওর এই মোনোলগটায় লোকে স্পেলবাউন্ড হয়ে যেত। কাঁদতে কাঁদতে হাততালি দিত।

প্রেমিকের গুণাবলীর কথা বলতে গিয়ে রীতিমতো উত্তেজিত তিতাস। কিন্তু উত্তোরত্তর কুঁচকে যাচ্ছিল ভাদুড়ি মশায়ের ভ্রূযুগল। একটু একটু করে তাঁর মনের মধ্যে জেগে উঠছিল ক্রোধ। কূট একটি সম্ভাবনা ক্রমশ দৃঢ় হয়ে বসে যাচ্ছিল তাঁর মনে। অস্থির ভাবে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন পল্লবের জন্য।

মিনিট পনেরোর মধ্যেই পল্লব চলে এল। তাকে বসতে না দিয়েই ভাদুড়ি মশায় বললেন, আমার লাইব্রেরি ঘরে এসো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।

আসতে না আসতেই লাইব্রেরি ঘর! বাকিদের মতোই পল্লবও ভারী অবাক হয়ে গেল কিন্তু বৃদ্ধকে প্রশ্ন করার নিয়ম নেই। পায়ে পায়ে সে গিয়ে ঢুকল লাইব্রেরি ঘরে। এই সেই লাইব্রেরি যা দেখলে পল্লব তীব্র ইনফিরিয়োরিটি কমপ্লেক্সে ভোগে। গিয়ে নিজের ইজিচেয়ারে বসে পড়লেন ভাদুড়ি মশায়। হাত দিয়ে পল্লবকে সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন, বোসো।

পল্লব বসল ঠিকই কিন্তু ভাদুড়ি মশায়ের এই আচরণের কারণ সে ধরতে পারছিল না। তীব্র চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়ি মশায়। এই তীক্ষ্ন অন্তর্ভেদী দৃষ্টির সামনে যে কেউই ঘাবড়ে যাবে। গুটিয়ে যাবে। পল্লবেরও তাই হল। সে আমতা আমতা করে বলল, কী হল স্যার? কী দেখছেন অমন করে?

হঠাৎই সম্পুর্ণ একটা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করলেন বৃদ্ধ। বললেন, আমাকে একটা সত্যি কথা বলবে পল্লব? কথা দাও মিথ্যে বলবে না?

ঘাবড়ে গেল পল্লব। বলল, না, আপনাকে মিথ্যে বলব কেন? আপনাকে আমি ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি। আজ অবধি আপনার সামনে মিথ্যে বলিনি।

আচমকা চাপা গলায় গর্জে উঠলেন ভাদুড়ি মশায়, বলেছ। চরম মিথ্যে বলেছ তুমি।

কবে? কোথায়? আশ্চর্য হল পল্লব?

চটকপুরে, সেই ত্রিকোণাকার খাঁজের সামনে, কঠিন গলায় বললেন ভাদুড়ি মশায়, সে দিন তুমি যা করেছিলে তা অভিনয়। তুমি সত্যি সত্যি নিজেকে ত্যাগ করতে আসোনি সে দিন। তুমি আমায় ছলনা করেছিলে। এমনকী ছলনা করেছিলে দেবীকেও।

মাথায় বাজ পড়লেও বুঝি বা পল্লব এত অবাক হতো না। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ভাদুড়ি মশায়ের দিকে। কাটা কাটা উচ্চারণে তিনি বললেন, ভাবছ কী করে আমি ধরে ফেললাম তাই তো? তোমার এই নাটকটা তোমায় ধরিয়ে দিয়েছে পল্লব। তুমি খেয়াল করোনি, এ নাটকে সেই সংলাপগুলোই আছে যা সে দিন রাতে তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলে। অভিনয় না হলে প্রতিটা শব্দ কিছুতেই এক হতে পারে না। অথবা তুমি সবই জানতে কিন্তু ভেবেছিলে, আমি বুড়ো মানুষ, ছ' মাস পরে হয়তো সব ভুলে যাব। কেন করেছিলে এই মিথ্যাচার? বলো কেন করেছিলে? ক্ষমাহীন শোনাল ভাদুড়ি মশায়ের কণ্ঠ।

কিছুক্ষণ তাঁর দিকে অপলকে তাকিয়ে রইল পল্লব। তার পর ধীরে ধীরে বলল, মাই ব্যাড স্যার। সত্যি আমার মনে ছিল না এই নাটকে ওই সংলাপগুলো আছে। না হলে এ নাটক আমি অভিনয় করতে দিতাম না। আসলে এটা তিতাসের খুব প্রিয় নাটক তো তাই ওই এটাকে বেছেছিল। আর একটা কথা, আমি সে দিন মিথ্যে বলিনি স্যার।

মিথ্যে বলোনি? এখনও অস্বীকার করছ নিজের পাপ?

পাপ? হেসে উঠল পল্লব, পাপের তো প্রশ্নই ওঠে না। আর আবার বলছি, আমি সে দিন কোনও মিথ্যাচার করিনি। আমি অভিনয় করেছিলাম এটা ঠিকই কারণ আমি আপনি নই। আপনার মতো উদার নই। সত্যি সত্যি নিজেকে উৎসর্গ করার মতো বুকের পাটা আমার নেই কিন্তু ভুলে যাবেন না, শ্রী শম্ভু মিত্র বলেছেন, 'অভিনয় হল আত্মার মধ্যে থেকে মিথ্যাভাষণ।' এটা একটা অক্সিমোরন স্যার। যা আত্মার মধ্যে থেকে বলা হয় তা চরম সত্য আবার একই সাথে অভিনেতাকে অন্য অনেকগুলো দিক খেয়াল রাখতে হয়। এক জন অভিনেতা যখন সম্রাট শাহজাহানের চরিত্রে অভিনয় করে সে নিজেকে শাহেনশা ভাবে। না হলে সে চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলবে কেমন করে? দর্শকের কাছে চরিত্রটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে কি করে? কিন্তু আবার একই সঙ্গে তাকে মাথায় রাখতে হয়, কোন জায়গাটায় ক্ল্যাপ পাওয়ার জন্য থামতে হবে। উইংসের কোন দিক থেকে আলো খেতে হবে। সহ অভিনেতাকে ঠিক জায়গায় পরবর্তী সংলাপের খেই ধরিয়ে দিতে হবে। তাই আপনি যেমন বলতে পারেন না অভিনেতা খোদ সম্রাট শাহজাহান তেমনই বলতে পারেন না তিনি শাহজাহান নন। আপনি তো রসতত্ত্ব আমার থেকে ভাল জানেন স্যার। নিশ্চয়ই জানেন, বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থেকে বলা মুশকিল আপনি জলে না স্থলে আছেন? কারণ যে মুহূর্তে ভাবলেন আপনি স্থলে ওমনি সাগরের ঢেউ এসে আপনার পা ভিজিয়ে দিল। আবার যেই ভাবলেন আপনি জলে ওমনি জল সরে গেল পায়ের তলা থেকে। কোনটাকে আপনি মিথ্যে বলবেন স্যার? আমি সে দিন একটা ক্যালকুলেটিভ রিস্ক নিয়েছিলাম। ইয়েস আই রিপিট, ক্যালকুলেটিভ রিস্ক। অনেক অঙ্ক কষে নেওয়া একটা ঝুঁকি। আমার মনে হয়েছিল, দু'টো মানুষের আত্মত্যাগের ইচ্ছে একটি বলির চেয়ে ওজনে ভারী হবে। তিতাস, মিতুল বা আপনি... আমি কাউকেই হারাতে পারতাম না স্যার। আপনি চলে গেলে ক্ষতি কম কিছু হতো না। তাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কেন জানি না, আমার বিশ্বাস আমাকে ড্রাইভ করেছিল। বলেছিল, যদি আমি ঠিক করে অভিনয় করতে পারি তা হলে দেবীকেও বিভ্রান্ত করতে পারব। এত মানুষ যখন অভিনয়কে সত্য বলে মেনে নিয়ে হাসে, কাঁদে তখন দেবীর কেন ক্যাথারসিস হবে হবে না? তিনি আমার থেকে বেশি জানেন বলে? বেশি বোঝেন বলে? কিন্তু আমিও তো আমার ক্রাফটটা, শিল্পটা মন দিয়ে অভ্যাস করেছি স্যার। এও তো সাধনা। আমার সাধনাতেও তো ফাঁকি নেই। প্রেসিডেন্সি কলেজ আমায় ফাঁকি দিতে শেখায়নি। এ বার যদি আপনি বলেন আমি ভুল করেছি, সে ভুল আমি মাথা পেতে স্বীকার করে নেব।

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল পল্লব। তার মুখ জ্বলজ্বল করছে এক জ্যোতিতে। এ জ্যোতি আর কিচ্ছু নয়, আত্মপ্রত্যয়। কনফিডেন্স। সে দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়ি মশায়। তার পর ধীরে ধীরে বললেন, আর একটা খটকা। হাতে যে ছুরি বসিয়েছিলে, সেটাও কি?

হ্যাঁ স্যার। সেটাও অভিনয় ছিল। একটু চড়া দাগের অভিনয় মাত্র। তিতাস ডাক্তার। ওর সাথে কথায় কথায় আমি জানতে পেরেছিলাম, আর্টারি কেটে না গেলে রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় না। ছুরিটা আমি কোণাকুণি বসিয়েছিলাম।

স্তব্ধ হয়ে গেলেন ভাদুড়ি মশায়। পল্লব যা বলছে তা তিনি যুক্তি দিয়ে কাটতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন না। শেষে বলে উঠলেন, দেবীর সাথে যে ছলনা করলে, দেবী যদি তোমার ওপর কুপিতা হতেন? বা এখনও সময় চলে যায়নি, তিনি যদি কুপিতা হন?

নির্মল হাসল পল্লব। বলল, আপনি তো আছেন। বাঁচিয়ে নেবেন। আর নয়তো তখন আবার কিছু একটা বুদ্ধি খাটানো যাবে। স্যার আমি জানি, আমি আলফাল বকি বলে আপনি আমায় অন্যদের চেয়ে কম ভালবাসেন। কিন্তু আমি আপনাকে খুব ভালবাসি স্যার। মাফ করবেন, আপনার না থাকাটা আমি অ্যাফোর্ড করতে পারতাম না।

চিকচিক করছে পল্লবের চোখ। এক রাশ পাড়ভাঙা ঢেউয়ের মতো কখন যে স্নেহ এসে তাঁর চেতনাকে আচ্ছন্ন করেছে বুঝতেই পারেননি ভাদুড়ি মশায়। পল্লবকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। মস্তক আঘ্রাণ করে বললেন, বেঁচে থাকো বাবা। বেঁচে থাকো। তোমার মঙ্গল হোক। তুমি আবার একবার প্রমাণ করে দিয়েছ, এ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অলৌকিক হল মানুষের বুদ্ধিমত্তা, ইনটেলিজেন্স।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%