ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

'উফফ! এটা হোটেল, না এয়ারপোর্ট স্যার? সামনে আবার একখানা মনুমেন্ট।'
'ওটা মনুমেন্ট নয় অনন্তবাবু।' জগুমামা হেসে বললেন, 'পিছন থেকে ওরকম লাগছে। ওটা একটা স্ট্যাচু।'
'অ্যাঁ! স্ট্যাচু! মানুষের স্যার?'
'না তো কি ভূতের? আপনি এত ভাট বকেন।'
'তুমি চুপ করো তো!' অনন্ত সরখেল বলে উঠলেন, 'এখনও ভদ্র ল্যাংগুয়েজ শিখলে না! এইজন্যেই বলে, পণ্ডিতের ভাগ্নে ভগ্নদূত।'
ভগ্নদূত! আমি পুরো বোল্ড।
'একটু বাইরে বেরোনো যাক।' জগুমামা বললেন, 'প্রায় ত্রিশ বছর পরে মস্কো এলাম।'
'দীপালি ম্যাডাম?'
'ওর আসতে এখনও ঘণ্টাখানেক দেরি আছে।'
'হ্যাঁ আঙ্কল, চলো, চলো।' সোমলতা বলল, 'কী দারুণ শহর!...টুকলুদা, বাইরে তাকাও। আকাশটা দেখেছ?'
অপূর্ব! মেঘ চিরে ডুবন্ত সূর্য বেরিয়ে এসেছে। মেঘের খাঁজে-খাঁজে রঙের খেলা। আকাশে বিরাট এক রেনবো।
অটোমেটিক গ্লাস-ডোর পেরিয়ে বাইরের ব্যালকনিতে আমরা। আবার বিস্ময়! বাঁ-দিকের আকাশ ফুঁড়ে এক ইস্পাতের রকেট-মনুমেন্ট। ঝলমল করছে।
'আঙ্কল! ওটা কী?'
'ওটা পৃথিবীর প্রথম কসমোনট বা মহাকাশচারীদের মিউজিয়ম। এরাই প্রথম জ্যান্ত মানুষকে মহাকাশে পাঠিয়েছিল।'
'য়ুরি গ্যাগারিন?'
'ইয়েস। গ্যাগারিনই প্রথম মানুষ, যিনি স্পেসে কাটিয়ে সশরীরে ফিরে এসেছিলেন। সারা দুনিয়ায় তোলপাড় পড়ে গেছিল। সেইসময় এটা কেউ ভাবতেই পারত না।'
আমরা সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এসেছি। চওড়া ধাপগুলোয় বৃষ্টির জল লেগে আছে।
ঠান্ডা কনকনে বাতাস। চারজনেরই টুপি, শরীরে জ্যাকেট, ইনার, মাফলার জড়ানো। তবু সূচের মতো বিঁধছে।
সামনে কংক্রিটে বাঁধানো মস্তবড় জায়গা। ফাঁকে ফাঁকে বাগান, ছোট-ছোট মূর্তি। সামনে সেই মনুমেন্টাল স্ট্যাচু। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিশালদেহী মানুষটা।
সোমলতা বলে উঠল, 'আঙ্কল ইনিই কি হোটেলের প্রতিষ্ঠাতা?'
'উহুঁ মামণি! দ্যাখো, নীচে নাম খোদাই করা আছে। চার্লস দ্য গল।'
'চার্লস দ্য গল! মানে-মানে ইনি সেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট, যার নামে প্যারিসের দ্য গল এয়ারপোর্ট?'
'রাইট। এখনও ফরাসিরা মনে করে, ওরকম স্ট্রং প্রেসিডেন্ট ওদের দেশে আর আসেনি। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে এই মানুষটার অবদান বিরাট।'
'কিন্তু তাঁর সঙ্গে এই হোটেলের কী সম্পর্ক মামা?'
'এটা হচ্ছে, রেসপেক্ট দেখাবার রাশিয়ান প্রথা। হিটলারের বিরুদ্ধে ওয়ার্ল্ড ওয়ারে সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স একসঙ্গে লড়েছিল। আমেরিকাও ছিল। মিত্র শক্তি। যুদ্ধের পরে গল যখন প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন রাশিয়ার সঙ্গে ওনার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।'
'আঙ্কল, আমরা কোন দিকে যাব?'
'যেকোনো একদিকে হাঁটলেই হয়। তবে বেশিদূর যাওয়া যাবে না।'
'উফফ, বড্ড ঠান্ডা স্যার!'
'তা ঠিক। আসলে সূর্য ডুবলেই মস্কোর টেম্পারেচার ড্রপ করে। এখন নির্ঘাত বারো-তেরোতে নেমে এসেছে। ভালো করে নাকমুখ ঢেকে নিন।'
আমরা হাঁটছি প্রসপেকট মিরার ফুটপাত ধরে। মিরা মানে রাজপথ। দ্রুত সন্ধে নেমে আসছে। প্রায় ন'শো বছরের প্রাচীন মস্কো আলোকমালায় ঝলমল করে উঠছে।
সারা শরীর রোমাঞ্চিত। এই সেই রাশিয়া, এই সেই মস্কো! দাদুর মুখে এই দেশটার কত যে গল্প ছোটবেলায় শুনেছি।
রাশিয়ায় আমাদের আসাটাও অদ্ভুতভাবে ঘটে গেছে।
জগুমামা দিন পনেরো আগে প্যারিস থেকে ফিরেছেন। যেদিন সন্ধেবেলায় ফিরলেন, তার পরদিন সকালেই প্রথমে ফোন, পরে বিকেল হতে-না-হতে হাজির অশীতিপর সত্যপ্রিয় সরকার এবং তার স্ত্রী।
সত্যপ্রিয়বাবু জগুমামার শিক্ষক। এতবছর পরেও সেই বন্ধন অটুট আছে। এখনও নিয়মিত স্যারের খোঁজখবর নেন জগুমামা।
স্যার হাঁটাচলায় এখনও ফিট। টকটকে গায়ের রঙ। চুল সাদা হয়ে যাওয়া ছাড়া বার্ধক্যের ছাপ পড়েনি।
গাড়ির হর্ন শুনেই জগুমামা তরতর করে নেমে গেলেন। স্যারকে উপরে নিয়ে এলেন। সসম্ভ্রমে কাউচে বসালেন।
তারপর বললেন, 'আপনি কেন এলেন স্যর? আমি তো আপনার কাছে যেতে চাইছিলাম।'
অধ্যাপক সরকার সামনে রাখা গ্লাস তুলে একটু জল খেলেন। বললেন, 'বাবা জগু। ব্যাপারটা যে কতটা আর্জেন্ট সেটা বোঝাতেই আমরা তোমার কাছে এসেছি। দেরি করলে সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেতে পারে।'
পাশ থেকে তাঁর স্ত্রী বলে উঠলেন, 'তুমি তো জান, আমাদের একটাই মাত্র মেয়ে। তাও সে চলে গেল অতদূরে। ওখানে সংসার পেতেছে। ওর বিপদের কথা শুনলে—'
অধ্যাপক সরকার হাত দিয়ে স্ত্রীকে থামিয়ে বললেন, 'আমি বলছি। জগু জানলেও একটু ডিটেলসে বলা দরকার। দীপালি পোস্ট ডক্টরেট করতে যায় মস্কো ইউনিভার্সিটিতে। পঁচিশ বছর আগে। ওখানেই বিয়ে করে। আমার জামাই ফিওডরও ডাক্তার। সেন্ট পিটার্সবার্গের পাশের এক কান্ট্রিসাইড টাউনে ওদের প্রচুর খেত-জমি আপেল-আঙুরের বাগান। ওরা বলে ডাচা। ডাচা মানে বুঝলে তো?'
'হ্যাঁ স্যর। খামার বাড়ি। আগে রাশিয়ান জমিদাররা থাকত।'
'রাইট। কমিউনিস্টরা চলে যাওয়ার পরে ওরা অ্যানসেস্ট্রাল প্রপার্টি ফেরত পায়। সেসব দেখাশোনা করে ফিওডরের ভাই ভ্লাদিমির। সে ফ্যামিলি নিয়ে বাবা-মার সঙ্গে ডাচাতেই থাকে।'
'এনি ফ্যামিলি প্রবলেম স্যর?'
'মোটেই না। ওদের দুই ভাইয়ে বেস্ট অফ রিলেশানস। ভ্লাদিমিরও কাছের একটা কলেজে পড়ায়। জামাই উইক এন্ডে দেশের বাড়ি যায়। কখনো দীপালি সঙ্গে যায়, নয়ত সে মেয়েকে নিয়ে মস্কোর অ্যাপার্টমেন্টে থাকে।'
অধ্যাপক একটু থামলেন। আরেকটু জল খেলেন। তারপর বললেন, 'মাসখানেক আগে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটে। ফিওডরের বাবার অতি আদরের এক কুকুর ছিল। রাশিয়ান শেফার্ড। সে ওদের বাড়িঘর পাহারাও দিত। কুকুরটা একদিন সকালে হঠাৎ হিংস্র হয়ে ওঠে। ভদ্রলোককে কামড়ে-খুবলে রক্তাক্ত করে দেয়।'
'সে কী!'
'হ্যাঁ। ওরা কোনোক্রমে ভদ্রলোককে রেসকিউ করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কুকুরকে চেন বেঁধে রাখা হয়। কিন্তু কুকুরটা বাঁচল না।
আর ভদ্রলোক বাড়ি ফিরে এলেন ঠিকই, কিন্তু মেন্টাল ব্যালান্স নষ্ট হয়ে যায়। বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছেন। এমন অবস্থা যে, তাকে শিকল বেঁধে রাখতে হয়েছে। সারাক্ষণ চেঁচাচ্ছেন, ফিওডর, ফিওডর।'
'ফিওডর? মানে স্যর আপনার জামাই?'
'হ্যাঁ। ওনার ধারণা, সে নাকি ওনার কাছে আসছে। থ্রেট করছে! অথচ আমার মেয়ে-জামাই দুজনেই থাকে মস্কোতে।'
'তাহলে তো স্যর ওনাকে এখনই কোন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার।'
'দেখিয়েছে। লাভ হয়নি। দীপালি আমায় একটাই কথা বলছে, তুমি জগুদাকে যে করে হোক বুঝিয়ে-সুজিয়ে একবার পাঠাও। এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও মিস্ট্রি আছে। সামনাসামনি ওনাকে সব বলব। ওনাকে স্পটে নিয়ে যাব।'
'আচ্ছা।' জগুমামা চিন্তিতগলায় বললেন, 'কিন্তু আমি তো...!'
অধ্যাপক সরকার জিজ্ঞাসুচোখে তাকালেন। বললেন, 'প্রবলেম?'
'হ্যাঁ স্যর।' জগুমামা একটু সঙ্কুচিতভাবে বললেন, 'স্যর...কোথাও আমার একা যাওয়া হয়ে ওঠে না। কোনও ইনভেস্টিগেশনে গেলে তিন-চারজনে যাই। কিন্তু স্যর, রাশিয়া...বিদেশ। তার ফ্লাইট ফেয়ার, অ্যাকোমোডেশন...'
'কোনও ব্যাপার নয় জগু।' স্যার থামিয়ে দিলেন, 'দীপালির শ্বশুরবাড়ি ফিলদি রিচ। দে উইল বিয়ার অল এক্সপেন্সেস।...তুমি একবার যাও প্লিস। দীপালিরা বড় কিছু একটা ঘটতে পারে ভেবে খুব ভয় পাচ্ছে।'
'টুকলুদা! এদিকে, এদিকে দ্যাখো!' সোমলতার কথায় ঘুরে তাকিয়েছি।
রাস্তার ঠিক মাঝখানে এক অসম্ভব সুন্দর স্থাপত্য!
নারী-পুরুষ যুগলমূর্তির বিশাল উঁচু স্ট্যাচু। পাশাপাশি দৃপ্তভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। নারীর ডান হাতে কাস্তে, পুরুষের বাঁ-হাতে হাতুড়ি। নীচের বেদি থেকে আলোর ফোকাস। অন্ধকার আকাশে সোনার মতো ঝলসাচ্ছে।
'মামা, আমরা যে শুনেছিলাম, এরা পুরোনো জমানার সব ভেঙেচুরে দিয়েছে।'
'ঝাড়া মিথ্যে!' জগুমামা বললেন, 'ওয়েস্টার্ন মিডিয়ার প্রচার।'
মামার হাতের মোবাইলটা বাজতে শুরু করল।
'হ্যালো—হ্যাঁ, বলো দীপালি।...হ্যাঁ হ্যাঁ, উই আর ফাইন।...হোটেলের বাইরে...আশেপাশে পায়ে হেঁটে...আচ্ছা...আচ্ছা, আচ্ছা।'
ফোনটা রেখেই অ্যাবাউট টার্ন করলেন, 'চলো। ব্যাক টু হোটেল। দীপালি এসে যাচ্ছে। লাউঞ্জে থাকতে বলল।'
'তুমি কি আগে দীপালি ম্যাডামকে দেখেছ মামা?'
'ফিসিক্যালি দেখেছি বছর কুড়ি আগে। তবে ভার্চুয়ালি...এই পরশুই ভিডিও কল করল। তুই-ই তো ছিলি।' মামা হাসলেন, 'এখন দেখাশোনা ব্যাপারটা এত সহজ হয়ে গেছে।'
'আঃ! প্রাণে ধড় এল।' কফিতে চুমুক দিয়ে অনন্ত সরখেল তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, 'আরটু হলেই বরফ হয়ে যেতুম স্যার।'
আমরা চারজন এখন কসমস হোটেলের কফি শপে। হোটেল বটে একখানা! অনন্তবাবু কিছু ভুল বলেননি। গ্রাউন্ড আর এই মেজেনাইন ফ্লোর জুড়ে অজস্র রেস্তোরাঁ, ড্রেস মেটিরিয়াল শপ, বুক শপ, কিউরিও গিফট শপ...! আর লোক যে কতরকম আর কত দেশের।
সোমলতা কফির মাগ হাতে পাশের কিউরিও শপে ঢুকেছে। ওখান থেকেই ডাকল, 'আঙ্কল! এই দ্যাখো। পুতুলগুলো কী কিউট না?'
মামা হাসলেন, 'কিউট নয় শুধু, ইউনিক। ওদের স্পেশালিটি কি জান? একটার পেট খুললে ভেতরে আরেকটা ছোট, তার ভেতরে আরও ছোট...এরকম হতে শেষেরটা এই অ্যাতটুকু। সবগুলো একইরকম নিখুঁত। এই রাশিয়ান ডল হয়ত একমাত্র এখানেই তৈরি হয়।...লাস্টবার কয়েকটা নিয়ে গেছিলাম।'
'হ্যাঁ স্যার। আমাকেও একবার এক রিলেটিভ এনে দিয়েছিলেন। নামটা...নামটা..,' অনন্তবাবু খ্যাঁচম্যাচ করে দাড়ি গোঁফ চুলকোতে লাগলেন। তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন, 'পেয়েছি! পেয়েছি! মাতাহারি! মাতাহারি!'
'মাতাহারি!' জগুমামা বললেন, 'ধ্যুৎ! সে তো মশাই ফেমাস লেডি স্পাই। এই পুতুলগুলোর নাম মাত্রোশকা। বাবুশকাও বলে।...'
বলতে-বলতে মোবাইলে সময় দেখলেন, 'কী হল? দীপালি এত দেরি করছে কেন? প্রায় কুড়ি মিনিট হয়ে গেল।'
হঠাৎ অনন্ত সরখেল কনুই দিয়ে আমায় ঠেলা মারলেন। ফিসফিস করে বললেন, 'ওই যে! দেখেছ?'
'কী? কী দেখব?'
'পাশের টেবিলের ওই দুজন! এতক্ষণ কফি খাচ্ছিল। ওই যে সিঁড়ি দিয়ে নামছে!...ওদের দেখে কী মনে হচ্ছে? রাশিয়ান?'
'কী আবার মনে হবে? রাশিয়ান কিনা জানি না, তবে হোয়াইট।'
'হুঁ-হুঁ বাছা। এজন্যেই বলি, চোখ কান খোলা রাখো। ওরা নির্ঘাত ইন্ডিয়ান।'
'ইন্ডিয়ান? যাঃ!'
'যা নয় হে, হ্যাঁ। দুজনে হিন্দিতে কথা বলছিল।'
'হিন্দিতে কথা বলছিল?' দেখতে পাচ্ছি, ওরা কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েছে। টকটকে গায়ের রঙ। সবেগে মাথা ঝাঁকালাম, 'অ্যাবসার্ড!'
'মোটেই না। সার্ড, সার্ড। শোন হে খোকা, আমি হিন্দিটা বুঝি। ওদের একজন কী বলছিল জান? বলছিল, অব শুরু হোগা আসলি খেল।'
একজন পার্স থেকে কার্ড বের করে পেমেন্ট করছে। সঙ্গে ছোট স্ট্রলি লাগেজ।
'খুবই গোলমেলে কেস।' অনন্ত সরখেল চোখমুখ কুঁচকে বললেন, 'কথাবার্তা ঠিক নেই।'
মেন ডোর এক্সিট দিয়ে দুজন নেমে গেল।
এক মিনিটও হয়নি, হন্তদন্ত হয়ে যে মোটাসোটা মহিলা হোটেলে ঢুকে এলেন, তাঁকে ভার্চুয়ালি আগেই দেখেছি। দীপালি সরকার। তাঁর পাশে একজন মাঝবয়েসি পুরুষ।
মামার পিছন-পিছন আমরাও সিঁড়ি দিয়ে নামছি।
'দীপালি! এই যে, এদিকে।'
'জগুদা।' দীপালি আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। কিন্তু তাঁর চোখে বিভ্রান্ত দৃষ্টি। অন্য কাউকে খুঁজছেন।
'এনি প্রবলেম দীপালি?' মামা বললেন, 'তুমি কি কাউকে খুঁজছ?'
'হ্যাঁ জগুদা। এত ভুল আমার হবে না।' দীপালি বললেন, 'আমরা যখন ক্যাব ছেড়ে হোটেলে ঢুকছি, কাচের ফাঁক দিয়ে ওকে স্পষ্ট দেখলাম। কী বাসু, তুমিও দেখেছ তো?'
'হ্যাঁ দিদি।' দীপালির সঙ্গের লোকটি বাঙালি।
'কাকে দেখেছ?'
'ফিওডর...মানে...আমার হাসব্যান্ডকে। কোথায় গেল?'
'ফোন করো। হয়ত তাড়া ছিল, তাই বেরিয়ে গেছে।'
'না জগুদা। ওর এখানে থাকার কথাই নয়। আজ সকালেই সে সেন্ট পিটার্সবার্গের দিকে রওনা হয়ে গেছে। ভ্লাদিমির কাল রাতে ফোন করেছিল। ফাদার ইন-ল-র কন্ডিশন ডিটোরিয়েট করেছে।'
'কুল ডাউন দীপালি। তোমার চোখের ভুল হতে পারে।'
আমরা ছয়জনে একতলার একটা জয়েন্টে বসেছি। বাঙালি ভদ্রলোকের নাম বাসু সখা। রাশিয়াতে এসে 'সাহা' এখন 'সখা'। রাশিয়ানে এইচ-এর উচ্চারণ 'খ'। বাসু এখানে 'ট্যুরিসম সায়েন্স' পড়ান। ট্যুর অর্গানাইস করেন, দোভাষীর কাজ করেন। দীপালির ঘনিষ্ঠ সহচর।
'বলো দীপালি।' জগুমামা পেপসিতে চুমুক দিয়ে বললেন, 'স্যর একটা আভাস দিয়েছেন।'
'না জগুদা। বাবাকে পুরো সত্যিটা বলিনি।' দীপালি বললেন, 'ওদের বয়েস হয়েছে। সাতপাঁচ ভেবে শরীর খারাপ করবেন। প্রবলেমটা নরম্যাল নয়। নয়ত আপনাদের এতদূরে টেনে আনতাম না।'
'আচ্ছা! তার মানে তোমার শ্বশুরকে পোষা কুকুর কামড়ে দেয়নি?'
'না-না, দিয়েছে। সাংঘাতিকভাবেই দিয়েছে। কিন্তু কেন দিল? যে কুকুরটা আমাদের সকলের এত ন্যাওটা সে হঠাৎ হিংস্র হয়ে উঠল কেন? এইটাই তো রহস্য। তারপর দু-দিনের মধ্যে সে মরেও গেল। আসলে কী হয়েছিল ওর?'
দীপালি একটু থামলেন। আমাদের সকলের মুখের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে বললেন, 'এমা মারা যাওয়ার পরে দেখা গেল, ওর ফ্যারিংস মানে গলায় আটকে আছে ছোট্ট একটা পাথর।'
'পাথর!'
'হ্যাঁ জগুদা। পিকিউলিয়ার পাথর। পাথর, কিন্তু ইনঅ্যানিমেট নয়।'
অ্যাঁ! পাথরটা জড়পদার্থ নয়?'
'না দাদা!' দীপালি পানীয় গলায় ঢাললেন। তারপরে রুমালে মুখ মুছে বললেন, 'যা যা ঘটেছিল, সংক্ষেপে বলছি। আমরা সবাই তখন সিসিলবার্গে, আমাদের গ্রামের বাড়িতে। শ্বশুরের কন্ডিশান ভীষণ ক্রিটিক্যাল! ওনার দুই ছেলে পালা করে থাকছে হাসপাতালে। আর এদিকে এমা, মানে পোষা কুকুরটাকে একটা ঘরে চেন দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার মধ্যেই সে ননস্টপ চিৎকার করে চলেছে, দাপাদাপি করে যাচ্ছে। মনিবকে ওইভাবে ক্ষতবিক্ষত করার পরে সে খাবার তো দূরের কথা, জল অব্দি স্পর্শ করেনি।
যা স্বাভাবিক, তাই হল। দুদিনের মধ্যে এমার ছটফটানি শেষ। কেউ ওর জন্যে একফোঁটাও চোখের জল ফেলিনি। বরঞ্চ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি।
ঘরের মধ্যে এমার লাশ মেঝেতে পড়ে ছিল। বাগানে গোর দেওয়া হবে। গর্ত খোঁড়া হয়ে গেছে। নাদিয়া মানে ভ্লাদিমিরের বউ আর আমি দুজনে ওকে একটা সাদা কাপড়ে মুড়ে তুলছি। এমার মুখের দিকটা আমার হাতে।
ওর গলার কাছটায় হাত পড়তেই চমকে উঠলাম। এ কী! গরম ঠেকছে কেন! ওর দেহটা বরফের মতো ঠান্ডা! শুধু তাই নয়, গলার ওই অংশটুকু থিরথির করে কাঁপছে!'
'তারপর? তারপর?' সোমলতা রুদ্ধশ্বাসে বলে ওঠে।
'চমকে উঠে লাশটাকে তাড়াতাড়ি মেঝেতে নামিয়ে রাখলাম। তারপর উবু হয়ে বসে ফের ওর গলার নীচে হাত দিলাম। জীবন্ত প্রাণীর স্পন্দন! কী করে সম্ভব?
ফিওডর তখন বাড়িতে নেই। কয়েকটা বাড়ি পরেই ওর বন্ধু ভেটেরনারি ডক্টরের ডাচা। তিনি লাকিলি ওখানে ছিলেন। তাঁকে ডেকে আনা হল। উনিও তাজ্জব।
ভেটের ব্যাগে কিছু স্ক্যালপেল ইত্যাদি ছিল। দু-তিন মিনিটের মধ্যে ভেট লাশের ফ্যারিংসের ভিতর থেকে বের করে আনলেন ছোট্ট একটা নুড়িপাথর।'
'বুঝেছি। ওটার জন্যেই কুকুরটা মারা গেছে।' জগুমামা বললেন।
'না জগুদা। ভেট বললেন, পাথরটা এমন অদ্ভুতভাবে সেট-ইন করেছিল ফ্যারিংসের খাঁজে, তাতে শ্বাসপ্রশ্বাস বা খাওয়াদাওয়ায় অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দাদা, ওটা কি আদৌ পাথর? কারণ—', দীপালি বললেন, 'আমি নিজে ওটাকে হাতে নিয়েছিলাম। জীবন্ত প্রাণীর মতো উষ্ণ। কাঁপছিল!'
'কাঁপছিল! বলো কী! পাথরটা কোথায়?'
মুহূর্তে দীপালির মুখ কালো হয়ে গেল। আস্তে আস্তে বলল, 'কী বলি জগুদা! আমি হাতে নিয়ে ওটাকে দেখছি, আচমকা ছোঁ মেরে ভ্লাদিমির আমার হাত থেকে তুলে নিল। আমি কিছু বলার আগেই দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।'
'মানে! পাথরটা কি এখন ওর কাছে?'
'নাহ। আমি ওর পিছু ধাওয়া করেছিলাম। দেখলাম, ও ছুটতে ছুটতে আমাদের পুকুরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু বলার আগেই ছুঁড়ে দিয়েছে জলে।'
'সে কী! ওটা ফেলে দিল?'
'হ্যাঁ জগুদা। বলল, অপয়া পাথর! এইসব হাবিজাবি পাথর রাখে বলেই বাবার আজ এই দশা।'
'পাথর! তোমার শ্বশুর পাথর রাখেন নাকি?'
'হ্যাঁ দাদা। আমাদের খামারবাড়ির একটা ঘরে বিরাট জেমস অ্যান্ড স্টোনস কালেকশন আছে। কিউরিও রুম বলতে পারেন। ইনহেরিটেড প্রপার্টি। ঘরটা তালাবন্ধ থাকে। চাবি থাকে শ্বশুরের কাছে। তিনি রোজ তালা খুলে ঘরে ঢোকেন। কিছুক্ষণ থাকেন। তারপর বেরিয়ে আসেন।'
'ওকে। দীপালি, তুমি কি ওইসব জেমস কালেকশন দেখেছ?'
'দেখেছি জগুদা। শ্বশুর নিজেই দু-চারবার দেখিয়েছিলেন। আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন, কোন পাথরের কী কী গুণ! আমার ইন্টারেস্ট নেই দেখে পরে আর দেখাননি।'
'কালেকশনে মোটামুটি কী-কী আছে, বলতে পার?'
'আমার পক্ষে বলা খুব মুশকিল জগুদা। ফিওডর জানে। এই ধরুন, এমারেল্ড, ডায়মন্ড...'
দীপালির কথা শেষ হল না। ওর ফোন বাজতে শুরু করেছে। ওর ভ্রু কুঁচকে গেছে।
'হ্যালোও। দা—দা—স্তো? ও ময় বগ।' ওর মুখ মুহূর্তে কাগজের মতো সাদা। ফোন ছেড়ে অস্ফুটে বলল, 'ফিওডরের ফোন। শ্বশুর একটু আগে এক্সপায়ার করেছেন।'
'ওহো! ভেরি স্যাড।'
দীপালি কিছু বলল না। চুপ করে রইল কয়েক মিনিট। তারপর বড় শ্বাস ফেলে বলল, 'জগুদা, আমি মিডনাইট এক্সপ্রেসেই বেরিয়ে যাচ্ছি। বাসু আপনাদের কাল সকালে নিয়ে যাবে। ও সব চেনে। কী বাসু?'
বাসু সখা ঘাড় নাড়লেন।
'হুম।' জগুমামা বললেন, 'দীপালি, তুমি কি আরেকটু থাকতে পারবে? জাস্ট কিছু ক্যোয়ারি ছিল।'
'বলুন।' দীপালি একটু অন্যমনস্ক।
'কুকুরের গলা থেকে যে পাথরটা বের হল, তুমি সেটা হাতে নিয়েছিলে। ঠিক কেমন দেখতে বলো তো? ওটাকে কি পাথর মনে হয়েছিল, না অন্য কিছু?'
'কালচে সবুজ রং। অনেকদিন পালিশ না হলে স্টোন যেমন দেখতে লাগে, তেমন। হ্যাঁ জগুদা, পাথর ছাড়া ওটাকে অন্য কিছু মনে হয়নি। তাই তো ওইরকম চমকে গেছিলাম। তবে পাথরটা আমার হাতে ছিল হার্ডলি মিনিটখানেক।'
'আরেকবার ওই জিনিস দেখলে চিনতে পারবে?'
'সিওর।'
'স্যর বলছিলেন, হসপিটাল থেকে ফেরার পর তোমার শ্বশুরমশাই পাগল হয়ে গেছিলেন। উনি নাকি 'ফিওডর' আতঙ্কে ভুগছিলেন।'
'হ্যাঁ জগুদা।' দীপালির মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল, 'ব্যাপারটা আমাদের কাছেও রহস্য থেকে গেছে। বাড়িতে ফিরে 'এমা'র মতোই সারাক্ষণ চিল্লাচ্ছিলেন। ফিওডরের নামে অকথ্য গালাগাল দিচ্ছিলেন। ও নাকি ওনাকে ভয় দেখাচ্ছে, গুপ্তধন ঘরের চাবি চাইছে। অথচ দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলেই ছিল ওনার বেশি ক্লোস। আরেকটা ব্যাপার হল—'
বলে থেমে গেলেন। মামা বললেন, 'কী হল? কী ব্যাপার?'
'নাহ। সেটা ফিওডরই আপনাকে ডাইরেক্ট বলবে। এইসব ঘটনা ঘটার কিছুকাল আগে ব্যাপ-ব্যাটা দুজনে ওই ঘর থেকে কীসব বিশেষ বস্তু উদ্ধার করে। উর্দুতে লেখা!'
'উর্দুতে!'
'হ্যাঁ, উর্দুতে। আপনি কি আফানাসি নিকিতিনের নাম শুনেছেন?'
'নাঃ। কে তিনি?'
'তিনিই প্রথম রাশিয়ান, যিনি পাহাড়-সমুদ্র ডিঙিয়ে ইন্ডিয়ায় এসেছিলেন। ফিফটিন্থ সেঞ্চুরিতে। আফানাসি ফিওডরদের পূর্বপুরুষ।'
'আচ্ছা।' জগুমামা চোখ বড় করে বললেন, 'দ্যাট মিনস তোমাদের জেমস কালেকশন আফানাসি সায়েবের সময় থেকে শুরু হয়েছে!'
'রাইট জগুদা। আফানাসির তিনশো বছর পরে নিকিতিন ফ্যামিলির আরেকজন যান ইন্ডিয়ায়। ভিক্টর নিকিতিন। শুনেছি, তিনিও ভারতে ছিলেন প্রায় দশ বছর। কিন্তু...' দীপালি সময় দেখে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, 'উহুঁ। এত জিস্টে বললে হবে না। কাল বিকেলে দেখা হচ্ছে। ফিওডরকে নিয়ে আসছি।...বাসু, দাদাদের তুমি পিটার্সবার্গের মস্কো হোটেলে চেক ইন করাবে। ওদের সেটল করিয়ে ডাচায় চলে আসবে। কেমন?'
বাসু সখা ফের ঘাড় নাড়লেন। ভদ্রলোকের কণ্ঠস্বর একবারও শুনিনি। শুধু ঘাড় নাড়া আর হাসি। অনন্তবাবু কানের কাছে মুখ এনে বললেন, 'ঘোড়েল মাল একখানা।'
অনন্ত সরখেলের সন্দেহভাজন ব্যক্তির তালিকায় এবার বাসুও ঢুকে পড়েছেন!
'টুকলু! শুনছিস?'
'হ্যাঁ মামা। যাই।' জগুমামার ডাকে সাড়া না দিয়ে উপায় আছে! এর আগে প্রথমে অনন্তবাবু, তারপর সোমলতা নানাভাবে উত্যক্ত করেছে, ওদের সঙ্গে শহরটা ঘুরতে বেরোনোর জন্য। রাজি হইনি। শেষে আমায় বাদ দিয়ে দুজনেই বেরিয়ে পড়েছেন।
তার দুটো কারণ। প্রথম, কোনাকুনি এই স্যুইট থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গের যে প্যানোরামিক ভিউ দেখা যায়, সে এককথায় অপূর্ব। গভীর নীল নিভা নদী, ভেসে চলেছে বড় ছোট জাহাজ, পরপর ব্রিজে গাড়ি, সবুজ প্রান্তর, নদীর সরু সরু শাখা-প্রশাখা, ছোট ছোট লঞ্চ, অপূর্ব সব সোনারঙের স্থাপত্য...জুড়িয়ে যায় চোখ। দ্বিতীয় কারণ, মনের মধ্যে অবিরাম একটা কাঁটা ফুটছে। রহস্যটা কি শুধু ওই পাথর? আমাদেরকে ওরা কি নিয়ে এল শুধু এই পাথর-রহস্য ভেদ করার জন্যে?
ভাবনাটা অদ্ভুতভাবে মিলে গেল জগুমামার সঙ্গে। আইপ্যাড খোলা সামনে। থুতনিতে হাত দিয়ে তিনি বসে আছেন।
'কেন আমাদের ডেকে আনল বল তো? বাবাকে বাঁচাতে? সে তো মরে গেল। কুকুরটার গলার পাথরটা না হয় মিস্টিরিয়াস। কিন্তু এখন আর এসব ঘাঁটাঘাঁটি করে কী লাভ? তাহলে কি অন্য কোনো সমস্যা আছে?'
'হ্যাঁ মামা। নিশ্চয়ই ঘাপলা আছে। আমার ধারণা, ফিওডরের লাইফে কিছু থ্রেট আছে।'
'কিন্তু তাহলে ওর বাবা বলছিল কেন ফিওডর তাকে থ্রেট করছে?'
'একটা কথা বলব মামা? আমার মনে হচ্ছে, দীপালি ম্যাডামও হয়ত সবটা জানেন না। এখানে হয়ত লুকোনো গুপ্তধনের কাহানি আছে।'
জগুমামা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। বললেন, 'গুপ্তধন! তোর একথা মনে হচ্ছে কেন? ভিক্টর নিকিতিন ভারত থেকে নিয়ে এসেছিল? তার নাম কিন্তু কোত্থাও পেলাম না। অথচ এই দ্যাখ, আফানাসির নাম উইকিপিডিয়ায় আছে। বম্বের কিছুদূরে রেওদন্দ বন্দরে প্রথম সে পা রেখেছিল।'
দড়াম করে দরজা খুলে গেল। হুড়মুড়িয়ে ঢুকে এল সোমলতা আর অনন্ত সরখেল। ঢুকেই সোমলতা দরজা লক করে দিয়েছে। তার চোখে উদ্বেগ।
'কী হয়েছে? এরকম করছ কেন?'
'ওরা জান—ওরা তাড়া করে আসছে।'
'কারা?'

'চারটে রাশিয়ান।' সোমলতা থেমে থেমে বলল, আমি অনন্তবাবুকে মানা করলাম। উনি শুনলেন না। বললেন, এদেরই দুজনকে নাকি কাল কসমস হোটেলে দেখেছেন। তারা হিন্দিতে কথা বলেছে। আমরা মেট্রো স্টেশন আলেকজান্দ্রায় গিয়ে তখন ইনফরমেশন নিচ্ছিলাম। নিভা ক্রুজ কোত্থেকে ছাড়ে, কোন স্টেশনে যেতে হবে। হঠাৎ ওদের দেখতে পেয়ে অনন্তবাবু হুট করে পিছু নিলেন।'
'পিছু নিলেন! কোনও কারণ ছাড়া? আপনার মাথাটা কি পুরো গেছে অনন্তবাবু?'
অনন্তবাবু কুঁকড়ে গেছেন।
'কী বলব বলো টুকলুদা! লোক চারটে স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাঁটছে। উনিও ফলো করছেন। আমি তাঁর পিছনে। হঠাৎ ওদের একজন দুম করে থেমে গেল। ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তেড়ে এল। ভাঙা ইংরেজিতে একটা গালি দিয়ে বলল, অ্যাই বুড়ো? আমাদের পিছনে লেগেছিস কেন?'
'তারপর?'
'অনন্তবাবু কাচুমাচু হয়ে বললেন, তোমরা তো হিন্দুস্থানি। তাই একটু কথা বলতে ইচ্ছে করল। লোকটা আরও রেগে গেল। ফের গালি দিয়ে বলল, কী বললি? আমরা হিন্দু? দাঁড়া! বলেই চেঁচিয়ে বাকিদের ডাকল। আমরা ততক্ষণে ছুট দিয়েছি। ভাগ্যিস হোটেলের একটা লিফট নীচে ছিল। দরজা যখন বন্ধ হচ্ছে, দেখলাম, ওই লোকটা দল নিয়ে ঢুকেছে।' সোমলতা করুণগলায় বলল, 'এবার কী হবে আঙ্কল?'
'মনে হয়, কিছু হবে না।' জগুমামা অনন্তবাবুকে কটকট করে দেখতে-দেখতে বললেন, 'এখানে রুম-কার্ড টাচ না করলে লিফট স্টার্ট হয় না। বড়জোর রিসেপশন থেকে কল করতে পারে।'
বলতে-না-বলতে ইন্টারকম বেজে উঠল। অনন্তবাবু শিউরে উঠলেন। মামা ফোন তুললেন, 'হ্যালো।...ইয়েস...।...ওকে।...কামিং।' ফোন রেখে বললেন, 'দীপালিরা এসে গেছে। টুকলু, রুম-কার্ডটা নিয়ে যা। ওদের নিয়ে আয়।'
বেরোতে-বেরোতে কানে এল, 'অনন্তবাবু। আপনাকে লাস্ট ওয়ার্নিং, আজ কোথাও একা বেরোবেন না, ওদের সামনে একটাও কথা বলবেন না।'
'হ্যাঁ স্যার। সরি স্যার।'...
বিরাট কর্মযজ্ঞ চলেছে। রাশিয়ার রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গের একপ্রান্তে বাল্টিক সাগরের তীরে তৈরি হচ্ছে জার সাম্রাজ্যের শীতকালীন প্রাসাদ ও উদ্যান 'পিটারহফ।' এর সূচনা করে গেছিলেন প্রথম সম্রাট পিটার দ্য গ্রেট। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর ভাইপো-বউ জারেস ক্যাথারিন সিংহাসনে বসেই রাশিয়ার রাজধানী নিয়ে চলে যান মস্কোয়।
এখন ক্ষমতায় এসেছেন জারেস এলিজাবেথ। পিটারের এক মেয়ে। প্রবল দাপুটে। সেনাপ্রধান, মন্ত্রীরা তাঁকে যমের মতো ভয় পান। ক্ষমতা হাতে নিয়ে রাজধানী এখানে ফিরিয়ে তো এনেছেনই, সেই সঙ্গে বাবার অসমাপ্ত কাজকে আরও বড় করে সাজিয়ে তুলতে তিনি বদ্ধপরিকর।
এলিজাবেথের স্বপ্ন, পিটারহফ হয়ে উঠবে পৃথিবীর অন্যতম ওয়ান্ডার অফ দ্য ওয়ার্ল্ড।
দিনরাত কাজ চলছে। জলস্রোতের মতো রুবল খরচ হচ্ছে। হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছে, ফ্রান্স-জার্মানি থেকে বিখ্যাত স্থপতিদের আনা হয়েছে। তাদের অধীনে প্রচুর সুপারভাইসর।
তেমনই একজন সুপারভাইসর ভিক্টর নিকিতিন। বছর কুড়ি বয়েস। খুবই উদ্যমী আর বুদ্ধিমান। সে গ্র্যান্ড প্যালেসের সংলগ্ন উদ্যানে পরপর ফোয়ারা বসাচ্ছে। ভিক্টরদের মূল বাড়ি 'ভের' অঞ্চলে, ভোলগা নদীর ধারে। আপাতত সে পাশের গ্রামে থাকছে।
সেদিন যথারীতি কাজে এসেছে ভিক্টর। হঠাৎ লাল পোশাকের এক উর্দিধারী সামনে এসে দাঁড়াল, 'চলো আমার সঙ্গে।'
'কোথায়?'
'মহারানি ডেকেছেন।'
সর্বনাশ! রানির সমন মানেই কোতল। কিন্তু অনেক ভেবেও ভিক্টর তার অপরাধ কী, বুঝে উঠতে পারে না।
এলিজাবেথকে কুর্নিশ করে কাঁপতে-কাঁপতে এসে দাঁড়ায় ভিক্টর।
'তোমার নাম তো ভিক্টর। আফানাসি নিকিতিন কে জান?'
'আজ্ঞে মহারানি, জানি। আমার ফোরফাদার। অনেক বছর আগে উনি ইন্ডিয়া গেছিলেন।'
'গুড। ভিক্টর, তুমি কি ফোরফাদারের মতো ইন্ডিয়া যেতে রাজি আছ?'
হাঁ হয়ে তাকায় ভিক্টর। সে কি স্বপ্ন দেখছে? সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ তাকে ইন্ডিয়া যেতে বলছেন! তার স্বপ্নের দেশ। আফানাসি ইন্ডিয়া থেকে ফিরে সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে মস্তবড় বৃত্তান্ত লিখেছেন। সেটা সে পরম যত্নে রেখে দিয়েছে। সময় পেলেই বারবার পড়ে।
'কী হল? চুপ করে আছ? তুমি কি যেতে চাও?'
'আজ্ঞে মহারানি, চাই, খুব চাই।' সে ঘাড় নাড়তে-নাড়তে ছুটে যায় সিংহাসনের কাছে। পা জড়িয়ে ধরে মহারানির। বারবার বলতে থাকে, 'হ্যাঁ, যেতে চাই ইন্ডিয়া। আপনি আমার মা, আপনি দেবী!'
'থ্যাঙ্কিউ ভিক্টর। তুমি ইন্ডিয়া যেতে রাজি হয়েছ জেনে খুব খুশি হয়েছি। আজ সন্ধে ছ'টায় তুমি প্যালেসে চলে এসো।'
সেইদিনই পুরো প্ল্যানিং হয়ে গেল। পরের মাসের গোড়ায়, অর্থাৎ ১৭৫২ সালের এপ্রিল মাসে ভিক্টর রওনা হবে।
ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুই জার পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভারতের পণ্ডিচেরিতে ফরাসিরা আগে থেকেই কলোনি গড়ে তুলেছে। নিয়মিত প্যারিস থেকে জাহাজ ছাড়ে। সেই জাহাজেই উঠে পড়বে ভিক্টর।
কিন্তু তাকে পাঠাচ্ছেন কেন এলিজাবেথ? ভারতে কার সঙ্গে সে দেখা করবে সম্রাজ্ঞীর চিঠি ও উপঢৌকন নিয়ে?
সে দেখা করবে চতুর্থ নিজাম মীর মুহাম্মদ খান ওরফে সালাবাত জং-এর সঙ্গে। পণ্ডিচেরি থেকে হায়দ্রাবাদ বেশি দূর নয়।
এলিজাবেথ বিশ্বস্তসূত্রে জেনেছেন, নিজামের কাছে অদ্ভুত সব রত্ন বা জেমস আছে, যার অলৌকিক ক্ষমতা। সেই রত্ন ধারণ করলে সব রোগ সেরে যায়, যৌবন ফিরে পাওয়া যায়। এমনকী শত্রুরাও কাছে ঘেঁষতে পারে না।
তাই তিনি ভিক্টরের হাত দিয়ে বিরাট এক 'রত্ন পেটিকা' পাঠিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুটো এমারেল্ড। রয়েছে রুবি, কোরাল, এমনকী ডায়মন্ডও। পরিবর্তে নিজামের সংগ্রহ থেকে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন কিছু পাথর তিনি পেতে চান। চিঠিতে সেই অনুরোধও রয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ—এই পিটারহফ প্যালেস। এলিজাবেথ এই প্যালেস গার্ডেনে নানা দেশ থেকে মূর্তি এনে বসাচ্ছেন। সেইসব দেশের জীবন্ত মানুষদের মডেল করে স্থপতিরা মূর্তি বানাচ্ছে। তাদের মধ্যে এক ভারতীয় যোদ্ধার মূর্তিকেও তিনি চাইছেন।...
একটানা বলে থামলেন ফিওডর নিকিতিন।
'ভেরি ইন্টারেস্টিং।' জগুমামা বললেন, 'কিন্তু এখনও পর্যন্ত—'
'না স্যর। সবে ওয়ান থার্ড বলেছি।' ফিওডর বললেন, 'প্লিস এক্সকিউস মি। আমি একটু বাইরে থেকে আসছি। স্মোকিং-এর বদভ্যেস কিছুতেই ছাড়তে পারিনি।'
আজ ফিওডরের সঙ্গে কথার শুরুতেই জগুমামা তাকে বলেছিলেন, 'কোনও কথা লুকিও না। তাতে তোমাদেরই প্রবলেম হবে।'
ফিওডর ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিয়েছিলেন। দুঃখ করে জানান, বাবা ইগর নিকিতিনের সঙ্গে তারই বেশি অ্যাটাচমেন্ট ছিল। কিন্তু সেই বাবা হসপিটাল থেকে ফেরার পর থেকে কেন যে তাকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত একনাগাড়ে ব্লেম করে গেছেন, বুঝে উঠতে পারছে না।
ওকে নিয়ে আমাদের স্যুইটে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আরেক কাণ্ড ঘটে। ফিওডরকে দেখামাত্র অনন্ত সরখেল তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বাথরুমে ঢুকে গেলেন।
পরে ওদের যখন লিভিং রুমে বসানো হল, অনন্তবাবু গুটি-গুটি টয়লেট থেকে বেরোলেন। সোমলতা বলল, 'কী হয়েছিল আপনার?'
উনি ফিসফিস করে বললেন, 'কী আশ্চর্য! তুমি ওকে চিনতে পারনি? এই তো সেই সাংঘাতিক লোকটা!'
ফিওডর ফিরে এসেছেন। আবার কথা শুরু হল। বলা বাহুল্য, অনন্তবাবু বেডরুম থেকে আর বেরোননি।...
ভিক্টর নিকিতিন পন্ডিচেরি পৌঁছয় ১৭৫২-র জুন মাসে। নিজামের দরবারে পৌঁছয় আরও কয়েকদিন পরে। তাকে পৌঁছিয়ে দেয় ফরাসি আর্মি অফিসাররা।
জারেস এলিজাবেথের রত্নপেটিকা উপহার পেয়ে সালাবাত জং খুব খুশি। চিঠিটা তর্জমা করে পড়ে শোনাল একজন ভারতীয় ইন্টারপ্রেটর।
শুনে মৃদু হেসে মাথা দোলাতে লাগলেন নিজাম। ভিক্টরকে বললেন, 'তোমায় অত বড় দেশের রানিসাহেবা পাঠিয়েছেন। তুমি আমাদের মাননীয় মেহমান। এখন কিছুদিন এদেশে থাক। খাতিরদারি করি তোমার। হিন্দুস্তানে মেহমান আসে নিজের ইচ্ছায়, যায় মেছবানের (গৃহস্বামী) ইচ্ছায়।'
সেই ইচ্ছেটা আর হয় না নিজামের। আসলে রাশিয়ান যুবককে প্রথম দর্শনেই তাঁর ভালো লেগে গেছে। দেখতে-দেখতে মাস ঘুরে যায়...পেরিয়ে যায় বছর। ভিক্টরকে কাছ ছাড়া করেন না নিজাম। ভিক্টর হয়ে ওঠে প্রৌঢ় নিজামের ছায়াসঙ্গী। বেশ কয়েকবার ফরাসি দূত মারফত রাশিয়ার সম্রাজ্ঞীর চিঠি এসেছে। প্রতিবারই নিজাম নানা ছলছুতো ভরা জবাব লিখে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ভিক্টর আছেও ভারি আরামে। নিজামের খাস পেয়ারের লোক সে। তার প্রযুক্তি-বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে নিজাম মহলে বেশ কিছু চমকপ্রদ বিলাসের ব্যবস্থা সে করেছে। বিশেষ ধরনের আয়না, আয়না দেওয়া ঝাড়বাতি, জলের পাইপ, জল ছিটিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখা...এইরকম নানা কিছু। এতে ফল হয়েছে উল্টো। দেশে ফেরা তার পক্ষে আরও দূর-অস্ত হয়ে উঠেছে।
নয় বছর কেটে যাচ্ছে। দেশের জন্য মন খারাপ করে ভিক্টরের। কেমন আছে বাবা-মা-ভাই বোনরা? খবর পাওয়ারও কোনও উপায় নেই। অস্থির হয়ে ওঠে সে।
অবশেষে মাথায় বুদ্ধি খেলে গেছে। কয়েকদিন আগেই ফরাসি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা এসেছিল নিজামের কাছে। ফ্রান্স সরকারের চিঠি নিয়ে। তারা এই রাজত্বে ব্যবসা করার অনুমতিপত্র চায়। তাদের হাত দিয়ে সে খোদ সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথকে গোপনে চিঠি পাঠাল। তাঁকে লিখতে বলল, ভিক্টরের বাবা খুব অসুস্থ। ও বাবাকে দেখে আবার এদেশে ফিরে আসবে।
এতে কাজ হল।...
বিদায়ের সময় নিজাম ওকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলেন। এলিজাবেথের জন্যে প্রচুর রত্ন-সোনা-পাথর তো দিলেনই, ভিক্টরের জন্যেও আলাদা করে দিলেন আরও প্রচুর। বললেন, 'বেটা। তুমি কিন্তু ফিরে এসো আমার রিস্তেদারের সঙ্গে। আমি ইন্তেজার করব।'...
'রিস্তেদার!' জগুমামা বললেন, 'ভিক্টরের সঙ্গে এদেশে একজন ইন্ডিয়ানও এসেছিল নাকি?'
'হ্যাঁ স্যর।' ফিওডর বললেন, 'ওই যে ভারতীয় যোদ্ধার একটা জীবন্ত মডেল চেয়েছিলেন রানি! তাকে সামনে রেখে স্থপতি পিটারহফের জন্যে মূর্তি গড়বে!'
'ও! তারপর? ভিক্টর নিশ্চয়ই আর ভারতে ফেরেনি। ভারতীয় লোকটা কি দেশে ফিরে গেছিল?'
'পার্টিনেন্ট কোয়েশ্চেন স্যর। বলছি।' ফিওডর বললেন, 'এখনও পর্যন্ত যে ইতিহাসটা বললাম, সবটাই ভিক্টরদাদুর লেখা থেকে। ওনার ন'বছর ইন্ডিয়ায় কাটানোর এক্সপিরিয়েন্স পাতার পর পাতা লিখে গেছেন। কিন্তু এদেশে ফেরার পরে উনি কী করেছিলেন, এক লাইনও লেখেননি। সেই তথ্য আমরা পেয়েছি ওনার ছেলে নিকোলাই দাদুর লেখা থেকে।'
'তাই?'
'হ্যাঁ স্যর। ইন্ডিয়ান মানুষটার ব্যাপারে বলার আগে আর কয়েকটা ইনফর্মেশন দিই। আপনি হয়ত দীপালির কাছে শুনে থাকবেন, আমাদের কান্ট্রি হাউসে যে ঘরটা তালাবন্ধ থাকে, সেটা আসলে কিউরিও রুম। ফোরফাদারদের লেখা ফ্যামিলি হিস্ট্রি, তাদের সব বিলঙ্গিংস রাখা আছে। আছে দলিল-দস্তাবেজ, চিঠিপত্র, জেমস, জুয়েলারি ঠাসা সব সিন্দুক। রয়েছে নানা অ্যান্টিক, যার বেশিরভাগটাই নিয়ে এসেছিলেন ভিক্টর দাদু। বাঘসিংহের ছাল, রাইনোর খড়গ, হাতির দাঁত থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ান মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট, উর্দু-আরবি ভাষায় লেখা রেয়ার পুথি—কী নেই ওই ঘরে! এমনকী ফেরার পরে ভিক্টর নিকিতিনকে এলিজাবেথ যে মিলিটারি অনার দিয়েছিলেন, তার মেমেন্টো এবং জমির দানপত্রও।'
'বেশ। এবার বলো ভারতীয় লোকটার সম্বন্ধে কি আর কিছু জানতে পেরেছিলে?'
'পেরেছিলাম স্যর। তবে রাশিয়ায় বসে নয়। সে ছিল সালাবাত জং-এর নিজের ভাইপো। তার পরিণতি কী হয়েছিল, সেটাও জেনেছি। সেই জানতে যাওয়াটাই আমার কাল হয়েছিল।'
'কাল হয়েছিল!'
'হ্যাঁ স্যর। কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়েছে। সেই কেউটেই এখন ছোবল মারতে বেরিয়ে পড়েছে।'
জগুমামা অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন। আমরাও।
ফিওডর আমাদের মুখের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে বলল, 'নিকোলাই দাদু লিখে গেছেন, তার বাবা উর্দু, আরবি, ফারসি ফ্লুয়েন্ট বলতে-লিখতে পারতেন। জেমস আর স্টোন নিয়ে অ্যাস্ট্রোলজি, তন্ত্রমন্ত্র চর্চা করতেন। বশীকরণ করতেন, শত্রুতা করলে নিশ্চিহ্ন করে দিতেন, আবার নাকি পাড়াপ্রতিবেশীদের রোগটোগও সারিয়ে দিতেন। সবাই তাকে ভীষণ ভয় করত। কিন্তু—'
একটু থেমে বললেন, 'কিন্তু এ সব মাত্র পাঁচ বছরের জন্য। ভিক্টর নিকিতিনের লাইফের এন্ডিং খুব ট্র্যাজিক। একদিন সকালে তাঁর ডেডবডি পাওয়া যায় ডাচার একটু দূরে, পেকা নদীর ধারে। তখন ওনার ছেলে মানে নিকোলাইয়ের বয়েস মোটে চার।'
আমরা নিশ্চুপ শ্রোতা। জগুমামা আস্তে-আস্তে বললেন, 'মৃত্যুর কারণ কিছু লেখা নেই?'
'নাহ। তবে পরে বুঝেছি, এটা খুন। আসলে কি জানেন স্যর, ভিক্টর নিকিতিনের বংশধর ইগর আর তার ছেলে এই ফিওডরের অ্যাস্ট্রোলজির উপর খুব ন্যাক ছিল। দুজনেই বিশ্বাস করে, স্টোনস-জেমসের বিরাট পাওয়ার আছে। আপনারা যাকে প্যারাসায়েন্স বলেন।'
'তুমি—তুমি সায়েন্সের স্টুডেন্ট হয়ে এসব বিশ্বাস করো?'
'করি স্যর। হাতে-হাতে ফলও পেয়েছি। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে পাথর-কৃস্টাল নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছিলাম।...এই করতে করতে একদিন হঠাৎ খুঁজে পেলাম খুব ডেকরেটিভ দুটো প্রাচীন কাঠের বাক্স। ভিক্টরদাদুর বড় সিন্দুকের একেবারে ভিতর দিকে ঢুকে ছিল! সারপ্রাইজিংলি, এই বাক্সদুটো আমাদের কোনও ফোরফাদারের চোখে পড়েনি! সেই দুটো—'
টুং-টুং-টুং। দীপালির মোবাইল ফোনটা বাজতে শুরু করল।
'হ্যালোও। দা—। দীপালি—দা।...স্তো...স্তো?' দীপালি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। তারপর রাশিয়ান ভাষায় কিছু বলতে-বলতে ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
দীপালি এসে বসলেন। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। থমথমে মুখ।
'কার ফোন দীপালি? এনি প্রবলেম?'
ফিওডরের দিকে তীব্রদৃষ্টিতে তাকালেন দীপালি, 'ইয়েস, প্রবলেম। সিভিয়ার প্রবলেম। নাদিয়া ফোন করেছিল।'
'নাদিয়া! হোয়াটস রং?'
'তোমার কথা আগে শেষ করো। আজ আমাকে একটা'—রাগে দীপালির কথা আটকে গেছে!
'দীপালি, কী হল?' জগুমামা বললেন।
'অনেক কিছু হয়েছে জগুদা। আপনি ভাবতে পারেন, ওর স্ত্রী হয়ে এইসব স্টোরি আমি প্রায় কিছুই জানি না?'
'তুমি তো এসবে কোনোদিন একফোঁটা ইন্টারেস্ট দেখাওনি দীপালি!' ফিওডর কুঁকড়ে গেছেন। কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, 'প্রথম বাক্সের ডালা খুলতেই বেরিয়ে এল একতাবড়া হ্যান্ডমেড পেপার। প্রতিটার মাথায় আরবিতে সোনার জলে এমবস করা নিজাম রাজের এমব্লেম। নীচে উর্দুতে সই। সম্ভবত সালাবাত জং-এর।
'প্রত্যেক পেপারের পিছনে আবার আলাদা আলাদা জেমস এবং জুয়েলারির রঙিন ছবি। বিভিন্ন স্টোন—রুবি, পার্ল, ডায়মন্ড। জুয়েলারির মধ্যে রয়েছে পেনডেন্ট, ইয়ার রিং, রিস্ট ব্যান্ড...।
'আমরা দুজনেই অবাক। ছবিগুলোর নীচে-নীচে উর্দু হরফে কয়েকটা করে লেখা। এত স্টোন-জেমস নিজাম কি রানিকে দিয়েছিলেন? সেগুলো কোথায় গেল?'
'দ্বিতীয় বাক্সটা খুলতে স্যর, আরও বড় ধাক্কা। এটার মধ্যে রানীর তরফ থেকে নিজামকে দেওয়া গিফট ডকুমেন্ট। রাশিয়ান ভাষায় লেখা। সোনার পাতে মোড়া। উপরে রানির ছবি আর নাম। নীচে লেখা—ডেডিকেটেড টু নিজাম-উল-মুলুক, সালাবাত জং, হিন্দুস্তান।
প্রতি পৃষ্ঠার নীচে এলিজাবেথের সই। উপরে পরপর মণিমুক্তো খচিত রাশিয়ান জুয়েলারির ছবি। পরের কয়েক পৃষ্ঠায় জেমস আর স্টোনের ছবি। বড় বড় এমারেল্ড, স্যাফায়ার, রুবি, ডায়মন্ড।
গুলিয়ে গেল। এটা তো ভিক্টর দাদু নিজামকে দেওয়ার জন্যে নিয়ে গেছিলেন। সেই সনদটা আমাদের এখানে এল কী করে? উনি কি এগুলো নিজামকে দেননি?
আর কী আশ্চর্যের কথা জানেন, এইসব রেয়ার স্টোনস আর জুয়েলারির কয়েকটা আবার ওনার ট্রেজারিতেও দেখেছি। কী করে এল?'
ফিওডর থামলেন। জগুমামা একটাও কথা বললেন না। নিষ্পলক চোখে ওর মুখের দিকে চেয়ে আছেন।
ফ্রেঞ্চ উইন্ডো দিয়ে বাইরে চোখ পড়ল। আকাশে বাদল মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। তার ছায়া পড়েছে নিভা নদীতে।
'স্যর। আপনি কি বিশ্বাস করছেন না?'
'শেষ করুন।' মামা শান্তভাবে বললেন।
'হ্যাঁ স্যর। এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সাংঘাতিক বিপদ হল। পাকিস্তান এমব্যাসিতে আমার এক স্কুলফ্রেন্ড চাকরি করে। উর্দু কাগজগুলো জেরক্স করে নিয়ে গেলাম। ওদের এক কাউন্সিলর পড়ে অদ্ভুত কথা বলল।'
'অদ্ভুত কথা!'
'হ্যাঁ স্যর। বলল, প্রতিটা শিটের সামনের লেখাগুলো একেকটা উর্দু শায়েরি। নীচে নিজামের সই। কাগজের উল্টোপিঠে জুয়েলারি বা স্টোনের বৃত্তান্ত। যে শিটগুলোয় স্টোন বা জেমসের ছবি আছে, সেগুলোয় তাদের সুপারন্যাচারাল পাওয়ার দেওয়া আছে। ফর একসাম্পল, রুবির ছবির নীচে নাকি লেখা আছে, ওই বিশেষ পাথরটা দিয়ে যে রেড লাইট বের হয়, সেটা শত্রুকে বিনাশ করতে পারে। ওই কাগজটার সামনের দিকে যে উর্দু শায়েরি লেখা আছে, তাতেও নাকি মৃত্যুর কথা লেখা আছে।'
'কীরকম?'
'যেমন—,' ফিওডর মোবাইলটা স্ক্রোল করে বললেন, 'আমি স্যর রোমান হরফে লিখে রেখেছিলাম। এই যে—খিড়কিয়াঁ হি খিড়কিয়াঁ হ্যায় জিন্দেগী তেরে লিয়ে, দর খুলে বস তো ওঁয়াহা সে মওত কা আগাজ হো। এর মানে, জীবনের অনেক জানলা আছে, মৃত্যুর একটাই দরজা। কাউন্সিলর আমার কাছ থেকে সব শুনে বলল, ইন্ডিয়ার হায়দ্রাবাদে যেতে। নিজামের ফ্যামিলির সঙ্গে কথা বললে হয়ত আরও বড় কিছুর হদিশ মিলতে পারে।'
'বড় কিছু বলতে?'
'হয়ত লুকোনো কোনও গুপ্তধন। বাবাকে বলতে তিনিও সায় দিলেন।'
'তারপর? তুমি হায়দ্রাবাদ গেছিলে?'
'হ্যাঁ স্যর।'
'হোয়াট!' দীপালি চেঁচিয়ে উঠলেন, 'তুমি—তুমি ইন্ডিয়ায় গেছিলে? আমাকে জানাওনি? ইউ—ইউ—'
'প্লিস দীপালি প্লিস! একটু বোঝার চেষ্টা করো।'
'কী চেষ্টা করব? তুমি—তুমি একটা মিথ্যেবাদী, শয়তান! মুখোশ পরে বসে আছ। তুমি হায়দ্রাবাদ গেলে, আমি জানতেও পারলাম না। দ্যাট মিনস, তুমিই আসলে শ্বশুরকে ভয় দেখাতে। ছিঃ ছিঃ!'
'দীপালি!' জগুমামা সামলাবার চেষ্টা করলেন, 'আমি দেখছি। কুল ডাউন প্লিস। আগে বলো, নাদিয়া কী বলেছে!'
'নাদিয়া বলেছে, কাল ভোররাতে সে ওকে দেখেছে, লকার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে। সঙ্গে আরও দুজন ছিল। ও চেঁচিয়ে উঠতে ওরা পালিয়ে যায়।'
'ওয়ান সেকেন্ড! কাল রাতে তো ইগর সায়েবের ডেডবডি ঘরেই ছিল। তখনও তার লাস্ট রাইট হয়নি।'
'হ্যাঁ, আমার আর মেয়ের পৌঁছোনোর জন্য সবাই ওয়েট করছিল। ডেডবডির পাশের ঘরেই নাদিয়ারা শুয়ে ছিল। শ্বশুরের বডির পাশে দুজন আয়া ছিল।'
'ফিওডর। তুমি কাল কোথায় ছিলে?'
'কী বলব স্যর? বাবার ঘরের অনেকটা তফাতে আমার ঘর। বাবার পাশেই আমি ঘণ্টাদুয়েক বসে ছিলাম। তারপর ধরুন, দুটো নাগাদ ঘরে গেছিলাম। আমার এক অ্যাসিস্ট্যান্ট কামেনেভ, দীপালি তাকে চেনে, আমার সঙ্গেই আগাগোড়া ছিল।'
'তোমাকে একটুও বিশ্বাস করি না!' দীপালি গর্জন করে উঠলেন, 'তুমি লোভী, ব্ল্যাটান্ট লায়ার। সব প্রপার্টি তুমি একা গ্রাস করতে চাও! না-না জগুদা, আপনি ওকে একটুও বিশ্বাস করবেন না। আমি ওর লাইফ পার্টনার, আমাকে পর্যন্ত সবকিছু সাপ্রেস করেছে!'
'প্লিস দীপালি। বিশ্বাস করো, আমার কোনো ব্যাড ইনটেনশন ছিল না। বাবা আমায় আর কাউকে বলতে মানা করেছিল। প্লিস দীপালি!' বলতে বলতে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন ফিওডর নিকিতিন।
'চুপ! একদম ড্রামা করবে না! সব বুঝতে পেরে গেছি। শ্বশুরকে একলা পেলেই ঘরের বাইরে থেকে তুমি ভয় দেখাতে, সম্পত্তির দলিল চাইতে।'
'না দীপালি, না।' চোখ মুছতে-মুছতে ফিওডর কাকুতিমিনতি করে বললেন, 'তুমি জান, তখন আমি প্রায় রোজই মস্কো থেকে যাতায়াত করতাম। তুমি তো জান, বাবা মেন্টালি ডিসব্যালান্সড হয়ে গেছিলেন। হ্যালুসিনেট করতেন।'
'আগে তাই ভাবতাম, এখন ভাবছি না। তুমি যে হসপিটালে নাইট ডিউটির নাম করে ফ্লাইটে এখানে চলে আসতে না, প্রমাণ করতে পারবে?'
'নাহ! পারব না।' অসহায়ভাবে মাথা ঝাঁকালেন ফিওডর, 'বাট প্লিস, বিলিভ মি। বাবা আমায় ইনস্টিগেট না করলে হায়দ্রাবাদ যেতাম না। অতবড় ভুল করতাম না।'
'ভুল! ভুল বলছ কেন ফিওডর?' জগুমামা বললেন।
'মারাত্মক ভুল স্যর। রহস্য জানতে গিয়ে তিনশো বছর আগের জঘন্য ঘটনাকে কবর খুঁড়ে বের করেছি স্যর। যিশুর দিব্যি, আমার একফোঁটা ব্যাড ইনটেনশন ছিল না।'
'কবে গেলে ইন্ডিয়া?' জগুমামা চোখের ইঙ্গিতে দীপালিকে থামিয়ে বললেন, 'যদি নিজের ভালো চাও, দয়া করে আর কিছু গোপন কোরো না।'
'করছি না স্যর। আমি তো নিজেই বলেছি হায়দ্রাবাদ যাওয়ার কথা! আমিই তো দীপালিকে বলেছি, আপনার পরামর্শ নিতে। বলো দীপালি, বলিনি?'
'হুঁ।' জগুমামা একপলক তাকালেন দীপালির দিকে, 'কবে গেছিলে?'
'এই লাস্ট জুনে স্যর। থার্ড উইকে সামার ভেকেশনের ছুটিতে দীপালি কলকাতা গেল জিনিয়াকে নিয়ে। আমিও তার পরদিন ফ্লাইট ধরি।'
'তারপর?'
'তারপর...কী বলব স্যর...আই ওয়স আটারলি শকড। ভিক্টরদাদু তার ইন্ডিয়ায় কাটানোর টাইমের সব কীর্তি চেপে গেছিলেন!'
'কীর্তি!'
'ইয়েস স্যর। ভাবতে পারেন, ইন্ডিয়ায় গিয়ে উনি স্বেচ্ছায় ইসলামে কনভার্টেড হয়েছিলেন? নিজাম সালাবত জং-এর এক মেয়ে প্রিন্সেস সফিউন্নেসাকে ম্যারি করেছিলেন!'
'হোয়াট!' জগুমামা সোজা হয়ে বসেছেন।
'ইয়েস স্যর। নিজাম ওকে ছেলের মতো স্নেহ করতেন, অন্ধ বিশ্বাস করতেন। তাকে নিজের জামাই করেছিলেন। আলাদা হাভেলি বানিয়ে দিয়েছিলেন। ভিকটর নিকিতিন হয়ে গিয়েছিলেন বশির নুরুদ্দিন। নিজের চোখে স্যর নিজাম ফ্যামিলির প্রাইভেট মিউজিয়ামে ফ্যামিলি ট্রির ছবি দেখে এসেছি।'
স্তম্ভিত সবাই, নিশ্চুপ। ফিওডর ঢকঢক করে বোতলের জল গলায় ঢাললেন।
বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। সেন্ট পিটার্সবার্গে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। আলোর মালা ফুটে উঠেছে শহর জুড়ে।
'কী করে ট্রেস করলে ফিওডর?'
ফিওডর ম্লান হাসলেন। বললেন, 'লম্বা গল্প স্যর। সংক্ষেপে বলছি। এখন জীবিত নামকা-ওয়াস্তে নিজাম মুকররম জা। আশির উপর বয়েস। খানদানী, পণ্ডিত মানুষ। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, তাঁর সেক্রেটারিকে ধরে দেখা করার সুযোগ পেলাম। পরিচয় গোপন করে বললাম, মস্কো ইউনিভার্সিটিতে আমি ভারতীয় রাজাদের নিয়ে গবেষণা করছি। যদি উনি একটু সাহায্য করেন। মুকররম সাহেব এককথায় রাজি। পুরানা হাভেলিতে ওনাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রির লাইব্রেরি। তার লাইব্রেরিয়ান মাহবুব খান। তিনিও নিজাম ফ্যামিলির ডিসট্যান্ট রিলেটিভ। তাকে আমার কথা বলে দিলেন।
'বিশাল লাইব্রেরি। আলমারি ভর্তি শুধু বই আর বই। একটা হলঘরে সব নিজাম আর জ্ঞাতিগুষ্টির পেন্টিং দেয়ালে ঝুলছে। ছোটবড়, নানা মাপের।
'প্রথম দিনেই ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটা জায়গায় গিয়ে চোখ আটকে গেল। আরে! এ তো আমাদের ভিক্টর দাদুর ছবি। পাশে খুব সুন্দরী এক মহিলা। ইনি কে? দুজনেরই ভারতীয় রাজপোশাক। উত্তেজনায় আমার হাত-পা কাঁপছে।
'অতিকষ্টে সামলে নিয়ে শুরু করলাম চামড়ায় বাঁধানো অন্য ভলিউমগুলো দেখতে। ফোর্থ নিজাম সালাবাত জং-এর অটো-বায়োগ্রাফির ইংরেজি তর্জমা।
'বিশ্বাস করুন স্যর, পাতার পর পাতা রুদ্ধশ্বাসে পড়ে গেছি। মাঝামাঝি পৌঁছেই পেয়ে গেলাম ভিক্টর নিকিতিনকে। হ্যাঁ স্যর, ভিক্টর দাদুর নিজের লেখার সঙ্গে পরপর সব মিলে যাচ্ছিল। তারপরেই স্যর প্রচণ্ড শক! নিজামের অতি স্নেহের ভিক্টর ইসলাম ধর্ম নিয়েছে, তার নতুন নাম বশির নুরুদ্দিন। তার সঙ্গে নিজাম নিজের মেয়ের বিয়ে দিলেন। ওদের একটি ছেলেও হল।
'এরপরেই এল সেই মারাত্মক ঘটনা! ফিরে আসবে বলে বিবি- বাচ্চাকে অপেক্ষায় রেখে নুরুদ্দিন রাশিয়া চলে যায়। সঙ্গে যায় নিজামের ভাইপো, ভিক্টরের সমবয়েসি ইউসুফ।'
আবার থামলেন ফিওডর। একটু জল খেলেন।
'সেই যে নিজামের নুরুদ্দিন গেল তো গেল। আর ফেরার নাম নেই। খবর নেই ভাইপো ইউসুফেরও। এই সময়ের সালাবাত জং-এর মানসিক উদ্বেগ আর যন্ত্রণার কথা লেখা আছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। মেয়ে কাঁদছে, নাতি কাঁদছে। তিনি প্রবোধ দিচ্ছেন, নিশ্চয়ই ওরা ফিরবে। বারবার পণ্ডিচেরির ফ্রেঞ্চ গভর্নরকে খোঁজ নিতে বলেছেন। ওরাও কোনো খবর আনতে পারছে না।
'দেখতে-দেখতে দেড় বছর কেটে গেছে। সালাবাত মনের দুঃখে প্রায় শয্যাশায়ী। হঠাৎ একদিন সকালে উজির-ই-আজম তাঁর কাছে এসে সালাম দিল। বলল, পণ্ডিচেরি থেকে ফরাসিরা একজনকে নিয়ে এসেছে। সেই ইনসান তাঁর কথা বলছে। লোকটাকে দেখে নিজাম চমকে উঠলেন। এ কে? তার ভাইপো ইউসুফ না? কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে তার?
'ইউসুফ এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। হাউহাউ করে কাঁদছে। নুরুদ্দিন ভয়ংকর বেইমানি করেছে। রানীর প্যালেসে ইউসুফ এতদিন বন্দী ছিল। তাকে জানোয়ারের মতো পায়ে শিকল পরিয়ে রোজ সকালে বাইরে বের করা হতো। দাঁড় করিয়ে রাখা হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ওকে দেখে-দেখে ওরই মূর্তি খোদাই করত আর্কিটেক্টরা। নুরুদ্দিন ওকে রানীর জিম্মায় রেখে সেই যে উধাও হয়ে গেছে, একদিনের জন্যেও দেখা করতে আসেনি।'
'সে কী!'
'ইয়েস মাই ফ্রেন্ড।' ফিওডর আমার কথায় মাথা নেড়ে বলে, 'এখানেই শেষ নয়। ইউসুফ কানাঘুষোয় জেনে যায়, যেদিন মূর্তিটা সমুদ্রের ধারের বাগানে বসানো হবে, তার আগের রাতে ওকে মার্ডার করা হবে। ওর দেহ কফিনে পুরে পুঁতে দেওয়া হবে মূর্তির নীচের মাটিতে!'
'মাই গড! তারপর?'
'রাতের অন্ধকারে জেলের পাঁচিল টপকে কোনোভাবে বেরিয়ে আসে ইউসুফ। কিন্তু যাবে কোথায়? বিরাট প্যালেস গার্ডেনের তিনদিকেই উঁচু প্রাচীর। তার মাথায় টহল দিচ্ছে পাহারাদার। আর সামনে অথৈ জল। ইউসুফ মরিয়া। তাকে বাঁচতে হবে। সে ঝাঁপ দিল সমুদ্রে। সাঁতরাতে থাকে। ভাগ্য ভালো, হাঙরের পাল্লায় পড়েনি। একটা কাঠের ভেলা আঁকড়ে ভেসে ছিল দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। ওই অবস্থায় দেখতে পেয়ে এক জাহাজের নাবিকরা ওকে উদ্ধার করে।...শেষপর্যন্ত কোনোভাবে সে পৌঁছে যায় ফ্রান্সে।...'
ফিওডর একটু থেমে বললেন, 'সালাবাত জং রাগে কষ্টে উন্মাদ হয়ে গেছিলেন। উনি কিছুতেই ছাড়বেন না নুরুদ্দিনকে! প্রতিশোধ নেবেন। এইরকম একটা জায়গায় ওনার লেখা উর্দু শায়েরি দেখলাম।'
মোবাইল স্ক্রোল করে ফিওডর বললেন, 'লিখছেন—জিস সীনে মে সবকো সমায়া মেরে হিন্দুস্তান নে কাল, সুর্খ পড়া হ্যায় ওহ মগরিবী খঞ্জর সে হোকে বেকল। মানে হচ্ছে—হিন্দুস্তান সকলকে বুকে টেনে নিয়েছে, তার বুকে ছুরি মেরেছে পশ্চিমীরা।'
'সেই রিভেঞ্জটা শেষপর্যন্ত তিনি নিয়েওছিলেন!'
'অবশ্যই স্যর। সেটাও পরিষ্কার লেখা আছে। ভিক্টর নিকিতিনকে গোপনে খুন করার জন্যে ফ্রেঞ্চ গভর্নরকে প্রচুর ধনরত্ন দিয়েছিলেন নিজাম।...বুঝতেই পারছেন স্যর, এই লেখা পড়তে-পড়তে আমি কতটা এক্সাইটেড হয়ে গেছিলাম! নিজেকে আর সামলাতে পারি না। দুম করে মাহবুব খানকে আসল পরিচয় দিয়ে ফেলি। শুধু তাই নয়, সঙ্গে আনা উর্দুতে লেখা কাগজগুলোর কয়েকটা জেরক্স তাকে দেখাই। জিগ্যেস করি আমার মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলো!'
'এই রে!'
'ইয়েস, মাই ফ্রেন্ড।' ফিওডর আমায় বলে, 'মারাত্মক সর্বনাশ হল। আমি যে রাশিয়া থেকে এসে রিসার্চ করছি, সেটা মুকররম সায়েব শুধু নন, ওনার ছেলেরা আগেই জেনে গেছিল। আমার এই পরিচয় পাওয়ামাত্র ওনার এক ছেলে তিন চারজনকে সঙ্গে নিয়ে আধঘণ্টার মধ্যে হোটেলে হাজির হয়ে যায়। আমায় টেনে নিয়ে যায় ওর বাবার কাছে। আমি আরেকটা ভুলও করে ফেলেছিলাম।'
সবাই তাকিয়ে আছি ফিওডরের দিকে।
'স্যর।' ফিওডর একটু থেমে বলতে শুরু করলেন, 'আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম নিজামের লেখাগুলোর জেরক্স ছাড়াও এলিজাবেথের লেখাগুলোর জেরক্স। যদি কোনো লিঙ্ক খুঁজতে প্রয়োজন হয়। সবগুলোই একসঙ্গে হোটেলের রুমের টেবিলে রাখা ছিল। ওরা সবগুলোই বাজেয়াপ্ত করে নিল। তারপর নিজামের চৌমহলার একটা ঘরে আমাকে আটকে রেখে শুরু হয় জেরা। সে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা স্যর। একটাই প্রশ্ন—আমার কাছে কী করে এল নিজাম আর এলিজাবেথের গিফট লিস্ট? না বললে ওরা তখনই খুন করবে। প্রাণ বাঁচাতে স্বীকার যাই, এগুলোর অরিজিন্যাল আমাদের গ্রামের বাড়িতে আছে। তবে শুধু এই ডকুমেন্টগুলোই আছে, আর কিছু নেই।
কিন্তু ওরা বিশ্বাস করে না স্যর। ইউসুফের লেখা কাগজ থেকে পড়ে শোনায়, নিজামের অগাধ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে নুরুদ্দিন নিজামকে রানীর পাঠানো প্রচুর ধনরত্নও চুরি করে নিয়ে গেছিল। সেগুলো নিশ্চয়ই আমাদের কাছে আছে। ওরা আমার সঙ্গে রাশিয়ায় এসে ওদের প্রাপ্য ফেরত নিয়ে যাবে। তাই ওরা রাশিয়ার ভিসা না পাওয়া অব্দি আমায় হায়দ্রাবাদেই থাকতে হবে। আমার রাজি না হয়ে উপায় ছিল না স্যর।'
'কিন্তু তুমি ওদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে এলে!'
'হ্যাঁ স্যর। ওরা কী সাংঘাতিক জানেন? একজন আর্মড গার্ডকে সেই মুহূর্তে পোস্টিং করে দিল হোটেলের লাউঞ্জে। আমি একমিনিটও দেরি করিনি। হোটেলের পিছনের সার্ভিস লিফট দিয়ে নেমে একবস্ত্রে বেরিয়ে সোজা এয়ারপোর্ট। লাগেজ-জামাকাপড় সব পড়ে থাকল। সম্বল শুধু পাসপোর্ট আর কিছু টাকা। নেক্সট ফ্লাইট ধরে দিল্লি। সেই রাতেই ব্যাক টু মস্কো।'
'মাই গড!' এতক্ষণে দীপালির মুখে কথা ফুটল। অস্ফুটে বললেন, 'ওরা তো তাহলে আমাদের কাউকে ছাড়বে না। নিশ্চয়ই এদেশে এসে পড়েছে।'
'আমারও তাই মনে হয়।' ফিওডর মুখ নিচু করে বললেন, 'যা কিছু ঘটে চলেছে, তাতে ওরা অবশ্যই ইনভলবড।'
দীপালি কান্নাভেজা গলায় বললেন, 'তাহলে কী হবে জগুদা?'
জগুমামার ভ্রু কুঞ্চিত। গম্ভীর গলায় বললেন, 'বিষয়টা খুব কমপ্লিকেটেড হয়ে গেছে। ফিওডর, তুমি তো কুকুরের গলার পাথরের ব্যাপারটা জেনেছ। সে ব্যাপারে কিছু বলতে পারবে?'
'নাহ স্যর। দীপালি যে কী বলছে, বুঝতে পারছি না। ওরকম কোনো অদ্ভুত পাথর আমাদের কিউরিও রুমে নেই স্যর।'
'বেশ। নিজামের ছেলের নাম কী? ওর কি কোনো ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলে? মানে এখন তো মোবাইলে—'
'হ্যাঁ-হ্যাঁ, অবশ্যই স্যর।' ফিওডর বলে উঠলেন, 'ওর নাম আজম খান। ওর সঙ্গে আরও তিনজন ছিল। একজনের নাম শুনেছি। ওমর। ওদের সবার ছবি, মুকররম খান, মাহবুব খানের ছবি, লাইব্রেরি, মিউজিয়ামের সবকিছুরই ফোটো রয়েছে আমার কাছে।'
'গুড। আমাকে মেল করে দাও। আর ফেডারেল পুলিশে জাস্ট একটা এফ.আই.আর. করে রাখো।'
অনন্ত সরখেল কখন যে বেডরুম থেকে বেরিয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, খেয়াল করিনি। বিকট মুখভঙ্গি করে দেখে যাচ্ছেন ফিওডর নিকিতিনকে।
'উঁহু! মিলছে না। কোথাও একটা গ্যাপ থেকে যাচ্ছে।' জগুমামা হাঁটছেন আর মাথা নাড়ছেন।
'গ্যাপ! কেন বলো তো?'
'ফিওডর নির্ঘাত একটা কিছু চেপে যাচ্ছে। একটা কথা বল, ও পাকিস্তানি ভদ্রলোককে দিয়ে উর্দুতে লেখা লিস্টগুলো পড়িয়েছিল। ওই লিস্টগুলোতে কি গুপ্তধনের কথা কিছু আছে? নেই। তাহলে পাকিস্তানি লোকটি খামোকা ওকে হায়দ্রাবাদ যেতে বলবে কেন? আদৌ কি বলেছিল? না কি ওটা সে বানিয়ে বলল ওর ইন্ডিয়ায় যাওয়া জাস্টিফাই করার জন্য?'
এখন সকাল ৯টা। একটু আগে আমরা হাইড্রোফয়েল ক্রুজে এসে নেমেছি পিটারহফের জেটিতে। ডাঙায় পা দিয়ে গার্ডেনের ভিতরে কিছুটা ঢুকতেই মুগ্ধ, অভিভূত। প্যালেস-গার্ডেন যে কী অসম্ভব সুন্দর, ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
জারসাম্রাজ্যের বিলাস বৈভবের প্রতীক বিশাল সোনারঙের গ্র্যান্ড কাসকেড, মনপ্লাইসির প্রাসাদ, হারমিটেজ, অসংখ্য ফোয়ারা, বাগান জুড়ে অসংখ্য মূর্তি, স্থাপত্য। সকালের সোনালি রোদে চোখ ঝলসে দিচ্ছে।
ট্যুরিস্টের মেলা বসে গেছে। কত দেশের মানুষ। সবাই এগিয়ে যাচ্ছে গ্র্যান্ড কাসকেডের দিকে। জগুমামা আমাদের থামিয়ে দিলেন।
'নোও! ওদিকে নয়। আমাদের ফার্স্ট টার্গেট ভারতীয় সোলজারের মূর্তি। তাকে খুঁজে বের করতে হবে।'
সোমলতা খুঁতখুঁত করে উঠল, 'আঙ্কল! আমাদের এবার কিছুই দেখা হচ্ছে না!'
'হবে মামণি, হবে। যে কাজে ওরা আমাদের এনেছে, সেটা শেষ করি।'
দীপালি খামারবাড়িতে আমাদের আনার জন্যে বাসু সখাকে দিয়ে হোটেলে ক্যাব পাঠাতে চেয়েছিলেন। মামা নাকচ করে দিয়েছেন। বলেছেন, 'চিন্তা কোরো না, আমরা আমাদের মতো ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব। গুগল ম্যাপ আছে। তোমরা শুধু বাড়িতে থেকো।'
আসলে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে যেমন সড়কপথে, তেমন জলপথেও পিটারহফ আসা যায়। সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরটা জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে আছে নদী আর খাল। সব গিয়ে মিশেছে বাল্টিক সাগরে।
আগেই মামাকে ক্রুজ সফরে রাজি করিয়ে রেখেছিল সোমলতা।
কিন্তু তাতে যে আজ এমন বিপত্তি ঘটবে, কে জানত! প্লুটনিক ক্রুজ স্টেশন থেকে বেরিয়ে দিব্যি জল কেটে এগিয়ে যাচ্ছিল ছুঁচোলো মুখো হাইড্রোফয়েল। ঝকঝকে সকাল, কনকনে বাতাস। মিনিট দশেকের মধ্যেই নিভা নদী পেরিয়ে এসে পড়ল সমুদ্রের মোহনায়। অল্প অল্প ঢেউ, শান্ত সাগর। পিছনে ঝাপসা হয়ে এসেছে শহর।
হঠাৎ জলযানটা দুলতে শুরু করল! কী ব্যাপার! ক্যাপ্টেন অ্যানাউন্স করলেন, 'সবাই সিটে বসুন। সিটবেল্ট বাঁধুন।' বাইনোকুলার নিয়ে উনি দেখছেন, বোঝার চেষ্টা করছেন।
দুলুনি প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। বড় বড় ঢেউ! সবাই একটু আশঙ্কিত, আমাদের মুখ ফ্যাকাশে। ঠিক তখনই উনি ফের চেঁচিয়ে উঠলেন, 'ওয়াহ! গ্রেট! সি—সি—টু বিগ হোয়েলস!'
হোয়েলস! মানে দুটো তিমি। এরকম সৌভাগ্য কালেভদ্রে ঘটে। ওদের দাপাদাপির জন্যেই সমুদ্র আজ এত উত্তাল! সিট আঁকড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে সকলে। তিমিদুটোর পাখনা একেকবার উঁকি দিচ্ছে। পাইলট ওদের পাশ কাটিয়ে বেরোবার চেষ্টা করছে। হাইড্রোফয়েল কলার মোচার মতো নাচছে।
'তি-তি-তিমি! কী-কী হবে স্যার?' অনন্ত সরখেলের দিকে তাকাতেই আমাদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া। এ কী! কী হল বুড়োর? দাঁত-মুখ ছেতরে গেছে, পরক্ষণে 'তি-তি' করতে করতে সিটের ওপর এলিয়ে পড়লেন!
'ওয়াটার! ওয়াটার!' জগুমামা চেঁচিয়ে উঠেছেন। সোমলতা বোতল থেকে ওনার চোখেমুখে জল ছিটোতে শুরু করেছে। অনন্তবাবুর ঘাড় এলিয়ে পড়েছে। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরুচ্ছে। কোনও সাড় নেই!

স্টিমার এলাকাটা পেরিয়ে এসেছে। টারবুলেন্ট সী আবার শান্ত। ওনাকে ধাক্কাচ্ছি, 'অনন্তবাবু! ও অনন্তবাবু!'
অবশেষে তিনি পিটপিট করে চাইলেন। আমরা হাঁফ ছাড়লাম।
উফ! যা ভয় খাইয়ে দিয়েছিল বুড়োটা!
গোল-গোল চোখে তাকাতে-তাকাতে বললেন, 'কী যে হয়ে গেল! বুঝলুম না!'
হুঁ! বুঝলুম না! ওনার কেরদানির জন্যে একটাও ছবি তুলতে পারিনি। জীবনে এ আফশোস আমাদের যাবে না।...
বিরাট বিরাট গাছপালায় মাঝের পথটি ছায়াময়। সেই পথ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছি। মাঝে-মাঝে দ্বীপের মতো একটুকরো সবুজ ঘাস আর ফুলের বাগান, মধ্যমণি পাথরের বিচিত্র সব মূর্তির মুখ দিয়ে অবিরাম ফোয়ারা।
বাঁ-দিকে সমুদ্র উঁকি দিল। রাস্তাও দু-ভাগ। মামা বিড়বিড় করলেন, 'সমুদ্রের রাস্তাতেই আগেরবার মূর্তিগুলো দেখেছি।'
কিন্তু মূর্তি কি একটা দুটো! প্রাচীন গ্রীস-রোমের দেবদেবী থেকে শুরু করে জাপান-চীনের মানুষের স্ট্যাচু, নানাদেশের যোদ্ধা থেকে পরী-হুরী-ড্রাগন...কী নেই!
সমুদ্রের পাড়ের রিং রোডের কাছে চলে এসেছি। এমন নরম রোদ্দুরেও ঘাম বেরিয়ে গেছে। জগুমামা মজা করে বললেন, 'কোথায় গেলে ভাই। তোমার দেখা নাইরে, তোমার দেখা নাই!'
ডানদিকে আবার একটা বাগান। একটা ফোয়ারা। তার মাঝে বাংলো প্যাটার্নের একতলা প্যালেস। কোনো এক রানীর নাম প্লাকার্ডে লেখা। সোমলতা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, 'আঙ্কল! আঙ্কল!'
রিং রোডের এককোণে দাঁড়িয়ে আছে সে। প্রায় দুই মানুষ সমান ঝলমলে হলুদ রঙা বেদী, তার উপরে কোমরে হাত দিয়ে দৃপ্তভঙ্গিতে দণ্ডায়মান। ভারতীয় যোদ্ধা! সমুদ্রের দিকে কোণাকুণি তার মুখ।
কিন্তু স্ট্যাচুর ঠিক পিছনে ওরা কারা গোল হয়ে দাঁড়িয়েছিল? আমাদের আওয়াজ পেয়েই হুস করে ঢুকে গেল ডানদিকের ঝোপ- জঙ্গলে!
আরেকজনকেও স্পষ্ট দেখেছি। সে হনহনিয়ে হেঁটে সমুদ্রের দিকে চলে যাচ্ছিল। মামার দিকে তাকালাম। তিনিও মাথা নাড়লেন, 'হ্যাঁ রে। ঠিকই দেখেছিস। আজ জাহাজেও ওকে দেখেছি। আমায় দেখতে পেয়েই উপরের ডেকে উঠে গেছিল।'
অনন্তবাবু ফিসফিস করে উঠলেন, 'স্যার, আবার! আবার স্যার!'
'কী আবার?'
'স্যার, সেই লোকটা। মস্কো থেকে আমি বলে যাচ্ছি, আপনারা কান দিচ্ছেন না। এই বলে দিলুম স্যার, ওই লোকটাই কালপ্রিট! এখন গপ্পো ফাঁদছে।'
'কে লোকটা বলবেন তো!'
'কতবার বলব স্যার?' অনন্ত সরখেল সখেদে বললেন, 'ওই যে স্যার আপনার দীপালির বর। আজকে আবার একটু অন্যরকম ভেক ধরেছে মনে হল। গালে দাড়ি দেখলুম যেন।...অ্যাঁ! ওই তো, ওই তো! লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের দেখছে।'
বলতে-বলতে হঠাৎ তীরের বেগে সামনের ঝোপের দিকে তেড়ে গেলেন, 'দাঁড়া! আজ তোকে দেখাচ্ছি।'
ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে আমরা আটকাবার সুযোগ পেলাম না। 'আরে, দাঁড়ান, দাঁড়ান,' চেঁচাতে চেঁচাতে ওঁর পিছনে ছুটে গেলেও তার আগেই তিনি ঝোপের ভেতরে অনেকটা ঢুকে পড়েছেন।
মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড! ঝোপের মধ্যে ধস্তাধস্তির প্রবল খড়মড়- খড়মড় এবং অনন্তবাবুর আর্তনাদ, 'আহ-আহ! উহ-উহ—বাবা গো।'
মর্মান্তিক দৃশ্য। বুকে হাত দিয়ে পড়ে আছেন অনন্ত সরখেল! যন্ত্রণায় ছটফট করছেন।
ঝোপঝাড় ভেঙে চারজন লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে যাচ্ছে ডানদিকের আরও ঘন জঙ্গলে।
জগুমামার হাতে উঠে এসেছে সর্বক্ষণের সঙ্গী রিভলবার। রাগে গনগন করছে মুখ। ছুটতে গিয়েও থেমে গেলেন।
সোমলতা উবু হয়ে বসে পড়েছে। অনন্তবাবুর বুকে মালিশ করছে। রুমাল জলে ভিজিয়ে মুখ মুছিয়ে দিচ্ছে।
লোকগুলোকে আর দেখা যাচ্ছে না।
আমরাও হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছি। মামা নরমগলায় বললেন, 'কেন যে এমন পাগলামি করেন! যদি ওরা ছুরি বা পিস্তল চালিয়ে দিত।'
'হ্যাঁ স্যার।' কাতরাতে-কাতরাতে অনন্ত সরখেল বললেন, 'নচ্ছারটাকে দেখে...মাথা ঠিক রাখতে...পারিনি স্যার।...জাপটে ধরেছিলুম স্যার!...উঃ, ওটার গায়ে অসুরের শক্তি। ঘুষি মারছিল...তবু ছাড়িনি...তারপর এমন একখানা লাথি ঝাড়ল...উঃ! পাঁজরাটা বোধহয় ভেঙে গেছে।'
'না-না, ভাঙেনি।' মামা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, 'ওষুধ খেলে ব্যথা কমে যাবে।...মামণি, টুকলু। ওনাকে আস্তে আস্তে ধরে ওঠাও। বাইরে বেদীতে নিয়ে বসাও।'
স্ট্যাচুর একটু দূরেই পাথরের চওড়া বেদী। অনন্তবাবুকে শুইয়ে দিয়েছি। সোমলতা হ্যান্ডব্যাগ খুলে ফেলেছে। ওর ব্যাগে নানা ট্যাবলেট আর ফার্স্টএডের সরঞ্জাম থাকে। লোশন বের করে তুলো দিয়ে চেপে ধরছে রক্ত ফুটে ওঠা গলায় নাকে, বুকে। একটা ট্যাবলেটও খাইয়ে দিল।
কিন্তু মামা? জগুমামা এখনও বেরোচ্ছেন না কেন? ডাকতে যাচ্ছি, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলেন। একহাতে সানগ্লাস, অন্য হাত মুঠো করা। অনন্ত সরখেল 'উঃ-আঃ' করতে করতে উঠে বসেছেন।
'সানগ্লাসটা পেলে?'
'হ্যাঁ রে। তবে শুধু সানগ্লাস নয়, আরেকখানা বস্তুও পেয়েছি। 'বেচারি অনন্তবাবু মারধোর খেলেন, উল্টোদিকে আমাদেরও কিছু লাভ হয়েছে।...মিলিয়ে দেখতে হবে, যা ভাবছি, তাই কিনা।' মুঠোর মধ্যেকার বস্তুটা চট করে মামা পকেটে ভরে ফেললেন।
খুবই জানতে ইচ্ছে করছিল বস্তুটা কী, কিন্তু জানি, মামা এখন কিছুতেই মুখ খুলবেন না।
'আঙ্কল। এখান থেকে যাব কী করে? ওনার যা কন্ডিশান—'
'না-না। আমি...আমি ঠিক পারব।' অনন্ত সরখেল উঠতে গিয়ে ককিয়ে উঠে ফের বসে পড়লেন।
'উঁহু! ছটফট করবেন না।' জগুমামা বললেন, 'মামণি। তুমি আর টুকলু রিং রোড ধরে একটু যাও। আসার সময়ে কয়েকটা কাফে দেখেছি। কড়া করে কফি বানিয়ে আনো। চাঙা হয়ে যাবেন।...ওদের এটাও জিগ্যেস করো, হ্যান্ডিক্যাপড মানুষদের জন্যে ভেতরে যে ব্যাটারি অপারেটেড ভেহিকল দেখেছি, সেগুলো কীভাবে পেতে পারি!'
জগুমামা বলছেন ঠিকই, কিন্তু অন্যমনস্ক। ওঁর ভ্রু কুঞ্চিত, চক্ষু নিবদ্ধ সামনের ঝোপটার দিকে। বিড়বিড় করছেন নিজের সঙ্গে।
আমরা এগোতে-এগোতে দেখলাম, মামা ফের সেই ঝোপের মধ্যে ঢুকে গেলেন।...
স্পষ্ট বোঝা যায়, কেন এদেশ আমাদের চেয়ে ঢের এগিয়ে। আমরা অ্যাকসিডেন্টের কথা বলতেই কাফের ভদ্রমহিলা কাউকে ফোন করলেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে কফির কাপ হাতে আমরা চারদিক খোলা ব্যাটারি গাড়িতে চড়ে বসেছি।
একটু দূর থেকে চোখে পড়ল, মামার হাতে একগোছা কাগজ। উনি গভীর মনোযোগে সেগুলো উল্টেপাল্টে দেখছেন। অনন্তবাবুও পাশ থেকে ঝুঁকে পড়েছেন।
আমার মোবাইলটা বাজছে। রাশিয়ান নাম্বার।
'হ্যালো, অর্ণব! আমি দীপালি বলছি। কী ব্যাপার তোমাদের?'
'কেন ম্যাডাম? আমরা তো...মানে আমাদের...' বলতে গিয়েই গিলে নিলাম, 'আমরা এখন পিটারহফ প্যালেসে। গার্ডেনে ঘুরছি।'
'কিন্তু জগুদা? জগুদা তোমাদের সঙ্গে নেই? তাকে ফোনে পাচ্ছি না।'
'তাই নাকি? একসেকেন্ড ম্যাডাম।' আমাদের গাড়ি মামার সামনে এসে গেছে। 'মামা! দীপালি ম্যাডাম ফোন করছেন।'
'হ্যাঁ দীপালি।...ওহো! সরি, দ্যাখো কী কাণ্ড।...কোনোভাবে সাইলেন্ট হয়ে গেছিল। আমরা এখান থেকে তোমাদের বাড়িই যাচ্ছি।...কী! কী বলছ? কবে?...কতজন? ফিওডর—হোয়াট?...তুমি সকালেই বলোনি কেন?...হ্যাঁ...হোটেলেই তো অল্টারনেট নাম্বার হিসেবে অর্ণবের নাম্বার দেওয়া ছিল।...বাসুকে হোটেলে পাঠিয়েছিলে?...সিওর?... ঠিক আছে, ঠিক আছে। শিগগির একটা মেল পাঠিয়ে দাও ফেডারেল পুলিশে। হ্যাঁ—এখনই।...ডোন্ট ওয়ারি।...আমরা ক্যাব ধরে তোমাদের বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছি।'
ফোনটা রেখে জগুমামা গুম হয়ে গেলেন। দুম করে কোটের পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ফস করে ধরিয়ে ফেললেন।
আমরা চারজনেই গাড়িতে চড়ে বসেছি। গাড়ি চলেছে প্রধান ফটকের দিকে।
'মামা। কী হল? একটু বলো।'
মামা আমার দিকে তাকালেন। চোয়াল শক্ত। বললেন, 'হায়দ্রাবাদ অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। কাল বেশ রাতে দুজন ইন্ডিয়ান দীপালিদের ডাচায় গেছিল। সঙ্গে আরও জনাচারেক লোকাল ছিল। অবশ্যই তারা ভাড়া করা গুন্ডা। ইন্ডিয়ান দুজন খুব বিনীতভাবে বলে, ওদের কিউরিও রুমে ওরা ঢুকতে চায়। কারণ, ওদের প্রপার্টি বেআইনিভাবে ভিক্টর নিকিতিন তিনশো বছর আগে নিয়ে এসেছিল। দীপালিরা বলে, ওদের কাছে ওই রুম বা লকারের চাবি নেই। সব ফিওডরের কাছে।'
'ফিওডর কাল রাতে বাড়ি ছিলেন না? বিকেলেই তো একসঙ্গে হোটেলে এসেছিলেন।'
'তা এসেছিল।' জগুমামা বললেন, 'ফেরার পথে ফিওডর দীপালিকে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়। বলে, একটা জরুরি কাজ সেরে রাতে ফিরছে। আর ফেরেনি।...তাতে অবশ্য একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। ওরা চব্বিশ ঘণ্টা টাইম পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, ফিওডর গেল কোথায়? নিজামের লোকজন নিশ্চয়ই ওকে কিডন্যাপ করেনি।'
'বাসু সখা তখন দীপালি ম্যাডামদের বাড়িতে ছিল?'
'নাহ। সে তো কাল বিকেলে ওদের সঙ্গে আমাদের হোটেল অবধি আসে। বাসু টুরিস্ট পার্টি অরগানাইস করে। তার একটা ট্যুরিস্ট পার্টির নাকি আজ এখানে আসার কথা!'
'তার মানে, তুমি-আমি ঠিকই দেখেছি?'
'জানি না। যদি তাই হবে, তাহলে দীপালি যখন আমায় ফোনে পায় না, বাসু আমাদের হোটেলে খোঁজ নিয়ে কী করে জানাল, আমরা ভোরে উঠে বেরিয়ে গেছি?'
'এটা ভেরি সিম্পল মামা! এর জন্যে হোটেলে যাওয়ার দরকার পড়ে না। রিসেপশনে একটা ফোন করলেই জেনে যাবে!'
'রাইট! আচ্ছা...হুঁ! একটা কথা বল, যাদের সঙ্গে অনন্তবাবুর এনকাউন্টার হল, তাদের মধ্যে কি বাসুকে দেখেছিস?'
'ওদের দলেই যে ছিল, বলা যাবে না। তুমিই তো বললে, ও সকালে ক্রুজেও ছিল। আমাদের দেখে নাকি সরে গেছিল। আর আমরা যখন ইন্ডিয়ান সোলজারের স্ট্যাচুর কাছে যাচ্ছিলাম, সিওর ও ছিল। তুমি আমি দুজনেই দেখেছি। পট করে কোথাও সরে পড়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, সে আমাদের দেখে বারবার লুকোচ্ছে কেন?'
মামা বেশ কয়েকবার জোরে টান দিয়ে সিগারেটটা ফেলে দিলেন। নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে বললেন, 'যতবার ভাবি, একদম ছেড়ে দেব, তখনই এই হতচ্ছাড়া চুম্বকের মতো টানে।'
কড়া রোদ্দুর উঠে গেছে। খুব আরাম লাগছে। বাঁ-দিকে ভুবন- ভোলানো গ্র্যান্ড কাসকেড, পরপর মিউজিয়ম, চার্চ, হারমিটেজ, অন্যান্য প্রাসাদ পেরিয়ে দুপাশের সবুজ চিরে গড়গড় করে ছুটছে ব্যাটারি গাড়ি।
দেখতে-দেখতে প্যালেসের শেষপ্রান্তে এসে গেছি। সামনে প্রধান ফটক।
য়ুরোপীয় গথিক প্যাটার্ন, বড় বড় থাম, সোনালি আর সাদা রঙ। গেটের বাইরে বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর। তার ওপারে সারি সারি গাড়ি-বাস দাঁড়িয়ে।
'অনন্তবাবু, পারবেন তো?'
'হ্যাঁ স্যার।' ভেঙেচুরে উঠে দাঁড়ালেন অনন্তবাবু। কফি আর ওষুধের প্রভাবে তিনি অনেকটাই চাঙা।
কাতারে কাতারে ট্যুরিস্ট। সেলফি-ছবি তুলছে, মাঠে গড়াগড়ি দিচ্ছে বাচ্চারা। হইচইয়ে সরগরম।
কয়েক পা এগিয়েছি। ডানদিক থেকে বাঙালি গলা ভেসে এল, 'সার, সার! আমি অ্যাখানে।'
হকচকিয়ে গেছি। আরে—বাসু সখা! এই প্রথম তার গলা শোনা গেল।
'আপনি! আপনি কী করছেন?'
'ক্যান সার? আপনাগো লগে ওয়েট করতাসি।'
নিখাদ বাঙাল উচ্চারণ। মামা অবাক হয়ে বললেন, 'আমাদের জন্যে!'
'হাঁ সার। দিদি কইল, আপনারা তাগো বাসা যাইবেন।' একগাল হাসলেন বাসু।
'কিন্তু...' মামা ঠান্ডাগলায় বললেন, 'আপনি তো সকালে আমাদের সঙ্গেই ক্রুজে এসেছিলেন।'
'হাঁ সার, আসছিলাম।' বাসু সখা একগাল হেসে বললেন, 'ট্যুরিস্ট পার্টি ছিল। অগো হোটেলে ছাইড়া আসলাম। দিদির কথা ফেলি ক্যামনে? এইখানে খাড়ান সার, ক্যাব ডাইকা আনি।'
চতুর্দিক রোদে ঝলমল করছে। ধু-ধু হলুদ গমের ক্ষেত, আপেল বাগান, ছোট ছোট জঙ্গল, ক্যানাল-কালভার্ট। মাঝে মাঝে গ্যাস স্টেশন, দোকানপাট, কান্ট্রি হাউস। ঠান্ডা এলোমেলো বাতাস।
মসৃণ রাস্তা দিয়ে সাঁ-সাঁ করে ছুটছে ঢাউস গাড়ি। ফাঁকা হাইওয়ে, কখনও-সখনও ওদিক থেকে দু-একটা গাড়ি-ট্রাক বেরিয়ে যাচ্ছে। জগুমামা আর আমি একেবারে পিছনের সিটে। মাঝে অনন্তবাবু সোমলতা। ড্রাইভারের পাশে বাসু সখা।
মামার হাতে মোবাইলটা বাজছে। ট্রুকলার দেখাচ্ছে—ফিওডর নিকিতিন।
'ইয়েস, ইয়েস।...তুমি কোথায়?...আচ্ছা, আচ্ছা।...হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি।... ঠিক আছে।...এসো।...'
মামার দিকে তাকালাম। তিনি ঘাড় নাড়লেন। পরক্ষণে আমার চোখ গেছে নিজের ফোনের দিকে। এ কী! গুগল ম্যাপ দেখাচ্ছে আমরা লোকেশন থেকে অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। মামাকে সঙ্গে সঙ্গে দেখালাম।
'বাসুবাবু।'
'বলেন সার।'
'আমরা কোথায় যাচ্ছি?'
'এই যে। আইসা গেছি।'
বলতে-বলতে আমাদের এসইউভি ঢুকে গেল একটা বড় কম্পাউন্ডের মধ্যে। হোটেল ওল্ড পিটারহফ। চারতলা বিল্ডিং।
গাড়িটা পের্টিকোতে এসে থেমেছে। ভিতর থেকে চারজন রাশিয়ান বেরিয়ে এল। দরজা খুলে ঘিরে দাঁড়াল।
'এটা কোথায় এলাম বাসুবাবু?'
'সার, মিড ওয়ে হল্ট! চা-নাস্তা করব। আপনারা ফিওডর ভাইয়ের সাথে আলাপ করবেন।'
'ফিওডর! মানে?'
'হ্যাঁ সার।' বাসু হেসে বললেন, 'আসেন।'
জগুমামা ফিসফিস করে বললেন, 'শিগগির হোটেলের ছবিটা তুলে দীপালিকে হোয়াটসঅ্যাপ কর।'
টপ ফোরে লিফট থেকে বেরিয়েই প্রশস্ত লাউঞ্জ। আর সেখানকার সোফায় বসে আছেন—আর কেউ নয়, স্বয়ং ফিওডর নিকিতিন! নেভি ব্লু স্যুট, টাই। পাশের একজন মনে হচ্ছে ইন্ডিয়ান বা এশিয়ান, অন্য তিনজন রাশিয়ান।
হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি। কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না। ফিওডর কথা বলছেন না, মৃদু মৃদু হাসছেন।
কথা বললেন বাসু সখা, 'সার, ওনার জিনিসগুলান ফিরায়ে দ্যান।'
'জিনিস!'
'হ্যাঁ সার। জঙ্গলে যেগুলান আপনি কুড়ায়ে পাইসেন।'
'ও।' মামা কোটের পকেট থেকে সানগ্লাসটা বের করে এগিয়ে দিলেন। ফিওডর চোখে পরে নিলেন।
'আর কাগজগুলান?' বাসুর মুখে অমায়িক হাসি, 'যাতে সব আকাজোকা আছে।'
জগুমামা আগুনচোখে তার দিকে তাকালেন। তারপর অন্য পকেট থেকে ভাঁজ করা পাতাগুলো বের করে দিলেন।
'বসেন সার, বসেন। কফির অর্ডার দিচ্ছি। তাড়াহুড়া করবেন না।' বাসু সখা কাগজগুলো নিকিতিনের পাশের লোকটির হাতে তুলে দিয়ে নির্লিপ্তভাবে বললেন, 'মিলিয়ে নিন।...আর সারকে পরিষ্কার করে সব বুঝিয়ে বলে দিন।'
এই অংশটুকু বললেন হিন্দিতে! আরও গুলিয়ে গেল।
সোমলতা-অনন্তবাবুকে উপরে আনা হয়নি। ওরা দুজনেই রিসেপশনে বসে।
'আসসালাম আলাইকুম স্যর।' ফিওডরের পাশের লোকটি এবার হিন্দিতে বলল, 'আপনাদের পরিচয় জানি স্যর। আমরা হায়দ্রাবাদের নিজাম ফ্যামিলির উত্তরপুরুষ। আপনারা ইন্ডিয়ান, আমরাও ইন্ডিয়ান। আপনি কি জানেন স্যর, রাশিয়ান নিকিতিন ফ্যামিলির একজন পূর্বপুরুষ নিজামের সঙ্গে কী জঘন্য অপরাধ করেছিল?'
'শুনেছি।' জগুমামা ঘাড় নাড়লেন।
'শুনেছেন! বেশ! এটাও কি জানেন নিকিতিন লোকটা একটা চোর? সালাবাত জং-এর বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রচুর ধনরত্ন ও ভ্যালুয়েবল ডকুমেন্ট চুরি করে পালিয়ে এসেছিল?'
'সব জানি ভাই।' জগুমামা পাশের ফিওডরের দিকে একঝলক দেখে বললেন, 'সে বউ বাচ্চাও ফেলে এসেছিল আমাদের দেশে। তার এক সম্পর্কে শালাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু—কিন্তু তার প্রতিশোধও তো নিজাম নিয়েছিলেন। আজ এই তিনশো বছর পরে আবার ওই ইতিহাসকে কবর খুঁড়ে বার করে কী লাভ!'
'এ কী বলছেন স্যর!' লোকটি উত্তেজিত হয়ে উঠল, 'আমাদের প্রাপ্য জিনিস ফেরত পাব না? এলিজাবেথ যে হীরে-জহরত, তার লিস্ট বড়েদাদাজীকে পাঠিয়েছিলেন, সেগুলো কোথায় থাকার কথা? আমাদের মিউজিয়ামে। সেই শয়তানটা সেগুলোও নিয়ে পালিয়ে আসে। ওদের বাড়ির একটা ঘরে সব রাখা আছে, আমরা জেনে ফেলেছি।'
'আরে ভাই, সে তো ফিওডর গেছিল বলে জানতে পেরেছেন! সে না গেলে কি আর জানতে পারতেন?'
'জী স্যর। লেকিন ফিওডর কি এমনি এমনি গেছিল, স্যর?' লোকটা হাতের কাগজগুলো দেখিয়ে বলল, 'তার কাছে ওর ফোরফাদার চোরটার নিজের হাতে উর্দুতে লেখা গুপ্তধনের এই ম্যাপগুলো ছিল। গুপ্তধন কোথায় আছে, রাশিয়া না হায়দ্রাবাদে, সেটার পাতা করতেই সে হায়দ্রাবাদ গিয়ে আব্বার সঙ্গে দেখা করে। স্যর, একটা কথা আপনাকে স্পষ্ট করে বলতে চাই।'
'বলুন।'
'আপনারা এর মধ্যে থাকবেন না। সব ধনরত্ন আমাদের ইন্ডিয়ার প্রপার্টি। এই রাশিয়ানরা ইবলিসের বাচ্চা! আমরা ফেরত নেবই। যদি না দেয়, এদের ফ্যামিলিকে খতম করে দেব। আপনাকে অনুরোধ করছি, একজন ইন্ডিয়ান হয়ে ওদের সাপোর্ট করবেন না স্যর।'
'বেশ তো। ফিওডর নিজেই এখানে রয়েছে। ও যদি আপনাদের পাওনা দিয়ে দিতে রাজি হয়ে যায়, তো আমরা মাঝে থাকব কেন?' মামা ফিওডর নিকিতিনের দিকে ইশারা করে বললেন।
লোকটা হো-হো করে হেসে উঠল। মামার ভ্যাবাচাকা খাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'স্যর! লোকে ওইটাই গলতি করে। ওইজন্যেই ওকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। ইধর আকে স্রিফ উনসে দাড়িমুছ সাফ কর লিয়া। বুঝলেন স্যর? শুনুন স্যর, আমি হলাম নিজামের ডাইরেক্ট ডিসেনডেন্ট। আমার নাম আজম খান। ও হল গিয়ে আমার এক ফুফাতো ভাই—ওমর নুরুদ্দিন। আভি কুছ সমঝ মে আয়া স্যর?'
'নুরুদ্দিন!' জগুমামা চোখ বড়-বড় করে তাকিয়ে আছেন ওমরের মুখের দিকে, 'এর মানে...এর মানে হচ্ছে উনি ভিক্টর নিকিতিন ওরফে বশির নুরুদ্দিনের—'
'পাক্কা স্যর, পাক্কা!' আজম খান হাততালি দিয়ে বলে উঠল, 'ওমর হচ্ছে সালাবাত জং-এর বেটি বেগমসাহেবা সফিউন্নিসার ডাইরেক্ট ডিসেনডেন্ট। বড়ি নানী ওই শয়তানটা ভেগে যাওয়ার পরে আর নিকাহ করেননি। অকেলাই বাচ্চাকে মানুষ করেন। ওদের ফ্যামিলি ট্রি-তে তাই নুরুদ্দিন টাইটেলটা থেকে গেছে। অওর উসকা জিসম মে ভি রাশিয়ান খুন বহে রহা হ্যায়।'
'তাই বলে এতখানি মিল! এ যে অবিকল ফিওডর বসানো।'
'হ্যাঁ রে টুকলু।' মামা নিষ্পলক চোখে দেখছেন ওমরকে। স্বগতোক্তি করলেন, 'একেই বলে জিন-এর খেলা। ডমিনেন্ট-রিসেসিভ ক্রস ব্রিডিং হতে হতে হঠাৎ কয়েকশো বছর পরে দুটো মানুষকে একরকম দেখতে হয়ে গেছে।...হুম। আস্তে-আস্তে সব পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। এই ওমরই আসলে রাতের বেলা গিয়ে ইগর নিকিতিনকে অঙ্গভঙ্গি করে ভয় দেখাত, হুমকি দিত, ঘরের চাবি চাইত। তাই তো বাসুবাবু?'
বাসু সখা চুপ।
'কী হল? আপনি চুপ করে আছেন কেন? দীপালি আপনাকে এত বিশ্বাস করে। নিজের ভাইয়ের মতো ভালোবাসে। আর আপনি কিনা—'
'না সার। ওভাবে বলবেন না।' বাসু বললেন, 'এটা আমার প্রফেশন। আর আফটার অল আমি একজন ইন্ডিয়ান। নিজামদের সঙ্গে ভিক্টর নিকিতিন যে অন্যায় কইরাছিল, তার শিক্ষা পাবে না অরা? কী বলেন, আঁ! আমি সার, নিজে কিছু করি নাই। দ্যাশের মানুষরে জাস্ট হেল্প করসি।'
'হ্যাঁ-হ্যাঁ, জাস্ট হেল্প তো বটেই!' জগুমামা ব্যঙ্গের সুরে বললেন, 'কত লক্ষ টাকা দিয়েছে ওরা?'
'স্টপ ইট!' আজম খান হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, 'আপলোগ বেফালতু বহেস বন্ধ কীজিয়ে! আপনাকে ক্লিয়ার জানাতে চাই, হামলোগ উহ শয়তানকো ছোড়নেওয়ালা নেহি হ্যায়। আমাদের এই লড়াইয়ের মধ্যে আপনার থাকা চলবে না স্যর। আপনার সম্পর্কে সব ইনফর্মেশন নিয়ে ফেলেছি। আপনাকে দুটো অপশন দিচ্ছি।'
'অপশন!'
'জী স্যর। ফার্স্ট অপশন, আমাদের লোক আপনাদের গার্ড করে নিয়ে যাবে মস্কো অবধি। সেখান থেকে ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ধরিয়ে তুলে দেবে। সব খরচ আমাদের।'
'আচ্ছা। আর সেকেন্ড অপশন?'
'সেকেন্ড অপশন, আপনারা এই হোটেলে আমাদের জিম্মায় থাকবেন। স্যর, লাস্ট থ্রি উইক আমরা এখানে। পুরো হোটেল আমরা রিসার্ভ করে রেখেছি। ফিফটি আর্মড গার্ড রয়েছে। জ্যামার লাগানো আছে। আপনাদের মোবাইল চেক করে নিন। নো নেটওয়ার্ক। শুধু আমাদের সিলেকটেড কয়েকটা নাম্বার চালু রাখা আছে।'
আজম খান বলতে-বলতে আমি দেখেও নিয়েছি। দরদর করে ঘাম ঝরতে শুরু করেছে জ্যাকেটের ভিতরে!
'আর যদি দুটো অপশনের মাঝামাঝি কিছু চাই?' জগুমামা আশ্চর্যরকম নির্বিকার। বললেন, 'মানে এই ধরুন, হোটেলে আটকে না থেকে আপনাদের সঙ্গে বন্দী হয়েই অপারেশনে থাকলাম! অ্যাস স্পেকটেটরস। আমার কাছে একটামাত্র রিভলবার আছে। সেটাও জমা রাখতে রাজি আছি।'
আজম খান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে মামার দিকে।
'কেন চাইছেন স্যর? কী ইনটেনশন?'
'স্রেফ দেখা। আমরা ফিওডরদের বাড়ির কিউরিও রুম দেখিনি। ইন ফ্যাক্ট, ওদের বাড়িতেই তো কোনোদিন যাইনি। তাছাড়া যে গুপ্তধনের কথা বলছেন, সেটা কোথায়, নিজের চোখে দেখতে চাই।'
কয়েক মুহূর্ত। কিছু ভাবছে আজম খান। একপলক তাকাল বাসুর দিকে। স্পষ্ট দেখলাম, বাসু মাথা নাড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আজম বলে উঠল, 'না স্যর, সরি স্যর। মাঝামাঝি কিছু হবে না। সেকেন্ড অপশন নিলে আপনাদের হোটেলেই থাকতে হবে।'
'অগত্যা!' মামা বড় করে নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন, 'তাহলে ফার্স্ট অপশনই বেছে নিচ্ছি। এদেশে থেকে আর কী লাভ! ইন্ডিয়ায় ফিরে যাব।'
আমি অবাক হয়ে মামাকে দেখলাম। মামা যেতে রাজি হয়ে যাচ্ছেন!
মামা একটু থেমে বললেন, 'তবে—'
'তবে?'
'তবে আমার দুটো কিউরিওসিটি আর একটা রিকোয়েস্ট আছে। রিকোয়েস্টটা আগে করছি। খুব সিম্পল। ভাঞ্জা আর আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি। ওই বুড়ো লোকটা আর বাচ্চা মেয়েটাকে ছেড়ে দিন। ওরা আমাদের দোস্ত। খুব আশা করে এসেছিল এই দেশটা ঘুরে দেখবে বলে। ইস ইট পসিবল মিস্টার খান?'
'ডান।' আজম বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুল তুলল, 'এবারে জলদি বলে ফেলুন স্যর, কী কী জানতে চান। একটু পরেই আমরা ফাইনাল অপারেশন স্টার্ট করব।'
'নিকিতিনদের কান্ট্রি হাউস ছাড়া অন্য কোথাও কি গুপ্তধন থাকার চান্স আছে?'
'জরুর হ্যায় স্যর।' আজম খান উত্তেজিতভাবে বলল, 'ঠিক যেখানে ইউসুফ দাদাজির স্ট্যাচুটা আছে, তার ম্যাক্সিমাম হান্ড্রেড স্কোয়ার ফুট রেডিয়াসের মধ্যে। মাটির নীচে। আমরা কি ওখানে আঙুল চুষতে গেছিলাম স্যর!'
'এই যে স্যর, এখানে সব লেখা আছে।' মামার ফেরত দেওয়া কাগজের তাবড়া সে তুলে দেখাল, 'রুশি শয়তানটা ইচ্ছে করে এই হরফে, এই ভাষায় লিখে গেছিল। যাতে এদেশের কেউ সহজে গুপ্তধনের নাগাল না পায়। বুঝলেন! এখানে পুরো ডিরেকশন দেওয়া আছে। আরে স্যর, আপনাদের ফিওডর কি এমনি এমনি ইন্ডিয়া ছুটেছিল! ওকে পাকিস্তানি কাউন্সিলর হিন্ট দিল বলেই না আমাদের ওখানে গিয়ে হাজির হল। এর মধ্যে আরও কী লেখা আছে জানেন? লেখা আছে, মাটির নীচে সুপারন্যাচারাল পাওয়ারফুল সব ক্রিস্টাল আর জেমস রাখা আছে। ওরাই পিটারহফকে সেভ করেছে।'
'সেভ করেছে!' জগুমামা নিজের মনে বিড়বিড় করলেন, 'যদি তাই হতো, তাহলে সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে হিটলারের নাৎসি ফোর্স কী করে পিটারহফ দখল করল? দখল শুধু নয়, অনেক মূর্তি-টূর্তিও নাকি ধ্বংস করে দিয়েছিল! সে যাগ্যে, সবটাই তো আসলে—'
কথা শেষ না করে আজমকে বললেন, 'আপনি কি জানেন, ফিওডরদের বাড়ির পোষা কুকুরটা পাগল হয়ে গেছিল? কামড়ে প্রায় মেরেই ফেলেছিল ওর বাবাকে? জানেন, মরে যাওয়ার পরে ওর গলার ভেতর থেকে একটা পাথর বেরিয়েছিল, যেটা আসলে পাথর নয়?'
'জানি তো।' আজম খান ফের হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে ভ্রু নাচিয়ে বলল, 'জরুর জানি। জিন্দা পাত্থর! বেহতরীন চিজ। মেরা পাস বহোত হ্যায়। আপনার চাই স্যর? ওই পাত্থর দিয়েই তো আমাদের অ্যাকশন স্টার্ট হয়েছিল। মারলাম বেতমিজ কুত্তা আওর তার মালিকটাকে।'
জগুমামা পলকহীন চোখে চেয়ে আছেন।
'আরে স্যর, ওহ চিজ কোই পাত্থর নেহি থা।' রুমাল দিয়ে আজম মুখ ও হাসি মুছল। বলল, 'এক কিসিমকা পেড় হ্যায়।'
'হোয়াট? পেড়! ইউ মিন প্ল্যান্ট?'
'হাঁ জী, ক্যাকটাস ভ্যারাইটির ভেরি স্পেশাল গাছ।' আজম বলল, 'ইংলিশে ওকে বলে লিভিং স্টোন। দেখতেও এমারেল্ড স্টোন ইয়ানি পান্নার মতো। আমার হরেক কিসিম গাছের বহোত শখ। এক দোস্ত সাউথ আফ্রিকা গেছিল। ইসকা ফোটো ভেজা, তো দেখকে ম্যায় চঁক গয়া। দোস্ত মেরে লিয়ে দো তিন পেড় লায়া। ভেবেছিলাম, ইন্ডিয়ান ক্লাইমেটে বাঁচবে না। ফিরভি বচ গয়া। লেকিন যেটা হল, দু-চারদিন বাদে ছাদে এর টবের পাশে দেখলাম, কয়েকটা কাক কবুতর চড়াই মরে পড়ে আছে! আমার শক হল। আরেক দোস্ত বটানির প্রফেসর। সে টেস্ট করে বলল, এই সয়েলে পাত্থর- পেড়গুলো মারাত্মক পয়সনাস হয়ে গেছে। এদেশে আসার সময় কী মনে করে কয়েকটা নিয়ে এসেছিলাম। বাস, কাজে লেগে গেল।'
'কী করে কাজে লাগালেন?'
'বহোত সিধা। সেই রাতে বাসুজী ওমরকে নিয়ে নিকিতিনদের বাড়ি গেছিল। আসলি ফিওডর ঘরে ছিল না। যতক্ষণ না ওমর মুখ খুলবে, কেউ ওকে চিনতে পারবে না। পারেওনি। বুড়োটার খুব পাথরের ওপর লোভ। ওমরের হাতে দেখেই প্রায় কেড়ে নেয়।...তারপর ঠিক কী হয়েছে, আমরা জানি না। নেক্সট ডে এরা মস্কো ব্যাক করে আসে। নিশ্চয়ই কুত্তাটা খানা ভেবে মুখে দিয়েছিল।...ছোড়িয়ে স্যর।' আজম খান ঘড়ি দেখে উঠে দাঁড়াল, 'টাইম হো গয়া। আভভি আপ দোনোকো নিকালনা পড়েগা।'
এখন রাত ১২টা ১৫। সেন্ট পিটার্সবার্গের পুলকোভা এয়ারপোর্ট। ফ্লাইট থেকে নেমে ছুটতে-ছুটতে লাউঞ্জে এসে ঢুকেছি। বাইরে বীভৎস ঠান্ডা।
এরোফ্লোটের এই লাস্ট ফ্লাইট ফাঁকা-ফাঁকা ছিল। যারা এসেছে, তারা এই শহরের মানুষ। দু-চারজন মানুষ অবশ্য গেস্টদের জন্যে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। খুব দ্রুত এয়ারপোর্ট খালি হয়ে যাচ্ছে।
বাইরের বিস্তীর্ণ পার্কিং জোন প্রায় জনশূন্য। যে ক'খানা গাড়ি দাঁড়িয়েছিল, তারা পরপর প্যাসেঞ্জার তুলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
'কী রে টুকলু! দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? চল।'
'কোথায় যাব মামা? কীভাবে যাব?'
'সে ঠিক ব্যবস্থা হয়ে যাবে। টাকা বেশি লাগবে, দেব। পৌঁছতেই হবে রে টুকলু। ফ্লাইট যখন এসেছে, ট্যাক্সিও থাকবে।'
ঠিক বেরোনোর মুখেই 'গেট ট্যাক্সি'র কাউন্টার। মহিলা আলো নেভাচ্ছিলেন। তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি আমার মোবাইলে গেট ক্যাবের 'অ্যাপ' ডাউনলোড করে দিলেন। লোকেশন পুট করার সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারের মুখ ও ফোন নাম্বার ফুটে উঠল।
ঠিক দশ মিনিটের মধ্যে আমরা হলুদ ক্যাবে চড়ে বসেছি। ডেস্টিনেশন—নিকিতিনদের ডাচা।
এতখানি ঝুঁকি নিয়ে এভাবে যাওয়া বোধহয় জগুমামার পক্ষেই সম্ভব। বিশেষত আজ বিকেল চারটের পর থেকে যা-যা ঘটে গেল, এখন নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না!...
ওল্ড পিটারহফ হোটেল থেকে আমাদের নিয়ে বেরোল দুজন ভাবলেশহীন আর্মড গার্ড। মামার রিভলভার থেকে গুলি বের করে যন্ত্রটা ফেরত দিল। তারপর সোজা এই পুলকোভা এয়ারপোর্ট। আমাদের পাসপোর্ট তখনও ওদের কাছে।
সন্ধে ৬.৩০ মিনিটে আমরা মস্কোর শেরেমেটিয়েভো এয়ারপোর্টের ট্রান্সফার ডেস্কে। ওই দুজন তখনও সেঁটে আছে। আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে রাত সাড়ে ন'টার মস্কো-দিল্লির টিকিট। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে টিকিট ও পাসপোর্ট চেক করে আমাদের সিকিউরিটিতে ঢুকিয়ে দিল।
এনক্লোজারে ঢুকতে-ঢুকতে দেখলাম, ওই দুটো লোক তখনও ওপ্রান্তে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে।
চেক-ইন করে ফ্লাইটের গেটের দিকে হাঁটছি। জগুমামা বললেন, 'দাঁড়া। অত হুটপাট করিস না। দেখি, তোর পাসপোর্টটা দে।'
ভালো করে দেখে বললেন, 'যাক, কনফার্ম হওয়া গেল। এরা ডিপার্টিং প্যাসেঞ্জারদের পাসপোর্টে কোনও স্ট্যাম্প মারে না।'
তখনও আমার মাথায় কিছুই ঢোকেনি। মামা বললেন, 'কেন বললাম, বুঝলি? আমরা ইন্ডিয়া ফিরছি না।'
'ফিরছি না! মানে?'
'মানে আমাদের এখন পিটার্সবার্গে ফেরত যেতে হবে।'
'ফেরত যাব! কীভাবে?'
'ভেরি সিম্পল! টিকিটটা পকেটে রাখ। লিফটে নীচে নেমে অ্যারাইভাল লাউঞ্জ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাব।'
'বলছ কী মামা? এটা বিদেশ! যদি ধরা পড়ি—'
'ধরা পড়ার কী আছে? আমাদের সঙ্গে ভ্যালিড ভিসা আছে। যদি ধরেও ফেলে—বলব, হঠাৎ অ্যাক্সিডেন্টের খবর এসেছে, তাই যেতে হচ্ছে। চল, চল। স্মার্টলি বেরোবি।'
'কিন্তু মামা, টাকাপয়সা? আমাদের টাকাকড়ি যে মস্কো হোটেলের লাগেজে।'
'গুলি মার! এখন বাইরে বেরিয়ে এটিএমে কার্ড ঢুকিয়ে রুবল তুলে নেব। কার্ড দিয়েই পিটার্সবার্গের টিকিট কাটব। আমার সব ভাবা হয়ে গেছে।'
অ্যারাইভাল গেট দিয়ে অন্য প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে স্রোতে মিশে বেরোচ্ছি। গেটের দুদিকে সিকিওরিটি। বুকের মধ্যে 'ঢুব-ঢুব' শব্দ হচ্ছিল।
উঃ! কী টেনশন। যাক, বেরিয়ে এসেছি। জগুমামার দৃষ্টি চারদিকে ঘুরছে। নাহ, এখানে কেউ নেই। আজম খানের গার্ডরা ফিরে গেছে।
সন্ধে ৭টা ৪৫ মিনিট। ৯টার ফ্লাইট ফুল। লাস্ট ফ্লাইটের টিকিট কাটা, টাকা তোলা হয়ে গেছে। প্রবল খিদে পেয়েছিল। বাইরের ফুড জয়েন্টে কফি আর বার্গার খেয়ে শরীরে আরাম হল। দুজনে ধীরেসুস্থে ডোমেস্টিক ডিপারচার লাউঞ্জের দিকে হাঁটা দিলাম।...ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে কী হচ্ছে, কে জানে। টিকিটে আমাদের ফোন নম্বর নেই, ওরা ট্রেস করতে পারবে না।...
রাত ১২টা ৫০। জনশূন্য হাইওয়ে—ওয়েস্টার্ন হাইস্পিড ডায়ামিটার। হলুদ আলোর ওপারে নিকষ অন্ধকার। আমাদের ক্যাব ছুটছে ঝড়ের গতিতে।
জগুমামা চুপ করে কিছু ভাবছেন। হঠাৎ কী মনে হতে, মোবাইলটা নিয়ে স্ক্রোল করলেন। তারপর কল করে দিলেন। দীপালির নাম্বার। মামা স্পিকার অন করে দিলেন। ফোন বাজছে।
'হ্যালো, হ্যালো জগুদা! কোথায়? কোথায় তোমরা? আমাদের বাড়ি আসবে বললে, এলে না। বাসুকে পাঠালাম। সেও তোমাদের দেখতে না পেয়ে ফিরে এল।'
'না দীপালি, আসতে পারলাম না। তুমি কি এখন বাড়িতে?'
'হ্যাঁ জগুদা। সবাই এখানে। আসতে পারলে না কেন? কী হয়েছে?'
'ফিওডর, বাসুবাবু সবাই কি ওখানে আছে?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ, সবাই এখানে। তোমাদের অনেকবার ফোনে ট্রাই করেছি। ফোন যাচ্ছিল না। সেই যে বিকেলে অর্ণব একটা হোটেলের ছবি আমায় হোয়াট-অ্যাপ করল, তার পর থেকে তোমাদের দুজনেরই ফোন সুইচড অফ। খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল।'
'হওয়ারই কথা। শোন দীপালি, আমরা মস্কো এয়ারপোর্টে। চেক ইন করেছি। ইন্ডিয়া ফিরে যাচ্ছি।'
'ইন্ডিয়া ফিরে যাচ্ছ! সে কী! কেন জগুদা? কী হয়েছে?'
'সে অনেক কারণ দীপালি। একটা কথা আমায় বলো, সব প্রটেকশন নিয়েছ তো? আজ ওরা আসবে বলেছিল না?'
'বলেছিল তো। হয়ত এসেওছিল। সিকিওরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট দেখে ফিরে চলে গেছে। তোমার কথামতো ফেডারেল পুলিশকে লিখিত রিপোর্ট মেল করেছিলাম। সঙ্গে-সঙ্গে সিটি পুলিশ ডিভিশন থেকে ফোর্স পাঠিয়েছে। ওদের হেড একজন সার্জেন্ট। গুড অফিসার। কিন্তু তুমি—তোমরা এই অবস্থায় আমাদের ফেলে—'
'দীপালি।' মামা গলার স্বর খাদে নামিয়ে আনলেন। ফিসফিস করে বললেন, 'তুমি একটা কাজ করবে প্লিস? ফোনটা নিয়ে একটু দূরে চলে যাবে? যেখানে আর কেউ নেই! প্লিস—।'
'সিওর, সিওর।...হ্যাঁ, এইবার বলো জগুদা। আই কান্ট বিলিভ যে—'
'ফিওডর কোথায়?'
'সে তার ঘরে। সন্ধের দিকে বাসু আর সে একসঙ্গেই এল। কিন্তু ওর চোখমুখের অবস্থা দেখে বুঝলাম, শরীর ঠিক নেই। খুব টায়ার্ড লাগল। একটাও কথা বলেনি। আমাকে বাই করে ঘরে ঢুকে গেল। এতক্ষণে বোধহয় ঘুমিয়েও পড়েছে। ওদের দরকার জগুদা? ডেকে দেব?'
'না—না। ঠিক আছে। আর বাসু? সে ও কি ঘুমিয়ে পড়েছে?'
'না জগুদা। সে আমার সঙ্গে ড্রইংরুমেই ছিল। টিভি দেখছিল।'
'বেশ। ডোন্ট রিয়্যাক্ট, যা বলছি, চুপচাপ শুনে যাও। ফিরে গিয়ে ড্রইংরুমের আলো নিভিয়ে দাও। বাসুকে বলো, ঘুমোতে যেতে। একটু পরে চুপিচুপি গিয়ে প্রথমে ফিওডরের ঘরে, তারও আরেকটু পরে গিয়ে বাসুর ঘরের বাইরে থেকে হ্যাচ টেনে দাও।'
'উঁ-ক! উঁ...ক-কী...?'
'কোনো কথা নয় দীপালি। যা বলছি, তাই করো। ইটস আ গ্রেট কন্সপিরেসি। উইদিন ফর্টিফাইভ মিনিটস আমরা তোমাদের ওখানে পৌঁছে যাচ্ছি। আর তোমার ওখানে পোস্টেড সার্জেন্টের নাম আর নাম্বার এখুনি টেক্সট করো। ওকে বলে রাখো, আমি তোমার দাদা। ফোন করলে যেন রেসপন্ড করে।'
'ও-ওকে, ওকে।' দীপালির কণ্ঠস্বর খুব উদ্বিগ্ন শোনাল। বেচারি কিছুই জানে না।
'মামা। ফিওডরকে একবার ফোন করবে?'
'ইয়েস!' জগুমামা বলে উঠলেন, 'খুব ভালো মনে করিয়েছিস। বিকেলে আমায় ফোন করে বলেছিল, গাড়িতে আমাদের পিছনে কিছুদূরেই ছিল। বলল, সেও নাকি ডাকতেই ফিরছে। কিন্তু—তারপরে আর—।'
আগের কলটাই ফিওডরের। মামা টিপে দিলেন। ফোনটা বাজছে। বেজেই যাচ্ছে। বেজে বেজে কেটে গেল।...কী হল তার?
টুং। দীপালির মেসেজ ঢুকল। মিখাইল গ্রেগোরিয়েভ, আর ফোন নম্বর। সঙ্গে সঙ্গে জগুমামা ফোন করলেন। এবারেও স্পিকার অন।
'হ্যালো মিখাইল। দিস ইস মুখার্জি ফর্ম ইন্ডিয়া। দীপালির কাসিন। বুঝতে পারলে?
'ইয়েস স্যর। উনি এইমাত্র বললেন।'
'তোমার সিকিওরিটি অ্যারেঞ্জমেন্ট কাইন্ডলি বলবে? অন্য কিছু নয়, ওদের বাংলোর ঘরগুলোর সামনে গার্ড পোস্টিং আছে কি?'
'না স্যর। আমরা মেইন গেট আর বাউন্ডারি ওয়ালের সামনে গ্যাপ দিয়ে পোস্টিং করিয়েছি। কারণ, বাইরে থেকে এসে মিসক্রিয়েন্টরা হামলা করতে পারে, ওরা তেমনই অ্যাপ্রিহেন্ড করছিল।'
'রাইট। বাট সিচুয়েশন হ্যাস বিন চেঞ্জড। দীপালিকে বলো, ওদের কিউরিও রুমটা তোমায় দেখাতে। সেখানে দুজনকে পোস্টিং করা দরকার।...আর একটা কথা। লাস্ট টু আওয়ার্সের মধ্যে কেউ ডাচায় ঢুকেছে বা বেরিয়েছে?'
'না স্যর।'
'ওকে, ওকে। আমরা কাছে এসে কল করছি।' ফোনটা চলতে- চলতেই দেখলাম, ফিওডর নিকিতিনের কল। মামা ধরে নিলেন।
'হ্যালো, ফিওডর...! কোথায় তুমি? তখন যে বললে, ডাচায় যাচ্ছ, যাওনি?'
'না স্যর। আপনাদের হোটেলে ঢুকতে দেখে তালগোল পাকিয়ে গেল।...ভাবলাম, অন্য কাজ শেষ করে ফিরব।...এখন তো দেখছি স্যর...সাংঘাতিক অবস্থা।...আমি...স্যর এখন...আমার ফ্রেন্ড ভেটের ডাচাবাংলোয়...ওরা আমাদের ডাচার বাইরে ঘিরে আছে...আপনি কোথায় স্যর?'
'মেন রোড দিয়ে দশ মিনিটে ঢুকছি...ইয়েলো ক্যাব...ওটা কি তোমাদের আগে পড়বে? তোমায় কি পিক আপ করে নেব?'
'সিওর...কিন্তু ঢুকবেন কী করে স্যর? ওরা কর্ডন করে আছে...।'
'উইল টেক কেয়ার। তুমি রেডি থাকো। দরজা দিয়ে লক্ষ্য রাখো। স্লো করলেই উঠে পড়বে।'
ড্যাশবোর্ডে বড় ট্যাবে জিপিএস দেখাচ্ছে আর মাত্র ১২ মিনিট। নেক্সট ৩ মিনিট পরেই বাঁ-দিকে টার্ন।
মামার মোবাইল বেজে উঠল।
'হ্যাঁ দীপালি।'
'জগুদা! ফিওডর বেডরুমে নেই। মিসিং!'
'মিসিং!'
'ইয়েস জগুদা। হ্যাচ টানতে গিয়ে উঁকি মেরেছিলাম। বিছানা ফাঁকা। সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বালিয়ে ঘর, অ্যান্টি রুম, ওয়াশরুম—সব তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। সে কোত্থাও নেই। এখন কী করব জগুদা? এতবড় ডাচা-বাগান-এত ঘর...কোথায় খুঁজব? একবার ফোন করব?'
'উহুঁ।' জগুমামা একসেকেন্ড ভাবলেন। বললেন, 'আর তোমার বাসু সখা? সে কোথায়?'
'বাসু? সে কিন্তু ঘরে আছে বলেই মনে হল।'
'মনে হওয়ার কোনো ব্যাপার নেই দীপালি। সঙ্গে আর্মড সিকিওরিটি নিয়ে তার ঘরেও ঢোকো। ভালো কথা—তোমাদের কিউরিও রুম? সেখানে কী অবস্থা? বাইরে সিকিওরিটি পোস্টিং হয়েছে?'
'এখনই দেখছি জগুদা। দেখে জানাচ্ছি। আমার সঙ্গে বাড়ির অন্যরাও আছে।'
'গুড। ওই দুজনকে খুঁজে বের করতেই হবে। দ্যাটস ইট।'
ইয়েলো গেট ক্যাব ঢুকে পড়েছে 'ডাচা' জোনে। দুদিকে ছড়িয়ে আছে সব কান্ট্রি হাউস, গাছপালা, ঝোপঝাড়, বাগান। ক্ষীণ চাঁদের আলোয় অপার্থিব, নিস্তব্ধ।
আবার ফোন, 'জগুদা, য়ু আর রাইট। বাসুও ঘরে নেই। আর...আর কিউরিও রুমের লক ভাঙা। ভিতর থেকে বন্ধ। কী করব জগুদা?'
'ভেঙে ঢুকতে হবে। নো অপশন। খুব সাবধান! আমর্ড ফোর্স আগে থাকবে।'
জি পি এস দেখাচ্ছে লোকেশন আর এক মিনিট। ডানদিকে মোড়। বাইরে গাছতলায় একটা ছায়ামূর্তি? ওটা কে? কাঁধে কারবাইন মনে হচ্ছে! পথের দুপাশে তিন-চারটে বড় গাড়ি অন্ধকার মেখে দাঁড়িয়ে আছে। মামা গাড়ি স্লো করিয়েছেন।
ঠিক তখনই পাশের কান্ট্রি হাউসের ভিতর থেকে ছুটে আসছে দুজন মানুষ! আমাদের গাড়ির দিকে।
ভয়ানক কাণ্ড ঘটে গেল! খটা খট খটা খট...। নিথর রাত্রির নৈঃশব্দ খানখান হয়ে গেছে।
গুলিবৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। গাছতলার প্রহরীটা ওদের লোক! কারবাইন চালিয়ে দিয়েছে।
কাটা কলাগাছের মতন পড়ে গেল অগ্রসরমান একজন! অন্যজন বাড়ির দিকে দৌড় দিয়েছে।
গার্ডটা আমাদের গাড়িকেও দেখে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে কারবাইন চালিয়ে দিল।
'ফাস্ট! ফাস্ট!' মামা চিৎকার করে উঠেছেন। মাথা নীচু করে ফেলেছি। ঝনঝন করে ভাঙছে গাড়ির কাচ, কেঁপে উঠছে গাড়ি।
কয়েক সেকেন্ডে পাশের ডাচার গেট দিয়ে ঢুকে গেছে গাড়ি। আর্মড ফোর্স বেরিয়ে এসেছে। নিমেষে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলো স্টার্ট দিয়ে দিল। ওই প্রহরীটা তার একটায় লাফ মেরে উঠে পড়েছে।
পুলিশও ইনস্ট্যান্ট গুলিবর্ষণ শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু তার আগেই গাড়িগুলো ফায়ারিং রেঞ্জের বাইরে।
'মামা! ফিওডর? মরে গেল!'
'জানি না।' মামার গলাও কেঁপে গেল, 'দে আর ডেঞ্জারাস! আমরা একচুলের জন্যে বেঁচে গেছি।'
গাড়ি থেকে নেমে পড়েছি। ক্যাব ড্রাইভার ছেলেটা পুরো পাথর। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। জগুমামা তাকে অভয় দিতে চেষ্টা করলেন, 'নাও উই আর সেফ। ডোন্ট ওরি। তুমি গাড়ি নিয়ে এখানেই থেকে যাও।'
লম্বা, টানা পরপর বাংলো প্যাটার্নের ঘর—ডাচা। অন্ধকার। শুধু মাঝের একটা ঘর থেকে ক্ষীণ আলো চুঁইয়ে-চুঁইয়ে বেরোচ্ছে। মানুষজনের সাড়াশব্দ শোনা যাচ্ছে না। দীপালিরা কোথায় গেল? আমি শুধু ভাবছি, কী করে মামা দীপালির মুখোমুখি হবেন! আমরা সেই দিকেই ছুটছি।
'স্তপ! স্তপ!' পিছন থেকে একজনের চিৎকার। আমরা দু'হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
জগুমামাও চেঁচিয়ে বললেন, 'গ্রেগরিয়েভ! গ্রেগরিয়েভ! হি নোস... উই...ওনার্স রিলেটিভ...।'
'পদসজি..।' রাশিয়ান ভাষা। নির্ঘাত থামতে বলছে। কিন্তু এরা কি আমাদের পক্ষ, না কি...? ভাবতেই শরীর ঠান্ডা।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। দুজন আর্মড রাশিয়ান পুলিশ বেরিয়ে এসেছে। আমাদের ইশারা করে কালাশনিকভ উঁচিয়ে এগিয়ে চলল। আমরা ওদের অনুসরণ করলাম।
'দীপালি? দীপালি? গ্রেগরিয়েভ?'
ওরা আঙুলের ইশারা করল সামনের দিকে। একবার দীপালি ম্যাডামকে ফোন করি? পকেট থেকে মোবাইল বের করতেই মামা মাথা নেড়ে বললেন, 'পাবি না। তোর নেটওয়ার্ক পাবি না। এরাও জ্যামার বসিয়ে রেখেছে।'
এতক্ষণে দেখতে পেলাম, ডাচার একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরের সামনে বেশ কিছু মানুষ কর্ডনিং করে দাঁড়িয়ে আছে। যাক, নিশ্চিন্ত। তার মানে লোকদুটো পালাতে পারেনি। ঘরের ভিতরেই আটকে আছে।
'মামা, ওরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে কেন? কী দেখছে? ফায়ারিং স্টার্ট করে দিক।'
'তুই কি পাগল হয়ে গেছিস টুকলু?' মামা বিরক্তির সুরে বললেন, 'গুলি শুরু করবে! ওই ঘরে কীসব রেয়ার অ্যান্টিক কিউরিও আছে, শুনিসনি! সব তো ধ্বংস হয়ে যাবে। যা কিছু করতে হবে, খুব সাবধানে, ভেবেচিন্তে। যেকোনও একটা টোপ দিয়ে ওই বদমাশ বাসুটাকে যদি একবার বাইরে বের করা যায়...।'
আরও কয়েক গজ এগোতে মূর্তিদের মধ্যে দুজন মহিলাকে আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে। জগুমামা ডেকে উঠলেন, 'দীপালি! দীপালি! আমরা এসে গেছি।'
'জগুদা!' দীপালি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। অসহায় গলায় বললেন, 'কী করব জগুদা? ফিওডর আর বাসু দুজনেই যে ভেতরে। সাড়া দিচ্ছে না, বেরোচ্ছেও না। আমি যেতে চাইছি, গ্রেগরি অ্যালাও করছে না। তুমি ওকে একবার বলবে জগুদা?'
দীপালি এখনও আসল সত্যিটা জানেন না। জগুমামা ফোনে শুধু ষড়যন্ত্র বলেছেন, আর কিছু বলেননি। হাসব্যান্ডের জন্যে তার এই উদ্বেগ খুব স্বাভাবিক।
'ও জগুদা। চুপ করে আছ কেন?' দীপালি ফের চেঁচিয়ে উঠলেন, 'আমি কিন্তু আর কারও কথা শুনব না। আমি—আমি—'
এইসময় হঠাৎ ঘরের দরজা খুলে গেল। ভিতর থেকে একজন বেরিয়ে এল।
স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, দরজার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে সে হাতছানি দিয়ে ডাকছে দীপালিকে। কিন্তু এ তো...এ তো আসলে...
'ফিওডর! ফিওডর।' চিৎকার করে ছুটতে যাচ্ছিলেন দীপালি, পিছন থেকে ওকে জাপটে ধরেছে আরেক মহিলা! ভ্লাদিমিরের বউ নাদিয়া। মামাও চেঁচিয়ে উঠেছেন, 'না দীপালি—না-আ! ও ফিওডর নয়।'
মুহূর্তে তীরবেগে লোকটার দিকে দৌড়ে গেল দুজন আর্মড পুলিশ। কিন্তু তার আগেই লোকটা ঢুকে গেল ঘরের মধ্যে। সশব্দে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
দীপালি পাগলের মতো ছটফট করছেন, 'ছাড়ো! ছাড়ো বলছি। আমাকে ফিওডরের কাছে যেতে দাও।'
কয়েকটা মুহূর্ত। তারপরেই—ও মাই গড! বুম—বুম ফটাস-স! প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। ভেঙে খানখান হয়ে গেল রাতের নৈঃশব্দ্য।
গোটা ঘরটা দাউ দাউ করে জ্বলছে। বিকট শব্দে ফেটে ফেটে যাচ্ছে ভিতরের যাবতীয় জিনিস, আগুনের শিখা লকলক করে উঠে রাতের আকাশ লাল করে তুলেছে।
'ফিওডর!' আর্ত চিৎকার করে লুটিয়ে পড়েছেন দীপালি।
হাহাকার করে বসে পড়েছেন জগুমামাও।
'স্কাউন্ড্রেল! হিংস্র পিশাচ! সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিয়ে গেল। নিজেদেরও শেষ করল। ইতিহাসের সব অমূল্য সম্পদ...কোনও চিহ্ন রইল না। আমরা আটকাতে পারলাম না। উঃ...উঃ...!'
জগুমামা দু'হাতে নিজের চুল খামচাচ্ছেন আর মাথা ঝাঁকাচ্ছেন।
এবারেও হেরে গেছি আমরা।
'আঙ্কল। ওই ঘরের মধ্যে ওইরকম বীভৎস ব্লাস্ট হল কী করে? বাইরে থেকে পুলিশ ফোর্স কি কোনও—'
'না না, মোটেই না।' সোমলতাকে থামিয়ে দিয়ে জগুমামা বললেন, 'আমাদের চোখের সামনেই তো পুরো ঘটনাটা ঘটেছে। পুলিশ একটাও অ্যাকশন নেয়নি। ইন ফ্যাক্ট তার সুযোগই ছিল না। ওরা এক্সপ্লোসিভ সঙ্গে নিয়েই এসেছিল। ঠিক করেই এসেছিল, নিজেরা যদি ধনসম্পত্তির দখল না পায়, তাহলে সব শেষ করে দিয়ে যাবে। তাতে যদি নিজেদের মরতে হয়, হবে। সুইসাইডাল স্কোয়াডের একরকম ক্যাটেগরি।'
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'ওদের প্ল্যান নাইনটি পার্সেন্ট ফুলপ্রূফ ছিল। ধরো, আমরা যদি মস্কো থেকে না ব্যাক করতে পারতাম, এবং সেটাই নরম্যাল ছিল, কী হতো বুঝতে পারছ? পুলিশ ফোর্স চলে যাওয়ার পরে ওরা নিশ্চিন্তে সব লুটপাট করত। তারপর গোটা নিকিতিন ফ্যামিলিকে খুন করে ইন্ডিয়ায় ফিরে যেত। কেউ ওদের টিকি ছুঁতে পারত না। কী দারুণ প্ল্যান, ভেবে দ্যাখো! নকল ফিওডরকে নিয়ে ওদের ডাচায় ঢুকে পড়েছে ওই শয়তানটা, বাসু সখা। দীপালি চিনতে পারেনি, পারা অসম্ভব। রাশিয়ান পুলিশকে বলা আছে, নতুন কাউকে রাতে ঢুকতে দেবে না। আসল ফিওডর নিজের বাড়ি ঢুকবেই বা কী করে! ডাচার বাইরে চারিদিকে কর্ডন করে রেখেছে আজম খানের ভাড়া করা খুনের দল। আমরা যে ফিরতে পারব, ওরা এটা একটুও গেস করতে পারেনি। আর ফিওডর যে এখনও বেঁচে আছে, সে ওর আয়ুর জোরে। নইলে ওর চেলা কামেনেভের তো আমাদের গাড়ির আলো দেখে হড়বড় করে এগিয়ে যাওয়ার কথা নয়।'
একটু থেমে কফির কাপে চুমুক দিলেন জগুমামা। আবার একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লেন। বললেন, 'এতকিছুর পরেও ওরা কিন্তু লাস্ট ব্যাক আপ রেডি রেখেছিল। যদি সব প্ল্যান ফেল করে যায়, তাহলে নিজেকে মেরে হলেও ভিক্টর নিকিতিনের সব অ্যান্টিক প্রপার্টি ডেস্ট্রয় করে দেবে। এতটাই হিংস্র আক্রোশ! শেষ অব্দি তাই হল।'
'আঙ্কল। ঘরের ভিতর একটাই পোড়া লাশ পাওয়া গেছে। সে নকল ফিওডর মানে ওমর নুরুদ্দিন। কিন্তু আরেকজন, মানে ওই বাঙালি লোকটা পালাল কীভাবে? সে কি ছদ্মবেশ নিয়েছিল? তোমরা চিনতে পারনি?'
'হতেই পারে মামণি, অস্বাভাবিক নয়। কারণ তখন যা সিচুয়েশন ছিল! তবে চিন্তা কোরো না, এদের সিকিওরিটি খুব স্ট্রং। আজম খান, বাসু সখা এদের কেউ পালাতে পারবে না!'
'কিন্তু মামা, যদি ধরো—' পাশের সোফায় ভেবলে বসে থাকা বুড়োর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলাম, 'ওই বাঙালিটা যদি অনন্ত বাবুর ছদ্মবেশ নেয়! এই যে ইনি, ইনি যদি আসলে অনন্তবাবু না হয়ে...প্রস্থেটিক মেকআপে...'
'অ্যাই, অ্যাই!' তড়াক করে অনন্ত সরখেল লাফিয়ে উঠলেন, 'টুকলু, তুমি কিন্তু...বাড়াবাড়ি হচ্ছে...স্যার, স্যার!'
'আরে, আপনি অত ঘাবড়ে যাচ্ছেন কেন?' জগুমামাও হেসে উঠলেন। মজা করে বললেন, 'তেমন সন্দেহ করলে বড়জোর আপনার দাড়িগোঁফের জঙ্গল কেটে দেবে, আর তো কিছু হবে না!...আচ্ছা মামণি, তুমি আজ যে ইউনিভার্সিটি গেছিলে, কাজ হয়েছে? দেখা হয়েছে প্রফেসর অ্যালিনার সঙ্গে?'
'হ্যাঁ আঙ্কল।' সোমলতা বলল, 'ম্যাডামকে তোমার স্যাম্পলটা দেখালাম। উনি সব চেক করে বললেন, হ্যাঁ , ওটা একধরনের প্ল্যান্ট, ক্যাকটাস। অবিকল স্টোনের মতো দেখতে। সায়েন্টিফিক নেম লিথপস। লিথপস স্যালিকোলা। ফ্যামিলি আইজোয়েসি। পার্টিকুলারলি এটা ভয়ানক বিষাক্ত। আজম খান ঠিকই বলেছিল। এইরকম কত-কত অদ্ভুত স্পেসিস যে ছড়িয়ে আছে আঙ্কল, আমরা জানিই না।'
'স্যার, ইয়ে...মানে একটা কথা বলব?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন না! অত সংকোচ করছেন কেন?'
অনন্ত সরখেল দাড়িগোঁফ চুলকে বললেন, 'বলছিলুম যে গুপ্তধনের ব্যাপারটা কিন্তু স্টিল লাইভিং। মানে স্যার, ওই যে স্ট্যাচুটার নীচে...কাগজে যে ডিরেকশন দেওয়া ছিল...যে কাগজগুলো আপনি জঙ্গল থেকে পেলেন, শয়তানটা কেড়ে নিল...বুঝছেন তো?'
'আপনি ওই আশায় আছেন এখনও!' জগুমামা বহুক্ষণ পরে হেসে উঠলেন।
'কেন মামা? হাসছ কেন? অনন্তবাবু এটা তো ভুল বলেননি। আজম খান...'
'তিষ্ঠ বৎস, তিষ্ঠ।' জগুমামা আমাকে থামিয়ে দিলেন,' আসল ব্যাপারটা হল, বেশিরভাগ রাজফ্যামিলির লোকজন অলস আর লোভী হয়। সেদিন কী বলেছিলাম, মনে করে দ্যাখ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেশ কিছুদিন পিটারহফ হিটলারের নাৎসি ফোর্সের দখলে ছিল। ওরা অনেক মূর্তি-ফোয়ারা-বাগান-প্রাসাদ লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। পরে সোভিয়েত গভমেন্ট দশ বছর ধরে পিটারহফকে ঢেলে সাজায়, পুরোনো মূর্তির আদলে নতুন সব মূর্তি বসায়। আমি সেদিনই ভালো করে দেখেছিলাম। এখনকার ওই স্ট্যাচুটার বয়েস বড়জোর ষাট-সত্তর বছর!'
'হায় হায়। শেষ আশাও নিভে গেল স্যার।' অনন্ত সরখেল দু'হাতে কপাল চাপড়ে বলে উঠলেন, 'অভাগা যেদিকে তাকায়...সমুদ্র শুকিয়ে যায়।'
সামনের টেবিলে রাখা জগুমামার ফোন বাজছে। মামা স্পিকার অন করলেন, 'বলো দীপালি। সামলে নিয়েছ তো সব? ফিওডর, মেয়ে, ভ্লাদিমির-নাদিয়া ঠিকঠাক?'
'হ্যাঁ জগুদা, সবাই ভালো। আপনি না থাকলে...দাদা, আপনারা এখন কসমস হোটেলে তো? দাদা, যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। আমরা সকলে খুশি, ওইসব আপদ গেছে। যেজন্যে ফোন করছি, ভ্লাদিমির আপনাকে বলতে বলেছে, কাল থেকে ও আপনাদের সঙ্গে হোটেলে থাকবে। মস্কোর ক্রেমলিন থেকে রাশিয়ান সার্কাস, বলশয় থিয়েটার, লেনিনের মুসোলিয়াম সব ঘুরিয়ে দেখাবে। অল এক্সপেন্স আমাদের।...জগুদা, প্লিস আপনি এতে না করবেন না। প্লিস।'...
'আচ্ছা।' মামা নিমরাজি হয়ে ফোনটা কেটে দিলেন।
অমনি সোমলতা সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল, 'ওয়াও! আঙ্কল লা জবাব।'
অনন্ত সরখেল দু'হাত তুলে গেয়ে উঠলেন, 'আহা কী আনন্দ রাশিয়ার আকাশে...! জয় জয়তু জগবন্ধু!'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন