জঙ্গলে ভয় ছিল

ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়

'এ কী গো কাকু! ক'দিনের মধ্যে এই চেহারা।' সোমলতা অবাকগলায় বলল।

'এ তো সবে শুরু মামণি।' অবনী রায় হেসে বললেন, 'আগস্ট মাস আসতে দাও। একে আর চিনতেই পারবে না। ভূটান পাহাড়ে অঝোরে বৃষ্টি হবে। আর সেই জল নামবে হুড়-হুড় করে। ফুলে ফেঁপে উপচে আসবে বাগানে।'

আমরা বাঁধের চওড়া রাস্তায়। সামনেই আদিগন্ত তোর্ষা। তার প্রকাণ্ড বুক জুড়ে ঘোলা জল, পাক খেতে-খেতে ছুটে চলেছে। একটানা জলের শব্দ।

আকাশে লেপটে আছে মেঘ। মেঘের ফাঁক দিয়ে ছিটকে বেরোচ্ছে রামধনু রঙের কয়েকটা আলোর তির। গোধূলির মায়াবি নিসর্গ।

ওপারে জলদাপাড়া ন্যাশনাল ফরেস্টের সরু কালো রেখা। তার মাথায় জমাট বাঁধছে ধুমসো কালো মেঘ। হামাগুড়ি দিয়ে মেঘটা উঠে আসছে দিগন্ত বেয়ে, ছেয়ে ফেলছে আকাশ। জোলো বাতাস বইতে শুরু করল।

অবনী রায় বললেন, 'নাহ! আর থাকা যাবে না। বৃষ্টি আসছে। চলো, গাড়িতে উঠি।...কিন্তু...ভদ্রলোক গেলেন কোথায়?'

কে? অনন্ত সরখেল? তাই তো! বাঁধে এসে গাড়ি দাঁড়ানো মাত্র হনহন করে সামনের দিকে এগিয়ে গেছিলেন। কতদূর গেলেন?

কিছুটা এগিয়েই রাস্তাটা বেঁকে গেছে বাঁ-দিকে। অনন্তবাবুকে দেখা যাচ্ছে না!

'অনন্তবাবু! ও অনন্তবাবু!' জোরে-জোরে ডাকছি, আর এগোচ্ছি। কোনো উত্তর নেই। আশ্চর্য লোক বটে।

বেশ খানিকটা হাঁটার পরে সোমলতা বলে উঠল, 'টুকলুদা! শুনতে পাচ্ছ?...ও অনন্তবাবু!'

আমারও কানে এসেছে। কিন্তু তিনি কোথায়?

আরেকটু এগোতেই মহাপ্রভু দৃশ্যমান হলেন। দুপাশে ঝোপঝাড়। তার ফাঁক দিয়ে ঢুকে তিনি নেমে গেছেন ঢাল বেয়ে। নদীর জলের খুব কাছে।

কিন্তু কিছুই তাঁর কানে ঢুকছে না। তাঁর চোখ বন্ধ! দু-হাত দু-দিকে ছড়ানো। শরীর দুলছে। গলা ছেড়ে গাইছেন:

'বাদলা হাওয়ার মাতাল দিনে...পাগল আমার মন নেচে ওঠে...। জানা চেনার কোন বাইরে...সেখানে হাত নাই...নাইরে...বাদলা হাওয়ার...।'

উফ-ফ! রবীন্দ্রনাথ এখানে থাকলে তোর্ষায় ঝাঁপ দিতেন।

'অনন্তবাবু। অনন্তবাবু!...প্লিস, থামুন।' দুজনেই গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি।

'আঃ!..উঃ!...তোমরা আমায় একটু শান্তিতে গাইতেও দেবে নাকো!' হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন অনন্ত সরখেল, 'কী ক্ষতি করিচি তোমাদের? ডিস্টাব করিচি, অ্যাঁ?'

'না-না, তা নয়!' সোমলতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে উঠল, 'আসলে গানের লিরিক...মানে রবীন্দ্রনাথের কথা—'

'বেশ করিচি। একশোবার করব।' দ্বিগুণজোরে চেঁচিয়ে উঠলেন অনন্তবাবু, 'উনি কি শুনতে এসেছেন নাকি! মরে ভূত হয়ে গেছেন কোনজম্মে...কপিরাইট অব্দি চলে গেছে। যে যেমন খুশি নেচেকুঁদে গাইছে, আর আমি নিজের মতো কবে একটু গাইলেই যত দোষ, অ্যাঁ।'

'দোষ কিছুই না! তবে রবি ঠাকুরের ভূত এসে যখন রাতবিরেতে আপনার ঘাড়ে চাপবে, তখন বুঝবেন!'

'অ্যায় টুকলু, খবরদার! তুমি—'

'মিস্টার সরখেল!' অবনীবাবুও আমাদের পিছন-পিছন এসে গেছেন। হাসতে-হাসতে বললেন, 'ওদের কথায় কান দেবেন না। না মশাই, ভালোই গাচ্ছিলেন। আসলে বৃষ্টি আসছে কিনা, তাই—।'

'বৃষ্টি! ওমা, তাই নাকি? বৃষ্টি আসছে! আহারে আহারে, কী আনন্দ!' অনন্ত সরখেল তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলেন। বুড়োর মাথা পুরো গেছে।

'কদ্দিন...আহা কদ্দিন ভিজিনি বিষ্টিতে! ভিজবই, আমি ভিজবই।' হাততালি দিয়ে গাইতে শুরু করে দিলেন, '...মেঘমোর মনের সঙ্গী...ছুটে চলে দিক দিগন্তে...।'

'ওয়ান সেক!' হঠাৎ অবনী রায়ের গলা পালটে গেল। ঠান্ডাগলায় বললেন, 'এখানে আপনি থাকুন, জলে ভিজুন, নো প্রবলেম মশাই। শুধু একটা ইনফর্মেশন জেনে রাখুন—এই বাঁধের রাস্তায় চলাফেরা করে কিছু ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল। যেমন—লেপার্ড, রাইনো, বুনো হাতি। আর ওয়াইল্ড ডগ গ্যাং-এর এটাই মেন করিডর। চলি, কেমন?'

'ল-লেপার্ড! রাইনো...মানে গ-গণ্ডার?' অনন্তবাবুর চক্ষুদুটি মুহূর্তে রাজভোগ, 'অ-আমায় শুধুমুধু ভয় দেখাচ্ছেন মশাই! জলদাপাড়া জঙ্গল ওপারে।'

'আর এপারে বুঝি চিলাপাতা, কোদালবস্তি নেই? জন্তুরা নদী পেরিয়ে এপারে আসে না?...যাগ্যে, আপনি থাকুন, আপনার রিস্ক।'

'অ্যাই, অ্যাই মশাই, যাচ্ছি, যাচ্ছি!...আউফ!...ওফ!' ঝোপঝাড় আঁকড়ে হাচড় পাচড় করে বাঁধের রাস্তায় উঠে এলেন অনন্ত সরখেল।

বৃষ্টির কয়েকটা ফোঁটা গায়ে এসে পড়ল। গাড়ির দিকে ছুট দিলাম।

ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। অন্ধকার ঘন হয়ে নামছে।

অবনী রায় ড্রাইভারের সিটে। পাশে আমি। পিছনে সোমলতা আর অনন্তবাবু। অবনীবাবু সুইচ দিয়ে সেলফ ঘোরালেন।

ঘোয়াঁ-য়াঁ-য়াঁ—সেলফ আর্তনাদ করছে। স্টার্ট হচ্ছে না।

'যা ব্বাবা! এ আবার কী হল?'

'কাকু, মনে হচ্ছে, সেলফ ফেঁসে গেছে।'

'হুম!' অবনীবাবু আমার কথায় মাথা নাড়লেন, 'কী যে মাঝে মাঝে হয়! জিপসিটাকে এবার পাল্টাতে হবে। অনেক বয়েস হল।'

গাড়ির আলো নিভিয়ে দিলেন। হাফপ্যান্টের পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করলেন, তারপর হতাশভাবে মাথা নাড়লেন।

'এই হচ্ছে আমাদের বাগানের প্রবলেম। দুদিকে দু-দুটো টাওয়ার বসালাম। তবুও যখন-তখন সিগন্যাল থাকে না।...বিলুটাকে যে ডেকে নেব, তারও উপায় নেই।'

'মেকানিক নাকি?'

'হাফ মেকানিক-কাম-ড্রাইভার। আমাদের বাগানেরই স্টাফ।'

'হ্যাঁ কাকু। ওকে চিনি।' সোমলতা বলে উঠল, 'গতমাসে ও আমাদের বাগডোগরা পৌঁছে দিয়েছিল। আচ্ছা কাকু, ওর গাড়িটাকে আনতে বললে হয় না? মানে মোবাইলে সিগন্যাল এলে?'

'না মামণি, হয় না। ওটা লাক্সারি কার। এই পাথুরে জমিতে চলবে না।...একটা কাজ করতে পার?'

'নিশ্চয়ই কাকু। বলুন না।'

'আমার মনে হচ্ছে, তোমরা পিছন থেকে একটু পুশ করলে হয়ত সেলফ ছেড়ে যাবে, স্টার্ট হয়ে যাবে। বৃষ্টিটাও ধরেছে।'

'ওকে।' নেমে পড়ছি।

অনন্তবাবু নামতে গিয়ে থমকে গেলেন, 'ও-ওগুলো কী? ও মশাই?'

'কোনগুলো?'

'ওই যে...কতগুলো সবুজ চোখ...দপদপ করচে...আরেঃ—! এদিকেই আসছে!'

'ওই চোখ? হাঃ হাঃ হাঃ!' অবনী রায় খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলেন, 'আরে স্যার, ওগুলো গরুর চোখ! বাগানের পোষা গরু। হাঃ হাঃ হাঃ! আপনি স্যার...একটু ডরপোক আছেন।'

'ডরপোক? আমি!' অনন্ত সরখেল খ্যাঁক করে উঠলেন, 'আমি কি আপনার মতো কাউ-স্পেশালিস্ট নাকি? বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াই, অ্যাঁ?'

হেঁই ও! হেঁই ও! জোরসে বারতিনেক ঠেলা দিতেই হেঁচকি তুলে জিপসি গর্জন করে উঠল।

বেশ কিছুটা বাঁধের রাস্তা দিয়ে এগোনোর পরে বাগানে ঢোকার ঢালু পথ। খুব সন্তর্পণে গাড়িকে কাত করে অবনী রায় নামাচ্ছেন প্রায় দশ ফুট খাড়া ঢাল বেয়ে।

এই সময় আকাশ চিরে সাপের মতো বিদ্যুৎঝলক! পরক্ষণে ভয়ানক বজ্রপাত।

কয়েক সেকেন্ডের জন্যে সাদা আলোর ঝলকানি। এমন বিকট আওয়াজ, মনে হল যেন আমাদের খুব কাছেই।

সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থামিয়ে দিয়েছেন অবনীবাবু। চতুর্দিকে এবার বিদ্যুতের আলো আর বাজ পড়তে শুরু করেছে।

হেডলাইটও নিভিয়ে দিলেন। বিড়বিড় করে বললেন, 'আবার শুরু হয়েছে! নাহ, আরও ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে।...চারদিন আগেই পাশের বাগানে বাজ পড়ে দুজন লেবার মারা গেছে।...এখানে কোনো বাড়িও নেই, যে ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ব।'

ফিনফিনে গুঁড়োর মতো বৃষ্টি ফের শুরু হয়ে গেছে। কচ্ছপের গতিতে জিপসিকে নিয়ে একটা ঝোপের পাশে দাঁড় করালেন অবনীবাবু।

'মোবাইলগুলো সুইচ অফ করে দিন। ওরা বাজ টেনে নেয়। বৃষ্টি জোর হলে বাজ কমবে।'

দুপাশে অন্ধকারের বুকে আদিগন্ত চায়ের বাগান। বিদ্যুতের সাদা আলোয় ঝলসে-ঝলসে উঠছে।

ভূতের মতো চারজনে বসে জিপসির ভেতরে।...মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। এখনও বাজের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তবে দূরে-দূরে।

'বাগানের ভেতর দিয়ে ঘুরপথে যেতে হবে। সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে বড়-বড় গাছ। কখন যে আবার বাজ আরম্ভ হবে, জানি না।' অবনী খুব ধীরগতিতে ডানদিকের ফাঁকা মাঠের রাস্তা ধরলেন।

'কাকু, মামাদের লেটেস্ট খবর পেলেন?'

'উহুঁ।' অবনীবাবু মাথা নাড়লেন। বললেন, 'দেড়টা নাগাদ আমি কল করেছিলাম। তখন জাস্ট বাগডোগরায় নেমেছেন। তারপর আর কোনও খবর নেই। হিসেবমতো এতক্ষণ পৌঁছে যাওয়া উচিত।...তুমি একবার দেখবে? হতে পারে, উনি হয়ত করেছিলেন। তখন আমাদের ফোন বন্ধ ছিল।'

জগুমামার নাম্বারে চেষ্টা করে যাচ্ছি। সুইচড অফ। হয়ত ফোনের ব্যাটারির চার্জ শেষ।

নেকস্ট অপশন—পট্টনায়েক। কুঁক...কুঁক...শব্দ হয়েই যাচ্ছে।

ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। তার দাপটে উইন্ডস্ক্রিন ঝাপসা— ওয়াইপার দুটো পারছে না।

হঠাৎ চমকে উঠেছি। হেডলাইটের ফোকাসের বৃত্ত দিয়ে কোনও এক প্রাণী বিদ্যুৎগতিতে রাস্তা পেরিয়ে গেল।

'ওটা—ওটা কী কাকু?'

'লেপার্ড।' অবনী রায় নির্লিপ্তভাবে বললেন, 'জল থেকে বাঁচতে শেল্টার খুঁজছে।'

'ল-লেপার্ড! এ-এই ব-বাগানে!' অনন্ত সরখেলের কথা আটকে গেছে।

'হ্যাঁ। রেগুলার ফিচার। ছাগল-মুরগি টেনে নিয়ে যায়। ক'দিন আগে লেবাররা জাল পেতে একটাকে ধরেছিল। ভিডিও করে রেখেছি। বাড়ি ফিরে দেখাব।'

ফোঁ-ও-স! অনন্ত সরখেল সশব্দে শ্বাস ফেললেন।

এই তো! এতক্ষণে পট্টনায়েকের ফোনটা লেগেছে।

'হ্যালো, আঙ্কল। আমি টুকলু।'

'হ্যাঁ টুকলু, বুঝেছি। আমাদের আরেকটু দেরি হবে।'

'কেন আঙ্কল? এনি প্রবলেম?'

'না। এখনও সব ঠিক। আমরা ফরেস্টে ঢোকার পরে ম্যাডামের মোবাইলে একটা কল এল। উনি একটু কথা বলে ডক্টর মুখার্জিকে ফোনটা দিলেন। মুখার্জি এগ্রি করলেন। তারপর দুজনে নেমে ফরেস্টে ঢুকে গেলেন। আমাকে রাস্তায় ওয়েট করতে বললেন।'

'কী বলছেন আঙ্কল? রাতে ফরেস্টের মধ্যে দুজনে?'

'না-না টুকলু, ডোন্ট ওরি। শুধু দুজন নয়। সঙ্গে চারজন আর্মড এস.পি.জিও গেছে। তাদের একজনের সঙ্গে একটু আগে আমার কথা হয়েছে। সে বলল, মুখার্জিসায়েব আর ম্যাডাম ওদের দাঁড়াতে বলে আরও ডেন্স ফরেস্টে ঢুকে গেছেন মিনিট দশেক আগে। আমি বলেছি, আর দশ মিনিট দেখতে। তারপর ওরাও ঢুকে যাবে।'

'আ-চ্ছা। কী হয়, একটু জানাবেন আঙ্কল।'

ক'দিন আগেই জেনেভায় একটা আন্তর্জাতিক সেমিনার সেরে সল্টলেকের দিদির বাড়ি ফিরেছেন জগুমামা।

রবিবারের দুপুর চারটে। মাংসভাত সাঁটিয়ে সোফায় এলিয়ে ফেসবুক খুলেছি। আমাদের সেন্ট লরেন্স স্কুল-বন্ধুদের বড়সড় গ্রুপ হয়েছে ফেসবুকে। বেশিরভাগই প্রবাসী বা অনাবাসী। সকলেই এই সময়টা রেডি থাকে। মেসেঞ্জারে আড্ডা, খবরাখবর শেয়ার, লেগ পুলিং ঘণ্টাখানেক ধরে চলে।

হঠাৎ সাড়ে চারটে নাগাদ আমার মেসেঞ্জারে এক অচেনা না-বন্ধুর মেসেজ ঢুকল। এক ভদ্রমহিলা। প্রোফাইলের নামটা অদ্ভুত—'টিটলার্ক দ্য ইন্ডিয়ান।'

'যদি কিছু মনে না করেন, আপনার নিকনেম কি টুকলু? আপনিই কি ন্যাশনাল সায়েন্টিস্ট জগবন্ধু মুখার্জির ভাগ্নে?...আসলে আপনার প্রোফাইলে ডক্টর মুখার্জির সঙ্গে একটা ছবি আছে। অ্যাম আই রাইট?'

'ইয়েস ম্যাডাম।' সোজা হয়ে বসেছি।

ঠিক তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যেই মেসেঞ্জার কলিং...টুং-টুং-টাং। ভদ্রমহিলা।

ধরব-কি-ধরব না দোনামনা করতে করতে ধরেই নিলাম। কী আর হবে? আমার ফোনের লোকেশন অফ করা আছে।

'হ্যালো অর্ণববাবু! ক্ষমা করবেন। খুব দরকারে পড়ে কল করছি। ডক্টর মুখার্জির সঙ্গে আমার ভীষণ দরকার। কিন্তু এখনও তাঁর কন্ট্যাক্ট নাম্বার জোগাড় করতে পারি নি। গত দু'বছর আমি আমেরিকায়। বিপদে পড়ে কলকাতায় এসেছি। ওনার নাম্বারটা একটু দেবেন প্লিস?'

'নিশ্চয়ই দেব। ওনার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব। কিন্তু বিপদটা কী একটু বলবেন?'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ।' মহিলার গলা কান্নায় জড়িয়ে এল, 'আমার বাবা ফিজিক্সের প্রফেসর আনন্দ নারায়ণ রায়। রিটায়ারমেন্টের পরে একটা অদ্ভুত রিসার্চ করছিলেন। আপনার মামা হয়ত চিনতে পারেন। কারণ বাবার মুখে বেশ ক'বার ওনার নাম শুনেছি।...আমেরিকায় থাকলেও বাবার সঙ্গে আমার রেগুলার কথা হত ফোনে। হঠাৎ গত দশদিন বাবাকে আর পাচ্ছি না। ফোন বন্ধ। টোটালি ডিটাচড। এমন কী, বাবার যে সহকারী ছিল, পলাশদা, তার ফোনও বন্ধ।'

'আপনার মা?'

কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর বললেন, 'মা খুব ছোটবেলাতে মারা গেছেন। শুধু বাবা আর আমি। রিলেটিভদের সঙ্গেও বাবা সম্পর্ক রাখতেন না।...একটু ওনাকে দেবেন প্লিস?'

'আপনি তো এখন কলকাতায়। আমাদের অ্যাড্রেসে একবার কি আসতে পারেন? তাহলে সামনাসামনি—'

'আরে! সিওর! সিওর! আমি এখনই যাচ্ছি।' মহিলা আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন।...

'আমরা নর্থ বেঙ্গলের মানুষ। জন্ম, লেখাপড়া সব ওখানেই। ওদলাবাড়িতে গ্রামের বাড়ি ছিল। তবে বাবার পড়ানোর সূত্রে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির প্রফেসর্স কোয়ার্টারেই থেকেছি। পরে আমি রিসার্চ করতে চলে আসি কলকাতায়। বাবা রিটায়ারমেন্টের পরে নিজের রিসার্চের জন্যে হাসিমারায় একটা বাড়ি কেনেন।'

'হাসিমারায়?' জগুমামা বললেন, 'তোমাদের গ্রামের বাড়ি আগেই তো ছিল, বললে।'

'হ্যাঁ, তা ছিল। এটা অ্যাডিশনাল—রিসার্চ পারপাস। চিলাপাতা ফরেস্টের নাম শুনেছেন স্যার? ওই জঙ্গলের খুব কাছে।'

মহিলার নাম তিতির রায় বর্মন। টিটলার্ক-এর বাংলা প্রতিশব্দ। সঙ্গে হাসব্যান্ডও এসেছেন। আজাদ বর্মন। আমাদের ড্রইংরুমে দুজনে জগুমামার মুখোমুখি।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমেছে।

জগুমামা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, 'তোমার বাবার নাম হয়ত এক আধবার শুনেছি। কিন্তু কোনোদিন যোগাযোগ বা আলাপ হয়নি। ওনার রিসার্চের টপিক কী ছিল, জান কিছু?'

'হ্যাঁ স্যর, জানি। তিতির একটু চুপ করে থেকে বললেন, 'তার আগে স্যর একটা প্রশ্ন করব? বাবার সঙ্গে আপনার কখনো দেখাসাক্ষাৎ বা চিঠি-মেল কিছুই হয়নি?'

'নাহ। আই কানট রিমেমবার।'

'ওকে স্যর।' কথাটা মানতে অসুবিধে হচ্ছিল মহিলার। একটু চুপ করে থেকে বললেন, 'বাবার রিসার্চের বিষয়টা খুব পিকিউলিয়ার। লাইটনিং ইলেকট্রিসিটি এনার্জিকে এগ্রিকালচার ইন্ড্রাস্ট্রিতে কাজে লাগানো।'

'কী!' জগুমামা অবাক হয়ে বলে উঠলেন, 'লাইটনিং-এর ইলেকট্রিসিটিকে চাষের কাজে ব্যবহার?'

'হ্যাঁ স্যর। বাবা কাজটা নিয়ে অনেকটা এগিয়েও গেছিলেন। আমি লাস্ট খ্রিসমাস ভেকেশনে এসেছিলাম। দেখে গেছি। আজ বাবা থাকলে...' ফের গলা বুঁজে এল তিতির রায়বর্মনের।

একটু সামলে নিয়ে বললেন, 'স্যর, আপনি তো জানেন, প্রাণীদের উপর বিদ্যুতের বিরাট এফেক্ট আছে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ধান-গম এইসব শস্যগাছে যদি ব্রিডিং সিজনে রেগুলারলি মেসারড ইলেকট্রিক কারেন্ট দেওয়া যায়, লাইক শকথেরাপি, তাহলে তাদের গ্রোথ খুব দ্রুত হয়।'

জগুমামা ঘাড় নাড়লেন, 'হ্যাঁ, শুনেছি।'

'হ্যাঁ স্যর। কিন্তু মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে থাকা শস্যক্ষেতে এই শকথেরাপি দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বাবার বক্তব্য ছিল—ন্যাচারাল ইলেকট্রিসিটি, যেমন লাইটনিং, তার থেকে যে পাওয়ার জেনারেটেড হচ্ছে, তাকে যদি এই কাজে লাগানো যায়, তবে ক্রপ প্রোডাকশন অনেকগুণ বেড়ে যাবে। সোসাইটি বেনিফিটেড হবে।'

'অ্যামেজিং আইডিয়া। কিন্তু...লাইটনিং-এর থেকে যে হাই ভোল্টেজ পাওয়ার জেনারেটেড হচ্ছে, তাকে স্টোর করা কী করে সম্ভব? সে তো সেকেন্ডের মধ্যে সামনে যাকে পাচ্ছে, পুড়িয়ে-জ্বালিয়ে আর্থে নেমে যাচ্ছে।'

'তা যাচ্ছে স্যর।' তিতির বললেন, 'ইন ফ্যাক্ট ওটাই বাবার রিসার্চ, ওটাই চ্যালেঞ্জ। আমি দেখেছি, বাবা বাংলোর জমির বাউন্ডারি ওয়াল জুড়ে পাম গাছ লাগিয়েছেন। সেই গাছগুলোর প্রত্যেকটার মাথায় আছে মেটালিক রিসেপটর। গাছের গায়ে জড়ানো তার। সেই তারগুলো এসে জুড়েছে বাংলোর লাগোয়া বড় শেডের মধ্যে। সেখানে বড় বড় মেশিন বসানো। আর—'

একটু থেমে বললেন, 'সামনের জমিতেও তার বিছোনো। উইন্টার, তাই ন্যাড়া পড়ে ছিল। ব্যস, তখন এটুকুই দেখেছি।'

'এবার এসে এখনও যাওনি?'

'না স্যর। বাবা-পলাশদা দুজনের কারোর সঙ্গে কনট্যাক্ট করতে না পেরে হুড়মুড় করে দেশে চলে এসেছি। আজাদকে যেতে বলেছিলাম। ও একা যেতে রাজি হল না। আসলে এখন কুচবিহার-জলপাইগুড়িতে আমাদের তেমন পরিচিত কেউ থাকে না। আর যাদের চিনি, তাদের—'

থেমে গেলেন তিতির। আজাদের দিকে তাকাচ্ছেন।

আজাদ এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি। কাগজের পাতা ওলটাচ্ছিলেন। এবার বলে উঠলেন, 'না-না। সব খুলে বল। তোর বলতে অসুবিধে থাকলে আমি বলতে পারি।'

জগুমামা ওর দিকে তাকালেন। বললেন, 'তোমরা দুজনেই এখন আমেরিকায়?'

'না স্যর। তিতির একা গেছে। আমি ব্যাঙ্গালোরেই আছি।' আজাদ বললেন, 'আমরা দুজন কলেজ থেকে ক্লাসমেট। একসাথে বায়ো টেকনোলজিতে এম.এসসি, পি এইচডি করেছি। একই কোম্পানিতে চাকরি করছিলাম। বছর দেড়েক হল ফ্লোরিডার ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট ডক স্কিম পেয়ে তিতির ইউ এস এ গেছে।'

'তুমিও নিশ্চয়ই নর্থ বেঙ্গলের ছেলে?'

'হ্যাঁ স্যর।...তাই তো মনে হয়।' আজাদ একটু যেন হোঁচট খেলেন। তারপর বললেন, 'আমার সম্পর্কে বরঞ্চ তিতির বলবে।'

'কথা পরে হবে।' মা যথারীতি এসে দাঁড়িয়েছেন। দু-হাতে দুটো বড় বড় থালায় প্রচুর বেগুনি আর পকোড়া। পিছনে সোমলতা। ওর হাতে এক জামবাটি মুড়ি।

'আগে এগুলোর গতি করো। তেলেভাজা ঠান্ডা খাওয়া উচিত নয়।'

'যা বলেছেন বৌদি!' পিছন থেকে টপকে একখানা বেগুনি ছোঁ মেরে তুলে নিয়েছেন অনন্ত সরখেল।

রবিবারের বিকেলের দুই রেগুলার গেস্ট অনন্ত সরখেল আর সোমলতা। অনেকক্ষণ এসেছেন। কিন্তু একটানা কথার ফাঁকে ওদের সঙ্গে আলাপ করানো যায়নি।

সোমলতা বলে উঠেছে, 'আরে, দারুণ কোইনসিডেন্স। আমি তো ক'দিন আগেই ওইসব জায়গা ঘুরে এলাম। চিলাপাতা, বানিয়া নদী—ওদিকে জলদাপাড়া, ফুন্টশিলিং...সব ঘুরেছি।'

তিতির বললেন, 'বাঃ, তাই?'

'হ্যাঁ। আমার বন্ধুর বাবা অবনীকাকু লক্ষ্মীমণি টি এস্টেটের জেনারেল ম্যানেজার। অনেকদিন ধরে জয়া বলছিল। হাসিমারার একেবারে গায়ে বিরাট চা বাগান।...আঙ্কল, একবার অবনীকাকুকে জিগ্যেস করব?'

জগুমামা হেসে বললেন, 'একটু দাঁড়াও মামণি। পুরো ব্যাপারটা ওদের থেকে আগে জেনে নিই।...হ্যাঁ আজাদ, তুমি আগে বলো।'

আজাদ একমুঠো মুড়ি মুখে দিয়েছেন। চিবোতে-চিবোতে তিতিরের দিকে চোখের ইশারা করলেন। তিতির বললেন, 'তোর যা খুশি বলতে পারিস। তোর মতামত তুই বলবি। আমার এতে কী বলার আছে!'

'থ্যাঙ্কিউ।' আজাদ বলতে শুরু করলেন, 'স্যর, তিতিরের বাবাকে চিনি কলেজ লাইফ থেকে। মানুষটা পণ্ডিত, সর্বক্ষণ বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে থাকতেন। কিন্তু অতীব সরল, তেল খান। যে যা বলে, বিশ্বাস করে ফেলেন। আর সেটাই মেন সমস্যা।'

'কীরকম?'

'যেমন ধরুন স্যর, কেউ বা কারা আপনাকে বলল, আপনি রাজা। বিশ্বাস করবেন? করবেন না। কিন্তু উনি করবেন। ওনাকে কিছু লোক এটাই বুঝিয়েছে, উনি রাজা। মানে রাজফ্যামিলির। ব্যস, উনি বিশ্বাস করে ফেললেন।'

'রাজফ্যামিলির!'

'হ্যাঁ স্যর। আপনারা নরনারায়ণ রায়ের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন। পাঁচশো বছর আগে ওই এলাকাটার নাম ছিল কামতাপুর। কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, আসামের অনেকটা অংশ নিয়ে স্বাধীন রাজ্য ছিল কামতাপুর। নরনারায়ণ তার সবচেয়ে নামী রাজা ছিলেন। পরে সব ভেঙেচুরে যায়। নরনারায়ণের ভাই চিলা ছিলেন রাজ্যের সেনাপতি। তার নামেই চিলাপাতা ফরেস্ট। ওখানে একটা প্রাচীন দুর্গের খণ্ডহরও আছে। নলরাজার গড়। সেটা নাকি কামতাপুরের রাজধানী ছিল।...'

আজাদ বলে যাচ্ছেন। জগুমামার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হল। পুরোনো এক স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই জীবন মণ্ডল! মদনমোহন মূর্তি! আবার কামতাপুর?

'তো ওই লোকগুলো ওনাকে বোঝায় যে, উনিই এখন এই বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী। সুতরাং ওনাকে সামনে রেখে রাজবংশীদের একজোট করে আলাদা রাজ্য চাইতে হবে।'

'কে এল ও?'

'কে এল ও মানে কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশন? না অর্ণববাবু। ওরা সাত-আট বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু যা হয়! ভিতরে ভিতরে ধিকিধিকি আগুন নেভে না। বাইরের উস্কানি থাকে সবসময়। টাকাপয়সার খেলা। নতুন একটা গ্রুপ তৈরি হচ্ছিল। তারা ওনাকে অ্যাপ্রোচ করে স্বাধীন কামতাপুরের রাজা হওয়ার জন্যে। উনি রাজি হয়ে গেলেন।'

'রাজি হয়ে গেলেন!'

'হ্যাঁ স্যর, গেলেন। যতদিন ইউনিভার্সিটিতে ছিলেন, ততদিন ব্যাপারটা গোপন ছিল। কিন্তু রিটায়ারমেন্টের পরে ওনার বাংলোতে লোকগুলো আসত। মিটিং হত। উনি নিখোঁজ হওয়ার আগে পর্যন্ত এভাবেই চলছিল। আমি বা তিতির অনেক মানা করেছি, শোনেননি। এমন কী—'

একটু থেমে আজাদ বললেন, 'বাংলোর বাইরে নরনারায়ণের একটা হাফ বাস্ট মূর্তি বসিয়েছিলেন। পুরো পাগলামি। এর ফলে কী হল? সরকার সব জানতে পেরে গেল। ওনার ওপর নজর রাখা শুরু হল। অসাধারণ সব রিসার্চ করা সত্ত্বেও গভমেন্টের কোনো ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট উনি পাননি।'

'হুম।' জগুমামা লম্বা শ্বাস ছাড়লেন, 'তিতির, তুমি কি এদের কথা মিন করেছ? এদের সঙ্গে এখনো তোমার যোগাযোগ আছে?'

'না স্যর।' তিতির বললেন, 'এদের এখন বিশেষ ক্ষমতাও নেই। তবু বাবার সূত্রে আগে দু-একজন কখন-সখনও ফোন করত। রিসেন্টলি করেনি।'

'আমায় ওদের নম্বরগুলো দিও।...আর আজাদ সম্পর্কে কী বলবে বলছিলে?'

'ওর সম্পর্কে?' তিতির ম্লান হাসলেন। বললেন, 'কিছুই বলার নেই। সেজন্যেই ও আমায় বলতে বলল। স্যর, আজাদ একজন পিওর অরফ্যান। কুমারগ্রামের মাঝেরডাবরী টি-এস্টেটের পাশে একটা পুরোনো চার্চ আছে। তার গেটের সামনে কাপড়ে জড়ানো অবস্থায় ওকে পাওয়া যায়। দিনটা ছিল পনেরোই আগস্ট। স্বাধীনতা দিবস, তাই ফাদাররা নাম দেন আজাদ। চার্চের কেয়ারটেকার ছিলেন মানিক বর্মন। ওর পালক-বাবা। ব্যস।'

'বুঝলাম।' উঠে দাঁড়ালেন জগুমামা। বললেন, 'তিতির, তোমার বাবার গবেষণা নিয়ে আরো ডিটেলসে জানতে চাই। ভেরি ইন্টারেস্টিং। যা-যা রিসার্চ করেছেন বা করবেন বলে ভেবেছেন আমায় খুব সংক্ষেপে জানাবে। মেল আইডি তোমায় মেসেজ করছি।'

'ওকে স্যর।'

'ডোন্ট ওরি। আমি বিষয়টা হাতে নিচ্ছি।...টুকলু, সব নোট করে রাখ।'

আজাদ বললেন, 'স্যর, আমি কাল ব্যাঙ্গালোর ফিরে যাচ্ছি। পরশু ফরেন টিম ভিসিট। আপনাকে স্যর পেয়ে গেছি। সিওর, সব ঠিক হয়ে যাবে।'...

রাত ন'টা। এর মধ্যে মামা লক্ষ্মীমণি চা বাগানের অবনী রায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। অবনীবাবু মানুষটাকে চিনতেন। তবে মাস তিনচারেক দেখা হয়নি। বিরক্তির সুরে বলেছেন, 'ঘোড়ার ডিমের বিজ্ঞানী! উন্মাদ, মেগালোম্যানিয়াক একটা।'

'কেন?'

'আরে, বলবেন না! হুমকি দিত, সব তাড়িয়ে দেব। ব্রিটিশদের দালালি করে আমাদের রাজ্য শুষছেন। এসব আর চলবে না।'

'ওনার রিসার্চ নিয়ে কোনো কথা হয়নি?'

'হ্যাঁ। অ্যাবসার্ড কথাবার্তা সব। আমাদের বাগানের গাছে-গাছে নাকি যন্তর ফিট করে দেবে। বাজ পড়া বন্ধ হবে। চা পাতারা খুব বাড়বে। পাগলের প্রলাপ!'

'ওনার ডেরা চিনতেন?'

'লোকেশনটা জানি। নিয়ে যেতে পারব।'...

চোখ বোলাতে-বোলাতে হঠাৎ সোজা হয়ে বসলেন জগুমামা। ভ্রু কুঞ্চিত।

'দ্যাখ তো! প্রফেসর রায়ের ফোন নাম্বারগুলো কি চেনা-চেনা লাগছে তোর?'

চেনা-চেনা? দু-তিনবার দেখছি...দেখছি...আরে হ্যাঁ...তাই তো!... কোনো লেটারহেডের মাথায় কি ছাপা ছিল?

সহসা বিদ্যুৎঝলক! মনে পড়ে গেছে।

'মামা! ওই চিঠিটা...যেটা পরশু এল, কোথায়?'

'রাইট! দারুণ! এই তো তোর ব্রেনে আবার স্পার্ক হচ্ছে! কম্পুটার টেবিলের ওপরেই পড়ে আছে। নিয়ে আয়।'

ছ'মাসের পুরোনো তারিখের চিঠি। এসেছিল মুখ বন্ধ খামে। সাত মুল্লুক ঘুরে।

প্রেরক এক বিজ্ঞানী। তাঁর কাছে জগুমামার ফোন, মেল আই ডি, এমন কী এখনকার ঠিকানা ছিল না। প্রথমে মামার পাঁচ বছর আগে দিল্লির জে.এন.ইউ. অ্যাড্রেস থেকে রি-ডাইরেক্ট হয়ে গেছে কেন্দ্রীয় সরকারের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে। সেখান থেকে ওরা ক্যুরিয়ারে পাঠিয়েছেন কলকাতায়।

বিজ্ঞানীর নাম বিষ্ণুরাজ আনন্দ। লেটারহেডে শুধু তাঁর নাম, মেল-আই-ডি. এবং দুটো মোবাইল নম্বর ছাপা ছিল। কোনো ঠিকানা নেই।

বিষ্ণুর ইংরেজিতে টাইপ চিঠিটা মাত্র তিন লাইনের।

'ডক্টর মুখার্জি, খুব জরুরি। আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। প্লিস, একটু তাড়াতাড়ি সময় দেবেন।' নীচে তাঁর সই।

সেইদিনই যোগাযোগের চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিষ্ণুর দুটো ফোনই বন্ধ ছিল।

মামার নির্দেশে ফোন নম্বর দিয়ে মেলও করেছি পরশু দিনই।...কোনো জবাব আসেনি।

আশ্চর্য! আনন্দ রায়ের দুটো নাম্বার সাউথ ইন্ডিয়ান বিজ্ঞানী বিষ্ণুর নাম্বারের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। কী করে সম্ভব?

বাবা টিভি দেখছিলেন। আমাদের কথার মাঝে হেসে ফুট কাটলেন, 'দ্যাখো, ইনি হয়ত বিখ্যাত সাহিত্যিক মূলক রাজ আনন্দের কেউ হবেন।'

'তিতিরকে একবার ধর তো।' জগুমামা বললেন।

'ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে লাগছে মামা। আবার সেই কামতাপুরি কেস। আমরা কি আর এগোব, নাকি—'

'না রে ভাগ্নে। তা হয় না।' জগুমামা বললেন, 'কথা দিয়েছি। আফটার অল একজন বিজ্ঞানী নিখোঁজ, তার মেয়ে বাবার খোঁজে বিদেশ থেকে ছুটে এসেছে, কী করে ছেড়ে দিই বল? দেখা যাক, দেখা যাক।'

জগুমামা হাঁটতে হাঁটতে একবার পিছন ফিরে তাকালেন। গাড়িদুটোর আলো আর দেখা যাচ্ছে না। ওরা অনেকটাই ভিতরে ঢুকে এসেছেন রাস্তা থেকে।

চতুর্দিকে পিচঢালা অন্ধকার। সেই অন্ধকার চিরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে চার-চারটে এল.ই.ডি টর্চের ফোকাস। ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল-বিশাল গাছেদের ফাঁক দিয়ে শুঁড়ি পথ।

পাতায়-পাতায় হাওয়ার শন-শন শব্দ। একটানা জংলি ঝিঁঝিদের গান। আর কোনো শব্দ নেই। গোটা জঙ্গলটা কেমন থম মেরে আছে।

ছ' জনের দলটা ঢুকে পড়েছে জঙ্গলের আরও গভীরে।

তিতির গটগট করে এগিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এ পথ সে চেনে।

জগুমামা এখন বললেন, 'তিতির। আমরা ঠিক যাচ্ছি তো?'

'হ্যাঁ স্যর।'

একটু আগে তিতিরের মোবাইল বেজে উঠেছিল। সে নিচুগলায় 'হুঁ-হাঁ' করে ছেড়ে দেয়। তারপরেই ওর হাঁটার গতি বেড়ে গেছে।

জগুমামার মনে হচ্ছে, তিতিরের কথায় হুট করে 'হ্যাঁ' বলা ঠিক হয়নি। আগের প্ল্যান অনুযায়ী কাল সকালে এলেই ঠিক হত।

পরক্ষণে ভাবছেন, সঙ্গে চারজন সশস্ত্র ফোর্স আছে। যদি এর পিছনে কোনো কনস্পিরেসি থেকেও থাকে, এত সহজ হবে না।

যথেষ্ট আটঘাট বেঁধে কাজে নামা হয়েছে। লোকাল পুলিশের কাছ থেকে সমস্ত রেকর্ড নেওয়া হয়েছে। এবং জানা গেছে, তিতিরদের দেওয়া ইনফর্মেশন সঠিক।

আনন্দ নারায়ণ রায় নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির রিটায়ার্ড প্রফেসর। কয়েক বছর হল, চিলাপাতার পাশে কোদালবস্তি ফরেস্টের লাগোয়া কয়েক বিঘা জমি কিনে সেখানে বাংলো-টাংলো বানিয়ে থাকতেন। কীসব রিসার্চ করতেন। বিশেষ কারো সঙ্গে মিশতেন না। সঙ্গে এক সহকারি ছিল। কিছু লোকাল লোক ওর কাছে কাজ করত। পুলিশকে গোয়েন্দারা খবর দিয়েছিল, কিছু সন্দেহজনক লোকজনের আনাগোনা আছে প্রফেসরের বাড়িতে। তারপর থেকে পুলিশ নজর রাখত। দিনদশেক হল, বাংলো বন্ধ। আলো জ্বলে না। কোনো সাড়াশব্দ নেই। কেউ আসে না।

পট্টনায়েক নির্দেশ দেন, তিনি আসছেন। পুরো এলাকা ছানবিন করে রিপোর্ট চাই। বিজ্ঞানীকে খুঁজে বের করতে হবে।

জগুমামা যোগাযোগ করেন কেন্দ্রীয় সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের কর্তার সঙ্গে।

সেখান থেকে বিচিত্র তথ্য হাতে এল।

আনন্দ নারায়ণ রায়ের নাম বিজ্ঞানী হিসেবে রেকর্ডে আছে। ওইটুকুই, আর কিছু নেই। কারণ, তিনি কখনও সরকারের কাছে কোনো স্কিম বা প্রজেক্ট জমা দেননি।

অন্যদিকে বিষ্ণুরাজ আনন্দ নামের যে সাউথ ইন্ডিয়ান বিজ্ঞানী মামাকে চিঠি দিয়েছিলেন, তাঁর সম্পর্কে অনেকটা তথ্য পাওয়া গেছে। বিষ্ণুর ঠিকানা ব্যাঙ্গালোর। উনি ফিজিক্স-এর নানা বিষয়ে রিসার্চের জন্যে নানা সময়ে সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগকে আবেদনপত্র ও প্রজেক্ট জমা দিয়েছেন।

অদ্ভুত-অদ্ভুত সব সাবজেক্ট। ফিজিক্স-এর সঙ্গে বায়োলজি, অ্যাস্ট্রোনমি থেকে ওয়েদার সায়েন্স কিছুই বাদ নেই! ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। কোনোটাই স্ক্রুটিনি কমিটি অ্যাপ্রূভ করেনি। তারা প্রজেক্টগুলোকে অবাস্তব মনে করেছে।

শেষ আবেদনপত্র বিষ্ণুপাঠিয়েছিলেন ৬ মাস আগে। তারিখ মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, তার পরদিনই জগবন্ধু মুখার্জির সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে তিনি চিঠি পোস্ট করেন।

কর্নাটক পুলিশের সর্বোচ্চ মহলে খবর গেছে বিষ্ণুকে খুঁজে বের করার জন্যে। এখনও পর্যন্ত জানা গেছে, বিষ্ণুগত কয়েক মাস ওই ঠিকানায় থাকছেন না।

তিতির এবং তার কর্তা আজাদ স্পষ্ট জানিয়েছে, বিষ্ণুরাজ আনন্দ নামের কোনো ব্যক্তিকে তারা চেনে না। নামও শোনেনি।

তিতিরকে নিয়ে জগুমামা যখন সদলবলে ঘটনাস্থলে আসা স্থির করে ফেললেন, তখন লক্ষ্মীমণি টি এস্টেটের অবনীবাবু নাছোড়বান্দা হয়ে পড়লেন। তাঁদের বাগানের বাংলোতেই থাকতে হবে। জগুমামা রাজি হয়ে গেলেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী টুকলু, সোমলতা ও অনন্ত সরখেল যেদিন সকালে পৌঁছলেন হাসিমারা স্টেশনে, সেইদিন দুপুরের ফ্লাইটে নামলেন জগুমামা, পট্টনায়েক আর তিতির রায়বর্মন। বাগডোগরায় তাঁদের জন্যে তিন পুলিশকর্তা ছাড়াও অপেক্ষা করছিল দশজন আর্মড এস.পি.জি এবং তিনটে বোলেরো।

ওখান থেকে সোজা এরা চলে আসবেন চা বাগানে, এটাই ঠিক ছিল। অ্যাকশন শুরু পরদিন থেকে, পুলিশের সঙ্গে হাই প্রোফাইল মিটিং-এর পরে।

কিন্তু পুরো প্ল্যান পালটে গেল একটা ফোনে।

তিনজনে গাড়িতে সবে উঠে বসেছেন। তিতিরের ফোন বেজে উঠল।

তিতিরের চক্ষু বড় বড়, 'স্যর! পলাশদা! বাবার অ্যাসিস্টেন্ট।'

'তাই? ধরে নাও, ধরে নাও।'

'হ্যালো পলাশদা! পলাশদা, তুমি কোথায়? বাবা, বাবা কোথায়?... কোথায়?' তিতির প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।

ওপাশের কথা শোনা যায় না।

'কী!...কী বলছ? মানে?...বন্দী?...কেন?...আচ্ছা, আচ্ছা। বলো, বলো, শুনছি।...জায়গাটা কি বাবার বাংলোর কাছে? তাহলে?...কোনদিকে?...আচ্ছা। কী চাইছে ওরা?...হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমি রাজি।...অবশ্যই বোঝাব। অ্যাট এনি কস্ট।...যাচ্ছি, এখনই যাচ্ছি।...'

ফোনটা রেখে থরথর করে কাঁপছে তিতির। ওর চোখ ঠিকরে বেরোচ্ছে।

'স্যর, স্যর,' তিতিরের কথা আটকে যাচ্ছে, 'ওরা বাবাকে আটকে রেখেছে...মেরে ফেলবে বলছে...।'

'কেন? কারা?'

'বাবার রিসার্চটা ওদের চাই...ওরা স্যর, ওই লোকগুলো...মানে যারা বাবাকে উসকাচ্ছিল...যারা আবার কামতাপুর...।'

'পলাশ কোথায়?'

'পলাশদাকে ওরা ধরতে পারেনি। সে ওদের ডেরার পাশে লুকিয়ে আছে। সেখান থেকেই আমায় ফোন করেছে। বলছে, তোমার বাবাকে বোঝাও, দিয়ে দিতে বলো। তুমি বললে হয়ত প্রফেসর সায়েব রাজি হয়ে যাবেন।'

'কিন্তু ওই রিসার্চ নিয়ে ওরা করবেটা কী?'

'সেটা তো জানি না স্যর। নিশ্চয়ই অনেক কোটি টাকায় বেচে দিয়ে দলের ফান্ড বানাবে। পলাশদা বলছে, লোকগুলো খুব ক্রুয়েল। মানুষ মারতে ওদের হাত কাঁপে না।...আমি যাব স্যর। আমি বাবাকে বোঝাব। দিয়ে দিতে বলব।'

'বলছ কী তিতির? তোমার বাবার এতদিনের স্বপ্ন, কতগুলো বদমাসের হাতে তুলে দেবে?'

'হ্যাঁ স্যর, দেব। আমার কাছে বাবার জীবন সবার আগে। আমি এখনই যাব। ওখানেই যাব। বাবাকে রাজি করাব।'

'কোথায় যাবে?'

'চিলাপাতা জঙ্গলে। পলাশদা ডিরেকশন দিয়ে দিয়েছে। কাছাকাছি পৌঁছে আরেকবার ওর সঙ্গে কথা বলে নেব। আমায় নামিয়ে দিয়ে চলে যান স্যর। বাবা ছাড়া আমার আর কেউ নেই স্যর।'

তিতিরের চোখ ভরে এসেছে জলে। অস্থিরভাবে সে ছটফট করছে গাড়ির মধ্যে।

সঙ্কটজনক পরিস্থিতি! পট্টনায়েকও জগুমামার কথায় সায় দিলেন। তিনটে গাড়ি হাসিমারা স্টেশন পেরিয়ে ডানদিকের চা বাগানের রাস্তায় না ঢুকে সোজা এগিয়ে চলল চিলাপাতা ফরেস্টের দিকে।

ফরেস্টের এনট্রি গেটে টিমটিমে আলো। ব্যারিকেড ফেলা ছিল। পুলিশের গাড়ি দেখে মুহূর্তে উঠে গেল।

মাঝেমাঝেই ছোট-ছোট ব্রিজ বা কালভার্ট। নীচে দিয়ে পাহাড়ি নদী বয়ে যাচ্ছে। তিতির বিড়বিড় করছে, 'দুটো হল...।'

এরমধ্যেই তিতির দু-দুবার কথা বলেছে ফোনে। পলাশের সঙ্গে।

চার নম্বর কালভার্ট দেখা যাচ্ছিল হেডলাইটের আলোয়। তিতির বলে বলে উঠল, 'ক্রস করেই গাড়ি থামাবেন। নেমে যাব।'

ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে ডুয়ার্সের অরণ্যরাজ্য। জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই। এই অবস্থায় তিতিরকে একা ছেড়ে দেবেন জগুমামা? কখনও হয়?

'চলো তিতির। আমিও তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।'

'না স্যর। আপনি কেন যাবেন স্যর? আমার বাবা, আপনি স্যর রিস্ক নেবেন কেন? তাছাড়া পলাশদা আমায় একা যেতে বলেছে।'

'তেমন হলে নাহয় ফিরে আসব। প্রফেসর রায় আর আমি একই ফ্রেটারনিটির মানুষ। ইট ইস মাই ডিউটি তিতির। নয়ত আসতামই না।...চলো।...'

বনের অনেক ভিতরে ঢুকে পড়েছেন। বাঁ-দিকে গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে হালকা রুপোলি রেখা। সেই নদীটাই ঘুরেফিরে বয়ে যাচ্ছে।

স-স-স! দাঁড়িয়ে পড়েছে দলটা। টর্চের ফোকাস গিয়ে পড়েছে তার শরীরে। মেটে রঙের বড়সড় একটা পাইথন সরসর করে ঢুকে যাচ্ছে গাছের ফাঁকে।

আবার তিতিরের ফোন বেজে ওঠে। খুব নিচুস্বরে কিছু কথাবার্তা। তারপরেই বলল, 'স্যর, পলাশদা একটু দূরে।...আলোয় আমাদের দেখতে পেয়েছে। আমায় একা যেতে হবে স্যর। এদের নিয়ে যাওয়া যাবে না। বলছে, ওরা দেখে ফেললে সঙ্গে-সঙ্গে বাবাকে মেরে দেবে।'

জগুমামা একমুহূর্ত ভাবলেন। তারপর বললেন, 'ঠিক আছে।...শোন, তোমরা এখানে টর্চ নিভিয়ে ওয়েট করো। আমি ওর সঙ্গে যাচ্ছি।...চলো তিতির।'

সর্বক্ষণের সঙ্গী রিভলবার গুঁজে নিয়েছেন কোমরে। বাঁ-পকেটে পেন্সিল টর্চটাও ঢুকিয়েছেন।

অন্ধকারে চোখ অনেকটা সয়ে গেছে। ছায়ামূর্তির মতো দুজনে এগিয়ে যাচ্ছেন। বড়-বড় গাছে-ঝোপের ফাঁক দিয়ে।

জগুমামার ভিতরে-ভিতরে খুব অস্বস্তি হচ্ছে। ঠিক যুক্তিতে মিলছে না। কে এই পলাশ লোকটা? তিতিরকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে কেন? প্রফেসর রায় সত্যিই কি বন্দী? তাকে ক্রিমিন্যালদের হাত থেকে ছাড়াতে মেয়েকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে? কিন্তু এতদিন পলাশ ফোন বন্ধ রেখেছিল কেন? আজকেই খুলল কেন? ও কি তাহলে খবর পেয়েছিল, তিতির সবাইকে নিয়ে বাবাকে খুঁজতে আসছে? খবরটা পলাশকে কে দিল? তিতিরের বাবার অ্যাসিস্ট্যান্ট পলাশ, নাকি ক্রিমিন্যালদের এজেন্ট?

তিতিরকে অন্ধের মতো অনুসরণ করতে-করতে প্রশ্নগুলো জগুমামা ভেবে যাচ্ছিলেন। এই কথাগুলো এখনই তিতিরকে বলা দরকার। কিন্তু ও কি আদৌ শুনবে?

'তিতির! তিতির! একটু শুনবে?'

'বলুন স্যর। পলাশদা বলছে, সময় নেই।'

'বলছিলাম, পলাশদাকে কি তুমি—'

জগুমামার কথা শেষ হল না। নিশুতি জঙ্গলের অখণ্ড নৈঃশব্দ হঠাৎ ভেঙে গেল।

দূর থেকে ভেসে আসে এক জড়িত কণ্ঠস্বর, 'মা তিতির! তিতির! কোথায় মা তুই, কতদূর?'

অনেকটা আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছে বয়স্ক মানুষটির গলা।

'বাবা! বাবা গো!' চিৎকার করে উঠল তিতির, 'কোথায় তুমি? আমি এসে গেছি বাবা। আসছি, বাবা আসছি।'

বলতে-বলতে সে ছুটল শব্দ লক্ষ্য করে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে ধাক্কা খেতে খেতে, হোঁচট খেতে-খেতে মেয়েটা ছুটছে। ছুটছে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে।

সম্পূর্ণ ঘটনাটা ঘটে গেল তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে। জগুমামা পিছন থেকে চেঁচালেন, 'তিতির! তিতির!'

কোনো জবাব দিল না। নিরুপায় মামাও ছুটছেন তিতিরের পিছন- পিছন। ক্রমেই অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে মেয়েটার শরীর।

কিন্তু একটু পরেই মামাকে থামতে হল। হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেন একটা ঢিবির ওপর।

চশমাটা ভাঙেনি। সামলে উঠে দাঁড়ালেন। কুচকুচে অন্ধকারে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। কীসের ঢিবি এটা?

পকেট থেকে পেনসিল টর্চ বের করে জ্বাললেন। পরক্ষণে জগুমামার শরীরে বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।

এ কী! এটা কবরস্থান? না শ্মশান? এগুলো...অসংখ্য মৃত প্রাণীর হাড়গোড়! স্তুপ হয়ে আছে।

কোত্থেকে এল এত হাড়গোড়? এগুলো মানুষের করোটি, না জন্তুর? গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে!

বিস্ফারিত চোখ, বিহ্বল জগুমামা। কিছুই বুঝতে পারছেন না।

আকাশে মেঘ করেছে। দু-একবার বিদ্যুৎ চমকাল। ঝলসানো আলোয় জগুমামা দেখলেন, থমথমে নিথর বন। একটাও প্রাণের শব্দ নেই।

ঠান্ডা-ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে। অদ্ভুত একটা মিষ্টি গন্ধ ঘনিয়ে আসছে চারপাশ থেকে। মামার শরীর কাঁপছে।

ফ্যাঁ-স! চমকে উঠে দেখলেন, অদূরেই দুটো সবুজ চোখ জ্বলজ্বল করছে।

লেপার্ড? না-না, মনে হচ্ছে বড়সড় বুনো বেড়াল। বনের ভিতর থেকে ছুটে আসছে বাইরের এই ফাঁকা জমিতে।

কিন্তু পারল না। ওকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে অদ্ভুতদর্শন সব ছায়ামূর্তি। তারা পেঙ্গুইনের মতো দুলছে দুদিকে।

ফ্যাঁ-ও-ফ্যাঁ-ও-ও...! জন্তুটার আর্তনাদ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে। ওকে গ্রাস করে নিচ্ছে ছায়া-ছায়া অবয়বগুলো। একসময় ওর চোখদুটোও ডুবে গেল অন্ধকারে।

মিষ্টি গন্ধটা ভয়ংকর উগ্র হয়ে উঠেছে। ছড়িয়ে পড়ছে। দুলতে-দুলতে ভূতুড়ে ছায়াশরীররা এবার এগিয়ে আসছে জগুমামার দিকে...।

পালাও! পালাও! আর একমুহূর্ত এখানে নয়। জগুমামার মাথার মধ্যে পাগলা ঘণ্টি বেজে উঠেছে! এই বন স্বাভাবিক নয়! এখানে বিভীষিকা আছে।

আরে! গন্ধটা এত মাতাল করে দিচ্ছে কেন? হাত-পা অবশ হয়ে আসছে...মাথা ঝিমঝিম করছে। কেউ স্প্রে করছে সুগন্ধি তরল?

জগুমামা টেনে বের করলেন রিভলবার। ছায়ামূর্তিগুলোকে লক্ষ্য করে অন্ধের মতো গুলি চালিয়ে দিলেন।

দ্রাম...দ্রাম...দ্রাম! পরপর গুলির আওয়াজে কেঁপে উঠছে জঙ্গল।

টলমল পায়ে ছুটতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু হাত-পা-মাথা কেউ এখন কথা শুনছে না। তবু আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন! চলে যেতে হবে দূরে, আরো দূ-রে...।

পারলেন না। কিছুদূর যেতে-না-যেতে দীর্ঘ শরীরটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

জগুমামার চোখের সামনে থেকে সব মুছে গেল। নেমে এল অন্ধকার।

'ডক্টর মুখার্জি। জায়গাটা আইডেন্টিফাই করতে পারবেন? আই মিন, যেখানে অ্যাটাকড হলেন?' ডি আই জি বললেন।

'মনে হয়, পেরে যাব।' জগুমামা আস্তে আস্তে বললেন, 'এসপিজি যেখান থেকে আমায় তুলে এনেছিল...পট্টনায়েক, ওই অব্দি তো যাওয়া যাবে?'

'নিশ্চয়ই।' পট্টনায়েক বললেন, 'কিন্তু ডক্টর মুখার্জি, আমি একটা ব্যাপার এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। আপনার মতো মানুষ সবকিছু ভুলে গিয়ে অতবড় রিস্ক নিলেন কী করে? মেয়েটা ছুটল, আপনিও পিছু-পিছু ছুটলেন। আনথিঙ্কেবল।'

'ঠিকই বলছেন পট্টনায়েক।' জগুমামা ম্লান হেসে বললেন, 'আমার নিজেরও এখন ভেবে অবাক লাগছে। ওর কথায় রাজি হলাম কেন, কেন এসপিজিদের ওয়েট করতে বললাম, এর ব্যাখ্যা পাচ্ছি না।...আচ্ছা, তিতির বা পলাশ...কারও খোঁজ পাওয়া গেছে?'

'নাঃ। ফোন বেজে গেল তিতিরের। তবে আমরা এখনও বনের ভিতরে ফোর্স পাঠাইনি।' ডি আই জি বললেন, 'কাল রাত থেকে আপনাকে নিয়ে যা চলছিল! এবার আপনার সঙ্গে কথা বলে নেক্সট কোর্স অফ অ্যাকশন ঠিক করতে হবে।'

লক্ষ্মীমণি টি এস্টেটের বাংলোর দোতলার হলঘরের বড় খাটে জগুমামা আধশোয়া। একটু আগে বাগানের নিজস্ব হাসপাতাল থেকে ওঁকে নিয়ে আসা হয়েছে।

জগুমামার রিভলবারের গুলির শব্দ শুনে সেদিকে ছুটে যায় বনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা চারজন এস.পি.জি। ওদিকে গাড়ি থেকে পট্টনায়েকও ফোর্স নিয়ে ঢুকে পড়েন জঙ্গলে।

প্রায় পনেরো মিনিট ধরে তন্নতন্ন খোঁজাখুঁজির পরে জগুমামাকে পাওয়া যায় গভীর জঙ্গলের মধ্যে।

তাঁর অসাড় শরীরটা চিৎ হয়ে পড়েছিল। মৃদু মৃদু নিঃশ্বাস পড়ছিল।

হাতে ও পায়ের নানা জায়গায় ছোট বড় ক্ষত। রক্ত পড়ে-পড়ে জমাট বেঁধে ছিল। দেখে মনে হয়েছে, এক বা একাধিক মাংসাশী জীব খুবলে-খুবলে খেয়েছে। করাতের মতো ধারালো দাঁতের দাগ।

কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, জগুমামার দেহের চারপাশের জমিতে কোনো প্রাণীর পায়ের ছাপ বা রক্তের দাগ কিছুই পাওয়া যায়নি। ওই পরিস্থিতিতেও এসপিজিরা টর্চ জ্বেলে বেশ কিছুটা এলাকা খুঁজেছে।

তবে আততায়ী কি আধিভৌতিক কিছু? বিজ্ঞানে যার ব্যাখ্যা হয় না?

সেই মুহূর্তে প্রথম কাজ ছিল, জগুমামাকে তুলে এনে সঙ্গে সঙ্গে ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করা। সত্যসাধন পট্টনায়েক ঠিক তাই করেছেন। মামাকে গাড়িতে শুইয়ে নিয়ে এসেছেন টি এস্টেটের নিজস্ব হাসপাতালে। অবনীবাবু ডাক্তারকে ঘুম থেকে তুলে এনেছেন।

মামাকে বেডে শুইয়ে অক্সিজেন, স্যালাইন স্টার্ট করা হয়েছে। উন্ডগুলোকে ড্রেসিং করে স্টিকার লাগানো হয়েছে। ডাক্তার রঞ্জন মিত্র পোড়খাওয়া, অভিজ্ঞ ডাক্তার। আশপাশের পাঁচটা চা বাগান হসপিটালের হেড। মামাকে পরীক্ষা করে নাড়ি টিপে বললেন, 'শরীরে কড়া মাদক জাতীয় ড্রাগ গেছে।'

'ড্রাগ! ড্রাগ কী করে যাবে?' পট্টনায়েক অবাক হয়ে বললেন, 'ওনাকে তো বনের মধ্যে সেন্সলেস কন্ডিশনে পাওয়া গেছে।'

'তা বলতে পারব না। তবে শরীরে কিছু আননোন ফরেন অবশ্যই এলিমেন্ট গেছে।'

মামার জ্ঞান ফেরে ভোর সাড়ে পাঁচটায়। আমরা সকলে ঠায় বসে।

তবে ঘুম-ঘুম ড্রাউসি ভাবটা পুরোপুরি কাটতে আরও ঘণ্টা- পাঁচেক লেগেছে। বেলা বারোটায় জগুমামা চোখ মেলে তাকালেন। মুখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে আমাদের দেখলেন। অস্ফুটে বললেন, 'আমি... এখানে...কী...হ...ল?'

তারপরেই ওঁর নিশ্চয়ই আগের রাত মনে পড়ে গেল। তিনি চুপ করে গেলেন।...

'মামা। তিতির রায়বর্মন ছুট দেওয়ার পরে তুমি পিছন পিছন ছুটলে। তারপরে হাড়গোড়ের স্তুপ...তারপর...তোমায় ঘিরে ধরল কিছু অদ্ভুত প্রাণী? তাই তো?'

'প্রাণী! কী করে বলি প্রাণী? অন্ধকারে ছায়ার মতো দুলছিল ওরা... অনেকটা...অনেকটা...,' জগুমামা ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন। কয়েক মুহূর্ত পরে বললেন, 'ওদের দেখতে অনেকটা ওয়াইন গ্লাসের মতো। নীচের দিকটা সরু। নীচের সরু অংশে বা ঠ্যাঙে ভর দিয়ে ওরা ডানদিকে-বাঁদিকে দুলছিল। দুলতে দুলতে এগোচ্ছিল...একটা বনবেড়াল না লেপার্ড...জানি না...ঢুকে পড়েছিল ওখানে...সেটাকে গিলে ফেলল... উঃ!'

'গিলে ফেলল! ওগুলোর মুখ ছিল?' ডি আই জি বলে উঠলেন।

'দেখতে পাই নি। অন্ধকারে ছায়া-ছায়া কতকগুলো শরীর। তাদের মধ্যেই ঢুকে গেল প্রাণীটা।...আর্তনাদ করছিল।...' জগুমামা বলতে গিয়ে হাঁফাচ্ছেন।

'কুল ডাউন ডক্টর মুখার্জি।' পট্টনায়েক বললেন।

'প্রেতাত্মা—প্রেতাত্মা—পিশাচ! কামতাপুরীদের প্রেত!' অনন্ত সরখেল ভয়ে কাঁপছেন, 'উরিব্বাপ! আমি এখান থেকে একপাও নড়ছি না। ক্যাডাভেরাস কেস।'

জগুমামা ভ্রু কুঁচকে দেখলেন অনন্তবাবুকে। তারপর বললেন, 'পট্টনায়েক, একটা কথা বলুন তো! আপনারা যখন ওখানে গিয়ে পৌঁছলেন, আশেপাশে কিছুই দেখতে পাননি?'

'নো, নাথিং। আপনি একা জমির ওপর পড়ে ছিলেন।'

'কোনো মদজাতীয় মিষ্টি গন্ধ পেয়েছিলেন?'

'গন্ধ! না। তখন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। মাটির, গাছের পাতার ওই গন্ধ...বাট নাথিং স্পেশাল!'

'বুঝেছি।' জগুমামা বললেন, 'অথচ আমার ধারণা, ওই বিদঘুটে চেহারার ছায়াগুলো একটা ঝাঁঝালো গন্ধ স্প্রে করছিল। শরীর অবশ করে দিচ্ছিল। আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল...হাত-পা অসাড়...চোখ ঝাপসা...নিশ্চয়ই কোনো কেমিক্যাল...।'

'হ্যাঁ, হ্যাঁ। ডাক্তার মিত্র কাল প্রথমেই এ কথা বলেছেন।' পট্টনায়েক বললেন, 'আচ্ছা, আপনি অদ্ভুত জীবগুলোর চোখ-নাক-মুখ কিছু দেখতে পাননি?'

'উহুঁ।' জগুমামা বললেন, 'সেজন্যেই তো আমি ভীষণ কনফিউসড, ওগুলো আসলে কী! কোন জন্তু?'

একটু থেমে বললেন, 'আচ্ছা, চিলাপাতা ফরেস্টের স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টগুলো—'

'অবশ্যই ডক্টর মুখার্জি।' ডি আই জি মামার কথার ওপরে বলে উঠলেন, 'আজ ভোর পাঁচটা থেকে ফরেস্ট গার্ড, পুলিশ পোস্টিং করে দেওয়া হয়েছে। প্রফেসর রায়ের বাংলোর পাশে তো আগে থেকেই পোস্টিং ছিল।'

'গুড। থ্যাঙ্কিউ।' জগুমামা থেমে-থেমে বললেন, 'আরেকটা কাজও ইমিডিয়েট করা দরকার। সব ক'জনের ফোনের লোকেশন ট্র্যাকিং। অন করলেই ধরে ফেলা যাবে।...টুকলু, একবার তিতিরকে দ্যাখ তো।'

সঙ্গে সঙ্গে নম্বর টিপলাম। ফোন বন্ধ।

জগুমামা মাথা নাড়লেন, 'হয়ত চার্জ শেষ হয়ে গেছে। কিম্বা বন্ধ করে রেখেছে। এনিওয়ে, ওর হাসব্যান্ড আজাদকে জানানো হয়েছে কিছু?'

'না।' পট্টনায়েক বললেন, 'তাকেও জানানো যায়নি। তারও ফোন বন্ধ ছিল।'

চা বাগান থেকে মিনিট পনেরোর ড্রাইভ। চিলাপাতা জঙ্গল যেখানে পাতলা হয়ে এসেছে, বানিয়া নদীর ওপরের কালভার্ট পেরিয়ে পূবদিকের ভাঙাচোরা পথে আরও মিনিট পাঁচেক।

জঙ্গলের মধ্যে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বাংলো। পাঁচটা গাড়ির কনভয় নিয়ে আমরা তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। তিতির ঠিক যেমনটি বলেছিল, পাঁচিলের গা জুড়ে চতুর্দিকে সারি সারি পাম গাছ। মেঘলা বিকেল। হাওয়া দিচ্ছে।

কম্পাউন্ডের মেন ফটক বন্ধ। বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। পুলিশরা টপাটপ নেমে পড়ল। ডি আই জি বললেন, 'তালা ভাঙি? ভেতরে ঢুকব তো?'

'ঢুকতে তো হবেই।' জগুমামা বললেন, 'তবে তার আগে বাইরে দিয়ে কম্পাউন্ডটা চক্কর কাটব। না-না, গাড়িতে নয়। হাঁটতে পারব।'

সকলে মামাকে পইপই করে বলেছিলেন, আজকের দিনটা রেস্ট নেওয়ার জন্য। রাজি হননি। হাতে একটা ছড়ি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন।

বাংলোর সামনের দিকটা শুধু একটু ফাঁকা। বাকি তিনদিকে বন। ঝোপঝাড় আর শাল-সেগুন-খয়ের সব বড়বড় গাছেরা ঝুপসি হয়ে আছে।

হাঁটতে হাঁটতে পিছন দিকে গিয়ে জগুমামা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। পাঁচিলের গায়ে এক-মানুষ মাপের একটা ফাটল। ইটগুলো ভাঙা।

'আঙ্কল। দেখেছ?' সোমলতা বলে উঠল।

'দেখেছি বলেই তো দাঁড়ালাম মামণি।' জগুমামা বললেন, 'এখান দিয়ে বনের ভিতরে পায়ে-চলা পথও আছে।...আচ্ছা, এখান থেকে নলরাজার গড় কদ্দূর হতে পারে?'

'বনের মধ্যে দিয়ে গেলে বেশিদূর হবে না।' ডিআইজি মাদারিহাট থানার ওসির দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তাই তো বড়বাবু? সকাল বেলায় পট্টনায়েক সায়েব যে জায়গাটা আইডেন্টিফাই করেছিলেন, সেটাই কি গড়ে ঢোকার এনট্রি পয়েন্ট?'

'হ্যাঁ স্যর।' ওসি ঘাড় নাড়লেন।

'তার মানে—,' জগুমামা একটু থেমে বললেন, 'কাল রাতে তিতির ওদিকেই মুভ করেছিল।...মিলে যাচ্ছে। কামতাপুরের রাজধানী ছিল নলরাজার গড়। সুতরাং এখান থেকে ওখান পর্যন্ত করিডর হল এই পথটা। রেগুলার এদের যাতায়াত ছিল, বোঝা যাচ্ছে।'

এইসময়ে জোরে বাতাস বইতে শুরু করল। দু-চারটে বৃষ্টির ফোঁটা।

'চলুন! চলুন! বৃষ্টি আসছে!' অবনী রায় চেঁচিয়ে উঠলেন।

ফটাফট বড়-বড় ছাতা খুলে গেছে। এখানকার পুলিশরা এই আবহাওয়ায় অভ্যস্ত।

কিন্তু বৃষ্টি নামার আগেই শুরু হয়ে গেল ঘনঘন বজ্রপাত!

কড়-কড়-কড়াৎ! আকাশ চিরে ঝলসে উঠছে আলোর রেখা। পরক্ষণে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। বাজগুলো এত কাছে পড়ছে যে মনে হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে একখানা আছড়ে পড়বে আমাদের ওপর।

কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছি।

জগুমামা ভ্রুক্ষেপহীন। বললেন, 'দাঁড়ালেন কেন? চলুন।'

'কী বলছেন ডক্টর মুখার্জি?' পট্টনায়েক বললেন, 'এখানে তবু বড় বড় গাছ আছে। বাজটা একটু কমতে দিন।'

'হ্যাঁ স্যর। বৃষ্টি জোরে হলেই বাজ কমে যাবে।' অবনীবাবু বললেন, 'বাজ পড়ে খুব মানুষ মরে এখানে।'

'এখানে কিচ্ছু হবে না। পাঁচিলের পাশ দিয়ে নিশ্চিন্তে চলুন। প্রত্যেকটা পাম গাছে লাইটনিং রিসেপটর লাগানো আছে। ওরা বিদ্যুৎ টেনে নিচ্ছে। তবে সাবধান, পাঁচিল টাচ করবেন না।'

ঝমঝমে বৃষ্টির মধ্যে আমরা কয়েকজন ফটক পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি বাংলোর পোর্টিকোতে। বাকিরা বাইরে।

ওমা, এ কী আশ্চর্য দৃশ্য! ঘুমন্ত পুরী হঠাৎ জেগে উঠেছে। কোথাও জনপ্রাণীর সাড়া নেই। অথচ পাশের শেডে দু-দুটো ট্রান্সফর্মারের মতো দেখতে মেশিন গমগম শব্দে চলছে। বাংলোর বাঁধানো অংশের বাইরের কাঁচা চাষের মাটিতে জালের মতো ইলেকট্রিক তার বিছানো। ফাঁকে-ফাঁকে ছোট বড় গাছ। তারের মাঝে-মাঝে চিড়িক-চিড়িক করে বিদ্যুতের ফুলকি উঠছে।

জগুমামা ফিসফিস করে বললেন, 'টুকলু! মেয়েটা মিথ্যে বলেনি রে। সব অটোমেটিক, প্রোগ্রামিং করা আছে। বাজ পড়ল। অমনি সিস্টেম চালু।...কারেন্ট ফ্লো করছে গাছে-গাছে। কিন্তু...সায়েন্টিস্ট নিজে কোথায়?'

সাড়ে চারটে বাজে। বৃষ্টি কমে আসছে। মেঘেঢাকা আকাশ সন্ধেকে দ্রুত টেনে নিয়ে আসছে।

বড় কাঠের দরজা। নানাভাবে খোলার চেষ্টা হচ্ছে, পারা যাচ্ছে না। ওসি বললেন, 'স্যর, অর্ডার করুন। ভেঙে ফেলি।'

'না-না। দাঁড়ান।' এতক্ষণ সেন্সরটাকে জগুমামার চোখে পড়েনি। তিনি দরজার ঠিক মাঝে বসানো কালো কাচের সামনে মুখ রাখলেন।

অমনি পোর্টিকোর আলোগুলো জ্বলে উঠল। দুদিকের দেয়াল ফুঁড়ে দুটো সিসি ক্যামেরা বেরিয়ে এল। এক কণ্ঠ ইংরেজিতে জিগ্যেস করল, 'প্রফেসর এ এন রায়ের ল্যাবে ওয়েলকাম। কে তুমি?'

'আমি প্রফেসর জগবন্ধু মুখার্জি। ডক্টর রায়ের সঙ্গে মিট করতে চাই।'

'তোমায় চিনতে পারছি না। দেখা হবে না।'

মামা আমার মুখের দিকে তাকালেন। পট্টনায়েক বললেন, 'কী ব্যাপার? এখানে তো দশ-বারোদিন কেউ থাকে না!'

'কম্পিউটার রেইসড ভয়েস। প্রোগ্রামিং করা আছে, তাই বলে যাচ্ছে। চলুন।' মামা নীচুগলায় বললেন, 'সন্ধের আগেই নলরাজার গড়ে পৌঁছতে হবে। এখানে গার্ড পোস্টিং থাক।'

হঠাৎ চমকে উঠলাম। স্পিকার চালু হয়ে গেছে। এবার মানুষের গলা।

'এসো, এসো জগবন্ধু মুখার্জি! তোমায় চিনব না? তোমার মতো খারাপ লোক খুব কম আছে। কালকে তো মরেই যাচ্ছিলে, কপালের জোরে বেঁচে গেছ। তোমার জন্যে আমাদের বিজ্ঞানী রাজা কোনো রেকগনিশন পায়নি। একটা পয়সাও সরকার থেকে পায়নি।'

'কে—কে তুমি?' মামা কয়েকমুহূর্তে সামলে নিয়েছেন, 'কী বাজে কথা বলছ? দরজা খোলো। নয়ত ভেঙে ঢুকব।'

'ভাঙো না! ভিতরে ঢুকে পাবে তো কাঁচকলা। কিস্যু নেই, কেউ নেই।...মুখার্জিসায়েব, তোমার কি মনে পড়ে সেইসব পুরোনো কথা? তোমার জন্যে একটা বাচ্চা মেয়ের জীবন তছনছ হয়ে গেছে! তাকে জেল খাটতে হয়েছে সাত-সাতটা বছর। তার বাবা-মা সেই শক সহ্য করতে না পেরে দুজনেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে মরে গেছে। কী-ই, এবার কিছু মনে পড়ছে তোমার?'

বাচ্চা মেয়ে! আপ্রাণ স্মৃতি হাতড়াচ্ছি। মামাও চেয়ে আছেন আমার মুখের দিকে। এরা কি কামতাপুরের রাজফ্যামিলির কথা বলছে? সেই জীবন মণ্ডল, তার শালীর মেয়ের কথা? অনিতা?

'অনিতা!' মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।

'এই তো! তোমার ভাগ্নেবাবুর ঠিক মনে পড়েছে।...তবে হ্যাঁ, এবার আর ভুল হবে না। আমরা যা চাইছি, সেটা আদায় করেই ছাড়ব।'

'তিতির, পলাশ, আজাদ...এরা কোথায়? তোমাদের খপ্পরে?'

'তোমায় বলব কেন? বদমাস বাঙ্গালি ভাটিয়া! মর গে যা—!'

বলার সঙ্গে সঙ্গে 'বুম-ম' করে কান ফাটানো শব্দ হল।

জমিতে ছড়ানো তারের ফিলামেন্টগুলো একসঙ্গে বার্স্ট করে গেল। দাউ-দাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছে চাষের ক্ষেতে।

এ কী অবস্থা হল? এখান থেকে বাইরের রাস্তায় পৌঁছব কী করে? চারপাশে আগুনের সমুদ্র! এ আগুন নিভবে কী করে?

বীভৎস পরিস্থিতি! বাংলোর চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা জমি-খেত...সর্বত্র লক-লক করে আগুন জ্বলছে। লালচে শিখা, পোড়া গন্ধ আর ধোঁয়ায় আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছে।

আমরা জাঁতাকলে আটকা পড়েছি। গেটের বাইরে দাড়িয়ে আছে পঁচিশজনের সশস্ত্র ফোর্স। ওরা কিছুই করে উঠতে পারছে না।

সোমলতা আমার বাহু চেপে ধরেছে।

'কী হবে গো টুকলুদা? ও আঙ্কল! কী হবে? আগুনগুলো যে এগিয়ে আসছে।'

জগুমামা গম্ভীর। চোখদুটো অস্থির। কোনো জবাব দিলেন না।

স্পিকার ফের সরব হয়ে উঠল। সেই লোকটা খ্যাকখ্যাক করে হাসছে। হাসতে হাসতে বলল, 'কী হে বিজ্ঞানী স্যর? কেমন লাগছে মরতে? আর কয়েক মিনিট! তারপর বাড়িটাও জ্বালিয়ে দেব। তোমাদের কোনো চিহ্ন থাকবে না!'

শিউরে উঠেছি। এভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরতে হবে? আমাদের কপালে এরকম অসহায় ইঁদুরের মৃত্যু লেখা ছিল?

এস পি জি ফোর্সের ক্যারিশমা দেখা সত্যিই বাকি ছিল। দশ মিনিটের মধ্যে ওরা হোসপাইপ ফিট করে ফেলেছে কাছাকাছি কোনো জলের সোর্সের সঙ্গে!

মোটা হোসপাইপটা এনে ফেলল ফটকের সামনে। তারপরেই ফটক থেকে পোর্টিকো পর্যন্ত আসার বাঁধানো রাস্তাটার ওপরে ফুল ফোর্সে জল স্প্রে শুরু করে দিল।

থানার বড়বাবু চেঁচিয়ে উঠেছেন, 'স্যর! ম্যাডাম! সময় নেই! সবাই আসুন...ছুটুন...বেরিয়ে আসুন জলের ফোর্সের মধ্যে দিয়ে। আসুন! আসুন! সময় নেই।'

জলস্তম্ভের মাঝখান দিয়ে ছুটছি প্রাণের দায়ে। ছুটতে-ছুটতে বেরিয়ে এলাম বাইরে। ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছি সকলে, কাঁপুনি দিচ্ছে ঠান্ডায়। কিন্তু একটুও কষ্ট হচ্ছে না। উফ! চোখের সামনে জ্বলন্ত মৃত্যুকে এগিয়ে আসতে আগে দেখিনি। আঃ, কী আরাম! কী শান্তি! জীবন এত সুন্দর।

একটা বিস্ফোরণ হল। গোটা বাড়িটা জ্বলতে শুরু করেছে।

জগুমামার পায়ের ব্যথা নিশ্চয়ই বেড়ে গেছে। খোঁড়াচ্ছেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'বাস্টার্ডরা জ্বালিয়ে দিল প্রজেকটটা। যাওয়া যাক।'

মাদারিহাট থানার ওসি পাশে এসে দাঁড়ালেন। ডিআইজি, পট্টনায়েক সবাই আছেন।

'একটা খবর আছে স্যর। বাগানের ট্রাক ছিনতাই করে ফরেস্ট দিয়ে বেরোচ্ছিল, পুলিশ স্যর সন্দেহ হওয়ায় আটকেছে। মনে হচ্ছে, এই র্যাকেটের। মোট চারজন স্যর।'

'লরির অরিজিন্যাল ড্রাইভার-খালাসিকে পাওয়া গেছে?'

'না স্যর। খোঁজ চলছে। নির্ঘাত ফরেস্টেই কোথাও আধমরা করে ফেলে রেখেছে।'

জগুমামা বললেন, 'তাহলে আগে থানাতেই চলুন। ওদেরকে জেরা করতে হবে। ল্যাজ টানলে মাথা বেরোয়।'

থানার লক আপ ফাঁকা ছিল। শুধু ওই চারজন। আমাদের দেখেই ওরা ভিতর থেকে হাউমাউ করে উঠেছে, 'স্যর। শুধুমুদু আমাদের আটকায়েছে।'

জগুমামা ওদের আপাদমস্তক দেখলেন। ওসির চেম্বারে এসে বসলাম। বেশ সাজানো গোছানো। মাদারিহাট থানা বিল্ডিংটাও নতুন।

'মামা! এদের দেখে তো কুলি-মজুর-ড্রাইভার মনে হচ্ছে। যা বেশভূষার ছিরি! লোকাল লোক।'

মামা হাসলেন। ওসিকে বললেন, 'বড়বাবু, চারটেকে নিয়ে আসুন। আরেকটা কথা, কেউ কিছু মনে করবেন না। আমি, টুকলু, ডিআইজি সায়েব, বড়বাবু আর পট্টনায়েক ছাড়া বাকি সবাই কাইন্ডলি বাইরে ওয়েট করুন। ইন্টারোগেশন শেষ হলে ডেকে নেব।'

কোমরে দড়ি বেঁধে চারজনকে হাজির করা হল। একজন যুবক, বাকি তিনজন মাঝবয়েসি। চারজনেরই পরনে আধময়লা লুঙি আর ছেঁড়াফাটা জামা। খুব করুণ মুখ করে চেয়ে আছে।

জগুমামা প্রথমেই টার্গেট করলেন যুবকটাকে। বললেন, 'এই বয়েসেই এইসব খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়লে! তোমার সামনে কত সুযোগ, ব্রাইট ফিউচার!'

'কী কইতাসেন সার!' ছেলেটা দু'হাত জড়ো করে বলল, 'আমরা গরীব মানুষ, বাগানের লরির খালাসি, তিনি ডেরাইভার। কিছু জানি না সার।'

'তাই? কিছু জান না?' বলতে-বলতে জগুমামা উঠে এগিয়ে গেলেন ছেলেটার সামনে।

সপাটে থাপ্পড় মারলেন তার গালে। একটানে ছিঁড়ে দিলেন ওর জামা।

ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল ওর ধবধবে সাদা গেঞ্জি আর গলায় মোটা সোনার চেন!

'এটা কী রে হারামজাদা? লরির খালাসির গলায় সোনা!' জগুমামা গর্জন করে উঠেছেন, 'বল! স্বীকার কর এখনি! নইলে—'

মামা রাগে কাঁপছেন, 'সব কটাকে গুলি করে মারব। তোদের লাশ পড়ে থাকবে ফরেস্টে। শেয়ালে খাবে। বল, শিগগির বল।' জগুমামার হাতে রিভলবার নাচছে।

ছেলেটা জবাব দিল না। ঘাড় শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের মতো মুখ। বোঝা যাচ্ছে, অন্য ধাতুতে তৈরি।

মামা ফট করে পাশের লোকটার জামা খিমচে ধরলেন, 'কী রে! এই যে তুই! স্বীকার যাবি, না খুলিটা উড়িয়ে দেব? ঘরে বালবাচ্চাদের কী হবে, অ্যাঁ?...এক, দুই, তিন...'

'ব-বলছি সার।' লোকটা ভেঙে পড়ল। ভয়ে থরথর করে কাঁপছে।

জগুমামা রক্তচক্ষু করে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। রিভলবার স্থির হয়ে আছে কানের ওপরে। লোকটা কাঁপতে-কাঁপতে বলতে শুরু করল।

পেশায় ড্রাইভার সে। রামু সরকার। সরাসরি 'কামতাপুরী' দল করে না। তবে জাতে রাজবংশী বলে ওদের সমর্থন করে। এরা ডাকলে অন্য কাজ ফেলে চলে আসে। অন্য সময় বড়-ছোট সবরকম গাড়ি চালায়, যখন যা পায়।

ওর সঙ্গী দুজনও বলতে গেলে একই ক্যাটেগরির। জাতে রাজবংশী। কাজ করে পাশের চা বাগানের মেশিনে। সেখানকার কোয়ার্টারেই থাকে। এরা ডেকেছে, তাই দু-তিনদিন কাজে 'নাগা' করে চলে এসেছে।

আসল নেতা হল বছর বাইশ-তেইশের ছেলেটা। ওর মতো কয়েকজন ছেলে-ছোকরা আবার 'কামতাপুর'কে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। ওর নাম ভবেশ বর্মন। কলেজ পাশ করেছে। একসময়ের কেএলও জঙ্গী মিল্টন বর্মন সম্পর্কে ওর কাকা।

ওদের দল নাকি বড় হচ্ছে। শুধু নর্থবেঙ্গল নয়, দেশ বিদেশেও ওদের সাপোর্টাররা আছে। অনেক জ্ঞানী পণ্ডিতরাও আছে। কয়েকদিন আগে রামু দুজন জ্ঞানী মানুষকে বাগডোগরা থেকে নিয়ে এসেছিল। তারা নাকি কীসব সাইন্স-টাইন্স করে। ওদের দলের যে হেড, তিনি নাকি 'রাজা'। তাঁর বাংলো আছে। অদ্ভুত নানা কাণ্ড করেন 'রাজা'। তবে তাকে রামু কখনো দেখেনি। রামু দলের সুপ্রিমোকেও দেখেনি। তিনি কে, কোথায় থাকেন, সে জানে না। ভবেশ ছাড়া নেতাদের নাম-টামও রামু বিশেষ জানে না।

নলরাজার গড়ের পিছনের জঙ্গলে সেই কয়েকজন কীসব সাইন্স-টাইন্স করছিল। সেই সময়ে খবর আসে, জঙ্গলে নাকি অদ্ভুত কাণ্ডমাণ্ড হয়েছে! পুলিশ ফোর্স আসছে। তখনই এরা ঠিক করে, এইভাবে ছোট-ছোট গ্রুপ করে ওরা তাড়াতাড়ি জঙ্গল ছেড়ে পালাবে।

পালানোর জন্যে এরা চারজন জঙ্গলের মধ্যে একটা পয়েন্টে ওৎ পেতে বসেছিল। পুলিশ ফোর্স যে জঙ্গল ঘিরে রেখেছে, ওরা আগেই জেনে গেছিল। সুভাষিণী টি এস্টেটের ট্রাককে আসতে দেখেই ওরা বাঁশ ফেলে দেয় রাস্তায়। তারপর ড্রাইভার আর খালাসিদের কাবু করে হাইজ্যাক করে ট্রাকটা চালিয়ে দেয়।

হাইওয়েতে একবার উঠে পড়তে পারলে আর ওদের টিকি ছোঁয়া যেত না। জয়গাঁ দিয়ে ভূটান পাহাড়ে পালিয়ে যেত। সেখানে এখনও নাকি বেশ কিছু কামতাপুর-পন্থীরা লুকিয়ে আছে।

'বাগানের ড্রাইভার, খালাসিদের কোথায় ফেলেছিস?' জগুমামা ফের চেঁচিয়ে ওঠেন, 'এতক্ষণ কি আর বেঁচে আছে অভাগাগুলো! নির্ঘাত লেপার্ড টেনে নিয়ে গেছে।' তাঁর সুর ভারী হয়ে এল।

'না সার। সে ভয় নাই।' রামু ড্রাইভার বলে ওঠে, 'অরা যদি জঙ্গলের ভিতরে না ঢুকে, তবে বাইচা যাবে।'

'মানে! কেন?'

'জঙ্গলের ওইখানটায় কুনো জন্তুজানোয়ার নাই। তারা আসে না।'

'কী বলছিস? জঙ্গলে কি বাউন্ডারি ওয়াল আছে নাকি? যত বাজে কথা!' জগুমামা বললেন, 'ঠিক লোকেশনটা বল।'

'বললাম ত সার। বানিয়া নদীর উপর একটা ছোট বিরিজ পড়বে। উখান থেকে সিধা।'

জগুমামা পট্টনায়েকের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, 'বুঝেছি। ওখানেই ঘাঁটি।...বড়বাবু, আপনি আগে লোকগুলোকে রেসকিউ করার পুলিশ পাঠান।'

ডিআইজি বললেন, 'আর এগুলোকে এখন লক-আপে ঢোকান।'

রামু আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, 'আমি ভিতরে যাব না সার। ভবেশ অ্যাহনি আমারে গলা টিইপে মাইরা ফ্যালাবে। আপনাদের সব কইয়া দিসি যে!'

'আচ্ছা, আচ্ছা।' জগুমামা বললেন, 'রামু এখানে থাকুক।'

হঠাৎ আমার মোবাইলটা ভাইব্রেট করতে শুরু করল। অচেনা নাম্বার।

'হ্যালো।'

'আপনি অর্ণববাবু তো?'

'হ্যাঁ। আপনি কে?'

'কেউ না। খুব আর্জেন্ট খবর। এরা একটা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এসেছে। টাটা সুমো। নাম্বার—সিক্স সিক্স নাইন নাইন। তার মধ্যে ফলস পেশেন্ট সাজিয়ে বড়গুলো পালাবে।'

'কারা? কোথায় পালাবে?'

'ধুৎ! এখনো বোঝেননি? অপদার্থ একটা!...হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা, একটু দাঁড়াও। আসছি।'

ব্যস, গলাটা চিনে ফেলেছি। যা বোঝার, বুঝে গেছি। ফোনটা কেটে দিল। শুধু ফোনের টাওয়ার লোকেশনটা দরকার।

টুং করে একটা শব্দ। মেসেজ ঢুকল ওই নম্বর থেকে। হেভেন-ইন রিসর্ট।

আবার ফোনটা ভাইব্রেট করছে। যা ব্বাবা! এ আবার ফোন করছে কেন?

'হ্যাঁ বলো! কী ব্যাপার?...ক-কী! কী বলছ?...তুমি নিজের কানে শুনেছ?...এখন কোথায়? আচ্ছা।...বলছি, মামাকে বলছি।'

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পার হয়ে গেছে। এখনও ওরা রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে।

সাত-আটটা বুনো হাতি আচমকা চার নম্বর কালভার্টের ডানদিকের জঙ্গল থেকে পরপর বেরিয়ে এসেছিল। তখন আমাদের গাড়িগুলো বড়জোর একশো গজ দূরে।

সঙ্গে সঙ্গে সবকটা গাড়ির হেডলাইট নিভিয়ে স্টার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শব্দহীন অন্ধকারে আমরা অপেক্ষা করে চলেছি, কখন গজেন্দ্রবাহিনী বিদায় নেন!

আজ আকাশ পরিষ্কার। চাঁদের আলোয় ঠিক চলমান পাহাড়ের মতো লাগছে হাতিগুলোকে। ধীরেসুস্থে ওরা ঘোরাফেরা করছে রাস্তার ওপর। কিন্তু বনের মধ্যে আর ঢুকছে না।

'মামা। কী ব্যাপার বলো তো? ওরা এদিকে আসবে নাকি?'

'আসতেই পারে! ওদের মর্জি।'

'মাই গড! তখন কী হবে মামা? ওদের পায়ের লাথিতেই তো গাড়িগুলো চেপটে দলা পাকিয়ে যাবে।'

'তা তো বটেই। হাতি খেপে গেলে ভয়ংকর। সেজন্যেই তো এমন চুপ করে ওয়েট করছি। তবে ওরা এমনি-এমনি অ্যাটাক করে না। ওই দ্যাখ, দেখেছিস?'

'হ্যাঁ, শুঁড় তুলে রেখেছে।'

'হাওয়ায় ভেসে আসা গন্ধ শুঁকছে। হাতির ঘ্রাণশক্তি খুব তীক্ষ্ন। গন্ধ না পেলে এদিকে আসবে না।'

'যদি গন্ধ পেয়ে যায়?'

'তখন তেড়ে আসতেই পারে। আমাদেরও নেমে ছুট লাগাতে হবে। কেনিয়ায় একবার পড়েছিলাম ওই সিচুয়েশনে। আরে দ্যাখ, দ্যাখ।'

তিন-চারটে হাতি নেমে পড়েছে কালভার্টের বাঁ দিকের জঙ্গলে।

মামা বললেন, ওটাই নাকি নলরাজার গড় যাওয়ার পথ। বাকিগুলো রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

হঠাৎ নৈঃশব্দ্য কাঁপিয়ে বনের মধ্য থেকে পরপর বৃংহন! হাতিদের ডাক! এখান থেকে মনে হচ্ছে, বনের মধ্যে যেন তাণ্ডব চলছে। গাছপালা ভাঙচুরের মড়মড় শব্দ ভেসে আসছে।

কয়েক মিনিট! তারপরেই যে ক'টা হাতি ওপারের বনে নেমেছিল, লাফাতে-লাফাতে উঠে এল রাস্তার উপরে। ডাক ছেড়ে, শুঁড় নেড়ে-নেড়ে নিজেদের মধ্যে কথা হল। বেশ কয়েকবার নিস্তব্ধ বনভূমি কাঁপিয়ে আওয়াজ ছাড়ল।

তারপর বনের যেদিক থেকে এসেছিল, সুড়সুড় করে সেদিকেই ঢুকে গেল।

'কিছু বুঝলি?' মামা রুদ্ধশ্বাসে বললেন, 'হাতিরাও ওই বনে ঢুকল না।'

গাড়িগুলো এখনও স্টার্ট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে। হাতির পাল কতদূর চলে গেছে, সেটা আঁচ করে নিচ্ছে অভিজ্ঞ সারথীরা। তারপর স্টার্ট দেবে।

রওনা হওয়ার আগেই জেনেছি, হেভেন ইন রিসর্টের চারিদিক সাদা পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের খবর এখনও পাইনি। তবে সর্বত্র গাড়ির নাম্বার দেওয়া হয়ে গেছে।

আমাদের সঙ্গে রয়েছে সেই রামু ড্রাইভার।

গাড়ির কনভয় স্টার্ট দিল। এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যে চার নম্বর কালভার্টের কাছে এসে দাঁড়াল।

থমথম করছে অরণ্য। কোথাও কোনো শব্দ নেই। মস্তবড় সশস্ত্র দল বনের মধ্যে নেমে পড়ল।

সামনে রামু ড্রাইভার। চতুর্দিকে কর্ডন করে ফোর্স। অটোমেটিক রাইফেল ছাড়াও সঙ্গে আনা হয়েছে কেরোসিন আর পেট্রলের বড় বড় জেরিকেন। আর আছে লাঠির ডগায় কাপড় জড়ানো কয়েকটা মশাল।

মামাকে জিগ্যেস করতে সূক্ষ্ম হেসে বলেছেন, 'দ্যাখ না, কী হয়! তেমন হলে বনে আগুন লাগিয়ে দিতে হবে।'

নিশ্চিত মামা কিছু ইঙ্গিত পেয়েছেন। কারণ বেরোনোর আগে জগুমামা সকলকে ঘর থেকে বার করে রামুর সঙ্গে আলাদা কথা বলেছেন।

বড় বড় টর্চের আলোয় বনের ভেতর এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। আঁকাবাঁকা শুড়ি পথ দিয়ে রামু দলটাকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

কিন্তু কী আশ্চর্য! বড় জন্তু দূরে থাক, ছোটখাট খরগোশ, বেড়াল কি বুনো কুকুর কিচ্ছু চোখে পড়ছে না। ঝোপঝাড়ে খড়মড় শব্দ নেই! এমন কী এত জোরালো টর্চের আলোতেও অন্ধকার গাছগুলো থেকে পাখির ডানা ঝটপটানির শব্দ উঠছে না!

জগুমামা চতুর্দিকে দেখতে-দেখতে হাঁটছেন। বিড়বিড় করে উঠলেন, 'ওই ঢিবিটা কোথায় গেল?...অ্যাই রামু! দাঁড়া তো!...মনে হচ্ছে, আমি ওইদিকের পথটা নিয়েছিলাম।'

জগুমামা বাঁদিকে ঘুরতে যাচ্ছিলেন। পিছন থেকে পট্টনায়েক বলে উঠলেন, 'প্লিস ডক্টর মুখার্জি! আপনার ওই স্পটে পৌঁছোনোর চেয়ে অনেক আর্জেন্ট ক্রিমিন্যালদের ডেনে পৌঁছে যাওয়া। ওরা নিশ্চয়ই চুপ করে বসে নেই।'

'সিওর, সিওর পট্টনায়েক।' জগুমামা থমকে দাঁড়িয়েছেন। লজ্জিতভাবে বললেন, 'আমি আজকাল বড্ড বেশি হাইপার হয়ে যাচ্ছি। চল রামু।'

থমথমে স্তব্ধ জঙ্গল। মাঝে মাঝে হাওয়া দিচ্ছে, পাতার ঝরঝর শব্দ উঠছে। টর্চের আলোর সুড়ঙ্গ দিয়ে, ভিজে জমিতে মচমচ শব্দ তুলে আমরা ঢুকে যাচ্ছি আরও গভীরে।

কিন্তু চারজনে কর্ডন করে আর এগোনো যাচ্ছে না। গাছেরা এত জমাট বেঁধে যাচ্ছে, বিশাল-বিশাল মহীরূহ আর লতাগুল্মের ঝোপঝাড় এমন ঘেঁষাঘেঁষি করে পরস্পরকে আঁকড়ে আছে, লাইনটা চওড়ায় ক্রমেই সরু হয়ে যাচ্ছে। চার থেকে তিন, দুই হয়ে এখন মাত্র এক। একজন-একজন করেই এগোতে হচ্ছে।

রামুর পিছনেই জগুমামা। বললেন, 'রামু! এই পথে তোরা যাতায়াত করতিস? সম্ভব নাকি?'

'শটকাটে করতাম স্যর! গড় যাওয়ার বড় রাস্তা ধরলে সময় অনেক বেশি লাগে। তবে রাতে এ পথ ধরা মানা ছিল।'

'কেন? কেন?'

'সে জানি না সার। নেতারা হুকুম দিত। কখনও জিগ্যাস করিনি। তবে আপনারে তো কইছি, অরা অনেক জ্ঞেনী ছিল। নিজেদের মধ্যে নানা আলোচনা করত। রাতের বেলা কেরাসিন ছড়াত। ওইজন্যেই আপনারে কইলাম কেরাসিন নিতে।'

আমাদের রাতের এই জঙ্গল-অভিযানে প্রায় সকলেই আছেন। শুধু দুজন ছাড়া। একজন মাদারিহাট থানার বড়বাবু, অন্যজন অনন্ত সরখেল। অনন্তবাবু অনেক উপরোধ-অনুরোধ করেছেন থানায় বসে, মামা কানে তোলেননি।

হঠাৎ মামা দাঁড়িয়ে পড়েছেন। জোরে-জোরে নাক টানছেন।

বললেন, 'কেউ কোনো গন্ধ পাচ্ছেন? পিকিউলিয়র স্মেল?'

'আপনার গন্ধবাতিক হয়েছে ডক্টর মুখার্জি!' সত্যসাধন পট্টনায়েক হেসে উঠলেন, 'সেই কাল রাত থেকে খালি গন্ধ পাচ্ছেন। হ্যাঁ, গন্ধ পাচ্ছি। বনের গাছপালার গন্ধ। কী ডিআইজি সায়েব?'

পিছন থেকে সোমলতা চেঁচিয়ে বলল, 'হ্যাঁ আঙ্কল! আমি একটু-একটু পাচ্ছি! মদ-মদ গন্ধ।'

'পাচ্ছ তো মামণি?' জগুমামা বললেন, 'প্লিস হল্ট। টুকলু! শিগগির পিছনে যা! হেড কাউন্ট কর! ডিআইজি সায়েব, আমরা মোট ক'জন? আই মিন, সবাইকে ধরে?'

'আমরা?' দলটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। ডি আই জি বললেন, 'পুলিশ থেকে দশ, এসপিজি দশ, আর এদিকে ডিএসপি, সিআই, আমি আর আপনারা এক দুই তিন...পাঁচজন। মোট আটাশজন।'

'মামা! মামা!' আতঙ্কে আমি চেঁচিয়ে উঠেছি, 'হিসেব মিলছে না। একজন কম হচ্ছে। সাতাশজন।'

'দেখেছেন? দেখেছেন?' জগুমামা প্রচণ্ড উত্তেজিত, 'বলেছিলাম!'

'অ্যাবাউট টার্ন।' ডিআইজি-র চিৎকারে পুরো বাহিনী পিছনদিকে ছুটতে শুরু করল।

'তেলে চুবিয়ে মশাল জ্বালো! কেরোসিন, পেট্রল—যা হাতে আছে, ছুঁড়তে-ছুঁড়তে যাও।' জগুমামাও চেঁচিয়ে উঠেছেন।

মশাল জ্বলছে। টিন-টিন কেরোসিন-পেট্রল ছোঁড়া হচ্ছে আশেপাশের গাছপালা লক্ষ্য করে। কটু উগ্র গন্ধে জঙ্গল ঝাঁ-ঝাঁ করছে।

'উঃ মাগো! অসহ্য!' সোমলতা বেচারি গন্ধ সহ্য করতে পারে না।

সকলেই ছুটছে পিছন দিকে। প্রায় এক কিলোমিটার পরে লোকটাকে পাওয়া গেল। পুলিশের একজন হাবিলদার। তখনও আমাদের কেরোসিন ছোঁড়া চলছে।

বেঁহুশ হয়ে পড়ে আছে লোকটা। বন্দুক দূরে পড়ে। খাকি উর্দি এবং প্যান্ট ছিন্নভিন্ন। মনে হচ্ছে, কেউ বা কারা ওকে পায়ের দিক থেকে গিলে খাওয়ার উপক্রম করেছিল। জুতো গড়াগড়ি খাচ্ছে। একপায়ে মোজা নেই। সেখানে গভীর ক্ষত। অন্য মোজাটার ওপর চটচটে রস।

'বীভৎস! ভয়ংকর!' চতুর্দিকে চোখ ঘোরাতে-ঘোরাতে ডিআইজি বললেন, 'অথচ কোত্থাও কিছু নেই। কী ব্যাপার বলুন তো ডক্টর মুখার্জি?'

'আছে, আছে সায়েব।' জগুমামা বললেন, 'ওরা জঙ্গলের মধ্যে মিশে থাকে, লুকিয়ে থাকে। আপনার কনস্টেবল ফুল ড্রেসড ছিল, তাই তাড়াতাড়ি গিলতে পারেনি। তবে আমরা যদি ব্যাক না করে আসতাম, কাল এই লোকটার হাড়গোড় পাওয়া যেত ঢিবিটার কাছে।'

'এক্সট্রিমলি সরি ডক্টর মুখার্জি।' মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন পট্টনায়েক। অস্ফুটে বললেন, 'মাই সিনসিয়ার অ্যাপোলজি—।'

'আরে নাঃ! কোনো ব্যাপারই নয়।' মামা বললেন, 'এই লোকটাকে এখনই হসপিটালাইস করা দরকার।'

দুটো গাড়ি থেকে ড্রাইভার চলে এল। আমাদের দল থেকে একজন সঙ্গে গেল।

ফের রওনা হলাম পুরোনো পথে...বনের মধ্যে।

এখনও বনের পথে, ঝোপেঝাড়ে-গাছপালায়...সর্বত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে পেট্রল আর কেরোসিনের গন্ধ। সোমলতা নাক চাপা দিয়ে সমানে বিড়বিড় করে যাচ্ছে।

আমার অবশ্য পেট্রোলিয়ামের যে-কোনো গন্ধই ভালো লাগে।

এখন আরও ভালো লাগছে। কারণ—আগেরবার যখন বনের মধ্যে ঢুকেছিলাম, কীরকম চাপা-চাপা লাগছিল। খালি মনে হচ্ছিল, চারদিক থেকে কারা যেন আমাদের চেপে ধরতে আসছে।

এবার মনে হচ্ছে, এই জঙ্গল মুক্ত হয়ে গেছে। আর কেউ আমাদের চেপে ধরবে না। কেন মনে হচ্ছে, জানি না। তবে সকলেরই গতি বেড়ে গেছে।

হাঁটতে-হাঁটতে রামু শ্বাস ফেলে বলল, 'সার। আপনারা দলে ভারী ছিলেন, তাই আজ পুলিশটা বাইচা গেল। একরাতে এই জঙ্গলে ঢুকে আমাদের এক দোস্ত হারায়ে গেছল। আর তারে পাইনি। বনে তার ছেড়া লুঙি আর জামাখান পইড়ে ছিল।'

'সে কী!' জগুমামা বললেন, 'তোদের দলের লোক! তোরা কেউ কিছু বললি না?'

'কইছিলাম সার। ভবেশ কয়, স্বাধীন দেশ চাইবা, বলিদান দেবা না! কেরাসিন না নিয়া ও গেছে ক্যান? ওর কপালে মরণ ছিল। অমন দু-চারখান পেরান গেলে যাবে, পিছায়ে পড়লে হবে না!...এ জঙ্গলে প্রচুর পেরেত আছে সার। অরা ছাইড়ে রাখছে।'

'নিজে কখনো দেখেছিস?'

'হাঁ সার। একবার এই জঙ্গলে সার...তবে ভগবান বাচায়ে দিছে। হাতে সেইদিন কাটারি ছিল। সেই কালো ভূতগুলান যেই ঘিরে ধরছে, কাটারি চালায়ে দিছি। অরা সরে গেছে। আমিও দৌড় দিছি।...তবে অরা এমন বিষ ছাড়ছিল, ঘরে ফিরে বেহুঁশ ঘুমাইছি।'

পাশে জলের কলকল শব্দ। গাছের ফাঁক দিয়ে মরা চাঁদের আলোয় দেখলাম, আবার একটা নদী।

'কীরে রামু! নদীর কাছে ফিরে এলাম নাকি?' মামা বললেন।

'না সার। বানিয়া নদীর শাখা এইটি।...কিছু দ্যাখতে পান সার?'

'হ্যাঁ-হ্যাঁ। ওটাই কি তোদের নলরাজার গড়?'

'হ্যাঁ সার। ওটারে পেরায়ে পিছনে আরও খানিক যেতে হবে।'

জগুমামা বলে উঠলেন, 'সবাই অ্যাটেনশন। টর্চ নেভাও। মশাল নেভাও। একটু-একটু করে কেরোসিন ছড়াও।'

জঙ্গল একটু পাতলা হয়ে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে ভগ্নস্তুপ। আগাছা-ঝোপঝাড়ের মাঝে বড় বড় থাম, অট্টালিকার খিলান, প্রধান ফটকের আভাস। দুর্গের আদল।

ডিআইজি বললেন, 'ডক্টর মুখার্জি, জানেন বোধহয়, এটা একটা টুরিস্ট স্পট। অনেকেই দেখতে আসে। তবে দিনের বেলা।'

'নলরাজার গড় কেন বলে জানেন?'

'আমার মনে হয় কিছুটা ইতিহাস, কিছুটা কল্পনা। বলা হয়, গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ দিকে সমুদ্রগুপ্তের বংশধরেরা নাকি পাঠানদের তাড়া খেয়ে এখানে চলে আসে। তাদেরই কোনো একজন ছিল নলরাজা। সত্যি-মিথ্যে জানি না। তবে কামতাপুর রাজাদের রাজধানী যে এটা ছিল, তার প্রমাণ আছে।'

'হুম।' জগুমামা বললেন, 'সেইজন্যেই নব্য কামতাপুরীরা এর আশেপাশে ঘাঁটি গেড়েছে।...কিন্তু কোথায়?'

'ওই যে সার।' রামু বলে উঠল।

দুর্গ-অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে যাওয়ার কিছুটা পরেই একটা খোলা মাঠ। তার মধ্যে সারি-সারি অন্ধকার টেন্ট বা তাঁবু। গোল বৃত্তাকারে তাঁবুগুলো সাজানো।

একবিন্দু আলোর চিহ্ন নেই।

'সব অন্ধকার।' জগুমামা বললেন, 'তার মানে ভিতরে তোদের কেউ নেই?'

'খবর পেয়ে নিশ্চয় পলায়ে গেছে সার।' রামু বলল, 'আমরা যখন ছিলাম, তখন অন্দরে অনেকে ছিল। গলা পাইছি। বাইরে গাড়িও ছিল দু-তিনখান। তবু একবার চলেন। এট্টু কাছে যাই।'

'সাবধান ফোর্স! অ্যাটেনশন।' ডিআইজি বলে উঠলেন, 'রাইফেল রেডি।'

'রামু, তোর মোবাইল থেকে একটা ফোন করে দ্যাখ।'

'কাকে করব সার? আমার কাছে শুদু ভবেশের নম্বরটাই আছে। নেতাদের সাথে ও কনটাক রাখত।'

রাত গভীর। ঘড়ির কাঁটা একটা ছুঁই-ছুঁই। ছেঁড়া-ছেঁড়া বনের মধ্যে দিয়ে ছাব্বিশজনের দল নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছে।

'গার্ড নিয়ে চলুন।' জগুমামা বললেন, 'যে-কোনো সময় ওদিক থেকে ফায়ারিং স্টার্ট করতে পারে।'

আস্তে-আস্তে গাছেদের আড়ালে-আড়ালে এগোচ্ছি। তাঁবুগুলোকে ঘিরে ফেলছে ফোর্স। উত্তেজনায় টানটান হয়ে আছি। এনকাউন্টার কি আসন্ন?

'ডক্টর মুখার্জি, আমরা কি এবার—'

ডিআইজি সাহেবের কথা শেষ হল না। অকস্মাৎ ঘুমন্ত বন জেগে উঠল।

নৈঃশব্দ্য ভেঙে গমগম করে উঠল সেই চেনা কণ্ঠ, 'ওয়েলকাম! ওয়েলকাম এগেইন জগবন্ধু মুখার্জি!'

কে—কে? কোথা থেকে কথা বলছে? ত্রিসীমানায় কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

জগুমামা ফিসফিস করে বললেন, 'গাছেদের মাথায় সিসি ক্যামেরা আর স্পিকার! ওই যে!'

'তার মানে ওরা টেন্টে আছে? সাবধান!'

'নট লাইকলি। পুরোটাই রিমোটে হতে পারে। যেমন প্রফেসর রায়ের বাড়িতে হয়েছিল।...তবুও কসাস হওয়া উচিত।...স্টপ! স্টপ!'

ফোর্স থমকে দাঁড়িয়েছে পজিশন নিয়ে।

স্পিকার ফের কথা বলে উঠল, 'কী হল? থেমে গেলে কেন? এসো জগবন্ধু! এসো ভারতীয় পুলিশ! আমাদের ধরবে না? এত ভয়!'

হা-হা করে হেসে উঠল লোকটা। অসহ্য!

'ফায়ার! ফায়ার!' ডিআইজি চেঁচিয়ে উঠলেন।

ঝাঁকে-ঝাঁকে গুলি ছুটে গেল অন্ধকার তাঁবুদের লক্ষ্য করে।

'হাঃ হাঃ হাঃ—!' অলক্ষ্য থেকে মেঘনাদ ফের হেসে উঠল, 'বাব্বা! কী বীরপুরুষ! কাকে ফায়ার করছ? ছায়ার সঙ্গে কুস্তি করছ নাকি?...তোমাদের জন্যে কি আমরা বরণডালা সাজিয়ে বসে আছি? বোকার হদ্দ, সব ইডিয়ট! হাঃ হাঃ হাঃ!'

গুলি বন্ধ। ডিআইজি রাগে গজরাচ্ছেন, 'শুনছেন? স্কাউন্ড্রেলটা আমাদের ভ্যাঙাচ্ছে। ওদেরকে—'

'কুল ডাউন সায়েব।' জগুমামা বললেন, 'ওরা যদি এখানে কেউ না থাকে, তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? আজ সকাল থেকে পুলিশের ফরেস্ট ঘিরে থাকার কথা। তার ফাঁক দিয়ে ওরা পালাল কেমন করে? নিশ্চয়ই আপনাদের পুলিশের মধ্যে কেউ—'

'ইমপসিবল ডক্টর মুখার্জি।' ডিআইজি মামাকে থামিয়ে দিলেন, 'চলুন তো! আমি সিওর, ওরা আমাদের মিসগাইড করছে। ফোর্স! মুভ উইথ ফায়ারিং।'

আবার ফায়ারিং শুরু। আর্মড ফোর্স কর্ডনিং করে এগোচ্ছে।

কিন্তু প্রতিপক্ষ যে নিরুত্তর। অন্ধকারে ভূতের মতো গোল হয়ে আছে টেন্টগুলো।

প্রথম সারিতে পুলিশ ও এসপিজি। একরাউন্ড গুলি করছে, কয়েক কদম এগোচ্ছে। একটু থামছে, ফের এগোচ্ছে।

ঠিক যেন যুদ্ধক্ষেত্র।

পিছনের সারিতে আমরা। জগুমামা, ডিআইজি ও অন্যদের খরদৃষ্টি ঘুরছে সবদিকে।

বেশ কাছে এসে পড়েছি। ছোট-ছোট তাঁবুর ফাঁক দিয়ে এবার চোখে পড়ল, ঠিক মধ্যিখানে আরেকটা মস্ত তাঁবু। সেটাও অন্ধকার। ব্যাপারটা কী?

ভাবতে না ভাবতে আবার সরব মেঘনাদ!

'বাঃ বাঃ! এসো জগবন্ধু, এসো বন্ধুরা। আরও কাছে এসো! এসো—!'

বুম-বুম! বুম-বুম! বুম-বুম!

বিকট শব্দে বিস্ফোরণ! বিস্ফোরণের পর বিস্ফোরণ!

একী! একী! ছোট-ছোট টেন্টগুলো বোমার মতো দুম-দুম করে ফাটছে। আগুনের বড়-বড় গোলা লাফিয়ে উঠছে, ছিটকে-ছিটকে যাচ্ছে চতুর্দিকে।

নিমেষে সবাই মাটিতে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়েছে। আগুনের তাপ এসে লাগছে আমাদের গায়ে।

অবর্ণনীয় দৃশ্য। নিকষ অন্ধকার আকাশে যেন মহাকায় সব আতসবাজি ফাটছে।

কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সব গুলিয়ে যাচ্ছে। এরা কোত্থেকে অপারেট করছে? এদের অপারেশনের সেন্ট্রাল হাব কোথায়? এরা কারা?

ঘট-ঘট-ট্যার-ট্যার-ট্যার! অন্যরকম আওয়াজ!

মুখ তুলতেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। দাউ-দাউ আগুনের ব্যারিকেড ঘিরে আছে সার্কেল করে। তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ঠিক মধ্যিখানের মস্তবড় তাঁবুটা আর নেই!

তার বদলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একখানা কালো হেলিকপ্টার। এ কী ম্যাজিক? তার প্রপেলার ভীষণ জোরে ঘুরতে শুরু করেছে।

'ফায়ার! ফায়ার!' ফোর্স ঝটিতি উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ফায়ারিং-এর আগেই যন্ত্রপাখিটা দুলতে-দুলতে মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে পড়েছে।

ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু লাভ হল না। চোখের সামনেই হেলিকপ্টার উঠে যাচ্ছে উপরে...আরও উপরে। মুখ ঘুরিয়েছে উত্তরের দিকে।

জগুমামা চিৎকার করছেন, 'শিগগির বলুন বিএসএফ-কে! ওরা নির্ঘাত ভূটান যাচ্ছে।'

ডিআইজি ফোন করছেন, 'হ্যালো! হ্যালো।...' হেলিকপ্টারটা অন্ধকার আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু বিন্দু বিন্দু আলো দেখা যাচ্ছে।

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র বাহিনী। নাকের ডগা দিয়ে ওরা ক্যামোফ্লেজ করে পালিয়ে গেল। কিছুই করতে পারল না কেউ!

ধপ করে বসে পড়লেন জগুমামা। জগুমামার বডি ল্যাঙ্গুয়েজে হেরে যাওয়ার কষ্ট। স্বগতোক্তি করলেন, 'সত্যিই আমরা ইডিয়ট। মধ্যের তাঁবুটা যে আসলে কপ্টারের হ্যাঙার, বুঝতেই পারিনি!'

পট্টনায়েক এসে জগুমামার পিঠে হাত রাখলেন। জগুমামা মুখ তুলে তাকালেন। বললেন, 'দেশের পরিস্থিতি বেশ খারাপ পট্টনায়েক। এরা কিন্তু শুধু কামতাপুরী নেটওয়ার্কের লোক নয়।...নাটের গুরুগুলো পালিয়ে গেল! কিছুই করতে পারলাম না।'

কখন যে আকাশে মেঘ জমেছে, কারও চোখে পড়েনি। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল।

ফটাফট অনেক ছাতা খুলে গেছে। ডিআইজি বললেন, 'চলুন ডক্টর মুখার্জি। অ্যাম্বুলেন্সটা হাইওয়েতে ধরা পড়েছে। সাতজন ছিল ওর মধ্যে।'

'হ্যাঁ, চলুন। জগুমামা উঠে দাঁড়িয়েছেন। বললেন, 'উঃ! আবার অতখানি জঙ্গল ভাঙতে হবে। পায়ে বেশ ব্যথা হচ্ছে।'

'না স্যর। আমরা ফরেস্ট ক্রস করে গেছি।' আরেক পুলিশকর্তা বললেন, 'এদিকে আরেকটা রাস্তা আছে। গাড়িগুলো আনতে বলেছি।'

'রামু...রামু কই?' মামা বললেন।

'এই যে সার।' রামু এসে দাঁড়াল। ভয়ের গলায় বলল, 'দ্যাখলেন তো সার! আমারেও অরা বাঁচতে দেবে না।'

গাড়িতে উঠে বসেছি। সামনে পট্টনায়েক। পিছনে জগুমামা, সোমলতা আর আমি।

'আমরা এখন কোথায় যাব?' পট্টনায়েক বললেন।

'বাগানের বাংলোয়। তিতিরকে তুলে আনুন রিসর্ট থেকে। ও চাইলে ওর বাবাকেও। সামনাসামনি বসে কথা বলতে হবে।'

'আর জঙ্গলের ওই ভয়ানক ভূতুড়ে ব্যাপারটা? কিছু কি আঁচ করতে পেরেছেন ডক্টর মুখার্জি?'

'একটু-একটু মনে হচ্ছে, পেরেছি। আজ কনস্টেবল লোকটাকে কাছ থেকে এক্সামিন করে একটা ধারণা হচ্ছে। কী মামণি? তোমার কিছু মনে হচ্ছে না?'

'আমার? হ্যাঁ আঙ্কল, হচ্ছে। আবার বিশ্বাসও হতে চাইছে না। দাঁড়ান আঙ্কল! এটা ওই পুলিশটার হাতের মুঠোর মধ্যে ছিল। দেখাচ্ছি।'

সোমলতা জিনসের পকেট থেকে একটা অদ্ভুত বস্তু বের করল।

গাড়ির ভেতরের লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছেন পট্টনায়েক। কচুগাছের একটুকরো কাণ্ড বলে মনে হল। ওইরকম নরম শাঁসালো।

'বাঃ বাঃ।' জগুমামা ওর হাত থেকে গাছের অংশটা নিয়ে ঘুরিয়ে- ফিরিয়ে দেখছেন। তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠেছে, 'এটা দারুণ কাজ করেছ মামণি।'

বলতে-বলতে নাকের সামনে ধরেছেন। সোমলতা বলে উঠল, 'এখন আর গন্ধ নেই আঙ্কল। শুকিয়ে গেছে। তখন ছিল। ওইরকম গন্ধ।'

একটু চুপ করে থেকে বলল, 'বি.এসসি-র এক্সকারশনে গেছিলাম জয়ন্তী হিলসে। তখন স্যর আমাদের দেখিয়েছিল।...এটা কি সেটাই?'

'মনে হচ্ছে।' জগুমামা বললেন, 'তিতির আমায় যে মেল করেছিল, তাতে এর হিন্টস ছিল।...পট্টনায়েক! বুঝলেন, সারা পৃথিবী জুড়ে নানা যুদ্ধ চলছে। তারই একটা হচ্ছে বায়োলজিক্যাল ওয়ার।'

'এই যে! এই যে আঙ্কল! পেয়েছি!' সোমলতা চেঁচিয়ে উঠল, 'ওরেব্বাস! অ্যাত্তবড়! মানুষের চেয়েও বড়!'

আমরা ছুটে গেলাম ওর কাছে। সোমলতা স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে আছে সামনের বড় ঝোপটার দিকে। বিড়বিড় করছে, 'মাই গড! ওদের রুট কোথায়?'

শাল-সেগুন-খয়ের গাছেদের গা ঘেঁষে ফুল-পাতা-গুল্মের মধ্যে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে ওরা। উজ্জ্বল-লাল-গোলাপি হলুদ রঙের একেকজন। ঠিক মামা যেমন বলেছিলেন, সুরাপাত্রের মতো দেখতে। প্রত্যেকের মাথার উপরে টুপির মতো একটা আধখোলা ঢাকনা।

'কলস উদ্ভিদ! পিচার প্ল্যান্ট!' জগুমামা হাঁ হয়ে দেখছেন। বললেন, 'এই জঙ্গলে হয় নাকি? কোনোদিন শুনিনি! তাছাড়া...তাছাড়া এগুলো তো শিকার ধরার কলসি বা ট্র্যাপ! লিফ-স্টেম...মূল গাছটা কোথায়?'

'সেটাই তো ভাবছি আঙ্কল।' সোমলতা বলল, 'তবে আমাদের দেশে পিচার প্ল্যান্ট আছে। কাল বলছিলাম না আঙ্কল, নর্থ ইস্টের জঙ্গলে দেখেছি। যদ্দূর মনে পড়ছে, নাম নেপেনথিস খাসিয়ানা। হার্বেরিয়ামের জন্যে কালেক্ট করেছিলাম। তবে সে হচ্ছে বড়জোর বিঘৎখানেক—অ্যাত্তটুকু! খুদে পোকামাকড় ওদের আঠায় আটকায়!'

'আইব্বাপ! গাছ জন্তু-মানুষ ধরে-ধরে খাচ্ছে!' অনন্ত সরখেল পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তার চোখ রাজভোগ, 'কী ভয়ানক জায়গা স্যার। আপনাকে খাবে বলে তাড়া করেছিল!' বলতে-বলতে নিজেই তিনটে লাফ কেটে পেছিয়ে গেলেন।

'আমি একটা নিয়ে যাব আপনার জন্যে। আপনার বাড়িতে পুঁতে দেব। সোমলতা টেক কেয়ার করবে। কী, ভালো হবে না?'

'ছ্যাবলামি সবসময় ভালো লাগে না টুকলু!' অনন্ত খ্যাক করে উঠলেন।

আজ সূর্যোদয়ের পর থেকে জঙ্গলের এই অঞ্চল জুড়ে দক্ষযজ্ঞ আরম্ভ হয়েছে।

চার নাম্বার কালভার্টের পাশ দিয়ে পরপর চারটে বুলডোজার নেমেছে। গড়গড় করে সেগুলো বনের একেকটা জায়গায় ঢুকছে, যান্ত্রিক বেলচা দিয়ে উপড়ে ফেলছে ঝোপঝাড়। এত ঘন জঙ্গলে একটা পাখি পর্যন্ত চোখে পড়ে নি।

সাফ করতে-করতে বুলডোজার পৌঁছে গেছে হাড়গোড়ের ঢিবিটার কাছে। আর ওই ঢিবির কাছে ঝোপঝাড়-লতাগুল্মের মধ্যেই ওদের আস্তানা।

এখন ওরা অতি নিরীহ। গতিহীন। ভাবলেই গা কেঁপে উঠছে, অন্ধকার নামলে এরাই বেরোয় শিকারের খোঁজে!

তিতির রায় বর্মন একটু দূরে চুপ করে দাঁড়িয়ে। মামা ডাকলেন, 'তিতির! এদের ব্যাপারে কিছু জান?'

তিতির ঘাড় নাড়ল। আস্তে-আস্তে বলল, 'আগে জানতাম না। পরে সত্যিটা জেনেছি। এদেরকে বানানো হয়েছে।'

'বানানো হয়েছে?'

'হ্যাঁ স্যর। থমথমে গলায় তিতির বলল, 'সবকিছুই হয়েছে কামতাপুর স্বাধীন করার জন্যে। জঙ্গলে এমন এক অ্যাম্বিয়েন্স সৃষ্টি হবে, কেউ এদিক মাড়াবে না। জন্তু-জানোয়ার-মানুষ, কেউ না। একটা থ্রেট। এরা পাহারা দেবে নিঃশব্দে। ভিতরে-ভিতরে প্ল্যানিং চলবে।...

'কিন্তু ম্যাডাম, পিচার প্ল্যান্টের এই কলস-ফাঁদ আলাদা অরগ্যান হিসেবে পাতা থেকে বেরোয়। মূল গাছটা মাটিতে শিকড় ঢুকিয়ে থাকে।' সোমলতা বলল, 'এখানে সেটা কই?'

'এখানে কলসটাই গাছ। বায়ো-টেকনোলজির সাহায্যে এই ক্রিয়েশন হয়েছে। ইটস আ নিউ ক্রিচার।' তিতির বললেন, 'তুমি নিশ্চয়ই শুনেছ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিচার-প্ল্যান্ট হচ্ছে নেপেনথিস রাজা। বোর্নিও-মালয়েশিয়ার পাহাড়ি জঙ্গলে পাওয়া যায়। তবে সেও বড়জোর দেড় ফুট। তার জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে, কলসের নীচে ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের নিউম্যাটোফোর বা শ্বাসমূল জুড়ে একে সৃষ্টি করা হয়েছে। ওই নিউম্যাটোফোরের ওপর ভর দিয়েই চলাফেরা ওরা করত।'

একটু থেমে বললেন, 'বাবা সবকিছুই আমার সঙ্গে শেয়ার করত। এটাও বাবার আইডিয়া। একটা ইউনিক কনসেপ্ট ছিল। কিন্তু সেটাকে পুরো উল্টে দিল ওরা। তাই নিয়েই তো বাবার সঙ্গে অশান্তি বাধল। ওরা বাবাকে গুম করে রাখল।'

'ইউনিক কনসেপ্ট ছিল!' জগুমামা বললেন, 'কীরকম?'

'স্যর, এই পিচার প্ল্যান্টের মধ্যে পাওয়ার স্টোরেজ হবে। অন্ধকার হলে আলো ছড়াবে। ভেবে দেখুন স্যর, কত ইলেকট্রিসিটি সাশ্রয় হবে। রাস্তার ধারে ধারে এদের বসানো থাকবে। জীবন্ত ল্যাম্পপোস্ট।'

'কিন্তু পাওয়ার আসবে কোত্থেকে?'

'কেন স্যর, নেচার থেকে। সোলার এনার্জি, লাইটনিং এনার্জি...। প্রকৃতিতে এনার্জি কিছু কম আছে স্যর?'

এই সময় হঠাৎ কোত্থেকে ছুটতে-ছুটতে এসে হাজির হল রামু। তার হাতে মস্ত একখানা কাটারি। ভয়ানক উত্তেজিত।

'খবর পালাম, শয়তানগুলান এখানেই আছে।' রামু হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, 'আমার বন্ধুরে খাইছে। আমারেও খাইত। পিরথিবীর জঞ্জাল! আজ নিজের হাতে কাটব, যে কটারে পারি।'

বলতে-বলতে সে উদ্ভিদগুলোর কাছে গিয়ে এলোপাথাড়ি কাটারি চালাতে শুরু করল। অবাক হয়ে দেখলাম, উদ্ভিদগুলোর কাটা-কাটা অংশ থেকে রক্তের মতো টকটকে লাল রস গড়াচ্ছে। আর বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছে অবশ-করা তীব্র মদ-মদ গন্ধ।

'থামো! থামো!' পট্টনায়েক বললেন, 'এভাবে কোরো না। এই রস, কাটা টুকরোগুলো জমিতে পড়ছে। তাদের থেকে এই ভয়ংকর গাছ ফের গজাতে পারে। বুলডোজার দিয়ে সবশুদ্ধ উপড়ে গাছগুলো জ্বালিয়ে দিতে হবে।'

পট্টনায়েকের ফোন বেজে উঠল।

'হ্যালো।...আচ্ছা।...যাচ্ছি।' ফোন রেখে বললেন, 'চলুন ডক্টর মুখার্জি। ডিআইজি বললেন, সবাই এসে গেছে।...চলো তিতির। তোমার বাবা আর সবাইকে মাদারিহাট থানাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।'

'প্রফেসর রায়। এবারের মতো মোটামুটি খেলা শেষ। অবশ্য উল্টোদিক দিয়ে বলাই যায়, নতুন খেলা শুরুর আগে।'

'শুরুর আগে কেন বললেন ডক্টর মুখার্জি?' ডিআইজি বললেন।

'তার কারণ আসল ক্রিমিন্যালদের ধরতে পারিনি।' জগুমামা বললেন, 'এমনকী এদিককার কয়েকটা মাথাও ওদের সঙ্গে পালিয়ে গেল। এখনই হয়ত এখানে অশান্তি শুরু হবে না। এতবড় দেশের অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে...এ খেলা চলতেই থাকে।'

একটু থেমে বললেন, 'প্রফেসর রায়, আমার কয়েকটা মাত্র প্রশ্ন আছে। আপনি কি জবাব দেবেন?'

স্থিরচোখে চেয়ে আছেন বিজ্ঞানী আনন্দ নারায়ণ রায়। বয়েস ষাটের কোটায়। প্রশান্ত মুখ। কাঁচাপাকা চুল।

'ডক্টর মুখার্জি, চেষ্টা করব। এই স্টেজে এসে আমার হারানোর কিছু নেই! তিতির ছাড়া। তবে আপনি জিগ্যেস করার আগেই বলি, একটা প্রশ্নের জবাব আমার পরিষ্কার জানা নেই। তাই জবাব দেব না।'

'কোন প্রশ্ন?' জগুমামা অবাক হয়ে বললেন।

'এই কর্ম বা দুষ্কর্ম কাণ্ডের পিছনে, আপনার কথায়, আসল ক্রিমিন্যাল কারা। আমি কী বলতে চাইছি, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। ওদের ক্ষমতা কী সাংঘাতিক, আপনারা দেখেছেন। আমার মেয়ে বিদেশে একা থাকে। ওর কোনো ক্ষতি হয়, এমন কিছু আমি বলব না। তাতে আমার জেল-ফাঁসি যাই হোক!'

জগুমামা হোঁচট খেলেন। কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'হ্যাটস অফ টু ইউ।...ওটাই আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল। এনিওয়ে...নেক্সট প্রশ্নে আসি?'

'সিওর স্যর।'

'আপনারা আমায় টার্গেট করলেন কেন? আপনাকে আমি চিনতাম না। অথচ আপনার মেয়ে ফেসবুক থেকে যোগাযোগ করে...বাড়িতে গিয়ে...এবং ও বেশ অবাক হয়ে বারবার জিগ্যেস করেছিল, আমি আপনাকে চিনি কিনা। যদি আমি এরমধ্যে না জড়াতাম, তাহলে তো আপনাদের খেলাটা আরও জমে উঠতে পারত। কামতাপুরের জন্যে চোরাগোপ্তা অশান্তি, আন্দোলন অনেকখানি এগিয়ে যেত।'

'তিতির আমাদের আর কোনো পরিচয় আপনাকে দেয়নি?' আনন্দ রায় মেয়ের দিকে তাকালেন। তিতির চুপ।

'নাহ।'

'ও। আপনার অনিতাকে মনে আছে? আগেরবার কামতাপুর আন্দোলনের সময়ে জীবন মণ্ডলের বাড়ি থেকে যাকে আপনি অ্যারেস্ট করিয়েছিলেন মার্ডার কেসে?'

'হ্যাঁ, আছে। ও তার কাজের শাস্তি পেয়েছে।'

'আমি ওর কাকা। তিতির ওর খুড়তুতো বোন।...অনিতার লেটেস্ট খবর জানেন কিছু?...আলটিমেটলি শি হ্যাড কমিটেড সুইসাইড।...আপনিই বলুন ডক্টর মুখার্জি, আপনার উপর আমার বা আমাদের ঘেন্না-রাগ থাকবে না?...তাছাড়া আমাদের কমিউনিটির ধারণা—আপনি আমার আসল রাজবংশী বা কামতাপুরী পরিচয় সবটাই জানতেন। সেজন্যেই আমি কখনও সরকারি হেল্প পাইনি।...আমাদের এই মনোভাব তিতির কিন্তু জানত না। বরঞ্চ ওর সামনে আপনার অনেক প্রশংসা করেছি। তাই ও আমাকে না পেয়ে সোজা চলে গেছিল আপনারই কাছে।'

'আপনার খবর পাচ্ছিল না কেন?'

'ওরা ফোন-টোন কেড়ে নিয়ে আমায় নজরবন্দী করে রেখেছিল। আমি কামতাপুর চাই ঠিকই, কিন্তু ওরা যেভাবে সেটা করতে চাইছিল, মানতে পারছিলাম না। বহুদিন ধরে যে রিসার্চ করে প্রায় শেষদিকে এসে গেছিলাম, সেই লাইটনিং এনার্জি স্টোরেজের সব পেপার ওরা নিয়ে নিতে চাইছিল। তারপর ধরুন, এই যে আমার পিচারপ্ল্যান্টের কনসেপ্ট, সেটাকে ওরা ডিসটর্টেড করে দিচ্ছিল।'

'তিতির বলেছে। কিন্তু ওরা বলতে কাদের কথা বলছেন আনন্দবাবু?'

আনন্দ নারায়ণ রায় থমকে গেলেন। কয়েকমুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, 'একজনের নাম আপনি জানেন। নিজের ফোনটা বন্ধ করে মেয়েটাকে এত দূর থেকে টেনে আনল!'

'হ্যাঁ, তারপর বনের মধ্যে নিয়ে এল। আপনারই ছায়াসঙ্গী পলাশ। তাই তো?...আর কে?'

আবার আটকে গেলেন আনন্দবাবু। তিতিরের দিকে একপলক তাকালেন। ধরা গলায় বললেন, 'কী আর বলব! ও আমার নিজের ছেলেই ছিল। ওর সঙ্গে দিনের পর দিন পিচার প্ল্যান্টের ওপর এক্সপেরিমেন্টগুলো—'

'আমিই তাহলে বলে দিচ্ছি প্রফেসর রায়।' জগুমামা বললেন, 'ব্যাঙ্গালোর পুলিশ ওর ফ্ল্যাট ভেঙে অনেক কাগজপত্র, ছবি পেয়েছে। আমায় কাল বিকেলে ছবি তুলে মেল করে দিয়েছে। আপনার জামাই আজাদ। ঠিক বলছি?'

ঘাড় নাড়লেন আনন্দ রায়।

'আমার প্রথম সন্দেহ হল পরশু বিকেলে। পলাশ কী করে আমাদের ট্র্যাক করছে? কী করে জানছে তিতিরকে নিয়ে আমরা বাগডোগরা নেমেছি? ওর সঙ্গে দশ-বারোদিন কোনো যোগাযোগ নেই। আচ্ছা, প্রফেসর রায়, আরেকটা কথা জিগ্যেস করি। সেই রাতে তিতির আপনার কাছে পৌঁছনোর পরে কী হল?'

'কী আবার হবে?' হতাশগলায় আনন্দ বললেন, 'তিতিরকে দিয়ে ওরা আমার ওপর প্রেশার দিল। আমি সব দিয়ে দিলাম। রাদার দিতে বাধ্য হলাম।'

'দিয়ে দিলেন! আপনার রিসার্চ পেপার দিয়ে দিয়েছেন?'

'হ্যাঁ। ল্যাপটপে লক করা ছিল।...বুঝলেন না, ওরা ওই কারণেই তো বাড়িটা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিল।...উই ডোন্ট হ্যাভ এনি প্রূফ!'

'ও মাই গড!'

'কিছু করার নেই স্যর।' তিতির এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। বলে উঠল, 'আমার বাবার জীবনের দাম ওই রিসার্চের চেয়ে অনেক-অনেক বেশি।'

'আপনার কাছে কোনো ডুপ্লিকেট কপি নেই প্রফেসর রায়?'

'নাঃ! নতুন করে শুরু করার ইচ্ছেও নেই।' আনন্দবাবু ক্লান্তগলায় বললেন।

তিতির পাশ থেকে বলে উঠলেন, 'স্যর। বাবাকে যদি নির্দোষ হিসেবে ছেড়ে দেন, আমি সঙ্গে নিয়ে চলে যাব। এই টেনশন নিতে পারছি না। এদেশে থাকলে আবার কে কখন চেপে ধরবে, বাবা জড়িয়ে পড়বে। আসলে এখনও বাবার স্বজাতিদের ওপর সাংঘাতিক ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট আছে। চারদিকে তারা ছড়িয়ে আছে। এই যে পলাশদা—আজাদ, এরা কিন্তু আবার সম্পর্কে নিজেরা ভাই।'

'ভাই!'

'হ্যাঁ স্যর। মানিক বর্মনের পালিত ছেলে আজাদ। আসল ছেলে পলাশ। পলাশের ছোটভাই আবার ভবেশ। সার্কেলটা বুঝলেন স্যর?'

'হুম।' জগুমামা কিছুক্ষণ চুপ। তারপরে বললেন, 'ছোট্ট শেষ প্রশ্ন। বিষ্ণুরাজ আনন্দ নামে এক ইন্ডিয়ান সায়েন্টিস্ট দেখা করতে চেয়ে আমায় চিঠি পাঠায়। সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ডিপার্টমেন্টে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সে অনেক প্রজেক্ট জমা দিয়েছে, অ্যাপ্রূভ হয়নি। তার আর আপনার কনট্যাক্ট নাম্বার এক। কী করে হল?'

আনন্দ নারায়ণ রায়ের মুখে এতক্ষণে একচিলতে হাসি ফুটল। বললেন, 'খুব সিম্পল। দুটো মানুষ এক, তাই। এই বুদ্ধিটা আজাদের। বলল, জগবন্ধু মুখার্জি খুব বাজে লোক। তোমার নামে অ্যাপ্লাই করলে জীবনে গ্র্যান্ট পাবে না। তাই ছদ্মনাম। তবে এটা আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ জানত না।

'বুঝেছি, বুঝেছি।' সোমলতা বলল, 'বিষ্ণুমানে তো নারায়ণ!'

'ঠিক বলেছ মেয়ে! আর রাজবংশীদের মধ্যে রায় মানে রাজা।'

আনন্দ রায় মাথা নাড়লেন।

জগুমামা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, 'ডিআইজি সায়েব, এবার আপনার কাজ। আইন মেনে কতটুকু ছাড় দেওয়া যায়, দেখুন। আফটার অল, প্রফেসর রায় ওয়স আ স্কেপগোট।'

সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মামা পিছন থেকে ডাকলেন, 'অবনীবাবু। এই বাগানের ম্যানেজারিটা এবার ছেড়ে দিন। অন্য কোথাও জয়েন করুন। মাড়োয়ারি মালিকের কিন্তু কিছু হবে না। আপনি ফাঁসবেন।'

'মানে? কী বলছেন স্যর?'

'যা বলছি, ঠিক বুঝেছেন। না বোঝার ভান করলে আপনারই বিপদ। পলাশের এজেন্ট হিসেবে রেগুলার কাজ করেছেন। আমাদের মোড অফ অপারেশন ওকে জানিয়ে দিয়েছেন। মোবাইলটা নিয়ে সার্চ করব? সেটা কি ভালো হবে? সোমলতা নিজের কানে শুনেছে।'

মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছেন অবনী রায়। বিড়বিড় করে বললেন, 'হ্যাঁ স্যর।...অন্যায় হয়েছে স্যর।...আসলে আমাদের মালিক আগরওয়াল সায়েবের সঙ্গে ওরা কলকাতায় দেখা করত। মোটা ডোনেশন নিত। বলেছিল, কামতাপুর আলাদা স্টেট হলে লক্ষ্মীমণি আলাদা অনেক ফেসিলিটি দেবে বাগানকে। আমি...আমি...বুঝেছি স্যর। আই উইল চেঞ্জ মাই জব ইমিডিয়েটলি।'

অধ্যায় ১ / ২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%