অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

বাংলা বিহার সীমান্তে
একদল লোক প্রত্যহ যায় রাজার জন্য ঘি আনতে ৷
গোধূলিতে গোয়ালপাড়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা
এক দলে ঘি লুটতে থাকে, অন্যে দেয় পাহারা ৷
ইয়া তাদের গালপাট্টা, গুল-বসানো লাঠি
সন্ধেবেলা দেখলে তোমার লাগবে দাঁত-কপাটি ৷
গোয়ালারা কী আর করে, বুক ফাটিয়ে কাঁদে
এমন সাহস তাদের নেই যে রাজার লোককে বাঁধে ৷
রাজার কাছে নালিশ করতে দু-বার তারা গিয়েছে রাজধানী––
যদি রাজা তাদের দুঃখ শোনেন,
তারা কি আর জানে কোথায় থাকেন রাজা কিংবা রাজার রানী––
রাজপ্রাসাদের পিছন দিকের বনে
বৃথা খানিক ঘোরাঘুরি করে তারা ফিরে এসেছে দেশে––
ততক্ষণে সন্ধ্যা নামছে রাক্ষসের বেশে ৷
এমনি করে দিন কেটে যায় তাদের
গয়লাদের ছেলেরা খিদেয় কাঁদে
তফাৎ নেই আর অমাবস্যায় চাঁদে
বুক ফেটে যায় গয়লাপাড়ার মা’দের ৷
সেদিন পূর্ণিমা ৷
খিদের জ্বালায় ছেলে কাঁদে, দেখে কাঁদেন মা ৷
বিকেল মুছে নামতে শুরু করেছে গোধূলি
বাঁশবাগানে চাঁদ উঠেছে ঠিক যেন এক মড়ার মাথার খুলি ৷
গোয়ালপাড়ার ঘরে ঘরে ভয়––
হয়েছে সময়!

ওই তো হল্লা শোনা যাচ্ছে–– রাজার লোক আসছে পালে পালে––
এসব কবে ঘটছে জানো? উনিশশো নয় সালে ৷
গয়লাপাড়ার ঝুলনতলার মোড়ে
ঝড়ের মতন এল তারা মহিষগাড়ি চড়ে ৷
দৌড়ে এসে মহিষগুলো ফেলছে ভীষণ শ্বাস
যতক্ষণ লুট চলবে, মহিষ খাবে গয়লাপাড়ার ঘাস ৷
এদিকে তো ঘরে ঘরে উঠল মরা-কান্না––
একজন লুটেরা কাঁদিস কেন? তোদের প্রাণটা মহারাজার দান না?
বলেই সোজা মাথায় মারল লাঠি
এক ঘায়েতেই লোকটা নিল মাটি ৷
খিদেয় যারা কাঁদছিল, আর ভয়ে কাঁদছে না
মড়ার খুলির মতন চাঁদ ছড়াচ্ছে জ্যোৎস্না ৷
গয়লাপাড়ার যা কিছু সম্বল
মহিষগাড়ি বোঝাই করে নিয়ে চলল রাজার সৈন্যদল––
দূরের পথে মিলিয়ে গেল দু-কুড়ি লোক আর দু-কুড়ি মহিষ ৷
এমন সময় হাওয়ায় বাজল তিনটে তীক্ষ্ণ শিস ৷
চমকে উঠল গয়লাপাড়ার লোক
তাদের মনে সব হারানোর শোক
দুঃখে রাগে বুক জ্বলছে, মনের মধ্যে ভয়––
তবুও শিস শুনেই তাদের সন্দেহ তো হয় ৷
গয়লাপাড়ার প্রবীণ যারা, তারা ভাবছে বসে––
রাজার লোকে মেরে রেখেছে, পড়েছি কি নতুন কারো রোষে?
গয়লাপাড়া শিসের হদিশ চায় ৷
কারণ তখন বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যায়
সবাই কাঁপে হীরু ডাকাতের নামে
যদিও ইংরেজ বাহাদুর রটিয়েছে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার গ্রামে
শীঘ্র নাকি হীরুর হবে ফাঁসি ৷
তাহলে কেন আজ এখানে কাল সেখানে হীরুর শিস আর বাঁশি?
ইংরেজের এ লোকঠকানো নিশ্চয়ই চালাকি!
হীরু যদি বন্দী, তবে বাঁশিটি রাম-পালা কি?
একজন গয়লা বড্ড ভয়ই করে
মানুষ কি আর থাকবে না তার ঘরে?
এ কি তবে হীরুরই শিস?
কেউ জানো এর সঠিক হদিশ?
হীরুর দলের শিস শুনেছ আগে?
আরেকজন গয়লা শুনিনি ঠিক, তবে যেন সেইরকমই লাগে ৷
তৃতীয় গয়লা উঁহু, আমার লাগছে কিন্তু খটকা––
চতুর্থ গয়লা তার চে’ চলো, ফাটাই গিয়ে পাঁচটা-ছ’টা পটকা ৷

পঞ্চম গয়লা হয়তো হীরুর নকল করে কেহ––
প্রথম গয়লা আমার সন্দেহ––
আচ্ছা, সেই ছেলে তিনটে কই?
তাদের মা কি সত্যি আমার প্রথম বউয়ের সই?
সেই যে যারা ক’দিন আগে কেঁদে পড়ল এসে––
জল দিলাম, বাতাসা দিলাম, বলল, ‘‘সইয়ের দেশে
মা আমাদের পাঠিয়ে দিলেন ৷’’ সে বেঁচে নেই শুনে
ফুঁপিয়ে উঠে শুয়ে পড়ল নেভানো উনুনে ৷
সত্যি যদি সইয়ের ছেলে হয়
বউটা আমার খুশি হবে স্বর্গে নিশ্চয় ৷
ষষ্ঠ গয়লা সত্যি যে তার প্রমাণ কী?
দ্বিতীয় গয়লা একই মায়ের ছেলে যদি, বয়েস হবে সমান কি?
ষষ্ঠ গয়লা দেখতেও তো এক না
প্রথম গয়লা গেল কোথায়? খুঁজেই একটু দেখ না––
সপ্তম গয়লা থাকতে দেওয়া ঠিক হয়নি ৷
প্রথম গয়লা তখন তো কেউ তা কয়নি ৷
অষ্টম গয়লা পরশু সাঁঝে লুটের শেষে সামন্তদের বনে
যাচ্ছে দেখি লুটেরাদের পিছু-পিছু গা ঢেকে গোপনে––
ষষ্ঠ গয়লা পড়েছে যা দিনকাল
কুমির আনছ কেটে খাল!
প্রথম গয়লা হা অদৃষ্ট ৷ হায়রে কপাল! অন্ধ ছিলাম আমি
আমার দোষে দিতে হবে আক্কেল সেলামি!
সবাই জানে হীরুর দলে তিনটে ছেলে ঘোরে
তারাই খবর ক’রে
ডাকাত ডেকে আনে––
কয়েকজন গয়লা এবার বুঝতে পারছি শিসের মানে ৷
ষষ্ঠ গয়লা হীরু ডাকাত এসে পড়বে এবার ৷
পঞ্চম গয়লা এখানে তার কী আছে আর নেবার?
প্রথম গয়লা রাজায় নিল ঘি আর ডাকাত নেবে গরু-মহিষ!
এমন সময় আবার বাজল শিস ৷

নবম গয়লা আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, চোর ডাকাত না, হয়তো বা গোভূত
অন্য একজন গয়লা ধু্যৎ!
বিপদে কি মাথার ঠিক আর থাকে?
ভূত ভাবছ যাকে পাচ্ছ তাকে!
নবম গয়লা না না, আমার কল্পনা এ না––
কালকে রাতে আমাদেরই চেনা
খড়ের তৈরি নকল বাছুরটিকে
স্পষ্ট দেখি যাচ্ছে বনের দিকে––
রাতও তখন অন্তত তিন প্রহর ৷
আরেকজন গয়লা এ তুমি কী শোনালে গো খবর––
চামড়া ঢাকা খড়ের বাছুর হাঁটছে আপন মনে?
নবম গয়লা হ্যাঁ–– সোজা ঢুকে গেল সামন্তদের বনে
তৃতীয় বার শিসের ধ্বনি অর্ধেকটা বেজেই থেমে গেল!
নেপথ্য কণ্ঠ মার দুটোকে! জ্যান্ত পুঁতে ফেলো ৷
বলতে বলতে ছ-জন গয়লা হিঁচড়ে টেনে আনল তাদের শিকার––
শিকার মানে তিন বালকের দুটি ৷
পিছমোড়া হাত, গয়লাদের মুঠোয় ধরা ঝুঁটি––
ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল, কিন্তু নির্বিকার ৷
একজন গয়লা জানতে চেয়েছিলে শিসের হদিশ?
প্রথম গয়লাকে অশথগাছের ডালে বসে লম্বা-চওড়া শিস
দিচ্ছিল এই দুটো শকুনছানা!
প্রথম গয়লা কী রে, আমার প্রথম বউয়ের সই তোদেরই মা, না?
বলেই হঠাৎ চড় কষাল এক বালকের গালে
একজন গয়লা চলো সোজা ঝুলিয়ে দিই অশত্থের ডালে ৷
আরেকজন গয়লা দুই ঘুষিতে মুণ্ডু দুটি ওড়াই?
আরেকজন গয়লা তার চেয়ে চল, জ্যান্ত ওদের পোড়াই!
প্রথম গয়লা বলো তো বাপ, মতলবটা কী?
দুধ-কলা দিয়ে আমি সাপ পুষেছি!

একজন বালক এজ্ঞে, আমরা পাখির সঙ্গে করতেছিনু খেলা
একজন গয়লা অশথগাছে–– ভর সন্ধেবেলা––
পাখিও বুঝি তোদের মায়ের সই?
প্রথম গয়লা তা তোদের আরেক স্যাঙাৎ কই?
সত্যি করে বল তো কে তিনি?
দুই বালক বিকেল থেকে আমরা তাকে চোখেই দেখিনি ৷
হয়তো কোথাও চলে গেছে, হয়তো বা রাগ করে
একজন গয়লা আছাড় মারব তোদের দু-ঠ্যাং ধরে
মিথ্যে যদি বলিস আরেক বার!
প্রথম গয়লা ঠিক করে বল–– গয়লাপাড়ায় তোদের কী দরকার?
চোরের মতন ঘুরিস-ফিরিস, বল না কী মতলবে?
একজন গয়লা মোড়ল, মিথ্যে কথা বাড়াও, এসেছে তো গরু চুরির লোভে ৷
কয়েকজন গয়লা কোথায় বাড়ি? কী নাম? সত্যি বল––
আরেকজন গয়লা তোরাই তবে হীরু ডাকাতের দল?
কয়েকজন গয়লা মিথ্যে বললে, পুঁতে ফেলব–– খেয়াল রাখিস সেটা!
একজন বালক এটা
কী বলছেন আপনারা গো, আমরা অনাথ বালক
আরেকজন বালক গাছের ডালে পাখি বসল–– কী চমৎকার পালক
একজন গয়লা মিথ্যে মানেই মরণ–– মনে রাখিস!
একজন বালক ঈশ কী পাখি! আজ্ঞা করো, আরেকটা দিই শিস!
একজন গয়লা খবরদার না! বল কী শিসের মানে?
একজন বালক বড্ড পাখি ভালবাসি ৷ ভালবাসার টানে
শিস দিয়েছি, তার কি মানে থাকে?
প্রথম গয়লা কথা তো বেশ ফুটছে মুখে নাকে
একজন বালক তোমরা ভাবলে হীরুর দলের শিস?
বলেই তারা করল কুর্নিশ ৷
দুই বালক হীরু হলেন ডাকাত, আমরা রাখাল
দেশে আমাদের আকাল
মায়ের কথায় এলাম সীমান্তে
দুঃখ না সুখ–– না জানি কী আনতে ৷
একজন গয়লা এ তো দেখছি গাঁজাখোরের রাজা!
মোড়ল জানিস এ-গাঁয় মিথ্যে বলার সাজা?
একজন বালক মোদের কথায় বিশ্বাস হয়নি?
আরেকজন বালক মিথ্যে বলব? মাথা খারাপ! চড়টা গালে এখনো সয়নি!
প্রথম গয়লা কাহিনী রাখ ৷ বেড়ে যাচ্ছে রাত!
আরেকজন গয়লা কথায় কথায় কাল কাটাচ্ছে কালসাপের জাত!
কয়েকজন গয়লা হাত-পা বেঁধে চলো ভাসাই খালে
হঠাৎ দূরে শিরীষ গাছের ডালে
ডেকে উঠল একটা হুতোম প্যাঁচা ৷

কয়েকজন গয়লা
হাত-পা বাঁধতে বাঁধতে চ্যাঁচা, এবার যত পারিস চ্যাঁচা––
একজন গয়লা ভগবানের বাপও আসবে না
কয়েকজন গয়লা পাথরে বেঁধে জলে ফেলব, জষ্ঠিমাসেও লাশটি ভাসবে না ৷
এক বালক আঃ! এমন মোচড়াচ্ছেন হাত!
একজন গয়লা বল এখনো, কে পাঠাল, মা, না হীরু ডাকাত?
আরেকজন গয়লা চুপ, সবাই চুপ!
কিসের যেন আওয়াজ আসছে, গায়ের লোমকূপ
দ্যাখো কেমন হয়ে উঠছে খাড়া!
আরেকজন গয়লা মিথ্যে ভয় পাবে কি গয়লাপাড়া!
বলেই লোকটা শুয়ে পড়ল সোজা
মাটিতে কান, চক্ষু দুটি বোজা ৷
লোকটা কী সর্বনাশ–– ঘোড়া!
আরেকজন গয়লা একটা, না এক জোড়া?
আরেকজন গয়লা না কি অনেকগুলো?
লোকটা তোমরা কি গো কানে দিয়েছ তুলো?
দুই বালক ঘোড়ার চাঁটে মরব নাকি–– এ কী!
বাঁধন খোলেন দেখি––
একজন গয়লা মেরে তোদের করব বেগুনপোড়া ৷
লোকটা ঝড়ের মতন ছুটে আসছে ঘোড়া
আরেকজন গয়লা বিপদ কি আর একলা আসে? স্বপ্ন দেখছি না কি?
বনের থেকে বেরিয়ে আসছে খড়ের বাছুরটা কি?
আরেকজন গয়লা কী করে সম্ভব?
প্রথম গয়লা হায় আমাদের সবই গেল–– সব!
আরেকজন গয়লা রাজা মারল ভাতে
এবার এক সাথে আজ রাতে––
আরেকজন এ বড় অদ্ভুত!
কয়েকজন সবাইকে আজ প্রাণে মারবে ভূত
সামনে গোভূত, তার পিছনে দূরে
স্পষ্ট আওয়াজ উঠছে ঘোড়ার খুরের ৷
এমন দৃশ্য কেউ দেখেনি কখনো
চামড়া-ঢাকা খড়ের বাছুর তখনো
চাঁদের আলোয় দিচ্ছে লম্ভ-ঝম্প
গয়লাদের বুকে তো হৃৎকম্প!
ওই তো আবার জোড় পায়ে লাফ দিয়ে আসছে কাছে
হঠাৎ যেন মিলিয়ে গেল হাওয়ায় কিংবা গাছে ৷
ঠিক মনে হয় পিছন পিছন দৌড়ে এল ঘোড়া
পিঠের ওপর সওয়ার–– যেন শাল দিয়ে গা মোড়া ৷
গ্রামের প্রান্তে শীর্ণ খাল
ঘোড়া যেন দিল উড়াল––
পেরিয়ে এসে দাঁড়াল এই দাওয়ায় ৷
শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়া কোনো শব্দ নেই আর হাওয়ায় ৷

ঘোড়সওয়ার গ্রামের নাম তো গোপালটুলি?
দাঁড়া আগে শালটা খুলি ৷
শাল খুলতেই দেখা গেল জাঁদরেল এক পুলিস ৷
পুলিস এখান থেকে একটু আগে কে দিল রে শিস?
প্রথম গয়লা নমস্কার হই বড়বাবু, দারোগা গো পরণাম
কী দিয়ে আজ সেবা করব–– এবার বুঝি মরলাম!
অন্যান্য গয়লা তোমার পায়ে গড় করি গো, খেতে দেব কী?
লুটেরাদের থেকে কেন একটুখানি ঘি
চেয়ে রাখলাম না!
দারোগা থামাবি কান্না?
একটু আগে শিস দিল কে? সন্দেহ হয় তারা হীরুর চ্যালা ৷
কয়েকজন গয়লা
দুই ছেলেকে বোঝো এবার ঠ্যালা!
দারোগাকে হুজুর এই যে বেঁধে রেখেছি–– এই হল আসামী!
দারোগা ঠিক আছে, যা করার করব আমি ৷
ঘোড়াটাকে জল দে ৷
দুই ছেলেকে বল ব্যাটারা,গয়লাপাড়ায় কে পাঠাল, কে?
হীরু তোদের কে হয়?
গলা টিপলে এখনো দুধ বের হয়
এখন থেকেই ডাকাতি!
এক ছেলে আমরা না তার নাতি
না তার ছেলে কিংবা দলের লোক ৷
দারোগা গয়লাদের এইও! গাছের গুঁড়িতে এর জোরসে মাথা ঠোক ৷
দুই ছেলেকে রাম দারোগার বন্দুকের এক গুঁতোয়
ঘুচবে তোদের সমস্ত ছল ছুতো ৷
শিগগির বল, হীরু কোথায়, বল ৷
মিথ্যে বললে জানিস তো তার ফল?
তার বদলে যদি তোরা হীরুর হদিশ দিস
কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে আমি হীরু, চিনতে পেরেছিস?
দুই ছেলে ওরে বাবা, মেরে ফেলল, মোদের ছেড়ে দিন
এত কষ্ট দেন কেন গো, প্রাণটা কেড়ে নিন ৷
দারোগা গয়লাদের সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না, চল নিয়ে চল ঘরে
গয়লারা তো দৌড়ে এসে দুই ছেলেকে ধরে
দারোগা চালের সঙ্গে দড়ি বেঁধে সঙ্গে ঘুঁটেপোড়া––
হেঁ হেঁ, কথার তাৎপর্যটা বুঝেছিস তো ছোঁড়া?
হাত-পা বেঁধে ঘুঁটের ছ্যাঁকা––
দেখব ন্যাকা
সেজে তোরা থাকিস কতক্ষণ!
একজন গয়লা এই দুজন ছাড়াও কিন্তু ছিল আরেক জন
গয়লাদের কুঁদোর একটি ঘায়ে এরা কবুল করবে সব
ডাকাত ধরে কাল এখানে হবে রে উৎসব ৷
প্রথম গয়লা হুজুর ডাকাত সত্যি পড়বে নাকি?
দারোগা কেন, ডাকাতটা কি
শোনেনি তার চরের মুখের শিস?
প্রথম গয়লা দুই ছেলেকে তোদের মনে এতই ছিল বিষ!
দারোগাকে হুজুর তবে কী হবে উপায়?
ভেবে বুকের রক্ত যে শুকায়!
দারোগা আমি আছি, ভয় কী বাবা, শোও গিয়ে সব শিগ্রী
এই ঘরে আজ চালাব থার্ড ডিগ্রী ৷
হীরু আসার আগেই জানব হীরুর গতিবিধি
আমি হলাম স্বয়ং ব্রিটিশ রাজের প্রতিনিধি ৷
দরজা বন্ধ করে হীরু দুই বালকের বাঁধন খুলল আগে
নকল হম্বি-তম্বি করে লোক দেখানো রাগে
লাঠি মারল দেয়ালে আর ঘরের নিচু চালে ৷
হীরু পড়েছিস বাপ রাম দারোগার জালে ৷
দুই বালক সর্দার, আমরা গিয়েছিলাম ওদের পিছু পিছু
হীরু সন্দেহ তো করেনি ওরা কিছু?

এক বালক দেখতেই পায়নি ৷
হীরু কালকে ওদের মজা দেখাচ্ছি!
আরেক বালক দু কুড়ি লোক আর দু কুড়ি মহিষ
হীরু একটা দিলে শিস––
তিন কুড়ি লোক ঘাপটি মেরে থাকবে, সঙ্গে ফাঁসুড়ে ইসমাইল
একজন বালক সর্দার এরা বড্ড গরিব, পুড়িয়ে খায় গো চিল ৷
পান্নাটাকে ভূত ভেবেছে এরা
আরেকজন বালক খড়ের বাছুর মাঝরাত্তিরে করছে ঘোরাফেরা
দেখেই এদের ভিরমি খাবার জোগাড়
প্রথম বালক লুটেরারা মহিষগাড়ি চড়ে আসে–– একেকটা ঠিক ষাঁড়!
হীরু পান্না আমায় সব বলেছে, শোন
এখান থেকে ঠিক কতটা সামন্তদের বন?
একজন বালক বড় বড় পা ফেললে সাত কুড়ি পাঁচ পা ৷
আরেকজন বালক বন গিয়েছে সোজা উড়িষ্যা ৷
হীরু দু কুড়ি মোষ, তার মানে তো গাড়ি মাত্র কুড়ি
একজন বালক হ্যাঁ–– ওই যাঃ, থুড়ি
একটা কথা বলতে ভুলে গেছি বেমালুম
পরশু শুনলুম
কালকে রাজা শোনপুরের সেই মেলায় যাবে, থাকবে দু তিন দিন
রাজ-ধোপারা শুনছি নাকি চুনোট করছে রাজার জামা ঢাকাই মসলিন
হীরু এই বুদ্ধির বহর?
মেলায় যাবার খবর
জানি আমি এগার দিন আগে
নইলে রাতে গয়লাপাড়ায় হীরু ডাকাত জাগে?
একজন বালক কিন্তু সর্দার, যা সব ওদের মোষ!
হীরু তোরা একটু বোস––
আমার এবার সাজতে হবে গয়লা
জামার নিচে আছে ছেঁড়া ময়লা
ফতুয়া আর থান ৷
কথা বলছে ফিসফিসিয়ে, কিন্তু সজাগ কান ৷

একটু পরেই আবার বাঁধব তোদের,
দুপুর বেলা ফেলে রাখব রোদে ৷
দাঁড়া, এবার সারি অন্য কাজ
মটকা মেরে পড়ে থাকবি, করবি না আওয়াজ ৷
এই বলে সে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ায়––
চাঁদের আলোয় ভাসছে গয়লাপাড়া ৷
গয়লারা তো জেগেই ছিল, দারোগা নিয়ে কে কবে আর ঘুমোয়!
হীরু মেরে ওদের সমস্ত গা করেছি ডুমো ডুমো ৷
শেয়ালদুটো জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে আছে ভুঁয়ে ৷
ঘরের বাতি নিভিয়ে দে এক ফুঁয়ে ৷
দারোগার স্বর শুনে তারা দোর জানালার ফাঁকে
দু চোখ রেখে দেখে নিচ্ছে অচিন দারোগাকে!
গয়লারা আপনি বটে কে?
হীরু বিশেষ প্রয়োজনে পুলিস গয়লা সেজেছে ৷
একজন গয়লা আপনিই সে! চিনতে পারিনি
আরেকজন গয়লা দারোগাসাব নন তো আর ইনি
ঠিক যেন ভাই মোদেরই একজন
হীরু এক ঢিলে দুই পাখি মারার করছি আয়োজন
একজন গয়লা গড় করি গো বাবু তোমায়, কিন্তু লাগছে খটকা
হীরু ডাকাত আসে শুনি চড়ে মস্ত রণ-পা
আরেকজন গয়লা তাছাড়া ওর ঘোড়াও নাকি আছে!
হীরু রাম দারোগার কাছে
খাটবে না ওর ওসব জারিজুরি ৷
একজন গয়লা কিন্তু আপনি একা, ওরা হয়তো বা চার কুড়ি,
হীরু আরে মূর্খ, পুলিস আবার একলা দোকলা কী?
যদি একবার হুইসিলে ফুঁ দি
দৌড়ে আসবে হাজার কনস্টেবল
একটা কথা মনে রাখবি কেবল––
মুখের কথা শেষ হল না, দূরের বনে ডাকল তক্ষক
গয়লারা হুজুর, আপনি মোদের মা বাপ, মোদের রক্ষক
হীরু অন্যমনস্কভাবে কী বলছিলাম? যাক, সেকথা কাল ৷
দে তো আমার শাল
একবারটি থানায় যাব, ফিরব ভোরের বেলা
হীরু ডাকাতের চ্যালা
যেমন আছে তেমনি থাকুক, বাইরে থেকে শেকল তোলা আছে ৷
খবরদার হে, কেউ যাবি না কাছে!
একজন গয়লা হুজুর, আপনার গায়ে গয়লার বেশ––
হীরু সেজেছি জম্পেশ!
আমি থানার দারোগা হে, চিনবে গলার আওয়াজ!
থানায় আমার খুব জরুরি কাজ ৷
ঘরে তোদের ভুট্টা আছে? যদি থাকে, গোটা কতক পোড়া ৷
বলেই হীরু বনের দিকে ছুটিয়ে দিল ঘোড়া ৷
মানুষজনের অচেনা এক গভীর অরণ্যে
ঢুকতে গিয়ে হীরু দাঁড়ায়, শোনে স্বকর্ণে
নেপথ্য কণ্ঠ জল, বাবা গো জল!
ঝোপের পাশে চোখ পড়তেই হীরু তো চঞ্চল ৷
ময়লা ছেঁড়া নেংটি পরে মুমূর্ষু এক লোক––
কষ্টমাখা উঃ কী করুণ চোখ––
ঘাসে শুয়ে গোঙায় ৷
ঘোড়া থেকে নেমে হীরু পদ্মপাতার ঠোঙায়
জল এনে দেয় ওই লোকটার মুখে
জল খেয়ে সে সুস্থ হলে হীরু বলে, তার শিয়রে ঝুঁকে,
দুর্গম এই বনের মধ্যে এলেন কী করে?
হঠাৎ যদি না দেখতাম তো যেতেনই ঠিক মরে ৷
কোথা থেকে আসছিলেন আর যাচ্ছিলেন কার বাড়ি?
বলুন তাড়াতাড়ি ৷

লোকটা সাধ করে কেউ আসে কি এই ভীষণ গহন বনে!
সরকারি এক মস্ত বিজ্ঞাপনে
বলেছে, কেউ হীরুর খবর দিলে––
কিন্তু বাবা––
আর পারি না!
হীরু কি এক ভগ্নডানা চিল যে তাকে মারব একটা ঢিলে?
দুদিন ধরে বনে বনে–– আর পারি না–– বড্ড গরিব আমি
কত দুঃখে ঘর ছেড়েছি জানেন অন্তর্যামী ৷
ভেবেছিলাম যদি হঠাৎ হীরুর খবর পাই––
বাড়ির সবাই মিলে চারটি গরম ভাত খাই!
থানায় খবর দিলেই পাঁচশো ৷ জ্যান্ত মরা ধরে দিলে আরও বেশি ইনাম––
জানো তো ভাই, পঁচিশ হাজার হীরুর মাথার দাম!
যদিও হীরু মনে মনে ফেটে পড়ছে ক্ষোভে––
মুখে বলল কী আশ্চর্য, আমিও ওই লোভে
দুদিন ধরে ঘুরছি বনে বনে ৷
একটা কথা শোনেন––
একই সঙ্গে দুজন করি চেষ্টা
দুইয়ের কষ্টে মিলবে ঠিকই কেষ্টা ৷
জ্যান্ত কিংবা মরা হীরু ধরে দিলেই পাব পঁচিশ হাজার!
আহ কী মজা! দুবেলা খাব খেতে চেয়েছি যা যা ৷
পঁচিশ হাজার দুভাগ হলেও–– আহা রে কী ফুর্তি!
সামনের ওই বনটা দেখুন–– জোছনা যেন ধরেছে কালীমূর্তি ৷
আমি একবার ঘুরেই আসি ৷
সত্যি হবে হীরুর ফাঁসি!
আমরা পাব পুরো পঁচিশ হাজার!
সুখে নিদ্রা যাবে দেশের জমিদার আর রাজা ৷
যাই দেখি গে বনের ভেতরটা
হয়তো কোথাও রয়েছে সে চোরটা ৷

লোকটা তোমার কথায় আশা জাগছে খুব
দেখো বাবা, ফিরতে তোমার ফরসা না হয় পুব ৷
হীরু দেখুন না এই এলাম বলে––
ঘুমে না যেন পড়েন ঢলে––
গভীর বনে ঢুকল হীরু, মানুষ তো ছাড়, চাঁদেরও এ চেনা রাস্তা না
আজকে রাতে এটাই হীরুর দলের আস্তানা ৷
সতর্ক পায়ে ঢুকল ঘোড়া, পিঠে ডাকাত হীরে
দলের সবাই দৌড়ে এসে ধরল তাকে ঘিরে ৷
একজন ডাকাত সর্দার! সর্বনাশ হয়েছে––
হীরু কেন, সব কি ফাঁস হয়েছে?
আরেকজন ডাকাত তা না, তবে ছজন চরের
হীরু ওসব পরে––
চটপট বল, গড়িয়েছে কদ্দুর?
সেই ডাকাত পঞ্চুকে তো পাঠিয়েছিলে রাজার অন্তঃপুর
সেখান থেকে ফিরে এসে জমাদারের বেশে
থানায় গিয়ে শুনেছে সে–– নানা ছদ্মবেশে
পুলিসের চর লেগেছে খুব সংবাদ সংগ্রহে!
হীরু ওহে!
অস্ত্র ফেলে নাও তুলসীর মালা ৷
এ তো বড্ড জ্বালা––
দুটো পয়সা পাচ্ছে চরের কাজে––
তোমার বুঝি বড্ড বুকে বাজে!
মূর্খ, গাধা, ভীরু!
বন্দুকটা বাগিয়ে ধরে মেঘের মতো গর্জে উঠল হীরু
কে তোর প্রভু–– পুলিসের চর কিংবা হীরু ডাকাত?
তোর জীবনের আজকেই শেষ রাত ৷

সেই ডাকাত সর্দার, আমি ভয় পাইনি, মরতেও ভয় নেই
পুলিস এবার চর ব্যবস্থা জোরদার করতেই
ছ’জন বেছে তক্ষকের ডাক ডাকতে পাঠাই আমি ৷
হীরু আহা, মস্ত দামী
কাজ করেছিস! তক্ষকের ডাক ডাকার দায়িত্বে
বল আছে কে কে?
পুলিসের চর শুনেই তারা পুলিস দেখল–– বাহ!
কয়েকজন ডাকাত সর্দার, দেখো, আর কখনো এমন ঘটবে না!
হীরু বেশ
মূর্খতার এই শেষ?
কয়েকজন ডাকাত বিলকুল বিলকুল ৷
অন্যরা আর হবে না ভুল ৷
হীরু শোন, ওদিককার সব ব্যবস্থা পাকা ৷
আলাদাভাবে এক-একজন গা-ঢাকা
দিয়ে ঢুকবি গয়লাপাড়ায়–– সাঁঝ লাগবার আগে––
বুঝেছিস তো? থাকবি ভাগে ভাগে ৷
যত রাজ্যের ছেঁড়া-খোঁড়া ময়লা
কাপড় পরে সাজবি যেন সাতজন্মের গয়লা ৷
ইসমাইল তার ফাঁসুড়ে দল নিয়ে এতক্ষণে
ডেরা বেঁধেছে সামন্তদের বনে ৷
বল তো তোদের পথ দেখাবে কে?
সবাই চামড়া ঢাকা খড়ের বাছুর যে ৷
আরেকজন ডাকাত নিলু-বিলু শুনছি নাকি বাঁধা রয়েছে গাছে?
হীরু হীরের চর তো––রাম দারোগার মারের চোটে ওদের জ্ঞান কি আছে!
কয়েকজন ডাকাত তুলনা নেই নিলু বিলু আর পান্নার ৷
হীরু এখন ওসব আর না––
আগে একটু বাঁশি বাজাই, দাঁড়া––
কয়েকজন ডাকাত ধুয়ে মুছে রেখেছি মা-র খাঁড়া ৷

বনের থেকে ফেরার পথে অপেক্ষমাণ দুস্থ মানুষটিকে
ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে হীরু রওনা হল গোপালটুলির দিকে ৷
এদিকে তো গয়লাপাড়া ঘামছে উত্তেজনায়––
হীরু ডাকাত এলেই তার বিষদাঁত আর ফণা
রাম দারোগা উপড়ে নেবে এই জন্মের মতো
রাম দারোগার সঙ্গে আছে পুলিস শত-শত ৷
গয়লাপাড়ায় হীরু ফিরল, রাত তখনো হয়নি তেমন ফরসা ৷
গয়লারা দারোগা গো, আপনি মোদের ভরসা ৷
প্রথম গয়লা একে তো রোজ রাজার হামলা, তার ওপরে আবার
হীরু ডাকাতের থাবার
এক ঘা খেলে, আপনি বলুন, যায় কি বেঁচে থাকা?
হীরু থানায় গিয়ে সব ব্যবস্থা করে এলাম পাকা ৷
বলছিলাম না–– এক ঢিলে দুই পাখি মারব আমি!
সামন্তটার বাড় বেড়েছে, প্রায়ই থানায় পাঠাচ্ছে প্রণামী ৷
কয়েকজন গয়লা সামন্ত কে?
হীরু তোরা যাকে
রাজা বলিস ৷ আসলে তো লোভী জমিদার ৷
হীরুও এবার পার পাবে না, করব সোজা ভবনদী পার!
দুস্থ লোকটা আপনি, আজ্ঞে, আপনি স্বয়ং দারোগা?
তাই তো বলি, তা না হলে ঘোড়ার অমন তেলচকচক কালো গা ৷
সাধ্যমতো হীরে খুঁজছি, খুঁজতে তো দোষ নেই ৷
হীরু সব বুঝেছি প্রথম দর্শনেই ৷
আশা করছি হীরে ধরব আজ বা কাল রাতে ৷
ইতিমধ্যে দু-মুঠো শাক-ভাতের
ব্যবস্থা তোর হয়েই গেল ৷ যা এবারে ভাগ––
রাম দারোগার মন বোঝা ভার–– এই হাসি, এই রাগ ৷
সন্ধে হবার মুখে হীরু হঠাৎ দিল শিস ৷
গয়লারা করেন কী গো, ঈশ––
এ যে একদম হীরু ডাকাতের মতো!
হীরু তোদের কাছে দেব কি কৈফিয়ৎ অতশত?
জানিস আমি দিলাম কেন শিস?
বিষেই ক্ষয় হয় সমস্ত বিষ!
পুলিসকে সব বলা আছে, শুনেই আমার সঙ্কেত
গয়লা বেশে ছুটে আসবে পেরিয়ে বন, খাল, খেত ৷
শিস না দিয়ে হুইসিলে ফুঁ দিলে
চমকে যেত হীরু ডাকাতের পিলে
টের পেত সে আমার উপস্থিতি
অভিযানের ইতি
ঘটাত ওইখানে ৷
বুঝেছিস এই ছল-চাতুরির মানে?
একজন গয়লা আমরা বাবু মুখু্য মানুষ–– ক্ষুদ্র মনিষ্যি
আরেকজন গয়লা শাক পাতা খাই, নেশা বলতে দু-এক টিপ নস্যি ৷
অন্য কয়েকজন কিংবা ধরুন, একটু আধটু তামাক পাতা, দুবেলা চাট্টি মুড়ি
প্রথম গয়লা আহ, ওসব রাখ তো এখন! দসু্যরা দুই কুড়ি
এসে পড়ল বলে–– এই তো আসন্ন গোধূলি!
হীরু গুণ্ডাদলের সঙ্গে এবার করব কোলাকুলি––
সব তৈয়ার হ ৷
গয়লারা হুজুর, ওরা মেরে মোদের বানাবে আজ দ ৷
হীরু ওই চেয়ে দ্যাখ–– গুনতে পারিস? গোন––
ওই যেখানে খালের পাড়ে অন্ধকার বন
সেখান থেকে আমার লোকরা গয়লাবেশে আসছে চুপিসারে
গয়লারা ও বাবারে–– মা-রে
ছদ্মবেশী ডাকাত নয়তো?
সত্যি জানেন–– সবাই এরা পুলিস?
হীরু এখনো সব সন্দেহেতে দুলিস!
আজ গোধূলি বৃথা যাবে না––
তোদের ঘি আর রাজা খাবে না!
শুনতে পাচ্ছিস? শোন––

গয়লাপাড়ার পূর্ব দিকে ঠিক যেখানে সামন্তদের বন
সেখান থেকে ভেসে আসছে অনেক লোকের ভীষণ আর্তনাদ!
হীরু এতদিন তো ঘুঘুই দেখল, এবার দেখছে ফাঁদ ৷
সামন্তদের বনে আমার লোক
টিপে মারছে গয়লাপাড়ার জোঁক!
বুঝেছিস তো কাদের
আর্তনাদে হাওয়া নাচছে? কাদের
গলায় বলির পশু উঠছে কেঁদে?
দুষ্ট গরুর মতন ওদের গলায় দড়ি বেঁধে
আমার সেপাই করছে পগার পার!
গয়লারা বাপরে, বাবা! কী ক্ষমতা মোদের দারোগার!
গয়লাবেশী হীরুর যে দল পেরোচ্ছিল খাল––
পাহাড় ঘেরা গভীর বনে দেখলে যাদের কাল––
হীরুর সামনে এসে তারা সিপাহীদের মতন করল সেলাম ৷
হীরু ডাকাতের দল বাতাসে শিস শুনেই আমরা এলাম ৷
হীরু দাঁড়া––
হাওয়ায় পাচ্ছি ইসমাইলদের সাড়া ৷
আগে আসুক ওরা
গয়লাদের এই যে বাবা, তোরা
ঝট করে এক কাজ কর তো দেখি
অনেকগুলো ঘিয়ের হাঁড়ি–– আসল নয় রে, মেকি––
সাজিয়ে ফেল গোবর কাদা ভরে
একটুখানি ঘিয়ের ছোঁয়া লাগিয়ে দিস ওপরে ৷
বলতে বলতে মহিষ গাড়ি চড়ে এল সদলবলে ফাঁসুড়ে ইসমাইল ৷
হীরু সময় নেই আর–– হোসনি তো কেউ কাহিল?
ইসমাইলের লোকেরা কেউ না, কেউ না, কেউ না ৷
আমরা নদীর ঢেউ না?

ইসমাইল লুটেরারা যেই এসেছে বনের কাছাকাছি
সবাই মিলে ছুঁড়ে দিলাম যে যার দড়্গিাছি ৷
দু-কুড়ি ফাঁসের হ্যাঁচকা টানে দুই-দুকুড়ি লোক
ওহো যদি দেখতে তুমি–– ছিটকে গিয়ে ভুঁয়ে পড়ল, উল্টে গেল চোখ!
হীরু ওসব এখন শুনতে চাই না, আসল কথা বল––
ইসমাইল হুজুর, ওরা প্রাণ করে সম্বল
ছেড়ে গিয়েছে সুখের জন্মভূমি––
আমি তো বললুমই
হবে না আর এমুখো কোনদিন––
হয়তো গিয়ে থামবে সোজা তিব্বতই কি চীন ৷
মুখে ওদের আচ্ছা করে ঘষে দিয়েছি ঝামা!
হীরু পাগড়ি, লাঠি, জামা––
ইসমাইলের লোকেরা সব নিয়েছি ৷ এবার বলো করতে হবে কী?
হীরু গয়লাদের এই, তোরা সব এনেছিস তো ঘি––
মানে ঘিয়ের হাঁড়ি?
বোঝাই কর গে যত মোষের গাড়ি ৷
দলের লোকেদের শোন,
যে দুকুড়ি গিয়েছিলিস সামন্তদের বন––
সবাই তোরা চটপট আয় কাছে
অল্প সময়, অনেক জিনিস বুঝিয়ে দেবার আছে ৷
বলে হীরু সাপের মতন দৌড়ে গিয়ে সোজা এর ওর কানে
বলল কী কে জানে!
হয়তো কোনো গোপন পরামর্শ ৷
ভঙ্গি যেন শিকার দেখে চিতার না আর তর সয় ৷
গয়লারা তো ভ্যাবাচ্যাকা
দিচ্ছে গায়ে সুখের ছ্যাঁকা
কিন্তু কেঁপে উঠছে প্রাণের পাখি!
সবাই যদি পুলিস–– কারো গায়েতে নেই খাকি?
তাছাড়া এই দারোগাটার
চিতার মতো চলা-হাঁটা––
ব্যাপারটা গোলমেলে!

হীরু হীরুকে আজ পুরবই ঠিক জেলে!
গয়লাদের কীরে!
দেখছিস কী অমন ফিরে ফিরে?
হুবহু ঠিক লুটেরাদের মতন সাজা গাড়ি––
হীরুকে আজ সোজা যমের বাড়ি
না পাঠাই তো আমার নামে নেড়ি কুত্তা পুষিস!
লুটেরাদের খবর শুনে তোরা তো সব খুশি?
গয়লারা তোমার পায়ে প্রণাম মোদের তিন কুড়ি দশ লক্ষ ৷
হঠাৎ দূরে, ক্রমেই কাছে, একের পর এক ডেকে উঠল ঠিক তেরটা তক্ষক!
হীরুর চোখে বিজলি হানা, হীরুর গলায় হুঙ্কার
হীরু গয়লাদের ময়ূরাক্ষী নদী চাইছে খুন কার?
কার গজালো ডানা?
তোদের মধ্যে কে গিয়েছে থানায়?
গয়লাপাড়ার প্রত্যেকটা ঘর
তন্ন তন্ন কর ৷
দ্যাখ তো কে নেই ঘরে?
সে লোকটা কই–– খিদের জ্বালায় এই মরে সেই মরে?
গয়লাদের তো লাগল বিষম ধন্দ––
ঘরপোড়া গাই অল্পেই পায় বিপদ-বিপদ গন্ধ ৷
তার ওপরে আরো অবাক ব্যাপার––
দুকুড়ি লোক খুলে গায়ের র্যাপার
সাজল যেন হুবহু ঠিক রাজার গুণ্ডাদল–– এক্কেবারে লুটেরাদের মতো ৷
হীরু দলের লোকদের সময় নেই আর, গাড়ি হাঁকা পারিস জোরে যত
ঝড়ের বেগে সামন্ত রাজবাড়ি
গিয়ে বলবি আরো ঘিয়ের হাঁড়ি
গয়লারা সব বয়ে আনছে কাঁধে ৷
যতক্ষণ না আমি যাচ্ছি, আটকে রাখিস হেঁয়ালি আর ফাঁদে ৷
গাড়ির পেটের তলায় নিস বল্লম আর মশাল ৷
এসব যখন ঘটছে তখন ঠিক উনিশশো ন সাল
একজন গয়লা হুজুর, সবাই ঘরে আছে, হাভাতেটাও ঘুমোচ্ছে ওইখানে
প্রথম গয়লা হুজুর থানায় কে গিয়েছে–– মানে?
আপনি থানার মালিক!
বেড়াল কেন ঘাবড়াবে গো সামনে পেলে শালিক?
অন্য গয়লা আপনি হলেন দারোগা
হীরু না খেয়ে খেয়ে তোরা সবাই যা রোগা
বলতে ভয়ই করে
একজন গয়লা হুজুর, হীরুর বিচ্ছু দুটি চর নেই তো ঘরে!
শুনেই হীরু অল্প অল্প হাসছে ৷
একজন গয়লা ওই দেখুন ওই খালের পাড়ে আবার গোভূত আসছে ৷
হীরু না না, ওরা আমারই লোক–– পান্না, নিলু, বিলু ৷
শুনেই ভয়ে গয়লাদের নড়ে উঠল ঘিলু
(হেসে) আমি হলাম হীরে ৷
গয়লারা হীরে ডাকাত! ঘরে মোদের কিছু নেই গো, ভগবানের কিরে!
হীরু গয়লাদের তোদের কাছে হীরু ডাকাতের কিছুই নেই রে নেবার ৷
দেবার আছে ৷ নিলু-বিলু, বেরিয়ে আয় এবার ৷
কদমগাছের ডাল ঝাঁকিয়ে নামল নিলে বিলে
নিলু-বিলু সারাটা দিন ভুট্টা খেয়ে যা তড়পাচ্ছে পিলে!
হীরু একটু ধৈর্য ধর ৷
দলের লোকেদের ঘিয়ের বাঁক সবাই কাঁধে কর ৷
গয়লাদের একটু পরে এসে পড়বে পুলিস
দরজা খুলতে বললে দরজা খুলিস ৷
আমায় ওরা করবে গরুখেঁাজা ৷
দে তো একটা বিড়ি, থাকুক বাঁ কানে গোঁজা ৷

কয়েকজন গয়লা বাবাগো, মা, ওই যে আবার এসেছে গোভূত ৷
হীরু তোরা তো অদ্ভুত
নিলু-বিলু, এবার ওটার গায়ের চামড়া খোলো ৷
এত করে বলছি তবু ভয়েই এরা মোলো ৷
বাছুরের কাজ শেষ হয়েছে, আর না ৷
নিলু বিলু হাত চালিয়ে গুটিকতক ফিতের
বাঁধন কেটে গোবৎসটির চামড়া খুলে নিতে
লম্ভ দিয়ে বেরিয়ে এল তাদের বন্ধু পান্না ৷
নিলু বিলু গয়লাদের মোদের স্যাঙাৎ–– দ্যাখো এবার চিনতে পার কিনা
একজন গয়লা নিজের হাতে তৈরি বাছুর সকলেরই এ চেনা
নিলু সেই বাছুরের ভেতর থেকে খড়
বের করে ঠিক সেইখানে এর ধড়
পুরে দিয়ে বানালাম গো ভূত
প্রয়োজনে হয়েছিল আমাদের দূত ৷
পান্না সর্দার, পুলিস প্রথমে যায় কৃষ্ণচন্দ্রপুরে ৷
সেখান থেকে পদ্মপুকুর ঘুরে
আসছে এদিক পানে ৷
হীরু তক্ষকের ডাক ঘুরে যাওয়ার মানে
সব বুঝেছি ৷ দলে ওরা কজন?
পান্না এক কুড়ি আট ন’জন ৷
হীরু গয়লাদের যা রে এবার বউমায়েদের চুলোয় আগুন দে
সবাই পেটের আগুন নেভা দুমুঠো অন্নে ৷
গয়লাদের তো চক্ষু ছানাবড়া
গয়লারা আপনাদিগের সঙ্গে মোদের পড়বে কি হাতকড়া?
হীরু মূর্খ তোরা! ভালো মন্দ বোঝার শক্তি নেই
জীবন গেল রাজার ওপর ভয়ে ভক্তিতেই ৷
দলের লোকদের মনে রাখিস সবাই তোরা গয়লা
দলের লোকেরা জয় মা কালী! আমরা করব জয়লাভ!
হীরু সামন্তরাজ আজ রয়েছে মেলায়
ফিরতে ফিরতে পরশু বিকেলবেলা!
বুঝেছিস তো? প্রহরীদের দিবি গাঁজা খৈনি
একজন ডাকাত রাজবাড়িতে ঠিক কতজন সৈনিক?
হীরু দুকুড়ি তো পগার পার আর বাকি রইল কী?
এসব কথা ইসমাইলকে বিশদ বলেছি ৷
আহা কেমন চাঁদ উঠেছে ব্যাঁকা ৷
এবার একটু একা
বাঁশিতে সুর তুলি!
পান্না সর্দার, পুলিশ ঘিরবে গোপালটুলি!
কয়েকজন ডাকাত সর্দার, আমরা দু চার জনে থাকি না এইখানে ৷
হীরু মেরে ফেলবো জানে!
হীরের কথার অবাধ্য ফের হলে––
আহারে ঈশ! চাঁদ পড়েছে ঢলে!
এক্ষুনি যা ছোট!
পান্না, ঘোড়ায় ওঠ ৷
বিলুও সঙ্গে যা
পুবদিকে ঠিক সাত কুড়ি পাঁচ পা
গেলেই তো বন, বনের মধ্যে তোরা তো এক জোড়া,
সামলে রাখিস আমার কালো ঘোড়া ৷
নিলু, সোজা খালপাড়ে যা ওই যেখানে শ্মশানকালীর ঢিবি ৷
গাছের ডালে লুকিয়ে বসে দু তিনটে শিস দিবি––
পুলিস যদি গয়লাপাড়ায় পাকায় গণ্ডগোল!
গয়লাপাড়ায় কানটা রাখিস, আর যা কিছু ভোল ৷
পুলিস ধেয়ে গেলেই আরো দূরে
পথ ভোলাবি শিসের সুরে সুরে ৷
বলেই হীরু বাঁশের বাঁশি তুলেছে তার ঠোঁটে ৷
রাতের হাওয়ায় বাঁশির সুর আর ভাতের গন্ধ ছোটে ৷
তারপরে কী হল তোমরা শুনতে আরো চাও?
বিশ শতকের শেষেও যদি আজও তোমরা চাঁদের হাটে যাও––
শুনবে সেসব কতদিনের কথা,
শুনতে শুনতে দুষ্টু ছেলেও ভোলে অবাধ্যতা ৷
আজও দেখবে চাঁদের হাটের মেয়ে এবং ছেলে
ঠাকুমাদের কোলে শুয়ে হীরুর গল্প গেলে ৷
সন্ধেবেলা, সাপকে যখন লোকে বলে লতা,
ঠাকুমারা বলবে হীরুর কথা ৷

ওদিকে তো গয়লাপাড়ায় উনিশশো নয় সালে
চাঁদ নেমেছে খালে ৷
বাঁশির সুরে কাঁপছে আকাশ-বাতাস
ঠিক তখনই বনের মধ্যে এক দারোগা, সঙ্গে সিপাই সাতাশ––
শিকার দেখা বাঘের মতো আসছে চুপি চুপি ৷
গায়ে তাদের খাকি পোশাক, মাথায় লোহার টুপি ৷
হীরু শুধু বাঁশি বাজায়, তখনো চোখ বন্ধ!
হাওয়ায় ভাসছে জ্যোৎস্নামাখা বুনো ফুলের গন্ধ ৷
গয়লারা এমন জোরে বাজাচ্ছেন যে? কাল কি যাবেন ফাঁসি!
হীরু আমার সঙ্গে তোরাও বাজা বাঁশি ৷
গোল হয়ে বোস কদম গাছের তলায়
আচ্ছা, তোরা দুস্থটাকে দিয়েছিস দুধ কলা?
গয়লারা দুধ দিয়েছি, ঘি দিয়েছি, খেয়ে দিয়েছে ঘুম ৷
খালের পাড়ে প্যাঁচা ডাকল, লক্ষ্মী না ভুতুম?
হীরু দৌড়ে যে যার বাঁশি নি’ আয়, চটপট সুর তোল––
গয়লাপাড়ায় অতিথ আসছে, খাওয়াবি নাকি ঘোল?
বিশ-পঁচিশটা বাঁশির সুরে ভরল গয়লাপাড়া––
ঘুম-ভাঙা সব পাখির বাসায় পড়ল ভীষণ সাড়া ৷
নেপথ্যে বজ্রকণ্ঠ হাম্বা থামা–– গরুগুলো! রাতদুপুরে ধরেছে সব বাঁশি!
গোটা গয়লাপাড়াকে আজ যদি না দিই ফাঁসি––
বলতে বলতে দারোগার দল হাজির ৷
দারোগা কী হচ্ছে সব! ছুঁচো, প্যাঁচা, পাজি?
গয়লাদের বুক করছে তো ঢিবঢিব
গয়লারা এজ্ঞে, আমরা কেষ্টভক্ত জীব––
দারোগা রাত দুপুরে কেষ্টলীলা? কই সে? কেষ্ট নেই?
চোখ ঘুরিয়ে দেখল হীরু, তাদের ঘিরে পুলিসবেষ্টনী!
লাফিয়ে হীরু দারোগার পায়ে পড়ে
হীরু এতক্ষণে পরান ফিরল ধড়ে!
জয় ভগবান, রাধে কেষ্ট, হরি!
দারোগা গো, সন্ধে থেকে আমরা ভয়ে মরি ৷
বাঁচান, মোদের বাঁচান!
ভুরু কুঁচকে দারোগা তার গোঁফজোড়াটি নাচান ৷
দারোগা একজন সেপাইকে এই, এটাকে সরা এখান থেকে!
গয়লাদের বাঁশি তোরা বাজাচ্ছিলি কে কে?
কেষ্টভক্ত জীব ব্যাটারা, দাঁড়া দু হাত তুলে––
আদ্যোপান্ত সব কথা বল খুলে ৷
বাঁশি কেন বাজাচ্ছিলি বল?
হীরু শুনি, বাবু, হীরু ডাকাতের দল

পাখি প্যাঁচার নকল করে আগাম খবর নেয়––
তারপরে ঝাঁপ দেয় ৷
আজ হল কী––
রাজার লোক তো লুটে নে গেল ঘি––
দারোগা আহ! ওসব শুনতে চাইছি না––
হীরু না, না, সেসব কাঁদুনি গাইছি না––
যার যেমনটি কপাল বাবু ৷ আজকে হঠাৎ শুনি
তক্ষক আর প্যাঁচা ডাকছে ৷ শুনে তো তক্ষুনি––
দারোগা আই সি! কতদূরে–– ক’বার ডেকেছিল?
হীরু ছ-মাইল, বা হয়তো ন-মাইলও
হতে পারে ৷ ক’বার?
একজন গয়লা আজ্ঞে, ন-বার ৷
আরেকজন গয়লা সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, ছ-বার ৷
দারোগা নয়-ছয়ের জ্ঞান নেই রে মূর্খ, গয়লা হওয়াই মানায় ৷
একজন সেপাই হুজুর, বলুন সব কটাকে ধরে নিয়ে যাই থানায়?
দারোগা বকিসনি–– চুপ কর!
থানা গোয়ালঘর?
হীরু আজ্ঞে কত্তা, মোদের মাথায় শুকনো গোবর পোরা
দারোগা বাঁশি কেন বাজাচ্ছিলি তোরা?
ভয়ে কি কেউ বাঁশি বাজায়?
হীরু বাঁশিপাগল রাখাল রাজা––
তাঁরে––
দারোগা আরে!
তুই-ই একা কথা বলছিস? তুই কি এদের মোড়ল?
হীরু আজ্ঞে হুজুর ৷ বুড়ো মানুষ–– ঘরে বসেই থোড় ওল
যখন যা পাই কাটি––
আর কী, এবার নিলেই হল মাটি!
বয়েস তো কম নয় ৷
এখন শুধু মনে একটাই ভয়––
ভাগ্যে আছে হীরুর হাতে অপঘাতে মরা?
দারোগা
একজন সেপাইকে বলছি না এই বুড়োটাকে সরা!
গয়লাদের সত্যি করে বল––
এপথ দিয়ে যায়নি হীরুর দল?
রণ-পা চড়ে–– কিংবা ঘোড়ায়? হাতে সবার মশাল––
এসব যখন ঘটছে তখন ঠিক উনিশশো ন’সাল
হীরু শুনেই কেমন ঘাম বেরোচ্ছে দেখুন
গয়লারা হীরু দেখেও বেঁচে থাকব? আমরা শাল না সেগুন?
দারোগা মনে মনে যেখানে যাই সেখানে নেই!
বের হলাম কী কুক্ষণেই!

হঠাৎ সেপাইদের রেডি! কুইক মার্চ!
প্রত্যেকটা ঘর কর গে সার্চ ৷
এরা যে সব সত্যি বলছে আমি প্রমাণ চাই ৷
উড়িয়ে দ্যাখ যেখানে যত ছাই ৷
হীরু ডাকাত কি গো বিড়াল, না কি টিয়ে?
পুষব ঘরে দুধ আর ছোলা দিয়ে!
একজন গয়লা একে আমরা হীরুর ভয়ে কাবু––
হীরু মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা দেন বাবু?
দারোগা ছেঁদো কথায় কান দিবি না–– যা––
ভেঙে দেখবি প্রতিটি দরজা ৷
বাসিন্দারা ক’জন সেটা গুনিস ৷
এমন সময় খালের পাড়ে বেজে উঠল শিস ৷
দারোগা হল্ট! অ্যাটেনশান! সবাই ফেরো!
খালের পাড়ে জঙ্গলটা ঘেরো ৷
দৌড়ে, কিন্তু পা টিপে টিপে চল––
শয়তানটা জানে নানান ছল
উত্তেজনায় দারোগার চোখ জ্বলে
সেপাই নিয়ে ঢুকল সোজা খালপাড়ের জঙ্গলে ৷
এবারে শিস বাজল দূরের বনে ৷
পঁচিশ হাজার ঝমঝমাচ্ছে দারোগাটার মনে ৷
হীরু গয়লাদের সময় নেই আর–– যাচ্ছি এখন, আবার আসব ফিরে ৷
গয়লারা জলদি এসো ৷ ভোরটা হলেই ভোজ দেব দই-চিঁড়ের ৷
একদিকে খাল, আরেক দিকে সামন্তদের বন
সেই যেখানে রয়েছে তিন জন,

পান্না বিলু ঘোড়া,
সেইখানে এক জোড়া
শঙ্খচিলের নকল ডাকে থামল হীরু ডাকাত ৷
হীরু কী অপরূপ অরণ্যের এই রাত!
পান্না, বিলু বেরিয়ে এল সঙ্গে নিয়ে হীরুর ঘোড়াটিকে
হীরু চড়ল ঘোড়ায় আর ছেলেরা যায় গয়লাপাড়ার দিকে ৷
হীরুর ঘোড়া হল এবার কালবোশেখির ঝড়
ঝড়ের মতোই ছুটছে ঘোড়া–– দুপাশে ধর-ধর
করে যেন ধাওয়া করছে পাহাড়ী জঙ্গল ৷
হীরু ঘোড়াকে এখানেই থাক–– খেয়ে নে মিষ্টি জল ৷
বলে হীরু একা-একাই গেল রাজার বাড়ি ৷
প্রহরীরা সিদ্ধি খাচ্ছে, কেউ বা খাচ্ছে তাড়ি
কেউ বা লম্বা টান দিচ্ছে গাঁজায়
প্রহরীরা হো রামারে, সারে গামারে, ঘরমে নেই হ্যায় রাজা
আওরে দোস্ত, গাওরে দোস্ত, খাওরে খৈনি গাঁজা ৷
হীরু রাজা নেই তো কেয়া হুয়া?
হুক্কা হুয়া হুক্কা হুয়া
তোরাই তো আজ রাজা
ঘুরে ঘুরে ফিসফিসিয়ে বলল নিজের দলকে
বেশি করে সেজে দে গাঁজার কল্কে ৷
এক দল নিস বল্লম আর এক দল নিস খাঁড়া
একে একে সবাই উঠে দাঁড়াস ৷
আস্তে আস্তে আড়ালে চলে যা
মাতাল এরা, এগোবে না এক পা ৷
মনে রাখিস, মশাল যেন নিমেষে ওঠে জ্বলে ৷
শিস শুনলেই ঝাঁপিয়ে পড়বি জয় মা কালী বলে!

অনেক দিনের কথা–– তখন উনিশশো নয় সাল ৷
রে-রে শব্দে জ্বলে উঠল অসংখ্য মশাল!
রাজবাড়িতে ঝড়ের মতন ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা––
দৌড়ে এল এগারজন–– ভিতরবাড়ির অস্ত্রধারী যারা ৷
হীরু জয় মা কালী, হরিবোল!
মাথার ওপর দু-হাত তোল
বাধা দিলেই যমের বাড়ি যাবি ৷
মা-বোনেরা, বার করে দিন সিন্দুকের সব চাবি ৷
ভয় নেই গো, যেমন আছেন থাকুন
গায়ের গয়না মেঝেয় খুলে রাখুন ৷
আমি হীরু ডাকাত
নারী-শিশুর গায়ে দিই না হাত ৷
রাজবাড়িতে হুলুস্থুলু
প্রহরীরা ঢুলুঢুলু
এগারজন অস্ত্রধারী দু-হাত তোলা পুতুল ৷
হীরু গয়লাপাড়ায় অত্যাচারের করে গেলাম উশুল!
রাজা ফিরলে বলিস
দু-কুড়ি লোক–– যাদের বাহন মহিষ
বাংলা-বিহার ছেড়ে গিয়েছে, ফেরার উপায় নেই
তাদের গলায় ফাঁসের দাগ এখনো শুকায় নি ৷
মোষ আর গাড়ি নিয়ে গেলাম আমি––
হীরুর পায়ে রাজা মশাইয়ের সামান্য প্রণামী!
দলের লোকদের কটা বস্তা হল?
দলের লোকেরা তিন কুড়ি আর ষোলো ৷
হীরু গয়নাগাঁটি, খাবার-দাবার নিয়েছিস তো সব?
কয়েকজন ডাকাত সব নিয়েছি, এমনকী ওই সাত বস্তা যব––
হীরু ঘি?
কয়েকজন ডাকাত তাও নিয়েছি ৷

মোষের গাড়ি বোঝাই করে গয়লাপাড়ায় যখন ফিরল তারা
ভোরের আলো তখনো সূর্য-হারা ৷
অন্ন-বস্ত্র, সোনা-দানা, হারানো ঘিয়ের হাঁড়ি
পেয়ে তো সব গয়লাবউরা পরল নতুন শাড়ি ৷
গয়লারা কেউ ঘুমোয়নি আর রাতে
সূর্য ওঠা মাত্র তারা নৃত্য-গীতে মাতে ৷
গয়লারা বাজা, কলসি বাজা
এলেন রাখাল রাজা!
হীরু ডাকাত মোদের ভগবান ৷
জান বাঁচাল মান বাঁচাল
হীরুই ভগবান ৷
ঘর ভরবে দুধে-ঘিয়ে
ধানের খেতে ধান
হীরু ডাকাত মোদের ভগবান ৷
হীরু দুস্থ লোকটা ঘুমোচ্ছে কি? যা তো ডেকে আন––
সেই যে সেই মুমূর্ষুপ্রায় অতিথ––
একজন গয়লা ওই তো গাইছে গীত
দুস্থ লোক আহারে, এ কী মহৎ দৃশ্য!
হীরুর কাছে এসে আমায় করো তোমার শিষ্য ৷
হীরু ডাকাত দেখে দুচোখ জুড়োয় ৷
হীরু গয়লাদের খুদকুড়োয়
পেট ভরেছে? ঘুম হয়েছে কাল?
এই নাও গো, তোমায় দিলাম আমার গায়ের শাল––
এবার কী চাও? মাথা?
দলের লোকেরা সর্দার, এসব বলছ কী যা তা!
হীরু দলের লোকদের তোরাও এবার যে যা নিবি নে,
যাকে যা দিবি দে––
এবার আমার ছুটি ৷
দলের লোকেরা সর্দার, তোমার দুটি
পায়ে পড়ি, শোনো––
দুস্থ লোক তোমায় ছাড়া বাঁচব না একজনও ৷
একজন ডাকাত সর্দার, এই পরগাছাটা কে?
দুস্থ লোক বাড়ি আমার সরগাছা গাঁয়ে ৷
একজন গয়লা সরগাছা গ্রাম? সুনাম শুনি ওদের সরভাজার––
হীরু লোকটা বড্ড গরিব, ভাবছি, পায় যদি ও পুরো পঁচিশ হাজার––
দলের লোকেরা সত্যি ভাবছ ধরা দেবে? ফেলব এটার লাশ!
দুস্থ লোক আপনারা কি পাগল হলেন? আমি কি কালিদাস?
যেই ডালটায় বসে খাচ্ছি সেটাই কাটব? তাছাড়া এই এমন মহৎ প্রাণ
ধ্বংস করব জেনেশুনে? আমি কি শয়তান?
আমি কি নরাধম?
কয়েকজন ডাকাত এই নে রে চাল গম
সঙ্গে কিছু টাকাও দিলাম–– এবারে বাপ কাট––
হীরু থাক না, বরং সঙ্গে যাবে সোজা চাঁদের হাট ৷
দুস্থ লোকটিকে যাবে নাকি? দুদিন পরে বউকে নিয়ে এসে
থাকবে সুখে নদীর পাড়ের দেশে ৷
দলের লোকদের তোরাও এবার যে যার গ্রামে ফের
টানিস না আর এই ডাকাতির জের ৷
ধান ফলাবি, পাট ফলাবি, পালবি মুরগি মৌ,
দেখিস কষ্ট না পায় গাঁয়ের বউ ৷
হীরুর কথা শুনেই–– ওই যে নিলু বিলু আর পান্না
কান্না গিলতে গিয়েও ফেলল কেঁদে
নিলু-বিলু-পান্না বাঁচতে চাই না, বাঁচতে চাই না, আর এ ছার প্রাণ না!
গয়লাদের গয়লাভাইরা, বলছিলেন না–– খালে ফেলবেন, গায়ে পাথর বেঁধে
হীরু এই ছেলেরা, হচ্ছে কী?
হীরু তোদের মরছে কি?
বাবা-মায়ের বড় কি কেউ আছে?
যা বাপ, তাদের কাছে ৷
ততক্ষণে গয়লাপাড়ায় থেমেছে গান-বাজনা
গয়লারা থাকতে আপনি আসেন নি গো, যাবেন ঠাকুর–– আজ না ৷
গয়লাবউয়েরা আজ খেয়ে যাও পায়েস-পিঠের ভোজ
গয়লারা আমরা কি আর পাচ্ছি তোমায় রোজ?
হীরু আজ যে তোরা মনের সুখে খাবি
সেটাই আমার সকল সুখের চাবি ৷
থামাসনি নাচ গান––
ওতেই আমার জুড়োবে মন প্রাণ ৷
সকলকে বিদায় দে রে এবার
দলের লোকেরা কে বটে তুমি মিথ্যে হুকুম দেবার!
হীরু হুকুম দিচ্ছে হীরে
এক্ষুনি যা ফিরে ৷
ডাকাতদল তো জানে না আর হীরুর হুকুম বিনে ৷
যেমন বিষাদ বাজতে থাকে ঠিক বিজয়ার দিনে
সবার মনে তেমনি বিষাদ, মুখগুলি সব ভার ৷
কয়েকজন ডাকাত সর্দার তোমায় বলছি এ শেষবার––
হীরু আমার হুকুম শুনিস নি কি? হুংকারে কি কাঁপাব তল্লাট?
একজন ডাকাত একটা কথা, যাচ্ছ চাঁদের হাট?

হীরু ছোট্ট একটা কাজ রয়েছে, সেটা সেরেই বেরিয়ে পড়ব দূরে
পৃথিবীটা দেখব একটু ঘুরে
বিশেষ করে বিন্ধ্য-হিমালয়––
পুব আকাশে ওই চেয়ে দ্যাখ আলোর দিগ্বলয় ৷
যা রে এবার ৷ বিদায়!
ডাকাতদলও জানত না এই ছেড়ে যাওয়া কী দায়!
চোখের জলে বুক ভিজিয়ে গেল যে যার পথে ৷
হীরু দুস্থ লোকটিকে যাবে তো চলো, ওঠো আমার রথে ৷
বলেই হীরু লাফিয়ে উঠল ঘোড়ায়
খাল পেরোবার সময় দ্যাখে খালের জলও ভোরের আলোয় মোড়া ৷
বনের পথে যাচ্ছে হীরু, একই ঘোড়ায় দুজন ৷
হীরু পেছনের লোকটিকে শুনতে পাচ্ছ? আহ কী পাখির কূজন!
ভোরবেলাকার বনের মজাই এই!
লোকটি ঠাকুরের আজ ভাসান যেন, আহারে, আজ সঙ্গে গজা নেই!
গয়লাবউ ভেজে দিয়েছে–– এই নাও গো, সরভাজা আর পুরি
বলেই সোজা হীরুর পিঠে বসিয়ে দিল ছুরি ৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন